চীন সফর ইতিবাচক

চীন সফর ইতিবাচক

গৌতম দাস

০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2BN

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই মাসের শুরুতে ১-৬ জুলাই চীন সফরে যাচ্ছেন। এটা তার চলতি গত ১০ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে প্রথম ২০১০ সালের মার্চেরটা সফরটা সহ ধরলে এটা তৃতীয় চীন সফর হবে। তবে আগের ২০১৪ সালের জুনের  সফরটা ছিল ২০১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে। এবারো প্রায় তাই, ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরের ছয় মাস শেষে। গতবারের সফরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর পরিকল্পিত থাকা সত্ত্বেও চীন সফরে গিয়ে তিনি মত বদলিয়ে তাতে স্বাক্ষর করেননি। মনে করা হয়, ভারতের আপত্তিকে গুরুত্ব দিতে তিনি বিরত থেকেছিলেন। যদিও তখন চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প কেবল শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এই মহাপ্রকল্পের কোনো ছাপ বা প্রভাব সেবারের কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই ছিল না। কিন্তু আসল ঘটনা ছিল ভারতের ভাষায় “আমার প্রভাব বলয়ের” বাংলাদেশ কেন চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতায় যাবে, এই মনোভাব। না, এটা কোন জল্পনা-কল্পনা ছিল না। ভারত মনে করত যে, এশিয়ার পড়শি দেশগুলো হল ভারতের খাস তালুক যেন নিজ বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ির উ্ঠান। আর সে জন্য এটা তার “প্রভাববলয়ের” এলাকা। তবে অবশ্য ভারত নিজেই পরে এ থেকে পিছু হটে।

নীচের প্যারা দুটা গত ২০১৮ সালের পুরানা লেখা থেকেঃ

[‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।]

এটা ঘটেছিল ট্রাম্পের আমেরিকার হাতে পড়ে এর আগে আমেরিকা থেকে ভারত যা যা পেত – প্রাপ্ত প্রায় সে সব সুবিধা গুটিয়ে যাওয়া অথবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই যখন ভারত নিজ-কল্পিত দেবতা ট্রাম্পের উপর পুরা হতাশ হয়ে চীনমুখী পথ ধরেছিল; এর শুরুতেই তখন ভারত নিজ মিডিয়াতেই যেচে স্বীকার করে বলেছিল যে, তার এমন মুরোদ নেই। “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক”।

যা হোক, ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে। বাংলাদেশে আমরা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছি বলে বেড়িয়েছি, আবার সময়ে পিছিয়েও গিয়েছি। এ কথাও বলেছি, “আমরা যা দিয়েছি ভারতকে মনে রাখতে হবে”। এমনকি উল্টো ভারতকেই বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে সাহসের সাথে আহবান রেখেছি। আবার পরক্ষণে চাপের মুখে বলেছি, বাংলাদেশের জন্য আমরা “চীন না অন্য বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজছি”। আবার চীনা রাষ্ট্রদূতের সাহসের বলে বাইরে বের হয়ে বলেছি বেল্ট-রোড প্রকল্পে আমরা জিন্দা আছি। আমরা বিএনপিসহ সর্বদলীয় “বাংলাদেশ-চায়না সিল্ক রোড ফোরাম নামে অধিকাংশ দলের এক সমিতি গঠন করে ফেলেছি।

এমনই এক পটভূমি পরিস্থিতিতে আর বিশেষ করে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার চীন সফরে যাচ্ছেন। এখন এবারও কী প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগের সফরের বকেয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তা তুলে ধরে এগিয়ে যেতে পারবে? সার কথায়, যেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ, এর পক্ষে সবলে দাঁড়িয়ে চীনের সাথে গভীর সম্পর্কে গড়তে এগিয়ে যেতে সাহস করবে? এতে কে কী মনে করবে তা পেছনে ফেলে সফলভাবে নিজ লক্ষ্য অর্জনে লিপ্ত হতে পারবে? এগুলো সবই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, সন্দেহ নেই।

তবে প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে এই চীন সফর আয়োজন করে ফেলা – এটাই ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ও সঠিক পদক্ষেপ। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক আপত্তি বা সমালোচনা যা আছে সব সহই এ ঘটনাকে আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারি; অন্তত এ কারণে যে এই সফরটাই ভারতের স্বার্থের অধীন থেকে বা এর কবল থেকে বাইরে বেরিয়ে বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে নেয়া এক ইতিবাচক পদক্ষেপ।

যদিও এখানে একটা লুকোছাপা আছে। ভারতের একটা নিমরাজি সম্মতি আছে এই সফরে। ভারতের নিজ মুখরক্ষার একটা বয়ানও আছে। সেটা হল এমন, যেন নিজে নিজেদেরই সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা আছে। এই সমস্যার হাল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব-শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক ও কিছু মাত্রায় ঘনিষ্ঠতায় যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই। তাই ভারত এটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হতে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব-বলয় আগের মতোই আছে বা থাকছে- এই অনুমান। যেমন আনন্দবাজার এমনই সাফাই দিয়ে লিখেছে,

“এক দিকে ওবর (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) মহাপ্রকল্পে বাংলাদেশকে কাছে টানা, অন্য দিকে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চিন, ভারত, মায়ানমার) অর্থনৈতিক করিডরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। চিনের এই যৌথ কৌশল ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল বলে মনে করছে বিদেশ মন্ত্রক। দেশে নতুন সরকার আসার পরে এই করিডরটি নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করবে চিন, এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এ বার বাংলাদেশের স্বার্থকে করিডরের সঙ্গে আরও বেশি করে তারা যুক্ত রাখবে, যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না”।

রোহিঙ্গা ইস্যুঃ
রোহিঙ্গা ইস্যুকে আমাদের সরকার সামনে নিয়ে এসেছে এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। তবে এ প্রসঙ্গে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসাই মূলত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কথাও খুবই সত্যি যে, এটা ষাটের দশক নয় যখন  কোন জনগোষ্ঠীকে দিনের পর দিন উদ্বাস্তু করে অনিশ্চিত ফেলে রাখা হবে আর তারা চুপচাপ নিরীহ বসে থাকবে। আগে যাই ঘটে থাকুক, এই শতক শুরুই হয়েছে সশস্ত্রতায় – হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া দিয়ে। ফলে গ্লোবাল পরিস্থিতি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার পক্ষে অথবা বলা যায় অভ্যস্ত। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগাতে তৎপর পরস্পরবিরোধী ছোট-বড় স্বার্থ এত বেশি যে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ধরে রাখাই এক কঠিন কাজ। হোস্ট বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে একাজে।

