পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় ফিরবে- তৃণমূল না বামফ্রন্ট

পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় ফিরবে- তৃণমূল না বামফ্রন্ট
গৌতম দাস
১৮  এপ্রিল ২০১৬,  সোমবার
গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-118

আবার এক ঝলকে ভারতের কিছু রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভারতের প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচনকে রাজ্যের (রাজ্যসভা নয়) নির্বাচন বা বিধানসভা নির্বাচন বলা হয়।  আগামী ৪ এপ্রিল থেকে এই ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এভাবে মোট পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নসীম জইদি জানিয়েছেন, আসামে ২ দফা এবং কেরালা, তামিলনাডু ও পণ্ডিচেরিতে এক দফা করে ভোট নেয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা নেয়া হবে ৬ দফায়। এমনকি দিনের হিসাবে সাত দফায় ভোট হবে পশ্চিমবঙ্গে। ফলে প্রায় এক মাস ধরে চলবে এই ভোট পর্ব। পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি আসনে মোট ৭৭ হাজার ২৪৭টি ভোট গ্রহণ কেন্দ্রে ভোট নেয়া হবে। আর সব রাজ্যের সবখানে ভোট নেয়া শেষে আগামি মাসে একই দিন  ১৯ মে, পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় সেই ভোট গ্রহণ করা হয়েছে বিগত ৪ এপ্রিল।

কী করলে নির্বাচনে জেতা যাবে ভারতের রাজনৈতিক দলের আচরণ ও ততপরতার ভিত্তি সেটাই। এই বিচারে ভারতের রাজনীতি মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক। সত্য-মিথ্যা আধা সত্য ইত্যাদি মিলিয়ে যেটা বললে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে তাই বলতে হবে, করতে হবে, এটাই হয়ে গেছে ভারতের রাজনীতি। এটাই ভারতের রাজনীতিক সব দলের পরিচালনের মৌলিক নীতি। এর বাইরে ভারতের রাজনৈতিক দল অন্য কোন নীতি-অবস্থান নাই। বাংলাদেশের দিক বিচারে, এবার একসাথে পাঁচ জায়গায় বিধান সভা নির্বাচন হলেও এর দুটা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমানার দুই প্রান্তে – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে। তাই ঠিক ২০১৪ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের মতো মোদি এবারো নির্বাচনী বক্তৃতা করতে এসে গেছেন। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতোই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষ উগড়ে দেয়া বক্তৃতা করছেন। এর প্রধান ইস্যু হল, বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত অনুপ্রবেশ ইস্যু। বিশেষত আসামে এই ইস্যুর প্রপাগান্ডা, দামামা প্রবল। আবার মুখে বলে বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারি কিন্তু ব্যাতিক্রমহীনভাবে বুঝানো হয় “মুসলমান”।  এ নিয়ে তাঁরা নিয়মিত কথা বলছেন, হুঁশিয়ারি ও হুঙ্কার দিচ্ছেন। এ ছাড়া তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং পুরো সীমান্ত সিল করে দেয়ার হুমকি ইতোমধ্যে দিয়েছেন। কিন্তু মজার কথা হল, সেই গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরের দু’বছর মোদি বা তার সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ নিয়ে আর কোন কথা বলেনি। ফলে অনেকে আশা করতে পারেন যে, এবারও বিধানসভার নির্বাচনের আগে অনুপ্রবেশ নিয়ে মোদি ও তার দল হয়ত চিৎকার করবেন কিন্তু ভোটের পর সম্ভবত আর কোনো কথা তুলবেন না, ভুলে যাবেন। এটাকেই ভারতের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি বলে। এ কারণেই অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী রাজনীতিতে কোনো সরকার যেসব কথা বলবে এর সাথে সরকারের বিদেশ নীতি বা পড়শির প্রতি নীতিতে কোন ছাপ পড়বে না, এর সাথে কোনো সম্পর্কও থাকে না।
পাঁচটি বিধানসভার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের চলতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায়, মানে তাঁর দল তৃণমূল-কংগ্রেস ক্ষমতায়। পাঁচ বছর আগে বা ২০১১ সালে মমতা প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। মানে এর আগে রাজ্য-সরকারে কমিউনিস্ট সিপিএমের বামজোট ক্ষমতায় ছিল এবং একটানা ৩৪ বছর ধরে তারা ক্ষমতায় ছিল। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, বামজোট কী এবার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে, সম্ভাবনা কতটুকু? সম্ভাবনা আছে কি না বা সেটা যা-ই থাক স্বভাবতই আমরা তা একেবারে নিশ্চিত হতে পারি একমাত্র নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর। তবে এর আগেই একটা ঘটনা হল, খোদ সিপিএমই যেন খোদ আমাদেরকে আগাম জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই নির্বাচনে জিতে ফিরে আসছে না। কিভাবে তা জানিয়েছে? না, অবশ্যই সিপিএম বা বামফ্রন্ট এ কথা ঘোষণা দিয়ে বলেনি। বলেছে কাজ তৎপরতায় আর নিজের আচার-আচরণে তা প্রকাশ করে। যেমন সিপিএম, মানে জোটবদ্ধ বামফ্রন্ট এবার একা নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট মিলে জোটে, সিট ভাগাভাগি করে নির্বাচনে অংশ নিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সিপিএম এর নিজের দলের অভ্যন্তরীণ বাধা এবং কংগ্রেসের বেলায় তাদের কলকাতা স্থানীয়সহ কেন্দ্রিয় নেতৃত্বকে এব্যাপারে রাজি করানোর নানান অনিশ্চয়তা কাটিয়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি ততপর সিপিএমের নেতা সীতারাম ইয়েচুরির তৎপরতা শেষে সফলতার মুখ দেখেছে। কংগ্রেস-বামফ্রন্টের গাঁটছড়া এর আগে অনেকবারই হয়েছে, তবে সবসময় তা কেবল কেন্দ্রের ক্ষমতা বা নির্বাচনকে লক্ষ করে হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় রাজ্যপর্যায়ের নির্বাচনে কংগ্রেস-বামফ্রন্টের গাঁটছাড়া এই প্রথম। ইতোমধ্যে নির্বাচনের আগেই কংগ্রেসের সাথে আসন ভাগাভাগির পর্যায়ে জোটবদ্ধতাও কার্যকর হয়ে গেছে। তাই এখন কংগ্রেসের সাথে বামফ্রন্টের আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটাই প্রমাণ করে যে, তাদের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়নটা কী! তারা মনে করে একা বামফ্রন্ট হিসেবে তারা সম্ভবত জিতবে না। তার সম্ভাবনা এখনো কম। একনাগাড়ে ৩৪ বছর শাসনের পর তারা তৃণমূলের কাছে ২০১১ সালে প্রথম হেরে গিয়েছিল। সে ঘটনা এখন পাঁচ বছরের অতীত ঘটনা হয়ে গেলেও, জনগণের মনোভাব এখনো তাদের দিকে যথেষ্ট সদয় হয়ে ফেরেনি এটাই সিপিএম এর মুল্যায়ন, এটাই তাদের নিজের সম্পর্কে রিডিং। এই রিডিংয়ের কারণেই  এবার কংগ্রেসের সাথে দ্বিধা ছেড়ে আগেভাগে জোট বেঁধে বামফ্রন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেসের সাথে তার জোটবদ্ধতার তাৎপর্য এটাই।
আবার এটা শুধু বামফ্রন্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী শরিক সিপিএমের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়নই নয়। কংগ্রেসেরও পশ্চিমবঙ্গে তাদের নিজস্ব দশা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন এটা। আজকের সিপিএমের ক্ষমতাচ্যুতি দশা মাত্র পাঁচ বছরের। বিগত ১৯৭৭ সাল থেকে একটানা ৩৪ বছর ক্ষমতার রমরমাতে ছিল বামফ্রন্ট। অর্থাৎ ওই ৩৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের অবস্থাও এমনই শোচনীয় ছিল। মানে একমাত্র ১৯৭৭ সালের আগেই কেবল পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের রমরমা অবস্থা ছিল। সে দিক থেকে কংগ্রেসের দুরবস্থা এবার ২০১৬ সালের নির্বাচনে নতুন কিছু নয় হয়ত। কিন্তু অন্য বিচারে কংগ্রেসের জন্য এটা অবশ্যই নতুন দশা। কেন? বিগত ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচনে কংগ্রেসের অবস্থা অতীতের যেকোনো সময় থেকে ভিন্ন রকমের এবং আরো শোচনীয়। ঐ(২০১৪) নির্বাচনের ফলাফল থেকেই মোদি প্রধানমন্ত্রী হন আর ওই নির্বাচনে জোটে অংশগ্রহণ করা বিজেপি নিজের জোট ছাড়াই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেছিল। অথচ কংগ্রেসের অবস্থা ঠিক এর উল্টো। বিগত ২০০৪ সাল থেকে পরপর দুই টার্ম যে কংগ্রেস কেন্দ্রে জোট সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিল সেই কংগ্রেস ২০১৪ নির্বাচনের ফলাফলে এতটাই শোচনীয় যে, লোকসভায় বিরোধী দলের অবস্থান পেতেও সমস্যা অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছিল। অনেক কষ্টে শেষে বিরোধী দলের মর্যাদা জোটাতে হয়েছে। কারণ বিরোধী দল হতে  প্রয়োজনীয় এমন সংসদীয় আসন সে পায়নি। কংগ্রেসের আসন ছিল লোকসভার মোট আসন ৫৪৩-এর ১০ ভাগেরও কম, ৪৫-এর আশপাশে। শুধু তাই নয়, কংগ্রেস নিজের এই দুরবস্থা টের পেয়েছিল, তা স্বীকার এবং মনেও রেখেছিল।
দু’মাস আগের সর্বশেষ বিহার বিধানসভার নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস সর্বভারতীয় দলের দাবি ত্যাগ করেছিল; যেন সে বিহারের অন্যান্য আঞ্চলিক দলের পাশাপাশি তাদের মতোই আর একটা দল। এমন মর্যাদাতেই কংগ্রেস বিহারেরই বিধানসভা নির্বাচনে এক জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এথেকে মনে করা যেতে পারে যে, তার দিন শেষ হয়েছে – এটা কংগ্রেস মেনে নিয়ে আগাচ্ছে। বাস্তবতা সে আগেই মেনে নিচ্ছে। আগামীতে ভারতজুড়ে সংগঠন আছে এমন সর্বভারতীয় দল বলতে কংগ্রেস বলে আর কিছু থাকবে না – এজন্যও যেন সে রেডি হচ্ছে। বড়জোর এক স্থানীয় আঞ্চলিক দলের অবস্থান পেয়ে অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সাথে কোনো জোটে অস্তিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে এবারের কংগ্রেস সেই নতুন চেহারার কংগ্রেস। সে হিসেবেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের সাথে পশ্চিমবঙ্গে সে জোটবদ্ধ হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ৪ এপ্রিল থেকে ভোট শুরু হয়ে গেছে এবং প্রথম পর্বে ১৮ বিধানসভা আসনের নির্বাচন দিয়ে এই নির্বাচন শুরু হবে। ওই ১৮ বিধানসভার আসন মূলত মাওবাদ প্রভাবিত এলাকাগুলোর। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট ছাড়া আরো দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হল বিজেপি এবং ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতার তৃণমূল। এখন কে জিততে পারে এই প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গে বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের বিন্যাসকে ভিত্তি ধরলে  – ওই নির্বাচনে তৃণমূল ভাগে পেয়েছিল ৩৯.৮ শতাংশ, বামফ্রন্ট ২৯.৯ শতাংশ, কংগ্রেস ৯.৭ শতাংশ, আর বিজেপি ১৭ শতাংশ ভোট। ইতোমধ্যে এবার কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট গড়ে ফেলেছে। তাই, ২০১৪ সালের হিসাব মাথায় রাখলে একই বিচারে এবার এই জোটের ভাগের সব ভোটের যোগফল দাড়ানোর কথা  ৩৯.৬ শতাংশ। আর ওদিকে সব কিছু আগের মতো থাকলে সে ক্ষেত্রে মমতার পক্ষে আসতে পারে ৩৯.৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় কাছাকাছি। তাই মমতার দিক থেকে দেখলে এই জোট হওয়াটা তার জন্য অস্বস্তিদায়ক। কারণ পুরাণ ভোটের ফলাফলের বিচারে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেললে মমতার তা ভাল লাগার কথা নয়।
তবে পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে অন্য আরো অনেক ফ্যাক্টরও আছে। যেমন ফ্যাক্টর নম্বর এক। বিগত ২০১১ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রাপ্ত মোট ভোট ছিল ৪ শতাংশ, আর ২০১৪ সালে সেখান থেকে বেড়ে গিয়ে মোদি নামের জোয়ারে তা হয়েছিল ১৭ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে প্রাপ্ত মোট ভোটে সেটা আবার কমে ৪ শতাংশে ফিরে যাবে বলে বিজেপি বিরোধী অথবা পক্ষের অনেকেই অনুমান করছেন। যদি তাই হয় তবে সে ক্ষেত্রে বিজেপির অবশিষ্ট বা বের হয়ে যাওয়া ভোট কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট আর তৃণমূলের মধ্যে ফিরে চলে যাবে তা স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারি। কিন্তু কিভাবে কী অনুপাতে সেটা কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট আর তৃণমূলের মধ্যে ভাগ হবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এনিয়ে জল্পনা-কল্পনাও পরিসংখ্যান নাড়াচারা শুরু হয়ে গেছে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি থেকে এবার মুখ ফিরিয়ে নেয়া বা ফেরত চলে আসা ভোটারদের মাত্র ২০ শতাংশ যদি তৃণমূলের ভাগে এসে যায় তাহলেই তৃণমূল আবার জিতে যাবে। মানে সে ক্ষেত্রে ২০১৪ সালে প্রাপ্ত মোট ভোটের ১৭ শতাংশ যা বিজেপির ছিল তা এবার কমে ৪ শতাংশ হয়ে গেলে – অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফেরত চলে যাওয়া ভোট হবে মোট মোটের ১৩ %। অর্থাত সেক্ষেত্রে গতবারের বিজেপির পাওয়া মোট ভোটের ১৭% ভোট এবার ভাগ হবার কথা – বিজেপি ৪%, কংগ্রেস-বামফ্রন্ট ৪.৫৫% (১৩% এর ৩৫%) আর তৃণমূলের ভাগে ৮.৪৫% (১৩% এর ৬৫%) – এভাবে অর্থাৎ ৩৫ঃ৬৫ ভাগ হলেই দেখা যাচ্ছে মমতার তৃণমুল জিতে যাবে।  কারণ সেক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি বিধানসভা আসন তৃণমূল নিজের পক্ষে পেয়ে জিতে যাবে। আর যদি বিজেপির কমে যাওয়া ভোটের ৩৫% এর জায়গায় মাত্র ১৫ শতাংশ তৃণমূলের পক্ষে আসে তাহলে কংগ্রেস-বামফ্রন্টের জোট তৃণমূলের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অতএব, বিজেপির কমে যাওয়া ভোটের কত অংশ তৃণমূল নিজের দিকে টানতে পারবে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলমান ভোটার পশ্চিমবঙ্গে আরেক বিরাট ইস্যু; বিশেষ করে সাচার কমিশনের রিপোর্টে মুসলমানদের দুরবস্থার কথা ফুটে উঠতে শুরু করার পর থেকে। বিগত ২০১১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই “মুসলমান ভোট” ইস্যু হয়ে উঠতে শুরু করে। সবার নজর পড়ে যে, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের ২৮ শতাংশ মুসলমান এবং এটা এখন প্রতিষ্ঠিত যে, পশ্চিমবঙ্গের মোট মুসলমান ভোটারের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটারই মমতার দলের পক্ষের ভোটার হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে। মমতার তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান কমিউনিটির সাথে রাজনৈতিক আঁতাত এবং বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছে। এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিক হল, এর আগে সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকেই মুসলমান ভোটাররা প্রথমে কংগ্রেসের ভোটব্যাংক হয়েছিল, এরপর ১৯৭৫ সালের পর থেকে তা বদলে গিয়ে পরের ৩৪ বছর ধরে বামফ্রন্টের ভোটব্যাংক হিসেবে ছিল। কিন্তু দুই জায়গাতেই মুসলমানেরা ছিল সেকুলার জামা গায়ে দিয়ে নিজের মুসলমান পরিচয় ঢেকেঢুকে আড়াল করে। সে তুলনায় মমতার দলে এসে এবার তাঁরা ভোটার হয়েছে খোদ মুসলমান পরিচয়েই, কোনো আড়াল লুকাছাপা না করেই। ফলে এটা বিজেপির জন্য চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফলাফলে ক্ষমতায় আসার পরপরে কয়েক মাসের মধ্যে বর্ধমান বোমাবাজির ইস্যু তুলে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ – মুসলমানেরা জঙ্গি, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে, অনুপ্রবেশকারি, তারা জেএমবি ইত্যাদি নানা প্রপাগান্ডার ঝড় তুলে ফেলেছিল। সেই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা লিড ভূমিকা নিয়েছিল আর তা বিস্তৃত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম আলো আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি – আনন্দবাজারের রিপোর্টের বরাতে রিপোর্ট করে ওই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় শামিল হয়েছিল। দাবি করেছিল এগুলো জামায়াতের কাজ। কিন্তু হঠাৎ করে মোদির প্রধানমন্ত্রীর অফিস  বিজেপির অমিত শাহের প্রচার-প্রপাগান্ডার তথ্যকে অনুমোদন না দিয়ে খোদ মোদির সরকার পিঠ ফিরে দাঁড়িয়ে যায়। লোকসভায় দাঁড়িয়ে মোদির এক মন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে সেটা অস্বীকার করেছিল। ফলে সেই থেকে বর্ধমান ইস্যু বা মুসলমান-জঙ্গি ইস্যু আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যায়। এমন হওয়ার মূল কারণ বিজেপি হিসাব করে দেখেছিল যে, নিজেদের ওই প্রপাগান্ডা সফল হলে তৃণমূল হয়তো ঘায়েল হবে কিন্তু এর ফলাফল বিজেপির পক্ষে আসবেই না; বরং না এসে তা কংগ্রেস-বামফ্রন্টের পক্ষে চলে যাবে। কারণ তখনকার বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান সিপিএমের বিমান বসু খোদ বিজেপির অমিত শাহের ভাষ্যের সাথে মিল রেখে প্রায় একই ভাষায় তৃণমূলকে বাংলাদেশের জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক ও জঙ্গি সংগঠন বলে প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল। তাই মোদির হঠাৎ করে ওই পিঠটান দেয়া।
মোদির এই পিঠটান দেয়া নীতির আলোকে সেই থেকে মমতা গত দুই বছর মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দুই সংসদেই (লোকসভা ও বিশেষ করে রাজ্যসভাতে) বিরোধিতার কোনো ইস্যুতে যোগ দেয়নি; অথবা কোনো বিরোধী জোটে যোগ দিয়ে বিরোধিতা করেনি। যা করেছে তৃণমূল আলাদা করে করেছে। মোদির বিজেপি, কলকাতায় তৃণমূলের ক্ষমতায় ফিরে আসার চেয়ে বামফ্রন্টের ফিরে আসার বিরোধী বেশি। তাদের ধারণা, সিপিএমকে আর আরেকটি পাঁচ বছরের টার্ম পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলে বামফ্রন্ট চিরদিনের মতো ক্ষমতায় ফিরে আসার সক্ষমতা হারাবে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির লক্ষ্য এটাই। তাই এই নীতির আলোকে বিজেপির লক্ষ্য হল এবারের বিধানসভা নির্বাচনও মমতার হাতে চলে গেলে তা যাক। এভাবে ছেড়ে দিয়ে এরও পরের বার মানে ২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে কৌশল সাজানো। এতসব হিসাবকিতাব এর কারণে সব মিলিয়ে মমতার তৃণমূল খুব সম্ভবত মার্জিনালি হলেও আবার নির্বাচিত হয়ে জিতে সরকার গঠন করতে সম্ভবত সক্ষম হতে যাচ্ছে। তবে মমতার বিরুদ্ধে বিজেপির অন্য এক কামনা ও করণীয় আছে। বিষয়টি বাইরে থেকে মানে বাংলাদেশ থেকেও সুনির্দিষ্টভাবে খেয়াল না করলে বোঝা সম্ভব নয়। বিষয়টি হলো মমতার তৃণমূল ভোট কারচুপির দিকে ঝুঁকছে বলে বিজেপিসহ সব বিরোধীর অভিযোগ ও অনুমান। বাংলাদেশে বসে এর সত্যতা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু না বলতে পারলেও ভারতের নির্বাচন কমিশনের অ্যাকশন ও তৎপরতার বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি চিৎকার ক্রমশ বাড়ছে – সেটা লক্ষ্য করা যায়। যেমন মমতার খাতিরের পুলিশ অফিসার বা প্রশাসনিক আমলার বিরুদ্ধে কমিশন ক্রমান্বয়ে বদলির আদেশ দিলেই মমতা তাতে হইচই করে উঠছেন। যেমন কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার অথবা আমলা আইপিএস অফিসার ভারতী ঘোষকে নির্বাচন কমিশনের বদলি করা নিয়ে মমতা কঠিন আপত্তি তুলেছে, যদিও মমতা তা ঠেকাতে পারে নাই। তবে মমতা যে ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাতেই মমতার বিরুদ্ধে কারচুপির সন্দেহের সত্যতা প্রবল হচ্ছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে আমাদের যতই ইতিবাচক ধারণা থাক মমতার আমলে বিগত বছরগুলোতে মেয়র-কাউন্সিলর ধরণের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখলের সীমাহীন কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। এগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের মতো মানের নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। এ কারণে এবার নির্বাচন কমিশন আরো কড়া কিছু পাল্টা কঠোর অ্যাকশনে গেছে। আর এরই বিরুদ্ধে মমতা সোচ্চার হয়েছেন। সোচ্চার হলেও হয়তো সেটা তেমন কিছু হতো না কিন্তু তিনি যা বলছেন তা থেকে মমতার বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগের পাল্লাই ভারী হয়। মমতা পাবলিক মিটিংয়ে এ নিয়ে কী বলছেন তা আনন্দবাজার থেকে কোট করছি, “ইলেকশন আসলে অনেক কেন্দ্রীয় বাহিনী আসবে। ইলেকশন কমিশনের অবজার্ভার আসবে। কোনো দিন তাদের ভুল বুঝবেন না। যত্ন করবেন, আদর করবেন। তারা আমাদের অতিথি। অতিথিকে যত্ন করা আমাদের কাজ। তারা কিছু বললে চুপচাপ শুনবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী বা কমিশন তিন দিনের জন্য, তারপর আমরাই থাকব। কমিশন চলে গেলে তৃণমূলই থাকবে এলাকায়। ভোটারদেরও তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়েই থাকতে হবে”। মমতার এই হুমকি মমতাকে নির্বাচনে জিততে সাহায্য করবে হয়তো কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লাকেই আরো মজবুত করবে। সাদা কথায় কারচুপির অভিযোগ মমতার ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ০৬ এপ্রিল ২০১৬  দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার এবং ০৩ এপ্রিল ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় প্রথম ভার্সান হিসাবে ছাপা হয়েছিল। এখানে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এডিট করে ছাপা হল।]

 

 

 

Advertisements

কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

কানে পানি গেছে,
এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

গৌতম দাস
০১ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-hR

বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

দুই.
ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২

ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী

ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী
গৌতম দাস
২৩ নভেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-d1

বাংলাদেশে যোগ দেয়া শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিকাব) সাথে এক মতবিনিময়-বিষয়ক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে দৈনিক মানবজমিনে এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে পরের দিন, গত ১৩ নভেম্বর। মানবজমিন লিখেছে, “ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে” বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা।
রাষ্ট্রদূতের এই বাক্যের কথা আপাতভাবে খুবই সাদামাটা মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে তা নয়। ওই বাক্যে গুরুত্বপুর্ণ শব্দ হলো, সমান বা সমান সম্পর্ক। অর্থাৎ তিনি চীন ও ভারতের সাথে শুধু সম্পর্ক রক্ষা নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন ‘সমান সম্পর্ক’ রাখার কথা। আর সমান সম্পর্ক রাখাটা হবে ‘বেশি সুফলের’, সে কথা তিনি বলছেন। কেন? সেটাই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদলের কালে
এই শতকে দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদল চলছে। আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার কথা আগেই শুনা গিয়েছিল এখন বাস্তবে ফলতে শুরু করেছে। কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তিগত অবস্থান পায় বা দেখাতে পারে, যখন এর আগেই  অর্থনীতি শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে দেশটির অর্থনীতি প্রথম দুই বা বড়জোর তিন রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গিয়ে থাকে। বলা যায়, দুনিয়ায় অর্থনীতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানের ওপর ভর করে কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অর্থনীতিগত অবস্থানের দিক থেকে চীন আমেরিকাকে কয়েক বছর ধরে ছাড়িয়েই যাচ্ছে বলেই আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় আর এক ঘটনা হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ পশ্চিম থেকে পুব দিকে এশিয়ামুখী হয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় অর্থনৈতিক তৎপরতার মোকাম বা ভারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এশিয়া। এসবের মিলিত ফলাফলে এশিয়ায় আরো দুটো ইস্যু তৈরি হয়েছে। একটা আমাদের সাউথ এশিয়া অঞ্চলের ধরাধরি আর অন্যটা সাউথ চায়না সি বা চীনের প্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের উত্তেজনা। এমন উত্তেজনার মূল কারণ বিশ্বে আমেরিকার পরাশক্তিগত প্রভাব কমে যাওয়া টের পেয়ে আমেরিকা নিজেই এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজের সামরিক ক্ষমতাজাত সার্ভিস বিক্রির চেষ্টা করছে। সে এই বলে  এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যে, চীনের নব উত্থান ও এর কোনো সম্ভাব্য খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচতে তোমাদের সামরিক সহযোগিতা দরকার হবে। এই বরকন্দাজ হতে সার্ভিস দিতে চাই আমি। বিনিময়ে তোমরা আমার সাথে এক টিপিপি (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আমাকে ব্যবসায় দিবে। সাউথ চায়না সিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার তৈরি করা দ্বন্দ্ব ও টেনশন ছড়ানোর বৈশিষ্টটা এ রকম।
আর অন্য দ্বিতীয় বিষয়টা হল, আমাদের অঞ্চলে মানে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেরটা আর একটু অন্য রকম। বাড়তি আরো কিছু বৈশিষ্টের কারণে। সেটা হলো, আমেরিকা ভারতকে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে বা পাশে আছে ধরনের ধারণা তৈরি করে  ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব উসকে দিতে চাইছে। এটা করার সুযোগ নিতে পারছে কারণ ভারত ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বন্দ্বের ইস্যু আছে। আর তা মূলত অসম সামরিক সক্ষমতার কারণে। ভারতের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি – যেটা আমেরিকা বিক্রি ও সরবরাহ দিবার উছিলায় সে ভারতের ঘনিষ্টতা চাইছে। আবার ভারতও সম্ভাব্য সামরিক বিরোধের কথা ভেবে আমেরিকাকে অস্ত্রের উৎস এবং বিরোধে অন্তত মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা নিতে পারে – এমন দরকার অনুভব করছে। এছাড়া ১৯৬২ সালের অভিজ্ঞতা ভারতের ভাল নয়। এসব মিলিয়ে সারকথায় চীন নিয়ে ভারতের ভীতি ও সন্দেহ আছে, আর আমেরিকা সেটাকেই ভালোমতো ব্যবহার ও উসকে দিয়ে রাখতে চায়। আবার চীন-ভারতের সম্পর্ক সবটাই বিরোধাত্মকতা নয়। বরং আর বিপরীত দিকে ভারত-চীনের পারস্পরিক ব্যবসায়িক সহযোগিতার প্রয়োজন এবং স্কোপ আছে। এবং সে সুযোগ পরস্পর নিচ্ছে। বাণিজ্য-ব্যবসায়ের দিক থেকে উভয়ের উভয়কে দরকার। কিন্তু আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আর এক দিক আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা যেটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। BRICS ও AIIB ধরণের উদ্যোগের আবির্ভাব এর প্রমাণ। পুরানা অর্ডারটাকে ভেঙে আমেরিকার কর্তৃত্বের বাইরে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করাতে ভারত ও চীনের একসাথে কাজ করা উভয়ের ভবিষ্যতের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকটা খেয়াল করে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের দিকগুলো উদোম করে উসকানি দিয়ে প্রধান ও মুখ্য করে তোলার নীতি নিয়েছে। এসবের মিলিত প্রভাব ও ফলাফলে এশিয়া, বিশেষত আমাদের অঞ্চলে মূল তিন শক্তি আমেরিকা, ভারত ও চীন – এশিয়ায় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে, টানাহিঁচড়া করছে, এশিয়ার বাদবাকি প্রত্যেকটা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার প্রবল চেষ্টা করছে। এ অঞ্চলের প্রতিটা দেশের রাজনীতিতে এই তিন শক্তির প্রভাব তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রবল। অন্য দিকে প্রতিটা দেশের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী মুল দু-তিনটা রাজনৈতিক দল থাকে, সম্পর্কের দিক থেকে এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও এটাই স্বাভাবিক। তবু অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব বিদেশী তিন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের আলোকে সাজানো হয়ে যায়, জড়িয়ে যায়। যা হওয়া উচিত নয়। কারণ যার যার নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে এমন অবস্থা মারাত্মক আত্মঘাতী।
আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের স্বার্থের লড়াই, পারস্পরিক শত্রুতা ইত্যাদি প্রত্যেকেই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে করছে, লড়ছে; এগুলো করারই কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল একটা বিষয় বাদে তা হবার কথা। তা হলো, আমেরিকার নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা ভেঙে নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করানো – এ বিষয়টায় চীন ও ভারতের কোর স্বার্থ একই।
কিন্তু এতে আমাদের কী? এটা কী শুধুই আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই যেখানে আমরা দর্শকমাত্র যার কিছুই আসে যায় না? না একেবারেই তা নয়। এটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখা পরাশক্তিগত লড়াইয়ের মত নয়। আমাদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে। এটাতে আমাদের মতো গরিব রাষ্ট্রসহ সবারই এখানে গভীর ও এক  কমন স্বার্থ আছে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের চলতি বিশ্বব্যবস্থা যেটা আমেরিকার মত মোড়ল ও তার সাগরেদদের দিকে কান্নি মেরে সাজানো ও দাঁড়ানো ব্যবস্থা বলে যেটাকে আমরা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করি – এরই তো ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অল্প বিস্তর ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। এটা পুরা ভেঙ্গে নতুন আসন্ন ব্যবস্থাটায় আমাদের জন্য কতটুকু কী রিলিফ দিবে তা তো কেউ এমনি দিবে না, আর তা বুঝে নিবার ব্যাপার ও কাজ আছে। সেজন্য আমাদের প্রথম কাজ হল, পরিবর্তনের অভিমুখ রবং কোথায় কী পরিবর্তন হতে পারে কতটুকু তা ঠিকমত বুঝে পদক্ষেপ নেয়া, নিজের অবস্থান নেয়া, দল জোট পাকানো ইত্যাদি। ফলে চীন ও ভারতসহ এই ইস্যুতে যারাই নতুন গ্লোবাল অর্ডার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিনিময়ব্যবস্থা দাঁড় করানোর পক্ষে থাকবে তাদের পক্ষে থাকা আমাদের কাজ। এই ইস্যু বাদে অন্য সব বিষয়ে আমেরিকা, ভারত ও চীনের লড়াই আসলে তাদের নিজ নিজ একান্ত স্বার্থে নিজের লড়াই। আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ তাতে নেই। অতএব সাবধান, এসব ধরনের লড়াইয়ে এই তিন শক্তির কোনো একটার পক্ষ নেয়া আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য বিপজ্জনক। বিশেষত এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার কোলে ঢুকে অপর দুই অথবা কোনো একটার পক্ষে দাঁড়ানো আরো বিপজ্জনক। যেমন, চীনের কোলে বসে চীন-ভারতের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীনের পক্ষ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। অথবা ঠিক একই কাজ কিন্তু উল্টা ভাইস ভারসা – ভারতের পক্ষে জোটবদ্ধ হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ভারত অথবা চীন কোনো একটার পক্ষ নিয়ে নিজের স্বার্থে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বা খেলার চেষ্টা – এটা অতিবুদ্ধিমানের গলায় দড়ির অবস্থাই তৈরি করবে।
এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী দেশ হলো শ্রীলঙ্কা। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে আমরা খুঁজছি রাষ্ট্রদূতের ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ ঠিক কী হতে পারে বা হওয়া উচিত।

কী কী নির্ণায়ক মেনে চললে সেটা ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ হবে :
০১. আমেরিকা, ভারত ও চীন – কোনো এক রাষ্ট্র অন্য দুইয়ের যে কারো উপর বাড়তি সামরিক স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা পায়, এমন কাজে সহযোগিতা করার বিষয়কে বাংলাদেশের জন্য হারাম জ্ঞান করতে হবে।
০২. তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অবশ্যই গভীরে নেয়া যাবে। কেবল কাউকে একচেটিয়া, বিশেষ করে অন্যকে বঞ্চিত করে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক করা বা দেয়া যাবে না।
০৩. এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মাপকাঠি হিসেবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের মুখ্য বিষয় অবশ্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ হতে হবে। এদিক থেকে তাকিয়ে কাজ করলেই তখন আর কোনো সিদ্ধান্তকে ‘কারো বিরুদ্ধে কাউকে বাড়তি সুবিধা’ দেয়ার জন্য করা হচ্ছে এমন হবে না। কেউ আঙুল তুলতেও পারব না।
০৪. এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার সামরিক স্বার্থকে বাংলাদেশের সাথে করা ওর বাণিজ্যের সম্পর্ক আলাপ ডিলের ভেতর আনা যাবে না। সযত্নে দূরে রাখতে হবে। যেমন গভীর সমুদ্রবন্দর এটা একমাত্র বাণিজ্যিক বিষয়, পারস্পরিক একমাত্র বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয় হিসেবে আসতে হবে। এর ভেতর কোনো ধরনের ইস্যু যেমন, সামরিক বিষয় আনা যাবে না। মিলানো যাবে না, হারাম জ্ঞান করতে হবে। বন্দর প্রজেক্টকে পরবর্তিতে কখনও প্রয়োজনে বা সময়েও সামরিক ব্যবহার করা যাবে না এই সুযোগ আগে থেকেই মুখবন্ধেই ঘোষণা দিয়ে নাকচ করে রাখতে হবে।
০৫. তিন রাষ্ট্রের কারো সাথে এমন কোনো সম্পর্কে যাওয়া যাবে না, যেটা দেশের নয় বরং ক্ষমতাসীন নিজ দলকে ক্ষমতা রাখতে সুবিধা পাওয়ার জন্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে – কারণ এর অর্থ হবে, নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেও একই কাজ করতে উসকানি দেয়া ও আগাম নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট দিয়ে রাখা।
০৬. এই তিন রাষ্ট্রের যেকোন কারো কাছ থেকেই যেকোনো সামরিক হার্ডওয়ার অবশ্যই কেনা যাবে; কিন্তু কোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, যেটা বিশেষত অন্য দুইয়ের যেকোনো এক অথবা দুটোরই বিরুদ্ধে তৎপরতা মনে হয় এমনটতে জড়ানো যাবে না। যেমন, চীনা সাবমেরিন বা আমেরিকান হার্ডওয়ার বা পুরান নেভি আইটেম কেনা, বা অল্প দামে পাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু এর বদলে অন্য দুই যে কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি বিশেষত যেটা এই তিনের অন্য যেকোন রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তা করা যাবে না।
০৭. কোনো “প্রতিহিংসায়” তিনের কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, পথ চলা বা পরিচালিত হওয়া যাবে না। তাতে অতীতে ওই রাষ্ট্র আমাদের নিজ দেশেরই কোনো এক রাজনৈতিক দলের সাথে বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক রক্ষা করে থাকুক না কেন। এর কারণ, আমাদের কোথাও না কোথাও ফুলস্টপ বলতে হবে। কেয়ামত সে কেয়ামত সেটা চলতে দেয়া যাবে না। কারণ প্রতিহিংসার সূত্রে আবার ভবিষ্যতে এই তিনের আর এক রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ ফেবার দেয়া অথবা বঞ্চিত কোনোটাই দিতে করতে শুরু হতে দেয়া যাবে না। যেমন ভারতের এখনকার ভূমিকার জন্য প্রতিহিংসা করা যাবে না। ভারত অথবা চীনকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক সহযোগিতায় জড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

ওপরের এই সাতটা পয়েন্ট দিয়ে যা বলতে চাচ্ছি তা হল পুরা বিষয়টা বুঝিয়ে বলার সুবিধার জন্য কেবল। এটা অবশ্যই এই সাত পয়েন্টই সব কথা বা শেষ কথা, তা মনে করে নেয়া ভুল হবে।

ঘটনার ব্যকগ্রাউন্ড শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার পরপর দু’বারের বিগত সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজা পাকসে। তার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহকে তাঁর কালে প্রথম বলপ্রয়োগে দমন ও বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপকে সমূলে উৎখাত করে দেয়া হয়েছিল। এ কাজে চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল। জাতিসংঘে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও এসংক্রান্ত চাপ সামলাতে ভূমিকা রেখেছিল দেশটি। ফলে বিদ্রোহ দমন-উত্তর পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার পাকসের সরকারকে চাপ সামলানোর দিক থেকে চীনের খুবই উল্লেখযোগ্য সহযোগিতার ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া আবার ঐ আমলে চীনের বিপুল বিনিয়োগও শ্রীলঙ্কায় এসেছিল। আর সর্বশেষ চীনের দুই সাবমেরিনের বহর তিনি শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করতে দিয়েছিলেন। কী বয়ানে কী সম্পর্কে চীনা সাবমেরিন এসেছিল, তা সাধারণ্যে যথেষ্ট স্পষ্ট জানা না গেলেও ভারতের সরকারের ও মিডিয়ায় এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল প্রবল। কারণ টেনশন কমিয়ে দূরে রাখার জন্য অনেক সময় ‘শুভেচ্ছা সফরেও’ নৌজাহাজ আমেরিকারটা চীনে অথবা চীনেরটা আমেরিকায় যায়। এমনকি আবার ‘যৌথ সামরিক মহড়াও’ হতে দেখা যায়।

