বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

গৌতম দাস

২২ মে ২০১৭, ০০ঃ ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2fz

প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান,  বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত” ব্যক্তি কিনা সেই সন্দেহ রেখেছেন। ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’! কী দুর্দান্ত ভাষা! আর সেই বিশেষ ‘অনুভুতি’ মাপার ডাক্তার হয়েছেন মিজান। বাহ! বাহ! এটা কি রাজনীতি পর্যালোচনার ভাষা  নাকি যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা জাতীয় মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ? অথবা ‘ব্যাটলিং বেগামস’ এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে প্রথম-আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপের এক এগারোর রাজনীতির নতুন ড্রিল? গত ১১ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো মিজানুর রহমান খানের ‘জিয়া-যাদু গোপন চুক্তিটি কি প্রকাশ করবেন খালেদা জিয়া?’ লেখাটি প্রকাশ করে। শিরোনামের স্টাইল খেয়াল করলেই সন্দেহ জাগে এর মতলব ভালো না। যাদু মিয়ার সঙ্গে জিয়াউর রহমান নাকি একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন । আর এখন ১০ মেবুধবার খালেদা জিয়া তাঁর ভিশান ২০৩০ পেশ করবার পরপরই দৈনিক প্রথম আলোর একটাই বিশাল রহস্যমিশ্রিত আবদার, সেই ‘গোপন’ চুক্তি খালেদা জিয়া প্রকাশ করুক!

বিএনপি এবং ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির যেকোন সমালোচনা পর্যালোচনা হতেই পারে। কিন্তু বলুন তো খালেদা জিয়ার মধ্যে  গণতন্ত্র মনস্ক অনুভূতিসম্পন্ন “উপলব্ধি” আছে কিনা সেটা বিচার করবার ডাক্তার কোথায় পাবেন? দ্বিতীয়ত একটি দেশ বা সমাজের রাজনীতি স্রেফ একজন ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না। যে সকল রাজনৈতিক বর্গ কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠি নিজ নিজ ক্ষমতা  এবং নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক সম্মতি তৈয়ার করে তার সঙ্গে সেই বর্গটি সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন বয়ানের ভূমিকা থাকে। থাকবেই। সেই ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কে  যে সকল বয়ান সমাজে হাজির এবং সেই সকল বয়ান কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক সমালোচনা পর্যালোচনা ছাড়া জাতীয় রাজনীতির কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। তার মধ্য দিয়েই জনগণের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটে। এই গোড়ার কথা যখন আমরা মনে রাখি না, তখন হলুদ সংবাদ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার সমাধান হিসাবে ‘মাই নাস টু’ ফর্মুলা তৈয়ার এবং তা কার্যকর করবার কাজে অনায়াসেই লেগে পড়তে পারে। গত এক-এগারোর সময় এটাই আমরা দেখেছি। “মাইনাস টু” রাজনীতির মূল তত্ত্ব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য দুইজন “ব্যাটলিং বেগাম” – অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়ী। অতএব করণীয় হচ্ছে এদের দুইজনকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ পাঠক আপনার নিজের মতো করে বুঝে নিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য যখন আমাদের বিচারের মানদণ্ড খালেদা কিম্বা শেখ হাসিনার ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত উপলব্ধি’ থাকা না থাকার বিচার হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা মূলত মাইনাস টুর তত্ত্বই আর এক ভাবে আওড়াই। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্ট ভাবে খালেদা জিয়া সম্পর্কে এই বোম্বাস্টিক বিশেষণ প্রয়োগের চেষ্টা দেখে আন্দাজ করা যায়  এবার মাইনাস-টু না সম্ভবত মাইনাস ওয়ান এটা।

যাক্‌,  তবুও বাংলাদেশে তাহলে ‘গণতন্ত্রমনস্ক’ এবং গণতন্ত্রের ‘অনুভূতি প্রসূত উপলব্ধি্র’ ধারক মহানুভব   একজন ব্যক্তি পাওয়া গিয়েছে।  বিএনপি একটা ভাল দল কীনা, ওর রাজনীতি ভাল কীনা এমন কিছু প্রমাণ মিজানুর রহমান খান করবেন আমরা তা আশা করি না। যদিও পর্যালোচনায় ভালমন্দ উভয় দিকটাই তুলে ধারা্র কথা। মুল্যায়নে বসলে বিএনপির একগাদা ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা অনেকেই খুজে পেতেই পারেন। তবে মিজানুর রহমান খান  ব্যক্তিগতভাবে একজন বাকশাল-প্রেমি ও ‘বাঙালী জাতীবাদ”-প্রেমিও তিনি বটে। যদিও তাতেও আমাদের সমস্যা নাই।   কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন চরম প্রিজুডিস বা নিজের বাকশালপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবাদকে পাশে সরিয়ে না রেখে উলটা তা দিয়েই  রাজনীতির মুল্যায়ন করতে বসেন। সেটা দৈনিক প্রথম আলোর মতো তথিকথিত সাংবাদিকতার আড়ালে মূলত ‘বাকশালী’ অপপ্রচারের অধিক কিছু হয়ে ওঠে না।

কোন রাজনীতি বা রাষ্ট্রের ভালমন্দ বিচার করবেন কী দিয়ে? সে বিচার কাজে ক্রুশিয়াল বৈশিষ্টগুলো কী কী ?  সেগুলো জেনে রাখার বদলে নিজের বাকশালপ্রীতির উপর ভরসা করে বিচারে বসলে তাতে সেটা ঘোরতর অন্ধ দলবাজীই হবে। প্রথম আলোতে প্রকাশ্যে ঘোষিত মিজানসহ তিনজন বাকশাল সমর্থককে এডিটর আমরা দেখে থাকি।  বিশেষ করে মিজানের লেখায়, যেমন আলোচ্য এই কলামের শিরোনাম পড়ে যেকারও মনে হবে পাপীতাপী বিএনপির বিরাট এক গোপন দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসে মিজান কথা বলছেন। তাই কী? আসেন তাহলে দেখা যাক!

বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীলরা’ কেউ কোনদিন শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর কোন রিভিউ, সমালোচনা করেছেন জানা যায় না। তবু অনেকের মনে পড়বে হয়ত, একদলীয় শাসন অথবা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ইত্যাদির কথা। কিন্তু এগুলো সেই সংশোধনী কার্যকর করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের যে  বৈশিষ্ট্যগত  ত্রুটি ঘটেছে তার আসল বিচার নয়। অর্থাৎ কনষ্টিটিউশানাল বা রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা নয়। অথচ মিজানুর রহমান খান অনবরত নিজেকে মহা সংবিধান বিশারদ জ্ঞান করে আমাদের আলোকিত করে থাকেন!

গঠন প্রক্রিয়া কিম্বা বৈশিষ্ট্য কোন দিক থেকেই বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদর্শ মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। সেটা ইতিহাসের ফলাফল, আমরা তা মেনে নিয়ে যতটুকু পেয়েছিলাম তাই নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। সেই ক্ষেত্রে তার যতটুকু ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য আছে তা অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু বাকশাল সংশোধনীর ফলে এরপরের বাংলাদেশ আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় বরং এক  দানব বা স্বৈরশাসন আনয়নকারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন বদলানোর ফলে সেই দানবীয় চরিত্র  কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে খুব কমই পর্যালোচনা দেখা যায়।  তবু বাকশালী মিজানুর রহমান খানের একটা সহজ ফর্মুলা হল অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিয়াউর রহমানকে গালি গালাজ করা। বাকশাল সম্পর্কে টুঁ শব্দ না করে সারাক্ষণ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গালমন্দ পাড়া। সব সমস্যার কারণ হিসাবে সামরিক শাসনকে দেখানো। সামরিক  শাসন সামরিকতন্ত্র খারাপ, অবশ্যই। কিন্তু বাকশালকে মহৎ প্রমাণ  করবার সুবিধা না পেয়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কতো খারাপ ছিলেন সেটা প্রমাণ করে বাকশালের মহিমা গোপনে জারি রাখাই বাংলাদেশের নব্য বাকশালিদের কাজ। মিজানুর রহমানকে তাদের সর্দার বলা যায়। সেটা বাকশালিদের পক্ষে সহজ হয়েছে কারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বুদ্ধিজ্ঞানহীন বোকাদের দল, যারা নব্য বাকশালিদের রাজনীতি মোকাবিলা করবার ন্যূনতম হিম্মত রাখে না।

মিজান তাঁর লিখায় নিজেকে বারবার   রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক ক্ষমতা পুঞ্জীভুত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব হিসাবে তুলে ধরেন।  কিন্তু আজীব ব্যাপার হল, আমাদের সংবিধানে সর্বপ্রথম যে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে প্রায় সব ধরণের ক্ষমতা সঞ্চিত করা হয়েছিল সেটা বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী। তা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে মিজানুরের কলম জাগে না। বরং তিনি কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বলে এক রহস্য তৈরি করতে গিয়েছেন, ১১ মে এর ঐ কলামে। কথিত সেই গোপন চুক্তি নাকি অপ্রকাশিত, মিজান জানাচ্ছেন। কিন্তু অপ্রকাশিত হলেও মিজানুর আবার এর পুরাটা জানেন ও এবং সেটা তার আবার মুখস্থ। তাঁর কথিত মতে, শেখ মুজিবের বাকশালী সংশোধনীতে প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীন যে একক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন, জিয়া নাকি এরচেয়েও আরও ক্ষমতা চেয়েছিলেন। যদিও মিজান নিজেই জানাচ্ছেন জিয়া শেষে এমন ক্ষমতা নেনই নাই। সেই না নেওয়ার দলিলই হল মিজান কথিত যাদু মিয়ার সাথে ‘গোপন চুক্তি’। তাহলে  সেক্ষেত্রে কথিত সেই দলিল বলে যদি কিছু আদৌ থেকেও থাকে তবে তা  বিএনপি বা জিয়ার কোন কলঙ্কের দলিল হয় কেমন করে? কিন্তু তবু মিজানুর রহমান খানের দাবি কথিত ঐ গোপন দলিল ‘কলঙ্কিত’ এবং তা “খালেদা জিয়াকেই প্রকাশ করতে হবে”।

মিজানুরের চরম বিনোদনমূলক তামাসাটা হল, তিনিই বলছেন ঐ গোপন দলিল আসলে জিয়াউর রহমানের বাড়তি ক্ষমতা না নেওয়ার দলিল বা রাজনীতিবিদ যাদু মিয়ার সাথে  “সন্ধি-পত্র”  – অথচ এই কথিত চুক্তি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি  আর জিয়া এবং  বিএনপিকে ‘পাপীতাপী’ ‘অভিশপ্ত’ বলে ইঙ্গিত তৈরি করছেন তিনি। এই সুযোগ মিজানুর কোথায় পাচ্ছেন? বরং মিজানুর যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক সীমাহীন ক্ষমতা সঞ্চিত করার বিরুদ্ধের সোচ্চার প্রবক্তা হতে চান তবে সেক্ষেত্রে শেখ মুজিবের এবং বাকশাল সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা দিয়েই তাকে শুরু করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি তার প্রগতিশীলতা-বোধ, বাঙালী জাতিয়তাবোধ কিংবা বাকশালপ্রীতি বাধা হয়ে দাড়ায় তবে তা তাকেই পেরিয়ে আসতে হবে। এপর্যন্ত যা তিনি কখনও পেরেছেন আমরা দেখিনি।

এই প্রসঙ্গে বলে নেয়া যায় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস বিচারে – বিশেষত কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী কী কী কারণে কালোদাগের এবং ক্ষতিকর এমন কোন একাদেমিক মুল্যায়ন আমরা ‘প্রগতিশীলদের’ ঘর থেকে বের হয়েছে দেখি নাই। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসরেও এবিষয়ে আর যা দেখা যায় সেগুলোকে বড়জোর পার্টিজান বা দলকানাদের সমালোচনা। এই অবস্থায় বাকশালের আসল মুল্যায়ন হল – এককথায় বললে – এই সংশোধনী্র মধ্য দিয়ে আসলে বাংলাদেশ  রাষ্ট্রের খোদ কনষ্টিটিউশনকেই নাই করে দেয়া হয়েছে।  সোজা কথায় ভাঙাচোরা হোক বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে একটা রাষ্ট্র বানানো গঠন হয়েছিল, আর সেটাকেই বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী পুরাটাই ভেঙ্গে দিয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী এই অর্থে রাষ্ট্র নিরাকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যে অভিজ্ঞতা থেকে বারবার আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র নাই অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়ার দলিল এটা।

কেন? এর মূল কারণ এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রের  নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের আদালতে  রিট করার ক্ষমতা [আর্টিকেল ৪৪] কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই না, জুডিশিয়ারির বা আদালতের রিট শোনার যে আলাদা নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া ছিল [আর্টিকেল ১০২ (১)] সেটাও চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। [চতুর্থ সংশোধনীর পিডিএফ কপিতে এখানে দেখুন, সংশোধনীর ইংরাজী অংশে প্রথম পাতায় ৩ নম্বর সংশোধনী আর ১৭ নম্বর সংশোধনী দেখুন হলুদ মার্কার দেয়া আছে।।] আর প্রেসিডেণ্ট জিয়ার সামরিক অধ্যেদেশ বলেই, আবার বলছি ১৯৭৬ সালের সামরিক অধ্যাদেশ বলেই  ঐ বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া [আর্টিকেল ৪৪] এবং [আর্টিকেল ১০২ (১)]  ফেরত নিয়ে আসেন। একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ এবং কথাগুলো সবচেয়ে সহজে স্পষ্ট বুঝা যায় কনষ্টুটিটিশনের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের আপিল কোর্টের রায়ে। ঐ রায় ১৮৪ পৃষ্টার। ঐ রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল বলে জানানো হলেও একই সাথে পঞ্চম সংশোধনীর যেসব অংশ বাতিল হবে না, বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জীবিত থাকবে সেসবের একটা তালিকা দেয়া আছে ওর ১৮৩ পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা আছে জিয়ার আনা সংশোধনীর কথা। [দেখুন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়, আপিল কোর্ট জাজমেন্ট ২০১০,  ১৮৩ পৃষ্ঠায় 3e এর (iii, iv & v)]    শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর ফলে এভাবেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতার দানব বানিয়েছিল, এর বিরুদ্ধে আদালতে কোন প্রতিকার চাইবার সুযোগ ছিল না। ফলে বাংলাদেশ  আর কোন প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে নাই। যে রাষ্ট্রে রিট করার সুযোগ নাই, সেটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না। এই দিকটা নিয়ে কোন জজ-উকিল বা কোন রাজনীতিবিদকে আমরা পয়েন্ট তুলতে শুনি নাই। এটাও এখন প্রমাণিত যে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনষ্টিটিউশনের ভাল-মন্দ বিচার কী করে করব, কী করে এটা কাজ করে তা বুঝার ক্ষেত্রেও আমরা এখনও যথেষ্ট লায়েক হই নাই। এখনও কেবল দলবাজি আর প্রগতিশীলতার ভাণ ও ভণ্ডামির মধ্যে আটকে আছি। অথচ আমরা আবার আওয়ামি লীগ বা বিএনপির এবং রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট বুঝার বিচারক হতে চাচ্ছি।

‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা
মিজানুর রহমান খানের আর এক প্রবল পছন্দের বয়ান হল ‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার’ তুলনা। এটাতে  তাঁর চিন্তা করার কাঠামোটাও ধরা পরে। অবশ্য এটা তাঁর একার না, বাকশালের পক্ষে সাফাই যারাই দেন তাদের সাধারণ বয়ান এটা। মিজান সে বয়ান পরিপাটি করেন মাত্র। এই বয়ান দিয়ে তিনি বলতে চান বাকশাল দানব ক্ষমতার রাষ্ট্র তৈরি করলেও যেহেতু এটা বেসামরিক শাসন, আর বেসামরিক শাসন মানেই বৈধ শাসন, তাই দানব বাকশাল হলেও এটা বৈধ, ফলে গ্রহণীয়। আর তাই বিপরীত যুক্তিতে সামরিক শাসন অবৈধ। দারুন বাকশালী যুক্তি। বিএপির বিরুদ্ধে এটাই  প্রধান বাকশালী অস্ত্র, কিন্তু বিএনপির সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা এই বাকশালী কৌশলের মর্ম ধরতে পারে না বলে এর কোন উত্তর দেবার হিম্মত দেখাতে পারে না।

আসলে এভাবে বৈধ-অবৈধ এর ভাগাভাগির লাইন টানা – এটা নগ্ন  শঠতা। মিজান বলতে চান বাকশাল সংশোধনীর ভিতরে যত খারাপ কিছুই থাক তবু এটা বৈধ কারণ তা সিভিলিয়ান ক্ষমতা। এটাই শঠতা। উপরে দেখিয়েছি, কনষ্টিটিউশনে চতুর্থ সংশোধনী এনে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে চাইলে কোন নাগরিকের আইনিভাবে আদালতে নালিশ জানাতে যাবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে এরপরের বাংলাদেশ, এটা দেখতে তখনও একই দেশ বা আধুনিক রাষ্ট্র মনে হলেও কার্যত এটা আর তখন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। এটা আসলে নির্বাহী প্রেসিডেন্ট – নামে “এক সম্রাটের  প্রি-রিপাবলিক বাংলাদেশ” হয়ে গেছিল। আমি নিশ্চিত মিজানসহ কোন ‘প্রগতিশীল’, ‘বাঙালী জাতিবাদীর” চিন্তায় এটা ধরা পড়বে না। এভাবে তারা চিন্তা করে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এমনকি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও নয়। বেসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন মানেই মন্দ গল্প তারা বাকশালিদের কাছ থেকে ভালোই হজম করে। হয়তো নীরবে মেনেও নেয়।  চতুর্থ সংশোধনী যেখানে রাষ্ট্রের রিপাবলিক বৈশিষ্টই নষ্ট করে দেয় এরপর সেই বাকশালী রাষ্ট্রটা বৈধ নাকি অবৈধ –  সামরিক নাকি বেসামরিক – সেটা  কী আর কোন তর্ক? কিন্তু মিজান মার্কা এই বাকশালী মিথ্যা আর চাতুর্য প্রপাগান্ডার তোড়ে বিএনপিই  ঘায়েল হয়ে গিয়েছে। কারণ রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য সুরক্ষা বিএনপির রাজনীতি নয়। এর ফলে তারা জিয়াউর রহমানকেও স্রেফ একজন সামরিক শাসকের বেশী বুঝতে অক্ষম। অথচ বাকশালী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব আসলে আমাদেরই এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতায়, “পোস্ট-বাকশাল পরিস্থিতিতে আবার ট্রাকে উঠার উদ্যোগ” এটা বোঝার ক্ষমতা বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নাই।

এমনিতেই বৈধ-অবৈধের তর্ক আর এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ বিষয়কে বুঝার চেষ্টা একটা খুবই নাবালকের কাজ। মনে রাখতে হবে একটা কালাকানুন বা কালো আইন – চরম দমনমূলক ও নিপীড়ন আইন হলেও সেটা বিদ্যমান সংবিধানের কারণে  ‘বৈধ’ আইন হতে পারে; কোন অসুবিধা ছাড়াই।  তাই, এই বৈধ-অবৈধ জাতীয় শঠ প্রশ্ন তুলে বাকশালের কুকীর্তি আড়াল করে বলেই মিজানুর রহমান খানকে বাকশালের দলবাজ সমর্থক বলছি।

আবার বিপরীতে সেসময়ের জিয়ার সামরিক ক্ষমতা সেটাও সামরিক নাকি বেসামরিক সেবিচারে যাওয়াও একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কারণ সেটা যাই হোক না কেন সেসময়ের ঐ ক্ষমতাটা ছিল এক অন্তর্বর্তী ধরণের ক্ষমতা মাত্র। এটাই ঐ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্ট। আর ওর ভাল মন্দ নির্ধারিত হবে নতুন যে ক্ষমতা কাঠামো সে তৈরি করবে বা হবে ওর গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। তাতে যারা নির্বাচিত হয়ে নতুন ক্ষমতায় আসবেন সেসব অনেক কিছুর গ্রহনযোগ্যতার উপরে। আর প্রি-কনষ্টিটিউশনাল সরকার মাত্রই অন্তর্বর্তী সরকার। বাকশাল করে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা এবং  শেখ মুজিব খুন হবার পর যা আমরা পেয়েছি তাতে সেটা আবার একটা প্রজাতান্ত্রিক কনষ্টিটিউশনের ফিরে যাবার আগের অন্তবর্তী অবস্থা।

তবু মিজানুরের মনে হতে পারে যে না, “ক্যান্টনমেন্টে বসে” যারা দল বানালো তাদেরকে হাতে নাতে ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যায় না। ওকে নো প্রবলেম, আসুন মিজান তাহলে এবার আপনারই বিচার করি। ১/১১ এর সরকার কী সামরিক সরকার ছিল না? আর এই সামরিক সরকারের সাথে খোদ আপনি মিজান আর আপনার বস  মতি-মাহফুজদের  সম্পর্ক কী ছিল তা  নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নিবেন? আপনি মিজান কী তখন সে কালের “ক্যান্টনমেন্টে বসে” রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কারের নামে মহৎ কাজে  লিপ্ত হন নাই? ঐ কাজ আর ঐ সামরিক সরকার কী “বৈধ” হয়ে গেছিল আপনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে?   আরও ভিতরে যাবেন?  আসেন!
১/১১ এর ক্ষমতায় ইচ্ছামত যা মনে চায় করে যে রাজনৈতিক সংস্কার আপনারা করেছিলেন – কী তার পরিণতি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও এর কাঠামো এমন কিছু অথবা কী ছাপ আপনারা রেখে গেছিলেন যার সুফল এই আট বছরের হাসিনা সরকারের থেকে আমরা পাচ্ছি? বলেন, কোনটা  আপনাদের অবদান? কোন সে সুফল? আপনাদের সংস্কারের ফসল কী খোদ হাসিনার শাসনটাই নয়? নিঃসন্দেহে এখন কোন দায়ই নিতে চাইবেন না, আপনি। আমরা জানি। কিন্তু ইতিহাস সবাইকে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। আপনারাও ব্যতিক্রম নন।

কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ
মিজান আর এক বিরাট অভিযোগ করেছেন প্রায়ই করেন, “সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, যা পার্লামেন্টকে একটি রাবার স্ট্যাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেত্রীর বশংবদ করে রেখেছে,সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি”।  তিনি এটা প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আর এর রাজনৈতিক নেতাদের গায়ে কালি লাগায় দিবার জন্য করে থাকেন।  তো মিজানের এই কথা পড়লে সকলেরই মনে হবে হা, তাই তো!  মিজান এই মোক্ষম জায়গায় ধরেছেন। হা, অবশ্যই এক মোক্ষম জায়গা। কিন্তু মিজান কাকে ধরেছেন? খালেদা জিয়া? নাকি এখানে অনুল্লেখ থাকা শেখ হাসিনাকে? মোটেও না। মিজান আসলে ধরেছে নিজেকেই।  বাইরের মানুষ – হাসিনা, খালেদাকে দোষারোপের আগে মিজান আপনি নিজেকে কাঠগড়ায় তুলার হিম্মত দেখান। পারবে্ন?
যতদিন মিজানুরসহ মতি-মাহফুজের মিডিয়া গ্রুপের মত লোকের সক্রিয় সমর্থনে, ১/১১ ঘটবার সম্ভাবনা আর বিশেষ করে বিদেশী স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব গ্রুপের লোকেদেরকে ব্যবহারে ভাড়া খাটা মিজানুর রহমান খানেরা লুপ্ত না হবেন ততদিন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ থাকতে থাকবে। কারণ এই ৭০ অনুচ্ছেদই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। মিজানদের মত লোকেদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। আমরা বরং  মিজানের এসব স্বীকার করার সৎসাহস দেখতে চাইতে পারি। হাসিনা খালেদারা খারাপ রাজনীতির ধারক বাহক, এটা কে না জানে, এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এখান থেকে বের হতে, তা পরিস্কার করতে, পালটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া লাগবে। বিদেশী স্বার্থে সংস্কারের নামে পরাশক্তির  স্বার্থরক্ষা নয়। এই স্বার্থ রক্ষার্থে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কলঙ্কের দাগ দেখিয়ে নয়।

মিজান আরও অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রও দলের প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আছে, আর সেজন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন। ফলে এরও সংস্কার দাবি করেছেন তিনি। মিজান নিশ্চয় ভুলে যান নাই – মান্নান ভুঁইয়াকে দিয়ে কীভাবে বাধ্য করে সংস্কার ধারার বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বেচারা দেলোয়ার হোসেনকে  কিভাবে ছেঁচা  দেয়া হয়েছিল, এর কষ্ট মৃত দেলোয়ার হোসেনই জানতেন। তবু তার গৌরব, তিনি পতাকা ছাড়েন নাই। শামসুল হুদার ভুঁইফোড়  নির্বাচন কমিশন কোনটা “আসল বিএনপি” সেই রায় দিয়েছিল। আর পরে তিনি নিজেই তার এই কাজ অন্যায় হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।  এটা যেন আমরা কেউ না ভুলি। তাহলে দাঁড়াল এই যতদিন বিদেশী স্বার্থে আপনি মিজান ও আপনাদের পত্রিকা  বাইরে থেকে ইচ্ছামত কোনটা বৈধ দল, কোনটা বিএনপি ঠিক করতে থাকবেন, সে সম্ভাবনা থাকবে, ততদিন হাসিনা-খালেদা কনস্টিটিউশানে ৭০ অনুচ্ছেদ রাখবে এবং অবশ্যই রাখবেন। ‘গণতন্ত্র’ শিখাতে আসবেন না। মনে রাখবেন, হাসিনা বা খালেদা সেসব কম বুঝে না। তাঁরা দলের সব ক্ষমতা সভাপতি হিসাবে অবশ্যই নিজের হাতেই রাখবেন। কোনটা আওয়ামী লীগ আর কোনটা বিএনপি এটা যদি বিদেশীরা নির্ধারণ করতে থাকে তবে এমন ব্যবস্থা ও সুযোগ যতদিন থাকবে ততদিন এই শকুনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে  হাসিনা-খালেদার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদের পক্ষে থাকা এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থান। দুনিয়ার হুঁশজ্ঞান ওয়ালা মানুষ মাত্রই এটাই করবে।  তাই বাইরে  অন্যদের দিকে না, সৎসাহসে নিজের দিকে তাকান। নিজেকেই কাঠগড়ায় দেখতে পাবেন।

অতএব, কনষ্টিটুশনে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার জন্য আপনারা মিজানেরাই মূলত দায়ী। নিজেরা যা করেছিলেন এর রিভিউ করেন, আবেদন করি ভাল হয়ে যান আগে। এরপর ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি তুলেন।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গতকাল ২১ মে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা খুবই সংক্ষিপ্ত ভার্সান; চল্লিশ ভাগ ফেলে ষাট ভাগ ছাপা ভার্সান বলা যায়। এছাড়া  অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও আর এক ভার্সান ছাপা হয়েছে আজ ২২ মে ২০১৭, তাতে অনেকাংশেই পুর্ণ ভার্সান সেটা। কিন্তু তবু ফুল ভার্সান নয়। এখানে আরও বহু সংযোজন ও এডিটের পর সর্বশেষ ভার্সান এটাই।  ]

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

গৌতম দাস
০২ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৫

http://wp.me/p1sCvy-2f6

কাশেম বিন আবুবাকার নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে মিডিয়ায় মানে, টিভি টকশো, নিউজ, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সোস্যাল মিডিয়া সবখানেই তোলপাড় চলছিল; এক বহুল উচ্চারিত নাম তিনি। তাও শুধু দেশে নয়, প্যারিসভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপির কল্যাণে কাশেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে তাদের করা নিউজটা যেসব দেশের স্থানীয় মিডিয়া প্রকাশ করেছে সেসব দেশেও কাশেম বিন আবুবাকারের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কী সে খবর? আবুবাকারের কী খবর? এখানে একটু দম ধরে থামতে হবে।
কয়েক বাক্যে মুল খবর হল, বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক কাশেম বিন আবুবাকার ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখেন। শ’খানেক উপন্যাস লিখেছেন। আধুনিক জগতে অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে যে মডার্নিটি বা আধুনিকতাকে শুধু গ্রহণ না করে নয়, রীতিমতো আলিঙ্গন না করে কোন উপন্যাস লেখা সম্ভব কিনা। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে বিচার করলে মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, মডার্নিটিকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরালে ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখা কি সম্ভব? বিশেষ করে যখন ইউরোপের আধুনিকতার যেসব ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধ বা সে মরালিটির ওপর ভর করে সাহিত্য উপন্যাস লেখা ও চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে বহু আগেই এবং এর প্রভাবে দুনিয়াতে প্রায় সব শহরে প্রবল প্রভাব ছেয়ে গেছে! দুনিয়াতে নানা জায়গায় এর প্রভাব পড়েছে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শাসক সূত্রে; তাদের আধুনিকতা ও এনলাইটেনমেন্টের চিন্তা ও তৎপরতার প্রভাবে আমাদের মতো দেশে এরই প্রভাবিত ধারা ও এর চর্চা গড়ে উঠেছে। আর সেটাই প্রধান ধারা হওয়ার দাবিতে নিজের আসন পোক্ত করে নিয়েছে! এরপরে আর কি ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস বা ফিকশন সম্ভব নয়? [উপরের কথাগুলো লিখেছি এটা ধরে নিয়ে যে আধুনিকতার ভিত্তিগিত ধারণা ও এর উপর দাঁড়ানো মুল্যবোধ আর ইসলামি মুল্যবোধে বড় ফারাক আছে। যদিও সে ফারাক কী, কোথায় সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাই নাই।]

আধুনিকতার এমন বাস্তবতাতেও কাশেম বিন আবুবাকার হলেন সেই লোক যিনি আধুনিকতার ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধের বাইরে সমান্তরালে (যদিও ক্রিটিক্যালি বললে আধুনিকতার  প্রভাবের বাইরে থাকা একালে কারো পক্ষেই আর সম্ভব নয়, ফলে তিনিও পুরোপুরি বা ঠিক বাইরে নন) ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন। নয়া ধারা সৃষ্টি করেছেন। এর চেয়েও বড় কথা তার উপন্যাস আবার যে সে উপন্যাস নয়, তাঁর একেবারে ৮৫ শতাংশ লেখা মূলত রোমান্টিক উপন্যাস। আধুনিক চিন্তায় লেখা উপন্যাসের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা খেয়াল রেখে বললে, আবুবাকার অবশ্যই মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। মনে হতে পারে অনেকেই তো অনেক কিছু লেখেন, লিখেছেন, কিন্তু তা হয়তো শেষে ঠাঁই পায় বালিশের তলায়, আবুবাকারকে কী এই অর্থে রোমান্টিক উপন্যাস লেখক বলা হচ্ছে? না অবশ্যই না, একেবারেই না। তবে উপন্যাসের সাহিত্য-মূল্য বিচার, এটা সেকুলার মডার্ন জগতেও যথেষ্ট জটিল, থিতু বা সেটেলড্ নয়। ফলে সে দিকটা এখানে উহ্য রেখেও বলা যায় – তার লেখার পাঠক আছে কিনা, সে পাঠকেরা ব্যাপক কিনা, সে পাঠকেরা আবুবাকারের উপন্যাসের সাথে নিজেকে সম্পর্কিত, যেন নিজেরই জীবনের ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখছেন বলে মনে করেন কিনা, এই বিচারে বলা যায় আবুবাকার একজন সফল ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর পাঠকপ্রিয় এবং প্রধান ধারার নাম কামানো ঔপন্যাসিকদের চেয়েও তার পাঠক সংখ্যা বেশি। তবে স্বভাবতই তার পাঠকরা ভিন্ন ক্যাটাগরির যাদেরকে ভিন্ন অর্থনৈতিক ভিত্তি, সামাজিক মর্যাদার স্তর ভিত্তি, মূল্যবোধের ভিত্তি ইত্যাদি অনেক কিছু দিয়েই আলাদা করা সম্ভব। আবার যারা প্রধান ধারার পাঠক সেই ক্যাটাগরিরও কিছু অংশ তারও পাঠক। এই বিচারে এক কথায় বলা যায়, আবুবাকার প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিক। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আর, ২০১১ সালের খবর হলো সেটা ছিল ত্রিশতম সংস্করণ প্রকাশিত। যদিও টিভি সাক্ষাতকারে  তিনি বলেছেন এটা আরও বেশি হতে পারে। কারণ রয়েলিটি না দেওয়ার জন্য প্রকাশকেরা অনেক সংস্করণের খবর প্রিন্টে উল্লেখ করে না।  আর তাঁর দেয়া ধারণা মতে, প্রতি সংস্করণ বই প্রকাশ সংখ্যা ৩০০০-এর কম নয়।

একথা ঠিক যে মিডিয়া তাকে নিয়ে তোলপাড় করছে। কিন্তু যতগুলো মিডিয়া আলোচনা ও মন্তব্য শোনা, জানা বা কাউকে করতে দেখা গিয়েছে তাতে খুবই নগণ্য সংখ্যক (প্রায় কেউ নয়) দাবি করেছেন যে, তিনি আবুবাকারের কোনো উপন্যাস পড়েছেন। মূল কথা হল, মিডিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে যে আবুবাকার তাঁর উপন্যাস পাঠক জগতে এত বিখ্যাত অথচ মিডিয়া সেটা জানে না কেন? ফলে খোদ মিডিয়া এবং সেকুলার পাঠক পেরেসান হয়ে গেছে যে তাদের কালচারাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাদের প্রভাবকে তুচ্ছ করে ইতোমধ্যেই গজিয়ে যাওয়া হাজির কাশেম বিন আবুবাকার ফেনোমেনাকে তারা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন।  উপায়ন্ত না পেয়ে তারা  তাঁকে নিচা দেখানো বা খাটো তুচ্ছ করে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। যেমন তাদের ট্যাগ হল, তিনি “চটুল” লেখক, তিনি “ইসলামি যৌনতার” লেখক ইত্যাদি। আর সব তর্ক-বিতর্ক আলোচনা চলছে এসব মিথ্যা ভিত্তিহীন ট্যাগের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাদের কালি লাগানোর সব প্রচেষ্টা ঢলে পড়েছে। এর মূল কারণ এরা সবাই স্বীকার যে তারা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই। এছাড়া আরও বড় প্রশ্ন আছে, উপন্যাস পড়া এক জিনিষ আর উপন্যাসের মুল্যায়ন-সক্ষমতা কী সবার আছে? সাহিত্যের ভিতর থেকে প্রকাশিত সামাজিক মন, সমাজতত্ত্ব বের করে আনা, দেখতে পাওয়া, ট্রেন্ড ব্যাখ্যা  করা কিংবা লিখায় লেখকের লিখাকালীন সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব কী কতটুকু – এসব কিছু যথেষ্ট সিরিয়াস ও পেশাদারি কাজ – এসব কাজ আমপাঠকের কাজ নয়। অতএব, এক কথায় বললে প্রায় প্রত্যেকেই নিজের অযোগ্যতা বা মনের ক্ষোভ মিটাতে ইচ্ছামতন মন্তব্য করছেন ট্যাগ লাগাচ্ছেন। কিন্তু কঠিন সত্যি হল, প্রথমত এরা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই।  কোন উপন্যাসে এটা আছে এমন কোন রেফারেন্স উল্লেখ করে কেউ অভিযোগ করছেন না।  ৭১ টিভি টকশোতে এঙকর শুরুতেই খোদ আবুবাকারের সাথে কথা বলতে গিয়ে অবলীলায় এক বিশেষণ লাগিয়ে কথা বলছেন, “আপনার চটুল উপন্যাস”। আবুবাকার পাল্টা যখন জিজ্ঞাসা করলেন “চটুল উপন্যাস বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন” এঙকর তখন আর তার ব্যবহৃত বিশেষণ এর পক্ষে কোন সাফাই পেশ করতে পারলেন না, চুপচাপ এড়িয়ে গেলেন। বলা বাহুল্য ঐ টকশোতে প্যানেলিস্ট কেউ ছিলেন না যে আবুবাকারের কোন উপন্যাস পাঠ করেছেন।

দৈনিক বাংলা ট্রিবিউন ২৭ এপ্রিল এক সাক্ষাতকার নিয়েছে। সেখানে, “আপনি কেন পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন, এ প্রশ্নের জবাবে আবুবাকার বলছেন,   “আমি মানুষকে মানুষ করতে চেয়েছি লেখার মধ্য দিয়ে। মুসলমান হয়ে চরিত্রহীন হলে চলবে না। আল্লাহর কথা মতো যারা চলে না, তারা তো মুসলমান না। আমি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে চেয়েছি বলে আমি জনপ্রিয়”। কিন্তু প্রশ্নকর্তা এবার জানতে চান “ইসলামি উপন্যাস” ইসলাম অনুমোদন করে কি না। অর্থাত প্রশ্নকর্তা নিজেই আবুবাকারের উপন্যাসেকে “ইসলামি উপন্যাস” লেবাস বা নামকরণ দিয়ে দিলেন।  এর বিপদ বুঝতে পেরে আবুবাকার পরিস্কার করে দিলেন, ‘আমি তো ইসলামি উপন্যাস লিখিনি। আমি ইসলামি ভাবকে কাজে লাগিয়ে উপন্যাস লিখেছি। কোরআন-হাদিসের আলোকে রোমান্টিসিজমের কথা লিখেছি”।  এছাড়া অনেকে দ্বিধা করেন জটিলতা পাকায়  ফেলেন যে প্রেম ও ইসলাম এর সম্পর্ক কী, এরা কী পরস্পর বিরোধী অথবা প্রেম মানেই তা যৌনতা কীনা।  তিনি এসব ধারণা পরিস্কার করার চেষ্টা করে বললেন এভাবে,  “প্রেম তো থাকবেই — ভাইয়ের সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, বিয়ের আগে প্রেমিকের সঙ্গে। কিন্তু সেই প্রেম ভেঙে গেলে প্রেমিকাকে এসিড ছুড়তে হলে সেটা তো প্রেম না, সেটাকে বলে মোহ। আমার বইয়ের মধ্য দিয়ে আমি এগুলোই শেখাতে চেয়েছিলাম পাঠকদের। আর আমার লেখা এই শিক্ষামূলক বই সবাই পড়তে চেয়েছে বলেই আমি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছি”। এছাড়া এই পত্রিকাও শুরুতে পরিচিতিমূলক বক্তব্য আবুবাকারার উপন্যাসকে বলছেন “প্রেমের চটুল গল্পের”। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যারা চটুল শব্দ ব্যবহার করছেন তারা কেউ তার উপন্যস না পড়েই প্রিযুডিস (আগাম বিচারবিবেচনা করা ছাড়া ধারণা) থেকে সেকুলার নাক সিটকানো থেকে কথা বলছেন।  তিনি বলছেন শালীনতার কথা, শালীনতা রেখেও প্রেমের পথের কথা – ইসলামি মুল্যবোধের হেদায়েতের কথা আর এর বিপরীতে সেকুলার অভিযোগ হল তিনি নাকি চটুল গল্প লিখছেন, ইসলামি লেবাসে যৌনতা লিখছেন।

ওদিকে প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আরও পরিস্কার করে কথা বলেছেন আর এক অনলাইন পত্রিকায়। তিনি বলছেন, (প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক কী) “এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমি বার বার হয়েছি। আমি ইসলামের কথা বলি প্রেমের উপন্যাসে। কেউ কেউ আমাকে বলেছেনও আমি অর্থ উপার্জনের জন্য এমন করেছি। কিন্তু আমার মন জানে আমি কেনো করেছি। আমি চিন্তা করেছি অন্য জায়গা থেকে। আমি প্রেমকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছি। কারণ, আমরা যতো বাধাই দেই না কেনো যুবকদের প্রেমবিমুখ করতে পারবো না। তাই আমি প্রেমকেই বাহক হিসেবে বেছে নিলাম এবং তাদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিলাম। তাদের বোঝালাম, প্রেমের লাভ-ক্ষতি হিসেব কিন্তু আমি আমার উপন্যাসে দিয়েছি। বিশেষ করে সীমালঙ্ঘন যেনো না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছি”। অর্থাৎ আমরা দেখছি এমন লোককে চটুল গল্প লেখক বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগেই খোদ এএফপির রিপোর্টে এক বিপজ্জনক মন্তব্য আছে তা নিয়ে কথা। আর তা থেকে এই রিপোর্ট এখন প্রকাশ করার উদ্দেশ্য কী তা কিছুটা আন্দাজ করা যায় সম্ভবত। বলা হয়েছে, “আবুবাকারের (কাজকে এখন নাকি) এক নবজাগরণের বা এক রেনেসাঁর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তা হল, যাতে বাংলাদেশের যুগ যুগ ধরে জারি থাকা মডারেট মুসলমান পরিচয় এখন থেকে এটা  ধর্মীয় কালামের আরো রক্ষণশীল ব্যাখ্যার দিকে ঢলে পড়ছে”।
Now his work is undergoing something of a renaissance as Bangladesh slides from the moderate Islam worshipped for generations to a more conservative interpretation of the scriptures.’

এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাসের সাথে সাম্প্রতিককালের হেফাজতের (আওয়ামি লীগের ঘনিষ্ঠতার) সম্পর্ক আছে এবং এটা নেতিবাচক।
একাত্তর টিভির একটা টকশো হয়েছিল যার শিরোনাম ‘লেখক কাসেম বিন আবুবাকার লাইভে এসে লেখা ও নিজের সম্পর্কে যা বললেন’– এভাবে সেটা ইউটিউবে ২৮ এপ্রিল আপলোড হয়েছে। আলোচনায় প্যানেলে ছিলেন রবীন আহসান, প্রকাশক ও সম্পাদক বই নিউজ ২৪; তিনিই মুলত আবুবাকারের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগকারী, একমাত্র তিনি অভিযোগ তুলছিলেন। এএফপি কী বুঝাতে ওই রিপোর্ট করেছিল তা রবীন এহসানের অভিযোগ থেকে আঁচ করা যায়। রবীন একই কথা অনেক ব্তযাখ্বেযা করে বলার পেয়েছেন বা নিয়েছেন। তবে রবীনের বক্তব্যের উপস্থাপন ছিল একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মত। বলতে চেয়েছেন, এএফপির রিপোর্ট ছিল যেন ‘বিদেশীদের ষড়যন্ত্র’। আর সে ষড়যন্ত্রের কথা বলতে চাওয়ার ছলে রবীন আঙুল তুলেছেন আবুবাকারের দিকে। বলছেন, আবুবাকার সেই ‘ষড়যন্ত্র প্রজেক্টে’ শামিল ।

রবীনের কিছু বক্তব্যের অংশ বিশেষ তুলে ধরছি এখানে: “তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরি করার জন্য উপন্যাস লিখেছেন। আমার যেটা মনে হয়েছে, এটা একটা প্রজেক্টের মতো। আবুবাকার একটা প্রজেক্টের মধ্যে ছিলেন। ত্রিশ বছরে তিনি যা লিখেছেন, এর প্রতিফলন সমাজের মধ্যে পড়েছে। তার উপন্যাসের নাম হচ্ছে ‘বোরখা পরা সেই মেয়েটি’ [ফ্যাক্টস হলো এই  উপন্যাস আবুবাকারের লেখা নয়]। তার উপন্যাসের ভেতর তার নায়ক-নায়িকারা যেভাবে কথা বলেন এবং বোরখা পরে, হিজাব পরে, এরকম সব চরিত্র হচ্ছে তার উপন্যাস এবং নিজেই যখন বলেছেন ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করার জন্যই তিনি লিখছেন। এজন্য কিন্তু তিনি সফল। মানে বাংলাদেশের যে সমাজ, যে সমাজের মধ্যে আমরা আছি, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই যে ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে লেখা এবং ইসলামি মূল্যবোধকে সাহিত্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে সমাজের মধ্যে প্রয়োগ করা, এতে কিন্তু কাসেম সফল হয়েছেন। তার আজকে যে ঢালাও করে প্রচার প্রপাগান্ডা পশ্চিমা দেশে হয়েছে, সেটার কিন্তু প্রমাণ হচ্ছে যে, হঠাৎ করে নিউজটা হয়েছে যখন কোনো বইমেলা নেই; তখন দেখা যাচ্ছে ইসলামি বই লাখ লাখ বিক্রি হচ্ছে-এই রকম একটা সংবাদ হয়েছে। আমি বলব, সমাজে যখন হেফাজতে ইসলামের একটা গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, ইসলামি সব দলের একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে এবং এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আবুবাকারের একটা অবদান আছে। এই যে ত্রিশ বছর পর্যন্ত তিনি লিখেছেন যে ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করবেন, ইসলামি নায়ক বানাবেন, নায়িকা বানাবেন, বোরখা পরে চলাচল করবে, আমরা কিন্তু সেটাই সমাজে দেখছি।’
[এই অনুলিপি আমার করা, কাজ চালানোর জন্য। এতে দু-একটা শব্দ এদিক ওদিক হতে পারে। তাই একেবারে সঠিক স্ক্রিপ্টের জন্য মূল ইউটিউব নিজে দেখে নেবেন, অনলাইনে। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি।]

এখন মূল কথা হল, রবীন এখানে আবুবাকারকে অভিযুক্ত করছেন উপন্যাসে ইসলামি মূল্যবোধ আনা, চর্চা বা জাগানোর চেষ্টা করার জন্য। যদি রবীনের একথাকে ফ্যাক্টস হিসাবে-একেবারে সত্যি বলে ধরেও নেই, তার পরেও বলতে হয়-ইসলামি মূল্যবোধ জাগানোর চেষ্টা করা কি অন্যায়? অপরাধ? ইসলামি বা আধুনিক যেকোন মুল্যবোধ প্রচার যে কেউ করতে পারে। আর তা বিচার বিবেচনা করে গ্রহণ -বর্জনের অধিকারও সকলের।  আবুবাকার এখানে ইসলামি এথিক্স / মরালিটির কথা বলছেন। একটা মরালিটির চর্চাকে অন্যায় বলবেন কি করে, একে অপরাধ বলবেন কী করে? আবুবাকার কারও কপালে বন্দুক ধরে মূল্যবোধের চর্চার কথা বলছেন না। তিনি এটা করতে আহ্বান রাখছেন কোন প্রবন্ধ লিখেও না- আরও নরম করে, একেবারে রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লিখে। অথচ এটাকেও রবীন আহসান অপরাধ মনে করছেন। ফলে এটা এক জাতীয় ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখছি না। এটা হতেই পারে যে, রবীন ইসলামি মূল্যবোধ পছন্দ করেন না, তাই তিনি এই মূল্যবোধ বর্জন করতে পারেন, এমনকি এর ‘অসুবিধা’র দিক নিয়েও পাল্টা প্রচার করতে পারেন। এছাড়া তিনি অবশ্যই ইসলামি মূল্যবোধের চেয়েও ভিন্ন, ভালো এবং কার্যকর মূল্যবোধ নিয়ে এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন। কিন্তু তিনি এটা ইসলামি হওয়াটাই যেন অপরাধ, সে হিসেবে ধরে নিয়ে কথা বলেছেন। এটা তাঁর লাইন ক্রশ।

রবীন আহমদ হেফাজতসহ ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ আনছেন। সত্যি এ’এক তামাসা বলতেই হয়। কোন চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেলে কি কাউকে অভিযুক্ত করা যায়? এটা তো ওই চিন্তা প্রচারকারীদের গৌরব যে, মানুষ তাদের কথা শুনেছে। রবীনের উলটো এটাকে অভিযোগ হিসেবে নেয়া বা অন্যায় মনে করেই বরং এক ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা নয় কী? এটা আইনি বিচারি চোখেও অন্যায় কাজ।
এএফপি যেন আসলে ঠিক রবীনের মতোই সাজেশন রাখতে চেয়েছিল। অভিযুক্ত করতে চাইছিল যে কাসেম বিন আবুবাকার রোমান্টিক উপন্যাস লিখে দোষী। কারণ এতেই ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, আর যেন ঠিক এ কারণেই হাসিনা হেফাজতের সাথে আপস করেছেন। এটা কাকতালীয় শব্দটার চেয়েও বেশি কাকতালীয় বক্তব্য সন্দেহ নেই। এমনকি ৭১ টিভির ওই টকশোতে অংশগ্রহণকারী আর এক প্যানেলিস্ট ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকেও রবীন আহসান তার কাকতালীয় দাবি ‘খাওয়াতে’ পারেননি। শ্যামল দত্ত অন ক্যামেরা প্রকাশ্যে তার আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

ওদিকে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরেক তথ্য জানা যাচ্ছে। উপরে এএফপির রিপোর্ট থেকে যে ইংরেজি উদ্ধৃতি দিয়েছি, যেটা ওই নিউজ মিডিয়া (কনসার্ন-বোধ করে) উদ্বেগ বোধ করেছিল – এভাবে জানিয়েছিল। পরবর্তিতে এই রিপোর্ট ফলে ঐ একই উদ্বৃতিও চোখে  পড়েছিল স্টিভ ব্যাননের।  তিনি হচ্ছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের  প্রধান পরিকল্পনা প্রণয়নকারী ( চিফ স্ট্রাটেজিস্ট)। হকিস আগ্রাসী ভুমিকার যে ট্রাম্পকে আমরা দেখেছিলাম বছরের শুরুতে এই নীতি প্রণয়নকারীদের বস তিনি। তবে ছিলেন বলতে হবে কারণ সম্প্রতি তাকে সাইজ করা হয়েছে, বহু পদ-পদবি ও দায়ীত্ব থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।  স্টিভ ব্যাননও  ঐ উদ্বৃতি তুলে নিয়ে তার নিজের ওয়েবসাইটে সেটে দিয়ে  উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটা সত্যিই মজাদার ব্যাপার যে, রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাসে লিখেও বাংলাদেশের আবুবাকারা “জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে” লড়াকুদেরও উদ্বেগের মুখে ফেলা দিতে পারেন!

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান একাডেমিক, গবেষক ও বাংলাদেশ এক্সপার্ট ড. আলী রীয়াজ। তিনি আবুবাকার ইস্যুতে ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাকে সম্ভাবত এই প্রথম একাডেমিকের ভঙ্গিতে দেখা গেল যে, কোনো ইস্যুতে তিনি সহজে কোনো পক্ষ না নিয়ে একাডেমিক অবজারভারের অবস্থান নিলেন। অবশ্য তার বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ ফ্যাক্টস হিসেবে সত্যি নয়।

তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের সোস্যাল মিডিয়ায় যারা সক্রিয় তাদের এক বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন; সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন, অবশ্যই এএফপির কাছে। কিন্তু আবিষ্কারের পরে তাদের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই লেখকের বিষয়ে তারা কিছু না জানায় বিস্মিত এবং খানিকটা ক্ষুব্ধ”।
এটা আলী রীয়াজের স্টাটাসের প্রথম দুই বাক্য। কিন্তু … আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে… ‘সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন’- এই বাক্যটা ফ্যাক্টস নয়। এটা বরং উলটো। কারণ এবারের আগে সোস্যাল মিডিয়ায় আবুবাকার ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছিলেন অন্তত গত বছর ডিসেম্বরে। পরে এএফপিতে তিনি রিপোর্টেড হয়েছেন মাত্র সেদিন।
দ্বিতীয়ত, আলী রিয়াজ “ইসলামপন্থী জনপরিমণ্ডলব্যবস্থার” আলাপ তুলেছেন। অর্থাৎ এএফপির মতো আবুবাকারা আর হেফাজত-সরকারের সম্কাপর্কক নিয়ে কাকতালীয় উদ্বেগ জানাতে যাননি ঠিকই, তবে একাডেমিকভাবে আর খুবই নরমভাবে প্রায় একই কথা বলছেন। ‘জনপরিমণ্ডল’ খুবই খটমটে শব্দ মনে হতে পারে অনেকের কাছে তাই সারকথাটা বলে রাখি। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ আরও ইসলামি মূল্যবোধের (আবুবাকারার রোমান্টিক উপন্যাসের মাধ্যমে) গভীরে ঢুকে গেলে এর যে সামাজিক প্রভাব তৈরি হবে (যা ভালো মন্দ বহু কিছু) এরপর আবার সেগুলোর পরোক্ষ ফলাফলে তা কতটা আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবে, সেটা সমাজতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে বুঝতে হবে। ফলে সরাসরি আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাস লেখা দেখে আমেরিকার জন্য কেঁদে উদ্বেগে হাহুতাশ করে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

তিনি বলছেন, “এ ধরনের উপন্যাস জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ বিষয়ে মনোনিবেশ করা দরকার কাউকে নিন্দা করার (ভিলিফাই অর্থে) জন্য নয়, বরঞ্চ জনপরিসরের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে তা বোঝার জন্য”।

এখানে তিনি বলেছেন, ‘জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ’- এখানে ‘ইসলামীকরণ’ শব্দের ব্যবহার না করলেই তিনি ভালো করতেন। যে দেশের ডেমোগ্রাফিক্যালি মুসলমানের, তাকে আর ‘ইসলামীকরণ’-এর অভিযোগ করা কি চলে? ও ন্যাচারালভাবে যাই করবে তার মধ্যে ইসলামই তো দেখা যাবে, ছাপ থাকবে। তাই নয় কী? তাহলে তিনি বলছেন ‘ইসলামীকরণ’ কিন্তু বুঝাতে চাইছেন সম্ভবত অন্য কিছু। আবুবাকার মুসলমান হিসাবে যদি প্রেমের উপন্যাস লিখে ইসলামি মরালিটির প্রচার এবং প্রদর্শন করেন তাহলে এটাই কী খুবই স্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক “ইসলামিকরণ” নয়? এর মধ্যে নেগেটিভ কী দেখলেন? এটা কী বেআইনী? মুসলমানের হাঁচি কাশিতেও নিজের বিপদ দেখলে, নিজের আধিপত্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুজে পেলে আমার মনে হয় না তাকে সাহায্য করতে পারবে? আর এখানে আধিপত্য হারানোর ট্রমা – এই মানসিক রোগে চিকিতসা ছাড়া সাহায্যেরই বা কী আছে?   বাংলাদেশের এক কমিউনিস্ট মুসলিম তরুণের বাবা মারা গিয়েছেন। তিনি দলের পত্রিকাও দেখাশুনা করেন। তো পত্রিকায় তিনি চার লাইনের এক কলামের সংবাদ লিখলেন, তার বাবা ওমুক মারা গিয়েছেন ইত্যাদি এবং ওমুক গোরস্থানে তার কবর হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক ঐ খবরটার “কবর” শব্দটা এডিট করে লিখলেন – তার “সমাধি” হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলে জানালেন “কবর সাম্প্রদায়িক শব্দ” তাই ছেটে দিয়েছেন। এই সম্পাদকও আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ট্রমাতে ভুগছেন। তবে আমাদের বাড়তি লাভ হল, আমরা সাম্প্রদায়িক শব্দের আসল সংজ্ঞা জেনে নিলাম।

আর তবুও তিনি যদি অভিযোগ করতেই চান, এই যে ইসলামিকরণ হয়ে গেল কীনা বোধের ট্রমা,  এতে নন-ইসলামি পশ্চিমা সরকার ও জনগোষ্ঠীর কি দায় ভূমিকা নেই?

সংক্ষেপে আরো কিছু সিরিয়াস স্পষ্ট আপত্তির কথা জানিয়ে রাখা যায়। ঘটনা হল, কাসেম বিন আবুবাকার মূলত মুসলিম লীগ – এই ধারার প্রডাক্ট বা ফসল। যে অর্থে আমেরিকায় জঙ্গিবাদ শব্দ ব্যবহার করা হয় সে অর্থে মুসলিম লীগ আর আলকায়েদা দুটোই ইসলামি হলেও  দুটোই একই ফেনোমেনা নয়। যেমন আবুবাকার তার গল্পে কোথাও সশস্ত্র পন্থার পক্ষে বলেনি। তা সত্ত্বেও তাকে কি আমরা ইসলামি মূল্যবোধের পক্ষেও কথা বলতে দেব না?  আবুবাকার এক রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাতে, এই “ইসলামিকরণে” যদি আমেরিকার গায়ে ফোস্কা পড়ে তাহলে, এই আমেরিকা লয়া আমরা কী করিব? ইহাকে কোথায় রাখিব?

শেষ পয়েন্ট : বলতে গেলে এই চলতি শতকে (২০০১ সালের পরে) আরও উপন্যাস লেখেন নাই। অর্থাৎ ৯/১১ এর পরে বাকার আর উপন্যাস লেখেননি। গত শতক ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামের। আর ইরানি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা বাদ রাখলে গত শতকে পোস্ট-কলোনি সময়কালের ইসলাম মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামই; এবং তা আবার ‘এ প্রডাক্ট অব মডার্নিটি’ অর্থে।

আবুবাকারের সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস “ফূটন্ত গোলাপ”। আমাদের দুর্ভাগ্য যে বিখাত সব আলোচকদের বেশীর ভাগই এই “ফূটন্ত গোলাপ” সহ কোন উপন্যাসই পড়ে দেখেন নাই। পড়লে দেখতেন এটা (মোটাদাগে ১৯০০ সালের পরে কলোনিয়াল কিন্তু হিন্দু ডমিনেটেড ) কলকাতা কেন্দ্রিক টিপিকাল মধ্যবিত্তের মডেল এর আলোকে লেখা কিন্তু ঢাকার মধ্যবিত্ত। বড়লোক নায়ক গুলসানের ও নায়িকা পুরান ঢাকার, দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। নায়িকার ফ্যামিলির মর্ডানসহ ইসলামি ভ্যালু দ্বারা পরিচালিত হতে অভ্যস্ত, আর নায়কের ফ্যামিলি মর্ডান কিন্তু নামাজ পড়তেও জানে না। এবং নায়িকার ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব যা লেখক ফুটিয়ের তুলেছেন সেজন্য কাশেম বিন আবুবাকার আপনি আমার সালাম নিবেন। বহু প্রগতিশীল এমন ব্যক্তিত্ব ধারে কাছে নয়।  লেখককে ইসলামি মরালিটির ক্ষমতা দেখাতে হবে সেজন্য তিনি লিখতে বসেছেন। ফলে এখানে আবুবাকারের মডেল হল নায়িকা লাঈলি। এই হল কলোনির হাত ধরে উঠে আসা চেনা আধুনিকতা যা কলোনি উত্তরকালের জাতীয়তাবাদ – যার প্রতীক হল মুসলীম লীগ। তা অবশ্যই আধুনিকতার ফসল। তবে উপরে পাঞ্চ করা ইসলামি মরালিটি। এই গল্প এই পরিবার আর ইসলামি ভ্যালু। মনে রাখতে হবে গত শতকে আমেরিকার সাথে ইসলামের (মানে জাতীয়তাবাদি কলোনি মর্ডানিজমের) কোনই সমস্যা নাই, ছিল না। তারা বন্ধু। এমনকি আফগান মুজাহিদ এরা একটু ভিন্ন তবুও  তারা আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু। এর বিপরীতে, একালে চলতি শতকের আলকায়েদার  নিজে কোনো আর অফ প্রডাক্ট অথবা বাই প্রডাক্ট হিসেবেও কোন জাতিবাদী ইসলাম ওটা নয়।
তাহলে আবুবাকার ও তাঁর প্রেমের উপন্যাসকেও আমেরিকা সহ্য করতে পাচ্ছে না কেন? উদ্বিগ্ন হচ্ছে কেন? আসলে এই সমস্যাটা আমেরিকার, আমাদের না। ফলে বলতেই হয়, আবুবাকারাকে নিয়ে যারা এসব উদ্বেগ-ওয়ালারা এরা হয় হেজিমনি হারানোর ভয়ে  ট্রমাটিক না হয় ধান্দাবাজ। কিন্তু মুল কথা এই “উদ্বেগ”  ভুল জায়গায় ‘নক’ করে বেড়াচ্ছে। ভুয়া সেকুলারদের গলা জড়িয়ে অস্হিরতায় কান্নাকাটির রোল তুলতে চাইছে।

তাহলে ব্যাপারটা  হল, একটা রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাও সহ্য করতে না পারছে না, আমেরিকা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, কেন? তাহলে আমাদেরই তো আমেরিকান জনপরিমণ্ডলের দিকে তাকাতে হবে, তাই তো না কী?

 সবশেষে পাঠকের কাছে একটা আবেদন রাখব, কাশেম বিন আবুবাকারের কোন একটা উপন্যাস অন্তত তার ফুটন্ত গোলাপ না পড়ে তাকে নিয়ে মন্তব্য করবেন না, অংশগ্রহণ করবেন না, কাউকে শুনবেনও না। এরপর নিজের মুল্যায়ন নিজে করেন। সেই মুল্যায়নের স্বপক্ষে তর্ক -বিতর্কের ঝড় তোলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ৩০ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

গৌতম দাস

বৃহষ্পতিবার ২৭ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2f3

 

ঘটনার শুরু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলায়, যা ৯/১১ বলে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে বিশেষ ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেয় এবং তা নির্মূল করবার জন্য নতুন ধরণের যুদ্ধের সূচনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ‘আল কায়েদা’কে দায়ী করে। বুশের নেতৃত্বে আমেরিকা আল-কায়েদার রাজনীতি ও হামলা মোকাবিলার যে নীতি গ্রহণ করে তার বৈশিষ্টগুলো হলোঃ

১. খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় আল কায়েদা নির্মূলের যুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিশ্চান জগতের ক্রুসেড সাব্যস্ত করে লড়া।

২. “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়া, এই ডাকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে পক্ষে টানা। সবাইকে সতর্ক করা যে এটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সামিল হয়ে এই হামলা মোকাবিলা করার কমন লাইন হলো, ওয়ার অন টেরর।

৩.“হয় তুমি আমার পক্ষে নইলে তুমি আমার শত্রু” – এই নীতির ভিত্তিতে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নৌকায় উঠতে বাধ্য করা, ভূগোল জুড়ে এই বিভাজনের ভিত্তিতে নতুন এক অক্ষশক্তি তৈরি করা যার লক্ষ্য হচ্ছে যারা এই ক্রুসেডের পক্ষে নয় তাদের নির্মূল করা।

৪. এই যুদ্ধকে খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় ক্রুসেড বলে মনে করলেও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে আবার সেকুলারিজমের রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলে দাবি করা ও প্রচার চালানো। ক্রুসেডের মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশাবে তৈরি হওয়া এই সেকুলারিজমের সোজা মানে দাঁড়ালো, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়া। ইসলাম ডাকনামে যত রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রকাশ দুনিয়ায় আছে সবকিছুকেই শত্রুর কাতারে ফেলা। দুষমন জ্ঞান করে নির্মূল করা, ইত্যাদি।

 

যুদ্ধের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা
আমাদের নিশ্চয় স্মরণ হবে ৯/১১ হামলার সময় বাংলাদেশ ছিল একটা সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। তবুও তাকে আফগানিস্তান হামলায় বিমানের রিফুয়েলিং ও এয়ার স্পেস ব্যবহার করতে অনুমতি দিতে হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যুদ্ধ চাহিদা মেটানোর দায় কবুল করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত কোন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলেও এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লতিফুরকে নিতে হয়েছিল ।

একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশকে ওয়ার অন টেররের নৌকায় তুলে নেয়ার কাজটাতে একটা পজ দিতে হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ আগেই ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে কো্ন দল ক্ষমতায় আসে সেটা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসকে এটা মানতে হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যে, ওয়াশিংটনের পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস যে-লাইনে আগানোর পরিকল্পনা নেয় সেটা হলো, ইসলামের নাম-গন্ধ আছে এমন সব দল ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার কায়েম করা। নির্বাচিত বিএনপির জোটের সরকারকে ক্রুসেড নীতি্র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তা বাস্তবায়নের জনু উপযুক্ত মনে হয় নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মোকাবিলার একটা জাতীয় সরকার গঠিত হোক। তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ওয়ার অন টেররের নৌকায় উঠুক। প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার উদ্যোগ ছিল এটাই।

জোট সরকার ও মার্কিন যুদ্ধের অংশীদারিত্ব নেবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা
মোটা দাগে বললে, বিএনপি বাংলাদেশ সরকারকে বুশের নৌকায় ওঠানো এড়িয়ে যেতে পারে নাই। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ক্ষমতা শেয়ার আর ইসলামী রাজনীতির যাবতীয় প্রকাশগুলোকে শত্রু গণ্য করে একটা ভাগ তৈরির পলিসি জোট সরকার মানে নাই, এই দিকটা এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে আবার র‍্যাব গঠন, পশ্চিমের টার্গেট করা লোকদের ধরে নির্যাতন করে তথ্য আদায় ও তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ, ইত্যাদি কাজে জোট সরকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সহযোগী ভূমিকাই পালন করেছে। এককথায় রেনডিশনের কাজে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে বিশেষ সিকিউরিটি স্টেট আকারে সাজানো, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস ও পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলকে জোট সরকার মোটামুটি আস্থায় নিতে পেরেছিল। সেটাও সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। বেচারা বদরুদ্দোজার পদত্যাগ এসবেরই প্রতীকি প্রকাশ।

তখনকার মত পরিস্থিতি এভাবে থিতু হওয়াতে হাসিনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে হতাশ হাসিনা এই ঘটনার ভিতর থেকে পশ্চিমের চাহিদাটা ভাল করে বুঝেছিলেন। এই চাহিদা হবহু পূরণ করে দিতে পারলে তিনি পশ্চিমের চোখে একচ্ছত্র প্রার্থী হতে পারেন – এই সম্ভাবনার কথা ভেবে পরবর্তীতে তিনি এই লাইনেই রাজনীতি করবেন বলে মনস্থ করেন। শেখ হাসিনা পশ্চিমের ওয়ার অন টেররের চাহিদা বুঝে তাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের দিকে পা বাড়ান। সিদ্ধান্ত নেন এই চাহিদা মোতাবেক নিজে ও দলকে ঢেলে সাজাবেন। সে মোতাবেক রাজনৈতিক কৌশল তৈরিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির চেয়ে নিজেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি আন্তরিক ও উপযুক্ত খেদমতগার হিশাবে পশ্চিমের বাজারে হাজির করা। এই কাজের জন্য তিনিই একমাত্র ক্যান্ডিডেড হিসাবে নিজেকে বিক্রির কাজটা করতে পারা। ওয়ার অন টেররের উপযুক্ত সৈনিক হিশাবে আমেরিকান সমর্থন যোগাড় করা তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। এই লক্ষ্যকেই ধ্যানজ্ঞান করে ২০০২ সাল থেকে শেখ হাসিনা কাজ করে গেছেন।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশল, লোকাল এজেন্ডা
নিজের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ হাসিনার কৌশল হলো, ওয়ার অন টেররের আমেরিকান নৌকায় তিনি সদলবলেই উঠবেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এর নাম দিবেন “যুদ্ধাপরাধের বিচার”। আবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে তিনি একনিষ্ঠ – এই ভাব ধরে “স্বাধীনতার চেতনার” নামে নতুন এক রাজনীতি তিনি কায়েম করবেন। হাসিনার এই “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতির মানে হোল নিজের বাইরের আর সব রাজনীতি, চিন্তা, তৎপরতার যা কিছু বাংলাদেশে আছে তাকে নির্মূল করবার পথে অগ্রসর হওয়া। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের যে দাবি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গুমরে মরছিল, তাকে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়নের অধীনে এনে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের বীজ তিনি বপন করলেন তার কুফল শাহবাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে পড়ল। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে পারে নি, তাদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যারা করেছিল তাদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। সুষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া মেনে ও দেশে বিদেশে সকলের কাছে বৈচারিক নীতির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য একটি বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুষিয়ে রাখা এই দাবি মেটানোই ছিল সঠিক পথ। শেখ হাসিনা সেই পথে অগ্রসর হন নি।

ওয়ার অন টেররের ছাতার নীচে পপুলার এক উন্মত্ততা (ফ্যাসিজম) তৈরি করে কঠোরভাবে তার নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও নির্মূল করবার পথে তিনি গেলেন। ‘নির্মূল’ করাটা আক্ষরিক অর্থেই, অর্থাৎ ফিজিক্যালি বা শারিরীক ভাবে নির্মূল করা। এছাড়া হাসিনা যেভাবে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বুঝেছেন, তিনি চেয়েছেন চেতনার জয়গান। তার গান গাওয়াই হবে বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। খাঁটি বাঙালি তারাই যারা তার চেতনা ধারণ করে। শেখ হাসিনার “স্বাধীনতার চেতনায়” সওয়ার হয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোও বাঙালির খাঁটি চেতনা পয়দা করবার কাজে নেমে পড়ল। এই খাঁটি চেতনা, খাঁটি ইতিহাস, খাঁটি বাঙালি ধারণা, খাঁটি বাঙালি (পাঠ্য পুস্তকসহ) বই পুস্তক ছাড়া বাকি সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক উন্মাদনা তিনি আনলেন। নিজের এই খাঁটি বাঙালিত্ব বাদে আর সমস্ত চিন্তাকে রাজাকারি বা রাজাকারের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগিয়ে নির্মুল করবেন। একেই আমরা “বাঙালী জাতীয়তাবাদের” উগ্রতার চরম ও ৭১ এর পরের নব উত্থান এবং একই সাথে শেষ পর্যায় বলতে পারি। যারা গত পাঁচ-ছয় বছরের বাংলা ব্লগ ট্রেন্ড খেয়াল করেছেন তারা ভাল বুঝবেন এই নব উত্থিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ আক্ষরিক অর্থে তার প্রতিপক্ষকে ফিজিকালি নির্মূল করবার আকাংখা কিভাবে চর্চা করেছে। এই নির্মূলের আকাংখার তাগিদেই তাদের কদম কদম বাড়বৃদ্ধি হয়েছে। সেতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তচিন্তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে। এই উন্মাদনায় ধর্ম বা ইসলাম আমাদের সব চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান শত্রু এই ধারণা ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে আবার শুরু হয় আস্তিক-নাস্তিক ইত্যাদি নানান বিতর্কের ঝড়।

এতটুকু তাও সহনীয় ছিল। সব সমাজে নাস্তিকতা থাকে,আমাদের সমাজেও অনেকদিন থেকে আছে। কিন্তু এবারের আক্ষরিক অর্থে বিনাশ বা শারিরীক ভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মুলের আকাঙ্খা এতোই উন্মত্ত ছিল যে আস্তিক-নাস্তিক ঝগড়া সহজেই ইসলামের আখেরি নবীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চর্চার নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কারণ এই রাজনীতির অনুমান হচ্ছে লাখ দুয়েক রাজাকার ও রাজাকারের সহযোগী বলে যাদের ট্যাগ লাগানো হবে তাদের সবাইকে নির্মূল করে দিলে “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতিকে একচ্ছত্র করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয় নিশ্চিত করা যাবে। এই নির্মূল পরিকল্পনা আক্ষরিক অর্থেই এক ক্লিনজিং অপারেশানের মতো, এই ধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক ভাবে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবার এটাই উপযুক্ত পথ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রেখে এই যুদ্ধ চালাবার এটাই মোক্ষম সময়। দ্বিতীয় পজন্মের মুক্তিযুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এভাবেই বিশুদ্ধ এক বাঙালির বাংলাদেশ কায়েম করতে হবে। আরেকবার রক্তে স্নান করে একাত্তরের যুদ্ধের দায় মুক্তি ঘটবে।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশলের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি
কিন্তু হাসিনার এই নতুন যুদ্ধবাজ রাজনীতির বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা আছে।

১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বড় জোর একটা ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার হতে পারে। এটাকে ওয়ার অন টেরর বা পশ্চিমের চোখে সন্ত্রাস দমনের কাজ হিসাবে কতটুকু হাজির করা সম্ভব যাতে পশ্চিমারা আগ্রহী হবেন?

২. জামাত একটা সংবিধান মেনে চলা দল, যারা কনস্টিটিউশনাল রাজনীতি করে। পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা মানে এবং সেখানে অংশ গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য তা বিশ্বাসও করে। এমন একটি লিবারাল নির্বাচনমুখী ইসলামী দলকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাস্তবেও এটা সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন তৈরির দল। বাংলাদেশের শ্রেণি-গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশেরই আশা আকাঙ্খার দল। শেখ হাসিনা একে একটা ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসাবে হাজির করবেন কি করে? জামাত যতটুকু ত্রাস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তা অন্য দুই প্রধান পার্লামেন্টারী দল আওয়ামী বা বিএনপির চাপাতি, পিস্তল বা কাটা রাইফেলের ত্রাস সৃষ্টি করতে পারার মতই। কিন্তু একটা পার্লামেন্টারী রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী দল বলে হাজির করতে গেলে অন্ততপক্ষে তাকে নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠন বলে হাজির করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। যে দল ভোট চাইতে জনগণের কাছে যায় তাকে একটা গোপন, সহিংস বা সশস্ত্র দল হিসাবে দেশে বিদেশে চেনানো কঠিন।

৩. বাংলাদেশে জামাতই একমাত্র ইসলামী দল নয় বা ইসলামী রাজনীতির একমাত্র প্রকাশ নয়। যারা আফগানিস্তান ফিরে এসেছে তারা কেউ জামাতের রাজনীতি করে না, কখনও করে নাই। বরং তারা আওয়ামী লীগ করে এমন নজিরই বরং আছে। আবার মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নয়। কিম্বা ইসলামি বিপ্লবও নয়। জামাতে ইসলামি ক্যাডার ভিত্তিক রেজিমেন্টেড সৎ চরিত্রের মানুষ গড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল। এই দিক থেকে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল ‘সুশীল’দের রাজনীতির। যারা জামাতে ইসলামির মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক চায়। মওলানা মওদুদি মনে করতেন ঈমানের দুর্বলতার জন্য রাষ্ট্রের সদর্থক উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায় । তার মানে আল্লাভীরু সৎ চরিত্রের লোকের রাষ্ট্রনায়কী নেতৃত্বের অভাবে। সমস্যাটা নৈতিকতার। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে তার চিন্তায় মধ্যে বিপুল ওসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতা আছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হচ্ছে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বহুদিক ইসলামী ঈমান আকিদা ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা করলেও শেষমেষ ‘আধুনিক রাষ্ট্রই কায়েম করতে চেয়েছেন। অথচ ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র কায়েম আদৌ ইসলামের লক্ষ্য হতে পারে কিনা সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিশাবে হাজির হয়েছে।

অন্যদিকে ‘৭২ সালের পর থেকে মওলানা মওদুদির নিজের চিন্তার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের পুরানা রাজনীতিতে তিনিই আর থাকেননি। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাকি ৭ বছর তার কেটেছে সৌদি আরবে। ইরানী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশে ইসলামের রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক আঁচ থেকে বাঁচানোর কাজটা সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। জামাতে ইসলামি সে কারনে সোদি রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণহয়ে ওঠে । সুন্নি বাংলাদেশে সৌদি রাজতন্ত্রকে সেই সার্ভিস আন্তরিকতার সঙ্গেই জামাত দিয়েছে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। মোগল আমল থেকেই সামাজিক সৌজন্য আকারে আমরা বিদায় বেলায় “খোদা হাফেজ” বলতে অভ্যস্ত। আমাদের বয়স্ক প্রজন্ম এখনও তাই বলেন। কিন্তু এখন এটা “আল্লাহ হাফেজ” হয়ে গেছে। কখন থেকে কিভাবে এটা ঘটে গেছে কেউ টের পাইনি।

কোন ধরণের রেডিক্যাল ইসলামী রাজনীতি জামাতের লক্ষ্য নয় সেটা ১৯৭৯ সালের পরের সময়কালে জামাতের ভুমিকা আরও সাক্ষ্য দেয়। রাজনৈতিক দল হিশাবে জামাতে ইসলামি কখনই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন ক্ষেত্রেই জালিমের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু ভূমিকার চর্চা করে নি, বরং সবসময়ই নিজের ভাবমূর্তি এভাবেই তৈরী করেছে যে কোন প্রকার বিপ্লবী ইসলামী রাজনীতি তার স্বার্থের বিরোধী। ইরানী বিপ্লব থেকে কেউ যেন কোন ইতিবাচক পাঠ না নেয় জামাত সেই কাজটাই সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিক ভাবে করে গিয়েছে। ইসলামী রাজনীতির পরিমণ্ডলে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামির সখ্যতা গভীর। এককথায় বললে বলতে হয় ইসলামের নামে কোন রাডিক্যাল রাজনীতি যেন বাংলাদেশে জেগে না ওঠে ও দানা বাঁধতে না পারে পাশ্চাত্যের পক্ষে জামাতে ইসলামি তারই খেদমতগারি করে গিয়েছে। এই ধরণের মিত্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের চোখে শত্রু প্রমাণ করা শেখ হসিনার জন্য কঠিন একটি কাজ।

টাইম বাউন্ডিং দুর্বলতা বা গ্লোবাল যুদ্ধ কৌশলে বদল
উপরে শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতির যেসব বড় দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বললাম সেগুলো স্থায়ী। কিন্তু আর এক বিশাল দুর্বলতার দিক আছে যাকে বলা যায় “টাইম বাউন্ডিং” বা সময় নির্ধারিত দুর্বলতা। মানে, কোন্‌ সময়ে তিনি তার রাজনীতিটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতিটার ২০০৭-৮ সালের আগে করতে সক্ষম হলে এক রকম হত, কিন্তু এর পরের যে কোন সময়ে করতে চাওয়াটা এক বিরাট বাধা। কেন? মুল কারণ ২০০৮ সালের পর খোদ আমেরিকাই আর বুশের নীতিতে থাকেনি। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট যুদ্ধনীতি বদলে ফেলেছে। এটা ২০০৮ সালে বুশের বদলে ওবামা জিতেছে বলে নয়। বুশের সম্মুখ সমরে ইসলাম মোকাবিলার নীতি তার ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরে নিজস্ব মুল্যায়ন রিপোর্টে ঐ নীতি অকেজো প্রমাণিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষের নাম লক্ষণ নাই বরং তা আফগানিস্তান বা ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর সবকিছুর উপরে যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের উপরে দাঁড়ানো বলে পরিণতিতে এটা একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা (২০০৭-৮) হিসাবে হাজির হয়।

এর ফলে বুশের সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে অল-রাউন্ড যুদ্ধ মোড় বদলাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধকৌশল মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক খুজে বের করার দিকে ধাবিত হয়, যার বাইরের নাম আরব স্প্রিং। ব্যাড মুসলিম আর গুড মুসলিমের ভাগাভাগি শুরু হয়। ওয়ার অন টেররের বাগাড়ম্বর স্তিমিত কিম্বা অবস্থা বিশেষে গায়েব হয়ে যায়। যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো আর বাড়ানো নয় বরং কত দ্রুত (২০১৪ সাল টার্গেট) সবগুলোকে গুটিয়ে নেয়া যায় – এটাই হয়ে যায় মার্কিন নীতি। কিন্তু হাসিনার স্থানীয় যুদ্ধকৌশল তো বুশের একরোখা ওয়ার অন টেররের উপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ইতমধ্যে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া হয়ে ওঠে ওবামা প্রশাসনের কাছে আগামি দিনের সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ আর সেকারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুকরাষ্ট্র কতোটা সমর্থন তা এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ওবামা আমলে আমেরিকার নতুন নীতি ও যুদ্ধকৌশলের সীমার ভিতরে হাসিনার নেয়া স্থানীয় ইসলাম নির্মূল কৌশল আনফিট ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ এই দিকটা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূল নীতির পালে হাওয়া লাগা অসম্ভব কিছু নয়। টাইম বাউন্ডিং বা সময় দ্বারা নির্ধারিত এই দুর্বলতার দিকটা বাদ রেখে হাসিনা তার দুর্বলতাগুলো কিভাবে কাটিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলোচনা এখন সেদিকে নেবো।

শেখহাসিনা-নির্মুল কমিটির পরিপূরক সম্পর্ক
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দুর্বলতাগুলো পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখেন শাহরিয়ার কবীর ও তার নির্মুলের রাজনীতি। এটাকে হাসিনার কৌশলের সাথে শাহরিয়ারের রাজনীতির পারফেক্ট ম্যাচ মেকিং বলা যায়। হাসিনার নতুন কৌশলটা শাহরিয়ার কবীরই সবচেয়ে পছন্দ করেছিলেন। সেই ২০০২ সাল থেকে নির্মুলের রাজনীতি প্রচার ও চর্চার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছিলেন তিনি। একাজে তিনি নতুন শত্রুর যে ভাগটা তৈরি করেন তা হলো, ব্রড হেডলাইনে ইসলাম আর তার প্রকাশ মানেই হলো জামাত। এভাবে তিনি কি করেছিলেন এবং কেন তা পেরেছিলেন এর তিনটা কারণ উল্লেখ করা যায়।

১. বাংলাদেশে আলকায়েদা বা তালেবানদের মত ইসলামী রাজনীতির সোল এজেন্ট, একমাত্র সম্ভাব্য দল হলো জামাত -এই মিথ্যা ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে তিনি একাজ করেছেন। এছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামাত মানেই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সকল ধারা ও প্রবণতার উৎপত্তি কারণ, উৎস ও প্রতীক। এভাবে বয়ান তৈরির সম্ভব হয়েছিল কারণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তো বটেই কমিউনিস্টরাও দুনিয়ায় বা বাংলাদেশের ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে কোনটার সাথে কোনটার মৌলিক রাজনৈতিক তফাত কি, কোন ইস্যুতে তাদের পার্থক্য, কোথায় তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক — এইসবের কোন খবর জানে না, রাখার দরকারও মনে করে না। বরং মনে করে মানুষের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ হলো ধর্ম, মানে ইসলাম। ফলে ধর্ম উৎখাত তাদের বিশাল রাজনৈতিক কর্তব্য। এই পরিস্থিতি শাহরিয়ারকে তার বয়ান তৈরি করতে সহায়তা করেছে।

২. ১৯৭১ সালে জামাতের রাজনীতি আর একালের তালেবান রাজনীতির কোন মিল থাকুক আর নাই থাকুক জামাতের ৭১ সালের ভুমিকাই হোল অকাট্য প্রমাণ যে জামাত তালেবানের মত একটা “সন্ত্রাসী” দল। জামাতের ৭১ এর ভুমিকা নিয়ে জনগনের মনে যে সেন্টিমেন্ট আছে তা কচলে ব্যবহার করে সাধারণভাবে সব ইসলামী রাজনীতিকে দানব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এই জবরদস্তি শাহরিয়ারের দরকার ।

৩. আফগান ফেরতদের দলগুলোর নানান তৎপরতা এবং জেএমবির স্বল্পকালীন উত্থান (২০০৫) এই ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবীরদের দারুণ কাজে লেগেছিল। শহুরে মধ্যবিত্তকে জঙ্গী ইসলামের নিশ্চিত আবির্ভাব সম্পরক্কে ভীত ও আতংকিত করা গেছে। জেএমবির উত্থান রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে অন্ধ অবস্থা তৈরী করেছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছিলে নির্মূলের রাজনীতি। জামাতের রাজনীতির সাথে জেএমবির রাজনীতির কোনই মিল নাই। কিন্তু মিল না থাকলেও মধ্যবিত্ত, সেকুলার,কমিউনিস্ট আর মিডিয়ার চোখে এদের জামাতি বলে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ঘটলো যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটা আর ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার থাকল না। বিচারের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকল না। বয়ানের পাটাতন একেবারে বদলে গিয়ে হয়ে দাড়ালো, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে সবকিছুরই নির্মুল, বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে ঝেড়ে মুঝে সাফ করে ফেলা। একাকার করা এই বয়ানে এক দড়িতে ফাঁসি হয়ে গেল “বিচার” আর ইসলামের।

এতে দ্বিতীয় আরেক বিপদ তৈরি হলো। ধরা যাক ঠিক বিচার নয়, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ আছে সেগুলোকেই মোকাবিলা করতে চান শাহরিয়ার ও তার নির্মুল কমিটি। তাতে একটু না হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার কথাটা ঢাল হিসাবেই ব্যবহারই তিনি করেছেন। এভাবেই যদি ধরি তো সেক্ষেত্রেও যে প্রশ্ন আমাদের ছাড়ে না তা হলো,ইসলাম নামে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশগুলোর মোকাবিলা কি নির্মূল বা ইসলাম ক্লিনজিং করে করা যায়, নাকি সম্ভব? অর্থাৎ কাজটা কি নির্মুল বা ক্লিনজিং -এর? যার যার মাথায় ইসলামী চিন্তা আছে এমন লোকদের এক এক করে ধরে মাথা কেটে ফেলার ব্যাপার ? মোটেই না। চিন্তার মোকাবিলা একমাত্র আরো অগ্রসর চিন্তা দিয়েই করা সম্ভব। নইলে তার পরাস্ত হবার কোন সম্ভবনাই নাই। । অর্থাৎ চিন্তা বা ভাবাদর্শগত ভাবে পরাস্ত করা এবং সেভাবে পরাস্ত করবার রাজনীতির মানে আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করা নয়। ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়া মানে মানুষের পুনর্গঠন আর পুনর্গঠিত সেই নারী ও পুরুষের নতুন সম্পর্ক রচনা — দুনিয়া থেকে পুরুষ নির্মূলের কর্মসুচী নয়। মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব সংঘাত শ্রেণীযুদ্ধ বটে কিন্তু কোনভাবেই এটা সমাজের মালিক অথবা শ্রমিক কাউকেই ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। বরং এটা সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্গঠনের যাতে সমাজে একদিকে পুঁজিপতি আর অন্যদিকে শ্রমিক উৎপাদন করতে না পারে। অর্থাৎ সামাজিক মানুষ যেন দুই বিবাদমান শ্রেণি হয়ে উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত না হয়, ইত্যাদি।

ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে অনেকের মনে হতে পারে বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষমতার জন্ম দিতে গেলে একটা যুদ্ধ তো হবেই, সেটা কি? সেটা আর যাই হোক কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং অপারেশান নয়। বিদ্যমান ক্ষমতাকে পরাস্ত করে নতুন ক্ষমতা কায়েমের জন্য যতোটুকু বলপ্রয়োগ লাগে ততোটুকুই। বৈপ্লবিক রূপান্তরে প্রাণের ক্ষয় ঘটে ঠিক, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়, নতুন ক্ষমতার জন্ম দেওয়া এবং নতুন আইন ও নীতিনৈতিকতার জন্ম দিয়ে নিজের নতুন ক্ষমতার বৈধতা ও ন্যায্যতা প্রমান করা। নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা যেন নতুন মানুষ তৈরী হতে পারে। কোনভাবেই সেটা ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। । এমন বাসনা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা কেউ একা বা দলবদ্ধভাবে তৈরি করা নয়। সমাজের সংস্কার বা বিপ্লব প্রতিহিংসার চর্চা হতে পারে না। জিঘাংসার আকাঙ্খা যে উন্মাদনা তৈরি করে বাস্তবে একা বা গোষ্ঠিসহ কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং করা মানেই হলো আরেকটি যুদ্ধাপরাধ ঘটানো।

সমাজে চিন্তা ও ভাবাদর্শগত লড়াইকে খুনোখুনি করে সস্তায় সেরে ফেলতে চেয়েছেন শাহরিয়ার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে হাসিনা আর নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার, মুনতাসির ইত্যাদিরা মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে গেছেন আর সমর্থকদের মনে সফল ভাবে ঢুকিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর ক্লিনজিং-এর আকাঙ্খা। নির্মূল বাসনার এক অসুস্থ উন্মত্ততা।

শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ারের এই যৌথ প্রকল্পের খবর অনেকেই রাখেননি। বলা বাহুল্য শেখ হাসিনার সাথে শাহরিয়ারের এই মহামিলন ও তাদের প্রজেক্টের অভিমুখ ও পরিণতি হলো হাসিনার কারজাই হওয়া। আর প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই এটা তালেবান রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা। ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে শাহরিয়ার আজীবন নির্মূলের মধ্যেই তার সমাধান দেখেছেন। তার সাফল্য হলো,এই উন্মাদনাকে তিনি বাংলাদেশের সমাজে একটা মানসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পেরেছেন। এখন বলে বুঝিয়ে এদের কাউকে বিরত করা যাবে মনে হয় না। কারণ এই উন্মাদনা চেপে বসেছে। তাদের অনুমানে দুলাখ ইসলামপন্থীদের নির্মূলের পথে নিয়া যাবার জন্য এরা তাদের মন ও সেকুলার জিঘাওংসাকে পুরাপুরি বেঁধে ফেলেছেন।

শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নির্মূল বাসনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটাচ্ছে সেটা বিচার করবার সাথে সাথে আমাদের কাছে একটা দিক পরিস্কার থাকতে হবে। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত একটি ইস্যু। বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ায় এর ফয়সালা না করলে নানান পেটি স্বার্থে এই জাতীয় ইস্যুটি সবসময় রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতেই থাকবে। যেমন শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর যেভাবে করছেন।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শাহরিয়ারের যুদ্ধ প্রস্তাব
তবু শেষ বিচারে হাসিনা আর শাহরিয়ারের রাজনৈতিক আকাঙ্খা কিন্তু এক নয়। শেখ হাসিনার আকাংখা ও পথ হোল যে-রাজনৈতিক লাইন বুকে ধরে তিনি গত দশ বছর এগিয়েছেন তা দিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার কাজে এই পথটাকে ব্যবহার করা। এই বিচারে শাহরিয়ার কিন্তু সৎ ও নির্মূলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর নিজের ভাষাতেও “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করতে চান। এজন্য তিনি VOA এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছে হস্তক্ষেপ সহায়তা চেয়েছেন। হাসিনা পশ্চিমের সমর্থনে একনিষ্ঠ “ওয়ার অন টেররের” একনিষ্ঠ খেদমতগার হয়ে বিনিময়ে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চান, নিজস্ব “স্বাধীনতার চেতনার” বাইরে থাকা বাকি সবাইকে মেরে কেটে সাফ করা যার লক্ষ্য, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আতাত ও আপোষ করতে বাধা নাই। । শাহরিয়ার চান একই “ওয়ার অন টেররের” খেদমতগার হওয়া, কিন্তু কোন আঁতাত বা আপোষ নয়। কারন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন তার উদ্দেশ্য নয়। বরং “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করবার কাজে একনিষ্ঠ থাকতে চান। এই কাজে তিনি শেখ হাসিনার ওপর পুরাপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। বরং সরাসরি আমেরিকার সমর্থন, লজিস্টিক , সৈন্য সব কিছুই চান। কোথায় তাদের মিল আর কোথায় পার্থক্য সেটা আমাদের বুঝতে হবে। একই সাথে শাহবাগের অংশ গ্রহণকারীরা যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে নিজেদের পৃথক দাবি করে, তারা শাহরিয়ারের নির্মূলের রাজনীতি ধারণ করে বলেই সে কথা বলে। ঠিক যে শাহবাগ শেখ হাসিনার আশু রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলিত থাকলেও শাহবাগের রাজনীতি শেখ হাসিনার রাজনীতি নয়। সেটা একান্তই শাহরিয়ার কবীরের নির্মূল বা ক্লিনজিং-এর রাজনীতি।

লক্ষ্য করার বিষয় ভয়েস অব আমেরিকার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার কিন্তু আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলছেন না। বলছেন ওয়ার অন টেররের খাঁটি লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন”। এটাই চান তিনি। বিষয়টা শাহরিয়ারের কাছে স্পষ্টতই এখন আর আদালত পাড়ার বিষয় নয়, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবার বিষোয়।। তাই তিনি প্রকাশ্যে সাক্ষ্যতকারে দাবি করছেন,“জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”। কিন্তু প্রশ্ন হোল এখন তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকারঙ্করে সবাইকে জানাচ্ছেন কেন? এতদিন আড়ালে যেভাবে চলছিল সেই পর্দা উঠিয়ে ফেলার কী দরকার ছিল।

কারণ শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ার – প্রতীকি নামের দুই রাজনৈতিক আকাঙ্খা হাত ধরাধরি করে চলতে থাকলেও তাদের উদ্দেশ্যে পার্থক্য ছিল। এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও এতদিন তাদের সহাবস্থানে অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এখন সেটা দিনকে দিন সেটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ারের নির্মূল ধারা মনে করছে হাসিনা যথেষ্ঠ কঠোর পথে যাচ্ছেন না। কি সেই কঠোর পথ? সুনির্দিষ্ট করে বললে, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে দানব হয়ে মাঠে নেমে পড়া, দাবড়ানো, খুনোখুনি। জিতি অথবা মরি জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে হাসিনা নির্বাহি ক্ষমতায় আছেন আর শাহরিয়ার আছেন একই নির্মূলের আদর্শে, চিন্তায় রাজনৈতিক লাইনে, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকার ঠেলা বা বিপদ শাহরিয়ারের বুঝের বাইরে। পোলাপান অনেক কিছুই আবদার করে। কিন্তু বাবাকে টাকা কামিয়ে, সেই কামানো অনুপাতে ব্যয় করতে হয়। তার পর আবদার কতক অংশ পুর্ণ করতে পারে কতক অংশ পারে না। পোলাপানের আবদারকে ভিত্তি মেনে বাবার চলা অসম্ভব। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার মানে ও পরিণতি কী সেটা না বুঝে শেখ হাসিনা পা ফেলতে পারেন না। বিশেষত সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার সায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আগে নিতে হবে। তা না নিয়ে লাঠি হাঁকাতে পারেন না তিনি। সন্ত্রাস দমন আইন দিয়ে ক্লিনজিংয়ে্র লাইনে ঝাপিয়ে পড়ার মানে শুধু পরিস্থিতি লেজে গোবরে করে ফেলা না, কিম্বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও না, বরং নিজের জান বাচানোও এতে সঙ্গীন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, লজিষ্টিক বা রসদের সরবরাহ পাওয়া না পাওয়ার কথা নাইবা তুললাম।

শেখ হাসিনাএখন একটা স্ববিরোধিতায় পড়েছেন। তিনি সচেতন ভাবে ক্লিনজিংয়ের ধারণা দিয়ে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠিকে তাতিয়েছেন। শুধু আওয়ামী পন্থী নয়, যারা আওয়ামী লীগ করে না সেকুলারিষ্ট, বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক, তরুণ ভোটার -ইত্যাদি সকলকে জিঘাংসার উন্মাদনায় শেখ হাসিনা উন্মত্ত করেছেন। তিনি এসব করেছেন এই উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ভাবে প্রবাহিত করে নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করার কাজে একে ব্যবহার করতে। অন্যদিকে শাহরিয়ার চাইছেন, উন্মাদনাকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মত্ত ব্যবহারে প্রয়োগ করতে, ক্লিনজিংয়ের কাজে লাগাতে। এজন্য তিনি পরিষ্কার করেই এখন বলছেন আদালতে কোন ‘বিচার’ এমনকি শাহবাগের মত ফাঁসিও না, একেবারে নির্মুল বা ক্লিনজিং করবার কাজ সম্পন্ন করতে চান তিনি। চান চিরতরে “জঙ্গি মৌলবাদ দমন”। একাজেই “আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”।

শাহরিয়ার কবীরের এই নির্মূল বাসনা আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যে তীব্র সংঘাত চলছে তার প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তাহ তিনেক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির এক টকশো তে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর প্রয়োগের পক্ষে আর বিপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুব। ওখানে মাহবুব বারবার আর্গু করছিলেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আর ব্যারিষ্টার আমিরুল ততই বারবার আর্গু করছিলেন সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ধরে নিতে পারি হাসিনা অন্তত বোঝেন “সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯” বাংলাদেশের হলেও আইনটা কার্যত আমেরিকার। আমেরিকার আগ্রহে ও ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি গাইড লাইন মেনে এটা তৈরি। এই আইন ব্যবহার করে নির্মুল বা ক্লিনজিং-এর পথে যেতে গেলে আমেরিকার আশির্বাদ লাগবে। কিন্তু শাহরিয়ার, মুনতাসির বা আমিরুল সেটা বেখবর। ফলে তারা বালখিল্য আচরণ করছেন। কান্নাকাটি করছেন, আমেরিকা কেন আফগানিস্তান বা ইরাকের মত বাংলাদেশেও একটা নতুন তালেবান মোকাবিলার ফ্রন্ট খুলছে না।

সন্ত্রাস দমন আইন এমন আইন যা কোথাও ব্যবহার করলে এর সব একটিভিটি রিপোর্ট আমেরিকাকে দিতে হয়। কেন? সেটা আমরা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ বুঝি সেই সহজ বোঝাবুঝি ছাড়াও আরও ভিন্ন দিক থেকে বোঝার ব্যাপার আছে। আমেরিকাকে না জানিয়ে হাসিনা যদি এই আইন একার বুদ্ধিতে ব্যবহার করে তবে সে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠবে। সেটা একটা তালেবান পরিস্থিতি তৈরি করবে, প্রথম চোটে যার অভিমুখ হবে এন্টি-আমেরিকান, বাংলাদেশের সব পশ্চিমা ইনষ্টলেশন এর টার্গেট হবে। অল-রাউন্ড একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট ওপেন করলে যেমন ঘটে। শুধু তাই নয়,এর উপচে পড়া প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশে না, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বার্মাসহ পুরা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের প্রতিদিনের আঞ্চলিক ঝগড়া দ্বন্দ্ব বিবাদ সবসময়ে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মায়ানমারে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিবাদ হিসাবে চলছে এগুলো সমন্বিত হবে আর তার নির্দিষ্ট অভিমুখ হবে পশ্চিমা-বিরোধী। স্থানীয় যে কোন বিরোধ এভাবে গ্লোবাল বিরোধ হয়ে হাজির হতে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য আত্মরক্ষামূলক ধরণের হলেও সেই সীমিত লক্ষ্যের নতুন ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতা তৈরি করে ফেলবে। ফলে সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ দেখতে বাংলাদেশের মনে হলেও এর প্রয়োগ ও পরিণতি শতভাগ আঞ্চলিক ও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। এদেশে যারা দুলাখ জামাত ও রাজাকারি ট্যাগ লাগানো লোক মেরে নির্মুলের মধ্যে ঘটনার সুখকর সমাপ্তি দেখছেন তাদের বেহুঁশ ও বালখিল্য বললে কম বলা হয়। আমেরিকার যুদ্ধ বালখিল্য ব্যাপার নয়। যদি তাই হোত তাহলে সারা দুনিয়ার উপর সাম্রাজ্যের ছড়ি ঘুরাতে পারত না। তাহলে কি শাহরিয়ারের লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন” কাজে আমেরিকাকে ডাকার চেষ্টাটা ভূয়া? এতে কিছু হবে না? কোন বিপদ নাই?

না ভূয়া বলছি না। বলতে পারলে ভাল লাগত। গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো,আওয়ামী লীগ, অ-আওয়ামী লীগার, সেকুলারিস্ট,বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক –সকলেই একপ্রকার জিঘাংসার উন্মাদনায় আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তাতানোর ফলাফল এটা। এটা পটেনশিয়াল ও খুবই বিপজ্জনক। যে কোন দিকে এর মোড় নেবার সম্ভাবনা আছে। হাসিনা একে তার নির্বাচনী বা ক্ষমতা লাভালাভের কাজের মধ্যে পরিণতি টানবার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। শাহবাগ নামে যা ফেটে বের হয়েছে। আবার শাহবাগের অনেকেই যেমন বলে শাহবাগের অভিমুখ একটা না, ভিতরে অনেক অভিমুখ আছে। এর ভিতরের একটা শক্ত অভিমুখকে চিনিয়ে দেই। যেমন ষ্টেজে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আছেন সবসময় ইমরানের পাশে। নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একই সাথে হাসিনা ও নির্মূল কমিটির প্রতীক। ওখানে যে আইকন বা ছবি তোলা হয়েছে সেটা “বঙ্গবন্ধুর” না, নির্মুল কমিটির জাহানারা ইমামের । বেঁচে থাকলে জাহানারা নির্মূলের রাজনীতি করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তার ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটির পটেনশিয়ালিটি নিশ্চয় নতুন করে বলবার কিছু নাই।

কোথায় নিয়ে যাবে এরা?
পটেনশিয়ালিটি – মানে কিছু ঘটিয়ে দেবার উন্মত্ততা। শেখ হাসিনা কিন্তু এখনো তৈরি হওয়া এই উন্মত্ততা দিয়ে কিছু ঘটিয়ে ফেলার পটেনশিয়াল নিস্তেজ করতে পারেন নি। ওদিকে শাহরিয়ার, মুনতাসির বা ব্যারিস্টার আমিরুলের নির্মুলের রাজনৈতিক আকাঙ্খা জীবিত আছে, সরব হচ্ছে। হাসিনার টালবাহানা দেখে শাহরিয়ার সরাসরি আমেরিকার কাছে আহ্বান নিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে নির্মুল কমিটির ধারাটাই উন্মত্ততার উপযুক্ত ও কার্যকর ক্যারিয়ার হতে পারে। এই হোল পটেনশিয়াল বিপদ তৈরি হয়ে থাকার দিক। ওদিকে আমেরিকাও বাংলাদেশে কোন নতুন ফ্রন্ট খোলার কোন তাগিদ দেখাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও অর্থ খরচের সামর্থ হারাচ্ছে তারা। অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উন্মত্ততার লাইন প্রথম ঝাপ্টায় ইতোমধ্যে দেড়শ লোক মেরে ফেলেছে, কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। প্রথম দফার রক্তারক্তির পর উভয় পক্ষই সমাজকে স্ব স্ব পক্ষে নতুন শক্তি ও শ্রেণি বিন্যাস তৈরির জন্য সময় নিচ্ছে। কোন পক্ষই টোন ডাউন করবে এমন বাস্তবতা নাই। কিছু ঘটাবার সক্ষমতা উভয় পক্ষেই আছে। এটাই অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা আর অনিচ্ছুক আমেরিকাকে যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতায় টেনে নিতে পারে। একটা লোকাল ঘটনা রিজিওনাল ও গ্লোবাল হয়ে উঠতে পারে। এর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাকে কিছু তো করতে হবে, অন্তত আত্মরক্ষামূলক। লিবিয়ার “আরব স্প্রিং” উন্মাদনার এত বড় ঘটনায় খরচের কথা চিন্তা করে আমেরিকা কোন মেরিন পাঠানোর পথে যায় নাই। এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু গাদ্দাফি উত্তরকালে নিজের রাষ্ট্রদুত খুন হবার পর কিন্তু সে মেরিন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সোজা মানে হলো, মেরিন পাঠানোর অবস্থা তার এখনও নাই বললে চলে, একান্ত বাধ্য হয়ে না গেলে। খরচ সামলানো মুশকিল। এখন কম খরচে ন্যূনতম কিছু করতে হলে সেটা হবে ড্রোন হামলা।

এসব বিবেচনায় করেই প্রতীকি ভাবে ড্রোনের কথা এসেছে। কিন্তু মুল বিষয় হলো, যে পটেনশিয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে তা যে কোন দিকে মোড় নেবার ঝুঁকি রাখে। উন্মত্ততা নিস্তেজ করবে কে, কি দিয়ে এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে না। এখন এই সম্ভাবনা আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

 

[এই লেখাটির একটি প্রাথমিক খসড়া সর্বপ্রথম তোলা হয়েছিল গত ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ফেসবুকে নোট আকারে। শিরোনাম ছিল, ‘শাহরিয়ার ও শাহবাগ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে’সেই লেখাটি এক সম্পাদিত রূপ এরপর ছাপা হয়েছিল চিন্তা নামের ওয়েব পত্রিকায়।  চিন্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল দুদিন পড়ে  ২৪ মার্চ ২০১৩ সালে। এখানে চিন্তা পত্রিকার ভার্সানটাই আবার এখানে হুবহু তুলে আনা হল, সংরক্ষণের জন্য।]

 

 

বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য

বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-aR

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে গত মাসের ২৩ জুন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায়। বিগত আশি’র দশকে তাকে আমরা নিজেদের মধ্যে সংক্ষেপে SIC বা সিক স্যার বলে ডাকতাম। সে সময়ে উনি কী বলেন তা শোনার, কী লিখতেন তা পড়ার একটা আগ্রহ কাজ করত, ফেসবুকের ভাষায় যাকে বলে, তাকে ফলো করতাম। যদিও গত কয়েক বছর ধরে তার কোনো লেখা ধৈর্য ধরে পড়েছি বলে আর মনে পড়ে না। গত ৮০’র দশকের শেষ থেকে আগ্রহে ভাটা পড়ে গেছে। এর কারণ সম্ভবত ওই সময় থেকে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বুঝতে তার কথা আর কোনই কাজে লাগছিল না। অর্থাৎ ৮০’র দশকের প্রথম দিকে মনে হতো যে, বোধহয় কাজে লাগছে। ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে নিঃসন্দেহে আবার নতুন এক ধরনের আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। যা থেকে এ’লেখার সুত্রপাত।

বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম নিয়ে তত্ত্ব করা ও পক্ষে তত্ত্ব দেয়া তার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ করেননি। বদরুদ্দীন উমরসহ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লিটারেচারে যারা লিখেছেন ‘সেক্যুলারিজম’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রসঙ্গ হিসেবে সেখানে ছিল অবশ্যই। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর “সেক্যুলারিজম” এর বয়ান তফসির সেগুলো থেকে আলাদা। কেন আলাদা, কোথায় আলাদা তা তখন বুঝতে বা বুঝিয়ে বলতে পারতাম না, শুধু ফারাকটা টের পেতাম। পেছন ফিরে দেখলে এখন মনে হয় সম্ভবত ফারাকটা বুঝতে পারি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা ইউরোপকে, ইউরোপের ইতিহাসকে যা জেনেছে তা শুধু লাল বই পড়ার ভেতর দিয়ে। লাল বইয়ের বাইরে দিয়ে অন্য কোনো বই পড়ে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্ট রেওয়াজে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাই। অর্থাৎ ইউরোপের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব লেখা পড়ে সেখান থেকে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্টদের চর্চা-অভ্যাসে নেই। নেই এজন্য যে, লাল বইয়ের বাইরের কোনো কিছু মানে ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান; যা কমিউনিস্টদের চোখে শত্রুর বয়ান, মানে অনাস্থা রাখতে হবে তাতে – এই ধারণা প্রবলভাবে কাজ করে। এটা করত বলা ভাল কারণ এখন সব আউলায়া গেছে, কমিউনিস্টরা আর সে ধারণা ধরে রাখতে, টিকাতে পারে নাই।

বিপরীতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঠিক কোনো দলীয় ধারার কমিউনিস্ট নন, আর নিজেকে তিনি কমিউনিস্ট বলার চেয়ে ‘প্রগতিশীল’ বলতে পছন্দ করেছেন দেখা গেছে। এছাড়া তিনি লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন, সেখানে বসে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন। ইংরেজি সাহিত্য বোঝার প্রয়োজনে ইংলিশ সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমি তিনি জানতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি ইউরোপের ঘরের বই শুধু নয়, তিনি ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন “এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতা” সম্পর্কে জেনেছেন, নিজের শখের পড়াশোনা সূত্রে নয়, বরং বাধ্য হয়ে, ইংরেজি ভাষার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ঘটনা ও এর ফলে ভাষায় বদলকে বোঝার প্রয়োজনে। একজন কমিউনিস্টের চোখে এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতাকে বুঝা, পারলে তত্ত্বের দিকসহ বিস্তার করে বুঝা, জানা ও পড়াশোনা কোন কাজের বিষয় নয়। কারণ মোটা দাগে এগুলো সবকিছুই ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান যা শত্রুর বয়ান, যা এত জানার কিছু নয়। ফলে এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন সক্রিয় কমিউনিস্টের চেয়ে একেবারেই আলাদা। অতএব তাঁর আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজমের বর্ণনা কমিউনিস্টদের চেয়ে বিস্তারিত ও ভিন্ন হতে বাধ্য। এখন বুঝি, এই ফারাকটাই পাঠক হিসেবে আমাকে আকর্ষণ করত। তবে অবশ্যই তিনি যাই লিখতেন তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকেই সমাজে পুষ্ট করত। নিজের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রগতিশীল, আধুনিক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য রাজনীতির মতাদর্শ সরবরাহকারী, পোক্তকারী।

ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের এই সাক্ষাৎকার নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতাদর্শ সরবরাহকারী, তাদের আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজম সম্পর্কে বয়ান যার কারণে পোক্ত হয়েছে, তিনি একালে এসে যখন সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদের এখন আর দেয়ার কিছু নেই” তখন এটা খুবই ইন্টারেস্টিং ও কৌতূহল উদ্রেককারী।

পত্রিকার সম্পাদকের চোখে সাক্ষাৎকারের এদিকটা শিরোনাম হওয়ার যোগ্য হওয়ারই কথা। হয়েছেও তাই। কিন্তু আমার মন আকর্ষিত হয়েছে শুধু এদিকটার কারণে নয়। অন্য কারণে। যারা বয়সে ১৯৪৭ সালে কমপক্ষে সজ্ঞান কিশোর বা টিনএজে ছিল, তাদের নিয়ে আমার এক বিশেষ কৌতূহল আছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালে, বয়স এখন ৮০ বছর। তাঁর প্রজন্মের সদস্যরা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথবা দেহ রেখেছেন। এদের সেকালের প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন হল “পাকিস্তান আন্দোলন”, যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী ছিলেন তাদের প্রজন্ম। এ সাক্ষাৎকারেও আমরা সেটাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু “পাকিস্তান আন্দোলনের” প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী এই প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ ষাটের দশকের পর থেকে পুর্ববঙ্গের বা পুর্ব-পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘পাকিস্তান আন্দোলনকে’ আর নিজের মনে না করা এবং এর সাথে সম্পর্ককে অস্বীকারের নতুন বয়ান খাড়া করা শুরু হয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৭১-২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিক স্যারের প্রজন্ম সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেও ‘পাকিস্তান আন্দোলনের’ কথা ঘুণাক্ষরেও যেন রেফারেন্স হিসেবে না এসে যায় সেজন্য মুখে কুলুপ আঁটেন, একাজে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে নেন। কারণ তাদের কৈশোর বা তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা, তখন যা তাদের আন্দোলিত করেছিল, চরম সত্য মনে হয়েছিল তা স্বাধীনতার পরের কালে উচ্চারণ করলে নিজ পরিবারের তরুণের হাতে নিগৃহীত না হলেও কটুকথা শোনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কারণ তারা রক্ষণশীল, প্রাচীনপন্থী শুধু নয়, পরাজিত চিন্তাধারার প্রতীক বলে চিহ্নিত হতে পারেন। এভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম কিন্তু সেই যে ঐকালে মুখে কুলুপ আঁটলেন সে অভিজ্ঞতা কাউকে আর তাঁরা বলেন না। এমনকি নাতি-নাতনিদেরকেও না। যদিও শুধু রাজনীতির মাঠে নয়, সেসময়ের পুর্ববঙ্গের প্রতিটা মুসলমান পরিবারের ঘরে ঘরে প্রত্যেক সদস্যের কাছে পাকিস্তান আন্দোলনে কোথায় কি হচ্ছে তা সকলের জীবনের আপন ঘটনাবলী হিসাবে লেগে ছিল। সেই প্রজন্মের এরা আজ বয়সের ভারে একে একে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রজন্ম শেষ হয়ে যাওয়ার আগে, আমরা তাদের অভিজ্ঞতাকে মানি আর নাই মানি, তাদের অভিজ্ঞতা একালে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে আমাদের ইতিহাস বয়ান শুরু হয় ১৯৫২ সাল থেকে। যেন এর আগে পুর্ববঙ্গে আমরা কেউ ছিলাম না। ভুঁইফোঁড়ের মতো ১৯৫২ সাল থেকে যেন আমাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এর আগে পাকিস্তান আন্দোলন বলে যেন কিছুই ঘটেনি। অথচ মানুষ তো ভুঁইফোঁড় নয়, হতে পারে না। অতীতের সবই ভালও নয় আবার সবই মন্দও নয়। এমন অতীতের উপরেই বর্তমান জন্মায়, দাঁড়িয়ে থাকে। আবার ফাউন্ডেশনাল কিছু বৈশিষ্ট্য থাকেই, যার ওপর বর্তমান খাড়া হয়ে থাকে। পাকিস্তান আন্দোলন তেমনই একটা কিছু। এটা ভীষণ আগ্রহ ও কৌতূহলের যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার নিজের পাকিস্তান আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। আমাদের সঙ্গে শেয়ার করছেন। এখানে নিচে সেসব নিয়ে কিছু অবজারভেশন ও মন্তব্য বলে এই লেখা শেষ করব।

এক. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাকিস্তান আন্দোলন ওন করছেন বা আপন বলে ধারণা দিচ্ছেন।
তিনি বলছেন, ‘ব্রিটিশ ভারতে আমাদের জন্ম, ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই, পাকিস্তান আন্দোলন দেখে বড় হচ্ছি। ফলে বেড়ে ওঠার মধ্যেই একটা রাজনীতি সচেতনতা ছিল।’ অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলন খারাপ কিছু ছিল না, যা তিনি সে সময় দেখেছেন এবং এখন স্মরণ করার মতো তা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। যদিও পরের প্রশ্নের জবাবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে নতুন গড়ে ওঠা মুসলমান মধ্যবিত্তের আকাঙ্খার বাহক হিসেবে দেখছেন। তার এ’কথাটা সত্য, তবে আংশিক ও খন্ডিত। খুব সম্ভবত তার কাছে যা ইমিডিয়েট বা চোখের সামনে, শুধু সেই শহুরে মধ্যবিত্তের কথাই তিনি এখানে ফোকাসে এনেছেন। কেন খন্ডিত বলছি?

আসলে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান এবং একনিষ্ঠ শক্ত সমর্থক ছিল গ্রামের কৃষক-প্রজা। সব সমাজে সব কালের রাজনীতিতে কোনো না কোনো একটা প্রধান বা মুখ্য স্বার্থ দ্বন্দ্ব থাকে। যাকে ঘিরে সমাজের বাকি সব স্বার্থ দ্বন্দ্বের সংঘাত আবর্তিত হয়, আকার নেয়, অ্যালায়েন্স করে। পাকিস্তান আন্দোলনের কালে সে সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল জমিদার-প্রজা; এমন প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে তা বিরাজিত ছিল পেছনের দেড়শ’ বছরের বেশি। কলকাতা কেন্দ্রিক বা কলকাতাগামী দৃশ্যমান মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান বা জন্ম ১৯০০ সালের পর থেকে। এরপরেই একমাত্র এর আগে থেকে চলে আসা গ্রামের কৃষক-প্রজার জমি পাওয়ার আন্দোলনের সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তের যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্স গঠিত হয় সেটাকেই আমরা অন্য ভাষায় পাকিস্তান আন্দোলন বলে চিনি। এই শ্রেণীমৈত্রীর রাজনৈতিক শক্তির বাহকের নাম মুসলিম লীগ। স্মরণ করিয়ে দেয়ার দরকার আছে যে, এটা ১৯৭১ সালের মুসলিম লীগ নয়। এমনকি এটা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরের সব ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কুক্ষিগত করে সাজানো দাপটে চাপা পড়া পূর্ব পাকিস্তান, এমন সময়কালের মুসলিম লীগের কথাও বলা হচ্ছে না। ১৯৪৭ সালের আগের কথা বলছি, যখন পূর্ববঙ্গের গ্রাম-শহরের এমন কোনো মুসলিম প্রজন্ম পাওয়া যাবে না যারা সেকালের মুসলিম লীগকে তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের সব আকাঙ্খার বাহক সংগঠন মনে না করত। তৎকালের জমিদারি উচ্ছেদের প্রধান এবং একমাত্র দাবিদার সংগঠন মুসলিম লীগ। এ অর্থে মুসলিম লীগ বিপ্লবী। পূর্ববঙ্গের চোখের মণি এই আন্দোলনের নাম “পাকিস্তান আন্দোলন”। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই স্মৃতির কথা বলছেন।

দুই. মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন
এটা খুবই ইন্টারেস্টিং যে, তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন। কথাটা বলছি এজন্য যে, ১৯৪৭ বা পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে ভারতের ঐতিহাসিকদের সাধারণ মূল্যায়ন বয়ান এবং অভিযোগ হলো এটা ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের আন্দোলন’, ‘জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব’ ইত্যাদি। অতএব মুসলিম লীগের এই রাজনীতি নেতিবাচক, ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ঘৃণিত। পূর্ববঙ্গের অনেক কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল এই বয়ান অনুমোদন করেন বা আপন মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলারিজম নিয়ে বই-পুস্তক, কলাম লিখে যিনি বিখ্যাত সেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তা আজও মনে করছেন না। পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন এটা নিঃসন্দেহে ইন্টারেস্টিং। অনেকের মনে হতে পারে, এটা তার হাতছুট বা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কথা। তাদের নিশ্চিত করার জন্য বলছি – না তা নয়। তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্নের লম্বা জবাবের শেষ প্যারায় তিনি আবার পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে আর একটু পরিষ্কার করে বলছেন, এটা ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’। বলছেন জিন্নাহর বক্তৃতার (১৯৪৮) প্রতিক্রিয়ায় “… এই সূত্রেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যাত্রা শুরু হলো।”

অর্থাৎ এখানে তার সার মূল্যায়ন হলো, পাকিস্তান আন্দোলন কোনো নেতিবাচক আন্দোলন তো নয়ই, কোনো ‘ঘৃণিত’ বা “সাম্প্রদায়িক” ধর্মভিত্তিক আন্দোলনও নয়; বরং জনগণের আকাঙ্খার ধারক, জনগণকে দেয়া এক প্রতিশ্রুতির আন্দোলন। তবে ১৯৪৮ সালের পর থেকে জিন্নাহর বক্তৃতায় এটা বিপথগামী বা বিচ্যুত হয়ে যায়।

তিন. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ সাক্ষাৎকারেও নিজে একটা প্রগতিশীল পজিশন নিচ্ছেন বলে মনে করছেন।
তিনি কোনো দলীয় কমিউনিস্ট সদস্য বলে আমার জানা নেই। তবে তিনি নিজেকে কমিউনিস্টদের প্রতি নেক আছে এমন ধারণার প্রগতিশীল বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, দেখেছি। চতুর্থ প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু মধ্যবিত্তেরই পার্টি আসলে। কমিউনিস্ট পার্টির এখানে প্রধান দুর্বলতা হলো, তারা কৃষকের কাছে যেতে পারেনি। এজন্য দেশে বিপ্লব হয়নি।”

এখানে আমরা দেখছি মূলত তার অভিযোগ দুইটাঃ ‘মধ্যবিত্তেরই পার্টি’ আর ‘তারা কৃষকের কাছে যেতে পারে নাই।’ খুবই মারাত্মক অভিযোগ, সন্দেহ নেই। তবে অভিযোগ অবশ্যই জেনুইন এজন্য যে, কমিউনিস্ট পার্টি কখনও ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এর পক্ষে কখনও কোনো অবস্থান নেয়নি। তবু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কমিউনিস্টদের প্রতি যথেষ্ট সিমপ্যাথিটিক। তাই সাতচল্লিশের পরের কথা বলছেন, ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রও কমিউনিস্টদের খুব অত্যাচার করতে শুরু করল।’ তার মতো অনেক কমিউনিস্ট বা একাদেমিসিয়ানরাও তাই মনে করে থাকেন যে, স্বাধীন পাকিস্তানেও কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এগুলো বাস্তব সত্য কিন্তু সবটা সত্যি না এবং একপেশে। সেকালের এবং একালের আমাদের অনেকে মনে করতে পারেন, আয়ুব খানই পাকিস্তানে প্রথম ক্যু করেন। এ কথাটাও সঠিক নয়। প্রথম ক্যু করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন কমিউনিস্টরা মার্চ ১৯৫১ সালে এবং তাতে ব্যর্থ হলে তাদের দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়, এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পর লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রীর আমলের ঘটনা। ইতিহাসের খাতিরে “রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র” নামে খ্যাত এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রসঙ্গ সামনে আনার দরকার আছে। ফলে একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সারা পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টরা ধর্মবিরোধী বলে অজুহাতে বা আমেরিকার প্ররোচনাতে নিষিদ্ধ ছিল না।

চার. “পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্র হবে এমনটা তারা চায় নাই”
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বক্তব্য পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ সম্পর্কে বহু অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে। পঞ্চম প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের এ গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন পেশ করছেন। আবার একদিকে স্বীকার করছেন, ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ধর্ম।’ কিন্তু এই পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে আবার শক্ত ন্যায্যতা নিজেই দিয়েছেন। বলছেন, “তারা একটা রাষ্ট্র (অর্থাৎ পাকিস্তান) চেয়েছে, যেখানে তারা মুক্ত হতে পারবে। তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছে। জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দু, চাকরি-বাকরিতে হিন্দু, ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু ওদের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য পাকিস্তান দরকার”।
তবু তাঁর এই শক্ত ন্যায্যতার প্রশংসা করার পরেও একটা ক্রিটিক্যাল সমালোচনার দিক মনে রাখার দরকার আছে। একথা সত্যি সেসময়ের সমাজ বলতে সেটা ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একচেটিয়া ক্ষমতা আধিপত্যের সমাজ। বিপরীতে মুসলমানদের অবস্থান হিন্দু জাত-বর্ণপ্রথায় নমশুদ্রেরও নীচে, এমনকি মুসলমানেরা বাঙালি বলেও কোন স্বীকৃতি ছিল না। এরপরেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেভাবে পরিস্থিতিটাকে হাজির করেছেন যে জমিদারগিরি, মহাজনগিরি, চাকরি-বাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ইত্যাদি সবকিছুতে হিন্দু প্রাধান্যে ছিল বলে পাকিস্তান আন্দোলন জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দুকে সরিয়ে মুসলমান জমিদার, মুসলমান মহাজন কায়েমের আন্দোলন ছিল না। ফলে কমিউনিষ্টদের মধ্যে যেমন সব কিছুকে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা থাকে এটা তা ছিল না। বরং খোদ জমিদার-প্রজা সম্পর্কটাই উতখাত, ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের দাবি এবং এক ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরে পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কমিটি বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধীনস্ত, উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে পড়ে একথা সত্য। ফলে অচিরেই (১৯৪৯) আওয়ামি মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। কিন্তু সেজন্য পাকিস্তান আন্দোলনের বিখ্যাত অর্জন ১৯৫১ সালের ১৫ মে জমিদারি উচ্ছেদ আইন (THE STATE ACQUISITION AND TENANCY ACT, 1950) পাশ করা সবচেয়ে বিপ্লবী ঐতিহাসিক ঘটনা। একে খাটো করতে পারি না। আজও স্বাধীন বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে আমাদের জন্য এটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ফলে এটা হিন্দু জমিদারের জায়গায় মুসলমান জমিদার বসানোর আন্দোলন ছিল না। এই তাতপর্য যেন আমাদের চোখ না এড়ায়।

পাঁচঃ “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”
এতক্ষণ রাষ্ট্র আলোচনায় ধারণাটাকে তিনি ‘আধুনিক রাষ্ট্র বনাম ধর্ম রাষ্ট্রের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু এবার ষষ্ঠ প্রশ্নে এসে ‘পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ বলে এক নতুন ধারণা আমদানি করেছেন। তিনি বলছেন, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”। ‘নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ এ কথার একটাই অর্থ হতে পারে যে, নিপীড়ন বলতে তিনি শ্রেণী বা অর্থনীতিবিষয়ক নিপীড়নের কথা বলছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক ছাড়াও ভিন্ন ধরণের নিপীড়ন হতে পারে। যেমন জাতিগত নিপীড়ন বলতে মুখ্যত তা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনাই বোঝায়।
তবে এর চেয়েও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক মারাত্মক মন্তব্য এখানে আছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বিষয়ে। তিনি ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় দাবি করে বলছেন, ‘পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্র নেই। এখানে (বাংলাদেশ) একটা জাতিপ্রধান আছে বটে, কিন্তু অন্য জাতিগোষ্ঠীও আছে।’ তার কথা হয়তো সঠিক। তবে ইংরেজি শব্দ ‘রেস’ ও ‘নেশন’ ধারণার বিভ্রান্তি থেকে এসবের ভুল ধারণার উৎপত্তি। তিনিও এই বিভ্রান্তি নতুন করে ছড়ালেন। মুল সমস্যা হল, ‘রেস’ ও ‘নেশন’ দুইটি শব্দকেই বাংলায় ‘জাতি’ অনুবাদ করে সে বিভ্রান্তিকে আরও উসকে দেয়া হয়েছে। ফলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব বিভ্রান্তির বাইরে এমন দাবি করা যাচ্ছে না। যেমন তিনি বলছেন, ‘রাষ্ট্র এবং জাতি এক না। একটা রাষ্ট্রে একাধিক জাতি থাকতে পারে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, আর ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’। এর প্রথম দুই ছোট বাক্য হয়ত সঠিক। কিন্তু “জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ” এ কথাটা তিনি যথেষ্ট ভেবে বলেছেন বলে মনে হয় না। কারণ এ বাক্যটাও ‘রেস‘ ও ‘নেশন’ বিষয়ক বিভ্রান্তির বাইরে নয়। রেস অর্থে ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, কথাটা সঠিক। কিন্তু নেশন কথাটার বেলায় “নেশন অর্থে জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, এই কথাটা সঠিক নয়। ‘নেশন’ অবশ্যই পলিটিক্যাল ক্যাটাগরি। রাজনৈতিকভাবে কনস্ট্রাকটেড বর্গ ও ধারণা। রেস ধারণার মতো তা প্রাকৃতিক বা ‘নৃতাত্ত্বিক বর্গ’ নয়, বরং রাজনৈতিক বর্গ।
তবে হয়তো এটা বলা যায় যে, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা অপ্রতুল ও অস্পষ্টই শুধু নয়, বেকুবি এবং অনিবার্যভাবেই তা বর্ণবাদিতায় ঢলে পড়বেই, এমন ধারণা।
এই প্রসঙ্গটা শেষ করার আগে, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের…” প্রসঙ্গে –
বাংলাদেশে পাহাড়িদের ওপর বাঙালি রাষ্ট্রের নিপীড়ন, এটা কি ‘পুজিবাদী রাষ্ট্রের’ কারণে ঘটছে? আমরা কি তাই বলতে পারি না এগুলো অর্থহীন কথাবার্তা হবে? আসলে এসব ‘শ্রেণী বিলাসী’ চিন্তা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। অনেক হয়েছে। তবে তার শেষ বাক্য, তাই, “জাতিরাষ্ট্র নয়, আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” – এ কথা বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা কখনও মানবে না। বোঝা যাচ্ছে, শেষ বয়সে এসে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে হাত ছেড়ে দিতে চাইছেন। প্রসঙ্গটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, এ স্বল্প পরিসরের বাইরে সময় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ তুলতে হবে।

ছয়ঃ “হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব”
গত ২০১৩ থেকে শাহবাগ অন্দোলন সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিছু সাহসী মন্তব্য করেছেন। সাধারণ কমিউনিষ্টদের থেকে ব্যাতিক্রমী মন্তব্য করেছেন তিনি। বলেছেন, “শাহবাগ আন্দোলন পর্বে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে আমার কাছে বড় দিক মনে হয়েছে শ্রেণী পরিচয়। শ্রেণী-বিভাজনটাই সেখানে ছিল প্রধান ইস্যু। হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব। গ্রামে মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়ছে তারা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত। আমরা এখানে যারা পড়ছি তারা সুবিধাপ্রাপ্ত। এখানে দূরত্ব আছে। গণজাগরণ মঞ্চে তুমি কিন্তু শ্রমজীবীকে টানতে পারছ না। যে রিকশাঅলা তোমাকে ওখানে পৌছে দিয়ে যায় সে কিন্তু মঞ্চে যাচ্ছে না। রাস্তায় যেসব শ্রমিকরা আছে তারাও কিন্তু আসছে না। এমনকি তোমরা ভদ্রলোকরা যে সভা করছে সে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। যে ওটা বড়লোকদের ব্যাপার, নাচানাচি করতেছে, গান বাজনা করতেছে। শ্রেণীর সমস্যাটাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না”। তাঁর কথায় হয়ত পয়েন্ট আছে কিন্তু কোন কমিউনিষ্ট এমনকি “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ” করার সুযোগ হিসাবে যারা “শাহবাগকে” দেখেছেন, নিয়মিত সাময়িকী বের করেছেন, টক শোতে কমিউনিষ্ট হয়েও লীগ ও সরকারের পক্ষে সাফাই, তত্ত্ব দিয়েছেন এমন কাউকেই এমন অবস্থান নিতে দেখা যায় নাই। সে হিসাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এমন মন্তব্য সাহসী ও ব্যতিক্রমী অবশ্যই।

সাতঃ “আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা”
কোন রাখঢাক না রেখে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদ আছে, কিন্তু তার এখন আর দেওয়ার কিছু নাই। আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা। আমাদের চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ যে শুকিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কি জাতীয়তাবাদীরা কথা বলছে? হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কি তারা কথা বলছে? নরেন্দ্র মোদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। পাকিস্তানের কেউ যদি উর্দুতে বক্তৃতা দিত আমরা মানতাম? অথচ মোদিকে আমরা হাততালি দিলাম। জাতীয়তাবাদের কথা বললে। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান তো ভাষা”।
এটা খুবই তাতপর্যপুর্ণ যে “প্রগতিশীল” আশি বছরের তরুণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সরাসরি ভারতের বাংলাদেশ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ এখনও অনেক কমিউনিষ্টকে আমরা পাই যারা এমন সমালোচনাকে “সাম্প্রদায়িক” হিন্দু বিরোধীতার কাজ মনে করেন। এর আগেই কখনও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে “চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ” নিয়ে কথা বলতে শুনেছি বলে মনে করতে পারলাম না। তাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাই সকলকে সাহস যোগানোর জন্য। মনে হচ্ছে টেক্কা কে টেক্কা বলতে চাইছেন তিনি। আপাতত সবাইকে এর তাতপর্য অনুধাবণ করতে বলব।

[লেখাটা এর আগে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল গত ২৭ জুলাই ২০১৫ তারিখে। এখানে পরিপুর্ণভাবে আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

[কোন ব্যাপার নজরে আনতে বা লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে goutamdas1958@hotmail.com এই ঠিকানায় মেল করতে পারেন।]

জাতীয়তাবাদী মনের অসুখঃ মেহেরজান সিনেমা

মেহেরজান সিনেমাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখ খোলাখুলি বাইরে এসে পড়েছে। মনের এই অসুখটা অনেক গভীরের, অনেক পুরানোও বটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী মন মেহেরজান নিয়ে তাদের আপত্তির ন্যায্যতা কতখানি তা তাদের চিন্তার মুরোদ দিয়ে গলা ও কলমের জোরে দেখিয়ে দিতে পারত। কিন্তু মোকাবিলার সে পথে তারা যায়নি। মাত্র আটদিন মেহেরজান-এর প্রদর্শনী সহ্য করার পর নিজের অসুখের উত্তাপে তারা প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার বীরত্ব দেখিয়েছে। সিনেমা হলে মেহেরজান দেখানোর শুরু থেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ছবিটা ‘নিষিদ্ধ করা হোক’। কেউ কেউ নাকি আতঙ্কিতও হয়ে পড়েছিলেন এরপর প্রশ্ন করেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকারের সেন্সর বোর্ড এ ছবি মুক্তি দিল কী করে”। অর্থাৎ নিজের চিন্তার মুরোদের উপর তাঁর ভরসা নাই, তাই শেষ অবলম্বন সেন্সর বোর্ড। যাত্রা নাটকের উপর সরকারের সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে এদেরকেই এককালে আমরা সোচ্চার হতে দেখেছি। অথচ আজ এরা নিজেরাই সরকারকে ছবি নিষিদ্ধ করতে দাওয়াত দিচ্ছে। বড়ই আজীব তাদের সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে লড়াই। অনেকে বলেছেন এ ছবি লাহোরের বদলে ভুল করে ঢাকায় রিলিজ করা হয়ে গেছে। এসব এলোপাথাড়ি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পর জানিয়েছেন তিনি ছবি নিষিদ্ধের পক্ষে নন, বরং গভীর আগ্রহে সিনেমা হলে দর্শকের প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখতে চান। কিন্তু সম্ভবত আট দিনে সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে “কাম্য প্রতিক্রিয়া” না দেখতে পেয়ে নিজেরাই সেন্সর বোর্ডের ভূমিকায় নেমে পড়েন। তবে পিছনের দরজা দিয়ে। প্রদর্শক বা ডিস্টিবিউটরকে চাপ দিয়ে সে কাজ করিয়েছেন। ডিষ্টিবিউটর হাবিব খান তাঁর সে লড়াই আর দুঃখের কথার গুমোর কিছুটা ফাঁস করে জানিয়েছেন বিডিনিউজ২৪ আয়োজিত এক আলোচনা সভায়। ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার পর স্বভাবতই “সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে” ঐসব লড়াকু সৈনিকদের কাউকেই বন্ধের বিপক্ষে দাঁড়াতে দেখা যায় নি। কেউ কেউ চিন্তার দৌড় অনুপাতে স্বভাবসুলভ “পাকিস্তানী লবির এজেন্ডা” আবিষ্কার করেছেন, এদের কেউ আবার নিজেকে আলাদা করে এসব “ষড়যন্ত্র তত্ত্বের” বাইরে থাকার কপট দাবি জানিয়ে শেষমেশ নিজেও সেই পাকিস্তানী এজেন্ডারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ স্রেফ ‘পাকিস্তানের’ ভয় দেখিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার ফ্রেমের মধ্যে সবাইকে বেধে রাখার সেই পুরানো অক্ষম প্রচেষ্টা। ঠিক যেভাবে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সব কিছুর ভিতরে ‘হিন্দুদের’ ষড়যন্ত্র দেখতে পেতেন।
সব কিছুকে পাকিস্তানী এজেন্ডা বা একটা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে দেখার খপ্পর থেকে বেরিয়ে আমরা যদি আমাদের সংকীর্ণ চোখকে মুক্ত করি, মনকে স্বাধীন চিন্তা করার সাহস যোগাই তবে আমাদের বহু চিন্তার জট খুলে যাবে, ব্যাখ্যা মিলবে, আমাদের সমস্যা আর সম্ভাবনা দুটোই দেখতে পাব। যদিও আপাতত সেটা একটা সম্ভাব্য পথ মাত্র। যদি তা মানি তবে বুঝব, প্রেম যদি সব দূরত্ব-বাধা ভেদী সর্বগামী এবং সার্বজনীন বলে মানি তবে পাকিস্তানী-বাঙালির মধ্যে প্রেম হতে না পারার কোন কারণ নাই। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রেও কী সম্ভব? সাথে ধর্ষণ যখন প্রকট সত্য হয়ে হাজির? সেটা নির্ভর করে কাহিনী কীভাবে উপস্থাপন করছি। চিত্রনাট্য, দৃশ্যকল্প, অভিনয় ইত্যাদি ও সর্বোপরি পরিচালকের মুন্সিয়ানায় যদি ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য,লজিক ও শক্ত জাষ্টিফিকেশন খাড়া করে উপস্থাপন করা যায়, ঘটনা ও চরিত্রের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি আকর্ষণ করাতে সমর্থ হয় – তবে সেখানেও প্রেম সম্ভব ও ন্যায্যও বটে। এইক্ষেত্রে মেহেরজান ছবির দুর্বলতা আছে। কিন্তু মেহেরজানকে যারা পাকিস্তানী-এজেন্ডা আখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করছেন এটা তাদের সংকীর্ণ চিন্তার সমস্যা। তাঁরা চিন্তার সংকীর্ণতা দেখিয়ে শেষ করেন নি, ছবি বন্ধের একশনে গিয়েছেন।
আশির দশক থেকে আক্ষেপ শুনে আসছি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন মহাকাব্য লেখা হলো না বলে। এতে বক্তা যে মহাকাব্য পড়েছেন তা জানা গেছিল বড় জোর। কিন্তু কোন জনগোষ্ঠিতে মহাকাব্য রচিত হতে গেলে সামাজিক মানস গঠনে কী প্রাকপ্রস্তুতি লাগে, সামাজিক না হোক অন্তত নিজের সে পরিপক্কতা এসেছে কীনা – সে খবর এদের জানা হয় নাই। সংকীর্ণ “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বা বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কর্ম এটা নয় তা বলা বাহুল্য। কারণ যে নাদান অপরিপক্ক চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে, এক্ষেত্রে সে নিজেই তো মস্ত এক বাধা। প্রাকপ্রস্তুতি সেরে পরিপক্ক হতে চাইলে সবার আগে আমাদের অন্তত নিজের জীবনকে নানাভাবে দেখতে জানতে হবে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কাছে জীবন মানে “বাঙালি” – যার আগে কিছু নাই, পরেও কিছু নাই। এই ‘বাঙালি’ বলতে সাংস্কৃতিক নাকি রাজনৈতিক – সে কী বুঝে সেসবের সতর্কতা তার নাই। সে নিজেকে ‘বাঙালি’ বলে চিনেছে এই সত্যের বাইরে আর কোন সত্য কি আছে? নাকি আর কোন সত্য হতেই পারে না? এঁদের জানা হয় নাই। যদি সে ‘বাঙালি’ এটাই একমাত্র সত্য হয় তাহলে সে কি আবার মানুষও? যদি মানুষ হয় তবে দুনিয়ার অপরাপর সব অপর মানুষের প্রেক্ষিতে সে কে? তাদের সাথে কোন সম্পর্ক, টান কি অনুভব করে? যদি না করে তাহলে তো বালাই নাই। যদি করে তাহলে অ-বাঙালি সব অপরের সাথে টান অনুভবের কারণ কী? কারণ যে নিজের বাঙালি পরিচয়কে একমাত্র সত্য জ্ঞান করে তাঁর তো অ-বাঙালি সব অপরের সাথে সম্পর্কিত–এ অনুভব থাকার কোন কারণ নাই। ফলে অপর সব মানুষ কী তাকে অর্থাৎ ‘বাঙালি’কে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, অথবা সে নিজে অপরকে? জর্জ হ্যারিসনের কথাই ধরা যাক, নিশ্চয় তিনি বাঙালি ছিলেন না। তাহলে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ কায়েম হলো কি হলো না তাতে তাঁর কিসের ঠেকা? আর আমরাই বা এই অ-বাঙালি অপর মানুষটাকে আমাদের বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে জায়গা দিব কোথায়, ধারণ করব কী করে!
এই পরিস্থিতিতে মেহেরজান সিনেমা প্রমাণ করল মহাকাব্য দূরে থাক ছকবাঁধা ফ্রেমে আটকা মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বাইরে অন্য কোনভাবে জীবনকে দেখতে, অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে দেখা বা দেখানোর চেষ্টার পরিণতি কী হতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণ মন এখনো এতই নাদান যে এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানানোর মত পরিপক্কতা সে লাভ করে নাই। এর মানে এমন নয় যে মেহেরজান একটা ‘উৎরে যাওয়া’ ছবি। ‘উৎরে যাওয়া’ মানে–কী বলতে চাই, কীভাবে বলতে চাই, সিনেমা বানানোর পর তা বলতে পারা গেছে কী না এসব। এই বিচারে মেহেরজান সফল হতে পারেনি। তবে বলা যেতে পারে, সে কাজের একটা ছোট পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেষ্টা এটা। আর এতটুকুতেই খড়্গ নেমে এসেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী মন একে তাড়া করে আঁতুড় ঘরেই মেরে ফেলতে চাইছে।

ইতিহাসে বিতর্ক তাই ইতিহাসেরই সমবয়সী
দুনিয়ার কোন দেশের যুদ্ধের ইতিহাস একাট্টা নয়, হওয়ার কোন কারণও নাই। অসংখ্য বয়ান থাকে, থাকবে ওখানে। এটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা, বিভিন্ন স্বার্থের দিক থেকে দেখা, বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে দেখার কারণে এসব ভিন্নতা দেখা যায়। ইতিহাসে বিতর্ক তাই ইতিহাসেরই সমবয়সী। আবার এসবের মধ্য থেকে সাধারণ একটা বয়ানও বের করা যায়, যাকে আমরা অবিতর্কিত মুলধারার বয়ান বলে মানি। কিন্তু ইতিহাসের বিতর্ক আর পলিটিসাইজড ইতিহাসের বিতর্ক (যেটা আসলে ইতিহাস নিয়ে দলবাজীর কুতর্ক) এক কথা নয়। যেমন, ধরা যাক স্বাধীনতার ঘোষণা, যুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, ধর্ষণ ঘটনার সংখ্যা ইত্যাদি নিয়ে যে তর্ক করা হয় তা ইতিহাসের বিতর্ক বলে মানা যায় না; এগুলো এমনভাবে করা হয় যেন এই তর্কের সমাধানের উপর নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধ আদৌ হয়েছে কি হয় নি, অথবা যেন ২৫শে মার্চের কালোরাত্রির নৃশংসতা ইত্যাদি সব মিথ্যা হয়ে যাবে। অথচ ঘটনা হলো, ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা বা শহীদের সংখ্যা বেশি কিংবা কম হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণসহ সব অপরাধ, নৃশংসতা জায়েজ হয়ে যাবে না। শেখ মুজিবের অবদান খাটো হয়ে যাবে না। কিন্তু এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়েছে যেন ধর্ষণের সংখ্যা বেশি হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রেডিট আর কম হলে ডিসক্রেডিট। অদ্ভুত এ’এক মনের খবর পাই এখানে।
আবার আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, এমন একটা লজিক তৈরি করা হয়েছে যেন, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবের ক্রেডিট কতখানি তা দিয়ে এখনকার আওয়ামী লীগের রাজনীতির ক্রেডিট রেটিং আমাদের করতে হবে এবং আওয়ামী লীগকেই ভোট দিতে হবে। একই লজিক বিএনপিরও। রেডিওতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কারণে এখনকার বিএনপির রাজনীতির ক্রেডিট রেটিং আমাদের করতে হবে এবং বিএনপিকেই ভোট দিতে হবে। আর এইসব হাস্যকর লজিককে আমরা ইতিহাস-বিতর্ক বলে দাবি করতে দেখছি। আবার এই খাঁটি দলবাজিগুলোই নাকি “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি”! জাতীয়তাবাদী মন ইতিহাসের নামে দলবাজির এই চক্করে আমাদের সবাইকে বেধে রাখতে চায়, তাদের চিন্তার ফ্রেমের বাইরে যে কোন চিন্তাকে শেকল পড়াতে চায়।
যুদ্ধ ব্যক্তি মানুষকে জনগোষ্ঠীগত মানুষের একজন, এক মানুষের মধ্যে হাজারও মানুষের অস্তিত্ব, মানুষের এক একক কমিউনিটিবোধ জাগাতে বাধ্য করে। এক মানুষ সারা পৃথিবীর মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে দায়, দায়িত্ত্ব বোধ করে। এতে চিন্তার অর্গল খুলে যায় বলে নানান দিক থেকে জীবন পরখ করা, ছুঁয়েছেনে দেখার সুযোগ মিলে। মনের শঠতা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, পলায়নপরতাগুলো কোন এক কোণে চাপা পড়ে যায়। এর মানে এই না যে রক্তমাংসের দোষত্রুটি-ওয়ালা মানুষের বদলে সবাই বইয়ের আদর্শ মানুষ বনে যায়। আদর্শ মানুষ তো আদর্শ-আইডিয়েল, বাস্তবের রক্তমাংসের রিয়েল মানুষ সে নয়। বইয়ের আদর্শ মানুষ বই থেকে বেরিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বাস্তব মানুষ কোনদিন হতে পারে না, আমরাও দেখব না। রক্তমাংসের দোষত্রুটি-ওয়ালা মানুষই একমাত্র বাস্তব মানুষ হতে পারে। তবে একথা সত্য ইতিহাস লেখার সময় মানুষের আদর্শগত দিকটা প্রধান হয়ে উঠে। তবে এক্ষেত্রে, মানুষের আদর্শগত দিকটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি রক্তমাংসের মানুষের দোষত্রুটি আছে থাকে এটাও সমান সত্যি হয়ে তখনও থেকে যায়।
তবে যারা শিল্পজগতের লোক, নতুন কিছু করতে চায়, শিল্প করতে চায়, তাদের পছন্দ রক্তমাংসের মানুষ। তারা রক্তমাংসের মানুষ আর আদর্শ মানুষ – এই একই মানুষের ভিতরের দুইদিকের দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করে শিল্প রচনার ভিত গড়ে।
সেসব দিক থেকে সুনির্দিষ্টভাবে মেহেরজানে কী আছে সে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতেই পারে। এখানে সেসবের আগে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখটা কী তা একটু বিশদ করে দেখব, সেখানে প্রবেশ করব।

সাংস্কৃতিক বাঙালি ও রাজনৈতিক বাঙালি
আমরা বাঙালী – দুটো অর্থে কথাটা বলা যায়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগেও আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম, পরেও ‘বাঙালি’। এই বাক্যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার বাঙালি আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট অর্থে। আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে জীবনযাপন, জীবন প্রকাশ করার ধরণ অর্থে। দুনিয়ায় বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও অনেকানেক নৃবৈশিষ্টের মানুষের পাশাপাশি আমরা আমাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। ভাষা, ধর্ম, সৃষ্টিশীলতা, জীবনকে দেখার ধরণ, পারস্পরিক সম্পর্কের রূপ, পরিবার, সমাজের ধরণ, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে প্রকাশিত আমাদের সুদীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ছাপ যার প্রতিটি পরতে পরতে লুকানো। তবে এটা আবার একাট্টা না, মোটাদাগের সাংস্কৃতিক ফ্রেমের মধ্যে আভ্যন্তরীণ লড়াই সংগ্রাম আছে, বাঁক ফেরা আছে; যদিও নদীর স্রোতের মত তা বহমান, যাতে পরিবর্তন আছে তবে সদা বিকশিত। এভাবেই আকার নিচ্ছে, ভাঙছে আবার আকার নিচ্ছে। সব মিলিয়ে এককথায় একে বাঙালি সাংস্কৃতিক রূপ, বৈশিষ্ট্য বলছি।
অন্যদিকে যদি বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম না, এরপর ‘বাঙালি’ পরিচয় নিয়েছি; আর এরপরে কী হব এখন জানি না। তবে ভবিষ্যতে অন্যকিছু পরিচয় নিতেও পারি। এবার এই কথার মধ্যে যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার করেছি তার অর্থ কিন্তু এখানে রাজনৈতিক; সাংস্কৃতিক পরিচয় সীমা ছাড়াও রাজনৈতিক অর্থে বাঙালি। এতে আমাদের সাংস্কৃতিক বাঙালীত্ব ঘুচে গেল না, তবে যোগ হলো রাজনৈতিক পরিচয়। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ কথা হলো, রাজনৈতিক পরিচয় বলতে এটা কোন চিরস্থায়ী ধরণের ব্যাপার নয়।
বাঙালি – এই শব্দ ব্যবহারের সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলে এই ভাগটা সতর্কভাবে মনে রাখা দরকার। আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? রাজনৈতিক পরিচয় হলো, অফুরন্ত সম্ভাবনাময় মানুষের চিন্তায় নিজেকে অনুভব, চিন্তার এক প্রডাক্ট বা ফসল। এটা আমরা জনগোষ্ঠী হিসাবে নিজেরা নির্মাণ করি। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগোষ্ঠীর নিজে নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবনে লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে। এটাই কোন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে বড় ফারাক।
রাজনৈতিক পরিচয়- এই কথাটায় এমন কী আছে যা সাংস্কৃতিক নয়? কেন মনে ভাগ বজায় রাখার কথা বলছি? এর জবাব অনেকভাবে দেয়া যেতে পারে। সেসবে এখানে বিস্তার না ঘটিয়ে সংক্ষেপে মূল কিছু দিক উল্লেখ করব। কোন জনগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বলে যা আকার নেয় এর মূলে আছে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট। যেমন, হিমালয় – সুউচ্চ পর্বত, এর পাদদেশের শেষ মাথায়, এর বরফগলা পানি, বিশেষ মিঠা পানি সমুদ্রে মিশে নিজ বৈশিষ্ট্য লোপ পাবার ঠিক আগে প্রায় সমতল এক ভূমিতে আমাদের জন্ম। পর্বতের বরফগলা বিশেষ মিঠা পানিতে কৃষি চাষাবাদ করে ও মাছ খেয়ে আকার পাওয়া কোন নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী দুনিয়াতে আর কোথাও আছে কিনা খোঁজ করে দেখা যেতে পারে। গরুর দুধকে নানানভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন নতুন নানান খাদ্য ও খাদ্যাভাসের কথা দুনিয়ার নানান জনগোষ্ঠির মধ্যে চল আছে আমরা দেখতে পাই, যেগুলো আবার প্রায় নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কমন। যেমন, মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি। কিন্তু ছানা? রসে সিদ্ধ করা সেই ছানার রসগোল্লা? এটা এতই আন-কমন খাদ্য বা খাদ্যাভ্যাস যে ‘ছানা’ শব্দের ভাষান্তর মেলে না। সাধারণভাবে বললে ছানা একধরণের প্রসেসড মিল্ক। একই দুধ কিন্তু আমাদের প্রক্রিয়াজাত করণের মধ্যে এমন এক বিশেষ ধরণ আছে যার কারণে এটা দুধের অন্য আর সব সাধারণ প্রক্রিয়াজাত ফল মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি থেকে একেবারে ভিন্ন। সব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এমন বিশেষ কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। একথাগুলো পড়তে পড়তে পাঠককে জাতগর্বে বা আবেগে আপ্লুত হতে বারণ করি। কারণ আসল কথাটা এখন বলতে হবে। লক্ষ্য করলে দেখব, আমরা যা বাঙালি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে চিনছি তা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামোর উপর। আর গুরুত্ত্বপূর্ণ হলো, এই মৌলিক কাঠামোটা প্রকৃতি-প্রদত্ত, আমাদের কোন কেরামতি নাই। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত বা গিভেন, অনেকে যা গড-গিভেন বলতে পছন্দ করেন। আগে থেকে নির্ধারিত ঐ পটভূমির উপর বেঁচে থাকা, জীবনধারণ, যাপন করতে গিয়ে আমাদের কেরামতিটা অতটুকুই যে, আমাদের জীবন সংগ্রাম লড়াই ও তার মধ্যে দিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর জীবন প্রকাশের বিশেষ ধরণ এটা—এককথায় যাকে আমরা সাংস্কৃতিক বাঙালি বলে জানছি। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে আকার দিচ্ছে আমাদের নৃবৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামো—এই পূর্বনির্ধারিত পটভূমি মেনে নিতে হচ্ছে কেন? কারণ, আমরা কেউই আল্লার সাথে চুক্তি করে বঙ্গদেশে জন্ম নেইনি; আমার নাক-বোচা, শ্যামলা, গড়ে সাড়ে পাঁচ ফুটের হব কিনা তা আমরা কেউই ঠিক করিনি; মাটিতে হিমালয় পর্বত থাকতে হবে যার পাদদেশে আবার বিস্তীর্ণ সমতলভূমি থাকতে হবে এমন নিশ্চয়তা জন্মের আগে আমাদের কেউ দেয়নি। এর মানে আকার পাওয়া সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মৌলিক দিকগুলো পূর্বনির্ধারিত, প্রকৃতি-প্রদত্ত; কোন জনগোষ্ঠীর ওতে কোন হাত নাই। ওকে খণ্ডান বা বদলে নেয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।
তাহলে এখানকার জন্য মুলকথা, আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত।
কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? এটা জনগোষ্ঠী নির্মাণের রাজনৈতিক ভাব, কাজ ও তৎপরতার মধ্যে মানুষ তৈরি করে। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। জনগোষ্ঠীর নিজের নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবন লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে।
রাজনৈতিক পরিচয় কথাটা একটু ভেঙ্গে বলি। রাজনৈতিক পরিচয় মানে রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়; একটা নতুন রাষ্ট্র গঠনে যা কালমিনেট অর্থে পরিণতি পায়। এখানে রাষ্ট্র বলতে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থাৎ রাজা সম্রাটের সাম্রাজ্য অর্থে রাষ্ট্র নয়। যেমন ১৯৭২ সালে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কালমিনেটেড, মোটাদাগে এর রাজনৈতিক পরিচয় বিনির্মাণ (রিকনষ্ট্রাকশন) শুরু ষাটের দশকে। আমরা এক নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, বাঙালি (সাংস্কৃতিক নয় রাজনৈতিক অর্থে) বা বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিচয় ধারণ করে জনগোষ্ঠীগত ভাবে নতুন আকার নিতে শুরু করেছিলাম। এটা সাংস্কৃতিক অর্থে খেয়ে পড়ে জীবনযাপন বেঁচে থাকা ও স্রেফ জীবন প্রকাশ নয়; নতুন রাষ্ট্র গঠন, রাষ্ট্রে পরিণতি পাওয়ার মামলা; তাই রাজনৈতিক। প্রকৃতি-প্রদত্ত বিষয়াবলীর উপর মানুষের নিজস্ব অর্জন, চিন্তার মুরোদ হাজির করা। পাঠক হয়ত লক্ষ্য করেছেন, আগের বাক্যে ‘রিকনষ্ট্রাকশন’, ‘নতুন’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছি। তার মানে রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে বা কনষ্ট্রাক্ট করে নেবার বিষয়; যা আগে থেকেই হয়ে বা গড়া থাকে না। এটা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মত প্রকৃতি-প্রদত্ত অর্থে গিভেন না। আবার ‘রি-কনষ্ট্রাকশন’ এর ‘রি’ অথবা ‘নতুন’ বলেছি—তার মানে এক্ষেত্রে আমাদের অন্য কোন রাজনৈতিক পরিচয় আগেও একবার নির্মিত হয়েছিল! হ্যাঁ, হয়েছিল। যেটা পাকিস্তান রাষ্ট্র। ভুল বা শুদ্ধের প্রশ্ন নয়; ফ্যাক্টস হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক পরিচয় ধারণের আগেও আমরা একবার মুসলমান ডাকনামের রাজনৈতিক পরিচয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের ফসল বা পরিণতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রে আকার পেয়েছিলাম। আর ওটা ছিল আমাদের প্রথম রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ। [এর আগে আমরা ছিলাম বৃটিশ-ইন্ডিয়া এই কলোনী রাষ্ট্রের প্রজা, আর এরও আগে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রজা; ফলে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণতি চাই এমন নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় এগুলোর কোনটাই নয়, ঘটনা নয়। তাই রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ওগুলোকে বলতে পারব না।]
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ গড়নের বিষয়টা আসলে কেবল একবারই নয়, বারবার তা নির্মাণ পুণর্গঠন হতে পারে; জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয়কে আবার নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই পূর্ববঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর আমাদের বিভিন্ন সব সম্ভাব্য পরিচয়ের মধ্য থেকে এক সময়, মূলত কলোনী ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটাতে মুসলমান পরিচয় মুখ্য গণ্য করে একবার পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং পরবর্তীতে সেই নিপীড়ক পাকিস্তান রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে নতুন আর এক রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমাদের উদ্ভব ঘটেছিল। এখান থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, একই বাঙালি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী আগামীতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবার নতুন রাষ্ট্রে পুণর্গঠিত হবার চেষ্টা করতে পারে।
পস্থিত কোন রাষ্ট্রের মধ্যে বসে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করে রাজনৈতিক সংগ্রামের কাজ একটা নিরন্তর ঘটনা। কিন্তু কাকে রাজনৈতিক পরিচয় মেনে ধরে নিয়ে তা বারবার আগাবে তা নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূর-মীমাংসীত্ব বিরোধ স্বার্থসংঘাত কী রূপ, চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছে। তবে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করা মানে রাষ্ট্রের সীমানা ভেঙ্গে নতুন সীমানা নিয়ে রাষ্ট্র হতেই হবে এমন কোন কথা নাই। একই বাংলাদেশ ভৌগলিক সীমার মধ্যে থেকেই রাষ্ট্র নতুন করে নতুন পরিচয়ে পরিগঠিত হতে পারে। বাংলাদেশের এখনকার রাষ্ট্র বদলে আগামীতে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে একই ভৌগলিক সীমায় যদি নতুন রাষ্ট্র, কনষ্টিটিউশনে পুণর্গঠিত হয় তবে একাদেমিক ভাষায় একে নতুন বাংলাদেশের সেকেন্ড রিপাবলিক বলা হবে।
এখনকার জন্য মূল কথা হলো, সাংস্কৃতিক অর্থে বাঙালি একই জনগোষ্ঠী বারবার রাজনৈতিক পরিচয় বদল করতে পারে, রাষ্ট্র বদলে পুণর্গঠিত হতে পারে। তবে এখনকার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ভবিষ্যতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করে বদলে গেলেও সাংস্কৃতিক অর্থে অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক, ভৌগলিক অর্থে সে একই বাঙালি জনগোষ্ঠীই থাকবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ – এই রাজনৈতিক পরিচয় তার শেষ কথা নয়; এর যেমন শুরু আছে তেমনি শেষও আছে। আর, এটা সাংস্কৃতিক অর্থে শেষ হওয়া নয়। আবার, সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি বলে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ওর একমাত্র ও থিতু-রূপ হবে এমন ধারণার কোন ভিত্তি নাই।
আবার সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি –এটাও শুকিয়ে মরা অর্থে শেষ হতেও পারে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের কথা ধরা যাক। ওর সাংস্কৃতিক পরিচয় এখনও বাঙালী হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে ওরা ৪৭ সাল থেকেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। এখন ওর রাজনৈতিক পরিচয় তো বিলীন হয়েছে দেখা যাচ্ছে, এই সাংস্কৃতিক পরিচয়টুকুও কী শেষ পর্যন্ত থাকবে? এটা নির্ভর করে সর্বভারতীয় যে আগামী রাষ্ট্র পরিচয় দাড়াবে তা সে বর্তমান ভারতীয় জাতীয়তাবাদ থাকুক আর যাই থাকুক—তাতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীর চিন্তার অবদান কতটুকু ও কী থাকবে এর দ্বারা। ঠিক একইভাবে দুনিয়াতে বাংলাদেশ বলে আগামীতে কিছু কি থাকবে? আলাদা করে চেনা যাবে? এটা নির্ভর করে গ্লোবাল চিন্তা জগতে আলাদা করে চেনা যায় এমন কোন অবদান যদি আমাদের থাকে, রাখার মুরোদ রাখি তবে। নইলে এমনও হতে পারে কারও কোন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে চাপে প্রভাবে আমরাও বিলীন হয়ে গেছি।

রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ও রেসিজমের বিপদ
এবার কথা আর একটু সরাসরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করব। রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ মানে একইসাথে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করে ফেলাও বটে। কলোনী ভূমিব্যবস্থা অর্থাৎ জমিদারী-প্রজা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ইস্যুতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পূর্ববঙ্গীয় প্রজাদের পক্ষে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারে নি। বরং দেশভাগ ঘটনার শেষের দিকে বিশেষত ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময় থেকে সংখ্যাগরিষ্ট পূর্ববঙ্গের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ বা হিন্দুদের রক্ষা করার নামে জমিদারদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এসব ঘটনায় পূর্ববঙ্গ পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে মিলে মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে দেশভাগের দাবির সাথে একাত্ম হয়ে যায়, আর এর নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সাথে বিপরীতে নতুন সম্ভাব্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় হয়ে যায় ‘হিন্দু’; এটা এড়ানোর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না। এখন মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে দেশভাগ ঘটে যারার পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ গরহাজির হয়ে যায়। অথচ ইতোমধ্যে ‘মুসলমান’ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করে ফেলার কারণে চাইলেই ঐ রাষ্ট্রের শত্রু যে আর বাস্তবে ‘হিন্দু’ নয় সেই বয়ান থেকে সরে আসা সম্ভব হয় না। কারণ আগেই ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যে নতুন প্রোথিত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি ‘মুসলমান’। এটাই যে কোন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ, গ্রহণের আজন্ম স্ববিরোধ।
অবিভক্ত বৃটিশ ভারতে পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা সংঘাত ছিল ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানো। কিন্তু বিশাল ভারতবর্ষের হাজারো বিরোধ সংঘাতের মধ্যে পূর্ববঙ্গ নিজের দাবিকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতার রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে হাজির করতে পারার মত রাজনৈতিক শক্তি তার ছিল না। একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৪৭ সালের আগের দেড়শ বছর ধরে চলা বৃটিশ ভূমি চিরস্থায়ী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রজা-কৃষক আন্দোলন। তিতুমীর, শরিয়তুল্লাহ বা ফরাজী আন্দোলনকে বাইরের আবরণ দেখে ভুলে এগুলোকে ধর্মীয় আন্দোলন বলে মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো মুলত বৃটিশ ভূমি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকের জমি পাওয়ার আন্দোলন সংগ্রাম। জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড় থেকে মুক্তির আন্দোলন। কিন্তু এগুলোর কোনটাই সফল হতে পারেনি। কারণ এগুলো সর্বভারতীয় বৃটিশ রাষ্ট্রক্ষমতার বিপরীতে কোন পালটা ক্ষমতা হতে পারেনি, বড়জোর স্থানীয় ঘটনা হিসাবে থেকে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯০০ সালের পরের ও ১৯৪৭ সালের আগে এই সময়কালে পূর্ববঙ্গের ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের বদলের আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতা হয়ে উঠতে এবার সে রাজনৈতিক মৈত্রী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এই রাজনৈতিক মৈত্রী গড়া ভাল না খারাপ অথবা ভুল না শুদ্ধ হয়েছিল সে বিচারে নয়, ফ্যাক্টস হিসাবে কী ঘটেছিল সেদিক থেকে বললে, পূর্ববঙ্গে প্রথম এলায়েন্সটা গড়ে উঠেছিল ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড়ে আটকে থাকা প্রজা-কৃষক আর মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে; এরা কলকাতাকেন্দ্রিক ততদিনে গড়ে উঠা শহুরে প্রথম প্রজন্মের মুসলমান মধ্যবিত্ত। পড়াশুনা, সরকারী চাকরি, ওকালতি ইত্যাদি নানান পেশা—সবমিলিয়ে এক শহুরে মুসলিম মধ্যবিত্ত, মোটাদাগে সোহরাওয়ার্দী এদের নেতা বা বলা যায় এটাই সোহরাওয়ার্দীর কনষ্টিটিউয়েন্সী। এরপর পূর্ববঙ্গে প্রথম এই এলায়েন্সটার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের এলায়েন্স— এটাই পালটা ক্ষমতা, বৃটিশ রাজ আর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সক্ষম এক সংহত ক্ষমতা হয়ে উঠতে পেরেছিল। পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা ভূমিবিরোধ একমাত্র এভাবেই অন্যেরা শুনতে বাধ্য করা যায় এমন শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছিল, পূর্ববঙ্গের একমাত্র গতি হয়ে উঠেছিল। মুসলীম লীগ নামের এই এলায়েন্সের ভিত্তি একটাই –তাদের সবার শত্রু কমন, অবশিষ্ট ভারতের রাজনৈতিক শক্তি; আর ঐ এলায়েন্সের দাবি হলো মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে তাদের আলাদা রাষ্ট্র হতে হবে। অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ নিজের মূল দাবি জমিদার-প্রজা বিরোধের সমাধান শেষে, মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের মধ্যে খুঁজে নেবার একটা রাস্তা পেল। কিন্তু এতে নতুন অনুসঙ্গ, সেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় ভিত্তি হয়ে উঠল ‘মুসলমান’।
ওদিকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ মানে আসলে কী? নতুন পরিচয়ের মানে খুঁজতে গিয়ে তা শেষে গিয়ে দাঁড়াল পাকিস্তান রাষ্ট্রকে “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র হতে হবে—এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এখন পুর্ববঙ্গের দিক থেকে দেখলে তার প্রধান বিরোধ যার সে সমাধান খুজছিল তা ছিল ভূমিব্যবস্থার সমাধান; কিন্তু কাম্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে তা শেষে হয়ে দাঁড়াল “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। বুঝাই যাচ্ছে মূল জায়গা থেকে সরে যাওয়া এ এক লম্বা জার্নি; ছিল ভূমিবিরোধ সমাধান দাবি, কিন্তু শেষে তা হয়ে দাঁড়ালো ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয়ে এক “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় দেয়া হয়ে গেছে হিন্দু। এটাই রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে যাওয়ার স্ববিরোধ ও বিপদ। কারণ দেশভাগ হয়ে যাবার পর, যখন বাস্তবে ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটে গিয়েছে এরপর হিন্দুরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রু একথা বলবার আর কোন মানে হয় না, ভিত্তি থাকে না।
শুধু তাই না, ভূমি বিরোধ অবসানের পর নতুন বিরোধ নতুন রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে তা মুখ্য হয়ে উঠেছিল। সেসবের খবর যারাই করতে গিয়েছিল এমন পূর্ববঙ্গের প্রতিটা প্রশ্নকে নতুন “পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সংহত” করার নামে তা “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা বিরোধী” বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হতে লাগল। আরও একটু আগ বাড়িয়ে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলা হতে লাগল।
‘মুসলমান’—এই রাজনৈতিক পরিচয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়েও আর এক বড় বিপদ ঢেকে আনে। বিপদটা হলো দেশভাগ ঘটে যারার পরেও শত্রুকে দেখানো, চেনানোর সমস্যা। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী প্রথা বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ হাজির নয়। ফলে এই নতুন বাস্তবতায় শত্রুকে আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে দেখানো চেনানো বাস্তবে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জমিদারী উচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল জমিদারকে কোন ক্ষতিপূরণ দেবার মত আপোষমূলক ছাড় না দিয়ে; ফলে ‘জমিদার-প্রজা’ ধরণের কোন পুরানো উৎপাদন সম্পর্কের জের ওখানে থাকেনি, সমুলে উৎখাত হয়ে গিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান বলে নির্মম নৃশংস দাঙ্গা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এর তলে তলে পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে গিয়েছিল অথচ মালিকানায় রদবদল অর্থে কোন ধরণের সামাজিক ঝাকুনি এতে তৈরি হয়নি। যেন কেউ টেরই পায়নি। এতে মজার এক ব্যাপার ঘটে। কোন সামাজিক ঝাকুনি তৈরি না করে, পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে যাবার ঘটনা ঘটেছিল অথচ সবার মনে ছাপ ফেলেছিল, ঝাকুনি দিয়েছিল হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আর ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটনার সুফল সবাই ভোগ করেছে। ওদিকে এই অবস্থায় নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র ততদিনে অদৃশ্য ‘হিন্দু’ শত্রুর ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্র সংহত করতে চাইছে, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে সেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুললে তাকে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলে টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছে। একইভাবে আমরা যদি পরবর্তীকালের ভাষাভিত্তিক বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, এই ‘পরিচয়ের রাজনীতি (politics of identity) বিচার করতে বসি তবে আগের ‘মুসলমান’ ‘পরিচয়ের রাজনীতি’র সাথে এর অবাক করা মিল খুঁজে পাব।
পাকিস্তান থেকে আমরা আলাদা নিজের রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছি ৪০ বছর হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন আমাদের উন্মেষ, বিকাশ, চিন্তাভাবনা চর্চার, সিদ্ধান্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা– একথা বলবার কোন মানে হয় না। কিন্তু ‘পাকিস্তান’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র করেছি। ঠিক যেমন ‘হিন্দু’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে পাকিস্তান নামে রাষ্ট্র হয়েছিল।
পাকিস্তানের প্রেক্ষিতে, পূর্ববঙ্গের দিক থেকে মূলত জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান চাইতে গিয়ে রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা, ঘটনাপ্রভাবে ‘হিন্দু’ শত্রুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হয়ত গ্রহণযোগ্য মনে করা যেতে পারে। কিন্তু এর মানে যদি হয় হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠা? ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা তাল সামলাতে না পেরে আগ বাড়িয়ে যদি হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে যায়? তবে এটাকে রেসিজম বলে। যে কোন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণের সাথে সহজাতভাবে তবে লুকিয়ে হাজির থাকে রেসিজম। এটাই ‘পরিচয়ের রাজনীতির (politics of identity)ভয়াবহ দিক। মুসলমান পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘হিন্দু’কে শত্রু ঠাউরে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে তার নিজের হিন্দুবিদ্বেষী বা হিন্দু-রেসিষ্ট (রেসিষ্ট হিন্দু নয়) হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া এড়ানো খুবই কঠিন। আর ঘটলে তা হবে ভয়াবহ। একইভাবে ‘পাকিস্তানী’কে শত্রু ঠাউরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে তার পাকিস্তানীবিদ্বেষী বা পাঞ্জাবীবিদ্বেষী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এর উপর কেউ যদি পাকিস্তান ও ইসলাম – শব্দ দুটোকে মনে মনে সমার্থক জ্ঞান করে তাহলে সে ইসলামবিদ্বেষী হবে সন্দেহ নাই।
রাজনৈতিক বা আকাদেমিক দুনিয়া রেসিজম (Racism) কথাটার সাথে আমাদের পরিচয়, সচেতনতার খুব বেশি দিন আগের নয়। সাউথ আফ্রিকার শাসকের সাদা-কালো বর্ণবাদের বিরোধিতা অথবা একালের পুর্ব-ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গোত্র বা নৃজাতি (Race)দের মধ্যে পরস্পরকে খতম বা নির্মূল অভিযানমুলক সংঘাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন ইত্যাদি এগুলোর চিহ্ন। কিন্তু আমাদের চিন্তার মধ্যে রেসিজমের ব্যাধি এমনই অদ্ভুত যে বহনকারী গর্বের সাথে সে কথা বলে এবং সে কোনদিন খেয়াল করেই দেখেনি যে ঐ বক্তব্য রেসিজমের ব্যাধিতে ভরপুর। মানুষকে যত ধরণের পরিচয়ে বিভক্ত করে হাজির করা সম্ভব বা বলা চলে মানুষে মানুষে যত ধরণের বিভক্তিমূলক চিহ্ন আবিস্কার করা সম্ভব যেমন, গায়ের রং, শরীরের গড়ন (বেটে-লম্বা, নাক খাড়া-বোচা ইত্যাদি), সমতল-পাহাড়ী বা কোস্টাল, ধর্ম, গোত্র, বংশ, প্রাচ্য-পশ্চিম, নারী-পুরুষ ইত্যাদি। এসব বিভক্তি চিহ্ন মানুষের মধ্যে হাজির আছে। এসব বিভক্তি টের পাওয়া সচেতন হওয়া কোন সমস্যা নয়। এবং সম্ভবত এই বিভক্তি চিহ্নকে ভিত্তি করেই রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণ ঘটে থাকে, আমরা এড়াতে পারি না। কিন্তু এই বিভক্তি চিহ্নের ভিত্তিতে একটাকে অন্যটার বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ গণ্য করা, হেয় গণ্য করা, খাটো বা নিচু করে দেখানো, উচু-নিচু ধারণা তৈরি করে বিদ্বেষী হয়ে যাওয়া রেসিজমের ব্যাধি, রেসিস্ট মন তৈরি করা।
জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকে তৈরি হয়, সেই দ্বন্দ্বে লড়াই সংগ্রাম চলে, চলতেই থাকে। সে লড়াইয়ে স্বার্থে শত্রু-মিত্র সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেজন্য রেসিজম তৈরি করা, ওর মর্ম অপর জাতবিদ্বেষী হয়ে পড়া জরুরী নয়।
কিন্তু জরুরী না হলেও রেসিজম, বিদ্বেষই ঘটতে দেখি আমরা। পাকিস্তান রাষ্ট্র হিন্দু রেসিজমে ভুগেছিল। ঠিক একইভাগে বাঙালি জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিজমে ভুগছে। পাকিস্তানের বেলায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পর সে হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল। কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা”, ‘“ইসলামী চেতনা’র” বিরোধী বলে ট্যাগ লাগিয়ে দমন নিপীড়ন, নিষিদ্ধ ঘোষণার পথে মোকাবিলা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের বেলায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের পাকিস্তানীবিদ্বেষী হতে বলছে। ‘পাকি’, ‘পাঞ্জাবী’, ‘সিন্ধী’ এসব শব্দে জাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে আমোদ জাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে দমনের পাকিস্তানের দেখানো রাস্তা বেছে নিচ্ছে।
“পাকি’’ বা ‘পাকিস্তানী’ বলে জাতবিদ্বেষ জাগিয়ে তোলার যারা চেষ্টা করেন তাদের পক্ষে যে যুক্তি তাকে পরীক্ষা করলে পাওয়া যায় তার সার বয়ানটা হলো, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী রাষ্ট্র-সেনাবাহিনী নৃশংস অত্যাচার ধর্ষণ চালিয়েছে তাই আমাদেরকে পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী রেসিষ্ট হতে হবে। কেউ কেউ আবার নিজের মনের রেসিজমকে ঢাকতে শর্ত দিয়ে বলে, পাকিস্তান এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায় নাই। কাজেই পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী জায়েজ। পাকিস্তান কিভাবে নিজের গায়ের রক্ত কৃতকর্ম, পরিচয় সাফসুতরা করবে, দুনিয়ায় নিজেকে হাজির করবে সেটা একজন পাকিস্তানী ও পাকিস্তানী রাষ্ট্রের নিজস্ব গভীর সমস্যা। এই ইমেজ পরিচয় সঙ্কট পাকিস্তান নিজে না কাটানো দায়িত্ত্ববোধ না করা পর্যন্ত তাদের প্রতি সারা দুনিয়ার সাথে আমাদেরও খারাপ ধারণা থাকবেই, করুণা ছাড়া আর কীইবা করতে পারি। কিন্তু ওদের ইমেজ পরিচয়ে দাগ নিজস্ব সমস্যা সঙ্কট আছে বলে সেটাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে আমাদের নিজেকে কলঙ্কিত করব? বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী জায়েজ করার এই যুক্তিটা এমনই আজীব।
এই বয়ানের ফাঁকির দিকটা হলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভূমিকা আমরা এখনো জ্বলজ্বলে স্মরণে রাখতে পারি, মাফ না করতে পারি কিন্তু এই সুযোগে আমাদের জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা ন্যায্য হয়ে যায় না। এমনকি পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে যুদ্ধের ভয়াবহতা, বিভৎসতা দেখে কেউ যদি ট্রমাটাইজড হয়ে যান তখন বা এখন তবে সেই ট্রমার সাইকোপ্যাথিক চিকিৎসা করতে পারি। কিন্তু সেই ট্রমাকে মহৎ জ্ঞান করে মুকুট বানিয়ে আমরা নিজেদের স্বভাবে তা অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারি না, জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে যেতে পারি না। বিভৎসতা দেখে আমাদের ঘৃণা জাগতে পারে, ট্রমাটাইজডও হয়ে যেতে পারি—এতদূর পর্যন্ত একটা স্তর। কিন্তু তা থেকে এবার জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা এটা দ্বিতীয় ধাপ—এর দায় যে হয়ে ওঠে তাঁর। প্রথম স্তরের দায় পাকিস্তানের আর দ্বিতীয়টা আমাদের।  ঘটনাচক্রে কোন ধর্ষণের ঘটনায় নারীর ট্রমাটাইজড হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে নারী এ থেকে পুরুষবিদ্বেষীও হয়ে যেতে পারেন। সমাজের দিক থেকে এ ঘটনায় মনোভাব হয় ঘৃণা, নিন্দা ও ধর্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির। ধর্ষণের ঘটনার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ কারণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হলো, আমরা কেউ এজন্য সব নারীকে পুরুষবিদ্বেষী হয়ে উঠার জন্য তাগিদ দেই না। আবদারও করি না। করতে পারি না।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ বিকৃত হয়ে ঐ রাষ্ট্রকে হিন্দুবিদ্বেষী রেসিস্ট এই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় “বাঙালি” বাংলাদেশের অনেককে পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিস্ট জায়গায় নিয়ে গেছে।

* লেখাটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বিডিনিউজ২৪ মতামত-বিশ্লেষণ বিভাগে ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১১ , সেই লিঙ্ক এখানে আবার কিছু এডিট করার করে এখানে ছাপানো হলো।