ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sc

 

 

আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়

লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

Advertisements

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

প্রথম পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

http://wp.me/p1sCvy-2hE

 

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

১৯৪৮ সালের বৃটিশ কলোনি শাসকমুক্ত মায়ানমারের জন্মের আগে থেকেই দমন নির্মুল আর নির্বিচারে হত্যা, এই রাষ্ট্রকে ধরে রাখার একমাত্র উৎস হয়ে গেছে ও আছে। বার্মা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যায় আকর্ণ ডুবে থাকার সমস্যা ওর জন্মের সময় থেকেই।  মায়ানমারের সবচেয়ে বড় এথিনিক জনগোষ্ঠি হল  ‘বার্মান’ বা ‘বর্মীজ’; এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ। এই বর্মী জনগোষ্ঠির রাষ্ট্র জন্মের পর থেকেই এর মূল সংকট হল অভ্যন্তরীণ অন্যান্য এথিনিক জনগোষ্ঠির সাথে সংঘাত;  অন্যভাবে বললে, বর্মীছাড়া অন্য এথিনিক জনগোষ্ঠিকে বর্মীজদের নিজেদের কর্তৃত্বের নিচে দাবায় রাখাকেই একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নেওয়া – এটাই সব বৈরীতা ও সংঘাতের উতস। অথচ এক ফেডারেল ব্যবস্থা হতে পারত এর সহজ সমাধান। বৃটিশ শাসনামলেও মায়ানমারে কোথাও কোথাও স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ ছিল।  কিন্তু ১৯৪৮ সালে জন্মের পর থেকে মায়ানমারে কোন ফেডারেল ব্যবস্থা  চেষ্টা না করে বরং পুরানা স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে সবকিছু বর্মীজদের অধীনে আনার জবরদস্তির চেষ্টা করা হয়েছে। আর তা থেকেই শুরু হয়েছে Bamar. Chin. Kachin. Kayin. Kayah. Mon. Rakhine. Shan ইত্যাদি জনগোষ্ঠির বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র ততপরতা। পরে সামরিক ক্যু করে জেনারেল নে উইনের বিগত ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলের পরও সেই বিচ্ছিন্নতাবাদে আকর্ণ ডুবে থাকা  অবস্থা থেকে বের হতে মায়ানমারের সরকারগুলো  “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” চর্চাকে উপায় হিসাবে হাজির করেছে। এই “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর আর নাম  “মায়ানমারিজম”। ফলে মায়ানমার রাষ্ট্রের আকার পরিচয় হয়েছে, “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী” ভিত্তিতে গড়া এক রাষ্ট্র। একমাত্র এতেই তারা ‘এক’ থাকতে পারবে  এমন আঠা বা গ্লু এর নাম হয়েছে “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ”, আর এর জিগির। যদিও এই নামের আড়ালে আসলে এক তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ চর্চা করে এসেছে তারা।  ব্যাপারটা পরিস্কার হবে মায়ানমারকে ধর্মীয় জনসংখ্যার দিক থেকে দেখলে। গত ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মায়ানমারের প্রায় ৮৮ ভাগ বৌদ্ধ,  ৬ ভাগ খ্রীশ্চান ও ৪ ভাগ মুসলমান। জনগোষ্ঠির বড় অংশ বৌদ্ধ বলে, এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বয়ান তৈরি করে ফেলা হয়েছে যা আবার ইসলাম বিদ্বেষী করে সাজানো – একে নিজের রাজনীতিক ভিত্তি হিসাবে বেছে নিয়েছিল নে উইন সরকার। নে উইনের অনুমান ছিল এতে মুসলমান বাদে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী জনগোষ্ঠিগুলোকে (প্রায় সবাই আবার বৌদ্ধ বলে ) “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর পরিচয়ে বেধে রাখতে। এতে  পুরান বর্মীজ আধিপত্যটা উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের (ইসলাম বিদ্বেষ) আড়ালে থেকে শাসনকাজ চালাতে পারবে। আবা ইসলাম বিদ্বেষী এই বয়ানটা  “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে” উগ্র আর গাঢ় হতে সাহায্য করবে। মুসলমানেরা সব বৌদ্ধ জনগোষ্টির কাছে এক ইমাজিনড কমন শত্রু হিসাবে হাজির করবে।  এটাই অনেকে মায়ানমারিজম বলে। এই মায়ানমারিজম তৈরি করতে পারার প্রথম সফলতা আসে ১৯৭৭ সালে। একারণে ১৯৭৭ সাল থেকে নে উইন তৈরি রোহিঙ্গা সমস্যার প্রথম প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিল এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী আসর জোয়ার দেখা গিয়েছিল। পরে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মায়ানমার বেশীর ভাগ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও, আবার ১৯৮২ সালের নতুন ইমিগ্রেশন আইন সবকিছুকে আগের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে যায়।  এরপর ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর এর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত থেমে থেমে সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা নির্মুল অপারেশন বিভিন্ন সময় চলেছে। এরপর আগের ‘মায়ানমারিজম’ সাথে এবার বয়ানে ‘ইসলামি সন্ত্রাসের’ অভিযোগ তুলার সুযোগ যুক্ত হয়েছিল। ফলে তা নিজের দানবীয় উগ্রতার পক্ষে আরও সাফাই নিয়ে হাজির হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে এক বৃটিশ সাংবাদিক ১৯৭১ সালের প্রথমার্ধে অভিযোগ করেছিলেন আপনি পুর্ব-বাংলার শরনার্থী লোকদেরকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করছেন। ইন্দিরার জবাব ছিল, ওরা কোনটা আগে হয়েছে, শরনার্থী না মুক্তিযোদ্ধা? একথার মধ্যে সব জবাব আছে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা বুশ-ব্লেয়ারের ২০০১ সালে ওয়ার অন টেররের যুদ্ধ শুরু আগে থেকেই রোহিঙ্গারা শরনার্থী হয়েছে। কাজেই একথাটা মোদি-সুচির সন্ত্রাসের বয়ান ও অভিযোগকে ভিত্তিহীন করে দেয়।

তাই বলা যায়, মায়ানমারের মুল সংকট রোহিঙ্গা বা মুসলমান ছিল না, নয়। বরং ‘মায়ানমানিজম’ এই বয়ান হাজির করার দরকারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। আর এটা বলা বাহুল্য ৮৮% বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির দেশে ৪% মুসলমান নিজে ভিকটিমই হয়, অত্যাচারিত মজলুমই হয়। অন্যের উপর অত্যাচার নির্যাতনকারি বা অন্যকে নির্মুলের কর্তা সে হতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে সে সুযোগ বিরাজ করে না।

মায়ানমান পরিস্থিতি ২০০৬ -৭ সাল থেকে এক নতুন মাত্রা পায়। আর ততদিনে মায়ানমার ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের নিন্দা ও অভিযোগের মধ্যে আর  আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ রকমের অবরোধের অধীনে। এমনিতেই জেনারেল নে উইনের শাসনামলে (১৯৬২-৮৮) বার্মা ছিল বাকশালী সমাজতন্ত্রের মত এক ‘নে উইনি সমাজতন্ত্রের’ অধীনে;  আর এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ ছিল জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-বিদ্বেষ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মায়ানমার এমন হওয়ার পিছনে ওর দুটা গঠন বৈশিষ্ট উল্লেখযোগ্য।

এর একটা হল জেনোফেবিক যার উৎস হল ভারতবিরোধীতা। ১৮২৪ সালে বৃটিশদের বার্মা দখল নিবার পর থেকে,  বার্মাকে ভারতের এক প্রদেশ (১৮২৪-১৯৩৭) বানিয়ে কলোনি শাসকেরা শাসন চালাত। [১৯৩৭ সালের পর থেকে বার্মা সরাসরি বৃটিশ শাসিত কলোনি হয়েছিল।] এতে ভারতীয় নেটিভদের মাধ্যমে বৃটিশরা শাসন করত, ফলে ভারতীয় কর্মচারি বা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেখানে ইত্যাদি। আর এখান থেকে একধরণের ভারতবিদ্বেষী জেনোফোবিক বৈশিষ্ট বার্মার জনমানসে ও  রাজনীতিবিদদের মধ্যে গেড়ে বসেছিল। ফলে বৃটিশেরা ১৯৪৮ সালে বার্মা ছেড়ে যাবার পর পর বহু ভারতীয় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর একই কারণে, ১৯৬২ সালে নে উইন সামরিক ক্যুতে ক্ষমতা দখলের পরে প্রায় চার লাখ ভারতীয় বার্মা ত্যাগ করেছিল অথবা মারা গিয়েছিল। (see Thant Myint-U’s recent fine historical travelogue, Where China meets India).

আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হল, ১৯৪২ সালের আগে সেকালের জাপান – কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক জাপান – এই কলোনি মাস্টারের হাতে সেকালের বার্মার স্বাধীনতা- যোদ্ধাদের সামরিক ট্রেনিং হওয়া। বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে কেড়ে নিবার পরিকল্পনায়, জাপানিজ কলোনি মাস্টার  মার্শাল তেজোর বাহিনীর হাতে, বেছে নেওয়া ত্রিশজন রাজনৈতিক তরুণ সামরিক ট্রেনিং পেয়েছিল। যারা পরে দেশ ফিরে প্রথম সামরিক সংগঠন ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’ বানিয়েছিল আর ১৯৪২ সালে জাপানিজ বাহিনীর সহায়তায় এরাই বৃটিশদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। সু কি বাবা অং সান (Aung San) এর নেতৃত্বে উ নু (U Nu) আর নে  উইন (Ne win) ও রাখাইন রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ – টপ এদের নেতৃত্বে ছিল সেই ত্রিশজনের দল। এদের নেতৃত্বেই নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে বার্মার সামরিক বাহিনীর ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’  (Burma Independence Army (BIA) গড়া হয়েছিল। বলা হয় জাপানিজদের দেয়া নির্মমতার ট্রেনিং, নির্যাতনের টেকনিক সেই থেকে বর্মীজ সেনাবাহিনীতে বৈশিষ্ট হয়ে যায়। পরে অবশ্য ১৯৪৫ সা্লে এসে এরা সবাই জাপান এম্পায়ারকে ছেড়ে বৃটিশ এম্পায়ারের পক্ষে সুইচ করেছিল। আর পরে এই ত্রিশ কমরেড এরাই ১৯৪৮ সালে নিগোশিয়েশন করে বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেছিল। আজও মায়ানমারে সব রাজনৈতিক সামাজিক গোষ্ঠির মধ্যে তাদের চিন্তা ও বয়ানে (সস্তাবুঝের) দেশপ্রেম ও জাতীবাদের উদাহরণ বা হিরো হয়ে আছে ঐ ত্রিশ জন। গেড়ে বসা ঐ ত্রিশজন সম্পর্কে নানান মিথ এবং তাদের চিন্তা ও বয়ান ভেঙ্গে নতুন করে তা ভেবে দেখা, ফিরে দেখা আর নতুন করে মুল্যায়নের সাহস না হওয়া পর্যন্ত মায়ানমারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি তার নির্মমতা, নির্মুলের সামরিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
কিন্তু এখনকার মূল প্রসঙ্গ হল, কলোনি শাসক জাপানিজদের হাতে জন্ম হবার কারণে ‘রাজনীতি’ বিষয়টাকে এই ‘ত্রিশ জেনারেল’ যতটা ক্ষমতা, সামরিকতার দিক থেকে বুঝেছিলেন ঠিক ততটাই যেন রাজনীতি বলতে একই সাথে আইডিয়া বা চিন্তাও – এদিকটা বুঝতে ব্যর্থ ছিলেন।  রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা ও সামরিকতা নয়, এর অন্যদিকও আছে। অন্যভাবে বলা যায়, একারণে বলা যায় মর্ডান রিপাবলিক স্টেট অথবা আধুনিকতা সম্পর্কে ততটাই তাদের জানাশুনার অভাব দেখা যায় বা তারা কম আগ্রহী ছিলেন। এই ঘাটতির কারণে পরবর্তিকাল  ঐ ত্রিশজনকে দেখা যায় দুটা ঝোঁকের পক্ষে ভাগ হয়ে যেতে; যারা রাজনীতিতে গেলেন আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলেন, এভাবে। সামরিক ধারায় যারা ছিলেন যেমন এদের শিরোমনি জেনারেল নে উইন, তার অভিযোগ রাজনীতিবিদ ধারার শিরোমনি উ নু এর প্রতি যে এরা কম দেশপ্রেমিক, এরা নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবে, এরা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে জানে না (অর্থাৎ কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন) ইত্যাদি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাস হল ঐ ত্রিশজন ও তাদের অনুসারীর – যারা রাজনীতিতে গেল আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলে এই দুভাগ হয়ে যাওয়া – আর পরস্পর পরস্পরের খামতি পুরণে দুপক্ষই অযোগ্য হিসাবে থেকে যাওয়া। যা একালেও রাজনীতিক বনাম সামরিক অফিসার এভাবে ভাগ হয়ে থেকে গেছে। মায়ানমার রাষ্ট্রের বৈশিষ্টেও এর বিরাট ছাপ রয়ে আছে।  মায়ানমারই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কমান্ডার ইন চিফ আর রাজনীতিক রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। এতে যেন খোদ রাষ্ট্রটাই ভাগ হয়ে আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এক ঠিকই কিন্তু তার আবার দ্বৈত-নির্বাহী।  এক ঘরে দুই পীর যেমন বসবাস করে থাকতে পারে না, দ্বৈত-নির্বাহীও তাই। নির্বাহী বা একজিকিউটিভ একজনই হয়, হতে হয়। নইলে সেটা ক্ষমতাই নয়। তাই কার্যত মায়ানমারে প্রধান একজিকিউটিভ হয়ে আছে সামরিক বাহিনী। যেমন ১৯৬২ সাল থেকে  সর্বেসর্বা হয়ে আছে এক মেলেটারী কাউন্সিল। এই কাউন্সিল হল আসলে পিছনে এক সামরিক বাহিনী আছে, যার মধ্যকার ক্ষমতার বিন্যাস বা সাজানো কাঠামোর শীর্ষ স্থানটাই হল কাউন্সিল। এরপর এর কাউন্সিলের অধীনে আবার একটা রাষ্ট্রও আছে। অর্থাৎ যেমন আমরা দেখতে অভ্যস্ত যে, রাষ্ট্রের ভিতরে সামরিক বাহিনী বলে এক প্রতিষ্ঠান থাকে। এখানে এর উলটা; সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানটা হল কাউন্সিল, আর সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটা রাষ্ট্রও আছে।  এখানে আবার  কমান্ডার ইন চীফ আর কাউন্সিল কথাটা সময়ে পাল্টাপাল্টি করে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যখন সামরিক ক্ষমতার একটা অংশ সিভিলিয়ান ফেসে হাজির রাখার অবস্থা তৈরি হয় তখন সামরিক বাহিনীর আবার একটা রাজনৈতিক দলও আছে। বাহিনীতে সক্রিয় চাকরিতে আছে এমন অফিসার আর অবসর নেয়া বুড়া জেনারেলরা এই দলের সদস্য হয়।  এর নাম Union Solidarity and Development Party (USDP)।  গত ২০১০ সালের আগে এটা সামরিক বাহিনীর এক এসোসিয়েশন নামে ছিল। এখন সেটাই এক রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দল। আর সবচেয়ে বড় কথা হল,  কমান্ডার ইন চীফ চাইলে যে কোন নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারে। গত ২০১৫ সালে সংসদ ঐ  USDP দলের দখলে ছিল, তখন একটা প্রস্তাব উঠেছিল ভেটো ক্ষমতা রদ করা হবে কী না এনিয়ে। যদিও বাহিনী শেষ এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।  তা নিয়ে বিবিসির ২০১৫ জুনের এই রিপোর্টটা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
দ্বৈত- নির্বাহী ক্ষমতার কথা উঠেছিল, মায়ানমারের  কমান্ডার ইন চিফ নিজেই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র  ও সীমান্তরক্ষা এই তিন মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে থাকেন আর প্রেসিডেন্ট প্রধান নির্বাহি তিনি বটে, কিন্তু তিনি ঐ তিন মন্ত্রীকে মেনে নিয়ে এবার বাকী মন্ত্রী নিয়োগ দেন। ফলে নে উইনের হাতে আর্মির সেট করে দেওয়া এই বিশেষ রাষ্ট্র বৈশিষ্ট – ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ -এর  ভিতরে অধীনে থেকে সু কি কে নোবেল প্রাইজের ধ্বজাধারী হতে থাকতে হয়, কাজ করতে হয়। এব্যাপারটা সুকি চায় কী চায় না তাতে কোন ফারাক আসে না। অর্থাৎ কার্যত সুকিও এই মায়ানমারিজম চায়। এজন্য গত সপ্তাহে বিবিসি লিখেছে, “মিয়ানমারে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্যানিং  বিবিসিকে বলেছেন তিনি (সু চি) রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। ‘বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’ সেদেশ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাকে সমর্থন না করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে”। আবার একই কারণে সু চি এর জীবনীকার উইন্টেলের বরাতে বিবিসি ঐ রিপোর্টেই লিখছে,” ………তিনি (সু চি) এখন সেনা বাহিনীর পকেটে”। ………”মিস সু চি হাড়ে মজ্জায় বার্মিজ। আমার বলতে খারাপ লাগছে – কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের পশ্চিমে রাখাইনে যা ঘটছে তা চরম জাতিবিদ্বেষী। সেখানে মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সমন্বিত বিদ্বেষ রয়েছে”।

