অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

গৌতম দাস

২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2DQ

 

-একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

[বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

“বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

২.
এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

আইনি কারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

অর্থনৈতিক কারণঃ
জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

গৌতম দাস

০৯ জুন ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2s2

 

 

কখনও কখনও কারো কারো কোন কথা বিশ্বাস হতে চায় না। তেমনই এক অবস্থা তৈরি হয়েছে ভারতের কিছু রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদেরকে নিয়ে। সত্যি কথাও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। ধরা যাক, এমন একটা বাক্য পত্রিকার পাতায় পাওয়া গেল যেখানে ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা অথবা মন্ত্রী বলছেন, “ধর্মের নামে জনগণের মাঝে বিভক্তি আনার কথা বলা অনুচিত”। অথবা বাক্যটা একটু এরকম যে বলা হয়েছে, “ভারত এমন এক দেশ যেখানে জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারও প্রতি বৈষম্য করার সুযোগ নেই। এটা কখনো বরদাস্ত করা হবে না”। বলাই বাহুল্য এমন বক্তব্য নিশ্চয় ভারতের কোনো সেকুলার বা কমিউনিস্ট নেতার বক্তব্য বলেই আমরা ধরে নিব।

কিন্তু না। এই অনুমান ও ধারণা অবিশ্বাস্যভাবে শতভাগ ভুল। আসলে প্রথম কথাটা বলেছেন, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। আর পরের কথাটা বলেছেন, ভারতের মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এদের দু’জনের বক্তব্য একই প্রসঙ্গে একই দিনে। ভারতের লিডিং সব ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকাতে গত ২২ মে অথবা পরের দিন এই খবর পাওয়া যাবে। এমনকি গ্লোবাল নিউজ এজেন্সি রয়টার্সও একই খবর পাঠিয়েছে। ফলে পাঠককে আশ্বস্ত করে বলা যায়, এখানে দেখতে বা পড়তে কোনো ভুল হয়নি।

ওদিকে আবার, আমরা যদি দেখি কেউ কাউকে “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা” করতে পরামর্শ দিচ্ছেন, আমরা ধরে নিতে পারি যে, ওই পরামর্শদাতা আর যাই হোক বিজেপি কোনো নেতা বা মন্ত্রী নিশ্চয় নন। কিন্তু না, এখানেও বিস্মিত হওয়ার পালা। মোদী সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক এক মন্ত্রী আছেন যার নাম মুক্তার আব্বাস নাকভি। তিনি বলেছেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার। আমরা তাদের এটাই বলতে পারি যে, প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন”। এখানেও আগের একই প্রসঙ্গে মন্ত্রী নাকভিও এই বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে কী সেই প্রসঙ্গ, যা থেকে অবিশ্বাস্য সব কথা বের হয়ে আসছে বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীদের মুখ দিয়ে?

রয়টার্স লিখেছে, “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান। কাগজকলমে ভারত সেকুলার হলেও পাঁচ ভাগের চার ভাগ মানুষ এদেশে হিন্দুধর্ম চর্চা করে”। [Christians constitute less than 3 percent of Hindu-majority India’s 1.3 billion people. India is officially secular, but four-fifths of its population profess the Hindu faith.] এই তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সারা ভারতেই ছড়িয়ে আছে, দক্ষিণ ভারতে তুলনামূলকভাবে এর ঘনত্ব বেশি। আর রাজধানী দিল্লির ক্ষমতা কাঠামোর করিডোরে অথবা একাডেমিক বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিও দৃশ্যমান। বিশেষ করে নাম কামানো মিশনারি স্কুল ও কলেজগুলোর কারণে ঐ সমাজে তারা অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। আবার সারা দুনিয়ার মতো ভারতেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধারা রয়েছে। দিল্লির ক্যাথলিক ধারার আর্চবিশপ হলেন অনিল কুটো (Anil Couto)। তিনি তাঁর ধারার অন্যান্য বিভিন্ন চার্চ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এক অভ্যন্তরীণ চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমরা একটা টালমাটাল রাজনৈতিক আবহাওয়া প্রত্যক্ষ করছি, যেটা আমাদের কনষ্টিটিউশনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং আমাদের জাতীয় সেকুলার নীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে”। [“We are witnessing a turbulent political atmosphere which poses a threat to the democratic principles enshrined in our Constitution and the secular fabric of our nation,”]। তাই ঐ চিঠিতে তিনি আহ্বান জানান আগামী বছরের নির্বাচন পর্যন্ত তাদের অনুসারী শাখাগুলো যেন এ জন্য এক ‘বিশেষ প্রার্থনা কর্মসূচি’ হাতে নেয়। এই চিঠি তিনি লিখেছিলেন গত ৮ মে। সেটা দু’সপ্তাহ পরে হলেও প্রকাশ্যে বিজেপির নজরে আসাতে তারা আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এই চিঠির ‘বিপদ’ টের পেয়ে যান। এই চিঠিটা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী জোট খাড়া করে ফেলার উপাদানে ভরপুর, তা বুঝতে বিজেপির দেরি হয়নি।

যদিও এই চিঠিতে যে একশনের আহ্বান জানানো হয়েছে তা খুবই ‘হেদায়েতি ভাষ্য’। বলা হয়েছে – যিশু ও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে। অর্থাৎ কোনো মিছিল মিটিং করার আহ্বান দূরে থাক, আলোচনা সভাও করতে বলা হয়নি। আর প্রতি শুক্রবার “জাতির জন্য উপাস থাকা’ পালন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এর সোজা মানে করে বললে এটা হল, বড় জোর আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ধরনের একটা ততপরতা। এর মধ্যে ন্যূনতম কোনো আক্রমণাত্মক ভাষ্য নেই। সাদামাটা এ বক্তব্যের মধ্যে স্পিরিচুয়্যাল শক্তির প্রার্থনা, নালিশ ও আহ্বান আছে অবশ্যই। সেই সাথে, সব ধর্মের লোকদের মাঝে পারস্পরিক ঘৃণা বা হিংসার সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় যেন থাকে, এ কামনায় প্রার্থনা করতে বলেছেন আর্চ বিশাপ।

কিন্তু এটাও সহ্য করার অবস্থায় নাই বিজেপি। কারণ এই চিঠিতে খ্রিস্টান, অখ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার প্রতি আবেদন রেখে সবাইকে মানবিক স্পর্শে ছুয়ে ফেলে মিলিত এক শক্তি হয়ে ওঠার মতো বহু উপাদান ও ক্ষমতা আছে। এটাই এই চিঠির শক্তির দিক। আর আসন্ন (২০১৯ সালে) নির্বাচনে এটা বিজেপির রাজনীতির জন্য বিরাট বিপদের দিক ঠিক ততটাই। তাই, সহজেই অনুমান করা যায় এই ধারণা থেকেই বিজেপি ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসভাবে নিয়ে পাল্টা চাপ তৈরি ও অভিযোগ অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিজেপির মূল আদর্শিক সংগঠন আরএসএস (RSS), সেও উপায়ান্তর না দেখে নিজেই ‘সেকুলার’ হয়ে গেছে। দাবি করেছে, আর্চবিশপের এই চিঠি “ভারতের সেকুলারিজম ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ”। […the RSS claimed it was a “direct attack on Indian secularism and democracy].’ আর তা থেকেই ২২ মে, অমিত শাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথসহ বিজেপি অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীদের সব অবিশ্বাস্য বক্তব্য।

কিন্তু বিজেপির কাছে সমস্যা দেখা দেয় যে, বিজেপি কী বয়ান দিয়ে এই চিঠির বিরোধিতা করবে? কারণ এই চিঠির অভিযোগের বিরোধিতা করতে গেলে খোদ বিজেপির রাজনীতিরই বিরুদ্ধে ও বাইরে চলে যেতে হবে। যেমনঃ এখানে সবচেয়ে বড় তামাশার শব্দ হয়ে উঠেছে ‘পোলারাইজেশন’- যার বাংলা হল, “জনগণের মাঝে বিভক্তি” অথবা “সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্তি”। এখানে আর্চবিশপের চিঠির অভিযোগকে মিথ্যা বলে বিজেপি অস্বীকার করে কোনো পাল্টা বয়ান খাড়া করতে গেলে তাতে ভারত রাষ্ট্র ও সরকারের জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারো প্রতি বৈষম্য করার বিরোধিতা করতে হবে অথবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি করার বিরোধিতা করতে হবে। এটাই মডার্ন রিপাবলিক কোনো রাষ্ট্রের “সাম্য নীতির” মূল কথাঃ কোনো পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সবাইকে সমান গণ্য করতে হবে, রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ, বা সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে না।

কিন্তু বিজেপির রাজনীতির মূল কথাই হচ্ছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজকে পোলারাইজ করতে বা বিভক্তি টানতে হবে। এটা তারা করে যতটা হিন্দুত্বকে ভালোবেসে এর চেয়েও বেশি হল, ‘হিন্দুত্বের ভোট’ বাক্সের প্রতি ভালোবাসা। প্রধানত, হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশে ‘হিন্দুত্বের ভোট’-এর জোর অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এটাই দলটা সবচেয়ে ভাল করে জানে। তাই বিজেপি মানেই সমাজকে হিন্দুত্বে উসকে পোলারাইজ করা; ভোটের বাক্স ভর্তি করা।

কিন্তু আর্চবিশপের অভিযোগ বিজেপিকে কুপোকাত করে দিয়েছে। তাই উপায় কী, নরম ভাষায় হলেও, বিজেপিকে নির্বাচনের বছরে খ্রিষ্টান কমিউনিটির অভিযোগ তো ঝেড়ে অস্বীকার করতেই হবে। নিরুপায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবার তাই সুশীল ভদ্র হয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘It’s not appropriate if anyone is talking about polarising people in the name of religion । আসলে নিজেরই দলের স্বভাব ও রাজনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, “পোলারাইজেশন হারাম”। একইভাবে, অগত্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কনস্টিটিউশনের সাম্যনীতি আঁকড়ে ধরে হুঙ্কার (আসলে নিজের বিরুদ্ধেই) দিচ্ছেন, “… no discrimination against anyone on the basis of caste, sect or religion. Such a thing cannot be allowed,” – কোনো বৈষম্য বরদাস্ত করা হবে না। আর বিজেপি সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নাকভি সোজা মিথ্যা বলেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো রকম ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার”। আর সেই সাথে তিনি আবার ‘প্রগতিশীল’ বলে শব্দটাও ধার করেছেন, তা বিজেপি রাজনীতির পরিভাষা নয় অবশ্যই। বলেছেন, “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুন”।  আসলে বিজেপির মূল অবস্থান হল, আর্চবিশপ অনিল কুটোর অভিযোগ যেভাবেই হোক অস্বীকার করতে হবে, তাতে বিজেপির নিজ রাজনীতির বিরোধিতা করে হলেও। দলটার এতই দিশেহারা অবস্থা। তবে আর একটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা হল – উল্টা আর্চবিশপের ওপর অভিযোগ আনা যে, তিনি খ্রিষ্টান-অখ্রিষ্টান বিভেদ তুলছেন এবং বিশপের বক্তব্য রাজনৈতিক, এই অভিযোগ তোলা।

এদিকে ভারতের মিডিয়ার অবস্থা ‘ভয়াবহ’ বললে কম বলা হয়। সম্প্রতি বিজেপির এক ছদ্ম সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে [sting operation] শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২৫ টিভি চ্যানেলকে তারা বিজেপির হিন্দুত্বের পক্ষে টাকার বিনিময় প্রচার চালাতে চায় কী না – এই অফার দিলে দেখা গেছে দুইটা বাদে তারা প্রায় সবাই রাজি। এই অপারেশন চালানোর পর ‘কোবরাপোস্ট’ https://www.cobrapost.com    নামে এক ওয়েবসাইট থেকে ইউটিউবে সব কথোপকথন ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। তেমনি এক নিউজ এজেন্সি এএনআই টিভি, (ANI TV) তারা এই ইস্যুতে বিজেপিকে সার্ভিস দিতে নিউজ ক্লিপ তৈরি করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আসলে বিজেপির দিক থেকে আর্চবিশপকে দেয়া হুমকিমূলক বার্তায় ভরপুর বলা যায়। বিজেপির আর এক মন্ত্রী গিরিজা সিং সেখানে আর্চবিশপের চিঠির ঘটনাতে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে।’ [Giriraj Singh as saying that “every action has a reaction”]। বিজেপির আর এক নেতা বিনয় কাতিয়ার বলছেন, আর্চবিশপের মন্তব্য বিভিন্ন ‘সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা, অসন্তোষ তৈরি’ করতে পারে [archbishop’s comments could lead to “communal tensions”.]। মোদী সরকারের টুরিজম মন্ত্রী বলেছেন, Union minister of tourism KJ Alphons said Couto’s remarks were “unfair” to the government and that “godmen” should stay away from politics. অর্থাৎ এটা হলো দাঙ্গা তৈরির অপবাদ দিয়ে ভয় দেখানো। স্বভাবতই এতে খ্রিষ্টান ধর্মের অন্য প্রায় সব ধারার নেতারা আর্চবিশপের পদক্ষেপ ও অভিযোগকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।

আর্চবিশপের অভিযোগের ফলে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়ার পক্ষে তা ভূমিকা রাখতে পারে ভেবে বিজেপি আজ ‘ভেজা বিলাই’ সাজছে, সব অভিযোগ অস্বীকার করছে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ২০১৫ সাল থেকেই নিয়মিতভাবে বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠন, ‘ঘর ওয়াপাসি’ প্রোগ্রামের নামে নির্বিচারে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, সম্পত্তি দখল, চার্চ ও মসজিদে হামলা, হত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে। গত ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসীন হবার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় ও পরবর্তিতে, তিনি সরবে ও প্রকাশ্যে মোদি সরকারের খ্রিস্টান ও মুসলমান দলনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভারত রাইজিং ইকোনমির দেশ হয়ে চাইলে এগুলো বন্ধ করতে হবে, এগুলো নেতি ইমেজ তৈরি করে। ওবামা বলেছিলেন,  “ভারত সফল হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ধর্মীয় লাইনে বিচ্ছিন্নতা বিভক্ত হয়ে পড়া ঠেকাতে পারবে [India will succeed as long as it is not ‘splintered’ on religious lines: Obama]

ফলে পরে চাপের মুখে মোদী এবিষয়ে তাঁর সরকারের নীতি কী তা পাবলিকলি ঘোষণা করেছিলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। তিনি বলেছিলেন,  “যেকোন নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা রক্ষা’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব” – এটাই নিজের সরকারি নীতি বলে দিল্লির এক চার্চে্র অনুষ্ঠানে তিনি লিখিতভাবে এই বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছিলেন। কথাগুলো মোদীর মুখ থেকে বের হয়েছে ভেবে অবাক অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু এই লিখিত কথাগুলা মোদীর নিজস্ব ওয়েব সাইটে এখনও আছে। সেখান থেকে আমি এখনই টুকে আনলাম। অন্যান্য নিউজ অন লাইনেও পাবেন।

My government will ensure that there is complete freedom of faith and that everyone has the undeniable right to retain or adopt the religion of his or her choice without coercion or undue influence. My government will not allow any religious group, belonging to the majority or the minority, to incite hatred against others, overtly or covertly. Mine will be a government that gives equal respect to all religions.

উপরের অংশটুকুর বাংলা অনুবাদ আমার করাঃ ভারতের পক্ষ থেকে, আমার সরকারের পক্ষ থেকে বললে আমি ঘোষণা করছি আমার সরকার ওপরের ঘোষণার প্রতিটা শব্দ ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমার সরকার ধর্মবিশ্বাসের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে যে প্রত্যেক নাগরিক সে কোনো ধর্ম ধরে রাখা অথবা গ্রহণ করা তার পছন্দের বিষয় এবং এটা কোনো ধরনের কারো বলপ্রয়োগ অথবা অন্যায্য প্রভাব ছাড়াই সে করবে এটা নাগরিকের অ-অমান্যযোগ্য অধিকার। আমার সরকার কোনো ধর্মীয় গ্রুপ, তা সে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যে ধরনেরই হোক, সঙ্গোপনে অথবা খোলাখুলি অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহ্য করবে না। সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান দেবে আমার এই সরকার।

মোদীর পুরা বক্তৃতার টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করা পাবেন এখানে, আমার আগের লেখায় শেষ অংশ।

কিন্তু তার এই কথায় যে ফাঁক ছিল তা হল, তিনি “মোদী সরকারের” নীতি শুনিয়েছিলেন। “মোদীর দল বিজেপির” নীতি নয়। এছাড়া  আসলে দুঃখের বিষয়, মোদী নিজেই এরপরে বিজেপি দলে, বিশেষ করে আরএসএসে নিজ প্রতিদ্বন্দ্বিদের ঠেলাগুতা চাপ পড়ে নিজেই “সংখ্যালঘু মত” হয়ে যান। বিশেষ করে  ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির মূল পরিচালক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (আরএসএস এর অঙ্গ সংগঠন) প্রভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে হেরে যান। ‘ঘর ওয়াপসি’ কথার আক্ষরিক মানে হল “ঘরে ফিরিয়ে আনা”। সোজা মানে হল, এর আগে কোন ভারতীয় যে কেউ খ্রিষ্টান বা মুসলমান হয়েছে তাকে এবার বাধ্য করে হিন্দুত্বে ফিরিয়ে আনার তাণ্ডব তৈরি করা। অথবা সুনির্দিষ্ট ঘটনা অভিযোগ থাকুক না থাকুক, ভুয়া অভিযোগে চার্চ বা মসজিদে আক্রমণ করা, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কিংবা জোর করে কোনো মুসলমান নাগরিককে নির্যাতনে বাধ্য করে “জয় শ্রীরাম” বলানো ইত্যাদি। এরই বর্ধিত আর এক রূপ হল গোমাংসকে নিয়ে তান্ডব তৈরি করা। [‘মাংসমাত্রই তা গরুর মাংস’; এই অনুমান ও এই অভিযোগে মাংস খাওয়া, রাখা, বহন করা নিয়ে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো। ]

ফলে মোদী সরকারের “ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার নীতি” নিছকই তা কাগুজে ঘোষণা হয়ে থেকে যায়। আর বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ আরএসএসের সহযোগী সব দলের ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি আগের মতোই সরকারের দিক থেকে প্রশাসনিক বাধাহীন, অবাধে চলতে থাকে। কেবল গরুর মাংসের বিরুদ্ধে করা মোদির আইন (জবাই, কেনাবেচা, বহন ও খাওয়া ইত্যাদি) ও বিতর্কের ব্যাপারে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আপত্তির কারণে শেষে সরকার নিজেই “আইনটা আপাতত প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে আদালতকে জানিয়ে নিষ্পত্তি করেছিল। কিন্তু তাতে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু ঘটানো – এগুলো বন্ধ হয় নাই। এই তো গত মাসেই (২৮ মে ) উত্তরপ্রদেশের কাইরানা নির্বাচনি এলাকায় উপ-নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বিজেপির পুরানা কৌশল গরুর মাংস খাওয়ার ভুয়া অপরাধে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। যাতে এই টেনশনে হিন্দুত্ব ভোটের জিগির উঠে, পোলারাইজেশন ঘটে। যদিও আগে এটা বিজেপির আসন ছিল। তবুও এই উপনির্বাচনে বিজেপি হেরে যায়।

আসলে বিজেপির মূল রাজনৈতিক কৌশলই হল, এভাবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজে পোলারাইজেশন ঘটানো, ‘জোশ-জজবা’ তোলা – একাজ করেই বিজেপি আগিয়ে চলেছে। এভাবে ভোটের বাক্সে হিন্দুত্বের ভোট জোগাড় করে ভরে তোলা। এই নীতিতেই মোদির ভারত গত চার বছর পার করেছে। তাই, সার কথাটা হল, মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লির আর্চবিশপের অভিযোগ শতভাগ সঠিক। তবে তাঁর এখনকার এই পদক্ষেপ ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদীকে কতটা ঠেকাতে পারবে তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে নগদ লাভ হল, অমিত শাহ আর রাজনাথের ‘পোলারাইজেশন বিরোধিতা’র ‘ভক্ত’ হয়ে যাওয়া, এই তামশা দেখার সুযোগ হলো আমাদের।

আর একটা দিক আছে, অনেকেই ইস্যুটাকে (পোলারাইজেশন বিরোধী অবস্থান নেয়া) সেকুলারিজম বা প্রগতিশীলতা বলে বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করছেন। এটা শতভাগ ভুল। আসলে এটাই এদের নিজ ইসলামবিদ্বেষী অবস্থানের লুকানোর জায়গা। বিষয়টার মূলধারণাটা হচ্ছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাম্যের নীতি রক্ষা, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি পালন করে চলল কিনা। নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এই হলো ইস্যু। অথচ রাষ্ট্র ধারণা বুঝে না বুঝে বিভ্রান্তিকরভাবে এই ইস্যু ও ভাবটাকে ‘সেকুলার’ শব্দ দিয়ে খামোখা বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করতে দেখা হয়। আর এই ‘সেকুলার’ শব্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ।

অনিল কুটো ধরনের ব্যক্তিরাও বুঝে না বুঝে ‘জাতীয় সেকুলার নীতির’ কথা তুলে নিজেদের বিভ্রান্তিতে ও অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় ঢুকিয়ে রাখেন। এভাবে ভুতুড়ে না-বুঝা এক ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আড়ালে ধর্মবিদ্বেষ জারি থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় এটাকে ‘ধর্মের সাথে রাজনীতি’ মেলানো বা না-মিলানোর বাজে বিতর্ক হিসেবে হাজির হতে দেন। অথচ পরিষ্কার ভাষায় বললে, রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি, নাগরিকের জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যহীনতার নীতি, সুরক্ষার নীতি পালন করে চলল কিনা; এবং নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এটাই হলো দাবি ও মূল ইস্যু।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৭ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বিহারে মোদির বিজেপির পরাজয় কী টার্নিং পয়েন্ট হবে

বিহারে মোদির পরাজয় কী ভারতের রাজনীতিতে টার্নিং পয়েন্ট হবে
গৌতম দাস
১১ নভেম্বর ২০১৫

https://wp.me/p1sCvy-cU

ভারতের বিহারে মোদির বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছে। বিহারের প্রাদেশিক নির্বাচন যেটাকে ভারতের কনস্টিটিউশনের ভাষায় বিধানসভা বলা হয়, সেই রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচ পর্বে নেয়া এ ভোটের ফল ০৮ নভেম্বর সকাল থেকে প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়েছিল। ফলাফলের খুঁটিনাটি বিস্তার আসতে সারা দিন লেগে যায়। সেসব বাদ দিয়ে মোটা দাগে কোন দল কতটা আসন পেয়েছে, এরই মধ্যে সে তথ্য এসে গেছে। মোট আসন সংখ্যা ২৪৩ বলে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা ১২২। আর ভোটের ফল হলো বিজেপি- বিরোধীদের মহাজোট পেয়েছে ১৭৮ আসন, বিজেপি পেয়েছে ৫৮ এবং অন্যরা ৭ আসন। ফল দেখে এরই মধ্যে পরাজয় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী মোদি বিরোধী জোটের নেতা নীতিশ কুমারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিরোধী মহাজোট মূলত তিন দলের জোট, এর মধ্যে আছে দুই আঞ্চলিক দল লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (এ নির্বাচনে যার প্রাপ্ত আসনসংখ্যা ৮০) এবং চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (আসনসংখ্যা ৭১), আর এদের সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস দল (আসনসংখ্যা ২৭)। আমাদের লেখার প্রসঙ্গ এই হারের ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রতিফলন প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। ফলে এ লেখার জন্য নির্বাচন বিষয়ক আপাতত এতটুকু তথ্যই যথেষ্ট। এখন থেকে মোদি সরকারের নতুন অভিমুখে কী হওয়ার সম্ভাবনা, তা নিয়ে কথা বলব। কী সে সম্ভাবনা?
মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন যে নির্বাচন থেকে, ভারতের ভাষায় লোকসভার সে নির্বাচন শেষে ওর ফল হয়েছিল ২০১৪ সালের মে মাসে। ওই নির্বাচনে মোদির দল হিন্দুত্ববাদী বিজেপি হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুত্ব নয়, মোদির মুখ্য শ্লোগান ছিল “বিকাশ”, মানে উন্নয়ন। উন্নয়ন কথাটা ভেঙে বললে ওর মানে হল অর্থনীতিতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। মূলত উন্নয়ন খাতে মূলত বিদেশি (তবে সরকারিও) বিপুল বিনিয়োগ ঘটানো হবে – এটাই বলতে চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতেই বা কী হবে? সে বর্ধিত অর্থ হল,  বিকশিত অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে, সুবিধা নিতে প্রলুব্ধ হয়ে কারখানা-ইন্ডাস্ট্রি খাতে এবার প্রাইভেট, পাবলিক এবং দেশি-বিদেশি ব্যাপক বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ঘটবে। আর এসব কিছুর নিট ফল গরিব মানুষের জন্য বিপুল পরিমাণ কাজ সৃষ্টি, কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এক কথায় ব্যাপারটা হল, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ ঘাটতিতে ধুঁকে মরা ভারতের অর্থনীতিকে দুনিয়ার মধ্যে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের লোভনীয় স্থান করে সাজানো। এ পুরো বিষয় বা প্রক্রিয়াটাকে এককথায় প্রতীকীভাবে উন্নয়ন শব্দে বা হিন্দিতে বিকাশ শব্দের ভেতর ধরা হয়েছে।
কিন্তু বিজেপির মতো এক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক দলের প্রধানমন্ত্রীর মুখে মুখ্য শ্লোগান “বিকাশ” হওয়ার তাৎপর্য ব্যাপক। কেন? প্রথমত, মোদির “বিকাশ” শ্লোগান নেহাত কথার কথা নয়। বরং ব্যক্তি হিসেবে এ পর্যন্ত দেখা ভারতের রাজনীতিকদের মধ্যে সত্যি সত্যিই তিনি এটা মিন করেন এবং সবচেয়ে অর্থপূর্ণভাবে এ কথা বলছেন।  এবং এরই মধ্যে গুজরাট রাজ্যে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় এমনটা করে দেখিয়েছেন তিনিই। এমন রেকর্ড একমাত্র তাঁরই আছে। এছাড়া এরই মধ্যে মোদির ১৮ মাসের প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে এরই মধ্যে অনেক অর্থনৈতিক নীতি-সংস্কার তিনি করেছেন, উদ্যোগের ঝড় তুলেছেন, তা উল্লেখযোগ্য এবং সাহসী। দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। জিডিপির বাড়ার বিচারেও তা যথেষ্ট ভাল, গেল বছর সাড়ে সাত ভাগের পর এখন অবশ্য সাত ভাগ। বিগত কংগ্রেস সরকারের শেষ সময়ে যা সাড়ে ছয়ে বা কখনও পাঁচে নেমে গিয়েছিল।
এখন একটা ইমাজিনড চোখে কিছু বলা যাক। ধরা যাক “বিকাশ” শ্লোগানের মোদির ভারত সরকার ৫ বছর সমাপ্তিতে উল্লেখযোগ্য সফলতা নিয়ে হাজির হল এবং তা এমনভাবে যে, বাস্তবে এটা যে কাজ করেছে, ফল দেখানো শুরু করছে তা সাধারণ মানুষের নজরে এবং দেশি-বিদেশি এক্সপার্টের চোখেও স্বীকৃতি পেতে শুরু করল। সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বলা যায়, মোদির সামগ্রিক রাজনীতির ভিত্তি এর পর আর বিজেপি-হিন্দুত্ব না থেকে এর বদলে ‘বিকাশ’ হয়ে যেতে বাধ্য। মূল কারণ হিন্দুত্বের জিগিরের চেয়ে “বিকাশ” বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেলে দল “বিকাশ” মুখ্য শ্লোগান করে রাজনীতি করবে।  পরের নির্বাচনে মোদি আরও জোর দিয়ে বিকাশের কথা বলে ভোট চাইবেন। আর দলের হিন্দুত্ত্বের বয়ান ঠিক ততটাই অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিজেপি মুসলমান বা ‘অ-হিন্দু’ বিদ্বেষী রাজনীতিকে অন্তত সেকেন্ডারি করে পেছনে ফেলে বিকাশের সাফল্যকে প্রধান ও একমাত্রভাবে হাজির করতে বাধ্য হবে। এমনিতেই ক্যাপিটালিজমের এক কমন স্বভাব হল, ক্যাপিটালিজম যেন এক বিরাট মেল্টিং পট, সবকিছু গালিয়ে ঘুটা দেয়ার পাত্র। এই পাত্র যে পড়ে এর আগের তার কোন বৈশিষ্ঠ আর অবশিষ্ট থাকে না, লোপ পায়। নানা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পদার্থকে এক পাত্রে নিয়ে একটা ঘুটা দেয়ায় এরা এরপর সবাই পুরনো আলাদা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা এক নতুন বস্তুর ঘুটা। তবে এর পর হয়তো নতুন বৈশিষ্ট্যের কোন দ্বন্দ্ব তাতে হাজির হতে পারে। কিন্তু পুরনো ধরনের ভিন্নতা ভেদ-বিভক্তি আর কারও মধ্যে থাকে না। ফলে সফল “বিকাশ” রাজনীতির সাফল্যের মানে সার কথায় বললে ‘অ-হিন্দু’বিদ্বেষী, হিন্দুত্বের রাজনীতি করার বাস্তব পরিস্থিতি বাস্তবতা নিজে নিজেই লোপাট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এটা বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা নয়; বরং বিকাশের রাজনীতিতে সাফল্যের সামনে পড়ে অনিচ্ছায় হিন্দুত্বের রাজনীতির বাস্তবতা শুকিয়ে যাওয়া; ফোকাস হারিয়ে নিদেনপক্ষে সেকেন্ডারি দুর্বল হয়ে যাওয়া; কথার কথা হয়ে থাকা এক দশা।
এটাই হলো বিকাশের সাফল্যে পড়ে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি টিকে থাকার সম্ভাবনা্কে নিজেই নাকচ করা এবং রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা।
ইমাজিনেশন ছেড়ে এবার বাস্তব মূল্যায়ন আসা যাক। মুল্যায়ন করলে দেখা যায় বিকাশের রাজনীতির দিক থেকে মোদির সরকারের প্রথম বছর খুবই সফল। এমনকি প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যে দুনিয়ার মুখ্য ইকোনমিক প্লেয়ার হিসেবে চীন, জাপান ও আমেরিকার সঙ্গে বিনিয়োগ বিষয়ক চুক্তি এবং সেই সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে ডিল সম্পন্ন করা দ্রুততম সময়ের দিক থেকে উদাহরণ। এজন্য হোমওয়ার্ক, নীতি পরিকল্পনা, হার্ড ওয়ার্ক ও কমিটমেন্ট এসবই ‘বিকাশ’ এর ব্যাপারে মোদি সিরিয়াসনেসের প্রকাশ ঘটিয়ে দেখানোর প্রমাণ। যদিও বছর শেষের আগেই মতাদর্শিক গুরু সংগঠন আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ধরনের প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা “ঘর ওয়াপসি” বা চার্চে হামলা ইত্যাদির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান ও অ্যাকশন মোদিকে দেখাতেই হয়। মোদি পেরেছিলেন। মনে হয়েছিল, মোদি ‘বিকাশ’ রাজনীতি থেকে ফোকাস সরিয়ে নষ্ট হতে পারে অথবা অন্য কিছুর ছায়া এর ওপর পড়তে পারে, এমন কিছু থেকে একে রক্ষা করার ব্যাপারে তখনও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাদের প্রকাশ্যে সমালোচনাও করেছিলেন। আর যে কোনো নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা করতে তার সরকার নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ – প্রকাশ্যে তা জানিয়েছিলেন।
কিন্তু তার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম বছর পার হতে না হতেই তার আগের দৃঢ়তায় ঢিলা পড়তে দেখা যায়। এবছরের এপ্রিলে শুরুতে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয়েছিল। ঘটনার শুরু গোমাংস ইস্যুতে।  মহারাষ্ট্র
রাজ্যের বিজেপির সরকার গরু জবাই করার বিরুদ্ধে আইন তৈরি করে প্রয়োগ শুরু করেছিল। এতদিন প্রধানমন্ত্রী মোদি সবসময় কোনো রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত থেকে অথবা নিজ বিজেপি বা আরএসএসের কার্যকলাপ থেকে তার কেন্দ্রীয় সরকার ভিন্ন – এ কথা প্রচার করেছেন ও মেনে চলেছেন। আইনত এ কথা সত্যিও বটে। ফলে ওদের সিদ্ধান্ত বা ততপরতার কোনো দায়দায়িত্বও নেননি, পৃষ্ঠপোষকতাও দেননি। “ঘর ওয়াপসি” বা চার্চে হামলার বিরুদ্ধে যে কোন নাগরিক ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষার তাঁর সরকারের নীতি ঘোষণা এর প্রমাণ।  মোদির কাছে – দল ও সরকার ভিন্ন – এভাবে মেনে চলা নীতি অনুসারে গরু জবাই তাঁর সরকারের সিদ্ধান্ত নয়। ফলে এর কোনো দায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বা তাঁর সরকারের বা মন্ত্রীর নয়; সংশ্লিষ্টতা থাকার কথাও নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম, তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফের সঙ্গে মিটিংয়ে গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। বললেন, বাংলাদেশে যাতে গরু পাচার হয়ে না যায়, বাংলাদেশ যেন দামবৃদ্ধির ঠেলায় গরুর মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এভাবে নাকি হিন্দু ভারতের গরুপ্রীতি রক্ষা করতে হবে। বক্তৃতায় এত দূর গেলেন। অথচ গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে তার কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো আইনই নেই। অর্থাৎ ভারতের সব রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ নয়। মহারাষ্ট্র রাজ্যের সিদ্ধান্ত ও আইন অন্য রাজ্যে বা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর প্রযোজ্যও নয়। অথচ এ অসামঞ্জস্য ততপরতা প্রকাশ্যে ঘটতে শুরু করল।
কেন এটা হলো? নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম বাধাহীন পালন করার সুযোগকে মোদির যেচে এটা অ-হিন্দু নাগরিকেরও অধিকার বলে স্বীকার করে নেয়া এবং ওই অধিকার রক্ষা নিজ সরকারের নীতি বলে ঘোষণা দেয়ার কথা যেটা আগে বলেছিলাম। মোদির এমন সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ও সাহসী ছিল বটে, আমরাও আগে মোদির এমন কঠোর ঘোষণাকে আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ওপর মোদির নিয়ন্ত্রণ বা লাগাম টেনে দেয়া বলে বুঝলেও এখন বুঝা যাচ্ছে সেটা ছিল বাইরের একটা প্রকাশ্য দিক। অন্তরের দিক ঠিক এমন নয়। অন্তরের দিকে খুব সম্ভব মোদির “নাগরিকের ধর্ম পালন রক্ষার দায়িত্ব নেয়া” ঘোষণার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মোদি সরকার আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। যার ফলাফল তিনি হেরে যাওয়ায় তাকে আঁতাত সমঝোতায় যেতে হয়। এরই বাইরের পয়লা প্রকাশ্য দিক হলো গরু ইস্যুকে কোন ঘোষণা ছাড়াই উহ্য রেখে নিজের বলে মোদি সরকারের হাতে তুলে নিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, নরেন্দ্র মোদি ছোট বেলা থেকেই আরএসএসের ভেতরেই বড় হয়েছেন এমন কোর সদস্য। ফলে মোদি ও আরএসএস পরস্পর পরস্পর থেকে দূরের কেউ নয়। তাই একসঙ্গে বসে পরস্পরের কনসার্নগুলো পরস্পরের কাছে তুলে ধরে
কমন এক  সিদ্ধান্তে আসার তাগিদবোধ ও সম্ভাবনা দূরের কোনো বিষয় হয়নি। যদিও ২০১৩ সালে মোদির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করাতে মোদি সফল হয়েছিলেন আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে নিজের পক্ষে সমর্থনে নিয়ে। আর বিপরীতে  বিজেপির এলকে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, অরুণ সুরী, যশবন্ত সিংসহ ৭০ বছরের বেশি বয়সের বয়স্ক যত নেতা আছে, তাদের কোণঠাসা করে। এদের তিনি (দল নয়) সরকারে অংশগ্রহণে বদলে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়াতে সক্ষম হন। সে সময় এভাবেই  বুড়াদের প্রভাব খর্ব করে মোদি দল বিজেপিকে নিজের একক কর্তৃত্বাধীনে আনেন। একমাত্র কেবল বাজপেয়িকে নিজের পক্ষে মুরব্বি পরামর্শক রেখেছিলেন মোদি। এই হল “কেন এটা হল” এসম্পর্কে পুরানা কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড ফ্যাক্টস। তবে আরও কিছু আছে।
সম্প্রতি দিল্লীতে ৪- ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে আরএসএস ও মোদি সরকারের মধ্যে এক বিশেষ সাক্ষাত-বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। সবাইকে পাবলিকলি জানিয়ে তবে একান্তে এই বৈঠক হয়েছে। এনডিটিভি, দ্য হিন্দু ইত্যাদি মিডিয়ার গোপন সোর্সের খবর অনুসারে এটা নাকি ছিল মোদি সরকারের প্রথম বছরের পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন বৈঠক। সরকারের শীর্ষ নীতি বিষয়ে মুরব্বি আরএসএসের পরামর্শ নিয়ে তা সমন্বয় করা হয় সেখানে। মাস তিনেক আগে  গুজরাটের এক অখ্যাত হৃদ্দিক প্যাটেল তার নিজের প্যাটেল বা পতিদার সম্প্রদায়কে অবহেলা এবং এর পক্ষে সরকারি সুযোগ-সুবিধার কোটা দিবার দাবিতে গুজরাটের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে সারা ভারতের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। এখন মিডিয়ায় কানাঘুষা চলছে, এর পেছনে ছিলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভাপতি পারভীন তোগোদিয়া এবং বিজেপির সভাপতির দূর থেকে সমর্থনের কথাও সেখানে উঠেছে। সবশেষে বর্তমানে হৃদ্দিক প্যাটেল জেলখানায় ডিটেইন্ড। তাই এমন মনে করার কারণ আছে যে, এটা কি তবে আরএসএস এফিলিয়েটেড সংগঠনের সঙ্গে (হয়ত ঠিক আরএসএসের প্রধান নেতারা নয়) মোদি ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই ছিল, যে কারণেই কি প্রকাশ্যে দিল্লিতেই আরএসএস ও মোদি সরকার মধ্যে সমন্বয় বৈঠক! এখানে মনে রাখতে হবে, ওখানে মোদি ও তার মন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন বিজেপির নেতা হিসেবে নয়, খোদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে। তবে এতে সরকারী নীতির গোপনীয়তা যারা রাষ্ট্রের শপথ নেননি, এমন লোকজনের সঙ্গে শেয়ার করার অসাংবিধানিক কাজ করেছে বলে কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছিল।
এতসব কথার সারকথা, মোদি সরকার গঠনের পর থেকে জানিয়ে ও মেনে আসছিলেন যে, সরকার ও বিজেপি দুটি আলাদা সত্তা তিনি মেনে চলবেন। এরই সর্বশেষ প্রকাশ হলো, মোদির যে কোনো নাগরিকের ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা তার সরকারের কর্তব্য বলে ঘোষণা করা। কিন্তু এর পর থেকে শুরু হয় আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম এবং মোদির হার শুরু হয়। ফলে পরিণতি একেবারে উল্টো। এখন আরএসএসের নির্দেশ-পরামর্শ শুনতে অধীনস্থ হয়েছে এবং জবাবদিহিতা নেয়ার উচ্চ কর্তা হিসাবেও আরএসএস হাজির হয়েছে। এটাই কার্যত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এজন্য গরু জবাই, মাংস খাওয়া ইস্যুটা মোদি সরকারই আরও সবলভাবে সর্বত্র হাজির করেছে। বিজেপি দল আর সরকার বলে কোনো ফারাক সেখানে আর নেই। বিহারের নির্বাচনেও দ্বিধা ঝেড়ে এবং বিচ্ছিন্নভাবে নয়, দলের দায়দায়িত্বে গরুপ্রীতি, গরু জবাই, মাংস খাওয়া ইত্যাদি সরাসরি দলের প্রচার-প্রোপাগান্ডায় ইস্যু করা হয়েছিল। এমনকি বিহারে গরুপ্রীতি ও ভক্তি দেখিয়েএক পোস্টার ছাপানো হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে,  গরুকে জড়িয়ে ধরে এক মেয়ে আদর করছে। ার ঐ পোস্টারে  বিরোধীরা (যারা বিহার নির্বাচনে সদ্য জিতে গেল) এরা কেন গরু বিষয়ে বিজেপির মতো অবস্থান নিচ্ছে না, জনগণকে এর জন্য জবাবদিহিতা চাইতে বলা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যারাই বিজেপির বিরুদ্ধে ‘অসহিষ্ণুতার’ অভিযোগ তুলছেন, অভিনেতা শাহরুখ খানসহ সবার বিরুদ্ধেই দল ও সরকারের মন্ত্রীরা তাকে পাকিস্তানের এজেন্ট বলে পাল্টা অভিযোগ ও আক্রমণ করেছেন। একই সূত্রে নেপালের কনস্টিটিউশন ইস্যুতে নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়ার দাবি বিহার বিজেপি থেকে করা হয়েছিল। নেপাল-ভারত সীমান্ত বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত; ফলে কিছু অংশ সীমান্ত এখানেও শেয়ার হয়েছে।


যে কথা নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, বিকাশের রাজনীতি বনাম বিজেপির হিন্দুত্বঃ যেখানে প্রথম বছর আশাবাদ রেখেছিলাম, ‘বিকাশের’ রাজনীতি মুখ্য ফোকাসে থেকে সাফল্য দেখাতে পারলে হিন্দুত্ব ভুলে বা হিন্দুত্বকে পেছনে ফেলে বা চাপা দিয়ে ভারতের হিন্দুত্ব রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আড়ালে চলে যেতে পারে। কিন্তু ঘটনা আকস্মিক সেদিকে না গিয়ে এর বদলে এক ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে মোদিই কার্যত হেরে গেছেন দেখা যাচ্ছে। ফলে মোদি সরকারের ১৮ মাসেই দেখা যাচ্ছে, কী ভয়াবহভাবে মোদি ক্রমেই হিন্দুত্বের রাজনীতির তলে হারিয়ে যাচ্ছেন।
৮ নভেম্বর নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন শেষে ভারতের মিডিয়ায় প্রধান আলাপ উঠেছে এখন বিহারে বিজেপির হারের পর মোদি নিশ্চয়ই তার নীতিতে ‘কারেকশন’ আনবেন, ‘সহিষ্ণুতায়’ ফিরিয়ে আনবেন ইত্যাদি। উপরের আলোচনা থেকে এটা মনে করাই স্বাভাবিক যে, এমন আশাবাদ ভিত্তিহীন। মোদি, বিজেপি অথবা আরএসএস এখন কি পিছু হটে আসার কথা ভাববেন? মনে হয় না। অন্তত আজকের টিভি টকশো দেখে মনে হয়নি। বরং মোদি সরকারের বাকি সাড়ে ৩ বছর কীভাবে কাটবে, সে শঙ্কাই প্রবল হবে। স্বভাবতই এর আঁচ পড়শিদেরও ভোগাবে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়াঃ
উপরে বয়স্ক নেতা যাদের কথা বলছিলাম এদের চারজন এলকে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, যশবন্ত সিং এবং শান্তা কুমার প্রকাশ্যে সরকারকে চিঠি দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। মিডিয়ায় সে চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। ওর সারকথা হল, এর আগে দিল্লীতে হেরে যাবার পরও কোন শিক্ষা নেয়া হয় নায়। আর কাদের জন্য এই ব্যর্থতা তা চিহ্নিত ও দায়ী না করে আগের মতই এবারও চেপে যাওয়া হয়েছে। চিঠির পুর্ণ টেক্সট এখানে আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

শেষ কথাঃ বিকাশের রাজনীতি বনাম বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি এই লড়াইয়ে শুরু থেকেই বিকাশ বিষয়টা মোদির এক ব্যক্তিগত সাফল্যের শখ বা অবসেশন এর বিষয় যেন এমনই থেকে গেছিল। অপরদিকে হিন্দুত্বের রাজনীতি – এটা জনগোষ্টির উগ্র হিন্দুত্ব-জাতীয়তাবাদের আবেগ তুলে সেই আবেগের উপর ভর করে ক্ষমতা তৈরি এবং এটা ক্ষমতায় যাওয়ার বেশ কাজের বিরাট হাতিয়ার – এই বোধও প্রবল। যেমন মোদি প্রথমবার গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী হবার পরে ২০০২ সালে দাঙ্গাটা করেছিলেন। এতে পরপর আরও দুবার মোট তিনবার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এরপরে আর দাঙ্গার পথে যান নাই। আবার লোকসভা ২০১৪ নির্বাচনে যেখান থেকে মোদি প্রধানমন্ত্রী হলেন, ঐ নির্বাচনে কেবল উত্তর প্রদেশ রাজ্যে একই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন কিন্তু ফলাফল (মোট আশির মধ্যে বাহাত্তর আসন) নিজের পক্ষে আনতে পেরেছিলেন। ঐ ঘটনায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এক মামলায় প্রধান আসামি, তবে মামলা পেন্ডিং। আবার মোদী সরকার গঠনের পর ১৮ মাসে আরও দাঙ্গার ব্যাপারে চুপচাপ। তবে দলের ভিতর দুই লাইনের লড়াই আছে। এতে ইচ্ছা বা উভয় পক্ষ যেখানে একমত হয় যে দুটাই – বিকাশ ও হিন্দুত্ব – করতে হবে। সম্ভবত “বিকাশ” পক্ষে দ্রুত কাজ ততপরতার করলেও ফল দেখাতে বা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের চোখে ও মাঠে হাজির হতে সময় লাগতে পারে। তাই হিন্দুত্বের লাইন ততপরতা এই অপশনটা সমান্তরালে রেখে দিচ্ছে। কিন্তু এমন যুক্তি বা ভাবনা ভিত্তিহীন। কারণ ২০১৪ নির্বাচনে মোদির “বিকাশ” শ্লোগানের অর্থ বুঝতে তো গরীব মানুষের কোন অসুবিধা হয় নাই। তাঁরা হয়ত ফিগার ডাটা অথবা তত্ত্ব দিয়ে বুঝে না কিন্তু বুঝে নিজের কায়দায়। নইলে গত ৩০ বছরের নির্বাচনে যেখানে কেন্দ্রে কোন একক সংখ্যাগরিষ্টের সরকার আসে নাই। কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোন সর্বভারতীয় দল একক সংখ্যাগরিস্টতা (অর্ধেক আসনের চেয়ে এক বেশি) পায় নাই।  সেই ট্রেন্ড থমকে দাড় করিয়ে মোদির জোটকে না কেবল একা বিজেপিকে জনগণ একক সংখ্যাগরিষ্টের দল হিসাবে ক্ষমতায় আনল। এবং খুব সম্ভবত জনগণকে মোদি ব্যর্থ করে দিলে জনগণ আবার বিগত দিনের ট্রেন্ডে ফিরে যাবে। আর কোন দিন ফিরে আসবে না। যে জনগণ শুধু শ্লোগান শুনেই অর্থ বুঝতে পারে তারা সরকারের সুদ্ধান্ত, ততপরতার অগ্রগিতি বুঝবে না এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

আবার আসলে, বিকাশ বনাম হিন্দুত্ব এর মধ্যে সম্পর্কটাই এমন বিরোধী যে দুটা একসাথে থাকতে চলতে পারে না। কারণ বিকাশ কার্যকর হতে গেলে সেখানে হিন্দুত্ত্বের দাঙ্গা অনিরাপত্তা অথবা ভারতের চলতি হালের ভাষায়, “অসহিষ্ণুতা” থাকতে পারবে না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের মোদিকে  পরামর্শের ভাষায়  “অসহিষ্ণুতা” চললে যেসব বিদেশী পুঁজি, সম্পর্ক, আস্থা তৈরি তিনি করেছেন এগুলো সব ফিরে চলে যাবে। ওবামাও কমবেশি তাকে একই কথা বলেছিলেন। ঘর ওয়াপসি বা চার্চে হামলা দেখে প্রকাশ্যে তবে পরামর্শের ভাষায় সাবধান করেছিলেন বলেই মোদি সময় একেবারে শেষ হবার আগেই নিজের নীতি ঘোষণা করেছিলেন, “নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার করা তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি” – তা বলতে পেরেছিলেন।  লক্ষণীয় যে আধুনিকতার চিন্তা ফ্রেমে এটা ইউরোপের কোন রাষ্ট্রের ভাষা নয়; আমেরিকার কনষ্টিটিউশনের ভাষা। বলা বাহুল্য উগ্রজাতিয়তাবাদী  হিন্দুত্বের বিজেপির রাজনীতির সাথে “নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি” সামজ্ঞস্যপুর্ণ নয়। তবু মোদি এটাকেই তাঁর সরকারের নীতি বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।  কিন্তু এতে উত্থিত সংঘাত সামলাতে পারেন নাই। যেখান থেকে পরবর্তি নতুন আরও বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখি তিনি।

এনডিটিভি এই মিডিয়া প্রশ্ন তুলেছিল বিহারের নির্বাচনে গরু আদর করা মেয়ের ছবির পোস্টার করার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে বলছিলেন, মোদি যদি বিকাশের” কথাই বলবেন রাজনীতি করবেন তাহলে এই পোস্টারের সাথে বিকাশের যোগসুত্র কী?

আসলেই মোদি এদুটোর মধ্যে সম্পর্ক কী তা কখনই দেখাতে পারবেন না। দলের আভ্যন্তরীণ গঠন প্রকৃতির জন্য আগামিতেও নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারবেন – এমন আশা করার সুযোগও খুবই কম। বিশেষ করে গরুর মাংস আর বিহারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপির বয়ানের যে মান হাজির হয়েছে। 

ওদিকে মোদির “বিকাশ” রাজনীতি ব্যর্থ হবার অর্থ হল, ভারতের ভবিষ্যত, ভারতের রাজনীতি অতলে হারিয়ে যাবার এক প্রবল সম্ভাবনা। বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে – “বিকাশের”, মানে এক বিকশিত ভারত আমাদের জন্য কাম্য। না, এটা ভাবভালবাসার উইশ বা ফর্মালিটির কথা নয়। কারণ এর অর্থ হিন্দুত্বের রাজনীতির দিন শেষ হবে। এটা এই অঞ্চলের জন্যও কাম্য।

[এই লেখাটা গতকাল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় সংক্ষিপ্ত রূপে ছাপা হয়েছিল। এখানে পুরা ভার্সান ছাপা হল। ]

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক