ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

গৌতম দাস

২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2vW

 

 

এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

সংলাপ, নাকি বিরোধী দলে বসার প্রস্তাব!

সংলাপ, নাকি বিরোধী দলে বসার প্রস্তাব!

গৌতম দাস

০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2vz

 

 

সংলাপ কত দূর, কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? গত ০১ নভেম্বর সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে হাজির হওয়া সংলাপ শেষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোথায় নিয়ে যাবে?

ত মাসে ১৩ অক্টোবর “জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট” গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এরপর তাদের দাবি ও করণীয় দফার তালিকা নিয়ে তারা সরকারের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আমরা দেখেছিলাম সরকারি দল কোনো ধরনের সংলাপ বা আলোচনাকে একেবারেই নাকচ করে দিচ্ছে। আর টিটকারি বা বাঁকা কথা দিয়ে হাসিনাসহ মন্ত্রীরা কাঙ্খিত   যেকোনো সংলাপের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে নানান কটুকথা বলে চলছিলেন। “কোনো সংলাপ হবে না। …সংলাপের কথা ভুলে যান” – স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিংবা, “যে ঐক্য নীতিহীন, যে ঐক্য স্বাধীনতাবিরোধী ও দেশবিরোধী—সেই ঐক্যে এ দেশের সাধারণ জনগণ যাবে না, মেনে নেবে না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র বিশ্বাস করে।” – আইনমন্ত্রী ইত্যাদি… এধরণের কথা শুনতে শুনতে আম-পাবলিকে মনেও তা দৃঢ়বিশ্বাস জন্মে গেথে গেছিল। কেউ আর আশা করেনি যে, আলোচনা-সংলাপ বলে এবার এমন কিছু আর বাংলাদেশ দেখবে। কিন্তু না।  তাহলে সরকারের এই মন পরিবর্তনকে অবশ্যই আকস্মিক বলা যায়। কারণ, এটা কেবল গত শেষ এক সপ্তাহের গতিপ্রকৃতি ও বিকাশ। কিন্তু এমন পরিবর্তন কেন?

সংলাপে সরকারের তাগিদ কী এবং কেন? সেটি কী দিয়ে কোথা থেকে এই বোঝাবুঝি শুরু করব? সে কাজ সবচেয়ে সহজে করতে আর সবচেয়ে বেশি অথেনটিক রেজাল্ট পেতে চাইলে এর উপায় হল জাতীয় পার্টির এরশাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা। আমাদেরকে এরশাদের নড়াচড়ার দিকে চোখ ফেলতে হবে। এই সংলাপের দিন ১ নভেম্বর বাংলাদেশের সবচেয়ে বিরক্তিবোধ করা ব্যক্তিটি ছিলেন জাতীয় পার্টির এরশাদ। এর চেয়েও বড় কথা তিনি যে, এ দিন খুবই বিরক্ত সেটা তিনি রেজিস্টার করে রাখতে চেয়েছিলেন এবং তা রেখেছিলেন একেবারে মিডিয়ায়।

কিন্তু এ’দিন ঢাকায় মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া খুবই কঠিন ছিল। কারণ, এ দিনের ঢাকার মিডিয়া বিশেষ করে টিভি মিডিয়াগুলো দু’টি হাই-প্রফাইল কাভারেজ নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিল। এর একটি হল, এ দিন রাষ্ট্রপতির সাথে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের নির্ধারিত সাক্ষাতের দিন ছিল। আর ওই সাক্ষাতের শেষে নির্বাচনের তারিখ যা ফাইনাল হয়েই আছে অনুমান করা যায়, এর ঘোষণার দিন না হলেও ইঙ্গিতে তা সামনে চলে আসতে পারে। ফলে সেটির কাভারেজ গুরুত্বপুর্ণ এবং প্রতিযোগিতাপুর্ণ। আর দ্বিতীয়ত সবচেয়ে বড় প্রফাইল হল, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে সরকারের সংলাপের সংবাদ কাভারেজ। অতএব বলাই বাহুল্য, সংলাপের এই দিনের এই দুই হাই-প্রফাইল ঘটনার বাইরে আর কারও মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া সত্যি কঠিন। ব্যাপারটা আঁচ করতে এরশাদ ও তার সঙ্গীদের সময় লাগার কথা না। খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেকায় মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া নিশ্চিত করতে এরশাদকে রংপুর চলে যেতে হয়। যাতে রংপুরের স্থানীয় কাভারেজ দিয়ে তিনি ঢাকার ড্রয়িংরুমগুলোতে সন্ধ্যায় নিজেকে হাজির করতে পারেন।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ দিন তিনি ছিলেন যেন ১ নভেম্বরের বাংলাদেশের সবচেয়ে বিরক্তিবোধ করা মানুষ। আর সেই বিরক্তি তিনি মিডিয়ায় আনতে চান, এই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু আসল কথা এরশাদের নড়াচড়া দেখলে ঢাকায় সংলাপ আয়োজনের মূল কারণ জানা যাবে কেন?

এরশাদ গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে এক অদ্ভুত বিপদের মুখে আছেন। সেই থেকে থাকেনও প্রায় সময়ই। তুলনা করে বললে, ব্যাপারটা যেন এমন, এক লোক খুবই আকর্ষণীয়, কিন্তু অদ্ভুত এক দাওয়াত পেয়েছেন। সেটি বলা বাহুল্য খুবই লোভনীয় কিন্তু ওই দাওয়াত খাওয়ার ক্ষেত্রে সেখানে একটা শর্ত আছে। সেটি হল দাওয়াতের হোস্ট বা দাওয়াতদাতা এই ব্যক্তিকে আগাম জানাচ্ছেন, আপনি দাওয়াত পেয়েছেন বটে কিন্তু আসলে দ্বিতীয় একজনও দাওয়াত পেয়েছেন যিনি আসলে মূল গেষ্ট বা দাওয়াতি, ফলে তারই আসার কথা। মূলত এই দ্বিতীয় দাওয়াতিকে খাওয়ানোর জন্যই এত আয়োজন, তার সেখানে খাওয়ার কথা। তবে এখানে শর্ত হল দ্বিতীয়জন বা মূল গেষ্ট – তিনি যদি আসেন ও খাওয়াদাওয়া করেন তবে সে ক্ষেত্রে প্রথমজন আপনি – ভাই, আপনার জন্য ভাত বা খাবার কোনোটার ব্যবস্থা থাকবে না। আর উল্টো হলে, স্বভাবতই মূল দাওয়াতি দ্বিতীয়জন যদি অনুপস্থিত থাকেন তবে প্রথমজনের কপাল খুলে যাবে। তিনি তার দোস্তদের সাথে পেটপুরে খেতে পাবেন। এই গল্পের মূল দাওয়াতি বা দ্বিতীয়জন হলো আসলে বিএনপি। আর প্রথমজন হলেন এরশাদ, তিনি এই অদ্ভুত দাওয়াত পেয়ে অপেক্ষায় আছেন। আপাতত রংপুরে গেছেন।

২০১৪ সালে তিনি এমন দাওয়াত দিলে তা খাবেনই না বলার পরও কোনো এক কারিশমাতে তিনি ও তার দল একাধারে সরকারি ও বিরোধী দলেরও এমপিই – দুটোই হয়ে গেছিলেন। অর্থাৎ সরকারি মন্ত্রিত্ব নিয়েছেন আবার তারা নিজেদেরকে বিরোধী দল মনে করেন। সংসদের সকলেও তাদেরকে সরকারি মন্ত্রীত্ব পাওয়া আবার বিরোধী দল মর্যাদা পাওয়া এমপি গণ্য করতে দ্বিধা করে না। আজ এর প্রায় পাঁচ বছর শেষের দিকে দেখা যাচ্ছে এরশাদ ও তার দলের অভিজ্ঞতা হলো, ভালোই ছিল বলে তারা উপভোগ করেছেন। তাই এবার এরশাদ নিজেই যেচে সেটি এবারো চাইছেন।

সেই এরশাদ এবার সংলাপের দিন সংলাপ প্রসঙ্গে রংপুর থেকে খুবই বিরক্তি প্রকাশ করে কথা বলেছেন। কারো মুখের সামনে থেকে খাবার সরিয়ে আনলে বা উঠিয়ে নিয়ে সরিয়ে রাখতে তার যেমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হয়, এই প্রতিক্রিয়া যেন তেমনই।

রশাদকে মিডিয়া কাভারেজ সবচেয়ে ভালো দিয়েছে যুগান্তর। আমরা এরশাদের বক্তব্য সেখান থেকে টুকে আনলে সেগুলা হল : “সংলাপের সফলতা নিয়ে এরশাদের সংশয়”… “ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির কোনোটিই মানা সম্ভব নয়”।… “সংলাপ ব্যর্থ হবে”… “শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো দাবিই কোনোভাবে মেনে নেয়া সম্ভব নয়”। “বিএনপি আদৌ নির্বাচনে অংশ নেবে সন্দেহ রয়েছে”। আর সবশেষে বলেছেন… “বিএনপি নিজেদের অস্তিত্বের সঙ্কটে রয়েছে”। এগুলো সব দৈনিক যুগান্তর থেকে জড়ো করা এরশাদের ভাষ্য। দেখাই যাচ্ছে, এখানে প্রতিটি বাক্যে এরশাদের অসন্তোষ ফুটে উঠেছে। যেন তিনি বলতে চাইছেন, যেটা হবে না সেটা নিয়ে কেন যে আপা চেষ্টা করছেন!

এখান থেকে পরিস্কার ফুটে উঠেছে যা এরশাদকে দেয়া আছে – বিরোধী দল হয়ে থাকা – তা এই সংলাপ থেকে অন্য কাউকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর সেকারণেই এরশাদ এবার “সর্ব হারা” হবার শঙ্কায় হাহুতাশ শুরু করেছেন।

ব্যাপারটা হল, অনুমান করা যায় এরশাদ জানতেন বা তাকে জানানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর এই সংলাপের মানে কী? এরশাদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়, খুব সম্ভবত  ১ নভেম্বর এটি ছিল আসলে বিরোধী দলের আসন নিতে বিএনপি রাজি হবে কি না- এই লক্ষ্যে তাদেরকে ডেকে দেয়া অফার। কাজেই সংলাপ মানে ছিল বিরোধী দল হওয়ার জন্য বিএনপিকে দেয়া লীগের অফার। অতএব এই অফার মানে আবার, দেয়া দাওয়াত যদি বিএনপি তা না নেয়, তবেই এটা জাতীয় পার্টির এরশাদের। সে কারণে এরশাদের দাওয়াতটাই এমন যে, বিএনপি যদি বিরোধী দলের আসন নেয়ার অফার নিয়ে নেয়, তবে এরশাদের দলের ভাগে আর ভাত নেই হয়ে যাওয়া। সে কারণে এরশাদের পুরো বক্তব্যই বেশি বেশি করে গরু মরে না কেন এ জন্য শকুনের করা বদ-দোয়ার মত।

এরশাদের কাছে তাই অজানা নয় যে সংলাপের আসল মানে হল, বিএনপিকে বিরোধী দলের আসন নিতে হাসিনার অফার, এর মানে এরশাদের ভাগে সেক্ষেত্রে কিছুই জুটবে না। তাই স্বভাবতই সংলাপের দিন সবচেয়ে দুঃখ আর হা-হুতাশের দিন হলো এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টির। আর এ কারণে তিনি এ দিন যা প্রচার চালিয়ে গেছেন এর সারকথা হল- “সংলাপ ব্যর্থ হবে”। সবার চেয়ে স্পষ্ট করে এরশাদ বলেছেন, সংলাপের সফলতা নিয়ে তার সংশয় আছে।
আর সবার শেষে একটা বোমা মেরে বলেছেন, “… আগামী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে”।

অতএব এখান থেকেই আমরা সিদ্ধান্তে যেতে পারি, এরশাদের এই প্রবল বদ-দোয়া – এটা বলছে যে হাসিনা হঠাৎ মন পরিবর্তন করে সংলাপ করতে চাইলেন, এ জন্য যে বিএনপিকে তিনি বিরোধী দল হতে অফার করেছেন। বলা বাহুল্য বিএনপি যদি এই অফার মেনে নিতে আপসে রাজি হয়ে যায়, তবে এর সোজা অর্থ হল বিএনপি লীগকেও সরকারি দলে আবার ক্ষমতায় থেকে যেতে দিতে সেও আগাম রাজি হয়ে যাচ্ছে।
অতএব গত ১ নভেম্বর থেকে সবচেয়ে টেনশনে ও বদদোয়া দেয়ার মধ্যে আছে জাতীয় পার্টি। কত দিন যে থাকতে হয়। গতবার এক অদ্ভুত সরকারি মন্ত্রীর বিরোধী দল হতে পেরেছিল এরশাদ হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে। এবার কি আর সেই কপাল হবে?

সংলাপের দিনের বেশ কিছু সময় টিভি মিডিয়া কাভারেজে উভয় পক্ষকে দেখা গেছিল। স্বল্প সময়ের হলেও আমরা তাতে তাদের মুখ ও চোখের ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদি দেখতে পেয়েছিলাম। লক্ষণীয় হল, অন্তত ক্যামেরার সামনে সরকারি দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে অতিথিদের প্রতি যেন এক বিশেষ ধরনের সম্মান ও সম্ভ্রমবোধ প্রকাশ পাচ্ছিল। কাউকে সম্মান করে পা টিপে বা সতর্ক হয়ে হাঁটলে যেমন লাগে, তেমন মনে হচ্ছিল। লীগের চোখ দিয়ে দেখে সেটা কল্পনা করা যাক, তারা ভাবতে পারে এটা হল, এই দুর্বল সময়ে দুর্বল বিএনপিকে দেয়া আমাদের বেস্ট অফার। তাহলে লীগের দিক থেকে যার অর্থ হবে এটা লীগের জন্য শুধু আগামী পাঁচ বছর ক্ষমতার নিশ্চয়তা নয়, বরং আসন্ন অ-নে-ক বছরের ও অনেক কিছুর নিশ্চয়তা। ফলে এমন বিএনপি বা তার বন্ধুদের জোট ঐক্যফ্রন্টের জন্য লীগের বিশেষ সম্মান ও সম্ভ্রমবোধ প্রকাশ- এটা কোনো ব্যাপারই নয়। চাই কি আরো একটু খাতির যত্নও তারা করতে পারে। তবে কাউকে একেবারে হিসাব করে বিরোধী দলের আসনে বসানো, কাজটা  ২০১৪ সালের নির্বাচনে (১৫৩ জন খ্যাত) ফলাফল বানানোর কারিগর এইচটি ইমাম এর মত হাতও ব্যর্থ হবে।

তবে প্রস্তাব সরকারি দল যাই দেক না কেন, সংলাপের নিয়ন্ত্রণ এখনও সরকারি দলের হাতে। তাই কাদের বলছেন, “আমরা সংবিধানের বাইরে যাব না, আলোচনা অব্যাহত থাকবে: কাদের”। অর্থাৎ আমরা যা দিচ্ছি তাই। এর বাইরে কিছু নাই।

তবে আর একটা দিক আছে। গত ১ নভেম্বর গণভবনে টেবিলের দু’পাশে যারা মুখোমুখি বসেছিলেন, তারা এটা ১৯৯১ সালের পর প্রায় ২০ বছরের মতো হলো, এভাবে মুখোমুখি আগে কখনো এমন বসেছেন আমাদের মনে পড়ে না। এই সময়কালের শেষের ১০ বছর বিরোধীরা সরকারি দলের মুখোমুখি হয়েছে কেবল ভিকটিম হিসেবে। ফলে তারা যে আবার কখন টেবিলে মুখোমুখি বসতে পারে বা চোখে তাকিয়ে কথা বলতে পারে, এটা মিডিয়া বা সাধারণ মানুষের চোখে অকল্পনীয় হয়ে গেছিল। তাই অনভ্যস্ততার চোখ ছড়িয়ে ছিল চার দিকে।

এখন কী হবে?
প্রথমত, সরকারি পক্ষ ছিল সংলাপ কেন তা তাদের জানা। ফলে প্রস্তুতও পরিকল্পিত। অন্য দিকে, বিরোধীরা ছিল চোখে লাগার মত হোমওয়ার্কহীন আর পুরো অন্ধকারে। যদিও কেনো সংলাপ, কী অফার সেসব কিছুই আগাম ধারণা না থাকায়, সেটাও একধরনের অপ্রস্তুতি এবং পরিকল্পনাহীন হয়ে থাকতে হওয়া। তবে তারা এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব ইতিবাচকভাবে দেখছিল, অথচ কোথাও কোনো ইঙ্গিত ছাড়াই। এ ছাড়া মানুষ ভালো হয়ে যেতেও পারে – ধরনের ভাবনাকে চিন্তার কোন অবস্থানে জায়গা দিয়েছিল; অথচ তাদের উচিত ছিল তাদের দাবির কোন কথাটা কিভাবে, কার পরে কী বলবে- এগুলো নিয়ে কিছু আগাম পরিকল্পনা করে হাজির হওয়া। আর আগাম কিছুই ইতিবাচক দেখার দরকার ছিল না। তবে এখন আর একটু গোছানোর সময় পেয়েছে।জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তা নিয়ে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে ‘সমাধান পায়নি’ তারা।

তাহলে এখন কী হবে?
লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী কাদের এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করেছেন। তার অনুমান ৮ নভেম্বরের পর অনেক কিছু জানা যাবে। তিনি আসলে হয়ে যাওয়া সংলাপকে (মানে প্রদত্ত অফার) প্রবল ইতিবাচকভাবে দেখার ও পেশ করার সুযোগ নিয়েছেন। তিনি বলছেন, আবার ছোট আকারে বসার দরকার হতে পারে।

এখন ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি যদি সংলাপ (বা কোনো অফার) প্রত্যাখ্যান করলাম ধরনের কথা বলার দিকে যদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে স্বভাবতই মধুচন্দ্রিমার দিন শেষ হবে, কাদেরের ৮ তারিখও। সে ক্ষেত্রে আমরা সংলাপ-পূর্ব দিনগুলোর মতো আবার দমন-নির্যাতনে সংঘাতের দিনগুলোতে ফিরে যেতে দেখব।

না, আজকের পরিস্থতি আরও আপোষের অভিমুখে। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আশা করছেন, আবার সংলাপ খালেদার মুক্তির এজেন্ডায় হতে পারে। কাদের: খালেদার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

সবশেষে গত কালকে ভারতের পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী এক লেখা ছাপা হয়েছে সাউথ এশিয়া মনিটরে, সেখানে তার কিছু মন্তব্য আছে। এটা মূলত আগের বার হাসিনাকে তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ যতকিছু বলে অভিযুক্ত করেছিলেন এবারের লেখাটা তার শোধবোধে থুক্কু বলা; কথা ফিরিয়ে নেয়া বলা যেতে পারে। যদিও লেখার শিরোনামটা অদ্ভুত – লিখছেন, “ঘেরার মধ্যে পড়া আওয়ালী লীগ কী সম্মিলিত বিরোধীদের চাপ সামলাতে পারবে?”। আসলে এবারের পুরা লেখায় তার বক্তব্য কেবল একটা বাক্যে – “In this effort, the AL can count on India’s support.”। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই পরিস্থিতিতে হাসিনার ভারতের কোলে মাথা রাখতে পারে। “তারা খুশিই হবে”।

যদি পরিস্থিতির পরিণতি এদিকেই যায় বা নিয়ে যাওয়া হয় তবে এর মানে হবে, বাংলাদেশের রাজনীতিক সংকটে এরপর সমাজের একটা বড় অংশ এসবের বাইরে থেকে যাবে যারা রেডিকেল হতে থাকবে। না, বলা ভাল তাদেরকে ঠেলে দেয়া হবে; যাদেরকে না লীগ না বিএনপি বা এদের মত কেউ প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সংলাপ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্যাক ক্যালকুলেশন

ব্যাক ক্যালকুলেশন

গৌতম দাস

০৮ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার ০০ঃ০৩

https://wp.me/p1sCvy-2qv

 

 

‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’। কথাটার মানে হল, দু’টি সংখ্যার যোগফল আর ওই সংখ্যা দু’টির একটা জানা থাকলে; বিয়োগ করে অপর সংখ্যাটি বের করা যায়। অর্থাৎ ফলাফল থেকে শুরুর উপাদান কী ছিল, তা জানার চেষ্টা। অথবা রান্না খেয়ে রেসিপি কী ছিল তা বোঝার চেষ্টা বলা যায়।

গত ১৯-২১ ফেব্রুয়ারি হোটেল র‌্যাডিসনে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ’ নামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ভারতের প্রধান ধারার প্রিন্ট মিডিয়ার বেশির ভাগই অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর পর্যায়ের ব্যক্তিরা (যুগান্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা কমপক্ষে আটজন) এতে যোগ দিয়েছিলেন। যুগান্তরের রিপোর্ট থেকে আরো জানা যাচ্ছে, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ -এর আহ্বায়ক শ্যামল দত্ত। তিনি বাংলাদেশের দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক। কিন্তু কেন এই অপ্রচলিত আয়োজন? এর একটি জবাব খুঁজে পাওয়া যায় “মৌলবাদ রুখতে দিল্লিকে চায় ঢাকা” শিরোনামে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আনন্দবাজার পত্রিকার অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা রিপোর্ট থেকে। অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তিনিও একজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তিনি লিখছেন, “দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে সরকারি স্তরে তৎপরতা তো রয়েছেই। তার পাশাপাশি মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে দুই দেশের সাংবাদিকদের মতবিনিময়ের মতো ‘ট্র্যাক টু’ কূটনীতির একটি উদ্যোগ নজর কেড়েছে ঢাকার একটি পরিচিত ‘থিংক ট্যাংক’ ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইসিএলডিএস) উদ্যোগে”।

তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা বেশ চিন্তাভাবনা করে করা আয়োজন। কিন্তু আনন্দবাজারের ‘ট্র্যাক টু’ কথাটা যেন অনেক কিছু বলে দিচ্ছে, যা কোথায় নাই, বলা হয়নি। “ব্যাক ক্যালকুলেশন” করা যাক। মাস কয়েক আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময়ও আনন্দবাজার এই শব্দটা ব্যবহার করেছিল। “ট্র্যাক টু” – মানে মূল কূটনৈতিক চ্যানেল ও অবস্থানের বাইরে দ্বিতীয় আর এক মাধ্যমে যোগাযোগ বা বার্তা পৌছানো। অর্থাৎ ‘কাকাবাবু’ যেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হয়ে কিছু একটা মোদি সরকারের কাছে পৌঁছে দেন, সুপারিশ করেন বা দুই সরকারের মতভিন্নতায় মধ্যস্থতা করেন ইত্যাদি। কিন্তু কী সে বিষয়, তা কোথাও লিখিত প্রকাশ ছিল না, যদিও অনুমানে ছিল।

আসলে ঘটনার শুরু বা গুঞ্জন অনেক পুরনো; শেখ হাসিনার সর্বশেষ ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফরের সময় থেকে। কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত দুই সরকারের মধ্যে মতভিন্নতা বাড়ছিল,  গত প্রায় একবছর ধরে। তা কমিয়ে একটা আপোষ-রফার একমত অবস্থানে  দাঁড় করানো যায় কীনা সে প্রচেষ্টাও চলছে। সেই আপোষ-রফায় পৌছানোর ইচ্ছায় আমাদের সরকারের দিক থেকে নেয়া পদক্ষেপ হিসাবে  ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ ্কে বলা যায় এক সর্বশেষ উদ্যোগ।

