দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

গৌতম দাস

মার্চ ২৪, ২০১৭ ভোর ছয়টা

http://wp.me/p1sCvy-2dU

 

 

জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন সম্ভবত প্রায় ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে।  এককথায় বললে এটা হিন্দু (জাতীয়তা) আইডেনটিটির উপর দাঁড়ানো বা আইডেনটিটি পলিটিকসের উপর দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হয়ে আছে। কোন সমাজের সকলে অন্তর্ভুক্ত কোন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ এর এক সাম্যের রাষ্ট্র ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নয়। যদিও মুখে এতটুকু বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। ফলে হিন্দুত্ব ছাড়া অন্য কোন কিছুর উপর তাদের নিজেদের কোন আস্থাই ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো রাষ্ট্র গঠনের কর্তারা পড়েছে হয়ত তবে তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে এরা ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথার উপর ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। দুটোই চাপাবাজির অর্থহীন শব্দ। রিপাবলিক রাষ্ট্রের তিন মৌলিক বৈশিষ্ঠের অর্থ তাতপর্য বুঝলে ও বাস্তবায়ন করলে তো আর এই দুই ফালতু শব্দের (‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ ) দরকার দেখা যেত না। ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র নয় বলেই মুসলমানেরা হিন্দুদের মত সমান নয় বলেই মুসলমানদের সে প্রশ্ন চাপা দিতে বাড়তি এবং অর্থহীন ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ শব্দ দু্যটো আনা হয়েছে। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো আপত্তি বা সমস্যা নেই, বরং তারা কোনো সমস্যাই দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এই ভাবেই চলে ভারতের রাজনীতি, চলে আসছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। তাই বিজেপির প্রথম একক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ট বা একার তৈরি সরকার হল ২০১৪ সালেরটা।  তবুও ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন?

কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ?

তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং গুরু মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে এক নতুন নাম নেন – যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামের সংগঠন একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা দুটাই একই নামে চালাত। পরে ধর্মতাত্ত্বিকসহ সব ততপরতার মূল সংগঠন হয় আরএসএস। আর ১৯৮০ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতার আলাদা সংগঠন হয়  বিজেপি। যদিও  হিন্দু মহাসভার গান্ধী হত্যায় দায় ঘাড়ে এসে পড়ায় গুরুত্বপুর্ব সদস্যরা ১৯৫১ সাল থেকেই হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গত ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি ইত্যাকার সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই কমন নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যনাথের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকেই নির্বাচিত এমপি হতেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। আর এরপর তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে স্বাধীনই থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজস্ব সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এছাড়া এরপরে, ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে “হিন্দু যুব বাহিনী” গঠন করেন। তিন বছরের মাথায় ২০০৫ সালে একভয়াবহ দাঙ্গায় অংশ নেয়ার জন্য এই বাহিনীর সিনিয়র নেতারা অভিযুক্ত হয়েছিল।  এছাটা ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগানোর ঘটনা যেটার লেজ  ধরে পরে  গুজরাতের দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষ সহ ট্রেন পুরানা মামলাতেই এই সংগঠনের সদস্যরা সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’।  আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। আদিত্যনাথের প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতার ভাষা শুনা ও দেখার জন্য এই ইউটিউব ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারেন যেখানে তিনি বলছেন,  “একজন হিন্দু খুন হলে পরে আগামি দিনে আমরা প্রশাসনের কাছে এফআরআই মামলা দর্জ করব না। বরং পালটা এমন দশ ব্যক্তিকে খুন করাব ……”। এছাড়া সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশেকে জড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বলছেন মুসলমান অনুপ্রবেশকারিরা ভারতে এসেছে এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য এখানে দেখতে পারেন।  এছাড়া নিয়মিতভাবে ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা তার প্রতিদিনের রুটিন কাজ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ৭৫ ঘন্টার মধ্যে কসাইখানা বন্ধের আর গরু চলাচলে তার ভাষায় উত্তরপ্রদেশে গরু পাচার করে আনা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব ঘটনাবলিতে হিন্দুত্ব ভিত্তিক কনষ্টিটিউশনে যেমন  “ভদ্র লোকেরা” কোন সমস্যা দেখে নাই, এখানেও তেমন কেউ অসুবিধা দেখে নাই। তবে নিরাপদ দুরত্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যেমন প্রধানমন্ত্রী মোদির যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার পত্রিকা যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে – ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগের মত তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হত। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে নির্বাচন করেছিল মোদি।  ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

ভারতের নির্বাচনে উদোম হিন্দুত্ব পরিচয়

ভারতের নির্বাচনে উদোম হিন্দুত্ব পরিচয়

গৌতম দাস

মার্চ ২৩, ২০১৭ বিকেল সাড়ে পাঁচটা

http://wp.me/p1sCvy-2dN

 

 

ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে। মুখে বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। কিন্তু নিজেদের আস্থাই তত গভীর ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান সমাজ গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথায় ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, তারা কোনো সমস্যা দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন? কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ? তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে নতুন নাম নেন- যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামে একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা একই নামে চালানো হতো। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়ে পড়েন। তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরেই স্বাধীন থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এরপর ২০০২ সালে যোগী বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ গঠন করেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’। আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য আর ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা। যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে- ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগে তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হতো। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

 

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে পরিবর্তন অনলাইন পত্রিকায় ২০ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

মোদির আগামি দুবছরের রাজনীতি হবে কেবল হিন্দুত্ব

মোদির আগামি দুবছরের রাজনীতি হবে কেবল হিন্দুত্ব

গৌতম দাস

২৩ মার্চ ২০১৭, বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2dG

ভারতের ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন সম্পন্ন হবার পর এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ মার্চ। এই নির্বাচন ছিল রাজ্য সরকারের অর্থাৎ প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচন। ভারতের সংবিধানে ইংরেজিতে একে রাজ্য অ্যাসেম্বলি ইলেকশন (State Assembly Election) বা বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন নামে অভিহিত করা হয়েছে। জন্মের শুরু থেকেই ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য ছিল উত্তর প্রদেশ। সেখান থেকে কিছু জেলা (উত্তরপ্রদেশেরও উত্তর অংশের) আলাদা করে নিয়ে গত ২০০০ সালে বানানো নতুন রাজ্যের নাম ‘উত্তরখণ্ড’। এরপরে এখনও উত্তর প্রদেশ সবচেয়ে বড় রাজ্য। এই দুই রাজ্য এবং পাঞ্জাব, গোয়া ও মনিপুর মিলে মোট এই পাঁচ রাজ্যে এবার প্রায় এক মাস ধরে সাত পর্বে নির্বাচন শেষ হয় গত ৮ মার্চ। এরপরেই ১১ মার্চ সকাল থেকে সবগুলো রাজ্যের একযোগে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ শুরু হয়। উত্তর প্রদেশ ও উত্তরখণ্ড রাজ্যে বিজেপি আর পাঞ্জাবের রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করেছে।
বাকি দুই রাজ্য গোয়া ও মনিপুরে কেউ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে কংগ্রেস অন্য সব দলের চেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজেপি প্রবল তৎপরতায় কংগ্রেস বাদে আর সব ছোট দল ও স্বতন্ত্র সদস্য যারা জিতেছে তাদের সবাইকে বিজেপি সাথে নিয়ে জোট বেঁধে এই দুই রাজ্যে সরকার গঠন করে ফেলেছে। অর্থাৎ বিজেপির নেতৃত্বে গোয়া ও মনিপুরে কোয়ালিশন গর্ভমেন্ট গড়তে সফল হয়েছে বিজেপি।  এখানে ‘তৎপরতা’ কথাটা অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে, বিজেপি যখন কংগ্রেস বাদে আর সব নির্বাচিত ছোট দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সাথে সরকার গঠনের দেনা-পাওনা আলাপ আলোচনা চালিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনের ‘চুক্তি’ সম্পন্ন করে ফেলছিল, কংগ্রেস তখন কে তাদের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হবে এ নিয়ে ঝগড়া ও মনকষাকষিতে মত্ত থেকে সরকার গঠনের সুযোগ হারিয়েছিল।

ওদিকে প্রায় এরকমই অন্য কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল উত্তরপ্রদেশ। এর মূল কারণ রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ জনসংখ্যায় সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী এলাকার – কেন্দ্রিয় লোকসভা আসন ৮০। ভারতের জন্মের পর থেকে (১৯৮৫ পর্যন্ত) পুরো নেহরু পরিবারের কাল পর্বে ভারতের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশ থেকেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসতাণ্ডব, গোধন ট্রেনে আগুন ও ব্যাপক দাঙ্গার ঘটনাপর্ব সামগ্রিকভাবে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছে। আর সে সবের বেশির ভাগ এই উত্তরপ্রদেশই। সেই উত্তরপ্রদেশে মোট ৪০৩ আসনের বিধানসভা নির্বাচনে এবারই প্রথম বিজেপি ৩২৬ আসনে জয়লাভ করেছে। এর আগে গত ২০১৪ সালে মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লোকসভা নির্বাচনে অবশ্য বিজেপি প্রথম মোট ৮০ আসনের মধ্যে ৭৩ আসনের বিজয় লাভ করেছিল। সেটাই উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পা রেখে পেখম মেলার শুরু বলা যায়। পরে কেবল দিল্লি রাজ্য সরকারের নির্বাচনে এবং বিহারের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির খুব খারাপ হার হওয়াতে এবারের নির্বাচনে বিজেপি আবার উত্তরপ্রদেশে আগের মতো বিরাট ব্যবধানে জিতবেই এটা কোনো পক্ষই নিশ্চিত ধরেনি। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এমন বিজয়ের দাবি বরাবর করে যাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া চার মাস আগে মোদি ভারতের মোট ছাপা নোটের ৮৫ শতাংশ মূল্য ধারণ করে এমন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট দুটা বাতিল করে দিয়েছি, আর নতুন নোটে তা বদলে দিয়ে ছিল। তবে এথেকে কালো টাকা উদ্ধারের কোনো সুফল মোদি দেখাতে পারেননি। আবার নোট বাতিলের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো খুবই কষ্টের হয়ে পড়েছিল। এর চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হল, সেই থেকে ভারতের অর্থনীতি প্রচণ্ড খারাপ অবস্থায় পড়েছে। ব্যাংক গভর্ভর থেকে সরকারি টেকনিক্যাল উপদেষ্টারাও তা অস্বীকার করে পারে নাই। এতে  নির্বাচন বিশেষজ্ঞসহ সব পক্ষই আশঙ্কা করছিল, এই নির্বাচনের দেওয়া ভোটে সেটা বড় ছাপ ফেলতে পারে এবং মোদি একটা বড় ধাক্কা খেতে পারেন। শুধু তাই না, সেটা হলে তা ২০১৯ সালের মোদির দ্বিতীয় নির্বাচনী ফলাফলকেও প্রভাবিত করবে। কিন্তু মোদির কপাল ভাল তা হয় নাই। ভারতের রাজনীতির বিচারে নোট বাতিল কেন্দ্রের রাজনীতির ইস্যু; স্থানীয় রাজনীতির নয়। তাই এক কথায় বললে, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে ভোটদাতারা ভোট দিয়েছে কেন্দ্রীয় ‘নোট বাতিল ও এর প্রভাবকে’ উপেক্ষা করে বরং স্থানীয় নানা ইস্যুতে। এসব আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করার পটভূমিতে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পালটা বিপুল জয়লাভ ভিন্ন অনেক কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল বিজয়ের অর্থ হল, কংগ্রেসের জায়গা দখল করে কংগ্রেসের মতোই সর্বভারতীয় দল হিসেবে বিজেপি ভারতীয় রাজনীতিতে উত্থিত হয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফল তাই প্রমাণ করছে। এই দাবি অনেক বিশ্লেষকও করছেন। আগামী দিনের ঘটনাবলী তা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু এসবের বাইরে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল বিজয় সাময়িক হতাশ থাকা মোদিকে আরো চাঙ্গা ও আস্থাবান করে তুলেছে। এই বিজয়কে কেন্দ্র করে মোদি ও বিজেপি আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রে নির্বাচনে জয়লাভের ছক সাজানো শুরু করেছে। কারণ বিজেপির মূল্যায়ন হল, হিন্দুত্ববাদকে মুখ্য করে পরিচালিত রাজনীতি হল, ভোটের বাক্স ভরানোর উপযুক্ত এবং বিজেপির জন্য পারফেক্ট রাজনীতি।
মোদির পরপর তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী থেকে পরে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত এবং সেই সাথে বিজেপির উত্থানপর্বে সবসময় আগ্রাসী নীতিতে পরিচালিত হয়েছেন। বাজি ধরে ধরে এগিয়েছেন। যত ঝুঁকি নিয়েছেন, প্রায় সব ফলাফলই তার পক্ষে গেছে। ফলে সাহসী হয়ে উঠছেন অথবা বলা যায় বাজি ধরে ঝুঁকি নেওয়াই তাঁর একমাত্র বিকল্প তার হাতে আছে ধরে নিয়ে এগিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার কুড়ি শতাংশ মুসলমান। এবারে বিজেপি যে কৌশলের ওপর এককভাবে দাঁড়িয়ে সে ৭৮ ভাগ আসন জিতেছে তা হল, ২০ শতাংশ মুসলমান ভোটারের পরোয়া না করে এর বিপরীতে ব্রাহ্মণ থেকে যাদব ও আরো নিচু জাত – এভাবে সব হিন্দু জনসংখ্যার নানা অংশকে যতদূর সম্ভব ভোটের একই বাক্সে ভরে আনা। এমন এক বড় রেঞ্জের হিন্দু-কোয়ালিশন গড়ে নির্বাচন লড়া।
যোগী আদিত্যনাথকে বিজেপি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উগ্র আগ্রাসী ও বিতর্কিত মন্তব্যকারী মাত্র ৪৪ বছর বয়সের বিজেপি নেতা আদিত্যনাথ। বিগত ১৯৯৮ সালে সবচেয়ে কম বয়স, মাত্র ২৬ বছরে তিনি প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং সেই থেকে পরপর পাঁচবার তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ বা লোকসভার এমপি। যদিও  এই আসনটা ছিল তার গুরু অবৈদ্যনাথ মোহন্ত এর, যিনি এই আসন থেকে নির্বাচিত হতেন। উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষনাথে এক প্রাচীন মঠ আছে, গুরু অবৈদ্যনাথ যার প্রধান পুরোহিত ছিলেন। গুরুর মৃত্যুর আগেই ১৯৯৪ সালে যোগীকে এই মঠের প্রধান পুরোহিত করে যান। আর এই মঠকে নিজেদের প্রভাবে এলাকায় নতুন মাত্রার রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিলেন যোগী। এখানে পুরনো গোরক্ষনাথ কলেজও হয়ে পড়ে তরুণদের প্রভাবিত করার উপায়। কলেজকে কেন্দ্র করে বিজেপি রাজনৈতিক তৎপরতা, বিশেষ করে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে চলা তৎপরতা জোরদার হয়েছিল এই কলেজকে ঘিরেই। গত ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ এখানে তরুণদের নিয়ে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ নামে এক নতুন সংগঠনের জন্ম দেন। আসলে উগ্র ও আক্রমণাত্মক ভাষায় মুসলমান ও ইসলাম অথবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য ও বয়ান দি্তে এই আগ্রাসী সংগঠন তিনি গড়ে তোলেন। তিনি প্রায়ই বক্তৃতায় হিন্দুত্বের রাজনীতির পক্ষে তার সাফাই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘হিন্দুত্ব কখনোই ত্যাগ করতে পারব না। কিছু জায়গায় হিন্দুরা নির্যাতিত। হিন্দুদের দেশে এটা হতে পারে না। তাই আমি হিন্দুত্বের পক্ষে কথা বলি। আমাকে বলতেই হবে”। এবারের রাজ্য নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রসঙ্গে তার এক আজব দাবি আছে। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প মোদিকে অনুসরণ করে জিতেছেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলে ট্রাম্প জিতেছেন। রাশিয়ার পুতিনও মুসলমানদের বিরোধী। বিষয়গুলোতে নাকি তাদের চোখ খুলে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। বিভিন্ন সময়ে তাঁর চরম উত্তেজক ও মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো মন্তব্যগুলো এক জায়গায় এনেছে আনন্দবাজার পত্রিকা এখানে। 
সেই যোগী আদিত্যনাথ উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন শুরুর দু’বছর আগে থেকেই  – মুসলমানদের ভারত থেকে বিতাড়িত করতে হবে, পাকিস্তান পাঠিয়ে দিতে হবে বলে দাবি জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। নির্বাচনের ফলাফলের পরে উত্তরপ্রদেশের কয়েকটা জেলায় ইতোমধ্যে মুসলমান বিতাড়নের পক্ষে পোস্টার পড়েছে। কয়েকটা ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক এর ছবি ছেপেছে। এরপরই বিজেপির সংসদীয় বোর্ড মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদিত্যনাথের নাম ঘোষণা করেছে।
আদিত্যনাথের তৎপরতার একটা প্যাটার্ন লক্ষ করা যায়। তার কাজের ধরন হল, মুসলমানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে উসকানিমূলকভাবে কথা বলা। এরপর এতে গ্রেফতার হলে তাকে মুক্ত করে আনার জন্য শহরে দাঙ্গা হাঙ্গামা তৈরি করা যাতে এই চাপে প্রশাসন তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ক্রমাগত আগ্রাসীভাবে েকের পর এক পদক্ষেপে চাপ বাড়িয়ে চলা। এভাবেই মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল তার ‘হিন্দু যুব বাহিনীর’ হাতে। এখানে এই তথ্যগুলোর বেশির ভাগ ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এভাবে যোগীর চাপ প্রয়োগ এবং ইচ্ছামতো কাজ করিয়ে নিয়ে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে  প্রধান হাতিয়ার হল তাঁর ‘হিন্দু যুব বাহিনী’। একই প্রক্রিয়ার চাপ তিনি কখনো কখনো খোদ বিজেপির ওপরও প্রয়োগ করেছেন। এবারের নির্বাচনে এই বাহিনী এত ক্ষমতাবান বোধ করে যে, তারা নিজস্ব ১৪ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে দাবি জানিয়েছিল। বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ তা মানেননি। ফলে মনকষাকষি চলছিল। এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদিত্যনাথের নামের ঘোষণা আসে।
ভেতরের এসব বিতর্ক যতই থাকুক বিজেপির এই নির্বাচনের মূল্যায়ন হল, হিন্দুত্বের জাতিবাদ আর মুসলমানবিরোধী গলাবাজি তবে – এটা সঠিক অনুপাতে ব্যবহার করার কৌশল নিতে পারলে ২০১৯ সালের নির্বাচনেও আবার তাদের জিতিয়ে আনতে পারে – এই বিশ্বাস তাদের দৃঢ় হয়েছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই অর্থে এবারের নির্বাচন আর বিজেপির বিপুল বিজয় হলো প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে শেষবার দপ করে জ্বলে ওঠা। দেখা যাক আগামিতে ২০১৯ এর নির্বাচন পর্যন্ত হিন্দুত্বকে পুরাপুরি আকড়ে ধরলে সেই রাজনীতি কতটা ভারতের আর কতটা বিজেপিকে সফলতা দেয়।

[এই নির্বাচন প্রসঙ্গ কভার করে আরও বিস্তারিত একটা লেখা আজ এখনই ছাপা হইয়েছে এখানে দেখুন।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনের ১৯ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

 ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

গৌতম দাস

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1Rl

বাংলাদেশে খবরটা সবাই পড়েছেন বেশ উতসুক হয়ে আগ্রহের সাথে। কারণ বিষয়টা  জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশকে ভাটির দেশ হিসাবে পাওনা পানি থেকে বঞ্চিত করার ভারতের জুলুম ও অত্যাচারের কাহিনীর অংশ। জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করা বাংলাদেশে বিষয়টা উস্কে তোলার মত খবরটা হল, ভারতের বিহার রাজ্যের চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার, তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করে ফরাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিতে দাবী করেছেন। এই ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা নদীর পানির উপর ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশের যা ন্যায্য হিস্যা সেই পানি জবরদস্তি করে ভারত আটকে নিয়ে রেখেছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দিয়ে রেখেছে শুধু তাই না, সেই পানি খাল কেটে পশ্চিমবঙ্গের অন্য নদীতে নিয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশের সকলের চোখে, এটা বাংলাদেশের চরম স্বার্থহানিকর ঘটনা। ফলে  ভারতের দুষমনির প্রতীক হল ফারাক্কা বাঁধ। এবার সেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেবার কথা তুলেছেন ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ২২ আগষ্ট ২০১৬ প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ২৪ আগষ্টের রিপোর্ট বলছে – নিতীশ কুমারের অভিযোগ, “বিহারে গঙ্গা অববাহিকায় বন্যার জন্য ফরাক্কা বাঁধ দায়ী। বক্সার থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার নাব্যতা অনেকটাই কমেছে। ফলে জল জমে তা দু’পার ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকা বাড়ছে। তাই ফরাক্কা বাঁধের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ফরাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন নীতীশ”। এই খবর বাংলাদেশের কাছে যেন আল্লার দুনিয়ার ন্যায়-ইনসাফের ঘন্টা আপন উদ্যোগে বেজে উঠার ইঙ্গিত ইশারা এটা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এই দাবি করেছেন বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে নয়, বিহারের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। কারণ বিহার এখন গঙ্গা নদী প্রবাহের উপচানো পানিতে বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। উতপত্তিগত দিক থেকে গঙ্গা নদী ভারতের যেসব প্রদেশ আগে ডিঙ্গিয়ে এরপর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ক্রমানুসারে ভারতের সেসব প্রদেশ বা রাজ্যগুলো হল – সবার আগে উত্তরপ্রদেশ এরপর বিহার, এরপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে শেষে বাংলাদেশের চাপাই-নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা। তো নীতিশ কুমারের দাবি কী আমাদের জন্য ইনসাফের ইশারা? এটা বুঝবার জন্য আমাদের সবার কান খাড়া হয়েছিল, সন্দেহ নাই।

ঐ সাক্ষাত ছিল এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া এক প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক এপয়েন্টমেন্ট করে দেয়া সাক্ষাত। অতএব এতে অনুমান করা ভুল হবে না যে তা অনেক আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তবে এটা নেহায়েতই এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত ছিল না। এর আরও বহু গভীর মাত্রা আছে। প্রথমত নীতিশ বিহারের এক আঞ্চলিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড)এর সভাপতি ও মুখ্যমন্ত্রী। না এতটুকুই নয়। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির মোদী নিরঙ্কুশভাবে জিতে আসার পর ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে যে মোদী ঝড় উঠেছিল সে ঝড় ঐ নির্বাচনের পরেও অন্যান্য রাজ্য নির্বাচনেও থামছিলই না। শেষে গত নভেম্বর ২০১৫ বিহারের প্রাদেশিক (বিধানসভা) নির্বাচনে প্রথম সবচেয়ে শক্তভাবে থেমে উলটা দিকে তা ঘুরেছিল। বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরেছিল। আর নীতিশ কুমারের নেতৃত্বের বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছিল। ঐ জোটে বিহারের আর এক বড় আঞ্চলিক দল, লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ছিল সোনিয়া গান্ধীর খোদ কংগ্রেস পার্টিও। এককথায় বললে বিজেপি বিরোধী শক্ত জোট ছিল সেটা। ফলে সেই শক্ত জোটের সবার প্রতিনিধি ও নেতা ছিলেন নীতিশ কুমার । নীতিশের পরিচয়-বৈশিষ্ঠের আরও কিছু বাকী আছে। আগামি বছর ২০১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঐ নির্বাচনেও যদি বিজেপির হার হয় তবে তা ভারতের রাজনীতিতে আর এক নতুন দিকে মোড় ঘুরানো ঘটনা হবে সেটা। ঐ হারকে পুজি করে ভারতের পরবর্তি লোকসভা (২০১৯) নির্বাচনে বিজেপির মোদীকে হারানোর লক্ষ্যে বিজেপি-বিরোধী জোট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। কারণ আগামি নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী দল কংগ্রেস হবে না। আঞ্চলিক দলগুলোর গঠিত জোট হবে মোদীর বিজেপির প্রধান বিরোধী, প্রধান চ্যালেঞ্জ।  এই লক্ষ্যে সম্ভাব্য ঐ জোট গড়ে তোলার খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। সম্ভাব্য ঐ আঞ্চলিক দলের জোট গঠনের মূল নেতা ও উদ্যোক্তা হবেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।  এই জোটের মূল লক্ষ্য হবে বিজেপি ও মোদীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল। গত কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেস ক্রমশ শুকিয়ে ছোট হতে হতে অনেক আগেই কোন এক আঞ্চলিক দলের সমান প্রভাবের দল হয়ে গেছে। ফলে নীতিশ-মমতাসহ নানান আঞ্চলিক দলের মিলিত জোট বনাম বিজেপির মোদী – এই হবে ঐ নির্বাচনে মূল ক্ষমতার লড়াই।

ভারত রাষ্ট্রের জন্মগত সুত্রে দুর্বলতা বা ত্রুটি হল ওখানে কেন্দ্র কে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথায় কিভাবে তৈরি হয় তা রাজ্যে বসে টের পাওয়া যায় না। ফলে ভুতুড়ে কেন্দ্র বনাম রাজ্য এর বিবাদ জন্ম থেকেই। ফলে বিজেপি বনাম আঞ্চলিক দলের জোট এর লড়াই  এর তাতপর্য  এবার পুরানা ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ ক্ষমতার লড়াইকে আবার মুখ্য হয়ে তুলতে যাচ্ছে। অতএব মোদী সেই বিশেষ নীতিশ কুমারকে সাক্ষাতের এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন।

ফসলের মাঠ ও শহরও ডুবে যাওয়া বিহারের এবারের বন্যার প্রভাব হয়েছিল মারাত্মক। টানাটানিতে চলা রাজ্য আর তুলনামূলক উদ্বৃত্তে চলা রাজ্য এই ভিত্তিতে যদি ভারতের রাজ্যগুলোকে ভাগ করি তবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার টানাটানিতে চলা রাজ্যের অন্তর্গত। ফলে বন্যায় ব্যাপক ত্রাণের আয়োজন করার সীমাবদ্ধতা এখানে আছে। আর এই সীমাবদ্ধতা সমস্যাটা ব্যক্তি নীতিশ কুমার অথবা তার দল-জোটের কারণে নয়।  ওদিকে এই বন্যায় মানুষের যা ক্ষয়ক্ষতি এককথায় বিহার রাজ্য সরকারের পক্ষে তা পুরণ অসম্ভব। ফলে যেটা সম্ভব তা হল তাতক্ষণিক কিছু ত্রাণ বিতরণ। সারকথায় বিহারের জনগণের ক্ষোভ মোকাবিলা আসলেই কঠিন। ফলে৪ জনগণের ক্ষোভকে কেন্দ্রের উপর ঠেলে দেয়ার তাগিদ নীতিশের আছে। ওদিকে এই বন্যা কেন হল, এর সাথে কী ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার কোন সম্পর্ক নাই? অবশ্যই আছে। গঙ্গার মত প্রবল বিপুল পলিমাটিবাহী নদীর ক্ষেত্রে এর উপর বাঁধ দিলে সে প্রভাব আরও জটিল ও মারাত্মক হওয়ার কথা, হয়েছেও। অতএব সবমিলিয়ে এর দায় কার কেন্দ্রে না রাজ্যের এই বলে দায় ঠেলাঠেলির এক বিরাট ক্ষেত্র হল বন্যা ও বাঁধ ইস্যু। বিশেষত যখন বাঁধ দেয়া ও মেন্টেনেন্স ব্যবস্থাপনার প্রশাসন চলে সরাসরি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত – তাই এই দায় কেন্দ্রের; ওদিকে বন্যা হলে তা মোকাবিলা ও ত্রাণ বিতরণ রাজ্যের দায়। এসব কথা সাক্ষাতের আগেই আগাম ভেবে নিয়েছিলেন নীতিশ ও মোদী দুজনেই। কারণ, ঐ সাক্ষাত থেকে দায় ঠেলাঠেলি শুরুর এক বিরাট সম্ভাবনা আছে তা দুজনেই জানতেন। নীতিশ মোদীর কাছে এসে নিজ বিহার জনগণকে বুঝাতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন মুল সমস্যা ফারাক্কা বাঁধ। অর্থাৎ দায় কেন্দ্রের। মোদীর কাছে বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার কথা তুলে, দাবি জানিয়ে তিনি সে অর্থ করতে চেয়েছিলেন যে দায় কেন্দ্রের। আর মোদী সেকথা টের পেয়ে সাথে সাথে বাঁধ কর্তৃপক্ষকে  বাঁধের সব গেট খুলে দেবার নির্দেশ জারি করেন। এভাবে তিনিও বুঝাতে চাইলেন রাজ্য যা চেয়েছে তিনি ততক্ষণাত তাই দিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং কেন্দ্রের দায় নাই।  বন্যায় কারণে  বিহারের জনগণের যদি কোন কষ্ট-ক্ষোভ থেকে থাকে তবে এর দায় ত্রাণের পরিমাণ কম  অথবা বিতরণে রাজ্য সরকারের সমস্যাজাত। ফলে ২৩ আগষ্ট নীতিশ-মোদীর সাক্ষাত ছিল আসলে আগামি ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কার ইমেজ ক্রেডিট ভাল তা এখন থেকেই ঠিকঠাক রাখার প্রতিযোগিতা। ফলে ঐদিনের প্রথমার্ধে ঘটনাবলী ছিল নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী জানান আর মোদীর ততক্ষণাৎ সবগুলো গেট খুলে দিবার নির্দেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল।

কিন্তু কেবল নীতিশ আর মোদী নন গঙ্গার ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতেই আরও পক্ষ আছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান হল ফারাক্কা বাঁধ থাকা তার স্বার্থের পক্ষে। কারণ গঙ্গার পানি শেষে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌছানোর বদলে সেই পানি বাংলাদেশে ঢুকবার আগেই তা কেটে গতিপথ বদলে আলাদা খাল খুড়ে টেনে ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ফেলা হয়েছে। এভাবে হুগলী নদী ধরে শেষে ঐ বাড়তি পানি কলকাতা বন্দরে নিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলা হয়েছে। মমতার মুল উদ্বেগ হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটির চরের কারণে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা সঙ্কটে পড়েছে, এথেকে বন্দরকে রক্ষা করা, বন্দরকে সচল রাখা। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে মনে করা হয়েছিল যে খাল কেটে আনা অতিরিক্ত বা বাড়তি পানির চাপের তোড়ে হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটি অপসারণ হয়ে যাবে যাতে এভাবে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পানি টেনে আনার পরও তা দিয়ে পলিমাটি পর্যাপ্ত বা কাম্য মাফিক কিছুই সরানো যায় নাই। ফলে  বন্দরের এই নাব্যতা সংকট খুব মিটে নাই তো বটেই উলটা নাব্যতা রক্ষা যতটুকু হচ্ছে তা বজায় রাখতে গিয়ে প্রত্যেক বর্ষা মৌসুমে ঐ সংযোগ খাল (৪০ কিমি লম্বা) ও নদীর দুই পাড় উপচে পড়া পানিতে এলাকায় বন্যা হচ্ছে। ফলে বিহার ছাড়াও নাব্যতা রক্ষার কাফফারা হিসাবে পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিবছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবির কয়েক ঘন্টা পরে ঐদিনই ভারতের এনডিটিভি মমতাকে প্রতিক্রিয়া জিজ্ঞাসা করেছিল। জানতে চাওয়া হয়েছিল যে নীতিশের ঐ দাবীর পর মমতার প্রতিক্রিয়া কী? ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, মমতা এর কোন জবাব না দিয়ে এড়িয়ে চলে যান।   এতে এনডিটিভির রিপোর্টার মন্তব্য করে এটা মমতার কৌশলগত নিশ্চুপ থাকা। পরে কলকাতার নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র ক্যামেরার সামনে (ঐ একই ক্লিপে দেখুন শেষ ভাগে) দাবি করেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিলে নাকি এখন ২০০ কিমি নদী শুকিয়ে যাবে। তাই তাঁর মতে নীতিশের দাবী আজিব রিডিকুলাস, তিনি বলেন। পরে ঐ রিপোর্টের অন্য অংশ থেকে জানা যায় মমতা বলছেন, বিহারে বন্যার কারণ মনুষ্য-সৃষ্ট। কারণ সঠিক সময়ে বাঁধের পানি ছাড়া হয় নাই। ফলে পুরা ব্যাপারটায় কেন্দ্রের দায়।

মমতার এই বক্তব্যের পরে ঐদিনই (২৩ আগষ্ট পরের দ্বিতীয়ার্ধে) বিজেপি শিবিরে টনক নড়ে। তারা আবার ভেবে মুল্যায়ন করে দেখে যে ভোটের রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে রাজনীতিকদের কথা সাজানো ও পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের লড়াইয়ে তারা পিছিয়ে পড়ে গেছে। কারণ নীতিশ আর মমতার ভাষ্যে ভিন্নতা আছে। অথচ এর সুবিধা বিজেপির পক্ষে কাজে লাগানো হয় নাই। তাই আবার নতুন করে দোষারোপ সাজানোর উদ্যোগ নেয় তারা। বিহারের রাজনীতিতে নীতিশ কুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব হলেন বিজেপি নেতা হলেন সুশীল কমার মোদী। তিনি একদিন পরে অর্থাৎ ২৫ আগষ্ট মিডিয়ায় এক বিবৃতি পাঠিয়ে তাই এবার তিনি দাবি করলেন, নীতিশের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবীর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিতে থাকলেন, “বরং যেহেতু নীতিশের বিহার সরকার বন্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয় নাই, ত্রাণ ঠিক মত বিতরণ করতে পারে নাই – সেই খামতি আড়াল করতে সে এখন বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী তুলেছে”। অর্থাৎ  তিনি মমতার পক্ষে ছদ্মভাবে দাঁড়িয়ে মমতা-নীতিশের বক্তব্য বা অবস্থানের বিরোধ বড় করে দিতে চাইলেন। এছাড়াও বন্যার কারণ ফারাক্কা বাঁধ নয় – বলে বাঁধকে দায়ী হওয়ার হাত থেকে বাচিয়ে দিতে চাইলেন তিনি। আর এর চেয়েও বড় কথা তিনি ইচ্ছা করে এক বিভ্রান্ত তৈরি করলেন। বন্যা হওয়া না হওয়ার জন্য বাঁধ দায়ী কীনা এটা এক জিনিষ। কিন্তু তিনি দাবী করলেন ফারাক্কা বাঁধ নয়, রাজ্য সরকারের ত্রাণ ঠিকমত বিতরণ ব্যবস্থাপনা না করতে পারাটাই যেন বন্যার কারণ। যেন ত্রাণ পরিমানে প্রচুর আর  ঠিকমত বিতরণ করতে পারলে তাহলে আর বিহারে বন্যা হত না।  এই হল ভারতের আগামি কেন্দ্র-রাজ্য লড়াই প্রকট হয়ে উঠার আগেই পরস্পরের দোষারোপ করে দায় ঠেলাঠেলির – ভোটের রাজনীতি।

ঘটনার এখানেই শেষ না। কারণ গঙ্গা ও ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার সাথে যুক্ত পক্ষ শুধু ভারতে না, ভারতের বাইরেও বাংলাদেশ আছে। তাই এবার বাংলাদেশ অংশ। এখানে দুই মন্ত্রীর পরস্পর বিরোধী দুই বক্তব্য নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে সরকার ঘনিষ্ট বিডিনিউজ২৪ গত ২৮ আগষ্ট।  তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, যেটা এবারের ফারাক্কা বাধের গেট খুলে দিবার কারণে বন্যায় অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা। রোববার ভেড়ামারা উপজেলার চর গোলাপনগরে পদ্মা নদীর পাড়ে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে  ত্রাণ বিতরণের সময় ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাব নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানাচ্ছেন। তিনি লিখছেন তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, “অভিন্ন নদীর উপর একতরফা গেইট খুলে দেওয়াটা সঠিক কাজ নয়। এ বিষয়ে আমাদের যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করব।” একই সময়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যববস্থাপনামন্ত্রী মায়া চাঁদপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ নেতা মায়াকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজ২৪ লিখেছে,“এক সময় আমরা বলেছি ফারাক্কার বাঁধ আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ। কিন্তু এখন তা ভারতের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ফারাক্কার পুরো বাঁধ ছেড়ে দিলে কিংবা ভেঙে দিলে আমাদের দেশে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার নিচে আছে। ফারাক্কার পানি আমাদের কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে আমরা মনে করি”। অর্থাৎ সংকীর্ণ চোখে যার যার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে বুঝ দিবার বক্তৃতা এগুলো। ঠিক সামগ্রিক দেশ ও জনগণের স্বার্থের দিক থেকে দেয়া অবস্থান নয়।

নিতীশ-মমতার অবস্থানের বিরোধকে বড় করে দেখানোর সুযো নিবার জন্য এবার এগিয়ে আসেন ভারতের রঞ্জন বসু। তার সে তৎপরতা আমরা পাই গত ০২ সেপ্টেম্বর কলকাতার সাংবাদিক রঞ্জন বসুর লেখা বাংলা ট্রিবিউনে “ফারাক্কার গেট খোলা নিয়ে অপপ্রচারে ‘বিরক্ত’ বাংলাদেশ” শিরোনামে। ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে, নতুন করে ফারাক্কা বাধের গেট খোলার কোন ঘটনাই আসলে ঘটে নাই। কারণ বর্যার সময় সবগেট খোলাই থাকে। ফলে নতুন করে গেট না খুললেও মিডিয়ার তা প্রচার হয়েছে। হয়ত রঞ্জন বসুর এই দাবী সত্য। কিন্তু ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে আমাদের দিল্লী দুতাবাস নাকি দাবি করেছে রাজশাহী বা অন্য কোথায় কোন বন্যা হয় নাই। রঞ্জন বসু লিখেছেন, “……পদ্মায় বাড়তি পানির স্রোতে রাজশাহী বা অন্য কোথাও কি বন্যা হয়েছে বলে খবর এসেছে?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ দেখা যাছে, রঞ্জন বসুর লেখার এই অংশ আবার আর এক চরমপ্রান্ত বা সবকিছু অস্বীকারের চেষ্টা। উপরের দুই মন্ত্রীর বক্তব্যসহ বিডিনিউজের রিপোর্ট এর প্রমাণ। জানিয়ে রাখা ভাল গত ২৮ আগষ্ট খোদ ঐ  বিডিনিউজ২৪ এর ১.৪৬ মিনিটের এক ভিডিও ক্লিপ রিপোর্টের শিরোনাম হল “রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল”। ফলে রঞ্জন বসু এবং দিল্লীর বাংলাদেশ দুতাবাসের নামে তার দাবি একশ ভাগ মিথ্যা। এটা বড় জোড় মমতা-নীতিশের বিরুদ্ধে মোদীর পক্ষে রঞ্জন বসুর এক মিথ্যা প্রচারণা মাত্র।

সারকথায় বললে,এই লেখায় ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত সব পক্ষের বক্তব্যগুলোকে একসাথে পাখির একটা চোখ দিয়ে দেখলে যেমন হয় তেমনই এক সঙ্কলন। এককথায় বললে, বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এসব কথোপকথন গুলো একটাও নয়। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফারাক্কা ইস্যু হয়েছিল মাত্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে  মাসিক অন্যদিগন্তের চলতি প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার সংযোজন ও এডিট করে ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

 

লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

গৌতম দাস

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়ার গবেষণা ফেলো হলেন লিসা কার্টিস (Lisa Curtis)। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার আমেরিকান সংবাদদাতা লিসা কার্টিসকে কিছু লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন, যার লিখিত জবাব তিনি দিয়েছেন আর মানবজমিন পত্রিকায় তা গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ ছাপা হয়েছে।

থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও আমেরিকান বিদেশনীতি
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আমেরিকার থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। থিঙ্কট্যাংক মানে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে আগাম চিন্তাভাবনা ও নিজস্ব গবেষণা করে এতে পাওয়া ফলাফল জনসমক্ষে হাজির করা হয়, তা পরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি হবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভুমিকা রাখে। তবে থিঙ্কট্যাংক বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে চলে, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান সে নয়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিশেষত্ত্ব হল, ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগানের প্রভাবে এই প্রো-ইহুদি থিঙ্কট্যাংক জন্ম নেয়। ঘোষিত লক্ষ্য হল, ঘোষণা দিয়ে বলে কয়েই রক্ষণশীলভাবে চিন্তা করা। রক্ষণশীলভাবে ভেবে দেখা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতি কি হতে পারে, হওয়া উচিত। আর হেরিটেজ মনে করে আমেরিকান রাষ্ট্র যেন অবশ্যই বেসরকারি উদ্যোগ ও খাতের মাধ্যমে প্রায় সব কিছু করতে ও পরিচালিত হতে দেয়, রাষ্ট্র দায় কম নেয় এবং সব বিষয়ে রাষ্ট্র যেন সীমিত সংশ্লিষ্টতার ভুমিকায় থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায়, প্রচলিত আমেরিকান মুল্যবোধ আর শক্ত আমেরিকান জাতীয় প্রতিরক্ষাবোধের কথা খেয়াল রাখে।

কিন্তু ছাপা হওয়া লিসা কার্টিজের এই প্রশ্নোত্তরকে আমাদের এত গুরুত্ব দেবার কি আছে? আমেরিকান সরকারগুলোর নীতিতে কোন থিঙ্কট্যাংকের ভুমিকা ও গুরুত্ব কি তা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সমাজের কোন গ্রুপের কোন নীতি বা অবস্থান সরকারের নীতি হয়ে উঠার আগের ধাপটা হল থিঙ্কট্যাংকের উদ্যোগে করা চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ। তবে আবার এটা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঠিক কোন বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একেবারেই তা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আর থিঙ্কট্যাংকের কাজের ধরণ হল, সিরিয়াস গবেষণা শেষে ফলাফল স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাডেমিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল নেতা, দেশের ও প্রয়োজনে বিদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সকলের সাথে তা শেয়ার করা, আর গোলটেবিল, সেমিনার আলোচনা সভার মাধ্যমে সে নীতি অবস্থানকে যতদুর সম্ভব একটা প্রতিনিধিত্বমুলক করে আকার দিয়ে তোলা। আর সবশেষে সরকারি অফিসের লোকজন চাইকি গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় হলে সর্বোচ্চপদ মন্ত্রণালয়ের সচিব (আমেরিকান হিসাবে আন্ডার সেক্রেটারিকে) সেসব সভায় দাওয়াতে হাজির করে থিঙ্কট্যাংকের অবস্থান চুড়ান্ত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এরপরেও থিঙ্কট্যাংকের নীতি-অবস্থান কোন আমেরিকান সরকার তার নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য না হলেও সাধারণত দেখা যায় থিঙ্কট্যাংকের ঐ অবস্থান আংশিক অথবা পুরাটাই সরকারের নীতি হয়। আর অনেক সময় কোন সরকারের কেউ নিজেই “অনানুষ্ঠানিকভাবে” বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কোন থিঙ্কট্যাংককে কোন একটা বিষয়ে এমন উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

হাসিনা সরকার টিকে যাবার জন্য কি ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন দায়ী
লিসা কার্টিজ এই প্রশ্নোত্তরে ৫ জানুয়ারির পরও হাসিনার টিকে যাওয়ার জন্য ভারত, চীন ও রাশিয়ার স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। লিসা কোন আমেরিকান সরকারী পদবীধারী কেউ নন। ফলে তার মুখ দিয়ে এমন সরাসরি অভিযোগ করা মন্তব্য নিয়ে ভারত, চীন বা রাশিয়া সরকারের কারও হেরিটেজের লিসা কার্টিজের অথবা আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের (আমাদের হিসাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কাছে ব্যাখ্যা চাইবার কিছু নাই। আবার লিসার বক্তব্য “আনুষ্ঠানিক” সরকারি না হয়েও আবার আসলে পরোক্ষে সরকারিই। লিসার বক্তব্যকে আমরা আমেরিকান সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রটোকল, কূটনীতির ভাষা, ফরমালিটির নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা মন খুলে কথা বলতে পারলে কি বলতেন তেমন বক্তব্যের এক মহড়া মনে করতে পারি; এবং তা নীতি নির্ধারকদের সবার চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও অন্তত প্রভাবশালী একটা ধারার বক্তব্য হিসাবে দেখতে পারি। ফলে লিসা কার্টিজের বক্তব্যকে আমরা সেখান থেকে দেখে পাঠ করে এটাকে উসিলা করে তা নিয়ে আলোচনার সুত্রে মুল্যায়নে কিছু বলার সুযোগ হিসাবে নিব।
প্রথমত প্রকৃত তথ্য হিসাবে এক ভারত ছাড়া চীন অথবা রাশিয়া কি আসলেই হাসিনার সরকার টিকে যাবার কারণ, তাদের সমর্থনের উপর কি হাসিনা টিকে গেছে? তা মনে করার কোন কারণ আমরা দেখি না। এমন কোন ফ্যাক্টসের খবর কারও কাছে আছে অথবা বাস্তবে এটা তাই -এর কোন সত্যতা নাই। আমার আগের লেখায় বলেছি, ফ্যাক্টস হল ভারত আমেরিকা চীন রাশিয়া সবাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট (যে যেমনটা দেখতে চায় তেমন) একটা আকার নিয়ে থিতু হয়ে বসুক তা নিজের স্ব স্ব স্বার্থে চায়। আবার এর সমস্যা ও এর জটিলতাগুলোও বুঝে ও মানে। ফলে এথেকে বেরোনোর পথ হিসাবে ভারতের নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ সেটা বর্তমান ভারসাম্যের প্রায় স্থবির অবস্থাটা ভেঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরির নিয়ামক হতে পারে। আমার ঐ লেখাতেও আমি চীনের অবস্থান কোনভাবেই হাসিনার সরকারে টিকে থাকুক এমন তথ্য বা ব্যাখ্যা দেখাই নাই। কারণ ব্যাপারটা অলীক। বরং চীনের এ পর্যন্ত দেয়া রাষ্ট্রদুতের বিবৃতিগুলো, তাদের ফরেন অফিসের মন্তব্য এমন কোন সাক্ষ্য বহণ করে না। আর চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ আসার অপেক্ষায় আছে কথা সত্য তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা আবার গেড়ে বসার পরেও সে এটাকে সঠিক ও উপযুক্ত সময় মনে করতে পারে নাই; অপেক্ষা করছে এক স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকার দেখার জন্য। এর সর্বশেষ প্রমাণ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য। (বিনিয়োগ বোর্ডের অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে) তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন চীনের দিক থেকে এব্যাপারে কোন নড়াচড়া নাই। ফলে লিসা কার্টিজের অভিযোগ আমরা দেখছি ভিত্তিহীন, কোন সারবত্তা নাই।
তবে লিসা আর এক অভিযোগ তুলেছেন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি প্রসঙ্গে। ঐ প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেয়ে এই দেশটিতে কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করা যাবে সেদিকেই মস্কো ও পেইচিংয়ের মনোযোগ বেশি”। লিসা কার্টিজের এই অভিযোগকে পেটি ঈর্ষাজাত ক্ষোভ হিসাবে আমরা বড়জোর দেখতে পারি। প্রথম কথা চীনা সাবমেরিন বা অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টা ৫ জানুয়ারির বহু আগের ঘটনা; অন্ততপক্ষে ২০১১ সালের ডিল, একালেরই নয়। আর যদিও একথা সত্য যে পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্ত্র সরবরাহের তালিকায় বিলের অঙ্কে এবং পরিমাণে চীনা অস্ত্র আমেরিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। কিন্তু এর কারণ চীনের আমাদের উপর বিশেষ আগ্রহ একথাটা ভিত্তিহীন। অথবা চীন আমাদেরকে মুখ্যত তার অস্ত্রের বাজার হিসাবে দেখে এটা কোন গবেষকের মুখ থেকে শোনা হাস্যকর বললে কম বলা হয়। এই বিদ্যা অথবা মুল্যায়ন এসেসমেন্ট দিয়ে কারও পক্ষে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোন গবেষণাকর্ম করা অসম্ভব। এতে ঘোড়ায়ও হাসবে। একথা বলে লিসা কার্টিজ নিজেকেই তুচ্ছ করেছেন। এর বেশি এনিয়ে আর কি বলব! পরিসংখ্যানের যে কথা বলছিলাম, খুব সম্ভবত অস্ত্রের মুল্য এবং অস্ত্রের উপর আস্থা মানে আমাদের বাজেট ও বাজেট অনুপাতে পাওয়া মান এগুলোই এখানে মুল ফ্যাক্টর। ফলে চীনা অস্ত্র কিনতে আমাদের মানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের চেয়ে বাহিনীর আগ্রহই বেশি ও মুখ্য। আর েব্যাপারে যারা খোঁজ রাখে তাঁরা কে না জানে আমেরিকার যেকোন অস্ত্র বা সরঞ্জামের মুল্য সর্বাধিক, তাতে কোয়ালিটি ও হাইটেক সুবিধা যত উচ্চমানেরই হোক। ফলে আমাদের বাহিনীর সিদ্ধান্ত – এটা প্রাকটিক্যাল, স্বাভাবিক এবং সর্বপরি আমাদের বাজেট বাস্তবতা যে তাঁরা সঠিকভাবেই মুল্যায়ন করতে জানেন এর প্রমাণ। ওদিকে, ভারতের উপর পুরা নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি হাসিনার সরকারের নীতিতে দোষের শেষ নাই, একথা সত্য। কিন্তু এবিষয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজন, বাহিনীর নিজস্ব যুক্তি অবস্থান ও আগ্রহের প্রসঙ্গে গত পাঁচ বছরে হাসিনা যথোপযুক্ত উতসাহ ও সাড়া দেন নাই, প্রাধান্য দেন নাই এমন কথা বলা ও ভাবা ভুল হবে। একথা লুকানো নয় যে হাসিনা সর্বক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল, বহু আন্ডারহ্যান্ড ডিল আন্ডারষ্টান্ডিং ভারতের সাথে তাঁর আছে, বাইরে থেকে দেখে আমরা অনুমান করতে পারি। আবার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থজাত সিদ্ধান্তকে হাসিনা রাজনৈতিক অনুসমর্থন জানায় নি এমন উদাহরণ একেবারে নাই যে তা নয় (যেমন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ ইস্যু)। তাসত্ত্বেও মোটের উপর হাসিনার রেকর্ড ভাল। যেমন ভারতের আপত্তি আর বিরূপ প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ চীনা সাবমেরিন কেনার সামরিক বাহিনীর প্রস্তাবে উদ্যোগে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হন নাই। আমেরিকা এবং ভারতের অখুশি, আপত্তি, চোখ বড় বড় করে তাকানো সত্ত্বেও গত ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে ভাল ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পর্কও বজায় রেখেছেন, সফর বিনিময় অব্যাহত আছে এবং তা গুরুত্বের সাথেই, এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহে সাড়া দিয়ে রেখেছেন। এককথায় বললে চীনের সাথে সম্পর্ককে হাসিনা ভারতের সাথে সম্পর্কের একই ঝুড়িতে রেখে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন নাই, আলাদা আলাদা বক্সে রেখেছেন যাতে কোন ঠোকাঠুকি না লাগে এমন করে বুদ্ধিবিবেচনার সুযোগ করে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এথেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা বা বোকামিরও সুযোগ নাই যে হাসিনার সরকার ভারতের সাথে সাথে চীনেরও সমর্থনের উপর টিকে থাকা এক সরকার।
এমন সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ না থাকার মুল কারণ (গত মাসের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলি) চীনের বিদেশনীতি এখন পর্যন্ত আমাদের মত দেশে কেমন সরকার বা কে সরকারে থাকবে এধরণের কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগিদারী কর্তৃত্ত্ব না হলে চীনের বিদেশনীতি আগাবে না অথবা আমেরিকার মত চাপ দিয়ে আদায় করার নীতিতে চলে এমন করে তা সাজানো নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আদায় করে চলে এমন নয়। আবার লিসা কার্টিস যেমন এক জবরদস্তিতে আরোপিত ধারনা দেবার চেষ্টা করেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেনবা বাংলাদেশ চীনের কাছে অস্ত্রের লোভনীয় বাজার ফলে খাতক মাত্র। আর চীনও যেনবা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার উপর দাড়িয়েই রাইজিং চীনের অর্থনীতি হয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডাহা ভিত্তিহীন কথা এবং প্রপাগান্ডা। কেউ গবেষক হতে চাইলে তাঁর প্রথম পাঠ হল, অন্তত প্রপাগান্ডা আর তথ্যের ফারাক করে চলতে শেখা। এম্পায়ার আমেরিকার খাসলত দেখতে দেখতে লিসা কার্টিসের হয়ত একপেশে ধারণা হয়ে গেছে যেন আমেরিকা বা পশ্চিমের খাসিলতই চীনের খাসলত হতেই হবে। আগামিতে চীনের খাসলত কি দাঁড়াবে সেটা আগামিই বলতে পারে। কিন্তু এখনই পশ্চিমের খাসলত দিয়ে আগাম চীনের ঘাড়ে তা খামোখা চড়িয়ে আরোপ করে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করার কোন অর্থ হয় না; তবে হয়ত পেটি ঈর্ষাজাত মনের সুখ পাওয়া যেতে পারে। তাহলে হাসিনা তাঁর সমস্ত বেকুবি নীতির দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সামরিক বাহিনীর চীনা অস্ত্র কেনার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে সক্ষম হয়েছে। এটাই বাস্তব। এটা কতটা সামরিক বাহিনীর সাথে দুরত্ব তৈরি করার রিস্ক বা চটানো তিনি সহ্য করতে পারবেন বা পারবেন না সে কথা ক্যালকুলেশন করে রেখে করেছেন অথবা করেন নাই এনিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু বটম অব দা ফ্যাক্ট হল বাস্তবে তিনি এগুলো করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, এর কারণ যাই হোক। আবার লিসা কার্টিজের “চীনের অস্ত্রবিক্রির ধান্দা” এমন কথার প্রেক্ষিতে যদি বলি, আমাদের সামরিক অফিসারদের উপর প্রভাবের দিক থেকে যদি দেখি তবে তাদের ট্রেনিং সেমিনার ভিজিট ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদিতে আমেরিকার প্রভাবের সমতুল্য এর ধারে কাছে আর কোন রাষ্ট্র নাই। এমনকি ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকার হাত মুচড়ানিতে পড়ে আমাদের সেনাবাহিনী এই তো সেদিন ১/১১ এর ক্ষমতা দখল করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে! কিন্তু এজন্য আমি কেন কেউই বলবে না যে সেনা অফিসারদের উপর আমেরিকার প্রবল প্রভাব আছে অতএব আমেরিকার সমর্থনে হাসিনা টিকে আছে এগুলো তার প্রমাণ! অথবা লিসা যেভাবে বলেছেন যে বাংলাদেশে চীন “কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি” করতে পারে সেই তালে আছে – তেমন করে কেউ বলবে না যে, আমেরিকা কেবল আমাদের অফিসারদেরকেই হাত করার তালে আছে। কারণ এতে বক্তার নিজের কান্ডজ্ঞানশুণ্য আর গাভর্তি রাগ ক্ষোভকে প্রমাণ করবে।

এবার হাসিনার টিকে থাকার ব্যাপারে রাশিয়ার ভুমিকা প্রসঙ্গে আসি। হ্যা, একথা সত্যি যে রাশিয়ার মধ্যে প্রবল অস্থিরতা আছে। যেখানেই কোন সরকারের সাথে আমেরিকার নুন্যতম বিরোধ সংঘাত আছে, রাশিয়া দেখে, সেখানেই ঐ সরকারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে -এমন সরল করে পরিস্থিতি মুল্যায়নের ও অস্থির মতির সিদ্ধান্ত নেবার একটা ঝোঁক রাশিয়ার আছে। এটা শত্রুর শত্রু মানেই আমার বন্ধু –এমন এক সরল তত্ত্ব। অথচ বন্ধুত্বের সম্ভাবনার এই যুক্তির ভিত্তি যথেষ্ট দুর্বল এবং আমাদের অভিজ্ঞতাও এর পক্ষে সায় দেয় না। মুল কারণ প্রতিটা বন্ধুত্ত্বের সম্পর্কের নিজস্ব পজিটিভ ভিত্তি লাগে। আর তাছাড়া একটা শেষ কথা আছে। রাশিয়ার এই ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এটাই তার নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা শেষ কথা নয়, শেষ বিচার্য ব্যাপারটা এমনও নয়। আরও বিবেচনাও আছে। আমেরিকা বা পশ্চিম বিরোধী ও পশ্চিমা বলয়ের বাইরে কোন স্বার্থজোট গড়ার আগ্রহ রাশিয়ার প্রবলভাবেই আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু একা সেকাজ করার মত সক্ষমতা রাশিয়ার নাই, বাস্তবতা নাই এটাও রাশিয়া ভালভাবেই জানে। কারণ রাশিয়ার যতই রাগ ক্ষোভ থাক এটা রাশিয়া-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়, দুনিয়াও নয়, সেদিন গত হয়েছে বহু আগেই এটা সে ভালই হুশ রাখে। বরং রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর জোট (BRICS Bank এর মত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে) এর পক্ষে তেমনি একটা সম্ভাবনা, তাই সে মানে। উতসাহী রাশিয়ার এমন মান্যি করাটা টের পাওয়া যায় যদি আমরা মনে রাখি প্রথম ব্রিকস সম্মেলন ডাকার আয়োজক হয়েছিল রাশিয়াই, ২০০৯ সালে। ওদিকে এব্যাপারে চীন ততোই ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার। কোন হুড়োহুড়ি অস্থিরতা, এখনই সব জবরদস্তিতে করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে এমন অবিবেচক সে নয়, তা দেখায়নি। চলতি গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারটা ভেঙ্গে এরই প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করানো এবং আমেরিকার বদলে নতুন নেতৃত্বে নতুন অর্ডার চালু করার কাজটা সফল করতে যেখানে পরিস্থিতিকে পরিপক্ক করে তুলার কাজটা কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে করা মত কাজ নয়। বরং পরিপক্ক হতে যেখানে যতটুকু সময় ও মনোযোগ লাগবে সেখানে ঠিক ততখানিই দিতে হবে এব্যাপারে সে পরিস্কার। আমরা তাই দেখেছি। এছাড়া ব্যাপারটা পরিপক্ক বা ম্যাচিয়র হওয়াটা আবার ভলিন্টারিলি ও আপন ইচ্ছায় হতে হবে এমন দিকটাও তার নজর এড়ায়নি। যেমন একথা আজ পরিস্কার কেবল ব্রিক ব্যাংকই এখনও ফাংশনাল হতে পারল না ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতার কারণে। একদিকে পুরানো বা চলতি অর্ডারটা থেকে আমেরিকার তরফে বেশি সুবিধা পাবার লোভে পড়েছে ভারত আর অন্যদিকে ততটাই নতুন অর্থনৈতিক অর্ডারটা খাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতের তাই পিছুটান ফলে ব্রিক ব্যাংক বিষয়ে ধীরে চলা – এই হল ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতা। ভারত এখনও তাই মনস্থির করে ব্রিক ফেনোমেনার পক্ষে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু সেজন্য চীনের ভারত নীতিতে আমরা কোন চাপাচাপি দেখিনি।

ভারতের দ্বিধামুখে বা দুমুখে খেলার আর এক প্রতীকী উদাহরণ
ভারতের দ্বিমুখি ঝোঁকের প্রতীকী ও আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত ‘সাংহাই কর্পোরেশন’ উদ্যোগ। “সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন” (Shanghai Cooperation Organization (SCO) – ১৯৯৬ সালে শুরু হবার সময় মনে হয়েছিল এটা সম্ভবত এক সামরিক বা ষ্ট্রাটেজিক জোট হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ এটা মূলত এক অর্থনৈতিক জোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সে কারণে এখনও আমেরিকান মিডিয়া থিঙ্কট্যাংক (কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন) এটাকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট – ন্যাটোর মত এর পাল্টা সমান্তরাল এক সামরিক জোট, “চীনের ন্যাটো” বলে চিত্রিত করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা চীন ও রাশিয়া, সাথে নেয়া হয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশ, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, and Uzbekistan। জন্মের শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালে SCO এক বিবৃতি দিয়েছিল এই বলে যে কবে “আমেরিকান সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল এশিয়া অঞ্চল থেকে গুটিয়ে চলে যাবে এর তারিখ তারা জানতে চায়”। তবে ঐ বিবৃতিতে আমেরিকাকে চলে যেতে হবে ঠিক এমন দাবী তারা করেনি কেবল তারিখ জানতে চেয়েছে আর আমেরিকার যে যাওয়া দরকার এতে এই তাদের আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ক্রমশ এই জোট একালে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে আফগানিস্তান ২০১৪ পরবর্তি পরিস্থিতিতে। ২০১৪ পরবর্তি মানে আমেরিকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে এবছর ২০১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সৈন্য (ন্যাটোও) প্রত্যাহার করবেই। এটা তিন বছর আগেই নির্ধারিত ও সিধান্ত হিসাবে ঘোষিত। মূলত খরচ যোগাতে অসমর্থ অর্থনৈতিক অপারগতা -আমেরিকান নিজস্ব এই সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণা। যদিও ২০১৫ সাল থেকে কি হবে, কেবল ট্রেনিং এর নামে (১০ হাজার রাখার ইচ্ছা আমেরিকার) কতজন সৈন্য থাকবে এবিষয়ে কোন নতুন চুক্তি কারজাই করেন নি। আফগানিস্থানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে চলতি মাসে কিন্তু ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, প্রক্রিয়াধীন। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন নতুন আয়োজনে কিছু আমেরিকান সৈন্য রাখার চুক্তি কেমন হবে বা আদৌও হবে কি না। বাস্তব এই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে SCO ভাবনা-চিন্তা করছে এবছরের শেষে ন্যাটো ও আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে তারা সামরিক নয় বরং এক ব্যাপক বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রবেশ করতে চায় আফগানিস্তানে। SCO তে অবজারভার ষ্টেটাসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর উপস্থিতিতে গত কয়েক বছর তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারত এই পাঁচ রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত SCO এর অবজারভার সদস্য, পুর্ণ সদস্য নয়। তবে প্রতি বছরের SCO সম্মেলনে তারা গুরুত্ব দিয়ে অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়ে থাকে। গত বছর ২০১৩ সেপ্টেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমন খুরশিদ কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত SCO সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং ভারত পুর্ণ সদস্য হতে চায় সে ইচ্ছা ব্যক্ত করে এসেছেন। (দেখুন, India aspires to become full SCO member) কিন্তু একই সাথে তার স্ববিরোধীতা বা পিছুটানও ব্যক্ত করেছেন ঐ রিপোর্টে। বলেছেন, We are not sure of a timeline অর্থাৎ সময়সীমা বা কবের মধ্যে হব জানি না। এককথায় ব্যাপারটা হল, পুরানা গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণ হিসাবে আমরা দেখছি পালটা উদ্যোগগুলো একটা যেমন “ব্রিকস ফেনোমেনা” ঠিক তেমনই আর এক উদ্যোগ হল এই SCO গঠন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, “ব্রিকস ফেনোমেনা” এই উদ্যোগের মতই SCO গঠন উদ্যোগেও ভারতের ভুমিকা দোলাচালে, আছি আবার নাই এমন দোদুল্যমান নন-কমিটেড। কিন্তু ধীরস্থির চীন বরাবরের মতই; ভারতের চিন্তা ও ভুমিকা সে জানে কিন্তু সেজন্য চীন ভারতকে তাড়া লাগায় নি, কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি, নিজে কায়দা কৌশল করে চাপ বা শর্ত তৈরি করেনি ভারতের উপর। বরং ছেড়ে দিয়ে রেখেছে ভারতের ভলিন্টারি ও আপন ইচ্ছার উপর। পরিস্থিতি পরিপক্ক হতে যতটা সময় লাগছে, দিচ্ছে। আবার আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিকঃ চীন বা রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের নৌকা ভাসানো মানে ব্যাপারটা যে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অথবা তাদেরকে একঘরে করা তা যে নয় এটা চীন সযত্নে খেয়াল রাখতে চায়। সকলকে মনে করায় রাখতে চাই। রাশিয়ার মত তাই চীন ব্যাপারটাকে প্রতিহিংসায় রি রি করে উঠার বিষয় মনে করে না, কারণ আসলে তো ব্যাপারটা পশ্চিমের উপরে প্রতিশোধ নেয়ারও নয়। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ইউরোপের কলোনী মালিক (বৃটিশ, ফরাসী, স্প্যানিস, ডাচ, পর্তুগীজ ইত্যাদি) যাদের সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কখনই অস্ত যাবে না বলে বড়াই শোনা যেত একদিকে তা ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল আর অন্যদিকে এর বদলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের সুচনা হয়েছিল কিন্তু আমেরিকা ব্যাপারটাকে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রতিশোধ হিসাবে ঘুর্ণাক্ষরেও দেখেনি, ইউরোপকে একঘরে করা হিসাবেই দেখেনি। কারণ আমেরিকা মানে তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (১৯৩৩-৪৫ পরপর চারবারের প্রেসিডেন্ট) এটা পরিস্কার ছিলেন যে এই পালাবদলের অর্থ প্রতিশোধ বা একঘরে করার মত তা একেবারেই নয়। বরং তাঁর নেতৃত্ত্বে এটা আরও সকলের সাথে ইউরোপকেও সাথে নিয়েই নতুন এক গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার সুচনা করার কাজ। ব্যাপারটা রুজভেল্টের দয়া বা উদারতার চোখে দেখার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা ও ঘটনাবলির বাস্তব অর্থও এটাই। এমনকি নীতিগতভাবে ষ্টালিনের রাশিয়াকেও কোন নীতিগত কারণে (যেমন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র বলে) বা কোন প্রিযুডিস বা আগাম অনুমানে ধরে তার নেতৃত্বে আসন্ন নতুন গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের বাইরে রাশিয়াকে রাখার কথা তিনি ভাবেননি। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় টানা ২২ দিনের ব্রেটনহুড সম্মেলনে রাশিয়া উপ্সথিত ছিল। এনিয়ে বিস্তার করে অন্য কোথাও লিখতে হবে। এবারের পালাবদলেও ব্যাপারটাও তাই, এখানে সাদৃশ্য আছে। এখনকার প্রসঙ্গের জন্য সারকথা এতটুকুই যে রাশিয়ার ইতিউতি উঁকি মারা বা অস্থিরতায় থাকলেও অন্তত চীনকে বাদ দিয়ে এককভাবে হাসিনাকে চোখবন্ধ সমর্থন দিয়ে রাশিয়া এগিয়ে যাবে এই অনুমান ভিত্তিহীন। হাসিনার সাথে ৫ জানুয়ারির পরের পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাশিয়ান বিবৃতিতেও এমন কিছু নাই যেটা একই প্রসঙ্গে আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে নাই। ফলে রাশিয়াকেও জড়িয়ে লিসা কার্টিসের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অনুমানের।

হাসিনাকে দানব বানানোর তিন দেশীয় সমর্থনের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোন সূত্র থেকে
একটা কথা বলে রাখা ভাল, লিসা কার্টিসের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোথা থেকে? একেবারেই কি তা সুত্রহীন? না, সুত্র সম্ভবত একটা আছে। সেই সুত্র ভারত নিজে। একটা হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন বা কানকথা ভারত ছড়িয়েছে। ধীরস্থির চীনের বিপরীতে অস্থির প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে যেমন রাশিয়া ঠিক তেমনই আর এক প্রান্ত হল ভারত, হাত নিশপিশ করা ভারত। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে তার সুখের হানিমুন ভেঙ্গে যাওয়াতে এই হাত নিশপিশ, পারলে আমেরিকাকে এখনই একটা শিক্ষা দিয়ে দেয় এমন ভাব। উপরে বলেছি, এতদিন ভারত আমেরিকার লোভের ফাঁদে পড়ে কেবল নিজের জন্য পুরানো বা চলতি অর্ডা্রটা ও এর সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিগত ভারসাম্যটাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকলে আমেরিকার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাবে এই বেকুবি লোভে ও আশায় ব্রিক ব্যাংকের উদ্যোগকে ধীরে চল নীতিতে আটকে রেখেছিল। আজ আমেরিকার সাথে বিরোধে হঠাত স্বপ্নভঙ্গ হওয়াতে সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছে। মিথ্যা ভয় ছড়িয়েছে, প্রপাগান্ডায় মেতেছে যে ভারত, চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে উঠতেছে ফলে এবার আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়া হবে। যদিও এই বাস্তবতা পরিপক্ক হতে এখনও ঢেড় সময় লাগবে এবং ব্যাপারটা মোটেও ঠিক শিক্ষা দেবার বা প্রতিশোধ নেবার মত নয়। কিন্তু সার কথা সেটা অন্তত একদুই কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবার মত তো নয়ই। আর সেকাজটাও তো খোদ ভারতই ধীরে চল নীতিতে ফেলে রেখেছে, দোদুল্যমান ও লোভী হয়ে মনোযোগ দেয়নি। এটা সে ভাল করেই জানে। এবং এখনও মনস্থির কিনা আমাদের জানা নাই। ফলে কানকথা ছড়িয়ে শত্রু আমেরিকার যদি কিছু ক্ষতি করা যায়, ভয় দেখিয়ে কিছু বাগে আনা যায় – তো তাতেই মনের সুখ ভারতের। আর এই কান কথা ছড়ানোর প্রপাগান্ডা মেশিনের দায়িত্ত্ব দিয়েছে বা নিয়েছে হাসিনা সরকার। মন্ত্রী হবার পর, ভারত সফর করা (১৮-২২ জানুয়ারী, ২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রী হলেন তোফায়েল আহমেদ। ভারত সফর থেকে ফিরে ঢাকায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেই এই কানকথাগুলো ছড়িয়েছেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই লিসা কার্টিজের – ভারত, চীন রাশিয়া – এই তিন “অক্ষশক্তিকে” হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখার খলনায়ক হিসাবে প্রপাগান্ডা। এটাকে ভারতের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লিসা কার্টিসের প্রপাগান্ডার কৌশল বলা যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ দিকটা হল, প্রপাগান্ডার লড়াই করা – এই কাজ কোন গবেষকের হতে পারে না। লিসা এখানে গবেষক মর্যাদা থেকে পতিত স্খলিত হয়েছেন।

সত্য লুকানো
লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। একথা বলে লিসা সত্য লুকালেন। বেশিদিন আগে নয় ২০০৭ সালে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল বৈঠকে “দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ভারতের চোখে নিজের নিরাপত্তা ইস্যুটাকে দেখবে” বিষয়টা সাব্যস্ত হয়েছিল সেসময়ের আন্ডার সেক্রেটারী অব ষ্টেট (২০০৫ – ৮) নিকোলাস বার্ণসের উপস্থিতিতে। নিকোলাস বার্নসকে বলা হয় ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকান নতুন ও বিশেষ সম্পর্কের (বিশেষ করে পারমানবিক টেকনোলজি, অন্য অস্ত্র ভারতকে সরবরাহ এবং নিরাপত্তা চুক্তির প্রধান নিগোশিয়েটর) কারিগর। আমেরিকা নিজের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে কি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক রাখেনি, সারাজীবন আমাদের মত দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ঠিক করার যাতাকাঠিটা কি ভারতে হাতে ব্যবহার করতে ধার দেয়নি? এসবই ২০০৭-৮ সালের ঘটনা, আমাদের তা ভুলে যাবার কোন কারণ নাই, লিসারও নয়।
অর্থাৎ চীনের রাইজিং ইকোনমি তথা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে দাড়াবার বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে টেনে তার মন পাবার জন্য আমেরিকা কেবল “ভারতের প্রেসক্রিপসনের” নয়, বাচ্চা যা চায় তা সব পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর তাতে বাংলাদেশের জন্য এমন দানব ভারতের আবির্ভাব ঘটিয়েছে যে তার একক স্বার্থে গড়া যেন এক কলোনি বাংলাদেশ সরকার হাজির করেছে ২০০৯ সাল থেকেই। আজ খোদ ভারত ও হাসিনা সরকার লিসার আমেরিকাকে কলা দেখিয়েছে, তুচ্ছ করছে – এতে এখন বেয়ারা বাচ্চা কথা শুনে না বলে লিসার গোস্যা করার কি আছে? এমনটাই কি হবার সম্ভাবনা সবসময় ছিল না অথবা কথা নয়।
তবে এটা ঠিক সর্বশেষ গত তিন বছর ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে মুখোমুখি সংঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে লিসার কথা কেবল এখন অর্থে সঠিক যে “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাচন-মরণ এমন নির্ধারক ভারত ফ্যাক্টর হয়ে উঠল কবে থেকে? তা কি আমেরিকার প্ররোচনাতেই হয় নাই?
যদি মানবজমিনের অনুবাদের কিছু বাদ পরে না যেয়ে থাকে তবে দেখা যাচ্ছে লিসা বলছেন “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। অর্থাৎ বাক্যটা আমেরিকা “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর কখনও নির্ভর করে নি অথবা করে না” – এমন নয়। লিসা সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যেন প্রছন্নে ধরে নিয়ে বলতে চাইছেন – “আগে করত এখন করছে না”। তো সেক্ষেত্রে “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর” আগে নির্ভর করা আর এখন না করা সবকিছুর দায়ভার কাফফারা সবই তো আমেরিকারই।
এছাড়া এখন লিসা আবিস্কার করে বলছেন, “মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। খুবই ভাল কথা, সত্যি কথা। কিন্তু সত্যি কথাটা অনুভব করতে আমেরিকা বড্ড দেরি করে ফেলেছে। এর দায় এবং দুর্ভোগ দুটার জন্য আমেরিকার তৈরি হওয়াটাই লিসার কপাল! নয় কি? আমেরিকান নীতির দায় খেসারত তো আমেরিকারই। এতে বাংলাদেশে আমাদের দুর্দশার কথা তাকে আর নতুন করে কিইবা বলার আছে এখানে!
তবে লিসা এখন হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। মানবজমিন জানাচ্ছে, “লিসা বলেন, “যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে”। “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না,এটা সত্য”। অর্থাৎ লিসা হাসিনা সরকারকে এখন চিহ্নিত করছেন, “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” সরকার বলে। বিগত ৫ বছর অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারির ইলেকশনের আগে পর্যন্ত কি এটা ভিন্ন কিছু ছিল? লিসা বাক্যের মধ্যে অর্থের একটা ফাঁক রেখে দিতে চেয়েছেন, পরিস্কার করেননি। বাংলাদেশের আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটা ২০০৯ সাল থেকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই,আমাদের কাছে কোন কিছুই নতুন ঠেকে নাই। তাহলে কি লিসা এতদিন খবর নেন নাই, রাখেন নাই? না, আসলে ব্যাপারটা তা না। পুরা প্রশ্নোত্তরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে লিসার বক্তব্যে ছত্রে ছত্রে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতির উপর হতাশা ফুটে বের হয়ে আছে। এটা আসলে নিজ কর্মফলের উপর নিজেরই হতাশা। সেই হতাশা থেকে এখন “দায়ী কে” বলে নিজের দিকে না তাকিয়ে বাইরের শত্রু খোজার চেষ্টা আছে। যেমন যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, “লিসা কার্টিস বলেন,শেখ হাসিনা সরকারকে চীন,রাশিয়া ও ভারতের এই নিঃশর্ত সমর্থন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে”। অর্থাৎ তিনি দোষী খুজে পেয়েছেন, ভারত চীন ও রাশিয়াকে। এই তিন রাষ্ট্রের তাদের স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে। কেন তিনি এভাবে বাইরের শত্রু খুজছেন?

আমেরিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান
লিসার দরকার থাপ্পড় খাবার পরও আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিকে একটা ইতিবাচক ভাবাদর্শগত টোপড় পড়িয়ে আড়াল টানা। যেটাকে বলে আমেরিকান নীতির পক্ষে ইডিওলজিক্যাল ন্যায্যতা জোগাড় করা। লিসার দিক থেকে তিনি জানেন, আমেরিকান নীতির সততা প্রমাণ করতে চাইলে আসলে আগে দরকার বিপরীতে ভিলেন ক্যারেকটার চিহ্নিত ও চিত্রিত করা। ভিলেনকে যত নোংরাভাবে আঁকা তিনি আঁকতে পারবেন আপনাআপনি নায়ক আমেরিকা বা ওর নীতির সততা ততোই উজ্জ্বল হবে। সিনেমার মত এই হল তাঁর ফর্মুলা।
লিসার সম্ভাব্য বা হবু প্রমাণিতব্য বিষয় হল এতদিনের আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যেন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার ততপরতাই এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভিতর দিয়ে এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” খপ্পরে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করার ততপরতা। এখানে তাঁর ফোকাস শব্দ গণতন্ত্র। আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে হাজির করা।
এই প্রসঙ্গে তিনি চিন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির ‘নোংরা’ বা ভিলেন ভুমিকার পিছনের কারণ সম্পর্কে বলছেন। মানবজমিন লিখছে, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যত ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক বিষয়ে লিসা বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন শেখ হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়াবে- এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা, এই দেশ দু’টির নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার কিংবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব কমই উদ্বিগ্ন”। এটা লিসার দেয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা তথ্য সন্দেহ নাই । চিন ও রাশিয়ার “নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই”। তাই তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না, দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন তারা কায়েম করল। এবং তা আবিস্কার করে লিসা আশ্চর্য হন নাই। লিসার এই যুক্তির পাটাতনটা আমেরিকা-রাশিয়ার ঠান্ডা-যুদ্ধের সময়কালের। যখন আমেরিকা রাশিয়ার ‘গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ভিত্তি নাই, ফলে বুঝল না’ বলে প্রপাগান্ডা করত আর বিপরীতে নিজে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন প্রমাণ করতে আমাদের মত সবদেশেই মার্শাল ল’ এর দানব শাসনের সরকার কায়েম করত। পুরা ঠান্ডা যুদ্ধের কালেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের মত সব দেশগুলো চলেছে আমেরিকান সমর্থিত সামরিক শাসনে। এটা বেশ মজার যে লিসা কার্টিজ সেই ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি একালে সবাই যেখানে একই গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রে সম্পর্কিত সেকালে আবার হাজির করছেন। সেসব বাজে ফালতু কথা থাকুক। আমরা বরং প্রশ্ন করি, যে কোন রাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে মুল পরিচালক নির্ধারক ফোকাস কোনটা? আরেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নাকি নিজের পরাশক্তিগত অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অথবা ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ হাসিল করা? এটা লুকিয়ে লাভ নাই যে প্রশ্নাতীতভাবে এর জবাব দ্বিতীয়টা। এবং এটা ঠান্ডাযুদ্ধের সেকাল এবং একাল যেটাই হোক সবকালেই অর্থাৎ সবসময় এটা সত্য। তবে হ্যা এটা কাঁচা সত্য অর্থাৎ কূটনৈতিক ভাষায় এই সত্য এই লক্ষ্য বা ফোকাসের কথা সরাসরি বলা হয় না, বলা যাবে না। বলা হবে মোড়ক, রেঠরিক বা বাকচাতুরি দিয়ে। যেমন ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, কিংবা ‘গণতন্ত্র মহান’ এসব বাকচাতুরির ভাষায়। বেশিদিন আগের নয়, ‘সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ তো আমরা সেদিনও বাংলাদেশে দেখেছি।
তাহলে দাড়ালো এই যে বাংলাদেশের জন্য লিসার আমেরিকা গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আর চীন বা রাশিয়ার নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই বলে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না – এই তত্ত্বের বেইল নাই। এটা ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি। কিন্তু তবু লিসার তত্ত্বে আর একটা জিনিষ কিছুতেই বেড় পায় নাই মানে চওড়ায় আটাইতে পারে নাই। লিসার এই তত্ত্ব ভারতের বেলায় খাটাতে গিয়ে তিনি বিপদ টের পেয়েছেন। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নরা ভারতকে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” পরাকাষ্ঠা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলে ফেলে থাকে। ফলে চীন বা রাশিয়ার মত ‘নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই’ বলে সব সমস্যাকে এসেন্সিয়াল করার লিসার বিগতযৌবনা যুক্তি বা তত্ত্বটা এখানে খাটছে না। তাই এবার নতুন পাঞ্চ, নতুন টুইষ্ট বা প্যাঁচ। মানবজমিন লিখছে, “লিসা কার্টিস বলেন, ভারতে যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ গতিশীল এবং দেশটি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে থাকে, কিন্তু নিজ দেশের গণ্ডির বাইরে গণতন্ত্র উত্তরণে নয়া দিল্লিকে কখনও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি”।
আগে বলেছি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চাওয়া না চাওয়াটা এমনকি কোনটাকে গনতন্ত্র করা হচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়া হবে এর সবটাই নির্ভর করে ভারতসহ যেকোন বিদেশীদের বিদেশনীতিতে কোনটা তাদের নিজেদের আপন স্বার্থে যায় এর উপর। অর্থাৎ সুপ্রিম হল, ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন স্বার্থ। কেউই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য নিজের রাষ্ট্রে দোকান খুলে নাই। বাংলাদেশের জনগণও তা করতে কাউকে দিতেও পারে না। প্রশ্নও উঠে না। য়ার ২০০৯ সালে কি আমেরিকা ভারতের হাত দিয়ে আমাদেরকে হাসিনার মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন উপহার দেয়নি? আসলে লিসা এই প্রশ্নোত্তর লিখার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, লিসা কার্টিজ একজন কূটনৈতিক নন বরং গবেষক, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। গবেষক হিসাবে তাঁর কাজ কোন বিদেশনীতিকে ক্রিটিক্যাল ও এনালাইটিক্যাল চোখে অর্থাৎ বিশ্লেষক হিসাবে ঘটনাবলিকে দেখার বিরাট সুযোগ তার ছিল এবং আছে। বিদেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বাস্তবের মুখোমুখিতে পড়লে ওর সমস্যাগুলো কি, কি চেহারা নিয়ে তা দাড়ায় তা নিয়ে বিশ্লেষক অন্তর্দৃষ্টি হাজির করা হত পারত তার আসল ভুমিকা। সম্ভবত একাজে তাঁর ঘাটতি খামতি ঢাকতেই তিনি গবেষকের বদলে স্বচ্ছন্দে তিনি যেন কূটনৈতিক – এই ভুমিকায় নেমে পড়েছেন।

আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক
মানবজমিনের প্রশ্নোত্তরের রিপোর্টিংয়ের শুরুতে বলেছে, “গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্বার গণআন্দোলনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে। গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না”। একথাগুলো লিসা কার্টিজের প্রশ্নোত্তরে বলা তার নিজেরই কথা কি না আমরা পরিস্কার হতে পারিনি। হতে পারে তা লিসা কার্টিজের লেখা জবাবের কোন অংশ পড়ে মানবজমিন রিপোর্টারের মনে যে ছাপ তৈরি হয়েছে সেই সুত্রে লেখা। যাই হোক সেটা, এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত একবছরের বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথাই যদি বলি যখন গণবিক্ষোভ আন্দোলনের তোড়ে এক পর্যায়ে ঢাকা ঢাকার বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল সেসময় এর প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি। চলমান ঐ গণআন্দোলন যতই মাত্রা লাভ করছিল আমেরিকাসহ বাংলাদেশের পশ্চিমা কূটনীতিকরা ততোই একে ‘সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করছিল বললে কম বলা হবে। বলতে হবে অভিযুক্ত করেছে একতরফা ভাবে। আর তথাকথিত ‘অহিংস’ প্রতিবাদের কথা নসিহত করছিল আমাদের। কিন্তু এই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে হাসিনা সরকারের রাস্তায় প্রতিবাদ “বিক্ষোভ দেখা মাত্রই আর্মড গাড়িতে চড়ে সরাসরি গুলি” এই মারাত্মক মোকাবিলার ধরণ সম্পর্কে কোন কার্যকর নোটিশ তারা করেছে এমন প্রমাণ তারা রাখে নাই। অর্থাৎ সরকারের সরাসরি গুলি এটা সহিংসতা নয়, নৃশংসতা নয়। যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সেটা সহিংসতা করা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্যের পিছনে এমন নীতিটাই আমরা দেখেছি।
অর্থাৎ দেখা গেছে আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে হাসিনা এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে তবে সততার সাথে তা বলতে হত, করতে হত। উলটা জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংসতা’ বলে লেবেল লাগিয়ে পালটা প্রচারণায় তাদের নামার কথা নয়। কিন্তু তারা সেটাই করেছে। নিজেদের স্ববিরোধী নীতিটারই বাইরে সরব প্রকাশ ঘটিয়েছে। কূটনীতিকদের কথা সে জগতে থাক। লিসা কার্টিজ বা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গে সেদিকে আর না যাই। কূটনীতিকদের কথা বাদ রেখে এনিয়ে খোদ লিসার আর এক লেখা (৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগে লেখা) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু সারকথা বলা যাক। লেখার শিরোনাম, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াঃ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে রাখা। এখানে দেখুন। [Combating Islamism in South Asia: Keeping Bangladesh on the Democratic Path] এই লেখা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে স্পনসর করা লিসা কার্টিজের কাজ। ওর সারাংশ দেয়া আছে রিপোর্টের শুরুতে সেখান থেকে একটা বাক্য, “While the threat from terrorism had diminished to some extent under the government of Prime Minister Sheikh Hasina, the recent execution of an Islamist politician and the sentencing to death of other opposition leaders accused of war crimes during Bangladesh’s war of independence in 1971 have unleashed furor among Islamists.”। অর্থাৎ লিসা দাবি করছেন হাসিনা সরকারের অধীনকালে নাকি সন্ত্রাসবাদের বিপদ কিছুটা কমেছে। কিন্তু লিসা কিভাবে বুঝলেন যে বিপদ কমেছে। তাঁর বুঝাবুঝির নির্ণায়ক, মানে কি দেখে তিনি বুঝলেন? আমরা জানি না। কিন্তু এক নিশ্বাসে একই বাক্যের পরের অংশে বলছেন, “একজন ইসলামিষ্ট রাজনীতিকের ফাঁসি দেয়া হয়েছে”। অর্থাৎ লিসা সরাসরি বলছেন না তবে তার নির্ণায়ক কি সেটা তিনি ইঙ্গিতে বলছেন।
কিন্তু কোন ‘ইসলামি রাজনীতিকের’ ফাঁসির সাথে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কি? হাসিনা কি তাঁকে ফাঁসি দিয়েছেন “সন্ত্রাসবাদের” জন্য? আমেরিকা “সন্ত্রাসবাদ” মনে করে তেমন কোন ততপরতার জন্য এই ফাঁসি দেয়া? লিসা সেটা খোলসা করে না বরং ইঙ্গিতে ধরে নিতে বলেছেন। চিন্তার এই ফাঁকি ও অসততাটা লক্ষণীয়। আবার তিনি বলছেন ফাঁসিটা “‘৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত হিসাবে তবে এটা ইসলামিষ্টদের বিক্ষুব্ধ করেছে”।
তিনি যদি বুঝাতে চেয়ে থাকতেন, ৭১ সালের একটা কৃত যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি এটা তাহলে এটা কোনই সমস্যার হত না। যদিও সেক্ষেত্রে সেই অপরাধী ইসলামিষ্ট কিংবা ইসলামিষ্ট নয় তাতে কিছুই এসে যাবার কথা নয় কারণ এটা গৌণ দিক। মুখ্য দিক হবার কথা তিনি যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তিনি এই ফাঁসির ঘটনাকে সম্পর্কিত করছেন ১) হাসিনাকে “সন্ত্রাসবাদের হুমকি” কমানোর নায়িকা হিসাবে। (২) ফাঁসির কারণে যারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরকে বিক্ষোভকে “ইসলামিষ্টদের বিক্ষোভ” হিসাবে চিহ্নিত করে।
একটা কথা লিসাসহ এমনভাবে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে পরিস্কার করে বলতে হবে। ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ কি একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ? যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার? আমাদের মনে রাখতে হবে, আলকয়েদা বা তা সংশ্লিষ্ট দল বা গ্রুপের ততপরতা অথবা আলকায়েদার মত ততপরতাকে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার
কোন প্রশ্ন না রেখে ধরে নিচ্ছি আমেরিকায় সংজ্ঞায় যেটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয় সেটাই সন্ত্রাসবাদ। আদালতে কোন অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়ে গেলে তা থেকে বুঝার উপায় কি যে ঐ অপরাধ সন্ত্রাসবাদের অপরাধ ছিল কি না? তার আগে একটা কথা পরিস্কার করে নেই। অপরাধটা যদি কোন “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” করেন (লিসা কার্টিস Islamist politician বলে এক শব্দ ব্যবহার করেছেন) তাহলেই কি সেটাকে সন্ত্রাসবাদের অপরাধ বলে বুঝব? না তা অবশ্যই বুঝা যাবে না, বুঝা ঠিকও হবে না। কারণ মূল বিষয় হল, দেশের কোন আইনে অভিযোগটা দায়ের করা হয়েছে এটাই সবকিছুর নির্ধারক। এটাই এবিষয়ে সব তর্কের অবসানের মুখ্য উপায়। ফলে অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে “যুদ্ধাপরাধ আইনে” (আমাদের মূল ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ যা সংশোধিত হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার তার সর্বশেষ সংশোধনীসহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। আর অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে আমাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (আমাদের মূল সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে তা সহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র সন্ত্রাসবাদের অপরাধ করেছেন, অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। এই কথা থেকে পরিস্কার যে, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ কোনভাবেই নয়। এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচা্র তাও কোনমতেই নয়। যেসব জামাতের নেতাদের বিচার চলছে বা ফাঁসি হয়ে গেছে এরা কেউই “সন্ত্রাসবাদের অপরাধে” এখনও বিচারের কাঠগড়ায় অথবা বিচার শেষে রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত বা ফাঁসিপ্রাপ্ত তা একেবারেই নয়। মুল কারণ তাদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ – এই আইনে। এরপর আশা করি জামাতের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধাপরাধের (আসলে সঠিক আইনী ভাষায় ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’) বিচার বা শাস্তিকে কেউ “সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে” বিচার হচ্ছে বলে বুঝবেন না, ভুল করবেন না, মিথ্যা ছড়াবেন না। এমনকি জামাতের কোন নেতাকে (লিসা কার্টিসের মত করে) কেউ Islamist politician বলে মনে করেন কিংবা না করেন তাতে কোন ফারাক পড়বে না।
এখান লিসা কার্টিসের চিন্তার ফাঁকিটা গ্রেফতার করা যায়। এরপরেও জবরদস্তিতে লিসা কার্টিজ যদি মনে করেন, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধটাও একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ। তাতেও আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু লিসা কার্টিজসহ যারা এভাবে মনে করবেন তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তাহলে আমেরিকা নিজেই ঐ “সন্ত্রাসবাদের” অংশ। আজ ৭১ সালের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলেন অথবা “সন্ত্রাসবাদ” বলেন যে নামেই লিসা কার্টিজ ডাকেন এর দায়ভার আমেরিকারও। কারণ তখন আমেরিকান অবস্থান মুসলিম লীগ বা জামাতে ইসলামসহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকের পক্ষে ছিল, সমর্থন ছিল।
ধরে নিচ্ছি আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নের এসব বিপদ টের পেয়ে এবার হয়ত লিসা কার্টিজ জোর দিবেন তাঁর ব্যবহৃত “ইসলামিষ্ট” শব্দটার উপর। অর্থাৎ ইসলামিষ্ট রাজনীতি মানেই “সন্ত্রাসবাদ”, ফলে সন্ত্রাসবাদের বিপদ দেখতে পাওয়া। লিসাদের জেনে অথবা না জেনে অথবা চিন্তায় ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভুত দেখে বেড়ানোটাও আরও মারাত্মক বিপদের। কারণ জামাত ইসলামি ইসলামি রাজনীতি করে তাতে সন্দেহ নাই। এই অর্থে লিসা যদি “ইসলামিষ্ট” শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই বিচারটা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের আইনে কোন এন্টি-টেরর ল জাতীয় কোন “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” নয়। ফলে আমেরিকার “সন্ত্রাসবাদ” খুজে ফেরা চোখে লিসা কার্টিজ বড়জোর একজন আমেরিকান নাশনালিষ্ট নাগরিক, কোন মতেই কোন গবেষক নন। এছাড়া আমরা আরও বুঝব লিসাও হাসিনার বাকচাতুরির ফাঁদে পড়েছেন। এই ফাঁসি কোন এন্টি-টেরর এক্টে হচ্ছে কি না – এই সহজ দিকটা খেয়াল করার মত বুদ্ধি তিনি দেখাতে পারেন নাই। যদি লিসা দেখতেন, জানতেন তবেই সেটা খুব সহজেই আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী ঘটনা তিনি বলতে পারতেন ও সে ঘটনাকে তাঁর ‘ইসলামিষ্টের বিচার’ কথার কোন অর্থ হত।
হুশ হারানো বুদ্ধি বিবেচনার এই স্ববিরোধ লিসা কার্টিজের একার নয়। আমেরিকাসহ প্রায় সব পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও একই অবস্থা। ইসলামিষ্ট কথাটাকে তারা জবরদস্তি তাদের সংজ্ঞার সন্ত্রাসবাদ বলে ইঙ্গিত মেরে প্রচ্ছন্নে বুঝাতে চান। এভাবে তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া তারা নিজেরাই গুলিয়ে ফেলেন। অথবা ইচ্ছা করে করে রাখেন। কিন্তু বটম লাইন হল, জামাত আওয়ামি লীগের মতই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটুশনাল আইনী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাদের উভয় দলের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা পাড়ায় আওয়ামি লীগের মতই জামাতও চাপাতি ধরণের সন্ত্রাস করে। কিন্তু চাপাতির সন্ত্রাস করলেও যেমন আওয়ামি লীগ সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের কোন রাজনৈতিক দল নয় ঠিক তেমনি জামাতও আওয়ামি লীগের মতই কোন সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের রাজনৈতিক দল নয়। এমনকি একথা ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মওলানা মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তার ও দলের ক্ষেত্রেও সমান সত্য ও প্রযোজ্য।

যদিও সমস্যাটা কেবল লিসা কার্টিজের নয়, কেবল পশ্চিমা কূটনৈতিকদেরও নয়। এমনকি আমাদের অনেকেই ইসলামি রাজনীতি অপছন্দ করি বলে এই জবরদস্তি জেনে অথবা না জেনে করি। সে যাক, পশ্চিমা কূটনৈতিকরা মনে করতেই পারেন তারা তাদের সন্ত্রাসবাদের লড়াই করবেন আর সেকাজে বাংলাদেশে একটা “গণতান্ত্রিক” মেকানিজম ও প্রক্রিয়া চালু রেখে বা দেখতে চেয়ে তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করবেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার আগে তাদের মনে খোলা হতে হবে। “ইসলামিষ্ট” শব্দটা শুনে কোন আগাম ধারণার বশবর্তি হয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার কিছু নাই। অন্তত আইডিয়ালি বললে একাজে তারা কোন ব্রান্ডের “ইসলামিষ্টদেরকেও” না পাবার কোন কারণ নাই। কারণ শুনে ইসলামিষ্ট লাগলেও মর্ডান রাষ্ট্রের মত এক লিবারেল রাষ্ট্রই তাদের কল্পনা – এটুকু আছে কিনা সেটাই তো মূল বিবেচ্য হওয়ার কথা।
তাহলে, মুল সমস্যাটা পশ্চিমা মনের। এই স্ববিরোধের কারণে তাই একদিকে লিসা কার্টিজ হাসিনা সরকারকে সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ে খামোখা সার্টিফিকেট দেন আবার অভিযোগ করেন হাসিনার বাংলাদেশ এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে।

একটা সতর্কবাণী দিয়ে শেষ করি। এতক্ষণ কথাগুলো বলেছি, বাইরের মানুষ আমাদেরকে কি করে দেখে সেদিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজটা আমাদের। এবং একান্তই আমাদের। একমাত্র আমাদেরকেই তা বাস্তব করে তুলতে হবে। সেকাজে আন্দোলন সংগ্রামই আমাদের পথ। লিসা কার্টিস সহ বাইরের কেউ আমরা কি করি জানতে আগ্রহ থাকতে পারে। তাতে তাদের দেখার স্ববিরোধীতাটা কোথায় তা তারা ঠিক জানুক আর নাই জানুক, আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আশা করি সেদিকটা আমলে রেখে আমরা লেখাটা পাঠ করব।

SHORT LINK:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (১), প্রথম কিস্তি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (১)

গৌতম দাস

০১ এপ্রিল ২০১৪

https://wp.me/p1sCvy-57

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানান বিদেশি ফ্যাক্টর কাজ করে, এটা আমরা জানি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সহাবস্থান ও আঁতাতের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে এই ফ্যাক্টরগুলো আমাদের রাজনীতিতে কি ভুমিকা নিতে পারে সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে নি। এখানে তার প্রাথমিক কিছু আলোচনা হাজির করছি।

প্রথম কিস্তিঃ
দুনিয়া এখন একটাই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়া
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশের ভিতরের ফ্যাক্টরগুলো ছাড়াও বাইরের বিদেশি ফ্যাক্টরগুলো কেন বিরাট ভুমিকা নেবার সুযোগ পাবে এযুগে এনিয়ে প্রশ্ন তোলা যতোটুকু না রাজনৈতিক তার চেয়ে অধিক নৈতিক। অর্থাৎ আমরা নৈতিক জায়গা থেকেই তর্ক তুলে বলি যে কোন বিদেশী শক্তি আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত না বা করতে পারবে না। সেটা ভাল, কিন্তু বহু আগে থেকেই আমরা এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে বিশ্বব্যাপী লেনদেন, বিনিময় বা বাণিজ্যে ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের ভিতর প্রবেশ করে আছি, যেটা এক বিকল্পহীন বাস্তবতা। অর্থাৎ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আমরা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই বিকল্পহীন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। কারণ এই ভ্রমণের উলটা পথে পিছন ফিরার কথা চিন্তা করা এখন অকল্পনীয় এবং অবাস্তব। আমরা প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক অবস্থায় যেমন ফিরে যেতে পারি না, ঠিক তেমনি চাইলেই ‘হস্তক্ষেপ’ বন্ধ করতে পারি না। দুনিয়ার কোন দেশই এখন আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এযুগে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অর্থনীতি হয়ে থাকা অবাস্তব ও অসম্ভব।
আবার, দুনিয়া আগের মতো ‘পুঁজিতান্ত্রিক’ আর ‘সমাজতান্ত্রিক’ শিবিরে আর বিভক্ত নয়। দুনিয়া এখন একটাই, সেটা একটাই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়া। অতএব একে মাথায় রেখেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবার নীতি ও কৌশল ঠিক করতে হবে। দুনিয়ার সকল দেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকার বাস্তবতা মেনেই বিদেশি রাজনীতি ও স্বার্থের ফ্যাক্টরগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। নিজস্ব স্বার্থ যতটা সম্ভব সুরক্ষা করার রাজনীতিই আমাদের একমাত্র গন্তব্য।

শেখ হাসিনার পক্ষে ক্ষমতায় থাকা কিম্বা বিরোধীদলের ক্ষমতা আসার সম্ভাবনা অনেকাংশেই এর এই বিবেচনাগুলো আমলে নেবার উপর নির্ভরশীল। ক্ষমতায় থাকবার জন্য কিম্বা ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের নীতি ও কৌশল নির্ণয়ও নির্ভর করে এই ফ্যাক্টরগুলোকে বাস্তবচিতভাবে বিবেচনার ওপর। ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার বাইরের শক্তি কে কিভাবে সেটা করছে তার ওপর রাজনীতিতে তাদের পরিণতি অনেকাংশেই ঠিক হবে। সেটা নিশ্চিত। আবার, জনগণের দিক থেকে এই দুই পক্ষের কোন পক্ষের স্বার্থ রক্ষা প্রধান বিবেচনা হতে পারে না। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের দিকগুলো নির্মোহ ভাবে চিহ্নিত করা, বোঝা ও বিচার করার ওপর আমাদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গাগুলো কোথায় নিহিত সেটা নির্ধারণ করা দরকার। এই লেখাটি সেই আলোকেই লেখা হচ্ছে। এই তিনটি স্বার্থের ক্রম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অনুমান হচ্ছে বিশ্ব ও আঞ্চলিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান স্বার্থ অর্থনৈতিক এবং এর পরে সামরিক। সামরিকতার প্রশ্নকে আমরা গণশক্তি বিকাশের অন্তর্গত বিবেচনা বলে মনে করি। এর বিকাশ ছাড়া বাংলাদেশের মতো এখনকার রাষ্ট্রের পক্ষে জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তে চলবার শক্তি কখনই অর্জন করতে পারবে না।
অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থেই আলাদা করে রাজনৈতিক স্বার্থের চিন্তা করা দরকার। রাজনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কোনই সন্দেহ নাই। সেই ক্ষেত্রে প্রধান ও প্রাথমিক বিবেচনা হচ্ছে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বিশ্ব সভায় বাংলাদেশের টিকে থাকা। সেই লক্ষ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদ যেভাবে বাংলাদেশের জনগণকে বিভক্ত করছে এবং রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী কায়দায় জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষত ক্রমাগত গভীর করে চলেছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার। তার জন্য জাতিবাদী অথবা ধর্মবাদী আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিপরীতে দরকার গণশক্তি নির্মাণের রাজনীতি। যার মর্ম মচ্ছে নাগরিক চেতনা ও বোধকে শক্তিশালী করা। দল, মত, ধর্ম বা মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষাই এই দিক থেকে এখনকার প্রধান রাজনীতি, কোন প্রকার দলবাজি বা জনগণকে বিভক্ত করে এমন মতাদর্শিক ফেরেববাজিতে পা দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ত্বরান্বিত করা নয়। কিন্তু বিধ্বংসী রাজনীতিতেই আমাদের প্রবল উৎসাহ, নির্মাণের রাজনীতিতে নয়। নানান মতাদর্শিক বিতর্ক আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতে আছে এবং আরও বহুদিন থাকবে। সেগুলোর এটা বা সেটার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র গড়তে হবে এমন জিদ আত্মঘাতি। বরং সে তর্কবিতর্কগুলো চলতে দিয়ে, এই অর্থে এড়িয়ে একটা কমন কনসেনসাসের ভিত্তিতে নাগরিক চেতনা ও বোধে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করে নেয়া এখনকার প্রধান কাজ।
এই বাস্তবতাগুলো মনে রেখে এবং সজ্ঞান ও সচেতন তরুণদের কথা মনে রেখে এই লেখাটি পেশ করা হচ্ছে। যাদের জাগতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করা এবং সম্পদ বন্টনে সুষম ও সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সুযোগ প্রাপ্তিতে সাম্য নিশ্চিত করার ওপর। যেদিক থেকেই বিচার করি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করাই এখনকার কাজ। সেই ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বিরোধ, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাবার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি অর্জন করা দরকার। বাংলাদেশের এখন যে বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি সেখান থেকে এই ব্যাপারে প্রত্যাশার কিছুই নাই। সে কারণেই বাংলাদেশের সেই সকল তরুণদের কথা মনে রেখে এ লেখা লিখছি যারা দেশের ভেতরের অবস্থা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাস্তবচিত নতুন রাজনীতির জন্ম দিতে আগ্রহী। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির নানান অশুভ পক্ষের টানাপড়েনে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবার বিপরীতে যারা সাঁতার দিতে প্রস্তুত। অসম ও অন্যায্য অবশ্যই, কিন্তু আমরা একই অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই সবাই বসবাস করি, এই ব্যবস্থার মধ্যেই আমাদের নিজেদের জন্য সর্বোচ্চ শক্তিশালী জায়গা করে নিতে হবে। সেটা কেউই আমাদের দয়া করে দেবে না।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের প্রতি আগামি দিনে ভারত, আমেরিকা, চিন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য অবস্থান কী হতে পারে সেটা আগাম আন্দাজ করা আমাদের দরকার। যাতে এব্যাপারে আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে কিছু আগাম ধারণ আমরা করতে পারি। কয়েকটি কিস্তিতে এই লেখাটি লিখছি। এই আন্দাজ যে, তা আমাদের আগামি দিনে সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি জাতীয় অবস্থান নির্ণয়ে সহায়ক হবে বলে আশা করি।

দিল্লী ও ওয়াশিংটনের বিদেশ নীতিতে নতুন পরাশক্তিগত বিন্যাস
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী দেশগুলো কে কী ভূমিকা পালন করছে সেটা কমবেশী হয়তো আমরা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি, কিন্তু আগামি দিনে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের ভূমিকা কী রূপ নিতে পারে সেটা অনুমান করার চেষ্টা আমাদের এখনি করা দরকার। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে যে ভূমিকাই নিক সবাই ভারতের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল কী দাঁড়ায় সেদিকে এখন সকলেই তাকিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে।
কেন আসন্ন ভারতীয় নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার জন্য বিদেশি শক্তি সবাই অপেক্ষামান? কারণ আগের যেকোন ভারতীয় নির্বাচনের চেয়ে এবারকার ভারতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক। চলতি বাংলাদেশের সরকার বিগত সরকারেরই ধারাবাহিকতা। তারা ২০০৯ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল। এই সরকারের দুই আমলেই গুমখুন, সন্ত্রাস, ও আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রকট আকার ধারণ করেছে, বিরোধী মত ও চিন্তা ও বিরোধী দলীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনরা কার্যত একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিবাদী আবেগ ও মুক্তিযুদ্ধের দলীয় বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে জাতিবাদী উগ্রতার যে রূপ এই সরকার প্রদর্শন করছে তাকে ফ্যসিবাদ বললে কমই বলা হয়। সংবিধানের পরিবর্তন করে নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ, বিচার বিভাগ ও আইন শৃংখলা প্রতিষ্ঠানের চরম দলীয়করণ ইত্যাদির নানান বৈশিষ্ট্য বিচার করে ফ্যাসিবাদের এই বিশেষ রূপের আরও পরিচ্ছন্ন পর্যালোচনা দরকার। কিন্তু যেটা আশ্চর্যের সেটা হোল এই নিপীড়ক, ফ্যাসিষ্ট এবং ঘোরতর ভাবে গণবিচ্ছিন্ন চেহারা নিয়েও এই সরকার টিকে আছে। টিকে থাকার পিছনে প্রধান কারণ দিল্লীতে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি একক সমর্থন। বাংলাদেশে পরাশক্তির ভূমিকা বা বিদেশী ফ্যাক্টরগুলো আগামি দিনে কী করতে পারে সেই আন্দাজ বর্তমানের এই বাস্তবতা থেকে শুরু করাই সংগত। বাংলাদেশ মূলত দিল্লীর বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অধীনস্থ ও অনুগামি একটি সরকার। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই আগামি দিনে পরাশক্তির ভূমিকা কি হতে পারে আমরা তা আন্দাজ করবার চেষ্টা করতে পারি।
গত ২০০৯ সালে হাসিনা সরকার আসার পিছনের দুবছরে (২০০৭-৮ সালে) ধরে চলা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ঠিক হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের চরিত্র এমনই হবে। এটা যখন বাস্তবায়িত হচ্ছিল তখন এই ক্ষেত্রে ভারতের এমন বাংলাদেশ নীতির সাথে আমেরিকার অনুমোদন ও সহায়ক সমর্থন ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে দিল্লীর স্বার্থের এক সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল ওয়াশিংটন। আবার সেটা গত তিন বছর হল উলটে গিয়েছে। আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি আর ভারতের বাংলাদেশ নীতির মধ্যে গুরুতর ফারাক ঘটে গেছে। বাংলাদেশ নীতি প্রসঙ্গে ভারতের সাথে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য ঘটেছে এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বও দেখা দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ভারতের নির্বাচনের ফল বাংলাদেশে কী প্রভাব ফেলবে সেটা ভাবতে হবে।
আসন্ন ভারতীয় নির্বাচনে কংগ্রেস সরকার তৃতীয়বারের মত নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে এমন সম্ভাবনা একেবারেই নাই বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের রাজনীতির যাঁরা বিশ্লেষক তাঁরা এই বিষয়ে কমবেশী একমত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলো কে কী ভূমিকা নেবে সেটা এই কারণেই ভারতের নির্বাচনের মুখাপেক্ষি হয়ে রয়েছে।
আগেই বলেছি, ২০০৭-৮ সালে বাংলাদেশ নীতিতে আমেরিকা ও ভারত হাতে হাত মিলিয়ে একই অবস্থান নিয়েছিল। কারণ সেটা ছিল আমেরিকার বিদেশ নীতিতে মৌলিক দুটো ইস্যুতে অবস্থান বদলের সময়কাল। ওবামা প্রেসিডেন্সীর প্রথম টার্ম শুরু হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এর আগের প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের ওয়ার অন টেররের ব্যর্থ নীতি মার্কিন নীতি নির্ধারকদের একটা অংশের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মার্কিন জনমতের মধ্যেও। সেই বিদেশনীতি থেকে সরে এসে নতুন কি করা যায় তা নিয়ে আমেরিকার জন্য ভাবনার প্রস্তুতিমূলক সময় ছিল সেটা। তখনও হিলারি ক্লিনটনের ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’ পুরাপুরি দানা বাঁধে নি; গণ কূটনীতির (public diplomacy) আলোকে সরকার বিরোধী জনমতকে উসকিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সংস্কারের বুদ্ধি সবে দানা বাঁধছিল। যার ফল আমরা পরবর্তীতে ‘আরব স্প্রিং’ নামে হাজির হতে দেখেছি। অর্থাৎ নতুন “আরব স্প্রিংয়ের” নীতি তখনও স্থির বা থিতু হয় নাই। জুনিয়র বুশের শেষ আমলের এই অন্তর্বর্তী পরিস্থিতিতে, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ভারতের হাতে হাত মিলানো অবস্থাটা পুরাপুরি বহাল হয়েছিল। এই সময়কালটাতে বাংলাদেশের “১/১১ এর সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের” কেচ্ছা এই বলয় পরিস্থিতির মধ্যেই পাঠ করতে হবে। চিনের উত্থানকে মোকাবিলার জন্য দিল্লী ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিভিন্ন নিরাপত্তা চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ভারত প্রকৃতিগত কারনেই (natural ally) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু এই ধারণাও দুই দেশে জোরে শোরে প্রচারিত হচ্ছিল। তবে দক্ষিণ এশিয়া বা আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে আমেরিকার বিদেশ নীতিতে আমেরিকা ও ভারত হাতে হাত মিলিয়ে চলার নীতি নিতে হবে এমন সিদ্ধান্তের পিছনের তাগিদ হিসাবে দ্বিতীয় আরেকটি ইস্যু ছিল। সেই ইস্যুই আমেরিকার এই গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রভাবক ভুমিকায় পালন করেছে। কী সেই ইস্যু?
অল্প কথায় বললে, সেটা হল একক পরাশক্তি ও গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার একক এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য ভুমিকায় বদল অনিবার্য ও আসন্ন হয়ে ওঠা। নীতি নির্ধারকের তা দেখতে পাচ্ছিল। এই সংক্রান্ত আমেরিকান সরকারি এক বিস্তারিত সার্ভে রিপোর্টের চুম্বক অংশগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল ২০০৭ সালে। পরিপুর্ণ রিপোর্ট আসে ২০০৮ সালে। [2025_Global_Trends_Final_Report] ঐ রিপোর্টের সারকথা সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়:
১. গ্লোবাল পরাশক্তিতে আমেরিকা আর একক ভুমিকায় থাকছে না, পরাশক্তিগত গ্লোবাল ক্ষমতা অন্তত পাঁচভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। আর আমেরিকা বড় জোর ঐ পাঁচের একটা হয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে;
২. গ্লোবাল অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহ পশ্চিম থেকে পূবে এশিয়ামুখী হচ্ছে। আর এটা আগামি ভবিষ্যতে কখনও আর উলটা প্রবাহ নিবে না বা পরিগ্রহণ করবে না; ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থায়ী ভারকেন্দ্র হয়ে উঠছে এশিয়া। আগে অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনায়, পশ্চিমে উন্নত বা ডেভলপড অর্থনীতি আর বাকি সবাই উন্নয়নশীল বা ডেভলপিং অর্থনীতি বলে একটা ভাগ করতে দেখা যেত। ঐ রিপোর্টে নতুন একটা বিভাজক শব্দ বা ধারণা চালু করা হয় “রাইজিং ইকোনমি” – নতুন পাঁচ পরাশক্তির বেলায় এই নতুন নাম প্রয়োগ করা হয়। ঘটনাচক্রে ঐ পাঁচ রাইজিং ইকোনমির দুটাই এশিয়ার – চিন ও ভারত। (বাকি তিনটা ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা)। আমেরিকান বিদেশ নীতিতে দ্বিতীয় ইস্যু হাজির হবার পিছনে এই রিপোর্ট সেই পটভুমি, আপাতত সংক্ষেপে এতটুকুই।

স্বভাবতই রিপোর্টটা পরাশক্তিগত দুনিয়ার এক আসন্ন মোচড়ানির নির্দেশক বা ইঙ্গিত । তাই, আমেরিকার বিদেশনীতিতে দ্বিতীয় বদলটা আসে এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে। ওয়াশিংটন সিদ্ধান্ত নেয় এশিয়ার দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে, পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে (চিন) ঘায়েল করা। লক্ষ্য, তাতে যদি পরাশক্তিগত নিজের অবস্থান কিছু হেরফের ঘটিয়ে অন্য সম্ভাব্য পাঁচের চেয়ে কিছুটা উপরে করা যায়। মনে রাখতে হবে, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার এই তুমুল টালমাটালের যুগে কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তিগত ভুমিকায় হাজির হবার পুর্বশর্ত হচ্ছে সবার আগে অর্থনীতির দিক থেকে পরাশক্তি হওয়া। অর্থাৎ অর্থনীতিতে শীর্ষ ভুমিকার সবলতা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক বড় শেয়ার দখল করে হাজির হওয়া, বৈদেশিক বাণিজ্যে একটা ভালরকম উদ্বৃত্তের অর্থনীতি হওয়া ইত্যাদি। চিনের অর্থনীতিগত উত্থান আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার ঐ সার্ভে রিপোর্টে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন এই পালাবদলের পরিস্কার ইঙ্গিত ফুটে উঠেছিল। এই সূত্রে আমেরিকার নতুন বিদেশনীতির আগ্রহে আমেরিকা-ভারতের সখ্যতার শুরু ২০০৭-৮ সাল থেকে। আর আঞ্চলিক সখ্যতার প্রথম প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে। আমাদের ১/১১ এর সময়ে তা “মাইনাস-টু” ঘটাতে হবে এমন নিয়ত নিয়েই শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই নিয়ত মাঝপথে হঠাৎ করেই হাসিনামুখি হয়ে যায়। হাসিনার হাতে ক্ষমতা দিয়ে কেটে পড়ার দিকে ১/১১ এর ক্ষমতাসীনরা তৎপর হয়ে পড়ে। কিন্তু আগেই বলেছি, সেসময়টা ছিল বুশের ওয়ার অন টেররের নীতির ব্যর্থতা থেকে আমেরিকার সরে আসার সময় কিন্তু এর বদলে নতুন “আরব স্প্রিং” এর নীতি তখনও ঠিক গুছিয়ে থিতু হয় নাই। ফলে ভারতের সাথে আমেরিকার সখ্যতার নীতিটা দাড়িয়েছিল ওয়ার অন টেররের ব্যর্থ নীতির অপসৃয়মান আলোছায়ায়। ফলে সখ্যতা আসলে দাড়িয়েছিল এক তথাকথিত কমন ‘সিকিউরিটি ইন্টারেস্ট’ এর উপর। ওয়ার অন টেররের নীতির বৈশিষ্ট হলঃ ইসলামের কোন রূপের রাজনীতির সাথেই সখ্যতা নয়, বরং ইসলামের সকল প্রকার অভিপ্রকাশ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ, ইসলামকে বিশ্বসভ্যতার খাতা থেকে মুছে দেওয়া। বিপরীতে “আরব স্প্রিং” ধরনের নীতির বৈশিষ্টটা হলঃ বিশেষ ধরনের (“আরব স্প্রিং”) ইসলামি রাজনীতির সাথে সখ্যতা, বাকি সব রূপের ইসলামি রাজনীতির সাথে আগের মতই বিরোধিতা, উৎখাত, দমন, নির্মূল ইত্যাদি। তবে তা অবশ্যই আর যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে “ওয়ার অন টেরর” শ্লোগান না দিয়ে, লো প্রোফাইলে।
কিন্তু ভারতের দিক থেকে আমেরিকা “ওয়ার অন টেরর” মোডে থাকলেই দিল্লীর – বিশেষত কংগ্রেসের বেশি পছন্দের। ফলে ২০০৭-৮ এর পর থেকে আমেরিকা যতই নতুন “আরব স্প্রিং” এর নীতিতে থিতু হয়েছে, ইসলামকে একাট্টা গণ্য করে এর সকল রূপের বিরুদ্ধে লড়বার নীতি থেকে সরে এসেছে, ততই সেটা ভারতের সাথে সখ্যতার নীতিতে একটা খচখচে কাঁটা হয়ে উঠেছে। তবে আমেরিকা-ভারত সখ্যতার মধ্যের মূল কাঁটা এটা নয়। নতুন আরও বড় কাঁটা পরবর্তীতে হাজির হয়।
আগে একটা কথা বলে নেয়া ভাল, দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে (চীন) ঘায়েল করা – কথাটা বলা যত সহজ বাস্তবে তা ঘটানো আমেরিকার জন্য এত সরল সিধা ব্যাপার নয়। ঐ রিপোর্টের ইঙ্গিত অনুযায়ী, একালে চীন-আমেরিকার এই পরাশক্তিগত নতুন টেনশন, প্রতিযোগিতা ইত্যাদি ঘটছে ২০০১ সাল পরবর্তী গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভুমিতে। এটা কোনভাবেই আর আগের ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ের (১৯৫০-৯০) আমেরিকা-রাশিয়া দুই ব্লকে বিভক্ত দুনিয়ার টেনশন প্রতিযোগিতার মত নয়, কোন অর্থেই। কারণ, ঐ ব্লক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট ছিল, দুই ব্লক মানে দুটা আলাদা অর্থনীতি। আলাদা বলতে, এই দুই অর্থনীতিতে পরস্পরের মধ্যে পণ্য লেনদেন বাণিজ্যসহ কোন প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, ফলে কোন নির্ভরশীলতা সরাসরি প্রায় ছিল না বললেই চলে – এমনই আলাদা। উভয়ের মধ্যে পুঁজির চলাচল, প্রবাহ, কোন বিনিয়োগ সম্পর্ক একেবারেই ছিল না। এমনকি এটা কেবল রাশিয়ার (ততকালীল ইউএসএসআর) মধ্যেও সীমাবদ্ধ তো নয়ই; রাশিয়ান ব্লকের কোন দেশকে (যেমন পোল্যান্ড) আইএমএফ লোন দিতে চাইলেও আমেরিকা তা নাকচ করে দিয়েছিল এমন রেকর্ড আছে। এমনই দুটো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত টিকে ছিল ব্লক রাজনীতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, এটাই ছিল পুরা স্নায়ু যুদ্ধের মৌলিক বৈশিষ্ট। বিপরীতে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়ার সময় থেকেই দুটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ধরনের অবস্থানের যুগের শেষ হয়। এরপর থেকে আজকের গ্লোবাল অর্থনীতি মানে সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল পুঁজির অধীনস্থ ও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত; পরস্পর নানান সম্পর্কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তবে ওর ভিতরেই পরস্পরের স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতা লড়াইয়ে ঝগড়ায় সবাই নিয়োজিত। অর্থাৎ আমেরিকা-রাশিয়ার দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অর্থনীতির টেনশন প্রতিযোগিতার বিপরীতে একালে আমেরিকা-চীনের মধ্যেও ক্রম-উদীয়মান টেনশন প্রতিযোগিতা অবশ্যই আছে কিন্তু এবার এরা দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অর্থনীতির নয় বরং উভয় অর্থনীতি দুনিয়া জোড়া একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ ও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। চীন আর আমেরিকার মধ্যে এমন নতুন সম্পর্কের সুত্রপাত বা খাতা খোলা অনেক পুরানো, সেই ১৯৭১ সাল থেকে এর পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। পরস্পরের কুটনৈতিক, সামরিক ও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের কথা মনে রেখে নানান চুক্তি, আইন-কানুন স্থির করা এবং সেগুলোর সুরক্ষাকবচ ঠিকঠাক করে আমেরিকান নেতৃত্বে পুঁজির প্রবাহ ঢেলে চীনকে সাজানোর একটা লম্বা প্রস্তুতি পর্ব পার করে আসতে হয়েছে। আজকে যে চিন আমরা দেখছি, সেই চিন গড়তে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক সময়ে কেটে যায় ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এরপর আমেরিকান পুঁজিবাজারের প্রতীকি কেন্দ্র ওয়াল ষ্ট্রিট নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে পুঁজির প্রবাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে। এর পরিণতিই আজকের রাইজিং ইকোনমির চিন। দুনিয়াজুড়া একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ হয়ে এক নতুন গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়ে চীন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
কিন্তু এর ফলে একইসাথে নতুন পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার পরিগঠনের পার্শ্বফল হিসাবে নতুন এক স্ববিরোধী দিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাজির হয়। আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থ আর আমেরিকান ওয়াল ষ্টিটের স্বার্থ আর একতালে না থেকে ক্রমশ সংঘাতমূলক চরিত্র নিয়ে হাজির হতে শুরু করে। যেমন, নিজে ফুলে-ফলে রাইজিং অর্থনীতির হিসাবে চিনের উত্থান এক বিশাল সম্ভাবনা যা আসলে ক্রমশ পুঞ্জীভুত ও আকারে বেড়ে ওঠা গ্লোবাল পুঁজির প্রতীকি কেন্দ্র ওয়াল ষ্ট্রীটের ফুলে ফেঁপে উঠা, বিশ্বপুঁজির নিজেরই সম্ভাবনা, ফলে তা ওয়াল স্ট্রিটের কাছে আদরণীয়। সম্ভাবনা এজন্য যে, পুঁজির আদি ও ইন্টিগ্রাল স্ববিরোধ হল একদিকে মুনাফাসহ ফিরে আসা পুরান বিনিয়োগ এবার আকারে বড় হবার কারণে সবসময় আরও নতুন বড় বিনিয়োগের বাজার আকাঙ্খা ও দাবী করে। কিন্তু বিনিয়োগ বাজারকে সঙ্কুচিত করে ফেলার কারণ সে নিজেই। কারণ বাজার থেকে যতই যে বড় করে মুনাফা তুলে আনে তত পরিমাণই সেটা বাজারের ভোগ/চাহিদা (ফলে নতুন উতপাদন/বিনিয়োগের বাজার) কমিয়ে ফেলে। এই স্ববিরোধে হয়রান হয়ে এটা সে সমাধানের উপায় খুজে সবসময় নতুন আন-এক্সপ্লোরড বাজার (সাধারণত কোন ছোট হয়ে থাকা অর্থনীতির রাষ্ট্রে নতুন করে) যোগাড়ের তালাশে। যদিও সেখানেও আবার সমস্যা হলো, যেহেতু সেটা নিজ রাষ্ট্র নয় ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ফলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে নাকি ঐ রাষ্ট্র কোন এক পর্যায়ে বিনিয়োগ মালিকানা তার নিজের জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রীয়করণ করে ফেলে কি না এও এক বিশাল টেনশন। এসব বিচারে আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের চোখে চিন লকলকে লোভে লোভনীয় এক বাজার। তার ক্রম-পুঞ্জিভুত আকার বেড়ে চলা পুঁজির আয়ু, টিকে থাকার সম্ভাবনা। তবে নিজের বিনিয়োগ নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি, আইনকানুন, আন্ডারষ্টাডিং ঠিকঠাক করতে প্রথম বিশ বছর (১৯৭১-৯০) কেটে গিয়েছিল।
কিন্তু আবার রাইজিং ইকোনমির চিনের এই পরিণতিতে রাষ্ট্র হিসাবে আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্য তা প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিও হয়ে উঠছে। এই দিক থেকে আমেরিকান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রীটের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রবলভাবে পরস্পর বিরোধী। চীন রাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হলে আমেরিকান রাষ্ট্র এতে তার বিপদ দেখে আর ওয়াল ষ্ট্রীট মনে করে এতে তার কিছু আসে যায় না। গ্লোবাল লেনদেন বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করাতে আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৪ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ, ও মুদ্রার মান নির্ণয় (এটাই আইএমএফ প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট) ও বড় পুঁজি বিনিয়োগ বাণিজ্যের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ (এটাই বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট) ইত্যাদি নিশ্চিত করতেই গড়ে তোলা হয় আইএমএফ- বিশ্বব্যাঙ্কের মত প্রতিষ্ঠান। অথচ আজ ওয়াল ষ্ট্রিটই (তার হয়ে বিশেষ করে ‘গোল্ডম্যান স্যাসে’ কোম্পানী) চীন রাষ্ট্রকে বুদ্ধি পরামর্শ ও তাগিদ দিচ্ছে চিনের নেতৃত্বে নতুন করে আগামি বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক গঠন করে এগিয়ে যেতে।
কাজেই যেকথা বলছিলাম, আমেরিকার দুনিয়ায় একক পরাশক্তি হয়ে থাকার ভুমিকার জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন পরাশক্তিগুলোর উত্থান ঠেকানো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরোধ মীমাংসা কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের জন্য সরল কাজ নয়। ঠান্ডা যুদ্ধের কালের মত সরল কাজ ও সময় তো এটা নয়ই। তবু সরল নয় বলে ওবামার রাষ্ট্র তো চুপ করে বসে থাকতে পারে না। যতদুর সম্ভব প্রাণপণ চেষ্টা করছে, করবে। তাই, দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে চিন ঘায়েল করে দাবড়ানোর চেষ্টা – আমেরিকার বিদেশনীতিতে দ্বিতীয় ইস্যু বা মূল বৈশিষ্ট এটাই। যতোই পুঁজি গ্লোবাল আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে ততোই শক্তির ভারসাম্য ওয়াশিংটন থেকে সরে ওয়াল স্ট্রিটে পুঞ্জিভূত হচ্ছে। নিজের এই আভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি চিনের উত্থান বিরোধিতা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিদেশনীতিতে এই দ্বিতীয় ইস্যু যাত্রা শুরু করে ২০০৭ সালে থেকেই। কিন্তু থিতু হয়ে আরও গোছানো ভার্সনে প্রবলভাবে প্রয়োগে আসা শুরু করে ২০১১ সালের শুরুতে। নতুন এই ভার্সনে এবার ঠিক আগের মত আর চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে পিঠে হাত রেখে আদর বা কোলে তুলে নেয়া নয়। বরং চীন-ভারত দুই রাইজিং ইকোনমির বিরোধ বা দ্বন্দ্বের মাঝে অবস্থান নেয়া যাতে নিজের একটা ভারকেন্দ্র বা ভারসাম্যের ভুমিকা নিশ্চিত করা যায়। আর সেকাজের উপায় বা টুল হিসাবে এশিয়ায় নিজের সামরিক উপস্থিতি ঘটানো ও ব্যবহার করা।

ফলে এর দুটো প্রকাশ আমরা দেখি। এক. চীনের নৌপ্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত নৌসামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে আমেরিকার তৎপর হওয়া। আসলে এটা চিনের অর্থনীতির লাইফ লাইন; মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানী তেলসহ কাঁচামাল আনা আর নিজের পণ্য বিতরণ ইত্যাদির মুখ্য লাইন। আর দুই. বাংলাদেশকে তার রাজনৈতিক ও সামরিক স্ট্রাটেজির গুরুত্ত্বপুর্ণ গুরুত্বপূর্ণ এক অপারেশনাল কেন্দ্র বানানো। ম্যাপের দিক তাকালে আমরা দেখব বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান চীন-ভারতের মাঝখানে। আগে আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট বা আমাদের হিসাবে যেটা ওদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেখানে বাংলাদেশ ডেস্ক বলে আলাদা কিছু ছিল না; ইন্ডিয়ান ডেস্কেরই অন্তর্গত ছিল বাংলাদেশ। নীতির নতুন পর্যায় বা গুরুত্বের কারণে এবার ২০১১ সাল থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ ডেস্ক খোলা হয়। আর নৌ-উপস্থিতির কারণ ঠিক কোন যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া নয়। বরং চিনের অর্থনৈতিক উত্থানের ফলে পরাশক্তিগত বা ষ্ট্রাটেজিক উৎকণ্ঠার কারনে এশিয়ার ছোট ছোট রাষ্ট্র ভীত হতে পারে এই আগাম অনুমানে ভীতুদের কাছে “অভয়” বিক্রি করা। বিনিময়ে তাদেরকে নিজের বলয়ে আনা, নিজের ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার বানানো। এজন্য আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতিতে নতুন এক বয়ান হাজির হয় “পার্টনারশিপ ডায়লগ”। এই অঞ্চলের সবদেশের সাথে আমেরিকা “পার্টনারশিপ ডায়লগ” নামে চুক্তির জন্য তৎপর হয়ে উঠতে দেখছি আমরা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই “পার্টনারশিপ ডায়লগ” বিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী। ধরনের দিক থেকে “পার্টনারশিপ ডায়লগ” এর ফোকাস অর্থনৈতিক নয়, বরং ষ্ট্রাটেজিক, অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামরিক।
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন মাত্রা ও যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সাল থেকে। তখন থেকে অস্ত্র, পারমানবিক সরঞ্জাম, সূক্ষ্ম বা প্রিসিশন টেকনোলজি ইত্যাদি পাবার বিষয়ে আমেরিকার সাথে বিবিধ লোভনীয় চুক্তি ও বিশেষ সুবিধা ভারত পেয়ে আসছে । আবার, অন্তত ১৭-১৮ টা বিষয়ে আলোচনা ডায়লগ করার জন্য জয়েন্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জাতীয় কমিটি গঠন ও পরস্পরের সুবিধা অসুবিধা আলাপ আলোচনা করে সহযোগিতার একক নীতি তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। “পার্টনারশিপ ডায়লগ” বিষয়ে আলাপও হয়েছে, কিন্তু ভারত “পার্টনারশিপ ডায়লগ” চুক্তিতে এসেছে বলে স্পষ্ট জানা নাই। অথবা হলেও ওর অগ্রগতি নাই। এর মূল কারণ, আমেরিকার বিদেশ নীতির যে দুই ইস্যু বা বৈশিষ্ট নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম শুরুর চার বছরের মধ্যে ২০১১ সালের পর থেকে এটা আর তেমন স্বাদের নয় বলে ভারতের দিক থেকে অনুভুত হতে শুরু করে। দিল্লির দিক থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রচনায় অস্বস্তির মুল কারণ অনেকগুলো। যেমন,
এক. ওয়ার অন টেরর থেকে সরে সহনশীল একটা ইসলাম বা আরব স্প্রিং এর দিকে আমেরিকার ঝুঁকে পড়াটা ভারতের কাছে ঠিক আগ্রহের নয়। বুশের হকিশ বা বাজপাখি যুদ্ধবাজ লাইনের ওয়ার অন টেরর ভারতের বেশি পছন্দের।
দুই. চিনের ভয়ে বড়ভাই আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা, আমাদের মত দেশকে যাতা দেবার কাঠি দিল্লিকে একচ্ছত্র ভাবে ব্যবহার করতে দেওয়া তা খুবই উপভোগ্য ছিল। এই সময় মার্কিন নীতি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় “নিরাপত্তা নীতিতে” দিল্লীর চোখে দেখা নীতিই মার্কিন নীতি। দিল্লির কাছেও তাই এই নীতি লোভনীয় ছিল।

কিন্তু ২০১১ এর পর থেকে ওয়াশিংটনের দিল্লির হয়ে এই অঞ্চলে নিজের স্বার্থ দেখার নীতি থেকে সরে আসতে শুরু করে। বরং স্বরূপে দক্ষিণ এশিয়ায় হাজির থাকা এবং ওর মধ্য দিয়ে নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক সামরিক এলিমেন্ট চর্চা শুরু করে – এটা দিল্লির জন্য জন্য অস্বস্তির কারণ। বলতে গেলে মিঠা ফল আমেরিকা ক্রমশ তিতা লাগতে শুরু করে ভারতের কাছে। বিরোধ ও অস্বস্তি ফেটেফুটে প্রকাশ হয়ে পড়ার ঘটনাটা ঘটে গতবছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওদিক কূটনৈতিক পর্যায়ে দেবযানী খোবরাগোড় এর ইস্যুতেও। এককথায় বললে দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির একচ্ছত্র আধিপত্য ওয়াশিংটন মেনে নিক দিল্লি সবসময়ই এটা আকাঙ্খা করে। ওয়াশিংটন ভারতের চোখ দিয়ে নিজের স্বার্থ দেখুক, ভারতকে এ অঞ্চলের সর্দার বানাক এমনটাই ভারতের সবচেয়ে পছন্দের। এই সম্পর্কের চর্চা বেশ কিছুকাল চললেও ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা আর সেজায়গায় থাকতে চায়নি বা পারেনি। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে নৌ ফ্লিট নিয়ে উপস্থিত থাকবার আমেরিকান আকাঙ্খাটা প্রকাশ হয়ে পড়ার পর থেকেই দিল্লি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছে। তার নিজের ষ্ট্রাটেজিক ও সামরিক স্বার্থের দিক থেকে একে সংঘাতসংকুল বলে মুল্যায়ন করতে ও সতর্ক হতে শুরু করেছে। সার করে বললে, এই অঞ্চলে চীনের পরাশক্তিগত উত্থান ইস্যুতে একসাথে কাজ করা পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ নিজে সরাসরি দেখভাল করবে, দিল্লী একে বিপদ হিসাবেই দেখতে শুরু করে। কারণ এর ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এতে দিল্লীর ভাগে টান পড়ে, একটা বড় ধরণের পরিবর্তন এতে অনিবার্য হয়ে ওঠে।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল, ২৮ মার্চ ২০১৪।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত,চিন,রাশিয়া ও আমেরিকা (১)
গৌতম দাস || Friday 28 March 14 |
http://chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/268/ ]

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২), দ্বিতীয় কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২)

ভারতের নির্বাচন ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বদলের সম্ভাবনা

গৌতম দাস

https://wp.me/p1sCvy-2g

১ এপ্রিল ২০১৪

ভারতে নতুন নির্বাচন আসন্ন। দুমাস ধরে নয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে তা ফলাফল ঘোষণাসহ শেষ হবে মে মাসের ১৬ তারিখে। এপর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে একের পর এক প্রকাশিত একজিট পোলগুলো বলছে, ৫৪৩ আসনের আইনসভায় (লোকসভা) সরকার গড়তে দরকার ২৭২ আসন। কিন্তু কংগ্রেস ও তার জোট ইউপিএ মিলিয়ে তার ভাগ্যে জুটার সম্ভাবনা মাত্র ৯৮-১০২ আসন, অর্থাৎ ১০০ আশেপাশে, এর বেশি নয়। ফলে ইউপিএ এর সরকার যে হচ্ছে না এখন পর্যন্ত সবগুলো এক্সিট পোলই সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সোজা মানে আমেরিকার সাথে (কংগ্রেস দলসহ) ভারত সরকারের গত সাত বছরের যে সখ্যতা ও সর্বশেষ বিরোধের সম্পর্ক – তা কোনভাবেই আর আগের জায়গায় থাকছে না, এতে পালাবদল আসন্ন। বাংলাদেশে একমাত্র ভারতের সমর্থনের হাসিনার সরকার, এর প্রধান খুটি যা, বাইরের সমর্থনের দিক থেকে তা এই প্রথম ভীষণ নড়বড়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে শুরু করেছে। তাহলে কি বিজেপির নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসছে? না তাও একেবারে নিশ্চিত করতে পারেনি কোন একজিট পোল। সবগুলো একজিট পোলের ফলাফলে দেখা গিয়েছে বিজেপি জোটে ২৩৩ আসনের নিচে থেকেছে এই পর্যন্ত। [এখানে দেখুন,] আবার ১৬ তারিখের পর আসল ফলাফলে কোন কারণে এটাও যদি না হয় তবে ১৯৯৬ সালের দেবগৌড়ের সরকারের মত আঞ্চলিক দলগুলোর জোট ক্ষমতায় আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারতে এক দুর্বল সরকার মানে দুর্বল রাজনৈতিক কর্তৃত্ত্বের সরকার গঠিত হবে সন্দেহ নাই। এসব দিকে নজর রেখে আমেরিকার সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের অঞ্চলের ডেস্কের নিশা দেশাই সপ্তাহ তিনেক আগে বিজেপির মোদির সাথে বিস্তারিত আলাপ করতে এসেছিলেন। (যদিও সফরের প্রকাশ্য মূল এজেন্ডা ছিল ভারতের ট্রেড বিষয়ক বিরোধগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে কথা বলা।) ঘটনা শেষ পর্যন্ত যাই দাঁড়াক, এবার আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যে ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর সুবিধা পাবে, পশ্চিমা স্বার্থের সাথে সমন্বয় করে হাজির হতে সুযোগ পাবে তা বলাই বাহুল্য। অন্ততপক্ষে আমেরিকা ও ভারত উভয়ের বাংলাদেশ নীতি নতুন ভারসাম্য পরিস্থিতি নতুন করে রচিত করার সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। কংগ্রেস সরকারের সাথে মুখোমুখি বিরোধে জড়িয়ে তা যতটা সংঘাতপুর্ণ বা অকেজো হয়ে আছে তা নতুন রাস্তা নিবে। কারণ ভারতের এই নির্বাচনের ফলাফলে যে কোন অ-কংগ্রেসী সরকার গঠিত হলে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে গত তিন-চার বছরে যুক্ত হওয়া নতুন বাস্তবতা, নতুন করে হাজির হওয়া উপাদানগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভারসাম্যে রচিত হবে সন্দেহ নাই। উভয় রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতির কমন ভিত্তি খুজে বের করা ও রচনা হবে। অন্তত কংগ্রেস সরকারের মত “যেকোনভাবেই হোক আমার হাসিনা সরকারকেই চাই” এই জবরদস্তিমূলক অবস্থানে আর থাকছে না। এটা অবস্থাদৃষ্টে পরিস্থিতি যেদিকে বিকশিত ও মোচড় নিচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে এক অনুমান মাত্র। তবে একেবারেই হাওয়াই অনুমান নয়। এই অনুমানের পিছনের একটা বড় কারণ, মোদি এবং এবারের মোদির বিজেপির নীতি (তুলনায় ওল্ড হাগার্ড আদবানির বিজেপি নয়)।

মোদির বিজেপি কেমন নীতি ক্ষমতা নিয়ে হাজির হতে পারে
বিজেপি “সেকুলার” নয় অথবা মুসলমান-বিদ্বেষী এই অভিযোগ মোদি এই নির্বাচনে সিরিয়াস আমলে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। মোদি ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন “বল্লভ ভাই প্যাটেলের মত তিনিও সেকুলার”। [দেখুন,] প্যাটেল কে ছিলেন? স্বাধীন ভারতে ১৯৪৭ এর আগষ্টের পর নেহেরুর প্রথম সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন প্যাটেল। এই “প্যাটেলের সেকুলার” কথার অর্থ তাতপর্য কি তা নিয়ে আলাদা কোথাও বিস্তারে আলোচনা করতে হবে। আপাতত সংক্ষেপে – কংগ্রেস ও বিজেপি এবারের নির্বাচনে কমন যে ইস্যুতে বিতর্কে লিপ্ত তা হল, ভারতের অখন্ডতা। সব জনগোষ্ঠীকে এক ভারতে ধরে রাখা এই সুত্রে অখন্ডতা আলাপ। আর এক ‘সেকুলার ভারত” এটা ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য নাকি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। এই হলো অখন্ডতার আলাপের মধ্যে সেকুলার শব্দটা ঢুকে পড়ার সম্পর্ক সুত্র। বুঝাই যাচ্ছে এসব কথাবার্তাগুলো আসলে সমস্যার মুল এড়িয়ে শব্দের ফুলঝরি বা রেঠরিক। যেভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন করে আরও ভাগ টুকরা করে নতুন নতুন রাজ্য গঠনের দাবী বেড়েই চলেছে (এক পশ্চিমবঙ্গকেই আরও দুই তরফে আরও নতুন দুই ভাগে ভাগ করার দাবী আছে) এই ফেনোমেনার মুল তাতপর্য হল, ক্ষুদ্র (উত্তরপুর্ব ভারত) অথবা বড় (দক্ষিণ ভারত) ধরনের জনগোষ্ঠিগুলোকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা। এককথায় বললে এগুলো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপ্রতিনিধিত্ত্ব করে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। প্রায়ই “বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন” নাম দিয়ে এগুলোকেই নেতিবাচক লক্ষণ বা ফেনোমেনা বলে এমন বয়ানে চিনানোর চেষ্টা হতে দেখি আমরা। এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথাও তৈরি আছে যার হদিস নাগাল করার জন্য পাবার জন্য এগুলো মূলত ক্ষমতায় উপযুক্ত অংশীদারিত্ত্ব না পাওয়া অথবা শ্রুত হবার জন্য বঞ্চিত জনগোষ্ঠির আর্তনাদ। নিজের উপর এই ফেটিস বা ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দানবীয় শাসন এরা টের পায় কিন্তু সেক্ষমতাকে ধরতে পারে না, ভাগ পায় না। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় সে অপ্রতিনিধিত্বশীল থেকে যায়। কিন্তু কথার মারপ্যাচে ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্বশীলতার সব সমস্যাগুলোর সমাধান যেনবা সেকুলারিজম – এমন এক ইঙ্গিত দিয়ে সমস্যাকে ঝুলিয়ে বা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায়। ফলে “সেকুলারিজম” বলে বয়ানের আড়ালে বাকচাতুরি রেঠরিকে কংগ্রেস-বিজেপির মিছা লড়াই চলতে থাকে। বিগত ত্রিশ বছরে ধরে একনাগাড়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়ে আসছে কেবল আঞ্চলিক দলের সমর্থনে, কোয়ালিশনে। সাধারণভাবে কোয়ালিশন সরকার মানেই তা খারাপ লক্ষণ তা বলা হচ্ছে না। খেয়াল করতে হবে এটা বিজেপি বা কংগ্রেসের মত তথাকথিত সর্বভারতীয় দলগুলোর পরস্পরের কোয়ালিশন নয়। বরং বিজেপি বা কংগ্রেসের সাথে “আঞ্চলিক দলের” কোয়ালিশন। এটাই ভারতের অখন্ডতা সমস্যার মূল দিক, মৌলিক বিপদ। কংগ্রেস বা বিজেপি নিজেদের সর্বভারতীয় দল দাবী করে আসলেও তাই এর অন্তর্সারশুণ্যতা এখানেই। পুরা দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক দলের প্রভাব একচেটিয়া, একনাগাড়ে এবং বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরের। “আঞ্চলিক দল” এই ফেনোমেনোটার অর্থ তাতপর্য কি? এককথায় বললে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীভুত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। নেহেরুর ভারত রাষ্ট্র গঠনতান্ত্রিকভাবে ১৯৪৮ সালের শুরু থেকেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত ও কুক্ষিগত করে রাখতে হবে, একমাত্র তাহলেই অখন্ড ভারত রাখা যাবে, বিশাল ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে – এই নীতিতে রাষ্ট্র গঠন করে রাখা হয়েছে। অথচ নানান আঞ্চলিক দলের উত্থান ফেনোমেনো চোখে আঙুল দিয়ে বারবার বলছে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার রাষ্ট্র নয় ফেডারল ধরনের রাষ্ট্রক্ষমতাই এর একমাত্র সমাধান। এই প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নিতে হবে কখনও। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ যেটা – বাইরের পড়শি রাষ্ট্র, “সীমাপাড়-কী আতঙ্কবাদ” এগুলোই নাকি ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যা তৈরি করছে, এগুলো নাকি বাইরের তৈরি, মুসলমানদের তৈরি ফলে ‘সেকুলারিজম’ এর সমাধান এমন মুলা ঝুলিয়ে মূল সমস্যা ‘ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীলতা” এদিকটাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা তৈরির পথ চালু রাখা হয়েছে। আর এব্যাপারে কংগ্রেস ও বিজেপির মৌলিক মিল আছে, যদিও সমাধান প্রশ্নে অবস্থান ভিন্নতা আছে। যেমন, বিজেপি এপর্যন্ত ব্যাখ্যা করে এসেছে এর সমাধান “হিন্দু জাতিয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্য” আর কংগ্রেস দাবী করেছে সেকুলারিজমের ঐক্য এই বয়ানের আড়ালে আর এক ব্রান্ডের হিন্দু জাতিয়তাবাদ। উভয় দলের মিলটা হল কেউই রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতা গঠনের ভিতরেই যে সমস্যা সেদিকটা নিয়ে সরাসরি আলাপ তুলতে সাহস রাখে না। সমস্যাটা নাকি রাষ্ট্রের বাইরে থেকে আসছে এই দাবির ব্যাপারে উভয়ে একমত। এরা অস্বীকার করতে চায় সমস্যা রাষ্ট্রের বাইরে থেকে তৈরি করা, উস্কানি দিবার চেষ্টা থাকতেই পারে থাকবে কিন্তু এটা তখনই ইস্যু হবে, খচখচে কাঁটা হয়ে উঠবে যদি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা গঠনে সমস্যা থাকে, ক্ষমতা অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকে। পঞ্চাশ রাজ্যের ফেডারল রাষ্ট্র আমেরিকার অখন্ডতাকে কি বাইরের শত্রু রাষ্ট্রের উস্কানি দিয়ে ভেঙ্গে দিবার মত শত্রু রাষ্ট্রের অভাব আছে, না কি কোন কালে ছিল? কিন্তু কখনই আমেরিকা তা অনুভব করে নাই কেন?
বড় ভুগোল, বড় জনসংখ্যা, ভিতরে অনেক ধরনের আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত বিভক্তি-চিহ্ন এবং বড় অর্থনীতি ইত্যাদি পরিস্থিতিতে ঐ দেশের জন্য একে এক রাষ্ট্রে সংগঠিত করতে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রক্ষমতা গাঠনিক দিক থেকে দেখলে এপর্যন্ত সারা দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভাল রাষ্ট্র অভিজ্ঞতা হলো আমেরিকান রাষ্ট্র, ফেডারল ভিত্তির রাষ্ট্র। ফেডারল ধরণের রাষ্ট্র কথাটা বিস্তার করতে পারলে ভাল হত। প্রসঙ্গ অন্যদিকে চলে যাওয়া এড়াতে সংক্ষেপে কেবল বলব, একে বুঝবার জন্য আইন পরিষদ ( আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদ বা আমাদের সংসদ) থাকার পরও কোন আইন সংসদে পাশ হবার পর তা আবার সিনেটেও পাশ হতে হবে, কারা এই সিনেট গঠন করেছে এদিকটাসহ ফেডারল রাষ্ট্রে ক্ষমতা গঠন নীতির দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। অনেকে তর্ক তুলতে পারেন ভারতে সিনেট নামে না থাকলেও রাজ্যসভা নামে তো কিছু আছে। এর জবাব হল, ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র ভুমিকা ২৭২ জন লোকসভার (সংসদ) সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু ফেডারল আমেরিকা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল আইনসভা (প্রতিনিধি পরিষদ) কেন্দ্রিক কোন একটা ক্ষমতা-কেন্দ্র নাই, ফলে সেখানে কেন্দ্রীভুতও নয়। তাই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতাগঠন প্রক্রিয়া ও কাঠামো এক ভুতুড়ে অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাই তৈরি করবে সবসময়, এপর্যন্ত করে এসেছে। ফলে একই মাত্রায় তা বিরোধ সংঘাতে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে পড়ার বিপদ মাথায় নিয়ে ঘুরবে। এর আদি পাপ ১৯৪৭ সালে অখন্ড ভারত গঠন কাঠামোর মধ্যে যেখানে মুল যে বিষয়ে জোর দেয়া হয়ে হয়েছিল তা হলো নির্ভেজাল একছত্র “বলপ্রয়োগ”। আমাদের অনুমান থাকতে পারে যে বৃটিশ ভারত বোধহয় অখন্ড কিছু একটা ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন বৃটিশরা ছেড়ে যায় তখনও ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ৫০০ রাজার রাজ্যকে ইন্টিগ্রেট করে অখন্ড ভারত খাড়া করার বিপদ নেহেরুকে মোকাবিলা করতে হয়। এর মুল নীতি ছিল বলপ্রয়োগ; স্ব-ইচ্ছার ইউনিয়নও নয়, ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বশীলতার প্রশ্ন সেখানে নির্ধারক নয়। নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্ত্বে গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেল ছিলেন ওই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থাৎ বলপ্রয়োগ ঘটাবার কাজটা তাকেই করতে হয়েছিল। একটা উদাহরণ দেই। যেমন, এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ যা হায়দ্রাবাদকে রাজধানী করে পুনগঠিত হয় ১৯৪৭ সালের পরে। কিন্তু কেবল ঐ হায়দ্রাবাদ আসলে ছিল এক রাজার রাজ্য। এই রাজ্যের নিজাম (রাজা) বৃটিশ করদ দেয়া শর্তে স্বাধীন রাজার রাজ্য ছিল। হায়দ্রাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে অখন্ড ভারত বানাতে গিয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে যেতে হয়েছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলকে। বলপ্রয়োগ আর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এই ছিল তর্কের বিষয় – এনিয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এতকিছু শব্দ থাকতে ‘কমিউনিষ্ট’ কেন? নেহেরুকে যেখানে ‘প্রগতিশীলেরা’ কমিউনিষ্ট না হলেও সমাজতন্ত্রী বলেই চিত্রিত করতে পছন্দ করে দেখা যায়!

এর সংক্ষিপ্ত জবাব ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লবের পর রাষ্ট্র গঠনে লেনিনকে নানান জাতিগোষ্ঠিকে (যেগুলো আসলে ছিল রাশিয়া ও এর পড়শি জার সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা নানাঞ্জনগোষ্ঠি) ঐ রাষ্ট্রে ইন্ট্রিগ্রেশেন যা মুলত ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা তা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। নেহেরুর মন্ত্রী প্যাটেলের মতই লেনিনের মন্ত্রী (রুশ ভাষায় commiserate বা মন্ত্রণালয়ের কমিসার বলা হত) ছিলেন জর্জিয়ান জোসেফ ষ্টালিন। ষ্টালিনীয় নির্মম বলপ্রয়োগ তা ঘটানো হয়েছিল। [যদিও লেনিনের নীতিগত অবস্থান ছিল, জনগোষ্টিগত উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিরোধ সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সমর্থন করতে হবে। কিন্তু এটা নীতিগত। ষ্টালিনের হাতে বাস্তবে প্রয়োগে এটা যা দাড়িয়েছিল এর সাথে লেনিনের নীতির আর কোন সামঞ্জস্য খুজে পাওয়া যায় নাই। বিপ্লব ঘটেছিল কেবল রাশিয়ায়। কিন্তু একছত্র ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে দানবীয় করতে রাশিয়ার তথাকথিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পড়শি পর পড়শি রাষ্ট্র বা অঞ্চল জোড়া দিতে দিতে সীমান্ত বাড়িয়ে সেই রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন নাম ধারণ করে। এই পড়শি জোড়া দেয়া ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল, একই সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে তবে সাইজ সীমান্ত বাড়িয়ে, থামে নাই। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে ছত্রাখান হয়ে পড়ার পর এবার এতদিন জোর করে দাবিয়ে রাখা জাতিগত প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা ফেটে প্রকাশিত হয়তে শুরু করে। উলটা পথ, আবার ম্যাপ সীমান্ত আঁকা। ষ্টালিনের শখের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার তা ছোট্ট রাশিয়া হয়ে যায়। আলাদা দুই রাষ্ট্র হয়ে ষ্টালিনের জর্জিয়া লেনিনের রাশিয়ার সাথে এখন সীমান্ত যুদ্ধে লিপ্ত। কসোভো, বসনিয়া এবং এমনকি হাল আমলের ইউক্রেন বা ক্রিমিয়া এভাবে প্রতিটা সমস্যার আদি গোড়া একটাই -ভুতুড়ে রাষ্ট্রে “বলপ্রয়োগে ইন্ট্রিগেশন” -জবরদস্তি। আমেরিকা ফেডারেল রাষ্ট্রের জন্ম ১৭৭৬ সালে। কিন্তু কেউই রাষ্ট্রগঠন ইতিহাসের এই গুরুত্বপুর্ণ অভিজ্ঞতাকে আমল করে নাই; না সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভারত।] সেই সুত্রে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের সেকুলারিজমের বিপরীতে বিজেপির মোদির নির্বাচনী কালার ‘প্যাটেলের সেকুলারিজম’ কথার অর্থ তাতপর্য এখন থেকে পাওয়া যেতে পারে। আকার ইঙ্গিত রেঠরিক বাকচাতুরি যে যতই করুক মুল কথা ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডিয়া বা অখন্ড ভারত ধরে রাখা। কিন্তু কি ভিত্তিতে সেটাই মূল প্রশ্ন। অথচ এটাই ভারত রাষ্ট্রের মাথার উপর সবসময় টিকটিক করা বিখন্ড হয়ে পড়ার বিপদ – এটাই নানান ইঙ্গিতে নানান ছলে ইস্যু হিসাবে এই নির্বাচনে হাজির – বিজেপি ও কংগ্রেস রেঠরিক নানা কথার টোপড়ের আড়ালে এর স্বীকৃতি দিচ্ছে।

কিন্তু এবারের নির্বাচনের আর একটা দিক, ভারতের মুসলমান ভোটাররা আর একটা ফ্যাক্টর হয়ে হাজির, এই অর্থে যে মুসলমানেরা আর ‘সেকুলার ভারত’ এমন কথার লোভে কংগ্রেস বা কমিউনিষ্টদের কনষ্টিটুয়েন্সি হয়ে থাকতে চাইছে না; এটা পরিস্কার। মোদি ও তার দল ইতোমধ্যে পাবলিক মিটিংয়ে মুসলমানদের কাছে শুধু মাফ চান নাই, শুধু একবারের মত সুযোগ যেন তারা দেয় এই আকুতি জানিয়েছেন। [“apologize to you by bowing our heads” দেখুন,]। পশ্চিমবঙ্গের মমতার মুসলিম কনষ্টিটুয়েন্সী হাসিল করার প্রচেষ্টাও প্রায় একই রকম।

মোদির নীতি ক্ষমতার সম্ভাব্য ফোকাস
মোদি বা বিজেপি প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে দিকটা নিয়ে কথা বলব সেটা আলোচনার সুত্রে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, একনাগাড়ে পরপর তিন টার্মের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। সারা ভারতে মূলত ব্যবসায়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি হিসাবে গুজরাতিদের একটা একক পরিচয় আছে। মোদি টাইটেলটাও এর সূচক। যদিও গত কয়েক বছরে তার পরিচয় ছাপিয়ে উঠেছে দাঙ্গায় মুসলমান হত্যার নেতা-লোক হিসাবে। কিন্তু একইসাথে তার গুজরাট মানে রাইজিং ইকোনমির গুজরাট। আর একাজে সে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে জাপান থেকে। তাঁর খাতির, সম্পর্ক বেশির ভাগটাই জাপানের পলিটিক্যাল ও বিজনেস এলিটদের সাথে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সে সরাসরি দাওয়াত দিয়ে গুজরাটে এনে সম্বর্ধনা দিয়েছে। এদিক থেকে যদি দেখি তবে গ্লোবাল পরিসরে তার রাজনীতিবোধটাকে বলা যায়, মুলত বিজনেস ওরিয়েন্টেড পলিটিক্স। শুধু জাপান নয়, একই সাথে চিন, জার্মান, ফ্রান্স, আমেরিকার সাথে মোদির গভীর সম্পর্কের দিকটা বুঝার জন্য এই আর্টিকেলটা মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। আবার, আসামের নির্বাচনী বক্তৃতায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আর চীন সীমান্তে অরুণাচলের নির্বাচনী বক্তৃতায় চীন প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন যা যুদ্ধবাজ বাজপাখী অথবা সাম্প্রদায়িক মনে হলেও তা রেঠরিক হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কারণ তিনি কিছুই না বললে সমালোচকরা সেটা নিয়েই কথা যাতে না তুলতে পারে তারই ব্যবস্থা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। [দেখুন,]
আবার আমেরিকার বিদেশনীতি বিষয়ক গুরুত্বপুর্ণ জার্ণাল foreignpolicy তে এক বিশেষ নিবন্ধে [দেখুন Decoding Modi’s Foreign Policy] দেখা যাচ্ছে মোদির নীতির ফোকাসের ব্যাপারটা তাদেরও নজরে এসেছে। বলছে, Despite his roots in a nationalistic, right wing BJP, the highlight of Modi’s foreign policy will likely be economics, and not security. While taking a rhetorical hard line on India’s national interests suits his political ideology, Modi appears to understand that as prime minister he will need to prioritize boosting trade and fixing India’s economy. নিজের দায়িত্বে বাংলায় বললেঃ “এক ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভিতর মোদির শিকড় পোতা থাকলেও তাঁর বিদেশনীতির বৈশিষ্ট হবে খুব সম্ভবত নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি। ভারতের জাতীয় স্বার্থ বিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে খাপখায় এমন হার্ডলাইনের রেঠরিক ঠাটবাট বাকচাতুরি তার আছে। কিন্তু মোদি বুঝে একজন প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে তাকে তাঁর কোন চাহিদাটা প্রধান করতে হবে আর সে প্রাধান্যের বিষয়টা হল, বাণিজ্যকে চাঙ্গা করা, ভারতের অর্থনীতিতে বাধা ও সমস্যাগুলোকে সমাধান করা”।
এখানেই বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির থেকে বিজেপির মোদির বড় নীতিগত পার্থক্য। যদিও মোদির সম্ভাব্য ভারতের জন্য কঠিন কাজটা রয়ে গেছে। সেটা হল, ভারতের সাথে আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ককে নিজের স্বার্থের দিক আমলে রেখে একটা ফাইন ব্যালেন্সের উপর দাঁড় করানো। এটা ঠিক আমেরিকা ও চীন এদের একের বিরুদ্ধে অন্যটাকে ব্যবহারও নয়, আবার কোনটাকে বাদ দিয়ে নয়। কংগ্রেসের ভারত যেটা করতে শোচণীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। [অবশ্য আমেরিকার উস্কানি লোভ দেখানিও ছিল।] এটাই এই অঞ্চলের আমাদের সবার জন্য সঠিক এক পদক্ষেপ হবে।
সংক্ষেপে একটা কথা বলে রাখি। বিজেপির পুরানা রাজনৈতিক লাইন – মুসলমান বিদ্বেষ কেন্দ্রিক হিন্দু জাতিয়তাবাদ – এর প্রতীকী নেতা হয়ে থেকে আছেন আদবানি, সাথে আছেন সুষমা স্বরাজ প্রমুখ। নরেন্দ্র মোদির ব্যবসা বা অর্থনীতি ফোকাসের লাইন এটাই আন্ত-পার্টি সংগ্রাম হিসাবে আদবানিকে পরাজিত করে ‘বিজেপি জিতলে মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন’ হিসাবে হাজির হয়েছে। এটা কেবল ফোকাস বা প্রাইয়োরিটি সরিয়ে আনা। এতটুকুওই বদল। তবু এই বদলটাই তাতপর্যপুর্ণ। বিশেষত বাংলাদেশের দিক থেকে। কারণ এটা কংগ্রেসের মত তথাকথিত নিরাপত্তা বিষয়ক যুদ্ধবাজ লাইনে ফোকাস নয়। তবে কোন কারণে মোদি সরকার গঠন পর্যন্ত পৌছাতে না পারলে বর্তমানে কোনঠাসা আদবানিরা পুরানা ফোকাসের বিজেপি আবার জেগে উঠবে বলে মনে হয়।


সবমিলিয়ে শেষ কথাটা হলো, ব্যবসায়ী মোদির সরকার যদি গঠন হতে সুযোগ পায় তবে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। বর্তমান কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতির ফোকাসটা হলো, সিকুইরিটি মানে তথাকথিত নিরাপত্তা। এককথায় বললে, এটা আসলে “মুই কি হনু রে” ধরনের পথে আশেপাশের সবাইকে দাবড়ে বেরিয়ে নিজের প্রিভিলেজ সুবিধাটা নিশ্চিত ও হাসিল করতে চাওয়া। বিপরীতে তুলনা করে বললে, মোদির লক্ষ্য ব্যবসা ও অর্থনীতিতে এক রাইজিং ইন্ডিয়া হাজির করা আর সেকাজে দলের পুরান ইমেজ পরিচয় মুসলমান বিদ্বেষী এক বিজেপি এই পরিচয়কে ফিকে করে ফেলা। একমাত্র একাজ করেই সে ভোটারদের মনে এই নতুন বিজেপির পরিচয়কে স্থায়ীত্ব দিতে চায়। পুরানো পরিচয়গুলোকে যেন ছাপিয়ে উঠে রাইজিং ইন্ডিয়ার মোদি ও বিজেপি। এমন এক ইঙ্গিত মোদি হাজির রেখে চলেছেন। সেটা শেষ পর্যন্ত কোথায় কি হয় সেটা অবশ্যই হতে দেখবার বিষয়, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদি তাঁর ইঙ্গিত সত্যি ও অর্থপুর্ণ হয়, সে প্রেক্ষিত মাথায় রেখেই বলেছি সেক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। তবে আমাদের জন্য মূল কথা হল, ঘটনা যেদিকেই যাক, বটম লাইন হল, সরকার বদলের সাথে বর্তমান ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে বদল আসছেই। তাতে অন্তত বাংলাদেশে ফ্যাসিজমের ভিত আলগা হচ্ছে। বাইরের গুরুত্বপুর্ণ সমর্থন নাই হয়ে যাচ্ছে, এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। “আমার হাসিনা সরকারই চাই” আগামি ভারত সরকারের এমন অবস্থান আর থাকছে না।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল, ২৮ মার্চ ২০১৪।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত,চিন,রাশিয়া ও আমেরিকা (১)
গৌতম দাস || Friday 28 March 14 |
http://chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/268/ ]
]