আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

গৌতম দাস

 ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Lb

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ভারত সফর ছিল চলতি অক্টোবর মাসের ৩ থেকে ৬ তারিখ। প্রধানমন্ত্রী তিন তারিখ সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলেন। সেই দিনই মানে ভোরে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র নেতা শাহরিয়ার কবিরের একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। ওর শিরোনাম ছিল “Hasina ascent marked Hindu turnaround: Kabir”। মানে “হাসিনার ক্ষমতারোহণ হিন্দুদের ঘুরে দাঁড়ানোর চিহ্ন হয়ে উঠেছেঃ কবির”।

ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ কলকাতার আনন্দবাজার গ্রুপের পত্রিকা। তবে এর টার্গেট পাঠক আনন্দবাজারের মত ঠিক ‘অস্বস্তিকর দেশপ্রেমী’ বা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা নন। টেলিগ্রাফ রিপোর্টিংয়ের চেয়ে কলাম দিয়ে পাঠক আকর্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে চলে। সম্ভবত এই পত্রিকা এমন কলামের পাঠকের ওপর ভর করে টিকে যেতে পারে বলে তাদের অনুমান। এই সুবাদে একালের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কিছু কলামিস্টদের ভালো কিছু লেখা আমাদের পড়ার সুযোগ ঘটে যায় অবশ্য। এই বিচারে টেলিগ্রাফ একেবারেই মান খারাপ কোন পত্রিকা না হলেও শাহরিয়ার কবিরের কথিত এই সাক্ষাতকারটা বেশ বেমানান তো বটেই। তবে বুঝাই যায় এটা অর্ডারি বা খেপ মারা মাল। ভদ্র ভাষায় যাকে অনেকে পেজ-বিক্রি করা পাওয়া বা ছাপা লেখা বলে থাকে। মানে, এধরণের পাতায় কী ছাপা হয়েছে এর দায়দায়িত্ব সম্পাদকের নাই বলে মনে করা হয়।

একেবারেই সাজানো আর কথিত এক অধ্যাপককে দিয়ে করানো এই সাক্ষাতকারে যেখানে শেষে শাহরিয়ারের নিজ বীরত্বের প্রশংসাটা বাদ দিলে পাঁচটার মত প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু উনি কোথাকার অধ্যাপক, কী বিষয়ের বা আদৌও কোন অধ্যাপক কিনা এমন কোন পরিচয়-ধারণা দেওয়া নাই সেখানে। তাঁর প্রশ্ন শুনে এক গদ্গদ ঘন আবেগী ধরণের কলকাতার এক আম হিন্দু নাগরিক – এর চেয়ে বেশি, যিনি স্থিরভাবে কিছু চিন্তাও করতে পারেন, এমন মনে হয় নাই। বলা বাহুল্য ওখানে প্রশ্নগুলো ফরমায়েশি। যার উদ্দেশ্য হল একটা প্রচারণা চালানো – এই বলে যে বর্তমান আমলে হিন্দুরা বাংলাদেশে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে – এই কথার পক্ষে ঢাক পিটানো। ভারতের কাছে এই ঢাক পিটিয়ে বাংলাদেশের কোন শাসককে সার্টিফিকেট নিতে হবে কেন, এর কোন সদুত্তর এখানে নাই। তবুও এর উদ্দেশ্যটা আরও বুঝতে হলে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছে তোলা তার অভিযোগগুলোর নাটকটা মনে করে দেখতে পারি। সেখানে হাজির করা প্রিয়া সাহার বক্তব্যেরই পালটা কিছু ঠিক কাটান কথা নয় শ্রেফ দাবিই শাহরিয়ার এখানে জানিয়েছেন।

যেমন, সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার দাবি করেছেন, ২০০৯ সালের পর (সুনির্দিষ্ট করেন নাই) তিন লাখ হিন্দু নাগরিক নাকি বাংলাদেশ থেকে ভারতে দেশান্তরী হয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসন এত ভালো ছিল যে, ওর মধ্যে আড়াই লাখ হিন্দুই আবার ভারত থেকে ফিরে বাংলাদেশে চলে এসেছেন”। [……out of 3 lakh Hindus who had crossed the boundary, two-and-a-half lakh returned to Bangladesh] . মানে হাসিনার আমলেও হিন্দু দেশান্তর আগের মতই ঘটে – তিনি স্বীকার করছেন। তবু হাসিনা বীর এজন্য যে তাঁর আমলে এই তিন লাখের আড়াই লাখই আবার ফিরে আসে, তাই। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দাবি তা অবশ্য জানা যায় না। সেখানে কোনো রেফারেন্স দেয়া নাই। আবার ধরে নেয়া হয়েছে যে তিন না হলেও আড়াই লাখ লোকের এমন যাওয়া আসা কোন ব্যাপারনা। শুধু তাই না। তাদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘর সম্পত্তি তারা আবার ঠিকটাক ফিরেও পেয়েছে। দাবির এই অংশটাই বেশ ইন্টারেস্টিং।  এ ছাড়া আরো দাবি করা হয়েছে, হিন্দুদের জন্য এখন জব মার্কেট খুলে রাখা আছে […job market was thrown open for the Hindus,]। এটা পড়ে কারও মনে সন্দেহ হলেও কিছুই করার নাই যে আগে কি তাহলে এই ‘জব মার্কেট’ বন্ধ ছিল! এছাড়া আরও দাবি আছে। বলছেন, গত নির্বাচনে (২০১৮) ‘তারা’ ব্যবস্থা করাতে, ব্যবস্থা নেয়াতে ও পাহারা দেয়াতে মোট ৬১ কনস্টিটুয়েন্সিতে হিন্দুরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছিলেন। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করাই বোধহয় সঠিক। কারণ এবার কেউ ভোট দিতে পেরেছিল কি না সে অভিজ্ঞতা, সেটা সবারই জানা আছে। সারকথায় শাহরিয়ার তার কোন বক্তব্যের স্বপক্ষেই কোন পয়েন্টে কোনও প্রমাণ সাথে দাখিল করেননি। বলা যায় কেবল কিছু স্টেটমেন্ট রেখেছেন।

বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতিতে’ বড় বাঁক বদল
বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতি’ বিশেষত গত তিন বছর ধরে চলা রাজনীতি খুবই বিপজ্জনক স্কেলে ও ডিরেকশনে আগাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এটা ভারতে মোদীর উত্থান এবং তাতে আরএসএসের ততপরতা ও সুবিধা বিতরণ ও উস্কানির মিলিত প্রভাব বা আফটার এফেক্ট। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির শুরু হিন্দু কমিউনিস্ট নেতাদের হাতে, সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্মের পরে। এটা কোন রাস্তায় যাবে, কিভাবে ফুলে-ফলে বাড়বে সেটিও তাদের হাতেই সূচিত। এভাবে এর কৌশল ও বয়ানগুলোও নির্ধারিত হয়েছিল। এই বাস্তবতা মানলে বলা যায় বাংলাদেশের সেই হিন্দু রাজনীতি একালে এসে এখন আরএসএসের দিকে মোড় নিয়েছে – এটা অকল্পনীয় এবং এটা আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরএসএস যারা এখন সমর্থন করে এদের কাছে অতীত হিন্দু-বুঝের সেকুলারিজম এখন কেমন লাগে? তারা কি এখন আরএসএস করেও সেকুলারিজম অপ্রয়োজনীয় বলে বুঝে তাই বাদ দিয়েছেন? এটা পরিষ্কার করে জানা যায় না। এ ব্যাপারে হ্যাঁ ও না, দু’টি জবাবই পাওয়া যায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদ কিভাবে গ্রহণীয় হয়ে যেতে পারে, প্রগতিবাদী থেকে হিন্দুত্ববাদে ঝাপিয়ে পড়া এই জার্নি – সেটা দেখতে পাওয়াই আসলে এক বিরাট বিস্ময়। যার অপর বা ৯০ শতাংশ পড়শি নাগরিক হল মুসলমান সে কী ভবিষ্যত বুঝে এই রাজনীতি বেছে নেয় সেটা এক বিষ্ময় বললেও কমই বলা হয়, সেটা বুঝা সত্যিই মুশকিল! এঁদের স্বপ্ন কী এক হিন্দুত্বের বাংলাদেশ? এ’ কেমন স্বপ্ন!  এছাড়া ওদিকে বাংলাদেশের হিন্দুদের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বেছে নেওয়া মানে আসলে নিজের জন্য রাজনীতি না করে বরং ভারতের জন্য রাজনীতি করা। বাংলাদেশে যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনায় তারা ছিল সেখান থেকে নগদ কিছু লাভের আশায় ভাড়া খাটাই, তবে আরও বড় গহবরে ঢুকে যাওয়া।  অবশ্য সেকালে মস্কোর বৃষ্টির ছাতা বাংলাদেশে তুলে ধরা গেলে এরা আর এখন দোষ করেছে কী? সে সাফাইওও দেয়া যায়। মানুষ তো এমন করেই থাকে, নানান কারণে। যাই হোক, এসব প্রশ্ন আগামীতে নিজেই নিজের জবাব হয়ে উঠে আসবে হয়ত। তবে মনে রাখতে হবে খোদ ভারতেরই ভবিষ্যৎ হিন্দুত্ববাদের ভেতরে নিহিত হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখনো পুরাটাই অমীমাংসিত।

আবার এই প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে, ইউরোপে হিটলারিজম ফিরে আসতে পারে কী, এমন ধরনের। ইউরোপে হিটলারের নাম না নিয়ে হলেও “হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট” বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী নামের ধারার সমর্থক বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একথা সত্য। তবে এখনো তা বিচ্ছিন্নভাবে ও বিভিন্ন পকেটে। আর ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পই সম্ভবত আমেরিকার শেষ ও ছোট হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে থেকে যাবেন। তাতে ওদিকে স্টিভ বেননেরা [STEVE BANON] আবার সুপ্রিমিস্ট চিন্তাকে জাগাতে মটিভেশনাল ক্লাস নেয়া শুরু করেছেন ইতালিতে। সেটাও সত্য।

এদিকে বাংলাদেশে, যারা নিজেদের সুর্যসেন, প্রীতিলতাদের উত্তরসূরি বলে দাবি করেন, দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকে আজকাল মোদী-আরএসএসের দিকে ছুটছেন। এখানে স্পষ্ট কথাটা হল, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়া, এই প্রশ্নে প্রথমবার ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতে যাওয়া আর তা করতে গিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া পর্যন্ত যারা গিয়েছিলেন – তাদের এটা ছিল এক হিন্দুইজমের রাজনীতিতে ঝাপায় পড়া। এক হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি, যা বাস্তবত জমিদার স্বার্থের রাজনীতি। পূর্ববঙ্গের কৃষি উদ্বৃত্ত যা ততদিনে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে, যা কলকাতায় জমা হচ্ছিল – এর বদলে সেসময় বাংলা ভাগ হয়ে পুর্ববঙ্গ আলাদা হওয়াতে এবার কৃষি উদ্বৃত্ত ঢাকায় জমা হবে – এটা জমিদার স্বার্থের প্রাণকেন্দ্র ‘কলকাতা’ মেনে নিতে চায়নি। এটাই স্বার্থবিরোধের মূল। অথচ এটা তো সাধারণভাবে জমিদারি উচ্ছেদের মত কোন কিছু ছিল না, তাই তাদের গায়ে কোনো আঁচড় লাগার কথাও নয়। তবু এটুকু পরিবর্তনও তারা সহ্য করতে পারেননি। কারণ পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে তাতে পুর্ববঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না বলে তারা কর্তৃত্ব হারাতে হত, একথা ঠিক। এই স্বার্থ হারানো এটা তারা মেনে নিতে চায়নি মূল কারণ এটা আর তা থেকে জমিদারদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান।

কাজেই অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর ওপর অহেতুক বিপ্লবীপনা আরোপ করে কমিউনিস্টদের এদেরকে মহান করে দেখানোর কিছু নাই।  এটা বাংলার বা অন্ততপক্ষে পুর্ববঙ্গের সবার স্বার্থের রাজনীতি ছিল না তা তারা করেও নাই। তাদের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা মানে, জমিদারের স্বার্থে পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধিতা। এটাই তারা করেছিলেন। এটাকে স্বদেশী আন্দোলন বলে াপনি এতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন কি না, সেটা নির্ভর করে আপনার রাজনীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্ভর কি না। এই হল প্রীতিলতা-প্রীতি যাদের আছে তাদের রাজনীতি। কাজেই প্রীতিলতাদের উত্তরসুরিদের এখন মোদী-আরএসএস এর দিকে যাওয়া এটা তো তাদের ন্যাচারাল  গন্তব্য, নয় কী? কাজেই সুর্যসেনদের অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর রাজনীতি একটা হিন্দুইজমের রাজনীতি, সেকালের জমিদারদের স্বার্থের রাজনীতি। এর মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজা রঙের আড়াল চড়িয়ে দেয়া অথবা একে কোন অর্থেই প্রগতিশীল বলে দাবি করার কোন সুযোগ নাই।

এবার একালে আসি। আওয়ামি লীগের বোকা হয়ে যাওয়া, মানে না-বুঝে ভুল রাজনীতি করে ফেলার সময়টা হল যখন আওয়ামী লীগে নিজেই আরএসএসের রাজনীতির শাখা হিসাবে বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট’ দল খুলতে দিয়েছিল অথবা নিজেই খুলে বসেছিল। আমরা আরএসএসের আইকন বিনায়ক দামোদর সাভারকারের “কালো টুপিটা” দেখেও চিনতে পারিনি, কারা আরএসএস আর কারা নয়। অথচ মাথায় এই টুপিটা রাখা, এটা আরএসএস প্রধান মোহন ভগত থেকে শুরু করে হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক, এভাবে আরএসএসের সবার চিহ্ন। এই দল ব্যানারে নিজেদের নাম হিন্দিতে কেন লেখে, সে প্রশ্নও আমরা করিনি।  ব্যাপারটা হল, বাঙালি হিন্দু যদি আবার হিন্দির প্রয়োজন বা প্রীতি বোধ করে তা-ও আবার বাংলাদেশে বসে, বুঝতে হবে এটাই রাজনৈতিক ‘হিন্দুত্ব’- হিটলারি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা- এখানে তা ছেয়ে বসেছে। আমরা আসলে সম্ভবত অবুঝ গর্দভ হয়েছি, অথচ ভাব ধরেছি যে এটা উদারতা উদার। আমাদের উদারতার ঠেলায় আমাদেরই কাপড় খুলে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের হুশ নাই। অন্ততপক্ষে হাত ছেড়ে দিতে ত পারতাম!

বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কবে খোলা হয়েছিল এ নিয়ে অনেক মত আছে। কেউ কেউ ২০১৩ সালও বলে থাকে। তবে আওয়ামী লীগ এদের বিরুদ্ধে কিছু ছোট অ্যাকশনে গিয়েছিল সম্ভবত ২০১৬ সালে। কিন্তু যে বুঝ বা অজুহাতে তা করেছিল তাতেই বোঝা যায় এটাই লীগের ভুল রাজনীতি। লীগ ভেবেছিল এমন ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কায়েম হলে সেটা নাকি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক কাটবে। কেবল এতটুকুই নাকি আওয়ামী লীগ ক্ষতি, দেশের ক্ষতি! চিন্তার ক্ষেত্রে এমনই দীনতায় আক্রান্ত আওয়ামী লীগ! মানে, দলটি চিনতেই পারেনি বাংলাদেশের আরএসএস তার সামনে হাজির। তাই শুধু ভোটের চিন্তাতেই নিজেকে অস্থির রেখেছিল। আবার অন্যদিকটা যদি  দেখি? আচ্ছা ব্যাপারটা যেন এমন বাংলাদেশে কী ভোট হয় এখন? যেন, বাংলাদেশের মানুষের ভোটই আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় আনছে! তাই কি?  নিজের সাথে এ’কেমন প্রতারণা!

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএসের নেতা, হিন্দু মহাজোটেরও নেতা এখন গোবিন্দ প্রামাণিক। তার সাথে চট্টগ্রামের অ্যাডভোকেট আরেক হিন্দু নেতা রানা দাসগুপ্তের ব্যক্তিবিরোধের কথা জানা যায়। তাই তারা একই দল হিন্দু মহাজোট করতে পারেন না বলে শুনা যায়। তবু দেখা যায় প্রিয়া সাহা এদের দু’জনেরই লোক, প্রিয়া এদের দুজনের সাথেই সংশ্লিষ্ট।  সেকারণের রানা দাসগুপ্তও দেখিয়েছে যে মোদী পর্যন্ত একসেস তাঁরও আছে আর তা কম না, তবে প্রামাণিকের হাত ধরে তিনি সেখানে যান না।

এই বিচারে শাহরিয়ারের বক্তব্য এই প্রথম প্রিয়া সাহা, প্রামাণিক অথবা সংশ্লিষ্ট হিন্দু নেতা এমন যেকারও অবস্থানের বিরোধিতা করে হাজির করা বক্তব্য ও অবস্থান। তাহলে, শাহরিয়ার কি বুঝাতে চাচ্ছেন এটাই সরকারের নতুন অবস্থান ও লাইন? আওয়ামি লীগ তোবা করতেছে? এমনটা কেউ মনে করতে পারে অথবা করুক – এটাই সম্ভবত শাহরিয়ারের বক্তব্যের উদ্দেশ্য। তবে সেক্ষেত্রে এটা বিয়ের আসর ভেঙ্গে যাওয়ার পর বাজনাদারের বাজাতে আসার মত। প্রামাণিকের মত এসব করিতকর্মা ব্যক্তিত্বরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আরএসএসের রাজনীতি এনে দল খুলে বসেছে শুধু তাই না। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাতের পুতুল হয়েছে। উঠতে বসতে আসামের পত্রিকায় বিবৃতির হুঙ্কার দিচ্ছে। বারবার বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিবৃতি ঠুকতেছে, আমরা দেখছি।  আসামের এনআরসিতে বাদ পড়া উনিশ লাখ  লোক নাকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বলে ফতোয়া দিচ্ছে। আর জোর দাবি জানাচ্ছে বাংলাদেশকে এদের ফেরত ও দায়িত্ব নিতে হবে। এই দাবি এখন পর্যন্ত অমিত শাহ অথবা প্রামাণিকের বড় হুজুর, নেতা খোদ মোহন ভগতও বলতে পারেন নাই। মোদীর সরকারও যেখানে নিজের সরকারি ভাষ্য ও অবস্থান হিসাবে এখনও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছেন যে এনআরসি ভারতের নিজের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ইস্যু। সেখানে গোবিন্দ প্রামাণিক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কোলে বসে তাদের পুতুল হয়েছে আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন, হুঙ্কার দিচ্ছেন। তিনি কোনদিকে এখান থেকেই পরিস্কার।

একটা কথা আছে, মুখে মাটি যাওয়া বা মাটি খেয়ে ফেলা। আওয়ামী লীগের অবস্থাটা হয়েছে তেমন। এটা লীগকে আরো বড় নির্বুদ্ধিতায় ফেলেছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনের বছরের শুরুতে। ভারতের আরএসএস বাংলাদেশে নির্বাচনে পঞ্চাশটা আসন হিন্দু প্রার্থীদের পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি খেলেছিল। আর এই ফাঁদে পড়েছিল লীগ-বিএনপি দু’দলই। এদের চিন্তাশক্তি ও খুবই উর্বর চিন্তা করার ক্ষমতা, যার প্রশংসা না করে আমাদের উপায় নাই। বিগত নির্বাচনে আরএসএস ভারতের সমর্থন এনে দিবে – এই মুলা ঝুলিয়ে দু’দলকেই বিভ্রান্ত করেছিল আরএসএস। আর অবাক বিষ্ময়ে আমরা দেখেছিলাম দু-দলই বিভ্রান্ত হয়েছিল! বলা হয়ে থাকে, এ কাজে আওয়ামী লীগের সমর্থনে পীষুষ বন্দোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ নামে সংগঠন খুলে দেয়া হয়েছিল। ভারতীয় সাংবাদিক চন্দন নন্দীর ভাষ্যমতে, বিএনপির ভিতরের ভারত লবির একটি গ্রুপও আরএসএস সমর্থিত দল বা প্রার্থীকে বিএনপির মনোনয়ন দানের কথা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আরএসএসকে ঘোরতরভাবে এখানকার রাজনীতিতে ডেকে আনা তখন থেকে। অথচ ক্ষমতাসীনদের উচিত ছিল আরএসএসের সাথে কোনো রফায় বা কোনো সুযোগ করে দিতে না যাওয়া। তাতে বিএনপি পালটা যদি হিন্দু মনোনয়ন দিয়ে আরএসএসের কোলে গিয়ে উঠত, সেটা মোকাবেলার অনেক অনেক বিকল্প ও সহজ রাস্তা ছিল। সোজা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারলে তারাই শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসেও নড়ে’। তাই কিছু দিনের মধ্যে প্রিয়া সাহারা উন্মোচিত হয়ে যায়, ট্রাম্পের কাছে নালিশকাণ্ড থেকেই তাদের রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বাস্তবতা হল, শাহরিয়ার কথিত ওমন ৬১ টা কনষ্টিটুয়েন্সি যেখানে মেজর কনসেন্ট্রেশন ভোটার হিন্দুরা – এটা বাংলাদেশে বাস্তবত কোথাও নাই। আমাদের কোন কনষ্টিটুয়েন্সি আপনা থেকেই ওমন কোন ধর্মীয় ভাগে বিভক্ত নয়, বরং ভৌগলিকভাবে মানে ইউনিয়ন বা উপজেলা হিসাবে একেকটা  কনষ্টিটুয়েন্সিতে পড়েছে, এভাবে বিভক্ত। আল্লাহ বাঁচাইছে, চাইলেও আমাদের কোন ধর্মীয় ভাগের কনষ্টিটুয়েন্সি নাই। কিন্তু এই সুযোগে আমরা দেখে ফেলেছি, আমাদের দলগুলোই মোদীর সরকারও না খোদ হিন্দুত্ববাদের কেন্দ্র আরএসএসকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোই বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা বানিয়ে দিতে, মেনে নিতে কীভাবে একপায়ে রাজি এবং বেপরোয়া!

এই অবস্থায় এই কথিত সাক্ষাৎকারের শাহরিয়ার এক সবচেয়ে বড় ভান করেছেন। ওখানে এক প্রশ্ন করানো হয়েছিল, সেটা মূল ইংরাজিটা ছিল এরকম……
Q. The journal South Asia has said that the RSS is working actively in Bangladesh. It has targeted the Hindu minority and is trying to forge a strong Hindu power bloc and a Hindu political party which could act as a power-broker.
প্রশ্নের মূল ভাবটা বাংলায় লিখলে তা হবে এমন যে, – বাংলাদেশে আরএসএস সক্রিয়ভাবে বাড়ছে। তারা স্থানীয় হিন্দুদের সাথে মিলে একটা শক্তিশালী “হিন্দু পাওয়ার ব্লক” নাকি বানিয়েছে?
জবাবে শাহরিয়ার কবির খুব শান্তভাবে বলেন যে, “তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য নেই”। তবে বাংলাদেশে আরএসএস এর রাজনৈতিক উপস্থিতি বা হিন্দু মহাজোট দল বা এদের সহযোগী দল গঠন ইত্যাদিকে সাহায্য করে এবার এসব কিছুকে অস্বীকার করলে আওয়ামি লীগ নিজের বোকামি ঢেকে রাখতে পারবে না। তবে এরপর শাহরিয়ার বাংলাদেশের হিন্দুদের “হিন্দু মৌলবাদী’ দল” না করতে পরামর্শ প্রদান করেছেন। বলেছেন, ” I would strongly advise the Hindu community not to form any fundamentalist outfit”।

তাহলে এবার তামাশাটা দেখেন, শাহরিয়ার আরএসএসকে সেকুলারিজমের মহিমা বুঝাইতে চেয়ে যেন বলছেন, I would like to state candidly that … we speak of a secular, welfare state………। অথবা আবার আরএসএসকে আশ্বস্ত করতে বুঝাইতেছেন যে শাহরিয়াররা বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের আকড় কনষ্টিটিউশনে, সেকুলার কনষ্টিটিউশনে [we are determined to go back to the 1972 Constitution ] নিয়ে যাবেনই। অর্থাৎ তামশাটা লক্ষ্য করেন, শাহরিয়ার এতই বুদ্ধিমান যে আরএসএসের কাছে সেকুলারিজম উপহার নিয়ে গেছেন!

একদিকে তিনারা আরএসএসে কাছে পঞ্চাশ হিন্দু প্রার্থী্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভেবেছিলেন সেই আশীর্বাদে বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকবেন। আবার এখন তারাই আবার আরএসএসের কাছে “সেকুলারিজম” উপহার নিয়ে যাচ্ছেন!

ব্যাপারটা হল, সারা ভারত যেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদের জ্বরে ছেয়ে গেছে, জয় শ্রীরাম না বলাতে মুসলমান পিটিয়ে মেরে ফেলছে। আবার, মোদীর সরকারী অবস্থান হল ভারতে কোথাও কোন পাবলিক লিঞ্চিং (পিটিয়ে মেরে ফেলা) নাই, ঘটে নাই তবে কিছু গুজব আছে। আরএসএস প্রধান মোহন ভগত দাবি করেছেন, লিঞ্চিং শব্দটা যেন ব্যবহার না করা হয়। কারণ লিঞ্চিং নাকি একটা “বিদেশি” ও “খ্রীশ্চান” শব্দ আর এসবের আলোকের বাংলাদেশে আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হিন্দুরাও এতে তাদের আকাঙ্খা ও দাবি সাজিয়েছেন। সেইখানে শাহরিয়ারেরা এই আকাঙ্খাকে সেকুলারিজম দিয়ে ঠান্ডা করতে বা আটকানোতে সক্ষম হবেন, এর কোন কারণ নাই। বাংলাদেশে আরএসএসের প্ররোচনায় বাংলাদেশের নেতা হিন্দুদের সেই আকাঙ্খা এখন এক কল্পিত “হিন্দুত্ববাদের বাংলাদেশে” পৌছে গেছে। শাহরিয়ার ও তার বন্ধুরা একদিকে বাংলাদেশে আরএসএস ও তাদের হিন্দুত্ববাদকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা করবেন আবার তাদের সেকুলারিজম উপহার দিবেন? এটা কোন তামশা? তারা যে তামাশা করতেছেন সেইটা বুঝবার হুশও তারা হারায় ফেলছেন।
আবার দেশে আর একদল লোক ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যারা আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা, হিন্দু মহাজোট দল খুলে দেওয়া গোবিন্দ প্রমাণিক বা দাসগুপ্ত অথবা ইসকনের ততপরতা ও প্রসাদ খাওয়ানো নিয়ে কথা বললে এরা অভিযোগ করছেন যে এই কথা তোলা নাকি “সাম্প্রদায়িকতা” করা হচ্ছে। সমাজ দুনিয়াদারির খবর না রাখা এরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের সাম্প্রদায়িকতার “মহিমা” যে কত অফুরান তাই দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে?

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে? অথচ এককথায় বললে, এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনীতি হতে পারে না, এটা তাদের স্বার্থে যাবে না। কারণ, অন্যদেশের স্বার্থে বাংলাদেশে তৎপর এক কোটারি হিন্দুগোষ্ঠীর ততপরতা এটা।

সুতরাং, ঐ সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের জন্য কাউন্টার প্রডাকটিভ হবে, হতে বাধ্য। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএসের প্রভাব বাড়াতেই, ওর কবলে চলে যেতেই এটা ব্যবহৃত হবে। কেন?
বাংলাদেশের কোন ধর্মীয় বা সামাজিক গ্রুপের বিশেষ অভিযোগের প্রেক্ষিত  বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহির সম্পর্ক পাতাতে পারে না। তাতে সেটা স্বেচ্ছায় অথবা ক্ষমতায় থাকার ভারতের সমর্থনের লোভ যা কিছুই হোক।
বাংলাদেশের সরকারের এক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতাসীনদের আশ্বস্ত করার কিছুই নেই। এটা তেমন বিষয় হতেই পারে না।

জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের সভায়ও আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই জবাবদিহিতা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন নয়। কারণ আমরাই স্বেচ্ছায় জাতিসংঘ ও ঐ কাউন্সিলের সদস্য হয়েছি। ওর নিয়মকানুনে আমরা নিজেই সম্মতি দিয়েছি। নিজের সংসদে তা রেটিফিকেশন করেছি। ঐ মানবাধিকার আমরা নিজ নাগরিকের বেলায় রক্ষা করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এথেকেই এটা আমাদের উপর প্রযোজ্য হতে পেরেছে।
কাজেই অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে আমাদের জবাবহিহিতার কোন সম্পর্ক হতে পারে না। ঠিক যেমন, ভারতে কোন মুসলমান নিপীড়ন হলে কী ভারত আমাদের কাছে জবাবদিহিতা করবে? সেটা কী আমাদের আশা করার ইস্যু হতে পারে?  আমরা কী ভারতের মুসলমান রক্ষাকর্তা সাজতে পারি?

খাড়া কথাটা হল,  বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকের অভিযোগে বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহিতা করতে যেতে পারে না। অথচ শাহরিয়ার কবির হাসিনা সরকারের হয়ে এমন তোষামোদি ও জবাবদিহিতার সম্পর্কই স্থাপনই যেন করতে গিয়েছেন। এটা আত্মঘাতি। এটা তিনি করতে পারেন না। ভারতের ক্ষমতাসীনদেরকে এখানে শাহরিয়ারের আশ্বস্ত করার কিছুই নাই। এটা শাহরিয়ারের বোকামি ও অনধিকার।

প্রিয়া সাহারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের “দুঃখ বেচে খাওয়ার লোক” হিসেবে তাদের চেয়ে শাহরিয়ারেরা কত নাদান ও অযোগ্য। কারণ তারা ভারতের আরএসএস এর ক্ষমতা ও এর শ্রীবৃদ্ধির স্বার্থে ততপর হয়ে চলতে জানে।  বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো যদি নাদান হতে চায়, যদি বাংলাদেশের দলগুলোকে ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে আরএসএস-কে যদি তারা ক্ষমতার উতস বা দাতা মনে করে এর অর্থ তাদেরকে আরএসএসের অধীনস্ত হয়েই রাজনীতিই করতে হবে। আরএসএসের রঙের রাজনীতিই করতে হবে।  এর বাইরে অন্য কিছু ঘটবে না। আর এরপর সেটা আর বাংলাদেশ থাকে, থাকবে না! এটা তাদের বুঝতে হবে। এমনকি সেটা আর বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশও থাকবে না!

যেমন বাংলাদেশের কোন হিন্দু নাগরিকের নালিশ করার জায়গা ভারত হতে পারে না, তেমনি তারা বাংলাদেশে আরএসএস বা হিন্দু মহাজোটকে ডেকে আনতে পারে না। তারা অথবা আমাদের কোন সরকার আরএসএস ও হিন্দু মহাজোটকে দোকান খুলতে দিতে পারে না। আবার আমরাও ভারতের কাছে জবাবদিহি করতে যেতে পারি না। তাহলে?

ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

এখন খাড়া কথাটা শুনেন ও মনে রাখেন।  ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৯ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আরএসএসের মন জয়ের চেষ্টা!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম’

 

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম

গৌতম দাস

০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2JS

https://www.kolkata24x7.com থেকে নেওয়া

[সার সংক্ষেপেঃ ছুপা হিন্দু জাতীয়তাবাদী গান্ধী-নেহেরুসহ ভারতের ইমেজ হল গান্ধীরা খুবই ভাল মানুষ। আর জিন্নাহ বেটা খুব খারাপ তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানিয়েছে, এতই খারাপ এরা। কিন্তু কঠিন সত্যি হল কংগ্রেস গান্ধী-নেহেরুসহ এরাই নিজেদের হিন্দুইজমের বাইরে কখনই যায় নাই। একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারতই কায়েম করতে কাজ করে গেছে তারা। আর এর সবচেয়ে বড় তাত্বিক নেতা হল গান্ধী। ফলে এদের হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হতে চাওয়াটাই নিরুপায় মুসলমানদেরকে ঠেলে দিয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান কায়েম করতে। কাজেই নিরুপায় হয়ে জিন্নাহ সঠিকভাবেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কায়েম করেছিলেন। বলা যায় মুসলিম লীগ মুসলিম জাতীয়তাবাদের দিকে কেন গিয়েছিল তা গান্ধী-নেহেরুসহ কংগ্রেসের হাতে নির্ধারিত হয়েছিল।
মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করা বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ কথিত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা যারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার দায় জিন্নাহ’র উপর এককভাবে চাপিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চায় তাদেরকে চ্যালেঞ্জ। এরা মনগড়া কথা বলে এই গল্প তৈরি করেছে। নিজেদের দায় আকাম জিন্নাহর উপর চাপিয়েছে।
এই লেখার একটা সারকথা এটা। তবে গান্ধী বনাম আরএসএসের তর্ক লড়াটাই কী ছিল তা জানার মাধ্যমে মূলত আপনাদেরকে চিনতে হবে গান্ধীর হিন্দুইজম-কে।]

 

আসেন ছুপা হিন্দুবাদীগণকে চিনে নেইঃ
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যাকে আমরা গান্ধী নামে চিনি। অনেকে তাকে আদর করে বা তেল দিয়ে তোয়াজ করতে বাপু বা মহাত্মা নামেও ডাকে। গান্ধী, জিন্নাহ, প্যাটেল- এরা সবাই মোদীর মতই গুজরাতি। যদিও সেকালের গুজরাট বলতে এটা বোম্বাই মানে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল। মাত্র গত ১৯৬০ সালে গুজরাত প্রথম বোম্বাই (মহারাষ্ট্র) থেকে রাজ্য হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। গত দুই অক্টোবর ছিল সেই গুজরা্তি গান্ধীর জন্মবার্ষিকী; তাও আবার ১৫০তম। সম্ভবত সে কারণে তাকে নিয়ে স্তুতিমূলক-মূল্যায়নের ছড়াছড়ি একটু বেশি দেখা গিয়েছিল এবার, এটা বলতে পারলে সহজ হত হয়ত। কিন্তু সমস্যা জটিল করে তুলতে সক্ষম হয়েছে, বিজেপি এবং আরএসএস এ দুই প্রতিষ্ঠানই। তাই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ‘১৫০তম’ জন্মবার্ষিকীই এবারের হইচইয়ের আসল কারণ কি না।

এক কথায় বললে, ভারতের জন্মের সময় থেকে কংগ্রেসের তৈরি সব না হলেও অনেক আইকন অথবা বয়ান এত দিন ধরে আরএসএস-বিজেপি এই গোষ্ঠী, এরা ভাগ বসিয়ে হয় নিজেদের আইকন করে নিয়েছে অথবা একে ম্লান বা পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। বিজেপির তেমনই আর এক এবারের উদ্যোগ হল গান্ধীকে নিজেদের আইকন করে নেয়ার চেষ্টা। খোদ আরএসএস প্রধান মোহন ভগত এ দিন দাবি করেছেন, “গাঁধীর আদর্শেই এগোচ্ছি”
তবে বলাই বাহুল্য, আইকন দখলের সময় বিজেপি-আরএসএস এর আগের বয়ান-মূল্যায়নকে নিজেদের মত করে আকার দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে থাকে। যেমন নেহরুর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গান্ধীঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল- এই প্যাটেলকে ইদানীং বিজেপি-আরএসএস একেবারে নিজেদের নেতা আইকন করে নিয়েছে। গুজরাতে পৃথিবীর দীর্ঘতম স্ট্যাচু এখন প্যাটেলের, মোদীর উদ্যোগে এটা বানিয়ে নেয়া হয়েছে। মোদীর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে ২০১৩ সালে, পরিচালনা কমিটি তৈরি, অর্থ সংগ্রহসহ এর কাজ তিনি উদ্বোধন করেছিলেন। প্যাটেলকে তুলে ধরারও কারণ-সূত্র একটাই। ভারত স্বাধীনের বছরের আগস্টের পরবর্তীকালে ৫৫০-এরও বেশি ছোট-বড় করদরাজ্যের রাজাগুলোকে বলপ্রয়োগে পিটিয়ে নতুন ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এই বলপ্রয়োগের প্রশ্নে নেহরুর সাথে প্যাটেল একমতে থাকলেও, প্যাটেল নিজে ও তার মন্ত্রণালয় ও এর কাজকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক আগ্রাসী ও চরমপন্থা অবস্থানে। আর শুধু সে কারণেই এক আগ্রাসী হিন্দুজাতিবাদী হিসেবে প্যাটেলকে পরিচিতির আইকন লাগিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে মোদি-আরএসএস গোষ্ঠী। তাই এবার খোদ গান্ধীকে দখল নিতে এবারে বিজেপি এক কর্মসুচি শুরু করেছে যার নাম, “গাঁধী সঙ্কল্প যাত্রা”। ভেঙে বললে এটা হল, থেমে থেমে আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে গান্ধীর জন্মের ১৫০ বছর পালনে বিজেপির নেয়া ১৫০ কিলোমিটার পদযাত্রার এক কর্মসূচি।

স্বভাবতই কংগ্রেসের গান্ধী, তাদের এত বড় “জাতির পিতা’ আইকন বিজেপি-আরএসএসের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া- এটা কংগ্রেস এখন দুর্বল ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেও আপত্তি তো তাদের তুলতেই হয়। তারা তুলেছেও, আর সাথে কমিউনিস্টরাও বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সঙ্গ দিয়েছে। বিজেপি-আরএসএসের গান্ধী দখলে এবারের বার্ষিকীতে ঝাপিয়ে পড়া নিয়ে খোঁচা মারাও কম হয় নি। যেমন কংগ্রেস নেতা  মল্লিকার্জুন খড়্গে; তিনি বলেন,  ‘‘এত দিন যাঁরা শুধু গডসের নাম নিতেন, ভোট পেতে তাঁরা গাঁধীর নাম নেওয়া শুরু করেছেন”।  গডসে [Nathuram Vinayak Godse] হল গান্ধীকে গুলি করে [৩০ জানুয়ারী ১৯৪৮] হত্যাকারী সেই আততায়ীর নাম। দলের দায় এড়াতে যে হত্যা করার আগে দিয়ে আরএসএস থেকে নিজে পদত্যাগ করে নিয়েছিল। আর একালে এই সেদিনও প্রকাশ্যেই বিজেপি গডসে কে দলের হিরো মেনেছিল।

ঘটনার এ দিকটা নিয়ে আমাদের আর এতে খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু এই ১৫০তম উপলক্ষে আমরা অন্তত তিনজন একাদেমিকের লেখা বা মন্তব্য জানতে পেরেছি। এদের একজন প্রফেসর ও লেখক রামচন্দ্র গুহ [Ramachandra Guha], যাকে গবেষক বা ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করা সিরিয়াস লেখক বলা যায়। কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি বর্ষ-পুরানা চিবিয়ে রাখা জিনিষটাই আবার চিবাতে থাকেন, এমন ভারতীয় একাদেমিক না। তার চিন্তার ফ্রেম পুরানাদের চেয়ে আলাদা। কাজেই খুব বড় করে পরিচয় না বললেও আপাতত অন্তত এতটুকু বলতেই হবে। তিনি কলকাতার ইংরেজি দৈনিক “হিন্দুস্তান টাইমস” এবং “টেলিগ্রাফে” কলাম লিখে থাকেন। সেখানে যেমন লেখা এক কলামের তিনি শিরোনাম দিয়ে দিয়েছেন – “সোনিয়া গান্ধীর কেন ইবনে খালদুন পড়া উচিত”। অবলীলায় ইবনে খালেদুনের নাম নিয়ে কথা বলা একাদেমিক ভারতে খুব কমই আছেন!

তিনি “গান্ধী ও আরএসএস” [Gandhi and the RSS] – এই শিরোনামে এক কলাম লিখেছেন গান্ধীর ‘১৫০তম জন্মবার্ষিকী’র তিন দিন আগে। এটা ছিল গবেষণাধর্মী দেড় হাজারের বেশি অক্ষরের এক সিরিয়াস লেখা, সাথে সুনির্দিষ্ট বইপুস্তকের রেফারেন্স। যার মূল প্রসঙ্গ হল, ঘটনাকাল ১৯৪৭ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর, এই সময়কালে গান্ধীর সাথে আরএসএসের সম্পর্ক কেমন গিয়েছিল, তা রেফারেন্সসহ তুলে আনা। তাঁর লেখায় ঘটনার মূল পাত্রপাত্রী হল একদিকে গান্ধী আর অন্য দিকে আরএসএস প্রধান গোলওয়ালকার [Golwalker] ও তার দল।  সে সময়ে নানান শহরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ঘটছিল আর গান্ধী সেসব শহরে গিয়ে দাঙ্গা থামানোর উপায় হিসেবে অহিংস প্রতিবাদে দাঙ্গা না থামা পর্যন্ত অনশনে বসছিলেন। এছাড়া এর পাশাপাশি আরএসএসও সেসব শহরে গিয়ে মুসলমান ও গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, হুমকি দিয়ে কিভাবে লিপ্ত হত অথবা তাদের মুখপাত্র “অর্গানাইজার” পত্রিকায় উসকানি দিয়ে কী লিখত, এমনকি গান্ধীর সাথে চিঠি চালাচালি বা একবারের মুখোমুখি সাক্ষাতে কিভাবে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার অভিযোগ অস্বীকারের লুকোচুরি খেলে গান্ধীর প্রচেষ্টাগুলো ভণ্ডুল করে গেছিল – গান্ধী রচনাবলী ও আর্কাইভ ঘেঁটে তা তুলে আনা- সেসবের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এই লেখায় পাব। তিনি বলেছেন, আর দুদিন পরে (জন্মবার্ষিকীতে) মোদী ও আরএসএস গান্ধী সম্পর্কে নানান ভাল ভাল কথার ফুলঝুড়ি [nice things will be said] তুলবে। তাই এর আগেই তিনি সেকালে গান্ধী ও আরএসএসের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নিয়ে এই রেকর্ড হাজির করে রাখতে চান।
এই লেখকের লেখা অনুসারে, পলিটিক্যাল লাইনের দিক থেকে গান্ধীর অবস্থান হল, তিনি বহুধর্মীয় জাতীয়তাবাদের (religiously plural nationalism) ধরণের এক ভারত চাইছেন, সেজন্য লড়েছেন। গান্ধীর এই হিন্দুবাদে হিন্দুধর্ম বলতে এটা ‘এক্সক্লুসিভ রিলিজিয়ান’ নয়। মানে একা হিন্দুধর্ম না, অন্য (মুসলমান) ধর্মও সাথে আছে। [Hinduism was not an exclusive religion]। কিন্তু মূলকথা এই বিশেষ হিন্দুবাদের, একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভারত চাইছেন গান্ধী। বিপরীতে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার চাইছেন মুসলমানদের মেরে কেটে হলেও বাধ্য করে পাকিস্তানে পাঠানো। হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই মুসলমানদের হিন্দুস্তানে রাখে” [no power on Earth could keep them in Hindustan”]। তো এসব লেখা বা কথার সারাংশ হল, একজন মুসলমানদের কচুকাটা করে ভাগাতে চাইছেন তো অন্যজন হিন্দু-মুসলমানের কথিত ঐক্যের পুর্বশর্ত ও এর জোয়ার তুলতে চাইছেন। না হলে অনশনে, না খেয়ে রইছেন। আর একারণে কাজের কাজ কিছু হোক আর না হোক অন্তত সহানুভুতি তার পক্ষে যাচ্ছে। এতে গান্ধীর আপাত জিত ও জাতির পিতা হওয়া তো কার পক্ষে ঠেকানো যায় নাই।

কিন্তু আসল কথা হল, তাতে লাভ কী হয়েছে? ভারত কি হিন্দু-মুসলমানের ভারত হয়েছে? পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলেও ভারতে নিয়মিত দাঙ্গা হয়ে চলেছে। এমনকি চলতি শতকের শুরুতেও গুজরাটে বড় দাঙ্গা হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত নাগরিকের রাষ্ট্র হতে পারেনি। হিন্দুর রাষ্ট্র হয়ে থেকেছে। পারস্পরিক ধর্মীয় বিদ্বেষ কিছুই মেটেনি, দীর্ঘ সময় যাওয়াতে যা যতটুকু চাপা পড়েছিল তা প্রবল হচ্ছে আবার। সারকথা গান্ধীর নিজের আমল থেকেই দাঙ্গা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু কেন? এর জবাব গান্ধী কখনো দেননি। অর্থাৎ গান্ধীর হিন্দুইজমের ভারতরাষ্ট্র এটা কখনই সমাধান হতে পারে নাই। আসলে তা হওয়ার কথাও না।

তবে রামচন্দ্র গুহের এই পরিশ্রমী কাজটির পরও এই লেখা থেকে একালে, মোদি-আরএসএস খারাপ আর গান্ধী মহান- এর বেশি কিছুই প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। গান্ধীর হিন্দুইজমের বিপরীতে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ- এর ভারত আরও শক্ত হয়ে হাজির হয়েছে। এককথায় রামচন্দ্র গুহের পরিশ্রমটার মধ্যে কোন প্রতিকার নাই, ইঙ্গিত নাই। আছে খালি গান্ধী মহান! সে তো আমরা সকলেই জানতামই!

আবার আর দুই শিক্ষাবিদ- গৌতম ভদ্র ও দীপেশ চক্রবর্তী, এদের মন্তব্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করেছে আনন্দবাজার, এখানে “গাঁধীর স্বরাজ আর সঙ্ঘের রাষ্ট্র এক নয়” – এই শিরোনামে। এদুইজনের মিলের দিকটা হল তারা নিজেদের সাবঅল্ট্রান [subaltern] ধারার প্রবক্তা ভাবেন বা ভাবতেন, যদিও তারাই এখন বলে থাকেন, এই ধারা এখন সাংগঠনিকভাবে মৃত। এদের একটা বৈশিষ্ট্য বলা যায় যে, তারা হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোলে বসে সেই চোখে দেখার যে অভ্যস্ত যুগ ও ধারা ছিল এর বাইরের এরা। বরং সমাজের যাদের কথা বা স্বর শোনা হয় না, উপেক্ষিত, নিচু আয়ের, নিচু জাতের মনে করে চাপানো হয় ইত্যাদি তাদের উদ্বেগগুলো উঠিয়ে আনা বা তাদের জায়গায় বসে দেখার পক্ষের লোক। কিন্তু মডার্ন রিপাবলিক গড়তে একটা ‘জাতি’ ধারণা বা একটা না একটা “জাতীয়তাবাদ” অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে এরা মনে করেন কি না- এই প্রশ্নে, প্রশ্নটাই তাদের মাথায় এসেছে এমন প্রমাণ দেখা যায় না।
তবে দীপেশের এখনকার অবস্থানটা হল, ঠিক মোদী মানে উদ্র জাতীয়তাবাদীরা নয় তবে সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ যেহেতু ভারত মেনেই নিয়েছে তাহলে একইভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে জায়গা করে দিতে অসুবিধা কী। প্রথম আলো বা তাদেরই প্রতিচিন্তায় তাঁর কিছু লেখা দেখে এমন মনে হয়েছে। কিন্তু মূল কথা যেটা, কেন ধর্মীয়সহ যেকোন জাতীয়তাবাদ একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয় পুর্বশর্ত মনে করা হয়েছে? এটা ভিত্তিহীন নয় কেন, সে প্রশ্ন এদের অবস্থান দেখা যায় নাই।

এদিকে আনন্দবাজার দীপেশের একটা বড় উদ্ধৃতি এনেছে সেটা হল এরকম, “হেডগেওয়ার ১৯৩৪ সালেই বলে দিয়েছিলেন, রাজনীতি বিষয়ে সঙ্ঘ উদাসীন। অন্য দলের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সে খাদির সমর্থক এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের বিরোধী নয়। তখনকার কংগ্রেস আর সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেস যেমন এক নয়, হেডগেওয়ারের সঙ্ঘ আর আজকের সঙ্ঘও এক নয়”। এই কথাটাকে স্পষ্ট বুঝবার জন্য এখানে ফুটনোট দিয়ে রাখছি। তা হল, আরএসএস –এর পুরা নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংক্ষেপে একে সঙ্ঘ বলে ডাকে অনেকে। এই সঙ্ঘ ১৯২৫ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হেডগেওয়ার (কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার)। আর পরবর্তিতে ৪৭ সালের দিকে আরএসএস-এর প্রধান ছিলেন,  গোলওয়ালকার (মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার); যার নাম এই লেখার প্রথম দিকে নেয়া হয়েছে।

বিপরীতে গৌতম ভদ্র – তার বিজেপি-আরএসএস সমালোচনা অনেক সরাসরি। তার দুটি উদ্ধৃত বক্তব্য ঐ রিপোর্টে এসেছে। যেমন- ভদ্র আরএসএস প্রধানের সমালোচনা করে বলছেন – ‘ভারত আধ্যাত্মিক দেশ। আধ্যাত্মিক পথেই এর উত্থান হবে বলে চেয়েছিলেন গাঁধী” – মোহনের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। বরং আসল বক্তব্য ও ব্যাখ্যা হল, “গাঁধী কখনই আধ্যাত্মিক দেশ বলেননি। তিনি ধর্মের কথা বলেছেন, রামরাজ্যের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই রাম অযোধ্যায় থাকেন না, অস্তিত্বের ভেতরে তার স্বর অনুভব করা যায়। ইনার ভয়েস!”।
আর ভদ্রের দ্বিতীয় উদ্ধৃতি, গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে প্রবন্ধের অর্থ, এখনকার আরএসএস প্রধান মোহন ভগত যেভাবে করেছেন, এর সমালোচনা সংক্রান্ত। মোহন বলেছেন, “পরাধীনতার ফলে তৈরি গোলামি মানসিকতা যে কী ক্ষতি করতে পারে, গাঁধী বুঝতেন। স্বদেশী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তাই এক ছাত্রের চরিত্র এসেছিল। তৎকালীন রাজনীতিবিদেরা দেশের পূর্ব গৌরব ভুলে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ চালিয়ে যেতেন। তার প্রভাব আজও দেখা যাচ্ছে”। শেষে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন, ‘গাঁধীর পথ ধরেই ভারত আবার বিশ্বগুরু হয়ে উঠবে”।
আনন্দবাজার বলছে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে, দুই ইতিহাসবিদই আপত্তি করে তাদের মতে বলছেন, “হিন্দ স্বরাজ নিছক স্বদেশীর কথা বলে না। সে আধুনিকতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর নৈরাজ্যবাদের কথা বলে। সঙ্ঘের রাষ্ট্রবাদের সাথে তার সম্পর্ক নেই”। ‘আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের অসভ্য করে’- ঐ বইয়ে লিখেছিলেন গাঁধী। ‘হিন্দ স্বরাজ’ আর ‘হাউডি মোদি’ মেলে না কিছুতেই! তবে দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, গান্ধীর কাজকে তিনি বলছেন, একে “জেহাদি অহিংসা বলতে পারেন”। গৌতম ভদ্রও এতে একমত। মোটা দাগে তাঁদের সারকথা হল, মোদি ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি নয়। যদিও সেটা তো বলাই বাহুল্য।

আসলে এখান থেকে দু’টি প্রশ্ন উঠে, যা নিয়ে উপরের রামচন্দ্রসহ তিন শিক্ষাবিদের কেউই তোলেননি। তার প্রথমটি হল, যদি মোদী ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি না-ই হয়, তবু মোদী ও আরএসএস গান্ধীকে নিজেদের করে নেয়ার সুযোগ নিতে বা দাবি করতে পারছেন কেন? এই যে দুইটা পক্ষ এদের উভয়ের চিন্তার মিল বা মৌলিক দিকটি কী ছিল?
কংগ্রেস ও আরএসএস ভিন্ন রাজনৈতিক দল অবশ্যই। তবুও তাদের রাজনীতিতে মিলের দিকটি হল – হিন্দু জাতীয়তাবাদ। উভয়েই হিন্দু জাতীয়তাবাদী। আর ফারাক হল, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে দুই দল দু’ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। আরএসএস বলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ- এটাই হিন্দুত্ব। হিন্দু জাতি খাঁটি, পিওর; খাঁটি আর্য রক্তের ধারা হিন্দুরা। এটাই আবার হিটলারের ভাষায় জর্মানিরা পিওর আরিয়ান রেস (খাঁটি আর্য রক্তের)। অর্থাৎ এরা তাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে এই একই জায়গাকে কেন্দ্র করে। এ কারণে হিটলার ও আরএসএসের রেসিজম বা বর্ণবাদিতা, জাত-শ্রেষ্ঠত্ব একই ধরনের।
বিপরীতে গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় তাঁর দাবি হিন্দু বা হিন্দুইজম শব্দ – এটা কেবল একটা হিন্দুধর্ম নয়, অন্য (মুসলমান) ধর্মও। এ নিয়ে তার ব্যাখ্যার পক্ষে বিস্তর কোশেশ আছে। যেমন দাঙ্গার মুখে প্রতিকার হিসেবে তিনি হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলাতে চান আবার, মুসলমানকে জয় শ্রীরাম ধরনের কিছু। এ কারণে গান্ধীর হিন্দুইজমের পূর্বশর্ত হচ্ছে, কথিত এক ফ্যান্টাসির “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য”। এ প্রসঙ্গে গান্ধী নিজ দলীয় কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশ করে বলা ১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বরের এক ভাষণ থেকে রামচন্দ্র গুহের গবেষণায় উদ্ধৃতিটা দেয়া হল এখানেঃ “be true to the basic character of the Congress and make Hindus and Muslims one, for which ideal the Congress has worked for more than sixty years”.

কিন্তু বাস্তবতা হল, গান্ধীর নির্দেশ নিজের দল কতটা মেনেছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ তো বটেই। এ ছাড়া, এমনকি তা পুরোপুরি মেনে চললেও ফলাফল শূন্যই হয়েছিল। তখন ও এখনকার বাস্তবতাই এর প্রমাণ। তাহলে মূল সমস্যা কোথায়? গান্ধীর “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য” কথার আসল মানেই বা কী? এর সোজা অর্থ পরস্পরের ধর্মের পক্ষে জয়গানের স্লোগান দিতে হবে, এটাই বলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য।

কিন্তু তাতে এ থেকেই আবার, হিন্দুদেরকে কেন আল্লাহু আকবর বলতে বলছেন গান্ধী- এই অভিযোগ তুলে আরএসএস তাদের মুখপাত্র অর্গানাইজার পত্রিকায় গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করে তাদের ধুয়ে দিয়েছিল। আসলে এতে উল্টো আরএসএসের পক্ষে দাঙ্গা বাধানোই সহজ হয়ে গেছিল।

এখানে মূল কথা হল, গান্ধীর এই ঐক্যের প্রস্তাবই ছিল অলীক ও অবাস্তব, বাস্তবায়ন অযোগ্য। ধর্ম মানুষের যার যার কোর বিশ্বাসের প্রশ্ন। এখানে চাইলেই এক ধর্মের লোক আর এক ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বলে ধ্বনি দিতে পারে না। এমনকি কোনো মুসলমানের অন্য ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বা মূল শ্লোক বা কালাম উচ্চারণ করার পরে সে আর মুসলমান থাকে কি না সে প্রশ্ন তো উঠবেই! আবার এটা হিন্দুর দিক থেকেও একই ভাইসভারসা। অথচ গান্ধীর প্রস্তাব ও ব্যাখ্যা দাবি করছে একটা ভারত রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এসব অস্বস্তিকর নিজ নিজ ধর্মবিরোধী অবস্থানে নাকি যেতেই হবে। হিন্দু-মুসলমানের তথাকথিত ঐক্য- এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব নাকি এতই।

এক কথায় বললে গান্ধীর কথিত ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ প্রকল্প- এর ধারণাই বাস্তবায়ন অযোগ্য। ফলে তা অবাস্তব হয়ে থেকে গেছে। আর গান্ধী খুন হয়ে মরে যেন বেঁচে গেছেন।

কিন্তু কেন একটা ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ, বিশেষ করে তা কেন ‘হিন্দুইজমের’ হতেই হবে ? এ ছাড়া একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদই কেন দরকার? একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে চাইলে কেন এটা অনিবার্য?

লক্ষণীয় যে, ওপরের তিন ভারতীয়  একাডেমিকের কেউ এসব প্রশ্নগুলোর দিকে যাননি বা যেতে চাননি। কোনো রাষ্ট্র গড়তে চাইলে একটা জাতীয়তাবাদ, তাও আবার একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ- এটাকে কেন এসেনশিয়াল বা অনিবার্য প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। জাতীয়তাবাদ যার গোড়াটা আছে কথিত এক ‘জাতি’ ধারণায়। বাংলায় জাতি বললেও এটা দু’টি আলাদা ধারণা ইংরেজিতে রেস ও এথনিক- এ দুই শব্দের অর্থ বাংলায় একটাই- ‘জাতি’ করা হয়ে থাকে।

লক্ষণীয় যে, ইংরেজিতে এই দু’টি শব্দই অরাজনৈতিক পরিচয়-প্রকাশমূলক শব্দ। যেমন বাঙালি রেসের লোক আর আমার খাদ্যাভ্যাস বা ধর্ম-সংস্কৃতি কী হবে এই এথনিক পরিচয় আমার জন্মের আগে থেকেই নির্ধারিত। এই পরিচয়গুলো আমরা যে কেউ বেছে নিয়ে দুনিয়ায় আসি না বলেই, এগুলো অরাজনৈতিক। এর দায় আমার নয়। এর সাথে আমি কেমন রাষ্ট্র গড়বে এর সম্পর্ক কী? এমন কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই রাষ্ট্র গড়তে চাইলে নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে সংশয় তৈরি করার প্রয়োজন কী?

নিশ্চয় নেহরু-গান্ধীরা কোনো বোকা অবুঝ মানুষ নন! কিন্তু তবু সেই রামমোহনের আমল থেকেই আমরা যেন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ অনিবার্য প্রয়োজনীয়, এমন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তালাশে থাকতে দেখতে পাই আমরা। কেন?

মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের তাবৎ কামনা, বোঝাবুঝি আগ্রহ ইত্যাদি সব কিছুর উৎস হল ব্রিটিশ কলোনি মাস্টারের রাষ্ট্র। রামমোহন থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই বিশ্বাস করতেন [তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় থাকা একমাত্র রাষ্ট্র] যে ব্রিটিশ রাষ্ট্র তারা দেখছে এর নাগরিকদের এক থাকার পেছনে তাদের একই ধর্মীয় পরিচয় ( এংলিকান ক্যাথলিক, Anglican Catholic)- এটাই তাদের কথিত ঐক্য বা এক হয়ে থাকার ভিত্তি হয়ে আছে। কাজেই ভারতেরও একটা রাষ্ট্র হতে গেলে তাদেরও একটা ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে একটা একক ধর্ম থাকতেই হবে। এই ছিল তাদের প্রবল অনুমান। কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভুল ও ভিত্তিহীন। বৃটিশ রাষ্ট্রের ভিত্তি মানে তা এক হয়ে আছে কোন Anglican Catholicism র কারণে নয়।   যদিও আবার এরা সবাই দেখেছিল ভারতে সেটা বাস্তবতা নয়। কারণ অবিভক্ত ভারতে সবার ধর্ম এক হিন্দুত্ব মানে এক হিন্দুধর্ম তা ছিল না। তাই সেখান থেকে রামমোহন বলে গেছিলেন অবিভক্ত ভারতের সবার জন্য একটা ব্রাহ্ম ধর্ম তৈরি করতে, যদিও সেটাও  অলীক ও অপ্রয়োজনীয় বলে ব্যর্থ হয়েছিল। সম্ভবত সেকারণে গান্ধীর পথটা রামমোহন থেকে আলাদা হয়েছিল। যেটা আবার পরবর্তি উদ্যোগ হিসাবে বঙ্কিম চন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) -এর হিন্দুত্বের কাছাকাছিই, ইসলামবিদ্বেষী ছুপা অথবা উদাম।

এককথায়, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে ঐ সমাজে পিছনে একটা একক ধর্মের মিল বা ঐক্য থাকতেই হয়, এই অনুমান মিথ্যা, ভিত্তিহীন। সম্পুর্ণত এক ভুল ধারণা। বরং রাষ্ট্রে নাগরিক এক হয়ে থাকে – নাগরিক ঐক্য থাকে – মূলত বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার বা নাগরিক নির্বিশেষে “সাম্য” কায়েম রাখতে পারলে। এটাকেই অনেকে ক্লাসিক অর্থে সেকুলারিজম (ইসলামবিদ্বেষী সেকুলারিজম নয়) বলেও বুঝে থাকে।

পরবর্তীকালে সেই একই কারণে গান্ধী নতুন ব্যাখ্যা দিলেন যে ভারতের হিন্দুইজম মানে এটা একটা ধর্ম না, বহু। এক রিলিজিয়াস প্লুরালিটি। একে হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্ম বলে, বহু বলে বুঝতে হবে দাবি করতেন। গান্ধীর হিন্দুইজম বলতে তাই ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য’ কথাটা এভাবে বুঝতে হবে। গান্ধীর এই অবাস্তব সোনার পাথরের বাটি ধারণার উৎস এখানে। অথচ হিন্দু ও মুসলমান শুধু নয়, বরং যেকোনো দুই মানুষ এক বোধ, একটা ঐক্যবোধ করতে পারে খুবই সহজে এভাবে যে,  পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রে সব নাগরিক সমান, তাদের নাগরিক অধিকার সমান- এই ভিত্তিতে যদি একটা রাষ্ট্র গড়া যায়। মানুষের এথনিক, রেসিয়াল, নারী-পুরুষ, ভাষা বা ধর্মীয়সহ যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে এক অধিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কায়েম ছিল এর আসল সমাধান। অথচ খুব সম্ভবত হিন্দু বা হিন্দু সভ্যতা এসব কোনো ধারণার আড়ালে গান্ধীসহ সবার মনেই একটা হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব একটা হেজিমনি কায়েমের, এর ধারণা কাজ করত। তাই কোন হিন্দুইজম ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা তারা করতে চান নাই, বা পারেন নাই। অথচ এক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে হিন্দু-মুসলমানকে এক হয়ে যেতে হবে কেন? এছাড়া এই – হিন্দু-মুসলমান এক করে ফেলা – এই প্রকল্পটাই তো অলীক অবাস্তব; এক সোনার পাথরের বাটি!

ফলে বাস্তবত এক দিকে গান্ধীর দেয়া অলীক অবাস্তব প্রস্তাবের কারণে হিন্দু-মুসলমান এরা এক পরস্পর বিরোধাত্মক পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছিল এবং যেটা এখনো আছে। আবার তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য থাকতে হবে বলে পরস্পর একে অপরের ধর্মের পক্ষে চিল্লা দিতে হবে বলে দাবি করছেন, নইলে তিনি অনশনে যাবেন। আর অন্যদিকে আরএসএস গান্ধীর এই অবস্থানকেই যে [হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলতে হবে], গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে আরএসএসের পক্ষে আনার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার ও দাঙ্গায় প্ররোচিত করে গেছে।

সারকথায়, গান্ধী নিজেই দাঙ্গার কারণ, আবার দাঙ্গা উঠে এলে তিনি অনশনে বসে গেছেন! আর এই গান্ধীকেও মোদী ও আরএসএস এখন নিজেদের করে নিতে চাচ্ছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৫ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে গান্ধীর স্ববিরোধী ‘হিন্দুইজম“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

গৌতম দাস

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ja

          হিন্দিতে ক খ গ লেখা, এনডিটিভি থেকে নেয়া, ১৪ সেপ্টে ২০১৯

[সার-সংক্ষেপঃ আরএসএস -বিজেপি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদের পরে এবার মোদী-অমিত চেষ্টা করছেন হিন্দি জাতীয়তাবাদ মানে, সাথে ভাষার জাতীয়তাবাদও হাজির করার চেষ্টা করছেন। চলতি প্রজন্ম হয়ত জানে না। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রথম দল কংগ্রেস ও এর নেতা জওহরলাল নেহর্‌ এটা আগেই চেষ্টা করে  ও পরাজিত হয়ে গেছিলেন। ১৯৬৩ সালে এরই প্রচেষ্টায় তিনি The Official Languages Act, 1963 করেছিলেন। কিন্তু তা দক্ষিণের দ্রাবিড়ীয়দের আন্দোলনের মুখে ব্যর্থ হয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি ভারতের “জাতীয় ভাষা” আর নয়। মোদী-অমিত আবার সেই পুরানা ব্যর্থ প্রচেষ্টাটাই নতুন করে জবরদস্তিতে আনতে চাইছেন, যা ইতোমধ্যেই নেহরুর হাতে পরীক্ষিত ও পরাজিত। কংগ্রেসের এখনকার বিবৃতিই এর প্রমাণ।]

এবারের ১৪ সেপ্টেম্বর নাকি ভারতের “হিন্দি দিবস” [Hindi Divas] ছিল। মানে পালিতও হল। বুঝা গেল, ভারতের অমিত শাহ এবার হিন্দুত্বের পরে নতুন মোদী-হিটলারি লাঠি – হিন্দি” নিয়ে হাজির হলেন। ব্রিটিশেরা চলে যাবার পরে স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন যখন লেখা হচ্ছিল সেই ১৯৪৯ সালে ১৪ সেপ্টেম্বরকে একটা হিন্দি দিবস ঘোষণা করে রাখা ছিল। রাখা ছিল বলছি এ জন্য যে এটা রেখে কোনো লাভ হয়নি, পরে হিন্দিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। খুব একটা কিছু আগায়নি। কী আগায়নি?

ব্রিটিশ আমল থেকেই, রাজনীতি জিনিসটা কী – তা অস্পষ্ট বোল-এর উচ্চারণে আধা-বুঝাবুঝির সময় থেকেই ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে একমাত্র একটা জাতীয়তাবাদী দলই বুঝা হত। আবার এই জাতীয়তাবাদ বলতে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব ছাড়া আর অন্য কিছু হতে পারে না- এই অনুমান নিয়েই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদিও হিন্দুনেতাদের নিজেদের মধ্যে একটা তফাত বা বিতর্ক ছিল যে, তারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র বলতে যে একটা হিন্দুত্ব-রাষ্ট্র বুঝছেন তা স্পষ্ট করেই বলা হবে, না তা কৌশলে আড়াল রাখা হবে, এ নিয়ে কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভা (একালের নাম আরএসএস) গোষ্ঠির মধ্যে ভিন্নতা ছিল। কিন্তু হিন্দু রাজনীতিক মাত্রই প্রায় সবাই মানত যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া ভিন্ন কোনো রাজনীতি করা এবং রাষ্ট্র গড়া ও থাকা অসম্ভব, তা হতেই পারে না। ঠিক এ কারণেই তারা অ-হিন্দু, বিশেষ করে ভোকাল মুসলমানদের সামনে নিজেদের হিন্দুত্ব চিন্তার ন্যায্যতা কী তা প্রতিষ্ঠা করতে না পারা থেকেই কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

পরিণতিতে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু মুসলমানেরা রাষ্ট্রে আলাদা হয়ে যাওয়া সত্বেও তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের “রাষ্ট্র ধারণা” বুঝের মধ্যে এর কোন প্রভাব পড়েনি। তারা হিন্দুত্ব আঁকড়ে ধরেই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশন বানানোর পরবর্তিতে বাস্তবত ১৯৬৩ সালের মধ্যে,  শুরু হয়ে যায় এর পতন; অর্থাৎ ডিজেনারেশন [degeneration]  বা ভেঙে পড়া। মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের চিন্তা ও রাষ্ট্র বাস্তবায়ন শুরুর পর্যায়েই এরা টের পেতে থাকে যে সব ভেঙে পড়ছে।

অনেকের ধারণা যে, কোনো জনগোষ্ঠীর আশি-নব্বই পার্সেন্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়তে কোনো সমস্যা হয় না। এ ধারণা ভুয়া, ভিত্তিহীন। এর মানে, এই অনুমান অনুসারে ভারতের মুসলমানেরা ভেঙে আলাদা নিজের রাষ্ট্র গড়ে বেরিয়ে গেলে তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গড়তে আর অসুবিধা হবে না, পোক্ত হবে। তাই তো হওয়ার কথা, কিন্তু ভারতে তা হয়নি। মাত্র তেরো বছরের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের নামে দক্ষিণের ওপর হিন্দি-বলয়ের কর্তৃত্ব উপড়ে ফেলে দিয়েছিল। কর্নাটকের প্রধানত কন্নড় ভাষা, কেরালার মালয়ালম ভাষা, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু ভাষা, তামিলনাড় তামিল ভাষা এদেরকে একসাথে দ্রাবিড়িয়ান ভাষা বলে। অনেকে তাই দক্ষিণের এই চার রাজ্যকে দ্রাবিড়িয় রাজ্য বলে। অনেকে আবার ভৌগলিকভাবে (এটা আসলে পুব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটা উঁচা প্লাটো[Plateau] বা মালভুমি যার নাম ডেকান) এটা বুঝাতে দাক্ষিণাত্য বা ইংরেজিতে ডেকান [Deccan] বলে থাকে। এরাই মূল লড়াকু যারা উত্তর ভারতের (হিন্দুভাষী বা হিন্দিবলয়ের) আধিপত্যের চরম বিরোধী।

এমনকি এই বিরোধিতার বা বলা ভাল উত্তরের আর্যদের প্রতিরোধ লড়াইয়ের উৎস হিন্দু ধর্মের মতোই প্রাচীন। উত্তর ভারতে মানে মূলত এখনকার উত্তরপ্রদেশ, এখানে আর্যদের আগমনের পরে আশপাশের রাজ্য-এলাকায় বিস্তার লাভের পরে আরও দক্ষিণ দিকে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রবেশের আগে থেকেই  পরে আর আগাতে পারেনি। আরও দক্ষিণে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে সেই এলাকাটাই দাক্ষিণার্থ বা দ্রাবিড়িয় অঞ্চল। অর্থাত ডেকান মালভুমি পেরিয়ে এরও পরে এখনকার তামিলনারু বা আরও পশ্চিম বরাবর কোস্টাল রাজ্য কেরালায় এদিকে আর আর্যরা বিস্তৃত হতে পারে নাই। একইভাবে পুবদিকে আর্যদের বিস্তার ঘটেছিল মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিহার পর্যন্ত। আর এর পরেই  (পুব ও পশ্চিম) বাংলা অঞ্চল। এখানেও আর্যরা কত ভিতরে এসেছিল বা আসেনি সে তর্ক ছাপিয়ে বলা যায়, বাংলার প্রতিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দূরবর্তী হলেও ভাষা বা কালচারে আর্যদের প্রভাব বাংলার উপর পরেছিল বা আছে এ নিয়ে তর্ক নেই। আর্যদের বিস্তার প্রসঙ্গে এই ফ্যাক্টসটাই একালেও সব ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। সাতচল্লিশের ভারত ভাগের পরের ভারত মূলত হিন্দি-বলয়ের (যেন পুরানা দখলি নিয়ে বসা আর্যদের) ক্ষমতা হয়েই সারা ভারতকে শাসনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে চেয়েছে। পুরা ভারতের উপর এটাই – উত্তরের শাসন, হিন্দি বলয়ের শাসন, হিন্দিভাষীদের শাসন ইত্যাদি নানান থাকে থেকে গেছে।  এটাই মর্ডান ভারতে এক কাশ্মীরি ব্রাক্ষণ জওহরলাল নেহেরু ভুতুড়ে উত্তরের ক্ষমতার শাসন সর্বপ্রথম কায়েম করতে গিয়েছিলেন। যা প্রথম বড় আঘাত পেয়ে থমকে গিয়েছিল ১৯৬৩ সালে, দ্রাবিড়ীয় প্রতিরোধে। আর সেটাই আবার তবে এবার গুজরাতি মোদী-অমিত নেহেরুর ব্যার্থতার জুতা পায়ে গলিয়ে ভুতুড়ে সেই উত্তরের ক্ষমতার শাসনটাই আবার জাগানোর চেষ্টায় নেমেছেন। নেহেরুই প্রথম ১৯৬৩ সালে হিন্দুত্ব পাশে থুয়ে রেখে হিন্দি চাপানোর ভাষা-জাতীয়তা চালু করেছিলেন। বলা বাহুল্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতাকেই আবার কাঁধে উঠায় নিলেন মোদী-অমিত।

সারকথায়, উত্তরের শাসন, যেটা নেহেরুর হাতে নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের আড়ালে কার্যকর থাকতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক রেওয়াজ রিনিউ করে এরই প্রবল বিরোধী হল দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চল। একালে গত কয়েক বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার যে মোদী বা হিন্দির বিরোধিতা সেটা পুরানা ঐতিহাসিক বিরোধিতারই এক নব অধ্যায়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, দ্রাবিড়ীয় ও বাংলাএই দুই অঞ্চল থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা উঠে এসেছিল। হিন্দুধর্মের পক্ষে  থেকে নিজের ন্যায্যতা দিতে গিয়ে এর সবচেয়ে দুর্বল দিক হল, এর ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদের বয়ান – এটা উদাম হয়ে যায়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চলের মিল পাওয়া যায়। বাংলায় সুলতান শাসন আমলের (১২০৫-১৫৭৬) শেষের দিকে নদীয়াকেন্দ্রিক চৈতন্যের ও পরবর্তীতে লালনের জাতপাতবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কথা অনেকেই জানি।

আর ওদিকে ব্রিটিশ আমল থেকেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় সরাসরি ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল তামিল সমাজ। আজকের তামিলনাড়ুতে যে দুই স্থানীয় দলের হাতে এই রাজ্য পালটাপালটি শাসিত হয়ে আসছে সে মূল দলের নাম ডিএমকে [DMK]। ইংরেজি আদ্যক্ষরে বলা এই দলের নাম দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম (দ্রাবিড় প্রগেসিভ ফেডারেশন) [Dravida Munnetra Kazhagam ( transl. Dravidian Progress Federation] থেকেই ডিএমকে। আর সেটা থেকে ভেঙে পরে (১৯৭২) অন্য আরেক অংশের দলের নাম এআইএডিএমকে [AIA-DMK]। ততকালীন মাদ্রাজে (তামিলনাড়ু) ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণের ঝগড়া তীব্র উঠেছিল বৃটিশ আমলেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় চরম বৈষম্য থেকে।  সেখান থেকেই  ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল জাস্টিস পার্টি, ১৯২০ সালেরও আগে থেকে।  এই দলেরই কয়েকজন পরে ১৯৪৪ সালে নিজেরা পুনর্গঠিত হয়ে জন্ম দেন দ্রাবিড়া কাজাঘাম [Dravidar Kazhagam, DK] দল। ব্রাহ্মণের সামাজিক আধিপত্যের বিরোধীতা এই ছিল তাদের মূল ইস্যু; তাই তারা সাম্যের সমাজ ছিল তাদের মূল শ্লোগান। কিন্তু প্রধান দুই নেতার বিরোধ থেকে ১৯৪৯ সালে এক অংশ দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম [Dravida Munnetra Kazhagam] ডিএমকে খুলে বসেন। নেতা আনাদুরাই -এর নেতৃত্বের এই দল, এদের ব্রাহ্মণ বিরোধিতা এতই তুঙ্গে ছিল যে এরাই প্রথম কোন ব্রাক্ষণ ছাড়াই সামাজিক-ধর্মীয় বিয়ের নতুন প্রথা চালু করেছিল। এটাকেই আইনি কাঠামো দিয়ে  তারা এর নাম দিয়েছিল আত্মসম্মানের আইনে বিয়ে [Self-respect marriages Act]।

কিন্তু  সবাইকে ছাড়িয়ে ডিএমকে দল বিখ্যাত হয়েছিল নেহেরুর হিন্দি-জাতিবাদের বিরোধীতার আন্দোলনে সফল হয়ে।  নেহরুর যুগে.১৯৬৩ সালে ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের ভারত বানানোর প্রচেষ্টা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল দ্রাবিড়িয়দের বিশেষ করে ডিএমকে দলের হাতেই। দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান পাবার পরে, মূল নেতা মুসলিম লীগের জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তানে ভিলেন হয়ে যান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রশ্নে। কিন্তু মজার কথা হল, ঠিক একই ধরণের ভাষা-জাতিবাদী চিন্তায় জিন্নাহর মতই একই কাজ করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তাঁর আমলেই হিন্দিকে সরকারি ভাষা করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই হিন্দি দিবস বলে একটা দিন চালু ও পালন করা হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।

আর ১৯৪৯ সালে এর আইনটা লেখা হয়েছিল এভাবে, ভারতের জাতীয় ভাষা (National language) হিসাবে হিন্দি, প্রথম সরকারি দফতরের ভাষা (Official language), আর ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু থাকবে”। তবে এখানে দুইটা “কিন্তুও” ছিল। প্রথমত, ভাষার নাম হিন্দি হবে, ঠিক তা বলা হয়নি। বলা ছিল হিন্দুস্থানী ভাষা”। তা আরও ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছিল, তা দেবনাগরি অক্ষরে (এখন ভারতে যে অক্ষরে হিন্দি লেখা হয়) বা ফার্সি অক্ষরে হতে পারবে। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, এই নিয়ম বা আইনটা , পরবর্তি ১৫ বছর পর্যন্ত চালু থাকবে। এরপর পার্লামেন্ট নিজে বসে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এরপরে কী হবে।

এই হিসাবে ১৯৬৩ সালে “হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ” কায়েমের জোশে, মহান সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়ে জিন্নাহর মতনই নেহরুও হিন্দিকে জাতীয় ভাষা ও একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা ঘোষণা করে সংসদে পাস করা এক আইন জারি করেন। এছাড়া এর আগেই অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামে হিন্দি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে অহিন্দি রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে দ্রাবিড়িয় অঞ্চলে। সেখানে ক্ষোভ প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে পাঁচজন মানুষ নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিল। সাথে ঐ আন্দোলনে দুজন পুলিশেরও মৃত্যু হয়েছিল। কেরালায় বহু কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে আগুন দেয়া হয়েছিল। অবশেষে বাধ্য হয়ে কংগ্রেস সরকার আইনটা প্রত্যাহার করে নিয়ে আন্দোলন থামিয়েছিল। পরের বছর ১৯৬৪ [২৭ মে ১৯৬৪] সালে নেহরুর মৃত্যু হয়।  আর ১৯৬৪ সালে [০৯ জুন ১৯৬৪]  নতুন প্রধানমন্ত্রী হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আর স্বভাবতই তাঁর প্রথম কাজ ছিল একটা ভাষা প্রশ্নে একটা আপোষ ফর্মুলা বের করা। তাঁর আমলেই নতুন করে আগের official language act 1963 এর মধ্যে সংশোধন এনে জানুয়ারি ১৯৬৫ সালে এটাকে আগের মতই হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি সরকারি দাপ্তরিক ভাষা ফিরে করা হয়। তবে জাতীয় ভাষা কী হবে তা উহ্য রাখা হয়। আসলে এটাই ছিল দ্রাবিড়িয় রাজ্যগুলোর সাথে আপসনামা রফায় সংশোধিত অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট ১৯৬৩। এইবিষয়টা পড়ে গুজরাত হাইকোর্টের ২০১০ সালের এক রায়েও স্বীকৃত হয়।  সেকালে মামলাটা ছিল্ভিন্ন প্রসঙ্গে যে, এক ব্যক্তি আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মামলা করেছিল যেসব্ব পণ্যের গায়ে হিন্দিতে বর্ণনা লেখা বাধ্যতামূলক করা হোক। কিন্তু আদালত অপারগতা জানিয়ে বলে, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে গুজরাট হাইকোর্টের এক রায়ে এটাই স্বীকার করা হয়েছে যে, ভারতে জাতীয় ভাষা বলে কোনো কিছুই নেই।

সারকথাটা হল, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র গড়ার দাবিদারেরা বিশেষত নেহরুর কংগ্রেস ১৯৬৩ সালেই এই প্রথম সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়। যেটা আসলে হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত  ও উন্মোচিত হয়ে মার খেয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান এসবের জাতীয়তাবাদ আসলে হতভম্ব হয়ে বিভ্রান্ত ও ফিকে হয়ে যেতে থাকে।

বহুবার বলেছি, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান অথবা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের কামনা কেবল কংগ্রেসের নয়, এটা হিন্দু মহাসভা বা পরে এদেরই নতুন নাম আরএসএস-জনসংঘ বা একালের বিজেপির কামনা ছিল সবসময়। তফাত শুধু এই যে, হিন্দুত্বকে কংগ্রেস সেকুলার জামার আড়ালে রেখে ফেরি করতে চায়। আর বিজেপি হিন্দুত্বকে গর্ব করে প্রকাশ্যে বলতে চায়। তবে ১৯৬৫ সালের মধ্যেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে হিন্দি ও হিন্দুত্বের মার খেয়ে যাওয়া- এ প্রসঙ্গটা কংগ্রেসের কাছে প্রচন্ড হতাশার অবশ্যই কিন্তু কোনো বিকল্প করণীয় ছাড়াই।

কংগ্রেসের এই ঢিলেঢালা অবস্থাতেই চলতে চলতে ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকেই হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে ওই ১৯৬৩ সালে কংগ্রেসের প্রথম পরাজয়ের পর থেকে ডিএমকেই কংগ্রেসের পরে প্রথম (আঞ্চলিক) রাজনৈতিক দল, যারা ১৯৬৭ সালের নির্বাচন থেকে এককভাবে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই থেকে দ্রাবিড় অঞ্চল থেকে হিন্দিভাষী দলের হারিয়ে যাওয়া শুরু। তবে ১৯৭২ সালে ডিএমকে তে একদভা ভাঙনে তৈরি হয়েছিল এআইএডিএমকে [AIA-DMK] বা আন্না ডিএমকে। তাই ঐ ১৯৬৭ সাল থেকেই তামিলনাড়ূতে ডিএমকে অথবা আন্নাডিএমকে পাল্টাপাল্টি করে রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসেছে।

কিন্তু এই পরাজয় সম্পর্কে বা সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র কামনা সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির ভাষ্য ও মূল্যায়নটা হলো, কংগ্রেস লিবারেল বা দুর্বল ঈমানের হিন্দুত্ব করে বলেই হেরে গেছে। আগ্রাসী-হিন্দুত্ব নিয়ে আগালে হিন্দুত্ব কখনো হারত না।

অনুমান করা যায় এসব ব্যাকগ্রাউন্ড মনে রাখার কারণেই, মোদীর দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে বিজেপি এবার আস্তে ধীরে নিজেদের মূল্যায়নের ঝাঁপি খুলে ধরতে শুরু করেছে। কাজেই মোদি সরকার-টু, এটা আসলে (১৯৪৭-৬৩) সময়কালের কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও দর্শন যে মিথ্যা, অকেজো ও অকার্যকর প্রমাণ হয়েছিল সেই হিন্দুত্বকেই এবার আবার ধুয়ে মুছে কিন্তু  প্রচন্ড আগ্রাসী-হিন্দুত্ব হিসেবে হাজির করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসছেন মোদি-অমিত গোষ্ঠী। বলাই বাহুল্য, হাস্যকর জিনিস করার উদ্যোগে প্রথমবারের ব্যর্থতার পরও দ্বিতীয়বার তা নিলে সেটা এবার তামাসার পরিণতি নিয়েই ফেরে। এই হাস্যকর জিনিসটা হলো হিন্দুত্বের জাতীয়তবাদ- যা এখন জয় শ্রীরাম বলে পরিচিত!

হিন্দি দিবস এতদিন ধুলা ময়লায় পড়ে কোথাও কোণে অবহেলায় গড়াগড়ি যাচ্ছিল। ওদিকে  এতদিনে সরকারি দপ্তরের ভাষা, হিউম্যান রিসোর্স  বা  বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ডিফল্ট ভাষা হয়ে উঠেছে ইংরাজি। কংগ্রেস হাত-পা ছেড়ে এটাই একবাক্যে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু অমিত শাহ এবার সেই ধুলা ময়লা পড়া “হিন্দি দিবস” তা ঝেড়ে পুছে নিয়ে এবার আবার পালন করে বসলেন। যদিও সেটা বড় তেমন কোন কিছু নয়। কেবল এক টুইটার স্টেটমেন্ট তাও আবার তা হিন্দিতেই হতে হয়েছে। তবে সেই স্টেটমেন্টটাই গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই। সেটার আনন্দবাজারের করা বাংলা অনুবাদটা হল এরকম – ‘‘ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন,যাকে বিশ্ব স্বীকৃতি দেবে ভারতীয় ভাষা হিসেবে। যদি কোনও ভাষা দেশকে বাঁধতে পারে,তা হিন্দি”।

প্রথমত লক্ষণীয় হল, অমিত শাহ কোন প্রধানমন্ত্রী নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কাজেই ভাষা নিয়ে বিবৃতি এটা তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজই নয়। ভারতে হিউম্যান রিসোর্স  বলে মন্ত্রণালয় আছে, সেই মন্ত্রী যদি এই হিন্দি দিবস পালনের বিবৃতি দিতেন তাও একটা কথা ছিল!  তাহলে অমিত শাহ কেন? একটা টেনেটুনে সাফাই অনেকেই করতে চাইবে হয়ত যে অমিত শাহ দলের সভাপতি, তাই। কিন্তু না। কাজটা রাষ্ট্রের তরফের, দল না। খুব সম্ভবত এর আসল অর্থ হল, হিন্দি জাতীয়তাবাদ করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালের কংগ্রেসের মত এবার আগ্রাসী-হিন্দুত্বতে তা করতে গিয়ে যদি এবারও তা মার খেয়ে যায় তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যেন পশ্চাদ-অপসারণটা ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, অমিতের বিবৃতিতে প্রথম দুই বাক্যে বলা হয়েছে, “ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে”। এর মানে হল তারা ১৯৬৩ সালের পরাজয়টা আমল করেছেন। তাই আগাম প্রলেপ দিয়ে নিলেন। কিন্তু আরএসএস-বিজেপির মূল যুক্তিটা জানা গেল পরের বাক্য  – “দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন”।  এছাড়া ইতোমধ্যেই মোদীর খসড়া শিক্ষানীতি ২০১৯-এ দেখা গেছে, হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা আছে সেখানে – যেখানে স্বয়ং নেহেরু পরাজিত হয়ে পিছু হটে গিয়েছিলেন।

অমিত আসলে বলতে চাইছেন “ভারতের একটা হিন্দি-হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন”। কেন? সেই পুরানা বেকুবি যুক্তি। আর সেটাকেই  আনন্দবাজারের তার শিরোনাম করে লিখেছে – [ভারতকে বাঁধতে পারে হিন্দিই”,এক রাষ্ট্র, এক ভাষা চান অমিত শাহ]।
এই যুক্তিটা আসলে রাষ্ট্র না-বুঝ যারা এদের। এরা একই সঙ্গে যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের হিটলার একেকজন – “জয় শ্রীরাম” – এদের যুক্তি।
অমিতের কথা অনুযায়ী ভারতকে বাঁধতে পারে এমন “রশি” বা ভাল “আঠা” দরকার অমিতের। আচ্ছা নাগরিক কী বেধে রাখার জিনিষ? অমিত মনে করেন হাঁ; এজন্য দরকার একটা হিন্দুত্ব মানে, হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ। না হলেও একটা হিন্দি ভাষার জাতীয়তাবাদ।

মোদী-অমিত শাহরা আসলে অসুস্থ চিন্তার লোক।  কোন রাষ্ট্র গড়বার জন্য না হিন্দুত্বের মত কোন আদর্শ, না কোন ধরণের জাতীয়তাবাদ – কোনটার কোনই দরকার নাই। কোন দিন ছিলও না। কিন্তু ভুল বুঝা হয়েছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন –স্টেট বলে এক সোনার পাথর বাটি ধারণা এসেছে। আর নাগরিককে রাষ্ট্রে ধরে রাখার জন্য কোন ভাষাগত ঐক্য বা ধর্মীয় ঐক্য অপ্রয়োজনীয়। যদি তাই হত তবে দ্রাবিড়ীয়রা কী হিন্দু ধর্মের বাইরের? পাঞ্জাব কী বৃহত্তর হিন্দি ধর্ম বা কালচারের বাইরের? এই ডিএমকে ১৯৬২ সালের আগে পর্যন্ত স্বায়ত্বশাসন বা বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়ার দল ছিল। পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতার সমস্যা এখনও একেবারে মিটে গেছে তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমাদের ধর্মীয় ঐক্য থাকা সত্বেও কী আমরা বিচ্ছিন্ন হই নাই! কেন এমন হয়েছিল?

রাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ থাকতে মূল প্রয়োজন, অনিবার্য  দরকার আসলে  –  বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার, নাগরিক নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ – এমন এক “রাজনৈতিক নীতির ঐক্য”। এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি কায়েম। এমন নাগরিক অধিকার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং এর বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রে জুলুম বন্ধ করুন, নাগরিক নির্বিশেষে কোন জুলুমে ভুক্তভোগী সবাইকে একটা ইনসাফ দেন। এমন ব্যবস্থা কায়েম করেন। মানুষকে বেধে রাখতে হবে না, কোনো বাড়তি রশি, আঠা কিছুই লাগবে না।

রাষ্ট্রগড়া প্রসঙ্গে, সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় টেনে আনা শব্দ বা নামটা আসলে নেশন, জাতি বা জাতীয়তাবাদ।
আমেরিকা রাষ্ট্রটা আদর্শ নয়। অনেক খুঁত ও ব্যর্থতাও এর আছে অবশ্যই। তবু খুঁটিয়ে দেখেন তো- আমেরিকান রাষ্ট্র গড়তে কোনও ধরনের জাতীয়তাবাদের ব্যবহার আছে কিনা? আমেরিকানেরা কারা ও কোন ‘জাতি’? পঞ্চাশ রাজ্যের সমাহার আমেরিকা। ভারতের চেয়েও বড়। তবু কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নাই কেন? নাগরিক বা খোদ কোন রাজ্যের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ওখানে রশি বা আঠা বলে কিছু, কোনো জাতীয়তাবাদ কী আছে? খুজে দেখেন!

তাহলে আমেরিকা-রাষ্ট্রটা টিকে আছে কী করে? অনেক দুর্বলতা আছে এর, কিন্তু ভাঙার, ভেঙ্গে পড়ার, এক না থাকার কোন কথা নেই।
আর ভারতের বেলায় দেখেন, কংগ্রেসের নিজের পরাজয় ঘটে গেছে বহু আগেই। আর দলটা এখন শুকিয়ে যাওয়াতে কংগ্রেসের আর ভারত ভাঙার কারণ হওয়ার সুযোগ বা উসিলা নেই। বিপরীতে এ থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুল করতে হিটলারি আগ্রাসী হয়ে হিন্দুত্ব, এক “জয় শ্রীরাম” হাতে এগিয়ে আসছে মোদি-অমিতেরা।

এরা আসলে হিন্দুত্বে ডুবে অসুস্থ হয়ে গেছে, আর ততটাই এরা রাষ্ট্র ধারণা ও চিন্তায় অবুঝ। এদের ধারণা হিন্দুর সবকিছুতে শত্রু হল মুসলমান। আচ্ছা তাহলে দ্রাবিড়ীয় যত নেতা আছেন, ডিএমকে এর নেতা স্টালিনসহ এরা কী মূসলমান? কলকাতার সিপিএম বা মমতা এরা? তা হলে? কথা হল, দ্রাবিড়িয়রা বা বাঙালিরা হিন্দু হলেও তারা অমিত-মোদীদের বিরোধী হবেই। কারণ তারা হিন্দি বলয়ের ক্ষমতার নামে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটার বিরোধী। অমিত-মোদীরা এই চোরা আর ভুতুড়ে ক্ষমতায় বিশ্বাসী, এটাই তো আসল সমস্যা।

যেমন দেখেন, কেন্দ্রের হাতে জমা হওয়া রাজস্ব তা বিলি বন্টনে কোন রাজ্য কত পাবে কিসের ভিত্তিতে? – এটা রেখে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর খেয়ালের হাতে, ব্যক্তি-ইচ্ছার বাইরে নিরপেক্ষতা ও অবজেকটিভ নিয়ম বা সুত্র রাখা হয়নি। যেমন মমতা মোদীর দলের না হওয়াতে তিনি মমতাকে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন? মমতাকে যেকোন বিরোধিতার শাস্তি দিতে পারেন। এটা কি ইনসাফ? এর সোজা মানে এক রাজ্যের কাঁধে চড়ে আরেক রাজ্য খাচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী নিজে অথবা যাকে ইচ্ছা তাকে এটা খাইতে দিবেন। এটারই একমাত্র প্রতিকার ছিল ফেডারেলিজম [Federalism]। আমেরিকার মত ভারতেরও এক ফেডারল রাষ্ট্র হওয়া। এটা তো প্রমাণিত এখন যে “মহান” নেহেরু সাহেবের ভারত রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকেই এনিয়ে কোন বুঝাবুঝি ছিল না। আস্থা ও সাহসের ঘাটতিও ছিল। কোন প্রমাণ রাখেন নাই যে তিনি ফেডারেলিজম বুঝতেন।

আবার মোদীকে দেখেন। ভারতের সিবিআই, ইডি বা গোয়েন্দা র – এসব প্রতিষ্ঠান তো আগে থেকেই ছিল। তাতেও মোদি সন্তুষ্ট নন, সম্ভবত  পুরানগুলাকে ততখানি নিজদলীয় মনে হয় নাই। অথবা দলীয় করতে সময় লাগবে, যে সময় তার নাই। এখন বিজেপির প্রভাবে এন্টি টেররিজমের নামে গড়ে নেয়া হয়েছে অল্প বয়সী (২০০৯) নতুন আরেকটা এনআইএ (NIA)।  আর এরপর এধরণের সব প্রতিষ্ঠানকে মোদী ব্যবহার করছেন (আগে কংগ্রেসও কমবেশি করেছে) বিরোধীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের নামে তাদের শায়েস্তা করতে, এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়রানি করতে পারেন এমন হাতিয়ার হিসেবে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীন সরকারের অপব্যবহার থেকে স্বাধীনভাবে কাজের আইন, নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে দেয়ার বদলে উলটা তা ব্যাহত করে নিজদলীয় স্বার্থে এদের ব্যবহার করছেন মোদী। যেমন দেখেন, মোদীর প্রথম গত পাঁচ বছরে বিরোধীদের সমর্থন ছাড়া রাজ্যসভায় তাঁর সরকার কোন বিল পাস করতে পারেননি। এবার সিবিআই, ইডি, র ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে বিরোধীদের বাগে এনেছেন। আর তা দিয়ে এবার মোদী-টু সরকারের প্রথম তিন মাসের আগেই “কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল” – পাস করে নিয়েছেন। বিরোধীরা যে বাগে এসেছে এটা টেস্ট করার জন্য এর আগে মোদী-টু এর নতুন সরকার, তিনি  “তিন তালাক বিল পাস” করে নিয়েছেন। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র একটা অন্ধকারের ক্ষমতা একটা দাগী ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসেবে রেখে দিতে চান মোদী-অমিতেরা। আর মুখে বুলি জয় শ্রীরাম আর হিন্দুত্ব। হিন্দি বা হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, এটা দিয়ে নাকি রাষ্ট্র এক রাখবেন!

মোদী-অমিত হিন্দি-হিন্দুত্বের আড়ালে এসব যা করছেন মূলত এজন্যই ভারত ভেঙে যাবে। ভারত ভাংবার কারণ হবেই মোদী-অমিত। আর তাদের অন্ধকারের ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ।

ভারতে কেন আঞ্চলিক দলের এত ছড়াছড়ি? মানে, রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন ডিএমকে বা মমতার তৃণমূল – বিভিন্ন রাজ্যে এমন দলের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে কেন? এর সোজা জবাব, মূলত দায়ী নেহেরু ও তার কংগ্রেস। মানে তাদের  রাষ্ট্র-চিন্তায় কিছু মারাত্মক ত্রুটি বা ঘাটতি। তাদের সর্বভারতীয় দলের নামে (১৯৪৭-৮৫) উত্তর ভারতের কোটারি ক্ষমতা দিয়ে সারা ভারতের সব রাজ্যকে দাবড়িয়ে চলেছিলেন। এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, অন্ধকারের একটা দাগী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রথম জনক এরা।  আর এখন একেই একেবারে হুবহু কিন্তু আরও আগ্রাসী-হিন্দুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজিয়ে, এবার কংগ্রেসকেই অনুসরণ করছে বিজেপি। আর  প্রথম জমানায় কংগ্রেসের  কালো ভুতুড়ে ক্ষমতার অত্যাচারেই আঞ্চলিক দল খুলার হিড়িক লেগেছিল। এরই ফলশ্রুতিতে বিগত (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময় কালে লাগাতরভাবে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারই একমাত্র বাস্তবতা ছিল।  মানে কংগ্রেস অথবা বিজেপি একা নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠাতার মুরোদে নয়, আঞ্চলিক দলের সাথে একমাত্র  কোয়ালিশন করেই এরা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। এই সময়কালে রেকর্ড বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি এইদুইয়ের যে দল কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের মোট ৫৪২ আসনের মধ্যে নিজ দলের মুরোদে তা প্রাপ্ত মোট আসন তা ১১৫ ছাড়িয়েছিল তারাই গোটা দশেক আঞ্চলিক দলের সহায়তায় কেন্দ্রে সরকার করেছিল; যেখানে হাফ মার্ক বা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল ২৭২ আসন। এটাই ছিল (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময়কালের ফ্যাক্টস ও রেকর্ড।  এর মানে এই সময় কালে কংগ্রেস বা বিজেপির চেয়ে সরকার গঠনে সবসময় আঞ্চলিক দলগুলো মোট সংখ্যা মানে ভুমিকাটা ছিল মুখ্য ও বেশি।

অথচ অমিত এখন “বাণীদাতা” হয়েছেন। উলটা বলতেছেন “আঞ্চলিক দলগুলোই নাকি ভারতের “অনৈক্যের” কারণ“। এটা হল রোগের লক্ষণকেই রোগ বলে চালানো চেষ্টা। ভারত-রাষ্ট্রগঠন কাঠামোর মধ্যে মূল সমস্যা হল, এখানে এক রাজ্যের অন্য রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে খাওয়ার সুযোগ আছে। এই সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। কারণ উত্তরপ্রদেশের কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ নেহেরু ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। কারণ তার ধারণা ও বুঝ ছিল যে ভারতকে জবরদস্তিতে এক রাখতে চাইলে এমন ক্ষমতা কাঠামোই তাকে মাইলেজ বা বিশেষ সুবিধার ক্ষমতা দিবে।  ভারতকে তথাকথিত এক রাখার ভুয়া ডরে নেহেরু এমন কাঠামোতেই ভারত গড়েছেন। এতে  কেন্দ্র যার হাতে থাকে সে এই নির্ধারণ ক্ষমতাটা পায় যে কে কার ঘারে চড়বে ও খাবে। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ব্যবস্থা গড়ার সময়ের মৌলিক কাঠামোগত ত্রুটির জন্য এটা সম্ভব হয়ে আসছে। আর এর লক্ষণ হিসাবে মাত্র প্রায় ৩৮ বছরের মধ্যে কংগ্রেসের একক ক্ষমতার দল হিসাবে বিদায়, পরাজয় ও রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল জন্মানোর হিড়িক দেখা দিয়েছিল। কংগ্রেসের বদলে ঠিক সে জায়গাটাই নিতে আজ নতুন কুতুব হতে চেষ্টা করছে মোদীর -অমিতের বিজেপি। তাই এখন লক্ষণকেই রোগ বলে চালানোর চেষ্টা করছে। অমিত শাহ রাষ্ট্র-ক্ষমতা “জ্ঞানের” বিরাট তাত্বিক হয়ে উঠেছেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার লিখেছে,
আজ দিল্লির অল ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনএর অনুষ্ঠানের মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা আসলে ব্যর্থ কি না? ওই ব্যবস্থা কি দেশবাসীর লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে?’’ তার পরে নিজেই জবাব দিয়েছেন,‘‘মানুষ আশাহত”। তাঁর দাবি,আঞ্চলিক দলগুলি আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। 

এই ইস্যুটাকে ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া দেশে এক দলীয় শাসনের ইঙ্গিত হিসাবে রিপোর্ট করেছে,। কলকাতার টেলিগ্রাফ একদলীয় পার্টির শাসনের ইঙ্গিত বলেছে। এভাবে ডিএনএ, লাইভমিন্ট, এশিয়ান-এজ অনেকেই।
কংগ্রেস বিবৃতি দিয়ে বিজেপির জোট এনডিএ-এর কোয়ালিশন দলগুলোকে জবাব দিবার দাবি জানিয়েছে।  সারকথায় অমিতের যুক্তি হল, কংগ্রেস শক্তহাতে “হিন্দুত্ব” কায়েম এর এক কর্তৃত্ববাজ শাসন জারি করতে পারে নাই দেখেই এসব ঘটেছিল। কাজেই এখন শক্ত হাতে সেটা পূরণ করতে আগ্রাসী হয়ে বিজেপি  শাসন করবে। কী তামসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে অমিতের হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

গৌতম দাস

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2IQ

 

Om Birla during Hindu Mahasabha event (Facebook/om birla) by NEWS18, India

ভারতের আরএসএস বা বিজেপির অঙ্গসংগঠন অনেক। এগুলোর একটা হল, “অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভা”। শুধু ব্রাহ্মণদের নিয়ে সংগঠন এমন আরো আছে – ‘অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ একতা পরিষদ, সর্বব্রাহ্মণ মহাসভা, পরশুরাম সর্বকল্যাণ, ব্রাহ্মণ মহাসভা’ ইত্যাদি। অবশ্য বুঝাই যায় হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিচরণ ধর্মকে পেশা হিসেবে নেয়া অসংখ্য ব্যক্তি বা তাদের দলের মধ্যেই হবে।

গত নির্বাচনের (মে ২০১৯) পরে, ভারতের লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছিল রাজস্থানের এক এমপি, ওম বিড়লাকে। তার পরিচিতি পড়ে তিনি কোনো বড় কেউকেটা কেউ নন মনে হচ্ছে। এমনকি তিনি আইনের ছাত্রও নন। সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পিকাররা আইন পেশার ব্যক্তিত্ব হন। বিড়লা আগে ছিলেন রাজস্থানের প্রাদেশিক সংসদের (ভারতের ভাষায় বিধান সভা বা Assembly) তিনবারের এমএলএ। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বিজেপির যুব সংগঠন – ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার সাবেক রাজ্য সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্থান রাজ্যের কোটা শহরে অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভার এক সভায় যোগ দিয়েছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। কোটা স্পিকারের নিজের নির্বাচনী কনস্টিটুয়েন্সিও। তবে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের শুরু ওই সভায় তার বক্তৃতা থেকে।

তিনি সেখানে ঠিক কী বলেছেন এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বলাটা ঠিক হয়েছিল কিনা, এটাই বিতর্কের বিষয়। কারণ আসলে অনুষ্ঠানস্থল ছিল – রাজস্থান রাজ্যের রাজধানীও নয়, তৃতীয় বড় শহর এই কোটা, যেটা আসলে এক জেলা শহর মাত্র। তাই, ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে সেখানে ভারতের প্রধান পত্রিকাগুলোর সাংবাদিক অনুমান করা যায়, খুব কমই উপস্থিত ছিলেন। তবে সব পত্রিকাতেই ঘটনার নিউজ হয়েছে ছোট, কিন্তু অথেনটিক। কারণ স্পিকার নিজেই এক টুইট করেছেন বা ফেসবুকে ছবি দেয়েছেন ওই সভা প্রসঙ্গে। সেটাই সবার খবরের উৎস। তবে মাত্র তিনটা বাক্যের এক টুইট, তা আবার হিন্দিতে লেখা। অথেনটিক তিনটা বাক্যই সব বিতর্কের উৎস।

স্পিকার বিড়লা তার টুইটারে অনুষ্ঠানের কয়েকটা ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, “সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। যে স্থান তাদের ত্যাগ ও তপস্যার ফল। এ কারণেই সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময় পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন”।

“Brahmins have always had a high status in society. This status is a result of their sacrifice and dedication. This is the reason that Brahmins have always been the guiding light for society,” – নিউজ১৮, এটা একটা টিভির ওয়েব পেজ, থেকে নেওয়া।

কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্ট পড়লে মনে হয়, পত্রিকাটি যেন সবসময় ক্লাস টুয়ের বাচ্চাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ও শেখানোর লক্ষ্যে লিখছে। তবে বলাই বাহুল্য, তারা আবার ঝোপ বুঝে চলে। এবার মনে হচ্ছে কোপ দেয়ার সুযোগ দেখেছে, তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের প্রথম বাক্য, “ব্রাহ্মণেরা সমাজে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য করে বিতর্ক বাধালেন স্পিকার ওম বিড়লা”। আর ও প্রকাশের হিন্দি বক্তব্যের আনন্দবাজারের করা বাংলাটা হল, ‘‘ত্যাগ ও তপস্যার কারণে ব্রাহ্মণেরা বরাবরই সমাজে উচ্চ স্থানে আসীন। তাঁরা সমাজে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন।’’

কিন্তু কথা হচ্ছে এটাই কি ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ভারতীয় হিন্দু সমাজের প্রধান ও সত্য বয়ান নয়!  তাই এমন কথা কী ওম বিড়লাই  প্রথম! ব্রাহ্মণের জাতভেদের বয়ানের ওপর দাঁড়িয়েই কি তাদের সমাজ বিভক্ত নয়? এছাড়া  একালে বিজেপির উসকানি-প্রটেকশনে পুরানা দিন ফিরিয়ে এনে একে ব্রাহ্মণ্য বলশালী কর্তৃত্বের বয়ান হিসেবে সমাজে তা ফেরত আনার চেষ্টা কী চলছে না? দোষ একা যেন কেবল স্পিকারের – আনন্দবাজারের এমন ভান করার দরকার কী?

এই তো গত মার্চ মাসে (২০১৯) ভারতের প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক গিয়েছিলেন উড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির দর্শনে। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ, ব্রাহ্মণমতে একজন দলিত বা নীচু জাতের মানুষ। তাই তার মন্দিরে “প্রবেশ নিষেধ”। এই যুক্তিতে ঐ মন্দিরের ভক্ত ও সেবায়েত- তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের পথরোধ করে বাধা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, এটা “শকিং, চরম বিব্রতকর ও বেয়াদবি আচরণ”। [In a shocking and an extremely embarrassing incident …‘misbehaved with’ ]  আরো লিখেছিল, মন্দির পরিচালনা প্রশাসনের মিটিংয়ে আলাপ হয়েছে, এমন রেকর্ড মোতাবেক কথিত সেবায়েতরা প্রেসিডেন্ট পত্নিকে তাঁর চলার পথের সামনে বাধা দিয়ে তাকে ‘ধাক্কা মেরেছেন” [The group had also shoved the First Lady, as per the minutes of a meeting occurred……… ]। অথচ এনিয়ে কোনো আইনি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোথায় হয়নি। এটাই কি বাস্তবের ভারতীয় হিন্দু সমাজ নয়?

আসলে মন্দিরের দেবতা-রক্ষকদের দাবি মতে, ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে উল্টা, যেন দেবতা নন, দলিতেরা এতই ‘পাওয়ার ফুল’ যে তাঁরা কোনো মন্দির কেন, এমনকি খোদ দেবতাকে ছুঁয়ে দিলে অচ্ছুতেরাই সব কিছুকেই অপবিত্র করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতীয় হিন্দু সমাজের জাত-বিভক্তির উঁচা-নিচা সত্যি খুবই ‘আধুনিক’!

ভারতের স্পিকার ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে যতগুলো অভিযোগ উঠেছে, এসবের মূল কথাটা হল, এটা “জাতবাদ” বা “জাতের শ্রেষ্ঠত্ববাদ”; মানে এটা বর্ণবাদের [racism] মতই আর এক নস্টামি। যেমন, কংগ্রেসের এক প্রাক্তন এমপি, দিল্লির উচ্চ আদালতের নামকরা উকিল কপিল সিবাল বলেছেন, এটা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধযুক্ত মনের, এক মন্তব্য” [senior Congress leader Kapil Sibal said that his mindset reeks of casteism]। তিনি আরও বলেন, “It is this mindset that caters to a caste-ridden unequal India. We respect you Birlaji not because you are a Brahmin but because you are our Speaker in Lok Sabha,” tweeted Kapil Sibal.]। “বিড়লাজি, আমরা আপনাকে সম্মান করি কারণ আপনি স্পিকার, কিন্তু আপনি ব্রাহ্মণ বলে না”।

কথাটা সঠিক। কিন্তু সমস্যাটা হল, কেউ যখন কটু বা পঁচা গন্ধের কোন কিছু নিয়ে সারাক্ষণ সারাদিন নাড়াচাড়া করতে থাকে তাতে একসময় তার শরীর ওই খারাপ গন্ধ-প্রুফ হয়ে যায়। খারাপ গন্ধটা এতই গা-সওয়া হয়ে যায় যে, তার কাছে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি কেউ তাকে মনে করিয়ে দিলেও সে এটা বিশ্বাস করতে বা মানতে চায় না। বিজেপি-আরএসএসের অবস্থাটা হয়েছে তাই। তারা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধপ্রুফ” বা গা-সওয়া হয়ে গেছেন।

হিন্দু-ধর্ম চর্চাকারী সমাজের প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য জাত-ভেদ [caste system]। সমাজের সব মানুষকেই উচা-নিঁচার বিভিন্ন স্তরে এখানে ভাগ করা হয়ে থাকে। তাই হিন্দু ধর্ম মানেই এই জাত-ভেদ প্রথা তার প্রধান অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য। যদিও মানুষের আধুনিক জীবন যাপনের বা শহরায়নের সাথে সাথে জাত-ভেদ ধারণা ও এর চর্চার প্রাবল্য কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই বিজেপির আমলে এটা এখন আবার উল্টামুখী। জাত-ভেদ ব্যবস্থাটাকে অনেক ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ [Brahminism] বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এই সিস্টেমে এর ভিত্তি বা চিন্তাটা হল, ব্রাহ্মণকে শীর্ষে রেখে এটা সমাজের বাকি সব মানুষকে অধস্তন বানায়। এভাবে একটা জাত-ভেদের ব্যবস্থামূলক ধর্ম হয়ে তা নিজেকে হাজির করে থাকে। এই “অধস্তনতার বয়ান” বাস্তবে সক্রিয় ও সত্যি হয়ে যায় এজন্য যে, ওখানে দাবি করা হয়, যাগ-যজ্ঞ-পূজার একমাত্র অধিকারি ব্রাহ্মণের। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ, সবার উপরে।

অনেক হিন্দু ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ শব্দ ও এর অর্থটা না বুঝে ভুল আচরণ, প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন। তাই না বুঝে মনে করে বসে যে কেউ ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ লিখেছে সুতরাং এটা নিশ্চয় হিন্দুদেরকে গালি দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা একেবারেই এমন না। যেমন ইতিহাসবিদ বা প্রাক্তন সাব-অল্টার্ন গ্রুপের সদস্য গৌতম ভদ্র, তিনিও ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তিনি মনে করেন ও  লিখেছেন, বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক”। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দটা কোন গালি নয়, একটা বিশেষ ধরণের চিন্তা ও সেই আদর্শ ও বৈশিষ্ঠকে চিনানোর একটা শব্দ বা নাম এটা।

থিওলজিক্যাল স্কলারদের মধ্যেও, সেই প্রাচীন কালে এমন জাতভেদমূলক-ব্যবস্থা কেন করা হয়েছিল এর এক ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, সেকালের জনগোষ্ঠির পক্ষে সন্তান জন্মদান বা প্রজন্ম টিকানো কঠিন ছিল বলে এটা চালু হয়েছিল। কিন্তু তাতে এটা ন্যায্য-সাফাই হোক আর না হোক, একালে সমাজের হিসেবে এই জাত-ভেদ প্রথা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মূল কারণ এটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের আমল। এখানে নাগরিক অধিকারে অসাম্য, বা মানুষ সকল সমান না এমন বক্তব্যের পক্ষে সাড়া পাওয়া কঠিন। সেটা যাই হোক, এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, কালক্রমে সমাজের এই জাতিভেদ  ব্যবস্থাটাই হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে – একজনের ঘাড়ে চড়ে অন্যদের বা কথিত উঁচু জাতের দাবিদারদের আয়েশি জীবন যাপনের ব্যবস্থার উৎস।

আর যারা একবার জাতের স্তরভেদের সুবিধা লুটেছে তারা আর তা ছাড়তে চাইবে কেন! চাওয়ার কারণ নেই। শুধু তাই না, সমাজের কাছে জাতভেদ প্রথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওই উঁচু জাতের দাবিদারেরাই নিজের অন্যায় সুবিধা অপরিবর্তনীয়, এটা স্থায়ী এমন এক ধারণা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে এখনো। অর্থাৎ ধর্মের নামে জাত-ভেদের ওপর আস্থা বিশ্বাসটা একালে শিথিল বা বাস্তবে তত প্রবল নয় এমন হয়ে পড়লেও, বাড়তি সুবিধা ভোগের লোভে কথিত উচ্চবর্ণরা সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর স্তরে জাত-ভেদের বয়ান বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তা আঁকড়ে সেখান থেকে দাপটের সাথে সব সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। বরং এখানে তাদের মূল অজুহাত হল – তোমরা জাতভেদ মানো না, এর মানে তোমরা ধর্ম মান না। এই যুক্তি তুলে ভয় দেখিয়ে সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে স্তরে জাত-ভেদ কে ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

তবে, এখানে আমাদের একটু সাবধান হতে পরামর্শ রাখব। ব্যাপারটা হল,  সবার কাছেই সবার ধর্মই সবচেয়ে ভাল, এমন মনে করা এটাই স্বাভাবিক। আবার, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করা ঠিক না। তর্ক চলে না সেখানে। তাই এখানে সমাজের আমরা পরস্পরকে একটু স্পেস বা জায়গা করে দিতে হবে। যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অছিলায় কোনো ঘৃণা ছড়ানোর কাজে আমরা যেন নেমে না যাই সেদিকটা খেয়াল রাখাই কাম্য। আর “ব্রাহ্মণরা বদ লোক তাদের উদ্দেশ্য খারাপ” – পাঠককে এমন কোনো ধারণা দেয়া অনুচিত। ফলে সেটা বলা এখানে কোন উদ্দেশ্য নয়। এমন অনুমান সেটা ঠিক হবে না শুধু তাই নয়, বরং অতি সরলীকরণ দোষ হবে।

তাহলে মূল কথাটা কী? সেটা হল, আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে জাত-ভেদ প্রথার চিন্তাকে দুয়ারের বাইরে জুতার মত খুলে রেখে আসতে হবে। অথবা এটা রাষ্ট্রের সাথে সঙ্ঘাতের নয় এমন ব্যাখ্যা বয়ানে, এমন নন-কনফ্রন্টেশনাল ভাবে হাজির করতে হবে।

কারণ জাতভেদ প্রথার সারকথাটা হল, মানুষ সকলে এখানে সমান নয়, সমান হিসেবে গণ্য নয়, মানুষে-মানুষে জাত বলে ভেদাভেদ আছে। অথচ একটা মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ওর কনস্টিটিউশন, গঠন ও মৌলিক ভিত্তি ইত্যাদির বিচারে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রেই সবাই সমান। কোনো অসাম্য সেখানে নেই, রাষ্ট্র তা অনুমোদন করে না। সবাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান, বৈষম্যহীনভাবে আচরণ পাওয়ার যোগ্য, সব সুবিধা সমান পাওয়ার যোগ্য – তাতে নাগরিক মানুষের ধর্ম-বর্ণ-জাত ইত্যাদি যা হোক না কেন।  এবং রাষ্ট্র নাগরিককে বৈষম্য থেকে প্রটেক্ট করতে বাধ্য। কাজেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার আছে, এমন সব বিষয়ে জাতভেদ প্রথার ধর্মীয়-সামাজিক বয়ান নন-কনফ্রন্টেশনাল হয়ে জায়গা ছেড়ে রাখবে।

কিন্তু বাস্তবে ভারত হল এমন – যেখানে পত্নীসহ খোদ প্রেসিডেন্টকেই চরম বৈষম্যের শিকার করা হয়েছে। এক এমএলএ আরেক সহ-এমএলএকে প্রকাশ্যেই ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। অথচ সমাজ নির্বিকার, কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কেউ কেউ এখন বলার চেষ্টা করছেন স্পিকার পদটা নিরপেক্ষ, তাই তার পদত্যাগ করা উচিত। আনন্দবাজার লিখেছে, “নিরপেক্ষতার শপথ নিয়ে যিনি সাংবিধানিক পদে বসেছেন, তিনি কিভাবে একটি বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে সওয়াল করতে পারেন,তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবিলম্বে ওমকে স্পিকারের পদ থেকে সরানোর দাবিও উঠেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা- সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির সুরে কথা বললে এখন সাত খুন মাফ হয়ে যায়। ওমও ছাড় পেয়ে যেতে পারেন। কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের কাছে তাদের আদর্শই শেষ। সংবিধান মূল্যহীন”।

খেয়াল রাখতে হবে যে, ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব সঠিক কি না এটা নিয়ে রাষ্ট্রের বলবার কিছু নেই। কারণ কোন ধর্ম কেমন হবে বা হতে হবে তা নিয়ে কথা বলা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ ছাড়া কোন ধর্মের সংস্কার করা আদৌও দরকার তা, দেখাও রাষ্ট্রের কাজ না।  রাষ্ট্র কেবল বৈষম্যহীন এক নাগরিক সমাজ বজায় রাখা আর মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া ছাড়াই আপসহীন থাকবে। কারণ এটা মৌলিক বিষয়।

ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রায় সব মিডিয়া এখানেই শেষ হয়ে গেছে।  কিন্তু আরও এগিয়ে আনন্দবাজার কিছু একাদেমিকের মন্তব্য এখানে যোগ করেছে। আনন্দবাজার লিখেছে ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র বলেছেন, “বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে ব্রাহ্মণদের মতো অত্যাচারী আর কেউ নেই। ধর্মপদে বলা হয়েছে, মন্ত্র দিয়ে ব্রাহ্মণ হয় না। গুণ থাকতে হয়। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ জাতিভেদ প্রথাকে তুলে ধরে। বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক। ব্রাহ্মণের মূল ক্ষমতা ছিল যজ্ঞের অধিকার। তাই বুদ্ধদেব যজ্ঞের বিরোধী ছিলেন। যজ্ঞের বিরোধিতার মাধ্যমেই সমাজে ব্রাহ্মণদের কার্যত অর্থহীন করে দেয়া হয়েছিল”।  এছাড়া আরো এক সমাজতত্ত্ববিদ অভিজিৎ মিত্রের সাথে কথা বলেছে। মিত্র বলেছেন, “যে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারেন। যিনি গুণের অধিকারী এবং যে গুণ মঙ্গলময় তিনিই ব্রাহ্মণ। তিনি যে কোনও শ্রেণীর প্রতিনিধি হতে পারেন। জ্ঞানের দিক থেকে একটি উচ্চতায় পৌঁছলে সেই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ধরা হতো। সেটাই ছিল ধারণা”। আনন্দবাজার বলছে,  “অভিজিৎ বাবুর বক্তব্য, ‘বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ব্রাহ্মণেরা ব্যর্থ হয়েছেন”।
“ফারাক আছে ব্রাহ্মণে-ব্রাহ্মণেও। যিনি অপরের কাছ থেকে বেশি দান গ্রহণ করেন, তাদের ব্রাহ্মণেরাই নীচু চোখে দেখেন।’ ব্রাহ্মণ হওয়ার অধিকার একটি বর্ণের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করেন অভিজিৎ বাবু”।

কিন্তু আমাদের বক্তব্য এমন হওয়া ঠিক হবে না। কারণ, উপরের দুটা বক্তব্যই মূলত ধর্ম-সংস্কারমূলক। এগুলো একটাও রাজনীতি বা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা নয়। বক্তা একাদেমিক দুজনই ধর্ম সংস্কারের আলাপ করেছেন, তাঁরা আলাপ করেছেন ব্রাহ্মণের তাতপর্য, তাদের কী হওয়া উচিত, না উচিত ইত্যাদি এসব নিয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-রাজনীতির আলাপ করেননি তারা। কিন্তু রাষ্ট্র তো সব ধর্মের নাগরিক সবার। তাই এর এখতিয়ার নেই যে, কোনো ধর্মের সংস্কার হওয়া উচিত কিনা, কেমন হওয়া উচিত এমন কোন আলাপে মগ্ন হয়ে ওঠা। বরং রাষ্ট্র বলবে, জাত-ভেদের আলাপ আপনার ধর্মে থাকুক আর না থাকুক, নাগরিক সবার স্বার্থে আপনাদেরকে আমার নীতিকে – নাগরিক সাম্যের নীতি ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার নীতি – একে সবার উপরে প্রাধ্যন্য দিয়ে মেনে চলতে হবে।

এদিকে, “সিভিল লিবার্টি” নিয়ে কাজ করে এমন এক সংগঠনও ভারতে আছে দেখা যাচ্ছে। আনন্দবাজার আরো জানাচ্ছে, “পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস (পিইউসিএল)- স্পিকারের ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এর রাজস্থান শাখার সভাপতি কবিতা শ্রীবাস্তব”। তাঁর দাবি, “স্পিকারকে ওই মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে”। কবিতা বলেন, “একটি বর্ণ বা জাতকে অন্যদের চেয়ে ভালো বলা বা একটি জাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এটা এক দিকে অন্য বর্ণকে খাটো করে দেখায়, তথা জাতিভেদ প্রথাকে আরো উৎসাহিত করে”।

বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, দল হিসাবে অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

কিন্তু কথা কনস্টিটিউশনে থাকা আর বাস্তবে চর্চা এক নয়। বাস্তবে যদি থাকতই তাহলে তো বিজেপি রাজনৈতিক দল হিসেবে অনুমোদনই পেত না। বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাগরিকবোধের চেয়ে হিন্দুত্ববোধ যদি কারো চিন্তা ও বুদ্ধিতে ওপরে চড়ে থাকে তবে অবস্থা এরকমই হবে।

তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিন্দা করা মন্তব্য দিয়েছেন গুজরাট রাজ্য সংসদের এক এমএলএ ও এক্টিভিস্ট – জিগনেস মাভানি। তিনি তাঁর টুইটে লিখেছেন, “ভারতের জাত ব্যবস্থার পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা – এটা শুধু নিন্দাযোগ্যই না এটা  বিব্রতকরভাবে পিছন-দিকে-হাঁটা। এটা আমাদের জন্য এক তামাশা যে এমন জাত-বর্ণবাদী একজন লোক আমাদের লোকসভার স্পিকার। জনগণের কাছে তার আচরণের জন্য মাফ চাওয়া উচিত”।
এটা একটা ট্রাজেডি যে কনষ্টিটিউশন জাত ব্যবস্থার উচ্ছেদ চায় সেই কনষ্টিটিউশন রক্ষার শপথ নিয়েছেন এই ব্যক্তি।
[Gujarat MLA Jignesh Mevani sought Birla’s apology. “This celebration of Indian caste system is not only condemnable but also cringe-worthy,” he tweeted. “It’s a joke on us that a casteist like him is our Lok Sabha speaker. He should publicly apologise for this attitude.”
He added: “It’s a tragedy that such people take oath on our Constitution that wants to annihilate the caste system.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জাত ভেদের সমাজে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নিজ পারসেপশনের ফাঁদে নিজেই আটকে পড়া

নিজ পারসেপশনের ফাঁদে নিজেই আটকে পড়া

গৌতম দাস

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Im

অবশেষে আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া এনআরসির নামে জেনো-ফোবিয়া [Xenophobia] বা বিদেশিবিদ্বেষ ব্যর্থ হয়ে থেমেছে। কোন যাচাই প্রমাণ ছাড়াই বিদেশিরাই আসামের দুঃখের কারণ – এই ছিল তাঁদের খুবই শক্ত এক অনুমান। সব জিনিষ নিয়ে আন্দাজি কথা বলা যায় না, খুবই বিপদজনক আত্মঘাতি হয়ে যেতে পারে তা। আসামের এনআরসি [NRC, National Register of Citizens] তাই প্রমাণ করল। আন্দাজে বলা কথা, মানে যা প্রমাণ হয় নাই অথচ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেছে এবং তা পপুলার ধারণা – একেই বলে পারসেপশন [Perception]। বাস্তবে প্রমাণ করা বা প্রমাণ পাবার আগেই সারা অসমিয়দের [Assamese] এক দৃঢ় ধারণা, পারসেপশন চলে আসছে সেই 1951 সাল থেকে যে, বিদেশিরাই আসামের দুঃখের কারণ। যে বিদেশি বলতে তারা বুঝাত কথিত বাংলাদেশ থেকে  আসা বাঙালি, আর যেটাকে বিজেপির কল্যাণে ২০১৬ সালের পর থেকে হয়ে গেছিল বাঙালাদেশি মুসলমান। আজ সেই মনে মনে মিঠাই খাওয়ার সুখ – সেই পারসেপশন হয়ে উঠেছে নিজেরই গলার দড়ি। আসামের এনআরসি অবশেষে  প্রায় ১৯ লাখ লোকের নাগরিকত্ব নাই করে দিতে পেরেছে।

ভারতে ইংরাজিতে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নামে পত্রিকা আছে। ওর এক বাংলা ভার্সান আছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা। সেখানে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল,  –‘হিন্দু বিরোধী এনআরসি’, বিজেপি বিধায়ক-সাংসদদের পদত্যাগ দাবি বরাকের হিন্দু সংগঠনের।  অর্থাৎ নাগরিকত্ব হারানো ভুক্তভোগী বা তাদের বন্ধুরা এখন তাদের প্রাণের এনআরসি কে নিজেরাই “হিন্দুবিরোধী” বলছে। শুধু তাই না, ঐ রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “এনআরসি তালিকা থেকে বাদপড়া ১৯ লক্ষের মধ্যে ১১ লক্ষ হিন্দু রয়েছেন তাই এই তালিকাটি ত্রুটিপূর্ণ”।  আর ভিতরে লিখেছে, “……সারা আসাম বাঙালি হিন্দু এসোসিয়েশনের সভাপতি বাসুদেব শর্মা বলেন, ১৯ লক্ষের মধ্যে মাত্র ছয় লক্ষ মুসলমান এবং এর দ্বিগুণ হিন্দু রয়েছেন”। তাই এনিয়ে এলাকার লোকেরা এখন তাদের সংসদদেরকে দায়ী অভিযুক্ত করছেন। লিখেছে, “শনিবার সকালে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, বিজেপির সভাপতি রঞ্জিত দাস, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কবীন্দ্র পুরকায়স্থ-সহ বিভিন্ন নেতারা এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন”। এজন্যই কী প্রবাদে বলে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে তাতে ঐ গর্তে নিজের পড়ারই সম্ভাবনা তৈরি হয়! এনআরসি আজ বুমেরাং সেই প্রশ্ন উঠে গেছে!

শুধু তাই না আসাম বিজেপি এখন এমনই কোনঠাসা যে মানুষের এই গালমন্দ ক্ষোভ যেন পত্রিকায় রিপোর্টেড হয়ে আরও সামাজিক আলোচনা বা সোসাল মিডিয়ায় চর্চায় না বাড়তে পারে তাই  “আসামকে প্রটেক্টেড এরিয়া” ঘোষণা করা হয়েছে।  এর সুবিধা হল, প্রোটেক্টেড এরিয়া ক্যাটেগরির অন্তর্গত এলাকায় সংবাদমাধ্যমের বিচরণে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। বিদেশ থেকে আসা কোনও সাংবাদিক বিনা অনুমতিতে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না।

ওদিকে, প্রতীক হাজেলা [Prateek Hajela]। আসামের সব পক্ষ এখন দোষী করার মত এক ব্যক্তিত্ব পেয়ে বেঁচে গেছে। সবাই একমাত্র তাকেই দায়ী করে, সব দোষ তার মাথায় ঢেলে দিয়ে নিজ নিজ হাত-পা ধুয়ে নিতে চাচ্ছে। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া এনআরসির বাস্তবায়নে প্রধান আমলা, এই ব্যক্তিত্বের নাম প্রতীক হাজেলা। আমাদের বিসিএসের মত প্রশাসনিক ক্যাডার অফিসার, যদিও মধ্যপ্রদেশের এক আইটি গ্র্যাজুয়েট তিনি। ২০১৩ সালে তিনি ছিলেন আসাম রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব। সে সময়ের আদালত নিজের তত্ত্বাবধানে হবু এনআরসি শুরু করতে চেয়ে এর জন্য প্রধান আমলা কে হতে পারেন, এমন সম্ভাব্য নামের প্রস্তাব দিতে বললে তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগোই, প্রতীক হাজেলার নামই প্রস্তাব করেছিলেন।

ভারতের আসাম রাজ্য, যার আরও সারা উত্তরের বাদিকের নিরীহ ভুটানকে বাদ দিলে  বাকিটা চীনা সীমান্ত আর দক্ষিণ দিকে বাংলাদেশ সীমান্ত, এভাবে পুরানা আসাম চিপায় পড়া এক ভূখণ্ড মাত্র। যার কেবল পশ্চিম দিকে এক ছোট্ট কোনা দিয়ে শিলিগুড়ি হয়ে সে পশ্চিমবঙ্গ মানে মূল ভূখণ্ড ভারতের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। ভারতের পলিটিক্যাল এলিট এই অঞ্চলটা নর্থ-ইস্ট বলতে ভালবাসে। বাংলায় কেউ কেউ সাত ভাই বলে। আসলে ভারত স্বাধীনের পর থেকে  নর্থ-ইস্ট বলতে পুরা আসাম প্রদেশ আর ততসংলগ্ন কিছু ট্রাইবাল এরিয়া আর প্রাক্তন কিছু প্রিন্সলি স্টেট এলাকাকে মিলিয়ে বুঝাত। পরে বিভিন্ন সময়ে (১৯৬৩ সালে নাগাল্যান্ড আলাদা হওয়া থেকে সর্বশেষ সম্ভবত ১৯৮৭ সালে অরুণাচলের আলাদা রাজ্য হওয়া ) সেই মূল আসামকে ভেঙে সাতটা ছোট ছোট নতুন রাজ্যের জন্ম দেয়া হয়েছে। এভাবে সব মিলিয়ে সাত ভাই হল – Arunachal Pradesh, Assam, Meghalaya, Manipur, Mizoram, Nagaland and Tripura।

চীন ১৯৬২ সালের ভারত আক্রমণ করেছিল। কথিত আছে, চীনের অভিযোগ ছিল নেহরুর ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় সীমান্তে সিআইএ তৎপরতা চালাতে দিয়েছিল, যা মূলত ছিল চীনের উপর গোয়েন্দাগিরির কাজ। এ ছাড়া ভারত-চীন সীমান্তের এ দিকটায় বহু অংশই পুরানা সেই কলোনি আমল থেকেই বিতর্কিত সীমানার, অর্থাৎ উভয় পক্ষ একমতে মেনে নেয়নি, এমন অনেক পকেট আছে। এসব মিলিয়ে কিছু উত্তেজনা, খোঁচাখুঁচি শুরু হতেই চীন ভারত আক্রমণ করে বসেছিল, “ভারতকে শিক্ষা দেয়ার” জন্য। সে সময় ভারত আসাম ভূখণ্ড রক্ষা করতে আসেনি বা পারেনি। আর বিপরীতে ক্ষমতার সক্ষমতা দেখানোর জন্য চীন আসাম দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু পরে নিজে থেকেই নিজের সৈন্য প্রত্যাহার করে পুরানা চীন-আসাম সীমান্তে ফিরে গিয়েছিল। এখান থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতা ও সরকারগুলোর চোখে আসাম কী, এর একটা ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। সেই থেকে ভারতের এক দুঃস্বপ্ন বা ট্রমার নাম হয়ে থেকে যায় আসাম।

সেকালে সেই ঘটনার বর্ণনা একালে এই গত মাসে আবার কিছুটা তুলে এনেছেন এক ভারতীয় সাংবাদিক দেবাশীষ রায় চৌধুরী [Debasish Roy Chowdhury], যিনি হংকং থেকে প্রকাশিত পত্রিকা “সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট”-এর চায়না ডেস্কের এক ডেপুটি এডিটর। আসাম এনআরসির নাগরিক তালিকা প্রসঙ্গে এর প্রকাশের চার দিন আগে ২৬ আগস্ট তিনি তার এক রিপোর্ট লেখা শুরু করেছিলেন এভাবেঃ –
“১৯৬২ সালের শীতকালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জনগণকে আতঙ্ক গ্রাস করেছিল। রণভঙ্গ দিয়ে পালাতে থাকা ভারতীয় বাহিনীর পিছে ধাওয়া করে চীনের সেনারা আসামে চলে আসার উপক্রম হয়। চীনারা এসে পড়ছে এই ভয়ে সরকারি অফিসাররা সব কাগজপত্র পুড়িয়ে পালিয়ে যাচ্ছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় লোকজনও পালাতে শুরু করে। আতঙ্কে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে থাকা নোট পোড়ানো শুরু হয় এবং কারাগার থেকে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত বন্দীদের ছেড়ে দেয়া হয়। স্থানীয়রা দেখে যে কয়েদিরা চীনের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে। এতে তারা মনে করে চীনারা তাদের ছেড়ে দিয়েছে”।
“২০ নভেম্বর রেডিও ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু জাতিকে পরাজয়ের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, তার হৃদয় আসামের জনগণের সাথে রয়েছে। নয়া দিল্লি আসামকে পরিত্যাগ করবে বলে কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও আসামবাসী মনে মনে সেই ধারণা করে নিয়েছিল। কিন্তু বেইজিং হঠাৎ করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে সেনাদের ফিরিয়ে নেয়। এক মাস আগে হঠাৎ করে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। আসাম ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়। কিন্তু সুরো দেবীর সংগ্রাম তখন শুরু হয়।…”।
দেবাশীষ এটা লিখছিলেন আসলে কথিত ওই সুরো দেবীর জীবনকাহিনী বলতে যেয়ে, যে তখন ওই যুদ্ধ শেষের সময় থেকে এক পরিত্যক্ত এতিম শিশু। পরবর্তীকালে পালিত হিসেবে বড় হয়ে তার বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু কোন সন্তান জন্মানোর আগেই স্বামীর মৃত্যু হয়। এখন সুরো এক বৃদ্ধের দেখভালের কাজ করে বেঁচে আছেন। কিন্তু এনআরসি তাকে নাগরিকত্বহীনের তালিকায় ফেলেছে। দেবাশীষের এই লেখার সাথে আমাদের সম্পর্ক আপাতত এতটুকুতেই।

আমরা দেবাশীষের লেখার এই অংশটুকে এনেছি এ জন্য যে, সেই যুদ্ধের পর থেকে আসামের সাথে ভারতের সম্পর্কও একধরনের এতিমের, সে সমান্তরাল টেনে ধরিয়ে দেয়ার জন্য। ভারতের এক দুঃস্বপ্ন বা ট্রমার নাম হয়ে থেকে যায় আসাম। যে তাকে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার অনুভূতি দিয়েছে। আর সেই থেকে ভারতের ক্ষমতার জগতে এই ট্রমা আর এক মিক্সড অনুভূতি থেকেই আসামের অবকাঠামো উন্নয়ন করা, রাস্তাঘাটসহ সব কিছুতে বিনিয়োগ করা আদৌ ঠিক হবে কি না, এ নিয়ে ভারতের ক্ষমতার করিডোরে  দ্বিধাদ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। না, ঠিক আসামকে শাস্তি দেয়ার জন্য নয়। তবে অনেকটা নিজের প্রসব করা অবৈধ সন্তানের প্রতি যেমন মিশ্র অনুভূতি থাকে, এটা তেমনই একটা কিছু। যার সারকথাটা হল, আসামের অবকাঠামো ভাল উন্নত করে দিলে তা তো চীনেরই ভোগে লাগবে হয়ত। কারণ, যদি চীন আবার আসে?

যদি চীন আবার আসে! ওই অবকাঠামো ব্যবহার করে সহজেই আরও ভারতের ভিতরে চলে আসে? অথবা এই নেতিবাচক অনুমানের বদলে আর একটা যেটা ঠিক যুদ্ধের মতো নয়। সেটা হল, সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আসামের উন্নত অবকাঠামো ব্যবহার করে চীন যদি এরপর বাংলাদেশ হয়ে (বাংলাদেশের সাথে বরাবরই চীনের সম্পর্ক ভালো বলে) এর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেতে আসামের উপর দিয়ে হাঁটাচলা শুরু করে যদি, তাহলে? তবে ভারত কিভাবে চীনকে না করবে অথবা না করতে কি পারবে? সব মিলিয়ে এক বিরাট সিদ্ধান্তহীনতা। যেটা ভারতের নেতাদের মনে পুরানা ট্রমার ওপর বাড়তি এক অনুষঙ্গ। এরই নীট ফলাফল হল, আসামকে সেই থেকে অনুন্নত অবকাঠামো করে ফেলে রাখা।

আসামের এই কোণায় পড়ে থাকা, বাকি ভারতের সাথে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, এটা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে মানে বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান)-এর জন্মের পর যখন থেকে, আসাম আর বাকি ভারতের মাঝখানে বাংলাদেশ ঢুকে থাকা থেকেই। সে কারণে প্রথম এনআরসি বা নাগরিক তালিকা করার তৎপরতা ১৯৫১ সালের। আর এরপর আবার ১৯৬২ যুদ্ধের ট্রমা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আসামের অনুন্নত অর্থনীতির মূল কারণ যোগাযোগ দুর্বল অবকাঠামো, যেখান থেকে কাজ চাকরি সৃষ্টিতে অভাব ও সামাজিক সুযোগ সুবিধার অভাব দেখা দেয়ার শুরু। কিন্তু সে দিকে না তাকিয়ে, কারণ হিসেবে অবকাঠামো দুর্বলতাকে চিহ্নিত না করে বরং আসামে মানুষ বেশি হয়ে গেছে, “বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা মনে করা”, এই বিদেশী বিদ্বেষ [Xenophobia] জেগে উঠা বা পরিকল্পিতভাবে উঠানো, আর তা কেন্দ্র সরকারের হাতে তার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা- এটাই আসামের  অরিজিনাল বা মূল সঙ্কট।

কিন্তু এসবের চেয়েও এসব থেকেই আর এক বড় সঙ্কট এখন ‘পারসেপশন’ [Perception]। কিসের পারসেপশন? পারসেপশন মানে যাচাইয়ে প্রমাণ হওয়া ছাড়াই আন্দাজে একটা অনুমান দাঁড় করানো, এবং দৃঢ়ভাবে তা বিশ্বাস করা। এমনভাবে বিশ্বাস করা  যা থেকে মানুষ এরপর থেকে ভুলে যায় যে সেটা একটা অপ্রমাণিত অনুমান মাত্র ছিল। যেমন, আসামে বহিরাগত বাঙালিরাই আসল সমস্যা কি না তা কি বাস্তবে মাঠে যাচাই করা হয়েছে? জবাব হল, না, কখনোই হয়নি। এ ছাড়া আগে এতক্ষণ এটাই বলেছি, আসামের মূল সমস্যা সব ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামো দীর্ঘ দিন বিনিয়োগহীন পড়ে থাকা বা কেন্দ্রের ফেলে রাখা। কিন্তু বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা- এই পারসেপশন শুধু জেঁকে বসে গেছে শুধু তাই নয়, এর ওপর দাঁড়িয়ে পুরো আসাম সমাজ সে সময় (১৯৭৯-৮৫) এতই উন্মত্ত হয়ে গেছিল যে তারা ভারত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হতে নিচ্ছিল। আর তা ঠেকাতে সেকালের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী “১৯৮৫ সালের ‘আসাম একর্ড” চুক্তি করেছিলেন, যার মূল পয়েন্ট ছিল “বহিরাগত খেদাও”।

কোন পারসেপশন আর বিচার-আদালত একসাথে চলতে পারে না। চালাতে চাইলে ওর নাম হয় শাহবাগ।  বিচার-আদালত মানেই তাতে কোন একটা জিনিষ সত্য প্রমাণিত হতেও পারে, আবার না-ও পারে। বিচার শেষের আগে এর কোনোটাই সঠিক বলা যাবে না। এই দু’টি অপশনই ঘটতে পারার সুযোগ খুলে রাখতে হবে। কোন বিচারে বসার আগেই যদি আগাম তা না খুলে রাখা হয়, তবে ঐ বিচার শুরু করার মানেই হয় না। ওটা বিচার বলাই যাবে না। কারণ, যদি ধরেই নেই পারসেপশনই সত্য তাহলে আর যাচাই-বিচারে বসার দরকার কী?

আসামের তাই বহিরাগত বাঙালিরাই সমস্যা – এই পারসেপশন, এটা আর সত্য কি না তা আর যাচাইয়ের কোনো সুযোগই নেই। অন্তত যতক্ষণ এটা ‘পারসেপশন’ জারি থাকবে। হয় চোখ বন্ধ করে একে মেনে নিতে হবে আর নাহলে পারসেপশন ফেলে দিয়ে সত্যতা যাচাইয়ে নামতে হবে। একসাথে বিচার আর পারসেপশন চলতে পারবে না।

কিন্তু আসামে তা হচ্ছে না। হয়নি; অথচ তারা এনআরসি করতে নেমে গিয়েছিল। মানে যাচাই করতে নেমেছিল। কারা নাগরিক তা যাচাইয়ে নেমেছিল। কিন্তু এর ফলাফলে তাদের পারসেপশন ভুল প্রমাণ হলে, আসামের বাসিন্দারা কি তা মেনে নেবে? জবাব হল যে কখনোই না।
সে সুযোগ রাখা হয়নি। না রেখেই এনআরসি বা নাগরিকত্বের বাছবিচারে নামা হয়েছে। এমনকি আদালতের বিচারকেরাও ছিল বিরাট বেকুব। একটা বিদেশী বা বহিরাগত খেদাওয়ের আন্দোলন সফল হয়ে গেছে, একটা চুক্তি হয়েছে তাদেরই পক্ষে। এটা তো আদালতের জানাই ছিল। তাহলে তা আবার আদালতের মাধ্যমে “নাগরিকত্ব যাচাইয়ে নামার” মানে কী?  কারণ, “বহিরাগত খেদাওয়ের” আন্দোলন করা ভুল ছিল তা প্রমাণও হতে পারে, সেই অপশন ত খুলে রাখা হয়নি।

কাজেই এই অপশন খুলে না রাখার কারণে ২০১৩ সালে আদালত তো মূলত নাগরিকত্ব যাচাই বিচারের প্রক্রিয়া শুরুর আদেশ দিতেই পারে না। তবু হয়ত হতে পারত এক শর্তে যে, আদালতকে পরিষ্কার ঘোষণা দিতে হত, নাগরিকেরা যেন তাদের মনে গেড়ে বসা অনুমান বা পারসেপশন ভুল প্রমাণ হয়ে যেতে পারে, সে জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। অথচ আদালত এমন কোনো ঘোষণা দিয়ে রাখেননি। মানুষকে সাবধান করেনি। দেখা যাচ্ছে, আসলে আদালতও ছিলেন অহমীয়দের মত একই পারসেপশনের শিকার।

এসবেরই ফলাফল হল, এখন এনআরসির পরিণতি দেখে আসামের সব পক্ষই অখুশি। যদিও বিজেপি জানত যে এটাই হতে যাচ্ছে। তাই তা আগে টের পেয়ে দুই মাস আগে আদালতের কাছে আবার বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তের ২০ শতাংশ ডাটা রি-ভেরিফিকেশন বা পুনঃ যাচাই এর দাবি তুলেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল আবার যাচাইয়ের নামে এবার তারা ডাটায় হাত ঢুকাবে আর ‘পারসেপশন’ মোতাবেক ফল বের করে আনবে।

কিন্তু আদালত এমন পুনঃ যাচাইয়ের আবেদন নাকচ করে দেয় এই অজুহাতে যে, প্রতীক হাজেলা নিয়মিত যে অগ্রগতি রিপোর্ট দিত, এর শেষ রিপোর্টে বলা ছিল, ইতোমধ্যে ২৭ শতাংশ ডাটা পুনঃযাচাই করা হয়ে গেছে। আর এতেই বিজেপির কূটকৌশল মারা পড়ায় সবার আগে তারাই এনআরসির সব ব্যর্থতার জন্য প্রতীক হাজেলাকেই দায়ী করে মিটিং করেছিল। এরপর আসামের বহিরাগত খেদাও – এই পারসেপশনের সব পক্ষই বিজেপিকে অনুসরণ করে প্রতীক হাজেলার মাথায় সব ব্যর্থতার ভার চাপিয়ে দিয়েছে।

আবার এখনো যা করা হচ্ছে যে সব ব্যর্থতার ভার চাপানো – সেটাও তো ঠিক হাজেলার অপরাধ নয়। কারণ ব্যাপারটা হল, নিজের অজান্তে তিনি একটা সত্যি কথা বলে রাখার জন্য বিজেপির এতে পরবর্তিতে হাত ঢুকানোর সুযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়া- এটা তো হাজেলার কোন অপরাধ নয়। এখন যদি কোনো টেকনিক্যাল কারণে প্রতীক হাজেলাকে দায়ী করার সুযোগ না থাকত তাহলে কী হতো? সোজা হিসাব, ‘পারসেপশনে’ মজে থাকা আসামের সব পক্ষই আদালতকে দায়ী করত, এর একটা বিরাট সম্ভাবনা ছিল।

এদিকে আদালতের নির্দেশে প্রতীক হাজেলা এখন সব ধরনের পাবলিক উপস্থিতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। এর লাভালাভ আদালতের পক্ষেও কম যাচ্ছে না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

_

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “নিজের পারসেপশনে আটকে পড়া“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু মনে করতে পারি না, এটা অবৈধঃ

গৌতম দাস

২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৭ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2GL

 

20 Aug 2019, Dhaka, Press Conference.

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তাঁর দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য চলে আসছে, তা আমাদের কারও অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে সব ছেড়ে দিয়ে আরেকবার লুঠ হবার বা হেরে যারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন নির্বাচন করেই হোক, চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও চলতি বছরের মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে ইতোমধ্যে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। ওদিকে রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হল, আসামের এনআরসি [NRC] ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও উৎপাত তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ’ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি, এখন মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন – এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিয়ে চলছিলেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রায় দুসপ্তাহ আগে ভারতে গত ৭ আগস্ট দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক  আলোচনার এজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু তা সত্বেও ভারতের [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart] কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই আমরা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও আমাদের সরকারকে সতর্ক [আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না] করেছিলাম।  ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছিলাম দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় [‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মতান্তর, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি] কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠক নিয়ে আলাদা আলাদা যার যার দেশের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ’প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১৪ দিনের মাথায় এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ [Assam NRC is India’s internal matter: Jaishankar] বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এই এক ইস্যু আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট, আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু যতই উত্তেজনা আর উস্কানি তৈরির চেষ্টা হোক না কেন ভারতের সরকারী অবস্থান হল, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যার মানে হল আসামের এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণ প্রক্রিয়ায় কেউ নিজেকে নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলেও এজন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না, কারণ, বাংলাদেশ এব্যাপারে সংশ্লিষ্টই নয় বলে ভারত মনে করে। তাই এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করার চেষ্টা কমে আসবে হয়ত, এছাড়া কোন সরকার সংশ্লিষ্ট সদস্য এমন অভিযোগ তোলার কথাই না। তাও কেউ তুললে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি এই প্রথম আমাদের হাতে এল, যা আমাদের সরকার বা যে কেউ ব্যবহার করতে পারব। একটা উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া যাওয়াতে আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ নই।

NRC in Assam is India’s internal matter, says MEA S Jaishankar, S External Affairs Minister. File photo   –  The Hindu

দুঃখের কথা হল, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” [Mr. Jaishankar said, “It’s an internal matter.” – এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার প্রায় কেউই ধরতেই পারেন নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জয়শঙ্করের এই সফরে কোন কোন ইস্যুগুলো মুখ্য হয়ে উঠবে এসব আগেই জানা না থাকার কোন কারণ নাই। বুঝা যাচ্ছে এনিয়ে মিডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিটের কারও এব্যাপারে কোন হোমওয়ার্ক নাই।  জয়শঙ্করের এই সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে ভেসে উঠা বা উঠতে পারত এমন ইস্যুগুলো হল, ১। তিস্তা বা ৫৪ নদীর পানি,  ২। সীমান্ত হত্যা, ৩। অসম বাণিজ্য, ৪। আসাম এনআরসি ইস্যু, আর ভারতের দিক থেকে ৫। বাংলাদেশের পোর্টগুলো ব্যবহারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, ৬। ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ, ৭।  কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি অন্য কিছু। এসবের মধ্যে আসাম এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের মিডিয়ার চোখে হওয়া উচিত ছিল এক নম্বর ইস্যু। কারণ, ৩১ আগষ্ট তারিখে আসামে ফাইনাল নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশবিরোধী প্রচার আর অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে শ্লোগানে সব ছেয়ে ফেলার হতে পারে যে “অনুপ্রবেশকারিরা ফেরত যাও” । কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের মিডিয়াও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে এব্যাপারে ছিল পুরাই উদাসীন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, এমনকি জয়শঙ্করের সফরে সাংবাদিক সম্মেলন কাভার করে যে মিডিয়া রিপোর্ট পরদিন ছাপা হয়েছে সেখানেও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে প্রায় কিছুই নাই বললেই চলে। অথচ জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” সংলগ্ন যেকোন বক্তব্য হওয়ার কথা ছিল শিরোনাম। পারলে এই কয়েক শব্দে দেয়া জয়শঙ্করের বক্তব্যের ভিডিওসহ রিপোর্টিং হত সবচেয়ে উপযুক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন কোন জায়গায় আছে এর এক বিরাট মাপকাঠি হয়ে গেল – জয়শঙ্করের সফর বা “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” নিয়ে রিপোর্ট। কোনভাবেই এখানে হাসিনার ফ্যাসিজমের শাসন, মিডিয়ার উপর সরকারি চাপ ইত্যাদির অজুহাত তোলারও সুযোগ নাই। কারণ মিডিয়া মূলত ১. কোন ইস্যুটা এই সফরে এক নম্বরের সে ইস্যুটাই বুঝে নাই, এটা প্রমাণিত। ২. ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয় যে আমাদের মিডিয়ায় জয়শঙ্কর বলেছেন “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” এটাকে প্রধান শিরোনাম করলে বা ভিডিওওতে দেখালে সরকারের বা ভারতের দিক থেকে আপত্তির কিছু আছে। কাজেই এটা ছিল সরকারি কোন চাপ ছাড়া ইস্যু। ৩. এটা ছিল বাংলাদেশের বার্ণিং আর জেনুইন স্বার্থের ইস্যু। ৪। এমন রিপোর্ট হাসিনার পক্ষেই যায়। কাজেই হাসিনাকে দোষ দিয়ে মিডিয়ার নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার কোন সুযোগই নাই।
এছাড়া উলটা করেও দেখানো যায়  – আমাদের মিডিয়া বিকল্প কী বা কাকে তারা শিরোনাম করেছে? – এটা থেকেও প্রমাণ হয় যে মিডিয়া ইস্যুটা বুঝেই নাই। দেখা গিয়েছে বেশির ভাগের কাছে ইস্যু হয়েছে  – তিস্তা ইস্যু। যার সার কথা হল তিস্তা নিয়ে কিছু হল না এটা দেখিয়ে ভারতকে বেইজ্জতি করব, হাসিনা কত অযোগ্য তা দেখাব। এগুলো সম্ভবত বামপন্থি মধ্যবিত্তের চোখ ও সেই মাপের বুঝাবুঝি। যেমন দেখেন বাম গণতান্ত্রিক জোট – এদের কারবার [জয়শঙ্করের সফর : তিস্তা চুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস না থাকায় বাম জোটের ক্ষোভ]। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা নিজেদের সবার উপরের নিজেদের বুঝমান মনে করে। তাই তাদের বুঝে আসাম এনআরসিতে কি হচ্ছে সেটা না, তিস্তা এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ।  কেউ কেউ আরও বাম বুদ্ধিমান হতে চেয়ে  – “ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ” এটাকে মূল শিরোনাম করেছে। এমনকি যাকে প্রফেশনাল পত্রিকা বলে মানতে চায় অনেকে সেই প্রথম আলোও  দেখা গেছে ইস্যুটা বুঝেই নাই। তাদেরও আমলে আসে নাই। তাই  শিরোনাম, ২২ আগষ্টের –  “জয়শঙ্করের সফর: বাংলাদেশের বিষয়গুলো আসেনি, ভারত স্বস্তি পেয়েছে—বামজোট”। ২২ আগষ্টের  শিরোনাম,  “মোদির কিছু বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”

জয়শঙ্করের নিজে যেচে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে স্বীকার করে নিবার অর্থ হল, যে ভারত নীতিগতভাবে মানল যে ১। ভারতে কেউ নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণে করতে না পারলেও – এর পরের বাক্য হবে – সেটাও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।  ২। ভারত অফিসিয়ালি বলতে পারবে না যে ঐ লোক তাহলে বাংলাদেশের; অথবা বাংলাদেশের থেকে আসা গোপনে প্রবেশকারি বা অনুপ্রবেশকারি। ৩। বাংলাদেশকে বলতে পারবে না যে আসেন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি।

তাহলে দাড়াঁলো কী? যেটা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল যে, জয়শঙ্করের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরের দিনে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার লীড হেডলাইন হত – আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর। সেটা হয় নাই। এতে আমাদের মিডিয়া সেন্সের করুন হাল আমরা দেখলাম। এমনকি পুরা জয়শঙ্করের সফর কাভার ছাড়াও আলাদা করে আর একটা রিপোর্ট দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। আমার কথাটা বুঝা যাবে শুধু Jaishankar bangladesh NRC – এই তিনটা শব্দ লিখে গুগুলে সার্চ দেন দেখবেন সার্চের ফলাফলে প্রথম দুই পাতা জুড়ে ভারতীয় পত্রিকার নাম আসবে যাদের রিপোর্টের শিরোনাম হল, “NRC in Assam India’s internal matter: Jaishankar”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের মিডিয়া কিন্তু ঠিকই বুঝেছে তাদের রিপোর্টের শিরোনাম কী করতে হবে।  এমনকি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য আরও কী নতুন অর্থ-তাতপর্য তৈরি করছে সেটা নিয়ে দ্যা হিন্দু পত্রিকা লিখেছে,   His statement is significant as it indicates India’s official position just days before the final NRC list is to be published on August 31. In July, Mr. Momen had expressed concern about the possible fallout of the final list on Bangladesh.

তাহলে দাঁড়ালো যা তা হল, আমরা কমিউনিস্ট প্রগতিশীল ধরণের বুঝমান খেতাব পেতে যত আগ্রহী, সাধারণ কান্ডজ্ঞান দেখাতে ততটাই বেখবর। কি আর করা – কাজেই এখন আসেন আমরা আপাতত দোয়া-কামনা করি যাতে কান্ডজ্ঞান জাগে। আর এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। এখনও বিরাট এক কাজ রয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আসামের এনআরসি ইস্যুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন আগামী ৩১ আগস্ট। কাজেই ভারতের সরকারী অবস্থান বাংলাদেশকে জড়ানো বা দায়ী করার না হলেও বাংলাদেশবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী পিছন থেকে সংগঠিত তথাকথিত “অসমিয়া স্বার্থের” দাবি তোলা হতে পারে।  তাই আগে থেকেই এর পাল্টা আমাদের বয়ান অবস্থান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। এছাড়া জয়শঙ্করের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কেমন গুরুত্ব দিতে হবে সেখানে এব্যাপারটা বুঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এর আলোকে কোন মিডিয়া রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।
যেমন বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “আসামের নাগরিকত্ব ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। ভিতরে লিখেছিল – “সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি”।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে – ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান …’। এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বুঝানো হচ্ছে যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর কেন এত সহজে ‘এনআরসি অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানলেন?
জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হল, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হল, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে শহরের বাইরের ক্যাম্পে রাখবে তারা; এসব ক্যাম্প ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে; আর যদিও অনেক পরে এদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মত নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। আর সম্ভবত অ-মুসলমানদের বেলায় এটা ঘটবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ এমনভাবে  করতে চান।
দুই. সামনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কাজ, দম ফেলার সময় নাই। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে এবার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা নিজের অবস্থানের পক্ষে রাষ্ট্রগুলোকে আনার কাজে – মুখোমুখি হবার সময় তাদের। তাই  অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হল ভারতের কাছে এখনকার আসাম এনআরসির চেয়েও আরেক বড় ইস্যু হল কাশ্মীর, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে  এখন থেকেই আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,  ২৪-২৬ আগষ্টে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক চলছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, সে এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদী দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা নেতারা কথা বলতে চায়। মোদী সেখানে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, এখন অলরেডি তিনি প্যারিসে, যেখানে এবারের জি৭ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

India’s risky Kashmir power grab, VOX

এর এক সোজা অর্থ কাশ্মীর আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু একেবারেই নয়, তা প্রকারান্তরে এখানে মেনে নেয়া হয়েছে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথের এক দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আরও রাষ্ট্রকে পক্ষে আনতে ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভাগুলো শুরু হয়ে যাবে; যেখানে বলাই বাহুল্য কাশ্মীর সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু-সমর্থক জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে – ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। এছাড়া আর একটা দিক আছে। ভারতের হিন্দু-মনের চোখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আসলে পুরান একক পাকিস্তান – “মুসলমানের” পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু বলে মেনে নেওয়া – এর অর্থ বাংলাদেশ যতটা ভাল দেশ ইমরানের পাকিস্তান ততই খারাপ, সহি না – এমন ইঙ্গিত তৈরি হয় এখানে। এটাকে ভারত তার বড় পাওয়া মনে করে, আর যেখানে কাজে লাগবে সেখানে ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি।

কিন্তু কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, একেবারেই না। সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং যে কোন জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু আমরা মনে করতে পারি না, কারণ জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী এটা অবৈধঃ
কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। মুল কারণ, কাশ্মীর সমস্যা আসলে জাতিসংঘের চার্টারের [Charter of the United Nations] আলোকে মিটাতে আমরা বাধ্য। আর কাশ্মীর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হল, কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কোন রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরি দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে এটা মেনে নেওয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের কেউ নয়। বরং কাশ্মীরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক। কাজেই হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, কোন চুক্তি করে দিয়েছে – এই তুলে দেওয়া বা চুক্তি আইনত অকেজো, মুল্যহীন। কারণ জাতিসংঘের দৃষ্টিতে কোন রাজা অথবা উপনিবেশ মালিকপ্রভু কোন ভুখন্ডের মালিক হতে পারে না। ঐ ভুখন্ডের মালিক, শাসক কে তা নির্ধারণের একমাত্র হকদার ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়ার মত হয়ে যাবে। এর ফলশ্রুতিতে ঐ দখলকারি দেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যেতেও পারে। সাদ্দামের ইরাকের কুয়েত দখল করা যেভাবে অবৈধ গণ্য হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। নিজ ভুখন্ডের শাসক নাগরিক নিজে অথবা তার সম্মতি নেয়া এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকার। নিজ ভুখন্ডের শাসক হল নাগরিক নিজে বা তার সম্মতি নেয়া প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।  তাই কোন ভুখন্ডের উপরে ওর বাসিন্দাদের বাইরে অন্য কোন রাজতন্ত্রী (Monarchy) অথবা কলোনিয়াল (Colonial) মালিকানা শাসক দাবি করাকে জাতিসংঘ অবৈধ মনে করে। অবৈধ দখলদার মনে করে।

UN Declaration 1942

জাতিসংঘের জন্ম দলিল ও ভিত্তি

  • ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই নীতি মেনে ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
  • পরে ঐ বছর শেষে ১৯৪২ সালের ০১ জানুয়ারি এতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। অর্থাৎ ঐদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এবং আগের চার্চিল ও রুজভেল্ট এভাবে মোট চার রাষ্ট্র আর এক ছোট দলিলে লেখেন ও স্বাক্ষর করেন এই বলে যে তারা আগের  Atlantic Charter  এর যৌথ ঘোষণার সাথে একমত হয়ে এই স্বাক্ষর করছেন।
    পরবর্তিতে এই চার রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত দলিল এটাই জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা [1942: Declaration of The United Nations] মানা হয়।
  • পরের দিন ০২ জানুয়ারি ১৯৪২, আরও ২২ রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেছিল। জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করা হয় এভাবে।
  • পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালে পুর্ণ গঠন দলিল লেখা শেষ হলে যেটাকে জাতিসংঘের চার্টারের [UN Charter]  বলা হয়, ওর ১১০ নম্বর ধারা মতে ঐ গঠন দলিলে অন্যান্য রাষ্ট্গুলো স্বাক্ষর করাতে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছে

এই ভিত্তিতেই পরবর্তিতে অসংখ্য গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থগত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। একালে সেসব কনভেনশন, আইন ইত্যাদির হেফাজতকারি ও তদারককারি হল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিল (UNHRC)। কাজেই জাতিসংঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

এছাড়া আর সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীর প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ
১। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,  রাজা হরি সিং ভারতের নেহেরুর সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে  কাশ্মীরের বৈধ প্রতিনিধি না।
কাশ্মীরের জনগণের কোন রায় নিয়ে তিনি নেহেরুর কাছে যান নাই।
২। গিয়েছিলেন রাজা হিসাবে, একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন রাজা হিসাবে।
তাই জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,এই চুক্তি অবৈধ, অকেজো মুল্যহীন।
৩। যদি ধরেও নেই এই দলিল বৈধ তাতেও সমস্যা হল এটা ঠিক কোন একসেশন চুক্তি নয়। এটা আসলে করদ রাজ্য চুক্তি। ঠিক যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে হরি সিংয়ের প্রিন্সলি স্টেট চুক্তি ছিল – হরি সিং নেহেরুর সাথে তেমনই এক চুক্তি করেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘের চোখে করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি সেটা আরও অগ্রহণযোগ্য, তাই অবৈধ। কারণ এর ভিত্তি কলোনি বা কলোনিয়ালিজম। নেহেরুর রিপাবলিক ভারত কী করে কাশ্মীরের জনগণকে এক কলোনিয়ান করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি করতে পারেন?
৪। আটল্যান্টা চুক্তি বা জাতিসংঘ ঘোষণার সারকথা ও মূখ্য ভিত্তি হল “কলোনিয়ালিজম অবৈধ, তাই বাতিল”। ভুখন্ডের শাসক বা মালিক ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা। বিদেশি কলোনি মাস্টার ভুখন্ডের কেউ নয়।  মনে রাখতে হবে আটল্যান্টিক চার্টারের কথা। কলোনি মাস্টার চার্চিল সেখানে তৃতীয় ধারায় স্বীকার করে নিচ্ছেন যে – ” Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them; । অর্থাৎ কোন ভুখন্ডের মালিক সেই ভুখন্ডের বাসিন্দা এই নীতি মেনেই ঐ চার্টার চুক্তিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দাসখতের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে নিয়েছিলেন রুজভেল্ট। আর এই শর্তেই তিনি হিটলারের হাতে থেকে বৃটিশসহ ইউরোপকে বাচিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারাই ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদেরককে অর্থ ও অস্ত্রসহ সবরকম সহায়তা করেছিলেন।

অতএব ভারতের কনষ্টিটিউশনে বা ৩৭০ ধারাতে যাই লেখা থাক, অথবা এই মাসে এখন ৩৭০ ধারা রদ -বাতিল করে ভারতের রাষ্ট্রপতির যে ঘোষণাই দেয়া হোক কাশ্মীর নিয়ে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিসহ সবই অবৈধ। মূল কারণ, কোথাও কাশ্মীরের জনগণ – সেই মুল বাসিন্দাদের – কোন ম্যান্ডেট বা রায় নেয়া হয় নাই কোথাও।

তাই কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘ চার্টার, জাতিসংঘের নানান গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসংঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। অন্তত জাতিসংঘের সদস্যপদ বজায় রেখে। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগই নেই যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মিটাতে হবে।

সুতরাং জাতিসংঘ চার্টার অমান্য করে বাংলাদেশেরও – কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু মনে করা, ঘোষণা করা ভিত্তিহীন। শুধু তাই না এটা আত্মঘাতি। এটা যেকোন পর্যায়ে বাংলাদেশেরই সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

গৌতম দাস

১২ আগষ্ট ২০১৯, ০০;০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Fc

[সার সংক্ষেপঃ অবিভক্ত ভারতে যাদের জন্ম বা উত্তরসুরি আমাদের সকলের এক “আদি-পাপ” হল, সেই রামমোহন রায়ের তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র-ধারণাটা ওর মূল ফিচার অথবা কী পয়েন্ট ও বৈশিস্টগুলো কী থাকতেই হয় তা আমরা রপ্ত করতে পারি নাই। অথচ ভারতে আধুনিকতা এসে গেছে, প্রগতিশীলতাও বলে গর্ব ফুটিয়ে বেড়াই। আসলে তো মনে মনে হিন্দুত্বের বাসনা আর বর্ণহিন্দুর জাতবিচারে শ্রেষ্ঠত্ব ভাবনা সব জায়গায় ঘুরে ফিরে আগের মতই আধিপত্যের আসনে বসে আছে। কিছু বদলাতে দেয় নাই। যে দেশে সমাজের সবখানে  বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথা সক্রিয় ও সবলভাবে টিকে আছে সেদেশে রিপাবলিক রাষ্ট্র কার্যকর আছে , নাগরিক-নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য নাই এমন দাবির রাষ্ট্র আছে – এর চেয়ে ঠাট্টা আর কী হতে পারে?  এছাড়া, এই যেমন ধরেন কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তান কোনদিকে যোগ দিবে?  না, এটা কোন এক হরি সিং রাজার খায়েস কোনদিকে এর দ্বারা নির্ধারিত হবে না, সে মামলা এটা একেবারেই নয়। তাহলে সমস্যাটা কী? গোড়ার সমস্যা হল আপনি হিন্দুত্ব-ছাড়া অন্য কোনভাবে রাষ্ট্র বুঝতে বা গড়তেই রাজি না। এটাই সমস্যার গোড়া। এখন ভেবে দেখেন হিন্দুত্ব-ছাড়া রাষ্ট্র বুঝতে না পারা বা চাওয়ার কারণে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী এক হিন্দুত্বই নির্ধারণ করে দিয়েছে – বলতে পারেন বাধ্য করে বলছে যে মুসলমান তুমি মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র কর। এভাবে একেবারে জবরদস্তিতে এদিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।  অথচ আবার এর জন্য দায়ী করা হয়েছে উলটে মুসলমানদেরকেই।

অথচ সহজ সমাধান ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কোন নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না, কাউকে করতেও দিবে না, হতে দিবে না।  যেকোন ধর্ম, কিংবা পাহাড়ি-সমতলি, সাদা-কাল, বাংলা বা হিন্দিভাষী ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলেই রাষ্ট্রের চোখে সমান নাগরিক হবে – এমন রাষ্ট্র গড়তে হত। এক সমান নাগরিক পরিচয় ছাড়া আর কোন পরিচয়ে রাষ্ট্র কাউকে চিনে না। এই ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র, যেটাকে ইতিবাচকভাবে অনেকে সাম্যের (equality) রাষ্ট্র বলে বুঝে। কিন্তু হিন্দুত্বের নেহেরু ভাবলেন কেউ বুঝে ফেলার আগের সেরে ফেলবেন ব্যাপারটা; তাই তিনি কাশ্মীর যেন হরি সিং-এর ব্যক্তি সম্পত্তি ও সে অনুসারে সিদ্ধান্তের বিষয় বলে চালিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু কথায় আছে, পাপ তো কারও  বাপকেও ছাড়ে না।  তাই আমরা সকলেই আবার ব্যাক-টু-প্যাভেলিয়ান। কাশ্মীর ইস্যু আমাদের সকলকেই আবার ১৯৪৭ এর পুরানা অমীমাংসিত প্রশ্নে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তফাত এটাই যে এখন হিন্দুত্ব দগদগে সর্বাঙ্গে ঘাঁ-এর বিভৎস শরীর নিয়ে সে হাজির। তাই সকলেই চিনে ফেলতে পারছে। হিন্দুত্বকে আজ তাই সহজে সকলেই চিনতে পারে। সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে। আরও ভাঙ্গবে। কিন্তু শুধু চিনতে পারা নয় দরকার এক্ট করা, দৃঢ় পদক্ষেপের একশন।]

 


কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এটা নেহেরু-গান্ধীসহ ততকালীন কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারাও জানতেন ও মানতেন। কেন? কিন্তু এই “অংশই” বা করে নিবার সঠিক বা জনসমর্থিত পথ ও পদ্ধতি হত কোনটা? এটা সেই ১৮১৫ সালের রামমোহনের রেনেসাঁ থেকে একাল পর্যন্ত ভারতের নেতাদের কারই জানা হয় নাই। বরং কমবেশি সকলেরই বেকুবি ধারণাটা হল, ব্যাপারটা বোধ হয় বলপ্রয়োগ করেই করার বিষয়।

বৃটিশ-ইন্ডিয়ার প্রশাসন মানে কীঃ
আমাদের অনেকের ধারণা, অবিভক্ত ভারত মানে একটা একক প্রশাসনিক এলাকা; যা ব্রিটিশেরা ১৯৪৭ সালে চলে যাওয়ার সময় যেন একটা অংশ নেহরু-গান্ধীদের  দিয়ে যায় যা থেকে ভারত আর অপর অংশ মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র বানাতে দিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই ধারণা ভিত্তিহীন। ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়া ছিল প্রধানত তিন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিভক্ত ভারত – বড় তিন প্রেসিডেন্সি (বাংলা,বোম্বাই ও মাদ্রাজ), প্রায় ১৭টা প্রদেশ আর ৫৫০-এরও বেশি প্রিন্সলি স্টেট (Princely State বা করদরাজ্য)। আর এদের প্রত্যেকেই ছিল কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (সংক্ষেপে এখন থেকে “কোম্পানি” লিখব) হেডকোয়ার্টারের অধীনে সরাসরি শাসনে; কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ আর প্রিন্সলি স্টেটগুলো এভাবে এরা সবাই একেকটা আলাদা সত্তা। প্রিন্সলি স্টেটগুলো আবার আরো জটিল এ কারণে যে, সেগুলোর অভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন প্রশাসন কোম্পানির অধীনে নয়, তৈরিও নয়। বরং কেবল বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ- এ বিষয়গুলোই এককভাবে কোম্পানির এক্তিয়ার, দখলে ও অধীনে। এসব ইস্যুতে কোম্পানি যা সিদ্ধান্ত নিবে তাই ফাইনাল। আসলে এর মূল কারণ ছিল বৃটিশ কলোনির প্রতিদ্বন্দ্বি অন্যরা যেমন ফরাসি, ডাচ  এমন অন্য কলোনি মালিকেরা যেন বৃটিশের অধীনের রাজাদের সাথে যোগাযোগ করে বেশি সুবিধা দিবার লোভ দেখায় বৃটিশদের থেকে রাজাদেরকে ভাগায় নিয়ে যেতে না পারে, তাই “নো ফরেন কমিউনিকেশন” নীতি পালন করত তারা।

তবে করদ রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, প্রশাসন ও রাজস্ব আদায় একচেটিয়াভাবে রাজাদের হাতেই থাকত, যদিও রাজারা আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট শেয়ার ব্রিটিশদেরকে দিতে বাধ্য থাকত। এ বিষয়ে প্রত্যেক রাজার সাথেই কোম্পানির আলাদা আলাদা চুক্তি ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম এক শ’ বছর, অর্থাৎ ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে ছিলাম। আর ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটলে, একে দমনের পর থেকে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি কোম্পানির সব কর্তৃত্ব নিজে অধিগ্রহণ করেছিল, আর শাসন করেছিল ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত।

তাই দেশ ভাগের সময় প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগুলো সহজে ও সরাসরি স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে গেলেও প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বলেই ব্রিটিশ সরকার বিদায় নিয়েছিল। কারণ কোম্পানি বা বৃটিশদের সাথে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিতে এমন কিছু লেখা নাই – এই যুক্তিতে তারা ইস্যুটা ফেলে পালিয়েছিল। আবার প্রিন্সলি স্টেট মানে আসলে, কোম্পানির ভারতে জেঁকে বসার আগে থেকেই এরা অসংখ্য ছোট-বড় রাজার রাজ্য ছিল। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে অনেকগুলোকে কোম্পানি পরাস্ত করে নিজ প্রশাসনিক দখলে নেয়নি, কিন্তু কোম্পানির অধীনে করদরাজ্য করে রেখে দিয়েছিল। তাই প্রশাসন রাজার হাতেই থেকে গিয়েছিল।

       প্রিয়জীত দেবসরকার: ‘ত্রিদিব রায় ছিলেন এমন একজন রাজা যিনি ব্যক্তি স্বার্থ-র জন্য তাঁর রাজত্ব হারিয়েছেন’ – বিবিসি বাংলা

কাশ্মীর আর আমাদের পাহাড়ি ইস্যুর মিল কেবল করদ রাজ্য হিসাবেঃ
ভারতের ভাগে পড়া প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে নেহরু নিজের জন্য যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তা হল, সব প্রিন্সলি স্টেটকে নবজাত ভারতে অন্তর্ভুক্ত অংশ করে নেয়া হবে। রাজাদেরকে স্বেচ্ছায় সারেন্ডার করতে হবে নইলে বলপ্রয়োগ করে রাজ্য দখল করে নেয়া হবে। এবং বিনা ক্ষতিপুরণে। অর্থাৎ রাজপরিবারকে কোনো খোরপোশ বা ভাতাও দেয়া হবে না। তবে বসতভিটা বা হাভেলির নামে যা নিতে পারে, নিবে। এই কাজটা নেহেরু বাস্তবায়ন করেছিলেন প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেলকে দিয়ে। বিপরীতে পাকিস্তান প্রিন্সলি স্টেট নিয়ে এত সিরিয়াস ছিল না। একারণেই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাজারা পাকিস্তান “মুসলমানদের” এটা জানা সত্বেও তাদের সাথেই যুক্ত হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এনিয়ে সম্প্রতি একটা পিএইচডি গবেষণা হয়েছে, যাতে এই কারণটাই উঠে এসেছে। এনিয়ে রিপোর্ট বিবিসি বাংলাতে প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০১৫ সালে। বিবিসির মতে, “সেই কাজটি করেছেন লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার, যার বই ‘দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান’ ঐ রিপোর্টের আগের সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছিল”। উপরের ছবিতে সেই বইটাই হাতে তুলে ধরে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কাজেই এরপর আমরা আশা করব পাহাড়ি ইস্যুতে বাংলাদেশকে দোষারোপ অভিযুক্ত করার আগে প্রগতিশীলেরা একটু পড়াশুনা করে নিবে। ইসলামবিদ্বেষী হয়ে বাংলাদেশের যারা কথিত প্রগতিশীলতা বা ভিকটিমহুডের ইমেজ তৈরি করে কাশ্মিরের সাথে পাহাড়ি ইস্যু মিলিয়ে তুলনা করছেন, সেটা ভিত্তিহীন। এই খবর যেন তাদের থাকে। আসলে পাহাড়ি রাজারা, পাকিস্তানে রাজা হিসেবে যোগ দিলেও মডার্ন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভেতরে ‘রাজাগিরি’ অকেজোই থেকে যায়, এই “আধুনিক” বাস্তবতাতে তা নিজেই শুকিয়ে গেছিল। কেবল পাহাড়িদের পুরানা ‘১৯০০ সালের ম্যানুয়াল’ বলে অকেজো কিছু একটা আছে। আর জমির অনেক অংশই এখন বাঙালিদের দ্বারা বেদখল হয়ে আছে, এও আরেক সত্য। কিন্তু সাবধান, এগুলো কেবল ১৯৭৫ সালের পরের, পাহাড়িরা অস্ত্র হাতে তুলে নিবার পরের নতুন ঘটনা। ভারতের প্ররোচনায় পাহাড়িরা আগে-পিছে চিন্তা না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে তাতে ফেল করার ভুল রাজনীতির পরিণতিতে এটি হয়েছে। পাহাড়িদের, যারা যে জমিতে আগে ছিল তাকে সেখানেই অবশ্যই পুনর্বাসন করা সম্ভব, যদি তারা ইতিবাচক রাজনীতির পথে ফিরে, সঠিক বন্ধু বাঙালি রাজনীতিকদের খুঁজে বের করে নেয়ার যোগ্য হয়।

কাশ্মীরের বেলায় নেহেরুর নিজের নীতি ভেঙ্গেছিলেনঃ
যা হোক, নেহরু নিজ নীতি ভেঙে ‘ব্যতিক্রম’ করেছিলেন কাশ্মিরের বেলায়। কাশ্মিরের দুর্ভাগ্য যে, এটা এক প্রিন্সলি স্টেট। এটা না হয়ে যদি কাশ্মির সরাসরি কোম্পানির অধীনস্থ কোনো প্রদেশ হত? তাহলে এর সোজা মানে হত কাশ্মীর মুসলিমপ্রধান অঞ্চল বলে এই কাশ্মীর সরাসরি পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত। কারণ, ১৯৪৭ সালের ডেমোগ্রাফিতে দেখা যায়, পুরো জম্মু-কাশ্মিরের কাশ্মির বা উপত্যকা অংশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নেই বললেই চলে। আর জম্মু অংশেও ৩০ শতাংশের বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠী নাই।  আর এটা বাদে বাকি সারা অবিভক্ত কাশ্মিরে ৯৫-৯৯ শতাংশই মুসলমান। তাই পাকিস্তানে সপক্ষে যোগ দিবার ক্ষেত্রে এটাই হ্ত কাশ্মীরিদের   প্রধান যুক্তি।

কিন্তু কাশ্মীরের পাঞ্জাবি (হিন্দু) রাজা হরি সিং ভারতের সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন এবং ভারতে যোগ দিতে চাওয়ার খায়েশ প্রকাশ করাতে নেহরু প্রলুব্ধ হয়ে উল্টো পথে হাঁটেন। নেহরু প্রিন্সলি স্টেট হায়দরাবাদের নিজাম (রাজা) [একমাত্র মুসলমান রাজা যিনি জমির উদ্বৃত্ব থেকে রাজস্ব আয়ে আয়েসি জীবন কাটিয়ে কিংবা বাঈজি নাচিয়ে জীবনযাপন না করে বরং জমির উদ্বৃত্ব সঞ্চয় জড়ো করে  ইন্ডাস্ট্রি গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে এর পণ্য বেচা এক ব্যতিক্রমি রাজা তিনি], তাকেও নেহরু আর্মি পাঠিয়ে উৎখাত করেছিলেন। সেই নেহরু হরি সিংয়ের কথায় প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। কাশ্মীরের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, একটি মূল ভারতের ভুখন্ডের ভিতরের কোন প্রিন্সলি স্টেট নয়। বরং এর অবস্থান সীমান্তে, ভারতের উত্তর পাশে সীমান্তে তো বটেই, আবার এর বড় এক অন্য ভুখন্ড অংশ পাকিস্তানেরও উত্তর সীমান্তে। তাই কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তানে যুক্ত হবে – এমন দুই রাস্ট্রের যেকোনটাই যোগ দিবার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

বৃটিশেরা ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগের পরে প্রিন্সলি স্টেটগুলো ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার যে প্রচলিত চুক্তির রূপ – একেই বলা হয় কাশ্মীরেr “ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন” [instrument of accession] বা “সংযুক্ত হওয়ার (আইনগত) উপায়”।  তবে হরি সিংয়ের সাথে নেহরু যে একসেশন চুক্তি করেন তা ব্যতিক্রম ফলে শর্তযুক্ত। তা আসলে ব্রিটিশের সাথে কলোনি আমলে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিরই অনুরূপ, মডেলের। এটা মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় ভারতের হাতে দিয়ে দেয়া সাপেক্ষে বাকি ইস্যুতে নিজে করদ-রাজা হয়ে থাকার খায়েসি চুক্তি। অনস্বীকার্য বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল, নেহেরু সংখ্যালঘুর সমর্থনপুষ্ট রাজা হরি সিংয়ের সাথেই “শর্তযুক্ত” একসেশন চুক্তি করেছিলেন। কেন? খুব সম্ভবত, মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মির তো নেহরুর ভারতে যুক্ত হওয়ার কথাই নয়। কাজেই “পড়ে পাওয়া চারআনার” ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শর্তযুক্ত চুক্তি করলেই বা কী? এমন ভাবনার কারণে।

নেহেরু ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ চুক্তি করলেও রাজাগিরি রাখেন নাইঃ
কিন্তু নেহরু এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেন নাই। অর্থাৎ চুক্তি করলেও কাশ্মীর নেহরুর ভারতের নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে দাঁড়ায়নি। নেহরুর হাতে এ কাজে হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন কাশ্মিরের ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের নেতা শেখ আবদুল্লাহ। কাশ্মির ছিল প্রিন্সলি স্টেট মানে, রাজার রাজ্য ছিল বলে সেখানে ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজনৈতিক দল জমেনি। কারণ আমরা বুঝব, কোন রাজার রাজ্যে রাজনীতি থাকতে নাই। বুদ্ধিমান রাজারা তা থাকতে দেয় না। কারণ, রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল  থাকলেই তা রাজতন্ত্রের রাজ্যকে প্রজাতন্ত্র হওয়ার দিকে নিতে রওনা দিবে, যা রাজতন্ত্রের জন্য যম বা মরণকাঠি। তাই রাজার দেশে রাজা কোন পাল্টা ক্ষমতা জন্ম নিবার বীজ ও চিন্তাভাবনা হিসেবে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, জমায়েত এগুলো থাকতে দেয় না। তাই শেখ আব্দুল্লাহর পিঠে হাত রেখে নেহরু ঐ শেখেরই ন্যাশনাল কনফারেন্সকে কাশ্মীরে নেহেরু কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে উঠে আসতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। তাই চুক্তি করলেও কাশ্মীর নয়া দিল্লির নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, রাজার বিকল্প হিসেবে নেহরু শেখ আব্দুল্লাহকেই কাশ্মীরের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে ফেলেন। তবে এটা প্রথম পর্যায়। আর রাজা মনের দুঃখে বনবাসে যাওয়ার অবস্থায়। কালক্রমে রাজা কাশ্মীর থেকে দূরে পুরানা বোম্বাইয়ে বসবাস করতে থাকেন, সেখানেই ১৯৫১ সালে মারা যান। যদিও নেহরুর আসল দুঃখ তাতে ঘোচেনি।

সারা ভারতের যে কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, কাশ্মীর ভারতের অংশ হল কী করে? সবাই একবাক্যে বলবেন হরি সিং লিখে দিয়েছেন। এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ একসেশন চুক্তি অনুযায়ী হরি সিং কিন্তু ভারতকে কেবল মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো হস্তান্তর করেছেন, পুরা কাশ্মীর বা এর কোন ভুখন্ড না। এর অর্থ কাশ্মীর ভারত রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নয় বা ভারতের আইন ও কনস্টিটিউশনের অধীন নয়। তাই হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিতে থাকা কথাগুলোই এবার আবার লিখে ভারতের কনস্টিটিউশনে যে অনুচ্ছেদে সাজিয়ে আনা হয়, সেটাই ৩৭০ ধারা।
কিন্তু এরও আগে নেহরু পরিষ্কার জানতেন, কাশ্মির ভারতের অংশ নয়। বরং এটাই ভারত বা নেহেরুর দুর্বলতা। কিন্তু এই দুর্বলতা কাটাতে গিয়ে তিনি আরেক ভুল করে বসেন। তিনিই প্রথমে নিজে কাশ্মীর ইস্যুকে জাতিসঙ্ঘে তোলেন। যদিও এমনিতেও জাতিসঙ্ঘ এই বিবাদের ভেতরে ঢুকেই ছিল।

কাশ্মীরে এক দিকে ভারত অন্য দিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসঙ্ঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন, এটাই ভারত-পাকিস্তান অবজারভার মিশন [United Nations India-Pakistan Observation Mission (UNIPOM)]। জন্মলগ্নের সেকালে জাতিসঙ্ঘ মধ্যস্থতা করার জন্যই একপায়ে খাড়া থাকত। কেন?

হরি সিং কাশ্মীর কাউকে দিয়ে দেওয়ার কেউই ননঃ
প্রথমত একটা ফ্যাক্টস মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালিত ও শেষ করা হবে কীভাবে কী বৈশিষ্ট চেহারা নিয়ে – এসবের প্রধান নির্দেশক ও স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন সেকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। জাতিসংঘ তাঁরই ইমাজিনেশনের বাস্তব রূপ। যার সারকথাটা হল, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্ব স্ব রাষ্ট্রস্বার্থ নিয়ে যত বিবাদ এর অনেকগুলোই জাতিসংঘের নীতি কনভেনশন মেনে এর মধ্যস্ততায় বিনা যুদ্ধে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। সেকাজেই জাতিসংঘ গড়া। তাই কাশ্মীরে যতই আপাত থিতু এসেছিল ততই একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসংঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন– এভাবে বসে যায়।

হরি সিং একসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭। আর নেহরু কাশ্মীর ইস্যু জাতিসঙ্ঘে তোলেন ১ জানুয়ারি ১৯৪৮। প্রথমত, নেহরুর জাতিসঙ্ঘে যাওয়াটাই প্রমাণ করে যে, কাশ্মীর ভারতের নয় – এটা নেহেরুও মানছেন। এ ছাড়া হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিটা দুর্বল, নেহরুর তা না বুঝবার কথা নয়। সেই দুর্বলা পূরণ করতে, সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন জাতিসঙ্ঘ তাকে ফেভার করতে পারে। কিন্তু তার অনুমানটা ভুল ও ভিত্তিহীন। কাশ্মীর ভারতের, এমন রায় নেহরু জাতিসঙ্ঘ থেকে আনতে পারেননি। এক কথায় তিনি ব্যর্থ। কেন?

নেহরু কত দূর রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারী ছিলেন? তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্ব এনজয় করতেন কী চোখে? নীতি করণীয় ঠিক করতেন কোন মানদণ্ডে? এসব বিচারে এক কথায় তিনি ছিলেন, আসলে একজন কলোনাইজার । শাসক হওয়া বলতে তিনি কলোনি শাসক হওয়া বুঝতেন, আকাঙ্খী ছিলেন। তিনি নিজেকে একজন কলোনি শাসকের বেশি ভাবেননি। তাই ভারত কলোনিমুক্ত হয়ে গেলেও, রাষ্ট্র বলতে তাঁর ইমাজিনেশন বা বুঝ হল – এক কলোনি শাসক তিনি। তিনি মডার্ন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধারণায় জন্ম নেয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এর মর্ম তিনি যাই বুঝে থাকুন না কেন, সেটা তার ব্যবহারিক রাষ্ট্রে ও প্রধানমন্ত্রিত্বে প্রতিফলিত করতে পারেননি – রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে তাঁর কলোনি শাসক বুঝের কারণে। এটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছিল জাতিসঙ্ঘের কাছে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর আশা-কামনার মধ্যে। তিনি সম্ভবত খেয়ালই করেননি কোন বয়ানের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনাকারী ও বিজয়ীরা তা শেষ করেছিল। আর যুদ্ধ শেষে দুনিয়া নতুন করে সাজানো হচ্ছিল কোন মৌলিক ভিত্তিমূলক নতুন ভাবনার ভিত্তিতে।

“কোন  জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রকে কে শাসন করবে, কিভাবে তা শাসিত হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার কেবল ঐ জনগোষ্ঠীর”। রুজভেল্টের [Franklin Delano Roosevelt] এই প্রস্তাব প্রথম চোখবন্ধ মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল (আগষ্ট ১৪, ১৯৪১)  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। পরে রাশিয়াসহ সারা ইউরোপ এটাকে ভিত্তি হিসেবে মানতে রাজি হওয়াতেই রুজভেল্ট হিটলার ঠেকাতে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। রুজভেল্ট রাশিয়াসহ ইউরোপের সবাইকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে যুদ্ধে জিতিয়েছিলেন। আর যুদ্ধ শেষের  দুনিয়াটাকে একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ে সেটাসহ সাজানো হয়েছিল ঐ একই শাসন-নীতির ভিত্তিতে। যে নীতিটা বলে দিয়েছিল বা ওর সারকথাটা ছিল – কলোনি শাসন অবৈধ। এবং রাজাও।

কোন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কে নেবে, তা নির্ধারিত করবে কেবল নিজ নিজ জনগোষ্ঠী – এই নীতিতে যদি কাশ্মীর ইস্যুর ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দেখি, হরি সিং আসলে কাশ্মীরের কেউ নন। বরং কাশ্মিরের জনগণই ঠিক করবে কাশ্মিরের ভাগ্য কী হবে। তাই হরি সিং কোথায় কী চুক্তি অথবা সই করেছেন তা মূল্যহীন। নেহেরু-হরি সিং একসেশন চুক্তি তাই বিশ্বযুদ্ধের পরে সাজানো জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে যে World order, সেই নতুন দুনিয়ার চোখে অকেজো, মুল্যহীন এক কাগজ মাত্র।

নেহেরুর কাছে  রিপাবলিক ধারণা আকর্ষণীয় না, তাই নতুনওয়ার্ল্ড বুঝেন নাই, মনেপ্রাণে কলোনি-ক্ষমতার ভক্তঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মূল মর্ম নেহরু যদি বুঝতেন তিনি কখনই কলোনি শাসকের নকল করতে যেতেন না। ফলে তখন তিনি হরি সিং  একসেশন চুক্তিকে বাইবেল জ্ঞান করতেন না। তিনি জাতিসঙ্ঘেও যেতেন না। কারণ জাতিসঙ্ঘের জন্মই হয়েছে রুজভেল্টের ওই “নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর” শাসননীতিতে। তাই জাতিসঙ্ঘে গেলে, সে প্রতিষ্ঠান হরি সিংয়ের চুক্তিকে ন্যাকড়া মনে করে ফেলে দেয়ারই কথা। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের রায় – রাজা নয়, একমাত্র “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই”  সিদ্ধান্ত নিতে হবেই – এমনই হবে, এটা তো জানা কথাই ছিল। “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই” সব কিছু নির্ধারণের ভিত্তি, একেই মানতে বলবে। এটা নেহরুর জানা থাকা উচিত ছিল। তাই নেহেরুর জাতিসংঘে যাওয়া প্রমাণ করে যে নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ না অসচেতন ছিলেন।

নেহরু তাই জাতিসঙ্ঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করে এরপর সে খামতি নিজেই পূরণ করতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহকে আরো বেশি করে হরি সিংয়ের উপরে তুললেন। আর এখান থেকে জন্ম নিল, আর্টিকেল ৩৭০। এর সারকথা হল, একসেশন চুক্তি যেন ভারতের কনস্টিটিউশনের বিরোধী না হয়ে, সামঞ্জস্যপুর্ণ করে নেয়া যায়। আমাদের দেশী ভাষায় বললে, হালাল করে নেয়া হয়। কারণ একসেশন চুক্তি আসলেই তো ভারতীয় কনস্টিটিউশন-বিরোধী। কারণ, চুক্তিতে কাশ্মীরের জনগোষ্ঠিকে বুঝাতে কাশ্মীরের জনগণ নিজেরা নয়, কোথাকার এক ‘রাজা’কে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি বলে স্বীকার করা ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো রিপাবলিকের চোখে কোনো রাজা এমন গুরুত্ব পেতেই পারেন না। কোনো রাজা বা রাজতন্ত্রের চিন্তাকে কোন প্রজাতন্ত্র স্বীকার করতেই পারে না। তবু নেহরু অ্যাকসেশন চুক্তিকে হালাল করে নিতে কনস্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা যোগ করে। ভারতের কনস্টিটিউশন যারা ড্রাফট করেছেন, এর মূল ভূমিকায় ছিলেন প্রথম আইনমন্ত্রী ড. অম্বেদকার। নেহরু তাকে অনুরোধ করেন, হবু ৩৭০ ধারা ড্রাফট করতে। অম্বেদকার তা করতে অস্বীকার করেন।
ব্রিটিশ আমলে শাসক হিসেবে হরি সিং কাশ্মীরে এক বড় রাজত্বই চালাতেন। ফলে তার আমলাদের যথেষ্ট দক্ষ হতে হয়েছিল। এছাড়া পাশে ব্রিটিশরা থাকাতে তাদের থেকে এরা ট্রেনিং পেতেন সহজেই। এমনকি স্বয়ং হরি সিং স্বল্প বয়সে বাবার পরে কাকাও মারা যাওয়াতে রাজা হন। পরে তাঁর তাবৎ একাডেমিক শিক্ষা ও সামরিক ট্রেনিংও ব্রিটিশদের হাতে হয়েছিল। তাই কাশ্মীরের রাজার মুখ্য আমলা যাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত, তিনি হলেন ব্রিটিশ ট্রেইনড এক তামিল ব্যক্তিত্ব গোপালস্বামী আয়াঙ্গার। এই আয়াঙ্গার আর শেখ আবদুল্লাহ মিলে ৩৭০ ধারা ড্রাফট করেছিলেন।

৩৭০ ধারা আসলে কী?
এই ৩৭০ ধারা কী? ধরেন, আপনার লাখ টাকা আগেই আমি আমার বলে নিয়ে নিলাম। এরপর এই টাকা ফেরত দেয়ার সময় একটা দলিল করলাম। দলিলে লিখলাম, ১. আমিই আপনাকে লাখ টাকা দিলাম। ২. আপনি এই টাকা এখন আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দু’টাই মিলে গেলে, সে মোতাবেক খরচ করবেন। ৩. আপনার বাসায় কাউকে বসবাস করতে দিবেন না; আমার বাসা থেকে কেউ গেলেও না। তবে কাকে দেবেন না দেবেন, সেটি আপনাকে ঠিক করার অনুমতিটা আমিই আপনাকে দিয়ে দিলাম।
এতিনটা ধারার প্রথম দু’টি মিলে হল ৩৭০ ধারা, পাস হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। আর তৃতীয় ধারাটি হলো ৩৫এ, যা প্রেসিডেন্টের আদেশ হিসেবে ১৯৫৪ সালে চালু করা হয়েছিল।

তাহলে এবার মোদী-অমিত ঠিক কী করলেনঃ
আসলে এবার মোদী-অমিত মিলে যা করলেন তা হল – তারা বললেন এখন আর আপনার টাকাই আপনাকে দেয়ার দলিল না। দলিল থাকবে বাদ বা রদ। আর খোদ আপনি পুরাটাই এখন থেকে আমার।
এটাই ‘দ্যা কনস্টিটিউশন (অ্যাপ্লিকেশন টু জম্মু ও কাশ্মির) অর্ডার ২০১৯’  [The Constitution (Application to JAMMU & KASHMIR) Order 2019 ] এই নামে গত ৫ আগস্ট এক প্রেসিডেন্ট আদেশরূপে জারি করা হয়। আর এতে বলা হয়, এটাই “আগের “আর্টিকেল ৩৫এ” কে সুপারসিড’ করল। [It shall came into force at once and shall thereupon supersede the constitution (Application to Jammu & Kashmir) order, 1954……] মানে আগে যা-ই থাক, এখন থেকে এটাই 35A এর জায়গা নিল। এর সোজা মানে – এখন যা হল, একেবারে গায়ের জোরে পুরা কাশ্মীরকে (পাকিস্তান এবং চীনের কাশ্মীর অংশসহ) ভারতের ভুখন্ড বলে দাবি করে নিয়ে নেয়া হল।

এখন তাহলে আগে দলিলে যে লেখা ছিল ‘আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দুটাই মিলে গেলে’ [এই কথাটা বুঝাতে সব সময় সব জায়গায় concurrence শব্দটা ব্যবহার করা আছে।  বাংলায় যার মানে “সমঘটিত”। ] এটাই ভারতের পার্লামেন্টে পাশের পর যেকোন আইন আবার কাশ্মীরের পার্লামেন্টেও পাশ হলে বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটার কী হল? এছাড়া, এটাই ৩৭০ ধারা তে বাতিলের আগে কাশ্মীরিদের মত নেওয়ার পদ্ধতি বলে বুঝানো হয়েছে, তা হল কিভাবে?
এর জবাবে অমিত শাহ বলবেন, কাশ্মীরিদের মতামত মানে তো স্থানীয় প্রাদেশিক পার্লামেন্ন্টটে অনুমোদন, তাই তো? ঘটনা হল, এখন কাশ্মীরে  পার্লামেন্ট নেই, প্রেসিডেন্ট শাসনে আছে রাজ্যটাতে। তাই প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা – এর মানেই তো কাশ্মীরিদের মতামত বুঝতে হবে।

অর্থাৎ, অমিতের  ব্যাখ্যা অনুসারে, কাশ্মীরিদের মতামত=ভারতের প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা।  তাই ৫ আগষ্টের ঐ প্রেসিডেন্টের আদেশে শুরুর বাক্যটা হল এভাবে – আমি আমার সাথে একমত হয়ে… এই আদেশ জারি করলাম।

কিছু বাড়তি প্রসঙ্গঃ
আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো পরের লেখায় আনা যাবে হয়ত। সেখান থেকে কেবল দুটা সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ দিয়ে এখন শেষ করব।
সোশাল মিডিয়ায় দেখলাম সবাই আশা করছে এখন কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান বলতে বন্ধু রাষ্ট্র, দেশ, গ্রুপ বা ব্যক্তির সামরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো – এভাবে বুঝে। মানে মিলিটারি পদক্ষেপ বা যুদ্ধই এর একমাত্র সমাধান। এই অনুমান ভিত্তিহীন। এছাড়া যুদ্ধে যেতে চাইলেও অন্তত ভারত-পাকিস্তান কারই যুদ্ধে যাবার অর্থনৈতিক সামর্থ নাই।
আসলে ইস্যুটার ফোকাস মূলত লিগাল। তাই সেটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠবে। ভারতের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্যের একজনকে যদি পেতে হয়, তবে সম্ভাব্য সেটা হতে পারে আমেরিকা। কিন্তু সেটা ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে পাকিস্তানের গলা চড়ানো পদক্ষেপে।  ভারতের হাত আমেরিকা যতটুকু আড়ালে ধরেছিল, সেটি ছেড়ে এখন আমেরিকা তা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে [No policy change on Kashmir, says U.S.]। আমেরিকার স্টেটস ডিপার্টমেন্টের বা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত Ms. Ortagus এর প্রেস ব্রিফিং থেকে এটা পরিস্কার। অর্থাৎ, পাকিস্তানের কূটনীতির একটা বিরাট ভূমিকা এখানে আছে এবং আগামিতে থাকবে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান যতটুকু করেছে, তাতেই ভারত ইতোমধ্যে ব্যাকফুটে। ভারতের বিবৃতিগুলোতে তা পরিষ্কার।

পাকিস্তানের ডিপ্লোমেটিক প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পাঁচ পদক্ষেপঃ
1. Downgrading of diplomatic relations with India. 2. Suspension of bilateral trade with India.
3. Review of bilateral arrangements. 4. Pakistan to go to UN, including the Security Council.
5. August 14 (Pakistan’s Independence Day) to be observed in “solidarity with brave Kashmiris”. India’s Independence Day will be marked as “Black Day”.
পাকিস্তানের একক সিদ্ধান্ত – ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিচা স্কেলে নামিয়ে আনা – এটাকরে ফেলে নিজ রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার করা ও ভারতকে তারটা ফেরত নিতে বলা – এটা পশ্চিমাদেশের জন্য শক্ত ও সিরিয়াস ম্যাসেজ হিসাবে হাজির হয়েছে। এতে ভারতের প্রতিক্রিয়ার তাদের ভাষায় সেটা বুঝা গেছে। ভারতের the wire পত্রিকার ভাষ্যও তাই। পাকিস্তানের পদক্ষেপের পর ভারতের বিবৃতি বলছে, পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছে [India urged Islamabad to review these measures…।।] দেখে এই পত্রিকা বলছে। পত্রিকাটার ধারণা ইউরোপ, আমেরিকা পাকিস্তানের বিবৃতির পক্ষে চলে যেতে পারে এই ভয়ে ভারত এমন বিবৃতি দিয়েছে।  এছাড়া পত্রিকাটা মন্তব্য করছে, ভারতের বিবৃতিটা কম কড়া বা কম কর্কশ ভাষার [The Indian response seemed comparatively less strident, ]।
ওই দিকে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ভারতের বিরুদ্ধে চলে যাবে ধীরে ধীরে, যেটা উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে দেখা গিয়েছে। ওআইসি ধরনের আন্তর্জাতিক বডিগুলোতে ব্যাপক লবি লাগবে, কারণ আমির ও বাদশাহরা ‘পিছলে ভারতের পক্ষে  চলে যেতে পারে’। যেটা ঠেকাতে পাকিস্তানের কূটনীতির বিরাট ভুমিকা আছে। এসব ব্যাপারে আমাদের উলটা নাদান চিন্তাও প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। পাকিস্তানের জামায়েত বা কিছু ইসলামপন্থি দলগুলোর জোটের প্রতিক্রিয়া হল ইমরান খান কাশ্মীর ইস্যু আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা আসলে পাকিস্তানে কোনঠাসা হয়ে পড়া বিরোধি দলের ইমরানকে আক্রমণের আভ্যন্তরীণ ইস্যু। এতে তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন কিছু প্রমাণ দেয়াটা গুরুত্বপুর্ণ নয় – তাই তারা দেনও নাই। বরং এই আক্রমণটায় মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে কিনা সেটাই বিবেচ্য। তাই অভিযোগটা কাশ্মীরের পক্ষে বা বিপক্ষে গেল কিনা সেটা একেবারেই বিবেচনার বিষয় নয়। বরং আভ্যন্তরীণভাবে পাকিস্তানের বিরোধীদেরকে মাইলেজ দিয়েছে কি না সেটাই বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশ বসে আমাদের পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে কারও মুখপাত্র হওয়ার কোন মানে হয় না। আমাদের কাছে মুখ্য হওয়া উচিত কাশ্মীরের স্বার্থ, পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কে আগিয়ে থাকল সেটা একেবারেই নয়।

সুপ্রীম কোর্ট কী প্রতিকার দিবে, ভরসা করা যায়?
ভারতের সুপ্রীম কোর্ট জনমত শক্ত হয়ে না উঠলে মামলাটাই নেবে না, পিছলাবে মনে হচ্ছে। এটা কিছুটা পরিস্কার হয়েছে এক মামলায় রায়ে [৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে]। আসলে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরার বিরুদ্ধে  নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আদালতের সাজার রায় হলে তিনি পালটা জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। ক্ষমতা ছাড়েন নাই, জেলেও যান নাই। সেই থেকে ভারতের আদালত ও একাদেমিকদের বুঝাবুঝি হল –  নির্বাহী ক্ষমতা বা প্রধানমন্ত্রী আগ্রাসি হয়ে গেলে আদালত মানতে না চাইলে – তাতে সেক্ষেত্রে ওর সামনে না গিয়ে ততটাই পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই সঠিক – এই অবস্থানে যেতে হবে। যদিও এমন সিদ্ধান্তে দুনিয়ার কোথাও রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া ঠেকানো যায় নাই। পারার কথাও নয়। তবু এসব আকাম্মা মধ্যবিত্তসুলভ গা-বাঁচানো চিন্তা এখনও ভারতে ভেসে বেড়াচ্ছে। গত নির্বাচনেও আমরা তাই দেখেছি। মোদীকে নির্বাচন কমিশন কোন নুন্যতম দন্ড দিতেই পারে নাই, কমিশন নিজেই গা-বাঁচিয়ে পালিয়েছে। ফলে আগ্রাসি মোদীর সামনে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া – আদালতের এই অবস্থান হওয়াটা অসম্ভব নয়।  যদিও ২০১৮ সালের অক্টোবরে এক মামলায়, আদালতের রায় দিয়েছিল যে, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।

ভারত ভেঙ্গে পড়ার প্রাথমিক আলামতঃ
ওদিকে রাজ্যগুলোও খুবই ভয় পেয়েছে। কারণ ভারত রাষ্ট্র মানে কথিত এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, “কেন্দ্র” নামে যে জারি আছে। কে তাকে কী ক্ষমতা দিয়েছে, এই ক্ষমতার উৎস কী, কেউ জানে না। কিন্তু এই ক্ষমতা চাইলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কাল থেকে বিধানসভা বলে কোনো প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি নাই – এমন ঘোষণা দিতে পারে। ব্যাপারটা এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে। এই ভুতুড়ে কেন্দ্র এখন, পশ্চিমবঙ্গকেও একটা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। এবং তা কেন্দ্রিয় পার্লামেন্ট অথবারাজ্য বিধান সভাতেও কোন আলোচনা পরামর্শ ছাড়াই।  কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল ইস্যুতে রাজ্যগুলো এটাই দেখল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে আগে শঙ্কিত হয়েছে নাগাল্যান্ড ধরনের ট্রাইবাল ছোট রাজ্যগুলো। এব্যাপারে ভারতেরই এক মিডিয়া পর্যালোচনায় ভীতি ও আশঙ্কা এখানে পড়ে দেখা যেতে পারে [No debate, no discussion, no dissent, and the Constitution is changed]।

মোদীর রাজ্যসভার ভোট ম্যানেজ – ভারতের “দুদুকের” ভয়ে বাঘ বিড়াল যেনঃ
শুধু তাই না। ভারতের কনষ্টিটিউশন অনুসারে কোন বিষয় আইন হতে হলে তা লোকসভা ও রাজ্যসভা এই দুই পার্লামেন্টেই পাশ হতে হবে।  গত পাঁচ বছর মোদী্র লোকসভায় পাশ করা কোন আইনকে পরিপুর্ণতা দিতে রাজ্যসভা থেকে একক বিজেপি-জোটের ভোটে পাশ করাতে পারে নাই। বরং যা কিছু আইন পাশ হয়েছে এর সবই বিরোধী দলেরও ভোট-সমর্থন পাওয়া সাপেক্ষে। মোদীর দ্বিতীয় সরকারের বেলাতেও তাই, এবারও রাজ্য সভায় বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। কিন্তু তিনি কাশ্মীর ইস্যুসহ পরপর দুইটা আইন পাশ করিয়ে নিলেন। কীভাবে?

সোজা বুদ্ধি – যারই বা ঘনিষ্ট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে মামলা আছে – সিবিআই-ইডি [CBI-ED] (আমাদের দুদুক যেমন) এর হয়রানি বা মামলা খাবার ভয় আছে এমন সব দলের সদস্যদেরকে মোদীর পক্ষে ভোট দিবার বিনিময়ে সওদা করা হয়েছে। তাতে রাজ্যসভায় মোদীর দল ও জোটের এখন ১০৬ ভোট আর বিরোধীরা ১০০ ভোট হয়ে গেছে। AGP, YSR, BSP, NCP, TDP অথবা kejrilal  এদের এসব আঞ্চলিক দলের এরা কেউ  গত নিবাচনেও মোদীর দলে বা জোটের পক্ষের কেউ ছিল না। বরং বিপক্ষ জোটে ছিল। কিন্তু তারা সকলে কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর পক্ষে ভোট দিয়েছে।

,এখন, সব মিলিয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, ব্যাপারটা ভুতুড়ে ক্ষমতার কারণে ভারত রাষ্ট্রের ভেঙে টুকরা হয়ে যাওয়ার দিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছে তাই নির্দেশ করে। আর ইতিবাচকভাবে দেখলে, মাথা নাগরিকদের মুরোদ থাকলে এই ভাঙাটাই পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ কোন কিছু না ভাঙলে তা ফিরে গড়বেন কী করে? তবে পুনর্গঠনের মুরোদ যদি থাকে – এই হল মুখ্য প্রশ্ন। যদি তা না থাকে, তখনই এর অর্থ ভারতের ৩৬ টুকরা হয়ে যাওয়া। আর মুরোদ দেখাতে পারলে, পুনরায় আমেরিকার মত এক ফেডারেল ভারত হিসাবে নিজেকে পুনর্গঠিত ভারত হিসেবে আবির্ভূত করে ফেলা। বলাই বাহুল্য, সেক্ষেত্রে সবার আগের করণীয় বা লক্ষ্মণ হল,  “হিন্দুত্ব” কে চিরতরে সামাজিক চিন্তা থেকে ঝেটিয়ে বিদায়, একে  নির্বাসন করতে হবে। কেবলমাত্র এরপরেই ফেডারেল রাষ্ট্রবিষয়ক পাঠ পড়াশুনাগুলা সম্পন্ন করতে হবে বা যেতে পারে। কাশ্মীর তাই আসলে বিরাট ধবংস ও পতনের বীজ এক আইসবার্গ [iceberg], বিরাট বরফের চাঙ্গর, হিমশৈল। বাইরে থেকে এর কেবল উপরে ভেসে থাকা ছোট্ট মাথাটা  দেখা যাচ্ছে। অথচ সে বিরাট জাহাজ ঢুবিয়ে দিয়ে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন! না ভারতের কেউ এটা দেখতে পাচ্ছে, তা মনে হচ্ছে না। কারণ চারিদিকে প্রবল এক হিন্দুত্ব-জ্বর ছেয়ে গেছে, সবাই ভুগছে! এক অধপতিত নস্টা  চিন্তা – কাশ্মীরি নারীর নিয়ে ইতরোচিত অবদমিত ফ্যান্টাসি, হিন্দুত্ব-চিন্তাকে পুষ্ট করে আগাচ্ছে! এক গভীর অসুখে ভুগছে ভারত!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে ভাঙ্গন শুরু হতে পারে কাশ্মীর থেকে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  একই শিরোনামে  বিডিভিউজ  অন লাইনেও ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

গৌতম দাস

২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2DQ

 

-একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

[বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

“বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

২.
এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

আইনি কারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

অর্থনৈতিক কারণঃ
জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]