বিরোধের ইস্যুগুলো কী
চীনের One Belt One Road বা সংক্ষেপে OBOR প্রকল্প। এটা মূলত ৬৫ রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে বা ঐসব রাষ্ট্রের ভিতর দিয়ে যাবে এমন এক মেগা অবকাঠামো প্রকল্প। এটা সড়ক ও রেল পথে ও সাথে সমুদ্র পথেও যোগাযোগের সম্পর্কের দিক থেকে পণ্য চলাচলের এক নেটওয়ার্ক হয়ে উঠবে।  মূলত এশিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র, ওদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও সেন্ট্রাল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এবং রাশিয়াসহ ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রকে এই প্রকল্পের যোগাযোগের আওতায় আনা এর লক্ষ্য।  তবে এর সাথে কিছু আফ্রিকান ও ল্যাটিন আমেরিকান রাষ্ট্রকেও সাথে যুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। আর মূল অবকাঠামোটা রেল ও সড়ক-ভিত্তিক হলেও এই পুরা সড়ক পথের অন্তত পাঁচ জায়গায় পাঁচ গভীর সমুদ্র বন্দরের কানেকশন থাকবে। অর্থাৎ সমুদ্রপথে পণ্য- মালামাল এনে সুবিধামত কোন একটা গভীর সমুদ্র বন্দরে তা নামিয়ে এবার সড়ক পথে যে কোন দেশে ঐ পণ্য নেওয়ার সুবিধা থাকবে এই প্রকল্পে। এইভাবে এটা ট্রিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগের  এক প্রকল্প। বাংলাদেশ সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে রাজি হলে সে বন্দরও বেল্ট-রোড প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবে। তবে তা  হোক আর নাই হোক, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ বা যুক্ত হয়ে থাকতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারের সাথে ভারতের বিরোধ, আপত্তি বা মতভিন্নতা এখান থেকে। সাথে অবশ্য আরও কিছু প্রসঙ্গও আছে।

এই OBOR প্রকল্প কাজের নানা অগ্রগতি আছে। তার একটা হল এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারি রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে সর্বপ্রথম এক সামিট ডাকা। ঐ সামিট ডাকা হয়েছিল চীনের বেইজিংয়ে গত বছর মানে, ২০১৭ সালের মে মাসে। তখন থেকে OBOR  প্রকল্পের আর এক নতুন নামকরণ হয়, Belt-Road Initiative (BRI) অথবা বাংলায় ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’।

বাইরে থেকে চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে  যুদ্ধ লেগে না গেলেও অনবরত আমরা বিবাদ, রেষারেষি দেখি সেটা মুদ্রার এক পিঠ। সহযোগিতার অন্য পিঠ আছে। না, এখান থেকে দুই পিঠের মধ্যে কোন স্ববিরোধিতা বা শঠতা খুঁজা যাবে না, ভুল হবে। এটা শুধু চীন-ভারত বলে নয় সব আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কই একালে এরকমই হবে, এটাই স্বাভাবিক।  তবে ‘একালে’ কথার মানে কী? একালে মানে হল, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পরের সময়ে। তখন থেকে সারা দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত। ফলে,  পণ্য, পূজি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য আর একই বাজারে্র এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ  লেনদেনে একেবারে মাখামাখি। এখানে কেউ আর বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি বা বিনিময় সম্পর্কহীন কেউ নয়। তাই একালে মানে ১৯৯১ সালের পরের দুনিয়াতে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কুটনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি সব সম্পর্ক এরকম দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার – মাখামাখি।

ফলে অন্য পিঠ, চীন-ভারতের মধ্যে প্রবল সহযোগিতাও আছে। যদিও ভারতের মিডিয়া ব্যাপারটাকে আরাল করে এক উগ্র এবং ভুয়া জাতিবাদী অবস্থান প্রচার করে থাকে। যেমন তাদের দ্বিপাক্ষিক পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশই হলো চীনের রফতানি আর ১০ শতাংশ ভারতের রফতানি,  চীনের বিনিয়োগ ভারতে ডেকে আনা আছে, আবার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আপারহ্যান্ড বা বড় ভাগটা চীন নিয়ে নিল কি না সে টেনশন আছে, সেই সাথে অচিহ্নিত সীমান্ত বিতর্কের টেনশন – তা তো আছেই। কিন্তু ২০১৭ সালের মে মাসের আগ পর্যন্ত  কখনোই তাদের মধ্যে বড় বা দৃশ্যমান কোন অসহযোগিতা দেখা যায়নি। এমনকি, গত ২০০৫ সাল থেকে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিতে সে ভারতের পিঠে হাত রাখা সত্ত্বেও চীন-ভারত সম্পর্ক এমনই ছিল। ভারত ঐ সামিটে দাওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও,  সেবারই প্রথম চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সামিট ভারত বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল।

ভারত যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এর কারণ বলেছিল যে,   বিতর্কিত পাকিস্তান অংশের কাশ্মিরের উপর দিয়ে এই প্রকল্প গেছে, তাই ভারত  নিজের সার্ভভৌমত্ব লঙ্ঘণের সমস্যা হিসাবে দেখে সেই  আপত্তিতে তারা এতে অংশ নিচ্ছে না। “Regarding the so-called ‘China-Pakistan Economic Corridor’, which is being projected as the flagship project of the BRI/OBOR, the international community is well aware of India’s position. No country can accept a project that ignores its core concerns on sovereignty and territorial integrity, ” Baglay added.  [Gopal Baglay is the Spokesperson of MEA, India.]

তবে ভিতরের কারণও চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অশোক কান্তা বলে দিয়েছিলেন ভারতের এক মিডিয়াতে। আমরা যদি এর আগে ২০১৫ সালের চীনের বিশ্বব্যাংক (AIIB ব্যাংক) গড়ার সময়ের ভারত-চীন সহযোগিতার সাথে তুলনা করি, তাহলে আমরা দেখি –  যে কোন ভাগাভাগিতে মুড়োটা নিজের পাতে পাওয়ার জন্য ভারত দরাদরি করেছে আর চীন সহানুভূতির সাথে তা দেয়ার চেষ্টা করছে। সব পশ্চিমা রাষ্ট্রের চেয়েও ভারতকে ভাগের দিক থেকে ওপরে রাখছে চীন। কিন্তু বেল্ট রোড উদ্যোগের বেলায় ভারতের মনের কথাটা সার করে অশোক কান্তা যা বলছেন তা হল, “বেল্ট-রোড উদ্যোগ খুবই কাজের; তা সবার দরকার। বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্রের জন্য।  কিন্তু ভারত এতে যোগ দিলে সে চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবার সম্বেভাবনা খুব বেশি, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত প্রথম তিনটি অর্থনীতির মধ্যে একটি হতে যাচ্ছে”।  [আসলে বেল্ট-রোড উদ্যোগ যে খুবই কাজের তা ভারত কেন আর এক প্রতিদ্বন্দ্বি আমেরিকাও তা অস্বীকার করে নাই কোথাও।] নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা ১৩ মে ২০১৭ থেকে ইংরাজি উদ্ধৃতিগুলো নেয়া। 
[Former Indian Ambassador to China Ashok K Kantha said,
“It needs pragmatic approach on China’s part as well. We will be two largest economies of the world by 2030. So joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,” Kantha added.]

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, এটা কেবল তথাকথিত সার্বভৌম ইস্যুতে ভারত ‘বেল্ট-রোড সামিট’ বয়কট করছে; তা নয়। এ প্রসঙ্গে ভারতের সিরিয়াসনেস কত গভীরে সেটা বুঝানোর জন্য একটু বিস্তারিত বলতেই হবে। কিন্তু তার আগে একটি ডিসক্লেমার দিয়ে রাখতে হবে। সেটা হল, মনে রাখতে হবে, এখানে আমি বলিনি যে, ভারতের বা অশোক কান্তার এই অনুমান-বিশ্বাস [ইংরাজিতে কোট করে আনা উপরের বক্তব্য] সঠিক। আসলে এটা তাদের একটা পারসেপশন মাত্র। অর্থাৎ আমি এখানে কেবল বলছি যে, ভারত নিজেকে কী মনে করে, সেটা। কিন্তু তাদের এই অনুমান সঠিক আমি তা মনে করি না। ফলে আমি তাতে কিন্তু সায় দেইনি। আর খুব সম্ভবত এই বয়কটের কারণেই ভারতের ট্রেন মিস হবে। তবে সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

স্বভাবতই এই বয়কটের সিদ্ধান্তের পরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং এ’ঘটনার লেজ আছে। এর অন্যতম হল, এরপর থেকেই ভারতের বিদেশনীতিতে নতুন কিছু হিসাব, কিছু ‘মুই কী হনু রে’ যোগ হয়েছে।  যেমন  এশিয়ার যেসব রাস্ট্রের সরকার চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছে ভারতের বিদেশনীতি তাদের উপর খড়্গহস্ত হয়ে গেছে। নেপাল বা শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। এশিয়ায় ভারতের পড়শি মানে চীনেরও, এমন রাষ্ট্রের কোনো সরকার যদি চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে নিজের সম্মতি চীনকে দিয়ে থাকে, তবে সেই পড়শির সরকারের এখন কপাল খারাপ। কারণ ওই সরকারের সাথে ভারত চরম অসহযোগিতার অবস্থান নেয়। শুধু তাই না, ঐ সরকার ফেলে দেয়া, অথবা ওর বিরোধীদের জিতিয়ে আনার চেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, এমনকি সম্ভাব্য সাবভার্সিভ এক্টিভিটিসহ দরকার মতো সবকিছু করা পর্যন্ত ভারত যেতে পারে। এই হয়েছে ভারতের বিদেশ নীতির নতুন বৈশিষ্ট, নতুন পালক। কিন্তু কেন, এর কারণ নিয়ে পরে আসছি। তবে ভারতের এই বিদেশ নীতি, স্বভাবতই এটা কোনো দলিল দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। তবে খোলা চোখে বাস্তব তৎপরতা দেখে বোঝা যেতে পারে। বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বলেছে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ২০১৭ সালের এপ্রিল ভারত সফরে তিনি বার্তা পেয়েছিলেন – No OBOR, নো চাইনিজ প্রজেক্ট। আমাদের ব্যাক ক্যালকুলেশন এটাই বলে। কারণ যেকথা দিয়ে লেখা শুরু হয়েছিল, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’  এতে আগত ভারতীয় সম্পাদকেরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে তিনি পরোক্ষে এটাই বলেছেন যে ভারতীয় সম্পাদকেরা যেন ভারতের চীন নিয়ে উদ্বেগ কমাতে ভুমিকা রাখে।

কিন্তু এই রচনার মূল প্রসঙ্গে এখন আসব। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা কীভাবে নিয়েছিলেন, ভারতের বার্তা ও পরামর্শকে?

আগে বলেছি ভারতের নির্ণায়ক হল ‘চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে’ যে সরকার সম্মতি জানিয়েছে, ভারত সে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু খুব সম্ভবত বাংলাদেশ ভারতের ‘অনেক কাছের ও বন্ধু সরকার’ বলে একে কাছে ডেকে ভারতের চাহিদার কথা বলে দেয়া হয়েছিল। সরকার ফেলানো বা সরাসরি বিরোধীতার দিকে যায় নাই।

আসলে ভারত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে, সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে উথাল-পাথাল চলছে, চীন নতুন নেতা হয়ে আসছে কিন্তু ভারতের কী হবে – ইত্যাদি পুরা ব্যাপারটা নিয়ে এপর্যন্ত অন্তত চারটি (তিনটা আমেরিকার সরকারি ও একটা প্রাইভেট) বড় বড় সার্ভে ও গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে এপর্যন্ত , কিন্তু তাদের কোনটাতেই এমন কথা বলা হয়নি। তবু যেন ভারত এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে, এই বিশ্বাসে আমাদের দৈনিক কালেরকন্ঠ পত্রিকা কোনো রেফারেন্স ছাড়াই এমন দাবি করে একটি লেখা ছাপিয়ে ফেলেছে গত মাসে। যার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “কয়েক বছরেই চীনকে টপকে যাবে ভারত, উবে যাবে পাকিস্তানও!”। অথচ কোথা থেকে এই খবর পেল এর কোন রেফারেন্স সেখানে দেয়া হয় নাই। খুব সম্ভবত ভারতের ইকোনমিক টাইমসের কোন ‘প্রপাগান্ডা’ খবর এখানে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

উপরে যেসব স্টাডি রিপোর্টের কথা বললাম, ওর মধ্যে প্রাইভেট কোম্পানী “প্রাইজ-ওয়াটার-হাউজ-কুপারস” এর যে রিপোর্ট তা ২০৫০ সালের দুনিয়ায় সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে সার্ভে স্টাডি। একমাত্র সেখানেই ভারতকে আমেরিকার উপরে নিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখলের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আর বাকি তিনটা আমেরিকান রিপোর্ট হল ২০৩০ সাল, ২০৩৫ সাল ও ২০৩৫ সালের দুনিয়ায় টপ অর্থনৈতিক অবস্থানে কোন রাষ্ট্র কে কোথায় থাকবে তা নিয়ে। কিন্তু  (২০৩০-২০৫০ সালের মধ্যে) কোথাও কোন রিপোর্টে ভারতের প্রথম স্থান দখলের কথা কোথাও নাই। চারটা রিপোর্টেই চীন প্রথম এবং দ্বিতীয় যে কারও চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা প্রথম।

ওদিকে আবার শেষ বিচারে এই রিপোর্টগুলো এখনও একেকটা সার্ভে ও স্টাডির এক অনুমিত ফলাফল,  যা বাস্তব নয়। তবে সম্ভাবনা মাত্র। ফলে বহু ‘যদি, কিন্তু’সহ নানা শর্তসাপেক্ষ; যার মূলকথা হল, এগুলা অনুমিত ফলাফল বা প্রেডিকশন। কিন্তু ভারত ব্যাপারটাকে পুরাপুরি ভিত্তিহীন অনুমানে অর্থনীতিতে নিজের প্রথম হওয়ার বিষয় হিসাবে নিয়ে সেটা ফসকে যাওয়া-না যাওয়া হিসেব এমন সিরিয়াস হয়ে দেখছে।

তাহলে সারকথা হল, ভারতের একটা পারসেপশন তৈরি হয়েছে যে ভারত নিজের কথিত এক নম্বর অর্থনীতি সে হতে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে যে ব্যাপারটা পারসেপশনের,মানে অনুমানের। যেটা সত্য নয়। আর ঐ পারসেপশনের উপর দাড়ানো ভারতের বৈদেশিক নীতি অবস্থান হল এই যে, বেল্ট-রোড প্রকল্পে এশিয়ার যে সরকার যাবে সে ভারতের শত্রু। ভারতকে ওর বিরোধিতা করতে হবে, ঐ সরকারের পতন ঘটানো ভারতের স্বার্থ। ফলে তা থেকেই ভারত সরকারের এক প্রেসিং ডিমান্ড তৈরি হয়েছে কেবল যাকে ব্যাখ্যা করতে পারলে জানা যাবে যে ভারত এত মরিয়া অবস্থায় কেন, অথবা কেন ভারত এক চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

ব্যাপারটা দাঁডিয়েছে এমন যে, এশিয়ার কোন সরকার চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে ভারতের কাছে একথার মানে ঐ সরকার ভারতের দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট করতে কাজ করছে।

আমাদের সরকার কী ভারতের বার্তা বুঝেছে?
তাহলে হাসিনা তার গত ভারত সফরে তিনি যে বার্তা পেয়েছিলেন তা কী ঠিকঠাক বুঝেছিলেন? খুব সম্ভবত না। কী দেখে তা মনে হল? মনে হল কারণ, হাসিনার ঐ এপ্রিল ২০১৭ সফরের পরে,  ঐ বছরই ২০১৭ অক্টোবরে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব ভারত সফরে গিয়ে সরবে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা জানিয়ে এসেছিলেন। অর্থাৎ আমাদের সরকার বুঝাতে চাচ্ছিল যে ভারতের আপত্তি মতভিন্নতা আছে কিন্তু ব্যাপারটা আমাদের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ। অথচ ভারতের মূল আপত্তি হল কোন সরকারের  চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়া, চীনা বিনিয়োগ নেয়া।  এথেকে বুঝা যায় যে বাংলাদেশ ভারতের অবস্থানের সম্মক উপলব্দি ছিল না। অথবা ভারতও তার আপত্তির কারণ খুলে বলে নাই। ভারতের (পারসেপশন অনুসারে)অবস্থান হল যদি সে বাংলাদেশকে বেল্ট-রোডে যোগ দিতে দেয়, চীনা বিনিয়োগ এনে নিজের উন্নয়ন চালায়ে যায় তবে এর মানে হবে সেই বাংলাদেশ ভারতের “দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট” করতে কাজ করছে। অর্থাৎ এটা ভারতের মরিয়া স্বার্থ। কিন্তু এটা যে ভারতের প্রথম হওয়া ফসকে যাবার মামলা তা সে কখনও বাংলাদেশের মত কাউকে খুলে বলছে না। বলছে পাকিস্তান-কাশ্মীর হয়ে প্রকল্প আঁকাতে তা ভারতের সার্বভৌমত্ব – এটাই তার আপত্তি। ফলে হাসিনা সরকারও মনে করছে এই ইস্যুটা হল, ঠিকমত ভারতকে বুঝালে, তোয়াজ করলে ভারত মানবে। আর সে কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের চীনা বেল্ট-রোডের পক্ষে থাকা শক্ত করে তুলে ধরে ভারতকে বুঝানো। অথচ হাসিনা সরকারের ঠেকা যদি হয় আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন তার জন্য খুবই জরুরি তবে সরকার আসলে পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়ে উলটা কাজই করিয়েছে। মুল কথা এটা তো পরিস্কার যে হাসিনাকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে দিয়ে ভারত নিজের এক নম্বর হওয়ার ‘মরিয়া স্বার্থ’ [perceived desparate interest] নষ্ট করতে পারে না। ভারতের কাছে হাসিনার আবার ক্ষমতায় আসা না আসা ভারতের মরিয়া স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারে না।

অতএব এই ব্যাপারে সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে যে হাসিনা ভারতের পারসেপশন, ভারতের অবস্থান কেন এমন ইত্যাদি বুঝেছে কি না। বরং হাসিনা ব্যাপারটাকে চীন-ভারতের সাধারণ বিরোধ যেমনটা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে স্বাভাবিক রুটিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা,  প্রতিযোগিতায় হতে দেখা যায় এর বেশি কিছু বলে দেখেছে মনে হয় না। সে কারণেই, বাংলাদেশ সরকার এখনো মনে করছে একটা ভালো পারসুয়েশন হলে, একটু তোয়াজ কিংবা বুঝিয়ে বললে ভারত বুঝে যাবে। অর্থাৎ আমাদেরকে চীনা প্রজেক্ট নিতে দেবে। গত এক বছর ধরে আমরা দেখেছি সেই পারসুয়েশনের তোয়াজ, বাংলায় যাকে বলে, মন জয়ের চেষ্টা। আর এর সর্বশেষ নজির হল  ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ-২০১৮’।

যদিও আসলে এটা তোষামোদ কি না সেটা আমার বলার মুল বিষয় নয়। মূল ব্যাপার হল, ভারত ব্যাপারটাকে দেখছে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিজের কথিত প্রথম হওয়া-না-হওয়া হিসেবে। বাংলাদেশ সরকার এখনও বিষয়টা ভারতের চোখে দেখেনি বা এই পারস্পেকটিভের নাগালই পায়নি,  কারণ ভারতও খুলে সেকথা বলছে না বা বলতে পারছে না বা চাচ্ছে না – এটা মনে করার কারণ আছে। কারণ, আমাদের সরকার নাগাল পেলে বা জানা থাকলে তো বুঝত যে সেক্ষেত্রে এরপরে আর এখানে তোয়াজ বা ভারতকে বুঝানোর আর কিছু নেই। সেকারণে এই উলটা তোয়াজ আমরা হতে দেখছি, ভারতীয় সম্পাদকদের মাধ্যমে হাসিনা ম্যাসেজ পৌছাতে চাইছেন যে ‘‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। বাংলাদেশের কাছ ভারত ভারতের জায়গাতেই থাকবে, চিন চিনের জায়গায়। ভারতের বন্ধুত্ব সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। চিন তো নতুন বন্ধু।’’ অথচ এই ম্যাসেজের অর্থ ভারতের কাছে তো উলটা।

ভারত হাসিনাকে বলছে, বাংলাদেশে নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ। আর হাসিনা পালটা ম্যাসেজ দিচ্ছে, বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আমি আর কিছু করব না, চীনের বলয়ে যাব না। এটাই হল এখানে, ব্যাট আর বলের পরস্পরের সংযোগ সম্পর্ক না হবার ঘটনা।  ভারত চাচ্ছে চীনের সাথে সম্পর্কহীন, বিনিয়োগ সম্পর্কহীন এক বাংলাদেশ। অথচ সরকার এটাকে বুঝছে এভাবে যে, চীনের থেকে বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক না রাখলেই বুঝি ভারত সন্তুষ্ট হবে!

তাহলে ভারতের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে? এককথায় এর জবাব ভারতের কাছে নাই। তবে ভারতের স্বপ্ন হল কল্পিত চীনের বেল্ট-রোড এর এক বিকল্প ‘মাজা ভাঙা’ একটা চার দেশীয় জোট হতে পারে কি না তেমন প্রাথমিক আলাপ চলছে এবং যেটা পাল্টা বেল্ট-রোড উদ্যোগ হতেও পারে। যেটা অবশ্যই অনেকটা ‘গোফে তেল’ ধরণের। তবুও গরিবেরও যেমন অর্থ না থাকলেও স্বপ্ন থাকে, তেমনি। ওই বিকল্প চালু হলে এরপরে ভারত সেই হবু প্রজেক্টের নৌকায় বাংলাদেশকে তুলে নেবে। আর ততদিন বাংলাদেশকে বিনিয়োগহীন বসে থাকতে হবে। বাস্তবে এখন, বাংলাদেশে অবকাঠামোতে যে বিনিয়োগ চাহিদা সেখানে ভারতের কোনো বিনিয়োগই নেই, অবদান নেই। থাকার কথাও না। মূল কারণ হল – ভারত এখনো অন্য রাষ্ট্রের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে পারে, এমন অর্থনীতিই নয়। তবে দু-চার বিলিয়নের যে কথা শোনা যায় সেটা বাংলাদেশে কোন অবকাঠামো বিনিয়োগ নয়। আসলে সেটা ভারতের দুর্বল মান এবং প্রতিযোগিতায় অচল স্টিল ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ভর্তুকির অর্থ। এজন্য ওই দু-চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়ে মূলত ভারতের স্টিল সংশ্লিষ্ট প্রডাক্ট (টাটা বা অন্য ভারতীয় গাড়ি, রেলের যন্ত্রপাতি) কিনতে পারা যায়; যাতে ভারতের অদক্ষ স্টিল ইন্ডাস্ট্রি ভারত সরকারের সাহায্যে টিকে থাকে। তাহলে বাংলাদেশ সরকারের মূল সমস্যাটা হল, চীনকে বাদ দিলে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় সে বিনিয়োগ ভারত থেকেও পাচ্ছে না। তাহলে কোথা থেকে পাবে? আর বিনিয়োগ না পেলে –“গণতন্ত্র না উন্নয়ন” – এ বিতর্কে নিজেকে উন্নয়নের কর্তা হিসেবে কেমনে প্রচার করবে? কারণ, অবকাঠামো বিনিয়োগ নেই মানে প্রজেক্ট নেই। প্রজেক্ট নাই তো হাসিনার দল বা কর্মি কিছুই নাই। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের চাহিদা পূরণের দিক থেকেও ভারত এখনও অযোগ্য, অপুষ্ট। আসলে ভারত এখনও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ গ্রহীতা অর্থনীতির রাষ্ট্র। অথচ স্বপ্নে পোলাও খায়। চীনের রিজার্ভ যেখানে ৩১৮১ বিলিয়নের উপরে ভারতের সেখানে মাত্র ৪১৭ বিলিয়ন। কিন্তু ভারত এখনই ‘গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক নম্বর অর্থনীতি হয়ে গেছে’- এই ভাব ধরতে চায়।

এই বিচারের দিক থেকে দেখলে প্রথম আলোও একই ভুল করছে, ব্যাপারটা তারাও বুঝেছে মনে হয় না। তারা একটা আর্টিকেল ছেপেছে, “চীন-ভারতের ‘লড়াই’য়ে বাংলাদেশ জড়িত না” এই শিরোনামে, এটাও অর্থহীন। কারণ বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনা তো জড়াচ্ছেন না। ভারতই তার অনুমিত ধারণা বা পারসেপশনে জড়িয়ে বাংলাদেশকে দেখছে। আর প্রশ্নটা আসলে চীনা বিনিয়োগে ভারতের কঠোর আপত্তি। বলছে, শুধু বেল্ট-রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে না তাই নয়; কোনো চীনা বিনিয়োগই নিতে পারবে না হাসিনা সরকার। অপর দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’ দুটো এক কথা নয়। বরং বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগই তো ভারতের ‘পারসিভড’ উদ্বেগের কারণ। আসলে ভারত যেন বাংলাদেশকে বলছে- ‘কোনো কিছু না ছুঁয়ে বসে থাক।’ এ কথার মানে কী পাঠকেরা কল্পনা করে দেখতে পারেন। কারণ বিনিয়োগের বাজারে, মুরোদে ভারত এখনো বামন, অপুষ্ট। তাই ভারত, চীনের কোন বিকল্প নয়। প্রথম আলোও বুঝেছে যেন চীনা প্রভাব বলয়ে হাসিনা যাবে না – এর নিশ্চয়তা চাচ্ছে ভারত। অথচ বিষয়টা চীনা প্রভাব বলয় নয়, চীনা বিনিয়োগ নেয়া না নেয়ার।

ভারত যদি মনে করে বাংলাদেশে  – নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ – অবস্থান মানলে একমাত্র তবেই হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিবে – তাহলে অবস্থা দাড়াবে এবার তাহলে আর ভারত হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিতে পারছে না।

এ অবস্থায় আস্তে ধীরে হলেও হাসিনা সরকার তাই সপক্ষে কোনো বিদেশের সমর্থন পাওয়া ছাড়াই সংসদ নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছে, বুঝতে হবে।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ মার্চ ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ব্যাক ক্যালকুলেশন”  -এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

গৌতম দাস

বৃহষ্পতিবার ২৭ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2f3

 

ঘটনার শুরু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলায়, যা ৯/১১ বলে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে বিশেষ ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেয় এবং তা নির্মূল করবার জন্য নতুন ধরণের যুদ্ধের সূচনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ‘আল কায়েদা’কে দায়ী করে। বুশের নেতৃত্বে আমেরিকা আল-কায়েদার রাজনীতি ও হামলা মোকাবিলার যে নীতি গ্রহণ করে তার বৈশিষ্টগুলো হলোঃ

১. খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় আল কায়েদা নির্মূলের যুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিশ্চান জগতের ক্রুসেড সাব্যস্ত করে লড়া।

২. “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়া, এই ডাকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে পক্ষে টানা। সবাইকে সতর্ক করা যে এটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সামিল হয়ে এই হামলা মোকাবিলা করার কমন লাইন হলো, ওয়ার অন টেরর।

৩.“হয় তুমি আমার পক্ষে নইলে তুমি আমার শত্রু” – এই নীতির ভিত্তিতে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নৌকায় উঠতে বাধ্য করা, ভূগোল জুড়ে এই বিভাজনের ভিত্তিতে নতুন এক অক্ষশক্তি তৈরি করা যার লক্ষ্য হচ্ছে যারা এই ক্রুসেডের পক্ষে নয় তাদের নির্মূল করা।

৪. এই যুদ্ধকে খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় ক্রুসেড বলে মনে করলেও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে আবার সেকুলারিজমের রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলে দাবি করা ও প্রচার চালানো। ক্রুসেডের মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশাবে তৈরি হওয়া এই সেকুলারিজমের সোজা মানে দাঁড়ালো, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়া। ইসলাম ডাকনামে যত রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রকাশ দুনিয়ায় আছে সবকিছুকেই শত্রুর কাতারে ফেলা। দুষমন জ্ঞান করে নির্মূল করা, ইত্যাদি।

 

যুদ্ধের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা
আমাদের নিশ্চয় স্মরণ হবে ৯/১১ হামলার সময় বাংলাদেশ ছিল একটা সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। তবুও তাকে আফগানিস্তান হামলায় বিমানের রিফুয়েলিং ও এয়ার স্পেস ব্যবহার করতে অনুমতি দিতে হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যুদ্ধ চাহিদা মেটানোর দায় কবুল করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত কোন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলেও এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লতিফুরকে নিতে হয়েছিল ।

একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশকে ওয়ার অন টেররের নৌকায় তুলে নেয়ার কাজটাতে একটা পজ দিতে হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ আগেই ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে কো্ন দল ক্ষমতায় আসে সেটা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসকে এটা মানতে হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যে, ওয়াশিংটনের পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস যে-লাইনে আগানোর পরিকল্পনা নেয় সেটা হলো, ইসলামের নাম-গন্ধ আছে এমন সব দল ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার কায়েম করা। নির্বাচিত বিএনপির জোটের সরকারকে ক্রুসেড নীতি্র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তা বাস্তবায়নের জনু উপযুক্ত মনে হয় নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মোকাবিলার একটা জাতীয় সরকার গঠিত হোক। তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ওয়ার অন টেররের নৌকায় উঠুক। প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার উদ্যোগ ছিল এটাই।

জোট সরকার ও মার্কিন যুদ্ধের অংশীদারিত্ব নেবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা
মোটা দাগে বললে, বিএনপি বাংলাদেশ সরকারকে বুশের নৌকায় ওঠানো এড়িয়ে যেতে পারে নাই। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ক্ষমতা শেয়ার আর ইসলামী রাজনীতির যাবতীয় প্রকাশগুলোকে শত্রু গণ্য করে একটা ভাগ তৈরির পলিসি জোট সরকার মানে নাই, এই দিকটা এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে আবার র‍্যাব গঠন, পশ্চিমের টার্গেট করা লোকদের ধরে নির্যাতন করে তথ্য আদায় ও তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ, ইত্যাদি কাজে জোট সরকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সহযোগী ভূমিকাই পালন করেছে। এককথায় রেনডিশনের কাজে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে বিশেষ সিকিউরিটি স্টেট আকারে সাজানো, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস ও পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলকে জোট সরকার মোটামুটি আস্থায় নিতে পেরেছিল। সেটাও সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। বেচারা বদরুদ্দোজার পদত্যাগ এসবেরই প্রতীকি প্রকাশ।

তখনকার মত পরিস্থিতি এভাবে থিতু হওয়াতে হাসিনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে হতাশ হাসিনা এই ঘটনার ভিতর থেকে পশ্চিমের চাহিদাটা ভাল করে বুঝেছিলেন। এই চাহিদা হবহু পূরণ করে দিতে পারলে তিনি পশ্চিমের চোখে একচ্ছত্র প্রার্থী হতে পারেন – এই সম্ভাবনার কথা ভেবে পরবর্তীতে তিনি এই লাইনেই রাজনীতি করবেন বলে মনস্থ করেন। শেখ হাসিনা পশ্চিমের ওয়ার অন টেররের চাহিদা বুঝে তাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের দিকে পা বাড়ান। সিদ্ধান্ত নেন এই চাহিদা মোতাবেক নিজে ও দলকে ঢেলে সাজাবেন। সে মোতাবেক রাজনৈতিক কৌশল তৈরিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির চেয়ে নিজেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি আন্তরিক ও উপযুক্ত খেদমতগার হিশাবে পশ্চিমের বাজারে হাজির করা। এই কাজের জন্য তিনিই একমাত্র ক্যান্ডিডেড হিসাবে নিজেকে বিক্রির কাজটা করতে পারা। ওয়ার অন টেররের উপযুক্ত সৈনিক হিশাবে আমেরিকান সমর্থন যোগাড় করা তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। এই লক্ষ্যকেই ধ্যানজ্ঞান করে ২০০২ সাল থেকে শেখ হাসিনা কাজ করে গেছেন।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশল, লোকাল এজেন্ডা
নিজের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ হাসিনার কৌশল হলো, ওয়ার অন টেররের আমেরিকান নৌকায় তিনি সদলবলেই উঠবেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এর নাম দিবেন “যুদ্ধাপরাধের বিচার”। আবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে তিনি একনিষ্ঠ – এই ভাব ধরে “স্বাধীনতার চেতনার” নামে নতুন এক রাজনীতি তিনি কায়েম করবেন। হাসিনার এই “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতির মানে হোল নিজের বাইরের আর সব রাজনীতি, চিন্তা, তৎপরতার যা কিছু বাংলাদেশে আছে তাকে নির্মূল করবার পথে অগ্রসর হওয়া। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের যে দাবি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গুমরে মরছিল, তাকে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়নের অধীনে এনে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের বীজ তিনি বপন করলেন তার কুফল শাহবাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে পড়ল। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে পারে নি, তাদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যারা করেছিল তাদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। সুষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া মেনে ও দেশে বিদেশে সকলের কাছে বৈচারিক নীতির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য একটি বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুষিয়ে রাখা এই দাবি মেটানোই ছিল সঠিক পথ। শেখ হাসিনা সেই পথে অগ্রসর হন নি।

ওয়ার অন টেররের ছাতার নীচে পপুলার এক উন্মত্ততা (ফ্যাসিজম) তৈরি করে কঠোরভাবে তার নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও নির্মূল করবার পথে তিনি গেলেন। ‘নির্মূল’ করাটা আক্ষরিক অর্থেই, অর্থাৎ ফিজিক্যালি বা শারিরীক ভাবে নির্মূল করা। এছাড়া হাসিনা যেভাবে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বুঝেছেন, তিনি চেয়েছেন চেতনার জয়গান। তার গান গাওয়াই হবে বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। খাঁটি বাঙালি তারাই যারা তার চেতনা ধারণ করে। শেখ হাসিনার “স্বাধীনতার চেতনায়” সওয়ার হয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোও বাঙালির খাঁটি চেতনা পয়দা করবার কাজে নেমে পড়ল। এই খাঁটি চেতনা, খাঁটি ইতিহাস, খাঁটি বাঙালি ধারণা, খাঁটি বাঙালি (পাঠ্য পুস্তকসহ) বই পুস্তক ছাড়া বাকি সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক উন্মাদনা তিনি আনলেন। নিজের এই খাঁটি বাঙালিত্ব বাদে আর সমস্ত চিন্তাকে রাজাকারি বা রাজাকারের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগিয়ে নির্মুল করবেন। একেই আমরা “বাঙালী জাতীয়তাবাদের” উগ্রতার চরম ও ৭১ এর পরের নব উত্থান এবং একই সাথে শেষ পর্যায় বলতে পারি। যারা গত পাঁচ-ছয় বছরের বাংলা ব্লগ ট্রেন্ড খেয়াল করেছেন তারা ভাল বুঝবেন এই নব উত্থিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ আক্ষরিক অর্থে তার প্রতিপক্ষকে ফিজিকালি নির্মূল করবার আকাংখা কিভাবে চর্চা করেছে। এই নির্মূলের আকাংখার তাগিদেই তাদের কদম কদম বাড়বৃদ্ধি হয়েছে। সেতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তচিন্তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে। এই উন্মাদনায় ধর্ম বা ইসলাম আমাদের সব চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান শত্রু এই ধারণা ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে আবার শুরু হয় আস্তিক-নাস্তিক ইত্যাদি নানান বিতর্কের ঝড়।

এতটুকু তাও সহনীয় ছিল। সব সমাজে নাস্তিকতা থাকে,আমাদের সমাজেও অনেকদিন থেকে আছে। কিন্তু এবারের আক্ষরিক অর্থে বিনাশ বা শারিরীক ভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মুলের আকাঙ্খা এতোই উন্মত্ত ছিল যে আস্তিক-নাস্তিক ঝগড়া সহজেই ইসলামের আখেরি নবীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চর্চার নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কারণ এই রাজনীতির অনুমান হচ্ছে লাখ দুয়েক রাজাকার ও রাজাকারের সহযোগী বলে যাদের ট্যাগ লাগানো হবে তাদের সবাইকে নির্মূল করে দিলে “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতিকে একচ্ছত্র করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয় নিশ্চিত করা যাবে। এই নির্মূল পরিকল্পনা আক্ষরিক অর্থেই এক ক্লিনজিং অপারেশানের মতো, এই ধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক ভাবে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবার এটাই উপযুক্ত পথ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রেখে এই যুদ্ধ চালাবার এটাই মোক্ষম সময়। দ্বিতীয় পজন্মের মুক্তিযুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এভাবেই বিশুদ্ধ এক বাঙালির বাংলাদেশ কায়েম করতে হবে। আরেকবার রক্তে স্নান করে একাত্তরের যুদ্ধের দায় মুক্তি ঘটবে।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশলের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি
কিন্তু হাসিনার এই নতুন যুদ্ধবাজ রাজনীতির বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা আছে।

১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বড় জোর একটা ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার হতে পারে। এটাকে ওয়ার অন টেরর বা পশ্চিমের চোখে সন্ত্রাস দমনের কাজ হিসাবে কতটুকু হাজির করা সম্ভব যাতে পশ্চিমারা আগ্রহী হবেন?

২. জামাত একটা সংবিধান মেনে চলা দল, যারা কনস্টিটিউশনাল রাজনীতি করে। পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা মানে এবং সেখানে অংশ গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য তা বিশ্বাসও করে। এমন একটি লিবারাল নির্বাচনমুখী ইসলামী দলকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাস্তবেও এটা সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন তৈরির দল। বাংলাদেশের শ্রেণি-গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশেরই আশা আকাঙ্খার দল। শেখ হাসিনা একে একটা ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসাবে হাজির করবেন কি করে? জামাত যতটুকু ত্রাস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তা অন্য দুই প্রধান পার্লামেন্টারী দল আওয়ামী বা বিএনপির চাপাতি, পিস্তল বা কাটা রাইফেলের ত্রাস সৃষ্টি করতে পারার মতই। কিন্তু একটা পার্লামেন্টারী রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী দল বলে হাজির করতে গেলে অন্ততপক্ষে তাকে নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠন বলে হাজির করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। যে দল ভোট চাইতে জনগণের কাছে যায় তাকে একটা গোপন, সহিংস বা সশস্ত্র দল হিসাবে দেশে বিদেশে চেনানো কঠিন।

৩. বাংলাদেশে জামাতই একমাত্র ইসলামী দল নয় বা ইসলামী রাজনীতির একমাত্র প্রকাশ নয়। যারা আফগানিস্তান ফিরে এসেছে তারা কেউ জামাতের রাজনীতি করে না, কখনও করে নাই। বরং তারা আওয়ামী লীগ করে এমন নজিরই বরং আছে। আবার মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নয়। কিম্বা ইসলামি বিপ্লবও নয়। জামাতে ইসলামি ক্যাডার ভিত্তিক রেজিমেন্টেড সৎ চরিত্রের মানুষ গড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল। এই দিক থেকে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল ‘সুশীল’দের রাজনীতির। যারা জামাতে ইসলামির মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক চায়। মওলানা মওদুদি মনে করতেন ঈমানের দুর্বলতার জন্য রাষ্ট্রের সদর্থক উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায় । তার মানে আল্লাভীরু সৎ চরিত্রের লোকের রাষ্ট্রনায়কী নেতৃত্বের অভাবে। সমস্যাটা নৈতিকতার। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে তার চিন্তায় মধ্যে বিপুল ওসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতা আছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হচ্ছে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বহুদিক ইসলামী ঈমান আকিদা ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা করলেও শেষমেষ ‘আধুনিক রাষ্ট্রই কায়েম করতে চেয়েছেন। অথচ ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র কায়েম আদৌ ইসলামের লক্ষ্য হতে পারে কিনা সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিশাবে হাজির হয়েছে।

অন্যদিকে ‘৭২ সালের পর থেকে মওলানা মওদুদির নিজের চিন্তার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের পুরানা রাজনীতিতে তিনিই আর থাকেননি। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাকি ৭ বছর তার কেটেছে সৌদি আরবে। ইরানী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশে ইসলামের রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক আঁচ থেকে বাঁচানোর কাজটা সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। জামাতে ইসলামি সে কারনে সোদি রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণহয়ে ওঠে । সুন্নি বাংলাদেশে সৌদি রাজতন্ত্রকে সেই সার্ভিস আন্তরিকতার সঙ্গেই জামাত দিয়েছে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। মোগল আমল থেকেই সামাজিক সৌজন্য আকারে আমরা বিদায় বেলায় “খোদা হাফেজ” বলতে অভ্যস্ত। আমাদের বয়স্ক প্রজন্ম এখনও তাই বলেন। কিন্তু এখন এটা “আল্লাহ হাফেজ” হয়ে গেছে। কখন থেকে কিভাবে এটা ঘটে গেছে কেউ টের পাইনি।

কোন ধরণের রেডিক্যাল ইসলামী রাজনীতি জামাতের লক্ষ্য নয় সেটা ১৯৭৯ সালের পরের সময়কালে জামাতের ভুমিকা আরও সাক্ষ্য দেয়। রাজনৈতিক দল হিশাবে জামাতে ইসলামি কখনই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন ক্ষেত্রেই জালিমের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু ভূমিকার চর্চা করে নি, বরং সবসময়ই নিজের ভাবমূর্তি এভাবেই তৈরী করেছে যে কোন প্রকার বিপ্লবী ইসলামী রাজনীতি তার স্বার্থের বিরোধী। ইরানী বিপ্লব থেকে কেউ যেন কোন ইতিবাচক পাঠ না নেয় জামাত সেই কাজটাই সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিক ভাবে করে গিয়েছে। ইসলামী রাজনীতির পরিমণ্ডলে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামির সখ্যতা গভীর। এককথায় বললে বলতে হয় ইসলামের নামে কোন রাডিক্যাল রাজনীতি যেন বাংলাদেশে জেগে না ওঠে ও দানা বাঁধতে না পারে পাশ্চাত্যের পক্ষে জামাতে ইসলামি তারই খেদমতগারি করে গিয়েছে। এই ধরণের মিত্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের চোখে শত্রু প্রমাণ করা শেখ হসিনার জন্য কঠিন একটি কাজ।

টাইম বাউন্ডিং দুর্বলতা বা গ্লোবাল যুদ্ধ কৌশলে বদল
উপরে শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতির যেসব বড় দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বললাম সেগুলো স্থায়ী। কিন্তু আর এক বিশাল দুর্বলতার দিক আছে যাকে বলা যায় “টাইম বাউন্ডিং” বা সময় নির্ধারিত দুর্বলতা। মানে, কোন্‌ সময়ে তিনি তার রাজনীতিটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতিটার ২০০৭-৮ সালের আগে করতে সক্ষম হলে এক রকম হত, কিন্তু এর পরের যে কোন সময়ে করতে চাওয়াটা এক বিরাট বাধা। কেন? মুল কারণ ২০০৮ সালের পর খোদ আমেরিকাই আর বুশের নীতিতে থাকেনি। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট যুদ্ধনীতি বদলে ফেলেছে। এটা ২০০৮ সালে বুশের বদলে ওবামা জিতেছে বলে নয়। বুশের সম্মুখ সমরে ইসলাম মোকাবিলার নীতি তার ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরে নিজস্ব মুল্যায়ন রিপোর্টে ঐ নীতি অকেজো প্রমাণিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষের নাম লক্ষণ নাই বরং তা আফগানিস্তান বা ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর সবকিছুর উপরে যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের উপরে দাঁড়ানো বলে পরিণতিতে এটা একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা (২০০৭-৮) হিসাবে হাজির হয়।

এর ফলে বুশের সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে অল-রাউন্ড যুদ্ধ মোড় বদলাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধকৌশল মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক খুজে বের করার দিকে ধাবিত হয়, যার বাইরের নাম আরব স্প্রিং। ব্যাড মুসলিম আর গুড মুসলিমের ভাগাভাগি শুরু হয়। ওয়ার অন টেররের বাগাড়ম্বর স্তিমিত কিম্বা অবস্থা বিশেষে গায়েব হয়ে যায়। যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো আর বাড়ানো নয় বরং কত দ্রুত (২০১৪ সাল টার্গেট) সবগুলোকে গুটিয়ে নেয়া যায় – এটাই হয়ে যায় মার্কিন নীতি। কিন্তু হাসিনার স্থানীয় যুদ্ধকৌশল তো বুশের একরোখা ওয়ার অন টেররের উপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ইতমধ্যে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া হয়ে ওঠে ওবামা প্রশাসনের কাছে আগামি দিনের সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ আর সেকারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুকরাষ্ট্র কতোটা সমর্থন তা এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ওবামা আমলে আমেরিকার নতুন নীতি ও যুদ্ধকৌশলের সীমার ভিতরে হাসিনার নেয়া স্থানীয় ইসলাম নির্মূল কৌশল আনফিট ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ এই দিকটা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূল নীতির পালে হাওয়া লাগা অসম্ভব কিছু নয়। টাইম বাউন্ডিং বা সময় দ্বারা নির্ধারিত এই দুর্বলতার দিকটা বাদ রেখে হাসিনা তার দুর্বলতাগুলো কিভাবে কাটিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলোচনা এখন সেদিকে নেবো।

শেখহাসিনা-নির্মুল কমিটির পরিপূরক সম্পর্ক
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দুর্বলতাগুলো পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখেন শাহরিয়ার কবীর ও তার নির্মুলের রাজনীতি। এটাকে হাসিনার কৌশলের সাথে শাহরিয়ারের রাজনীতির পারফেক্ট ম্যাচ মেকিং বলা যায়। হাসিনার নতুন কৌশলটা শাহরিয়ার কবীরই সবচেয়ে পছন্দ করেছিলেন। সেই ২০০২ সাল থেকে নির্মুলের রাজনীতি প্রচার ও চর্চার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছিলেন তিনি। একাজে তিনি নতুন শত্রুর যে ভাগটা তৈরি করেন তা হলো, ব্রড হেডলাইনে ইসলাম আর তার প্রকাশ মানেই হলো জামাত। এভাবে তিনি কি করেছিলেন এবং কেন তা পেরেছিলেন এর তিনটা কারণ উল্লেখ করা যায়।

১. বাংলাদেশে আলকায়েদা বা তালেবানদের মত ইসলামী রাজনীতির সোল এজেন্ট, একমাত্র সম্ভাব্য দল হলো জামাত -এই মিথ্যা ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে তিনি একাজ করেছেন। এছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামাত মানেই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সকল ধারা ও প্রবণতার উৎপত্তি কারণ, উৎস ও প্রতীক। এভাবে বয়ান তৈরির সম্ভব হয়েছিল কারণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তো বটেই কমিউনিস্টরাও দুনিয়ায় বা বাংলাদেশের ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে কোনটার সাথে কোনটার মৌলিক রাজনৈতিক তফাত কি, কোন ইস্যুতে তাদের পার্থক্য, কোথায় তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক — এইসবের কোন খবর জানে না, রাখার দরকারও মনে করে না। বরং মনে করে মানুষের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ হলো ধর্ম, মানে ইসলাম। ফলে ধর্ম উৎখাত তাদের বিশাল রাজনৈতিক কর্তব্য। এই পরিস্থিতি শাহরিয়ারকে তার বয়ান তৈরি করতে সহায়তা করেছে।

২. ১৯৭১ সালে জামাতের রাজনীতি আর একালের তালেবান রাজনীতির কোন মিল থাকুক আর নাই থাকুক জামাতের ৭১ সালের ভুমিকাই হোল অকাট্য প্রমাণ যে জামাত তালেবানের মত একটা “সন্ত্রাসী” দল। জামাতের ৭১ এর ভুমিকা নিয়ে জনগনের মনে যে সেন্টিমেন্ট আছে তা কচলে ব্যবহার করে সাধারণভাবে সব ইসলামী রাজনীতিকে দানব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এই জবরদস্তি শাহরিয়ারের দরকার ।

৩. আফগান ফেরতদের দলগুলোর নানান তৎপরতা এবং জেএমবির স্বল্পকালীন উত্থান (২০০৫) এই ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবীরদের দারুণ কাজে লেগেছিল। শহুরে মধ্যবিত্তকে জঙ্গী ইসলামের নিশ্চিত আবির্ভাব সম্পরক্কে ভীত ও আতংকিত করা গেছে। জেএমবির উত্থান রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে অন্ধ অবস্থা তৈরী করেছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছিলে নির্মূলের রাজনীতি। জামাতের রাজনীতির সাথে জেএমবির রাজনীতির কোনই মিল নাই। কিন্তু মিল না থাকলেও মধ্যবিত্ত, সেকুলার,কমিউনিস্ট আর মিডিয়ার চোখে এদের জামাতি বলে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ঘটলো যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটা আর ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার থাকল না। বিচারের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকল না। বয়ানের পাটাতন একেবারে বদলে গিয়ে হয়ে দাড়ালো, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে সবকিছুরই নির্মুল, বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে ঝেড়ে মুঝে সাফ করে ফেলা। একাকার করা এই বয়ানে এক দড়িতে ফাঁসি হয়ে গেল “বিচার” আর ইসলামের।

এতে দ্বিতীয় আরেক বিপদ তৈরি হলো। ধরা যাক ঠিক বিচার নয়, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ আছে সেগুলোকেই মোকাবিলা করতে চান শাহরিয়ার ও তার নির্মুল কমিটি। তাতে একটু না হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার কথাটা ঢাল হিসাবেই ব্যবহারই তিনি করেছেন। এভাবেই যদি ধরি তো সেক্ষেত্রেও যে প্রশ্ন আমাদের ছাড়ে না তা হলো,ইসলাম নামে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশগুলোর মোকাবিলা কি নির্মূল বা ইসলাম ক্লিনজিং করে করা যায়, নাকি সম্ভব? অর্থাৎ কাজটা কি নির্মুল বা ক্লিনজিং -এর? যার যার মাথায় ইসলামী চিন্তা আছে এমন লোকদের এক এক করে ধরে মাথা কেটে ফেলার ব্যাপার ? মোটেই না। চিন্তার মোকাবিলা একমাত্র আরো অগ্রসর চিন্তা দিয়েই করা সম্ভব। নইলে তার পরাস্ত হবার কোন সম্ভবনাই নাই। । অর্থাৎ চিন্তা বা ভাবাদর্শগত ভাবে পরাস্ত করা এবং সেভাবে পরাস্ত করবার রাজনীতির মানে আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করা নয়। ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়া মানে মানুষের পুনর্গঠন আর পুনর্গঠিত সেই নারী ও পুরুষের নতুন সম্পর্ক রচনা — দুনিয়া থেকে পুরুষ নির্মূলের কর্মসুচী নয়। মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব সংঘাত শ্রেণীযুদ্ধ বটে কিন্তু কোনভাবেই এটা সমাজের মালিক অথবা শ্রমিক কাউকেই ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। বরং এটা সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্গঠনের যাতে সমাজে একদিকে পুঁজিপতি আর অন্যদিকে শ্রমিক উৎপাদন করতে না পারে। অর্থাৎ সামাজিক মানুষ যেন দুই বিবাদমান শ্রেণি হয়ে উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত না হয়, ইত্যাদি।

ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে অনেকের মনে হতে পারে বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষমতার জন্ম দিতে গেলে একটা যুদ্ধ তো হবেই, সেটা কি? সেটা আর যাই হোক কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং অপারেশান নয়। বিদ্যমান ক্ষমতাকে পরাস্ত করে নতুন ক্ষমতা কায়েমের জন্য যতোটুকু বলপ্রয়োগ লাগে ততোটুকুই। বৈপ্লবিক রূপান্তরে প্রাণের ক্ষয় ঘটে ঠিক, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়, নতুন ক্ষমতার জন্ম দেওয়া এবং নতুন আইন ও নীতিনৈতিকতার জন্ম দিয়ে নিজের নতুন ক্ষমতার বৈধতা ও ন্যায্যতা প্রমান করা। নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা যেন নতুন মানুষ তৈরী হতে পারে। কোনভাবেই সেটা ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। । এমন বাসনা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা কেউ একা বা দলবদ্ধভাবে তৈরি করা নয়। সমাজের সংস্কার বা বিপ্লব প্রতিহিংসার চর্চা হতে পারে না। জিঘাংসার আকাঙ্খা যে উন্মাদনা তৈরি করে বাস্তবে একা বা গোষ্ঠিসহ কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং করা মানেই হলো আরেকটি যুদ্ধাপরাধ ঘটানো।

সমাজে চিন্তা ও ভাবাদর্শগত লড়াইকে খুনোখুনি করে সস্তায় সেরে ফেলতে চেয়েছেন শাহরিয়ার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে হাসিনা আর নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার, মুনতাসির ইত্যাদিরা মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে গেছেন আর সমর্থকদের মনে সফল ভাবে ঢুকিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর ক্লিনজিং-এর আকাঙ্খা। নির্মূল বাসনার এক অসুস্থ উন্মত্ততা।

শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ারের এই যৌথ প্রকল্পের খবর অনেকেই রাখেননি। বলা বাহুল্য শেখ হাসিনার সাথে শাহরিয়ারের এই মহামিলন ও তাদের প্রজেক্টের অভিমুখ ও পরিণতি হলো হাসিনার কারজাই হওয়া। আর প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই এটা তালেবান রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা। ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে শাহরিয়ার আজীবন নির্মূলের মধ্যেই তার সমাধান দেখেছেন। তার সাফল্য হলো,এই উন্মাদনাকে তিনি বাংলাদেশের সমাজে একটা মানসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পেরেছেন। এখন বলে বুঝিয়ে এদের কাউকে বিরত করা যাবে মনে হয় না। কারণ এই উন্মাদনা চেপে বসেছে। তাদের অনুমানে দুলাখ ইসলামপন্থীদের নির্মূলের পথে নিয়া যাবার জন্য এরা তাদের মন ও সেকুলার জিঘাওংসাকে পুরাপুরি বেঁধে ফেলেছেন।

শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নির্মূল বাসনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটাচ্ছে সেটা বিচার করবার সাথে সাথে আমাদের কাছে একটা দিক পরিস্কার থাকতে হবে। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত একটি ইস্যু। বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ায় এর ফয়সালা না করলে নানান পেটি স্বার্থে এই জাতীয় ইস্যুটি সবসময় রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতেই থাকবে। যেমন শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর যেভাবে করছেন।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শাহরিয়ারের যুদ্ধ প্রস্তাব
তবু শেষ বিচারে হাসিনা আর শাহরিয়ারের রাজনৈতিক আকাঙ্খা কিন্তু এক নয়। শেখ হাসিনার আকাংখা ও পথ হোল যে-রাজনৈতিক লাইন বুকে ধরে তিনি গত দশ বছর এগিয়েছেন তা দিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার কাজে এই পথটাকে ব্যবহার করা। এই বিচারে শাহরিয়ার কিন্তু সৎ ও নির্মূলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর নিজের ভাষাতেও “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করতে চান। এজন্য তিনি VOA এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছে হস্তক্ষেপ সহায়তা চেয়েছেন। হাসিনা পশ্চিমের সমর্থনে একনিষ্ঠ “ওয়ার অন টেররের” একনিষ্ঠ খেদমতগার হয়ে বিনিময়ে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চান, নিজস্ব “স্বাধীনতার চেতনার” বাইরে থাকা বাকি সবাইকে মেরে কেটে সাফ করা যার লক্ষ্য, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আতাত ও আপোষ করতে বাধা নাই। । শাহরিয়ার চান একই “ওয়ার অন টেররের” খেদমতগার হওয়া, কিন্তু কোন আঁতাত বা আপোষ নয়। কারন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন তার উদ্দেশ্য নয়। বরং “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করবার কাজে একনিষ্ঠ থাকতে চান। এই কাজে তিনি শেখ হাসিনার ওপর পুরাপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। বরং সরাসরি আমেরিকার সমর্থন, লজিস্টিক , সৈন্য সব কিছুই চান। কোথায় তাদের মিল আর কোথায় পার্থক্য সেটা আমাদের বুঝতে হবে। একই সাথে শাহবাগের অংশ গ্রহণকারীরা যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে নিজেদের পৃথক দাবি করে, তারা শাহরিয়ারের নির্মূলের রাজনীতি ধারণ করে বলেই সে কথা বলে। ঠিক যে শাহবাগ শেখ হাসিনার আশু রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলিত থাকলেও শাহবাগের রাজনীতি শেখ হাসিনার রাজনীতি নয়। সেটা একান্তই শাহরিয়ার কবীরের নির্মূল বা ক্লিনজিং-এর রাজনীতি।

লক্ষ্য করার বিষয় ভয়েস অব আমেরিকার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার কিন্তু আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলছেন না। বলছেন ওয়ার অন টেররের খাঁটি লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন”। এটাই চান তিনি। বিষয়টা শাহরিয়ারের কাছে স্পষ্টতই এখন আর আদালত পাড়ার বিষয় নয়, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবার বিষোয়।। তাই তিনি প্রকাশ্যে সাক্ষ্যতকারে দাবি করছেন,“জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”। কিন্তু প্রশ্ন হোল এখন তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকারঙ্করে সবাইকে জানাচ্ছেন কেন? এতদিন আড়ালে যেভাবে চলছিল সেই পর্দা উঠিয়ে ফেলার কী দরকার ছিল।

কারণ শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ার – প্রতীকি নামের দুই রাজনৈতিক আকাঙ্খা হাত ধরাধরি করে চলতে থাকলেও তাদের উদ্দেশ্যে পার্থক্য ছিল। এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও এতদিন তাদের সহাবস্থানে অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এখন সেটা দিনকে দিন সেটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ারের নির্মূল ধারা মনে করছে হাসিনা যথেষ্ঠ কঠোর পথে যাচ্ছেন না। কি সেই কঠোর পথ? সুনির্দিষ্ট করে বললে, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে দানব হয়ে মাঠে নেমে পড়া, দাবড়ানো, খুনোখুনি। জিতি অথবা মরি জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে হাসিনা নির্বাহি ক্ষমতায় আছেন আর শাহরিয়ার আছেন একই নির্মূলের আদর্শে, চিন্তায় রাজনৈতিক লাইনে, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকার ঠেলা বা বিপদ শাহরিয়ারের বুঝের বাইরে। পোলাপান অনেক কিছুই আবদার করে। কিন্তু বাবাকে টাকা কামিয়ে, সেই কামানো অনুপাতে ব্যয় করতে হয়। তার পর আবদার কতক অংশ পুর্ণ করতে পারে কতক অংশ পারে না। পোলাপানের আবদারকে ভিত্তি মেনে বাবার চলা অসম্ভব। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার মানে ও পরিণতি কী সেটা না বুঝে শেখ হাসিনা পা ফেলতে পারেন না। বিশেষত সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার সায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আগে নিতে হবে। তা না নিয়ে লাঠি হাঁকাতে পারেন না তিনি। সন্ত্রাস দমন আইন দিয়ে ক্লিনজিংয়ে্র লাইনে ঝাপিয়ে পড়ার মানে শুধু পরিস্থিতি লেজে গোবরে করে ফেলা না, কিম্বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও না, বরং নিজের জান বাচানোও এতে সঙ্গীন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, লজিষ্টিক বা রসদের সরবরাহ পাওয়া না পাওয়ার কথা নাইবা তুললাম।

শেখ হাসিনাএখন একটা স্ববিরোধিতায় পড়েছেন। তিনি সচেতন ভাবে ক্লিনজিংয়ের ধারণা দিয়ে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠিকে তাতিয়েছেন। শুধু আওয়ামী পন্থী নয়, যারা আওয়ামী লীগ করে না সেকুলারিষ্ট, বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক, তরুণ ভোটার -ইত্যাদি সকলকে জিঘাংসার উন্মাদনায় শেখ হাসিনা উন্মত্ত করেছেন। তিনি এসব করেছেন এই উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ভাবে প্রবাহিত করে নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করার কাজে একে ব্যবহার করতে। অন্যদিকে শাহরিয়ার চাইছেন, উন্মাদনাকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মত্ত ব্যবহারে প্রয়োগ করতে, ক্লিনজিংয়ের কাজে লাগাতে। এজন্য তিনি পরিষ্কার করেই এখন বলছেন আদালতে কোন ‘বিচার’ এমনকি শাহবাগের মত ফাঁসিও না, একেবারে নির্মুল বা ক্লিনজিং করবার কাজ সম্পন্ন করতে চান তিনি। চান চিরতরে “জঙ্গি মৌলবাদ দমন”। একাজেই “আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”।

শাহরিয়ার কবীরের এই নির্মূল বাসনা আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যে তীব্র সংঘাত চলছে তার প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তাহ তিনেক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির এক টকশো তে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর প্রয়োগের পক্ষে আর বিপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুব। ওখানে মাহবুব বারবার আর্গু করছিলেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আর ব্যারিষ্টার আমিরুল ততই বারবার আর্গু করছিলেন সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ধরে নিতে পারি হাসিনা অন্তত বোঝেন “সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯” বাংলাদেশের হলেও আইনটা কার্যত আমেরিকার। আমেরিকার আগ্রহে ও ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি গাইড লাইন মেনে এটা তৈরি। এই আইন ব্যবহার করে নির্মুল বা ক্লিনজিং-এর পথে যেতে গেলে আমেরিকার আশির্বাদ লাগবে। কিন্তু শাহরিয়ার, মুনতাসির বা আমিরুল সেটা বেখবর। ফলে তারা বালখিল্য আচরণ করছেন। কান্নাকাটি করছেন, আমেরিকা কেন আফগানিস্তান বা ইরাকের মত বাংলাদেশেও একটা নতুন তালেবান মোকাবিলার ফ্রন্ট খুলছে না।

সন্ত্রাস দমন আইন এমন আইন যা কোথাও ব্যবহার করলে এর সব একটিভিটি রিপোর্ট আমেরিকাকে দিতে হয়। কেন? সেটা আমরা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ বুঝি সেই সহজ বোঝাবুঝি ছাড়াও আরও ভিন্ন দিক থেকে বোঝার ব্যাপার আছে। আমেরিকাকে না জানিয়ে হাসিনা যদি এই আইন একার বুদ্ধিতে ব্যবহার করে তবে সে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠবে। সেটা একটা তালেবান পরিস্থিতি তৈরি করবে, প্রথম চোটে যার অভিমুখ হবে এন্টি-আমেরিকান, বাংলাদেশের সব পশ্চিমা ইনষ্টলেশন এর টার্গেট হবে। অল-রাউন্ড একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট ওপেন করলে যেমন ঘটে। শুধু তাই নয়,এর উপচে পড়া প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশে না, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বার্মাসহ পুরা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের প্রতিদিনের আঞ্চলিক ঝগড়া দ্বন্দ্ব বিবাদ সবসময়ে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মায়ানমারে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিবাদ হিসাবে চলছে এগুলো সমন্বিত হবে আর তার নির্দিষ্ট অভিমুখ হবে পশ্চিমা-বিরোধী। স্থানীয় যে কোন বিরোধ এভাবে গ্লোবাল বিরোধ হয়ে হাজির হতে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য আত্মরক্ষামূলক ধরণের হলেও সেই সীমিত লক্ষ্যের নতুন ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতা তৈরি করে ফেলবে। ফলে সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ দেখতে বাংলাদেশের মনে হলেও এর প্রয়োগ ও পরিণতি শতভাগ আঞ্চলিক ও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। এদেশে যারা দুলাখ জামাত ও রাজাকারি ট্যাগ লাগানো লোক মেরে নির্মুলের মধ্যে ঘটনার সুখকর সমাপ্তি দেখছেন তাদের বেহুঁশ ও বালখিল্য বললে কম বলা হয়। আমেরিকার যুদ্ধ বালখিল্য ব্যাপার নয়। যদি তাই হোত তাহলে সারা দুনিয়ার উপর সাম্রাজ্যের ছড়ি ঘুরাতে পারত না। তাহলে কি শাহরিয়ারের লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন” কাজে আমেরিকাকে ডাকার চেষ্টাটা ভূয়া? এতে কিছু হবে না? কোন বিপদ নাই?

না ভূয়া বলছি না। বলতে পারলে ভাল লাগত। গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো,আওয়ামী লীগ, অ-আওয়ামী লীগার, সেকুলারিস্ট,বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক –সকলেই একপ্রকার জিঘাংসার উন্মাদনায় আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তাতানোর ফলাফল এটা। এটা পটেনশিয়াল ও খুবই বিপজ্জনক। যে কোন দিকে এর মোড় নেবার সম্ভাবনা আছে। হাসিনা একে তার নির্বাচনী বা ক্ষমতা লাভালাভের কাজের মধ্যে পরিণতি টানবার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। শাহবাগ নামে যা ফেটে বের হয়েছে। আবার শাহবাগের অনেকেই যেমন বলে শাহবাগের অভিমুখ একটা না, ভিতরে অনেক অভিমুখ আছে। এর ভিতরের একটা শক্ত অভিমুখকে চিনিয়ে দেই। যেমন ষ্টেজে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আছেন সবসময় ইমরানের পাশে। নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একই সাথে হাসিনা ও নির্মূল কমিটির প্রতীক। ওখানে যে আইকন বা ছবি তোলা হয়েছে সেটা “বঙ্গবন্ধুর” না, নির্মুল কমিটির জাহানারা ইমামের । বেঁচে থাকলে জাহানারা নির্মূলের রাজনীতি করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তার ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটির পটেনশিয়ালিটি নিশ্চয় নতুন করে বলবার কিছু নাই।

কোথায় নিয়ে যাবে এরা?
পটেনশিয়ালিটি – মানে কিছু ঘটিয়ে দেবার উন্মত্ততা। শেখ হাসিনা কিন্তু এখনো তৈরি হওয়া এই উন্মত্ততা দিয়ে কিছু ঘটিয়ে ফেলার পটেনশিয়াল নিস্তেজ করতে পারেন নি। ওদিকে শাহরিয়ার, মুনতাসির বা ব্যারিস্টার আমিরুলের নির্মুলের রাজনৈতিক আকাঙ্খা জীবিত আছে, সরব হচ্ছে। হাসিনার টালবাহানা দেখে শাহরিয়ার সরাসরি আমেরিকার কাছে আহ্বান নিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে নির্মুল কমিটির ধারাটাই উন্মত্ততার উপযুক্ত ও কার্যকর ক্যারিয়ার হতে পারে। এই হোল পটেনশিয়াল বিপদ তৈরি হয়ে থাকার দিক। ওদিকে আমেরিকাও বাংলাদেশে কোন নতুন ফ্রন্ট খোলার কোন তাগিদ দেখাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও অর্থ খরচের সামর্থ হারাচ্ছে তারা। অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উন্মত্ততার লাইন প্রথম ঝাপ্টায় ইতোমধ্যে দেড়শ লোক মেরে ফেলেছে, কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। প্রথম দফার রক্তারক্তির পর উভয় পক্ষই সমাজকে স্ব স্ব পক্ষে নতুন শক্তি ও শ্রেণি বিন্যাস তৈরির জন্য সময় নিচ্ছে। কোন পক্ষই টোন ডাউন করবে এমন বাস্তবতা নাই। কিছু ঘটাবার সক্ষমতা উভয় পক্ষেই আছে। এটাই অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা আর অনিচ্ছুক আমেরিকাকে যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতায় টেনে নিতে পারে। একটা লোকাল ঘটনা রিজিওনাল ও গ্লোবাল হয়ে উঠতে পারে। এর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাকে কিছু তো করতে হবে, অন্তত আত্মরক্ষামূলক। লিবিয়ার “আরব স্প্রিং” উন্মাদনার এত বড় ঘটনায় খরচের কথা চিন্তা করে আমেরিকা কোন মেরিন পাঠানোর পথে যায় নাই। এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু গাদ্দাফি উত্তরকালে নিজের রাষ্ট্রদুত খুন হবার পর কিন্তু সে মেরিন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সোজা মানে হলো, মেরিন পাঠানোর অবস্থা তার এখনও নাই বললে চলে, একান্ত বাধ্য হয়ে না গেলে। খরচ সামলানো মুশকিল। এখন কম খরচে ন্যূনতম কিছু করতে হলে সেটা হবে ড্রোন হামলা।

এসব বিবেচনায় করেই প্রতীকি ভাবে ড্রোনের কথা এসেছে। কিন্তু মুল বিষয় হলো, যে পটেনশিয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে তা যে কোন দিকে মোড় নেবার ঝুঁকি রাখে। উন্মত্ততা নিস্তেজ করবে কে, কি দিয়ে এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে না। এখন এই সম্ভাবনা আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

 

[এই লেখাটির একটি প্রাথমিক খসড়া সর্বপ্রথম তোলা হয়েছিল গত ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ফেসবুকে নোট আকারে। শিরোনাম ছিল, ‘শাহরিয়ার ও শাহবাগ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে’সেই লেখাটি এক সম্পাদিত রূপ এরপর ছাপা হয়েছিল চিন্তা নামের ওয়েব পত্রিকায়।  চিন্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল দুদিন পড়ে  ২৪ মার্চ ২০১৩ সালে। এখানে চিন্তা পত্রিকার ভার্সানটাই আবার এখানে হুবহু তুলে আনা হল, সংরক্ষণের জন্য।]

 

 

বাংলাদেশে ‘ভারতের সমর্থনের সরকারও’ কাজ করছে না

বাংলাদেশে ভারতের সমর্থনের সরকারও কাজ করছে না

গৌতম দাস

১৮ এপ্রিল ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2eC

 

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষ হবার পর সপ্তাহ পার হতে চলছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা এখন শেষ হয়েছে ধরে নেয়া যায়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকেই সবচেয়ে বড় সমালোচনার আসর ছিল বলা যায়। যেকোনো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর সফরকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সম্মেলনের আবহাওয়ায় নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে ঘিরে সাধারণত প্রচুর জল্পনাকল্পনা হয়ে থাকে। আর তাতে উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যুর সম্ভাব্য অর্থ তাৎপর্য কী তা নিয়ে মিডিয়ায় বিভিন্ন বয়ান ব্যাখ্যা শুরু হওয়া সাধারণ ঘটনা। কিন্তু শেখ হাসিনার সফরকে ঘিরে সেসব বিবেচনায় যত আলাপ-আলোচনা উঠে থাকুক না কেন তা যথেষ্ট ছিল না। যেমন তিস্তার পানি ইস্যুতে আমরা মিডিয়াতে বিস্তর আলোচনা হতে দেখছি যে – কেন পানি দিচ্ছে না, কী সমস্যা, কী হলে দিতে পারে, কবে দিতে পারে, আদৌ দিবে কি না, অথবা কী হলে সমস্যার হাল হতে পারে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই আলোচনায় উঠে এসেছে। এরপরও নির্দ্বিধায় বলা যায় তবু মূল একটা বিষয় কোথাও আসেনি। কী সেটা? না, শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সবচেয়ে বড় সমর্থন জুগিয়ে চলেছে ভারত, বলা যায় এই সমর্থন সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। বাস্তবতা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে কম বেশি সব পক্ষই তা স্বীকার করেন। “ভারতের সমর্থনের সরকার” – ভারতের দিক থেকে দেখলে এটাই কী সবচেয়ে বড় কিছু দিয়ে দেয়া নয়? তাহলে এরপরে আরও কিছু কেন দিবার কথা ভাববে?
ব্ব্র

ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে দেখলে, এই সমর্থনকে তারা এক বিরাট দান বলে গণ্য করে। ভারতের এই দানের অনুভব এটা কেউ আমল করেনি। আর এই দান তারা বাংলাদেশকে দিলো, নাকি তাদের পছন্দের ব্যক্তি বা দলকে দিলো সবই তাদের কাছে সমান। কিছু আসে যায় না। যদিও এর ফারাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশাল হয়ত। কিন্তু ভারত গণ্য করবে দুই ক্ষেত্রেই তারা বাংলাদেশকে বিশাল কিছু দিয়েছে। আর ঠিক সে কারণেই আমরা আর যা কিছু ভারত থেকে আশা করছি তা তাদের চোখে বিবেচনায় আরো অতিরিক্ত, বাড়তি। এ কারণেই সব সময়ই ভারতের মনে প্রশ্ন উঠে কোনো বাড়তি বা অতিরিক্তগুলো সে আর কেন দেবে? বিনা নির্বাচনে একটা সরকার বসিয়ে দেয়া বা তাতে ভারতের সমর্থন দেয়া – এর একটা বড় রকমের মূল্য যে আছে সেটা ভারতকে বুঝিয়ে বলার কিছু নাই। ভারত এটা না বুঝার কথা নয়।

হাসিনার ভারত সফরকে নিয়ে বিস্তর দিকে আলোচনা উঠেছে কিন্তু ভারতের এই দৃষ্টিকোণটা সব আলোচনাতেই অনুপস্থিত। অথচ এটাই ভারতের মুখ্য দৃষ্টিভঙ্গি।
তিস্তায় বা অন্য কোনো যৌথ নদীর বেলায় পানি, এটা তো বাড়তি; এই পানি ভারত কেন দিবে? অথবা ট্রানজিটের মূল্য কেন দেবে, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার করতে পারবে না কেন, সীমান্তে লোক মারা বন্ধ করা ইত্যাদি। আগেই তো সরকারে সমর্থন দিয়ে রেখেছে! এক কথায় বললে সমর্থন দিয়ে সরকার ক্ষমতায় রাখার মূল্য এতই অমূল্য বা তা সীমাহীন হওয়ারই কথা। ফলে সেই অমূল্যদানের পরে এরপর আবার বাংলাদেশের আর কোনো মূল্য চাওয়ার আছে এটা তারা গণ্য করতে রাজি না হওয়ারই কথা। সরকার বসিয়ে দেওয়ার পর সেই সরকারের আর কতটা বারগেন-দড়কষাকষির অবস্থা অবশিষ্ট থাকে! বাকী সব ডিমান্ড সেকেন্ডারী গুরুত্বের হয়ে যায়।
তিস্তার কথাই ধরা যাক, সবশেষ ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা ইস্যু প্রসঙ্গ সবচেয়ে জীবন্ত ছিল। ভারত তখ্নও পানি দিতে পারেনি বা চায়নি। কেবল নাম-কা ওয়াস্তে একটা চুক্তি করে রাখতে চেয়েছিল। বড় জোর যেমন গঙ্গাপানি চুক্তি। চুক্তির সাথে বাস্তবে পানি প্রাপ্যতার সম্পর্কিত নয়। সেবার তিস্তার বেলায় সেটাও হয় নাই।  এরপর থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে হাসিনার দিক থেকে ভারতের সমর্থন পাওয়া স্বভাবতই এতই গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক ছিল যে ওই নির্বাচনের দুই বছর আগে এবং পরে নির্বাচনের একই  সাথে তিস্তা প্রসঙ্গ তোলা হত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই তোলার বিষয়টা গুরুত্ওব যোগাড় করতে পারে নাই। নির্বাচনে সমর্থন পাওয়া ব্যাপারটা যতই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে অন্য যেকোনো ইস্যু তুলনায় ততই গুরুত্বহীন হবে, তোলা হবে না এটাই তো স্বাভাবিক; বাংলাদেশ ততই ‘লেস ডিমান্ডিং’ হবে। বাংলাদেশের এই দুর্বলতার দিকটা ভারতীয় কূটনীতিকদের টের না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই ঠিক এর পাল্লা দিয়ে যেন ভারতের অবস্থা হয়েছে তাদের স্তবার্তথের ইস্যুতে  ‘এন্ডলেস ডিমান্ডিং’।
সরকারে রাখার সমর্থনের ‘বিনিময় মূল্যও’ দাবি হয়ে পড়েছে অফুরন্ত। আবার ২০১৭ সালের হাসিনার ভারত সফর, এখানেও তিস্তা গত ছয় বছরের মতোই কোনো ইস্যু ছিল না, হতে পারেনি। কারণ এবার হাসিনার কাছে এর চেয়ে অনেক অনেক উঁচু প্রায়োরিটির একনম্বর ইস্যু ছিল ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’। অর্থাৎ ডিফেন্স প্যাক্ট না করে আপাতত শুধু একটা এমওইউর মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রেখে যদি ফিরতে পারেন, এটাই হবে তাঁর বিরাট অর্জন। রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলী একবার স্পষ্ট এই ভাষাতেই কথাটা বলে ফেলেছিলেন।

ভারতের সাথে চীনের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধ আছে, থাকাই স্বাভাবিক। সব রাষ্ট্রের সাথেই যেমন সবার থাকে। আর মূলত যে কারণে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র বলে নিজেকে গণ্য রাখে, টিকিয়ে রাখে মিলে যায় না। যেকোনো বড় দুই ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রেরও স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্ট আলাদাই হয়, সঙ্ঘাতমুখর হতে পারে। আবার সব রাষ্ট্র একই কূটনৈতিক পথে নিজের স্বার্থবিরোধ নিয়ে লড়ে আর, আদায় ও মোকাবেলা করে না। নানান কায়দা সেখানে থাকে, নরম-গরম, গিভ অ্যান্ড টেক, কোনো ইস্যুতে নরম হলেও আবার একই সময়ে আর এক ইস্যুতে গরম ইত্যাদি সব কিছুর মিশাল, এটাই এই শতকের কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু শুধু এই স্বাভাবিক বিষয়টাই ভারত-বাংলাদেশ এখানে কার্যকর নয়। কিছু সীমিত কার্যকর দিক থাকলেও তা মুখ্য নয়।  এখানে ব্যতিক্রম বা বাড়তি বিষয়টা হল, ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গি যে, ‘বাংলাদেশ’ সেটা তো আমাদেরই সরকার। তাই ভারতের দাবি ও আকাঙ্খা হল, তাহলে চীন-ভারত স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ যেসব জায়গায় সঙ্ঘাতপূর্ণ সেখানে বাংলাদেশ মানে হাসিনা সরকার নিজের সব কিছু ভুলে ভারতের স্বার্থে অবস্থান নেবে না কেন?  বাংলাদেশে যেকোন অবকাঠামো প্রজেক্ট থেকে চীনকে বাংলাদেশ দূরে রাখুক – এটা ভারতের কাম্য।  ভারতের সব ডিম্যান্ডের-আর্গুমেন্ট, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আকাঙ্খা এখান থেকেই। এটাকে বলা যায় হাসিনা ভারতের ‘দাবির জবরদস্তির’ ভেতর পড়ে গেছে। কারণ ভারত এমন পেতে পেতে এভাবে নিতে ও পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেন এমন হলো?
একটা উদাহরণ নেয়া যাক। ডিপ সি পোর্ট বা গভীর সমুদ্রবন্দর। কক্সবাজারের  সোনাদিয়ায় টেকনিক্যাল স্টাডি করে লোকেশন পছন্দ করা, ফিজিবিলিটি ভায়াবিলিটি নিরীক্ষা সব শেষ হওয়ার পরও ২০০৯ সালে এই সরকার আসার পর ঐ প্রজেক্ট ঠেলতে ঠেলতে এখন সোনাদিয়া একেবারেই বাদ করে দেয়া হয়েছে। আবার ভারত এর বদলে পোর্ট অন্য কোথাও  কিছুই না করার পক্ষে ছিল। কিন্তু শেষে ‘পায়রায়’ বিকল্প বন্দর পছন্দ করেছে। যেন এটা খামখিয়ালের বিষয়। আর তবুও এই প্রজেক্টে ভারতকে অযাচিত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অযাচিত এই অর্থে যে অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকা সত্ত্বেও ভারতকে ছোট অনুসঙ্গী করে প্রজেক্টে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবু প্রজেক্টে মূল পোর্ট গড়ার কাজ চীনকে দিতেই হয়েছে। কারণ অন্য কারও কোন অর্থ বিনিয়োগের সংস্থান মুরোদ নেই, কেবল ভারতের ইচ্ছাকে জায়গা দেয়া এটা বাংলাদেশ দিতে চাইলেও তো দিতে পারা সম্ভব নয়, সম্ভব নয়। মূল প্রশ্ন বিনিয়োগ কে দেবে? আর এই মারাত্মক কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পিপিপি বা ব্যক্তি উদ্যোগ ঢুকানো হয়েছে। অবকাঠামো প্রকল্প আর বাণিজ্যিক প্রকল্পের ফারাক আর বজায় রাখা হয়নি। যেন যমুনা সেতু নামমাত্র সুদের অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে করে বাংলাদেশ ভুল করেছে। এতে ট্রাকপিছু এর টোল এখনো এক হাজার টাকা। এর বদলে ওই সেতু যদি (২-৬% সুদের) বাণিজ্যিক প্রকল্প অথবা পিপিপি করতাম তাহলে টোল পড়ত ট্রাকপিছু তিন হাজার টাকা, এটাই ভালো হত। তাই কী? এমন এক বেলজিয়াম কোম্পানিকে ঢুকানো হয়েছে মূল চ্যানেল খননের কাজে। আর পুরো প্রজেক্টটাই জি-টু-জি তে চীনকে। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশ থেকে টেন্ডার আহ্বান উঠে গেছে। যদিও এখনো বিনা সিক্রি টকশোতে বলে বেড়াচ্ছেন মূল প্রজেক্ট নাকি চীনকে না, ডাচদেরকে দেয়া হয়েছে।
আচ্ছা সোনাদিয়ায় ভারতের আপত্তির মূল বক্তব্য কী? ভারতের বক্তব্যকে কোনো যুক্তি হিসেবে মেনে নেয়া মুশকিল। ভারতের একটা সুপ্ত স্বপ্ন-আকাঙ্খা আছে, তা হলো চীন বাংলাদেশে কিছুই করতে পারবে না। মুরোদের খবরহীন ফালতু এসব স্বপ্ন নিয়ে কথা বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। ওবামার আমেরিকার একটা লক্ষ্য ছিল চীন ঠেকানো; চায়না কনটেইনমেন্ট। বুশ ও ওবামার আমেরিকা এটা ভারতকে সামনে রেখে ভারতকে দিয়ে যতদূর সম্ভব করাতে চাইত। ট্রাম্পের আমলেও ‘চীন ঠেকানো’ এখনও ট্রাম্পের আমেরিকার এজেন্ডা কিনা এখনও আমরা এর রিনিউয়াল কিছুই শুনিনি। কিন্তু ভারত তার পুরনো অবস্থানেই আছে, ‘চীন নাকি ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলল’, আমেরিকার এই শিখানো বুলি সে কপচে চলছে।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর একটা বাণিজ্যিক প্রজেক্ট। কোনো ডিপ সি পোর্ট প্রজেক্ট যেটা নাকি আসলে ছুপা  স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হয়েছে বা হতে পারে এটা শোনা যায়নি। এর কারণ মূল প্রজেক্টটাই কমপক্ষে চার বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি একমাত্র এটা বাণিজ্যিক হলেই এই বিনিয়োগ ঋণের বোঝার দায় নিতে সে সক্ষম। কারণ স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হলে ওর বাণিজ্যিক রিটার্ন নেই। সারকথায় বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো প্রজেক্ট মানেই তা অবশ্যই বাণিজ্যিক  প্রজেক্ট হতে হবে। নইলে ঋণ শোধ করতে পারবে না। তাই  নিঃসন্দেহে সোনাদিয়া আসলেই ছিল এক বাণিজ্যিক প্রজেক্ট এবং বাংলাদেশকেও নিজে থেকেই যেটা নিশ্চিত করতে হবে –  চীনের সাথে কথা বলতে হতে পারে যে এটা মাত্র বাণিজ্যিক প্রজেক্টই হবে। এ জন্য যে এই বন্দর ব্যবহার করে চীনের সাউথ-ইস্ট, ভারতের নর্থ-ইস্ট এবং বার্মা সবাই মূলত নিজের নিজের ল্যান্ডলকড অঞ্চল বা এলাকাগুলোকে সমুদ্র যোগাযোগের আওতায় নাগালে আনবে। এটাই সবার মুখ্য আর বার্ণিং স্বার্থ। ফলে এর যেন শুধু বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় এটা বাংলাদেশ নিজেই দায়িত্ব ও লিড নিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে ও চায়। ভারত এটাই বাংলাদেশের কাছে আশা করতে পারত। আর চীনের এতে আপত্তিরও কোনো কারণ থাকত না। নিজের ল্যান্ডলকড দশা ছুটানোটাই চীনের বিরাট ও মূল স্বার্থ। বাংলাদেশের গভীর স্বার্থ হল, এটা যদি ব্যবহারকারীদের সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ শক্তভাবে রক্ষা করা যায় তবে সবার ব্যবহারে ব্যবহারকারী বেশি হওয়ায় পোর্টের বিনিয়োগ খরচ তুলে আনা সহজ ও দ্রুত সম্ভব। কিন্তু ভারত সে পথে না গিয়ে আমাদের সরকারের ওপর আবদারের চাপ তৈরি করে সোনাদিয়া বন্ধ করে দিল। যদিও অন্য কোন ডিপ সি পোর্ট না করার পক্ষে থেকে চুপ থাকতে পারেনি। সরকারের ওপর চাপ দিয়ে পায়রাতে রাজি করিয়েছে। কিন্তু কেন? এতে ভারতের কী লাভ হয়েছে? একমাত্র ঈর্ষা হাসিল করা ছাড়া? আচ্ছা চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক সামরিক প্রভাবও বাড়বেই। সেটাকে   ঠেকানো – ভারতের এই চিন্তা বড় জোর এক খড়কুটো নয় কী? আর এটা কি সেই পথ?  আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারতের সেই মুরোদ কৈ? আর বাংলাদেশ সেটা ভারতের ইচ্ছায় কেন ঠেকাবে? বাংলাদেশের কী লাভ হয়েছে এতে? ভারতেরই যেখানে মুরোদ নাই সেখানে বাংলাদেশের মুরোদ কোথায়? উলটা বাংলাদেশের বৈষয়িক সুবিধা আছে এখানে।  হাসিনা সরকারকে কেন, ভারতের যেকোনো বসানো সরকারকে তারা নিজের ব্যক্তিগত গোলাম বানিয়ে রেখেও তো বাংলাদেশের কোনো ডিপ সি পোর্টের চাহিদা ঠেকানো সম্ভব নয়। এটা অবজেকটিভিটি, এক বাস্তবতা।
কিন্তু পায়রাতে সরিয়ে নেওয়াতে এখন ফলাফল কী হয়েছে? ভারতকে বাংলাদেশে চীনের সংশ্লিষ্টতাতেই একটা ডিপ সি পোর্ট তৈরি মানতেই হয়েছে। কিন্তু লোকেশন বদলে ভারতের কী লাভ হয়েছে? আমাদের অর্জন কী? সর্বশেষটা শোনা যাক। পায়রায় লোকেশন পছন্দ-পরিকল্পনার ভিতরে শুরু থেকেই ড্রাফটের সমস্যা ছিলই। ড্রাফট মানে গভীরতা বা নাব্যতার সমস্যা ছিল। তাই শুরু থেকেই নাব্প্রযতা ধরে রাখতে প্রবেশমুখ ও আশপাশের ১০-১৫ কিমি নিয়মিত ড্রেজিং করে যাওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়েছিল।  এটাই সে পরিকল্পনাতে ত্রুটির  প্রমাণ। এরপরেও এর ড্রাফট সোনাদিয়ার সমপর্যায়ের লেভেলে পৌঁছাবে না, সমান হবে না এটা সবাই জানত। এখন সেই দায়ভার আগেই ঝেড়ে ফেলতে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলে বসেছেন, ‘পায়রা বন্দরের স্থান নির্বাচন সঠিক হয় নাই’, গত ১০ এপ্রিলের দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বরাতে আমরা এ কথা জানছি। এখন একনম্বর প্রশ্ন হল, তাহলে সোনাদিয়া বাদ দেয়া আর পায়রায় নতুন স্থান নির্বাচন  কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছিল? বাণিজ্যিক ঋণ নিয়ে বড় অবকাঠামো প্রজেক্টে এসব খামখেয়ালিপনা করা হচ্ছে কেন? আমরা চাইলেই কি ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব? করা উচিত হচ্ছে? এর অর্থনৈতিক দায় কে নিবে?

ভারত সফরের একমাস আগে থেকে আমরা দেখলাম ভারত চলতি সরকারের বদলে অন্য কাউকে সরকারে রাখার কথা ভাবতে পারে এই সন্দেহ হাসিনার সরকারে হাজির হয়েছে। আবার ভারতেরও সন্দেহ হয়েছে চীনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের পক্ষে ‘তাদের সমর্থিত সরকার” সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সম্ভবত তাদের পক্ষে থাকছে না!
এসব মিলিয়ে এটা আজ পরিষ্কার ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ বাংলাদেশে এটা কোনো কাজের না, ফাংশনাল না, কাজ করছে না। এটা কার্যকর থাকছে না, থাকবে না। আমরা চাইলেই ভারতের খুশিতে খামখেয়ালিভাবে পায়রায় বন্দর করতে পারছি না। সম্ভব নয়।

ওদিকে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কথাটারই আর এক অর্থ হল, এর প্রভাবে বাংলাদেশে এখন নির্বাচন আয়োজন ঠিকঠাক মত করা না করার সাথে ক্ষমতার কোনোই সম্পর্ক নেই। নির্বাচনের বাইরে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এটাই আজকের হাসিনার সরকারের রীতি। কিন্তু তা ওয়ার্কেবল কী? হাসিনার সব মিলিয়ে আট বছর অভিজ্ঞতা বলছে না যে তা খুব সুখকর কিছু। এর চেয়ে বড় বিষয় ইতোমধ্যেই হাসিনা নিজেকে ভালনারেবল বা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছেন। জনগণের সাথে থেকে মোকাবেলা, সাথে নিয়ে থাকা, নির্বাচন ইত্যাদি সবকিছু থেকে দূরে চলে গিয়েছে দল এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ফলে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতার বিকল্প যে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কোনো মতেই নয় এটা বোঝার মতো কানে পানি যাওয়ার কথা। ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ হাসিনার জন্য আরো রিস্কি ও অনিশ্চিত এক পথ, এই বাস্তবতা ক্রমে বাইরে আসা স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে। হাসিনা কি সাহসের সাথে নিজের সে অনুভব পক্ষে কাজ করতে পারবেন? কারণ সেটা হাসিনা পারেন আর নাই পারেন এটা প্রমাণিত যে ‘আমরা চাইলেই ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব না।
হাসিনার ভারত সফর-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে, “ভারতে গিয়ে আরো পাঁচ বছরের দাসখত দিয়ে আসলেন কিনা, অথবা আরো পাঁচ বছরের ক্ষমতা নিশ্চিত করে আসলেন কিনা” , এমন প্রশ্ন উঠেছিল। সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন হাসিঠাট্টা করে প্রধানমন্ত্রী জবাব দিয়েছেন। এটা কিন্তু তেমন ঠাট্টার বিষয় নয়। গত ২০০১ সালে বিএনপি ভারতের কাছে দেশ বেচছিল সেকারণে ২০০৯ অথবা ২০১৪ তে আওয়ামী লীগের বেচাটা জায়েজ বা ভালো। এটা গ্রহণ করার মতো বয়ান বক্তব্য নয়। বাংলাদেশ অথবা এর কোনো রাজনীতিকের ভবিষ্যৎও ঐ বয়ানে নেই। এই কথা তাই কাউকে ভালো লাগার মতো কথা নয়। ফলে আমরা যত ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’  এরপরেও চেষ্টাই করতে দেখি না কেন, জনভিত্তি গড়া ও জনসমর্থন ধরে রাখা-মুখী রাজনীতি ও সরকার আবার ফিরে আসবেই। অচিরেই ফিরবে, অভিমুখ সেটাই। আমাদের কী সাহস হবে অভিমুখ চিনে সাড়া দিবার!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ১৬ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। ১৮ এপ্রিল অনলাইন দুরবীন ম্যাগাজিনেও ছাওয়া হয়েছে।  সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

গৌতম দাস

০৪ মার্চ ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2eb

 

দিল্লির নাকি আঞ্চলিক আধিপত্য  ছিল অথবা আছে কিংবা কায়েম করতে হবে – এধনের অনুমানের উপর অনেকেই কথা বলেন দেখা যায়। শিরোনামের “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” কথাটা আমার না। ভারতীয় শাখার থিঙ্কটাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ‘কর্ণেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর সি রাজামোহনের থেকে ধার নেয়া। দিল্লি নাকি এতদিন তাঁর কথা শুনে নাই। তাই  হতাশ হয়ে তিনি বলছেন এটা বাগড়ম্বরা; “……দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”।  এখন “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” তো  বাগড়ম্বরাই তাহলে আর আমাদের সরকারের উপর ভারতের ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ এর চাপাচাপি  – এটা তো আসলে ফালতু কথাবার্তা। হাসিনার আবার “নির্বাচিত” হবার ঠেকা আছে বলে তাকে অপব্যবহার করার সুযোগ নেয়া নয় কী? আসলে কুঁজা লোকেরও চিত হয়ে শোয়ার শখ হয়!

