সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের সাথে প্রথম অস্ত্রবিরতি

সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের প্রথম অস্ত্রবিরতি

গৌতম দাস

২৩ জুন ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sl

 

 

SCO, সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন – এই সংগঠন শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো। এর আজকের জায়গায় আসার পেছনে কয়েকটা ঘটনা পটভূমি হয়ে আছে। সেখান থেকে জানা যায়, এসসিও বা সাংহাই গ্রুপের আজকের ভূমিকা এবং এর সম্ভাবনা ও অভিমুখ। এসসিও (SCO) বা সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন কী ও কেন?

এমনিতেই পুরনো ইতিহাস অর্থে সাধারণভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়ার (মধ্য এশিয়া বলতে পাঁচ রাষ্ট্র বুঝায় কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। যদিও এর বাইরে মঙ্গোলিয়াসহ অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের অংশকেও মধ্য এশিয়া বলতে বুঝানো হয়ে থাকে।) সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ঘটনা ঘটেছিল ইসলাম যখন বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় (abbasid dynasty) খলিফা শাসন (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) আমলে। আগের শাসক চীনা ‘তাং রাজবংশ’ (Tang dynasty) আব্বাসীয়দের হাতে পরাজিত হলে সেন্ট্রাল এশিয়া সদলবলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আর দ্বিতীয় বড় প্রভাবের ঘটনা হল, কলোনি দখলদারি যখন দুনিয়ার মুল অভিমুখ ও সাম্রাজ্য শাসনের স্টাইল সেই আমলে রাশিয়ান জার এম্পায়ারের। সে আমলে ১৮৩৯-৮৫ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে নানান যুদ্ধে রাশিয়ার প্রাচীন জার সাম্রাজ্যের সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়। যতক্ষণ না এর পালটা বৃটিশ এম্পায়ার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার দিক থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্থানে না পৌছেছিল।

আর একালের প্রথম ঘটনা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া (১৯৯১) যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য ছিল রাশিয়াসহ সেন্ট্রাল এশিয়ার ঐ পাঁচ রাষ্ট্রই। তবে রাশিয়াসহ কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরঘিজস্তান এরা সবাই এখন সাংহাই গ্রুপের সদস্য। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে এক জোট গঠন তাদের হাতে শুরু হয়েছিল ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ- এই নাম দিয়ে ১৯৯৬ সালে; তবে তখনো উজবেকিস্তান এতে যোগ দেয়নি বলে তখন ছিল পাঁচ রাষ্ট্র, তাই ‘সাংহাই ফাইভ’।

দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় যে ভয়ে সবসময় দিন কাটাতে হত তা হল, আমেরিকা বা ইউরোপ অর্থে, পশ্চিমা শক্তি যেন ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত থেকে আলাদা হয়ে পড়া ১৫ রাষ্ট্র বিশেষ করে, সেন্ট্রাল এশিয়ার কোন রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব ও খাতির জমিয়ে ঢুকে না পড়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক ধরণের সম্পর্ক জমিয়ে এগিয়ে যেতে না শুরু করে। যদি তা পারে তাহলে প্রায় ১৮৮৫ সালের পর থেকে নিশ্চিত থাকা রাশিয়ার এশিয়ার দিক থেকে নিরাপত্তা এবার হুমকির মুখে পড়বে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়া সবসময় চেষ্টা করে গেছে নানা উছিলা, নানান জোট, সামাজিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক করে এর মধ্য দিয়ে সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকতে। [তবে সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে একটা রাষ্ট্রের কথা এতক্ষণ বাদ পড়ে যাচ্ছে, তা হলো তুর্কমেনিস্তান। কারণ, দেশটি সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশনের সদস্য নয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে না।]

এখন গুরুত্বপূর্ণ কথা, সেন্ট্রাল এশিয়ার নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হল এটা ল্যান্ডলকড এবং চার দিকে পাহাড় পর্বতের ভেতর ডুবে থাকা, এক কথায় বদ্ধ। এশিয়ার সর্বোচ্চ উত্তরে, গহীন পাহাড়ি অঞ্চল। ফলে যত বিদেশী শাসক এর জীবনে এসেছে শেষ বিচারে সে কলোনিপ্রভু এ যেমন সত্য, ততোধিক সত্য হয়ে যে, সেইই তার বদ্ধ-দশা বিশেষত বদ্ধ অর্থনৈতিক জীবনে প্রাণ সঞ্চারের ভূমিকা ও গতি আনার ক্ষেত্রে, ত্রাতা হয়ে কম বেশি ভূমিকা রেখেছে। সেন্ট্রাল এশিয়া গহীন পাহাড় ঘেরা অঞ্চল বলে সেকালের পশ্চিমা শক্তি ইউরোপও এদের দখলে নিতে আসতে পারেনি অথবা এটা তাদের পোষায়নি। তবু শেষ দিকে ব্রিটিশেরা একবার উঁকি মেরেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ এম্পায়ার তার উপনিবেশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে আজকের পাকিস্তান তথা পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা চালাতেই সেন্ট্রাল এশিয়া আরো নিশ্চিতভাবে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে পোক্ত হয়ে যায়।

বলা যায়, সেই থেকে জার সম্রাটের উপনিবেশ হয়ে গিয়েছিল সেন্ট্রাল এশিয়া। এই সত্য পূর্ণ স্বীকার করেও বলা যায়, এই সম্রাট ও সাম্রাজ্যই ছিল তার একমাত্র আশার বাতি। কেন? কারণ ল্যান্ডলকড সেন্ট্রাল এশিয়ার আবদ্ধতা ঘোচানোর ক্ষেত্রে তিনিই একটু সম্ভাবনা। এখান থেকে বের করে সমুদ্রে পৌঁছানোর রাস্তা অথবা অন্য রাষ্ট্রের ভূমি পেরোনোর পর সমুদ্রে পৌঁছানোর সুযোগ কেউ যদি দেখাতে পারেন, তিনি হলেন ঐ উপনিবেশবাদী শাসক জার সম্রাট। ইতোমধ্যে জার সম্রাটের উচ্ছেদ ঘটিয়ে লেনিনের বিপ্লব (১৯১৭) হয়ে গেলেও ‘সেন্ট্রাল এশিয়া হল পুরনো জারের কলোনি’- এই সম্পর্কটাই থেকে যায় কিছুটা নতুন সোভিয়েত কাঠামোতেও। যা হোক, আজো সেন্ট্রাল এশিয়ায় যা কিছু কলকারখানা তা সোভিয়েত সূত্রের এবং তার সমুদ্র দর্শনও। আর অনেক কথার এক কথা হিসেবে বলা যায়, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরে, এখনো সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচ রাষ্ট্রের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অনবরত রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন। এটা তাদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। হয়তো নিজ নিজ স্কুলগুলোতে রুশ ভাষা শেখার সুযোগ আগের মতোই তারা এখনও চালু রেখেছেন।

আর একাল? পুতিনের রাশিয়ার উদ্বেগের মূল কথা উপরে বলেছি। কিন্তু সামর্থ্য বা মুরোদ পুতিনের নেই। সেন্ট্রাল এশিয়ায় আমেরিকাসহ পশ্চিমের কোনো প্রভাব ঠেকাতে হলে আগেই ব্যাপক অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যয় ও বিপুল বিনিয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে। তা হলেই হয়ত সেন্ট্রাল এশিয়ায় পশ্চিমা প্রভাব ঠেকানো সম্ভব। এই বিবেচনা থেকেই পুতিনের সব সামর্থের মূল উৎস হল চীন। পুতিনকে সাথে নিয়ে চীন ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ তৈরি করেছিল। এটা একই সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক জোট হিসেবে হাজির হয়েছিল। তুলনায় আর অন্য সব জোটের কথা আমরা শুনি এরা মূলত সবগুলোই অর্থনৈতিক জোট। এছাড়া এই জোটের ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যে আরো সহজেই আগানোর সুযোগ এর হাতে আসে।

নাইন-ইলেভেনের (২০০১) হামলার পর আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাক হামলা সাংহাই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে প্রথম ধাক্কায় মনে হলেও পরে (২০১১) বুঝা যায়, এটা আসলে আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, নাইন-ইলেভেনের আগেই ২০০১ সালের জুন মাসে আগের ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ নিজেকে SCO, (সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন)- এই নতুন নামে ও ম্যান্ডেটে নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিয়েছিল। এই লেখায় সংক্ষেপে এরপর থেকে একে ‘সাংহাই গ্রুপ’ লিখব।

ওবামার আমেরিকার ২০১১ সালে এসে আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে এ দেশকে বিধস্ত করে ফেলে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূল কারণ ওই যুদ্ধ অনন্তকাল অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এ ছাড়াও যুদ্ধের ব্যয় বেড়েই চলেছিল। এ এক বিরাট জগাখিচুড়ি। জট পাকানো এই দশা থেকে বের হওয়ার সব উপায় আমেরিকা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদিকে যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমেরিকা অপারগ হয়ে শুধু নিজ অর্থনীতি ভেঙে ফেলা নয়, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাও ডেকে এনেছিল। এই পরিস্থিতিই SCO -এর জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়।

লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে সাংহাই গ্রুপের সদস্য সবাই আফগানিস্তানের পড়শি এবং আফগানিস্তানের সাথে তাদের সীমান্ত আছে। ফলে আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পরের পরিস্থিতিতে কারা তালেবান ও প্রো-আমেরিকান আফগান সরকারকে সহায়তা করবে, কে শান্তি স্থিতিশীলতার দিকে নেবে, এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা কারা তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার কোন রফায় পৌঁছাতে পারবে – এমন শক্তির অনুপস্থিতি ও অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, ওই অঞ্চলের সবকিছুকে গভীর সঙ্কটে হ-য-ব-র-ল করে ফেলা আমেরিকা নিজেরও স্বার্থ ছিল এখানে। কিন্তু সে কাজে তার নিজের কোনো ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতা কোথাও ছিল না।

স্বভাবত এই পরিস্থিতিতে চীনের নেতৃত্বে সাংহাই গ্রুপ দুনিয়াজুড়ে সবার কাছেই ‘একমাত্র ত্রাতা’ হয়ে হাজির হয়। কারণ আফগানিস্তানে পশ্চিমা শক্তির তুলনায় যে কারো চেয়ে চীন হল সবচেয়ে বড় গ্রহণযোগ্য শক্তি। এর মূল কারণ, আফগানিস্তানে একমাত্র চীনের হাতেই কোনো অস্ত্র নেই। ফলে অসহায় আমেরিকা প্রকাশ্যে চেয়েছে এবং স্বীকার করেছে চীন আফগানিস্তানে ভূমিকা নিক। সাংহাই গ্রুপ ভূমিকা রাখুক। অন্তত যুদ্ধে ভেঙে পড়া আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে, অবকাঠামো গড়তে।

মোটামুটি ২০১৫ সাল থেকেই চীন আফগান তালেবানদের সাথে ডায়লগে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তবে এর আগেও এবং পাশাপাশি, আফগানিস্তানে সামাজিক পুনর্বাসন, পুনর্গঠনসহ বহু অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে তৎপর হয়ে গেছিল। এ ছাড়াও আফগানিস্তানকে এখন সাংহাই গ্রুপের ‘অবজারভার সদস্য’ করে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রই এ বছর থেকে এর পূর্ণ সদস্য। ফলে সব মিলিয়ে আফগানিস্তান বুঝে গিয়েছিল আমেরিকার মতো চীনের হাতে অস্ত্র নেই, অথচ চীনের হাতে আছে পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশনের সামর্থ্য ও যোগ্যতা। আর শান্তি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যা প্রধান উপাদান, মানুষকে পুনরায় অর্থনৈতিক জীবন ও তৎপরতায় ফিরিয়ে নেয়ার বাস্তব শর্ত- বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা একমাত্র চীনের এবং সে তা দিতে অপেক্ষা করছে।  ফলে চীনা উদ্যোগ এবং তার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা – সহজেই কাজ করতে শুরু করেছিল। এখন শুধু কাজ করতে নয়, ফল দিতেও শুরু করেছে।

এটা টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটা রিপোর্ট। এখানে মূল ঘটনাটা হল চীনের তালেবান ইস্যুতে অর্জন। ঘটনাটা হচ্ছে, সদ্য শেষ হওয়া এই ঈদে তালেবান বনাম সরকার যুদ্ধে এই প্রথম উভয় পক্ষ তিন দিনের অস্ত্রবিরতি পালন করেছে। তাই খবরের শিরোনাম, “Taliban agrees to unprecedented Eid ceasefire with Afghan forces”।  ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এই প্রথম এক সত্যিকারের ঈদ অনুভব। তাঁরা এই প্রথম আত্মীয়স্বজনে মিলে ঈদ পালন করেছে। ওই রিপোর্ট লিখছে, ‘তালেবানেরা ২০০১ সালের পর এই প্রথম আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে। চিন্তাও করা যায় না এমন ঘোষণাটা আসে আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা সপ্তাহব্যাপী স্থগিত ঘোষণা করার দু’দিন পরে। [“The Taliban announced its first ceasefire in Afghanistan since the 2001 US invasion today against the country’s security forces.  The unexpected move came two days after the Afghan government’s own surprise announcement of a week-long halt to operations against the Taliban.] তবে তালেবানদের শর্ত ছিল, এই বিরতি ‘বিদেশী দখলদার’ [আমেরিকা বা তার বন্ধুদের বুঝানো হয়েছে] জন্য প্রযোজ্য হবে না।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মিডিয়া রিপোর্ট হল, পাকিস্তান ও চীনের প্রবল তৎপরতার কারণেই কেবল তালেবানেরা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। [Afghan Eid truce ‘backed by Pakistan, China’] কারণ এব্যাপারে তালেবান নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, “কেবল চীন ও পাকিস্তান গ্যারান্টার হলে তবেই আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাবো। কারণ আমরা বাকিদের (আমেরিকা) বিশ্বাস করি না”।

ডিপ্লোম্যাট মহলে এখন এমন আলোচনা উঠেছে, চীন এমন এক ক্ষমতাবান মধ্যস্থতাকারীর আস্থা অর্জন করেছে যে, চাইলে এক দিকে আফগান সরকারের ওপর চাপ খাটাতে পারে, অন্য দিকে সে কারণে চাপ খাটাতে পারে তালেবানদের ওপরেও। কেন এবং কী করে এটা সম্ভব হয়েছে? কারণ, গত ডিসেম্বর থেকে আফগান-পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চীন নিয়মিত ডায়লগ অনুষ্ঠান করে আসছে। ফলে স্বভাবতই এখন যেকোনো সময় আফগানিস্তানে অস্ত্রবিরতি ডাকা, নেগোসিয়েশনে বসানো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে চীন ঘন ঘন দেখতে পা্রবে বলে সবাই আশা করছে। নিঃসন্দেহে, এটা এক বিরাট আশার আলো।

এখন এর পাল্টা ঘটনাটা স্মরণ করা যেতে পারে। ঘটনাটা হল, গত বছরের আগস্টে ট্রাম্পও তাঁর আফগান পলিসি দিয়েছিলেন। সেখানে ভারতকে আফগানিস্তানে ব্যবসার সুবিধা নিতে ডাকা হয়েছিল আর পাকিস্তানকে তালেবানদের (হাক্কানি গ্রুপ) সহায়তার দায়ে অভিযুক্ত করে সাবধান করা হয়েছিল। সাথে আমেরিকান ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। আসল ঘটনা ছিল অন্য।

পাক-আফগান সীমান্ত চিহ্নিতকরণ নিয়ে বিতর্ক সেই ১৮৯৩ সালের আফগান যুদ্ধ-পরবর্তী “ডুরান্ড লাইন” টানা থেকে। এটা অবাস্তাবায়িত থেকে যাওয়ার মূল কারণ মূল পশতুন বা পাঠান জনগোষ্ঠিকে ভাগ করে ফেলে এই লাইন। ফলে লাইন ফেলে রেখে সীমান্ত পোস্ট বৃটিশ আমল থেকেও বৃটিশ-ভারতের [বর্তমান পাকিস্তান] ভিতরে গাড়া হয়, তাতেও সুরাহা আসে নাই।  এ ছাড়া একালের কয়েক লাখ আফগান উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে এসেছে, এখন তারা প্রায় স্থায়ী। ফেরার নাম নাই।  স্থানীয় পাকিস্তানিদের মতোই সব ব্যবসায় ওরা জড়িত। এসব খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু। এর বিতর্ক খুবই গভীর কিন্তু তালেবান ইস্যু সামনে থাকাতে এর আড়ালে তা কাজ করে থাকে।  খুব সম্ভবত আগাম পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজ প্রভাব তৈরির কথা ভেবে কিছু তৎপরতা পরিচালনা করে থাকে। তাই আফগান তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপের সাথে পাকিস্তান বিশেষ সম্পর্ক রাখে। এটাকেই ট্রাম্প প্রচার করেছেন যেন ‘পাকিস্তানের প্ররোচনাতেই তালেবানেরা তালেবান হয়েছে’- এমন প্রপাগান্ডায় শামিল হয়ে। অপর দিকে, এটাই ট্রাম্পের সাথে ভারতের নীতির মিল। ‘পাকিস্তান মানে তালেবান’- এই প্রপাগান্ডা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে মাইলেজ দেয়। ট্রাম্পের এই প্রপাগান্ডা যেন বলতে চায়, পাকিস্তানই টুইন টাওয়ারে হামলা করেছিল। পাকিস্তানই তালেবানের জনক। অথচ কঠিন বাস্তব তা হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের প্রতিক্রিয়া থেকে পাকিস্তান আমেরিকার ইচ্ছায় বাধ্য হয়ে তালেবান দায় নিয়ে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ করে গেছে, যাচ্ছে।

যা হোক, ট্রাম্পের আমেরিকার পাশাপাশি চীনা কূটনীতির অ্যাপ্রোচ লক্ষণীয়। চীন শুরু করেছে পাক-আফগান অমীমাংসিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা থেকে এবং তাদের ডায়লগ এখান থেকেই। ট্রাম্পের মত পাকিস্তানকে তালেবান বলে গালি দিয়ে, সব দায় চাপিয়ে ওরা শেষ করেনি।
এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট, গ্লোবাল এম্পায়ার বা লিডারের কিছু ভূমিকায় ইতোমধ্যেই চীন আমেরিকাকে সরিয়ে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, ক্রমশ আগিয়ে আসছে চীন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সাংহাই গ্রুপ ও তালেবানের প্রথম অস্ত্রবিরতি”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

গৌতম দাস

২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

http://wp.me/p1sCvy-2hc

 

সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

[জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

গৌতম দাস

মার্চ ২৪, ২০১৭ ভোর ছয়টা

http://wp.me/p1sCvy-2dU

 

 

জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন সম্ভবত প্রায় ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে।  এককথায় বললে এটা হিন্দু (জাতীয়তা) আইডেনটিটির উপর দাঁড়ানো বা আইডেনটিটি পলিটিকসের উপর দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হয়ে আছে। কোন সমাজের সকলে অন্তর্ভুক্ত কোন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ এর এক সাম্যের রাষ্ট্র ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নয়। যদিও মুখে এতটুকু বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। ফলে হিন্দুত্ব ছাড়া অন্য কোন কিছুর উপর তাদের নিজেদের কোন আস্থাই ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো রাষ্ট্র গঠনের কর্তারা পড়েছে হয়ত তবে তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে এরা ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথার উপর ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। দুটোই চাপাবাজির অর্থহীন শব্দ। রিপাবলিক রাষ্ট্রের তিন মৌলিক বৈশিষ্ঠের অর্থ তাতপর্য বুঝলে ও বাস্তবায়ন করলে তো আর এই দুই ফালতু শব্দের (‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ ) দরকার দেখা যেত না। ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র নয় বলেই মুসলমানেরা হিন্দুদের মত সমান নয় বলেই মুসলমানদের সে প্রশ্ন চাপা দিতে বাড়তি এবং অর্থহীন ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ শব্দ দু্যটো আনা হয়েছে। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো আপত্তি বা সমস্যা নেই, বরং তারা কোনো সমস্যাই দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এই ভাবেই চলে ভারতের রাজনীতি, চলে আসছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। তাই বিজেপির প্রথম একক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ট বা একার তৈরি সরকার হল ২০১৪ সালেরটা।  তবুও ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন?

কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ?

তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং গুরু মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে এক নতুন নাম নেন – যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামের সংগঠন একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা দুটাই একই নামে চালাত। পরে ধর্মতাত্ত্বিকসহ সব ততপরতার মূল সংগঠন হয় আরএসএস। আর ১৯৮০ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতার আলাদা সংগঠন হয়  বিজেপি। যদিও  হিন্দু মহাসভার গান্ধী হত্যায় দায় ঘাড়ে এসে পড়ায় গুরুত্বপুর্ব সদস্যরা ১৯৫১ সাল থেকেই হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গত ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি ইত্যাকার সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই কমন নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যনাথের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকেই নির্বাচিত এমপি হতেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। আর এরপর তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে স্বাধীনই থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজস্ব সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এছাড়া এরপরে, ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে “হিন্দু যুব বাহিনী” গঠন করেন। তিন বছরের মাথায় ২০০৫ সালে একভয়াবহ দাঙ্গায় অংশ নেয়ার জন্য এই বাহিনীর সিনিয়র নেতারা অভিযুক্ত হয়েছিল।  এছাটা ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগানোর ঘটনা যেটার লেজ  ধরে পরে  গুজরাতের দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষ সহ ট্রেন পুরানা মামলাতেই এই সংগঠনের সদস্যরা সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’।  আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। আদিত্যনাথের প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতার ভাষা শুনা ও দেখার জন্য এই ইউটিউব ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারেন যেখানে তিনি বলছেন,  “একজন হিন্দু খুন হলে পরে আগামি দিনে আমরা প্রশাসনের কাছে এফআরআই মামলা দর্জ করব না। বরং পালটা এমন দশ ব্যক্তিকে খুন করাব ……”। এছাড়া সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশেকে জড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বলছেন মুসলমান অনুপ্রবেশকারিরা ভারতে এসেছে এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য এখানে দেখতে পারেন।  এছাড়া নিয়মিতভাবে ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা তার প্রতিদিনের রুটিন কাজ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ৭৫ ঘন্টার মধ্যে কসাইখানা বন্ধের আর গরু চলাচলে তার ভাষায় উত্তরপ্রদেশে গরু পাচার করে আনা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব ঘটনাবলিতে হিন্দুত্ব ভিত্তিক কনষ্টিটিউশনে যেমন  “ভদ্র লোকেরা” কোন সমস্যা দেখে নাই, এখানেও তেমন কেউ অসুবিধা দেখে নাই। তবে নিরাপদ দুরত্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যেমন প্রধানমন্ত্রী মোদির যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার পত্রিকা যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে – ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগের মত তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হত। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে নির্বাচন করেছিল মোদি।  ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

গৌতম দাস

২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-29P

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

দুইঃ
হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো

তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো
গৌতম দাস
২২ জানুয়ারি ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-zG

ব্যাপারটা শেষ বিচারে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে বিক্রির প্রতিযোগিতা। চলতি মাসের ১৪ তারিখে রয়টার্সের বরাতে দৈনিক ‘বণিকবার্তা’ বলছে, ১৫০ ডলার ব্যারেলের তেল এখন দাম কমতে কমতে প্রায় ৩০ ডলারেরও নিচে নেমে গেছে। বিগত শেষ ২ বছর থেকে এ কমতি দশা। বিশেষ করে বিগত প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্রমে একটানা বাড়তিতে ২০০৮ সাল থেকে যে তেলের দাম ১৫০ ডলার উঠেছিল প্রথমে পরে সেই দাম নামতে নামতে ৭০ ডলারে থিতু হয়েছিল। কিন্তু গত ৬ মাস থেকে এটাই আবার নামতে নামতে এখন এ ২৭ ডলারে নেমে যাওয়ার দশা। প্রায় ১ বছরের কিছু আগে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্সের এক নিউজ রিপোর্ট শঙ্কা ব্যক্ত করেছিল যে, তেলের দাম ২০ ডলারে পৌছাতে পারে। মনে হচ্ছে, ঘটনা সেই দিকে যাচ্ছে। আল-জাজিরার টক শো “ইনসাইড স্টোরি”তে তেলের দাম ১০ ডলারে নেমে যেতে পারে কিনা তা নিয়ে আলোচনা তুলেছিল গত সপ্তাহে।

তেলের দাম এত উঠাপড়ার সাধারণ কারণ কি আছে
মোটা দাগে বললে, একেক পর্যায়ে তেলের দাম ওঠা বা পড়ার কারণ একেক ধরনের। তাই সাধারণীকরণ না করে প্রতি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণের দিক থেকে তা বুঝতে হবে। যেমন, যে ১৩ বছর ধরে বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে দাম উঠতির কথা বলছিলাম এর প্রধান কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি। ব্যাপারটা মূলত চীনকে ঘিরে। চীনের মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। তাঁর মৃত্যুর আগের শেষ ৬ বছরের সময়কালে পশ্চিমের সঙ্গে (মূলত আমেরিকার সঙ্গে) চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বড় ধরনের রদবদল ঘটায় নতুন করে তা সাজানো হয়েছিল। যার সারকথা হলো, চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি নেবে, চীনে ব্যাপকভাবে বিদেশি পুঁজি আসতে দেবে। অবকাঠামো নির্মাণ খাতে এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ খাতেও। এককথায় গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের দুনিয়ার ভেতর কমিউনিস্ট চীন পুরোপুরি প্রবেশ করবে। অন্যভাষায় বললে, কমিউনিস্ট চীন নিজে এক ব্যাপক পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তরে যাবে এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় পুঁজি চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে আসতে দেবে। এরই মৌলিক নীতিগত রফাদফা সম্পন্ন হওয়ার কাল ছিল ঐ শেষ ছয় বছর। বিস্তারিত রফাদফার খুঁটিনাটি শেষ করে চীনের নিজের অভ্যন্তরীণ আইনকানুন নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন নিয়্মে সাজাতে সাজাতে সময় লেগে যায় প্রায় ১৫ বছর, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এটাকে প্রস্তুতিমূলক বা পিকআপ নেয়ার আগের সময় বলা যেতে পারে। পরের ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছরকে বলা হয় রাইজিং ইকোনমির বা উদীয়মান অর্থনীতির চীন। এই এক নতুন টার্ম, যেটা উন্নত পশ্চিম আর আন্ডার ডেভেলপড (অনুন্নত) তৃতীয় বিশ্ব এই দুই শব্দের বাইরে; নতুন এক শব্দ। মূলত চীনের একেবারে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর প্রভাবে আর যে চার অর্থনীতি – ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা উঠে দাঁড়িয়েছিল মোট এ পাঁচ অর্থনীতিকে বোঝাতেই এই নতুন টার্ম রাইজিং ইকোনমি।

তাহলে কথা দাঁড়াল, তেলের দাম দিয়ে গ্লোবাল অর্থনীতির মতিগতি বুঝতে সেকালে তেলের দাম বৃদ্ধির এক অন্যতম কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি – এটা বুঝতে হবে। এমনটা ঘটার বড় কারণ ছিল ১৯৯০-২০১০ এ ২০ বছরে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ডাবল ডিজিটের জিডিপিতে, যেটা খুবই মূল্যবান লক্ষণ মানা হয় এবং কোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সচরাচর তা দেখা যায় না এমন। বলার অপেক্ষা রাখে না, চীনা অর্থনীতির এ প্রবৃদ্ধির সে সময়ের আর এক লক্ষণ ছিল, ক্রমবর্ধমানভাবে চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা। এ বেড়ে চলা চীনের চলতি যে জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছিল শুধু সেজন্য নয়, বরং পরের কমপক্ষে ২০ বছরের পরিকল্পনায় চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরবরাহের প্রবাহ যেন একই ধরনের থাকে, এজন্য বিভিন্ন দেশের প্রমাণিত রিজার্ভের তেল খনিতে আগাম বুকিং বা ক্রয়চুক্তি করেছিল চীন। অর্থাৎ সার কথা হলো, চীনের অর্থনীতিতে তেলের চাহিদা – এ ক্ষুধার খবর বাজারে রটে থাকাতে তেলের বাজারে বিপুল বিনিয়োগকারীর আনাগোনায় দাম ১৫০ ডলারে উঠেছিল। অতএব ওই সময়ের তেলের উচ্চমূল্য রাইজিং ইকোনমিগুলোর উচ্চ চাহিদার নির্দেশক ছিল।

এখানে মনে রাখা ভাল চীনের অর্থনীতির ওই ক্রমবর্ধমান উচ্চ চাহিদার প্রভাবে গ্লোবাল অর্থনীতিও বৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল ও নাড়াচাড়া পড়েছিল। বিশেষ করে তেল বিক্রির দেশ এবং বাকি রাইজিং ইকোনমির দেশের অর্থনীতিও চাঙা হয়েছিল। তেল বিক্রির দেশ, যেমন রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আলজিরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, দুবাই এদের সবারই বাজেটের বড় বা মূল আয়ের উৎস হল তেল বিক্রি থেকে আয়। কোনো কোনো এমন দেশের ৯০ থেকে ১০০ ভাগ বিদেশি মুদ্রা আয় বা রাজস্ব আয় হল তেল বিক্রি থেকে আসা অর্থ। ফলে চীনের তেলের চাহিদা বৃদ্ধি মানে এসব তেল বিক্রি করা দেশের অর্থনীতি চাঙা করে রাখা। অর্থাৎ একটা চেইন ইফেক্ট বা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতার এক লম্বা শিকলের মতো অর্থনীতি ওখানে ওই পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল। তবে একেক দেশের তেল উতপাদন বা তোলার বিনিয়োগ ইত্যাদির খরচে ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় হলো এ হিসাবে দেখা গেছে, তেল রাজস্বের ওপর নিজের বাজেট নির্ভরশীল বলে মোটামুটি ৯০ থেকে ১০৫ ডলার – তেলের দাম ঐ জোনের মধ্যে বা উপরে থাকলে তা প্রায় সব তেল বিক্রি করে চলা দেশের অর্থনীতি চাঙাভাবে থাকে। রাষ্ট্র হাত খুলে বাজেট তৈরি ও খরচ করতে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রগুলোর সবার বেলায় তেল-রাজস্ব ঠিক মত না এলে ঠিক বাজেট ছাঁটতে হবে এমনটা নয়। বিশেষ করে সৌদি আরব। যদিও এবারই প্রথম এবারের ঘোষিত সৌদি বাজেট ঘাটতি বাজেট বলে দেখানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, সৌদি অর্থনীতি প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা হাফ বিলিয়ন ডলার আয় কম হচ্ছে এই অর্থে সে ঘাটতিতে আছে। আইএমএফের এক অনুমিত হিসাব মতে, গালফ রাষ্ট্রগুলো এ বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় হারাবে। একা সৌদি আরব ইতোমধ্যে গত একবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৬৪৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে বলে সৌদি মনিটারি এজেন্সীর বরাতে আলজাজিরা জানাচ্ছে। 

অন্যদিকে আর একটা খবর আমাদের এ দিকের মিডিয়ায় নজরেই আসে নি। সেই খবরটা হলো, আমেরিকা এখন তেল রফতানিকারক দেশ। অনেকে অবশ্য হতে পারে আগে খেয়াল করেননি অথবা নিশ্চিত ছিলেন না যে আমেরিকা কি তেল রফতানিকারক দেশ ছিল নাকি! জবাব হচ্ছে হ্যাঁ, আগে ছিল না। তবে কথাটা ভেঙে বলতে হবে- ছিল না মানে কী? রফতানি করার মতো তেল ছিল না নাকি, তেল ছিল কিন্তু আইন করে রোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল? হ্যাঁ, দ্বিতীয়টা। অর্থাৎ আমেরিকার রফতানি করার মতো তেল থাকা সত্ত্বেও আইন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল, যাতে রফতানি করা না যায়। এমনকি আমেরিকার যেসব স্টেট বা রাজ্য তেল তুলে বেচার ব্যবসায় জড়িত ও তেল বেচা আয়ের উপর রাজ্য বাজেট বড়ভাবে নির্ভরশীল এমন রাজ্যগুলোর রাজস্ব আয় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে, যেমন আলাস্কা, নর্থ ডাকোটা, টেক্সাস, ওকলাহামা, লুসিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যগুলো।

কবে থেকে এবং কেন?
কারণের বিস্তারে যাওয়া যাবে না এখন, সে অন্য প্রসঙ্গ হয়ে যাবে তাই। তবে সংক্ষেপে বললে, তৃতীয় আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ, আরব জাতীয়তাবাদী হয়ে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় ও শেষবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ হয়েছিল।ঐ যুদ্ধে আরবেরা খুব খারাপভাবে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু এতে এর চেয়ে বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে এরপর সবাই আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা ফেলে নিজ নিজ রাষ্ট্রবাদী-জাতীয়তাবাদ আঁকড়ে ধরেছিল; সেই থেকে আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা আর কেউ বইতে রাজি হয় নাই। যেমন আরব জাতীয়তাবাদী জামাল নাসেরের মিসর এর পর থেকে হয়ে যায় মিসরীয় জাতীয়তাবাদে। এখানে বলে রাখা ভালো, বাক্যগুলোকে এভাবে লেখা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু  এটা “আরব জাতীয়তাবাদ” হারানোর কোন শোক থেকে একেবারেই নয়। বরং কথাগুলোকে আরব জোটবদ্ধতা হারানোর শোক হিসেবে দেখা যেতে পারে। সেভাবেই লেখা। আরব জোটবদ্ধ যেটা ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এখনও খুবই জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু সেসময়ে যুদ্ধে হেরে আরবদের দিক থেকে রাগের মাথায় একটা খুব বাজে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত “তেল অবরোধ” নামে পরিচিত। শুনতেও খুব ভাল, জাতীয়তাবাদী জোশে উঠে দাড়ানোর মত। ব্যাপারটা হল জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ আরবেরা সে সময়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল পশ্চিমকে আর তেল বেচবে না। এই ছিল সিদ্ধান্তের সারকথা। মনে করা হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চিমকে খুব বড় বিপদে ফেলা যাবে। কারণ পশ্চিমা সভ্যতা ও এর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ফসিল ফুয়েল বা মাটির নিচের জ্বালানির ওপরে। দুনিয়াতে যে জ্বালানির বিরাট এক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের দেশে ও দখলে । ফলে পশ্চিমারা বিরাট অসুবিধায় পড়বে। কথা সত্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য এক সত্যও আছে। রিলেশনাল, মানে পশ্চিমের সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকার দিকটা কেউ ভালো করে দেখেনি। তেল না বেচলে ক্রেতার কী দশা হবে, কী অসুবিধায় পড়বে এটা যত বেশি নজর করা হয়েছিল, এর কণামাত্র নজর দেয়া হয়নি এতে বিক্রেতার কী দশা হবে। এতে ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যেন তেল বিক্রি করা বিক্রেতার একটা ঐচ্ছিক ব্যাপার খেয়াল বা শখ। তেল বিক্রি যেন বিক্রেতার দিক থেকেও গভীর প্রয়োজনের বিষয় নয়। অথচ ব্যাপারটা ছিল ঠিক এর উল্টো।  প্রতিটি আরব রাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশেষ করে বাজেটের রাজস্ব আয়ের (৯০-১০০%) একমাত্র উৎস ছিল ফসিল ফুয়েল বিক্রি। ফলে তেল বিক্রি না করলে পশ্চিমা শক্তি বিশাল বিপদে পড়বে সন্দেহ নেই; কিন্তু তেল বিক্রেতা আরব দেশগুলোর অর্থনীতি চলবে কীভাবে? এ দিকটাতে কোন গুরুত্বই দেয়া হয়নি। অতএব বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্তের ফলাফল শেষ বিচারে আত্মঘাতী হিসেবে হাজির হয়েছিল। আরব জাতীয়তাবাদ থেকে মিসরীয় জাতীয়তাবাদ অথবা সিরীয় জাতীয়তাবাদ হয়ে যাওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলোও কাজ করেছিল। শেষ বিচারে তেল অবরোধ হয়ে ওঠে আরবদের জন্যই বুমেরাং, কাউন্টার প্রোডাকটিভ। এ ছাড়া যুদ্ধ কোন ব্যয়-বিনিয়োগ প্রকল্প নয়, বরং আয়বিহীন বা রিটার্ণ না আসা এক বিনিয়োগ। ফলে  একদিক থেকে দেখলে যুদ্ধ মানে একটি রাষ্ট্রের আয়বিহীন এক ব্যয়ে জড়িয়ে পড়া। আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে সব আরব রাষ্ট্রের দশা ছিল তাই। ফলে যখন তেল বিক্রির আরব রাষ্ট্রগুলোর দরকার আরও আয় যাতে যুদ্ধ মানে ওই আয়বিহীন একটি ব্যয়ে ভারসাম্য ফেরে। অথচ তাঁরা পদক্ষেপ নিয়েছিল প্রয়োজনের উলটা – তেল অবরোধ। ফলে তেল অবরোধ সিদ্ধান্ত না টেকার পেছনে এটাও বড় একটা কারণ।
তবু “তেল অবরোধ” নামে তৎপরতাটাই, তা সে যত কম দিন কার্যকর থাকুক তা পশ্চিমকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিল। এরই প্রমাণ হলো আমেরিকার থেকে তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন। পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে আমেরিকা তেলে উদ্বৃত্ত হোক আর না হোক, আমেরিকান তেল কোনো ব্যবসায়ী রফতানি করতে পারবে না বলে আইন পাস হয়েছিল। আইনটা পাসের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, “আমেরিকার নিজের মজুদ তেল সংরক্ষণের (মানে আমেরিকান নিজের তেল একমাত্র শেষ হতে হবে কেবল নিজেরা ভোগ করে, বিক্রি করে নয়) জন্য রফতানিকে নিরুৎসাহিত করতে এই বিল আনা দরকার”, তাই। ‘সংরক্ষণের’ এ কথা থেকে বোঝা যায় তাদের ভয়ের মাত্রা সম্পর্কে।

চল্লিশ বছর এতদিনে পরে এখন সেই আইন সংশোধন করে নেয়া হলো। অর্থাৎ এখন থেকে আমেরিকান তেল রফতানি করা যাবে। লন্ডন ইকোনমিস্ট ১৮ ডিসেম্বর বলছে, মূলত রিপাবলিকানদের উৎসাহ ও তাদেরই আনা বিল এবং তেল ব্যবসায়ী লবি যারা গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছিল এদেরই মিলিত আগ্রহে বিলটা আসে। আর ডেমোক্র্যাটরা যারা সংখ্যালঘু, এখন তারা অন্য একটি কিছু পাওয়ার আসায় সেই বিনিময়ে আনা এই আইনকে পাস হতে সম্মতি দিয়েছে। সব মিলিয়ে আইনটি পাস হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫। প্রায় এক মাস আগে। এই অর্থে এটা কোনো একটা দলের একক প্রচেষ্টা আর অন্যটার বাধা দেয়া নয়, বরং বাই-পার্টিজান বা আমেরিকান দুই পার্টি মিলে নেয়া যৌথ সিদ্ধান্ত। আমেরিকান পুঁজিবাজারবিষয়ক মুখ্য পত্রিকা ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মন্তব্য করে লিখেছে, চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার পরে ‘এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক’ এবং ‘এতে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ের মুখে পড়ে আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটবদল’ প্রতিফলিত। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা গেল চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার ঘটনাটা। কিন্তু ‘তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ে’ ঘটা ঘটনাটা কী? মানে ঠিক এখনই কেন তেল রফতানির অবরোধ তুলে নেয়া?

নতুন ধরনের এক তেলের উৎস একালে চালু হয়েছে- শেল অয়েল। চালু হয়েছে কথাটা টেকনোলজির দিক থেকে বলা- নতুন এক টেকনোলজি চালু হওয়াতে শক্ত শ্লেট থেকে তেল উৎপাদন করা যাচ্ছে। শ্লেট-পেন্সিলে লেখার শ্লেটের মতো দেখতে, স্তরের ওপর স্তর পড়া শক্ত মাটির শ্লেট  – মাটির নিচে এর ওপর উচ্চ চাপ ও তাপের পানি পাঠিয়ে তা থেকে উত্থিত তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করার টেকনোলজি ব্যবহার করে এই তেল উৎপাদন করা হয়। সম্ভবত এটাও আরেক ধরনের জীবাশ্ম, তবে এটা থেকে তেল বের করার কার্যকর টেকনোলজি ছিল না বলে এর ব্যবহার আগে ছিল না। এখন এই টেকনোলজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি ও খরচ পোষায় মনে করাতে শেল অয়েলের ব্যবসায় একটা উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা চলছে। এভাবে তেল বের করার এই টেকনোলজিটাকে বলা হয় ফ্রেকিং। তাই অনেকে এটাকে ফ্রেকিং অয়েলও বলে। অথবা শ্লেট জাতীয় উপাদান বা কাঁচামাল থেকে এই তেল বের করা হয় বলে একে শেল অয়েলও বলা হয়। এ ছাড়া এই টেকনোলজিতে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয় বলে এবং এর প্রক্রিয়ায় প্রচুর অব্যবহৃত তাপ উদ্ভব হয়, যেখানে দুনিয়ার তাপমাত্রা কমানোটাই এখন ইস্যু সেখানে পরিবেশগত দিক থেকে এটা পরিবেশ বিনষ্ট আরো বাড়িয়ে তোলে এমন এই টেকনোলজি। ফলে অনেকে একে নোংরা তেল বা ডার্টি অয়েল নামেও ডাকে। মাটির নিচে  মজুদ শ্লেটের এর দিক থেকে বড় বা শীর্ষে থাকা দেশ হল আমেরিকা, জর্ডান, কানাডা ইত্যাদি। বলা হচ্ছে, আমেরিকান মজুদের পরিমাণ এত বেশি যে, তা দিয়ে আমেরিকান জ্বালানি চাহিদা মেটানো তো বটেই এমনকি তা মিটিয়েও আমেরিকা শেল অয়েল রফতানি করতে পারে। তাই, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকায় এই শেল অয়েল উৎপাদনের জোয়ার উঠেছে। ফলে গত তিন বছর ধরে এই জোয়ার ওঠাতে আমেরিকান মিডিয়ায় শেল অয়েলের বিরুদ্ধে নেগেটিভ দিক যেগুলো আছে তা খুব কমই ছাপা হচ্ছে। এই টেকনোলজির আরেক বড় নেগেটিভ দিক হল এই টেকনোলজি ব্যবহারের তুলনামূলক খরচ মানে তেল বের করা বা তেল তুলার খরচ অনেক বেশি। বলা হয়েছিল বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের বেশি হলে বেশ আয়েশে এই ব্যবসা করা যায়। সারকথায় তরল জীবাশ্ম তেল উৎপাদনের চেয়ে এর খরচ বেশি। সেটা যাই হোক, আমেরিকার এই শেল অয়েল বা ফ্রেকিং অয়েল উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে বলেই এই তেল উৎপাদনকারীদের লবি চাপ ইত্যাদিতে পরে এখন চল্লিশ বছর পরে আমেরিকা থেকে তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হল।

আর ঠিক এখানেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জীবাশ্ম তরল তেল উৎপাদকদের (মূলত মধ্যপ্রাচ্যের) এক কার্টেল-জোট হল ওপেক (OPEC)। ওপেকের সাথে পশ্চিমের স্বার্থবিরোধ অনেক পুরনো। আমেরিকান রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া উপলক্ষে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট গত মাসে ১৮ ডিসেম্বর এক রিপোর্ট বের করেছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা অনুবাদ করলে হয় এরকম : “যুগ যুগ ধরে ‘বাজার’ শব্দটা বিশ্বব্যাপী তেলবাণিজ্যে এক আনফিট শব্দ হয়ে আছে। তেল উৎপাদনকারীদের আন্তর্জাতিক কার্টেল ওপেক শুধু তেলের বাজারে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করেছেই শুধু নয়, নিজের জন্য নানা মাত্রার সফলতাও বের করে নিয়ে গেছে।” এই বাক্য থেকে ওপেকের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধের তীব্রতা টের পাওয়া যায়। সারা দুনিয়ায় যে তেল উৎপাদন হয় এর এক-তৃতীয়াংশ করে ওপেক সদস্যরা সবাই মিলে। আর ওপেকে উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশের কিছু বেশি একাই উৎপাদন করে সৌদি আরব- এটা প্রতিদিন মোটামুটি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল, যেখানে এখন দুনিয়ায় দৈনিক মোট উৎপাদন ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। ফলে ওপেকের কোনো সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। ফলে তেলের বাজারে আমেরিকার শেল অয়েল নিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে সৌদি আরব লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কাজে সে সহজেই ওপেককে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে নিতে পেরেছে। এখানে শেল অয়েলকে ঠেকানোর সৌদি কৌশল হল- শেল অয়েলের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি, সেটাকে কাজে লাগানো। এ কারণে এক দিকে সৌদি আরব ক্রমান্বয়ে তেলের দাম ফেলে দিচ্ছে। আবার একই সাথে ওপেকে জোটবদ্ধ হয়ে উৎপাদন না কমিয়ে (তেলের দাম বেড়ে যাবে বলে) বরং বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে তেলের দাম ফেলে দিয়ে ২০০৩ সালের সমান ২৭ ডলারে নামিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে হটানোর মতো ফল এতে পেয়েছে। যেমন ব্রিটিশ বিপিসহ বহু তেল কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী ছাঁটাই করেছে, নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে, নতুন করে রিগ বসানোর যত পরিকল্পনা তেল তোলা কোম্পানিগুলোর ছিল, সব স্থগিত হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি সৌদি আরবের কম হয়নি। বলা হয়, প্রতিদিন নাকি সৌদি আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানে হাফ বিলিয়ন ডলার কম হচ্ছে। আইএমএফ হিসাব করে বলছে, এ বছরে মধ্যপ্রাচ্য মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হারাবে। আইএমএফ সৌদি আরবকে সাবধান করেছে এভাবে সীমাহীন তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিপদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে।

সৌদিদের এই লড়াইয়ে জেতার কৌশল সহজ। তারা মনে করে, দীর্ঘ দিন ২০ ডলার বা কম দামে তেল বিক্রি করে লোকসান সহ্য করার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে দেউলিয়া বানানোর পরেই সে বাজারের লাগাম টেনে ধরবে, উৎপাদন কমিয়ে তেলের দাম বাড়াবে। এ ব্যাপারে সৌদিদের অনুমিত সময়কাল এক বছর। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বা সৌদিরা দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে। এ বছরের জুন মাসের পর থেকে এসব ব্যাপারে আলামত ফুটতে শুরু করবে সৌদি আরবের বিশ্বাস। এ কাজে তার প্রধান টার্গেট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রথমত আমেরিকান শেল অয়েল। আর এর পরের টার্গেট আবার বাজারে ফিরে আসা ইরান। দেখা যাক কার নার্ভ কত শক্ত, কে কতক্ষণ টেকে!

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ১৭ জানুয়ারি.২০১৬ সংখ্যায়  এবং ১৬ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল।]

তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা : রাশিয়া পশ্চিমের নজর চায়

তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা
রাশিয়া পশ্চিমের জোটে অন্তর্ভুক্তি, অবরোধ তুলে নেয়া ইত্যাদিতে নজর চায়

গৌতম দাস ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-iw

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে সেই কবে পঁচিশ বছর আগে। শুধু তাই নয় ভেঙ্গে রাশিয়া নামে এমন এক ক্ষুদ্র আকার নিয়েছে যে সেই রাশিয়া এখন সব গাইগুই ছেড়ে পুঁজিতান্ত্রিক মুল ধারা বা গ্লোবাল অর্ডারের অংশ। সোভিয়েত ধারার অর্থনীতি বলতে কিছুই ওর ভিতর অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু সোভিয়েত ভক্ত পুরান কমিউনিষ্টদের মাথা ঠেকিয়ে ভক্তি দিবার জায়গার অভাব হয় নাই। তারা এখনও প্রবল ভক্তি সহকারে একালের মাফিয়া রাষ্ট্র পুতিনের রাশিয়াকে পুরান সোভিয়েৎ ইউনিয়নের জায়গায় বসিয়ে ভক্তি সেবা দেয়। মাফিয়া রাশিয়ার হয়ে প্রপাগান্ডায় মেতে উঠে। এটা সত্যিই এক আশ্চর্যের বিষয়। প্রেমের আবেগের সামনে জ্ঞান বুদ্ধি বিবেচনার যে আজও অচল সেটাই বরং আবার প্রমাণিত।
আজকের দুনিয়ার আইএস বা ইসলামী স্টেট ইস্যুটা দিনকে দিন বিশ্ব-রাজনীতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। ব্যাপারটি অনেকটা ‘কুইনাইন সারাবে কে’ অবস্থার মত। ম্যালেরিয়া তাড়ানোর জন্য রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। এতে কুইনাইনে ম্যালেরিয়া তাড়ানো গিয়েছিল কিনা, সেকথা চাপা পড়ে গিয়ে এর চেয়েও বড় ঘটনা হয়ে গিয়েছিল নতুন রোগ – কুইনাইন এ নতুন রোগ ডেকে এনেছে। তা থেকে আবার আরও অনেক নতুন নতুন রোগের বিস্তার ঘটেছে। এই অবস্থা। এভাবে সর্বশেষ জটিল ঘটনাটি হল, তুরস্কের বোমারু এফ-১৬ বিমান এক রাশিয়ান বোমারু এসইউ-৩০ বিমানকে গোলা মেরে ভূপাতিত করেছে। আগেই বলেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের চোখে রাশিয়াই এখন সেই তাদের চোখে পুরান সহানুভূতি পাবার রাষ্ট্র হিসেবে সে জায়গা নিয়েছে। সিরিয়াতে সেই রাশিয়ার বিমান হামলা শুরু হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে। প্রথম এক সপ্তাহ টানা বোমাবাজি করে এরপর থেকে থেমে থেমে যেন গড়ে দিনে একটা করে এবং বেছে বেছে জায়গায় বোমা ফেলা, যেখানে ফেললে তা আসাদের রাষ্ট্র যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে সুবিধা পায়- এভাবে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়ার নতুন যুদ্ধবিমান খুয়ানোর ঘটনাটা ২৪ নভেম্বরের। ওই দিন তুরস্কের বোমারু বিমান রাশিয়ান এক বোমারু বিমানকে গোলা মারার ঘটনাটা ঘটে। এ ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া কার কী ধরনের, কে কী বলেছে এর একটা সঙ্কলন রিপোর্ট তৈরি করেছে আল জাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক। সেই রিপোর্ট অনুসরণ করে এখানে কথা এগোব।

তবে এর আগে কেন তুরস্ক রাশিয়ান বোমারু বিমান ভূপাতিত করল সেদিকে কিছু আলোকপাত করা যাক। বিষয়টা নিয়ে এর স্বপক্ষে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর রাশিয়ান প্রপাান্ডা থাকলেও সিরিয়া-তুরস্কের সীমান্তে হামলা হওয়া ওই অঞ্চলের কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্যের দিকে মনোযোগ দেব। যে অঞ্চলে তুরস্ক-রাশিয়ান বোমারু বিমানে হামলা হয়েছে, অথবা বলা যায় সিরিয়ার যে অঞ্চলে রাশিয়া বিমান হামলা করতে গিয়েছিল সেটা সিরিয়া-তুরস্কের একেবারে সীমান্ত অঞ্চল। সিরিয়ার দিক থেকে তা লাটকিয়া প্রদেশ আর তুরস্কের দিক থেকে সেটা হাতায়ে প্রদেশ- এই হলো দুই প্রদেশের সীমান্ত সেটা। শুধু তাই না, ওই অঞ্চলের বসবাসকারীরা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা টানার বহু ঐতিহাসিক যুগ আগে থেকেই সিরিয়ার ‘সিরিয়ান টার্কম্যান’ বা অরিজিনাল টার্কি বংশোদ্ভূত তবে সিরিয়ায় বসবাসরত বলে সিরিয়ান। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যেহেতু আজকের সিরিয়া বলে কোনো আলাদা রাষ্ট্র ছিল না; বরং আজকের সিরিয়া, ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যই তুরস্কের শাসনাধীন একই অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সীমানা অঞ্চল ছিল। ফলে আজকের সিরিয়ান তুর্কিরা তুরস্কের মূল তুর্কি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার একই অংশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সুলতানের পরাজয়ের পর ওই সাম্রাজ্য ব্রিটিশ-ফরাসিরা গোপন চুক্তির কারণে ভাগাভাগিতে সিরিয়া বলে আলাদা রাষ্ট্র সীমানা টানার সময় লাটকিয়া অঞ্চল নতুন রাষ্ট্র সিরিয়ার ভাগে চলে যায়। এ হলো পুরনো ঐতিহাসিক দিক। আর একালের সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই তথ্য হলো- এক. সিরিয়ান আরব স্প্রিং বা সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই সিরিয়ান টার্কম্যানরা আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে লিপ্ত হয়েছিল এবং এখনও আছে। আর রক্ত এবং আত্মীয়তা সূত্রে তুরস্ক থেকে সব ধরনের সাহায্যপ্রাপ্তিও সেই থেকে তারা পেয়ে আসছে। তুরস্কের সরকারের দিক থেকে সরকারও নিজ টার্ক-জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক সূত্রে সিরিয়ান টার্কম্যানদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা নিজের সমাজের দা্বি । তথ্য দুই. এটা আমাদের প্রসঙ্গের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লাটকীয়া অঞ্চল সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই আইএস অথবা পরবর্তীতে যারা আইএস হয়ে হাজির হচ্ছে তাদের কোনো তৎপরতা বা প্রভাব এখানে নেই, তাদের অনাগ্রহের এলাকা বা মুক্ত এলাকা।
কিন্তু রাশিয়ান বিমান ধ্বংস হওয়ার পর রাশিয়ান বয়ানে সুনির্দিষ্ট করে কেন রাশিয়ার বিমান লাটকিয়ায় গিয়েছিল, তা কোথাও উল্লেখ করে নাই, করতে চায় না। শুধু সামগ্রিকভাবে দাবি করে চলছে যে, পুরো সিরিয়াতে তারা আইএসের ওপর বোমাবাজি করতেই গিয়েছিল। অথচ মাঠের তথ্য হলো, লাটকিয়া প্রদেশ টার্কি বংশোদ্ভূত সিরিয়ানদের সশস্ত্র প্রতিরোধ তৎপরতা সিরিয়া-তুরস্কের এক ধরনের ঘরোয়া মামলা, যার মধ্যে আইএস নেই, স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কিছু নেই। অতএব রাশিয়া লাটকিয়াতে আইএস মারতে গিয়েছিল- এ বয়ান অচল; কারও হজম হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে রাশিয়া ওখানে আইএস মারার উসিলায় আসাদ সরকারকে সামরিক সুবিধা দিতে আর সিরিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ হাসিলে আসাদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ান টার্কম্যানদের উচ্ছেদ করতে গিয়েছিল। এ কাজ করতে যাওয়ার আগে রাশিয়া স্পষ্টত যেদিকটা আমলে নেয়নি তা হল, লাটকিয়ার বাসিন্দাদের রক্ষা করার স্বার্থ তুরস্ক সরকারেরও আছে। রক্ত ও আত্মীয়তা সূত্রে সিরিয়ায় থেকে যাওয়া টার্কদের রক্ষা করতে নিজ জনগণের কাছে তুরস্ক সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তাহলে সার কথা দাঁড়াচ্ছে, লাটকিয়া আসলে সিরিয়া ও তুরস্কের পারস্পরিক স্বার্থে সরাসরি সংঘাতের এক ইস্যু। সিরিয়ায় সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ সংঘাতের শুরু থেকেই লাটকিয়ার বাসিন্দাদের তুরস্ক সব সময় সিরিয়ান বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা করে গেছে। একালে রাশিয়া আইএস মারার উসিলায় তুরস্ক-সিরিয়ার স্বার্থ সংঘাতের ইস্যুতে নিজের হাত ঢুকালে তুরস্ক একইভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াবে এবং তা-ই দাঁড়িয়েছে। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করছিল আল জাজিরা টিভি। তুরস্কের নিজের এই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণকেই ওখানে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে স্বভাবতই তুরস্কের এ স্বার্থের কথা তিনি পটভূমি হিসেবে বলছিলেন। রাশিয়ান বিমান ভুপাতিত করে দেয়ার পক্ষে আইনি বা কূটনৈতিক যুক্তি হিসেবে নয়। হামলার পক্ষে তুরস্কের আইনি যুক্তি হল- রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশসীমা ভঙ্গ করে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং তুরস্ক বিমান বাহিনীর পাঁচ মিনিটে ১০ বার ওয়ার্নিং রেডিও মেসেজ দেয়ার পরও রাশিয়ানরা তা উপেক্ষা করেছে। তুরস্ক ওই মেসেজের অডিও মিডিয়ায় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আল জাজিরায় প্রচারিত মেসেজে শোনা যাচ্ছে ওই সাবধান বাণী। সেই সঙ্গে রাশিয়ান ওই বিমানের দুই পাইলটের বেঁচে যাওয়া একজন পাইলটের দাবিও আল জাজিরা আমাদের দেখিয়েছে। ওখানে তিনি দাবি করছেন, তুরস্ক থেকে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হয়নি।
অবস্থাদৃষ্টে সবমিলিয়ে বললে, বয়ানের ন্যায্যতা ও গাথুনির দিক থেকে রাশিয়া পিছিয়ে পড়েছে। রাশিয়া নিজ বয়ানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।

বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতিক্রিয়া যেটা রয়টার্স থেকে আল জাজিরা টুকে এনেছে; ওখানে দেখা যাচ্ছে, পুতিনের ভাষ্যটা যেন হার স্বীকার করা হারু পার্টির ভাষ্য। যেমন- পুতিন দাবি করছেন, বিমানটা বোমার গোলা খাওয়ার পর ওর ভাঙা অবশেষ সীমান্তে সিরিয়ার দিকে চার কিলো ভেতরে পড়েছে। অতএব আমরা সিরিয়ান সীমার ভেতরেই ছিলাম, তুরস্কের সীমানায় ঢুকিনি। – এগুলো খুবই হাস্যকর যুক্তি। কোন মীমাংসায় আসা যায় না এমন দাবি, তবে মুখ রক্ষায় কাজে লাগে এমন যুক্তিও। সাধারণত যে কোনো বোমারু বিমান এক মিনিটে কমপক্ষে ১০-১৫ কিলোমিটার পার হয়ে যায়, এছাড়া টার্কিশ আকাশ সীমায় গুলি খেয়েও কোনো বিমানের পড়ার মাটি সিরিয়া হতেও পারে। সুনির্দিষ্টভাবে এক্ষেত্রে তুরস্কও দাবি করছে, রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং ১৭ সেকেন্ড ধরে ছিল। কাজেই সিরিয়া-তুরস্কের এসব সেকেন্ড-মিনিট দিয়ে মিডিয়া বয়ান কারও নিজের পক্ষে প্রমাণ হিসাবে কাজে আসবে না। বরং যে প্রশ্নে রাশিয়ানরা চুপচাপ তা হল, লাটকিয়া আইএসবিহীন অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ান বিমান ওখানে কেন গিয়েছিল! সেখানে আমাদের জবাব খুঁজতে হবে। যুদ্ধবিমান গোলা খাওয়ার পরে পুতিন অভিমানের ভাষায় বলছেন, “বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।” এছাড়াও বলছেন, “তারা (মানে তুরস্ক) কি ন্যাটোকে আইএসের পক্ষে খেদমতে লাগাতে চায়?” পুতিনের এ দুই বয়ানের পিঠে আগাম ধরে নেয়া আছে যে, রাশিয়ান পাইলটরা যেন আইএস মারতে ওখানে গিয়েছিল আর সেই যোদ্ধা রাশিয়ার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অথচ রাশিয়ান পাইলটরা ওখানে কোনো আইএস মারতে গিয়েছিল, তাই তো প্রতিষ্ঠিত নয়। পুতিন আমাদের ধরে নিতে বলছেন, সিরিয়ার যে কোনো জায়গায় রাশিয়ান বিমানের যাওয়া মানেই তা শুধু আইএসের ওপর বোমা মারতে যাওয়া। অথচ রাশিয়ার ভালোভাবেই জানা থাকার কথা যে, লাটকিয়ায় সিরিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ আর তুরস্ক রাষ্ট্রের স্বার্থ সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে আইএসবিহীন ওই অঞ্চলে রাশিয়া যাওয়ার অর্থই হল আসাদের পক্ষে ভারসাম্য আনতে সরাসরি তুরস্কের বিপক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। অতএব তুরস্কের গুলি খেয়ে বিমান হারানোর রিস্ক রাশিয়া তো আগে থেকেই জেনেশুনে নিজেই নিয়েছে। এছাড়া যেদিন রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত হয় সেদিনই রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের কথা ছিল, যা ঐদিনের ঘটনা প্রেক্ষিতে পরে বাতিল করা হয়। ফলে কোনো বিশেষ কারণে রাশিয়াকে যদি লাটকিয়ায় বোমারু বিমান নিয়ে যেতেই হয়, তবে তা নিয়ে ওই সম্ভাব্য সভায় তুরস্কের সাথে মুখোমুখি বসে আগেই রাশিয়ার সিদ্ধান্ত সমন্বয় করে নেয়া যেত। অথচ রাশিয়া যেন ধরেই নিয়েছিল, আইএস মারার নাম করে রাশিয়া আসাদের পক্ষে মাঠের পরিস্থিতি এনে দেবে আর কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না!
এ বিষয়ে ওবামার বক্তব্যের ভেতর একটা বাক্য আছে। ওবামা বলছেন, লাটকিয়ায় রাশিয়ানরা ‘মডারেটবিরোধী’ (মানে আইএস বাদে অন্য মধ্যপন্থী আসাদবিরোধীরা) বিরুদ্ধে অ্যাকশনে চলে গেছে। অর্থাৎ ওবামাও তার বক্তব্যে পুতিনকে বকা দিয়ে কথা বলেছেন।
সেকালের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধী আমেরিকা ও ইউরোপের মিলিত যুদ্ধজোট হল ন্যাটো বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন,যার জন্ম ১৯৪৯ সালে। আর তুরস্ক ওর সদস্যপদ পায় বা নেয় ১৯৫২ সালে।
ফলে রাশিয়ান বিমানের ভূপাতিত হওয়ার পর এ ইস্যুতে সাধারণভাবে সব ন্যাটো সদস্যই তুরস্কের পক্ষে দাঁড়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের কারণে বাধ্য। তাই দেখা যায়, হামলার পরের বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমবাক্যেই তুরস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু পরের বাক্যে তুরস্ক ও রাশিয়ার দুই রাষ্ট্রের প্রতি আবেদন রেখেছেন যেন সামরিক টেনশন আর না বাড়ানোর ব্যাপারে দুই পক্ষ সংযত থাকে। অর্থাৎ ইঙ্গিতটা হলো, বাকি ন্যাটো সদস্যরা তুরস্কের পক্ষে দাঁড়ালেও ন্যাটোর কোনো সদস্য বিষয়টা নিয়ে আরও কোনো উত্তেজনা, কোনো সামরিক সংঘাতের দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে না। তারা বরং মূল শত্রু আইএসের ব্যাপারে সবাই একজোট হয়ে অ্যাক্ট করতেই চাচ্ছে।
এ ব্যাপারে সিরিয়ান সরকারের বিবৃতি স্বভাবতই রাশিয়ার পক্ষে। তবে রাশিয়ার পক্ষে এক আইনি যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করেছে সিরিয়া। রাশিয়ার বিমান ভূপাতিত করায় তুরস্কের এ কাজকে “অ্যাক্ট অব এগ্রেশন” বলে চিহ্নিত করেছে সিরিয়া। এটা জাতিসংঘের আইনি ভাষা। অর্থ “আইন লঙ্ঘন কর হামলা করা”।
তাই তুরস্ক সরকারের বিবৃতিতে সিরিয়ান অভিযোগের পাল্টা জবাব দেয়া হয়েছে। বলেছে, “তুরস্কের তৎপরতা (বিমান ভূপাতিত করা) অন্যের ভূমিতে বেআইনি প্রবেশ করে হামলাকারী হওয়ার মতো কাজ নয়”। এই হল, তোলা অভিযোগ আর এর বিরুদ্ধে কাটান দেওয়ার কেচাল। এসবের বাইরে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এসব পাল্টাপাল্টির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা। কারণ তাঁর রাষ্ট্রস্বার্থ আইএস বিরোধী জোটে রাশিয়ান অন্তর্ভুক্তি দেখতে চাওয়ার তাগিদ আছে। তিনি বলছেন, (রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে) সামরিক উত্তেজনা আর যেন না ঘটে, সেদিকে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আইএস দমনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিক্রিয়া এবং ওবামার প্রতিক্রিয়ার প্রথম অংশ এভাবে সবারই প্রতিক্রিয়ার সাধারণ দিক হল, সবাই জোর দিচ্ছেন রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আর না বাড়ানো এবং আইএসবিরোধী জোটে সবাইকে সামিল করা।
সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নিট ক্ষতিটা হলো রাশিয়ার। রাশিয়ান এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান একেবারেই নতুন হাইটেক বিমান- এমন যুদ্ধবিমান রাশিয়াকে খোয়াতে হল। অথবা বলা যায়, আইএসবিরোধী পশ্চিমা জোটে অন্তর্ভুক্তি পেতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমা অবরোধের মধ্যে থাকা রাশিয়াকে যে মূল্য দিতে হল তা বোধহয় বেশ বেশি। তবু এটা রাশিয়াকে পশ্চিমের সাথে জোটে ঢুকিয়ে দেয়ার পক্ষে তা এক কদম আগাম পদক্ষেপ। রাশিয়ার কাছে এটা যথেষ্ট দামি। তবে মাঝখান থেকে রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বিনিময় অচল হয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধবিমান হারিয়ে রাশিয়া তুরস্কের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। পুতিনের রাগ, ক্ষোভ তো কারও কারও ওপর পড়ে তবেই না প্রশমিত হতে হবে! তবে লাটকিয়ায় পুতিনের বেকুবি থেকে তিনি কী কোনো শিক্ষা নেবেন? দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

দুইঃ

বিশ্বযুদ্ধ কোন ছেলেখেলা নয়!
রাষ্ট্র মাত্রই ওর পরিচালনার মধ্যে নিজের পক্ষে প্রপাগান্ডা করা একটা কাজ। কিন্তু সে প্রপাগান্ডা আপনি বিশ্বাস করে বসবেন কিনা,ঐ প্রপাগান্ডাকে সত্যি মনে করে নিজের চিন্তা সে আলোকে মানে নিজেকেও সাজাবেন কী না এর দায়দায়িত্ব সম্পুর্ণ আপনার নিজের। কানাডায় রেজিষ্টার্ড অফিস নিয়ে বসা রাশিয়ার এক প্রপাগান্ডা ওয়েব সাইট আছে, “গ্লোবাল রিসার্চ” নামে। রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের বরাতে বা বরাত উল্লেখ করা ছাড়াই বিভিন্ন খবর ওখানে ছাপা হয়। অর্থাৎ বুঝা যায় রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্স ডাটা ও রিপোর্টে ঐ গ্লোবাল রিসার্চের কর্তাদের একসেস বা প্রবেশাধিকার আছে। তা খারাপ কী! ওয়েষ্টার্ণ সুত্রর বরাতের বাইরে এই উছিলায় আমরা কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা ওখান থেকে পেতে পারি। কিন্তু সেসব তথ্য নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের অবশ্যই সাবধান হতে হবে, ‘ইন-বিটুইন দা লাইন’ নিজের মত করে পাঠ নিতে হবে কারণ ওসব তথ্যের সাথে আবার রাশিয়ান প্রপাগান্ডা-স্বার্থও মিশান আছে। ফলে টুইষ্ট আছে। সেদিকে খেয়াল রেখে তা বাদ রেখে বেছে পড়তে হবে। ঐ সাইটের টার্গেট পাঠক আপনিও হতে পারেন যদি দেশে দেশে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রগতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের একজন খাতক হিসাবে আপনি নিজেকে এখনও মনে করেন। আর সেই সাথে যদি মনে করেন রাশিয়ান রাষ্ট্রের স্বার্থই আপনার স্বার্থ,মানে রাশিয়ান রাষ্ট্রের বৈদেশিক স্বার্থ-ব্যাগেজ বইবার দায় আপনি নিয়েছেন।
তো ঐ সাইটের অনেক প্রপাগান্ডা ইস্যু ও মেটেরিয়ালের মধ্যে একটা হল “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” এমন একটা দামামা বছরের পর বছর ধরে বাজিয়ে চলা। প্রায়ই বাংলাদেশে দেখা যায় অনেক পুরান কমিউনিষ্ট পুরান অভ্যাসে বাছবিচারহীনভাবে ঐ দামামা বাজানোতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তেমনই এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২৬ নভেম্বর দৈনিক মানবজমিনে – “মুখোমুখি তুরস্ক-রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী আসন্ন?” – এই শিরোনামে।
দুনিয়াতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন দিন হতে পারে না – এমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে না কেন; হলে আমেরিকার পতন হবে ফলে এমনটা দেখতে চাওয়ার একটা প্রবল কামনা রাশিয়ার আছে। এবং সেটাও হয়ত তেমন দোষেরও কিছু নয় যতক্ষণ না এটা যুক্তিবুদ্ধি বিচারহীন ম্যানিয়াক হয়ে না চাওয়া হয়, প্রপাগান্ডার ঘ্যানর ঘ্যানর করে ফেলা না হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য রাশিয়ার বিশেষত পুতিনের রাশিয়ার সে সমস্যা প্রবল। ১৯৯১ সালের আগে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন (আজকের রাশিয়ার পুর্বসুরি) আমেরিকার সাথে পরাশক্তিগত টক্কর দিত রাশিয়ার আর সেই যৌবন নাই। অথচ আমেরিকা অটুট আছে শুধু না, ইতোমধ্যে এক মেরুর দুনিয়া ভোগ করার সুবিধা নিয়েছে। এটা যেন রাশিয়ার কিছুতেই আর সহ্য হয় না। যদিও আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াও আর টিকছে না। সেই নেতৃত্বে বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলা একালে ক্রমশ ভাঙছে এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তা ঘটাবার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোন ভুমিকা নাই; এটা রাশিয়ার হাতে নাই – না এটা ঘটাতে, না এটা ত্বরান্বিত করতে। বরং সবচেয়ে বড় নির্ধারক ভুমিকা আছে চীনের, তবে সেটাও অবজেকটিভ। অর্থাৎ এটা চীনা নেতাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রসুত নয় বরং চীনের বৈষয়িক অর্থনৈতিক অর্জন উন্নতির কারণে পরোক্ষে পড়ে পাওয়া লাভ। এটা ঠিক আমেরিকার দুনিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্দেশ্যেই করা চীনের ততপরতা নয় বরং নিজের অর্থনৈতিক উত্থানের পক্ষে কাজ করে যাওয়া চীনের কারনে যেটা পরোক্ষ অর্থে – আমেরিকার দুরবস্থা এবং বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলার নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও নতুন অর্ডার জন্ম আসন্ন হয়ে উঠা। এই পালাবদলটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে ষ্টাডি, আগাম অনুমান করা বলতে পারা ইত্যাদির জন্য বারদিকে বিস্তর গবেষণা পড়ালেখা চলছে। গত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ সংখ্যায় লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এবিষয়ে এক রিপোর্ট ছেপেছে। ওর সারকথা হল, দুনিয়াতে একালের পালাবদল পরিবর্তন বিষয়টার কিছুটা সমতুল্য পুরান ঘটনা হল ১৩৫ বছর আগের। সেটা হল, ১৮৮০ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আমেরিকান অর্থনীতি যখন দিনকে দিন ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। আর দুনিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য ১৯১৩ সালের দিক আর পাউন্ড-স্টার্লিংয়ে না ঘটে বরং এর চেইয়ে বেশি আমেরিকান ডলারে হওয়া শুরু করেছিল। ইকোনমিষ্টের উদ্দেশ্য হল, সেকালের ঘটনাবলি পাঠ করে সেখান থেকে একালে কোন আগাম অনুমান করা যায় কীনা! কতটা করা যায় ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে জিনিষটা সুনির্দিষ্টভাবে নিজের মত ঠিক করা লম্বা পা ফেলে আগাচ্ছে এবং যার উপর রাশিয়ার কোন হাত নাই তা নিয়ে প্রপাগান্ডা করা যে – “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” বলে দামামা বাজানো যে কোন সময় বুমেরাং হতে পারে। বিশেষ করে আজকের রাশিয়ান অর্থনীতি হল, মাটির নিচের তেল-গ্যাস সম্পদ বিক্রি করে জমিদারি ফিউডাল দশায় যেন ফিরে যাওয়া অর্থনীতি, যার কোন শিল্প-ইন্ডাষ্টি ভিত্তি নাই। একালে রাশিয়ার যা আছে তুলনায় সেটা উন্নত শিল্প ভিত্তির ইউরোপের কোন রাষ্ট্র দূরে থাক, দক্ষিণ কোরিয়া লেবেলেরও নয়। সার কথায় রাশিয়ার পরাশক্তি ষ্টাটাস খুবই নড়বড়ে, কোন শক্ত শিল্প অর্থনৈতিক ভিতের উপর তা দাঁড়ানো নয় বরং তেল-গ্যাস বেচা অর্থনীতি। ফলে খুব সহজেই ৪০ ডলারে নেমে যাওয়া তেলের কারণে আর এর উপরে পশ্চিমা দেশের অবরোধে রাশিয়ার অর্থনীতি আরও চরম দুর্দশায় পড়েছে, পশ্চিম এঅবস্থায় রাশিয়াকে ফেলতে পেরেছে। সারকথায় আমেরিকান অর্থনীতি দুর্বল হয়ে তার বিশ্ব-অর্থনৈতিক অর্ডারে নিজের নেতৃত্বের স্থান থেকে চ্যুত হওয়াটা বাস্তবে চীন বা অন্যান্য রাষ্ট্রের রাইজিং অর্থনৈতিক অর্জনের মধ্য দিয়ে ঘটাবার, বাস্তবে করে দেখানোর মত কাজ। এটা প্রপাগান্ডা চালিয়ে অর্জন করার মত কাজ নয়। এছাড়া শকুনের বদ-দোয়ার কারণে বেশি বেশি করে গরু মরে ভাগাড়ে আসে না। এটা তো জানা পুরান প্রবাদের কথা। ফলে বদ-দোয়া দিয়ে, কামনা করে, প্রতিহিংসা দিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে দুর্বল করা যাবে না। হবে না।
এছাড়া বারবার যে কথা বলি, কোল্ড ওয়ার (১৯৫০-৯০) কালের চল্লিশ বছরে একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবার সম্ভাবনা যত বেশি ছিল সে তুলনায় এখন বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা ঠিক এর উলটা, অর্থাৎ আরও কম। এর মূল কারণ সেকালে বিবদমান পক্ষ রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাবের লেনদেন বিনিময় তেমন কিছু ছিলনা বললেই চলে। দুটা দুই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন লেনদেনহীন অর্থনীতি ছিল। সে তুলনায় আজ রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাসহ সবাই একই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ; পরস্পর পরস্পরের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাব ইত্যাদির লেনদেনে আষ্টেপৃষ্ঠে সংশ্লিষ্ট ও একে অন্যের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে চীনের বোমায় আমেরিকা ধবংস হয়ে গেলে সেটাতে চীনেরই ক্ষতি হয় এবং তা আমেরিকার বোমার বেলায়ও ভাইস ভারসা। অতএব একটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটে যাবার সম্ভাবনা এখন আগের মানে কোল্ড ওয়ার সময়ের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম। অবশ্য এর অর্থ আবার এমন নয় যে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতেই পারে না। ঠিক এই জিনিষটাই প্রতিফলিত হয়েছে এই সপ্তাহে তুরস্কের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় রাশিয়ান বোমারু বিমান ভুপাতিত হবার পরের পরিস্থিতি। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের বাধ্যবাধকতায় বাকী সদস্য সারা পশ্চিমাদেশ তুরস্কের পক্ষে দাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু সাথে যোগ করা এক নিঃশ্বাসে বলা তাদের পরের বাক্যই হল – তুরস্ক ও রাশিয়া যেন আর উত্তেজনা না বাড়ার দিকে খেয়াল রাখে; এছাড়া আইএসের বিরুদ্ধে সকলের সমন্বয় গড়ে তোলা এখনকার করণীয়। ওদিকে মানবজমিনের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, যেসব বিশ্লেষণ মেনে সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয় ছড়াচ্ছে তা সবই রাশিয়ান উৎসের বয়ান। যা এমনকি পারমানবিক যুদ্ধ বাধাবার ইঙ্গিত হুমকিতে ভরপুর। আসলে এটা রাশিয়ার এক নতুন যুদ্ধবিমান হারিয়ে এবার ইজ্জত ইমেজ রক্ষার ততপরতা মাত্র।
আর আমরা? অনেক তো হল, এবার আমাদের পরিপক্ক হওয়া দরকার। একালে রাশিয়ান বেকুবি, রাষ্ট্রের মাফিয়াগিরি আর রাশিয়ান স্বার্থের প্রপাগান্ডা দূরে রেখে নিজ হুশ জ্ঞানে বাস্তবতা বুঝা ও ব্যাখ্যা করতে পারার তাকত অর্জন দরকার। আমাদের সে তৌফিক হোক এই কামনায় -।

 

[লেখাটা আর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ২৮ নভেম্বর সংখ্যায় এবং শেষের অংশ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৩ ডিসেম্বর সংখ্যায় এর আগে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা নতুন করে আরও সংযোজন ও এডিট করে সর্বশেষ এডিটেড ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

 

ইরাকঃ আধুনিক রাষ্ট্র লজিকের আর বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা

ইরাকঃ আধুনিক রাষ্ট্র লজিকের আর বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা

গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-7Y

০১ আগস্ট ২০১৪।
চলমান ইরাকের সঙ্কট গত কয়েকমাসে মিডিয়ায় নতুন মাত্রায় শিরোনাম হতে শুরু করেছে প্রথমে ISIL এর আন্দোলন নামে পরে ইরাককে খলিফা রাষ্ট্রের ঘোষণায়। এতে সমস্ত মনোযোগ গিয়ে জড় হয়েছে এই শব্দ দুটোতে – ISIL আর খলিফা রাষ্ট্র। এটা ইরাক রাষ্ট্রের সঙ্কটের এক নতুন মাত্রা। যদিও ইরাক রাষ্ট্রের সঙ্কটকে এখানে ব্যাখ্যা করব মূলত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর থেকে; ইরান বিপ্লবের সাথে ইরাকের ভাগ্য ঘোরতরভাবে সম্পর্কিত। এটা সঙ্কটের অবশ্যই দ্বিতীয় পর্যায়। আর প্রথম পর্যায়ের আর এক সঙ্কটও ছিল যেটাকে ১৯১৯ সালে বৃটিশ-ফরাসী কলোনি মাষ্টারের দেয়া জন্ম সঙ্কট বলা চলে, সেটা কলোনি ভাগবাটোয়ারার স্বার্থে ইরাকের বর্তমান রাষ্ট্র সীমানা যখন টেনে ইরাক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়েছিল। তবে প্রসঙ্গ এখানে দ্বিতীয় পর্যায়ের সঙ্কটের দিকেই, ওর গোড়ার কিছু মৌলিক ইস্যুর দিকে পাঠকের নজর ফিরাব।
দেশে দেশে বিপ্লবের কথা আমরা অনেক শুনেছি। শুনে আমরা অনেকে আপ্লুতও হই। বিপ্লবী ক্ষমতা্র উত্থান – বলতে প্রচলিতভাবে অনেকে যেমন অনেকে ধরে নেন একটা কমিউনিষ্ট বিপ্লব ঠিক তা নয়। এখানে বিপ্লব বলতে শুধু কমিউনিষ্ট বিপ্লবে তা সীমাবদ্ধ এমন ধরে না নিয়ে বরং ইরানের মত ইসলামি বিপ্লব অথবা যেকোন র্যা ডিক্যাল বিপ্লবী ক্ষমতাকেও ধরে নিয়ে কথা বলব। আবার, মোটা দাগে যেকোন “বিপ্লবী ক্ষমতা” বিষয়টাকে তিনটা পর্বে ভাগ করতে পারি -১) বিপ্লবী ক্ষমতা তৈরি, ২) তা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল আর ৩) পরের এক বড় ধাপ হল সে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু প্রথম দুইটা পর্যায় সম্পর্কে আমরা যতটা অনুসরণ করি ও খবর রাখি “ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার দিকটা” আমাদের কাছে ততটাই অনালোকিত হয়ে দৃষ্টির বাইরে থেকে গেছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই কাজটা নিয়ে এপর্যন্ত কোন রাজনৈতিক তত্ত্ব নাই। তবে কিভাবে বাস্তব ইতিহাসে তা ঘটেছে সেদিকে এখানে আলো ফেলব।

বিপ্লব কমিউনিষ্ট অথবা ইসলামি হোক, তা এক গ্লোবাল বিপ্লবের ধারণা
“বিপ্লবী ক্ষমতা” বিষয়টা্র প্রথম দুই পর্ব – বিপ্লবী ক্ষমতা তৈরি ও ক্ষমতা দখল উদ্যোগেরও আগের কাজ, বিপ্লবী তত্ত্ব বা আইডিয়া হাজির করার একটা পর্যায় থাকে। ইডিওলজি (ideology) হিসাবে আইডিয়া (idea) – এদিক থেকে দেখলে যেহেতু এটা আইডিয়া অর্থাৎ চিন্তা বা ভাব ফলে এমনিতেই তা নিজ ভুখন্ড ছাড়িয়ে দুনিয়ায় যেকোন কোণে তা ছড়ানোর যোগ্য। চিন্তা ও চিন্তার প্রভাব রাষ্ট্রীয় সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না; বিশেষত ইডিওলজি যদি নিজেই গ্লোবাল হয় অর্থাৎ গ্লোবালভাবে ঘটবার, ঘটাবার দাবি কর্তব্য সাথে নিয়ে হাঁটে সেক্ষেত্রে ‘আইডিয়া মানেই তা রাষ্ট্রীয় সীমানা ছাড়িয়ে দুনিয়াব্যাপী প্রয়োগ-প্রযোজ্য’ – এই কথাটা আরও পোক্ত হয়ে উঠে। এই বিচারে কমিউনিষ্ট বিপ্লব অথবা ইসলামি বিপ্লবের ধারণা –এগুলো গ্লোবাল বিপ্লবী তত্ত্ব; গ্লোবাল ইডিওলজি; এর প্রয়োগ-প্রযোজ্য এলাকা দুনিয়াব্যাপী – ‘প্যান’ বা নিখিল জুড়ে।
কিন্তু একটা বিপরীত বাস্তবতা হল, আইডিয়া গ্লোবাল হলেও যে মানুষ বা যারা এই আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য লড়বে তাদেরকে নির্দিষ্ট ভুখন্ড দাঁড়িয়েই লড়তে হয়, এর অন্যথা হবার যো নাই। যেমন কমিউনিষ্ট বিপ্লবের তত্ত্বটা গ্লোবাল, কিন্তু সুনির্দিষ্ট ভুখন্ড রাশিয়াতেই সেটাকে প্রয়োগে বাস্তব সত্য করে তুলতে গিয়েছিলেন লেনিন ও তার সাথীরা। অথচ আগেই বলেছি, যা নিয়ে বিপ্লবীরা লড়বে সেই চিন্তা, ভাব বা আইডিয়া মাত্রই ওর প্রয়োগ প্রযোজ্যতা প্রভাব তখনও গ্লোবালই থেকে গিয়েছিল। আবার, ওদিকে তত্ত্ব গ্লোবাল বলে স্বাভাবিকভাবে এর এনিমি বা শত্রুও তো গ্লোবালই হবে। কেন শত্রুও গ্লোবাল হবে সে কথাটা আবার অন্য আর দিক থেকে আরও বেশি সত্য। যেমন, যতদিন যাচ্ছে জাতীয়, স্থানিক বা লোকাল ক্যাপিটালিজম বলে আর কিছুই থাকছে না, থাকবে না; স্থানীয় অর্থনীতিগুলো ততই পরস্পর আরও ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত ও গভীর থেকে গভীরতরভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম হয়ে উঠছে, আরও উঠবে। লোকাল ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই এই অভিমুখ চোখা হয়ে হাজির ছিল। ফলে এর বিপরীতে ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে নানান ভুখন্ডে প্রতিরোধ যেকোন লোকাল রাষ্ট্রীয় সীমার আন্দোলন লড়াই সংগ্রাম হলেও ওর গ্লোবাল দিক ছিল ও আছে এবং সেটা আর পিছনের শত বছর মত সুপ্ত না থেকে স্পষ্ট মুর্ত হয়ে হাজির হচ্ছে, হবেই। ফলে স্থানীয় ইতিহাস মানেই তা এখন স্পষ্ট গ্লোবাল ইতিহাসের উপাদান হয়ে হাজির হচ্ছে। অন্যভাবে বললে যে কোন স্থানীয় প্রতিরোধ আন্দোলন মাত্রই তাতে গ্লোবাল আকার ধারণ করার উপাদান থাকবে।
তাহলে সারকথাটা দাড়ালো, আইডিয়া গ্লোবাল তবু স্থানীয় ও সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রে দাঁড়িয়েই সুনির্দিষ্ট ভুখন্ডে প্রকাশিত প্রতিভাত সুনির্দিষ্ট ও আপাত লোকাল কিছু ইস্যুকে কেন্দ্র করেই লড়াই সংগ্রাম শুরু ও সংগঠিত হচ্ছে, হবেই। আর লোকাল এসব আন্দোলনের গ্লোবাল দিক অভিমুখ থাকলেও বাইরে থেকে দেখে তাকে আবার আপাত লোকাল আন্দোলন ও সংগ্রাম মনে হবে। কিন্তু এবার গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রশ্ন – কে এই লড়াইয়ে বাধা হবে? বাধা দেবার শক্তি হবে মূলত লোকাল রাষ্ট্রই। অবশ্যই এমনও হবে, ফোরফ্রন্ট্রে লোকাল রাষ্ট্র থাকবে যদিও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সুত্রে সহজেই সম্পর্কিত থাকা গ্লোবাল পরাশক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধাদানের জন্য স্থানীয় রাষ্ট্রের পক্ষে ভুমিকাও নিবে। অর্থাত মোটের উপর সাক্ষাত বা ইমিডিয়েট শত্রু লোকাল রাষ্ট্র।
এখন আইডিয়াল বা আদর্শ হত, সারা দুনিয়ায় গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে নানান ভুখন্ডে এবং নানান চেহারার প্রতিরোধ আন্দোলন লড়াইগুলোকে এক কো-অরডিনেশন ধরণের কেন্দ্রের মাধ্যমে যদি পরিচালিত হতে দেখা যেত। কো-অরডিনেশন বা সমন্বয়ের অনুভুত তাগিদ হাজির থাকাটা সবচেয়ে স্বাভাবিক কারণ দেশে দেশে সব প্রতিরোধ লড়াইগুলোর শত্রু কমন – গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। যাহোক আগেই বলে নিয়েছি এটা আইডিয়াল। তাহলে বাস্তবটা কেমন? এব্যাপারে বাস্তব ইতিহাসে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো খুবই খারাপ। শব্দটা “কো-অরডিনেশন ধরণের এক কেন্দ্র” বলেছি, কারণ এশব্দের পিছনের অনুমানটা হল দুনিয়াব্যাপী প্রতিরোধের আন্দোলনগুলো যতটা সম্ভব পরস্পর একে অপরের সহযোগী হয়ে কাজ করতে পারা উচিত – আর তাতে সবাই উপকার পাবে। কিন্তু বাস্তব ইতিহাসে আমরা দেখেছি এটা একটা কো-অরডিনেশন কেন্দ্রের বদলে হাজির হয়েছে যে আগে বিপ্লবী ক্ষমতা দখল করেছে সেই রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থে ও নেতৃত্ত্বে এক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। যেমন লেনিনের রাশিয়া বা মাওয়ের চীন। যার কাজ আর কো-অরডিনেশন থাকেনি, বাস্তবে হয়ে দাড়িয়েছে নিজ রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থে অন্যদের সকলকে ব্যবহার – অন্য দেশ, রাষ্ট্র, দল গোষ্ঠিকে ব্যবহার। এতে বাস্তবে আসলে কি ঘটে সেখানে? বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের পরের রাষ্ট্র একটা মহান কিছু হয়েছে মনে হতে পারে কিন্তু শেষ বিচারে তো সেটা রাষ্ট্রই – আধুনিক রাষ্ট্রেরই কোন একরূপ সেটা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের লজিকও বলবত হবে সেখানে। আর সে লজিকটা হল, রাষ্ট্রের সহজাত বৈশিষ্টমূলক স্বভাব হল সে নিজ রাষ্ট্র সীমার মধ্যকার কেবল নিজ জনগোষ্ঠির স্বার্থকে সবকিছুর উপর প্রাধান্যে রাখে। সেজন্যই সে রাষ্ট্র। ফলে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইডিয়া বাস্তবায়নের বাস্তব উপায় হতে গিয়ে পরিণত হয় নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে ঐ আইডিয়াকে টেলারিং ও খাটো করে নিজ একান্ত স্বার্থের অধীন করে ফেলে। ব্যাপারটা এবার আরও সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলি।
যেমন কমিউনিষ্টদের বিপ্লবের উদাহরণ হিসাবে সোভিয়েত বিপ্লবকেই যদি ধরি তবে দেখব বিপ্লব ঘটেছিল আসলে কেবল রুশ দেশে, রাশিয়ায়। তাই আসলে ওটা ছিল কেবল রুশ বিপ্লব, অন্তত প্রথম পাঁচ বছর, ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম হবার আগে পর্যন্ত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আসল বিপ্লবটা যেটানে ঘটেছে বিজয়ী নতুন সেই রুশ রাষ্ট্র যেন বাইরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে, টিকে থাকতে ব্যর্থ না হয় সেজন্য কেন্দ্রে কোর হিসাবে রুশ রাষ্ট্রকে রেখে পড়শি দেশগুলোকে যেন ওকে ঘিরে ধরা এক প্রতিরক্ষা বর্মের বলয় হয় সে কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, গঠিত সেই বর্মের নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুশ বিপ্লবে পড়শি-রাষ্ট্রগুলোকে বলি দেবার এই কাজটা আরও সহজ হয়েছে কারণ ১৯২২ সালে যেটাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বলা হল অর্থাৎ যাদের ব্যবহার করা হল এরা আগে থেকেই রুশ সম্রাট জারের রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্ত ছিল। ফলে রুশ সাম্রাজ্যের সীমানাটাই নতুন নামে সোভিয়েত রাষ্ট্রের সীমানা হল। আর এবার কেন্দ্রে থাকল রুশ রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থ – নিজের প্রতিরক্ষা অথবা অন্যভাষায় বললে নিজ বিপ্লব টিকানো। আজকের পুতিনের রুশ ফেডারেশনকে কেন্দ্রে রেখে এমন [রুশসহ মোট] ১৫ রাষ্ট্র (Russia,Ukraine, Belarus, Turkmenistan, Uzbekistan, Tajikistan, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Georgia, Armenia, Azerbaijan, Estonia, Latvia, Lithuania, Moldavia) মিলিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছিল সেসময়। [এরই বিপরীত পথ পরিক্রমাটাই আমরা দেখেছিলাম ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার ১৫ রাষ্ট্রে তার ভাগ হয়ে যাওয়ায় ভিতর।]
কিন্তু ষ্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়ন খাঁড়া করেও যেন তাতে নিশ্চিত বা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ঐ সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরেও আবার বাফার ষ্টেট এর এক বর্ম গড়ে তোলা হয়েছিল – রুমানিয়া, চেকোশ্লোভিয়া, যুগোশ্লোভিয়া, পোল্যান্ড এমনকি পরে পুর্ব জার্মান এদের নিয়ে। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল, রুশ রাষ্ট্রের প্রথম নিরাপত্তা বর্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন আর এরও উপরে দ্বিতীয় নিরাপত্তা বর্ম হিসাবে এই রাষ্ট্রগুলো ছিল বাফার ষ্টেট বা স্যাটেলাইট ষ্টেট। উদ্দেশ্য একটাই, বিপ্লবের কেন্দ্র রুশ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সুরক্ষা। আর এটা করতে গিয়ে পড়শিরা “দুনিয়ার মজদুর এক হও” নামে শ্লোগানের আড়ালে প্রত্যেকে নিজে বলি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া “বিপ্লব রপ্তানি” বলে আরও একটা কথা আছে। সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনে স্ব স্ব দেশের পার্টিগুলো “দুনিয়ার মজদুর এক হও” নামে ঐ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুরক্ষার পক্ষেই স্থানীয় পার্টি নীতি অনুসরণ করেছিল। তাতে বাস্তবে এর অর্থ দাড়িয়েছিল নিজ জনগোষ্ঠিগত রাষ্ট্রস্বার্থ ভুলে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিদেশ নীতির অন্ধ অনুসরণ করা বললে কম হবে, বলতে হবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিদেশনীতি বাস্তবায়নের বর্ধিত অংশ হওয়া। আর সামগ্রিকভাবে এই ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে গ্লোবাল কমিউনিষ্ট আন্দোলন। [যদিও পরিস্কার থাকার দরকার আছে,একথাগুলো বলতে গিয়ে কেউ যেন মনে না করেন যে, “দুনিয়ার মজদুর এক হও” শ্লোগানটা ভুল ছিল এমন দাবি করা হচ্ছে। না তা নয়। বরং বলা যায়, শ্লোগান বাস্তবায়নের উপায় কৌশলে অপব্যবহার ঘটেছে আর তাতে শ্লোগানের অর্থ বদলে গেছে।] ফলে এখান থেকেই শ্লেষাত্মক মন্তব্য “মস্কোতে বৃষ্টি হলে বাংলাদেশে ছাতা ধরা” এর বাস্তবতা টের পাওয়া যায়। অর্থাৎ মস্কো একান্ত নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থে নিজের রাষ্ট্র ক্ষমতা সুরক্ষা বা বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য পড়শি রাষ্ট্র বা ভিন্ন রাষ্ট্রকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিল। আর একাজে আরও বিশেষ সহায়ক হয়েছিল বিপ্লবের ইডিওলজি আন্তর্জাতিক বা প্যান ধরণের ছিল তাই। অন্যের রাষ্ট্রস্বার্থকে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে বলি দেবার কাজটা আরও সুবিধার ও সহজ হয়েছিল তাতে।
লেনিনের দেশে ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পরে একটা আভ্যন্তরীণ তর্ক উঠেছিল এক দেশে একটা বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের পরে তাকে একাই টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না। সম্ভব হলে তা কি উপায়ে? এটা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ রাষ্ট্রতত্ত্বের বিতর্ক ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই বিতর্কের কোন সমাধান হয় নাই। তত্ত্বগতভাবে এর কোন সমাধান বের করা হয় নাই। লেনিনের জীবদ্দশায় নয় [রুশ বিপ্লবের পরে লেনিন মাত্র ছয় বছর বেঁচে ছিলেন।] তাঁর মৃত্যুর পরেও আর কখনও নয়। বিপ্লব টিকিয়ে রাখার উপায় হিসাবে সংকীর্ণ কেবল নিজ রুশ রাষ্ট্রস্বার্থে বাস্তবে যা করা হয়েছিল, মনে করা আর বাস্তবে ঘটানো হয়েছিল তা ষ্টালিনের হাতে ও নেতৃত্ত্বে। আর সেটা হল, অন্য সব বিপ্লব সমর্থক রাষ্ট্র আর দেশে দেশে কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোকে রুশ রাষ্ট্র বিপ্লবের স্বার্থে নিজের রাষ্ট্র টিকানোর স্বার্থে ব্যবহার করা। এবং এটাকেই গ্লোবাল কমিউনিষ্ট আন্দোলনের নামে “দুনিয়ার মজদুর এক হও” কথার বাস্তবায়নের পথ বলে তাকে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল।
আধুনিক রাষ্ট্র ধারণার সহজাত মৌলিক বৈশিষ্ঠের লজিকটা হল, রাষ্ট্র কেবল নিজের, মানে নিজ জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ হাসিলের পক্ষে কাজ করে যাওয়াই ওর একমাত্র কাজ। এখানে নিজ রাষ্ট্র সীমানার বাইরের কোন জনগোষ্ঠি বা স্বার্থ দেখার কাজ নিজ রাষ্ট্রের নয়। বরং সুযোগ পেলে রাষ্ট্র অন্যকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে। ফলে রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থ মানে যে স্বার্থের জন্য সে অন্ধ। আবার অন্যদিকে, কোন রাষ্ট্র নিজ একান্ত স্বার্থের পক্ষে যদি কাজ না করে তবে খোদ নিজ অস্বস্তিত্ত্বই সঙ্কটে পড়ে।
অন্যদিকে গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক ইডিওলজি রাষ্ট্র সীমানা ছাড়িয়ে প্রযোজ্য এবং প্রয়োগ হতে চায়। সে দাবি করে একই সাথে সে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র এবং অন্য সব রাষ্ট্রের বেলায়ও একই চিন্তার ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে। এটা স্ববিরোধী। কারণ রাষ্ট্রস্বার্থ কখনও কখনও সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থের ভিতরে নিজেরও স্বার্থ ফলে কমন স্বার্থ দেখতে পারে বটে কিন্তু এর মানে এই না যে রাষ্ট্র দুটোর স্বার্থ সবসময় সব ইস্যুতে এক হবেই; কারণ পরক্ষণেই ভিন্ন ইস্যুতে তাদের পরস্পর বিরোধি দেখতে পাওয়া তা হবে সবচেয়ে স্বাভাবিক। এর মুল কারণ গ্লোবাল ইডিওলজি আর রাষ্ট্রস্বার্থ সবসময় হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। আর এক বড় কারণ, রাষ্ট্রস্বার্থগুলো হাজির হয় আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত কমন স্বার্থ – এর উপর ভিত্তি করে। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর সমন্বয় – আবার এটা ঠিক দুটো স্বার্থের সমন্বয় নয় বরং বিশেষ করে গ্লোবাল আইডিয়ার মৌলিক শিক্ষা বা গাইড লাইনের আলোকে রাষ্ট্রস্বার্থগুলোকে ঢেলে সাজানো ও সমন্বয়।
তাহলে কোন গ্লোবাল ইডিওলজির (কমিউনিজম বা ইসলামের মত যাই হোক) কি কোন ভবিষ্যত নাই? প্রয়োগ যোগ্যতা নাই? না, এখানে আলোচনায় তা বলতে চাওয়া হয়নি। এই রচনায়, প্রয়োগ যোগ্যতা নাই তা বলা হয়নি বরং এটা কিছু মৌলিক প্রায়োগিক সমস্যার দিকে নজর আকর্ষণের চেষ্টা বলা যেতে পারে। আর কে অস্বীকার করতে পারে গ্লোবাল ইডিওলজি ছাড়া মজলুমের মুক্তি অসম্ভব। এছাড়া গ্লোবাল ইডিওলজি নাই তো গাইডিং প্রিন্সিপল নাই একথা কে না মানবে। অর্থাৎ গ্লোবাল ইডিওলজি এক গভীর প্রয়োজনীয় ও মৌলিক জিনিষ। যেকোন আইডিয়া বা চিন্তার দুনিয়াব্যাপী সার্বজনীন অংশটাই দুনিয়ার ভবিষ্যত। তাহলে আধুনিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রস্বার্থ আর ইডিওলজি যদি কখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় তখন এই সংঘাতের সমাধান কি? বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। এমন বাস্তবতা ঘটবেই। ফলে কখনও যদি আমাদের মুখোমুখি হতেই হয় তাহলে অন্তত নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থটাকে গ্লোবাল ইডিওলজির স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া অন্তত আমরা সৎভাবে পরিত্যাগ করতে পারি। দ্বিতীয়ত, কো-অরডিনেশন। অর্থাৎ আইডিয়ার মৌলিক দিকগুলো পরস্পর শেয়ার করা। তবে ঐ আইডিয়া প্রত্যেক ভুখন্ডে আলাদা আলাদা প্রয়োগ কৌশলের পরিচালিত হওয়ার ব্যাপারটা ছেড়ে দেয়া এবং যতদুত সম্ভব পরস্পরের সহযোগী হবার চেষ্টা করা। এভাবে বাস্তব কাজের ভিত্তির দিয়ে ঐক্য পৌছানোর চেষ্টা করা। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের একান্ত সংকীর্ণ স্বার্থ আড়াল করার উপায় হিসাবে ইডিওলজির ভুমিকাকে ব্যবহার করা যাবে না, এই রচনায় এদিকটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আরও কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।
যেমন ১৯৭৯ সালে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে বসে। অজুহাত হল আফগান কমিউনিষ্ট বারবাক কারমেল নাকি বিপ্লব করেছে, তাই সোভিয়েত আর্মি আফগানিস্তান মার্চ করছে। অথচ আসল ট্রিগার ঘটনা হল সে বছরের শুরুর ইরান বিপ্লব। অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকা মুসলমান পপুলেশনে অধ্যুসিত সেন্ট্রাল বা মধ্য এশিয়ায় [যা তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ] না ইরান বিপ্লবের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবে বিদ্রোহ বিপ্লব দেখা দেয়। তা ঠেকাতে আগাম একশনে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন, [ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার মাঝে] আফগানিস্তান দখল করে উদ্দেশ্য একে বাফার ষ্টেট হিসাবে ব্যবহার করা – সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রের যেটা একান্ত স্বার্থ। কিন্তু সারা দুনিয়ার মস্কো সমর্থক কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো চোখ বন্ধ করে রাশিয়ার সাম্রাজ্য স্বার্থকেই গ্লোবাল কমিউনিষ্টদের স্বার্থ ফলে নিজ স্বার্থ দাবি করে এর সমর্থনে নিজ নিজ দেশ মিছিল সমাবেশ করে। এখানে “সাম্রাজ্য স্বার্থ” শব্দটা সচেতনে ব্যবহার করেছি। কারণ বৃটিশ-ভারত আমলে বৃটিশ সাম্রাজ্য আর জার সাম্রাজ্য ঠিক একইভাবে একইকারণের উভয়েই [Anglo-Afghan War (1878-1880)] আফগানিস্তান দখলের লড়াই করেছিল। ওখানে তখন ট্রিগার ঘটনা ছিল, এর আগে জার সম্রাট সেন্ট্রল এশিয়া অঞ্চল দখল করেছিল আর সেই ভয়ে আফগানিস্তা্নের বাদশা জারের সাথে এক অনাক্রমণ চুক্তি করেছিল। কিন্তু এতে বিপরীতে আবার ভয় পেয়েছিল বৃটিশ-ভারতের বৃটিশ সাম্রাজ্য। তার ভয় সন্দেহ হল যে জারের সাম্রাজ্য আর বৃটিশ সাম্রাজ্যের সীমানার মাঝে এতদিন বাফার রাষ্ট্র হয়ে থাকা আফগানিস্তান না জারকে বৃটিশদের উপর বাড়তি সুবিধা করে দেয়। তাই বৃটিশ সাম্রাজ্য আগাম আফগানিস্তানে হামলা করেছিল। এই প্রসঙ্গে আমরা যেন ভুলে না যাই যে মধ্য এশিয়াসহ জার সাম্রাজ্যের সীমা যতদুর ছিল রুশ বিপ্লব সেই সেই পুরানা সীমা নিয়েই নিজেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পুনর্গঠন করে নিয়েছিল। এই বিচারে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বলা চলে সেই জার সাম্রাজ্যই কিন্তু এবার রুশ কমিউনিষ্ট নেতৃত্ত্বে। মধ্য এশিয়ায় ইরানী বিপ্লবের প্রভাব ঠেকাতে ভয়ে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাই আফগানিস্তান দখল করেছিল। সারকথা, এখানে কমিউনিষ্ট ইডিওলজির ভুমিকা হয়ে গিয়েছিল রুশ রাষ্ট্রের নিজ সংকীর্ণ স্বার্থ আড়াল করার উপায়।
সমতুলনীয় আর এক ঘটনার উদাহরণ হল, ৬৯-৭১ সালের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চীনা কমিউনিষ্টরা আয়ুব-ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে লড়ুক নেতৃত্ত্ব দেক এটা কমিউনিষ্ট চীন তার একান্ত স্বার্থের সাথে যায় এমন বিষয় মনে করতে পারে নাই। কারণ আজকের চীনের যে উত্থান দেখছি এর সুচনা পর্ব, ততকালে কূটনৈতিক সম্পর্কহীন চীন ও আমেরিকার বিশেষ সম্পর্কের শুরু, সুচনা বা প্রস্তুতি পর্ব ছিল ঐ সময়টা। যেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব ও পরে ইয়াহিয়ার ভুমিকা ছিল চীন-আমেরিকা উভয়েরই ঘনিষ্ট বন্ধু হিসাবে বিশ্বস্ততার সাথে দুতয়ালী করে দেয়া, কথাচালাচালি ঘটিয়ে দেয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ ততদিনে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ডিল ফাইনাল করতে ১৯৭১ সালের ০৯ জুলাই ভোরবেলা দুদিনের জন্য কিসিঞ্জারকে পাকিস্তান ভ্রমণের সময়কালিন গোপনে চীন ভ্রমণ [গোপন এই সফরের কোড নাম ছিল, “মার্কোপোলো”] ও চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাইয়ের সাথে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়া ইত্যাদি। তবে এঘটনার প্রকাশ্য আলামত শুরু হয়েছিল ঠিক তিনমাস আগে ০৭ এপ্রিল ১৯৭১। ঐদিন হঠাত চীনের চেয়ারম্যান মাওসেতুং আমেরিকার এক টেবিল টেনিস খেলোয়ার দলকে চীন ভ্রমণের আমন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেন। দিন তারিখের দিকে দেখলে ঘটনাগুলো খুব দ্রুতই ঘটেছে। আর এর সাত দিন পরে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাই আমেরিকান টেবিল টেনিস দলের সাথে সাক্ষাত অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন, ১৯৪৯ সালের পরে এরাই প্রথম কোন আমেরিকান অতিথি। “আপনারা আমেরিকান জনগণ ও চীনা জনগণের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করলেন”। চৌএন লাইয়ের এর ঘোষণার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন, আগামি বছর তিনি চীন সফরে যাচ্ছেন বলে মিডিয়ায় ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ সারা দুনিয়া জানে এই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নাই। On April 7, 1971, Chinese Chairman Mao Zedong made a decision to invite the United States table tennis team to visit China. On April 14, Premier Zhou Enlai met with the US ping-pong players, the first visiting American guests since 1949. Zhou told the US players: “You open a new historical chapter in the bilateral relations between Chinese people and American people.” এই ডিলের অংশ হিসাবে এখানে তিনটা ঘটনা উল্লেখ করব। (১) চীন ঐ ১৯৭১ সালের অক্টোবর ২৫ তারিখে জাতিসংঘের প্রথম সদস্যপদ পায় যে সদস্যপদ পাওয়া ১৯৪৯ সালে মাও এর চীন বিপ্লবের পর থেকে মূলত আমেরিকার আপত্তিতে আটকে ছিল। আপত্তির মূল কারণ, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠনের সময় থেকে ওর নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা পাঁচ সদস্যের একজন ছিল চায়না। কিন্তু মাত্র চার বছর পর ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লবের পর থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত তাইওয়ান নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্য। অর্থাৎ মূলভুমি মাও এর নয়াচীন জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত দেশই নয় আর চীন বলতে জাতিসংঘের চোখে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা চীন মানে এক ছোট দ্বীপ তাইওয়ান। অর্থাৎ মাও এর চীনের জন্য ১৯৭১ সালের অক্টোবর ২৫ খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ দিন। এদিন থেকে চীন শুধু জাতিসংঘের সদস্যপদই পায় নাই, একেবারে সরাসরি ভেটো ক্ষমতাওয়ালা পাঁচ সদস্যের একজন হয়ে গিয়েছিল, আমেরিকান আপত্তি প্রত্যাহারে। এবং সমান গুরুত্ত্বপুর্ণ, তাইওয়ানের ষ্টাটাস তখন থেকে জাতিসংঘের অস্বীকৃত ভুখন্ড। অর্থাৎ তাইওয়ান নয়াচীনের অঙ্গিভুত ভুখন্ড অংশ – নয়াচীনের এই দাবিকে সরাসরি না হলেও প্রকারন্তরে স্বীকৃতি দেয়া হয় জাতিসংঘ। (২) আর দেরি না করে পরের বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রথম চীন সফরে যান। এরপর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ভীত্তিমূলক নীতিগুলোর খসড়া ও বুঝাপড়াগুলো তৈরি হতে থাকে। মূল বিষয়, চীন নিজেকে আমেরিকার দানব-পুঁজি বাজার প্রতীকিভাবে যা ওয়াল ষ্ট্রিট নামে পরিচিত তার কাছে উন্মুক্ত করে দিবে। বিনিময়ে আমেরিকান বাজার চীনা পণ্যের জন্য উন্মুত্ত হবে ইত্যাদি। এগুলো ঠিকঠাক তৈরি, আলোচনা, দেনদরবার নিগোশিয়েশন ইত্যাদি শেষ হতে ১৯৭৮ সাল লেগে যায়। (৩) আর ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারী থেকে চীন আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে ইতোমধ্যে তৈরি সমস্ত ডিল আনুষ্ঠানিক করে নেয়। আর ঐদিন থেকে তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে আমেরিকা।] ফলে এসব গুরুত্ত্বপুর্ণ কারণে আয়ুব ও ইয়াহিয়া এরা দুজনই চীনের কাছে খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ত্ব ছিল। তাই চীনের স্বার্থের খেদমত করার বিনিময়ে বাংলাদেশের (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) চীনা কমিউনিষ্টদেরকে ৬৯ সালের পর আয়ুব ও ইয়াহিয়া নিজেদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা থেকে বিরত করতে চীনের কমিউনিষ্ট পার্টিকে অনুরোধ রেখেছিল। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করতে ছাত্রদের অংশ বাদ দিলে মূলত শ্রমিকদের সংগঠিত করতে নির্ধারক ভুমিকা ছিল ভাসানীর নেতৃত্ত্বে অধীনস্ত বাংলাদেশ চীনের কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো। আর ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের চীনা কমিউনিষ্টরা নিজ স্বার্থের চেয়ে চীনা রাষ্ট্রস্বার্থকে জেনে অথবা না জেনে প্রাধান্যে রেখেছিল।
তাহলে সারকথায় বললে, একই আন্তর্জাতিক ইডিওলজির দুই রাষ্ট্র আইডিওলজির মিল আছে এমন হলে একজনের স্বার্থে অপরজনের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সব সময় সেখানে থাকবে। উপরে চীনের উদাহরণ্টা আনলাম এটা দেখানোর জন্য যে দুই রাষ্ট্রস্বার্থ কেমন সরাসরি পরস্পর বিরোধি ১৮০ ডিগ্রি হয়ে যেতে পারে তা বুঝাতে। অতএব এটা আসলে যে কোন আন্তর্জাতিক আইডিওলজির সমস্যা অথবা বলা যায় আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা। অথবা এই দুইয়ের মধ্যকার স্ববিরোধ। আমরা যে রাজনীতিই করি না কেন এই কঠিন বাস্তবতা আমাদের নজরে নিতে হবে, বাস্তব সমাধান খুজতে হবে। কারণ আমাদের আন্তর্জাতিক আইডিয়া বিপ্লবের তত্ত্বও দরকার, আবার রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর মুখোমুখি হওয়া একে অন্যকে ব্যবহার করে ফেলা এগুলো এড়ানোর উপায় জানতেই হবে।

ইরান রাষ্ট্রের সঙ্কট অথবা “ইরানি স্বার্থের ইরাক রাষ্ট্র”
ইরাক সঙ্কট নিয়ে লিখতে বসে এতক্ষণ উপরের লেখা অংশকে কমিউনিষ্টদের প্যাচাল মনে করবেন পাঠকের কেউ হয়ত, লিখলাম কেন অনেকের মনে তা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। লিখলাম এজন্য যে এই সমস্যাটা কেবল সোভিয়েত বা চীনা কমিউনিষ্টদের বেলায় ঘটে বা সত্যি তাই নয়। যেকোন গ্লোবাল আইডিয়ার ক্ষেত্রেও ঘটবে। কারণ মুলত সমস্যাটা যে কোন আন্তর্জাতিক ইডিওলজির সমস্যা অথবা বলা যায় আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা।
তাই আমরা এখন দেখব কমিউনিষ্ট বিপ্লব না হওয়া সত্ত্বেও ইরান বিপ্লবও একইভাবে নিজরাষ্ট্রের টিকানোর স্বার্থে পড়শিদের ব্যবহার করেছে।
ইসলামও নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ইডিওলজি। যারা খলিফা ধারণার রাজনীতি ধারণ করেন সেটা আরো ঘোরতর আন্তর্জাতিক বা প্যান ধারণা। ইরানী বিপ্লব যদিও যতটা না আন্তর্জাতিক তার চেয়ে বেশি জাতীয় বৈশিষ্টের। তবু এটা সুনির্দিষ্ট এক ইডিওলজিক্যাল বিপ্লব। আবার তা পশ্চিমের মত অর্থে একটা আধুনিক রাষ্ট্র না হলেও নতুন ধরণের তবুও মোটা দাগে তা মর্ডান রাষ্ট্র বৈশিষ্টেরই। আর ইরান বিপ্লবে কমিউনিষ্টদের সাথে সবচেয়ে বেশি মিলের দিকটা হল, নিজ বিপ্লব রক্ষা করার সমস্যা, বিপ্লব রপ্তানি এবং নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে ইরাক রাষ্ট্রকে বলি দেয়া এসব কিছুই সে ঘটিয়েছে। কিছু উদাহরণ দিব।
এক) ইরান বিপ্লবের পরেপরেই ১৯৮১-৮৭ প্রতিবছর হ্বজ করতে গিয়ে নিজ বিপ্লবের পক্ষে প্রচার প্রপাগান্ডা করতে আর সৌদি রাষ্ট্র শাসকের নিন্দা করতে এক সংগঠিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়েছিল। কারণ হ্বজ মানে সারা দুনিয়া থেকে মুসলমানেরা সেখানে সমবেত হয়। ইরান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিবছর মক্কা ও মদিনায় মিটিং মিছিল সমাবেশ বয়ান আয়োজন করে আসছিল। এতে সৌদি কর্তৃপক্ষের মনে মক্কা ও মদিনার ধর্মীয় স্থানগুলো তাদের দখল পরিকল্পনা আছে এই সন্দেহ ক্রমশই বাড়ছিল। ১৯৮৬ সালে ইরানী দলবদ্ধ রাষ্ট্রীয় হ্বাজিদের (মোট হ্বাজি দেড় লাখ) প্রায় ১০০ জনকে এক্সপ্লোসিভসহ ইমিগ্রেশনে আটক করা হয়েছিল। এসব নিয়ে পরের বছর হ্বজের সময় যথেষ্ট টেনশন বইতেছিল। দ্বিতীয় দিনে ইরানীদের বিশেষ সমাবেশ সামলাতে গিয়ে সৌদি সরকার তাতে (১৯৮৭ সালে ৩১ জুলাই) সরাসরি গুলি করে, কঠোর হাতে দমন করতে গিয়ে স্পটেই চারশতের উপর হ্বাজি ও সৌদি পুলিশ মারা গিয়েছিল। এই ম্যাসাকারের ঘটনা নিশ্চয় আমাদের অনেকের মনে আছে। এঘটনাতে সৌদি ইসলাম ভাল না ইরানী ইসলাম ভাল অথবা ইরান না সৌদি সরকার কে সঠিক ছিল সে ব্যাপারে বিচারকের ভুমিকায় বসা এখানকার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। এই রচনার উদ্দেশ্যও নয়। ফলে তা উহ্য রেখেও বলা যায় ইরান নিজ বিপ্লব নিজ রাষ্ট্র সুরক্ষার তাগিদে ফলে এর পক্ষে দুনিয়ায় মুসলমানদের মনে জায়গা করে নেবার বাসনায় – তার বিপ্লব ধারণার রপ্তানির বাসনা – থেকেই এটা ঘটিয়েছিল, এটুকু বলা যায়।
দুই) অন্যদিকে, নিজ বিপ্লবী রাষ্ট্র সুরক্ষা নিরাপদ করতে ইরাকি শিয়াদের তাকে ব্যবহার করতে হবে এই বাসনা যে ইরানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের ছিল তা আজকে দাঁড়িয়ে পরিস্কার বলা যায়। যদিও এই বাসনা প্রকাশ্য নয়, এর বাইরের দিকটা হল তাঁরা নিপীড়িত ইরাকি শিয়াদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে। একথা ঠিক যে সাদ্দামের আমল ইরাকি শিয়াদের অবদমন আর নিপীড়নে কেটেছে। কিন্তু সেই দশার সুযোগে ইরাকি শিয়াদেরকে ইরানী বিপ্লব ও রাষ্ট্র সুরক্ষা করতে ব্যবহার করার কারো আকাঙ্খা ন্যায্য হতে পারেনা। ওদিকে ইরানী বিপ্লবের পর, ১৯৮০-৮৮ এই সময়টা ইরাক-ইরান যুদ্ধে কেটেছে। অথচ আদর্শ হতে পারত সাদ্দামের সাথে ইরানের কোন সমঝোতা চুক্তিতে পৌছানো যাতে ইরাকের মোট পপুলেশনের ৬০-৬৫ ভাগ ইরাকি শিয়ারা ইরাক রাষ্ট্র ক্ষমতায় উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ত্বের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়, অবদমন আর নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়, বিনিময়ে ইরাকের দিক থেকে ইরানী বিপ্লবও নিরাপত্তা সুরক্ষার নিশ্চয়তা পায়। কিন্তু তা ঘটেনি। ইরাক-ইরানের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ অবিশ্বাসই মুখ্য হয়ে উঠে ফলে আট বছর ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলে। আজকের পরিস্থিতি দেখে মনে করার কারণ আছে যে স্বাধীন ইরাকি রাষ্ট্র হিসাবে ইরাকি শিয়ারা ইরাকেই টিকে থাক, ইরাক রাষ্ট্র অটুট থাকুক – এটা নয় বরং ইরানী রাষ্ট্র নিরাপত্তা সুরক্ষার কাজে ইরাকি শিয়াদের ব্যবহার করাই ইরানের লক্ষ্য ছিল।
আজকের ইরাক রাষ্ট্রের বাস্তবতা এমন জায়গায় পৌছিয়েছে যে, “ইরাকি” অর্থাৎ নিজ ইরাকি রাষ্ট্রের জন্য আকাঙ্খা কারও নাই, ইরাক ভুখন্ডে যারা আছেন তারা আসলে শিয়া, সুন্নি অথবা কুর্দি – ইরাকি কেউ নাই, ইরাকি রাষ্ট্র আকাঙ্খা করে, রাখে বাস্তবায়ন দেখতে চায় এমন আর কেউ নাই। এজন্য বাস্তবত ইরাক রাষ্ট্রটা আসলে কোথাও নাই। সবাই এর সমাধান দেখেছে হয় শিয়া, না হয় সুন্নি অথবা কুর্দি হয়ে। ইরাকি নাগরিকের দিক, ইরাকি হয়ে থেকে সমাধান দেখার কেউ নাই। একমাত্র নাগরিক পরিচয়েরই রাষ্ট্র হতে হয় অর্থাৎ রাষ্ট্রে নাগরিক মাত্রই সকলে সমান মর্যাদার, [মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদ রচনা করে এমন রক্ত, বংশ, গোত্র, গায়ের রং বা অন্য বর্ণবাদিতা, রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, নারী-পুরুষ ধরণের ভাগ, পাহাড়ি-সমতলী ধরণের ভুগোল ভাগ ইত্যাদি যত রকমের ভেদটানা সম্ভব সেসব কিছুর উর্ধে সকলে সমান মর্যাদার নাগরিক] একে অন্যের মর্যাদার নিশ্চয়তাকারি এমন না হলে শিয়ারা যদি শিয়া পরিচয় মুখ্য করে রাষ্ট্র হতে চায় তবে বাকি সবাইও নিজের নিজের পরিচয় ঝান্ডা খাড়া করবে। ইরাকি রাষ্ট্র বলে কিছু খাড়া হবে না। এটাও রাষ্ট্রতত্ত্বের আর এক মৌলিক শিক্ষা।
তিন) একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমেরিকার সাথে পরমাণু ইস্যুতে ইরানের চরম বিরোধ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বুশের ২০০৩ সালের ইরাক হামলা ও দখলে ইরানের সম্মতি ছিল। আমেরিকার ইরাক দখল ইরানের নিরাপত্তার জন্য এক বড় একটা ঘটনা হবার কথা অথচ অবাক বিষয় এঘটনায় আমেরিকার উপস্থিতি ইরান রাষ্ট্রের দিক থেকে সে কোন হুমকি অনুভব করেনি। তাই সম্মতির প্রশ্ন উঠছে। না হলে ইরানী বিপ্লব যে জন্ম থেকেই যেখানে আমেরিকার সাথে একনাগাড়ে সরব বিরোধ চালিয়ে গেছে তা থাকা সত্ত্বেও সেই আমেরিকা ইরাক দখল করে ইরানের ঘাড়ের উপর এসে বসেছে অথচ ইরানের কোন অস্বস্তি নুন্যপক্ষে কোন আপত্তির বিবৃতিও আমরা দেখি নাই কেন? শুধু তাই না ২০০৬ সাল থেকে সেই যে ইরানের পছন্দের নুরে আল মালিকি প্রধানমন্ত্রী হলেন তা এখনও চলছে। আর বুশ তাকে পরিচিত করিয়েছিলেন “আমাদের লোক” হিশাবে। কারণ মালিকি ছিলেন সেই বিন্দু যেখানে আমেরিকা ও ইরানের কমন স্বার্থ এক হয়েছিল। কিন্তু সেটা ইরাকের নিজের রাষ্ট্রস্বার্থে নয়, বরং ইরান মালিকির ইরাকের ভিতর নিজ রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিরাপত্তা দেখেছিলেন। সাদ্দামের শিয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে সমাধান নিশ্চয় এবার শিয়া প্রাধান্যে সুন্নিদের উপর অত্যাচার নয়, অথবা এবার সুন্নিদের অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা নয়। তাও আবার পরদেশি ইরানের স্বার্থের এক রাষ্ট্র হয়ে। আসলে “ইরানি স্বার্থের ইরাক রাষ্ট্র” এই বাক্যটাই স্ববিরোধী। ভিন রাষ্ট্রের স্বার্থে কেউ আর নিজের রাষ্ট্র থাকে না, থাকতে পারে না। ওদিকে মুকতাদর আল সদর ও অন্য কয়েকজন ইরাকি আয়াতুল্লাহ (যেমন সিসতানি) কখনও কখনও শিয়া পরিচয়ের উপরে উঠে ইরাকি হতে চেয়েছেন। কিন্তু বারবার তারা চুপ করে গেছেন। অন্তত তারা যে গলার ও প্রভাব-ক্ষমতার জোরের দিক থেকে সংখ্যালঘু তা প্রমাণ হয়েছে।
(চার) গত কয়েক মাসে ISIL বলে যে বিদ্রোহীদের আমরা দেখছি এটা মূলত আলকায়েদা ঝোকের অংশ সাথে পুরানা বাথিষ্ট (সাদ্দামের দলের নাম) আর সুন্নি গোত্র প্রধানদের সমন্বয়ের এক সুন্নি জোট। যেখানে আলকায়েদা অংশের সাথে বাকি অংশের এলায়েন্সের কমন ভিত্তি হল দুটো –বাগদাদ দখল ও ইরাকি রাষ্ট্রকে ইরানি প্রভাব মুক্ত করা। এছাড়া কোন আদর্শগত বড় মিল এখানে নাই বরং অমিল বেশি। এই জোট উত্তর-পশ্চিমের মসুল দখল করে যখন বাগদাদের দিকে ধাবমান তখন মালিকির ইরাকি সেনাবাহিনী প্রতিরোধ না করে আগেই ময়দান ফেলে বাগদাদে পালিয়ে আসে। অবস্থা দেখে অনেকেই প্রথমে একে বাগদাদের সেনাবাহিনীর মনোবলের ঘাটতি মনে করেছিল। কিন্তু একদিন পরে ইরাকের আকাশে দেখা গেল সিরিয়ান এয়ারফো্র্সের বোমা বর্ষণ। অর্থাত সিরিয়ান এয়ারফো্র্সকে ISIL এর উপর বোমাবর্ষনের সুবিধা করে দেবার জন্য মালিকি নিজ সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কিন্তু এই বোমাবর্ষনের উদ্দেশ্য আরও ভয়ঙ্কর। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েও গেছে যে আমেরিকা-ইরান (সাথে বগলদাবা সিরিয়া)[এই অর্থে সিরিয়া থেকে ইরান এই শিয়া জোট] একজোট হয়ে ISIL বা সুন্নি ও আলকায়েদার বিরুদ্ধে লড়াই করা – এটা ঘটানো সম্ভব। এর প্রবল সম্ভাবনা একটা আছে। আর এতে ইরানের প্রবল আগ্রহ আছে। তার মানে সুন্নি জোটের বিরুদ্ধে এটা আমেরিকা-ইরানের কোন কূটনৈতিক ভাবালাপ নয় একেবারে জয়েন্ট মিলিটারি অপারেশন – এমন ভাবনা কল্পনা করা ইরানের জন্য ডালভাত। এই ইঙ্গিত ভয়ঙ্কর। এটা ইরান রাষ্ট্রের জন্ম থেকে আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির বিরোধীতাকে অর্থহীন প্রমাণ করেছে। ইরান নিজ সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকার সাথে সামরিক জোট করে আগানোর নিজ ইচ্ছা প্রকাশ করার মধ্যে কোন অস্বস্তি দেখে নাই। এভাবে ইরাক নামের কোন রাষ্ট্র জাহান্নামে যাক, ইরান [আর সেই সুত্রে আসাদের সিরিয়া রাষ্ট্রও] রাষ্ট্রের স্বার্থ সুপ্রীম। তা যেকোন উপায়ে হাসিল করতে হবে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম! এর কিছুদিন পরে বাগদাদে মালিকির প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড, সেনাবাহিনী, আল সদরের বাহিনী ইত্যাদি মিলে যে সামরিক মহড়া আয়োজন করেছিল সেখান থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এটা ইরাকের বাগদাদ রক্ষা নয়, বরং বাগদাদকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে, সেখানে বসে ইরান রাষ্ট্রের সুরক্ষা প্রতিরক্ষার ফিজিক্যাল মহড়া ও মাসল দেখানো ছিল সেটা। অর্থাৎ এটা প্রকাশ্যেই প্রমাণ করেছে মালিকির ইরাকি রাষ্ট্র এমনই এক অদ্ভুত “রাষ্ট্র” যা সাজানো হয়েছে নিজ নিঃস্বার্থ হয়ে ইরান রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা নিজ করণীয় ও কর্তব্য বলে ঠিক করেছে। সেই সাথে ইরানী সেনাবাহিনী ও গার্ড বাহিনী যে ইতোমধ্যেই বাগদাদে এসে ততপরতা শুরু করেছে এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাগদাদে দুজন ইরানী সেনা অফিসারের মৃত্যুর ঘটনা থেকে। ইরান আনুষ্ঠানিক ভাবে তা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করতেও দ্বিধা করেনি।
ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তান দখল করে নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে অন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি করেছিল। এবার ইরানের একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থের এক ইরাক সাজিয়ে ইরান আরও বিশাল উদাহরণ তৈরি করল।
তাহলে বিপ্লব বলতে সেটা রাশিয়ার সোভিয়েত বিপ্লব হোক কি ইরানের ইসলামি বিপ্লব – গোড়ার সমস্যা একই, আধুনিক রাষ্ট্রের লজিক ও বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা।

[এই রচনা পাঠে পাঠকের প্রতি কিছু পরামর্শঃ] আলোচ্য শিরোনামের লেখাটা চূড়ান্ত কিছু নয়, প্রাথমিক প্রস্তাব। আরও এডিটেড একটা ভার্সান পরে হাজির করার ইচ্ছা রাখি। এখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন বা ইরান সম্পর্কে বেশ কিছু ঐতিহাসিক তথ্য সংযোজিত করা হয়েছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য এমন একেবারেই নয় যেন পাঠকের এথেকে এসব দেশের প্রতি বিরূপ মনোভাব অথবা ঘৃণা তৈরি হোক – তা রাষ্ট্রীয় বা ইডিওলজি যেকোন অর্থে। অথবা এমন নয় যে বাংলাদেশের স্বার্থে এসব দেশের কোন ইতিবাচক অবদান নাই। অথবা এমন নয় যে নতুন আইডিয়া হিসাবে এসব দেশের বিপ্লবের কোন আবেদন এবং আমল করার মত রাষ্ট্র-ধারণায় গুরুত্ত্বপুর্ণ কোন তত্ত্বীয় অবদান, সংযোজন নাই। অথবা এমন নয় যে এসব দেশের রাষ্ট্রনীতির সাথে বাংলাদেশের মানুষের কোন স্বার্থ মিল হবার ভবিষ্যতে কোন সম্ভাবনা নাই। ফলে এমন ধারণা করা সঠিক হবে না। অথবা বাংলাদেশে আমি কোন জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ফেরি করতে চাইছি, কোন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই এখন ভরসা এমন কোন ইঙ্গিত করছি। অথবা নাগরিক ধারণাকে কোন না কোন জাতীয়তাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বা আটকে রেখে ফেরি করছি। এসব অনুমান অমূলক হবে ও লেখকের প্রতি অবিচার করা হবে। এক হিসাবে নানা দেশের এখানে যা কিছু তথ্য সংযোজিত হয়ে আছে সেগুলোকে ঐতিহাসিক অবজেক্টিভ ফ্যাক্ট ও রিয়েলিটি হিসাবে গ্রহণ করলে সুবিচার করা হবে। অর্থাৎ আমাদের পরস্পরের রাষ্ট্রস্বার্থগুলো ওসব জায়গায় কমন থাকতে পারেনি – এর উদাহরণ হিসাবে নিলেই যথাযথ হবে। তবে অবশ্যই আমি জোর দিব একথা বলে যে, আইডিয়ার নামে আড়ালে একে অন্যকে একান্ত স্বার্থে ব্যবহার – একাজে বিরত থাকা এবং ঘোষণা দিয়ে তা পরিত্যাগ করতেই হবে।

লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

গৌতম দাস

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়ার গবেষণা ফেলো হলেন লিসা কার্টিস (Lisa Curtis)। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার আমেরিকান সংবাদদাতা লিসা কার্টিসকে কিছু লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন, যার লিখিত জবাব তিনি দিয়েছেন আর মানবজমিন পত্রিকায় তা গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ ছাপা হয়েছে।

থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও আমেরিকান বিদেশনীতি
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আমেরিকার থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। থিঙ্কট্যাংক মানে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে আগাম চিন্তাভাবনা ও নিজস্ব গবেষণা করে এতে পাওয়া ফলাফল জনসমক্ষে হাজির করা হয়, তা পরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি হবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভুমিকা রাখে। তবে থিঙ্কট্যাংক বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে চলে, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান সে নয়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিশেষত্ত্ব হল, ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগানের প্রভাবে এই প্রো-ইহুদি থিঙ্কট্যাংক জন্ম নেয়। ঘোষিত লক্ষ্য হল, ঘোষণা দিয়ে বলে কয়েই রক্ষণশীলভাবে চিন্তা করা। রক্ষণশীলভাবে ভেবে দেখা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতি কি হতে পারে, হওয়া উচিত। আর হেরিটেজ মনে করে আমেরিকান রাষ্ট্র যেন অবশ্যই বেসরকারি উদ্যোগ ও খাতের মাধ্যমে প্রায় সব কিছু করতে ও পরিচালিত হতে দেয়, রাষ্ট্র দায় কম নেয় এবং সব বিষয়ে রাষ্ট্র যেন সীমিত সংশ্লিষ্টতার ভুমিকায় থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায়, প্রচলিত আমেরিকান মুল্যবোধ আর শক্ত আমেরিকান জাতীয় প্রতিরক্ষাবোধের কথা খেয়াল রাখে।

কিন্তু ছাপা হওয়া লিসা কার্টিজের এই প্রশ্নোত্তরকে আমাদের এত গুরুত্ব দেবার কি আছে? আমেরিকান সরকারগুলোর নীতিতে কোন থিঙ্কট্যাংকের ভুমিকা ও গুরুত্ব কি তা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সমাজের কোন গ্রুপের কোন নীতি বা অবস্থান সরকারের নীতি হয়ে উঠার আগের ধাপটা হল থিঙ্কট্যাংকের উদ্যোগে করা চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ। তবে আবার এটা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঠিক কোন বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একেবারেই তা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আর থিঙ্কট্যাংকের কাজের ধরণ হল, সিরিয়াস গবেষণা শেষে ফলাফল স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাডেমিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল নেতা, দেশের ও প্রয়োজনে বিদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সকলের সাথে তা শেয়ার করা, আর গোলটেবিল, সেমিনার আলোচনা সভার মাধ্যমে সে নীতি অবস্থানকে যতদুর সম্ভব একটা প্রতিনিধিত্বমুলক করে আকার দিয়ে তোলা। আর সবশেষে সরকারি অফিসের লোকজন চাইকি গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় হলে সর্বোচ্চপদ মন্ত্রণালয়ের সচিব (আমেরিকান হিসাবে আন্ডার সেক্রেটারিকে) সেসব সভায় দাওয়াতে হাজির করে থিঙ্কট্যাংকের অবস্থান চুড়ান্ত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এরপরেও থিঙ্কট্যাংকের নীতি-অবস্থান কোন আমেরিকান সরকার তার নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য না হলেও সাধারণত দেখা যায় থিঙ্কট্যাংকের ঐ অবস্থান আংশিক অথবা পুরাটাই সরকারের নীতি হয়। আর অনেক সময় কোন সরকারের কেউ নিজেই “অনানুষ্ঠানিকভাবে” বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কোন থিঙ্কট্যাংককে কোন একটা বিষয়ে এমন উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