তাহলে ২০০৬ -৭ সাল থেকে মায়ানমার পরিস্থিতি নতুন কী মাত্রা পেয়েছিল? গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৮৮ সালে নে উইন দৃশ্যত পদত্যাগ করলেও ক্ষমতা নেন তারই শিষ্য জেনারেলেরাই। ক্ষমতা ও রাজনীতি বলতে যারা একটাই জানে  – দমন ও নির্মুল – ফলে সেই পুরানা অভিজ্ঞতায় প্রায় কয়েক হাজার লোক মেরে দমিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার কাউন্সিল’ এই নতুন নামে ক্ষমতা নেন এবার জেনারেল স মং (Saw Maung)। পরবর্তিতে অবশ্য তিনি নিজেই মাত্র ৫০০ জন ‘দুষ্ট লোক’ সরিয়ে ফেলার কথা নিজেই গর্ব করে পাবলিককে বলেছিলেন।  এই সময় থেকে কথিত ‘নে উইনি সমাজতন্ত্র’ তিনি নিজেই ও তার সরকারকে সরে যেতে, গড় হাজির হতে শুরু করিয়েছিলেন। আর  ১৯৯০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন দেয়া হয়, কিন্তু বিরোধীরা জিতলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং সে নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করে দেয় জেনারেলেরা।  পরবর্তিতে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মায়ানমার একের পর এক পশ্চিমের (আমেরিকা ও ইউরোপের) স্যাংসন বা বাণিজ্য লেনদেন অবরোধের মুখে পড়ে যায়। এই অবস্থায় বাইরের প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে মায়ানমারের বাণিজ্য বিনিয়োগ লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম থেকে যায় পড়শি চীন। ফলে একমাত্র চীনের ভিতর দিয়ে যতটুকু বাইরের দুনিয়ার সাথে বার্মার সংযোগ সম্পর্ক বজায় ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মায়ানমারে চীনা বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ২০০২-৩ সালের পর থেকে। এমন অবস্থায় ২০০৬ -৭ সালের দিকে এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতি হিসাবে  চীন ও ভারত নিজ নিজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকেই মায়ানমারের গ্যাস কেনার (বুকিং ও চুক্তি) জন্য প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এই সময় থেকেই অবরোধের ব্যাপারটাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়।

ততদিনে আবার, আমেরিকা নীতি পলিসিতে এশিয়ায় ভারতকে কাছে টেনে চীন ঠেকানোর চর্চা পোক্ত নির্দিষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে ভারতের মাধ্যমে বার্মার অবরোধ তুলে নেওয়ার এক ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। এই অবস্থানের পিছনে যে মুল্যায়ন কাজ করেছিল তা হল মায়ানমারের উপর অবরোধ দেওয়াতে কোন লাভ হচ্ছে না। বরং পশ্চিমের অবরোধের সুফল চীন একা খাচ্ছে। তাই ভারতের মধ্যস্থতায় অবরোধ তুলে নেওয়ার নতুন ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। পশ্চিম পরিস্কার জানত, মায়ানমার কোন গণপ্রজাতন্ত্রী নয়, সামরিক বাহিনীর পকেটের রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও  সু চি কে কেবল ঐ কাঠামোর উপরে এক সিভিলিয়ান ফেস হিসাবে সামনে রেখে সামরিক ক্ষমতাটাই চালু রাখার পক্ষে নাম কা ওয়াস্তে এক সংস্কার করার পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। এই হল সেই ফর্মুলা। কেন “দ্বৈত নির্বাহী” এই ভুতুড়ে ধারণার ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসাবে আমরা এখনও মায়ানমারকে দেখছি – এর মূল কারণ এটা। যেমন এর আর এক বৈশিষ্টবলছিলাম যে, এই রাষ্ট্রে কমান্ডার ইন চীফ সরকারের কোন নির্বাহী সিদ্ধান্তের উপর ভেটো প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাহী সরকার একমাত্র বা একক নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী নয়, এটা এক সতীনি ক্ষমতা বলেই এমন বাক্য রচনা এখানে সম্ভব হচ্ছে। আর ২০০৮ সাল থেকে চালু যে কনষ্টিটিউশনে এসব কথা লেখা আছে তা সংশোধন করতে গেলে ওতে শর্ত দেওয়া আছে যে, ৭৫% এর বেশী ভোটের সমর্থন থাকতে হবে। কিন্তু ৭৫% কেন? কারণ প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্র সংসদে ২৫% আসন সব সময় বাহিনীর জন্য রিজার্ভ করে রাখা আছে। অর্থাৎ সারকথায় কমান্ডার ইন চিফ রাজী না থাকলে ঐ ২৫% এর একটু সমর্থনও পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, ফলে কোন সংশোধনীও সম্ভব নয়।

আসলে সব কথার এক কথা বা সেই মূল কথাটা হল, ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছিল এই কনষ্টিটিউশন। আর তা একা মনের মাধুরি মিশিয়ে সামরিক বাহিনীই এককভাবে নিজের খাতিরে লিখেছিল। কিন্তু যারা কনষ্টিটিউশন লিখেছে এরা কারা? এদের হাতে ক্ষমতা দিল কে, কী তাদের ক্ষমতার ভিত্তি – এসব প্রশ্নের ভিতরে সব জবাব আছে। যার সোজা অর্থ মায়ানমার এখনও প্রি-ষ্টেট মানে রাষ্ট্রগঠনের আগের অবস্থায় বা কোন গণপরিষদ বা সংবিধান সভা বসার আগের অবস্থায় আছে।  এই অর্থে মায়ানমার এখনও কোন মর্ডান রিপাবলিকই নয়।

ফলে এই রাষ্ট্রের কাছে মানবাধিকার, জনগণের মৌলিক অধিকার এসব কথা অর্থহীন। আর ‘ডেমোক্রাসির নেতা সু চি’ এই শব্দ আর বাক্যগুলো তো আরও হাস্যকর।

অতএব পশ্চিম সংস্কারের নামে যেটা করেছে সেটা হল ঐ সামরিক স্বৈরক্ষমতাকে সিভিলিয়ান সু চির টোপর পরিয়ে ঐ ক্ষমতাকে উদ্ভোধন বা হালাল করে দিয়েছিল। বিনিময়ে তারা নিজের ব্যবসা বিনিয়োগের করার সুযোগ বুঝে নিয়েছিল। এমনকি এই লক্ষ্যে কোন ধরণের সংস্কারের কাজ শুরু হবার আগেই এমনকি তা আসলেই কতটুকু কী সংস্কার হয় তা দেখার আগেই ২০১০ সালেই আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম নিজের বিনিয়োগ নিয়ে  মায়ানমারে ঢুকে পড়েছিল। তবে এটা নিয়ে চীনের সাথে মায়ানমারের জান্তার কোন বিরোধ দেখা দেয় নাই। চীনের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক অটূট রেখে আপোষেই তা হয়েছিল। জেনারেলেরা বিশেষ করে প্রাক্তন জেনারেল ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি থেন সিন (যিনি ২০১৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন) চীনকে বুঝাতে পেরেছিল যে পশ্চিমের অবরোধ উঠে যাওয়া মায়ানমারের জন্য কতটা জরুরি। ফলে চীন যেন জায়গা ছেড়ে দেয়।  চীনও সেটা সহজেই মেনে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। আর এসবের ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই হঠাত কেবল ২০১০ সালেই মায়ানমারে বিদেশি ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হয়েছে ২০ বিলিয়ন, আর এর অর্ধেক হল একা চীনের।

কিন্তু ভারতের অর্জন কী এতে? না তেমন কোন বৈষয়িক বিনিয়োগ ব্যবসা, না প্রভাব – কোনটাই অর্জন হয় নাই ভারতের।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনদিনের মায়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। চলতি রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরনার্থী হওয়া প্রসঙ্গে,   সু চি বলেছেন,  “অসত্য খবর প্রচার করে রাখাইনে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে”। সু চি হামলাকারিদের “টেররিস্ট” বলেছেন। আর মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”।  কিন্তু এই সাফাই যুগিয়ে দেয়ায় ভারতের কোন লাভ হয় নাই। তবে মায়ানমার সফর থেকে মোদি কী অর্জন করতে চান এই প্রশ্নে বিবিসি কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিককে সাক্ষী মেনে অনেক কথা বলিয়ে নিয়েছেন। সুবীর ভৌমিক এই কথাগুলো ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তরফ থেকে আমাদের কাছে পৌছাতে চেয়েছেন, এটাও ধরে নিতে পারি। সুবীর বিবিসিকে বলছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য বিবৃতির মূল্য উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা”। মি ভৌমিক বলছেন, “রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার”। “মুসলিমদের প্রশ্নে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী এবং কট্টর বৌদ্ধরা মি মোদি এবং তার দল বিজেপির সাথে একাত্ম বোধ করে”। ভারত যে সম্প্রতি বিশেষ অভিযানের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেছেন, সেটাকেও দেখা হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনা অভিযানের প্রতি দিল্লির সমর্থন হিসাবে”। উপরে সি রাজামোহনের লেখায় দেখেছিলাম ভারতের বিনিয়োগ মুরোদহীনতার কথা। অর্থাৎ ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রশ্নে কোন অর্জন নাই। বরং বর্মীজ জেনারেলদের ইসলামবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়ার জন্য ভারত কাজ করছে। এই কাজটাই ২০০৮ সাল থেকে ভারত করে জেনারেলদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা হত্যার বড় ঘটনাগুলো ঘটতে পেরেছে বলে মনে করা হয়।

এবারের নতুন সংযোজন মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমার মাইন পুতে রেখেছে। মায়ানমার অল্প কিছু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা যে মাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ জাতিসংঘের কনভেনশন স্বাক্ষর না করা দেশ। বাংলাদশ এখন পর্যন্ত এনিয়ে জাতিসংঘে নালিশ বা সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতে যায় নাই। পলায়নপর আশ্রয়প্রার্থিদের জন্য মাইন পুতে রাখা হয়েছে, এরা কী কোন বিদ্রোহী? অর্থাৎ নিরীহ সাধারণ মানুষ কোন আশ্রয়ও না পাক, মায়ানমারের হাতেই তাকে মরতে হবে এই স্যাডিজম এখানে কাজ করছে।  আর এই স্যাডিজমকে মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”। তার মানে ব্যাপারটা দাড়াল যেহেতু ভারতের নিজ বিনিয়োগের সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাড়ানোর মুরোদ নাই, তাই তাকে নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে। বর্মী জেনারেলরা গণহত্যার ক্লিনজিং অপারেশনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকছেন ক্রমাগত, ভারতের এই মনোরঞ্জনে কোন জেনারেলের দায় কী কমছে? অথবা বার্মার সাথে চীনের সম্পর্কে কোন ফাটল? ভারতের উতসাহে বার্মার জেনারেলরা গত ফেব্রুয়ারির রোহিঙ্গা হত্যা অপারেশন ঘটানোর পরেও কী, এই এপ্রিলে চীনের সাথে বর্মার প্রেসিডেন্ট ১০ বিলিয়ন ডলারের বন্দর নির্মাণ চুক্তি করেন নাই?  তাহলে ভারতের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অর্জন কোনটাকে ধরেন? স্যডিজমে অন্যের শরীরে কষ্টের পিন ফুটানোতে সুখ?

[এই লেখা এপর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হয়েছে। তবে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। সেটা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

গৌতম দাস

২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

http://wp.me/p1sCvy-2hm

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

“I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

গৌতম দাস

২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

http://wp.me/p1sCvy-2hc

 

সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

[জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

“চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

গৌতম দাস

১৭ আগস্ট ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2h7

 

 

চীন-ভারত সামরিক সংঘর্ষ কী আসন্ন? সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় এটা নিয়েই জল্পনা-কল্পনা চলছে। ভুটানের  ডোকলাম উপত্যকায় মুখোমুখি হয়ে থাকা ভারতীয় ও চীনা সেনাদের এই অবস্থান আরো উত্তেজনাময় হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত মুখোমুখি অবস্থান ছেড়ে কেউ ফেরত যায় নাই। যদিও সৈন্য সমাবেশের সংখ্যা কমানো-বাড়ানো ঘটেছে সময়ে। কুটনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে চীনা দাবি হল, ভারতীয় সেনাদেরকে সবার আগে ঐ অবস্থান ছেড়ে  ফিরে যেতে হবে। এরপর ভারতের সাথে কথা হতে পারে, এর আগে নয়।  কারণ চীনের ব্যাখ্যা হল, বৃটিশ ও চীনা রাজশক্তির ১৮৯০ সালের  সীমান্ত চুক্তি  অনুসারে সেই থেকে ঐ স্থান আর কোন বিতর্কিত ভুখন্ড নয়, বরং চিহ্নিত ভাবে চীনের ভুখন্ড। তাই ভারত চীনা ভুখন্ডে ‘অনুপ্রবেশকারি’। এই প্রসঙ্গে গত ১১ আগষ্ট আনন্দবাজার লিখেছে, “চিন দাবি করছে, অতীতে ভুটান লিখিত ভাবে তাদের জানিয়েছে ডোকলামের ভূখণ্ডটি চিনের অধীনে। সুতরাং ডোকলামে ভারতীয় সেনা পাঠানো সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি যখন চিনের সঙ্গে ভুটানের তখন ভারত নাক গলাচ্ছে কেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে”।

বিপরীতে ভারতীয় কুটনৈতিক অবস্থান হল, ঐ স্থান চিহ্নিত নয় বিতর্কিত, এবং তা ভুটানের দাবিকৃত ভুখন্ড। ভারত ভুটানের পক্ষ থেকে চীনাদেরকে বাধা দিয়েছে। কিন্তু এরপর ভারত আরও বলতে চাইছে, আসলে ওগুলো কথা আর ভারতের জন্যও আর কোন গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপুর্ণ হল, ‘আসেন চীনা ভাইয়েরা’, “একসাথে” বরং সেনা প্রত্যাহার করি। ভারতের এই বদল অবস্থান কেন?

চীনা অবস্থান কত কড়া তা  বুঝা যায় গত জুলাই মাসে জর্মানিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদী চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং-এর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও চীন রাজি হয়নি। এমনকি এখনও চীন তার নিজের অবস্থান থেকে একচুল সরে নাই।  ওদিকে আনন্দবাজার আরও লিখেছে, “তাতপর্যপুর্ণ ভাবে আজ ডোকলামকে চিনা এলাকা বলে মেনে নেওয়ার কথা (এখন) অস্বীকার করেছে ভুটান। থিম্পু জানিয়েছে, ডোকলাম তাদেরই এলাকা। সেখানে রাস্তা তৈরি করে চিনা সেনা ভুটানের সার্বভৌমত্বে হাত দিয়েছে। ভারতের চাপেই ভুটান এই পদক্ষেপ করেছে বলে ধারণা কূটনীতিকেরা”। অর্থাৎ ভারত চেষ্টা করছে নিজের অন্যের ভুখন্ডে “অনুপ্রবেশকারি” হওয়ার যে আন্তর্জাতিক আইনি দায় তা থেকে নিজের নাম কাটাতে।

আর ওদিকে এখন আর রাস্তা তৈরিতে চীনকে বাধা দেয়া ভারতের কাছে কোন ইস্যু নয়। ভারত চাইছে যত দ্রুত মানুষ ভুলে যাক যে ভারত চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। ভারতের মূল ইস্যু এখন ‘সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণ করা’। এর সুযোগ সে পেতে চাচ্ছে। অর্থাৎ ভারতীয় সেনা যে এখনই ফিরে যেতে চায়, এ ব্যাপারে তারা একপায়ে রাজি। কিন্তু চুপচাপ ফিরে গেলে নিজের বেইজ্জতি হয়, তাই ভারতের মুখ রক্ষার স্বার্থে ভারত-চীন একসাথে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে  ভারত চীনকে যে প্রস্তাবে  রেখেছে,  চীন তাতে রাজি হলে ভারতের ইজ্জত বাঁচে। বিপরীতে চীনের অনড় ভূমিকা এবং তারা অনবরত হুমকি দিয়ে বলে চলছে, ভারতীয়রা বিতর্কহীন চীনা ভূখণ্ডে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। অতএব সবার আগে তাদেরকে চুপচাপ ফিরে যেতে হবে। সারকথায়, সব বাদ দিয়ে ভারত এখন মরিয়া হয়ে একটা সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণের সুযোগ খুঁজে ফিরছে। কিন্তু তাদের দশা এমন দুস্থ অবস্থায় পৌঁছল কেন?

কারণ এক. নির্বাচনী অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরির কথা ভেবে মোদি সরকার পরিকল্পনা করেছিল, আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোদি বেশি তৎপর – এটা দেখানো। এই উগ্র জাতীয়তা প্রদর্শন করাই মোদির লক্ষ্য ছিল। এমনটা দেখাতে পারলে আগামী ভোটে এটা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি সুবিধা দেবে বা আগিয়ে রাখবে, এই ছিল বিজেপি এবং মোদির হিসাব। ভুটান-চীন সীমান্তে চীন রাস্তা তৈরি করতে গেলে তাই মোদি সরকার অন্য কোনো উপায়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পথ না খুঁজে এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে  সরাসরি নিজ সৈন্য পাঠিয়ে উগ্রতা প্রদর্শন করতে গিয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এতটাই কাঁচা ছিল যে, ঘটনা তিন সপ্তাহে না গড়াতেই তৈরী করা টেনশন সামলাতে না পেরে আপসের পথে যেতে অস্থির হয়ে উঠেছে। এ কারণে, মোদি ভারতীয় সংসদের সব দলকে ডেকে এক সর্বদলীয় পরামর্শ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। ওই সভায় সবার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায়, মোদি সরকার সেনা পাঠিয়ে অযথা সামরিক টেনশন তৈরি করেছে অথচ, কূটনৈতিক পদক্ষেপে হিসাবে সম্ভাব্য বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে তেমন কোন প্রস্তুতি নেয়নি। যেমন জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে যদি ডোকলাম প্রসঙ্গ উঠে বা ইস্যু হয়ে যায় তবে সেখানে রাশিয়া কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে – এমন কোনো আগাম প্রস্তুতি বা রাশিয়ার সাথে আলোচনা করে কোন নিশ্চয়তা নেয় নাই , মোদির সরকার। বরং অনুমান করা যায়,  সে পরিস্থিতিতে রাশিয়া সম্ভবত চীনের দিকে তাকিয়ে অবস্থান নেবে।

অপর দিকে এত আশা-ভরসাস্থল, বন্ধু মনে করা আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে? এরও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। নেয়া হয় নাই। আর আমেরিকা সম্ভবত ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। ইতোমধ্যেই নানা উছিলায় প্রকাশিত আমেরিকান অবস্থান এটাই। সারকথায় আমেরিকা দূরে দাঁড়িয়ে বলবে, তারা মিটসাট করে নেক।  ফলে ভারতের বিরোধী দল, বিশেষ করে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী মোদিকে এই বলে অভিযুক্ত করেন, তার আমলে এসে আমাদের ট্র্যাডিশনাল বন্ধুরা দূরে অনিশ্চিত অবস্থানে চলে গেছে। এসব মিলিয়ে ওই সর্বদলীয় মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হয় সরকার যেন সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়। এতে অবশ্য মোদির লাভের গুড় ঠিক থেকেছে। অন্তত সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নেয়ার দায় একা মোদির নয়, সবার বা সর্বদলীয় – তাই হয়ে গেছে। আসলে মোদির লক্ষ্য ছিল, নিজের আগামি নির্বাচনের জন্য অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরি। সে কাজ ইতোমধ্যে যা অর্জন  হবার তা হয়েই গেছে। যদিও এখন বিরাট সমস্যা হল, চীন তাকে সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নিতে দিচ্ছে না, বরং এর বদলে সীমিত আকারে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে অনবরত চীনা হুমকি দিয়ে।

ভারতের থিংকট্যাংক ডোকলাম ইস্যুকে কিভাবে দেখছে?
প্রত্যেক সামর্থ্যবান রাষ্ট্র, মানে এমন রাষ্ট্র যে এক বা একাধিক থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ জোগাতে সক্ষম –  তার জন্য একাধিক থিংকট্যাংক গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ বলে বিবেচিত হয় একালে। থিঙ্কট্যাঙ্কের মানে হল, এ কালের রাষ্ট্রের কৌশলগত বহুবিধ স্বার্থ থাকে, সেসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা চালানো এবং এতে পাওয়া ফলাফল ব্যবহার করা হয়। ঐ গবেষণার ফলাফল সমাজে একাদেমিক দুনিয়ায় খোলা থাকে, চর্চা আলোচনায় আরও সমৃদ্ধ হয়। এসব থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা ওই গবেষণার ফলাফল বা সুপারিশের আলোকে সঠিক নীতি গ্রহণে তা ব্যবহার করতে পারে। যেহেতু রাষ্ট্রস্বার্থে এই গবেষণা ফলে এসব থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় বা দাতব্যভাবে সাধারণত নিজের খরচ জুগিয়ে থাকে। কিন্তু কখনই তা রাষ্ট্রের বাইরের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠতে পারে না বলে সাধারণত মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার রেওয়াজ হল, বেশির ভাগ থিঙ্কট্যাঙ্ক  অভ্যন্তরীণ দান দাতব্যে অর্থ সংগ্রহ করে চলে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারত এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। সে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের পয়সায় নিজের থিঙ্কট্যাঙ্কের এক্সপার্ট ও গবেষক তৈরি করছে। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতের স্বার্থে কাজ করতে পারে। এটা কি সম্ভব? খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে দিবার নেশায় তা এখন সম্ভব-অসম্ভবের উর্ধে এক বাস্তবতা। গত  ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর থেকে  আমেরিকা-ভারত প্রথম পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের প্রয়োজনে কাছে আসা শুরু হয়েছিল। যদিও আমেরিকার তাগিদে ‘ওয়ার অন টেরর’ ইস্যুতে তা শুরু হয়েছিল, কিন্তু খুব দ্রুত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ ইস্যুতেও ভারতের সাগরেদ হয়ে যাওয়ায় এটাই মুখ্য ইস্যু হয়ে যায়। ‘চীন ঠেকাও ইস্যুতে দোস্তালির’ দিন শুরু হয়ে যায়।  সেকালে অবশ্য থিঙ্কট্যাঙ্কের ধারণাই ভারতে তেমন একটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না; কেবল যুদ্ধ-কৌশল অর্থে গবেষণার কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু বুশের ওই সফরের ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলতে শুরু করে দেয়। সত্যি সে এক আজব ঘটনা। না আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর শাখা বাংলাদেশে নাই তা নয়। অথবা আমেরিকান সরকার বা  এনজিও ফান্ডেড লোকাল থিঙ্কট্যাঙ্ক বাংলাদেশে নাই, ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু সেগুলোর ভুমিকা বাংলাদেশের সরকারকে গবেষণা দিয়ে নীতি নিতে সাহায্য করা নয়। বরং বাংলাদেশে আমেরিকান নীতি কী হলে আমেরিকান স্বার্থের জন্য সঠিক হবে  তা আমেরিকান সরকারকে বুঝতে বা তথ্য সংগ্রহ করে দিতে কার্যকর থাকাই এদের লক্ষ্য।

প্রেম, রোমান্স – এগুলো কি করে করতে হয় থেকে তা নিয়ে কারও কাছ থেকে কোচিং বা ট্রেনিংয়ে তা শিখার বিষয় কখনও নয়। কারণ সেক্ষেত্রে নিজের প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে না, বরং ঐ কোচ বা ট্রেনারের সাথে প্রেম রোমান্স হয়ে যাবার সম্ভাবনা।  তাই প্রেমিক-প্রেমিকারা বাইরের কারো কাছ থেকে কোনো ট্রেনিং নেয়া ছাড়াই এটা নিজেরা নিজেরা ‘সরাসরি স্টেজে পারফর্ম করতে করতে ব্যাপারটা শিখে ফেলার বিষয়। এ জন্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের কৌশলগত নীতি-পলিসি কী হবে, সে গবেষণার খরচ রাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু তা না করে নানান আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের অর্থ ও গাইডে ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক গড়ে তোলা হয়েছে। আমেরিকানরা খরচ বহন করছে, ভারতীয় মধ্যবিত্তকে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছে পিএইচডি, মাস্টার্স করাতে- এতেই তারা খুশি। আর ভাবছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান যেন ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখবে। ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন, যেন আমেরিকার স্বার্থচোখ দিয়ে কেউ ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখছে। এ’এক সোনার পাথরের বাটি! ফলাফল হয়েছে যে আমেরিকান শিখানো বুলিই তারা প্রায়ই আউড়ায়।

গত ১০-১২ বছর আগে থেকে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতে গড়ে তোলা শুরু হওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এর অন্যতম প্রভাবশালী এমন এক ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। বর্তমানে তিনি আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’র ডিরেক্টর। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ‘রাজা মন্ডলা’ (Raja Mandala) শিরোনামে তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। এক্সপার্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশেও আসেন। ডোকলাম ইস্যুতে তার লেখা কয়েকটি কলাম  আছে। এর একটি হল – ‘মাইন্ড দ্যা পাওয়ার গ্যাপ’ (Mind the power gap)। অর্থাৎ প্রভাব-ক্ষমতার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের তুলনীয় সক্ষমতার অর্থে, ভারত পিছিয়ে পড়া দেশ, এক বিরাট পাওয়ার গ্যাপ আছে দুই দেশের মধ্যে, ফলে সাবধানে পা ফেলো! এটাই বলতে চাইছেন তিনি।

