ভারতের বাংলাদেশে ‘সৈন্য পাঠানো’ শখ

ভারতের বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ শখ

গৌতম দাস

২৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Yj

 

গত ২১ এপ্রিল ভারতের অনেক  প্রিন্টেড মিডিয়া তাদের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই এর বরাতে একটা রিপোর্ট ছাপায় যে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। পরে তৃতীয় দিনে ২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের কাছে সেখানকার ভারতীয় হাইকমিশন জানায় যে এই খবরটা মিথ্যা (This claim is false )।

পিটিআই এর এটাকে বলে স্রেফ ইতরামো – মোদী সরকার, তার সরকারী বার্তা সংস্থা আর তার গোয়েন্দা বিভাগের সবচেয়ে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও নিচু একটা কাজ তারা করেছে।  দেখা যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় সরকারি বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই), এরা বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমেছে, বাংলাদেশে কথিত ভারতীয় সেনা পাঠানোর প্রপাগান্ডায় নেমে এনিয়ে বানানো খবর ছেপে দিয়েছে। যাতে বাংলাদেশকে নিচা দেখানে যায় আর তাতে তাদের দেশ ও দেশপ্রেমের ভারতকে যেন দেখানো যায় অনেক উপরে।  বাংলাদেশকে মোদীর অধীনস্ত করে দেখালে তাতে নরেন্দ্র মোদী ভারতকে অনেক উপরে উঠায়ছেন দেখান যাবে এই হল তাদের বিশ্বাস। তাই, প্রচারিত সেই খবরটা হল ভারত নাকি “বাংলাদেশে আর্মি পাঠাচ্ছে” [Indian Army to send teams to Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan & Afghanistan to fight Covid-19]। আর এই মিথ্যা খবরটা ছড়িয়েছে সরকারি সংস্থা পিটিআই।

এই খবরের ভাষ্যে ভাবটা এমন যেন ভারত যেন তার পড়শি ‘কলোনিগুলোকে’ দেখভাল ও  রক্ষার্থে এসব দেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটা হল প্রপাগান্ডা। কিন্তু এই পিটিআই কী জানে না কোনটা নিউজ আর কোনটা ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা? এটা অবিশ্বাস্য তাই, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষত করে ভারতে প্রায়ই সে দেশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে “পেজ-বিক্রি” করা খবর ছাপা হয়, এটা যদি মনে রাখি। অনেকের মতে, ভারতে মিডিয়ায় এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে, কোনো পত্রিকার ফাইন্যান্সিয়াল অবস্থা যত খারাপ গোয়েন্দা বিভাগের কাছে সে তত বেশিবার নিজেকে বিলিয়ে দিবে, ‘পেজ বিক্রি’ করে অর্থ বা সুবিধা সংগ্রহ করবে।  আর সেক্ষেত্রে বিনিময়ে গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে যা খুশি ছাপতে চায়, সেভাবে তা যেন ছাপাতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে এই ইতরামো করে চলতে প্রায়ই দেখি আমরা। আর ভারতের গোয়েন্দাবিভাগকেও এদের এই দুরবস্থার সুযোগের সদব্যবহার করতে প্রায়ই দেখা যায়। গোয়েন্দাবিভাগেরও হাতেও মিডিয়া-বাজেট মানে মিডিয়াকে প্রভাবিত করার বাজেট থাকে সেটাই এখানে ব্যবহৃত হয়। ছপ্পড় ফেরে এই বাজেটের লোভ লাগিয়ে দেয়া হয়। ভারতে প্রধানধারার বাইরের অনেক ইন্ডেপেন্ডেন্ট মিডিয়া দাঁড় করার উদ্যোগ আছে, যেমন থাকে সবদেশেই.  যেমন, WIRE, SCROLL, CARAVAN ইত্যাদি। কিন্তু অনেককে দেখি হঠাত করে একটা ‘খেপ’ মেরে বসেছে। যেমন ২০১৪ সালে অমিত শাহের মমতার বিরুদ্ধে জঙ্গি প্রপাগান্ডা ও আক্রমণ। দাবি পশ্চিমবঙ্গের “বর্ধমানে জেএমবি বোমা হামলা ঘটনা” পাওয়া গেছে। আর এতে তখনও কিছু মিডিয়া পয়সা কামিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর দেখা গেলে মোদীর অফিসের প্রতিমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং ‘এসব কিছু না’ বলে হঠাত ঘটনায় ঠান্ডাপানি ঢেলে দিয়েছিলেন। এটাই  ভারতের দুস্থ মিডিয়ার এই সাধারণ ঝোঁক যেটা সব সময় দেখা যায়।

আলোচ্য ঘটনাটা আরো অনেক বড় গুরুত্বের এজন্য যে, দেখা যাচ্ছে এবার সরকারি পিটিআই নিজেও এই বানোয়াট খবরের ব্যবসায় এসে গিয়েছে অথচ, পিটিআই ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা। শুধু তাই না আরও দিক আছে।  যেমন একটা বার্তা সংস্থা বানোয়াট প্রপাগান্ডার কনট্যাক্ট নিউজ বা চুক্তিতে ছাপানো খবর ডেস্কে রাখলেই তা ঐ সংস্থার সব “প্রাহক মিডিয়া” যেমন ধরা যাক ওয়েব পত্রিকা “দ্যাপ্রিন্ট” – তাকেও নিউজটা  গ্রহণ ও নিজ পত্রিকায় তা ছাপাতেই হবে ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। উলটা এমনকি “দ্যাপ্রিন্ট” চাইলে এর পালটা নিজস্ব ইনভেস্টিগেটিভ রহস্যভেদী কোন রিপোর্টও ছাপতে পারে। কিন্তু ঘটেছে উলটা। দাপ্রিন্ট প্রপাগান্ডা খবরটা যত্ন করে ছাপিয়েছে।

তাহলে শেখর গুপ্তা যিনি এতই  বর্ষীয়ান সম্পাদক, ভারতের অনেক কয়টা প্রধান দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক  ও তাঁর ইন্ডেপেন্ডন্ট মিডিয়ার বড়াই – বর্তমানে “দ্যাপ্রিন্ট” এর চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা, তাঁর এত বড় বড় কথা বলে লাভ হল কী?   সেই “দ্যাপ্রিন্ট”-ও পিটিআইয়ের প্রপাগান্ডা নিউজটা ছেপেছে  এবং সবার চেয়ে হুবহু বেশি আর নিষ্ঠার সাথে।  তাকেও কী দিয়ে ব্যাখ্যা করব? শেখর গুপ্তের নিজের পত্রিকা ‘দ্য প্রিন্ট’- তারও এই দশা কেন? এমনকি এই নিউজ প্রসঙ্গে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর চেয়ে ‘দ্য হিন্দুর’ প্রেজেন্টেশন অনেক শোভন। কিন্তু ‘দ্য প্রিন্ট’ পড়ে মনে হয় পিটিআইয়ের ভাষ্যটা হুবহু না তুলে  লিখলে যেন ‘দ্যাপ্রিন্ট’ পেমেন্ট কম পাবে, এই ভয়ে আছে। তাই আলোচ্য কেসটা আসলেই আরো বড়। আচ্ছা, ভারতীয় হাইকমিশন এখন  জানিয়ে দিছেন যে পিটিআইয়ের এই  খবরটা মিথ্যা – “This claim is false. There is no decision to send the Indian army …,”।  – এখন মিডিয়ার স্বাধীনতা ইনডিপেন্ডেন্টস নিয়ে মুখের ফেনা তোলা শেখর গুপ্তারা কী বলবেন? কী বা কোন “দেশপ্রেমের” আড়ালে নিজেকে  লুকাবেন? বলবেন যে “ভারতীয় হিন্দুজাতির স্বার্থে রাষ্ট্রের দেশপ্রেমে এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা হলেও সরকারের পক্ষে থাকতে হয়েছিল! হায় রে দুস্থ হাভাতে হতভাগার দেশপ্রেম!

বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ওয়াকেবহাল যারা পিটিআইয়ের বানোয়াট কারবারটা দেখেছেন ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বুঝতে  তাদের বাড়তি কিছু মনোযোগ দিতে হতে পারে।  আমাদের বার্তা সংস্থা বাসস বা ইউএনবিকে দিয়ে ভারতের পিটিআই এর ধারণা নেয়া যাবে না। কারণ এদের তুলনায় পিটিআই মহীরূহ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, ভারতের মিডিয়া ব্যবসায় খবর সংগ্রহের খরচ কমানোর জন্য এত বড় ভারতজুড়ে নেটওয়ার্ক ছড়ানো আছে একমাত্র পিটিআই এর। এ কারণে ভারতের সব রাজ্যের সব পত্রিকার প্রধান ও প্রায় একমাত্র খবরের উৎস এই প্রতিষ্ঠান। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে  কোন বার্তা সংস্থার ভূমিকা অনেক কম। কারণ আমাদের এখানে বাংলাদেশের প্রতিটা মিডিয়া হাউজেরই সবার মূলত নিজস্ব আলাদা  রিপোর্টার স্টাফ সেট থাকে। তবে তাদের সংগৃহীত খবরের খুব ছোট একটা অংশ তারা সরকারি-বেসরকারি বার্তা সংস্থা থেকেও নিয়ে থাকেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিটের সাংবাদিক আছে।  অর্থাৎ সরকথায় ভারতের নিউজ মিডিয়া জগতে বার্তা সংস্থা হিসাবে পিটিআই-এর ভুমিকা অনেক বড় প্রভাবের।

নিউজমিডিয়ায় বার্তা সংস্থার খবর ছাড়া আর এক ধরনের ‘উৎস’ থাকতে দেখা যায় – যেমন ‘আমাদের “নিজস্ব সোর্স” বা সূত্র বলেছে’। যদিও কখনওবা কথিত ‘সোর্স’ অথবা ‘সূত্র মোতাবেক’ এর কথা বলে আড়ালে গুজব বা প্রপাগান্ডাও চালিয়ে দেয়া হয়। ভারতে পেজ বিক্রি এভাবেই হয়ে থাকে। তবে “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” বা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সোর্স-এগুলো বিশ্বাসযোগ্যও হয় অনেকসময়। তবে পিটিআইয়ের ‘আমার সোর্স বলছে’ বা ‘সূত্র মোতাবেক’ বলে এমন উৎসের খবর ছাপানোর সুযোগ কম। মূল কারণ এটা সরকারি তো বটেই; এছাড়া একটা বার্তা সংস্থা সাধারণত ‘সূত্র-খবরের’ উপরে কাজ করে না। এছাড়া ‘সূত্র-খবরের’ ধরনের কাজগুলো মূলত ব্যক্তি বা গ্রুপ মালিকের পত্রিকাগুলোর জন্যই যেন মূলত বরাদ্দ। এই সূত্রে আমরা কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে সে দেশের কম-প্রচারিত পত্রিকাগুলোর সাথেই মূলত সরাসরি ‘কেনাবেচা’ করতে দেখি।

এসব বিচারে ‘ভুয়া সোর্সের নামে’ পিটিআই ভারতে ‘পেজ বিক্রি’ করেছে- এমন আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এগুলো প্রাইভেট মিডিয়া আউটলেট এরাই মূলত করে থাকে। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখলাম সরকারি পিটিআই এমন প্রপাগান্ডায় লিপ্ত হয়েছে।

ঐ রিপোর্টে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও আফগানিস্তান এই চারটা দেশের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে- ভারতীয় সৈন্য এসব দেশে আলাদা আলাদা গ্রুপে পাঠাতে প্রস্তুত করা হচ্ছে [The sources said the teams for Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan and Afghanistan are being readied ]। আর তাতেই চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম- এই প্রপাগান্ডা খবর অস্বীকার করেছে [Dhaka needs no Indian army ……] দৈনিক নিউ এজ -কে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এ মোমেন। এর পরে তা করেছেন আরেকটু পরিষ্কার ও কঠোরভাবে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কমল গুণরত্নে [No need of military assistance from other countries… ]। শ্রীলঙ্কার বক্তব্য বেশি ক্যাটাগরিক্যাল এবং বোল্ড। তিনি বলেছেন, “সৈন্য পাঠানো প্রসঙ্গে দু’রাষ্ট্রে আমাদের মধ্যে কোনো ডায়লগও হয়নি” [there was no such dialogue that had taken place between two nations.]। অর্থাৎ তিনি বুদ্ধিমানের মত প্রকারন্তরে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম দেশ। ফলে কোন ডায়লগ ছাড়া আমি রাজি না হলে আপনি মোদী আমার দেশে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনি কে? মনে হচ্ছে আমাদের অবশ্য এত সাহস হয় নাই।  মানে শ্রীলঙ্কা তার প্রতিক্রিয়া অন্যদের চেয়ে আরেকটু কড়া বা জোরদার করতে পেরেছিল বলা যায়। কারণ শ্রীলঙ্কার অন্তত দু’টি মিডিয়া এখবরের সত্যতা নিয়ে কলম্বোর স্থানীয় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে প্রশ্ন করলে (যেমন, শ্রীলঙ্কার ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকাকে)  ভারত জানিয়েছে এমন ‘খবর মিথ্যা’ (“This claim is false. ) বলে খবরটাকে অস্বীকার করেছে।

এখন এখানে এক মজার তামাশা দাঁড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হল, ভারত সরকারের একটি অফিস আরেকটি অফিসের দাবিকে ‘মিথ্যা বলছে’, অস্বীকার করছে। শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশন মানে হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের অংশ প্রতিষ্ঠান। কাজেই তাদের বক্তব্য ওজনদার। কাজেই এখন এর একমাত্র ফয়সালা প্রধানমন্ত্রী মোদীই করতে পারবে সম্ভবত!
এর মানে হল, পিটিআইয়ের ইজ্জত-লজ্জা কিছু থাকলে তাদেরই এখন ‘ঝুলে পড়া উচিত’। কারণ শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশনই বলেছে তারা মিথ্যা বলেছে। অথচ পিটিআইয়ের দাবি এমন খবর নাকি “বিশেষ সূত্রের খবর”। এই বিশেষ সুত্র এরা তাহলে এখন কোথায়? তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে? সবচেয়ে তামাসাটা হল এমন নিউজ প্রকাশের জন্য পিটিআই কোন জবাবদীহি করেছে আমরা এখনও শুনি নাই।  সরকার বা পিটিআই কাউকে ‘সরি’ বলে নাই।
এর মানে প্রমাণ হল  পিটিআই-এর এডিটরের পক্ষে দিল্লির কোন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও কোন টংয়ের দোকান চালানোর যোগ্যতাও তাঁর নাই।  মোদীকে কাপড় পড়ায়ে ঢাকতে গিয়ে পিটিআই-এডিটর নিজেই ন্যাংটা হয়ে গেছেন!  অবস্থা এখন এমন  কোন ভারতীয় হাইকমিশন মানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলছে,  পিটিআই-এডিটর এক ভুয়া নিউজ করেছে। এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য পিটিআই-এডিটর এর জন্য আর কী হতে পারে?

তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে?
খুব সম্ভবত এটা নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী আর বিজেপির ইমেজ বাড়ানোর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। আর এদিকে একাজ করে দিয়ে অর্থ বা পদ-পদবির লোভ ভারতের কিছু সরকারি কর্মচারী সামলাতে পারেননি, এরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য হয়ত (মোদী সরকারের বিশেষ স্বার্থ বা দেশপ্রেম বলে ভুয়া কথার আড়ালে) গোয়েন্দা বিভাগ আর পিটিআইকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল। যার মূল ভাষ্যটা হল- এটা দেখানো যে এই মোদী সরকার এতই উঁচুতে ভারতকে নিয়ে গেছে যে, পড়শি চার-চারটা রাষ্ট্রকে এখন মোদী পকেটে রেখে চালায়। আর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সেগুলো দেখভাল আর ঠিকঠাক করে রাখতে হয়”। এই ভাষ্যটা যেন বলতে চাইছে, ওসব দেশে সরকার বা প্রধানমন্ত্রী এক আধজন থাকে বটে তবে মোদীই সেগুলোকে মূলত চালায়ে থাকেন। – মোটামুটি এটাই সম্ভবত ছিল গগন-ফাটানো “মোদীগল্প”। আর এদিকে আমরা হয়েছি যেন মোদীগল্প বাস্তবায়ন করে দেয়ার চাকর-বাকর; কিন্তু তাতে আমরা অস্বস্তিহীন হয়ে গেলাম কিনা সে খবর নাই। “ভারতের ব্যগেজ” বইতে বইতে আমাদের মান-ইজ্জত বলে আর কিছু নাই। থ্যাঙ্কস টু শ্রীলঙ্কান জার্নালিস্ট!

পিটিআইয়ের ঐ প্রপাগান্ডা রিপোর্টে একটা বাক্য ছিল যে অংশটা কোনো পত্রিকা কপি করতে  বাদ দেয়নি। বাক্যটা হল, “সার্ক রিজিয়নে করোনা মহামারী ঠেকানোর জন্য একটা কমন ফ্রেমওয়ার্ক গড়ার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এগিয়ে রয়েছে ভারত  [New Delhi has also been playing a key role in pushing for a common framework in dealing with the crisis.]”। কিন্তু মোদীকে এই – “প্লেয়িং কী রোল” –  করতে তারে কে এত ডাকতেছে?
আচ্ছা মোদীর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী  সার্কের করোনা বৈঠক করতে গেছিলেন কেন? এই কী রোল দেওয়ার জন্য নয় তো? চাঁদাই বা দিয়েছিলেন কেন? মোদীকে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে দেয়া- ‘প্লেয়িং কী রোল’ করার জন্য নয় নিশ্চয়? কিন্তু এতে খুশি হয়ে তিনি যখন খুশি তখন, কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই কিছু দেশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিতে পারেন? তাই কী? সত্যি অবিশ্বাস্য! অথচ ‘সার্বভৌমত্ব’ বলে একটা শব্দ আছে! মনে হয় না ভারতের কেউ শব্দটা শুনেছে!

এখানে আলোচ্য পিটিআইয়ের ঐ মিথ্যা রিপোর্টের কিছু অসংলগ্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাকঃ
একঃ  পিটিআইয়ের ওই রিপোর্টে মাত্র চারটি দেশের নাম আছে। কিন্তু পাকিস্তান বা নেপালের নাম নেই কেন?  ভারত বা মোদীর কী নাম নিতে ভয় লেগেছে! না কোনো ‘ঝাপ্টা’ খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল? সার্কের সদস্য তো অন্তত সাত রাষ্ট্র।

দুইঃ ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মোদি সরকারের বন্ধুত্ব-সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে মহামারী সামলাতে ৫৫টা দেশে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন পাঠানো হয়েছে, আর তা আমেরিকাতেও” [As part of its policy to help friendly countries to deal with the pandemic, India is also supplying anti-malarial drug hydroxychloroquine to 55 countries] । কিন্তু ঘটনা হল, এই তথ্য অর্ধসত্য অথবা কোথাওবা পুরাটাই অসত্য। যেমন, এই ওষুধ ভারতের প্রয়োজনের তুলনায় দশ গুণ উৎপাদিন হওয়া সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ভারত থেকে তা রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গোঁফে তা দিয়ে যেন দাম বাড়াবার আনন্দ উপভোগ করতে চায় ভারত। কিন্তু পরে ট্রাম্পের হুমকি-ধমক খেয়ে তৎক্ষণাৎ সব রফতানি বাধা খুলে দিয়েছিল মোদী সরকার। শুধু তাই নয়। এরপর থেকে মোদি দাবি করছেন, এখন তিনি উদার হয়ে গেছেন, ৫৫টি দেশে ভারতীয় ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  পাঠাবেন।

তিনঃ কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য ও তথ্য হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনাভাইরাস নিরাময়ের কোন ওষুধই নয়। এটা মূলত ম্যালেরিয়া তাড়ানোর ওষুধ। অথচ ভারত সরকার গত দুই সপ্তাহের বেশি ধরে এমন ভাব আনছে যেন ক্লোরোকুইনই করোনাভাইরাসের ওষুধ এবং ভারতই এই মহা-ওষুধের আবিষ্কারক, অথবা যেন এবারই এটা প্রথম আবিষ্কার হল। অথচ এই কথাগুলোর কোনটাই সত্য নয়। অনেক আগেই এই ওষুধ আবিষ্কৃত আর ভারতের ম্যালেরিয়া রোগীর জন্য তাদের নিজেদেরই এটা অনেক লাগে, তাই অনেক প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তবু এটা আগে বা কখনো করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদিতই নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO  বা হু) ’র কাছেও অনুমোদিত নয়।

চারঃ ঐ একই রিপোর্টের পরের বাক্যও অসত্য।
যেমন পরের বাক্যে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন অ্যামেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশনের দ্বারা করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ট্রিটমেন্ট বলে চিহ্নিত করা হয়েছে…”। এটা শতভাগ মিথ্যা তথ্য – [ Hydroxychloroquine has been identified by the US Food and Drug Administration as a possible treatment for COVID-19] ।

মজার কথা হল, মিথ্যা করে হলেও ২১ এপ্রিলের এই রিপোর্টেই প্রথম অ্যামেরিকায় যে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) বলে ওষুধের অনুমোদনদাতা বা অথরিটি প্রতিষ্ঠান বলে কেউ আছে, তা নিয়ে প্রথম ভারতের মিডিয়ায় কোন স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল। কারণ, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতের প্রতিটি দৈনিকসহ মিডিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন নিয়ে তুঙ্গে তুলে আলাপ করা হচ্ছিল এভাবে যে ১. ভারতেই করোনার ওষুধ পাওয়া গেছে। ২. তা ভারতের হাতেই আছে। ৩. তা বিশাল ‘গেম চেঞ্জার’, ‘ভারত খেলা বদলে দিতে পারে’ ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বাইরে আসল কথাটা যে এই ওষুধের এফডিএ অনুমোদন নাই – এটা কোন মিডিয়ায় উল্লেখ করা হচ্ছিল না। অর্থাৎ প্রমাণিত কার্যকারিতার প্রমাণ  বা অনুমোদনই নেই এবং কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় – এ দিকটা ভারতের সব মিডিয়া চেপে চলেছিল।

কেন?
প্রথমত এর জন্য মূলত দায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর সেই আড়ালে লুকাতে চেয়েছে ভারতের ব্যবসায়ী-মহলসহ ক্ষমতাসীন মোদীর দলবল। তাই তারা এই ওষুধ একবার ব্যবহারে শুরু হয়ে গেলে তারা সবাই কত বিলিয়ন ডলারের মুনাফায় লালে লাল হয়ে যাচ্ছে- এই লোভে মশগুল ছিল।  ট্রাম্পের ঘনিস্ট বন্ধুরা এবং তিনি নিজেও এই ওষুধের প্রস্তুতকারি কোম্পানির SONAFI এর কিছু শেয়ারের মালিক বলে, ট্রাম্প এই ওষুধের পক্ষে একটা প্রপাগান্ডা বলয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা –  শুরু থেকেই প্রমাণিত যে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হার্টের রোগীর জন্য  নিষিদ্ধ ও ব্যবহার মারাত্মক হতে পারে। বিশেষত অসংলগ্ন অস্থির হার্টবিটের চাপের মুখে রোগী পড়ে যেতে পারেন। অথচ তা ভারতের কেউ বলছেন না। তবে ট্রাম্প এই ওষুধের গ্লোবাল কোম্পানি সানোফির শেয়ারের মালিক বলে তিনিও এটাকে ‘প্রমাণিত’ ওষুধ বলে চালিয়ে দিয়ে চান। এফডিএ-এর ওপর তিনি চাপ দিয়ে যতটুকু করতে পেরেছেন, তা সত্ত্বেও এখনো ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’কে  এফডিএ এখনও করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবু এটা বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেটা ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে। কোনো ডাক্তার এই ওষুধকে কেবল ‘অফ ড্রাগ’ হিসেবে ব্যবস্থা দিতে পারেন শর্তসাপেক্ষে। সেটা কেবল মরণাপন্ন করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই। তবে রোগীকে জানিয়ে ব্যাখ্যা করে ‘সজ্ঞান-সম্মতি’ লিখিতভাবে নিয়ে, রোগী যদি রিস্ক নিতে রাজি থাকেন কেবল এমন বিশেষ পরিবেশে ও শর্তে তা সম্ভব বলে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে। এটাও ট্রাম্প করেছেন এফডিএ’র কমিশনারের ওপর চাপ সৃষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত গত সংখ্যায় লিখেছিলাম।

সবচেয়ে বড় কথা মাত্র গত ২৩ এপ্রিল ভারতের প্রথম যে পত্রিকা ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের অনুমোদনহীনতার কথা ভারতে প্রকাশ করে দিয়েছে –   মিথ্যা লোভ ভেঙেছে ও রিপোর্ট করে দিয়েছে- সেটা কলকাতার ইংরেজি ‘টেলিগ্রাফ’। এর রিপোর্টের বাংলা শিরোনাম- ‘লোভ-লালসার ড্রাগ থেকে সাবধান হয়ে যান’ (ওয়ার্নিং অন কাভেটেড ড্রাগ, Warning on coveted drug)।  এতে যে খবরটা আগেও সত্য ছিল তা ভারতের ভিতরেই আরও মেলে তুলে ধরেছিল কলকাতা টেলিগ্রাফ।  ঐ রিপোর্ট আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্কুল অব মেডিসিনের স্টাডি-গবেষণার ফলাফলের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলছে, ‘এজিথ্রোমাইসিন নামে অন্য ওষুধের সাথে অথবা একা –  ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধের করোনাভাইরাসের নিরাময়ে কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ নেই” [……had found no evidence that hydroxychloroquine (HCQ), used with or without the antibiotic azithromycin, reduced mortality or the need for ventilation in hospitalised Covid-19 patients.]।

কিন্তু তবু আজ ২৬ এপ্রিল ভারত নিজেদের তৈরি ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন যা আসলে করোনার জন্য অনুমোদনহীন, আ বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তাহলে ৫৫টা দেশে ভারতের অকার্যকর ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধকে পাঠাবার মোদীর উদ্দেশ্য তাহলে কী?  এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অকার্যকর ওষুধ পাঠিয়ে বাজার ধরা? মোদী তো দেখা যাচ্ছে একদম ট্রাম্পের পারফেক্ট শিষ্য!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর প্রসঙ্গ : বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]