চীন সফর ইতিবাচক

চীন সফর ইতিবাচক

গৌতম দাস

০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2BN

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই মাসের শুরুতে ১-৬ জুলাই চীন সফরে যাচ্ছেন। এটা তার চলতি গত ১০ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে প্রথম ২০১০ সালের মার্চেরটা সফরটা সহ ধরলে এটা তৃতীয় চীন সফর হবে। তবে আগের ২০১৪ সালের জুনের  সফরটা ছিল ২০১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে। এবারো প্রায় তাই, ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরের ছয় মাস শেষে। গতবারের সফরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর পরিকল্পিত থাকা সত্ত্বেও চীন সফরে গিয়ে তিনি মত বদলিয়ে তাতে স্বাক্ষর করেননি। মনে করা হয়, ভারতের আপত্তিকে গুরুত্ব দিতে তিনি বিরত থেকেছিলেন। যদিও তখন চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প কেবল শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এই মহাপ্রকল্পের কোনো ছাপ বা প্রভাব সেবারের কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই ছিল না। কিন্তু আসল ঘটনা ছিল ভারতের ভাষায় “আমার প্রভাব বলয়ের” বাংলাদেশ কেন চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতায় যাবে, এই মনোভাব। না, এটা কোন জল্পনা-কল্পনা ছিল না। ভারত মনে করত যে, এশিয়ার পড়শি দেশগুলো হল ভারতের খাস তালুক যেন নিজ বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ির উ্ঠান। আর সে জন্য এটা তার “প্রভাববলয়ের” এলাকা। তবে অবশ্য ভারত নিজেই পরে এ থেকে পিছু হটে।

নীচের প্যারা দুটা গত ২০১৮ সালের পুরানা লেখা থেকেঃ

[‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।]

এটা ঘটেছিল ট্রাম্পের আমেরিকার হাতে পড়ে এর আগে আমেরিকা থেকে ভারত যা যা পেত – প্রাপ্ত প্রায় সে সব সুবিধা গুটিয়ে যাওয়া অথবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই যখন ভারত নিজ-কল্পিত দেবতা ট্রাম্পের উপর পুরা হতাশ হয়ে চীনমুখী পথ ধরেছিল; এর শুরুতেই তখন ভারত নিজ মিডিয়াতেই যেচে স্বীকার করে বলেছিল যে, তার এমন মুরোদ নেই। “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক”।

যা হোক, ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে। বাংলাদেশে আমরা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছি বলে বেড়িয়েছি, আবার সময়ে পিছিয়েও গিয়েছি। এ কথাও বলেছি, “আমরা যা দিয়েছি ভারতকে মনে রাখতে হবে”। এমনকি উল্টো ভারতকেই বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে সাহসের সাথে আহবান রেখেছি। আবার পরক্ষণে চাপের মুখে বলেছি, বাংলাদেশের জন্য আমরা “চীন না অন্য বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজছি”। আবার চীনা রাষ্ট্রদূতের সাহসের বলে বাইরে বের হয়ে বলেছি বেল্ট-রোড প্রকল্পে আমরা জিন্দা আছি। আমরা বিএনপিসহ সর্বদলীয় “বাংলাদেশ-চায়না সিল্ক রোড ফোরাম নামে অধিকাংশ দলের এক সমিতি গঠন করে ফেলেছি।

এমনই এক পটভূমি পরিস্থিতিতে আর বিশেষ করে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার চীন সফরে যাচ্ছেন। এখন এবারও কী প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগের সফরের বকেয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তা তুলে ধরে এগিয়ে যেতে পারবে? সার কথায়, যেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ, এর পক্ষে সবলে দাঁড়িয়ে চীনের সাথে গভীর সম্পর্কে গড়তে এগিয়ে যেতে সাহস করবে? এতে কে কী মনে করবে তা পেছনে ফেলে সফলভাবে নিজ লক্ষ্য অর্জনে লিপ্ত হতে পারবে? এগুলো সবই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, সন্দেহ নেই।

তবে প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে এই চীন সফর আয়োজন করে ফেলা – এটাই ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ও সঠিক পদক্ষেপ। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক আপত্তি বা সমালোচনা যা আছে সব সহই এ ঘটনাকে আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারি; অন্তত এ কারণে যে এই সফরটাই ভারতের স্বার্থের অধীন থেকে বা এর কবল থেকে বাইরে বেরিয়ে বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে নেয়া এক ইতিবাচক পদক্ষেপ।

যদিও এখানে একটা লুকোছাপা আছে। ভারতের একটা নিমরাজি সম্মতি আছে এই সফরে। ভারতের নিজ মুখরক্ষার একটা বয়ানও আছে। সেটা হল এমন, যেন নিজে নিজেদেরই সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা আছে। এই সমস্যার হাল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব-শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক ও কিছু মাত্রায় ঘনিষ্ঠতায় যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই। তাই ভারত এটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হতে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব-বলয় আগের মতোই আছে বা থাকছে- এই অনুমান। যেমন আনন্দবাজার এমনই সাফাই দিয়ে লিখেছে,

“এক দিকে ওবর (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) মহাপ্রকল্পে বাংলাদেশকে কাছে টানা, অন্য দিকে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চিন, ভারত, মায়ানমার) অর্থনৈতিক করিডরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। চিনের এই যৌথ কৌশল ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল বলে মনে করছে বিদেশ মন্ত্রক। দেশে নতুন সরকার আসার পরে এই করিডরটি নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করবে চিন, এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এ বার বাংলাদেশের স্বার্থকে করিডরের সঙ্গে আরও বেশি করে তারা যুক্ত রাখবে, যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না”।

রোহিঙ্গা ইস্যুঃ
রোহিঙ্গা ইস্যুকে আমাদের সরকার সামনে নিয়ে এসেছে এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। তবে এ প্রসঙ্গে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসাই মূলত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কথাও খুবই সত্যি যে, এটা ষাটের দশক নয় যখন  কোন জনগোষ্ঠীকে দিনের পর দিন উদ্বাস্তু করে অনিশ্চিত ফেলে রাখা হবে আর তারা চুপচাপ নিরীহ বসে থাকবে। আগে যাই ঘটে থাকুক, এই শতক শুরুই হয়েছে সশস্ত্রতায় – হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া দিয়ে। ফলে গ্লোবাল পরিস্থিতি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার পক্ষে অথবা বলা যায় অভ্যস্ত। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগাতে তৎপর পরস্পরবিরোধী ছোট-বড় স্বার্থ এত বেশি যে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ধরে রাখাই এক কঠিন কাজ। হোস্ট বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে একাজে।

তবে মনে রাখতে হবে চীনকে কোন কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীনা কূটনীতির শক্তি এখানে অর্থনীতিক, ঠিক রাজনৈতিক নয়। চীন রোহিঙ্গা সমস্যাকে দেখে থাকে, রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ বা অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব এটাই মূল কারণ। ফলে চীনের দেখা এর সমাধানও এখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করার মধ্যে – এভাবে। রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ সমস্যা আছে  একথা হয়ত সত্য হলেও কিন্তু সেটাই রোহিঙ্গাদের চরম নিপীড়িত ও উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণ নয়। মূল সমস্যা রোহিঙ্গারা মুসলমান এই রেসিয়াল ঘৃণা তো বটেই; এ ছাড়া বরং নিজ বার্মিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে সবাইকেই এই বার্মিজ জেনারেলরা প্রচন্ড বর্ণবাদী ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। আর একারনেই রোহিঙ্গাসহ জেনারেলদের অপছন্দ এমন সব জনগোষ্ঠীকেই একমাত্র স্মূলে নির্মূল করার মধ্যেই তাঁরা সমাধান দেখে থাকে। এমন বার্মিজ শাসকদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে কাজ আদায়ের কৌশল কতটা কাজ করবে তাতে আস্থা রাখা কঠিন। সারকথায় চীনা এই পদ্ধতিতে কাজ আদায় বা চাপ দেয়া – টুলস হিসেবে খুবই দুর্বল। আসলে বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে নয় “রাজনৈতিক চাপ” সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুরই কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

চাপ হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন তোলা ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশনের জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইট বা বিচারের আইসিসির তৎপরতা ঘটানো – এটাই একমাত্র “রাজনৈতিক চাপ” এর উপায় নয় নিশ্চয় তা হলেও সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু যেকোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের মত চীন এই পথে খুবই দুর্বল। হিউম্যান রাইট কমিউনিস্টদের হাতিয়ার নয়। যদিও অন্য কোন কিছুও হাতিয়ার হতে পারে। যেমন কমিউনিস্ট পটভূমির রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও পশ্চিমের আমেরিকাসহ যারা হিউম্যান রাইট ইস্যুতে চাইলে গ্লোবাল ক্ষমতার করিডোরে খুবই সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে, মিয়ানমারের জেনারেলদের নাস্তানাবুদ করতে পারে – আমেরিকা বা ইউরোপের হিউম্যান রাইট বিষয়ক ততপরতার দিক থেকে এই চাপ এখনও খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে, এই সুযোগ এখনো হারিয়ে যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কেবল চীনামুখী বা চীনা নির্ভরতা হয়ে পড়া হবে মারাত্মক ভুল। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায় আমরা এককভাবে নিয়ে যে ইউরোপসহ পশ্চিমা শক্তিকে রক্ষা করেছি সে কথা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি। আর সেই সাথে  দায়-কর্তব্যের তাদের পার্ট মনে করাতে এক ক্যাম্পেন করতে পারি। এর পরিপূরক হিসেবে অন্তত অর্থনৈতিক দায় বইতে তাদেরও আমাদের সহায়তা দেয়া ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে তাদেরকেও চাপ দেয়া ও বাধ্য করতে পারি।

সারকথায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমাশক্তি আর অন্যদিকে চীন এভাবে সবার চাপ সৃষ্টির শক্তিকে একসাথে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। এটা না করতে পারলে বরং মিয়ানমারের জেনারেলেরা চীনকেই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে ফেলবে, যা করে এত দিন সে টিকে আছে।

এ দিকগুলো বিবেচনা করে কথা বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামার দাভোস সম্মেলনঃ
তবে এই চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও আরেকটা টুপি বা আড়াল আছে তা হল – ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (এখন থেকে সংক্ষেপে কেবল ‘ফোরাম’ লিখব)। অফিশিয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন যাচ্ছেন কারণ ফোরাম-এর “সামার দাভোস সম্মেলন” [Summer Davos“. Organised by the World Economic Forum] চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই আড়ালটা হল, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ১-৩ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সেই- ‘সামার দাভোস সম্মেলনে’ যোগ দিতে যাচ্ছেন। ফোরামের খুব সংক্ষেপে পরিচয় দিলে, এই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জন্ম ১৯৭১ সালে, যা মূলত রাজনীতি ও ব্যবসায়ের নেতা এবং গ্লোবাল সমাজের অন্যান্য নেতাদেরকে একসাথে বসিয়ে গ্লোবাল, রিজিওনাল বা শিল্প-কলকারখানা-বিনিয়োগের নানা ইস্যুতে কথা বলানো, যাতে তা পরিণতিতে এটা দুনিয়াকে নতুন ইতিবাচক আকার দিতে সহায়ক হয় – এমন কথা বলানোরই প্লাটফর্ম হল এই ফোরাম।

একেবারে স্বল্প কথায়, এটা হলো ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বসিয়ে কথা বলানো – কথা বলানোর এক ফোরাম। এতে এর বার্ষিক সম্মেলন একই সময় একাধিক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হবে এভাবে আগাম ঠিক করা ইস্যুতে রাষ্ট্রপ্রধানসহ যে কাউকে বক্তা ও শ্রোতা বানিয়েীটা আয়োজন করা হয়। আয়োজক এই ফোরাম নন-প্রফিট দাতব্য ধরনের সংগঠন, যা নিজেরা নিজেদের ‘প্রাইভেট-পাবলিক’ সংগঠনের মিলনমেলা বলতে পছন্দ করে। বরাবর প্রতি বছর জানুয়ারিতে এই ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ২০০৭ সাল থেকে এর বার্ষিক সম্মেলন দুইবার করে হচ্ছে। প্রতি জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস জেলা শহরের মুল সম্মেলনটা ছাড়াও ২০০৭ সাল থেকে সব সময় চীনে আরেকটা সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের দালিয়ান ও তিয়ানজিং এ দুই শহরের একেকবার একেকটায়, প্রতি জুলাইয়ে তা ঐ একই ফোরামের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এটাকেই ‘সামার দাভোস’ নামে ডাকা হচ্ছে। তবে এখানে প্রাধান্য পায় উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো। একারণে সামার দাভোসের আর এক নাম হল Annual Meeting of the New Champions। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এখানেই যোগ দিতে যাচ্ছেন। আর যেহেতু চীনে যাচ্ছেনই, তাই যেন তিনি চীনের সাথে এই ফাঁকে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৈঠকগুলোো করে নেবেন ৩-৬ জুলাই, ব্যাপারটা হাজির করা হয়েছে অনেকটা এ রকমভাবে।

এই সফরে কী কী চুক্তি স্বাক্ষর হবে সে বিষয়ে মিডিয়ায় যা প্রকাশ হয়েছে তা হল মোট আটটা চুক্তি (বা কোনটা সমঝোতা স্মারক)। যার প্রথম চারটিই হল, পটুয়াখালির পায়রায় যে তেরো শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণ হচ্ছে তা উৎপাদনে গেলে পরে এই বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিতে হলে নতুন কিছু “বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামো” নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ গ্রিড নির্মাণ, লাইন টেনে পরিচালন ও তা বিতরণ ইত্যাদি- এই কাঠামো তৈরিতে যে বিনিয়োগ লাগবে এমন বিষয়ক চুক্তি। এমন প্রথম চার চুক্তির কেবল অর্থমূল্য হিসেবে তা সম্ভবত মোট মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাকি পরের দুই চুক্তি হল, চীনের সাথে যেসব বিনিয়োগ আগামীতে হবে এর টেকনিক্যাল দিক – মানে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতার চুক্তি। এ ছাড়াও অন্য একটা চুক্তি হল, ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎস চীনে, সে অংশ ও আমাদের অংশের প্রবাহবিষয়ক তথ্যবিনিময় ও তা ব্যবহারে সহযোগিতাবিষয়ক। আর শেষের চুক্তিটা হল, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে। এই হল মোট আট চুক্তি।

BCIM প্রকল্পঃ
অতএব, ঠিক বড় বিনিয়োগ আনতে বা এখনই বড় কোনো প্রকল্প চুক্তি হতে যাচ্ছে এই সফর ঠিক তেমন নয়। তা হলে? চোরের মন পুলিশ পুলিশ। ভারতের প্রবল অনুমান যে এই সফরে মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে BCIM প্রকল্প। BCIM নামটা চার রাষ্ট্রের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি। এপ্রসঙ্গে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক খবর ভারতের অনেক মিডিয়াই ছেপেছে। পিটিআই বলছে,  [BCIM] ‘বিসিআইএম(কলকাতা থেকে ঢাকা কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং- এই সড়ক ও রেল সংযোগ) প্রকল্পকে চীনারা সাম্প্রতিককালে আবার জাগিয়েছে” [China lately is making efforts to revive the BCIM.]। আসলে এই প্রকল্প কখনোই বাতিল করা না হলেও ভারত একে মৃত বলতে, এমন রটনা করতে পছন্দ করে থাকে। কারণ ভারত চায় না এই বিসিআইএম প্রকল্পে সে নিজে জড়িয়ে থাকে অথবা তাকে বাদ দিয়ে এটা সফল হয়ে যাক তা-ও চায় না। এখনকার এর কারণ, চীনের নতুন প্রস্তাব হল BCIM প্রকল্প বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হোক,  এতে বাংলাদেশ খুবই আগ্রহী; কিন্তু ভারত একেবারেই নয়। তবে এই প্রস্তাবের আগেও ভারতের অবস্থান ছিল নেহায়তই না বলতে না পেরে যুক্ত থাকা। কারণ আবার ভারত চায়, বিসিআইএম প্রকল্প বলতে এর মানে হোক শুধুই সড়ক ও রেল সংযোগ। কোন গভীর সমুদ্র বন্দর নয়।

অথচ এর বড় এক মূল অনুষঙ্গ ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দর ছাড়া এই “সংযোগ” অবকাঠামো গড়া অর্থহীন। এমনকি তা অর্থনৈতিকভাবে বিচারে এতে বিনিয়োগ করলে তা ভায়াবল হবে কি না বা খরচ উঠবে কি না সন্দেহ। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলেও, ভারত শুরু থেকেই বন্দর নির্মাণকে বিসিআইএম প্রকল্পের অংশ নয় মনে করতে চায়। অতএব চীন-বাংলাদেশের বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা মানেই তা সোনাদিয়া বন্দরসহই। আর এটাই ভারতের জন্য অস্বস্তির।

তবে ভারতের আপত্তির যুক্তি বড়ই অদ্ভুত আর তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বলছে সে চাচ্ছে না ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্টের ভেতর দিয়ে এসে চীন বাংলাদেশের কোনো বন্দর ব্যবহার করুক। আনন্দবাজারের ভাষায় বললে, “বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে। ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”। কিন্তু ঘটনা হল। বিসিআইএমের রুট হল, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে মান্দালয় হয়ে কুনমিং। এটা ভারতের সব মিডিয়া নিজেই লিখছে এই রুট মোট দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটারের। যেমন এভাবে, [The 2800-km BCIM corridor proposes to link Kunming in China’s Yunnan province with Kolkata, passing though nodes such as Mandalay in Myanmar and Dhaka in Bangladesh before heading to Kolkata.]।

অথচ ওদিকে ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্ট হল,  বাংলাদেশের দিনাজপুর-সিলেট এই পুরা উত্তর ভূখণ্ডেরও আরো উত্তরে, যা বিসিআইএম’র রুটেই নয়। বিসিআইএম’র রুট হল বলতে গেলে, কলকাতা-যশোর-ঢাকা হয়ে এবার পুরা দক্ষিণে বা দক্ষিণ-পুবে, আর নর্থ ইস্ট হল এর পুরো উত্তরে। তাহলে?

আসলে BCIM প্রকল্পে চীন বলতে সকলে কুনমিং বুঝলে ও বুঝালেও (কুনমিং আমাদের কক্সবাজার থেকে বার্মার মান্দালয় পার হলে তবেই পৌছানো যাবে) এমন হলেও ভারত জবরদস্তিতে মানে করতে চাচ্ছে – এটা ভারতের নর্থ-ইস্টের অংশ অরুনাচল প্রদেশে চীন-ভারত সীমান্তের ওপারের চীন। হতে পারে ভারতের ভয় এখন চীন বলতে কুনমিং বুঝলেও ভবিষ্যতে প্রকল্প গড়া শেষ হলে চীন তখন আসাম-অরুনাচল সীমান্তের অপর পারের দিক থেকে চীন হিসাবেও আসাম-বাংলাদেশ হয়ে সোনাদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

আর সম্ভাব্য এখানেই চীনকে আসাম করিডোর ব্যবহার করতে দিতে ভারতের ভীতি ও আপত্তি আছে, ধরা যাক ভারত এটাই বলতে চাইছে। ভারতের এই কথার মানে হল, তাহলে কাউকে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ জায়েজ। অতএব, বাংলাদেশ কেন নিজ ভুখন্ড পেরিয়ে ভারতকে নর্থ-ইস্টে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ করবে না।

আবার মজার কথা হল, আসামসহ নর্থ-ইস্টকে চীন করিডোর হিসেবে যাতে ব্যবহার না করতে পারে বা করে ফেলবে এই ভয়ে ভারত নর্থ-ইস্টকে চরম পিছিয়ে পড়া, অবকাঠামোহীন এক অঞ্চল করে গত সত্তর বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রেখেছে। এটাই আসাম সংকটের মূল কারণ; ওখানকার বাসিন্দাদের স্থবির হয়ে থাকা ও রাখা অর্থনৈতিক জীবনের। অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে যে মুসলমানেরা এর কারণ। বাসিন্দাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে ঘৃণা জাগাতে। আর মুসলমান মানেই যেন এরা নিশ্চয় বাংলাদেশের – এই অদ্ভুত প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আর এখান থেকেই এনআরসি (NRC), মুসলমান খেদানো, ৪০ লাখ মানুষকে রিফুউজি ক্যাম্পে মানবেতরে জীবনে ফেলে রাখা ইত্যাদি কী নয়! অর্থাৎ এ যেন, নিজ সন্তান হত্যা করে হলেও প্রতিবেশীর ক্ষতি করতে হবে – এই মনোভাব। সত্যি অদ্ভুত এই হিন্দুত্বের রাজনীতি!

অদ্ভুত এক বাস্তবতা হল, হাসিনার এই আসন্ন সফর নিয়ে ভারতের এই “হিন্দুত্বের রাজনীতি” চরম অস্থির ও খামোখা উদ্বিগ্ন। পিটিআই’র [PTI] ওই রিপোর্ট আরও লিখেছে, ‘সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদি সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের সামিট মিটিংয়ের (১৩-১৪ জুন) সাইডলাইনে কথা বলেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি দীর্ঘ সময়ের পরে বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে কথা তোলেন”। [After a long gap, Xi raised the BCIM project during his meeting with Prime Minister Narendra Modi at Bishkek on the sidelines of the Shanghai Cooperation Organisation summit early this month.]।

লক্ষণীয়, এখানে বিসিআইএম প্রকল্প চীন আগে বাতিল করেছিল তা বলা হয়নি, বলা হয়েছে আফটার লং গ্যাপ- অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পরে প্রেসিডেন্ট শি ইস্যুটা নিয়ে কথা বলেছেন। পিটিআই’র এমন লেখার পেছনের কারণ পাওয়া যায় এখানে, গত ১০ জুন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট [China denies abandoning BCIM corridor। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত প্রতিদিন এক সাংবাদিক প্রেস ব্রিফিং করে থাকে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের কথা ভেবে ভারতীয় সাংবাদিক সেখানে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসে যে, চীন বিসিআইএম প্রকল্প বাতিল করেছে কিনা। স্বভাবতই ব্রিফিং কর্মকর্তা তা নাকচ করেন ও বলেন যে, না তা চালু আছে [“the BCIM has not been abandoned. It is very much on board.”]। আর তা থেকেই হিন্দুত্বের রাজনীতি অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে যে হাসিনার চীন সফরে গুরুত্বপুর্ণ আলোচনার বিষয় বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে কথা হবে। বাংলাদেশ নিজ একান্ত স্বার্থে তার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী স্বাধীনভাবে শেষ পর্যন্ত এবিষয়ে আলোচনা আগিয়ে নিয়ে সক্ষম হবে! আমরা বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছি!

আমেরিকাও কান পাতাঃ
হাসিনার আসন্ন চীন সফর নিয়ে আরেক লক্ষণীয় দিক হল – কেবল ভারত নয়, আমেরিকাও কান পেতে এ সফরকে জানা ও শুনার জন্য গভীর আগ্রহী। এর আগে এসব ক্ষেত্রে দেখা যেত এনিয়ে একটা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার রিপোর্টই তাদের যথেষ্ট ছিল। ইদানীং দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কিছু মিডিয়া হাসিনার চীন সফর নিয়ে ভারতের মতোই আগ্রহী রিপোর্ট ছেপেছে। ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’ বা এর এফিলিয়েটেড ‘বেনার নিউজ’ এমন আমেরিকান সরকারের বিদেশনীতির আলোকে রিপোর্ট লিখেছে। এরা পরস্পর একই রিপোর্ট শেয়ার করে থাকে।  Radio Free Asia, এই নাম বা শব্দের মধ্যে “FREE” শব্দটা ইন্টারেস্টিং। কোল্ড ওয়ারের যুগে সোভিয়েত বিরোধী প্রপাগান্ডা লড়তে আমেরিকার প্রিয় শব্দ ছিল ফ্রি। মানে বদ্ধ সোভিয়েত দুনিয়া থেকে মুক্ত দুনিয়ায় আহবান। ব্যাপারটা এখানেও প্রায় তেমনই। বলা হয়েছে এশিয়ার যেসব দেশের জনগণকে তাদের সরকার সত্যিকথা শুনতে জানতে দেয় না, এই রেডিও তাদের জন্য। অর্থাৎ এটা এখন একালে চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডার কাজে লিপ্ত। যা হোক এটা কেবল রেডিও হলেও এদেরি সহযোগী এফিলিয়েটেড আর প্রতিষ্ঠান হল, BenarNews. এরা ইংরাজি ছাড়া আরও বাংলাসহ চার ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন নিউজ।

বাংলাদেশ কতটা চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চলে গেল এ নিয়ে ভারতের মতই আমেরিকার উদ্বিগ্নতা – এটাই তাদের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কলাপাড়া, পটুয়াখালীতে দুর্ঘটনায় এক স্থানীয় শ্রমিকের মৃত্যু হলে শ্রমিকদের সাথে চীনা ঠিকাদারের ম্যানেজমেন্টের বিরোধে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একজন বাংলাদেশী শ্রমিক ও একজন চীনা টেকনিশিয়ান নিহত হয়েছেন। মূলত নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকের “লাশ গুম হওয়ার গুজব ছড়িয়ে” পড়লে মূলত তা থেকেই সংঘর্ষের শুরু।

এই পরিস্থিতির উত্তেজনা সামলাতে ও ঠান্ডা করতে আপাতত সবাইকে দু’সপ্তাহ ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। বেনার নিউজ লিখছে, It was not immediately clear whether Hasina and the Chinese leaders will discuss the recent fight between Chinese and Bangladeshi workers at a site of a partly built China-funded power plant.]। সারকথাটা বাংলা করে বললে তারা ‘পরিষ্কার নয় যে, এটা ইস্যু হিসেবে চীন-বাংলাদেশ সামিটে আলোচনা হবে কি না’!

আসলেই, এটা Benar এবং RFA এর গভীর উদ্বেগপ্রসূত “আশা”! কিন্তু সমস্যা হল, শকুনের বদ দোয়াতে গরু কখনও মরে না। তবে আমরা পরিস্কার থাকতে পারি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টও লিখে এমন “শকুনি আশা” জানাবে না। ঘটনা হল, এই প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ আবার বাংলাদেশী শ্রমিকের অধিকার রক্ষাও বাংলাদেশের স্বার্থ – দুটোই আমাদের স্বার্থ। দুটোই আমাদের সবল রক্ষা করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এটা নিয়ে “সামিট লেবেল” কথা বলতে হবে? এটা কী চীন-বাংলাদেশ কোন বিরোধ? ঐ রিপোর্ট কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন?  এটা তো রিপোর্টিং নয়, বেয়াদবি খোঁচাখুচি!  ভাষা লক্ষ্য করার মত লিখেছে এটা নাকি “চীনা ও বাংলাদেশি শ্রমিকের ফাইট” [fight between Chinese and Bangladeshi workers] এর ইস্যু। ব্যাপারটা বড়জোর বাংলাদেশী প্রকল্প পরিচালক আর ওই চীনা ঠিকাদার কোম্পানির মিলিতভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক সৎ উদ্যোগ এ সমস্যা মিটিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। অথচ …। বাংলাদেশ-চীনের প্রকল্প ভালো না চললে বা তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেই যেন রিপোর্টারের লাভ, তাই তিলকে তাল। বদ দোয়াই ভরসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন সফর ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

গৌতম দাস

০৩ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AL

 

বাংলাদেশের “পররাষ্ট্রনীতি” বলতে যা কিছু আছে তা হঠাৎ করে আমেরিকানদের নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। যদিও এরা কোন আমেরিকান, কারা এরা, তা নিয়েও কথা আছে অবশ্য। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই নড়াচড়া বা নজর ফেলা এককথায়, পন্ডশ্রম। বিষয়টা ‘প্রথম আলো’র ভাষাতেই বললে, গত ১৭ মে তাদের একজন লিখেছে, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞেস নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই, BEI) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই, IRI )“।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান দু’টি আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। তারা ঐ থিঙ্কট্যাঙ্কেরই বাংলাদেশ শাখা নাকি কেবল ফান্ডদাতা-এনজিও সম্পর্ক, কোনটা- সেটা তাদের মুখ থেকেই আমাদের জানার বাকি আছে। যা হোক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যা কিছু নিজের কাজের ইস্যু হিসেবে তুলে আনে, অনুমান করা অবাস্তব হবে না যে, তা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ বলে তারা মনে করে।

কথা হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন আছে, এর ঘাটতি, খামতি কী – সে প্রশ্ন এখন কেন? বিশেষ করে আজকের খোদ বাংলাদেশই যে দশায় আছে, একে এই অবস্থায় আনা ও ফেলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় আমেরিকান বন্ধুদেরও অবদান আছে। গত ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকা বুশ এবং ওবামা- এই দুই প্রশাসনের তো বটেই অন্তত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরও [AEI] বিশেষ ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কী করা হবে এনিয়ে অন্তত  ভারত-আমেরিকার আলোচনাগুলোতে, গোলটেবিল বা ইনফরমাল বৈঠকে ইনপুট দিয়ে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ধরনের পরিণতি, এই অর্থে ‘উত্তরসূরি’ বলা যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে এক ধরনের সামরিক ক্ষমতা দখল হয়েছিল তাকে আমরা অনেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলি, যা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। কেন এই ঘটনা ঘটেছিল, এর ‘আনুষ্ঠানিক’ কারণ কখনও জানা যাবে না। কিন্তু আসল কারণ যা দখলকারীদের সাফাই-বক্তব্য থেকে জানা যায়, মোটাদাগে সে ভাষ্যটা হল – আগের সরকার  “ওয়ার অন টেরর” -কে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে “জঙ্গি মোকাবেলার উপযোগী” করে ঢেলে সাজানো ও সংস্কার করা হয়নি। সে কাজগুলো সম্পন্ন করতেই ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই বক্তব্যটা ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পরে বদলে যায়।

মূল কারণ, আমেরিকান অগ্রাধিকার মানে কোনটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ ও আগে দরকার সেই বোধ বদলে গিয়ে এক নতুন আকার নিয়েছিল। আমেরিকা ওয়ার অন টেরর বা জঙ্গি ঠেকানোর চেয়ে তখন থেকেই “চীন ঠেকানো’-কে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করেছিল।  না সাব্যস্ত করা ছিল আগেই তবে বাস্তবায়ক রেডি ছিল না তখন। আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’[China containment], মানে ‘চীন ঠেকানো’ নামের কর্মসূচি আছে। এর অর্থ হল, ২০০৫ সালের পর থেকে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হিসেবে চীনা উত্থান আর আমেরিকার পতন যখন আমেরিকার নিজের করা সার্ভে ও পরে তা নিয়ে প্রকাশিত (২০০৮) রিপোর্টও স্বীকার করে, তখন এশিয়ার দুই ‘রাইজিং অর্থনীতি’ চীন ও ভারত – এদের একটাকে (ভারতকে) কাছে টেনে একে অপরটির (চীনের) বিরুদ্ধে লাগানোর নীতিই আমেরিকার “চায়না কনটেইনমেন্ট”। আমেরিকার এই “চায়না ঠেকানোর” নীতিতে ভারত নিজেকে পরিচালিত হতে দিতে রাজি হয়ে যায় এসময়েই। বাংলাদেশে আমেরিকান প্রায়োরিটি বদলের রহস্য এখানেই।  সেজন্যই হঠাত করে এই রদবদল ঘটেছিল।

আর এর বিনিময়ে ভারত পায় – এক. একদিকে আমেরিকায় পণ্যের রফতানি বাজারে বিনা বা কম শুল্কে আমেরিকায় প্রবেশ সুবিধা, ভারতের আমেরিকান হাইটেক অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি। আর দুই. এছাড়াও অন্য দিকে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে “দেখভালের দায়িত্ব” তুলে দেয় যাতে জঙ্গী ঠেকানো কথার আড়ালে ভারত বিনা পয়সার করিডোর, আসামের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারসহ এ দেশকে সরাসরি অন্যান্য নানান ব্যবহার করে সব সুবিধাই নিতে পারে ভারত।  প্রায় নিয়ন্ত্রক বনে ভারতের হাতে চলে যায় বহু কিছু। যেমন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ও প্রয়োজনে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনের সাহায্য নিবে কিনা তা নির্ভর করবে ভারতের স্বার্থ এই অগ্রাধিকার যদি তা এলাও করে একমাত্র তবেই। এর সোজা অর্থ, ভারত বন্দর চায় না তাই বাংলাদেশ এটা করতে পারবে না।

ফলে এভাবেই এরপর থেকে চলে আসছে আজ পর্যন্ত, আমাদের এই দুর্দশার শুরু এখান থেকে। কিন্তু সেই আমেরিকা এখন আবার আরও কী চায়? একই লোকদের আমরা আবার তৎপর হতে দেখছি কেন?

গত ২০১৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা দেখেছিলাম যে, সেবার বাংলাদেশের বিনা ভোটের নির্বাচনকে ভারত প্রকাশ্যে সদর্পে সমর্থন দিয়েছিল আর তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এত ঘনিষ্ঠতায় মিলে গেছিল যে, তারা কেউই আর যেন আমেরিকাকে চেনেই না। বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ডন মোজিনা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্রিফিং না পেয়ে বা না নিয়ে ভারতে গেছিলেন – এই ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী নিঃসন্দেহে!

বাস্তবতা হল, আমেরিকা এখন নিজের সব মুরোদই হারিয়েছে। চীন ঠেকানোর যে কাজ ভারতকে দিয়ে করানোর বিনিময় হিসেবে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে দেখার দায় তুলে দিয়েছিল, তাতে কি চীনের উত্থান ঠেকানো গেছে? প্রশ্নই উঠে না কারণ এভাবে তা হয় না।  তাই আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। কোন দাগও ফেলতে পারেনি, আমাদেরকে কষ্ট-দুর্দশায় ফেলা ছাড়া। বরং নিজেরই বেগতিক অবস্থায় আর দুর্দিনে আমেরিকা এক “পাগলা প্রেসিডেন্ট” পেয়েছে, যিনি নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি নাকি ন্যাশনালিস্ট আমেরিকান! কী তামাশা! গ্লোবালাইজেশনের নেতা আমেরিকা, যে দুনিয়াটাকে অন্তত ৩০ বছর ধরে একটা গ্লোবালাইজড শ্রমবিভাজিত এক গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিয়ে গিয়েছে, সেই আমেরিকার পাগলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, উনি এখন নাকি ‘ন্যাশনালিস্ট’, সবকিছু “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে ফরে সাজিয়ে ফেলবেন বা হয়ে যাবেন। যেন বুড়া বয়সে বিড়াল বলছে সে আর মাছ খাবে না।

কিন্তু ঘটনার কঠিন সত্য দিকটা হল, আমরা কেউই মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারি না, পারব না।  এটা সম্ভব নয়। তাই এর চিন্তাই করি না। কিন্তু এই গোয়াড় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন এটাও নাকি করা সম্ভব। ব্যাপারটা এমনই নাকি সহজ। আসলে পাগলামি আর দেশ চালানো তো এক জিনিস নয়। তাতে আমাদের অসুবিধা নেই; কিন্তু যারা বাংলাদেশে আমেরিকান স্বার্থের দেখভাল করে সেই “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা” তাদেরকে আবার তৎপর হতে আর বড়ই পেরেশান দেখাচ্ছে। সমস্যাটা মূলত তাদের। মনে হচ্ছে তাঁরা এটা বুঝতে বা এই বাস্তবতা মানতে চাচ্ছেন না।

অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ন্যায় কিনা কথা সেটা না। সে প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে আগালে এসব ব্যাপারে প্রথম দেখা প্রয়োজন হয় মুরোদ আছে কী না। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা মুরোদহীন। অর্থাৎ তিনি আমেরিকাকে মুরোদহীন করে ফেলেছেন অথবা আমেরিকা যে মুরোদহীন এটা মেনে নিয়েছেন। এখন ‘মুরোদহীন’ হলে আর সে তো মরদ থাকে না। তাই আমেরিকার মরদগিরি শেষ। ভারতকে বাংলাদেশ দিয়ে দেয়ার পর থেকে ঘটনাচক্রে আমেরিকাও এই মুরোদহীন হয়ে যায়, ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। তাই, ইতিহাসে ২০০৭ সালই সম্ভবত বাংলাদেশে ‘সর্বশেষ আমেরিকান হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ থাকবে। অন্তত ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, মানে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমেরিকা এমন থাকবে – অভিমুখ, ঝোঁক তাই বলছে। ২০২১ সালে (মানে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে) কে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জিতে বসবে – ডেমোক্রাট না রিপাবলিকান, এছাড়া আবার সে কেমন প্রেসিডেন্ট হবে – এগুলো হাজারটা শর্তের “যদি-না-কিন্তু” এর প্রশ্ন। এককথায় বিষয়টা এখন পুরাটাই অনিশ্চিত। আর ততদিনে আমেরিকার আগের মতন বাস্তব হস্তক্ষেপের মুরোদই থাকবে না, তা না হলেও তা আরও কমে যাবে। বাস্তবতাই থাকবে না হয়ত। অতএব, বাংলাদেশের “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকান” – আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। পারছেন না। আমরা জানি নভেম্বর ২০১৮ জেমস মাতিসের [Mattis] পদত্যাগ আপনাদের সব আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে, আপনারা অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল আসলে সেটাই শেষ।  মনে রাখতে পারেন – ট্রাম্প যতদিন অফিসে আছে তিনি সবকিছু ফ্রিজ করে দিবেন। এই সময়ের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন ইত্যাদি যেখানেই যা কিছু নড়াচড়া শুরু হোক না কেন, সেসব হোয়াইট হাউজে যাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকান স্বার্থের’ সবচেয়ে ‘ভালো ভালো উদ্যোগ ও প্রস্তাব’ তা যত ভালই হোক না কেন – এসবই ডিপ ফ্রিজে চলে যাবে। কারণ, পুরনো অভ্যাসে “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকার”  এসব তৎপরতার প্রতি ট্রাম্প ন্যূনতম আগ্রহী নন। এখান থেকেই এটাকে ‘মুরোদহীনতা’র শুরুও বলতে পারেন। কাজেই দিন শেষ!

আসলে ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ যারা তাঁরা সম্ভবত আসলে খেয়ালই করেননি যে ২০০৭ সালেই তাদেরকে অসত্য বলা হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে তা সামনে রেখে এর আড়ালে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর প্রায়রিটি’তে মেতে উঠেছিল। ভারতের হাতে সব তুলে দিয়েছে অথচ বাংলাদেশের বন্ধুদেরই তা বলেনি। আর বাংলাদেশের বন্ধুরা যদি জানতেনই তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতি। তবে তাদের শান্ত্বনা এই যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে আমেরিকার পক্ষে আর সত্য লুকায়ে রাখা সম্ভব হয় নাই।  ‘ওয়ার অন টেরর’ যে আর আমেরিকার প্রায়রিটি নয়, সে তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস এই সময়ে এসে আর না লুকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন [Mattis: US national security focus no longer terrorism]। এটা ২০১৮ সালের শুরুতে ১৯ জানুয়ারি বিবিসির সংবাদ শিরোনাম। মাতিস বলছেন, “টেররিজম নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আমেরিকার জন্য প্রধান হুমকি”। অথচ এই কথাটাই ২০০৭ সাল থেকেই তাদের মনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় থেকেই সব স্তরে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুল কারণ দুনিয়াতে চীনা উত্থান অনিবার্যভাবে আসন্ন – সেকথা তারা তখনই গবেষণা সার্ভে ও স্টাডির রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক-কাল অবস্থা থেকেই তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। আনুষ্ঠানিক এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।

এই বিকল্প ডেভেলবমেন্টগুলো ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ এরা আমল করেছিলেন বা করতে সক্ষম ছিলেন তা তাদের কারবার ততপরতা দেখে কখনও মনে হয় নাই। কিন্তু এতে আসলে যা মূল জিনিষটা বদলে গেছে, বিশেষ করে খোদ ‘ফ্রেন্ডস’ শব্দটিরই সংজ্ঞা বদল হয়ে গেছে ট্রাম্পের হাতে, সেটাই কেউ আমল করেছে মনে হয় নাই। ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান – তাঁর পরিচলন নীতিটাই আসলে বলে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে – আদৌ আমেরিকার কোনো ফ্রেন্ড দরকার আছে কি না? ট্রাম্প নিজেই জবাব দিয়েছেন, যে দরকার নাই। আর যদি থাকেও, তারা ভিন্ন কেউ; অথবা বাংলাদেশে তার এমন ফ্রেন্ড আর লাগবে না। ট্রাম্প নিশ্চয় সরাসরি এ কথা বলেননি, তবে তাঁর অনুসৃত নীতি (ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্প বা ট্রাম্পের নাশনালিজম) এই মেসেজটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে আমেরিকান বন্ধুদের (Friends of America, in Bangladesh) বাংলাদেশকেই সবকিছুর জন্য দোষী ঠাউরানো – অস্বাভাবিক বা নতুন না। এটাই তারা সবসময় করে এসেছেন। যেমন এভাবে অনেকে এখনও বলছেন যে, ভাল ভাল “গণতান্ত্রিক দেশে”  তাদের পররাষ্ট্রনীতি নাকি “জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে” সমর্থিত ও সমৃদ্ধ থাকে বলে, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ তারা সহজেই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা; সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রথম আলো পত্রিকা যে রিপোর্ট করছে তাতেও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্যারায় তারাও লিখেছে এভাবে – “আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা বদলে যায় বলে জনমনে ধারণা আছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সুশাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আলোচক”। অর্থাৎ সার কথা আমেরিকার কোন দোষ নাই। সব আমাদের দুই দলের রেষারেষির কারণে, তাই সবদোষ আমাদেরই।

বিইআই ও আইআরআই-এর আলোচনা সভায় আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর সব দায় চাপিয়ে এমন মন্তব্য খুবই অনুচিত ও অবিচার তা বলাই বাহুল্য। কারণ, ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপার কমবেশি সবই আপনারা তো জানেন। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিবাদ আছে কথা সত্য, ফলে তা অনেক কারণের একটা । কিন্তু তা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কারণ তো – আমেরিকার হস্তক্ষেপ।