তবে মনে রাখতে হবে চীনকে কোন কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীনা কূটনীতির শক্তি এখানে অর্থনীতিক, ঠিক রাজনৈতিক নয়। চীন রোহিঙ্গা সমস্যাকে দেখে থাকে, রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ বা অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব এটাই মূল কারণ। ফলে চীনের দেখা এর সমাধানও এখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করার মধ্যে – এভাবে। রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ সমস্যা আছে  একথা হয়ত সত্য হলেও কিন্তু সেটাই রোহিঙ্গাদের চরম নিপীড়িত ও উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণ নয়। মূল সমস্যা রোহিঙ্গারা মুসলমান এই রেসিয়াল ঘৃণা তো বটেই; এ ছাড়া বরং নিজ বার্মিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে সবাইকেই এই বার্মিজ জেনারেলরা প্রচন্ড বর্ণবাদী ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। আর একারনেই রোহিঙ্গাসহ জেনারেলদের অপছন্দ এমন সব জনগোষ্ঠীকেই একমাত্র স্মূলে নির্মূল করার মধ্যেই তাঁরা সমাধান দেখে থাকে। এমন বার্মিজ শাসকদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে কাজ আদায়ের কৌশল কতটা কাজ করবে তাতে আস্থা রাখা কঠিন। সারকথায় চীনা এই পদ্ধতিতে কাজ আদায় বা চাপ দেয়া – টুলস হিসেবে খুবই দুর্বল। আসলে বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে নয় “রাজনৈতিক চাপ” সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুরই কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

চাপ হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন তোলা ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশনের জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইট বা বিচারের আইসিসির তৎপরতা ঘটানো – এটাই একমাত্র “রাজনৈতিক চাপ” এর উপায় নয় নিশ্চয় তা হলেও সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু যেকোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের মত চীন এই পথে খুবই দুর্বল। হিউম্যান রাইট কমিউনিস্টদের হাতিয়ার নয়। যদিও অন্য কোন কিছুও হাতিয়ার হতে পারে। যেমন কমিউনিস্ট পটভূমির রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও পশ্চিমের আমেরিকাসহ যারা হিউম্যান রাইট ইস্যুতে চাইলে গ্লোবাল ক্ষমতার করিডোরে খুবই সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে, মিয়ানমারের জেনারেলদের নাস্তানাবুদ করতে পারে – আমেরিকা বা ইউরোপের হিউম্যান রাইট বিষয়ক ততপরতার দিক থেকে এই চাপ এখনও খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে, এই সুযোগ এখনো হারিয়ে যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কেবল চীনামুখী বা চীনা নির্ভরতা হয়ে পড়া হবে মারাত্মক ভুল। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায় আমরা এককভাবে নিয়ে যে ইউরোপসহ পশ্চিমা শক্তিকে রক্ষা করেছি সে কথা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি। আর সেই সাথে  দায়-কর্তব্যের তাদের পার্ট মনে করাতে এক ক্যাম্পেন করতে পারি। এর পরিপূরক হিসেবে অন্তত অর্থনৈতিক দায় বইতে তাদেরও আমাদের সহায়তা দেয়া ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে তাদেরকেও চাপ দেয়া ও বাধ্য করতে পারি।

সারকথায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমাশক্তি আর অন্যদিকে চীন এভাবে সবার চাপ সৃষ্টির শক্তিকে একসাথে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। এটা না করতে পারলে বরং মিয়ানমারের জেনারেলেরা চীনকেই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে ফেলবে, যা করে এত দিন সে টিকে আছে।

এ দিকগুলো বিবেচনা করে কথা বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামার দাভোস সম্মেলনঃ
তবে এই চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও আরেকটা টুপি বা আড়াল আছে তা হল – ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (এখন থেকে সংক্ষেপে কেবল ‘ফোরাম’ লিখব)। অফিশিয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন যাচ্ছেন কারণ ফোরাম-এর “সামার দাভোস সম্মেলন” [Summer Davos“. Organised by the World Economic Forum] চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই আড়ালটা হল, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ১-৩ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সেই- ‘সামার দাভোস সম্মেলনে’ যোগ দিতে যাচ্ছেন। ফোরামের খুব সংক্ষেপে পরিচয় দিলে, এই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জন্ম ১৯৭১ সালে, যা মূলত রাজনীতি ও ব্যবসায়ের নেতা এবং গ্লোবাল সমাজের অন্যান্য নেতাদেরকে একসাথে বসিয়ে গ্লোবাল, রিজিওনাল বা শিল্প-কলকারখানা-বিনিয়োগের নানা ইস্যুতে কথা বলানো, যাতে তা পরিণতিতে এটা দুনিয়াকে নতুন ইতিবাচক আকার দিতে সহায়ক হয় – এমন কথা বলানোরই প্লাটফর্ম হল এই ফোরাম।

একেবারে স্বল্প কথায়, এটা হলো ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বসিয়ে কথা বলানো – কথা বলানোর এক ফোরাম। এতে এর বার্ষিক সম্মেলন একই সময় একাধিক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হবে এভাবে আগাম ঠিক করা ইস্যুতে রাষ্ট্রপ্রধানসহ যে কাউকে বক্তা ও শ্রোতা বানিয়েীটা আয়োজন করা হয়। আয়োজক এই ফোরাম নন-প্রফিট দাতব্য ধরনের সংগঠন, যা নিজেরা নিজেদের ‘প্রাইভেট-পাবলিক’ সংগঠনের মিলনমেলা বলতে পছন্দ করে। বরাবর প্রতি বছর জানুয়ারিতে এই ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ২০০৭ সাল থেকে এর বার্ষিক সম্মেলন দুইবার করে হচ্ছে। প্রতি জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস জেলা শহরের মুল সম্মেলনটা ছাড়াও ২০০৭ সাল থেকে সব সময় চীনে আরেকটা সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের দালিয়ান ও তিয়ানজিং এ দুই শহরের একেকবার একেকটায়, প্রতি জুলাইয়ে তা ঐ একই ফোরামের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এটাকেই ‘সামার দাভোস’ নামে ডাকা হচ্ছে। তবে এখানে প্রাধান্য পায় উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো। একারণে সামার দাভোসের আর এক নাম হল Annual Meeting of the New Champions। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এখানেই যোগ দিতে যাচ্ছেন। আর যেহেতু চীনে যাচ্ছেনই, তাই যেন তিনি চীনের সাথে এই ফাঁকে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৈঠকগুলোো করে নেবেন ৩-৬ জুলাই, ব্যাপারটা হাজির করা হয়েছে অনেকটা এ রকমভাবে।

এই সফরে কী কী চুক্তি স্বাক্ষর হবে সে বিষয়ে মিডিয়ায় যা প্রকাশ হয়েছে তা হল মোট আটটা চুক্তি (বা কোনটা সমঝোতা স্মারক)। যার প্রথম চারটিই হল, পটুয়াখালির পায়রায় যে তেরো শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণ হচ্ছে তা উৎপাদনে গেলে পরে এই বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিতে হলে নতুন কিছু “বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামো” নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ গ্রিড নির্মাণ, লাইন টেনে পরিচালন ও তা বিতরণ ইত্যাদি- এই কাঠামো তৈরিতে যে বিনিয়োগ লাগবে এমন বিষয়ক চুক্তি। এমন প্রথম চার চুক্তির কেবল অর্থমূল্য হিসেবে তা সম্ভবত মোট মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাকি পরের দুই চুক্তি হল, চীনের সাথে যেসব বিনিয়োগ আগামীতে হবে এর টেকনিক্যাল দিক – মানে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতার চুক্তি। এ ছাড়াও অন্য একটা চুক্তি হল, ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎস চীনে, সে অংশ ও আমাদের অংশের প্রবাহবিষয়ক তথ্যবিনিময় ও তা ব্যবহারে সহযোগিতাবিষয়ক। আর শেষের চুক্তিটা হল, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে। এই হল মোট আট চুক্তি।

