নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

গৌতম দাস

বৃহষ্পতিবার ২৭ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2f3

 

ঘটনার শুরু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলায়, যা ৯/১১ বলে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে বিশেষ ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেয় এবং তা নির্মূল করবার জন্য নতুন ধরণের যুদ্ধের সূচনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ‘আল কায়েদা’কে দায়ী করে। বুশের নেতৃত্বে আমেরিকা আল-কায়েদার রাজনীতি ও হামলা মোকাবিলার যে নীতি গ্রহণ করে তার বৈশিষ্টগুলো হলোঃ

১. খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় আল কায়েদা নির্মূলের যুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিশ্চান জগতের ক্রুসেড সাব্যস্ত করে লড়া।

২. “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়া, এই ডাকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে পক্ষে টানা। সবাইকে সতর্ক করা যে এটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সামিল হয়ে এই হামলা মোকাবিলা করার কমন লাইন হলো, ওয়ার অন টেরর।

৩.“হয় তুমি আমার পক্ষে নইলে তুমি আমার শত্রু” – এই নীতির ভিত্তিতে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নৌকায় উঠতে বাধ্য করা, ভূগোল জুড়ে এই বিভাজনের ভিত্তিতে নতুন এক অক্ষশক্তি তৈরি করা যার লক্ষ্য হচ্ছে যারা এই ক্রুসেডের পক্ষে নয় তাদের নির্মূল করা।

৪. এই যুদ্ধকে খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় ক্রুসেড বলে মনে করলেও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে আবার সেকুলারিজমের রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলে দাবি করা ও প্রচার চালানো। ক্রুসেডের মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশাবে তৈরি হওয়া এই সেকুলারিজমের সোজা মানে দাঁড়ালো, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়া। ইসলাম ডাকনামে যত রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রকাশ দুনিয়ায় আছে সবকিছুকেই শত্রুর কাতারে ফেলা। দুষমন জ্ঞান করে নির্মূল করা, ইত্যাদি।

 

যুদ্ধের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা
আমাদের নিশ্চয় স্মরণ হবে ৯/১১ হামলার সময় বাংলাদেশ ছিল একটা সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। তবুও তাকে আফগানিস্তান হামলায় বিমানের রিফুয়েলিং ও এয়ার স্পেস ব্যবহার করতে অনুমতি দিতে হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যুদ্ধ চাহিদা মেটানোর দায় কবুল করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত কোন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলেও এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লতিফুরকে নিতে হয়েছিল ।

একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশকে ওয়ার অন টেররের নৌকায় তুলে নেয়ার কাজটাতে একটা পজ দিতে হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ আগেই ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে কো্ন দল ক্ষমতায় আসে সেটা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসকে এটা মানতে হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যে, ওয়াশিংটনের পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস যে-লাইনে আগানোর পরিকল্পনা নেয় সেটা হলো, ইসলামের নাম-গন্ধ আছে এমন সব দল ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার কায়েম করা। নির্বাচিত বিএনপির জোটের সরকারকে ক্রুসেড নীতি্র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তা বাস্তবায়নের জনু উপযুক্ত মনে হয় নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মোকাবিলার একটা জাতীয় সরকার গঠিত হোক। তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ওয়ার অন টেররের নৌকায় উঠুক। প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার উদ্যোগ ছিল এটাই।

জোট সরকার ও মার্কিন যুদ্ধের অংশীদারিত্ব নেবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা
মোটা দাগে বললে, বিএনপি বাংলাদেশ সরকারকে বুশের নৌকায় ওঠানো এড়িয়ে যেতে পারে নাই। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ক্ষমতা শেয়ার আর ইসলামী রাজনীতির যাবতীয় প্রকাশগুলোকে শত্রু গণ্য করে একটা ভাগ তৈরির পলিসি জোট সরকার মানে নাই, এই দিকটা এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে আবার র‍্যাব গঠন, পশ্চিমের টার্গেট করা লোকদের ধরে নির্যাতন করে তথ্য আদায় ও তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ, ইত্যাদি কাজে জোট সরকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সহযোগী ভূমিকাই পালন করেছে। এককথায় রেনডিশনের কাজে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে বিশেষ সিকিউরিটি স্টেট আকারে সাজানো, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস ও পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলকে জোট সরকার মোটামুটি আস্থায় নিতে পেরেছিল। সেটাও সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। বেচারা বদরুদ্দোজার পদত্যাগ এসবেরই প্রতীকি প্রকাশ।

তখনকার মত পরিস্থিতি এভাবে থিতু হওয়াতে হাসিনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে হতাশ হাসিনা এই ঘটনার ভিতর থেকে পশ্চিমের চাহিদাটা ভাল করে বুঝেছিলেন। এই চাহিদা হবহু পূরণ করে দিতে পারলে তিনি পশ্চিমের চোখে একচ্ছত্র প্রার্থী হতে পারেন – এই সম্ভাবনার কথা ভেবে পরবর্তীতে তিনি এই লাইনেই রাজনীতি করবেন বলে মনস্থ করেন। শেখ হাসিনা পশ্চিমের ওয়ার অন টেররের চাহিদা বুঝে তাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের দিকে পা বাড়ান। সিদ্ধান্ত নেন এই চাহিদা মোতাবেক নিজে ও দলকে ঢেলে সাজাবেন। সে মোতাবেক রাজনৈতিক কৌশল তৈরিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির চেয়ে নিজেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি আন্তরিক ও উপযুক্ত খেদমতগার হিশাবে পশ্চিমের বাজারে হাজির করা। এই কাজের জন্য তিনিই একমাত্র ক্যান্ডিডেড হিসাবে নিজেকে বিক্রির কাজটা করতে পারা। ওয়ার অন টেররের উপযুক্ত সৈনিক হিশাবে আমেরিকান সমর্থন যোগাড় করা তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। এই লক্ষ্যকেই ধ্যানজ্ঞান করে ২০০২ সাল থেকে শেখ হাসিনা কাজ করে গেছেন।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশল, লোকাল এজেন্ডা
নিজের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ হাসিনার কৌশল হলো, ওয়ার অন টেররের আমেরিকান নৌকায় তিনি সদলবলেই উঠবেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এর নাম দিবেন “যুদ্ধাপরাধের বিচার”। আবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে তিনি একনিষ্ঠ – এই ভাব ধরে “স্বাধীনতার চেতনার” নামে নতুন এক রাজনীতি তিনি কায়েম করবেন। হাসিনার এই “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতির মানে হোল নিজের বাইরের আর সব রাজনীতি, চিন্তা, তৎপরতার যা কিছু বাংলাদেশে আছে তাকে নির্মূল করবার পথে অগ্রসর হওয়া। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের যে দাবি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গুমরে মরছিল, তাকে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়নের অধীনে এনে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের বীজ তিনি বপন করলেন তার কুফল শাহবাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে পড়ল। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে পারে নি, তাদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যারা করেছিল তাদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। সুষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া মেনে ও দেশে বিদেশে সকলের কাছে বৈচারিক নীতির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য একটি বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুষিয়ে রাখা এই দাবি মেটানোই ছিল সঠিক পথ। শেখ হাসিনা সেই পথে অগ্রসর হন নি।

ওয়ার অন টেররের ছাতার নীচে পপুলার এক উন্মত্ততা (ফ্যাসিজম) তৈরি করে কঠোরভাবে তার নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও নির্মূল করবার পথে তিনি গেলেন। ‘নির্মূল’ করাটা আক্ষরিক অর্থেই, অর্থাৎ ফিজিক্যালি বা শারিরীক ভাবে নির্মূল করা। এছাড়া হাসিনা যেভাবে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বুঝেছেন, তিনি চেয়েছেন চেতনার জয়গান। তার গান গাওয়াই হবে বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। খাঁটি বাঙালি তারাই যারা তার চেতনা ধারণ করে। শেখ হাসিনার “স্বাধীনতার চেতনায়” সওয়ার হয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোও বাঙালির খাঁটি চেতনা পয়দা করবার কাজে নেমে পড়ল। এই খাঁটি চেতনা, খাঁটি ইতিহাস, খাঁটি বাঙালি ধারণা, খাঁটি বাঙালি (পাঠ্য পুস্তকসহ) বই পুস্তক ছাড়া বাকি সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক উন্মাদনা তিনি আনলেন। নিজের এই খাঁটি বাঙালিত্ব বাদে আর সমস্ত চিন্তাকে রাজাকারি বা রাজাকারের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগিয়ে নির্মুল করবেন। একেই আমরা “বাঙালী জাতীয়তাবাদের” উগ্রতার চরম ও ৭১ এর পরের নব উত্থান এবং একই সাথে শেষ পর্যায় বলতে পারি। যারা গত পাঁচ-ছয় বছরের বাংলা ব্লগ ট্রেন্ড খেয়াল করেছেন তারা ভাল বুঝবেন এই নব উত্থিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ আক্ষরিক অর্থে তার প্রতিপক্ষকে ফিজিকালি নির্মূল করবার আকাংখা কিভাবে চর্চা করেছে। এই নির্মূলের আকাংখার তাগিদেই তাদের কদম কদম বাড়বৃদ্ধি হয়েছে। সেতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তচিন্তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে। এই উন্মাদনায় ধর্ম বা ইসলাম আমাদের সব চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান শত্রু এই ধারণা ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে আবার শুরু হয় আস্তিক-নাস্তিক ইত্যাদি নানান বিতর্কের ঝড়।

এতটুকু তাও সহনীয় ছিল। সব সমাজে নাস্তিকতা থাকে,আমাদের সমাজেও অনেকদিন থেকে আছে। কিন্তু এবারের আক্ষরিক অর্থে বিনাশ বা শারিরীক ভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মুলের আকাঙ্খা এতোই উন্মত্ত ছিল যে আস্তিক-নাস্তিক ঝগড়া সহজেই ইসলামের আখেরি নবীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চর্চার নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কারণ এই রাজনীতির অনুমান হচ্ছে লাখ দুয়েক রাজাকার ও রাজাকারের সহযোগী বলে যাদের ট্যাগ লাগানো হবে তাদের সবাইকে নির্মূল করে দিলে “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতিকে একচ্ছত্র করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয় নিশ্চিত করা যাবে। এই নির্মূল পরিকল্পনা আক্ষরিক অর্থেই এক ক্লিনজিং অপারেশানের মতো, এই ধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক ভাবে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবার এটাই উপযুক্ত পথ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রেখে এই যুদ্ধ চালাবার এটাই মোক্ষম সময়। দ্বিতীয় পজন্মের মুক্তিযুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এভাবেই বিশুদ্ধ এক বাঙালির বাংলাদেশ কায়েম করতে হবে। আরেকবার রক্তে স্নান করে একাত্তরের যুদ্ধের দায় মুক্তি ঘটবে।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশলের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি
কিন্তু হাসিনার এই নতুন যুদ্ধবাজ রাজনীতির বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা আছে।

১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বড় জোর একটা ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার হতে পারে। এটাকে ওয়ার অন টেরর বা পশ্চিমের চোখে সন্ত্রাস দমনের কাজ হিসাবে কতটুকু হাজির করা সম্ভব যাতে পশ্চিমারা আগ্রহী হবেন?

