ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

 ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

গৌতম দাস

 ০২ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2TE

 

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যুবায়ের – রয়টার্স

দিল্লির ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকান্ড ভারত-রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। রাষ্ট্র ‘ভেঙে পড়া’ মানে অকার্যকর হয়ে পড়া বা টুকরো হয়ে যাওয়া। সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন মানে, সিএএ’র বিরোধিতা আর দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় হার এসবের বদলা-প্রতিশোধ নিতে মোদী-অমিত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।  দিল্লি জ্বলছে, ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৪২ জন এই জিঘাংসার বলি।

বৈষম্য বা রাগবিরাগের প্রধানমন্ত্রী মোদী
মোদী-অমিতের মনে কী আছে তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবার। ভারত-রাষ্ট্রের মুখ্য দায়ীত্বে থাকা ব্যক্তিদুজন যে কতটা নৃশংস হয়ে উঠতে পারে সেটা এখন প্রমাণসহ হাজির হয়ে গেছে।  যেমনঃ জেলা শহরের ছোট এক হাসপাতাল [Al Hind Hospital, a nursing home] থেকে কয়েকজন মুসলমান রোগীকে আরও চিকিৎসার প্রয়োজনে বড় হাসপাতালে [GTB বা Guru Tegh Bahadur Hospital ] স্থানান্তর করতে পুলিশ প্রটেকশনের অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে দরখাস্ত দেয়া হয়েছিল। পুলিশ তা সন্ধ্যা পর্যন্ত করেনি। এ দিকে বিবিসির এক ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, রোগী বহনরত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের ওপর হামলা করা হয়েছে। রড দিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে আর এক মেডিক্যাল কর্মী আবেদন করে বলছে – “এটা তো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। তাই হিন্দু-মুসলমান যেই হোক সবার প্রয়োজনে আমাদের সাড়া দিতে হবেই। কাজেই আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার তো কিছু নেই”।
এসব বিবেচনা করেই রোগীর আত্মীয়স্বজনরা উকিলের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর দিল্লি রাজ্য-হাইকোর্টের  প্রধান বিচারপতি এস মুরলীধর [ঐ মামলার পর এখন বদলি করে দেয়া হয়েছে] এর সাথে যোগাযোগ করেন। বিচারক তৎক্ষণাৎ আদালত বসানোর ব্যবস্থা করে রিট আবেদন শুনে এর নিষ্পত্তি করে পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে সহযোগিতা করার আদেশ দেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঐ বিচারককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার হাহকোর্টে বদলি করে দিতে, পেন্ডিং এক বদলির আদেশ চাঙ্গা করে আর প্রেসিডেন্ট কোবিন্দ তাতে সই করেছেন। আর তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করতে নির্দেশ জারি হয়েছে। পরদিন মোদীর এক মন্ত্রী এ ঘটনায় সাফাই দিয়ে বলেছেন, এটা রুটিন বদলি।
মোটেও তা নয়। বরং মোদী সরকারই প্রধান দোষী। অসুস্থতার চিকিৎসায় মানবিক কারণেই রোগীকে সরকারের আগ বাড়িয়ে সহায়তা দেয়া উচিত ছিল। এটা ছাড়াও, নাগরিকের চিকিৎসাকাজে সহায়তা পাওয়া, রোগী মুসলমান হন আর না হন তা রোগীর নাগরিক অধিকার। অথচ তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, মূলত মুসলমান বলে। এভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়েছে। একজন বিচারপতি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক আদেশ দিয়েছেন। অথচ সরকার তাকেই বদলি করে দিয়েছে।
অনুমান করি, আসলে মোদী সরকার ভয় পেয়েছে যে সরকারের বিরুদ্ধে এই বিচারক মুরলীধর এর এমন আদেশ দেয়া চালু রাখলে অমিত শাহের দিল্লির পুলিশের প্রটেকশনে মুসলমানদের উপর হামলার বিরুদ্ধে সবাই দলে দলে ঐ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া শুরু করতে  পারে। কারণ ইতোমধ্যে ঐ রাতেই ঐ একই আদালত আরো দু’টি রিট মামলার নিষ্পত্তি করে রায় দেন। সে কারণেই সকালে যেন ঐ বিচারক আর আদালত বসাতে না পারেন, সে ব্যবস্থাটাই বন্ধ করে দিয়েছে মোদী সরকার। সারা দুনিয়ার অধিকার প্রসঙ্গে সংবেদনশীল কোনো প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের নাগরিক বৈষম্য ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নেয়ার করা চিন্তাই করতে পারে না। অথচ মোদী-অমিত নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা ও নাগরিককে নিরাপত্তাদানের জন্য শপথ নিয়েও তা ভঙ্গের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কেন? এটাই তাদের মন যে রিরি করা ঘৃণায় পরিপুর্ণ হয়ে আছে এরই প্রমাণ।
অমিত-মোদী এখানেই থামেন নাই।  তারা বিচারক মুরলীধরের সিদ্ধান্ত ক্ষুব্ধ হয়ে তাতে আরও বাধা সৃষ্টি করেছেন। হাসপাতালে পৌছানোর পথে পুলিশ বসিয়ে আবার বাধা দিয়েছে। আর এর শক্ত প্রমাণ এর হল দুটা ভিডিও ক্লিপ যা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে আছে।  আর বড় হাসপাতালে [GTB] রোগীদের সাথে যেতে আলহিন্দ হাসপাতাল থেকে আসার সময় একজন ডেন্টিস্ট ডাক্তার তাদের সবাইকে এসকর্ট করে সাথে আসছিল। সে ডাক্তারের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষ্যের বর্ণনা ইংরাজি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়  পয়লা মে “Eyewitness account: Delhi Police beat up wounded riot victims, said if he dies, he dies’ ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছে। তাতে ঐ ডাক্তার [তাঁর নাম, ডাঃ মেরাজ বিন একরাম] ঘোষণা দিয়েছেন তাঁকে যদি আবার সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়া হয় তবে যেকোন পরিণতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। [Ekram added: “This is the truth. If I have to face consequences for telling the truth, I will.”]।

বাংলাদেশে যেমন ফেক বা ভুয়া নিউজ চেক করে সত্যতা যাচাই করার ওয়েব গ্রুপ আছে “ফ্যাক্ট চেক” [Fact Check] নামে; সেরকম ভারতের একটা গ্রুপের নাম অল্ট. নিউজ [Alt.News]। তারা আরও একটা প্রায় একই রকম ভিডিও দেখে বিচার করে নিশ্চিত করে দিয়েছে যে ভাইরাল হওয়া আগের ক্লিপটা ফেক নয়, বরং জেনুইন। ইংরাজী টেলিগ্রাফ পত্রিকা  আরও জানিয়েছে,  তারা পুলিশের মুখপাত্রকে এনিয়ে করা ফোনের বা টেক্স ম্যাসেজের কোন সাড়া তিনি দেয় নাই।  আসলে পুলিশের গ্রুপ যেটা রোগীদের হাসপাতালের পৌছানোর পথে এই গুন্ডামি – অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী বা অজ্ঞান রোগীকে আবারও রড দিয়ে পিটিয়ে জাতীয় সঙ্গিত গাইতে বাধ্য করা ইত্যাদির ন্যুইসেন্স করছিল  সেটা ছিল একটা হাইরাইজ আবাসিক বিল্ডিং এর নিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আর ঐ বিল্ডিংয়ের দুই বাসিন্দাই উপর থেকে মোবাইলে ঐ ভিডিও ধারণ করেছিল।  তাই, পুলিশের কাছে এর সেখবরই ছিল না। সে কারণে এই অকাট্য প্রমাণ রয়ে গেছে।
এই ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সাথে থাকায় শুধু দিল্লি পুলিশের প্রধানই নয়,  এই মারাত্মক অপরাধের সাথে কমিশনার ও পুলিশ প্রধানের সরাসরি বস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শাহের বস প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ জড়িত সকলের নাম জড়িয়ে গেছে এখন। অথচ নাগরিক বৈষম্য দূর করা রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্রসহ যেকোন রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য ও রাষ্ট্রবৈশিষ্ট্য। ঘটেছে উলটা – বৈষম্য করা বা রাগবিরাগের বশবর্তী হয়ে পরিচালিত হওয়ার অপরাধ করে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের মন্ত্রী। এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ও অকার্যকর হয়ে পড়ার আগের লক্ষণ।

এটা দাঙ্গা নয়, পরিকল্পিত ম্যাসাকার
লক্ষণীয় যে, দিল্লির এই ম্যাসাকারগুলো হয়েছে গত দিল্লি নির্বাচনে হাতেগোনা যে ক’টা আসনে বিজেপির প্রার্থীরা জিতেছে কেবল এমন কনস্টিটুয়েন্সিতে। তবুও দিল্লিতে এই ম্যাসাকার, এটা কোনো দাঙ্গা ছিল না। এটা ছিল একপক্ষীয়ভাবে মুসলমানদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন করে জিঘাংসা চরিতার্থ করা, যাতে তারা ভয়ে চুপ করে আরও মার্জিনাল হয়ে বসবাস করতে শুরু করতে বাধ্য হয়, মেনে নেয়। এনিয়ে আনন্দবাজারের এক রিপোর্টের শিরোনাম, – “গুজরাতের মতো দাওয়াই না দিলে চলবে না! শাসানি দিল্লিতে”। অর্থাৎ এটা ছিল গুজরাট স্টাইলে দাওয়াই – দাবড়ে দেয়া!
আগেও বলেছি, প্রশাসনিক কাঠামো হিসাবে  দিল্লি একটা রাজ্য হলেও এটা আবার ভারতের রাজধানী বলে কনস্টিটিউশন অনুসারে দিল্লির পুলিশ প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। তাই  অন্যসব রাজ্যে তাদের মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে রাজ্য পুলিশ প্রশাসন থাকলেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিলালের অধীনে কোন পুলিশই নাই। এটাকেই সুযোগ হিসাবে নিয়ে সদ্য দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় হেরে গেলেও এই অমিত শাহ দিল্লির ওপর ছড়ি ঘুরাতে, ম্যাসাকার করতেই বেছে নিয়েছিলেন এক পুলিশ প্রধান হিসাবে, কমিশনার ‘অমূল্য পট্টনায়েককে’। উনি ইতোমধ্যে রিটায়ার্ড অথচ তাকে এক মাসের এক্সটেনশন দিয়ে অ্যাকটিভ করে দিল্লির পুলিশ কমিশনার করে রেখে দেয়া হয়েছে, কুকামগুলো সম্পন্ন করে নেয়ার জন্য। ইতোমধ্যে তিনি অবসরে চলে যাওয়াতে এখন ঘটনার দায় ঢাকতে সুবিধা হবে – এই হল অমিত শাহের অনুমান।  কয়েক দিন আগে কাপড়ে মুখ ঢেকে জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে [JNU] (ও জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও) একইভাবে পুলিশের প্রটেকশনে বিজেপির কর্মীদের হলে ঢুকতে দিয়ে, সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে এই পট্টনায়েকই হামলা করিয়েছেন বিজেপিবিরোধী ছাত্র সংসদের সদস্যদের ওপর। হামলা সম্পন্ন করার পর পুলিশি প্রটেকশনে হামলাকারি বিজেপির ছাত্র সংগঠনের কর্মিদের বের হয়ে চলে যেতে দেন। এরপর রাস্তার বাতি ফিরে জ্বালিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল।
দিল্লির চলতি ম্যাসাকারের বেলাতেও এই কমিশনারের পুলিশি প্রটেকশনে বিজেপি-বজরং-হিন্দুসেনা কর্মিদেরকে নিরাপত্তা এসকর্ট দিয়ে এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাদের দিয়ে বেছে কেবল মুসলমানদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা নির্যাতন আর তাদের বাড়িঘর, সম্পত্তি লুটপাট ও জ্বালিয়ে দেয়ার তাণ্ডব ঘটিয়েছেন তিনি। দিল্লিতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে যেসব ও যে পরিমাণ উপাদান বা অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখে এক পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, এগুলো সংগ্রহ করতে কমপক্ষে দু’সপ্তাহের প্রস্তুতি লেগেছিল। অর্থাৎ এটা একটা পরিকল্পিত হামলা।

গঙ্গাজল
নৃশংসতা নিয়ে ভারতের বিহারের একজন প্রযোজক-পরিচালক একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন – নাম ‘গঙ্গাজল’। সেখানে ‘গঙ্গাজল’ বলতে এসিড বুঝানো হয়েছিল। মানে, নৃশংসতা হিসেবে জীবন্ত মানুষের চোখ এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া। দিল্লির হামলাতেও বিজেপির কৌশল ছিল ‘গঙ্গাজলের’। এ পর্যন্ত অন্তত চারজন নিরীহ মুসলমানকে হাসপাতালে কাতরানো অবস্থায় পাওয়া গেছে, যারা এখনো বেঁচে আছেন কিন্তু তাদের চোখ এসিড ঢেলে গলিয়ে দেয়া হয়েছে। ভিন্ন ঘটনায়, এসিডসহ এর বহনকারী চার বজরং কর্মীও আটক হয়েছে যারা সিএনজিতে চড়ে যাচ্ছিল [অটোর ভিতর থেকে অ্যাসিডের বোতল-সহ আটক করা হয়েছে চার যুবককে]

আশ্রয় ও নিরাপত্তার খোঁজে – আনন্দবাজার

এদিকে প্রায় সপ্তাহজুড়ে হামলা শেষে দিল্লিতে এখন শুরু হয়েছে মাইগ্রেশন। মুসলমানেরা বাড়িঘর ছেড়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পরিবার নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন শহরের পাড়া বা কনস্টিটুয়েন্সিতে বন্ধু-আত্মীয়ের বাসা খুঁজে ফিরছে।
এসিড হামলা নিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে এক লোমহর্ষক রিপোর্টঃ

“…আর একটি উদ্বেগজনক বিষয়, মুস্তাফাবাদ থেকে আজ বেশ কিছু আহত এসেছেন হাসপাতালে। তাঁদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন। খুরশিদ নামে এক জনের দু’চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তেগ বাহাদুর হাসপাতাল থেকে লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালে আসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও পাননি তিনি। গিয়েছেন রিকশায়। দুই চোখ-সহ পুরো মুখ ঝলসে গিয়েছে ওয়কিলের। …এটা স্পষ্ট, আগুন লাগানো, পাথরবাজি, গুলির সঙ্গে ‘গঙ্গাজল (অ্যাসিড)’-এরও আয়োজন করা হয়েছে রীতিমতো  আট ঘাট বেঁধে।”

আবার অমিত শাহের কৌশল ইতরামিতে এতই প্রখর যে আগেভাগেই আদালতে  মোদীর সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা … দিল্লি হাইকোর্টকে জানিয়েছেন, “পুলিশকে নাকি অ্যাসিড হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে”। মানে আগেই হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন তিনি।

মোদী-অমিত বিপদঃ
পাবলিকের উপস্থিতি যেখানে মদী-অমিতকে চেহারা দেখাতেই হয় সেসব কিছু এড়িয়ে পালিয়ে ফিরছে মোদী-অমিতও।  এই সময়টা মোদী-অমিত বিরাট বিপদের সুতার উপরে হাঁটছেন। ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বাড়ছে দেখে মোদী-অমিত ভয়ও পেয়েছেন মনে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর ছিল ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাও ২৪ তারিখটা সরাসরি গুজরাটে নেমেই। আর ২৫ তারিখটা তিনি ছিলেন দিল্লিতে রাতে ডিনার শেষ করা পর্যন্ত। কিন্তু এটা আর এখন লুকানোর কোনো সুযোগ নেই যে, অমিত শাহ পরিকল্পিত হামলা শুরু করিয়েছিলেন নিজ দলের কপিল মিশ্রকে সামনে রেখে। মিশ্র বড় প্রভাবশালী নেতা হওয়ার উচ্চাকাক্ষী হলেও এবারের দিল্লি নির্বাচনে পরাজিত এক রাজ্য এমএলএ। অমিত শাহ  নিজেকে সুরক্ষিত ও আড়ালে রাখতে তাই কপিলের মুখ দিয়ে বলিয়েই প্রত্যক্ষ হামলার হুমকি দেয়ার বে-আইনি  কাজটা করিয়েছেন।
উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদে, যেটা মূল হামলার কেন্দ্র, সেখানে শাহীনবাগের মতই এক অবস্থান ঘর্মঘট চলছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে সাথে নিয়ে কপিল ২৪ তারিখে এখানে এসে অন ক্যামেরায় হুমকি দেন যে, “পুলিশ এই স্থানীয় অবস্থান সমাবেশ ভেঙে না দিলে তিনি নিজে ট্রাম্পের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করতে পারেন। তিনি এটা ভেঙে দেবেন”। এই হুমকির ভিডিও ক্লিপ এখন  ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এরপর সে রাতেই ঐ সমাবেশের আশপাশে তিনি এক ট্রাক পাথর আনলোড করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে এই পাথর দিয়েই হামলা শুরু হয়েছিল। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া আর পুলিশের উপস্থিতিতে এই হুমকি দেয়া স্পষ্টতই কপিল মিশ্রের করা একটি ক্রিমিনাল অফেন্স।
অথচ প্রকাশ্যে এই ঘোষণা না দিয়েও বিজেপি একই হামলা ও ম্যাসাকার তো করতে পারত। তাহলে ঘোষণা দিয়ে করার মানে কী? তা হল- আমিই (বিজেপি) ক্ষমতা- এই দম্ভ দেখানো; যাতে হামলা খেয়ে ভয়ে মুসলমানেরা এই ক্ষমতার কাছেই নতজানু হওয়া লুটিয়ে পড়া উপায়হীন শ্রেয়কাজ মনে করে। একইভাবে গত নির্বাচনের সময় অমিত শাহ এই কপিলকে দিয়েই মুসলমানরা ‘দেশদ্রোহী’, তাদের ‘গোলি মারো’ বলে স্টেজ থেকে বিবৃতি পড়ে শুনিয়েছিল। অমিতের ধারণা এই হুঙ্কার দেয়ার কাজটা তিনি নিজে না করে কপিলকে দিয়ে করালে তিনি কপিলকেও প্রটেক্ট করতে পারবেন আর নিজেকেও হুকুমদাতা সংগঠক মূল নেতা হয়েও আড়ালে রাখতে পারবেন। কিন্তু বিপরীতে, নিজে করলে আদালতে প্রমাণসহ দায়ী বলে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আর তাতে বলা যায় না, মোদীও অমিতের সাথে সহমরণ থেকে সেক্ষেত্রে সম্ভবত খুব বেশি দূরে থাকতে পারবেন না। এসব বিবেচনা থেকেই মোদী ও অমিত দিল্লির হামলা ইস্যুতে পাবলিক এড়িয়ে চলা বা কোন ঘরোয়া সমাবেশে সামনে নিজেরা মুখ খোলা এড়িয়ে যেতেই ‘কপিল মিশ্র’ ধরনের উচ্চাকাঙ্খী লোকদের সামনে আনছেন।

মানুষের অসহায়ত্ব আর হতাশা – গার্ডিয়ান

এদিকে ম্যাসাকারের চতুর্থ দিনেও মোদী (বা অমিত) মুখ না খুললেও ম্যাসাকার বেশি হয়ে গেছে কি না এই ভীতি থেকে মোদী ঐদিন প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে দিল্লির ‘স্বরাষ্ট্র ইস্যু’ দেখতে দায়িত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু প্রথম আট-দশ ঘণ্টা দোভাল প্রকাশ করেননি  ঠিক কী পরিচয়ে তিনি দিল্লিতে তদারকি কাজে নেমেছেন। ইতোমধ্যে  মিডিয়ায় জল্পনা রিপোর্ট প্রকাশ হয়ে যায় যে, তবে কি এটা ” দিল্লি পুলিশের দায়ীত্বে থাকা মন্ত্রী অমিতের উপর মোদীর অনাস্থার প্রকাশ”? এই জল্পনা আরো বাড়িয়ে দেয় সে সময় সোনিয়া গান্ধীর এক প্রেস কনফারেন্স। তিনি দাবি করেন, দিল্লি্কে রক্ষার ব্যর্থতায় অমিতকে পদত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার সারা দিন ড: মনমোহন সিং অমিতের পদত্যাগ দাবি করেছেন সেটা ভারতের টিভিগুলোর টেলপে স্ক্রল করে দেখিয়ে গেছে। ওদিকে দোভালের বিপদ হল, প্রেসকে যদি বলেন মোদী তাকে পাঠিয়েছেন তাহলে প্রশ্ন উঠবে, অমিত শাহ কি ব্যর্থ? তাই তিনি বলে বসেছেন যে, না অমিত শাহও তাকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কিছু ঢাকা পড়ে নাই।
কিন্তু দোভালের দিল্লির দায়িত্ব নেয়া বা পাওয়া, এটা আবার তাঁর পদ-পদবির দিক থেকেও মিলে না। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাগিরি করা মূলত বহিঃরাষ্ট্রবিষয়ক কাজ অথবা বড়জোর ‘র’সহ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি পর্যন্ত। কিন্তু ভারতের কোন ধরণের সশস্ত্র  “বাহিনীর বা ফোর্সের” উপর কমান্ড করা তার কাজ নয়। কাজেই দিল্লি পুলিশের তাঁর উপর মাতব্বরির দায় নেয়া কাজটা মিলে না। এছাড়া হামলাকারির মূলনেতা অমিত নিজেই যদি দোভালকে এখন সেই হামলা ঠেকাতে পাঠায় তবে এই পরস্পরবিরোধী একই অমিতের মনের কারণে দোভালের কাজে এর ছাপ পড়ারই কথা। যেমন দিল্লির অলিগলিতে একটা বাচ্চা মেয়ের অভিযোগে তিনি বলে বসেন ‘‘যো হো গ্যায়া হো গ্যায়া।… আর এনিয়ে মিডিয়ায় সোরগোল এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলা পুলিশের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মুখে মানায় না।। আসলেই তাই। পুলিশ বলবে আমরা তাকে গ্রেফতার করে আদালতে তুলব – এমন একশনের কথাই হতে হয় পুলিশের কথা।
সম্ভবত এসব বিবেচনায় মোদী-অমিত এক কানপড়া রিপোর্ট ছাপিয়েছেন দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় “বেনামি সূত্র” থেকে  পাওয়া খবর বলে। দাবি করা হয়েছে ‘ট্রাম্পকে বিদায় দেয়ার পর থেকে মোদী নাকি খুবই আপসেট। মোদী মনে করছেন, দেশে-বিদেশে তার ইমেজ ইজ্জত গেছে।’ [ Upset with how the Hindu-Muslim riots in Northeast Delhi overshadowed the visit of US President Donald Trump to India, Prime Minister Narendra Modi ]  গোপন সুত্রের এই দাবির সত্য-মিথ্যা যতটুকুই হোক মোদী-অমিতের এখন উভয় সঙ্কট হল, প্রকাশ্যে দিল্লি ম্যাসাকার ইস্যুতে মিডিয়ার সামনে মুখ খুললেই সরাসরি এর দায় তাঁদের ওপর এসে পড়বেই। কারণ দিল্লি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং দিল্লি পুলিশের বস হলেন অমিত। বলতে গেলে এর দায়িত্ব মোদীর মন্ত্রীসভার। সে জন্য মিডিয়া এড়িয়ে চুপ করে চলতে চাইছেন মোদী-অমিত দু’জনই। এজন্য  দোভালকে দিল্লি পাঠিয়েই দিল্লির অলি-গলিতে দোভাল যাচ্ছেন এর লাইভ ছবি টিভিতে ব্যাপক প্রচার করা হয়েছে। আর  এতে দেখাতে চেয়েছেন মোদী-অমিত অনেক ব্যস্ত মানুষ তাই অজিত দোভালকে পাঠিয়ে ঠিকই খবরাখবর নিচ্ছেন। কিন্তু এর আবার বিপদ হল, বাজারের মোদী-অমিতবিরোধী যেসব বয়ান বা কানাঘুষা চলছে এর বিরুদ্ধে মোদী-অমিত নিজের বয়ান ও গল্প ঠিকঠাক তাঁরা নিজে পাবলিকলি হাজির থেকে তা প্রকাশ করে পালটা সুযোগ নিতে পারছেন না।

মোদী-অমিতের পিছনে টিকটিক করা অন্য বিপদ – আদালতঃ
অন্য দিকে, এই মুহূর্তে মোদী-অমিতের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিপদ হল – আদালত।  ভিকটিম ও ক্ষতিগ্রস্থরা যতজন আদালত পর্যন্ত পৌছাতে পারবেন, প্রতিকার চাইবেন – সেটা কেবল শুধু মোদী-অমিত নয় আদালতের জন্যও যথেষ্ট পরীক্ষার। আদালতকে মোদী-অমিতের বিরুদ্ধে একশনে যাবার  তাকত দেখাতে হবে এই চাপ বাড়তেই থাকবে। সেটা আদালত এড়াবে কী করে? আদালত না চাইলেও এটা  যেকোন সময় যেকোন দিকে টার্ণ নিতে পারে।  তবে যেভাবে চাপ বাড়ছে সেটা অবশ্যই সব পক্ষের জন্য খুবই বিপদের ইঙ্গিত।  ইতোমধ্যে কপিল মিশ্রসহ অন্তত চারজন বিজেপির  ফেল করা বা প্রাক্তন এমএলএ-এর বিরুদ্ধে গত নির্বাচনী আইনভঙ্গের অভিযোগে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল এরই পুর্ণাঙ্গ মামলায় মামলা রুজু [FIR] করার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি ছেড়েছেন দিল্লির সাবেক প্রধান বিচারপতি মুরলীধর। তাতে ইতোমধ্যে মামলা রুজু করাও হয়ে গেছে। এবার যদি আরও উপরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো রিট হয়ে যায়? এসব নিয়ে মোদী-অমিত চিন্তিত। তাই আদালতের ওপর  মোদী-অমিত নিজেদের লোকের মাধ্যমে প্রচণ্ড পাল্টা চাপ সৃষ্টি ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে চলেছেন।

তাহলে কি মোদী-অমিত হেরে যেতে পারেন? পাবলিক রিয়াকশনের চাপ তীব্র হলে অবশ্যই হতে পারেন এবং তা খুবই সহজে। মিডিয়া যে চাপটা বাডাতে বড় ভুমিকা রাখছে। এমনকি এর সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও তা খুবই বিপদের হবে ।  এখানে পরিস্কার করে একটা কথা বলে ও জেনে রাখতে হবে আমাদের।  এখানেই ভারত-রাষ্ট্র ভাঙনের উভয় সঙ্কটে। কারণ যে ম্যাসাকার ঘটে গেছে এতেই রাষ্ট্রের ভাঙন আরও নিশ্চিত করে গেছে। এখন আদালত যদি নুন্যতম প্রতিকারও না দেখায়, মোদী-অমিতের প্রভাবে বা ভয়ে ভীত হয়ে তাদেরকে মাফ করে দেয়, পালানোর সুযোগ করে দেয়;  তবে, এর সোজা মানে হবে আদালতও রাষ্ট্রকে ভাঙনের পথে আগানোকে আরও সহযোগিতা করল। এটাকে দ্রুত করে দিল। আবার যদি নুন্যতম কিছু একশন নেয় সেটাই মোদী-অমিতকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলবে। আর তাতেও ভারত ভাঙ্গন আগাবে। কারণ বিকল্প শক্তি নাই, তৈরি নাই বা হয়নি। যদিও গুজরাট ২০০২ সালের ম্যসাকারের অভিজ্ঞতা বলছে অনেক কষ্ট করে হলেও মোদী-অমিত নিজেদেরকে গুজরাটের মামলাগুলো থেকে শেষে মুক্ত করে ফেলেছেন। কাজেই এবারও পারবে না কেন?। কিন্তু অনেকে এখানে পালটা বলবেন মোদী-অমিত এখন আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়ীত্বে না। এখন তারা কেন্দ্রের সরকারের দায়ীত্বে। অতএব এর ওজন বেশি, সংশিষ্ট বিপরীত স্বার্থের পক্ষগুলো ও তাদের স্টেকও অনেক বেশি। কাজেই এবার একই রকমভাবে ঘটনা শেষে হবে না। না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি হয়ত।

ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়াঃ
সারকথাটা হল, আদালত মোদী-অমিতের কোন অপরাধ আমল ও শাস্তির ব্যবস্থা না করতে পারলেও ভারতের ভাঙন তীব্রভা বাড়বে। তবে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারলেও ভাঙন বন্ধ হবে না যদিও ভাঙ্গার তীব্রতা কমতে পারে। আসলে, একা আদালত ভারতের ভাঙন ঠেকাতে পারবে না। এছাড়া আরও  সবচেয়ে বড় পক্ষ বা ফ্যাক্টর হল অন্য বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বা দলের অনুপস্থিতির কারণে ভাঙনের সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন সিএএ ইস্যুতে এখনও এটা কোন বিকল্প রাজনৈতিক দলের  আন্দোলন নয়।  এটা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক তরুণ মধ্যবিত্ত আর তাদের সহযোগী হল সরাসরি ভিকটিম মুসলমানেরা। (এর বিপরীতে মোদীর পক্ষে তরুণদের আরেক অংশ – মুলত “মফস্বলের তরুণেরা” এরাই বজরং দলসহ বিভিন্ন নামের সেনা এমন বিজেপির অঙ্গ দলগুলোর মুল শক্তি। এমনকি কপিল মিশ্র ধরণের উচ্চাকাঙ্খীদের বয়স লক্ষণীয়। )

এছাড়া একটু দূরে আর কমপ্লেক্স ভাবে আছে আসাম বা নর্থইস্ট রাজ্যগুলো। যারা ঠিক ছাত্র ও ভিকটিম মুসলমানদের মতই সিএএ-বিরোধী কিন্তু  একইভাবে ও কারণে মোদী-অমিতের বিরোধী নয়, তবে নিজেদের অবস্থান হিসাবে বিরোধী। অর্থাৎ বিজেপির এই বিকল্প বিরোধীদের পরিচয়ই বলে তারা কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে বা রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত কেউ নয়।

কংগ্রেস অথবা বিরোধী যেকোন আঞ্চলিক দল সিপিএম বা ডিএমকে, জনতাদল ধরণের যারা – এরা সকলেই মনে করে বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের ক্ষমতা পাওয়া যাবে কী করে সেদিক থেকে এই সাপেক্ষে বিজেপির বিরোধী সিএএ ইস্যুটাকে তাদের দেখতে হবে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস জোট করে তৃণমুলের মমতার  বিরুদ্ধে মাঠে নেমে গেছে। প্রকাশ্যেই বলছে এটা মোদী-মমতার বিরুদ্ধে একসাথে  আন্দোলন। এই জোটের জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি মিথ্যা করে হলেও তারা দেখাতে পারে যে মোদী-মমতার রাজনীতি বা লক্ষ্য এক। এই চেষ্টাটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের মুল কাজ মনে করে করে যাচ্ছে। কারণ আগামি বছর কলকাতার রাজ্য নির্বাচন, সেখানে মমতাকে ফেলানো  এটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের প্রধান লক্ষ্য।  মোদী-অমিতের প্রণীত সিএএ-এর বিরোধিতা এই জোটের কাছে এখানে তুলনায় কিছুই নয়। বড়জোর সেকেন্ডারি। এতে মোদী যদি ভারতকে মুসলমান শুণ্য করে ফেলেও দেয় তাতেও তাদের জোটের লক্ষ্য একই থাকবে। কারণ মোদীকে সরানো তাদের মুখ্য ইস্যু নয়, রাজ্যের ক্ষমতা পাওয়াই ইস্যু। এই একই অবস্থা কমবেশি সব আঞ্চলিক দলেরই।
আবার এসবেরই কিছু উস্কানিমূলক প্রভাব হয়ত আছে ভারতের মুসলমানদের উপর। তারাও সিএএ কে কেবল মুসলমানদের ইস্যু হিসাবে দেখার পক্ষপাতি। যাতে এটাকে কারণ দেখিয়ে সিএএ-বিরোধিতা কেবল মুসলমানদেরই বিরোধীতা হিসাবে তুলে ধরতে পারে।  মুসলমানেরা সিএএ-বিরোধী  ইস্যুতে এলায়েন্স করতে কম আগ্রহী।  মুসলমানেরা ঠিক নাগরিক হিসাবে সিএএ এর বিরোধী হওয়ার চেয়ে বরং মুসলমান হিসাবে এর বিরোধীতার আন্দোলন করতে চায়। মুসলমানেরাই কেবল মুসলমানদের কজে[cause] বা কারণে সোচ্চার হবে – এই রাজনীতি করতে চায়। এটা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতি । এই কৌশলের কারণে ভারতের মুসলমানেরা নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। মূল কারণ, বিজেপি এটাই চায়। মুসলমান হিসাবে মুসলমানেরা সংগঠিত হচ্ছে এটা দেখিয়েই তার হিন্দুদের সহজে  ভয় দেখিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে। বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি তো এটাই, ফলে তাদের ভোটের বাক্স ভরে তুলার কাজ সফল হবে বলে বিজেপির অনুমান।
অন্যদিকে ভারতে মোদীর ম্যাসাকারের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প ও সংগঠিত রাজনৈতিক দল নাই। কমন ইস্যুতে এলায়েন্স নাই।  রাজনৈতিক হবু শক্তি আছে, মানুষও আছে কিন্তু কাঠামো বা উপযোগী  রাজনীতি নাই। শক্তিজোট বা এলায়েন্স নাই। এজন্যই ভারত-রাষ্ট্রের ভাঙন অনিবার্য – তাতে তা ধীরে বা দ্রুত তা যাই হোক।  অথচ একেকটা অঞ্চলিক দলের কেবল রাজ্যকেন্দ্রিক ক্ষমতা পাবার পরিকল্পনা ও রাজনীতি আছে – এটাই তো ভারত ভেঙ্গে ফেলার পক্ষে কাজ করা। অর্থাৎ লড়াইটা আগাচ্ছে  “হিন্দুত্ব” বনাম রাজ্যক্ষমতা দখল – এদুই রাজনীতি; যেটা আসলে মূলত  ভারত ভাঙ্গনের সবচেয়ে বড় তোড়জোড় এক রাজনীতি! অবশ্যই এভাবেই এদিকেই তা যাচ্ছে!

