ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

গৌতম দাস

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2IQ

 

Om Birla during Hindu Mahasabha event (Facebook/om birla) by NEWS18, India

ভারতের আরএসএস বা বিজেপির অঙ্গসংগঠন অনেক। এগুলোর একটা হল, “অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভা”। শুধু ব্রাহ্মণদের নিয়ে সংগঠন এমন আরো আছে – ‘অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ একতা পরিষদ, সর্বব্রাহ্মণ মহাসভা, পরশুরাম সর্বকল্যাণ, ব্রাহ্মণ মহাসভা’ ইত্যাদি। অবশ্য বুঝাই যায় হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিচরণ ধর্মকে পেশা হিসেবে নেয়া অসংখ্য ব্যক্তি বা তাদের দলের মধ্যেই হবে।

গত নির্বাচনের (মে ২০১৯) পরে, ভারতের লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছিল রাজস্থানের এক এমপি, ওম বিড়লাকে। তার পরিচিতি পড়ে তিনি কোনো বড় কেউকেটা কেউ নন মনে হচ্ছে। এমনকি তিনি আইনের ছাত্রও নন। সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পিকাররা আইন পেশার ব্যক্তিত্ব হন। বিড়লা আগে ছিলেন রাজস্থানের প্রাদেশিক সংসদের (ভারতের ভাষায় বিধান সভা বা Assembly) তিনবারের এমএলএ। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বিজেপির যুব সংগঠন – ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার সাবেক রাজ্য সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্থান রাজ্যের কোটা শহরে অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভার এক সভায় যোগ দিয়েছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। কোটা স্পিকারের নিজের নির্বাচনী কনস্টিটুয়েন্সিও। তবে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের শুরু ওই সভায় তার বক্তৃতা থেকে।

তিনি সেখানে ঠিক কী বলেছেন এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বলাটা ঠিক হয়েছিল কিনা, এটাই বিতর্কের বিষয়। কারণ আসলে অনুষ্ঠানস্থল ছিল – রাজস্থান রাজ্যের রাজধানীও নয়, তৃতীয় বড় শহর এই কোটা, যেটা আসলে এক জেলা শহর মাত্র। তাই, ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে সেখানে ভারতের প্রধান পত্রিকাগুলোর সাংবাদিক অনুমান করা যায়, খুব কমই উপস্থিত ছিলেন। তবে সব পত্রিকাতেই ঘটনার নিউজ হয়েছে ছোট, কিন্তু অথেনটিক। কারণ স্পিকার নিজেই এক টুইট করেছেন বা ফেসবুকে ছবি দেয়েছেন ওই সভা প্রসঙ্গে। সেটাই সবার খবরের উৎস। তবে মাত্র তিনটা বাক্যের এক টুইট, তা আবার হিন্দিতে লেখা। অথেনটিক তিনটা বাক্যই সব বিতর্কের উৎস।

স্পিকার বিড়লা তার টুইটারে অনুষ্ঠানের কয়েকটা ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, “সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। যে স্থান তাদের ত্যাগ ও তপস্যার ফল। এ কারণেই সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময় পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন”।

“Brahmins have always had a high status in society. This status is a result of their sacrifice and dedication. This is the reason that Brahmins have always been the guiding light for society,” – নিউজ১৮, এটা একটা টিভির ওয়েব পেজ, থেকে নেওয়া।

কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্ট পড়লে মনে হয়, পত্রিকাটি যেন সবসময় ক্লাস টুয়ের বাচ্চাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ও শেখানোর লক্ষ্যে লিখছে। তবে বলাই বাহুল্য, তারা আবার ঝোপ বুঝে চলে। এবার মনে হচ্ছে কোপ দেয়ার সুযোগ দেখেছে, তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের প্রথম বাক্য, “ব্রাহ্মণেরা সমাজে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য করে বিতর্ক বাধালেন স্পিকার ওম বিড়লা”। আর ও প্রকাশের হিন্দি বক্তব্যের আনন্দবাজারের করা বাংলাটা হল, ‘‘ত্যাগ ও তপস্যার কারণে ব্রাহ্মণেরা বরাবরই সমাজে উচ্চ স্থানে আসীন। তাঁরা সমাজে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন।’’

কিন্তু কথা হচ্ছে এটাই কি ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ভারতীয় হিন্দু সমাজের প্রধান ও সত্য বয়ান নয়!  তাই এমন কথা কী ওম বিড়লাই  প্রথম! ব্রাহ্মণের জাতভেদের বয়ানের ওপর দাঁড়িয়েই কি তাদের সমাজ বিভক্ত নয়? এছাড়া  একালে বিজেপির উসকানি-প্রটেকশনে পুরানা দিন ফিরিয়ে এনে একে ব্রাহ্মণ্য বলশালী কর্তৃত্বের বয়ান হিসেবে সমাজে তা ফেরত আনার চেষ্টা কী চলছে না? দোষ একা যেন কেবল স্পিকারের – আনন্দবাজারের এমন ভান করার দরকার কী?

এই তো গত মার্চ মাসে (২০১৯) ভারতের প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক গিয়েছিলেন উড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির দর্শনে। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ, ব্রাহ্মণমতে একজন দলিত বা নীচু জাতের মানুষ। তাই তার মন্দিরে “প্রবেশ নিষেধ”। এই যুক্তিতে ঐ মন্দিরের ভক্ত ও সেবায়েত- তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের পথরোধ করে বাধা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, এটা “শকিং, চরম বিব্রতকর ও বেয়াদবি আচরণ”। [In a shocking and an extremely embarrassing incident …‘misbehaved with’ ]  আরো লিখেছিল, মন্দির পরিচালনা প্রশাসনের মিটিংয়ে আলাপ হয়েছে, এমন রেকর্ড মোতাবেক কথিত সেবায়েতরা প্রেসিডেন্ট পত্নিকে তাঁর চলার পথের সামনে বাধা দিয়ে তাকে ‘ধাক্কা মেরেছেন” [The group had also shoved the First Lady, as per the minutes of a meeting occurred……… ]। অথচ এনিয়ে কোনো আইনি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোথায় হয়নি। এটাই কি বাস্তবের ভারতীয় হিন্দু সমাজ নয়?

আসলে মন্দিরের দেবতা-রক্ষকদের দাবি মতে, ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে উল্টা, যেন দেবতা নন, দলিতেরা এতই ‘পাওয়ার ফুল’ যে তাঁরা কোনো মন্দির কেন, এমনকি খোদ দেবতাকে ছুঁয়ে দিলে অচ্ছুতেরাই সব কিছুকেই অপবিত্র করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতীয় হিন্দু সমাজের জাত-বিভক্তির উঁচা-নিচা সত্যি খুবই ‘আধুনিক’!

ভারতের স্পিকার ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে যতগুলো অভিযোগ উঠেছে, এসবের মূল কথাটা হল, এটা “জাতবাদ” বা “জাতের শ্রেষ্ঠত্ববাদ”; মানে এটা বর্ণবাদের [racism] মতই আর এক নস্টামি। যেমন, কংগ্রেসের এক প্রাক্তন এমপি, দিল্লির উচ্চ আদালতের নামকরা উকিল কপিল সিবাল বলেছেন, এটা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধযুক্ত মনের, এক মন্তব্য” [senior Congress leader Kapil Sibal said that his mindset reeks of casteism]। তিনি আরও বলেন, “It is this mindset that caters to a caste-ridden unequal India. We respect you Birlaji not because you are a Brahmin but because you are our Speaker in Lok Sabha,” tweeted Kapil Sibal.]। “বিড়লাজি, আমরা আপনাকে সম্মান করি কারণ আপনি স্পিকার, কিন্তু আপনি ব্রাহ্মণ বলে না”।

কথাটা সঠিক। কিন্তু সমস্যাটা হল, কেউ যখন কটু বা পঁচা গন্ধের কোন কিছু নিয়ে সারাক্ষণ সারাদিন নাড়াচাড়া করতে থাকে তাতে একসময় তার শরীর ওই খারাপ গন্ধ-প্রুফ হয়ে যায়। খারাপ গন্ধটা এতই গা-সওয়া হয়ে যায় যে, তার কাছে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি কেউ তাকে মনে করিয়ে দিলেও সে এটা বিশ্বাস করতে বা মানতে চায় না। বিজেপি-আরএসএসের অবস্থাটা হয়েছে তাই। তারা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধপ্রুফ” বা গা-সওয়া হয়ে গেছেন।

হিন্দু-ধর্ম চর্চাকারী সমাজের প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য জাত-ভেদ [caste system]। সমাজের সব মানুষকেই উচা-নিঁচার বিভিন্ন স্তরে এখানে ভাগ করা হয়ে থাকে। তাই হিন্দু ধর্ম মানেই এই জাত-ভেদ প্রথা তার প্রধান অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য। যদিও মানুষের আধুনিক জীবন যাপনের বা শহরায়নের সাথে সাথে জাত-ভেদ ধারণা ও এর চর্চার প্রাবল্য কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই বিজেপির আমলে এটা এখন আবার উল্টামুখী। জাত-ভেদ ব্যবস্থাটাকে অনেক ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ [Brahminism] বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এই সিস্টেমে এর ভিত্তি বা চিন্তাটা হল, ব্রাহ্মণকে শীর্ষে রেখে এটা সমাজের বাকি সব মানুষকে অধস্তন বানায়। এভাবে একটা জাত-ভেদের ব্যবস্থামূলক ধর্ম হয়ে তা নিজেকে হাজির করে থাকে। এই “অধস্তনতার বয়ান” বাস্তবে সক্রিয় ও সত্যি হয়ে যায় এজন্য যে, ওখানে দাবি করা হয়, যাগ-যজ্ঞ-পূজার একমাত্র অধিকারি ব্রাহ্মণের। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ, সবার উপরে।

অনেক হিন্দু ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ শব্দ ও এর অর্থটা না বুঝে ভুল আচরণ, প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন। তাই না বুঝে মনে করে বসে যে কেউ ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ লিখেছে সুতরাং এটা নিশ্চয় হিন্দুদেরকে গালি দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা একেবারেই এমন না। যেমন ইতিহাসবিদ বা প্রাক্তন সাব-অল্টার্ন গ্রুপের সদস্য গৌতম ভদ্র, তিনিও ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তিনি মনে করেন ও  লিখেছেন, বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক”। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দটা কোন গালি নয়, একটা বিশেষ ধরণের চিন্তা ও সেই আদর্শ ও বৈশিষ্ঠকে চিনানোর একটা শব্দ বা নাম এটা।

থিওলজিক্যাল স্কলারদের মধ্যেও, সেই প্রাচীন কালে এমন জাতভেদমূলক-ব্যবস্থা কেন করা হয়েছিল এর এক ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, সেকালের জনগোষ্ঠির পক্ষে সন্তান জন্মদান বা প্রজন্ম টিকানো কঠিন ছিল বলে এটা চালু হয়েছিল। কিন্তু তাতে এটা ন্যায্য-সাফাই হোক আর না হোক, একালে সমাজের হিসেবে এই জাত-ভেদ প্রথা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মূল কারণ এটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের আমল। এখানে নাগরিক অধিকারে অসাম্য, বা মানুষ সকল সমান না এমন বক্তব্যের পক্ষে সাড়া পাওয়া কঠিন। সেটা যাই হোক, এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, কালক্রমে সমাজের এই জাতিভেদ  ব্যবস্থাটাই হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে – একজনের ঘাড়ে চড়ে অন্যদের বা কথিত উঁচু জাতের দাবিদারদের আয়েশি জীবন যাপনের ব্যবস্থার উৎস।

আর যারা একবার জাতের স্তরভেদের সুবিধা লুটেছে তারা আর তা ছাড়তে চাইবে কেন! চাওয়ার কারণ নেই। শুধু তাই না, সমাজের কাছে জাতভেদ প্রথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওই উঁচু জাতের দাবিদারেরাই নিজের অন্যায় সুবিধা অপরিবর্তনীয়, এটা স্থায়ী এমন এক ধারণা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে এখনো। অর্থাৎ ধর্মের নামে জাত-ভেদের ওপর আস্থা বিশ্বাসটা একালে শিথিল বা বাস্তবে তত প্রবল নয় এমন হয়ে পড়লেও, বাড়তি সুবিধা ভোগের লোভে কথিত উচ্চবর্ণরা সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর স্তরে জাত-ভেদের বয়ান বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তা আঁকড়ে সেখান থেকে দাপটের সাথে সব সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। বরং এখানে তাদের মূল অজুহাত হল – তোমরা জাতভেদ মানো না, এর মানে তোমরা ধর্ম মান না। এই যুক্তি তুলে ভয় দেখিয়ে সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে স্তরে জাত-ভেদ কে ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

তবে, এখানে আমাদের একটু সাবধান হতে পরামর্শ রাখব। ব্যাপারটা হল,  সবার কাছেই সবার ধর্মই সবচেয়ে ভাল, এমন মনে করা এটাই স্বাভাবিক। আবার, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করা ঠিক না। তর্ক চলে না সেখানে। তাই এখানে সমাজের আমরা পরস্পরকে একটু স্পেস বা জায়গা করে দিতে হবে। যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অছিলায় কোনো ঘৃণা ছড়ানোর কাজে আমরা যেন নেমে না যাই সেদিকটা খেয়াল রাখাই কাম্য। আর “ব্রাহ্মণরা বদ লোক তাদের উদ্দেশ্য খারাপ” – পাঠককে এমন কোনো ধারণা দেয়া অনুচিত। ফলে সেটা বলা এখানে কোন উদ্দেশ্য নয়। এমন অনুমান সেটা ঠিক হবে না শুধু তাই নয়, বরং অতি সরলীকরণ দোষ হবে।

তাহলে মূল কথাটা কী? সেটা হল, আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে জাত-ভেদ প্রথার চিন্তাকে দুয়ারের বাইরে জুতার মত খুলে রেখে আসতে হবে। অথবা এটা রাষ্ট্রের সাথে সঙ্ঘাতের নয় এমন ব্যাখ্যা বয়ানে, এমন নন-কনফ্রন্টেশনাল ভাবে হাজির করতে হবে।

কারণ জাতভেদ প্রথার সারকথাটা হল, মানুষ সকলে এখানে সমান নয়, সমান হিসেবে গণ্য নয়, মানুষে-মানুষে জাত বলে ভেদাভেদ আছে। অথচ একটা মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ওর কনস্টিটিউশন, গঠন ও মৌলিক ভিত্তি ইত্যাদির বিচারে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রেই সবাই সমান। কোনো অসাম্য সেখানে নেই, রাষ্ট্র তা অনুমোদন করে না। সবাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান, বৈষম্যহীনভাবে আচরণ পাওয়ার যোগ্য, সব সুবিধা সমান পাওয়ার যোগ্য – তাতে নাগরিক মানুষের ধর্ম-বর্ণ-জাত ইত্যাদি যা হোক না কেন।  এবং রাষ্ট্র নাগরিককে বৈষম্য থেকে প্রটেক্ট করতে বাধ্য। কাজেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার আছে, এমন সব বিষয়ে জাতভেদ প্রথার ধর্মীয়-সামাজিক বয়ান নন-কনফ্রন্টেশনাল হয়ে জায়গা ছেড়ে রাখবে।

কিন্তু বাস্তবে ভারত হল এমন – যেখানে পত্নীসহ খোদ প্রেসিডেন্টকেই চরম বৈষম্যের শিকার করা হয়েছে। এক এমএলএ আরেক সহ-এমএলএকে প্রকাশ্যেই ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। অথচ সমাজ নির্বিকার, কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কেউ কেউ এখন বলার চেষ্টা করছেন স্পিকার পদটা নিরপেক্ষ, তাই তার পদত্যাগ করা উচিত। আনন্দবাজার লিখেছে, “নিরপেক্ষতার শপথ নিয়ে যিনি সাংবিধানিক পদে বসেছেন, তিনি কিভাবে একটি বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে সওয়াল করতে পারেন,তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবিলম্বে ওমকে স্পিকারের পদ থেকে সরানোর দাবিও উঠেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা- সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির সুরে কথা বললে এখন সাত খুন মাফ হয়ে যায়। ওমও ছাড় পেয়ে যেতে পারেন। কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের কাছে তাদের আদর্শই শেষ। সংবিধান মূল্যহীন”।

খেয়াল রাখতে হবে যে, ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব সঠিক কি না এটা নিয়ে রাষ্ট্রের বলবার কিছু নেই। কারণ কোন ধর্ম কেমন হবে বা হতে হবে তা নিয়ে কথা বলা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ ছাড়া কোন ধর্মের সংস্কার করা আদৌও দরকার তা, দেখাও রাষ্ট্রের কাজ না।  রাষ্ট্র কেবল বৈষম্যহীন এক নাগরিক সমাজ বজায় রাখা আর মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া ছাড়াই আপসহীন থাকবে। কারণ এটা মৌলিক বিষয়।

ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রায় সব মিডিয়া এখানেই শেষ হয়ে গেছে।  কিন্তু আরও এগিয়ে আনন্দবাজার কিছু একাদেমিকের মন্তব্য এখানে যোগ করেছে। আনন্দবাজার লিখেছে ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র বলেছেন, “বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে ব্রাহ্মণদের মতো অত্যাচারী আর কেউ নেই। ধর্মপদে বলা হয়েছে, মন্ত্র দিয়ে ব্রাহ্মণ হয় না। গুণ থাকতে হয়। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ জাতিভেদ প্রথাকে তুলে ধরে। বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক। ব্রাহ্মণের মূল ক্ষমতা ছিল যজ্ঞের অধিকার। তাই বুদ্ধদেব যজ্ঞের বিরোধী ছিলেন। যজ্ঞের বিরোধিতার মাধ্যমেই সমাজে ব্রাহ্মণদের কার্যত অর্থহীন করে দেয়া হয়েছিল”।  এছাড়া আরো এক সমাজতত্ত্ববিদ অভিজিৎ মিত্রের সাথে কথা বলেছে। মিত্র বলেছেন, “যে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারেন। যিনি গুণের অধিকারী এবং যে গুণ মঙ্গলময় তিনিই ব্রাহ্মণ। তিনি যে কোনও শ্রেণীর প্রতিনিধি হতে পারেন। জ্ঞানের দিক থেকে একটি উচ্চতায় পৌঁছলে সেই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ধরা হতো। সেটাই ছিল ধারণা”। আনন্দবাজার বলছে,  “অভিজিৎ বাবুর বক্তব্য, ‘বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ব্রাহ্মণেরা ব্যর্থ হয়েছেন”।
“ফারাক আছে ব্রাহ্মণে-ব্রাহ্মণেও। যিনি অপরের কাছ থেকে বেশি দান গ্রহণ করেন, তাদের ব্রাহ্মণেরাই নীচু চোখে দেখেন।’ ব্রাহ্মণ হওয়ার অধিকার একটি বর্ণের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করেন অভিজিৎ বাবু”।

কিন্তু আমাদের বক্তব্য এমন হওয়া ঠিক হবে না। কারণ, উপরের দুটা বক্তব্যই মূলত ধর্ম-সংস্কারমূলক। এগুলো একটাও রাজনীতি বা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা নয়। বক্তা একাদেমিক দুজনই ধর্ম সংস্কারের আলাপ করেছেন, তাঁরা আলাপ করেছেন ব্রাহ্মণের তাতপর্য, তাদের কী হওয়া উচিত, না উচিত ইত্যাদি এসব নিয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-রাজনীতির আলাপ করেননি তারা। কিন্তু রাষ্ট্র তো সব ধর্মের নাগরিক সবার। তাই এর এখতিয়ার নেই যে, কোনো ধর্মের সংস্কার হওয়া উচিত কিনা, কেমন হওয়া উচিত এমন কোন আলাপে মগ্ন হয়ে ওঠা। বরং রাষ্ট্র বলবে, জাত-ভেদের আলাপ আপনার ধর্মে থাকুক আর না থাকুক, নাগরিক সবার স্বার্থে আপনাদেরকে আমার নীতিকে – নাগরিক সাম্যের নীতি ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার নীতি – একে সবার উপরে প্রাধ্যন্য দিয়ে মেনে চলতে হবে।

এদিকে, “সিভিল লিবার্টি” নিয়ে কাজ করে এমন এক সংগঠনও ভারতে আছে দেখা যাচ্ছে। আনন্দবাজার আরো জানাচ্ছে, “পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস (পিইউসিএল)- স্পিকারের ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এর রাজস্থান শাখার সভাপতি কবিতা শ্রীবাস্তব”। তাঁর দাবি, “স্পিকারকে ওই মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে”। কবিতা বলেন, “একটি বর্ণ বা জাতকে অন্যদের চেয়ে ভালো বলা বা একটি জাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এটা এক দিকে অন্য বর্ণকে খাটো করে দেখায়, তথা জাতিভেদ প্রথাকে আরো উৎসাহিত করে”।

বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, দল হিসাবে অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

কিন্তু কথা কনস্টিটিউশনে থাকা আর বাস্তবে চর্চা এক নয়। বাস্তবে যদি থাকতই তাহলে তো বিজেপি রাজনৈতিক দল হিসেবে অনুমোদনই পেত না। বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাগরিকবোধের চেয়ে হিন্দুত্ববোধ যদি কারো চিন্তা ও বুদ্ধিতে ওপরে চড়ে থাকে তবে অবস্থা এরকমই হবে।

তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিন্দা করা মন্তব্য দিয়েছেন গুজরাট রাজ্য সংসদের এক এমএলএ ও এক্টিভিস্ট – জিগনেস মাভানি। তিনি তাঁর টুইটে লিখেছেন, “ভারতের জাত ব্যবস্থার পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা – এটা শুধু নিন্দাযোগ্যই না এটা  বিব্রতকরভাবে পিছন-দিকে-হাঁটা। এটা আমাদের জন্য এক তামাশা যে এমন জাত-বর্ণবাদী একজন লোক আমাদের লোকসভার স্পিকার। জনগণের কাছে তার আচরণের জন্য মাফ চাওয়া উচিত”।
এটা একটা ট্রাজেডি যে কনষ্টিটিউশন জাত ব্যবস্থার উচ্ছেদ চায় সেই কনষ্টিটিউশন রক্ষার শপথ নিয়েছেন এই ব্যক্তি।
[Gujarat MLA Jignesh Mevani sought Birla’s apology. “This celebration of Indian caste system is not only condemnable but also cringe-worthy,” he tweeted. “It’s a joke on us that a casteist like him is our Lok Sabha speaker. He should publicly apologise for this attitude.”
He added: “It’s a tragedy that such people take oath on our Constitution that wants to annihilate the caste system.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জাত ভেদের সমাজে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় ফিরবে- তৃণমূল না বামফ্রন্ট

পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় ফিরবে- তৃণমূল না বামফ্রন্ট
গৌতম দাস
১৮  এপ্রিল ২০১৬,  সোমবার
গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-118

আবার এক ঝলকে ভারতের কিছু রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভারতের প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচনকে রাজ্যের (রাজ্যসভা নয়) নির্বাচন বা বিধানসভা নির্বাচন বলা হয়।  আগামী ৪ এপ্রিল থেকে এই ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এভাবে মোট পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নসীম জইদি জানিয়েছেন, আসামে ২ দফা এবং কেরালা, তামিলনাডু ও পণ্ডিচেরিতে এক দফা করে ভোট নেয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা নেয়া হবে ৬ দফায়। এমনকি দিনের হিসাবে সাত দফায় ভোট হবে পশ্চিমবঙ্গে। ফলে প্রায় এক মাস ধরে চলবে এই ভোট পর্ব। পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি আসনে মোট ৭৭ হাজার ২৪৭টি ভোট গ্রহণ কেন্দ্রে ভোট নেয়া হবে। আর সব রাজ্যের সবখানে ভোট নেয়া শেষে আগামি মাসে একই দিন  ১৯ মে, পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় সেই ভোট গ্রহণ করা হয়েছে বিগত ৪ এপ্রিল।

কী করলে নির্বাচনে জেতা যাবে ভারতের রাজনৈতিক দলের আচরণ ও ততপরতার ভিত্তি সেটাই। এই বিচারে ভারতের রাজনীতি মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক। সত্য-মিথ্যা আধা সত্য ইত্যাদি মিলিয়ে যেটা বললে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে তাই বলতে হবে, করতে হবে, এটাই হয়ে গেছে ভারতের রাজনীতি। এটাই ভারতের রাজনীতিক সব দলের পরিচালনের মৌলিক নীতি। এর বাইরে ভারতের রাজনৈতিক দল অন্য কোন নীতি-অবস্থান নাই। বাংলাদেশের দিক বিচারে, এবার একসাথে পাঁচ জায়গায় বিধান সভা নির্বাচন হলেও এর দুটা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমানার দুই প্রান্তে – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে। তাই ঠিক ২০১৪ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের মতো মোদি এবারো নির্বাচনী বক্তৃতা করতে এসে গেছেন। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতোই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষ উগড়ে দেয়া বক্তৃতা করছেন। এর প্রধান ইস্যু হল, বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত অনুপ্রবেশ ইস্যু। বিশেষত আসামে এই ইস্যুর প্রপাগান্ডা, দামামা প্রবল। আবার মুখে বলে বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারি কিন্তু ব্যাতিক্রমহীনভাবে বুঝানো হয় “মুসলমান”।  এ নিয়ে তাঁরা নিয়মিত কথা বলছেন, হুঁশিয়ারি ও হুঙ্কার দিচ্ছেন। এ ছাড়া তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং পুরো সীমান্ত সিল করে দেয়ার হুমকি ইতোমধ্যে দিয়েছেন। কিন্তু মজার কথা হল, সেই গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরের দু’বছর মোদি বা তার সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ নিয়ে আর কোন কথা বলেনি। ফলে অনেকে আশা করতে পারেন যে, এবারও বিধানসভার নির্বাচনের আগে অনুপ্রবেশ নিয়ে মোদি ও তার দল হয়ত চিৎকার করবেন কিন্তু ভোটের পর সম্ভবত আর কোনো কথা তুলবেন না, ভুলে যাবেন। এটাকেই ভারতের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি বলে। এ কারণেই অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী রাজনীতিতে কোনো সরকার যেসব কথা বলবে এর সাথে সরকারের বিদেশ নীতি বা পড়শির প্রতি নীতিতে কোন ছাপ পড়বে না, এর সাথে কোনো সম্পর্কও থাকে না।
পাঁচটি বিধানসভার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের চলতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায়, মানে তাঁর দল তৃণমূল-কংগ্রেস ক্ষমতায়। পাঁচ বছর আগে বা ২০১১ সালে মমতা প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। মানে এর আগে রাজ্য-সরকারে কমিউনিস্ট সিপিএমের বামজোট ক্ষমতায় ছিল এবং একটানা ৩৪ বছর ধরে তারা ক্ষমতায় ছিল। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, বামজোট কী এবার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে, সম্ভাবনা কতটুকু? সম্ভাবনা আছে কি না বা সেটা যা-ই থাক স্বভাবতই আমরা তা একেবারে নিশ্চিত হতে পারি একমাত্র নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর। তবে এর আগেই একটা ঘটনা হল, খোদ সিপিএমই যেন খোদ আমাদেরকে আগাম জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই নির্বাচনে জিতে ফিরে আসছে না। কিভাবে তা জানিয়েছে? না, অবশ্যই সিপিএম বা বামফ্রন্ট এ কথা ঘোষণা দিয়ে বলেনি। বলেছে কাজ তৎপরতায় আর নিজের আচার-আচরণে তা প্রকাশ করে। যেমন সিপিএম, মানে জোটবদ্ধ বামফ্রন্ট এবার একা নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট মিলে জোটে, সিট ভাগাভাগি করে নির্বাচনে অংশ নিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সিপিএম এর নিজের দলের অভ্যন্তরীণ বাধা এবং কংগ্রেসের বেলায় তাদের কলকাতা স্থানীয়সহ কেন্দ্রিয় নেতৃত্বকে এব্যাপারে রাজি করানোর নানান অনিশ্চয়তা কাটিয়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি ততপর সিপিএমের নেতা সীতারাম ইয়েচুরির তৎপরতা শেষে সফলতার মুখ দেখেছে। কংগ্রেস-বামফ্রন্টের গাঁটছড়া এর আগে অনেকবারই হয়েছে, তবে সবসময় তা কেবল কেন্দ্রের ক্ষমতা বা নির্বাচনকে লক্ষ করে হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় রাজ্যপর্যায়ের নির্বাচনে কংগ্রেস-বামফ্রন্টের গাঁটছাড়া এই প্রথম। ইতোমধ্যে নির্বাচনের আগেই কংগ্রেসের সাথে আসন ভাগাভাগির পর্যায়ে জোটবদ্ধতাও কার্যকর হয়ে গেছে। তাই এখন কংগ্রেসের সাথে বামফ্রন্টের আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটাই প্রমাণ করে যে, তাদের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়নটা কী! তারা মনে করে একা বামফ্রন্ট হিসেবে তারা সম্ভবত জিতবে না। তার সম্ভাবনা এখনো কম। একনাগাড়ে ৩৪ বছর শাসনের পর তারা তৃণমূলের কাছে ২০১১ সালে প্রথম হেরে গিয়েছিল। সে ঘটনা এখন পাঁচ বছরের অতীত ঘটনা হয়ে গেলেও, জনগণের মনোভাব এখনো তাদের দিকে যথেষ্ট সদয় হয়ে ফেরেনি এটাই সিপিএম এর মুল্যায়ন, এটাই তাদের নিজের সম্পর্কে রিডিং। এই রিডিংয়ের কারণেই  এবার কংগ্রেসের সাথে দ্বিধা ছেড়ে আগেভাগে জোট বেঁধে বামফ্রন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেসের সাথে তার জোটবদ্ধতার তাৎপর্য এটাই।
আবার এটা শুধু বামফ্রন্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী শরিক সিপিএমের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়নই নয়। কংগ্রেসেরও পশ্চিমবঙ্গে তাদের নিজস্ব দশা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন এটা। আজকের সিপিএমের ক্ষমতাচ্যুতি দশা মাত্র পাঁচ বছরের। বিগত ১৯৭৭ সাল থেকে একটানা ৩৪ বছর ক্ষমতার রমরমাতে ছিল বামফ্রন্ট। অর্থাৎ ওই ৩৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের অবস্থাও এমনই শোচনীয় ছিল। মানে একমাত্র ১৯৭৭ সালের আগেই কেবল পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের রমরমা অবস্থা ছিল। সে দিক থেকে কংগ্রেসের দুরবস্থা এবার ২০১৬ সালের নির্বাচনে নতুন কিছু নয় হয়ত। কিন্তু অন্য বিচারে কংগ্রেসের জন্য এটা অবশ্যই নতুন দশা। কেন? বিগত ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচনে কংগ্রেসের অবস্থা অতীতের যেকোনো সময় থেকে ভিন্ন রকমের এবং আরো শোচনীয়। ঐ(২০১৪) নির্বাচনের ফলাফল থেকেই মোদি প্রধানমন্ত্রী হন আর ওই নির্বাচনে জোটে অংশগ্রহণ করা বিজেপি নিজের জোট ছাড়াই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেছিল। অথচ কংগ্রেসের অবস্থা ঠিক এর উল্টো। বিগত ২০০৪ সাল থেকে পরপর দুই টার্ম যে কংগ্রেস কেন্দ্রে জোট সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিল সেই কংগ্রেস ২০১৪ নির্বাচনের ফলাফলে এতটাই শোচনীয় যে, লোকসভায় বিরোধী দলের অবস্থান পেতেও সমস্যা অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছিল। অনেক কষ্টে শেষে বিরোধী দলের মর্যাদা জোটাতে হয়েছে। কারণ বিরোধী দল হতে  প্রয়োজনীয় এমন সংসদীয় আসন সে পায়নি। কংগ্রেসের আসন ছিল লোকসভার মোট আসন ৫৪৩-এর ১০ ভাগেরও কম, ৪৫-এর আশপাশে। শুধু তাই নয়, কংগ্রেস নিজের এই দুরবস্থা টের পেয়েছিল, তা স্বীকার এবং মনেও রেখেছিল।
দু’মাস আগের সর্বশেষ বিহার বিধানসভার নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস সর্বভারতীয় দলের দাবি ত্যাগ করেছিল; যেন সে বিহারের অন্যান্য আঞ্চলিক দলের পাশাপাশি তাদের মতোই আর একটা দল। এমন মর্যাদাতেই কংগ্রেস বিহারেরই বিধানসভা নির্বাচনে এক জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এথেকে মনে করা যেতে পারে যে, তার দিন শেষ হয়েছে – এটা কংগ্রেস মেনে নিয়ে আগাচ্ছে। বাস্তবতা সে আগেই মেনে নিচ্ছে। আগামীতে ভারতজুড়ে সংগঠন আছে এমন সর্বভারতীয় দল বলতে কংগ্রেস বলে আর কিছু থাকবে না – এজন্যও যেন সে রেডি হচ্ছে। বড়জোর এক স্থানীয় আঞ্চলিক দলের অবস্থান পেয়ে অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সাথে কোনো জোটে অস্তিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে এবারের কংগ্রেস সেই নতুন চেহারার কংগ্রেস। সে হিসেবেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের সাথে পশ্চিমবঙ্গে সে জোটবদ্ধ হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ৪ এপ্রিল থেকে ভোট শুরু হয়ে গেছে এবং প্রথম পর্বে ১৮ বিধানসভা আসনের নির্বাচন দিয়ে এই নির্বাচন শুরু হবে। ওই ১৮ বিধানসভার আসন মূলত মাওবাদ প্রভাবিত এলাকাগুলোর। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট ছাড়া আরো দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হল বিজেপি এবং ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতার তৃণমূল। এখন কে জিততে পারে এই প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গে বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের বিন্যাসকে ভিত্তি ধরলে  – ওই নির্বাচনে তৃণমূল ভাগে পেয়েছিল ৩৯.৮ শতাংশ, বামফ্রন্ট ২৯.৯ শতাংশ, কংগ্রেস ৯.৭ শতাংশ, আর বিজেপি ১৭ শতাংশ ভোট। ইতোমধ্যে এবার কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট গড়ে ফেলেছে। তাই, ২০১৪ সালের হিসাব মাথায় রাখলে একই বিচারে এবার এই জোটের ভাগের সব ভোটের যোগফল দাড়ানোর কথা  ৩৯.৬ শতাংশ। আর ওদিকে সব কিছু আগের মতো থাকলে সে ক্ষেত্রে মমতার পক্ষে আসতে পারে ৩৯.৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় কাছাকাছি। তাই মমতার দিক থেকে দেখলে এই জোট হওয়াটা তার জন্য অস্বস্তিদায়ক। কারণ পুরাণ ভোটের ফলাফলের বিচারে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেললে মমতার তা ভাল লাগার কথা নয়।
তবে পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে অন্য আরো অনেক ফ্যাক্টরও আছে। যেমন ফ্যাক্টর নম্বর এক। বিগত ২০১১ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রাপ্ত মোট ভোট ছিল ৪ শতাংশ, আর ২০১৪ সালে সেখান থেকে বেড়ে গিয়ে মোদি নামের জোয়ারে তা হয়েছিল ১৭ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে প্রাপ্ত মোট ভোটে সেটা আবার কমে ৪ শতাংশে ফিরে যাবে বলে বিজেপি বিরোধী অথবা পক্ষের অনেকেই অনুমান করছেন। যদি তাই হয় তবে সে ক্ষেত্রে বিজেপির অবশিষ্ট বা বের হয়ে যাওয়া ভোট কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট আর তৃণমূলের মধ্যে ফিরে চলে যাবে তা স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারি। কিন্তু কিভাবে কী অনুপাতে সেটা কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট আর তৃণমূলের মধ্যে ভাগ হবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এনিয়ে জল্পনা-কল্পনাও পরিসংখ্যান নাড়াচারা শুরু হয়ে গেছে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি থেকে এবার মুখ ফিরিয়ে নেয়া বা ফেরত চলে আসা ভোটারদের মাত্র ২০ শতাংশ যদি তৃণমূলের ভাগে এসে যায় তাহলেই তৃণমূল আবার জিতে যাবে। মানে সে ক্ষেত্রে ২০১৪ সালে প্রাপ্ত মোট ভোটের ১৭ শতাংশ যা বিজেপির ছিল তা এবার কমে ৪ শতাংশ হয়ে গেলে – অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফেরত চলে যাওয়া ভোট হবে মোট মোটের ১৩ %। অর্থাত সেক্ষেত্রে গতবারের বিজেপির পাওয়া মোট ভোটের ১৭% ভোট এবার ভাগ হবার কথা – বিজেপি ৪%, কংগ্রেস-বামফ্রন্ট ৪.৫৫% (১৩% এর ৩৫%) আর তৃণমূলের ভাগে ৮.৪৫% (১৩% এর ৬৫%) – এভাবে অর্থাৎ ৩৫ঃ৬৫ ভাগ হলেই দেখা যাচ্ছে মমতার তৃণমুল জিতে যাবে।  কারণ সেক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি বিধানসভা আসন তৃণমূল নিজের পক্ষে পেয়ে জিতে যাবে। আর যদি বিজেপির কমে যাওয়া ভোটের ৩৫% এর জায়গায় মাত্র ১৫ শতাংশ তৃণমূলের পক্ষে আসে তাহলে কংগ্রেস-বামফ্রন্টের জোট তৃণমূলের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অতএব, বিজেপির কমে যাওয়া ভোটের কত অংশ তৃণমূল নিজের দিকে টানতে পারবে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলমান ভোটার পশ্চিমবঙ্গে আরেক বিরাট ইস্যু; বিশেষ করে সাচার কমিশনের রিপোর্টে মুসলমানদের দুরবস্থার কথা ফুটে উঠতে শুরু করার পর থেকে। বিগত ২০১১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই “মুসলমান ভোট” ইস্যু হয়ে উঠতে শুরু করে। সবার নজর পড়ে যে, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের ২৮ শতাংশ মুসলমান এবং এটা এখন প্রতিষ্ঠিত যে, পশ্চিমবঙ্গের মোট মুসলমান ভোটারের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটারই মমতার দলের পক্ষের ভোটার হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে। মমতার তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান কমিউনিটির সাথে রাজনৈতিক আঁতাত এবং বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছে। এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিক হল, এর আগে সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকেই মুসলমান ভোটাররা প্রথমে কংগ্রেসের ভোটব্যাংক হয়েছিল, এরপর ১৯৭৫ সালের পর থেকে তা বদলে গিয়ে পরের ৩৪ বছর ধরে বামফ্রন্টের ভোটব্যাংক হিসেবে ছিল। কিন্তু দুই জায়গাতেই মুসলমানেরা ছিল সেকুলার জামা গায়ে দিয়ে নিজের মুসলমান পরিচয় ঢেকেঢুকে আড়াল করে। সে তুলনায় মমতার দলে এসে এবার তাঁরা ভোটার হয়েছে খোদ মুসলমান পরিচয়েই, কোনো আড়াল লুকাছাপা না করেই। ফলে এটা বিজেপির জন্য চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফলাফলে ক্ষমতায় আসার পরপরে কয়েক মাসের মধ্যে বর্ধমান বোমাবাজির ইস্যু তুলে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ – মুসলমানেরা জঙ্গি, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে, অনুপ্রবেশকারি, তারা জেএমবি ইত্যাদি নানা প্রপাগান্ডার ঝড় তুলে ফেলেছিল। সেই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা লিড ভূমিকা নিয়েছিল আর তা বিস্তৃত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম আলো আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি – আনন্দবাজারের রিপোর্টের বরাতে রিপোর্ট করে ওই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় শামিল হয়েছিল। দাবি করেছিল এগুলো জামায়াতের কাজ। কিন্তু হঠাৎ করে মোদির প্রধানমন্ত্রীর অফিস  বিজেপির অমিত শাহের প্রচার-প্রপাগান্ডার তথ্যকে অনুমোদন না দিয়ে খোদ মোদির সরকার পিঠ ফিরে দাঁড়িয়ে যায়। লোকসভায় দাঁড়িয়ে মোদির এক মন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে সেটা অস্বীকার করেছিল। ফলে সেই থেকে বর্ধমান ইস্যু বা মুসলমান-জঙ্গি ইস্যু আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যায়। এমন হওয়ার মূল কারণ বিজেপি হিসাব করে দেখেছিল যে, নিজেদের ওই প্রপাগান্ডা সফল হলে তৃণমূল হয়তো ঘায়েল হবে কিন্তু এর ফলাফল বিজেপির পক্ষে আসবেই না; বরং না এসে তা কংগ্রেস-বামফ্রন্টের পক্ষে চলে যাবে। কারণ তখনকার বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান সিপিএমের বিমান বসু খোদ বিজেপির অমিত শাহের ভাষ্যের সাথে মিল রেখে প্রায় একই ভাষায় তৃণমূলকে বাংলাদেশের জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক ও জঙ্গি সংগঠন বলে প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল। তাই মোদির হঠাৎ করে ওই পিঠটান দেয়া।
মোদির এই পিঠটান দেয়া নীতির আলোকে সেই থেকে মমতা গত দুই বছর মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দুই সংসদেই (লোকসভা ও বিশেষ করে রাজ্যসভাতে) বিরোধিতার কোনো ইস্যুতে যোগ দেয়নি; অথবা কোনো বিরোধী জোটে যোগ দিয়ে বিরোধিতা করেনি। যা করেছে তৃণমূল আলাদা করে করেছে। মোদির বিজেপি, কলকাতায় তৃণমূলের ক্ষমতায় ফিরে আসার চেয়ে বামফ্রন্টের ফিরে আসার বিরোধী বেশি। তাদের ধারণা, সিপিএমকে আর আরেকটি পাঁচ বছরের টার্ম পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলে বামফ্রন্ট চিরদিনের মতো ক্ষমতায় ফিরে আসার সক্ষমতা হারাবে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির লক্ষ্য এটাই। তাই এই নীতির আলোকে বিজেপির লক্ষ্য হল এবারের বিধানসভা নির্বাচনও মমতার হাতে চলে গেলে তা যাক। এভাবে ছেড়ে দিয়ে এরও পরের বার মানে ২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে কৌশল সাজানো। এতসব হিসাবকিতাব এর কারণে সব মিলিয়ে মমতার তৃণমূল খুব সম্ভবত মার্জিনালি হলেও আবার নির্বাচিত হয়ে জিতে সরকার গঠন করতে সম্ভবত সক্ষম হতে যাচ্ছে। তবে মমতার বিরুদ্ধে বিজেপির অন্য এক কামনা ও করণীয় আছে। বিষয়টি বাইরে থেকে মানে বাংলাদেশ থেকেও সুনির্দিষ্টভাবে খেয়াল না করলে বোঝা সম্ভব নয়। বিষয়টি হলো মমতার তৃণমূল ভোট কারচুপির দিকে ঝুঁকছে বলে বিজেপিসহ সব বিরোধীর অভিযোগ ও অনুমান। বাংলাদেশে বসে এর সত্যতা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু না বলতে পারলেও ভারতের নির্বাচন কমিশনের অ্যাকশন ও তৎপরতার বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি চিৎকার ক্রমশ বাড়ছে – সেটা লক্ষ্য করা যায়। যেমন মমতার খাতিরের পুলিশ অফিসার বা প্রশাসনিক আমলার বিরুদ্ধে কমিশন ক্রমান্বয়ে বদলির আদেশ দিলেই মমতা তাতে হইচই করে উঠছেন। যেমন কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার অথবা আমলা আইপিএস অফিসার ভারতী ঘোষকে নির্বাচন কমিশনের বদলি করা নিয়ে মমতা কঠিন আপত্তি তুলেছে, যদিও মমতা তা ঠেকাতে পারে নাই। তবে মমতা যে ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাতেই মমতার বিরুদ্ধে কারচুপির সন্দেহের সত্যতা প্রবল হচ্ছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে আমাদের যতই ইতিবাচক ধারণা থাক মমতার আমলে বিগত বছরগুলোতে মেয়র-কাউন্সিলর ধরণের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখলের সীমাহীন কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। এগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের মতো মানের নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। এ কারণে এবার নির্বাচন কমিশন আরো কড়া কিছু পাল্টা কঠোর অ্যাকশনে গেছে। আর এরই বিরুদ্ধে মমতা সোচ্চার হয়েছেন। সোচ্চার হলেও হয়তো সেটা তেমন কিছু হতো না কিন্তু তিনি যা বলছেন তা থেকে মমতার বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগের পাল্লাই ভারী হয়। মমতা পাবলিক মিটিংয়ে এ নিয়ে কী বলছেন তা আনন্দবাজার থেকে কোট করছি, “ইলেকশন আসলে অনেক কেন্দ্রীয় বাহিনী আসবে। ইলেকশন কমিশনের অবজার্ভার আসবে। কোনো দিন তাদের ভুল বুঝবেন না। যত্ন করবেন, আদর করবেন। তারা আমাদের অতিথি। অতিথিকে যত্ন করা আমাদের কাজ। তারা কিছু বললে চুপচাপ শুনবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী বা কমিশন তিন দিনের জন্য, তারপর আমরাই থাকব। কমিশন চলে গেলে তৃণমূলই থাকবে এলাকায়। ভোটারদেরও তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়েই থাকতে হবে”। মমতার এই হুমকি মমতাকে নির্বাচনে জিততে সাহায্য করবে হয়তো কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লাকেই আরো মজবুত করবে। সাদা কথায় কারচুপির অভিযোগ মমতার ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ০৬ এপ্রিল ২০১৬  দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার এবং ০৩ এপ্রিল ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় প্রথম ভার্সান হিসাবে ছাপা হয়েছিল। এখানে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এডিট করে ছাপা হল।]