BCIM প্রকল্পঃ
অতএব, ঠিক বড় বিনিয়োগ আনতে বা এখনই বড় কোনো প্রকল্প চুক্তি হতে যাচ্ছে এই সফর ঠিক তেমন নয়। তা হলে? চোরের মন পুলিশ পুলিশ। ভারতের প্রবল অনুমান যে এই সফরে মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে BCIM প্রকল্প। BCIM নামটা চার রাষ্ট্রের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি। এপ্রসঙ্গে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক খবর ভারতের অনেক মিডিয়াই ছেপেছে। পিটিআই বলছে,  [BCIM] ‘বিসিআইএম(কলকাতা থেকে ঢাকা কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং- এই সড়ক ও রেল সংযোগ) প্রকল্পকে চীনারা সাম্প্রতিককালে আবার জাগিয়েছে” [China lately is making efforts to revive the BCIM.]। আসলে এই প্রকল্প কখনোই বাতিল করা না হলেও ভারত একে মৃত বলতে, এমন রটনা করতে পছন্দ করে থাকে। কারণ ভারত চায় না এই বিসিআইএম প্রকল্পে সে নিজে জড়িয়ে থাকে অথবা তাকে বাদ দিয়ে এটা সফল হয়ে যাক তা-ও চায় না। এখনকার এর কারণ, চীনের নতুন প্রস্তাব হল BCIM প্রকল্প বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হোক,  এতে বাংলাদেশ খুবই আগ্রহী; কিন্তু ভারত একেবারেই নয়। তবে এই প্রস্তাবের আগেও ভারতের অবস্থান ছিল নেহায়তই না বলতে না পেরে যুক্ত থাকা। কারণ আবার ভারত চায়, বিসিআইএম প্রকল্প বলতে এর মানে হোক শুধুই সড়ক ও রেল সংযোগ। কোন গভীর সমুদ্র বন্দর নয়।

অথচ এর বড় এক মূল অনুষঙ্গ ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দর ছাড়া এই “সংযোগ” অবকাঠামো গড়া অর্থহীন। এমনকি তা অর্থনৈতিকভাবে বিচারে এতে বিনিয়োগ করলে তা ভায়াবল হবে কি না বা খরচ উঠবে কি না সন্দেহ। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলেও, ভারত শুরু থেকেই বন্দর নির্মাণকে বিসিআইএম প্রকল্পের অংশ নয় মনে করতে চায়। অতএব চীন-বাংলাদেশের বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা মানেই তা সোনাদিয়া বন্দরসহই। আর এটাই ভারতের জন্য অস্বস্তির।

তবে ভারতের আপত্তির যুক্তি বড়ই অদ্ভুত আর তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বলছে সে চাচ্ছে না ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্টের ভেতর দিয়ে এসে চীন বাংলাদেশের কোনো বন্দর ব্যবহার করুক। আনন্দবাজারের ভাষায় বললে, “বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে। ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”। কিন্তু ঘটনা হল। বিসিআইএমের রুট হল, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে মান্দালয় হয়ে কুনমিং। এটা ভারতের সব মিডিয়া নিজেই লিখছে এই রুট মোট দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটারের। যেমন এভাবে, [The 2800-km BCIM corridor proposes to link Kunming in China’s Yunnan province with Kolkata, passing though nodes such as Mandalay in Myanmar and Dhaka in Bangladesh before heading to Kolkata.]।

অথচ ওদিকে ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্ট হল,  বাংলাদেশের দিনাজপুর-সিলেট এই পুরা উত্তর ভূখণ্ডেরও আরো উত্তরে, যা বিসিআইএম’র রুটেই নয়। বিসিআইএম’র রুট হল বলতে গেলে, কলকাতা-যশোর-ঢাকা হয়ে এবার পুরা দক্ষিণে বা দক্ষিণ-পুবে, আর নর্থ ইস্ট হল এর পুরো উত্তরে। তাহলে?

আসলে BCIM প্রকল্পে চীন বলতে সকলে কুনমিং বুঝলে ও বুঝালেও (কুনমিং আমাদের কক্সবাজার থেকে বার্মার মান্দালয় পার হলে তবেই পৌছানো যাবে) এমন হলেও ভারত জবরদস্তিতে মানে করতে চাচ্ছে – এটা ভারতের নর্থ-ইস্টের অংশ অরুনাচল প্রদেশে চীন-ভারত সীমান্তের ওপারের চীন। হতে পারে ভারতের ভয় এখন চীন বলতে কুনমিং বুঝলেও ভবিষ্যতে প্রকল্প গড়া শেষ হলে চীন তখন আসাম-অরুনাচল সীমান্তের অপর পারের দিক থেকে চীন হিসাবেও আসাম-বাংলাদেশ হয়ে সোনাদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

আর সম্ভাব্য এখানেই চীনকে আসাম করিডোর ব্যবহার করতে দিতে ভারতের ভীতি ও আপত্তি আছে, ধরা যাক ভারত এটাই বলতে চাইছে। ভারতের এই কথার মানে হল, তাহলে কাউকে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ জায়েজ। অতএব, বাংলাদেশ কেন নিজ ভুখন্ড পেরিয়ে ভারতকে নর্থ-ইস্টে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ করবে না।

আবার মজার কথা হল, আসামসহ নর্থ-ইস্টকে চীন করিডোর হিসেবে যাতে ব্যবহার না করতে পারে বা করে ফেলবে এই ভয়ে ভারত নর্থ-ইস্টকে চরম পিছিয়ে পড়া, অবকাঠামোহীন এক অঞ্চল করে গত সত্তর বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রেখেছে। এটাই আসাম সংকটের মূল কারণ; ওখানকার বাসিন্দাদের স্থবির হয়ে থাকা ও রাখা অর্থনৈতিক জীবনের। অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে যে মুসলমানেরা এর কারণ। বাসিন্দাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে ঘৃণা জাগাতে। আর মুসলমান মানেই যেন এরা নিশ্চয় বাংলাদেশের – এই অদ্ভুত প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আর এখান থেকেই এনআরসি (NRC), মুসলমান খেদানো, ৪০ লাখ মানুষকে রিফুউজি ক্যাম্পে মানবেতরে জীবনে ফেলে রাখা ইত্যাদি কী নয়! অর্থাৎ এ যেন, নিজ সন্তান হত্যা করে হলেও প্রতিবেশীর ক্ষতি করতে হবে – এই মনোভাব। সত্যি অদ্ভুত এই হিন্দুত্বের রাজনীতি!

অদ্ভুত এক বাস্তবতা হল, হাসিনার এই আসন্ন সফর নিয়ে ভারতের এই “হিন্দুত্বের রাজনীতি” চরম অস্থির ও খামোখা উদ্বিগ্ন। পিটিআই’র [PTI] ওই রিপোর্ট আরও লিখেছে, ‘সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদি সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের সামিট মিটিংয়ের (১৩-১৪ জুন) সাইডলাইনে কথা বলেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি দীর্ঘ সময়ের পরে বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে কথা তোলেন”। [After a long gap, Xi raised the BCIM project during his meeting with Prime Minister Narendra Modi at Bishkek on the sidelines of the Shanghai Cooperation Organisation summit early this month.]।

লক্ষণীয়, এখানে বিসিআইএম প্রকল্প চীন আগে বাতিল করেছিল তা বলা হয়নি, বলা হয়েছে আফটার লং গ্যাপ- অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পরে প্রেসিডেন্ট শি ইস্যুটা নিয়ে কথা বলেছেন। পিটিআই’র এমন লেখার পেছনের কারণ পাওয়া যায় এখানে, গত ১০ জুন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট [China denies abandoning BCIM corridor। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত প্রতিদিন এক সাংবাদিক প্রেস ব্রিফিং করে থাকে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের কথা ভেবে ভারতীয় সাংবাদিক সেখানে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসে যে, চীন বিসিআইএম প্রকল্প বাতিল করেছে কিনা। স্বভাবতই ব্রিফিং কর্মকর্তা তা নাকচ করেন ও বলেন যে, না তা চালু আছে [“the BCIM has not been abandoned. It is very much on board.”]। আর তা থেকেই হিন্দুত্বের রাজনীতি অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে যে হাসিনার চীন সফরে গুরুত্বপুর্ণ আলোচনার বিষয় বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে কথা হবে। বাংলাদেশ নিজ একান্ত স্বার্থে তার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী স্বাধীনভাবে শেষ পর্যন্ত এবিষয়ে আলোচনা আগিয়ে নিয়ে সক্ষম হবে! আমরা বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছি!

আমেরিকাও কান পাতাঃ
হাসিনার আসন্ন চীন সফর নিয়ে আরেক লক্ষণীয় দিক হল – কেবল ভারত নয়, আমেরিকাও কান পেতে এ সফরকে জানা ও শুনার জন্য গভীর আগ্রহী। এর আগে এসব ক্ষেত্রে দেখা যেত এনিয়ে একটা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার রিপোর্টই তাদের যথেষ্ট ছিল। ইদানীং দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কিছু মিডিয়া হাসিনার চীন সফর নিয়ে ভারতের মতোই আগ্রহী রিপোর্ট ছেপেছে। ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’ বা এর এফিলিয়েটেড ‘বেনার নিউজ’ এমন আমেরিকান সরকারের বিদেশনীতির আলোকে রিপোর্ট লিখেছে। এরা পরস্পর একই রিপোর্ট শেয়ার করে থাকে।  Radio Free Asia, এই নাম বা শব্দের মধ্যে “FREE” শব্দটা ইন্টারেস্টিং। কোল্ড ওয়ারের যুগে সোভিয়েত বিরোধী প্রপাগান্ডা লড়তে আমেরিকার প্রিয় শব্দ ছিল ফ্রি। মানে বদ্ধ সোভিয়েত দুনিয়া থেকে মুক্ত দুনিয়ায় আহবান। ব্যাপারটা এখানেও প্রায় তেমনই। বলা হয়েছে এশিয়ার যেসব দেশের জনগণকে তাদের সরকার সত্যিকথা শুনতে জানতে দেয় না, এই রেডিও তাদের জন্য। অর্থাৎ এটা এখন একালে চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডার কাজে লিপ্ত। যা হোক এটা কেবল রেডিও হলেও এদেরি সহযোগী এফিলিয়েটেড আর প্রতিষ্ঠান হল, BenarNews. এরা ইংরাজি ছাড়া আরও বাংলাসহ চার ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন নিউজ।

বাংলাদেশ কতটা চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চলে গেল এ নিয়ে ভারতের মতই আমেরিকার উদ্বিগ্নতা – এটাই তাদের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কলাপাড়া, পটুয়াখালীতে দুর্ঘটনায় এক স্থানীয় শ্রমিকের মৃত্যু হলে শ্রমিকদের সাথে চীনা ঠিকাদারের ম্যানেজমেন্টের বিরোধে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একজন বাংলাদেশী শ্রমিক ও একজন চীনা টেকনিশিয়ান নিহত হয়েছেন। মূলত নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকের “লাশ গুম হওয়ার গুজব ছড়িয়ে” পড়লে মূলত তা থেকেই সংঘর্ষের শুরু।

এই পরিস্থিতির উত্তেজনা সামলাতে ও ঠান্ডা করতে আপাতত সবাইকে দু’সপ্তাহ ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। বেনার নিউজ লিখছে, It was not immediately clear whether Hasina and the Chinese leaders will discuss the recent fight between Chinese and Bangladeshi workers at a site of a partly built China-funded power plant.]। সারকথাটা বাংলা করে বললে তারা ‘পরিষ্কার নয় যে, এটা ইস্যু হিসেবে চীন-বাংলাদেশ সামিটে আলোচনা হবে কি না’!

আসলেই, এটা Benar এবং RFA এর গভীর উদ্বেগপ্রসূত “আশা”! কিন্তু সমস্যা হল, শকুনের বদ দোয়াতে গরু কখনও মরে না। তবে আমরা পরিস্কার থাকতে পারি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টও লিখে এমন “শকুনি আশা” জানাবে না। ঘটনা হল, এই প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ আবার বাংলাদেশী শ্রমিকের অধিকার রক্ষাও বাংলাদেশের স্বার্থ – দুটোই আমাদের স্বার্থ। দুটোই আমাদের সবল রক্ষা করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এটা নিয়ে “সামিট লেবেল” কথা বলতে হবে? এটা কী চীন-বাংলাদেশ কোন বিরোধ? ঐ রিপোর্ট কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন?  এটা তো রিপোর্টিং নয়, বেয়াদবি খোঁচাখুচি!  ভাষা লক্ষ্য করার মত লিখেছে এটা নাকি “চীনা ও বাংলাদেশি শ্রমিকের ফাইট” [fight between Chinese and Bangladeshi workers] এর ইস্যু। ব্যাপারটা বড়জোর বাংলাদেশী প্রকল্প পরিচালক আর ওই চীনা ঠিকাদার কোম্পানির মিলিতভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক সৎ উদ্যোগ এ সমস্যা মিটিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। অথচ …। বাংলাদেশ-চীনের প্রকল্প ভালো না চললে বা তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেই যেন রিপোর্টারের লাভ, তাই তিলকে তাল। বদ দোয়াই ভরসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন সফর ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