ট্রাম্পের সফরঃ
অনেকে মনে করছেন ট্রাম্পের ভারত সফর সামগ্রিকভাবে মোদীর ম্যাসাকারের পক্ষে একটা আমেরিকান সমর্থন – এই ইমেজ সৃষ্টির আয়োজন করা। কিন্তু এই অনুমান ভিত্তিহীন; এমন মনে করার কারণ আছে। যদিও এমন ক্যাম্পেইন হয়, হতে পারে। এর আলাদা মুল্যও আছে।
ট্রাম্পের এই সফর ছিল মূলত আসন্ন নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে  কিছু সম্ভাব্য বাড়তি মাইলেজ পাওয়া যায় কিনা এরই এক প্রচেষ্টা এটা। যাতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রবাসীরা ট্রাম্পকে সমর্থন বা ভোট দিতে পারে। ঠিক মোদীর শেষ আমেরিকা সফরে “হাউডি মোদী” সমাবেশটা যেই লক্ষ্য হাসিলে আয়োজন করা হয়েছিল। আর বিপরীতে ট্রাম্পের সফরে মোদীর এখনকার লাভ হল যে,  মোদীর বিরুদ্ধে তার দেশের বিরোধীদের অভিযোগ যে, তিনি নানান বিতর্কিত আইন পাস করিয়ে বিদেশে ভারতের ইমেজ নষ্ট করেছেন, ভারতকে বন্ধুশূণ্য করে ফেলছেন ইত্যাদি – এসবের বিরুদ্ধে মোদীর সপক্ষে একটা ভালো জবাব হবে ট্রাম্পের এই সফর। দুই নেতার এমন পরস্পরের ব্যক্তিস্বার্থের, পরস্পর পরস্পরের পিঠচুলকে দেওয়ার – সেই সফর ছিল এটা। এ কারণে, হোয়াইট হাউজ থেকেই সফরের আগে ট্রাম্প নিজে এবং একজন স্টাফ অফিসার পরিষ্কার করে বলে রেখেছিলেন যে, এই সফরে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হবে না। আর প্রকাশ্য অভিযোগ এনেছিলেন যে,  ভারত  “ভাল আচরণ করে না”
এছাড়া ট্রাম্পের একটু ক্ষ্যাপা কথাবার্তাও অশ্যই ছিল।  এমনকি হোয়াইট হাউজের এই উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন যে  “ট্রাম্প ভারতে গিয়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার’ বিষয়টি জোরালো ভাবে তুলবেন। তাঁর কথায়,‘‘সব ধর্মকে সমান সম্মান দেওয়ার বিষয়টি ভারতের সংবিধানের অন্তর্গত। গোটা বিশ্ব এ ব্যাপারে ভারত কি করে সেদিকে তাকিয়ে আছে’’ ।

এছাড়া, ভারতে এসে পাবলিক বক্তৃতায় ট্রাম্প মোদীকে প্রশংসার ছলে বলতে গিয়ে মোদীবিরোধী স্বার্থগুলোও আড়াল থেকে বাইরে এনে ফেলেছিলেন।  যেমন “মোদী ভাল লোক কিন্তু খুব টাফ”। এই টাফ বলতে আসলে এটা মূলত উভয় দেশেরই লেনদেন বাণিজ্যে বাড়তি ট্যারিফ আরোপের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়াতে, সেব্যাপারে বলছিলেন মোদী টাফ। কিন্তু এই বাণিজ্যবিরোধ হাল্কা করার জন্য কোন পক্ষ থেকে  কোন কথাবার্তা চালানো এই সফরের কোনই লক্ষ্য ছিল না। সবকিছুই যেমন ছিল সেখানেই স্থবির হয়ে আছে তাই। এমনকি আমেরিকান নৌজাহাজ থেকে উড়তে পারে এমন হেলিকপ্টার কেনার কথাবার্তাও একইভাবে বিতর্কে স্থবির হয়েই আছে।

কিন্তু যেটা প্রথমে ট্রাম্প ছাড় দিতে চান নাই যে, মুসলমানদের উপর নিপীড়ন বেড়েছে এ নিয়ে “ভারতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলবেন ট্রাম্প” এমন শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল সফর শুরুর আগের দিন।  কেননা এর বহু আগেই আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’ সিএএ ইস্যুতে মোদীর কঠোর সমালোচনা করেছিল। নাগরিক বৈষম্য করার অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু মোদী ট্রাম্পের সফরের আগেই এমন মন্তব্য পেয়েই লবি শুরু করে দেন। শেষে মোদী একটি রফা করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সফরকালে এনিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কোন কথা হবে না। সেটাই বজায় রাখা হয়েছিল আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু শর্ত অনুসারে  ট্রাম্পের বিদায়ের পরের দিনই “দিল্লিতে বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে হামলা চালানো” হয়েছে বলে অভিযোগ করে বসেছে আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’।

ভারতীয় মিডিয়াঃ
মোদীর জাতিবাদী বা পাকিস্তানবিরোধী উস্কানির বিষয় না হলে ভারতীয় মিডিয়া এপর্যন্ত সময়ে সরকারের বিপক্ষে, সময়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এখন শেষবেলায় পুরোপুরি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তা মোদী-অমিতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এবং তাদের ‘ডুবিয়ে’ দেয়ার সামর্থ্য রাখে। এমনকি, আনন্দবাজার গ্রুপেরই ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ সবার আগে লিড নিয়েছে। ম্যাসাকারের দ্বিতীয় দিনেই সবার আগে তাদের মারাত্মক শিরোনামটা হল, “গুজরাটের মডেল দিল্লি পৌঁছিয়েছে তখন নিরো ডাইনিং-এ” [Neros dine as Gujarat Model reaches Delhi]।

রোম পুড়ছিল আর নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল- এর অনুকরণে বা সেটা মনে রেখে এই শিরোনাম। আর ডাইনিং মানে এখানে ঐ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেই  দিল্লিতে আরেকাংশে  চলছিল মোদী-ট্রাম্পের নৈশভোজ; সেটাকেই ইঙ্গিতে বুঝানো হয়েছিল।  বুঝানো হয়েছিল মোদী আর ট্রাম্প দুজনেই এখানে উদাসীন, দায়ীত্বজ্ঞানহীন – রোমের নিরো।  আবার গুজরাট বলতে এখানে এই মোদী-অমিত জুটিই ২০০২ সালে গুজরাটে রাজ্য সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় ২০০০ মুসলমানের হত্যা করিয়েছিলেন। তাই বলা হচ্ছে সেই গুজরাত মডেলের ম্যাসাকার দিল্লিতে এসে গেছে। টেলিগ্রাফের দেখাদেখি বহু পত্রিকাই পরের দিন একই লিড শিরোনামের রিপোর্ট করেছে। এ ছাড়া পরের দিনের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সরাসরিই লিখেছে ‘দিল্লির গণ-নৃশংসতার টার্গেট মুসলমানেরা’ [Express says Muslims target of mob violence in Delhi]।

আনন্দবাজার  পত্রিকাও ছবিতে চিনিয়ে দিয়ে দেখিয়েছিল কিভাবে লাঠি-রড হাতে হামলাকারী আর পুলিশ একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা সক্রিয় হয়ে হামলার পক্ষে কাজ ভুমিকা রাখছে। আর এমন সব রিপোর্টে  সকলেই দাবি করে বলেছে বা প্রমাণ দেখিয়েছে যে, “এই হামলা পুলিশের সহযোগিতায় ও প্রটেকশনে ঘটেছে”। ফলে মিডিয়ায় এই চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি ইনডিপেন্ডেন্ট অর্থে “স্বাধীন বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের কথাও” ফাঁক-ফোকরে উঠে আসছে। যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে “হেট ক্যাম্পেইন” বা মুসলমানের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য রাখা – এর ক্রাইম, এই অভিযোগ উঠেছে। তাই ২৮ ফেব্রুয়ারির দ্য প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় দিল্লি বিজেপি সভাপতির বরাতে এক রিপোর্ট করে বলা হয়েছে, বিজেপি দিল্লি সভাপতি মনোজ তিওয়ারি বলছেন, “কোন কোন বক্তব্য হেট ক্রাইম বা ঘৃণা-ছড়ানোর তা মূল্যায়ন ও চিহ্নিত করতে একটা স্বাধীন কমিশন দরকার”।

এসব কিছু মিলিয়েই ভারতের সরকারব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ার দিকে ধাপে ধাপে আগাচ্ছে!

 লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে ভারত রাষ্ট্র কোন দিকে আরো আগাল – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

 

প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব 

ভারতে হচ্ছেটা কী?
প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব!

গৌতম দাস

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Tr

 

‘Are you Hindu or Muslim?’: TOI photojournalist

সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু কেউ আমল করে নাই। সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
ঘটনা হল, টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিউটিরত এক ফটোসাংবাদিক অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে দিল্লিতে বজরং দলের গুন্ডারা প্যান্ট খুলিয়ে তাঁর “নাগরিকত্ব  টেস্ট” করেছে। এরপর সে “মুসলমান নয়” এটা নিশ্চিত হয়ে তবেই ছেড়ে দিয়েছে।

গত সোমবার থেকে  রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর হামলার আগুন লেগেছে  দিল্লিতে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী বা তাদেরকে দেয়া কাজের ব্রিফিং কী ছিল তানিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়ার ভাষ্যে ইতোমধ্যে ছবি প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ পুলিশের দিকে আঙুল উঠানো হয়ে গেছে।  এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?

ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনার দায় রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়।

কিন্তু দিল্লি এসব কিছুর ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে এর সাফাইটা হল, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’ [NCT] মানে, কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে বা অবস্থিত।  এই বিশেষ আইনের কারণে দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা অপেক্ষায় আদালতে মুলতবি আছে।
বিজেপি চলতি মাসেই শোচনীয়ভাবে দিল্লিতে হেরেছে । দিল্লি এই রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় বলছি  এজন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা কৃতিত্বের(!) রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের মুসলমান-টার্গেট করে করা হামলা ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। এক জিঘাংসা। এই বিশ্বাসে কঠিন অকল্পনীয় নির্যাতন আর চাপের মধ্যে ফেলতে পারলে বিজেপি-বিরোধিতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে।  মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
গত তিনদিনের ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ঐ রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
ইতোমধ্যে অবশ্য লক্ষণীয় ভাবে ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। [যা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার সরকারবিরোধী হইয়ে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ] দিল্লির এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই বলে। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে ‘মোদি মোদি’ বলে স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
ফটো জার্নালিস্ট হলেন কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি। সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে দিতে তার কেটেছিল। বা বলা যায় বিজেপির ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তাঁর কপালে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা সেই হিন্দুসেনার ডায়লগ ছিল, “তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে… আপনিও তো হিন্দু; কাজেই এতে ক্ষতি কী?”।
সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, “আপনিও তো হিন্দু, কেন তবে ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল তাদের একজন বলে ওঠে “তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান?” এরপরই তাঁরা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার ঐ এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভার এক গরীব ছাপোষা বলে মন গলিয়ে তবেই সে যাত্রায় তারা পার পায়।
উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়া – এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলো সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।

এই রিপোর্টের শুরুতে, লেখক ওসব বিজেপি-সেনা কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে গেছে। এরা “মিসগাইডেড ইয়ুথ”। “আইন হাতে তুলে” নিয়ে “ভায়োলেন্স” ছড়াচ্ছে। এরা “ধর্মীয় আইডেনটিটি” ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে। ইত্যাদি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কী মোদীর ভারতে চালু ছিল না? কেউ মুসলমান হলে নিপীড়ন করে “জয় শ্রীরাম” বলানোতে বাধ্য করা,  গরু ব্যবসায়ী হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা, এমন যে কাউকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথি মারার অজস্র ক্লিপ কী আমরা সোশাল মিডিয়ায় দেখিনাই?  অথচ সামাজিক প্রতিবাদ দূরে থাকে ঐ ঘটনাস্থলের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মজা দেখা এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে “এধরণের ঘটনাগুলো সব গুজব বলে” – এগুলোর কোন অস্তিত্ব নাই বলে মোদীর সংখ্যালঘু মন্ত্রীর বয়ান কী ভারতের মিডিয়া ছাপেনি? কোন মিডিয়াই কী মন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে একটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেছিল? নাকি তখন কি কেবল মনে হয়েছিল “আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর!  কাজেই সমস্যাটা আমার না” – এমন মনে হয়েছিল তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা জানাতে চাচ্ছে কেন?  কে শুনবে? মোদী না অমিত শাহ? কী আশা করেছিলেন আপনি?

বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন? কেন এতদিন চুপ ছিলেন? মুসলমানদের উপর হচ্ছিল বলে? তুচ্ছ করে? তাহলে আপনি কী?

সারা ভারত আর সাথে এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই মুসলমান মারা বা নির্যাতন করার নষ্ট “মেরুকরণের” বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি?  এটা ভারতের কনষ্টিটিউশন-বিরোধী ততপরতা – এই দায়ে বিজেপির উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দিয়ে গেছে? তাই, আজ আঁতকে উঠে লাভ কী, অনিন্দ্য?  সবই তো শেষ!

বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে তা আবিস্কার হয়েছিল এমন নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া ধরণের আবিস্কার সেগুলো।। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনাতে এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই “নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ”। কারণ কে মুসলমান কেবল এটা জানতেই তো বিজেপির এত আয়োজন। তাই নয় কী? তাহলে এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবেপ্রিন্টে ‘নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!”এই শিরোনামে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

দিল্লিতে নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

দিল্লি নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

গৌতম দাস

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2SL

 

দিল্লি প্রাদেশিক বা রাজ্য নির্বাচনে মোদী-অমিতের বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। আম আদমি পার্টি (আপ বা AAP) দলের আগের ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মতই এবারো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে তারা ৭০ আসনের দিল্লির ৬০-এর বেশি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জার্মান সরকারের ডয়েচে ভেলে [Deutsche Welle] গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে অত জনপ্রিয় না হলেও ফেলনা গুরুত্বের নয়। সেই ডয়েচে ভেলের (ইংরেজি সংস্করণ) এক রিপোর্টের শিরোনাম, “দিল্লির নির্বাচনী হার : প্রধানমন্ত্রী মোদীর শেষ দিনের শুরু?” [Delhi election losses: The beginning of the end for PM Modi?]।

এটা ঠিক যে, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA) প্রায় সব প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশে এক ব্যাপক নাড়াচাড়া দিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতের লোকসংখ্যা বা ভোক্তা বাজার প্রায় ১৩৬ কোটির; সে কথা পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় খুবই মনে রাখে। তারা তাই এমন কিছুই বলতে চায় না পাছে তা এই বাজার হাতছাড়া হওয়ার কারণ হাজির করে ফেলে। কিন্তু মোদী-অমিতের বৈষম্যমূলক ও মুসলমানবিদ্বেষী করে সাজানো নতুন নাগরিকত্ব আইন পশ্চিমাদেশের জন্য ঐ ভোক্তা বাজারের লোভের চেয়েও আরো বড় বিপদের। সাধারণভাবে তারা আতঙ্কিত এ জন্য যে, তাদের আশঙ্কা এই আইন দুনিয়াতে বিপুল রিফিউজির ঢল তৈরি করতে পারে যারা আবার রাষ্ট্রচ্যুত। মোদীর এই আইন আগামীতে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন রিফিউজির সারিবদ্ধ ঢল নামাতে পারে, যেটা সদ্য মোকাবিলা করা সিরিয়ান রিফিউজিদের চেয়েও হবে ভয়ঙ্কর। কারণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি বৈশিষ্ট্য হল, এরা হবে রাষ্ট্রহীন; ‘থেকেও নাই’ এমন রাষ্ট্রচ্যুত বলে তাড়ানো এক জনগোষ্ঠী।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘এই আশঙ্কার’ ওপর দাঁড়ানো এক নিন্দা প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আনা হয়েছিল আর যা এখন আগামি মধ্য মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করে রাখা আছে। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এনিয়ে কী রায় দেয় মূলত সেটা দেখতে আর মার্চে মোদী ইইউ সামিটে এসে কী প্রতিশ্রুতি দেন না দেখার জন্য। নতুন রিফিউজির ঢলের উদ্ভব বা মানবাধিকার রক্ষার দায় হিসেবে এর ভাগ বা দায়ভার গ্রহণ প্রশ্নে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও বেশি ভীত, বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতির স্থবিরতা দুনিয়াতে যখন প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়া দশা সেই পরিপ্রেক্ষিতে। ডয়েচে ভেলের এই শিরোনাম এসব আশঙ্কায় আক্রান্ত বলে এমন হয়ে থাকতে পারে। তা আমরা অনুমান করতে করি।

দিল্লির রাজ্যনির্বাচন শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজেপিবিরোধী মূলত দিল্লির এক আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি (আপ) এবারের নির্বাচনে ৬২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতেছে। আর সেই থেকে অসংখ্য কর্নার থেকে কেন ফলাফল এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মিডিয়াগুলো ভরপুর হয়ে উঠেছে। রাজ্য হিসেবে দিল্লি খুবই ছোট; যেখানে ভারতের পুরনো মাঝারি সাইজের রাজ্যগুলোতে ২০০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে আসন থাকে। সেই বিচারে এগুলোর তিন ভাগের একভাগ সাইজের রাজ্য হল দিল্লি। তবুও দিল্লির এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ অনেক বেশি। কেন?
মূল কারণ, মোদী-অমিতের নাগরিক বৈষম্যমূলক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ পাস করার পরের ভারতজুড়ে আপত্তি ও প্রতিক্রিয়া; আর তা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এটা ছিল কোন রাজ্যে অমিত শাহের প্রথম নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া। এছাড়া এমনিতেও দিল্লির নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্বে ছিলেন অমিত। যেমন শুরুতে বিজেপির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক ভোটে কী হয়েছিল সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ভাষায়, “কিন্তু নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংহ, জগৎপ্রকাশ নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহই আস্থা জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দিল্লি বার করে নেবেন। মেরুকরণই হবে প্রধান অস্ত্র। তখনই স্থির হয়, শাহিন বাগই হবে প্রধান ‘প্রতিপক্ষ’। আর প্রচারে শাহ বলেছিলেন, ‘‘ইভিএমের বোতাম এত জোরে টিপুন যেন শাহিন বাগে কারেন্ট লাগে। “। তাই তখন থেকেই দিল্লি নির্বাচনে ঠিক কী বলে, কোন কৌশলে বিজেপি ভোটে অংশ নেয় আর তাতে ভোট প্রদানের ধরনের মধ্যে কী মেসেজ ফুটে ওঠে – এসব জানার জন্য সব মহলের ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর তা থেকেই এত বিশ্লেষণ।
এসব বিশ্লেষণগুলোতে কমন ব্যাখ্যার ধারাটা হল, এটা ‘উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু’ – এরই লড়াই যেখানে ‘উন্নয়ন’ জিতেছে। কিন্তু এখানে ‘উন্নয়ন’ মানে কী? আমাদের দেশের মতই, হাসিনার ‘উন্নয়ন’ বনাম নাগরিক অধিকার, এর কোনটা চান- এর মত? না, ঠিক তা নয়। তবে হয়ত কিছু কাছাকাছি। দিল্লির বেলায় এর মানে হল, নাগরিক মিউনিসিপ্যাল সুবিধা ও সার্ভিসগুলো; যেমন পানি, বিদ্যুৎ, নিষ্কাশন, বাসভাড়া, শিক্ষা ইত্যাদিতে সার্ভিস ব্যবস্থাপনা আর এর স্বল্প চার্জ বা মওকুফ করা চার্জ- এভাবে আপ দলের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গত পাঁচ বছর কাজ করে সাফল্য এনেছেন। এটাকেই এখানে ডাকা হচ্ছে “উন্নয়ন” বলে। আর এর বিপরীতে ‘কেন্দ্রের ইস্যু’ জিনিষটা কী?
এখানে কেন্দ্রের ইস্যু হল যেমন, সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু সিএএ বা এর সাথে এনআরসি; এ ছাড়া ধীরগতির ধসে পড়া অর্থনীতি, কাজ সৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরেকভাবে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা আছে। যেমন নির্বাচনী ফলাফল কী হতে পারে সেই আগাম অনুমিত ফলাফল জানার লক্ষ্যে করা সার্ভেতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হল, “জাতীয় নিরাপত্তা”। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই প্রলেপ লাগানো শব্দ। আসলে কদর্য কিছু ধারণাকে লুকিয়ে রাখতে বলা এক ‘ভদ্র শব্দ’। কারণ এর পেছনের মূল কথাটা হল, ‘মুসলমানবিদ্বেষী উসকানি দিয়ে প্রচারণার” পক্ষে কারা। এটাকে আবার বিজেপি নিজেও আরেকটা শব্দ – ‘পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ’ বলে প্রকাশ করে থাকে। যেমন এই নির্বাচনে অমিত শাহ ও তার দলের বিদ্বেষী ভাষ্য হল, কেজরিওয়াল একজন ‘জঙ্গি’ নেতা, সে পাকিস্তানের বন্ধু, মুসলমান তোষণকারী ইত্যাদি। দিল্লির এক মুসলমান-প্রধান এলাকা শাহীনবাগ, এখানকার সিএএ-বিরোধীদের মূলত নারীদের একটা স্থায়ী প্রতিবাদ মঞ্চ আছে। এ সম্পর্কে অমিতের মন্তব্য এটা নাকি এক ‘মিনি-পাকিস্তান’। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কথাটার আসল মানে হল মানে, এই ক্যাটাগরিটা আসল অর্থ হল – বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও এর প্রপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিয়ে কারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – তাদের কথা বুঝানো হচ্ছে। এরাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে দেয়া ভোটার। এমনকি আনন্দবাজারের ভাষাতেও – এটা হলো “বিজেপির (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং হিন্দু ভোট একাট্টা করার কৌশল”। অর্থাৎ হিন্দুত্বের জোশ তুলে সব হিন্দু ভোট যেন বিজেপির বাক্সে আসে, বিজেপির নেয়া এই কৌশল । এটাও অনেকসময় আরেকটা সার শব্দে প্রকাশ করা হয় – পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। “হিন্দুর হিন্দুকে ভোট দিতে হবে আর সেটা কেবল বিজেপিকেই” – এটাই হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা কৌশলের সারকথা। এটাকেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদ নিজেদের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ অথবা এটা “বিজেপির কৌশল” বলে প্রকাশ্যেই দাবি করে থাকে।
দিল্লির নির্বাচনের পরে ভারতের টিভির এক টকশোতে এসেছিলেন শেষাদ্রি চারি [SESHADRI CHARI]। তিনি হচ্ছেন, আরএসএসের ভাবাদর্শী পর্যায়ের এক নেতা , তিনি আবার আরএসএসের মুখপত্র এক প্রাচীন পত্রিকা ‘অরগানাইজার’-এর সাবেক সম্পাদক। তিনি বিজেপির এই ‘ঘৃণা তৈরির’ নিন্দনীয় কাজ ও ততপরতাকেও “অনৈতিক” বলে মানতে রাজি হননি। বরং দাবি করেছেন এটাই ‘বিজেপি রাজনীতির কৌশল’। দেখুন, not hate politics but strategy.।
ভারতের কনস্টিটিউশন এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া বেআইনি। কিন্তু যেখানে সারা ভারতই এখন ‘হিন্দুত্বে’ ভাসছে সেখানে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলবে কে? আর নির্বাচন কমিশন সেখানে কোনো প্রশ্ন না তুলে আরামে কাজ করার পথ ধরবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
ঠিক এ’কারণে বিজেপির অমিত শাহের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ এবার কিভাবে কাজ করে, আদৌ করে কিনা, সেটি সবাই দেখতে চেয়েছিল। কঠিন বাস্তবতা হল, এবারই এটা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, খোদ অমিত শাহ এবার তা নিজ মুখে প্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন।
“ভারতে হিন্দুরাই রাজত্ব করবে, অন্য কারও কথা চলবে না। যারা অমান্য করবে তারা ‘দেশকে গদ্দারকো, গোলি মারো শালো কো’।  এভাবে বিজেপির সমাবেশ মঞ্চ থেকে স্লোগান দেয়া শুধু নয়, লিখিত বিবৃতি মানে ঠাণ্ডা মাথায় লেখা এমন এক বিবৃতি পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে দুদিন ধরে অমিত শাহের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ থেকে গায়েব ছিলেন। বেচারা অমিত “খুব শরমিন্দা আর শোকে” ভুগছে মনে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসেও যান নাই। দু’দিন পরে ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রেসের সামনে তিনি বলেন, “গোলি মারো বলে বিবৃতি দেয়া অথবা ‘ইন্দো-পাক ম্যাচ’ ধরনের মন্তব্য করাটা আমাদের ঠিক হয়নি। আমাদের দল এসব মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়”। এছাড়াও, তিনি স্বীকার করে নেন যে, খুব সম্ভবত এমন মন্তব্যের জন্যই “দিল্লিতে আমাদের পরাজয় ঘটেছে”। এর সাথে তিনি এটাও স্বীকার করে নেন যে, দিল্লি নির্বাচন সম্পর্কে “তার আগাম অনুমানে ভুল ছিল”। ভেবেছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। আমার বেশির ভাগ মূল্যায়ন ঠিক হয়,এ বার ভুল হল”। সাথে সাথেই অবশ্য বড় ধূর্ততার সাথে নিজেই বলে রাখেন – “কিন্তু তাই বলে ‘দিল্লিতে বিরোধীদের বিজয় সিএএ-এনআরসি বিরোধী কোনো গণরায় নয়”।

এটা সে গণরায় কি না তা সামনে স্পষ্টই বুঝা যাবে। এখনই বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে দিল্লি রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা যেখানে ১৩% সেখানে মুসলমান ভোটারদের ৭৫% (আর এরই সাথে শিখ ভোটের ৪২%) আপ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। [The AAP got the lion’s share of the Muslim vote, significant in a city-state with 13 per cent Muslims.] শাহীনবাগ যে কনস্টিটিউয়েন্সিতে পড়েছে এর নাম ‘ওখলা’ [Okhla]। সেখানে এবার ভোটারের উপস্থিতি রেকর্ডসংখ্যক। মোট উপস্থিত ভোটারের হার যেখানে ৬২% এর মতো সেখানে ওখলাতে তা ৬৬%-এর মত। আর ‘আপ’ দলের আমানতুল্লাহ খান এখানে জিতেছেন (1,30,367 votes) প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর (Braham Singh  58,540 votes) চেয়ে ডাবলের বেশি ভোটে।  এমনিতেও দেখা গেছে বেশির ভাগ আসনে ভোটাভুটির ফয়সালা হয়েছেও ষাট হাজার ভোটের কাছাকাছি।

উত্তরপ্রদেশের ‘গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী’ যোগী আদিত্যনাথ যার একমাত্র যোগ্যতা মুসলমানদের মারব-ধরব বলে গালিগালাজ করা, তাকে উওরপ্রদেশ রাজ্যের পড়শি রাজ্য দিল্লিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল প্রায় ১৩টা বিজেপি কনস্টিটিউয়েন্সিতে প্রধান সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তিনি কেজরিওয়ালকে “জঙ্গি মদদদাতা, দেশদ্রোহী গাদ্দার, পাকিস্তানের বন্ধু ইত্যাদি বলে বক্তৃতা করেছিলেন। ফলাফল নিম্ন চাপ!  ঐ ১৩ আসনের ১১টাতেই বিজেপি অনেক ব্যবধানেই পরাজিত হয়েছে
অনেকেই অমিত শাহের স্বীকারোক্তিকে তার দলের এই হারের ফলাফল পাঠ করে, করা মন্তব্য বলে দেখেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এখন থেকে তাহলে ভালো হয়ে গেলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি?

