ভারতের বাংলাদেশে ‘সৈন্য পাঠানো’ শখ

ভারতের বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ শখ

গৌতম দাস

২৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Yj

 

গত ২১ এপ্রিল ভারতের অনেক  প্রিন্টেড মিডিয়া তাদের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই এর বরাতে একটা রিপোর্ট ছাপায় যে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। পরে তৃতীয় দিনে ২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের কাছে সেখানকার ভারতীয় হাইকমিশন জানায় যে এই খবরটা মিথ্যা (This claim is false )।

পিটিআই এর এটাকে বলে স্রেফ ইতরামো – মোদী সরকার, তার সরকারী বার্তা সংস্থা আর তার গোয়েন্দা বিভাগের সবচেয়ে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও নিচু একটা কাজ তারা করেছে।  দেখা যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় সরকারি বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই), এরা বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমেছে, বাংলাদেশে কথিত ভারতীয় সেনা পাঠানোর প্রপাগান্ডায় নেমে এনিয়ে বানানো খবর ছেপে দিয়েছে। যাতে বাংলাদেশকে নিচা দেখানে যায় আর তাতে তাদের দেশ ও দেশপ্রেমের ভারতকে যেন দেখানো যায় অনেক উপরে।  বাংলাদেশকে মোদীর অধীনস্ত করে দেখালে তাতে নরেন্দ্র মোদী ভারতকে অনেক উপরে উঠায়ছেন দেখান যাবে এই হল তাদের বিশ্বাস। তাই, প্রচারিত সেই খবরটা হল ভারত নাকি “বাংলাদেশে আর্মি পাঠাচ্ছে” [Indian Army to send teams to Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan & Afghanistan to fight Covid-19]। আর এই মিথ্যা খবরটা ছড়িয়েছে সরকারি সংস্থা পিটিআই।

এই খবরের ভাষ্যে ভাবটা এমন যেন ভারত যেন তার পড়শি ‘কলোনিগুলোকে’ দেখভাল ও  রক্ষার্থে এসব দেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটা হল প্রপাগান্ডা। কিন্তু এই পিটিআই কী জানে না কোনটা নিউজ আর কোনটা ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা? এটা অবিশ্বাস্য তাই, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষত করে ভারতে প্রায়ই সে দেশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে “পেজ-বিক্রি” করা খবর ছাপা হয়, এটা যদি মনে রাখি। অনেকের মতে, ভারতে মিডিয়ায় এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে, কোনো পত্রিকার ফাইন্যান্সিয়াল অবস্থা যত খারাপ গোয়েন্দা বিভাগের কাছে সে তত বেশিবার নিজেকে বিলিয়ে দিবে, ‘পেজ বিক্রি’ করে অর্থ বা সুবিধা সংগ্রহ করবে।  আর সেক্ষেত্রে বিনিময়ে গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে যা খুশি ছাপতে চায়, সেভাবে তা যেন ছাপাতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে এই ইতরামো করে চলতে প্রায়ই দেখি আমরা। আর ভারতের গোয়েন্দাবিভাগকেও এদের এই দুরবস্থার সুযোগের সদব্যবহার করতে প্রায়ই দেখা যায়। গোয়েন্দাবিভাগেরও হাতেও মিডিয়া-বাজেট মানে মিডিয়াকে প্রভাবিত করার বাজেট থাকে সেটাই এখানে ব্যবহৃত হয়। ছপ্পড় ফেরে এই বাজেটের লোভ লাগিয়ে দেয়া হয়। ভারতে প্রধানধারার বাইরের অনেক ইন্ডেপেন্ডেন্ট মিডিয়া দাঁড় করার উদ্যোগ আছে, যেমন থাকে সবদেশেই.  যেমন, WIRE, SCROLL, CARAVAN ইত্যাদি। কিন্তু অনেককে দেখি হঠাত করে একটা ‘খেপ’ মেরে বসেছে। যেমন ২০১৪ সালে অমিত শাহের মমতার বিরুদ্ধে জঙ্গি প্রপাগান্ডা ও আক্রমণ। দাবি পশ্চিমবঙ্গের “বর্ধমানে জেএমবি বোমা হামলা ঘটনা” পাওয়া গেছে। আর এতে তখনও কিছু মিডিয়া পয়সা কামিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর দেখা গেলে মোদীর অফিসের প্রতিমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং ‘এসব কিছু না’ বলে হঠাত ঘটনায় ঠান্ডাপানি ঢেলে দিয়েছিলেন। এটাই  ভারতের দুস্থ মিডিয়ার এই সাধারণ ঝোঁক যেটা সব সময় দেখা যায়।

আলোচ্য ঘটনাটা আরো অনেক বড় গুরুত্বের এজন্য যে, দেখা যাচ্ছে এবার সরকারি পিটিআই নিজেও এই বানোয়াট খবরের ব্যবসায় এসে গিয়েছে অথচ, পিটিআই ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা। শুধু তাই না আরও দিক আছে।  যেমন একটা বার্তা সংস্থা বানোয়াট প্রপাগান্ডার কনট্যাক্ট নিউজ বা চুক্তিতে ছাপানো খবর ডেস্কে রাখলেই তা ঐ সংস্থার সব “প্রাহক মিডিয়া” যেমন ধরা যাক ওয়েব পত্রিকা “দ্যাপ্রিন্ট” – তাকেও নিউজটা  গ্রহণ ও নিজ পত্রিকায় তা ছাপাতেই হবে ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। উলটা এমনকি “দ্যাপ্রিন্ট” চাইলে এর পালটা নিজস্ব ইনভেস্টিগেটিভ রহস্যভেদী কোন রিপোর্টও ছাপতে পারে। কিন্তু ঘটেছে উলটা। দাপ্রিন্ট প্রপাগান্ডা খবরটা যত্ন করে ছাপিয়েছে।

তাহলে শেখর গুপ্তা যিনি এতই  বর্ষীয়ান সম্পাদক, ভারতের অনেক কয়টা প্রধান দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক  ও তাঁর ইন্ডেপেন্ডন্ট মিডিয়ার বড়াই – বর্তমানে “দ্যাপ্রিন্ট” এর চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা, তাঁর এত বড় বড় কথা বলে লাভ হল কী?   সেই “দ্যাপ্রিন্ট”-ও পিটিআইয়ের প্রপাগান্ডা নিউজটা ছেপেছে  এবং সবার চেয়ে হুবহু বেশি আর নিষ্ঠার সাথে।  তাকেও কী দিয়ে ব্যাখ্যা করব? শেখর গুপ্তের নিজের পত্রিকা ‘দ্য প্রিন্ট’- তারও এই দশা কেন? এমনকি এই নিউজ প্রসঙ্গে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর চেয়ে ‘দ্য হিন্দুর’ প্রেজেন্টেশন অনেক শোভন। কিন্তু ‘দ্য প্রিন্ট’ পড়ে মনে হয় পিটিআইয়ের ভাষ্যটা হুবহু না তুলে  লিখলে যেন ‘দ্যাপ্রিন্ট’ পেমেন্ট কম পাবে, এই ভয়ে আছে। তাই আলোচ্য কেসটা আসলেই আরো বড়। আচ্ছা, ভারতীয় হাইকমিশন এখন  জানিয়ে দিছেন যে পিটিআইয়ের এই  খবরটা মিথ্যা – “This claim is false. There is no decision to send the Indian army …,”।  – এখন মিডিয়ার স্বাধীনতা ইনডিপেন্ডেন্টস নিয়ে মুখের ফেনা তোলা শেখর গুপ্তারা কী বলবেন? কী বা কোন “দেশপ্রেমের” আড়ালে নিজেকে  লুকাবেন? বলবেন যে “ভারতীয় হিন্দুজাতির স্বার্থে রাষ্ট্রের দেশপ্রেমে এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা হলেও সরকারের পক্ষে থাকতে হয়েছিল! হায় রে দুস্থ হাভাতে হতভাগার দেশপ্রেম!

বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ওয়াকেবহাল যারা পিটিআইয়ের বানোয়াট কারবারটা দেখেছেন ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বুঝতে  তাদের বাড়তি কিছু মনোযোগ দিতে হতে পারে।  আমাদের বার্তা সংস্থা বাসস বা ইউএনবিকে দিয়ে ভারতের পিটিআই এর ধারণা নেয়া যাবে না। কারণ এদের তুলনায় পিটিআই মহীরূহ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, ভারতের মিডিয়া ব্যবসায় খবর সংগ্রহের খরচ কমানোর জন্য এত বড় ভারতজুড়ে নেটওয়ার্ক ছড়ানো আছে একমাত্র পিটিআই এর। এ কারণে ভারতের সব রাজ্যের সব পত্রিকার প্রধান ও প্রায় একমাত্র খবরের উৎস এই প্রতিষ্ঠান। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে  কোন বার্তা সংস্থার ভূমিকা অনেক কম। কারণ আমাদের এখানে বাংলাদেশের প্রতিটা মিডিয়া হাউজেরই সবার মূলত নিজস্ব আলাদা  রিপোর্টার স্টাফ সেট থাকে। তবে তাদের সংগৃহীত খবরের খুব ছোট একটা অংশ তারা সরকারি-বেসরকারি বার্তা সংস্থা থেকেও নিয়ে থাকেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিটের সাংবাদিক আছে।  অর্থাৎ সরকথায় ভারতের নিউজ মিডিয়া জগতে বার্তা সংস্থা হিসাবে পিটিআই-এর ভুমিকা অনেক বড় প্রভাবের।

নিউজমিডিয়ায় বার্তা সংস্থার খবর ছাড়া আর এক ধরনের ‘উৎস’ থাকতে দেখা যায় – যেমন ‘আমাদের “নিজস্ব সোর্স” বা সূত্র বলেছে’। যদিও কখনওবা কথিত ‘সোর্স’ অথবা ‘সূত্র মোতাবেক’ এর কথা বলে আড়ালে গুজব বা প্রপাগান্ডাও চালিয়ে দেয়া হয়। ভারতে পেজ বিক্রি এভাবেই হয়ে থাকে। তবে “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” বা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সোর্স-এগুলো বিশ্বাসযোগ্যও হয় অনেকসময়। তবে পিটিআইয়ের ‘আমার সোর্স বলছে’ বা ‘সূত্র মোতাবেক’ বলে এমন উৎসের খবর ছাপানোর সুযোগ কম। মূল কারণ এটা সরকারি তো বটেই; এছাড়া একটা বার্তা সংস্থা সাধারণত ‘সূত্র-খবরের’ উপরে কাজ করে না। এছাড়া ‘সূত্র-খবরের’ ধরনের কাজগুলো মূলত ব্যক্তি বা গ্রুপ মালিকের পত্রিকাগুলোর জন্যই যেন মূলত বরাদ্দ। এই সূত্রে আমরা কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে সে দেশের কম-প্রচারিত পত্রিকাগুলোর সাথেই মূলত সরাসরি ‘কেনাবেচা’ করতে দেখি।

এসব বিচারে ‘ভুয়া সোর্সের নামে’ পিটিআই ভারতে ‘পেজ বিক্রি’ করেছে- এমন আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এগুলো প্রাইভেট মিডিয়া আউটলেট এরাই মূলত করে থাকে। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখলাম সরকারি পিটিআই এমন প্রপাগান্ডায় লিপ্ত হয়েছে।

ঐ রিপোর্টে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও আফগানিস্তান এই চারটা দেশের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে- ভারতীয় সৈন্য এসব দেশে আলাদা আলাদা গ্রুপে পাঠাতে প্রস্তুত করা হচ্ছে [The sources said the teams for Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan and Afghanistan are being readied ]। আর তাতেই চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম- এই প্রপাগান্ডা খবর অস্বীকার করেছে [Dhaka needs no Indian army ……] দৈনিক নিউ এজ -কে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এ মোমেন। এর পরে তা করেছেন আরেকটু পরিষ্কার ও কঠোরভাবে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কমল গুণরত্নে [No need of military assistance from other countries… ]। শ্রীলঙ্কার বক্তব্য বেশি ক্যাটাগরিক্যাল এবং বোল্ড। তিনি বলেছেন, “সৈন্য পাঠানো প্রসঙ্গে দু’রাষ্ট্রে আমাদের মধ্যে কোনো ডায়লগও হয়নি” [there was no such dialogue that had taken place between two nations.]। অর্থাৎ তিনি বুদ্ধিমানের মত প্রকারন্তরে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম দেশ। ফলে কোন ডায়লগ ছাড়া আমি রাজি না হলে আপনি মোদী আমার দেশে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনি কে? মনে হচ্ছে আমাদের অবশ্য এত সাহস হয় নাই।  মানে শ্রীলঙ্কা তার প্রতিক্রিয়া অন্যদের চেয়ে আরেকটু কড়া বা জোরদার করতে পেরেছিল বলা যায়। কারণ শ্রীলঙ্কার অন্তত দু’টি মিডিয়া এখবরের সত্যতা নিয়ে কলম্বোর স্থানীয় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে প্রশ্ন করলে (যেমন, শ্রীলঙ্কার ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকাকে)  ভারত জানিয়েছে এমন ‘খবর মিথ্যা’ (“This claim is false. ) বলে খবরটাকে অস্বীকার করেছে।

এখন এখানে এক মজার তামাশা দাঁড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হল, ভারত সরকারের একটি অফিস আরেকটি অফিসের দাবিকে ‘মিথ্যা বলছে’, অস্বীকার করছে। শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশন মানে হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের অংশ প্রতিষ্ঠান। কাজেই তাদের বক্তব্য ওজনদার। কাজেই এখন এর একমাত্র ফয়সালা প্রধানমন্ত্রী মোদীই করতে পারবে সম্ভবত!
এর মানে হল, পিটিআইয়ের ইজ্জত-লজ্জা কিছু থাকলে তাদেরই এখন ‘ঝুলে পড়া উচিত’। কারণ শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশনই বলেছে তারা মিথ্যা বলেছে। অথচ পিটিআইয়ের দাবি এমন খবর নাকি “বিশেষ সূত্রের খবর”। এই বিশেষ সুত্র এরা তাহলে এখন কোথায়? তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে? সবচেয়ে তামাসাটা হল এমন নিউজ প্রকাশের জন্য পিটিআই কোন জবাবদীহি করেছে আমরা এখনও শুনি নাই।  সরকার বা পিটিআই কাউকে ‘সরি’ বলে নাই।
এর মানে প্রমাণ হল  পিটিআই-এর এডিটরের পক্ষে দিল্লির কোন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও কোন টংয়ের দোকান চালানোর যোগ্যতাও তাঁর নাই।  মোদীকে কাপড় পড়ায়ে ঢাকতে গিয়ে পিটিআই-এডিটর নিজেই ন্যাংটা হয়ে গেছেন!  অবস্থা এখন এমন  কোন ভারতীয় হাইকমিশন মানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলছে,  পিটিআই-এডিটর এক ভুয়া নিউজ করেছে। এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য পিটিআই-এডিটর এর জন্য আর কী হতে পারে?

তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে?
খুব সম্ভবত এটা নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী আর বিজেপির ইমেজ বাড়ানোর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। আর এদিকে একাজ করে দিয়ে অর্থ বা পদ-পদবির লোভ ভারতের কিছু সরকারি কর্মচারী সামলাতে পারেননি, এরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য হয়ত (মোদী সরকারের বিশেষ স্বার্থ বা দেশপ্রেম বলে ভুয়া কথার আড়ালে) গোয়েন্দা বিভাগ আর পিটিআইকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল। যার মূল ভাষ্যটা হল- এটা দেখানো যে এই মোদী সরকার এতই উঁচুতে ভারতকে নিয়ে গেছে যে, পড়শি চার-চারটা রাষ্ট্রকে এখন মোদী পকেটে রেখে চালায়। আর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সেগুলো দেখভাল আর ঠিকঠাক করে রাখতে হয়”। এই ভাষ্যটা যেন বলতে চাইছে, ওসব দেশে সরকার বা প্রধানমন্ত্রী এক আধজন থাকে বটে তবে মোদীই সেগুলোকে মূলত চালায়ে থাকেন। – মোটামুটি এটাই সম্ভবত ছিল গগন-ফাটানো “মোদীগল্প”। আর এদিকে আমরা হয়েছি যেন মোদীগল্প বাস্তবায়ন করে দেয়ার চাকর-বাকর; কিন্তু তাতে আমরা অস্বস্তিহীন হয়ে গেলাম কিনা সে খবর নাই। “ভারতের ব্যগেজ” বইতে বইতে আমাদের মান-ইজ্জত বলে আর কিছু নাই। থ্যাঙ্কস টু শ্রীলঙ্কান জার্নালিস্ট!

পিটিআইয়ের ঐ প্রপাগান্ডা রিপোর্টে একটা বাক্য ছিল যে অংশটা কোনো পত্রিকা কপি করতে  বাদ দেয়নি। বাক্যটা হল, “সার্ক রিজিয়নে করোনা মহামারী ঠেকানোর জন্য একটা কমন ফ্রেমওয়ার্ক গড়ার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এগিয়ে রয়েছে ভারত  [New Delhi has also been playing a key role in pushing for a common framework in dealing with the crisis.]”। কিন্তু মোদীকে এই – “প্লেয়িং কী রোল” –  করতে তারে কে এত ডাকতেছে?
আচ্ছা মোদীর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী  সার্কের করোনা বৈঠক করতে গেছিলেন কেন? এই কী রোল দেওয়ার জন্য নয় তো? চাঁদাই বা দিয়েছিলেন কেন? মোদীকে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে দেয়া- ‘প্লেয়িং কী রোল’ করার জন্য নয় নিশ্চয়? কিন্তু এতে খুশি হয়ে তিনি যখন খুশি তখন, কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই কিছু দেশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিতে পারেন? তাই কী? সত্যি অবিশ্বাস্য! অথচ ‘সার্বভৌমত্ব’ বলে একটা শব্দ আছে! মনে হয় না ভারতের কেউ শব্দটা শুনেছে!

এখানে আলোচ্য পিটিআইয়ের ঐ মিথ্যা রিপোর্টের কিছু অসংলগ্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাকঃ
একঃ  পিটিআইয়ের ওই রিপোর্টে মাত্র চারটি দেশের নাম আছে। কিন্তু পাকিস্তান বা নেপালের নাম নেই কেন?  ভারত বা মোদীর কী নাম নিতে ভয় লেগেছে! না কোনো ‘ঝাপ্টা’ খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল? সার্কের সদস্য তো অন্তত সাত রাষ্ট্র।

দুইঃ ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মোদি সরকারের বন্ধুত্ব-সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে মহামারী সামলাতে ৫৫টা দেশে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন পাঠানো হয়েছে, আর তা আমেরিকাতেও” [As part of its policy to help friendly countries to deal with the pandemic, India is also supplying anti-malarial drug hydroxychloroquine to 55 countries] । কিন্তু ঘটনা হল, এই তথ্য অর্ধসত্য অথবা কোথাওবা পুরাটাই অসত্য। যেমন, এই ওষুধ ভারতের প্রয়োজনের তুলনায় দশ গুণ উৎপাদিন হওয়া সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ভারত থেকে তা রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গোঁফে তা দিয়ে যেন দাম বাড়াবার আনন্দ উপভোগ করতে চায় ভারত। কিন্তু পরে ট্রাম্পের হুমকি-ধমক খেয়ে তৎক্ষণাৎ সব রফতানি বাধা খুলে দিয়েছিল মোদী সরকার। শুধু তাই নয়। এরপর থেকে মোদি দাবি করছেন, এখন তিনি উদার হয়ে গেছেন, ৫৫টি দেশে ভারতীয় ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  পাঠাবেন।

তিনঃ কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য ও তথ্য হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনাভাইরাস নিরাময়ের কোন ওষুধই নয়। এটা মূলত ম্যালেরিয়া তাড়ানোর ওষুধ। অথচ ভারত সরকার গত দুই সপ্তাহের বেশি ধরে এমন ভাব আনছে যেন ক্লোরোকুইনই করোনাভাইরাসের ওষুধ এবং ভারতই এই মহা-ওষুধের আবিষ্কারক, অথবা যেন এবারই এটা প্রথম আবিষ্কার হল। অথচ এই কথাগুলোর কোনটাই সত্য নয়। অনেক আগেই এই ওষুধ আবিষ্কৃত আর ভারতের ম্যালেরিয়া রোগীর জন্য তাদের নিজেদেরই এটা অনেক লাগে, তাই অনেক প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তবু এটা আগে বা কখনো করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদিতই নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO  বা হু) ’র কাছেও অনুমোদিত নয়।

চারঃ ঐ একই রিপোর্টের পরের বাক্যও অসত্য।
যেমন পরের বাক্যে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন অ্যামেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশনের দ্বারা করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ট্রিটমেন্ট বলে চিহ্নিত করা হয়েছে…”। এটা শতভাগ মিথ্যা তথ্য – [ Hydroxychloroquine has been identified by the US Food and Drug Administration as a possible treatment for COVID-19] ।

মজার কথা হল, মিথ্যা করে হলেও ২১ এপ্রিলের এই রিপোর্টেই প্রথম অ্যামেরিকায় যে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) বলে ওষুধের অনুমোদনদাতা বা অথরিটি প্রতিষ্ঠান বলে কেউ আছে, তা নিয়ে প্রথম ভারতের মিডিয়ায় কোন স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল। কারণ, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতের প্রতিটি দৈনিকসহ মিডিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন নিয়ে তুঙ্গে তুলে আলাপ করা হচ্ছিল এভাবে যে ১. ভারতেই করোনার ওষুধ পাওয়া গেছে। ২. তা ভারতের হাতেই আছে। ৩. তা বিশাল ‘গেম চেঞ্জার’, ‘ভারত খেলা বদলে দিতে পারে’ ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বাইরে আসল কথাটা যে এই ওষুধের এফডিএ অনুমোদন নাই – এটা কোন মিডিয়ায় উল্লেখ করা হচ্ছিল না। অর্থাৎ প্রমাণিত কার্যকারিতার প্রমাণ  বা অনুমোদনই নেই এবং কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় – এ দিকটা ভারতের সব মিডিয়া চেপে চলেছিল।

