চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

গৌতম দাস
০৪ জানুয়ারি ২০১৮, বৃহষ্পতিবার, ০০:১৮

চীন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু দিনকে দিন মুখোমুখি হয়ে ওঠা বাড়ছে। তবে চীনের ভেতরে মানবাধিকার আছে কি না তা নিয়ে চীনকে পশ্চিমের খোঁচা দেয়া কিংবা বিব্রত করার যে নিয়মিত প্রচেষ্টা আছে, আমরা সেটার কথা বলছি না। যদিও দুটার মধ্যে কোথাও একটা সম্পর্ক আছে, তবুও এখানে প্রসঙ্গ সেটা নয়। প্রসঙ্গ খোদ চীনের অভ্যন্তরীণ নয়, বাইরের। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে যেগুলো বাইরের দেশ যেমন, আমাদের মতো রাষ্ট্র বা মিয়ানমার –  সেখানে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের পরিস্থিতি। চীনের আভ্যন্তরীণ নয় বাইরের ভিন্ন রাষ্ট্রে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ঘটনায় চীনের দায় কী?কী অর্থে? যেমন আমাদের মতো দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা, নির্বাচিত সরকার থাকা কী রাষ্ট্রের জন্য জরুরি? আবার কিংবা ধরুন বিরোধী দল মানে সরকারে থাকা দলটা ছাড়াও এর বাইরের কোনো দল দেশে থাকা জরুরি কি না? অথবা সরকারের কোনো সমালোচক থাকা কতটা দরকার? অথবা ধরেন, কোন বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ও সাফাই মানে না, ভিন্ন চোখে দেখতে চায় – এমন লোক কি দেশে থাকতে পারবে না গুম হয়ে যাবে, ইত্যাদি। অথবা কথাটা আরেকভাবে তোলা যায়। গণতন্ত্র না উন্নয়ন, কোনটা চান? মানে, যেন মানবাধিকার ও উন্নয়ন- এ দুটোর কোনো একটা বেছে নিতে হবে। এর একটা যেন অপরটার বিকল্প! যেন পথ দু’টি কিন্তু একই ফল পাওয়া যায় এমন। এমন কথা বলা কী ঠিক? এগুলো তো দানব সরকারের কাজ!  এছাড়া এখানে আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল যে দানব সরকার এমন দানবীয় সাফাই দিচ্ছে তাই না। বরং খোদ চীন সরকার এব্যাপারে এখন সাফাই দিয়ে এগিয়ে এসে যাচ্ছে।

এটাই হল এসবের সাথে চীনের সম্পর্ক। বিতর্ক অন্য রাষ্ট্রের ভেতরের হলেও গুরুত্বপূর্ণ হল, চীন বিষয়গুলোতে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নিজেই একটা সাফাইদাতা হয়ে উঠছে। লজ্জ্বার মাথা খেয়ে এভাবে চীন সেই সব স্বৈরশাসক রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশ্য মঞ্চে সাফাই বা জাস্টিফিকেশন দিতে শুরু করেছে। বলছে, এটা হচ্ছে নাকি যার যার রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ বা ‘নিজস্ব গণতন্ত্রবোধ’। এখানে অন্যের কিছু বলার নাই। সবাইকে একই বুঝ ও বোধের হিউম্যান রাইটে চলতে হবে এমন কোনো মানে নাকি নেই! চীনের ধারণা, হিউম্যান রাইটের বোধ যেহেতু একেকটা রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, ফলে ‘গণতন্ত্র’বোধ একেকজনের একেক রকম হতে পারে। আর সেই সূত্রে কোনো রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট রক্ষা মুখ্য কাজ হিসাবে নিতে পারে। আবার কেউ নাকি উন্নয়নের পথ বেছে নিতে পারে। এমনকি “উন্নয়নের স্বার্থে” কোনো রাষ্ট্রের কাউকে গুম, খুন করতে হতে পারে! দুর্নীতিও পুষতে হতে পারে! এটাও কোনো এক ‘বুঝের বা বোধের গণতন্ত্র’। এটাই যেন বা ‘কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব উন্নয়নের পথ’। এটা নিয়ে অন্যের কথা বলার কিছু নেই। যেমন চীনের অন্য রাষ্ট্রে মাথা গলানোর কিছু নেই বলে চীন বড় গলায় দাবি করে।

চীন বলছে এই যে, প্রত্যেক রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ এটাতে চীন কোনো মাথা গলাতে চায় না। এর কারণ চীনের সাধারণ নীতি হচ্ছে অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যাপারে, মানে তার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ব্যাপারে চীন মাথা ঘামায় না। সাধারণভাবে বললে, ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের’ ধারণার দিক থেকে দেখলে এটা অনেক পুরনো কথা, ফলে চীন নতুন কিছু বলেনি। কিন্তু চীন এ কথা বলে আসলে যেসব রাষ্ট্রের স্বৈরাচার শাসক নিজের আকামগুলাকে ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নিয়েছে বলে চালিয়ে দিবার চেষ্টা করছে – চীন এসব রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজকে সাফাই সরবরাহকারি ও স্বৈরশাসকের ‘রক্ষক’ হয়ে উঠতে চাইছে। এক কথায়, অন্যের রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করি না – এ কথা বলে চীন আসলে স্বৈরশাসকদের বন্ধু আর এমন শাসকদের ক্লাবের নেতা ও সংরক্ষক হতে চাইছে।

কিন্তু চীনের এটা হওয়ার দরকার কী? দরকার হচ্ছে কেন? দরকার হচ্ছে এ জন্য যে, ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন, আর সেকথার পক্ষে এক গ্লোবাল স্বীকৃতিও আছে। চীন দুনিয়ার নেতা হয়ে উঠতে চাওয়া এমন হবু গ্লোবাল নেতা। কিন্তু তাঁর এমন আকাঙ্ক্ষার আগে থেকেই ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন হয়ে আছে। আর এই গ্লোবাল স্বীকৃতি পেয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে নতুন দুনিয়া গড়ার কাল থেকে। জাতিসঙ্ঘ বলে প্রতিষ্ঠান ১৯৪৫ সালে গড়ে ওঠে আর ১৯৪৮ সালে ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস চার্টার’ ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার ভিতর দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার বিষয়টা সার্বজনীন স্বীকৃত। এটা ছিল প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই নাগরিকদের জন্য অধিকারের সনদ। আর চীনকে আজ একথা মানতে হবে যে, ১৯৪৮ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রে মনে করা হয়নি বা কেউ এমন কথা তোলেনি যে, ওই চার্টারের কারণে ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে বা এতে কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ ঘটছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ‘রাইট’ বা ‘অধিকার’ কথাটা কেবল বিশেষ একটি রাষ্ট্রের জন্য পালনীয় ধারণা নয়, বরং এটা বিশ্বজনীন ধারণা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, এটা রাষ্ট্রসংঘের সদস্য ও অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সব রাষ্ট্রেরই পালনের এক ধরনের বাধ্যবাধকতাও আছে। যেমন রাষ্ট্রসংঘের আর এক কনভেনশন হল, International Covenant On Civil And Political Rights 1966 । সদস্য ইচ্ছুক রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষর শেষে এটা কার্যকর হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। স্বাক্ষরের পরে নিজ নিজ সংসদে এতে অনুস্বাক্ষরের প্রস্তাব পাশ করে ফেলার পরে ঐ রাষ্ট্র ঐ কনভেনশনে বর্ণিত ভাবে নিজ নাগরিকের সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইট রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যান। মজার কথা হচ্ছে, চীন এতে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। আর আগামী বছর এতে চীনের স্বাক্ষরের ২০ বছর পূর্তি পালন করতে হবে।  তাই চীনেরও বাধ্যবাধকতা আছে। অতএব আমরা ধরে নিতে পারি, চীনের এই স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে চীনের ওপর বাইরের বা রাষ্ট্রসংঘের কারও কোন হস্তক্ষেপ ঘটে নাই বলেই চীন বিশ্বাস করে।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? হিউম্যান রাইট বা মানবাধিকার বিষয়টা এমন না যে যার যার মত করে এর একটা সংজ্ঞা দেয়া যায়। নিয়মিত হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন করে এরপরে আবার সেটাকে যার যার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ঘটনা বলে চালানোর সুযোগ নাই। আমার হিউম্যান রাইট বুঝের সংজ্ঞা আলাদা তাই আমার ইচ্ছামতো স্বৈরশাসক হওয়ার সুযোগ আছে। এই ব্যাপারে, চীন যা বলছে তা সত্য নয়। স্বৈরশাসকদের ক্লাব বানানো ও চীনের এদেরকে আগলে রেখে পেলে পুষে এদের নেতা হওয়ার সুযোগ আসলেই নেই। যেমন মিয়ানমারের সু চি এবং ওর জেনারেলদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন ততপরতা অথবা কম্বোডিয়ার স্বৈরশাসক হুন সেন – এদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের কাজকে চীন ওদের  ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেওয়া বলে সাফাই দিয়েছে। অথচ এই সাফাইয়ের কোন সুযোগ নাই। আর এই উসিলায় এদেরকে নিয়ে চীনের আলাদা স্বৈরশাসক ক্লাব বানানো অথবা তাতে বাংলাদেশকে যোগ করানোর চেষ্টা করা – এগুলোর কোনো সুযোগ আসলে নেই। তবু এই প্রবণতা দিন দিন বাড়তে দেখছি আমরা।

কিন্তু কেন বাড়ছে, গোড়াটা কোথায়? ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের এই চার্টার গঠন ও অনুমোদনের সময়কালে বা পরে কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র এই চার্টার মানি না অথবা এর অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হবো না – এমন কথা বলেনি। যদিও কোনো কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট কথাটার একটা ভিন্ন সংজ্ঞা, একটা ‘কমিউনিস্ট ব্যাখ্যা’ আগলে নিয়ে সময় সময়ে তা আউরেছে। সেই কমিউনিস্ট ব্যাখ্যাটাই সব ত্রুটি আর বিভ্রান্তির উৎস। স্বৈরশাসকের পক্ষে সাফাই ওখান থেকে আসছে।

কমিউনিস্টদের এক বিশাল আত্মতুষ্টি যে, তারা মনে করেন- রিপাবলিক রাষ্ট্র বিষয়ে ‘পশ্চিমের রাজনৈতিক সাম্য ও নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার ধারণা’- এগুলো খামাখা এবং ভিত্তিহীন। তারা মনে করেন, ‘অধিকার’ ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখা ও বোঝাটাই এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’। কেন? কারণ, কমিউনিস্টদের চোখে বরং অধিকারের আসল অর্থ হল ‘বৈষয়িক অধিকার’। এই বিচারে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান – এই বৈষয়িক অধিকারগুলোই আসলে কমিউনিস্ট বুঝ, বিকল্প বুঝের ‘অধিকার’-এর অর্থ। পশ্চিমের ধারণার বিরুদ্ধে ‘অধিকার’ শব্দের কমিউনিস্ট অর্থ ও সংজ্ঞা এটাই। বলা বাহুল্য এটা খুবই অধপতিত ধারণা।

তাই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া – এই কথার আড়ালে স্বৈরশাসকদের কথার সারার্থ হল, তারা রাজনৈতিক অধিকার বা মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার কথা মানেন না। কারণ তারা কমিউনিস্ট হন বা না হন, তারা কমিউনিস্টদের ইচ্ছামত বানানো হিউম্যান রাইটের নতুন সংজ্ঞা গ্রহণ করতে চান। আড়ালে থাকতে চান। কারণ চীনের মত কমিউনিস্টরা রাজনৈতিক অধিকার মানেন না।  এটাকেই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া বলে চালাতে চান। আর এই নতুন বক্তব্যের ভিত্তিতে চীন স্বৈরশাসকদের ‘নতুন ক্লাব’ গড়ার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে দেখছি আমরা। এক কথায় বললে, এটা  কমিউনিস্টদের ‘অধিকার’-সম্পর্কিত ভিত্তিহীন ধারণা। কমিউনিস্টদের চোখে অধিকার মানে বৈষয়িক সুবিধাদি পাওয়ার অধিকার। ফলে যে স্বৈরশাসক দাবি করবেন- আমি ‘গণতন্ত্র না উন্নয়নের’ বিতর্কে ‘উন্নয়ন’ এর পক্ষে আছি- এর মানেই হলো সেই স্বৈরশাসক বলতে চাইছেন, অধিকার সম্পর্কিত পশ্চিমা ধারণার বিরুদ্ধে আমি। তাই আমাকে পশ্চিমের ধারণা দিয়ে মাপলে হবে না। আমি আমার ব্যাখ্যা সহি আছি।

তবে বাংলাদেশ কি চীনের এই ক্লাবে জয়েন করবে? কিছু তোড়জোড় দেখা গিয়েছিল। সিপিবিসহ চার দল নিয়ে চীনা মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিল, আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সম্ভবত বেশি সুবিধা হয়নি।

অনেকে ভাবতে পারেন, এগুলো তো ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগের কমিউনিস্টদের ধারণা। ফলে সেই পুরান দায় দিয়ে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করা কি ঠিক হবে? হ্যাঁ অবশ্যই সঠিক হবে। কেন? ওয়েন জিয়াবাও ২০০৩ সাল থেকে ১০ বছর ধরে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বাণী শুনুন। তিনি বলেছেন, “সবচেয়ে বড় হিউম্যান রাইট হল ১.৩ বিলিয়ন লোককে খাওয়ানো। ফলে সিভিল নাগরিকের ধারণা- পশ্চিমের এই ধারণা আসলে বাতিল বলে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে”। [……Jiabao, when premier, said the biggest human rights issue was feeding 1.3 billion people. Civil liberties were rejected as Western ideals…….]

চীনের আরেক আলোচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন। ২০০৬ সালে তার এক বিখ্যাত মন্তব্য, ‘পেট ভর্তি থাকছে কি না আর গরম কাপড় পরা আছে কি না – এসবের ভিত্তিতে চীনের হিউম্যান রাইটকে সংজ্ঞায়িত করে দেখতে হবে।’  [Former president Jiang Zemin famously said in 2006 that having a full stomach and warm clothes was how human rights should be defined in China.] এর সোজা অর্থ পুরান কমিউনিস্টদের হিউম্যান রাইটের ‘বিকল্প সংজ্ঞা’ চীন এখনো ত্যাগ করেনি, বরং আঁকড়ে ধরে আছে। আর একালে এসে স্বৈরশাসকদের ক্লাব গড়ে সেখান থেকে চীন নিজেই সাফাই সরবরাহকারী হতে চাচ্ছে। চীন যদি ভেবে থাকে এই নতুন সাফাইয়ের ভিত্তিতে  দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকদের নিয়ে চীন নিজের ‘স্বৈরশাসক ক্লাবের মেম্বার’ বানাবে, বুঝতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের কোন ধারণাই হয় নাই।

মানুষ কি কেবল  খাওয়া আর বাথরুম করার একটা মেশিন? কেবল এক বৈষয়িক ভোগের মেশিন মাত্র? নাকি তার এসবের বাইরেও বহু উন্মেষ আছে এবং তা দরকারও! মানুষ আসলে রক্তমাংসের জীবন্ত সত্তা, আবার এক স্পিরিচুয়াল সত্বা সে। দুনিয়ায় সে কেন এসেছে, কিভাবে দুনিয়ার আর সব কিছুর সাথে সে সম্পর্কিত, কী তার দায়-কর্তব্য- এসব বোঝাবুঝি এবং তদনুযায়ী অ্যাক্ট-রিঅ্যাক্ট করার নামই মানুষ। একথাগুলোকেই আরেক ভাষায় আমরা বলি মানুষের রাজনৈতিক সত্ত্বা আছে। এমনকি সে অবজেকটিভ সত্ত্বা না, কর্তা সত্ত্বা আছে। এজন্যই তাঁর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে এমন বৈশিষ্টের রাষ্ট্রও লাগে। কেবল খাওয়া-পরায় বাঁচায় রাখার রাষ্ট্র হলে চলে না, সন্তুষ্ট হয় না সে।

অপর দিকে, রাষ্ট্রসংঘের হিউম্যান রাইট চার্টারই শেষ কথা নয়। চার্টারেরও নানান ঘাটতি আছে ও ত্রুটি আছে। সবচেয়ে বড় ফাউন্ডেশনাল ত্রুটি হল, এটা ইনডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর দাঁড়িয়ে সাজানো। অথচ মানুষ মানেই সামাজিক মানুষ। কিন্তু সেদিকটা ফেলে, ভুলে মানুষের ব্যক্তিবোধের দিকটাই কেবল সত্য ধরে নিয়ে ‘চার্টার’ সাজানো হয়েছে।  ফলে এটাও ভেঙ্গে চুড়ে নতুন কিছু লাগবে, এরও আরও অনেক উন্মেষ লাগবে। কিন্তু সেই ‘আরো ভালো কিছু’ পাওয়ার আগে কিছু শুরু করার বিন্দু হিসেবে এখনো চার্টারের ভূমিকা আছে। ফলে একালে এসে, মানুষ রাজনৈতিক না বৈষয়িক- এই বিতর্কটা এমন নয় যে, মানুষ হয় কেবল রাজনৈতিক না হয় কেবল বৈষয়িক সত্ত্বা। কমিউনিস্টরা ‘অধিকার’ বলতে রাজনৈতিক অধিকারের বদলে বৈষয়িক অধিকার বলে বুঝাকেই সহি মানতে চেয়েছে। কিন্তু এটা ডাহা ভুল ও এবসার্ড।

একারণে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের আর এক দগদগে স্ববিরোধীতা আছে।   ইউরোপের মর্ডানিটির ফসল আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রকে কমিউনিস্ট চিন্তার বিচারে এটা এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’ বা ‘বুর্জোয়া কান্ডকারখানা’ বলে তুচ্ছ করা হয়।  রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা – এগুলোকে কোন অর্জন বলে মানা হয় না, গুরুত্ব দেয়া হয় না। খেয়াল করলে দেখা যাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে বা চীনে বিপ্লবের পরের নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা রেখে দেয়া হয়েছে। USSR অথবা PRC নাম দুটার মধ্যেই ‘R’ এর অর্থ রিপাবলিক। রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা যদি তুচ্ছ এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে থাকে তবে রাষ্ট্রের নামের মধ্যে রিপাবলিক শব্দ বয়ে বেড়ানোর ন্যায্যতা কী?

এখন রাষ্ট্রসংঘের ‘চার্টারে’  ‘অধিকার’ বলতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ হয়ে গেছে – এই ভয়ে ও অভিযোগে অধিকারের রাজনৈতিক অর্থের দিক – মৌলিক মানবিক অধিকারের দিকটা তুচ্ছজ্ঞান করা্র কোন সুযোগ নাই। এটা ভিত্তিহীন ও মারাত্মক অন্যায়। ফলে ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়’ সর্বস্ব অধিকারের বৈষয়িক ধারণাই মুখ্য – এমন মনে করাও বোকামি। মনে রাখতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের এই বৈষয়িকতাসর্বস্ব চিন্তার কারণেই – চীন বার্মায় ব্যবসা করতে গিয়েছে, অথচ পাশে একটা বিরাট (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠী নিধন হয়ে যাচ্ছে। তবু চীন বে-খবর। কারণ চীনের শাসকেরা মানুষ নয়, একটা বৈষয়িক বিষয়-আশয় বোধের ডিব্বা। তাই চীন নিজের ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়ের’অধিকার’ রাজনীতিতে বুঁদ হয়ে আছে। হয়ত বিশাল উন্নতি করছে চীন! কিন্তু এই বিশাল উন্নীত চীন ‘লইয়া দুনিয়া কী করিবে!’

গৌতম দাস
লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের পেট ভর্তিআর গরম কাপড়ের মানবাধিকার“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়
গৌতম দাস
০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Nl

 

ঘটনার শুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ থেকে। সেখানে তিনি এই ভাষণে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ( এবং সাথে পাকিস্তানের কাশ্মীর অংশেও) দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ এনেছেন। ‘আমি বালুচিস্তান, গিলগিট, ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিষয়ে বলতে চাই। এ নিয়ে ভারত সরব হওয়ায় গত কয়েক দিনে ওখানকার অনেক লোক আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।’’ এর ব্যাখ্যা হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে (ভারতীয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ব্যক্তি যোগাযোগে করলে) নাকি বলা হয়েছে, মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ এনেছেন এ জন্য যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আগের দিন ১৪ আগস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে চলমান লাগাতার বিক্ষোভ, কারফিউর প্রসঙ্গ টেনে একে ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মানে এসব আসলে একটা পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা, যেখান থেকে সত্যতা বের করা কঠিন। তবে ১৪ আগস্টের আগেও ড্রেস রিহার্সেলের মত করে মোদী বেলুচ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। গত ১২ আগস্ট ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে ভারতের কাশ্মিরকেন্দ্রিক সব রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক হয়। মুজাহিদ কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরে লাগাতার কারফিউ কাশ্মিরের জনজীবন স্থবির করে রেখেছে। সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বৈঠকে মোদী সর্বপ্রথম বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আনন্দবাজারের রিপোর্টের ভাষায়, ‘গত শুক্রবার কাশ্মির প্রসঙ্গে সবর্দলীয় বৈঠকে প্রথম এই নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী। এই নতুন পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি সেই বৈঠকে বলেছিলেন,পাক-অধিকৃত কাশ্মির ও বালুচিস্তানের মানুষ যারা এখন অন্য কোনো দেশে থাকেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানের নির্যাতনের কথা সামনে আনতে হবে।’ সার কথা হল, কাশ্মির অসন্তোষে বুরহান ইস্যুর পর থেকে বর্তমানে ভারত যে চাপের মুখে আছে সেখান থেকে মুক্তি পেতে পাল্টাপাল্টিতে পড়ে ঘটনা এখন মোদীর ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ পর্যন্ত ঠেকেছে।

নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলা অন্তত ভারতের দিক থেকে একেবারেই নতুন অস্ত্র। এই অস্ত্র ভারতের জন্য শুধু নতুন তাই নয়। কারণ মানবাধিকার ইস্যু সবসময়ই দু’ধারী তলোয়ারের মত। কাঁচের ঘরে বসে অ্ন্যের উপর ঢিল ছুড়ার মত। ফলে তা ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করে ভারত নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। এক কথায় বললে কারো বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ আনা ভারত কখনোই নিজের কাজ মনে করেনি বা নিজের চায়ের কাপ হিসেবে গ্রহণ করেনি। আজ ভারত যেমন এক এককাট্টা রাষ্ট্র বলে দেখি কলোনি আমলের বৃটিশ-ভারত ঠিক তা ছিল না। সরাসরি কিছু প্রাদেশিক (সেকালে প্রেসিডেন্সী বলা হত) সরকারি এলাকা আর প্রায় ৫০০ এরও বেশি ছোট বড় করদ রাজ্য – এই সব মিলিত ভুখন্ডটাকে বলা হত বৃটিশ-ভারত। বিগত ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্মের সময় থেকেই অন্তত পরের তিন বছর ধরে সমানে পিটাপাটা আর সামরিক বলপ্রয়োগ করে বিভিন্ন রাজার রাজ্যকে মুল ভুখনন্ডে অন্তর্ভুক্তিতে বাধ্য করতে হয়েছিল। অর্থাৎ নেহেরুর নেতৃত্বের নতুন ভারত সরকারের অধীনে পুরান স্টাইলে কোন রাজাকে কর-খাজনা দিয়ে করদ রাজ্য হয়ে থাকার ব্যবস্থা রাখেন নাই। যেখানে ভারতভুক্তি আপোষে হয় নাই সেখানে সামরিক বল প্রয়োগ করে তা করা হয়েছিল। এর পরবর্তিকালের ভারতে একের পর এক লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও মাওবাদী আন্দোলনের সমস্যা ভারত রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কাশ্মির, পাঞ্জাব, নকশাল আর উত্তর-পূর্বের সাত বোন রাজ্যের আন্দোলন সেসবের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রকে জন্মের পর থেকেই লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাজনৈতিক সমস্যাকে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বলপ্রয়োগ, হত্যা-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে দমিয়ে নিজের রাষ্ট্রকে সংহত রাখতে হয়েছে ও হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট সেই রাষ্ট্রের কাছে ‘মানবাধিকার’ শব্দটিই হারাম। কারণ সে নিজেই সর্বক্ষণ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। স্বভাবতই ওই রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হবে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা। জন্মের পর থেকে এটাই এত দিন ভারত রাষ্ট্রের পুরানা সব সরকারের গৃহীত নীতি ছিল। ছিল বলতে হচ্ছে, কারণ অগ্রপশ্চাৎ যথেষ্ট বিবেচনা করে মোদি সেই নীতি এখন ভেঙেছে তা মনে করা যাচ্ছে না। খুব সম্ভবত চলতি কাশ্মীর ক্রাইসিস আরও মহীরুহ হয়ে সামনে আসতেছে এটা আঁচ  করে, মোকাবিলায় উপায়ন্ত না দেখে আপাতত “কুইনাইন খাইয়ে” যেভেবেই হোক জ্বর ছাড়াবার ব্যবস্থা এটা। এতে এরপর কুইনাইন সারাবে কে সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা – এটাই এতদিনের ভারতের নীতি ছিল তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত দেখা যায় পশ্চিমা রাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কের দিকে, বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের দিকে তাকালে। যেকোনো পশ্চিমা বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর শুরুতে ভারত সব সময় সবার আগে কবুল করিয়ে নেয় যে ‘কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু’, ভারত এই ইস্যুর ‘কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না’, এমনকি ‘জাতিসঙ্ঘেও মুখোমুখি হতে চায় না’ – এ ব্যাপারে ভারতের সেই পরদেশী বন্ধু একমত আছে। এমন একমত হবার পরই কেবল ভারত সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে আগায়। সে কারণে যে আমেরিকা মানবাধিকার ইস্যুকে অন্য রাষ্ট্রের পেছনে লাগার, তাকে বিব্রত করার বিষয় হিসেবে ব্যবহার করে প্রতি বছর রিপোর্ট বের করে থাকে, অথচ সে ভারতের কাশ্মির ইস্যুতে উল্টো নিজেকেই নিয়ন্ত্রিত রাখে। তো এই হল, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ইস্যু কেন ভারতের চায়ের কাপ নয়, এটা ভারতের জন্য নয়- এই ভাব ধরে রাখার ভারতীয় স্টাইল। তাই ‘মানবাধিকার’ ভারতের জন্য ‘নো গো’ বা অগম্য এলাকা- এভাবেই এত দিন ছিল। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীদের ব্রিফিংও এত দিন এই আলোকে সাজানো ছিল, এভাবেই চলে আসছিল।
তাই  ‘বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে’- মোদির এই নতুন বয়ানের পথ অনুসরণ করা দেখে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছে ভারতের ভেতরেরই অন্য রাজনৈতিক, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া গোষ্ঠী। তাঁরা দেখতে পাচ্ছে, মোদির রাজনৈতিক লাইনটি এ রকম যে, মোদি এখন থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তুলবে। আর তাতেই নাকি পাকিস্তান কুপোকাত হয়ে যাবে। মোদির এই লাইনের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, ভারতের কাশ্মিরের অসন্তোষ তৈরি করার জন্য পুরোপুরিভাবে পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করে দোষ চাপানোর ফলে অনেক রিলিফ পাওয়া যাবে, চাপ কমানো যাবে। ঠিক যেমন বেলুচিস্তানে অসন্তোষের জন্য পাকিস্তান ভারতকে দায়ী করে থাকে। উভয় পক্ষের এসব দায়ী করার ঘটনার সাথে সবচেয়ে ভাল তুলনীয় ঘটনা হল, ঠিক যেমন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হত ভারতের প্ররোচনাতেই নাকি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে। যেন বাংলাদেশের জনগণের কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্খা বা লড়াই-আন্দোলন বলে কিছু ছিল না। আবার তাই বলে বাংলাদেশের আন্দোলন বলশালী হলে এর মধ্যে ভারতের কোনোই স্বার্থ-প্রভাব ছিল না, এটা ঠিক তা বলাও নয়। ব্যাপারটা হল হবু বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষই নিজের নিজের স্বার্থ দেখেছিল। ফলে স্বার্থের এক সম্মিলন আমরা দেখেছিলাম। তবে প্রপাগান্ডার সময় মুখ রক্ষার্থে পাকিস্তান ভারতের প্ররোচনার কথাই বলবে। ঠিক যেমন ভারতের কাশ্মির সমস্যা ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের প্ররোচনাকে দায়ী করার পথ ধরতে চাইছে। প্রচারণার এসব স্টাইল নতুন নয়। যেটা নতুন তা হল ভারতের আমলা কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা মোদীর এই নতুন রাজনৈতিক লাইনের ভেতর বিরাট বিপদ ও সমস্যা দেখছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট মোদির বক্তব্য নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তারা তখনো ছিল খোশমেজাজে, কারণ বিপদ তখনো কেউ তাদের মনে করিয়ে দেয়নি। এ দিনের আনন্দবাজারের দু-দু’টি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ভারত-পাক সঙ্ঘাতের নয়া কেন্দ্র চিরবিদ্রোহী বালুচিস্তান’ এবং ‘কাশ্মিরের জবাবে বালুচ তাস, পাকিস্তানকে ফের খোঁচা মোদির’– যা তাদের স্পষ্ট উচ্ছ্বাসের প্রকাশ। আনন্দবাজার সবসময় তাতানো সেনসেশনাল আর খুবই সস্তা জাতীয়তাবাদী শিরোনামে রিপোর্ট লিখে থাকে। এই উচ্ছাস তেমনই। তবে সে হানিমুনের পিরিয়ড এখানেই শেষ। এর পরের দিন থেকে আনন্দবাজারসহ সব মিডিয়া, কূটনীতিক সবাই খুবই সতর্ক, যার প্রতিফলন দেখা যায় মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে। পরের দিন ১৭ আগস্ট থেকে মিডিয়া পুরো উল্টে যায়। যেমন এবার আনন্দবাজারের রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘লাভ কী হবে বালুচ তাসে, উঠছে প্রশ্ন’ অথবা আরও একদিন পর ১৮ আগস্টের রিপোর্ট, ‘বালুচিস্তান নিয়ে বেপরোয়া হতে গিয়ে মোদি এখন ঘোর কূটনৈতিক প্যাঁচে’। এখানে ভারতীয় বাংলা পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বাংলায় বুঝানোর সুবিধা নিলাম। ইংরেজি পত্রিকা রিপোর্টগুলোও কমবেশি একই রকম।
তাহলে কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা এতে কী বিপদ দেখলেন? তারা আসলে বলতে চান মানবাধিকার রেকর্ডের রিপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারত প্রতিযোগিতা করলে তাতে পাকিস্তানের যা হবে হোক, কিন্তু ভারতের কাপড় খুলে যাবে। কারণ জন্ম থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদ বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হুমকি সামলাতে গিয়ে ভারত মারাত্মক দুস্থ ও বিপজ্জনক অবস্থায় আছে; কারণ তার মানবাধিকার রেকর্ড খুবই খারাপ। ফলে মানবাধিকারের কথা যত চেপে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় ততই ভাল।
তাই আনন্দবাজার লিখছে, “…দ্বিধাবিভক্ত দেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক শিবির। অনেকের প্রশ্ন, ইসলামাবাদের ঢিলের বদলে পাটকেল ছোড়ার এই নতুন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে কি না?”। আর সবশেষে লিখছে, তবে কূটনীতিকদের একাংশের মত, “বালুচিস্তান নিয়ে ভূকৌশলগত খেলা চালিয়ে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করা যাবে। কিন্তু তাতে কাশ্মির সমস্যা মিটবে না। বালুচিস্তানের সাথে চিন ও ইরানের স্বার্থও জড়িত। মোদির এই তাসে ওই দু’টি দেশও ক্ষুব্ধ হবে বলেই মত অনেক কূটনীতিকের”। যদিও মোদীর এই মানবাধিকার বয়ানের লাইনের আরও এক আসল কারণ আছে তা এখানে আনন্দবাজার বলে নাই। সেটা এই রচনার শেষের দিকে আনব।
অর্থাৎ এখানেও আসল কারণ লুকিয়েছে মিডিয়া রিপোর্ট। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কংগ্রেসের সাবেক বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, তিনি আসল কারণ কিছুটা বলেছেন। আনন্দবাজার বলছে, সলমন খুরশিদের মতে, “অন্য দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু খোলাখুলিভাবে তা নিয়ে ভারত নাক গলায় না। …সে দেশের নেতাদের কাছে ঘরোয়াভাবে আমরা উদ্বেগ জানাই ঠিকই। কিন্তু সেটাকে কখনো নীতি হিসেবে ব্যবহার করি না। তাহলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের পার্থক্য কী হলো? …বালুচিস্তান নিয়ে ভারত গলা চড়ালে পাকিস্তানও কাশ্মির নিয়ে আরো সরব হওয়ার সুযোগ পাবে”। তবে কংগ্রেস দল সলমন খুরশিদের কথাকে নিজ দলের কথা তা বলতে পারেনি। বরং বলেছে এটা সলমনের ব্যক্তিগত মতামত। আনন্দবাজার এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছে, “ভোটের রাজনীতির কথা ভেবে কংগ্রেস মোদির পাকিস্তান বিরোধিতা থেকে দূরে যেতে চায়নি। তাই এমন সিদ্ধান্ত”।
এখানে এখন একটা তথ্য দেইয়া যাক। পাঠকের মনে হতে পারে এগুলো ভারত-পাকিস্তানের “সাদিও পুরানা” ক্যাচাল, এতে আমাদের কী! এমন দেশী পাঠককে সন্তুষ্ট করার জন্য তথ্যটি হল, আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার তথ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সাথে কথা বলেছেন। ওই পত্রিকার এসংক্রান্ত রিপোর্টের শিরোনাম, ‘মোদীর বেলুচিস্তান ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থন’ (Bangladesh backs Modi on Balochistan)। ওই রিপোর্ট থেকে দু’টি উদ্ধৃতি আনব এখানে। এক. ইনু বলেছেন, “বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে (বেলুচ) মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য এবং আমরা শিগগিরই বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ আমাদের সরকারের নীতি ঘোষণা করব”। এরপর উদ্ধৃতি দুই. “দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাপারের টেররিজম পাঠিয়ে আর বেলুচদের মতো গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের নিজ ভূখণ্ডে নির্যাতন করে ইসলামাবাদ কী পেতে চায় তা ব্যাখ্যা করা উচিত”।
মানবাধিকারের নীতিগত দিক থেকে এবং সে বিচারে আমাদের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। যেকোনো মুক্তি আন্দোলন বা রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি নির্যাতনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খুবই মারাত্মক। কিন্তু তবু তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারত সন্তুষ্ট হয়েছে কি না বলা মুশকিল। কারণ, যে কেউই ওই একই বাক্যে বেলুচ শব্দের জায়গায় কাশ্মির আর ইসলামাবাদের জায়গায় দিল্লি বসিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। এতে ভারতের কোনো সরকারি পাঠক খুশি না হয়ে উল্টো বিপদ দেখে ফেলতে পারেন।

সবশেষে এখানে মোদীর মানবাধিকার কর্মী হবার এই লাইন কেন নিলেন এর আসল কারণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এটা সেপ্টেম্বর মাস। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ ২৫ তারিখের আশেপাশে নিউইয়র্ক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়ে সরগরম থাকে। কারণ জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলি বা সাধারণ পরিষদের বৈঠক চলে। বিগত ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীরে গণভোট দিবার এক প্রস্তাব পেন্ডিং বা চাপা পড়ে আছে। এজন্যই ভারত বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের আগে কবুল করিয়ে নিয়ে রাখে যে, “কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু”, ভারত এই ইস্যুর “কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না”।  কাশ্মীরের অসন্তোষ চলছে। এবারের বুরহান ইস্যুতে এপর্যন্ত প্রায় ৭৫ এর উপরে মানুষ সেখানে মারা গিয়েছে।  তাই ভারতের আশঙ্কা পাকিস্তান এবারের জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে কাশ্মীর ইস্যুকে সরগরম করার চেষ্টা করবে। তাই পালটা কৌশল হিসাবে আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আর টেররিজমের ইস্যু তুলে রাখার কৌশল নিয়েছে ভারত। অন্যান্য মিডিয়া ব্যাপারটা আবছা ভাষায় বললেও ভারতের livemint পত্রিকা স্পষ্ট করে লিখেছে পাকিস্তান ২২ জন ডিপ্লোম্যাট নিয়োগ দিয়েছে যারা কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লবি করবে। মোদীর ভাষ্য জাতিসংঘে এই লড়াইয়ে জিতবার জন্যই সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাই এবারের G20 বা টপ ২০টা অর্থনীতির রাষ্ট্রের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ৫ সেপ্টেম্বর চীনে। মোদী সেখানকার বক্তৃতায় নাম না ধরে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও টেররিজমের অভিযোগ তুলে বক্তৃতা করেছেন। আর ওদিক সিপিএম এর সীতারাম ইয়াচুরী মোদীকে অভিযোগ করছেন যে তিনিওই পাকিস্তানকে জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলছেন,

We are giving an opportunity to Pakistan by raising the Balochistan issue. Now Pakistan may say that since India is taking about Balochistan, which is an integral part of that country, they have the right to talk about Kashmir. With this kind of foreign policy, we are giving an opportunity to others to internationalise the Kashmir issue, Mr. Yechuri said.

অর্থাৎ ইয়াচুরি বলতে চাইছেন, আমরা সবসময় বলে এসেছিলাম, “কাশ্মীর ইস্যু ইন্টারনাশনালাইজ করতে দিব না। সেখান থেকে মোদী সরে আসাতেই এটা ঘটতেছে”। এখন দেখা যাক, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা কী দেখব। আগামি নভেম্বরে সার্ক সম্মেলন বসার কথা পাকিস্তানে। আদৌও তা হবে কিনা তা পুরাটাই নির্ভর করছে এই সেপ্টেম্বরের ফলাফল কেমন কী হয়, তিক্ততা কেমন মাত্রায় ছড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছু উপরে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সরকার প্রধান যেতে পারছেন না বলে প্রচার হওয়া শুরু করেছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ২১ আগষ্ট ২০১৬ (প্রিন্টে ২২ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট  করে আবার ফাইনাল ভার্সান আকারে ছাপা হল।]