‘সাবমেরিন কেনা’ শব্দটা আমাদের মিডিয়ায় হারিয়ে আস্তে আস্তে যত পেছনে চলে যাচ্ছে, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ ব্যাপারটা ততই ভাসুরের নাম নেয়ার মতো আকার-ইঙ্গিত থেকে এবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এই বিচারে গত পয়লা এপ্রিল ছিল ভারতের সাথে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’-এর পক্ষে বড় ও প্রকাশ্য উচ্চারণের দিন। সংবাদ সংস্থা বাসস জানাচ্ছে, সেদিন ‘ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইক্ল্যাডস) আয়োজনে রাজধানীতে লেকশোর হোটেলে এক গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে। সেখানে আলোচনার শুরুতে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন এর নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ। আগ্রহীরা মো:আবদুর রশীদ এর পুরা লেখাটা পেতে পারেন, দৈনিক সমকাল পত্রিকাতে, সেখানে পুরা লেখাটাই উনার নিজের নামে ছাপা হয়েছে। (দেখুন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’)। লেকশোর হোটেলের ঐ গোলটেবিল বৈঠক এটাকে মূলত সরকারের পক্ষের পেশাজীবীদের সমর্থন সমাবেশ বলা যেতে পারে। সেখানে মো: আবদুর রশীদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, “প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অবয়ব আমরা জানি না এখনো”। অর্থাৎ ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ ভারত কী প্রস্তাব করেছে তা অনেকের মতো তারও জানা নেই। ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ কথাটা ভারতের মিডিয়া থেকে নিয়ে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ধারণাপত্রে সারকথা হলো তিনি শর্তসাপেক্ষে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ স্বাক্ষর করার পক্ষে। তিনি বলছেন, “সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা খর্বের শর্ত না থাকলে এবং সামরিক জোটের ক্ষেত্র বাদ দিয়ে সামরিক সহযোগিতা হতে কোনো বাধা নেই। রাজনৈতিকভাবে বন্ধুকে সামরিকভাবে বৈরী ভাবার কোনো যুক্তি নেই”। যার সোজা অর্থ, ‘নিজ সার্বভৌমত্ব খর্ব’ করা যাবে না আর, ভারতের সাথে কোনো ‘সামরিক জোটে’ ঢুকে পড়া যাবে না। কিন্তু কি হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন বা খর্ব হবে এর ব্যাখ্যা কে দিবে। হয়ত একটা ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ হয়ে যাবার পরেও মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ এর কাছে মনে হতে পারে যে সেটাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হয় নাই। দ্বিতীয়ত  বিএসএফ গুলি করে সীমান্তে বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা চলে । সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষা বা গণপ্রতিরক্ষার সুনির্দিষ্ট নীতি দাঁড় না করালে বিমূর্ত ভাবে ভারতের সঙ্গে ‘সামরিক সহযোগিতা’ কথাটা কোন অর্থ বহন করে না। সেটা কি সহযোগিতা নাকি দাসত্বের দাসখৎ তা আমরা ফাঁপা কথাবার্তা দিয়ে বুঝব না।

সামরিক সহযোগিতা নিয়ে ফিসফিসানি থেকে শুরু করে লেকশোর হোটেলের গোলটেবিল আলোচনা দেখে এখন স্পষ্ট করে বলা যায় যে, বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ‘কথিত’ সামরিক চুক্তি প্রস্তাব নিয়ে চোরাগোপ্তা আলোচনাটা চার মাসের শেষে আর আড়ালে আবডালে রইল না। তবে প্রথম কিঞ্চিত একে প্রকাশ্য দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল ভারতের বরাতে আমাদের মিডিয়ায় বাংলা ট্রিবিউনে গত বছর ডিসেম্বরের ১ তারিখে। দেখুন, “সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ভারতের নতুন প্রস্তাব”। আর এরপর গত ১০ ডিসেম্বর আনন্দবাজার লিখেছিল, “দিল্লিতে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন হাসিনা। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর গোপালকৃষ্ণ প্রভু পর্রীকর ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করেছেন”।  আগ্রহিরা এবিষয়ের আরও দেখতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও দেখতে পারেন (এখানে দেখুন, Bangladesh keen to forge expanded military ties with India)।  ভারতের আনন্দবাজার ৯ ডিসেম্বর রিপোর্ট করেছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ডিফেন্স প্যাক্ট করতে যাবার সফর পিছিয়ে গেল।  (দেখুন, ‘পিছিয়ে গেল সফর, ফেব্রুয়ারি নাগাদ আসতে পারেন হাসিনা’)।

তবু ,এমনকি গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পরেও, আমাদের মিডিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে কোনো রিপোর্ট ছেপেছে বলে দেখা যায়নি। ফলে ভারতের কথিত ডিফেন্স প্যাক্ট’-এ কী আছে তা আমরা কেউই জানি না। তবে ভারতীয় মিডিয়ার বক্তব্য নিয়ে একধরনের কানাঘুষা উঠছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রকে ব্যাশিং নিয়ে। সেটা অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে ডিফেন্স প্যাক্টে কী আছে তা নিয়ে নয়। কিন্তু গত এক সপ্তাহে আমরা দুটো গোলটেবিল হতে দেখলাম। প্রথমটা ২৮ মার্চ প্রথম আলোর আয়োজনে ( দেখুন, ‘ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও ঘাটতি আস্থায়‘); আর পরেরটা এ লেখায় আগেই উল্লিখিত হয়েছে (যুগান্তরের রিপোর্ট দেখতে পারেন, ‘ভারত বিরোধিতা রাজনৈতিক কৌশল, ২ এপ্রিল ২০১৭) ‘। এতে একটা লাভ হয়েছে যে ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে ভারতের প্রস্তাব যে আছে, আমাদের মিডিয়ায় তার স্বীকৃতি মিলল। সরকারের সম্ভবত দ্বিধা ছিল বিষয়টা নিয়ে খোলা আলাপ হলে তা কোথায় গড়ায় তা নিয়ে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশে ভারতের বাংলাদেশ নীতিরযারা সমর্থক তারাও সমস্যায় ভুগছিলেন। কারণ সরকারের পক্ষে তারা চুক্তির সমর্থনে নামুন, তাতে ভারতীয় হাইকমিশন সম্ভবত নিজের স্বার্থ দেখলেও কিছু করা যাচ্ছিল না। ফলে লেকশোর হোটেলের এই গোলটেবিলকে তাদেরই উদ্যোগ হিসাবে দেখা যায়। 

ওদিকে প্রথম আলোর ২৮ মার্চের গোলটেবিলের আগে গত ১৩ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খানের কলামটা ছিল উল্টা অবস্থানের।  (দেখুন,  ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, তিস্তা চুক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা’)।  মিজানুর রহমান, তিনি ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বলে সব নষ্টের গোড়া এক শত্রু হাজির করেছিলেন।  অর্থাৎ মিজান প্রচ্ছন্নে ডিফেন্স প্যাক্টের পক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছিলেন। একই কথা লেকশোর হোটেলের গোলটেবিলে আলাপেও দেখা গিয়েছিল শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্যে; এটা মূলত ভারতীয় কূটনীতির কৌশলগত বয়ান। যাই হোক মিজানের ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বয়ানের পরে ২৮ মার্চ এবার প্রথম আলোর গোলটেবিলে বসে দেখতে পেয়েছে, ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা সাম্প্রতিক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে গেছে। তার পরও দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কে আস্থার সঙ্কট লক্ষ করা যায়’। বাংলাদেশে  ‘ভারতের বাংলাদেশ নীতি’র কোনো সমর্থক যখন দিল্লি-ঢাকার ‘পারস্পরিক আস্থার সঙ্কট’ দেখতে পান, তখন এটা তাৎপর্যপূর্ণ মানতেই হয়। প্রথম আলোর গোলটেবিলের সার মূল্যায়ন হলো, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ অপ্রয়োজনীয়। ওপরে প্রথম আলোর রেফারেন্সেই দেখুন, নিজেই লিখেছে এভাবে: “কোন প্রেক্ষাপটে, কী প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সহযোগিতার রূপরেখা হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে”।

এরপরেও যেটা দুঃসংবাদ হয়ে এখনো রয়ে গেছে তা হলো, যেটাকে শুধু ডিফেন্স প্যাক্টবলে এক বোঝাবুঝির মধ্যে রাখছি তা পুরো ইস্যুটার খুবই ক্ষুদ্র অংশ। মুল ইস্যুটা অনেক ব্যাপক।  পুরা ইস্যুটা আসলে কেবল বাংলাদেশ তো নয়ই, সাথে ভারতকে নিয়েও নয়; রিজিওনাল! হা, আঞ্চলিক তো বটেই, বরং আরো কিছু। এমনকি আগামীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা ভারত সমর্থন করবে কি না এতটুকুতেও সীমিত নয়।

বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় থাকবে ভারতের কেবল এতটুকুর নির্ণায়ক হওয়াতে তা আগামি আর যথেষ্ট হচ্ছে না। এত দিন তো ভারত নির্ণায়ক হয়েই ছিল বা আছে। তা , প্রতীকীভাবে কথাটা বলা যায় এভাবে: গত বছরের অক্টোবর মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ভারত সরকারের সস্তা জাতীয়তাবাদে তাল দিতে ভারতের মিডিয়া সারাক্ষণ চীনা ব্যাশিং করে থাকে। ওদিকে আবার যদিও ভারতের প্রতিটা রাজ্য সরকার কিভাবে গুজরাটের মতো চীনের সাথে বিশেষ সম্পর্ক পাতিয়ে নিজ রাজ্যে বিনিয়োগ-বাণিজ্য আনবে এর জন্য উদগ্রীব আর পরস্পর প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে, তা ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক জানিয়েছেন। ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি থেকে শুরু করে এনডিটিভির অ্যাঙ্কর-সাংবাদিক বরখা দত্ত, সবাই পাবলিক আলোচনায় এটা উল্লেখ করতে ভোলেন না যে, তাদের ফ্রেন্ডলি এক সরকার বাংলাদেশে বসানো আছে। এনডিটিভিতে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকে মাথায় রেখে বরখার এঙ্করে এক টকশোর আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, একটা ধাঁধার উত্তর জানা। তারা সবাই জানেন, বাংলাদেশে তাদের পছন্দের একটা “বন্ধু সরকার” আছে। প্রায় তাদের সব প্রয়োজন পুরণ করতে খেদমত করার জন্য একপায়ে খাড়া হয়ে।  কিন্তু তাহলে এখানে চীনা প্রেসিডেন্ট সফরে আসেন কেমনে? তার সঙ্গে হাসিনার এত কী খাতির? তাইলে কি তাদের ‘ফ্রেন্ডলি সরকার’ ধারণাটা ভুল? এই ধাঁধার জবাব কী? তো ইতোমধ্যে তারা ঐ টকশোতে জানিয়েছে যে প্রেসিডেন্ট শি ওই সফরে বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিতে আসছেন। ফলে আলোচনা শেষে ওই টকশোর কনক্লুশন হলো, ভারত তো আসলে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ গ্রহীতা দেশ। সে নিজেও চীন থেকে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ নিচ্ছে। ফলে ২৪ বিলিয়নের তুলনায় ভারতের ২-৩ বিলিয়ন (তাও অবকাঠামো খাতে নয়, টাটার স্টিলে তৈরি বাস বা রেল পণ্য বিক্রির খাতে) বাংলাদেশে বিনিয়োগ – এদুটা ফিগার কি তুলনীয়? কোনোভাবেই না। তাই তারা বিমর্ষ হয়ে মেনে নিয়েছিল যে, এই খাতে বাংলাদেশে চীনের ভূমিকা ও প্রয়োজন অনেক বেশি আর সেটা ভারতের সাথে তুলনীয়ই নয়। এটা সেদিন অন্তত টকশোর লোকেরা বুঝেছিলেন। কথা আরো আছে; পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এখন বড় প্রজেক্টে বিশ্বব্যাংককে বাদ রেখেই অবকাঠামোর জন্য বিকল্প বিনিয়োগ ভারতের চরম অপছন্দের হলেও হাসিনা ঐ বিনিয়োগ চীন থেকে জোগাড় করে চলেছে। আরও আছে। ভারতকে ট্রানজিট দিতে যশোর থেকে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত নতুন যে রেল যোগাযোগ তৈরি করা হচ্ছে এই বিনিয়োগও চীন দিচ্ছে। সার কথায় ভারতের খায়েশ ট্রানজিট পাওয়া,  কলকাতা-আগরতলা ট্রেন যোগাযোগ অবকাঠামো বাংলাদেশ তৈরি করে দিচ্ছে, চীন থেকে বিনিয়োগ ঋণ নিয়ে।

এদিকে আর একটা বিষয় লক্ষণীয়, ইতোমধ্যে নির্বাচন সরকার বদল করে না বা কাউকে ক্ষমতায় আনে না;  নির্বাচন আর ক্ষমতায় থাকা- এটা আর সম্পর্কিত নয়। হাসিনার সরকার নিজেই এমন নীতিচালু করেছে, সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে সরকারের নতুন স্লোগান হলো, “ভালো নির্বাচন নয়; মূল কথা হলো জনগণের দরকার মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়ন”। আর এই সরকার নাকি উন্নয়নে চ্যাম্পিয়ন। তাই সব ঠিক আছে। একথাগুলো আমরা সবাই কমবেশি জানি। যেটা জানি না বা খেয়াল করা হয় নাই তা হল এই স্লোগান সরকার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এ জন্য যে, সে ভারতের কথা শুনে চীনের সাথে ঘনিষ্টতা ত্যাগ করে নাই। চীনকে হারায় নাই তাই। চীনের সাথে খাতির রেখেই বিনিয়োগ এনেছে। উল্টা বিশ্বব্যাংককে কলা দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক ও পশ্চিমকে মামলা প্রত্যাহার করতেও বাধ্য করেছে। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষমতার উৎস কাকাবাবু- এ কথা্টা একেবারেই সবটা সত্যি নয়। উন্নয়নেরস্লোগান চালু রাখতে গেলে কাকাবাবু না, শিং জিন পিংকেই  হাসিনার দরকার। এটা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি ভালো আর কে বুঝে? ফলে যারা ছদ্ম হাসিনাপ্রেমী সেজে ডিফেন্স প্যাক্ট করতে হাসিনাকে সমর্থন জোগাতে মাঠে নেমেছেন অথবা ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে আস্থাহীনতা দেখছেন এরা কেউ সরকারের সংকট সমস্যার গভীরতা বুঝে কথা বলছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।

সম্প্রতি চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করে গেলেন। বাংলাদেশেও আসার কথা ছিল। তা হয়নি। চীনের গ্লোবাল টাইমস গত ২১ জুন চীনা সাংবাদিক আই জুনের লেখা চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওই সফর নিয়ে এক রিপোর্ট ছাপে। শিরোনাম ছিল, “সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চীনের সংশ্লিষ্ট হওয়া নিয়ে ভারত অহেতুক অস্থির হয়”। দেখুন, (India over-sensitive on China’s engagement in South Asia) এই রিপোর্টে বহু কথা চাঁচাছোলা ভাষায় বলা হয়েছে। ওর কনক্লুশন বক্তব্য হলো, চীন পালটা লড়াই করবে। বলছে, ভারত বাধা সৃষ্টি করলে তাকে এমন ‘পাল্টা লড়ানি’ জবাব দিতে হবে; কারণ এটা চীনের কোর স্বার্থ। এটা মূলত চীনের সাথে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মৌলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক – বিনিয়োগ বাণিজ্যের সম্পর্ক। তবে চীনের কথাটা আবার আরও বড় প্রেক্ষাপট থেকে বলা। সেটা হলো চীনের ‘এক বেল্ট, এক সড়ক’ প্রজেক্ট। সাউথ-ইস্ট এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কারা এই ‘সড়ক ও গভীর সমুদ্র যোগাযোগের প্রজেক্টে’ যুক্ত হতে চায় – চীনের কাছে এখনকার সময়টা হলো, এমন সবার কাছে এই সুবিধা ফেরি করতে যাওয়া। স্বল্পসুদে লম্বা সময়ের এই অবকাঠামো ঋণ চীন সবাইকে দিতে চায়। এমনকি ভারতকেও। প্রেসিডেন্ট শিং এর বিগত বছর ঢাকা সফরের সময় এই প্রস্তাব রেখে গেছেন। গত সপ্তাহে নেপালের মাওবাদী প্রধানমন্ত্রী এই প্রজেক্টে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কাও চিন্তা করছে। আর পাকিস্তান ইতোমধ্যে চীনের কাছ থেকে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট নিয়েছে যা বেল্ট-সড়ক প্রজেক্টের অংশ এবং  অন্তর্ভুক্ত। বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে। এই প্রজেক্ট মূলত অর্থনৈতিক। কিন্তু এত বিশাল প্রজেক্ট, বড় বিনিয়োগের বলে একে প্রতিরক্ষার একটা ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সেই সূত্রে গ্রহীতা এই রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে তাদের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক প্রতিরক্ষা-সাহায্য চীনকে করতে হবে। এখন ভারত যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে খামাখা “পুরা সাউথ-ইস্ট এশিয়াকে নিজের বাড়ির পেছনের আপন বাগানবাড়ি” মনে করে, সেভাবে আচরণ করে — যেমন দেখেন, আজ পর্যন্ত ল্যান্ডলকড ভুটানের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত হতে দেয়নি ভারত, এভাবে যদি চলতে থাকে তবে চীনকে ফাইটব্যাক করতেই হবে, না করে উপায় কী? গ্লোবাল টাইমসে এই কথা গুলোই চাঁচাছোলা ভাবে বলা হয়েছে।

ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকলেও সবাইকে নাকি চীনের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে সম্পর্ক করত হবে ভারত এমন দাবি করে। “চীনের প্রতি পড়শি রাষ্ট্রগুলোর নিউট্রাল অবস্থানকেও” ভারত চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া মনে করে। ‘বল কিন্তু ভারতের কোর্টে’, যা করার সে কী করবে সে সিদ্ধান্ত ভারতকেই নিতে হবে।

ভারতের কৌশলগত বিষয় ও নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলোর বড় অংশটাই আমেরিকান ফান্ডেড। অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে সাজিয়ে খাড়া করার আমেরিকান নীতি – এরই প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে ভারতের নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলো। এরই অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। তিনি ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’- ওয়াশিংটনভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা ‘কার্নেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর। তিনি এখন নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ কলাম লিখেন ম্যানডেলা শিরোনামে। তিনি গ্লোবাল টাইমসের ওই রিপোর্ট নিয়ে লিখেছেন নিজের কলামে। রাজামোহন খুবই হতাশা ব্যক্ত করে নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে দিল্লির প্রস্তুতি নেই।’ ওই কলামের শেষ প্যারাটা অনুবাদ করে দিচ্ছি যেখান থেকে তার কথার একটা সারবক্তব্য পাওয়া যাবে। প্রথম আলোর অনুবাদটাই এডিট করেছি এখানে।

‘… গ্লোবাল টাইমস নয়া দিল্লিকে উপদেশ দিয়েছে, ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ব্যাপারটি দিল্লিকে মেনে নিতে হবে। এসব দেশে বেশি বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান শিকড় গাড়তে শুরু করলে চীন অনিবার্যভাবেই তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করবে। শুধু চীনের নয়,এই অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষার্থেও তাদের এটা করতে হবে।’

তামসার দিক হলো, রাজামোহন স্বীকার করে বলছেন, “ভারত দেরিতে হলেও এই ব্যাপারটা আমলে নিতে শুরু করেছে। দিল্লি এখন বুঝতে পারছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়তে থাকলে এর কৌশলগত রূপও দেখা যাবে, যার মধ্যে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারিও থাকতে পারে”। অথচ তা সত্ত্বেও আমরা দেখছি, ডিফেন্স প্যাক্ট করার জন্য হুদাই ভারত হাসিনাকে চাপাচাপি করছে। যে বাস্তবতা রাজামোহন মেনে নিয়েছেন তা ভারতের মানতে কষ্ট লাগছে। 

  বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে – একথা  এবং বাস্তবতা রাজামোহনও সহজেই মানছেন। তাই আরো বলছেন , কংগ্রেস সরকার চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পকে আপত্তিসহকারে মেনে নিলেও নরেন্দ্র মোদির সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর সম্পর্কেও সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে। ভারত আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা কূটনীতিও জোরদার করেছে। এতে বেইজিং ও দিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত বাড়বে। ভারত যে উপমহাদেশে চীনের ক্ষমতা বিস্তারের ব্যাপারে এত দিন পরে কার্যকরভাবে সাড়া দিলো, সেটাই বরং বিস্ময়ের ব্যাপার। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বহু দিনের সামরিক সম্পর্ক। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান হারে চীনের অস্ত্র বিক্রিকে ভারত এত দিন ভালোভাবে না নিলেও তারা আশপাশের দেশগুলোতে চীনের কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির ব্যাপারে একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। দিল্লি অনেক দিন থেকেই উপমহাদেশে নিজের স্বাভাবিক শক্তি সম্পর্কে আত্মসন্তুষ্ট ছিল”।

রাজামোহন শেষ বাস্তবতা মেনে নিয়েই যেন মানতে চাচ্ছেন না। ব্যাপারটা নাকি মূলক ভারতের “আমলা গোয়েন্দাদের আলস্য” এমন ব্যাখ্যার আড়ালে যেতে চাইছেন। তিনি লিখছেন, “স্বাধীনতার পর ভারত তার আশপাশে পশ্চিমা, বিশেষ করে ইঙ্গ-মার্কিন সামরিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ১৯৮০ সালে আফগানিস্তান দখল করে নেয়, তখন সে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করেছে। কিন্তু বহু দূরের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব আজ ২১ শতকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখন চীনের সামরিক শক্তি ভারতকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন ও রফতানির কথা বলেছেন, কিন্তু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলস্য দূর করাতে পারেননি”।

তিনি বলতে চাইছেন তিনি পরামর্শ দেয়া সত্ত্বেও কেউ শুনে নাই।   বলছেন, এমনকি তিনি “প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রতিরক্ষা কূটনীতির ব্যাপারটা গ্রহণ করাতে পারেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী বারবার অনুনয়-বিনয় করা সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ব্যাপক পরিসরে সামরিক বিনিময় করতে পারেনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মনোভঙ্গি না বদলালে ‘ভারতীয় আঞ্চলিক আধিপত্য’ ও ‘উপমহাদেশের কৌশলগত একতা’ নিয়ে দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”। এখানে এসে তিনি তিনি পুরা হতাশ, দোষারোপ আর হাল ছেড়ে দেয়া অবস্থায়।

আসলে বড় বড় হামবড়া কথার বিরুদ্ধে গ্রাম দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, “ট্যাকা লাগে চাচা! এমনি হইব না!” –  রাজামোহনের এখন সেই অবস্থা।  আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সমগ্র দিক সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ওয়াকিবহাল – আমরা ধরে নিতে পারি। । তাই আমাদের গোলটেবিল-ওয়ালারা তাঁকে চুক্তি করার হাওয়াই সাহস দিচ্ছেন বুঝা যাচ্ছে। রাজামোহনের মত কী আমরা বাস্তবতা মেনে নিব? কঠিন সত্যিটা হলো, চুক্তির বাস্তবতাই নেই- এটা তাদের কে বুঝাবে! আর এই বাস্তবতা বুঝেও কী প্রধানমন্ত্রী ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ যাবেন, শুধু আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন আবার পাবার কথা ভেবে? আর ওদিকে  ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’র পক্ষে চীনের প্রতিক্রিয়া কী স্বাভাবিক থাকবে? নিশ্চিত বলা যায় এটাও প্রধানমন্ত্রীকে আমলে নিতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে সর্ব প্রথম দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইন ০২ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এরপর এর আর এক ভার্সান ‘চিন্তা’ ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর এক ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর সব শেষে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন ও এডিটের পর এখানে ছাপা হল। ]

হাসিনার ‘র’-কে তুলাধুনাতে টার্গেট ছিল কে

হাসিনার ‘র’-কে তুলাধুনাতে টার্গেট ছিল কে

গৌতম দাস

২৯ মার্চ ২০১৭ ভোর সাড়ে পাঁচটা

http://wp.me/p1sCvy-2dZ

গত ১১ মার্চ মহিলা আওয়ামি লীগের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বোমা ফাটানোর মত এক বক্তব্যে বলেন, “২০০১ সালে পার্শ্ববর্তী দেশের কাছে দেশের সম্পদ বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও তারা আজ ভারত বিরোধিতার কথা বলছে। ভারতবিরোধিতার কথা বিএনপির মুখে মানায় না”। বাসসের বরাতে প্রথম আলো এই সংবাদ ছেপেছিল।

এই বক্তব্য হাসিনা এর আগেও মানে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগেও অনেক সময় রেখেছিলেন, কম বেশি একই ভাষায়। সেখানে তার বলবার মূল পয়েন্ট থাকত যে, দেশের স্বার্থে তিনি নাকি আপোষ করেন নাই বলে ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন নাই। তাই কথাগুলা পুরানা কথার বরাতে আবার কমবেশি একই কথা ফলে সে হিসাবে হয়ত মনে হতে পারে কথার নতুন তাৎপর্য কিছু নাই। কিন্তু তাই কি? এবারের তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে নতুন এবং তাৎপর্যময় দিকটা হল  বক্তব্যের পরের অংশে।  প্রথম আলো লিখেছে, “শেখ হাসিনা আরও বলেন, এখন ভারতবিরোধী কথা বললেও আমেরিকান অ্যাম্বাসি, র-এর লোকেরা তো (তখন) হাওয়া ভবনে Continue reading “হাসিনার ‘র’-কে তুলাধুনাতে টার্গেট ছিল কে”

ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

গৌতম দাস

০২ মার্চ ২০১৭, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2db

Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star
Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star

গত বছর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক” বিষয়ে ঢাকায় এক ‘সংলাপ’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার এবং আইপিএজি (ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড গভর্নেন্স) নামে এক সংগঠনের যৌথ নামে  ও উদ্যোগে তা করা হয়েছিল। দিনব্যাপী ভারত ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, কূটনীতিক, সরকারি প্রতিনিধি ও একাডেমিকরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি গত ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই ভারতকে করিডোর দেয়ার পক্ষে কখনো ট্রানজিটের কথা তুলে, কখনো কানেকটিভিটির কথা তুলে সবার আগে থেকে যুক্তির হাল ধরার কাজ করে এসেছেন।
গ্লোবাল অর্থনীতিতে সত্তরের দশক থেকেই গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ঝাণ্ডা উড়তে শুরু করেছিল।  আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ব্যাপক তাগিদ তৈরিতে নেমে পড়েছিল। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানে। ইতিবাচকভাবে বললে, এরই প্রকাশ্য দিক হল – আমাদের মনে আছে নিশ্চয়, “রফতানিমুখী অর্থনীতির” শ্লোগান। মানে, কেবল জাতিবাদী অভ্যন্তরীণ বাজারমুখিতা আর নয়; এর বদলে রফতানিমুখী করে নিজ অর্থনীতি সাজানো। এর এক মৌলিক স্বীকৃত দিক হল, নিজের বাজারে অন্যকে ঢুুকতে দেয়া এবং অন্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ নেয়া। তবে বাস্তবে এই দেয়া-নেয়ার কোনো কিছুই একেবারে অবাধ নয়। মূল কথাটা  বললে, গ্লোবাল অর্থনীতি কেবল কিছু পরাশক্তিগত বিশেষ ক্ষমতার অধীনেই কার্যকর, ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময় এক বাস্তবতা। সুতরাই এখানে এ ক্ষেত্র ‘অবাধ’ বলে কিছু নেই। দুনিয়ায় উপস্থিত সেসব ক্ষমতাবান রাষ্ট্র ও তাদের অর্থনীতির আধিপত্যের অধীনে এবং তাদের মাতব্বরি মেনে নিয়েই এটা কেবল ঘটতে পারে। এই “রফতানিমুখী অর্থনীতির” ফাংশনাল দিকটাই এমন। যেমন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ঢুকতে গেলে  সেটা অবাধে নয়; বরং কোটা, মাল্টি ফাইবার এগ্রিমেন্ট বা তেমন অনুমতি থাকলেই কেবল ঢুকতে পারে। নইলে রক্ষণশীল প্রটেকটিভ বিশাল অঙ্কের শুল্ক দিয়ে “অবাধে” ঢুকতে হবে। বিপরীতে বাংলাদেশে আমেরিকার পণ্যের বেলায় সেটা অবাধ। এই সমস্যা ছিল এখনও আছে। ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময়ে আছে। এমন অসাম্যের পরও বাজার যতটুকু আমাদের দখলে থেকে যায়, সে ফ্যাক্টর হল নিজ শ্রম-দক্ষতা আর কোয়ালিটি পণ্য বা সস্তা প্রতিযোগী পণ্য দিয়ে নিজের জন্য তুলনামূলক বাড়তি সুবিধা যেখানে যার বেশি, সে ভিত্তিতে ও কারণে। এসব সীমিত অর্থে এই গ্লোবালাইজেশন – তবু এটা রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ধারণা ও অবস্থানের বিপরীত একটা অবস্থান অবশ্যই। এটাকে অনেকে পশ্চিমের “মার্কেট লিবারালাইজেশন” বলেও চেনাতে চান। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই গ্লোবালাইজেশনের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান হল, দুনিয়াজোড়া সবার মধ্যে এক এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা- এক গ্লোবাল পণ্যবাণিজ্য, পণ্যবিনিময় ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলছে এটা। আর ইতোমধ্যেই এটা যে জায়গায় বিকশিত হয়ে বা পৌছে  গেছে তাতে এটা আর আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব।
গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে তত্ত্বগত ও প্রচারের দিকগুলো যখন প্রথম আনা হয়েছিল, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, তখন এখানে ১৯৮২ সালের সামরিক ক্ষমতা দখল ও সংস্কার কর্মসূচি চালু করার সময় ছিল। রফতানিমুখী অর্থনীতির নেতিবাচক দিকগুলো বাদ রেখে কেবল  ইতিবাচক দিকগুলো আদর্শিকভাবে হাজির করলে যা হবার কথা, সে প্রসঙ্গে সে সময় একাডেমিক জগতে এক বয়ান চালু ছিল। যেমন, বলা হত – কল্পনা করুন, প্রত্যেক রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠী একটা বা কয়েকটা করে পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে দক্ষ হয়ে উঠলে, সারা দুনিয়ার বাজারের জন্য তৈরি করে এরপর সেসব পণ্য প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজেদের পরস্পরের মধ্যে বাধাহীন বিনিময় ঘটাতে পারলে এই বেনিফিট সব জনগোষ্ঠীই পেতে পারে। সবাই কোনো-না-কোনো পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করবে এবং দক্ষ শ্রমের অধিকারী হয়ে উঠবে। এতে একটা গ্লোবাল বাজার ও বিনিময়ের মধ্য দিয়ে এবং এর মাধ্যমে এক গ্লোবাল বাণিজ্য গড়ে ওঠার কারণে গ্লোবালাইজেশন ঘটানো সম্ভব। সবাই যার সুফল ভোগ করবে। জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীল ক্যাপিটালিজমের বিপরীতে এটাই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার (বাস্তবায়ন করতে হবে এমন) মডেল ধারণা।

গত বছর ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ বিষয়ে ঐ সংলাপে রেহমান সোবহান এই গ্লোবালাইজেশনেরই আরোও এক কোয়ালিফায়েড বৈশিষ্ট্য আরোপ করে কথাটা পেড়েছিলেন। সে কথাটা হল – ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ (value addition chain) তৈরির দিক থেকে প্রসঙ্গটাকে বিচার করা। ভ্যালু এড মানে কোন কাঁচামালে অথবা আধা-সম্পুর্ণ পণ্যে আবার শ্রমের প্রবেশ ঘটিয়ে তাকে আরও-সম্পুর্ণ পণ্য বা একেবারে সম্পন্ন পণ্যে রূপান্তর করা। একই দেশে কাঁচামাল থেকে সম্পুর্ণ পণ্যে রূপান্তর না ঘটিয়ে নানান দেশে তা সম্পন্ন করা এটাকে ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ পণ্য উতপাদন বলা হয়।   গ্লোবালাইজেশনের মধ্যে এটা আর এক জটিল ধাপ উপরে উঠে এটা এক ধরণের পণ্য উতপাদন ও  বিনিময়। রেহমান সোবহান বলছিলেন  ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর দিক থেকে দেখে তুলনা করে বলছিলেন সিনসিয়ার মনোযোগী হওয়ার কারণে চীন কেন সফল আর ভারত কেন বিফল, সে আলোচনা তুলেছিলেন। চীনের ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ মানে হল, একটা প্রডাক্টের কয়েকটা অংশ কয়েকটা চীনের পড়শি দেশ থেকে তৈরি হয়ে আসার পর অর্থাৎ ভ্যালু যোগ হয়ে আসার পর সেগুলো চীনে জড়ো হবে, এরপর সেগুলো সব চীনে অ্যাসেম্বল বা সংযুক্ত হয়ে একটা ফাইনাল প্রডাক্ট হিসাবে বের হবে। অর্থাৎ চীন পড়শি কয়েকটা দেশকে সাথে নিয়ে একটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর মাধ্যমে তৈরী প্রডাক্ট এবার রফতানি করবে। এতে সংশ্লিষ্ট সব অর্থনীতিই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে একসাথে বেড়ে উঠবে, সবাই লাভবান হবে। এ ছাড়া, পুরাটাই চীনে করতে হবে এমন জাতীয়তাবাদী ধারণা নয় এটা। ফলে এটা শুধু সবার ফিনিসড পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ক্রবে তা নয়। পণ্য উতপাদনেই শেয়ার করা এক পণ্য উতপাদন। তিনি চীনের প্রশংসা করছিলেন চীনের পড়শিদের সাথে এমন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ প্রডাক্ট তৈরির সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে সে জন্য। প্রফেসর রেহমান সোবহানের বক্তব্যসহ পুরা অনুষ্ঠানের প্রায় এক ঘন্টার ভিডিও ক্লিপ ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
চীনের পথ ধরে বাংলাদেশের সাথে ভারত ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর সম্পর্ক গড়তে পারেনি বলে তিনি ভারতের সমালোচনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ৩৯০ বিলিয়ন ডলারের ভারতের আমদানি ব্যবসার ০.২ শতাংশও বাংলাদেশ পায়নি। এই তথ্য হাজির করে তিনি সমালোচনা করছিলেন। বলছিলেন, “অথচ বাংলাদেশ নাকি ভারতে বিনা কোটায় ও বিনাশুল্কে পণ্য রফতানির সুবিধাপ্রাপ্ত” “বন্ধুরাষ্ট্র”। এই হল ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বন্ধুরাষ্ট্রের”  দশা। আসল বাংলাদেশের দশা বুঝানোর জন্য তিনি আরো শক্ত উদাহরণ তুলেছিলেন। তিনি তুলনা দিয়ে বলেছিলেন, ভারত নানা পণ্য রফতানিকারী যেসব দেশ ভারতে বাংলাদেশের মত কথিত কোনই ফ্রি ট্রেড সুবিধাপ্রাপ্ত নয়, যেমন- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, এমনকি মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার মতো এসব রাষ্ট্রও ভারতে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রফতানি করে থাকে।
অর্থাৎ, রেহমান সোবহান এখন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর জায়গায় দাঁড়িয়ে ভারতের সমালোচক হতে চাইছেন। সেটা প্রশংসনীয় সন্দেহ নাই। তবে ২০০৭ সাল থেকেই আমরা তাঁর মুখ থেকে  ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটির কথা শুনে আসছি, কিন্তু কখনো ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমন শোনা যায়নি। এখন সমালোচক হওয়াতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান দশার দায় তার ওপর কি কমে আসবে? তা দেখতে হবে।

তবে রেহমান সোবহান এখন কড়া সমালোচক হলেও পুরনো স্টাইলে ভারতের প্রশংসা করা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে পঞ্চমুখ হওয়ার লোক অনেকে এখনো বোধ হয় আগের মতোই আছেন। এদের একজন হলেন সাবেক কূটনীতিক ফারুক সোবহান। তিনি আমেরিকাকেন্দ্রিক থিংকট্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী। তিনি গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যেখানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চারটি উন্নতি তিনি দেখেছেন বলেন। জানিয়েছেন, উন্নতির ক্ষেত্র এর চেয়ে বেশি থাকলেও তিনি সদয় হয়ে বেছে কেবল চারটি উল্লেখ করেছেন; যার প্রথম আর সবচেয়ে বড় সফলতার ক্ষেত্রটা নাকি “বিদ্যুৎ সহযোগিতা”। অথচ সোজা কথায় বললে, আসলে ভারতকে “বিদ্যুৎ ট্রানজিট” দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ভারতের এপার ওপার যোগ করে নেয়া হয়েছে। অথচ তিনি বলছেন, এই অবকাঠামো নাকি আমাদেরকে ভারতীয় বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য সদয় হয়ে করা হয়েছে। ফলে এটাই নাকি আমাদের স্বার্থে উন্নয়ন। আর ভবিষ্যতে নেপাল ও ভুটানে আকাশকুসুমে কল্পিত বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে কল্পিত সেই বিদ্যুৎ আমাদের কেনার পথ সুগম হয়েছে এতে। এটাই ‘সফলতা’। অথচ এখনই নেপালে যেসব বিদ্যুৎ কোম্পানী ভারতীয় মালিকানায় নয় তাদের বিদ্যুৎ বিক্রিতে জটিলতা শুরু হয়েছে।  তাঁর দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ভারতের বাজারে বাংলাদেশ নাকি  কোনো শুল্ক অথবা কোটা ছাড়াই অবাধ রফতানি সুবিধা ভোগ করছে। এমনকি নন-ট্যারিফ যেসব বাধা ছিল সেগুলোও নাকি অপসারণ হয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি যে পুরা উল্টা, সেটা আমরা ওপরে খোদ রেহমান সোবহানের বরাতে জেনেছি। তিনি পরিসংখ্যান হাজির করে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের তৃতীয় ও চতুর্থ অর্জন হিসেবে ফারুক সোবহান এনেছেন বাংলাদেশ ভারতকে নিজের দু’টি পোর্ট ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছে। আর চতুর্থ হল ভারতের নর্থ-ইস্ট নাকি এখন আমাদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। অথচ হয়েছে ঠিক উল্টা। ট্রানজিট দেয়াতে বাংলাদেশী পণ্যের চেয়ে ভারতের অপর অংশের পণ্য তার নর্থ-ইস্টে আমাদের বেশি প্রতিযোগী হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের দু’টি পোর্টই বিনা শুল্কে ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়ায় তাতে আমাদের কিভাবে উন্নতি হয়েছে তা তিনি ব্যাখ্যা করে কিছুই বলেননি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[লেখাটা এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

 ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

গৌতম দাস

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1Rl

বাংলাদেশে খবরটা সবাই পড়েছেন বেশ উতসুক হয়ে আগ্রহের সাথে। কারণ বিষয়টা  জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশকে ভাটির দেশ হিসাবে পাওনা পানি থেকে বঞ্চিত করার ভারতের জুলুম ও অত্যাচারের কাহিনীর অংশ। জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করা বাংলাদেশে বিষয়টা উস্কে তোলার মত খবরটা হল, ভারতের বিহার রাজ্যের চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার, তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করে ফরাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিতে দাবী করেছেন। এই ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা নদীর পানির উপর ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশের যা ন্যায্য হিস্যা সেই পানি জবরদস্তি করে ভারত আটকে নিয়ে রেখেছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দিয়ে রেখেছে শুধু তাই না, সেই পানি খাল কেটে পশ্চিমবঙ্গের অন্য নদীতে নিয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশের সকলের চোখে, এটা বাংলাদেশের চরম স্বার্থহানিকর ঘটনা। ফলে  ভারতের দুষমনির প্রতীক হল ফারাক্কা বাঁধ। এবার সেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেবার কথা তুলেছেন ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ২২ আগষ্ট ২০১৬ প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ২৪ আগষ্টের রিপোর্ট বলছে – নিতীশ কুমারের অভিযোগ, “বিহারে গঙ্গা অববাহিকায় বন্যার জন্য ফরাক্কা বাঁধ দায়ী। বক্সার থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার নাব্যতা অনেকটাই কমেছে। ফলে জল জমে তা দু’পার ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকা বাড়ছে। তাই ফরাক্কা বাঁধের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ফরাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন নীতীশ”। এই খবর বাংলাদেশের কাছে যেন আল্লার দুনিয়ার ন্যায়-ইনসাফের ঘন্টা আপন উদ্যোগে বেজে উঠার ইঙ্গিত ইশারা এটা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এই দাবি করেছেন বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে নয়, বিহারের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। কারণ বিহার এখন গঙ্গা নদী প্রবাহের উপচানো পানিতে বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। উতপত্তিগত দিক থেকে গঙ্গা নদী ভারতের যেসব প্রদেশ আগে ডিঙ্গিয়ে এরপর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ক্রমানুসারে ভারতের সেসব প্রদেশ বা রাজ্যগুলো হল – সবার আগে উত্তরপ্রদেশ এরপর বিহার, এরপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে শেষে বাংলাদেশের চাপাই-নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা। তো নীতিশ কুমারের দাবি কী আমাদের জন্য ইনসাফের ইশারা? এটা বুঝবার জন্য আমাদের সবার কান খাড়া হয়েছিল, সন্দেহ নাই।

ঐ সাক্ষাত ছিল এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া এক প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক এপয়েন্টমেন্ট করে দেয়া সাক্ষাত। অতএব এতে অনুমান করা ভুল হবে না যে তা অনেক আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তবে এটা নেহায়েতই এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত ছিল না। এর আরও বহু গভীর মাত্রা আছে। প্রথমত নীতিশ বিহারের এক আঞ্চলিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড)এর সভাপতি ও মুখ্যমন্ত্রী। না এতটুকুই নয়। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির মোদী নিরঙ্কুশভাবে জিতে আসার পর ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে যে মোদী ঝড় উঠেছিল সে ঝড় ঐ নির্বাচনের পরেও অন্যান্য রাজ্য নির্বাচনেও থামছিলই না। শেষে গত নভেম্বর ২০১৫ বিহারের প্রাদেশিক (বিধানসভা) নির্বাচনে প্রথম সবচেয়ে শক্তভাবে থেমে উলটা দিকে তা ঘুরেছিল। বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরেছিল। আর নীতিশ কুমারের নেতৃত্বের বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছিল। ঐ জোটে বিহারের আর এক বড় আঞ্চলিক দল, লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ছিল সোনিয়া গান্ধীর খোদ কংগ্রেস পার্টিও। এককথায় বললে বিজেপি বিরোধী শক্ত জোট ছিল সেটা। ফলে সেই শক্ত জোটের সবার প্রতিনিধি ও নেতা ছিলেন নীতিশ কুমার । নীতিশের পরিচয়-বৈশিষ্ঠের আরও কিছু বাকী আছে। আগামি বছর ২০১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঐ নির্বাচনেও যদি বিজেপির হার হয় তবে তা ভারতের রাজনীতিতে আর এক নতুন দিকে মোড় ঘুরানো ঘটনা হবে সেটা। ঐ হারকে পুজি করে ভারতের পরবর্তি লোকসভা (২০১৯) নির্বাচনে বিজেপির মোদীকে হারানোর লক্ষ্যে বিজেপি-বিরোধী জোট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। কারণ আগামি নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী দল কংগ্রেস হবে না। আঞ্চলিক দলগুলোর গঠিত জোট হবে মোদীর বিজেপির প্রধান বিরোধী, প্রধান চ্যালেঞ্জ।  এই লক্ষ্যে সম্ভাব্য ঐ জোট গড়ে তোলার খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। সম্ভাব্য ঐ আঞ্চলিক দলের জোট গঠনের মূল নেতা ও উদ্যোক্তা হবেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।  এই জোটের মূল লক্ষ্য হবে বিজেপি ও মোদীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল। গত কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেস ক্রমশ শুকিয়ে ছোট হতে হতে অনেক আগেই কোন এক আঞ্চলিক দলের সমান প্রভাবের দল হয়ে গেছে। ফলে নীতিশ-মমতাসহ নানান আঞ্চলিক দলের মিলিত জোট বনাম বিজেপির মোদী – এই হবে ঐ নির্বাচনে মূল ক্ষমতার লড়াই।

ভারত রাষ্ট্রের জন্মগত সুত্রে দুর্বলতা বা ত্রুটি হল ওখানে কেন্দ্র কে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথায় কিভাবে তৈরি হয় তা রাজ্যে বসে টের পাওয়া যায় না। ফলে ভুতুড়ে কেন্দ্র বনাম রাজ্য এর বিবাদ জন্ম থেকেই। ফলে বিজেপি বনাম আঞ্চলিক দলের জোট এর লড়াই  এর তাতপর্য  এবার পুরানা ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ ক্ষমতার লড়াইকে আবার মুখ্য হয়ে তুলতে যাচ্ছে। অতএব মোদী সেই বিশেষ নীতিশ কুমারকে সাক্ষাতের এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন।

ফসলের মাঠ ও শহরও ডুবে যাওয়া বিহারের এবারের বন্যার প্রভাব হয়েছিল মারাত্মক। টানাটানিতে চলা রাজ্য আর তুলনামূলক উদ্বৃত্তে চলা রাজ্য এই ভিত্তিতে যদি ভারতের রাজ্যগুলোকে ভাগ করি তবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার টানাটানিতে চলা রাজ্যের অন্তর্গত। ফলে বন্যায় ব্যাপক ত্রাণের আয়োজন করার সীমাবদ্ধতা এখানে আছে। আর এই সীমাবদ্ধতা সমস্যাটা ব্যক্তি নীতিশ কুমার অথবা তার দল-জোটের কারণে নয়।  ওদিকে এই বন্যায় মানুষের যা ক্ষয়ক্ষতি এককথায় বিহার রাজ্য সরকারের পক্ষে তা পুরণ অসম্ভব। ফলে যেটা সম্ভব তা হল তাতক্ষণিক কিছু ত্রাণ বিতরণ। সারকথায় বিহারের জনগণের ক্ষোভ মোকাবিলা আসলেই কঠিন। ফলে৪ জনগণের ক্ষোভকে কেন্দ্রের উপর ঠেলে দেয়ার তাগিদ নীতিশের আছে। ওদিকে এই বন্যা কেন হল, এর সাথে কী ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার কোন সম্পর্ক নাই? অবশ্যই আছে। গঙ্গার মত প্রবল বিপুল পলিমাটিবাহী নদীর ক্ষেত্রে এর উপর বাঁধ দিলে সে প্রভাব আরও জটিল ও মারাত্মক হওয়ার কথা, হয়েছেও। অতএব সবমিলিয়ে এর দায় কার কেন্দ্রে না রাজ্যের এই বলে দায় ঠেলাঠেলির এক বিরাট ক্ষেত্র হল বন্যা ও বাঁধ ইস্যু। বিশেষত যখন বাঁধ দেয়া ও মেন্টেনেন্স ব্যবস্থাপনার প্রশাসন চলে সরাসরি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত – তাই এই দায় কেন্দ্রের; ওদিকে বন্যা হলে তা মোকাবিলা ও ত্রাণ বিতরণ রাজ্যের দায়। এসব কথা সাক্ষাতের আগেই আগাম ভেবে নিয়েছিলেন নীতিশ ও মোদী দুজনেই। কারণ, ঐ সাক্ষাত থেকে দায় ঠেলাঠেলি শুরুর এক বিরাট সম্ভাবনা আছে তা দুজনেই জানতেন। নীতিশ মোদীর কাছে এসে নিজ বিহার জনগণকে বুঝাতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন মুল সমস্যা ফারাক্কা বাঁধ। অর্থাৎ দায় কেন্দ্রের। মোদীর কাছে বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার কথা তুলে, দাবি জানিয়ে তিনি সে অর্থ করতে চেয়েছিলেন যে দায় কেন্দ্রের। আর মোদী সেকথা টের পেয়ে সাথে সাথে বাঁধ কর্তৃপক্ষকে  বাঁধের সব গেট খুলে দেবার নির্দেশ জারি করেন। এভাবে তিনিও বুঝাতে চাইলেন রাজ্য যা চেয়েছে তিনি ততক্ষণাত তাই দিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং কেন্দ্রের দায় নাই।  বন্যায় কারণে  বিহারের জনগণের যদি কোন কষ্ট-ক্ষোভ থেকে থাকে তবে এর দায় ত্রাণের পরিমাণ কম  অথবা বিতরণে রাজ্য সরকারের সমস্যাজাত। ফলে ২৩ আগষ্ট নীতিশ-মোদীর সাক্ষাত ছিল আসলে আগামি ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কার ইমেজ ক্রেডিট ভাল তা এখন থেকেই ঠিকঠাক রাখার প্রতিযোগিতা। ফলে ঐদিনের প্রথমার্ধে ঘটনাবলী ছিল নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী জানান আর মোদীর ততক্ষণাৎ সবগুলো গেট খুলে দিবার নির্দেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল।

কিন্তু কেবল নীতিশ আর মোদী নন গঙ্গার ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতেই আরও পক্ষ আছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান হল ফারাক্কা বাঁধ থাকা তার স্বার্থের পক্ষে। কারণ গঙ্গার পানি শেষে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌছানোর বদলে সেই পানি বাংলাদেশে ঢুকবার আগেই তা কেটে গতিপথ বদলে আলাদা খাল খুড়ে টেনে ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ফেলা হয়েছে। এভাবে হুগলী নদী ধরে শেষে ঐ বাড়তি পানি কলকাতা বন্দরে নিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলা হয়েছে। মমতার মুল উদ্বেগ হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটির চরের কারণে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা সঙ্কটে পড়েছে, এথেকে বন্দরকে রক্ষা করা, বন্দরকে সচল রাখা। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে মনে করা হয়েছিল যে খাল কেটে আনা অতিরিক্ত বা বাড়তি পানির চাপের তোড়ে হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটি অপসারণ হয়ে যাবে যাতে এভাবে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পানি টেনে আনার পরও তা দিয়ে পলিমাটি পর্যাপ্ত বা কাম্য মাফিক কিছুই সরানো যায় নাই। ফলে  বন্দরের এই নাব্যতা সংকট খুব মিটে নাই তো বটেই উলটা নাব্যতা রক্ষা যতটুকু হচ্ছে তা বজায় রাখতে গিয়ে প্রত্যেক বর্ষা মৌসুমে ঐ সংযোগ খাল (৪০ কিমি লম্বা) ও নদীর দুই পাড় উপচে পড়া পানিতে এলাকায় বন্যা হচ্ছে। ফলে বিহার ছাড়াও নাব্যতা রক্ষার কাফফারা হিসাবে পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিবছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবির কয়েক ঘন্টা পরে ঐদিনই ভারতের এনডিটিভি মমতাকে প্রতিক্রিয়া জিজ্ঞাসা করেছিল। জানতে চাওয়া হয়েছিল যে নীতিশের ঐ দাবীর পর মমতার প্রতিক্রিয়া কী? ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, মমতা এর কোন জবাব না দিয়ে এড়িয়ে চলে যান।   এতে এনডিটিভির রিপোর্টার মন্তব্য করে এটা মমতার কৌশলগত নিশ্চুপ থাকা। পরে কলকাতার নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র ক্যামেরার সামনে (ঐ একই ক্লিপে দেখুন শেষ ভাগে) দাবি করেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিলে নাকি এখন ২০০ কিমি নদী শুকিয়ে যাবে। তাই তাঁর মতে নীতিশের দাবী আজিব রিডিকুলাস, তিনি বলেন। পরে ঐ রিপোর্টের অন্য অংশ থেকে জানা যায় মমতা বলছেন, বিহারে বন্যার কারণ মনুষ্য-সৃষ্ট। কারণ সঠিক সময়ে বাঁধের পানি ছাড়া হয় নাই। ফলে পুরা ব্যাপারটায় কেন্দ্রের দায়।

মমতার এই বক্তব্যের পরে ঐদিনই (২৩ আগষ্ট পরের দ্বিতীয়ার্ধে) বিজেপি শিবিরে টনক নড়ে। তারা আবার ভেবে মুল্যায়ন করে দেখে যে ভোটের রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে রাজনীতিকদের কথা সাজানো ও পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের লড়াইয়ে তারা পিছিয়ে পড়ে গেছে। কারণ নীতিশ আর মমতার ভাষ্যে ভিন্নতা আছে। অথচ এর সুবিধা বিজেপির পক্ষে কাজে লাগানো হয় নাই। তাই আবার নতুন করে দোষারোপ সাজানোর উদ্যোগ নেয় তারা। বিহারের রাজনীতিতে নীতিশ কুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব হলেন বিজেপি নেতা হলেন সুশীল কমার মোদী। তিনি একদিন পরে অর্থাৎ ২৫ আগষ্ট মিডিয়ায় এক বিবৃতি পাঠিয়ে তাই এবার তিনি দাবি করলেন, নীতিশের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবীর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিতে থাকলেন, “বরং যেহেতু নীতিশের বিহার সরকার বন্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয় নাই, ত্রাণ ঠিক মত বিতরণ করতে পারে নাই – সেই খামতি আড়াল করতে সে এখন বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী তুলেছে”। অর্থাৎ  তিনি মমতার পক্ষে ছদ্মভাবে দাঁড়িয়ে মমতা-নীতিশের বক্তব্য বা অবস্থানের বিরোধ বড় করে দিতে চাইলেন। এছাড়াও বন্যার কারণ ফারাক্কা বাঁধ নয় – বলে বাঁধকে দায়ী হওয়ার হাত থেকে বাচিয়ে দিতে চাইলেন তিনি। আর এর চেয়েও বড় কথা তিনি ইচ্ছা করে এক বিভ্রান্ত তৈরি করলেন। বন্যা হওয়া না হওয়ার জন্য বাঁধ দায়ী কীনা এটা এক জিনিষ। কিন্তু তিনি দাবী করলেন ফারাক্কা বাঁধ নয়, রাজ্য সরকারের ত্রাণ ঠিকমত বিতরণ ব্যবস্থাপনা না করতে পারাটাই যেন বন্যার কারণ। যেন ত্রাণ পরিমানে প্রচুর আর  ঠিকমত বিতরণ করতে পারলে তাহলে আর বিহারে বন্যা হত না।  এই হল ভারতের আগামি কেন্দ্র-রাজ্য লড়াই প্রকট হয়ে উঠার আগেই পরস্পরের দোষারোপ করে দায় ঠেলাঠেলির – ভোটের রাজনীতি।

ঘটনার এখানেই শেষ না। কারণ গঙ্গা ও ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার সাথে যুক্ত পক্ষ শুধু ভারতে না, ভারতের বাইরেও বাংলাদেশ আছে। তাই এবার বাংলাদেশ অংশ। এখানে দুই মন্ত্রীর পরস্পর বিরোধী দুই বক্তব্য নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে সরকার ঘনিষ্ট বিডিনিউজ২৪ গত ২৮ আগষ্ট।  তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, যেটা এবারের ফারাক্কা বাধের গেট খুলে দিবার কারণে বন্যায় অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা। রোববার ভেড়ামারা উপজেলার চর গোলাপনগরে পদ্মা নদীর পাড়ে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে  ত্রাণ বিতরণের সময় ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাব নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানাচ্ছেন। তিনি লিখছেন তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, “অভিন্ন নদীর উপর একতরফা গেইট খুলে দেওয়াটা সঠিক কাজ নয়। এ বিষয়ে আমাদের যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করব।” একই সময়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যববস্থাপনামন্ত্রী মায়া চাঁদপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ নেতা মায়াকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজ২৪ লিখেছে,“এক সময় আমরা বলেছি ফারাক্কার বাঁধ আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ। কিন্তু এখন তা ভারতের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ফারাক্কার পুরো বাঁধ ছেড়ে দিলে কিংবা ভেঙে দিলে আমাদের দেশে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার নিচে আছে। ফারাক্কার পানি আমাদের কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে আমরা মনে করি”। অর্থাৎ সংকীর্ণ চোখে যার যার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে বুঝ দিবার বক্তৃতা এগুলো। ঠিক সামগ্রিক দেশ ও জনগণের স্বার্থের দিক থেকে দেয়া অবস্থান নয়।

নিতীশ-মমতার অবস্থানের বিরোধকে বড় করে দেখানোর সুযো নিবার জন্য এবার এগিয়ে আসেন ভারতের রঞ্জন বসু। তার সে তৎপরতা আমরা পাই গত ০২ সেপ্টেম্বর কলকাতার সাংবাদিক রঞ্জন বসুর লেখা বাংলা ট্রিবিউনে “ফারাক্কার গেট খোলা নিয়ে অপপ্রচারে ‘বিরক্ত’ বাংলাদেশ” শিরোনামে। ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে, নতুন করে ফারাক্কা বাধের গেট খোলার কোন ঘটনাই আসলে ঘটে নাই। কারণ বর্যার সময় সবগেট খোলাই থাকে। ফলে নতুন করে গেট না খুললেও মিডিয়ার তা প্রচার হয়েছে। হয়ত রঞ্জন বসুর এই দাবী সত্য। কিন্তু ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে আমাদের দিল্লী দুতাবাস নাকি দাবি করেছে রাজশাহী বা অন্য কোথায় কোন বন্যা হয় নাই। রঞ্জন বসু লিখেছেন, “……পদ্মায় বাড়তি পানির স্রোতে রাজশাহী বা অন্য কোথাও কি বন্যা হয়েছে বলে খবর এসেছে?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ দেখা যাছে, রঞ্জন বসুর লেখার এই অংশ আবার আর এক চরমপ্রান্ত বা সবকিছু অস্বীকারের চেষ্টা। উপরের দুই মন্ত্রীর বক্তব্যসহ বিডিনিউজের রিপোর্ট এর প্রমাণ। জানিয়ে রাখা ভাল গত ২৮ আগষ্ট খোদ ঐ  বিডিনিউজ২৪ এর ১.৪৬ মিনিটের এক ভিডিও ক্লিপ রিপোর্টের শিরোনাম হল “রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল”। ফলে রঞ্জন বসু এবং দিল্লীর বাংলাদেশ দুতাবাসের নামে তার দাবি একশ ভাগ মিথ্যা। এটা বড় জোড় মমতা-নীতিশের বিরুদ্ধে মোদীর পক্ষে রঞ্জন বসুর এক মিথ্যা প্রচারণা মাত্র।

সারকথায় বললে,এই লেখায় ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত সব পক্ষের বক্তব্যগুলোকে একসাথে পাখির একটা চোখ দিয়ে দেখলে যেমন হয় তেমনই এক সঙ্কলন। এককথায় বললে, বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এসব কথোপকথন গুলো একটাও নয়। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফারাক্কা ইস্যু হয়েছিল মাত্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে  মাসিক অন্যদিগন্তের চলতি প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার সংযোজন ও এডিট করে ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

 

জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

গৌতম দাস

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-1Rb

বাংলাদেশের দু-একটি দৈনিকে খবরটা আসে গত ৯ সেপ্টেম্বর যে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর  নয়াদিল্লীর এক সেমিনারে “ঢাকাকে সমর্থন দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান” জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।  দক্ষিণ ভারত ভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দুর’ বরাত দিয়ে ঢাকার মিডিয়া খবরটি প্রকাশ করে। এর এক দিন পর অর্থাৎ  ১০ সেপ্টেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার জয়শঙ্করের ঐ বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। তবে ঢাকার মিডিয়াসহ সব জায়গায় পাঠকের মনে একটা কমন বিভ্রান্তি ছিল যে, জয়শঙ্কর কোথায় এবং কেন এই বক্তব্য রেখেছেন। কারণ গত ২৯ আগস্ট আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) জন কেরির বাংলাদেশ সফরের পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিদেশী প্রভাবশালী ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করেনি। আবার বাংলাদেশের কোনো সরকারি নেতা বা মন্ত্রীও ভারত অথবা কোনো প্রভাবশালী দেশ সফরে নেই। ফলে কোন পটভূমিতে জয়শঙ্করের বক্তব্যের অর্থ বুঝব, সেই পটভূমি সবাই জানতে চাইছিল। যেমন- মানবজমিন লিখেছিল, ‘জয়শঙ্কর দিল্লিতে ২০১৬ ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সে’ বক্তব্য রাখেন। এখন ‘ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সটা কী জিনিস এটা ওই রিপোর্ট থেকে কিছুই জানা যাচ্ছে না। অর্থাৎ জয়শঙ্করের বক্তব্যের একটা কনটেক্সচ্যুয়াল বা পটভুমিগত দিক আছে। তাই সংক্ষেপে সেই পটভূমি বা ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সটি কী তা খুঁজে দেখা দরকার হয়ে পড়ে। এরপ্র তা খুঁজে দেখে জানা যাচ্ছে যে আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপরাজ্যের এক একাডেমিক ইন্সটিটিউট হল ঐ “ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার”। আর প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত ছিল বা আছে, এমন ভারতীয় প্রফেশনালদের একটি সংগঠন আছে দিল্লিতে, যার নাম ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন’ (বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশে এমন শাখা আছে)। এই অ্যাসোসিয়েশন তিন দিনব্যাপী এক কনফারেন্স (ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া কনফারেন্স নামে) ডেকেছিল দিল্লিতে ৮-১১ সেপ্টেম্বর, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন জয়শঙ্কর ও অন্য আরেক নোবেল সেলিব্রিটি। জয়শঙ্কর সেখানে যে লিখিত বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটারই সারাংশ ঐ খবরের উৎস, যা মিডিয়া রিপোর্টে এসেছে। এখন এরপরেও আরো প্রশ্ন থেকে যায় যে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ এটা আবার কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান?

‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ আমেরিকার ৫০তম রাজ্য হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় নন-প্রফিট একাডেমিক প্রতিষ্ঠান। হাওয়াই আমেরিকান মূল ভূখণ্ডের বাইরে প্রশান্ত মহাসাগরে এক দ্বীপপুঞ্জ রাজ্য। আমেরিকার সাথে এশিয়ার ভূখণ্ডগত দূরত্বের দিক থেকে এ দ্বীপ মাঝে অবস্থিত।  হাওয়াইয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠানের বিরাট ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠানটি জন্ম বা উদ্বোধনের সময় সাবেক সিনেটর  ও সেকালের আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডসে জনসন বলেছিলেন, এটা “পশ্চিম (আমেরিকার) আর পুবের (এশিয়ার) ইন্টেলেকচ্যুয়ালদের মিলনস্থল হবে”।
আরো প্রশ্ন, আমেরিকা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলে কেন? এর জবাবে প্রেক্ষিতের দিকটি হল বিশাল পরিসরে দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। এই বৃহত্তর প্রেক্ষিত থেকে দেখে বললে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে বসবাস ও অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো অসমভাবে বিকশিত হয় বা হচ্ছে, ফলে পরস্পরবিরোধী নানা স্বার্থবিরোধ এর ভিতর সবসময় তৈরি হতে থাকে। এই দ্বন্দ্ব-বিরোধগুলোকে নিয়ে বসে কথা বলে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা যতটা কমানো বা লঘু করে দেয়া যায়, আমেরিকার দিক থেকে বুঝ তৈরি করা যায়, কাউকে কাউকে কিনে ফেলা বা প্রভাবিত করে রাখা যায় – এসব প্রয়োজনে আমেরিকা ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের মত একাডেমিক থিঙ্কট্যাংক অথবা নীতি গবেষণা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার তাগিদ আমেরিকা বোধ করে থাকে। তবে থিঙ্কট্যাঙ্ক-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এই ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ কিছুটা ভিন্ন এক অর্থে যে, এ সেন্টার নিজ খরচ চালানোর একটা বড় ফান্ড আমেরিকান সরকার থেকে আসে, আর বাকিটা অন্যান্য আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তুলে চলে। যেখানে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর বেলায় তারা প্রায় সবাই প্রাইভেট দাতব্য প্রতিষ্ঠানের (সরকারি ফান্ড নয়) অর্থে চলে।
জয়শঙ্করের বক্তৃতা লিখিত ও তাতে ১৭টা পয়েন্ট ছিল। যার মূলকথাগুলো সার করেই ‘দ্য হিন্দু’ নিয়ে এসেছিল তিনটা শিরোনামে : চীন প্রসঙ্গ, টেররিজম ও পাকিস্তান এবং শেষে বাংলাদেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশের মিডিয়া কেবল বাংলাদেশ অংশটিই তুলে রিপোর্ট করেছে।
এ সম্মেলনে জয়শঙ্করের টার্গেট শ্রোতা পশ্চিম, বিশেষত আমেরিকা। অর্থাৎ ঠিক বাংলাদেশ বা এ দেশের জনগণ নয়। কারণ আমেরিকা যেন এশিয়া নিয়ে ভারতের কথা শুনতে এসেছে। ফলে ভারতের চোখে এশিয়ায় দ্বন্দ্ব বা খোঁচা-বিরোধ তৈরি হয়ে থাকা জায়গা হল এই তিন ইস্যু। জয়শঙ্কর আমেরিকাসহ পশ্চিমকে বলতে চাচ্ছেন, শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের ঝামেলায় আছে। বিগত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের ওপর ভর করে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান আছে কথা সত্য। এবং তা প্রকাশ্যই ফলে সবাই জানে। তাই জয়শঙ্কর বলছেন, “এটা সমালোচনার সময় নয়। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আমাদেরও উদ্বেগ রয়েছে। আর এ জন্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সরকারকে সমর্থন দেয়া উচিত”। শেষ বাক্যটা ‘দ্য হিন্দু’ থেকে নিয়ে অনুবাদ করে লেখা হল। ওদিকে আনন্দবাজার কথাটা লিখেছে এভাবে, “বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদকে রক্ষা করা না গেলে সেখানে জঙ্গিপনা আরো বাড়বে”। তবে জয়শঙ্করের ১৭ পয়েন্টের বক্তব্য যেটা সরাসরি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সাইটে পাওয়া যায়, তার ১৪ নম্বর পয়েন্ট হল, ‘বাংলাদেশ সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ চাপের মুখে আছে, এই অবস্থায়  আমাদের দ্বিধা ঝেড়ে সমর্থন করা উচিত। ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা করে প্রত্যেক দিকে অতিরিক্ত গুরুত্বের সাথে না তাকিয়ে আমাদের বরং সামগ্রিক উন্নয়নের অভিমুখের দিকে তাকানো উচিত, সুনির্দিষ্ট করে এটা গুরুত্বপূর্ণ”। এ অনুবাদ আমার করা এবং এখানে লেখা।
জয়শঙ্কর বলতে চাইছেন, সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন হয়েছে কি না, অভিমুখ ঠিক আছে কি না সেটা আগে চেক করলেই তো হয়। তা হয়ে থাকলে সেটা অর্জনে গুম-খুন-নিপীড়ন-দলন ধরনের কিছু হয়ে থাকলে সেগুলো আর আলাদা আলাদা করে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় এখানে, আমাদের এই বাক্য দুটো পড়ার সময় প্রথম বাক্যটির আগে দ্বিতীয় বাক্যটি পড়তে হবে। কারণ দ্বিতীয় বাক্যটি নিজেই জয়শঙ্করের প্রথম বাক্যটির বিরোধী।
জয়শঙ্করের দ্বিতীয় বাক্যের সারকথা হল – সামগ্রিক বিচারে উন্নয়নের অভিমুখ ঠিক আছে তো, সব ঠিক আছে। তাহলে যদি তাই হয়, তবে প্রথম বাক্য আর বলার দরকার থাকে না। কারণ “সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ বিপদে থাকুক আর নেই থাকুক, দুনিয়ার কোন সরকারেরই আর হাসিনা সরকারকে দ্বিধাহীন সমর্থন করার কিছু থাকে না। কারণ উন্নয়ন তো হয়েছেই। উন্নয়ন ঠিকমতো হয়ে থাকলে “সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ বিপদে” আছে অথবা না আছে তা আবার দেখতে যাব কেন?” সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদকে আবার রক্ষা করা কেন? কারণ উন্নয়ন ছাড়া আর কোনো কিছু নিয়ে ফোকাস না করতেই কি জয়শঙ্কর দ্বিতীয় বাক্যে আমাদের পরামর্শ দেননি? উন্নয়ন হলেই তো সব হচ্ছে!
তাহলে দাঁড়াল, বাংলাদেশ সম্পর্কে জয়শঙ্কর দু’টি বাক্য লিখেছেন, যার একটি অপরটিকে নাকচ করে দেয়। এ ধরনের স্ববিরোধী পরিস্থিতিতে আমরা বলতে পারি, ভারতের বিদেশ সচিব জয়শঙ্করের ‘কথা হয় না’! কারণ তা স্ববিরোধী। আচ্ছা, একটা সেকেন্ড থট দেয়া যাক।
‘বহুত্ববাদ’ এই শব্দটি কি ভারতের বিদেশনীতিতে আছে বা ছিল?  জবাব হল – না, তা আগে জানা যায়নি। তাহলে কী আমেরিকাকে খুশি করতে কেবল জয়শঙ্কর এখন এই শব্দ ব্যবহার করতে চাইছেন? আমাদের সন্দেহ প্রবল হচ্ছে। কেন? কারণ, বহুত্ববাদ বলতে আমেরিকা আমাদেরকে বোঝাতে চায় কেবল কোন সরকারের বক্তব্য নয়, সরকারবিরোধীদেরও সমালোচনা বক্তব্য থাকবে, থাকতে দিতে হবে। বিরোধীরাও অবাধে তাদের কথা বলতে পারবে। তাদের কোনো আপত্তি, বিরোধিতা থাকলে তা আমলে নিতে হবে। ইনক্লুসিভ অর্থে সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে ও ক্ষমতাসীনদের তা যতই অপছন্দ লাগুক তা শুনতে হবে। আর বিনা বাধায় তা সরকারকে সহ্য করতে হবে। জয়শঙ্কর কি বহুত্ববাদ বলতে এটাই বুঝেছেন বা বুঝাচ্ছেন? তাই যদি হয়, তবে ২০১৪ নির্বাচনে ‘সবাইকে নিয়ে’ নির্বাচনের বিপক্ষে কেন ভারত অবস্থান নিয়েছিল? কেন ভারতের বিদেশ সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে জানালেন সবাই নয়, যারা যারা হাসিনার অধীনে আসে এই অর্থে মেজরিটি নিয়ে নির্বাচনের পক্ষে ভারতের অবস্থান? অর্থাৎ বহুত্ববাদকে ভারত নিজেই বহু আগে থেকে চাপের মুখে বিপদে ফেলে ত্যাগ করে রেখেছে। তাই নয় কী? তাহলে এখন কান্নাকাটি করে লাভ কী? বোঝা যাচ্ছে, জয়শঙ্কর খুব খারাপ ছাত্র! এসব পুরানা দিক নিয়ে  হোমওয়ার্ক করে ক্লাসে আসেননি!
আসলে আমাদের মানতেই হয় সুজাতা জয়শঙ্করের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান ছিলেন। কারণ ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এখন থেকেই বহুত্ববাদের কথা তুলে জয়শঙ্কর কি আগামিতে নিজের বিপদ ডেকে আনার রাস্তা খুলছেন! যেটা সুজাতা কখনোই করেননি। যেহেতু ২০১৪-এর নির্বাচন বলে রাখা হয়েছিল যে ২০১৯ সালে ঐ সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, তার মানে সরকারকে ২০১৯ সালে আবার নির্বাচনের ঝামেলা পোহাতে হবে। সেই আলোকে আগে থেকেই বহুত্ববাদের কথা মাঠে এনেছেন বলে জয়শঙ্করের বেলায়  বিপদের আশঙ্কা প্রবল। সুজাতা বুদ্ধিমান ছিলেন বলে ‘বহুত্ববাদ’ বলে কোনো কথাই তোলেননি। এবার সুজাতার জায়গায় জয়শঙ্কর কী বলবেন?
আসলে কঠিন এক বাস্তবতা হল, আমরা মানি আর না-ই মানি, ক্ষমতা বলে কিছু থাকলে ক্ষমতার বিরোধী বলেও কেউ কেউ থাকবে। এখন বিরোধী বলতে যদি কোনো বিরোধী দল না থাকতে দেই, মানে আমার দলের বাইরে বিরোধী কাউকে থাকতে না দেই – তাহলে আমার দলের ভেতরেই এক সবল বিরোধী গ্রুপ হবে। এ ছাড়া আরো এক বিপদ আছে। লিবারেল বা আইনি বিরোধী দলের সবাইকে যদি গুম-খুন করে দমিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলি, তো এবার এক সশস্ত্র বিরোধী দল হাজির হবে।  এর অর্থ হল – আসলে আমিই ঠিক করি আমার বিরোধীরা কেমন হবে, কোথায় থাকবে, ভেতরে না বাইরে, সশস্ত্র না নিরস্ত্র ইত্যাদি। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকলে ক্ষমতার বিরোধীও থাকবেই। শুধু তাই না, ঐ বিরোধী বেছে নেয়ার দায় এবং ক্ষমতা আসলে ক্ষমতাসীনের। দেখেন কোনটা নেবেন! অন্যকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (প্রিন্টে ১২ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। তা আরও সংযোজন ও এডিট করে এখানে আবার নতুন ভার্সান হিসাবে তা ছাপানো হল।]