তার এই কলামের প্রথম বাক্য হল, “উপমহাদেশে একের পর একটি ক্ষেত্রে চীনের ঢুকে পড়ার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নবাবি চিন্তা করার অবস্থায় ভারত নেই”। (As India settles into an extended military standoff with China in the Himalayas, it can’t afford to take its eyes off Beijing’s maritime forays in the Indian Ocean….। India no longer has the luxury of contesting Chinese strategic incursions into the Subcontinent one piece at a time.)   তিনি শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার আর ভুটানের ডোকলাম, এ তিন ইস্যুতে চীনের সাথে ভারতের নিজেকে তুলনা করার কথা ভাবাকে “নবাবি চিন্তা” বলছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর চীনা মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অপর দিকে মিয়ানমারও চীনা সহযোগিতায় একটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছে; উদ্দেশ্য ওই পোর্ট থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। এটাই এর মূল উদ্দেশ্য, তবে মায়ানমারও তা ব্যবহার করবে।

রাজামোহন বলতে চাইছেন, ওই দুই পোর্টের মাধ্যমে চীনা প্রভাব যেভাবে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের ওপর বাড়বে, সে তুলনায় ডোকলামে কিছু জায়গাজমির মারামারি খুবই তুচ্ছ ঘটনা। অর্থাৎ পোর্ট ইস্যু ভারতের অনেক বড় স্বার্থ হারানোর বিষয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর কাজ হল – নিজেদের ‘চীন ঠেকাও’ বুলি ভারতীয় শাখায় জড়ো হওয়া ইন্টেলেক্টদের মনে গেঁথে দেয়া। সে কাজে যেসব বয়ান ভারতীয়দের মনে তারা গেঁথে দিয়েছে, সেটা হল অবাস্তব কিছু হাহাকার। যেমন – ‘সব চীন নিয়ে গেল’, ‘চীন ভারতকে ঘিরে ধরছে’ ইত্যাদি। ভারত যেন চাইলেই চীনা অর্থনৈতিক প্রবল প্রভাব উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে পারে। এটা যেন ভারতের সাবজেকটিভ ‘ব্যক্তি ইচ্ছার’ ব্যাপার।  অথচ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বা সক্ষমতা এগুলো অবজেকটিভ, বাস্তবতা। চীনের কিছু ব্যক্তি এমন দাবি করেন বলেই এটা সত্য, তা এমন একেবারেই নয়। এটা হল অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

ধরা যাক, চীনের “সব নিয়ে যাওয়া” বা “ঘিরে ধরা” বয়ান শতভাগ সত্য। কিন্তু এসব তৎপরতা কি বেআইনি, অবৈধ কাজ? মোটেও তা না। এমনকি ভারতও তা দাবি করে বলতে পারছে না। অর্থাৎ অভিযোগ করছে না। কিন্তু তাহলে অভিযোগটা কী? বাস্তবতা হল, চীনের পরাশক্তিগত সক্ষমতার সাথে ভারতের সক্ষমতা তুলনাযোগ্য নয়। কিন্তু সেটা তো চীনের অপরাধ নয়। পরাশক্তিগত সক্ষমতা মানে যার মূল ভিত্তি হল, নিজ অর্থনৈতিক অগ্রসরতা।

রাজামোহনেরই ওই লেখায় তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীনের বর্তমান জিডিপির আকার ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বড় এবং চীনের সামরিক খাতে ব্যয়ও ভারতের চেয়ে চারগুণ বেশি”। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের শেয়ার সবচেয়ে বড়, চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতার সাথে কেউ তুলনীয় নয়। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এশিয়ায় চীনের প্রভাব ভারতের চেয়ে অনেক বেশি হবে এবং এটা স্বাভাবিক। এমনকি যারা ভারতের পড়শি রাষ্ট্র তাদের ওপর চীনা প্রভাব, তাদের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ অনেক বেশি হবে এবং তা বিরাট ভূমিকা নিবে। কিন্তু এরপরই আবার রাজামোহনসহ ভারতীয়দের আহাজারি আমরা শুনতে পাবো – “ভারতের প্রভাবাধীন এলাকায়”, ভারতের ‘পড়শি রাষ্ট্রে’ চীন ঢুকে পড়ছে।

এখানে ভারতের প্রভাবাধীন এলাকা কথাটি বড়ই তামাশার। এর অর্থ কী? যেন এর অর্থ হল, সেটা ভারতেরই তালুক। আসলে তারা বোঝাতে চান, ভারতের বাপ-দাদা হল ব্রিটিশেরা। আর ওইসব এলাকা ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশদেরই তো ‘তালুক’ ছিল, কাজেই ভারতের বাপ-দাদা বৃটিশদেরগুলাই এখন ওগুলো যেন ভারতের তালুক!  এছাড়া আর এর অন্য মানে কী?  একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছিল। কিন্তু সে জন্য কি ১৯৪৭ সালের পর এসব দেশের ওপর নেহরুর ভারতের কোনো মৌরসি তালুক-প্রভাব বর্তায়? অথচ ভারতের ইঙ্গিত এমন যেন কলোনিয়াল ব্রিটিশ-প্রভাবের উত্তরসূরি হল নেহরুর ভারত। ব্রিটেন যেন ভারতের বাপ-দাদা। অথচ ‘প্রভাবাধীন এলাকা’ কথাটির একটিই মানে হতে পারে আর তা হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রভাব আশপাশে যতটুকু। এটা লিগ্যাল প্রভাব না, কোনো বৈধ মালিকানাবোধও এখানে নাই, থাকে না।

এছাড়া আরও বলা যায়, আজ আমার অর্থনীতি প্রভাবশালী বলে এর প্রভাব থাকলেও কাল যদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যায়, তবে প্রভাব কমে আবার শূন্যও হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অন্য কেউ আমার চেয়ে অর্থনীতিতে বড় প্রভাবশালী হিসেবে হাজির হয়ে গেলে স্বভাবতই আমার প্রভাব নেমে যাবে, শূন্য হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের কাছে তার পড়শি মানেই ব্রিটিশ কলোনি সূত্রে নেহরুর ভারতের কল্পিত “স্থায়ী প্রভাবাধীন এলাকা’ বলে কিছু একটা। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হল, এত যুক্তিবুদ্ধি নিজেই দেয়ার পরও খোদ রাজামোহন একইভাবে চীনের বিরুদ্ধে হা-হুতাশ করার বাইরে না। অথচ ব্যাপারটা হল, আগামীতে যদি ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কখনো, তবে ‘ভারতের প্রভাবাধীন’ কথাটি অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটা এখনই আগেই হয়ে গেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এসব বালক- সুলভ আবদার করার মানে হয় না।

এ ছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। যখন দুনিয়া কলোনি দখলের প্রতিযোগিতার যুগে ছিল, আর ব্রিটিশরা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সবার শ্রেষ্ঠ ছিল, সে যুগের পড়তি দিকে ১৮৮০-এর দশকে আমেরিকা প্রথম অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, তবু দুনিয়ার মাতবর হয়ে উঠতে আমেরিকার আরো ৬০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের পর আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের নেতৃত্বের অধীনে নিতে পেরেছিল। আরো লক্ষণীয়, এই ৬০ বছরে আমেরিকানরা কোনো বড় যুদ্ধে নিজেকে বিরাটভাবে জড়ায়নি। তবে যুদ্ধ একবারই করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেটা নির্ধারক যুদ্ধ, যার শেষে আমেরিকা ‘দুনিয়ার রাজা’ হয়েছে। এর মাঝে আমেরিকা কোনো নাকি কান্না করেনি, সব নিয়ে গেল বলে হাত-পা ছোড়েনি। আজকের চীনের কাছে তার উত্থানের মডেল সেই আমেরিকা, তাকেই অনুসরণ করে।

কিন্তু ভারত? আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির সমর্থক হওয়ায় বড় ভাই পিঠ চাপড়ে দিয়েছে আর ভারত মনে করছে – সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা গায়ে-গতরে খেটে অর্জন করার জিনিস। বড় ভাই পিঠে হাত রাখলেই এটা অর্জিত হয়ে যায় না, কখনও যাবে না। অতএব ভারতের একেবারে পড়শির ওপর চীনের লংটার্ম কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব যদি এসে হাজিরও হয়, তবে এ নিয়ে নাকিকান্নার সুযোগ নেই। এছাড়া এটা বেআইনি বা অবৈধও নয়। আর চীনের এই প্রভাব ছুটানোর জন্য ভারতের একটাই করণীয়, চীনের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে ফিরে আসতে পারা। কিন্তু পড়শি দেশের রাজনীতিতে, নির্বাচনে হাত ঢুকিয়েও এই পাল্টা প্রভাব অর্জন করা যায় না। যা প্রায় প্রত্যেকটা পড়শি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ সবখানে ভারত করে যাচ্ছে, আর ঘৃণা অর্জন করছে। এমন শর্টকাটে কিছুই অর্জন হয় না, বরং এই কূটকৌশল পুরোটাই ভারতের বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৬ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন

ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন

গৌতম দাস

০৯ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:৪০

http://wp.me/p1sCvy-2fj

আমেরিকার চলতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি শপথ গ্রহণ করেছিলেন গত ২০ জানুয়ারি। গত ২৯ এপ্রিল সে ক্ষমতার ১০০ দিন পূর্ণ হল। লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট (২৮ এপ্রিল ২০১৭) বলছে, “আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ১০০ দিনের কাজ ও তৎপরতা মাপার ব্যাপারটা প্রায়ই খুব চাতুর্যপূর্ণ হয়”। (Measuring the performance of presidents is often tricky. ) কথা সঠিক। আসলে এটা যেন নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়ে গেলেও এর এক সর্বশেষ অংশ। ঐ প্রচারণায় সত্য-মিথ্যা বহু কিছু বলা হয়, আমাদের ঘরোয়া ভাষায় যাকে আমরা চাপাবাজি বলি, এর চূড়ান্ত মাত্রা ঘটতে দেখা যায়। এ ছাড়া, এটাকে কথা বিকৃত (টুইষ্ট) করা অথবা কায়দা করে মিথ্যা বলার এক চূড়ান্ত মহড়াও বলা যায়। আর ‘ক্ষমতার ১০০ দিন হল’ অনেকটা এমন বলা যে, আমরা বেশি মিথ্যা বলিনি। তা আমরা ক্ষমতা পেলেই প্রথমে কী কী করব বলছি, এর তালিকা দেখে বুঝতে পারবেন। বলা যায়, এটা হল – নির্বাচনের মিথ্যা আর চাপাবাজি থেকে প্রথম সংযত হয়ে বাস্তবে ফেরার প্রয়াস। সে জন্য ঐ ১০০ দিনে বেছে কিছু কাজ ও সিদ্ধান্তের তালিকাও প্রকাশ হতে আমরা দেখি।

তাই,  ট্রাম্প “আমেরিকাকে আবার মহান বানাবেন”  – এই লক্ষ্যে প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার তালিকা একটা ছিল যাতে ১৮ টা সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ নেবার কথা আর কংগ্রেসে ১০টা নতুন আইনের প্রস্তাব আনার কথা লেখা ছিল। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ তিনটা ইস্যুও ছিল – ১. আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে বাস্তবিকই কংক্রিটের দেয়াল তুলে বেআইনি অভিবাসীর অনুপ্রবেশ বন্ধ করবেন, সন্ত্রাস-প্রবণ মুসলমান দেশ থেকে প্রবেশকারীদের আমেরিকার প্রবেশ ঠেকাবেন। (যদিও এখানে কথাটা সন্ত্রাস আর মুসলমান শব্দ দিয়ে পরিচিত করে হাজির করা হয়েছিল। কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসের কথা তুলে এর আড়ালে আরও কিছু অবৈধ ও চাকরিপ্রার্থী অভিবাসী ঠেকানো/কমানো)। আর চীনের নিজ মুদ্রামান কারসাজি করে আমেরিকার বাজারে নিজ পণ্য প্রবেশের সুবিধা গ্রহণকারী (ম্যানিপুলেটর) হিসেবে করা তৎপরতা বন্ধ করবেন- এমন বিষয়ও ওই ১৮ কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ১০০ দিনের ব্যাপারটা কী, তা নিয়ে  তার ঐ লেখায় ‘ইকোনমিস্ট’  কী মনে করে এমন এক ব্যাখ্যা দিয়েছে। সাময়িকী বলছে, “(১০০ দিন) এই সময়কাল আসলে সে বছর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যবহার কত উঁচুমাত্রায় উঠেছিল তা দেখার একটা সুযোগ। ওই সময়টা আসলে প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন, আবার আগের প্রচারণা থেকে নির্বাচন পর্যন্ত পথ চলার পর বিজয়লাভ ঘটে গেলে তাতে তিনি যে জোশ পেলেন, তা ঐ ১০০ দিনে খরচ করেন যাতে এবার তিনি পরের চার বছরের কাজের এজেন্ডা কী হবে, তা ঠিক করেন আর কংগ্রেসকে কী কী আইন পাস করাতে চাপ দেবেন, সে পরিকল্পনা হাতে নেন”। ইকোনমিস্টের কথা একদিক থেকে সঠিক। তবে এর সার কথা হল, বিজয়লাভ করেছ এবার উচ্ছ্বাস থুয়ে বাস্তবের মাটিতে পা নামাও।