মুক্তামালায় ঘিরে ধরার গল্প
এছাড়া  এ প্রসঙ্গে আর এক কথা বলা ভালো। বিগত ২০০৫ সালে বুশের আমলে ভারত-আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক শুরু হয়। এমনটা শুরু হওয়ার আগে ভারত সরকারের সামরিক, স্ট্র্যাটেজিক, নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোয় থিংক ট্যাংক বা এমন বিষয়ে গবেষণা খাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভারত সরকারি বিনিয়োগ খুবই কম ছিল। এরই অবসান ঘটেছিল, সামরিকসহ বহুবিধ খাতে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা চুক্তির যুগ ২০০৫ সালে শুরু হলে থিংক ট্যাংক বা গবেষণা খাতেও আমেরিকা সহযোগিতা দেবে এমন চুক্তি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান গড়তে সহযোগিতা দেবে বা আমেরিকান থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলবে, আমেরিকান পিএইচডি স্কলারশীপে বা কাজের খরচ যোগাতে স্কলারশিপে যৌথ গবেষণার কাজ করবে,   ইত্যাদি নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এতে আসল যে ঘটনাটা ঘটে যায় তা হল, আমেরিকান থিংক ট্যাংক-গুলোর বয়ান, দৃষ্টিভঙ্গি এরপর থেকে ভারতীয় ইনটেলেক্টদেরও বয়ান দৃষ্টিভঙ্গি হতে শুরু করে যায়। বিশেষত আমেরিকার চীনবিরোধী বা ক্যাম্পেইনমূলক যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর বয়ান ভারতে ভালোমতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেসব বয়ানগুলোই আবার এদের লেখা কলাম বা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সুত্রে ভারতীয় মিডিয়াতে ছেয়ে ফেলে। যেমন চীন নাকি গভীর সমুদ্রবন্দর বানিয়ে ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অথবা চীন ভারতকে সামরিক দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে। লাফলে ভারতীয় মিডিয়ার কল্যাণে এগুলো অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও পপুলার প্রপাগান্ডা এবং একচেটিয়া বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই প্রপাগান্ডা বয়ানের দুর্বল দিক হল, যেন গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো বিষয়টা সামরিক উদ্দেশ্যেই একমাত্র হয়, এটা ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ বন্দর বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্যই হতেই হয় বাণিজ্য। বাণিজ্য উদ্দেশ্য সাধিত হবার পরে পড়ে পাওয়া সুবিধা হিসাবে সামরিক কাজে এর ব্যবহার এটা অপ্সহনাল ব্যাপার। কখনই মুল উদ্দেশ্য হয় না। কারণ একমাত্র বাণিজ্যিক আয় দিয়েই কোন বন্দর বানানোর কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিপুল খরচ তুলে আনা সম্ভব। সে জন্য বাণিজ্যই একমাত্র ও  মুখ্য উদ্দেশ্য হতে বাধ্য। যদিও এরপর বন্দর মালিক রাষ্ট্রের অভিপ্রায় থাকলে এর দ্বৈত ব্যবহার হিসেবে সামরিক কাজে তা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় কেবল ভারতকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো করা হচ্ছে, তবে তা সত্যের অপলাপ এবং প্রপাগান্ডাই হবে। এ ছাড়া মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বলতে যে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, সেটাও কতটা সত্যি তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
এপর্যন্ত পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় দুটো গভীর সমুদ্রবন্দর হয়েছে, তাতেই মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বয়ান শুরু হয়। বাংলাদেশের সোনাদিয়া তখনো আলাপে আসেনি।বা এখনও বাস্তবায়নের আলাপ নাই। কিন্তু এই প্রপাগান্ডায় যে ফ্যাক্টসকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয় তা হল, চীনের উত্তরপুর্ব দিক ছাড়া বাকি তিন দিকের ভুখন্ড ল্যান্ড লকড – ভুবেষ্টিত। সমুদ্রে বের হবার পথ নাই। বিশেষ করে চীনের পুরা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পুর্ব দিক পাহাড় পর্বতে অগম্য। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পুর্ব সীমান্ত পুরাপুরিভাবে ল্যান্ড লকড হলেও তা ছুটাবার কিছু সুযোগ আছে। যদিও ওসব দিক দিয়ে কোন সমুদ্রে বের হওয়ার উপায় নেই, কিন্তু চীনের পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব (কুনমিং) অঞ্চলের মানুষকে পুরা চীনের সাথে সমানতালের বিকাশে আনতে চাইলে চীনকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে বন্দর বানিয়ে দিয়ে ওই বন্দর নিজেরও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্রেতা হিসেবে হাজির হলে তা উভয় দেশেরই লাভ হতে পারে। যার মূল কারণ চীনও ওসব বন্দরের ব্যবহারকারি হবে বলে এই অর্থে বিনিয়োগ পরিকল্পনার খরচ তুলে আনা ভায়াবল হয়, তাই। অন্য দিকে চীনেরও ল্যান্ড লকড দশা ঘোচে। অর্থাৎ মুক্তোমালার গল্প থুয়েও আমরা এর ভিন্ন ও আর এক বয়ান পেতে পারি। অর্থাৎ পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ চীনকে দেয় তবে সবারই বাণিজ্যিক লাভ হয়। তাই চীনের ল্যান্ড-লকড দশার দিকে নজর না দিয়ে কেবল ভারতকে ঘিরে ধরার জন্য এই বন্দর নির্মাণ করছে এই বয়ান খুবই নিম্নমানের প্রপাগান্ডা। এখন এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগের উপরে চীনকে সামরিক ব্যবহারের সুযোগ খুলে তখন ভারতের প্রপাগান্ডা অর্থপুর্ণ হতে পারে। আপাতত এবিষয়ে  কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ছায়া চিহ্নও নাই।

গল্পের বিকল্প ও বুদ্ধিমান হওয়া
তবু ভারতের মনে সন্দেহ আছে এটা বাস্তবতা। এই আলোকে ভারত বুদ্ধিমানভাবে ইতিবাচক হতে পারে। যেমন এসব বন্দর ব্যবহারের চুক্তি যেন অ-সামরিক থেকে যায় এই স্বার্থকে লবি বা পারশু করা। বিশেষত ভারতও ওসব বন্দর ব্যবহারকারি হয়ে নাম লিখানো সবচেয়ে ভাল। সেক্ষেত্রে ঐ বন্দর “কেবল বাণিজ্যিক কাজেই” ব্যবহারকারি সকলে ব্যবহার করবে একথা মুখবন্ধ ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া সহজ। যেমন  বাংলাদেশের বেলায় তো এটাই সহজ পথ।
বিশেষ করে যেমন, বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর যদি হয়, তবে বাস্তবতই এর ব্যবহারকারী হবে চীন ও ভারত উভয়েই। কারণ এরা উভয়েই – চীনের বেলায় ওর দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশ (কুনমিং) এবং ভারতের বেলায় ওর পুরা সাতভাই পূর্ব দিক ল্যান্ড লকড। কারণ এখানেও আবার বন্দরের ব্যবহারকারী বেশি হবে বলে বন্দর বানানোর বিনিয়োগ খরচ তুলে আনার সম্ভাব্যতা সম্ভাব্য এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো এবং কম সময়ে ঘটবে। আর সে জন্য এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশকে আগেই ঘোষণা করে বলতে হবে এবং বলা সম্ভব যে বিদেশীদের এই বন্দরের সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ যে বন্দরের সম্ভাব্য ব্যবহারকারী চীন ও ভারত উভয়েই, সেখানে একমাত্র আগেই নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে তবেই এই প্রকল্প নেয়ার পথে আগানো সম্ভব।

যা-ই হোক, আমাদের শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে ফিরে যাই।  শ্রীলঙ্কার হাম্বনটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর এমনিতেই অনেক আগে থেকেই ‘মুক্তামালায় ঘিরে ধরার’ প্রপাগান্ডার শিকার। এর ওপর আবার শ্রীলঙ্কায় চীনা সাবমেরিন আসাটা, বোঝা যায় এটা যথেষ্ট সেনসিটিভিটি বা সতর্কতার সাথে করা হয়নি, তা আজ বলাই বাহুল্য। এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচনে রাজাপাকসেকে সরাতে ভারতের বিশেষ হস্তক্ষেপ তৎপরতার অভিযোগ পাকসে ক্যাম্প থেকে উঠেছিল। শ্রীলঙ্কায় পরপর দু’বার নির্বাচন ঘটিয়ে পাকসের বিপরীত ক্যাম্প ‘চীনের সে বাড়তি প্রভাব’ দূর করেছে। আপাতত নতুন সরকার থিতু হয়েছে। সেসবের বিস্তারে এখানে না গিয়েও বলা যায়, রাজা পাকসের অতিরিক্ত চীনের দিকে ঢুকে যাওয়ার অভিযোগ কমবেশি সত্য। এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেই শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত সম্ভবত বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সাথে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে।’
আবার সমান সম্পর্ক বলতে এক ধরণের ভারসাম্যমূলক এক সম্পর্কের কথা তিনি বলছেন। কিন্তু এখানে সমান মানে ‘সমান দূরে’ ঠিক তা নয়। আবার ভারসাম্য বলতেও লাঠির এক দিকে চীনকে, অন্য দিকে ভারতকে বেঁধে কাঁধে নেয়ার ভারসাম্য ঠিক তাও নয়। বরং ওপরে যে সাতটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছি সে আলোকে এটা বোঝা যেতে পারে। যার সারকথা হলো, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাকে ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব অবিশ্বাস ও সন্দেহের ভেতরে, ওর অংশ হওয়া যাবে না। এটা ভুল হবে। এই অর্থে এটা সমান সম্পর্ক বা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক।

সতর্কতা
এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, এ কালের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সম্পর্ক সব সময় বিশেষ। েই অর্থে যে, তা কোনভাবেই আর আগের দিনের (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার আগের) মত নয়। কোনোভাবেই তা রাশিয়া-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের কালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা যাবে না, গেলে ভুল হবে। স্পষ্টতই কারণ এখানে চীন-ভারতের দ্বন্দ্বের কথা যেমন বলা হচ্ছে ঠিক, তেমনই সেই চীনের সাথেই আবার মোদি সরকারের আমলে ভারতের ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, কাজ চলছে। চীন-ভারত উভয় পক্ষের বাণিজ্যের বাজার ৭০ বিলিয়ন ডলারের কম নয়। এ দিকগুলো মনে রেখে ভারত-চীন সম্পর্ক বুঝতে হবে।

অস্থির উথালপাথাল সময়ে বুদ্ধিমান প্রুডেন্ট হওয়াই একমাত্র ভরসা।

[এই লেখাটার আগের ভার্সান দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটা আরও পরিবর্তন, সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল]

“মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি

“মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি
গৌতম দাস
২৬ আগষ্ট ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-bf

গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সে সফরের পর দেশের সরকার বা বিরোধী দল অথবা কোন বিদেশী কূটনীতিক কেউ দায়িত্ব নিয়ে বলেনি নরেন্দ্র মোদি কী মেসেজ রেখে গেলেন। কিন্তু কানাঘুষা,আর অনুষঙ্গী ঘটনাবলিতে ক্ষমতাসীনদের আচরণ বক্তব্য থেকে দিনে দিনে এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, মোদি-হাসিনা এবং মোদি-খালেদা আলোচনায় একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয় ইস্যু হিসাবে উঠেছিল। অনুমানে ধরে নেয়া এই আলোচনার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় এমন দু’টি শব্দ এরপর থেকে রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত হয়ে উঠতে দেখা যায় – “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি”। এই ব্যাপারটাকে উল্টো করে বলা যায় যে, “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু হওয়া থেকে বোঝা যায় মোদির সফরে নির্বাচন বিষয়ে একটা ইস্যু সেখানে উঠেছিল। আর একটু স্পষ্ট করে বলা যায়, নির্বাচন বিষয়ে অনুমান করা ঐ আলাপের সারকথা সম্ভবত এরকম যে, “সকলকে নিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা দরকার কারণ রাজনৈতিক সঙ্কট এভাবে ফেলে রাখাটা আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে”। মোদির সফর- উত্তরকালে মোদির এই মেসেজের অর্থ কী অথবা কেমনে কী অর্থ দাঁড়িয়ে যায় সেসব সম্ভাবনার আগেই সম্ভবত শেখ হাসিনার সরকার এবং ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নিজেই এর অর্থ নিজের মত করে সাজানো শুরু করে দেয়। সে অর্থটাই সম্ভবত “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু করেছে। তবে এথেকে “মধ্যবর্তী নির্বাচন” কথাটার অর্থ কমবেশি সহজে বোঝা যায় কিন্তু “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” কথাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী?

এখানে তামাশার দিকটা হল, বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে জামায়াত ছাড়া না জামায়াত সহ এই শর্ত আওয়ামী লীগের মুখ থেকে আসছে। এক্ষেত্রে এমন একটা ভাব তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে যেন এখানে আওয়ামী লীগ দাতা আর বিএনপি গ্রহীতা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপির ক্ষমতাদাতা নয়। আওয়ামি লীগ নিজে বড়জোর নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে আবার নিজের মত করে একটা নির্বাচন দিতে পারে, তাই নয় কি? কারণ এটা কারো না বুঝতে পারার কারণ নেই যে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে অনেক কিছু হয়ত দিতে পারে কিন্তু এর পরেও যা কখনই দিতে পারে না তা হল ক্ষমতা। আর যাই হোক, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতাদাতা হতে পারে না। হওয়ার কথাও নয়।
তবু এই সরল কথাটা আড়াল করে একটা ভাব ছড়ানো হয়েছে যেন এক শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপির ক্ষমতাদাতা হতেও পারে। কি শর্তে? যে, বিএনপি যদি জামাতমুক্ত হয় তবে যেন সে লীগের কাছে থেকে ক্ষমতাও পেয়ে যেতে পারে! তাই আওয়ামি লীগ এখান থেকেই বিএনপিকে নির্দেশদাতা হবার ভান ধরেছে, বলছে যে জামাতমুক্ত হয়ে যাও তুমি!

এ’এক সত্যি বিরাট তামশা। শুধু তাই না। এছারা এখানে এভাবে আর একটা ইঙ্গিত তৈরি করা হয়েছে যেন ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এর পক্ষে সাফাই দিচ্ছে এমন যেন নেহায়ত বাধ্য হয়ে ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামি লীগ নিজেকে বৈধ সরকার বলে দাবি করেছে। যেমন, লীগের হস্তক্ষেপ ছাড়া একটা ফেয়ার নির্বাচন হলে তাতে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে পড়লেও যেন আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল না,থাকত না। কিন্তু লীগের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এজন্য যে, ওই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতযুক্ত থেকে যাবার কারণে সহযোগী জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে আর কেবল ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের আপত্তি। জামাত ঠেকানোর মহান কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্যই যেনবা জবরদস্তিতে আওয়ামি লীগ নির্বাচন না হতে দিয়েও নিজেকে নির্বাচিত দাবি করছে! তাই কী? আওয়ামী লীগের এমন সাফাই, এমন ইঙ্গিত অবশ্য কেউই বিশ্বাস করে না, এমনকি তারা নিজেরাও না। এটা যে ছলনামূলক মিথ্যা কথা, কেউ বিশ্বাস করবে না জেনেও মুখরক্ষার জন্য বলা কথা তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সবাই জানে, মানে। তবু তাদের এই কথা বলা ছাড়া মুখরক্ষার সাফাই হিসেবে আর কিছু বলার নেই। এই হল, “জামাতমুক্ত বিএনপি দেখতে চাওয়া” আওয়ামি লীগের আবদারের সারকথা।
তবে এ বিষয়ে আরও করুণ অবস্থা ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেখানেও হবু নির্বাচনের পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো এবং এরশাদকেও হবু নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য যে যুক্তি তিনি এরশাদকে দিয়েছিলেন এরশাদের সাথে সুজাতার মিটিং শেষে তা গরম থাকতে থাকতেই এরশাদ নিজেই মিডিয়াকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন। সুজাতা সিং বলেছিলেন জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাবে তা ঠেকানোটা এরশাদের আসল কাজ। মহান দায়িত্ত্ব। আর জামায়াত ঠেকাতে হবে সে জন্য এরশাদকে হাসিনার সাথে নির্বাচনে যেতে হবে। আর এই মহৎ কাজের জন্যই বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে রাখার যে সুযোগ পাওয়া গেছে তা ব্যবহার করতে এরশাদের নির্বাচনে যেতে যেন দ্বিধা না করেন। সুজাতার যুক্তির সারকথা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাকে “জামাতমুক্ত” দেখতে যাওয়ার খায়েশ। বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামি লীগকে ভোট না দিলেও জবরদস্তিতে লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার ভারতের ব্যকুলতা কত তীব্র ছিল যে একটা ভাল সাফাই যুক্তি যোগাড় করতে না পারলেও বাংলাদেশে এমন ন্যাংটা হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলতে সুজাতা কত ডেসপারেট ছিলেন।
সুজাতা সিং সেসময়ের ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মধ্যে শীর্ষ কূটনীতিক। এই শীর্ষ কূটনীতিকের এটা নিঃসন্দেহে তার করুণ দুর্দশার চিত্র। তিনি তার হস্তক্ষেপের কাজকে,এরশাদের সাথে মিটিংয়ের বক্তব্যের স্বপক্ষে পাবলিকলি কোন সাফাই হাজির করতে পারেন নাই। এর ফলে তাঁর কথা হয়ে গেছে এমন যে, বাংলাদেশের মানুষ যদি চায়ও বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দেবে, নিজেদের প্রতিনিধি বলে নির্বাচন করবে তবু সুজাতার ভারত তা হতে দিতে পারে না। আচ্ছা, এটা কি কোনো অতিথি পররাষ্ট্র সচিব বলতে পারেন? সেটা কি বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচন করবে, নেতা প্রতিনিধি মানবে এর বিরুদ্ধে সুজাতার সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাধা দেয়ার সফর ছিলো না? সম্ভবত সে জন্য এর পর থেকে তিনি আর কখনো বাংলাদেশে মিডিয়ার মুখোমুখি হননি।
সেই থেকে এবারও ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একই দুর্দশা দেখা যাচ্ছে। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে এবারও র‍্যাশানালিটি বা যুক্তি-বুদ্ধি হাজির করতে পারছে না। তাদের সব যুক্তির প্রধান কথা সবসময় যা থাকে তা হচ্ছে, বাংলাদেশের “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বা তাদের উত্থান” – এই বিষয়ে তারা উদ্বিগ্ন। খুবই ভালো কথা। ফ্যাকটস হিসেবে ভারতের এমন উদ্বিগ্নতার পক্ষে সত্যতা আছে কি না সে তর্ক না তুলেই ভারতের উদ্বিগ্নতা স্বীকার করে নেয়া যাক।
কিন্তু সে জন্য তারা বাংলাদেশের জনগণ কাকে ভোট দেবে তা কি ঠিক করে দিতে পারে? একটা হস্তক্ষেপের নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে? জনগণ কোন দলকে কোন নেতাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে? ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে,তাদের পছন্দের নেত্রীর পাবলিক রেটিং যদি না থাকে তারপরও কি তাদের জিতিয়ে আনার পক্ষে কিছু করার সুযোগ থাকে?
আমরা এখানে খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন তুলেছি। প্রশ্নটা হলো, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে, নেত্রীর নিজ গুণেই যদি নিজেদের পাবলিক রেটিং ধরে রাখতে না পারেন, না থাকে তাহলে কি তারা বাংলাদেশে একটা হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন হতে দেবে না? এসব বিষয় মোটেও কোনো বিশাল কিছু নয়। এসব প্রশ্ন তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৪১ সালে রুজভেল্ট-চার্চিলের বিখ্যাত আটলান্টা চার্টারে সমাধা হয়ে গেছে, সেকালেই। এটা এখনও যারা মানতে পারে না তারা নিশ্চয় এখনো কলোনি শাসনের পক্ষের লোক। অথচ সে সময়ই এটা দুনিয়াতে সমাধা হয়ে গেছিল যে, জনগণকে পছন্দের নেতা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না দেয়া, নেতা বেছে নিতে না দেয়া মারাত্মক অপরাধ। অন্য রাষ্ট্রের এমন কাজের কোনো অধিকারই নেই। ভিন রাষ্ট্র বা পড়শি রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের নির্বাচিত কোনো নেতাকে বড় জোর প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোন নেতাকে নির্বাচিত হতে,বেছে নিতে জনগণকে কোনোক্রমেই বাধা দিতে পারে না। ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একালে এমন অধপতিত দশায় পড়তে হয়েছে যে তারা প্রত্যক্ষ বাধা দিচ্ছেন। আবার তাদের কাজের পক্ষে যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়েও দাঁড়াতে পারছেন না। খোলাখুলি হাসিনার গায়ের জোরের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে।
তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোড়ার সঙ্কট হলো, হাসিনার আওয়ামী লীগ পাবলিক রেটিং নেই। অথচ ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা সেই হাসিনার ওপর সব বাজি ধরে বসতে চান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন একটা করিয়ে নিয়েছেন,কিন্তু শান্তি নেই। নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন এটা এখন স্বীকার না করে পারছেন না। রা নির্বাচন না দিলে আরো বড় বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। ঘটনা পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে হাতছুট হয়ে যেতে পারে সে সম্ভাবনার রিস্ক নিতে হবে।
তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপির কথা পাড়তে হচ্ছে। অথচ বুঝতে চাইছেন না যে আওয়ামী লীগের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ শর্ত আওড়ানোর কোনো মানে হয় না। কারণ এর মানে কী বিএনপি জামায়াতমুক্ত হলে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতা দেবে? ক্ষমতায় এনে দিবে? আর বিএনপি যদি জামাতমুক্ত না হয় তাহলে লীগ কোন ফেয়ার বা হস্তক্ষেপহীন নির্বাচন হতে দিবে না? এটাই কী ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের অবস্থান বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি? ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ কথাটার পক্ষে সাফাই?

অন্য আর একদিক থেকে বললে, জামায়াতমুক্ত বিএনপির বাসনা অবশ্য আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের থাকতেই পারে – যদি সেটা তাদের বাসনা মাত্র হয়। কারণ আইনগতভাবে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র শর্ত আরোপ করতে পারে জনগণ অনুসমর্থিত কনস্টিটিউশনাল একটা রেফারেন্ডাম। দেশের ভিতর কে কেমন পার্টি হবে এটা বিএনপির আওয়ামী লীগের উপর কিংবা আওয়ামী লীগের বিএনপির উপর আরোপ করার বিষয় নয়। ঠিক যেমন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বা ভাইসভারসা কেউ কাউকে ক্ষমতায় আনতে পারে না,এমনটা অবাস্তব ঠিক তেমনই শর্ত দিতে কিংবা শর্ত পূরণ করলে তবেই অন্যকে ক্ষমতায় আনব এটাও অবাস্তব। অর্থহীন কথাবার্তা। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে কথা বলার দিক থেকে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা কেউ না, কোনো পার্টিই নয়।
এ কারণে বিএনপির কোনো নেতা অথবা কোনো সুশীল বুদ্ধিজীবী অথবা প্রথম আলোর উপসম্পাদকের মতো কোনো মিডিয়া কর্মী যখন এমন কথা ছড়ায় যে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ হতে হবে এটা হাস্যকর। অবাস্তব। এক্ষেত্রে তারা অবশ্যই আদতে আওয়ামী কর্মী না হলে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দার স্বার্থ পালনকারী।

এখানে বলে রাখা ভাল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা “জামায়াতমুক্ত” অথবা “জামায়াত বিরোধিতা” এমন কথা বলে বা লিখে কেবল জামায়াত রাজনৈতিক দলকে বুঝায় না। তারা আসলে বুঝাতে চায় যেকোনো ইসলামি রাজনীতি বা রাজনীতির সমর্থক; এক কথায় বললে ইসলামি ফেনোমেনা বা পুরা ইসলামি কনস্টিটুয়েন্সি। এখন আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তারা সবাই আসলে বুঝাতে চায় তারা বাংলাদেশে কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ, রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা তারা দেখতে চায় না। যদি তাদের চাওয়াটা ন্যায্য বলে ধরেও নেই তবু এটা বাস্তবায়ন করার উপায় লীগ-বিএনপির এক দল অপর দলকে শর্ত দেয়া নয় বরং জনসমর্থিত (রেফারেন্ডাম বা তুল্য কোনো কিছুর মাধ্যমে) এমন একটা কনস্টিটিউশন হাজির করে তা নিশ্চিত করা। কারণ এক দল অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার কেউ নয়। কোন রাজনীতি কে করতে পারবে তা একে অপরকে ডিকটেক্ট করার তারা পরস্পরকে বলার কেউ নয়।
আবার বাংলাদেশে কোনো “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না” আর বাংলাদেশে কোনো “ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ,রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা থাকতে পারবে না” বলা এক কথা নয়। প্রথম বক্তব্যটা কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্যটার বেলায় ইসলামি নাম নিয়ে আইনত কিছুই থাকতে পারবে না। তবে অবশ্যই নাম না নিয়েও তা থেকে যাবে। কারণ আইন করে একটা রাজনৈতিক চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না। আবার প্রথম কথাটা পড়শি ভারতসহ যেকোনো বিদেশী আশা করতে পারবে। মানে “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে বলতে পারবে, আশা করতে পারবে। কিন্তু এরপরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকলে তা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে বিদেশীরা কিছু বলার কেউ নয়।
আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওপরের শেষ বাক্যটা। অর্থাৎ ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ বলে কিছু হবে কি না এ নিয়ে ভারতের কিছু বলার নেই। ভারত বলার কেউ নয়। ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না’ এমন ধরনের কথা বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। আর এ নিয়ে ভারতের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু এসব আইনি সাংবিধানিক কাজের দিক দিয়ে না এগিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ কথা বলানো খুবই বিপজ্জনক। কারণ একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাস্তবতা হলো, “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে মেজরিটি মানুষের একটা কনসেনসাস জনমত আছে। জনমত জরিপেও সেটা প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যদি বলা যায় “কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলই বা ফেনোমেনাই বাংলাদেশে থাকতে পারবে না” সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে এই একই জনগোষ্ঠী বা জনমতের মেজরিটি উল্টো রায় দেবে। শুধু তাই নয়,চাপাচাপি করতে যাওয়ার জন্য নিজের দেশ ভূমি জমিতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখতে চায় না এর সপক্ষের মেজরিটির ঐকমত্যের জনমতটাও এরপর আর থাকবে না। হত্যা করা হবে।
এ ছাড়া একটা কথা সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় হয়েছে যে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির’ হতে পারে বা থাকতে পারে এটা ভারতের স্বার্থের বা উদ্বিগ্নতার বিষয় নয়। ভারত বরং এসব বিষয়ে তত সিরিয়াস নয়। বিষয়টাও তত সিরিয়াস নয়। রাষ্ট্রের রুটিন তৎপরতাতে সেসব দিক নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সম্ভব এবং তাই হচ্ছেই। বরং ভারতের সিরিয়াস প্রসঙ্গ হলো, ক. বিনা শুল্কে, বিনা বিনিয়োগে, বিনিয়োগের দায় না নিয়ে ট্রানজিট হাসিল করা খ. বাংলাদেশ চীনের সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সম্পর্কে কতটা পক্ষে বা দূরে থাকবে তা বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থে নির্ধারণ করার বদলে ভারতের স্বার্থে নির্ধারণ করতে বাধ্য করা। ভারত তার নিরাপত্তার উদ্বিগ্নতার কথা বলে এর আড়ালে এসব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে হাসিল করতে জবরদস্তি করে চলছে। এ কাজে কোনো পাবলিক রেটিংয়ে দুর্বল রাজনৈতিক দলই তার জন্য বেশি উপযুক্ত। কারণ যত জনসমর্থন বেশি ভারতের কথা তত সে শুনবে না।

দুই.
গত এক সপ্তাহে খালেদা জিয়ার কথিত এক মন্তব্যকে নিয়ে দু’টি প্রপাগান্ডা রিপোর্ট বের হয়েছে। প্রথমটি ভারতের ‘দি হিন্দু’ (THE HINDU) পত্রিকার খোদ সম্পাদকীয়। দ্বিতীয়টি স্টাটফোর (STRATFOR) নামে আমেরিকান গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স পত্রিকার এনালাইসিস রিপোর্ট। দু’টি রিপোর্টের প্রসঙ্গ একই এবং এটা পরিষ্কার যে, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের প্রভাবে এই রিপোর্ট দু’টি তৈরি। বাংলাদেশে তারা যে অবস্থান বা নীতিতে পরিচালিত সেই নীতির পক্ষে এ দুটোই প্রপাগান্ডা রিপোর্ট। হিন্দু সম্পাদকীয় বের হয়েছে ২৮ জুলাই আর স্টাটফোরেরটা বের হয়েছে ৩০ জুলাই। দু’টি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়া নাকি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছেন। ফলে তাতে নাকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

হিন্দু দাবি করছে, ‘BNP’s decision to drop its demand for the formation of a caretaker government। আর স্টাটফোর দাবি করছে, Khaleda Zia has indicated that parts of the opposition might be willing to drop some of their demands — such as imposing a neutral caretaker government to oversee elections.
প্রথমত তথ্য হিসেবে এটা মিথ্যা যে, খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছেন, বা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই খালেদা জিয়া তার গুলশানের অফিসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সময় নাকি এ কথা বলেছেন। বিডিনিউজ২৪ পত্রিকার রাজনৈতিক লাইন বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক লাইনের সবচেয়ে কাছাকাছি। ফলে এখানে পর্যবেক্ষণ হল, সরকার আর ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের কমন অবস্থানটাই সবচেয়ে ভালো প্রতিফলিত হয় এই পত্রিকার রিপোর্টে। সেই বিডিনিউজ ঐদিনের প্রসঙ্গে খালেদার কথা কী বুঝেছে তা দেখা যাক। বিডিনিউজ২৪ ইংরাজী শিরোনাম করেছে, Khaleda says fairness is the key, caretaker or no caretaker’। আর ভেতরে কোট আনকোট লিখছে, ‘It is not necessary that elections should be under a caretaker government. Whatever it is called, we want a neutral government to ensure free and fair elections’। এতটুকু পড়ে যে কারো নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ত্যাগ করেছেন এমন বুঝ এখান থেকে বের করার সুযোগ নেই। কারণ সারকথা হলো, খালেদা জিয়া ‘কেয়ারটেকার’ শব্দ নিয়ে আঁকড়ে বসে থেকে ঝোলাঝুলি না করে ‘হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন’ দাবি তার মূল কথা এটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ বিডিনিউজ অন্তত ভুল বা উল্টো বোঝেনি। তবু হিন্দু আর স্টাটফোর বুঝেছে।
তবু কি আর করা যাবে এবার তাদের বোঝার যুক্তিবুদ্ধি বা লজিকটা কী তা পরখ করা যাক।

খালেদা জিয়া কেয়ারটেকার দাবিটা যদি ত্যাগ করেই থাকেন তো সেটা ইতিবাচক বা তার মধ্যে আশার আলো দেখার কি আছে?
গত দু-তিন বছরে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনগুলোর ন্যূনতম ফেয়ারনেস বা গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে যদি এই দুই মিডিয়া রিপোর্টারের ধারণা না থাকে তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এমন সম্পাদকীয় বা বিশেষণ লেখার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুতরাং ধরে নিতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার গুরুতর সঙ্কট যে আছে এটা তারা জানেন। আর কে না জানে হাসিনার অধীনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নেই এ জন্য নয় যে বিরোধীরা তাতে অংশগ্রহণ করেনি। অংশগ্রহণ করলেও সেখানে আরো মারাত্মক সঙ্কট আছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি নির্বাচন এর সাক্ষী যেখানে খোদ খালেদার গাড়িতে নিয়মিত আক্রমণ করতেও শেখ হাসিনা দ্বিধা করেনি। ভোট কারচুপির ডেস্পারেটনেস দেখার মতো। তাহলে এ অবস্থায় খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছে সুতরাং এটা ভালো খবর হিসেবে উদযাপন করা উচিত, তাই কী? তার মানে এই পত্রিকা দু’টি একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হওয়াটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন খালেদার কথিত কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দেয়া, এটাকে আবার তাদের ভালো এক ‘আপসরফাও’ মনে হয়।

পত্রিকায় রিপোর্ট লিখতে গেলে ন্যূনতম কিছু এথিকসের ওপর দাঁড়াতেই হয়। একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে সব পত্রিকা দাঁড়াবে এটাও তো স্বাভাবিক। আমরা এখানে দেখছি পত্রিকা দুটো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো দরকার মনে করছে না। এর চেয়ে বরং না করে কথিত আপসরফা করে ফেললে আমাদেরকে খুশি হতে তাগিদ দিচ্ছে। পত্রিকা দুটো নিজেরাও দেখা যাচ্ছে এ খবরে খুশি হয়েছে। নির্বাচনটা এখন বিশ্বাসযোগ্য না হলেই বরং এই দুই পত্রিকা খুশি দেখা যাচ্ছে। এ কেমন খুশি? কেমন এথিকসবোধ?

স্টাটফোরের নামে সম্প্রতিকালে দাগ লেগেছে। সম্প্রতি উইকিলিকস সিআইএর সাথে তাদের অনৈতিক যোগাযোগের ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। নইলে এর আগে এটা যথেষ্ট সম্মানজনক পত্রিকা ছিল। কিন্তু ‘হি্ন্দু’ (১৮৭৮ থেকে প্রকাশিত) মাদ্রাজ থেকে বের হওয়া প্রায় দেড় শ’ বছরের পুরানো ইংরেজি পত্রিকা। যেকোনো পত্রিকা তার দেশে-বিদেশের রিপোর্ট করতে গিয়ে তার সরকারের অবস্থান তাকে কাঁধে করে ঘুরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যদি না মনিকাঞ্চন বা অনুগ্রহ লাভের কোনো ব্যাপার না থাকে। এ ছাড়া এটা সম্ভবও নয়। কারণ সরকার অনেক সময় অনেক অবস্থান নেয় অনেক কারণে, অনেক স্বার্থে। এর সবগুলো সবসময় ওই পত্রিকারও স্বার্থ হবে এমন কোনো কারণ নেই। বরং না হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন নিজের দেড় শ’ বছরের ইমেজ রাখার স্বার্থ আর আমলা-গোয়েন্দা বাহিনীর প্রপাগান্ডা রিপোর্ট এই দুই স্বার্থ স্ববিরোধী হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে তা আত্মঘাতী হয়েছে।

এক বিচারে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সফল যে তারা দুটো পত্রিকাকে তাদের প্রপাগান্ডায় শামিল করতে পেরেছে। এতে পত্রিকা দুটো যে এথিক্যাল সঙ্কটে জড়িয়ে গেছে এর দায় ক্ষতি তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। তবে স্টাটফোর আবার হিন্দুর থেকে এককাঠি সরেস। স্টাটফোর দাবি করছে শেখ হাসিনা নাকি গত দু-তিন বছরে যা করেছেন এটা নাকি বিরোধী দল দমন নয়, সন্ত্রাসবাদ দমন। তাই যদি হয় তাহলে আবার খালেদার সাথে আলোচনা, কম্প্রোমাইজ এসবের মানে কি? যে সন্ত্রাসী তার সাথে আবার আলোচনা নিগোশিয়েশন কম্প্রোমাইজ কি হতে পারে? তাকে তো দমন ও নির্মূল করারই কথা। এই প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে স্টাটফোরের মাথায় আসেনি। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে একটা স্পেস ভাড়া দেয়ার রিপোর্ট তারা করছে এটা তাদের কাছেও পরিষ্কার।

তাহলে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র রাজনীতির অর্থ হলো এক আকাক্সক্ষা যে আশা করছে বিএনপি যেমন-তেমন এক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বার যেভাবে হোক বিজয়ী ঘোষণা করে দেয়ার জন্য। মানুষের আকাঙ্খার রকমফেরের আসলে কোনো শেষ নেই।

[লেখাটার প্রথম ভার্সান সংক্ষিপ্ত আকারে আগে ছাপা হয়েছিল গত ০৯ আগষ্ট ২০১৫, মাসিক অন্যদিগন্ত পত্রিকায়। এখানে আবার নতুন করে লিখে, এডিট করে ছাপা হল।]

জয়া চ্যাটার্জির ভিলেনঃ বাঙলার ‘হিন্দু ভদ্রলোক এলিটদের’ নিয়ে তাঁর বিপদ

জয়া চ্যাটার্জির ভিলেনঃ বাঙলার ‘হিন্দু ভদ্রলোক এলিটদের’ নিয়ে তাঁর বিপদ

গৌতম দাস
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-b1

দেশভাগের ১৯৪৭ সাল। এ অঞ্চলের ইতিহাসকে দেখার ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যেকোন প্রশ্ন এখনও ঘুরেফিরে ভারত ভাগকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। তবে সেটা এই কারণে নয় যে, এর মধ্যদিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়েছে। বরং পরিণতিতে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম আর অন্যসব কিছুকে ছাপিয়ে, এখানে আলোচনার প্রধান জায়গা হয়ে উঠে, “ভারত ভাগ”। এবিষয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা বা বয়ানের অভাব না থাকলেও সেসব জড়াজীর্ণতায় ক্লিশে হয়ে আছে। তবে এসবের বাইরে গিয়ে যারা ইতিহাস চর্চা করেছেন বলে একাডেমিক জগতে পরিচিতি আছে তাদের মধ্যে একজন হলেন ভারতের জয়া চ্যাটার্জি। তার পিএইচডি গবেষণার ফলাফল যেটা পরবর্তিতে বই আকারে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস লন্ডন থেকে প্রকাশিত, এর নাম “বেঙ্গল ডিভাইডেড” (১৯৯৪)। পরে বাংলাদেশ থেকে ঐ একই ইংরাজী বই বাংলায় অনুবাদ করে বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয় এর নাম “বাংলা ভাগ হল” (২০০৩)। এই বইয়ে জয়া চ্যাটার্জির বাংলা ভাগের জন্য প্রচলিত ক্লিশে ধারণায় মুসলিম লীগ বা কায়েদে আজম জিন্নাহকে নয় দায়ী করেন নাই, দায়ী করেছেন বাংলার “হিন্দু ভদ্রলোক এলিট” শ্রেণীকে।

বলা বাহুল্য এর ভিতর দিয়ে জয়া চ্যাটার্জি সরাসরি কোন রাজনৈতিক বয়ান নয়, ইতিহাসের এক একাডেমিক বয়ান হাজির করেছেন। ফলে পশ্চিম বাংলায় সামাজিক মিথ ও ইতিহাস হিসাবে ধরে নেয়া চলতি অনেক কিছুকেই জয়া ভিন্নভাবে দেখে এবং জবরদস্তিগুলোকে অস্বীকার করেই “বাংলা ভাগের” নতুন ইতিহাস বয়ান করে গেছেন। তবু জয়া লিখছেন বাংলা দুবার ভাগ হল। ওপার পশ্চিম বাংলার দৃষ্টিতে (১৯০৫ ও ১৯৪৭) দুবারই বাংলা ভাগ হওয়ার ঘটনা দুঃখ ও বিরহের। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, দুবারের একবারও পুর্ববঙ্গের প্রজা কৃষক ও মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গীটা এমন নয়, বরং এর উলটা, তারা খুশি হয়েছিল, আশা দেখেছিল। তাদের চোখে এটা ছিল আনন্দের ও নতুন সম্ভাবনার। এই খুশি হওয়া ঠিক কি বেঠিক হয়েছে, পন্ডিতেরা কি বলেন তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ ঐতিহাসিক সত্য গ্রহণ করা না করা দিয়ে বদলানো চলে না। বরং কেন সেটা সত্য হল বড় জোর তা বুঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। তাসত্ত্বেও পুর্ববঙ্গের অবস্থান দৃষ্টিভঙ্গী যেন ভুল ছিল এমন ইতিহাসের বয়ান খাড়া করার চেষ্টার অন্ত নাই। তবে পুর্ববঙ্গ থেকে দেশান্তরী হিন্দুদের মনোভাব এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, তাদের দুঃখ পাবারই কথা। কে নিজ ঘরবাড়ী ছেড়ে দেশান্তরী হতে চায়, দেশ ছাড়াকে সঠিক মনে করতে পারে। অতএব সার করে বললে কঠিন সত্যিটা হল, বাংলা ভাগ প্রসঙ্গে দুবাংলার মানুষ সবাই একই চোখে ব্যাপারটাকে দেখে নাই। আর দুবারই এমন ঘটেছে। ইতিহাসে সততা চাইলে এসত্য আমরা সবাই মেনে নিতে বাধ্য। ফলে আসলে যা একই চোখে দেখা হয় নাই, সেটা দেখানোর চেষ্টা করতে হবে, জবরদস্তি করতে হবে অথবা মুসলমানদের দেখাটাকে “কারেক্ট” করে দেখাতে হবে এমন চিন্তা ও ততপরতা অর্থহীন। এগুলো ব্যর্থ এবং মতলবি চেষ্টা। তবুও ফ্যাক্টস বা মাঠের সত্য যেটা তা সরাসরি না বলে এর বদলে “কিভাবে দেখা ঠিক এবং বেঠিক” তা দিয়ে ইতিহাসে ঘটনাটাকে দেখতে দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষিতজনদের ভিতরই কেবল এটা প্রবল এবং করা সম্ভব হয়েছে। এমনটা সম্ভব হবার পিছনের সম্ভাব্য একটা বড় কারণ ইতিহাস লেখকেরা খোদ পশ্চিমবঙ্গের অথবা ইতিহাস লেখক পুর্ববঙ্গের হলেও তাঁর চিন্তার উপর পশ্চিমবঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব প্রবল। প্রগতিশীলতার নামে, “অসাম্প্রদায়িকতার” নামে এরাও এগুলো করেছে। সেসব প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিয়ে, চাপা পড়া সত্য সেসব কথার অনেক কিছুই এখন জয়া চাটার্জির মুখ থেকে আসছে।

বাংলা বইয়ের শুরুতে “বাংলা সংস্করণের মুখবন্ধে” জয়া বলছেন, “১৯৮০ সালে আমি যখন এ গ্রন্থের জন্য গবেষণা শুরু করি তখন একটা সাধারণ ও অনুকুল ধারণা প্রচলিত ছিল যে, ভারত বা বাংলার বিভক্তি মুসলমানদের কাজ – হিন্দুরা তাদের মাতৃভুমির অখন্ডতাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে কোন কিছুই করেনি। ঐ সময়ের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণায় প্রকাশ পায় যে, স্বাভাবিক ও ঐতিহ্যগতভাবে হিন্দুত্বের বৈশিষ্ট হল সহনশীল এবং বহুত্ববাদী। তাই হিন্দুত্বে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার সুযোগ নেই। তবে আমার গবেষণায় প্রচলিত ঐ সাধারণ ও তৃপ্তিদায়ক ধারণা তো নয়ই, বরং ভিন্ন তথ্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। ঐ গবেষণায় প্রকাশ পায় যে, বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় তাঁরা সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে কূটকৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা হিসাবে বিভিন্ন ভাবাদর্শকে (ideologies) ব্যবহার করে। সত্যিকার অর্থে ঐ কূটকৌশলকে একমাত্র সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। আত্মরক্ষায় যুযুধান ঐ সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দু ভদ্রলোকদের প্রদেশ ভাগের দাবীর পেছনে যুক্তি ছিল যে, এতে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। আসলে ত্রিশ চল্লিশের দশকে বাঙলায় যা ঘটে এবং উনিশ শতকের শেষ দিকে যুক্ত প্রদেশের উর্দুভাষী ভদ্রলোকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মুসলমান রাজনীতির যে উন্মেষ ঘটে তা একই দৃষ্টিভঙ্গীতে বিবেচনা করা যেতে পারে। এত আমরা উপলব্দি করতে পারি যে, রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশল হিসাবে বিভিন্ন গোষ্ঠি বিভিন্ন সময় তাদের চলমান প্রাধান্যের প্রতিকুল হুমকির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতাকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে”।
উপরের পুরা প্যারাটাই জয়ার লেখা থেকে তুলে আনা লম্বা উদ্ধৃতি, তবে এতে আন্ডারলাইন ও বোল্ড করা আমার। জয়ার চোখে লেখা উপরের বক্তব্যের সারকথা হল – পুরা ঘটনায় ভিলেন হলেন বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকেরা (এলিট)। কিন্তু এর চেয়ে তাতপর্যপুর্ণ হল, জয়া যেভাবে এই এলিটদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। প্রথমে “ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা” – এই তিন বৈশিষ্টায়িত শব্দ ব্যবহার করে তিনি বলছেন, “বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন…” হয়েছিল। অর্থাৎ এলিটদেরকে তিনি বুঝতে বলছেন প্রায় দেড়শ বছর ধরে তাদের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদার রুস্তমি চালিয়ে যাওয়া লোক হিসাবে। এরপর তাদের এগুলো যখন চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ল ফলে একে তিনি বলছেন, “ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু” থেকে আত্মরক্ষার চাতুরি, কূটকৌশল হিসাবে যে মতাদর্শকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিল সেটাকে তিনি বলছেন “সাম্প্রদায়িকতা”।

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটা বেশ অদ্ভুত। বিশেষ ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশির ভাগ সময় এই শব্দ ব্যবহার করা হয় মুসলমান, মুসলিম লীগ বা কায়েদে আজম জিন্নাহর বিরুদ্ধে, এদের গায়ে কালি লাগিয়ে দিতে। উপনিবেশী কলোনী শাসনের প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরা সময় ধরে হিন্দু বাঙালীর আধিপত্য – সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম ছিল। সেকালে বাঙালী বলতে তারা কেবল হিন্দু বাঙালী বুঝত, বুঝাত। ক্ষমতা আধিপত্যের এই সৌধের বিরুদ্ধে যে কোন প্রতিবাদ, চ্যালেঞ্জকে তারা এতদিনের হিন্দু ডোমেনকে ‘অস্থিতিশীল’ করা, নিজেদের শান্তি নষ্ট  হিসাবে দেখত আর প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে পালটা অভিযোগ করত। এই লজিকের অব্যক্ত দিকটা এরকম যে বাঙালী ধারণার ভিতর মুসলমান বলে তো কিছু নাই। ফলে এরা তো গোনায় না ধরা এক প্রজাতি। আন-হার্ড – যাদের কথা শোনার যোগ্য নয়, পাত্তা দেবার কিছু নাই অন্তজ চাষা এমন মুসলমানেরা হিন্দুদের “বাঙালী” ধারণার মধ্যে অস্বীকৃতই তো থাকবে।  মুসলমানদের চিৎকার, প্রতিবাদ, চ্যালেঞ্জকে  বাঙালী (হিন্দুরা) বাঙালী ধারণাকে বিভক্ত করবার চ্যালেঞ্জ হিসাবে মনে করবেই। হিন্দুদের শৌর্যবীর্যে আঘাত মনে করবে। সাজানো বাগান হস্তক্ষেপ মনে করবে। এই অর্থে অতএব এটা সেক্টোরিয়ান বা বিভক্তিসূচক খারাপ কাজ  – “সাম্প্রদায়িক“।

জয়া এই ততপরতাকে এলিটদের সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে কূটকৌশল অবলম্বন করা এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা হিসাবে এক ভাবাদর্শকে (ideologies) ব্যবহার করার কথা বলছেন। বলছেন, “সত্যিকার অর্থে ঐ কূটকৌশলকে একমাত্র সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়”। এক্ষেত্রে জয়ার সাম্প্রদায়িক শব্দটার আসল অর্থ উপরে ব্যাখ্যার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে।

বইয়ে পরবর্তিতে “ভুমিকার” তৃতীয় পৃষ্ঠা থেকে বাকি অংশ জুড়ে অন্তত দশ বারো দিক থেকে এই “ভদ্রলোক” বলতে  জয়া কাদের বুঝাচ্ছেন তা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, জয়া বলছেন, ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের প্রথম বার বাংলা ভাগের সময়ও এই ভদ্রলোকেরাই বাধা দিয়েছিলেন। মুল ইংরাজি এবং বাংলা অনুবাদেও বইয়ের ভুমিকায় জয়া বলছেন, “১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে প্রদেশ ভাগ করতে সেই শ্রেণীর লোকেরাই নেতৃত্বে দেয় যারা বাংলার প্রথম ভাগের সময় থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল, যাদের পরিচিতি ছিল তথাকথিত ভদ্রলোক বা ‘সম্মানিত’ লোক”। [ভুমিকা, পৃষ্ঠা ১]

তার মানে হল জয়া দাবি করছেন, এই “হিন্দু ভদ্রলোকেরা” ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ মানে বাংলা ভাগ করতে বাধা দেয়ার পক্ষে কাজ করেছেন এবং কাজটা ঠিক করেন নাই। তিনি তাঁর লেখায় ১৯০৫ সালের বাংলা ভাগ হওয়ার ব্যাপারটাকে বিষাদময় ঘটনা হিসাবেই দেখার চেষ্টা করছেন? আবার ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগটাকেও জয়া বিষাদময় ব্যাপার হিসাবে দেখেন। যেমন বইয়ের ভুমিকায় শুরুতে তিনি লিখছেন, “হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গার ফলে ১৯৪৭ সালে বাঙলা আবার ভাগ হয়। কিন্তু এসময় প্রায় কারও কন্ঠেই প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হল না………”। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে কারও কন্ঠে অন্তত প্রতিবাদ আশা করছিলেন জয়া। এটাকে প্রতিবাদ করার মত ঘটনা হিসাবে দেখছেন জয়া। সোজা কথায় দেশভাগ বা বাংলা ভাগ ভাল নয় – জয়ার দাবি এটাই। এই চিন্তা প্রস্তাবের উপর দাঁড়িয়ে পুরা বইটা লেখা হয়েছে। তাঁর এই দেখা সঠিক অথবা বেঠিক তা নিয়ে তর্ক না তুলেও বলতে হয়, দেখার এই দৃষ্টিটা কোনভাবেই ওপার বাংলার, পূর্ববঙ্গের নয়। আর সঠিক-বেঠিক ছেড়ে ঘটনার সত্য দিকটা হল, সে সময় “পাকিস্তান আন্দোলনের” পক্ষের মানুষেরা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রই চেয়েছিলেন। ফলে তাদের চোখে বাংলা ভাগ সবসময়ই কাম্য ছিল। আমরা পছন্দ করি আর নাই করি, ইতিহাসের সত্য হল, পুর্ববঙ্গের আপামর মুসলমান ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ দুবারই বাংলা ভাগকে তাদের জন্য কাম্য হিসাবেই দেখেছিল। এই নিরেট বাস্তবতার খবর জয়া এই বই লেখার সময়  বিবেচনায় নিয়েছেন এর প্রমাণ মিলে না।

তাহলে জয়া যে আশা আকাঙ্ক্ষার উপর দাঁড়াচ্ছেন, দেশভাগ ব্যাপারটাকে দেখতে চাইছেন – সেটা “পাকিস্তান আন্দোলনের” মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গী নয়। আবার সে দৃষ্টিভঙ্গীটা দেশ ভাগের ভিলেন জয়ার ভাষায় “হিন্দু ভদ্রলোকেদেরও” নয়। তাহলে কাদের আশা আকাঙ্খার উপর জয়া দাঁড়াতে চাইছেন? দেশভাগ হওয়া সঠিক মনে করেন না এরা কারা?

সারকথায় বললে, অখন্ড ভারতের বা অখন্ড বাংলার পক্ষে থাকা এক “ভারতীয় জাতীয়তাবাদের” জন্য আকাঙ্ক্ষা ও পক্ষপাতিত্ব জয়া চাটার্জির আছে। কিন্তু এটা একেবারেই কল্পিত, অবাস্তব কল্পনা এজন্য যে বাস্তবে এটা নাই, তবে জয়ার কাছে এটা এমন কাল্পনিক হলেও কামনার বিষয়। এক কল্পিত আদর্শও। এই রাজনৈতিক অবস্থানের উপর দাঁড়িয়ে জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বই লিখেছেন। বাস্তবে না থাকলেও তবু মনে মনে এমন একটা খাসা সমাধানের আকাঙ্ক্ষা জয়া এখনও মনে পুঁষে রাখেন এবং এটাই তার চোখে আদর্শ সমাধান হত। জয়ার বই পড়তে গিয়ে তাঁর কল্পিত এই আদর্শ সমাধান বা “আদর্শ ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে” (যেটা বাস্তবে আছে সেটা নয়) কল্পনায় আমাদের সবসময় পাশে রাখা দরকার। যদি রাখি তাহলে সহজে জয়াকে বুঝব। জয়া বাস্তবে পাওয়া সবকিছুকে কোন কল্পিত আদর্শর প্রেক্ষিতে বিচার করছেন এবং সবকিছুর ভিতরে খুঁত দেখছেন, প্রত্যাখ্যান করছেন তা বুঝব। যেমন বাস্তবে দেখতে পাওয়া বঙ্কিম-অরবিন্দ বা কংগ্রসের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জয়ার চোখে কাঙ্খিত আদর্শ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নয়, মানদন্ড সম্মত নয়। জয়ার চোখে সম্ভবত এর একটা কারণ প্রথমবার (১৯০৫-১১) বাংলা ভাগের সময় থেকেই “এই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল “হিন্দু ভদ্রলোকেরা”। জয়ার পুরা বইয়ে এই “হিন্দু ভদ্রলোকেরাই” দেশভাগের ভিলেন। “হিন্দু ভদ্রলোকেদের” হিন্দু কারবারই জয়ার চোখে তাঁর কল্পিত ও কাম্য ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিচ্যুতি। দুধের মধ্যে চোনা। জয়ার বইয়ের সারকথা এটাই। কিন্তু আগেই বলেছি, জয়ার সারকথার (কোন অর্থেই) খাতক ততকালীন পুর্ববঙ্গ বা এখনকার বাংলাদেশ নয়। কারণ বাংলা ভাগ করেই কেবল পুর্ববঙ্গের চাষা প্রজারা নিজের মত শান্ত ও সন্তুষ্ট হয়েছে। অন্যথায় পুর্ববঙ্গের চাষা প্রজা কৃষকেরা হয়ত বিগত দুশ বছরের জমিদারি অত্যাচার উসুল করতে জয়ার ভিলেন বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোক এলিটদের  কলকাতা থেকেও তাদের উতখাত করত। অর্থাৎ বাংলা ভাগ না করার আর এক অর্থ হল, কলোনি ঔরসে বেড়ে চলা জমিদারির রুস্তমদের কলকাতা থেকেও উতখাত করে পুরা বাংলাকেই প্রজা কৃষকের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নেয়া।

কিন্তু তবু জয়া স্ববিরোধী। জয়া অন্তত একটা বড় স্ববিরোধ এড়াতে পারেন নাই। যেমন বইয়ের ভুমিকার প্রথম পৃষ্ঠাতেই জয়া লিখছেন,
“আদর্শ ও রাজনৈতিক আচরণের দিক থেকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার মধ্যকার সম্পর্ক জটিল এবং দুই বিপরীতধর্মী শক্তির একটি সংশ্লেষিত রূপ। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন দাবি করা হয় যে ভারতের জাতীয়তাবাদকে সাম্প্রদায়িকতার ভিন্নরূপ গণ্য করা যায় না। সাম্প্রদায়িকতার বিপরীত ধারণা হল ধর্মনিরপেক্ষতা, যা ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে দেয়। অবশ্যই স্বীকার করতে হয় যে, এই অর্থে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অনেক কিছুই ধর্মনিরপেক্ষ নয়। জনসমর্থন পাওয়ার জন্য ধর্মীয় কল্পমূর্তি ও ইস্যুকে জাতীয় আন্দোলন পরিচালনার সময় কৌশলে ব্যবহার করা হয়। …… এই জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহমত পোষণ করে যে, ভারতীয় সমাজের গোড়াতে রয়েছে ধর্মীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত সম্প্রদায়”।

এখানে প্রথম বাক্যেই তিনি আবার তাঁর কল্পিত আদর্শের বিশুদ্ধ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নয় বরং তাকে ছেড়ে বাস্তবের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নিয়ে কথা বলছেন। বাস্তবের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর সহানুভুতি লক্ষ্যণীয়। অর্থাৎ এখানে তিনি আর তাঁর কল্পিত আদর্শের সাথে বাস্তবের দুরত্ব বা খুঁত মাপছেন না। এছাড়া এখানে এক নতুন ক্যাটাগরি সাম্প্রদায়িকতা ধারণার সুচনা ঘটাচ্ছেন তিনি। বলার অপেক্ষা রাখে না এই ক্যাটাগরি তাঁর বিচারের দিক থেকে এক নেগেটিভ ক্যাটাগরি। যার পজিটিভ ক্যাটাগরি করতে দেখা যায়, অসাম্প্রদায়িকতা । সাম্প্রদায়িকতা বলে একটা ক্যাটাগরি সুচনা করা এবং তা দিয়ে ফেনোমেনা ব্যাখ্যা করার পরিণতি সবসময় নতুন বিভ্রান্তি তৈরি করে। কারণ এই ক্যাটাগরির পিছনের ধারণা এবং ধারণার পিছনের অনুমানগুলোতে বিরাট অস্পষ্টতা আছে। সময়ে তা নিয়ে কথা তুলা যাবে। কিন্ত এখানে বাক্য রচনার গাথুনিতে এটা বুঝা যাচ্ছে যে, বাস্তব ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং ধরে নেয়া চরম নেগেটিভ ক্যাটাগরি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ – এই দুইয়ের “সংশ্লেষিত রূপ” জয়ার কাছে খুব একটা অনাকাঙ্খিত নয়। পরের বাক্যে সেটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বলছেন, “ভারতের জাতীয়তাবাদকে সাম্প্রদায়িকতার ভিন্নরূপ গণ্য করা যায় না”। অর্থাৎ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতারই আর এক রূপ নয়। কথাটা সোজা করে বললে, জয়া এখানে এসে দাবি করছেন, বাস্তবের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ তার চোখে কোন সাম্প্রদায়িকতা নয়। এই স্ববিরোধিতা কেন? একদিকে নিজেই বলছেন এটা জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সংশ্লেষিত রূপ। অন্যদিকে আবার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কোন সাম্প্রদায়িকতা নয়।
এছাড়া এরপরের বাক্য আরও মারাত্মক – “সাম্প্রদায়িকতার বিপরীত ধারণা হল ধর্মনিরপেক্ষতা, যা ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে দেয়”। মারাত্মক বলছি বাক্যের প্রথম অংশের জন্য নয়। ভুতুড়ে ক্লিশে “সাম্প্রদায়িকতা” এই ক্যাটাগরির পরে আর এক ভুতুড়ে ক্যাটাগরি তিনি এনেছেন – ধর্মনিরপেক্ষতা । এনে দুটোকে এক সাথে ইকুয়েট তিনি করেছেন সেটাও বড় বিষয় নয়। একালে কেউ নিজের ধর্মবিদ্বেষ, ইসলাম বিদ্বেষ ও ফোবিয়া লুকাতে নিজেকে “অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ” বলে আড়াল করছেন – এটা আজকাল আর বড় বিষয় নয়। বেখবর থেকে অবলীলায় করে এসব।   ইসলাম কারও পছন্দের বিষয় নাই হতে পারে। নিজের চায়ের কাপ তিনি নাও মনে করতেই পারেন। এটা ফেয়ার এনাফ। এটা কোন দোষেরও নয়। কিন্তু তাঁকে সতর্ক থাকতে হবে এই অপছন্দ তিনি ইসলামের বা এর অনুসারির বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়িয়ে প্রকাশ করছেন কিনা। আর এক কিসিমের বর্ণবাদি হয়ে উঠছেন কি না। যাই হোক, তিনি দাবি করছেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যা নাকি ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে দেয়”। এটা ধর্ম ও রাজনীতি যে কোনটাই বুঝে না এমন কারও বক্তব্য জয়া এখানে এনেছেন। তবে এটা বলার পর জয়া টের পেয়েছেন এই ফিল্টার মোতাবেক তাঁর প্রিয় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী দল কংগ্রেসও সাম্প্রদায়িক দল বলে চিহ্নিত ও আটকা পড়ে যাচ্ছে। তাঁর প্রিয় বললাম এজন্য যে ভুমিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় এসে জয়া পরিপুর্ণভাবে প্রকাশ্য স্ববিরোধিতায় জড়িয়ে পড়েছেন। এবার তিনি প্রায় গায়ের জোরে কংগ্রেসকে তকমা দিচ্ছেন “অসাম্প্রদায়িক” দল বলে। আর মুসলিম লীগকে সাম্প্রদায়িক দল বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন। যেমন ভুমিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠার শুরুতে লিখছেন,
“অধিকাংশ জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ জাতীয় পরিচিতির বর্ণনাকালে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী ব্যবহার করেছেন – যে দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন ভারতীয় মানে একজন হিন্দু। এ বিষয়টি বাঙলা প্রদেশের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনায় এবং তাদের অনুপ্রাণিত বিশেষ ধরণের “চরম” জাতীয়তাবাদে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এ জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না, ‘সাম্প্রদায়িক’ ছিল না”
পাঠকেরা শেষের বাক্য আর ঠিক এর আগের বাক্য লক্ষ্য করবেন। এখানে জয়া কেন কোন জাতীয়তাবাদকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে তকমা এটে দিচ্ছেন আর কাকে ‘সাম্প্রদায়িক’নয় বলে তকমা দিচ্ছেন এর নির্ণায়ক নিরপেক্ষ নয়। ফলে বুঝা মুসকিল।
আবার এর পরের বাক্যঃ
“জাতীয় আন্দোলনের মুলধারা পরিচালিত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। ঐ আন্দোলনে ধর্মকে ব্যবহার করা হয় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের অনুভুতিকে জাগ্রত করার জন্য। অন্য দিকে, সাম্প্রদায়িক দল ও আদর্শসমুহ একটি সম্প্রদায়কে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ইউনিট হিসাবে অভিহিত করে, অন্য সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে এর ছিল চিরবৈরি সম্পর্ক”।
এখানে, প্রথম দুই বাক্যে বঙ্গভঙ্গ বা ১৯০৫ সালে বাংলার প্রথম ভাগ হওয়া ঠেকাতে হিন্দুদের “অনুশীলন” ও “যুগান্তর” নামে দুই সশস্ত্র জঙ্গিধারার আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে। জয়া তুলেছেন। ঐ “জঙ্গিধারা” এদের বক্তব্যের সারকথা ছিল, দেশকে মা কালী (দেশমাতৃকা) কল্পনা করে দেশের জন্য জীবন বলি দিতে অনুপ্রাণিত করা। আইডিয়াটা বাংলার হিন্দুদের “মা-কালীর” বা শক্তির পুজারী “শাক্ত ধারার” বয়ানের সারকথা থেকে নেয়া। অর্থাৎ হিন্দুদের “অনুশীলন” ও “যুগান্তর” নামে দুই সশস্ত্র জঙ্গিধারার এই আন্দোলনে “রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার” জয়া স্বীকার করছেন। ধর্মের ব্যবহার হওয়ায় জয়ার ক্রাইটিরিয়া অনুসারেই এটা সাম্প্রদায়িক আন্দোলন হয়, “ধর্মনিরপেক্ষ” আন্দোলন হয় না। কিন্তু তার পরেও আমরা দেখি জয়া এটাকে বরং “মানুষের অনুভুতি” জাগানো বলে ন্যায্যতার সাফাই দিচ্ছেন। কিন্তু পরক্ষণেই পরের বাক্যে মুসলিম লীগকে উদ্দেশ্য করে বলছেন – এরা সাম্প্রদায়িক দল।
১৯০৫ সালের বাংলা ভাগকে কেন্দ্র করে জয়ার বর্ণিত তিন লাইন দেখলাম। এখন এই পুরা ঘটনাটার ফ্যাক্টস হল, ঢাকাকে রাজধানী করে বাংলা-আসাম মিলিয়ে কার্জন সাহেবের নতুন ভাগ বিভাগকে পুর্ববঙ্গ নিজেদের পক্ষের সুযোগ হিসাবে দেখেছিল। এটাকে বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্ষমতা কর্তৃত্ব আর দাপট থেকে নিজেদের জন্য তুলনামূলক মুক্তির উপায় হিসাবে দেখেছিল। এজন্যই তারা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে। এখন কলোনি ঔরসের কলকাতায় বেড়ে উঠা জমিদারি ক্ষমতা কর্তৃত্ব আর দাপটের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে যদি জয়া হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক কাজ মনে করেন এটা জয়ার ভুল এবং স্ববিরোধীতা অবশ্যই। জয়া নিজেই যে “হিন্দু ভদ্রলোকদেরকে” ভিলেন বানিয়েছেন, জয়া বলছেন এরা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল সে সময় থেকে। জয়া নিজেই বলেছেন, বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় তাঁরা সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে কূটকৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা হিসাবে বিভিন্ন ভাবাদর্শকে (ideologies) ব্যবহার করে। সত্যিকার অর্থে ঐ কূটকৌশলকে একমাত্র সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়”।
তার মানে জয়া এবার নিজেই নিজের বিরোধিতা করছেন। আগে বলেছিলেন, দুবারই বাংলা ভাগের ফলে বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) এতদিনের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির মুখে পড়েছিল ফলে তাদের প্রতিক্রিয়াকে “সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়” বলেছিলেন জয়া। পুর্ববঙ্গের মুসলমানেরা তো এই এলিট ক্ষমতাকেই ভাঙ্গতে চাইছিলেন। ফলে বঙ্গভঙ্গকে নিজেদের পক্ষের সুযোগ হিসাবে দেখেছিলেন। এর মধ্যে ভুল কোথায়? অথচ বাংলা ভাগ শুনলেই জয়া একে “সাম্প্রদায়িক” কাজ বলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

জয়া চ্যাটার্জির সংকট হল, একদিকে তিনি বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ভিলেন ভুমিকা গবেষণায় আবিস্কার করেছেন। কিন্তু সমস্যা বেধেছে, আগে থেকে মাথায় থাকা আগাম এক চিন্তা ফ্রেমে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এসব বর্গ বা ক্যাটাগরিগুলোর ভিতর দিয়ে তিনি ভিলেন ভুমিকাকে ধরতে চাইছেন, ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। অথচ এই চিন্তা ফ্রেম বহু আগে থেকেই বর্ণবাদী ফলে প্রশ্নবিদ্ধ। আবার কলোনি শাসন মানেই বিপরীতে কিছু করলে সেটা জাতীয়তাবাদ এমন আগাম মুখস্ত অনুমানের বদলে আগে জনগোষ্ঠির রাজনৈতিকতা বোধ, রাজনৈতিক কমিউনিটি, রাজনীতি ইত্যাদি ধারণাগুলোকে এক্সপ্লোর করা দরকার। এর আগে “জাতীয়তাবাদের” নামে কোন ধারণার পক্ষে ঝাপিয়ে পড়া অর্থহীন। এছাড়া মনে রাখতে হবে সব ধরণের জাতীয়তাবাদই সেকটোরিয়ান অর্থে সাম্প্রদায়িক এবং ভিন্ন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ঘৃণা বিদ্বেষ অন্তরে পুষে রাখে।

[এই লেখাটার প্রথম ভাষ্য প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ঈদুল ফিতর জুলাই ২০১৫ সংখ্যায়। এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ঈদ সংখ্যাটার কোন অনলাইন ভার্সন ছিল না, কেবল প্রিন্ট ভার্সন। তাই প্রিন্ট ভার্সানের স্ক্যান কপি আগ্রহীরা এখানে দেখতে পারেন। এলেখার এডিট গত মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু নানান ব্যস্ততার ভিড়ে শেষ করতে পারি নাই। আজ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ শেষ করা হল। একারণে শিরোনামের লীংক এড্রেসের তারিখ “আগস্ট” দেখাচ্ছে।]

প্রধানমন্ত্রী মোদি আর বিজেপির মোদিঃ ফারাক কি বজায় রাখতে পারবেন

লেখার ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-a7

 

বাস্তবে যা পাওয়া যায় তাই বাস্তব, যা বাস্তব করা যায় না তাই আদর্শ

ভারতের এখন বিজেপির সরকার ক্ষমতাসীন আর এর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদি। বাংলাদেশে মোদী সম্পর্কে পাবলিক পারসেপসন হল, “ও মোদী উনি তো বিজেপি, আর সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি সম্পর্কে কি আর নতুন বলব”। মোটা দাগে বললে এই বয়ান এটাও এক সত্য। এথেকে এই বয়ান কনষ্ট্রাকশনের পিছনের অনুমানগুলো কি তাও বুঝা যায়, আমরা কমবেশি জানি। তবে অবশ্যই এমন বয়ান যথেষ্ট নয়। আবার এই বয়ানের কারিগর এক সেকুলার মন, মানে “কমিউনিষ্ট”, “প্রগতিশীল”, লিবারেল উদারবাদী ইত্যাদির হলেও ইসলামী মনের দিক থেকে যারা দেখেন তারাও এই বয়ানের বিরুদ্ধে বিশেষ আপত্তি করবেন না। কারণ তাদের আপত্তি-জাত সিদ্ধান্তও কমবেশি একই। এজন্য এই বয়ান ডমিনেটিং বা প্রায় সব পক্ষের উপরে দাঁড়ানো ও ছেয়ে থাকা বয়ান। এখন একথা মেনে নিয়েও বিজেপির মোদী যখন প্রধানমন্ত্রী মোদী হিসাবে একশনে ততপর – এই ডায়ানামিক পরিস্থিতির দিকে নজর ফেলতে এই লেখা। ডায়ানামিক কেন? বলা হয়, কোন রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল নিজেকে যাদের দল বলেই মনে করুক না কেন, দলের পতাকা বা সাইনবোর্ডে যে রংকেই প্রতীকী চিহ্নে হাজির করুক না কেন ঐ ব্যক্তি বা দল আসলে কেমন বৈশিষ্টের রাজনীতির – তা নির্ধারকভাবে বুঝার উপযুক্ত একমাত্র উপায় হল ওর ততপরতা, মানে ষ্টেপ বা পদক্ষেপগুলো কি, কেমন এর ভিতর দিয়ে তাকে বুঝতে চেষ্টা করা। কারণ শেষ বিচারে এসব পদক্ষেপগুলোই ঐ দল বা ব্যক্তির প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতীকী রং-চিহ্ন আঁকে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দল বা কোন রাজনৈতিক ট্রেন্ডকে ওর ঘোষণাপত্র গঠনতন্ত্র এগুলো দিয়ে চিনা যায় না, চিনতে হয় ওর বাস্তব পদক্ষেপ, বাস্তব ঘটনায় ওর বাস্তব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রকা্‌শ, অবস্থান নেয়া, করণীয় মনে করে বাস্তবে যা করে ইত্যাদি এসব দিয়ে। সোজা কথায়, রাজনীতির ঘোষিত প্রতীকী রঙ কমিউনিষ্ট গাড় লাল বা ইসলামি গাড় সবুজ যাই দেয়া থাক না কেন ওর রাজনীতির আসল রঙ কতটা ফিকে বা ট্রু কালার কী তা বুঝতে হয় ওর পদক্ষেপ দেখে। কোন কমিউনিষ্ট পার্টির দলের রঙ আর পদক্ষেপে ফারাক – এঘটনাকে অনেকে ঘোষিত রংয়ের বিচ্যুতি বা “আদর্শ বিচ্যুতি” বলে চিনাতে পারে। কিন্তু এটা বিচ্যুতি কিনা সেই তর্কে আমাদের জড়ানোর চেয়ে বাস্তব প্রেক্ষিতে রংটা কি, ঐ রঙয়ের অর্থ কি সেটা বুঝার দিকে মনোযোগ দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ “আদর্শ লইয়া আমরা কি করিব”। আদর্শ তো আদর্শই, তা কখনই বাস্তব নয়। আদর্শ সব সময়ই আগাপাশতলা অবাস্তব তবে, এক প্রাক-আইডিয়া মাত্র। যা হুবহু বাস্তবে হাজির করা যায় না, হয় না। অথবা বাস্তবে হাজির হতে গেলে তা আসলে কি হয়ে যায় সেটাই মুখ্য ফোকাস। বুঝার বিষয়। আদর্শ কি রূপ কল্পনায় এঁকে সে মাঠে নেমে ছিল তা শত মোহনীয় হলেই বা আমাদের কি লাভ, কি যায় আসে তাতে। বাস্তব মানে চলমান ডায়ানামিক পরিস্থিতিতে যা আকার নেয়। ফলে এখানে একজামিনের বিষয় বাস্তব মোদী। এই অর্থে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বাস্তব পদক্ষেপ সমূহ। সেই ট্রু কালারের খোঁজে এই রচনা।

গত বছর ২০১৪ সালের ২৬ মে নরেন্দ্র দামোদর মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি, এই দলের পরিচয়েই তিনি প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেসের মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো তিনিও একজন গুজরাটি হলেও গান্ধীর সাথে তুলনায় অন্য অনেক কিছুর চেয়ে তার সবচেয়ে বড় ফারাক হলো প্রজন্মে। ১৯৪৭ সালের পর ভারতে যাদের জন্ম এমন প্রজন্মের মধ্যে তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় শিখরে। গুজরাট রাজ্যের পরপর তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। সেই সাথে প্রথমবারের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়ের গুজরাটের দাঙ্গা, মুসলমান হত্যার দাগ ও এর দায়দায়িত্বের মূল অংশীদার তিনি। এতে মামলা বা আইনি দিক থেকে রেহাই পেয়ে গেলেও এর রাজনৈতিক দায়দায়িত্বের দিক থেকে তিনি কখনই মুক্ত হবেন না। তার দল সম্পর্কে আপামর সাধারণ ধারণা হলো, আমাদের দেশের ও ভারতের সেকুলারদের ভাষায় বলা হয় এটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল।
যদিও বিজেপি সম্পর্কে মূল্যায়নের মূল দিকটা হলো জন্ম থেকেই বিজেপি ইসলামফোবিক দল, মুসলমানবিদ্বেষী দল। আরো পরিষ্কার করে বললে, বিজেপির বয়ানের সারকথা হলো ভারতে ধর্ম ও সংস্কৃতিতে হিন্দুত্ব বলে একটা কিছু আছে। বিশেষ সেই হিন্দুত্ব ধারণাজাত ও একে ভিত্তি মেনে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দল বিজেপি; এই হিন্দুত্ব ধারণা শ্রেষ্ঠ, এমন বয়ানের ওপর দাঁড়ানো সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আধিপত্যের স্বপ্ন ও অনুমান এ দলের আছে।
কথা আরও আছে, কথিত হিন্দুত্বের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আধিপত্যের প্রাবল্য মেনেই ভারতে অন্য যেকোনো ধর্ম, রাজনৈতিক শক্তি বা বয়ান হাজির থাকতে পারবে। এই হলো বিজেপির আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন বা ভিশনে দেখা কাঙ্খিত ভারত। যেমন, ভারতের প্রাচীন সামাজিক ও ক্ষমতা কাঠামোয় হিন্দু ধর্মের বর্ণাশ্রমের বিষয়টি আমরা কমবেশি বুঝি। মানে এক কালে সমাজে কার কী পেশা হবে, সামাজিক মর্যাদা কী হবে এসবের ভাগ-বণ্টন ও বিভক্তির ভেতর দিয়ে শাসক ব্রাহ্মণদের সামাজিক ক্ষমতা চর্চা হত। এই অর্থে এটা ভারতের সামাজিক শ্রমের এক বর্ণ বিভাজন। একালে ক্যাপিটালিজমের পাল্লায় পড়ে এবং ক্রমশ বিস্তারে সে কাঠামো কেবল ভাঙছে আর ভাঙছে, দুর্বল হচ্ছে। তবুও ঐ মৌল কাঠামোটা সমাজে এখনো নির্ধারক ভূমিকা রেখে চলে, টিকে আছে। আমাদের চলতি ভাষায়, এটা এক জাতপাত ব্যবস্থা। বিজেপির ইমাজিনেশন বা কল্পচিত্রটা হলো তাদের হিন্দুত্ব ধারণার বাইরে আর কোনো ধর্ম, বা মতাদর্শ যা আছে সেগুলোকে বড়জোর তারা পুরনো বর্ণাশ্রমের ধারণার ভেতরেই যেনবা আর একটা জাত-বর্ণ কেবল এতটুকু মর্যাদা তারা সব ‘অপর’দের দিতে পারে, চায়। অর্থাৎ নানান জাত-বর্ণের মতোই নিজ হিন্দুত্বের অধীনস্থ যেন আর এক জাত হয়ে কেউ চাইলে থাকতে পারে। এতটুকু ‘অপর’ সে সহ্য করতে রাজি আছে। যেখানে বিজেপির হিন্দুত্ব ধারণাজাত সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধীনস্থ থাকবে সব জাত, ধর্ম, বয়ান সবকিছুই।
বিজেপি কংগ্রেসের সেকুলার ধারণা গ্রহণ করে না। তবে পপুলার পারসেপশন হলো, কংগ্রেস অন্তত মুখে বলা বা আড়াল হিসেবে নিজেকে সেকুলার বলে দাবি জানায়, তাই সে বিজেপির চেয়ে একটু বেশি ভালো। বিজেপি এই ভান করা ঠিক মনে করে না। তবে আমরা সেকুলার ধারণার প্রতি আগাম বিশেষ পক্ষপাতিত্বের ঝোঁক থেকে না দেখলে সম্ভবত এর সঠিক ব্যাখ্যা হবে বিজেপি ও কংগ্রেস দুটোই মূলত ‘হিন্দুত্ব’ ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী দল। অর্থাৎ ঐতিহ্য কথার আড়ালে ‘হিন্দুত্ব’ বয়ানে গঠিত এক সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের ভারত হতেই হবে। উভয় দল এই চিন্তায় অভিন্ন এবং তাদের মৌলিক চাওয়া। কিন্তু নিজেকে বাইরে উপস্থাপনের প্রশ্নে কংগ্রেস সেকুলার জামা পরে নেয়া ঠিক মনে করে, আর বিজেপি এর বালাই রাখতে রাজি নয়। মানে দাঁড়াল, এ বিষয়ে এই দু’টি দলই ‘হিন্দুত্ব’ ধারণার হিন্দু ছাড়া ভিন্ন কোনো ধর্ম বা বয়ানের কাউকে একই সাম্য-মর্যাদা দেওয়া বা কোনো সামঞ্জস্য বিধান দূরে থাক, কোনো আংশিক শেয়ার দিতেও রাজি নয়। আবার এভাবে উদ্ভূত ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা যে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ছাড়া অন্য কোনো ভিত্তিতে পুনর্গঠন করে নিতে পারে, আগামিতে হতে পারে এমন সম্ভাবনা এই দুই দলই মনে করে না। এ বিষয়ে ভাবতে পারে না বা চায় না। এমন না চাওয়ার পেছনে বড় এক অনুমান আছে যেটা আবার দুটো দলেরই চিন্তার মৌলিক ভিত্তি। এটাই আবার কংগ্রেস ও বিজেপি এই দুই দলের মধ্যে বিরাট এক মিলের দিক। সেটা হলো, দুই দলের প্রধান ধারণা হিন্দুত্ব, তবে দুইভাবে ইমাজিন বা কল্পচিত্রে এঁকে নেয়া, পরিগঠিত এক হিন্দুত্ব। দুই দলেরই দৃঢ়বিশ্বাস হলো, এই ‘হিন্দুত্ব’ ধারণাটা হলো নানা জাতপাতের ভারত, নানা প্রদেশের ভারত, সমতলী-পাহাড়ি ভারত ইত্যাদি নানা স্বার্থ বিরোধের ভারতকে এক রাখার চাবিকাঠি। এক ভুতুড়ে হিন্দুত্ব পরিচয় (দুইভাবে তৈরি) এটাই ভারতকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখার ভিত্তি। এমন ভাবনার পেছনের অনুমান হলো, এই হিন্দুত্ব ধারণার ভেতর গোঁজামিল, অসামঞ্জস্যতা যাই থাক হিন্দুত্ব ধারণা প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ না করলে গতি নেই। ভারতে কোন ‘রাজনৈতিকতা’, রাজনৈতিক ভিত্তি আরম্ভ করা সম্ভব নয়।
এমন ভাবনা কেন?
ক্ষমতা, আইন, জাতিগঠন, রাষ্ট্র, জাতি রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো সম্পর্কে মৌলিক ধারণাগুলো গত অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের হাত ধরে দুনিয়ায় হাজির হয়েছে। তবু এভাবে উদ্ভবের ভিতরে এর অস্পষ্টতা অস্বচ্ছতাও কম নয় বরং সময়ে মারাত্মক। উপরে অনেকগুলো শব্দ উল্লেখ করে মৌলিক বিষয় ও ধারণাগুলোকে চিনিয়েছি। তবে গুরুত্বের কমবেশির দিক এসব শব্দ বা ধারণার মধ্যে মূলত ‘পলিটিকস’, ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ ধারণা দুটো প্রধান। বাকি ধারণাগুলো এই দুই ধারণা সাপেক্ষে নির্মিত ও অর্থপুর্ণ হতে পারে, নইলে নয়। চিন্তার দিক থেকে মূলত ‘পলিটিকস’, ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ ধারণাদুটোর অর্থ গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে চলতি শতকে এসে একাডেমিক ও বাস্তব মাঠের চর্চা এবং উদাহরণ অভিজ্ঞতায়ও এখন তা অনেক স্বচ্ছ হয়েছে। কিন্তু তবু তা ডোমিনেটিং হয়েছে একথা বলা যায় না। এগুলো চিন্তার দিক থেকে মূলত ‘পলিটিকস’, ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ ইত্যাদি ধারণাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী তা বোঝা অনুসন্ধানের পথে না চেয়ে বরং ইউরোপ বা তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের নকল করতে গিয়ে সেসব অস্বচ্ছতার আবর্জনা তৈরি হয়েছে তা থেকে জাত সমস্যা। তবে সবকিছুই আবার চিন্তার সীমাবদ্ধতার সমস্যা নয়। বৈষয়িক স্বার্থও সমস্যার উৎস হয়। আর একটু স্পষ্ট করে বললে এগুলো পশ্চিমের এনলাইটমেন্ট ধারণায় রামমোহন বা বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তা, তাদের চিন্তার আমলের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা।
ওদিকে ভুতুড়ে এক ‘হিন্দুত্ব’ ধারণার ভিত্তিতে ভারতকে এক রাখার সমস্যাগুলো ভারতের সব রাজনৈতিক, ইনটেলেকচুয়াল সদস্য সবার জানা। কিন্তু নতুন করে নতুন চিন্তায়, নতুন ভারত পুনর্গঠনের কাজটা এতই পর্বত প্রমাণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যে এই ভারত নিজ গুণে ভেঙে পড়ে অচল না হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউই এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না তুলে বরং ‘হিন্দুত্বের’ ভেতরেই মাথা গুঁজে যত দিন টিকে থাকা যায়, সমস্যা নেই মনে করা যায় সেটাকেই শ্রেয় মনে করে।

গান্ধীর সাথে মোদির কথা তুলেছিলাম মূলত প্রজন্মের দিকটা ভেবে। অর্থাৎ মোদি কি সেই প্রজন্ম হতে পেরেছেন যিনি অন্তত গান্ধী-নেহরুর জমানার বাইরে নতুন চিন্তা করার মতো চিন্তার মুরোদ-সামর্থ্য ও সাহস রাখেন? এই প্রশ্নটার জবাব খোঁজার বা পাঠককে সাথে নিয়ে ভাবার চেষ্টা করব।

ওপরে চিন্তার ভিত্তি প্রসঙ্গে স্বল্প কিছু যে পরিচিতি বিজেপির দিয়েছি সে দিক থেকে মোদিকে বিজেপি থেকে আলাদা করা যায় না। অর্থাৎ চিন্তার ভিত্তির দিক থেকে মোদি বিজেপি থেকে কিছুই আলাদা নন অবশ্যই। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় প্রধানমন্ত্রী মোদির স্বপ্ন চিত্রকল্পের আগামী ভারতের ছবির মধ্যে এমন কিছু আছে যা তাকে আলাদা করে আগামীতে তিনি আলাদা হয়ে উঠতেও পারেন। তবে অবশ্যই এটা সম্ভাবনা, এটা হতে যাচ্ছে বা হবেই এমন দাবি করছি না। কি সেটা? প্রধানমন্ত্রী মোদি আর বিজেপির মোদি এই দুইয়ের মধ্যে একটা ফারাক আছে। এভাবে এই বাক্য লিখে তার প্রাথমিক ধারণা হাজির করা যায়।

প্রথমত, মোদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতে যে ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি বদলানো ও পুনর্গঠন কাজ করতে চান তা মনে করে তিনি হাঁটছেন না। কিন্তু তিনি যে ‘বিকাশের স্বপ্ন’ দিকে তাকিয়ে একাগ্র হয়ে হাঁটছেন তাতে ভারত রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি বদল ও পুনর্গঠনের দিকে রওনা হয়ে যেতে পারে।

অন্য যেকোনো হিন্দুত্বভিত্তিক আর পাঁচটা নেতার মতোই হলেও অন্যদের চেয়ে মোদির ফারাক এখানেই, তিনি নতুন মাত্রার এক ‘বিকশিত’ ভারত কল্পনা করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির মুখ্য স্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’। হিন্দিতে বিকাশ শব্দের অর্থ আমাদের কাছে প্রচলিত ‘উন্নয়ন’ বা ‘ডেভেলপমেন্ট’ ধারণাটাই। কিন্তু বিকাশ, ‘উন্নয়ন’ বা ডেভেলপমেন্ট শব্দগুলোর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এককথায় বললে নানা বাধা পেয়ে বামন হয়ে থাকা ক্যাপিটালিজমের বাধাগুলো দূর করে ভালো ধরনের বিকাশ। অর্থাৎ কার বিকাশ, উন্নয়ন বা ডেভেলপমেন্ট এই প্রশ্ন করলে জবাব আসবে, ক্যাপিটালিজমের বিকাশ। ক্যাপিটালিজমের বিকাশ সম্ভব এই অভিজ্ঞতা বা অভিজ্ঞতার মজা মোদি হাতে-কলমে পেয়েছেন গুজরাটের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে। এটাই হিন্দুত্বের বিজেপির মোদির কাছেই নতুন বিস্ময়। নতুন আলো। মোদির নতুন প্রেম তাই ‘বিকাশ’-এর সাথে, তার চিন্তার মৌলিক পরিচয় ভিত্তি বিজেপিরই হওয়া সত্ত্বেও।

এর কারণ কী বা এটাকে অনেক রকম সমাজতাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন অনেকে। যেমন অনেকে বলতে পারেন মোদি রেল স্টেশনে চা বিক্রি করে পেট চালানো মা-বাবার সন্তান। আবার তিনি ছোট থেকেই আরএসএস ও বিজেপির সাথে যুক্ত। ফলে জীবনের স্পিরিচুয়াল দিকটা মানসিক ভিত্তি হিসেবে তিনি হয়তো তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন। কিন্তু বৈষয়িকভাবে জীবন নির্বাহ, বাঁচিয়ে রাখার কষ্ট এই বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকটা তিনি কখনই উপেক্ষা করেননি। ভুলে যাননি, বাদ দেননি। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রচার চলার সময়ই অবলীলায় তিনি সেসব দিনের কাহিনী অকপটে পাবলিক মিডিয়ায় বলেছেন। তার মায়ের প্রতি সবিশেষ অনুরাগ তিনি এখনো লুকাননি। কারণ মা তাকে খেয়ে না খেয়ে কষ্ট করে বড় করেছেন। একমাত্র বসবাসের ঘরে একই সাথে শুকনা গোবরের জ্বালানি রাখতে হতো বলে এর গন্ধে তিনি কেমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন সেই খুঁটিনাটি বর্ণনাও তিনি বাদ দেননি। আবার মানুষের জীবনে কাজের সংস্থান না থাকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার অর্থ কী তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানেন।
সম্ভবত সে জন্যই তিনি নিজের ‘বিকাশ’ স্লোগানের অর্থ করছেন নিজে এভাবে ‘সবার টেবিলে খাবার, সব বাচ্চা স্কুলে, সকলের জন্য কাজের সংস্থান, পায়খানাসহ একটা বাসস্থান, প্রত্যেক পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ’ ইত্যাদি। এগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় বলা। যেটা মোদির সরকারের দিক থেকে ‘বিকাশ’ এই অর্থনীতিক নীতি পলিসি। বিজেপির মোদি ছাপিয়ে রক্ত-মাংসের মানুষের জীবন ব্যবহারিক দিক থেকে দেখা অভিজ্ঞতায় এসব মিলিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদি।

আর এক সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হতে পারে এরকম। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ বা রাজ্যের জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম বা অন্য সবার আগে নিজ ভাষাভাষীর পরিচিত এলাকা ছেড়ে বাইরে বের হয়েছেন কাজের অনুসন্ধানে বা বেটার লাইফের জন্য তারা হলো গুজরাটের বাসিন্দা বা গুজরাটি। তারাই জমিজিরাতি ছেড়ে ভিন্ন পেশার সন্ধানে অভিযাত্রী। ক্রমে তারাই ট্রেডার। বাণিজ্যিক বেণে বা ব্যবসায়ী। ফলে ব্রিটিশ আমলেই তারা ব্রিটিশের হাত ধরে সাউথ আফ্রিকাসহ সারা আফ্রিকাতেই প্রবেশ করেছিল এবং এখনো ছড়িয়ে আছে। ব্যবসায়ী কথার আর এক ইতিবাচক অর্থ উদ্যোক্তা। নতুন কর্মের সংস্থান, নতুন আইডিয়ায় নতুন উৎপাদনের সংগঠন হাজির করতে লেগে থাকার নিরন্তর প্রয়াস। এটাও হয়তো মোদির রাজনৈতিকভাবে ‘বিকাশ’ ধারণা ও মনে এক স্বপ্ন পুশে একটা ভিশনে পৌঁছানোর পেছনের কথা। হয়তো মোদির বেলায় তা ভালোরকম এক অবসেশনও মাখা।  প্রতিদ্বন্দ্বীরা গুজরাটিদের নেতিবাচকভাবে দেখাতে, নিজের অক্ষমতা ঢাকতে গুজরাটিদের ‘গুজ্জু’ বলে থাকে।

যাক সেসব কথা। মূলকথা প্রধানমন্ত্রী মোদি নামটা নতুন মাত্রায় হাজির হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। সমাজে ও রাজনীতিতে যেভাবে তিনি ক্ষমতা তৈরি করেছেন ধাপে ধাপে মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ততই তার ‘বিকাশের’ স্বপ্ন প্রধান হয়ে উঠতে শুরু করেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পর তিনি সব কিছুর আগে ‘বিকাশের’ স্বপ্নধারণকারী মোদি এরপর অধস্তন তিনি বিজেপির মোদি এমন হয়ে উঠছেন। এটা লুকিয়ে বা অজান্তে বেখেয়ালে করে ফেলা কাজ না। তিনি সরব। বলছেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিজেপির প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকতে চান না। নিজ দল আর সরকারের মধ্যে তিনি এক পরিষ্কার ভাগ বজায় রাখতে চান। এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বলে কেউ যেন তাকে কেবল গুজরাটের লোক না ভাবেন তা নিয়ে তিনি আগেই সজাগ। তাকে অনেক দূর যেতে হবে, অনেককে নিয়ে পথ চলতে হবে, তাই তিনি আগেভাগেই সতর্ক। আবার এই অবস্থানটাই কেবল তার ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারো রাজা নয়, এম্পায়ার বা এক সাম্রাজ্যের শাসক হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত হলো তাকে সঙ্কীর্ণ কোনো স্বার্থ নয় বরং সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থের দিকে নজর করে সমন্বয়ে এক কমন স্বার্থ হাজির করে, বাদ বাকিগুলো সামলিয়ে চলতে পারার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। বড় পরিকল্পনা সফল হওয়ার পূর্বশর্তও এটাই। এটা ঠিক কারো শৌখিনতা বা উদারতার ব্যাপার নয়।

এবার বিপরীত দিকটি আমরা দেখি। এভাবে প্রধানমন্ত্রী মোদি যতই তার ‘বিকাশের’ স্বপ্নকে সবার ওপরে রেখে চলতে শুরু করবেন, বা বলা যায় বিজেপিকে সেকেন্ডারি করে রাখবেন ততই আস্তে আস্তে একসময় তিনি বিজেপির মোদির বদলে প্রধানমন্ত্রী মোদি হয়ে উঠবেন। এটা কোনো সন্দেহ না রেখে বলা যায়। ব্যাপারটাকে বোঝানোর জন্য নিচে একটা উদাহরণ এনেছি। মোদির এক লিখিত ভাষণ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছি নিজ দায়িত্বে।
সে প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে এর পটভূমি প্রেক্ষিত জানিয়ে রাখা দরকার যাতে পাঠকের পড়ে বুঝতে সুবিধা হয়।

১. বিজেপি দলের কাঠামো মোটা দাগে বললে এককেন্দ্রিক নয়, যে অর্থে আমাদের হাসিনা, খালেদা বা ভারতের সোনিয়া। এক ‘নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র’ এমন একটা জায়গা বিজেপি তার চর্চায় জারি ও চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে। দলের মূল নীতি বা কাজের কৌশল সেখানে ঠিক করার পর তা বাস্তবায়নের প্রধান হবেন খোদ দলের সভাপতি। এই অর্থে বিজেপির সভাপতি কংগ্রেসের সভাপতির সোনিয়ার মতো নন। সোনিয়া একাধারে নীতিনির্ধারক শেষ কথা বলার অধিকারী। তিনি দলের সভাপতি ঠিকই তবে বিজেপির মতো আবার ওই গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ক প্রধান হিসেবে সভাপতি তিনি নন।
ওদিকে বিজেপির নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র আর সভাপতি দুটোই আলাদা। বরং নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রের অধীনস্থ হলেন সভাপতি। কিন্তু এর মানে এমন নয় যে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ লড়াই নেই। মোদি ২০১৪ নির্বাচনের মাস আটেক আগে যেদিন নিজেকে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে দল থেকে সিদ্ধান্ত পাস করিয়ে আনলেন সেদিন থেকে দলের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে বয়স্ক নেতাদের (আদভানি বা যোশী) পরাস্ত করেই অর্থাৎ নিজে জিতেই নিজেকে হাজির করেছিলেন। সেই থেকে তিনি নিজেকে কেন্দ্রে রেখেই বর্তমান দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা সাজানো হয়ে যায়। কিন্তু তিনি আবার নিজেকে দলের সভাপতিও করেননি। এ ছাড়া ওদিকে আরএসএসের সাথে সমন্বয় এবং বৃদ্ধ পুরনো প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ সমন্বয়ও ঠিকমতো রাখেন। অনুমান করা যায় নিজের ‘বিকাশের’ স্বপ্নকে শেয়ার করেন। তিনি নিজের কাজ সফলতা যোগ্যতা দেখিয়ে সম্মতি আদায় করে নেন।

২. মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিজেপির দলীয় কর্মসূচি আগের নীতিতেই চলছে বরং আরো ব্যাপক এবং সরব হয়েছে। যেমন সবচেয়ে সরব কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’। বাংলায় বললে যেসব হিন্দু চার্চের তৎপরতায় খ্রিশ্চান হয়ে যাচ্ছেন, অথবা কথিত ‘লাভ জিহাদে’ গল্পে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে, মুসলমানের সাথে প্রেম বা বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এমন ক্ষেত্রে তাদের প্রতি সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে আবার হিন্দুতে ফিরিয়ে আনা। তাদের ‘ঘরে ফেরানো’ বা এন্টি কনভারশন কর্মসূচি। সোজা কথায় হিন্দুত্বের উন্মাদনা সৃষ্টি করা, আর বিজেপির ভাষায় এগুলো তাদের সামাজিক কর্মসূচি। এবারের কর্মসূচির বিশেষ দিকটা হলো, এবারের আক্রমণের ঘটনা চার্চ, বা খ্রিশ্চান স্কুলের ওপর বেশি। চার্চে হামলার ঘটনা সামাজিক বা মিডিয়ায় হইচই ফেলেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি এই কর্মসূচির ব্যাপারে শুরু থেকেই নির্বাক। তার ইনার মেসেজটা এমন যে এটা দলীয় কর্মসূচি, দলীয় ব্যাপার। এটা তো তার সরকারের কর্মসূচি নয়। আর তিনি তো দেশের সবার প্রধানমন্ত্রী তাই প্রতিক্রিয়াবিহীন।
এভাবেই এই পরিস্থিতি পাঁচ মাস ধরে চলছিল, গত জানুয়ারিতে ওবামার সফরের আগ পর্যন্ত। ওবামা বিদায় নেয়ার দিন ২৭ জানুয়ারি মিডিয়ায় ওবামা এক সাক্ষাৎকারে মোদি সরকারের প্রতি এক হেদায়েত বাণী রেখে যান। যার সারকথা হলো, মোদির ‘রিলিজিয়াস টলারেন্সের’ (ভিন্ন ধর্মকেও সহাবস্থান করতে দেয়া) ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া উচিত। নইলে এগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। (‘splintered along the lines of religious faith’) । এ ঘটনার পরের দিন এর প্রতিবাদ করে কিন্তু বিজেপি থেকে এক বিবৃতি দেয়া হয়। মোদি তবু নিশ্চুপ। আর প্রায় সব প্রধান মিডিয়ার মূল সুর আগে থেকেই ছিল বিজেপির তৎপরতার বিরুদ্ধে, তখনো তেমনই থাকল। তবে টিভির টক শোগুলোতে মোদি সরকারকে অভিযুক্ত করা শুরু হলো। পরের মাস ফেব্রুয়ারি ১৭ তারিখে মোদি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কেরালাভিত্তিক এক চার্চের বার্ষিক ওরস ধরনের উৎসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি হন। এখানেই তিনি এ বিষয়ে প্রথম মুখ খোলেন। নিজ সরকারের নীতিগত এক বিস্তারিত লিখিত অবস্থান তুলে ধরেন। যদিও এর আগে সিরিজ ঘটনায় ঘর ওয়াপসি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লির বুকে চার্চ ও খ্রিশ্চান স্কুলে একের পর এক হামলা-ভাঙচুরের পরিপ্রেক্ষিতে খ্রিশ্চান ধর্মীয় নেতাদের একটা দল মোদীর সাথে দেখা করে অভিযোগ জানিয়েছিল। কিন্তু তারপরও মোদি ১৭ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত একেবারে নিশ্চুপ ছিলেন।

৩. হায়দ্রাবাদের নিজাম অর্থাৎ এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী, এই অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের পর আরো নিচে বা দক্ষিণ থেকে ভারতের একেবারে শেষ দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত যেসব রাজ্য আছে এককথায় এই অঞ্চলকে দক্ষিণার্ত বলা হয়। বলা হয় উত্তরের আর্য প্রভাব, দখল শাসন যে অঞ্চলের আগেই আটকে গিয়েছিল, প্রবেশ করতে পারেনি এটা সেই অঞ্চল। এটা দ্রাবিড়ীয় অঞ্চল বলেও ইতিহাসে কথিত আছে। কিন্তু ব্রিটিশ-ভারত আমলে সবচেয়ে বেশি খ্রিশ্চান মিশন ও কনভারসন তৎপরতা ওই অঞ্চলেই ঘটেছে। এখন এ অঞ্চলের কোনো কোনো জনবসতিতে খ্রিশ্চান জনসংখ্যা ওই শহরের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের মতো। এর মধ্যে আবার সর্বদক্ষিণের কেরালা রাজ্য অর্থডক্স খ্রিশ্চান বা পর্তুগীজ চার্চসহ সবধরণের ফ্যাকড়ার খ্রীশ্চান চার্চ অধ্যুষিত। সেকালে দুর্গম যোগাযোগের এই রাজ্যে পড়াশোনার বিস্তার খ্রিশ্চান স্কুল মিশনারির মাধ্যমেই ঘটেছিল। কেরালা-ভিত্তিক দিল্লীর ঐ চার্চের ওরস ধরণের অনুষ্ঠানের উপলক্ষ ছিল, সে আমলের দুই বিখ্যাত পাদ্রির মোদির ইংরেজি ভাষ্যে এটা elevation to sainthood বলে বর্ণনা করা হয়েছে, যার বাংলা করা হয়েছে ‘সাধুসন্তে উত্তরণ’ হওয়ার দিন উদযাপন। অর্থাৎ পাদ্রির অবদান মূল্যায়ন করে চার্চের দেয়া তিনি কত বড় কামেল পীরের ভূমিকা রেখেছেন তার স্বীকৃতি দেয়ার দিন। এরই বার্ষিকী স্মরণ উৎসবের অনুষ্ঠান ছিল সেটা।

৪. কী করে এটা পাঠক পড়বে এর একটা পরামর্শ রাখতে চাই। সেটা হলো, মোদি ‘ধর্মীয় সহনশীলতা’ বিষয়ে তার সরকারের নতুন নীতি ব্যাখ্যা করছেন কিভাবে সেদিকটা বুঝতে মনোযোগী হওয়াটাই সঠিক কাজ হবে। কারণ এখানে কোন মোদিকে বুঝতে হবে? যে মোদির দল বিজেপি জন্ম থেকেই বিশেষত বিগত পাঁচ মাস ‘ঘর ওয়াপসি’ (ঘরে ফেরা) কর্মসূচি চালিয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদি হিসেবে তিনি উল্টো অবস্থান নিচ্ছেন। অনুমান হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের এই নীতিমালা বা এর দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে মোদি নির্ধারকভাবে বিজেপির ঘোষিত ও চর্চাকৃত দলের নীতির পুরোপুরি উল্টো দিকে অবস্থান নিলেন। অর্থাৎ সরকারের নীতি আর বিজেপি দলের নীতি পরস্পরের উল্টো অবস্থানে।
ব্যবহারিক দিক থেকে বললে সরকারের এমন মৌলনীতির অধীনতা মেনেই একমাত্র কোনো রাজনৈতিক দল তৎপর থাকতে পারে। মৌলনীতি বলছি কারণ এর সাথে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও কনস্টিটিউশন যুক্ত হয়ে গেছে, এটা সাদামাটা মোদি সরকারের কোনো নীতি পলিসির ঘোষণা ধরনের নয়। যেমন মোদি আসলে ধর্মীয় সহাবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছেন। বলছেন, ধর্মীয় কারণে (কনভারসনসহ) কেউ কারো ওপর বলপ্রয়োগ করলে মোদি সেটা গ্রহণ করবেন না, ব্যবস্থা নেবেন। বলছেন, ‘আমার সরকার এমন কাজের বিরুদ্ধে শক্তভাবে তৎপর হবে’। অর্থাৎ তার সরকার এমন কৃতকাজের বিরুদ্ধে দমনমূলক অবস্থান নেবেন, আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তি দেয়ার পথে যাবেন।

ওদিকে মোদির এই ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মোদি ইস্যুটাকে সেকুলারিজম বলে কোনো ধারণার দিক থেকে বা সাহায্যে বা কোনো সেকুলার অবস্থান নিয়ে এর ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করেননি। বরং বলছেন যে, যেটা খুশি ধর্ম পছন্দ করতে পারবেন এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে পারবেন এর সপক্ষে মোদির সরকার ওই নাগরিককে সুরক্ষা দেয়ার নীতির কথা বলছেন।

দিল্লীতে চার্চে দেয়া মোদির ভাষণের পূর্ণ বিবরণ। মূল ইংরেজি উৎস ভারতের ‘ফার্স্টপোস্ট’ ওয়েব পত্রিকা। ভুল অনুবাদের দায় অনুবাদকের। পাঠকের কোনো সন্দেহের ক্ষেত্রে মূল উৎস থেকে দেখে নিতে পারেন।

[নীচে মোদীর বক্তৃতার পুর্ণ টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।]
আমি কেরালা দুই সাধু সেন্ট কুরুয়াকোস ওরফে চাভারা এবং সেন্ট ইউফ্রাসিয়া তাদের সাধুসন্তে উত্তীর্ণের দিন উদযাপনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে উচ্ছ্বসিত বোধ করছি। তাদের এই স্বীকৃতিতে দেশবাসী গর্বিত। তাদের উত্তরণ কেরালারই আর এক সাধু সেন্ট আলফানসো শুরু করে গিয়েছিলেন। সেন্ট চাভারা এবং সেন্ট ইউফ্রেসিয়া তাদের জীবন ও কর্ম শুধু খ্রিশ্চান কমিউনিটির জন্যই অনুপ্রাণিত হওয়ার উৎসস্থল নয় বরং সামগ্রিক মানবজগতের জন্যও বটে।
সেন্ট চাভারা মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র এবং তিনি একজন সমাজ সংস্কারকও। সে যুগে যখন শিক্ষাদীক্ষার জগতে প্রবেশ খুবই সীমিত ছিল তখন তিনি সব চার্চেরই একটা করে স্কুল থাকার ওপর জোর দিয়েছিলেন। এভাবে তিনি সমাজের সব অংশের জন্য শিক্ষার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন।
কেরালার বাইরে খুব কম লোকই জানে যে, তিনি একটা সংস্কৃত স্কুলও খুলেছিলেন এবং একটা ছাপাখানা প্রেস। নারীর ক্ষমতাপ্রণর পক্ষে তার অবদানও উল্লেখযোগ্য।
সেন্ট ইউফ্রাসিয়া ছিলেন একজন ইন্দ্রীয়-অতীত মিষ্টিক, তার সারা জীবন তিনি অর্চনা ও গডের আনুগত্যে উৎসর্গ করেছিলেন।
অনুসারী সাথীদের খেদমত করে এই উভয় সাধু গডের জন্য জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। প্রাচীন ভারতীয় প্রবাদ নিজেদের জীবন ব্যাখ্যা করেছে এভাবে : ‘আত্মানো মোক্ষর্থম জগত হিতাযাচা’ মোক্ষ (মুক্তি) লাভের পথ হলো দুনিয়ার কল্যাণের জন্য কাজ করা।
বন্ধুরা,
ভারতের ঐতিহ্যের শেকড় হলো স্পিরিচুয়ালিজম। হাজার হাজার বছর আগে, ভারতের সাধুরা এবং গ্রিক জ্ঞানীরা নিজেদের মধ্যে চিন্তা ও স্পিরিচুয়াল বিনিময় করে গেছেন। নতুন আইডিয়ার প্রতি দরজা খুলে রাখার কথা ঋকবেদে হাজির আছে : ‘আনো ভদ্রা: কৃতও যন্তু বিখত’ নোবেল চিন্তা সব দিক থেকে আমাদের কাছে আসতে দাও। বিস্মরণের কাল থেকে এই দর্শন আমাদের চিন্তা-বুদ্ধির চর্চাকে গাইড করে গেছে। ভারতমাতা এই ভূমিতে অনেক ধর্মীয় ও স্পিরিচুয়াল স্রোতধারার জন্ম দিয়েছে। এগুলোর কিছু আবার এমনকি ভারতের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়েছে।
সব ধর্মবিশ্বাসকে স্বাগত জানানো, সম্মান জানানো এবং শ্রদ্ধা করা ভারতেরই সমবয়সী পুরনো ঐতিহ্য। স্বামী বিবেকানন্দ যেমন বলেছেন : ‘আমরা সার্বজনীনতাকেই শুধু জায়গা ছেড়ে দেই না, আমরা সব ধর্মকেই সত্য বলে গ্রহণ করি’। শতবর্ষ আগে বিবেকানন্দ সৎ ও শুভইচ্ছা আঁকড়ে ধরেছিলেন চিরদিনের জন্য কেবল আমাদের জনগোষ্ঠীর জন্য নয় বরং আমাদের সরকার এবং এই অর্থে ভারতের যেকোনো রাজনৈতিক দলের সরকারের জন্য। সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম-আচরণের এই মৌলিক নীতি হাজার বছরের ভারতের মৌলিক বৈশিষ্ট্যচিহ্নের অংশ হয়ে আছে। আর সে কারণেই তা ভারতের কনস্টিটিউশনের অঙ্গে পরিণত হয়েছে। আমাদের কনস্টিটিউশন শূন্য থেকে উদ্ভূত হয়নি। এর মূল ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে প্রোথিত।
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক স্বপ্নভূমির কথা বলেছেন, চিত্ত যেথা ভয় শূন্য এবং উচ্চ যেথা শির। এটা সেই মুক্তির স্বর্গ যা আমরা সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করে রাখতে প্রতিশ্রুতবদ্ধ। আমরা বিশ্বাস করি সব ধর্মেই সত্য আছে। ‘একম সৎ বিপ্র বহুধা বদন্তি’।
বন্ধুরা,
সমকালীন দুনিয়াতে শান্তি ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সহবস্থানের জন্য যা মুখ্য ও ক্রিটিক্যাল ইস্যু সে দিকে আলোকপাত করি। দুনিয়া দিনকে দিন ধর্মীয় ভাগের লাইনে বিভক্ত ও মারমুখী হতে দেখছে। এটা গ্লোবাল উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই পটভূমিতে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবিষয়ক প্রাচীন ভারতের যে নিবেদন প্রস্তাব তা এখন গ্লোবাল চিন্তা বিনিময়ের স্তরে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
পারস্পরিক সম্মানজনক সম্পর্কের এই দীর্ঘ অনুভূত প্রয়োজন ও আকাক্সক্ষা ২০০৮ সালের দশ ডিসেম্বর হেগে অনুষ্ঠিত ‘মানবাধিকারের বিশ্বাস’ এই ‘ইন্টারফেথের’ কনফারেন্সে নিয়ে আমাদের হাজির করেছিল। ঘটনাচক্রে সেটা ছিল জাতিসঙ্ঘের সার্বজনীন মানবাধিকার চার্টার ঘোষণার ৬০তম বর্ষপূর্তিরও বছর।
খ্রিশ্চানিটি, হিন্দুজম, যুদাইজম, বাহাই, বুদ্ধইজম, ইসলাম, তাওইজম এবং লোকায়ত ধর্ম বিশ্বাসের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যারা দুনিয়ার প্রধান ধর্মগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেন তারা মিলিত হয়েছিলেন, আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন এবং সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এবং ধর্ম অথবা বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক ঘোষণায় বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত ও এর অর্থ হাজির করেছিলেন এবং কিভাবে তা সুরক্ষা করতে হবে তা বলেছিলেন।
আমরা মনে করি, কোনো ধর্ম বা বিশ্বাস কারো থাকা, ধরে রাখা, গ্রহণ করা এগুলো নাগরিকের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়।
দুনিয়া এক পথ পরিক্রমার জংশনে আছে। যদি সঠিকভাবে তা পার হতে না পারি তবে তা আমাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ফ্যাকড়া, ফ্যানাটিসিজম ও রক্তগঙ্গার অন্ধকারের দিকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে। ধর্মগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যের ঐকতান দুনিয়া এমনকি তিন হাজার বছরে প্রবেশের আগেও অর্জন করতে পারবে না। এখনই সময়। দেখা যাচ্ছে বাকি দুনিয়াও প্রাচীন ভারতের পথেই আবর্তনের পথ গ্রহণ করছে।
ভারতের পক্ষ থেকে, আমার সরকারের পক্ষ থেকে বললে আমি ঘোষণা করছি আমার সরকার ওপরের ঘোষণার প্রতিটা শব্দ ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমার সরকার ধর্মবিশ্বাসের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে যে প্রত্যেক নাগরিক সে কোনো ধর্ম ধরে রাখা অথবা গ্রহণ করা তার পছন্দের বিষয় এবং এটা কোনো ধরনের কারো বলপ্রয়োগ অথবা অন্যায্য প্রভাব ছাড়াই সে করবে এটা নাগরিকের অ-অমান্যযোগ্য অধিকার। আমার সরকার কোনো ধর্মীয় গ্রুপ, তা সে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যে ধরনেরই হোক, সঙ্গোপনে অথবা খোলাখুলি অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহ্য করবে না। সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান দেবে আমার এই সরকার।
ভারত বুদ্ধ ও গান্ধীর মাটি। সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রতিটি ভারতীয়ের ডিএনএ-তে থাকতে হবে। যেকোনো ওছিলায় কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য এবং আমি এমন সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাই। আমার সরকার এমন কাজের বিরুদ্ধে শক্তভাবে তৎপর হবে। এই প্রতিশ্রুতিতে আমি সব ধর্মীয় গ্রুপের প্রতি সংযত হওয়া, পারস্পরিক সম্মান দেখানো ও জায়গা করে দেয়া প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এসব সৎ স্পিরিটে দাঁড়াতে বলি যেটা আমাদের কনস্টিটিউশনেও প্রতিভাত এবং যেটা হেগ ঘোষণাতেই অনুলিখিত আছে।
বন্ধুরা,
আধুনিক ভারত গড়ার এক স্বপ্ন আমার আছে। আমার এই স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে এই বিরাট মিশনে আমি রওনা হয়েছি। আমার মন্ত্র হলো উন্নয়ন, বিকাশ ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’।
সহজ ভাষায় বললে এর মানে সবার টেবিলে খাবার, সব শিশু স্কুলে, সবার জন্য কাজের সংস্থান, পায়খানাসহ একটা বাসস্থান, প্রত্যেক পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ। সেটা এক গর্বের ভারত হবে। একতাবদ্ধ হয়েই আমরা তা অর্জন করতে পারি। একতা আমাদেরকে শক্তিশালী করবে। বিভক্তি আমাদের দুর্বল করবে। আমি আন্তরিকভাবে সব ভারতীয়ের কাছে এবং সবাই যারা এখানে উপস্থিত আছেন তাদের কাছে নিবেদন করি এই বিশাল কর্মযজ্ঞে আমাকে সহায়তা করুন।
সেন্ট চাভারা এবং সেন্ট ইউফ্রাশিয়ার সাধুসন্তে উত্তরণ এবং তাদের নোবেল কাজ আমাদের অনুপ্রাণিত করুক :
-আমাদের অন্তরশক্তি বৃদ্ধি করতে।
-অপরের সেবা করার ভেতর দিয়ে আমাদের সমাজের রূপান্তর কাজে সেই শক্তি ব্যবহার করতে।
-আধুনিক ভারত ও উন্নীত ভারত আমাদের এই যৌথ স্বপ্ন পূরণ করতে।
ধন্যবাদ সবাইকে।

______________অনুবাদ এখানে শেষ___________

সবশেষে, এবার মোদী কেন নিজ দলীয় অবস্থানের বিরোধী নিজের এই সরকারি অবস্থান নিলেন। এর তাৎপর্য কী সে প্রসঙ্গে কিছু কথা।

১. প্রধানমন্ত্রী মোদি তার ‘বিকাশের স্বপ্নকে’ নিজ দলের পুরনো নীতির ওপরে প্রাধান্য দিয়ে বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ এখন দলের নীতি সরকারের নীতির লাইনে খাপ খাইয়ে চলতে, সাজিয়ে নিতে বাধ্য হবে। কার্যত সরকারি অবস্থানটাই ইতোমধ্যে আধিপত্যের জায়গা নিয়ে ফেলেছে।
২. মোদির স্বপ্ন এর আসল অর্থ তিনি একটা ভারতীয় ক্যাপিটালিজম গড়ার পথে সিরিয়াস। ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের স্বার্থের সাথে নিজের স্বপ্নকে এলাইন করার দিকটা তিনি বেছে নিতে ভুল করলেন না।
৩. চলতি গত দশ বছরের আলকায়েদা বা ইসলামি খলিফা স্টেট ধরনের দুনিয়াব্যাপী ফেনোমেনা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের জন্য হুমকি মনে করে। তাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম সিস্টেম বা ব্যবস্থার দিক থেকে প্রতিক্রিয়াটা হলো ‘ইন্টারফেথ’ নামের পালটা কর্মসূচির পথে যাওয়া। মোদি নিজেকে ইন্টারফেথ কর্মসূচির সাথে নিজেকে এলাইন করলেন। আবার অন্য দিকে এর ওপর বাড়তি নিজ দলের ‘হিন্দুত্ব’ কর্মসূচি বা নিজ স্থানীয় এজেন্ডা থেকে সরে আসা সঠিক মনে করলেন।

৪. যদি ধরা যাক আগামী বছরর জুন মাসের দিকে মোদি সরকারের অর্থনীতিক কর্মসূচি (‘বিকাশের স্বপ্ন’ দুই বছর পার করবে তখন) ফল দেখাতে শুরু করে। অর্থাৎ অর্থনীতিক পরিসংখ্যানগুলোতে কাঙ্খিতভাবে হাজির হতে শুরু করে, জিডিপি বাড়ে, নতুন কাজ সৃষ্টির হার ভালো হয়। এককথায় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে এক ভাইব্রেন্ট অর্থনীতি হিসেবে হাজির হতে শুরু করে তবে বিজেপি দলের রাজনীতির মুখ্য ফোকাস তখন সব ছেড়ে হয়ে যাবে এই ‘বিকাশ’ আর এর সাফল্য প্রচার এমন হতে বাধ্য হয়ে যাবে। এমনটা যতই হবে ততই ‘হিন্দুত্ব’ ভিত্তিতে বিজেপির রাজনীতি ভিত্তি বদল করে ফেলবে। ‘বিকাশ’ ধরনের বক্তব্য আর এর সাফল্য প্রচার এটা বিজেপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে থাকবে। ফলাফলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে প্রচলিত ইস্যুর মধ্যে এক বড় ধরনের রূপান্তর দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা হাজির হবে। নিঃসন্দেহে এর একটা ইতিবাচক বেনিফিট বাংলাদেশ রাষ্ট্র পাওয়ার কথা। কারণ বর্তমানে ভারত নিজের ‘নিরাপত্তা’ যার ভেতর যেভাবে দেখে এই ভিত্তিমূলক দিক বদলে যাবে। যদিও মোদি সরকারের ‘বিকাশের’ পথে আরো অনেক বাধা আছে যেগুলোর অনেক যদি কিন্তু আছে। তবুও এই আলোচনার সীমার বাইরে বলে তা এখানে আনা হয়নি। তা পরে কোথাও আনা যাবে। আপাতত এতটুকুই।

________সমাপ্ত______

[এই লেখাটা আজকে পোস্ট করেছি কিন্তু এটা লেখা হয়েছিল প্রায় মাস খানেক আগে অর্থাৎ এপ্রিলের শুরুতে এখানে তবে ভিন্ন শিরোনামে। ইতোমধ্যে বিজেপি দলের রাজনীতি থেকে আলাদা করে কিছুকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর অবস্থান বলে  চিহ্নিত করা আরও বেশি অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গরু জবেহ করা যাবে না বলে সারা ভারতে নয় কেবল মহারাষ্ট্র রাজ্যে আইন পাস করা হয়েছে – এই ফালতু অজুহাতে বিপদজনক বিভক্তির রাজনীতির ইস্যুতে মোদীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  রাজনাথ সিং বাংলাদেশ সীমান্তে এসে বিএসএফের সাথে মিলে এই দলীয় কর্মসুচীর পক্ষে প্রচার চালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বেশি হবে আর প্রাপ্যতা কমতিতে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিবে এমন বক্তব্যও রেখেছেন। ফলে পরবর্তি এই পরিস্থিতি নিয়ে আরও আপডেটেড লেখা আলাদা করে লিখতে হবে। তার আগে এই লেখা পড়ার সময় পাঠক যেন মাস খানেক আগে লেখা পড়ছি একথা মনে রেখে পড়েন – এই অনুরোধ করছি।]

মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

গৌতম দাস
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-9n

mamota

পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ঢাকা সফরে এসেছেন। এমন সময়ে তার আসা যখন আমরা বিরাট রাজনৈতিক সংকট, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এই সংকটে ভারতের অবস্থান কোন দিকে এ’সম্পর্কে জানতে আমরা আগ্রহী, বিশেষত দিল্লি আর কলকাতার অবস্থানের ঐক্য ও পার্থক্য আমরা বুঝতে চাই। বলা বাহুল্য, এখানে ভুল করার বিশেষ কোন অবকাশ নাই যে মমতা একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোন প্রতিনিধি তিনি নন, প্রতিনিধিত্ব তিনি করছেনও না, করার সুযোগও নাই। তাহলে মমতার এই সফরের প্রয়োজন দেখা দিল কেন?
এর দুটো দিক আছে। এক, হাসিনা সরকার কেন মমতার সফরে আগ্রহ দেখালেন? আর দুই, মমতা এই সফর কেন প্রয়োজন মনে করলেন? এই দুটো বিষয় নিয়ে আমরা এখানে কথা তুলব।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে বিচারে ভারতের কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থাকতে পারে তবে দিল্লির নীতি নির্ধারক শক্তি হিসাবে মনেকরে তাকে গণনায় নেবার কোন কারণ নাই। না রাষ্ট্রীয় প্রটোকল হিসাবে না ব্যবহারিক সুবিধার কারণে। ভারতের যে কোন রাজ্য সরকারের সাথে আমাদের সৌজন্যমূলক সম্পর্ক থাকাটাই যথেষ্ট, কারণ খামাখা সম্পর্ক খারাপ করার কোন মানে হয় না। ভারতের কনষ্টিটিউশনে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক অনুসারে যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ রাজ্যের ভাগে পড়েছে সে বিষয়ে কোন বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হলে রাজ্য সরকারের মতামতের সঙ্গে সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আছে। তবে আবার কোন বিদেশি কোম্পানীকে কারখানার জমি বরাদ্দ দেবার ক্ষেত্রে রাজ্যের ভুমিকাই প্রধান, কেন্দ্র সেই ক্ষেত্রে পিছনে। ইত্যাদি। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোকে নিয়েই যে ভারত ইউনিয়ন সেই সমগ্র ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করার এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকার কি করে রাজ্য সরকারকে নিজের প্রতিনিধিত্বের অধীনে আনবে সেটা নিশ্চিত করবার দায়ও কেন্দ্রীয় সরকারের। যেমন কেন্দ্রীয় সরকার নদীর পানি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কোন চুক্তি করার সময় রাজ্য সরকারকে কেমন করে দিল্লির সিদ্ধান্ত-বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে সেটা তাদের ব্যাপার। আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসবে কেন্দ্রীয় সরকার, তার দায়দায়িত্বও কেন্দ্রীয় সরকারের । তবে বুদ্ধিমানের মত “ইনফরমালি” আমাদের জেনে রাখা জরুরি ও ভাল যে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি রাজ্যের সম্মতি রয়েছে কিনা। ঐ সম্মতি সাথে নিয়ে কেন্দ্রের প্রতিনিধি এসেছেন কি না। অর্থাৎ ঐ ইস্যুতে ভারতের যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-আমলা কথা বলতে এসেছেন ‘বাস্তবে’ তিনি রাজ্যেরও প্রতিনিধিত্ব সত্যিই করছেন কিনা সেটা আমাদের জানা থাকা দরকার। কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে কোন মতদ্বৈততা থাকতে পারে যা না জানলে দিল্লির সঙ্গে কোন বিষয়ে চুক্তি এক হাওয়াই চুক্তি হয়ে থেকে যেতে পারে। এমন রেকর্ডও আছে যেমন, কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী-আমলা জানতেন যে তারা রাজ্যকে সহমতে না নিয়েই বাংলাদেশে চুক্তি করতে আসছেন। তবু তারা এসেছেন আর আসার আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলে এসেছেন যে চুক্তিটা হয়ে যাবার পরে আপনার আপত্তি আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে চিঠি দিলে আমরা এরপর চুক্তির বাস্তবায়ন না করে ফেলে রাখব। ফলে আপনার অসুবিধা হবে না। এতে সত্যমিথায় যাই থাকুক দিল্লি এটা করে এবং দুর্বল প্রতিবেশির সঙ্গে তাদের এ ধরনের অসৎ সম্পর্ক চর্চা অস্বাভাবিক কিছু নয় বাংলাদেশে এই বিশ্বাস বেশ প্রবল। গত তিস্তাচুক্তির সময় এমন কথা শোনা গেছিল। এরপর আমাদেরকে জানানো হল যে মমতার জন্যই নাকি ঐ চুক্তিটা হয় নাই। অথচ এটা তো আমাদের জানার বা শোনার কথা নয়। কারণ আমাদেরকে যদি এমন কথা শুনতেই হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলে যারা আমাদের কাছে এসেছিলেন সেই মনমোহন সিং বা প্রণব মুখার্জি আসলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কেউ ছিলেন না, তারা প্রতিনিধি ছিলেন না। ভারতের প্রতিনিধিত্বের ম্যান্ডেট বাস্তবে তাদের ছিল না। সরকারে থেকেও তারা সরকারি নন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যেন যার গোডাউনে মাল নাই অথবা যে মাল আছে সেটা তাঁর নিজের নয় সেই পার্টির সাথে পণ্য বিনিময় চুক্তি করতে গিয়েছিলাম আমরা। এই পরিস্থিতিতে আমরা কি দেখলাম? দেখলাম যে চুক্তি হতে গিয়েছে দিল্লির সঙ্গে, কিন্তু তার কোন খবর নাই, আর অন্যদিকে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, খাতির জমানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। অর্থাৎ যেটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায় এবং কাজ উভয়ই আমরা নিজের কাঁধে নিলাম। সেই থেকে বাংলাদেশে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর গুরুত্ব আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছি কিম্বা ভারতের রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রতারিত করবার জন্য কি ধরনের ছুতা ব্যবহার করে তার বৈশিষ্ট্য ও মাত্রা সম্পর্কে আমাদের ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
ভারতের এই কপট কূটনীতি প্রসঙ্গে আরও দুটো কথা বলা জরুরি। এমনিতেই হাসিনার এই ভারত-খাতিরের জমানায় আমরা ভারতের সাথে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো যেন কেবল তিস্তা আর ল্যান্ড বাউন্ডারির দুই ইস্যু সেই স্তরে নামিয়ে এনে দিয়েছিলাম। সীমান্ত হত্যা, বাকি নদীর পানি বন্টন ইত্যাদি আর কোন ইস্যু যেন আমাদের আর নাই। ওদিকে ল্যান্ড বাউন্ডারি – আমাদের সাধারণ্যের প্রচলিত ভাষায় ছিটমহল বিনিময় চুক্তি – তা মুলত ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরার মধ্যে সেকালে স্বাক্ষরিত হওয়া এক চুক্তি। ফলে সেকালের ঐ চুক্তিতেই তা শেষ হবার কথা। কিন্তু সেকালে চুক্তি একটা হয়েছিল বটে কিন্তু বাস্তবায়নের খবর আজও হয় নাই। অর্থাৎ আজও কাগজে কলমে মীমাংসিত বিষয়টা আসলে একটা অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির শর্ত অনুসারে দুই রাষ্ট্রের সংসদে ঐ স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসম্মতি জানিয়ে অনুমোদন দেবার কথা ছিল। বাংলাদেশে আমরা তা সততার সঙ্গে করেছিলাম সেকালেই, কিন্তু ভারতের পার্লামেন্ট এখনও তা করেনি। আদালতে মামলা আছে এই অজুহাতে এখনও সেটা পেন্ডিং। যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ঐ চুক্তি হতে পারে বলে রায় দিয়ে মামলা চূড়ান্ত নিস্পত্তি করে দিয়েছে গত ১৯৯৪ সালেই। সেই থেকে ইস্যুটা ঝুলে ছিল। এদিকে এখনকার পার্লামেন্টে চুক্তির বিপক্ষে দেওয়া আপত্তির যুক্তি বেশ অদ্ভুত। ভারতের বিগত পার্লামেন্টে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বা মমতার দলের আপত্তি ছিল এরকম যে, যেহেতু এখানে সমান পরিমাণ ছিটমহলের জমি বিনিময় হবে না, ভারত কম পাবে তাই এই চুক্তি তারা পার্লামেন্টে পাশ করবে না। প্রথম ধাক্কায় শুনতে অনেকের মনে হতে পারে যে এই কথায় বোধহয় যুক্তি আছে। কিন্তু সে ধারণা ভিত্তিহীন। অল্পকথায় ভারতের সুপ্রীম কোর্ট চুক্তিটা হতে পারে বলে রায় দিয়েছিল ওর যুক্তিটা শুনলে আমরা বুঝব যে এসব কথা ঈর্ষাকাতর এক পেটি-মনের চিন্তা ও  ছলনা মাত্র।
যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের গঠনের ভিত্তিগত ধারণা বা পিছনের চিন্তা হল, নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা মানেই ওর ভুখণ্ডগত সীমারেখাসহ তা উল্লেখ করে তার ওপর ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌম এখতিয়ার ঘোষণা। পরবর্তিতে রাষ্ট্রের কোন নির্বাহী (প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা পার্লামেন্ট) ঐ ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ভুখন্ডের কোন অংশ অন্য কোন রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে বা বিনিময় করার ক্ষমতা রাখে না। এই যুক্তিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার ঐ চুক্তি অবৈধ এবং পার্লামেন্ট ঐ চুক্তির পক্ষে অনুসিদ্ধান্ত জানাতে পারে না বলে আদালতে মামলা করা হয়েছিল। এর বিপরীতে এই মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নিস্পত্তি করার যুক্তি হল – ঠিকভাবে দেখলে এটা ভারতের ভূখন্ড বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া বা বিনিময় করার মত কোন চুক্তি নয়। মূলত এটা, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ভারত-পাকিস্তান দুটো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সময় উল্লেখিত ভুখণ্ডের কোন অদল-বদলও নয়। বরং চুক্তিটা হল, ঐ গঠন-ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের পর্যায়ে দীর্ঘকালীন বিষয়টি অমীমাংসিত ফেলে রাখা বিষয়ের মীমাংসা। অতএব এই চুক্তি হতে পারে। অর্থাৎ এটা মাঠ পর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের মামলা মাত্র। কোন জমি অদলবদলের চুক্তি নয়।
একই যুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখন একমাত্র সমান পরিমাণ জমির বিনিময়ই কেবল এই চুক্তি হতে পারে বা হতে হবে এমন কথার কোন ভিত্তি নাই। তাহলে বিনিময় বলা হচ্ছে কেন? কারণ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ ঘেরা ভুখন্ডে অথবা বাংলাদেশের নাগরিকের বেলায় উলটা ভারতের ভুখন্ডে এই অবস্থায় আছে। ফলে উভয় পক্ষেই নাগরিকেরা নিজ নিজ মুল রাষ্ট্র ও ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হবে তাই বিনিময় ধরণের একটা ধারণা এখানে প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু আইনী ভাষায় এটা মূলত উভয় রাষ্ট্রের অমীমাংসিত সীমানা চিহ্নিত করণের মামলা। এখানে চিহ্নিতকরণের পরের হিসাবে কারও ভাগে জমি কম বেশি হতেই পারে। কিন্তু সেই হিসাবটা চুক্তির ভিত্তি নয়, সেটা চুক্তির জন্য কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। অতএব ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধীদের যুক্তি ভিত্তিহীন। এছাড়া বাংলাদেশের চোখে দেখলে, এটা মমতার বা তার রাজ্য সরকারের বিষয় নয়। এটা সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ত্ব করে বলে দাবিদার কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। তাদেরই আইনী বাধ্যবাধকতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার আপত্তি কি এটা শোনা বা দেখার দায়দায়িত্ত্ব আমাদের নয়। ফলে মমতার কাছে আমাদের দেনদরবার করার কোন যুক্তিই নাই। রাষ্ট্র হিসাবে আমরা চিনি কোন রাজ্য সরকার নয় কেবল কেন্দ্রীয় সরকারকে, যে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে দাবি করে আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসে বা এসেছিল।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল পানি চুক্তি, বিশেষ করে তিস্তা পানি চুক্তি। মমতাসহ যারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিল তাদের যুক্তির প্রসঙ্গে যাব। এ প্রসঙ্গে প্রায়ই একটা কথা শুনতে পাই যে, নদীতে পানিই নাই ভারত দিবে কোথা থেকে। অথবা প্রাকৃতিক পানি এখন কমে আসছে তাই আমরা কতদুর কি করতে পারি। অথবা মমতার ক্লাসিক যুক্তি – তিস্তার পশ্চিমবঙ্গ অংশের অববাহিকা অঞ্চলের লোকেরাই চাষাবাদের পানি পাচ্ছে না, আমরা আর কি দিব। ইত্যাদি। অর্থাৎ পানি চুক্তির প্রসঙ্গটা যেন ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পর আমাদের দিবার মত পানি থাকে কি না এর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এই “প্রয়োজন” কথাটাকে কি দিয়ে ব্যাখ্যা করব? বুঝব? পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পানির ‘প্রয়োজন’-এর সীমা কিভাবে কোথায় টানব? মানুষের প্রয়োজনও অসীম। এখানে পুরা তর্কটাকে পর্যবসিত করা হয়েছে আগে পশ্চিমবঙ্গের “প্রয়োজন” মিটাতে হবে এরপর বাংলাদেশ। না থাকলে নাই। ভারতের দিক থেকে এটা একটা ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। কিভাবে তারা তাদের “প্রয়োজনের” সমস্যাটাকে আগে মিটিয়ে নেবে তারপর বাংলাদেশের জন্য কি করতে পারে সেটা বিবেচনা করবে। অর্থাৎ ভারত সদয় পানিদাতা আর আমরা ঐ দাতার ভিক্ষাপ্রার্থী। আন্তরাষ্ট্রীয় কমন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশ আমরা, উজানের দেশ ভারত পানি আটকে রেখে দিয়েছে আর আমরা তার ভিক্ষা প্রার্থী? তাই কি? আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের দেনাপাওনা ভিক্ষা বা দয়ার উপর দাঁড়ায় না। বিশেষত স্বার্থের প্রশ্নে দয়া বা ভিক্ষা চলে না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শনে পর্যবসিত হয়।
না আমরা মোটেই পানিভিক্ষাপ্রার্থী না। আন্তর্জাতিক নদী আইন বলছে, উজান দেশের মত ভাটির দেশও সমান কমন নদীর পানির ভাগীদার। এটা তার হক। এছাড়াও উজানের দেশ নদীর মুল ধারা থেকে খাল কেটে বা বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিতে সে পারে না। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে নদীর সিকিম অংশে তাই করা হয়েছে। তাহলে দাঁড়ালো, পানি ভাগাভাগির আসল ভিত্তি হল, ভাটির দেশের হক ও অধিকার। উজানের দেশের কাছে সে পানির জন্য ভিক্ষাপ্রার্থী নয়। আগে উজানের দেশের পানির প্রয়োজন মিটানো এরপর যদি থাকে তবে বাংলাদেশ পাবে এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে দিল্লিকে দেয়া হয় নি, দেয় না। অতএব ভারতের পানির প্রয়োজন কত তা জানারও কোন প্রয়োজন আমাদের নাই। অথচ পানি ভাগাভাগির আলাপ উঠলেই ভাগের ভিত্তি কি এটা অস্পষ্ট থেকে যায়। ভাগের ভিত্তি কি তা অস্পষ্ট রেখে মিডিয়াসহ সব জায়গার আলাপ শুরু হয়ে যায় ভারতের প্রয়োজনের গল্প। আজ পর্যন্ত কোন পানির আলোচনায় পানি ভাগের ভিত্তি কি এনিয়ে কোন কথা আমরা শুনি নাই। সব খানে বয়ানটা হল ভারত পানির সদয় দাতা। আশা করি মমতার এই সফরেও আমরা এই একই গান শুনতে পাব। মমতা দির দয়ার ওপর তিস্তার পানি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করছে গণমাধ্যমগুলো এই বাজে তর্ক করে যাবে।

দুই
মমতার দিক থেকে তাঁর বাংলাদেশ সফরের তাগিদটা কি? আমার আগের লেখায় বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন আগামি বছর ২০১৬ সালের মে মাসে। ইতোমধ্যে মমতা এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ৩৪ বছরের বামফ্রন্টকে পরাজিত করে গত ২০১১ সালে নির্বাচনে রাজ্য সরকার দখলের চেয়েও প্রভাবের দিক থেকে এটা আরো বড় বিপ্লব। বড় তার তাৎপর্য। কে কি ধরণের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে ভোটে জিতেন সেই ভোটারদেরকে বলা হয় কনস্টিটুয়েন্সী। আমরা এই ধারণাকে নামিয়ে ক্ষুদ্র করে অর্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এমপি কোন এলাকা থেকে জিতে এসেছেন ঐ “এলাকার” অর্থে আমরা কনস্টিটুয়েন্সী শব্দটাকে নামিয়ে এনেছি। যদিও এর মূল অর্থ এমপি কাদের প্রতিনিধি, কোন ভোটাররা তাকে ভোট দিয়েছেন তারাই ঐ এমপির কনস্টিটুয়েন্সী – এটাই এর অর্থ।
তো এই অর্থে মমতার দল তৃণমুলের মূল কনস্টিটুয়েন্সী এখন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটাররা। যেখানে মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের ২৮%। যারা এরআগে প্রথমে কংগ্রেস ও পরে বামফ্রন্টের ভোটার ছিল। এখন মমতার অবদান তিনি মুসলমান ভোটারদের মুসলমান হিসাবেই মুক্তি দিয়েছেন, তাদের এখন আর “সেকুলার” ভোটার বলে অকেজো ধারণার আড়ালে লুকানোর দরকার নাই। তারা যা তাই। পিছিয়ে পড়া দশা থেকে বের হতে তাঁরা এখন কেন্দ্র ও রাজ্যের রিসোর্স বরাদ্দে নিজের অংশ দাবি করতে পারে। আগামি দিনে কতদুর এর বাস্তবে পারবে কি দাঁড়াবে সেসব আলাদা প্রশ্ন। অর্থাৎ এসবের প্রতি রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এখন সামনে এসে গেছে। একধরণের রাজনৈতিক স্বীকৃতি এসেছে, এখন দেখার বিষয় অর্থনৈতিক অর্থে এটা কতটা কতদিনে বাস্তবায়িত হয়। মুসলমান ভোটারদের ইস্যু বাকি সব কলকাতা কেন্দ্রিক দল যেমন বিজেপি, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জন্য বিরাট মাথাব্যাথার ইস্যু হয়ে গেছে।
এর অর্থ বাকি ৭২% ভোট এখন তৃণমূল সহ চারটা দলের মধ্যে ভাগ হবে, ভোটের সংখ্যার এই সংখ্যাতত্ত্ব পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে মূল নির্ধারক, মূল নির্বাচনি ইস্যু। এখান থেকেই দলগুলোর রাজনৈতিক বয়ানের ভিন্নতা এবং মিল। যেমন ইদানিং বিজেপি ও বামফ্রন্টের বয়ানের ফারাক খুজে পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। কারণ এখন মূল বয়ান হতে হবে এন্টি-মুসলমান যেটা এন্টি-তৃণমূল হয়ে কাজ করবে, তৃণমূলকে কাটবে। কিন্তু সরাসরি এন্টি-মুসলমান বয়ান তো দেয়া যায় না, এতে সেকুলারদের সেকুলার জামা আর গায়ে থাকে না, আপনাতেই খুলে পড়ে। আবার ভারতের নির্বাচনী আইনে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই বয়ানটা কিছুটা বদলে হয়েছে – আড়াল করতে করা হয়েছে ‘জঙ্গী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বয়ান’। জঙ্গী-সন্ত্রাসী মানেই তো মুসলমান এই সূত্রে। শুধু তাই নয় পড়শি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মানে একটা হিন্দু-মনের চোখে মুসলমান, হিন্দুর ‘অপর’ — এ ছাড়া কলকাতা ভিন্ন কিছু ভাবতে পারে তার প্রমাণ খুবই কম। আর কি! বাংলাদেশকে এটাতে জড়াতে পারলে বয়ান আরও পোক্ত হবে। ফলে এই হল, বাংলাদেশ-জঙ্গী-সন্ত্রাস বয়ানের সুত্র। মমতা বাদে বাকি তিন দলের আসন্ন নির্বাচনে প্রপাগান্ডার কৌশলও তাই মুসলমানদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
মমতার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সময় শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন মমতা। কলকাতায় হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের বিপরীতে একদিকে মুসলমানদের ভোটের ক্ষেত্রে একচেটিয়া সমর্থন ধরে রাখা, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের সঙ্গে অতিরিক্ত মৈত্রী প্রদর্শন করে কলকাতার হিন্দুদের অভিমান হ্রাস করা — এই দোদুল্যমান রাজনীতি মমতা ব্যানার্জির। বাংলাদেশ সফরে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। আমাদের ইমপ্রেস হবার কিছু নাই। এখনকার সফরে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করলেও পশ্চিম বঙ্গের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সহমর্মিতার প্রয়াস বাংলাদেশের জনগণ সমর্থন করবে। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির বিপরীতে সীমান্তের দুই পাশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জি কী ভূমিকা রাখেন তা দেখার জন্য নজরে এই দেশের জনগণের আগ্রহ আছে।
বর্ধমান জেলায় একটা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল গত বছর অক্টোবরে। সেটা কাজে লাগিয়ে এই প্রপাগান্ডায় আলো-বাতাস লাগানো হয়েছে। ওদিকে সারদা কেলেঙ্কারি নামে এক অর্থ কেলেঙ্কারিতেও মমতার দল অভিযুক্ত হয়ে আছে। (সারদা কেলেঙ্কারি হল আমাদের ‘ডেসটিনি” কেলেঙ্কারির মত সমতুল্য ঘটনা।) এই দুইয়ে মিলে প্রপাগান্ডার গল্প জমিয়ে তোলা হয়েছে। এই গল্পকে আরও সুনিপুণ করতে বাংলাদেশের জামাতকেও টেনে আনা হয়েছে। যাতে মূলত এন্টি-মুসলমান ক্যাম্পেনটাকে জামাত-জঙ্গী-সন্ত্রাসী এসব শব্দের মোড়কে হাজির করা যায়। সেটা জায়েজ এমন একটা ন্যায্যতাও টানা যায়। জামাত পর্যন্ত প্রসঙ্গ টানা শুরুর কারিগর মূলত পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর। গত ২০১৪ মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কলকাতা বামফ্রন্টের প্রধান সমাবেশ থেকে তিনি এই বয়ান দিয়েছিলেন। মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সী মমতার কাছে হারানোর দুঃখের তীব্রতা আমাদের এভাবেই তিনি জানিয়েছিলেন। তখনও বর্ধমান ইস্যু হাজির হয় নাই। পরে এই ইস্যু হাজির হলে বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ — যিনি পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে দলকে জিতানোর মূল দায়িত্বে এখন আসীন — তিনি বিমান বসুর বয়ানটাকেই এবার বাড়তি আকার দেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে আগামি নির্বাচনে তখন থেকে অনেকবার উচ্চারিত শব্দ হয়েছে বাংলাদেশ, আগামিতেও থাকবে, নির্বাচন পর্যন্ত। কিন্তু অমিত শাহের এসব কারবারে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী সরকার নিজেকে দূরে রাখতে চান। যদিও তার বিশ্বস্ত প্রধান অমিত শাহকে তিনিই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দলকে ক্ষমতাসীন করার এসাইমেন্ট সঁপেছেন। তবু নিজের হাত ধুয়ে রাখতে, আর তা রেকর্ডে রাখতে মোদী ইতোমধ্যেই ভারতীয় পার্লামেন্টে নিজের এক মন্ত্রীর লিখিত বিবৃতি পাঠ করিয়ে পরিস্কার করেছেন যে, বাংলাদেশ-বর্ধমান-সারদা ইস্যু এসব মিলিয়ে যে বয়ান তার পক্ষে  তদন্তকারি গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ এর রিপোর্টে প্রমাণ করার মত তথ্য মিলেনি। অমিত শাহ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসন, র কে আর সেই সাথে এনআইএ-এর বাংলাদেশ সফর, পালটা বাংলাদেশ থেকেও আমাদের গোয়েন্দাদের সফর ইত্যাদিতে প্রশাসন পর্যায়ে অনেকদুর ব্যবহার করেছেন। মোদী সরকারের বিবৃতির পরে তবুও পশ্চিমবঙ্গ পর্যায়ে প্রপাগান্ডা এখনও একই রকম রয়ে গেছে। কারণ জঙ্গী-সন্ত্রাসের ভীতিটা রয়েই গেছে।

মমতার প্রত্যাশা
এই পটভুমিতেই মমতা বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি কি চাইবেন হাসিনার কাছে?
মমতা চাইবেন, হাসিনা যেন পশ্চিমবঙ্গের চলতি নির্বাচনী প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে, বাংলাদেশকে জড়িয়ে যে জঙ্গী-সন্ত্রাসের বয়ান চলছে একে পরিপুষ্ট না করেন। হাসিনা নিজে এমন কোন বয়ান যোগ না করেন যেটা এই বয়ানকে পরিপুষ্ট করে। বরং বাংলাদেশের নাম যতই উঠুক তিনি যেন এটা ভারতের এক আঞ্চলিক এবং একেবারেই নির্বাচনী রেঠরিক সেদিক থেকে দেখেন। যার বিপরীতে কলকাতার বয়ানের বিরুদ্ধে যায় হাসিনার নিজস্ব পালটা বয়ানে যদি তেমন কিছু হাসিনা যোগ করতে রাজি হন তাহলে সেটা মমতার চরম পাওয়া হবে। আর যদি তা না-ই পারেন, তবে যেন চুপ থাকেন, তাহলেও মমতার জন্য এটা ভাল কাজে লাগবে। এই হবে মমতার চাওয়া। এটাই তার বাংলাদেশ সফরের মুল উদ্দেশ্য। অবশ্য সেটা যাই হোক এই সফর থেকে একটা বাড়তি সুবিধা তিনি পাবেন। মমতা যে বাংলাদেশ থেকে “যাওয়া” জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয় দেবার নেত্রী নন — যে প্রপাগান্ডা কলকাতায় তাঁর বিরোধীরা জারি রেখেছে – তার প্রমাণ তিনি এবার করতে পারবেন। সেটা হবে এরকম যে, তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন এবং হাসিনার দ্বারা ভাল আপ্যায়িত হয়েছেন। তিনি জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয়দাত্রী হলে কি এই মর্যাদা পেতেন!
কিন্তু মমতা যেভাবে যা চাইবেন তাই হাসিনা দিবেন এমন কোন কারণ নাই। তাহলে হাসিনা কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিবেন? তাঁর সিদ্ধান্ত নিবার ভিত্তি হবে মমতা কি দিতে পারেন যা তার ক্ষমতাকে পোক্ত করতে কাজে লাগতে পারে। হাসিনার সরকারের পক্ষে মোদীর সমর্থন আনার ক্ষেত্রে মমতা সঠিক লোক নন, বরং উলটা। তবে তিস্তার পানি বা ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যুতে তিনি আপত্তি করবেন না এমন ধারণা মমতা ঘোষণা করতে পারেন। যদিও এমন ঘোষণা মানেই এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের পেয়ে যাওয়া নয়। যদিও ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যু আগামি ২৩ মার্চের মধ্যে ভারতের পার্লামেন্টে চুড়ান্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে এবং তা মোদীর ক্রেডিটে আসবে। তার চেয়েও বড় কথা হাসিনার কাছে এর মূল্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সরাসরি তাকে সাহায্য করে এমন কোন ইস্যু নয়। বাংলাদেশের চলতি সংকটের যাত্রায় যদি হাসিনা ক্ষমতায় টিকে যেতে পারেন তবে এরপরে হয়ত প্রপাগান্ডায় এটা তাঁর কাজে লাগতে পারে। সারকথায় মমতা যা দিতে পারেন তা হাসিনার চলতি ক্ষমতা-সংকটকে সরাসরি সাহায্য করতে পারে এমন কিছু নয়। ফলে মমতার অফার হাসিনার জন্য বড়জোর অপ্রত্যক্ষ এক সুবিধা মাত্র। আগামিতে কাজে দিবে এমন। এধরণের বিচারের প্রেক্ষিত থেকে হাসিনার সিদ্ধান্ত পরিচালিত হবে বলে অনুমান করা যায়। এই সফরের বাকিটা হবে হাসিনা ও মমতার উভয়ের জন্যই শো-আপ এর লাভালাভ।
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫।
[এই লেখাটা গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার সামান্য এডিট করে ছাপা হল।]

বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

গৌতম দাস

ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-99

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ phil reiner

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার (Phil Reiner) গত ০৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন। বিষয় ছিল সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফর সম্পর্কে প্রেসকে অবহিত করা। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি। এ বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে ওবামা ২৫-২৭ জানুয়ারি ভারত সফরে এসেছিলেন। ফিল রেইনার ওবামার ভারত সফরে সঙ্গী ছিলেন। ঐ প্রেস কনফারেন্স ছিল মূলত ভারত সফরে ওবামার দিক থেকে নিজের তাৎপর্য বিশেষত অর্জনগুলো তুলে ধরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটের ওয়েবসাইটে রেইনারের প্রেস কনফারেন্সটিকে সেই ভাবেই পেশ করা হয়েছে। (আগের লিঙ্কে দেখুন, From President Obama’s Trip to India: Perspectives on U.S.-India Relations।
গত কংগ্রেস সরকারের শেষ তিন বছর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমশ অমীমাংসিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিরোধে জড়িয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল। এসব বিরোধগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিশেষত বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে উভয়ের বিরোধ আরও প্রকাশ্য ও চরমে উঠেছিল। জানুয়ারি ২০১৪ সফরটা ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে ওবামা-মোদীর দ্বিতীয় মুলাকাত। গতবছর মে মাসে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠনকে ভারত এবং আমেরিকা উভয়েই তাদের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বিরোধ মিটানোর উপায় হিসাবে দেখেছিল। কারণ উভয়ে অনুভব করছিল যে সম্পর্ক স্থবির রাখাতে উভয়েই ভালোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে মোদীর দিক থেকে আটমাসের সরকারের সাফল্য হল, দ্রুততর সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি। সেখানে ওবামা-মোদীর নানান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রসঙ্গে আলাপের সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল।

ফিল রেইনার এর প্রেস কনফারেন্সের খবরটা আমাদের মিডিয়ায় প্রচার হতে শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে, ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। খবরটা হল, গত মাসের শেষে ওবামার ভারত সফরে ওবামা-মোদী দুজনের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল। আসারই কথা, এটা অনুমান করা খুব কষ্টকল্পিত কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে ব্যাপারটা তথ্য হিসাবে কোন সংবাদপত্রে আসা এক কথা আর যেচে তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ভিন্ন। শেষেরটা অবশ্যই কষ্টকল্পিত। যদিও ভারত অথবা আমেরিকার দিক থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া বা না দেয়াটা খুব জরুরি নয়। এমনকি ভারত-আমেরিকার শীর্ষ আলাপে ভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মন্তব্য রেওয়াজ সম্মতও নয় বলে কেউই এ বিষয়ে তেমন কিছু প্রকাশ্যে আশা করে নাই। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে কোন কথা হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে হয়ত আমরা ভারত বা আমেরিকার সরকারি ভাবে না, বরং শুনতাম বড়জোর কোন অনুসন্ধানী দেশি বা বিদেশি মিডিয়া কর্মীর বিশেষ রিপোর্ট থেকে। এভাবেই কূটনৈতিক বিষয়গুলো প্রকাশিত হওয়া রেওয়াজ।

কিন্তু আমরা ব্যতিক্রম দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার না চাইতে বৃষ্টির মত অনেক তথ্য আমাদের ঢেলে দিয়ে জানাচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও আছে। লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, তিনি প্রেসিডেন্টের হোয়াট হাউস অথবা স্টেট বা পররাষ্ট্র ডিপার্টমেন্টের নেহায়েতই কোন মুখপাত্র নন। অর্থাৎ আমেরিকা তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের কোন মুখপাত্রের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ বা প্রচার করতে চাইছেন না। সাদামাটা রুটিনের বদলে চাইছেন এই প্রকাশ ও প্রচার গুরুত্ব পাক। তাই বক্তব্য এসেছে একজন একজিকিউটিভ কর্মকর্তার মুখ দিয়ে। ফিল রেইনার মিডিয়াতে এসে অনেক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিচ্ছেন। এটাও একটা ব্যতিক্রম। যেমন “বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না” । এই তথ্য বড়জোর মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে প্রকাশ্যে এলেই যেখানে যথেষ্ট হত। তা ছাড়িয়ে — অফিসের মুখপাত্রও না — একেবারে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের এক পরিচালকের মুখ দিয়ে প্রকাশ করা হল। এখানে কেবল একটাই স্বাভাবিক অথবা বলা যেতে পারে দৃশ্যমান ছুতা: সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফরে তাঁর অর্জন প্রেসকে অবহিত করা। এখানে ইংরেজি ‘রিড আঊট’ কথাটা ‘তাৎপর্য “অর্জন” ইত্যাদি অনুবাদে সতর্কভাবেই ব্যবহার করতে হচ্ছে কারণ এটা আমেরিকার দিক থেকে শুধু বিরাট অর্জনই নয়, ওবামার এই সফরকে রেইনার ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ পাশা খেলায় দান বা চাল দিয়ে খেলার অভিমুখ উলটানোর মত ঘটনা। তা সেটা ছিল অবশ্যই। অনেক মিডিয়াতেও এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাব না। তবে ঐ প্রেস কনফারেন্স বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসেছিল অবশ্য সাইড টক হিসাবে। তবু সেই “সাইড টকের” প্রসঙ্গেই ফিল রেইনার অনেক বেশি লম্বা সময় ব্যয় করেছেন। আর সেসব কথা বলতে গিয়ে ফিল রেইনার অনেকটা যেচে বাড়তি তথ্য দিয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতি বুঝতে হলে সরকারী ভাষ্যগুলো সরাসরি ইংরেজিতে মূল দলিলে পড়াই ভাল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা নয়। মুল মানে অরিজিনাল ইংরাজি হুবহু বক্তব্য পাঠ করার পিছনে আরও একটা কারণ আছে। মানবজমিন তাদের প্রতিবেদনে “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে একটা কথার অনুবাদ যেভাবে ব্যবহার করেছে তাতে বিভ্রান্তির সুযোগ আছে। ফিল রাইনার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” মানে ইংরাজিতে “পারটিসিপেটরি ইলেকশন” বা “অল পার্টি ইলেকশন” ধরণের কোন কথা বলেন নাই। বরং তাঁর বক্তব্যে তিনি কখনও “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” আবার কখনও “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” শব্দ ব্যবহার করেছেন । অর্থাৎ তিনি গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে ওর শক্তি দেখিয়ে -এই পথে দেশি-বিদেশি সবার অন্তর্ভুক্তির তাগিদ নিয়ে আগাতে চান। যাতে আওয়ামি লীগ, বিএনপিসহ কোন ‘গণতান্ত্রিক’ পক্ষ বাদ না পড়ে। আবার ওদিকে ভারত ও আমেরিকাও ঐক্যমত্যে আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মানবজমিন এটাকেই তার পাঠকের জন্য “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে অনুবাদ করেছে। গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আর ওর শক্তি দেখানোর কথা বলে আসলে ফিল রাইনার বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন করার সমালোচনা করেছেন। নিজ দেশে কোন দলকে কায়দা করে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার কথা ভারত যেমন ভাবতেই পারবে না সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি দলকে ভারতের জিতিয়ে আনার কথাও ভাবা যায় না। কিন্তু এ ধরনের নীতি দিল্লি নিল কি করে? এই দিকটা নিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশংসা করে আর এর সাথে তুলনা করে ফিল রেইনার প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনের প্রতি ভারতের সমর্থন করারই সমালোচনা করেছেন। আবার “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” বা “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবার আহ্বান জানিয়ে ভারত-আমেরিকার ঐকমত্যের ভিত্তি দাঁড় করাতে চাইছেন। ফিল রেইনার বলছেন,
“আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলংকায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি ও নাগরিক শক্তির যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন”(দেখুন, মানব জমিন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
অনেক লম্বা বক্তব্য। আর এতে প্রথমেই তার বক্তব্য নিবদ্ধ করেছেন “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়নি – কথা সেদিক নিবার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। সাধারণভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের” উদাহরণ তুলে তিনি বলতে চেয়েছেন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।

ফিল রেইনারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রসঙ্গ করার আর এক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আর ওবামা সরকারের মধ্যে বড় ধরণের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রশ্নে আমেরিকা পক্ষে আর ভারত বিপক্ষে অবস্থান প্রকাশ করে। শুধু তাই না ভারতের এই অবস্থানের প্রাকটিক্যাল মানে হল, হাসিনার পাবলিক রেটিং যত নিচেই হোক, নির্বাচনের নামে যা হয় হোক, বাংলাদেশের মানুষ কাকে ভোট দিতে চায় তাতেও ভারতের কিছুই আসে যায় না, যে কোনো উছিলায় দিল্লি আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। রেইনার সম্ভবত সেকথা স্মরণ করে আমাদের জানালেন যে, এসব নিয়ে ভারত-আমেরিকার বিরোধ আগে যে জায়গায়ই থাক এবারের মোদী-ওবামা আলোচনায় ভারত-আমেরিকার নীতি ও স্বার্থ বিষয়ে পুরানা অনেক বিরোধে এলোমেলো সংঘাতময় অবস্থান এবার ইস্ত্রি করে সোজা করা হয়েছে। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” এই কমন নীতিগত অবস্থান তেমনি একটা। কিন্তু রেইনার এখানেও থামেন নাই। আরও বাড়তি বলছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে (দুটি দেশ) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” নিয়েছেন। অর্থাৎ অতীতের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে এখন ভারত-আমেরিকা একমত হয়েছে শুধু তাই নয়, বরং ঐ ভুয়া নির্বাচনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বর্তমান “অস্থিতিশীল পরিস্থিতির” দিকেও তারা নজর রেখেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ বাক্য –“বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে”। অর্থাৎ তাদের অতীতের গুরুতর অনৈক্য ঘটে যাওয়া বিষয়ে এখন শুধু ঐকমত্য প্রকাশ করা নয়, বরং এখন সেই ঐকমত্যের বাস্তবায়ন বা কারেকশনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

যেচে এসে ফিল রেইনারের এসব তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের আর এক উদ্দেশ্য সম্ভবত আছে। বাংলাদেশ নীতি প্রশ্নে আমেরিকা-ভারতের অবস্থানের সংঘাত ২০১১ সাল থেকে। এরপর সেই স্বার্থ বিরোধ ২০১৩ সালে এসে চরম স্থবির অবস্থায় পড়ার কথা আমরা সবাই জানতাম। এই স্থবির দশা এরপর কোনদিকে যাবে আদৌ কোনো দিকে যাবে কিনা, নাকি কতদিন এমনই দিশাহীন পড়ে থাকবে এসব কেউ জানত না। পরবর্তিতে ২০১৪ সালের মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসা, আর আস্তে আস্তে ভারত-আমেরিকার পুরান স্থবির বিরোধের ঝাঁপি খুলে দেখতে দেখতে এটা ছিল মোদী-ওবামার খুবই স্বল্প সময় মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে মোদীর দ্বিতীয়বার ওবামার সাথে সাক্ষাত। এর আগের লেখায় বলেছিলাম, ভারত-আমেরিকার বিরোধ যতটা না ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও রাজনীতিবিদের এর চেয়ে সম্ভবত আরও বেশি আমেরিকার সাথে ভারতের গোয়েন্দা-আমলার পর্যায়ের বিরোধ। এপ্রসঙ্গে আমরা আমেরিকায় ভারতের কূটনৈতিক দেবযানী খেবড়াগোড়া কাহিনী আর এর পালটা ভারতে আমেরিকান কূটনীতিকদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেওয়া এমনকি নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টা স্মরণ করতে পারি।
ভারতের ২০১৪ নির্বাচনের আগে এবং পরে বহুবার আমরা বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ কে বলতে শুনেছি যে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস-ভিন্ন অন্য দলের বিজয়ে সরকার বদল হলেও ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়ে না, বদল হয় না, হবে না। একথার অর্থ আরও পরিষ্কার করে তিনি গত জুন ২০১৪ সালে অর্থাৎ মোদীর জয়লাভে প্রধানমন্ত্রীত্ব নিবার পরেও বলেছিলেন, বাংলাদেশে “০৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে। আমরা ঐ ইস্যু এখন আর আবার ফিরে মূল্যায়ন করতে চাই না কারণ এখন এজেন্ডা ভিন্ন হয়ে গেছে”।( About the January 5 elections, Pankaj Saran said that was a constitutional requirement. “I do not see that issue will be revisited today because today the agenda is different.” – ১৫ জুন ২০১৪ ঢাকা ট্রিবিউন।)
পঙ্কজ শরণের এমন কথার অর্থ কি? এর মুল উদ্দেশ্য হাসিনাকে সাহায্য করা এভাবে যে, কংগ্রেস সরকার আবার জিতে না আসতে পারছেনা টের পেয়ে যাতে হাসিনার কর্মি-সমর্থক নিজের নিজের ভাগ্য গুছাতে হাসিনাকে ফেলে কেটে না পড়ে। বলাবাহুল্য এটা একজন হাইকমিশনারের সীমাছাড়ানি কাজ । পঙ্কজের বাড়াবাড়ি। অথচ পঙ্কজ জানেন, একদিকে ভারত-আমেরিকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে, বাংলাদেশ নীতিতে উভয়ে দুই মেরুতে আছে, পরবর্তীতে এই সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু উভয়পক্ষের জন্য এক জায়গায় আসা জরুরি এই তাগিদ আছে। সেটা আদৌ হবে অথবা হবে না তার কোন দিশা নাই। অন্যদিকে মে মাসের ২০১৪ সালেই ভারতের নতুন দল ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের আগেথেকেই জানা যাচ্ছিল নতুন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রায়োরিটি ও এজেন্ডা কংগ্রেস থেকে একেবারেই আলাদা হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (এবং এরই ফাঁকে বাংলাদেশ নীতিতে বিরোধ) নিয়ে ভারতের নিজের কারণেও নতুন করে সমাধানে উদ্যোগী হতে বাধ্য । ফলে তা কোনদিকে মোড় নিয়ে কিভাবে কোথায় গিয়ে দাড়ায়, ঐক্যমত্যে আসে কি না সেসব আগাম অনুমান করা কঠিন। কিন্তু সে যাই হোক পঙ্কজ শরণ এর জন্য অপেক্ষা করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি আগেই হাসিনার সমর্থকদের চাঙ্গা করে রাখতে চান। সেজন্য আগেই নিজ দায়িত্বে জবরদস্তিতে ঘোষণা দিয়ে রাখলেন যে মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাতে ভারতের নীতিতে কোন বদল হবে না, ভারত যেভাবেই হোক হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষেই থাকবে, ইত্যাদি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের গোয়েন্দা-আমলা যতই শক্তিশালী হোক না কেন রাজনীতিকরাই শেষ কথা বলার ক্ষমতা রাখেন এবং এটা আইনি, আমলাদের বিজনেস রুল ও রেওয়াজের দিক থেকেও সত্য। ভারতের গোয়েন্দা-আমলারাও এটা মেনে চলতে অভ্যস্ত। তবু পঙ্কজ যেন কি বিশেষ কারণে মরিয়া। তিনি ধরেই নিতে চান এবং প্রমাণ করতে চান নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সাথে স্থবির অমীমাংসিত ইস্যুতে যাই করেন, যেভাবে নতুন আকার দেন না কেন তা পঙ্কজ তথা গোয়েন্দা-আমলাদের হিসাব, পথ ও কথা না শুনে মোদী করতে পারবেন না। যেন করতে দেয়া হবে না। এককথায় বললে, এটা রাজনীতিবিদদের উপর আমলাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বালখিল্য ধারণা প্রসূত এক কল্পনা। রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য খোলা স্পেস ছেড়ে না দিয়ে উলটা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা।
বালখিল্য ওমন কাজের ফলাফলেই কি ইতোমধ্যেই মোদীর হাতে সচিব পর্যায়ের তিনজনের বাধ্যতামূলক অপসারণ? এমন মনে করার কারণ আছে। যাই হোক আপাতত আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকে এসবের সারকথা হল, গোয়েন্দা-আমলা বিশেষত সুজাতা সিং বা পঙ্কজ শরণ ধরণের ব্যক্তিত্বের মনোভাব এবং ভারতের বিদেশনীতিতে সাধারণ ভাবে গোয়েন্দা-আমলাদের প্রভাবের একটা ফলাফল হল মোদী ক্ষমতায় আসার পর দিল্লী তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক রচনা করতে চায় সেই বিষয়ে অ্নিশ্চয়তা। দৃশ্যত মোদী কংগ্রেসের চেয়ে আলাদা এবং নতুন এজেন্ডা নিয়ে আবির্ভূত হাজির। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দু’বার ওবামার সঙ্গে সাক্ষাত করে এক নতুন নীতিগত ঐক্যমত্যের আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি নীতিতে ভারত-আমেরিকা কোন ঐকমত্যে আসতে পেরেছে কি না সেটা এরপরও বোঝা যাচ্ছিল না। বিশেষত সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে। যদিও বোঝা যাচ্ছিল তাঁরা একটা একমতে এসেছেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু আলামত দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এতদিন নিশ্চিত হয়ে কেউই কিছু বলতে পারছিলেন না। পুরানা এক ষ্টেলমেট পরিস্থিতিই বিরাজ করছিল। কোনদিকে নড়াচড়া করছিল না। এমনকি গত ২৬ জানুয়ারি ওবামা-মোদীর মধ্যে এইসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করলেও এর কোন ছাপ অন্তত বাংলাদেশে পড়ছিল না। দৃশ্যমান হচ্ছিল না। ফিল রেইনার যেন ওবামা-মোদীর নীতিগত ঐকমত্যের দিকটা দৃশ্যমান করতেই ঐ প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট ও বিস্তৃত স্বীকারোক্তি হাজির করেছিলেন।
এতে একটা জিনিষ পরিষ্কার হয়েছে। মোদীর জয়লাভের পরও পঙ্কজ শরণের “সাংবিধানিক প্রয়োজনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন” হয়েছিল, অথবা “এটা অতীতের মৃত ঘটনা এটা নিয়ে আবার ভেবে দেখার কিছু নাই” – এধরণের বক্তব্য যেটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এখন চাকরি হারানো পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর বক্তব্যেরই কপি – এই সব কিছুকে ফিল রেইনারের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে। বিশেষ করে রেইনারের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে বক্তব্য পঙ্কজ শরণের ভারতের অবস্থান বলে যা প্রচার করছেন তাকে সরাসরি নাকচ করে। গত ৩ জানুয়ারি রেইনারের বক্তব্য প্রচারের পর দশ দিনের বেশি দিন গত হতে চলল, কিন্তু এখনও খোদ পঙ্কজ শরণ নিজে অথবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেইনারের বক্তব্য নিয়ে কোন আপত্তি অথবা ভিন্ন বক্তব্য জানাতে আমরা দেখি নাই।

ফিল রেইনারের বক্তব্যের সারকথার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি দাবি করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় “শান্তি ও স্থিতিশীলতার” ব্যাপারে দুই নেতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিষয়টা ওবামা-মোদীর স্বাক্ষরিত ৫৯ দফা “যৌথ ঘোষণার” ৪৬ নম্বর দফায় এবং আলাদা করে স্বাক্ষরিত “এশিয়া নীতি বিষয়ে যৌথ ষ্ট্রাটেজিক ভিশন”র শুরুতেও উল্লেখিত হয়েছে। এগুলো ভারত-আমেরিকার নীতিগত ঐকমত্যের দিক। কিন্তু কি উপায়ে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এপ্রসঙ্গে ফিল রেইনার দাবি করছেন, -ওবামা ভারতের সক্রিয় “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া” ও “এর নির্বাচন” এবং “এটা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে” এবং এর মাধ্যমে “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা”, এবং “জনগণের সব অংশের ক্ষমতাবান হয়ে উঠা” এসব কিছু হতে পারে সেই উপায়। এব্যাপারে উভয় নেতা একমত হয়েছেন। তাই এই ‘উপায়কে’ তারা উভয়ে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং উৎসাহিত করতে থাকবেন। “উভয় নেতার কথোপকথন দেখে (I was able to see in terms of the conversation)” এটাই ফিল রেইনারের অনুভব ও মন্তব্য।
মোদী-ওবামার মিটিংয়ে সম্পর্কের অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বসিত ফিল রেইনার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপনের আর একটা কারণ আছে। ওবামার ভারত সফরের পরে সিএনএনের ফরিদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে, ওবামা চীন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। কারণ ইতোমধ্যে এই সফর চীনের বিরুদ্ধে ভারত-আমেরিকার জোট পাকানো কিনা তা নিয়ে মিডিয়ায় কথা উঠে গিয়েছিল। ওবামা জানিয়েছেন, এসব “বুলি” বা উস্কানিমূলক ধরণের আলোচনা থেকে দূরে থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের বন্ধনের পক্ষে কাজ করে যেতে চান তিনি।
এশিয়ায় চীন-আমেরিকা-ভারতের অবস্থা এখন এমনই যে কোন দৈব ঘটনাবলে এরা তিন পক্ষ মিলে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারলে এরপরেও পারস্পরিক কিছু সন্দেহ অবিশ্বাসের বাস্তবতা থেকেই যাবে। এর মূল কারণ বাকি দুপক্ষের তুলনায় চীনের উত্থিত অদম্য “অর্থনৈতিক সক্ষমতা” এবং তীব্র প্রতিযোগিতা। এর ফলাফলে এই তিন পক্ষের যে কেউ অন্য দুইয়ের চেয়ে, তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ভাল অবস্থানে থাকার চেষ্টা করবেই। এক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত ও আমেরিকার অন্তত একটা বাড়তি সুবিধা হল, ভারত ও আমেরিকা নিজেদেরকে “আভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনুসরণের শক্তি” মনে করে। তাদের বিচারে যা চীনের নাই। ফলে যদি তারা উভয়ে মিলে একাগ্রভাবে এশিয়ার জন্য প্রত্যেক দেশে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের পক্ষে’ থাকে তবে এশিয়ায় জোট পাকানোর ক্ষেত্রে তারা চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে তাদের উভয়ের দৃঢ় অনুমান। চীনের উত্থান দেখে পালটা যতদূর সম্ভব গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকা, ড্রাম বাজানো – এই অনুমানের অরিজিনাল উদ্গাতা হলেন এখনও সক্রিয় তবে বুড়ো তাত্ত্বিক হেনরি কিসিঞ্জার। যদিও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের এইকালে পাশাপাশি একই সাথে ইসলাম কিছু প্রশ্ন তুলে সামগ্রিকভাবে পশ্চিমকে কুপোকাত করে ফেলেছে। আর একে ওয়ার অন টেররের নীতিতে মোকাবিলা করতে গিয়ে কিসিঞ্জারের তত্ত্বও অকেজো এবং কথার কথা হয়ে আছে। এসব আমেরিকাসহ পশ্চিমের অজানা নয়। তবু যেসব অঞ্চলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বিষয় আছে সেসব জায়গায় কিসিঞ্জারের তত্ত্ব কিছু কাজে লাগতে পারে এই আশা আমেরিকা ছেড়ে দেয় নাই। যেমন, ভারত-আমেরিকার প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা কূটনীতিতে সেখানে দেখব বলা হচ্ছে দুনিয়ার দুই “বৃহৎ কার্যকর গণতন্ত্র চর্চার দেশ”, “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা” – ইত্যাদি। অর্থাৎ ওবামা তাঁর চীনকে ঘায়েল করার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির ফাঁদের মাহাত্ম ও সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভারতকে কাছে টানতে চাচ্ছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ভারত-আমেরিকার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির কমননেস বা সাধারণ দিক এরই ভিত্তি বলে ড্রাম পিটতে চাইছে।
তবে ভারত-আমেরিকা ড্রাম বাজাতে চাইছে কথা সত্য হলেও এতে ভারতের কিছু পুরান জামা খুলে পড়ারও লক্ষণ এটা। যেমন, নেহেরু আমলের ভারত তখনও বৃহৎ “গণতান্ত্রিক” নাকি তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র ছিল এর ফয়সালায় কোন স্পষ্ট উচ্চারণ আজ এখনও নাই। কেউ সাহস করে নাই এখনও । তবু মাঝামাঝি ষাটের দশকের সময়ে রাশিয়া-আমেরিকার বাইরে “জোটনিরপেক্ষ দেশের” একটা তকমা নেহেরুর ভারতের ছিল অনেকদিন। তাসত্ত্বেও ঐ অবস্থাতেই কালক্রমে নেহেরুর আমল থেকেই অস্ত্রের চালানের প্রয়োজনে ভারত যতই রাশিয়া মুখি হয়েছিল ততই ভারতের মুখে আর “আমাদের বৃহৎ গণতন্ত্রের” ঢাক শোনানোর দরকার দেখা যায় নাই। বরং সত্তর দশক থেকে ইন্দিরা আমলে “সমাজতন্ত্র” আর “সেকুলারিজম” ভারতের প্রধান পরিচয় বলে তিনি স্পষ্ট দাবি করতে শুরু করেন। তামাশার দিকটা হল, সেটাই আবার ইন্দিরার “জরুরী আইন” জারি করে ভারত চালানোর কাল। এরপর ১৯৮৫ সালের পর থেকে নেহেরুর নাতি রাজীবের আমলে ক্রমশ “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র কথাটা কার্পেটের তলে চলে যেতে থাকে আর “বৃহৎ গণতন্ত্র” কথাটা প্রথম সামনে আসতে থাকে। তবুও তখনও একটা জিনিষ – আমেরিকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিনা এই সার্টিফিকেট ভারত আমেরিকাকে দেয় নাই, মূলত রাশিয়ান ব্লক রাজনীতির পুরান দায় বা লিগ্যাসির কারণে। না দিয়ে চলতে হয়েছিল। শেষে গত ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের ইউপিএ এর সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে আমেরিকার সাথে ষ্ট্রাটেজিক এলায়েন্সের দিকটা স্পষ্ট আকার নিতে থাকে। কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির মুখে আমরা ভারত দুনিয়ার “বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ” এই বয়ান শুনেছি। অর্থাৎ তিনি আর ভুয়া “সমাজতন্ত্রের” জামা পড়তে চাচ্ছেন না। ভারত এবার পরিষ্কার করে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” ভারত হল। আর এর সম্ভবত আরও চূড়ান্ত দিকটা ঘটল এবারের মোদী সরকারের হাতে। ভারতের কনষ্টিটিউশন গ্রহণ ও কার্যকর হবার দিন ২৬ জানুয়ারি, যেটা তাদের ভাষায় প্রজাতন্ত্র দিবস। সম্ভবত ২০০৪ সাল থেকে ভারতে গত কয়েক বছরের এক নতুন রেওয়াজ চালু করা হল যে, ঐদিন কোন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রধান অতিথি করে আনা হবে। আর গত বছর থেকে। আমেরিকার সাথে ভারতের জটিল ও জট পাকিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গিট-ছুটাতে একটা শো-আপ করা মোদীর খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। মোদী তাই ওবামার প্রতি আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়ে থাকার ইমেজ দেখাতে ওবামাকে হঠাৎ করে প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল অতিথি হিসাবে এবার দাওয়াত দেন। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য এই ঘোষণা প্রথম তিনি নিজেই প্রকাশ করেন নিজের টুইটার একাউন্ট বার্তা থেকে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবস তো নিজেই রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী। “প্রগতিশীলতার” শ্লোগান ধরে রাখার লোভে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে নিজের প্রজাতন্ত্র দিবসে দাওয়াত দিবার কথা এর আগে সম্ভবত ভারতের কোন নেতা কেউ ভাবতেও চায়নি। মোদী সেটাই করে দেখায়ে দিলেন। কিন্তু এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ তকমার বদলে গণতন্ত্রী বলে সার্টিফিকেট দিতে চান বলে এটা করেছেন। মনে রাখতে হবে, এবারের মোদী-ওবামা সাক্ষাতে যৌথ ঘোষণায় যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এর প্রায় সব ইস্যুগুলোই গত কংগ্রেসের আমলে ২০০৫ থেকে চালু ছিল তবে অকেজো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এবার সেগুলোই অর্থাৎ আমেরিকার সাথে সব পুরান চুক্তিই এবারের চুক্তিগুলোর বিষয়। কারণ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানান বিরোধ সংঘাত একটা করে বের হতে হতে গত দশ বছরে ভারত-আমেরিকা সামগ্রিক সম্পর্কই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। ভারতের দিক থেকে মোদীর সাফল্য এই যে তিনি মাত্র আট মাসে ওবামার সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই প্রত্যেক ইস্যুতে জটগুলো মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, চুক্তিগুলো নবায়ন করেছেন। ভারতের বৈদেশিক সম্পর্কের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যেমন, চীন বা জাপানের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক মুখ্য ইস্যু, আমেরিকার সাথে ঠিক তেমনটা নয়। আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক অর্থনৈতিকও বটে তবে মুখ্য ইস্যুগুলো হল সামরিক, ষ্ট্রাটেজিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ-ঝগড়া বিষয়ক নীতি নিয়ে। ফলে তা যথেষ্ট জটিলও। মোদীর দিক থেকে, আমেরিকার সাথে এসব মুখ্য ইস্যুগুলোকে সুরাহা করে, পার হয়ে তবেই নিজের মুখ্য ফোকাস – অর্থনীতি বা ইনফ্রাষ্টাকচার উন্নয়নের দিকে তাঁকে যেতে হবে। তাই কাজের মানুষ মোদীর এই তাড়া। কিন্তু এই বিষয়গুলো ভারতের জন্য কি লাভালাভ আনবে, কতটুকু কাজে লাগবে সেই বিস্তারিত আলোচনা এখন না অন্য কোথাও তুলতে হবে।
এখনকার প্রসঙ্গে আমাদের জন্য এতটুকুই প্রাসঙ্গিক যে এযাত্রায় মোদী ওবামার সাথে মিলে “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির মাহাত্মে যদি মেতে উঠেন, ফিল রেইনারের বক্তব্য যদি অর্থপূর্ণ হয় তাহলে অন্তত – বাংলাদেশের ভোট, ভোটার বা নির্বাচন আমরা কিছু বুঝি না, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওমুক দলকেই আমরা ক্ষমতায় দেখতে চাই ভারতের এই অন্যায় দুঃসহ আবদার থেকে আমাদের আপাতত মুক্তি মিলতে পারে। আমাদের নগদ লাভ এখানেই। তবে এখানে এসব কথার অর্থ আরও পরিষ্কার করার দরকার আছে। যেমন এর অর্থ এমন নয় যে আমাদেরকে চীনের বা আমেরিকার পক্ষপুষ্ট হয়ে বা যেয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া। এমন মনে করা ভুল হবে। সাধারণভাবে বললে, এশিয়ায় ভারত, চীন বা আমেরিকা এই তিন শক্তির কোন একটার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকে ঢলে পড়ে অপর দুটোর কোন একটার বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করার চিন্তা করাই যাবে না। বরং কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে বিশেষত কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিপক্ষে অন্যকে সুবিধা দিবার আত্মঘাতী পথে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই নিতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা আমাদের টিকে থাকার জন্য খোলা আছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের দশা এক্ষেত্রে সেরকমের উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ক্ষমতার দল করা যাবে না যে, নিজের জনসমর্থন হারিয়ে, আকণ্ঠ লুটপাটে নিমজ্জিত হয়ে এরপর চীন অথবা ভারতকে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নিজে ক্ষমতায় থাকতে চায় – এই দুর্গতির পথে হাটা যাবে না। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার, আগামী সম্ভাব্য বিএনপি অথবা আসন্ন যেকোনো দলের বেলায় কঠিন ভাবে সত্যি। এদিকটা খেয়াল রেখে এজন্য উপযোগী রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ্ধতি কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তবেই আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি। এছাড়া আভ্যন্তরীণ কোন বিভাজনের ইস্যু যেমন সেকুলারিজম বনাম ইসলাম ধরণের বিভাজন পরিহার করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।
এসব ঘটনাবলী ঘটছে খুবই দ্রুত। স্বভাবতই ফিল রেইনারের এই প্রেস বক্তব্য হাসিনা সরকার ও সমর্থকদের মনোবল ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট। ফলে এর পালটা কিছু প্রোপাগান্ডাও আমরা লক্ষ্য করছি। দৃশ্যত এর কেন্দ্রবিন্দু বিবিসি, তবে বিবিসি কলকাতার বাংলা বিভাগ। প্রথম রিপোটটা এসেছিল কেন্দ্রীয় বিজেপি নয়, কলকাতা বিজেপি সুত্রে। দুদিন পরে, এরপর ছাপা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার পঙ্কজ সরণকে আশ্বস্ত করেছেন”। পঙ্কজের নামে চালানো তবে পঙ্কজ নয় “বিশেষ সুত্রে পাওয়া” এমন বরাতে, যে পঙ্কজ সরণকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার কি বলেছেন। অর্থাৎ যেন পঙ্কজ সেটা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে কিভাবে রিপোর্ট করেছেন সেই ভঙ্গিতে। আদৌও পঙ্কজ সেটাই রিপোর্ট করেছেন কি না তা আমরা কেউ জানি না। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের কোন সরকারই ফরমালি পঙ্কজ সরণকে এটা বলবে না যে নিজ সরকারের হাতে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে বাংলাদেশের সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছেন, ড্রাইভিং সিটে আছেন এমনটাই স্বাভাবিকভাবে হাসিনা পঙ্কজকে বলবেন। আস্থা রাখতে বলবেন। কিন্তু তাতে ভারতের হাইকমিশনার আশ্বস্ত হয়ে গেছেন কিনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব রিডিং কি সেটা একেবারেই আলাদা বিষয়। এরপর আবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পঙ্কজের রিডিং কতটুকু কিভাবে গ্রহণ করবেন, একমত হবেন বা হয়েছেন সেটা আরও আলাদা। কিন্তু বাংলা বিবিসির রিপোর্টে এই পুরা বিষয়টাকে প্রোপাগান্ডা করতে শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, “আশ্বস্ত করেছেন” বলে দাবি করে। একথা সত্যি যে হাসিনা সরকার পঙ্কজকে “আশ্বস্ত করাতেই চাইবেন”। কিন্তু সেটাকে পঙ্কজের আশ্বস্ত হওয়া এবং তাতে ভারতের সচিব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও “আশ্বস্ত হয়েছেন” বলে ইঙ্গিত করে চালিয়ে দেয়া মিডিয়া টুইষ্টিং। এটা আর নিউজ নয়, বড় জোর এক লেখকের কলাম বা ভিউজ। কারও রাজনীতির প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হওয়া এমনটা হয়ত মিডিয়ায় হয়, করে থাকে কিন্তু সেটাকে অন্তত নিউজ দাবি করে করা যায় না। তবু আপাতত এসব প্রোপাগান্ডার চল আমরা দেখছি।

[লেখা এই রচনা এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫  চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সামান্য এডিট করে আবার ছাপা হল।]

মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

গৌতম দাস
ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-91

২৩ জানুয়ারি ২০১৫।

পরাশক্তি হওয়ার নির্ণায়ক
কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার অথবা গ্লোবাল পাওয়ার বলে যেটা আমরা বুঝাই) খেতাব পাবার নির্ণায়ক কি? অনেকের মনে হতে পারে পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষমতা আর সে বোমা কোন রাষ্ট্রের সংগ্রহে থাকলেই তাকে বোধহয় পরাশক্তি বলা যায়। আসলে এই ধারণার কোন ভিত্তি নাই। তবু কারও কারও এমন ধারণা থাকে। সেটা তৈরি হবার পিছনের কারণটা হল – কোন রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা এটা নিঃসন্দেহে তার সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার একটা মাত্রা ও সেই মাত্রাকে প্রকাশ করা মাত্র। কিন্তু শুধু ঐ একটা মাত্র দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পায় একথা সত্যি না – ভুল অনুমান এখানে। অর্থাৎ সার কথাটা হল, কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতাকে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলে বুঝা – এটা ভুল। আবার পরাশক্তি ধারণা মানে  কেবল কোন সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নও নয়, বরং সামরিকের সাথে ষ্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন এবং সর্বোপরি সব ধরণের সক্ষমতার মূল ভিত্তি হল ঐ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। কারণ কারও পরাশক্তি হয়ে উঠার প্রথম শর্ত নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলে, উদ্বৃতের অর্থনীতিতে পৌছালে তা বাকি সামরিক, স্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার পুর্বশর্ত বলে এরপর পরাশক্তি হয়ে উঠা কিছু সময়ের ব্যাপার কেবল। যদিও, এটা ঠিক যে নিজের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকলে শত্রুর কাছ থেকে বড় বা সর্বাত্মক ধরণের হামলা বা আক্রমণ আসার সম্ভাবনা এটা কমায় মাত্র। আবার শত্রুর উপর এই বোমা ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগও একই কারণে খুবই সীমিত হয়ে যায়। যেমন ভারত-পাকিস্তান কখনও কোন বড় বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ায় না একারণেই। দুদেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে কেউই যুদ্ধকে বড় করতে বা ছড়াতে চায় না – সীমিত স্তরে রাখতে চায়। কারণ কোন পক্ষ অপর পক্ষের হাতে চরম নাস্তানাবুদ হয়ে গেলে সে অপমাণিত বোধ থেকে এটা তাকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে উস্কানি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এই অস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রকৃতি ও মানুষের উপর বিকিরণ বিষয়ে পার্মানেন্ট ক্ষতির কথাও বিবেচনায় নিতে হয়। না নিয়ে গত্যন্তর থাকে না। কারণ বিকিরণের প্রভাব তার নিজ ভুখন্ডেও আসতে পারে। ফলে সামগ্রিক বিবেচনায় পারমাণবিক বোমা মূলত আত্মরক্ষামূলক; এবং তাও সীমিত অর্থে।
আত্মরক্ষামূলক কথার আরও মানে হল সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা যাই থাক না কেন, কোন রাষ্ট্রের সে সক্ষমতা তার প্রতিপক্ষের তুলনায় ছাড়িয়ে গেলেও হামলা করার সময় আক্রমণকারী যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করবে। করবে এই ভয়ে যে সেক্ষেত্রে উপায়হীন দেখে আক্রান্ত প্রতিপক্ষ, দুর্বল হলেও, নিজের কাছে মজুদ থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভেবে বসতে পারে, সেদিকে যেন উস্কানি দেয়া না হয়। আবার আক্রমণকারী শত্রুরও যদি পারমাণবিক সক্ষমতা থাকে সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করে থাকে, উভয়কেই কড়া সর্তক থাকতে হয় যেন কেউ কাউকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেয়। সর্বশেষ ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ফলে নিট ফলাফল হচ্ছে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহে থাকার কারণে উভয় পক্ষকেই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করতে হয়, উভয়কেই একটা স্ব-আরোপিত সীমা তৈরি করে ও তা মানতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে শত্রুকে ঘায়েল বা ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং ভয় দেখানো এবং ভয় পাবার দিক থেকে এটা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে।
আবার ২০০১ সালের পরে আমেরিকার আফগানিস্তান বা ইরাক হামলার বেলায় ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন; ঐক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন নয় যে আমেরিকার পারমাণবিক সক্ষমতা আছে বলেই সে সহজে ঐ দুই দেশকে আক্রমণ করে পদানত ও দখল জারি করতে পেরেছিল। যদিও আফগানিস্তান বা ইরাকের হাতে পারমানবিক বোমা থাকলে ফারাক কিছু হতেও পারত। পারমাণবিক বোমা মূলত ভয় দেখানোর অস্ত্র, যতটা ঠেকিয়ে রাখার অস্ত্র ততটাই তা ব্যবহারের নয়। এসব কারণে, জাপানে ১৯৪৫ সালে এই বোমা ব্যবহারের পর বিশ্বে কোন যুদ্ধ সংঘাতে আর কোথাও এর ব্যবহার হয় নাই। এছাড়া ইদানীং বোমা কেন, পরমাণু এনার্জির ব্যাপারেও প্রত্যেক দেশেই জনগণ যেভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে, ব্যবহার-বিরোধী জনমত প্রবল হচ্ছে তাতে বোমা সংগ্রহে থাকলেও তা ব্যবহারের বিরুদ্ধে খোদ নিজ জনগণেরই মনোভাব প্রবল বাধা হয়ে উঠতে পারে, এটা নাকচ করা যায় না। অতএব বাস্তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
আবার আর একদিক থেকে দেখলে, পারমাণবিক সক্ষমতা মানে নুইসেন্স করার ক্ষমতাও বটে; যেমন উত্তর কোরিয়া। সে তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করছে দেশের ভিতরে ও বাইরে একটা ভয়ের রাজত্ব তৈরির কাজে। একদিক থেকে মনে হতে পারে উত্তর কোরিয়ার শাসক এই বোমার জোরে নিজ সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু আবার অন্যদিক থেকে যদি প্রশ্ন করি, সার্বভৌমত্ব রক্ষা মানে কি? এর অর্থ খুঁজতে ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে, উত্তর কোরিয়ায় এর আসল অর্থ হয়ে আছে নিজ অর্থনীতিকে ক্ষুদ্র বামন করে রাখা, এমনকি বর্তমান ক্ষমতার অধীনেই ন্যূনতম সংস্কার করার আগ্রহ না দেখানো, জনগণের উদ্যমকে দাবিয়ে রাখা, জীবনের মান অচলায়তনে আটকে ধুঁকে ধুঁকে মরা ইত্যাদি। ফলে এগুলো করে কার সার্বভৌমত্ব রক্ষা হচ্ছে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা। সবমিলিয়ে দেশের ভিতরে বাইরে সবার কাছেই উত্তর কোরিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা অন্যদের চোখে ‘নুইসেন্স’ হিসাবেই হাজির হয়ে আছে। অতএব এখানেও আমরা দেখছি, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার অধিকারী বলেই পরাশক্তি হিসাবে গণ্য নয়।
যদিও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে উঠাকেই পরাশক্তির হয়ে উঠা বলে ভুল অনুমানের ধারণা এক সময় বেশ প্রকট হয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় কোন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া বাদে অন্যান্য দিক বিকশিত করবার দিকে ঝোঁক ক্রমশ বেড়েছে। আগের কিস্তিতে বলেছিলাম সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কোন রাষ্ট্রের কেমন থাকবে কি থাকবে না অথবা তা কতটা হবে এটা মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তি অর্জনের উপর। পারমাণবিক সক্ষমতা তো নয়ই এমনকি সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটাও ঠিক কারও পরাশক্তি হবার পরিমাপক অথবা নির্দেশক নয়। কারণ সামরিক খরচ বইবার মত একটা সামঞ্জস্যপুর্ণ উপযুক্ত ও যোগ্য অর্থনীতি সবার আগে থাকতে হবেই। এর উপরই দাঁড়াতে পারে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটার অর্থ। এক্ষেত্রে এখনকার রাশিয়া এক আদর্শ উদাহরণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে থাকার সময় এর যে সামরিক সক্ষমতা ছিল এখন রাশিয়ান ফেডারেশন হয়ে যাবার পর সে নিজ অর্থনীতির মাপে নিজের আগের সামরিক সক্ষমতাকে ছেঁটে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। সেটাও বহাল রাখতে পারছে অর্থনীতির ইন্ডাষ্টিয়াল সক্ষমতা্র ভিত্তি দিয়ে নয়, মাটির নিচের তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থনীতি দিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে।
অতএব, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় যে কোন রাষ্ট্রের জন্য সবার আগে দরকার একটা দ্রুত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি অর্জনের সক্ষমতা নীতি গ্রহণ করা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে সম্পদ বিতরণ ও বণ্টনের নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থা যেন আভ্যন্তরীণ সংকট রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে না পারে। এই দুটো দিক অর্জিত হলে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা আসা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু তারপরও কোন দেশ নিজেকে পরাশক্তি বলে গণ্য নাও করতে চাইতে পারে। অর্থাৎ গণ্য হওয়াটা ঠিক অনিবার্য বা জরুরিও নয়।
মনে রাখতে হবে পরাশক্তি ধারণাটা মূলত ঐতিহাসিক। অর্থাৎ দুনিয়ায় একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ শর্তে এই ফেনোমেনা হাজির হয়েছে যেটা ভিন্ন সময় শর্ত পরিস্থিতি এটা উধাও হতে পারে। ফলে অনিবার্য বা চিরন্তন কিছু নয়। দুনিয়ায় কলোনি শাসনের আবির্ভাবের কাল থেকে ধারণাটার উদ্ভব। ধারণাটা মূলত কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল প্রভাব আধিপত্য কেমন এরই এক নির্দেশক। আবার অন্যদিক থেকে নেতিবাচক। আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন বিনিময় সম্পর্ককে কেবল জবরদস্তি খাটানো বিনিময় সম্পর্ক হিসাবে জারি রাখা, জবরদস্তিতে নিজের মতাদর্শগত দিকটা দুনিয়ার অন্য জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া, নিজেকেই একমাত্র সভ্যতার ধারক-বাহক, আদর্শ বিবেচনা করা -এগুলো হল পরাশক্তি ধারণাটার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। পরাশক্তির এটা খারাপ অর্থ। তবে আগামী দিনের নতুন কোন গ্লোবাল অর্ডারে যদি পরাশক্তি ধারণার প্রত্যক্ষ ও খারাপ অর্থগুলো কমতে কমতে নাই হয়ে যায় তবু এরপর কোন রাষ্ট্রের নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক সক্ষমতার সূত্রে গ্লোবাল প্রভাব রাখার বিষয়টা থেকে যাবে, সম্ভবত সহসাই উবে যাবে না।

সম্ভাবনা সম্পন্ন হয়তো, কিন্তু ভারত পরাশক্তি নয়
পরাশক্তি শব্দটার এই স্বল্প ব্যবচ্ছেদ থেকে আমরা এতটুকু স্পষ্ট হতে পারি যে, পরাশক্তি ধারণার বিচারে ভারত কোন পরাশক্তি এখনও নয়। কিন্তু তবু আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতকে পরাশক্তি বিবেচনা করার কথা উঠেছে। এর কিছু কারণ নিশ্চয় আছে, সেদিক যাব। যেমন, ২০০৪ সালের মে মাসে কংগ্রেসের ইউপিএ সরকারের প্রথম টার্মে ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২৭ জুন ২০০৫, ভারত-আমেরিকা একটা “ডিফেন্স প্যাক্ট” সই করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সহায়তায় ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ উপলক্ষে টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৯ জুন ২০০৫ এর রিপোর্টিং এর প্রথম বাক্যটা এরকম, “India and the United States have signed a 10-year defence relationship agreement that gives credence to the Bush administration’s pledge to help India become a major world power in the 21st century.” এই বাক্যের ভিতরের পরের অংশটা ইন্টারেস্টিং। বলছে, “ভারতকে ২১ শতকে ‘মেজর ওয়ার্ল্ড পাওয়ার’ বা পরাশক্তি হতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছিল এই চুক্তি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে”। এখন পরাশক্তি কথার আমরা আসল যে অর্থ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে ন্যূনতম শীর্ষ তিন-চার জনের একজন হওয়া -এমন অর্থবোধে গত দশ বছরেও ভারত পরাশক্তি হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট অথবা দাবি আমরা কোথাও দেখি নাই। তাহলে এই মিডিয়া রিপোর্টটা এমন কেন? এটা পড়ে অনুমান করা যায় যে অর্থে ভারতের পরাশক্তি হওয়া মানে করা হয়েছে, তাও আবার আমেরিকার সহায়তায়, এটা কারো পরাশক্তি হওয়া বুঝায় কি না? অন্য রাষ্ট্রের সহায়তায় কেউ পরাশক্তি হতে পারে কি না এমন প্রশ্ন বা সন্দেহ এই রিপোর্টে নাই। এছাড়া এই রিপোর্টটা মূলত ভারতকে আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার ও টেকনোলজি সরবরাহ সংক্রান্ত। অর্থাৎ এতে ভারতের বড়জোর সামরিক সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু তাতে ওয়ার্ল্ড পাওয়ার বা পরাশক্তি হবার সম্পর্ক কি – সে প্রশ্ন করতে মিডিয়া ভুলে গেছে। রিপোর্টের এসব ভুয়া অনুমান উদোম করতে এই রিপোর্ট থেকে আরও কিছু প্রসঙ্গ তুলে আনব।
প্রথমত রিপোর্ট জানাচ্ছে, “Hugely ambitious in its size and scope, the agreement envisages a broad range of joint activities, including collaborating in multinational operations ‘when it is in their common interest,’ ”। অর্থাৎ ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে আছে, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ বলে উভয়ে মনে করলেই ‘টেররিজম ধ্বংস’ জাতীয় কোন কিছুর উছিলা তুলে ভারত আমেরিকার সাথে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ঐ “টেররিষ্ট” দেশের বিরুদ্ধে লড়তে সম্মতি জানাচ্ছে। এই পত্রিকার রিপোর্ট নিজে অবশ্য চুক্তিতে কেবল এমন অনুচ্ছেদ থাকাকে ভারতের “উচ্চাকাঙ্ক্ষা” হিসাবে দেখছে। আর এই চুক্তি অনুমান করছে এভাবেই নাকি “two militaries to promote security” তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে আগিয়ে যাবে। রিপোর্টের আর এক অংশ বলছে, “The framework agreement also envisages what is tantamount to the U.S and India jointly policing the world.”। এখানে পত্রিকা প্রতিরক্ষা চুক্তিটা সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্য লিখে বলছে, যেন ভারত-আমেরিকা যৌথভাবে বিশ্ব-পুলিশের ভূমিকায় নামতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্ব-পুলিশী করার খায়েস রাখার বিপদের দিকটা নিয়ে পত্রিকা আপত্তি তুলছে। তৃতীয়ত, ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে সই করেছিলেন, যুদ্ধবাজ বুশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফিল্ড আর ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রণবকে এক রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিলেন, এটা “playing a subservient role to a unipolar US agenda” অর্থাৎ ভারতের দিক থেকে দুনিয়াতে এক মেরুর মাতবর আমেরিকার এজেন্ডার অধীনস্থ হওয়া হয়ে যাচ্ছে কি না। এর জবাবে প্রণব আমেরিকাকে বিশাল ঠকান ঠকিয়ে এই চুক্তি জিতে এনেছে এমন এক মিচকি হাসি দিয়ে বলেছেন, “This is the real deal…we have both put down what we want for the next decade… “he didn’t expect convergence or agreement on all issues at all times.”। তর্জমা করলে, “এটাই তো আসল খেলা, … পরের দশক পর্যন্ত আমরা কি চাই তা উভয়েই ওখানে লিখে রেখেছি।… সব ইস্যুতে সবসময় আমাদের উভয়ের একমত হতে বা মিলতে হবে এটা আমি আশা করি না”। প্রণবের এমন আস্থাবাচক মুচকি হাসির কারণ, ঐ প্যাক্টের আর এক অনুচ্ছেদ হল এরকম, “এই চুক্তি ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়ার অধিকার খর্ব করে না”। “ The agreement does not preclude India’s right to its independent views.”। এই হোল প্রণবের “ভারত পরাশক্তি” নামক প্রপাগান্ডার ফানুস। তবে ফানুস উড়িয়ে একটা ভাব তো ছড়ানোই যায় যে আমরা এই তো চাঁদে চলে যাচ্ছি। সে যাক, কিন্তু ‘আমেরিকাকে মহা ঠকিয়েছে’ ভাবটা প্রণব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। ভারত প্রথম ধাক্কা খায়, ২০১১ সালের প্রথম অর্ধে যখন বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর রাখার পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। স্বভাবতই ওবামার এই ইচ্ছার ভিতরে ভারত এবার খোদ নিজেরই নিরাপত্তার জন্য হুমকি আর বিপদের দিকটা দেখেছিল। ভারত আমেরিকান পরাশক্তির যাঁতাকাঠি ধার পেয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ থেকে; বাংলাদেশে কে সরকারে আসবে থাকবে, কি শর্তে থাকবে তা ঠিক করার কর্তা হওয়ার ভিতর দিয়ে। এটাও প্রণবের চোখে পরাশক্তি ভাবার সুখবোধ হতে পারে।

দুই হাজার চৌদ্দ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কথাবার্তার পর নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন কম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ছিল ২৬%, সেটা এখন বাড়িয়ে ৪৯% করা হয়েছে। দুই হাজার পনেরো সালে ভারত ও মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ হবার কথা ছিল। মোদীর মার্কিন সফরের পর সেটা আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভারতের সেই সুখবোধে টান পড়তে শুরু করে প্রায় একই সময় ২০১১ সাল থেকে। এরই এক প্রকাশ্য রূপ হল, বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারত-আমেরিকার দুই মেরুতে অবস্থান। অর্থাৎ আমেরিকার বিদেশনীতি আর ভারতের বিদেশনীতি হরিহরাত্মার মত একই আত্মা না হলেও “নিরাপত্তা”, “টেররিজম” এসব শব্দের আড়ালে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এই হরিহর মিলনের মধ্যে কোন খটমটর নাই, আসবে না এই ভাব ছড়ানো হয়েছিল। এমন মিথ্যা ধারণাটা উন্মোচিত হয়ে যেতে শুরু করেছিল ২০১১ সাল থেকে। অথচ ভারত ও আমেরিকা দুজনেই জানত যে মূলত আমেরিকার চীন ঠেকানোর ইচ্ছা থেকে এসব ঘটছে এবং ঘটানো হচ্ছে। যদিও আসলে চীন ঠেকানো অসম্ভব এটাই অবজেক্টিভ বাস্তবতা। একেই আগের কিস্তিতে “উদ্বৃত্ত বাস্তবতা” বলেছিলাম। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে যতটুকু ও যতদিন আমেরিকা পরাশক্তি হিসাবে নিজের উঁচু জায়গা জাগিয়ে রাখতে পারে সেই উদ্দেশ্য সাধনে সাময়িক সে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। কিন্তু উভয়েই এই জানা জিনিষটা লুকানোর ভাব ধরেছিল। বিশেষত ভারত ভাব ধরে ছিল যে সাদা চোখে ধরা পড়া জিনিষটাও সে দেখেও দেখে নাই। যেন এটাই তার পরাশক্তি হবার পথ, যেন আমেরিকা তাকে পরাশক্তি হতে সহায়তা করছে, এই ধারণা প্রণবের সরকারই মিডিয়াতে ছড়িয়েছিল।

আজকের দুনিয়ার মুল দ্বন্দ্ব
আজকে চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্বের মুল বিষয় হল, আগামি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কে নিয়ন্ত্রণ করবে? একালেও ব্রিটেনের সাথে আমেরিকার ছোটখাটো স্বার্থবিরোধ দ্বন্দ্ব আছে কিন্তু এই দ্বন্দ্ব তুলনায় তেমন একেবারেই কিছু নয়। তবে এককালে, ব্রিটেন ও আমেরিকার সত্যিকারের একটা বড় দ্বন্দ্ব ছিল, যা ক্রমশ চরমে উঠা আর ফয়সালার সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টা (১৯১৪-১৯৪৪), এই ত্রিশ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের কর্তা হিসাবে ব্রিটেনের পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে আমেরিকার মাতব্বরিতে নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল। যদিও বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে হাজারো বই-পুস্তক সিনেমায় হাজির বয়ান আছে। যেখানে যুদ্ধের মুল প্রতিপাদ্য হল হিটলারের জার্মানি, ইটালি বনাম বাকি পশ্চিমা শক্তি – যেন এমন এক “ন্যায়ের যুদ্ধ” সেটা। জেনারেলদের বীরত্বের এক এক গাথা সেগুলো। কিন্তু কোন বর্ণনায় যেটা বলে না তা হল, ঐ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক তাতপর্য। তা হল, সারা দুনিয়াকে উপনিবেশ বা কলোনিতে ভাগ করে নেয়া, এক একটা সাম্রাজ্যের অধীন করে রেখে দেয়া আর শিরোমনি হিসাবে থাকা বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা সীমিত বিকশিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারটা ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষে হস্তান্তর হয়ে আমেরিকার হাতে চলে যাওয়া। সেটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে -এই প্রথম জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া আর নিজের পরাশক্তিগত উত্থান। অর্থাৎ আগে বৃটিশ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে নড়বড়ে অবিকশিত এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ছিল কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো ছিলই না। এমনকি কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল না, ছিল Rothschild family এর পারিবারিক ব্যাংকের মত কিছু প্রতিষ্ঠান মাত্র। এসবের বিপরীতে কায়েম হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে এক প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার। তবে তা ছিল তখনকার “উদ্বৃত্ত বাস্তবতায়” আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার জোরে, সামরিক বা গায়ের জোর দেখিয়ে নয়। আর, ব্রিটেন সেকালের উদীয়মান শক্তি আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের পুরানা কলোনি ব্যবস্থা অর্থাৎ তখনকার গ্লোবাল অর্ডারকে টিকানো বাস্তবত অসম্ভব ছিল বলে কিছুই করতে পারে নাই। তবে পরাজিত হবার পর ব্রিটেন আবার আমেরিকার নেতৃত্বে যে নতুন গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হল সেখানে আমেরিকার খুবই ছোট পার্টনার হয়ে আমাদের মত ছোট অর্থনীতির উপর রুস্তমির ভাগ যতদূর পায় তা টুকিয়ে সেই থেকে দিন চালাচ্ছে।

আজ চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব ১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ-আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বড় দ্বন্দ্বের মতই। দ্বন্দ্বটা একই ধরণের, পুরান ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডার বনাম আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার; এর নিয়ন্ত্রণ করবে কে –সেটাকেই আমরা আর এক অর্থে মাতবর বা পরাশক্তি হবার লড়াই বলছি। আজ চীন আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারটা চ্যালেঞ্জ করে ফেলেছে। এটা ভেঙ্গে দিয়ে নিজের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম করতে চাইছে। দ্বন্দ্বের সারকথা এটাই। ফলে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব লড়াইয়ের মুখে আমেরিকা ভারতকে পাশে রাখতে চায় যাতে ভারত চীনের সাথে নতুন গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করবার সহযোগী সাথী না হয়ে ওঠে। সে লক্ষ্য হাসিল করতে আমেরিকা ভারতকে পরাশক্তি হবার মিথ্যা লোভ দেখিয়েছে। মিথ্যা এজন্য যে, পরাশক্তি হওয়াটা কারও সহযোগিতায় পাওয়া না পাওয়ার উপর নয় বরং আপন অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করার উপর নির্ভর করে। ফলে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে আমেরিকা প্রলুব্ধ করেছে আর প্রণবের কংগ্রেস সে লোভে মশগুল থেকেছে। এভাবেই স্বপ্ন দেখতে দেখতে কংগ্রেস ইউপিএ সরকারের দশ বছর পার হয়েছে। আর সেই থেকে ভারত একটা পরাশক্তি এমন ভুয়া ধারণা মিডিয়ায় খামাখা চালু হয়ে রয়েছে।

আগে বলেছি ভারতের সামরিক শক্তিতে শ্রীবৃদ্ধি হলেও এর মানে তার পরাশক্তি হওয়া নয়। তাছাড়া মুল কথা, কোন রাষ্ট্র কাউকে সহযোগিতা দিয়ে পরাশক্তি বানিয়ে দিতে পারে না। তবু সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজির আকাঙ্ক্ষা ও লোভে ভারত আমেরিকার এই প্ররোচনায় পা দিয়েছে। তাও হয়ত হতে পারে। কিন্তু, আমেরিকা কি চীন ঠেকাতে গিয়ে ভারতকে পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা বাস্তব করে তুলতে পারে? অর্থাৎ আমেরিকা যদি চীনের পরাশক্তি হওয়া খর্ব করতে চায় সেই আমেরিকা আবার আর এক পরাশক্তি হতে ভারতেকে কি সহযোগিতা আদৌ করতে পারে? কেন করবে? জবাব হল করতে পারে না, কোন কারণ নাই। তবু ভারত সেটা বিশ্বাস করে যে সে পরাশক্তির হতে চলেছে বা হয়ে গয়েছে। এমন স্বপ্নে দিল্লী বিভোর থেকেছে।

তাহলে সারকথা, ভারতের পরাশক্তি হবার আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঠিক মৌলিক করণীয় কাজ হল সবার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা, সবার আগে অর্থনীতি ফোকাস করে এগিয়ে যাবার নীতি গ্রহণ করা। “নিরাপত্তার” নামে বাকচাতুরি, আমেরিকাকে ফাঁকি দিতে পারছে মনে করা -এগুলো আসলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া, সদর রাস্তা থুয়ে ব্যাকডোরে কাজ হাসিল করার মত শর্টকাট কাজ – পণ্ডশ্রম। আবার অন্যদিকে প্রণবের কংগ্রেসের দশ বছরে সর্বোচ্চ জিডিপি ছিল একমাত্র ২০১০ সালের প্রথম দুই মাস, ডাবল ডিজিটে। এরপর এটা পড়তে পড়তে কংগ্রেসের বাকি আমল ছিল পাঁচের নিচে। গত বছর কংগ্রেসের পতনের পরে, এসবের বিপরীতে যা কিছু বুঝে বা মনে করেই হোক মোদীর ভারতের উত্থান অর্থাৎ অর্থনীতি ফোকাস করে নিজের আগানোর নীতি নির্ধারণ স্বভাবতই সঠিক পদক্ষেপ। যদিও মোদী আমেরিকার সাথে ডিল করবে কি করে সে প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিতই রয়েই গেছে।

জুন-সেপ্টেম্বর মোদীর ক্ষমতার প্রথম চার মাসের পরে
আগের কিস্তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মানসিক আমোদ, আদর্শ এবং সুখবোধের উৎস হয়ে থেকে গেছে। আমলাদের এমন মনোগাঠনিক প্রভাব সত্ত্বেও মোদি নিজেকে পরিচালিত করতে সুযোগ পেয়েছিলেন প্রথম চার মাস। এর মধ্যেই ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওবামার সাথে শীর্ষ বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসে। ফলে আমেরিকার সাথে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসে, গোয়েন্দা-আমলাদের মনোগাঠনিক প্রভাবের বাইরে মোদি আর থাকতে পারেন নাই। এর সম্ভাব্য কারণ, মোদী এবং তাঁর টিম ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য যে পথে পরিচালিত করতে চান এনিয়ে স্বপ্ন পরিকল্পনায় যতটা হোমওয়ার্ক করেছেন ততটা সময় আমেরিকার সাথে ডিলিং এর বিষয়ে দিতে পারেন নাই। এর কারণ ভারত-আমেরিকার দেনাপাওনার ফোকাস সিম্পল অর্থনৈতিক নয়। এছাড়া ভারতের চাওয়াগুলো কি করে আদায় করবেন, এমনকি তা কোন জায়গায় রেখে কংগ্রেস সরকার বিদায় নিয়েছে সেখান থেকে এর বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং উত্তরণের পথ কি হতে পারে এনিয়ে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তার টিমকে স্টাডির কাজ দিয়ে হয়ত শুরু করতে হত। আর মুখ্য বিষয় কংগ্রেসের অকেজো “নিরাপত্তা” লাইনের বদলে নিজের “অর্থনীতি” লাইনে চলতে চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সেই একই রয়ে গেছে।
ওদিকে নতুন গ্লোবাল অর্ডার যা ভারতেরও অর্থনৈতিক স্বার্থ, তা নির্মাণে BRICS ও AIIB মত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়তে মোদী কি চীনের মতই পাশে থেকে সক্রিয় উদ্যোগ নিবেন? নাকি আমেরিকার প্ররোচনায় সেই উদ্যোগে গড়িমসি করে বিনিময়ে আমেরিকার থেকে নিজের অমীমাংসিত স্বার্থগুলো আদায়ে একে ব্যবহার করবেন? বিগত কংগ্রেস এই বিনিময়ের লাইন বজায় রেখে এগিয়েছিল, যদিও বাস্তবে তাতে ভারতের কোন স্বার্থই হাসিল হয়নি, কোনদিকে তেমন ফল দেয় নাই।

সমান মালিকানা শেয়ার, সমান ভোট ফলে মতামতের সমান ওজন
দ্বিতীয় আর এক দোনোমনা অবস্থা ভারতের রয়ে গেছিল। BCIM অথবা BRICS গড়ার প্রশ্নে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বা নতুন সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগের প্রশ্ন ছিল সেখানেই চীনের শেয়ার যাতে কোনভাবেই বেশি না হয় তা ঠেকানোর বিষয়টাকে মুখ্য বিবেচনা করে এগিয়েছে। অন্যভাবে বললে ভারত এমন নিয়ম আরোপের পক্ষে কাজ করেছে যাতে উদ্যোক্তাদের সবার বিনিয়োগ সমান হতে হবে, এই নিয়ম আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলেছিল। বাস্তবে যে কথার মানে হল, BCIM অথবা BRICS প্রতিষ্ঠানগুলো আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্যারালাল প্রতিদ্বন্দ্বী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়াতে নিজস্ব প্রাইমারি মূলধন চাহিদা যাই থাক এবং তা পূরণের চাহিদা সম্মিলিতভাবে থাক আর না থাক, তাকে ছেঁটে ভারতের নিজের নিচু বিনিয়োগ ক্ষমতার মাপের সীমায় আটকে বামন ও অকার্যকর করে রাখা। ফলাফলে এগুলো প্রভাবশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হোক না হোক তা ভারতের বিবেচনার বিষয় নয়। অথবা সেকেন্ডারি বিবেচনা। একথা ঠিক আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসারে, ওসব প্রতিষ্ঠানে আমেরিকান শেয়ার সবার চেয়ে বেশি বলে, যে কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ মালিকানা নীতি অনুসারে মালিকানা শেয়ার যার বেশি মানে ভোটের ক্ষমতা তার বেশি, মানে তার নিজের অবস্থান মতামতের ওজন অন্য সবার চেয়ে বেশি। এর ফলাফলে এগুলো হয়েছে আমেরিকান স্বার্থে কান্নি মারা প্রতিষ্ঠান। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসরণে নতুন করে BCIM অথবা BRICS গড়তে গেলে তা একই সমস্যার জন্ম দিবে। ফলে ভারতের উদ্বেগ জেনুইন। কিন্তু এই উদ্বেগের সমাধান করবার ফর্মুলা কোনভাবেই উদ্যোক্তা মালিকানা সবার শেয়ার সমান করে দেয়া হতে পারে না। কারণ এর অর্থ তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বামন ও অকার্যকর করে রাখা হবে। ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপ মানে ততোধিক নিচু মূলধন বিনিয়োগের ক্ষমতা। মনে রাখতে হবে আমরা এই প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগ বলতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের কথা বলছি না। এটা অবকাঠামোগত অথবা নতুন অর্থনৈতিক সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি বীজ-পুঁজির কথা বলছি। যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মুনাফা নয়, এই বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসবে আধা পার্সেন্টের নিচে অথবা হয়ত কোন মুনাফাই নয় এমন। ফলে ভারতের এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সক্ষমতার চেয়েও কম হবে। তাহলে আমাদের এই পথে নয়, অন্য সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অর্থাৎ ভারতের উদ্বেগ অস্বস্তি জেনুইন, কিন্তু সমাধানের প্রস্তাবনা নয়। কি হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান?
মালিকানা শেয়ার ভিত্তিতে ভোট বা বক্তব্যের ওজন – সিদ্ধান্ত ও পরিচালনা নীতি এমন না করে সদস্যদের মালিকানা শেয়ার অবশ্যই অসমান হবে আর তা যার যাই হোক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি হয় কনসেনসাস বা ঐক্যমত্য এবং অবজেক্টিভ টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত বিবেচনা তাহলে সহজেই এই সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ কারও মালিকানা ভোটকে তার অবস্থান বক্তব্যের ওজন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। অবস্থান মতামতকে নিজ মেরিটে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী হতে হবে, ভোটের ক্ষমতার জোরে নয়। এটা করতে পারলে প্রধান সুবিধা যা পাওয়া যাবে তা হল, চীনের হাজির প্রবল বিনিয়োগ সক্ষমতাকে BCIM অথবা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করা। যেটা BCIM অথবা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত প্যারালাল সমতুল্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির করতে পারে। ঠিক এরকম অন্য কারও কোন প্রস্তাবও হতে পারে। কিন্তু মূলকথা, মালিকানা ভোটের ভয়ে নব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বামন করে রাখা যাবে না। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে নতুন কিন্তু বামন প্রতিষ্ঠান করা আর না করা সমান। কোন অর্থ হয় না তাতে।
প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? আমরা একেবারেই নিশ্চিত নই। আমরা অপেক্ষা করছি। মোদী সম্পর্কে মূল্যায়নে শেষকথা বলার সময় এখনও আসেনি। আর তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাসের নীতির কারণে এই নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মোদীর পক্ষে এমন চিন্তা করা অবশ্যই সম্ভব হলেও তিনি তা করবেন, তাঁর গোয়েন্দা-আমলাদেরকে পিছনে ফেলে আগাতে পারবেন এতদূর এখনই বলা ঠিক হবে না। তবে আরও কিছু ফেভারেবল দিক আছে; যেমন, চীনের প্রতি তাঁর সাধারণ মনোভাব অন্তত প্রণবের মত নয়। আমেরিকার প্রতি সাধারণ মনোভাবও অন্তত প্রণবের কংগ্রেস বা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মত নয়। আমেরিকা ভারতকে একটা “পরাশক্তি ভাব” দিবার সক্ষমতা বাস্তবতায় থাক আর না থাক তাকে ঢলে পড়তে হবে, না দিলে আবদার অথবা আকাঙ্ক্ষার সুখবোধে বিভোর থাকতে হবে – এমন একেবারেই নয়। তবুও মোদীর অবস্থান দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সাথে মুলাকাতের প্রথম পর্ব মোদীর শেষ হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তাতে মোদীর ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের অমীমাংসিত এবং জট পাকিয়ে যাওয়া ইস্যুগুলোর সাথে সাক্ষাত বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়েছেন। আমরা অনুমান করতে পারি, আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজি পাবার বিষয়ে তিনি যতদূর নমনীয় হওয়া সম্ভব হবেন। কিন্তু সেটা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে রাখার বিনিময়ে নয়। এই ভরসা রাখছি এজন্য যে শেষ বিচারে মোদী তাঁর অর্থনীতি” ফোকাস থেকে সম্ভবত কোনভাবেই সরবেন না। কারণ তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাস আকাঙ্ক্ষাকে জীবিত রাখতে চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব তাঁর চেয়ে ভাল আর কে বুঝে। এই পটভূমিতে ওবামা এমাসেই ভারত সফরে আসছেন বিশেষ দাওয়াতি হিসাবে। ভারতের “প্রজাতন্ত্র দিবস” মানে কনষ্টিটিউশন গৃহীত হবার দিন, ২৬ জানুয়ারি উৎযাপনে, প্রধান অতিথি হিসাবে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার হিসাবে খ্যাত সি রাজামোহন এটাকে বলছেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের দিক থেকে মোড় ঘুরার সফর। অর্থাৎ ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে যে দোলাচল আছে তা অনেকটা থিতু হবার সফর। তিনি একটা বিশেষ দিকে নজর এনেছেন যার সারকথা হল, গত সেপ্টেম্বরের মোদীর সফরের সময় ওবামা-মোদী উভয়ে তাদের আমলা প্রশাসনের অবস্থান মতামতকে পিছনে ফেলে বাণিজ্য বিষয়ে ঝগড়ার মীমাংসা করেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, পত্রিকায় তিনি লিখছেন, … suggests that the two leaders had personally driven their bureaucracies to bring the dispute on trade facilitation to an end.। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে সামরিক ইস্যু ছাড়াও অন্য মুল ইস্যু হল WTO সম্পর্কিত বাণিজ্য সুবিধাদি নিয়ে বিতর্ক। অর্থাৎ আমলা প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতে পুরাপুরি পরিচালিত না হয়ে বরং এর উপরে নিজেদের রাজনৈতিক বিবেচনাকে স্থান দেবার একটা চল মোদী-ওবামা উভয়ের মধ্যে আছে। এই বিচারে ওবামার এই সফর থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে থিতু হচ্ছে এর আরও কিছু অগ্রগতি এখানে আমাদের দেখতে পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও রাজামোহনের দৃষ্টিতে এই সফরকে দেখার করার দরকার নাই। মনে রাখতে হবে, তিনি ভারতকে আমেরিকার “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” হিসাবে দেখতে চাইবার লোক। এখানে “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” কথাটা ভাঙলে এর সারার্থ, চীন বিরোধী হয়ে ভারত-আমেরিকার আগানোর ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ জোট।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি প্রণব মুখার্জির দৃষ্টিভঙ্গী
প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? সে প্রসঙ্গে যাবার আগে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারের প্রতি প্রণবের মনোভাব সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক। এটা শুধু প্রণবের মনোভাব নয় বরং বিগত কংগ্রেসের সরকার যে রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেছে তা হল – ভারত চীনের সাথে এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে চলে যেতে পারে আমেরিকাকে এই ভয় দেখিয়ে এটাকে জিম্মির বুটি বানিয়ে এ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা। সারকথায় পুরানা গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটার আয়ু আরও লম্বা করে দেওয়া। যেমন, ভারতের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি হয় নি সেটা বিবেচ্য না, কিন্তু ভারতের লোভ বর্তমান জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে চীন বা আমেরিকার মতই ভেটো মেম্বার কিভাবে হওয়া যায়। আর এই লোভের কথা টের পেয়ে আমেরিকারও তাকে মুলা ঝুলিয়ে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মিথ্যা লোভের তীব্রতা বুঝার জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে হাসিনার প্রথম ভারত সফরে মনমোহন-হাসিনার যে ৫১ দফা যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর হয়েছিল এর ৪৮ নম্বর দফা দেখা যেতে পারে। ঐ দফা বলছে, “ভারতের ভেটো মেম্বার হবার খায়েসে বাংলাদেশ ভারতকে সমর্থন করে”। অর্থাৎ এর অর্থ হল, প্রণবের ভারত কল্পনায় নিজেকে এমন এক আগামী দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে যেখানে আদতে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাই থাকবে আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে চীন ঠেকানোর পুরস্কার হিসাবে তাদের স্বার্থে সাজানো গ্লোবাল অর্ডারকে টিকিয়ে রাখে এমন জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের মতই সমান গ্লোবাল ক্ষমতায় ভারতকে পাশে বসাবে। এভাবে পুরান ময়লার ভিতরে প্রণবের ভারত নিজের ভবিষ্যৎ দেখে, এর বেশি ভাবতে পারে না। এটা ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বের চিন্তা-প্রতিবন্ধতার সমস্যা, তারা স্বপ্ন দেখতেও শিখেনি। তারা জানতে শিখতে খবর করতে এখনও অক্ষম যে ১৯৪৪ সালে কোন শর্ত বা পরিস্থিতিতে পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকা গঠন করে নিতে পেরেছিল। কাদের মধ্যে ভেটো ক্ষমতা ভাগ করে নেয়া হয়েছিল, কেন তা সম্ভব হয়েছিল। এ সম্পর্কে স্টাডি করে সেটা না বুঝলে এটা বুঝা যাবে না এই অর্ডার ভেঙ্গে পড়বে কেন এবং কখন। কোন্‌ আলামত দেখলে তা বুঝা যাবে। অথবা কেন তারা আজ গ্লোবাল অর্ডারের পড়তি দশায় ভারতকে তাদের সমান আসনে বসাবে অথবা আদৌ বসিয়ে দিতে পারে কি না। একদম মৌলিক প্রশ্ন – জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা কি কেউ কাউকে অনুগ্রহ করে অথবা চীনকে জিম্মি করার বুটি হিসাবে দিবার বিষয়? নাকি নিজেই নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে নিজেই তা নিবার বিষয়? প্রণবের কংগ্রেস চিন্তা কতবড় নাবালক এরই প্রমাণ এগুলো। ভারতের ভেটো সদস্য হবার স্বপ্ন দেখাটা শুধু স্বপ্ন অর্থ কোন সমস্যার নয়। কিন্তু চিন্তার দেউলিয়াত্ব বা সমস্যা হল, নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে উঠার উদ্যোগে সামিল না হয়ে বরং আমেরিকার অনুগ্রহে পাবার চেষ্টা আর পুরান অর্ডারের ময়লা ঘেঁটে এর মধ্যেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় মনে করা। তারা ভুলে থাকতে চায় অথবা খেয়াল করেই হয়ত দেখেনি যে, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে তাদের সমমর্যাদা দিবার লোভ দেখানোর অর্থ কি? এটা কি পশ্চিমের নিজেদেরই ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডারে নিজেদের গুরুত্ব বা মর্যাদাকে চ্যুত করা নয়? সারকথায় পশ্চিমের উপস্থিত সমস্যা হল, পুরান গ্লোবাল অর্ডারের পড়ে যাওয়াটাকে কি করে ঠেকানো যায় অথবা অন্ততপক্ষে দেরি করিয়ে দেয়া যায়। সেই দশায় সে কাকে কি দিতে পারে? কেন দিবে? আমাদের সৌভাগ্য যে প্রণবের এসব এবসার্ড স্বপ্ন তাদের সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থাতেই অকেজো, ফলহীন বৃক্ষ হয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। তাসের ঘরের মত প্রণবের স্বপ্নের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক নন-ফাংশনাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটা আজ প্রমাণিত যে এই লাইন অনুসরণ করে ভারতের পাতে কিছুই আসেনি। আমেরিকার সাথে তার জমে উঠা দূরে থাক, এশিয়ায় আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থকে জায়গা করে দিতে গেলে এখন খোদ ভারতের মৌলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি যায় এটা আজকের বাস্তবতা। ফলাফলে আমেরিকার সাথে মনোমালিন্য আর ঝগড়া তুঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতাকাল শেষ করেছিল।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রণবের এই অবাস্তব ও অকেজো আমেরিকান অনুগ্রহ পাবার স্বপ্নের বলয়ের মধ্যেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে। হাসিনা-প্রণব সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশকে দিল্লি হয়ে মার্কিন অনুগ্রহের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল, ঢাকা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও। প্রণবের দিল্লি বোঝাতে চেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার দায় দিল্লির, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন মনোমালিন্য সেই ক্ষেত্রে বড় কোন সংকট হয়ে ওঠে নি। প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লীর মার্কিন অনুগ্রহ পাবার মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ কি? সেটা বোঝা যাবে ভারতের মনমোহনের সাথে শেখ হাসিনার যৌথ ঘোষণার মধ্যে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যা স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনার ক্ষমতায় আসার প্রায় ঠিক একবছর পর। এটা ভারতের সমর্থনে হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্ন, হাসিনা মানে দিয়েছিলেন যে তার স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ। এমনকি দল হিসাবে এটা আওয়ামী লীগের স্বার্থ এটাও অনিবার্য ধরে নেয়ার কারণ নাই। প্রণবের সরকারের আয়ু-দশাতেই এটা প্রমাণিত যে প্রণব ও কংগ্রেসের স্বপ্নটাই অবাস্তব। ইতোমধ্যে ভারতে সরকারই বদলে গিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এখনও সে পথেই আছেন। ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সকল বিষয় ভারতের স্বার্থে যায় তাকেই হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছেন।। এই ভরসায় যে দিল্লী তাতে অনুরাগ বোধ করবে এবং মূল্য হিসাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ভারতের স্বার্থ হয়ে উঠবে। প্রণব যেমন ছিলেন, এখন মোদীও যেন হাসিনার পক্ষে ভারতের সমর্থন নিয়ে হাজির হন বা হবেন। কিন্তু এর মিসিং লিঙ্ক হল, প্রণব বা কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচ্যুত। যদিও একই চিন্তার লাইনের গোয়েন্দা-আমলারা রয়ে গেছেন। কিন্তু মোদী কি গোয়েন্দা-আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত প্রভাবিত হবেন? এখনও কিছুই স্পষ্ট নয়। আপাতত এতটুকু বলা যায় যে মোদীর সরকার পরিচালনা নীতি স্পষ্টতই সেদিকে নয়। মোদী প্রণবও নন।

[এই রচনা প্রথমে ছাপা হয়েছিল এখানে গত সপ্তাহে। এখন এখানে আরো আপডেটসহ আবার এডিট করে ছাপা হল।]

 

মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী

মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী
হাসিনা লোভনীয় সম্পদ নাকি দায়

গৌতম দাস

০২ জুলাই ২০১৪।
ভারতের নবগঠিত মোদি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তিনদিনের সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়ায় দাদাগিরি মন্তব্য আর মুই কি হনুভাব আবার চেগে উঠেছে। ভারতের নির্বাচন শুরু হবার পর থেকে ফলাফল প্রকাশ শেষে সুষমার বাংলাদেশ সফরের আগে পর্যন্ত – সব মিলিয়ে প্রায় চার-পাঁচ মাস এসব উতপাতে ভাটা পড়েছিল। এমনিতেই ভারতের সব তরফের দাদাগিরিতে আমরা অস্থির অসহ্য থেকেছি গত প্রায় ছয় বছর। এর উপরে আরও সবচেয়ে অসহ্য ঠেকে ভারতের মিডিয়া, সেরের উপর যেন সোয়া সের। “রাজার চেয়ে পারিষদ বলে শতগুণ”। এরা বুঝতেই পারে না সবকিছুর একটা সহ্য সীমা লিমিট আছে। এরপর সেটা বুমেরাং হয়।
ভারতীয় মিডিয়া তবু যদি গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ বুঝতে নজর দেবার ক্ষমতা দেখিয়ে তাতে ভারতের কি সম্ভাবনা – ভারত কোন উচ্চতায়, সম্ভাব্য কোন ভুমিকায় তার অবস্থানের গুরুত্ত্ব, মোদি সেটা কিভাবে পাঠ করছেন ও নীতি নিচ্ছেন এনিয়ে যদি তাদের উগ্রজাতিবাদী জোশমুক্ত ও নির্মোহ কোন বাস্তব মুল্যায়নের উপরে দাঁড়ানো কথা বলতে দেখা যেত তাও নাহয় সহ্য করা যেত। সেদিকে না গিয়ে বরং গায়ে মানে না আপনি মোড়লি মন্তব্যের নামে উস্কানিমূলক কলাম আবার প্রতিদিন একটা না একটা পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে।
কাকে ফেলে কার কথা দিয়ে শুরু করব? দ্যা হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দার, না টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটোরিয়াল নাকি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের শুভজিত রায়ের কথা? এছাড়া বিখ্যাত আঁতেল ডঃ সুবীর ভৌমিক তো নিয়মিতই আছেন। মোদির বিপুল জয়লাভের পর আবার দেখা গেল কেউ কেউ পুরা ভোল পালটিয়ে ফেলেছেন। যেমন, ডঃ সি রাজামোহন, গত দশ বছরের কংগ্রেস শাসনে তিনি নয় বছরই কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির সমর্থক ছিলেন। যা আসলে সেসময়ের ভারতের পিঠে হাত রাখা আমেরিকার সমর্থিত কংগ্রেসের নীতি ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের সাথে আমেরিকার বিবাদ শুরুর পরের সময়ে তিনিও কংগ্রেসের শেষের বছর একটু দুরত্ত্ব রাখছিলেন। আর সেই তিনি এখন একেবারে মোদি ভরসা। সপ্তাহ দুয়েক আগে তিনি বাংলাদেশে এসে সভা সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে গিয়েছেন। সেই সাথে গত ১৩ জুন চ্যানেল আই টিভিতে টকশোর সময়ে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সুবীর আর রাজামোহন মূলত আমেরিকান খুটি ভরসা মানে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রাখায় বলশালী অনুভব করে কথা বলতেন। তাদের ভারতই বিশাল রুস্তম এই ভাবের উপর দাঁড়িয়ে তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনগণকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কথা বলতেন।

অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
মোদির উত্থানে কংগ্রেস টানা দশ বছর ক্ষমতায় কাটানোর সমাপ্তি ঘটল। এই শাসনকালের শুরুটা কেটেছিল ওয়ার ওন টেররের রমারমা কোলে। বুশের আমেরিকার দরকার ছিল ভারতকে কোলে তুলে নিবার, পিঠে হাত রাখার। কিন্তু কংগ্রেসের ভুল ছিল সে ঐকালকে বুঝেছিল আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় আশেপাশে পড়শির উপর রুস্তমি দেখাবার কাল হিসাবে। কংগ্রেসের অযোগ্যতা হল ঐ সময়ের আসল দিকটা পাঠ করতে না পারা। সেটা হল, গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ মোচড় দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে, এশিয়ামুখি হয়ে পাশ ফিরে শুতে চাচ্ছে। তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” হাসিলের নামে রুস্তমি করলে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবে নাকি গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি হওয়াতে যেসব সুবিধা ভারতের জন্য ধেয়ে হাজির হচ্ছে তাকে কাজে লাগানোই নিজ অর্থনীতি বিকশিত করার পথ – রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নাকি অর্থনীতি কোনটা ফোকাস হবে এখান থেকেই এর পয়েন্ট অব ডিপারেচার; পথ আলাদা হয়ে বিভক্ত। কংগ্রেস তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” বলে বিষয়টাকে বুঝছিল। আর এরই তৈরি আবর্জনার নাম বাংলাদেশের বর্তমান হা্লের হাসিনার সরকার। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এটা সবার কাছে দিনের মত পরিস্কার ছিল যে বিগত কংগ্রেস সরকার হাসিনাকে তাদের বিশেষ পছন্দের সরকার হিসাবে পেয়েছিল। অবস্থা এমনও দেখা গেছে যেন বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হলেও নিজের স্বার্থকে ভারতের স্বার্থের অধীনস্ত রেখে সরকার চালানো – এমন নীতিতে সাজানোর জন্যই হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সেটা ভরা নদী ভরাট করে ভারতীয় যান চলাচলে বিনা খরচের ট্রানজিট দেয়া থেকে শুরু করে সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যার জন্য উলটা ভারতের পক্ষেই সাফাই গাওয়া পর্যন্ত সবকিছুতে। এছাড়া খুবই কৌশলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অসংখ্য অমীমাংসিত ইস্যু থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যেন কেবল দুটো -তিস্তার পানি আর সীমান্তে ভুমি বিনিময় – এভাবে নামিয়ে আনতে মিডিয়া প্রচার প্রপাগান্ডায় সফলতা দেখিয়েছেন হাসিনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ঐ দুটা ইস্যুও কোন ধরণের মীমাংসা ছাড়াই কংগ্রেস সরকারের সময়কাল শেষ হয়েছে। এরপরও হাসিনার পাঁচ বছর শাসনের শেষে ভারতের আবদার আর হাসিনার খায়েসের শেষ হয়নি। বাংলাদেশে ভারতের হাসিনাকেই আবার ক্ষমতায় চাই, তাতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খা জাহান্নামে যাক – এই অবস্থান নীতি নিয়েছিল। এভাবে বাংলাদেশ ছিল ভারত সরকারের তাদের তথাকথিত “নিরাপত্তা স্বার্থের” নামে এক অবারিত অভয়ারণ্য – কংগ্রেসের এই আগ্রাসী ও জবরদস্তির নীতির সহায়ক ছিল ভারতের আমলা, কূটনীতিক ও গোয়েন্দা বিভাগ, আর সবার উপরে ছিল ভারতীয় মিডিয়ার ঐ দঙ্গল। সবাই একটা বিষয়ে একমত হয়ে কাজ করেছিল যে ভারতের “নিরাপত্তার স্বার্থের” নামে তাদের পড়শি অপর রাষ্ট্রে যা খুশি করার জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের অবারিত অভয়ারণ্য করে নিতে পারে। যেন এটা জায়েজ। আর এটাই নাকি বাংলাদেশের ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র, ভারতের সাথে সম্পর্ক ভাল হয়ে থাকার মডেল। এই প্রচার ভারতের মিডিয়ায় তুঙ্গে করে রেখেছিল এই খেদমতগারেরা। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত ইস্যু নাকি কেবল দুইটা এটা প্রতিষ্ঠা করার পরও তা নিয়ে কোন অগ্রগতি না হওয়াতে ভারতের ঐ ম্যানেজড মিডিয়াও লজ্জায় পড়ে। মুখ লুকানোর জায়গা খুজে না পেয়ে এদের কেউ কেউ শেষ বছরে কংগ্রেস সরকারের মৃদু সমালোচনা শুরু করে, সরকারের সাথে নিজেদের দুরত্ত্ব প্রকাশের চেষ্টা করে। দায়দায়িত্ত্ব অস্বীকার করে।
এটা পরিস্কার যে নতুন মোদির সরকার কংগ্রেসের এই নীতি ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক হয়েছে এমন ভাবতে শুরু করেছে। বহুবার বলেছি, মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু বিজেপির অতীত কেমন তা দিয়ে এবারের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে। অন্তত মোদির প্রথম দুই বছরে কি ফলাফল অভিমুখ তৈরি হয় সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ফলে বিজেপির মোদি নয়, মোদির বিজেপি কি তা বুঝতে চেষ্টার দরকার আছে। মোদির বিদেশনীতির মুখ্য ফোকাস অর্থনৈতিক উন্নতি বা নিজের জনগণকে কাজ দেবার চ্যালেঞ্জ। অন্যভাবে বললে, আসন্ন গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটের সুবিধা বুদ্ধিমানের মত ব্যবহার করে এক ফাইন টিউনের মধ্য দিয়ে নিজের বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হবার যে সুযোগ দেখা দিয়েছে তাকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা। বিপরীতে কংগ্রেসের ফোকাস ছিল তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। মোদির হুশজ্ঞানের সাথে যদি তুলনা করি তবে বলতে হয় কংগ্রেস অবুঝ শিশু, পোলাপান। প্রথমত ভারতের গ্লোবাল সম্ভাবনার কথা কংগ্রেস বুঝেই নাই। অথবা বুঝেছে আমেরিকান স্বার্থের ফাঁদে পড়ে। ওয়ার অন টেররের নীতির দিক থেকে। যেটা আগে বলেছি কংগ্রেস মনে করেছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটে হাজির সুবিধা কথার অর্থ আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা। আর তাতে ভারত অর্থনৈতিক অর্থে নয় রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক অর্থে পরাশক্তির ভুমিকায় এসে গেছে। এভাবে এতটুকুই বুঝেছে। কিন্তু নিজেকে মৌলিক প্রশ্নটা করে নাই যে নিজের অর্থনৈতিক ভিতের উপর না দাঁড়িয়ে কেউ রাজনৈতিক পরাশক্তি হতে পারে কি না। কারও যাতাকাঠি ধার করে রাজনৈতিক পরাশক্তি ভাবের মাসল দেখিয়ে পড়শিকে ধরব মারব কাটব – এটা কি ধার করে দেখানোর জিনিষ? কংগ্রেস আমেরিকার ওয়ার অন টেররের মধ্যে নিজের বিশাল সম্ভাবনা দেখেছে, আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে পেয়ে নিজের আঞ্চলিক মোড়ল হবার চকচকে লোভে পড়েছে, ফাঁদে পড়েছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত যে উলটপাল্ট চলছে এর প্রধান অভিমুখ ও ইঙ্গিত হল ভারতের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা। আর কোন রাষ্ট্র নিজ সক্ষমতায় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হলে সেই সাথে এবার তার রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হিসাবে উদয় হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেটা এমন নিজের পায়ে দাঁড়ানো যা অন্য কেউ চাইলেও অস্বীকার করতে পারে না। মোটা বুদ্ধির শর্টকাটে মারা লোভি কংগ্রেস এসব দিকে খবর না রেখে নিজদেশের গত দশ-বার বছর নষ্ট করেছে পিছিয়ে দিয়েছে – শুধু নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে, নিজের অর্থনীতি ধুঁকে মরার অবস্থায় নিয়ে গেছে তাই নয়, এই অঞ্চলে সবচেয়ে ক্ষতি করেছে বাংলাদেশের।
এই ব্যাপারটাকে এককথায় বললে, কংগ্রেসের ফোকাস ছিল অর্থহীন তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” আর বিপরীতে মোদির ফোকাস অর্থনীতি। আবার এর মানে এমন নয় যে মোদি ভারতের সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে খাটো করছেন, তা নয়। যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফকে তিনি কি বলতে পারেন? ডিল রফা করবেন এভাবে যে কাসাবদের বোম্বাই হামলার মত বিষয়গুলো আর না ঘটার বিষয়ে তিনি পাকিস্তানের নীতিগত সক্রিয়তা ও নিশ্চয়তা চান। আর এই নিশ্চয়তা নিয়েই তিনি পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের সকলে মিলে এক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট করে সব দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে হাটতে চান। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটা আসলে বিচ্ছিন্ন আলটপকা আলাদা বিষয় নয়, গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপাল্টের সুবিধায় এশিয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেই অর্থনীতি ফোকাসে পথ চলার অবিভাজ্য অংশ।
অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা – বলে দুই ফোকাসের ভাগ দেখালাম এটা কি কাল্পনিক? মোদির উপরে নিজের মনের ভালভালাইয়া সৎ খেয়ালে আরোপ করা? মোটেও নয়। মোদির সরকারের বয়স মাত্র একমাস। ওর নীতিগত দিক কি হতে যাচ্ছে তার অনেককিছু অনুমান করা, অপ্রত্যক্ষে জানা গেলেও লিখিত ডকুমেন্টে এখনও তা যথেষ্ট হাজির নয়। কিন্তু তবু সুষমার এই সফরে তাঁর এক লিখিত বক্তব্য আমরা ইতোমধ্যেই হাতে পাই। সুষমার টাইট কর্মসুচীতে বিকেলে এক সেমিনারে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ওখানে এক লিখিত বক্তব্য তিনি পড়েছিলেন যা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটেও গুরুত্ত্বের সাথে পাবলিক করে দেয়া হয়েছে। সুষমার এই সফরে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক প্রস্তুতি করেই যে তিনি এসেছিলেন এর ছাপ সব জায়গায় আছে। যেমন ভারতের নতুন সরকারের দিক থেকে দেখলে প্রথমত গত ছয় বছরে কংগ্রেস বাংলাদেশে যথেচ্ছাচার তান্ডব করেছে, অথচ তাতে অর্থনৈতিক বা ষ্ট্রাটেজিকভাবে ভারতের জন্য এমন কোন লাভালাভ ফল আনে নাই যা নিজে টিকে থাকে। বরং এটা অজস্র দায় ও আবর্জনা তৈরি করেছে। বিশেষত ঐ আবর্জনা পরিস্কার না করে ওর উপরে মোদির নতুন কোন নীতি কার্যকর হবে না – তা মোদি ও তাঁর নীতিনির্ধারক টিমের লোকজনের উপলব্দি হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন ভারতের অর্জনের দিক থেকে দেখলে এখন ভারতের সামনে আষ্টেপৃষ্টে বাধা এক হাসিনার বাংলাদেশ আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এটা ভারতের জন্য এক বিশাল দায়। এর মূল কারণ ক্ষমতা ভিক্ষা করা হাসিনার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশই হাসিল করে আছে ঠিকই কিন্তু হাসিনারই নিজ দেশে কোন বেইল নাই। অন্তত পাবলিক রেটিং এর দিক থেকে যদি বলি এটা যতটাই শুণ্য এটা ভারতের জন্য ততটাই বোঝা। হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগি ছাড়া সারা বাংলাদেশের সব কোনা আজ ভারত বিরোধি হয়ে উঠেছে। এমনকি বাম রাজনীতিক যারা এর আগে কখনই ভারতের জবরদস্তির বিরুদ্ধে কিছু বললে সেটা নাকি “সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে” এই পবিত্র শুদ্ধ থাকার লোভে কখনও এনিয়ে কথা বলে নাই সেই বামেরাও এখন সোচ্চার হতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বহু আওয়ামি বন্ধুকে বলতে শুনেছি হাসিনা নিজেকে বিক্রি করছে কাজটা খারাপ। কিন্তু কি করব আমি আমার ফয়দাটাই কেবল এখান থেকে তুলে নিচ্ছি কিন্তু কোন দায় নিব না। কংগ্রেসের হাসিনার বাংলাদেশ রেটিং আজ এমন দুরবস্থায়। কিন্তু তবু এই রেটিং শুণ্য হাসিনাকে দিয়েই বাংলাদেশ থেকে কোন লাভালাভ সুবিধা ভারত যদি আদায় করতে চায় তবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরও জবরদস্তির উজান নৌকা তাকে বাইতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খার সরাসরি বিরুদ্ধে গিয়ে মোদির ভারতকে দাঁড়াতে হবে। স্বভাবতই এটা ভারতের সুবিধা নয়, লায়াবিলিটি। ওদিকে মোদি যে স্বপ্ন দেখে তাতে তাঁর দরকার বাংলাদেশকে এক গুরুত্ত্বপুর্ণ অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে, কংগ্রেসের মত ভারতের তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে এক দাস বাংলাদেশ নয়। যেমন প্রেমের বেলায় পুর্বশর্ত হল, কেউ কারও দাস হলে চলবে না, পার্টনার উভয়কে উভয়ের জবরদস্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। যে মাত্রায় মুক্ত সেই মাত্রায় লেবেলের প্রেম-সম্পর্ক হবে। জমিদারের প্রেমাকাঙ্খা নিজ কুলবধুর সাথে মিটে না, কারণ ওখানে বধুর ভুমিকা কেবল কুল বা বংশরক্ষা ও বিস্তারের মধ্যেই সীমিত। তাই জমিদার দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে বাঈজির কাছে যায়। আসলে জমিদারের দরকার কুলবধু আর বাঈজি এই দুই ভুমিকার মিলিত এক বধু। আবার সেটা যদি হাসিলই হয় তখন দেখা যাবে জমিদার আবার জমিদার নাই। জমিদারি পরিচয় লোপ পেয়ে নিজেই অর্থনৈতিক উতপাদনের উদ্যোক্তা হয়ে গেছে। মোদি জানে নিজের উদ্যোক্তা ভুমিকা। ফলে তাঁর দাস নয় বা দাসের বোঝা নয়, এক মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেই তার চাই।
মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেএগুলো কোন সুখস্বপ্ন কল্পনা নয়। সুষমা লিখিত বক্তব্যে বলছেন, “We are convinced that India’s development cannot be complete and sustainable unless we succeed in building productive partnerships with our immediate neighbours. We will, therefore, devote our energy to working much more closely with our neighbours in pursuit of our development goals. We will walk the extra mile to create opportunities and to build virtuous cycles of prosperity in the region. We will pursue the goal of economic integration and interconnectedness through trade, investment, transportation, capacity building, environment friendly practices and means that promote equitable development in the region”। নিজ দায়িত্ত্বের এর বাংলা করে বললে সুষমা বলছেন, “আমরা বুঝতে পেরেছি ভারতের (অর্থনৈতিক)বিকাশ নিজে টিকে থাকার মত স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হতে পারে না যদি সংলগ্ন পড়শীদের সাথে কার্যকর সক্রিয় পার্টনার সম্পর্ক আমরা তৈরি করতে না পারি। তাই আমরা আমাদের বিকাশের লক্ষ্য অভিমুখে আমাদের পড়শিদের সাথে আরও ঘনিষ্টভাবে কাজ করতে আমাদের শক্তি ব্যয় করব। এই অঞ্চলের এমন সুযোগ সুবিধা আর দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্র (virtuous cycles of prosperity) তৈরি করতে আমরা নিজেই আগবাড়িয়ে বাড়তি পথ হাটব। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যাতায়াত,অবকাঠামোগত সক্ষমতার এক প্রকৃতি-পরিবেশ সহায়ক চর্চা তৈরির মাধ্যমে ও উপায়ে আমাদের অর্থনীতিগুলোকে পারস্পরিক পরিপূরক ও আন্তঃনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে আমরা জোর দিব যা এই অঞ্চলে সবার সমান বিকাশ (equitable development)আগিয়ে নিবে”।

BCIM জোটের তাতপর্য
অনেকের মনে হতে পারে কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষায় এরকম অনেক কথাই তো বলা হয়,এটাকে এত গুরুত্ত্ব দিবার কি আছে। না, এটা কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষার কথার কথা নয়। সেজন্য আরও কিছু পটভুমির কথা বলব, যে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাগুলো পাঠ করতে হবে।
অনেকবার বলেছি,১)গ্লোবাল অর্থনীতি এখন এশিয়ামুখি। ২)দুনিয়ার আগামি নির্ধারক দুই অর্থনীতি চীন ও ভারতকে কেন্দ্র করেই এশিয়ামুখি গ্লোবাল অর্থনীতি আবর্তিত হবে। ৩) চীন ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার উচানিচা আছে আর এই দেশদুটোর ঠিক মাঝেই বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে সক্ষমতার উচানিচার ভিতর জোটের (BCIM জোট, বাংলাদেশ,চীন,ভারত ও মায়ানমার মিলিয়ে যে অর্থনৈতিক জোট)নীতিগত সাম্য এবং ভারসাম্য তৈরিতে বাংলাদেশের ভুমিকা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ হবে। [আমেরিকার প্ররোচনায় পড়ে কংগ্রেসের ভারত এতদিন এই সম্ভাবনাকে ছুপিয়ে রেখেছিল, উপেক্ষা করেছিল। মাত্র গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে বিষয়টাকে আমেরিকার উপর প্রতিহিংসা ও রাগ দেখানোর বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করে এবার সে নিজেই BCIM ঢোল পিটিয়েছিল।ঐ সময় চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ভিতর দিয়ে ভারত-চীনের পারস্পরিক সীমান্ত হামলার সন্দেহের সমাপ্তি হয়।যদিও ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়াই এখনও এই তথ্য আড়াল করে ভারত-চীনের কোন প্রসঙ্গ আসলেই তাকে সেনসেটিভ করে উস্কানি দেয়ার খাসিলত ত্যাগ করে নাই।] ৪) BCIM জোট খাড়া করা মানে এটা কোনভাবেই আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মিটানো নয়। আমেরিকার কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্য চীনের কোলে চলে যাবার ভয় দেখানো নয়। আমাদেরকে কাজ করে দেখাতে হবে। এই চার দেশের অর্থনীতিতে সব অঞ্চলে সম উন্নয়নের সিরিয়াস বিষয় এটা। ৫) কেবল ভৌগলিক অবস্থান নয়,BCIM জোটের তাতপর্য যতটা না এই অঞ্চলের চার দেশের বাইরের বাকি দেশগুলোর সাপেক্ষে নিজেদের জোটবদ্ধ শক্তি হওয়া এরচেয়েও বেশি গুরুত্ত্বপুর্ণ হল জোটের বাইরে নয় বরং এই চার দেশের প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুষম বিকাশের দিকটা। মূল কারণ এই BCIM অঞ্চলটা মুলত চীন ও ভারত উভয়েরই ল্যান্ডলকড পুর্বাঞ্চল। যার আবদ্ধ অবস্থা থেকে সরাসরি সড়ক রাস্তাঘাটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগের দুয়ার খোলার উপায় BCIM জোট। ফলে তা এই অবরুদ্ধ অঞ্চলগুলোতেও স্ব স্ব মূল রাষ্ট্রের সব জায়গার মতই সমান অর্থনৈতিক বিকাশের উপায়। আর এই মুক্তি ঘটবে বাংলাদেশ ও বার্মার ভুমির উপর দিয়ে এবং বাংলাদেশে নির্মিতব্য গভীর সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে। ফলে “ভারতের বিকাশ পড়শিদের উপর নির্ভরশীল আর স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হবার উপায়” – একথাটা একেবারেই বাকচাতুরি কূটনৈতিক রেঠরিক নয়। সুষমা বা মোদি একথা “বুঝতে পেরেছে” তা স্বীকার করলে বা না করলেও তখনও এটা সত্যি। এছাড়া প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিকাশের দিক মুখ্য করে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট যদি ঠিকমত দাঁড়িয়ে যেতে পারে তবে এশিয়ার বাকি অঞ্চলের উপরে এই জোট ভারকেন্দ্র ভুমিকায় চলে আসবে। কল্পিত সে পরিস্থিতি -এটা আর শুধু বাংলাদেশ থেকে সংকীর্ণ ভারতের জবরদস্তিতে ও বিনাপয়সায় ট্রানজিট আদায় করার মত মুদি দোকানি ভাবনা নয়। যেমন, কংগ্রেসের ভারত যে কতবড় ছেচড়া খুদে মুদি দোকানি তা বুঝা যায় তাদের আগাবার পদ্ধতির দিকে দেখলে। তারা জোর দিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিট অনুমতির কাগজ যোগাড়ে এবং তা বিনা পয়সায় হতে হবে। কিন্তু অনুমতি সে তো একটা কাগজ মাত্র। কাগজের উপর দিয়ে তো ভারতীয় মালামাল পারাপার হবে না,বাস্তব রাস্তাঘাট অবকাঠামো লাগবে,আর সেটা যে সে না ভারি যানবাহন চলার অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ট্রাফিক রুল,প্রটোকল, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি অনেক কিছু। এমনকি বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থকথা যদি বাদও দেই তো তবু তাতে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে একটা কিছু লাগবে। ফলে অন্তত ৫০০ কিমি ভারি রাস্তানির্মাণের বিনিয়োগ লাগবে যেটা তা বাংলাদেশ দূরে থাক ভারতও যোগানোর সামর্থ রাখে না। ফলে BCIM কেই জোটবদ্ধভাবে এর প্রয়োজনীয় ফান্ড যোগাড় করতে হবে। এবং এটা অবশ্যই সম্ভব শুধু নয় অন্য বিনিয়োগ দাতারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই বাস্তব দিকে ভারতের কোন আগ্রহ নাই। মুদি দোকানি যেন ধরেই নিয়েছে ভারতের ট্রানজিটের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চাহিদা বাংলাদেশের অর্থনীতিই পূরণ করবে। কিন্তু কেমন করে – এটা ভারতের ভাবনার বিষয় নয়। বরং ভাবটা এমন যেন হাসিনার ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে ওর কাছ থেকে একটা অনুমতির কাগজ হলেই তো ভারতের হবে। এজন্যই একে মুদি দোকানি বলছি যে নিজেকেও ক্ষুদ্র করে রাখে,নিজেকে অবাস্তব ও ক্ষুদ্রস্বার্থের আলোকে হাজির করে। অন্যদিকে ব্যাপারটাকে আবার বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে তার ভারতের শত্রু হয়ে থাকার কোন কারণ নাই,মতলব উদ্দেশ্য লক্ষ্যও হতে পারে না,কোন ফয়দা নাই,যদি না সেটা যে করেই হোক বাংলাদেশের স্বার্থ নয় সংকীর্ণ কেবল হাসিনার ক্ষমতায় থাকতেই হবে এই স্বার্থ হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুর শেষ নাই বরং বাড়ছে। সেগুলোকে জবরদস্তিতে অমীমাংসিত ফেলে রেখে কেবল ভারতের এবং সংকীর্ণ করে তা ট্রানজিটের কাগজ ধরণের উপস্থাপনের চিন্তায় কংগ্রেস গত ছয় বছর চালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের অমীমাংসিত সব ইস্যুগুলোর একটা প্যাকেজ ফয়সালা হলে ভারতের সাথে BCIM এ জোটবদ্ধভাবে সবার অর্থনৈতিক বিকাশে সামিল না হতে বাংলাদেশের আপত্তির কিছু নাই, থাকতে পারে না। সেখানে তখন কেবল ভারতের ট্রানজিট খুবই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়। বরং BCIM এর ট্রানজিট হাব হওয়ার মধ্যেই আসলে বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে। তবে অবশ্যই তা কোন জবরদস্তিতে নয় সমান ও সমলাভের জোট পার্টনার হিসাবেই।
সুষমা এই কথারই প্রতিধ্বনি করছেন। তাঁর virtuous cycles of prosperity শব্দ ব্যবহার যেটার অনুবাদ করেছি “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ” -একথার অর্থ বুঝতে হবে অন্য আর এক অনুমিত বিপরীত শব্দের প্রেক্ষিতে। “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধি” শব্দের বিপরীতটা হল, পরস্পর রেষারেষি তথাকথিত “দেশের নিরাপত্তা স্বার্থ” এই নীতি থেকে যা উতসারিত। যেটা এতদিন কংগ্রেস অনুসরণ করেছে। মোদির সুষমা এর বিপরীতে “দায়িত্ত্ববান” হতে, হয়ে সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করতে আহবান রাখছেন। ফলে এটা কংগ্রেসের নীতি সম্পর্কে মোদির মূল্যায়ন এবং তা পরিত্যাগও।
সুষমা আগের উদ্ধৃতির শেষে আরও বলছেন,”Building a comprehensive and equitable partnership with Bangladesh is essential for the realization of our vision of a stable, secure and prosperous South Asia. History and geography have destined us to live together. How we do so is within our hands, and our hands alone.”- এর বাংলা করে বললে,”এক সুস্থির,সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া দেখার আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ এক সামগ্রিক ও সমমর্যাদার পার্টনার, এই সম্পর্ক তৈরি করা মৌলিকভাবে জরুরি। আমাদের ইতিহাস ও ভুগোল আমাদের একত্রে বসবাসের ভাগ্য ঠিক করে দিয়েছে। এটা কি করে করব তা আমাদেরই হাতে, একান্তই আমাদের হাতে”। এখানে comprehensive and equitable partnership অর্থাৎ অনুবাদে “সামগ্রিক” ও “সমমর্যাদার পার্টনা” শব্দদুটো বিশেষ গুরুত্ত্ব বহন করে।

সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা আসলে কি
অর্থনীতি বনাম তথাকথিত নিরাপত্তা – কার কি ফোকাস প্রসঙ্গে এভাবে কংগ্রেস ও মোদির বিজেপির তুলনা করছি। কংগ্রেস মনে করেছিল উত্তরপুর্ব ভারতের সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা নাকি ভারতের নিরাপত্তার সমস্যা। জবরদস্তি উত্তরপুর্ব ভারতে ওদের পিটাপিটি দিয়ে আর বাংলাদেশে শিখন্ডি হাসিনার ক্ষমতা থাকা নিশ্চিত করার ভিতরেই ভারত সাত রাজ্য সমস্যার সমাধান। গত সাত বছর কংগ্রেস সমস্যাটা দেখেছে “সাতরাজ্য যেন বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়” এই নীতিতে। ফলে কংগ্রেসের চোখে এটা ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু হিসাবে থেকেছে, আর এই নষ্টা বয়ানকে মিডিয়া তাল দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মোদির দেখবার চোখ সম্পুর্ণ ভিন্ন। মোদি অত্যন্ত সঠিকভাবে সমস্যার গোড়ায় তাকাতে পারেন। মোদির চোখে ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর এমন সমস্যার সমাধান বলপ্রয়োগ বা নিরাপত্তা নয়। রিসোর্স এলোকেশন মানে সম্পদের বরাদ্দ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলেই একমাত্র এর সমাধান। এসব রাজ্যগুলো ছোট অর্থনীতির ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদ মানে বিনিয়োগেরও ক্ষমতা কম,ফলে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি। মোদি কথাটা তুলেছিলেন ঠিক সাত রাজ্যকে কেন্দ্র করে নয়,মমতার পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে। মমতার দেখার মধ্যেও সংকীর্ণতা আছে,আছে অর্থনীতিকে মানবতা দেখানোর কাজ ভেবে বিচার করার ঝোক। তিনি গরীব মানুষকে প্রায় সরাসরি নগদ অর্থ বিতরণ ধরণের বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এক কর্মসুচী চালাচ্ছেন। মমতা বলছেন তিনি তার রাজ্যের অর্থমন্ত্রীকে অর্থ যোগাড় সম্ভব কি না জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি যোগাড়ে সমর্থ হয়েছেন। তাই তিনি এটা চালাচ্ছেন। ছোট অর্থনীতির পশ্চিমবঙ্গও এমনিতেই ছোট উদ্বৃত্ত সম্পদের ফলে সবসময় সক্ষমতা্র অভাবে ভুগবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই অভাবের আকাঙ্খা মিটাতে মমতা মনে করেন কেন্দ্রের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এভাবেই এর সমাধান। বিপরীতে মোদি গত নির্বাচনের আগে এই সাক্ষাতকারে বলছেন,এটা কোন সমাধান নয়। বসিয়ে ভর্তুকিতে খাওয়ানো নয়,বরং কাজ সৃষ্টি ফলে বিনিয়োগ এর সমাধান। ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিনিয়োগ যোগাড় করে দেয়া কেন্দ্রের দায়িত্ত্ব মনে করেন তিনি। তিনি কেন্দ্রে গেলে এটাই করবেন।অর্থাৎ আমরা দেখছি কংগ্রেস যেটাকে যুদ্ধবাজি দমনের সংকীর্ণ চোখে “নিরাপত্তার” সমস্যা হিসাবে দেখে মোদি সেটাকে বিনিয়োগ অর্থনীতিক বিকাশে সমাধান দেখেন। দুটো এপ্রোচের আকাশ-পাতাল ফারাক এখানে।

সুষমার আমলা বাঁচানো নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোল তৎপরতা
গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের সক্রিয় হস্তক্ষেপে পক্ষ নেয়া ও কূটনীতিক সীমালঙ্ঘন করে হাসিনাকে পুন-ক্ষমতায় আনা এটা আমাদের দেশে ও বিদেশে সবাই অবাক বিস্ময়ে নজর করেছে। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই ভোট দিতে চাক নিজেদের প্রতিনিধি মনে করতে চাক সেগুলো তুচ্ছ। কংগ্রেসের হাসিনাকেই ক্ষমতায় চাই – এই ছিল কংগ্রেসের নীতি অবস্থান। ভারতের পররাষ্ট সচিব সুজাতা সিং নির্বাচনের ঠিক আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসে প্রকাশ্যেই সেসব ততপরতা চালিয়েছিলেন। এর কয়েকমাসের মধ্যে ভারতের নির্বাচনে খোদ সেই কংগ্রেস মোট আসনের ১০ ভাগেরও কম আসনপ্রাপ্তিতে ভরাডুবি এবং বিপুল ভোটে মোদির উত্থান – এই পটভুমিতে নতুন সরকা্রের সুষমার বাংলাদেশ সফর ঘটেছে। কংগ্রেসের ভুমিকা হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগী ছাড়া বাংলাদেশের সবার মনে দগদগে ঘাঁ এর মত জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। সুজাতা ছাড়াও এর আর এক প্রকাশ্য প্রবক্তা হলেন হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ। তিনিও চাকুরিজীবি আমলার সীমায় থাকেন নাই। কংগ্রেসী হয়ে গেছিলেন। তিনিও ভারতের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত বলে গেছেন ভারতের বাংলাদেশ নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে। অন্তত দুবার প্রকাশ্যে তা উচ্চারণ করেছিলেন। এটা তাঁর সীমা লঙ্ঘন। চাকুরিজীবি আমলাকে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের অধীনতা মেনেই কাজ করতে হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বই রাষ্ট্রের নীতি ঠিক করেন যেখানে সেটা অনুসরণ করাই তার আমলা ভুমিকা। আর তিনি কিভাবে জানবেন কে নির্বাচিত হতে যাচ্ছে? আর কংগ্রেস আবার নির্বাচিত হলেও তো নিজের আগের নীতিতে সবটা অথবা কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু তিনি প্ররোচিত হয়ে হাসিনার সমর্থকদের আশঙ্কা দূর করতে নিজেকে বলি দিলেন। নিজেকে কংগ্রেসী রাজনীতির অংশ করে ফেললেন। কিন্তু মোদির বিপুল বিজয়ের পর পঙ্কজ ঠিক সময়মত তওবা পড়ে নিয়েছেন। একাত্তর টিভিতে দেয়া সাক্ষাতকারে যেটা বিডিনিউজ২৪ ট্রান্সস্ক্রিপ্ট করে ছাপিয়েছিল। ট্রান্সস্ক্রিপ্ট থেকে এবিষয়ের প্রয়োজনীয় অংশ তুলে আনছি। ইমরোজ খালিদী প্রশ্নকর্তা, বিডিনিউজের মালিক সম্পাদক।
খালিদী: আপনি আগে বলেছিলেন, সরকার পাল্টালেও স্বার্থের পরিবর্তন হয় না। দিল্লিতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের হেরফের হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কোন কোন স্বার্থগুলো কখনোই পরিবর্তন হবে না বলে আপনি মনে করেন?
সরণ: আমি আমার সেই বক্তব্য স্পষ্ট করতে চাই। আমি বলতে চেয়েছি, সাধারণ বিবেচনায় দুই দেশের স্বার্থ একই থাকে এবং তা রক্ষায় সম্পর্কের মূল নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে। ফলে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর দেয়াটাও জরুরি।
খালিদী: তাহলে আগের ওই বক্তব্য নিয়ে আপনি একটু চিন্তিত?
সরণ: না, ওটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমি যা বলতে চাই তা হলো- নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক করে প্রেসিডেন্ট লোকসভায় একটা বক্তব্য দিয়েছেন।
বলছে। তবে ভারত ওই নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও কি একই রকম থাকবে?
সরণ: আমার মনে হয়, সেসময় আমাদের বক্তব্য ছিল- সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে- এমনটাই আশা করা হয়েছিল। আমি মনে করি, আমাদের এখন বর্তমানকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। পুরনো বিষয় নতুন করে সামনে আনার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না, এখনকার এজেন্ডাই ভিন্ন।

যদিও এটা ঘরের “আমরা আমরাই তো” ধরণের সাক্ষাতকার তবু পঙ্কজের পিছ-পালানোটা বেশ রগড়-তামশার। পঙ্কজ বলছেন, “কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে”। “সময়ের অনেক পার্থক্য আছে”, “বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার” – এই বাক্যাবলিতে তিনি এবার আগের পাপের হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। সুজাতা বলেছিলেন, “সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে” এই প্রসঙ্গ সেখানে এসেছিল। সুজাতার বক্তব্য তিনি এখানেও সমর্থন করেন তবে একটু পুনঃব্যাখ্যা করে নিয়ে। কিন্তু পঙ্কজ নিশ্চয় মানবেন, বাংলাদেশের জনগণ খোদ সংবিধানই বদলে নিতে পারেন, ১৯৯১ সালের মত অমান্য করতে পারেন এমন বহু কিছু। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ হল এটা তো বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনীতির আভ্যন্তরীণ প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি এই ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে আছে। সেখানে ভারতের কোন একপক্ষের দিকে পছন্দ প্রকাশ মারাত্মক গর্হিত ও এমন “মন্তব্য করাটা ভারতের জন্য ধৃষ্টতার সামিল”। এবং লজ্জার মাথা খেয়ে সুজাতা তাই করেছিলেন।
এই “এরেঞ্জড সাক্ষাতকার” দিয়ে পঙ্কজ তওবা পড়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন,ফলে বাংলাদেশে তাঁর চাকরি রক্ষা করে তিনি টিকে আছেন। অনুমান করা যায় এই তওবা পড়ার কাজটা সুষমাকে না জানিয়ে পঙ্কজ ঘটান নাই।এতে সুষমার এক সমস্যা মিটল এতে।কিন্তু আরও বড় কালপ্রিট সুজাতা সিং তিনি তো এখনও পররাষ্ট্র সচিব। এখানে সুষমার সমস্যা হল,নিজের মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ছাড়া তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন না। অন্তত খারাপ দেখাবে সেটা। আবার সুজাতার কৃতকর্মের জন্য তিনিও বাংলাদেশে প্রেসের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যেতেও পারেন। এই সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে সুষমার এই সফর ছিল কংগ্রেসের কৃত পাপ-আবর্জনা থেকে নিজ সরকারকে মুক্ত করার সফর। ড্যামেজ কন্ট্রোলের সফর। তাই,সুষমা নিজেকে এবং সুজাতাকেও বাংলাদেশে মিডিয়া থেকে দূরে রেখেছিলেন। ভারতের মন্ত্রী বা সচিবের বাংলাদেশ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এর আগে কখনই সঙ্গি হন নাই। কিন্তু এবার মন্ত্রী ও সচিব দুজনই আসা সত্ত্বেও তিনি এসেছেন এবং একা এককভাবে প্রেস সামলানোর ভার তাঁর উপরে। সেই সাথে অবশ্য নিয়ে এসেছেন,আসার আগে নিজ সরকারের সবাই মিলে হোমওয়ার্কে সাব্যস্ত করা বক্তব্যটা। সেটাই তিনি সব জায়গায় বলেছেন, -”সরকার সরকারের সাথে কাজ করে” আর সেই সাথে “তারা বাংলাদেশের জনগণের সাথেও কাজ করতে চান”। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট হাসিনা তাদের আগ্রহের বিষয় নয় – একথাটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকাশ করলেন। অনেকে মনে করতে পারেন এটা জোর করে অর্থ টেনে বের করে ভারতীয় মুখপাত্রের কথা পাঠ করছি। আসলে তা নয়। এর প্রমাণ হিসাবে আগে উদ্ধৃত সুষমার ঐ লিখিত বক্তব্যের আর কিছু অংশ তুলে আনব।
“I am aware that the Indian general elections in April and May this year were followed closely in Bangladesh. I thank you for all the good wishes that we received. These elections were not just the largest democratic exercise in the world. They mark a turning point in the evolution of India’s democratic polity. They were an election of Hope. I stand before you as the representative of a Government that has come to power through an election process, in which, after a gap of nearly 30 years, the people of India have given a clear verdict in favour of a single political party. … My Government’s foreign policy will be based on the principles of developing peaceful and friendly relations with all countries, anchored in enlightened national self-interest. … We know from experience that democracy requires building strong institutions and promoting a culture of tolerance, inclusion and respect for differences. The strength of democracy lies in its ability to manage differences and resolve them through peaceful means. We all espouse same universal values where there can be no place for violence. We will be glad to share our experiences and best practices, if asked to do so.নিজ দায়িত্ত্বের বাংলায় বললে,“ আমি জানি এবছরের এপ্রিল মে মাসে ভারতীয় নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বাংলাদেশে খুব মনোযোগের সাথে অনুসরণ করা হয়েছে। অনেকে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এজন্য আমি ধন্যবাদ জানাই। এই নির্বাচন কেবল দুনিয়ার এক বৃহত্তম গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল না। এটা একই সাথে ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকতা পরিমাপে এক মোড় ঘুরানোর মত ঘটনা ছিল। এটা ছিল আশাভরসার নির্বাচন। আমি আপনাদের সামনে সরকারের এক প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছি যারা একটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে; যেটা বিরাট এক ত্রিশ বছরের গ্যাপ, এবারই ভারতের জনগণ কোন একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে পরিস্কার রায় দিয়েছে।…… আমার সরকারের বিদেশনীতি হবে সব দেশের সাথে শান্তিপুর্ণ ও বন্ধুত্ত্বপুর্ণ সম্পর্কে উন্নতি করার নীতিতে অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ অনুসরণ করবে। …… অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বুঝি গনতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী (রাষ্ট্রীয়) প্রতিষ্ঠান তৈরি আর মতভিন্নতাকে সহ্য করা, সাথে নেবার ও সম্মান করার সংস্কৃতি দরকার হয়। মতভিন্নতাকে সামলানোর এবং শান্তিপুর্ণ উপায়ে তা মীমাংসার সক্ষমতা ভিতর দিয়ে গণতন্ত্রের শক্তি প্রমাণ করা যায়। আমরা কিছু সার্বজনীন মুল্যবোধ ধারণ করি যেখানে সহিংসতার কোন জায়গা নাই। এব্যাপারে যদি চাওয়া হয়, আমরা আমাদের চর্চার ভালমাপের উপায় ও আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো অন্যান্যদের সাথে আনন্দে শেয়ার করতে পারি”।

বিএনপির প্রেস ব্রিফিং
উদ্ধৃতিটা টুকে এনেছি তিনটা অংশ থেকে। সে প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে একটা অন্য কথা। খালেদা জিয়ার সাথে সুষমার সাক্ষাতে কি কথা হয়েছে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসম্পর্কে বিএনপির মঈন খান জানিয়েছেন —“বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতন্ত্রের দেশ তার প্রতিবেশী দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না,তা আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে”(২৭ জুন প্রথম আলো থেকে)। মঈন খানের এটা খুবই দাসত্ত্বমূলক মনোভাব। যদিও খালেদা ঠিক এই ভাষায় সুষমাকে এই প্রসঙ্গে বলেছেন কিনা জানার উপায় নাই। বলে থাকলে সেটাও দাসত্ত্বমূলক। অর্থাৎ বিএনপি কোন হোমওয়ার্ক করে যায় নাই অথচ মনের ভিতর ভারতের দাসত্ত্বভাব রয়ে গেছে;এরই প্রকাশ এটা। ভারত বাংলাদেশে কেমন অথবা এমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না – ভারতকে এই সুযোগ বা অপশন আমরা দিতে পারি না। এটা যেচে ভারতের দাসত্ত্ব নেয়া। দেশ একাজ করতে বিএনপিকে দায় দেয় নাই। বরং বিএনপির দিক থেকে যেটা খাড়া অথচ কূটনৈতিক শোভন কথা হতে পারত -”বাংলাদেশের গত নির্বাচন উপলক্ষ্যে ভারতের বিগত সরকারের নেয়া একপেশে ও পক্ষপাতিত্ত্বমূলক (ইচ্ছা ও সাহসে কুলালে “কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভুত” শব্দ বিএনপি যোগ করতে পারে) অবস্থান আমাদের হতাশ করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। ভারতের নতুন সরকার বিষয়টাকে কিভাবে দেখে আমরা জানতে আগ্রহী” -এভাবে বলা যেত। ঠিক এভাবেই বলতে বলা হচ্ছে না,তবে মূলভাবটা অবশ্যই এমনই হতে হত। অর্থাৎ ভারতকে নাক গলানোর কোন অপশন দেয়া নয় বরং তাদের নীতি কি,ওর পরিণতি কি এসম্পর্কে অসন্তুষ্টি জানানো। বিএনপির মত “অবিপ্লবী” দলের পক্ষে ভারতের নীতিতে “হতাশা” জানানো কঠিন কোন কাজ নয়। এটা খুবই স্বাভাবিক কূটনৈতিক রেওয়াজি শব্দ।
টুকে আনা সুষমার উদ্ধৃতির প্রথম অংশঃ এতে স্পষ্টতই সুষমার পরোক্ষে হাসিনাকে নিজেদের মনোভাব বুঝিয়ে দেয়া যে ভারত গণতন্ত্র বা জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের মত কোর বিষয়কে কিভাবে দেখে এবং হাসিনা তেমন প্রতিনিধি নয় সেটাই মনে করিয়ে দেয়া। সুষমার দলের মত ত্রিশ বছর অপেক্ষা করে হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিকতাগুলোকে দুর্বল করে দেয়া উচিত নয়,জবরদস্তি খাটিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা উচিত নয়। ঝিকে মেরে বঊকে শিখানোর মত করে কথাগুলো এভাবেই সুষমা বলে গেছেন।

“enlightened” মোদি
উদ্ধৃতির মাঝের অংশঃ এটা একটাই বাক্যের, এই উদ্ধৃতিটা সাদামাটা কূটনৈতিক বাক্যই তবে একটা শব্দ ছাড়া। শব্দটা হল enlightened national self-interest। বাংলা করেছি,“অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ”। শব্দটা ইন্টারেষ্টিং। যে কোন রাষ্ট্রের কাজই হল স্ব-স্বার্থ মানে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ দেখা, সেজন্যই ওটা রাষ্ট্র। মুখ্যত কেবলমাত্র নিজ ভুখন্ডের জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ দেখভাল করাই ওর কাজ। কিন্তু স্ব-স্বার্থ মানে কি? অনেক সময় আঞ্চলিক স্বার্থের ভিতর নিজের মুখ্য স্বার্থ থাকে সেগুলো সংকীর্ণ চোখে না দেখাই বুদ্ধিমানের, আরও বড় লাভের দিক থেকে দেখার মত চোখ সেখানে খুব গুরুত্ত্বপুর্ণ। এই অর্থে enlightened। শব্দটা প্রয়োগের প্রশংসাই করতে হয়। ছোট মুদি দোকানদারের চোখ থাকে দুএক পয়সার দিক পর্যন্তও। একজন বড় রপ্তানিকারক সফল ব্যবসায়ী হতে চাইলে এত ছোট চোখে চলে না। তাঁর যে ডিষ্টিবিউটর যার মাধ্যমে তার মালামাল খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে তাদেরও স্বার্থের ভিতরে নিজের স্বার্থ দেখে বড় ব্যবসায়ী উতপাদক। ফলে সে ব্যবসায়ীকে enlightened বলা যায় অবশ্যই।
টুকে আনা সুষমার বক্তৃতার শেষ অংশঃ মতভিন্নতাকে জায়গা করে দেয়া, অন্তর্লীন করে নেয়া বা একপাত্রে ধরা -কেন গুরুত্ত্বপুর্ণ সে প্রসঙ্গে এটা সুষমার সবক। এখানে বড় তামাশাটা হল,হাসিনার আওয়ামি লীগ নিজেদের সেকুলার রাজনৈতিক শক্তি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে,বিপরীতে বিজেপি সম্পর্কে তাদের রিডিং হল ওটা সাম্প্রদায়িক দল। কিন্তু এখানে সেই বিজেপি সরকারের কাছ থেকেই হাসিনাকে জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের অর্থ কি, গণতন্ত্রের কোর ভ্যলু মতভিন্নতাকে কিভাবে দেখতে হয় এর সবক শুনে যেতে হল।
সুষমার এই সফরকে সামগ্রিক দিক থেকে বলা যায়,কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির বিপদ ও আত্মঘাতি দিক মোদির বিজেপি উপলব্দি করেছে। কিন্তু অন্য দেশ সফরে এসে তা প্রকাশ্যে খোলাখুলি বলতে পারেনা, বলা যায় না। এটা হাসিনার কারবার নয় যে নিউইর্য়কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মিটিংয়ে গিয়ে বিগত খালেদা সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে। কিন্তু তাদের উপলব্দি কি সেটা তারা পরিস্কার করেছে সুষমার ঐ সেমিনারের লিখিত বক্তৃতায়। আর সেই সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাবার নতুন নীতির কথা বলে আসলে পুরানো কংগ্রেসের নীতি যে ভুল ছিল সেটাই পরোক্ষে বলে গেলেন সুষমা। মোদি পরিস্কার করেছেন তাঁর স্বপ্ন অনেক উচু। অনেক উচুতে বসে enlightened হয়ে তিনি নিজের স্বার্থ দেখতে পারেন। এটা কংগ্রেসের মত ফাকা বুলি ও আকামের তথাকথিত “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নয়।

ভারতের মিডিয়ায় অসময়ী কংগ্রেসী প্রপাগান্ডা
ভারতের মিডিয়ার কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। এরা মোদির চিন্তা অভিমুখ নীতি কি সেদিকে খবর নাই। সুষমার সফরকে ঘিরে এরা কংগ্রেসের “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নামের নীতি অনুসরণ করে পরামর্শ কলাম রিপোর্ট লিখেই চলেছে। এর কতটা পুরানা অভ্যাস আর কতটা হাসিনা-গওহরের মিডিয়া প্রভাবিত করা বা পেজ কিনে নেবার ক্ষমতা তা আলাদা করা মুশকিল। এমন রিপোর্টেগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সীমা ছাড়ানি লেখাটা হল টাইমস অব ইন্ডিয়া। এটা মূলত টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার এডিটোরিয়াল তাই লেখকের কোন নাম ছাপা হয় নাই। ১৯৭৪ সাল থেকে পেন্ডিং ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি বা ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ভারতীয় সুপ্রিম আপিল কোর্টের রায় হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনও লটকে আছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা এবার এর বিস্তর আলাপ আলোচনা টেকনিক্যাল কাজ শেষে কেবল ভারতীয় সংসদে পাস হওয়া বাকি। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়া সেটাকে আবার নতুন করে ঘোলাটে করার উদ্যোগ নিয়েছে। বলছে, বাংলাদেশের তেতুলিয়া সীমান্তে নতুন করে চার কিলোমিটার করিডোরে দিলে ভারতের পুর্বাঞ্চলে পৌছানোর রাস্তা ৮৫ কিমির মত কমবে তাই মোদির এব্যাপারে বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া দরকার। যেন ব্যাপারটা এমন যে ভারত বাংলাদেশকে চাপ দিলেই সব পেয়ে যেতে পারে। তো হাসিনাকে চাপ দিয়ে গোটা বাংলাদেশটাই নিয়ে নিলেই তো হয়? নাকি? যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশ কেন দিবে? একথার পিছনে টাইমসের যুক্তি জ্ঞানবুদ্ধি কি? না সেসব কিছু পাওয়া যায় নাই। দাদাগিরি একটাই কথা ভারতের দরকার। ভারতের দরকার এটাই একমাত্র র্যাাশনালি। এটা কংগ্রেসের দাদাগিরির চেয়ে বড়, মিডিয়া দাদাগিরি।
আবার, দ্যা হিন্দু পত্রিকার ডিপলোমেটিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার। তিনিও হিন্দু পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতই বুঝা যায় সুহাসিনীরও মোদির লক্ষ্য নীতি সম্পর্কে তার কিছুই জানা হয় নাই। জানার দরকার অনুভব নাই। বরং এখনও কংগ্রেসের নীতিতে বিভোর আছেন। কংগ্রেস-হাসিনা নীতির পক্ষে মিথ্যা প্রপাগান্ডার সোরগোল তোলাই এর লক্ষ্য। তাঁর লেখা তথ্যের সত্য-মিথ্যায় ভরপুর এবং কষ্ট না করে আওয়ামি পছন্দের লোকে ব্রিফে লেখা এই উপসম্পাদকীয়। যেমন সুহাসিনী লেখার আগেই অযাচিতভাবে ঠিক করেছেন আবার বিএনপি-জামাতের ক্ষমতায় আসা ভারতের স্বার্থের বিরোধী ফলে এটা প্রমান করবেন যে তাদের আগের আমলে ভারতের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে। সুহাসিনী ২০০৩ সাল থেকে কাহিনী শুরু করেছিলেন। জামাত-বিএনপির ঐ আমলে বাংলাদেশ ভয়াবহ এন্টি-ইন্ডিয়ান সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল এর ঘটনাবলির ইতিহাস ধারা বর্ণনা দিচ্ছেন। কিন্তু একথা বলতে বলতে হঠাত বছর সাল পিছিয়ে ২০০১ সালে পদুয়ার ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যর কথায় চলে আসলেন। কিন্তু সুহাসিনী খবর রাখেন নাই যে পদুয়ার ঘটনা শুধু ২০০১ সালের বলে নয় এটা তাঁর প্রিয় হাসিনা সরকারের আমলেরই ঘটনা। ইণ্ডিয়া টুডে এর ঐ সময়ের এক রিপোর্ট বলছে ২২ এপ্রিল ২০০১ প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফলে সুহাসিনী যে প্রেমিজের উপর দাঁড়িয়ে তাঁর লেখার যে বিএনপি মানেই ভারতের স্বার্থবিরোধী সন্ত্রাসের বাংলাদেশ এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আর ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনাকে যদি তিনি ভারত বিরোধী সন্ত্রাসের নমুনা হিসাবে উপস্থাপন করতে চান তবে ঐ সন্ত্রাসের কারিগর হন শেখ হাসিনা। নিশ্চয় এটা তার পছন্দ হবে না। সুহাসিনী আরও বলছেন ২০০৩ সালে বিএনপির-জামাতের আমলে হুজির হেড কোয়ার্টার নাকি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, আমরা পছন্দ করি আর নাই করি আফগান ফেরত বাংলাদেশিদের ইসলামি রাজনীতিক উত্থান ১৯৯৩ সালের পর থেকে, হুজিও তাদের তেমনই এক সংগঠন ও প্রকাশ। হুজির হামলাগুলো তাই হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছরের আমলেও ছিল, উদিচী, নারায়নগঞ্জ ঘটনা পর্যন্ত। অর্থাৎ হুজির এই উত্থানের সাথে হাসিনা অথবা খালেদা কার সরকারের আমল এমন কোন তাল মিল রেখে ঘটেছে এমন কোন সম্পর্কই নাই। অর্থাৎ বাংলাদেশের বোমাবাজির ঘটনাগুলো কোন সরকারের আমলে ঘটেছে এর ভিত্তিতে ঐ সরকারের তাতে পৃষ্ঠপোষকতা আছে এমন বয়ান খাড়া করে প্রপাগান্ডা চালাতে চাইলে অভিযোগ করলে হাসিনাও দোষী হবেন। একথা সুহাসিনী খেয়াল রাখেন নাই। ফলে বলা বাহুল্য সুহাসিনীর এই রিপোর্ট মিথ্যা ও বায়াসড অথবা পেজ বিক্রি করার চুক্তিতে এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট।
সুষমার সফর উপলক্ষ্যে ভারতের মিডিয়া রিপোর্টগুলো কমবেশি এরকমই। ব্যতিক্রম হিসাবে চোখে পড়েছে ইংরাজি অনলাইন ফাষ্ট পোষ্ট এর এসএনএম আবদির লেখা আর্টিকেল যেখানে তিনি মোদিকে সাবধানে বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে পরামর্শ রেখেছেন। আর ওদিকে রয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের এক কলাম যেটা থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক Syed Munir Khasru এর লেখা। এই কলামে তিনি বাংলাদেশের অসন্তুষ্টি এবং স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার ইস্যুগুলো এবং প্রণব বন্দোপাধ্যায়ের দেয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপের তালিকা – সব তুলে এনেছেন। ওদিকে আর এক আগ্রাসী নীতির ডঃ সুবীর ভৌমিক সুষমার সাথে বাংলাদেশেও এসেছিলেন কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছু লিখেছেন চোখে পড়েনি।

শেষের কথা
সামগ্রিক বিচারে সুষমার সফরে হাসিনা বেচতে চেষ্টা করেছেন ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” রক্ষার্থে তিনি কত কিছু করেছেন সেকথা। কিন্তু মোদির চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি নীতি কিছুই হাসিনা ষ্টাডি করেন নাই। মোদি আসলে এগুলো কিনতেই আসেন নাই। ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে তিনি আগ্রহী নন। এটা তাঁর ফোকাসও নয়। তার ফোকাস আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এক বড় ভুমিকা রাখা যেখানে তাঁর লক্ষ্য আরও অন্য অনেক কিছু, দেয়ানেয়ার equitable partner পার্টনার হিসাবে বাংলাদেশ। ফলে বলা বাহুল্য অপ্রতিনিধিত্ত্বের হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে কোন মদদে তাঁর ঠেকা নাই। হাসিনা মোদির কাছে নিজ চাহিদার পক্ষে কোন সম্পদ নয়, লায়াবিলিটি। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুষমার সফর শেষ হচ্ছে, হাসিনার দিক থেকে অবিক্রিত পসরা মাথায় তিনি হাট থেকে ফিরছেন। আর সুষমার দিক থেকে তাঁর পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যে ইমেজ ড্যামেজ করে রেখেছিলেন তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন এমন ধারণায় এটা গুড ষ্টার্টার ভাবছেন।।