উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

Advertisements

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

গৌতম দাস

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

http://wp.me/p1sCvy-2hx

 

গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

[প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

যখন সাফাই নিজের অবস্থান আরো দুর্বল করে

যখন সাফাই নিজের অবস্থান আরো দুর্বল করে
গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1Zu

চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা হাঙ্গেরি সফর করে দেশে ফিরেছেন। সেখান থেকে ফিরে আসার পর জনগণকে সেই সফর প্রসঙ্গে অবহিত করতে এক সংবাদ সম্মেলনে ডেকেছিলেন। সেখানে বাড়তি প্রসঙ্গ হিসেবে অনেক কিছুই হাজির হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন কিভাবে করা হবে সে প্রসঙ্গও ছিল। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন কিভাবে হবে তা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অফিসে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সাংবাদিকেরা মূলত সেই প্রস্তাবের বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া বা অবস্থান জানতে চাইছিলেন। কিন্তু এতে তিনি যেভাবে এবং যে জবাবে এই প্রশ্নকে মোকাবেলা করেছেন তা জোরালো তো ছিলই না এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সাফাই না হয়ে এটা তাঁর বিপক্ষে গেছে বলে মনে করা যেতে পারে। আর সবচেয়ে কম করে বললেও তা কোন প্রধানমন্ত্রীর জন্য মানানসই হয়নি। আর একভাবে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তার জবাব কনস্টিটিউশনাল আইনের চোখে সিদ্ধ হচ্ছে কি না সে দিকটা একেবারেই বিবেচনায় নেননি, বরং তা আইনসিদ্ধ হোক আর না হোক ডোন্ট কেয়ার হয়ে কেবল রাজনীতির বাকচাতুর্য দিয়ে কথা সাজিয়েছেন। এক ধরণের সাফাই খাঁড়া করতে গিয়েছেন। পার হয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই সাফাই যথেষ্ট হয় নাই ও উপযুক্ত না হওয়ার কারণে তার অবস্থানের বিরাট এই দুর্বল দিকটাই প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

এখানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বক্তব্যগুলো প্রথম আলোয় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছিলেন ৩ ডিসেম্বর। প্রথম আলো অনলাইনে ৩ ও ৪ ডিসেম্বর এ বিষয়ে পরপর দুই দিন দুটা রিপোর্ট ছেপেছিল। এর মধ্যে ৪ ডিসেম্বরের রিপোর্টটাই সবিস্তারে। এখানকার সব কোটেশন প্রথম আলো ৪ ডিসেম্বরের রিপোর্ট থেকে নেয়া।

১. নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলছেন, “ওনার (মানে খালেদা জিয়ার) প্রস্তাব উনি দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে বলুক। এটা রাষ্ট্রপতি ভালো বুঝবেন উনি কী পদক্ষেপ নেবেন। রাষ্ট্রপতি যে পদক্ষেপ নেবেন; সেটাই হবে। এখানে আমাদের বলার কিছু নেই”। প্রথমত মনে রাখা দরকার নির্বাচন কমিশন কনষ্টিটিউশনে একটা স্টাটুটারী (statutory) প্রতিষ্ঠান। ধারণা হিসাবে ষ্টাটুটারী প্রতিষ্ঠান মানে যার নিয়ন্ত্রণকারী এবং রিপোর্টিং (জবাবদিহি) অফিস রাষ্ট্রপতির অফিস, নির্বাহী সরকার নয়। ফলে আমাদের নির্বাচন কমিশনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগের মানে নির্বাহী সরকারের অধীনে নয়, বরং সরাসরি রাষ্ট্রপতির অফিসের অধীনে। অর্থাৎ সার কথা হল, নির্বাচন কমিশন অফিসের কমিশনারদের নিয়োগকর্তা হলেন রাষ্ট্রপতি এবং তাদের জবাবদিহি করার বা রিপোর্টিং অফিস হল রাষ্ট্রপতির অফিস। প্রধানমন্ত্রীর অফিস নয়। কিন্তু আমাদের কনস্টিটিউশনে আবার অন্য এক আর্টিকেল আছে যেখানে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগদান বাদে বাকি সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই পরিচালিত হবেন। এই বলে রাষ্ট্রপতির উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে রাখা আছে। এই কারণে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগদান বাদে  রাষ্ট্রপতির তৎপরতার সবকিছু বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নিজের বিবেচনা প্রয়োগ করে কিছুই নির্ধারণ করতে অপারগ। ফলে সবকিছুই সরকার বা সরকারপ্রধান দ্বারাই নির্ধারিত হয়ে থাকে। ব্যবহারিক দিক থেকে বললে, প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে পাঠানো পরামর্শ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি একমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। অতএব প্রধানমন্ত্রীর এই জবাবের কার্যত কোনো অর্থ নেই। ‘রাষ্ট্রপতি ভালো বুঝবেন, উনি কী পদক্ষেপ নেবেন’, এটা নিছক কথার কথা। কারণ এই ইস্যুতে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী যা পরামর্শ দেবেন রাষ্ট্রপতি সেই সিদ্ধান্তই নিতে কনষ্টিটিউশন আইনে বাধ্য। সোজা কথা আমাদের কনস্টিটিউশন অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনার বাইরে ভিন্নভাবে ভেবে দেখার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রপতির নেই।

২. নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে বিএনপির দেয়া প্রস্তাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিএনপি যে প্রস্তাব দিয়েছে আপনারা এর মাথা বা লেজের হদিস পেয়েছেন কি না, আমি জানি না। তিনি নির্বাচন করেননি, একটা দল হিসেবে বা দলের প্রধান হিসেবে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন থেকে বিরত থেকেছিলেন। এখন এত দিন পর ওনার টনক নড়ল। এরপর উনি মানুষ খুন করে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত করার আন্দোলন করলেন। যেকোনো প্রস্তাব দেয়ার আগে তার তো জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল”।
প্রথম আলো আরো লিখছে, ‘হত্যাকাণ্ড থেকে কোনো সম্প্রদায়ই রেহাই পাননি জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সাধারণ মানুষ, বাসের চালক, হেলপার, রেল, লঞ্চ, কোথায় না আঘাত করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়েছে, ইঞ্জিনিয়ারকে মেরেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ২০ জন সদস্যকে হত্যা করেছে। আগে সেই জবাবটা জাতির কাছে দিক। তারপর প্রস্তাব নিয়ে কথা হবে। তারপর তার প্রস্তাব নিয়ে কথা বলব।’

প্রথমত বিএনপি আগের নির্বাচন অংশ নেয় নাই। কিন্তু সেজন্য এবার নির্বাচন কমিশন গঠন কী করে হওয়া উচিত তা নিয়ে প্রস্তাব রাখতে পারবে না কিছু বলার সুযোগ, আইনী অধিকার নাই এমন ধারণার ভিত্তি নাই। একথা প্রধানমন্ত্রীর অজানা নয়। ফলে একথা তুলে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির উপর যে কালি লেপে দিতে চেষ্টা করেছেন সেটা ভুল। তাই তিনি তা করতে পারেন না। একইভাবে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের আইনগত ভুল বা সমস্যার দিক হল, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে বিএনপির সিদ্ধান্ত ভুল কি না আইনগত দিক থেকে নির্বাহী সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর সেটা বিবেচনায় নেয়ার কিছু নেই। এক্তিয়ার নাই। দ্বিতীয়ত, যদি এটা ভুল সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করা হয়ও, তবু সে কারণে নির্বাহী সরকারের এ নিয়ে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার আছে বলে জানা যায় না। এমনকি সে জন্য বিএনপির ‘জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত’ কি না তা নিয়ে আইনগত দিক থেকে সরকারের বলারও কিছু নেই। ফলে এটা প্রধানমন্ত্রীর প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু নয়। এ ছাড়া নির্বাচন বর্জন এবং তা করতে গিয়ে কোনো দল যদি কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স করে ফেলে, সে ক্ষেত্রে সরকার বড়জোর সুনির্দিষ্ট অপরাধকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে এবং আদালত (নির্বাহী সরকার নয়) এ ব্যাপারে আইনগত প্রক্রিয়ায় ওই অভিযোগের ইস্যু নিষ্পত্তি করবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গটা ব্যাখ্যা করছেন এভাবে বলে যে, আগে বিএনপি “জবাবটা জাতির কাছে দিক। তারপর তার প্রস্তাব নিয়ে কথা বলব”। প্রধানমন্ত্রী অন্য একটা দলের কাছে জবাব চাইবার কেউ নন। চাইতে পারেন না তিনি। কেউ তাকে জবাব চাইতে দায়িত্ব দেয় নাই। সেটা তিনি জানেন। তাই বলছেন, (তার কাছে না) তবে “জাতির কাছে জবাব দিক”।  প্রধানমন্ত্রী এভাবে বিষয়টা শর্তযুক্ত করলেন বটে- যে এটা দিলে সেটা দেয়া হবে- এ ধরনের করে; কিন্তু এমন করার এখতিয়ার তার আছে কি? আসলে কোনো নাগরিক কোনো ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে কি না সেটা বিচারের কোনো এখতিয়ার নির্বাহী সরকারের নেই। সরকার বড়জোর মামলা করতে পারে। আর আদালতে সে অভিযোগ পেশ করে সরকার প্রমাণের চেষ্টা করে যেতে পারে। কিন্তু সেটা কোনো অপরাধ হয়েছে কি না সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এক্তিয়ার একমাত্র আদালতের। এমনকি কোনো আদালতে যদি প্রমাণিত হয়ও যে, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করতে গিয়ে দলের কোন মেম্বার কেউ অপরাধ ঘটিয়েছে, কিন্তু তবুও সে জন্য দল হিসাবে বিএনপির নির্বাচন কমিশন সংস্কার করার বিষয়ে প্রস্তাব করার অধিকার খর্ব হয় না। অথবা জনগণের কাছে ‘ক্ষমা চাওয়া’র শর্ত পূরণ না হলে সরকার ওই প্রস্তাব বিবেচনা করবে না এটাই বলার এক্তিয়ার সরকারের নাই। আইনগত দিক থেকে এটা বলাও সরকারপ্রধানের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। বরং উল্টাটা, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে মাফ চাইলে তবেই সুষ্ঠু নির্বাচনের পদক্ষেপ নেয়া হবে- সরকারের অবস্থান যেন এমনটাই হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী যেন বলতে চাইছেন, বিএনপি জনগণের কাছে মাফ না চাইলে তিনি আগামি নির্বাচন সুষ্ঠ করার লক্ষে পদক্ষেপ নিবেন না – এমন হয়ে গেছে। আর তার চেয়েও বড় কথা এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যেন ইচ্ছাধারী এবং দাতা। যিনি শাস্তিও দিতে পারেন, আনুকুল্যের সুবিধাও দিতে পারেন। আর বিপরীতে বিরোধী সব দল তার দেয়া আনুকুল্য অথবা শাস্তি গ্রহীতা।
কথা হল, প্রধানমন্ত্রী এভাবে জবাব দিতে গেলেন কেন? এটা করা হল এ জন্য যে, এভাবে যুক্তি তুললে জনগণের চোখে বিএনপিকে ডিসক্রেডিট করা দেয়া যায়, হয়ত সেজন্য। সেটা ভেবে এমন বক্তব্য দেয়া হল। কিন্তু তাতে আসলে ঘটে গেছে ঠিক উল্টোটা। কারণ, আইনগত দিক থেকে প্রত্যেকটা কথা এখতিয়ারের বাইরে চলে গেছে। আর সরকারের দিক থেকে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হতে না দেয়ার পক্ষে তো মূলত কোনো যুক্তি চলে না। এরফলে ভাষ্যগুলো শুধু যে দুর্বল বলে হাজির হয়েছে তা-ই নয়; বরং উপযুক্ত সাফাই যে সরকারের হাতে নেই, এটাই প্রকট হয়ে গেছে।
এই বিষয়টা আরো এক নতুন সমস্যা সৃষ্টি করছে, তা হল – সরকারের স্ববিরোধিতা। যেমন সাধারণভাবে সরকার নিজেই নিজের ইমেজ বাড়ানোর লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ অন্তত লোক দেখানোর জন্য হলেও নিচ্ছে বলে দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। বিশেষত আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনের সময় থেকে এপর্যন্ত। যেমন আইনমন্ত্রী বলছেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, আইনবহির্ভূত হত্যা’। কিন্তু এটা নতুন স্ববিরোধিতা সৃষ্টি করছে। কারণ, এত দিন সরকার কোনো ‘আইনবহির্ভূত হত্যা’ দেশে ঘটছে না বা সরকার করছে না বলে পুরোপুরি অস্বীকারের মুডে ছিল। কিন্তু এখন ইমেজ বাড়বে মনে করে এই নতুন ভাষায় কথা বলাতে আসলে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়া হয়ে গেছে যে, “আইনবহির্ভূত হত্যা” হচ্ছে, ঘটছে। তাই এটা একটা বড় সমস্যা। ফলে, বিষয়টি যতটা স্বীকার করে নিচ্ছে ঠিক ততটাই সরকারের ইমেজ বাড়া দূরে থাক, উল্টো ইমেজ হারানো বা বদনাম হিসেবে হাজির হচ্ছে। অর্থাৎ স্বীকারোক্তিতে ইমেজ আরো কমছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু
সবশেষে এখন আরেকটি বিষয় আনব- রোহিঙ্গা ইস্যু। এটা অবশ্য ‘নির্বাচন কমিশন’ বা ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ ধরনের ইস্যু নয়। তবে এখানে মূলকথা হল, রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতন বিরাট মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। এটা বাংলাদেশের কমবেশি সব মানুষকে এক অসহায়বোধের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ফলে বার্মা বা মিয়ানমার সরকারের করা কাজের পক্ষে কোনো সাফাই আর কাজ করছে না। শুধু তা-ই নয়, আমাদের সরকারেরও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষের যুক্তিতে কোনো কাজ হচ্ছে না। ঐ একই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে একটা কথা বলে ফেলেছেন।
জানে মারা যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য, অন্তত একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য  রোহিঙ্গারা এখন পলায়নপর এবং মরিয়া হয়ে আশ্রয়প্রার্থী। এ অবস্থায় কোনো মানবিক আচরণ করা দূরে থাক, প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য মানবিক আচরণ না করার পক্ষে সাফাই দেয়া হয়ে গেছে। যেমন, প্রথম আলো লিখছে, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। সে দেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকেছে। বিজিবি সতর্ক আছে। কিছু মানুষ এলে মানবিক দিক বিবেচনা করে আশ্রয় না দিয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু যারা এর জন্য দায়ী, ৯ জনকে হত্যা করল, তারা কোথায় আছে? কী অবস্থায় আছে, ধরে দেয়া উচিত। তাদের জন্য হাজার হাজার মানুষ কষ্ট পাচ্ছে”। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, “তারা যদি আমাদের এদিকে এসে থাকে আমি ইন্টেলিজেন্সকে খবর দিয়েছি তাদের খুঁজে বের করার জন্য। কেউ যদি শেল্টার নিতে আসে দেবো না, তাদের মিয়ানমারের হাতে তুলে দেবো”।

অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়, তিনি বার্মা সরকারের সাফাই বয়ানটাই নিজের বয়ান মনে করছেন। যেমন, বার্মা সরকারের দাবি হল, বার্মা সরকারের হত্যা ও আক্রমণের মুখে মরিয়া হয়ে কথিত কিছু রোহিঙ্গা প্রতিরোধ করতে গিয়ে ৯ জন পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোককে হত্যা করে ফেলেছে। কাজেই বার্মা সরকারের এখন যে গণহারে রোহিঙ্গা গণহত্যা করছেন, এর জন্য বার্মা সরকার দায়ী নয়। বরং ওই প্রতিরোধকারীরাই দায়ী। সব দোষ তাদের। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে হবে। বার্মিজ সরকার গণহত্যা করছে কথাটা ঠিক। কিন্তু তারা সে জন্য দায়ী নয়। দায়ী ওই রোহিঙ্গা প্রতিরোধকারীরা, যারা ৯ জন পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোককে হত্যা করেছে। এই বক্তব্য বয়ান খুবই খুবই বিপদজনক। এর মানে হবে, পাকিস্তানের গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ করতে আমরা গিয়েছিলাম। ফলে এভাবেই কী আমরা আমাদের নিজেদের এক কোটি লোক উদ্বাস্তু হওয়ার, নিজেদের মানুষ রেপ আর আর হত্যা হওয়ার জন্য দায়ী? এই বয়ান কী আমরা গ্রহণ করতে রাজী হব!

আসলে এসব বক্তব্য আর অবস্থান নিতে গিয়ে সরকার নিজের কাজ ও আচরণের পক্ষে কোনো সাফাই সৃষ্টি করতে পারছে না, বরং যতই ভাল ইমেজ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছে ততই আর বেশি করে ইমেজ হারিয়ে ফেলছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ১২ ডিসেম্বর ২০১৬ (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে সে লেখা আরও ঘষামাজা আর এডিট করে আবার ছাপা হল।]