২. জামাত একটা সংবিধান মেনে চলা দল, যারা কনস্টিটিউশনাল রাজনীতি করে। পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা মানে এবং সেখানে অংশ গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য তা বিশ্বাসও করে। এমন একটি লিবারাল নির্বাচনমুখী ইসলামী দলকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাস্তবেও এটা সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন তৈরির দল। বাংলাদেশের শ্রেণি-গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশেরই আশা আকাঙ্খার দল। শেখ হাসিনা একে একটা ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসাবে হাজির করবেন কি করে? জামাত যতটুকু ত্রাস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তা অন্য দুই প্রধান পার্লামেন্টারী দল আওয়ামী বা বিএনপির চাপাতি, পিস্তল বা কাটা রাইফেলের ত্রাস সৃষ্টি করতে পারার মতই। কিন্তু একটা পার্লামেন্টারী রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী দল বলে হাজির করতে গেলে অন্ততপক্ষে তাকে নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠন বলে হাজির করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। যে দল ভোট চাইতে জনগণের কাছে যায় তাকে একটা গোপন, সহিংস বা সশস্ত্র দল হিসাবে দেশে বিদেশে চেনানো কঠিন।

৩. বাংলাদেশে জামাতই একমাত্র ইসলামী দল নয় বা ইসলামী রাজনীতির একমাত্র প্রকাশ নয়। যারা আফগানিস্তান ফিরে এসেছে তারা কেউ জামাতের রাজনীতি করে না, কখনও করে নাই। বরং তারা আওয়ামী লীগ করে এমন নজিরই বরং আছে। আবার মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নয়। কিম্বা ইসলামি বিপ্লবও নয়। জামাতে ইসলামি ক্যাডার ভিত্তিক রেজিমেন্টেড সৎ চরিত্রের মানুষ গড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল। এই দিক থেকে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল ‘সুশীল’দের রাজনীতির। যারা জামাতে ইসলামির মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক চায়। মওলানা মওদুদি মনে করতেন ঈমানের দুর্বলতার জন্য রাষ্ট্রের সদর্থক উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায় । তার মানে আল্লাভীরু সৎ চরিত্রের লোকের রাষ্ট্রনায়কী নেতৃত্বের অভাবে। সমস্যাটা নৈতিকতার। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে তার চিন্তায় মধ্যে বিপুল ওসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতা আছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হচ্ছে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বহুদিক ইসলামী ঈমান আকিদা ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা করলেও শেষমেষ ‘আধুনিক রাষ্ট্রই কায়েম করতে চেয়েছেন। অথচ ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র কায়েম আদৌ ইসলামের লক্ষ্য হতে পারে কিনা সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিশাবে হাজির হয়েছে।

অন্যদিকে ‘৭২ সালের পর থেকে মওলানা মওদুদির নিজের চিন্তার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের পুরানা রাজনীতিতে তিনিই আর থাকেননি। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাকি ৭ বছর তার কেটেছে সৌদি আরবে। ইরানী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশে ইসলামের রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক আঁচ থেকে বাঁচানোর কাজটা সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। জামাতে ইসলামি সে কারনে সোদি রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণহয়ে ওঠে । সুন্নি বাংলাদেশে সৌদি রাজতন্ত্রকে সেই সার্ভিস আন্তরিকতার সঙ্গেই জামাত দিয়েছে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। মোগল আমল থেকেই সামাজিক সৌজন্য আকারে আমরা বিদায় বেলায় “খোদা হাফেজ” বলতে অভ্যস্ত। আমাদের বয়স্ক প্রজন্ম এখনও তাই বলেন। কিন্তু এখন এটা “আল্লাহ হাফেজ” হয়ে গেছে। কখন থেকে কিভাবে এটা ঘটে গেছে কেউ টের পাইনি।

কোন ধরণের রেডিক্যাল ইসলামী রাজনীতি জামাতের লক্ষ্য নয় সেটা ১৯৭৯ সালের পরের সময়কালে জামাতের ভুমিকা আরও সাক্ষ্য দেয়। রাজনৈতিক দল হিশাবে জামাতে ইসলামি কখনই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন ক্ষেত্রেই জালিমের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু ভূমিকার চর্চা করে নি, বরং সবসময়ই নিজের ভাবমূর্তি এভাবেই তৈরী করেছে যে কোন প্রকার বিপ্লবী ইসলামী রাজনীতি তার স্বার্থের বিরোধী। ইরানী বিপ্লব থেকে কেউ যেন কোন ইতিবাচক পাঠ না নেয় জামাত সেই কাজটাই সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিক ভাবে করে গিয়েছে। ইসলামী রাজনীতির পরিমণ্ডলে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামির সখ্যতা গভীর। এককথায় বললে বলতে হয় ইসলামের নামে কোন রাডিক্যাল রাজনীতি যেন বাংলাদেশে জেগে না ওঠে ও দানা বাঁধতে না পারে পাশ্চাত্যের পক্ষে জামাতে ইসলামি তারই খেদমতগারি করে গিয়েছে। এই ধরণের মিত্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের চোখে শত্রু প্রমাণ করা শেখ হসিনার জন্য কঠিন একটি কাজ।

টাইম বাউন্ডিং দুর্বলতা বা গ্লোবাল যুদ্ধ কৌশলে বদল
উপরে শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতির যেসব বড় দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বললাম সেগুলো স্থায়ী। কিন্তু আর এক বিশাল দুর্বলতার দিক আছে যাকে বলা যায় “টাইম বাউন্ডিং” বা সময় নির্ধারিত দুর্বলতা। মানে, কোন্‌ সময়ে তিনি তার রাজনীতিটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতিটার ২০০৭-৮ সালের আগে করতে সক্ষম হলে এক রকম হত, কিন্তু এর পরের যে কোন সময়ে করতে চাওয়াটা এক বিরাট বাধা। কেন? মুল কারণ ২০০৮ সালের পর খোদ আমেরিকাই আর বুশের নীতিতে থাকেনি। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট যুদ্ধনীতি বদলে ফেলেছে। এটা ২০০৮ সালে বুশের বদলে ওবামা জিতেছে বলে নয়। বুশের সম্মুখ সমরে ইসলাম মোকাবিলার নীতি তার ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরে নিজস্ব মুল্যায়ন রিপোর্টে ঐ নীতি অকেজো প্রমাণিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষের নাম লক্ষণ নাই বরং তা আফগানিস্তান বা ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর সবকিছুর উপরে যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের উপরে দাঁড়ানো বলে পরিণতিতে এটা একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা (২০০৭-৮) হিসাবে হাজির হয়।

এর ফলে বুশের সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে অল-রাউন্ড যুদ্ধ মোড় বদলাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধকৌশল মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক খুজে বের করার দিকে ধাবিত হয়, যার বাইরের নাম আরব স্প্রিং। ব্যাড মুসলিম আর গুড মুসলিমের ভাগাভাগি শুরু হয়। ওয়ার অন টেররের বাগাড়ম্বর স্তিমিত কিম্বা অবস্থা বিশেষে গায়েব হয়ে যায়। যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো আর বাড়ানো নয় বরং কত দ্রুত (২০১৪ সাল টার্গেট) সবগুলোকে গুটিয়ে নেয়া যায় – এটাই হয়ে যায় মার্কিন নীতি। কিন্তু হাসিনার স্থানীয় যুদ্ধকৌশল তো বুশের একরোখা ওয়ার অন টেররের উপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ইতমধ্যে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া হয়ে ওঠে ওবামা প্রশাসনের কাছে আগামি দিনের সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ আর সেকারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুকরাষ্ট্র কতোটা সমর্থন তা এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ওবামা আমলে আমেরিকার নতুন নীতি ও যুদ্ধকৌশলের সীমার ভিতরে হাসিনার নেয়া স্থানীয় ইসলাম নির্মূল কৌশল আনফিট ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ এই দিকটা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূল নীতির পালে হাওয়া লাগা অসম্ভব কিছু নয়। টাইম বাউন্ডিং বা সময় দ্বারা নির্ধারিত এই দুর্বলতার দিকটা বাদ রেখে হাসিনা তার দুর্বলতাগুলো কিভাবে কাটিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলোচনা এখন সেদিকে নেবো।

শেখহাসিনা-নির্মুল কমিটির পরিপূরক সম্পর্ক
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দুর্বলতাগুলো পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখেন শাহরিয়ার কবীর ও তার নির্মুলের রাজনীতি। এটাকে হাসিনার কৌশলের সাথে শাহরিয়ারের রাজনীতির পারফেক্ট ম্যাচ মেকিং বলা যায়। হাসিনার নতুন কৌশলটা শাহরিয়ার কবীরই সবচেয়ে পছন্দ করেছিলেন। সেই ২০০২ সাল থেকে নির্মুলের রাজনীতি প্রচার ও চর্চার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছিলেন তিনি। একাজে তিনি নতুন শত্রুর যে ভাগটা তৈরি করেন তা হলো, ব্রড হেডলাইনে ইসলাম আর তার প্রকাশ মানেই হলো জামাত। এভাবে তিনি কি করেছিলেন এবং কেন তা পেরেছিলেন এর তিনটা কারণ উল্লেখ করা যায়।

১. বাংলাদেশে আলকায়েদা বা তালেবানদের মত ইসলামী রাজনীতির সোল এজেন্ট, একমাত্র সম্ভাব্য দল হলো জামাত -এই মিথ্যা ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে তিনি একাজ করেছেন। এছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামাত মানেই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সকল ধারা ও প্রবণতার উৎপত্তি কারণ, উৎস ও প্রতীক। এভাবে বয়ান তৈরির সম্ভব হয়েছিল কারণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তো বটেই কমিউনিস্টরাও দুনিয়ায় বা বাংলাদেশের ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে কোনটার সাথে কোনটার মৌলিক রাজনৈতিক তফাত কি, কোন ইস্যুতে তাদের পার্থক্য, কোথায় তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক — এইসবের কোন খবর জানে না, রাখার দরকারও মনে করে না। বরং মনে করে মানুষের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ হলো ধর্ম, মানে ইসলাম। ফলে ধর্ম উৎখাত তাদের বিশাল রাজনৈতিক কর্তব্য। এই পরিস্থিতি শাহরিয়ারকে তার বয়ান তৈরি করতে সহায়তা করেছে।

২. ১৯৭১ সালে জামাতের রাজনীতি আর একালের তালেবান রাজনীতির কোন মিল থাকুক আর নাই থাকুক জামাতের ৭১ সালের ভুমিকাই হোল অকাট্য প্রমাণ যে জামাত তালেবানের মত একটা “সন্ত্রাসী” দল। জামাতের ৭১ এর ভুমিকা নিয়ে জনগনের মনে যে সেন্টিমেন্ট আছে তা কচলে ব্যবহার করে সাধারণভাবে সব ইসলামী রাজনীতিকে দানব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এই জবরদস্তি শাহরিয়ারের দরকার ।

৩. আফগান ফেরতদের দলগুলোর নানান তৎপরতা এবং জেএমবির স্বল্পকালীন উত্থান (২০০৫) এই ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবীরদের দারুণ কাজে লেগেছিল। শহুরে মধ্যবিত্তকে জঙ্গী ইসলামের নিশ্চিত আবির্ভাব সম্পরক্কে ভীত ও আতংকিত করা গেছে। জেএমবির উত্থান রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে অন্ধ অবস্থা তৈরী করেছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছিলে নির্মূলের রাজনীতি। জামাতের রাজনীতির সাথে জেএমবির রাজনীতির কোনই মিল নাই। কিন্তু মিল না থাকলেও মধ্যবিত্ত, সেকুলার,কমিউনিস্ট আর মিডিয়ার চোখে এদের জামাতি বলে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ঘটলো যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটা আর ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার থাকল না। বিচারের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকল না। বয়ানের পাটাতন একেবারে বদলে গিয়ে হয়ে দাড়ালো, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে সবকিছুরই নির্মুল, বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে ঝেড়ে মুঝে সাফ করে ফেলা। একাকার করা এই বয়ানে এক দড়িতে ফাঁসি হয়ে গেল “বিচার” আর ইসলামের।

এতে দ্বিতীয় আরেক বিপদ তৈরি হলো। ধরা যাক ঠিক বিচার নয়, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ আছে সেগুলোকেই মোকাবিলা করতে চান শাহরিয়ার ও তার নির্মুল কমিটি। তাতে একটু না হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার কথাটা ঢাল হিসাবেই ব্যবহারই তিনি করেছেন। এভাবেই যদি ধরি তো সেক্ষেত্রেও যে প্রশ্ন আমাদের ছাড়ে না তা হলো,ইসলাম নামে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশগুলোর মোকাবিলা কি নির্মূল বা ইসলাম ক্লিনজিং করে করা যায়, নাকি সম্ভব? অর্থাৎ কাজটা কি নির্মুল বা ক্লিনজিং -এর? যার যার মাথায় ইসলামী চিন্তা আছে এমন লোকদের এক এক করে ধরে মাথা কেটে ফেলার ব্যাপার ? মোটেই না। চিন্তার মোকাবিলা একমাত্র আরো অগ্রসর চিন্তা দিয়েই করা সম্ভব। নইলে তার পরাস্ত হবার কোন সম্ভবনাই নাই। । অর্থাৎ চিন্তা বা ভাবাদর্শগত ভাবে পরাস্ত করা এবং সেভাবে পরাস্ত করবার রাজনীতির মানে আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করা নয়। ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়া মানে মানুষের পুনর্গঠন আর পুনর্গঠিত সেই নারী ও পুরুষের নতুন সম্পর্ক রচনা — দুনিয়া থেকে পুরুষ নির্মূলের কর্মসুচী নয়। মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব সংঘাত শ্রেণীযুদ্ধ বটে কিন্তু কোনভাবেই এটা সমাজের মালিক অথবা শ্রমিক কাউকেই ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। বরং এটা সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্গঠনের যাতে সমাজে একদিকে পুঁজিপতি আর অন্যদিকে শ্রমিক উৎপাদন করতে না পারে। অর্থাৎ সামাজিক মানুষ যেন দুই বিবাদমান শ্রেণি হয়ে উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত না হয়, ইত্যাদি।

ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে অনেকের মনে হতে পারে বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষমতার জন্ম দিতে গেলে একটা যুদ্ধ তো হবেই, সেটা কি? সেটা আর যাই হোক কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং অপারেশান নয়। বিদ্যমান ক্ষমতাকে পরাস্ত করে নতুন ক্ষমতা কায়েমের জন্য যতোটুকু বলপ্রয়োগ লাগে ততোটুকুই। বৈপ্লবিক রূপান্তরে প্রাণের ক্ষয় ঘটে ঠিক, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়, নতুন ক্ষমতার জন্ম দেওয়া এবং নতুন আইন ও নীতিনৈতিকতার জন্ম দিয়ে নিজের নতুন ক্ষমতার বৈধতা ও ন্যায্যতা প্রমান করা। নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা যেন নতুন মানুষ তৈরী হতে পারে। কোনভাবেই সেটা ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। । এমন বাসনা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা কেউ একা বা দলবদ্ধভাবে তৈরি করা নয়। সমাজের সংস্কার বা বিপ্লব প্রতিহিংসার চর্চা হতে পারে না। জিঘাংসার আকাঙ্খা যে উন্মাদনা তৈরি করে বাস্তবে একা বা গোষ্ঠিসহ কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং করা মানেই হলো আরেকটি যুদ্ধাপরাধ ঘটানো।

সমাজে চিন্তা ও ভাবাদর্শগত লড়াইকে খুনোখুনি করে সস্তায় সেরে ফেলতে চেয়েছেন শাহরিয়ার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে হাসিনা আর নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার, মুনতাসির ইত্যাদিরা মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে গেছেন আর সমর্থকদের মনে সফল ভাবে ঢুকিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর ক্লিনজিং-এর আকাঙ্খা। নির্মূল বাসনার এক অসুস্থ উন্মত্ততা।

শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ারের এই যৌথ প্রকল্পের খবর অনেকেই রাখেননি। বলা বাহুল্য শেখ হাসিনার সাথে শাহরিয়ারের এই মহামিলন ও তাদের প্রজেক্টের অভিমুখ ও পরিণতি হলো হাসিনার কারজাই হওয়া। আর প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই এটা তালেবান রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা। ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে শাহরিয়ার আজীবন নির্মূলের মধ্যেই তার সমাধান দেখেছেন। তার সাফল্য হলো,এই উন্মাদনাকে তিনি বাংলাদেশের সমাজে একটা মানসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পেরেছেন। এখন বলে বুঝিয়ে এদের কাউকে বিরত করা যাবে মনে হয় না। কারণ এই উন্মাদনা চেপে বসেছে। তাদের অনুমানে দুলাখ ইসলামপন্থীদের নির্মূলের পথে নিয়া যাবার জন্য এরা তাদের মন ও সেকুলার জিঘাওংসাকে পুরাপুরি বেঁধে ফেলেছেন।

শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নির্মূল বাসনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটাচ্ছে সেটা বিচার করবার সাথে সাথে আমাদের কাছে একটা দিক পরিস্কার থাকতে হবে। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত একটি ইস্যু। বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ায় এর ফয়সালা না করলে নানান পেটি স্বার্থে এই জাতীয় ইস্যুটি সবসময় রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতেই থাকবে। যেমন শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর যেভাবে করছেন।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শাহরিয়ারের যুদ্ধ প্রস্তাব
তবু শেষ বিচারে হাসিনা আর শাহরিয়ারের রাজনৈতিক আকাঙ্খা কিন্তু এক নয়। শেখ হাসিনার আকাংখা ও পথ হোল যে-রাজনৈতিক লাইন বুকে ধরে তিনি গত দশ বছর এগিয়েছেন তা দিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার কাজে এই পথটাকে ব্যবহার করা। এই বিচারে শাহরিয়ার কিন্তু সৎ ও নির্মূলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর নিজের ভাষাতেও “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করতে চান। এজন্য তিনি VOA এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছে হস্তক্ষেপ সহায়তা চেয়েছেন। হাসিনা পশ্চিমের সমর্থনে একনিষ্ঠ “ওয়ার অন টেররের” একনিষ্ঠ খেদমতগার হয়ে বিনিময়ে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চান, নিজস্ব “স্বাধীনতার চেতনার” বাইরে থাকা বাকি সবাইকে মেরে কেটে সাফ করা যার লক্ষ্য, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আতাত ও আপোষ করতে বাধা নাই। । শাহরিয়ার চান একই “ওয়ার অন টেররের” খেদমতগার হওয়া, কিন্তু কোন আঁতাত বা আপোষ নয়। কারন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন তার উদ্দেশ্য নয়। বরং “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করবার কাজে একনিষ্ঠ থাকতে চান। এই কাজে তিনি শেখ হাসিনার ওপর পুরাপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। বরং সরাসরি আমেরিকার সমর্থন, লজিস্টিক , সৈন্য সব কিছুই চান। কোথায় তাদের মিল আর কোথায় পার্থক্য সেটা আমাদের বুঝতে হবে। একই সাথে শাহবাগের অংশ গ্রহণকারীরা যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে নিজেদের পৃথক দাবি করে, তারা শাহরিয়ারের নির্মূলের রাজনীতি ধারণ করে বলেই সে কথা বলে। ঠিক যে শাহবাগ শেখ হাসিনার আশু রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলিত থাকলেও শাহবাগের রাজনীতি শেখ হাসিনার রাজনীতি নয়। সেটা একান্তই শাহরিয়ার কবীরের নির্মূল বা ক্লিনজিং-এর রাজনীতি।

লক্ষ্য করার বিষয় ভয়েস অব আমেরিকার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার কিন্তু আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলছেন না। বলছেন ওয়ার অন টেররের খাঁটি লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন”। এটাই চান তিনি। বিষয়টা শাহরিয়ারের কাছে স্পষ্টতই এখন আর আদালত পাড়ার বিষয় নয়, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবার বিষোয়।। তাই তিনি প্রকাশ্যে সাক্ষ্যতকারে দাবি করছেন,“জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”। কিন্তু প্রশ্ন হোল এখন তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকারঙ্করে সবাইকে জানাচ্ছেন কেন? এতদিন আড়ালে যেভাবে চলছিল সেই পর্দা উঠিয়ে ফেলার কী দরকার ছিল।

কারণ শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ার – প্রতীকি নামের দুই রাজনৈতিক আকাঙ্খা হাত ধরাধরি করে চলতে থাকলেও তাদের উদ্দেশ্যে পার্থক্য ছিল। এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও এতদিন তাদের সহাবস্থানে অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এখন সেটা দিনকে দিন সেটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ারের নির্মূল ধারা মনে করছে হাসিনা যথেষ্ঠ কঠোর পথে যাচ্ছেন না। কি সেই কঠোর পথ? সুনির্দিষ্ট করে বললে, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে দানব হয়ে মাঠে নেমে পড়া, দাবড়ানো, খুনোখুনি। জিতি অথবা মরি জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে হাসিনা নির্বাহি ক্ষমতায় আছেন আর শাহরিয়ার আছেন একই নির্মূলের আদর্শে, চিন্তায় রাজনৈতিক লাইনে, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকার ঠেলা বা বিপদ শাহরিয়ারের বুঝের বাইরে। পোলাপান অনেক কিছুই আবদার করে। কিন্তু বাবাকে টাকা কামিয়ে, সেই কামানো অনুপাতে ব্যয় করতে হয়। তার পর আবদার কতক অংশ পুর্ণ করতে পারে কতক অংশ পারে না। পোলাপানের আবদারকে ভিত্তি মেনে বাবার চলা অসম্ভব। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার মানে ও পরিণতি কী সেটা না বুঝে শেখ হাসিনা পা ফেলতে পারেন না। বিশেষত সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার সায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আগে নিতে হবে। তা না নিয়ে লাঠি হাঁকাতে পারেন না তিনি। সন্ত্রাস দমন আইন দিয়ে ক্লিনজিংয়ে্র লাইনে ঝাপিয়ে পড়ার মানে শুধু পরিস্থিতি লেজে গোবরে করে ফেলা না, কিম্বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও না, বরং নিজের জান বাচানোও এতে সঙ্গীন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, লজিষ্টিক বা রসদের সরবরাহ পাওয়া না পাওয়ার কথা নাইবা তুললাম।

শেখ হাসিনাএখন একটা স্ববিরোধিতায় পড়েছেন। তিনি সচেতন ভাবে ক্লিনজিংয়ের ধারণা দিয়ে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠিকে তাতিয়েছেন। শুধু আওয়ামী পন্থী নয়, যারা আওয়ামী লীগ করে না সেকুলারিষ্ট, বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক, তরুণ ভোটার -ইত্যাদি সকলকে জিঘাংসার উন্মাদনায় শেখ হাসিনা উন্মত্ত করেছেন। তিনি এসব করেছেন এই উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ভাবে প্রবাহিত করে নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করার কাজে একে ব্যবহার করতে। অন্যদিকে শাহরিয়ার চাইছেন, উন্মাদনাকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মত্ত ব্যবহারে প্রয়োগ করতে, ক্লিনজিংয়ের কাজে লাগাতে। এজন্য তিনি পরিষ্কার করেই এখন বলছেন আদালতে কোন ‘বিচার’ এমনকি শাহবাগের মত ফাঁসিও না, একেবারে নির্মুল বা ক্লিনজিং করবার কাজ সম্পন্ন করতে চান তিনি। চান চিরতরে “জঙ্গি মৌলবাদ দমন”। একাজেই “আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”।

শাহরিয়ার কবীরের এই নির্মূল বাসনা আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যে তীব্র সংঘাত চলছে তার প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তাহ তিনেক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির এক টকশো তে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর প্রয়োগের পক্ষে আর বিপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুব। ওখানে মাহবুব বারবার আর্গু করছিলেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আর ব্যারিষ্টার আমিরুল ততই বারবার আর্গু করছিলেন সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ধরে নিতে পারি হাসিনা অন্তত বোঝেন “সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯” বাংলাদেশের হলেও আইনটা কার্যত আমেরিকার। আমেরিকার আগ্রহে ও ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি গাইড লাইন মেনে এটা তৈরি। এই আইন ব্যবহার করে নির্মুল বা ক্লিনজিং-এর পথে যেতে গেলে আমেরিকার আশির্বাদ লাগবে। কিন্তু শাহরিয়ার, মুনতাসির বা আমিরুল সেটা বেখবর। ফলে তারা বালখিল্য আচরণ করছেন। কান্নাকাটি করছেন, আমেরিকা কেন আফগানিস্তান বা ইরাকের মত বাংলাদেশেও একটা নতুন তালেবান মোকাবিলার ফ্রন্ট খুলছে না।

সন্ত্রাস দমন আইন এমন আইন যা কোথাও ব্যবহার করলে এর সব একটিভিটি রিপোর্ট আমেরিকাকে দিতে হয়। কেন? সেটা আমরা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ বুঝি সেই সহজ বোঝাবুঝি ছাড়াও আরও ভিন্ন দিক থেকে বোঝার ব্যাপার আছে। আমেরিকাকে না জানিয়ে হাসিনা যদি এই আইন একার বুদ্ধিতে ব্যবহার করে তবে সে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠবে। সেটা একটা তালেবান পরিস্থিতি তৈরি করবে, প্রথম চোটে যার অভিমুখ হবে এন্টি-আমেরিকান, বাংলাদেশের সব পশ্চিমা ইনষ্টলেশন এর টার্গেট হবে। অল-রাউন্ড একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট ওপেন করলে যেমন ঘটে। শুধু তাই নয়,এর উপচে পড়া প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশে না, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বার্মাসহ পুরা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের প্রতিদিনের আঞ্চলিক ঝগড়া দ্বন্দ্ব বিবাদ সবসময়ে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মায়ানমারে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিবাদ হিসাবে চলছে এগুলো সমন্বিত হবে আর তার নির্দিষ্ট অভিমুখ হবে পশ্চিমা-বিরোধী। স্থানীয় যে কোন বিরোধ এভাবে গ্লোবাল বিরোধ হয়ে হাজির হতে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য আত্মরক্ষামূলক ধরণের হলেও সেই সীমিত লক্ষ্যের নতুন ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতা তৈরি করে ফেলবে। ফলে সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ দেখতে বাংলাদেশের মনে হলেও এর প্রয়োগ ও পরিণতি শতভাগ আঞ্চলিক ও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। এদেশে যারা দুলাখ জামাত ও রাজাকারি ট্যাগ লাগানো লোক মেরে নির্মুলের মধ্যে ঘটনার সুখকর সমাপ্তি দেখছেন তাদের বেহুঁশ ও বালখিল্য বললে কম বলা হয়। আমেরিকার যুদ্ধ বালখিল্য ব্যাপার নয়। যদি তাই হোত তাহলে সারা দুনিয়ার উপর সাম্রাজ্যের ছড়ি ঘুরাতে পারত না। তাহলে কি শাহরিয়ারের লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন” কাজে আমেরিকাকে ডাকার চেষ্টাটা ভূয়া? এতে কিছু হবে না? কোন বিপদ নাই?

না ভূয়া বলছি না। বলতে পারলে ভাল লাগত। গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো,আওয়ামী লীগ, অ-আওয়ামী লীগার, সেকুলারিস্ট,বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক –সকলেই একপ্রকার জিঘাংসার উন্মাদনায় আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তাতানোর ফলাফল এটা। এটা পটেনশিয়াল ও খুবই বিপজ্জনক। যে কোন দিকে এর মোড় নেবার সম্ভাবনা আছে। হাসিনা একে তার নির্বাচনী বা ক্ষমতা লাভালাভের কাজের মধ্যে পরিণতি টানবার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। শাহবাগ নামে যা ফেটে বের হয়েছে। আবার শাহবাগের অনেকেই যেমন বলে শাহবাগের অভিমুখ একটা না, ভিতরে অনেক অভিমুখ আছে। এর ভিতরের একটা শক্ত অভিমুখকে চিনিয়ে দেই। যেমন ষ্টেজে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আছেন সবসময় ইমরানের পাশে। নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একই সাথে হাসিনা ও নির্মূল কমিটির প্রতীক। ওখানে যে আইকন বা ছবি তোলা হয়েছে সেটা “বঙ্গবন্ধুর” না, নির্মুল কমিটির জাহানারা ইমামের । বেঁচে থাকলে জাহানারা নির্মূলের রাজনীতি করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তার ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটির পটেনশিয়ালিটি নিশ্চয় নতুন করে বলবার কিছু নাই।

কোথায় নিয়ে যাবে এরা?
পটেনশিয়ালিটি – মানে কিছু ঘটিয়ে দেবার উন্মত্ততা। শেখ হাসিনা কিন্তু এখনো তৈরি হওয়া এই উন্মত্ততা দিয়ে কিছু ঘটিয়ে ফেলার পটেনশিয়াল নিস্তেজ করতে পারেন নি। ওদিকে শাহরিয়ার, মুনতাসির বা ব্যারিস্টার আমিরুলের নির্মুলের রাজনৈতিক আকাঙ্খা জীবিত আছে, সরব হচ্ছে। হাসিনার টালবাহানা দেখে শাহরিয়ার সরাসরি আমেরিকার কাছে আহ্বান নিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে নির্মুল কমিটির ধারাটাই উন্মত্ততার উপযুক্ত ও কার্যকর ক্যারিয়ার হতে পারে। এই হোল পটেনশিয়াল বিপদ তৈরি হয়ে থাকার দিক। ওদিকে আমেরিকাও বাংলাদেশে কোন নতুন ফ্রন্ট খোলার কোন তাগিদ দেখাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও অর্থ খরচের সামর্থ হারাচ্ছে তারা। অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উন্মত্ততার লাইন প্রথম ঝাপ্টায় ইতোমধ্যে দেড়শ লোক মেরে ফেলেছে, কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। প্রথম দফার রক্তারক্তির পর উভয় পক্ষই সমাজকে স্ব স্ব পক্ষে নতুন শক্তি ও শ্রেণি বিন্যাস তৈরির জন্য সময় নিচ্ছে। কোন পক্ষই টোন ডাউন করবে এমন বাস্তবতা নাই। কিছু ঘটাবার সক্ষমতা উভয় পক্ষেই আছে। এটাই অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা আর অনিচ্ছুক আমেরিকাকে যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতায় টেনে নিতে পারে। একটা লোকাল ঘটনা রিজিওনাল ও গ্লোবাল হয়ে উঠতে পারে। এর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাকে কিছু তো করতে হবে, অন্তত আত্মরক্ষামূলক। লিবিয়ার “আরব স্প্রিং” উন্মাদনার এত বড় ঘটনায় খরচের কথা চিন্তা করে আমেরিকা কোন মেরিন পাঠানোর পথে যায় নাই। এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু গাদ্দাফি উত্তরকালে নিজের রাষ্ট্রদুত খুন হবার পর কিন্তু সে মেরিন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সোজা মানে হলো, মেরিন পাঠানোর অবস্থা তার এখনও নাই বললে চলে, একান্ত বাধ্য হয়ে না গেলে। খরচ সামলানো মুশকিল। এখন কম খরচে ন্যূনতম কিছু করতে হলে সেটা হবে ড্রোন হামলা।

এসব বিবেচনায় করেই প্রতীকি ভাবে ড্রোনের কথা এসেছে। কিন্তু মুল বিষয় হলো, যে পটেনশিয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে তা যে কোন দিকে মোড় নেবার ঝুঁকি রাখে। উন্মত্ততা নিস্তেজ করবে কে, কি দিয়ে এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে না। এখন এই সম্ভাবনা আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

 

[এই লেখাটির একটি প্রাথমিক খসড়া সর্বপ্রথম তোলা হয়েছিল গত ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ফেসবুকে নোট আকারে। শিরোনাম ছিল, ‘শাহরিয়ার ও শাহবাগ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে’সেই লেখাটি এক সম্পাদিত রূপ এরপর ছাপা হয়েছিল চিন্তা নামের ওয়েব পত্রিকায়।  চিন্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল দুদিন পড়ে  ২৪ মার্চ ২০১৩ সালে। এখানে চিন্তা পত্রিকার ভার্সানটাই আবার এখানে হুবহু তুলে আনা হল, সংরক্ষণের জন্য।]

 

 

লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

গৌতম দাস

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়ার গবেষণা ফেলো হলেন লিসা কার্টিস (Lisa Curtis)। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার আমেরিকান সংবাদদাতা লিসা কার্টিসকে কিছু লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন, যার লিখিত জবাব তিনি দিয়েছেন আর মানবজমিন পত্রিকায় তা গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ ছাপা হয়েছে।

থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও আমেরিকান বিদেশনীতি
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আমেরিকার থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। থিঙ্কট্যাংক মানে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে আগাম চিন্তাভাবনা ও নিজস্ব গবেষণা করে এতে পাওয়া ফলাফল জনসমক্ষে হাজির করা হয়, তা পরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি হবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভুমিকা রাখে। তবে থিঙ্কট্যাংক বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে চলে, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান সে নয়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিশেষত্ত্ব হল, ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগানের প্রভাবে এই প্রো-ইহুদি থিঙ্কট্যাংক জন্ম নেয়। ঘোষিত লক্ষ্য হল, ঘোষণা দিয়ে বলে কয়েই রক্ষণশীলভাবে চিন্তা করা। রক্ষণশীলভাবে ভেবে দেখা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতি কি হতে পারে, হওয়া উচিত। আর হেরিটেজ মনে করে আমেরিকান রাষ্ট্র যেন অবশ্যই বেসরকারি উদ্যোগ ও খাতের মাধ্যমে প্রায় সব কিছু করতে ও পরিচালিত হতে দেয়, রাষ্ট্র দায় কম নেয় এবং সব বিষয়ে রাষ্ট্র যেন সীমিত সংশ্লিষ্টতার ভুমিকায় থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায়, প্রচলিত আমেরিকান মুল্যবোধ আর শক্ত আমেরিকান জাতীয় প্রতিরক্ষাবোধের কথা খেয়াল রাখে।

কিন্তু ছাপা হওয়া লিসা কার্টিজের এই প্রশ্নোত্তরকে আমাদের এত গুরুত্ব দেবার কি আছে? আমেরিকান সরকারগুলোর নীতিতে কোন থিঙ্কট্যাংকের ভুমিকা ও গুরুত্ব কি তা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সমাজের কোন গ্রুপের কোন নীতি বা অবস্থান সরকারের নীতি হয়ে উঠার আগের ধাপটা হল থিঙ্কট্যাংকের উদ্যোগে করা চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ। তবে আবার এটা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঠিক কোন বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একেবারেই তা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আর থিঙ্কট্যাংকের কাজের ধরণ হল, সিরিয়াস গবেষণা শেষে ফলাফল স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাডেমিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল নেতা, দেশের ও প্রয়োজনে বিদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সকলের সাথে তা শেয়ার করা, আর গোলটেবিল, সেমিনার আলোচনা সভার মাধ্যমে সে নীতি অবস্থানকে যতদুর সম্ভব একটা প্রতিনিধিত্বমুলক করে আকার দিয়ে তোলা। আর সবশেষে সরকারি অফিসের লোকজন চাইকি গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় হলে সর্বোচ্চপদ মন্ত্রণালয়ের সচিব (আমেরিকান হিসাবে আন্ডার সেক্রেটারিকে) সেসব সভায় দাওয়াতে হাজির করে থিঙ্কট্যাংকের অবস্থান চুড়ান্ত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এরপরেও থিঙ্কট্যাংকের নীতি-অবস্থান কোন আমেরিকান সরকার তার নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য না হলেও সাধারণত দেখা যায় থিঙ্কট্যাংকের ঐ অবস্থান আংশিক অথবা পুরাটাই সরকারের নীতি হয়। আর অনেক সময় কোন সরকারের কেউ নিজেই “অনানুষ্ঠানিকভাবে” বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কোন থিঙ্কট্যাংককে কোন একটা বিষয়ে এমন উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

হাসিনা সরকার টিকে যাবার জন্য কি ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন দায়ী
লিসা কার্টিজ এই প্রশ্নোত্তরে ৫ জানুয়ারির পরও হাসিনার টিকে যাওয়ার জন্য ভারত, চীন ও রাশিয়ার স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। লিসা কোন আমেরিকান সরকারী পদবীধারী কেউ নন। ফলে তার মুখ দিয়ে এমন সরাসরি অভিযোগ করা মন্তব্য নিয়ে ভারত, চীন বা রাশিয়া সরকারের কারও হেরিটেজের লিসা কার্টিজের অথবা আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের (আমাদের হিসাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কাছে ব্যাখ্যা চাইবার কিছু নাই। আবার লিসার বক্তব্য “আনুষ্ঠানিক” সরকারি না হয়েও আবার আসলে পরোক্ষে সরকারিই। লিসার বক্তব্যকে আমরা আমেরিকান সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রটোকল, কূটনীতির ভাষা, ফরমালিটির নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা মন খুলে কথা বলতে পারলে কি বলতেন তেমন বক্তব্যের এক মহড়া মনে করতে পারি; এবং তা নীতি নির্ধারকদের সবার চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও অন্তত প্রভাবশালী একটা ধারার বক্তব্য হিসাবে দেখতে পারি। ফলে লিসা কার্টিজের বক্তব্যকে আমরা সেখান থেকে দেখে পাঠ করে এটাকে উসিলা করে তা নিয়ে আলোচনার সুত্রে মুল্যায়নে কিছু বলার সুযোগ হিসাবে নিব।
প্রথমত প্রকৃত তথ্য হিসাবে এক ভারত ছাড়া চীন অথবা রাশিয়া কি আসলেই হাসিনার সরকার টিকে যাবার কারণ, তাদের সমর্থনের উপর কি হাসিনা টিকে গেছে? তা মনে করার কোন কারণ আমরা দেখি না। এমন কোন ফ্যাক্টসের খবর কারও কাছে আছে অথবা বাস্তবে এটা তাই -এর কোন সত্যতা নাই। আমার আগের লেখায় বলেছি, ফ্যাক্টস হল ভারত আমেরিকা চীন রাশিয়া সবাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট (যে যেমনটা দেখতে চায় তেমন) একটা আকার নিয়ে থিতু হয়ে বসুক তা নিজের স্ব স্ব স্বার্থে চায়। আবার এর সমস্যা ও এর জটিলতাগুলোও বুঝে ও মানে। ফলে এথেকে বেরোনোর পথ হিসাবে ভারতের নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ সেটা বর্তমান ভারসাম্যের প্রায় স্থবির অবস্থাটা ভেঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরির নিয়ামক হতে পারে। আমার ঐ লেখাতেও আমি চীনের অবস্থান কোনভাবেই হাসিনার সরকারে টিকে থাকুক এমন তথ্য বা ব্যাখ্যা দেখাই নাই। কারণ ব্যাপারটা অলীক। বরং চীনের এ পর্যন্ত দেয়া রাষ্ট্রদুতের বিবৃতিগুলো, তাদের ফরেন অফিসের মন্তব্য এমন কোন সাক্ষ্য বহণ করে না। আর চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ আসার অপেক্ষায় আছে কথা সত্য তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা আবার গেড়ে বসার পরেও সে এটাকে সঠিক ও উপযুক্ত সময় মনে করতে পারে নাই; অপেক্ষা করছে এক স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকার দেখার জন্য। এর সর্বশেষ প্রমাণ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য। (বিনিয়োগ বোর্ডের অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে) তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন চীনের দিক থেকে এব্যাপারে কোন নড়াচড়া নাই। ফলে লিসা কার্টিজের অভিযোগ আমরা দেখছি ভিত্তিহীন, কোন সারবত্তা নাই।
তবে লিসা আর এক অভিযোগ তুলেছেন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি প্রসঙ্গে। ঐ প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেয়ে এই দেশটিতে কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করা যাবে সেদিকেই মস্কো ও পেইচিংয়ের মনোযোগ বেশি”। লিসা কার্টিজের এই অভিযোগকে পেটি ঈর্ষাজাত ক্ষোভ হিসাবে আমরা বড়জোর দেখতে পারি। প্রথম কথা চীনা সাবমেরিন বা অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টা ৫ জানুয়ারির বহু আগের ঘটনা; অন্ততপক্ষে ২০১১ সালের ডিল, একালেরই নয়। আর যদিও একথা সত্য যে পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্ত্র সরবরাহের তালিকায় বিলের অঙ্কে এবং পরিমাণে চীনা অস্ত্র আমেরিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। কিন্তু এর কারণ চীনের আমাদের উপর বিশেষ আগ্রহ একথাটা ভিত্তিহীন। অথবা চীন আমাদেরকে মুখ্যত তার অস্ত্রের বাজার হিসাবে দেখে এটা কোন গবেষকের মুখ থেকে শোনা হাস্যকর বললে কম বলা হয়। এই বিদ্যা অথবা মুল্যায়ন এসেসমেন্ট দিয়ে কারও পক্ষে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোন গবেষণাকর্ম করা অসম্ভব। এতে ঘোড়ায়ও হাসবে। একথা বলে লিসা কার্টিজ নিজেকেই তুচ্ছ করেছেন। এর বেশি এনিয়ে আর কি বলব! পরিসংখ্যানের যে কথা বলছিলাম, খুব সম্ভবত অস্ত্রের মুল্য এবং অস্ত্রের উপর আস্থা মানে আমাদের বাজেট ও বাজেট অনুপাতে পাওয়া মান এগুলোই এখানে মুল ফ্যাক্টর। ফলে চীনা অস্ত্র কিনতে আমাদের মানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের চেয়ে বাহিনীর আগ্রহই বেশি ও মুখ্য। আর েব্যাপারে যারা খোঁজ রাখে তাঁরা কে না জানে আমেরিকার যেকোন অস্ত্র বা সরঞ্জামের মুল্য সর্বাধিক, তাতে কোয়ালিটি ও হাইটেক সুবিধা যত উচ্চমানেরই হোক। ফলে আমাদের বাহিনীর সিদ্ধান্ত – এটা প্রাকটিক্যাল, স্বাভাবিক এবং সর্বপরি আমাদের বাজেট বাস্তবতা যে তাঁরা সঠিকভাবেই মুল্যায়ন করতে জানেন এর প্রমাণ। ওদিকে, ভারতের উপর পুরা নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি হাসিনার সরকারের নীতিতে দোষের শেষ নাই, একথা সত্য। কিন্তু এবিষয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজন, বাহিনীর নিজস্ব যুক্তি অবস্থান ও আগ্রহের প্রসঙ্গে গত পাঁচ বছরে হাসিনা যথোপযুক্ত উতসাহ ও সাড়া দেন নাই, প্রাধান্য দেন নাই এমন কথা বলা ও ভাবা ভুল হবে। একথা লুকানো নয় যে হাসিনা সর্বক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল, বহু আন্ডারহ্যান্ড ডিল আন্ডারষ্টান্ডিং ভারতের সাথে তাঁর আছে, বাইরে থেকে দেখে আমরা অনুমান করতে পারি। আবার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থজাত সিদ্ধান্তকে হাসিনা রাজনৈতিক অনুসমর্থন জানায় নি এমন উদাহরণ একেবারে নাই যে তা নয় (যেমন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ ইস্যু)। তাসত্ত্বেও মোটের উপর হাসিনার রেকর্ড ভাল। যেমন ভারতের আপত্তি আর বিরূপ প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ চীনা সাবমেরিন কেনার সামরিক বাহিনীর প্রস্তাবে উদ্যোগে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হন নাই। আমেরিকা এবং ভারতের অখুশি, আপত্তি, চোখ বড় বড় করে তাকানো সত্ত্বেও গত ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে ভাল ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পর্কও বজায় রেখেছেন, সফর বিনিময় অব্যাহত আছে এবং তা গুরুত্বের সাথেই, এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহে সাড়া দিয়ে রেখেছেন। এককথায় বললে চীনের সাথে সম্পর্ককে হাসিনা ভারতের সাথে সম্পর্কের একই ঝুড়িতে রেখে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন নাই, আলাদা আলাদা বক্সে রেখেছেন যাতে কোন ঠোকাঠুকি না লাগে এমন করে বুদ্ধিবিবেচনার সুযোগ করে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এথেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা বা বোকামিরও সুযোগ নাই যে হাসিনার সরকার ভারতের সাথে সাথে চীনেরও সমর্থনের উপর টিকে থাকা এক সরকার।
এমন সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ না থাকার মুল কারণ (গত মাসের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলি) চীনের বিদেশনীতি এখন পর্যন্ত আমাদের মত দেশে কেমন সরকার বা কে সরকারে থাকবে এধরণের কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগিদারী কর্তৃত্ত্ব না হলে চীনের বিদেশনীতি আগাবে না অথবা আমেরিকার মত চাপ দিয়ে আদায় করার নীতিতে চলে এমন করে তা সাজানো নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আদায় করে চলে এমন নয়। আবার লিসা কার্টিস যেমন এক জবরদস্তিতে আরোপিত ধারনা দেবার চেষ্টা করেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেনবা বাংলাদেশ চীনের কাছে অস্ত্রের লোভনীয় বাজার ফলে খাতক মাত্র। আর চীনও যেনবা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার উপর দাড়িয়েই রাইজিং চীনের অর্থনীতি হয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডাহা ভিত্তিহীন কথা এবং প্রপাগান্ডা। কেউ গবেষক হতে চাইলে তাঁর প্রথম পাঠ হল, অন্তত প্রপাগান্ডা আর তথ্যের ফারাক করে চলতে শেখা। এম্পায়ার আমেরিকার খাসলত দেখতে দেখতে লিসা কার্টিসের হয়ত একপেশে ধারণা হয়ে গেছে যেন আমেরিকা বা পশ্চিমের খাসিলতই চীনের খাসলত হতেই হবে। আগামিতে চীনের খাসলত কি দাঁড়াবে সেটা আগামিই বলতে পারে। কিন্তু এখনই পশ্চিমের খাসলত দিয়ে আগাম চীনের ঘাড়ে তা খামোখা চড়িয়ে আরোপ করে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করার কোন অর্থ হয় না; তবে হয়ত পেটি ঈর্ষাজাত মনের সুখ পাওয়া যেতে পারে। তাহলে হাসিনা তাঁর সমস্ত বেকুবি নীতির দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সামরিক বাহিনীর চীনা অস্ত্র কেনার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে সক্ষম হয়েছে। এটাই বাস্তব। এটা কতটা সামরিক বাহিনীর সাথে দুরত্ব তৈরি করার রিস্ক বা চটানো তিনি সহ্য করতে পারবেন বা পারবেন না সে কথা ক্যালকুলেশন করে রেখে করেছেন অথবা করেন নাই এনিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু বটম অব দা ফ্যাক্ট হল বাস্তবে তিনি এগুলো করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, এর কারণ যাই হোক। আবার লিসা কার্টিজের “চীনের অস্ত্রবিক্রির ধান্দা” এমন কথার প্রেক্ষিতে যদি বলি, আমাদের সামরিক অফিসারদের উপর প্রভাবের দিক থেকে যদি দেখি তবে তাদের ট্রেনিং সেমিনার ভিজিট ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদিতে আমেরিকার প্রভাবের সমতুল্য এর ধারে কাছে আর কোন রাষ্ট্র নাই। এমনকি ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকার হাত মুচড়ানিতে পড়ে আমাদের সেনাবাহিনী এই তো সেদিন ১/১১ এর ক্ষমতা দখল করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে! কিন্তু এজন্য আমি কেন কেউই বলবে না যে সেনা অফিসারদের উপর আমেরিকার প্রবল প্রভাব আছে অতএব আমেরিকার সমর্থনে হাসিনা টিকে আছে এগুলো তার প্রমাণ! অথবা লিসা যেভাবে বলেছেন যে বাংলাদেশে চীন “কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি” করতে পারে সেই তালে আছে – তেমন করে কেউ বলবে না যে, আমেরিকা কেবল আমাদের অফিসারদেরকেই হাত করার তালে আছে। কারণ এতে বক্তার নিজের কান্ডজ্ঞানশুণ্য আর গাভর্তি রাগ ক্ষোভকে প্রমাণ করবে।

এবার হাসিনার টিকে থাকার ব্যাপারে রাশিয়ার ভুমিকা প্রসঙ্গে আসি। হ্যা, একথা সত্যি যে রাশিয়ার মধ্যে প্রবল অস্থিরতা আছে। যেখানেই কোন সরকারের সাথে আমেরিকার নুন্যতম বিরোধ সংঘাত আছে, রাশিয়া দেখে, সেখানেই ঐ সরকারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে -এমন সরল করে পরিস্থিতি মুল্যায়নের ও অস্থির মতির সিদ্ধান্ত নেবার একটা ঝোঁক রাশিয়ার আছে। এটা শত্রুর শত্রু মানেই আমার বন্ধু –এমন এক সরল তত্ত্ব। অথচ বন্ধুত্বের সম্ভাবনার এই যুক্তির ভিত্তি যথেষ্ট দুর্বল এবং আমাদের অভিজ্ঞতাও এর পক্ষে সায় দেয় না। মুল কারণ প্রতিটা বন্ধুত্ত্বের সম্পর্কের নিজস্ব পজিটিভ ভিত্তি লাগে। আর তাছাড়া একটা শেষ কথা আছে। রাশিয়ার এই ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এটাই তার নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা শেষ কথা নয়, শেষ বিচার্য ব্যাপারটা এমনও নয়। আরও বিবেচনাও আছে। আমেরিকা বা পশ্চিম বিরোধী ও পশ্চিমা বলয়ের বাইরে কোন স্বার্থজোট গড়ার আগ্রহ রাশিয়ার প্রবলভাবেই আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু একা সেকাজ করার মত সক্ষমতা রাশিয়ার নাই, বাস্তবতা নাই এটাও রাশিয়া ভালভাবেই জানে। কারণ রাশিয়ার যতই রাগ ক্ষোভ থাক এটা রাশিয়া-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়, দুনিয়াও নয়, সেদিন গত হয়েছে বহু আগেই এটা সে ভালই হুশ রাখে। বরং রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর জোট (BRICS Bank এর মত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে) এর পক্ষে তেমনি একটা সম্ভাবনা, তাই সে মানে। উতসাহী রাশিয়ার এমন মান্যি করাটা টের পাওয়া যায় যদি আমরা মনে রাখি প্রথম ব্রিকস সম্মেলন ডাকার আয়োজক হয়েছিল রাশিয়াই, ২০০৯ সালে। ওদিকে এব্যাপারে চীন ততোই ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার। কোন হুড়োহুড়ি অস্থিরতা, এখনই সব জবরদস্তিতে করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে এমন অবিবেচক সে নয়, তা দেখায়নি। চলতি গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারটা ভেঙ্গে এরই প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করানো এবং আমেরিকার বদলে নতুন নেতৃত্বে নতুন অর্ডার চালু করার কাজটা সফল করতে যেখানে পরিস্থিতিকে পরিপক্ক করে তুলার কাজটা কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে করা মত কাজ নয়। বরং পরিপক্ক হতে যেখানে যতটুকু সময় ও মনোযোগ লাগবে সেখানে ঠিক ততখানিই দিতে হবে এব্যাপারে সে পরিস্কার। আমরা তাই দেখেছি। এছাড়া ব্যাপারটা পরিপক্ক বা ম্যাচিয়র হওয়াটা আবার ভলিন্টারিলি ও আপন ইচ্ছায় হতে হবে এমন দিকটাও তার নজর এড়ায়নি। যেমন একথা আজ পরিস্কার কেবল ব্রিক ব্যাংকই এখনও ফাংশনাল হতে পারল না ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতার কারণে। একদিকে পুরানো বা চলতি অর্ডারটা থেকে আমেরিকার তরফে বেশি সুবিধা পাবার লোভে পড়েছে ভারত আর অন্যদিকে ততটাই নতুন অর্থনৈতিক অর্ডারটা খাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতের তাই পিছুটান ফলে ব্রিক ব্যাংক বিষয়ে ধীরে চলা – এই হল ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতা। ভারত এখনও তাই মনস্থির করে ব্রিক ফেনোমেনার পক্ষে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু সেজন্য চীনের ভারত নীতিতে আমরা কোন চাপাচাপি দেখিনি।

ভারতের দ্বিধামুখে বা দুমুখে খেলার আর এক প্রতীকী উদাহরণ
ভারতের দ্বিমুখি ঝোঁকের প্রতীকী ও আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত ‘সাংহাই কর্পোরেশন’ উদ্যোগ। “সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন” (Shanghai Cooperation Organization (SCO) – ১৯৯৬ সালে শুরু হবার সময় মনে হয়েছিল এটা সম্ভবত এক সামরিক বা ষ্ট্রাটেজিক জোট হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ এটা মূলত এক অর্থনৈতিক জোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সে কারণে এখনও আমেরিকান মিডিয়া থিঙ্কট্যাংক (কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন) এটাকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট – ন্যাটোর মত এর পাল্টা সমান্তরাল এক সামরিক জোট, “চীনের ন্যাটো” বলে চিত্রিত করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা চীন ও রাশিয়া, সাথে নেয়া হয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশ, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, and Uzbekistan। জন্মের শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালে SCO এক বিবৃতি দিয়েছিল এই বলে যে কবে “আমেরিকান সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল এশিয়া অঞ্চল থেকে গুটিয়ে চলে যাবে এর তারিখ তারা জানতে চায়”। তবে ঐ বিবৃতিতে আমেরিকাকে চলে যেতে হবে ঠিক এমন দাবী তারা করেনি কেবল তারিখ জানতে চেয়েছে আর আমেরিকার যে যাওয়া দরকার এতে এই তাদের আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ক্রমশ এই জোট একালে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে আফগানিস্তান ২০১৪ পরবর্তি পরিস্থিতিতে। ২০১৪ পরবর্তি মানে আমেরিকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে এবছর ২০১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সৈন্য (ন্যাটোও) প্রত্যাহার করবেই। এটা তিন বছর আগেই নির্ধারিত ও সিধান্ত হিসাবে ঘোষিত। মূলত খরচ যোগাতে অসমর্থ অর্থনৈতিক অপারগতা -আমেরিকান নিজস্ব এই সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণা। যদিও ২০১৫ সাল থেকে কি হবে, কেবল ট্রেনিং এর নামে (১০ হাজার রাখার ইচ্ছা আমেরিকার) কতজন সৈন্য থাকবে এবিষয়ে কোন নতুন চুক্তি কারজাই করেন নি। আফগানিস্থানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে চলতি মাসে কিন্তু ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, প্রক্রিয়াধীন। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন নতুন আয়োজনে কিছু আমেরিকান সৈন্য রাখার চুক্তি কেমন হবে বা আদৌও হবে কি না। বাস্তব এই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে SCO ভাবনা-চিন্তা করছে এবছরের শেষে ন্যাটো ও আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে তারা সামরিক নয় বরং এক ব্যাপক বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রবেশ করতে চায় আফগানিস্তানে। SCO তে অবজারভার ষ্টেটাসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর উপস্থিতিতে গত কয়েক বছর তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারত এই পাঁচ রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত SCO এর অবজারভার সদস্য, পুর্ণ সদস্য নয়। তবে প্রতি বছরের SCO সম্মেলনে তারা গুরুত্ব দিয়ে অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়ে থাকে। গত বছর ২০১৩ সেপ্টেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমন খুরশিদ কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত SCO সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং ভারত পুর্ণ সদস্য হতে চায় সে ইচ্ছা ব্যক্ত করে এসেছেন। (দেখুন, India aspires to become full SCO member) কিন্তু একই সাথে তার স্ববিরোধীতা বা পিছুটানও ব্যক্ত করেছেন ঐ রিপোর্টে। বলেছেন, We are not sure of a timeline অর্থাৎ সময়সীমা বা কবের মধ্যে হব জানি না। এককথায় ব্যাপারটা হল, পুরানা গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণ হিসাবে আমরা দেখছি পালটা উদ্যোগগুলো একটা যেমন “ব্রিকস ফেনোমেনা” ঠিক তেমনই আর এক উদ্যোগ হল এই SCO গঠন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, “ব্রিকস ফেনোমেনা” এই উদ্যোগের মতই SCO গঠন উদ্যোগেও ভারতের ভুমিকা দোলাচালে, আছি আবার নাই এমন দোদুল্যমান নন-কমিটেড। কিন্তু ধীরস্থির চীন বরাবরের মতই; ভারতের চিন্তা ও ভুমিকা সে জানে কিন্তু সেজন্য চীন ভারতকে তাড়া লাগায় নি, কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি, নিজে কায়দা কৌশল করে চাপ বা শর্ত তৈরি করেনি ভারতের উপর। বরং ছেড়ে দিয়ে রেখেছে ভারতের ভলিন্টারি ও আপন ইচ্ছার উপর। পরিস্থিতি পরিপক্ক হতে যতটা সময় লাগছে, দিচ্ছে। আবার আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিকঃ চীন বা রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের নৌকা ভাসানো মানে ব্যাপারটা যে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অথবা তাদেরকে একঘরে করা তা যে নয় এটা চীন সযত্নে খেয়াল রাখতে চায়। সকলকে মনে করায় রাখতে চাই। রাশিয়ার মত তাই চীন ব্যাপারটাকে প্রতিহিংসায় রি রি করে উঠার বিষয় মনে করে না, কারণ আসলে তো ব্যাপারটা পশ্চিমের উপরে প্রতিশোধ নেয়ারও নয়। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ইউরোপের কলোনী মালিক (বৃটিশ, ফরাসী, স্প্যানিস, ডাচ, পর্তুগীজ ইত্যাদি) যাদের সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কখনই অস্ত যাবে না বলে বড়াই শোনা যেত একদিকে তা ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল আর অন্যদিকে এর বদলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের সুচনা হয়েছিল কিন্তু আমেরিকা ব্যাপারটাকে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রতিশোধ হিসাবে ঘুর্ণাক্ষরেও দেখেনি, ইউরোপকে একঘরে করা হিসাবেই দেখেনি। কারণ আমেরিকা মানে তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (১৯৩৩-৪৫ পরপর চারবারের প্রেসিডেন্ট) এটা পরিস্কার ছিলেন যে এই পালাবদলের অর্থ প্রতিশোধ বা একঘরে করার মত তা একেবারেই নয়। বরং তাঁর নেতৃত্ত্বে এটা আরও সকলের সাথে ইউরোপকেও সাথে নিয়েই নতুন এক গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার সুচনা করার কাজ। ব্যাপারটা রুজভেল্টের দয়া বা উদারতার চোখে দেখার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা ও ঘটনাবলির বাস্তব অর্থও এটাই। এমনকি নীতিগতভাবে ষ্টালিনের রাশিয়াকেও কোন নীতিগত কারণে (যেমন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র বলে) বা কোন প্রিযুডিস বা আগাম অনুমানে ধরে তার নেতৃত্বে আসন্ন নতুন গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের বাইরে রাশিয়াকে রাখার কথা তিনি ভাবেননি। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় টানা ২২ দিনের ব্রেটনহুড সম্মেলনে রাশিয়া উপ্সথিত ছিল। এনিয়ে বিস্তার করে অন্য কোথাও লিখতে হবে। এবারের পালাবদলেও ব্যাপারটাও তাই, এখানে সাদৃশ্য আছে। এখনকার প্রসঙ্গের জন্য সারকথা এতটুকুই যে রাশিয়ার ইতিউতি উঁকি মারা বা অস্থিরতায় থাকলেও অন্তত চীনকে বাদ দিয়ে এককভাবে হাসিনাকে চোখবন্ধ সমর্থন দিয়ে রাশিয়া এগিয়ে যাবে এই অনুমান ভিত্তিহীন। হাসিনার সাথে ৫ জানুয়ারির পরের পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাশিয়ান বিবৃতিতেও এমন কিছু নাই যেটা একই প্রসঙ্গে আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে নাই। ফলে রাশিয়াকেও জড়িয়ে লিসা কার্টিসের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অনুমানের।

হাসিনাকে দানব বানানোর তিন দেশীয় সমর্থনের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোন সূত্র থেকে
একটা কথা বলে রাখা ভাল, লিসা কার্টিসের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোথা থেকে? একেবারেই কি তা সুত্রহীন? না, সুত্র সম্ভবত একটা আছে। সেই সুত্র ভারত নিজে। একটা হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন বা কানকথা ভারত ছড়িয়েছে। ধীরস্থির চীনের বিপরীতে অস্থির প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে যেমন রাশিয়া ঠিক তেমনই আর এক প্রান্ত হল ভারত, হাত নিশপিশ করা ভারত। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে তার সুখের হানিমুন ভেঙ্গে যাওয়াতে এই হাত নিশপিশ, পারলে আমেরিকাকে এখনই একটা শিক্ষা দিয়ে দেয় এমন ভাব। উপরে বলেছি, এতদিন ভারত আমেরিকার লোভের ফাঁদে পড়ে কেবল নিজের জন্য পুরানো বা চলতি অর্ডা্রটা ও এর সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিগত ভারসাম্যটাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকলে আমেরিকার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাবে এই বেকুবি লোভে ও আশায় ব্রিক ব্যাংকের উদ্যোগকে ধীরে চল নীতিতে আটকে রেখেছিল। আজ আমেরিকার সাথে বিরোধে হঠাত স্বপ্নভঙ্গ হওয়াতে সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছে। মিথ্যা ভয় ছড়িয়েছে, প্রপাগান্ডায় মেতেছে যে ভারত, চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে উঠতেছে ফলে এবার আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়া হবে। যদিও এই বাস্তবতা পরিপক্ক হতে এখনও ঢেড় সময় লাগবে এবং ব্যাপারটা মোটেও ঠিক শিক্ষা দেবার বা প্রতিশোধ নেবার মত নয়। কিন্তু সার কথা সেটা অন্তত একদুই কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবার মত তো নয়ই। আর সেকাজটাও তো খোদ ভারতই ধীরে চল নীতিতে ফেলে রেখেছে, দোদুল্যমান ও লোভী হয়ে মনোযোগ দেয়নি। এটা সে ভাল করেই জানে। এবং এখনও মনস্থির কিনা আমাদের জানা নাই। ফলে কানকথা ছড়িয়ে শত্রু আমেরিকার যদি কিছু ক্ষতি করা যায়, ভয় দেখিয়ে কিছু বাগে আনা যায় – তো তাতেই মনের সুখ ভারতের। আর এই কান কথা ছড়ানোর প্রপাগান্ডা মেশিনের দায়িত্ত্ব দিয়েছে বা নিয়েছে হাসিনা সরকার। মন্ত্রী হবার পর, ভারত সফর করা (১৮-২২ জানুয়ারী, ২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রী হলেন তোফায়েল আহমেদ। ভারত সফর থেকে ফিরে ঢাকায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেই এই কানকথাগুলো ছড়িয়েছেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই লিসা কার্টিজের – ভারত, চীন রাশিয়া – এই তিন “অক্ষশক্তিকে” হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখার খলনায়ক হিসাবে প্রপাগান্ডা। এটাকে ভারতের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লিসা কার্টিসের প্রপাগান্ডার কৌশল বলা যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ দিকটা হল, প্রপাগান্ডার লড়াই করা – এই কাজ কোন গবেষকের হতে পারে না। লিসা এখানে গবেষক মর্যাদা থেকে পতিত স্খলিত হয়েছেন।

সত্য লুকানো
লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। একথা বলে লিসা সত্য লুকালেন। বেশিদিন আগে নয় ২০০৭ সালে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল বৈঠকে “দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ভারতের চোখে নিজের নিরাপত্তা ইস্যুটাকে দেখবে” বিষয়টা সাব্যস্ত হয়েছিল সেসময়ের আন্ডার সেক্রেটারী অব ষ্টেট (২০০৫ – ৮) নিকোলাস বার্ণসের উপস্থিতিতে। নিকোলাস বার্নসকে বলা হয় ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকান নতুন ও বিশেষ সম্পর্কের (বিশেষ করে পারমানবিক টেকনোলজি, অন্য অস্ত্র ভারতকে সরবরাহ এবং নিরাপত্তা চুক্তির প্রধান নিগোশিয়েটর) কারিগর। আমেরিকা নিজের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে কি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক রাখেনি, সারাজীবন আমাদের মত দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ঠিক করার যাতাকাঠিটা কি ভারতে হাতে ব্যবহার করতে ধার দেয়নি? এসবই ২০০৭-৮ সালের ঘটনা, আমাদের তা ভুলে যাবার কোন কারণ নাই, লিসারও নয়।
অর্থাৎ চীনের রাইজিং ইকোনমি তথা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে দাড়াবার বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে টেনে তার মন পাবার জন্য আমেরিকা কেবল “ভারতের প্রেসক্রিপসনের” নয়, বাচ্চা যা চায় তা সব পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর তাতে বাংলাদেশের জন্য এমন দানব ভারতের আবির্ভাব ঘটিয়েছে যে তার একক স্বার্থে গড়া যেন এক কলোনি বাংলাদেশ সরকার হাজির করেছে ২০০৯ সাল থেকেই। আজ খোদ ভারত ও হাসিনা সরকার লিসার আমেরিকাকে কলা দেখিয়েছে, তুচ্ছ করছে – এতে এখন বেয়ারা বাচ্চা কথা শুনে না বলে লিসার গোস্যা করার কি আছে? এমনটাই কি হবার সম্ভাবনা সবসময় ছিল না অথবা কথা নয়।
তবে এটা ঠিক সর্বশেষ গত তিন বছর ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে মুখোমুখি সংঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে লিসার কথা কেবল এখন অর্থে সঠিক যে “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাচন-মরণ এমন নির্ধারক ভারত ফ্যাক্টর হয়ে উঠল কবে থেকে? তা কি আমেরিকার প্ররোচনাতেই হয় নাই?
যদি মানবজমিনের অনুবাদের কিছু বাদ পরে না যেয়ে থাকে তবে দেখা যাচ্ছে লিসা বলছেন “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। অর্থাৎ বাক্যটা আমেরিকা “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর কখনও নির্ভর করে নি অথবা করে না” – এমন নয়। লিসা সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যেন প্রছন্নে ধরে নিয়ে বলতে চাইছেন – “আগে করত এখন করছে না”। তো সেক্ষেত্রে “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর” আগে নির্ভর করা আর এখন না করা সবকিছুর দায়ভার কাফফারা সবই তো আমেরিকারই।
এছাড়া এখন লিসা আবিস্কার করে বলছেন, “মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। খুবই ভাল কথা, সত্যি কথা। কিন্তু সত্যি কথাটা অনুভব করতে আমেরিকা বড্ড দেরি করে ফেলেছে। এর দায় এবং দুর্ভোগ দুটার জন্য আমেরিকার তৈরি হওয়াটাই লিসার কপাল! নয় কি? আমেরিকান নীতির দায় খেসারত তো আমেরিকারই। এতে বাংলাদেশে আমাদের দুর্দশার কথা তাকে আর নতুন করে কিইবা বলার আছে এখানে!
তবে লিসা এখন হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। মানবজমিন জানাচ্ছে, “লিসা বলেন, “যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে”। “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না,এটা সত্য”। অর্থাৎ লিসা হাসিনা সরকারকে এখন চিহ্নিত করছেন, “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” সরকার বলে। বিগত ৫ বছর অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারির ইলেকশনের আগে পর্যন্ত কি এটা ভিন্ন কিছু ছিল? লিসা বাক্যের মধ্যে অর্থের একটা ফাঁক রেখে দিতে চেয়েছেন, পরিস্কার করেননি। বাংলাদেশের আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটা ২০০৯ সাল থেকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই,আমাদের কাছে কোন কিছুই নতুন ঠেকে নাই। তাহলে কি লিসা এতদিন খবর নেন নাই, রাখেন নাই? না, আসলে ব্যাপারটা তা না। পুরা প্রশ্নোত্তরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে লিসার বক্তব্যে ছত্রে ছত্রে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতির উপর হতাশা ফুটে বের হয়ে আছে। এটা আসলে নিজ কর্মফলের উপর নিজেরই হতাশা। সেই হতাশা থেকে এখন “দায়ী কে” বলে নিজের দিকে না তাকিয়ে বাইরের শত্রু খোজার চেষ্টা আছে। যেমন যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, “লিসা কার্টিস বলেন,শেখ হাসিনা সরকারকে চীন,রাশিয়া ও ভারতের এই নিঃশর্ত সমর্থন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে”। অর্থাৎ তিনি দোষী খুজে পেয়েছেন, ভারত চীন ও রাশিয়াকে। এই তিন রাষ্ট্রের তাদের স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে। কেন তিনি এভাবে বাইরের শত্রু খুজছেন?

আমেরিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান
লিসার দরকার থাপ্পড় খাবার পরও আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিকে একটা ইতিবাচক ভাবাদর্শগত টোপড় পড়িয়ে আড়াল টানা। যেটাকে বলে আমেরিকান নীতির পক্ষে ইডিওলজিক্যাল ন্যায্যতা জোগাড় করা। লিসার দিক থেকে তিনি জানেন, আমেরিকান নীতির সততা প্রমাণ করতে চাইলে আসলে আগে দরকার বিপরীতে ভিলেন ক্যারেকটার চিহ্নিত ও চিত্রিত করা। ভিলেনকে যত নোংরাভাবে আঁকা তিনি আঁকতে পারবেন আপনাআপনি নায়ক আমেরিকা বা ওর নীতির সততা ততোই উজ্জ্বল হবে। সিনেমার মত এই হল তাঁর ফর্মুলা।
লিসার সম্ভাব্য বা হবু প্রমাণিতব্য বিষয় হল এতদিনের আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যেন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার ততপরতাই এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভিতর দিয়ে এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” খপ্পরে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করার ততপরতা। এখানে তাঁর ফোকাস শব্দ গণতন্ত্র। আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে হাজির করা।
এই প্রসঙ্গে তিনি চিন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির ‘নোংরা’ বা ভিলেন ভুমিকার পিছনের কারণ সম্পর্কে বলছেন। মানবজমিন লিখছে, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যত ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক বিষয়ে লিসা বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন শেখ হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়াবে- এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা, এই দেশ দু’টির নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার কিংবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব কমই উদ্বিগ্ন”। এটা লিসার দেয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা তথ্য সন্দেহ নাই । চিন ও রাশিয়ার “নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই”। তাই তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না, দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন তারা কায়েম করল। এবং তা আবিস্কার করে লিসা আশ্চর্য হন নাই। লিসার এই যুক্তির পাটাতনটা আমেরিকা-রাশিয়ার ঠান্ডা-যুদ্ধের সময়কালের। যখন আমেরিকা রাশিয়ার ‘গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ভিত্তি নাই, ফলে বুঝল না’ বলে প্রপাগান্ডা করত আর বিপরীতে নিজে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন প্রমাণ করতে আমাদের মত সবদেশেই মার্শাল ল’ এর দানব শাসনের সরকার কায়েম করত। পুরা ঠান্ডা যুদ্ধের কালেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের মত সব দেশগুলো চলেছে আমেরিকান সমর্থিত সামরিক শাসনে। এটা বেশ মজার যে লিসা কার্টিজ সেই ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি একালে সবাই যেখানে একই গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রে সম্পর্কিত সেকালে আবার হাজির করছেন। সেসব বাজে ফালতু কথা থাকুক। আমরা বরং প্রশ্ন করি, যে কোন রাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে মুল পরিচালক নির্ধারক ফোকাস কোনটা? আরেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নাকি নিজের পরাশক্তিগত অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অথবা ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ হাসিল করা? এটা লুকিয়ে লাভ নাই যে প্রশ্নাতীতভাবে এর জবাব দ্বিতীয়টা। এবং এটা ঠান্ডাযুদ্ধের সেকাল এবং একাল যেটাই হোক সবকালেই অর্থাৎ সবসময় এটা সত্য। তবে হ্যা এটা কাঁচা সত্য অর্থাৎ কূটনৈতিক ভাষায় এই সত্য এই লক্ষ্য বা ফোকাসের কথা সরাসরি বলা হয় না, বলা যাবে না। বলা হবে মোড়ক, রেঠরিক বা বাকচাতুরি দিয়ে। যেমন ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, কিংবা ‘গণতন্ত্র মহান’ এসব বাকচাতুরির ভাষায়। বেশিদিন আগের নয়, ‘সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ তো আমরা সেদিনও বাংলাদেশে দেখেছি।
তাহলে দাড়ালো এই যে বাংলাদেশের জন্য লিসার আমেরিকা গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আর চীন বা রাশিয়ার নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই বলে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না – এই তত্ত্বের বেইল নাই। এটা ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি। কিন্তু তবু লিসার তত্ত্বে আর একটা জিনিষ কিছুতেই বেড় পায় নাই মানে চওড়ায় আটাইতে পারে নাই। লিসার এই তত্ত্ব ভারতের বেলায় খাটাতে গিয়ে তিনি বিপদ টের পেয়েছেন। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নরা ভারতকে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” পরাকাষ্ঠা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলে ফেলে থাকে। ফলে চীন বা রাশিয়ার মত ‘নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই’ বলে সব সমস্যাকে এসেন্সিয়াল করার লিসার বিগতযৌবনা যুক্তি বা তত্ত্বটা এখানে খাটছে না। তাই এবার নতুন পাঞ্চ, নতুন টুইষ্ট বা প্যাঁচ। মানবজমিন লিখছে, “লিসা কার্টিস বলেন, ভারতে যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ গতিশীল এবং দেশটি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে থাকে, কিন্তু নিজ দেশের গণ্ডির বাইরে গণতন্ত্র উত্তরণে নয়া দিল্লিকে কখনও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি”।
আগে বলেছি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চাওয়া না চাওয়াটা এমনকি কোনটাকে গনতন্ত্র করা হচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়া হবে এর সবটাই নির্ভর করে ভারতসহ যেকোন বিদেশীদের বিদেশনীতিতে কোনটা তাদের নিজেদের আপন স্বার্থে যায় এর উপর। অর্থাৎ সুপ্রিম হল, ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন স্বার্থ। কেউই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য নিজের রাষ্ট্রে দোকান খুলে নাই। বাংলাদেশের জনগণও তা করতে কাউকে দিতেও পারে না। প্রশ্নও উঠে না। য়ার ২০০৯ সালে কি আমেরিকা ভারতের হাত দিয়ে আমাদেরকে হাসিনার মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন উপহার দেয়নি? আসলে লিসা এই প্রশ্নোত্তর লিখার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, লিসা কার্টিজ একজন কূটনৈতিক নন বরং গবেষক, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। গবেষক হিসাবে তাঁর কাজ কোন বিদেশনীতিকে ক্রিটিক্যাল ও এনালাইটিক্যাল চোখে অর্থাৎ বিশ্লেষক হিসাবে ঘটনাবলিকে দেখার বিরাট সুযোগ তার ছিল এবং আছে। বিদেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বাস্তবের মুখোমুখিতে পড়লে ওর সমস্যাগুলো কি, কি চেহারা নিয়ে তা দাড়ায় তা নিয়ে বিশ্লেষক অন্তর্দৃষ্টি হাজির করা হত পারত তার আসল ভুমিকা। সম্ভবত একাজে তাঁর ঘাটতি খামতি ঢাকতেই তিনি গবেষকের বদলে স্বচ্ছন্দে তিনি যেন কূটনৈতিক – এই ভুমিকায় নেমে পড়েছেন।

আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক
মানবজমিনের প্রশ্নোত্তরের রিপোর্টিংয়ের শুরুতে বলেছে, “গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্বার গণআন্দোলনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে। গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না”। একথাগুলো লিসা কার্টিজের প্রশ্নোত্তরে বলা তার নিজেরই কথা কি না আমরা পরিস্কার হতে পারিনি। হতে পারে তা লিসা কার্টিজের লেখা জবাবের কোন অংশ পড়ে মানবজমিন রিপোর্টারের মনে যে ছাপ তৈরি হয়েছে সেই সুত্রে লেখা। যাই হোক সেটা, এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত একবছরের বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথাই যদি বলি যখন গণবিক্ষোভ আন্দোলনের তোড়ে এক পর্যায়ে ঢাকা ঢাকার বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল সেসময় এর প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি। চলমান ঐ গণআন্দোলন যতই মাত্রা লাভ করছিল আমেরিকাসহ বাংলাদেশের পশ্চিমা কূটনীতিকরা ততোই একে ‘সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করছিল বললে কম বলা হবে। বলতে হবে অভিযুক্ত করেছে একতরফা ভাবে। আর তথাকথিত ‘অহিংস’ প্রতিবাদের কথা নসিহত করছিল আমাদের। কিন্তু এই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে হাসিনা সরকারের রাস্তায় প্রতিবাদ “বিক্ষোভ দেখা মাত্রই আর্মড গাড়িতে চড়ে সরাসরি গুলি” এই মারাত্মক মোকাবিলার ধরণ সম্পর্কে কোন কার্যকর নোটিশ তারা করেছে এমন প্রমাণ তারা রাখে নাই। অর্থাৎ সরকারের সরাসরি গুলি এটা সহিংসতা নয়, নৃশংসতা নয়। যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সেটা সহিংসতা করা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্যের পিছনে এমন নীতিটাই আমরা দেখেছি।
অর্থাৎ দেখা গেছে আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে হাসিনা এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে তবে সততার সাথে তা বলতে হত, করতে হত। উলটা জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংসতা’ বলে লেবেল লাগিয়ে পালটা প্রচারণায় তাদের নামার কথা নয়। কিন্তু তারা সেটাই করেছে। নিজেদের স্ববিরোধী নীতিটারই বাইরে সরব প্রকাশ ঘটিয়েছে। কূটনীতিকদের কথা সে জগতে থাক। লিসা কার্টিজ বা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গে সেদিকে আর না যাই। কূটনীতিকদের কথা বাদ রেখে এনিয়ে খোদ লিসার আর এক লেখা (৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগে লেখা) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু সারকথা বলা যাক। লেখার শিরোনাম, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াঃ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে রাখা। এখানে দেখুন। [Combating Islamism in South Asia: Keeping Bangladesh on the Democratic Path] এই লেখা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে স্পনসর করা লিসা কার্টিজের কাজ। ওর সারাংশ দেয়া আছে রিপোর্টের শুরুতে সেখান থেকে একটা বাক্য, “While the threat from terrorism had diminished to some extent under the government of Prime Minister Sheikh Hasina, the recent execution of an Islamist politician and the sentencing to death of other opposition leaders accused of war crimes during Bangladesh’s war of independence in 1971 have unleashed furor among Islamists.”। অর্থাৎ লিসা দাবি করছেন হাসিনা সরকারের অধীনকালে নাকি সন্ত্রাসবাদের বিপদ কিছুটা কমেছে। কিন্তু লিসা কিভাবে বুঝলেন যে বিপদ কমেছে। তাঁর বুঝাবুঝির নির্ণায়ক, মানে কি দেখে তিনি বুঝলেন? আমরা জানি না। কিন্তু এক নিশ্বাসে একই বাক্যের পরের অংশে বলছেন, “একজন ইসলামিষ্ট রাজনীতিকের ফাঁসি দেয়া হয়েছে”। অর্থাৎ লিসা সরাসরি বলছেন না তবে তার নির্ণায়ক কি সেটা তিনি ইঙ্গিতে বলছেন।
কিন্তু কোন ‘ইসলামি রাজনীতিকের’ ফাঁসির সাথে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কি? হাসিনা কি তাঁকে ফাঁসি দিয়েছেন “সন্ত্রাসবাদের” জন্য? আমেরিকা “সন্ত্রাসবাদ” মনে করে তেমন কোন ততপরতার জন্য এই ফাঁসি দেয়া? লিসা সেটা খোলসা করে না বরং ইঙ্গিতে ধরে নিতে বলেছেন। চিন্তার এই ফাঁকি ও অসততাটা লক্ষণীয়। আবার তিনি বলছেন ফাঁসিটা “‘৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত হিসাবে তবে এটা ইসলামিষ্টদের বিক্ষুব্ধ করেছে”।
তিনি যদি বুঝাতে চেয়ে থাকতেন, ৭১ সালের একটা কৃত যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি এটা তাহলে এটা কোনই সমস্যার হত না। যদিও সেক্ষেত্রে সেই অপরাধী ইসলামিষ্ট কিংবা ইসলামিষ্ট নয় তাতে কিছুই এসে যাবার কথা নয় কারণ এটা গৌণ দিক। মুখ্য দিক হবার কথা তিনি যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তিনি এই ফাঁসির ঘটনাকে সম্পর্কিত করছেন ১) হাসিনাকে “সন্ত্রাসবাদের হুমকি” কমানোর নায়িকা হিসাবে। (২) ফাঁসির কারণে যারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরকে বিক্ষোভকে “ইসলামিষ্টদের বিক্ষোভ” হিসাবে চিহ্নিত করে।
একটা কথা লিসাসহ এমনভাবে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে পরিস্কার করে বলতে হবে। ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ কি একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ? যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার? আমাদের মনে রাখতে হবে, আলকয়েদা বা তা সংশ্লিষ্ট দল বা গ্রুপের ততপরতা অথবা আলকায়েদার মত ততপরতাকে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার
কোন প্রশ্ন না রেখে ধরে নিচ্ছি আমেরিকায় সংজ্ঞায় যেটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয় সেটাই সন্ত্রাসবাদ। আদালতে কোন অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়ে গেলে তা থেকে বুঝার উপায় কি যে ঐ অপরাধ সন্ত্রাসবাদের অপরাধ ছিল কি না? তার আগে একটা কথা পরিস্কার করে নেই। অপরাধটা যদি কোন “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” করেন (লিসা কার্টিস Islamist politician বলে এক শব্দ ব্যবহার করেছেন) তাহলেই কি সেটাকে সন্ত্রাসবাদের অপরাধ বলে বুঝব? না তা অবশ্যই বুঝা যাবে না, বুঝা ঠিকও হবে না। কারণ মূল বিষয় হল, দেশের কোন আইনে অভিযোগটা দায়ের করা হয়েছে এটাই সবকিছুর নির্ধারক। এটাই এবিষয়ে সব তর্কের অবসানের মুখ্য উপায়। ফলে অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে “যুদ্ধাপরাধ আইনে” (আমাদের মূল ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ যা সংশোধিত হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার তার সর্বশেষ সংশোধনীসহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। আর অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে আমাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (আমাদের মূল সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে তা সহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র সন্ত্রাসবাদের অপরাধ করেছেন, অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। এই কথা থেকে পরিস্কার যে, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ কোনভাবেই নয়। এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচা্র তাও কোনমতেই নয়। যেসব জামাতের নেতাদের বিচার চলছে বা ফাঁসি হয়ে গেছে এরা কেউই “সন্ত্রাসবাদের অপরাধে” এখনও বিচারের কাঠগড়ায় অথবা বিচার শেষে রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত বা ফাঁসিপ্রাপ্ত তা একেবারেই নয়। মুল কারণ তাদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ – এই আইনে। এরপর আশা করি জামাতের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধাপরাধের (আসলে সঠিক আইনী ভাষায় ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’) বিচার বা শাস্তিকে কেউ “সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে” বিচার হচ্ছে বলে বুঝবেন না, ভুল করবেন না, মিথ্যা ছড়াবেন না। এমনকি জামাতের কোন নেতাকে (লিসা কার্টিসের মত করে) কেউ Islamist politician বলে মনে করেন কিংবা না করেন তাতে কোন ফারাক পড়বে না।
এখান লিসা কার্টিসের চিন্তার ফাঁকিটা গ্রেফতার করা যায়। এরপরেও জবরদস্তিতে লিসা কার্টিজ যদি মনে করেন, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধটাও একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ। তাতেও আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু লিসা কার্টিজসহ যারা এভাবে মনে করবেন তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তাহলে আমেরিকা নিজেই ঐ “সন্ত্রাসবাদের” অংশ। আজ ৭১ সালের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলেন অথবা “সন্ত্রাসবাদ” বলেন যে নামেই লিসা কার্টিজ ডাকেন এর দায়ভার আমেরিকারও। কারণ তখন আমেরিকান অবস্থান মুসলিম লীগ বা জামাতে ইসলামসহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকের পক্ষে ছিল, সমর্থন ছিল।
ধরে নিচ্ছি আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নের এসব বিপদ টের পেয়ে এবার হয়ত লিসা কার্টিজ জোর দিবেন তাঁর ব্যবহৃত “ইসলামিষ্ট” শব্দটার উপর। অর্থাৎ ইসলামিষ্ট রাজনীতি মানেই “সন্ত্রাসবাদ”, ফলে সন্ত্রাসবাদের বিপদ দেখতে পাওয়া। লিসাদের জেনে অথবা না জেনে অথবা চিন্তায় ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভুত দেখে বেড়ানোটাও আরও মারাত্মক বিপদের। কারণ জামাত ইসলামি ইসলামি রাজনীতি করে তাতে সন্দেহ নাই। এই অর্থে লিসা যদি “ইসলামিষ্ট” শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই বিচারটা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের আইনে কোন এন্টি-টেরর ল জাতীয় কোন “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” নয়। ফলে আমেরিকার “সন্ত্রাসবাদ” খুজে ফেরা চোখে লিসা কার্টিজ বড়জোর একজন আমেরিকান নাশনালিষ্ট নাগরিক, কোন মতেই কোন গবেষক নন। এছাড়া আমরা আরও বুঝব লিসাও হাসিনার বাকচাতুরির ফাঁদে পড়েছেন। এই ফাঁসি কোন এন্টি-টেরর এক্টে হচ্ছে কি না – এই সহজ দিকটা খেয়াল করার মত বুদ্ধি তিনি দেখাতে পারেন নাই। যদি লিসা দেখতেন, জানতেন তবেই সেটা খুব সহজেই আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী ঘটনা তিনি বলতে পারতেন ও সে ঘটনাকে তাঁর ‘ইসলামিষ্টের বিচার’ কথার কোন অর্থ হত।
হুশ হারানো বুদ্ধি বিবেচনার এই স্ববিরোধ লিসা কার্টিজের একার নয়। আমেরিকাসহ প্রায় সব পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও একই অবস্থা। ইসলামিষ্ট কথাটাকে তারা জবরদস্তি তাদের সংজ্ঞার সন্ত্রাসবাদ বলে ইঙ্গিত মেরে প্রচ্ছন্নে বুঝাতে চান। এভাবে তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া তারা নিজেরাই গুলিয়ে ফেলেন। অথবা ইচ্ছা করে করে রাখেন। কিন্তু বটম লাইন হল, জামাত আওয়ামি লীগের মতই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটুশনাল আইনী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাদের উভয় দলের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা পাড়ায় আওয়ামি লীগের মতই জামাতও চাপাতি ধরণের সন্ত্রাস করে। কিন্তু চাপাতির সন্ত্রাস করলেও যেমন আওয়ামি লীগ সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের কোন রাজনৈতিক দল নয় ঠিক তেমনি জামাতও আওয়ামি লীগের মতই কোন সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের রাজনৈতিক দল নয়। এমনকি একথা ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মওলানা মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তার ও দলের ক্ষেত্রেও সমান সত্য ও প্রযোজ্য।

যদিও সমস্যাটা কেবল লিসা কার্টিজের নয়, কেবল পশ্চিমা কূটনৈতিকদেরও নয়। এমনকি আমাদের অনেকেই ইসলামি রাজনীতি অপছন্দ করি বলে এই জবরদস্তি জেনে অথবা না জেনে করি। সে যাক, পশ্চিমা কূটনৈতিকরা মনে করতেই পারেন তারা তাদের সন্ত্রাসবাদের লড়াই করবেন আর সেকাজে বাংলাদেশে একটা “গণতান্ত্রিক” মেকানিজম ও প্রক্রিয়া চালু রেখে বা দেখতে চেয়ে তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করবেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার আগে তাদের মনে খোলা হতে হবে। “ইসলামিষ্ট” শব্দটা শুনে কোন আগাম ধারণার বশবর্তি হয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার কিছু নাই। অন্তত আইডিয়ালি বললে একাজে তারা কোন ব্রান্ডের “ইসলামিষ্টদেরকেও” না পাবার কোন কারণ নাই। কারণ শুনে ইসলামিষ্ট লাগলেও মর্ডান রাষ্ট্রের মত এক লিবারেল রাষ্ট্রই তাদের কল্পনা – এটুকু আছে কিনা সেটাই তো মূল বিবেচ্য হওয়ার কথা।
তাহলে, মুল সমস্যাটা পশ্চিমা মনের। এই স্ববিরোধের কারণে তাই একদিকে লিসা কার্টিজ হাসিনা সরকারকে সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ে খামোখা সার্টিফিকেট দেন আবার অভিযোগ করেন হাসিনার বাংলাদেশ এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে।

একটা সতর্কবাণী দিয়ে শেষ করি। এতক্ষণ কথাগুলো বলেছি, বাইরের মানুষ আমাদেরকে কি করে দেখে সেদিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজটা আমাদের। এবং একান্তই আমাদের। একমাত্র আমাদেরকেই তা বাস্তব করে তুলতে হবে। সেকাজে আন্দোলন সংগ্রামই আমাদের পথ। লিসা কার্টিস সহ বাইরের কেউ আমরা কি করি জানতে আগ্রহ থাকতে পারে। তাতে তাদের দেখার স্ববিরোধীতাটা কোথায় তা তারা ঠিক জানুক আর নাই জানুক, আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আশা করি সেদিকটা আমলে রেখে আমরা লেখাটা পাঠ করব।

SHORT LINK: