মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

গৌতম দাস

১২ আগষ্ট ২০১৯, ০০;০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Fc

[সার সংক্ষেপঃ অবিভক্ত ভারতে যাদের জন্ম বা উত্তরসুরি আমাদের সকলের এক “আদি-পাপ” হল, সেই রামমোহন রায়ের তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র-ধারণাটা ওর মূল ফিচার অথবা কী পয়েন্ট ও বৈশিস্টগুলো কী থাকতেই হয় তা আমরা রপ্ত করতে পারি নাই। অথচ ভারতে আধুনিকতা এসে গেছে, প্রগতিশীলতাও বলে গর্ব ফুটিয়ে বেড়াই। আসলে তো মনে মনে হিন্দুত্বের বাসনা আর বর্ণহিন্দুর জাতবিচারে শ্রেষ্ঠত্ব ভাবনা সব জায়গায় ঘুরে ফিরে আগের মতই আধিপত্যের আসনে বসে আছে। কিছু বদলাতে দেয় নাই। যে দেশে সমাজের সবখানে  বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথা সক্রিয় ও সবলভাবে টিকে আছে সেদেশে রিপাবলিক রাষ্ট্র কার্যকর আছে , নাগরিক-নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য নাই এমন দাবির রাষ্ট্র আছে – এর চেয়ে ঠাট্টা আর কী হতে পারে?  এছাড়া, এই যেমন ধরেন কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তান কোনদিকে যোগ দিবে?  না, এটা কোন এক হরি সিং রাজার খায়েস কোনদিকে এর দ্বারা নির্ধারিত হবে না, সে মামলা এটা একেবারেই নয়। তাহলে সমস্যাটা কী? গোড়ার সমস্যা হল আপনি হিন্দুত্ব-ছাড়া অন্য কোনভাবে রাষ্ট্র বুঝতে বা গড়তেই রাজি না। এটাই সমস্যার গোড়া। এখন ভেবে দেখেন হিন্দুত্ব-ছাড়া রাষ্ট্র বুঝতে না পারা বা চাওয়ার কারণে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী এক হিন্দুত্বই নির্ধারণ করে দিয়েছে – বলতে পারেন বাধ্য করে বলছে যে মুসলমান তুমি মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র কর। এভাবে একেবারে জবরদস্তিতে এদিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।  অথচ আবার এর জন্য দায়ী করা হয়েছে উলটে মুসলমানদেরকেই।

অথচ সহজ সমাধান ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কোন নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না, কাউকে করতেও দিবে না, হতে দিবে না।  যেকোন ধর্ম, কিংবা পাহাড়ি-সমতলি, সাদা-কাল, বাংলা বা হিন্দিভাষী ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলেই রাষ্ট্রের চোখে সমান নাগরিক হবে – এমন রাষ্ট্র গড়তে হত। এক সমান নাগরিক পরিচয় ছাড়া আর কোন পরিচয়ে রাষ্ট্র কাউকে চিনে না। এই ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র, যেটাকে ইতিবাচকভাবে অনেকে সাম্যের (equality) রাষ্ট্র বলে বুঝে। কিন্তু হিন্দুত্বের নেহেরু ভাবলেন কেউ বুঝে ফেলার আগের সেরে ফেলবেন ব্যাপারটা; তাই তিনি কাশ্মীর যেন হরি সিং-এর ব্যক্তি সম্পত্তি ও সে অনুসারে সিদ্ধান্তের বিষয় বলে চালিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু কথায় আছে, পাপ তো কারও  বাপকেও ছাড়ে না।  তাই আমরা সকলেই আবার ব্যাক-টু-প্যাভেলিয়ান। কাশ্মীর ইস্যু আমাদের সকলকেই আবার ১৯৪৭ এর পুরানা অমীমাংসিত প্রশ্নে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তফাত এটাই যে এখন হিন্দুত্ব দগদগে সর্বাঙ্গে ঘাঁ-এর বিভৎস শরীর নিয়ে সে হাজির। তাই সকলেই চিনে ফেলতে পারছে। হিন্দুত্বকে আজ তাই সহজে সকলেই চিনতে পারে। সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে। আরও ভাঙ্গবে। কিন্তু শুধু চিনতে পারা নয় দরকার এক্ট করা, দৃঢ় পদক্ষেপের একশন।]

 


কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এটা নেহেরু-গান্ধীসহ ততকালীন কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারাও জানতেন ও মানতেন। কেন? কিন্তু এই “অংশই” বা করে নিবার সঠিক বা জনসমর্থিত পথ ও পদ্ধতি হত কোনটা? এটা সেই ১৮১৫ সালের রামমোহনের রেনেসাঁ থেকে একাল পর্যন্ত ভারতের নেতাদের কারই জানা হয় নাই। বরং কমবেশি সকলেরই বেকুবি ধারণাটা হল, ব্যাপারটা বোধ হয় বলপ্রয়োগ করেই করার বিষয়।

বৃটিশ-ইন্ডিয়ার প্রশাসন মানে কীঃ
আমাদের অনেকের ধারণা, অবিভক্ত ভারত মানে একটা একক প্রশাসনিক এলাকা; যা ব্রিটিশেরা ১৯৪৭ সালে চলে যাওয়ার সময় যেন একটা অংশ নেহরু-গান্ধীদের  দিয়ে যায় যা থেকে ভারত আর অপর অংশ মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র বানাতে দিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই ধারণা ভিত্তিহীন। ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়া ছিল প্রধানত তিন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিভক্ত ভারত – বড় তিন প্রেসিডেন্সি (বাংলা,বোম্বাই ও মাদ্রাজ), প্রায় ১৭টা প্রদেশ আর ৫৫০-এরও বেশি প্রিন্সলি স্টেট (Princely State বা করদরাজ্য)। আর এদের প্রত্যেকেই ছিল কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (সংক্ষেপে এখন থেকে “কোম্পানি” লিখব) হেডকোয়ার্টারের অধীনে সরাসরি শাসনে; কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ আর প্রিন্সলি স্টেটগুলো এভাবে এরা সবাই একেকটা আলাদা সত্তা। প্রিন্সলি স্টেটগুলো আবার আরো জটিল এ কারণে যে, সেগুলোর অভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন প্রশাসন কোম্পানির অধীনে নয়, তৈরিও নয়। বরং কেবল বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ- এ বিষয়গুলোই এককভাবে কোম্পানির এক্তিয়ার, দখলে ও অধীনে। এসব ইস্যুতে কোম্পানি যা সিদ্ধান্ত নিবে তাই ফাইনাল। আসলে এর মূল কারণ ছিল বৃটিশ কলোনির প্রতিদ্বন্দ্বি অন্যরা যেমন ফরাসি, ডাচ  এমন অন্য কলোনি মালিকেরা যেন বৃটিশের অধীনের রাজাদের সাথে যোগাযোগ করে বেশি সুবিধা দিবার লোভ দেখায় বৃটিশদের থেকে রাজাদেরকে ভাগায় নিয়ে যেতে না পারে, তাই “নো ফরেন কমিউনিকেশন” নীতি পালন করত তারা।

তবে করদ রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, প্রশাসন ও রাজস্ব আদায় একচেটিয়াভাবে রাজাদের হাতেই থাকত, যদিও রাজারা আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট শেয়ার ব্রিটিশদেরকে দিতে বাধ্য থাকত। এ বিষয়ে প্রত্যেক রাজার সাথেই কোম্পানির আলাদা আলাদা চুক্তি ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম এক শ’ বছর, অর্থাৎ ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে ছিলাম। আর ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটলে, একে দমনের পর থেকে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি কোম্পানির সব কর্তৃত্ব নিজে অধিগ্রহণ করেছিল, আর শাসন করেছিল ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত।

তাই দেশ ভাগের সময় প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগুলো সহজে ও সরাসরি স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে গেলেও প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বলেই ব্রিটিশ সরকার বিদায় নিয়েছিল। কারণ কোম্পানি বা বৃটিশদের সাথে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিতে এমন কিছু লেখা নাই – এই যুক্তিতে তারা ইস্যুটা ফেলে পালিয়েছিল। আবার প্রিন্সলি স্টেট মানে আসলে, কোম্পানির ভারতে জেঁকে বসার আগে থেকেই এরা অসংখ্য ছোট-বড় রাজার রাজ্য ছিল। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে অনেকগুলোকে কোম্পানি পরাস্ত করে নিজ প্রশাসনিক দখলে নেয়নি, কিন্তু কোম্পানির অধীনে করদরাজ্য করে রেখে দিয়েছিল। তাই প্রশাসন রাজার হাতেই থেকে গিয়েছিল।

       প্রিয়জীত দেবসরকার: ‘ত্রিদিব রায় ছিলেন এমন একজন রাজা যিনি ব্যক্তি স্বার্থ-র জন্য তাঁর রাজত্ব হারিয়েছেন’ – বিবিসি বাংলা

কাশ্মীর আর আমাদের পাহাড়ি ইস্যুর মিল কেবল করদ রাজ্য হিসাবেঃ
ভারতের ভাগে পড়া প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে নেহরু নিজের জন্য যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তা হল, সব প্রিন্সলি স্টেটকে নবজাত ভারতে অন্তর্ভুক্ত অংশ করে নেয়া হবে। রাজাদেরকে স্বেচ্ছায় সারেন্ডার করতে হবে নইলে বলপ্রয়োগ করে রাজ্য দখল করে নেয়া হবে। এবং বিনা ক্ষতিপুরণে। অর্থাৎ রাজপরিবারকে কোনো খোরপোশ বা ভাতাও দেয়া হবে না। তবে বসতভিটা বা হাভেলির নামে যা নিতে পারে, নিবে। এই কাজটা নেহেরু বাস্তবায়ন করেছিলেন প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেলকে দিয়ে। বিপরীতে পাকিস্তান প্রিন্সলি স্টেট নিয়ে এত সিরিয়াস ছিল না। একারণেই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাজারা পাকিস্তান “মুসলমানদের” এটা জানা সত্বেও তাদের সাথেই যুক্ত হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এনিয়ে সম্প্রতি একটা পিএইচডি গবেষণা হয়েছে, যাতে এই কারণটাই উঠে এসেছে। এনিয়ে রিপোর্ট বিবিসি বাংলাতে প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০১৫ সালে। বিবিসির মতে, “সেই কাজটি করেছেন লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার, যার বই ‘দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান’ ঐ রিপোর্টের আগের সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছিল”। উপরের ছবিতে সেই বইটাই হাতে তুলে ধরে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কাজেই এরপর আমরা আশা করব পাহাড়ি ইস্যুতে বাংলাদেশকে দোষারোপ অভিযুক্ত করার আগে প্রগতিশীলেরা একটু পড়াশুনা করে নিবে। ইসলামবিদ্বেষী হয়ে বাংলাদেশের যারা কথিত প্রগতিশীলতা বা ভিকটিমহুডের ইমেজ তৈরি করে কাশ্মিরের সাথে পাহাড়ি ইস্যু মিলিয়ে তুলনা করছেন, সেটা ভিত্তিহীন। এই খবর যেন তাদের থাকে। আসলে পাহাড়ি রাজারা, পাকিস্তানে রাজা হিসেবে যোগ দিলেও মডার্ন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভেতরে ‘রাজাগিরি’ অকেজোই থেকে যায়, এই “আধুনিক” বাস্তবতাতে তা নিজেই শুকিয়ে গেছিল। কেবল পাহাড়িদের পুরানা ‘১৯০০ সালের ম্যানুয়াল’ বলে অকেজো কিছু একটা আছে। আর জমির অনেক অংশই এখন বাঙালিদের দ্বারা বেদখল হয়ে আছে, এও আরেক সত্য। কিন্তু সাবধান, এগুলো কেবল ১৯৭৫ সালের পরের, পাহাড়িরা অস্ত্র হাতে তুলে নিবার পরের নতুন ঘটনা। ভারতের প্ররোচনায় পাহাড়িরা আগে-পিছে চিন্তা না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে তাতে ফেল করার ভুল রাজনীতির পরিণতিতে এটি হয়েছে। পাহাড়িদের, যারা যে জমিতে আগে ছিল তাকে সেখানেই অবশ্যই পুনর্বাসন করা সম্ভব, যদি তারা ইতিবাচক রাজনীতির পথে ফিরে, সঠিক বন্ধু বাঙালি রাজনীতিকদের খুঁজে বের করে নেয়ার যোগ্য হয়।

কাশ্মীরের বেলায় নেহেরুর নিজের নীতি ভেঙ্গেছিলেনঃ
যা হোক, নেহরু নিজ নীতি ভেঙে ‘ব্যতিক্রম’ করেছিলেন কাশ্মিরের বেলায়। কাশ্মিরের দুর্ভাগ্য যে, এটা এক প্রিন্সলি স্টেট। এটা না হয়ে যদি কাশ্মির সরাসরি কোম্পানির অধীনস্থ কোনো প্রদেশ হত? তাহলে এর সোজা মানে হত কাশ্মীর মুসলিমপ্রধান অঞ্চল বলে এই কাশ্মীর সরাসরি পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত। কারণ, ১৯৪৭ সালের ডেমোগ্রাফিতে দেখা যায়, পুরো জম্মু-কাশ্মিরের কাশ্মির বা উপত্যকা অংশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নেই বললেই চলে। আর জম্মু অংশেও ৩০ শতাংশের বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠী নাই।  আর এটা বাদে বাকি সারা অবিভক্ত কাশ্মিরে ৯৫-৯৯ শতাংশই মুসলমান। তাই পাকিস্তানে সপক্ষে যোগ দিবার ক্ষেত্রে এটাই হ্ত কাশ্মীরিদের   প্রধান যুক্তি।

কিন্তু কাশ্মীরের পাঞ্জাবি (হিন্দু) রাজা হরি সিং ভারতের সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন এবং ভারতে যোগ দিতে চাওয়ার খায়েশ প্রকাশ করাতে নেহরু প্রলুব্ধ হয়ে উল্টো পথে হাঁটেন। নেহরু প্রিন্সলি স্টেট হায়দরাবাদের নিজাম (রাজা) [একমাত্র মুসলমান রাজা যিনি জমির উদ্বৃত্ব থেকে রাজস্ব আয়ে আয়েসি জীবন কাটিয়ে কিংবা বাঈজি নাচিয়ে জীবনযাপন না করে বরং জমির উদ্বৃত্ব সঞ্চয় জড়ো করে  ইন্ডাস্ট্রি গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে এর পণ্য বেচা এক ব্যতিক্রমি রাজা তিনি], তাকেও নেহরু আর্মি পাঠিয়ে উৎখাত করেছিলেন। সেই নেহরু হরি সিংয়ের কথায় প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। কাশ্মীরের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, একটি মূল ভারতের ভুখন্ডের ভিতরের কোন প্রিন্সলি স্টেট নয়। বরং এর অবস্থান সীমান্তে, ভারতের উত্তর পাশে সীমান্তে তো বটেই, আবার এর বড় এক অন্য ভুখন্ড অংশ পাকিস্তানেরও উত্তর সীমান্তে। তাই কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তানে যুক্ত হবে – এমন দুই রাস্ট্রের যেকোনটাই যোগ দিবার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

বৃটিশেরা ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগের পরে প্রিন্সলি স্টেটগুলো ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার যে প্রচলিত চুক্তির রূপ – একেই বলা হয় কাশ্মীরেr “ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন” [instrument of accession] বা “সংযুক্ত হওয়ার (আইনগত) উপায়”।  তবে হরি সিংয়ের সাথে নেহরু যে একসেশন চুক্তি করেন তা ব্যতিক্রম ফলে শর্তযুক্ত। তা আসলে ব্রিটিশের সাথে কলোনি আমলে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিরই অনুরূপ, মডেলের। এটা মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় ভারতের হাতে দিয়ে দেয়া সাপেক্ষে বাকি ইস্যুতে নিজে করদ-রাজা হয়ে থাকার খায়েসি চুক্তি। অনস্বীকার্য বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল, নেহেরু সংখ্যালঘুর সমর্থনপুষ্ট রাজা হরি সিংয়ের সাথেই “শর্তযুক্ত” একসেশন চুক্তি করেছিলেন। কেন? খুব সম্ভবত, মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মির তো নেহরুর ভারতে যুক্ত হওয়ার কথাই নয়। কাজেই “পড়ে পাওয়া চারআনার” ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শর্তযুক্ত চুক্তি করলেই বা কী? এমন ভাবনার কারণে।

নেহেরু ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ চুক্তি করলেও রাজাগিরি রাখেন নাইঃ
কিন্তু নেহরু এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেন নাই। অর্থাৎ চুক্তি করলেও কাশ্মীর নেহরুর ভারতের নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে দাঁড়ায়নি। নেহরুর হাতে এ কাজে হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন কাশ্মিরের ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের নেতা শেখ আবদুল্লাহ। কাশ্মির ছিল প্রিন্সলি স্টেট মানে, রাজার রাজ্য ছিল বলে সেখানে ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজনৈতিক দল জমেনি। কারণ আমরা বুঝব, কোন রাজার রাজ্যে রাজনীতি থাকতে নাই। বুদ্ধিমান রাজারা তা থাকতে দেয় না। কারণ, রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল  থাকলেই তা রাজতন্ত্রের রাজ্যকে প্রজাতন্ত্র হওয়ার দিকে নিতে রওনা দিবে, যা রাজতন্ত্রের জন্য যম বা মরণকাঠি। তাই রাজার দেশে রাজা কোন পাল্টা ক্ষমতা জন্ম নিবার বীজ ও চিন্তাভাবনা হিসেবে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, জমায়েত এগুলো থাকতে দেয় না। তাই শেখ আব্দুল্লাহর পিঠে হাত রেখে নেহরু ঐ শেখেরই ন্যাশনাল কনফারেন্সকে কাশ্মীরে নেহেরু কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে উঠে আসতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। তাই চুক্তি করলেও কাশ্মীর নয়া দিল্লির নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, রাজার বিকল্প হিসেবে নেহরু শেখ আব্দুল্লাহকেই কাশ্মীরের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে ফেলেন। তবে এটা প্রথম পর্যায়। আর রাজা মনের দুঃখে বনবাসে যাওয়ার অবস্থায়। কালক্রমে রাজা কাশ্মীর থেকে দূরে পুরানা বোম্বাইয়ে বসবাস করতে থাকেন, সেখানেই ১৯৫১ সালে মারা যান। যদিও নেহরুর আসল দুঃখ তাতে ঘোচেনি।

সারা ভারতের যে কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, কাশ্মীর ভারতের অংশ হল কী করে? সবাই একবাক্যে বলবেন হরি সিং লিখে দিয়েছেন। এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ একসেশন চুক্তি অনুযায়ী হরি সিং কিন্তু ভারতকে কেবল মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো হস্তান্তর করেছেন, পুরা কাশ্মীর বা এর কোন ভুখন্ড না। এর অর্থ কাশ্মীর ভারত রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নয় বা ভারতের আইন ও কনস্টিটিউশনের অধীন নয়। তাই হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিতে থাকা কথাগুলোই এবার আবার লিখে ভারতের কনস্টিটিউশনে যে অনুচ্ছেদে সাজিয়ে আনা হয়, সেটাই ৩৭০ ধারা।
কিন্তু এরও আগে নেহরু পরিষ্কার জানতেন, কাশ্মির ভারতের অংশ নয়। বরং এটাই ভারত বা নেহেরুর দুর্বলতা। কিন্তু এই দুর্বলতা কাটাতে গিয়ে তিনি আরেক ভুল করে বসেন। তিনিই প্রথমে নিজে কাশ্মীর ইস্যুকে জাতিসঙ্ঘে তোলেন। যদিও এমনিতেও জাতিসঙ্ঘ এই বিবাদের ভেতরে ঢুকেই ছিল।

কাশ্মীরে এক দিকে ভারত অন্য দিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসঙ্ঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন, এটাই ভারত-পাকিস্তান অবজারভার মিশন [United Nations India-Pakistan Observation Mission (UNIPOM)]। জন্মলগ্নের সেকালে জাতিসঙ্ঘ মধ্যস্থতা করার জন্যই একপায়ে খাড়া থাকত। কেন?

হরি সিং কাশ্মীর কাউকে দিয়ে দেওয়ার কেউই ননঃ
প্রথমত একটা ফ্যাক্টস মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালিত ও শেষ করা হবে কীভাবে কী বৈশিষ্ট চেহারা নিয়ে – এসবের প্রধান নির্দেশক ও স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন সেকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। জাতিসংঘ তাঁরই ইমাজিনেশনের বাস্তব রূপ। যার সারকথাটা হল, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্ব স্ব রাষ্ট্রস্বার্থ নিয়ে যত বিবাদ এর অনেকগুলোই জাতিসংঘের নীতি কনভেনশন মেনে এর মধ্যস্ততায় বিনা যুদ্ধে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। সেকাজেই জাতিসংঘ গড়া। তাই কাশ্মীরে যতই আপাত থিতু এসেছিল ততই একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসংঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন– এভাবে বসে যায়।

হরি সিং একসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭। আর নেহরু কাশ্মীর ইস্যু জাতিসঙ্ঘে তোলেন ১ জানুয়ারি ১৯৪৮। প্রথমত, নেহরুর জাতিসঙ্ঘে যাওয়াটাই প্রমাণ করে যে, কাশ্মীর ভারতের নয় – এটা নেহেরুও মানছেন। এ ছাড়া হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিটা দুর্বল, নেহরুর তা না বুঝবার কথা নয়। সেই দুর্বলা পূরণ করতে, সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন জাতিসঙ্ঘ তাকে ফেভার করতে পারে। কিন্তু তার অনুমানটা ভুল ও ভিত্তিহীন। কাশ্মীর ভারতের, এমন রায় নেহরু জাতিসঙ্ঘ থেকে আনতে পারেননি। এক কথায় তিনি ব্যর্থ। কেন?

নেহরু কত দূর রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারী ছিলেন? তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্ব এনজয় করতেন কী চোখে? নীতি করণীয় ঠিক করতেন কোন মানদণ্ডে? এসব বিচারে এক কথায় তিনি ছিলেন, আসলে একজন কলোনাইজার । শাসক হওয়া বলতে তিনি কলোনি শাসক হওয়া বুঝতেন, আকাঙ্খী ছিলেন। তিনি নিজেকে একজন কলোনি শাসকের বেশি ভাবেননি। তাই ভারত কলোনিমুক্ত হয়ে গেলেও, রাষ্ট্র বলতে তাঁর ইমাজিনেশন বা বুঝ হল – এক কলোনি শাসক তিনি। তিনি মডার্ন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধারণায় জন্ম নেয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এর মর্ম তিনি যাই বুঝে থাকুন না কেন, সেটা তার ব্যবহারিক রাষ্ট্রে ও প্রধানমন্ত্রিত্বে প্রতিফলিত করতে পারেননি – রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে তাঁর কলোনি শাসক বুঝের কারণে। এটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছিল জাতিসঙ্ঘের কাছে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর আশা-কামনার মধ্যে। তিনি সম্ভবত খেয়ালই করেননি কোন বয়ানের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনাকারী ও বিজয়ীরা তা শেষ করেছিল। আর যুদ্ধ শেষে দুনিয়া নতুন করে সাজানো হচ্ছিল কোন মৌলিক ভিত্তিমূলক নতুন ভাবনার ভিত্তিতে।

“কোন  জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রকে কে শাসন করবে, কিভাবে তা শাসিত হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার কেবল ঐ জনগোষ্ঠীর”। রুজভেল্টের [Franklin Delano Roosevelt] এই প্রস্তাব প্রথম চোখবন্ধ মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল (আগষ্ট ১৪, ১৯৪১)  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। পরে রাশিয়াসহ সারা ইউরোপ এটাকে ভিত্তি হিসেবে মানতে রাজি হওয়াতেই রুজভেল্ট হিটলার ঠেকাতে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। রুজভেল্ট রাশিয়াসহ ইউরোপের সবাইকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে যুদ্ধে জিতিয়েছিলেন। আর যুদ্ধ শেষের  দুনিয়াটাকে একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ে সেটাসহ সাজানো হয়েছিল ঐ একই শাসন-নীতির ভিত্তিতে। যে নীতিটা বলে দিয়েছিল বা ওর সারকথাটা ছিল – কলোনি শাসন অবৈধ। এবং রাজাও।

কোন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কে নেবে, তা নির্ধারিত করবে কেবল নিজ নিজ জনগোষ্ঠী – এই নীতিতে যদি কাশ্মীর ইস্যুর ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দেখি, হরি সিং আসলে কাশ্মীরের কেউ নন। বরং কাশ্মিরের জনগণই ঠিক করবে কাশ্মিরের ভাগ্য কী হবে। তাই হরি সিং কোথায় কী চুক্তি অথবা সই করেছেন তা মূল্যহীন। নেহেরু-হরি সিং একসেশন চুক্তি তাই বিশ্বযুদ্ধের পরে সাজানো জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে যে World order, সেই নতুন দুনিয়ার চোখে অকেজো, মুল্যহীন এক কাগজ মাত্র।

নেহেরুর কাছে  রিপাবলিক ধারণা আকর্ষণীয় না, তাই নতুনওয়ার্ল্ড বুঝেন নাই, মনেপ্রাণে কলোনি-ক্ষমতার ভক্তঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মূল মর্ম নেহরু যদি বুঝতেন তিনি কখনই কলোনি শাসকের নকল করতে যেতেন না। ফলে তখন তিনি হরি সিং  একসেশন চুক্তিকে বাইবেল জ্ঞান করতেন না। তিনি জাতিসঙ্ঘেও যেতেন না। কারণ জাতিসঙ্ঘের জন্মই হয়েছে রুজভেল্টের ওই “নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর” শাসননীতিতে। তাই জাতিসঙ্ঘে গেলে, সে প্রতিষ্ঠান হরি সিংয়ের চুক্তিকে ন্যাকড়া মনে করে ফেলে দেয়ারই কথা। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের রায় – রাজা নয়, একমাত্র “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই”  সিদ্ধান্ত নিতে হবেই – এমনই হবে, এটা তো জানা কথাই ছিল। “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই” সব কিছু নির্ধারণের ভিত্তি, একেই মানতে বলবে। এটা নেহরুর জানা থাকা উচিত ছিল। তাই নেহেরুর জাতিসংঘে যাওয়া প্রমাণ করে যে নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ না অসচেতন ছিলেন।

নেহরু তাই জাতিসঙ্ঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করে এরপর সে খামতি নিজেই পূরণ করতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহকে আরো বেশি করে হরি সিংয়ের উপরে তুললেন। আর এখান থেকে জন্ম নিল, আর্টিকেল ৩৭০। এর সারকথা হল, একসেশন চুক্তি যেন ভারতের কনস্টিটিউশনের বিরোধী না হয়ে, সামঞ্জস্যপুর্ণ করে নেয়া যায়। আমাদের দেশী ভাষায় বললে, হালাল করে নেয়া হয়। কারণ একসেশন চুক্তি আসলেই তো ভারতীয় কনস্টিটিউশন-বিরোধী। কারণ, চুক্তিতে কাশ্মীরের জনগোষ্ঠিকে বুঝাতে কাশ্মীরের জনগণ নিজেরা নয়, কোথাকার এক ‘রাজা’কে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি বলে স্বীকার করা ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো রিপাবলিকের চোখে কোনো রাজা এমন গুরুত্ব পেতেই পারেন না। কোনো রাজা বা রাজতন্ত্রের চিন্তাকে কোন প্রজাতন্ত্র স্বীকার করতেই পারে না। তবু নেহরু অ্যাকসেশন চুক্তিকে হালাল করে নিতে কনস্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা যোগ করে। ভারতের কনস্টিটিউশন যারা ড্রাফট করেছেন, এর মূল ভূমিকায় ছিলেন প্রথম আইনমন্ত্রী ড. অম্বেদকার। নেহরু তাকে অনুরোধ করেন, হবু ৩৭০ ধারা ড্রাফট করতে। অম্বেদকার তা করতে অস্বীকার করেন।
ব্রিটিশ আমলে শাসক হিসেবে হরি সিং কাশ্মীরে এক বড় রাজত্বই চালাতেন। ফলে তার আমলাদের যথেষ্ট দক্ষ হতে হয়েছিল। এছাড়া পাশে ব্রিটিশরা থাকাতে তাদের থেকে এরা ট্রেনিং পেতেন সহজেই। এমনকি স্বয়ং হরি সিং স্বল্প বয়সে বাবার পরে কাকাও মারা যাওয়াতে রাজা হন। পরে তাঁর তাবৎ একাডেমিক শিক্ষা ও সামরিক ট্রেনিংও ব্রিটিশদের হাতে হয়েছিল। তাই কাশ্মীরের রাজার মুখ্য আমলা যাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত, তিনি হলেন ব্রিটিশ ট্রেইনড এক তামিল ব্যক্তিত্ব গোপালস্বামী আয়াঙ্গার। এই আয়াঙ্গার আর শেখ আবদুল্লাহ মিলে ৩৭০ ধারা ড্রাফট করেছিলেন।