অমিত শাহকে নিজ দলে “ম্যাজিসিয়ান” বলা হয়। গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গাতেই তার জয়জয়কার। তিনি নাকি যেটা চান তাই করে আনতে পারেন। দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত আহত-নিহত হন, তাদেরও ভোট তিনি ব্যাগে ভরতে জানেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরবাদের দাঙ্গায় তিনি তাই ঘটিয়েছিলেন।  সেই ‘দাঙ্গা-ওস্তাদ’ তিনিই এবার দিল্লিতে হেরে গেছেন। না, তবু এর পরেও তাঁর স্বভাব বদলাবে না। কারণ তিনি কেবল এই ‘দাঙ্গা’ কাজটাই ভালো পারেন।
এ ছাড়া আরো বড় ফ্যাক্টর হল, ২০১৬ সালের নোট বাতিলের পর থেকে ডুবে যাওয়া অর্থনীতির চিহ্নগুলো মোদী লুকিয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ এর প্রথমার্ধ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাই সেই থেকে “মোদী-ম্যাজিক” বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতএব, আগামী সব নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে “হিন্দুত্ববাদ” এর জজবা বা মেরুকরণ। কাজেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েই তাকে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। হয়তো পরের বার আরো ভাল ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঘৃণা ছড়াবেন। এক কংগ্রেস নেতা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, তার কাছে নাকি গোপন সংবাদ আছে, ‘‘পাকিস্তান এ বারে দিল্লি থেকে বিহারের পথে রওনা হয়েছে’’। কেন?  আগামী অক্টোবরে বিহারে রাজ্য নির্বাচন। দেখুন মেরুকরণের ভবিষ্যত

তাহলে, কেজরিলালের উন্নয়নের বিজয় কী জিনিষ ও তা কতটা সত্য?
বড় সত্যটা হল, কোন রাজ্য নির্বাচনেই ভারতের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলো ভোটার-মানুষ ভুলে যায় না, যেতেই পারে না। যদিও এর পরেও এক্ষেত্রে একটা কিন্তু আছে। সেটা হল দিল্লির “গঠন প্রকৃতির” বিশেষত্ব। যেমন দিল্লি ছিল এক রাজধানী শহর কিন্তু আসলে ছিল এক জেলা শহর মাত্র। পরবর্তিতে তার পড়শি রাজ্য একদিকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা (মানে মুল ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য ভেঙে হরিয়ানা বলে আলাদা রাজ্য করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর হরিয়ানাই দিল্লির লাগোয়া পড়শি। ) আর অন্য দিকে উত্তর প্রদেশ – এদুই রাজ্য থেকে কেটে আনা জেলা শহর নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে আজ দিল্লি রাজ্য হয়েছে – ১১ জেলা শহরের। এভাবে অন্তর্ভুক্তি আবার এক দিনে হয়নি, ১৯৯৭ থেকে সর্বশেষে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে। এর সোজা অর্থ, এই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া জেলাগুলোতে  একটা রাজধানী শহরে  যেমন থাকা উচিত সেই পানি-বিদ্যুৎ-বাস-স্কুল টাইপের নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলোর কিছুই ছিল না। এসব অভাব চরমে  উঠা আর নাগরিক ক্ষোভ থেকেই একে পুঁজি করে আম আদমি পার্টির জন্ম ২০১২ সালে। আর গুছিয়ে ক্ষমতায় থেকে গত পাঁচ বছরে এই ব্যবস্থার চরম উন্নতি ঘটিয়েছে কেজরিলালের আপ দলটা। এই সময়ে রাজ্যের রাজস্ব আয় তিনি বাড়িয়েছেন ৩১%। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লির তথ্য নিয়ে লিখেছে,

ভারতের মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপাত্ত বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দিল্লির রাজস্ব আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আর এ আয় গেছে স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নে। যদিও এ সময়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৭ শতাংশ কমেছে। দিল্লি ভারতের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এর নেতা কেজরিওয়াল আদর্শ মুখ্যমন্ত্রী। পদত্যাগী এই সাবেক আমলা ম্যানেজমেন্ট বোঝেন ভালোই। তিনি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বড়লোকদের বিদ্যুতের রেট তুলনায় বেশি ধরে সে আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের ভর্তুকির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। একই ব্যবস্থা পানি ব্যবহারেও। আবার নারী বাসযাত্রীর ভাড়া ফ্রি। স্কুল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তাতে ইংলিশ স্কুল ছেড়ে অবস্থাপন্নরাও সরকারি স্কুলে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন। আজ আনন্দবাজার লিখেছে, মহিলা ভোটেই কুর্সিতে কেজরী, বলছে ফল-পরবর্তী সমীক্ষা। একারণে মূলত নারীরা তুলনায় আপ পার্টিকে ভোট দিয়েছে বেশি। এমনকি নাকি স্বামীরা বিজেপি-কংগ্রেসের সমর্থক হলেও স্ত্রীরা আপ দলকে ভোট দিয়েছে।  আর এসব ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্বের মূল সুফলভোগী হল সরাসরি স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে আপ দলের মূল ক্ষমতার ভিত্তি হয়েছে এই স্বল্প আয়ের লোকেরা।  নির্বাচনে কেজরিওয়াল নিজের এই সফলতাকেই তুলে ধরেছেন, আর প্রতিদান চেয়েছেন। এমনকি ভোটারদের বলেছেন, আপনি বিজেপি বা কংগ্রেসের সদস্য বা সমর্থক হয়েও থাকেন তবে দল ত্যাগ না করে আমার কাজের প্রতিদান ও আমাকে উৎসাহ দিতে আমার দলকে একটা ভোট দিন। আসলেই তো তিনি ‘স্বল্প আয়ের মানুষের বন্ধু’। না হলে দিল্লির মত ব্যয়বহুল রাজধানী শহরে গরীবদের বসবাস করা আরো কঠিন হয়ে যেত। কাজেই দিল্লির এই বিশেষ গঠন প্রকৃতি – এটা উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু – এই নাম দিয়ে ডাকা ও দেখা সবটা সত্যি নয়। আর এর মানে এই নয় যে, সিএএ-এনআরসি ইস্যু বা কাজ সৃষ্টির ইস্যুতে তাদের কিছু এসে যায় না।

তবে সার কথা হল, দিল্লিই প্রথম কথিত ম্যাজিসিয়ান অমিত শাহ ও তার দলের যে সারা ভারতে “অপরাজেয়” ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই দর্প এবার চূর্ণ করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ভাঙা আত্মবিশ্বাস কতটা অমিতরা ফেরত আনতে পারেন তা এখন দেখার বিষয়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘দিল্লিতে পরাজয়ের তাৎপর্য”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

গৌতম দাস

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Sm

বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও তার ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতা অব্যাহত আছে তো বটেই বরং বেড়েছে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। মানে, বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বা সংশোধিত নাগরিক আইন পাস করার পরে এ নিয়ে বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি বাড়িয়েই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারা এখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধিদের “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে;  নিজ কর্মীদের নিয়ে গুলি করে মারার শ্লোগান তুলেছে। এরই মধ্যে লন্ডনের ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন এই ইস্যুতে গত সপ্তাহে এক আর্টিকেল ছেপেছে। শিরোনাম “ইকোনমিস্ট এক্সপ্লেনস, দ্যা ইরোশন অব সেকুলার ইন্ডিয়া” [The Economist explains, The erosion of secular India]
‘Explains’ – শিরোনামে উল্লেখ থাকে এমন টাইপের লেখা সাধারণত অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হয় দেখা যায়; যাতে পাঠক ওই ইস্যুর খুঁটিনাটি দিকগুলো ঐ লেখা থেকে জেনে নিতে আগ্রহী হয়। ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেলটা তেমনি ধরনের এক লেখা, যেটার শিরোনাম হল – আমরা “ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা করে বলছি, ভারতের সেকুলারিজমে ক্ষয় ধরে গিয়েছে”।
এই আর্টিকেলের লেখক দিল্লিতে বসে লিখেছেন তা নিজেই জানিয়েছেন। আর এ ধরনের লেখাকে পত্রিকার নিজের অবস্থান, অন্তত কিছু দায়দায়িত্ব নিয়ে লেখা মনে করা হয়ে থাকে।
কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হল “সেকুলার” শব্দের ব্যবহার। সারা ভারতে সেকুলার শব্দের এধরণের বিশেষ আবিষ্কার ও বিরক্তিকর ব্যবহার প্রচলিত আছে সেই ১৯৪৭ সালের আশেপাশের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। সেটা এখন ‘লন্ডন ইকোনমিস্ট’ পর্যন্ত এতে সওয়ার হয়েছে এটা দেখতে পাওয়াটা বড়ই চমকপ্রদ ও তামাশার নিঃসন্দেহে! ইকোনমিস্ট এখানে ধরে নিয়েছে যে, ভারত একটা সেকুলার রাষ্ট্র, অন্তত সেকুলার রাষ্ট্র ছিল – ইকোনমিস্ট এই সার্টিফিকেট এখানে বিতরণ করেছে। কিন্তু ‘সেকুলা’র মানে কী? আর কোনটা সেকুলার কোনটা না, তা চেনার উপায় কী?

যারা দাবি করে থাকে যে সে সেকুলার অথবা তাদের অমুক রাষ্ট্র সেকুলার তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তিনি সেকুলারিজম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কনসেপ্ট সম্পর্কে আসলে খুবই কম কিছুই জানেন। যেমন এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় যে, ওমুক রাষ্ট্র বা ভারত সেকুলার কি না! ইউরোপে কোন রাষ্ট্র সেকুলার আর কোনটা না- এমন প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। এমনকি আমেরিকা কি সেকুলার রাষ্ট্র? এই প্রশ্ন করতে দেখা যায় না কেন? এছাড়া আবার ঠিক কী প্রয়োজন মিটাতে কোন রাষ্ট্রের সেকুলার হওয়া জরুরি কেন? এর জবাব কী তারা জানেন? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন- কোনো রাষ্ট্র সেকুলার কিনা তা বুঝার উপায় কী?

ইকোনমিস্টের এই লেখায় কোথাও অবশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কী অর্থে ভারতে ‘সেকুলারিজম আছে বা ছিল’ বলা হচ্ছে। এটা বলতেই বা আসলে কী বুঝান হয়েছে? তবুও ঐ লেখায় লেখকের এক দাবি হল- “১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত ভারতে সেকুলার ভিশন বজায় ছিল এবং তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নাই” , [“It was the secular vision which prevailed and which remained pretty much unchallenged until the 1980s.”] অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, সেকুলার শব্দের পাশে একটা ‘ভিশন’ শব্দ লাগানো হয়েছে; মানে সেকুলার জিনিসটা একটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে ব্যাখ্যা করতে দেখছি। এমনিতে অবশ্য ভারতের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ভারত সেকুলার কি না’ এই গর্ব বা তর্কের মীমাংসা করার পদ্ধতিটা দেখা যায়, খুবই সহজ। ভারতে একজন মুসলমানকে প্রেসিডেন্ট বানানো হলে এটাই তাদের কাছে সেখানে প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে গৃহীত হয়ে যায় যে, ভারত সেকুলার। অথচ ইস্যুটা অমন লোক দেখানোর মোটেই নয়। রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে যারা সিরিয়াস তাদের কাছে এসব আমলযোগ্য কথা হতে পারে না।

এ ছাড়া ঐ আর্টিকেলের শুরুতে বলা হয়েছে, ভারতের যারা মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ছিল (মানে কংগ্রেসকে কল্পনা করা হয়েছে) এরা নাকি ‘সেকুলারিজমের স্বপ্ন’ ও ‘ইনক্লুসিভ রিপাবলিক’-এর স্বপ্ন দেখতেন, [Whereas the mainstream of India’s independence movement envisioned a secular, inclusive republic……]। কিন্তু সরি, লেখক মহাশয়! আপনার এই কথা বাস্তবের সাথে মিলে না। ফলে, এটা অগ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো ধারণা প্রকাশ করা আমেরিকানদের চালু করা শব্দ। এ ছাড়া কোল্ড ওয়ার যুগ শেষের আগে আমাদের এদিকে এই শব্দ দেখা যায়নি। বিশেষ করে গ্লোবালি ইসলামী রাজনীতিতে একালে তা বাধ্যতামূলক আমলযোগ্য ইস্যু হয়ে পড়ার পর এটা আমেরিকানদের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশের পরই কেবল এটা এক ভাষ্য হয়ে উঠেছে; আগে না। ইসলামী রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র বা শাসন ধারণার “খেলাফত” শব্দে আমেরিকার আপত্তি তারা এভাবেই এই শব্দ দিয়েই প্রকাশ করে থাকে যে রাষ্ট্র মাত্র তাতে বসবসকারি সকল অংশকে সাথে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করতে হবে। কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, উপেক্ষায় ফেলে রাখা সুযোগ নেয়া যাবে না।

এছাড়া মূলত কংগ্রেস কখনই “ইনক্লুসিভ রিপাবলিক” বলে কোনো ধারণা ব্যবহার করে নাই। এমনকি ১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার সময় রুটিন কাজ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা ব্যবহার করা ছাড়া আর ভারতের আর কোথাও শব্দটাই ব্যবহার করা হয়নি। আসলে রিপাবলিক শব্দটাই আমাদের এশিয়ায় এদিকে প্রয়োজনীয় ধারণা মনে করার রেওয়াজ নাই। খুব সম্ভবত আমেরিকানেরা কমিউনিস্ট ঠেকাতে চালু করা এক ভুয়া শব্দ “ডেমেক্রেসি” – এটা চালু করার কারণে গুরুত্বপুর্ণ ‘রিপাবলিক’ ধারণাটা চাপ দিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই  এই দুর্দশা।  আর সোজা হিসাবে এদিকে ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটার ব্যবহার কংগ্রেস দলের নেতা ব্যক্তিত্বরা  যদি বুঝেই থাকত ও মেনে নিত, তবে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার দিকে যেত না। অথবা বলা যায় তাঁরা যেতে দিয়েছিল কী করে? তাহলে নেহরুর “অখণ্ড ভারত” দখলের ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা,  যেটা তাঁর ষোলোআনা ছিল, তার কী হবে? আমরা তো সেটার এখনো সহজেই এর প্রমাণ পাই। মনে রাখতে হবে, অখণ্ড ভারত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সবাইকে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ ভারত রাষ্ট্র গড়া- এ দুটো কারও কারও কাছে অতি উতসাহে শুনতে কাছাকাছি মনে হবে হয়ত। কিন্তু এ দুটো- একই বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও, এরা একেবারেই ভিন্ন বিষয়। আসলে একটা হল, স্রেফ ভূখণ্ডের লোভ। আর একটা হল সবাইকে একই ও সমান নাগরিক মানুষ হিসেবে একত্রে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ও গণ্য করে গড়ে তুলতে চাওয়া।
ওদিকে আবার, গান্ধী ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন; এর প্রমাণ দেখা যায় না।  বরং আসলে তা হবার কথাই না। কারণ  গান্ধী-নেহেরুর রাষ্ট্র-চিন্তা – সেটা এক জাতিরাষ্ট্র পাবার চিন্তা। আর জাতিরাষ্ট্র চিন্তায় “খেলাফত কোন অনিবার্য প্রয়োজনীয় ধারণা নয়।  বরং, তাদের কথিত “দেশপ্রেমিক জাতি” হলেই চলে। গান্ধী বরং তাঁর খামতি চিন্তার অপুষ্টির কারণে  সারাজীবন তিনি “হিন্দু আর মুসলমান’ – এভাবে পরিচয়মূলক শব্দ আওড়ায়ে গেছেন। নন-আইডেনটিটি-মূলক সিটিজেন বা নাগরিক শব্দ কখনই ব্যবহার করতে পারেন নাই।  আসলে মূলত তিনি ‘হিন্দু-মুসলমান এক করতে হবে’ এই হাল্কা ও অর্থহীন ভাষ্য আউড়িয়ে গেছেন। একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে দুটো আলাদা ধর্ম হিন্দু-মুসলমান, এদের এক করতে হবে কেন? এর চেয়েও বড় কথা- দুটো আলাদা ধর্মকে এক করা কি আদৌ সম্ভব, না এর দরকার আছে? এদিকগুলো তিনি ভাবতে সক্ষম ছিলেন মনে হয় না।
দুনিয়াতে ‘আধুনিক রিপাবলিক’ রাষ্ট্রধারণা আসা ও এটা গড়ার চিন্তা এসেছে কবে থেকে? জবাবে সবাই মেনে থাকেন যে, এটা মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর থেকে। একটা ভুল ধারণাও এখানে আছে যা অনেকে ধারণ করে থাকতে পারে। ১৬৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত জন্ম নেয়া সব রাষ্ট্র একই ধরনের রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রধারণা, তা কিন্তু নয়। সহজে চিনবার জন্য বললে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আর পরের ধারণা আলাদা এভাবে মনে রাখলেই চলে। এই যুদ্ধ সব বদলে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে ফারাকটা কী ছিল? তা হল, ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বলতে একমাত্র তা নেশন-স্টেট বলে বুঝা হত। আর পরে সেগুলো সবই হয়েছে অধিকারভিত্তিক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্রের “কাউন্সিল অব ইউরোপ” গঠনকে যদি  লক্ষ্য করা যায়। এর জন্ম-উদ্দেশ্যই ছিল এক হিউম্যান রাইটস কনভেনশন ডাকা (নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস, ECHR)। নিজেদের রাষ্ট্র-ভিত্তি কথিত “জাতি” ধারণা থেকে বদলে হিউম্যান রাইটে রূপান্তরিত করে নেয়া যায়।  যাতে ওই কনভেনশন শেষে একমত হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা, এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোকে জাতিরাষ্ট্র থেকে হিউম্যান রাইটসভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র আকারে ভিত্তি বদলে নেয়া যায়।

অতএব যে ইউরোপের কথা আমরা শুনি জানি, যার এক নমুনা হল সেকালের কলোনি-মালিক ব্রিটিশ রাষ্ট্র; এটা আসলে সেকালে ছিল এক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট; মানে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। আর তাই যে জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে সেকালের রেনেসাঁ-চিন্তা ব্রিটিশের হাত ধরে ভারতবর্ষে এসেছিল সেই রেনেসাঁ ছিল মূলত একটা জাতিরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ও ধারণা। কমিউনিস্ট সার্টিফিকেট অনুসারে সেকালের রাজা রামমোহন রায়কে ‘ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু’ মানা হয়। সেই রামমোহনের সক্রিয়তার কাল (১৮১৫) থেকে পরিশেষে ১৯৪৭ সালের আশপাশের সময়কালের নেহরু-গান্ধীর রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি এখনো সেই রাষ্ট্রধারণাটা মূলত একটা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৪৭ সালের পর  ‘গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত’ আসলে এক নেশন-স্টেট হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু ভারত নেশন-স্টেট বুঝের ভারত হলে, তাতে কী সমস্যা?

এক্কথায় এর জবাব হল, নেশন-স্টেট ধারণা “নাগরিক অধিকার” বা “হিউম্যান” রাইট ধারণা বুঝতেই পারে না। আর নেশন-স্টেট ধারণা এসেছে – রাষ্ট্রগড়া বলতে যেখানে মুল কর্তব্য ছিল একটা “রাজনৈতিক কমিউনিটি” গড়া – এই কাজ থেকে বিচ্যুতি [derailment] হিসাবে।
এছাড়া রাষ্ট্র বলতে এক ‘জাতিরাষ্ট্রে’র স্বপ্ন-কল্পনা থাকলে গঠনকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, কাকে তারা ‘জাতি’ হিসেবে নেবে? যেমন রামমোহন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র দেখে এক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু খেয়াল করতে হবে তার এই জাতি ধারণাটা আসলে (এথনিক অর্থে) এক ধর্মীয়-জাতি ধারণা। ঠিক যেমন এই একই  বিচারে ব্রিটিশরা হল, এঙলো-ক্যাথলিক খ্রিশ্চান, আর এই ধর্মের ভিত্তিতে তারা এক ব্রিটিশ জাতি। আর এখান থেকেই রামমোহন একটা একক ধর্মের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতির কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এতে হিন্দুধর্ম তার ‘ঐ’ প্রয়োজন মিটাতে পারবে, তা তিনি মনে করেননি। কারণ এই হিন্দুধর্ম জাতভেদ প্রথায় ডুবে অসংখ্য জাতে বিভক্ত। এছাড়া ভারতে আরো ধর্মও আছে। এছাড়াও তিনি কোন একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম হলে তা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হবে বলে মনে করতেন। কারণ হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার ধারণাকে তিনি এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনের দিক থেকে দেখে সমস্যা ভাবতেন। এসব চিন্তা থেকেই ১৮১৫ সালে তিনি একেশ্বরবাদী ‘ব্রাহ্মধর্মের’ প্রচলন করেছিলেন।
কিন্তু এই “জাতি” ধারণা প্রয়োজনে ধর্ম-প্রকল্প বাস্তবায়ন রামমোহন বা তার অনুসারীরা কেউ সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আর ১৮৭২ সালের দিকেই, খোদ ব্রাহ্মধর্মই দু’ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ সবাইকে এক ধর্মের অনুসারী করে জাতিরাষ্ট্র বানানো দূরে থাক ব্রাহ্মধর্ম নিজেই বিভক্ত হয়ে যায়। তাই, এটা উদ্যোক্তাদের কাছে অবাস্তব প্রকল্প মনে হতে থাকে আর ততই পরবর্তিকালে বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-বঙ্কিমচন্দ্রসহ সবার কাছেই “ব্রাহ্ম-প্রকল্প বাদ দিয়ে” হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একমাত্র বাস্তবতা বলে নিরুপায় ‘সাফাই’ হয়ে উঠতে থাকে। কংগ্রেসের জন্মের (১৮৮৫) পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা- এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন গান্ধী। পরের বছরের মধ্যে তিনি কংগ্রেসের হাল ধরেন । তখন থেকেই এবং মূলত ১৯২৩ সালের ‘লক্ষৌ প্যাক্ট’-এর ঐক্য ব্যর্থ হয়ে যারার পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একেবারে নির্দিষ্ট হয়ে জায়গা পেয়ে যায়। তবে গান্ধীর কৌশলে, এটা হিন্দুধর্মভিত্তিক বা এটা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সে কথা সরাসরি না বলে আবছা করে রাখা হয়। আর তখন থেকে বিপদে পড়লে হিন্দু শব্দটা ঠিক ধর্ম নয়, সভ্যতা বলে বুঝতে হবে বলে দাবি করার চাতুরী তারা করে গেছেন।

আসলে জাতিরাষ্ট্র বুঝের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এখানে ‘জাতি’ মানেই কোনো একটা আইডেনটিটির জাতি মানে, ভাষা ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়কে ভিত্তিতে জাতি ধরেই এখানে আগাতেই হয়। আর এতেই অন্যান্য ধর্ম অথবা অন্য আইডেনটিটিগুলোও কেন জাতির ভিত্তি হিসেবে তাদেরটা নেয়া হবে না, সে দাবিদারির প্রশ্ন উঠে নতুন অসন্তোষ তো অবশ্যই উঠে কিন্তু সবচেয়ে বড় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব খাড়া হয় যে নাগরিকদের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে একটা না একটা অসাম্য রাষ্ট্র নিয়মিত তৈরি করতে থাকে।

তুলনায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলো মীমাংসিত। যদিও কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার পরে এবার তা বাস্তবায়ন করাটা মূল কাজ যে, ধর্ম বা যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সারকথাটা হল গান্ধী-নেহরুরা হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা আঁকড়ে থাকাতে তারা জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বা কোনো মুসলমানের প্রতি বৈষম্যের কোন সদুত্তর বা সন্তোষজনক জবাব তৈরি করতে পারেননি। পরিণতিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি বড় হয়ে শেষে তারা আলাদা হয়ে যায়; যদিও অনেক মুসলমান দেশত্যাগ করলে নিজের বৈষয়িক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার হবু আশঙ্কায় ভয়ে আপসে ভারতেই থেকে যান।

এর সার কথাটা হল, এখান থেকেই হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণার কারণে ভারতের সব প্রধান দলই কমবেশি ‘হিন্দুত্ব’- এই জাতিবাদের অনুসারী থেকে যায়। এর মধ্যে সেকালের আরএসএস কে (একালের বিজেপি) বলা যায় ‘চরম’ হিন্দুত্ববাদের দল। এ কারণে লক্ষ্যণীয় যে বিজেপির চোখে এখনও ‘নাগরিক’ বলে কোনো ধারণা নেই। তাই সহজেই, মুসলমান বা অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার কোনো দায় অনুভব করে না বিজেপি। তাদের দলের কোনো দলিলেও এর স্বীকৃতি নেই।

তাহলে এটা কী কংগ্রেসের কি আছে? না তাও নেই। কারণ ভারত মূলত ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার দল দিয়েই গঠিত ও পরিচালিত। ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণা ও বোধের দল দিয়ে নয়, তাতে সে দল কমিউনিস্ট হোক কি বিজেপি!

উনিশ শ’ আশির দশকের শেষের দিক থেকে ভারতে কংগ্রেস দলের প্রভাব ও আধিপত্যের পতন শুরু হয়ে যায়। আর এটা লক্ষ্য করেই ইকোনমিস্টের লেখক দাবি করছেন সেকুলারিজমের ক্ষয় তখন থেকে। তিনি ‘কংগ্রেস’ শব্দের জায়গায় ‘সেকুলারিজম’ বসিয়ে কাজ সেরেছেন যেন এর আগে ভারত বিরাট সেকুলার ছিল। এর আগে যেন বছর বছর দাঙ্গা হয়নি। কাশ্মিরে নির্বাচনে ভোটে কারচুপি করে ভোটের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো আর রাজনীতিতে সশস্ত্রতার আমদানি কি ১৯৮৭ সালে কংগ্রেস আমলে হয়নি? তাই, একা বিজেপি সব দোষের ভাগী এ কথা ভিত্তিহীন। রাহুল গান্ধী কি একালে ‘সফট হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছেন না?

তাহলে এখন সত্যিকারভাবে চিনতে হয় কী করে যে, রাষ্ট্র সেকুলার কিনা? রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও বোধের অভাব আর সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে সেকুলারিজম সম্পর্কে সব অদ্ভুত ধারণা আমরা দেখতে পাই। সেটা মুসলমান রাষ্ট্রপতি দেখানো মানে, তা সেকুলারের লক্ষণ পর্যন্ত। এমনকি এটা কনস্টিটিউশনে ওই রাষ্ট্র সেকুলার বলে ঘোষণা দেয়া আছে কিনা অথবা রাষ্ট্রের মূলনীতির একটা সেকুলারিজম কিনা, ইত্যাদি দেখিয়ে যারা দাবি করে, আমার বা অমুকের রাষ্ট্রটা সেকুলার তারা রাষ্ট্র বা সেকুলারিজমের কিছুই বুঝে না। এটা আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। তবে একাজটা তারা করে তাদের একটাই উদ্দেশ্য হল, মূলত ধর্মীয় সংখালঘুদের ভোট এই উপায়ে হাসিল করা।

তাহলে আবার প্রশ্ন সেকুলারিজম বুঝব কেমন করে?  এপর্যন্ত আমরা দেখেছি সেকুলারিজম যেন অবশ্যই ধর্মবিষয়্ক একটা ইস্যু। হা আপতিকভাবে তা মনে হতে পারে কিন্তু এটা মূলত নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষম্যের ইস্যু। কোন দুই নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সাম্য বজায় না রাখার সমস্যা।  যেমন দেখেন, আমাদের রাষ্ট্র এখন ছাত্রলীগের বা আওয়ামি কোন অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইনভঙ্গ করে হলেও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। তাদের কৃত কোন অপরাধ বা রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকে উপেক্ষা বা প্রশ্রয় দিচ্ছে।  রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইন ভঙ্গ করে হলেও ছাড় দিচ্ছে, বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে – এগুলো যথেষ্ট প্রমাণ যে, এই রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষমাই করছে – ফলে বৈষম্যের রাষ্ট্র। নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র নয়। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক বৈষম্য করা মানে তা যদি হয় ধর্ম পরিচয়ের কারণ-সংশ্লিষ্ট তখন এটাকে রাষ্ট্র সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করছে বলা হয়। তাই ‘সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গ’ কথার মূল অর্থ হল নাগরিক বৈষম্য করা।
যেমন মোদীর সিএএ – এই আইনে মুসলমানদের বেলায় বৈষম্য করা হয়েছে তাই এই আইন সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে – এভাবে বলা যায়।  যদিও এখানে মূল কথাটা হল নাগরিকের মধ্যে অধিকার বৈষম্য করা। আর কেমন ধারার বৈষম্য এর উত্তরে বলা যায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিক বলে সংখ্যালঘু বলে তাদের সাথে করা বৈষম্য এটা।
আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এটাও বৈষম্য করা। ধর্মের কারণেসহ যেকোনো কারণে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা, বৈষম্যের চোখে দেখা ও আচরণ করা এটাই মূলত নাগরিক সাম্য বজায় রাখার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।  কেবল ধর্মীয় বৈষম্য নয়, বরং যেকোনো নাগরিক বৈষম্যই নাগরিক-সাম্যের নীতি ভঙ্গ করা।
এরপরে আর একটা দিক আছে। আলাদা করে “আমাদের রাষ্ট্র সেকুলার” – একথা কনস্টিটিউশনে লিখে রাখা বা না রাখাটা গুরুত্বপুর্ণ না। কারণ মূলত রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কারণের বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হয়ে দাড়ানোই  নাগরিক সাম্যনীতি।  তাই  রাষ্ট্র সেকুলার কিনা  এটা বুঝবার আসল জায়গা হল ঐ রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেখানে তাকাতে হবে।  আমার রাষ্ট্র সেকুলার – আলাদা করে একথা লিখা রাখা না রাখা এজন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।  মানে লিখে রাখলেও সেকুলারিজম কায়েম হবে না। এজন্যই যারা এই লিখে রাখাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এরা সেকুলারিজম ইস্যুটা বুঝে কিনা সন্দেহ করা যায়। রাষ্ট্রের চোখে দেশের সবার পরিচয় যাই থাক, মূল বিষয় হবে তাদেরকে কমন “নাগরিক” পরিচয়ে আমল করা হচ্ছে কি না, সে সমান অধিকারের নাগরিক বলে মানা হচ্ছে কি না, কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার সে হচ্ছে কি না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এগুলোর সদুত্তর হল সেকুলার রাষ্ট্রের চিহ্ন। নাগরিক সাম্যের ব্যত্যয় ঘটলেই মানে, অধিকারে বৈষম্য ঘটলেই আসলে  নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ হবে। আর নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ মানে সেখানে সেকুলারিজম নীতিভঙ্গও ঘটবেই। তাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলার লেখা আছে কি না এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেদিকে পরীক্ষা করতে হবে।

ওদিকে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র না হলে নাগরিক সাম্য বজায় থাকা বা বৈষম্যহীনতা রক্ষা করা আশা করা যায় না। আর সেকুলারিজম চিনার উপায় হল রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের বেলায় বৈষম্যমূলক কিনা মানে নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না এটা চেক করে দেখতে হব।