ইকোনমিস্ট বলছে, ১০০ দিনের ‘অগ্রগতি খুবই ধীর’ (progress has been slow. )। তবে এর চেয়েও আমাদের আগ্রহ জাগায়, এমন ব্যাপার হল, ইকোনমিস্ট নিজের উদ্যোগে ২২ এপ্রিলে করা, আমেরিকান নাগরিকের ওপর এক সার্ভের খবর দিয়েছে আমাদের। অবশ্য এটা ছোট স্যাম্পলের, ১৫০০ জন। আর ওখানে যাচাইয়ের বিষয় ছিল – “প্রেসিডেন্ট উত্তরদাতাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন কিনা”। জবাবদাতাদের মধ্যে ওখানে বড় একটা ভাগ হল, কারা নিজেদের ডেমোক্র্যাট/রিপাবলিকান হিসেবে অর্থাৎ কারা নিজের পার্টিজান পরিচয় দিয়েছেন আর কারা দেননি। সে হিসেবে কোনো না কোনো পার্টিজান পরিচয় যাদের আছে, তাদের মধ্যকার ৩০ শতাংশ মনে করেন, তাদের আশা পূরণ হয়েছে। কিন্তু যারা ওই ৩০ শতাংশের বাইরে (মানে বাকি ৭০ শতাংশ) তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মূল্যায়ন দেখা গেছে। যেমন এই ৭০ শতাংশের ৪১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট আর ২৮ শতাংশ রিপাবলিকান, যারা সবাই পার্টিলাইনে মন্তব্য করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট তার চেয়ে খারাপ করেছেন। বিপরীতে রিপাবলিকানরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ‘তার চেয়ে ভালো’ করেছেন। তবে ইকোনমিস্ট বলছে, এটা আসলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে জনমত কেমন (যেটাকে রেটিং বলে) তার প্রকাশ। ট্রাম্প বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে কম রেটিংয়ের প্রেসিডেন্ট। তবে এই রেটিং একেবারে দলভিত্তিক। রিপাবলিকানদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেছেন। ওদিকে ডেমোক্র্যাটদের ৮২ শতাংশ প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেন নাই।

এখন এসবের বাইরে, আমেরিকার রাজনীতির প্রত্যেকটি ইস্যুভিত্তিক বিচারে যদি আসি, তবে এই ১০০ দিনে সেগুলোর হাল-দশা কী, এই বিচারে বলতে হয়,
০১. মেক্সিকো প্রাচীর : স্বভাবতই শুরুতেই ট্রাম্পের সাথে এই ইস্যুতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের বিরোধ ঘটেছিল। যে দুই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের প্রায় প্রকাশ্যে বিরোধ হয়েছে সে দুটো হল, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের অন্য বিরোধের ইস্যুও আছে। ট্রাম্পের দাবি মতে, বলা বাহুল্য ওই প্রাচীর বানানোর খরচ দিতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট অস্বীকার করেছিলেন। আর মেক্সিকান পাবলিকের দিক থেকে দেখলে তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন; কারণ মাইগ্রেট করে আমেরিকায় প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি তাদেরকেই ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই বিরুদ্ধে চলে যাওয়া, এটাই আবার মেক্সিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষে দেয়া নাগরিকদের সমর্থন হিসেবে হাজির হয়েছিল।  এ’ব্যাপারে সর্বশেষ হল, নিজ খরচে “প্রাচীর গড়ে পরে মেক্সিকোর কাছ থেকে অর্থ কেটে” নিবেন ট্রাম্প – এরও কোনো খবর নেই। কারণ কংগ্রেস এক ট্রিলিয়ন ডলারের যে বাজেট পাস করেছে, সেখানে পরিষ্কার উল্লেখ করে দিয়েছে, এর অর্থ দিয়ে ঐ প্রাচীর নির্মাণ করা যাবে না।

০২. মুসলিম নিষেধাজ্ঞা (মুসলিম ব্যান) : সবচেয়ে বেশি প্রচারিত ট্রাম্পের এই উদ্যোগ নেয়া এবং ব্যর্থ হওয়ার খবর আমরা প্রায় সবাই দেখেছি। ট্রাম্প এ বিষয়ে দু’বার নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু দু’বারই তা ফেডারেল আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে এর কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়। আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবার পক্ষে  মূল যুক্তি ছিল “কেবল মুসলমানদের” টার্গেট করে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ফলে তা বৈষম্যপুর্ণ, সুতরাং  কনস্টিটিউশন বিরোধী। অর্থাৎ এই ইস্যু এখন আদালতের হিমঘরে। মনে হয় না আর কখনো এটা জাগবে।

০৩. ন্যাটো একটা অচল প্রতিষ্ঠান : নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, ন্যাটো কোল্ড ওয়ার যুগের প্রতিষ্ঠান; যখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পশ্চিম নিজের জাতশত্রু মনে করে এর বিরুদ্ধেই ন্যাটো বানানো হয়েছিল। কোল্ড ওয়ার আর সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটোই এখন ‘নাই’ হয়ে গেছে। ওদিকে, ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ এখন মুখ্য ইস্যু। ফলে এত পয়সা খরচ করে ন্যাটো রাখার কী দরকার! এই বুঝের ওপর দাঁড়িয়ে তাই শপথ নেয়ার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় তিনি বলে বসেন, ন্যাটো একটি অচল প্রতিষ্ঠান। আর এই গত মাসে ১২ এপ্রিল তিনি উল্টা বলেন, “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”। কেন এমন করলেন? ব্যাপারটা পাবলিকলি আনা হয়নি। তবে ইউরোপের দিক থেকে ব্যাপক দেনদরবার হয়েছে বলে এই ‘উলটো কথা’। তবে ন্যাটোর সেক্রেটারী জেনারেলের সঙ্গে মিটিং শেষ করে প্রেসের সামনে ট্রাম্প বলেন, আপনারা (ন্যাটো সদস্যরা)  সিরিয়ায় আমার ৫৯ টা মিসাইল নিক্ষেপে হামলার কাজ ও সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন সেজন্য ধন্যবাদ। এবং “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”
যদিও এমন ধরণের কথার পেছনে মূল কারণ হল – খরচের বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠান চালানোর  সিংহভাগ  খরচ আমেরিকাকে একা বইতে হয়। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্য রাষ্ট্রে যেখানেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে (জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া. অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি) এর খরচও আমেরিকা একা বহন করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সেই থেকে আমেরিকা এক এম্পায়ার আমেরিকা, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাতব্বর হিসেবে উঠে এসেছিল। মাতব্বরদের বহু অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়, কমিউনিটি-দুনিয়ার দায় একা বহন করতে হয়। ফলে এভাবেই এতদিন চলে আসছিল। এ ছাড়াও একটা এম্পায়ার- সাম্রাজ্য মোড়লিপনা চালানো বেশ জটিল। যেমন দক্ষিণ কোরিয়াকে উদাহরণ হিসাবে নেয়া যাক। সেখানে আমেরিকা নিজের (THAAD) থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার হাত থেকে দক্ষিণ কোরিয়াকে, অর্থাৎ নিজ মিত্রকে রক্ষার জন্য। কিন্তু এটা বসানোর জায়গা দেয়া ছাড়া অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসানোর আর কোনো খরচ কোরিয়া বহণ করে না, সব খরচ আমেরিকাই বহন করে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা চাইছে, এই ‘ঐতিহাসিক’ দায় থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু একথার মানে কি, আমেরিকার মাতব্বরিও ত্যাগ করতে চাইছেন তিনি? অবশ্যই ঠিক তা নয়। তবে তাঁর প্রথম বিবেচনা হচ্ছে, আমেরিকাকে এই খরচের বোঝা কমাতে হবে। তাতে মাতব্বরি কিছু কমে যাবে কিনা সেটা পরে দেখা যাবে। মাতব্বরি কমলে কী হবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র মানতে তৈরি কিনা, তা দ্বিতীয় বিবেচনা। কিন্তু বাস্তবতা হল, চাইলেও ট্রাম্প সে খরচ তুলে আনতে পারছেন না। কারণ থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা এখন পুরাপুরি আমেরিকান বাহিনীর হাতে। ট্রাম্প সম্প্রতি এর এক বিলিয়ন ডলার দাম চেয়েছেন কোরিয়ার কাছে; কিন্তু এটা কি আমেরিকা বিক্রি করতে চাইছে, নাকি এটা বিক্রিযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে? জবাব হলো, না। এই সিরিয়াস টেকনোলজি আমেরিকা কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রকে বা আসলে কাউকেই বিক্রি করতে চায় না। এদিকে, দঃ কোরিয়া বলছে, আমরা চাইলেও তো অর্থ দিতে পারছি না। আগে তোমরা বিক্রির সিদ্ধান্ত নাও। তবেই না! এ ধরনের বহুবিধ টেকনিক্যাল সমস্যা আছে, যেসবের কারণে শুরু থেকেই আমেরিকা নিজে থেকেই যেচে এর খরচ বহন করে থাকে। তাই ট্রাম্পের আমেরিকা চাইলেই এখান থেকে আমেরিকাকে বের করে নিতে পারবে না। অন্তত সেটা একেবারে সহজ কোন কাজ নয়। তাই ট্রাম্পের ১০০ দিনের অন্যতম ব্যর্থ ইস্যু এটা।

০৪. চীন ইস্যু : চীনকে ‘ঝাড়ি’ মারতে গিয়ে ট্রাম্প এখন উলটো ‘কেঁচো’ হয়ে গেছেন। আসলে ট্রাম্প এখন উলটো চীনকে দেখছেন তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাফল্য আনার এক উপায় হিসেবে। চীনকে যতটা সম্ভব পক্ষে নিয়ে উত্তর কোরিয়া ইস্যুর যদি একটা সুরাহা করা যায় তবে সেটা সত্যি সত্যিই আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্পের একটা বিরাট সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। ট্রাম্প পাগলা হলেও এটা বুঝতে তাঁর দেরি হয় নাই। কিন্তু এটা তো ১০০ দিনের অর্জনের বিষয় নয়। সম্ভাব্য অর্জনের তালিকায় নাই। বরং ওখানে চীনকে যেভাবে ভিলেন হিসেবে হাজির করে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল, চীনের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে উগ্র জাতীয়তাবাদী আমেরিকা খাড়া করানো হবে বলা হয়েছিল- সেটা তো একেবারেই হয়নি। করা যায়নি।  কারণ শত্রু ঠাহর করায় ভুল ছিল। ট্রাম্প এখন চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে তার সম্পর্কের ‘ভালো কেমিস্ট্রির’ কথা বলছেন। কিন্তু তবু তাতে তো এটা আর- ‘আমেরিকা ফাস্ট’-এর অবস্থান থাকল না। এটা হয়ে গেছে আসলে উলটা – ‘গ্লোবাল আমেরিকা’র পক্ষে অবস্থান। মানে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির হার।

০৫. বাণিজ্য জোট (নাফটা, টিপিপি) ত্যাগ : ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্য জোট ত্যাগের ঘটনা ঘটানো সহজ, আর তা ঘটেছে। ফলে ১০০ দিনের কাজ হিসেবে এই ইস্যু সফল। কিন্তু এর ফলাফল কি সুখপ্রদ? এর জবাব হল, না। আসলে এই তর্কে গোড়ার প্রশ্ন যদি করি, বিজয়ী ট্রাম্প জাতিবাদী আমেরিকা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন। এর অর্থ, খোদ আমেরিকাই আর গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত। এই বিচারে এখন বলা যায়, তিনি নিজে গ্লোবালাইজেশনের পক্ষেই থেকে গেছেন। অবস্থান তিনি একচুলও সরাতে পারেননি। বরং তার নীতির প্রায় সব ঝোঁক ওবামার নীতি অবস্থানে ফেরত যাওয়ার দিকে (বিশেষ কতগুলো ছাড়া)। সিএনএন মানি জানাচ্ছে,   নতুন করে নাফটা নিয়ে কথা বলা আর নতুন নিগোশিয়েশন শুরু করতে চাইছে ট্রাম্পের আমেরিকা। আর ট্রাম্পের উপদেষ্টারা এখন বিতর্ক করছেন কত দ্রুত নাফটা আলাপ শুরু করা যায়, এর সম্ভাব্য উপায় কী।  আর ‘বিশেষ কতগুলো’ কথাটা ভারতের সাথে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের হাত থেকে আমেরিকানদের চাকরি উদ্ধার বা কাজ ফেরানো এবং সে লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন, তা কিন্তু এগিয়েই চলছে; আগের মতই। এজন্য মোদি আগামী মাসের মধ্যে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের জন্য খুবই চেষ্টা করছেন।

০৬। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা : বের হয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে বটে; তবে ধীরগতিতে আর ভাষা নরম করে। তবে কানাডা থেকে পাইপলাইনে (পরিবেশগতভাবে নোংরা এবং বিপর্যয়ের হুমকির কারণে বিপজ্জনক) তেল আনার বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, পাইপ প্রস্তুতে আমেরিকান স্টিল সেখানে ব্যবহার করাবেনই। অর্থাৎ আমেরিকা ফাস্ট নীতি কার্যকর করবেনই তিনি এখানে। কিন্তু না, এখানে ট্রাম্প ব্যর্থ। তিনি আমেরিকান স্টিল ব্যবহার করাতে পারেননি। বরং এবিষয়ে নিজের নির্বাহী আদেশ বদলাতে হয়েছে তাঁকে।
আরো এমন অনেক পয়েন্ট তোলা যায় কিন্তু এখানেই শেষ করছি। এক কথায় বললে,  শপথ গ্রহণের দিনের বক্তৃতায়  ট্রাম্প যেভাবে পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বা বোকা ভেবে তাদের নীতির তুলোধুনা করেছিলেন, আর ক্ষমতা পেলেই সব বদলে ফেলার হুঙ্কার দিচ্ছিলেন, তা ১০০ দিন বা সাড়ে তিন মাসেই ফানুসের মতো চুপসে গেয়েছে। বলা যায়, চাপাবাজি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবের মাটিতে পা দিতেই সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

অনলাইন ‘মিডলইস্ট আই’ পত্রিকা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছে, ট্রাম্পের উল্টামুখিতার আংশিক ব্যাখ্যা হিসাবে বলা যায়-  এর কারণ হোয়াইট হাউজের ভেতরের রেডিক্যালেরা যেমন স্টিভ ব্যানন, মাইক ফ্লিন, কেটি ম্যাকফারল্যান্ড- এরা হয় পদত্যাগ করেছেন, না হলে সাইডলাইনে চলে গেছেন। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে ম্যাকমাস্টার আসাতে তিনি বহু কিছুকেই ফ্যাক্টবেজ করে ফেলেছেন। ফলে “রেডিক্যাল বা রাইট উইং দের” এই পতনকেই আমরা ট্রাম্পের উল্টোমুখিতা হিসেবে বাইরে থেকে দেখছি। আর এর আর এক বিপরীতের ঘটনা হল, “ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা, ট্রাম্পের জামাই কুশনার আর শীর্ষ অর্থনৈতিক পরামর্শক গ্রে কোহেন যারা মূলত গ্লোবালিস্ট; এদের অবস্থান ক্রমেই উঁচুতে জেঁকে বসছে। তবে ট্রাম্প পরিবর্তনের এই অভিমুখ নেয়াতে তিনি রিপাবলিকান দলের ধূর্তদের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন ওরাই কিন্তু তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে বিজয়ী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন”। খুবই খাটি কথা গুলো এখানে তুলে আনা হয়েছে। দেখা যাক এটা ট্রাম্পকে কোথায় নিয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ০৭ মে ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

গৌতম দাস

২৬ এপ্রিল ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2eM

 

Trump and Xi get down to talks in Mar-a-Lago. Photo: AFP

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি, গত ৬-৭ এপ্রিল ছিল বহু প্রতীক্ষিত তাদের প্রথম সামিট বা শীর্ষ প্রধানদ্বয়ের সাক্ষাৎ। ট্রাম্পের সাথে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়েছিল ফ্লোরিডা স্টেটে ট্রাম্পের আবাসে, পাল্ম বিচ শহরে  মার-আ-লাগো এস্টেটে। [Trump’s Mar-a-Lago estate in Palm Beach, Florida]। এই সফর সবার খুব মনোযোগের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কারণ নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প নিয়মিত চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝড় তুলে যাচ্ছিলেন যে, চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখে নিজের পক্ষে মার্কিন বাজার ধরে রাখছে, চীন পরিবেশবাদীদের পক্ষে গিয়ে তাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ক্ষেপিয়ে তুলছে ইত্যাদি। সেই চীন এরই শীর্ষ ব্যক্তির সাথে খোদ ট্রাম্পের বৈঠক হতে যাচ্ছিল তাই স্বভাবতই এটা সবার মনোযোগের কারণ। এছাড়া  আমেরিকা আর চীন এই  রাষ্ট্র-জোড়ার অর্থ তাতপর্য হল, প্রথমটা এখনও দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হয়ে আছে তবে হারিয়ে যাচ্ছে, আর দ্বিতীয়টা সে জায়গা নিতে উঠে আসছে। তবে ঐ সাক্ষাত থেকে এটা সবার জন্য আরও বড় মনোযোগের কারণ হয়ে যায় আরও অন্য কিছু কারণে। ঐ সাক্ষাতে বড় ইস্যু ছিল মূলত পাঁচটা। চীনের সাথে আমেরিকার ১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দেনা-পাওনার ঝগড়া নরম করা, ২. তাইওয়ান ইস্যু বা একচীন নীতির পক্ষে অবস্থান স্থায়ী করে জানানো, ‘৩. সাউথ চায়না সি’ দ্বীপ বিতর্ক অন্তত থিতু করা, ৪. চীন মুদ্রা ম্যানিপুলেটর না (নিজ মুদ্রামানের কারসাজি করে না) [চীনা মুদ্রা ইউয়ানের গড় মান, নিচে ফুট নোটে দেখুন, ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে ], ফলে আমেরিকার সে অভিযোগ প্রত্যাহার করেছে জানানো, আর উত্তর কোরিয়া ইস্যু সামলানো। এসবের মধ্যে প্রথমটা আর শেষেরটা মুখ্য। বাকিগুলো বর্তমানে দুর্বল হয়ে গেছে অথবা আধা মিটে গেছে এমন।
প্রথম ইস্যুর ক্ষেত্রে  – চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে,অথবা চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখেছে –  ট্রাম্প প্রশাসন এগুলা তার অভিযোগ বলে হাজির করে আসছিল। কিন্তু সমাধানে ঠিক কী চায়, দাবি কী সুনির্দিষ্ট করে তা জানে না বা বলতে পারছিল না।  হোমওয়ার্কে সে দুর্বলতা ছিল। কেবল ‘ট্যাক্স বসাবে’ ইত্যাদি বলে ট্রেড ওয়্যার বা বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দিত। অথচ এমনকি ওবামার দ্বিতীয় টার্মে নির্বাচনের আগে ২০১২ সালেও, একই পথ নিয়েছিলেন। কিন্তু টিকাতে পারেননি, বুমেরাং প্রভাব পড়েছিল তাই। অথচ বিপরীতে চীনের দিকে, তাদের বড় হোমওয়ার্ক করে আসা করিতকর্মা লোকজন ছিল। আর বাস্তবতা সম্পর্কে চীন সরকারের স্পষ্ট মূল্যায়ন তার ছিল। ফলে আমেরিকাকে সে কী দিতে চায়, কেন দিতে চায়, কতটুকু দিতে হবে পারবে ইত্যাদি সব বিষয়ে সে নিজে পরিষ্কার ছিল। তাই আমেরিকার নাকি কান্না বন্ধ করিয়ে কাজের টেবিলে নিয়ে বসিয়ে যখন কী কী চীন দিবে, সে ঝাঁপি মেলে ধরল তাতে ট্রাম্পসহ তার দল বেজার হয়ে থাকার বদলে অভিভূত হয়ে যায়। চীনের এমন আচরণের মূল কারণ আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে ঠিক মেরে ফেলা – এটা চীনা-স্বার্থ নয়। চীনের কাছে আমেরিকা এখনও এক বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ক এখনও বড় বিনিয়োগ-দাতার। আমেরিকান উতপাদক ও বাজারজাতকারী কোম্পানী চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি খলে সে পণ্য নিজে দেশে বাজারে বিক্রি করে। কখনও চীনা উতপাদক স্রেফ কেবল কমিশন মার্জিন ধার্যকারি উতপাদক, বাকী সবকিছু আমেরিকান কোম্পানীর।  আমেরিকা চীনের কাছে কেন  প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপুর্ণ সে সম্পর্কে চীনা মূল্যায়ন এটাই। এ জন্য এই সামিট আয়োজনের বহু আগে থেকেই চীনা প্রেসিডেন্ট বলে যাচ্ছিলেন, আমেরিকা ও চীনের ভাগ্য একসুতায় গাঁথা। ট্রাম্প যেন সে দিকটার গুরুত্ব আমল করে আর নাকি-কান্না শুরু না করে কথা বলেন। গত ৩৩ বছর চীন বিষয়ক অর্থনৈতিক নানা পলিসি-নীতি নিয়ে একাদেমিক কাজে জড়িয়ে আছেন কানাডার এমন এক অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে  অধ্যাপক কেন মোক (KEN MOAK), বর্তমানে সিঙ্গাপুরের এশিয়ান টাইমসে লিখেন; তার ভাষায় বললে,  ‘ট্রাম্পের এই ইউটার্ন এক বিরাট কাজের কাজ হয়েছে’। এ যেন নিজাম ডাকাতের সাধু হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। কারণ ট্রাম্প মন্তব্য করে বসেছেন, “প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে”।

আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে প্রথম বৈঠক নির্ধারিত ছিল ১৫ মিনিটের; সেটা বর্ধিত হয়ে গিয়ে ঠেকে ৩ ঘণ্টায়।’ এ এক বিরাট ওলট-পালট ঘটনা। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প নিজেই আমাদের আরো জানাচ্ছেন, ‘সাক্ষাতের দ্বিতীয় দিনে আর এক সভা ছিল মাত্র ১০ মিনিটের যেটা ২ ঘণ্টা ধরে চলেছিল’। ট্রাম্পের ভাষায় …‘আসলে আমাদের দু’জনের রসায়নটা জমে গিয়েছে’। অর্থাৎ তিনি যে শুধু বিগলিত হয়ে গিয়েছিলেন তাই নয়। সেটা আবার তিনি সবার কাছে প্রকাশ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
খুব সম্ভবত চীন-আমেরিকা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক ইস্যুতে আলাপের ‘রসায়ন যতই জমে যায়’, ততই উত্তর কোরিয়া বিষয়ে চীনের ভূমিকা আছে, চীনের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে ট্রাম্পের আশা আকাঙ্খা আরো বড় হয়ে যায়। সেটা এতই বড় হয়ে যায় যে, প্রেসিডেন্ট শি ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের অতিথি থাকা অবস্থায় ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর বোমা হামলা করে বসেন; সিরিয়া কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করছে – এই অভিযোগে। দু’দিন পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন এই হামলার আরও একটা কারণ বলছেন। বলছেন, উত্তর কোরিয়াকে শিক্ষা দিতে আর একটা মেসেজ দিতেও এই বোমা হামলা করা হয়েছিল। এ ছাড়া এরপর ট্রাম্প নিয়মিত এই প্রসঙ্গে নানান কথা বলে চলেছেন। যেমন টুইট করে বলছেন, ‘চীনা প্রেসিডেন্টকে ব্যাখ্যা করে বলেছি, উত্তর কোরিয়া সমস্যাটা তারা (চীন) মিটিয়ে দিতে পারলে আমরা অনেক ভালো এক বাণিজ্য সম্পর্ক করতে পারতাম’।

ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র (WMD) আছে- এই মিথ্যা অজুহাতে ২০০৩ সালে বুশ-ব্লেয়ার ইরাকে হামলা করেছিল। অতীতে (১৯৫০-৩ সালে) ঠিক একই রকম ‘কোরিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানো’ এই অজুহাতে পঞ্চাশের দশকে শুরুতে আমেরিকা কোরিয়ায় হামলা করেছিল। কিন্তু সে যুদ্ধ কোন জয়-পরাজয়ের লড়াই দিয়ে মীমাংসা হয়নি। বরং কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি টানা হয়েছিল। আমেরিকা পালিয়ে বেঁচেছিল। আর ওই ঘটনার লেজ ধরে পরে ভিয়েতনামকেও আমেরিকা হামলা ও দুভাগ করেছিল। যেটা ১৯৭৫ সালে একক ভিয়েতনামের স্বাধীনতায় সমাপ্ত হয়েছিল। আর কোরিয়ার বেলায়, কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি ওই অঞ্চলে তখনকার মত যুদ্ধ থামাতে পারলেও যুদ্ধের টেনশন সেই থেকে এখন পর্যন্ত কখনই মিটানো যায়নি। বরং সেই থেকে আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে স্থায়ী সেনাঘাঁটি করে বসে যায়। এর পালটা হিসেবে, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজেকে সুরক্ষা করতে গিয়ে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ করে ফেললে ঐ অঞ্চলের ভারসাম্য বদলে পরিস্থিতি সেই থেকে আরো জটিল হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে একালে চীনের সমাধান প্রস্তাব হল,ওই অঞ্চলের সবাইকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যেতে হবে। আর আমেরিকান এখনকার প্রস্তাবের মূল কথা হল, বলপ্রয়োগে কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র-ছাড়া করানো সম্ভব।’ এটা সম্ভবত মুখে বলা কথা। কিন্তু মনে মনে চায় চীন উত্তর কোরিয়াকে আমেরিকার সাথে টেবিলে আলোচনায় এনে বসিয়ে দেক। একটা রফা হোক।  ট্রাম্পের কথায় সে ইঙ্গিতও আছে যদিও। ফলে চীন-আমেরিকার উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে নীতির মূল ফারাক হল – চীন কোরিয়াকে টেবিলে ডেকে আনবে, আমেরিকাসহ সকলে বল প্রয়োগের পথ ছেড়ে সবাই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যাবে। নাকি আমেরিকা বোমা মারতে যাবে – এই হলো মূল তর্ক।

এখনকার এই সময় উত্তর কোরিয়া সুনির্দিষ্ট করে ইস্যু হয়ে উঠার পিছনের মূল কারণ অবশ্য আলাদা। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপান  উত্তর কোরিয়ার হামলার আয়ত্ত-সীমার ভেতর বহুদিন থেকেই আছে। তা থাকলেও খোদ আমেরিকা থেকে গেছে উত্তর কোরিয়ার নাগাল-সীমার বাইরে অনেক দূরে অন্য মহাদেশে। ফলে উত্তর কোরিয়ার  খায়েশ হামলার জন্য  আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল জোগাড় করা। সে বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সফলতা উত্তর কোরিয়া নাকি পেতে চেষ্টা করছে, কিছু একটা পেয়েছে যা এখন পরীক্ষা করতে পারে, দেখতে চায় – এমন জল্পনা কল্পনার তথ্য এই হলো এখনকার টেনশনের উৎস। অবশ্য অনেকে এমন তত্ত্ব দিচ্ছেন যে, এটা আসলে  ট্রাম্পের আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে জড়ানোর খায়েস বা উছিলা। একটা যুদ্ধ লাগিয়ে নিজ অর্থনীতির দশা ফিরানোর আকাঙ্খা ট্রাম্পের নাকি আছে। এসব ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ সত্য-মিথ্যা যাই হোক, নিউ ইয়র্ক টাইমস অন্য এক তথ্য জানিয়ে লিখছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর সঙ্গের এই সফরে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে কিছু একটা সমঝোতা হয়েছে, যেটা আস্তে ধীরে সামনে আসবে। [the Chinese have agreed to crack down on their second-tier banks that have helped finance the North’s trade.] অনুমিত এই খবর সত্যতা স্বীকার-অস্বীকার কোনটাই কেউ করে নাই। তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর ট্রাম্প সাক্ষাতের মাত্র দশদিনের মাথায় ইতোমধ্যেই দুবার তাদের দুজনের ফোনালাপ হয়েছে।

তবে কার্যত ও বাস্তবে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হল, স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে প্রয়োজন হয় বিশেষ গুণসম্পন্ন এক কয়লা, সে কয়লার খনি উত্তর কোরিয়ার আছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এর বড় ব্যবহারকারী। এমন কয়লাভর্তি প্রায় ১০টা জাহাজ চীনা বন্দর থেকে ফেরত দেয়া হয়েছে এবং উত্তর কোরিয়ায় তা ফিরিয়ে এনেছে। বার্তা সংস্থা রয়টারের জাহাজ চলাচলবিষয়ক বিশেষ স্যাটেলাইট মনিটরিং সার্ভিস এই তথ্য দিয়েছে। অর্থাৎ চীন উত্তর কোরিয়া থেকে এই কয়লা আমদানি এবার প্রথম বন্ধ করল। যদিও এ সম্পর্কে কোন কিছুই সাংবাদিকদের প্রশ্নে্র জবাবে  চীন এখনও কিছু জানায় নাই। এছাড়া  কিছুদিন আগে জাতিসঙ্ঘের উত্তর কোরিয়া বিরোধী অর্থনৈতিক অবরোধের সিদ্ধান্তের পক্ষে চীন অবস্থান জানিয়েছিল; বলে সেই থেকে উত্তর কোরিয়ার সাথে চীনের সম্পর্ক ঝুলেই আছে। অর্থাৎ যেটা অনুমানের তা হল, উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকরভাবে প্রয়োগে জন্য  চীনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে  আমেরিকার ট্রাম্প।

ওদিকে উত্তর কোরিয়ার শাসকের অবস্থান হল, পরিস্থিতি কোনো আলোচনার টেবিল পর্যন্ত গেলেও শর্তসাপেক্ষে তা কেবল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের চুক্তি টুক্তির মধ্যেই সবকিছু যেন সীমাবদ্ধ থাকে। অনুষঙ্গীভাবে কোনো পণ্অয বিনিময়, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক সবার সাথে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে, তা সে একেবারেই চায় না। কারণ সে ক্ষেত্রে তার সরকার চিরতরে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আবার চলতি পরিস্থিতিতে আমেরিকার জন্য এর নেতিবাচক দিকটা হল, সে দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের প্রতিরক্ষা-দাতা হলেও (এই দুই দেশেই আমেরিকার সেনাঘাঁটি আছে) এই দেশ দুটার কেউ আমেরিকার সাথে মিলে যুদ্ধে শামিল হতে রাজি নয়। এককথায় বললে,আমেরিকা ছাড়া ঐ অঞ্চলের কেউই যুদ্ধের পথে যেতে আগ্রহী নয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন  প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আসন্ন। তাই সব প্রার্থীই দাবি জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতামত না নিয়ে যেন আমেরিকা কোনো যুদ্ধ ঘোষণা না করে বসে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি আরো একটু খোলাখুলি। তিনি বলছেন, ‘ছোড়া গুলির প্রতিটার ঐতিহাসিক দায়দায়িত্ব ক্ষয়ক্ষতি ও শাস্তির কথা মনে রেখে যেন সবাই আচরণ করে’।  [they must shoulder that historical culpability and pay the corresponding price for this,”]  চীনা হুশিয়ারির মূল কথা হল, এরকম উত্তেজনার মধ্যে দীর্ঘ সময় বসবাস করার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়া কোন ভুলবশত “(accidental conflict)’ সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। চীন এদিকটা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।  বিশেষ করে চীন মনে করে ‘উত্তর কোরিয়ার সাথে আবার অস্ত্র কর্মসূচিতে নিগোসিয়েশন হতে পারে বলে চীন আস্থা রাখে এখনও’। কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চল কী এ যাত্রায় যুদ্ধ এড়াতে পারবে, সে উদ্বিগ্নতায় এশিয়ার সবাই। যুদ্ধ মানে এশিয়ায় উদীয়মান অর্থনীতিতে যার যেটুকু অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি হয়ে আছে তা ধুলিস্যাত হয়ে যাওয়া। ফলে মাথা গরম নয়, নিগোশিয়েশন।

সর্বশেষ হল, ট্রাম্প আমেরিকার সিনেটের সকলকে কংগ্রেসে ডেকেছেন, যৌথভাবে সকলকে উত্তর কোরিয়া বিষয়ে প্রেসিডেন্টের বিফ্রিং জানানোর জন্য।  স্বভাবতই ট্রাম্পের এই  সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়ায় আমেরিকার হামলা আসন্ন – এমন জল্পনা-কল্পনাকেই আরও বাড়িয়ে তুলল।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ২৩ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন আপডেট ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

ফুট নোটঃ চীনা মুদ্রার নাম ইউয়ান (RMB) । এক আমেরিকান ডলার=৬.৮৮ ইউয়ান। [অর্থাৎ এক ইউয়ান মানে আমাদের প্রায় ১২ টাকা।]  ঐতিহাসিকভাবে গত ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে, ডলার-ইউয়ান এর মান সবচেয়ে বেশি ছিল ১৯৯৪ সালে ৮.৭৩ ইউয়ান, আর সর্বনিম্ন ১৯৮১ সালে ১.৫৩ ইউয়ান। 

Historically, the Chinese Yuan reached an all time high of 8.73 in January of 1994 and a record low of 1.53 in January of 1981.

ট্রাম্প-ভক্তিতে খুশি থাকা ভারতীয় হিন্দু মন এখন বিপদে

ট্রাম্প-ভক্তিতে খুশি থাকা ভারতীয় হিন্দু মন এখন বিপদে

গৌতম দাস

০৯ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2en


ঘটনা বহুবিধ এবং বেশ তামাশার! যেন সেই বহু পুরান প্রবাদ যে, দাঁত থাকতে কেউ দাঁতের মর্ম বুঝে না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প – তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী দাবিদার হয়ে বাজারে আসার পর থেকে এনিয়ে ভারতের বিজেপি শিবসেনা সমর্থক কিছু মানুষের খুশি ছিল দেখার মত। কেন? এতে ভারতের খুশি হবার জন্য আবার কী হল? ভারতের সরকারি ইঙ্গিতে প্রকাশিত অবস্থান ছিল তারা খুশিতে আহ্লাদিত। তাদের অনুমান ছিল যে ট্রাম্প ২০১৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে জিতার অর্থ হবে বিগত জুনিয়র বুশ আমলের (দুই টার্ম ২০০১-৮) মত ইসলাম কোপানো দাবড়ানোর – মজা আর মজা- আবার ফিরে আসবে। খালি মুসলিম ব্যাশিং, মুসলমান দেখলেই দাবড়ানো আর চাপে রাখার নীতি ফিরে আসতেছে। এমনকি ট্রাম্পের জয়লাভের পর এবং গত জানুয়ারি ২০১৭ সালেও তারা প্রচন্ড খুশি ছিল। সদ্য উত্তরপ্রদেশে যে কুখ্যাত দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী হলেন আদিত্যনাথ তিনিও খুশি শুধু না উনি আরও এক কাঠি সরেস। তা হল এই মুসলমান ব্যাশিং কোপানো ব্যান ইত্যাদি এগুলো করা ট্রাম্প নাকি শিখেছেন  তাদের দলের কাছ থেকে। আবার ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে যাওয়াতে মোদী সরকারের মধ্তেযেও এক ধরণের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল কারণ এটাকে  তারা পাকিস্তানের উপর আমেরিকার চাপ বাড়ানোর দিন ফিরে আসতেছে বলে দেখত।  ওয়ার অন টেররে ভারতের প্রপাগান্ডা গুলোও বেশ অদ্ভুত। এই যুদ্ধের শুরু যেন আফগানিস্তানের আলকায়েদা বনাম আমেরিকা – এখান থেকে শুরু নয়। মুল বিষয় যেন আলকায়েদা-বিরোধী আমেরিকার লড়াই নয়, সেই লড়াইয়ে পাকিস্তান যেন আমেরিকার হয়ে লড়বার, লড়ে দিবার ফ্রন্টাল রাষ্ট্র নয়। আফগানিস্তানে আলকায়েদার উত্থান ও ততপরতা যেন পাকিস্তানের কারণেই, পাকিস্তানের ইচ্ছায় শুরু হয়েছে বা পাকিস্তানই এসব কিছু করেছে, এটা ভাবতে ও প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসে। অথচ মূল ঘটনাটা হল আসলে, আলকায়েদা টাইপের রাজনীতির সঙ্গে আমেরিকার রাজনৈতিক লড়াই। পাকিস্তান-ইন্ডিয়া কাশ্মীর নিয়ে লড়াই ঝগড়া প্রক্সি যুদ্ধ সবই করছে। সেগুলো আমেরিকার ওয়ার অন টেররের বড় জোর আন্ডার কারেন্ট। যেটা ৯/১১ এর আগেও ছিল এখনও আছে।

আবার আমেরিকা তার এই ওয়ার অন টেররের লড়াইটা লড়তে চায় এক. প্রচ্ছন্ন এই বয়ানের আড়ালে যে শুধু আলকায়েদারা টেরিরিস্ট নয় মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট। দুই. ‘টেররিস্ট’ শব্দটা এনে এই যুদ্ধে নিজের দায়ভার উলটে সে মুসলমানের উপর দিতে চায় এবং ‘ওরা’ খারাপ – এই দায়ভারে অভিযুক্ত করতে চায়। এর উপর আবার একালে আমেরিকান নির্বাচনে এসে ট্রাম্প আরও এক উলটা গান ধরতে চায়।  তা হল, “মুসলমানেরা দুনিয়ায় গন্ডগোল করছে” এই আগাম অনুমিত বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে এইবার বলতে চায় যে, তাই ট্রাম্প মুসলমানেদের আমেরিকায় ঢুকা বন্ধ করে আমেরিকানদের জীবন সুরক্ষা করার পথে যেতে চায়। সেকারণে নির্বাচনে এক অভিনব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ট্রাম্প যে, সে নির্বাচিত হবার পর দুনিয়ার মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবে। প্রমাণহীন এসব বয়ানের বাস্তবায়নের ঝামেলা এবং এতে ট্রাম্পের বর্ণবাদ ছড়ানোর বিপদ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এই ধারণাকেই ছড়িয়ে  পপুলার করার পথ ধরেছিল কেবল ভোটের স্বার্থে।

এদিকেও ভোটে জিতে শপথ নিবার পর তিনি এককথার লোক এটা দেখাতে, তিনি তাঁর কথা টুইস্ট করে কথার ফাঁক তৈরি করেন।  তাঁর বয়ানে প্রথমত তিনি দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট –এই ধারণা যেন তিনি বজায় রেখেছেন এই ভাব ধরলেন ঠিকই কিন্তু এনিয়ে সিদ্ধান্তের সময় কেবল সাত রাষ্ট্রের (সারা দুনিয়ার না) মুসলমানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।  দ্বিতীয়ত, আবার ইমিগ্রেশনে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় যে কোন দেশের মুসলমান মাত্রই কার্যত তাঁর উপর এই নিষেধাজ্ঞা ইমিগ্রেশনে ব্যবহার করতে চাইলেন। তিন. তিনি ভাব ধরতে চাইলেন যে তাঁর এই সিদ্ধান্ত যেন আজীবনের। কিন্তু আদেশে যে তিনি লিখলেন এই সিদ্ধান্ত তিন মাসের। অর্থাৎ এটা সাময়িক। ব্যাপারটা নির্বাহী আদেশের মধ্যে “সাময়িক” তা বলে রাখতে চান এজন্য যে তাহলে আসলে যে “দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট” এবং “মুসলমানদের অমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করে দিলে আমেরিকানদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে” এর কোন প্রমাণ বা স্টাডি ট্রাম্পের কাছে না থাকলেও তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে কোন সাফাই তাকে দিতে হবে হবে না। কারণ তিনি বলতে চান এবিষয়ে আমেরিকান সরকারের নীতি কী হবে তা ঠিক করতে গিয়েই তার সরকার বুঝাবুঝির শেষ করার জন্য এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ তাঁর দরকার। এই ছিল ট্রাম্পের চাতুর্য ও সাফাই। আবার এই কাজটাও তিনি বর্ণবাদ ছড়িয়ে করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমান মাত্রই সে ‘অভিযুক্ত’ ও ‘টেররিস্ট’ – বয়ান  এমন বানানোটা তা বর্ণবাদী। তা হলেও এই বর্ণবাদ করার লোভ ট্রাম্প ছাড়তে চান না। এমনকি কোন মুসলমান আমেরিকান নাগরিক বা আমেরিকায় বসবাস ও চাকরি করতে অনুমতিপ্রাপ্ত গ্রীনকার্ড ধারী ব্যক্তির বেলায়ও কেবল তিনি মুসলমান হলেই তার উপর ইমিগ্রশন নিষেধাজ্ঞা বলবত করতে চান ট্রাম্প।  এইভাবে মুসলমান  অধিবাসীর উপর আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ট্রাম্প। যদিও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত আমেরিকান আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। তিনি আর তা টিকাতে পারে নাই। বাতিল হয়ে যায়।  কিন্তু ট্রাম্পের এসব মিলিয়ে মুসলমান ব্যাশিং বা পিছনে লাগা – এটার ভিতরেই ভারত সরকার আর বিজেপি শিবসেনা সমর্থক দলীয় লোকেরা নিজেদের স্বার্থ দেখেছিল। কারণ এই মুসলমান ব্যাশিং ও বিদ্বেষ এর মধ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের কূটনৈতিক সুযোগ সম্ভাবনা আছে। আর এই নীতি বাস্তবায়নে আমেরিকাকে ভারতের উপর নির্ভরশীল করে ফেলার সুবর্ণ সুযোগ জুটে যাওয়া হিসাবে দেখেছিল ভারতের আমলা-গোয়েন্দা চক্র। এছাড়া মোদীর মত রাজনৈতিকরা মুসলমান বিরোধী রেঠরিক আওয়াজ তুলে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ও ভোটের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর বিশেষ সুবিধা পাবার সুযোগ হিসাবে দেখেছিল। এসব কিছু মিলিয়ে আমরা ভারতের কোন অর্ধ-আরবান শহরেও রাস্তায় রাস্তায় ট্রাম্পের ছবি টাঙিয়ে ফুল আর ধুপধুনা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘন্টা নেড়ে পুজা করা হতে দেখেছি আমরা। আগ্রহীরা এই ক্লিপটা খুলে দেখতে পারেন। স্বভাবতই এটা ঠিক আর পুজা ছিল না, থাকেনি। ইসলাম –বিদ্বেষ আর ঘৃণা ভারতে কত তীব্র ভাবে লালন পালন করা হচ্ছে এর কিছু নজির – তাই আমরা দেখেছিলাম।  অবলীলায় বর্ণবাদের খোলাখুলি এত প্রকাশ বোধহয় আর কিছুতে প্রকাশিত হতে দেখা যায় না। ভারতে  বর্ণবাদ-বিরোধী হুশজ্ঞানসম্পন্ন কোন মানুষ বসবাস করে মনে হয় নাই। সে যাই হোক কিন্তু ওদিকে আদালতের বাধায় ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা এক-দেড় সপ্তাহের বেশি কার্যকর থাকতে পারে নাই। কিন্তু অতটুকু সময়েই এমনকি ভারতীয়দের এমন তর্ক করতে আমরা দেখেছি যে তারা বলছে, ইসরায়েলে যেতে বাংলাদেশের পাসপোর্টে যেহেতু নিষেধাজ্ঞা জারি আছে অতএব এরই সমতুল্য ঘটনা নাকি ট্রাম্পের “আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি” করা। অথচ বাংলাদেশ-ইসরায়েলের ব্যাপারটা হল, একটা  পারস্পরিক আইনী কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা। এর ফলে কেবল নিজ দেশের নাগরিকের উপর নিষেধাজ্ঞা। অথচ এই বিষয়টাকে ট্রাম্পের “মুসলিম ব্যানের” এর সাথে জবরদস্তিতে তুল্য ঘটনা বানিয়েছিল এরা ফেসবুকে। পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা মানেই সেটা বর্ণবাদি সমস্যা নয়। চীনে মাওয়ের বিপ্লবের পর থেকে পরের ২২ বছর চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সেটা বর্ণবাদী সমস্যা নয়। ওদিকে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ধরণ নিজ নাগরিক উপর নয়। বরং দুনিয়ার এক বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়ের উপর (বর্ণবাদি কায়দায়)। এমনকি ঐ ধর্ম সম্প্রদায়ের  কোন দেশি বা বিদেশি নাগরিকের উপর নির্বিশেষে । তবু  ট্রাম্প-প্রেমিম ও  ইসলাম-বিদ্বেষী ভারতীয়দের এমন সাফাই গাইতে আমরা দেখেছি। ভারতের আমলা-গোয়েন্দার এই ইসরায়েল-প্রেম তাদেরকে কূটনৈতিক মাইলেজ দিবে বলে তারা বিশ্বাস করে।

কিন্তু বেশি দিন লাগে নাই। বেচারা ভারতের আমলা-গোয়েন্দা। আর ট্রাম্পকে আক্ষরিকভাবেই পুজা-কারী সেই প্যাথেটিক আরএসএস সমর্থক ও ভোটাররা। ট্রাম্পের ক্ষমতার শপথ নিবার মাত্র একমাস – এর মধ্যে ভারত টের পেতে শুরু করে যে ঘটনা কল্পনা মত আগাচ্ছে না। ট্রাম্প জুনিয়র বুশ না; যে আমেরিকার ইসলামবিদ্বেষী নীতি মানেই তা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কোলে ভারতীয় হিন্দু রাজনীতির উঠে পড়ার দুয়ার খুলে যাওয়ার এক্সট্রা মাইলেজ নয়।  বুশের আমলের রমরমা সুযোগ ট্রাম্পের হাত ধরে ফিরে আসছে না। ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ট্রাম্পকে পাঠ করেছিল খুবই সহজভাবে। “আমরা আমরাই তো মনে করে”, এক ইসলাম-বিদ্বেষী ক্রুক হিসাবে। হিন্দু রাজনৈতিক মন এখানে প্রায় শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে।

তাঁরা প্রথম ধাক্কাটা খায় “ভারতীয়রা আমেরিকানদের চাকরি খাচ্ছে” – ট্রাম্পের এই ইস্যুতে। এটা আমলা-গোয়েন্দারা আগে খেয়াল করে নাই এমন না। তারা ভেবেছিল একটা ‘প্যাচ আপ’ বা রফা তারা বের করে ফেলতে পারবে। এখানটাতেই তাদের নজর আন্দাজ ঘটে গেছিল।  ট্রাম্প কী নিয়ে রাজনীতি করতে চাচ্ছে তারা এটা শুধু বুঝেই নাই তা নয় একে আন্ডার এস্টিমেট করেছিল। ট্রাম্পের এই নির্বাচনের সাথে সাথে আমেরিকান সংসদ (কংগ্রেস) ও সিনেটের নির্বাচনে সবই রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্টতায় চলে যায়। গত বছর নভেম্বরে নির্বাচনের ফল আসার পর থেকেই প্রথমত “আমেরিকানদের চাকরি খাওয়ার” ভারতীয় কোম্পানীর বিরুদ্ধে একশনে  যাওয়া – এটা  পাগলা ট্রাম্পের একার পাগলামি ইস্যু নয়। এর প্রমাণ হল, ট্রাম্পের শপথ নিবার  আগে থেকেই লিড নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেস ও সিনেট ‘চাকরি খাওয়া ইস্যু’ নিয়ে পাল্টা নতুন আইন, চাকরি আমেরিকার বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো নিয়ে নানান আইন প্রণয়ন শুরু হয়। আর এই প্রক্রিয়া শুরুর আড়াই মাস পর ট্রাম্প শপথ নিয়ে এতে যোগ দিয়েছিল। এরচেয়েও বড় কথা নতুন আইনের প্রস্তাবে কেবল রিপাবলিকানই না, ডেমোক্রাটদেরও তাতে সমর্থন ছিল ও আছে। শুধু তাই না কোন কোন আইনের প্রস্তাবক বাই-পার্টিজান, মানে দুই দল মিলে। সারকথায় ট্রাম্প আমেরিকানদের চাকরি খাওয়াকে নিজের নির্বাচনি ইস্যু করেছিল কথাটা সত্যি হলেও  কংগ্রেস ও সিনেটে এই ইস্যুটা ছিল বাই-পার্টিজান।

আসলে এই ঘটনার আসল অর্থ তাতপর্য হল, আমেরিকা ক্রমশ পতন হইতেছে এমন এক পরাশক্তি – কানে পানি যাবার এই অনুভব আমাদের সকল রাজনীতিকের , সব দলের। ফলে সবাই চাইতেছে আমেরিকার ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসাবে রিপাবলিকানদের লিডে সবাই একসাথে সমর্থনে খাঁড়ানো। ট্রাম্প লিড নিলেও অন্তত এই ব্যাপারটাতে াইনের প্পিরস্ছতাবের পিছনে দাড়ানোর বেলায় সব অবস্থান গুলো এরকম। এদিকটাই ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাসহ অনেকেই আন্ডার এস্টিমেট করেছে। ভেবেছে এটা কেবল পাগলা ট্রাম্পের ইস্যু। ফলে ট্রাম্পের মুসলমান ব্যাশিং-এ খুশি হওয়া ভারতীয় হিন্দু মন অচিরেই বুঝতে শুরু করে যে ট্রাম্প তাদের রাজনীতির ‘বাবাও’ নয় অথবা কোন ‘দেবতাও’ নয়। ভারতীয় যারা আমেরিকানদের চাকরি খায় তারা “এইচ-১ বি” ক্যাটাগরির ভিসায় আমেরিকা গিয়ে চাকরি করে। আর ভারতে বসে কল সেন্টার’ ব্যবসা করা অথবা সফটওয়ার তৈরির শ্রমঘন অংশটা ভারত থেকে করে আনা – এগুলোকেই আমেরিকান চাকরি বাইরে থেকে করে আনা বা আউটসোর্সিং  বলা হয়। এসব কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন চলছে এখন। এসব খবর পেয়ে ভারতীয়দের টনক নড়া শুরু হয়। শেষ চেষ্টা হিসাবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারত সব ধরলনের লবি করা প্রায় শেষ করেছে। কিন্তু ফলাফল শুণ্য। ট্রাম্প বুশ নয়, এটা ট্রাম্পের আমল – দিন বদল গয়া। ভারত সরকার ইসলাম-বিদ্বেষী উচ্ছ্বাসে আমেরিকার এক নম্বর দোস্ত ally  – এই বুঝ,  বুশের আমলের সেই পুরান আলাপ ট্রাম্পের আমলে অচল। এটা বুঝতেই দেরি করে আন্ডার এস্টিমেট করে ভারত ধরা খেয়েছে। ট্রাম্পের ইসলাম-বিদ্বেষ আর বুশের ইসলাম বিদ্বেষ এক নয়। আসলে সোজা কথা হল,  ট্রাম্পের ইসলাম বিদ্বেষী ড্রাম-পিটানো মূলত বিদেশী খেদাও, ইমিগ্রেন্ট খেদাও দেশি মানুষের চাকরি বাঁচাও – এই লাইনের।

ঘটনা এক, ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবসহ কূটনীতিকরা আমেরিকায় লবি সফর শেষ করে ভারতে পা  দিয়ে যেই না বলেছে ‘চাকরি ইস্যুতে’ আমেরিকার আশ্বাস দিয়েছে সেই বলা শেষ না করতেই কল সেন্টার বিরোধী বিল পেশ, অথবা “এইচ-১ বি” ক্যাটাগরির ভিসার সুযোগ সুবিধা একটার পর একটা ছেটে দেওয়ার খবর ভারতীয় মিডিয়ায় ছেয়ে গেছে।

ঘটনা দুই, আরও যে সব নেগেটিভ কাহিনী ভারতীয় মিডিয়া নিচু আলোতে ফেলে রেখে এতদিন লুকায়ে রাখতে চাইছিল সেগুলো এখন উথলে সামনে আসছেই। গত ০৬ মার্চ আনন্দবাজার এখন লিখছে,  “তালিকাটা দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমশ। শ্রীনিবাস কুচিভোটলা, হার্নিশ পটেলের পরে দীপ রাই। আমেরিকায় ফের গুলিবিদ্ধ এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত”। ভারতীয়রা আমেরিকায় এসে আমেরিকানদের চাকরি খাচ্ছে – তাই ভারতীয়দের আক্রমণ বা খুন করে দেশে ফিরে যাবার “নকশালী চিরকুট প্রচার” শুরু হয়েছে, সেকথাই এখন ভারতীয় মিডিয়া বলছে। আনন্দবাজারের আর এক রিপোর্টের প্রথম বাক্য  এরকম, – “এক দিকে কূটনৈতিক স্তরে মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দৌত্য। অন্য দিকে,ভারত-মার্কিন বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে দিয়ে ট্রাম্প নেতৃত্বের উপর চাপ তৈরি করা। আমেরিকায় কর্মরত এবং বসবাসকারী ভারতীয়দের পেশা এবং নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এই দু’টি মাধ্যমে সক্রিয়তা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে নয়াদিল্লি” ।

এখআনে তামাশার দিকটা লক্অষ্থয করা যাক, এই তো কয়েক মাস আগেও মুসলিম ব্যানে আমরা ভারতীয় সরকার, দল ও সমর্থক ভোটারদের উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম। আর এখন আনন্দবাজার সেই ট্রাম্পের হাতে “ভারতীয়দের পেশা এবং নিরাপত্তা” নিয়ে উদ্বিগ্নতা খুজে ফিরছে।  আর উপরে যে “ভারত-মার্কিন বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে দিয়ে” কথাটা বলতে দেখলাম ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা এদেরকে দিয়েই আমেরিকায় বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিল।  এছাড়াও আনন্দবাজার নিজের এক সম্পাদকীয় লিখে বসেছে। যেখানে এবার লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে সম্পাদকের  আত্মসমালোচনাও আছে। অনলাইন আনন্দবাজারের সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের নামে লেখা ৬ মার্চ সম্পাদকীয়র শিরোনাম হল, “পড়শিরা যখন আক্রান্ত হচ্ছিলেন,তখন পাশ ফিরে শোওয়াটা উচিত হয়নি”।   অর্থাৎ যখন “মুসলিম ব্যান” চলছিল তখন এরাই হাততালি দিয়েছিল। ট্রাম্পের পুজা করছিল। আর আজ  মুসলমান ব্যশিং এর “আসল মজা” এখন টের পাচ্ছেন অঞ্জন। তাই দল ভারী করতে ‘উচিত হয়নি’ বলে নিজেরই সমালোচনা করছে। কিন্তু আর কী সে দিন আছে? নিজের বিশ্বাযোগ্যতা?

শেষ করব আর একটা তথ্য দিয়ে। আগেই বলেছি সোশাল মিডিয়াতে ভারতীয় বাঙালিরা, ট্রাম্পের মুসলিম ব্যানের নির্বাহী আদেশের আর ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের পাশপোর্টে ইসরায়েল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করেছিল।  গতকাল ১০ মার্চের খবর, ট্রাম্পের মুসলিম ব্যানের নির্বাহী আদেশে সেকালে খুশি হওয়া ভারতীয়রা নিজেই জানতে পারছে  – ভারতীয়রাও এই ব্যান থেকে বাইরে নয়। আনন্দবাজারের খবর, ট্রাম্পের দেশ “আমেরিকায় ঢোকা বারণ মনপ্রীতেরও”। সবচেয়ে বিস্ময়কর শব্দ হল “ও”, মনপ্রীত নামটা  মুসলমান নয়, এমন ভারতীয় মেয়েটাও। কানাডীয় নাগরিক হয়েও ভারতীয় শিখ অরিজিন মনপ্রীত আমেরিকার ঢুকতে পারেনি। ভারতীয়দের হয়ে আনন্দবাজার এতে খুবই কষ্ট পেয়েছে। এরপরেও কী হিন্দু-মন ইসলাম বিদ্বেষ বা বর্ণবাদি অবস্থান ত্যাগী হবে? হিন্দুগিরি নয়, সাধারণভাবে যে কোন মানুষের অধিকারের পক্ষে  নীতিগত অবস্থান নিবার তাগিদ বুঝবে? আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি!

 

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[[এই লেখাটা এর আগে মাসিক অন্যদিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপার জন্য ১১ মার্চ লেখা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

গৌতম দাস

২১ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2aC

 

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মাসে ২০ জানুয়ারি পরবর্তি চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এই চার বছর পৃথিবীর ইতিহাস রুটিন ইতিহাস না হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। বরং মনে হচ্ছে, বিরাট উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলিতে পরিপূর্ণ হতে চলেছে। সে সম্ভাবনা এতই প্রবলতর হচ্ছে যে, যদি না মাঝপথে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচের মতো কোনো ঘটনাতে সব কিছু থামিয়ে পথ বদলে যায়, তবে আমাদের পরিচিত দুনিয়া ও দুনিয়ার পরিবর্তন যেভাবে ও ধাপে ঘটে বলে আমাদের ধারণা বা অনুমান আছে, তা এবার ভেঙে যাবে। দুনিয়া অপরিচিত হয়ে উঠবে। এসব সম্ভাবনা বাড়ছে তো বাড়ছেই। ট্রাম্পের উত্থানের ফলে এমন উদাহরণ ও প্রমাণ হিসেবে অনেক ঘটনাই উল্লেখ করা যায়। আজ এখানে তেমনই এক বিষয় বা ইস্যু –  ট্রাম্প ও তাইওয়ানের চলতি প্রেসিডেন্টের (Tsai Ing-wen) ফোনালাপ নিয়ে আলোচনা করব। Continue reading “ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত”