নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

গৌতম দাস

০৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2QS

           https://gulfnews.com/photos/news

ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” ব্যাপারটা অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে গেছে। যেমন আগে এটা এনআরসি [NRC বা নাগরিক তালিকা প্রণয়ন]  বলেই নিজে বুঝা বা অন্যকে বুঝানো যেত।  এনআরসি ব্যাপারটা ছিল কেবল আসামে আর সেখানে কে নাগরিক কে নয় এরই এক বাছাই প্রক্রিয়া চলছে বলে বুঝলেই চলত।  কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের গোপন লক্ষ্য ও পরিকল্পনার দিকটা ক্রমশ পুরাটাই উদোম হতে শুরু করেছে। এতে পরবর্তিতে তা আর এক নতুন মাত্রার দিকে গেলে সেই বিষয়টা বলা হচ্ছে সিএএ (CAA, Citizen Amendment Act) । যার সোজা মানে হল সংশোধনী বিলে  আফগান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ এভাবে নাম ধরে উল্লেখিত দেশ থেকে মূলত হিন্দুধর্মের লোকদেরকে ডেকে নিয়ে এসে নাগরিকত্ব দেয়ার পরিকল্পনা এটা। যদিও তা আদৌও বিজেপি বাস্তবায়ন করতে পারবে তা আমরা নিশ্চিত নই। এতে এখানে গুরুত্বপুর্ণ দিক যেটা স্পষ্ট করে বলে রাখা হল ঐ তিন দেশের মুসলমানেরা এই সুবিধা পাবে না।  অর্থাৎ ঐ তিন দেশে কোন কারণে  মানবাধিকার হারানো যে কেউ “নাগরিক” নয়, কেবল মূলত হিন্দুধর্মের লোকের জন্যই এই সুবিধা। এটা এতই স্পষ্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বৈষম্যমূলক আইন।
আর এবছর থেকে এবার আরও এক নতুন ইস্যু এনপিআর (NPR বা জাতীয় জনগণনা) এর সাথে যোগ হচ্ছে। ভারতে প্রতি দশ বছর পরপর নিয়ম করে জনগণনা হয়। সেটা শুরু হবে এবছরের এপ্রিল থেকে আর তা কাজ শেষে প্রকাশ হবে ২০২১ সালে।  কিন্তু এবার জনগণনাতে বাড়তি প্রশ্ন ও তথ্য সংগ্রহের কিছু দিক থাকবে এমনভাবে যেন তা পরের এনআরসি ও সিএএ-এর বদ মতলবের কাজকে সাহায্য ও সহজ করে। তাই এখন থেকে ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” বলতে আমাদেরকে – NRC, CAA & NPR – এই তিনের কোন একটাকে না বুঝা তিনের সমন্বয়ে ‘পুরাটাই একটা’ এভাবে বুঝাই সঠিক হবে। তাই এখন থেকে ব্যাপারটাকে একসাথে “নাগরিকত্ব ইস্যু” লিখব।

অনেকের ধারণা, সম্প্রতিকালের “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” ভাল সাড়া ফেলা বিরোধী আন্দোলনের পর এখন বোহয় এর সমাপ্তি ঘটেছে। না, এমন মনে করা একেবারেই ভুল হবে। আর বাস্তবে এটা থেমেও যায়নি। বরং আসলে নতুন নতুন মাত্রা ও অভিমুখ নিয়েছে আর সেসব দিকে ছুটে চলেছে। আর এটা থেমে যেতে পারে যদি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কোন ঘোষণা আসে যে, পুরা ‘নাগরিকত্ব ইস্যুর’ সব কিছুই পরিত্যক্ত এবং আইনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হল। এর আগে নয়। যদিও ব্যাপারটা বিড়ালকে মাছ খাওয়া ছেড়ে দিতে বলার মত। বিজেপি তা করতে পারবে না, বাধ্য না হলে। কারণ, বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিই তো এটা যে, ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো, আর এর মাধ্যমে সাধারণভাবে সবাই নাগরিক বলে গণ্য না করা, বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক – সেটা নয়; বরং হিন্দুধর্মের লোকেরা শ্রেষ্ঠ এবং উপরে – এই হিন্দুত্ববাদের প্রচার তুঙ্গে তোলা যাতে এভাবে সমাজে ধর্মীয় পোলারাইজেশন ঘটে যায় আর তাতে হিন্দু ভোটে একা বিজেপির ভোটের বাক্সই ভরিয়ে তোলা যায়। কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যু নরেন্দ্র মোদীর সরকার কখনই ত্যাগ করতে চাইবে না, যদি না তাকে আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করা না যায়।

যদিও এটা ঠিক যে, স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের তীব্রতা সময়ে কমবে সময়ে তুঙ্গে উঠবে, কখনো সরকার পিছু হটবে, মিথ্যা বলবে আবার মোদী সরকার কিছু সুযোগ পেলেই দ্বিগুণ বেগে ফিরে আসবে – অনুমান করা যায় সাধারণভাবে এটা এভাবেই চলবে। আর তা চলবে অন্তত চলতি সরকারের স্বাভাবিক আয়ু, ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এমন হওয়ার অনেক কারণ আছে। এক নম্বর কারণ হল, বিজেপি সরকারের হাতে এ ছাড়া নিজের মুখরক্ষার আর কোনই ইস্যু নেই। অথচ ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থা খুব খারাপ আর তা দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে। ফলে এই দুর্দশা ঢাকতে উপযুক্ত ইস্যু দরকার। পেটের চিন্তা থেকে আম পাবলিকের মন সরানোর মত অন্য ব্যস্ততায় তাদের মাতিয়ে রাখার মত ইস্যু দরকার; যেটা গত ২০১৬ থেকেই মোদী করে আসছে। এ ছাড়া আরও বড় বিষয় হল, সরকারের বাকি চার বছরের আয়ুতে প্রতি বছরই গড়ে চার-পাঁচটা করে রাজ্য নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। সেখানে বলার মত নির্বাচনী ইস্যু পেতে হবে এমন জোশ তুলতে পারতে হবে সরকারকে।

এমন অনেক কিছুর মধ্যে আগামী বছর (২০২১) দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন আছে – পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম রাজ্যে। এ দুটোতে কী হবে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে; তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির (অমিত শাহ্ বলেছেন দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতবে) হার হলে, তা ‘নাগরিকত্ব ইস্যু’ নিয়ে এর পরে বিজেপির কোনদিন কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শামিল হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আসামের আগে হবার কথা। আর পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম দু’রাজ্যেই হেরে গেলে ভারতে খোদ হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বিপন্ন হয়ে যাবে। “মুসলমানবিদ্বেষী জিগির তুলে বিজেপির ভোট বাক্সে হিন্দু পোলারাইজেশন” – এই ফর্মুলা চিরতরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই এদুই রাজ্যে হারলে মোদী সরকারের সব হিন্দুত্ব-বয়ানেরই নৈতিক [moral] পরাজয় ঘটে যাবে। হিন্দুত্ববাদ-ভিত্তিক কোন বয়ান অনুসারে ব্যাখ্যা বক্তব্য নিয়ে পাবলিকের কাছে গেলেই মানুষের “দূর দূর” করা শুরু হতে পারে।  ফলে বাকি তিন বছর ক্ষমতায় থাকা তখন দুঃসহ হয়ে উঠতে পারে। অতএব, বিশেষ করে এ’দুই রাজ্যে অন্তত রাজ্য নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব ইস্যু থাকবে প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ইস্যু হয়ে।

ইতোমধ্যে, অমিত শাহ আরেক ধাপ পিছু হটে নিজ মুখেই “এনআরসি ‘এখন’ নয়” – বলেই পিঠটান দিয়েছেন। এনিয়ে দৈনিক আনন্দবাজারের এক শিরোনাম হল, “এনআরসি নয় ‘এখন’, শাহের কথায় ফের ধন্দ”। মানে হল, মিডিয়াগুলো এখন মোদী-অমিতের কোনো কথাকেই আর বিশ্বাস না করার লাইন নিয়েছে তাই এদের কোন কথাকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না। মিডিয়া তাই পাবলিকের মনের সাথে মিল রাখতে  প্রতিদিন ও সবসময় সন্দেহ করছে আর খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে চলেছে। কেন? কারণ, ভারতের এখনকার “পপুলার পাবলিক মুডটা এ রকম”- আসলে সেই ইঙ্গিতই তুলে ধরছে মিডিয়াগুলো। ভারতের রাজনীতিতে সহসা এমন ক্ষিপ্ত মুড তৈরি হতে দেখা যায় না। বরং প্রত্যেক পঞ্চম বছরে, মানে কেন্দ্রের নির্বাচনের বছর ছাড়া অন্য বছরগুলোতে বড় মিছিল-মিটিং আয়োজন করে দলগুলো পয়সা খরচ করতে চায় না, তেমন কোনো ফল এতে নেই বা হবে না মনে করে বলে। কিন্তু ব্যতিক্রমে এমন ক্ষিপ্ত মুড কখনও  তৈরি হয়ে গেলে মিডিয়ায় রিপোর্ট লেখার সময় সেই পাবলিক মুডের সাথে তাল না মিলিয়ে লিখলে পত্রিকাই বাজার হারানোর রিস্কে পড়ে যাবে। আনন্দবাজারসহ  এখনকার সব মিডিয়া রিপোর্ট তাই এই মুডে লেখা। এক কথায়, বিজেপির বয়ানের প্রতি কোনো সহানুভূতি প্রকাশ করে ফেলা মিডিয়াগুলোর জন্য রিস্কি হয়ে গেছে। তবে অবশ্যই সেটা ‘টাইমস নাউ’ বা ‘রিপাবলিক’ ইত্যাদি বিজেপি ঘরানার দলীয় মিডিয়াগুলো বাদে।

উত্তরপ্রদেশ বাসা থেকে সোনাদানা লুট শুরু হয়েছে
নাগরিকত্ব ইস্যুতে এখন আরেক তোলপাড় চলছে উত্তরপ্রদেশে। মোট ২৩ কোটি জনসংখ্যার বিরাট রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুসলমান প্রায় ২০ শতাংশ। এবারের নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে প্রাণহানিতে সারা ভারতে মোট মৃতের সরকারি সংখ্যা ২৫ জন, যার ১৭ জনই এই প্রদেশের। আন্দোলনের মুখে রাজ্যসরকার পিছু হটেছিল, আর এখন ঘোষণা দিয়ে প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। এই রাজ্যের একটা আইন ছিল, কোনো আন্দোলনে সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে রাজ্য সরকার এর জন্য  – দায়ী কে, তা সুনির্দিষ্ট চিহ্নিত করে, তাঁর থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে। কিন্তু পরে আবার রিট হওয়াতে সেবার হাইকোর্ট আরও স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, রাজ্য সরকার নয়, হাইকোর্টে প্রমাণ সাপেক্ষে তা কোর্ট আদায় করে দিবে। অর্থাৎ হাইকোর্টের মাধ্যমে রাজ্য সরকার তা আদায় করতে পারবে; নিজেই সরাসরি কাউকে দায়ী করে নয়। সোজা কথায় নির্বাহী ক্ষমতা নিজের মত করে কিংবা আদালতে প্রমাণ হওয়া ছাড়া নিজেই নয়। অথচ উত্তরপ্রদেশ রাজ্য-পুলিশ এখন হাইকোর্টের মামলা করা অথবা রায়ে তা প্রমাণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বেছে বেছে বেশির ভাগ মুসলমান নাগরিকের বাড়িতে প্রবেশ করে হয়রানি ও লুটপাট করে চলেছে- একেবারে সোনাদানা নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। বিবিসি সরেজমিন রিপোর্ট করেছে এ নিয়ে। যার শিরোনাম – “যোগী অদিত্যনাথের ‘বদলা’: বাড়ি বাড়ি সম্পত্তি ক্রোকের নোটিস”।
তাই বলা যায় এক ‘খাঁটি প্রতিশোধ’ আদায়ের পালা চলছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে।

ভারতের বিদেশী কূটনীতিক
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট ছেপেছে। ভারতে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকেরা নাগরিকত্ব ইস্যুতে মোদী সরকারকে কেমনভাবে দেখছেন, এই হল ওর বিষয়। এ নিয়ে তিন মহাদেশেরই প্রায় ১৬ জন কূটনীতিকের সাথে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিপোর্টার। এর শিরোনাম, “দ্রুত বন্ধু হারাচ্ছে ভারত : সিএএ কেউ সমর্থন করছে না, বিদেশী কূটনীতিকদের হুঁশিয়ারি” [No outreach on CAA, foreign diplomats warn: India fast losing friends]। সেখানে এক কূটনীতিকের মন্তব্য খুবই প্রতিনিধিত্বমূলক। ভারতে তিন বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন, এমন সেই কূটনীতিক বলেছেন, “মোদী পুনর্র্নিবাচিত হয়ে এসেছিলেন বলে নিজের স্বপক্ষে যে একটা ‘ফিল-গুড’ বা ‘স্বস্তির-ইমেজ’ [“feel-good” factor ]  তৈরি করতে পেরেছিলেন এত দিন, তার পুরোটাই এখন চলে গেছে” [“feel-good” factor about the re-elected government has “vanished”. ]।

তবে তাঁরা মূলত সবচেয়ে অখুশি এ জন্য যে, নাগরিকত্ব ইস্যু বা এর সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী আন্দোলন কিংবা জনবিভক্তিতে ক্ষোভ ইত্যাদি – এসব নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার আজও কোন কূটনৈতিক ব্রিফিং বা সরকারি ভাষ্য প্রদান করেননি। না, কূটনীতিকদের এই আকাঙ্খা এটা অনধিকার নয় বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়া নয়। কারণ, ইতোমধ্যে মোদী সরকার এ ধরনের কাজকে এর আগেি নিজের সরকারের জন্য রুটিন করে ফেলেছেন। যেমন- ‘পুলওয়ামা-বালাকোট হামলা’র পর, আগস্ট থেকে অক্টোবরে কাশ্মির নিয়ে সিদ্ধান্তের পর এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের ‘অযোধ্যা মামলা’র রায়ের পরও তারা কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছিলেন অথচ এখন নাগরিকত্ব ইস্যুতে চুপ- এ কারণে এবার তারা খুব অবাক হয়েছেন, [They recalled that through 2019, the Ministry of External Affairs (MEA) held several briefings, mostly after Pulwama-Balakot in February-March, followed by Kashmir from August to October — and, to their surprise, even once on the Supreme Court’s Ayodhya verdict.]।

ওদিকে সবচেয়ে বড় কথাটা হল, বিদেশী মিডিয়াতে যেভাবে বিক্ষোভ ও সরকারের সাঁড়াশি অভিযানের ছবি ও প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, তা ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর ভারতের পক্ষে দাঁড়ানোটাকে কঠিন করে তুলেছে। কারণ ওইসব দেশের অনেকেই ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ মানে নাগরিক অধিকার এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যহীনতা রক্ষা করে চলার প্রতিশ্রুতি, যা যেকোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র করে থাকে, তা ভারতে কোথায় গেল সেই প্রশ্ন তুলছেন তারা, [“With each passing day, the government’s position is getting weakened, as these images are not going away. And the action against the protesters and the latest reports of torture and intimidation are giving more credence to the view that the government is intolerant of criticism and dissent,”……. “It doesn’t speak well of the world’s largest democracy,” a diplomat from a G-20 country said”…….The State Department spokesperson had earlier urged India to “protect the rights of its religious minorities” in keeping with its “Constitution and democratic values”.

আসলে, এটা হল হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির মৌলিক সঙ্কট, যেকোন অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এ জন্য এমন মতবাদ অগ্রহণযোগ্য। সোজা কথাটা হল, বিজেপি অথবা আরএসএসের রাজনৈতিক চিন্তায় ‘নাগরিক অধিকার’ বলে কোন ধারণা নেই। কেবল ‘হিন্দু-জাতি’ আছে; নাগরিক বলে কোনো কিছু নেই। খাঁটি হিন্দুরা কেবল কথিত অলীক কোন হিন্দু-জাতির স্বার্থ দেখবেন, এ ধারণা আছে। দরকার হলে এ জন্য তারা অপর অন্যের মাথা ফাটিয়ে দেবেন। সেকারণে তাদের মনে হয়, ‘নাগরিক’ অথবা ‘অধিকার’ এসব শব্দ আবার কী?

দুনিয়া যতদুর পরিক্রম করে পেরিয়ে যে জায়গায় এসেছে তাতে আমরা পছন্দ করি আর নাই করি একালে গ্লোবাল সমাজের মৌলিক ভিত্তি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি। এমনকি তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ রাষ্ট্রও অন্তত মুখে এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে তা বলবার সুযোগ নাই। এবং তা বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে মানে। তাই এককথায় বললে ভারতের আজকের অবস্থা হল আন্তর্জাতিক জগতে সে একঘরে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। এ’কথারই প্রতিধ্বনি দেখা গিয়েছে আগের কংগ্রেস আমলের প্রাক্তন সেই সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের মুখে। তিনি বলছেন, আমাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে “শত্রুপক্ষকে আমরা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছি’।  “দেশের বাইরে থেকে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের তালিকা সত্যিকার অর্থেই দীর্ঘ। প্রেসিডেন্ট মখাঁ (ফ্রান্স) ও চ্যান্সেলর মার্কেল (জর্মানি) থেকে নিয়ে ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস এবং নরওয়ের রাজার মত ব্যক্তিরাও এর সমালোচনা করেছেন, যারা সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে ভদ্র অবস্থানে থাকেন”।

তবুও হয়ত ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা”- রাষ্ট্রের এই অভিন্ন প্রতিশ্রুতি (বা মূল্যবোধ) দেয়া বা রক্ষার কথা বিজেপি বা আরএসএস নিজে মানুক না মানুক তাদের দিয়ে মুখে স্বীকার করানো যেত, যদি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন ও কঠোর হতেন। কিন্তু মনে হয়, সে আশাই আর নেই। কারণ, ও দুই অফিসের নীতি হল, মোদির নির্বাহী ক্ষমতা আগ্রাসী হয়ে ধেয়ে এলেই তারা সবাই গুটিয়ে সরে যাবে। নাগরিককে সুরক্ষা দিতে কিংবা নাগরিককে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা ও প্রতিকার দিতে গেলে নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে- এমন পরিস্থিতির উদয় হলেই কোর্ট বা কমিশন এরা পাশ কাটাতে শুরু করবেন। কখনো পাশ কাটাতে তারা বছরওয়ারি শুনানির সময়ও ফেলতে থাকেন। যেমন, উত্তরপ্রদেশে রাজ্য সরকারের যেখানে এখতিয়ারই নেই সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায়ের, তা সত্ত্বেও নাগরিককে সীমাহীন হয়রানি করে চলছে, ঘোষিতভাবেই ‘প্রতিশোধ’ নেয়া হচ্ছে।

বিজেপি নেতা অমিত শাহের কঠোর সমালোচনা শুরু হওয়াতে দল থেকেই তাঁকে কিছু দিন চুপ থাকতে বলা হয়েছিল। ছিলেনও। কিন্তু আবারো তিনি সরব হয়েছেন। এবার পশ্চিমবঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে তিনি বলছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে (২০২১) ক্ষমতায় আসবে নাকি বিজেপি। এমনকি মমতার সাথে যদি কংগ্রেস ও বামফ্রন্টও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে তবুও এই ফল হবে। এতে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, নাগরিকত্ব ইস্যু যখন তৈরি ও হাজির ছিল না, তখন অমিত এমন বললে মমতা ছাড়া অন্যরা (মানে কলকাতার কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট) কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া শ্রেয় মনে করে এসেছে আমরা দেখেছি। কিন্তু এবার বিরোধীরা সবাই অমিতের মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অর্থাৎ গত বছরের (২০১৯) কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষুব্ধ সিপিএম যেমন মমতাকে হারিয়ে দিতে বেনামে অঘোষিতভাবে বিজেপির পক্ষে কাজ করেছিল এবার আর সে অবস্থা নেই, তা বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিজেপির অবস্থা আর তেমন ভালো নেই- এটা অমিত শাহেরই স্বীকারোক্তি। যেমন অমিত বলছেন, এনআরসি নয় ‘এখন’; মানে তার দল কলকাতার নির্বাচনে ব্যাকফুটে। হয়ত, এনআরসির কথা আর ভোটের আগে বিজেপি তুলে ধরবে না, এ ব্যাপারে পিছিয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ক্ষেপে গেছে, তা অমিত শাহ এভাবে পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের লোক কেমন ক্ষেপে থাকতে পারে, এর এক নমুনার সরেজমিন রিপোর্ট আছে আনন্দবাজারে – আধারের জন্য সারা রাত লাইনে ১১ হাজার।  [এখানে “আধার” মানে AADHAAR – এটা আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের মতন সমতুল্য ডকুমেন্ট। ] আর ওদিকে, আমাদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তের অপর পারে নদীয়া জেলা (ব্রিটিশ আমলে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার এক মহকুমা ছিল), এখনকার নদীয়ার এমন আরেক মহকুমা হল তেহট্ট – এই হল ঘটনাস্থল। সেখানকার একটা ঘটনা হল এই তীব্র শীতে বৃষ্টির রাতে আধার কার্ড সংশোধনের জন্য সারা রাত ১১ হাজার লোক লাইন দিয়ে বসেছিলেন। লোকের মনে আতঙ্ক যে, কার্ড না থাকলে যদি নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারার অপরাধে ভারত থেকে বের করে দেয়া বা ক্যাম্পে ফেলে রাখা হয়! নাগরিকত্ব ইস্যু হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার মনে কী পরিমাণ আতঙ্ক জন্ম দিয়েছে, এর জলজ্যান্ত প্রমাণ এই ১১ হাজার লোকের লাইন। এই লোকগুলো অথবা যারা এদের দুর্দশা দেখছেন, তারা কেউ বিজেপিকে কি আগামীতে ভোট দিবে মনে হয়?  তবে মনে হচ্ছে না অমিত শাহ এই সাধারণ মানুষগুলোর আতঙ্ক আর অমানুষিক কষ্টের দিকটা দেখতে পাচ্ছেন। বুঝা যাচ্ছে মোদী-অমিতেরা নিজের ভোটবাক্সে হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে আদায় ছাড়া আর কোন দিকেই তাদের হুশ নাই, এমনই নিষ্ঠুর অমানুষের চিন্তায় পৌছে গেছে তারা।

তাহলে এখন অমিত শাহ এত বিরাট দাবি করে বললেন, তারা জিতবেনই- এই দাবির মাজেজা কী?
ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় মোদীর কোনও কারচুপির মেকানিজম আছে এমন অনুমান ও অভিযোগ অনেকের। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মমতা এবং উত্তরপ্রদেশের মায়াবতীর সবচেয়ে বেশি। এটা কি সেই ইঙ্গিত যে, অমিত শাহের এখন শেষ ভরসা সেখানে? এই প্রশ্ন দানা বাঁধছে। মমতা ইতোমধ্যে ভোটব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের উভয় সংসদে নোটিশ দিয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার আছেন; তিনি গত নির্বাচনে মোদির নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের জন্য ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন বলে পরে তার পরিবারের সদস্য সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই (আমাদের দুদকের সমতুল্য তবে তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। ) লেলিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠে আছে। মোট কথা, অমিত শাহের দাবি অস্বাভাবিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ০৪ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক ও নাগরিকত্ব ইস্যু এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

গৌতম দাস

৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Qz

_

চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

গৌতম দাস

২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2PW

Modi-Amit from swarajyamag.com

নেক হয়েছে। এই অঞ্চলকে অনেকদূর বেপথে নিয়েছেন। এবার মোদী-অমিত, আপনাদের হার শুরু। আপনাদের হারের  চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠতে শুরু করেছে! আপনি পেছন ফিরে পালাতে চাচ্ছেন, নরেন্দ্র মোদী! মোদি-অমিতের সেই পিছু হটে পালানোর চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠছে, মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেয়া শুরু করেছে। আপনারা হার মানছেন এমন সব চিহ্ন ফুটে উঠছে। বুঝব কিভাবে?

চিহ্ন একঃ মোদী-অমিতের সরকার এবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসে.) সকালে অনেকগুলো উর্দু ও হিন্দি পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপানো হয়েছে – শিরোনামে “গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে” (“rumours and incorrect information being spread”.) । কিন্তু কোনটা গুজব আর অসত্য? বলতে পারছে না।  দাবি করছে যে, ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে – এমন কোন সরকারি ঘোষণা নাকি এখনও দেয়া হয়নি।  এই ডিটেইলটা ছাপা হয়েছে  ভারতের ইংরাজি ওয়েব পত্রিকা scroll.in. লিখেছে, [On Thursday morning, the Modi government put out advertisements in multiple Hindi and Urdu papers alerting people about “rumours and incorrect information being spread”.]

এতে মিডিয়াজুড়ে তোলপাড়ে প্রায় প্রত্যেক মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে, আগে কবে কোথায় অমিত শাহ ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেসবের রেফারেন্স প্রমাণ তুলে এনে রিপোর্ট ছাপানো শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বরাত দেয়া হয়েছে অমিত শাহের নিজের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে করা টুইটকে। সেখানে বলা হয়েছিল, “ভারতজুড়ে এনআরসি আমরা নিশ্চিত করব”।
এরপরও ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আবার অমিত শাহরা আরও বড় করে নিজেদের বেইজ্জতি ডেকে আনতে তাঁরা এবার সেই পুরান ১১ এপ্রিলের টুইটই মুছে ফেলেছে। আসলে বিরাট এক কেলেঙ্কারির অবস্থায় এখন বিজেপি। আনন্দবাজার থেকে টুকে আনা সেই টুইটটা [নিচে স্কান কপি দেখেন] ছিল এরকমঃ “We will ensure implementation of NRC in the entire country. We will remove every single infiltrator from the country, except Buddha, Hindu and Sikhs: @Amitshah #NaMoForNewIndia

চিহ্ন দুইঃ মমতার তৃণমূল কংগ্রেস দলের হয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতা হিসাবে সংসদে দলের স্বার্থে লিড ভুমিকা নেন আর ইস্যুগুলো দেখাশোনা করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক ও ব্রায়েন। তিনি টুইট করে লিখেছেন, “বিজেপির আইটি সেল টুইট মুছে দিতেই পারে। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সব রাজ্যে এনআরসি হবেই। তা মুছতে পারবে না ওরা”। কথা সত্য, সংসদের রেকর্ড মুছবার ক্ষমতা কোনো একটা দলের নেই।

উপরের এই টুইট-টাই এখন মুছে দেয়া হয়েছে যা ছিল গত ১১ এপ্রিলে লেখা।   আর প্রায় কাছাকাছি একই ভাষ্যের ২২ এপ্রিল লেখা অমিতের আর এক টুইট  এর কপি বরাত দিয়ে  স্ক্রোল [scroll.in] পত্রিকা দেখাচ্ছে সেখানেও অমিত শাহ সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করার কথা বলছেন। যেমন নিচে  দেখেন তা হল,
First, we will bring Citizenship Amendment Bill and will give citizenship to the Hindu, Buddhist, Sikh, Jain and Christian refugees, the religious minorities from the neighboring nations.
Then, we will implement NRC to flush out the infiltrators from our country.

এছাড়া গত অক্টোবরের ১ তারিখে কলকাতায় বক্তৃতা দিতে এসে অমিত শাহ বলেছিলেন, সারা ভারতে এনআরসি করে খুঁজে খুঁজে কিভাবে তেলাপোকা উইপোকা অনুপ্রবেশকারী (মুসলমান) মেরে তিনি  তাড়িয়ে দিবেন। সেই বর্ণনা দিয়ে ভোটার উত্তেজিত করার সহজ পথ নিয়েছিলেন। আজ মিডিয়াগুলো সেই রেফারেন্সটাই বের করে সরকারকে আরও বেইজ্জতি করেছে।

তাহলে এত জায়গায় রেফারেন্স থাকা সত্ত্বেও এবং এমন রেফারেন্স যা লুকানো বা মুছে ফেললেও, তা জানাজানি হয়ে যাবে – এসব জানা সত্ত্বেও মোদী-অমিতের সরকার এমন মিথ্যা কথা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে গেল কেন?

এর সোজা মানে হলে মোদী-অমিতেরা এমন বিপদের জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাদের হাতে কিছুই নাই। তাই “যদি লাইগা যায়” ধরণের কামকাজ শুরু করেছে – এমনই দশা।  খড় কুটো আঁকড়ে ধরছে।  বিশেষ করে এনআরসির সাথে নাগরিক বিলের কোন সম্পর্ক নাই একথা যদি পাবলিককে বিশ্বাস করাতে পারে আর তাতে যদি একথা মেনে নিয়ে রাস্তার আন্দোলন কিছু থিতু হয় এই হল অমিতদের শেষ আশা।
অর্থাৎ পাবলিক ঠান্ডা করার এর চেয়ে ভাল ও আস্থাবাচক কোনো বক্তব্য-হাতিয়ার বিজেপির কাছে নেই। আর এটাই মোদী-অমিতের হেরে যাবার সবচেয়ে বড় চিহ্ন। মোদি-অমিত এতই ফেঁসে গেছেন যে, এর চেয়ে ভাল বা বেশি বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য তাদের হাতে নেই। এ ছাড়া সরাসরি মিথ্যা বলা বা প্রপাগান্ডা করে সদর্পে মিথ্যা বলার দিকে বিজেপির ঝোঁক আগেও ছিল আমরা দেখেছি। তারা মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে অনেকদূর যাওয়া যায়, কেবল পাক্কা ব্যবহারকারি হতে হয়। যেমন সেই অর্থে ভারতের মুসলমানেরা বিজেপির আসলে কোনো শত্রু না, তা তারা জানে। বরং অ্যাসেট। কিভাবে? কারণ মুসলমানদের নামে ঘৃণা ছড়িয়েই তো কেবল হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে ঢুকাতে পারে! মুসলমানেরা না থাকলে সে কার ভয় দেখাত বা কার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াত। আর এটাই তো বিজেপির রাজনীতির কৌশল।

বোকা অমিতের স্ববিরোধী দাবি
সবাই জানি বিজেপির চোখে আমরা মুসলমানেরা সব উইপোকা তেলাপোকা, তুচ্ছকিট; তাই সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করে মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দিবে। বিশেষ করে কেন তাড়িয়ে দিবে? কারণ নাকি মুসলমানেরা স্থানীয়দের কাজ বা চাকরি সুযোগ নিয়ে নিচ্ছি। তা ভাল, কী আর বলা। এনআরসির সপক্ষে আপাত চোখে যুক্তির বিচারে সবচেয়ে ভাল যুক্তির বক্তব্য মনে হয় এটাই।
কিন্তু অমিত শাহ আপনার কপাল খারাপ। কারণ আপনার দিল সাফ নাই। অনৈতিক ও অসততার উপর দাঁড়ানো আপনার কথা। তাই আজ না হলে কাল আপনি ধরা পড়ে যাবেন। এবং গেলেন। কীভাবে?
আপনি এখন বলছেন বাংলাদেশসহ আরও তিন দেশ থেকে মূলত হিন্দুদের নিয়ে এসে আপনি ভারতের নাগরিকত্ব দিবেন এজন্য নতুন বিল এনেছেন। যদিও ঐ তিন দেশ থেকে কোন মুসলমান আসলে এই সুবিধা আপনি তাদের দিবেন না। মুসলমানবিদ্বেষী আপনি আমরা জানি তাই এনিয়ে এখানে কোন কথাই তুললাম না।
কিন্তু লক্ষ্য করেন আপনাদের দাবি হল কেউ মুসলমান হলেই সে ভারতের বাইরের লোক, আর এবার দাবি করতে থাকা যে এরা ভারতের বাসিন্দাদের চাকরি বা কাজ নিয়ে নিচ্ছে বলে আপনারা এনআরসি করছেন তাদের তেলাপোকার মত তাদের ভাগাবেন বলে তোলপাড় করে তুলছেন। তাহলে আবার বাংলাদেশসহ তিন দেশ থেকে সেখানকার হিন্দুদের নিতে চাইছেন কেন? হিন্দুরা কী ভারতে গিয়ে মূলত হিন্দুদের কাজ চাকরিতে ভাগ বসাবে না? তাহলে এনআরসিতে লোক খেদানো আবার নাগরিকত্ব বিলে লোক আমদানি এদুইয়ের রহস্য কী বা এই স্ববিরোধীতা কেন? তাহলে অন্তুত এতটুকু সৎ হয়ে বলেন যে “বিদেশিরা কাজ-চাকরি নিয়ে নিচ্ছে” একথা সত্য না। সত্যিই, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক মাহাত্ব সাংঘাতিক!

আসলে এখনকার ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপির ভিতরের মূল্যায়ন হল, একটু কৌশলে ভুল হয়ে গেছে, সেটা সংশোধন করে নিতে পারলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ভুলটা হল, সারা ভারতে এনআরসি করার কথা আগে না বলে আগে কেবল নাগরিকত্ব সংশোধিত বিল পাস করে নিতে হত, বিজেপিকে। এতে মুসলমান বাদে সব ধর্মের বললেও মূলত অন্যদেশের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে নিলে এরপরেই কেবল সারা ভারতে এনআরসি করার কথা তুলতে হত। তাহলে আজ যেভাবে ভারতের শহরের পর শহর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে উত্থাল হয়ে উঠছে সব উপড়ে ফেলতে শুরু করেছে, সেটা নাকি হত না। এই হল তাদের মুল্যায়ন। কিন্তু  এটা অবশ্যই তাদের মন-সান্ত্বনা!
বাস্তবতা অনেক গভীরে চলে গেছে, যার খবর আর বিজেপি নিতে পারবে না। কেন? ভারতের সাধারণ মানুষই বা মোদী-অমিতের উপর এত খেপে গেল কেন?

সমাজতন্ত্র নিয়ে আমরা জানি অথবা আমাদের অনেক প্রত্যক্ষ আছে। এর গালগল্প শুনিয়ে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে একেবারে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ হয়েছিল এর সবচেয়ে ভুক্তভোগী, কষ্টভোগী এবং ভিকটিমও বলা চলে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে বললে, উনিশশ ষাট সালের মধ্যেই যাদের জন্ম বা চুয়াত্তর সালের মধ্যেই যাদের টিনএজে প্রবেশ ঘটেছিল এদের সরাসরি সচেতন অভিজ্ঞতা আছে কিছু শব্দের যেমন রেশন, টিসিবি, আর কিছু স্মৃতি – ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের হাহাকার। এক পিস সাধারণ লাইফবয়  সাবান কিনতে পারার জন্য কয়েক ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। আর তাতে রেশন, লাইনে দাঁড়ানো আর সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল প্রায় সমার্থক শব্দ। আর মানুষের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে হতাশ করে ফেলার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর হয় না।  মানুষ ভাত জোগাড়ের চেষ্টা করবে না লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে? জীবনের উদ্দেশ্যই বা আসলে কী? কোন কিছুর সদুত্তর কারও জানা ছিল না।
সৌভাগ্যবশত মোটামুটি পঁয়ষট্টি সালের পরে যাদের জন্ম এরা টিনএজে এসে এদের আর রেশন, লাইন দেখতে হয়নি। জিয়ার আমল প্রায় শেষ করে এসে এটা আস্তে আস্তে এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এতে অন্তত  রাষ্ট্র  পরিচালনাকারি সরকার আর সাথে গরিব জনগণও সবারই বুঝাবুঝিতে আক্কেল হয়ে যায় যে রেশন-সমাজতন্ত্রে দেশ চালানো কী জিনিস! আর একালে এসে ট্রাকে করে চালবিক্রির চাল কেনাতে মানুষ উৎসাহী হয় তখনই যখন এতে যে পরিমাণ পয়সা বাঁচে তা অতিরিক্ত সময় ব্যায়ের তুলনায় লাভজনক বিবেচিত হয়, কেবল তখন। আসলে সেকালে পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকত যাদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে অফুরন্ত সময়ও সম্ভবত থাকত ফলে পোষাত; কিন্তু এমন দিন আর এখন সমাজের ভিতরেই তেমন নেই। কিন্তু লক্ষ করা গেছে যে, কোনকালের নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই কষ্টের দিকটা আমল করেছেন, গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন – না, কোনোকালেই এমনটা দেখা যায় নাই।
বরং দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে ভারতের মোদীর সরকার সবচেয়ে গোঁয়াড় আর দানব। একালে এই ২০১৬ সালে নোট বাতিলের ঘটনাটাকেই দেখেন। এই নোট বাতিলকে কেন্দ্র করে মোদী মানুষকে বাধ্য করেছিল – কাজকাম ধান্ধা ফেলে সকলে ছুটেছিল নোট বদলাবার জন্য ব্যাংকে লাইন ধরতে। মানুষের মুল ওয়ার্কিং আওয়ার নষ্ট করে দেয়া মানেই গরীব মানুষের সরাসরি আয়-ইনকামে ক্ষতি করে দেয়া। অথচ এই ক্ষতিটাই অবলীলায় করা হয়েছে। বিশেষ করে গরিব-মেহনতি মানুষের যে আয়ে ক্ষতি এর কোনোই ক্ষতিপূরণ নিয়ে কারও কোন বিকার নাই – ব্যাপারটা মোদী বা তাঁর নীতিনির্ধারকদের আমলেই নেই। অথচ কথাটা হল, সরকার যা দিতে পারে না, মুরোদ নেই, তা সরকার অন্তত কেড়েও নিতে পারে না। যোগ্যতা থাকতে পারে না। চাকরি বা আয়ের সুযোগ দেয়ার কথা সরকারের। তা না দিতে পারলে অন্তত আয়ের সুযোগ কেড়ে নেয়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাজ হতে পারে না। অথচ মোদীর সরকার-প্রশাসন এদিকটা আমল না করেই, কোন বিকল্প বা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা না করেই  নোট বাতিলের পথে গেছিল।
আর ঠিক একই সেই জিনিস ঘটিয়েছে  আসামের প্রশাসন ও মোদী । এনআরসির নামে দীর্ঘ ছয় বছর (২০১৩-১৯) ধরে মানুষকে প্রায়শই তাদের জীবন লাইনে দাঁড় করিয়ে পার করেছে। এখনও যা শেষ হয় নাই, সমাধান নাই। আর এর চেয়েও বেশি কষ্টকর অমানবিক অবস্থায় ফেলেছে ডকুমেন্ট জোগাড়ের ছোটাছুটি আর মানসিক অনিশ্চয়তা – যদি তালিকায় নাম না উঠে? একে তো গরিব মানুষ ভাত জোগাড়ে সব সময় হিমশিম খায়, সেখানে তাঁদের কোনমতে বেচে থাকা জীবনে এর চেয়েও প্রধান শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তালিকায় নাম ঊঠানো বা, নাগরিকত্ব হাসিল করা!  ভাতের অভাবের চেয়ে এ’এক কঠিনতর শাস্তি! অথচ যে এই শাস্তির আয়োজক সে একেবারেই নির্বিকার!

সারকথাটা হল, এনআরসির বেলাতেও এরা গরিব মেহনতিদের কষ্ট  – দিনভর লাইনে দাঁড়ানো, অনিশ্চয়তা, ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ভয় ও শঙ্কা, আয়-ইনকাম বন্ধ ইত্যাদি কোন কিছুর দিকটাই নীতিনির্ধারকরা আমল করেনি। বরং বিজেপির ভোটের বাক্সে হিন্দুভোট পোলারাইজেশন ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। তাই নির্বিকার লক্ষ্য।

তাহলে কেন এবার সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বিলের পক্ষে থাকবে? কেন এর ভেতর দিয়ে প্রতিবাদের সুযোগ পেলে সেটাকে প্রবলে সে কাজে লাগাবে না? মোদী-অমিত তাঁদের সীমাহীন কষ্টের দিকটা দেখেননি, দলের স্বার্থ আর ভোট ও ক্ষমতার লালসায়  সবকিছুকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে গেছে।  আজকে পাবলিক মোদী-অমিতকে উপেক্ষা করার একটু সুযোগ দেখেছে। সেটা তুলে নিয়ে কাজে লাগাবে না কেন? এটাই তো সব দানব সিদ্ধান্তগুলো উপড়ে ফেলার ভাল সুযোগ!
আবার এতদিন সবকিছুতে সর্বক্ষণ হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা হয়েছে। সেটা গরীব মানুষকে ভাল না লাগলেও খারাপ লাগেনি হয়ত, তাই পাশ কাটিয়ে থাকা শ্রেয় ভেবেছে। হয়ত ভেবেছে এটা আমার কী, এটা কেবল মুসলমানের সমস্যা হয়ত। কিন্তু এবার আসামের এনআরসিতে? এবার এতদিনে সকলেই বুঝে গেছে ব্যাপারটা স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে আরামে বসে বসে কেবল মুসলমানের কষ্ট দেখার ব্যাপার নয়। বরং ব্যাপারটা সবারই। ডকুমেন্ট, আধার কার্ড [AADHAAR card, আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সমতুল্য] ইত্যাদি জোগাড়ের অসম্ভব ছোটাছুটির অনিশ্চয়তা। আবার ভারতের আধার কার্ড মানে এই ন্যাশনাল আইডি দেয়া ও দেখাশুনা করা হয় তাদের পোস্ট-অফিসগুলো থেকে। ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব বা এনআরসির ক্যাচালে সবাই ছুটছে পোস্ট-অফিসে অথচ, পোস্ট অফিসে সেজন্য মোদী-অমিতেরা স্টাফ বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করেনি, হয়নি। হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে আনার কাজের বাইরে অন্য কোন দিকে মনোযোগ দিবার সময় কই তাদের? এনিয়ে আনন্দবাজার একটা ভাল বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন এখানে। লিখেছে, প্রায় সকলেই জানিয়েছেন, এনআরসি-র ভয়েই আধার কার্ড ঠিক করার জন্য লোকজন মরিয়া। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কারও তারিখ দু-তিন মাস পরে, কারও আবার বছরখানেক পরে। অর্থাৎ অমিত শাহের নিজনিজ ভোটের বাক্সের স্বার্থে মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ও ভোগান্তিতে ফেলছে অথচ স্টাফ বাড়ানো, কাজটা সহজ করতে বাড়তি স্টাফ দেয়ার আগ্রহ তাদের নেই। ব্যাপারটা তাঁদের মনোযোগের ভিতরেই আসে নাই। তাহলে কেন সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেলে তা উপড়ে ফেলে দিতে চাইবে না? এছাড়া এতদিতে তাঁরা বুঝে গেছে বিজেপির হিন্দুত্ব জিনিষটা এত মিঠা না!

সার কথায় বললে, পাবলিক পারসেপশন এখন আগের তুলনায় পরিপক্ব রূপ নিয়েছে মনে হচ্ছে।  একারণে, হিন্দুত্বের রুস্তমিতে হিন্দুগিরি বা হিন্দু-সুরসুরি তুললেই তা আর সমাজে তেমন কাজ করছে না সম্ভবত, ঢিলা দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থের দেনাপাওনার চোখ দিয়ে নাগরিকত্ব বা এনআরসি ইস্যুতে সরাসরি নিজের লাভক্ষতি দিতে বুঝতে চাচ্ছে মানুষ; বিশেষ করে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ।  আর এর সাথে এসে যোগ দিয়েছে  স্টুডেন্ট আর সাধারণ মানুষ। তাই তাঁরা নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেয়ে পুরা ষোল আনা কাজে লাগাচ্ছে, বলে মনে হচ্ছে। জীবন এমনিতেই প্রচন্ড ভারী, সেই ভারকে আর বাড়তি ভারী না করে নাগরিকত্ব বা এনআরসি থেকে মুক্ত করতে চাইছে সবাই!

অতএব প্রশ্নটা এনআরসির বাস্তবায়ন এটা মোদী-অমিতেরা  হিন্দুত্বের ক্ষমতার লালসায় নাগরিকত্ব বিলের আগে না পরে হবে সেটা তাদের কাছে এখানে কোনো ইস্যুই নয়। পাবলিক পারসেপশনের লেবেলে এর কোনো ফারাক নেই। বিজেপি সম্ভবত মুখরক্ষার জন্য এমন “সারা ভারতে এনআরসি বিজেপি চায়নি” বলে ক্ষিপ্ত পাবলিকের মনোযোগ সরানোর অজুহাত খুঁজছে। কিন্তু বিজেপির মুল সমস্যা হল মোদী-অমিতের উপর পাবলিক বিলা হয়ে গেছে। আস্থা হারিয়ে গেছে বা বিশ্বাস তুলে নিয়েছে মনে হচ্ছে। কাজেই এনআরসি না নাগরিকত্ব বিল কোনো ইস্যুতেই পাবলিক আর সরকারকে বিশ্বাস করছে না। যার সোজা মানে হল, মোদী-অমিতের বিজেপি সরকারকে – এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল – এদুটোকেই প্রত্যাহার  করা হয়েছে এই ঘোষণা করানোর দিকেই আগাচ্ছে।

বাংলাদেশের চলতি সরকারকেও বিজেপি বিক্রি করেছে
ইদানীং লক্ষণীয় যে, ভারতের মিডিয়া এবার প্রকাশ্যেই লিখছে বাংলাদেশের সরকার নাকি ‘খোলাখুলিভাবে কাজে ও বাক্যে বছর দশেক ধরে প্রো-ইন্ডিয়ান’ [Prime Minister Sheikh Hasina, who has been openly pro-India in word and deed since coming to power a decade ago]। কথাটা দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছে একজন এমন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ সরকারকেও অমিত শাহ অপব্যবহার করেছে তা বুঝাবার জন্য। কথা সত্য। অমিত শাহ ভারতের সংসদে  নতুন নাগরিকত্ব সংশোধিত বিলের পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য বাংলাদেশে সরকার হিন্দুদের ‘নির্যাতন করছে’, ‘সুরক্ষা করে নাই’  – এসব কথা সরাসরি বিলের ভাষায় অথবা সংসদে অমিত শাহের কথায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নাম সরাসরি বিলের ভাষায় পর্যন্ত উঠে এসেছে। সেটা আসায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করছে। তাহলে এর তথ্য ও প্রমাণাদি কই?   একথা খুবই সত্য যে অমিত শাহের নাগরিকত্ব বিল দাঁড়িয়ে আছে “বাংলাদেশ সরকারের হিন্দুদের উপর ধর্মীয় নির্যাতন করে চলেছে” একথা যদি নিশ্চিত ভাবে ধরে নেই একমাত্র তাহলেই।
অথচ কূটনৈতিক করণীয় অর্থের দিক থেকে বললে, এ নিয়ে আগে কোন আলোচনার এজেন্ডা সেট করা, কোনো আলাপ আলোচনা অথবা কোনো প্রমাণ পেশ ইত্যাদির কিছুই করা হয়নি। আবার বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করার বিনিময়েই এমন ভাষ্যের উপরের এই বল আনার যৌক্তিকতা ও সাফাই দাঁড়িয়ে আছে। আবার এটাই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে বিজেপির এর ফলাফলে হিন্দুভোট পোলারাইজেশনে বাক্স বোঝাইয়ের পরিকল্পনা ও উপায়। মানে হল ভারতের বিজেপি সরকার নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ সরকারকে বেঁচে দিয়ে একে নিজের ভোটের ক্ষমতা পোক্ত করার উপায় হিসেবে হাজির করেছে। এটা পানির মতই পরিস্কার।
আবার ওদিকে আসামের রাজ্য সরকার সেটাও বিজেপি দলের সরকার। আসাম সেই দেশ ভাগের সময় থেকে বাংলাদেশের কথিত  ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুসলমানদেরকে  তাঁদের সব দুঃখের জন্য দায়ী করে আসছে। তাঁরা নাকি স্থানীয়দের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে অসমীয়দের সমাজ-সংস্কৃতি সব ধবংস করে দিচ্ছে। অথচ এনআরসি তালিকাতে দেখা গেল তাদের এই অসমীয় পারসেপশন ভিত্তিহীন। ছিটেফোঁটাও সত্যি নয়। এনআরসিঢ় ফাইনাল তালিকা প্রকাশের পর এখন জানা যাচ্ছে  আসামের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার ১%-এর (প্রায় পাঁচ লাখ মাত্র) মত মুসলমান জনগোষ্ঠী তালিকায় নাম তুলতে পারেনি। অর্থাৎ একটা মিথ্যা পারসেপশনের উপরে তারা এখনো চলছে আর মুসলমানবিরোধী ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে।  [আমরা যেন না ভুলে যাই অরিজিনাল মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানোর শুরুকর্তা কিন্তু এই অসমীয়রা যারা তাদের মথ্যা পারসেপশন প্রমাণ করতে না পারলেও এখনও তা জারি রেখেছে। আর বিজেপি পরে এই দাবিটা কুড়িয়ে নিয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে রাজনীতি করছে।] আর এবার নাগরিকত্ব বিলের পরে অসমীয়দের ফোকাস গেছে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর যে, তারা এবার নাগরিকত্বের লোভে আসাম দৌড়াবে হয়ত। তবে এটা অবশ্যই মোদি-অমিত সরকারের ভোটবাক্স ভরবার ইস্যু। এই অর্থে  সেটা সত্যি সত্যিই ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু।
কিন্তু তামাসাটা হল,  বিজেপির এই আসাম সরকারকেই আবার বাংলাদেশ সরকার ফ্রিচার্জে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বের হতে ট্রানজিট আর বন্দর ব্যবহার সুবিধা দিতে যাচ্ছে। আসামের সরকার ও জনগণ কোন ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও সাফাইয়ের বলে এই সুবিধাগুলো নেবে? সম্প্রতি নাগরিক বিলবিরোধী জনঅসন্তোষ চলার সময় আসামে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর অফিসের সাইনবোর্ড ভাঙচুর ও গাড়িতে হামলা হয়েছে। এগুলো কী বিনা পয়সায় বাণিজ্যিক সুবিধা সহযোগিতা নিবার ও পাবার নমুনা?
আসলে বলাই বাহুল্য, অসমীয় জনগণ ও তাদের সরকার আসলে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়, কেমন সম্পর্ক চায় সেটা স্পষ্ট করে বলার হাই-টাইম চলে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ থেকে যেকোনো ট্রানজিটসহ, পোর্ট ফেসিলিটি ব্যবহার নিয়ে কোনো কথা শুরুর আগে ‘বাঙালি খেদাও’-এর ঘৃণাচর্চা নিয়ে তাদের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত নয় কী? যার প্রতি এত ঘৃণা তার কাছ থেকে কিছু নিবে্ন কেমন করে আর সে দিবেই-বা কেন, এমনকি আপনারা সঠিক চার্জ পুরাটা দিলেও দিবে কেন? সেও এক জেনুইন প্রশ্ন!

তাহলে মো্দী-অমিত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রমেই উইকেট পতন চলছে। আগামী সাত-দশ দিনে আর কয়টা রাজ্য বা শহরে আন্দোলনে প্রভাবিত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে- এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বলা হচ্ছে ইতোমধ্যে বড়ছোট মিলিয়ে ভারতের ২৮ রাজ্যের মধ্যে ১৬ রাজ্য আন্দোলন ছড়িয়েছে। অন্তু একবার সরকারবিরোধী মিছিল হয়েছে। এমনকি বিজেপি রাজ্য সরকারে আছে এমন রাজ্যেও তা হয়েছে।  অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যে বামেজর রাজ্যে বিক্ষুব্দ আন্দোলন হতে দেখলে সেক্ষেত্রে মোদী-অমিতের জন্য সেটা খুবই বিপদের কিছু হবে। কিন্তু সাবধান। কারণ বিশেষ করে মোদী-অমিতরা যত অসহায় হবেন ততই তাদের পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধাবার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। এছাড়া পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘাত বাধানোর সম্ভাবনাও বাড়বে। যেমন আমরা হাতে নাতে দেখেছিলাম নির্বাচনের আগে। এছাড়া সবার উপরে আমেরিকান জেনোসাইড ওয়াচের ভাষায়, ভারত ধাপে ধাপে সেদিকেই আগাচ্ছে, ‘ভারতে গণহত্যার প্রস্তুতি চলছে” – সেটা তো আছেই!’

শেষে বাড়তি কিছুঃ
এখানে একটা ছোট তথ্য ও রিপোর্টের খবর দিয়ে রাখি। আজ মানে ২২ ডিসেম্বর আনন্দবাজারের অগ্নি মিত্রের লেখা একটা রিপোর্ট আছে, শিরোনাম – “প্রিয়ঙ্কা নিয়েই ক্ষোভের শুরু ঢাকা-দিল্লিতে”। সেখানে সারকথাটা যা বলা হয়েছে তা হল, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর সাথে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা গত অক্টোবরে ভারত সফরের সময় দেখা  করা থেকেই মনোমালিন্য “ক্ষোভের” শুরু হয়েছিল। প্রথমত, এই রিপোর্টে যতটা অতিনাটকীয়তা আছে ততটাই সত্যতা নাই। আনন্দবাজারি রিপোর্ট অবশ্য এমনই ঝোঁকের সাধারণত হয়।  তবে গান্ধী পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা দেখাতে যাওয়াটা – ঠিক সেটা এখানে ইস্যু না। মূল ইস্যু বা শুরুর ইস্যু হল, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিজেপি-আরএসএস করুক বা সেদিকে ঝুকুক এব্যাপারে  ভারতের আরএসএস আমাদের সরকারের কাছে সহযোগিতা চাইলে অন্তত ২০১৮ সালে বা তারও  আগের কালে সরকার সম্মতি দিয়েছিল। কিছু কাজ ও প্রশ্রয় দেওয়া করেছিল। যার খেসারত হল প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছ পর্যন্ত গিয়ে অভিযোগ তোলা। গোবিন্দ প্রামাণিকের ঢাকায়  “আরএসএস” খুলে বসা, সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কথা বলা। রানা দাসগুপ্তের বেচাইন হয়ে খোদ মোদীর কাছে নালিশ পরে অস্বীকার ইত্যাদি। এছাড়া আগে থেকেই আবুল বারাকাতকে সরকারি তেল ঘি খাইয়ে পেলেপুষে তাঁর যে “ঐকিক নিয়মের বিশেষ পরিসংখ্যান” বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাই এখন বিজেপির পক্ষের অস্ত্র য়ার আমাদের বিরুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে হাজির হয়েছে। এসব কিছু বুঝতে বুঝতে হাসিনা সরকার বেশ কিছু ক্ষতি করে ফেললেও সবছিন্ন করে শেষমেশে শক্ত সিদ্ধান্তের কথাটা তিনি অক্টোবর সফরে পরিস্কার করে এসেছিলেন।
ঐ অক্টোবর সফরকালে তাই বলে বা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল হাসিনা সরকার আগে যা কথাই হোক সেখান থেকে এই বিষয়ে নো কমিট্মেন্টে” ফিরে যাচ্ছে। সরকার যে একথা বুঝিয়ে দিয়েছিল এর দুটা চিহ্ন আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই।  এক. শাহরিয়ার কবিরের কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকা সাক্ষাতকারে সে ইঙ্গিত রেখেছেন। [এনিয়ে সেকালে আমার লেখাটার লিংক এখানে। ] তার দাবি করে বলা  -বাংলাদেশে আরএসএস বলে কিছু নাই, “তাদের কোন ততপরতা নাই” ইত্যাদি – সে প্রমাণ।  আর দুই. রানা দাসগুপ্ত সেই থেকে এখন অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে হিন্দু নেতা হিসাবে “সরকারের অবস্থান” বহন করেন। কোন বেচাইনি রাখেন না। তিনি গত মাসদুয়েক আগে ভোলার ঘটনার সময় হেফাজতের শফি হুজুরের সাথে দেখা করে এসেছেন যেটা ফলাও করে প্রচার পেয়েছিল – সম্প্রীতির প্রতীক হিসাবে। এককথায় সরকারের অবস্থান হল – “আরএসএস-কে আর পৃষ্টপোষণ নয়”।  আর এখান থেকেই মোদী-আরএসএসের আমাদের সরকার প্রধানকে অসহযোগিতা , প্রকাশ্য অসম্মান করা ইত্যাদি। এক শুস্ক টেনশ্নের শুরু।

এদিকে এসবের মাঝেই মোদী-অমিতেরা এনআরসি-নাগরিকত্ব নিয়ে নিজেরাই নিজের জনগণের কাছে গ্যাড়াকলে পরে গেছেন। আর এই সুযোগটা ভাল্ভাবেই নিতে পেরেছে হাসিনা সরকার। নেওয়াটাই স্বাভাবিক ও উচিত। নড়বড়েরা যে এটা পারছে সেটাই শুকরিয়া। আবার এনিয়ে মোদী-অমিতের বলারও বিশেষ কিছু নাই। কেবল ভারতের মাস-পাবলিকের মুডের উঠানামার দিকে খেয়াল করে চললে, সে অনুসারে কখন মোদীকে আবার গুরুত্ব দিবে বা দিবেনা  তা  আগা-পিছা করলে আমাদের সরকারের অসুবিধা হবার কথা নয়। কাজেই সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক। কেবল একটাই সমস্যা, আমাদের নেতারা ভুলে থাকতে চায় যে তারা নিজেকে সম্পুর্ণ দান করে দিয়ে ভারতের সাথে  বিশাল ব্যক্তিগত সম্পর্কের জগত গড়তে ভারতের পায়ের কাছে শুয়ে থাকলেও ওদের চোখ আমরা কেবল নিচা “মুসলমান” – এটাই থাকব।  তারা তুচ্ছ করবে। যেন এখনও আমরা জমিদারের প্রজা যারা কখনই বন্ধু বা সমান হতে পারবে না। এই কথাগুলো আমাদের মনে থাকে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদি-অমিতের হারের চিহ্ন এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

গৌতম দাস

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Pa

 

[সার সংক্ষেপঃ জিন্নাহকে সব দোষে দোষী করার লোকের অভাব নেই, বিশেষত সাতচল্লিশের পরের জমিদারি হারানো কমিউনিস্টদের চোখ ও ভাষ্যে। অথচ ঘটনা হল, রামমোহন থেকে গান্ধী-নেহরুর আমল পর্যন্ত এসব মহারথীদের চিন্তাকে অনুসরণ ও  মুল্যায়ন করতে খুটিয়ে দেখার চিন্তাগত মুরোদ খুব কমজনেরই থাকতে দেখা যায়।  এদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটি ও তা থেকে বিভ্রান্তির কারণ  হল মূলত “জাতি” ধারণা। যেমন এর একটা নমুনা হল, এই মহারথীরা  সবাই “রাষ্ট্র গঠন” বলতে “জাতি গঠন” বুঝতেন। অথচ যেখানে জাতি মানে আসলে “রাষ্ট্র” কখনোই নয়। এছাড়া একটা অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর ভুল ধারণা হল জাতি [Nation]।   আবার কথা হল, ‘জাতি’ বলতে তারা কেবল আবার “ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন। যেমন তাদের বেলায় “হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন তাঁরা। অর্থাৎ মুল কথাটা হল, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় কেমনে! – এই ছিল তাদের প্রবল ভুল অনুমান।

রাষ্ট্র মানে জাতি আর, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় না –  এই হল তাঁদের ‘দুই ভুল অনুমান। এর উপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত হল বৃটিশেরা চলে গেলে তাঁদের একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারত “জাতি” চাই। অথবা এভাবে বলা যেতে পারে যে, হিন্দু জাতির একটা ভারত ছাড়া আর কীইবা তারা চাইতে পারে! কারণ তাদের চোখে এর অন্যথা কিছুই তো হতে পারে না।  ভারতবর্ষের “হিন্দু জাতি” তো একটা  “হিন্দু জাতির” ভারত ছাড়া অন্য কিছু চাইলেও কায়েম করতে বা হতে পারবে না – এই ছিল  সারকরে তাদের ভুল অনুমান।  রামমোহনের মূল কর্মততপরতার কালের শুরু ১৮১৫ সাল থেকে ১৯৪৮ সালে গান্ধীর মৃত্যু পর্যন্ত এই একশ ত্রিশ বছর হিন্দু জাতি বুঝের তাদের জার্নিটাই ছিল এমন।

লক্ষ্যণীয় উপরের প্যারায় শুরুতে রাষ্ট্র শব্দটা একবারই ব্যবহার হয়েছে, তাও সম্পর্ক দেখানোর জন্য। মূলত “রাষ্ট্র” শব্দটাই তাদের কোন চিন্তা বা অনুমানের মধ্যে থাকত না। রাষ্ট্র শব্দটাই তাঁরা তখনও শিখেনি অথবা এই শব্দের উপযোগিতা কী, কাম কী তারা বুঝে উঠতে পারে নাই।  কারণ তাদের চোখে দিনের আলোর মত পরিস্কার লাগত যে “স্বাধীন ও দেশপ্রেমিক এক হিন্দু জাতি হিসাবে নিজেদের গঠন” – এর বাইরে তারা আর কি করতে পারে।  এজন্য সেকালে রাজনীতি বলতে তারা তিনটা শব্দ বুঝত – স্বাধীনতা, দেশপ্রেম আর জাতি। রাজনীতি বলতে এই তিন শব্দ বুঝার ক্ষেত্রে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার বুঝাবুঝিতে আলাদা কিছু ছিল না।
এতে অসুবিধা কী?
অসুবিধা হল রাষ্ট্র ধারণা তখনও কারও মাথায় নাই অথবা কারও মাথায় আসেনি মানে রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদান নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই। তাই রাষ্ট্র নাই মানে নাগরিক ধারণাই নাই।  আর, নাগরিকের অধিকার ধারণা নাই। অথচ জাতি ধারণা আছে। মানে জাতি বলে বড়জোড় একট কমন স্বার্থের জনগোষ্ঠিগত স্বার্থ বলে ধারণা আছে। এটাই হিন্দু জাতি ধারণা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে জিন্নাহ বৃটিশ-ভারতের হবু রাজনৈতিক জগতে জিন্নাহ’র আবির্ভাবের আগে থেই হিন্দু জাতি ধারণা হাজির আছে। তাহলে জিন্নাহ-ই প্রথম হিন্দু আর মুসলমান এই  দ্বিজাতি তত্বের ধারণা আনলেন এমন দাবি ভিত্তিহীন।
দ্বিতীয়ত, ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্মের পরে যখন নিশ্চিত হয়ে উঠছে যে কংগ্রেস হিন্দু জাতির ভারত-ই একমাত্র কায়েম করতে চায়,  তাহলে কংগ্রেস ও গান্ধীর হিন্দু ‘জাতি গঠন ধারণাকে’ অস্বীকার করে ফেলে দেয়া ছাড়া জিন্নাহর উপায় কী ছিল! এটাই তাদের মুসলমান জাতীয়তাবাদ করতে চলে যাওয়া। অথচ মুলচিন্তায়  জটিলতার কেন্দ্র হল জাতি ধারণা, কাজটা কোন  জাতি গঠন নয়। বরং রাষ্ট্রগঠন। নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্রকে কনষ্টিটিউট করা এই অর্থে রাষ্ট্রগঠন।  এভাবে ব্যাপারটা হলো আসলে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিকের ভিত্তিতে বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রগঠন ও কায়েম হল সব কিছু সমাধান।
আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। জিন্নাহ হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি একথা তিনি এনেছেন। একথা পেরেছেন অবশ্যই। কিন্তু কেন? হিন্দু জাতিগঠন যারা মানবে না তারা যেন আলাদা রাষ্ট্র চাইতে পারে, এই ব্যাপারটার পক্ষে যুক্তি সাজানোর জন্য।  কিন্তু জিন্নাহ লক্ষ্যচ্যুত নন। তিনি নাগরিকত্ব মানে রাষ্টড়-নাগরিক বিষয়ক মৌলিক শিক্ষা ভাঙ্গেন নাই। কিভাবে? তিনি ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব করবেন না। তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিক হবেন এই পাকিস্তানের কথা বলেছেন।

তাই, ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালের বক্তৃতায় জিন্নাহ বুঝিয়ে রেখে যেতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় স্বাদের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব এই পাকিস্তান কায়েমের লোক জিন্নাহ নন। যদিও পরবর্তিতে কনষ্টিটিশনের পাকিস্তান – এমন পাকিস্তান হলেও বাস্তবের পাকিস্তান জিন্নাহর স্বপ্ন হতে পারেনি সেকথাও সত্য। একালের ইমরান খান আবার অনেক কিছুই নতুন চোখে দেখবার আশা করতে উসকানি দিচ্ছেন। কিন্তু অমিত শাহ? আগে ছিল যেগুলো গান্ধীর হিন্দুজাতির ভারত কায়েমের চিন্তা বিষয়ক ভুল। আজ অমিত সেই হিন্দুজাতির আরও বড় ভারতের কলঙ্ক হতে রওনা দিয়েছে। বৈষম্যহীনতার সমান নাগরিকই যেখানে সব কিছুর সমাধান। তবু অমিত শাহরা হিন্দুর স্বার্থ কেবল হিন্দু পরিচয়ের মধ্যে খুজে এক মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে ভোটবাক্স ভর্তি করতে চাইছেন।]

 

রাষ্ট্র মানে জাতিগঠন নয়। বৈষমহীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মামলা।
কাজেই জিন্নাহর, গান্ধীর ‘হিন্দুজাতি’ গঠন ধারণাকে উপড়ে ফেলে দেওয়া ছাড়া কী করার ছিল?

বাসায় চোর পড়লে অনেক সময় এরপর দেখা যায় চোরকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে চুরিতে নিরাপত্তার ফাঁকফোকরগুলোর দিকে নজর ও সংস্কার কাজ শুরু করে দিতে। কারণ, চুরিটা না হলে নিরাপত্তার ঘাটতির দিকগুলোতে আমাদের মনোযোগ যেত না। এই বিচারে আমরাও বাংলাদেশ থেকে এখন অমিত শাহকে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ঘর সুরক্ষার কাজে নামতে পারি। কারণ তিনি আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে নজর ফেলতে পরোক্ষে সুযোগ করে দিয়েছেন, যদিও তা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারব তা এখনই একেবারে নিশ্চিত নই আমরা।
ভারতের নাগরিক সংশোধনী বিল ২০১৯ [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)] উভয় সংসদে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে এখন চালু হয়ে গেছে। অমিত শাহের উচ্চারণ স্পষ্ট, “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”। আনন্দবাজার আশা করে লিখেছে – “রাজ্যসভায় শাহের রাখঢাক নেই”। পত্রিকাটা বলতে চেয়েছে এর আগে লোকসভায় যেভাবে অমিত যেভাবে ঢেকে রেখেছিলেন সেভাবে কেন ঢেকে রাখেন নাই।
কিন্তু তবু অমিতবিরোধী কারও কোন পক্ষ থেকে এর বিপক্ষে কী জবাব দেবে, এর তেমন জোরালো বয়ান দেখা যায়নি। কেন এটা এমন, কেন?
ব্যাপারটা হল এত দিনের যে প্রচলিত “হিন্দুজাতির” ভারত, সেখানে কেউ মুসলমান হলে ও নাগরিকত্ব পালার ইস্যু থাকলে হিন্দুদের পক্ষ থেকে তাকে নাগরিকত্ব না দিতে চাওয়া – এটাই কি স্বাভাবিক ছিল না?  ভারতের সামাজিক পরিসরে রাষ্ট্র বিষয়ে এমন বোধবুদ্ধি, বুঝাবুঝির লজিকই তো ভারতের সমাজে এত দিন ধরে ছড়িয়ে রাখা আছে। অন্তত নেহেরু-গান্ধীর আমল থেকেই।  এটা তো অমিত শাহ হঠাৎ করে বলছেন তা তো না। আর সে জন্যই তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। আর যারা শুনছেন তাদের কাছেও এটা নতুন, অনভ্যস্ত বা প্রথম মনে হচ্ছে না। তাই তেমন প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়াও নাই

অথচ সোজা ঘটনাটা হল এই যে, অমিত বলতে চাইছেন ভারত রাষ্ট্রের মন কেবল কেঁদে উঠবে অন্যদেশের একমাত্র মুসলমান ছাড়া বাকি সবার বেলায়। এমনকি খ্রীশ্চান হলেও কাঁদবে! এই বক্তব্যের পিছনের অনুমান হল যে,.১. যে ভারত রাষ্ট্রের “কমন মন” বলে একটা কিছু এখানে ধরে নেয়া হয়েছে সে মুসলমানবিদ্বেষী অথবা এর ভিতরে কোন মুসলমান নাই। ২. এই বক্তব্যে সার্বজনীন সবার নাগরিকের অধিকারের জন্য হওয়া উচিত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটাকে হাজির করা হয়েছে মুসলমানবিদ্বেষী ভাবে আর মুসলমান বাদে ভারতে দেখা যায় এমন সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য করে। এর অর্থ তারা ভারতকে একটা ধর্মনির্বিশেষে নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র মনে করে নাই।  আসলে এটাই তো গান্ধীর “হিন্দুজাতি” ধারণা।

আবার আসাম, ত্রিপুরাসহ নর্থ-ইস্টে যা দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখছি আমরা, সেটা মোদী-অমিতের সরকারের বিলের বিরুদ্ধে অবশ্যই। কিন্তু  সেটাও  ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের সমান নাগরিকত্ব থাকা উচিত সে অবস্থানের জন্য নয়। বরং বাংলাদেশেরই বিরুদ্ধে। তবে অমিতের পক্ষে নয়। তাহলে? এই নাগরিক সংশোধনী বিল মানে ক্যাব [CAB] বিল ইস্যুতে, সাধারণভাবে নর্থ-ইস্ট মনে করে ও তাদের আশঙ্কা এই যে অমিতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ফলে এখন নর্থ-ইস্টের লাগোয়া বাংলাদেশের সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের হিন্দু যারা আছে, তারা এখন সদলবলে নর্থ-ইস্টের আট রাজ্যে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব নিতে চাইবে। মূলত এর প্রবল বিরোধিতা করতেই তাদের মোদী সরকারবিরোধী দাঙ্গা-হাঙ্গামা। আর ত্রিপুরার ক্ষেত্রে এসব ছাড়াও  তাদেরবাড়তি একটা ইস্যু হল, সেখানের মোট জনগোষ্ঠির (সম্ভবত এক-তৃতীয়াংশ) আমাদের চাকমা, গাড়োরা সহ এদেরই মত মোট আট পাহাড়ি গোষ্ঠির। যারা ইতোমধ্যেই এক ধরণের স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে জেলাভিত্তিক। এরা এখন এই সুযোগে আলাদা রাজ্য চাওয়ার দাবি জোরালো করে তুলেছে। সার কথাটা হল সারা নর্থ-ইস্টেই সমতল (মূলত বাংলাদেশ) থেকে বাঙালিরা তাদের জেলায় এসে পড়া ও আশ্রয় নেয়ার বিরোধী তারা।

অমিত শাহ এই বিল আনার মাধ্যমে জেনে বা না জেনে দীর্ঘদিনের চাপা পড়ে থাকা দেশভাগের প্রায় সব বিতর্ককে আমাদের সামনে আবার জাহির করে দিয়েছে। এর মূল কারণ নেহরু-গান্ধীর জমানা থেকেই ভারতরাষ্ট্র যে নাগরিকে-নাগরিকের মধ্যে ফারাক বা বৈষম্য করতে পারে না। এটা যে হারাম তা তো কখনোই বাস্তবায়ন করতে গেছে তা আমরা দেখিনি। যদিও ভারতের কনষ্টিটিউশনে সেটা যেভাবেই লেখা থাক। যেকোন আধুনিক রিপাবলিক ভিত্তিমূলক যেসব মূলনীতি ধারণা থাকে এ দিক থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই ভারত-রাষ্ট্রকে বুঝা বা বুঝানো ও প্রাকটিশ করার চেষ্টা করা হয়নি।

যেমন মোদীর শাসনের চলতি এই গত ছয় বছরকেই বিচার করলে আমরা পাই  – এখানে মুসলমানদের ওপর যা খুশি জোর তো করাই যায়, বৈষম্য তো করাই যায়। মোদি-অমিত চাইলেই করতে পারে। তাই কি সারা ভারতবাসী দেখে আসেনি? মুসলমানকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো অথবা গরু খাওয়া, গরু বহণ করা ইত্যাদি অভিযোগে রাস্তায় রাস্তায় তা চেক করতে বিজেপির ভিজিলেন্স পার্টি তো বসানোই যায়; আর বসিয়ে এমন মুসলমানের খোঁজ পেলে তাকে রাস্তাতেই পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়- এটাই কি ভারতবাসী দেখেনি?

শুধু তা-ই নয়, এ নিয়ে সারা ভারতে কোথায় মামলা-বিচার কোথাও কিছু হয়নি। সর্বশেষ আবার এমন পিটিয়ে [তাবরিজ আনসারী খুনের ঘটনায়] মামলা হয়েছে যদিও কিন্তু সেটা খুনের না হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যর মামলা বলে।  গরু পালা দুধের ব্যবসায়ী পহেলু খানের হাট থেকে গরু কিনে আনাতে হাটের রশিদ দেখানোর পরেও লিঞ্চিং খুন হলে এর আসামিরা দুর্বল মামলা দেওয়ায় আসামীরা সবাই বেকসুর খালাস হয়ে গেছে। মএব্যাপারে মোদীর দ্বিতীয়বারের চলতি সরকারের আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান হল, ভারতে রাস্তায় পিটিয়ে মারা লিঞ্চিংয়ের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সবই গুজব, সাজানো আবার আরএসএস নেতা ভগত বলেছেন, পিটিয়ে মারা বা লিঞ্চিং শব্দ ব্যবহার না করতে। সারা ভারতে এভাবে এমনকি সাধারণ নাগরিককে বটেই, এক মুসলমান এমপিকে আর এক হিন্দু এমপি জয় শ্রীরাম বলাতে জোর খাটাতে, জনসমক্ষে তর্ক করতে দেখা গেছে।

মজার কথা হল, এসব নিয়ে কোনো জনস্বার্থবিষয়ক মামলা অথবা আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বলে কোনো কিছু হতে দেখা যায়নি; বরং সোস্যাল প্রাকটিস এর বয়ান হল উল্টাটা। যেমন মমতা নাকি মুসলমানদেরকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছেন, তাই পশ্চিমবঙ্গে মুসমানদেরকে দাবিয়ে রাখা নাকি দরকার – এমন ভাষ্য ফেসবুক সোস্যাল মিডিয়ায় ডমিনেটিং পারসেপশন।

সারা দুনিয়াতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রসঙ্গে সকলের একেবারে প্রাইমারি ঐক্যমত্যের বৈশিষ্ট্যগুলো হল –
১. এটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র আর এখানে সব নাগরিক সবার অধিকার সমান।
২. নাগরিক মাত্রই রাষ্ট্র বৈষম্যহীনভাবে সকলকে সমান চোখ দেখতে ও আচরণ করতে বাধ্য।

কাজেই এটা জাতিগড়া বা জাতিগঠনের বিষয়ই নয়। রাষ্ট্রের এটা নাগরিককে তার  নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মামলা। যেখানে নাগরিক আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক হল – নাগরিকেরা হল রাষ্ট্রের গঠনের উপাদান (constituent)। রাষ্ট্র নাগরিক দিয়ে তৈরি (constituted)। আর দলিল অর্থে তৈরি জিনিষ হল constitution। এখানে ‘জাতি’ [nation] বা হিন্দু জাতিগঠন বলে জিনিষটাকে বিভ্রান্ত করা বা বিভ্রান্তি ছড়াবার অন্তত একালে আর কোন সুযোগ নাই।
একারণেই এখানে রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ব্যবহৃত শব্দগুলো হয় – মানবাধিকার, সমানাধিকার, বৈষম্যহীনতা, সাম্য ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে? না এখানে সব কিছুর উপরে এক আজিব শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িক’। (অথবা একই ধারণায় বিপরীত অর্থে ‘অসাম্প্রদায়িক’।)

প্রথমত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার সাথে সম্পর্কিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে সংশ্লিষ্ট কোনো শব্দ-ধারণা দুনিয়ার কোথাও নেই; কিন্তু ভারতে এটা আছে। আর এটা হল মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সংকীর্ণভাবে কেবল তাদের দিক থেকে বলা শব্দ। তারা যাকে বা যে আচরণ বা রীতিকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে দায়ী করবে, সেটাই সাম্প্রদায়িক। সাধারণত মুসলমানদের অভিযুক্ত করতে তাদের এই সংজ্ঞা তারা ব্যবহার করে। যেমন ইসলামী চিহ্ন প্রকাশ হয়ে পড়ে (যেমন টুপি) এমন কোনো কিছু দেখিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করা যাবে না। এটা নাকি সাম্প্রদায়িক। মুল কথাটা হল হিন্দু ডমিনেটিং সমাজে এটাকে তারা তাদের কর্তৃত্ব আধিপত্যকে ঢিলা করে ফেলা বা যেন অস্বীকার করার সুযোগ হিসবে কেউ না নেয়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই “সাম্প্রদায়িক” নামে শব্দ ও বয়ান দিয়ে শাসন করা। কিন্তু সকালে পূজা-অর্চনা করে কপালে ফোঁটা বা ড্রয়িং তিলক এঁকে কাজে বা সংসদেও যাওয়া যাবে।

কিন্তু সারা দুনিয়াতে ‘সম্প্রদায়’ বা ‘কমিউনিটি’ কথাটা খুবই ইতিবাচক। এটা নিচা, হেয় বা খারাপ বুঝানোর শব্দ না।  যেমন ইউরোপের যেকোন শহরে সমাজের জন্য যে কাজ করে, স্বেচ্ছাশ্রম দেয় সে সম্মানিত ‘কমিউনিটি’ ওয়ার্কার। কিন্তু ভারতে কমিউনিটির রুট শব্দ কমিউন [commune] – এটা ব্যবহার করা হয় নেগেটিভ অর্থে। কমিউন থেকে ‘কমিউনাল’[communal] বলে ইংরেজিতে আর এক শব্দ বের করে আনা হয়েছে যেটাr অর্থও ইতিবাচক; ‘সমাজ সম্পর্কিত’ অর্থে। কিন্তু ভারতে এর অর্থ করে নিয়েছে খুবই জঘন্য। আর এরই বাংলা করা হয়েছে “সাম্প্রদায়িক”। মানে এটাই ভারতে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নেতিশব্দ। সাধারণত এটা মুসলমানদের উপর ব্যবহার করা হয়। যার আসল অর্থ হল, হিন্দু সামাজিক কর্ত্তৃত্ব মানতে যে অস্বীকার করে।

আসল কথাটা হল, ব্রিটিশ আমল থেকেই হিন্দু-জমিদারি ক্ষমতায় (এর তৎপরতা কার্যক্রমের শুরু মোটা দাগে বললে ১৮০০ সাল থেকে যেখানে তখন ১৭৯৩ সাল থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি আইন চালু করা হয়ে গেছে কেবল) এর যে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছিল, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল সে সময়ের কোনো শব্দের কী অর্থ হবে। বিশেষ করে তাদের সাজানো সেই আধিপত্য যেন মুসলমানরা ভঙ্গ না করে সেই লক্ষ্য সাজানো সামাজিক অনুশাসন। মুসলমানরা ছিল সেই সময়ের সামাজিক স্তরভেদে নিচে ধরে নেয়া স্তরেরও সবার নিচের স্তরে বলে, এটাই মনে করানো ছিল এর উদ্দেশ্য।

মনে রাখতে হবে, মোটা দাগে ১৮০০ সাল থেকে পরের দেড় শ’ বছর ধরে এই হিন্দু জমিদারি-কেন্দ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য এটাই প্রজা নিয়ন্ত্রণের বয়ান ও এর সংজ্ঞার নির্ধারক ছিল। কৃষি সে সমাজের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই কৃষি মালিকানা ব্যবস্থা হিসাবে চিরস্থায়ী জমি দেয়ার বন্দোবস্ত, যা আমরা জমিদারি বলি বুঝি আর সেখানে বেশির ভাগ জমিদার ছিল হিন্দু, মানে সবমিলিয়ে এরাই মূল রুলিং ক্লাস। এ কারণে তাদের এটাই ছিল সব কিছুর ওপর ডমিনেটিং ফ্যাক্টর, সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এই ক্ষমতাটাই সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ভয়-শঙ্কায় শশব্যস্ত হয়ে থাকত। তাদের ভয় ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতপ্রথার কথা তুলে জারি রেখে ক্ষমতার এই জার-স্তর তৈরি করে তারা এই সামাজিক অনুশাসন তৈরি করেছে। কাজেই মুসলমানেরা ভিন্ন ধর্মের – এই যুক্তি তুলে যদি তারা সাজানো শাসন ব্যবস্থা – মানতে অস্বীকার করে? আর এর মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতার এই সাজানো বাগান ভেঙ্গে দেয় – এই সম্ভাব্য ভঙ্গকারী যারা এরাই “সাম্প্রদায়িক”। তবে সাম্প্রদায়িক নাম দিবার পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে এই হিন্দু আধিপত্য বলতে চায় যে এই সামাজিক অনুশাসন নিয়ম ও কর্তৃত্ব দিয়ে আমি আমার এক সম্প্রদায় খাড়া করেছি। তুমি মুসলমান এর ভিতরে আবার তোমার ভিন্ন নিয়ম ভিন্ন কেন্দ্র চালু করে ফেলতে পার, তা আমি হতে দিব না। তাই তোমাকে আমি তোমার সম্প্রদায়ের বলে আলাদা কোন ক্ষমতার কেন্দ্র বানাতে দিব না। একারণে উলটা আমি তোমাকে বিভেদ আনার শক্তি হিসাবে প্রচার করব। তুমি আলাদা সম্প্রদায় গড়ে ফেলবার সম্ভাব্য শক্তি – অতএব তোমার নাম দিলাম “সাম্প্রদায়িক”। তুমি আমার ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দিতে বা চ্যালেঞ্জ করতে যাতে না পার তাই আগেই তুমি নেতিবাচক, তুন্মি খারাপ এই ট্যাগ লাগিয়ে এক প্রচার চালিয়ে রাখব।
সারকথায়, এই আধিপত্যেরই আবার যা কিছু অপছন্দনীয় বা যা তার নিজ ক্ষমতাকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ করতে পারে অথবা যাকে (মুসলমান) সে আগাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, সেসব কিছুই ‘সাম্প্রদায়িক’ ট্যাগ পাবে। মানে তার সাজানো রাজত্ব এর ভেতরে একটা ভিন্ন ‘সম্প্রদায়’ যেন যে তার সাজানো অর্ডার বিনষ্ট করতে চায়। এমন সব কিছুকে সে আগাম ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে, এই অধিপতি শ্রেণী নিজের সম্ভাব্য শত্রুকে চিনিয়ে রাখে। অনেকটা হিন্দু-জমিদারের নিজের মতো করে তার সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাজানো বাগান এটা সম্ভাব্য আগামীতে যে’জন তছনছ করতে পারে, সেই হলো সাম্প্রদায়িক। এই হলো সাম্প্রদায়িকতার আসল সংজ্ঞা ও উৎপত্তি।
এ কারণে ইংরেজি ‘কমিউনাল’ শব্দটা ইংলিশ সমাজে কেবল ইতিবাচক অর্থে সমাজ-সম্প্রদায় বুঝাতে এর ব্যবহারটাই কেবল দেখতে পাবেন। বিপরীতে কেবল ভারতীয়রাই শব্দটাকে নেতিবাচক ও বিশেষ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে। এই সোজা মানেটা হলো, ১৮০০ বা উনিশ শতকের শুরু থেকেই যে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্যের তৎপরতা শুরু হয়েছিল, এরই স্বার্থের বিরোধী যেকোনো কিছুই (সাধারণত মুসলমান) বোঝাতে ‘কমিউনাল’ শব্দ ব্যবহার শুরু হতে দেখা গেছিল।

কিন্তু কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কিভাবে বলে আমার বৈশিষ্ট হল ‘অসাম্প্রদায়িক’? যেখানে তার দেখার চোখ হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সমান এবং সমান নাগরিক? খাড়া কথাটা হল, হিন্দু ধর্মীয়-সামাজিক গোষ্ঠির মানে বাস্তবে অপসৃয়মান হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য শব্দ সাম্প্রদায়িক – এই শব্দ বা বৈশিষ্ট তো কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টই হতে পারে না – যেখানে ধর্ম-নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান গণ্য রাষ্ট্রকে করতেই হবে! আর এই অধিকার কেউ ভেঙ্গেছে কিনা সেটা বিচার করাই কেবল রাষ্ট্রের কাজ। কাজেই সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক নয়, রিপাবলিক রাষ্ট্রে অধিকারে সমান না বৈষম্য করা হয়েছে এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় এবং এর নির্ণায়ক।  হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কাজ একেবারেই নয়। কাজেই সাম্প্রদায়িক এই শব্দটা দিয়েই আসলে নাগরিক অধিকারের বৈষম্যহীন করবার ধারণাটাকে চর্চায় সামনে আসনে দেয়া ঠেকায় রাখার ক্ষেত্রে ভুমিকা আছে।

এর পাশাপাশি আমরা এখন রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) জমানায় যাবো। কেন রামমোহন? ভারতের প্রগতিবাদী বিশেষত সেকালের (বলতে ১৯২৬ সালের পরের বুঝতে হবে) খোদ কমিউনিস্ট পার্টির চোখে রাজা রামমোহন রায় হলেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ এর আদিগুরু। মানে রামমোহন যিনি ব্রিটিশদের হাত ধরে ইন্ডিয়াতে আসা বা আনা ‘ইউরোপীয় রেনেসাঁ’কে সবার আগে ভারতে পরিচয় করান এবং এর চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করেছিলেন, সেই আদি শুরুকর্তা। রামমোহন সুনির্দিষ্ট একাজটা শুরু করেছিলেন ১৮১৫ সালে, তার “আত্মীয় সভা” নামে সামাজিক সংগাঠনিক তৎপরতায়। এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৮৩৫ সালকে যখন ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন অ্যাক্ট ১৮৩৫’ চালু করবে।
এটাকে “এডুকেশন অ্যাক্ট” বলে অথবা এটাই হল ব্রিটিশ ‘কলোনি প্রশাসন’ এর শুরু করার আইন বলে বুঝতে পারি। এটাই ভারতীয় নেটিভ বা স্থানীয়দেরকেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত করে কলোনি প্রশাসন সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত মনে করেও পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষিত ব্রিটিশদের ব্যয়বহুল পথে (বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া) তাদের এখানে এনে আর নেয়া হবে না। স্থানীয় নেটিভদের শিক্ষিত করে নেয়া এক প্রশাসন গড়তে হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেটা আধুনিক শিক্ষা মানে রেনেসাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলার শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।
রামমোহনের মূল গুরুত্ব হল তিনি ব্রিটিশ মাস্টারের অনুকরণে সেকালের ব্রিটিশ-ভারতে, আমাদেরকে একটা “আধুনিক রাষ্ট্র” করতে হবে – প্রথম তিনিই এমন গড়ার স্বপ্ন দেখে ও এঁকেছিলেন। আবার ঠিক একই কারণে এতে তাঁর করা সব ভুল বা ধারণায় ঘাটতি বা তাতে অস্পষ্টতায় বিপথে যাওয়া এমন ধারণায় সব খামতির উৎপত্তিও তিনি। যদিও আধুনিক প্রগতিবাদীরা বা পরবর্তীকালে বিশ শতকে এসে কমিউনিস্টরাও রামমোহনকে তাদের আদিগুরু নেতা মানেন। বিশেষ করে যারা হিন্দু জমিদারীর “স্বদেশি ইতিহাসের ধারা” রচয়িতা।

কিন্তু তিনি প্রথম নেতা হলেও আধুনিক রিপাবলিক ধারণার মুখ্য বৈশিষ্ট্য যে তা নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র, নাগরিক মাত্রই অধিকার সমান এক বৈষম্যহীন সাম্য ইত্যাদি – এসব মৌলিক ধারণাকে তিনি আমল করতে সক্ষম ছিলেন এর প্রমাণ নাই।  আসলে নাগরিক সাম্য নয়, সম্ভবত রেনেসাঁ তার মুল আগ্রহের বিষয় হয়েই তিনি আটকেও গেছিলেন। অধিকার বা রাষ্ট্র পর্যন্ত আর নিজ চিন্তাকে প্রসারিত করতে পারেন নাই।  এমন চিহ্ন আমরা দেখি না। আরও বড়  কারণ কী?
মূল কারণ হল, রামমোহনদের কাছে কাজটা (উচিত অর্থে) হওয়ার কথা ছিল “রাষ্ট্রগঠন”। কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন “জাতি গঠন” বলে।  এখানে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিমূলক ধারণা ছিল “জাতি” [nation]। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারা রাষ্ট্র কথাটাই ব্যবহার করতেন না। এর বদলে ব্যাপারটাকে “জাতি” বলে কিছু একটা বুঝতে চাইতেন। এই হলো প্রথম ভুল। তবে পরের ভুলটা আরো মারাত্মক। জাতি গঠন বা জাতীয়তাবাদ বলতে তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বুঝতেন। তারা নিশ্চিত হয়ে থাকতেন যে জাতির মূল বৈশিষ্টই তো ধর্ম।  আর ধর্মই তো জাতিকে “জাতি” হয়ে উঠতে আঠার মত সকলকে ধরে রাখতে প্রধান ভুমিকা রাখে। কিন্তু এখনই খুশি হয়ে যেয়েন না, সাবধান হন। পরের বাক্যটার দিকে খেয়াল করেন।
অতএব এত বড় আর প্রাচীন হিন্দু ভুখন্ডে বৃটিশ শাসন-পরবর্তিকালে এক “হিন্দুজাতির ভারত” – এটাই আমাদের কাম্য। কারণ যে “বৃটিশ জাতি” আমাদেরকে শাসন করতে আমরা দেখছি সেটাও একটা ক্রিশ্চানিটিতেই আবদ্ধ, এক বৃটিশ “জাতিগঠন” হয়েই করেই দাঁড়িয়ে আছে।  সেকালে রামমোহন এন্ড গং তাদের বুঝাবুঝির মোটা ভাষ্যটা  সাজিয়ে লিখলে তা হবে এরকমই।
এই একই বুঝ বজায় ছিল অন্তত মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত; ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভুমিকা (১৯১৪-৪৮) এই সময়কালে। অর্থাৎ স্বাধীন দেশপ্রেমিক এক ভারত বলতে তিনিও এক ভারতীয় “জাতিগঠন” করার কর্তব্য ও এর রাজনীতি বলে বুঝতেন। অর্থাৎ হিন্দুজাতি গঠন বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ গড়া বুঝতেন। ঠিক এ কারণেই তাদের কাম্য রাষ্ট্র নাগরিকের রাষ্ট্র হল কিনা অথবা অধিকারে বৈষম্যহীন হলো কি না, নাগরিক মাত্রই সমান অধিকারের রাষ্ট্র হলো কি না- ইত্যাদি এগুলো কখনও  তাদের এজেন্ডা ছিল না।

উল্টো এটা ধর্মীয় জাতিগঠনের জাতীয়তাবাদের বলে আধুনিক রাষ্ট্রকে বোঝার কারণেই এখনো – “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”, কথাগুলো এখনো অবলীলায় উচ্চারিত হতে পারছে। কারও কানেও খটকা লাগছে না।

তাহলে রামমোহন থেকে গান্ধী সবার কাছেই ভারত রাষ্ট্র মানে কোনো বৈষম্যহীন নাগরিক রাষ্ট্র নয়, এ দিক থেকে রাষ্ট্র বোঝাই হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবের যে ভারত -রামমোহন থেকে গান্ধী- এরা কল্পনা বা বাস্তবে দেখেছিলেন এটা আবার সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক বুঝের হিন্দু জমিদারের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাষ্ট্র বলেই বুঝেছেন, দেখেছেন, পেয়েছেন।

এ কারণে যারাই রাষ্ট্রের মধ্যে “অসাম্প্রদায়িকতা” বৈশিষ্ট্য খুঁজে তাদের কাছে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা অর্জন হয়েছে কি না তা কোনো কাম্য বিষয়ই নয়।

অতএব, গান্ধী-নেহরুরা যে ভারতের জন্ম দিয়ে গেছে সেটাই বা সেখানেই তো মোদী-অমিতের হিন্দুত্বের রাষ্ট্র কায়েমের উপযুক্ত জায়গা। অবলীলায় ‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো’ বলতে পারার মতো দেশ-রাষ্ট্র।  এখানে নাগরিক ধারণাটাই পোক্ত না বরং এখনও অপুষ্ট। তাই নাগরিক অধিকারও। এর আকাঙ্খার ভেতরেও তাই নাগরিক বৈষম্যহীনতার আকাঙ্খাই নাই, অনুপস্থিত। একই কারণে সুপ্রিম কোর্টের চর্চাতেও তেমন নাই। নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই। সে কারণে বিজেপির মত দলও কনষ্টিটিউশন মোতাবেক রাজনৈতিক ততপরতা চালাবার জন্য যোগ্য দল বলে অনুমোদন দিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। সুপ্রীম কোর্টও এর মধ্যে কোন সমস্যা দেখে না। অথচ যে রাজনৈতিক দলের চিন্তা বৈষম্যমূলক নাগরিক অধিকারের সেই দল তো অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন পাওয়ারই কথা হয়। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রীম কোর্টও এটা কোন সিরিয়াস দিক মনে করে না। শেষ নির্বাচনে এদিকটা অবস্থা আরও ভয়াবহ। কোন নির্বাচনি ভায়োলেশনের অভিযোগ আমলে নিয়ে মোদীর গায়ে ফুলের টোকা দিতেও তারা রাজি হয় নাই। অবশ্য তারা বলতে চায় একজিকিউটিভ ক্ষমতার গায়ে হাত দিয়ে আমাদের খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিগত ১৯৭৫ সালের জুনে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি আইন যেখান থেকে ঘটেছিল সেই ইস্যুতে। সেই থেকে আদালতের অবস্থান হল, কোন নির্বাচনে যদি এক আগ্রাসী একজিকিউটিভ ক্ষমতা – নির্বাচিত হয়ে আসে তবে সে যতই আগ্রাসী আদালত ততই সংঘাত এড়িয়ে তাকে জায়গা করে দিবে।
কিন্তু তাই বলে কি “নাগরিক বৈষম্যহীনতা করা যাবে না”- একথা ভারতের কনস্টিটিউশনে লেখা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আছে কনস্টিটিউশনে লিখা থাকতে হয় তাই। এর ইমপিলিকেশন কী, ব্যবহার কী এবং কোথায় – কেন থাকতে হয়, গুরুত্ব কী সেসব দিক থেকে কিছুই বুঝা হয়নি, চর্চায় নেয়া হয় নাই। এর মূল কারণ সম্ভবত – “হিন্দুজাতি গঠনের এক ভারত” গড়া হয়েছে – এটাই তো ভারতের জন্ম থেকেই ছিল মূল বিবেচ্য!
তাহলে একালে ভারত কেন “হিন্দুজাতির ভারত” – এই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী কেন? এটা যদি কেউ দেখিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন তারা আড়াল খুঁজে বলে – কেন তারা তো অসাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ এটা ‘অসম্প্রদায়িক’ ও ‘হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী’ ভারত, কাজেই কোনো আর অসুবিধাই নেই।

আচ্ছা রামমোহনের রাষ্ট্রচিন্তা যে জাতিগঠন-বাদী চিন্তা, আর এই জাতিবাদ যে ধর্মীয় এমন দাবির প্রমাণ কী? এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল রামমোহনের ‘ব্রাহ্মধর্ম’ চালু করার তাগিদ। [রবীন্দ্রনাথের দাদু দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন রামমোহনের বন্ধু, অনুসারী। সেই সুত্রে তিনিও ছিলেন ‘ব্রাহ্মধর্ম’ অনুসারী ও প্রধান পৃষ্টপোষক। রবীন্দনাথও  ব্রাহ্ম অনুসারি আর এই সুত্রে তাঁর কালেও পুনর্বার মুখপাত্র তত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। ] সারা ভারতের সবাইকে এক ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী করে এরপর ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিগঠনের  ভারত কায়েম এই ছিল রামমোহনের লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে সবাইকে ব্রাহ্ম করার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে গান্ধী পর্যন্ত  (এদের মাঝে বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ইত্যাদি অনেক ব্যক্তিত্বও কমবেশি সামিল ছিলেন) এসে সবাই মেনে নেয় যে, ঐ স্থলে “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদী ভারতই তাদের কাম্য।
কিন্তু এই বুঝের ভিত্তিতে ১৮৮৫ সালে এসে কংগ্রেস দল জন্ম বা গঠন করার পরে এই প্রশ্ন জোরালো হতে থাকে যে, “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদ মুসলমানরা মেনে নেবে কেন? এর জবাব গান্ধীর কাছেও ছিল না। তিনি বড়জোর হিন্দু কথাটা ধর্মীয় না কালচারাল, এমন তর্কের কথা বলে পাশ কাটাতে চাইলেন। এছাড়া আমরা দেখি  উল্টা গান্ধীর নিজের বুঝের হিন্দু ধর্ম বলতে সেটা কেমন এটাকেই তিনি ‘হিন্দুইজম’ বলে প্রায় ৪২টা বক্তৃতা দিয়েছেন। অনলাইন আকাইভেও তা পাওয়া যায়। অথচ গান্ধীর কাছে মুসলমানরা “হিন্দুইজম কী” – তা শিখতে যাবে কেন? কোন সুখে অথবা দুখে? এমনকি অনেক হিন্দুও কেন তাকেই পছন্দ করবে, গান্ধীর “হিন্দুইজম কী” এর ব্যাখ্যা নিয়ে একমত হবে –  এই প্রশ্নের জবাব নাই  অথচ এই প্রশ্ন উঠেই থেকেছে।

সোজা কথা হল যার রাজনীতি  – রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, সমান অধিকারের রাষ্ট্র কায়েম এমন কেউ কেন “হিন্দুইজম কী” এই মাহাত্য প্রচার করতে যাবেন? গান্ধী যদি মনে করেন যে তাঁর “হিন্দুইজম কী”  ব্যাখ্যাটাই শ্রেষ্ঠ তাহলে এর মানে তিনি ধর্মতত্বের পন্ডিত হতে চাইছেন। অন্তত রাজনীতির না। ঠিক রাজনৈতিক নেতা তিনি না, ধর্মতাত্বিক নেতা হওয়া তার ঝোঁক যদি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রাজনীতির নেতা সেটা বাদ দেয়াই তাঁর উচিত ছিল। কারণ “হিন্দুইজম জানা বা এর  মাহাত্য প্রচার এটা না জানা থাকলেও ফেলো যেকোন ধর্মের নাগরিকের সাথে থাকার যোগ্য বিবেচিত হতে তো কোনই অসুবিধা নাই। এছাড়া এটা তো কোন নাগরিক সাম্যের রাজনৈতিক কাজ না। এগুলাই আসলে  আরও বড় প্রমাণ যে –  নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র কায়েম- এসবে গান্ধী বা নেহরুর কখনই আগ্রহ ছিল না, তারা বা তাদের ভারত এটা কখনই বুঝতেই পারেনি, তাই আমল করে নাই।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
চলতি নাগরিকত্ব বিলের তর্কে জিন্নাহ এখন সবারই অভিযোগ দায়ের করার সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানকে আলাদা হতে দিয়ে কংগ্রেস দ্বিজাতি বাস্তবায়ন হতে দিয়েছে অমিত শাহের এই ছিল অভিযোগ, এর জবাবে বলা সুপ্রীম কোর্টের কংগ্রেসের প্রধান আইনজীবী ও এমপি কাপিল সিবালের বক্তব্য ছিল, অম্বেদকারের বরাতে যে, জিন্নাহ ও সাভারকার (হিন্দু মহাসভা নেতা) দু’জনই ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান এরা দুই জাতি,  এই ধারণার অনুসারী।

তাহলে জিন্নাহই কি সব কিছুর জন্য দায়ী?
প্রশ্নই ওঠে না। উপরে রামমোহন থেকে অন্তত গান্ধী পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্র বলতে ‘জাতি’ বুঝতেন, বলেছি। আবার জাতি বলতে কেবল ধর্মীয় জাতিকে বুঝতেন। এই ছিল তাদের হিন্দু জাতিগঠন এই জাতীয়তাবাদী ভারত এর ধারণা।

কিন্তু এই হিন্দু জাতিগঠনের ভারত প্রশ্নে মুসলমানদের অস্বস্তি ও আপত্তির কারণেই ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। জিন্নাহও ক্রমশ একই ধরণের প্রশ্ন তুলে  কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

কিন্তু কংগ্রেস তার ‘হিন্দু জাতিগঠনের ভারত’ এই নীতি গ্রহণ করাতে মুসলিম লীগও যে জাতিবাদ করতে গেল, সেটাও মুসলিম জাতীয়তাবাদ হয়ে যেতে বাধ্য হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পেরে উঠতে গিয়ে ‘মুসলমানের ভিত্তিতে আলাদা এক জাতি’ এমন কথা বেশি স্পষ্ট প্রধান করে বলতে হয়েছিল। লীগ এ বক্তব্যের পক্ষে বিস্তর সাফাই গাইতে অনেকগুলো সম্মেলন হয়েছিল, যেখানে বিখ্যাত কবি ইকবালের সাফাই বক্তব্যও আমরা দেখে থাকব।

আর বিপরীতে এসব প্রশ্নের ঠেলায় কংগ্রেস ততই  ক্রমশ ছুপা-কৌশল গ্রহণ করে যে, তারা যে কৌশলগতভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত চায় এ কথা মুখে কোথাও স্বীকার করবে না। এর ফলে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ চাওয়ার সব দায় একা জিন্নাহর আর এ জন্যই অখণ্ড ভারত রাখা যায়নি- ভারতের সেই প্রপাগান্ডা সেই থেকে আজো প্রবল। একালে মানে ১৯৪৭ সালের পরে বিশেষ করে এই প্রপাগান্ডার দায় নিয়েছে কমিউনিস্টরা। যদিও তাদের ভাষ্যের প্রধান ফোকাস হলো, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মকে মেশানো খুবই গর্হিত কাজ,কাজেই মূল পাপে পাপী হলো জিন্নাহ।

কিন্তু সব জিনিষ লুকানো যায় না। কিন্তু মুল কারিগর কমিউনিস্ট, তাদের যুক্তিটাই সবকিছু উদোম করে দিয়েছে। কমিউনিস্টদের পয়েন্ট হল, রাজনীতিতে ধর্ম হারাম অথচ জিন্নাহ সেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার কথা খোলাখুলি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু কমিউনিস্টরা এতে নিজেই যেন নিজের জন্য ফাঁদ পেতেছে এমন হয়ে গেছে।  সেকালের সক্রিয় কমিউনিস্ট, পারিবারিকভাবে ব্রাহ্ম ও ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার রামমোহন রায়কে রেনেসাঁর আদিগুরুর ভুমিকায় দাবি করে বসানোর জন্য দায়ী মনে করা হয়।  এতে সমস্যা হল যে সুশোভন হয়ত ধর্মের উপর তত ক্ষেপা নয় কিন্তু সাধারণ কমিউনিস্টরা বিশেষত সাতচল্লিশের পরের কমিউনিস্ট চরম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে পড়েছিল। এই কমিউনিস্টদের এখন সাফাই ও জবাব দিতে হবে রাজনীতিতে ধর্ম যদি এতই হারাম হবে তাহলে রামমোহন রায় নতুন করে নিজেই আর একটা ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম, চালু করেছেন কেন? অন্তত জিন্নাহকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার আগে এটা নিজেরাই লক্ষ্য করে নিজেরাই এর জবাবটা দিয়ে রাখা উচিত ছিল। আর কোন কমিউনিস্ট আজ পর্যন্ত রামমোহনের দিকে আঙুল তুলে নাই কেন?

মজার কথা হল গান্ধী জিন্নাহর তত সমালোচনা করেন নাই, যতটা একালের কংগ্রেসি কিন্তু কমিউনিস্ট-ছাড়ানি প্রগতিধারী কেরালার এমপি শশীথারুর জিন্নাহর সমালোচনা করেছেন। কমিউন্সট পয়েন্টই তার পয়েন্ট, সিপিএমের সীতারাম ইয়াচুরিও একই দশা। ঠিক যেমন বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি। এককথায় এরা সকলেই কখনও  খেয়ালই করেছেন যে  “হিন্দুইজম কী” বলে সংকলিত গান্ধীর  ৪২ আর্টিকেল আছে – বলে মনে হয় না। রামমোহন রায়ের কথা আর বললাম না। কাজেই এরা মনোযোগী পাঠক এমন ধরে নেওয়া আর ঠিক হবে না।

এককথায় বললে এরা জিন্নাহর সাথে অবিচার করেছেন।  উপরে  রামমোহন আর গান্ধীর জাতিগঠন ধারণা তারা আমল করেছেন জানা যায় না। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রমাণ এখন হাজির করব।

সম্পতি পাকিস্তানের এক সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট YASSER LATIF HAMDANI সব তথ্য সাবুদ জড়ো করে একটা আর্টিক্যাল লিখেছেন ভারতের এক পত্রিকায় দ্যা প্রিন্ট – এখানে তা ছাপা হয়েছে। , যার বড় একটা অংশ আবার বিবিসির নিজের করা রিপোর্ট। যার সার কথা জিন্নাহর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতার, আগে যেখানে পাকিস্তানের যোগেন মণ্ডল তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। আর ওই সভা থেকেই যোগেন মণ্ডলকে পরে প্রথম আইনমন্ত্রী বানানো হয়েছিল। জিন্নাহ এই বক্তৃতার রেকর্ড ফলে রেফারেন্স হারিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেটা পরে ভারতের আর্কাইভে পাওয়া যায়। যা ভারত আবার একমাত্র রাইট-টি-ইনফরমেশন আইনে  এক ভারতীয় নাগরিককে অনেক পরে সরবরাহ করেছিল।

সেই সভায় জিন্নাহর বক্তৃতা সেটা। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সম্পর্কে জিন্নাহর মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে মৌলিক অংশটা নিচে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো :

মুল ইংরাজিটাঃ
We are starting in the days where there is no discrimination, no distinction between one community and another, no discrimination between one caste or creed and another. We are starting with this fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one State.
আমার অনুবাদঃ
‘আমরা একটা এমন দিন শুরু করতে যাচ্ছি- যেখানে আজ থেকে কোনো বৈষম্য, সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ, জাত চিহ্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে কোনো ভেদাভেদ গণ্য করা হবে না। আমরা সবাই নাগরিক এবং সমান নাগরিক- এই নাগরিক সাম্যের মৌলিক নীতিতে এক রাষ্ট্রে আমাদের দিন শুরু করতে যাচ্ছি’।

কিন্তু সবখানেই যে সমস্যাটা থাকে তা হলো, কথাটা বলা আর বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে দেখানো এর ফারাক সেটা পাকিস্তানের বেলাতেও আছে। কিন্তু অন্য সবার চেয়ে জিন্নাহ এই জায়গাতেই আলাদা যে তিনি জীবদ্দশাতেই তার ইমাজিন করা রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বৈষম্যহীনতা বা নাগরিক সাম্যের নীতির প্রতি তার প্রবল সমর্থন তিনি উচ্চারণ করে যেতে পেরেছিলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে জিন্নাহর নয়, গান্ধীর ভুল থেকেই…এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

গৌতম দাস

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2OV

 

 

_https://indianexpress.com/article/north-east-india/tripura/tripura-citizenship-bill-protest-northeast-india-tribal-parties-6150368/

এবার নাগরিকত্ব বিল। মানে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আনা এক সংশোধনী বিল [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)]। এর সোজা অর্থ হল আসামে এখন এবং ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যে এনআরসি তালিকা করার পর মুসলমান যারা বাদ পড়বেন, তাঁরা একেবারেই বাদ। আর তাঁরা বাদে বাদ পড়া অন্য সব ধর্মের সবাইকে যেন আবার ভারতের নাগরিকত্ব সহজেই দেয়া যায়; এরই এক খোলাখুলি নাগরিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হবে এটা। এই লক্ষ্যে মোদী সরকার আগামী সপ্তাহে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ওপর একটা সংশোধনী বিল আনতে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে মোদীর মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। আগামি সোমবার (৯ ডিসেম্বর) লোকসভায় পেশ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল।

বিজেপি-আরএসএসের একেবারে ওপরের নেতারা জানেন, মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো এটাই তাদের রাজনীতি। কেন? মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুরা ভাল – না, ঠিক এটা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাজ বা রাজনীতি নয়। তাদের মূল কাজ হল পোলারাইজেশন, মানে ভোটার মেরুকরণ। অন্য ভাষায় কাজটা হল হিন্দুদের আলাদা করা, হিন্দুরা আলাদা, ভালো আর সব কিছু তাদেরই- এটা সব সময় প্রমাণ করে চলা ও এই দাবি তাতিয়ে রাখা। কেন? কারণ এমনটা শুধু প্রমাণ করে রাখা তাদের কাজ নয়। বরং কাজের লক্ষ্য হল, হিন্দু হিসেবে তারা যেন এরপর দলবেঁধে কেবল বিজেপির প্রার্থীকেই ভোট দেয়। মানে বিজেপির বাক্সে সব হিন্দু-ভোট যেন এসে ঢুকে।

এই শেষ বাক্যটাই হলো আসল লক্ষ্য। অর্থাৎ মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুমাত্রই ভাল, এটা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার সময় আধা সত্য বা মিথ্যা যা খুশি কিছু প্রচার করা হল। এতে ধর্মীয় পোলারাইজেশন বা হিন্দু মেরুকরণ ঠিকঠাক করা হলো। কিন্তু কোনো কারণে বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট ঢুকল না। তাহলে কিন্তু এটা আর বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হবে না। বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে ফেলা- এটাই বিজেপির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চর্চা করার মূল লক্ষ্য।

স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ
এদের রাজনীতির বুঝও আজীব; মূলত তিনটি শব্দের- স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম বলে এ দুই শব্দের অর্থহীন কিছু আবেগী সুড়সুড়ি তুলে ফেলা আর তৃতীয়টা হল জাতীয়তাবাদ : মানে উগ্র-হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ রাষ্ট্র, অধিকার, নাগরিক, রিপাবলিক, কনস্টিটিউশন ইত্যাদি এসবই এদের কাছে একেবারে অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ও ধারণা। রাষ্ট্র বলে কোন ধারণা এদের কাছে অপ্রয়োজনীয় থাকে, তাই এর কোনো নীতিগত দিক যেমন নাগরিকের কিছু মৌলিক অধিকার থাকবে; যা রক্ষা করতে, সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- এটা বিজেপির রাজনীতিতে কোনো বিষয় নয়। অথবা ধরা যাক, রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে কোনো অধিকারবৈষম্য করতে পারবে না, আইনের চোখে সবাইকে সমান দেখবে ও আচরণ করবে ইত্যাদি বিষয়গুলো? রাষ্ট্রের এমন পালনীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটাও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিতে কোন আমলযোগ্য ব্যাপারই নয়। কেবল কেউ বিজেপি কি না, সে হিন্দুত্ব চিন্তার লোক কি না – সেটার দিকে চোখ রেখে চলে বিজেপির বাক্স ভরানোই এই রাজনীতিতে যথেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে বিজেপি-আরএসএস বা তাদের কর্মীরা কি কেবল এক হিন্দুত্বের আবেগের মধ্যেই তীব্রভাবে ডুবে থাকে- যেন কেবল এক হিন্দুত্বের ভাবাবেগের সুড়সুড়িই তাদের জন্য সব কিছু, ডুবে বুঁদ হয়ে থাকা? তাই কী? না, সম্ভবত তা একেবারেই নয়। যেমন আমরা পরীক্ষা করতে পারি এবার ভারতে পেঁয়াজ-উৎপাদক অঞ্চল বা রাজ্যে বন্যায় তা নষ্ট হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজসঙ্কট খাড়া করেছে। বাংলাদেশের মত ভারতেও নিজের বাজারেও পেঁয়াজের সঙ্কট চলছে। চড়া মূল্যের বাড়াবাড়ি হয়ত বাংলাদেশের মত না। কিন্তু মজার ঘটনাটা হল, তুরস্ক ভাল সহনশীল দামে ভারতকে পেঁয়াজ দিতে রাজি হওয়ায় সেই তুরস্ক ভারতের কাশ্মির নীতির কঠোর সমালোচনা করে ধুয়ে দিলেও এ ব্যাপারে মোদীর ভারত সরকার চুপচাপ। যেমন ভারতের অনলাইন ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় একটা খবরের শিরোনাম হলো, ‘মোদি সরকার তুরস্কের কাশ্মির সমালোচনা শুনেও চোখ বুজেছে; কারণ ভারতের এখন তুরস্কের পেঁয়াজ দরকার” [Modi govt ignores Turkey’s Kashmir criticism — because India needs its onions]।

আবার প্রায় একই রকমভাবে মালয়েশিয়ার মাহাথির গত সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে ভারতকে কাশ্মিরে ভারত ‘দখলদার বাহিনী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাতে ভারত প্রথমে ছদ্মরাগ দেখিয়েছিল যে, তারা আর মালয়েশিয়ার পামঅয়েল কিনবে না। কিন্তু দামে সস্তা পাওয়ায় ভারত এখন আগের মতোই মালয়েশিয়ার পামঅয়েল আমদানি করতে শুরু করেছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াল, উগ্র হিন্দুত্বের তথাকথিত আবেগ নয়, এমনকি মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়েও নয়; সুখ বলতে তা এখনো তাদের কাছে বিষয়-আশয়ের বস্তুসুখের মধ্যেই, সেখানে হুঁশ জাগ্রত রেখে খাড়া বৈষয়িক লাভালাভেই তাদের সুখ।

কাজেই ভুয়া হলেও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হল বাছবিচার হুঁশহীন এক উগ্র হিন্দুত্বই। যদিও সম্প্রতি তাদের পরপর দুইটা বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একটা হল মোদী সরকারের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মাপ জিডিপিতে ধস নেমেছে। আসলে বলতে হবে, এবারের ধস আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। দুই বছর আগে যেটা  ৮ শতাংশ বলে মোদী দাবি করেছিল, কিন্তু সেটা আসলে আড়াই পার্সেন্ট বাড়িয়ে বলা হচ্ছিল।  সেই বাড়ানো ফিগারটাও এখন কমতে কমতে এবার ৪.৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এটা সমাজের সব কোনায় হাহাকার তুলে ফেলেছে। কাজেই এটা ঢাকা দিতে এখন আবার কোনো এক জবরদস্ত মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণার ইস্যু দরকার।

এ ছাড়া তাদের আরেক বিপর্যয় ঘটেছে আসামের এনআরসি ইস্যুতে। তারা হিন্দুমনকে খুব তাতিয়েছিল যে, নিশ্চয় লাখ লাখ নাগরিকত্ব অপ্রমাণিত মুসলমান থেকে যাবে এমন-তারা তালিকায় দেখতে পাবে আশা করেছিল। কিন্তু হিন্দুদেরই হাহাকার উঠেছে কারণ নাগরিক-প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া মোট ১৯ লাখের ৭৫ শতাংশ হলো হিন্দু। এখন উঠতে-বসতে বিজেপিকে বদ দোয়া দেয়া আসামের এই হিন্দুদেরকে সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে বিজেপির। অন্যের জন্য খুড়ে রাখা গর্তে পড়ে এখন উলটা বিজেপিরই জান যায় অবস্থা।
তাই বিজেপি এখন অছিলা খুঁজছে দু’টি- ১. তৈরি হওয়া আসামের এনআরসি তালিকাই বাতিল বলে ঘোষণা করে দিতে আর ২. ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন।

বিজেপির মূল লক্ষ্য আসলে ‘বিদেশী’ বলে বা ‘মুসলমান’ বলে একটা কল্পিত স্থায়ী শত্রু খাড়া করে ফেলা; যারা সব সময় নাকি ভারতের ‘হিন্দুস্বার্থের বিরোধিতা’ যাচ্ছে এভাবে এমন একটা গল্প ও ইমেজ বিজেপি খুজছে যা দিয়ে সে একটা স্থায়ী শত্রুরূপ দান সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। বিজেপির ইচ্ছা কল্পিত এমন শত্রুর বিরুদ্ধেই সারাজীবন সে লড়াই করে যাচ্ছে তা দেখাতে পারে। যেন সে এই চেক ভেঙে ভেঙে সব সময় খেয়ে চলতে পারে, পোলারাইজেশন ও ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতি করে যেতে পারে। সে কাজে এমন স্থায়ী এক ইস্যু হতে পারে যেমন সেটা হতে পারে এমন যে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এই শ্লোগান।

তবে আসলে এটা আর অনুমান হিসেবে নেই, গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো এই বয়ানেই একমাত্র বিজেপি রাজনীতি করবে ও করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মোদি-অমিতের দানবগোষ্ঠী।

অর্থনীতিতে ডুবে গিয়ে এরা এখন এমন অবস্থায় যে ‘ভারতজুড়ে এনআরসি’ আর, বিদেশী খুঁজতে হবে- এটাই তাদের একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনার রাজনীতি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আঁচ করে দক্ষিণী প্রাচীন পত্রিকা দা হিন্দু এডিটোরিয়াল লিখে বলেছে The Centre should focus on the economy and address issues of real concern] কেন্দ্র সরকারের উচিত অর্থনীতির দিকে যেটা প্রকৃত উদ্বেগের ইস্যু সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।
যেমন এখন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নির্বাচন চলছে, সেখানে অমিত শাহ নির্বাচনী জনসভা বক্তৃতা করেছে- “ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে”, এই লাইন নিয়ে। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং- “আপনার পাশের লোকটা বিদেশী নয়তো, চেক করেছেন কী”- এমন বিদেশীভীতি বা জেনোফোবিয়া ছড়ানোর উদ্যোগ-রাস্তা ধরেছে। এটাকে এক মানসিক অসুস্থতা বললেও খুব কমই বলা হবে।

কিন্তু এর আগে ইতোমধ্যে আসামে যে ড্যামেজ ঘটে গেছে, তা হলো এনআরসি মোট ১৯ লাখ বাদ পড়াদের মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু। তাই এখন উলটা আসামের সমাজ থেকে এদের বাদ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হবে বিজেপিকে। তাই, এদেরকে বাঁচানোর ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে আগামী সপ্তাহে আনা হচ্ছে, ১৯৫৫ সালের পুরনো নাগরিকত্ব বিলের এক সংশোধনী। এটাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৯। যাতে তাদেরকে আবার নতুন করে নাগরিকত্ব দেয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে এই বিলে বলা হবে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানরা (কিন্তু মুসলমানরা বাদ) অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং উল্টো যেমন বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অভিবাসী এবং বৈধভাবে আসা অভিবাসী (কিন্তু যাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে), তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আসলে আগের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে কোনো অবৈধ অভিবাসী (ভিসা ছাড়াই ঢুকে পড়া বা ভিসার মেয়াদ শেষেও থাকা) বিদেশী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে না। সোজা কথায় মোদী নতুন আইনে এই বাধা তুলে দিতে চাইছে; কিন্তু মূলত মুসলমান ছাড়া বাকি সব ধর্মের মানুষের জন্য সুযোগ রেখে দিয়ে- এভাবে আনা হবে এই সংশোধনী। এটাই এর প্রত্যক্ষ মুসলমানবিদ্বেষ এবং মুসলমানবৈষম্য।

এমন এই বিদ্বেষ ও বৈষম্য তৈরি করা – এটাই হবে বিজেপি-আরএসএসের রাজনৈতিক পুঁজি। স্থায়ী ঘৃণাবিদ্বেষ তৈরি ও ছড়ানোর উৎস; যাতে এটা কেনাবেচা থেকেই স্থায়ীভাবেই পোলারাইজেশনে বিজেপি প্রার্থীর বাক্স ভরার রাজনীতি করে যাওয়া যায়। এক দিকে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এর রাজনীতি চালিয়ে অস্থির ঘৃণাবিদ্বেষ উত্তেজনা তাতিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা, মুসলমান তাড়িয়ে খাঁটি হিন্দুদের ভারত কায়েম করা- এ এক বিরাট মাইলেজের স্থায়ী ইস্যুর রাজনীতি বিজেপি-আরএসএস নিজের জন্য তৈরি করতে চাইছে। আর এ কাজ করতে গিয়ে কোনো হিন্দু এতে ফেঁসে নাগরিকত্ব খোয়ালে তাকে আবার নাগরিকত্ব দিয়ে আগের মতোই ভারতে রেখে দেয়া যাবে। এই সুবিধা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপি-আরএসএস-কে তাদের ঘৃণ্য-রাজনীতির ইস্যু সরবরাহের নিয়মিত খোরাক হয়ে থাকতে হবে, আর স্থায়ীভাবে নাগরিকবৈষম্যের শিকার হতে থাকতে হবে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের এই মুসলমান ‘বলি’ দিয়ে দেয়ার রাজনীতি- তা আবার ‘ভারত জুড়ে এনআরসি’ বা বিদেশী খোঁজো যে নামেই আসুক তা কি টিকেই যাবে? বিজেপি-আরএসএস এরাই কি একমাত্র সত্য হয়ে যাবে? আগাম কোনো কিছু শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা যায়।

এনআরসি নামে মোদি-অমিতের দানব শয়তানি শুরু ও শেষ হলে পরিণতি কী হয় তা মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে আসামের সবার তা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। অহমিয়া বা বিজেপি যতই এটা ‘বিদেশী’ বা মুসলমানরাই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে খুশিতে থেকেছিল বটে, কিন্তু সবশেষে এটা তাদের নিজের জন্যই খানাখন্দ খুঁড়ে রাখার মতো কাজ হয়েছে। এখন হাহাকার উঠেছে। শুধু তাই নয়, পড়শি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও এ বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষের তর্কে ওই বাংলাও এখন বুঝে গেছে যে, নাগরিকত্বের ডকুমেন্ট সার্টিফিকেট আর কার্ড জোগাড়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি কী জিনিস। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের যারা ইতোমধ্যে বিজেপিতে যোগ দিয়ে হিন্দুত্বে সুবিধা খাওয়া আর মুসলমানের রাস্তায় গড়াগড়ি যাওয়া ব্যালকনিতে বসে আরামে দেখা যাবে বলে ভেবেছিল, এরা নিজেই ইতোমধ্যে বুঝে গেছে এনআরসি কী জিনিস। এটা যে হিন্দু-মুসলমান বাছবিচার ছাড়াই নির্বিশেষে যে কাউকে চরমতম হয়রানির শিকার বানিয়ে ফেলতে পারে, সেটা এখন আসামের পরিণতি দেখে সবাই বুঝতে পেরেছে।

এনআরসিতে নাগরিক প্রমাণের দায় নাগরিকের, রাষ্ট্রের না। অথচ একটা ডকুমেন্ট ব্যক্তিপর্যায়ে রক্ষা সংরক্ষণ যতটা কঠিন রাষ্ট্রের হেফাজতখানা, সেটা রক্ষা উল্টো ততই সহজ। ব্যক্তি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে পারে সবচেয়ে সহজে। তাই স্বাভাবিক ছিল, কেউ নাগরিক নয় তা প্রমাণের দায় থাকা রাষ্ট্রের কাঁধে। ইন্দিরার আমলে একসময় এটা তাই ছিল।

এ ছাড়া এমনিতেই দুনিয়া এখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের- এর প্রধান স্বভাব বৈশিষ্ট্য তাই এমন যে পুঁজি আর শ্রমের (মানুষের) মাইগ্রেশন এখানে হবেই, তারা নিরন্তর ঘুরে বেড়াবে। শুধু মানুষ নয়, পুঁজিও এখানে দেশী-বিদেশী পরিচয় নেবে, ঘটবে। তাই ব্যাপক ইকোনমিক মাইগ্রেশন মানে বৈধ-অবৈধ লেবার মাইগ্রেশন সবচেয়ে কমন ঘটনা হবে এখানে। এর ওপর ভারতবর্ষের দেশভাগ- এটা নিজেই সবচেয়ে স্থায়ী এক রাজনৈতিক মাইগ্রেশনের ফেনোমেনা। যা কখনই একেবারে শেষ হয়নি, হবে না। ফলে এখানে একটা নিচু মাত্রার বা কিছু মাত্রার মাইগ্রেশন সব সময় আছে এবং আশা করি আরো অনেক দিন থাকবেই। একমাত্র বদ মতলব থাকলেই কেবল এটাকে কেউ ইস্যু হিসেবে হাজির করতে চাইবে, আর কেবল মুসলমানবিদ্বেষ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

‘মাত্র ছয় মাস। তার মধ্যেই ভগ্নমনোরথ দশা কাটিয়ে নিমেষে চাঙ্গা হয়ে উঠল তৃণমূল। তিনটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চমকে দেয়া পুনরুত্থান ঘটালেন নিজের দলের। তৃণমূলের ২১ বছরের ইতিহাসে কোনো দিন জয় মেলেনি যে দুই আসনে, সেই কালিয়াগঞ্জ এবং খড়গপুর সদর আসনও ছিনিয়ে নিল ঘাসফুল। আর লোকসভা নির্বাচনে করিমপুরে যে ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল, এবার জিতল তার চেয়ে অনেকটা বেশিতে।’ এটা এ মাসের শুরুর দিনে আনন্দবাজারের এক রিপোর্ট টুকে এনেছি।

গত মে মাসে মোদির আরো বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি প্রাদেশিক আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল এসেছে। তাতে এর তিন আসনই পেয়েছে মমতার দল। অথচ এ তিনটির দু’টিতে মমতার দল গত ২১ বছরে কখনো জিততে পারেনি। এই তিনটি আসনই হয় মুসলমান প্রধান অথবা বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া নয়তো বা আসাম লাগোয়া আসন। আর এসব সত্ত্বেও এগুলোর দু’টি ছিল সিপিএম বা কংগ্রেসের দখলে। আর একটি এমন রাজ্য বা বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন, যা গত কেন্দ্র নির্বাচনে প্রথম বিজেপি দখলে যাওয়া আসনের অন্তর্গত। তাই এবারের নির্বাচনের শেষে ফলাফল দেখে সব পক্ষই একবাক্যে স্বীকার করেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সবাই এনআরসি আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে, ভুগছে। এনআরসি তাদের আক্রমণ করে ফেলেছে। কলকাতার বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও স্বীকার করে নিয়েছেন বলে রিপোর্ট বলছে, Dilip Ghosh on Saturday identified “fear and confusion over NRC” ।

তাই সেই আতঙ্কের একমাত্র ত্রাতা হিসেবে মমতা তাদের আশ্রয় হয়ে ধরা দিয়েছে। তাই মমতার বিজয়। আগে তারা ভেবেছিল বিজেপির উত্থানে মুসলমানের কোণঠাসা হওয়া দেখতে তাদের খারাপ লাগবে না হয়তো। কারণ, ‘মমতা নাকি চাপে থাকা মুসলমানদের রশি আলগা করে মাথায় তুলেছিল।’ আর এখন বেলকনিতে বসে “মুসলমানদের কষ্ট পাওয়া দেখার মজা” দেখতে চাওয়ারা বুঝে গেছে, ব্যাপারটা এমন মজা-তামাশার নয়। এনআরসি মানে নিজেই নিজের জন্য হয়রানি ডেকে আনা, পকেটের পয়সা খরচ করে দুঃখ কেনা। তারা প্রত্যেকে ছোট চাকরি বা ব্যবসায় স্বল্প আয়-ইনকামে অস্থির থাকতে হয় এমন জীবন যাপন করেন। সেখানে উটকো নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের টেনশন? এই হয়রানি ডেকে আনা তাদের জীবনের অর্থ কী! কলকাতায় ইতোমধ্যে রেশন কার্ড বা ডকুমেন্ট ইত্যাদি জোগাড়ের নীরব দৌড়াদৌড়ি কেউ কেউ শুরু করে দিয়েছেন। কাজেই কেউ পারলে তাদের সেই ত্রাতা হতে পারেন মমতা- এই মেসেজই তারা হাজির করে ফেলেছেন!

ইতোমধ্যে আর একটা বড় ডেভেলপমেন্ট আছে। গত মে মাসে শেষ হওয়া নির্বাচনে এক ব্যাপক কারচুপি হয়েছে আর তা মূলত ডিজিটাল ব্যালট-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার সুযোগে। এটা বিজেপি ছাড়া মূলত সব আঞ্চলিক দল বিশ্বাস করে। যদিও হাতেনাতে দেয়ার প্রমাণ হাজির করা মুশকিল। এ ধারণা আরো জোরদার এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রিম কোর্ট গত নির্বাচনে খোদ মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যায়নি। পাশ কাটিয়ে চলেছে। সেটিও আবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল যে, যদি তা করতে হয়, তবে আগ্রাসী মোদির নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়ার রিস্ক তাদের নিতেই হতো। যদিও কনস্টিটিউশনালি সে ক্ষমতা তাদের দেয়াই আছে। কিন্তু কেউই আসলে সঙ্ঘাতে যেতে চায়নি। এমনকি একজন সক্রিয় আপত্তিকারী কমিশনার এখনো মোদির নির্বাহী ক্ষমতার হয়রানির শাস্তি ভোগ ও মোকাবেলা করে চলেছেন।

তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ইতোমধ্যে তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সংসদে ১৯টা বিজেপি-বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়েছে। ‘নির্বাচনী সংস্কার, ব্যালট ফেরানোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে’ রাজ্যসভায় স্বল্পমেয়াদি আলোচনার জন্য যৌথভাবে নোটিশ দিয়েছেন এ দলগুলোর নেতারা। এমন ইস্যুগুলো আস্তে ধীরে বড় ও সফল হয়ে উঠতে পারে, যা বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে পারে। আপাতত আগামী সপ্তাহের উত্তেজনা নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল নিয়ে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা গত  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

মোদীর অর্থনীতিতে ধ্স আর লুকানো গেল না

গৌতম দাস

০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2Os

ভারতের অর্থনীতির দুরবস্থা আর লুকিয়ে রাখা গেল না। এবছর মোদীর দ্বিতীয়বারের সরকার ক্ষমতায় বসার পর দ্বিতীয়-ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে গত ২৯ নভেম্বর। এবারও জিডিপি আরো অর্ধশতাংশ কম। অর্থাৎ গত কোয়ার্টারে ছিল ৫ শতাংশ, সেই জিডিপি এবার হয়েছে আরো কমে, ৪.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এটা আগের তিন মাসের চেয়েও আরো কম।

গত ২০১৬ সাল থেকে তথ্য লুকিয়ে বা আড়াল করে না হলে, গণনার ভিত্তিবছর বদলানো বা অন্য কোনো ছলে আড়ালে দিয়ে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে মোদী সরকার যে খেলা করে আসছিল  সেসব এবার আর অস্বীকার করার বা লুকিয়ে ফেলে পালাবার সুযোগ অনেক কিছুই আর থাকল না। তবে শেষে এসে এখন তর্কটা হল, জিডিপি ৪.৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে, সেটা তো লুকানোর নাই। তাই এখন বিরোধীদের সাথে তর্কের পয়েন্ট হল, অর্থনীতি ধীরগতি বা শ্লথগতির এটা স্বীকার করে নিয়েও মোদীর অর্থমন্ত্রী গলাবাজির করে বলছে এটা এখনও অর্থনৈতিক “মন্দা” [recession] বলে ডাকা যাবে না। ভারতের পার্লামেন্টে এই তর্কই চলছে এখন।

রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে নজর বা খেয়াল রাখার মূল কাজটা হল “মনিটরিং”। উৎপাদনের সামগ্রিক এবং ঘুঁটিনাটিতেও তথ্য-পরিসংখ্যানে অর্থনীতি কোথায় কমল না বাড়ল এবিষয়গুলো যেকোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নিয়মিত চোখে চোখ রাখা হয়। এই চোখ রাখা বা মনিটরিং ডাটা সংগ্রহের ব্যাপারটার সাধারণ স্ট্যান্ডার্ড হল প্রতি বছর এটা চারবার মানে প্রতি তিন মাস শেষের ডাটা সংগ্রহ করে পুরো হিসাবনিকাশ গণনা প্রক্রিয়া শেষ করা হয় একবার করে, এভাবে বছরে চারবার বা চার কোয়ার্টারে। আর প্রতি বছর এই চারবারের গড়টাই আবার বছরের জিডিপির মান বলে প্রকাশিত হয়। গতকাল ২৯ নভেম্বর ভারতের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক বা কোয়ার্টারের (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) জিডিপির হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সেকেন্ড কোয়ার্টারের জিডিপি ৪.৫ শতাংশ। কিন্তু এর তাৎপর্য কী?

প্রথমত, বাইরে প্রকাশ্যে যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এই অর্থে, কথাটা হল, এক বিরাট ধরনের হতাশা ছেয়ে বসেছে ভারতের  অর্থনৈতিক জীবনে, সর্বত্র। ইংরেজি দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা থেকে টুকে আনা কিছু তথ্য দেখা যাচ্ছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯ এই কোয়ার্টারে ম্যানুফ্যাকচারিং কমেছে ১ শতাংশ, কৃষিতে বেড়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ হারে, স্থাপনা-কাঠামো ৩.৩ শতাংশ বেড়েছে ও বিদ্যুৎ বেড়েছে ৩.৬ শতাংশ, ইত্যাদি। [Data released by the National Statistical Office showed that while manufacturing contracted by 1 per cent in the July-September quarter, agriculture grew by 2.1 per cent, construction by 3.3 per cent and electricity generation by 3.6 per cent.]।

এছাড়া ইন্ডিয়া রেটিং ও রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইকোনমিস্ট সুনীল কুমার সিনহার উদ্ধৃতি দিতে একই পত্রিকা লিখেছে, এবারের জিডিপি এমন কমে যাবার পিছনে তিনি দুটা কারণ উল্লেখ করেন – “কেনাকাটা কমিয়ে দেয়া মানে ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন আর রপ্তানিতে ধবস নামা”  […slowdown in GDP growth is largely on account of the slump in consumption expenditure and de-growth in export]।

এসব আবার অবশ্যই হঠাৎ করে ঘটে নাই। যেমন কারখানা উৎপাদনের মধ্যে গত তিন মাস ধরে প্রাইভেট কার উতপাদনের কোম্পানিগুলোর অবিক্রীত গাড়ির তথ্য ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছিল বানের জলের মত। অবিক্রীত গাড়ির সংখ্যা সেখানে দেখিয়েছিল বছরের উৎপাদিত গাড়ি্র ৪৫ শতাংশই  অবিক্রীত।

আসলে ভারতের জিডিপির পরিসংখ্যানের হিসাবে এর ধারাবাহিক পতনের শুরু হতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের মার্চের পর থেকে। মানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শেষ কোয়ার্টার জানুয়ারি-মার্চ -এর পর থেকে, সেবারই ছিল শেষ উঁচু জিডিপি ৮.১ শতাংশ। এর পর থেকে গত দেড় বছর ধরে চলছে টানাভাবে ওই শেষ উঁচু জিডিপিরই পতনের কাল। এটাই ধারাবাহিকভাবে প্রতি কোয়ার্টারে কমতে কমতে এসে এবার হয়েছে সাড়ে চার শতাংশ। যেটা এর আগের কোয়ার্টারে (এপ্রিল-জুন ২০১৯) ভারতের জিডিপি ছিল ৫ শতাংশ।

জিডিপিকে আবার উপমহাদেশের ভিত্তিতে ভাগ করে দেখে এর ভিন্ন কিছু তাৎপর্য বুঝা যেতে পারে। যেমন, এখানে বলে রাখা যায়, এশিয়ান জিডিপি হিসাবে সাড়ে চার শতাংশ হওয়ার অর্থ এটা খারাপ জোনের মধ্যে পড়ে যাওয়া, মনে করা হয়। সে হিসাবে পাঁচ বা এর বেশি শতাংশকে ভাল জিডিপির শুরু মনে করা হয়। আবার তুলনায় ইউরোপ-আমেরিকা্‌ সেখানে কোন রাষ্ট্রের চার শতাংশ জিডিপি হয়ে যাওয়া মানে এটা খুবই ভাল উন্নতি। সাধারণত ইউরোপ-আমেরিকা এই জোনের দেশ এক-দুই শতাংশের জিডিপিতেই আটকে থাকে। মূল কারণ পুরনো কলোনি মালিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অর্থনীতি বা উন্নত অর্থনীতির আমেরিকা বলতে এরা আসলে পুর্ণ-সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড [saturated] অর্থনীতি বলে মানা হয়। তাই এটা যা আছে তাতে টিকে থাকতে পারা সেটাকেই অনেক সাফল্য মনে করা হয়।

তুলনায় এশিয়ান যেকোনো অর্থনীতি মানেই  কয়েক শত বছর ধরে থেকে উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজি পাচার হয়েই চলে গেছে এমন অর্থনীতিই হবে সেটা। এই কারণে কলোনিমুক্ত স্বাধীন হওয়া পরেও একালে এসব দেশে অবকাঠামো ও উৎপাদনে বিনিয়োগের ব্যাপক পিছিয়ে থাকা ঘাটতি মেটাতে বিদেশী পুঁজি ধারে নিয়ে তা সুদসহ ফেরত দিয়েও এসব রাষ্ট্রের অনেক আগানো-উন্নতির পটেনশিয়াল থাকে। এরই থ্রেসহোল্ড জিডিপি মানে ন্যূনতম পা-রাখার জায়গা হল ৫ শতাংশ জিডিপি। আবার দেশ যোগ্য দল ও নেতৃত্ব পেলে এরা এর চেয়েও অনেক উপরে উঠতে পারে। কিন্তু এসব দেশের জিডিপিকে ন্যূনতম আট শতাংশের উপরে না নিতে পারলে বিরাট পরিবর্তনের স্বপ্ন আশা করা, স্বপ্ন দেখা অবান্তর। আবার ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে যেমন চীন, ১৯৯০-২০০৭ এই সময়কালে অনেক বারই ডাবল ডিজিট বা ১৩.৬ শতাংশ পর্যন্ত নিজের জিডিপি উঠিয়েছিল।

আবার ওদিকে আরেক ফেনোমেনা দেখা দিয়েছে একালে। দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস ফিগারের মধ্যে  বাইরে থেকে হাত ঢুকিয়ে দেয়া –  বিভিন্ন দেশে আজকাল এটা অনেক বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এভাবে আজকাল তথ্য-পরিসংখ্যান সাজিয়ে-বানিয়ে নেয়া ও ভাল পরিসংখ্যানের দাবি করা হচ্ছে অনেক বেশি। অনেকে এমন দাবি উঠে আসা কেন – এর মূল কারণ হিসাবে – ভোট বা পপুলার রাজনীতিকে দায়ী করেন। মানে এই প্রবক্তারা বলতে চায় রাজনীতিতে ‘পপুলারিটি’ বা ভোটের রাজনীতি আজকাল এতই প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ এরা বলতে চাচ্ছে আগে এটা এত বড় বিষয় ছিল না। এই প্রবক্তারা যেন বলতে চায়, আগে পাবলিক অনেক রয়েসয়ে ভোটের সিদ্ধান্ত নিত। আর এখন হয়েছে উল্টো। এই কথাটা সত্য যে, খারাপ পারফরম্যান্স বা খারাপ অর্থনীতিতেও ওর তথ্য ঠিকঠাক লুকিয়ে রেখে অনেক শাসক অনেকদূর তথ্য আড়াল করে কাটিয়ে দিতে পারে ও পারতে দেখা যাচ্ছে।

অবশ্য আমাদের নিজের দেশে ভোট না হলেও এখানে পপুলারিটি মানে মিথ্যা যেকোনো কিছু পরিসংখ্যান দাবি করার সুযোগ কত বেশি- সেটা বুঝতে হবে। তবে আমাদের দেশের মতই ভারতেও তথ্য-পরিসংখ্যান লুকানোর একটা ভালো উপায় হল, গণনার ভিত্তিবছর বদলে দেয়া। অর্থনীতির পরিসংখ্যান গণনা প্রক্রিয়ায় বিরাট অংশটাই তুলনামূলকভাবে বলা হয় এমন ভাষ্য। অর্থাৎ কোন কথা বলার সময় তাতে কোন একটা বছরকে ভিত্তি বছর ধরে এর ধারণা তৈরি করে কথা বলা হয়। কিন্তু এখনকার প্রবল প্রচলন হল ভিত্তি বছর কিভাবে কোন বছরকে ধরলে আমার আমলের পরিসংখ্যানগুলো বড় ফিগার দেখাবে, উজ্জ্বল্ হয়ে উঠবে সেভাবে ভিত্তি বছর বদলে নেয়া হচ্ছে। এমন মিথ্যা বলার সহায়ক পরিসংখ্যানবিদও আজকাল অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এটা আমাদের দেশে হচ্ছে, মনমোহনের আমলে অভিযোগ ছিল, মোদীর আমলে সে অভিযোগ আরো বেশি।

গতকালের (৩০ নভেম্বর) আনন্দবাজার,  জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক অধ্যাপিকা জয়তী ঘোষের বরাতে মনে করাচ্ছে, “মোদী জমানায় জিডিপি মাপার পদ্ধতি বদলে দেওয়া হয়। সেই পদ্ধতি নিয়েই বিতর্ক রয়েছে”।  পত্রিকা আরও লিখেছে, “বস্তুত, মোদী সরকারের প্রাক্তন মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনই বলেছিলেন, নতুন পদ্ধতিতে জিডিপি মাপায় তা ২ থেকে ২.৫ শতাংশ অঙ্ক বেশি হচ্ছে। তাঁর কথা মানলে আদতে আর্থিক বৃদ্ধির হার ২ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে”। অর্থাৎ পরশু যে জিডিপি ফিগার ৪.৫% বলে দেখানো হয়েছে এটাও আগের প্রকৃত হিসাবে এখন এটা মাত্র ২%।

ভারত চেম্বারের সভাপতি সীতারাম শর্মার আশঙ্কা, কেন্দ্র ব্যবস্থা না-নিলে দেশকে মন্দার হাত থেকে বাঁচানো কঠিন। তাঁর দাবি, ‘‘আর্থিক হাল ফেরানোর কোনও ব্যবস্থাই ফল দেয়নি। চাহিদা বাড়ানোর ব্যবস্থা চাই।’’ অনেকেরই আশঙ্কা, বৃদ্ধির হার আর যদি না-ও কমে, তবু বছর দুয়েকের মধ্যে তার মাথা তোলার সম্ভাবনা কম।

সে যাই হোক, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদীকে অর্থনীতিতে প্রথম নেতি প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় ‘ডিমনিটাইজেশন’ [demonetization] নিয়ে। মানে প্রচলিত ভাষায় যাকে সরকারের “নোট বাতিলের” সিদ্ধান্ত বলা হয় সেটা।  মানে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় হঠাত, মোদীর পাঁচশ ও হাজার রুপির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছলেন সেকথাই বলা হচ্ছে। এটা ছিল অর্থনীতিতে নেতি প্রতিক্রিয়া-পরিস্থিতিকে যেন মোদীর নিজেই ডেকে আনার এক কাজ।

যেন এতে মোদীর সরকার বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ধরে ফেলতে পারবেন, আর তাতে একক হাতে বিরাট ছক্কা মেরে দেবেনই, এই মিথ্যা লোভে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে ভারতের অর্থনীতি উলটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। বিরাট ইতিবাচক ফলাফলের আশা অথবা অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে ইত্যাদি এমন কিছু আশা ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মোদী।  কিন্তু না, এমন কোনো কিছুই আসেনি, এমন কোনো কিছু মোদির কপালে জোটেনি। উলটো ভারতের অর্থনীতি প্রবলভাবে ধাক্কা খেয়েছিল। সেই থেকে মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আর কখনো তার কোনো অর্থনৈতিক সাফল্য আছে এ কথা বলতে পাবলিকলি সামনে যান নাই।

‘ইনফরমাল সেক্টর’ [informal sector] বলে একটা কথা আছে। অনেক ঝকমারি কথা মনে হলেও আসলে তা নয়। ফরমাল সেক্টর কথাটার সোজা অর্থ হল, একটা গ্রামে যদি একটা গাড়ির কারখানা বসিয়ে ধরা যাক ৬০০ লোককে কারখানার ভেতরে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যায় তবে ওই এলাকায় ঐ শ্রমিকদের একেকজন পিছু আরও ছয়জন করে মোটামুটি প্রায় আরো ছত্রিশ শত লোকে বিভিন্ন কাজ পাবার অবস্থা হবে, এটা ধরা হয়। এতে ৬০০ জনের ফরমাল চাকরি হলে, মানে তাদের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ সৃষ্টি করলে এতে অপরিকল্পিতভাবে আর বাকিরা (ছত্রিশ শত) ইনফরমাল শ্রমিক হিসেবে কাজ পাবে।  যদিও এরা কারখানার ভিতরে কাজ পাবে না। বাইরে নানা সহায়ক পেশা যোগাড় করে নিবে। এদের মধ্যে বাদামভাজা বেচতে আসা অথবা শ্রমিকদের ভাত রান্নার লোক, কিংবা চা দোকানি, সবজি বা মুদি দোকানি বা হকার ইত্যাদি – এরা এমন বিভিন্ন পেশার লোক হবে।

মোদির ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণায় সয়লাব করা সবচেয়ে বড় নেতি প্রভাব হল, মোদীর নোট বাতিলের ঘোষণায় কাজ হারিয়ে ‘বলি’ হয়ে গিয়েছিল ভারতের এই ইনফরমাল সেক্টর। ভারতের শিল্পে অগ্রসর রাজ্য বলতে মুম্বাই, গুজরাটকে ধরা হয়। এ কথার আরেক প্রমাণ হল, ২০১৬ সালের আগে এখানের নিম্ন মধ্যবিত্তের হাতে  আয়-ইনকাম ভাল হওয়াতে কিছু বাড়তি সঞ্চয়ও আসত। আর তা আসত বলেই সেই সূত্রে কলকাতার স্বর্ণকাররা প্রতি ওস্তাদ সাথে তার ছয় সগরেদকে নিয়ে মুম্বাই বা গুজরাটে সেখানে দোকান দিয়ে বসতে দেখা যেত।

এতে স্বর্ণকার ওস্তাদ-সাগরেদরা নিয়মিত কলকাতায় পরিবারে টাকা পাঠাতে পারত। মানে সব পক্ষেরই আয়-ইনকাম নিয়ে বেচে থাকা একটু ভাল হচ্ছিল। কিন্তু হঠাত সবই ডুবে গিয়েছিল মোদীর ঐ ‘নোট বাতিলে’। কারণ সবারই আয়-ইনকাম এলোমেলো হয়ে যায় এতে। বিশেষ করে বাড়তি কাজ বা আয়ের সুযোগ যেখানে ছিল সেখানে সব, সবার আগে ছেঁটে পড়েছিল। তাই সেই শকিং ফলাফল বাস্তবতার মুখে ওস্তাদ-সাগরেদেরা সবকিছু গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে চলে গেছিল। অর্থাৎ ফরমাল কাজ দিতে না পা্রার ব্যর্থতা ভারতের অর্থনীতির বহুদিনের। কিন্তু তা থাকলেও ইনফরমাল কাজ যোগাড় করে আধপেটে খেয়ে হলেও নিজের সারভাইবাল মানুষ কষ্ট করে যোগাড় করে নিচ্ছিল। কিন্তু মোদীর   ডিমনিটাইজেশন খুবই অবিবেচক সিদ্ধান্ত বলে হাজির হয়েছিল। ডিমনিটাইজেশন গরীব জীবনকে আরও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছিল। মূল কারণ বাজারে লেনদেন করার মত মুদ্রার অভাব আর তা থেকে ছড়িয়ে পড়া অনাস্থা। সেখান থেকে শঙ্কা। সার কথায় মোদীর অর্থনীতিও মানুষকে ফরমাল চাকরি তো দিতেই পারে নাই, কিন্তু মোদী ডিমনিটাইজেশন করে মানুষের ইনফরমাল কাজ-চাকরিটাও খেয়ে ফেলেছিল।

ভারতের অর্থনীতির আরেক পুরানা মূল সমস্যা হল, এখানে ফরমাল সেক্টরে যে কাজ পেল পরের ছয় প্রজন্মের সন্তানেরও হয়ত আর ফরমাল চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।  কথাটা অন্যভাবে বললে, কষ্ট করে কোন সরকারের একটা টার্ম অর্থনীতি ভালো চললেও পরেরবার এটা শেষ, ঢলে পড়বেই। মনমোহনের আমলে তাই হয়েছিল। তাই দ্বিতীয়বার কংগ্রেস-জোট (২০০৯) আবার জেতার পর মনমোহন সরকারের অর্থনীতির ঢুবে সব শেষ হয়ে গেছিল। আবার পরে ২০১৪ সালে মোদী প্রথমবারই ক্ষমতায় আসার দু’বছর পরে (২০১৬) খারাপ দিন চলে এসেছিল। আর এখন তো খারাপ দিন শুরু হয়ে গেল সম্ভবত।

এ দিকে, গতকালই মনমোহন সিং এক বিরাট বাণী দিয়েছেন মোদীকে। সেটা ঠিক বিরোধী রাজনীতিকের বক্তব্য নয়, যেন পেশাদার অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরামর্শ, এমন মানে দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রায় ৮০০ শব্দের এক পরামর্শ বক্তব্য। না অবশ্যই, সব সমস্যার ধনন্বরি সমাধান মনমোহন বা তার কংগ্রেস দলের কাছে এখন আছে অথবা তাদের আমলেও হাতে ছিল ব্যাপারটা তা একেবারেই নয়। বরং সেকালে মনমোহনের দ্বিতীয় টার্মের যে অর্থনৈতিক ধস নেমেছিল, দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কোনো সমাধান সে সময় মনমোহনের হাতেও ছিল না। কেবল মোদী তখন উলটো মনমোহনের বদলে তিনিই পারবেন কারণ গুজরাট চালানোর অভিজ্ঞতা তার আছে এই ভুয়া আশ্বাস তৈরি করে তিনি পরে (২০১৪) ক্ষমতায় জিতে আসতে মনমোহনের সেই ব্যর্থতাকে পুঁজি করতে পেরেছিলেন কেবল।

গতকালের মনমোহনের সেই লিখিত বক্তৃতার সার কথাটার শিরোনাম হল ‘ভয়ের রাজত্ব’ [“climate of fear” ]। মনমোহন আসলে অভিযোগ তুলে বলছেন যে, মোদী এখন ভারতে এক ‘ভয়ের রাজত্ব’ সৃষ্টি করে রেখেছেন। অনুবাদ করা সেই দু’লাইন হল এ রকমঃ
“উল্লেখযোগ্য ভয় ও অবিশ্বাস আছে অর্থনীতিতে নানান অংশগ্রহণকারীদের মনে। রাষ্ট্রের থেকে তুলনামূলক স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষগুলো, তদন্ত-গোয়েন্দা দফতরগুলো ইত্যাদি – এদের উপর আমাদের জনআস্থার সব কিছু ক্ষয়ে গেছে। আমাদের সমাজের এক গভীর অনাস্থা, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ভয় ও অসহায়ত্ববোধ – এসবের বিষাক্ত মিশ্রণে আমাদের অর্থনৈতিক তৎপরতার দমবন্ধ হয়ে আসছে, আর তা থেকেই অর্থনৈতিক উন্নতিও দমবন্ধ হয়ে আসছে” [“There is profound fear and distrust among our various economic participants. Public trust in independent institutions such as the media, judiciary, regulatory authorities, and investigative agencies has been severely eroded. This toxic combination of deep distrust, pervasive fear and a sense of hopelessness in our society is stifling economic activity and hence economic growth,” ] ।

অর্থাৎ মূলত এক পলিটিকো গভীর অভিযোগ তুলে মনমোহন মোদীকে ভাল বিধিঁয়েছেন।

কিন্তু এগুলো সম্ভবত ঘটনার আসল দিক নয়। কারণ, আগামী আরো চার বছর তাহলে মোদী-আরএসএস রাজ্য নির্বাচনগুলো করবে কিভাবে, কী হাতে নিয়ে? আরো বেশি করে হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়! – মানে এনআরসি, সিটিজেনশিপ, গরু বা লিঞ্চিং ইত্যাদির তাণ্ডব দিয়ে! তাই নয় কি?

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ৩০ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির অর্থনীতির ঘণ্টা বেজে গেল!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

গৌতম দাস

১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৫, সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Nl

 

[সার সংক্ষেপঃ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কোন মুল্যায়ন চোখে পড়ে না। ফাঁপা আবেগী কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের পুজা বা স্তুতি দেখা ছাড়া। কেউ সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বোধের চিহ্ন বা রাজনৈতিক অবস্থান – তা নাও হতে পারে। নেতাজী সুভাষ এই তিন গুণের ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্র বা রাজনীতি জ্ঞান বলে কিছু ছিল তা জানা যায় না। জাপানি রেসিস্ট শাসকের ফ্যাসিজমের রাজনীতি ছিল। “নেতাজী” তিনি তাদের ট্রেনিং পেয়েছিলেন। ঠিক যেমন বার্মিজ জেনারেলেরা পেয়েছিলেন। এবং জাপানি সামরিক সহযোগিতায় এই জেনারেলেরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্য-মুক্ত করেছিলেন। কাজেই নেতাজী সুভাষ যদি জাপানি সামরিক সহায়তায় সশস্ত্রভাবে ভারতকে স্বাধীন করে ফেলতেন তবে তিনিও বার্মিজ  জেনারেলদের মত যাদের কৃতিত্ব হল নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো, ক্লিনজিং আর রেসিজম, ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি বৈশিষ্ঠের – এদের মতই নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! ]

ROAR বাংলা থেকে নেয়াঃ হিটলারের সাথেও সাক্ষাত করেছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসু; Source: commons.wikimedia.org

আসল নাম সুভাষচন্দ্র বসু, সংক্ষেপে সুভাষ বোস [Subhas Chandra Bose]। বৃটিশ-ভারতে অবিভক্ত বাংলার এক রাজনীতিবিদ, কংগ্রেস দলের দু’বারের সর্বভারতীয় সভাপতি। কিন্তু কলকাতার হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্তের যারা ঢবঢবে ইমোশনাল, এদের চোখে তিনি ‘নেতাজী’। প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে মধ্যবিত্তের সস্তা আবেগের নেতা হলেন সুভাষ বোস। এদেরই স্বীকার করে নেয়া সুভাষ বসুর খেতাবি নাম হল ‘নেতাজী’।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনসীমা খুবই ছোট, ১৯২১-১৯৪৫ সাল। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর ১৯২০ সালে বৃটিশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে না দিতেই সেই চাকরি ছেড়ে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর অপরপ্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, তিনি  বৃটিশ কলোনির এক বাসিন্দা হয়েও বৃটিশ-প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানি ও জাপানের সামরিক সাহায্য নিয়ে ছোট হলেও এক সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধে বৃটিশদেরকে পরাজিত করবেন ভেবে জাপানি সহযোগিতায় জাপানে বসে নিজস্ব এক সেনাবাহিনী (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা INA) বা আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়েছিলেন। যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ মেরুকরণের দিক বিচার করে বললে,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা-বৃটিশ-রুশ ইত্যাদি ‘মিত্রবাহিনীর’ কাছে জার্মানি, ইতালি ও জাপান ‘অক্ষশক্তির’ জোটের পরাজয় ঘটেছিল। ফলে সুভাষের বাহিনীকেও ১৯৪৫ সালে বৃটিশদের কাছে সারেন্ডার করতে হয়েছিল। কিন্তু এরপর দেশে ফিরতে যে সামরিক বিমানে তিনি উঠেছিলেন, এখান থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ বলেন তাইপেই-য়ের (এখন তাইওয়ানের রাজধানী) আকাশে প্লেন ক্রাশ করে  মারা গেছেন, কিন্তু সেই লাশ কই কেউ জানে না।  এরপর ঠিক কী হয়েছিল সুনিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না বরং ব্যাপারটা রহস্য আবৃতই থেকে যায়। কিন্তু এ’ঘটনাটাই আবার আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগ আরও সপ্তমে তুলতে ভুমিকা রেখেছে।

বয়সের হিসাবে নেহরু সুভাষের চেয়ে ৮-৯ বছরের বড়। তবে একসাথে কাজ করেছেন। যেমন, ১৯২৮ সালের কংগ্রেস দলের সম্মেলনে, গান্ধী আর মতিলাল নেহরু (জওয়াহেরলাল নেহরুর বাবা) এরা হেদায়েত করছিলেন “বৃটিশ ডমিনিয়ান রুল” দাবি করে দলের প্রস্তাব পাস করাতে। ডমিনিয়ান [Dominion] মানে হল, ভারতকে বৃটিশ শাসন কর্তৃত্বের অধীনেই রেখে ও মেনে, কেবল নিজেদের জন্য এক সীমিত স্বায়ত্বশাসন চাওয়া। আর এক্ষেত্রে গান্ধীর বিপরীতে তারুণ্যের অবস্থান নিয়েছিলেন জওয়াহেরলাল নেহরু আর সুভাষ বোষ, তাদের দাবি ছিল”পূর্ণ স্বাধীনতা”। সেকালে ‘পূর্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হত ডমিনিয়ান শব্দটা নাকচ করতে। যদিও নেহরু আর সুভাষ কংগ্রেসের একই উপধারার রাজনীতির লোক ছিলেন না। এটা ছিল তাদের  সিনিয়রদের বিরুদ্ধে কমন এক অবস্থান নেয়া।

সুভাষ বোস ছিলেন মূলত সব সময় আপাত ‘রেডিক্যাল’ বা সশস্ত্রতার রাজনীতির পক্ষে। আর একভাবে বলা যায় তিনি গান্ধীর আপোষকামী ও অহিংস ধারার রাজনৈতিক এপ্রোচের বিপরীতে বৃটিশের বিরুদ্ধে সংঘাত করে করে আগানো – এই লাইনের লোক।

সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই।

এখানে একটা কথা খুব পরিস্কার করে আমাদের মনে পরিস্কার রাখা দরকার। সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই। এই স্বল্প পরিসরে এর কিছু বুঝতে, একটা চিহ্নের কথা বলা যেতে পারে। যেমন সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা দিয়ে কেউ এমনকি “দেশ স্বাধীনও” করে ফেলতে পারে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে এরা দেশ বুঝে কিন্তু রাষ্ট্র বুঝে না। স্বাধীনতা অর্জনের পরে এরা কী রাষ্ট্র গড়বে? কী রাষ্ট্র গড়বে, কেমন? এরা জানে না। কারণ চিন্তা করে নাই। কলকাতার নেতাজী, সুভাষচন্দ্র বসু এমনই দেশপ্রেমী বিপ্লবী!

যদিও সুভাষ তাঁর দল খুঁজে নিয়েছিলেন ঐ কংগ্রেসকেই; তবে সেটা তিনি আসলে তার গুরু চিত্তরঞ্জন দাশের (মৃত্যু হয় ১৯২৫ সালে) কংগ্রেস দলেই এসে যোগ দিয়েছিলেন। এটা বড় প্রভাবক ছিল। কিন্তু আবার রেডিক্যাল যদি তিনি হবেনই, তবে কংগ্রেস দলে যোগ দিতে গিয়েছিলেন কেন? এর কোনো সদুত্তর বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আবার তিনি কোনও কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট রাজনীতিও করতেন না। ফলে এ কারণে তার চিন্তাকে রেডিক্যাল যদি বলি, তবে সে কথা টেকানোও মুশকিল। কোন এক আবছা রংয়ের সোশালিজমও তিনি পছন্দ করতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনটা হলেও ব্রিটানিকাও তাঁকে প্রমাণহীনভাবে সোশালিস্ট বলতে চেয়েছে। তা খুব সম্ভবত সেকালের যেসব ট্রেড ইউনিয়নিস্ট বা কৃষক আন্দোলনের নেতা যারা আবার দল হিসাবে কংগ্রেসেই থাকতেন আর যারা সারাজীবন কংগ্রেস দলের ভিতর গান্ধীর গালমন্দ খেয়ে কোনঠাসা হয়ে থাকতেন – এদেরকে আনুকুল্য দিতেন সুভাষ – এই কারণে।

তবে সুভাষের সশস্ত্রতা এর আরও বৈশিষ্ট আছে। যেমন তা আবার বৃটিশদের শত্রু হিসেবে খোদ হিটলার, তারই সাথে সখ্য গড়ে, সামরিক সাহায্য নিয়ে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেন – এমন লোক হলেন সুভাষ। এমনকি এই ‘নেতাজী সুভাষ’ আবার গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেসের ১৯৩৭ সালের প্রথম (বাংলাসহ সাত প্রদেশে) প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি জার্মান-জাপানের সহযোগিতায় বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে এমনই বদ্ধধারণায় ডুবে মোহাচ্ছন্ন ছিলেন যে, ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভারত ছেড়ে পালিয়ে তিনি জর্মানিতে গিয়ে খোদ হিটলারের সাথে দেখা করেন।

কিন্তু হিটলার, এত দূর সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা এসে জড়িয়ে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন বলে তিনি না করে দিলে, সুভাষ সেখান থেকে হিটলারের সহায়তায় জাপান চলে যান। হিটলারের যুদ্ধের বন্ধু জাপানের শাসক মার্শাল তেজোর [Tōjō Hideki] সাথে দেখা করেন আর সেখান থেকেই নেতাজী সুভাষের সামরিক সহায়তা পাওয়ার কপাল খুলে যায়। জাপানি সহায়তায় বাহিনী গড়ে নিয়ে সুভাষ একসময় বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে যান। তিনি বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর বার্মা সীমান্ত দিয়ে জাপানি বিমান হামলার কাভার বা ছত্রছায়ায় দুটো বৃটিশ সীমান্ত চৌকি আক্রমণ করে (ইম্ফল ও কোহিমা, দুটোই আজকের মনিপুর ও নাগাল্যান্ড ছোট দুই রাজ্যের রাজধানী) দখল করেছিলেন বলা হয়। এটাই তাঁর সর্বসাকুল্যে কৃতিত্ব ধরা হয়।

এর আগে তিনি যে অনেক দিন ধরেই (সম্ভবত ১৯২৭ সাল থেকে) জার্মান-জাপানের শাসকদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন তা কংগ্রেস দলের সিনিয়রেরা অনেকেই জানত। সুভাষ বোস কংগ্রেস দলে নিজ গ্রুপিং শক্তিশালী করে ১৯৩৮ সালে প্রথম কংগ্রেস দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি পরের বছরও একই প্রভাবে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হবার শেষে গান্ধী পরে আলটিমেটাম দেন যে, সুভাষকে পদত্যাগ করতে হবে; না হলে কমিটির বাকি নির্বাহী সদস্যরাও পদত্যাগ করবে। এর মূল কারণ ততদিনে সুভাষের জার্মান-জাপানের সাথে যোগাযোগ-সম্পর্কটা খুবই পরিপক্ক হয়ে উঠে স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তাই কংগ্রেসের রাজনীতিকে সশস্ত্রতার পক্ষে হেদায়েত করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তাই সুভাষের হেদায়েতি ঠেকাতেই গান্ধীর এই আলটিমেটাম এসেছিল। তখনই সুভাষ নিজের গ্রুপকে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ [Forward Bloc] নাম দিয়ে আলাদা দল হিসেবে প্রকাশ করেন। ফরওয়ার্ড ব্লক নামে দলটা এখনো কলকাতায় আছে আর তা “বামফ্রন্ট” নামে কলকাতাকেন্দ্রিক যে কমিউনিস্টদের জোট আছে তারই এক শরিক দল। মজার কথা হল, এই “ফরওয়ার্ড ব্লক” দল নিজেদেরকে এক কিসিমের কমিউনিস্ট দল বলে দাবি করে। কিন্তু কোন সূত্রে তারা কমিউনিস্ট, এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সম্ভবত আবছা জোড়াতালির ভাষ্যটা হবে এ রকম যে, তারা সশস্ত্রভাবে ‘দেশ স্বাধীন’ করার লোক। সুতরাং তারা ‘বিপ্লবী’ না হয়ে যায় না। আর বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিবাদী তো বটেই। অতএব…।

কিন্তু তাহলে আসল কথায় আসি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ মানে অবিভক্ত বাংলার থেকে পূর্ববঙ্গের আলাদা প্রদেশ ও ঢাকা এর রাজধানী হয়ে যাওয়ায় হিন্দু-জমিদারদের এর প্রবল বিরোধিতা শুরু করেছিল, পাগল হয়ে গেছিল। সেই ইস্যুতে অথবা খোদ জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদে পূর্ববঙ্গের দাবির প্রতি সুভাষ বসুর অবস্থান কী ছিল? এক কথায় ভিন্ন কিছুই না। একেবারেই আর পাঁচটা হিন্দু কংগ্রেসের নেতা, গান্ধী-নেহরুর মতই ছিল সুভাষের অবস্থান। অর্থাৎ হিন্দু-জমিদারি স্বার্থের নেতাই তিনিও। মূলত এ কারণেই নেতাজী (সুভাষচন্দ্র বসু) কংগ্রেস দলে গান্ধী-নেহরুর বিরোধী ক্যাম্পের নেতা হলেও তিনি পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তখন বা এখন কেউ হতে পারেন নাই, নন। যদিও সুভাষ কংগ্রেসে যোগ দেন অনেক পরে ১৯২১ সালে আর ততদিনে মানে ১৯০৫ সাল থেকেই এসব ভাগাভাগি ঘটে গিয়েছিল।

এরপরেও আমরা দেখব, বাংলাদেশে খুঁজে পাবো কেউ কেউ সুভাষ বোসের ছবি বা মূর্তি সাজিয়ে রেখেছেন ড্রয়িংরুমের শোকেসে। যেমন বাংলাদেশে টাটা গাড়ির এজেন্ট কোম্পানির মালিক অথবা কোন দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারের কেউ। সম্ভবত তাদের সাধারণ বুঝাবুঝি অবস্থানটা হল – কংগ্রেস দল যে হিন্দুইজমের দল, এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দল, তা অনেকে জেনেও লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। করে বলতে চায় কংগ্রেস  মানে তো প্রগতিশীলতা, কাজেই কংগ্রেস দলের কোনো নেতার চিহ্ন তো ধারণ করাই যায়।  তা দোষের নয়। অথবা উপরে বলা আগের ফর্মুলা যে সশস্ত্রতা মানেই বিপ্লবীপনা মানেই প্রগতিশীলতা। এ রকমই কিছু একটা ধামাচাপা বুঝ!

সম্প্রতি মোদীর এই জমানায় বিজেপির হাতে কিছু পুরানা বিতর্ক টেনে তোলা হয়েছে। মোদী বা বিজেপি দলের ধারণা নেতাজী সুভাষ যেহেতু কংগ্রেসের নেহরু-গান্ধীর বিরোধী ধারার, কাজেই হিন্দু কোলকাতার ‘নেতাজী’ আবেগে কৌশলগত সুড়সুড়িতে সমর্থন দিলে আখেরে বিজেপির তাতে লাভ আছে। তাই গত নির্বাচনে নেতাজীর এক ভাতিজার ছেলে চন্দ্রকুমার বসু, তিনি বিজেপির প্রার্থী হিসেবে কলকাতা থেকে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও জিততে পারেননি। সম্প্রতি সুবীর ভৌমিক এনিয়ে লিখেছেন। তিনিও একই নেতাজী আবেগ আঁকড়ে লিখেছেন – মোদী-বিজেপিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “গেরুয়ারা অপরিহার্যভাবেই বদহজমে ভুগবে”।

কারণ, পরবর্তিতে এসে হঠাৎ সেই চন্দ্রকুমার মোদীর বিজেপিকে এক হুঁশিয়ারির কথা বলে বিপদে ফেলে দিয়েছেন। বলেছেন, “মোদীর দল যদি ঐক্যবদ্ধ ভারতের নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ অনুসরণ না করে, তবে দেশ টুকরা টুকরা হয়ে যাবে”। কথাটা বিজেপির নেতাদের জন্য বিব্রতকর সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু এটা কোন অর্থপূর্ণ কথা তিনি বলেননি। কারণ, চন্দ্রবসু যদি এ কথাই আওড়াবেন তবে বিজেপির টিকিট নেয়ার তো তাঁর কথা নয়। তিনি বিজেপিতে গেছিলেন কেন? আবার বিজেপি যে তাঁর এই বয়ান বা নতুন রাজনীতির কেউ না, সেটা তো সকলেই আগে থেকেই জানে। কাজেই এই তামাশা অর্থহীন। স্টান্টবাজি করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

এ ছাড়া আবার চন্দ্রকুমারের উদ্ধৃত ও কথিত ‘নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ’- এটা আবার কী জিনিস? চন্দ্রবসু নিজেই এর জবাবে বলছেন যেহেতু, “নেতাজীর সেনাবাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম-শিখ ইত্যাদি” সব ধর্মের লোক ছিল তাই এটাই নাকি “নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ”। এসব কথা আসলে সোনার-পাথরের বাটি ধরণের। একজন কথিত মুসলমান প্রেসিডেন্ট থাকলেই ভারত একটা সেকুলার দেশ, এসব পোলাপানি বোকা-বুঝের রাজনীতি অনেক দিন ধরে চলে আসছ্‌ দেখেছি আমরা। এগুলো অর্থহীন, না বুঝে কথা বলা। যারা রাষ্ট্র ধারণা রাখেন না, এই ইস্যুতে কোন বুঝাবুঝি না রেখে আন্দাজে বলা কথা এগুলো। এরা না বুঝে মর্ডান রাষ্ট্র না বুঝে কোন সেকুলারিজম! তবু আন্দাজে কথা বলে যায়।

আসলে ব্যাপারটা হল, শত বিপ্লবীপনা ফলালেও ভারতের স্বাধীনতা কোনও সশস্ত্র আন্দোলনের ফলাফলে অর্জন হয় নাই। টেবিলে বসে আপোষ-আলোচনায় পাওয়া স্বাধীনতা এটা। এই আত্মশ্লাঘা নিয়ে  আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের মনে মেলা আপসোস আছে। এই ফাঁপা আবেগী জোশ মেটাতে “নেতাজী” এক ভাল টোটকার নাম। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা যায়, নেতাজীর অবদান কী? তখন আবার আরেক প্রশ্ন, কারও অবদান মাপে কেমনে? কারণ এটা তো জানা নাই। তবু তাতে যেমন যদি বলা হয়, তিনি জাতীয়তাবাদী ছিলেন? এখন জাতীয়তাবাদী মানে কী? অথবা তিনি কী রাষ্ট্র বুঝতেন? কেউ জানে না। আচ্ছা তাহলে বলেন যে, আপনার নেতাজীর ভারত রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে অবদান কী? এবার কবিরা একেবারেই নীরব হয়ে যাবে। অনেকে বলতে চাইবেন তাঁর মৃত্যুরহস্য কী কিছু না? মানে তিনি বলতে চাইছেন, এখানে গোয়েন্দা গল্পের প্লট আছে। কিন্তু আছে হয়তো তাতে কী?

এতেও নেতাজীর অবদান কী তা দেখানো যায় না। আসেন তাহলে উল্টো জায়গায় তাঁর হিটলারের সাথে দেখা করা বা জাপান যাওয়াকে মূল্যায়ন করি। না, হিটলার খারাপ তাই নেতাজী ভাল হয় কেমনে সেকথা না হয় নাই তুললাম। সেসব বাদ রেখেই আগাই। প্রথমত, জার্মান-জাপান যেতে নেতাজীর ভারত ছেড়ে বের হয়ে পড়া; এটা তার অবসেশন ও এক আবেগ মাত্র। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল  অধিকারভিত্তিক কলোনিমুক্ত রাষ্ট্র ও জাতিসঙ্ঘ জন্ম দেওয়ার এক নতুন ব্যবস্থার দুনিয়া কায়েম বনাম রেসিজম ও ফ্যাসিজমের কলোনি মালিকের দুনিয়া- এ দুয়ের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। যেখানে হিটলাররা দ্বিতীয় বা নেতিপক্ষ। এ দিকটা মূল্যায়নের ক্ষমতা হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগী-গর্বের কলকাতার নেই। আবার সময়ের সেন্সের দিকটা দেখেন। সুভাষ জাপান পৌছেছেন ১৯৪৩ সালের ২ জুলাই। কিন্তু ঘটনা হল ততদিনে যুদ্ধ ঘোরতর জায়গায় পৌছেছে শুধু তাই না। বরং বলা যায় যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেটা হল, হিটলার-তেজো-মুসোলিনির জোটপক্ষ হেরে যাচ্ছেন।  আসলে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকেই আমেরিকান রুজভেল্ট  এর বিজয়ের বাতি জ্বলে উঠে গিয়েছিল। বাকি ছিল তা ঘটতে যে সময়টা লাগে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সুভাষ বোস তা আমল করার যোগ্য বোধবুদ্ধির লোক ছিলেন না।

নেতাজী সুভাষ ভারত স্বাধীন করে ফেললে কী হত?
সবশেষে একটা পরিণতির কথা দেখিয়ে শেষ করব। ধরা যাক নেতাজী সুভাষ ও তাঁর সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিতে গেছেন। তারা ভারত স্বাধীন করে ফেলেছেন।  তাহলে কেমন ভারত দেখতাম আমরা?
আগে বলেছি দুটো সীমান্ত চৌকি তারা দখল করতে পেরেছিলেন, ইম্ফল ও কোহিমায়। কিন্তু এগুলো সবই বার্মা-ভারত সীমান্তে কেন?

এর মূল কারণ বা ঘটনার ভিতরের ঘটনা হলঃ জাপান মানে কলোনি শাসক মার্শাল তেজোর জাপানের সামরিক সহায়তায় ১৯৪২ সালে  বার্মা একবার বৃটিশ শাসনমুক্ত হয়ে গেছিল। ঠিক যেমনটা সুভাষ বোস স্বপ্ন কল্পনা দেখতেছিলেন। সেই জাপানিজ-বার্মায় এবার জাপান থেকে  সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজকে তুলে এনে এর হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিল। আর তাতে এই রাজধানী রেঙ্গুনে বসে ভারত-বার্মা সীমান্তে হামলা করা আর কঠিন কাজ ছিল না। আর তাতেই দুটা সীমান্ত চৌকি মুক্ত করার দাবি।

আসলে আমরা কেমন নেতাজী দেখতাম- এর এককথার জবাব হল, বার্মার এখনকার রোহিঙ্গা-কচুকাটা করা বীরত্মের জেনারেলদের মতই এক নেতাজী সুভাষের জেনারেলদের ভারত – এটাই দেখতে পেতাম আমরা। বার্মা প্রথমবার বৃটিশ কলোনি দখলে চলে যায় ভারত বৃটিশ-দখলে চলে যাওয়ার ৬৭ বছর পরে, ১৮২৪ সালে। যদিও ১৮৮৫ সালে তৃতীয় ও শেষ বৃটিশ-বার্মার যুদ্ধের পরে সেবার বার্মা স্থায়ী দখল হয়ে যায়। আর এতে বার্মা একই বৃটিশ-ভারত শাসক প্রশাসনের অধীনেই ভারতেরই একটা প্রদেশ (বার্মা প্রদেশ নামে) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ও শাসিত হতে শুরু করেছিল। এর ফলে বার্মার ভিতরে পাবলিকের দিক থেকে ধীরে ধীরে যে সর্বব্যাপী মূল অসন্তোষ দেখা দেয় এর লিড নিয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়্কেন্দ্রিক আন্দোলনকারি জনগণ। তাদের তপ্ত ক্ষোভের কেন্দ্রীয় সার বক্তব্য হল এই বলে যে, বৃটিশরা ভারতীয় সহকারীদের সাথে নিয়ে এসেছে আর তাদের দিয়েই বার্মা প্রশাসন চালাচ্ছে। আর এরই সাথে চাকরি-ব্যবসার পুরা বিষয়গুলোতে ভারতীয়রাই বার্মা এসে জেঁকে বসে গেছে, সব কিছুতে দখল দিয়েছে। বৃটিশ শাসকদের এই ভারতপ্রীতি এই প্রেফারেন্স – বার্মিজদের বদলে পুরনো অভ্যস্ততায় ভারতীয়দের অগ্রাধিকার করে ফেলা এটাই জেনোফোবিক বা বিদেশিবিরোধী করে তুলেছিল বার্মিজ এলিটদেরকেও।

অর্থাৎ বার্মিজ মধ্যবিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ভারতীয়রা বার্মায় চাকরি-ব্যবসা করত। এই অসন্তোষ বৃটিশরা টের পেয়ে ব্যবস্থা নিয়েছিল অনেক পরে ১৯৩৭ সালে। এতে  বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয়, বার্মার জন্য আলাদা বৃটিশ শাসক প্রশাসন কায়েক করতে করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই ১৯৩৭ সালে এসে বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয় ঘোষণা করা হয়। বার্মা আলাদা বৃটিশ-বার্মা কলোনি হিসেবে শাসিত হতে শুরু করেছিল।

কিন্তু ততদিনে বিক্ষুব্ধ বার্মা জাপানের তোজোর নাগাল পেয়ে গিয়েছিল। জাপান “ত্রিশজন বিপ্লবী” তরুণকে সবার আগে জাপানে নিয়ে গিয়ে সরাসরি ট্রেনিং দিয়েছিল। Aung San, U Nu এরা ছিল ঐ ত্রিশজনের মূল নেতা। Aung San হল একালে অং সাং সুচির বাবা।  পরে ঐ ত্রিশের তাদের হাতেই একটা পুরা সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এদেরকে সামনে রেখে পেছনে জাপানি আর্মি মিলে একত্রেএরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্যমুক্ত অর্থে স্বাধীন করে ফেলেছিল। পরে নতুন গঠিত সরকারের আজকের সু চির বাবা ওই ৩০ জনের একজন হিসাবে ১৯৪৪ সালে জাপান সমর্থিত বার্মা সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় ঐ বছরই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। মায়ানমারে এখনও ঐ ত্রিশজনকে বিরাট বিপ্লবী জাতীয় বীর মানা হয় যারা জাতীয় গর্বের। যদিও বলা হয় বর্তমানে ঐ ত্রিশজনের মধ্যে মাত্র দুজন জীবিত। যার একজন আবার ব্যাঙ্কক-এ নির্বাসিত জীবনে আছেন। ওদিকে পরবর্তিতে বার্মায় এই ত্রিশজনের-দলের বিরোধী ছিল যারা এদেরকে ১৯৪৪ সালে এক ফ্যাসিবাদবিরোধী জোটে শামিল করে, সম্মীলিতভাবে বৃটিশরা ফিরে বার্মা দখল করেছিল, বিশ্বযুদ্ধ শেষে। পরে অবশ্য ওই ৩০ জনের বেশির ভাগই বার্মার (১৯৪৮ সালে) নতুন ক্ষমতায় আসীন হয়ে যায়।

দুনিয়াতে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তায় জাপানিজদের অবদান রাখার মত কিছু নাই। ওদিকে সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকার সাথে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তার সাথে জানাশুনা পরিচিত থাকার কোন সম্পর্ক নাই।

তাহলে অসুবিধা কী? মানে নেতাজী ভারত মুক্ত করতে পারলে আমাদের কী অসুবিধা হত? অসুবিধা বিরাট।  বৃটিশরা কলোনি মাস্টার, জাপানের মার্শাল তেজোর সাম্রাজ্যও তাই। কিন্তু আরও বিরাট তফাত আছে। তা হল, বৃটিশদের হাত দিয়ে রেনেসাঁ চিন্তাও এসেছিল, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কী তা জানা গেছিল। আর জাপানের মার্শাল তেজোর হাত ধরে এসেছিল রেসিজম আর ফ্যাসিজম-এসবের জয়জয়কারের ধারণা। নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরানা “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরনো “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” শিক্ষা উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

আজ জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী? মার্শাল তেজোর ফ্যাসিজম? না। কারণ মার্শাল তেজো-দের কাছে রাজনীতি শব্দটাই অপরিচিত ছিল। কোন গণক্ষমতা, কোন রিপাবলিক, জনপ্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি সব মিলিয়ে কোন ধরণের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাই তাদের ছিল না। ছিল এক এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য ধারণা আর ছিল নির্মম বর্ণবাদিতা, ফ্যাসিজম -ইত্যাদি এগুলোই একমাত্র সত্য এই ধারণা। আজ জাপানে পার্লামেন্ট, সিনেট নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা ইত্যাদি আছে। যেগুলো সরাসরি কপি করে গড়ে নেয়া হয়েছে। সমাজে এসব নিয়ে কোন পক্ষও নাই এমনকি বিপক্ষও নাই। এজন্য সাথে অবশ্য আছে এরপর থেকে জন্মগতভাবে হতাশ জাপানি নাগরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তাদের কাছে জবাব নেই যে কেন তারা এমন দানব ছিল, কেন তারা সেকালে চীন আর দুই কোরিয়া এই পুরা অঞ্চল জুড়ে  সকলকে তাদের কলোনি বানিয়ে রেখেছিল? কেন কোরিয়ান মেয়েদের যৌন সেবাদাসী বা “গেইসা” বানানো আর নির্মমতার কিছুই করতে তাদের শাসকেরা বাকি রাখেনি! এই লজ্জা থেকে মুখ লুকাতে, জবাবহীনতা থেকে আপাত মুক্তি পেতে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকান মার্শাল প্লানে নতুন  বিনিয়োগ  পেয়ে, মিথ্যা করে নতুন উদ্যম দেখিয়ে জাপানিজরা “কাজপাগল” [workaholic] সাজার সুযোগ নিয়েছিল। নইলে সদলে আত্মহত্যা করার রাস্তাটাই কেবল তাদের জন্য বাকি খোলা ছিল!  রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হতে পারে এনিয়ে এমন রাজনৈতিক চিন্তায় এক কথায় বললে জাপানের অবদান শুণ্য। হয়ত নেগেটিভ। অথচ জাপান তো বৃটিশ এম্পায়ারের মত একই ধরণের কলোনি দখলদার এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য শক্তি।

আর জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত বার্মা? ওর কপালে যুদ্ধের পরে নতুন কিছু শিখবার সেই সুযোগ আর জোটেনি। তাই সেই আপাত সংশোধনও জোটেনি। তাই একালে বার্মা মায়ানমার হলেও এর মানে আসলে পুরনো জাপান। মার্শাল তেজোর জাপান। কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! আর বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে!

কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন হয়ত! অথবা আর নির্মম ও বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে! রেসিজমে বর্ণবাদীদের একটা “অপর” লাগেই, তাতে একটা না একটা ‘অপর’ হলেই চলে!

কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের এক ভগবান নিশ্চয়ই আছেন, বোধ করি! নইলে কার আশীর্বাদে তাঁরা- নেতাজী, এক বার্মিজ জেনারেলের মত- এক নেতাজী, এমনটা দেখার হাত থেকে বেঁচে গেলেন! সত্যিই সে এক বিষ্ময়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ১৬ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নেতাজী সুভাষ কেন বাংলাদেশের কেউ ননএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

আসছে, আবার বাবরি মসজিদ!

আসছে, আবার বাবরি মসজিদ!

গৌতম দাস

 ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Mh

SC has asked the special judge conducting the trial to deliver judgement within 9 months ইন্ডিয়া টুডে

ভারতের প্রধান বিচারপতি চলতি মাসে অবসরে যাচ্ছেন। খুব সম্ভবত ১৭ নভেম্বরের মধ্যে। এদিকে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ইস্যু আমাদের মনে কিছুটা আবছা হয়ে এলেও ইস্যুটা মুছে যায়নি। সেটা আবার উঠে আসতে যাচ্ছে এ মাসেই; কারণ ভাঙ্গা মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ হবে কিনা সে বিষয়ে আদালতের রায় প্রকাশিত হবে। আর তা হওয়ার কথা প্রধান বিচারপতির অবসরে যাবার আগেই।

লাগাতার তিন বছর ধরে নানান তোড়জোড়ের পর আরএসএস-বিজেপি হিন্দুত্বের জিগির তুলে সেই ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এটা যে  কথিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানুষ এর পরিকল্পিত দাঙ্গাহাঙ্গামার আয়োজন দিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল এনিয়ে এক স্টিং অপারেশন বিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, ২০১৪ সালে।  আর পাবলিকলি উন্মোচিত বিষয় হয়েই ছিল এটা যে আরএসএস-বিজেপির নানান অঙ্গসংগঠনসহ প্রধানত “বিশ্ব হিন্দু পরিষদের” নেতৃত্বে উন্মাদনার দাঙ্গা বাধিয়ে এই মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এক্ষেত্রে, তাদের অভিযোগ বা অজুহাত ছিল যে, এখানে আগে রামমন্দির ছিল, তাই তারা পুনরায় সেই মন্দির স্থাপন করতে চেয়ে মসজিদ ভেঙ্গেছিল।
মসজিদ ভেঙে ফেলার পরে ইস্যুটা এরপরে একপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টে আসে। তবে তা এই বলে যে, ঐ ভাঙা মসজিদের  স্থানে রামমন্দির গড়া আইনানুগ হবে কি না, এরই বিচার হবে আদালতে। কিন্তু দীর্ঘ দিন নানা অছিলায় এটা ঘুরেফিরে বন্ধ থাকার পর এ বছর থেকে শুনানির তারিখ পড়তে শুরু করেছিল।

মসজিদ ভাঙ্গা, আজ প্রায় ২৭ বছর আগের সেই ঘটনা এটা। এ ছাড়া বিজেপি এখন ক্ষমতায়। তাই বুক ফুলিয়েই এখন বিজেপি প্রকাশ্যেই বলছে, হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে সেই উন্মাদনাকে ক্যাশ করে ভোটের বাক্স ভরানোর লক্ষ্যেই তারা বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল। এছাড়া তাদের এই হিন্দুত্ববাদের জিগির তোলা, “এর ফায়দা ও মুনাফা নাকি কংগ্রেস” বা অন্য কেউ নিতে পারবে না।

সম্প্রতি এই কথাগুলোই টেনে এনেছেন ‘শেষাদ্রি চারি’[SESHADRI CHARI]।  শেষাদ্রি বিজেপি দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য আর, ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ [The Print] নামে এক অনলাইন পত্রিকায় তিনি, এক মতামত-কলাম লিখেছেন। ‘দ্য প্রিন্ট’ ভারতের ঠিক মেইনস্ট্রিম না হলেও মেইনস্ট্রিম পত্রিকার কিছু সম্পাদক ও সিনিয়রদেরই নিজস্ব এক পত্রিকা, তাই একটু ব্যতিক্রমী ও আমলযোগ্য। কলাম লেখক শেষাদ্রি চারি আবার আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে তিনি ‘অরগানাইজার’ [The Organiser] পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক। কোন ‘অরগানাইজার’ পত্রিকা? এর এত বিখ্যাতিই বা কী? ১৯৪৭ সালের ভারতভাগের কিছুদিন আগে থেকে প্রকাশিত শুরু হওয়া আরএসএস-হিন্দু মহাসভার প্রধান মুখপাত্র ও প্রাচীন দলীয় সংগঠক পত্রিকা এই অরগানাইজার; যেটা, সেই থেকে এখনও প্রকাশিত হয়ে চলেছে।

শেষাদ্রির লেখা সেই কলামের শিরোনাম হল, “বিজেপি জানে – এক ব্যাংক-চেক দু’বার ভাঙানো যায় না, অযোধ্যা এমনই এক ইস্যু [“BJP knows Ayodhya issue is a ‘cheque that cannot be encashed twice” ]।’ বাবরি মসজিদ ভাঙার ইস্যুটা উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বলে একে “অযোধ্যা” ইস্যু বা কখনো সেই স্থানে রামমন্দির বানাতে চায় বলে একে “রামমন্দির আন্দোলনের” ইস্যু বলে অনেকে ডাকে। শেষাদ্রির এই লেখায় তিনি সেখানে স্পষ্ট করেই বলেছেন, আজকের (২০১৯) দ্বিতীয়বার বিজয়ী মোদী সরকার পর্যন্ত বিজেপির যে ধারাবাহিক উত্থান, এর শুরুটাই হয়েছিল সেই ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার লাভালাভ থেকেই। লাভালাভ বুঝাতে তিনি লুকোছাপা না করে পরিস্কার দু’টি শব্দ বা ধারণা ব্যবহার করেছেন – এক. বলেছেন ‘পলিটিক্যাল ডিভিডেন্ট’ [political dividends ] বা রাজনৈতিক লাভের ভাগ-মুনাফা।
এছাড়া দুই. ‘নির্বাচনী ইস্যুতে একে ব্যবহার’ [utility as an electoral issue] অর্থে এই ইস্যুর ব্যবহারযোগ্যতা। অর্থাৎ বাবরি মসজিদ ভেঙে দিয়ে ভারতের জনগণের হিন্দু ধর্মীয় আবেগকে উসকে তুলে সামাজিক বিভক্তি বা হিন্দু-অহিন্দু পোলারাইজেশন করে ফেলা আর এরপর সেই আবেগকে বিজেপির ভোটের বাক্সে ক্যাশ করে নেয়া – এই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আর এটা ব্যবহার করেই তারা ১৯৯২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিস্তর লাভ তুলে চলেছে। এ পর্যন্ত ক্ষমতার শিখরে উঠে এসেছে।
মানুষের জীবন চলে যাচ্ছে, গেছে অথচ এরা ডিভিডেন্ট খুজছে এর ভিতরে! ধিক এই রাজনীতি!

“Ayodhya is no longer an issue that can yield political dividends for any party, regardless of whether it opposes or supports the Ram Mandir movement. While the Ram Mandir-Babri Masjid dispute remains an emotive issue, it has outlived its utility as an electoral issue. To borrow a phrase used by a late BJP leader, it is a ‘cheque that cannot be encashed twice’ ”.

গত ১৯৯২ সাল থেকে শুরু করে তিনি পরের প্রতিটি নির্বাচনে ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৯ এভাবে, বিজেপির নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে বারবার বাবরি মসজিদ ইস্যু কিভাবে ছিল – মসজিদ ভাঙা স্থানে সেখানে রামমন্দির নির্মাণ করতে হবে – এই ইস্যু সব সময় কিভাবে হাজির ছিল বর্ণনায় সেটা উল্লেখ করছেন। আবার এটাও বলছেন, কিন্তু বিজেপির সরকার ১৯৯৮ সালের নির্বাচনের সময় থেকে নিজে জবরদস্তি মন্দির নির্মাণ না করে আইনি পথে (মানে আদালতের রায়-নির্দেশে) এর বাস্তবায়নের কথা বলে গেছে মেনিফেস্টোতে। কেন?
শেষাদ্রির ব্যাখ্যা হল, তার লেখার শিরোনামে যা বলা হয়েছে – চেক দু’বার ভাঙানো যায় না। অর্থাৎ বিজেপি মন্দির নির্মাণ ইস্যু থেকে আবার দ্বিতীয়বার অর্থ বা ফয়দা তুলতে পারবে না। যদিও এখন থেকে মন্দির নির্মাণ আসলে সে অবশ্যই করবে – ভুলে আয় নাই যাবে না। তবে ‘আদালতে রায়ে যেভাবে বলবে’ সেভাবে। অর্থাৎ এতে দায় হবে আদালতের। আবার তিনি স্পষ্ট করে দিচ্ছেন, এই মন্দির নির্মাণ ইস্যু থেকে কংগ্রেস চাইলেও বিজেপিকে বাদ দিয়ে ইস্যুটাকে নিজের ভোটবাক্স ভরতে কাজে লাগাতে পারবে না।

কথা ঠিক বটে। কারণ বিজেপি যেমন ন্যাংটা হয়ে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভারতীয়দের নাগরিক নয়, ‘হিন্দু’ হয়েই ভোট দিতে আহ্বান জানায়, এই সুযোগটা তাদের মত করে কংগ্রেস দলটাও নিতে পারবে না। শুধু তাই নয়। বিজেপির প্রত্যক্ষ ইসলামবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতা করে বিরোধী বক্তব্য দেয়ারও মুরোদ নেই কংগ্রেসের; বরং এমন কাজ করলে “হিন্দু পরিচয়ের ভোট” তাতে আরও টান পড়বে; তা আর তার বাক্সে না যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাস্তবে এটাই স্পষ্ট ধরা পড়েছিল গত নির্বাচনেও। আর ২০১৬ সালের আসামের রাজ্য নির্বাচন চলাকালীন সময় থেকেই আগেই প্রস্তুতি নেয়া একটা সার্ভ-স্টাডি করা হয়েছিল। সেই রিপোর্টের ফাইন্ডিংসও তাই ছিল। এই কারণে, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীও গত নির্বাচনে (মে ২০১৯) বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ন্যূনতম কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতা দূরে থাক নিজেই “আরেক ব্র্যান্ডের হিন্দুত্ব” নিয়ে ভোট চাইতে নেমেছিলেন। আবার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন যে, তাঁর এটা “সফট হিন্দুত্ব”। অর্থাৎ এটাও আর এক ব্র্যান্ডের হিন্দুত্বই। মানে হিন্দুত্বই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের বা প্রধান দুই দলের জন্য একমাত্র রাজনীতির বয়ান-কাঠামো।

আবার শেষাদ্রি আর এ্ক ইঙ্গিত দিয়ে বলছেন, রামমন্দির নির্মাণ ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন রায় কোনো-না-কোনোভাবে, কোনো-না-কোনো শর্তে এক রামমন্দির নির্মাণ করার পক্ষেই যাবে বলে তিনি মনে করেন। সারা ভারতে এখন প্রবল হিন্দুত্বের জোয়ার বইছে, বিশেষ করে কাশ্মীরে ভারতের দখলদার হয়ে ওঠার পর থেকে পরিকল্পিত আবেগ জাগিয়ে মানুষের মাঝে ধ্বংসাত্মক জিগিরে পৌঁছানো হয়েছে। এটাই শেষাদ্রির অনুমান বা পরিস্থিতি নিয়ে রিডিং।

কয়েক বছর ধরে আদালত রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে মামলা ফেলেই রাখা ছিল, শুনানির কোনো তারিখও ফেলা হয় নাই, বলা যায়। মনে হয়েছে ২০১৯ সালের মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে আদালত কোনো তারিখ ফেলতে চায়নি। তবে মে মাসের পর গত তিন মাসে একনাগাড়ে চল্লিশ কার্যদিবস ধরে শুনানি সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা ও শুনাশুনির তর্ক চলেছিল। পরে সেসব প্রক্রিয়ার সমাপ্তিও ঘোষণা করা হয়েছে। এখন রায় দেয়ার অপেক্ষায়, তবে তারিখ ঘোষণা হয়নি। কিন্তু প্রধান বিচারপতির অবসরে যাওয়ার আগে শেষ কার্যদিবস ১৭ নভেম্বর বলে সবার অনুমান, এর আগেই রায় ঘোষণা তিনি করে যাবেন।

ভারতে এই রায় বাস্তবে শেষে কী আসে, তাতে ভারতে কী প্রতিক্রিয়া হয়, আর তাতে সীমান্ত ছাপিয়ে বাংলাদেশে কী প্রতিক্রিয়া হয় – এ নিয়ে আমাদের স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে কানখাড়া উদ্বিগ্নতা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়ায়ও একটা কমন অনুমান আছে যে, রায় যা-ই আসুক অমিত শাহ তা থেকে নির্বাচনী ফয়দা ঘরে তোলার লক্ষ্যে কিছু-না-কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছেন বলে তাদের অনুমান।

অন্যদিকে, ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থায় ধস নেমেছে, সে কথা আর ঢাকা থাকছে না। যদিও আমরা সেই ২০১৬ নোট বাতিলের সময় থেকেই এটা শুনে আনছি। কিন্তু পরিসংখ্যান-তথ্য লুকিয়ে রাখা, ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেখা, নির্বাচনের পর এসব তথ্য রিলিজ দেয়া বা হিন্দুত্বের নানা রকম জোয়ার তুলে ইত্যাদিতে খবর দাবিয়ে রেখে মোদী এ’পর্যন্ত চলে এসেছেন। তাতে শেষ বিচারে সেই ২০১৬ সাল থেকেই, নির্বাচনে অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রভাব খুব কমই দেখা গেছে। আবার, কোথাও ভোটারেরা স্বীকারও করেছেন যে, অর্থনৈতিক হাল খারাপের খবর তারা জেনেও একে কম গুরুত্ব দিয়েই তারা হিন্দুত্ব-জিগির সংশ্লিষ্ট ইস্যুর প্রভাবে মোদীকেই আবার ভোট দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন। বলাই বাহুল্য, হিন্দুত্ববাদের রঙ এতই গাঢ়। তবু গত মাসে এই প্রথম মহারাষ্ট্র-হরিয়ানা এই দুই রাজ্যের নির্বাচনে সম্ভবত অর্থনৈতিক হাল খারাপের খবর প্রভাব ফেলেছে। বিজেপি সে কারণে ফল খারাপ করেছে বলে মানে করা হচ্ছে। যদিও শতভাগ নিশ্চিত কেউই নয়, কারণ পরবর্তীকালে এর আরও ধারাবাহিক প্রভাব থাকে কিনা দেখতে সবাই অপেক্ষা করতে চাইছে।

সবচেয়ে বড় উলটা কথাটা হল, বিজেপি ছাড়া ভারতের সমাজের রাজনৈতিক-সামাজিক সব শক্তি তবুও হিন্দুত্ববাদের চাপে উল্টো নিজেরাই কোণঠাসা হয়ে আছে। এদিন সহসাই কাটছে কি না, কাটবে কি না বা কবে? কেউ বলতে পারে না। কিন্তু খেয়ে-না-খেয়ে হিন্দুত্ববাদ, হিন্দুইজম বা হিন্দুগিরি এভাবে সারা ভারতের কোনায় ছড়িয়ে পড়ল কেন? এর জবাব কী?

লক্ষণীয় যে ভারতে এমন কোন বিরোধী দল বলে কেউ নেই যে, হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলে বা হিন্দুত্ববাদের বয়ানের পাল্টা কোনো বয়ান হাজির করতে গিয়েছে বা পেরেছে। বরং সবার ভয় ও ধারণা যে, তাতে তাদের আরো ভোট হারানোর সম্ভাবনা। সে কারণে তারা কেউ মুখ খোলে না। হিন্দুত্ববাদের এতই দাপট! তাই আবার সেই প্রশ্ন, ভারতের পরিস্থিতি কেন এমন হল?

এককথায় জবাব, রামমোহন রায় থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই স্বাধীন ভারত বলতে একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতই বুঝেছে, আর এরই বাস্তবায়নে কাজ করে গেছে আজীবন, এমন রাষ্ট্রেরই ভিত্তি গড়ে চলেছে। আরো সোজা করে বললে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন স্বাধীন ভারত হতে পারে, এটা তাদের চিন্তা-কল্পনার অতীত ছিল। আর বলা বাহুল্য, এখানে ধর্মীয় বলতে এক হিন্দু জাতীয়তাবাদই তারা বুঝেছিলেন। ভারতের ন্যাশনাল আর্কাইভে গান্ধী রচনাবলী সংকলনে “হিন্দুইজম কী” – এই শিরোনামে আসলে ‘গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদ কী’- এমন লেখাগুলোর একটা আলাদা সঙ্কলন আছে। ভারতে “ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইন্ডিয়া” নামে কেন্দ্রীয় সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রকাশনা সংস্থা আছে। তারা এটা প্রকাশ করেছে। এর আবার অনলাইন পিডিএফ ভার্সনও [What is Hinduism, by MAHATMA GANDHI, First Edition 1994] পাওয়া যায় এই লিঙ্কে। এছাড়া বাংলাদেশের এক প্রকাশনা সংস্থাও এরই এক প্রিন্টেড বই প্রকাশ করেছে (2011) গান্ধীর “হিন্দু ও হিন্দুধর্ম কী” নামে। গান্ধীর রাজনীতি যে গান্ধীর হিন্দুইজম বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ – এরই প্রমাণ ছড়িয়ে আছে এসমস্ত লেখাগুলোয়।
অথচ ভাবসাবে সবাই মনে করে, নেহরু-গান্ধীরা এক আধুনিক রিপাবলিক ভারতই গড়ে গিয়েছেন। অথচ কঠিন সত্যিটা হল, এই ভিত্তিহীন ধারণার রিভিউ বা পুনর্পাঠ মূল্যায়ন করে সংশোধন করে নেওয়ার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। যেমন গান্ধীর কোনো নাগরিক ধারণা নেই, পাওয়া যায় না। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা বা নাগরিকের মানবিক মৌলিক অধিকারের ধারণাও নেই। তবে হিন্দুইজমের ধারণা আছে। এছাড়া কথিত “হিন্দু-মুসলমানের মিলন বা ঐক্য” – কিভাবে হবে এ নিয়ে তার ব্যাপক কথা, চর্চা তৎপরতা বা বাণী আছে।

এখন কথা হল, আপনি গান্ধী যদি “হিন্দু জাতীয়তাবাদই” করবেন তাহলে আবার হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য খুঁজতে যাচ্ছেন কেন? হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের দূত হওয়ার খায়েশ কেন? আর কেমনেই বা হবেন? কারণ, আপনাকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানাতে হবে- এই খায়েশেটাই তো সব দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের উৎস! এছাড়া আবার হিন্দু-মুসলমানের দুটা আলাদা ধর্মকে এক বানাবেন? এটা কি আদৌ সম্ভব? আর এর চেয়েও বড় কথা এটা কি আদৌ দরকারি? মানে এসেনশিয়াল? কেন? এটা কেমনে একটা রাষ্ট্র নির্মাণের পূর্বশর্ত হতে পারে? এই ধারণা তিনি কোথায় পেয়েছেন?

অথচ এক ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হইতে হইবে’- গোঁ-ধরা এই না-বুঝ, অবুঝের চিন্তা- এটাই তো সব সমস্যার গোড়া। আবার দেখেন যারা হিন্দু নয় অথবা যারা হিন্দু হয়েও হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র চায় না তাদেরকে কেন হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত তাদেরও কাম্য বলে মানতে হবে? এর কোন সুযোগ গান্ধী রাখেন নাই! অথচ তিনি নাকি মহাত্মা? ভারতের বিবেক?

আবার আরও কথা হল, গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানালে পরে সেটাকে আরও উগ্র হিটলারি ব্যাখ্যার আর একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যেটাই আসলে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ সেটাও তো আসবেই। হিন্দুত্বের পোলারাইজেশন বিভক্তি তুলে নিজের ভোটের বাক্স মোদী-অমিতরা তো ভর্তি করতে আসবেই – তাদের ঠেকাবেন কী দিয়ে? গান্ধী নিজের জীবদ্দশাতেই তিনি হিন্দু মহাসভা-আরএসএস এদেরকে  ঠেকাতে পারেননি। ব্যর্থ হয়ে এদের হাতেই তিনি গুলি খেয়ে মরেছেন।

আরএসএস সংগঠন (১৯২৫) জন্মের পর থেকে এ’পর্যন্ত চারবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। এর দ্বিতীয়বারেরটা হয়েছিল নাথুরাম গডসের হাতে গান্ধীর গুলিতে মৃত্যুর (৩০ জানু ১৯৪৮) পরবর্তীকালে বা পরিণতিতে। আর সর্বশেষ নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার সংশ্লিষ্টতায়। আর এখন সেই আরএসএস আবার খুব সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে ভাইব্রেন্ট তৎপর সংগঠন। আর ভারতের রাজনীতির অবস্থা পরিস্থিতি হল, হিন্দুত্বের জোয়ার উচ্ছ্বাস উন্মাদনার সামনে সেই গান্ধীর কংগ্রেস বা নেতা রাহুল গান্ধী কোণঠাসা- তারা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের কোন সমালোচনাই করতে পারে না, অক্ষম। উল্টো নিজেরাই নিজেদের তৎপরতাকে “সফট হিন্দুত্ববাদ” বলে ডাকে, মেনে নিয়েছে! এই হল গান্ধী ও তাঁর হিন্দুইজমের পরিণতি!

তবু সেই নেহরু-গান্ধীরাই সৌভাগ্যবান। কারণ, হিন্দু জাতীয়তাবাদী হওয়ার পরও তারাই কমিউনিস্ট প্রগতিবাদী চোখে প্রগতিশীলতার প্রতীক। আর দোষী হলো জিন্নাহ ও পাকিস্তান। জিন্নাহ-রাই নাকি ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান বানিয়েছে, দেশভাগ করেছে।

আচ্ছা, গান্ধী যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানাতে চান তাহলে এই কাজ ও ততপরতা – এটাই কী জিন্নাহ ও পাকিস্তানকে মুসলিম জাতীয়তাবাদ করার দিকে ঠেলে দেয়া, নয়? গান্ধীরা যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদ করতে চলে যায় তাহলে তা জিন্নাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ করার দিকে বাধ্য করে ঠেলে দেওয়াই। অথচ তা থেকেই কেবল জিন্নাহরাই ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার অপরাধে অপরাধী ! তাহলে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজ কারা শুরু করেছিল – তা বুঝাবুঝি ঢাকনা খুলতে কেউ আগ্রহি বা রাজী না। বুঝাই যাচ্ছে এই প্রগতিবাদীরা গান্ধী সম্পর্কে কিছুই পড়ে দেখেনি। এটা তাদের গভীর মুসলমান অন্ধবিদ্বেষ ও বিপরীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রীতি। তবে মূল সমস্যা সম্ভবত এখানে যে, রাষ্ট্র চিনতে বুঝতে হয় কিভাবে এটাই তাদের কখনো জানাই হল না!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০২ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আবার বাবরি মসজিদ!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

Last updated: OCT 28, 2019 @ 23:01:35

https://wp.me/p1sCvy-2LG

 

 

ঢাকায় ইসকনের একটি মিছিল

Ratha Yatra In Dhaka City By Shamibag Iskcon Temple 2017

ইসকন এখন বাংলাদেশে নানান জল্পনা-কল্পনায় প্রবল আলোচ্য বিষয়। এরই মাঝে বাংলাদেশের ২৪ অক্টোবর সকালটা শুরু হয়েছে আনন্দবাজারে প্রকাশিত ইসকন নিয়ে গুজবের গল্প পাঠ করে। গুজব বলছি কারণ যে খবরের সোর্স বা উৎসের ঠিকঠিকানা নাই, এই অর্থে। মানে, আবার সেই কোনো মিডিয়ার পেজ-বিক্রি, যেখানে এবারের মিডিয়া হল কলকাতার আনন্দবাজার, আর পত্রিকার পাতার ক্রেতা হল ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ। কথিত বেনামি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতের নামে বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন গল্প ছড়ানো হয়েছে সেখান থেকে।

এবারের গল্পটা দেখে  বিগত ২০১৪ সালের শেষভাগে কথিত “বর্ধমান জেএমবি বোমার গল্পটার” কথা মনে পড়ে যেতে পারে অনেকের। তখন মোদী কেবল প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছেন (মে ২০১৪), এর প্রায় ছয় মাসের মধ্যকার গল্প। অভিযোগের ফোকাস ছিল, কথিত মমতা-সারদা-জামায়াত-জেএমবি চক্র। আর ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্ট বর্ধমান জেলা। অমিত শাহ খুঁটি গেড়ে কলকাতায় বসে গিয়েছেন। সারদা মানে হল, প্রায় আমাদের দেশের মতই “ডেসটিনি” নামের প্রতিষ্ঠানের পাবলিকের টাকা মেরে ফেরার হয়ে যাওয়ার মত এক ঘটনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম।  তবে বাড়তি হল, এখানে অভিযোগ সাজানো হয়েছিল যে কথিত সারদার টাকা এসেছিল ঐ বোমা হামলার জন্য” বলে অমিত শাহ অভিযোগ তুলেছিলেন। আর পুরা ঘটনায় অমিত শাহের টার্গেট ২০১৬ কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে মমতার তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে পরাজয় ঘটানো, নির্মুল করা। তাই জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলা।  কলকাতার মুসলমানদের এক নেতাকে রাজ্যসভায় মমতার দলের নমিনেশন দেয়া থেকে জ্বলে উঠে এই প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল। কলকাতার মুসলমানেরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে, মমতা তাদের তোষামোদ করছেন ইত্যাদি এই সার অভিযোগ তুলে পরের ২০১৬ সালের রাজ্য সরকার ভোটের কথা মনে রেখে কলকাতার হিন্দু ভোটারদের মনে উস্কানি তৈরি করা। এই ছিল মূল ঘটনা। এমনকি একপর্যায়ে কলকাতার সিপিএম দলও এই একই অভিযোগের বয়ানের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশ-জামায়াত-মুসলমান ও জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে মমতাকে দায়ী করে  কলকাতার ব্রিগেডের মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করেছিল।

অভিযোগের প্রপাগান্ডা ডালি সাজিয়ে ভারতে বলা হয়েছিল, এটা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের খবর। আবার পরে একই গুজব বাংলাদেশে প্রচার করা হয়েছিল এটা ভারতের গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া খবর বলে। আর বাংলাদেশে তাতে শামিল হয়েছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির খালেদ মহিউদ্দিন [যিনি এখন জার্মানিতে বসে উলটা সরকারের বিরুদ্ধে ভোকাল হওয়ার চেষ্টা করছেন], চ্যানেল আই এমনকি প্রথম আলো ইত্যাদি অনেক মিডিয়া। সেকালের মোদীর ভারতের নতুন সংসদে এ নিয়ে ঝড় তোলা হয়েছিল। আর, গায়ক নতুন প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের অভিযোগের ডালি সাজিয়ে বসা আর সর্বশেষ কলকাতায় অমিত শাহের জনসভায় (০১ ডিসেম্বর ২০১৪) মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর আক্রমণের ডালি তুলে ধরা, সবই ঘটেছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎ সব ফুস, বেলুন চুপসে যায়।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটা পারসোনাল বিভাগ বা বাংলায় আমরা বলি সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিসের “আপন বিভাগ” আছে। আমাদের বেলায় এই বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্বাবধানে আর ভারতের বেলায় এর মাঝে আছেন এক প্রতিমন্ত্রী। ঘটনাওগুলোর অনেক কিছু স্মৃতি থেকে লিখা হল। তবে এখন হাতের কাছে একটা ভিডিও রিপোর্ট পাওয়া গেল। এনডিটিভির। তাতে দেখা যাচ্ছে মোদীর অফিসের ঐ প্রতিমন্ত্রীর নাম ছিল জিতেন্দ্র সিং। তাকে দিয়ে হঠাৎ এক বিবৃতির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যার সারকথা ছিল যে আপাতত ওই বর্ধমান মামলা স্থগিত রাখা হচ্ছে, আরো তদন্তের পরে ভবিষ্যতে এটা আবার দেখা যাবে। [Three days after Amit Shah, the president of the BJP, alleged in Bengal that funds involved in the Saradha scam were used for terror, the government appears to have contradicted him] ইতোমধ্যে অমিত শাহ কলকাতা ত্যাগ করেন কারণ জীতেন্দ্র সিং-ই অমিত শাহের দাবির বিরোধিতা করে সংসদে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তবে বাবুল সুপ্রিয়ই সবচেয়ে বেকুব হয়েছিলেন। ধরা খেয়ে বেকুব হয়ে তিনি কী বলেছিলেন সেটাও এনডিটিভিও ভিডিও ক্লিপে পাওয়া যাবে।  কারণ, তার ভুয়া অভিযোগ-আক্রমণই ছিল সবার শেষে মানে প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্রের ঘোষণা ঠিক আগে। কিন্তু কেন হঠাৎ পশ্চাৎপসারণ? খুব সম্ভবত কোনও কারণে বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে লড়বার নির্বাচনী কৌশল বদল করেছিল তাই। তবে এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, পরবর্তীকালে ঐ ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে মমতা আগেরবারের চেয়ে বেশি, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছিলেন। সেই ২০১৪ সাল থেকে আজও আর কখনো সেই জঙ্গিবাদের গল্প আর ঝাঁপি খোলেনি।

অতএব সাধু সাবধান। এসব পেজ বিক্রির আনন্দবাজারি গল্প আমাদের কাছে আবার আনা কি ঠিক হলো? যদিও এবারের ঘটনা মোদীর গুরু প্রতিষ্ঠান আরএসএসের ষ্ট্রাটেজিক ও ধর্মীয় সংগঠন “ইসকন”-কে নিয়ে। অনুমান করি, বাংলাদেশে লিগ্যাল স্ট্যাটাসের দিক থেকে ইসকন এক বিদেশী এনজিও হিসেবে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড ও তৎপর। আর বাংলাদেশের এখনকার মাঠের বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে ইসকন সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে, আধা সত্য-আধা গুজবে মাখামাখিতে ইসকন এক খুবই খারাপ ইমেজ নিয়ে হাজির; যা বাংলাদেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর এই ধারণায় ভরপুর হয়ে উঠছে ক্রমাগত ও দ্রুতগতিতে। সবচেয়ে বড় কথা ইসকনের এই ষড়যন্ত্রকারি ইমেজ এটা খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে, যা যেকোন সময় সামাজিক দাঙ্গা লাগিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে হাজির হওয়ার জন্য খুবই পটেনশিয়াল।

এই পটেনশিয়াল দিকটার কথা যদি মনে রাখি, তবে ভারতের বা কলকাতার এই গুজবের গল্প ছড়ানো খুবই অবিবেচক কাজ হয়েছে। অবশ্য যদি না ডেলিবারেট কোনো দাঙ্গা বাধানোর মধ্যে ভারতের সরকার ও গোয়েন্দাদের কোনো খায়েশ থেকে থাকে যা আমরা জানি না, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা আলাদা।

ইসকন [ISKCON]
ইসকন নিজেদের “ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘ- এভাবে একটি হিন্দু বৈষ্ণবধর্মীয় প্রতিষ্ঠান” বলে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত আমেরিকা ব্যক্তিবাদের ধারণাকে [individualism] চরমতম অর্থের দিক থেকে নেয়াতে আর সেটাই পপুলার ধারণা বলে পরিণতিতে সেখানে ব্যক্তিমাত্রই খুবই একা ও বিচ্ছিন্ন, এক সম্পর্কহীনতার অবস্থার দিকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হয়ে রয়ে যায় সবাই। কিন্তু স্বভাব হিসেবে মানুষমাত্রই রিলেটেড-সম্পর্কিত মানুষ তো বটেই, অন্ততপক্ষে এক জীবনসঙ্গীর “আকাঙ্খাসম্পন্ন” মানুষ। ফলে মানুষ একা তো নয়ই, অন্তত দোকা তো বটেই এবং মানুষের অস্তিত্বই  গভীরভাবে সামাজিকও। এর বাইরের দিকে তাকিয়ে সেটা অমান্য করতে চাইলেও ভিতরে এটা তাই-ই থাকে।  তাই তার গভীর স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদাও আছে। স্পিরিচুয়ালিটিই আসলে মানুষের নানান সম্পর্ক ও এথেকে জাত কামনার অর্থ তাৎপর্য ব্যাখ্যাও তুলে ধরে। এটা মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তি ও স্বভাবে আছে, কিন্তু পশ্চিমা চরমব্যক্তিবাদের সমাজ সেই স্বভাব ও আকাঙ্খাকে চাপা দিয়ে রেখেছে। এই স্পিরিচুয়ালিটি বলতে তা সে দার্শনিক অর্থে স্পিরিট [spirit] বা প্রজ্ঞা হোক অথবা থিওলজির অর্থে বা ভাষ্যে আত্মা-রুহু – সেটা যে যাই করুক বা বুঝুক না কেন – শেষ বিচারে এটা মানুষের অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক করা, সম্পর্কিত থাকা ও সম্পর্কিত অনুভবের আকাঙ্খা-চাহিদার সপক্ষেই দাঁড়িয়ে কথা বলে। এরই বৃহত্তর অর্থ হল মানুষের পরমসত্তা অনুভবের দিক। থিওলজিক্যাল অর্থে ও ব্যাখ্যায় এটাই মানুষের যার যার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভবের অথবা আল্লাহর মাধ্যমে মধ্যস্ততায় জগতের সকল অপর মানুষ ও সত্বার সাথে নিজেকে যুক্ত ও লিপ্ত অনুভব করার দিক। থিওলজি বলবে মানুষ তাই রূহুর চাহিদায় সাড়া না দিয়ে পারে না।

এটাই, ঠিক এটাই পশ্চিমের এক স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদার ক্ষেত্রে এক বড় ভ্যাকুয়াম হয়ে আছে দেখা যায়। তুলনায় এটাই এশিয়ান যেকোনো থিওলজির প্রভাব যথেষ্ট স্যাচুরেটেড বা পুষ্ট হয়ে আছে। অন্তত কোনো ভ্যাকুয়াম-শূন্যতা নেই। এখন এশিয়ান এই থিওলজিক্যাল পূর্ণতাকে এবার পশ্চিমের চাহিদার কথা খেয়াল করে এর উপস্থাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাবে, এক কৃষ্ণপ্রেম বিলিয়ে বেড়ানোর দিক থেকে ইসকন ভালো প্রভাব ছড়িয়ে আমেরিকায় নিজের যাত্রা শুরু বা ভিত গাড়তে পেরেছিল। আবার মানুষের সম্পর্ককে একটু ভিন্ন [সেক্সচুয়ালিটি] উপস্থাপনের দিক থেকে আর এক গুরু রজনীশও ভালই আমেরিকান চাহিদা ধরতে পেরে পসার জমাতে পেরেছিল। ভারতের গুরুরা এসব সহজেই তুলে ধরতে পারে বলে [এমনকি যোগ ব্যায়ামেরও স্পিরিচুয়াল দিক আছে তা ব্যাখ্যা করে থাকে অনেকে] এদের গড়ে তোলা নানান আশ্রম ও ব্যাপক ভক্তকুল আমরা আমেরিকাতে দেখতে পাই। এভাবে এমনই এক উদ্যোগ হল ইসকন – নানান উঠতি পড়তির মধ্যদিয়ে ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইসকন আমেরিকাতে খারাপ চলে নাই। তবে এসব ততপরতাগুলো সেকালে কোনোটাই ভারত-রাষ্ট্রের স্বার্থের কোনো রাজনৈতিক উপস্থাপন ছিল না। কিন্তু এই পরিস্থিতিটাই বদলে যায় ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার পর থেকে। বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে। বুশের আমেরিকা তার ওয়ার অন টেররের পক্ষে এশিয়ার এক কুতুব হিসাবে ভারতের সমর্থন পেতে, ভারতের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমর্থনের এক অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছিল, সেখান থেকে ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে।

কাশ্মীর সংকট ও এর “সীমা পার কী আতঙ্কবাদ” হয়ে উঠা
বলা হয়ে থাকে, ১৯৮৭ সালের জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাদেশিক নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ঘটানো হয়েছিল। পরিণতিতে এটা সেই থেকে  নির্বাচনী ধারার কাশ্মীরের রাজনীতি এর নিজ সমাজেই আস্থা হারিয়ে একে এক সশস্ত্র রাজনৈতিক ধারার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৪৯ সাল থেকে কাশ্মীর ইস্যু বিভক্ত ও অমীমাংসিত এমনই থেকে যাওয়া সত্ত্বেও এর রাজনীতি একটা নির্বাচনী ধারাতেই প্রবাহিত হয়েছিল, যেটা ১৯৮৭ সালের পরে কাশ্মীরে আর তেমন থাকেনি। এনিয়ে প্রচুর একাদেমিক গবেষণা স্টাডি হয়েছে। [যার রিপোর্ট ও ফাইন্ডিংস-গুলো (1987 March kashmir elections rigging লিখে) নেটে সার্চ দিলেই যেকেউ দেখতে পাবে।] আর সশস্ত্রতার রসদ তারা সংগ্রহ করেছিল সেকালে আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী আমেরিকা সমর্থিত লড়াকু মুজাহিদীনদের কাছ থেকে, পাকিস্তান হয়ে।

আর এথেকে কাশ্মীরের রাজনীতি পারস্পরিক খুনোখুনি রক্তারক্তির এক বাস্তবতায় ঢুকে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা হল, বড় সংখ্যায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যা করা আর পরিণতিতে তাদের কাশ্মীরে নিজ ভিটা-সম্পত্তি ত্যাগ করতে হয়েছিল। এতে কে কাকে কী বলে দায়ী করবে সে এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কারণ, সবাই জানত কাশ্মীরের সমস্যার কোন জবরদস্তি বা সামরিক সমাধান নাই, তবু পক্ষগুলো পরস্পরকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। [যেটা আজ আবার সেই একই বেকুবি পথে মোদী-আরএসএস ঠেলতে শুরু করেছে।]  তবু সেকালে পরবর্তী সময়ে নব্বই দশকের অস্থির সময়ে বিজেপি নেতা বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকে এরই পাল্টা সংগঠিত এক প্রপাগান্ডা শুরু হয় – “সীমা পাড় কা আতঙ্কবাদ” বলে। অর্থাৎ কাশ্মীরের সমস্যার মূলে আছে আফগান বা পাকিস্তান থেকে আসা  সশস্ত্রতা (কথিত টেররিজম)। মানে ভারতের রাষ্ট্র বা সরকারের কোন দায় নাই, ভুল বা অন্যায় শুরু করা নাই; সব দায় হল বাইরে থেকে আসা সশস্ত্রতার। কাশ্মীর রাজনীতিতে  নির্বাচনী কারচুপি করা যে বিরাট আত্মঘাতী পদক্ষেপ ছিল, কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতিতে কারচুপি আমদানি করলে যে হতাশগ্রস্থতা শুরু হয় তা থেকে যেকেউ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে নিয়ে চলে যেতে পারে – এটাই সেই আত্মঘাতী পথ। তাই এটা সেই মেসেজ দিয়েছিল যে কাশ্মীরে নির্বাচনী রাজনীতির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ফলে সশস্ত্রতাই একমাত্র বিকল্প- এই ভাবনাই যে পরবর্তীকালে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল, তা কমবেশি সব পক্ষের কাছেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই মনমরা হিন্দুমনে ধীরে ধীরে পাল্টা নতুন মরাল জাগানোর কাজটাই করেছিলেন বাজপেয়ি; এই বলে যে, সব দোষের গোড়া হল, বাইরে মানে পাকিস্তান থেকে আসা সশস্ত্রতা।

তবু এ কথা বলাতেই শুরুতে তখনও তা তেমন পাত্তা পায়নি। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর (১৯৮৯ সাল থেকে ধরলে ) ভারতকে সাফার করতে হয়েছিল, কোনো গ্লোবাল বন্ধু-সাথী রাষ্ট্রকে ভারত পাশে পায়নি। যার মূল কারণ সেকালে কাশ্মীরে পাওয়া সহজ হয়ে যাওয়া অস্ত্রের মূল উৎস তো আসলে আমেরিকা, আর সাথে এছাড়া স্বল্প কিছু ফেলে যাওয়া বা দখলি সোভিয়েত অস্ত্র। তাই এক লম্বা পথ বা ঘটনাক্রম  – সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার, পরে আমেরিকার আফগানিস্তানকে বিশৃঙ্খলতায় ফেলে চলে যাওয়া, শেষে একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে আফগানিস্তানে তালিবানদের আবির্ভাব, আর এতে তালিবানদেরক এক তুলনামূলক স্থিতিশীলতা আনার শক্তি হিসাবে দেখে আমেরিকা তাদের সমর্থন করলেও শেষে ক্রাইসিস মেটেনি। কারণ, পরে তালেবানি শাসকেরা আলকায়েদার প্রভাবে চলে যায়। আর তা থেকে আমেরিকায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলা – এই পুরা চক্র সমাপ্তি শেষ হতে দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। পরে বুশের ওয়ার অন টেরর প্রোগ্রামকে ভারত সমর্থন করেছিল, কাশ্মীরের সশস্ত্রতা পরিস্থিতিতে ভারতের সামরিক অবস্থান এবং ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিকে নষ্ট করা নয়, বরং “সীমা পারকে আতঙ্কবাদ” সবকিছুর জন্য দায়ী এই বয়ানের প্রতি আমেরিকার সমর্থন আদায়ের বিনিময়ে।

আর এথেকে আরও ডালপালা গজিয়ে তখন থেকেই শুরু হয় আমেরিকার সাথে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে ভারতের লম্বা খাতির সম্পর্কের যুগ। আর তা শুধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অফিস স্তরেই নয়, আমেরিকান এমপি (প্রতিনিধি পরিষদ) ও সিনেটেও ভারতের পক্ষে নিরন্তর লবি করার জন্য আমেরিকাতেই বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দেরকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগানোর বেশকিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এরই সমন্বয়কের ভুমিকা নিয়েছিল আমেরিকায় ভারতীয় এমবেসি (গোয়েন্দা বিভাগ)। এই লক্ষ্যে ২০০৩ সালে জন্ম হয় ” হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন”। যারা আমেরিকায় জন্ম নেয়া ভারতীয়-অরিজিন বাবা-মার পরের প্রজন্ম, যদিও তারা আমেরিকান নাগরিক, এরাই এর সদস্য। তারা গর্ব করে বলে আমরা ভারতীয় নই, আমেরিকান হিন্দু। কিন্তু বাস্তবে এরা ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার সংগঠন, ভারতীয় বিদেশনীতির বাস্তবায়ক। তাদের মুরুব্বিরাও তাদের পিছনে, অফ-সিনে। ১২০ মিলিয়ন ভারতের বাজারে ব্যবসা দেয়ার বিনিময়ে আমেরিকান ব্যক্তি ব্যবসায়ী আর এর সাথে এমপি ও সিনেটর মিলিয়ে এক চক্র যা লবি ও প্রেসার গ্রুপ, কোটারি গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল। লবি ও প্রেসার গ্রুপ তৈরি আমেরিকায় বৈধ। তাই আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্রে রেখে এরা আরো সংগঠিত করেছিল এক এমপি তুলসি গাব্বার্ড, ভারতীয় নানান সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন [ইসকন যার মধ্যে একটা বিশেষ] বা প্রবাসী ভারতীয়-অরিজিন আমেরিকান ব্যক্তিত্বকে।

ইসকন আর কৃষ্ণপ্রেম বিলায় না, ভারতরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার, হিন্দুত্ববাদ বিলি করে
এতে স্বভাবতই আগের শতকের আমেরিকান ইসকন, আগের কৃষ্ণপ্রেম বিলানো ইসকন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের খাঁচায় বিরহ একাকিত্বে আটকে থাকা সাদা আমেরিকানদের মুক্ত করতে আসা ইসকন, এমনকি তাই এর আগের নেতৃত্ব কোন কিছুই এক থাকেনি। সেই ইসকনের মৃত্যু হয়। ফোকাস বদলে যায়। নতুন ইসকন জন্ম নেয় যার কাজ ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার হওয়া। [Strategic বা স্ট্রাটেজিক মানে এখানে, রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নেয়া কৌশল ও পরিকল্পনা ]  কংগ্রেস আমলে যেটা ছিল সফট [soft] হিন্দুত্ব তাই এখন হয়ে উঠেছে আরও এগ্রেসিভ, আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদ। প্রথমত এর তৎপরতার ক্ষেত্রে তখন থেকে আর পশ্চিমাদেশ থাকেনি, বাংলাদেশও হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা ভৌগোলিক পকেটের হিন্দুজনগোষ্ঠির উপস্থিতি থাকলেই (যেমন আফ্রিকান অনেক দেশেই ইসকন সংগঠন পাওয়া যাবে) সেখানে ভারত রাষ্ট্র-সরকারের নীতি ও স্বার্থ স্ট্রাটেজির পক্ষে সকলকে জড়ো করা, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের বোধ জাগিয়ে তোলা, কমপক্ষে সহানুভূতিশীল করে তোলা – এসবই ইসকনের মুখ্য কাজ হয়ে ওঠে। এতে ভারত রাষ্ট্রই যে প্রকাশ্যে হিন্দু-রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে – ভারতীয় নাগরিককে সে “হিন্দু হিসাবেই” (এটা ভারত-রাষ্ট্রের কাজ ছিল না) সংগঠিত করছে, সাথে পাশে কোন অন্যদেশের হিন্দু থাকলে তাকেও হিন্দু হিসাবে ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে অবলীলায় শামিল করেছে।

একটা জিনিষ পরিস্কার থাকতে হবে, কোন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক-স্বার্থ বিষয়ক নানান সিদ্ধান্ত সে রাষ্ট্র অবশ্যই নিবে। আমাদের তাতে না করার কিছু নাই। আর বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। ব্যতিক্রম স্বল্প কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বাদে তা কখনও অন্য-রাষ্ট্রেরও পক্ষেও যাবে না। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল অন্য রাষ্ট্রের যে সিদ্ধান্ত যা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক তা প্রত্যাখান ও প্রতিরোধে করতে সক্ষম হতেই হবে। এটা ন্যায়-অন্যায়ে বিষয়ক ইস্যু যত না এর চেয়ে বেশি নিজ স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ও সক্ষম হওয়া, আপোষ করে বিক্রি না হয়ে যাওয়ার বিষয়। ইসকনের ততপরতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনের তদারকি ও লাইসেন্সিং প্রতিষ্ঠান “এনজিও ব্যুরোর” মাধ্যমে আর “ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন এক্ট ১৯৭৮” (যেটা সর্বশেষ ২০১৬ তে সংশোধিত হয়েছে) – এই আইন দিয়েই প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর আমাদের এটা করতে পারতেই হবে। আর সার কথাটা মনে রাখতে হবে ভিন্ন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক প্রতিষ্ঠানকে আমরা আমাদের দেশে ততপরতা চালাতে দিতে পারি না। বিদেশি এনজিও হিসাবে তো আরও নয়, তাও আবার ধর্ম-প্রচারের উসিলায়।

আসলে ইসকনের বাংলাদেশে উপস্থিতিটাই এর কথাকাজের বেমিলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, আমেরিকায় গিয়ে ইসকনের জন্ম হতে পেরেছিল মূলত একাকিত্বের আমেরিকান সমাজের শূন্যতার হাহাকার পূরণে। তাহলে ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ তার কাম্যভূমি হতেই পারে না, ম্যান্ডেটে কাভার করে না। কারণ বাংলাদেশ পশ্চিমাদেশ নয়, অন্তত স্পিরিচুয়ালিটির ভ্যাকুয়াম এখানে নাই। বাংলাদেশে হিন্দুদের ধর্মীয় সংগঠন – মন্ত্র জানা, শাস্ত্র জানা, বামুন পুরুত বা মন্দিরের কমতি এখানে ঘটে নাই – কখনও ছিল না। তাহলে আমেরিকায় যে কারণে ইসকনের জন্ম, ঠিক সে কারণেই বাংলাদেশে ইসকনকে হিন্দুদের দরকারই নেই।  তাই ইসকন ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠিত হওয়া থেকে বাংলাদেশে  ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের জন্যই এর জন্ম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

আর তাই অন্তত এই একটা কারণে, বাংলাদেশের সরকার ইসকনকে বিদেশি এনজিও হিসাবে এনজিও ব্যুরো থেকে রেজিষ্ট্রেশন দিতে পারে না।  ইসকন আসলে ধর্মীয় নয় ভারত রাষ্ট্রের হাতিয়ার রাজনৈতিক সংগঠন। আবার কোন ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠনকে এনজিও ব্যুরোর রেজিষ্ট্রেশন দেয়া হারাম – আপন রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধী বলে নিষিদ্ধ। কেবল রিলিফ বিতরণের কাজ, দাতব্য কাজ করতে পারে – সেজন্য অনুমতি পেতে পারে।

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব, ভারত সরকারের আমাদের সরকারের ওপর সবখানে প্রভাব বিস্তারের বিরোধী  – এমন মনোভাব প্রচন্ড বাড়ছে, এ নিয়ে আমাদের সমাজের কোনো কোণে বা কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বিমত পাওয়া যাবে না। তবে আবার দ্বিমত হবে এর মাত্রা নিয়ে। সরকারি পক্ষের হলে কেউ বলবেন ভারতের প্রভাব অনেক কম বা স্বাভাবিক। বিপরীতে অন্যরা বলবেন ভারতের প্রভাব চরম, সীমাহীন অসহ্য বা অনাকাঙ্খিত ইত্যাদি। আর এরই মধ্যে ইসকনের নাম ও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিরূপ মনোভাব ক্ষোভ ক্রমেই চড়ছে। এরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে চাইছে – এমন এগ্রেসিভ।  ইসকন সাধারণ্যে চোখে পড়া শুরু করে ২০১৬ সালে সিলেটের সঙ্ঘাত থেকে আর এ কালে চট্টগ্রাম শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে ‘প্রসাদ খাইয়ে’ কৃষ্ণনাম গাওয়ার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ হয়ে পড়া থেকে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে সনদ প্রদান বা তারা ইসকনের সদস্য বলে প্রচার চলা থেকে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই হয়ত অনুমান করে বলা, আধা সত্য অথবা প্রপাগান্ডা বা একেবারেই গুজব হয়ত।

গুজবের আসল অর্থ হল ফ্যাক্টসের সাপ্লাই না থাকা। সাধারণত  সরকারের বুঝে না বুঝে বোকা হয়ে খাড়িয়ে থাকা উদাসীন্যতা থেকে এর জন্ম হয়। এছাড়া, যারা বুঝতেই পারে না সঠিক বিশ্বাসযোগ্য ও স্পষ্ট তথ্য সমাজে সহজেই পাওয়া না যাওয়া অবস্থায় রাখা কত আত্মঘাতী। এটা আসলে চাইলেই পাওয়া যায় এমন করে রাখা হয়নি, এই পরিস্থিতি। তাই গুজব মোকাবেলার উপযুক্ত উপায় হচ্ছে, তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয় এভাবে হাজির রাখা। সমাজের বিভ্রান্তি সম্পর্কে খবর রাখা আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে আগে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য হাজির রাখা। নিশ্চুপ থাকলে বা গুজবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা গুজবের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বাড়তে পারে। কখনো তা ফেটে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।

ইসকন ও এনজিও ব্যুরো
বাংলাদেশে আইনে ইসকনের ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে ততপরতা করতে অনুমোদন, বিদেশী অর্থ নিয়ে আসা ও বিতরণের অনুমোদন জোগাড় করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০১৬, এই আইন পেরিয়ে বিদেশী স্বার্থ প্রতিফলিত হয় এমন তৎপরতার ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকে সেজন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন বিদেশী ধর্মীয় এনজিও প্রতিষ্ঠানের দেশে সহজে কোনো তৎপরতা চালানোর বিরুদ্ধে এভাবেই সাজানো। কারণ, তারা যেন কোনো ধর্মান্তকরণ বা ধর্মে প্রভাবিত করার কাজ না করতে পারে।

বাস্তবত ইসকন এখন কৃষ্ণপ্রেম বিলানোর চেয়ে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নের পার্টনার। ওদিকে সাধারণভাবে বললে কোন বিদেশী রাষ্ট্রের কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান অন্য দেশে  নিজ দেশের নীতি বা স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি পেতে বা চাইতেই পারে না। বিশেষত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাজের সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেয়া ছাড়াও বিদেশী অর্থ আনার অনুমোদনই পেতে পারে না। বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থ বলে কিছু নিয়ে তৎপরতা চালানো অথবা [এমনিতেই ইসকন আমেরিকান অরিজিনের] ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুনীতি নিয়ে তৎপরতা- এর কোনোটাই ইসকন বা  কোনো এনজিওকে বাংলাদেশে করতেই দিতে পারে না।  এটা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী হবে, তাই।
অথচ আনন্দবাজারের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে যে, কথিত জঙ্গি হামলা হতে পারে এই অজুহাত তুলে যেন বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থে  “জঙ্গী” মারার অজুহাতে কাজ করতে তৎপর হয়। এতে বাংলাদেশের সরকারের কী হাল হবে? তার নিজের স্বার্থ কোথায় এতে?

আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম কাজটি হল, এব্যাপারে নিজের হাত পরিষ্কার রাখা। সরকারকে নিজ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা, না হতে দেয়া, যেসব গুজব ইতোমধ্যেই উঠেছে তা বিনাশ করা। গুজবের বিনাশ করতে যেটা করতে পারে যে ইসকন কী হিসেবে রেজিস্টার্ড তা পরিষ্কার ও সরাসরি পাবলিককে জানানো। যেমন এটা কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, না রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান? এ কাজটা সরকার নিজে অথবা কোনো বিশাসযোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্বের অধীনে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করতে পারে।

যেমন ইসকন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমতিপ্রাপ্ত হলেও ‘প্রসাদ’ বিতরণ সে করতে পারে না, সেটা পুরোপুরি বেআইনি। ‘প্রসাদ’ বিলানো মানে যেটা ধর্মীয় এনজিও হিসেবে রেজিস্টার্ড (যে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার কথা নয়) কেবল সেই করতে পারে। এছাড়া ‘প্রসাদ’ বিলানো আর কাউকে দুপুরের খাওয়ার প্যাকেট বিতরণ এক কাজ নয়। আবার যেমন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়ে এবং অর্থ ছাড় করে সেই টাকায় ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা বেআইনি হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে পাবলিকের কাছে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ নিয়ে সরকারের কোন দায় নেয়ার অথবা কোন আড়াল টেনে দেওয়া  প্রয়োজন নেই। আমাদের আইন পারমিট না করলে সরকারের কিছুই করার নেই। আবার আমাদেরও ইসকন সম্পর্কে কিছু বুঝে না বুঝে জেনে ইসকন তাবলীগের মত এক সংগঠন ধরনের কোন সাফাই দেওয়ারও কিছু নাই। আর এতে “অসাম্প্রদায়িক” এই সার্টিফিকেট পাইবেনই অথবা এই সার্টিফিকেটের কোন মূল্য থাকবে এসবেরও কোন নিশ্চয়তা নাই। আমাদের দরকার আসলে ফ্যাক্টস – কোন গুজবও না, কোন সাফাইও না।

আবার এক শিক্ষকের ভাই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারের পর দেখা যাচ্ছে সে ইসকনের সদস্য অথবা সরকারি কর্মচারী ইসকনের পদক মেডেল বা সংবর্ধনা নিয়েছে বা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এখন এই ইসকনের সদস্য হওয়া কী জিনিস? কোনো বিদেশী এনজিও এখানে কাউকে ধর্মীয় দল গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য বানানোর কার্যক্রম নিতে পারে না। এনজিও বলতে মূলত বস্তুগত জিনিসের দাতব্য হতে হবে। এটাই কাম্য।

এনজিও করতে আসা চ্যারিটির কথা বলে কোনও “ভাব” (ধর্মীয় বা রাজনীতির) প্রচার করতে অনুমতি দেয়া হয় না, যায় না। তবে বড়জোর সেটা (ধর্মীয় নয়) সামাজিক সচেতনতা ধরনের কাজ যেমন অধিকারবিষয়ক, দক্ষতা শেখানো, স্বাস্থ্য বা পরিবেশবিষয়ক ইত্যাদি এ রকম হতে পারে। সরাসরি রাজনীতি অথবা ধর্ম প্রচার- এটা আমাদের এনজিও আইনে একেবারেই নিষিদ্ধ। আসলে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরে কী কার্যক্রম নেবে এর বিস্তারিত বর্ণনা, কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করবে ইত্যাদির হবু কার্যক্রমের বিস্তারিত সব কিছু কর্মসুচি আগেই এনজিও ব্যুরোতে জমা দিতে হয়। দেওয়ার কথা। আর আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ তা সরেজমিন যাচাই করে ইতি রিপোর্ট দিলে তবেই সে বিদেশী এনজিও অর্থ ছাড়ের অনুমতি পায়। আর এর ব্যতিক্রম করলে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ আইনে জেল-জরিমানার কথা লেখা থাকলে সেটাও প্রয়োগ হতে পারে।

বাংলাদেশের ইসকনের ততপরতা সম্পর্কে সরকারের ভাষ্য দেয়ার পিক আওয়ার চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইসকন নিয়ে এক সরজমিনে রিপোর্ট, যা খুবই ভয়াবহ অবস্থা নির্দেশ করেছে, তা প্রকাশিত হয়েছে। ওর শিরোনামই বাংলাদেশে বেপরোয়া ইসকন,‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’য় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা।

একটা রাষ্ট্র-সরকার চালাতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে নরমে-গরমে অথবা বিশেষ খাতিরের অনেক রূপের সম্পর্ক রাখার দরকার হতে পারে। কিন্তু এসব ডিলিং বা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের যা প্রচলিত আইন তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা বা আইন বাঁকা করে ফেলার তো দরকার নেই বা তা কাম্যও নয়। নিশ্চয়ই প্রতিবেশীসহ যে কোন রাষ্ট্র যার যারটা-সহ সব দেশের আইনি সীমার কথা বুঝবে ও মান্য করবে, এটাই কাম্য। এনজিও প্রসঙ্গে আমাদের প্রচলিত আইন যথেষ্ট স্বচ্ছ। কাজেই রেকর্ড স্পষ্ট রাখা আর সেসব রেকর্ড পাবলিকের জন্য খুলে রাখা হল সব কিছু জটিলতা থেকে পরিত্রাণ ও দূরে থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। বাংলাদেশের মানুষকে জানাতেই হবে বাংলাদেশে ইসকন ঠিক কী কী করার অনুমতি পেয়েছে? কোন আইনে? আর ইসকনের ততপরতা দেশের আইনসম্মত আছে কী না?
তথ্য স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য রাখার পরও কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উত্তেজনা বা বিভেদ তৈরি করার কেউ চেষ্টা করলে সরকারের তা মোকাবেলা সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়। এছাড়া এমন সমাজে গুজব বিভ্রান্তি বা প্রপাগান্ডাও আসলে শুরু করাই কঠিন থাকে। কাজেই স্বচ্ছতা সরকারের সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র। আমরা কী তা বুঝব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২৬ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছেএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম’

 

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম

গৌতম দাস

০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2JS

https://www.kolkata24x7.com থেকে নেওয়া

[সার সংক্ষেপেঃ ছুপা হিন্দু জাতীয়তাবাদী গান্ধী-নেহেরুসহ ভারতের ইমেজ হল গান্ধীরা খুবই ভাল মানুষ। আর জিন্নাহ বেটা খুব খারাপ তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানিয়েছে, এতই খারাপ এরা। কিন্তু কঠিন সত্যি হল কংগ্রেস গান্ধী-নেহেরুসহ এরাই নিজেদের হিন্দুইজমের বাইরে কখনই যায় নাই। একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারতই কায়েম করতে কাজ করে গেছে তারা। আর এর সবচেয়ে বড় তাত্বিক নেতা হল গান্ধী। ফলে এদের হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হতে চাওয়াটাই নিরুপায় মুসলমানদেরকে ঠেলে দিয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান কায়েম করতে। কাজেই নিরুপায় হয়ে জিন্নাহ সঠিকভাবেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কায়েম করেছিলেন। বলা যায় মুসলিম লীগ মুসলিম জাতীয়তাবাদের দিকে কেন গিয়েছিল তা গান্ধী-নেহেরুসহ কংগ্রেসের হাতে নির্ধারিত হয়েছিল।
মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করা বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ কথিত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা যারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার দায় জিন্নাহ’র উপর এককভাবে চাপিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চায় তাদেরকে চ্যালেঞ্জ। এরা মনগড়া কথা বলে এই গল্প তৈরি করেছে। নিজেদের দায় আকাম জিন্নাহর উপর চাপিয়েছে।
এই লেখার একটা সারকথা এটা। তবে গান্ধী বনাম আরএসএসের তর্ক লড়াটাই কী ছিল তা জানার মাধ্যমে মূলত আপনাদেরকে চিনতে হবে গান্ধীর হিন্দুইজম-কে।]

 

আসেন ছুপা হিন্দুবাদীগণকে চিনে নেইঃ
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যাকে আমরা গান্ধী নামে চিনি। অনেকে তাকে আদর করে বা তেল দিয়ে তোয়াজ করতে বাপু বা মহাত্মা নামেও ডাকে। গান্ধী, জিন্নাহ, প্যাটেল- এরা সবাই মোদীর মতই গুজরাতি। যদিও সেকালের গুজরাট বলতে এটা বোম্বাই মানে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল। মাত্র গত ১৯৬০ সালে গুজরাত প্রথম বোম্বাই (মহারাষ্ট্র) থেকে রাজ্য হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। গত দুই অক্টোবর ছিল সেই গুজরা্তি গান্ধীর জন্মবার্ষিকী; তাও আবার ১৫০তম। সম্ভবত সে কারণে তাকে নিয়ে স্তুতিমূলক-মূল্যায়নের ছড়াছড়ি একটু বেশি দেখা গিয়েছিল এবার, এটা বলতে পারলে সহজ হত হয়ত। কিন্তু সমস্যা জটিল করে তুলতে সক্ষম হয়েছে, বিজেপি এবং আরএসএস এ দুই প্রতিষ্ঠানই। তাই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ‘১৫০তম’ জন্মবার্ষিকীই এবারের হইচইয়ের আসল কারণ কি না।

এক কথায় বললে, ভারতের জন্মের সময় থেকে কংগ্রেসের তৈরি সব না হলেও অনেক আইকন অথবা বয়ান এত দিন ধরে আরএসএস-বিজেপি এই গোষ্ঠী, এরা ভাগ বসিয়ে হয় নিজেদের আইকন করে নিয়েছে অথবা একে ম্লান বা পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। বিজেপির তেমনই আর এক এবারের উদ্যোগ হল গান্ধীকে নিজেদের আইকন করে নেয়ার চেষ্টা। খোদ আরএসএস প্রধান মোহন ভগত এ দিন দাবি করেছেন, “গাঁধীর আদর্শেই এগোচ্ছি”
তবে বলাই বাহুল্য, আইকন দখলের সময় বিজেপি-আরএসএস এর আগের বয়ান-মূল্যায়নকে নিজেদের মত করে আকার দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে থাকে। যেমন নেহরুর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গান্ধীঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল- এই প্যাটেলকে ইদানীং বিজেপি-আরএসএস একেবারে নিজেদের নেতা আইকন করে নিয়েছে। গুজরাতে পৃথিবীর দীর্ঘতম স্ট্যাচু এখন প্যাটেলের, মোদীর উদ্যোগে এটা বানিয়ে নেয়া হয়েছে। মোদীর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে ২০১৩ সালে, পরিচালনা কমিটি তৈরি, অর্থ সংগ্রহসহ এর কাজ তিনি উদ্বোধন করেছিলেন। প্যাটেলকে তুলে ধরারও কারণ-সূত্র একটাই। ভারত স্বাধীনের বছরের আগস্টের পরবর্তীকালে ৫৫০-এরও বেশি ছোট-বড় করদরাজ্যের রাজাগুলোকে বলপ্রয়োগে পিটিয়ে নতুন ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এই বলপ্রয়োগের প্রশ্নে নেহরুর সাথে প্যাটেল একমতে থাকলেও, প্যাটেল নিজে ও তার মন্ত্রণালয় ও এর কাজকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক আগ্রাসী ও চরমপন্থা অবস্থানে। আর শুধু সে কারণেই এক আগ্রাসী হিন্দুজাতিবাদী হিসেবে প্যাটেলকে পরিচিতির আইকন লাগিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে মোদি-আরএসএস গোষ্ঠী। তাই এবার খোদ গান্ধীকে দখল নিতে এবারে বিজেপি এক কর্মসুচি শুরু করেছে যার নাম, “গাঁধী সঙ্কল্প যাত্রা”। ভেঙে বললে এটা হল, থেমে থেমে আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে গান্ধীর জন্মের ১৫০ বছর পালনে বিজেপির নেয়া ১৫০ কিলোমিটার পদযাত্রার এক কর্মসূচি।

স্বভাবতই কংগ্রেসের গান্ধী, তাদের এত বড় “জাতির পিতা’ আইকন বিজেপি-আরএসএসের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া- এটা কংগ্রেস এখন দুর্বল ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেও আপত্তি তো তাদের তুলতেই হয়। তারা তুলেছেও, আর সাথে কমিউনিস্টরাও বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সঙ্গ দিয়েছে। বিজেপি-আরএসএসের গান্ধী দখলে এবারের বার্ষিকীতে ঝাপিয়ে পড়া নিয়ে খোঁচা মারাও কম হয় নি। যেমন কংগ্রেস নেতা  মল্লিকার্জুন খড়্গে; তিনি বলেন,  ‘‘এত দিন যাঁরা শুধু গডসের নাম নিতেন, ভোট পেতে তাঁরা গাঁধীর নাম নেওয়া শুরু করেছেন”।  গডসে [Nathuram Vinayak Godse] হল গান্ধীকে গুলি করে [৩০ জানুয়ারী ১৯৪৮] হত্যাকারী সেই আততায়ীর নাম। দলের দায় এড়াতে যে হত্যা করার আগে দিয়ে আরএসএস থেকে নিজে পদত্যাগ করে নিয়েছিল। আর একালে এই সেদিনও প্রকাশ্যেই বিজেপি গডসে কে দলের হিরো মেনেছিল।

ঘটনার এ দিকটা নিয়ে আমাদের আর এতে খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু এই ১৫০তম উপলক্ষে আমরা অন্তত তিনজন একাদেমিকের লেখা বা মন্তব্য জানতে পেরেছি। এদের একজন প্রফেসর ও লেখক রামচন্দ্র গুহ [Ramachandra Guha], যাকে গবেষক বা ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করা সিরিয়াস লেখক বলা যায়। কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি বর্ষ-পুরানা চিবিয়ে রাখা জিনিষটাই আবার চিবাতে থাকেন, এমন ভারতীয় একাদেমিক না। তার চিন্তার ফ্রেম পুরানাদের চেয়ে আলাদা। কাজেই খুব বড় করে পরিচয় না বললেও আপাতত অন্তত এতটুকু বলতেই হবে। তিনি কলকাতার ইংরেজি দৈনিক “হিন্দুস্তান টাইমস” এবং “টেলিগ্রাফে” কলাম লিখে থাকেন। সেখানে যেমন লেখা এক কলামের তিনি শিরোনাম দিয়ে দিয়েছেন – “সোনিয়া গান্ধীর কেন ইবনে খালদুন পড়া উচিত”। অবলীলায় ইবনে খালেদুনের নাম নিয়ে কথা বলা একাদেমিক ভারতে খুব কমই আছেন!

তিনি “গান্ধী ও আরএসএস” [Gandhi and the RSS] – এই শিরোনামে এক কলাম লিখেছেন গান্ধীর ‘১৫০তম জন্মবার্ষিকী’র তিন দিন আগে। এটা ছিল গবেষণাধর্মী দেড় হাজারের বেশি অক্ষরের এক সিরিয়াস লেখা, সাথে সুনির্দিষ্ট বইপুস্তকের রেফারেন্স। যার মূল প্রসঙ্গ হল, ঘটনাকাল ১৯৪৭ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর, এই সময়কালে গান্ধীর সাথে আরএসএসের সম্পর্ক কেমন গিয়েছিল, তা রেফারেন্সসহ তুলে আনা। তাঁর লেখায় ঘটনার মূল পাত্রপাত্রী হল একদিকে গান্ধী আর অন্য দিকে আরএসএস প্রধান গোলওয়ালকার [Golwalker] ও তার দল।  সে সময়ে নানান শহরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ঘটছিল আর গান্ধী সেসব শহরে গিয়ে দাঙ্গা থামানোর উপায় হিসেবে অহিংস প্রতিবাদে দাঙ্গা না থামা পর্যন্ত অনশনে বসছিলেন। এছাড়া এর পাশাপাশি আরএসএসও সেসব শহরে গিয়ে মুসলমান ও গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, হুমকি দিয়ে কিভাবে লিপ্ত হত অথবা তাদের মুখপাত্র “অর্গানাইজার” পত্রিকায় উসকানি দিয়ে কী লিখত, এমনকি গান্ধীর সাথে চিঠি চালাচালি বা একবারের মুখোমুখি সাক্ষাতে কিভাবে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার অভিযোগ অস্বীকারের লুকোচুরি খেলে গান্ধীর প্রচেষ্টাগুলো ভণ্ডুল করে গেছিল – গান্ধী রচনাবলী ও আর্কাইভ ঘেঁটে তা তুলে আনা- সেসবের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এই লেখায় পাব। তিনি বলেছেন, আর দুদিন পরে (জন্মবার্ষিকীতে) মোদী ও আরএসএস গান্ধী সম্পর্কে নানান ভাল ভাল কথার ফুলঝুড়ি [nice things will be said] তুলবে। তাই এর আগেই তিনি সেকালে গান্ধী ও আরএসএসের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নিয়ে এই রেকর্ড হাজির করে রাখতে চান।
এই লেখকের লেখা অনুসারে, পলিটিক্যাল লাইনের দিক থেকে গান্ধীর অবস্থান হল, তিনি বহুধর্মীয় জাতীয়তাবাদের (religiously plural nationalism) ধরণের এক ভারত চাইছেন, সেজন্য লড়েছেন। গান্ধীর এই হিন্দুবাদে হিন্দুধর্ম বলতে এটা ‘এক্সক্লুসিভ রিলিজিয়ান’ নয়। মানে একা হিন্দুধর্ম না, অন্য (মুসলমান) ধর্মও সাথে আছে। [Hinduism was not an exclusive religion]। কিন্তু মূলকথা এই বিশেষ হিন্দুবাদের, একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভারত চাইছেন গান্ধী। বিপরীতে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার চাইছেন মুসলমানদের মেরে কেটে হলেও বাধ্য করে পাকিস্তানে পাঠানো। হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই মুসলমানদের হিন্দুস্তানে রাখে” [no power on Earth could keep them in Hindustan”]। তো এসব লেখা বা কথার সারাংশ হল, একজন মুসলমানদের কচুকাটা করে ভাগাতে চাইছেন তো অন্যজন হিন্দু-মুসলমানের কথিত ঐক্যের পুর্বশর্ত ও এর জোয়ার তুলতে চাইছেন। না হলে অনশনে, না খেয়ে রইছেন। আর একারণে কাজের কাজ কিছু হোক আর না হোক অন্তত সহানুভুতি তার পক্ষে যাচ্ছে। এতে গান্ধীর আপাত জিত ও জাতির পিতা হওয়া তো কার পক্ষে ঠেকানো যায় নাই।

কিন্তু আসল কথা হল, তাতে লাভ কী হয়েছে? ভারত কি হিন্দু-মুসলমানের ভারত হয়েছে? পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলেও ভারতে নিয়মিত দাঙ্গা হয়ে চলেছে। এমনকি চলতি শতকের শুরুতেও গুজরাটে বড় দাঙ্গা হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত নাগরিকের রাষ্ট্র হতে পারেনি। হিন্দুর রাষ্ট্র হয়ে থেকেছে। পারস্পরিক ধর্মীয় বিদ্বেষ কিছুই মেটেনি, দীর্ঘ সময় যাওয়াতে যা যতটুকু চাপা পড়েছিল তা প্রবল হচ্ছে আবার। সারকথা গান্ধীর নিজের আমল থেকেই দাঙ্গা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু কেন? এর জবাব গান্ধী কখনো দেননি। অর্থাৎ গান্ধীর হিন্দুইজমের ভারতরাষ্ট্র এটা কখনই সমাধান হতে পারে নাই। আসলে তা হওয়ার কথাও না।

তবে রামচন্দ্র গুহের এই পরিশ্রমী কাজটির পরও এই লেখা থেকে একালে, মোদি-আরএসএস খারাপ আর গান্ধী মহান- এর বেশি কিছুই প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। গান্ধীর হিন্দুইজমের বিপরীতে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ- এর ভারত আরও শক্ত হয়ে হাজির হয়েছে। এককথায় রামচন্দ্র গুহের পরিশ্রমটার মধ্যে কোন প্রতিকার নাই, ইঙ্গিত নাই। আছে খালি গান্ধী মহান! সে তো আমরা সকলেই জানতামই!

আবার আর দুই শিক্ষাবিদ- গৌতম ভদ্র ও দীপেশ চক্রবর্তী, এদের মন্তব্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করেছে আনন্দবাজার, এখানে “গাঁধীর স্বরাজ আর সঙ্ঘের রাষ্ট্র এক নয়” – এই শিরোনামে। এদুইজনের মিলের দিকটা হল তারা নিজেদের সাবঅল্ট্রান [subaltern] ধারার প্রবক্তা ভাবেন বা ভাবতেন, যদিও তারাই এখন বলে থাকেন, এই ধারা এখন সাংগঠনিকভাবে মৃত। এদের একটা বৈশিষ্ট্য বলা যায় যে, তারা হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোলে বসে সেই চোখে দেখার যে অভ্যস্ত যুগ ও ধারা ছিল এর বাইরের এরা। বরং সমাজের যাদের কথা বা স্বর শোনা হয় না, উপেক্ষিত, নিচু আয়ের, নিচু জাতের মনে করে চাপানো হয় ইত্যাদি তাদের উদ্বেগগুলো উঠিয়ে আনা বা তাদের জায়গায় বসে দেখার পক্ষের লোক। কিন্তু মডার্ন রিপাবলিক গড়তে একটা ‘জাতি’ ধারণা বা একটা না একটা “জাতীয়তাবাদ” অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে এরা মনে করেন কি না- এই প্রশ্নে, প্রশ্নটাই তাদের মাথায় এসেছে এমন প্রমাণ দেখা যায় না।
তবে দীপেশের এখনকার অবস্থানটা হল, ঠিক মোদী মানে উদ্র জাতীয়তাবাদীরা নয় তবে সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ যেহেতু ভারত মেনেই নিয়েছে তাহলে একইভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে জায়গা করে দিতে অসুবিধা কী। প্রথম আলো বা তাদেরই প্রতিচিন্তায় তাঁর কিছু লেখা দেখে এমন মনে হয়েছে। কিন্তু মূল কথা যেটা, কেন ধর্মীয়সহ যেকোন জাতীয়তাবাদ একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয় পুর্বশর্ত মনে করা হয়েছে? এটা ভিত্তিহীন নয় কেন, সে প্রশ্ন এদের অবস্থান দেখা যায় নাই।

এদিকে আনন্দবাজার দীপেশের একটা বড় উদ্ধৃতি এনেছে সেটা হল এরকম, “হেডগেওয়ার ১৯৩৪ সালেই বলে দিয়েছিলেন, রাজনীতি বিষয়ে সঙ্ঘ উদাসীন। অন্য দলের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সে খাদির সমর্থক এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের বিরোধী নয়। তখনকার কংগ্রেস আর সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেস যেমন এক নয়, হেডগেওয়ারের সঙ্ঘ আর আজকের সঙ্ঘও এক নয়”। এই কথাটাকে স্পষ্ট বুঝবার জন্য এখানে ফুটনোট দিয়ে রাখছি। তা হল, আরএসএস –এর পুরা নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংক্ষেপে একে সঙ্ঘ বলে ডাকে অনেকে। এই সঙ্ঘ ১৯২৫ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হেডগেওয়ার (কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার)। আর পরবর্তিতে ৪৭ সালের দিকে আরএসএস-এর প্রধান ছিলেন,  গোলওয়ালকার (মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার); যার নাম এই লেখার প্রথম দিকে নেয়া হয়েছে।

বিপরীতে গৌতম ভদ্র – তার বিজেপি-আরএসএস সমালোচনা অনেক সরাসরি। তার দুটি উদ্ধৃত বক্তব্য ঐ রিপোর্টে এসেছে। যেমন- ভদ্র আরএসএস প্রধানের সমালোচনা করে বলছেন – ‘ভারত আধ্যাত্মিক দেশ। আধ্যাত্মিক পথেই এর উত্থান হবে বলে চেয়েছিলেন গাঁধী” – মোহনের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। বরং আসল বক্তব্য ও ব্যাখ্যা হল, “গাঁধী কখনই আধ্যাত্মিক দেশ বলেননি। তিনি ধর্মের কথা বলেছেন, রামরাজ্যের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই রাম অযোধ্যায় থাকেন না, অস্তিত্বের ভেতরে তার স্বর অনুভব করা যায়। ইনার ভয়েস!”।
আর ভদ্রের দ্বিতীয় উদ্ধৃতি, গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে প্রবন্ধের অর্থ, এখনকার আরএসএস প্রধান মোহন ভগত যেভাবে করেছেন, এর সমালোচনা সংক্রান্ত। মোহন বলেছেন, “পরাধীনতার ফলে তৈরি গোলামি মানসিকতা যে কী ক্ষতি করতে পারে, গাঁধী বুঝতেন। স্বদেশী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তাই এক ছাত্রের চরিত্র এসেছিল। তৎকালীন রাজনীতিবিদেরা দেশের পূর্ব গৌরব ভুলে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ চালিয়ে যেতেন। তার প্রভাব আজও দেখা যাচ্ছে”। শেষে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন, ‘গাঁধীর পথ ধরেই ভারত আবার বিশ্বগুরু হয়ে উঠবে”।
আনন্দবাজার বলছে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে, দুই ইতিহাসবিদই আপত্তি করে তাদের মতে বলছেন, “হিন্দ স্বরাজ নিছক স্বদেশীর কথা বলে না। সে আধুনিকতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর নৈরাজ্যবাদের কথা বলে। সঙ্ঘের রাষ্ট্রবাদের সাথে তার সম্পর্ক নেই”। ‘আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের অসভ্য করে’- ঐ বইয়ে লিখেছিলেন গাঁধী। ‘হিন্দ স্বরাজ’ আর ‘হাউডি মোদি’ মেলে না কিছুতেই! তবে দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, গান্ধীর কাজকে তিনি বলছেন, একে “জেহাদি অহিংসা বলতে পারেন”। গৌতম ভদ্রও এতে একমত। মোটা দাগে তাঁদের সারকথা হল, মোদি ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি নয়। যদিও সেটা তো বলাই বাহুল্য।

আসলে এখান থেকে দু’টি প্রশ্ন উঠে, যা নিয়ে উপরের রামচন্দ্রসহ তিন শিক্ষাবিদের কেউই তোলেননি। তার প্রথমটি হল, যদি মোদী ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি না-ই হয়, তবু মোদী ও আরএসএস গান্ধীকে নিজেদের করে নেয়ার সুযোগ নিতে বা দাবি করতে পারছেন কেন? এই যে দুইটা পক্ষ এদের উভয়ের চিন্তার মিল বা মৌলিক দিকটি কী ছিল?
কংগ্রেস ও আরএসএস ভিন্ন রাজনৈতিক দল অবশ্যই। তবুও তাদের রাজনীতিতে মিলের দিকটি হল – হিন্দু জাতীয়তাবাদ। উভয়েই হিন্দু জাতীয়তাবাদী। আর ফারাক হল, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে দুই দল দু’ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। আরএসএস বলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ- এটাই হিন্দুত্ব। হিন্দু জাতি খাঁটি, পিওর; খাঁটি আর্য রক্তের ধারা হিন্দুরা। এটাই আবার হিটলারের ভাষায় জর্মানিরা পিওর আরিয়ান রেস (খাঁটি আর্য রক্তের)। অর্থাৎ এরা তাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে এই একই জায়গাকে কেন্দ্র করে। এ কারণে হিটলার ও আরএসএসের রেসিজম বা বর্ণবাদিতা, জাত-শ্রেষ্ঠত্ব একই ধরনের।
বিপরীতে গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় তাঁর দাবি হিন্দু বা হিন্দুইজম শব্দ – এটা কেবল একটা হিন্দুধর্ম নয়, অন্য (মুসলমান) ধর্মও। এ নিয়ে তার ব্যাখ্যার পক্ষে বিস্তর কোশেশ আছে। যেমন দাঙ্গার মুখে প্রতিকার হিসেবে তিনি হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলাতে চান আবার, মুসলমানকে জয় শ্রীরাম ধরনের কিছু। এ কারণে গান্ধীর হিন্দুইজমের পূর্বশর্ত হচ্ছে, কথিত এক ফ্যান্টাসির “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য”। এ প্রসঙ্গে গান্ধী নিজ দলীয় কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশ করে বলা ১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বরের এক ভাষণ থেকে রামচন্দ্র গুহের গবেষণায় উদ্ধৃতিটা দেয়া হল এখানেঃ “be true to the basic character of the Congress and make Hindus and Muslims one, for which ideal the Congress has worked for more than sixty years”.

কিন্তু বাস্তবতা হল, গান্ধীর নির্দেশ নিজের দল কতটা মেনেছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ তো বটেই। এ ছাড়া, এমনকি তা পুরোপুরি মেনে চললেও ফলাফল শূন্যই হয়েছিল। তখন ও এখনকার বাস্তবতাই এর প্রমাণ। তাহলে মূল সমস্যা কোথায়? গান্ধীর “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য” কথার আসল মানেই বা কী? এর সোজা অর্থ পরস্পরের ধর্মের পক্ষে জয়গানের স্লোগান দিতে হবে, এটাই বলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য।

কিন্তু তাতে এ থেকেই আবার, হিন্দুদেরকে কেন আল্লাহু আকবর বলতে বলছেন গান্ধী- এই অভিযোগ তুলে আরএসএস তাদের মুখপাত্র অর্গানাইজার পত্রিকায় গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করে তাদের ধুয়ে দিয়েছিল। আসলে এতে উল্টো আরএসএসের পক্ষে দাঙ্গা বাধানোই সহজ হয়ে গেছিল।

এখানে মূল কথা হল, গান্ধীর এই ঐক্যের প্রস্তাবই ছিল অলীক ও অবাস্তব, বাস্তবায়ন অযোগ্য। ধর্ম মানুষের যার যার কোর বিশ্বাসের প্রশ্ন। এখানে চাইলেই এক ধর্মের লোক আর এক ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বলে ধ্বনি দিতে পারে না। এমনকি কোনো মুসলমানের অন্য ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বা মূল শ্লোক বা কালাম উচ্চারণ করার পরে সে আর মুসলমান থাকে কি না সে প্রশ্ন তো উঠবেই! আবার এটা হিন্দুর দিক থেকেও একই ভাইসভারসা। অথচ গান্ধীর প্রস্তাব ও ব্যাখ্যা দাবি করছে একটা ভারত রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এসব অস্বস্তিকর নিজ নিজ ধর্মবিরোধী অবস্থানে নাকি যেতেই হবে। হিন্দু-মুসলমানের তথাকথিত ঐক্য- এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব নাকি এতই।

এক কথায় বললে গান্ধীর কথিত ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ প্রকল্প- এর ধারণাই বাস্তবায়ন অযোগ্য। ফলে তা অবাস্তব হয়ে থেকে গেছে। আর গান্ধী খুন হয়ে মরে যেন বেঁচে গেছেন।

কিন্তু কেন একটা ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ, বিশেষ করে তা কেন ‘হিন্দুইজমের’ হতেই হবে ? এ ছাড়া একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদই কেন দরকার? একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে চাইলে কেন এটা অনিবার্য?

লক্ষণীয় যে, ওপরের তিন ভারতীয়  একাডেমিকের কেউ এসব প্রশ্নগুলোর দিকে যাননি বা যেতে চাননি। কোনো রাষ্ট্র গড়তে চাইলে একটা জাতীয়তাবাদ, তাও আবার একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ- এটাকে কেন এসেনশিয়াল বা অনিবার্য প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। জাতীয়তাবাদ যার গোড়াটা আছে কথিত এক ‘জাতি’ ধারণায়। বাংলায় জাতি বললেও এটা দু’টি আলাদা ধারণা ইংরেজিতে রেস ও এথনিক- এ দুই শব্দের অর্থ বাংলায় একটাই- ‘জাতি’ করা হয়ে থাকে।

লক্ষণীয় যে, ইংরেজিতে এই দু’টি শব্দই অরাজনৈতিক পরিচয়-প্রকাশমূলক শব্দ। যেমন বাঙালি রেসের লোক আর আমার খাদ্যাভ্যাস বা ধর্ম-সংস্কৃতি কী হবে এই এথনিক পরিচয় আমার জন্মের আগে থেকেই নির্ধারিত। এই পরিচয়গুলো আমরা যে কেউ বেছে নিয়ে দুনিয়ায় আসি না বলেই, এগুলো অরাজনৈতিক। এর দায় আমার নয়। এর সাথে আমি কেমন রাষ্ট্র গড়বে এর সম্পর্ক কী? এমন কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই রাষ্ট্র গড়তে চাইলে নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে সংশয় তৈরি করার প্রয়োজন কী?

নিশ্চয় নেহরু-গান্ধীরা কোনো বোকা অবুঝ মানুষ নন! কিন্তু তবু সেই রামমোহনের আমল থেকেই আমরা যেন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ অনিবার্য প্রয়োজনীয়, এমন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তালাশে থাকতে দেখতে পাই আমরা। কেন?

মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের তাবৎ কামনা, বোঝাবুঝি আগ্রহ ইত্যাদি সব কিছুর উৎস হল ব্রিটিশ কলোনি মাস্টারের রাষ্ট্র। রামমোহন থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই বিশ্বাস করতেন [তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় থাকা একমাত্র রাষ্ট্র] যে ব্রিটিশ রাষ্ট্র তারা দেখছে এর নাগরিকদের এক থাকার পেছনে তাদের একই ধর্মীয় পরিচয় ( এংলিকান ক্যাথলিক, Anglican Catholic)- এটাই তাদের কথিত ঐক্য বা এক হয়ে থাকার ভিত্তি হয়ে আছে। কাজেই ভারতেরও একটা রাষ্ট্র হতে গেলে তাদেরও একটা ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে একটা একক ধর্ম থাকতেই হবে। এই ছিল তাদের প্রবল অনুমান। কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভুল ও ভিত্তিহীন। বৃটিশ রাষ্ট্রের ভিত্তি মানে তা এক হয়ে আছে কোন Anglican Catholicism র কারণে নয়।   যদিও আবার এরা সবাই দেখেছিল ভারতে সেটা বাস্তবতা নয়। কারণ অবিভক্ত ভারতে সবার ধর্ম এক হিন্দুত্ব মানে এক হিন্দুধর্ম তা ছিল না। তাই সেখান থেকে রামমোহন বলে গেছিলেন অবিভক্ত ভারতের সবার জন্য একটা ব্রাহ্ম ধর্ম তৈরি করতে, যদিও সেটাও  অলীক ও অপ্রয়োজনীয় বলে ব্যর্থ হয়েছিল। সম্ভবত সেকারণে গান্ধীর পথটা রামমোহন থেকে আলাদা হয়েছিল। যেটা আবার পরবর্তি উদ্যোগ হিসাবে বঙ্কিম চন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) -এর হিন্দুত্বের কাছাকাছিই, ইসলামবিদ্বেষী ছুপা অথবা উদাম।

এককথায়, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে ঐ সমাজে পিছনে একটা একক ধর্মের মিল বা ঐক্য থাকতেই হয়, এই অনুমান মিথ্যা, ভিত্তিহীন। সম্পুর্ণত এক ভুল ধারণা। বরং রাষ্ট্রে নাগরিক এক হয়ে থাকে – নাগরিক ঐক্য থাকে – মূলত বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার বা নাগরিক নির্বিশেষে “সাম্য” কায়েম রাখতে পারলে। এটাকেই অনেকে ক্লাসিক অর্থে সেকুলারিজম (ইসলামবিদ্বেষী সেকুলারিজম নয়) বলেও বুঝে থাকে।

পরবর্তীকালে সেই একই কারণে গান্ধী নতুন ব্যাখ্যা দিলেন যে ভারতের হিন্দুইজম মানে এটা একটা ধর্ম না, বহু। এক রিলিজিয়াস প্লুরালিটি। একে হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্ম বলে, বহু বলে বুঝতে হবে দাবি করতেন। গান্ধীর হিন্দুইজম বলতে তাই ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য’ কথাটা এভাবে বুঝতে হবে। গান্ধীর এই অবাস্তব সোনার পাথরের বাটি ধারণার উৎস এখানে। অথচ হিন্দু ও মুসলমান শুধু নয়, বরং যেকোনো দুই মানুষ এক বোধ, একটা ঐক্যবোধ করতে পারে খুবই সহজে এভাবে যে,  পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রে সব নাগরিক সমান, তাদের নাগরিক অধিকার সমান- এই ভিত্তিতে যদি একটা রাষ্ট্র গড়া যায়। মানুষের এথনিক, রেসিয়াল, নারী-পুরুষ, ভাষা বা ধর্মীয়সহ যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে এক অধিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কায়েম ছিল এর আসল সমাধান। অথচ খুব সম্ভবত হিন্দু বা হিন্দু সভ্যতা এসব কোনো ধারণার আড়ালে গান্ধীসহ সবার মনেই একটা হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব একটা হেজিমনি কায়েমের, এর ধারণা কাজ করত। তাই কোন হিন্দুইজম ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা তারা করতে চান নাই, বা পারেন নাই। অথচ এক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে হিন্দু-মুসলমানকে এক হয়ে যেতে হবে কেন? এছাড়া এই – হিন্দু-মুসলমান এক করে ফেলা – এই প্রকল্পটাই তো অলীক অবাস্তব; এক সোনার পাথরের বাটি!

ফলে বাস্তবত এক দিকে গান্ধীর দেয়া অলীক অবাস্তব প্রস্তাবের কারণে হিন্দু-মুসলমান এরা এক পরস্পর বিরোধাত্মক পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছিল এবং যেটা এখনো আছে। আবার তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য থাকতে হবে বলে পরস্পর একে অপরের ধর্মের পক্ষে চিল্লা দিতে হবে বলে দাবি করছেন, নইলে তিনি অনশনে যাবেন। আর অন্যদিকে আরএসএস গান্ধীর এই অবস্থানকেই যে [হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলতে হবে], গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে আরএসএসের পক্ষে আনার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার ও দাঙ্গায় প্ররোচিত করে গেছে।

সারকথায়, গান্ধী নিজেই দাঙ্গার কারণ, আবার দাঙ্গা উঠে এলে তিনি অনশনে বসে গেছেন! আর এই গান্ধীকেও মোদী ও আরএসএস এখন নিজেদের করে নিতে চাচ্ছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৫ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে গান্ধীর স্ববিরোধী ‘হিন্দুইজম“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]