জন্ম থেকেই ভারত হিন্দুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই ভারতের নাগরিক জীবনে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতা বজায় থাকার দাবি বা এই বোধ সরব বা সক্রিয় নয়। একই কারণে তাই সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের উপর নাগরিকের দাবি বা চাপ তেমন নেই। জেলা শহরভিত্তিক মফস্বলে বিজেপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা, মুসলমান বলে কোনো মানুষকে ধরে নির্যাতন করছে, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর লাফ দিয়ে জোড়া পায়ে উঠছে। অথচ গোল হয়ে চার পাশে মানুষ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে এই নির্যাতন উপভোগ করছে। অথচ  কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তাদের। এমন ভিডিও ক্লিপ মোদীর একালে আমরা অনেক দেখেছি। এর মানে হল,  নির্যাতিতকে কেউ তাঁরা তারই মত সমান মর্যাদা ও অধিকারের নাগরিক মনে করছে না। এটাই এর অর্থ তাতপর্য। আবার গত নির্বাচনে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি বা রায় দেয়নি। কেন? বিজেপি দলের ম্যানিফেস্টোতে নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই কেন? নির্বাচন কমিশন কোনো আপত্তি তুলেনি কেন? আবার বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়াতে এই ভাবনার উৎস হিসেবে দলের দলিল তালাশ করে কী কমিশন কখনও দেখেছে?  কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছে?  মনে হয় না। অথচ এগুলো সবই নাগরিক অসাম্যের মামলা। মানে সেকুলারিজমের নীতিও ভঙ্গের মামলা। অথচ ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে সেকুলারিজম শব্দের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ করা ও উল্টা বৈষম্য করা সবই যেন বৈধ।
এখন দিল্লির নির্বাচন চলছে। বিজেপি নেতা কাপিল গুজ্জর গুলি ছুড়ে হুমকি দিয়ে বলেন  এই দেশে কেবল হিন্দুরা যাই বলবে তাই চলবে On 1 February, Kapil Gujjar fired shots at Shaheen Bagh saying, “Iss desh mein sirf Hinduon ki chalegi (Only Hindus will have their say in this country).”। এগুলো গুরুতর নাগরিক বৈষম্য করার মামলা। এবং সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গের মামলা।

এভাবে এক হিন্দুত্ববাদ ছেয়ে বসছে চারদিকে; যেন হিন্দুত্ববাদই, অর্থাৎ এর এই বৈষম্য ও অবিচারের আধিপত্যই একালের নিয়ম!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘ইকোনমিস্টের’ মোদি-পাঠ”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

গৌতম দাস

০৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2QS

           https://gulfnews.com/photos/news

ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” ব্যাপারটা অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে গেছে। যেমন আগে এটা এনআরসি [NRC বা নাগরিক তালিকা প্রণয়ন]  বলেই নিজে বুঝা বা অন্যকে বুঝানো যেত।  এনআরসি ব্যাপারটা ছিল কেবল আসামে আর সেখানে কে নাগরিক কে নয় এরই এক বাছাই প্রক্রিয়া চলছে বলে বুঝলেই চলত।  কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের গোপন লক্ষ্য ও পরিকল্পনার দিকটা ক্রমশ পুরাটাই উদোম হতে শুরু করেছে। এতে পরবর্তিতে তা আর এক নতুন মাত্রার দিকে গেলে সেই বিষয়টা বলা হচ্ছে সিএএ (CAA, Citizen Amendment Act) । যার সোজা মানে হল সংশোধনী বিলে  আফগান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ এভাবে নাম ধরে উল্লেখিত দেশ থেকে মূলত হিন্দুধর্মের লোকদেরকে ডেকে নিয়ে এসে নাগরিকত্ব দেয়ার পরিকল্পনা এটা। যদিও তা আদৌও বিজেপি বাস্তবায়ন করতে পারবে তা আমরা নিশ্চিত নই। এতে এখানে গুরুত্বপুর্ণ দিক যেটা স্পষ্ট করে বলে রাখা হল ঐ তিন দেশের মুসলমানেরা এই সুবিধা পাবে না।  অর্থাৎ ঐ তিন দেশে কোন কারণে  মানবাধিকার হারানো যে কেউ “নাগরিক” নয়, কেবল মূলত হিন্দুধর্মের লোকের জন্যই এই সুবিধা। এটা এতই স্পষ্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বৈষম্যমূলক আইন।
আর এবছর থেকে এবার আরও এক নতুন ইস্যু এনপিআর (NPR বা জাতীয় জনগণনা) এর সাথে যোগ হচ্ছে। ভারতে প্রতি দশ বছর পরপর নিয়ম করে জনগণনা হয়। সেটা শুরু হবে এবছরের এপ্রিল থেকে আর তা কাজ শেষে প্রকাশ হবে ২০২১ সালে।  কিন্তু এবার জনগণনাতে বাড়তি প্রশ্ন ও তথ্য সংগ্রহের কিছু দিক থাকবে এমনভাবে যেন তা পরের এনআরসি ও সিএএ-এর বদ মতলবের কাজকে সাহায্য ও সহজ করে। তাই এখন থেকে ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” বলতে আমাদেরকে – NRC, CAA & NPR – এই তিনের কোন একটাকে না বুঝা তিনের সমন্বয়ে ‘পুরাটাই একটা’ এভাবে বুঝাই সঠিক হবে। তাই এখন থেকে ব্যাপারটাকে একসাথে “নাগরিকত্ব ইস্যু” লিখব।

অনেকের ধারণা, সম্প্রতিকালের “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” ভাল সাড়া ফেলা বিরোধী আন্দোলনের পর এখন বোহয় এর সমাপ্তি ঘটেছে। না, এমন মনে করা একেবারেই ভুল হবে। আর বাস্তবে এটা থেমেও যায়নি। বরং আসলে নতুন নতুন মাত্রা ও অভিমুখ নিয়েছে আর সেসব দিকে ছুটে চলেছে। আর এটা থেমে যেতে পারে যদি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কোন ঘোষণা আসে যে, পুরা ‘নাগরিকত্ব ইস্যুর’ সব কিছুই পরিত্যক্ত এবং আইনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হল। এর আগে নয়। যদিও ব্যাপারটা বিড়ালকে মাছ খাওয়া ছেড়ে দিতে বলার মত। বিজেপি তা করতে পারবে না, বাধ্য না হলে। কারণ, বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিই তো এটা যে, ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো, আর এর মাধ্যমে সাধারণভাবে সবাই নাগরিক বলে গণ্য না করা, বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক – সেটা নয়; বরং হিন্দুধর্মের লোকেরা শ্রেষ্ঠ এবং উপরে – এই হিন্দুত্ববাদের প্রচার তুঙ্গে তোলা যাতে এভাবে সমাজে ধর্মীয় পোলারাইজেশন ঘটে যায় আর তাতে হিন্দু ভোটে একা বিজেপির ভোটের বাক্সই ভরিয়ে তোলা যায়। কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যু নরেন্দ্র মোদীর সরকার কখনই ত্যাগ করতে চাইবে না, যদি না তাকে আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করা না যায়।

যদিও এটা ঠিক যে, স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের তীব্রতা সময়ে কমবে সময়ে তুঙ্গে উঠবে, কখনো সরকার পিছু হটবে, মিথ্যা বলবে আবার মোদী সরকার কিছু সুযোগ পেলেই দ্বিগুণ বেগে ফিরে আসবে – অনুমান করা যায় সাধারণভাবে এটা এভাবেই চলবে। আর তা চলবে অন্তত চলতি সরকারের স্বাভাবিক আয়ু, ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এমন হওয়ার অনেক কারণ আছে। এক নম্বর কারণ হল, বিজেপি সরকারের হাতে এ ছাড়া নিজের মুখরক্ষার আর কোনই ইস্যু নেই। অথচ ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থা খুব খারাপ আর তা দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে। ফলে এই দুর্দশা ঢাকতে উপযুক্ত ইস্যু দরকার। পেটের চিন্তা থেকে আম পাবলিকের মন সরানোর মত অন্য ব্যস্ততায় তাদের মাতিয়ে রাখার মত ইস্যু দরকার; যেটা গত ২০১৬ থেকেই মোদী করে আসছে। এ ছাড়া আরও বড় বিষয় হল, সরকারের বাকি চার বছরের আয়ুতে প্রতি বছরই গড়ে চার-পাঁচটা করে রাজ্য নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। সেখানে বলার মত নির্বাচনী ইস্যু পেতে হবে এমন জোশ তুলতে পারতে হবে সরকারকে।

এমন অনেক কিছুর মধ্যে আগামী বছর (২০২১) দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন আছে – পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম রাজ্যে। এ দুটোতে কী হবে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে; তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির (অমিত শাহ্ বলেছেন দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতবে) হার হলে, তা ‘নাগরিকত্ব ইস্যু’ নিয়ে এর পরে বিজেপির কোনদিন কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শামিল হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আসামের আগে হবার কথা। আর পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম দু’রাজ্যেই হেরে গেলে ভারতে খোদ হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বিপন্ন হয়ে যাবে। “মুসলমানবিদ্বেষী জিগির তুলে বিজেপির ভোট বাক্সে হিন্দু পোলারাইজেশন” – এই ফর্মুলা চিরতরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই এদুই রাজ্যে হারলে মোদী সরকারের সব হিন্দুত্ব-বয়ানেরই নৈতিক [moral] পরাজয় ঘটে যাবে। হিন্দুত্ববাদ-ভিত্তিক কোন বয়ান অনুসারে ব্যাখ্যা বক্তব্য নিয়ে পাবলিকের কাছে গেলেই মানুষের “দূর দূর” করা শুরু হতে পারে।  ফলে বাকি তিন বছর ক্ষমতায় থাকা তখন দুঃসহ হয়ে উঠতে পারে। অতএব, বিশেষ করে এ’দুই রাজ্যে অন্তত রাজ্য নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব ইস্যু থাকবে প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ইস্যু হয়ে।

ইতোমধ্যে, অমিত শাহ আরেক ধাপ পিছু হটে নিজ মুখেই “এনআরসি ‘এখন’ নয়” – বলেই পিঠটান দিয়েছেন। এনিয়ে দৈনিক আনন্দবাজারের এক শিরোনাম হল, “এনআরসি নয় ‘এখন’, শাহের কথায় ফের ধন্দ”। মানে হল, মিডিয়াগুলো এখন মোদী-অমিতের কোনো কথাকেই আর বিশ্বাস না করার লাইন নিয়েছে তাই এদের কোন কথাকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না। মিডিয়া তাই পাবলিকের মনের সাথে মিল রাখতে  প্রতিদিন ও সবসময় সন্দেহ করছে আর খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে চলেছে। কেন? কারণ, ভারতের এখনকার “পপুলার পাবলিক মুডটা এ রকম”- আসলে সেই ইঙ্গিতই তুলে ধরছে মিডিয়াগুলো। ভারতের রাজনীতিতে সহসা এমন ক্ষিপ্ত মুড তৈরি হতে দেখা যায় না। বরং প্রত্যেক পঞ্চম বছরে, মানে কেন্দ্রের নির্বাচনের বছর ছাড়া অন্য বছরগুলোতে বড় মিছিল-মিটিং আয়োজন করে দলগুলো পয়সা খরচ করতে চায় না, তেমন কোনো ফল এতে নেই বা হবে না মনে করে বলে। কিন্তু ব্যতিক্রমে এমন ক্ষিপ্ত মুড কখনও  তৈরি হয়ে গেলে মিডিয়ায় রিপোর্ট লেখার সময় সেই পাবলিক মুডের সাথে তাল না মিলিয়ে লিখলে পত্রিকাই বাজার হারানোর রিস্কে পড়ে যাবে। আনন্দবাজারসহ  এখনকার সব মিডিয়া রিপোর্ট তাই এই মুডে লেখা। এক কথায়, বিজেপির বয়ানের প্রতি কোনো সহানুভূতি প্রকাশ করে ফেলা মিডিয়াগুলোর জন্য রিস্কি হয়ে গেছে। তবে অবশ্যই সেটা ‘টাইমস নাউ’ বা ‘রিপাবলিক’ ইত্যাদি বিজেপি ঘরানার দলীয় মিডিয়াগুলো বাদে।

উত্তরপ্রদেশ বাসা থেকে সোনাদানা লুট শুরু হয়েছে
নাগরিকত্ব ইস্যুতে এখন আরেক তোলপাড় চলছে উত্তরপ্রদেশে। মোট ২৩ কোটি জনসংখ্যার বিরাট রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুসলমান প্রায় ২০ শতাংশ। এবারের নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে প্রাণহানিতে সারা ভারতে মোট মৃতের সরকারি সংখ্যা ২৫ জন, যার ১৭ জনই এই প্রদেশের। আন্দোলনের মুখে রাজ্যসরকার পিছু হটেছিল, আর এখন ঘোষণা দিয়ে প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। এই রাজ্যের একটা আইন ছিল, কোনো আন্দোলনে সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে রাজ্য সরকার এর জন্য  – দায়ী কে, তা সুনির্দিষ্ট চিহ্নিত করে, তাঁর থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে। কিন্তু পরে আবার রিট হওয়াতে সেবার হাইকোর্ট আরও স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, রাজ্য সরকার নয়, হাইকোর্টে প্রমাণ সাপেক্ষে তা কোর্ট আদায় করে দিবে। অর্থাৎ হাইকোর্টের মাধ্যমে রাজ্য সরকার তা আদায় করতে পারবে; নিজেই সরাসরি কাউকে দায়ী করে নয়। সোজা কথায় নির্বাহী ক্ষমতা নিজের মত করে কিংবা আদালতে প্রমাণ হওয়া ছাড়া নিজেই নয়। অথচ উত্তরপ্রদেশ রাজ্য-পুলিশ এখন হাইকোর্টের মামলা করা অথবা রায়ে তা প্রমাণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বেছে বেছে বেশির ভাগ মুসলমান নাগরিকের বাড়িতে প্রবেশ করে হয়রানি ও লুটপাট করে চলেছে- একেবারে সোনাদানা নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। বিবিসি সরেজমিন রিপোর্ট করেছে এ নিয়ে। যার শিরোনাম – “যোগী অদিত্যনাথের ‘বদলা’: বাড়ি বাড়ি সম্পত্তি ক্রোকের নোটিস”।
তাই বলা যায় এক ‘খাঁটি প্রতিশোধ’ আদায়ের পালা চলছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে।

ভারতের বিদেশী কূটনীতিক
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট ছেপেছে। ভারতে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকেরা নাগরিকত্ব ইস্যুতে মোদী সরকারকে কেমনভাবে দেখছেন, এই হল ওর বিষয়। এ নিয়ে তিন মহাদেশেরই প্রায় ১৬ জন কূটনীতিকের সাথে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিপোর্টার। এর শিরোনাম, “দ্রুত বন্ধু হারাচ্ছে ভারত : সিএএ কেউ সমর্থন করছে না, বিদেশী কূটনীতিকদের হুঁশিয়ারি” [No outreach on CAA, foreign diplomats warn: India fast losing friends]। সেখানে এক কূটনীতিকের মন্তব্য খুবই প্রতিনিধিত্বমূলক। ভারতে তিন বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন, এমন সেই কূটনীতিক বলেছেন, “মোদী পুনর্র্নিবাচিত হয়ে এসেছিলেন বলে নিজের স্বপক্ষে যে একটা ‘ফিল-গুড’ বা ‘স্বস্তির-ইমেজ’ [“feel-good” factor ]  তৈরি করতে পেরেছিলেন এত দিন, তার পুরোটাই এখন চলে গেছে” [“feel-good” factor about the re-elected government has “vanished”. ]।

তবে তাঁরা মূলত সবচেয়ে অখুশি এ জন্য যে, নাগরিকত্ব ইস্যু বা এর সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী আন্দোলন কিংবা জনবিভক্তিতে ক্ষোভ ইত্যাদি – এসব নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার আজও কোন কূটনৈতিক ব্রিফিং বা সরকারি ভাষ্য প্রদান করেননি। না, কূটনীতিকদের এই আকাঙ্খা এটা অনধিকার নয় বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়া নয়। কারণ, ইতোমধ্যে মোদী সরকার এ ধরনের কাজকে এর আগেি নিজের সরকারের জন্য রুটিন করে ফেলেছেন। যেমন- ‘পুলওয়ামা-বালাকোট হামলা’র পর, আগস্ট থেকে অক্টোবরে কাশ্মির নিয়ে সিদ্ধান্তের পর এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের ‘অযোধ্যা মামলা’র রায়ের পরও তারা কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছিলেন অথচ এখন নাগরিকত্ব ইস্যুতে চুপ- এ কারণে এবার তারা খুব অবাক হয়েছেন, [They recalled that through 2019, the Ministry of External Affairs (MEA) held several briefings, mostly after Pulwama-Balakot in February-March, followed by Kashmir from August to October — and, to their surprise, even once on the Supreme Court’s Ayodhya verdict.]।

ওদিকে সবচেয়ে বড় কথাটা হল, বিদেশী মিডিয়াতে যেভাবে বিক্ষোভ ও সরকারের সাঁড়াশি অভিযানের ছবি ও প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, তা ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর ভারতের পক্ষে দাঁড়ানোটাকে কঠিন করে তুলেছে। কারণ ওইসব দেশের অনেকেই ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ মানে নাগরিক অধিকার এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যহীনতা রক্ষা করে চলার প্রতিশ্রুতি, যা যেকোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র করে থাকে, তা ভারতে কোথায় গেল সেই প্রশ্ন তুলছেন তারা, [“With each passing day, the government’s position is getting weakened, as these images are not going away. And the action against the protesters and the latest reports of torture and intimidation are giving more credence to the view that the government is intolerant of criticism and dissent,”……. “It doesn’t speak well of the world’s largest democracy,” a diplomat from a G-20 country said”…….The State Department spokesperson had earlier urged India to “protect the rights of its religious minorities” in keeping with its “Constitution and democratic values”.

আসলে, এটা হল হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির মৌলিক সঙ্কট, যেকোন অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এ জন্য এমন মতবাদ অগ্রহণযোগ্য। সোজা কথাটা হল, বিজেপি অথবা আরএসএসের রাজনৈতিক চিন্তায় ‘নাগরিক অধিকার’ বলে কোন ধারণা নেই। কেবল ‘হিন্দু-জাতি’ আছে; নাগরিক বলে কোনো কিছু নেই। খাঁটি হিন্দুরা কেবল কথিত অলীক কোন হিন্দু-জাতির স্বার্থ দেখবেন, এ ধারণা আছে। দরকার হলে এ জন্য তারা অপর অন্যের মাথা ফাটিয়ে দেবেন। সেকারণে তাদের মনে হয়, ‘নাগরিক’ অথবা ‘অধিকার’ এসব শব্দ আবার কী?

দুনিয়া যতদুর পরিক্রম করে পেরিয়ে যে জায়গায় এসেছে তাতে আমরা পছন্দ করি আর নাই করি একালে গ্লোবাল সমাজের মৌলিক ভিত্তি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি। এমনকি তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ রাষ্ট্রও অন্তত মুখে এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে তা বলবার সুযোগ নাই। এবং তা বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে মানে। তাই এককথায় বললে ভারতের আজকের অবস্থা হল আন্তর্জাতিক জগতে সে একঘরে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। এ’কথারই প্রতিধ্বনি দেখা গিয়েছে আগের কংগ্রেস আমলের প্রাক্তন সেই সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের মুখে। তিনি বলছেন, আমাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে “শত্রুপক্ষকে আমরা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছি’।  “দেশের বাইরে থেকে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের তালিকা সত্যিকার অর্থেই দীর্ঘ। প্রেসিডেন্ট মখাঁ (ফ্রান্স) ও চ্যান্সেলর মার্কেল (জর্মানি) থেকে নিয়ে ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস এবং নরওয়ের রাজার মত ব্যক্তিরাও এর সমালোচনা করেছেন, যারা সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে ভদ্র অবস্থানে থাকেন”।

তবুও হয়ত ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা”- রাষ্ট্রের এই অভিন্ন প্রতিশ্রুতি (বা মূল্যবোধ) দেয়া বা রক্ষার কথা বিজেপি বা আরএসএস নিজে মানুক না মানুক তাদের দিয়ে মুখে স্বীকার করানো যেত, যদি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন ও কঠোর হতেন। কিন্তু মনে হয়, সে আশাই আর নেই। কারণ, ও দুই অফিসের নীতি হল, মোদির নির্বাহী ক্ষমতা আগ্রাসী হয়ে ধেয়ে এলেই তারা সবাই গুটিয়ে সরে যাবে। নাগরিককে সুরক্ষা দিতে কিংবা নাগরিককে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা ও প্রতিকার দিতে গেলে নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে- এমন পরিস্থিতির উদয় হলেই কোর্ট বা কমিশন এরা পাশ কাটাতে শুরু করবেন। কখনো পাশ কাটাতে তারা বছরওয়ারি শুনানির সময়ও ফেলতে থাকেন। যেমন, উত্তরপ্রদেশে রাজ্য সরকারের যেখানে এখতিয়ারই নেই সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায়ের, তা সত্ত্বেও নাগরিককে সীমাহীন হয়রানি করে চলছে, ঘোষিতভাবেই ‘প্রতিশোধ’ নেয়া হচ্ছে।

বিজেপি নেতা অমিত শাহের কঠোর সমালোচনা শুরু হওয়াতে দল থেকেই তাঁকে কিছু দিন চুপ থাকতে বলা হয়েছিল। ছিলেনও। কিন্তু আবারো তিনি সরব হয়েছেন। এবার পশ্চিমবঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে তিনি বলছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে (২০২১) ক্ষমতায় আসবে নাকি বিজেপি। এমনকি মমতার সাথে যদি কংগ্রেস ও বামফ্রন্টও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে তবুও এই ফল হবে। এতে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, নাগরিকত্ব ইস্যু যখন তৈরি ও হাজির ছিল না, তখন অমিত এমন বললে মমতা ছাড়া অন্যরা (মানে কলকাতার কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট) কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া শ্রেয় মনে করে এসেছে আমরা দেখেছি। কিন্তু এবার বিরোধীরা সবাই অমিতের মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অর্থাৎ গত বছরের (২০১৯) কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষুব্ধ সিপিএম যেমন মমতাকে হারিয়ে দিতে বেনামে অঘোষিতভাবে বিজেপির পক্ষে কাজ করেছিল এবার আর সে অবস্থা নেই, তা বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিজেপির অবস্থা আর তেমন ভালো নেই- এটা অমিত শাহেরই স্বীকারোক্তি। যেমন অমিত বলছেন, এনআরসি নয় ‘এখন’; মানে তার দল কলকাতার নির্বাচনে ব্যাকফুটে। হয়ত, এনআরসির কথা আর ভোটের আগে বিজেপি তুলে ধরবে না, এ ব্যাপারে পিছিয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ক্ষেপে গেছে, তা অমিত শাহ এভাবে পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের লোক কেমন ক্ষেপে থাকতে পারে, এর এক নমুনার সরেজমিন রিপোর্ট আছে আনন্দবাজারে – আধারের জন্য সারা রাত লাইনে ১১ হাজার।  [এখানে “আধার” মানে AADHAAR – এটা আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের মতন সমতুল্য ডকুমেন্ট। ] আর ওদিকে, আমাদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তের অপর পারে নদীয়া জেলা (ব্রিটিশ আমলে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার এক মহকুমা ছিল), এখনকার নদীয়ার এমন আরেক মহকুমা হল তেহট্ট – এই হল ঘটনাস্থল। সেখানকার একটা ঘটনা হল এই তীব্র শীতে বৃষ্টির রাতে আধার কার্ড সংশোধনের জন্য সারা রাত ১১ হাজার লোক লাইন দিয়ে বসেছিলেন। লোকের মনে আতঙ্ক যে, কার্ড না থাকলে যদি নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারার অপরাধে ভারত থেকে বের করে দেয়া বা ক্যাম্পে ফেলে রাখা হয়! নাগরিকত্ব ইস্যু হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার মনে কী পরিমাণ আতঙ্ক জন্ম দিয়েছে, এর জলজ্যান্ত প্রমাণ এই ১১ হাজার লোকের লাইন। এই লোকগুলো অথবা যারা এদের দুর্দশা দেখছেন, তারা কেউ বিজেপিকে কি আগামীতে ভোট দিবে মনে হয়?  তবে মনে হচ্ছে না অমিত শাহ এই সাধারণ মানুষগুলোর আতঙ্ক আর অমানুষিক কষ্টের দিকটা দেখতে পাচ্ছেন। বুঝা যাচ্ছে মোদী-অমিতেরা নিজের ভোটবাক্সে হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে আদায় ছাড়া আর কোন দিকেই তাদের হুশ নাই, এমনই নিষ্ঠুর অমানুষের চিন্তায় পৌছে গেছে তারা।

তাহলে এখন অমিত শাহ এত বিরাট দাবি করে বললেন, তারা জিতবেনই- এই দাবির মাজেজা কী?
ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় মোদীর কোনও কারচুপির মেকানিজম আছে এমন অনুমান ও অভিযোগ অনেকের। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মমতা এবং উত্তরপ্রদেশের মায়াবতীর সবচেয়ে বেশি। এটা কি সেই ইঙ্গিত যে, অমিত শাহের এখন শেষ ভরসা সেখানে? এই প্রশ্ন দানা বাঁধছে। মমতা ইতোমধ্যে ভোটব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের উভয় সংসদে নোটিশ দিয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার আছেন; তিনি গত নির্বাচনে মোদির নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের জন্য ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন বলে পরে তার পরিবারের সদস্য সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই (আমাদের দুদকের সমতুল্য তবে তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। ) লেলিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠে আছে। মোট কথা, অমিত শাহের দাবি অস্বাভাবিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ০৪ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক ও নাগরিকত্ব ইস্যু এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

গৌতম দাস

৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Qz

_

চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

গৌতম দাস

২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2PW

Modi-Amit from swarajyamag.com

নেক হয়েছে। এই অঞ্চলকে অনেকদূর বেপথে নিয়েছেন। এবার মোদী-অমিত, আপনাদের হার শুরু। আপনাদের হারের  চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠতে শুরু করেছে! আপনি পেছন ফিরে পালাতে চাচ্ছেন, নরেন্দ্র মোদী! মোদি-অমিতের সেই পিছু হটে পালানোর চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠছে, মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেয়া শুরু করেছে। আপনারা হার মানছেন এমন সব চিহ্ন ফুটে উঠছে। বুঝব কিভাবে?

চিহ্ন একঃ মোদী-অমিতের সরকার এবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসে.) সকালে অনেকগুলো উর্দু ও হিন্দি পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপানো হয়েছে – শিরোনামে “গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে” (“rumours and incorrect information being spread”.) । কিন্তু কোনটা গুজব আর অসত্য? বলতে পারছে না।  দাবি করছে যে, ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে – এমন কোন সরকারি ঘোষণা নাকি এখনও দেয়া হয়নি।  এই ডিটেইলটা ছাপা হয়েছে  ভারতের ইংরাজি ওয়েব পত্রিকা scroll.in. লিখেছে, [On Thursday morning, the Modi government put out advertisements in multiple Hindi and Urdu papers alerting people about “rumours and incorrect information being spread”.]

এতে মিডিয়াজুড়ে তোলপাড়ে প্রায় প্রত্যেক মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে, আগে কবে কোথায় অমিত শাহ ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেসবের রেফারেন্স প্রমাণ তুলে এনে রিপোর্ট ছাপানো শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বরাত দেয়া হয়েছে অমিত শাহের নিজের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে করা টুইটকে। সেখানে বলা হয়েছিল, “ভারতজুড়ে এনআরসি আমরা নিশ্চিত করব”।
এরপরও ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আবার অমিত শাহরা আরও বড় করে নিজেদের বেইজ্জতি ডেকে আনতে তাঁরা এবার সেই পুরান ১১ এপ্রিলের টুইটই মুছে ফেলেছে। আসলে বিরাট এক কেলেঙ্কারির অবস্থায় এখন বিজেপি। আনন্দবাজার থেকে টুকে আনা সেই টুইটটা [নিচে স্কান কপি দেখেন] ছিল এরকমঃ “We will ensure implementation of NRC in the entire country. We will remove every single infiltrator from the country, except Buddha, Hindu and Sikhs: @Amitshah #NaMoForNewIndia

চিহ্ন দুইঃ মমতার তৃণমূল কংগ্রেস দলের হয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতা হিসাবে সংসদে দলের স্বার্থে লিড ভুমিকা নেন আর ইস্যুগুলো দেখাশোনা করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক ও ব্রায়েন। তিনি টুইট করে লিখেছেন, “বিজেপির আইটি সেল টুইট মুছে দিতেই পারে। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সব রাজ্যে এনআরসি হবেই। তা মুছতে পারবে না ওরা”। কথা সত্য, সংসদের রেকর্ড মুছবার ক্ষমতা কোনো একটা দলের নেই।

উপরের এই টুইট-টাই এখন মুছে দেয়া হয়েছে যা ছিল গত ১১ এপ্রিলে লেখা।   আর প্রায় কাছাকাছি একই ভাষ্যের ২২ এপ্রিল লেখা অমিতের আর এক টুইট  এর কপি বরাত দিয়ে  স্ক্রোল [scroll.in] পত্রিকা দেখাচ্ছে সেখানেও অমিত শাহ সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করার কথা বলছেন। যেমন নিচে  দেখেন তা হল,
First, we will bring Citizenship Amendment Bill and will give citizenship to the Hindu, Buddhist, Sikh, Jain and Christian refugees, the religious minorities from the neighboring nations.
Then, we will implement NRC to flush out the infiltrators from our country.

এছাড়া গত অক্টোবরের ১ তারিখে কলকাতায় বক্তৃতা দিতে এসে অমিত শাহ বলেছিলেন, সারা ভারতে এনআরসি করে খুঁজে খুঁজে কিভাবে তেলাপোকা উইপোকা অনুপ্রবেশকারী (মুসলমান) মেরে তিনি  তাড়িয়ে দিবেন। সেই বর্ণনা দিয়ে ভোটার উত্তেজিত করার সহজ পথ নিয়েছিলেন। আজ মিডিয়াগুলো সেই রেফারেন্সটাই বের করে সরকারকে আরও বেইজ্জতি করেছে।

তাহলে এত জায়গায় রেফারেন্স থাকা সত্ত্বেও এবং এমন রেফারেন্স যা লুকানো বা মুছে ফেললেও, তা জানাজানি হয়ে যাবে – এসব জানা সত্ত্বেও মোদী-অমিতের সরকার এমন মিথ্যা কথা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে গেল কেন?

এর সোজা মানে হলে মোদী-অমিতেরা এমন বিপদের জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাদের হাতে কিছুই নাই। তাই “যদি লাইগা যায়” ধরণের কামকাজ শুরু করেছে – এমনই দশা।  খড় কুটো আঁকড়ে ধরছে।  বিশেষ করে এনআরসির সাথে নাগরিক বিলের কোন সম্পর্ক নাই একথা যদি পাবলিককে বিশ্বাস করাতে পারে আর তাতে যদি একথা মেনে নিয়ে রাস্তার আন্দোলন কিছু থিতু হয় এই হল অমিতদের শেষ আশা।
অর্থাৎ পাবলিক ঠান্ডা করার এর চেয়ে ভাল ও আস্থাবাচক কোনো বক্তব্য-হাতিয়ার বিজেপির কাছে নেই। আর এটাই মোদী-অমিতের হেরে যাবার সবচেয়ে বড় চিহ্ন। মোদি-অমিত এতই ফেঁসে গেছেন যে, এর চেয়ে ভাল বা বেশি বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য তাদের হাতে নেই। এ ছাড়া সরাসরি মিথ্যা বলা বা প্রপাগান্ডা করে সদর্পে মিথ্যা বলার দিকে বিজেপির ঝোঁক আগেও ছিল আমরা দেখেছি। তারা মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে অনেকদূর যাওয়া যায়, কেবল পাক্কা ব্যবহারকারি হতে হয়। যেমন সেই অর্থে ভারতের মুসলমানেরা বিজেপির আসলে কোনো শত্রু না, তা তারা জানে। বরং অ্যাসেট। কিভাবে? কারণ মুসলমানদের নামে ঘৃণা ছড়িয়েই তো কেবল হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে ঢুকাতে পারে! মুসলমানেরা না থাকলে সে কার ভয় দেখাত বা কার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াত। আর এটাই তো বিজেপির রাজনীতির কৌশল।

বোকা অমিতের স্ববিরোধী দাবি
সবাই জানি বিজেপির চোখে আমরা মুসলমানেরা সব উইপোকা তেলাপোকা, তুচ্ছকিট; তাই সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করে মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দিবে। বিশেষ করে কেন তাড়িয়ে দিবে? কারণ নাকি মুসলমানেরা স্থানীয়দের কাজ বা চাকরি সুযোগ নিয়ে নিচ্ছি। তা ভাল, কী আর বলা। এনআরসির সপক্ষে আপাত চোখে যুক্তির বিচারে সবচেয়ে ভাল যুক্তির বক্তব্য মনে হয় এটাই।
কিন্তু অমিত শাহ আপনার কপাল খারাপ। কারণ আপনার দিল সাফ নাই। অনৈতিক ও অসততার উপর দাঁড়ানো আপনার কথা। তাই আজ না হলে কাল আপনি ধরা পড়ে যাবেন। এবং গেলেন। কীভাবে?
আপনি এখন বলছেন বাংলাদেশসহ আরও তিন দেশ থেকে মূলত হিন্দুদের নিয়ে এসে আপনি ভারতের নাগরিকত্ব দিবেন এজন্য নতুন বিল এনেছেন। যদিও ঐ তিন দেশ থেকে কোন মুসলমান আসলে এই সুবিধা আপনি তাদের দিবেন না। মুসলমানবিদ্বেষী আপনি আমরা জানি তাই এনিয়ে এখানে কোন কথাই তুললাম না।
কিন্তু লক্ষ্য করেন আপনাদের দাবি হল কেউ মুসলমান হলেই সে ভারতের বাইরের লোক, আর এবার দাবি করতে থাকা যে এরা ভারতের বাসিন্দাদের চাকরি বা কাজ নিয়ে নিচ্ছে বলে আপনারা এনআরসি করছেন তাদের তেলাপোকার মত তাদের ভাগাবেন বলে তোলপাড় করে তুলছেন। তাহলে আবার বাংলাদেশসহ তিন দেশ থেকে সেখানকার হিন্দুদের নিতে চাইছেন কেন? হিন্দুরা কী ভারতে গিয়ে মূলত হিন্দুদের কাজ চাকরিতে ভাগ বসাবে না? তাহলে এনআরসিতে লোক খেদানো আবার নাগরিকত্ব বিলে লোক আমদানি এদুইয়ের রহস্য কী বা এই স্ববিরোধীতা কেন? তাহলে অন্তুত এতটুকু সৎ হয়ে বলেন যে “বিদেশিরা কাজ-চাকরি নিয়ে নিচ্ছে” একথা সত্য না। সত্যিই, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক মাহাত্ব সাংঘাতিক!

আসলে এখনকার ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপির ভিতরের মূল্যায়ন হল, একটু কৌশলে ভুল হয়ে গেছে, সেটা সংশোধন করে নিতে পারলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ভুলটা হল, সারা ভারতে এনআরসি করার কথা আগে না বলে আগে কেবল নাগরিকত্ব সংশোধিত বিল পাস করে নিতে হত, বিজেপিকে। এতে মুসলমান বাদে সব ধর্মের বললেও মূলত অন্যদেশের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে নিলে এরপরেই কেবল সারা ভারতে এনআরসি করার কথা তুলতে হত। তাহলে আজ যেভাবে ভারতের শহরের পর শহর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে উত্থাল হয়ে উঠছে সব উপড়ে ফেলতে শুরু করেছে, সেটা নাকি হত না। এই হল তাদের মুল্যায়ন। কিন্তু  এটা অবশ্যই তাদের মন-সান্ত্বনা!
বাস্তবতা অনেক গভীরে চলে গেছে, যার খবর আর বিজেপি নিতে পারবে না। কেন? ভারতের সাধারণ মানুষই বা মোদী-অমিতের উপর এত খেপে গেল কেন?

সমাজতন্ত্র নিয়ে আমরা জানি অথবা আমাদের অনেক প্রত্যক্ষ আছে। এর গালগল্প শুনিয়ে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে একেবারে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ হয়েছিল এর সবচেয়ে ভুক্তভোগী, কষ্টভোগী এবং ভিকটিমও বলা চলে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে বললে, উনিশশ ষাট সালের মধ্যেই যাদের জন্ম বা চুয়াত্তর সালের মধ্যেই যাদের টিনএজে প্রবেশ ঘটেছিল এদের সরাসরি সচেতন অভিজ্ঞতা আছে কিছু শব্দের যেমন রেশন, টিসিবি, আর কিছু স্মৃতি – ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের হাহাকার। এক পিস সাধারণ লাইফবয়  সাবান কিনতে পারার জন্য কয়েক ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। আর তাতে রেশন, লাইনে দাঁড়ানো আর সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল প্রায় সমার্থক শব্দ। আর মানুষের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে হতাশ করে ফেলার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর হয় না।  মানুষ ভাত জোগাড়ের চেষ্টা করবে না লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে? জীবনের উদ্দেশ্যই বা আসলে কী? কোন কিছুর সদুত্তর কারও জানা ছিল না।
সৌভাগ্যবশত মোটামুটি পঁয়ষট্টি সালের পরে যাদের জন্ম এরা টিনএজে এসে এদের আর রেশন, লাইন দেখতে হয়নি। জিয়ার আমল প্রায় শেষ করে এসে এটা আস্তে আস্তে এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এতে অন্তত  রাষ্ট্র  পরিচালনাকারি সরকার আর সাথে গরিব জনগণও সবারই বুঝাবুঝিতে আক্কেল হয়ে যায় যে রেশন-সমাজতন্ত্রে দেশ চালানো কী জিনিস! আর একালে এসে ট্রাকে করে চালবিক্রির চাল কেনাতে মানুষ উৎসাহী হয় তখনই যখন এতে যে পরিমাণ পয়সা বাঁচে তা অতিরিক্ত সময় ব্যায়ের তুলনায় লাভজনক বিবেচিত হয়, কেবল তখন। আসলে সেকালে পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকত যাদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে অফুরন্ত সময়ও সম্ভবত থাকত ফলে পোষাত; কিন্তু এমন দিন আর এখন সমাজের ভিতরেই তেমন নেই। কিন্তু লক্ষ করা গেছে যে, কোনকালের নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই কষ্টের দিকটা আমল করেছেন, গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন – না, কোনোকালেই এমনটা দেখা যায় নাই।
বরং দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে ভারতের মোদীর সরকার সবচেয়ে গোঁয়াড় আর দানব। একালে এই ২০১৬ সালে নোট বাতিলের ঘটনাটাকেই দেখেন। এই নোট বাতিলকে কেন্দ্র করে মোদী মানুষকে বাধ্য করেছিল – কাজকাম ধান্ধা ফেলে সকলে ছুটেছিল নোট বদলাবার জন্য ব্যাংকে লাইন ধরতে। মানুষের মুল ওয়ার্কিং আওয়ার নষ্ট করে দেয়া মানেই গরীব মানুষের সরাসরি আয়-ইনকামে ক্ষতি করে দেয়া। অথচ এই ক্ষতিটাই অবলীলায় করা হয়েছে। বিশেষ করে গরিব-মেহনতি মানুষের যে আয়ে ক্ষতি এর কোনোই ক্ষতিপূরণ নিয়ে কারও কোন বিকার নাই – ব্যাপারটা মোদী বা তাঁর নীতিনির্ধারকদের আমলেই নেই। অথচ কথাটা হল, সরকার যা দিতে পারে না, মুরোদ নেই, তা সরকার অন্তত কেড়েও নিতে পারে না। যোগ্যতা থাকতে পারে না। চাকরি বা আয়ের সুযোগ দেয়ার কথা সরকারের। তা না দিতে পারলে অন্তত আয়ের সুযোগ কেড়ে নেয়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাজ হতে পারে না। অথচ মোদীর সরকার-প্রশাসন এদিকটা আমল না করেই, কোন বিকল্প বা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা না করেই  নোট বাতিলের পথে গেছিল।
আর ঠিক একই সেই জিনিস ঘটিয়েছে  আসামের প্রশাসন ও মোদী । এনআরসির নামে দীর্ঘ ছয় বছর (২০১৩-১৯) ধরে মানুষকে প্রায়শই তাদের জীবন লাইনে দাঁড় করিয়ে পার করেছে। এখনও যা শেষ হয় নাই, সমাধান নাই। আর এর চেয়েও বেশি কষ্টকর অমানবিক অবস্থায় ফেলেছে ডকুমেন্ট জোগাড়ের ছোটাছুটি আর মানসিক অনিশ্চয়তা – যদি তালিকায় নাম না উঠে? একে তো গরিব মানুষ ভাত জোগাড়ে সব সময় হিমশিম খায়, সেখানে তাঁদের কোনমতে বেচে থাকা জীবনে এর চেয়েও প্রধান শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তালিকায় নাম ঊঠানো বা, নাগরিকত্ব হাসিল করা!  ভাতের অভাবের চেয়ে এ’এক কঠিনতর শাস্তি! অথচ যে এই শাস্তির আয়োজক সে একেবারেই নির্বিকার!

সারকথাটা হল, এনআরসির বেলাতেও এরা গরিব মেহনতিদের কষ্ট  – দিনভর লাইনে দাঁড়ানো, অনিশ্চয়তা, ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ভয় ও শঙ্কা, আয়-ইনকাম বন্ধ ইত্যাদি কোন কিছুর দিকটাই নীতিনির্ধারকরা আমল করেনি। বরং বিজেপির ভোটের বাক্সে হিন্দুভোট পোলারাইজেশন ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। তাই নির্বিকার লক্ষ্য।

তাহলে কেন এবার সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বিলের পক্ষে থাকবে? কেন এর ভেতর দিয়ে প্রতিবাদের সুযোগ পেলে সেটাকে প্রবলে সে কাজে লাগাবে না? মোদী-অমিত তাঁদের সীমাহীন কষ্টের দিকটা দেখেননি, দলের স্বার্থ আর ভোট ও ক্ষমতার লালসায়  সবকিছুকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে গেছে।  আজকে পাবলিক মোদী-অমিতকে উপেক্ষা করার একটু সুযোগ দেখেছে। সেটা তুলে নিয়ে কাজে লাগাবে না কেন? এটাই তো সব দানব সিদ্ধান্তগুলো উপড়ে ফেলার ভাল সুযোগ!
আবার এতদিন সবকিছুতে সর্বক্ষণ হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা হয়েছে। সেটা গরীব মানুষকে ভাল না লাগলেও খারাপ লাগেনি হয়ত, তাই পাশ কাটিয়ে থাকা শ্রেয় ভেবেছে। হয়ত ভেবেছে এটা আমার কী, এটা কেবল মুসলমানের সমস্যা হয়ত। কিন্তু এবার আসামের এনআরসিতে? এবার এতদিনে সকলেই বুঝে গেছে ব্যাপারটা স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে আরামে বসে বসে কেবল মুসলমানের কষ্ট দেখার ব্যাপার নয়। বরং ব্যাপারটা সবারই। ডকুমেন্ট, আধার কার্ড [AADHAAR card, আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সমতুল্য] ইত্যাদি জোগাড়ের অসম্ভব ছোটাছুটির অনিশ্চয়তা। আবার ভারতের আধার কার্ড মানে এই ন্যাশনাল আইডি দেয়া ও দেখাশুনা করা হয় তাদের পোস্ট-অফিসগুলো থেকে। ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব বা এনআরসির ক্যাচালে সবাই ছুটছে পোস্ট-অফিসে অথচ, পোস্ট অফিসে সেজন্য মোদী-অমিতেরা স্টাফ বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করেনি, হয়নি। হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে আনার কাজের বাইরে অন্য কোন দিকে মনোযোগ দিবার সময় কই তাদের? এনিয়ে আনন্দবাজার একটা ভাল বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন এখানে। লিখেছে, প্রায় সকলেই জানিয়েছেন, এনআরসি-র ভয়েই আধার কার্ড ঠিক করার জন্য লোকজন মরিয়া। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কারও তারিখ দু-তিন মাস পরে, কারও আবার বছরখানেক পরে। অর্থাৎ অমিত শাহের নিজনিজ ভোটের বাক্সের স্বার্থে মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ও ভোগান্তিতে ফেলছে অথচ স্টাফ বাড়ানো, কাজটা সহজ করতে বাড়তি স্টাফ দেয়ার আগ্রহ তাদের নেই। ব্যাপারটা তাঁদের মনোযোগের ভিতরেই আসে নাই। তাহলে কেন সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেলে তা উপড়ে ফেলে দিতে চাইবে না? এছাড়া এতদিতে তাঁরা বুঝে গেছে বিজেপির হিন্দুত্ব জিনিষটা এত মিঠা না!

সার কথায় বললে, পাবলিক পারসেপশন এখন আগের তুলনায় পরিপক্ব রূপ নিয়েছে মনে হচ্ছে।  একারণে, হিন্দুত্বের রুস্তমিতে হিন্দুগিরি বা হিন্দু-সুরসুরি তুললেই তা আর সমাজে তেমন কাজ করছে না সম্ভবত, ঢিলা দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থের দেনাপাওনার চোখ দিয়ে নাগরিকত্ব বা এনআরসি ইস্যুতে সরাসরি নিজের লাভক্ষতি দিতে বুঝতে চাচ্ছে মানুষ; বিশেষ করে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ।  আর এর সাথে এসে যোগ দিয়েছে  স্টুডেন্ট আর সাধারণ মানুষ। তাই তাঁরা নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেয়ে পুরা ষোল আনা কাজে লাগাচ্ছে, বলে মনে হচ্ছে। জীবন এমনিতেই প্রচন্ড ভারী, সেই ভারকে আর বাড়তি ভারী না করে নাগরিকত্ব বা এনআরসি থেকে মুক্ত করতে চাইছে সবাই!

অতএব প্রশ্নটা এনআরসির বাস্তবায়ন এটা মোদী-অমিতেরা  হিন্দুত্বের ক্ষমতার লালসায় নাগরিকত্ব বিলের আগে না পরে হবে সেটা তাদের কাছে এখানে কোনো ইস্যুই নয়। পাবলিক পারসেপশনের লেবেলে এর কোনো ফারাক নেই। বিজেপি সম্ভবত মুখরক্ষার জন্য এমন “সারা ভারতে এনআরসি বিজেপি চায়নি” বলে ক্ষিপ্ত পাবলিকের মনোযোগ সরানোর অজুহাত খুঁজছে। কিন্তু বিজেপির মুল সমস্যা হল মোদী-অমিতের উপর পাবলিক বিলা হয়ে গেছে। আস্থা হারিয়ে গেছে বা বিশ্বাস তুলে নিয়েছে মনে হচ্ছে। কাজেই এনআরসি না নাগরিকত্ব বিল কোনো ইস্যুতেই পাবলিক আর সরকারকে বিশ্বাস করছে না। যার সোজা মানে হল, মোদী-অমিতের বিজেপি সরকারকে – এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল – এদুটোকেই প্রত্যাহার  করা হয়েছে এই ঘোষণা করানোর দিকেই আগাচ্ছে।

বাংলাদেশের চলতি সরকারকেও বিজেপি বিক্রি করেছে
ইদানীং লক্ষণীয় যে, ভারতের মিডিয়া এবার প্রকাশ্যেই লিখছে বাংলাদেশের সরকার নাকি ‘খোলাখুলিভাবে কাজে ও বাক্যে বছর দশেক ধরে প্রো-ইন্ডিয়ান’ [Prime Minister Sheikh Hasina, who has been openly pro-India in word and deed since coming to power a decade ago]। কথাটা দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছে একজন এমন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ সরকারকেও অমিত শাহ অপব্যবহার করেছে তা বুঝাবার জন্য। কথা সত্য। অমিত শাহ ভারতের সংসদে  নতুন নাগরিকত্ব সংশোধিত বিলের পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য বাংলাদেশে সরকার হিন্দুদের ‘নির্যাতন করছে’, ‘সুরক্ষা করে নাই’  – এসব কথা সরাসরি বিলের ভাষায় অথবা সংসদে অমিত শাহের কথায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নাম সরাসরি বিলের ভাষায় পর্যন্ত উঠে এসেছে। সেটা আসায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করছে। তাহলে এর তথ্য ও প্রমাণাদি কই?   একথা খুবই সত্য যে অমিত শাহের নাগরিকত্ব বিল দাঁড়িয়ে আছে “বাংলাদেশ সরকারের হিন্দুদের উপর ধর্মীয় নির্যাতন করে চলেছে” একথা যদি নিশ্চিত ভাবে ধরে নেই একমাত্র তাহলেই।
অথচ কূটনৈতিক করণীয় অর্থের দিক থেকে বললে, এ নিয়ে আগে কোন আলোচনার এজেন্ডা সেট করা, কোনো আলাপ আলোচনা অথবা কোনো প্রমাণ পেশ ইত্যাদির কিছুই করা হয়নি। আবার বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করার বিনিময়েই এমন ভাষ্যের উপরের এই বল আনার যৌক্তিকতা ও সাফাই দাঁড়িয়ে আছে। আবার এটাই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে বিজেপির এর ফলাফলে হিন্দুভোট পোলারাইজেশনে বাক্স বোঝাইয়ের পরিকল্পনা ও উপায়। মানে হল ভারতের বিজেপি সরকার নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ সরকারকে বেঁচে দিয়ে একে নিজের ভোটের ক্ষমতা পোক্ত করার উপায় হিসেবে হাজির করেছে। এটা পানির মতই পরিস্কার।
আবার ওদিকে আসামের রাজ্য সরকার সেটাও বিজেপি দলের সরকার। আসাম সেই দেশ ভাগের সময় থেকে বাংলাদেশের কথিত  ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুসলমানদেরকে  তাঁদের সব দুঃখের জন্য দায়ী করে আসছে। তাঁরা নাকি স্থানীয়দের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে অসমীয়দের সমাজ-সংস্কৃতি সব ধবংস করে দিচ্ছে। অথচ এনআরসি তালিকাতে দেখা গেল তাদের এই অসমীয় পারসেপশন ভিত্তিহীন। ছিটেফোঁটাও সত্যি নয়। এনআরসিঢ় ফাইনাল তালিকা প্রকাশের পর এখন জানা যাচ্ছে  আসামের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার ১%-এর (প্রায় পাঁচ লাখ মাত্র) মত মুসলমান জনগোষ্ঠী তালিকায় নাম তুলতে পারেনি। অর্থাৎ একটা মিথ্যা পারসেপশনের উপরে তারা এখনো চলছে আর মুসলমানবিরোধী ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে।  [আমরা যেন না ভুলে যাই অরিজিনাল মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানোর শুরুকর্তা কিন্তু এই অসমীয়রা যারা তাদের মথ্যা পারসেপশন প্রমাণ করতে না পারলেও এখনও তা জারি রেখেছে। আর বিজেপি পরে এই দাবিটা কুড়িয়ে নিয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে রাজনীতি করছে।] আর এবার নাগরিকত্ব বিলের পরে অসমীয়দের ফোকাস গেছে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর যে, তারা এবার নাগরিকত্বের লোভে আসাম দৌড়াবে হয়ত। তবে এটা অবশ্যই মোদি-অমিত সরকারের ভোটবাক্স ভরবার ইস্যু। এই অর্থে  সেটা সত্যি সত্যিই ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু।
কিন্তু তামাসাটা হল,  বিজেপির এই আসাম সরকারকেই আবার বাংলাদেশ সরকার ফ্রিচার্জে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বের হতে ট্রানজিট আর বন্দর ব্যবহার সুবিধা দিতে যাচ্ছে। আসামের সরকার ও জনগণ কোন ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও সাফাইয়ের বলে এই সুবিধাগুলো নেবে? সম্প্রতি নাগরিক বিলবিরোধী জনঅসন্তোষ চলার সময় আসামে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর অফিসের সাইনবোর্ড ভাঙচুর ও গাড়িতে হামলা হয়েছে। এগুলো কী বিনা পয়সায় বাণিজ্যিক সুবিধা সহযোগিতা নিবার ও পাবার নমুনা?
আসলে বলাই বাহুল্য, অসমীয় জনগণ ও তাদের সরকার আসলে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়, কেমন সম্পর্ক চায় সেটা স্পষ্ট করে বলার হাই-টাইম চলে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ থেকে যেকোনো ট্রানজিটসহ, পোর্ট ফেসিলিটি ব্যবহার নিয়ে কোনো কথা শুরুর আগে ‘বাঙালি খেদাও’-এর ঘৃণাচর্চা নিয়ে তাদের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত নয় কী? যার প্রতি এত ঘৃণা তার কাছ থেকে কিছু নিবে্ন কেমন করে আর সে দিবেই-বা কেন, এমনকি আপনারা সঠিক চার্জ পুরাটা দিলেও দিবে কেন? সেও এক জেনুইন প্রশ্ন!

তাহলে মো্দী-অমিত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রমেই উইকেট পতন চলছে। আগামী সাত-দশ দিনে আর কয়টা রাজ্য বা শহরে আন্দোলনে প্রভাবিত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে- এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বলা হচ্ছে ইতোমধ্যে বড়ছোট মিলিয়ে ভারতের ২৮ রাজ্যের মধ্যে ১৬ রাজ্য আন্দোলন ছড়িয়েছে। অন্তু একবার সরকারবিরোধী মিছিল হয়েছে। এমনকি বিজেপি রাজ্য সরকারে আছে এমন রাজ্যেও তা হয়েছে।  অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যে বামেজর রাজ্যে বিক্ষুব্দ আন্দোলন হতে দেখলে সেক্ষেত্রে মোদী-অমিতের জন্য সেটা খুবই বিপদের কিছু হবে। কিন্তু সাবধান। কারণ বিশেষ করে মোদী-অমিতরা যত অসহায় হবেন ততই তাদের পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধাবার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। এছাড়া পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘাত বাধানোর সম্ভাবনাও বাড়বে। যেমন আমরা হাতে নাতে দেখেছিলাম নির্বাচনের আগে। এছাড়া সবার উপরে আমেরিকান জেনোসাইড ওয়াচের ভাষায়, ভারত ধাপে ধাপে সেদিকেই আগাচ্ছে, ‘ভারতে গণহত্যার প্রস্তুতি চলছে” – সেটা তো আছেই!’

শেষে বাড়তি কিছুঃ
এখানে একটা ছোট তথ্য ও রিপোর্টের খবর দিয়ে রাখি। আজ মানে ২২ ডিসেম্বর আনন্দবাজারের অগ্নি মিত্রের লেখা একটা রিপোর্ট আছে, শিরোনাম – “প্রিয়ঙ্কা নিয়েই ক্ষোভের শুরু ঢাকা-দিল্লিতে”। সেখানে সারকথাটা যা বলা হয়েছে তা হল, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর সাথে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা গত অক্টোবরে ভারত সফরের সময় দেখা  করা থেকেই মনোমালিন্য “ক্ষোভের” শুরু হয়েছিল। প্রথমত, এই রিপোর্টে যতটা অতিনাটকীয়তা আছে ততটাই সত্যতা নাই। আনন্দবাজারি রিপোর্ট অবশ্য এমনই ঝোঁকের সাধারণত হয়।  তবে গান্ধী পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা দেখাতে যাওয়াটা – ঠিক সেটা এখানে ইস্যু না। মূল ইস্যু বা শুরুর ইস্যু হল, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিজেপি-আরএসএস করুক বা সেদিকে ঝুকুক এব্যাপারে  ভারতের আরএসএস আমাদের সরকারের কাছে সহযোগিতা চাইলে অন্তত ২০১৮ সালে বা তারও  আগের কালে সরকার সম্মতি দিয়েছিল। কিছু কাজ ও প্রশ্রয় দেওয়া করেছিল। যার খেসারত হল প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছ পর্যন্ত গিয়ে অভিযোগ তোলা। গোবিন্দ প্রামাণিকের ঢাকায়  “আরএসএস” খুলে বসা, সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কথা বলা। রানা দাসগুপ্তের বেচাইন হয়ে খোদ মোদীর কাছে নালিশ পরে অস্বীকার ইত্যাদি। এছাড়া আগে থেকেই আবুল বারাকাতকে সরকারি তেল ঘি খাইয়ে পেলেপুষে তাঁর যে “ঐকিক নিয়মের বিশেষ পরিসংখ্যান” বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাই এখন বিজেপির পক্ষের অস্ত্র য়ার আমাদের বিরুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে হাজির হয়েছে। এসব কিছু বুঝতে বুঝতে হাসিনা সরকার বেশ কিছু ক্ষতি করে ফেললেও সবছিন্ন করে শেষমেশে শক্ত সিদ্ধান্তের কথাটা তিনি অক্টোবর সফরে পরিস্কার করে এসেছিলেন।
ঐ অক্টোবর সফরকালে তাই বলে বা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল হাসিনা সরকার আগে যা কথাই হোক সেখান থেকে এই বিষয়ে নো কমিট্মেন্টে” ফিরে যাচ্ছে। সরকার যে একথা বুঝিয়ে দিয়েছিল এর দুটা চিহ্ন আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই।  এক. শাহরিয়ার কবিরের কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকা সাক্ষাতকারে সে ইঙ্গিত রেখেছেন। [এনিয়ে সেকালে আমার লেখাটার লিংক এখানে। ] তার দাবি করে বলা  -বাংলাদেশে আরএসএস বলে কিছু নাই, “তাদের কোন ততপরতা নাই” ইত্যাদি – সে প্রমাণ।  আর দুই. রানা দাসগুপ্ত সেই থেকে এখন অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে হিন্দু নেতা হিসাবে “সরকারের অবস্থান” বহন করেন। কোন বেচাইনি রাখেন না। তিনি গত মাসদুয়েক আগে ভোলার ঘটনার সময় হেফাজতের শফি হুজুরের সাথে দেখা করে এসেছেন যেটা ফলাও করে প্রচার পেয়েছিল – সম্প্রীতির প্রতীক হিসাবে। এককথায় সরকারের অবস্থান হল – “আরএসএস-কে আর পৃষ্টপোষণ নয়”।  আর এখান থেকেই মোদী-আরএসএসের আমাদের সরকার প্রধানকে অসহযোগিতা , প্রকাশ্য অসম্মান করা ইত্যাদি। এক শুস্ক টেনশ্নের শুরু।

এদিকে এসবের মাঝেই মোদী-অমিতেরা এনআরসি-নাগরিকত্ব নিয়ে নিজেরাই নিজের জনগণের কাছে গ্যাড়াকলে পরে গেছেন। আর এই সুযোগটা ভাল্ভাবেই নিতে পেরেছে হাসিনা সরকার। নেওয়াটাই স্বাভাবিক ও উচিত। নড়বড়েরা যে এটা পারছে সেটাই শুকরিয়া। আবার এনিয়ে মোদী-অমিতের বলারও বিশেষ কিছু নাই। কেবল ভারতের মাস-পাবলিকের মুডের উঠানামার দিকে খেয়াল করে চললে, সে অনুসারে কখন মোদীকে আবার গুরুত্ব দিবে বা দিবেনা  তা  আগা-পিছা করলে আমাদের সরকারের অসুবিধা হবার কথা নয়। কাজেই সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক। কেবল একটাই সমস্যা, আমাদের নেতারা ভুলে থাকতে চায় যে তারা নিজেকে সম্পুর্ণ দান করে দিয়ে ভারতের সাথে  বিশাল ব্যক্তিগত সম্পর্কের জগত গড়তে ভারতের পায়ের কাছে শুয়ে থাকলেও ওদের চোখ আমরা কেবল নিচা “মুসলমান” – এটাই থাকব।  তারা তুচ্ছ করবে। যেন এখনও আমরা জমিদারের প্রজা যারা কখনই বন্ধু বা সমান হতে পারবে না। এই কথাগুলো আমাদের মনে থাকে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদি-অমিতের হারের চিহ্ন এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

গৌতম দাস

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Pa

 

[সার সংক্ষেপঃ জিন্নাহকে সব দোষে দোষী করার লোকের অভাব নেই, বিশেষত সাতচল্লিশের পরের জমিদারি হারানো কমিউনিস্টদের চোখ ও ভাষ্যে। অথচ ঘটনা হল, রামমোহন থেকে গান্ধী-নেহরুর আমল পর্যন্ত এসব মহারথীদের চিন্তাকে অনুসরণ ও  মুল্যায়ন করতে খুটিয়ে দেখার চিন্তাগত মুরোদ খুব কমজনেরই থাকতে দেখা যায়।  এদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটি ও তা থেকে বিভ্রান্তির কারণ  হল মূলত “জাতি” ধারণা। যেমন এর একটা নমুনা হল, এই মহারথীরা  সবাই “রাষ্ট্র গঠন” বলতে “জাতি গঠন” বুঝতেন। অথচ যেখানে জাতি মানে আসলে “রাষ্ট্র” কখনোই নয়। এছাড়া একটা অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর ভুল ধারণা হল জাতি [Nation]।   আবার কথা হল, ‘জাতি’ বলতে তারা কেবল আবার “ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন। যেমন তাদের বেলায় “হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন তাঁরা। অর্থাৎ মুল কথাটা হল, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় কেমনে! – এই ছিল তাদের প্রবল ভুল অনুমান।