৩৭০ ধারা আসলে কী?
এই ৩৭০ ধারা কী? ধরেন, আপনার লাখ টাকা আগেই আমি আমার বলে নিয়ে নিলাম। এরপর এই টাকা ফেরত দেয়ার সময় একটা দলিল করলাম। দলিলে লিখলাম, ১. আমিই আপনাকে লাখ টাকা দিলাম। ২. আপনি এই টাকা এখন আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দু’টাই মিলে গেলে, সে মোতাবেক খরচ করবেন। ৩. আপনার বাসায় কাউকে বসবাস করতে দিবেন না; আমার বাসা থেকে কেউ গেলেও না। তবে কাকে দেবেন না দেবেন, সেটি আপনাকে ঠিক করার অনুমতিটা আমিই আপনাকে দিয়ে দিলাম।
এতিনটা ধারার প্রথম দু’টি মিলে হল ৩৭০ ধারা, পাস হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। আর তৃতীয় ধারাটি হলো ৩৫এ, যা প্রেসিডেন্টের আদেশ হিসেবে ১৯৫৪ সালে চালু করা হয়েছিল।

তাহলে এবার মোদী-অমিত ঠিক কী করলেনঃ
আসলে এবার মোদী-অমিত মিলে যা করলেন তা হল – তারা বললেন এখন আর আপনার টাকাই আপনাকে দেয়ার দলিল না। দলিল থাকবে বাদ বা রদ। আর খোদ আপনি পুরাটাই এখন থেকে আমার।
এটাই ‘দ্যা কনস্টিটিউশন (অ্যাপ্লিকেশন টু জম্মু ও কাশ্মির) অর্ডার ২০১৯’  [The Constitution (Application to JAMMU & KASHMIR) Order 2019 ] এই নামে গত ৫ আগস্ট এক প্রেসিডেন্ট আদেশরূপে জারি করা হয়। আর এতে বলা হয়, এটাই “আগের “আর্টিকেল ৩৫এ” কে সুপারসিড’ করল। [It shall came into force at once and shall thereupon supersede the constitution (Application to Jammu & Kashmir) order, 1954……] মানে আগে যা-ই থাক, এখন থেকে এটাই 35A এর জায়গা নিল। এর সোজা মানে – এখন যা হল, একেবারে গায়ের জোরে পুরা কাশ্মীরকে (পাকিস্তান এবং চীনের কাশ্মীর অংশসহ) ভারতের ভুখন্ড বলে দাবি করে নিয়ে নেয়া হল।

এখন তাহলে আগে দলিলে যে লেখা ছিল ‘আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দুটাই মিলে গেলে’ [এই কথাটা বুঝাতে সব সময় সব জায়গায় concurrence শব্দটা ব্যবহার করা আছে।  বাংলায় যার মানে “সমঘটিত”। ] এটাই ভারতের পার্লামেন্টে পাশের পর যেকোন আইন আবার কাশ্মীরের পার্লামেন্টেও পাশ হলে বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটার কী হল? এছাড়া, এটাই ৩৭০ ধারা তে বাতিলের আগে কাশ্মীরিদের মত নেওয়ার পদ্ধতি বলে বুঝানো হয়েছে, তা হল কিভাবে?
এর জবাবে অমিত শাহ বলবেন, কাশ্মীরিদের মতামত মানে তো স্থানীয় প্রাদেশিক পার্লামেন্ন্টটে অনুমোদন, তাই তো? ঘটনা হল, এখন কাশ্মীরে  পার্লামেন্ট নেই, প্রেসিডেন্ট শাসনে আছে রাজ্যটাতে। তাই প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা – এর মানেই তো কাশ্মীরিদের মতামত বুঝতে হবে।

অর্থাৎ, অমিতের  ব্যাখ্যা অনুসারে, কাশ্মীরিদের মতামত=ভারতের প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা।  তাই ৫ আগষ্টের ঐ প্রেসিডেন্টের আদেশে শুরুর বাক্যটা হল এভাবে – আমি আমার সাথে একমত হয়ে… এই আদেশ জারি করলাম।

কিছু বাড়তি প্রসঙ্গঃ
আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো পরের লেখায় আনা যাবে হয়ত। সেখান থেকে কেবল দুটা সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ দিয়ে এখন শেষ করব।
সোশাল মিডিয়ায় দেখলাম সবাই আশা করছে এখন কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান বলতে বন্ধু রাষ্ট্র, দেশ, গ্রুপ বা ব্যক্তির সামরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো – এভাবে বুঝে। মানে মিলিটারি পদক্ষেপ বা যুদ্ধই এর একমাত্র সমাধান। এই অনুমান ভিত্তিহীন। এছাড়া যুদ্ধে যেতে চাইলেও অন্তত ভারত-পাকিস্তান কারই যুদ্ধে যাবার অর্থনৈতিক সামর্থ নাই।
আসলে ইস্যুটার ফোকাস মূলত লিগাল। তাই সেটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠবে। ভারতের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্যের একজনকে যদি পেতে হয়, তবে সম্ভাব্য সেটা হতে পারে আমেরিকা। কিন্তু সেটা ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে পাকিস্তানের গলা চড়ানো পদক্ষেপে।  ভারতের হাত আমেরিকা যতটুকু আড়ালে ধরেছিল, সেটি ছেড়ে এখন আমেরিকা তা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে [No policy change on Kashmir, says U.S.]। আমেরিকার স্টেটস ডিপার্টমেন্টের বা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত Ms. Ortagus এর প্রেস ব্রিফিং থেকে এটা পরিস্কার। অর্থাৎ, পাকিস্তানের কূটনীতির একটা বিরাট ভূমিকা এখানে আছে এবং আগামিতে থাকবে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান যতটুকু করেছে, তাতেই ভারত ইতোমধ্যে ব্যাকফুটে। ভারতের বিবৃতিগুলোতে তা পরিষ্কার।

পাকিস্তানের ডিপ্লোমেটিক প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পাঁচ পদক্ষেপঃ
1. Downgrading of diplomatic relations with India. 2. Suspension of bilateral trade with India.
3. Review of bilateral arrangements. 4. Pakistan to go to UN, including the Security Council.
5. August 14 (Pakistan’s Independence Day) to be observed in “solidarity with brave Kashmiris”. India’s Independence Day will be marked as “Black Day”.
পাকিস্তানের একক সিদ্ধান্ত – ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিচা স্কেলে নামিয়ে আনা – এটাকরে ফেলে নিজ রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার করা ও ভারতকে তারটা ফেরত নিতে বলা – এটা পশ্চিমাদেশের জন্য শক্ত ও সিরিয়াস ম্যাসেজ হিসাবে হাজির হয়েছে। এতে ভারতের প্রতিক্রিয়ার তাদের ভাষায় সেটা বুঝা গেছে। ভারতের the wire পত্রিকার ভাষ্যও তাই। পাকিস্তানের পদক্ষেপের পর ভারতের বিবৃতি বলছে, পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছে [India urged Islamabad to review these measures…।।] দেখে এই পত্রিকা বলছে। পত্রিকাটার ধারণা ইউরোপ, আমেরিকা পাকিস্তানের বিবৃতির পক্ষে চলে যেতে পারে এই ভয়ে ভারত এমন বিবৃতি দিয়েছে।  এছাড়া পত্রিকাটা মন্তব্য করছে, ভারতের বিবৃতিটা কম কড়া বা কম কর্কশ ভাষার [The Indian response seemed comparatively less strident, ]।
ওই দিকে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ভারতের বিরুদ্ধে চলে যাবে ধীরে ধীরে, যেটা উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে দেখা গিয়েছে। ওআইসি ধরনের আন্তর্জাতিক বডিগুলোতে ব্যাপক লবি লাগবে, কারণ আমির ও বাদশাহরা ‘পিছলে ভারতের পক্ষে  চলে যেতে পারে’। যেটা ঠেকাতে পাকিস্তানের কূটনীতির বিরাট ভুমিকা আছে। এসব ব্যাপারে আমাদের উলটা নাদান চিন্তাও প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। পাকিস্তানের জামায়েত বা কিছু ইসলামপন্থি দলগুলোর জোটের প্রতিক্রিয়া হল ইমরান খান কাশ্মীর ইস্যু আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা আসলে পাকিস্তানে কোনঠাসা হয়ে পড়া বিরোধি দলের ইমরানকে আক্রমণের আভ্যন্তরীণ ইস্যু। এতে তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন কিছু প্রমাণ দেয়াটা গুরুত্বপুর্ণ নয় – তাই তারা দেনও নাই। বরং এই আক্রমণটায় মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে কিনা সেটাই বিবেচ্য। তাই অভিযোগটা কাশ্মীরের পক্ষে বা বিপক্ষে গেল কিনা সেটা একেবারেই বিবেচনার বিষয় নয়। বরং আভ্যন্তরীণভাবে পাকিস্তানের বিরোধীদেরকে মাইলেজ দিয়েছে কি না সেটাই বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশ বসে আমাদের পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে কারও মুখপাত্র হওয়ার কোন মানে হয় না। আমাদের কাছে মুখ্য হওয়া উচিত কাশ্মীরের স্বার্থ, পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কে আগিয়ে থাকল সেটা একেবারেই নয়।

সুপ্রীম কোর্ট কী প্রতিকার দিবে, ভরসা করা যায়?
ভারতের সুপ্রীম কোর্ট জনমত শক্ত হয়ে না উঠলে মামলাটাই নেবে না, পিছলাবে মনে হচ্ছে। এটা কিছুটা পরিস্কার হয়েছে এক মামলায় রায়ে [৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে]। আসলে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরার বিরুদ্ধে  নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আদালতের সাজার রায় হলে তিনি পালটা জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। ক্ষমতা ছাড়েন নাই, জেলেও যান নাই। সেই থেকে ভারতের আদালত ও একাদেমিকদের বুঝাবুঝি হল –  নির্বাহী ক্ষমতা বা প্রধানমন্ত্রী আগ্রাসি হয়ে গেলে আদালত মানতে না চাইলে – তাতে সেক্ষেত্রে ওর সামনে না গিয়ে ততটাই পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই সঠিক – এই অবস্থানে যেতে হবে। যদিও এমন সিদ্ধান্তে দুনিয়ার কোথাও রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া ঠেকানো যায় নাই। পারার কথাও নয়। তবু এসব আকাম্মা মধ্যবিত্তসুলভ গা-বাঁচানো চিন্তা এখনও ভারতে ভেসে বেড়াচ্ছে। গত নির্বাচনেও আমরা তাই দেখেছি। মোদীকে নির্বাচন কমিশন কোন নুন্যতম দন্ড দিতেই পারে নাই, কমিশন নিজেই গা-বাঁচিয়ে পালিয়েছে। ফলে আগ্রাসি মোদীর সামনে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া – আদালতের এই অবস্থান হওয়াটা অসম্ভব নয়।  যদিও ২০১৮ সালের অক্টোবরে এক মামলায়, আদালতের রায় দিয়েছিল যে, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।

ভারত ভেঙ্গে পড়ার প্রাথমিক আলামতঃ
ওদিকে রাজ্যগুলোও খুবই ভয় পেয়েছে। কারণ ভারত রাষ্ট্র মানে কথিত এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, “কেন্দ্র” নামে যে জারি আছে। কে তাকে কী ক্ষমতা দিয়েছে, এই ক্ষমতার উৎস কী, কেউ জানে না। কিন্তু এই ক্ষমতা চাইলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কাল থেকে বিধানসভা বলে কোনো প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি নাই – এমন ঘোষণা দিতে পারে। ব্যাপারটা এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে। এই ভুতুড়ে কেন্দ্র এখন, পশ্চিমবঙ্গকেও একটা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। এবং তা কেন্দ্রিয় পার্লামেন্ট অথবারাজ্য বিধান সভাতেও কোন আলোচনা পরামর্শ ছাড়াই।  কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল ইস্যুতে রাজ্যগুলো এটাই দেখল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে আগে শঙ্কিত হয়েছে নাগাল্যান্ড ধরনের ট্রাইবাল ছোট রাজ্যগুলো। এব্যাপারে ভারতেরই এক মিডিয়া পর্যালোচনায় ভীতি ও আশঙ্কা এখানে পড়ে দেখা যেতে পারে [No debate, no discussion, no dissent, and the Constitution is changed]।

মোদীর রাজ্যসভার ভোট ম্যানেজ – ভারতের “দুদুকের” ভয়ে বাঘ বিড়াল যেনঃ
শুধু তাই না। ভারতের কনষ্টিটিউশন অনুসারে কোন বিষয় আইন হতে হলে তা লোকসভা ও রাজ্যসভা এই দুই পার্লামেন্টেই পাশ হতে হবে।  গত পাঁচ বছর মোদী্র লোকসভায় পাশ করা কোন আইনকে পরিপুর্ণতা দিতে রাজ্যসভা থেকে একক বিজেপি-জোটের ভোটে পাশ করাতে পারে নাই। বরং যা কিছু আইন পাশ হয়েছে এর সবই বিরোধী দলেরও ভোট-সমর্থন পাওয়া সাপেক্ষে। মোদীর দ্বিতীয় সরকারের বেলাতেও তাই, এবারও রাজ্য সভায় বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। কিন্তু তিনি কাশ্মীর ইস্যুসহ পরপর দুইটা আইন পাশ করিয়ে নিলেন। কীভাবে?

সোজা বুদ্ধি – যারই বা ঘনিষ্ট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে মামলা আছে – সিবিআই-ইডি [CBI-ED] (আমাদের দুদুক যেমন) এর হয়রানি বা মামলা খাবার ভয় আছে এমন সব দলের সদস্যদেরকে মোদীর পক্ষে ভোট দিবার বিনিময়ে সওদা করা হয়েছে। তাতে রাজ্যসভায় মোদীর দল ও জোটের এখন ১০৬ ভোট আর বিরোধীরা ১০০ ভোট হয়ে গেছে। AGP, YSR, BSP, NCP, TDP অথবা kejrilal  এদের এসব আঞ্চলিক দলের এরা কেউ  গত নিবাচনেও মোদীর দলে বা জোটের পক্ষের কেউ ছিল না। বরং বিপক্ষ জোটে ছিল। কিন্তু তারা সকলে কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর পক্ষে ভোট দিয়েছে।

,এখন, সব মিলিয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, ব্যাপারটা ভুতুড়ে ক্ষমতার কারণে ভারত রাষ্ট্রের ভেঙে টুকরা হয়ে যাওয়ার দিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছে তাই নির্দেশ করে। আর ইতিবাচকভাবে দেখলে, মাথা নাগরিকদের মুরোদ থাকলে এই ভাঙাটাই পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ কোন কিছু না ভাঙলে তা ফিরে গড়বেন কী করে? তবে পুনর্গঠনের মুরোদ যদি থাকে – এই হল মুখ্য প্রশ্ন। যদি তা না থাকে, তখনই এর অর্থ ভারতের ৩৬ টুকরা হয়ে যাওয়া। আর মুরোদ দেখাতে পারলে, পুনরায় আমেরিকার মত এক ফেডারেল ভারত হিসাবে নিজেকে পুনর্গঠিত ভারত হিসেবে আবির্ভূত করে ফেলা। বলাই বাহুল্য, সেক্ষেত্রে সবার আগের করণীয় বা লক্ষ্মণ হল,  “হিন্দুত্ব” কে চিরতরে সামাজিক চিন্তা থেকে ঝেটিয়ে বিদায়, একে  নির্বাসন করতে হবে। কেবলমাত্র এরপরেই ফেডারেল রাষ্ট্রবিষয়ক পাঠ পড়াশুনাগুলা সম্পন্ন করতে হবে বা যেতে পারে। কাশ্মীর তাই আসলে বিরাট ধবংস ও পতনের বীজ এক আইসবার্গ [iceberg], বিরাট বরফের চাঙ্গর, হিমশৈল। বাইরে থেকে এর কেবল উপরে ভেসে থাকা ছোট্ট মাথাটা  দেখা যাচ্ছে। অথচ সে বিরাট জাহাজ ঢুবিয়ে দিয়ে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন! না ভারতের কেউ এটা দেখতে পাচ্ছে, তা মনে হচ্ছে না। কারণ চারিদিকে প্রবল এক হিন্দুত্ব-জ্বর ছেয়ে গেছে, সবাই ভুগছে! এক অধপতিত নস্টা  চিন্তা – কাশ্মীরি নারীর নিয়ে ইতরোচিত অবদমিত ফ্যান্টাসি, হিন্দুত্ব-চিন্তাকে পুষ্ট করে আগাচ্ছে! এক গভীর অসুখে ভুগছে ভারত!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে ভাঙ্গন শুরু হতে পারে কাশ্মীর থেকে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  একই শিরোনামে  বিডিভিউজ  অন লাইনেও ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

গৌতম দাস

২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2DQ

 

-একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

[বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

“বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

২.
এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

আইনি কারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

অর্থনৈতিক কারণঃ
জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

প্রিয়া সাহা ইস্যুঃ জনগণের মন পড়তে ভুল করেন না

প্রিয়া সাহা ইস্যুঃ জনগণের মন পড়তে ভুল করেন না

গৌতম দাস

২৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০৫ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Dg

প্রিয়া সাহা অন্তত একটা ভাল কাজ করেছেন যে, বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আধাপ্রমাণিত-অপ্রমাণিত যেসব উদ্ভট তথ্যের ওপর এত দিন দাঁড়ানো ছিল, যা তাদের নিজেকে ভিকটিম হিসেবে দাঁড় করিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ করত – এমন যেসব বয়ান দীর্ঘ যুগ ধরে চালু আছে, তা এবার সরাসরি পাবলিক ডোমেনে সবার নজরে চলে এসেছে। আর তাতে সেসব বয়ান এক বিরাট সামাজিক আতসী-কাঁচের নিচে এসে পড়েছে। ফলে এবার আম-পাবলিকের সামনে আসল যাচাই-বাছাইয়ে তাকে নিজেকে প্রমাণ করতে পারতেই হবে, না হলে চিরতরে এসব বয়ানসহ বিদায় হওয়ার অবস্থা এসে গেছে।

প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে যা বলেছিলেন তা তিনি এর আরও অন্তত ৭২ ঘণ্টা পরে ঠাণ্ডা মাথায় আবার চিন্তা করে তা বলবার বা হাজির করার সুযোগ পেয়েছেন ও নিয়েছেন। বিডিনিউজ২৪ সেই ভিডিও বয়ান সংগ্রহ করে ট্রান্সস্ক্রিপ্ট ছাপিয়েছে, “নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন প্রিয়া সাহা” এই শিরোনামে,  আমি সেই ছাপানো রিপোর্ট ধরে কথা বলছি। বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, “প্রিয়া সাহা বলেন, সরকারের আদমশুমারি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী- দেশভাগের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৯.৭ শতাংশ ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক। ওই হার এখন নেমে এসেছে ৯.৭ শতাংশে”। এ ছাড়া আরও বলেন, ‘এখন দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ মিলিয়ন। সংখ্যালঘু জনসংখ্যা যদি একই হারে বৃদ্ধি পেত, তাহলে অবশ্যই যে জনসংখ্যা আছে, এবং যে জনসংখ্যার কথা আমি বলেছি ‘ক্রমাগত হারিয়ে গেছে’, সেই তথ্যটা মিলে যায়”।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “দেশভাগের সময়” আর “যদি” একই হারে বৃদ্ধি পেত। এককথায় বললে, প্রিয়া সাহা আসলে একটা “যদি” এর উপরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। মানে বাস্তবের জনসংখ্যা না, হাইপথিটিক্যাল ধরে নেয়া। অনেকটা দেশের কোন এক একর জমিতে যদি গুণে ১০টা গরু  পাওয়া যায় তাহলে দেশের মোট ১৪৭ হাজার বর্গকিমি ভূমিতে, ঐকিক নিয়মে ফেলে, গরুর সংখ্যা বের করে ফেলার মত।

এখন জানা যাচ্ছে, যে বই থেকে প্রিয়া এই তথ্য নিয়েছেন সে বইয়ের লেখক ডঃ আবুল বারাকাত। কিন্তু দেশে এখন প্রিয়ার দায় নিবার অথবা প্রিয়ার সাথে – আমি সম্পর্কিত বলে স্বীকার করার- লোকের সংখ্যা খুবই কম। কারণ দল নির্বিশেষে প্রায় সকলে প্রিয়ার বক্তব্যের বিরুদ্ধে যে নিন্দার ঝড় উঠেছে এরা সকলেই সেই ঝড়, বা সেই স্রোতের বাইরে থাকার বোকামি করতে একেবারেই নারাজ।  তাই বরং সম্পর্ক ত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে। সেটা মূল নেতা এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এর বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রিয়াকে বহিস্কার করে হাত ধুয়ে ফেলা থেকে শুরু করে, প্রিয়া সাহার নিজ এনজিও “শারি” এর কর্মীরা,    প্রিয়ার বক্তব্যের দায় না নিতে বইয়ের লেখক ডঃ আবুল বারাকাত বিবৃতি – এভাবে সকলে সামিল আছেন। বারাকাত এখন বলেছেন, প্রিয়া তাঁর “তথ্য-উপাত্ত বিকৃতভাবে উপস্থাপন” করেছেন। তাঁর দাবি,  “প্রিয়া সাহার বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক ও নীতি গর্হিত: বারকাত“।

হ্যাঁ, কেবল তথ্যের দিক বিবেচনায় বারাকাত তা বলতেই পারেন। যেমন- প্রিয়া দাবি করেছেন, ওই ২৯.৭ শতাংশ নাকি দেশভাগের সময়ের হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত। কিন্তু বারাকাত বলছিলেন, তার বইয়ে যা বলা আছে তাতে আসলে  ঐ অনুপাতটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ের নয়, বরং ১৯৬৪ সালের, প্রায় ১৭ বছর পরের। এটা বিরাট ভুল রেফারেন্স অবশ্যই। কিন্তু বারাকাত যে পদ্ধতিতে তাঁর হিসাব কষেছেন, যা এক – “যদি” এর উপর – দাঁড়ানো ঐকিক নিয়ম, প্রিয়া কিন্তু আসলে সে পদ্ধতিটাই অনুসরণ করেছেন। এব্যাপারে বারাকাত নিশ্চুপ।

এক স্বামী বাজারের ভেতর দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বড় বড় কৈ মাছ দেখে এসেছেন। বাড়ি ফিরে তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আদুরে গলায় গল্প আলাপ শুরু হয়েছিল, এক ‘যদি’র ওপরে। ‘যদি’ স্বামী বড় কৈ মাছ বাসায় আনতেন, সেখান থেকে স্ত্রী কত পদে কিভাবে তা রান্না করতেন সে আলাপ করতে যেয়ে স্ত্রীর আরও আহ্লাদ করতে ইচ্ছা করাতে তিনি বলে বসেন, ‘আমি ওই মাছ খেতাম না’। এতে স্বামী অগ্নিমূর্তি হয়ে বউ পেটানো শুরু করেছিলেন। তো মাছ বাজার থেকে বাসায় ঢোকার ব্যাপারটাই হাইপথিটিক্যাল থেকে গেলেও বাসায় বউ পিটানি ছিল কিন্তু জেনুইন। প্রিয়া-বারাকাতদের কাণ্ডটা প্রায় সেরকম।

এই তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক দিক হল, সরকারের পরিসংখ্যান দেখিয়েছে – হিন্দু জনসংখ্যাও নয়, বরং হিন্দু জনসংখ্যার (অন্যান্য ধর্মীয়-গোষ্ঠির তুলনায়) অনুপাত কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে ড. আবুল বারাকাত কেবল এতটুকুই জানছেন যে, অনুপাতে “কমেছে”, এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু এ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত টানতে গিয়ে আর “কমেছে” লিখছেন না। বরং তা না লিখে এর বদলে লিখছেন, এরা “নিরুদ্দিষ্ট”। বাক্যে লিখছেন এভাবে – যদি একই অনুপাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ধরা হয়, তাহলে ‘আনুমানিক ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নিরুদিষ্ট হয়েছেন“। এভাবে – কমেছে মানেই নিরুদ্দিষ্ট – এমন অর্থ তৈরি করছেন।

এটা কোন একাডেমিকের কাজ হতে পারে না। কোন একাদেমিক এভাবে ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত বা  উটকো অর্থ তৈরি করেন না। এটা আসলে নিজের একাদেমিক যোগ্যতাকে নিচা করে ফেলা কাজ। এছাড়া, যেহেতু বারাকাতের বাক্যটা ‘যদি’র ওপর দাঁড়ানো, তাই তাকে লিখতে হতো – নিরুদিষ্ট “হয়ে গেছে” না, নিরুদিষ্ট ‘হত’। পরিসংখ্যানে জনসংখ্যা কম দেখতে পাওয়া মানেই কি তাদের ‘নিরুদ্দিষ্ট’ হওয়া বলে চালিয়ে দেয়া যায়? কিসের ভিত্তিতে বারাকাত এই দাবি করছেন?

এছাড়া আমাদের সরকারি পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করে সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় ছাপা রিপোর্টে দেখেছি, ব্রিটিশ আমলেও হিন্দু জন্মহারের অনুপাত কখনো কখনো কমে গিয়েছিল। বিবিসি লিখেছে, বরং ব্রিটিশ আমলেও এই অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক হার কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়”। এর মানে “হিন্দুরা ভিকটিম” বলে দেখিয়ে সমাজের সহানুভুতি টানা আর যা প্রকারন্তরে সহ-জনগোষ্ঠি মুসলমানদের মনে অপরাধীর অনুভুতি তৈরি করা টাই বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতি। দেখা যাচ্ছে এর ফাউন্ডেশন নড়বড়ে।  আর এই নড়বড়ে ফাউন্ডেশনকে তবু খাড়া করে ধরে রাখতে আমরা এখন দেখছি আসলে, ড. আবুল বারাকাতের এই ‘নিরুদ্দিষ্ট’ শব্দ ব্যবহার খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

আরও আছে। এরপর বারাকাতের ‘নিরুদ্দিষ্ট’ শব্দটাকে আরও এককাঠি চড়িয়ে প্রিয়া এর ইংরেজি করেছেন ‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ [Disappear], মানে যাকে আমরা ‘গুম হওয়া’ বলি।  কিন্তু লিগাল টার্ম হিসাবে গুম [disappeared] শব্দটি হিউম্যান রাইটস্-এ খুব সিরিয়াস শব্দ, যেখানে রাষ্ট্র বিরাট অপরাধী গণ্য হয়ে যায়। তাই, নিজেকে মানবাধিকার কর্মী দাবি করা প্রিয়া সাহার এই ‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ শব্দ ব্যবহার করা, একটা ক্রিমিনাল কাজ হয়েছে। মানে তিনি বলতে চাইছেন, হাসিনা সরকারসহ বাংলাদেশের সরকারগুলো ৩.৭ কোটি হিন্দু লোককে গুম করে ফেলেছে!  অথচ কথাটা সিম্পলি তিনি বলতে পারতেন, তারা দেশ ছেড়ে গেছে, ‘ভারতে’ যদি নাও বলতে চান!

কিন্তু প্রিয়ার মত ড. আবুল বারাকাতও এই অভিযোগের বাইরে নন। তাতে যতই তিনি এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চান না কেন! তিনি সরকারি পরিসংখ্যান বইয়ে জনসংখ্যা কম দেখতে পেয়েছেন, এর মানে কি তিনি একে ‘নিরুদ্দিষ্ট’ হওয়া বলে দাবি করতে পারেন? ফলে শব্দের আসল “উসকানি” তো প্রথম তিনিই দিয়েছেন। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আধাপ্রমাণিত-অপ্রমাণিত যেসব তথ্যের বয়ান আছে, এই বয়ানদাতারা যেন তার কথাটা লুফে নেন, সে কাজই তিনি করেছেন। হাতে হাতে ফলও পেয়েছেন। নিশ্চয়ই বিজেপি-আরএসএস বারাকাতের এমন বই ও তথ্য হাজার হাজার কপি বিলির জন্য ছেপে নিবেন। তাই ড. আবুল বারাকাত খুবই সফল বিরাট “অর্থনীতিবিদ” বলতেই হয়!

তাহলে একা বাংলাদেশ না, ভারত ও পাকিস্তানও গুম-কা্রবারিঃ
আজকের বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান তিন দেশের জন্যই ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সবাইকে এক উথালপাথাল সময়ের ভেতরে যেতে হয়েছিল। কেন?
কারণ, ব্যাপক মাইগ্রেশন [Migration] বা পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশান্তর ঘটেছিল এ তিন দেশেই,  যা থেকে আজকের এই তিন রাষ্ট্রের কেউ বাদ নয়। যদিও এগুলো কারও জন্যই কোনো সুখকর স্মৃতি নয়। তবে মুলকথা, এটা কেবল যে বাংলাদেশ থেকেই হিন্দুরা দেশত্যাগ করে ভারতে গেছে তা একেবারেই নয়; বরং তিনটি দেশ থেকেই কোথাওই তা একমুখী নয়, প্রতি দুই দেশের মধ্যে উভয়মুখী দেশান্তর ঘটেছিল। আর কেবল বাংলাদেশের কথাই যদি তুলি, তবে বলা যায় – হিন্দুদের দেশান্তর হয়ে ভারতে যাওয়ার পাশাপাশি সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠী নিরাপদ জীবনযাপনের আশায় বাংলাদেশে চলে এসেছিল।

সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) সমগ্র সীমান্ত এলাকাজুড়েই এটা ঘটেছিল। বিশেষ করে এখনকার সাতক্ষীরা, বাগেরহাট আর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাগুলোতে অনেক বেশি করে। অথবা পশ্চিমবঙ্গের জল্পাইগুড়ি, কোচবিহার থেকে দিনাজপুর বা রংপুরে বাঙালি মুসলমানদের আসা। [দিনহাটা থেকে আসা এরশাদের পরিবারের কথা মনে করতে পারেন] এছাড়া আরো আছে। বিহার থেকে আমাদের দিনাজপুর কাছে বলে ব্যাপকসংখ্যক বিহারি-মুসলমান এসেছিল, যাদেরকে পুনর্বাসিত করতেই আমাদের সৈয়দপুরের জন্ম। দিনাজপুর-রংপুরের পঞ্চাশ মাইল দুরত্বের ঠিক মাঝখানে ২৫ মাইলে জায়গা বেছে নেয়া হয়েছিল। সেকালের মিল কারখানা প্রায় নাই পরিবেশে সৈয়দপুরের কয়েক কিলোর মধ্যে পার্বতিপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপকে মনে করা হয়েছিল পুণর্বাসনের এক বড় উপায়, তাই। তবে যেসব বিহারি অনেক আগেই বিহার ছেড়ে ততকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতায় কোন হাতের কাজ করত, ১৯৪৭ সালে এদের অনেকে আবার সেখান থেকে সরাসরি ঢাকায় চলে এসেছিল। ঢাকায় হাতের কাজ জানা কারিগরেরা গাড়িসহ যেকোন মেরামতি কাজ, ধুপবাতি তৈরি, নানান ডিজাইনের চটের হাতব্যাগ তৈরি, সেলুনের কারিগর ইত্যাদিতে – সর্বপ্রথম এভেলেবল কারিগর এরাই।  যেমন ঢাকার সেলুনগুলো চালানোর আদি কারিগর হল এরা।

সারকথায় বাংলাদেশের হিন্দুরাই একমাত্র [ভারতে] দেশান্তরি জনগোষ্ঠি নয়। দেশান্তরটা ঘটেছিল ক্রসবর্ডার মানে দুদিক থেকেই। কাজেই বাংলাদেশ কেবল হিন্দু জনগোষ্ঠিই ভিকটিম আর মুসলমানেরা সব এরজন্য দায়ী অপরাধী – এই বয়ান একচোখা। এই একই যুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে [পালিয়ে] আসা মুসলমানেদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদেরকেও কেউ দায়ী করতেই পারে। কিন্তু আমরা তা দেখি না। মানে এরা অভিযোগের বয়ান তৈরিতে দুর্বল, বুঝা যাচ্ছে। আবার তামসাও আছে। যেমন ধরেন, ডঃ আনিসুজ্জমান। কলকাতা থেকে প্রথম দেশান্তরি হন তার দুই সিনিয়র দুলাভাই [বাবার প্রথম পক্ষের দুই মেয়ের জামাই] সরকারি কর্মচারি, বাগেরহাটে। আনিসুজ্জামানের হোমিওপ্যাথি চিকিতসক বাবা এদেরকেই অনুসরণ করেন। একথাগুলো তাঁর আত্মজীবনী ধরণে লেখা বইতে পাওয়া যাবে। হাতের সামনে বইটা এখন নাই, আগে পড়ার স্মৃতি থেকে লিখলাম। কীন্তু তামসাটা হল তিনি এখন ঢাকার হিন্দু রাজনীতির বয়ান তৈরিকারিদের অংশ।

এখন তাহলে, প্রিয়া-বারাকাতদের তত্ব ও ফর্মুলা অনুসারে, ভারতের যে মুসলমান জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে চলে আসলো এতে ভারতের পরিসংখ্যান দেখে ভারতের কোন ডঃ ভট্টাচার্য অথবা কোন প্রিয়া রহমান কী এদেরকে  “নিরুদ্দিষ্ট” বা “ডিজঅ্যাপিয়ার্ড” বলে দাবি করছে? না, এটা বলবে? ভারতের কেউ কি তাদেরকে ভারত সরকারের হাতে “ডিজঅ্যাপিয়ার্ড” বলে দাবি করবে? আর কোনো এক প্রিয়া রহমান কী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গিয়ে আরো ৩.৭ কোটি মুসলমান ভারতের হাতে ডিজঅ্যাপিয়ার্ড বলে নালিশ দিবে? আর এতে নিশ্চয়ই প্রিয়া, বারাকাত এমনকি খোদ মোদী বা আরএসএস খুবই খুশি হবে! আদর করবে!

লুজ-টক, ‘দেশভাগ’ নাকি ভুলঃ
অনেকে প্রায়ই লুজ-টকের মতো করে বলে থাকেন, ১৯৪৭ সালের ‘দেশভাগ ভুল’। বিশেষত এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে করা হয়েছে, তাই। আসলে মূলকথাটা হল, এগুলো জমিদারদের স্বার্থের উপর দাঁড়িয়ে জেনে না জেনে বলা কথা। সেই বয়ান আপন করে নিয়ে বলা কথা। সেকালের জমিদার মানে হল, ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশরা যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তাদের কথা। অবিভক্ত সেই বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলতে ‘জমিদারি ভুমিমালিকানা ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাকেই বুঝাত, যা আবার ছিল কলোনি শাসকের স্বার্থের অধীনে। এই জমিদারদের সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিল বর্ণহিন্দু জমিদার।  ‘বর্ণ’ মানে জাতিভেদ প্রথা [Cast System]। এটা ব্রাক্ষ্মণদের সমাজে শীর্ষে রেখে বাকি মানুষদেরকে তাদের অধস্তন বিভিন্ন জাতের ক্যাটাগরিতে ফেলে একটা ‘কাস্ট সিস্টেম’ বা জাতপ্রথায় সাজিয়ে সমাজ পরিচালনা করা। প্রাচীন ভারত বলতে এই জাতপ্রথা ব্যবস্থার ব্রাক্ষ্মণ্যবাদের ভারতই বুঝাত।  ভারতে আজও যাই নতুন কিছু করতে চাওয়া হয়েছে তা শেষমেশে বর্ণহিন্দুদের শীর্ষে রেখে তাদের আধিপত্য বা হেজিমনিতে তৈরি এক ব্যবস্থা হয়েই দাড়িয়েছে। বৃটিশদের জমিদারি ব্যবস্থাও তাই বর্ণহিন্দুর জমিদারি ব্যবস্থা হয়ে দাড়িয়েছিল।
এতে অবিভক্ত সারা বাংলা মানে হয়ে যায় একচেটিয়াভাবে এই জমিদার শ্রেণীর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব – এক হেজিমনি। আবার অবিভক্ত বাংলা সেই প্রথম শহুরে-আরবান হতে শুরু করেছিল। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল ঐ জমিদারি ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই। ওরই ঔরসে। ‘শহর’ কথাটা আলাদা বিশেষ মনোযোগে বুঝতে হবে। অবিভক্ত বাংলার প্রথম “শহর” হওয়া খুব গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। তাও আবার বৃটিশ কলোনির সারা ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা ফলে সেই মাত্রার পুঁজি পুঞ্জীভবনের রাজধানী শহর কলকাতা –   বাংলার শহর হওয়ার শুরু সেই সারা ভারতের রাজধানী কলকাতা হবার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে। কিন্তু হলে কী হবে এই কলকাতা গড়ে উঠতেছিল এক বর্ণহিন্দু জমিদারের কর্তৃত্বেই।
একারণেই বাংলা ভাষা, বাঙালি বলে ‘জাতি’ ও সংস্কৃতিগত ধারণা, বাঙালির শহর, বাঙালির আধুনিকতা ইত্যাদি যাকিছু ঐ প্রথম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তা সব ঐ সময়েই এবং তা বর্ণহিন্দু জমিদার শ্রেণীর ঔরসে, পৃষ্ঠপোষকতায় ও স্বার্থে। বলা বাহুল্য, বাঙালি বিষয়ক এসব ধারণা তৈরি হয়েছিল ও আকার পেয়েছিল এই অনুমানে যে, বাংলার মুসলমানেরা বাঙালিই নয়, সুতরাং ‘এক্সক্লুডেড’। তাই জমিদারদের ‘বাঙালি’ ধারণায় কোথাও মুসলমানদের গোনায় ধরার দরকারই মনে করা হয়নি। এরই এক প্রবল প্রমাণ – উপন্যাসিক শরতচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখা। তিনি অবলীলায় তাই “বাঙালি বনাম মুসলমানের” ফুটবল খেলার গল্প বলেছেন। কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরী মরার আগে পর্যন্ত (একালে এরশাদের আমলেও) নিজের লেখায় স্বীকার করেন নি যে মুসলমানেরা বাঙালি।

এসব চিন্তা-ততপরতারই সার ফলাফল আমরা দেখেছিলাম সেকালে, সারা বাংলাতেই সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ইত্যাদি সব কিছুতে ছিল জমিদার হিন্দুর আধিপত্য। এতে সমাজে যে মুসলমান, তাকে মার্জিনাল করে কোণায় ফেলে রাখাই রেওয়াজ হয়ে যায়। আবার একই হিন্দু জমিদারের মুসলমান প্রজার জায়গায় হিন্দু প্রজার বেলায় দেখা যেত সামাজিক সাংস্কৃতিক ট্রিটমেন্ট আলাদা অর্থাৎ তুলনায় ভাল। যেমন জমিদারের বাড়িতে বসবার জায়গা থাকত আলাদা। বসার জায়গায় পাটি পাতা থাকত তাদের জন্য। অর্থাৎ মুসলমানদের মত খোলা মাটিতে তাদের বসতে হতো না। ভাল হুকোতে তামাক টানার ব্যবস্থা থাকত তাদের জন্য। আর এর ফলে হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজার চেয়ে  সামাজিকভাবে একটু উন্নত, উপরে এই ভাবটা সহজেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এই স্ট্যাটাসের কারণ তারা অন্তত সাংস্কৃতিকভাবে বর্ণহিন্দু জমিদারদের সাথে এক ছাঁচে লীন হয়ে যাওয়া, গণ্য হওয়া অনুভব করত। আবার যেমন, এমনকি বিশ শতকে এসেও ‘শেখ মুজিবের আত্মজীবনী’ বইতে যে সামাজিক বৈষম্য দেখি, সেটা তখনো খুবই প্রখর, মার্জিনালাইজড মুসলমানের এক মফস্বল শহরের। তবে একটা কাউন্টার ফ্যাক্ট ছিল সব সময় যে, পূর্ববঙ্গে মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।

একারণে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের দৃষ্টিতে দেখলে, তাই ১৯০৫ কিংবা ১৯৪৭ সালে তাদের কাছে বাংলার বিভক্তিজাত আলাদা প্রদেশ, কিংবা আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান – দুবারই তা খুবই কাম্য ছিল। আর এর ঠিক উল্টোটা হল, বৃটিশদের প্রশাসনিক পদক্ষেপে ১৯০৫ সালের বাংলার বিভক্তি থেকেই জমিদার হিন্দুদের চরম নাখোশ হওয়া। এর মূল কারণ পূর্ববঙ্গের ওপর তাদের কর্তৃত্ব হাতছাড়া হওয়ার ভয়। ব্রিটিশরা বড় হয়ে যাওয়া নিজেদের প্রশাসনিক ম্যানেজমেন্ট সহজ করার জন্য আর মুসলমানদের একটু স্বস্তি দেয়ার জন্য পূর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েছিল। কিন্তু জমিদারের কায়েমি স্বার্থের কাছে এটা অসহ্য লেগেছিল। কারণ, এতে মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে তারা হাতছুট হয়ে যায় কি না।

এদেরই লেখা ইতিহাসের আর এক বেছে নেয়া চালু শব্দ “ডিভাইড এন্ড রুল”।  মানে জমিদারী স্বার্থের দিক থেকে দেখে অভিযোগের সারকথাটা হচ্ছে, “বৃটিশ শাসক তুমি আমার পাশের মার্জিনাল মুসলমানদের উপরে উঠে যেতে সাহায্য করতে যাচ্ছ – এটাকে আমার বিরুদ্ধের কাজ, ওদের সুযোগ করে দেয়া বলে আমি দেখছি”। এই ডিভাইড করা তাই খারাপ কাজ।  কিন্তু যদি জমিদারকে জিজ্ঞাসা করা যেত তুমি কাকে ডিভাইড করে ফেলার কথা বলছ? মুসলমানদের তো তুমি ইতোমধ্যেই মার্জিনালাইড বলে আলাদা ডিভাইড করে রাখছ!  আসলে তামসাটা হল ডিভাইড বলার সময় সে মুসলমান প্রজাদের নিজের সাথে বলে ধরে নিয়েছে! আবার এখান থেকেই তাদের তথাকথিত স্বদেশী এবং বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের শুরু। কেন? না বৃটিশেরা মুসলমানদের একটু স্বস্তি দিবার জন্য পুর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ করতে গিয়েছে।

আসলে ১৯০৫ সালের পুর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হবার বিরুদ্ধে তথাকথিত বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন – খারা করে ফেলতে পারে, এটাই প্রমাণ করে জমিদারদের স্বার্থকেই হিন্দু প্রজারাও তাদের স্বার্থ গণ্য করেছিল। হিন্দুস্বার্থ বলে এক মিথ – এর ঘোল খেয়ে। এটাই বলে যে সে সমাজটা ছিল আসলে হিন্দুস্বার্থ বলে এক মিথ এর উপর দাঁড়ানো। মুসলমানেরা ঐ সমাজের কোন শক্তিই নয়।

তার মানে এটা কোন উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ছিল না। ছিল পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে  মুসলমানদের সম্ভাব্য প্রভাব বেড়ে যেতে পারে – এটা ঠেকানোর আন্দোলন। “অনুশীলন” বা “যুগান্তর” গোষ্ঠির মা-কালীর পুজা করে স্বদেশী আন্দোলন করতে বেরিয়ে পড়া এখান থেকে। উপন্যাসিকদের গল্প লিখে একে উতসাহ দেয়াও এখান থেকে। এটা মূলত জমিদার কায়েমি স্বার্থের বাইরে মুসলমানদের একটু হাতছুট হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন। অথচ  তারা ইতিহাস লিখেছে, এটাই নাকি ‘স্বদেশী আন্দোলন’। কার স্বদেশ? এই কারণে, বাংলাদেশের আম মুসলমানদের কাছে এখনো এর কোনো আবেদন নেই। অবশ্য এডুকেটেড মুসলমান ‘প্রগতিবাদী বুঝ’ থেকে অনেক সময়ে একে খুব বিরাট ঘটনা মনে করতে চায়। তাই আজ পুনোর্মুল্যায়ন করে দেখা দরকার এই আন্দোলনের কনটেন্ট, এর সারকথা কী? এটা কতটা আদৌও উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন নাকি বর্ণহিন্দুর জমিদারী ক্ষমতাকে যারা চ্যালেঞ্জ করছে তাদের দমানো মোকাবিলার আন্দোলন। পুর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ করানোর বৃটিশ এক প্রশাসনিক ঘোষণা – এর বিরোধিতা করার আন্দোলনকে কী কারণে “উপনিবেশবিরোধী” আন্দোলন মনে করতে হবে?

কিন্তু বাস্তবতা হল, পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজাদের কাছে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ ছিল সেই টুলস, যা দিয়ে সে জমিদারি উচ্ছেদ করে জমি পাওয়ার আন্দোলন বাস্তব করতে পারে। এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের গূঢ়ার্থ। বাইরে থেকে এটাকে ইসলাম কায়েম, মুসলমানরা দেশ পেয়েছে, ‘এটা মুসলিম জাতীয়তাবাদ কিংবা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়ে ফলে এটা নষ্ট, ইত্যাদি যাই বলা হোক না কেন, সারকথা ছিল জমিদারি উচ্ছেদ করে দেয়ার বাস্তব ক্ষমতা তারা হাতে পেয়ে যায়। তাই, ‘এস্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনেন্সি অ্যাক্ট ১৯৫০’ [The state acquisition and tenancy act, 1950 (East Bengal act no. Xxviii of 1951)]- যেটা পাস হয়েছিল ১৬ মে ১৯৫১ তারিখে, এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান ফলাফল হিসাবে সবচেয়ে সেই ‘বিপ্লবী ঘটনা’।

এই আইনের বলে জমিদারি পূর্ববঙ্গ থেকে উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। এতে অ্যাকুইজিশন মানে হল, বাংলাদেশ রাষ্ট্র দেশের সব জমিমালিকানা নিজের করে নিয়েছিল। এই আইনের ঘোষণাই সেটা। তাই এটাই জমিদারি উচ্ছেদ। এরপর যে যে জমি আগে চাষাবাদ করত এখন সরকারকে নির্ধারিত খাজনা দেয়া সাপেক্ষে সে সেই জমির মালিক। এটাই ছিল বাংলাদেশের (পুর্ব পাকিস্তান) অর্থনীতিতে “ক্যাপিটাল ফর্মেশনের’ দিক থেকে প্রথম সুদূরপ্রসারী কালজয়ী পদক্ষেপের ঘটনা। নিপীড়ন নিষ্পেষণের মধ্যে যুগ যুগ নিরন্তর ফেলে রাখা চাষা-প্রজার আত্মমুক্তির প্রথম পদক্ষেপ। বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন, আমাদের অর্থনীতির প্রথম ভিত্তি গেড়ে দেওয়ার এক আইন। সেটা হয়েছিল বলেই আজ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের এক্সপোর্ট গ্লোবাল বিজনেস, এক জটিল ব্যবস্থাপনার ব্যবসা সে  সামলাতে পারে মাথা তুলে, সেকালের সেই চাষার সন্তানরাই।

কোথাও বিপ্লব ঘটেছে বলে এমন কোনো কিছুকে চিনবার নির্ণায়ক যদি হয় নতুন রাষ্ট্র, মালিকানার ধরনে বদল, ক্ষমতায় বদল ইত্যাদি, তাহলে অন্তত এ তিন কারণে “পাকিস্তান আন্দোলন” ছিল একটা বিপ্লব। অনেকে বলবেন এর ধর্মীয় পরিচয়ের দিকটার কথা [এই আপত্তির অসারতার দিক নিয়ে আরেক সময় বলা যাবে]। কিন্তু এই জমিদারি উচ্ছেদের কাজটা খারাপ হয়েছে – এ কথা কেউ বলুক দেখি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে দুনিয়ার কলোনি শাসকের “শর্ত অনুযায়ী” কলোনি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এতে কলোনি শাসকেরা যত দেশ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, সব দেশেই এর সাধারণ ধারা ছিল, সবসম্পত্তি রেখে যাওয়া। যেমন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান রেলওয়ে, আমরা কেউ ব্রিটিশেরা চলে গেলেও তাদেরকে এর কোন মালিকানা শেয়ারও দেইনি। মিসরের নাসের সুয়েজ খালের মালিকানা নিয়ে কলোনি শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন ও জিতে এসেছিলেন। একাত্তর সালের পরে আমরাও পাকিস্তানি সম্পত্তি বায়োজাপ্ত করেছি ফেরত দেইনি। পাকিস্তানের ভুট্টো ১৯৭২ সালে পুরনো ব্যাংক বীমা কোম্পানির পুরানা আয়ুব আমলে প্রতিষ্ঠিত মালিকদের সম্পত্তি জাতীয়করণ করেছিলেন। তবে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, এথেকে পাওয়া মালিকানা সরকারের হাতে রাখতেই হবে, ব্যক্তির নয়।

তবে কলোনির ক্ষেত্রে সম্পত্তি বায়োজাপ্ত না করার একটাই উদাহরণ আছে, ওবামার প্রিয়জন  নেলসন ম্যান্ডেলার সাউথ আফ্রিকা। ১৯৯৪ সালে তিনি শ্বেতাঙ্গদের সম্পত্তি যেমন ছিল তাতে তিনি হাত দিতে দেননি। অথচ স্বাধীন হয়েছেন বলে ভান করেছেন, পশ্চিমারাও পিঠ চাপড়ে দিয়েছে। আর এরই ফলাফল হল, এখন সে দেশে খনি শ্রমিকের বেতন ১৬০০ ডলার, কিন্তু তারা বস্তির জীবনযাপন করে। কারণ, জীবনযাপন লন্ডনের মতো খুবই ব্যয়বহুল। আর ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষমতা আগের মতোই সাদাদের আধিপত্যে। কাজেই কাকে কী ফেরত দেয়া যাবে, এর নির্ণায়ক এগুলো। এক্ষেত্রে সম্পত্তি ও নাগরিকত্ব সাদাদের দিয়ে দেয়া মনে তাদেরকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাই দিয়ে দেওয়া। ক্ষমতার সাথে সম্পত্তির সম্পর্কটা এখানে এতই সিরিয়াস।

অতএব ধরা যাক, জমিদার রবীন্দ্রনাথ কবির চাদর গায়ে ফেরত এসেছেন বলে কিংবা গদ্য সাহিত্যের প্রমথ চৌধুরী যশোরের জমিদারি ফেরত চান বা লেখক সাহিত্যিক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী কিশোরগঞ্জ ফেরত চান বললেই আমরা ফেরত দিতে পারব না, দেওয়া যায় না, তাই না! আমাদের সাথে জমিদার-প্রজার সম্পর্কটা আমল না আড়ালে বাদ রেখে দেয়া যাবে না, মুল্যায়নে যাওয়া যাবে না। আমাদেরকে বুঝতে হবে কী দেয়া যায়, কী যায় না।

আমাদের এক মুরব্বি বদরুদ্দিন উমর, সেই ১৯৭০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কোথায় রাখব, এর একটা নির্ণায়কের কথা তুলেছিলেন। তিনি “…… আন্দোলনের এক প্রান্তে থাকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতিকে অবতার হিসেবে খাড়া করার স্থূল ও হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা” – এর নিন্দা করেছেন। আসলে এরাই হল তথাকথিত “বেঙ্গল রেনেসাঁবাদী”। এরাই একদিকে রেনেসাঁ বলতে ধর্ম বা পশ্চাদপদতা কোপানোর কথার আড়ালে ইসলামবিদ্বেষী হয়ে ইসলামকে কোপ দিয়ে গেছে। অন্যদিকে এদেরই মূল স্বার্থ বর্ণহিন্দুর জমিদারি কায়েমি স্বার্থকে রক্ষা করা। তাই তারা জমিদারী শাসনের বিরুদ্ধে কখনও কোন কথা বলে নাই। যেন এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যবস্থা – এটা ধরে নিয়েছে। আবার জমিদারি কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে আঁচও যেন না লাগে সে চেষ্টা করে গেছে। বরং আঁচ লাগা থেকেই তাদের তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলনের শুরু। এজন্য পুর্ববঙ্গের মানুষের প্রজা মুসলমানেরা “বেঙ্গল রেনেসাঁগিরি” কথিত এক আধুনিকতার নামে কায়েমি স্বার্থকে আমল করে নাই। নিজের মনে করে নাই। তাই আমাদের মূল্যায়নে মূল নির্ণায়ক হল,  উনিশ শতক (১৮০০-১৮৯৯) থেকে একালেও কোন ব্যক্তিত্বের  সেকালের জমিদারি শাসনের প্রতি মনোভাব কী ছিল? এর উচ্ছিষ্টভোগী থেকে চুপ ছিলেন কী না এগুলো। আসলে এসব দেখেই বাংলাদেশের স্বতন্ত্র মূল্যায়নের ধারাটাই প্রধান হয়ে উঠবে।

প্রিয়া সাহা কোন প্লাটফর্ম থেকে কথা তুললেন?
একালে এ’ঘটনার শুরু ২০০১ সালে আমেরিকায় ৯/১১, মানে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে। এর এক মাসেরও কম সময় পর ৭ অক্টোবরে তখনকার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সাথে মূল সাগরেদ তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে নিয়ে আফগানিস্তানের ওপর যুদ্ধবিমান হামলা শুরু করেছিলেন। আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি কমন প্র্যাকটিস হল, এসব ক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরু বা বিমান হামলার সাথে সাথেই আর একটা কাজ তারা শুরু করে। তা হল, দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই পররাষ্ট্-দূত পাঠানো। এর উদ্দেশ্য আমেরিকান ওই হামলার সিদ্ধান্তের পক্ষে বিশ্বজনমতকে নিজের পক্ষে জড়ো করা। কারণ, যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে চলে না, যদি না সাথে এর পক্ষে বয়ান ও জনমত তৈরি করে নেয়া যায়। অবশ্য এর আগে এই যুদ্ধ ও হামলার এক খুবসুরত ছোট নাম প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ দিয়ে নিয়েছিলেন – ‘ওয়্যার অন টেরর’। ফলে তৈরি হয় ‘ওয়্যার অন টেরর’-এর বয়ান। গ্লোবাল নেতা হিসেবে আমেরিকা দুনিয়ার ছোট-বড় বিভিন্ন রাষ্ট্রের ওপর যতটুকু প্রভাব অথবা চাপ তৈরিতে সক্ষমতা, তা দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্রের ওপর এর সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রয়োগ করে আমেরিকান কূটনীতিক পাঠিয়ে বুশ এই পুরো কাজটা সম্পন্ন করেছিলেন।

তবে এর অন্য একটা দিক আছে। আমেরিকান কূটনীতিকদের এই সফরের মধ্য দিয়ে আসলে যা ঘটে তা হল, স্থানীয় নানান দ্বন্দ্বগুলোর সাথে গ্লোবাল এ রকম ইস্যুর এলায়েন্স। মানে এতে নতুন করে এক পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ শুরু হয়ে যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেমন কাশ্মির, পাকিস্তান বা একটু দূরে হলেও বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ আছে। একে ভারতের চোখ দিয়ে দেখে তাতে সমর্থন দিয়ে আমেরিকা তা আমলে নিলে, এবার ভারত ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নৌকায় উঠতে রাজি বলে জানায়। তাই রফাটা মোটামুটি এখানেই হয়েছিল এভাবে যে আসলে আমেরিকাই হিন্দুত্বের স্বার্থকে ‘ওয়্যার অন টেরর’-এর সাগরেদ বানিয়ে নিয়েছিল। আর সেখান থেকেই  আমেরিকায় “হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন” এর জন্ম ২০০৩ সালে।

তারা মূলত পারিবারিকভাবে হিন্দু হলেও আমেরিকায় জন্ম নেয়া হিন্দু প্রজন্ম, নিজেদের পরিচয়ে এটাই তারা ফোকাস করে থাকেন। এদের বোর্ড অব ডিরেক্টরদের তালিকায় এদের পরিচয় ও বয়েস দেখলে বুঝা যাবে। চলতি ইস্যুতে এদের মধ্য সবচেয়ে প্রভাবশালী জয় কানসারা [Jay Kansara]।

এছাড়া আছেন, হাওয়াই এর প্রতিনিধি পরিষদ নেতা বা কংগ্রেসম্যান (আমাদের ভাষায় এমপি)  তুলশি গাব্বার্ড  [Tulsi Gabbard] যাকে প্রথম হিন্দু (প্রাকটিসিং হিন্দু) কংগ্রেসম্যান বলে দেখানো হয় [ first Hindu member of the United States Congress]। ডেমোক্রেট দলীয় এই এমপি ভাগবদ গীতার উপর হাত রেখে কংগ্রেসম্যান হতে হাউজে শপথ নিয়েছিলেন। বাবা হাওয়াই সিনেট সদস্য।

আমেরিকার ইসকনসহ যত হিন্দু প্রতিষ্ঠান আছে ইত্যাদি সব মিলিয়ে ওরা এক প্রেসার ও লবি গ্রুপ, যারা হাউজে বা সিনেট লবিতে তৎপর থাকে কথিত হিন্দুস্বার্থের পক্ষে। শেষ বিচারে এর ‘মাখন’টা যায় ভারতের বিদেশনীতির পক্ষেই। তাই এই গ্রুপ বা ব্যক্তিগুলোর সমন্বয় করে থাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা। আর হোয়াইট হাউজ পর্যন্ত তা হাজির করে আমেরিকার ‘ফ্রিডম হাউজ’-এর মত পুরোপুরি সরকারি ফান্ডে চলা এনজিও।

এসব তথ্যগুলোকে স্রেফ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসাবে পড়লে অতি-সরলিকরণ দোষে পড়তে হবে। এরচেয়ে বরং এসব লবিগ্রুপ তৈরি হচ্ছে কিভাবে সে প্রক্রিয়া, এদের খেলাস্র নিয়ম ইত্যাদি খুবই মনোযোগে স্টাডি করার বিষয়। চাইলে এখেলায় আপনিও নামতে পারেন। কিন্তু কী করে এগুলো কাজ করে, এই খেলার নিয়ম কী সব বুঝতে হবে আগে। নিজের স্বার্থ গ্রুপ খারা করতে পারেন। আমেরিকন আইনে আইন মেনে লবি বা প্রেসার গ্রুপ বানানো বৈধ। আপনাকে নিজের গ্রুপ বানাতেই হবে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। কিন্তু আপনাকে এদের সম্পর্কে কতদুর কী করতে পারে জানা থাকতে হবে। আবার শত্রুর শত্রু তত্ব অনুসারে যেহেতু এরা হিন্দুস্বার্থের পক্ষে গ্রুপ, মানে এরা ‘ওয়্যার অন টেররে’ মুসলমান স্বার্থের বিপক্ষে; অতএব মাছি আসবেই। ইসরায়েলি সাফাদি-কেও এখানে পাবেন।

তাহলে এবার একটু সার করি। ‘ওয়্যার অন টেরর’ থেকে জন্ম নেয়া এই হিন্দুস্বার্থ গ্রুপ (শব্দগুলো ওদের, লিখেছেন হিন্দুইজম প্রমোট করেন তারা, HAF’s work impacts a range of issues — from the portrayal of Hinduism to…….) এদের বেশকিছু ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পেছনে। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতি এখন যা মূলত বিজেপির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে; মূলত গত নির্বাচনের সময় থেকে। এরাও এরই অংশ, যোগাযোগ সম্পর্ক আছে, রাখে। ক্ষমতায় আসার সময় এদের সমর্থন আওয়ামি লীগের ভাল লেগেছিল। কিন্তু খবর নেয় নাই এরা কারা কার সাথে কে কীভাবে কাজ করে। এ’দিকটা সম্ভবত সরকার যথাযথ আমল না করায় এখন ‘সেম সাইডে গোল’ খেতে হলো।

ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিবার পর থেকে গত দুবছর ধরে আমেরিকার ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার আছে কিনা এনিয়ে আওয়াজ তোলা প্রেসার গ্রুপ প্রায় চুপসে গেছিল। কারণ ট্রাম্প আমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা ফেলে আমেরিকা ফাস্টের ন্যাসনালিজম করতে গেছিল। তাই গত দুবছর নামকাওয়াস্তে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার আছে কিনা – এসবের বার্ষিক রিপোর্ট হয়েছিল। এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে এতে ট্রাম্প বাবাজীবন হাজির। হতে পারে আগামি বছর নির্বাচন, তিনি আবার দাড়াতে চান, সেটা এর কারণ। ট্রাম্পের ন্যাশনালিজমের খোলস থেকে মাথা বের করা। তবে যে কারণেই হোক মনে হচ্ছে ভারত পুরানা মেকানিজমটাকে ততপর করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বিপদজনক হচ্ছে হাসিনা নিজেকে রক্ষা করতে বিব্রত না হতে চারদিকে খোঁজ রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ঠিক ঠিক কাজের লোক তার নাই না ছিল না। দৃশ্যত হাসিনাকে এখানে পরাজিত করে ফেলা হয়েছে, আশপাশের অকাজের লোকের জন্য। দু-একটা শাহরিয়ার কবির বা প্রিয়া সাহা পাওয়া কোন ব্যাপার না। এগুলা ঘটনার পেটি-দিক।
এরপর অন্যদিকে যাবার আগে বলে রাখি। আবার বিএনপিরও বিরাট ওস্তাদ ভাবার কোন কারণ নাই। এরাও প্রায় সমান বেকুব। গত নির্বাচনে আরএসএস আমাদের দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। দু দলই বোকার মত মোদীর সমর্থন পাবার সাথে ব্যাপারটাকে সম্পর্কিত করে  দুই দলের ভিতরেই কিছু লোক এই হিন্দুস্বার্থকে পঞ্চাশ আসন দেয়ার জন্য লবি ও রাজী করিয়েছিল। অথচ আরএসএস মোকাবিলার জন্য পাবলিকই যথেষ্ট ছিল। অথচ কেউ ব্যবহার চিন্তা করে নাই। হাস্না পীয্যুষকে লাগিয়েছিল, অযথা দাগ লাগানোর জন্য। আর বিএনপির ভিতরে যারা বিরাট বুদ্ধিমান কিন্তু আসলে কথিত হিন্দুস্বার্থের জন্য লবী করেছিল, এরাও কোণঠাসা হওয়া আর শক্ত ওয়ার্নিং পাওয়ার যোগ্য।

তবে আমরা পাবলিককে যে নীতির পক্ষে সবার হাত ধরে দাড়াতে হবে তা হল, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি। নাগরিক যেই হোক যে ধর্মের যে পরিচয়েরই হোক তার সাথে কোনই নাগরিক অধিকার বৈষম্য করা যাবে না। কাউকে বাড়ি সুযোগ, ক্ষমতাও দেয়া যাবে না। আইনের চোখে সবাই সমান হতে হবে। আমাদের সমস্যা এটা আসলে সেকুলারিজমের কোন ইস্যুই না। নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি অনুসরণ করলে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে ছলাকলা প্রয়োজনীয় হয়ে যাবে।  আবার আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়া ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।  হাসিনার উচিত হবে ইমিডিয়েট এসব নীতি অনুসরণ করে সব সমস্যাকে দেখা। আর সর্বোপরি জনগণের শক্তির উপর ভরসা করে খাড়ায় যাওয়া।
এসব অনুসরণ করলে কোন ট্রাম্প বা প্রিয়া, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বা বাংলাদেশকে কখনও ভয় দেখাতে, বিব্রত করতে পারবে না।  এক পেটি স্বার্থে, এক হিন্দুর বাড়ি জমি এনক্রোচমেন্ট করতে পড়শি আরেক হিন্দু বা মুসলমানকে দেয়া হয়েছে। এতে বদনাম ছাড়া, কোন দলের কার কী লাভ হয়েছে? এগুলোই এখন প্রধান অভিযোগ। আর তা এমনভাবে প্রিয়াদের হাতে উপস্থাপিত যেন বিশেষ করে ইসলামী দলসহ আমাদের সব রাজনৈতিক দলগুলোর  প্রধান কর্মসুচি যেন পড়শি এনক্রোচমেন্ট যেন হিন্দুর সম্পত্তি দখল। অথচ ১২% বিশেষ জনগণকে ২৫% চাকরি দেয়া যে কোন কাজে আসে না, এটাই আজ দেখা যাচ্ছে। এটা কোন পথই না।
অথচ দরকার ছিল নুন্যতম আইনের শাসন। তা দিয়েই এগুলো সমাধান করা যায়। আমাদের সরকার চালানো এমনই কেলাস, পেটিস্বার্থে ভরপুর। যার মুল কারণ শাসন-হীনতা। খোদ প্রভাবশালী হিন্দুরই দেবোত্তর পুজামন্ডপের সম্পত্তি গ্রাস করা থেকে যা বুঝা যায়। আসলে সরকারের জমিজমা সম্পত্তিই যখন দলের লোকেদের দখলে চলে যাওয়া র‍্যানডাম হয়ে যায়, তখন দুর্বল হিন্দুরটা এর বাইরে থাকবে কেন?

তবু প্রিয়া সাহার ঘটনা প্রমাণ করল, এ সরকারের জন্য বাংলাদেশের হিন্দুত্বের রাজনীতি আর নির্ভরযোগ্য নয়। ‘ফলে রি-অ্যাসেসমেন্ট’ দরকার বলে মনে করা যায়। আমরা সবার সাথে ভারসাম্য সম্পর্ক রাখব – এগুলো তো আসলে মুখে বলে কিছু হবে না। প্রিয়ার ঘটনা যে গওহর রিজভীও আগাম অনুমান বা বুঝেন নাই তা বলাই বাহুল্য। বরং আমরা দেখছি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ঐ “ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সম্মেলনে” যোগ দিতে পাঠানো হয়েছে। কেন? কী বুঝে?

এখন আবার কী হাসিনার ক্ষমতার লোভে ভুল জায়গায় পা দেয়া হবে? প্রিয়া ইস্যুটা ভারতের মধ্যস্থতায় আপোষ করে নিবে? হতে পারে এটাই সম্ভবত ভারতের আকাঙ্খা। অথচ নিজেদের শক্তি সামর্থের খবর না নিয়ে কেন রাজনীতি করতে যাওয়া! বাংলাদেশের পাবলিক মাইন্ড কানখাড়া করে একটা ডাকের অপেক্ষা করছে। ওদিকে একটা ইতি আলামত বলছে – ভারত এখন আমেরিকাকে হাসিনার বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারছে না। সুযোগ যেকারণেই হোক, নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু হাসিনা কী সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারবে?

একই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের লেখায় যেতে হলে এখানে ক্লিক করেন

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সরকারের বিরাট পরীক্ষা প্রিয়া সাহা ইস্যু এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2D0

 

ভারতের এনআরসি মানে ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স’ (National Register of Citizens (NRC))। কিন্তু এটা কেবল আসামের এক ইস্যু। ভারতের নর্থ-ইস্টে সাত রাজ্যের বড়টা হল আসাম। আসলে উল্টাটা। বড় আসামকে ভেঙ্গেই পরে সাত রাজ্য (ত্রিপুরাকেও সাথে ধরে) বানানো। নানান জনগোষ্ঠীর ট্রাইবাল পরিচয়ের ভিত্তিতে আগের আসাম রাজ্যকে বিভক্ত করার কাজটা হয়েছিল মূলত ১৯৭২ সালে, ভাগ করে মোট সাতটি আলাদা রাজ্য করা হয়েছিল। এরপরের যে আলাদা নতুন আসাম কেবল তারই এনআরসির সোজা মানে হল, কেবল আসামের নাগরিকদের জাতীয় তালিকার রেজিস্টার। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটা দিয়ে সারা ভারতের নাগরিক তালিকা বুঝানো হয়নি, কেবল ‘আসামের নাগরিকদের তালিকা’ বুঝতে হবে। কিন্তু কেবল আসামে কেন?

এনআরসির তৈরির কাজ শুরুর পর থেকে এর ফাইনাল তালিকা করা কবে শেষ হবে ও প্রকাশিত হবে এনিয়ে বহু মোচড়ামুচড়ির পরে ঘোষণা করার সর্বশেষ তারিখ ছিল, চলতি মাসের শেষে, ৩১ জুলাই। কিন্তু আবার গড়িমসি করা শুরু হয়ে গেছে। আবার আদালতে তারিখ পেছানোর দরখাস্ত পেশ করা হয়েছে। আর খুব সম্ভবত এবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে “মুসলমানেরা দায়ী”, “মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা দায়ী”- এ কথাগুলো প্রবল করার বিজেপি-আরএসএসের জল্পনা-পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।  তাই একটা চাপ তৈরি করার চেষতা হচ্ছে। এদিকে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপেশাদার আচরণও ইস্যুটাকে আরও বিপজ্জনক  করে তুলছে। এমনিতেই ভারতের কিছু মিডিয়া বলা শুরু করেছে যে, এনআরসির তালিকা তৈরি করার কাজটা শেষে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থেকে অম্পুর্ণ ও ব্যর্থ হবে। শেষ করতে পারবে না ইত্যাদি। কেউ কেউ চার-পাঁচ সম্ভাব্য কারণও ছাপিয়ে ফেলেছে [5 reasons why NRC implementation is bound to fail] । অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের লেখা, “এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর ভারত কি সত্যিই কাউকে ফেরত পাঠাতে পারে”। আর ভারতের এমন মিডিয়ার তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার নাম। এদের সর্বশেষ রিপোর্টের শিরোনাম ‘এনআরসি বিপর্যয় : প্রক্রিয়ার ত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্র ও আসাম” [NRC Disaster: Center and Assam virtually admit flaws in the process – এটা প্রকাশিত হয়েছে দুদিন আগে ১৭ জুলাই।

কেবল আসামে কেন- সেই প্রশ্ন থেকে শুরু করতে প্রথমে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা অবশ্যই প্রশাসনিক, মানে নির্বাহী সরকার করবে। কিন্তু আসামের ক্ষেত্রে এই এনআরসি তৈরির কাজটা চলছে মোদী অথবা তার আগের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা বা আদেশে নয়। তাহলে কী এটা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকারের আদেশে বা ইচ্ছায় হচ্ছে? না, তা-ও নয়। এটা আসলে চলছে বিচার বিভাগের নির্দেশে। না, এনআরসি তৈরিতে কাজে নেমে পড়ার আদেশ বলতে, একটা আদালতের রায় যেমন হয়, এটা ততটুকুই নয়। রায় তো দিয়েছেনই, সেই সাথে খোদ আদালতই এনআরসি কাজের তদারককারী, তত্ত্বাবধায়ক। তা-ও আবার “আদালত” বলতে আসাম রাজ্যের হাইকোর্ট নয়, একেবারে দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে। তবে ‘সমন্বয়কারী’ নামে পদে এক হেড বুরোক্র্যাট (প্রতীক হাজেলা, [Prateek Hajela]) আছেন বটে, কিন্তু তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে জবাবদিহির অধীনে। অর্থাৎ তিনি কেন্দ্রের মোদীর (বা আসাম রাজ্যের) নির্বাহী সরকারের হুকুমের অধীনস্থ কেউ নন। সোজা কথায় বিচার বিভাগ, এব্যাপারে নির্বাহী বিভাগের কাজকাম নিজের দখলে নিয়েছে। যেমন ধরেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল আইডি তৈরির কাজ আমাদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন শেষ বিচারে নির্বাহী বিভাগের অন্তর্গত। কারণ এটি কনস্টিটিউশনে উল্লেখ থাকা প্রতিষ্ঠান বলে রাষ্ট্রপতির অধীনে, আর সেই সূত্রে সে রাষ্ট্রপতির অফিস ঘুরে সেই নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই। এখন বাংলাদেশে এটা যদি সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তদারকিতে সম্পন্ন হলে যা হত, তাই হচ্ছে আসামের এনআরসিতে।

এতে একটা অসুবিধা বললাম যে, সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্বাহী আর বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা থাকে, সে নিয়ম এখানে ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে, নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন নির্বাহী ক্ষমতা মানে তো সরকার, মানে রাজনীতিবিদদের কাজ বা দায়িত্বের এরিয়া। কিন্তু সেই এরিয়ায় বিচারপতিরা কেন ঢুকবেন? বা ঢুকলে কী বিপদ হবে? সমাজের রাজনৈতিক তর্ক-ঝগড়া রাজনীতির মাঠে সমাধান হতে হয় – সঙ্ঘাত, আপস ইত্যাদির মাধ্যমে। অথবা অমীমাংসিত থাকলে সেটাও রাজনীতির মাঠে-পরিসরেই পরে থাকবে; উঠবে পরবে – এভাবেই চলবে। মানে সবকিছু সেখানেই। কারণ যা রাজনীতিক স্বার্থের প্রশ্ন তা তো রাজনৈতিকভাবেই ফয়সালা হতে হবে – সংঘাতে না হয় আপোষে। রাজনৈতিক সমস্যার আইনি সমাধানই হয় না। ওর কাজ না সেটা। এ জন্য রাজনীতিকদের এরিয়ায় বিচার বিভাগ কখনো আসবে না, তার কজ এটা না তাই। আদালত তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখবে যেন  সমাজ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো ফয়সালা করতে দিবার জন্য এবং একে নিজের ভুমিকা ও ফাংশনগুলোকে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু এনআরসি করাটাই আসাম সমাজের রাজনৈতিক সমাধান কি না- এ নিয়ে রায় দিয়ে দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এটাই সবেচেয়ে বড় ব্লান্ডার। এরপর আবার তা বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হয়ে গেছেন আদালত নিজেই, যা আরেক ব্লান্ডার। এটা বিশাল অকাজ, অনধিকার চর্চা। নিজের সীমা, কাজের ধরণ না বুঝে কাজ করা হয়েছে। ধরেই নেয়া হয়েছে আদালত রাজনৈতিক বিতর্ক, স্বার্থ-দ্বন্দ্ব সমাধান দিতে পারে। বা এটা তার কাজ। এখন যদি মিডিয়ার আশঙ্কা অনুসারে এনআরসি প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় [যেমন চলতি মাসে আসাম রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথভাবে (যার দুটোই বিজেপির দলের সরকার) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, যাতে ফাইনাল তালিকা প্রকাশ করার শেষ তারিখ ৩১ জুলাই থেকে পিছিয়ে তা অনির্দিষ্টকাল করা হয়।] যার অর্থ এটা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কোর্টের। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেন একটা রাজনৈতিক পক্ষ হয়ে উঠবে, যার বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক পক্ষ বা স্বার্থগুলো সোচ্চার হবে। অথচ এটা অকল্পনীয় যে, আদালত বা বিচারকেরা নিজেই এক রাজনৈতিক পক্ষ হবেন! এ কারণেই দুনিয়ার আদালতগুলো সব সময় বুদ্ধিমানের মত [Jurisprudence বা জুরিসপ্রুডেন্সের] প্রুডেন্ট হয়ে, দূরদর্শিতা দেখিয়ে আগাম কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা বিপক্ষ হওয়া থেকে দূরে থাকে। তাই আদালতের কাছে কেউ মামলা নিয়ে গেলেই আদালতের তাতে আমল করে রায় দিতে ঝাপায় পড়া – এটা দুরদর্শী আদালত কখনও করে না। ওর প্রথম বিবেচনা ইস্যুটা রাজনৈতিক কিনা। যদি দেখে হা তবে একে আমল না করে  ততক্ষণাত সমাজের রাজনৈতিক পরিসরে, মাঠে ফেরত নিয়ে যেতে অনুরোধ করে। মামলা ফিরিয়ে দেয় এই যুক্তিতে। কোন সমাজের সব সমস্যা আইনি না। সমাজের নানান সমস্যার  সবকিছুর সমাধান দেওয়ার আদালতই একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। আদালত সবকিছুতে নাক গলানোর মানে সবকিছুকে আইনি সমস্যার হিসাবে ও চোখে দেখে নামিয়ে এনে সেই খাপে ভরে দেয়া। আর এতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুমিকা রাখা ফাংশনাল হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়া হবে। তাই আদালতকে এসব দিক বিবেচনা করে দেখার মত যোগ্য আর বুদ্ধিমান হতে হয়। আইডিয়ালি এটাই হওয়ার কথা।

এনআরসি করার দাবিকে কেন আসাম সমাজের ‘রাজনৈতিক সমস্যা ও দ্বন্দ্ব’ বলেছি?
ভৌগোলিকভাবে এই নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারতের মাঝখানে আছে বাংলাদেশ। যদিও একেবারেই এক প্রান্তের শিলিগুড়ি করিডোরের এক “চিকন গলা” দিয়ে নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারত সংযুক্ত অবশ্যই।  এখন যদি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সরাসরি যাওয়া হয় (যদি বাংলাদেশ যেতে দেয়) তবে কলকাতা থেকে আসামের সবচেয়ে কাছের জেলার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশ অনুমতি না দিলে ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ হয়ে ঘুরে কলকাতা আসতে সেই দূরত্ব বেড়ে হয়ে যায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তান (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে  ১৭০০ কিলোমিটার দুরত্বের ফ্যারে পরে যায় আসাম। এটাই আসামের দুঃখের মূল উৎস। আসামের সাথে বাকি ভারতের সহজ যোগাযোগ ‘নাই’ হয়ে যায়। যোগাযোগ খারাপ তো লেনদেন বিনিময় ব্যবসা খারাপ। মানে ‘মানি সার্কুলেশন’ নাই, অর্থনীতি নাই, অবকাঠামো নাই, এভাবে সব কিছু নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। তবু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের নেহরু সরকার এভাবে আসামকে স্থবির ফেলেই রেখে দিয়েছিল। কেন?

কারণ তার ভয় আসাম নেহেরুর ভারতকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। আসামের আরও উত্তরের সীমান্ত হল – চীন সীমান্ত। আসামের স্বার্থে ভারত বাংলাদেশের সাথে কোনো ‘ফেয়ার ডিল’, এক “উপযুক্ত পালটা সুবিধার বিনিময়” করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম-কলকাতা যোগাযোগ সহজ করে নিতে পারে অবশ্যই।  কিন্তু জন্ম থেকেই ভারতের কেন্দ্র বা নেহেরু সরকার এতে আগ্রহ দেখায় নাই। কারণ, তাদের ভয় হল, আসামের জন্য বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া করিডোর পাওয়া গেলে এতে একই সাথে এবার বৃহত্তর আসাম সীমান্তের লাগোয়া অপর পাড়ের চীনের প্রদেশগুলোও আসামের ওপর দিয়ে, বাংলাদেশ হয়ে কোনো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ বা চীন তখন আসামের উপর দিয়ে চীনের জন্য করিডোর পাওয়া – এই প্রবেশাধিকার, ভারতকে দেয়া বাংলাদেশের সুবিধার বিনিময়ে শর্ত হিসেবে হাজির করে ফেলতে পারে? এটা ভারত একেবারেই চায় না। এব্যাপারে আনন্দবাজার ঠিক এই প্রসঙ্গে না বিসিআইএম [BCIM] প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লিখেছে ,“বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ (এই প্রকল্প নিয়ে)ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ‘ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল [মানে আসাম] চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে।’ ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”।

সারকথায় চীনকে এসব আলোচনার ভিতরে ঢুকতে দিতে চায় না ভারত, কারণ আলোচনায় একবার ঢুকে পড়লে শেষে চীন আসামের ওপর দিয়ে করিডোর না পেয়ে যায়। সম্ভবত ভারতের মনে ভয়, নর্থ-ইস্ট কখনো যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যেতে চায়, একই ভারত রাষ্ট্রে যদি না থাকতে চায়, তাহলে কী হবে? যদি স্বাধীন হতে চায় বা চীনের সাথে যুক্ত হতে চায় তাহলে কী হবে? সারকথা বিষয়টা হল, ভারত থেকে আসামের বেরিয়ে যাওয়ার ভয়। ভারতের শাসকেরা এপর্যন্ত তাদের মনের এই ভয়কেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে সব সময়। আর তাতে ব্যাপারটা হয়ে গেছে অনেকটা,  নিজের সন্তানকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে রাখার মত, যাতে সে পালিয়ে না যায়, তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো যায়। আর সে জন্য পুরো নর্থ-ইস্টকে জন্মের পর থেকেই ভারত যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক দিয়ে প্রায় অচল করে রেখেছে।

তাই কেবল গত দশ বছরের ঘটনা হল, এবার ভারত একা সব সুবিধা হাসিল করেছে। এই সুযোগ সুবিধা মানে বিনা পয়সার বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোরের একক সুবিধা ভারত এখন নিয়েছে। কারণ এটা আমেরিকার “চীন ঠেকানো” স্বার্থে ভারতের ভাড়া খাটার বিনিময়ে পাওয়া  বাংলাদেশ এখন মোস্ট ভারত-ফেভারেবল বাংলাদেশ পেয়েছে।  এখানে বাংলাদেশে করিডোরের বিনিময় চাওয়ারই কেউ নাই। এটা একপক্ষীয় করিডোরসহ সব সুবিধা। এমনকি মেজর অবকাঠামো তৈরির দায়ও বাংলাদেশের। আনন্দবাজার লিখছে, আসামে উপর দিয়ে চীন বাংলাদেশে আসুক সেটা চায় না। মানে, ভারত একপক্ষীয় করিডোর চায়।

কিন্তু এতদিন আসামের মানুষের একারনে জীবনযাপনে যে গরিবি হাল হয়ে আছে এর কারণ কাকে দেখানো হবে? এটাকে আড়াল বা দায়ী করার জন্য বয়ান তৈরি করা হয়েছে যে, আসামে বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) অনুপ্রবেশকারী, এদের ( বিদেশীরা) ঢুকে পড়া সবকিছু জন্য দায়ী। কথাটা আসলে উল্টোভাবে সত্য। কারণ ব্রিটিশ আমলে ধান ফলাতে বৃহত্তর রংপুর বা টাঙ্গাইল থেকে দক্ষ বাঙালি গৃহস্থকে আসামে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা, যাতে সেখানে ধানের উৎপাদন বাড়ে। বিশেষত চল্লিশের মহাযুদ্ধের সময়ে সেনাদের জন্য খাদ্যশস্যের খুবই বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ সেই মাইগ্রেশনটা অভাবে পড়ে মাইগ্রেশনও ছিল না এই অর্থে যে, এটা একই ব্রিটিশ কলোনির মধ্যেই এক প্রদেশ থেকে অন্য আর এক প্রদেশে মাইগ্রেশন ছিল। এছাড়া বৃটিশ শাসকেরা নিজে কর্মসূচি নিয়ে এটা ঘটিয়েছিল।

কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এ ব্যাপারটাকে দেখানো হল, আসামের ‘সব দুঃখের মূল কারণ’ হিসেবে – এই বলে যে বাঙালি বা মুসলমানেরাই দায়ী। আসামের মূল জনগোষ্ঠী হলো অসম (বা অহমীয়), বাঙালি (মুসলমানসহ) আর ট্রাইবাল বোড়ো। এ ছাড়া সাথে ছোট ছোট অনেক ট্রাইব বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও আছে। ‘বিদেশী’ বা কথিত পূর্ব বাংলার লোক, এদেরকে বের করে দিতে হবে- এই অছিলায় সেকালে কংগ্রেস আন্দোলন করেছিল। কথা বিদেশি বলে ঘুরিয়ে দিতে সেই প্রথম ১৯৫১ সালে নাগরিক তালিকা [NRC 1951] বা প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা ফাইনালি হয়েছিল আসলে আসামে বসবাসকারী সব বাসিন্দার আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি। অর্থাৎ এ থেকে কাউকে কী পদ্ধতিতে বের করে দেয়া হবে, কী করে বুঝবে সে বিদেশি ইত্যাদি সেই পর্যন্ত আর আগানো হয়নি। আর এই ক্ষোভ জমতে জমতে তা থেকেই পরে ১৯৭৯ সালে মূলত মাঠের ছাত্র আন্দোলন হিসাবে অতি উগ্র “অসমীয় জাতীয়তাবাদীরা” সাথে বোড়োদের সমর্থনে মূলত বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙালি খেদাও’ বলে আন্দোলন শুরু করেছিল। এটাই একপর্যায়ে চরমে উঠে, আসামেরই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করলে তা ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর সরকার দ্রুত আপসে ১৯৮৫ সালে ‘আসাম অ্যাকর্ড’ [Assam accord, 1985] নামে ছাত্রদের সাথে এক আপোষচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। সেখানেই বলা ছিল, ১৯৫১ সালের এনআরসিকে বিদেশী চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে আপডেট করা হবে। তাতে কে বিদেশী তা চিহ্নিত করে ওদের বের করে দেয়া হবে। এর পর থেকে ওই ছাত্ররাই এবার রাজনৈতিক দল খুলে বসে ‘অহম গণপরিষদ’ [AGP] নামে বা ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট’ নামে।

ওদিকে ১৯৮৫ সালের ‘আসাম অ্যাকর্ড’ চুক্তি হলেও এর বাস্তবায়ন ২০০৯ সাল পর্যন্ত কিছু না হওয়াতে একটি স্থানীয় দাতব্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান  – নাম ‘আসাম পাবলিক ওয়ার্কস’ – এই ইস্যুটাকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যায়, তারা রিট পিটিশন করে। ব্যাপারটা যেন খুবই গর্বের, দেশের কাজ আর বিরাট দেশপ্রেমের কাজ হয়েছে এই ভাব ধরে গত বছর কলকাতার ইংরাজি টেলিগ্রাফ এই রিপোর্ট ছাপছিল [Couple who set NRC ball rolling]।  আর ঐ রীট মামলার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শেষে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই হয়ে গেছিল আসাম সমাজের রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কের নিষ্পত্তির নির্বাহী বাস্তবায়ক।  এনআরসি তৈরির কাজের নিয়মকানুন কী হবে সেটাও আদালত ঠিক করে দেয়। বিচারকদের পা-পিছলানির ঐতিহাসিক ঘটনা এটা। কিন্তু এটা কেন “রাজনৈতিক ইস্যু”, যাতে বিচারকেরা পা পিছলে ঢুকে পড়েছিল – একথা বলছি?

মাইগ্রেশন মানে কাজ বা পেশায় সুবিধা পেতে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস; এর মূল কারণ বা চালিকাশক্তি হল অর্থনীতি। কেউ চাইলে এটাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্থানীয় লোকাল ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল হয়ে ওঠা, এমন “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ফেনোমেনা” বলতে পারেন। একটা দেশে যেকোনো কারণে ব্যাপক উদ্বৃত্ত বাড়তি সঞ্চয় ঘটে গেলে আর সেই সঞ্চয় অর্থনীতিতে আবার বিনিয়োজিত হতে চাইলে তাতে এবার ওই দেশে প্রাপ্ত জনসংখ্যার (লেবার) চেয়ে লেবারের চাহিদা বেশি হয়ে গেলে কী হবে? ঐ দেশে তখন অন্য দেশ থেকে মাইগ্রেশন হবেই। আর সেই দেশের আইনকানুন ও সীমান্তও চাইবে বিদেশী লেবার মানে শ্রমিক আসুক, তারা খুবই স্বাগত। কিন্তু  পরবর্তিকালে কখনও কোন কারণে যদি ঐ অর্থনীতি ভালো না? ভুবতে থাকে, মন্দা দেখা দেয়? তাহলে এবার, সেখানে বিদেশীবিরোধী আন্দোলন শুরু হবে, মাইগ্রেশনবিরোধী দল ক্ষমতায় আসবে ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিদেশীরা কত খারাপ, কত বেশি বেশি পয়দা করে বা মাইগ্রেটেড এরা তো স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, ওরা বেশি পয়দা করে, ওরা অসভ্য, ওদের ধর্ম নৃশংসতায় ভর্তি ইত্যাদি কত কিছু খুত আবিস্কার করে এসব বয়ান বলে এদের কুপিয়ে কেটে গণহত্যা করে ভাগাও- এসবই হবে ওদের সমাজের পপুলার রাজনীতির বয়ান। সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ডের শুটিং গণহত্যা বা ফ্রান্সের উগ্রপন্থী লি-পেনের দলের কাণ্ডকারখানা অথবা আমেরিকায় ট্রাম্পের ইমিগ্রেশনবিরোধীতা ( বিদেশীবিরোধী) ও মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলার বয়ান  – সবকিছু এই একই কারণে।

এগুলোই আসলে বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধিতার আড়ালে চরম নোংরা বর্ণবাদ। ওমুকেরা জাতে খারাপ, এমন বয়ান। ১৯৭৯ সালের পর থেকে আসামের পুরো সমাজ এমন বাঙালি বা বিশেষত মুসলমান বিরোধি ঘৃণাতেই ভেসে চলছিল।

আবার মনে করিয়ে দেই, আসামের মূল সমস্যা বা শুরুটা কিন্তু ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে আসামের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা এবং যা থেকে তৈরি খুবই খারাপ ও অবকাঠামোহীন, বিনিয়োগহীন এক স্থবির জনজীবন। এখন ধরা যাক, আসামে যাদের কথিত বাংলাদেশী বলা হচ্ছে যদি এদের সংখ্যা একই রকম থাকে, আর কালকেই যদি কোনো জাদুতে আসামের যোগাযোগ অবকাঠামো সহজ, বিনিয়োগের অভাব নেই, অর্থনীতি প্রবল চাঙ্গা ইত্যাদি – এমন এক অবস্থা হয় যাতে প্রাপ্ত লেবার যা আছে তা-ও কম পড়েছে দেখা যায়, তবে ঐ ঘাটতি পুরণে সেই আসামই আবার আরও নতুন মুসলমান ‘বিদেশীদের’কেও দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনবে। তাই বলছি, আসামের মূল সমস্যা আসলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক। অথচ সবাই ভাবছে, বিশ্বাস করে বসে আছে আসামের প্রধান ইস্যু এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা কবে ঘোষণা হবে; যেন এটা হয়ে গেলেই অসমিয়াদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অথচ এটা এমনি হিংসা ঘৃণায় ঢুবে থাকা জনজীবন যে ঐ সমাজে কারও বাস্তবতায় চোখ মেলার মুরোদ নাই, কারণ এটা তো আসলে এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। এরা অভিবাসী বা মাইগ্রেশন জিনিষটা নিয়ে কখনও বুঝে দেখেনি।  এরা আসলে চিন্তা করে দেখেনি যে, আসামের অর্থনীতি আরো খারাপ হলে তারা নিজেরাও অভিবাসী হতে ঘর ছাড়বে। যেমন ইতোমধ্যেই গুজরাত বা মুম্বাইয়ের মত শিল্প-শহরগুলোর অর্থনীতি আসামের চেয়ে প্রবল সচল। তাই ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষিত আধা শিক্ষিত অসমিয়া ওসব রাজ্যে ছুটছে, এই হার বেড়ে গেছে।

এ অবস্থায়, ৩১ জুলাই ফাইনাল তালিকা ঘোষণা হওয়ার আগে বিজেপি সভাপতি ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কী চাচ্ছেন? তিনি চাচ্ছেন মূলত অনির্দিষ্টকালের জন্য ফাইনাল তালিকা ঘোষণা পিছিয়ে দিতে। এই আবেদন আদালতে করা হয়েছে যৌথভাবে, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে। ইতোমধ্যে মিডিয়ায় লোকজন নামানো হয়েছে যেন এই লাইনের পক্ষে কথা বলে [OPINION | Why the Deadline For Final NRC Draft Should be Extended Beyond July 31]। যার সার আর্গুমেন্ট হল, যে তারা খুবই খাটিবাদী। কোনকিছু খাটি না হলে তাদের চলেই না। তাই তারা খুবই সঠিক নির্ভুল একটা তালিকা চান।

তাই, অমিতের কথিত যুক্তি হল, ২০ শতাংশ রি-ভেরিফিকেশন। মানে তালিকায় যাদের উঠানো হয়েছে অথবা বাইরে ফেলা হয়েছে এমন সব ডাটারই ২০% আবার খুলে চেক করা। এই কাজের জন্য তিনি কেন্দ্র্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে (এজি) দিয়ে তিনি যুক্তি দেয়াচ্ছেন যে, এনআরসি তৈরি “আগে কল্পনা করা যায় নাই এমন জটিল কাজ” [“unprecedented large scale of complexities” involved in the NRC process]। তাই এইটা আসামের পাবলিকের ধারণা, এই তালিকা সঠিক নয়। গত বছর প্রকাশিত প্রথম ড্রাফট তালিকাতে আসামের প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। তাই এক শুদ্ধ তালিকা পেতে.২০% ডাটা আবার খুলে চেক করতে সময় বাড়াতে হবে।

এদিকে অনেক রাজনীতিবিদ দাবি করছেন, এই ৪০ লাখের মধ্যে ২৫ লাখই হিন্দু। হতে পারে অমিত শাহের তারিখ পিছাতে চাওয়ার পিছনে এটা একটা উদ্বেগের কারণ। তবে সরকারি হিসাবে ৈ ৪০ লাখের মধ্যে ধর্মীয় ভাগের অনুপাত নিয়ে কিছুই জানানো হয়নি। এই সুযোগে অমিত শাহ এজিকে দিয়ে বলাচ্ছেন যে, ২০ পার্সেন্ট ডাটা আবার চেক করে দেখতে হবে। আর তা বিশেষ করে ঘটাতে হবে সীমান্ত জেলাগুলোতে। মানে বাংলাদেশের সীমান্তে। কারণ সেখানে নাকি (মুসলমান) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কোন তাল-ঠিকানা নেই। এভাবে যেভাবেই হোক বিচারকদের কিছু একটা বুঝ দিয়ে হলেও তারিখ পেছাতে এজি একেবারেই মরিয়া। কিন্তু আদালত এখনো রাজি না হয়ে ২৩ জুলাই তারিখ পর্যন্ত আরও শুনানি – এটা মুলতবি রেখেছে।

ওই দিকে আরেক কাণ্ড ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের স্ক্রোল [SCROLL] পত্রিকা বলছে, তিনি নাকি কোনো স্থানীয় টিভিতে বলেছেন, “যদিও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়, তবু পত্রিকার রিপোর্ট দেখে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে”। এভাবে আমাদের উদ্বিগ্নতা আছে, আবার নাই – এমন মাজা শক্ত না করা হা-না করে কথা বলছি কেন আমরা? এ ছাড়া গত বছর আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইনুর এক বিবৃতির রেফারেন্স দিচ্ছে ভারতের স্ক্রোল অন লাইন মিডিয়া। ইনু বলেছিলেন, “প্রথমত এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আসামের স্থানীয় সমস্যা” [“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। আরো বলেছিলেন, “এ নিয়ে তাই বাংলাদেশের কিছু করার নেই। ভারত সরকার আমাদের সাথে কখনো এ নিয়ে কথা বলেনি। তাই আমাদের কোনো অভিপ্রায় নেই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে তাদের সাথে কথা তোলার”[“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbor”.] আসলে এই কথাগুলো ইনু বলেছিলেন ১ আগষ্ট ২০১৮তে মূলত কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায়। সেটাই রেফারেন্স করা হয়েছে। ঐ বক্তব্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা বাক্যটা হল, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হবার ৪৮ বছর হয়ে গেল কিন্তু ভারত কখনও এনিয়ে প্রশ্ন তুলে নাই, আমাদের সাথে কথা বলে নাই। যার সোজা পরের অর্থ হল,  তাহলে এনিয়ে এখন আসছে কেন?  এর আমরা কিছুই জানি না, সংশ্লিষ্টই নই। কাজেই এখনও যদি কখনও তুলে তাতেও আমরা এটা আমল করব না।

তাহলে ইনুর ইনুর এই কথার পর এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের “আমাদের কিছু উদ্বিগ্নতা রয়েছে” বলার দরকার পড়ল কেন? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।  মোমেন বলছেন, “যারা দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে ওখানে আছে তারা ওদের নাগরিক, আমাদের নয়”। এই কথা থেকে পরিষ্কার, এ কথার চেয়ে আগে ইনুর- ‘এটা আমাদের ইস্যু নয়, কোনো দায়দায়িত্ব নেই’- বলা অনেক ভালো ছিল। সে তুলনায় এখন এক দুর্বল অবস্থান নেয়া হল। কারণ, ভারতে কেউ ৭৫ বা ১০০ বছর ধরে আছে কি না তাতে আমাদের কী? আর তারা কোথাকার নাগরিক তা নিয়ে আমাদের বলারও কিছু নেই। এর চেয়ে বরং “ভারতের কোনো সরকার এ নিয়ে আমাদের সাথে কখনো কথা তোলেনি’- এটাই সবচেয়ে ভালো ডিফেন্স, ভাল যুক্তি ছিল। এক কথায় বললে মোমেনের কথা ইনুর কথা থেকে সরে গেছে। এ ছাড়া বোকা কিসিমের আরেক কথা বলেছেন মোমেন। তিনি বলেছেন, “আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ঝামেলায় আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। বাংলাদেশ দুনিয়াতে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, “We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”]।

এত কেলাস কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত এর আগে দুনিয়া দেখে নাই। আমরা আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিছি তাই আর নিতে পারব না- এটা কি কোনো ডিপ্লোমেটিক কথা হল? এটা কী আরও নিব কিনা সেই কথা উঠে গেছে? প্রথমত, তিনি যেচে শরণার্থী নেয়া-না নেয়ার কথা কেন তুলছেন? ভারত কি এ প্রসঙ্গ তুলেছে আমাদের সাথে? তোলেনি।  ডিপলোমেসি খাউজানি আলাপ না, যে একটু অকারণে চুলকায় নিলাম। এখানে প্রতিটা শব্দ গুরুত্বপুর্ণ ও মাপা ও প্রয়োজনীয় হতেই হয়। আর এরচেয়ে ার এক গুরুত্বের বিষয় “ডকুমেন্ট” বা রেফারেন্স’। আগে কী বলেছি এর বাইরে যাওয়া যাবে না। যখন যেমন এটা তো চলবেই না। তাই এখানে আগে কী আছে এর রেফারেন্স খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এছাড়া মোমেনের কথায় মানে হয়েছে যেন, আমরা যদি কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী না নিয়ে থাকতাম তাহলে কি এখন আসামের শরণার্থী নিতাম- ব্যাপারটা কি এটাই? আবার, দুনিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ না হলে আমরা আসামের শরণার্থী নিতাম, তাই কি? সবচেয়ে বড় কথা, এ পর্যন্ত আমাদের সাথে কখনো ভারতের এ নিয়ে কথা হয়নি- এটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। অথচ প্রশ্ন এবং প্রসঙ্গ না বুঝেই অতিরিক্ত কথা বলা ও অকূটনীতিসুলভ কথা বলা নির্বুদ্ধিতা বটে। তাঁর প্রফেশনাল যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। সম্ভবত তিনি আমাদের আরো বড় বিপদে ফেলে দিবেন!

সর্বশেষঃ
চলতি জুলাই মাসের শুরুতে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের (UN-OHCHR) স্বাধীন এক্সপার্টেরা ভারতের আসামে এনআরসির ততপরতা নিয়ে বিরাট উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে [UN experts: Risk of statelessness for millions and instability in Assam, India]। এনআরসি নিয়ে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আপত্তির পয়েন্ট হল, আসামে নাগরিকত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি ঠিক নয়। কারণ কেউ নাগরিক নয় সেটা প্রমাণের দায় সবখানে হয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু আসামে এটা চাপানো হয়েছে নাগরিকের উপর, [“In nationality determination processes, the burden of proof should lie with the State and not with the individual,” said the experts, noting the discriminative and arbitrary nature of the current legal system.]। তাই এটা বৈষম্যমূলক ও খামখেয়ালিমূলক আইনি ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছে।

লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এটাকে সরাসরি মুসলমানদের টার্গেট করা এক প্রক্রিয়া বলে চিহ্নিত করেছে [India’s hunt for “illegal immigrants” is aimed at Muslims]।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাংলাদেশ কি এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছে? এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

গৌতম দাস

০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Co

 

Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেম, ইরানকে বলি

ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেমে, ইরানকে বলি

গৌতম দাস

১০ জুন ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2AX

 

Strait of Hormuz

ইরানের উপর আমেরিকান অবরোধ [Iran Sanctions] আরোপ করে রাখায় মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উপসাগরগুলোতে বিশেষ করে চিকন হয়ে আসা ইরানের সমুদ্রসীমায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলায় ‘খুঁচিয়ে ঘা করার’ একটা প্রবাদ আছে। এর সফল উদাহরণ হল সম্ভবত, ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা-ইরানের সম্পর্কের হাল অবস্থা। এমনিতেই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে জন্ম নেয়া নতুন ইরান, জন্ম থেকেই কঠোরভাবে আমেরিকাবিরোধী। এটা ফ্যাশন বা গতানুগতিক ঘটনা নয়, বরং অনিবার্য।  আমেরিকার স্ব-স্বীকারোক্তির ঘটনা হল সিআইএ এর হস্তক্ষেপে ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার  ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। আর সেসময় থেকে ইরান আমেরিকানদের দখল কব্জায়, পাপেট শাসনে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের আগে পর্যন্ত। তাই ১৯৭৯ সালে আমেরিকাবিরোধীতা ছিল অনিবার্য। আর সেখানে  এসে এটাই প্রমাণ যে, ইরান তখন সত্যি প্রথম ‘স্বাধীন’ হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব প্রমাণ করেছিল ইরানিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, একমাত্র তারাই নিজেকে শাসন করার বৈধ অধিকারী। বলা যায়, ১৯৫৩ সালের আমেরিকা সিআইএ পাঠিয়ে ইরানে হস্তক্ষেপের পরে এর সফল জবাব ছিল ১৯৭৯ সালের আয়াতুল্লাহ খোমেনির ‘ইসলামি বিপ্লব’।

নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা ও দখল করে। এতে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুতুল সরকার বসানোর পরও ইরানের সাথে মার্কিন সম্পর্কে এতে বড় রকমের কোন হেরফের হয়নি। ইতোমধ্যে ২০০৯ সালে ওবামা আমেরিকায় ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালের মধ্যে ইরাক থেকে সম্পূর্ণ আর আফগানিস্তান থেকে ১০ হাজার রেখে বাকি সব আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনেন। সেটা আমেরিকার ‘টেররিজমের’ যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন হয়েছে সেজন্য নয়, বরং যুদ্ধ শেষের কোনো লক্ষণ নেই। এর চেয়ে বড় কথা, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত অর্থনৈতিক সামর্থ্য আমেরিকা-রাষ্ট্রের আর নেই। পরে আবার আইএস এর সিরিয়ায় ততপরতা তুঙ্গে উঠার আমলে ওরা  সেখান থেকে আবার ফিরে ইরাকে শক্ত অবস্থান নিলে ওবামা সেই বিপদে পড়ে যে করণীয় ঠিক করেছিলেন, সেটাই প্রথম আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শুরু বলা যায়। ব্যাপারটা ছিল এই যে ইরাকে আইএসের উপস্থিতি ঠেকাতে হলে ওবামাকে আবার ইরাকে আমেরিকান সৈন্য পাঠাতে হত, অথচ ওবামার রাষ্ট্র সেই খরচ যোগাতে পারার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামর্থ্য ছিল না। তাই এর বিকল্প হিসেবে আমেরিকান যুদ্ধবিমানের সহায়তা ও সমর্থন নিয়ে নিচে মাঠে আইএস উৎখাতের সে কাজ ইরান করে দিতে পারে। এই শর্তে এবং ইরানের ‘পারমাণবিক বোমা’ বিষয়ক তৎপরতা জাতিসঙ্ঘের নজরদারিতে স্থগিত রাখা হবে, এই শর্তে সে সময় আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ও ইউরোপীয় নেতা দেশগুলো মিলে (পি৫+১) সবার স্বাক্ষরে তা সম্পন্ন হয়েছিল।

তাতে অবরোধ উঠে যাওয়াতে এই প্রথম ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ধারায় বিনা বাধায় তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি হয়েছিল ইসরাইল। ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার পরও ইসরাইলের এই অখুশির মূল কারণ, তেল বিক্রিসহ ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনের মূল ধারায় ফিরে আসা। আর তাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলা। তাই ওবামার আমলে প্রথম গড়ে ওঠা, আমেরিকা-ইরানের গঠনমূলক সম্পর্ককে মূলত জায়নিস্ট ইসরাইলের স্বার্থে ও আগ্রহে এবং সুনির্দিষ্ট কোন আমেরিকান স্বার্থ ছাড়াই ট্রাম্প তা ভেঙে দেন। এটাই ট্রাম্পের সেই ‘খুঁচিয়ে ঘা করা’। একটা সুস্থ শরীর, ক্ষতশুণ্য। কিন্তু তাকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত ক্ষত তৈরি করে এরপর সেই ক্ষতকে পঁচানোর মত ঘটনা ঘটানো, এটাই ট্রাম্পের কাজ। ভিন্নরাষ্ট্র ইসরাইলের স্বার্থে নিজ রাষ্ট্র আমেরিকাকে বিপদে ফেলা এবং এক আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের উদাহরণ হিসেবে এটা থেকে যাবে।

গত ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল শেষ যুদ্ধের পর আরবেরা ‘তেল অবরোধ’ [OIL Embargo 1973] করেছিল।  এমনিতেই যুদ্ধে হেরেছিল, ফলে সে যুদ্ধের খরচের ভার তো আছেই। আবার আরবদের প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্রই যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা বলতে তেল বিক্রি বুঝে, এমন অর্থনীতির দেশ। তাই ‘তেল অবরোধ’ মানে, পশ্চিমাদের কাছে তেল বেচব না বললে তা সবার আগে নিজেদেরই সমস্যায় ফেলা হয়ে যায়। পশ্চিমা সভ্যতার অর্থনীতি মাটির নিচে পাওয়া ফসিল জ্বালানির ওপরে দাঁড়ানো, এর চাকা ঘুরছে ঐ জ্বালানি ব্যবহার করে। ঐ তেল অবরোধে পরে তা এই প্রথম প্রবল জোরে এক ঝাঁকুনিসহ ধাক্কা খেয়েছিল।তিন ডলার ব্যরেলের তেল পাঁচ মাসের মধ্যে চারগুণ হয়ে গেছিল। তবুও ওই অবরোধের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরো মারাত্মক, যেটা “কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি ১৯৭৩” বলে খ্যাত। এর মূল দিকটি হল, সৌদিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বানানো। স্বীয় সংকীর্ণ স্বার্থ রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে আমেরিকান প্রটেকশন পাওয়ার বিনিময়ে তারা আমেরিকানদের তেল পাওয়া নিশ্চিত করবে। ফলে ঐক্যবদ্ধ আরব হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হল। এরকমই আরেক তৎপরতার নাম হল, ইসরাইলকে আরবের বিরুদ্ধে সক্রিয়তায় খাঁড়া করে ও তৎপর রেখে আরবদের শায়েস্তা করা। এরই আর এক অংশ হল ক্যাম্পডেভিড চুক্তি, যাতে মিসরকে ইসরাইলের সীমান্ত প্রহরীর ভূমিকায় বসানো হয়েছে।

কিন্তু অবস্থা এখন আর সে একই জায়গায় নাই, একালে যখন আমেরিকা নিজেই এখন তেল রফতানিকারক দেশ হয়েছে। মার্কিন [Fracking] অয়েল আর সৌদি ফসিল ফুয়েল তেলবাজারে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মার্কিন ফ্রেকিং অয়েলের অসুবিধা হল এর উৎপাদন (কোমল শিলা [Shale] থেকে পিষে তেল বের করার) খরচ বেশি। ফলে তেলের দাম ৫০ ডলারের নিচে চলে গেলে এটা লস প্রজেক্ট। তাই দাম কমিয়ে দিয়ে সৌদিরা ফ্রেকিং পদ্ধতিতে পাওয়া অয়েলকে চাপে ফেলে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। অতএব, এই যুগে আমেরিকা-সৌদি বন্ধন আর পুরনো ‘কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি’ দিয়ে আটকানো নয়; বরং সৌদিরাই নিজ স্বার্থে আমেরিকানির্ভর। কাজেই ওবামার তৈরি করা ইরান-আমেরিকা পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি থেকে আমেরিকাকে ট্রাম্পের এককভাবে বের করে আনার পক্ষে একালে আমেরিকার সুনির্দিষ্ট কোনো স্বার্থ নেই, ইসরাইলের স্বার্থ ছাড়া।

আবার ইসরাইল অথবা ইরান একে অপরকে এখনই একেবারে ধ্বংস করে ফেলতে চলেছে এবং ব্যাপারটা একেবারে আসন্ন বাস্তবে এমন কিছুই হাজির নাই। বাস্তবতা এমন না ফলে ইসরায়েলের এমন কোনো স্বার্থ নেই। হ্যাঁ, পারস্পরিক বৈরিতা অবশ্যই আছে, তবে তা রুটিন ধরনের। ফলে শেষ বিচারে ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষে ট্রাম্প অথবা তার ইহুদি জামাইয়ের ব্যক্তিগত লাভালাভ ছাড়া আমেরিকার সিদ্ধান্তের পক্ষে আর কোনো যুক্তি নেই।

মজার কথা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সদস্য কেউ অথবা জাতিসঙ্ঘের কাছেও – যারা ওই পারমাণবিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী একপক্ষ – তাদের কারও কাছেই ট্রাম্প নিজের ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষের সাফাই প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

এছাড়া, ট্রাম্প এবার শুধু আমেরিকাকে চুক্তি থেকে সরিয়ে এনেছেন তাই নয়, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করেছেন। ট্রাম্পের এই আমলে অবরোধ আরোপ করা হচ্ছে যথেচ্ছাচারে। কাউকে অপছন্দ হলেই অবরোধ। এই অবরোধ কথার ব্যবহারিক অর্থ হল, অবরোধ আরোপ করা হয় যে রাষ্ট্রের উপর, সে রাষ্ট্র আর আমদানি-রপ্তানিতে আমেরিকান ডলারে কোন পণ্য কাউকে বিক্রি বা কারও থেকে কেনা – কোনটাই করতে পারবে না। কেন আমেরিকার পক্ষে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? কারণ, ইনভয়েসে ডলারে পণ্যমূল্য লেখা থাকলে সেই মূল্য নগদায়ন করতে কোনো-না-কোনো পর্যায়ে যেকোনো এলসি খোলা ব্যাংকের একটা আমেরিকান ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কোনো আমেরিকান ব্যাংক এখন আর নিজে সে সার্ভিস দিতে চায় না। কারণ, অবরোধ আরোপের পরে কোনো আমেরিকান ব্যাংক তা উপেক্ষা করলে, সেই ব্যাংককে নিকট অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করে তা আদায় করেছে।

আমেরিকান ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেন বিনিময়ের একমাত্র মুদ্রা হিসেবে অনুমোদন দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা, মানে ১৯৪৪ সালের [Bretton Woods System] আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা শুরু করা হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল, সেকালে আর কোনো দেশের মুদ্রা বিকল্প হিসেবে পাওয়া যায় নাই। সবারই মুদ্রামান ছিল ত্রুটিপুর্ণ, ফুলিয়ে ফাপানো মানে অবমুল্যায়িত।  অথবা ওই মুদ্রার রাষ্ট্রের নিজস্ব আয়-ব্যয়ে উদ্বৃত্ত নেই, ঘাটতির; ফলে ভরসা করার মতো মুদ্রা তা আর ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা বলে গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে কেউই সেকালে চিন্তাও করেনি যে, আমেরিকা পড়তি অর্থনীতির রাষ্ট্র হিসাবে এককালে নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে অন্য কোন রাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলতে ডলার-অবরোধ আরোপ করে অন্যায় সুবিধা নেবে।

আসলে দুনিয়ার সব বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ এখনো ডলারে সম্পন্ন হচ্ছে বলে সেটাই আমেরিকার জন্য অবরোধ আরোপের বাস্তব সুবিধা হয়ে হাজির হয়েছে। তুলনায় চীনের ইউয়ান ধেয়ে আসতে থাকলেও এর উঠে আসতে এখনও সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমেরিকা অশুভ অর্থনৈতিক মোড়লিপনার শেষ সুবিধা যা পায় ইচ্ছামত তা  খায়ে নিচ্ছে বলা যায়। তবে এবার অন্য কোনো মুদ্রা গৃহীত হলে তাতে সুনির্দিষ্ট করে শর্ত আরোপ করা থাকতে হবে যে, কোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গৃহীত হতে হলে সংশ্লিষ্ট সেই রাষ্ট্র নিজ একক স্বার্থে কারও বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করতে পারবে না।

অন্যদিকে, ইরানের উপর এবারের অবরোধে আরেক বিশেষ ব্যতিক্রম হল, অন্যান্য বার অবরোধে চীন ও ভারত রাইজিং অর্থনীতি ও ব্যাপক জনসংখার দেশ বলে ইরানের তেল কিনতে গিয়ে আমেরিকার বিশেষ ছাড় পেয়ে এসেছে। ভারতের তিনটা তেল শোধনাগার ইরানি অশোধিততেল নির্ভর হয়ে  জ্বালানি তেল উতপাদনে আছে। কিন্তু এবার আমেরিকার ট্রম্প প্রশাসন কঠোরভাবে বলে দিয়েছে ১ মে ২০১৯ এরপর থেকে অবরোধ কার্যকর হবে সব রাষ্ট্রের উপর [US Secretary of State Mike Pompeo’s announcement that Washington would no longer issue exemptions from sanctions ………“We are going to zero,” Pompeo said of the waivers, ]। অর্থাৎ ভারতের বেলায়ও ইরানি তেল কেনায় আর কোন ছাড় কার্যকর নয়। অথবা কথাটা এভাবে বলা যায় যে, আমেরিকা থেকে ছাড় আদায় করে নেয়ার জন্য ভারত দরকষাকষিতে নেই অথবা করতে চায়নি। বরং বিনিময়ে আমেরিকা থেকে ভিন্ন কোন সুবিধা পাওয়ার আশা করছে সম্ভবত। অবশ্য চীন ইরানের তেল কেনার চুক্তি অব্যাহত রেখেছে। যদিও এখানেও কোন কেনাবেচায় কোন অবরোধ-ছাড় কার্যকর নয়। তবে চীন-ইরান তেলক্রয় চুক্তিতে  কেবল নতুন একটা শর্তের ধারা যুক্ত হয়েছে তাতে যে, ইরান নিজস্ব বাহনে [National Iranian Tanker Co (NITC) ] করে চীনে তেল পৌঁছে দেবে। বাস্তবত তা অবরোধ না মানার শামিল। এছাড়া গত ২২ এপ্রিলে প্রতিদিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে চিনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে,আমেরিকার একপক্ষীয় অবরোধ আরোপের চীন বিরোধী, ইরানের সাথে সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক (তেল-পণ্য কেনাবেচাসহ) আইনি ভিত্তির উপর দাঁড়ানো  [ Geng Shuang, a Chinese Foreign Ministry spokesman, said at a daily news briefing in Beijing on Monday that it opposed unilateral US sanctions against Iran and that China’s bilateral cooperation with Iran was in accordance with the law.]

তবে ভারতের এই সিদ্ধান্ত বহু কিছুর ইঙ্গিত এবং প্রকাশ্য রূপও বলা যায়। পুরানা ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) বা এর জেরে পুরা ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক মানে ছিল, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ নীতি পালন করে এর বিনিময়ে ভারত আমেরিকা থেকে পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যে বা অস্ত্র ক্রয় বিষয়ে নানা সুবিধা আদায়। কিন্তু ট্রাম্প আসার পর থেকে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে শুকিয়ে গেছে তো বটেই, ২০১৮ সাল থেকে অবস্থা এমন যে, সব সুবিধাপ্রাপ্তিই বন্ধ। আর উল্টো ভারতীয় পণ্যেও ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ-শুল্ক আরোপ করেছিল। এমনকি এবারের নির্বাচনে মোদী আবার জয়লাভের পরও আমেরিকার খাতায় ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ক্যাটাগরি থেকেও ভারতের নাম কেটে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতের মনোভাব এখনো একই রকম – “যদি ট্রাম্প সাহেবের মন আবার বদলায়” – মন পাবার সে আশায় তাকিয়ে থাকা। কিন্তু পরিস্কারভাবে ট্রাম্প যেভাবে একপক্ষীয়ভাবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন, এতে বোঝা যাচ্ছে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত  পুরো আমলেও ট্রাম্পের অনুসৃত নীতিতে কোনো ছেদ পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবুও ভারতের একপক্ষীয় প্রেমের সমাপ্তি নেই। এমনকি এদিকে, সাউথ চায়না সি নিয়ে প্রায় সব পড়শিদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্কে আমেরিকা এখন অনেকটা গায়ে পড়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। নানান মহড়ায় আয়োজন ও তাতে অংশ নিচ্ছে। এই সমুদ্রসীমা বিতর্কে ভারত সেখানে কোন পক্ষ নয়। মানে ভারতের তেমন কোন স্বার্থ না থাকলেও ভারত যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে।

ভারতের আচরণে, এসব দেখেশুনে এবার ইরানেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এপর্যন্ত অবরোধকালে ইরানি তেল কেনার বিনিময়ে ভারত সব সময় মূল্য ছাড় পেয়ে এসেছে। ইরানও ধৈর্যের সাথে তা দিয়ে এসেছে। কিন্তু এবার [১মে ২০১৯ এর পরে] অবস্থা সম্ভবত ভিন্ন, অব্রোধের উছিলায় ভারত তেল কিনতে চাচ্ছে না। তাই, এ নিয়ে মুখোমুখি হতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে এসেছিলেন গত মাসে ১৩ মে ২০১৯। ভারতের মিডিয়ায় লিখেছে সে খবর নিয়ে যে তাদের সম্পর্ক [India-IRAN Relation] এখন কোথায়। সেখানে আমরা জানছি, ভারত আর কী কী সুবিধা নিয়েছে ইরানের কাছ থেকে!
ইরানের চাবাহার সমুদ্র উপকূলে অগভীর বন্দর হলেও এই পোর্টে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক সুবিধার দিকটি হল, একে ব্যবহার করে ভারত পাকিস্তানের ভূমি বা বন্দর ব্যবহার না করেই আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ার দেশে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারে। এ কারণে এই বন্দরে অংশত বিনিয়োগ ভারতেরও আছে। তবে ‘প্রচারে ওস্তাদ’ ভারত এটাকে গোয়াদর গভীর বন্দরের সমতুল্য বলে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে।

ভারতের এক মিডিয়া লিখেছে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবারের সফরে চাবাহার পোর্ট নিয়ে ভারতকে পাল্টা চাপ দিয়েছে। an issue that is likely to dominate the bilateral discussion is Iran’s Chabahar port, ……………Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran turns that assurance somewhat blurry. বিবিসি বাংলা লিখেছে, “এদিন সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবধারিতভাবে চাবাহার তাস ব্যবহার করেছেন”।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর এবার শুধু ভারতেই থেমে নাই। মাত্র দশ দিনের মাথায় ২৩ মে ২০১৯, তিনি পাকিস্তান সফরে যান।

ইরান চাবাহার বন্দরকে গোয়াদর বন্দরের সহযোগী করে গড়তে চীন ও পাকিস্তানের সাথে আলাপ শুরু করেছে। এ ছাড়া, পাকিস্তানের কলামিস্টদের লেখায় উঠে এসেছে, এত দিন এটা ইরান চিন্তাও করেনি ভারতের স্বার্থে। ইরানের সরকারি প্রেস এজেন্সি এক খবরে বলছে ইরানি পররাস্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানকে  “গোয়াদর আর চাবাহার পোর্টকে যুক্ত করে দিতে প্রস্তাব দিয়েছেন” [“We can connect the two seaports and then connect Gwadar to our entire railroad system and from Iran to the North Corridor through Turkmenistan, Kazakhstan and also Azerbaijan, Russia and also to Turkey,” ]। এর সোজা মানে হল, চাবাহার পোর্টকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের গভীর পোর্ট গোয়াদরের বিকল্প হিসাবে প্রচার করত তা আর থাকল না। শুধু তাই না চাবাহার পোর্টও  চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিবার প্রস্তাব এটা – যেখানে এখনও পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্প ভারতের চোখে হারাম।

যেখানে ভারতেরই মিডিয়াই মন্তব্য লিখছে যে, টিটকারি দিয়ে বলছে বারবার মত বদলে ঘুরে যাওয়া ট্রাম্প নির্ভরযোগ্য নয়, সে যুদ্ধবাজ [Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran ………] অন্যদিকে তবু ভারতের আমেরিকা বা ট্রাম্পবিষয়ক ‘একপক্ষীয়’ প্রেম সম্ভবত আরো বেশ কিছুদিন থাকবে বুঝা যাচ্ছে। সেটা এতই যে ভারতের শখ ও সুখস্বপ্নের চাবাহার পোর্টকে ট্রাম্পের প্রেমে বলি দিতে ভারতের দ্বিধা নাই।

এসসিও বা সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন মূলত চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়া- মিলিয়ে একটি সামরিক ও বাণিজ্যিক জোট। গত বছর এতে সদস্য করে নেয়া হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানকেও। এ বছরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়েছে গত মাসের শেষে। আর রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে চলতি মাসের মাঝামাঝি, ১৩-১৪ জুন। ভারতের মিডিয়ায় খবর, ইমরানের সাথে একই সভায় মোদির সাক্ষাৎ হলেও সাইড লবিতে তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে না। এবারো নির্বাচনে জিতে আসার পেছনে ‘পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর’ মোদি এই প্রপাগান্ডা বিরাট কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। ক্রমশ সামনে দানব হয়ে উঠা মোদীর এমন অনেক কাজ বাকি। তাই স্বভাবতই ‘বীরের’ ইমেজ মোদী সহসাই হারাতে চাইবেন না। তাই অন্তত প্রকাশ্য নীতিতে মোদী সহসাই কোনো বদল আনছেন না। আমাদের আরও ভুগতে হবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)ইরান,ভারত ও আমেরিকা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

গৌতম দাস

০৩ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AL

 

বাংলাদেশের “পররাষ্ট্রনীতি” বলতে যা কিছু আছে তা হঠাৎ করে আমেরিকানদের নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। যদিও এরা কোন আমেরিকান, কারা এরা, তা নিয়েও কথা আছে অবশ্য। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই নড়াচড়া বা নজর ফেলা এককথায়, পন্ডশ্রম। বিষয়টা ‘প্রথম আলো’র ভাষাতেই বললে, গত ১৭ মে তাদের একজন লিখেছে, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞেস নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই, BEI) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই, IRI )“।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান দু’টি আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। তারা ঐ থিঙ্কট্যাঙ্কেরই বাংলাদেশ শাখা নাকি কেবল ফান্ডদাতা-এনজিও সম্পর্ক, কোনটা- সেটা তাদের মুখ থেকেই আমাদের জানার বাকি আছে। যা হোক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যা কিছু নিজের কাজের ইস্যু হিসেবে তুলে আনে, অনুমান করা অবাস্তব হবে না যে, তা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ বলে তারা মনে করে।

কথা হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন আছে, এর ঘাটতি, খামতি কী – সে প্রশ্ন এখন কেন? বিশেষ করে আজকের খোদ বাংলাদেশই যে দশায় আছে, একে এই অবস্থায় আনা ও ফেলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় আমেরিকান বন্ধুদেরও অবদান আছে। গত ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকা বুশ এবং ওবামা- এই দুই প্রশাসনের তো বটেই অন্তত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরও [AEI] বিশেষ ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কী করা হবে এনিয়ে অন্তত  ভারত-আমেরিকার আলোচনাগুলোতে, গোলটেবিল বা ইনফরমাল বৈঠকে ইনপুট দিয়ে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ধরনের পরিণতি, এই অর্থে ‘উত্তরসূরি’ বলা যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে এক ধরনের সামরিক ক্ষমতা দখল হয়েছিল তাকে আমরা অনেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলি, যা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। কেন এই ঘটনা ঘটেছিল, এর ‘আনুষ্ঠানিক’ কারণ কখনও জানা যাবে না। কিন্তু আসল কারণ যা দখলকারীদের সাফাই-বক্তব্য থেকে জানা যায়, মোটাদাগে সে ভাষ্যটা হল – আগের সরকার  “ওয়ার অন টেরর” -কে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে “জঙ্গি মোকাবেলার উপযোগী” করে ঢেলে সাজানো ও সংস্কার করা হয়নি। সে কাজগুলো সম্পন্ন করতেই ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই বক্তব্যটা ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পরে বদলে যায়।

মূল কারণ, আমেরিকান অগ্রাধিকার মানে কোনটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ ও আগে দরকার সেই বোধ বদলে গিয়ে এক নতুন আকার নিয়েছিল। আমেরিকা ওয়ার অন টেরর বা জঙ্গি ঠেকানোর চেয়ে তখন থেকেই “চীন ঠেকানো’-কে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করেছিল।  না সাব্যস্ত করা ছিল আগেই তবে বাস্তবায়ক রেডি ছিল না তখন। আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’[China containment], মানে ‘চীন ঠেকানো’ নামের কর্মসূচি আছে। এর অর্থ হল, ২০০৫ সালের পর থেকে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হিসেবে চীনা উত্থান আর আমেরিকার পতন যখন আমেরিকার নিজের করা সার্ভে ও পরে তা নিয়ে প্রকাশিত (২০০৮) রিপোর্টও স্বীকার করে, তখন এশিয়ার দুই ‘রাইজিং অর্থনীতি’ চীন ও ভারত – এদের একটাকে (ভারতকে) কাছে টেনে একে অপরটির (চীনের) বিরুদ্ধে লাগানোর নীতিই আমেরিকার “চায়না কনটেইনমেন্ট”। আমেরিকার এই “চায়না ঠেকানোর” নীতিতে ভারত নিজেকে পরিচালিত হতে দিতে রাজি হয়ে যায় এসময়েই। বাংলাদেশে আমেরিকান প্রায়োরিটি বদলের রহস্য এখানেই।  সেজন্যই হঠাত করে এই রদবদল ঘটেছিল।

আর এর বিনিময়ে ভারত পায় – এক. একদিকে আমেরিকায় পণ্যের রফতানি বাজারে বিনা বা কম শুল্কে আমেরিকায় প্রবেশ সুবিধা, ভারতের আমেরিকান হাইটেক অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি। আর দুই. এছাড়াও অন্য দিকে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে “দেখভালের দায়িত্ব” তুলে দেয় যাতে জঙ্গী ঠেকানো কথার আড়ালে ভারত বিনা পয়সার করিডোর, আসামের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারসহ এ দেশকে সরাসরি অন্যান্য নানান ব্যবহার করে সব সুবিধাই নিতে পারে ভারত।  প্রায় নিয়ন্ত্রক বনে ভারতের হাতে চলে যায় বহু কিছু। যেমন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ও প্রয়োজনে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনের সাহায্য নিবে কিনা তা নির্ভর করবে ভারতের স্বার্থ এই অগ্রাধিকার যদি তা এলাও করে একমাত্র তবেই। এর সোজা অর্থ, ভারত বন্দর চায় না তাই বাংলাদেশ এটা করতে পারবে না।

ফলে এভাবেই এরপর থেকে চলে আসছে আজ পর্যন্ত, আমাদের এই দুর্দশার শুরু এখান থেকে। কিন্তু সেই আমেরিকা এখন আবার আরও কী চায়? একই লোকদের আমরা আবার তৎপর হতে দেখছি কেন?

গত ২০১৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা দেখেছিলাম যে, সেবার বাংলাদেশের বিনা ভোটের নির্বাচনকে ভারত প্রকাশ্যে সদর্পে সমর্থন দিয়েছিল আর তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এত ঘনিষ্ঠতায় মিলে গেছিল যে, তারা কেউই আর যেন আমেরিকাকে চেনেই না। বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ডন মোজিনা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্রিফিং না পেয়ে বা না নিয়ে ভারতে গেছিলেন – এই ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী নিঃসন্দেহে!

বাস্তবতা হল, আমেরিকা এখন নিজের সব মুরোদই হারিয়েছে। চীন ঠেকানোর যে কাজ ভারতকে দিয়ে করানোর বিনিময় হিসেবে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে দেখার দায় তুলে দিয়েছিল, তাতে কি চীনের উত্থান ঠেকানো গেছে? প্রশ্নই উঠে না কারণ এভাবে তা হয় না।  তাই আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। কোন দাগও ফেলতে পারেনি, আমাদেরকে কষ্ট-দুর্দশায় ফেলা ছাড়া। বরং নিজেরই বেগতিক অবস্থায় আর দুর্দিনে আমেরিকা এক “পাগলা প্রেসিডেন্ট” পেয়েছে, যিনি নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি নাকি ন্যাশনালিস্ট আমেরিকান! কী তামাশা! গ্লোবালাইজেশনের নেতা আমেরিকা, যে দুনিয়াটাকে অন্তত ৩০ বছর ধরে একটা গ্লোবালাইজড শ্রমবিভাজিত এক গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিয়ে গিয়েছে, সেই আমেরিকার পাগলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, উনি এখন নাকি ‘ন্যাশনালিস্ট’, সবকিছু “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে ফরে সাজিয়ে ফেলবেন বা হয়ে যাবেন। যেন বুড়া বয়সে বিড়াল বলছে সে আর মাছ খাবে না।

কিন্তু ঘটনার কঠিন সত্য দিকটা হল, আমরা কেউই মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারি না, পারব না।  এটা সম্ভব নয়। তাই এর চিন্তাই করি না। কিন্তু এই গোয়াড় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন এটাও নাকি করা সম্ভব। ব্যাপারটা এমনই নাকি সহজ। আসলে পাগলামি আর দেশ চালানো তো এক জিনিস নয়। তাতে আমাদের অসুবিধা নেই; কিন্তু যারা বাংলাদেশে আমেরিকান স্বার্থের দেখভাল করে সেই “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা” তাদেরকে আবার তৎপর হতে আর বড়ই পেরেশান দেখাচ্ছে। সমস্যাটা মূলত তাদের। মনে হচ্ছে তাঁরা এটা বুঝতে বা এই বাস্তবতা মানতে চাচ্ছেন না।

অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ন্যায় কিনা কথা সেটা না। সে প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে আগালে এসব ব্যাপারে প্রথম দেখা প্রয়োজন হয় মুরোদ আছে কী না। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা মুরোদহীন। অর্থাৎ তিনি আমেরিকাকে মুরোদহীন করে ফেলেছেন অথবা আমেরিকা যে মুরোদহীন এটা মেনে নিয়েছেন। এখন ‘মুরোদহীন’ হলে আর সে তো মরদ থাকে না। তাই আমেরিকার মরদগিরি শেষ। ভারতকে বাংলাদেশ দিয়ে দেয়ার পর থেকে ঘটনাচক্রে আমেরিকাও এই মুরোদহীন হয়ে যায়, ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। তাই, ইতিহাসে ২০০৭ সালই সম্ভবত বাংলাদেশে ‘সর্বশেষ আমেরিকান হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ থাকবে। অন্তত ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, মানে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমেরিকা এমন থাকবে – অভিমুখ, ঝোঁক তাই বলছে। ২০২১ সালে (মানে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে) কে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জিতে বসবে – ডেমোক্রাট না রিপাবলিকান, এছাড়া আবার সে কেমন প্রেসিডেন্ট হবে – এগুলো হাজারটা শর্তের “যদি-না-কিন্তু” এর প্রশ্ন। এককথায় বিষয়টা এখন পুরাটাই অনিশ্চিত। আর ততদিনে আমেরিকার আগের মতন বাস্তব হস্তক্ষেপের মুরোদই থাকবে না, তা না হলেও তা আরও কমে যাবে। বাস্তবতাই থাকবে না হয়ত। অতএব, বাংলাদেশের “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকান” – আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। পারছেন না। আমরা জানি নভেম্বর ২০১৮ জেমস মাতিসের [Mattis] পদত্যাগ আপনাদের সব আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে, আপনারা অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল আসলে সেটাই শেষ।  মনে রাখতে পারেন – ট্রাম্প যতদিন অফিসে আছে তিনি সবকিছু ফ্রিজ করে দিবেন। এই সময়ের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন ইত্যাদি যেখানেই যা কিছু নড়াচড়া শুরু হোক না কেন, সেসব হোয়াইট হাউজে যাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকান স্বার্থের’ সবচেয়ে ‘ভালো ভালো উদ্যোগ ও প্রস্তাব’ তা যত ভালই হোক না কেন – এসবই ডিপ ফ্রিজে চলে যাবে। কারণ, পুরনো অভ্যাসে “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকার”  এসব তৎপরতার প্রতি ট্রাম্প ন্যূনতম আগ্রহী নন। এখান থেকেই এটাকে ‘মুরোদহীনতা’র শুরুও বলতে পারেন। কাজেই দিন শেষ!

আসলে ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ যারা তাঁরা সম্ভবত আসলে খেয়ালই করেননি যে ২০০৭ সালেই তাদেরকে অসত্য বলা হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে তা সামনে রেখে এর আড়ালে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর প্রায়রিটি’তে মেতে উঠেছিল। ভারতের হাতে সব তুলে দিয়েছে অথচ বাংলাদেশের বন্ধুদেরই তা বলেনি। আর বাংলাদেশের বন্ধুরা যদি জানতেনই তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতি। তবে তাদের শান্ত্বনা এই যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে আমেরিকার পক্ষে আর সত্য লুকায়ে রাখা সম্ভব হয় নাই।  ‘ওয়ার অন টেরর’ যে আর আমেরিকার প্রায়রিটি নয়, সে তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস এই সময়ে এসে আর না লুকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন [Mattis: US national security focus no longer terrorism]। এটা ২০১৮ সালের শুরুতে ১৯ জানুয়ারি বিবিসির সংবাদ শিরোনাম। মাতিস বলছেন, “টেররিজম নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আমেরিকার জন্য প্রধান হুমকি”। অথচ এই কথাটাই ২০০৭ সাল থেকেই তাদের মনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় থেকেই সব স্তরে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুল কারণ দুনিয়াতে চীনা উত্থান অনিবার্যভাবে আসন্ন – সেকথা তারা তখনই গবেষণা সার্ভে ও স্টাডির রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক-কাল অবস্থা থেকেই তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। আনুষ্ঠানিক এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।

এই বিকল্প ডেভেলবমেন্টগুলো ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ এরা আমল করেছিলেন বা করতে সক্ষম ছিলেন তা তাদের কারবার ততপরতা দেখে কখনও মনে হয় নাই। কিন্তু এতে আসলে যা মূল জিনিষটা বদলে গেছে, বিশেষ করে খোদ ‘ফ্রেন্ডস’ শব্দটিরই সংজ্ঞা বদল হয়ে গেছে ট্রাম্পের হাতে, সেটাই কেউ আমল করেছে মনে হয় নাই। ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান – তাঁর পরিচলন নীতিটাই আসলে বলে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে – আদৌ আমেরিকার কোনো ফ্রেন্ড দরকার আছে কি না? ট্রাম্প নিজেই জবাব দিয়েছেন, যে দরকার নাই। আর যদি থাকেও, তারা ভিন্ন কেউ; অথবা বাংলাদেশে তার এমন ফ্রেন্ড আর লাগবে না। ট্রাম্প নিশ্চয় সরাসরি এ কথা বলেননি, তবে তাঁর অনুসৃত নীতি (ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্প বা ট্রাম্পের নাশনালিজম) এই মেসেজটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে আমেরিকান বন্ধুদের (Friends of America, in Bangladesh) বাংলাদেশকেই সবকিছুর জন্য দোষী ঠাউরানো – অস্বাভাবিক বা নতুন না। এটাই তারা সবসময় করে এসেছেন। যেমন এভাবে অনেকে এখনও বলছেন যে, ভাল ভাল “গণতান্ত্রিক দেশে”  তাদের পররাষ্ট্রনীতি নাকি “জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে” সমর্থিত ও সমৃদ্ধ থাকে বলে, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ তারা সহজেই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা; সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রথম আলো পত্রিকা যে রিপোর্ট করছে তাতেও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্যারায় তারাও লিখেছে এভাবে – “আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা বদলে যায় বলে জনমনে ধারণা আছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সুশাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আলোচক”। অর্থাৎ সার কথা আমেরিকার কোন দোষ নাই। সব আমাদের দুই দলের রেষারেষির কারণে, তাই সবদোষ আমাদেরই।

বিইআই ও আইআরআই-এর আলোচনা সভায় আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর সব দায় চাপিয়ে এমন মন্তব্য খুবই অনুচিত ও অবিচার তা বলাই বাহুল্য। কারণ, ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপার কমবেশি সবই আপনারা তো জানেন। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিবাদ আছে কথা সত্য, ফলে তা অনেক কারণের একটা । কিন্তু তা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কারণ তো – আমেরিকার হস্তক্ষেপ।

ঠিক আছে তাহলে আসেন, আপনাদের বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়া ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, আপনাদের বক্তব্যের দুদিন পরেই। ভেঙ্গে বললে, একটা বড় ঘটনাই ঘটেছে। সম্ভবত বলা যায় যে চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এটাই এই প্রথম আমরা প্রধান দলগুলো একটা সফল এককাট্টা অবস্থান প্রকাশ করেছে।

তাহলে ঠিক এখনই আপনাদের নড়াচড়া কেন?
সম্প্রতি চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এই প্রথম প্রধান দলগুলো একটা সফল অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। আর এটা তারা করেছে ভারতের এব্যাপারে অবস্থান যাই হোক না কেন – এই প্রথম এটা ধরে নিয়ে। “গত ১৯ মে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশ চীন সিল্ক রোড ফোরাম’ গঠন করেছেন”। বেশির ভাগ পত্রিকার হেডিং এটাই। এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব হয়ত বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের – তা যারই হোক, এ ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভি, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ো -এদের উপস্থিতিতে সহায়ক সে কমিটি করা হয়েছে সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ অনেকে এর সদস্য হয়েছেন। মঈন খান বক্তৃতায় করেছেন। ওদিকে ড. গওহর রিজভী [Gowher Rizvi] ঐ সভায় দাবি করেছেন যে, “ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে”।

এই কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই আছে। তবু বাস্তবতা যতটুকুই থাক একেবারে মাঠের ফ্যাক্টস হল, এই গতকাল ১ জুন ২০১৯ ব্লুমবার্গ রিপোর্ট লিখেছে যে ট্রাম্প চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিসহ  ভারতের সাথে কোন খাতিরের সম্পর্কই করতে চান না। সবকিছুর মাথা মুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাগজ কলমে ভারত সুবিধাদিগুলো উপভোগ করত কারণ, ভারত আমেরিকার বিবেচনায় একটা উন্নয়নশীল দেশ [Developing Nation] ঘোষণা করা ছিল বলে। এখন ট্রাম্প সেটার মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, বলছে Trump Ends India’s Trade Designation as a Developing Nation.। এমনিতেই আগের ভারতকে দেয়া সবসুবিধা ( যা চীন ঠেকানোর বুটি হিসাবে ওবামা দিয়েছিল) ট্রাম্পের আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছিল গত বছর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শুধু তাই না উলটা ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক ট্যারিফ বসিয়ে দিয়েছিল যাতে রপ্তানিই অকার্যকর হয়ে যায়।

কাজেই ভারত এখনও আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর খেপ মারতে” পুরানো শর্ত রাজি থাকলেও খোদ ট্রাম্প বাবাজিরই “মন” নাই। নট ইন্টারেস্টেড। এই ফ্যাক্টসটা আমল করলে বাংলাদেশের ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ এদের সব ততপরতাই পন্ডশ্রম। ওদিকে খেয়াল করলেই আমরা নিজেরাও বুঝব যে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলতে চীন গত বছর থেকেই পুরাপুরি তৈরি – এবং তা বাস্তবায়িতই হয়ে গেছে। এর প্রমাণ সফল  য়ুহান সম্মেলন (Wuhan Summit)। এমনকি এবছরও সম্ভবত পরের মাসে দ্বিতীয় য়ুহান সম্মেলন হতে চলেছে। এসব ততপরতার সার কথাটা হল এবার হয় ভারত চীনা শুধু বেল্ট ও রোড প্রকল্পেই না খোদ চীনা নৌকাতেই উঠবে। যদি কোন কারণে না উঠতে পারে, বনাবনি না হয় তবে পরস্পর কঠিন শত্রুতার দিন শুরু হবে। সুতরাং  নিঃসন্দেহে ভারত অনেক দাম চাইবে। যা তার দাম নয় এর চেয়েও বেশি হবে হয়ত সেই প্রাথমিক “asking price” । কিন্তু চীনা স্বার্থের চেয়েও বেশি এমন অসম্ভব অবাস্তব কিছু না চাইলে এই ডিল হবার সমূহ সম্ভাবনা। বিশেষ করে দুটা ফ্যাক্টস এর পটভুমিতে একথা বিবেচনা করা যায়। এক. চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ মিটিয়ে নিবার ডিল ব্যর্থ হয়ে গেছে যা, এখন পরবর্তি ঝড়ের অপেক্ষায় যা এখন আসন্ন। আর দুই. ভারত শত চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের কোন ডিল, কোন “খেপ” পাবার কিছুই নাই, কোন অফারও নাই। বরং পুরা উপেক্ষা আছে। ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠে বসলেও যেন ট্রাম্পের তা নিয়ে কোন পরোয়া নাই। ভারতকে এমনই তাচ্ছিল্যের মুডে আছেন ট্রাম্প। যার মূল কারণ হল, ট্রাম্প তার এখন প্রধান লক্ষ্য হল দ্বিতীয় বার নির্বাচনে দাঁড়ানো – এই মুডেই তিনি আছেন। আর তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এখন নিচ্ছেন তা সে উদ্দেশ্যেই প্রভাবিত। চীনের সাথে বিরোধ মিটিয়ে কোন বাণিজ্য ডিল না করা অথবা ভারতকে কোন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া ইত্যাদি এমন সবই একারণে তুচ্ছ ট্রাম্পের কাছে। বরং তিনি বীর, তিনি আমেরিকান ন্যাশনালিস্ট – এই পরিচয় গড়তে তিনি একমাত্র ব্যস্ত যা দিয়ে তিনি নির্বাচন লড়বেন। যদি না আবার ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন!

কাজেই ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ, আপনাদের উচিত হবে বাস্তববাদী হওয়ার, সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পন্ডশ্রম অর্থহীন। বরং ফ্রেন্ডশীপ রিনিউ বা চেক করে দেখতে পারেন – তা এখনও বহাল আছে কী না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutam.das@gmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০১ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার বন্ধুদের নজরে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

গৌতম দাস

২০ মে ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ap

 

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচন প্রায় শেষ। এটা ভারতের ১৭তম লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন।  নির্বাচনের ছয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছিল আগেই। আজ ১৯ মে রোববার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এরপর ২৩ মে সকাল থেকে একযোগে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। ঐদিনই দুপুর ১২টা নাগাদ কোন প্রার্থী কে কোথায় এগিয়ে থাকছেন তা আঁচ পাওয়া শুরু হয়ে যাবে। কোন দল সরকার গড়তে যাচ্ছে এর অভিমুখ আন্দাজ করাও ঐদিনই সন্ধ্যার পর থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কে কোন আসনে জিততে যাচ্ছে; কোন দলের প্রাপ্ত মোট আসন সংখ্যা কেমন হবে ইত্যাদিও। আর প্রাপ্ত সে ফলাফলের ভিত্তিতে পরেরদিন ২৪ মে থেকে প্রত্যেক দলের জোট গড়ার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যাবে। ফলাফল কী হতে পারে এপ্রসঙ্গে প্রায় সবারই অনুমান ভারতে একটা কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

আসলে ভারতে কোয়ালিশন সরকার এবারই নতুন না। বরং গত ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সব সরকারই ছিল আসলে কোয়ালিশন সরকার। এমনকি মোদীর চলতি সরকারে বিজেপির মারজিনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এটাও ছিল এক কোয়ালিশন সরকার। তবে এ পর্যন্ত এসব কোয়ালিশন সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল হয় কংগ্রেস না হয় বিজেপির নেতৃত্বে। সেকালে এ’দুই পার্টির কোন একটা কোয়ালিশনের নেতা না থাকলে সরকার টিকে নাই। যেমন, ১৯৯৬ সালে দেবগৌড়া-জ্যোতি বসুর কোয়ালিশন ছিল এমন এক ব্যতিক্রম যা ১৮ মাসের বেশি টিকে নাই। তবে এবারই কংগ্রেস অথবা বিজেপিকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও এরকম আরও কয়েকজন যেমন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা মায়াবতী বা অন্ধ্রপ্রদেশের সিটিং মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুও আছেন যারা এমন সরকারের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। আর মমতাই এমন ভিন্ন ধরণের কোয়ালিশন সরকারের বিশেষত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে একে আলাদা নাম, ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর সরকার বলে ডাকছেন।

দুনিয়াতে  রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিপরীত ধারণা হিসেবে ইতিহাসের একপর্যায়ে উঠে আসে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা। যার মূল বৈশিষ্টগত ফারাক ও নতুনদিকটা হল,  রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার বলতে এটা পাবলিকের গণসম্মতির রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রে এর ক্ষমতার উতস – নাগরিক লোকক্ষমতা।  এছাড়াও এমন রাষ্ট্রের আবার আরও একটা রূপ আছে। বিশেষত কাঠামোর দিক থেকে বিচারে দুনিয়ায় সেই রাষ্ট্র-রূপটার নাম – ফেডারেল রিপাবলিক রাষ্ট্র। একে ফেডারেল বলার কারণ হল, এখানে রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রদেশ নিয়ে গঠিত বা বলা যায় রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রাদেশিক ইউনিট বা রাজ্যে বিভক্ত থাকে। তবে ফেডারল রাষ্ট্রের  বৈশিষ্টের মূল জায়গাটা হল, এখানে রাষ্ট্রের  কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও সম্পদ ইত্যাদি কী ভিত্তিতে রাজ্যগুলোও এসব উতস ব্যবহারের সমান সুযোগ [access] পাবে তা আগেই বিস্তারিত এর লিখিত নিয়ম বলা থাকে, একটা ন্যায্যতার ভিত্তিও যেন সেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাজ্য বা রাজ্য-সরকারকে দেয়া বরাদ্দ যেন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানের পছন্দের বা অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে, এভাবে এখানে রাজস্বসহ সব বরাদ্দ হতে হয়। রাজস্ব, সম্পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদিতে কোনো কোনো রাজ্য যেন কোন বৈষম্যের শিকার না হয়- এমন কাঠামোগত প্রটেকশন ব্যবস্থা থাকাই ফেডারেল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। ভারত আমেরিকার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় দলগুলোর সমন্বয়ে একটা কেন্দ্রীয় সরকার গড়া অর্থে মমতা এটাকে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ [Fedaral Front]- এর সরকার বলছেন।

গত ১৭ মে ছিল শেষপর্বের এবং পুরা নির্বাচনের প্রচারণার সর্বশেষ দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী ততপরতা ও কার্যক্রমের সমাপ্তি হিসেবে দলের প্রধান অমিত শাহকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। অমিত শাহ মুখস্থ কথার মত সেখানে বিজেপির জোট তিন শতাধিক আসন পাবে বলে দাবি করে আসছিলেন। মজার কথা হল, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক পাশে বসা মোদীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বলছিল না। ঐ সাংবাদিক সম্মেলনের পুরা সভা পরিচালনা ও শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সবই অমিত একাই করছিলেন, মাঝে মোদী কেবল একবার তার প্রশাসনের পাঁচ বছর সমাপ্ত হল বলে নিজের কিছু অনুভূতি প্রকাশ ও শেয়ার করেছিলেন। তবে কোনো কারণে তিনি এদিন সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি, সব অমিত একাই সামলেছেন। দ্যা হিন্দু পত্রিকা বলছে, এটা গত পাঁচ বছরের শেষে এক বড় ব্যতিক্রম [At his first press conference in 5 years, Modi says Amit Shah will take questions]। তবে মোদীর বক্তব্যের শরীরী-ভাষ্য ছিল ভিন্নররকম। যেন তিনি বলতে চাইছিলেন, গত পাঁচ বছরের শাসন আর এই নির্বাচনী প্রচারণা মিলিয়ে যা কিছু পেরেছি সব করলাম। যেন তিনি এখন ভগবান ভরসায় আছেন যদি তিনি আবার তাঁকে ক্ষমতায় আনেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় তিনি আবার ফিরে আসছেনই এমন কনফিডেন্স, গত ২০১৪ সালের মত, মোদির নিজের ওপর আস্থা বা মোদি-জ্বর ইত্যাদি কোনটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিবিসি (১৮ মে দিবাগত) রাত দশটায় এক খবর ছেপেছে যেখানে বলা হয়েছে মোদী উত্তরপ্রদেশেরও আরও উত্তরে প্রাচীন কেদারনাথ মন্দিরে ধ্যানে বসেছেন। বিবিসি শিরোনামে বলেছে এটা মোদীর “স্পিরিচুয়াল ব্রেক” [spiritual break]। ঘটনা হল তিনি নিজেই বা তাঁর দল টুইটারে ছবিসহ এই খবর দিয়েছে। একই ছবি দিয়ে তবে বিবিসির একটু আগে মধ্যপ্রাচ্যের এক ইংরাজি দৈনিক গালফ টুডে রিপোর্ট করেছে যে এই  ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। টুইটারেও অনেকে  মন্তব্য লিখেছে। একজন বলছে তিনি গতদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের সময় থেকেই তিনি ধ্যানে [@Bhai_saheb: Yesterday modiji was meditating in press conference and today at kedarnath]। সে যাই হোক মোদীর “মন অশান্ত” এটা স্বপ্রকাশিতভাবে বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ আগেরদিনের সাংবাদিক সভায় মোদীর শরীরী ভাষায় যে তিনি নিজেকে “হবু বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী” হিসাবে কনফিডেন্ট মনে করতে পারছিলেন মনের সেই অস্থিরতার কথাই আজকের টুইটারের ম্যাসেজ থেকেও প্রতিষ্ঠিত হল। এমনিতেই মোদী চরম মিথ্যাবাদী বলে মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করেছিল দুদিন আগে যে – ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট তিনি অনেক আগেই ব্যবহার জানতেন বলে এমন আগের সময়ে তিনি দাবি করেছেন সেটা ভারতে বাণিজ্যিকভাবে  ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট চালু হবার বছর পাঁচেক আগের ঘটনা হয়ে যায়।

   ______________________

সর্বশেষঃ  আজ ১৯ মে সন্ধ্যা থেকে এই প্রথম এক্সিট পোলের মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য আসতে শুরু করেছিল। এক্সিট পোল মানে ভোটের বুথ ফেরত কিছু সংখ্যক লোকের সাথে কথা বলা – এমন নমুনার ভিত্তিতে সংগৃহিত তথ্যের বিশ্লেষণ মন্তব্য। এমন আটটা  কোম্পানি থেকে প্রকাশিত আট এক্সিট পোলের ফলাফল  মানে অনুমান-মন্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ছয়টাই বলেছে মোদীর জোট  আবার ক্ষমতায় ফিরবে। মানে ২৭২ এর বেশি আসন পাবেন। কেবল দুটা এক্সিট পোলের ফলাফল-অনুমান-মন্তব্যে একটা বলছে ২৪২, অন্যটা বলছে ২৬৭ আসন পাবে। বলাই বাহুল্য এগুলো খাটি অনুমান মাত্র, সত্যি ফলাফল নয়। আর ভারতের নির্বাচনে এর আগে এক্সিট পোলের অনুমানের পুরা উলটা ফলাফল বাস্তবে হয়েছে এমন রেকর্ডও আছে। তাই  আসল ফলাফল পেতে ২৩ মে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আমরা সতর্কতা হিসাবে ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি
(প্রাক্তন বিজেপি নেতা) ভেঙ্কায় নাইডু বলছেন, “Exit polls do not mean exact polls...Since 1999, most of the exit polls have gone wrong”- উনার এই কথাটা মনে রাখতে পারি।______________________

ওদিকে  কেবল নন-কনফিডেন্ট মোদী কেবল চেহারাতেই নয়, মোদী সম্ভবত যে ফিরে ক্ষমতায় আসতে পারছেন না সে ব্যাপারটা চার দিকে সেভাবেই খবর ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অন্তত নির্বাচন শুরুর পর থেকে। প্রায় পাঁচ জোড়া নির্বাচনী-বিশ্লেষক গ্রুপ কেউই নির্বাচন শুরুর (১১ এপ্রিলের) পর থেকে আর ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে, মোদী আবার ক্ষমতায় আসছেন। শুধু তাই না, এবার মিডিয়াগুলোও তাদের মূল্যায়নে বলা শুরু করেছে, মোদির বিজেপি ও তাঁর জোট এনডিএ-কে সাথে নিলেও সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসন ) বিজেপি পাচ্ছে না। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোকে ভাগিয়ে নিজ নিজ জোটে ঢুকিয়ে নিতে ফলাফল ঘোষণা হবার পরে হর্সেস ট্রেডিং বা  এমপি কেনা-বেচার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠল। আর কংগ্রেসের বেলায় বলা হচ্ছে, ফলাফলে যদি তার মোট প্রাপ্ত আসন এক শ’র নিচে হয়, তবে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি ছেড়ে দেবেন আগেই; আর সেই সাথে জোটের অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবেন [কুর্সিতে অনড় নয় কংগ্রেস,বার্তা আঞ্চলিক দলগুলিকে]। আর যদি দেড় শ’র বেশি আসন পান, সে ক্ষেত্রেই কেবল জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল দরকষাকষিতে নামবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস যদি এক শ’র নিচে আসন পায় তবে আর কংগ্রেসের পক্ষের জোট ইউপিএ-এর পক্ষের কাউকে ভাগিয়ে মোদী তার এনডিএ জোটকে মোট ২৭২ এর উপরে নিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরাই ফেডারেল ফ্রন্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন করার সম্ভাবনা হাজির হয়ে যাবে।

নির্বাচন কেমন হলো?
এবারের নির্বাচন কেমন হলো? এক কথায় জবাব, খুবই খারাপ। ভারত-রাষ্ট্র আরেকবার আরেক ধাপ দুর্বল হয়ে গেল। এটা বলাই বাহুল্য যে কোন নির্বাচন কমিশন যখন নিরপেক্ষতা সততা স্বচ্ছতায় একটা সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাতে সবচেয়ে সবল হয়ে উঠে খোদ রাষ্ট্রটাই। ওর প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যত দৃঢ় হয়।  কিন্তু এবারের ভারতের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই এসব ক্ষেত্রেই অসফল; ফলে এই কমিশনই  ভারত-রাষ্ট্রকে পরাজিত করে দিল। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেল।

কিন্তু “আরেকবার” কেন? আর দুর্বল হওয়া মানেইবা কী?
সাধারণভাবে বললে, ভারত-রাষ্ট্র মূলত চালায়, চালিয়ে আসছে এর ব্যুরোক্র্যাটেরা। সেটাই হবার কথা এবং একমাত্র বিকল্প। কারণ ১৪০ কোটির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এক রাষ্ট্র, একে দক্ষ ব্যুরোক্র্যাটরাই একমাত্র চালাতে পারবে – এটাই স্বাভাবিক। অনেকে ভাবতে পারেন যে, কেন এভাবে বলা হচ্ছে যেখানে বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা তো সমাজে নেতিবাচক ধারণার বলে মনে করা হয়। হা তা থাকলেও মনে রাখতে হবে  বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা আসলে ইতিবাচক পজিটিভ এবং প্রয়োজনীয় শব্দ। প্রথমে এর সেই ইতিবাচক অর্থ বুঝতে হবে বুর‍্যোক্রাসির আসল মানে কী? আমাদের পরিবারগুলোর প্রধান ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা আমাদের মায়েরা। মা সন্তান, স্বামীসহ সব মেম্বারদের নিয়ে সবাইকে ভাত বেরে খাওয়ায় এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু ধরা যাক পরিবার বড় হয়ে যাবার কোন কারণে মা সন্তানদের মাথার কাছে নিয়ে হাত বুলিয়ে ভাল বেড়ে আর ভাত খাওয়াতে পারছেন না। তাই ম্যানেজ করার সুবিধার্থে মা নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছেন। এতে খাবার সবার পাতে পাতে আর তুলে না দিয়ে বাটিতে বাটিতে তরকারি বেড়ে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যেখানে কোনটা কার বাটি তা বুঝতে বাটির নিচে চিরকুটে নাম লিখে রাখা হয়ছে। এতে মার পক্ষে বড় সংসারটা ম্যানেজ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে, স্বাশ ফেলার সময় পাচ্ছেন। আর এখানেও মায়ের স্নেহ-মমতা প্রকাশ আছে অবশ্যই, তা টের পাওয়া যায় কিন্তু একটু পরোক্ষে। এটাই বুর‍্যোক্রেসি, এক বুর‍্যোক্রেটিক ম্যানেজমেন্ট।  বড় হয়ে যাওয়া যে কোন কাজ একমাত্র এভাবেই ম্যানেজ করা সম্ভব। এক লিখিত নির্দেশিকা বইয়ের মাধ্যমে বড় কাজ পরিচালনা।
এখন মা যাকে ম্যানেজার বা কেয়ারটেকার রেখে এই নতুন ব্যবস্থাপনা চালু রেখেছেন সেই ম্যানেজার এবার নিজের অসৎ কোন স্বার্থে মায়ের নির্দেশের উলটা মানে করল বা প্রয়োগ করল, আর মাও আবার তদারকি মনিটরিং করা ঢিলা দিল বা ভুলে গেল। অথবা মায়ের এক দুষ্ট সন্তান যে জানে, ডাক্তারের নির্দেশে তার এক বোনের বিশেষ যত্ন নিতে সেই  ভাগের বাটিতে বেশি মাংস থাকছে আজকাল  তাই  সেই দুষ্টু সন্তান এবার ম্যানেজারের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বাটি অদলবদল করে নিয়েছে ইত্যাদি  – এই যে পরিস্থিতি এখানে এসে এবার বুর‍্যোক্রাসির অর্থ হয়ে দাড়াবে নেগেটিভ। বুর‍্যোক্রাসির মানে হয়ে যাবে এবার অবহেলা, হ্যারাসমেন্ট দুর্নীতি ইত্যাদির এক ব্যবস্থা। তাহলে সারকথায় কোন কাজ ততপরতা যখ্ন বড় হয়ে যায় তা ম্যানেজ করতে বুর‍্যোক্রাসির বিকল্প কোন উপায় নাই। তাই আবার তদারকি মনিটারিং এর ভাল ব্যবস্থাপনা দিয়েই একে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বুর‍্যোক্রাসির অর্থ ইতিবাচক করাই একমাত্র পথ।

কাজেই যেখান থেকে কথা উঠেছিল,.১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতকে পরিচালনা করতে পারে কেবলমাত্র এক দক্ষ ও করিৎকর্মা এক বুর‍্যোক্রাসিই।  তবে এদের উপরে বসে রাজনৈতিক নির্দেশ দিতে, ভালো রাজনীতি ও রাজনীতিবিদও অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র চালানো শুধু ব্যুরোক্র্যাটদের কাজ নয়। এ ছাড়া শক্ত এক বিচার বিভাগও আরেকটা খুবই প্রয়োজনীয় অঙ্গ। ওদিকে নির্বাচন কমিশনও আছে – এরাও মূলত ব্যুরোক্র্যাটেরই অংশ। তাই তাদেরও শক্ত ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বলা হয়ে থাকে, সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (১৯৯০-৯৬) টিএন সেশন – তিনি তার আমলে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ও কঠোর সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে, আর সেটাই নির্বাচন কমিশনের আজকের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রধান উৎস। কিন্তু তবু এবারের নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশন ‘পরাজিত’।  অনুমান করা হচ্ছে রাজনীতিবিদের কারণে প্রভাবিত হয়ে দ্বিতীয়বার ভারত-রাষ্ট্রের পরাজয় ও দুর্বল হওয়ার ঘটনা ঘটল। চলতি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনাস্থা জমেছে পাহাড় প্রমাণ।

এবারের নির্বাচন ছিল পরিচালনের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এক নির্বাচন। যার মূল কারণ হল, মোদীর অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। আর তা থেকে পালাতে আড়ালে যেতে তিনি নির্বাচনকে সাজিয়েছেন “হিন্দুত্বকে” মুখ্য বা কেন্দ্র করে। হিন্দুত্বই শ্রেষ্ট এবং সবকিছু – এই বক্তব্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান হিসাবে মোদী তাঁর সব সংজ্ঞায়িত বা অসংজ্ঞায়িত ক্ষমতাকে অপব্যাবহারে কাজে লাগাতে নেমে গেছেন যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ভোটের স্বার্থে মুচড়ে ব্যবহার করা যায়। এতে তাঁর সৃষ্ট এই অযাচিত চাপ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা দ্বিধাগ্রস্থতা থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই বিশেষত মোদীর বিরুদ্ধে একশন নেবার ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে গেছে।  দ্বিতীয় সদস্য তাঁকে কোনঠাসা ও উপেক্ষা করে রেখেছে প্রধানসহ অন্য জন – মিডিয়াতেই এই অভিযোগ এসে গেছে।
এককথায় বললে, রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান যখন আইন মানতে চান না বা তাঁর বিরুদ্ধে যখন আইন প্রয়োগ করা যায় না বা প্রয়োগ কর্তা ভীত হয়ে এড়িয়ে চলতে চায় – এটা হল সেই অবস্থা। মূলত এটা রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া, অকেজো নন-ফাইশনাল হয়ে পড়ার পুর্বলক্ষণ। এমন অসহায় অবস্থার প্রকৃত  মানে বা ইঙ্গিতটা হল, রাষ্ট্রকে আবার ঢেলে সাজানো, নতুন করে প্রজাতন্ত্র গড়বার মুরোদ দেখানোর জন্য রাষ্ট্র আহবান জানাচ্ছে।

এমনই, প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি আসন থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘কারচুপি করে’ জিতেছিলেন – এই অভিযোগে ১৯৭১ সালেই মামলা হয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টে। এরই রায় এসেছিল ১২ জুন ১৯৭৫ সালে। সেবার আদালত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে সশরীরে এসে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিলেন, এমনকি আদালত পুলিশের নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর আদালতে প্রবেশ অনুমোদন করে নাই। বরং আইন সংশ্লিষ্ট সব পেশার লোক যারা আদালতে আসেন তাদের নিয়ে গড়া এক হিউম্যান চেইন – এর ভিতরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে রেখে আদালতের এমন নিজস্ব নিরাপত্তায় ইন্দিরা গান্ধী এজলাসে উঠে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু  রায় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে যায়, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাতে ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আপিল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত করেছিল আর কয়েকমাস পরে, ৭ নভেম্বর বিস্তারিত শুনানিতে সব শাস্তি রদ করে দেন। কিন্তু এর অনেক আগেই ঘটনা অন্য দিকে গড়ায় ও গতিমুখ বদলে যায় ।

হাইকোর্ট তার মূল রায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনে জিতবার দায়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওই কারচুপির নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে দেন। এছাড়া ইন্দিরার প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এর আগেই অন্য কাউকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়ার সংসদীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী ২০ দিন সময় দিয়ে ঐ নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু এখানেই নির্বাহীপ্রধান ইন্দিরা আইনের উর্ধে উঠে যেতে চাইলেন।

ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে যেন ক্ষমতা ছাড়তে বা সাজা খাটতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে পরবর্তি ২০ দিন শেষ হওয়ার আগেই ২৫ জুন ১৯৭৫ সারা দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে বসেন। এতে তিনি নাগরিক মৌলিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার, মিডিয়ায় সেন্সরশিপ আরোপ ইত্যাদি প্রায় সবকিছু করার সুযোগ নেন, সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। কনস্টিটিউশনাল জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে তিনি পাল্টা দাবি করেছিলেন যে, ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং তা ঠেকাতে’ এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। এভাবে স্রেফ নিজেকে বাঁচাতে তিনি রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশনকে অকার্যকর ও দুর্বল করে ফেলেন, খরচের খাতায় ঠেলে  দেন।
প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতাকে বা ক্ষমতাকেন্দ্র একক রাখতে হয় বিভাজ্য করা যায় না। একে বিভক্ত বা কোনো শরিকানা করার ভুল করা যায় না। একথা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে এই ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্যও কিছু পদক্ষেপ থাকতে হয়। যেমন কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও নির্বাহী প্রধানের বৃহত্তর অধীনেই রেখে; তবে ব্যক্তি না বরং নন-পারসনাল, অবজেকটিভভাবে ওর ক্ষমতা স্ট্যাটুটরি বিধানে বর্ণিত করে রেখে দেয়া হয়। যেমন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিষ্ঠান, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কম্প্রোটোলার জেনারেল নিয়োগ ইত্যাদির বেলায়। অথবা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে (তুলনামূলক অর্থে) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে স্বাধীন করে রেখে দেয়া খুবই দরকার হয়; যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া বা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় এবং যাবেই। কারণ শত আইন করে, লিখে রেখে এমন বিপর্যয়গুলোকে বন্ধ করা যাবে না। কারণ নির্বাহীপ্রধানই যদি আইনের উর্ধে উঠে যেতে চান তখন কী হবে! এর জবাবে বলা হয়, যাদের দিয়ে ক্ষমতার এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হবে, ক্ষমতার চর্চা হবে তারা নিজেরা প্রজ্ঞাবান হবেন – এটাই এর একমাত্র প্রতিকার। বিশেষ করে নির্বাহী প্রধানের হাতে এবং যার যার এখতিয়ার পেরিয়ে অন্যের সীমানায় ঢুকে পড়া, কোনো সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। আর সর্বোপরি, কেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে এমন করে রাখা হয়েছে, এর সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

কিন্তু না হলে?  অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন (যেটা সাধারণত নির্বাহী প্রধানের হাতে ঘটে থাকে, সেই ইংল্যান্ডের রাজার আমল থেকেই) ঘটলে তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা ও ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার কারণে রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়বে। তাই ঘটেছিল।

ভারতের জরুরি আইন জারির প্রায় দুবছর পরে ইন্দিরা গান্ধী (২১ মাসের) জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে, ১৯৭৭ সালে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিলেন এবং গোহারা হেরেছিলেন। তিনি নিজে এবং বড় সন্তান সঞ্জয় গান্ধী এতে পরাজিত হন অর্থাৎ পরোক্ষে শাস্তি পেয়েছিলেন বলা হয়। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতার দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এরই একটা দাগ হল এবারের নির্বাচনে এই দুরবস্থা।

কারণ ইন্দিরার ঐ ঘটনা এরপর থেকে ভারতের বিচার বিভাগ বা প্রশাসনে জড়িয়ে থাকা পেশাদার ব্যক্তিরা একটা শিক্ষা নিয়ে থাকবেন সম্ভবত – সেটা হলঃ  তারা কোনো দুর্দমনীয় নির্বাহী প্রধান মানে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে যাবেন না। বরং পরোক্ষে (কমন বন্ধুকে পাঠিয়ে) তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকবেন; আর বাস্তবে মুখোমুখি কোনো সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টা করবেন। খুব সম্ভবত ইন্দিরার ঐ ঘটনা সম্পর্কে তাদের মুল্যায়ন হল আদালতের ঐ একশন শেষ বিচারে কাউন্টার প্রডাকটিভ। তাই মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে মুখ বাঁচাতে হবে, সেটাই বেটার।  যেমন ওই মামলাতেই লক্ষণীয় হল, সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই সাজার রায় উল্টে দিয়েছিলেন। যদিও জরুরি আইন জারি থাকায় সে আমলে এটা করা তত জরুরি ছিল না। কিন্তু আসলেই কী এটা “বেটার”!

নরেন্দ্র মোদীর এই পাঁচ বছরে নির্বাহী ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অনেকবার তিনি ঘটিয়েছেন।  রিজার্ভ ব্যাংকের গর্ভনরের উপর চাপ সৃষ্টি অথবা নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা সিবিআই এর প্রধানকে অপসারণ করা নিয়ে বেপরোয়া হয়ে অনেক জল ঘোলা করেছেন। সেসব রেখে কেবল এবারের নির্বাচনের কথায় আসি। অন্যান্য বারের মত এবারের নির্বাচনের আগেও ভারতের নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ এক আচরণবিধি জারি করেছিল। সেখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে কোনো নির্বাচনী বক্তব্য দেয়া যাবে না, কাশ্মিরে পুলওয়ামায় প্যারামিলিটারি গাড়িবহরে হামলা বা এরপরে পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত ভারতের বিমান হামলা – এগুলোকে নির্বাচনী বক্তব্য বা পোস্টারে আনা যাবে না। বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু মোদী নিজেই  এসবগুলো আচরণবিধির সবই ভঙ্গ করেছেন। যেমন তিনি “তাঁর সেনাবাহিনীর” সাফল্য, যারা বালাকোটে সন্ত্রাসীদের বোমা মেরে ধ্বংস করে এসেছে “তাদের সম্মানে দেশপ্রেমে” এবারই প্রথম ভোটার’ যারা সে তরুণেরা যেন মোদীকে ভোট দেয়- এরকম প্রচারণার সব অভিযোগ মোদীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল।

কমপক্ষে পাঁচটা এমন সিরিয়াস আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এসেছিল মোদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক গড়িমসির পরে সব অভিযোগ থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীকে খালাস দিয়ে দেয় [EC’s clean chit to PM came amid dissent]। এটা দ্যা হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ঐ খালাস দেয়াটাই শেষ কথা নয়। কোনায় একতা শব্দ আছে “amid dissent”। যার মানে হল, Ashok Lavasa নামে এক নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে।

এছাড়া প্রথম দু-তিনটা অভিযোগ বা মামলার ক্ষেত্রে সে অভিযোগ প্রায় মাসখানেক ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রায় কাছাকাছি অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ৪৮ ঘণ্টা, আর এক বিরোধী নেতা মায়াবতীকে ৩৬ ঘন্টা নির্বাচনি প্রচার ততপরতা চালানো থেকে বিরত থাকার শাস্তি দেয়া হয়েছিল। যোগী আদিত্যনাথও ঐ একই “মোদি কা আর্মি” বলে সম্বোধন করে মোদীর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। এছাড়া আবার অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ যেখানে রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন কমিশন শাস্তি দিয়েছিল, সেখানে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে কমিশনের কেন্দ্র দিল্লির অফিসে।

ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল তাদের পদক্ষেপ-হীন অভিযোগ ফেলে রাখার  নানান উদাহরণ দিয়ে। কিন্তু তবু আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক রায় শুনাতে যায় নাই। এর স্বপক্ষে অবশ্য আদালতের শক্ত যুক্তি আছে যা ভ্যালিড। তাই আদালত রায়ে বলেছে,  ‘কমিশন স্বাধীনভাবে এসব ব্যাপার নিজেই বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি দিতে পারে’  – এভাবে বলে এক উৎসাহিত করার রায় দিয়েছে। এর পেছনের সুপ্রিম কোর্টের শক্ত অবস্থান আছে বলে  আমরা নিজেরাই অনুমান করতে পারি। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের মতোই নির্বাচন কমিশনের নিজেরও বিচারিক ক্ষমতা আছে। ফলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হল, আগেই নিজে হস্তক্ষেপ না করা, বরং কমিশনের নিজের বিচারিক ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালনের জন্য যে ক্ষমতা আছে, তা ব্যবহার প্রয়োগ করতে পর্যাপ্ত সময় সুযোগ করে দেয়া, যাতে কমিশন তা ব্যবহার করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট আগেই হস্তক্ষেপ করতে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠত। ফলে এটা এড়ানো সুপ্রীম কোর্টের সঠিক পদক্ষেপ।

কিন্তু আমরা দেখছি, নির্বাচন কমিশন মোদীর নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাত করতে চায় নাই, এড়িয়ে যাবার পথ ধরেছে গেছে। এটা এখন দগদগেভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা মিডিয়াও প্রসঙ্গটা তুলেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে  যথেষ্ট সক্ষম ও দক্ষ এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। যদিও বাংলাদেশের গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি দল হয়ে এসে কী ভূমিকা নিয়েছিল আমরা জানতেই পারি নাই। বলাই বাহুল্য তাদের সফর কূটনীতির বুদ্ধিতেই পরিচালিত হয়েছিল, কমিশন পর্যায়ের বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ হয়নি।

সাম্প্রতিককালে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অপব্যবহার করে কিছু স্টাটুটারি প্রতিষ্ঠান যেমন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা তদন্ত প্রতিষ্ঠান সিবিআইর প্রধানসহ অনেকের সাথে, তাদের তুলনামূলক স্বাধীন থাকার ক্ষমতা ক্ষুন্ন করতে গিয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছিলেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হয়তো বিজেপি দলের; কিন্তু স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও ক্ষতযুক্ত করে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী দাগ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় এর ‘কাফফারা’ দিতে হতে পারে।

খুব সম্ভবত মোদীর আগের এসব তৎপরতা দেখেই এর প্রতিক্রিয়ায় এবার নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে। কিন্তু তাতে কী? ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল করে ফেলার দুর্ঘটনা কী এড়াতে পেরেছে – সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে! এটা ভারত-রাষ্ট্রকে অনবরত তাড়া করতেই থাকবে; সম্ভবত কখন কোন কাফফারা আদায় করে নিবে, কে জানে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৮ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)মোদির শরীরী ভাষা তা নয় এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মাহাথির কায়দায় ‘ঋণফাঁদে’র গল্প মোকাবেলা

মাহাথির কায়দায় ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলা

গৌতম দাস

২৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2zH

 

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ, বাংলাদেশে তাকে চেনেন না এমন লোক খুব কমই আছে। অবশ্য নিজ স্বার্থে কেউ কেউ নিজের আকামের পক্ষের সাফাই হিসাবে তাঁর নাম মুখে নিয়ে থাকেন  ঢাল হিসেবে মাহাথিরকে ব্যবহার করে থাকে। মালয়েশিয়ার টানা পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী আর ১৯৮১-২০০৩ সাল, এই ২২ বছরের সক্রিয় রাজনীতিবিদ তিনি। প্রাকটিসিং সরকারি ডাক্তারির চাকরি রেখে ১৯৬৪ সাথে প্রথম পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল। তার শাসনকালের প্রধান সাফল্য মনে করা হয়, মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে তিনি বিপুল উঁচু স্তরে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ার শিল্পায়িত ভবিষ্যত তাঁর হাতেই আলো দেখেছিল। আবার তিনিই এমন রাজনীতিবিদ ষাটের দশকের শেষভাগে যেটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথমপর্যায় ছিল, তখন  তারই লেখা একটা বই – তারই দলের সরকার এর প্রকাশনা ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরিণতিতে যা তাঁকে রাজনীতি ও দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কারণ প্রকাশিত “মালয় ডিলেমা” নামে ঐ বইয়ে তিনি স্থানীয় মালয়বাসীর পক্ষে, তাদের জীবনে অসাম্য দূর করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। মালয়েশিয়া মূল চারটা নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠির [race or ethnic groups] দেশ মনে করা হয়। [এই কথাগুলো মালয়েশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান বিভাগের এই রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে।] সেখানে ২০১০ সালের জনসংখ্যা রিপোর্টের উপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলা হয়েছে। ঐ চার এথনিক গোষ্ঠি মধ্যে ভুমিপুত্র [Bumiputera (inclusive of Malay and Indigenous)]  মিলিয়ে এরা ৬০ ভাগ বলা হয়েছে [Bumiputera, the main ethnic constituted 60.3 per cent]। আর চীনা-অরিজিন মালয়েশিনেরা ২২.৯% [Chinese and Indians at 22.9 and 6.8 per cent] বলা হয়েছে।  ভুমিপুত্ররা সংখ্যায় বেশি কিন্তু চীনা-অরিজিন মালয়েশিয়ানদের চেয়ে বেশি গরীব বলে মাহাথির ঐ বইয়ে দাবি করেছিলেন ভুমিপুত্রদের সামাজিক-অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধায় কিছুদিন বেশি দেয়া হোক। (আমাদের পাহাড়ি কোটার মত যেটাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘এফারমেটিভ একশন'[affermative action] বলা হয়ে থাকে।) কিন্তু ততকালীন প্রধানমন্ত্রী আব্দুল রহমান [Prime Minister Abdul Rahman] এসব কথা তোলাতে এথনিক বিবাদ লড়াই না উস্কে উঠে এই ভয়ে তা চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এথেকেই সেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এগুলো সবই ১৯৭২ সালের আগের ঘটনা। তবে ১৯৭২ সালে ঐ প্রধানমন্ত্রীর টার্ম শেষ হয়ে তিনি অবসরে গেলে, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে, মাহাথির আবার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যান। এর পর থেকে তার রাজনৈতিক জীবনের কালো দিন কেটে যায়, তাকে আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি। ১৯৭৪ সালে তিনি মন্ত্রীসভায় স্থান পান, আর ১৯৮১ সালের পর থেকে টানা পাঁচ টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্বের দিন শুরু হয়ে যায়। তবে তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁর গৃহিত অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য দিয়েই তিনি বিভক্ত এথনিক জনগোষ্ঠিগত অসাম্য দূর করেছিলেন। [Mahathir sought to bridge Malaysia’s ethnic divisions by increasing general prosperity. ]

এ সময়কালে এক দিকে তার পরিচালিত সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য যেমন সত্য, তেমনি অন্য দিকে তিনিই ১৯৮৭ সালে ‘ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ [Internal Security Act] নামে কালো আইন পাস ও তা আরোপ করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। এভাবে ২০০৩ সালে তিনি তাঁর পাঁচ টার্ম প্রধানমন্ত্রীত্ব শেষ করে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের দিনে (২০১৮ সালের নির্বাচন থেকে) তিনি আবার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জোটসঙ্গী করে নির্বাচনে জিতে এখন ক্ষমতায়। যদিও সেকালে ঐ ১৯৮৭ সালের কালো আইন দিয়েই মাহাথির, আনোয়ার ইব্রাহিমসহ বহু বিরোধী নেতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টকে বন্দী করে রেখেছিলেন। এতে সেসময় মোট চারটি দৈনিক পত্রিকা বন্ধ এবং মোট প্রায় ১০৬ জন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাকে গ্রেফতার করেছিলেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ক্ষমতা খর্ব এবং কাউকে কাউকে পদত্যাগ করতে বাধ্যও তিনিই করেছিলেন। এভাবে বেপরোয়া মানবাধিকার কেড়ে নেয়াতে আমেরিকাসহ দেশী-বিদেশী অনেকের ভাষায় ও চোখে তিনি ‘স্বৈরশাসক ও নিপীড়ক’ হয়ে উঠেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই বৈপরীত্যের কারণে আমাদের কালের অনেক “স্বৈরশাসক” নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে মাহাথির মোহাম্মদের নামের আড়ালে নিজেদের অপকর্ম লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকেন।

২০০৩ সালে মাহাথির রাজনীতি থেকে অবসরে চলে গেলেও তিনি মালয়েশিয়ার নির্বাচনে (গত ২০১৮ সালের মে মাসে) কোয়ালিশন জোটে বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছেন এবং ৯৩ বছর বয়সে এখন আবার প্রধানমন্ত্রী। একালের মাহাথিরসহ তাঁর জোটসঙ্গীদের দাবি, এই জোট গড়ার মূল কারণ নাজিব রাজাকের অপশাসন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাকের আমলের কুশাসন ও ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতি থেকে মালয়েশিয়াকে বাঁচাতে জেলে বন্দী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথেই জোটবদ্ধ হয়ে মাহাথির আবার নির্বাচনে নামেন এবং বিজয়ী হয়ে জোটের বোঝাপড়া অনুসারে, এখন প্রথম দুই-তিন বছরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আছেন।

আমাদের আজকের আলোচনার বাকি অর্ধেক অংশের প্রসঙ্গ চীন। এটাকে বলা যেতে পারে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের চীন অথবা নতুন করে চলতি চীন-মালয়েশিয়া গভীর সম্পর্ক স্থাপন কেন সম্ভব হল, সেটাই প্রসঙ্গ।

আগের প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের শাসনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল, ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট। আর এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ঘটনা হল 1MDB প্রকল্প। 1MDB মানে ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলবমেন্ট লিমিটেড” (মালয় ভাষায় বেরহাড) নামে এক কোম্পানি। এটা মালয়েশিয়ান অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজ মালিকানাধীনে  “উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার চিন্তায়” নেয়া এক কোম্পানির নাম। আগ্রহিরা প্রভাবশালি মিডিয়া ব্লুমবার্গের এই রিপোর্ট-টা পড়ে নিতে পারেন।  কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা কখনো নিজ-সক্ষমতার [insolvent] কোম্পানি হয়ে উঠতে পারে নাই। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে অচচ্ছভাবে  লেনদেন, মানি লন্ডারিং, অর্থ নয়ছয় ও চুরির অভিযোগে নজরদারিতে পরে যায়। ব্লুমবার্গ এনিয়ে রিপোর্টের শিরোনাম থেকেই একে মহা অর্থ-কেলেঙ্কারি Scandal বলে চিহ্নিত করেছে।

বলা হয়েছিল, এটা আসলে মালয়েশিয়া সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন প্রকল্প, লক্ষ্য ফান্ড সংগ্রহ; কিন্তু বাস্তবে এটা আমেরিকা-সুইজারল্যান্ডসহ সাত দেশের বিভিন্ন বিনিয়োগ ফান্ড কোম্পানির সাথে মিলে দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ নিয়ে যাওয়াসহ বহু অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির এক প্রকল্প হিসেবে হাজির হয়। মোট প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার এখানে ‘নয়ছয়’ হয়েছে। এ ছাড়া, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের গত কয়েক বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ষ বিনিয়োগ কোম্পানি “গোল্ডম্যান স্যাস” [Goldman Sachs ] এতে জড়িত বলে আমেরিকার আইন বিভাগ সে অভিযোগ তদন্তে নেমেছে, মামলা করেছে। স্যাক্সের অন্তত তিনজন ব্যাঙ্কার এই মামলায় আসামি।  ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাক ও তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে এই প্রকল্প থেকে প্রায় বিলিয়ন ডলার অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কীভাবে এত অর্থ রাজাকের একাউন্টে এল, গত নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাজাক এর কোন সদুত্তর দিতে পারেন নাই। এভাবে এক মহা-কেলেঙ্কারির দুর্নীতি মামলায় রাজাক ও তার স্ত্রী এখন জেলে।

East Coast Rail Link (ECRL) from railprofessional.com

ওদিকে এই 1MDB প্রকল্প ছাড়াও আরও এর বাইরে চীনের সাথে নেয়া বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্পে মালয়েশিয়াকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে মাহাথির জোটের অভিযোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হল, চীনের সাথে নেয়া “ইস্ট কোস্ট রেল লিঙ্ক প্রকল্প” (East Coast Rail Link, ECRL)। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এটা এক বড় প্রকল্প এবং  নির্মিত হয়ে গেলে এটা চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত ও অংশ হয়ে যাবে। মালয়েশিয়ার পূর্ব-পশ্চিম দু’দিকেই সমুদ্রসীমানা। এই প্রকল্প পূর্বের কেলানতান বন্দর থেকে উপকূল বরাবর নেমে পশ্চিমে গিয়ে সেখানকার ক্লাঙ্গ বন্দরের সাথে যুক্ত হবে – এমন রেল যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রকল্প এটা। বলা হয়, নাজিব সরকার বিপুল ব্যয় করে এই প্রকল্প নিয়েছিল ‘ভালো কমিশন’ পাওয়ার স্বার্থে। তাই এত বড় বিনিয়োগের ভার তাদের অর্থনীতি বইতে পারবে কি না সে দিক উপেক্ষা করেছিল।

মাহাথির এবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ২০১৮ সালের মে মাসের নির্বাচনে। এর তিন মাসের মধ্যে আগষ্ট ২০১৮ তিনি চীন সফরে চলে যান যার মূল ইস্যু এই ECRL প্রকল্প। সেকালে এই প্রকল্প নিয়ে মাহাথিরের জনসমক্ষে বলা প্রধান যুক্তি ছিল, “আমার দেশ এত বড় বিনিয়োগের ভার সইতে পারবে না, অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে”।  তিনি চীনাদেরকে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পরে যেতে পারা – এই দুর্দশার দিকটা আমল করতে বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ভুল বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প – এমন বলছেন না। এদিকে চীনা ঠিকাদার কোম্পানির হাতে প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে, মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হয়েই চীনের সাথে কথা বলে প্রকল্পের কাজ স্থগিত করিয়ে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন।

একালে এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ব্যাপক হারে অবকাঠামো খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেখা যায়। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই আবার চীনা ‘বেল্ট-রোড’ মহাপ্রকল্পে যুক্ত হওয়ার কথা। তাই  চীন-ঠেকানোর বুদ্ধিতে স্বভাবতই এসব প্রকল্পের চরম বিরোধী অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্পের আমেরিকা। সাথে কিছু থিংক-ট্যাংক প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এমনই এক প্রপাগান্ডা শব্দ-চিহ্ন হল – “ঋণের ফাঁদ” [Debt Trap]।

এই প্রপাগান্ডার সারকথা বা দাবি হল, চীন বিভিন্ন দেশকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে নিজের কব্জায় নিয়ে ফেলছে। এমন অভিযোগ সত্তর দশকে এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রথম আগমনের সময় থেকে বিশ্বব্যাংকের, মানে আমেরিকার বিরুদ্ধেও ঊঠেছিল বা দেয়া হত। মজার বিষয় হল, আমেরিকা এখন সেই ভাষাতেই  চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা-অভিযোগ আনছে। এটা চীনবিরোধী মোক্ষম প্রপাগান্ডা বলে তা ভারতের (বিশেষ করে তার মিডিয়ার) কাছেও খুবই লোভনীয়। নিয়মিতভাবেই ভারতের মিডিয়া এই ফাঁদের প্রপাগান্ডায় মেতে আছে।  একারণে “ঋণের ফাঁদ” বিষয়ক ভারতীয় উৎসের যেকোন রিপোর্ট পাঠ বা রেফার করার সময় সতর্কতা থাকা জরুরি যাতে ভারতীয় মিডিয়া-প্রপাগান্ডার শিকার না হতে হয়। ভারতের কৌশলগত কূটনৈতিক অবস্থান হল চীন-ঠেকানোর এই প্রপাগান্ডায় অংশ নেয়া। কিন্তু ঘটনা হল, এমনকি জেনে অথবা না জেনে আমাদের প্রথম আলোতেও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

চীনা “ঋণের ফাঁদ” বা বেল্ট-রোড বিরোধী প্রপাগান্ডার এপর্যন্ত সবচেয়ে মোক্ষম রিপোর্ট হল, থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভলবমেন্টের রিপোর্ট। আবার এর যুক্তিগুলোকে কেটে পালটা বক্তব্যের অবস্থানও আছে এখানে এক ডাচ কনসালটেন্টের বক্তব্যে।

কিন্তু ভারতের চীনের বিরুদ্ধে আপত্তির বিপরীতে একটা মজার দিক আছে। সেটা হল, খোদ ভারতেও চীনা বিনিয়োগের অর্থে নেয়া এমন অবকাঠামো প্রকল্প কম নয়। এমনকি চীনা ‘ব্রিকস’ উদ্যোগে নেয়া ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (যা বিশ্বব্যাংকের মত প্রায় একই কাঠামোতে চলে) নামে একটা অবকাঠামো ব্যাংক আছে – যার বিনিয়োগ প্রকল্পের একমাত্র খাতক হল ভারত; কিন্তু এসব চীনা প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের জন্য তা ‘ঋণের ফাঁদ’ এমন কোনো অভিযোগ নেই ভারতের। এর মানে, অন্তত বোঝা গেল যে, চীনা ‘ঋণফাঁদের’ খারাপ স্বভাব চরিত্র ভারতে এলে ভাল হয়ে যায়। যেন খারাপ “চীনা খাসিলত” আর কাজ করে না।

তবে লক্ষণীয় হল, এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান বা মালয়েশিয়ায়- যেখানে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয়েছে- সরকার বদলের সাথে সাথে সব দেশেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব আপত্তি নিয়ে নতুন সরকারগুলো চীনা সরকারের সাথে কোনো সঙ্ঘাতের সম্পর্কে যাওয়া ছাড়াই বরং আপস আলাপ আলোচনা সব ক্ষেত্রই আপত্তি মীমাংসা করতে পেরেছে। অর্থাৎ সে সুযোগ ছিল এবং তা নেয়া হয়েছে বোঝা গেছে। আর এই আলোচনা শেষ হয়েছে পুনরায় নেগোসিয়েশন ও আগের চুক্তিটা সংশোধিত ও নবায়ন করার ভেতর দিয়ে। সারকথায় কোথাও কোনো প্রকল্প অমীমাংসিত বিতর্কে আটকে যায়নি। বড় জোর এক বছরের মধ্যে নিরসন করা হয়েছে মানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যায়নি এবং এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই হয়েছে। চীন কোন আদালত ‘আইন’ দেখায় নাই;  বাড়তি ক্ষতিপূরণ দাবি, জোরাজুরি বা চাপ দিচ্ছে এমন অভিযোগ কোথাও – এমনকি আমেরিকান প্রপাগান্ডার ভেতরেও নেই।

যদিও একথা সত্যি যে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চীনা প্রকল্প নেয়ার সময় এশিয়ার সরকারগুলোকে প্রকল্প থেকে বেনামে কমিশন দেয়া হয়েছে। আর একালের বিশ্বব্যাংকের নেয়া প্রকল্পের সাথে তুলনা করলে বলা যায়, এ ব্যাপারে চীনা প্রকল্প কম স্বচ্ছ এবং এ’পর্যন্ত দাঁড়ানো বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা যেন ওর লক্ষ্যই নয়।

যা হোক, মাহাথিরের ক্ষেত্রেও এবার তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তিন মাসের মধ্যে (আগস্ট ২০১৮) চীন সফরে প্রকল্প নিয়ে তার আপত্তি একইভাবে চীন আমলে নিয়েছিল। সফর থেকে ফিরে তিনি বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্পের খরচ বেশি, যা আমাদের বইবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই, তাই এখনকার মতো এটা বাতিল করতে হচ্ছে।’  [‘We just can’t pay’: Mahathir ] তবে ‘চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক অটুট থাকবে, কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলা ছাড়াই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’ [Malaysia has seen a change of government, its foreign policy concerning China remains the same.”]।

পরে এ বছর জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা এই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে মালয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বরাতে রয়টার্স জানাচ্ছে, অর্থমন্ত্রীও একই কারণ জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রকল্প বাতিলের জন্য ক্ষতিপূরণ কত দিতে হবে এ নিয়েও ঠিকাদারের সাথে কথা চলছে বলে জানিয়েছিলেন।

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল ভারতসহ আমেরিকান প্রপাগান্ডিস্টরা। চীনা প্রকল্প নিয়ে কতগুলো দেশ পরে সরকার বদলের সাথে প্রকল্প বাতিল বা সংশোধিত চুক্তি করেছে, এই উদাহরণের তালিকায় মালয়েশিয়াকে যুক্ত করে আরেকটা দেশ হিসেবে দেখিয়ে কথিত চীনা ‘ঋণের ফাঁদের’ কথিত ভয়াবহতা তুলে ধরতে শুরু করেছিল তারা। এর পর থেকে প্রপাগান্ডা জোরে শোরে চলছিল চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এক আমেরিকার ভদ্রলোক লিখেছিলেন, “the debt-trap argument gained further credence after Malaysian Prime Minister Mahathir Mohamed cancelled $23 billion in BRI projects and warned China against falling prey to ‘a new version of colonialism,’” according to Haenle.

কিন্তু গত ১২ এপ্রিল এই প্রসঙ্গে হংকংয়ের এক মিডিয়া  “সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট” সব উলটে যাবার খবর দিয়ে লিখছে , ১২ এপ্রিল মালয়েশিয়া জানিয়েছে যে, বাতিল হয়ে যাওয়া রেল প্রজেক্ট নিয়ে তারা আবার এক নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরো লিখছে, গত কয়েক মাসে কিছু ভুল কথা আর মাহাথিরের দুই ধরনের বক্তব্যের পরে এই চুক্তি আবার স্বাক্ষর হলো” [after months of false starts and contradictory statements from Prime Minister Mahathir Mohamad’s government on the future of the multibillion-dollar project”.।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে এবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হলো প্রপাগান্ডিস্টদের। কিন্তু কেন এমন ঘটল? কেন বাতিল চীনা রেল প্রকল্প মালয়েশিয়ায় আবার ‘জিন্দা’ হলো?

গরিবের অনাদরে পড়ে থাকা খাদ্য পামবীজ বা তা থেকে পিষে তৈরি করা পামঅয়েলকে মাহাথিরের মালয়েশিয়া দুনিয়াজুড়ে ভোজ্যতেলের প্রধান উৎস হিসেবে হাজির করেছিল। গুরুত্বপুর্ণ হল, তা আমেরিকান সয়াবিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এর ছাঁকনি টেকনোলজিসহ তেল বের করার পুরা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক টেকনিক্যাল অগ্রগতি হলে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসহ ওই অঞ্চলই ভোজ্যতেলের প্রধান সরবরাহকারী এলাকা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও সয়াবিন নামে যা বিক্রি হয় এর বেশির ভাগই আসলে রিফাইনড পামঅয়েল। এগুলো আমরা কমবেশি সবাই জানি। আমেরিকার সয়াবিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব সময় আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিত থাকতে হয় মালয়েশিয়াসহ উৎপাদক দেশগুলোকে। এভাবে ইউরোপের বাজারেও একটা বড় মার্কেটশেয়ার তৈরি করে ফেলেছিল মালয়েশিয়া; কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চলা কানাঘুষা এবার বোঝা গেল সত্যি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ‘পামঅয়েল চাষাবাদের কারণে ব্যাপকভাবে বনজঙ্গল ধ্বংস ঠেকাতে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পামঅয়েল ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেবে”[This month, the European Commission concluded that palm oil cultivation results in excessive deforestation and its use in transport fuel should be phased out by 2030.]।

খবরটা শুনে মাহাথির স্বভাবতই খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি এটাকে ইইউ’র বিবাদ-সঙ্ঘাত লাগিয়ে চলার মনোভাব হিসেবে দেখে বলেন, আমরা পামঅয়েল বিপ্লব ঘটানোতে যেখানে ‘এটা এখন চকোলেট থেকে লিপস্টিকসহ প্রসাধনী ও সাবানের প্রধান কাঁচামাল হয়ে গেছে- তখন ইইউ নিজের পণ্য, রাইসরিষার তেলের বাজার সংরক্ষণের জন্য এই দুশমনি’ শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ এমন ভালো জিনিস নয় যে, আমরা তা প্রমোট করতে চাই। কিন্তু তা বলে বড়লোকের দেশের গরিব দেশের মানুষকে আরো গরিবি হালে ফেলার চেষ্টা- এটা মারাত্মক অবিচার” [Mahathir, 93, said the EU’s increasingly hostile attitude towards palm oil, a commodity used in everything from chocolate spread to lipstick, was an attempt to protect alternatives that Europe produced itself, like rape seed oil.]।
এই মারাত্মক অবিচারের প্রশ্ন তুলতে পারা- এটাই মাহাথির যে আসল নেতা- এর পরিচয়। তিনি ইইউ’র বাজার দখল করার দিকটাকে সামনে আনলেন।

গত জানুয়ারি মাসে রেল লিঙ্ক প্রকল্প বাতিল করার পর থেকে নানা প্রসঙ্গে মাহাথির চীনের নেতৃত্ব নিয়ে নিজে অনেক ক্রিটিকাল হয়ে ভালমন্দের বিচার করেছেন। তবে ইতিবাচকভাবে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে আমেরিকার নেতৃত্বে কথিত “ঋণের ফাঁদের” কথা তোলা অথবা চীন নিজের হুয়াওয়ে ফাইভ-জি মোবাইল টেকনোলজি দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে ইত্যাদি প্রপাগান্ডা প্রসঙ্গে একপর্যায়ে তিনি পাশ্চাত্যবিরোধী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি সরাসরি স্পষ্ট করে বলে বসেন, ‘ধূর্ত আমেরিকানদের মোকাবেলা করতে ধনী চীনাদের পক্ষ নেবো” [I’d side with rich China over fickle US: Malaysia’s Mahathir Mohamad”]। শুধু তাই নয়, চীন প্রসঙ্গে তার অবস্থান আরো স্পষ্ট করতে তিনি বলেছেন, ‘উদীয়মান শক্তি চীন থেকে ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়ার চেয়ে ওদের সাথে কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলার একটা ভালো উপায় বের করতে হবে আমাকে” […to find ways of working with the rising power rather than to let fears…]। আবার বলছেন, ‘আমরা যখন থেকে চীনের সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছিলাম সে সময়ের গরিব চীনের দিকে আমরা ভীত চোখে তাকাতাম। আজ চীন বড়লোক, এখনো আমরা ভীত। এটা চলবে না। আমার মনে হয়, চীনের সাথে সম্পর্ক পাতানোর একটা ভালো উপায় আমাদের বের করতে হবে” [I think we have to find some way to deal with China.]।

মাহাথিরের সে উপায় হল, চীনের সাথে বাজার শরিক করার সম্পর্ক ও বুঝাবুঝি তৈরি করা। এই ফর্মুলায় সহজেই তিনি বিভিন্ন চুক্তিতে উপনীত হয়ে গেলেন। তাতে এখন থেকে আমেরিকান সয়াবিন নয়, বরং চীন হবে মালয়েশিয়ান পামঅয়েলের একচেটিয়া ভোক্তা। সেই খুশিতে মাহাথির এবার সেই পরিত্যক্ত চীনা রেল লিঙ্ক প্রকল্প- এতে বিভিন্ন জায়গায় সংশোধনী এনে হলেও আবার চীনের সাথেই এ নিয়ে চুক্তি করে ফেলেছেন। [Malaysia to ‘take advantage’ of ECRL deal to sell China more palm oil: Mahathir Mohamad]। তিনি চীনাদেরকে ভাল ব্যবসায়ী বলে প্রশংসা করে এক লম্বা ইন্টারভিউ দিয়েছেন এখানে, Chinese by nature are very good businesspeople’: Malaysian Prime Minister ।

শুধু তাই নয়, গত ২৫ এপ্রিল চীনে দ্বিতীয় বেল্ট-রোড সামিট মানে, বেল্ট-রোড ফোরামের সম্মেলন শুরু হয়েছে। আড়ম্বরের সাথে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তিন-চারজন অতিথি-বক্তার একজনও তিনি।

হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা “ঋণফাঁদের” অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মাহাথিরের পক্ষ পত্রিকা খোদ এডিটোরিয়াল লিখেছে। Editorial by SCMP Editorial।

কারও প্রপাগান্ডায় ভয় পাওয়া কোনো কাজের কথা নয়; বরং নিজ বুদ্ধিতে চীনের সাথে চলার উপায় বের করে আগানো শিখতে চাইলে মাহাথির আমাদের সামনে শিক্ষণীয় হয়ে থাকলেন। আমরা কী এই শিক্ষা চর্চার জন্য যোগ্য হতে পারব না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৭ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলার মাহাথির-পথ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]