কেন?
প্রথমত এর জন্য মূলত দায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর সেই আড়ালে লুকাতে চেয়েছে ভারতের ব্যবসায়ী-মহলসহ ক্ষমতাসীন মোদীর দলবল। তাই তারা এই ওষুধ একবার ব্যবহারে শুরু হয়ে গেলে তারা সবাই কত বিলিয়ন ডলারের মুনাফায় লালে লাল হয়ে যাচ্ছে- এই লোভে মশগুল ছিল।  ট্রাম্পের ঘনিস্ট বন্ধুরা এবং তিনি নিজেও এই ওষুধের প্রস্তুতকারি কোম্পানির SONAFI এর কিছু শেয়ারের মালিক বলে, ট্রাম্প এই ওষুধের পক্ষে একটা প্রপাগান্ডা বলয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা –  শুরু থেকেই প্রমাণিত যে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হার্টের রোগীর জন্য  নিষিদ্ধ ও ব্যবহার মারাত্মক হতে পারে। বিশেষত অসংলগ্ন অস্থির হার্টবিটের চাপের মুখে রোগী পড়ে যেতে পারেন। অথচ তা ভারতের কেউ বলছেন না। তবে ট্রাম্প এই ওষুধের গ্লোবাল কোম্পানি সানোফির শেয়ারের মালিক বলে তিনিও এটাকে ‘প্রমাণিত’ ওষুধ বলে চালিয়ে দিয়ে চান। এফডিএ-এর ওপর তিনি চাপ দিয়ে যতটুকু করতে পেরেছেন, তা সত্ত্বেও এখনো ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’কে  এফডিএ এখনও করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবু এটা বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেটা ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে। কোনো ডাক্তার এই ওষুধকে কেবল ‘অফ ড্রাগ’ হিসেবে ব্যবস্থা দিতে পারেন শর্তসাপেক্ষে। সেটা কেবল মরণাপন্ন করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই। তবে রোগীকে জানিয়ে ব্যাখ্যা করে ‘সজ্ঞান-সম্মতি’ লিখিতভাবে নিয়ে, রোগী যদি রিস্ক নিতে রাজি থাকেন কেবল এমন বিশেষ পরিবেশে ও শর্তে তা সম্ভব বলে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে। এটাও ট্রাম্প করেছেন এফডিএ’র কমিশনারের ওপর চাপ সৃষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত গত সংখ্যায় লিখেছিলাম।

সবচেয়ে বড় কথা মাত্র গত ২৩ এপ্রিল ভারতের প্রথম যে পত্রিকা ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের অনুমোদনহীনতার কথা ভারতে প্রকাশ করে দিয়েছে –   মিথ্যা লোভ ভেঙেছে ও রিপোর্ট করে দিয়েছে- সেটা কলকাতার ইংরেজি ‘টেলিগ্রাফ’। এর রিপোর্টের বাংলা শিরোনাম- ‘লোভ-লালসার ড্রাগ থেকে সাবধান হয়ে যান’ (ওয়ার্নিং অন কাভেটেড ড্রাগ, Warning on coveted drug)।  এতে যে খবরটা আগেও সত্য ছিল তা ভারতের ভিতরেই আরও মেলে তুলে ধরেছিল কলকাতা টেলিগ্রাফ।  ঐ রিপোর্ট আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্কুল অব মেডিসিনের স্টাডি-গবেষণার ফলাফলের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলছে, ‘এজিথ্রোমাইসিন নামে অন্য ওষুধের সাথে অথবা একা –  ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধের করোনাভাইরাসের নিরাময়ে কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ নেই” [……had found no evidence that hydroxychloroquine (HCQ), used with or without the antibiotic azithromycin, reduced mortality or the need for ventilation in hospitalised Covid-19 patients.]।

কিন্তু তবু আজ ২৬ এপ্রিল ভারত নিজেদের তৈরি ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন যা আসলে করোনার জন্য অনুমোদনহীন, আ বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তাহলে ৫৫টা দেশে ভারতের অকার্যকর ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধকে পাঠাবার মোদীর উদ্দেশ্য তাহলে কী?  এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অকার্যকর ওষুধ পাঠিয়ে বাজার ধরা? মোদী তো দেখা যাচ্ছে একদম ট্রাম্পের পারফেক্ট শিষ্য!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর প্রসঙ্গ : বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

গৌতম দাস

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tY

 

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে

প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party'”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]