রাষ্ট্র মানে জাতি আর, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় না –  এই হল তাঁদের ‘দুই ভুল অনুমান। এর উপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত হল বৃটিশেরা চলে গেলে তাঁদের একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারত “জাতি” চাই। অথবা এভাবে বলা যেতে পারে যে, হিন্দু জাতির একটা ভারত ছাড়া আর কীইবা তারা চাইতে পারে! কারণ তাদের চোখে এর অন্যথা কিছুই তো হতে পারে না।  ভারতবর্ষের “হিন্দু জাতি” তো একটা  “হিন্দু জাতির” ভারত ছাড়া অন্য কিছু চাইলেও কায়েম করতে বা হতে পারবে না – এই ছিল  সারকরে তাদের ভুল অনুমান।  রামমোহনের মূল কর্মততপরতার কালের শুরু ১৮১৫ সাল থেকে ১৯৪৮ সালে গান্ধীর মৃত্যু পর্যন্ত এই একশ ত্রিশ বছর হিন্দু জাতি বুঝের তাদের জার্নিটাই ছিল এমন।

লক্ষ্যণীয় উপরের প্যারায় শুরুতে রাষ্ট্র শব্দটা একবারই ব্যবহার হয়েছে, তাও সম্পর্ক দেখানোর জন্য। মূলত “রাষ্ট্র” শব্দটাই তাদের কোন চিন্তা বা অনুমানের মধ্যে থাকত না। রাষ্ট্র শব্দটাই তাঁরা তখনও শিখেনি অথবা এই শব্দের উপযোগিতা কী, কাম কী তারা বুঝে উঠতে পারে নাই।  কারণ তাদের চোখে দিনের আলোর মত পরিস্কার লাগত যে “স্বাধীন ও দেশপ্রেমিক এক হিন্দু জাতি হিসাবে নিজেদের গঠন” – এর বাইরে তারা আর কি করতে পারে।  এজন্য সেকালে রাজনীতি বলতে তারা তিনটা শব্দ বুঝত – স্বাধীনতা, দেশপ্রেম আর জাতি। রাজনীতি বলতে এই তিন শব্দ বুঝার ক্ষেত্রে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার বুঝাবুঝিতে আলাদা কিছু ছিল না।
এতে অসুবিধা কী?
অসুবিধা হল রাষ্ট্র ধারণা তখনও কারও মাথায় নাই অথবা কারও মাথায় আসেনি মানে রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদান নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই। তাই রাষ্ট্র নাই মানে নাগরিক ধারণাই নাই।  আর, নাগরিকের অধিকার ধারণা নাই। অথচ জাতি ধারণা আছে। মানে জাতি বলে বড়জোড় একট কমন স্বার্থের জনগোষ্ঠিগত স্বার্থ বলে ধারণা আছে। এটাই হিন্দু জাতি ধারণা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে জিন্নাহ বৃটিশ-ভারতের হবু রাজনৈতিক জগতে জিন্নাহ’র আবির্ভাবের আগে থেই হিন্দু জাতি ধারণা হাজির আছে। তাহলে জিন্নাহ-ই প্রথম হিন্দু আর মুসলমান এই  দ্বিজাতি তত্বের ধারণা আনলেন এমন দাবি ভিত্তিহীন।
দ্বিতীয়ত, ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্মের পরে যখন নিশ্চিত হয়ে উঠছে যে কংগ্রেস হিন্দু জাতির ভারত-ই একমাত্র কায়েম করতে চায়,  তাহলে কংগ্রেস ও গান্ধীর হিন্দু ‘জাতি গঠন ধারণাকে’ অস্বীকার করে ফেলে দেয়া ছাড়া জিন্নাহর উপায় কী ছিল! এটাই তাদের মুসলমান জাতীয়তাবাদ করতে চলে যাওয়া। অথচ মুলচিন্তায়  জটিলতার কেন্দ্র হল জাতি ধারণা, কাজটা কোন  জাতি গঠন নয়। বরং রাষ্ট্রগঠন। নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্রকে কনষ্টিটিউট করা এই অর্থে রাষ্ট্রগঠন।  এভাবে ব্যাপারটা হলো আসলে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিকের ভিত্তিতে বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রগঠন ও কায়েম হল সব কিছু সমাধান।
আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। জিন্নাহ হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি একথা তিনি এনেছেন। একথা পেরেছেন অবশ্যই। কিন্তু কেন? হিন্দু জাতিগঠন যারা মানবে না তারা যেন আলাদা রাষ্ট্র চাইতে পারে, এই ব্যাপারটার পক্ষে যুক্তি সাজানোর জন্য।  কিন্তু জিন্নাহ লক্ষ্যচ্যুত নন। তিনি নাগরিকত্ব মানে রাষ্টড়-নাগরিক বিষয়ক মৌলিক শিক্ষা ভাঙ্গেন নাই। কিভাবে? তিনি ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব করবেন না। তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিক হবেন এই পাকিস্তানের কথা বলেছেন।

তাই, ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালের বক্তৃতায় জিন্নাহ বুঝিয়ে রেখে যেতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় স্বাদের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব এই পাকিস্তান কায়েমের লোক জিন্নাহ নন। যদিও পরবর্তিতে কনষ্টিটিশনের পাকিস্তান – এমন পাকিস্তান হলেও বাস্তবের পাকিস্তান জিন্নাহর স্বপ্ন হতে পারেনি সেকথাও সত্য। একালের ইমরান খান আবার অনেক কিছুই নতুন চোখে দেখবার আশা করতে উসকানি দিচ্ছেন। কিন্তু অমিত শাহ? আগে ছিল যেগুলো গান্ধীর হিন্দুজাতির ভারত কায়েমের চিন্তা বিষয়ক ভুল। আজ অমিত সেই হিন্দুজাতির আরও বড় ভারতের কলঙ্ক হতে রওনা দিয়েছে। বৈষম্যহীনতার সমান নাগরিকই যেখানে সব কিছুর সমাধান। তবু অমিত শাহরা হিন্দুর স্বার্থ কেবল হিন্দু পরিচয়ের মধ্যে খুজে এক মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে ভোটবাক্স ভর্তি করতে চাইছেন।]

 

রাষ্ট্র মানে জাতিগঠন নয়। বৈষমহীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মামলা।
কাজেই জিন্নাহর, গান্ধীর ‘হিন্দুজাতি’ গঠন ধারণাকে উপড়ে ফেলে দেওয়া ছাড়া কী করার ছিল?

বাসায় চোর পড়লে অনেক সময় এরপর দেখা যায় চোরকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে চুরিতে নিরাপত্তার ফাঁকফোকরগুলোর দিকে নজর ও সংস্কার কাজ শুরু করে দিতে। কারণ, চুরিটা না হলে নিরাপত্তার ঘাটতির দিকগুলোতে আমাদের মনোযোগ যেত না। এই বিচারে আমরাও বাংলাদেশ থেকে এখন অমিত শাহকে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ঘর সুরক্ষার কাজে নামতে পারি। কারণ তিনি আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে নজর ফেলতে পরোক্ষে সুযোগ করে দিয়েছেন, যদিও তা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারব তা এখনই একেবারে নিশ্চিত নই আমরা।
ভারতের নাগরিক সংশোধনী বিল ২০১৯ [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)] উভয় সংসদে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে এখন চালু হয়ে গেছে। অমিত শাহের উচ্চারণ স্পষ্ট, “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”। আনন্দবাজার আশা করে লিখেছে – “রাজ্যসভায় শাহের রাখঢাক নেই”। পত্রিকাটা বলতে চেয়েছে এর আগে লোকসভায় যেভাবে অমিত যেভাবে ঢেকে রেখেছিলেন সেভাবে কেন ঢেকে রাখেন নাই।
কিন্তু তবু অমিতবিরোধী কারও কোন পক্ষ থেকে এর বিপক্ষে কী জবাব দেবে, এর তেমন জোরালো বয়ান দেখা যায়নি। কেন এটা এমন, কেন?
ব্যাপারটা হল এত দিনের যে প্রচলিত “হিন্দুজাতির” ভারত, সেখানে কেউ মুসলমান হলে ও নাগরিকত্ব পালার ইস্যু থাকলে হিন্দুদের পক্ষ থেকে তাকে নাগরিকত্ব না দিতে চাওয়া – এটাই কি স্বাভাবিক ছিল না?  ভারতের সামাজিক পরিসরে রাষ্ট্র বিষয়ে এমন বোধবুদ্ধি, বুঝাবুঝির লজিকই তো ভারতের সমাজে এত দিন ধরে ছড়িয়ে রাখা আছে। অন্তত নেহেরু-গান্ধীর আমল থেকেই।  এটা তো অমিত শাহ হঠাৎ করে বলছেন তা তো না। আর সে জন্যই তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। আর যারা শুনছেন তাদের কাছেও এটা নতুন, অনভ্যস্ত বা প্রথম মনে হচ্ছে না। তাই তেমন প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়াও নাই

অথচ সোজা ঘটনাটা হল এই যে, অমিত বলতে চাইছেন ভারত রাষ্ট্রের মন কেবল কেঁদে উঠবে অন্যদেশের একমাত্র মুসলমান ছাড়া বাকি সবার বেলায়। এমনকি খ্রীশ্চান হলেও কাঁদবে! এই বক্তব্যের পিছনের অনুমান হল যে,.১. যে ভারত রাষ্ট্রের “কমন মন” বলে একটা কিছু এখানে ধরে নেয়া হয়েছে সে মুসলমানবিদ্বেষী অথবা এর ভিতরে কোন মুসলমান নাই। ২. এই বক্তব্যে সার্বজনীন সবার নাগরিকের অধিকারের জন্য হওয়া উচিত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটাকে হাজির করা হয়েছে মুসলমানবিদ্বেষী ভাবে আর মুসলমান বাদে ভারতে দেখা যায় এমন সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য করে। এর অর্থ তারা ভারতকে একটা ধর্মনির্বিশেষে নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র মনে করে নাই।  আসলে এটাই তো গান্ধীর “হিন্দুজাতি” ধারণা।

আবার আসাম, ত্রিপুরাসহ নর্থ-ইস্টে যা দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখছি আমরা, সেটা মোদী-অমিতের সরকারের বিলের বিরুদ্ধে অবশ্যই। কিন্তু  সেটাও  ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের সমান নাগরিকত্ব থাকা উচিত সে অবস্থানের জন্য নয়। বরং বাংলাদেশেরই বিরুদ্ধে। তবে অমিতের পক্ষে নয়। তাহলে? এই নাগরিক সংশোধনী বিল মানে ক্যাব [CAB] বিল ইস্যুতে, সাধারণভাবে নর্থ-ইস্ট মনে করে ও তাদের আশঙ্কা এই যে অমিতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ফলে এখন নর্থ-ইস্টের লাগোয়া বাংলাদেশের সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের হিন্দু যারা আছে, তারা এখন সদলবলে নর্থ-ইস্টের আট রাজ্যে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব নিতে চাইবে। মূলত এর প্রবল বিরোধিতা করতেই তাদের মোদী সরকারবিরোধী দাঙ্গা-হাঙ্গামা। আর ত্রিপুরার ক্ষেত্রে এসব ছাড়াও  তাদেরবাড়তি একটা ইস্যু হল, সেখানের মোট জনগোষ্ঠির (সম্ভবত এক-তৃতীয়াংশ) আমাদের চাকমা, গাড়োরা সহ এদেরই মত মোট আট পাহাড়ি গোষ্ঠির। যারা ইতোমধ্যেই এক ধরণের স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে জেলাভিত্তিক। এরা এখন এই সুযোগে আলাদা রাজ্য চাওয়ার দাবি জোরালো করে তুলেছে। সার কথাটা হল সারা নর্থ-ইস্টেই সমতল (মূলত বাংলাদেশ) থেকে বাঙালিরা তাদের জেলায় এসে পড়া ও আশ্রয় নেয়ার বিরোধী তারা।

অমিত শাহ এই বিল আনার মাধ্যমে জেনে বা না জেনে দীর্ঘদিনের চাপা পড়ে থাকা দেশভাগের প্রায় সব বিতর্ককে আমাদের সামনে আবার জাহির করে দিয়েছে। এর মূল কারণ নেহরু-গান্ধীর জমানা থেকেই ভারতরাষ্ট্র যে নাগরিকে-নাগরিকের মধ্যে ফারাক বা বৈষম্য করতে পারে না। এটা যে হারাম তা তো কখনোই বাস্তবায়ন করতে গেছে তা আমরা দেখিনি। যদিও ভারতের কনষ্টিটিউশনে সেটা যেভাবেই লেখা থাক। যেকোন আধুনিক রিপাবলিক ভিত্তিমূলক যেসব মূলনীতি ধারণা থাকে এ দিক থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই ভারত-রাষ্ট্রকে বুঝা বা বুঝানো ও প্রাকটিশ করার চেষ্টা করা হয়নি।

যেমন মোদীর শাসনের চলতি এই গত ছয় বছরকেই বিচার করলে আমরা পাই  – এখানে মুসলমানদের ওপর যা খুশি জোর তো করাই যায়, বৈষম্য তো করাই যায়। মোদি-অমিত চাইলেই করতে পারে। তাই কি সারা ভারতবাসী দেখে আসেনি? মুসলমানকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো অথবা গরু খাওয়া, গরু বহণ করা ইত্যাদি অভিযোগে রাস্তায় রাস্তায় তা চেক করতে বিজেপির ভিজিলেন্স পার্টি তো বসানোই যায়; আর বসিয়ে এমন মুসলমানের খোঁজ পেলে তাকে রাস্তাতেই পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়- এটাই কি ভারতবাসী দেখেনি?

শুধু তা-ই নয়, এ নিয়ে সারা ভারতে কোথায় মামলা-বিচার কোথাও কিছু হয়নি। সর্বশেষ আবার এমন পিটিয়ে [তাবরিজ আনসারী খুনের ঘটনায়] মামলা হয়েছে যদিও কিন্তু সেটা খুনের না হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যর মামলা বলে।  গরু পালা দুধের ব্যবসায়ী পহেলু খানের হাট থেকে গরু কিনে আনাতে হাটের রশিদ দেখানোর পরেও লিঞ্চিং খুন হলে এর আসামিরা দুর্বল মামলা দেওয়ায় আসামীরা সবাই বেকসুর খালাস হয়ে গেছে। মএব্যাপারে মোদীর দ্বিতীয়বারের চলতি সরকারের আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান হল, ভারতে রাস্তায় পিটিয়ে মারা লিঞ্চিংয়ের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সবই গুজব, সাজানো আবার আরএসএস নেতা ভগত বলেছেন, পিটিয়ে মারা বা লিঞ্চিং শব্দ ব্যবহার না করতে। সারা ভারতে এভাবে এমনকি সাধারণ নাগরিককে বটেই, এক মুসলমান এমপিকে আর এক হিন্দু এমপি জয় শ্রীরাম বলাতে জোর খাটাতে, জনসমক্ষে তর্ক করতে দেখা গেছে।

মজার কথা হল, এসব নিয়ে কোনো জনস্বার্থবিষয়ক মামলা অথবা আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বলে কোনো কিছু হতে দেখা যায়নি; বরং সোস্যাল প্রাকটিস এর বয়ান হল উল্টাটা। যেমন মমতা নাকি মুসলমানদেরকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছেন, তাই পশ্চিমবঙ্গে মুসমানদেরকে দাবিয়ে রাখা নাকি দরকার – এমন ভাষ্য ফেসবুক সোস্যাল মিডিয়ায় ডমিনেটিং পারসেপশন।

সারা দুনিয়াতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রসঙ্গে সকলের একেবারে প্রাইমারি ঐক্যমত্যের বৈশিষ্ট্যগুলো হল –
১. এটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র আর এখানে সব নাগরিক সবার অধিকার সমান।
২. নাগরিক মাত্রই রাষ্ট্র বৈষম্যহীনভাবে সকলকে সমান চোখ দেখতে ও আচরণ করতে বাধ্য।

কাজেই এটা জাতিগড়া বা জাতিগঠনের বিষয়ই নয়। রাষ্ট্রের এটা নাগরিককে তার  নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মামলা। যেখানে নাগরিক আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক হল – নাগরিকেরা হল রাষ্ট্রের গঠনের উপাদান (constituent)। রাষ্ট্র নাগরিক দিয়ে তৈরি (constituted)। আর দলিল অর্থে তৈরি জিনিষ হল constitution। এখানে ‘জাতি’ [nation] বা হিন্দু জাতিগঠন বলে জিনিষটাকে বিভ্রান্ত করা বা বিভ্রান্তি ছড়াবার অন্তত একালে আর কোন সুযোগ নাই।
একারণেই এখানে রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ব্যবহৃত শব্দগুলো হয় – মানবাধিকার, সমানাধিকার, বৈষম্যহীনতা, সাম্য ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে? না এখানে সব কিছুর উপরে এক আজিব শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িক’। (অথবা একই ধারণায় বিপরীত অর্থে ‘অসাম্প্রদায়িক’।)

প্রথমত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার সাথে সম্পর্কিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে সংশ্লিষ্ট কোনো শব্দ-ধারণা দুনিয়ার কোথাও নেই; কিন্তু ভারতে এটা আছে। আর এটা হল মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সংকীর্ণভাবে কেবল তাদের দিক থেকে বলা শব্দ। তারা যাকে বা যে আচরণ বা রীতিকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে দায়ী করবে, সেটাই সাম্প্রদায়িক। সাধারণত মুসলমানদের অভিযুক্ত করতে তাদের এই সংজ্ঞা তারা ব্যবহার করে। যেমন ইসলামী চিহ্ন প্রকাশ হয়ে পড়ে (যেমন টুপি) এমন কোনো কিছু দেখিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করা যাবে না। এটা নাকি সাম্প্রদায়িক। মুল কথাটা হল হিন্দু ডমিনেটিং সমাজে এটাকে তারা তাদের কর্তৃত্ব আধিপত্যকে ঢিলা করে ফেলা বা যেন অস্বীকার করার সুযোগ হিসবে কেউ না নেয়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই “সাম্প্রদায়িক” নামে শব্দ ও বয়ান দিয়ে শাসন করা। কিন্তু সকালে পূজা-অর্চনা করে কপালে ফোঁটা বা ড্রয়িং তিলক এঁকে কাজে বা সংসদেও যাওয়া যাবে।

কিন্তু সারা দুনিয়াতে ‘সম্প্রদায়’ বা ‘কমিউনিটি’ কথাটা খুবই ইতিবাচক। এটা নিচা, হেয় বা খারাপ বুঝানোর শব্দ না।  যেমন ইউরোপের যেকোন শহরে সমাজের জন্য যে কাজ করে, স্বেচ্ছাশ্রম দেয় সে সম্মানিত ‘কমিউনিটি’ ওয়ার্কার। কিন্তু ভারতে কমিউনিটির রুট শব্দ কমিউন [commune] – এটা ব্যবহার করা হয় নেগেটিভ অর্থে। কমিউন থেকে ‘কমিউনাল’[communal] বলে ইংরেজিতে আর এক শব্দ বের করে আনা হয়েছে যেটাr অর্থও ইতিবাচক; ‘সমাজ সম্পর্কিত’ অর্থে। কিন্তু ভারতে এর অর্থ করে নিয়েছে খুবই জঘন্য। আর এরই বাংলা করা হয়েছে “সাম্প্রদায়িক”। মানে এটাই ভারতে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নেতিশব্দ। সাধারণত এটা মুসলমানদের উপর ব্যবহার করা হয়। যার আসল অর্থ হল, হিন্দু সামাজিক কর্ত্তৃত্ব মানতে যে অস্বীকার করে।

আসল কথাটা হল, ব্রিটিশ আমল থেকেই হিন্দু-জমিদারি ক্ষমতায় (এর তৎপরতা কার্যক্রমের শুরু মোটা দাগে বললে ১৮০০ সাল থেকে যেখানে তখন ১৭৯৩ সাল থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি আইন চালু করা হয়ে গেছে কেবল) এর যে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছিল, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল সে সময়ের কোনো শব্দের কী অর্থ হবে। বিশেষ করে তাদের সাজানো সেই আধিপত্য যেন মুসলমানরা ভঙ্গ না করে সেই লক্ষ্য সাজানো সামাজিক অনুশাসন। মুসলমানরা ছিল সেই সময়ের সামাজিক স্তরভেদে নিচে ধরে নেয়া স্তরেরও সবার নিচের স্তরে বলে, এটাই মনে করানো ছিল এর উদ্দেশ্য।

মনে রাখতে হবে, মোটা দাগে ১৮০০ সাল থেকে পরের দেড় শ’ বছর ধরে এই হিন্দু জমিদারি-কেন্দ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য এটাই প্রজা নিয়ন্ত্রণের বয়ান ও এর সংজ্ঞার নির্ধারক ছিল। কৃষি সে সমাজের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই কৃষি মালিকানা ব্যবস্থা হিসাবে চিরস্থায়ী জমি দেয়ার বন্দোবস্ত, যা আমরা জমিদারি বলি বুঝি আর সেখানে বেশির ভাগ জমিদার ছিল হিন্দু, মানে সবমিলিয়ে এরাই মূল রুলিং ক্লাস। এ কারণে তাদের এটাই ছিল সব কিছুর ওপর ডমিনেটিং ফ্যাক্টর, সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এই ক্ষমতাটাই সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ভয়-শঙ্কায় শশব্যস্ত হয়ে থাকত। তাদের ভয় ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতপ্রথার কথা তুলে জারি রেখে ক্ষমতার এই জার-স্তর তৈরি করে তারা এই সামাজিক অনুশাসন তৈরি করেছে। কাজেই মুসলমানেরা ভিন্ন ধর্মের – এই যুক্তি তুলে যদি তারা সাজানো শাসন ব্যবস্থা – মানতে অস্বীকার করে? আর এর মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতার এই সাজানো বাগান ভেঙ্গে দেয় – এই সম্ভাব্য ভঙ্গকারী যারা এরাই “সাম্প্রদায়িক”। তবে সাম্প্রদায়িক নাম দিবার পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে এই হিন্দু আধিপত্য বলতে চায় যে এই সামাজিক অনুশাসন নিয়ম ও কর্তৃত্ব দিয়ে আমি আমার এক সম্প্রদায় খাড়া করেছি। তুমি মুসলমান এর ভিতরে আবার তোমার ভিন্ন নিয়ম ভিন্ন কেন্দ্র চালু করে ফেলতে পার, তা আমি হতে দিব না। তাই তোমাকে আমি তোমার সম্প্রদায়ের বলে আলাদা কোন ক্ষমতার কেন্দ্র বানাতে দিব না। একারণে উলটা আমি তোমাকে বিভেদ আনার শক্তি হিসাবে প্রচার করব। তুমি আলাদা সম্প্রদায় গড়ে ফেলবার সম্ভাব্য শক্তি – অতএব তোমার নাম দিলাম “সাম্প্রদায়িক”। তুমি আমার ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দিতে বা চ্যালেঞ্জ করতে যাতে না পার তাই আগেই তুমি নেতিবাচক, তুন্মি খারাপ এই ট্যাগ লাগিয়ে এক প্রচার চালিয়ে রাখব।
সারকথায়, এই আধিপত্যেরই আবার যা কিছু অপছন্দনীয় বা যা তার নিজ ক্ষমতাকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ করতে পারে অথবা যাকে (মুসলমান) সে আগাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, সেসব কিছুই ‘সাম্প্রদায়িক’ ট্যাগ পাবে। মানে তার সাজানো রাজত্ব এর ভেতরে একটা ভিন্ন ‘সম্প্রদায়’ যেন যে তার সাজানো অর্ডার বিনষ্ট করতে চায়। এমন সব কিছুকে সে আগাম ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে, এই অধিপতি শ্রেণী নিজের সম্ভাব্য শত্রুকে চিনিয়ে রাখে। অনেকটা হিন্দু-জমিদারের নিজের মতো করে তার সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাজানো বাগান এটা সম্ভাব্য আগামীতে যে’জন তছনছ করতে পারে, সেই হলো সাম্প্রদায়িক। এই হলো সাম্প্রদায়িকতার আসল সংজ্ঞা ও উৎপত্তি।
এ কারণে ইংরেজি ‘কমিউনাল’ শব্দটা ইংলিশ সমাজে কেবল ইতিবাচক অর্থে সমাজ-সম্প্রদায় বুঝাতে এর ব্যবহারটাই কেবল দেখতে পাবেন। বিপরীতে কেবল ভারতীয়রাই শব্দটাকে নেতিবাচক ও বিশেষ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে। এই সোজা মানেটা হলো, ১৮০০ বা উনিশ শতকের শুরু থেকেই যে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্যের তৎপরতা শুরু হয়েছিল, এরই স্বার্থের বিরোধী যেকোনো কিছুই (সাধারণত মুসলমান) বোঝাতে ‘কমিউনাল’ শব্দ ব্যবহার শুরু হতে দেখা গেছিল।

কিন্তু কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কিভাবে বলে আমার বৈশিষ্ট হল ‘অসাম্প্রদায়িক’? যেখানে তার দেখার চোখ হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সমান এবং সমান নাগরিক? খাড়া কথাটা হল, হিন্দু ধর্মীয়-সামাজিক গোষ্ঠির মানে বাস্তবে অপসৃয়মান হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য শব্দ সাম্প্রদায়িক – এই শব্দ বা বৈশিষ্ট তো কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টই হতে পারে না – যেখানে ধর্ম-নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান গণ্য রাষ্ট্রকে করতেই হবে! আর এই অধিকার কেউ ভেঙ্গেছে কিনা সেটা বিচার করাই কেবল রাষ্ট্রের কাজ। কাজেই সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক নয়, রিপাবলিক রাষ্ট্রে অধিকারে সমান না বৈষম্য করা হয়েছে এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় এবং এর নির্ণায়ক।  হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কাজ একেবারেই নয়। কাজেই সাম্প্রদায়িক এই শব্দটা দিয়েই আসলে নাগরিক অধিকারের বৈষম্যহীন করবার ধারণাটাকে চর্চায় সামনে আসনে দেয়া ঠেকায় রাখার ক্ষেত্রে ভুমিকা আছে।

এর পাশাপাশি আমরা এখন রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) জমানায় যাবো। কেন রামমোহন? ভারতের প্রগতিবাদী বিশেষত সেকালের (বলতে ১৯২৬ সালের পরের বুঝতে হবে) খোদ কমিউনিস্ট পার্টির চোখে রাজা রামমোহন রায় হলেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ এর আদিগুরু। মানে রামমোহন যিনি ব্রিটিশদের হাত ধরে ইন্ডিয়াতে আসা বা আনা ‘ইউরোপীয় রেনেসাঁ’কে সবার আগে ভারতে পরিচয় করান এবং এর চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করেছিলেন, সেই আদি শুরুকর্তা। রামমোহন সুনির্দিষ্ট একাজটা শুরু করেছিলেন ১৮১৫ সালে, তার “আত্মীয় সভা” নামে সামাজিক সংগাঠনিক তৎপরতায়। এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৮৩৫ সালকে যখন ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন অ্যাক্ট ১৮৩৫’ চালু করবে।
এটাকে “এডুকেশন অ্যাক্ট” বলে অথবা এটাই হল ব্রিটিশ ‘কলোনি প্রশাসন’ এর শুরু করার আইন বলে বুঝতে পারি। এটাই ভারতীয় নেটিভ বা স্থানীয়দেরকেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত করে কলোনি প্রশাসন সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত মনে করেও পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষিত ব্রিটিশদের ব্যয়বহুল পথে (বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া) তাদের এখানে এনে আর নেয়া হবে না। স্থানীয় নেটিভদের শিক্ষিত করে নেয়া এক প্রশাসন গড়তে হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেটা আধুনিক শিক্ষা মানে রেনেসাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলার শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।
রামমোহনের মূল গুরুত্ব হল তিনি ব্রিটিশ মাস্টারের অনুকরণে সেকালের ব্রিটিশ-ভারতে, আমাদেরকে একটা “আধুনিক রাষ্ট্র” করতে হবে – প্রথম তিনিই এমন গড়ার স্বপ্ন দেখে ও এঁকেছিলেন। আবার ঠিক একই কারণে এতে তাঁর করা সব ভুল বা ধারণায় ঘাটতি বা তাতে অস্পষ্টতায় বিপথে যাওয়া এমন ধারণায় সব খামতির উৎপত্তিও তিনি। যদিও আধুনিক প্রগতিবাদীরা বা পরবর্তীকালে বিশ শতকে এসে কমিউনিস্টরাও রামমোহনকে তাদের আদিগুরু নেতা মানেন। বিশেষ করে যারা হিন্দু জমিদারীর “স্বদেশি ইতিহাসের ধারা” রচয়িতা।

কিন্তু তিনি প্রথম নেতা হলেও আধুনিক রিপাবলিক ধারণার মুখ্য বৈশিষ্ট্য যে তা নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র, নাগরিক মাত্রই অধিকার সমান এক বৈষম্যহীন সাম্য ইত্যাদি – এসব মৌলিক ধারণাকে তিনি আমল করতে সক্ষম ছিলেন এর প্রমাণ নাই।  আসলে নাগরিক সাম্য নয়, সম্ভবত রেনেসাঁ তার মুল আগ্রহের বিষয় হয়েই তিনি আটকেও গেছিলেন। অধিকার বা রাষ্ট্র পর্যন্ত আর নিজ চিন্তাকে প্রসারিত করতে পারেন নাই।  এমন চিহ্ন আমরা দেখি না। আরও বড়  কারণ কী?
মূল কারণ হল, রামমোহনদের কাছে কাজটা (উচিত অর্থে) হওয়ার কথা ছিল “রাষ্ট্রগঠন”। কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন “জাতি গঠন” বলে।  এখানে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিমূলক ধারণা ছিল “জাতি” [nation]। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারা রাষ্ট্র কথাটাই ব্যবহার করতেন না। এর বদলে ব্যাপারটাকে “জাতি” বলে কিছু একটা বুঝতে চাইতেন। এই হলো প্রথম ভুল। তবে পরের ভুলটা আরো মারাত্মক। জাতি গঠন বা জাতীয়তাবাদ বলতে তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বুঝতেন। তারা নিশ্চিত হয়ে থাকতেন যে জাতির মূল বৈশিষ্টই তো ধর্ম।  আর ধর্মই তো জাতিকে “জাতি” হয়ে উঠতে আঠার মত সকলকে ধরে রাখতে প্রধান ভুমিকা রাখে। কিন্তু এখনই খুশি হয়ে যেয়েন না, সাবধান হন। পরের বাক্যটার দিকে খেয়াল করেন।
অতএব এত বড় আর প্রাচীন হিন্দু ভুখন্ডে বৃটিশ শাসন-পরবর্তিকালে এক “হিন্দুজাতির ভারত” – এটাই আমাদের কাম্য। কারণ যে “বৃটিশ জাতি” আমাদেরকে শাসন করতে আমরা দেখছি সেটাও একটা ক্রিশ্চানিটিতেই আবদ্ধ, এক বৃটিশ “জাতিগঠন” হয়েই করেই দাঁড়িয়ে আছে।  সেকালে রামমোহন এন্ড গং তাদের বুঝাবুঝির মোটা ভাষ্যটা  সাজিয়ে লিখলে তা হবে এরকমই।
এই একই বুঝ বজায় ছিল অন্তত মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত; ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভুমিকা (১৯১৪-৪৮) এই সময়কালে। অর্থাৎ স্বাধীন দেশপ্রেমিক এক ভারত বলতে তিনিও এক ভারতীয় “জাতিগঠন” করার কর্তব্য ও এর রাজনীতি বলে বুঝতেন। অর্থাৎ হিন্দুজাতি গঠন বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ গড়া বুঝতেন। ঠিক এ কারণেই তাদের কাম্য রাষ্ট্র নাগরিকের রাষ্ট্র হল কিনা অথবা অধিকারে বৈষম্যহীন হলো কি না, নাগরিক মাত্রই সমান অধিকারের রাষ্ট্র হলো কি না- ইত্যাদি এগুলো কখনও  তাদের এজেন্ডা ছিল না।

উল্টো এটা ধর্মীয় জাতিগঠনের জাতীয়তাবাদের বলে আধুনিক রাষ্ট্রকে বোঝার কারণেই এখনো – “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”, কথাগুলো এখনো অবলীলায় উচ্চারিত হতে পারছে। কারও কানেও খটকা লাগছে না।

তাহলে রামমোহন থেকে গান্ধী সবার কাছেই ভারত রাষ্ট্র মানে কোনো বৈষম্যহীন নাগরিক রাষ্ট্র নয়, এ দিক থেকে রাষ্ট্র বোঝাই হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবের যে ভারত -রামমোহন থেকে গান্ধী- এরা কল্পনা বা বাস্তবে দেখেছিলেন এটা আবার সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক বুঝের হিন্দু জমিদারের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাষ্ট্র বলেই বুঝেছেন, দেখেছেন, পেয়েছেন।

এ কারণে যারাই রাষ্ট্রের মধ্যে “অসাম্প্রদায়িকতা” বৈশিষ্ট্য খুঁজে তাদের কাছে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা অর্জন হয়েছে কি না তা কোনো কাম্য বিষয়ই নয়।

অতএব, গান্ধী-নেহরুরা যে ভারতের জন্ম দিয়ে গেছে সেটাই বা সেখানেই তো মোদী-অমিতের হিন্দুত্বের রাষ্ট্র কায়েমের উপযুক্ত জায়গা। অবলীলায় ‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো’ বলতে পারার মতো দেশ-রাষ্ট্র।  এখানে নাগরিক ধারণাটাই পোক্ত না বরং এখনও অপুষ্ট। তাই নাগরিক অধিকারও। এর আকাঙ্খার ভেতরেও তাই নাগরিক বৈষম্যহীনতার আকাঙ্খাই নাই, অনুপস্থিত। একই কারণে সুপ্রিম কোর্টের চর্চাতেও তেমন নাই। নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই। সে কারণে বিজেপির মত দলও কনষ্টিটিউশন মোতাবেক রাজনৈতিক ততপরতা চালাবার জন্য যোগ্য দল বলে অনুমোদন দিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। সুপ্রীম কোর্টও এর মধ্যে কোন সমস্যা দেখে না। অথচ যে রাজনৈতিক দলের চিন্তা বৈষম্যমূলক নাগরিক অধিকারের সেই দল তো অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন পাওয়ারই কথা হয়। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রীম কোর্টও এটা কোন সিরিয়াস দিক মনে করে না। শেষ নির্বাচনে এদিকটা অবস্থা আরও ভয়াবহ। কোন নির্বাচনি ভায়োলেশনের অভিযোগ আমলে নিয়ে মোদীর গায়ে ফুলের টোকা দিতেও তারা রাজি হয় নাই। অবশ্য তারা বলতে চায় একজিকিউটিভ ক্ষমতার গায়ে হাত দিয়ে আমাদের খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিগত ১৯৭৫ সালের জুনে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি আইন যেখান থেকে ঘটেছিল সেই ইস্যুতে। সেই থেকে আদালতের অবস্থান হল, কোন নির্বাচনে যদি এক আগ্রাসী একজিকিউটিভ ক্ষমতা – নির্বাচিত হয়ে আসে তবে সে যতই আগ্রাসী আদালত ততই সংঘাত এড়িয়ে তাকে জায়গা করে দিবে।
কিন্তু তাই বলে কি “নাগরিক বৈষম্যহীনতা করা যাবে না”- একথা ভারতের কনস্টিটিউশনে লেখা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আছে কনস্টিটিউশনে লিখা থাকতে হয় তাই। এর ইমপিলিকেশন কী, ব্যবহার কী এবং কোথায় – কেন থাকতে হয়, গুরুত্ব কী সেসব দিক থেকে কিছুই বুঝা হয়নি, চর্চায় নেয়া হয় নাই। এর মূল কারণ সম্ভবত – “হিন্দুজাতি গঠনের এক ভারত” গড়া হয়েছে – এটাই তো ভারতের জন্ম থেকেই ছিল মূল বিবেচ্য!
তাহলে একালে ভারত কেন “হিন্দুজাতির ভারত” – এই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী কেন? এটা যদি কেউ দেখিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন তারা আড়াল খুঁজে বলে – কেন তারা তো অসাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ এটা ‘অসম্প্রদায়িক’ ও ‘হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী’ ভারত, কাজেই কোনো আর অসুবিধাই নেই।

আচ্ছা রামমোহনের রাষ্ট্রচিন্তা যে জাতিগঠন-বাদী চিন্তা, আর এই জাতিবাদ যে ধর্মীয় এমন দাবির প্রমাণ কী? এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল রামমোহনের ‘ব্রাহ্মধর্ম’ চালু করার তাগিদ। [রবীন্দ্রনাথের দাদু দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন রামমোহনের বন্ধু, অনুসারী। সেই সুত্রে তিনিও ছিলেন ‘ব্রাহ্মধর্ম’ অনুসারী ও প্রধান পৃষ্টপোষক। রবীন্দনাথও  ব্রাহ্ম অনুসারি আর এই সুত্রে তাঁর কালেও পুনর্বার মুখপাত্র তত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। ] সারা ভারতের সবাইকে এক ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী করে এরপর ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিগঠনের  ভারত কায়েম এই ছিল রামমোহনের লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে সবাইকে ব্রাহ্ম করার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে গান্ধী পর্যন্ত  (এদের মাঝে বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ইত্যাদি অনেক ব্যক্তিত্বও কমবেশি সামিল ছিলেন) এসে সবাই মেনে নেয় যে, ঐ স্থলে “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদী ভারতই তাদের কাম্য।
কিন্তু এই বুঝের ভিত্তিতে ১৮৮৫ সালে এসে কংগ্রেস দল জন্ম বা গঠন করার পরে এই প্রশ্ন জোরালো হতে থাকে যে, “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদ মুসলমানরা মেনে নেবে কেন? এর জবাব গান্ধীর কাছেও ছিল না। তিনি বড়জোর হিন্দু কথাটা ধর্মীয় না কালচারাল, এমন তর্কের কথা বলে পাশ কাটাতে চাইলেন। এছাড়া আমরা দেখি  উল্টা গান্ধীর নিজের বুঝের হিন্দু ধর্ম বলতে সেটা কেমন এটাকেই তিনি ‘হিন্দুইজম’ বলে প্রায় ৪২টা বক্তৃতা দিয়েছেন। অনলাইন আকাইভেও তা পাওয়া যায়। অথচ গান্ধীর কাছে মুসলমানরা “হিন্দুইজম কী” – তা শিখতে যাবে কেন? কোন সুখে অথবা দুখে? এমনকি অনেক হিন্দুও কেন তাকেই পছন্দ করবে, গান্ধীর “হিন্দুইজম কী” এর ব্যাখ্যা নিয়ে একমত হবে –  এই প্রশ্নের জবাব নাই  অথচ এই প্রশ্ন উঠেই থেকেছে।

সোজা কথা হল যার রাজনীতি  – রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, সমান অধিকারের রাষ্ট্র কায়েম এমন কেউ কেন “হিন্দুইজম কী” এই মাহাত্য প্রচার করতে যাবেন? গান্ধী যদি মনে করেন যে তাঁর “হিন্দুইজম কী”  ব্যাখ্যাটাই শ্রেষ্ঠ তাহলে এর মানে তিনি ধর্মতত্বের পন্ডিত হতে চাইছেন। অন্তত রাজনীতির না। ঠিক রাজনৈতিক নেতা তিনি না, ধর্মতাত্বিক নেতা হওয়া তার ঝোঁক যদি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রাজনীতির নেতা সেটা বাদ দেয়াই তাঁর উচিত ছিল। কারণ “হিন্দুইজম জানা বা এর  মাহাত্য প্রচার এটা না জানা থাকলেও ফেলো যেকোন ধর্মের নাগরিকের সাথে থাকার যোগ্য বিবেচিত হতে তো কোনই অসুবিধা নাই। এছাড়া এটা তো কোন নাগরিক সাম্যের রাজনৈতিক কাজ না। এগুলাই আসলে  আরও বড় প্রমাণ যে –  নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র কায়েম- এসবে গান্ধী বা নেহরুর কখনই আগ্রহ ছিল না, তারা বা তাদের ভারত এটা কখনই বুঝতেই পারেনি, তাই আমল করে নাই।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
চলতি নাগরিকত্ব বিলের তর্কে জিন্নাহ এখন সবারই অভিযোগ দায়ের করার সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানকে আলাদা হতে দিয়ে কংগ্রেস দ্বিজাতি বাস্তবায়ন হতে দিয়েছে অমিত শাহের এই ছিল অভিযোগ, এর জবাবে বলা সুপ্রীম কোর্টের কংগ্রেসের প্রধান আইনজীবী ও এমপি কাপিল সিবালের বক্তব্য ছিল, অম্বেদকারের বরাতে যে, জিন্নাহ ও সাভারকার (হিন্দু মহাসভা নেতা) দু’জনই ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান এরা দুই জাতি,  এই ধারণার অনুসারী।

তাহলে জিন্নাহই কি সব কিছুর জন্য দায়ী?
প্রশ্নই ওঠে না। উপরে রামমোহন থেকে অন্তত গান্ধী পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্র বলতে ‘জাতি’ বুঝতেন, বলেছি। আবার জাতি বলতে কেবল ধর্মীয় জাতিকে বুঝতেন। এই ছিল তাদের হিন্দু জাতিগঠন এই জাতীয়তাবাদী ভারত এর ধারণা।

কিন্তু এই হিন্দু জাতিগঠনের ভারত প্রশ্নে মুসলমানদের অস্বস্তি ও আপত্তির কারণেই ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। জিন্নাহও ক্রমশ একই ধরণের প্রশ্ন তুলে  কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

কিন্তু কংগ্রেস তার ‘হিন্দু জাতিগঠনের ভারত’ এই নীতি গ্রহণ করাতে মুসলিম লীগও যে জাতিবাদ করতে গেল, সেটাও মুসলিম জাতীয়তাবাদ হয়ে যেতে বাধ্য হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পেরে উঠতে গিয়ে ‘মুসলমানের ভিত্তিতে আলাদা এক জাতি’ এমন কথা বেশি স্পষ্ট প্রধান করে বলতে হয়েছিল। লীগ এ বক্তব্যের পক্ষে বিস্তর সাফাই গাইতে অনেকগুলো সম্মেলন হয়েছিল, যেখানে বিখ্যাত কবি ইকবালের সাফাই বক্তব্যও আমরা দেখে থাকব।

আর বিপরীতে এসব প্রশ্নের ঠেলায় কংগ্রেস ততই  ক্রমশ ছুপা-কৌশল গ্রহণ করে যে, তারা যে কৌশলগতভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত চায় এ কথা মুখে কোথাও স্বীকার করবে না। এর ফলে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ চাওয়ার সব দায় একা জিন্নাহর আর এ জন্যই অখণ্ড ভারত রাখা যায়নি- ভারতের সেই প্রপাগান্ডা সেই থেকে আজো প্রবল। একালে মানে ১৯৪৭ সালের পরে বিশেষ করে এই প্রপাগান্ডার দায় নিয়েছে কমিউনিস্টরা। যদিও তাদের ভাষ্যের প্রধান ফোকাস হলো, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মকে মেশানো খুবই গর্হিত কাজ,কাজেই মূল পাপে পাপী হলো জিন্নাহ।

কিন্তু সব জিনিষ লুকানো যায় না। কিন্তু মুল কারিগর কমিউনিস্ট, তাদের যুক্তিটাই সবকিছু উদোম করে দিয়েছে। কমিউনিস্টদের পয়েন্ট হল, রাজনীতিতে ধর্ম হারাম অথচ জিন্নাহ সেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার কথা খোলাখুলি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু কমিউনিস্টরা এতে নিজেই যেন নিজের জন্য ফাঁদ পেতেছে এমন হয়ে গেছে।  সেকালের সক্রিয় কমিউনিস্ট, পারিবারিকভাবে ব্রাহ্ম ও ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার রামমোহন রায়কে রেনেসাঁর আদিগুরুর ভুমিকায় দাবি করে বসানোর জন্য দায়ী মনে করা হয়।  এতে সমস্যা হল যে সুশোভন হয়ত ধর্মের উপর তত ক্ষেপা নয় কিন্তু সাধারণ কমিউনিস্টরা বিশেষত সাতচল্লিশের পরের কমিউনিস্ট চরম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে পড়েছিল। এই কমিউনিস্টদের এখন সাফাই ও জবাব দিতে হবে রাজনীতিতে ধর্ম যদি এতই হারাম হবে তাহলে রামমোহন রায় নতুন করে নিজেই আর একটা ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম, চালু করেছেন কেন? অন্তত জিন্নাহকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার আগে এটা নিজেরাই লক্ষ্য করে নিজেরাই এর জবাবটা দিয়ে রাখা উচিত ছিল। আর কোন কমিউনিস্ট আজ পর্যন্ত রামমোহনের দিকে আঙুল তুলে নাই কেন?

মজার কথা হল গান্ধী জিন্নাহর তত সমালোচনা করেন নাই, যতটা একালের কংগ্রেসি কিন্তু কমিউনিস্ট-ছাড়ানি প্রগতিধারী কেরালার এমপি শশীথারুর জিন্নাহর সমালোচনা করেছেন। কমিউন্সট পয়েন্টই তার পয়েন্ট, সিপিএমের সীতারাম ইয়াচুরিও একই দশা। ঠিক যেমন বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি। এককথায় এরা সকলেই কখনও  খেয়ালই করেছেন যে  “হিন্দুইজম কী” বলে সংকলিত গান্ধীর  ৪২ আর্টিকেল আছে – বলে মনে হয় না। রামমোহন রায়ের কথা আর বললাম না। কাজেই এরা মনোযোগী পাঠক এমন ধরে নেওয়া আর ঠিক হবে না।

এককথায় বললে এরা জিন্নাহর সাথে অবিচার করেছেন।  উপরে  রামমোহন আর গান্ধীর জাতিগঠন ধারণা তারা আমল করেছেন জানা যায় না। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রমাণ এখন হাজির করব।

সম্পতি পাকিস্তানের এক সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট YASSER LATIF HAMDANI সব তথ্য সাবুদ জড়ো করে একটা আর্টিক্যাল লিখেছেন ভারতের এক পত্রিকায় দ্যা প্রিন্ট – এখানে তা ছাপা হয়েছে। , যার বড় একটা অংশ আবার বিবিসির নিজের করা রিপোর্ট। যার সার কথা জিন্নাহর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতার, আগে যেখানে পাকিস্তানের যোগেন মণ্ডল তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। আর ওই সভা থেকেই যোগেন মণ্ডলকে পরে প্রথম আইনমন্ত্রী বানানো হয়েছিল। জিন্নাহ এই বক্তৃতার রেকর্ড ফলে রেফারেন্স হারিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেটা পরে ভারতের আর্কাইভে পাওয়া যায়। যা ভারত আবার একমাত্র রাইট-টি-ইনফরমেশন আইনে  এক ভারতীয় নাগরিককে অনেক পরে সরবরাহ করেছিল।

সেই সভায় জিন্নাহর বক্তৃতা সেটা। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সম্পর্কে জিন্নাহর মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে মৌলিক অংশটা নিচে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো :

মুল ইংরাজিটাঃ
We are starting in the days where there is no discrimination, no distinction between one community and another, no discrimination between one caste or creed and another. We are starting with this fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one State.
আমার অনুবাদঃ
‘আমরা একটা এমন দিন শুরু করতে যাচ্ছি- যেখানে আজ থেকে কোনো বৈষম্য, সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ, জাত চিহ্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে কোনো ভেদাভেদ গণ্য করা হবে না। আমরা সবাই নাগরিক এবং সমান নাগরিক- এই নাগরিক সাম্যের মৌলিক নীতিতে এক রাষ্ট্রে আমাদের দিন শুরু করতে যাচ্ছি’।

কিন্তু সবখানেই যে সমস্যাটা থাকে তা হলো, কথাটা বলা আর বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে দেখানো এর ফারাক সেটা পাকিস্তানের বেলাতেও আছে। কিন্তু অন্য সবার চেয়ে জিন্নাহ এই জায়গাতেই আলাদা যে তিনি জীবদ্দশাতেই তার ইমাজিন করা রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বৈষম্যহীনতা বা নাগরিক সাম্যের নীতির প্রতি তার প্রবল সমর্থন তিনি উচ্চারণ করে যেতে পেরেছিলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে জিন্নাহর নয়, গান্ধীর ভুল থেকেই…এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

গৌতম দাস

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2OV

 

 

_https://indianexpress.com/article/north-east-india/tripura/tripura-citizenship-bill-protest-northeast-india-tribal-parties-6150368/

এবার নাগরিকত্ব বিল। মানে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আনা এক সংশোধনী বিল [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)]। এর সোজা অর্থ হল আসামে এখন এবং ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যে এনআরসি তালিকা করার পর মুসলমান যারা বাদ পড়বেন, তাঁরা একেবারেই বাদ। আর তাঁরা বাদে বাদ পড়া অন্য সব ধর্মের সবাইকে যেন আবার ভারতের নাগরিকত্ব সহজেই দেয়া যায়; এরই এক খোলাখুলি নাগরিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হবে এটা। এই লক্ষ্যে মোদী সরকার আগামী সপ্তাহে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ওপর একটা সংশোধনী বিল আনতে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে মোদীর মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। আগামি সোমবার (৯ ডিসেম্বর) লোকসভায় পেশ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল।

বিজেপি-আরএসএসের একেবারে ওপরের নেতারা জানেন, মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো এটাই তাদের রাজনীতি। কেন? মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুরা ভাল – না, ঠিক এটা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাজ বা রাজনীতি নয়। তাদের মূল কাজ হল পোলারাইজেশন, মানে ভোটার মেরুকরণ। অন্য ভাষায় কাজটা হল হিন্দুদের আলাদা করা, হিন্দুরা আলাদা, ভালো আর সব কিছু তাদেরই- এটা সব সময় প্রমাণ করে চলা ও এই দাবি তাতিয়ে রাখা। কেন? কারণ এমনটা শুধু প্রমাণ করে রাখা তাদের কাজ নয়। বরং কাজের লক্ষ্য হল, হিন্দু হিসেবে তারা যেন এরপর দলবেঁধে কেবল বিজেপির প্রার্থীকেই ভোট দেয়। মানে বিজেপির বাক্সে সব হিন্দু-ভোট যেন এসে ঢুকে।

এই শেষ বাক্যটাই হলো আসল লক্ষ্য। অর্থাৎ মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুমাত্রই ভাল, এটা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার সময় আধা সত্য বা মিথ্যা যা খুশি কিছু প্রচার করা হল। এতে ধর্মীয় পোলারাইজেশন বা হিন্দু মেরুকরণ ঠিকঠাক করা হলো। কিন্তু কোনো কারণে বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট ঢুকল না। তাহলে কিন্তু এটা আর বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হবে না। বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে ফেলা- এটাই বিজেপির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চর্চা করার মূল লক্ষ্য।

স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ
এদের রাজনীতির বুঝও আজীব; মূলত তিনটি শব্দের- স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম বলে এ দুই শব্দের অর্থহীন কিছু আবেগী সুড়সুড়ি তুলে ফেলা আর তৃতীয়টা হল জাতীয়তাবাদ : মানে উগ্র-হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ রাষ্ট্র, অধিকার, নাগরিক, রিপাবলিক, কনস্টিটিউশন ইত্যাদি এসবই এদের কাছে একেবারে অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ও ধারণা। রাষ্ট্র বলে কোন ধারণা এদের কাছে অপ্রয়োজনীয় থাকে, তাই এর কোনো নীতিগত দিক যেমন নাগরিকের কিছু মৌলিক অধিকার থাকবে; যা রক্ষা করতে, সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- এটা বিজেপির রাজনীতিতে কোনো বিষয় নয়। অথবা ধরা যাক, রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে কোনো অধিকারবৈষম্য করতে পারবে না, আইনের চোখে সবাইকে সমান দেখবে ও আচরণ করবে ইত্যাদি বিষয়গুলো? রাষ্ট্রের এমন পালনীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটাও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিতে কোন আমলযোগ্য ব্যাপারই নয়। কেবল কেউ বিজেপি কি না, সে হিন্দুত্ব চিন্তার লোক কি না – সেটার দিকে চোখ রেখে চলে বিজেপির বাক্স ভরানোই এই রাজনীতিতে যথেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে বিজেপি-আরএসএস বা তাদের কর্মীরা কি কেবল এক হিন্দুত্বের আবেগের মধ্যেই তীব্রভাবে ডুবে থাকে- যেন কেবল এক হিন্দুত্বের ভাবাবেগের সুড়সুড়িই তাদের জন্য সব কিছু, ডুবে বুঁদ হয়ে থাকা? তাই কী? না, সম্ভবত তা একেবারেই নয়। যেমন আমরা পরীক্ষা করতে পারি এবার ভারতে পেঁয়াজ-উৎপাদক অঞ্চল বা রাজ্যে বন্যায় তা নষ্ট হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজসঙ্কট খাড়া করেছে। বাংলাদেশের মত ভারতেও নিজের বাজারেও পেঁয়াজের সঙ্কট চলছে। চড়া মূল্যের বাড়াবাড়ি হয়ত বাংলাদেশের মত না। কিন্তু মজার ঘটনাটা হল, তুরস্ক ভাল সহনশীল দামে ভারতকে পেঁয়াজ দিতে রাজি হওয়ায় সেই তুরস্ক ভারতের কাশ্মির নীতির কঠোর সমালোচনা করে ধুয়ে দিলেও এ ব্যাপারে মোদীর ভারত সরকার চুপচাপ। যেমন ভারতের অনলাইন ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় একটা খবরের শিরোনাম হলো, ‘মোদি সরকার তুরস্কের কাশ্মির সমালোচনা শুনেও চোখ বুজেছে; কারণ ভারতের এখন তুরস্কের পেঁয়াজ দরকার” [Modi govt ignores Turkey’s Kashmir criticism — because India needs its onions]।

আবার প্রায় একই রকমভাবে মালয়েশিয়ার মাহাথির গত সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে ভারতকে কাশ্মিরে ভারত ‘দখলদার বাহিনী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাতে ভারত প্রথমে ছদ্মরাগ দেখিয়েছিল যে, তারা আর মালয়েশিয়ার পামঅয়েল কিনবে না। কিন্তু দামে সস্তা পাওয়ায় ভারত এখন আগের মতোই মালয়েশিয়ার পামঅয়েল আমদানি করতে শুরু করেছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াল, উগ্র হিন্দুত্বের তথাকথিত আবেগ নয়, এমনকি মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়েও নয়; সুখ বলতে তা এখনো তাদের কাছে বিষয়-আশয়ের বস্তুসুখের মধ্যেই, সেখানে হুঁশ জাগ্রত রেখে খাড়া বৈষয়িক লাভালাভেই তাদের সুখ।

কাজেই ভুয়া হলেও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হল বাছবিচার হুঁশহীন এক উগ্র হিন্দুত্বই। যদিও সম্প্রতি তাদের পরপর দুইটা বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একটা হল মোদী সরকারের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মাপ জিডিপিতে ধস নেমেছে। আসলে বলতে হবে, এবারের ধস আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। দুই বছর আগে যেটা  ৮ শতাংশ বলে মোদী দাবি করেছিল, কিন্তু সেটা আসলে আড়াই পার্সেন্ট বাড়িয়ে বলা হচ্ছিল।  সেই বাড়ানো ফিগারটাও এখন কমতে কমতে এবার ৪.৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এটা সমাজের সব কোনায় হাহাকার তুলে ফেলেছে। কাজেই এটা ঢাকা দিতে এখন আবার কোনো এক জবরদস্ত মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণার ইস্যু দরকার।

এ ছাড়া তাদের আরেক বিপর্যয় ঘটেছে আসামের এনআরসি ইস্যুতে। তারা হিন্দুমনকে খুব তাতিয়েছিল যে, নিশ্চয় লাখ লাখ নাগরিকত্ব অপ্রমাণিত মুসলমান থেকে যাবে এমন-তারা তালিকায় দেখতে পাবে আশা করেছিল। কিন্তু হিন্দুদেরই হাহাকার উঠেছে কারণ নাগরিক-প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া মোট ১৯ লাখের ৭৫ শতাংশ হলো হিন্দু। এখন উঠতে-বসতে বিজেপিকে বদ দোয়া দেয়া আসামের এই হিন্দুদেরকে সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে বিজেপির। অন্যের জন্য খুড়ে রাখা গর্তে পড়ে এখন উলটা বিজেপিরই জান যায় অবস্থা।
তাই বিজেপি এখন অছিলা খুঁজছে দু’টি- ১. তৈরি হওয়া আসামের এনআরসি তালিকাই বাতিল বলে ঘোষণা করে দিতে আর ২. ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন।

বিজেপির মূল লক্ষ্য আসলে ‘বিদেশী’ বলে বা ‘মুসলমান’ বলে একটা কল্পিত স্থায়ী শত্রু খাড়া করে ফেলা; যারা সব সময় নাকি ভারতের ‘হিন্দুস্বার্থের বিরোধিতা’ যাচ্ছে এভাবে এমন একটা গল্প ও ইমেজ বিজেপি খুজছে যা দিয়ে সে একটা স্থায়ী শত্রুরূপ দান সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। বিজেপির ইচ্ছা কল্পিত এমন শত্রুর বিরুদ্ধেই সারাজীবন সে লড়াই করে যাচ্ছে তা দেখাতে পারে। যেন সে এই চেক ভেঙে ভেঙে সব সময় খেয়ে চলতে পারে, পোলারাইজেশন ও ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতি করে যেতে পারে। সে কাজে এমন স্থায়ী এক ইস্যু হতে পারে যেমন সেটা হতে পারে এমন যে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এই শ্লোগান।

তবে আসলে এটা আর অনুমান হিসেবে নেই, গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো এই বয়ানেই একমাত্র বিজেপি রাজনীতি করবে ও করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মোদি-অমিতের দানবগোষ্ঠী।

অর্থনীতিতে ডুবে গিয়ে এরা এখন এমন অবস্থায় যে ‘ভারতজুড়ে এনআরসি’ আর, বিদেশী খুঁজতে হবে- এটাই তাদের একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনার রাজনীতি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আঁচ করে দক্ষিণী প্রাচীন পত্রিকা দা হিন্দু এডিটোরিয়াল লিখে বলেছে The Centre should focus on the economy and address issues of real concern] কেন্দ্র সরকারের উচিত অর্থনীতির দিকে যেটা প্রকৃত উদ্বেগের ইস্যু সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।
যেমন এখন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নির্বাচন চলছে, সেখানে অমিত শাহ নির্বাচনী জনসভা বক্তৃতা করেছে- “ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে”, এই লাইন নিয়ে। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং- “আপনার পাশের লোকটা বিদেশী নয়তো, চেক করেছেন কী”- এমন বিদেশীভীতি বা জেনোফোবিয়া ছড়ানোর উদ্যোগ-রাস্তা ধরেছে। এটাকে এক মানসিক অসুস্থতা বললেও খুব কমই বলা হবে।

কিন্তু এর আগে ইতোমধ্যে আসামে যে ড্যামেজ ঘটে গেছে, তা হলো এনআরসি মোট ১৯ লাখ বাদ পড়াদের মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু। তাই এখন উলটা আসামের সমাজ থেকে এদের বাদ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হবে বিজেপিকে। তাই, এদেরকে বাঁচানোর ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে আগামী সপ্তাহে আনা হচ্ছে, ১৯৫৫ সালের পুরনো নাগরিকত্ব বিলের এক সংশোধনী। এটাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৯। যাতে তাদেরকে আবার নতুন করে নাগরিকত্ব দেয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে এই বিলে বলা হবে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানরা (কিন্তু মুসলমানরা বাদ) অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং উল্টো যেমন বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অভিবাসী এবং বৈধভাবে আসা অভিবাসী (কিন্তু যাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে), তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আসলে আগের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে কোনো অবৈধ অভিবাসী (ভিসা ছাড়াই ঢুকে পড়া বা ভিসার মেয়াদ শেষেও থাকা) বিদেশী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে না। সোজা কথায় মোদী নতুন আইনে এই বাধা তুলে দিতে চাইছে; কিন্তু মূলত মুসলমান ছাড়া বাকি সব ধর্মের মানুষের জন্য সুযোগ রেখে দিয়ে- এভাবে আনা হবে এই সংশোধনী। এটাই এর প্রত্যক্ষ মুসলমানবিদ্বেষ এবং মুসলমানবৈষম্য।

এমন এই বিদ্বেষ ও বৈষম্য তৈরি করা – এটাই হবে বিজেপি-আরএসএসের রাজনৈতিক পুঁজি। স্থায়ী ঘৃণাবিদ্বেষ তৈরি ও ছড়ানোর উৎস; যাতে এটা কেনাবেচা থেকেই স্থায়ীভাবেই পোলারাইজেশনে বিজেপি প্রার্থীর বাক্স ভরার রাজনীতি করে যাওয়া যায়। এক দিকে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এর রাজনীতি চালিয়ে অস্থির ঘৃণাবিদ্বেষ উত্তেজনা তাতিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা, মুসলমান তাড়িয়ে খাঁটি হিন্দুদের ভারত কায়েম করা- এ এক বিরাট মাইলেজের স্থায়ী ইস্যুর রাজনীতি বিজেপি-আরএসএস নিজের জন্য তৈরি করতে চাইছে। আর এ কাজ করতে গিয়ে কোনো হিন্দু এতে ফেঁসে নাগরিকত্ব খোয়ালে তাকে আবার নাগরিকত্ব দিয়ে আগের মতোই ভারতে রেখে দেয়া যাবে। এই সুবিধা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপি-আরএসএস-কে তাদের ঘৃণ্য-রাজনীতির ইস্যু সরবরাহের নিয়মিত খোরাক হয়ে থাকতে হবে, আর স্থায়ীভাবে নাগরিকবৈষম্যের শিকার হতে থাকতে হবে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের এই মুসলমান ‘বলি’ দিয়ে দেয়ার রাজনীতি- তা আবার ‘ভারত জুড়ে এনআরসি’ বা বিদেশী খোঁজো যে নামেই আসুক তা কি টিকেই যাবে? বিজেপি-আরএসএস এরাই কি একমাত্র সত্য হয়ে যাবে? আগাম কোনো কিছু শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা যায়।

এনআরসি নামে মোদি-অমিতের দানব শয়তানি শুরু ও শেষ হলে পরিণতি কী হয় তা মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে আসামের সবার তা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। অহমিয়া বা বিজেপি যতই এটা ‘বিদেশী’ বা মুসলমানরাই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে খুশিতে থেকেছিল বটে, কিন্তু সবশেষে এটা তাদের নিজের জন্যই খানাখন্দ খুঁড়ে রাখার মতো কাজ হয়েছে। এখন হাহাকার উঠেছে। শুধু তাই নয়, পড়শি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও এ বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষের তর্কে ওই বাংলাও এখন বুঝে গেছে যে, নাগরিকত্বের ডকুমেন্ট সার্টিফিকেট আর কার্ড জোগাড়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি কী জিনিস। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের যারা ইতোমধ্যে বিজেপিতে যোগ দিয়ে হিন্দুত্বে সুবিধা খাওয়া আর মুসলমানের রাস্তায় গড়াগড়ি যাওয়া ব্যালকনিতে বসে আরামে দেখা যাবে বলে ভেবেছিল, এরা নিজেই ইতোমধ্যে বুঝে গেছে এনআরসি কী জিনিস। এটা যে হিন্দু-মুসলমান বাছবিচার ছাড়াই নির্বিশেষে যে কাউকে চরমতম হয়রানির শিকার বানিয়ে ফেলতে পারে, সেটা এখন আসামের পরিণতি দেখে সবাই বুঝতে পেরেছে।

এনআরসিতে নাগরিক প্রমাণের দায় নাগরিকের, রাষ্ট্রের না। অথচ একটা ডকুমেন্ট ব্যক্তিপর্যায়ে রক্ষা সংরক্ষণ যতটা কঠিন রাষ্ট্রের হেফাজতখানা, সেটা রক্ষা উল্টো ততই সহজ। ব্যক্তি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে পারে সবচেয়ে সহজে। তাই স্বাভাবিক ছিল, কেউ নাগরিক নয় তা প্রমাণের দায় থাকা রাষ্ট্রের কাঁধে। ইন্দিরার আমলে একসময় এটা তাই ছিল।

এ ছাড়া এমনিতেই দুনিয়া এখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের- এর প্রধান স্বভাব বৈশিষ্ট্য তাই এমন যে পুঁজি আর শ্রমের (মানুষের) মাইগ্রেশন এখানে হবেই, তারা নিরন্তর ঘুরে বেড়াবে। শুধু মানুষ নয়, পুঁজিও এখানে দেশী-বিদেশী পরিচয় নেবে, ঘটবে। তাই ব্যাপক ইকোনমিক মাইগ্রেশন মানে বৈধ-অবৈধ লেবার মাইগ্রেশন সবচেয়ে কমন ঘটনা হবে এখানে। এর ওপর ভারতবর্ষের দেশভাগ- এটা নিজেই সবচেয়ে স্থায়ী এক রাজনৈতিক মাইগ্রেশনের ফেনোমেনা। যা কখনই একেবারে শেষ হয়নি, হবে না। ফলে এখানে একটা নিচু মাত্রার বা কিছু মাত্রার মাইগ্রেশন সব সময় আছে এবং আশা করি আরো অনেক দিন থাকবেই। একমাত্র বদ মতলব থাকলেই কেবল এটাকে কেউ ইস্যু হিসেবে হাজির করতে চাইবে, আর কেবল মুসলমানবিদ্বেষ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

‘মাত্র ছয় মাস। তার মধ্যেই ভগ্নমনোরথ দশা কাটিয়ে নিমেষে চাঙ্গা হয়ে উঠল তৃণমূল। তিনটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চমকে দেয়া পুনরুত্থান ঘটালেন নিজের দলের। তৃণমূলের ২১ বছরের ইতিহাসে কোনো দিন জয় মেলেনি যে দুই আসনে, সেই কালিয়াগঞ্জ এবং খড়গপুর সদর আসনও ছিনিয়ে নিল ঘাসফুল। আর লোকসভা নির্বাচনে করিমপুরে যে ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল, এবার জিতল তার চেয়ে অনেকটা বেশিতে।’ এটা এ মাসের শুরুর দিনে আনন্দবাজারের এক রিপোর্ট টুকে এনেছি।

গত মে মাসে মোদির আরো বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি প্রাদেশিক আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল এসেছে। তাতে এর তিন আসনই পেয়েছে মমতার দল। অথচ এ তিনটির দু’টিতে মমতার দল গত ২১ বছরে কখনো জিততে পারেনি। এই তিনটি আসনই হয় মুসলমান প্রধান অথবা বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া নয়তো বা আসাম লাগোয়া আসন। আর এসব সত্ত্বেও এগুলোর দু’টি ছিল সিপিএম বা কংগ্রেসের দখলে। আর একটি এমন রাজ্য বা বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন, যা গত কেন্দ্র নির্বাচনে প্রথম বিজেপি দখলে যাওয়া আসনের অন্তর্গত। তাই এবারের নির্বাচনের শেষে ফলাফল দেখে সব পক্ষই একবাক্যে স্বীকার করেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সবাই এনআরসি আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে, ভুগছে। এনআরসি তাদের আক্রমণ করে ফেলেছে। কলকাতার বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও স্বীকার করে নিয়েছেন বলে রিপোর্ট বলছে, Dilip Ghosh on Saturday identified “fear and confusion over NRC” ।

তাই সেই আতঙ্কের একমাত্র ত্রাতা হিসেবে মমতা তাদের আশ্রয় হয়ে ধরা দিয়েছে। তাই মমতার বিজয়। আগে তারা ভেবেছিল বিজেপির উত্থানে মুসলমানের কোণঠাসা হওয়া দেখতে তাদের খারাপ লাগবে না হয়তো। কারণ, ‘মমতা নাকি চাপে থাকা মুসলমানদের রশি আলগা করে মাথায় তুলেছিল।’ আর এখন বেলকনিতে বসে “মুসলমানদের কষ্ট পাওয়া দেখার মজা” দেখতে চাওয়ারা বুঝে গেছে, ব্যাপারটা এমন মজা-তামাশার নয়। এনআরসি মানে নিজেই নিজের জন্য হয়রানি ডেকে আনা, পকেটের পয়সা খরচ করে দুঃখ কেনা। তারা প্রত্যেকে ছোট চাকরি বা ব্যবসায় স্বল্প আয়-ইনকামে অস্থির থাকতে হয় এমন জীবন যাপন করেন। সেখানে উটকো নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের টেনশন? এই হয়রানি ডেকে আনা তাদের জীবনের অর্থ কী! কলকাতায় ইতোমধ্যে রেশন কার্ড বা ডকুমেন্ট ইত্যাদি জোগাড়ের নীরব দৌড়াদৌড়ি কেউ কেউ শুরু করে দিয়েছেন। কাজেই কেউ পারলে তাদের সেই ত্রাতা হতে পারেন মমতা- এই মেসেজই তারা হাজির করে ফেলেছেন!

ইতোমধ্যে আর একটা বড় ডেভেলপমেন্ট আছে। গত মে মাসে শেষ হওয়া নির্বাচনে এক ব্যাপক কারচুপি হয়েছে আর তা মূলত ডিজিটাল ব্যালট-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার সুযোগে। এটা বিজেপি ছাড়া মূলত সব আঞ্চলিক দল বিশ্বাস করে। যদিও হাতেনাতে দেয়ার প্রমাণ হাজির করা মুশকিল। এ ধারণা আরো জোরদার এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রিম কোর্ট গত নির্বাচনে খোদ মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যায়নি। পাশ কাটিয়ে চলেছে। সেটিও আবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল যে, যদি তা করতে হয়, তবে আগ্রাসী মোদির নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়ার রিস্ক তাদের নিতেই হতো। যদিও কনস্টিটিউশনালি সে ক্ষমতা তাদের দেয়াই আছে। কিন্তু কেউই আসলে সঙ্ঘাতে যেতে চায়নি। এমনকি একজন সক্রিয় আপত্তিকারী কমিশনার এখনো মোদির নির্বাহী ক্ষমতার হয়রানির শাস্তি ভোগ ও মোকাবেলা করে চলেছেন।

তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ইতোমধ্যে তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সংসদে ১৯টা বিজেপি-বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়েছে। ‘নির্বাচনী সংস্কার, ব্যালট ফেরানোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে’ রাজ্যসভায় স্বল্পমেয়াদি আলোচনার জন্য যৌথভাবে নোটিশ দিয়েছেন এ দলগুলোর নেতারা। এমন ইস্যুগুলো আস্তে ধীরে বড় ও সফল হয়ে উঠতে পারে, যা বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে পারে। আপাতত আগামী সপ্তাহের উত্তেজনা নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল নিয়ে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা গত  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

গৌতম দাস

০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2Os

ভারতের অর্থনীতির দুরবস্থা আর লুকিয়ে রাখা গেল না। এবছর মোদীর দ্বিতীয়বারের সরকার ক্ষমতায় বসার পর দ্বিতীয়-ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে গত ২৯ নভেম্বর। এবারও জিডিপি আরো অর্ধশতাংশ কম। অর্থাৎ গত কোয়ার্টারে ছিল ৫ শতাংশ, সেই জিডিপি এবার হয়েছে আরো কমে, ৪.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এটা আগের তিন মাসের চেয়েও আরো কম।

গত ২০১৬ সাল থেকে তথ্য লুকিয়ে বা আড়াল করে না হলে, গণনার ভিত্তিবছর বদলানো বা অন্য কোনো ছলে আড়ালে দিয়ে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে মোদী সরকার যে খেলা করে আসছিল  সেসব এবার আর অস্বীকার করার বা লুকিয়ে ফেলে পালাবার সুযোগ অনেক কিছুই আর থাকল না। তবে শেষে এসে এখন তর্কটা হল, জিডিপি ৪.৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে, সেটা তো লুকানোর নাই। তাই এখন বিরোধীদের সাথে তর্কের পয়েন্ট হল, অর্থনীতি ধীরগতি বা শ্লথগতির এটা স্বীকার করে নিয়েও মোদীর অর্থমন্ত্রী গলাবাজির করে বলছে এটা এখনও অর্থনৈতিক “মন্দা” [recession] বলে ডাকা যাবে না। ভারতের পার্লামেন্টে এই তর্কই চলছে এখন।

রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে নজর বা খেয়াল রাখার মূল কাজটা হল “মনিটরিং”। উৎপাদনের সামগ্রিক এবং ঘুঁটিনাটিতেও তথ্য-পরিসংখ্যানে অর্থনীতি কোথায় কমল না বাড়ল এবিষয়গুলো যেকোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নিয়মিত চোখে চোখ রাখা হয়। এই চোখ রাখা বা মনিটরিং ডাটা সংগ্রহের ব্যাপারটার সাধারণ স্ট্যান্ডার্ড হল প্রতি বছর এটা চারবার মানে প্রতি তিন মাস শেষের ডাটা সংগ্রহ করে পুরো হিসাবনিকাশ গণনা প্রক্রিয়া শেষ করা হয় একবার করে, এভাবে বছরে চারবার বা চার কোয়ার্টারে। আর প্রতি বছর এই চারবারের গড়টাই আবার বছরের জিডিপির মান বলে প্রকাশিত হয়। গতকাল ২৯ নভেম্বর ভারতের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক বা কোয়ার্টারের (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) জিডিপির হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সেকেন্ড কোয়ার্টারের জিডিপি ৪.৫ শতাংশ। কিন্তু এর তাৎপর্য কী?

প্রথমত, বাইরে প্রকাশ্যে যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এই অর্থে, কথাটা হল, এক বিরাট ধরনের হতাশা ছেয়ে বসেছে ভারতের  অর্থনৈতিক জীবনে, সর্বত্র। ইংরেজি দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা থেকে টুকে আনা কিছু তথ্য দেখা যাচ্ছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯ এই কোয়ার্টারে ম্যানুফ্যাকচারিং কমেছে ১ শতাংশ, কৃষিতে বেড়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ হারে, স্থাপনা-কাঠামো ৩.৩ শতাংশ বেড়েছে ও বিদ্যুৎ বেড়েছে ৩.৬ শতাংশ, ইত্যাদি। [Data released by the National Statistical Office showed that while manufacturing contracted by 1 per cent in the July-September quarter, agriculture grew by 2.1 per cent, construction by 3.3 per cent and electricity generation by 3.6 per cent.]।

এছাড়া ইন্ডিয়া রেটিং ও রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইকোনমিস্ট সুনীল কুমার সিনহার উদ্ধৃতি দিতে একই পত্রিকা লিখেছে, এবারের জিডিপি এমন কমে যাবার পিছনে তিনি দুটা কারণ উল্লেখ করেন – “কেনাকাটা কমিয়ে দেয়া মানে ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন আর রপ্তানিতে ধবস নামা”  […slowdown in GDP growth is largely on account of the slump in consumption expenditure and de-growth in export]।

এসব আবার অবশ্যই হঠাৎ করে ঘটে নাই। যেমন কারখানা উৎপাদনের মধ্যে গত তিন মাস ধরে প্রাইভেট কার উতপাদনের কোম্পানিগুলোর অবিক্রীত গাড়ির তথ্য ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছিল বানের জলের মত। অবিক্রীত গাড়ির সংখ্যা সেখানে দেখিয়েছিল বছরের উৎপাদিত গাড়ি্র ৪৫ শতাংশই  অবিক্রীত।

আসলে ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যানের হিসাবে এর ধারাবাহিক পতনের শুরু হতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের মার্চের পর থেকে। মানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শেষ কোয়ার্টার জানুয়ারি-মার্চ -এর পর থেকে, সেবারই ছিল শেষ উঁচু জিডিপি ৮.১ শতাংশ। এর পর থেকে গত দেড় বছর ধরে চলছে টানাভাবে ওই শেষ উঁচু জিডিপিরই পতনের কাল। এটাই ধারাবাহিকভাবে প্রতি কোয়ার্টারে কমতে কমতে এসে এবার হয়েছে সাড়ে চার শতাংশ। যেটা এর আগের কোয়ার্টারে (এপ্রিল-জুন ২০১৯) ভারতের জিডিপি ছিল ৫ শতাংশ।

জিডিপিকে আবার উপমহাদেশের ভিত্তিতে ভাগ করে দেখে এর ভিন্ন কিছু তাৎপর্য বুঝা যেতে পারে। যেমন, এখানে বলে রাখা যায়, এশিয়ান জিডিপি হিসাবে সাড়ে চার শতাংশ হওয়ার অর্থ এটা খারাপ জোনের মধ্যে পড়ে যাওয়া, মনে করা হয়। সে হিসাবে পাঁচ বা এর বেশি শতাংশকে ভাল জিডিপির শুরু মনে করা হয়। আবার তুলনায় ইউরোপ-আমেরিকা্‌ সেখানে কোন রাষ্ট্রের চার শতাংশ জিডিপি হয়ে যাওয়া মানে এটা খুবই ভাল উন্নতি। সাধারণত ইউরোপ-আমেরিকা এই জোনের দেশ এক-দুই শতাংশের জিডিপিতেই আটকে থাকে। মূল কারণ পুরনো কলোনি মালিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অর্থনীতি বা উন্নত অর্থনীতির আমেরিকা বলতে এরা আসলে পুর্ণ-সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড [saturated] অর্থনীতি বলে মানা হয়। তাই এটা যা আছে তাতে টিকে থাকতে পারা সেটাকেই অনেক সাফল্য মনে করা হয়।

তুলনায় এশিয়ান যেকোনো অর্থনীতি মানেই  কয়েক শত বছর ধরে থেকে উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজি পাচার হয়েই চলে গেছে এমন অর্থনীতিই হবে সেটা। এই কারণে কলোনিমুক্ত স্বাধীন হওয়া পরেও একালে এসব দেশে অবকাঠামো ও উৎপাদনে বিনিয়োগের ব্যাপক পিছিয়ে থাকা ঘাটতি মেটাতে বিদেশী পুঁজি ধারে নিয়ে তা সুদসহ ফেরত দিয়েও এসব রাষ্ট্রের অনেক আগানো-উন্নতির পটেনশিয়াল থাকে। এরই থ্রেসহোল্ড জিডিপি মানে ন্যূনতম পা-রাখার জায়গা হল ৫ শতাংশ জিডিপি। আবার দেশ যোগ্য দল ও নেতৃত্ব পেলে এরা এর চেয়েও অনেক উপরে উঠতে পারে। কিন্তু এসব দেশের জিডিপিকে ন্যূনতম আট শতাংশের উপরে না নিতে পারলে বিরাট পরিবর্তনের স্বপ্ন আশা করা, স্বপ্ন দেখা অবান্তর। আবার ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে যেমন চীন, ১৯৯০-২০০৭ এই সময়কালে অনেক বারই ডাবল ডিজিট বা ১৩.৬ শতাংশ পর্যন্ত নিজের জিডিপি উঠিয়েছিল।

আবার ওদিকে আরেক ফেনোমেনা দেখা দিয়েছে একালে। দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস ফিগারের মধ্যে  বাইরে থেকে হাত ঢুকিয়ে দেয়া –  বিভিন্ন দেশে আজকাল এটা অনেক বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এভাবে আজকাল তথ্য-পরিসংখ্যান সাজিয়ে-বানিয়ে নেয়া ও ভাল পরিসংখ্যানের দাবি করা হচ্ছে অনেক বেশি। অনেকে এমন দাবি উঠে আসা কেন – এর মূল কারণ হিসাবে – ভোট বা পপুলার রাজনীতিকে দায়ী করেন। মানে এই প্রবক্তারা বলতে চায় রাজনীতিতে ‘পপুলারিটি’ বা ভোটের রাজনীতি আজকাল এতই প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ এরা বলতে চাচ্ছে আগে এটা এত বড় বিষয় ছিল না। এই প্রবক্তারা যেন বলতে চায়, আগে পাবলিক অনেক রয়েসয়ে ভোটের সিদ্ধান্ত নিত। আর এখন হয়েছে উল্টো। এই কথাটা সত্য যে, খারাপ পারফরম্যান্স বা খারাপ অর্থনীতিতেও ওর তথ্য ঠিকঠাক লুকিয়ে রেখে অনেক শাসক অনেকদূর তথ্য আড়াল করে কাটিয়ে দিতে পারে ও পারতে দেখা যাচ্ছে।

অবশ্য আমাদের নিজের দেশে ভোট না হলেও এখানে পপুলারিটি মানে মিথ্যা যেকোনো কিছু পরিসংখ্যান দাবি করার সুযোগ কত বেশি- সেটা বুঝতে হবে। তবে আমাদের দেশের মতই ভারতেও তথ্য-পরিসংখ্যান লুকানোর একটা ভালো উপায় হল, গণনার ভিত্তিবছর বদলে দেয়া। অর্থনীতির পরিসংখ্যান গণনা প্রক্রিয়ায় বিরাট অংশটাই তুলনামূলকভাবে বলা হয় এমন ভাষ্য। অর্থাৎ কোন কথা বলার সময় তাতে কোন একটা বছরকে ভিত্তি বছর ধরে এর ধারণা তৈরি করে কথা বলা হয়। কিন্তু এখনকার প্রবল প্রচলন হল ভিত্তি বছর কিভাবে কোন বছরকে ধরলে আমার আমলের পরিসংখ্যানগুলো বড় ফিগার দেখাবে, উজ্জ্বল্ হয়ে উঠবে সেভাবে ভিত্তি বছর বদলে নেয়া হচ্ছে। এমন মিথ্যা বলার সহায়ক পরিসংখ্যানবিদও আজকাল অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এটা আমাদের দেশে হচ্ছে, মনমোহনের আমলে অভিযোগ ছিল, মোদীর আমলে সে অভিযোগ আরো বেশি।

গতকালের (৩০ নভেম্বর) আনন্দবাজার,  জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক অধ্যাপিকা জয়তী ঘোষের বরাতে মনে করাচ্ছে, “মোদী জমানায় জিডিপি মাপার পদ্ধতি বদলে দেওয়া হয়। সেই পদ্ধতি নিয়েই বিতর্ক রয়েছে”।  পত্রিকা আরও লিখেছে, “বস্তুত, মোদী সরকারের প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনই বলেছিলেন, নতুন পদ্ধতিতে জিডিপি মাপায় তা ২ থেকে ২.৫ শতাংশ অঙ্ক বেশি হচ্ছে। তাঁর কথা মানলে আদতে আর্থিক বৃদ্ধির হার ২ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে”। অর্থাৎ পরশু যে জিডিপি ফিগার ৪.৫% বলে দেখানো হয়েছে এটাও আগের প্রকৃত হিসাবে এখন এটা মাত্র ২%।

ভারত চেম্বারের সভাপতি সীতারাম শর্মার আশঙ্কা, কেন্দ্র ব্যবস্থা না-নিলে দেশকে মন্দার হাত থেকে বাঁচানো কঠিন। তাঁর দাবি, ‘‘আর্থিক হাল ফেরানোর কোনও ব্যবস্থাই ফল দেয়নি। চাহিদা বাড়ানোর ব্যবস্থা চাই।’’ অনেকেরই আশঙ্কা, বৃদ্ধির হার আর যদি না-ও কমে, তবু বছর দুয়েকের মধ্যে তার মাথা তোলার সম্ভাবনা কম।

সে যাই হোক, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদীকে অর্থনীতিতে প্রথম নেতি প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় ‘ডিমনিটাইজেশন’ [demonetization] নিয়ে। মানে প্রচলিত ভাষায় যাকে সরকারের “নোট বাতিলের” সিদ্ধান্ত বলা হয় সেটা।  মানে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় হঠাত, মোদীর পাঁচশ ও হাজার রুপির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছলেন সেকথাই বলা হচ্ছে। এটা ছিল অর্থনীতিতে নেতি প্রতিক্রিয়া-পরিস্থিতিকে যেন মোদীর নিজেই ডেকে আনার এক কাজ।

যেন এতে মোদীর সরকার বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ধরে ফেলতে পারবেন, আর তাতে একক হাতে বিরাট ছক্কা মেরে দেবেনই, এই মিথ্যা লোভে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে ভারতের অর্থনীতি উলটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। বিরাট ইতিবাচক ফলাফলের আশা অথবা অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে ইত্যাদি এমন কিছু আশা ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মোদী।  কিন্তু না, এমন কোনো কিছুই আসেনি, এমন কোনো কিছু মোদির কপালে জোটেনি। উলটো ভারতের অর্থনীতি প্রবলভাবে ধাক্কা খেয়েছিল। সেই থেকে মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আর কখনো তার কোনো অর্থনৈতিক সাফল্য আছে এ কথা বলতে পাবলিকলি সামনে যান নাই।

‘ইনফরমাল সেক্টর’ [informal sector] বলে একটা কথা আছে। অনেক ঝকমারি কথা মনে হলেও আসলে তা নয়। ফরমাল সেক্টর কথাটার সোজা অর্থ হল, একটা গ্রামে যদি একটা গাড়ির কারখানা বসিয়ে ধরা যাক ৬০০ লোককে কারখানার ভেতরে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যায় তবে ওই এলাকায় ঐ শ্রমিকদের একেকজন পিছু আরও ছয়জন করে মোটামুটি প্রায় আরো ছত্রিশ শত লোকে বিভিন্ন কাজ পাবার অবস্থা হবে, এটা ধরা হয়। এতে ৬০০ জনের ফরমাল চাকরি হলে, মানে তাদের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ সৃষ্টি করলে এতে অপরিকল্পিতভাবে আর বাকিরা (ছত্রিশ শত) ইনফরমাল শ্রমিক হিসেবে কাজ পাবে।  যদিও এরা কারখানার ভিতরে কাজ পাবে না। বাইরে নানা সহায়ক পেশা যোগাড় করে নিবে। এদের মধ্যে বাদামভাজা বেচতে আসা অথবা শ্রমিকদের ভাত রান্নার লোক, কিংবা চা দোকানি, সবজি বা মুদি দোকানি বা হকার ইত্যাদি – এরা এমন বিভিন্ন পেশার লোক হবে।

মোদির ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণায় সয়লাব করা সবচেয়ে বড় নেতি প্রভাব হল, মোদীর নোট বাতিলের ঘোষণায় কাজ হারিয়ে ‘বলি’ হয়ে গিয়েছিল ভারতের এই ইনফরমাল সেক্টর। ভারতের শিল্পে অগ্রসর রাজ্য বলতে মুম্বাই, গুজরাটকে ধরা হয়। এ কথার আরেক প্রমাণ হল, ২০১৬ সালের আগে এখানের নিম্ন মধ্যবিত্তের হাতে  আয়-ইনকাম ভাল হওয়াতে কিছু বাড়তি সঞ্চয়ও আসত। আর তা আসত বলেই সেই সূত্রে কলকাতার স্বর্ণকাররা প্রতি ওস্তাদ সাথে তার ছয় সগরেদকে নিয়ে মুম্বাই বা গুজরাটে সেখানে দোকান দিয়ে বসতে দেখা যেত।

এতে স্বর্ণকার ওস্তাদ-সাগরেদরা নিয়মিত কলকাতায় পরিবারে টাকা পাঠাতে পারত। মানে সব পক্ষেরই আয়-ইনকাম নিয়ে বেচে থাকা একটু ভাল হচ্ছিল। কিন্তু হঠাত সবই ডুবে গিয়েছিল মোদীর ঐ ‘নোট বাতিলে’। কারণ সবারই আয়-ইনকাম এলোমেলো হয়ে যায় এতে। বিশেষ করে বাড়তি কাজ বা আয়ের সুযোগ যেখানে ছিল সেখানে সব, সবার আগে ছেঁটে পড়েছিল। তাই সেই শকিং ফলাফল বাস্তবতার মুখে ওস্তাদ-সাগরেদেরা সবকিছু গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে চলে গেছিল। অর্থাৎ ফরমাল কাজ দিতে না পা্রার ব্যর্থতা ভারতের অর্থনীতির বহুদিনের। কিন্তু তা থাকলেও ইনফরমাল কাজ যোগাড় করে আধপেটে খেয়ে হলেও নিজের সারভাইবাল মানুষ কষ্ট করে যোগাড় করে নিচ্ছিল। কিন্তু মোদীর   ডিমনিটাইজেশন খুবই অবিবেচক সিদ্ধান্ত বলে হাজির হয়েছিল। ডিমনিটাইজেশন গরীব জীবনকে আরও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছিল। মূল কারণ বাজারে লেনদেন করার মত মুদ্রার অভাব আর তা থেকে ছড়িয়ে পড়া অনাস্থা। সেখান থেকে শঙ্কা। সার কথায় মোদীর অর্থনীতিও মানুষকে ফরমাল চাকরি তো দিতেই পারে নাই, কিন্তু মোদী ডিমনিটাইজেশন করে মানুষের ইনফরমাল কাজ-চাকরিটাও খেয়ে ফেলেছিল।

ভারতের অর্থনীতির আরেক পুরানা মূল সমস্যা হল, এখানে ফরমাল সেক্টরে যে কাজ পেল পরের ছয় প্রজন্মের সন্তানেরও হয়ত আর ফরমাল চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।  কথাটা অন্যভাবে বললে, কষ্ট করে কোন সরকারের একটা টার্ম অর্থনীতি ভালো চললেও পরেরবার এটা শেষ, ঢলে পড়বেই। মনমোহনের আমলে তাই হয়েছিল। তাই দ্বিতীয়বার কংগ্রেস-জোট (২০০৯) আবার জেতার পর মনমোহন সরকারের অর্থনীতির ঢুবে সব শেষ হয়ে গেছিল। আবার পরে ২০১৪ সালে মোদী প্রথমবারই ক্ষমতায় আসার দু’বছর পরে (২০১৬) খারাপ দিন চলে এসেছিল। আর এখন তো খারাপ দিন শুরু হয়ে গেল সম্ভবত।

এ দিকে, গতকালই মনমোহন সিং এক বিরাট বাণী দিয়েছেন মোদীকে। সেটা ঠিক বিরোধী রাজনীতিকের বক্তব্য নয়, যেন পেশাদার অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরামর্শ, এমন মানে দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রায় ৮০০ শব্দের এক পরামর্শ বক্তব্য। না অবশ্যই, সব সমস্যার ধনন্বরি সমাধান মনমোহন বা তার কংগ্রেস দলের কাছে এখন আছে অথবা তাদের আমলেও হাতে ছিল ব্যাপারটা তা একেবারেই নয়। বরং সেকালে মনমোহনের দ্বিতীয় টার্মের যে অর্থনৈতিক ধস নেমেছিল, দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কোনো সমাধান সে সময় মনমোহনের হাতেও ছিল না। কেবল মোদী তখন উলটো মনমোহনের বদলে তিনিই পারবেন কারণ গুজরাট চালানোর অভিজ্ঞতা তার আছে এই ভুয়া আশ্বাস তৈরি করে তিনি পরে (২০১৪) ক্ষমতায় জিতে আসতে মনমোহনের সেই ব্যর্থতাকে পুঁজি করতে পেরেছিলেন কেবল।

গতকালের মনমোহনের সেই লিখিত বক্তৃতার সার কথাটার শিরোনাম হল ‘ভয়ের রাজত্ব’ [“climate of fear” ]। মনমোহন আসলে অভিযোগ তুলে বলছেন যে, মোদী এখন ভারতে এক ‘ভয়ের রাজত্ব’ সৃষ্টি করে রেখেছেন। অনুবাদ করা সেই দু’লাইন হল এ রকমঃ
“উল্লেখযোগ্য ভয় ও অবিশ্বাস আছে অর্থনীতিতে নানান অংশগ্রহণকারীদের মনে। রাষ্ট্রের থেকে তুলনামূলক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষগুলো, তদন্ত-গোয়েন্দা দফতরগুলো ইত্যাদি – এদের উপর আমাদের জনআস্থার সব কিছু ক্ষয়ে গেছে। আমাদের সমাজের এক গভীর অনাস্থা, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ভয় ও অসহায়ত্ববোধ – এসবের বিষাক্ত মিশ্রণে আমাদের অর্থনৈতিক তৎপরতার দমবন্ধ হয়ে আসছে, আর তা থেকেই অর্থনৈতিক উন্নতিও দমবন্ধ হয়ে আসছে” [“There is profound fear and distrust among our various economic participants. Public trust in independent institutions such as the media, judiciary, regulatory authorities, and investigative agencies has been severely eroded. This toxic combination of deep distrust, pervasive fear and a sense of hopelessness in our society is stifling economic activity and hence economic growth,” ] ।

অর্থাৎ মূলত এক পলিটিকো গভীর অভিযোগ তুলে মনমোহন মোদীকে ভাল বিধিঁয়েছেন।

কিন্তু এগুলো সম্ভবত ঘটনার আসল দিক নয়। কারণ, আগামী আরো চার বছর তাহলে মোদী-আরএসএস রাজ্য নির্বাচনগুলো করবে কিভাবে, কী হাতে নিয়ে? আরো বেশি করে হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়! – মানে এনআরসি, সিটিজেনশিপ, গরু বা লিঞ্চিং ইত্যাদির তাণ্ডব দিয়ে! তাই নয় কি?

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ৩০ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির অর্থনীতির ঘণ্টা বেজে গেল!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]