হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

গৌতম দাস

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ja

          হিন্দিতে ক খ গ লেখা, এনডিটিভি থেকে নেয়া, ১৪ সেপ্টে ২০১৯

[সার-সংক্ষেপঃ আরএসএস -বিজেপি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদের পরে এবার মোদী-অমিত চেষ্টা করছেন হিন্দি জাতীয়তাবাদ মানে, সাথে ভাষার জাতীয়তাবাদও হাজির করার চেষ্টা করছেন। চলতি প্রজন্ম হয়ত জানে না। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রথম দল কংগ্রেস ও এর নেতা জওহরলাল নেহর্‌ এটা আগেই চেষ্টা করে  ও পরাজিত হয়ে গেছিলেন। ১৯৬৩ সালে এরই প্রচেষ্টায় তিনি The Official Languages Act, 1963 করেছিলেন। কিন্তু তা দক্ষিণের দ্রাবিড়ীয়দের আন্দোলনের মুখে ব্যর্থ হয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি ভারতের “জাতীয় ভাষা” আর নয়। মোদী-অমিত আবার সেই পুরানা ব্যর্থ প্রচেষ্টাটাই নতুন করে জবরদস্তিতে আনতে চাইছেন, যা ইতোমধ্যেই নেহরুর হাতে পরীক্ষিত ও পরাজিত। কংগ্রেসের এখনকার বিবৃতিই এর প্রমাণ।]

এবারের ১৪ সেপ্টেম্বর নাকি ভারতের “হিন্দি দিবস” [Hindi Divas] ছিল। মানে পালিতও হল। বুঝা গেল, ভারতের অমিত শাহ এবার হিন্দুত্বের পরে নতুন মোদী-হিটলারি লাঠি – হিন্দি” নিয়ে হাজির হলেন। ব্রিটিশেরা চলে যাবার পরে স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন যখন লেখা হচ্ছিল সেই ১৯৪৯ সালে ১৪ সেপ্টেম্বরকে একটা হিন্দি দিবস ঘোষণা করে রাখা ছিল। রাখা ছিল বলছি এ জন্য যে এটা রেখে কোনো লাভ হয়নি, পরে হিন্দিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। খুব একটা কিছু আগায়নি। কী আগায়নি?

ব্রিটিশ আমল থেকেই, রাজনীতি জিনিসটা কী – তা অস্পষ্ট বোল-এর উচ্চারণে আধা-বুঝাবুঝির সময় থেকেই ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে একমাত্র একটা জাতীয়তাবাদী দলই বুঝা হত। আবার এই জাতীয়তাবাদ বলতে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব ছাড়া আর অন্য কিছু হতে পারে না- এই অনুমান নিয়েই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদিও হিন্দুনেতাদের নিজেদের মধ্যে একটা তফাত বা বিতর্ক ছিল যে, তারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র বলতে যে একটা হিন্দুত্ব-রাষ্ট্র বুঝছেন তা স্পষ্ট করেই বলা হবে, না তা কৌশলে আড়াল রাখা হবে, এ নিয়ে কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভা (একালের নাম আরএসএস) গোষ্ঠির মধ্যে ভিন্নতা ছিল। কিন্তু হিন্দু রাজনীতিক মাত্রই প্রায় সবাই মানত যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া ভিন্ন কোনো রাজনীতি করা এবং রাষ্ট্র গড়া ও থাকা অসম্ভব, তা হতেই পারে না। ঠিক এ কারণেই তারা অ-হিন্দু, বিশেষ করে ভোকাল মুসলমানদের সামনে নিজেদের হিন্দুত্ব চিন্তার ন্যায্যতা কী তা প্রতিষ্ঠা করতে না পারা থেকেই কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

পরিণতিতে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু মুসলমানেরা রাষ্ট্রে আলাদা হয়ে যাওয়া সত্বেও তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের “রাষ্ট্র ধারণা” বুঝের মধ্যে এর কোন প্রভাব পড়েনি। তারা হিন্দুত্ব আঁকড়ে ধরেই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশন বানানোর পরবর্তিতে বাস্তবত ১৯৬৩ সালের মধ্যে,  শুরু হয়ে যায় এর পতন; অর্থাৎ ডিজেনারেশন [degeneration]  বা ভেঙে পড়া। মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের চিন্তা ও রাষ্ট্র বাস্তবায়ন শুরুর পর্যায়েই এরা টের পেতে থাকে যে সব ভেঙে পড়ছে।

অনেকের ধারণা যে, কোনো জনগোষ্ঠীর আশি-নব্বই পার্সেন্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়তে কোনো সমস্যা হয় না। এ ধারণা ভুয়া, ভিত্তিহীন। এর মানে, এই অনুমান অনুসারে ভারতের মুসলমানেরা ভেঙে আলাদা নিজের রাষ্ট্র গড়ে বেরিয়ে গেলে তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গড়তে আর অসুবিধা হবে না, পোক্ত হবে। তাই তো হওয়ার কথা, কিন্তু ভারতে তা হয়নি। মাত্র তেরো বছরের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের নামে দক্ষিণের ওপর হিন্দি-বলয়ের কর্তৃত্ব উপড়ে ফেলে দিয়েছিল। কর্নাটকের প্রধানত কন্নড় ভাষা, কেরালার মালয়ালম ভাষা, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু ভাষা, তামিলনাড় তামিল ভাষা এদেরকে একসাথে দ্রাবিড়িয়ান ভাষা বলে। অনেকে তাই দক্ষিণের এই চার রাজ্যকে দ্রাবিড়িয় রাজ্য বলে। অনেকে আবার ভৌগলিকভাবে (এটা আসলে পুব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটা উঁচা প্লাটো[Plateau] বা মালভুমি যার নাম ডেকান) এটা বুঝাতে দাক্ষিণাত্য বা ইংরেজিতে ডেকান [Deccan] বলে থাকে। এরাই মূল লড়াকু যারা উত্তর ভারতের (হিন্দুভাষী বা হিন্দিবলয়ের) আধিপত্যের চরম বিরোধী।

এমনকি এই বিরোধিতার বা বলা ভাল উত্তরের আর্যদের প্রতিরোধ লড়াইয়ের উৎস হিন্দু ধর্মের মতোই প্রাচীন। উত্তর ভারতে মানে মূলত এখনকার উত্তরপ্রদেশ, এখানে আর্যদের আগমনের পরে আশপাশের রাজ্য-এলাকায় বিস্তার লাভের পরে আরও দক্ষিণ দিকে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রবেশের আগে থেকেই  পরে আর আগাতে পারেনি। আরও দক্ষিণে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে সেই এলাকাটাই দাক্ষিণার্থ বা দ্রাবিড়িয় অঞ্চল। অর্থাত ডেকান মালভুমি পেরিয়ে এরও পরে এখনকার তামিলনারু বা আরও পশ্চিম বরাবর কোস্টাল রাজ্য কেরালায় এদিকে আর আর্যরা বিস্তৃত হতে পারে নাই। একইভাবে পুবদিকে আর্যদের বিস্তার ঘটেছিল মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিহার পর্যন্ত। আর এর পরেই  (পুব ও পশ্চিম) বাংলা অঞ্চল। এখানেও আর্যরা কত ভিতরে এসেছিল বা আসেনি সে তর্ক ছাপিয়ে বলা যায়, বাংলার প্রতিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দূরবর্তী হলেও ভাষা বা কালচারে আর্যদের প্রভাব বাংলার উপর পরেছিল বা আছে এ নিয়ে তর্ক নেই। আর্যদের বিস্তার প্রসঙ্গে এই ফ্যাক্টসটাই একালেও সব ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। সাতচল্লিশের ভারত ভাগের পরের ভারত মূলত হিন্দি-বলয়ের (যেন পুরানা দখলি নিয়ে বসা আর্যদের) ক্ষমতা হয়েই সারা ভারতকে শাসনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে চেয়েছে। পুরা ভারতের উপর এটাই – উত্তরের শাসন, হিন্দি বলয়ের শাসন, হিন্দিভাষীদের শাসন ইত্যাদি নানান থাকে থেকে গেছে।  এটাই মর্ডান ভারতে এক কাশ্মীরি ব্রাক্ষণ জওহরলাল নেহেরু ভুতুড়ে উত্তরের ক্ষমতার শাসন সর্বপ্রথম কায়েম করতে গিয়েছিলেন। যা প্রথম বড় আঘাত পেয়ে থমকে গিয়েছিল ১৯৬৩ সালে, দ্রাবিড়ীয় প্রতিরোধে। আর সেটাই আবার তবে এবার গুজরাতি মোদী-অমিত নেহেরুর ব্যার্থতার জুতা পায়ে গলিয়ে ভুতুড়ে সেই উত্তরের ক্ষমতার শাসনটাই আবার জাগানোর চেষ্টায় নেমেছেন। নেহেরুই প্রথম ১৯৬৩ সালে হিন্দুত্ব পাশে থুয়ে রেখে হিন্দি চাপানোর ভাষা-জাতীয়তা চালু করেছিলেন। বলা বাহুল্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতাকেই আবার কাঁধে উঠায় নিলেন মোদী-অমিত।

সারকথায়, উত্তরের শাসন, যেটা নেহেরুর হাতে নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের আড়ালে কার্যকর থাকতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক রেওয়াজ রিনিউ করে এরই প্রবল বিরোধী হল দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চল। একালে গত কয়েক বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার যে মোদী বা হিন্দির বিরোধিতা সেটা পুরানা ঐতিহাসিক বিরোধিতারই এক নব অধ্যায়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, দ্রাবিড়ীয় ও বাংলাএই দুই অঞ্চল থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা উঠে এসেছিল। হিন্দুধর্মের পক্ষে  থেকে নিজের ন্যায্যতা দিতে গিয়ে এর সবচেয়ে দুর্বল দিক হল, এর ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদের বয়ান – এটা উদাম হয়ে যায়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চলের মিল পাওয়া যায়। বাংলায় সুলতান শাসন আমলের (১২০৫-১৫৭৬) শেষের দিকে নদীয়াকেন্দ্রিক চৈতন্যের ও পরবর্তীতে লালনের জাতপাতবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কথা অনেকেই জানি।

আর ওদিকে ব্রিটিশ আমল থেকেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় সরাসরি ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল তামিল সমাজ। আজকের তামিলনাড়ুতে যে দুই স্থানীয় দলের হাতে এই রাজ্য পালটাপালটি শাসিত হয়ে আসছে সে মূল দলের নাম ডিএমকে [DMK]। ইংরেজি আদ্যক্ষরে বলা এই দলের নাম দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম (দ্রাবিড় প্রগেসিভ ফেডারেশন) [Dravida Munnetra Kazhagam ( transl. Dravidian Progress Federation] থেকেই ডিএমকে। আর সেটা থেকে ভেঙে পরে (১৯৭২) অন্য আরেক অংশের দলের নাম এআইএডিএমকে [AIA-DMK]। ততকালীন মাদ্রাজে (তামিলনাড়ু) ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণের ঝগড়া তীব্র উঠেছিল বৃটিশ আমলেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় চরম বৈষম্য থেকে।  সেখান থেকেই  ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল জাস্টিস পার্টি, ১৯২০ সালেরও আগে থেকে।  এই দলেরই কয়েকজন পরে ১৯৪৪ সালে নিজেরা পুনর্গঠিত হয়ে জন্ম দেন দ্রাবিড়া কাজাঘাম [Dravidar Kazhagam, DK] দল। ব্রাহ্মণের সামাজিক আধিপত্যের বিরোধীতা এই ছিল তাদের মূল ইস্যু; তাই তারা সাম্যের সমাজ ছিল তাদের মূল শ্লোগান। কিন্তু প্রধান দুই নেতার বিরোধ থেকে ১৯৪৯ সালে এক অংশ দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম [Dravida Munnetra Kazhagam] ডিএমকে খুলে বসেন। নেতা আনাদুরাই -এর নেতৃত্বের এই দল, এদের ব্রাহ্মণ বিরোধিতা এতই তুঙ্গে ছিল যে এরাই প্রথম কোন ব্রাক্ষণ ছাড়াই সামাজিক-ধর্মীয় বিয়ের নতুন প্রথা চালু করেছিল। এটাকেই আইনি কাঠামো দিয়ে  তারা এর নাম দিয়েছিল আত্মসম্মানের আইনে বিয়ে [Self-respect marriages Act]।

কিন্তু  সবাইকে ছাড়িয়ে ডিএমকে দল বিখ্যাত হয়েছিল নেহেরুর হিন্দি-জাতিবাদের বিরোধীতার আন্দোলনে সফল হয়ে।  নেহরুর যুগে.১৯৬৩ সালে ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের ভারত বানানোর প্রচেষ্টা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল দ্রাবিড়িয়দের বিশেষ করে ডিএমকে দলের হাতেই। দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান পাবার পরে, মূল নেতা মুসলিম লীগের জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তানে ভিলেন হয়ে যান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রশ্নে। কিন্তু মজার কথা হল, ঠিক একই ধরণের ভাষা-জাতিবাদী চিন্তায় জিন্নাহর মতই একই কাজ করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তাঁর আমলেই হিন্দিকে সরকারি ভাষা করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই হিন্দি দিবস বলে একটা দিন চালু ও পালন করা হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।

আর ১৯৪৯ সালে এর আইনটা লেখা হয়েছিল এভাবে, ভারতের জাতীয় ভাষা (National language) হিসাবে হিন্দি, প্রথম সরকারি দফতরের ভাষা (Official language), আর ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু থাকবে”। তবে এখানে দুইটা “কিন্তুও” ছিল। প্রথমত, ভাষার নাম হিন্দি হবে, ঠিক তা বলা হয়নি। বলা ছিল হিন্দুস্থানী ভাষা”। তা আরও ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছিল, তা দেবনাগরি অক্ষরে (এখন ভারতে যে অক্ষরে হিন্দি লেখা হয়) বা ফার্সি অক্ষরে হতে পারবে। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, এই নিয়ম বা আইনটা , পরবর্তি ১৫ বছর পর্যন্ত চালু থাকবে। এরপর পার্লামেন্ট নিজে বসে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এরপরে কী হবে।

এই হিসাবে ১৯৬৩ সালে “হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ” কায়েমের জোশে, মহান সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়ে জিন্নাহর মতনই নেহরুও হিন্দিকে জাতীয় ভাষা ও একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা ঘোষণা করে সংসদে পাস করা এক আইন জারি করেন। এছাড়া এর আগেই অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামে হিন্দি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে অহিন্দি রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে দ্রাবিড়িয় অঞ্চলে। সেখানে ক্ষোভ প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে পাঁচজন মানুষ নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিল। সাথে ঐ আন্দোলনে দুজন পুলিশেরও মৃত্যু হয়েছিল। কেরালায় বহু কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে আগুন দেয়া হয়েছিল। অবশেষে বাধ্য হয়ে কংগ্রেস সরকার আইনটা প্রত্যাহার করে নিয়ে আন্দোলন থামিয়েছিল। পরের বছর ১৯৬৪ [২৭ মে ১৯৬৪] সালে নেহরুর মৃত্যু হয়।  আর ১৯৬৪ সালে [০৯ জুন ১৯৬৪]  নতুন প্রধানমন্ত্রী হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আর স্বভাবতই তাঁর প্রথম কাজ ছিল একটা ভাষা প্রশ্নে একটা আপোষ ফর্মুলা বের করা। তাঁর আমলেই নতুন করে আগের official language act 1963 এর মধ্যে সংশোধন এনে জানুয়ারি ১৯৬৫ সালে এটাকে আগের মতই হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি সরকারি দাপ্তরিক ভাষা ফিরে করা হয়। তবে জাতীয় ভাষা কী হবে তা উহ্য রাখা হয়। আসলে এটাই ছিল দ্রাবিড়িয় রাজ্যগুলোর সাথে আপসনামা রফায় সংশোধিত অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট ১৯৬৩। এইবিষয়টা পড়ে গুজরাত হাইকোর্টের ২০১০ সালের এক রায়েও স্বীকৃত হয়।  সেকালে মামলাটা ছিল্ভিন্ন প্রসঙ্গে যে, এক ব্যক্তি আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মামলা করেছিল যেসব্ব পণ্যের গায়ে হিন্দিতে বর্ণনা লেখা বাধ্যতামূলক করা হোক। কিন্তু আদালত অপারগতা জানিয়ে বলে, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে গুজরাট হাইকোর্টের এক রায়ে এটাই স্বীকার করা হয়েছে যে, ভারতে জাতীয় ভাষা বলে কোনো কিছুই নেই।

সারকথাটা হল, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র গড়ার দাবিদারেরা বিশেষত নেহরুর কংগ্রেস ১৯৬৩ সালেই এই প্রথম সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়। যেটা আসলে হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত  ও উন্মোচিত হয়ে মার খেয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান এসবের জাতীয়তাবাদ আসলে হতভম্ব হয়ে বিভ্রান্ত ও ফিকে হয়ে যেতে থাকে।

বহুবার বলেছি, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান অথবা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের কামনা কেবল কংগ্রেসের নয়, এটা হিন্দু মহাসভা বা পরে এদেরই নতুন নাম আরএসএস-জনসংঘ বা একালের বিজেপির কামনা ছিল সবসময়। তফাত শুধু এই যে, হিন্দুত্বকে কংগ্রেস সেকুলার জামার আড়ালে রেখে ফেরি করতে চায়। আর বিজেপি হিন্দুত্বকে গর্ব করে প্রকাশ্যে বলতে চায়। তবে ১৯৬৫ সালের মধ্যেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে হিন্দি ও হিন্দুত্বের মার খেয়ে যাওয়া- এ প্রসঙ্গটা কংগ্রেসের কাছে প্রচন্ড হতাশার অবশ্যই কিন্তু কোনো বিকল্প করণীয় ছাড়াই।

কংগ্রেসের এই ঢিলেঢালা অবস্থাতেই চলতে চলতে ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকেই হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে ওই ১৯৬৩ সালে কংগ্রেসের প্রথম পরাজয়ের পর থেকে ডিএমকেই কংগ্রেসের পরে প্রথম (আঞ্চলিক) রাজনৈতিক দল, যারা ১৯৬৭ সালের নির্বাচন থেকে এককভাবে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই থেকে দ্রাবিড় অঞ্চল থেকে হিন্দিভাষী দলের হারিয়ে যাওয়া শুরু। তবে ১৯৭২ সালে ডিএমকে তে একদভা ভাঙনে তৈরি হয়েছিল এআইএডিএমকে [AIA-DMK] বা আন্না ডিএমকে। তাই ঐ ১৯৬৭ সাল থেকেই তামিলনাড়ূতে ডিএমকে অথবা আন্নাডিএমকে পাল্টাপাল্টি করে রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসেছে।

কিন্তু এই পরাজয় সম্পর্কে বা সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র কামনা সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির ভাষ্য ও মূল্যায়নটা হলো, কংগ্রেস লিবারেল বা দুর্বল ঈমানের হিন্দুত্ব করে বলেই হেরে গেছে। আগ্রাসী-হিন্দুত্ব নিয়ে আগালে হিন্দুত্ব কখনো হারত না।

অনুমান করা যায় এসব ব্যাকগ্রাউন্ড মনে রাখার কারণেই, মোদীর দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে বিজেপি এবার আস্তে ধীরে নিজেদের মূল্যায়নের ঝাঁপি খুলে ধরতে শুরু করেছে। কাজেই মোদি সরকার-টু, এটা আসলে (১৯৪৭-৬৩) সময়কালের কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও দর্শন যে মিথ্যা, অকেজো ও অকার্যকর প্রমাণ হয়েছিল সেই হিন্দুত্বকেই এবার আবার ধুয়ে মুছে কিন্তু  প্রচন্ড আগ্রাসী-হিন্দুত্ব হিসেবে হাজির করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসছেন মোদি-অমিত গোষ্ঠী। বলাই বাহুল্য, হাস্যকর জিনিস করার উদ্যোগে প্রথমবারের ব্যর্থতার পরও দ্বিতীয়বার তা নিলে সেটা এবার তামাসার পরিণতি নিয়েই ফেরে। এই হাস্যকর জিনিসটা হলো হিন্দুত্বের জাতীয়তবাদ- যা এখন জয় শ্রীরাম বলে পরিচিত!

হিন্দি দিবস এতদিন ধুলা ময়লায় পড়ে কোথাও কোণে অবহেলায় গড়াগড়ি যাচ্ছিল। ওদিকে  এতদিনে সরকারি দপ্তরের ভাষা, হিউম্যান রিসোর্স  বা  বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ডিফল্ট ভাষা হয়ে উঠেছে ইংরাজি। কংগ্রেস হাত-পা ছেড়ে এটাই একবাক্যে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু অমিত শাহ এবার সেই ধুলা ময়লা পড়া “হিন্দি দিবস” তা ঝেড়ে পুছে নিয়ে এবার আবার পালন করে বসলেন। যদিও সেটা বড় তেমন কোন কিছু নয়। কেবল এক টুইটার স্টেটমেন্ট তাও আবার তা হিন্দিতেই হতে হয়েছে। তবে সেই স্টেটমেন্টটাই গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই। সেটার আনন্দবাজারের করা বাংলা অনুবাদটা হল এরকম – ‘‘ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন,যাকে বিশ্ব স্বীকৃতি দেবে ভারতীয় ভাষা হিসেবে। যদি কোনও ভাষা দেশকে বাঁধতে পারে,তা হিন্দি”।

প্রথমত লক্ষণীয় হল, অমিত শাহ কোন প্রধানমন্ত্রী নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কাজেই ভাষা নিয়ে বিবৃতি এটা তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজই নয়। ভারতে হিউম্যান রিসোর্স  বলে মন্ত্রণালয় আছে, সেই মন্ত্রী যদি এই হিন্দি দিবস পালনের বিবৃতি দিতেন তাও একটা কথা ছিল!  তাহলে অমিত শাহ কেন? একটা টেনেটুনে সাফাই অনেকেই করতে চাইবে হয়ত যে অমিত শাহ দলের সভাপতি, তাই। কিন্তু না। কাজটা রাষ্ট্রের তরফের, দল না। খুব সম্ভবত এর আসল অর্থ হল, হিন্দি জাতীয়তাবাদ করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালের কংগ্রেসের মত এবার আগ্রাসী-হিন্দুত্বতে তা করতে গিয়ে যদি এবারও তা মার খেয়ে যায় তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যেন পশ্চাদ-অপসারণটা ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, অমিতের বিবৃতিতে প্রথম দুই বাক্যে বলা হয়েছে, “ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে”। এর মানে হল তারা ১৯৬৩ সালের পরাজয়টা আমল করেছেন। তাই আগাম প্রলেপ দিয়ে নিলেন। কিন্তু আরএসএস-বিজেপির মূল যুক্তিটা জানা গেল পরের বাক্য  – “দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন”।  এছাড়া ইতোমধ্যেই মোদীর খসড়া শিক্ষানীতি ২০১৯-এ দেখা গেছে, হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা আছে সেখানে – যেখানে স্বয়ং নেহেরু পরাজিত হয়ে পিছু হটে গিয়েছিলেন।

অমিত আসলে বলতে চাইছেন “ভারতের একটা হিন্দি-হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন”। কেন? সেই পুরানা বেকুবি যুক্তি। আর সেটাকেই  আনন্দবাজারের তার শিরোনাম করে লিখেছে – [ভারতকে বাঁধতে পারে হিন্দিই”,এক রাষ্ট্র, এক ভাষা চান অমিত শাহ]।
এই যুক্তিটা আসলে রাষ্ট্র না-বুঝ যারা এদের। এরা একই সঙ্গে যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের হিটলার একেকজন – “জয় শ্রীরাম” – এদের যুক্তি।
অমিতের কথা অনুযায়ী ভারতকে বাঁধতে পারে এমন “রশি” বা ভাল “আঠা” দরকার অমিতের। আচ্ছা নাগরিক কী বেধে রাখার জিনিষ? অমিত মনে করেন হাঁ; এজন্য দরকার একটা হিন্দুত্ব মানে, হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ। না হলেও একটা হিন্দি ভাষার জাতীয়তাবাদ।

মোদী-অমিত শাহরা আসলে অসুস্থ চিন্তার লোক।  কোন রাষ্ট্র গড়বার জন্য না হিন্দুত্বের মত কোন আদর্শ, না কোন ধরণের জাতীয়তাবাদ – কোনটার কোনই দরকার নাই। কোন দিন ছিলও না। কিন্তু ভুল বুঝা হয়েছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন –স্টেট বলে এক সোনার পাথর বাটি ধারণা এসেছে। আর নাগরিককে রাষ্ট্রে ধরে রাখার জন্য কোন ভাষাগত ঐক্য বা ধর্মীয় ঐক্য অপ্রয়োজনীয়। যদি তাই হত তবে দ্রাবিড়ীয়রা কী হিন্দু ধর্মের বাইরের? পাঞ্জাব কী বৃহত্তর হিন্দি ধর্ম বা কালচারের বাইরের? এই ডিএমকে ১৯৬২ সালের আগে পর্যন্ত স্বায়ত্বশাসন বা বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়ার দল ছিল। পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতার সমস্যা এখনও একেবারে মিটে গেছে তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমাদের ধর্মীয় ঐক্য থাকা সত্বেও কী আমরা বিচ্ছিন্ন হই নাই! কেন এমন হয়েছিল?

রাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ থাকতে মূল প্রয়োজন, অনিবার্য  দরকার আসলে  –  বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার, নাগরিক নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ – এমন এক “রাজনৈতিক নীতির ঐক্য”। এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি কায়েম। এমন নাগরিক অধিকার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং এর বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রে জুলুম বন্ধ করুন, নাগরিক নির্বিশেষে কোন জুলুমে ভুক্তভোগী সবাইকে একটা ইনসাফ দেন। এমন ব্যবস্থা কায়েম করেন। মানুষকে বেধে রাখতে হবে না, কোনো বাড়তি রশি, আঠা কিছুই লাগবে না।

রাষ্ট্রগড়া প্রসঙ্গে, সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় টেনে আনা শব্দ বা নামটা আসলে নেশন, জাতি বা জাতীয়তাবাদ।
আমেরিকা রাষ্ট্রটা আদর্শ নয়। অনেক খুঁত ও ব্যর্থতাও এর আছে অবশ্যই। তবু খুঁটিয়ে দেখেন তো- আমেরিকান রাষ্ট্র গড়তে কোনও ধরনের জাতীয়তাবাদের ব্যবহার আছে কিনা? আমেরিকানেরা কারা ও কোন ‘জাতি’? পঞ্চাশ রাজ্যের সমাহার আমেরিকা। ভারতের চেয়েও বড়। তবু কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নাই কেন? নাগরিক বা খোদ কোন রাজ্যের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ওখানে রশি বা আঠা বলে কিছু, কোনো জাতীয়তাবাদ কী আছে? খুজে দেখেন!

তাহলে আমেরিকা-রাষ্ট্রটা টিকে আছে কী করে? অনেক দুর্বলতা আছে এর, কিন্তু ভাঙার, ভেঙ্গে পড়ার, এক না থাকার কোন কথা নেই।
আর ভারতের বেলায় দেখেন, কংগ্রেসের নিজের পরাজয় ঘটে গেছে বহু আগেই। আর দলটা এখন শুকিয়ে যাওয়াতে কংগ্রেসের আর ভারত ভাঙার কারণ হওয়ার সুযোগ বা উসিলা নেই। বিপরীতে এ থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুল করতে হিটলারি আগ্রাসী হয়ে হিন্দুত্ব, এক “জয় শ্রীরাম” হাতে এগিয়ে আসছে মোদি-অমিতেরা।

এরা আসলে হিন্দুত্বে ডুবে অসুস্থ হয়ে গেছে, আর ততটাই এরা রাষ্ট্র ধারণা ও চিন্তায় অবুঝ। এদের ধারণা হিন্দুর সবকিছুতে শত্রু হল মুসলমান। আচ্ছা তাহলে দ্রাবিড়ীয় যত নেতা আছেন, ডিএমকে এর নেতা স্টালিনসহ এরা কী মূসলমান? কলকাতার সিপিএম বা মমতা এরা? তা হলে? কথা হল, দ্রাবিড়িয়রা বা বাঙালিরা হিন্দু হলেও তারা অমিত-মোদীদের বিরোধী হবেই। কারণ তারা হিন্দি বলয়ের ক্ষমতার নামে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটার বিরোধী। অমিত-মোদীরা এই চোরা আর ভুতুড়ে ক্ষমতায় বিশ্বাসী, এটাই তো আসল সমস্যা।

যেমন দেখেন, কেন্দ্রের হাতে জমা হওয়া রাজস্ব তা বিলি বন্টনে কোন রাজ্য কত পাবে কিসের ভিত্তিতে? – এটা রেখে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর খেয়ালের হাতে, ব্যক্তি-ইচ্ছার বাইরে নিরপেক্ষতা ও অবজেকটিভ নিয়ম বা সুত্র রাখা হয়নি। যেমন মমতা মোদীর দলের না হওয়াতে তিনি মমতাকে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন? মমতাকে যেকোন বিরোধিতার শাস্তি দিতে পারেন। এটা কি ইনসাফ? এর সোজা মানে এক রাজ্যের কাঁধে চড়ে আরেক রাজ্য খাচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী নিজে অথবা যাকে ইচ্ছা তাকে এটা খাইতে দিবেন। এটারই একমাত্র প্রতিকার ছিল ফেডারেলিজম [Federalism]। আমেরিকার মত ভারতেরও এক ফেডারল রাষ্ট্র হওয়া। এটা তো প্রমাণিত এখন যে “মহান” নেহেরু সাহেবের ভারত রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকেই এনিয়ে কোন বুঝাবুঝি ছিল না। আস্থা ও সাহসের ঘাটতিও ছিল। কোন প্রমাণ রাখেন নাই যে তিনি ফেডারেলিজম বুঝতেন।

আবার মোদীকে দেখেন। ভারতের সিবিআই, ইডি বা গোয়েন্দা র – এসব প্রতিষ্ঠান তো আগে থেকেই ছিল। তাতেও মোদি সন্তুষ্ট নন, সম্ভবত  পুরানগুলাকে ততখানি নিজদলীয় মনে হয় নাই। অথবা দলীয় করতে সময় লাগবে, যে সময় তার নাই। এখন বিজেপির প্রভাবে এন্টি টেররিজমের নামে গড়ে নেয়া হয়েছে অল্প বয়সী (২০০৯) নতুন আরেকটা এনআইএ (NIA)।  আর এরপর এধরণের সব প্রতিষ্ঠানকে মোদী ব্যবহার করছেন (আগে কংগ্রেসও কমবেশি করেছে) বিরোধীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের নামে তাদের শায়েস্তা করতে, এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়রানি করতে পারেন এমন হাতিয়ার হিসেবে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীন সরকারের অপব্যবহার থেকে স্বাধীনভাবে কাজের আইন, নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে দেয়ার বদলে উলটা তা ব্যাহত করে নিজদলীয় স্বার্থে এদের ব্যবহার করছেন মোদী। যেমন দেখেন, মোদীর প্রথম গত পাঁচ বছরে বিরোধীদের সমর্থন ছাড়া রাজ্যসভায় তাঁর সরকার কোন বিল পাস করতে পারেননি। এবার সিবিআই, ইডি, র ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে বিরোধীদের বাগে এনেছেন। আর তা দিয়ে এবার মোদী-টু সরকারের প্রথম তিন মাসের আগেই “কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল” – পাস করে নিয়েছেন। বিরোধীরা যে বাগে এসেছে এটা টেস্ট করার জন্য এর আগে মোদী-টু এর নতুন সরকার, তিনি  “তিন তালাক বিল পাস” করে নিয়েছেন। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র একটা অন্ধকারের ক্ষমতা একটা দাগী ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসেবে রেখে দিতে চান মোদী-অমিতেরা। আর মুখে বুলি জয় শ্রীরাম আর হিন্দুত্ব। হিন্দি বা হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, এটা দিয়ে নাকি রাষ্ট্র এক রাখবেন!

মোদী-অমিত হিন্দি-হিন্দুত্বের আড়ালে এসব যা করছেন মূলত এজন্যই ভারত ভেঙে যাবে। ভারত ভাংবার কারণ হবেই মোদী-অমিত। আর তাদের অন্ধকারের ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ।

ভারতে কেন আঞ্চলিক দলের এত ছড়াছড়ি? মানে, রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন ডিএমকে বা মমতার তৃণমূল – বিভিন্ন রাজ্যে এমন দলের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে কেন? এর সোজা জবাব, মূলত দায়ী নেহেরু ও তার কংগ্রেস। মানে তাদের  রাষ্ট্র-চিন্তায় কিছু মারাত্মক ত্রুটি বা ঘাটতি। তাদের সর্বভারতীয় দলের নামে (১৯৪৭-৮৫) উত্তর ভারতের কোটারি ক্ষমতা দিয়ে সারা ভারতের সব রাজ্যকে দাবড়িয়ে চলেছিলেন। এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, অন্ধকারের একটা দাগী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রথম জনক এরা।  আর এখন একেই একেবারে হুবহু কিন্তু আরও আগ্রাসী-হিন্দুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজিয়ে, এবার কংগ্রেসকেই অনুসরণ করছে বিজেপি। আর  প্রথম জমানায় কংগ্রেসের  কালো ভুতুড়ে ক্ষমতার অত্যাচারেই আঞ্চলিক দল খুলার হিড়িক লেগেছিল। এরই ফলশ্রুতিতে বিগত (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময় কালে লাগাতরভাবে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারই একমাত্র বাস্তবতা ছিল।  মানে কংগ্রেস অথবা বিজেপি একা নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠাতার মুরোদে নয়, আঞ্চলিক দলের সাথে একমাত্র  কোয়ালিশন করেই এরা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। এই সময়কালে রেকর্ড বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি এইদুইয়ের যে দল কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের মোট ৫৪২ আসনের মধ্যে নিজ দলের মুরোদে তা প্রাপ্ত মোট আসন তা ১১৫ ছাড়িয়েছিল তারাই গোটা দশেক আঞ্চলিক দলের সহায়তায় কেন্দ্রে সরকার করেছিল; যেখানে হাফ মার্ক বা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল ২৭২ আসন। এটাই ছিল (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময়কালের ফ্যাক্টস ও রেকর্ড।  এর মানে এই সময় কালে কংগ্রেস বা বিজেপির চেয়ে সরকার গঠনে সবসময় আঞ্চলিক দলগুলো মোট সংখ্যা মানে ভুমিকাটা ছিল মুখ্য ও বেশি।

অথচ অমিত এখন “বাণীদাতা” হয়েছেন। উলটা বলতেছেন “আঞ্চলিক দলগুলোই নাকি ভারতের “অনৈক্যের” কারণ“। এটা হল রোগের লক্ষণকেই রোগ বলে চালানো চেষ্টা। ভারত-রাষ্ট্রগঠন কাঠামোর মধ্যে মূল সমস্যা হল, এখানে এক রাজ্যের অন্য রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে খাওয়ার সুযোগ আছে। এই সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। কারণ উত্তরপ্রদেশের কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ নেহেরু ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। কারণ তার ধারণা ও বুঝ ছিল যে ভারতকে জবরদস্তিতে এক রাখতে চাইলে এমন ক্ষমতা কাঠামোই তাকে মাইলেজ বা বিশেষ সুবিধার ক্ষমতা দিবে।  ভারতকে তথাকথিত এক রাখার ভুয়া ডরে নেহেরু এমন কাঠামোতেই ভারত গড়েছেন। এতে  কেন্দ্র যার হাতে থাকে সে এই নির্ধারণ ক্ষমতাটা পায় যে কে কার ঘারে চড়বে ও খাবে। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ব্যবস্থা গড়ার সময়ের মৌলিক কাঠামোগত ত্রুটির জন্য এটা সম্ভব হয়ে আসছে। আর এর লক্ষণ হিসাবে মাত্র প্রায় ৩৮ বছরের মধ্যে কংগ্রেসের একক ক্ষমতার দল হিসাবে বিদায়, পরাজয় ও রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল জন্মানোর হিড়িক দেখা দিয়েছিল। কংগ্রেসের বদলে ঠিক সে জায়গাটাই নিতে আজ নতুন কুতুব হতে চেষ্টা করছে মোদীর -অমিতের বিজেপি। তাই এখন লক্ষণকেই রোগ বলে চালানোর চেষ্টা করছে। অমিত শাহ রাষ্ট্র-ক্ষমতা “জ্ঞানের” বিরাট তাত্বিক হয়ে উঠেছেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার লিখেছে,
আজ দিল্লির অল ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনএর অনুষ্ঠানের মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা আসলে ব্যর্থ কি না? ওই ব্যবস্থা কি দেশবাসীর লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে?’’ তার পরে নিজেই জবাব দিয়েছেন,‘‘মানুষ আশাহত”। তাঁর দাবি,আঞ্চলিক দলগুলি আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। 

এই ইস্যুটাকে ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া দেশে এক দলীয় শাসনের ইঙ্গিত হিসাবে রিপোর্ট করেছে,। কলকাতার টেলিগ্রাফ একদলীয় পার্টির শাসনের ইঙ্গিত বলেছে। এভাবে ডিএনএ, লাইভমিন্ট, এশিয়ান-এজ অনেকেই।
কংগ্রেস বিবৃতি দিয়ে বিজেপির জোট এনডিএ-এর কোয়ালিশন দলগুলোকে জবাব দিবার দাবি জানিয়েছে।  সারকথায় অমিতের যুক্তি হল, কংগ্রেস শক্তহাতে “হিন্দুত্ব” কায়েম এর এক কর্তৃত্ববাজ শাসন জারি করতে পারে নাই দেখেই এসব ঘটেছিল। কাজেই এখন শক্ত হাতে সেটা পূরণ করতে আগ্রাসী হয়ে বিজেপি  শাসন করবে। কী তামসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে অমিতের হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন

গৌতম দাস

১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৭

https://wp.me/p1sCvy-2wt

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে; যার শিরোনাম হল, “সংসদ নির্বাচন: গত দশ বছরের যে পাঁচটি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে”। সেখানে গত ২০০৮ সালের সাথে এখনকার বাংলাদেশের একটা তুলনা টানা হয়েছে- পাঁচটা ইস্যুতে। দাবি করা হয়েছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। বিবিসির চোখে ১০ বছর পরে বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হল – ১. কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২. সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, ৩. বিকাশমান অর্থনীতি, ৪. নয়া প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার বিস্তার, ৫. বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার। তাদের অনুমান হল আমাদের আসন্ন নির্বাচনে এই পরিবর্তগুলো গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চোখে পড়ার মত ঘটনা হল, এক ফাইন মর্নিং বা সুবহে সাদেকে যেন বিবিসি চোখ কচলে ‘আবিষ্কার’ করেছে, বাংলাদেশে নাকি ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। আর এরপর রিপোর্টের বাকি অংশ হল, এই ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ নিয়েই কচকচানি। এসব তৎপরতা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে “কর্তৃত্ববাদী শাসন” চলছে বলে একটা স্বীকারোক্তিকে প্রাধান্যে আনা হয়েছে যেন এতে সংশ্লিষ্টরা এখন এতে নিজেদের দায় ধুয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি ১০ বছর ধরে এই শাসন আনা ও চলার ক্ষেত্রে যেন বিবিসিরও কোনো দায় নেই!এমনকি বিবিসি যার রেফারেন্সে বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে চলে গেলে সেটা হল এক জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক সংগঠন বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন [[Bertelsmann Stiftung]; কিন্তু তাদের রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল গত মার্চ ২০১৮ সালে। এরা গ্লোবে সব রাষ্ট্রের শাসন কেমন সে বিষয়ে স্টাডি করে সুচক তৈরি করে প্রকাশ করে থাকে। তাদের করা স্টাডিও ২০১৫-১৭ সালের। এই দুই বছর ধরে মাঠে সংগ্রহ করে এরপর তা থেকে স্টাডি করে তৈরি রিপোর্ট। দুনিয়ার ১২৯ রাষ্ট্রের উপর করা স্টাডিতে বাংলাদেশের শাসন অবস্থান ছিল ৮০ তম খারাপ অর্থাৎ ৮০ টা রাষ্ট্রের নিচে।

এখানে যদিও বলা হচ্ছে এই পরিবর্তনের সময়কাল “দশ বছর”; অর্থাৎ হাসিনার শাসন কাল। কিন্তু যেকেউ নির্মোহ মুল্যায়ন করতে চাইলে মানবেন যে সত্যিকার ভাবে সাথে জড়িয়ে আছে আর দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ফলে এটা মোট ১২ বছরের। কারণ আসলে পরের ১০ বছর বা হাসিনার কালে যা কিছু হয়েছে, এর সব কিছুর ভিত গাঁথা, অভিমুখ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল ওই দুই বছরের আমলে। কেউ অস্বীকার করবে না যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর ওই দুই বছর আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও যেকোন গভীরে সীমাহীন। তাই সুবিবেচনা করতে চাইলে, লজ্জা বা দ্বিধা ভুলে মোট ১২ বছরের হিসাবই করতে হবে।

ঐ রিপোর্টের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তারা (মানে বিবিসি ও রিপোর্টে ইনপুট দাতারা) কেবল তত্ত্বাবধায়ক শাসনের দুই বছরসহ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের দায় বহন করেন। মানে, ওই সাত বছর যেন তাদের খানিকটা দায় সংশ্লিষ্টতা আছে – সেটা ভাবভঙ্গিতে ও প্রচ্ছন্নে হলেও সেটি কবুল করে কথা বলেছেন। তবে সেটা বুঝা গেলেও বুঝবার কোনো উপায় রাখেননি যে, ঠিক প্রথম কবে থেকে তারা ঠাহর করলেন যে, বাংলাদেশে এক ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। সেটা একেবারে যত্ন করে উহ্য রেখে দিয়েছেন। তবে মূল কথা – বিবিসির এই রিপোর্ট পড়ে আমরা নিশ্চিত যে, তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরের ‘মজা’ ও দায় তারা অন্তত অস্বীকার করছেন না। তবে আসলে মুল কথা যে প্রশ্নের জবাব দূরে থাক প্রশ্নটাই তারা পুরাই লুকিয়ে ফেলেছে তা হল, এই কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম নিল – কারা কারা দায়ী? তত্ববধায়কের গাঁথা ভিত ও ঠিক করা অভিমুখ থেকে কেন “কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম” হল – এই প্রশ্নটাই তারা গায়েব করে দিয়েছে।

বিবিসির চোখে ঐ পাঁচ পরিবর্তনের যা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, তা হল – বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটে যাওয়া। আসলে প্রথম পরিবর্তন ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনের’ সাথে দ্বিতীয়টি সহ-সম্পর্কিত বা কো-রিলেশনাল। এখানে বিবিসি এবং যাদের সাথে আলাপ করে বা ইনপুট নিয়ে তারা রিপোর্টটা তৈরি করেছেন, উভয়ের চোখে ‘ইসলামীকরণ’ – একটা নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ করে বা হয়ে গিয়ে খুব খারাপ হয়েছে – এই আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সবাই কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন এই ইস্যুতে পাল্টা কথা বলব, তখন শব্দটি ব্যবহার করলেও তা নেতি ধরে নেওয়া জরুরি নয়, বরং বর্ণনামূলক অর্থে এর ব্যবহার করব।

আর শব্দটাকে কখনও লিখব ‘ইসলামিস্ট’। যেমন – “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বেড়েছে” – সেটা এই অর্থে যে “রাজনীতিতে ইসলাম” দেখতে চাওয়া সব ধারার সকলে মিলে যারা এরা এখন সবচেয়ে এক বড় গোষ্ঠী; আর এরই বর্ণনামূলক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে বলা যায়, বাংলাদেশে এমন ‘ইসলামিস্টদের’ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। একথাতার সম-উদাহরণ হতে পারে যেমন, সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে নানা ফ্যাঁকড়ার ‘কমিউনিস্ট’, তারা সেযুগে সংখ্যায় ছিল সবচেয়ে বেশি – ঠিক তেমনি একালে ইসলামিস্ট। আবার কমিউনিস্টদের মতই ইসলামিস্টরাও তারা আসলে কী চান, এ ব্যাপারে সবাই একই কথা বলবেন, ব্যাপারটা তা না হলেও – বাংলাদেশের রাজনীতি ইসলাম ছুঁয়ে থাকলে, কি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তা দরকার – এ রকম একটা কথার পক্ষে এরা সবাই একমত হবেন – এমন অনুমান করা যায়। যাই হোক, আমাদের বর্ণনাত্মক ও অ-নেতিবাচক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ বুঝ নিয়েই আমরা নেতিবাচক ‘ইসলামীকরণ’ ধারণা নিয়ে কথা বলব।

আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ১/১১-এর ক্ষমতা দখল পছন্দ বা সমর্থন করেছিলেন কেন? কী সে কারণ ছিল? নীতি নির্ধারকদের পলিসি-চিন্তাকে নিয়ে এই প্রশ্ন করা বা বুঝবুঝির জগতে আলোচনা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান কী ছিল – এর ফরমাল অথবা ইনফরমাল ভাষ্য অথবা উইকিলিকস থেকে জানা ভাষ্য ইত্যাদি নানা কিছু থাকলেও বাস্তবে আমরা যা দেখেছি, সেখান থেকে তেমন এক অভিন্ন ভাষ্য মোটামুটি যা দাঁড়াতে পারে, তাই এখানে বলা হবে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে সে অনুমিত ভাষ্যটা হবে এরকমঃ বাংলাদেশ তার নিজ ভূখণ্ডে গ্লোবাল টেররিজমের প্রভাব প্রতিরোধে, বিএনপি তার শাসন আমলে অনেক করলেও যথেষ্ট করেনি বা সিরিয়াস ছিল নয়। আমেরিকার মত করে সিরিয়াসলি দেখে নাই। এছাড়া, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশকেও প্রতিরোধের রাষ্ট্র হিশাবে সেভাবে গুছিয়ে তৈরি করে নেয়নি। ‘সীমাহীন’ দুর্নীতিও ছিল। তাই দুর্নীতি তাড়ানোর অজুহাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দিতে বাংলাদেশে ঐ সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেছিল, যা আমেরিকার পছন্দ ও সমর্থিত। আলোচনার করার সুবিধার্থে এই ভাষ্যটা ধরে নিয়েই কথা আগাবো।

মানে, খোলাখুলি বলার সুযোগ থাকলে বা আইনি বিপদ ও সমস্যা না থাকলে, ১/১১-এর পক্ষে আমেরিকার অবস্থানের সাফাই মোটামুটি এমনই হত। [এটা আমেরিকার সাফাই ফলে বিএনপিকে এর সাথে একমত হতেই হবে তা নয়।] তার মানে দাঁড়াল, বিবিসির এই রিপোর্টে বাংলাদেশের ১০ বছরকে মূল্যায়ন করে পাঁচ ফ্যাক্টর বা বিপদ নিয়ে কথা বলতে বসেছে, সেই ১০ বছর হল আসলে এরও আগের দুবছরে আমেরিকার ‘তৈরি করে দেয়া’, রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দেয়ার পরের বাংলাদেশ। আর সেই সাথে ওই সাজানো রাষ্ট্র কে চালাবে, তেমন একজন শাসকও আমেরিকা পছন্দ করে তার পিঠে হাত রেখেছিল। ওই শাসক বা পরিচালক ছিল দল হিসেবে হাসিনার [RATS নয়] আওয়ামী লীগ। তবে এটা হতে পারে যে, আমেরিকা শেখ হাসিনার শাসনের ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় পাঁচ বছরের দায় নিয়ে আপত্তি করলেও প্রথম পাঁচ বছরের দায় আমেরিকার; সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।

এবার আমরা দেখব, তাহলে বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুট দেয়া আলোচকদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ”, এর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এর সোজা মানে হল, আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে সাজানো রাষ্ট্র আর শাসক ঠিক করে দিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের ১০ বছরের শাসনে হাসিনা সরকারের ‘টেররিজম মোকাবেলা’ করায় তা খামোশ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে ফলাফলে উল্টো ব্যাপক “ইসলামীকরণ” হয়েছে- এটাই বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুটদাতাদের পর্যবেক্ষণ – তাই নয় কি? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” হয়ে যাওয়া, এই ফেনোমেনা তাদের অপছন্দের; কিন্তু অপছন্দ করলেও এটাই আমেরিকার বেধে নেওয়া নীতি-পলিসি আর বেছে দেয়া শাসক – এসব মিলিয়ে তাদের ঐ শাসনের প্রডাক্ট বা ফলাফল। লক্ষ করতে হবে, ইসলামীকরণ তাদের অপছন্দের ফেনোমেনা কি না সেটার চেয়েও বড় বাস্তবতা হল, এই ‘ইসলামীকরণ’ আমেরিকার নীতি আর মনোনীত শাসকের শাসনেরই (অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের) প্রডাক্ট। কিন্তু কেন এমন প্রডাক্ট বা ফলাফল প্রসব করল আমেরিকার নীতি-পলিসি? সেই প্রশ্ন আর পাল্টা মূল্যায়নে যাওয়া উচিত নয় কী বিবিসি ও তার ইনপুটদাতা আলোচকদের? কিন্তু তারা এদিকে একেবারেই আগ্রহী নয়।

DEEP STATE

What does Deep State mean?

The Deep State is believed to be a clandestine network entrenched inside the government, bureaucracy, intelligence agencies, and other governmental entities. The Deep State supposedly controls state policy behind the scenes, while the democratically-elected process and elected officials are merely figureheads.

এছাড়া, বিবিসি জানিয়েছে আলী রিয়াজের ভাষ্যে বললে ‘ডীপ স্টেট’ হল, “যে কোন পরিস্থিতিতে যখনই রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়, তখন শক্তিপ্রয়োগের ধারা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। তখন যাদেরকে ‘ডীপ স্টেট’ বলে চিহ্ণিত করা হয়, তাদের ভূমিকা বাড়াটা স্বাভাবিক”। পাঠকের সুবিধার জন্য সেটাও এখানে দেয়া হল।

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেটে’ চলে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাকে ওয়েলকাম! কিন্তু এই উপলব্ধি কবে থেকে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। অথচ শুরু থেকেই হাসিনার ক্ষমতার ট্রেন্ড ছিল “ডিপ স্টেটে” বা দানব হওয়ার পথে রওনা দেওয়ার, এটা তো দেখাই যাচ্ছিল। তাই এই যাওয়া আমাদের অনুমান শুরু থেকেই, এটাই তো “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার” নামে ফ্যাসিজম। “মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা-শ্রেণীর’ একনায়কতন্ত্র”। এই জয়ধ্বনিতে, ক্ষমতার বিরোধী বাকি “সকল শ্রেণীকে” গুম-খুন-পঙ্গুতে পিষে দাবড়ে রাখা।

গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনের একটা মূল বৈশিষ্ট্য – তা হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, যেন যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন তিনি এই আড়ালে থেকে এইবার – ইসলামের নামে প্রকাশিত বাংলাদেশের – সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং ততপরতাকে “নির্মুল” করতে গেছে এরা। এই ছিল মুল রাজনৈতিক লাইন। সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক যেকোন ইসলামের নামে প্রকাশিত যেকোন ততপরতাকে “নির্মুল” করতে হবে – এই ছিল লাইন। এটাকেই “যুদ্ধাপরাধের বিচার” করা হচ্ছে এই আড়ালে সম্পন্ন করতে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে এই আড়ালে বসে – ইসলামের নামে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং তৎপরতাকে ‘নির্মূল’ করতে চেয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, এটাই তো বুশ প্রশাসনের (২০০১-৯) ‘টেররিজম’ মোকাবেলা যে, ইসলামের নামে প্রকাশিত ও তৎপর যেকোন ফেনোমেনাকে দমন-নির্মূল করো। আর পরবর্তিতে ২০০৭ সালে এসে কী লাভালাভ হল এই মুল্যায়নে নীতি-নির্ধারকেরা দেখল সব-ভুল। তেমন কিছু অর্জিত হয় নাই। শত্রু কিছুই মরে নাই। উলটা রাষ্ট্র অন্তহীন যুদ্ধে ঢুকে গেছে, মানে যুদ্ধের খরচ বইবার দাইয়ে আটকে গেছে। আর বাড়তি উপহার গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা। তাই বুশ প্রশাসনের টেররিজম নীতি ছিল পরাজয়ের ও অকেজো – সকলে একমত হয়। এরপর থিংকট্যাংক র‌্যান্ডের [RAND] গবেষণা প্রস্তাব [ইতোমধ্যে ২০০৭ সালের শুরুতেই হাতে আসা] অনুসরণ করে বুশ প্রশাসনের শেষ আমলে পুরানা নীতির পথ থেকে সরে ২০০৮ সাল থেকেই বুশ প্রশাসন নতুন ‘টেররিজম’ মোকাবিলার নীতি চালু হয়। পরে ২০০৯ সাল থেকে আরও ভালোভাবে ওবামা প্রশাসন টেররিজম প্রসঙ্গে তাদের নীতি-পলিসিতে বড় সংশোধন আনে। যদিও ইসলামের ‘সশস্ত্র’ ধারাগুলোর বেলায় নীতি মোটা দাগে আগেরটাই থাকে। তবে অন্যান্য ধারা, নিরস্ত্র বা আইনি রাজনৈতিক ধারা – এদের প্রতি সহনশীল এবং একসাথে কাজ করতে হবে। মিসরে হোসনি মোবারককে সরিয়ে নির্বাচনে শাসক ও শাসন বদলানো এবং তাদের সাথে আমেরিকার কাজ করা, এটাই নতুন নীতির (র‍্যান্ড প্রস্তাবের) বৈশিষ্ট্য। টেররিজম নিয়ে আমেরিকার বদলে যাওয়া এই নীতি, এটাই ‘আরব স্প্রিং’ পলিসি বলে পপুলারলি পরিচিত। এসবের বিপরীতে বুশ প্রশাসনের টেররিজমের ‘বাংলাদেশ ভার্সন’ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে থেকে ইসলামের নামে প্রকাশিত সকল সক্রিয় ফেনোমেনাকে নির্মুল ও দমন। আর সুকৌশলে যেকোনো বিরোধী রাজনীতি যেটা ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তাকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দমন-নির্মূল করা। মানে দাঁড়ালো জর্জ বুশের আমেরিকা যে নীতিকে ভুল মেনে সংশোধন করে সরে গেছে বাংলাদেশে সরকার সেই নীতিতে চলেছে। আর ২০০৯ সালের পর থেকে আমেরিকা সেটি উপেক্ষা করে গেছে, দেখেও না দেখে।

আমেরিকার এই অভিজ্ঞতাগুলো তো সকলেরই জানা ছিল। তার মানে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে গত ২০০৯ সালের শুরু থেকেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকারে এই পথই যে নিবে তা আমেরিকার অজানা ছিল না। আর তা মনে করার কোনো কারণও নাই। অথচ তামাশার দিকটি হল – বুশ প্রশাসনের পুরান নীতিটা অনুসরণেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকার পথ নিয়েছিল ।

সেই থেকে ক্ষমতাসীনেরা নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে – উদ্দেশ্য ও কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘ডিপ স্টেটে’ নিয়ে গেছেন। আজ আলী রিয়াজ অভিযোগ করে লিখছেন, “ডিপ স্টেটে” চলে যাবার কথা। বলছেন, বাংলাদেশে “গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা’র ব্যাপক বিস্তার এক ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে”। অথচ সরকার কি এটা ২০০৯ সাল থেকেই শুরু করেনি? শুরুতে এটা কেবল জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনকে প্রবোধ দিয়ে আমেরিকান নীতিনির্ধারক বা থিংকট্যাংকগুলো অন্য দিকে তাকিয়ে এ বিষয়কে উপেক্ষা করে গেছে। কিন্তু এটা কার অজানা যে, হিটলারও শুরুতে তার নাজিজমে নির্মূল তৎপরতা কেবল ইহুদিদের ওপর চালিয়েছিলেন। আর যারা ইহুদি নির্মূল করাকে দেখেও উপেক্ষা করেছিলেন, পরবর্তিতে তারাসহ যাকে হিটলারের শত্রু মনে হত সকলে একইভাবে সকলকে, তাদের সবাইকে নির্মূল করা হয়েছিল। শাসন ‘ডিপ স্টেটে’ চলে গেলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই হয়ে থাকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই আমেরিকার অজানা ছিল না, বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পলিসি কী, সে কোথায় যাবে ও যাচ্ছে। আসল কথাটা হল, ১/১১ ঘটানোর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশকে কোন গন্তব্যে, কোন অভিমুখে যাবে – অর্থাৎ বাংলাদেশের টেররিজম পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকা আর সিরিয়াস থাকে নাই। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমেরিকার কাছে তা অ-গুরুত্বপূর্ণ বা কিছু আসে-যায় না, এমন হয়ে গেছিল। কিন্তু কেন? কারণ, আমেরিকার তার স্বার্থের দিক থেকে আরও গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ দেখতে পেয়েছিল।

বাংলাদেশের টেররিজম ইস্যুর চেয়েও আমেরিকার গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ হাজির হয়েছিল। আমেরিকার যেটাকে দুনিয়াব্যাপী “ওয়ার অন টেরর” বা “টেররিজম ঠেকানো” বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর লক্ষ্যে কাজ করার চেয়েও আমেরিকার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরেক ইস্যু। সেটা হল, ‘চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো’ এই মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতকে কাজ করতে রাজি করানো। বাংলাদেশের টেররিজম নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এর প্রতি ভারতের সমর্থন চাইতে গিয়ে আমেরিকার জন্য নতুন দুয়ার খুলে যায়। ‘চীন ঠেকানো’ হয়ে যায় মুল আলাপের ইস্যু। আর ভারতকে তাতে রাজি করাতে বিনিময় আমেরিকা সওদা করেছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে। এর সাথে অবশ্য ভারত আরও কিছু আদায় করে নিয়েছিল। আমেরিকায় বাজারে নিজের রফতানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে আমেরিকার ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়েছিল। অবশ্য এই সুবিধা ২০১৭ সালের শুরুতে ট্যারিফ আরোপ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রত্যাহার করে নিয়েছে; চুক্তিতেও তাই ছিল।

বাংলাদেশ-ভারত-আমেরিকা কী গত দশ বছর সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম ইস্যুতে একসাথে কাজ করেছে? না সরি; এটা ধরে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, তাহলে এই টেররিজম ইস্যুর সাথে ভারতকে বাংলাদেশের ‘বিনা পয়সা’য় ট্রানজিট দেয়ার কী সম্পর্ক? তা বলতে বা দেখাতে পারতে হবে আগে। কেন ভারত যা চায় তা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের এই নীতি কেন? এটা বাংলাদেশের কোন টেররিজমের, কার টেররিজমের পক্ষে থাকা? কোন বলিদান?
টেররিজমের ইস্যুর আড়ালে আমেরিকা নিজের চীন ঠেকানো ইস্যুতে ভারতকে পাওয়া হাসিল করেছিল। আর আমরা এই সওদার বুটি হয়েছি, আর ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভারতকে সব ধরণের ট্রানজিট দেয়া আর ভারতের দিকে ঝুকে থাকা সরকার কায়েম ইত্যাদি……

আমেরিকা গত ১০ বছর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে একরকম অন্ধ ও উদাসিন হয়ে থেকেছে। আর আমাদের সরকার ‘চেতনার’ শাসনের আড়ালে ইসলাম জঙ্গি দমনের নামে তার ক্ষমতার বিরোধীদের নির্মুল করে চলেছে। রাষ্ট্র তার ফাংশনাল সব প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যাঙ্ক প্রশাসন আদালত সব। তাই এখন বিবিসি ও এর আলোচকেরা গত ১০ বছরে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” বলে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ তুলছেন তা যদি কিছু হয়ে থাকে বা যা যা কিছু হয়েছে – প্রথমত এটা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ আমেরিকা ত টেররিজম মোকাবিলাযোগ্য করে রাষ্ট্র তৈরি করে দিয়েছিল সাথে শাসকও ঠিক করে দিয়েছিল। তাহলে দশ বছর পরে ইসলামিকরণ প্রডাক্ট আসবে না। আর যদি আসে এর জন্য দায়ী কে? এটা কী আমেরিকার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়েই ঘটেছে তা বলা যাবে না! অথচ এরা কেউ বাংলাদেশ সরকার বা আমেরিকার নীতিকে দায়ী করছেন না। আজ হঠাৎ বাংলাদেশ ডিপ স্টেটে চলে গেছে বলে আঙুল তুললেও যেন এর দায় অন্য কারও বলে ব্যাখ্যা দেয়া্র চেষ্টা করছেন। কেন? এটা কি সঠিক? নাকি আমেরিকান পলিসিকে প্রশ্ন করতে হবে, মুরোদ থাকলে পলিসি নির্মাতাদের দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ, সত্যিকার পুনঃমূল্যায়নে যেতে হবে।

মূলকথাটা হল, ভারতের আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’র ঠিকাদারি নেয়াতেই বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে গেল না কোথায় গেল তা নিয়ে আমেরিকার অনাগ্রহের শুরু। আর এসবের ফলাফলেই কালক্রমে আজ আমেরিকাকে পাত্তা না দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ভারত-হাসিনার, দুজনে দুজনার, এমন শাসন হয়ে যাওয়ার গ্রাউন্ড হয়ে দাড়িয়েছিল।

অথচ এক শুভ সকালে বসে আলী রিয়াজ ডিপ স্টেটে চলে যাওয়া বা ইসলামিকরণ – এসব লক্ষ করেছেন করছেন কিন্তু আমেরিকান নীতি ও পদক্ষেপের সাথের এর সম্পর্কের দিকে দেখতে পাচ্ছেন না। যতক্ষণ বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কী এবং কেন – তা না বলতে পারবেন ততদিন এসব আবিস্কার অর্থহীন। যদিও তাতে ইসলামিস্টরা কত খারাপ তা প্রমাণে একে ব্যবহার করা যাবে অবশ্যই।

ওদিকে আর এক বড় কথা, বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করতে চাইছেন। কিন্তু কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করবেন? শুরু থেকেই হাসিনা লাগাতর এক অপ্রয়োজনীয় ইসলামবিদ্বেষী নীতি চালিয়ে গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। অথচ ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ দু’টির মধ্যে ১৯৭১ সালেও কোনো বিরোধ ছিল না। কেউ বিচার এড়ানো যুদ্ধাপরাধী হলে তাকেও সুস্থ পক্ষপাতহীন বিচারপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে কাঠগড়ায় নেয়া যেত। কিন্তু তা বলে যুদ্ধাপরাধীর সাথে ইসলামের কী সম্পর্ক? জামাতের কোন অপরাধ দোষত্রুটি মানে সেটাকে ইসলামের ত্রুটি হিসাবে দেখানো্র ইঙ্গিত করা – এটা তো চরম অসততা। এভাবে কী ইসলামের গায়ে কালি লাগিয়ে দেওয়া যাবে? এটা কী কোন পথ হতে পারে? এর সাথে ইসলামপন্থী রাজনীতি মোকাবিলার পথ ও উপায় হিসাবে একে ব্যবহার করা – এটাই তো চরম ইসলামবিদ্বেষী কাজ। এরচেয়ে আত্মঘাতি কাজ আর কী হতে পারে? এই রাজনীতি তো আজ অথবা কাল নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ ও পরাজিত হবেই।

আর এসব অবিবেচক তৎপরতারই সামাজিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। মানুষ এটাকে সরকারের জুলুম আর চরম বে-ইনসাফি হিশাবে দেখেছে। উলটা ইসলামের প্রতি আরও আগ্রহি ও সহানুভুতিশীল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা যেন রোমের মত। ঠিক এইভাবেই রোম সাম্রাজ্যে ক্রিশ্চানিটির প্রভাব উতখাতে লড়তে গিয়ে শেষে তা সামলাতে না পেরে সম্রাট কনস্টানটিনসহ নাগরিকেরা ক্রিশ্চান হয়ে গিয়ে রোমকে সেই প্রথম ৩৩২ খ্রীষ্টাব্দে ‘ক্রিশ্চান রোমে’ পরিণত করেছিল। আর এখানে গত দশ বছরের হাসিনার শাসনে কার্যত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা আগের চেয়েও আরো বেশি থাকার পক্ষে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এটাকেই বিবিসি ও তার বন্ধুরা বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে আক্ষেপ করছে।

বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে গেছে বলে কারো দিকে আঙুল তোলার আগে তাদের উচিত হবে, আমেরিকার বিদেশ নীতি আর সেই সূত্রে ভারতের নীতির পুনঃমূল্যায়ন থেকে দেখা শুরু করতে হবে। আর সম্ভবত তাতে দেখা যাবে যে, কথিত ‘ইসলামীকরণ’ আসলে আর কিছু নয়, আমেরিকান ফরেন পলিসি, তা থেকে ভারতের পলিসির অপর পীঠ। তাদের পলিসির কারণে ঢাকার সরকার কী করছে তা সকলেই উপেক্ষা করে গিয়েছে। আর ঢাকার সরকারের সবার ওপরে ডিপ স্টেট কায়েম আর চরম ইসলামবিদ্বেষী পলিসির চর্চা যা কিছু করেছে এসবের ফলাফলের অপর পিঠ হচ্ছে কথিত “ইসলামিকরণ”। আর আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এখনকার বাংলাদেশের এই অবস্থাটা শেষ বিচারে আমেরিকার বা ভারতের কোন স্বার্থের পক্ষে যায় নাই। বরং তাদেরকে এর কাফফারা চুকাইতে এখন রেডি থাকতে হবে!

এই পরিস্থিতিতে যারা বাংলাদেশ এক্সপার্ট হয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের কাজে নিজের নাম কামাতে চায় তাদের প্রথম কাজ হবে “ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে অস্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান ত্যাগ করা। বরং আমেরিকার নীতির কোন ভুলে এটা ঘটল তা পুনঃমূল্যায়িত করা এবং সেই পুনঃমূল্যায়িত নীতি, সংশোধিত নীতি নিয়ে এখনও ইতিবাচকভাবে আগালে, পুরান নীতিতে জমে যাওয়া আবর্জনা সাফসুতারা করতে বাংলাদেশের মানুষ এখনও তার পক্ষে সাড়া দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার কি নিজের পলিসি পুনঃমূল্যায়নের সাহস আছে? এই ট্রাম্প আমলে এসে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। আমাদের আস্থায় কমে গেছে।

বিবিসির আলোচ্য রিপোর্টে নির্বাচনে প্রভাব রাখার মতো পাঁচটা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আসল এক ফ্যাক্টরের কথাটাই তারা বলতে পারেননি। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারবে কী বা সুস্থ নির্বাচন কে নিশ্চিত করবে? এটাই তো সবচেয়ে বড় আর নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর সবচেয়ে বড় এই ফ্যাক্টরের ব্যাপারে বিবিসির রিপোর্ট বেখবর।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

গৌতম দাস

মার্চ ২৪, ২০১৭ ভোর ছয়টা

http://wp.me/p1sCvy-2dU

 

 

জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন সম্ভবত প্রায় ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে।  এককথায় বললে এটা হিন্দু (জাতীয়তা) আইডেনটিটির উপর দাঁড়ানো বা আইডেনটিটি পলিটিকসের উপর দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হয়ে আছে। কোন সমাজের সকলে অন্তর্ভুক্ত কোন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ এর এক সাম্যের রাষ্ট্র ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নয়। যদিও মুখে এতটুকু বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। ফলে হিন্দুত্ব ছাড়া অন্য কোন কিছুর উপর তাদের নিজেদের কোন আস্থাই ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো রাষ্ট্র গঠনের কর্তারা পড়েছে হয়ত তবে তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে এরা ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথার উপর ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। দুটোই চাপাবাজির অর্থহীন শব্দ। রিপাবলিক রাষ্ট্রের তিন মৌলিক বৈশিষ্ঠের অর্থ তাতপর্য বুঝলে ও বাস্তবায়ন করলে তো আর এই দুই ফালতু শব্দের (‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ ) দরকার দেখা যেত না। ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র নয় বলেই মুসলমানেরা হিন্দুদের মত সমান নয় বলেই মুসলমানদের সে প্রশ্ন চাপা দিতে বাড়তি এবং অর্থহীন ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ শব্দ দু্যটো আনা হয়েছে। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো আপত্তি বা সমস্যা নেই, বরং তারা কোনো সমস্যাই দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এই ভাবেই চলে ভারতের রাজনীতি, চলে আসছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। তাই বিজেপির প্রথম একক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ট বা একার তৈরি সরকার হল ২০১৪ সালেরটা।  তবুও ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন?

কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ?

তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং গুরু মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে এক নতুন নাম নেন – যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামের সংগঠন একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা দুটাই একই নামে চালাত। পরে ধর্মতাত্ত্বিকসহ সব ততপরতার মূল সংগঠন হয় আরএসএস। আর ১৯৮০ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতার আলাদা সংগঠন হয়  বিজেপি। যদিও  হিন্দু মহাসভার গান্ধী হত্যায় দায় ঘাড়ে এসে পড়ায় গুরুত্বপুর্ব সদস্যরা ১৯৫১ সাল থেকেই হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গত ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি ইত্যাকার সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই কমন নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যনাথের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকেই নির্বাচিত এমপি হতেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। আর এরপর তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে স্বাধীনই থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজস্ব সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এছাড়া এরপরে, ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে “হিন্দু যুব বাহিনী” গঠন করেন। তিন বছরের মাথায় ২০০৫ সালে একভয়াবহ দাঙ্গায় অংশ নেয়ার জন্য এই বাহিনীর সিনিয়র নেতারা অভিযুক্ত হয়েছিল।  এছাটা ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগানোর ঘটনা যেটার লেজ  ধরে পরে  গুজরাতের দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষ সহ ট্রেন পুরানা মামলাতেই এই সংগঠনের সদস্যরা সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’।  আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। আদিত্যনাথের প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতার ভাষা শুনা ও দেখার জন্য এই ইউটিউব ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারেন যেখানে তিনি বলছেন,  “একজন হিন্দু খুন হলে পরে আগামি দিনে আমরা প্রশাসনের কাছে এফআরআই মামলা দর্জ করব না। বরং পালটা এমন দশ ব্যক্তিকে খুন করাব ……”। এছাড়া সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশেকে জড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বলছেন মুসলমান অনুপ্রবেশকারিরা ভারতে এসেছে এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য এখানে দেখতে পারেন।  এছাড়া নিয়মিতভাবে ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা তার প্রতিদিনের রুটিন কাজ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ৭৫ ঘন্টার মধ্যে কসাইখানা বন্ধের আর গরু চলাচলে তার ভাষায় উত্তরপ্রদেশে গরু পাচার করে আনা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব ঘটনাবলিতে হিন্দুত্ব ভিত্তিক কনষ্টিটিউশনে যেমন  “ভদ্র লোকেরা” কোন সমস্যা দেখে নাই, এখানেও তেমন কেউ অসুবিধা দেখে নাই। তবে নিরাপদ দুরত্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যেমন প্রধানমন্ত্রী মোদির যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার পত্রিকা যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে – ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগের মত তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হত। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে নির্বাচন করেছিল মোদি।  ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

“টেলিভিশন”: সিনেমার গল্পের সমস্যা

টেলিভিশন”: সিনেমার গল্পের সমস্যা

গৌতম দাস
Sunday 03 February 13

http://wp.me/p1sCvy-2cM

television

মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর সিনেমা ‘টেলিভিশন’ রিলিজ হয়েছে সম্প্রতি সিনেমা হলে। কিছু তরুণ বন্ধুদের উৎসাহে শুক্রবার সকালে দশটায় অর্থাৎ প্রথম দিনের প্রথম শো দেখতে গিয়েছিলাম। দর্শকরা ছবিটি কিভাবে নেয়, কি ধরণের প্রতিক্রিয়া জানায় ইত্যাদি জানার দিক চিন্তা ভাবনা করে বন্ধুরা বলাকা হল বেছে নিয়েছিল।

সে হিসাবে যথারীতি সকালে যাওয়া। গিয়ে দেখা গেল টিকেটের চাহিদা এত বেশি যে বলাকা-২ বা আগের নাম বিনাকা হলে, তাও ব্যালকনি নয়, নীচতলার টিকেট পাওয়া গেল। সকাল দশটার আগেই হাউসফুল বোর্ডও টাঙানো হয়েছিল দেখেছিলাম। সকাল নয়টার দিকে বাসা থেকে রওয়ানা দেবার সময় ভেবেছিলাম এই শৈতপ্রবাহের সকালে নিশ্চয় হলে গিয়ে দেখব ভীড় তেমন নাই। দর্শকেরা হয়ত পরের শোগুলোতে ভীড় করবে। কিন্তু সিনেমা শুরু হবার এক ঘন্টার বেশি আগে পৌঁছে গিয়েও দেখি তরুণ আর তরুণ -অর্থাৎ আমার অনুমান একেবারেই ভুল। সেই আশির দশকের পরে আর বাংলাদেশের সিনেমা হলে যাওয়া হয়নি নানান কারণে, কেবল মাস ছয়েক আগে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়েছিলাম এক বার। যে হিসাবে তরুণ বলছি তাদের জন্ম সেই আশির দশকে। সিনেপ্লেক্সের তুলনায় বলাকা চত্তরে একটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলাম। লাইনে দাঁড়ানো হবু দর্শক সকলকে সহজেই এক ক্যামেরার চোখে একবারে ধরে দেখে বোঝার একটা সুবিধা ছিল সেখানে। বুঝেছিলাম দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে। এসব দিক, ব্যাখ্যা নিয়ে ভাবছিলাম। ফলে একটা ভাল লাগাও কাজ করেছিল এই ভেবে যে এই প্রজন্মের কিছু অংশের সাথে বসে সিনেমাটা উপভোগ করা যাবে। দুঘন্টার সিনেমা, তাই একটু ঢিলেঢালা সময় জ্ঞানে, এগারোটায় সিনেমা শুরু হয়েছিল।

দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে।

এর আগে বাংলাভিশন টিভিতে চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে ঘটনাচক্রে ‘টেলিভিশন’ নিয়ে প্রচারিত প্রায় এক ঘন্টার প্রমো-টা দেখেছিলাম। সেখানে সিনেমার গানগুলো সিনেমার কলাকুশলীসহ উপস্থাপন করা হয়েছিল। এরও আগে ‘টেলিভিশন’ টিমের কোরিয়া সফর সম্পর্কে যেসব মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল তা দেখেছিলাম। এটুকু ছিল আমার পূর্ব ধারণা অথবা পুঁজি, যা নিয়ে সেদিন সিনেমা হলে গিয়েছিলাম। যদিও এ থেকে কী নিয়ে এই সিনেমা সে কাহিনীর খোঁজখবর রাখিনি। আবার ঠিক কি নিয়ে একটা সিনেমা দেখতে এসেছি, কি দেখব এখানে বিশেষ তেমন প্রত্যাশাও কাজ করেনি। এসব না থাকলেও, ফারুকী ও তার দলবল কি ভাবছে, কি করছে এখন, তা বুঝবার দেখার একটা সুযোগ, ফলে সে নিয়ে একটা ভাল কৌতুহল অবশ্যই ছিল।

 

কা হি নী  সং ক্ষে প

যারা ছবিটি দেখেন নি, (কিম্বা দেখবেন না, তাদের সুবিধার জন্য সারকথায় গল্পটি পেশ করছি। তবে এক্ষেত্রে আমাকে সহায়তা করেছেন আমাদের আরেকজন তরুণ ছবি পরিচালক, তাসমিয়া আফরিন মৌ। তাঁর বয়ানে গল্পটা হচ্ছে এরকমঃ

টেলিভিশন – এই গল্পের শুরু এমন এক গ্রামে যেখানে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন উপায় নেই। সেই গ্রামে ইন্টারনেট চাট করে তরুণেরা কেউ তবে টেলিভিশন প্রবেশের অনুমতি নেই। গ্রামের চেয়ারম্যান ধার্মিক পরহেজগার যার একচ্ছত্র আধিপত্যে গ্রামে টেলিভিশন দেখা বা কেনার অনুমতি কারো নেই। তবে মুসলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মের মানুষ টেলিভিশন কিনলে নীতিগত কারণে তাকে বাধা দিতে পারে না কারণ, তার ধর্মে “টেলিভিশন” দেখায় নিষেধ নেই।

গল্পের শুরুতে একজন টেলিভিশন সাংবাদিক (বাংলাভিশন) এই চেয়ারম্যানের (রুমি) সাক্ষাৎকার নিতে আসে যার সাথে চেয়ারম্যান জবাব দিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরিস্থিতি খারাপ জায়গায় যেতে পারে তাই সাক্ষাতকার শেষ করে দেয়া হয়। দেখা যায় চেয়ারম্যান আবার প্রথম আলো পত্রিকা পড়েন, যেখানে ছবিসহ বিজ্ঞাপনগুলো আগেই সাদা কাগজ দিয়ে চেয়ারম্যানের সহচর ঢেকে দিয়েছে। চেয়ারম্যান একজন খুবই ভালো মানুষ, তার এলাকায় জনপ্রিয় এবং সবাই তার কথা মান্য করে। চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে সুলেমান (চঞ্চল) প্রেম করে সেই গ্রামের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত প্রবাসী ব্যক্তির কন্যা কোহিনূরের (তিশা) সাথে, যে কম্পিউটার চালনায় দক্ষ। সুলেমান বাবার কথার বাধ্য ছেলে, বাবার প্রতি তার সর্মথন আছে। বাবার ব্যবসা দেখা শোনা করলেও তার মোবাইল ফোন কেনার অনুমতি নেই। সুলেমানের কর্মচারি ও সহকারী মজনু (মোশাররফ) ট্রিকস খাটিয়ে চেয়ারম্যান বাবার কাছ থেকেই মোবাইল কেনার অনুমতি পাইয়ে দেয় সোলেমানকে। আবার মজনু ছেলেবেলা থেকে কোহিনূরের খেলার সাথী ছিল। সে মনে মনে কোহিনূরকে ভালোবাসে, এক সময় তাকে বলেও ফেলে। অন্যদিকে সুলেমানের সাথে কোহিনূরের প্রেমে নিয়মিত সহায়তা করলেও, মজনু নানাভাবে কোহিনূরকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

ঝামেলা বাধে সেই গ্রামে এক হিন্দু শিক্ষক টেলিভিশন নিয়ে প্রবেশ করলে। হিন্দু ধর্মে টেলিভিশন দেখার কোন সমস্যা নেই, এই ধারণার কারণে চেয়ারম্যান অনেক ভেবেচিন্তে তাকে বাধা দেয় না। তবে শর্ত দেয়, কোন মুসলমান তার বাসায় টেলিভিশন দেখতে যেতে পারবে না। পরবর্তীতে হিন্দু শিক্ষক এই শর্ত মেনে চলতে পারে না দুইটি কারণে। এক. গ্রামের মানুষের অত্যাধিক আগ্রহের জন্য চাপ তৈরী হয়। দুই. তার কোচিং সেন্টার টেলিভিশনের আকর্ষণে জমজমাট হয়ে উঠে।

মুসলমানরা হিন্দু শিক্ষকের বাসায় টেলিভিশন দেখতে যায় এই খবর পেয়ে চেয়ারম্যান সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে সেখানে যায়। সেই টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক কোহিনূর সেখানে ওদিনও উপস্থিত ছিল। বেয়াদবির অপরাধে সবার সামনে কোহিনূরকে কান ধরে উঠবস করায় চেয়ারম্যান। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে কোহিনূর প্রথমে সুলেমানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়, পরে সুলেমানকে শর্ত দেয় টেলিভিশন কিনে বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সে সম্পর্ক মূল্যায়ন করবে।

সুলেমান বাধ্য হয়ে তাই করে। বাবার লোকজনের সাথে তারা মারামারি হয়। চেয়ারম্যান পিছু হঠে। আবার পরে সুলেমানের অপরাধবোধ তৈরী হয়, সে মাফ চায়, তার বাবা তাকে মাফ করেও দেয়।

ওদিকে চেয়ারম্যান হ্বজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে হবে বলে তিনি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে ম্রিয়মান হয়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ছবি তুলে পাসপোর্ট করেন কিন্তু ঢাকায় এসে বুঝতে পারেন তিনি হ্বজ এজেন্সি দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। তিনি যেতে পারছেন না। মনভাঙ্গা সেই পরিস্থিতিতে বাড়িতে না ফিরে তিনি এক হোটেলে খানাদানা বন্ধ রেখে পড়ে থাকেন। তার ম্রিয়মানতা ভাঙ্গে ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ ধ্বনি শুনে। পাশের রুমের টেলিভিশনে তিনি হজ্জ্ব দৃশ্য দেখতে পান। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে হোটেলে নিজের রুমের টেলিভিশন ছাড়েন এবং কাঁদতে কাঁদতে টেলিভিশনের সাথে গলা মেলান। নিজেকে সমর্পন করে দেন বোকা বাক্সের আদর্শে। এই হোল মোটামুটি গল্প।

 

ঝা প সা  ফো কা স  বা  বি ষ য় নি ষ্ঠা হী ন গ ল্প

আসলে কি ছবিটি টেলিভিশান নিয়ে? অর্থাৎ টেকনলজির সঙ্গে প্রাচীন ও সংরক্ষণশীল মনের সংঘাত, নাকি ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনীটাই এখানে আসল গল্প !

ছবি তোলা বা টেলিভিশন দেখা ঠিক না – এক প্রত্যন্ত গ্রামের চেয়ারম্যান এক বয়স্ক মুরুব্বীর এই মুল্যবোধের সঙ্গে একালের অবারিত মিডিয়ার – এই দুই এর সংঘাতকে অনুষঙ্গ করে আবর্তিত হতে চেয়েছে সিনেমার কাহিনী। এক বাক্যে এভাবে বললাম বটে, কিন্তু লিখতে গিয়ে টের পাচ্ছি এক বাক্যে এটা বলা কতটা ঠিক হচ্ছে। দ্বিধা আমার নিজের, কিন্তু ভেবে দেখলে দ্বিধার উৎস আমি নই। কারণ, সিনেমায় এটা স্পষ্ট যে গল্পকার বা পরিচালক গল্পের ফোকাস বা নিষ্ঠা অস্পষ্ট করে ফেলেছেন। চেয়ারম্যানের মনের বা বিশ্বাসের সংঘাতের জায়গাটিকে মুখ্য করে রাখতে পারেননি, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সেই ফোকাসটা থাকেনি। তাছাড়া বিজ্ঞান বা টেকনোলজির সঙ্গে ধর্মের দ্বন্দ্ব খুবই ক্লিশে, প্রাচীন ছকে বুঝেছেন, আর সেভাবেই মীমাংসা করেছেন। ছবি এই দ্বন্দ্বকে নতুন কোন দিক থেকে আমাদের বুঝতে সহায়তা করে নি।

চেয়ারম্যান গ্রামের কাউকে টেলিভিশন দেখতে দেন না – এই পটভুমির উপর দাঁড়িয়ে আরেকটি আলাদা গল্প এখানে আছে। চেয়ারম্যানের ছেলে সুলেমান (চঞ্চল), তাঁর প্রেমিকা (তিশা) আর ওদিকে বাসার বা ব্যবসায়ের কর্মচারী (মোশাররফ) এই তিনজনের ট্রয়কা প্রেমও সিনেমার মধ্যে গল্পের মুখ্য ফোকাস হয়ে উঠেছে। এই উপ-গল্প ও চরিত্র তিনটা এত সময়, বিস্তার ও ট্রিটমেন্ট পেয়েছে যে মনে করার কারণ ঘটেছে যে এটাই গল্পের ফোকাস। আবার ওদিকে গল্প শেষ হচ্ছে – চেয়ারম্যানকে নিজের মুল্যবোধ বা বিশ্বাস ধরে রাখতে অক্ষমতার পরিবেশে ফেলে দিয়ে; হ্বজে যাবার জন্য আপোষ করে নিজের ছবি তোলা আবার প্রতারিত হয়ে হ্বজে না যেতে পেরে টিভিতে হ্বজ দেখে লাব্বায়েক লাব্বায়েক ধবনিতে শতচ্ছিন্নে ভেঙে পড়ার ভিতর দিয়ে। ফলে চেয়ারম্যানের আত্ম-সংঘাত কি গল্পের ফোকাস? না কি এটা কেবল গল্পের পটভুমি, যে-পটভুমিতে দাঁড়িয়ে অন্য এক প্রেমের গল্প আছে, সেটাই গল্পের মুল বিষয় – এই দুই এর মধ্যে গল্পের ফোকাস দোল খেয়ে ফিরেছে। কোথাও তা স্থির হয়ে বসতে পারেনি, কিম্বা দুই গল্পের মধ্যে কোন শক্ত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি।

ফলে লিখতে গিয়ে আমিও দ্বিধায়। এই দ্বিধা বেশ জটিল। সমস্যাটা সিনেমা দেখার অর্ধ সময়ের পর বা ইন্টারভ্যাল থেকেই টের পাচ্ছিলাম। কারণ ততক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে, চেয়ারম্যানের চরিত্র ও তার সংঘাত – সেই দিকে গল্প বিস্তারের আর সময় নাই, এই দিকটি আর উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পাবে না। সেই সুযোগ আর গল্পকার পাবেন না বা নিবেন না। অথচ গল্প শেষ হচ্ছে যেখানে সে অনুসারে এটাই গল্পের ফোকাস। সার কথায় চরিত্রটা উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পায়নি।

কোন গল্প সাজানোর সময় সেটা নানা দিকে যেতে পারে, নানান বিস্তারে যেতে হয়, একটা পরিস্থিতি তৈরীর প্রয়োজন থাকে। কোন দিকটায় গল্প কতটুকু বিস্তার হবে তা নির্ভর করে গল্পকার কোনটা ফোকাস করতে চাইছেন তার উপর, সেই প্রয়োজন দ্বারা নির্ধারিত। টিভি সিরিয়ালের তুলনায় সিনেমার ক্ষেত্রে এটা মেনে চলতেই হয়। গল্পের ফোকাস বিচারে সিরিয়ালে প্রত্যেক পর্বেই আলাদা আলাদা ফোকাস চাইলে রাখা সম্ভব। আর সিরিয়ালে পর্ব কয়টা হবে, সেই হিসাবও কিছু অদলবদল করা চলে। তার সীমার বাঁধন অন্তত সিনেমার মত ২-৩ ঘন্টা মেপে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে গল্পের ফোকাস বিচারে সিনেমার স্ক্রিপ্ট সাজাতে হয় একটা কিছুকে মুখ্য দৃষ্টিনিবদ্ধ করে।

তবুও ধরে নেয়া যাক, ‘টেলিভিশন’ সিনেমার -স্ক্রিপ্টের ফোকাস হিসাবে গল্পকারের মনে চেয়ারম্যানই ছিল মূল। কিন্তু এই ধরে নেয়া নিয়ে আমরা বেশিদুর অগ্রসর হতে পারি না। সেক্ষেত্রে প্রধান গরমিল বেঁধে যায় মোশাররফের চরিত্রটা। কারণ এই চরিত্র সেক্ষেত্রে একেবারেই নাও যদি থাকে তাতে গল্প ও তার ফোকাসের কোন সমস্যা হয় না। অথচ উলটা, মোশাররফের চরিত্রটা যথেষ্ট গুরুত্বপুর্ণ ও বড়। এটাকে যথেষ্ট প্রমিন্যান্ট একটা চরিত্র করা হয়েছে। এবং এমনভাবে তা করা হয়েছে যে মনে হয়েছে, চঞ্চল যদি তিশার প্রেমিক হতে পারে তবে কোন যুক্তিতে মোশাররফও সমান প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য প্রার্থী নয়। নায়িকার সাথে তার সম্ভাব্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেমিক হিসাবে বরং মোশাররফকেই বেশি যোগ্য করে দেখানো হয়েছে। ফলে এতে দর্শকের মনে সাজেশন দেয়া হয়েছে যে, এর একটাই কারণ মোশাররফের সোশাল ক্লাস, সোশাল ক্ষমতা চঞ্চলের চেয়ে নীচে। ফলে গল্পের একটা নতুন ডাইমেনশন এখানে তৈরি হয়েছে। অথচ কেন এই গুরুত্ব, মুল ফোকাসের বাইরে এই বিস্তার – এর কোন প্রাসঙ্গিকতা ছবিতে হাজির নাই। ফলে মোশাররফ চরিত্র হয়ে গেছে উদ্দেশ্যবিহীন। অন্যভাবে বললে, এই দিকটাকে প্রমিন্যান্ট করার কারণে স্ববিরোধী একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়েছে যেন এটা গল্পের ফোকাস। ফলে গল্পের ফোকাস চেয়ারম্যান চরিত্রের সাথে তুলনায় মোশাররফ চরিত্র বিস্তারে, ট্রিটমেন্টে অন্যায্য ও অসামঞ্জস্য চোখে ভাসে। কমবেশি একইভাবে আবার দিশা ও সুলেমানের (চঞ্চলের) সম্পর্ককেও কখন গল্পের মুল বিষয় মনে হয়েছে। সেক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও মোশাররফ এই দুই চরিত্রের কোনটাকেই এমন প্রমিন্যান্ট ও ডিটেইল করার কোন কারণ থাকে না। এই দিক থেকে ফিল্ম হিশাবে ছবিটি দেখতে বসে একটা বড় অস্বস্তি টের পাওয়া গেছে। এটা গল্পকার কেন করলেন তার ব্যাখা খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবু গল্পকার গল্পের ফোকাস ঠিক রাখতে পেরেছিলেন কি পারেন নি সে প্রশ্ন উহ্য রেখে বলা যায় খুব সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন, চেয়ারম্যান কেন্দ্রিক চরিত্র ও তাঁর সমস্যাটাই গল্পের ফোকাস। অনুমান করছি গল্পকার এটাই চেয়েছিলেন। নইলে নামও দেবেন কেন ‘টেলিভিশন? নাম দিতে পারতেন ত্রিমুখী প্রণয় বা এইরকম কিছু।

তিন জনের মধ্যে প্রেম, প্রতিযোগিতা আর সংঘাতের ব্যাপারটাও ছকের ব্যাপার মনে হয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নতুন কোন দিক নজরে পড়ে না, বা আমাদের ভাবায় না। 

 

গ ল্পে র  দ্ব ন্দ্ব  বা ক ন ফ্লি ক্ট

মানুষের ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না এমন বিশ্বাসে বিশ্বাসী একজন বয়স্ক মানুষের সমস্যা আছে ছবিতে। এই মানুষ সামাজিক দিক থেকে প্রতিপত্তিশীল, ফলে যে গ্রামের তিনি চেয়ারম্যান সেই গ্রাম টেলিভিশন-শূন্য। সেখানে কাউকেই টেলিভিশান দেখতে দেওয়া হয় না। এই বাক্য পড়ে পাঠক বা দর্শক তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করবে – তো? তো এনিয়ে পরিচালক কী বলতে চান? এর মানে হলো, পাঠক বা দর্শক জানতে চাইছেন গল্পের দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্টটা অথবা গল্পে তুলে আনা সমস্যাটা কি নিয়ে। এই সমস্যাটাকে গল্পকার বা পরিচালক কি করে ট্রীট করেছেন? আমাদের আজকের আধুনিক জীবনের সাদা চোখে, ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না -এতটুকু যদি কাউকে বলি – এমন ধারণা শুনলে আমরা বলব এটা একটা অচল ধারণা, (সিনেমা শেষে পরিচালকও যেটা প্রমাণ করেছেন যে চেয়ারম্যান একটা ‘অচল মাল’)। কিন্তু সমস্যা হলো, এটা তো একটা সহজ স্বতঃসিদ্ধ ষ্টেটমেন্টে। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট কই? একটা ‘অচল মাল’ দেখিয়ে আর কতটুকু দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট টেনেটুনে হাজির করা যাবে? সিনেমার গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – সেখান থেকে টান টান টেনশন – চাইলে টেনশনের আরও টুইষ্ট বা মোচড় – আর শেষে সে টেনশনের নিরসন তৈরি করে সিনেমা্র গল্প বানানো হবে। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, গল্পকার-পরিচালক এই প্রশ্ন মোকাবিলা করতে গিয়ে আগেই ধরে নিয়েছেন, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদিতা’ এমনই সরল অর্থাৎ ব্যাপারটা সেই পুরানা সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বের সরল সমাধান আমরা জানি, তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয়। যেন গল্প-স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গল্পকার বা পরিচালক কুপমন্ডুকতার উপর সেকুলারিজমের বা আধুনিক জীবনের বিজয়ের ওপর এক গাথা লিখে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটা একটা ক্লিশে বিজয়গাথা বা প্রপাগান্ডা হতে পারে – নতুনদিনের নতুন ভাবনার সিনেমা হবে কি না, সেটা সন্দেহ। এই ধরনের ক্লিশে জিনিস দিয়ে পুরানা ভাবনাকে নতুন ভাবে ঘটনার বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভাবে দেখাবার আগ্রহ তৈরী করবে না। পুরানা জিনিসই মনে হবে। ঘটনাকে নতুন করে দেখবার, দেখানোর আগ্রহ তৈরি করবে না।

ছবি দেখার পর আমাদের অনেকে বলছিলেন, একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না -এমন বয়ান আকড়ে ধরে থাকার লোক কি আছে? আবার যদি ধরে নেই কোনাকাঞ্চি কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুএকজন রয়ে গেছেন তাহলে সেই চেয়ারম্যান আবার ‘দৈনিক প্রথম আলো’ পড়েন কিভাবে? ধর্মচিন্তা, নীতিনৈতিকতা বা সুনির্দিষ্ট ভাবে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বদ্ধমূল ধারণারই উদ্গীরণ ঘটেছে চেয়ারম্যানের চরিত্রে। সিনেমায় চেয়ারম্যান চরিত্র আমাদের কাছে তুলে ধরবার জন্য দেখান হচ্ছিল যে পত্রিকায় ছাপা এড জাতীয় ছবিগুলোর উপর ছোট সাদা কাগজের তালি দিয়ে ঢেকে তিনি পত্রিকা পড়েন। যুক্তির দিক থেকে হয়ত কথা সত্যি। তবুও মেনে নিতে রাজি যে রেয়ার ও ব্যতিক্রম চরিত্র নিয়েও তো গল্পস্ক্রিপ্ট হয়। এমনকি কাল্পনিক এমন রেয়ার চরিত্র বানিয়ে নিয়েও ভাল স্ক্রিপ্ট হতে পারে। সেটা কোন বড় সমস্যা নয়। আর সিনেমায় চুলচেরা বাস্তবতা খোঁজার চেয়ে গল্প কি বলতে চায় তা মোটামুটি ধরা গেলেই চলে; তাতে সবকিছু খাটি রিয়েলিসটিক না হলেও দর্শক সেসব ত্রুটি উপেক্ষা করে গল্প বুঝতে রাজি থাকে বলেই আমার ধারণা। ফলে এটা কোন বড় পয়েন্ট নয়। কিন্তু একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না এমন রেয়ার ও ব্যতিক্রমী বয়ানধারী চরিত্র হাজির করে যদি শেষে তাকে একটা ‘অচল মাল’ বলে নাকচ করে দেয়া হয় তাহলে তা গল্প হওয়া খুবই কষ্টকর। ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এটাই তো স্বতঃসিদ্ধ। তাহলে সেখান থেকেই গল্প-স্ক্রিপ্ট কতটুকুই বা আগাবে, বের হবে? অন্যভাবে বললে, সিনেমার গল্প-স্ক্রিপ্টে এক বা একাধিক দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – সেখান থেকে টান টান টেনশন – আর শেষে সে টেনশনের নিরসন -এভাবে মোটাদাগে কোন গল্পের একটা মৌলিক কাঠামো থাকে ধরে নিলে, সেক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এমন স্বতঃসিদ্ধ ধারণার উপর দাঁড়িয়ে ও থেকে আবার দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করা আসলেই কঠিন। কারণ স্বতঃসিদ্ধ ধারণা মানে আগেই যা নিরসিত, ফলাফল আগেই নির্ধারিত। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করার আগেই এটা ছিবড়া। স্ক্রিপ্ট ন্যারেশন করতে করতে কনফ্লিক্ট–টেনশন-নিরসন এভাবে ধাপে ধাপে না হয়ে নিরসিত দ্বন্দ্ব দিয়ে শুরু করা মানে আগেই গল্পকে হত্যা করা বা এর আর গল্পমুল্য নাই না বললেও এর গল্পমুল্য আগেই দুর্বল হয়ে থাকে। তাই ঘটেছে এখানে।

ছ বি র  ভি লে ন  কে ?  না  থা কা র  স ম স্যা

দর্শকের চোখে ভিলেন বা নেতি চরিত্র যদি সবল ঘৃণা তৈরি করতে পারে তবে গল্পকার সার্থক। দর্শকের জন্য সেক্ষেত্রে উপযুক্তভাবেই ভিলেন বা নেগেটিভ চরিত্র ঘৃণিত। কিন্তু গল্পকারের কাছে? তাঁর কাছে ঘৃণিত আর প্রিয় বলে কিছু নাই; কারণ নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ আর নায়ক বা পজিটিভ চরিত্র নির্মাণ তার কাছে একই কথা, একই কাজের দুই দিক। কোনটাই তার কাছে এতটুকু কম গুরুত্বের নয়। অন্যভাবে বলা যায়, শক্ত নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ করতে পারলে একমাত্র তখনই তুলনায় এবং বিপরীতে পজিটিভ চরিত্রটা ততই শক্তপোক্ত হয়। নেগেটিভ চরিত্র যত শক্তপোক্ত তা ততটাই বিপরীত চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে, জেগে উঠবার শর্ত তৈরি করে। অনেকটা পরিমিত মাত্রার সাদা-কালোর কনট্রাস্টের মত। নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণের সময় তাঁর পক্ষে সম্ভাব্য সমস্ত ন্যায্যতা, শক্ত যুক্তির অভাব খামতি ঘটলে সব শেষ। এর কারণে, কোনভাবেই এ থেকে পজিটিভ চরিত্র দাঁড়াবে না, গল্প-স্ক্রিপ্টও মাঠে মারা যেতে বাধ্য। এটা মনে করা বেকুবি যে যেটা নেগেটিভ চরিত্র সেই চরিত্র তো শেষে পরাজিতই দেখানো হবে; তাহলে আর এর মুখের ডায়লগে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি দেবার দরকার কী? না, বরং নেগেটিভ চরিত্রের পক্ষে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি – এক কথায় আপাত ন্যায্যতাগুলো থাকার পরও পালটা একটার পর একটা তা নাকচ করার একটা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই একমাত্র পালটা চরিত্রটা ইতিবাচক বা নায়ক হয়ে উঠে। ফলে কোনটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক চরিত্র হবে এটা স্রেফ গল্পকার বা পরিচালকের আগাম ধরে নেবার বিষয়ই নয়। পরতে পরতে নির্মাণ করার বিষয়। এক অর্থে গল্পকার অর্থাৎ ভিজুয়াল গল্পকার মানে মানুষের মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, কষ্ট-সুখ, ভাল লাগা-মন্দ লাগা ইত্যাদি নিয়ে সফল মুন্সিয়ানায় খেলা করতে পারা। এটা কোনভাবেই গল্পকারের নিজেই কেবল দর্শক হয়ে যাওয়া নয়। গল্পকার যদি আগেই ধরে নেয়, চেয়ারম্যান চরিত্র তো ঘৃণিত এক রক্ষণশীল ‘এযুগের অচল মাল -যেটা গল্পকার করতে পারে না -ফলে ঐ চরিত্রের পক্ষে আর শক্ত সাফাই জাষ্টিফিকেশন কি থাকতে পারে তো -সেক্ষেত্রে তিনি আর গল্পকার নয়, বড়জোর তিনি একজন কেবলই দর্শক। বলা বাহুল্য এতে স্ক্রিপ্ট-সিনেমার ওখানেই মৃত্যু।

ভিলেন কে ছবির? বা যার বিপরীতে প্রধান চরিত্র অর্থবহ হয়ে ওঠে?

যেমন ‘টেলিভিশন’ গল্পে নেগেটিভ চরিত্র কে? চেয়ারম্যান? আর বিপরীতে পজিটিভ চরিত্র তার ছেলে সুলেমান? কিংবা সুলেমানের উপর শর্ত বা প্রণোদণাদাত্রী হিসাবে নায়িকা? সিনেমায় কোনটাই একেবারে স্পষ্ট নয়। তবে আকার ইঙ্গিত আছে মাত্র। আবার, চেয়ারম্যান কি নৈতিক বা মরাল দিক থেকে কোথাও স্খলিত? মোটেও না। কোথাও কোন দৃশ্যে তিনি তা নন। তার একটাই অপরাধ তিনি একটা ভ্যালু অথবা বিশ্বাস যেভাবে বুঝেছেন তাতে অটল। এভাবে তো নেগেটিভ চরিত্র গড়া কঠিন। বিপরীতে, ওদিকে সুলেমান? সে কি কোন সুনির্দিষ্ট ভ্যালু অথবা বিশ্বাস লালন বা ধারণ করে? মোটেই না, এমন কোন লক্ষণও নাই। আর নৈতিক বা মরাল দিক থেকে সে চেয়ারম্যানের ধারে কাছে নয়। বরং তুলনায় কার্য-স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্ততপক্ষে সে একজন ম্যানিপুলেটর; সে ছলনা বা মিথ্যা আশ্রয়ী। এর চেয়েও বড় কথা সে চেয়ারম্যানের বিপরীতের নতুন সমাজের একজন ভোক্তা কনজুমার কেবল, এবং বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। ফলে এই চরিত্র নেগেটিভের চরিত্রের তুলনায় খাটো, মোটেও পজিটিভ নয়। সে ভাবেও নির্মিত হয়নি। করা কঠিনও। অথচ আকার ইঙ্গিতে এটাকে ইতিবাচক বলার চেষ্টা আছে মাত্র।

ওদিকে চেয়ারম্যান চরিত্রের পরিণতি হলো, অচল মাল, সমাজের সাথে আনফিট । তিনি কম্প্রোমাইজ করে হ্বজে যাবার টেকনিক্যাল কারণে ছবি তুলতে বাধ্য হচ্ছেন আবার হ্বজ কোম্পানীর শঠতায় পড়ে যেতে পারেন নাই, চিটেড হয়েছেন। কিন্তু এসব কোনটাই তাঁর বিশ্বাস, মুল্যবোধে হঠাৎ ঘাটতি এসেছে সেজন্য তিনি করেছেন তা নয়। বরং, প্রতারিত হবার জন্য তিনি দায়ীই নন। নতুন সমাজ যা তাকে করতে বাধ্য করছে তাই তিনি করেছেন, এর পরেও তিনি প্রতারিত।

ক ম ন  শ ত্রু -গ ল্প কা রে র  আ ত্ম স ম র্প ণ

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, চেয়ারম্যানের মুল্যবোধ ও বিশ্বাস ধরে রাখার ক্ষেত্রে যা বাধা বা শত্রুর ভুমিকায় তা হলো, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের সমাজ বা দুনিয়া, অথবা এর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া টেলিভিশন টেকনোলজি। আর তার ছেলে সুলেমান ঐ সমাজেরই ভোক্তা, কনজুমার মাত্র, এবং সে বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। অর্থাৎ উভয়েরই শত্রু একই। কিন্তু তা সত্বেও সেই কমন শত্রু ফেলে পিতা-পুত্র এক আপতিক বিরোধে জড়িয়ে গেছে, আর ঐ কমন শত্রুই এই বিরোধ তৈরির কারণ। অথচ এইদিকটা গল্পকার দেখতে পাচ্ছেন এমন কোন ইঙ্গিতও নাই। ফলে পিতা চেয়ারম্যান বা পুত্র সুলেমান এই শত্রুর কাছে সারেন্ডার করছেন না, আসলে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছেন খোদ গল্পকার ও পরিচালক।

কিন্তু এর মানে কি আমি পিতা-পুত্রকে পিছনের ফেলে আসা কোন সময়ে, সমাজে ফিরে যেতে বলছি, মোটেই না। তবে সে জন্য একটা বোধোদয়, আত্ম উপলব্ধি বা আত্মসচেতনতার দিকেও তাদেরকে যেতে হবে। সে কাজ গল্পকার করতে পারতেন হয়ত। কথাটা অন্যদিক থেকে তুলব।

গল্পের মুল প্রসঙ্গ, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা। আর সিনেমায় এই ধারণার পরিণতি দেখানো হয়েছে এই মুল্যবোধ ও বিশ্বাসকে বলি দিয়ে। একধরণের প্রশ্নহীন ও আগাম অনুমান দিয়ে সরাসরি ধরে নেয়া হয়েছে, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা -এই ধারণাটাই ভুল। সোজাসাপ্টা এক সরলীকরণ সমাধান টেনে অন্তত বলা হয়েছে -এটা অচল ধারণা। সমস্যা সঙ্কটটাকে কোন ক্রিটিক্যাল দিক থেকে দেখার চেষ্টাও সেখানে নাই। যেমন, নিস্তরঙ্গ ফ্লাট ধরে নেয়া হয়েছে ছবি না তোলা বা দেখা -এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র। প্রশ্নহীন ধরে নেয়া হয়েছে এটা কুপমন্ডুকতা অথবা নেহায়তই এক রক্ষণশীলতা। কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, কারণ কি? – সে প্রশ্ন তোলার বা খুজে দেখার চেষ্টা কোথাও নাই। ধরেই নেয়া হয়েছে, এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র, ওর পিছনে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা নাই। চেয়ারম্যানের মুখ দিয়ে সে সম্পর্কে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেয়ার কারণে চেয়ারম্যান চরিত্রটাকে পুষ্ট হতে দেয়া হয় নাই। ফলে সে একটা ক্লাউন; অচল মাল ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে নি।

গ ল্পে র  বি ষ য় ব স্তু  বা ছা ই

এযুগে টেলিভিশন দেখে না, দেখতে দেয় না – এখান থেকে শুরু করে কৌতুককর কাহিনী তৈরি করা যেতেই পারে। খুবই সহজ কাজ সেটা। কিন্তু গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস।

প্রথম কথা হলো, প্রশ্নটা ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই না। ইসলামের দিক থেকে মানুষ, জীবজন্তু বা যে কোন প্রাণ কোন প্রকার (ছবি, অক্ষর ইত্যাদি) চিহ্নব্যবস্থায় প্রতিফলন ঘটানো বা তাকে নিছকই মূর্তি করে তুলে সৃষ্টবস্তুর মূল সত্তাকে গৌণ করে ফেলার বিরুদ্ধে ইসলাম আপত্তি জানায়। এটা একটা দিক। আরেকটি জটিল ও গভীর দিক হচ্ছে, নিরাকার ধারণা। ইসলামে নিরাকার বা আল্লাহর নিরাকার ধারণা একটা ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেটা একেবারেই মৌলিক ধারণা। আবার এটা নেহায়তই ইসলামের জন্য নয়, মানুষের চিন্তা, ভাব, দর্শনের জট খুলবার জন্য এক মৌলিক ও সিরিয়াস ধারণা। অজান্তে অজ্ঞতায় সেই গুরুত্বপুর্ণ দিক যাতে মানুষ হারিয়ে না ফেলে তা থেকে সাবধান থাকতেই ছবি তোলা বা না তোলার, আকার দেয়া না দেয়ার প্রসঙ্গটা এসেছে।

আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরা যায় না। আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরতে গেলেও তা ‘অধরা’ই থেকে যাবে। আর আকারের ভিতর নিরাকার ধারণা তো অধরা থেকে যাবারই কথা। কারণ তখনও আকারের নেতি হিসাবেই নিরাকারের চিন্তা করা হয়, হেগেলের ভাষায় ‘আকার’-এর মধ্যস্থতায় নিরাকারের হাজির হওয়া। তবু মানুষ আকার, আইকন, চিহ্ন করে, করে ফেলে। করতেই হয়। কোন কিছু বুঝতে নেবার প্রচেষ্টার প্রথম মুহুর্ত থেকেই এই স্ববিরোধটা ঘটে। কিন্তু ইসলাম দাবি করে নিরাকারকে কোন মধ্যস্থতা ছাড়া চিন্তা করবার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ইসলাম আমরা মানি বা না মানি এই প্রস্তাবের দার্শনিক গুরুত্বকে যতো হাল্কা আমরা গণ্য করি, ব্যাপারটা মোটেই হাল্কা ব্যাপার নয়। ফলে ছবি দেখা না দেখার বিষয়টা সেই জায়গা থেকে এসেছে। আসলে ছবি দেখা বা সে অর্থে টেলিভিশন দেখা আদৌ নিষিদ্ধ কিনা ইসলামের ভেতর থেকেও তার তত্ত্ব-উপায় আছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের চরিত্রের মধ্য দিয়ে তার নৈতিক সিদ্ধান্তকে মুখ্য করে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দিকে যাবার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাকে একটা হাস্যকর চরিত্রে পরিণত করা হয়েছে।

এ বিষয় নিয়ে যাঁরা লিখবার অধিকারী, তাঁরা লিখবেন। তবে আমার নিজের কাছে যেসকল প্রশ্নগুলো হাজির হয় তার কিছুটা নমুনা দিলে বোঝাতে পারব, ছবিতে টেলিভিশন দেখা না দেখাকে যতো ক্যারিকেচার পরিণত করা হয়েছে, আকার/নিরাকারের তর্ক আরও অনেক গভীর ও জটিল।

যেমন, উচ্চারণে যদি ধরা বুঝা শুরু করতে চাই, তাহলে নিরাকার ধারণা তো একমাত্র নৈ-স্বরে, নৈ-স্বরাকারে অথবা নৈ-উচ্চারণেই ধরতে পারার কথা, আলাদা আলাদা শব্দ-উচ্চারণে না। জানি ওরাল বা গলার স্বরে নিরাকার ধরা যাবে না, তবু ওরাল স্বরই আমাদের ভরসা। অধরা ভাবের ভিতর দিয়ে ওরাল স্বরের সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। অন্তত অর্থহীন স্বর তাকে হতেই হবে। যেমন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয় সনাতন ধর্মীয় আবহে গড়ে উঠা রাগ সঙ্গীত, তা অর্থহীন স্বর অথবা অনন্ত অর্থের এক স্বর হবার পিছনে এটা ছিল অন্তত একটা কারণ। ধ্রুপদি সঙ্গীতে ইসলামের বিশেষ আগ্রহের এটা একটা কারন হতে পারে।

নানান অক্ষর-বর্ণমালা দিয়ে আমরা আমাদের লেখা পুস্তক সাজাই, ওদিয়ে ধারণা ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু নিরাকারের ধারণা? একমাত্র অক্ষরগুলোর বিভেদ নিরাকরণে ঘুচলেই নিরাকার ধারণা আসতে পারে। তবু আলাদা আলাদা অক্ষর না আঁকলে, চিহ্ন আইকনে তাদের বিভেদ না করে নিলে লেখা, পুস্তকে কোন ভাব, ধারণা ধরা অসম্ভব। এটা স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

ভিজুয়ালাইজেশনঃ এতে আলাদা আলাদা ছবি সব, ছবি চিহ্ন আইকনের বিভেদ আমাদের শিখতেই হয়। জানা হয়। এই বিভেদের ভিতর দিয়েই এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই এবার চোখ বন্ধ করলে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

একটা চকমকে কাগজে আল্লাহু লিখলে ঐ কাগজ সেটা আল্লাহ নয়। আল্লাহকে তাতে উচ্চারণ করে পড়ে স্বরে, লিখিত অক্ষরে বা অক্ষর দেখে ভিজুয়ালাইজেশন ধরা যাবে না। তবু আমরা আল্লাহু লেখা কাগজ দেখি আমাদের মনে একটা ভাব তৈরি হয়। আমাদের কালচারে তা ফুটে উঠে। ঐ কাগজ কেউ অজান্তে পায়ে দলে দিলে কিছু হবার কথা না কারণ ঐ কাগজ নিজে আল্লাহু নয়। কিন্তু পায়ে দলা যদি ডেস্পারেট এটেম্পট হয় তবে ঐ ভাব গুণাহ কাজ বলে মানা হয়; আমাদের কালচার তা ধারণ করে চলে। সাবধান থাকার পরামর্শ ইঙ্গিত জারি রাখে।

আমরা সবাই আলাদা আলাদা নাম ধারণ করি। একের থেকে অন্যের বিভেদ, তফাত না করলে চিনা জানা মনে রাখা সম্ভব না। প্রকৃতিতে যাই দেখি তাকেই এক একটা আলাদা আলাদা নাম দেই। এগুলো আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় তো বটেই এটা। জানাজানি সচেতনতার প্রক্রিয়ায় এই স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সতর্ক খেয়াল রাখলেই তবে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। ফলে সেদিকটা বিবেচনা করে আমরা আল্লাহর গুণবাচক অর্থ –সমার্থক নাম রাখি, একটা কালচার গড়ে ঊঠেছে। যদিও তাতে সবদিক সামাল দেয়া যায়নি। প্রকৃতিতে এত কিছু কত কত দেখি আমাদের অনেক নামবাচক শব্দ দরকার। সব কুলকিনারা করা যায়নি। কেবল মানুষের নামের ব্যাপারটায় একটা কালচার তৈরি হয়েছে দেখি আমরা যদিও সেটাতেও ভাঙ্গা গড়া আছে।

টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত – কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা।

পশ্চিম দিকে কাবা শরীফের দিকে কেবলা বেধে নামাজ পড়ার নিয়ম। এর মানে কি আর দশ দিকে আল্লাহ নাই? মোটেই না। এটা ঠিক পুব-পশ্চিমের ব্যাপার না, বরং দশ দিক কেন্দ্রে এসে সমপাতিত হয়, মিলে মিশে একাকার নিরাকার হয়। নৈ-দিক হয়ে যায়। মানুষের ঐক্য, একটা একতাবদ্ধ মানুষের কমিউনিটি গড়ার উদ্দেশ্যের কথা মাথায় রেখে একই কেবলা অভিমুখী করে, কিন্তু নিরাকারের উপাসনার প্রতীকায়িত ঘটনা এটা। এখানে বেশ মজার কিন্তু গভীর একটা দিক আছে। ধরা যাক, ওখানে কাবা ঘর নাই। কিন্তু দুনিয়ার দশ দিকের নানান স্থান অবস্থানের মানুষ সবাইকে একই দিকে অভিমুখী বা কেবলা করতে গেলেও প্রতিটা দিকের অবস্থানের মানুষকে ঐ অবস্থানের ক্ষেত্রে একটা দিকের কথা বলতে হত যেদিকে দশ দিক সমপাতিত হয়। সেক্ষেত্রে সব অবস্থানের দিকের সেই সমপাতিত স্থান হলো যেন কাবা শরীফ। এতে দশ দিকের দশ দশ রকম মানুষের ভিন্নতার সমস্যা মিটিছে – একমুখী করা গেছে। যদিও ব্যবহারিক দিক থেকে একটা আইকন হিসাবে কাবা শরীফ এতে থেকে গেছে। এটা আকারের দুনিয়ায় নিরাকারের ধারণা আনার ব্যবহারিক সমস্যা।

এমন অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। প্রতিমুহুর্তে নানান আকার দেয়ার ঘটনা ঘটছে; চিহ্ন, প্রতীক আইকনে দুনিয়াও নানান আকার প্রকারে হাজির। আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়া জারি রাখতে গিয়ে নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় ঘটিয়েই একমাত্র এগুলো করা সম্ভব। তাই এই আপাত স্ববিরোধ। কিন্তু মুল প্রসঙ্গ, এই কাজ করতে গিয়ে এই স্ববিরোধে আমরা যেন নিরাকার ধারণা হারিয়ে না ফেলি। তাই প্রসঙ্গটা আসলে ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই নয়, মুল প্রসঙ্গ নিরাকারের ধারণা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি, বেকুবি অজ্ঞতায় না ডুবে যাই। হারিয়ে চিন্তার, ভাব, দর্শনের চরম সঙ্কটে না পড়ি।

কাজেই মুল ইস্যু নিরাকারের ধারণা রক্ষা করা। নিরাকারের ধারণা ফেলে, ভুলে আমরা যেন চিন্তার গলিঘুপচিতে আটকে না যাই। এইখান থেকেই সতর্কতায়, নবীজির কোন ছবি আঁকা বা আদল দেয়া নিষিদ্ধ। লালনের শিষ্যরা একই কারণে লালনের ছবি বা মুর্তির বিরুদ্ধে। যাতে সেই ছবি, আইকন প্রতীকের ফেরে পড়ে কেবল এসব প্রতীকই সত্য, মুখ্য হয়ে না যায় আর নিরাকারের কনসেপ্ট এর নীচে চাপা পড়ে গড়াগড়ি না খায়। লালনের অনুসারীদের ক্ষেত্রে অবশ্য বলা হয় তাঁরা ছবি পূজা করেন না, মানুষ ভজনা করেন। ফলে নবীজির কোন ছবির ব্যাপারে ইসলাম কেন এত কঠোর এটা স্রেফ মোল্লাদের কুপমন্ডুকতা, পশ্চাদপদতা বা রক্ষণশীলতা একেবারেই নয়। এর পিছনে শক্তিশালী দার্শনিক কারণ আছে এবং আমাদের তা রক্ষা করা দরকার।

অতএব, ‘টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত – কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা। গল্পকার সেদিকে তার গল্প প্ররোচিত করতে পারতেন। ফলে সেটা গল্পের পরিসমাপ্তি অর্থাৎ দ্বন্দ্ব নিরসন বা একটা সমাধান হতে পারত।

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান – সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি – ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান – সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি – ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।

এই বয়ানটা বাছবিচারহীন ধরে নেয় তথাকথিত আধুনিকতা বনাম ইসলামের লড়াইটাই হচ্ছে প্রগতিশীলতার লড়াই। অথচ এটা অনিবার্য এমন নয়। আবার এর মানে এও নয় যে এনলাইটমেন্ট অথবা আধুনিকতা থেকে মানুষের কিছুই নেবার নাই। আসলে মুল প্রশ্ন হলো, বাছবিচার করতে শিখা। ক্রিটিক করতে শিখা। আধুনিকতাকে টপকে যাওয়া। স্বভাবতই এর প্রথম কাজ জিনিষটা কি তা আকরসহ বুঝা। তবেই না বাছবিচার, ক্রিটিক! এটা অবশ্যই সমর্পণ না। মানুষের অনন্ত সম্ভাবনা মনে রাখা।

যা  হ তে  পা র ত

উপ-শিরোনাম দেখে মনে করার কারণ নাই যে যা হতে পারত সেসবের সীমা টেনে দিচ্ছি। না মোটেই তা নয়। কি হতে পারত সারকথায় এর কিছু ধারণা দিচ্ছি কি বলতে চাই তা বুঝানোর জন্য। যা হতে পারতঃ

১। টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বকেই মুখ্য করে প্রকারান্তরে চেয়ারম্যান কেন এমন, ঠিক কি বলতে বুঝাতে চায় তা – নায়িকা বা নায়ক যে কেউ একজনকে দিয়ে – সেটা বুঝবার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোন একটা সমাধান, দ্বন্দ্ব নিরসনে গল্পের এক মানবিক পরিসমাপ্তি হতে পারত। গল্পকার গল্পে চেয়ারম্যান কেন টেলিভিশন দেখার বিরোধিতা করছে এর কারণ কী সেটা গুমর হিসাবেই রেখে দিয়েছেন। এটা গুমরাহ রেখে দেয়াটাই এই গল্পের ভিত্তি একমাত্র যা থেকে একে সেকুলারিজম বনাম ইসলামের লড়াই অথবা তথাকথিত ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে আধুনিকতার লড়াই হিসাবে একে খাড়া করা যায়। অথচ এই গুমোরকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – উত্তজনা টেনশন চরমে নেবার পর গুমোর ভেঙ্গে দেখানো ভিতর দিয়ে দ্বন্দ্ব নিরসন করা যেতে পারত। তাতে এই ছবি আমাদের সামাজিক চিন্তায় চিন্তা করার ভিন্ন দ্বার খুলতে পারত।

২। গল্পকার বা পরিচালক ধরা যাক, নিজের তৈরি টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব নিজেও সমাধান করতে চায় না, বা দেখাতে চায় না। কিন্তু একটা মানবিক সমাধানের পরিসমাপ্তি আকুতি তাঁর আছে, সে চায়। এই মানবিক সমাধান অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সে খুজছে এটাই সে ফুটিয়ে তুলতে পারত। ফলে খোলা রেখে দিতে পারত। এটা বলছি, গল্পকার বা পরিচালক একদিকে একজন বিশ্বাসী বয়স্ক লোকের কোন ত্রুটি, (যা সে বিশ্বাস করে তাই সে করেছে) কোন স্খলন দেখাতে পারেনি বা দেখায় নি অথচ তাকে বিশ্বাসের বাইরে যেতে বাধ্য করেছে কিন্তু গিয়েও সে প্রতারিত হয়েছে যার জন্য সে কোনভাবেই দায়ী নয়। অন্যদিকে নায়িকা এক টেলিভিশন দেখার লোভ এতই অমানবিক ও লোভী যে এতে হবু শ্বশুর মরল কি বাঁচল তাতে তার কিছু যায় আসে নাই। এসবের বিপরীতে এটা কমপক্ষে একটা মানবিক সমাধান হত পারত। সিনেমা দেখার পর দর্শকও সেসব প্রশ্নে নানান সামাজিক তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে এর সমাধান খুজে ফিরত। কিন্তু এই গল্পে গল্পকার সহজেই পরিণতি দিয়েছেন, এটা নেহাতই এক রক্ষণশীল ‘অচল মালের’ সমস্যা।

৩। এটা হতেই পারে যে গল্পকার বা পরিচালকের টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব সমাধান কি করে করবে তা নিজের কাছে জানা নাই। কিন্তু আমাদের সমাজের চেয়ারম্যান ধরণের চরিত্র কে, কেন এটা এমন – তা সে আন্তরিকভাবে অনুসন্ধিতসু, সে বুঝতে চায়। ফলে বিশ্বাসী বয়স্ক মানুষটা কি রকম সব অমীমাংসিত সঙ্কটে পড়েছে এর কেবল মানবিক কষ্ট, সাফারিং – এর সব দিক সে খুটিয়ে প্রকাশ করতে চায়। এটাই তার মুল ফোকাস হতে পারত।

উপরে আমি সম্ভাব্য তিনটা ফোকাস ও পরিণতির কথা বলেছি। এখানেই থামলাম। এর মানে এমন নয় যে আর কোন কিছু হতে পারে না। বরং এমন অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তা হবে না, হয় নাই। কারণ, যতক্ষণ আগাম ধরে নেয়া থাকবে যে, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদী’ এমনই সরল অর্থাৎ সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব আর আমরা এভাবে বুঝা দ্বন্দ্বের সমাধান জানি তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয় ততক্ষণ আমাদের গল্পগুলো ‘টেলিভিশন’ এর মত এমনই হবে। আর গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট দুর্বল ফলে গল্পই দুর্বল থেকে যাবে।

গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ বাছাই করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে তাই এই ধরণের সিরিয়াস বিষয়কে গল্পের বিষয়বস্তু করতে হবে।

 

goutadas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে অনেকগুলো ভার্সানে অনেক জায়গায় ছাপা হয়েছে। এখানের ভার্সানটা ২০১৩ সালের ০৩ ফেব্রুয়ারি, চিন্তা ওয়েব পত্রিকার ভার্সানটারই কপি করে এখানে ছাপা হল। ]

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

গৌতম দাস

২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-29P

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

দুইঃ
হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

সাবধান, ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

সাবধান,  ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

গৌতম দাস
১৬ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-26g

গত সপ্তাহে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প । প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- এই দুই দলেরই (বাইপার্টিজান) এলিটরা মিলিতভাবে নিজ নিজ দলের কথা চিন্তা বাদ দিয়ে ‘ট্রাম্প ঠেকাও’-এর কাজে নেমে পড়েছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ০২ নভেম্বর  সিএনএন রিপোর্ট করেছিল ৩৭০ জন অর্থনীতিবিদ (যাদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়া অর্থনীতিবিদও আছেন), তারা সবাই এক বিবৃতিতে কেন ট্রাম্পকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না, তা জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের আগেই একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যে  ট্রাম্পের বোধ হয় আর কোনো সম্ভাবনা নেই; তাকে হারিয়ে হিলারিই জিতে যাইতেছেন। রয়টার্সের মতো মিডিয়া বলা শুরু করেছিল, হিলারি জিততেছেন এটা নাকি প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের জেতার আর যেন কোনো সম্ভাবনা নেই, চার দিকে সে কথাই কেবল প্রচার হচ্ছিল। কিন্তু ফলাফল এখন সবাই জানেন, মিডিয়ার সবার সব অনুমান সেখানে উল্টে গেছে।  তাহলে এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল কেন, আর প্রপাগান্ডার সব কিছু আসলে এক মিথ্যা ফানুস ছিল – এমনইবা শেষে প্রমাণ হলো কেন?

এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা সেই আমেরিকা যে এখনো গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, নির্ধারক রাষ্ট্র – যদিও এটা শেষযুগে যৌবন ঢলে পড়ার কালে। সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, তারই নির্বাচন এটি। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে একে প্রভাবিত করতে সরব মুখ খোলার কথা সমগ্র দুনিয়ার নানান স্বার্থের গোষ্ঠী-মানুষের। তবে মনে রাখতে হবে, সামগ্রিক দিক বিচারে বললে এই নির্বাচনে আসলে মোটা দাগে তিনটি পক্ষ ছিল। এক পক্ষ হল আমেরিকার বাইরের গ্লোবাল স্বার্থ-সুত্রে সম্পর্কিত মানুষ। অন্য দিকে যারা আমেরিকার ভেতরের, এদের মধ্যে আবার আরও দুই পক্ষ। এভাবে মোট তিনটা পক্ষ। মুল প্রসঙ্গটা আমেরিকান ভোটারের, ফলে এখানে ভেতরের মানে আমেরিকান নাগরিক যে ভোটার আর, বাইরের অ-নাগরিক মানে না-ভোটারের। ভেতরের মধ্যে মোটা দুই পক্ষের এক পক্ষ – এই দলে পড়বেন যারা আমেরিকাকে চালায় এমন বড়লোক, এলিট, নীতিনির্ধারক, ইন্টেলেক্ট, ওয়াল স্ট্রিটসহ ব্যবসায়ী জগৎ প্রভৃতি, যাদেরকে এখানে বলার সুবিধার্থে এখন থেকে একসাথে অভ্যন্তরীণ ‘এলিট’ বলে ডাকব। এলিট অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরের ‘আম-ভোটার’দের থেকে যারা আলাদা। এই এলিটরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ রাখেন। সাধারণ সময়ে আমেরিকার বাইরের অ-নাগরিক আর ভেতরের এই এলিট অংশ এরাই মূলত মিডিয়া দখল করে রাখেন, কেবল এদের বয়ানই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেটা একমাত্র নির্বাচনের সময়। এই সময় এই দুই কুতুবের বাইরে নিরব কুতুব যারা সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।  মিডিয়ার বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেরও ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ওদের বাইরেও তৃতীয় (অভ্যন্তরীণভাবে দেখলে দ্বিতীয়) পক্ষ, এঅংশটি হল ‘আম-ভোটার’। ভোটে এরাই নির্ধারক, প্রবল সংখ্যাধিক্যের কারণে। আর সবচেয়ে বড় এই অংশটাই  মিডিয়ার অগোচরেই থেকে যায়, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। অতএব ভোটের সময় এরা স্থানীয় মিডিয়ায় যদি থেকে যায় সেকথা বাইরে থেকে আমরা জানতে পারি না। এই ‘আম-ভোটার’ অংশটি সবচেয়ে বড় বলে ভোট দেয়া ও গণনায় সময় তাদের ভূমিকা নির্ধারক। অন্য যেকোনো গ্রুপের চেয়ে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর ভোটের সময়ের ঠিক এর উলটা দশা হল প্রথম দুই পক্ষের (বাইরের অনাগরিক আর ভেতরের এলিট)। কারণ এদের মধ্যে কেবল ভেতরের এলিটদের কিছু ভোট দেয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যটার ভোট নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকান নির্বাচনে একমাত্র নির্বাচনের সময়ই সবচেয়ে নির্ধারক হল – আম-ভোটার। অথচ আম-ভোটারদের চেয়ে যাদের ভোটই নেই অথবা ন্যূনতম কিছু ভোট আছে  এরাই নির্বাচনে পুরো মিডিয়া দখল করে রাখে এবং সেখানে কেবল তাদের স্বার্থের বা গ্লোবাল স্বার্থের কথা বয়ানগুলোকে মুখ্য করে রাখে। অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আম-ভোটারকে অ্যাড্রেস করতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা কী ভাষায়, কী চাতুরীতে বা কী কৌশলে কথা বলবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে এই আম-ভোটারের কাছে পৌঁছবে, প্রভাবিত করবে, এটা খুবই নির্ধারক। জিততে চাইলে প্রভাবিত করার সেই ভাষ্য অবশ্যই মিডিয়ার আমেরিকার বাইরের ও ভেতরের এলিটদের ভাষ্য থেকে ভিন্ন করাই হবে সহজ কৌশল। ট্রাম্প সম্ভবত তাই করেছেন। তিনি ব্যাপক আম-ভোটারের ভাষারপ্ত করে তাদের তাতিয়ে কথা বলেছেন। তার সেসব কথা মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের চোখে হয়তো অচল। তবুও তা পরোয়া না করে এই ভোটারদের জীবনধারায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি, চাওয়া-পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভোট চেয়ে কথা বলেছেন। কারণ মনে রাখতে হবে, আম-ভোটারদের কাছে তাদের নেতারা বিষয়ে তাদের মুখ্য বিবেচ্য একটাই – তা হল, সরকার তাদের জন্য অনেক কাজ আর ভাল বেতনের ব্যবস্থা করতে পারছেন কিনা, অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পেরেছেন কিনা ইত্যাদি। যদি পারেন আর তা পারতে গিয়ে অন্য দেশের তেল লুট করে নাকি মানুষ খুন করে সব সাফা করে এনেছেন এসব তাদের বিবেচনার কোন বিষয় হয় না। কারণ তারা জানে এলিটরা হার-হারামজাদা। এলিটরা একমাত্র নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের ধান্ধায় পরিচালিত। আর এটাই আম-ভোটারদেরকেও বিপরীত এক সংকীর্ণ স্বার্থের ভিতর দিয়ে নিজেদের দেখতে বাধ্য করে থাকে। ফলে ভিন দেশে গিয়ে আমেরিকান নেতা বা সরকার খারাপ বা অনৈতিক কী করছেন সে বিচারে বসার অবস্থায় তাঁরা থাকেন না। অন্তত নেতাদের আকামের বিচারে বসার চেয়ে বরং তাদের নিজের জন্য অনেক কাজ ও ভাল বেতনের বিষয় – এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যেমন ট্রাম্প কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বললেন; মেক্সিকো বা চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড বেরিয়ার (আমদানি বাণিজ্যে বাধার নীতি) ইত্যাদিতে কথা বলেছেন। সে বিষয়গুলো আম-ভোটাররা নিজের স্বার্থের দিক থেকে দেখবেন, গ্লোবাল মিডিয়ার দিক থেকে নয়। এ ছাড়া আরেকটা বিরাট দিক আছে – মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী শ্রমিক। অথবা রিফিউজি নামে প্রবাসী বা বিদেশী শ্রমিক। এটা এমন এক জিনিস, যখন অর্থনীতি ভাল চলে তখন সরকার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশী শ্রমিকও কাজের প্রাচুর্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে না। কোন সমস্যা দেখে না। বরং সুবিধার দিকটা দেখতে পায়। ফলে কে দেশের বাইরে থেকে এল, বিদেশী কিনা  তা তার কাছে বিবেচ্য হয় না। অর্থনীতি ভালো চললে, বাইরের শ্রম মানেই তুলনায় সস্তায় পাওয়া শ্রম, যে শ্রম তখন সবার দরকারও। তাই তা আদরণীয়। অথচ অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেলে ঠিক এর উল্টো। তখন মনে হয়, কালো বা বাদামি, বিদেশী বা মুসলমান সব খেদাও, এরাই নিয়ে গেল সব। জাতীয়তাবাদের জিগির উঠবে। এসব ক্রাইসিসের দিক খেয়াল রেখে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ট্রাম্প জেতার উপযুক্ত ভাষ্যটি সঠিক বানিয়েছিলেন। সেই ভাষায় কথা তুলে যিনি ভোট চাইবেন, স্বভাবতই তিনি সফল হবেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল শ্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” (make America Great again) – ’। আম-ভোটারদের আকৃষ্ট করার ভাষ্য হিসাবে, এটাই সঠিক শ্লোগান। শেষের ঐ ‘এগেইন’ শব্দটা গুরুত্বপুর্ণ। হৃত-গৌরব মনে করিয়ে দিয়ে সুরসুরি দেয়া। আন্তর্জাতিক দিক নয়, জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। আমরা ট্রাম্পের যত রকম কথা শুনেছি, সেগুলো আমরা আসলে ট্রাম্পের আম-ভোটারের চোখ দিয়ে না দেখে বরং ওর বাইরের অন্য দুই পক্ষের দিক থেকে দেখেছি। সমগ্র দুনিয়ার আমরা প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ স্থানীয় প্রেক্ষিত থেকে অথবা গ্লোবাল প্রেক্ষিতে। আমরা ভুলে গেছি, আমেরিকার বাইরের যারা, তারা যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তারা তো ভোটার নন। আর এটা তো আসলে কেবল ভোটেরই লড়াই। ফলে যারা বাইরের লোক বা সংখ্যায় ক্ষুদ্র দেশি-এলিট এদের নিন্দা-মন্দ কথা আমল করার কী আছে? কিছু নেই। নিন্দা-মন্দ আমল করলে তাতে ভোট সংখ্যা বাড়বে না।  ট্রাম্প এটা ঠিকই ধরেছেন। আর তাঁর জয়লাভের মূল কারণ সম্ভবত এখানে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আমেরিকার বাইরের অনাগরিক বা ভেতরের এলিট এসব স্বার্থ সন্তুষ্ট করে ভাষ্য তৈরি করে কোনো লাভ নেই। ভোটের বাক্সে এর কোনো প্রভাব নেই। তাই এ’দুই পক্ষের দিকে তাকিয়ে তিনি কথা বলেননি। দ্বিতীয়ত, একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল, হাতির দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবায়ও না, খায়ও না। চিবানোর দাঁত আলাদা। অথচ আমরা দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবানো দেখতে চাচ্ছি। ট্রাম্প ভোটে জিতে যাবার পর আমরা এখন চাচ্ছি ট্রাম্প যেন ভোট চাইবার ভাষাতেই তার হবু সরকারের নীতি সাজাক। আর তাতে আমরা যেন আরামে ট্রাম্পের গুষ্ঠি উদ্ধাস্র করতে পারি। আমরা ভোট পাওয়ার জন্য দেয়া পপুলার শ্লোগান (বা বয়ান) আর জিতে যাবার পর তা ‘হুবহু’ সরকারের নীতি-পলিসি করা যেন বাধ্যবাধকতা! অথচ দেখানো আর চিবানোর দাঁত তো আলাদা, তা আলাদাও হতে পারে, হয়। এটা খেয়াল করে দেখি নাই।
আমেরিকা রাষ্ট্রের বাইরের মানুষ, ভিনদেশী আর সাথে ভিতরের কেউ কেউ এমন অনেকেই মনে করে যে ট্রাম্প খুবই খারাপ মানুষ – রেসিস্ট, রেপিস্ট ইত্যাদি ধরনের সব কিছু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে আনা যায়, নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ তারা এখানে এথিকস এবং স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন ভঙ্গের কথা তুলছেন, তুলবেন। এ কথাও ঠিক যে ট্রাম্পের অনেক কথায় এথিকস ও আইনের ফিল্টার পার হবে না, আটকে যাবে এবং তা আসলে খুবই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে?

ট্রাম্পের বয়ান-অবস্থানের কী সমালোচনা করা যাবে না? সমালোচনা করা কি ভুল হবে? এক কথায় এর জবাব, অবশ্যই যাবে। তবে থিতু হতে একটু অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে তিনি কী কী বলেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত নোট নেন। কিন্তু কোনোভাবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেয়া ঠিক হবে না। আগামী বছর ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেবেন। এর আগেই ও পরে কিছু কিছু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘আসল’ (অর্থাৎ খাবার দাঁত) নীতি-পলিসি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচনে দেয়া তার বিভিন্ন বক্তব্যে কোথায় কোথায় এখন তিনি ফিল্টার দেবেন, ফাইন টিউন করে এরপর তা তার সরকারের নীতি-পলিসি হিসেবে ঘোষণা করবেন, তা বোঝা যাবে। এর আগে ট্রাম্প প্রসঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল হবে। এ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যেমন, ইতোমধ্যে ট্রাম্প তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্য সেটা তিনি নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে সর্বশেষ আর এক খবর হল – ওবামার স্বাস্থ্য বীমা পলিসি (অনেকে যেটা তামসা করে ওবামা-কেয়ার বলে), সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘রিপিল’ করবেন বলেছিলেন। ইংরেজি রিপিল মানে ফিরিয়ে নেয়া, প্রত্যাহার করা বা উল্টো আইন করে বাতিল করে দেয়া। এখন তিনি জানাচ্ছেন, “আমি সম্ভবত রিপিল করছি না। তবে কিছু সংস্কার করব”। এই গুমোর খুলেছেন তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া ট্রাম্পের প্রথম ইন্টারভিউয়ে। এর কিছু পরে ১২ নভেম্বর বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঐ ইন্টারভিউয়ের উপর একটা রিপোর্ট করে বিস্তারিত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাষায় এটা ট্রাম্পের ইউটার্ণ; খবরের শিরোনাম হল, “Donald Trump: I may not repeal Obamacare, President-elect says in major U-turn”।

একটা অবজারভেশন হিসাবে বলা যায়, নির্বাচনের সময় সমগ্র দুনিয়ায় প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা চাঁছা-ছোলা খোলা কথা বলে থাকে। কিন্তু জিতলে পরে যেটার ওপর কম অথবা বেশি ফিল্টার চড়ানো হয়, টোপর পরানো হয় বা ফাইন টিউনে একে বিচার-বিবেচনা করে বদলে নেবার পরেই কেবল তা  সরকারের নীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দেখা গেছে, সময়ে কোন রাষ্ট্রের ক্রাইসিস যত তীব্র থাকে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা তখন চাঁছা-ছোলা আনফিল্টার করে বলা হতে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কথার প্রতিশ্রুতির সাথে এরপর জিতে তা সরকারের নীতি হুবহু না হওয়াতে তা নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনের ফল হবার পরে তা নিয়ে খুব বেশি আগানো যায় না বা কাজে লাগে না। আর একটা প্রশ্ন থেকেই যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যাই তাই পরে সেটা তখনও কল্পনা তা সবাই মনে রাখে। তুলনায় পরে কংক্রিট ভাষায় সরকারের নীতিতে কী থাকছে সেটাই আসল, বাস্তব। ফলে নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষ কল্পনার চেয়ে বাস্তব নিয়েই কথা বলা অর্থপুর্ণ মনে করে। তবে হ্যা নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে  কোনো প্রার্থীর সমালোচনা একমাত্র তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাজে লাগে। এবং সেটা কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে , পরে আর নয়।  তাই আমাদের উচিত, চোখ-কান খুলে অপেক্ষা করা।

তাহলে ট্রাম্পই কি প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে দেয়া ‘হুবহু’ প্রতিশ্রুতিতে চলেন না? বরখেলাপ করেন? না, তা একেবারেই নয়। লিবারেল সুশীলদের প্রতিভূ শ্রী ওবামার কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর নির্বাচন চলাকালীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিতলে তিনি রেনডিশন প্রথা (আমাদের মতো দেশে তাদের আসামি পাঠিয়ে টর্চার করিয়ে আনা, কারণ ওমন টর্চার নির্যাতন করা আমেরিকান আইনে নিষিদ্ধ ) বন্ধ করে দেবেন, গুয়ানতানামো বে কুখ্যাত কারাগার উঠিয়ে দেবেন, আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবেন ইত্যাদি। যার একটিও তিনি করেননি এবং পরবর্তিতে তিনি নিজে সরাসরি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে আফগানিস্তানে ১০ হাজার আমেরিকান সৈন্য রেখে হলেও বাকিটা প্রত্যাহার করেছেন। আর এক উদাহরণঃ গত ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে মোদি হুঙ্কার ও ভয় পাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জিতলে জেতার পরের দিন থেকে ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত মোদির সে কথার পরবর্তী কথা কাজ বা তৎপরতা নেই। যেন এমন কথা তিনি কখনও বলেননি অথবা নিজেই ভুলে গেছেন।

তাহলে আমি কি বলতে চাইছি ট্রাম্পের ওবামা বা মোদীর মতই সব কথা ভুয়া, তাল ঠিক নেই? না, তাও একেবারেই সত্যি নয়। বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প দিচ্ছেন যে খুব সম্ভবত আমেরিকান রাষ্ট্রনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসন্ন। আজকের যে আমেরিকাকে আমরা দেখে অভ্যস্ত, চিনি এই আমেরিকার গড়ন আকার লাভ করে থিতু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে; আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়া নতুন অর্ডারে সাজিয়ে হাজির হয়ে আছে তখন থেকে। সে অবস্থাকে বলা হয় আমেরিকা দুনিয়ার এক এম্পায়ারের (সাম্রাজ্যবাদ নয়) ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছিল। এরপর থেকে তা সরাসরি আমেরিকার  নিজের প্রত্যক্ষ ভোগে বা কাজে লাগুক আর  নাই লাগুক – এমন বহু বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম এরপর থেকে তা চলে এখনও টিকে আছে। আর এর পরিচালন চালিয়ে টিকিয়ে রাখার পুরা দায়ভার আমেরিকাকেই বইতে হয়ে আসছে। মুখস্ত বা অভ্যাসের মত, সেই থেকে কোন রিভিউ ছাড়াই এগুলো চলে আসছে। এমন সব প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের দায়দায়িত্ব এই প্রথম রিভিউ করে কাটছাঁট ও পুনর্গঠন করা হতে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে যেমন, ন্যাটো। এর ৭৩ শতাংশ খরচ আমেরিকা একা বহন করে। ট্রাম্প এটা রিভিউ করার পর ঠিক করতে চান, এটা নিয়ে কী করা হবে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কোল্ড ওয়ার লড়াইয়ের যুগ শুরুর শুরুতেই ১৯৪৯ সালে গঠন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক মোকাবোলায় ন্যাটোর সদস্য সকল রাষ্ট্রের একসাথে এক্ট করতে একটা বাধ্যবাধকতা চালু করা, যাতে তা বড় এক রক্ষাকবজ নয়। ট্রাম্প যাকে আমাদের পাগল বেতাল লোক বলে প্রমাণ করতে চাইছি, বা যা মনে চায় তা বলে নির্বাচনে জিতার লোক মনে হচ্ছে – এমন প্রপাগান্ডা হয়েছে হচ্ছে যার নামে  – সেই ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই কবে ভেঙ্গে গেছে, দুনিয়াতে এখন সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে সম্পর্কিত হয়ে আছে – অর্থাৎ সেই শত্রুতাও আর তেমন নাই। উলটা এখনকার একমাত্র জলন্ত হুমকি হল “টেররিজম”। তাহলে ন্যাটোকে একইভাবে রেখে দেওয়ার মানে কী? ন্যায্যতা কোথায়? অন্তত এবিষয়ে একটা  রিভিউ  করে এটা ভেঙ্গে দেয়া যায় কী না তা দেখা উচিত। আর দরকার হলে “টেররিজমের” মোকাবোলায় উপযোগী কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম দেয়া হক।  ব্যাপারটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ইউরোপের অনেকের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কথা ফেলনা নয়, যুক্তি আছে।

একইভাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন – ট্রেড ব্যারিয়ার বা অবাধ পণ্য চলাচলে বাধা প্রসঙ্গে। চীনের সাথে বাণিজ্যে তিনি সস্তা জাতীয়তাবাদী হয়ে বাধা দেবেন না। তবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় নেগোশিয়েট করে একটা তুলনামূলক ভালো ডিল (আমেরিকানদের জন্য চাকরি বা আউটসোর্সিং) তিনি পেতে চাইবেন। স্বভাবতঅই এটাই নির্বাচন উত্তর থিতু ভাষ্য। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোটের লোভে এই বিষয়টাকেই তিনি চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কারের মত শোনায় একন ভাষাতেই বলেছিলেন।

আবার সিরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। তাতে আসাদ থাকল না গেল, সেখান থেকে সরে আসবেন। রাশিয়ার ওপর আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রের অবরোধ উঠানো নিয়ে কথা আগাবেন। আইএস মোকাবেলা ও দমনে রাশিয়ার সাথে দায় শেয়ার করবেন সম্ভবত। এগুলো সবই বিশ্বাযোগ্য কথা ও পদক্ষেপ তিনি নিতে যাচ্ছেন।  কেবল একটা জায়গায় ফাঁকি দিক ছিল। খুব সম্ভবত তিনি হিলারির বিরুদ্ধে পুতিনের দেয়া ইন্টেরলিজেন্স ব্যবহার করতে পুতিনের সাথে অপ্রমাণিত ডিল করেছিলেন। ট্রাম্প বলতে পারেন যে হিলারিও তো ওবামার প্রভাব ব্যবহার করে “সরকারী মেল ব্যক্তিগত সার্ভারে রেখে” তিনি ঠিক করেন নাই তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ হয় এমন কিছু ঘটান নাই বলে ছাড়পত্র এনেছিলেন। অর্থাৎ ওবামা-হিলারি এসব তথাকথিত লিবারেলরা কোন ধোয়া তুলসিপাতা নয় এটা মনে রাখতে হবে।  ওবামা-হিলারিরা কোন স্টান্ডার্ড বা আদর্শ নয়।

সৌদি, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যেখানে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে সে ঘাঁটি রাখার খরচ কে বইবে – এই প্রশ্নটা  ট্রাম্প সামনে আনতে চান।  অথবা রাখা আদৌ আমেরিকার জন্য কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান। এটা খুবই জেনুইন প্রশ্ন। এককালে আমেরিকার অর্থভান্ডারের অবস্থা ভাল ছিল পরে নিজ খরচে ভিন দেশে ঘাঁটি পোষা হয়ত গায়ে লাগত না। এখন লাভ-ক্ষতি হিসাব করা, বাস্তববাদী হওয়া অবশ্যই জায়েজ।

আমরা যদি মনে রাখি, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, তাহলে ট্রাম্পকে বুঝতে আমাদের তা কাজে লাগতে পারে।  উপরের সবগুলো প্রসঙ্গের একটা কমন দিক আছে। সেই বিচারে সবগুলো ইস্যু সম্পর্কিত। আমেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা খাটো হয়েও গেছে, শুকিয়েছে। ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি মোতাবেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার নতুন করে সাজানোর সময় পার হয়ে গেছে।  সারকথায় আমেরিকার এখনকার মানে শুকানো ভুমিকা মোতাবেক বড় খরুচে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ঢেলে সাজানো যায়। এককথায় যেটাকে দক্ষ সরকার – ম্যানেজমেন্ট এবং খরচের দিক থেকে স্মার্ট চটপটে সরকার কায়েম করার উদ্যোগ – নিঃসন্দেহে অনেক সুদুর প্রসারি ও বাস্তব চিন্তা।

আর একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর এক মজার মন্তব্য করেছেন। তিনি চীনা নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক এআইআইবি (AIIB), এই ব্যাংক জন্মের সময় ওর গঠন উদ্যোগের বিরোধিতা করা আমেরিকার দিক থেকে  ‘স্ট্র্যাটেজিক মিসটেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমন মন্তব্য খুবই উলটা বাওয়া মন্তব্য হলেও কথা মিছা না। বাস্তবতা হল এক আমেরিকা আর তাঁর পার্টনারস ইন ক্রাইম জাপান – এই দুই দেশ ছাড়া এখন AIIB সদস্য হতে কোন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ দেশ বাকী নাই। সর্বশেষ আমেরিকার পিছনে পিছনে চলা কানাডাও ঐ ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে। আর সেই বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে পিছেপিছে চলা শুরু করেছিল ইউরোপ। এই প্রথম নিজের স্বার্থ আমেরিকার চেয়ে আলাদা বলে অনুভব ও দাবি করে এরাও (মানে ইউরোপের প্রধান তিন প্রভাবশালী – জর্মন, বৃটিশ ও ফরাসী) চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগে পতাকা তুলতে দেরি করে নাই।  যদিও এই প্রসঙ্গে খোস ট্রাম্প কী অবস্থান নিবেন এখনও কিছুই জানা যায় নাই।

ওবামার এক আদরের নীতি হল বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি বা চুক্তি জোট গড়া। ওসব উদ্যোগে ওবামা মুখ্য বিশেষ্যত্ব হল ঐ চুক্তি বা বাণিজ্য জোট গুলোতে চীনকে বাদ রাখতে হবে।  চীনকে বাদ দিয়ে এরপর বাকিদের নিয়ে আমেরিকাসহ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি অথবা নাফটা) – এগুলো পুনর্গঠনের পক্ষে ট্রাম্প কথা বলছেন।খুব সম্ভবত চীনকে বাদ রাখা এটা খুব কাজের মানে কার্যকর সুবিধা আমেরিকাকে দিবে না অসুবিধা ডেকে আনবে – এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের কাছে ইস্যু।

এক কথায় বললে চীনের উত্থানে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন বিন্যাস ও অবস্থানের দিক থেকে আমেরিকার ভূমিকা কী? আর যাই হোক এতা নিশ্চয় আর আগের মত জায়গায় নাই। ফলে যে সব কোর বিশ্বাস বুঝাবুঝির উপরত আমেরিকার গত সত্তর বছর ধরে দাড়িয়ে ছিল তা বদলবার স্ময় হয়েছে।  ট্রাম্প সম্ভবত এ বিষয়গুলো এই প্রথম ঢেলে ভিন্ন দিক থেকে দেখে নতুন কিছু করতে চাইছেন। স্বভাবতই ট্রাম্পের প্রসঙ্গগুলো যত বিশাল, সে তুলনায় আমাদের কাছে তথ্য যেন আপাতত ততই কম। ফলে কোথায় তা কত দূর যেতে পারবে, আদৌ সম্ভব কি না তা দেখা-বোঝার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনোভাবেই বিষয়গুলোকে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব রেঠরিক মাত্র এই সংকীর্ণতা দিয়ে বুঝতে চাওয়া অর্থহীন হবে। একবাক্যে বললে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইছেন যেদিক থেকে আগে কখনই দেখা হয় নাই। যদিও বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রকাধ্য হয় নাই এখনও।

এ প্রসঙ্গের লেজ ধরে আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহলে সামনে উদয় হয়। চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে এখন থেকে কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইলে স্বভাবতই ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে ভারতের অথবা বাংলাদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। কারণ চীন দাবড়াতে হবে – এই অনুমানের উপরেই বর্তমান বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলো সাজানো। অতএব ট্রাম্পের নতুন দৃষ্টভঙ্গীতে এর ভেতর কোনো বিশেষ এবং নতুন দিক থাকবে কি না সে বিষয় এশিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ এই দুই দেশেই আপাতত ক্লুহীন। হাসিনার দ্বিধা মনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোটা সে আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে চীনের সাথে ট্রাম্পের নতুন সম্পর্ক সাজানোর দিকটি মাথায় রাখলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ওপর তার কিছু কিছু ছাপ, নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়ার কথা। সম্ভবত ওবামার ‘চীন ঠেকানো’ টাইপের অবস্থান – – এটাকেই  ট্রাম্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। ট্রাম্প এ রকম বহু প্রসঙ্গ তুলেছেন তা চূড়ান্ত নয়, বরং এগুলো ডেভেলপিং বলাই ভাল। তাই এক কথায় সব কিছুই  – ওয়েট অ্যান্ড সি, ডোন্ট কনক্লুড।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল।  আজ ১৬ নভেম্বর ঐ লেখা আরো সংযোজন ও এডিট করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনা প্রেসিডেন্টের সফরঃ গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

চীনা প্রেসিডেন্টের সফর

গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

গৌতম দাস

১৬ অক্টোবর ২০১৬, রবিবার
http://wp.me/p1sCvy-1RU

[লেখাটা গত ১৪ অক্টোবর শুক্রবার চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের দিনেই লেখা। তবে খুব সকালে বসে লেখা যখনও তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন নাই। অর্থাৎ এটা চীনা প্রেসিডেন্টের সফর-পুর্ব সময়ে লেখা। কী আশা করা যেতে পারে, এই সফরে কী হতে পারে ইত্যাদি চিন্তা করে লেখা। সফর শেষের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন, কিছুটা যা অনুমান করা গিয়েছিল তাই। সেসব নিয়ে আর একটা লেখা লিখতে হবে। আজ এই সফর-পরবর্তি পরিস্থিতিতে বসে আপাতত সফর-পুর্বের লেখা মনে রেখে এ’লেখা পড়তে হবে।]

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সরকারের উৎসাহ ও প্রচার ছিল লক্ষণীয়। যার অন্তর্নিহিত বার্তা সম্ভবত এই যে ১. অনির্বাচিত ভাবে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার দেখাতে চায় যে চীনা প্রেসিডেন্টের মত গুরুত্বপুর্ণ ও ক্ষমতাধর বাংলাদেশে এসেছে, অতএব আমার স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এতে অনেকটাই কেটে গেছে।  আর ২. বর্তমান সরকার ভারত-নির্ভরশীল ও ভারতের গভীর সমর্থনের উপর দাঁড়ানো হলেও সরকার চীনের প্রেসিডেণ্টের এই সফরের গুরুত্ব বুঝেছে ও গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই কি? খুব সম্ভবত তা নয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় থেকে যেভাবে হঠাৎ করে গভীর সমুদ্রবন্দর ইস্যুতে সরকার থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল কারণ ভারত চাইছে সরকার দূরে থাকুক; সে থেকে ‘চীনকে দূরে রাখতে হবে’ বলে একধরনের ‘চীন-শীতলতা’ আমরা দেখে আসছিলাম, সে অবস্থান কী হিলেছে? নাই? হিসাব পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং তাও ভারতের কোন স্বার্থেই- তাই কী? এর স্পষ্ট চিত্র বুঝতে আর একটু অপেক্ষা করতে হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফর থেকে আমাদের সরকার বিশেষ আশাভরসা নিয়ে অপেক্ষা করছে, তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তবে এটা সরকারের ভারত নির্ভরশীলতাকে ছাপিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকে গুরুত্ব দেয়া হিসেবে পাঠ করার অবস্থায় যায়নি- এটা মনে করাই সম্ভবত সঠিক হবে। যেমন একটা প্রশ্ন করে আগানো যাক, প্রায় মৃত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প- সেটা সোনাদিয়া বা অন্য কোথাও যেখানেই হোক- তা কি এখনো জীবিত এবং এবারের সফরে বিনিয়োগ প্রকল্প স্বাক্ষরের তালিকায় আছে বা থাকবে কি? সোনাদিয়া হয়তো থাকবে না এটা আগাম ধরে নেয়াই যায়। তবে কী অন্য কিছু হতে পারে! আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। যদিও সে প্রসঙ্গে কিছু কথা স্পষ্ট করে এখনই বলে দেয়া যায়। তা হল, আসলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর এবারের বাংলাদেশ সফরে বন্দর প্রসঙ্গে যদি কিছু না হয় তবে এই সরকারের আমলে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর আর হচ্ছে না। বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা – এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে কথাটা বুঝে বলা।  কারণ কথা হল, এমন সম্ভাব্য বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে চীন সরকার জড়িয়ে থাকলে একমাত্র তবেই হবু বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বজায় থাকবে, নইলে নয়। কারণ একা চীনই বড় ব্যবহারকারী হবে। দেশটি ল্যান্ড-লকড দক্ষিণ-পূর্ব দিককে সমুদ্র পর্যন্ত উন্মুক্ত করতে সড়ক ধরে এসে বন্দর ব্যবহারের জন্য  চীন খুবই আগ্রহী। আর তা করতে চীনের একারই এক গভীর সমুদ্রবন্দর দরকার। আর চীনের ব্যবহারের ভলিউম এতই বিরাট হবে যে, একা চীনই সে বন্দর ব্যবহার করে বিনিয়োগ তুলে আনার দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে। সে তুলনায় ব্যবহারকারী হিসেবে ভারতের থাকা না থাকাটা অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে প্রভাবহীন ফলে অগুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত বড় কোনো ব্যবহারকারী নয়। ফলে ঠিক এই কারণে চীনকে ব্যবহারকারী হিসেবে বাইরে রাখা কথাটার সোজা অর্থ বাংলাদেশের কোন গভীর সমুদ্র বন্দর না হতে দেওয়া। অন্য ভাষায় চীন ছাড়া এক্সক্লুসিভ ভারতের ইচ্ছায় গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রায় হওয়ারও সম্ভাবনা নাই। কারণ একক ব্যবহারকারি  যদি ভারত হয় সেক্ষেত্রে ঐ হবু বন্দরের বিনিয়োগ তুলে আনা অসম্ভব। ফলে এক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়ার সমস্যাও দেখা দিবে। আর অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা দুর্বল হলে সেই সমস্যা আরো বেশি। সারকথায়, একা চীন ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলেই বাংলাদেশে কোন গভীর সমুদ্রবন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার (বন্দরের আয় থেকে বিনিয়োগ ফেরত আনা) জন্য তা যথেষ্ট হবে। কিন্তু একা ভারত ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলে তা যথেষ্ট হবে না। ওদিকে আবার বন্দর বিষয়ে ভারতের অবস্থান হল, সে চায় না চীন ব্যবহারকারী বা বিনিয়োগকারী কোনোটা হিসেবেই এই প্রকল্পে জড়িয়ে থাকুক। এই অবস্থায় মিডিয়ার অনুমিত ভাষ্য হল, এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনার গত চীন সফরের সময় শেষ মুহূর্তে বন্দর বিষয়ে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। নিজ সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের সমর্থন নির্ধারক বিবেচনা করে বলে অতএব ভারতের এই ইচ্ছা-স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া এই সরকারের জরুরি। এই বিচারের জায়গায় বসে দেখলে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর এই সরকারের আমলে হওয়ার সম্ভাবনা নাই। যদি না ইতোমধ্যে নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট না থাকে। অর্থাৎ ওপরে যেটা বলেছি, ইতোমধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য এই অর্থে ‘নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট’ দেখা দিয়েছে কি না সে সন্দেহ রাখা যায়। আগামীকালের মধ্যে তা স্পষ্ট জানা যাবে আশা করা যায়। প্রথম আলো লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি এর সফরে নাকি ২৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প আছে যার মোট পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার – যা আলোচনার টেবিলে আছে। কিন্তু কী কী সেই প্রজেক্ট তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তারা উল্লেখ করতে পারেনি।
এ ছাড়া আর একটা সম্ভাবনা আছে। প্রথম আলো লিখছে, “শি জিনপিংয়য়ের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ বা ওবোর নামে পরিচিত উন্নয়ন কৌশল ও রূপরেখায়” বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হতে সম্মতি জানালে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়তে ‘চীনের সিল্করোড ফান্ড (এই উদ্যোগে যুক্ত দেশগুলোর জন্য চীনের সরকারি বিনিয়োগ তহবিল) থেকে স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে ঋণ’ পাবে। কিন্তু প্রথম আলো যা জানায়নি তা হল, কোনো গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিকল্পনা সাথে যদি সংযুক্ত না থাকে তাহলেও কি চীন ওই সিল্করোড ফান্ড উন্মুক্ত করবে? এটাই খুবই নির্ধারক প্রশ্ন? বাংলাদেশ মাতারবাড়ি বা অন্য কোথায় চীনকে গভীর সমুদ্রবন্দর করতে দিতে রাজি হলে বা উভয়ে একমত হলে তবেই বিড়ালের ভাগ্য এসব শিকা ছিঁড়বে, তা আগেই বলে দেয়া যায়।

কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) গ্লোবাল অর্থনীতি থেকে এ কালের গ্লোবাল অর্থনীতি বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম মৌলিকভাবে আলাদা। যেমন, একালে একই চীনের সাথে ভারতের ব্যবসা বিনিয়োগ লেনদেনের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ গভীর ও ভালো বটে। কিন্তু আবার আগামীতে অন্য সম্ভাব্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে ভারতের যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি কার সাথে ভারত দেখে  – এই বিচারে সেই নামের তালিকায় এক নম্বরে আছে চীন। এটাই একালের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশেষ আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভারতের মিডিয়া – তারা এই আলাদা বৈশিষ্ট্য আমল করার যোগ্য এর প্রমাণ রাখতে পারে নাই। ফলে চীনের সাথে ভারতের বৈরিতা, সম্ভাব্য যুদ্ধ বা শত্রু কেবল এই দিকগুলো প্রবলভাবে সবসময় তারা হাজির করে থাকে এবং কোল্ড ওয়ারের সময়ের চশমায় দেখা  -বিরোধ ভাবনা বা জাতীয়তাবাদ ভাবনা মাথায় রেখে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। যেন আমরা কোল্ড ওয়ার সময়ে বসবাস করছি।
ভারতের মিডিয়ায় বিষয়গুলো এতই প্রকট যে চীনের মিডিয়ারও তা নজর এড়ায় নাই। প্রেসিডেন্ট শি-এর সফর উপলক্ষে ভারতের মিডিয়াকে কিছু হেদায়েত করার কথা খেয়াল করে চীনের সরকারি এক মিডিয়া ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকায় গত ১২ অক্টোবর একটা কলাম ছাপা হয়েছে। ওর শিরোনাম হল, “India has nothing to fear from closer relationship between China and Bangladesh” – অর্থাৎ চীন-বাংলাদেশের কাছাকাছি আসা এই সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে ভারতের ভীত হবার কিছু নাই। আর এই উপসম্পাদকীয় বা কলাম নিয়ে ভারতের প্রায় সব দৈনিকে একটা করে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। গ্লোবাল টাইমসের কলামের সার কথা হল, ভারতীয় মিডিয়ার খামোখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা আর কোল্ড ওয়ার যুগের সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদ যা একালে অকেজো- এসব প্রচারকে নাকচ করে এমন কিছু মৌলিক তথ্য সে হাজির করতে চায়। সেজন্য ওই কলামের প্রথম বাক্যের চতুর্থ শব্দ হল, ‘মিসকনসেপশন’ অর্থাৎ মিথ্যা ধারণা কাটানো। কিন্তু গ্লোবাল টাইমসের এই উদ্যোগ সত্ত্বেও ভারতের প্রত্যেকটা মিডিয়া তাদের রিপোর্টে এই শব্দটা বাদ দিয়ে আর সব শব্দ দিয়ে তাদের পুরনো মিথ্যা ধারণাগুলোকেই আবার পুষ্ট করেছে।
যেমন এনডিটিভি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ‘জেলাস’ (ইংরেজি জেলাস, বাংলায় ঈর্ষা) শব্দের ওপর। শব্দটা কলামের শেষ দুই প্যারায় ছিল। তবে তা কিছুটা তামাশা করে বা মজা করে লেখার স্বার্থে। ওই দুই প্যারা, সারকথায় বললে, বলছে, ‘বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দেখে ভারতের ঈর্ষা করার কিছু নাই। কারণ এই সম্পর্ক বাড়লে এর অবকাঠামোগত সুবিধার ভাগ এই অঞ্চলের সবাই তথা ভারতও পাবে।’ ফলে “এ দিকটা আমল করে ভারত যদি চীনের সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করতে নিজে চাপ অনুভব করে, সে আলোকে এই অঞ্চলে নিজের স্ট্র্যাটেজি পুনর্মূল্যায়ন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে বিশেষ করে ভারতের গোয়ায় আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে”, তবে সেটা বাড়তি পাওনা হবে। অর্থাৎ ‘ঈর্ষা’ শব্দটা এখানে ঠিক নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয় নাই। যেমন ‘ভারতের স্ট্র্যাটেজি বদলানো উচিত’ এভাবে বাক্যটা লেখা হয় নাই। বরং বলা হয়েছে ‘ it would not necessarily be a bad thing’,  – অর্থাৎ ‘হলে খারাপ হয় না’ অথবা ‘সেটা বাড়তি পাওনা হবে’- এমন কথা বুঝানো হয়েছে। আর আসলেই তো তাই। কারণ এই সফরে যে অবকাঠামো বিনিয়োগ ঋণচুক্তির কথা বলা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের প্রস্তাব হল, নির্মীয়মান পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে নতুন যশোর-ঢাকা রেল যোগাযোগ প্রকল্প, এখানে চীনের কাছ থেকে সরকার বিনিয়োগ আশা করছে। আর এই যোগাযোগ করিডোর অবকাঠামো ভারতকে দেয়ার জন্যই। ফলে চীন-বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগ সম্পর্কের সুবিধা তো ভারতের স্বার্থেই।
ওদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা এই সফর উপলক্ষে শিরোনাম করেছে স্বভাবসুলভ ‘জবরদস্তি করে পাকিস্তান বিরোধিতা দিয়ে’। তারা শিরোনাম লিখেছে, “ঢাকা সফরে আসছেন চিনা প্রেসিডেন্ট, মহা উদ্বেগে পাকিস্তান’।  বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ (বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়, কম সুদের ঋণ চুক্তি) খুব বড় নয়। চার লেনের সড়ক অথবা বিদ্যুৎ উতপাদন ইত্যাদি যা আছে তা চীনের বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং ঠিকাদার কোম্পানী – এরাই বেশি। কিন্তু এসব নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ – এটা খুবই আজব কথা। অমিত বসুর ঐ পুরা লেখায় পাকিস্তানের উদ্বেগ কী তা নিয়ে কিছুই লেখা হয় নাই। পুরা ঘটনা কাশ্মীর নিয়ে। মানে ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীর ইস্যুতে। অযথা কাশ্মীরের কথা টেনে একবার লেখা হল,  “… আগুন কত দূর ছড়াবে স্পষ্ট নয়। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৪ অক্টোবর দু’দিনের বাংলাদেশ সফর চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর”।  কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের টেনশন থাকতে পারে কিন্তু এর সাথে চীনের প্রেসিডেন্টের সফপ্রের সম্পর্ক কী? আর বাংলাদেশেরই বা কী? আবার চীনা প্রেসিডেন্ট তো কেবল বাংলাদেশেই আসছেন না। তিনি বাংলাদেশ সফর শেষে এখান থেকে ভারতের গোয়ায় যাচ্ছেন। মানে অমিত বসুর “মেরা ভারত মহান” – সেই ভারত সফরেই তো যাচ্ছেন। তো সেক্ষেত্রে কেবল বাংলাদেশ সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে তুলে ধরার অর্থ কী? চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশের সফর যদি ভারতের স্বার্থের বিরোধী হয় তাহলে ঐ একই চীনা প্রেসিডেন্টের খোদ ভারত সফর – এটাকেও কী চোখে দেখা হবে? এখানে সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে দেখা হবে না কেন? আর যদি না থাকে তাহলে চীন একই সাথে ভারতের বন্ধুও। তাহলে ভারতের বন্ধু বাংলাদেশে আসলে ভারতের চোখ টাটানোর কী আছে? বা থাকতে পারে? রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আমরা অনেককে বিরাট দিগগজের মত রাজাউজির মারতে দেখি। অমিত বসুর এসব আলাপ মানের দিক থেকে এর চেয়েও নিচে। চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে  “পাকিস্তানের উদ্বেগ” দেখেছিলেন অমিত বসু। লেখার ভিতর পাকিস্তানের উদ্বেগ কী নিয়ে এর কোন হদিশ না দিয়ে শেষ প্যারায় লিখছেন, “এই সব টানাপড়েনের মধ্যেই জিনপিংয়ের ঢাকা সফর নিয়ে কিন্তু ঘোর চিন্তায় পাকিস্তান। যে চিনকে দাদা বলে নিজের অপকর্ম চালিয়ে যেতে চাইছে পাকিস্তান, সেই চিন কিনা শত্রু বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে! ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি, এটা হাড়ে হাড়ে বোঝে ইসলামাবাদ। তাই উদ্বেগ তো হবেই”। আচ্ছা,  “ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি” – মানে পাকিস্তানের ক্ষতি কেন কোথায় কীভাবে? এটা আসলে ভারতের পাকিস্তানবিদ্বেষ, যেটা বাংলাদেশের ঘাড়েও জবরদস্তিতে আছে বলে দাবি করা ছাড়া আর কী? রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বলতে যা বুঝায় তা পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলে পাকিস্তান-বাংলাদেশের সম্পর্ক এটাও কী তাই? এখানে বিরোধ, মনোমালিন্য আছে,  ঘনিষ্টতা নাই – এটাই সত্য। ভিন রাষ্ট্র মাত্রই কমবেশি তা থাকে। যেমন চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসছেন। তো চীনের সাথে কী বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধ নাই? অবশ্যই আছে। দগদগে ভাবে আছে। সব রাষ্ট্রই নিজের আপন আপন স্বার্থের যায়গা থেকে অবস্থান নিবে। সেখানে কেবল যেখানে যেখানে স্বার্থ কমন হয়ে এবং সময়ে তা দেখা দিবে কেবল সে ইস্যুতে ঘনিষ্টতা। এর চেয়ে বেশি কেউ কারও স্বার্থের পক্ষের কেউ না।   কিন্তু পাকিস্তান-ভারতের মত পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বাংলাদেশের নাই। অমিত বসুর ধারণা তাঁর ন্যারো পেটি আর অহেতুক ইর্ষার চোখ দিয়ে সবাইকে মানে আমাদেরকেও সব দেখতে হবেই।

তো চীনা মিডিয়া জানে ভারতের মিডিয়া জুড়ে এসব অমিত বসুদের সংখ্যাই বেশি। সেকথা মনে রেখে গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা ‘চীন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ভারতের ভয় পাওয়ার কিছুই নাই’ শিরোনামে লেখা ছেপেছিল। এরপর প্রথম প্যারাতে বলা হয়েছে, ভারতের একটা মিসকনসেপশন আছে যে ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চীন অখুশি’। গ্লোবাল টাইমসে – মিসকনসেপশন বলে – এই ধারণাকে নাকচ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, ‘ভারতের অনেকের ধারণা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েএর সফর যেন ভারতের কোল থেকে বাংলাদেশকে ছিনিয়ে নেয়ার সফর।’ বলা হয়েছে এমন ধারণাগুলোও ভিত্তিহীন। এমনকি, “চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পও যেন ভারতকে আটকে রেখে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা” – এটাও ভিত্তিহীন। “ওদের জানা উচিত এই প্রকল্প উদ্যোগটা কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার না। বরং সাড়ে চার বিলিয়ন জনসংখ্যাকে ছুঁয়ে এবং মোট ৬৫টি রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে এই প্রকল্পের সড়ক বিস্তৃত থাকবে”। আর সবচেয়ে বড় কথা “এতে যুক্ত হওয়া না হওয়া- এই রুটে পড়েছে এমন সংশ্লিষ্ট যে কোন রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছার ওপর তা নির্ভর করে”।
ফলে আসলেই এখানে জোড়াজুড়ির কিছু নাই। প্রভাবিত করার কিছু নাই। ভারতকে আটকে রেখে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রিত করার কিছু নাই। বলা হয়েছে, চীনের প্রতি কোনো রাষ্ট্রের এই ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বড় করে আগ্রহ দেখালে তবেই একমাত্র চীন সেই রাষ্ট্রকে সিল্ক রুট ফান্ডে জড়িত করবে। যেমন কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে, বার্মা হয়ে চীন- এই পথে (বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর) ভারত যুক্ত হতে চাইলে সেটা তার ইচ্ছা, নইলে নাই। কিন্তু এটা তো গেল ভারতের যুক্ত হওয়ার স্বার্থ ও ইচ্ছা। বাংলাদেশের স্বার্থ ও ইচ্ছা বোধ করলে তবেই। এই প্রকল্পে ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মিডিয়াতে তার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। তবে খোদ চীনের বেলায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের কোথাও যুক্ত করা যায় এমন কোনো একটা গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকলে এই পথে চীনের আগ্রহী হওয়ার কিছু নাই, এ কথাও সত্য। সে ক্ষেত্রে ভারতের কী ইচ্ছা এর আর কোনো অর্থ নাই। বাংলাদেশেরও সিল্ক রোডে যুক্ত হওয়ার ইরাদার কোনো অর্থ নাই। ফলে চীনকে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে রুখতে হবে, এ কাজে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করতে হবে ভারতের এমন কাজ তৎপরতা আসলেই ভারতের পক্ষে যাবে কিনা তা ভারতকেই ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে ‘বাংলাদেশ যেন ভারতের, ফলে চীনকে দূরে রাখতে হবে’- এসব বাতুল অকেজো আলাপ দূরে রাখতেই হবে।

আজ রবিবার কিছু বাড়তি সংযোজন
চীনা প্রেসিডেন্টের সফর শেষ হয়েছে। তিনি ভারতের গোয়া রওনা দিয়েছেন সেখানে ব্রিকসের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিবার জন্য। এদিকে এই সফরে গভীর সমুদ্র বন্দর অথবা চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগদান – এমন কোনটাতেই কিছুই অগ্রগতি নাই। কোন ব্রেক থ্রু নাই। অবস্থা আগের মতই, যেখানে ছিল। এসবের সার কথা  গভীর সমুদ্র বন্দর এই সরকারের আমলে হচ্ছে না, কোন সম্ভাবনা নাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ অক্টোবর দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে ১৫ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার কিছু এডিট ও সংযোজন করে আবার ছাপা হল।]

নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

 নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

গৌতম দাস
০৪ অক্টোবর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RL

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে জনসভায় জানিয়েছেন যে তিনি সামরিক যুদ্ধ বা যুদ্ধের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা করতে চান না। বরং কোন দেশ কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এর প্রতিযোগিতা করতে চান। ফলে সেই প্রতিযোগিতার আহ্বান জানাতে জনসভা থেকে তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে বক্তব্য রেখেছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধ বিষয়ে যেন তা লেগেই যাচ্ছে এইভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গরম কথা বলে মোদি নিজ জনগণকে আগে তাতিয়েছিলেন, শেষে কোঝিকোড়ে শহরের বক্তৃতায় সব উত্তেজনায় নিজেই ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন যুদ্ধ নয়, তিনি উন্নয়ন চান। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে তিনি যাবেন না। ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ কথার অর্থ কী, সেটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, পাকিস্তানকে তিনি ‘টেরোরিজমের’ অভিযোগে বড় প্রভাবশালী বা ছোট রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার চালিয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। এখন আমরা দেখছি “সার্জিক্যাল অপারেশনএর” নামে আবার এক বুঝরুকি। মোদীর প্রপাগান্ডার লড়াই, যা এখন উভয় পক্ষের দিক থেকেই প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে।  অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মোদী সবশেষে কোন সিরিয়াস যুদ্ধের দিকে যদি না-ই যাবেন, তিনি তা হলে গরম কথায় যুদ্ধের মত হুমকি দিয়েছিলেন কেন?
আমাদের ভুললে চলবে না, মূল ইস্যু ছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন। যেটা এখন প্রায় ৮০ দিনের বেশি টানা কারফিউ এর সত্ত্বেও চলছে। ওদিকে কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ইসলামি ঐক্য সংস্থা গত মাসে ২১ আগষ্ট ২০১৬ শক্ত ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেছিলেন । (OIC Secretary General Iyad Ameen Madani Monday expressed concern over the situation in Kashmir and called for an immediate cessation of atrocities by India, urging the Indian government for peaceful settlement of the dispute ‘in accordance with wishes of Kashmiri people and the UNSC resolutions’.।) বিগত ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নেয়া এক প্রস্তাব হল কাশ্মীরবাসী ভারতে থাকতে চায় কি না তা জানতে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। ওআইসি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানায়েছিল।  ওআইসি কাশ্মীরের প্রতিরোধ লড়াইকে তাদের “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য লড়াই” মনে করে, তাও জানিয়েছিলেন। কাশ্মীরের নিরস্ত্র গ-আন্দোলনের ধারার রাজনৈতিক দল হুরিয়াত কনফারেন্স। ওআইসির বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে তাদের বিবৃতির ভাষা ছিল আরও কড়া। তারা তুরস্ক সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন পাঠাবার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছিল।  ওদিকে এ বিষয়ে জাতিসংঘে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পরস্পরের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস সংগঠন হিউম্যান রাইট কাউন্সিল  দুই রাষ্ট্রের দুই কাশ্মির অংশেই সরেজমিন গিয়ে তদন্ত ও প্রত্যক্ষ দেখে যাচাই করে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারত উভয় সরকারের কাছে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অনুমতি চেয়েছিল। জবাবে পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ রাজি বলে জানালেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ওদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং তা মিডিয়ায় আসা শুরু করেছিল এই বলে যে, ক্রসফায়ারের নামে গ্রাম ঘিরে তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানিকে খুঁজে বের করে হত্যা করলে যে জনগণ কার্ফু ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যাবে – এ’সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী কিছুই আগাম জানাতে পারে নাই। এখানেই এবং এ’ঘটনা থেকেই ভারতের কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মারাত্মক গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতার কারণেই কাশ্মিরের বহু জেলা শহর এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিয়মিত আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মোদি সরকারের কাছে এসব বিপদের দিক তুলে ধরেছিল। আর প্রতিদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী মিডিয়া এই ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগে জনগণের দৃষ্টিকে ও মিডিয়াকে কাশ্মির থেকে সরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছিলেন মোদি। তাই ভারতের সীমান্ত শহর উরির ব্যারাকে হামলায় ১৮ সেনা হত্যা – তা সে যেই ঘটাক, একে ইস্যু করে মোদি দৃষ্টি সরানোর কাজ করতে সফল হন। মিডিয়া ও জনগণ থেকে কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন বা লাগাতর কারফিউ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটনার উল্লেখ এতে হাওয়া হয়ে যায়। নতুন প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আসন্ন কি না’, আর ‘পাকিস্তান থেকে আসা কথিত জঙ্গি’ এসব হয়ে যায় মিডিয়ার মূল প্রসঙ্গ। এগুলোই যেনবা সব সমস্যার কারণ। এই দৃষ্টি ঘুরাতেই মরিয়া হয়ে যুদ্ধের হুমকির গরম বক্তৃতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল মোদিকে।
কিন্তু তাতে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়  – ম্যালেরিয়া হওয়াতে রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু এখন কুইনাইনের প্রভাব প্রতিক্রিয়া শরীরে ছেয়ে মারাত্মক হয়ে গেছে, ফলে তা কমানো হবে কী দিয়ে? নিজেরই বাজানো ও ঝড় তোলা যুদ্ধের দামামা এখন কমাবে কী দিয়ে? অবস্থা দেখে খোদ বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরাই নাখোশ, হতাশ হয়ে পড়েছিল। সব দিক বিবেচনা শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে নেতাকর্মীদের হতাশার মধ্যেই সবার আগে পাবলিক বক্তৃতায় ‘যুদ্ধ নয়, উন্নয়ন চাই’ আর ‘কেবল কূটনীতি হবে চরম পদক্ষেপ’ বলে নিজের মূল অবস্থান পরিষ্কার ও প্রচার করে নেন মোদী।

আর এর সাথে পরদিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোদি নিয়েছিলেন। এক হল, সর্বদলীয় মানে সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা সভা থেকে নিজের ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে উপস্থিত সবার সমর্থন নিয়ে নেন তিনি। দুই. তিনি সব মিডিয়ার কাছে ওই নীতির পক্ষে সমর্থন চান। স্বভাবতই তা অন্তরালে। এটি এক কমন ফেনোমেনা এবং চর্চা যে ভারতের জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো আর সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিরোধিতা করে না। এবং সেই সাথে সব মিডিয়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। ফলে পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর কেউ কেউ মোদির বক্তৃতার নেতি রিপোর্ট ও সমালোচনা করলেও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় মিডিয়া মোদির ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি একযোগে মোদী সরকারের পক্ষে সামলে নিয়ে আসতে শুরু করে। বলা যায়, দুই দিনের মাথায় পরিস্থিতি মোদির পক্ষে ঘুরে যায়। এ কাজে মিডিয়াও আবার সাহায্য নিয়েছিল কয়েকটি ইস্যুর। যেমন এক. আগামী সার্ক সম্মেলনে একসাথে চার সদস্য দেশের যোগদানের অনীহা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। চার দেশের যোগ না দিতে অনীহার কারণ আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু তা ভারতের কূটনৈতিক লবির কারণে একসাথে প্রকাশ হওয়াতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটার কনস্টিটোয়েন্সির কাছে ব্যাপারটাকে ‘মোদির প্রতিশ্রুতি কাজ করছে’ এটা সাফল্য হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয় ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ছিল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি বাতিলের হুমকি। গত ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মিটিয়ে এই চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল এই দুই রাষ্ট্র। আসলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী মোট ছয়টি। ওই চুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র তিনটি করে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভাগ করে নেয়, যাতে প্রতি তিন নদীর পানিপ্রবাহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এক এক রাষ্ট্রের। এভাবে ওই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল। উভয় পক্ষই এতে এত দিন খুশি ছিল, এখনো পানির পরিমাণ ও ভাগের দিক দিয়ে উভয়ই খুশি। কিন্তু একটি টেকনিক্যাল দিক আছে। তা হল, ওই ছয়টি নদীরই উজানের দেশ হল ভারত। অর্থাৎ ভাটির দেশ হল পাকিস্তান। সোজা কথায় প্রথমে ভারত হয়ে, এরপর ওইসব নদী পাকিস্তানে প্রবেশ করে। ঠিক বাংলাদেশের মত। ফলে নদীর পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ করার ভূ-অবস্থানগত সুবিধাগুলো ভারতের পক্ষে। যদিও আন্তর্জাতিক নদী আইনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশকে প্রাপ্য পানিবঞ্চিত করা সম্পুর্ণ বেআইনি। কিন্তু মোদি ব্যাপারটিকে অন্তত প্রোপাগান্ডায় নেয়ার জন্য ওই চুক্তিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার জন্য সরকারি আমলা ও টেকনিক্যাল লোকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। বাস্তবে ভারত এই চুক্তি ভঙ্গ ও অমান্য করবে কি না, বাঁধ অথবা কোনো বাধা তৈরি করবে কি না সেটা অনেক পরের ব্যাপার; কিন্তু ইতোমধ্যে মোদির ওই নির্দেশ ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক প্রচারে নিয়ে গেছে। মোদী হুশিয়ারী দিয়ে বলছেন, “রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না, হুঁশিয়ারি মোদীর”। ফলে সাধারণ ভারতীয়দের মনে মোদী যুদ্ধ করার উসকানি যতটা তাতিয়েছিল, তা অনেকটাই এবার প্রশমিত হয়েছে এতে। যদিও মিডিয়ার এক কোণে ভারতীয় টেকনিক্যাল লোক বা প্রকৌশলীরা মন্তব্য করেছেন, এই পানি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ এটি প্রবল খরস্রোতা ও খাড়া প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। আবার পাকিস্তান থেকেও ওখানকার মিডিয়ায় পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে বলা হয়েছে, বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তবে সুবিধা হল, ভারতীয় মিডিয়া এই খবরটাকে নিজ দেশে তেমন প্রচারে নেয়নি। অবশ্য প্রথম দিন রাশিয়া-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বনির্ধারিত এক যৌথ মহড়া এ সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর তা যথাসময়েই শুরু হয় বলে এটাকে ভারতের জনগণের মন খারাপ করা খবর ও ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ভারতের মিডিয়া সেটাও সফলভাবেই সামলে নেয়।

অপর দিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আরেক খবর ছাপে যে, লাহোরে চীনা অ্যাম্বাসির কনসাল জেনারেল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই) সাথে দেখা করার সময় ভারত-পাকিস্তান বিরোধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে বলে জানিয়েছে। শাহবাজের তরফ থেকে বিবৃতির সূত্রে খবরটি ছাপা হয়। এই খবরটি পাক্কা দুই দিন টিকে থাকতে পেরেছিল। দুই দিন পরে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ে এমন খবর তাদের জানা নেই বলে জানায়। তবে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান প্রকাশ করে। তা হল, উভয় দেশ যেন সামরিক বিরোধে না জড়িয়ে বসে ডায়ালগে সমাধান খোঁজে, চীন এর আহ্বান জানায়। ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটি ব্যাপক প্রচারে নিয়ে যাওয়াতে এটিও মোদির পক্ষে জনগণের সমর্থন আনতে সাহায্য করে মিডিয়া। শুধু তাই নয়, ভারতের মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে যে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে আছে। যেমন- আনন্দবাজারের এক খবরের শিরোনাম হলো, ‘চাপের মুখেও পাক তর্জন, মার্কিন প্রশাসন পাশে আছে ভারতের।’ কিন্তু এটাকে প্রোপাগান্ডা বলছি কেন? অথবা আসলেই চীন ও আমেরিকার ভারত-পাকিস্তান বিরোধে অবস্থান কী, কেন? আর সেটাই বা কত দিন থাকবে বা জেনুইন কি না? পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার সমস্যা হিসেবে কংগ্রেস নেতা, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কেরালার এমপি শশী থারুর তাকে উদ্ধৃত করে হংকংয়ের এক মিডিয়া জানাচ্ছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। আমেরিকার আফগানিস্তানের কারণে পাকিস্তানকে দরকার। চীন পাকিস্তানে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এক একক বড় প্রকল্প নিয়েছে। যেটা দক্ষিণে বেলুচ সমুদ্রসীমায় এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সেখান থেকে দক্ষিণ থেকে উত্তর অবধি পাকিস্তানের বুক চিরে এরপর চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, এমন সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বছর শেষে তা প্রথম পর্যায় শেষ করা হবে। উদ্দেশ্য, এই সড়ক চীনের একমাত্র মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত যাবে। এভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ভূমিবেষ্টিত এই প্রদেশকে সমুদ্র পর্যন্ত এক্সেস দেয়া, যাতে পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে যায়। এটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নামে পরিচিত। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চীন থেকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন।

এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ আছে- গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থাৎ গ্লোবাল ক্যাপিটালের স্বার্থ। গত মাসে চীনে জি-২০ এর সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জি-২০ মানে হল, অর্থনীতির সাইজের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপরের দিকের রাষ্ট্র যারা – এমন টপ ২০টি বড় অর্থনীতির দেশের সম্মেলন। উদ্দেশ্য গ্লোবাল অর্থনীতিতে কিছু কমন সাধারণ স্বার্থের দিক নিয়ে একমত হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমন এবারের মূল ঐকমত্য হল, গ্লোবাল মন্দা বিষয়ে। দুনিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় ১৯৩০ সালে প্রথম মহামন্দা আসে। মহামন্দার সারার্থ হলো, সব রাষ্ট্রের নিজ মুদ্রার মান-দাম কমিয়ে অন্যের ওপর বাজার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা। এই ঘটনার লেজ ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল, যা থেকে প্রতিকার হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম। এ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো আবার যাতে মন্দা না হয় তা ঠেকানো। তবুও ২০০৭-০৮ সালে আবার মন্দা দেখা দিয়েছিল। আফগানিস্তান-ইরাকে যুদ্ধে গিয়ে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপুল যুদ্ধ খরচের এই ভারসাম্যহীনতা থেকে এর জন্ম বলে মনে করা হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিপুল অর্থ ঢেলে ব্যক্তি-কোম্পানিগুলোর ধস ঠেকায়। অথচ পশ্চিমের বাইরে চীন তখনো ডাবল ডিজিটের অর্থনীতি টেকাতে পেরেছিল, কারণ সে যুদ্ধের বাইরে। ফলে পশ্চিমাদের চোখে গ্লোবাল মন্দা ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে এক ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। চীন টিকলে তার ছোঁয়া ও প্রভাবে পশ্চিম তার সঙ্কট কাটাতে সুবিধা পাবে তাই। মন্দা দুনিয়াজুড়ে ছেয়ে যেতে বাধা হবে চীন তাই। পশ্চিম সেই থেকে মন্দা একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ওদিকে গত দুই বছর চীনের অর্থনীতি নিচের দিকে; কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতে আগের কংগ্রেস আমলে ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি এবার মোদির আমলে এখনো উঠতির দিকে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিই উঠতির দিকে পশ্চিমের চোখে সে আকর্ষণীয় ও আদরের। অতএব কোনোভাবেই ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা আবার ফিরে আসুক তা ঠেকাতে সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এবারের জি-২০ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল। ফলে এবার জি-২০ এর সর্ব সম্মতিতে, সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্ত নেয়, সঙ্কটের মুখে নিজ মুদ্রার মান-দাম কমানো এমন পদক্ষেপের পথে কেউ যাবে না। এ কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ফলাফলে তা গ্লোবাল অর্থনীতিকে ডুবিয়ে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। অতএব এই বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থের কারণে বড় অর্থনীতির কোনো রাষ্ট্রই সম্ভাব্য এই যুদ্ধকে নিজের স্বার্থের বিপক্ষে, নিজের জন্য বিপদ হিসেবে দেখে। যেন বলতে চায়, যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেয়ার বা পাওয়ার এটা সময় নয়।
গ্লোবাল উদ্বেগ ও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এ দিকটি সম্পর্কে মোদির জানা, সবাই তাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু তবুও মোদির কিছু একান্ত স্বার্থ আছে। একালে দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উত্তর প্রদেশে (সাথে পাঞ্জাবসহ আরো কয়েকটি) রাজ্য সরকারের নির্বাচন। এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোদি বা বিজেপি এখানে হেরে গেলে এখান থেকেই নীতিশ-মমতার নেতৃত্বে আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জোট গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা।
ওপরে লিখেছিলাম, মিডিয়াসহ মোদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর তৃতীয়টি হল, খুবই সীমিত পর্যায়ে সামরিক অ্যাকশন, যাতে আগামি ভোটে মোদির মুখ রক্ষা হয়। ভোটের বাক্স ভরে উঠে। এক কথায় বললে, “যুদ্ধ না উন্নয়ন আর কূটনীতি” এই নীতির পক্ষে ভারতের মিডিয়া একযোগে দাঁড়িয়েছিল খুবই সফলভাবে। মানুষের মন থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার পক্ষে আগের তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করে আনতে পেরেছিল; কিন্তু সম্ভবত সামরিকবাহিনীকে আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা তৈরি করে আনতে বলেছিলেন, যা তারা হাজির করেছিল একা মিডিয়াই তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করতে পারার পরে। সেই অর্থে আবার এই সামরিক এডভেঞ্চার তা ছোটখাট বলা হলেও মোদীর সেদিকে না গেলেও চলত।  কিন্তু সম্ভবত লোভে পড়ে, বাড়তি লাভের আশায় মোদী এই সামরিক অ্যাকশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেন। এই পরিকল্পনা মোতেও ছট খাটও নয়, রিস্কবিহীনও নয়। বরং মোদীর ভারতের জন্য আগুন নিয়ে খেলার মত রিস্কি। কিন্তু মোদী আগামি ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচনে ভাল করার লোভে এই আগুন নিয়ে খেলা খেলতে গিয়েছেন। এর অর্থ এখন মূল্যায়ন বসলে পরিস্কার দেখা যাবে, আগামী নির্বাচনে ভোটে সুবিধা দেয়ার কাজেই সামরিক বাহিনী ও এর ঐ পরিকল্পনা দেশের নয় দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। বিশেষত সামরিক হামলা তা যত ছোট দিয়ে শুরু হোক না কেন, এখন পাল্টাপাল্টি বড় থেকে আরো বড় হামলার দিকে দুই দেশ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। এ সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। শেষে এটা পুর্ণ যুদ্ধে না পরিণত হয়। যেটা তারা উভয়ে কেউ চায় না; কিন্তু সেখানেই গিয়ে পৌঁছবে। বিশেষ করে ভারত “সার্জিক্যাল অপারেশন” এই গালভরা নামের হামলা করতে গিয়ে যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইচ্ছা না থাকলেও ভারতকে এরপর আরেক দফা হামলায় যেতে হবে। কারণ ভারতের ঐ গালভরা নামের হামলায় এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে ধরা পরে আছে। ভারত প্রথম হামলা করার পর  মিডিয়াকে বীরদর্পে জানিয়েছিল, নিজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তারা নাকি পাকিস্তানের ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। যেন বলা হচ্ছিল, এখন ভারতের মিডিয়া মোদীর পক্ষে নির্বাচনী ক্রেডিট বিতরণ করতে নেমে পড়তে পারে। কিন্তু সন্ধ্যা লাগতেই জানা গেল, এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে আটকা পড়ে আছে। অথচ এটা আগে থেকেই এটা জানা সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনীর নেতারা তা লুকিয়ে অস্বীকার করে রেখেছিলেন। এটা ছাড়া যেটা এখন আর এক সবচেয়ে বড় সমস্যা তা হল – দুই দেশের বাহিনীই এখন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ঢুকে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ সত্যতা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে কি পূর্ণ যুদ্ধের (পারমাণবিক বোমা পকেটে রেখে) দিকেই যাবে বা যাচ্ছে পরিস্থিতি? সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। দুই পক্ষই তা না চাইলেও নিজ নিজ জনগণের কাছে বীরত্ত্ব আর  ‘ইজ্জত রক্ষার স্বার্থ’ দেখাতে গিয়ে পূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভাল সম্ভাবনা আছে।  এই সম্ভাবনা প্রবলতর হবে যদি না মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীন-আমেরিকা যৌথভাবে এগিয়ে আসে ও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় । পুরনো ইতিহাস বলছে, মধ্যস্থতাকারীর কিছু ভূমিকা আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০২ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে ০৩ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ]

ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

 ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

গৌতম দাস

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1Rl

বাংলাদেশে খবরটা সবাই পড়েছেন বেশ উতসুক হয়ে আগ্রহের সাথে। কারণ বিষয়টা  জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশকে ভাটির দেশ হিসাবে পাওনা পানি থেকে বঞ্চিত করার ভারতের জুলুম ও অত্যাচারের কাহিনীর অংশ। জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করা বাংলাদেশে বিষয়টা উস্কে তোলার মত খবরটা হল, ভারতের বিহার রাজ্যের চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার, তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করে ফরাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিতে দাবী করেছেন। এই ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা নদীর পানির উপর ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশের যা ন্যায্য হিস্যা সেই পানি জবরদস্তি করে ভারত আটকে নিয়ে রেখেছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দিয়ে রেখেছে শুধু তাই না, সেই পানি খাল কেটে পশ্চিমবঙ্গের অন্য নদীতে নিয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশের সকলের চোখে, এটা বাংলাদেশের চরম স্বার্থহানিকর ঘটনা। ফলে  ভারতের দুষমনির প্রতীক হল ফারাক্কা বাঁধ। এবার সেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেবার কথা তুলেছেন ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ২২ আগষ্ট ২০১৬ প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ২৪ আগষ্টের রিপোর্ট বলছে – নিতীশ কুমারের অভিযোগ, “বিহারে গঙ্গা অববাহিকায় বন্যার জন্য ফরাক্কা বাঁধ দায়ী। বক্সার থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার নাব্যতা অনেকটাই কমেছে। ফলে জল জমে তা দু’পার ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকা বাড়ছে। তাই ফরাক্কা বাঁধের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ফরাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন নীতীশ”। এই খবর বাংলাদেশের কাছে যেন আল্লার দুনিয়ার ন্যায়-ইনসাফের ঘন্টা আপন উদ্যোগে বেজে উঠার ইঙ্গিত ইশারা এটা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এই দাবি করেছেন বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে নয়, বিহারের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। কারণ বিহার এখন গঙ্গা নদী প্রবাহের উপচানো পানিতে বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। উতপত্তিগত দিক থেকে গঙ্গা নদী ভারতের যেসব প্রদেশ আগে ডিঙ্গিয়ে এরপর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ক্রমানুসারে ভারতের সেসব প্রদেশ বা রাজ্যগুলো হল – সবার আগে উত্তরপ্রদেশ এরপর বিহার, এরপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে শেষে বাংলাদেশের চাপাই-নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা। তো নীতিশ কুমারের দাবি কী আমাদের জন্য ইনসাফের ইশারা? এটা বুঝবার জন্য আমাদের সবার কান খাড়া হয়েছিল, সন্দেহ নাই।

ঐ সাক্ষাত ছিল এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া এক প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক এপয়েন্টমেন্ট করে দেয়া সাক্ষাত। অতএব এতে অনুমান করা ভুল হবে না যে তা অনেক আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তবে এটা নেহায়েতই এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত ছিল না। এর আরও বহু গভীর মাত্রা আছে। প্রথমত নীতিশ বিহারের এক আঞ্চলিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড)এর সভাপতি ও মুখ্যমন্ত্রী। না এতটুকুই নয়। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির মোদী নিরঙ্কুশভাবে জিতে আসার পর ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে যে মোদী ঝড় উঠেছিল সে ঝড় ঐ নির্বাচনের পরেও অন্যান্য রাজ্য নির্বাচনেও থামছিলই না। শেষে গত নভেম্বর ২০১৫ বিহারের প্রাদেশিক (বিধানসভা) নির্বাচনে প্রথম সবচেয়ে শক্তভাবে থেমে উলটা দিকে তা ঘুরেছিল। বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরেছিল। আর নীতিশ কুমারের নেতৃত্বের বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছিল। ঐ জোটে বিহারের আর এক বড় আঞ্চলিক দল, লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ছিল সোনিয়া গান্ধীর খোদ কংগ্রেস পার্টিও। এককথায় বললে বিজেপি বিরোধী শক্ত জোট ছিল সেটা। ফলে সেই শক্ত জোটের সবার প্রতিনিধি ও নেতা ছিলেন নীতিশ কুমার । নীতিশের পরিচয়-বৈশিষ্ঠের আরও কিছু বাকী আছে। আগামি বছর ২০১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঐ নির্বাচনেও যদি বিজেপির হার হয় তবে তা ভারতের রাজনীতিতে আর এক নতুন দিকে মোড় ঘুরানো ঘটনা হবে সেটা। ঐ হারকে পুজি করে ভারতের পরবর্তি লোকসভা (২০১৯) নির্বাচনে বিজেপির মোদীকে হারানোর লক্ষ্যে বিজেপি-বিরোধী জোট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। কারণ আগামি নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী দল কংগ্রেস হবে না। আঞ্চলিক দলগুলোর গঠিত জোট হবে মোদীর বিজেপির প্রধান বিরোধী, প্রধান চ্যালেঞ্জ।  এই লক্ষ্যে সম্ভাব্য ঐ জোট গড়ে তোলার খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। সম্ভাব্য ঐ আঞ্চলিক দলের জোট গঠনের মূল নেতা ও উদ্যোক্তা হবেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।  এই জোটের মূল লক্ষ্য হবে বিজেপি ও মোদীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল। গত কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেস ক্রমশ শুকিয়ে ছোট হতে হতে অনেক আগেই কোন এক আঞ্চলিক দলের সমান প্রভাবের দল হয়ে গেছে। ফলে নীতিশ-মমতাসহ নানান আঞ্চলিক দলের মিলিত জোট বনাম বিজেপির মোদী – এই হবে ঐ নির্বাচনে মূল ক্ষমতার লড়াই।

ভারত রাষ্ট্রের জন্মগত সুত্রে দুর্বলতা বা ত্রুটি হল ওখানে কেন্দ্র কে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথায় কিভাবে তৈরি হয় তা রাজ্যে বসে টের পাওয়া যায় না। ফলে ভুতুড়ে কেন্দ্র বনাম রাজ্য এর বিবাদ জন্ম থেকেই। ফলে বিজেপি বনাম আঞ্চলিক দলের জোট এর লড়াই  এর তাতপর্য  এবার পুরানা ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ ক্ষমতার লড়াইকে আবার মুখ্য হয়ে তুলতে যাচ্ছে। অতএব মোদী সেই বিশেষ নীতিশ কুমারকে সাক্ষাতের এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন।

ফসলের মাঠ ও শহরও ডুবে যাওয়া বিহারের এবারের বন্যার প্রভাব হয়েছিল মারাত্মক। টানাটানিতে চলা রাজ্য আর তুলনামূলক উদ্বৃত্তে চলা রাজ্য এই ভিত্তিতে যদি ভারতের রাজ্যগুলোকে ভাগ করি তবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার টানাটানিতে চলা রাজ্যের অন্তর্গত। ফলে বন্যায় ব্যাপক ত্রাণের আয়োজন করার সীমাবদ্ধতা এখানে আছে। আর এই সীমাবদ্ধতা সমস্যাটা ব্যক্তি নীতিশ কুমার অথবা তার দল-জোটের কারণে নয়।  ওদিকে এই বন্যায় মানুষের যা ক্ষয়ক্ষতি এককথায় বিহার রাজ্য সরকারের পক্ষে তা পুরণ অসম্ভব। ফলে যেটা সম্ভব তা হল তাতক্ষণিক কিছু ত্রাণ বিতরণ। সারকথায় বিহারের জনগণের ক্ষোভ মোকাবিলা আসলেই কঠিন। ফলে৪ জনগণের ক্ষোভকে কেন্দ্রের উপর ঠেলে দেয়ার তাগিদ নীতিশের আছে। ওদিকে এই বন্যা কেন হল, এর সাথে কী ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার কোন সম্পর্ক নাই? অবশ্যই আছে। গঙ্গার মত প্রবল বিপুল পলিমাটিবাহী নদীর ক্ষেত্রে এর উপর বাঁধ দিলে সে প্রভাব আরও জটিল ও মারাত্মক হওয়ার কথা, হয়েছেও। অতএব সবমিলিয়ে এর দায় কার কেন্দ্রে না রাজ্যের এই বলে দায় ঠেলাঠেলির এক বিরাট ক্ষেত্র হল বন্যা ও বাঁধ ইস্যু। বিশেষত যখন বাঁধ দেয়া ও মেন্টেনেন্স ব্যবস্থাপনার প্রশাসন চলে সরাসরি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত – তাই এই দায় কেন্দ্রের; ওদিকে বন্যা হলে তা মোকাবিলা ও ত্রাণ বিতরণ রাজ্যের দায়। এসব কথা সাক্ষাতের আগেই আগাম ভেবে নিয়েছিলেন নীতিশ ও মোদী দুজনেই। কারণ, ঐ সাক্ষাত থেকে দায় ঠেলাঠেলি শুরুর এক বিরাট সম্ভাবনা আছে তা দুজনেই জানতেন। নীতিশ মোদীর কাছে এসে নিজ বিহার জনগণকে বুঝাতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন মুল সমস্যা ফারাক্কা বাঁধ। অর্থাৎ দায় কেন্দ্রের। মোদীর কাছে বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার কথা তুলে, দাবি জানিয়ে তিনি সে অর্থ করতে চেয়েছিলেন যে দায় কেন্দ্রের। আর মোদী সেকথা টের পেয়ে সাথে সাথে বাঁধ কর্তৃপক্ষকে  বাঁধের সব গেট খুলে দেবার নির্দেশ জারি করেন। এভাবে তিনিও বুঝাতে চাইলেন রাজ্য যা চেয়েছে তিনি ততক্ষণাত তাই দিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং কেন্দ্রের দায় নাই।  বন্যায় কারণে  বিহারের জনগণের যদি কোন কষ্ট-ক্ষোভ থেকে থাকে তবে এর দায় ত্রাণের পরিমাণ কম  অথবা বিতরণে রাজ্য সরকারের সমস্যাজাত। ফলে ২৩ আগষ্ট নীতিশ-মোদীর সাক্ষাত ছিল আসলে আগামি ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কার ইমেজ ক্রেডিট ভাল তা এখন থেকেই ঠিকঠাক রাখার প্রতিযোগিতা। ফলে ঐদিনের প্রথমার্ধে ঘটনাবলী ছিল নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী জানান আর মোদীর ততক্ষণাৎ সবগুলো গেট খুলে দিবার নির্দেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল।

কিন্তু কেবল নীতিশ আর মোদী নন গঙ্গার ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতেই আরও পক্ষ আছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান হল ফারাক্কা বাঁধ থাকা তার স্বার্থের পক্ষে। কারণ গঙ্গার পানি শেষে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌছানোর বদলে সেই পানি বাংলাদেশে ঢুকবার আগেই তা কেটে গতিপথ বদলে আলাদা খাল খুড়ে টেনে ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ফেলা হয়েছে। এভাবে হুগলী নদী ধরে শেষে ঐ বাড়তি পানি কলকাতা বন্দরে নিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলা হয়েছে। মমতার মুল উদ্বেগ হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটির চরের কারণে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা সঙ্কটে পড়েছে, এথেকে বন্দরকে রক্ষা করা, বন্দরকে সচল রাখা। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে মনে করা হয়েছিল যে খাল কেটে আনা অতিরিক্ত বা বাড়তি পানির চাপের তোড়ে হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটি অপসারণ হয়ে যাবে যাতে এভাবে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পানি টেনে আনার পরও তা দিয়ে পলিমাটি পর্যাপ্ত বা কাম্য মাফিক কিছুই সরানো যায় নাই। ফলে  বন্দরের এই নাব্যতা সংকট খুব মিটে নাই তো বটেই উলটা নাব্যতা রক্ষা যতটুকু হচ্ছে তা বজায় রাখতে গিয়ে প্রত্যেক বর্ষা মৌসুমে ঐ সংযোগ খাল (৪০ কিমি লম্বা) ও নদীর দুই পাড় উপচে পড়া পানিতে এলাকায় বন্যা হচ্ছে। ফলে বিহার ছাড়াও নাব্যতা রক্ষার কাফফারা হিসাবে পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিবছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবির কয়েক ঘন্টা পরে ঐদিনই ভারতের এনডিটিভি মমতাকে প্রতিক্রিয়া জিজ্ঞাসা করেছিল। জানতে চাওয়া হয়েছিল যে নীতিশের ঐ দাবীর পর মমতার প্রতিক্রিয়া কী? ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, মমতা এর কোন জবাব না দিয়ে এড়িয়ে চলে যান।   এতে এনডিটিভির রিপোর্টার মন্তব্য করে এটা মমতার কৌশলগত নিশ্চুপ থাকা। পরে কলকাতার নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র ক্যামেরার সামনে (ঐ একই ক্লিপে দেখুন শেষ ভাগে) দাবি করেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিলে নাকি এখন ২০০ কিমি নদী শুকিয়ে যাবে। তাই তাঁর মতে নীতিশের দাবী আজিব রিডিকুলাস, তিনি বলেন। পরে ঐ রিপোর্টের অন্য অংশ থেকে জানা যায় মমতা বলছেন, বিহারে বন্যার কারণ মনুষ্য-সৃষ্ট। কারণ সঠিক সময়ে বাঁধের পানি ছাড়া হয় নাই। ফলে পুরা ব্যাপারটায় কেন্দ্রের দায়।

মমতার এই বক্তব্যের পরে ঐদিনই (২৩ আগষ্ট পরের দ্বিতীয়ার্ধে) বিজেপি শিবিরে টনক নড়ে। তারা আবার ভেবে মুল্যায়ন করে দেখে যে ভোটের রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে রাজনীতিকদের কথা সাজানো ও পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের লড়াইয়ে তারা পিছিয়ে পড়ে গেছে। কারণ নীতিশ আর মমতার ভাষ্যে ভিন্নতা আছে। অথচ এর সুবিধা বিজেপির পক্ষে কাজে লাগানো হয় নাই। তাই আবার নতুন করে দোষারোপ সাজানোর উদ্যোগ নেয় তারা। বিহারের রাজনীতিতে নীতিশ কুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব হলেন বিজেপি নেতা হলেন সুশীল কমার মোদী। তিনি একদিন পরে অর্থাৎ ২৫ আগষ্ট মিডিয়ায় এক বিবৃতি পাঠিয়ে তাই এবার তিনি দাবি করলেন, নীতিশের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবীর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিতে থাকলেন, “বরং যেহেতু নীতিশের বিহার সরকার বন্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয় নাই, ত্রাণ ঠিক মত বিতরণ করতে পারে নাই – সেই খামতি আড়াল করতে সে এখন বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী তুলেছে”। অর্থাৎ  তিনি মমতার পক্ষে ছদ্মভাবে দাঁড়িয়ে মমতা-নীতিশের বক্তব্য বা অবস্থানের বিরোধ বড় করে দিতে চাইলেন। এছাড়াও বন্যার কারণ ফারাক্কা বাঁধ নয় – বলে বাঁধকে দায়ী হওয়ার হাত থেকে বাচিয়ে দিতে চাইলেন তিনি। আর এর চেয়েও বড় কথা তিনি ইচ্ছা করে এক বিভ্রান্ত তৈরি করলেন। বন্যা হওয়া না হওয়ার জন্য বাঁধ দায়ী কীনা এটা এক জিনিষ। কিন্তু তিনি দাবী করলেন ফারাক্কা বাঁধ নয়, রাজ্য সরকারের ত্রাণ ঠিকমত বিতরণ ব্যবস্থাপনা না করতে পারাটাই যেন বন্যার কারণ। যেন ত্রাণ পরিমানে প্রচুর আর  ঠিকমত বিতরণ করতে পারলে তাহলে আর বিহারে বন্যা হত না।  এই হল ভারতের আগামি কেন্দ্র-রাজ্য লড়াই প্রকট হয়ে উঠার আগেই পরস্পরের দোষারোপ করে দায় ঠেলাঠেলির – ভোটের রাজনীতি।

ঘটনার এখানেই শেষ না। কারণ গঙ্গা ও ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার সাথে যুক্ত পক্ষ শুধু ভারতে না, ভারতের বাইরেও বাংলাদেশ আছে। তাই এবার বাংলাদেশ অংশ। এখানে দুই মন্ত্রীর পরস্পর বিরোধী দুই বক্তব্য নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে সরকার ঘনিষ্ট বিডিনিউজ২৪ গত ২৮ আগষ্ট।  তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, যেটা এবারের ফারাক্কা বাধের গেট খুলে দিবার কারণে বন্যায় অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা। রোববার ভেড়ামারা উপজেলার চর গোলাপনগরে পদ্মা নদীর পাড়ে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে  ত্রাণ বিতরণের সময় ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাব নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানাচ্ছেন। তিনি লিখছেন তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, “অভিন্ন নদীর উপর একতরফা গেইট খুলে দেওয়াটা সঠিক কাজ নয়। এ বিষয়ে আমাদের যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করব।” একই সময়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যববস্থাপনামন্ত্রী মায়া চাঁদপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ নেতা মায়াকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজ২৪ লিখেছে,“এক সময় আমরা বলেছি ফারাক্কার বাঁধ আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ। কিন্তু এখন তা ভারতের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ফারাক্কার পুরো বাঁধ ছেড়ে দিলে কিংবা ভেঙে দিলে আমাদের দেশে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার নিচে আছে। ফারাক্কার পানি আমাদের কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে আমরা মনে করি”। অর্থাৎ সংকীর্ণ চোখে যার যার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে বুঝ দিবার বক্তৃতা এগুলো। ঠিক সামগ্রিক দেশ ও জনগণের স্বার্থের দিক থেকে দেয়া অবস্থান নয়।

নিতীশ-মমতার অবস্থানের বিরোধকে বড় করে দেখানোর সুযো নিবার জন্য এবার এগিয়ে আসেন ভারতের রঞ্জন বসু। তার সে তৎপরতা আমরা পাই গত ০২ সেপ্টেম্বর কলকাতার সাংবাদিক রঞ্জন বসুর লেখা বাংলা ট্রিবিউনে “ফারাক্কার গেট খোলা নিয়ে অপপ্রচারে ‘বিরক্ত’ বাংলাদেশ” শিরোনামে। ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে, নতুন করে ফারাক্কা বাধের গেট খোলার কোন ঘটনাই আসলে ঘটে নাই। কারণ বর্যার সময় সবগেট খোলাই থাকে। ফলে নতুন করে গেট না খুললেও মিডিয়ার তা প্রচার হয়েছে। হয়ত রঞ্জন বসুর এই দাবী সত্য। কিন্তু ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে আমাদের দিল্লী দুতাবাস নাকি দাবি করেছে রাজশাহী বা অন্য কোথায় কোন বন্যা হয় নাই। রঞ্জন বসু লিখেছেন, “……পদ্মায় বাড়তি পানির স্রোতে রাজশাহী বা অন্য কোথাও কি বন্যা হয়েছে বলে খবর এসেছে?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ দেখা যাছে, রঞ্জন বসুর লেখার এই অংশ আবার আর এক চরমপ্রান্ত বা সবকিছু অস্বীকারের চেষ্টা। উপরের দুই মন্ত্রীর বক্তব্যসহ বিডিনিউজের রিপোর্ট এর প্রমাণ। জানিয়ে রাখা ভাল গত ২৮ আগষ্ট খোদ ঐ  বিডিনিউজ২৪ এর ১.৪৬ মিনিটের এক ভিডিও ক্লিপ রিপোর্টের শিরোনাম হল “রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল”। ফলে রঞ্জন বসু এবং দিল্লীর বাংলাদেশ দুতাবাসের নামে তার দাবি একশ ভাগ মিথ্যা। এটা বড় জোড় মমতা-নীতিশের বিরুদ্ধে মোদীর পক্ষে রঞ্জন বসুর এক মিথ্যা প্রচারণা মাত্র।

সারকথায় বললে,এই লেখায় ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত সব পক্ষের বক্তব্যগুলোকে একসাথে পাখির একটা চোখ দিয়ে দেখলে যেমন হয় তেমনই এক সঙ্কলন। এককথায় বললে, বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এসব কথোপকথন গুলো একটাও নয়। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফারাক্কা ইস্যু হয়েছিল মাত্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে  মাসিক অন্যদিগন্তের চলতি প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার সংযোজন ও এডিট করে ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

 

হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে
গৌতম দাস
০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬,রবিবার

http://wp.me/p1sCvy-1KF

ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি মূলত হিন্দুত্ব। এটা বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েরই অবস্থান; এটা তারা সঠিক মনে করেন, মেনে চলেন। বরং এর কোনো বিচ্যুতি ঘটছে মনে হলে একে অপরকে দোষারোপ করে। কেন করেন? কারণ তাদের মনে হয়, প্রায় ২৯টা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতার মানুষের এত বিশাল জনসংখ্যার মানুষকে কী দিয়ে একত্রে ধরে রাখা হবে বা যাবে? তবে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ও বাছবিচার ছাড়াই তাদের ধারণা ‘হিন্দুত্ব’ – এটাই সেই সুপার গ্লু যা তাদের সব আশঙ্কার সমাধান।

আসলেই কী রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে এমন একটা সুপার গ্লু – হিন্দুত্ত্বের বা কমন ধর্মীয়  ভিত্তি অথবা কমন ভাষার ভিত্তি  ইত্যাদি একটা না একটা ‘আইডেনটিটি’ এরকম একটা কিছু লাগেই? এমন ভাবনা থেকেই দুনিয়াতে আইডেনটিটির রাজনীতি শুরু হয়ে আছে। । ‘আইডেনটিটির রাজনীতি’ ছাড়া কী রাষ্ট্রগঠন অসম্ভব?  আমরা নিশ্চিত রাষ্ট্রচিন্তায় এদিকটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হয় নাই। অথচ আবার এই হিন্দুত্ত্বের ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের মূল কারিগর কংগ্রেস ও অন্যান্য ‘প্রগতিশীলদের’ চোখে পাকিস্তান – ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করে খুব খারাপ কাজ করেছে বলে তাদের অভিযোগ। অথচ সারকথা করে বললে, বাংলা ভাষার ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা ভাল বা আদর্শ, ধর্মের (হিন্দুত্ত্ব বা মুসলমানিত্বের ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা খুব খারাপ বা অগ্রহণযোগ্য এটা বলা বা ভাববার সুযোগ নাই।

সে যাক, ভারতের প্রধান দুই সর্বভারতীয় দল দল কংগ্রেস ও বিজেপি এরা এ জায়গায় ঐকমত্য। অন্যদের মধ্যে ‘বাস্তববাদীতার দোহাই দেয়া’ সিপিএম সেও ঐ দুই দলের মতো করে ভাবে ও মান্য করে যে ধন্বন্তরি ওষুধ বা সুপার গ্লু-এর নাম হিন্দুত্ব। কিন্তু কোনো দল প্রকাশ্যে মানে ফরমালি তা স্বীকার করে না। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলে, স্বীকার করে যুক্তি দেয়। তবে বলা না বলা, সেটাঅন্য জিনিস। ফলে এখান থেকেই আরো দুই খান কথা বলে তাদের বিভক্তি শুরু হতে দেখি আমরা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিন্দুত্ব- কংগ্রেস ও বিজেপির এ ব্যাপারে একমত হয়ে এটা মেনে নেয়ার পরও প্রত্যক্ষভাবে হিন্দুত্ব ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের কথা বাইরে প্রকাশ বা স্বীকার করা ঠিক হবে কি না- এই প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির ভিন্নতা শুরু। কংগ্রেস মনে করে, কৌশলী হওয়ার দরকার আছে। কথাটা সেকুলারিজমের ভেক ধরে বলতে হবে। বুঝতে বুঝাতে হবে হিন্দুত্ব কিন্তু মুখে বলতে হবে ‘সেকুলারিজম’। উপরে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে এর আড়ালে বসে মুখে সেকুলারিজম বললে হিন্দুত্বের এফেক্ট পাওয়া যাবে, আনা যাবে। এই হল কৌশল। এর বিপরীতে বিজেপি মনে করে, সেকুলারিজম- এটার আবার কী দরকার? হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রভিত্তি হিসেবে মানতে পারলে বলতে পারব না কেন? বরং ‘বোকা’ হয়ে লাভ নেই। হিন্দুত্বের গর্বকে বুক উঁচা করে সামনে আনলে এই ‘আইডেন্টিটির রাজনীতি’ কংগ্রেসের ওপরে তাদেরকে একটা বাড়তি মাইলেজ দিবে। কারণ হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সিতে এটা খুবই ফলদায়কভাবে মানুষের মনে সুড়সুড়ি লাগানোর ক্ষমতা রাখে। ভারতের সেকুলারিজম সত্যিই এমন এক তামাশার নাম।

২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদির বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির মূল দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের (আরএসএস)  গৃহীত ও নির্ধারিত এক কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’ চালু করেছে। এমন কর্মসূচির পক্ষে লজিকটি হল, ভারতে হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের যারাই আছে, তারা কোনো না কোনো সময়ে হিন্দু থেকেই ধর্মান্তরিত। অতএব, এই যুক্তিতে আরএসএস-বিজেপি তাদের ‘ওয়াপাস’- মানে ফিরিয়ে আনার প্রচার-প্রপাগান্ডার কর্মসূচি নিতে পারে, ফোর্স করতে পারে, বিজেপি সরকারের প্রটেকশনের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের হয়রানি করতে পারে, পাবলিক নুইসেন্স করতে পারে, সব পারে। আর এতে এক কামে সব কাম হবে। হিন্দুত্বের জয়জয়কার হবে, ভোটের বাক্সও ভরে উঠবে। বাড়তি লাভ হল কংগ্রেসও ভয়ে সিটিয়ে কেঁচো হয়ে থাকবে। কারণ এতে কংগ্রেসকে বিজেপি খুব সহজে উভয় সঙ্কটের ক্যাচালে ফেলতে পেরেছে। কংগ্রেস ভেবে ভীত যে, ‘ঘর ওয়াপসির’ বিরোধিতা করতে গেলে কংগ্রেসঈ হিন্দুরা হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সির প্রভাবে বিগড়ে গিয়ে যদি কংগ্রেসকে ভোট না দেয়! এই ভয়ে কিছু না বলে দলটি চুপ থাকে।
আসলে বিজেপি এ জায়গায় স্মার্ট ও ‘সৎ’। সে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চায়, হিন্দুত্বের রাজনীতি করে এবং প্রকাশ্যে তা বলেও। আর স্মার্ট এ জন্য যে, সে বুঝে গেছে কংগ্রেসকে এভাবে উভয় সঙ্কটে ফেলে জব্দ করা সহজ। এর পরও মূল বিষয় এখানে কন্সটিটুয়েন্সি। কন্সটিটুয়েন্সি মানে- ভোটারদের ক্যাটেগরি বা গ্রুপ অথবা ভোটার এলাকা; যারা কোন কথা, কোন দাবি অথবা কোন ইস্যুর পক্ষের ভোটার- এক কথায় কোন ক্যাটেগরির ভোটদাতা, কোন ভোটারদের গ্রুপে একে ফেলা যায় এই অর্থে ‘ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি’। আগেই বলেছি- কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই একমত যে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র থাকুক এবং থাকতেই হবে। এর পক্ষে তাদের কমন যুক্তি হল, এটা না হলে ভারতকে এক রাখা, একভাবে ধরে রাখার আর কোনো উপাদান বা আঠা-গ্লু নেই। কারণ রাষ্ট্র বলতে তারা একমাত্র এই আইডেন্টিটি-ভিত্তিক রাষ্ট্রই কল্পনা করতে সক্ষম। অন্য কোনো রাষ্ট্র হওয়া আদৌ সম্ভব কি না নেহরুর জমানা থেকেই এই পর্যন্ত এটা নিয়ে তাদের হোমওয়ার্ক বা পড়াশোনা আছে বলে জানা যায় না। এর বাইরে তাদের কল্পনা আগায় না, ভোঁতা করে রেখে দেয়া থাকে, তাই কাজ করে না। বরং আইডেন্টিটি-ভিত্তিক হিন্দুত্ব চিন্তার সুড়সুড়ি জাগানোর ক্ষমতা সীমাহীন। তাই সেটার প্রতি লোভে সবার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সারকথা দাঁড়াল ওপরের সেকুলার পর্দা সরিয়ে ফেললে কংগ্রেস ও বিজেপির ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আসলে একই। আর এটাই হল সমস্যার গোড়া। কেন? কোন রাজ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে অথবা সাধারণভাবে বিজেপি যখন ‘ঘর ওয়াপসি’ ধরনের কর্মসূচি চালাতে নেমে পড়ে তখন কংগ্রেস এর কোনো বিরোধিতা করতে পারে না। কারণ ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি তো ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণার’ সাথে সামঞ্জস্যের দিক থেকে সবচেয়ে পারফেক্ট। আসলে কংগ্রেস মনে করেছিল বা বলা ভাল, নিজের সেকুলারিজম স্ট্রাটেজিতে নিজেকে সাজিয়েছিল এই মনে করে যে, যেকোনো হিন্দু বিশেষত শিক্ষিত হিন্দু বুঝবে তার হিন্দুত্ব সেকুলারিজমের মোড়কে ‘ব্রান্ড করে’ প্রকাশ করাই সবচেয়ে লাভের। কারণ এতে সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকে তো পাওয়াই যাবে। সেই সাথে সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আর অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকেও কাভার করা যাবে- কংগ্রেস অনেক আগে থেকেই এসব অনুমানের ওপর সাজানো দল। কিন্তু বিজেপির ঘর ‘ওয়াপসি কর্মসূচি’র সামনে কিছু বলতে না পারায়, মুখ বন্ধ রাখতে হওয়ায় কংগ্রেসের কাম্য, তিন ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিই কংগ্রেসের ওপর বেজার হচ্ছে। তারা কংগ্রেসকে অকেজো মনে করছে। কারণ এই তিনের প্রথমটা, সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- এরা মনে করে কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপিই ভালো ও সঠিক। সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিতে যারা পড়ে, এদের মধ্যে পশ্চিমা জীবনকে আদর্শ মানা আধুনিক ভোটাররা এমনিতেই গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এরা নিজের ‘ক্লাস সচেতনতার’ কারণেও নিজেই আলাদা ও বিশেষ হয়ে থাকতে চায়। এরা ঘর ‘ওয়াপসি’র মতো কর্মসূচির সামনে নিজেই অসহায় মার্জিনালাইজড বোধ করে। আর তৃতীয়, অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- ঘর ওয়াপসি দেখে এরা হতাশ হয়ে কংগ্রেসকেই অভিশাপ দিতে থাকে যে, কংগ্রেস ‘সেকুলারিজমে’ সিরিয়াস না। এবার  গত মে মাসে সদ্যসমাপ্ত আসামের নির্বাচনের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, হিন্দুত্বের ভোটাররা কংগ্রেস ছেড়ে কিভাবে বিজেপিমুখী হয়েছে।
তবে এর ব্যতিক্রম কী হতে পারে তা বোঝার জন্য কাছাকাছি সবচেয়ে ভালো উদাহরণ সম্ভবত মমতা বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস। বিশেষত ঐ একই সময় গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনে তাঁর দলের বিশাল বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যদি খোজ করা হয় যে, ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র প্রশ্নে মমতার অবস্থান কী? মমতা তত্ত্ব জানেন না, তত্ত্ব করেন না, তত্ত্বের বড়াইও তাঁর নেই। মমতাকে সম্ভবত মাঠ অথবা  ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’ দেখার ভিত্তিতে চলা পপুলার রাজনীতিক বলা সঠিক হবে। ফলে তাকে বুঝতে হবে তার বাস্তব তৎপরতা দিয়ে। প্রথমত, তিনিই দেখালেন সেকুলারিজম নামের ছলনা না করেও প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিরও নেতা হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে মোট মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। ৩-৪% বাদ এরা সবাই আজ মমতার পিছনে। এমনকি মুসলীম লীগ অথবা সিপিএমে যারা মুসলমান নেতা ছিলেন তাঁরা গত নির্বাচনে মমতার দলের টিকিটে ভোটে দাড়িয়েছেন এবং জিতেছেন। তবু মমতা আজ পর্যন্ত কোথাও বলেননি যা তিনি করছেন তিনি সেটাকে সেকুলারিজম নাম দেয়ার কোনো ইচ্ছা করেন অথবা একাজকে সেকুলার বলে ডাকার দরকার আছে। গত রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন নিজ দল আবার বিজয়ী হয়েছে জানার পরে মিডিয়া মন্তব্যের কোথাও এই বিজয়কে তিনি সেকুলারিজমের জয় বলার দরকার মনে করেননি। বরং বলেছেন, বিজেপি হিন্দুত্বের কথা তুলে সব কিছুকে ভাগ-বিভক্ত করে এটা তার অপছন্দ। আবার বিগত ২০১৪ সালে বর্ধমানে কথিত জঙ্গি বোমা ইস্যুতে মুসলমানবিদ্বেষী ও তৃণমূল বিরোধী যে মিথ্যা জঙ্গী-আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল, বিজেপির অমিত শাহ তা করেছিলেন আর লজ্জার মাথা খেয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম এতে তাল দিয়ে নিজের রুটি সেঁকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করেও ফলাফল প্রকাশের দিন তবুও তৃণমূল দল অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি সংযত আচরণ করেছে। বলেনি যে, মুসলমানেরা ‘এবার দেখিয়ে দিয়েছে’। ‘বর্ধমান ঘটনার প্রতিশোধ নিয়েছে’- এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও প্রকাশ করেনি। মমতার দল ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ জুলাই দলের ১২ কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে ‘শহীদ দিবস’ পালন করে থাকে। এবারের ২১ জুলাই দলীয় কর্মসূচিতে জনসভায় দেয়া মমতার বক্তৃতাকে মিডিয়া শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ছাগল মুরগি খেলে দোষ নেই। গরু খেলেই দোষ!”। ” কেউ নিরামিষ খান। তাই বলে যারা আমিষ খান, তাদের আক্রমণ করবেন?”। ” শাড়ি-ধুতিতে দোষ নেই। যত অপরাধ সালোয়ার-কামিজ আর লুঙ্গিতে?” এ ছাড়া নাম না ধরেই বিজেপির বিশেষায়িত দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের (আরএসএস) সম্পর্কেও কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ভারতবাসী কী পরবে, কী খাবে- সেগুলো ঠিক করে দেবে একদল লোক?”। এসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি বুঝে নেয়া যায়। তবে এটা মমতাকে আদর্শ বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে এমন মনে করলে ভুল হবে। মমতার রাজনৈতিক ঝোঁকের ভেতরে ‘রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে হতে হবে’ এমন চিন্তার বাইরে থাকার চেষ্টা আছে। এতটুকুই বলা হচ্ছে। তবে তা শেষে কোথায় যাবে তা এখনই বলতে চাওয়া ভুল হবে।
ইতোমধ্যে মোদির বিজেপি ‘ঘর ওয়াপাসির’ পরে – গরু খাওয়া, জবাই ইত্যাদি নিয়ে আরেক তুলকালাম ‘গোরক্ষা কর্মসূচি’ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখনও পর্যন্ত গরু খাওয়া, জবাই করা যাবে না – এটা কেন্দ্র বা মোদি সরকারের কোনো আইন নয়। কেবল মহারাষ্ট্রসহ আরো কিছু রাজ্যের আইনে তা সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এটা স্থানীয় আইন; বাকি আর রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তা পালনীয় নয়। কিন্তু মোদি সরকার বা খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তিনি বিএসএফকে ‘গোরক্ষার’ পক্ষে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। যেসব রাজ্যে গোরক্ষার এমন আইন নেই, সেখানেও তা ঠেকাতে বিজেপি কর্মীরা মাঠে ‘গোরক্ষক’ সেজে নেমে জনগণকে নাজেহাল করছে। মধ্যপ্রদেশে দুই মহিলাকে তারা মাংস বহন করছিলেন এই অজুহাতে পুলিশের সামনেই তাদেরকে নির্যাতন-নাজেহাল করেছে। দিল্লির শহরতলির ভেতর চলাচলকারী ট্রেনে এমনকি ডিম – তা হাতে নিয়ে কোনো যাত্রী তা বহন করতে পারবেন কি না এটাও এখন ট্রেন কোম্পানি ও পুলিশের কাছে ইস্যু। তারা নজরদরি বসিয়েছে। অথচ ভারতের কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন অথবা উচ্চ আদালতে এসব হিন্দুত্বের দলের বিরুদ্ধে তাদের সেক্টোরিয়ান আচরণ এবং সম্প্রদায়গত বিভেদ বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে েকশন নিবার সুযোগ আছে তা করছে না, কেউ সেখানে অভিযোগ করারও সাহস দেখাচ্ছে না। মানে হিন্দুত্বভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র এতই সেকুলার যে, অভিযোগ করার কাউকে আমরা দেখি না। উলটা দিকে বিজেপিকে থামানোর কেউ নেই। এটা প্রমাণ করে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি কত বেপরোয়া ও ডমিনেটিং। তাহলে?

হঠাৎ গত ৬ আগস্ট থেকে কিছু উল্টা হাওয়া বইতে দেখা গেছে। খোদ নরেন্দ্র মোদি এ দিন নিজেই নিজের দলীয় ‘গোরক্ষকের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদেরকে ‘সমাজবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এরা বেআইনি কাজকারবারে জড়িত!’ “নিজেদের ‘কালো ধান্ধা’ ধামাচাপা দিতেই গোরক্ষকের মুখোশ পরে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে।” মোদির কথায়, ‘এসব দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।’ — অবাক করা হঠাৎ এই গেম চেঞ্জ? এটা কেন? ভারতের মিডিয়া আসন্ন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে এর পেছনের কারণ বলে ব্যাখ্যা করছে। ওখানে ভারতের প্রকট জাতবর্ণের বিভক্তিতে ডুবে থাকা সমাজের দলিত- চর্মকার, ঋষি, কসাই, মাংস ব্যবসায়ী, গরু ব্যবসায়ী ইত্যাদিরা হল উত্তর প্রদেশের এক বড় সমাজ; আসন্ন ভোটে তাদের মন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদের ভোট ছাড়া নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া যাবে না টের পেয়েই নাকি মোদীর এমন হার্ট বদল। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের জনবিন্যাস ও গঠনপ্রকৃতির দিক থেকে (জাতপাতের ধরনসহ) সাথে লাগোয়া বিহার রাজ্যের অনেক মিল। আর গত বছরের শেষে নভেম্বর ২০১৫, বিহারের নির্বাচনের সময়ও একই ভাবে ‘গোরক্ষা’ ইস্যু বিজেপি তুলেছিল ও চলছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিগত ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় ধসের পরাজয় সেটা। ফলে সেই  আশঙ্কা মোদিকে স্পর্শ করেছে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে ভোট-রাজনীতিতে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তিকে স্থায়ীভাবে না হলেও সাময়িকভা্েব দুর্বল কতে নির্বাচন করতে চাইছে বিজেপি। তবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির হার-জিত ভারতে বিজেপি শাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারক উপাদান হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই বলছেন, উত্তর প্রদেশের হার মোদির সরকারের আগামীতে ২০১৯ সালে পরেরবার সরকারে না আসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখা এর আগে গত ১৪ আগষ্ট ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১৫ আগষ্ট প্রিন্টে) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্তন সংযোজন ও এডিট করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]