গৌতম দাস

অপহরণ, গুম ও খুনের ভিতর ভাসছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে এটা এক চরম অবস্থানে এসে ঠেকেছে। হয়ত আরও কোন চরমে তা পৌছাবে। আতংক সমাজের প্রায় সব অংশকেই তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে এর আগে অপহরণ গুম ও খুন ঘটেনি, কিম্বা এখনকার মতো চরম আকার ধারণ করে নি । গত এক দেড় বছরে তো বটেই এমনকি গত ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের পর অপহরণ, গুম ও খুনের সংখ্যা ভীতিকর জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিল। অথচ এখনকার তুলনায় অপহরণ গুম ও খুন তখন গণমাধ্যমে আসে নি। যারা এর শিকার হয়েছিল তাদের প্রতি গণমাধ্যম সদয় ছিল না। এখনও সাতক্ষীরায় যে অপহরণ, গুম বা খুনের ঘটনা চলছে তা নারায়নগঞ্জের মত একইভাবে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে না। বিচারবহির্ভূতভাবে এদের ‘নির্মূল’ করবার ইচ্ছাটাও সমাজের একাংশের মধ্যে প্রবল হয়ে আছে। ফলে সেই সময়ের অপহরণ, গুম ও খুনের মিডিয়া রিপোর্টিং না হবার কারণে বিষয়টাকে সরকার আড়ালে রাখতে পেরেছিল এখনও “বিশেষ বিশেষ” অপহরণ, গুম বা খুনের বেলায় পারছে। যারা অপহরণ গুম ও খুন হচ্ছে তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” ফলে রাষ্ট্রের দিক থেকে এদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ড চালিয়ে যাওয়া জায়েজ -গণমাধ্যম খুব সফলভাবেই এই বিকৃত মানসিকতার চর্চা জারি রাখতে পেরেছিল ও পারছে। যে র্যা ব-১১ এর কমান্ডারের নামে এত অভিযোগ, শীর্ষে তিনি, নারায়নগঞ্জে বদলি হয়ে আসার আগে তিনি লক্ষীপুর জেলায় ছিলেন। সেখানকার বিএনপি ও জামাত নেতা কর্মীদের হত্যার অভিযোগ নিয়মিত আমরা দেখেছি। একবার তো ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে জনরোষ থেকে স্থানীয় র্যা ব বাহিনীকে উদ্ধার করতে হয়েছিল। কিন্তু লক্ষীপুরের সেসব ঘটনায় আজকের মত আমরা সামাজিক-রাজনৈতিক কোন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। অর্থাৎ বিচার ও আইনবহির্ভুতভাবে অপহরণ, গুম বা খুনের এক রাজনৈতিক-সামাজিক স্বীকৃতি আমরা দিয়েছি। অথচ সেই মিডিয়া ও সেই রাজনীতি আজকে অপহরণ, গুম বা খুনের বিরুদ্ধে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলতে চাইছে। বড়ই তাতপর্যপুর্ণ।
রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী ভূমিকা ও আইন শৃংখলা বাহিনীর আইন বহির্ভূতভাবে হত্যার পক্ষে দাড়ানো লোকের অভাব হয়নি, আর তাদের যুক্তির অভাব ঘটে নি। যেমন, এমন যুক্তিও আমরা শুনেছি যে, সর্বসাধারণের জান ও মাল রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; অতএব রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নাগরিকদের পঙ্গু কিম্বা হত্যা করতেই পারে। খুবই মজার যুক্তি এটা। কিন্তু সমাজের ভেতর থেকেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, কিন্তু গড়ে ওঠে সমাজেরই উর্ধে সমাজের ওপর চেপে বসে থাকা ‘দানব’ হিসাবে – এটা অতি পরিচিত পুরানকাল থেকেই চলে আসা বামপন্থি এক সবল চিন্তা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রকে দেখবার এই পুরানা বামপন্থি চিন্তার জায়গাটা বামপন্থিদের মধ্যেও খুব একটা অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ।
সেটা দূরে থাকুক, এখন ‘রাষ্ট্র’ নামক এই দানবকেই এক স্বাভাবিক সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য করবার মতাদর্শই বাংলাদেশে প্রবল। রাষ্ট্র হাজির আছে বলেই এই প্রতিষ্ঠানটি ন্যায্য, তার গঠনের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস ও চরিত্রের হদিস নেবার দরকার নাই, এই চিন্তা থেকে মুক্তি সহজ নয়। রাষ্ট্র আছে বলেই তার আর ন্যায্যতা প্রমাণের দরকার নাই, অতএব কোন নাগরিকের অধিকারের বালাই রাষ্ট্রের না করলেও চলে, এই চিন্তার প্রাবল্যের কারণেই ভিন্ন মতাদর্শের নাগরিকদের রাষ্ট্র যখন নিপীড়ন ও হত্যা করে তখন সমাজে কোন বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয় না। এমনকি তথাকথিত সুশীল বা লিবারেল কিম্বা প্রগতিশীলরাও নিশ্চুপ থাকা শ্রেয় মনে করে, সমর্থন যোগায়।
এমনকি যারা মুখে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের কথা বলেন, তাদেরও সে ক্ষেত্রে বলতে শুনি যে মৌলিক অধিকার বা অন্য সবকিছু দেখবার আগে দেখতে হবে রাষ্ট্রের দ্বারা নিপীড়িত বা আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে খুন হওয়া নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কি? যদি উনি ইসলামি রাজনীতির হন, কি ইসলামি চিন্তার উপর ঠেস দিয়ে আছেন বলে মনে হয়, তবে তিনি মৌলবাদি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। তখন রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও হত্যার সমালোচনা দূরে থাকুক, বরং প্রয়োজনে ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ বলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হত্যার পাশাপাশি তাদের নির্মূল করতে নেমে পড়তে হবে। এই হল তাদের দশা। এরা মনে করে “ইসলামপন্থি মৌলবাদি বা সন্ত্রাসীরা” রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মাকান্ডে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে গেলে দানব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার কিছু নাই। কারণ তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” এর মত রাজনৈতিক আদর্শের নাগরিক। এরা বলতে চান, এই নাগরিকদের নাগরিক অধিকার জান মাল মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়লেও অথবা রাষ্ট্র তার উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের মতো অপরাধ করলেও আগে বিবেচনায় নিতে হবে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। ক্ষমতাসীন সরকারের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে কোন নাগরিক ব্যক্তির নাগরিক অধিকার নাই – এই হোল তাদের সারকথা।
বাংলাদেশে এই ধরণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার বিরোধীদের সম্পর্কে একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। গত জানুয়ারির শেষে অপহরণ গুম ও খুনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রচারণার অংশ হিসাবে এক মানবাধিকার সংগঠনের সভার কাজে এক জেলা শহরে যেতে হয়েছিল। মূল প্রবন্ধ পড়ার পর সেখানে প্রথম বক্তা ছিলেন জেলা শহরেরই কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সভাপতি; জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতিও তিনি। তিনি কথা শুরু করলেন এভাবে, মানবাধিকারের কথা বইপুস্তকে অনেক ভাবে থাকে। সেটা সেখানে থাক। খোদ ওবামাও সেগুলো মানতে পারেন না। ফলে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধেও যে অপহরণ গুম ও খুনের অভিযোগ হচ্ছে সেগুলো নিয়ে বিচারে সবার আগে দেখতে হবে যারা অপহরণ গুম ও খুনের ভিকটিম তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। এটাই মুখ্য বিবেচনা। ইস্যুটাকে সেভাবেই দেখতে হবে।

“রাজনৈতিক আদর্শের” ভিত্তিতে রাষ্ট্র নাগরিককে তার নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণ করবে কথার অর্থ কি
কথাটার সার কথা কি? আমার পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাঁর নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো বা ক্ষুন্ন হবার বিপক্ষে সোচ্চার হওয়া যাবে না। বলা বাহুল্য, আমার খুবই বেগ পেতে হয়েছিল ঐ প্রকাশ্য সামাজিক সভায় সেই বক্তার মারাত্মক বিপদজনক ও আত্মঘাতি বক্তব্যের পরিণতি কি হতে পারে তা উপস্থিত সকলকে বুঝিয়ে বলতে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল। আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাটা ঘটনাচক্রে কমিউনিষ্ট পার্টি বা সিপিবি কেন্দ্রিক। কিন্তু এর অর্থ এমন নয় যে এই বিশেষ চরিত্রের “নাগরিক অধিকার” ধারণাটা কেবল সিপিবির পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটা ক্যাটাগরি করে বলা যেতে পারে যে, যারা নিজেদের “প্রগতিশীল” বা “চেতনার সৈনিক” মনে করেন নিজেকে মোটামুটি তাদের প্রায় সবারই অবস্থান এটা। তাই আমরা এখন দেখছি। একই বাহিনী কমান্ডারের ততপরতা লক্ষীপুরে ঘটলে কোন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। কিন্তু এবার নারায়নগঞ্জে ঘটলে প্রতিক্রিয়া হয়।
কোন “যদি” বা “কিন্তুর” আড়ালে বা কোন যুক্তিতেই রাষ্ট্র নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি করবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। এতে সমাজ বা রাষ্ট্র কোনটাই টেঁকে না। নতুন কোন রাষ্ট্রও এমন ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে না। সমাজের রক্তাক্ত বিভক্তি কিম্বা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে চাইলে এই অতি গোড়ার নীতি আমাদের আত্মস্থ করতে হবে। একে উপেক্ষা বা গাফিলতি মেনে নেওয়ার কোন সুযোগ নাই। অথচ এই ন্যূনতম নীতির অভাব তাদের মধ্যেই প্রবল যাদের কাছে আমরা এই নৈতিক প্রশ্নে দৃঢ়তা আশা করি। অথচ এরাই একই নিশ্বাসে নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন।
আদর্শ যাই হোক কোন রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিতে গিয়ে কোন নাগরিক যদি কোন ক্রিমিনাল অপরাধ করে বসেন তবে অবশ্যই তার অপরাধ আমলে নিতে হবে এবং বিচার করতে হবে। আদালতে অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে তিনি কেবল ঐ ক্রি্মিনাল অপরাধের জন্যই শাস্তি ভোগ করবেন। কোন ক্রমেই তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা তৎপরতার জন্য নয়। এটাই মূল কথা। এছাড়া আমরা ভুলে যাই রাষ্ট্রের নির্বাহি বিভাগ বিচার বিভাগ নয়। যার সোজা মানে নাগরিকের কোন কথিত অপরাধের বিচার সরকার করতে পারে না। সরকার বিচারক নয়, বড়জোর আদালতে অভিযোগ আনয়নকারী হতে পারে। অথচ সে জায়গায় আমরা রাষ্ট্রের নির্বাহী সরকারকেই অপরাধের বিচারক বানিয়ে ফেলছি। শুধু তাই নয় সরকারকেও কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ তাঁর পছন্দসই কিনা সেই বিচারের ভার দিয়েছি। অথচ কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কেমন তা কোন আদালতের বিচারকের পছন্দসই কিনা তা বিচারের এক্তিয়ার বিচার আদালতেরও নাই। আসলে, কোন রাজনীতি ভাল না মন্দ তা একমাত্র রাজনৈতিক পাড়ায় বিচার হয় অথবা জনগণ বিচার করে। আদালত পাড়ায় কোন রাজনীতির বিচার করা যায় না, চলে না; বিচারকের সেই এক্তিয়ার কনষ্টিটিউশন দেয় না। তবে কোন রাজনীতি কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করলে অথবা বিরোধী হলে সেটা অন্য কথা। যেটা কোনভাবেই রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোন দলের রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দ করা না করার বিষয় নয়। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শ বা গঠনতন্ত্র রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনের সাথে সংঘাতপুর্ণ বা বিরোধ তৈরি করে এমন প্রমাণিত না হলেই হল। এরপর ঐ রাজনীতি আর রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোনভাবেই পছন্দ অপছন্দের বিষয় নয়, এক্তিয়ার নাই। তবে যে কোন নাগরিক ঐ রাজনীতিকে (আদালতে আইনীভাবে নয় কেবল রাজনৈতিক পাড়ায়) পছন্দ করতে পারেন, বিরোধীতাও করতে পারেন। অথচ আমরা খোদ রাষ্ট্রকেই রাজনৈতিক আদর্শ বিবেচনার ভয়ংকর ও অদ্ভুত কথা বলে অবলীলায় সরকারকেই অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা ঘটাতে দিচ্ছি শুধু না, এর পক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছি।

দুই

নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনায় সমাজের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ঘটছে। এটা তাৎপর্যপুর্ণ। আমার অভিজ্ঞতার জেলা আইনজীবী সমিতির ঐ সভাপতির মত আমরা অনেকেই এই সরকারের শুধু শেষের গত তিন বছরে অপহরণ গুম ও খুন করতে দিয়ে একটু একটু করে এমন দানব বানিয়েছি। যুক্তি তুলতে দেখেছি, যে পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাকে তো সরকারের হাতে অপহরণ গুম ও খুনই হতে হবে। এই বেহুঁশ ও আত্মঘাতি চিন্তা নিয়েই আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম। আমাদের অনেকের কাছে তা খুবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু নারায়নগঞ্জের ঘটনা কি আমাদের হুঁশ ফিরিয়েছে, ফেরাতে সক্ষম হবে? এটা নির্ণয় করবার সময় এখনও আসে নি। যদিও রাজনৈতিক আদর্শ নির্বিশেষ সবারই অন্তত এটুকু হুঁশ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে যে, খারাপ কিছু একটা ঘটে গিয়েছে, যার ফল আমরা ভোগ করছি। কেউ বলছেন রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ছে, রাষ্ট্রের একটা মারাত্মক ব্যাত্যয় ঘটে গেছে কোথাও ইত্যাদি।
রাষ্ট্র কোন না কোন আদর্শের ওপর দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকাও সেই আদর্শের ওপর নির্ভর করে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলা হয় রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে মূল বিষয় নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ওপরই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ নাগরিকেরা সবাই একই রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী এমন কখনই থাকেন না। থাকার কথাও না। এমনকি মোটা দাগে অনেককে একই রাজনৈতিক আদর্শের কোন দলে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্বও থাকে। কিভাবে একটি রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র তাদের মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের মীমাংসা করে তার ওপর নির্ভর করে সেই দল কিম্বা রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকা।
যে কোন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠি বা প্রবণতার অধিকার আছে তাদের মতাদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়বার। কিন্তু সেকাজে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই একমাত্র সেটা করা যেতে পারে। ক্ষুন্ন করে নয়। মোটা দাগে গণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলো অগণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলোর বিরুদ্ধে লড়েই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কারো নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করে গণতন্ত্র কায়েম করে না, বরং সকল নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অগণতান্ত্রিক শ্রেণির তৎপরতা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বিচার বিভাগ এই ক্ষেত্রে একটা মুখ্য ভূমিকায় থাকে। এটাই গণতন্ত্র নিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী করবার পথ। এর কোন শর্টকা্ট রাস্তা নাই। প্রতিপক্ষকে ‘নির্মূল’ করাই যদি নীতি হয়, তাহলে প্রতিপক্ষও পালটা নির্মূলের নীতিই গ্রহণ করবে। এটা মনে রাখতে হবে। এটা দেশকে টুকরা টুকরা করবার নীতি, গড়বার বা গঠন করবার নীতি হতে পারে না।
আবার যার যার প্রত্যেকের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম দেখতে চাইলে বাস্তবে সেটা অসংখ্য রাষ্ট্রে টুকরা হয়ে যাবে। উদার গণতন্ত্র ভাল কি মন্দ সেই তর্কে না গিয়ে বলা যায়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি চর্চার অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণ্ণ করে না। মূলত নাগরিকের জানমাল সুরক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র; আবার রাষ্ট্র নাগরিকের সুরক্ষা করতে ব্যর্থ হবে না, কিম্বা নিরাপত্তা ভঙ্গের কারণ হবে না -রাষ্ট্রের এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বিনিময়েই নাগরিকরা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মানে বা মানাটা তার স্বার্থের অনুকুল বলে মনে করে। নাগরিকরা ভিন্ন ভিন্ন বা নানান রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করতে পারবে এটা সেখানে স্বীকৃত থাকে। ফলে সরকার বা ক্ষমতাসীন কোন গোষ্ঠির পছন্দসই রাজনৈতিক মতাদর্শ না হলে রাষ্ট্র তাকে অপহরণ গুম ও খুন করতে পারবে এই বিকৃত চিন্তা কোন সমাজে বা রাষ্ট্রে এসে গেলে সেটা ভয়াবহ নৈরাজ্যরই ইঙ্গিত বহন করে। একালে যে রাষ্ট্র নাগরিক ও মানবিক অধিকার স্বীকার করে না তার পরিণতি কী দাঁড়ায়? এককথায় এর জবাব হল আজ হোক কাল হোক রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাবে। বাংলাদেশে যেটা এখন ক্রমশ ঘটছে। অর্থাৎ যারা এতদিন সরকারী দলের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধীদের অপহরণ গুম ও খুনের পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন তারাই জেনে না জেনে নিজদের আত্মঘাতি চিন্তার কারণে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার মারাত্মক বিপদ দাওয়াত দিয়ে ঘরে তুলেছেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। যে বিপদ ডেকে এনেছেন তাকে বিদায়ও দিতে পারছেন না। পারবেনও না।
অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্র মানেই সম্পত্তি বা সম্পত্তি-সম্পর্ক রক্ষার জন্য কাঙ্খিত কার্যকর ও সুপ্রিম প্রতিষ্ঠান। এখানে নাগরিক মানেই সম্পত্তির মালিক, সম্পত্তি আগলে বসে থাকা নাগরিক। এটা শুধু যে প্রচুর সম্পত্তির মালিক কেবল তার বেলায় নয়, যার এক কানি জমি বা ভিটেমাটি আছে এটা তার বেলায়ও সত্য। এমনকি যার কিছুই নাই, সেও সম্পত্তির মালিক। সেই শ্রম হচ্ছে তার শ্রম শক্তি। সেই শক্তি বাজারে বেচাকেনার অধিকার তার নিজের। তাকে দাসের মতো জোর করে কোথাও খাটানো যায় না। অর্থাৎ সেও কোন না কোন সম্পত্তি আগলে থাকা নাগরিক। আমরা বলি, রাষ্ট্রের দায়িত্ত্ব নাগরিকদের “জান ও মাল অথবা জানমাল” রক্ষা। অর্থাৎ কেবল জান বা জীবন সুরক্ষাই নিরাপত্তা নয়, একই সঙ্গে মাল বা সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথাও শুনি আমরা।
তাহলে রাষ্ট্র যদি কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী হয়ে বাকি সব ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিক অপহরণ গুম ও খুন জারি রাখে তাহলে সেই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র ও সরকার কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের “জান ও মাল” সুরক্ষা করবে, অন্যদের নয়, এটা হতে পারে না। অথচ এই নীতির ভিত্তিতেই হাসিনা সরকারের বিগত ছয় বছর বিশেষ করে শেষ তিন বছর চলছে। “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” অপহরণ গুম ও খুন চলছে নিরন্তর। যাদের কাছে মনে হয়েছে “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” এর রাজনীতি ও আদর্শ তার পছন্দসই নয় তারা এতে চুপ থেকেছে, খুশি হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে সমর্থন ও যুক্তি তুলেছে যে হাসিনার সরকারের কাজ হচ্ছে ভিন্ন মতাদর্শীদের নির্মূল করা। নাগরিকদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার নয় বরং রাজনৈতিক আদর্শ সবার আগে বিবেচনায় রেখে অপহরণ গুম ও খুন চালিয়ে যাওয়া। হাসিনা সরকারের সবল ও এখনও টিকে যাবার পিছনে এটাই প্রধান মতাদর্শগত ভিত্তি।

আসলেই কি হাসিনা “চেতনার” আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার বিলি করেছেন
নারায়ণগঞ্জের নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা নতুন এক উপাদান যুক্ত করেছে। “রাজনৈতিক আদর্শ” দিয়ে বিচার করলে নজরুল ইসলাম, তার সাথে খুন হওয়া আইনজীবি চন্দন সরকারসহ বাকি ছয় জন, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত অপর কাউন্সিলর নূর হোসেন, শামীম ওসমান এবং খোদ হাসিনা এদের সকলের একই “রাজনৈতিক আদর্শ” – সকলেই আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত। এমনকি র্যাদবের কমান্ডারসহ নারায়নগঞ্জ প্রশাসন সবাই একই “রাজনৈতিক আদর্শ” ধারণ করে কিম্বা তার পরোক্ষ সমর্থক। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এই নীতির ভিত্তিতেই তারা প্রশাসন পরিচালনা করেছে। এভাবেই এরা হাসিনার অপহরণ গুম ও খুনের রাজনীতিতে পরিচালিত হতে স্বচ্ছন্দবোধ করে গেছে।
তবে নারায়নগঞ্জের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে ঘটনা ভিন্ন ভাবে ঘটেছে। খুনাখুনি হয়েছে শেখ হাসিনার মতাদর্শের ব্যক্তিদের মধ্যে। এটা সুস্পষ্ট ভাবেই রাষ্ট্রের ভাঙ্গন ও সরকার পতনের লক্ষণ। কারন যে নীতির ভিত্তিতে প্রশাসন এতোদিন চলছিল, সেই নীতি প্রশাসনকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে, যা সরকারকেই এখন গ্রাস করতে উদ্যত। যারা ভেবেছিলেন জামাত-বিএনপি-হেফাজত এর রাজনৈতিক আদর্শ না করে আওয়ামি লীগের রাজনৈতিক আদর্শ করলেই জানমাল সুরক্ষিত ও নিশ্চিত থাকবে, হাসিনার সরকার তা নিশ্চিত করবে সেটা এখানে একেবারেই ঘটে নাই। যারা মারা গিয়েছেন তারা আওয়ামি লীগে নাম লিখিয়েও নিজের জানমাল রক্ষা করতে পারেনি। ওদিকে যারা হাসিনার এই দানব রাষ্ট্রের তান্ডব আচরণকে সরাসরি বা প্রচ্ছন্নে সমর্থন করে গেছেন, হয়ত ভেবেছেন তিনি রাজনৈতিক আদর্শ হিসাবে জামাত-বিএনপি-হেফাজত ধারণ করেন না ফলে তিনি সুরক্ষিত ও নিরাপদ তাদের এখন হঠাৎ মানবাধিকারের কথা মনে পড়েছে। তারা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করছেন। এরা শঙ্কিত যে নজরুল ইসলাম সহ সাতজন ‘অপর’ কেউ নয় আসলে ওটা তারা প্রত্যেকে, খোদ নিজেই। নজরুলের ভাগ্য সবারই আগামি ভাগ্য, অপেক্ষমান পরিণতি। ওটা নজরুল নয় নিজেরই খুড়ে রাখা আপন কবর। এই কবর তো দীর্ঘদিন ধরেই খুঁড়ছিলেন, তখন তাদের হুঁশ ছিলনা।
একই রাজনৈতিক আদর্শ আওয়ামি লীগে অন্তর্ভুক্ত থাকি আর নাই থাকি,- সম্পত্তি বা বিভিন্ন ধরণের স্বার্থ নিয়ে নিজের আপন ভাই, আত্মীয়, আপন বা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায় পার্টনার ইত্যাদিদের সাথে নানান স্বার্থ বিরোধ নিয়েই আমরা সমাজে থাকি। সমাজের মুখ্য প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অধীনে থাকি। কিন্তু এর মানে এই না যে স্বার্থ বিরোধের ফয়সালা আমরা নিজে অপরের উপর রুস্তমিতে করি বা কেউ আমার উপর করুক। রাষ্ট্র একছত্র রুস্তম হয়ে থাকবে, আর অভ্যন্তরে একে অন্যের উপর রুস্তমি করতে দিবে না এই শর্তে নাগরিক রাষ্ট্রের রুস্তমি মেনে নেয়। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ঘটনা প্রমাণ করেছে হাসিনার রাষ্ট্র এই শর্ত ভেঙ্গেছে। সে নূর হোসেনকে রুস্তমি করতে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, প্রশ্রয় দিয়েছে। প্রতিটা নাগরিক চায় রুস্তমি বলপ্রয়োগে খুনোখুনি প্রতিপক্ষকে নির্মুলের পথে না, স্বার্থবিরোধ ‘বিচার’ বা আইন কানুনের নিয়মে ফয়সালা হো্ক। নারায়নগঞ্জের ঘটনায় রাষ্ট্র শর্ত ভঙ্গ করায় সকলের মনে আশঙ্কা জাগিয়েছে যে হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আপন ভাই বা আপন দলের বিরোধী স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের হাতে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে যাওয়াটাও খুবই স্বাভাবিক। এককথায় রাষ্ট্র নাগরিক নির্বিশেষে জানমালের রক্ষক আর নয়। যে কোন সময় সরকার যে কোন গ্রুপকে সমর্থন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের জানমাল বিপন্ন করে ফেলতে পারে। এবং কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা সরকার আর্শিবাদ জানাবে তারও কোন দিশা নাই। এক্ষেত্রে নির্ণায়ক হচ্ছে কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপুর্ণ মনে করে। অর্থাৎ একমাত্র বিবেচনা হাসিনার নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে আমার সেই জেলার আইনজীবি বন্ধু যেভাবে বলছিলেন, কারও রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দসই লাগে কি না এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার জানমালের নিরাপত্তা দিবে এই ভিত্তিতেও হাসিনা তার দানব রাষ্ট্র সাজায় নি। হাসিনার কাছেও রাজনৈতিক আদর্শ গুরুত্বপুর্ণ কিছু নয়। আসলে তাঁর একমাত্র বিবেচনা নিজে দানব ক্ষমতায় টিকে থাকা।
নারায়নগঞ্জের ঘটনা কেন্দ্রিক গণক্ষোভকে আমি এভাবে ব্যাখ্যা করছি ঠিকই। কিন্তু গণমন নিয়ে আমার এই অনুমান কতটা সঠিক সত্য নাকি একেবারেই সাময়িক ও বিচ্ছিন্ন তা জানা যাবে এই ঘটনার শেষ হয় কি করে তা দেখতে পাবার পর। এটা হতেও পারে আশঙ্কিত নাগরিকেরা তাদের ক্ষোভ বিক্ষোভকে কোন পরিণতির দিকে নিতে অবিচল থাকলেন না; আর ব্যাপারটা একটা সাময়িক ক্ষোভ হিসাবে থেকেই চাপা পড়ে গেল। সেটা যাই হোক, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সেই কমিউনিষ্ট নেতা যেভাবে রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার জানমালের রক্ষার পক্ষে যুক্তি তুলে হাসিনার রাষ্টকে দানব হতে পুষ্ট করছিলেন তার সেই আকাঙ্খার অন্তত একটা পরিণতি হল এই সাত অপহরণ গুম ও খুন।
উপরের কথাগুলো বর্তমানের হাসিনার সরকারকে সামনে রেখে বলছি মানে এই নয় এটা কেবল আওয়ামি লীগ বা হাসিনার জন্য সত্য। অপহরণ গুম ও খুন কমবেশি স্বাধীনতার পর থেকেই সবসময়ই বজায় ছিল। কিন্তু এর মাত্রার ভিন্নতার দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। আজকে এই কথাগুলো আগামি যে কোন সরকার, বিএনপি অথবা জামাতের অথবা অন্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য এবং সত্য। এব্যাপারে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ সন্দেহ নাই। তথাকথিত রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণের রাষ্ট্র এটা যে কোন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বেলায়ই সমান বিপদজনক। আমাদের কি এই শিক্ষা যথেষ্ট হয়েছে? আগামির ভরসায়!