ঠিক আছে তাহলে আসেন, আপনাদের বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়া ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, আপনাদের বক্তব্যের দুদিন পরেই। ভেঙ্গে বললে, একটা বড় ঘটনাই ঘটেছে। সম্ভবত বলা যায় যে চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এটাই এই প্রথম আমরা প্রধান দলগুলো একটা সফল এককাট্টা অবস্থান প্রকাশ করেছে।

তাহলে ঠিক এখনই আপনাদের নড়াচড়া কেন?
সম্প্রতি চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এই প্রথম প্রধান দলগুলো একটা সফল অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। আর এটা তারা করেছে ভারতের এব্যাপারে অবস্থান যাই হোক না কেন – এই প্রথম এটা ধরে নিয়ে। “গত ১৯ মে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশ চীন সিল্ক রোড ফোরাম’ গঠন করেছেন”। বেশির ভাগ পত্রিকার হেডিং এটাই। এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব হয়ত বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের – তা যারই হোক, এ ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভি, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ো -এদের উপস্থিতিতে সহায়ক সে কমিটি করা হয়েছে সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ অনেকে এর সদস্য হয়েছেন। মঈন খান বক্তৃতায় করেছেন। ওদিকে ড. গওহর রিজভী [Gowher Rizvi] ঐ সভায় দাবি করেছেন যে, “ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে”।

এই কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই আছে। তবু বাস্তবতা যতটুকুই থাক একেবারে মাঠের ফ্যাক্টস হল, এই গতকাল ১ জুন ২০১৯ ব্লুমবার্গ রিপোর্ট লিখেছে যে ট্রাম্প চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিসহ  ভারতের সাথে কোন খাতিরের সম্পর্কই করতে চান না। সবকিছুর মাথা মুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাগজ কলমে ভারত সুবিধাদিগুলো উপভোগ করত কারণ, ভারত আমেরিকার বিবেচনায় একটা উন্নয়নশীল দেশ [Developing Nation] ঘোষণা করা ছিল বলে। এখন ট্রাম্প সেটার মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, বলছে Trump Ends India’s Trade Designation as a Developing Nation.। এমনিতেই আগের ভারতকে দেয়া সবসুবিধা ( যা চীন ঠেকানোর বুটি হিসাবে ওবামা দিয়েছিল) ট্রাম্পের আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছিল গত বছর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শুধু তাই না উলটা ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক ট্যারিফ বসিয়ে দিয়েছিল যাতে রপ্তানিই অকার্যকর হয়ে যায়।

কাজেই ভারত এখনও আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর খেপ মারতে” পুরানো শর্ত রাজি থাকলেও খোদ ট্রাম্প বাবাজিরই “মন” নাই। নট ইন্টারেস্টেড। এই ফ্যাক্টসটা আমল করলে বাংলাদেশের ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ এদের সব ততপরতাই পন্ডশ্রম। ওদিকে খেয়াল করলেই আমরা নিজেরাও বুঝব যে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলতে চীন গত বছর থেকেই পুরাপুরি তৈরি – এবং তা বাস্তবায়িতই হয়ে গেছে। এর প্রমাণ সফল  য়ুহান সম্মেলন (Wuhan Summit)। এমনকি এবছরও সম্ভবত পরের মাসে দ্বিতীয় য়ুহান সম্মেলন হতে চলেছে। এসব ততপরতার সার কথাটা হল এবার হয় ভারত চীনা শুধু বেল্ট ও রোড প্রকল্পেই না খোদ চীনা নৌকাতেই উঠবে। যদি কোন কারণে না উঠতে পারে, বনাবনি না হয় তবে পরস্পর কঠিন শত্রুতার দিন শুরু হবে। সুতরাং  নিঃসন্দেহে ভারত অনেক দাম চাইবে। যা তার দাম নয় এর চেয়েও বেশি হবে হয়ত সেই প্রাথমিক “asking price” । কিন্তু চীনা স্বার্থের চেয়েও বেশি এমন অসম্ভব অবাস্তব কিছু না চাইলে এই ডিল হবার সমূহ সম্ভাবনা। বিশেষ করে দুটা ফ্যাক্টস এর পটভুমিতে একথা বিবেচনা করা যায়। এক. চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ মিটিয়ে নিবার ডিল ব্যর্থ হয়ে গেছে যা, এখন পরবর্তি ঝড়ের অপেক্ষায় যা এখন আসন্ন। আর দুই. ভারত শত চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের কোন ডিল, কোন “খেপ” পাবার কিছুই নাই, কোন অফারও নাই। বরং পুরা উপেক্ষা আছে। ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠে বসলেও যেন ট্রাম্পের তা নিয়ে কোন পরোয়া নাই। ভারতকে এমনই তাচ্ছিল্যের মুডে আছেন ট্রাম্প। যার মূল কারণ হল, ট্রাম্প তার এখন প্রধান লক্ষ্য হল দ্বিতীয় বার নির্বাচনে দাঁড়ানো – এই মুডেই তিনি আছেন। আর তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এখন নিচ্ছেন তা সে উদ্দেশ্যেই প্রভাবিত। চীনের সাথে বিরোধ মিটিয়ে কোন বাণিজ্য ডিল না করা অথবা ভারতকে কোন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া ইত্যাদি এমন সবই একারণে তুচ্ছ ট্রাম্পের কাছে। বরং তিনি বীর, তিনি আমেরিকান ন্যাশনালিস্ট – এই পরিচয় গড়তে তিনি একমাত্র ব্যস্ত যা দিয়ে তিনি নির্বাচন লড়বেন। যদি না আবার ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন!

কাজেই ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ, আপনাদের উচিত হবে বাস্তববাদী হওয়ার, সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পন্ডশ্রম অর্থহীন। বরং ফ্রেন্ডশীপ রিনিউ বা চেক করে দেখতে পারেন – তা এখনও বহাল আছে কী না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutam.das@gmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০১ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার বন্ধুদের নজরে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]