হাসিনা সরকার টিকে যাবার জন্য কি ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন দায়ী
লিসা কার্টিজ এই প্রশ্নোত্তরে ৫ জানুয়ারির পরও হাসিনার টিকে যাওয়ার জন্য ভারত, চীন ও রাশিয়ার স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। লিসা কোন আমেরিকান সরকারী পদবীধারী কেউ নন। ফলে তার মুখ দিয়ে এমন সরাসরি অভিযোগ করা মন্তব্য নিয়ে ভারত, চীন বা রাশিয়া সরকারের কারও হেরিটেজের লিসা কার্টিজের অথবা আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের (আমাদের হিসাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কাছে ব্যাখ্যা চাইবার কিছু নাই। আবার লিসার বক্তব্য “আনুষ্ঠানিক” সরকারি না হয়েও আবার আসলে পরোক্ষে সরকারিই। লিসার বক্তব্যকে আমরা আমেরিকান সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রটোকল, কূটনীতির ভাষা, ফরমালিটির নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা মন খুলে কথা বলতে পারলে কি বলতেন তেমন বক্তব্যের এক মহড়া মনে করতে পারি; এবং তা নীতি নির্ধারকদের সবার চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও অন্তত প্রভাবশালী একটা ধারার বক্তব্য হিসাবে দেখতে পারি। ফলে লিসা কার্টিজের বক্তব্যকে আমরা সেখান থেকে দেখে পাঠ করে এটাকে উসিলা করে তা নিয়ে আলোচনার সুত্রে মুল্যায়নে কিছু বলার সুযোগ হিসাবে নিব।
প্রথমত প্রকৃত তথ্য হিসাবে এক ভারত ছাড়া চীন অথবা রাশিয়া কি আসলেই হাসিনার সরকার টিকে যাবার কারণ, তাদের সমর্থনের উপর কি হাসিনা টিকে গেছে? তা মনে করার কোন কারণ আমরা দেখি না। এমন কোন ফ্যাক্টসের খবর কারও কাছে আছে অথবা বাস্তবে এটা তাই -এর কোন সত্যতা নাই। আমার আগের লেখায় বলেছি, ফ্যাক্টস হল ভারত আমেরিকা চীন রাশিয়া সবাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট (যে যেমনটা দেখতে চায় তেমন) একটা আকার নিয়ে থিতু হয়ে বসুক তা নিজের স্ব স্ব স্বার্থে চায়। আবার এর সমস্যা ও এর জটিলতাগুলোও বুঝে ও মানে। ফলে এথেকে বেরোনোর পথ হিসাবে ভারতের নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ সেটা বর্তমান ভারসাম্যের প্রায় স্থবির অবস্থাটা ভেঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরির নিয়ামক হতে পারে। আমার ঐ লেখাতেও আমি চীনের অবস্থান কোনভাবেই হাসিনার সরকারে টিকে থাকুক এমন তথ্য বা ব্যাখ্যা দেখাই নাই। কারণ ব্যাপারটা অলীক। বরং চীনের এ পর্যন্ত দেয়া রাষ্ট্রদুতের বিবৃতিগুলো, তাদের ফরেন অফিসের মন্তব্য এমন কোন সাক্ষ্য বহণ করে না। আর চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ আসার অপেক্ষায় আছে কথা সত্য তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা আবার গেড়ে বসার পরেও সে এটাকে সঠিক ও উপযুক্ত সময় মনে করতে পারে নাই; অপেক্ষা করছে এক স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকার দেখার জন্য। এর সর্বশেষ প্রমাণ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য। (বিনিয়োগ বোর্ডের অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে) তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন চীনের দিক থেকে এব্যাপারে কোন নড়াচড়া নাই। ফলে লিসা কার্টিজের অভিযোগ আমরা দেখছি ভিত্তিহীন, কোন সারবত্তা নাই।
তবে লিসা আর এক অভিযোগ তুলেছেন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি প্রসঙ্গে। ঐ প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেয়ে এই দেশটিতে কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করা যাবে সেদিকেই মস্কো ও পেইচিংয়ের মনোযোগ বেশি”। লিসা কার্টিজের এই অভিযোগকে পেটি ঈর্ষাজাত ক্ষোভ হিসাবে আমরা বড়জোর দেখতে পারি। প্রথম কথা চীনা সাবমেরিন বা অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টা ৫ জানুয়ারির বহু আগের ঘটনা; অন্ততপক্ষে ২০১১ সালের ডিল, একালেরই নয়। আর যদিও একথা সত্য যে পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্ত্র সরবরাহের তালিকায় বিলের অঙ্কে এবং পরিমাণে চীনা অস্ত্র আমেরিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। কিন্তু এর কারণ চীনের আমাদের উপর বিশেষ আগ্রহ একথাটা ভিত্তিহীন। অথবা চীন আমাদেরকে মুখ্যত তার অস্ত্রের বাজার হিসাবে দেখে এটা কোন গবেষকের মুখ থেকে শোনা হাস্যকর বললে কম বলা হয়। এই বিদ্যা অথবা মুল্যায়ন এসেসমেন্ট দিয়ে কারও পক্ষে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোন গবেষণাকর্ম করা অসম্ভব। এতে ঘোড়ায়ও হাসবে। একথা বলে লিসা কার্টিজ নিজেকেই তুচ্ছ করেছেন। এর বেশি এনিয়ে আর কি বলব! পরিসংখ্যানের যে কথা বলছিলাম, খুব সম্ভবত অস্ত্রের মুল্য এবং অস্ত্রের উপর আস্থা মানে আমাদের বাজেট ও বাজেট অনুপাতে পাওয়া মান এগুলোই এখানে মুল ফ্যাক্টর। ফলে চীনা অস্ত্র কিনতে আমাদের মানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের চেয়ে বাহিনীর আগ্রহই বেশি ও মুখ্য। আর েব্যাপারে যারা খোঁজ রাখে তাঁরা কে না জানে আমেরিকার যেকোন অস্ত্র বা সরঞ্জামের মুল্য সর্বাধিক, তাতে কোয়ালিটি ও হাইটেক সুবিধা যত উচ্চমানেরই হোক। ফলে আমাদের বাহিনীর সিদ্ধান্ত – এটা প্রাকটিক্যাল, স্বাভাবিক এবং সর্বপরি আমাদের বাজেট বাস্তবতা যে তাঁরা সঠিকভাবেই মুল্যায়ন করতে জানেন এর প্রমাণ। ওদিকে, ভারতের উপর পুরা নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি হাসিনার সরকারের নীতিতে দোষের শেষ নাই, একথা সত্য। কিন্তু এবিষয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজন, বাহিনীর নিজস্ব যুক্তি অবস্থান ও আগ্রহের প্রসঙ্গে গত পাঁচ বছরে হাসিনা যথোপযুক্ত উতসাহ ও সাড়া দেন নাই, প্রাধান্য দেন নাই এমন কথা বলা ও ভাবা ভুল হবে। একথা লুকানো নয় যে হাসিনা সর্বক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল, বহু আন্ডারহ্যান্ড ডিল আন্ডারষ্টান্ডিং ভারতের সাথে তাঁর আছে, বাইরে থেকে দেখে আমরা অনুমান করতে পারি। আবার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থজাত সিদ্ধান্তকে হাসিনা রাজনৈতিক অনুসমর্থন জানায় নি এমন উদাহরণ একেবারে নাই যে তা নয় (যেমন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ ইস্যু)। তাসত্ত্বেও মোটের উপর হাসিনার রেকর্ড ভাল। যেমন ভারতের আপত্তি আর বিরূপ প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ চীনা সাবমেরিন কেনার সামরিক বাহিনীর প্রস্তাবে উদ্যোগে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হন নাই। আমেরিকা এবং ভারতের অখুশি, আপত্তি, চোখ বড় বড় করে তাকানো সত্ত্বেও গত ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে ভাল ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পর্কও বজায় রেখেছেন, সফর বিনিময় অব্যাহত আছে এবং তা গুরুত্বের সাথেই, এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহে সাড়া দিয়ে রেখেছেন। এককথায় বললে চীনের সাথে সম্পর্ককে হাসিনা ভারতের সাথে সম্পর্কের একই ঝুড়িতে রেখে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন নাই, আলাদা আলাদা বক্সে রেখেছেন যাতে কোন ঠোকাঠুকি না লাগে এমন করে বুদ্ধিবিবেচনার সুযোগ করে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এথেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা বা বোকামিরও সুযোগ নাই যে হাসিনার সরকার ভারতের সাথে সাথে চীনেরও সমর্থনের উপর টিকে থাকা এক সরকার।
এমন সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ না থাকার মুল কারণ (গত মাসের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলি) চীনের বিদেশনীতি এখন পর্যন্ত আমাদের মত দেশে কেমন সরকার বা কে সরকারে থাকবে এধরণের কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগিদারী কর্তৃত্ত্ব না হলে চীনের বিদেশনীতি আগাবে না অথবা আমেরিকার মত চাপ দিয়ে আদায় করার নীতিতে চলে এমন করে তা সাজানো নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আদায় করে চলে এমন নয়। আবার লিসা কার্টিস যেমন এক জবরদস্তিতে আরোপিত ধারনা দেবার চেষ্টা করেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেনবা বাংলাদেশ চীনের কাছে অস্ত্রের লোভনীয় বাজার ফলে খাতক মাত্র। আর চীনও যেনবা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার উপর দাড়িয়েই রাইজিং চীনের অর্থনীতি হয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডাহা ভিত্তিহীন কথা এবং প্রপাগান্ডা। কেউ গবেষক হতে চাইলে তাঁর প্রথম পাঠ হল, অন্তত প্রপাগান্ডা আর তথ্যের ফারাক করে চলতে শেখা। এম্পায়ার আমেরিকার খাসলত দেখতে দেখতে লিসা কার্টিসের হয়ত একপেশে ধারণা হয়ে গেছে যেন আমেরিকা বা পশ্চিমের খাসিলতই চীনের খাসলত হতেই হবে। আগামিতে চীনের খাসলত কি দাঁড়াবে সেটা আগামিই বলতে পারে। কিন্তু এখনই পশ্চিমের খাসলত দিয়ে আগাম চীনের ঘাড়ে তা খামোখা চড়িয়ে আরোপ করে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করার কোন অর্থ হয় না; তবে হয়ত পেটি ঈর্ষাজাত মনের সুখ পাওয়া যেতে পারে। তাহলে হাসিনা তাঁর সমস্ত বেকুবি নীতির দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সামরিক বাহিনীর চীনা অস্ত্র কেনার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে সক্ষম হয়েছে। এটাই বাস্তব। এটা কতটা সামরিক বাহিনীর সাথে দুরত্ব তৈরি করার রিস্ক বা চটানো তিনি সহ্য করতে পারবেন বা পারবেন না সে কথা ক্যালকুলেশন করে রেখে করেছেন অথবা করেন নাই এনিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু বটম অব দা ফ্যাক্ট হল বাস্তবে তিনি এগুলো করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, এর কারণ যাই হোক। আবার লিসা কার্টিজের “চীনের অস্ত্রবিক্রির ধান্দা” এমন কথার প্রেক্ষিতে যদি বলি, আমাদের সামরিক অফিসারদের উপর প্রভাবের দিক থেকে যদি দেখি তবে তাদের ট্রেনিং সেমিনার ভিজিট ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদিতে আমেরিকার প্রভাবের সমতুল্য এর ধারে কাছে আর কোন রাষ্ট্র নাই। এমনকি ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকার হাত মুচড়ানিতে পড়ে আমাদের সেনাবাহিনী এই তো সেদিন ১/১১ এর ক্ষমতা দখল করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে! কিন্তু এজন্য আমি কেন কেউই বলবে না যে সেনা অফিসারদের উপর আমেরিকার প্রবল প্রভাব আছে অতএব আমেরিকার সমর্থনে হাসিনা টিকে আছে এগুলো তার প্রমাণ! অথবা লিসা যেভাবে বলেছেন যে বাংলাদেশে চীন “কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি” করতে পারে সেই তালে আছে – তেমন করে কেউ বলবে না যে, আমেরিকা কেবল আমাদের অফিসারদেরকেই হাত করার তালে আছে। কারণ এতে বক্তার নিজের কান্ডজ্ঞানশুণ্য আর গাভর্তি রাগ ক্ষোভকে প্রমাণ করবে।

এবার হাসিনার টিকে থাকার ব্যাপারে রাশিয়ার ভুমিকা প্রসঙ্গে আসি। হ্যা, একথা সত্যি যে রাশিয়ার মধ্যে প্রবল অস্থিরতা আছে। যেখানেই কোন সরকারের সাথে আমেরিকার নুন্যতম বিরোধ সংঘাত আছে, রাশিয়া দেখে, সেখানেই ঐ সরকারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে -এমন সরল করে পরিস্থিতি মুল্যায়নের ও অস্থির মতির সিদ্ধান্ত নেবার একটা ঝোঁক রাশিয়ার আছে। এটা শত্রুর শত্রু মানেই আমার বন্ধু –এমন এক সরল তত্ত্ব। অথচ বন্ধুত্বের সম্ভাবনার এই যুক্তির ভিত্তি যথেষ্ট দুর্বল এবং আমাদের অভিজ্ঞতাও এর পক্ষে সায় দেয় না। মুল কারণ প্রতিটা বন্ধুত্ত্বের সম্পর্কের নিজস্ব পজিটিভ ভিত্তি লাগে। আর তাছাড়া একটা শেষ কথা আছে। রাশিয়ার এই ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এটাই তার নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা শেষ কথা নয়, শেষ বিচার্য ব্যাপারটা এমনও নয়। আরও বিবেচনাও আছে। আমেরিকা বা পশ্চিম বিরোধী ও পশ্চিমা বলয়ের বাইরে কোন স্বার্থজোট গড়ার আগ্রহ রাশিয়ার প্রবলভাবেই আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু একা সেকাজ করার মত সক্ষমতা রাশিয়ার নাই, বাস্তবতা নাই এটাও রাশিয়া ভালভাবেই জানে। কারণ রাশিয়ার যতই রাগ ক্ষোভ থাক এটা রাশিয়া-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়, দুনিয়াও নয়, সেদিন গত হয়েছে বহু আগেই এটা সে ভালই হুশ রাখে। বরং রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর জোট (BRICS Bank এর মত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে) এর পক্ষে তেমনি একটা সম্ভাবনা, তাই সে মানে। উতসাহী রাশিয়ার এমন মান্যি করাটা টের পাওয়া যায় যদি আমরা মনে রাখি প্রথম ব্রিকস সম্মেলন ডাকার আয়োজক হয়েছিল রাশিয়াই, ২০০৯ সালে। ওদিকে এব্যাপারে চীন ততোই ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার। কোন হুড়োহুড়ি অস্থিরতা, এখনই সব জবরদস্তিতে করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে এমন অবিবেচক সে নয়, তা দেখায়নি। চলতি গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারটা ভেঙ্গে এরই প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করানো এবং আমেরিকার বদলে নতুন নেতৃত্বে নতুন অর্ডার চালু করার কাজটা সফল করতে যেখানে পরিস্থিতিকে পরিপক্ক করে তুলার কাজটা কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে করা মত কাজ নয়। বরং পরিপক্ক হতে যেখানে যতটুকু সময় ও মনোযোগ লাগবে সেখানে ঠিক ততখানিই দিতে হবে এব্যাপারে সে পরিস্কার। আমরা তাই দেখেছি। এছাড়া ব্যাপারটা পরিপক্ক বা ম্যাচিয়র হওয়াটা আবার ভলিন্টারিলি ও আপন ইচ্ছায় হতে হবে এমন দিকটাও তার নজর এড়ায়নি। যেমন একথা আজ পরিস্কার কেবল ব্রিক ব্যাংকই এখনও ফাংশনাল হতে পারল না ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতার কারণে। একদিকে পুরানো বা চলতি অর্ডারটা থেকে আমেরিকার তরফে বেশি সুবিধা পাবার লোভে পড়েছে ভারত আর অন্যদিকে ততটাই নতুন অর্থনৈতিক অর্ডারটা খাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতের তাই পিছুটান ফলে ব্রিক ব্যাংক বিষয়ে ধীরে চলা – এই হল ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতা। ভারত এখনও তাই মনস্থির করে ব্রিক ফেনোমেনার পক্ষে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু সেজন্য চীনের ভারত নীতিতে আমরা কোন চাপাচাপি দেখিনি।

ভারতের দ্বিধামুখে বা দুমুখে খেলার আর এক প্রতীকী উদাহরণ
ভারতের দ্বিমুখি ঝোঁকের প্রতীকী ও আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত ‘সাংহাই কর্পোরেশন’ উদ্যোগ। “সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন” (Shanghai Cooperation Organization (SCO) – ১৯৯৬ সালে শুরু হবার সময় মনে হয়েছিল এটা সম্ভবত এক সামরিক বা ষ্ট্রাটেজিক জোট হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ এটা মূলত এক অর্থনৈতিক জোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সে কারণে এখনও আমেরিকান মিডিয়া থিঙ্কট্যাংক (কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন) এটাকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট – ন্যাটোর মত এর পাল্টা সমান্তরাল এক সামরিক জোট, “চীনের ন্যাটো” বলে চিত্রিত করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা চীন ও রাশিয়া, সাথে নেয়া হয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশ, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, and Uzbekistan। জন্মের শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালে SCO এক বিবৃতি দিয়েছিল এই বলে যে কবে “আমেরিকান সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল এশিয়া অঞ্চল থেকে গুটিয়ে চলে যাবে এর তারিখ তারা জানতে চায়”। তবে ঐ বিবৃতিতে আমেরিকাকে চলে যেতে হবে ঠিক এমন দাবী তারা করেনি কেবল তারিখ জানতে চেয়েছে আর আমেরিকার যে যাওয়া দরকার এতে এই তাদের আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ক্রমশ এই জোট একালে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে আফগানিস্তান ২০১৪ পরবর্তি পরিস্থিতিতে। ২০১৪ পরবর্তি মানে আমেরিকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে এবছর ২০১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সৈন্য (ন্যাটোও) প্রত্যাহার করবেই। এটা তিন বছর আগেই নির্ধারিত ও সিধান্ত হিসাবে ঘোষিত। মূলত খরচ যোগাতে অসমর্থ অর্থনৈতিক অপারগতা -আমেরিকান নিজস্ব এই সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণা। যদিও ২০১৫ সাল থেকে কি হবে, কেবল ট্রেনিং এর নামে (১০ হাজার রাখার ইচ্ছা আমেরিকার) কতজন সৈন্য থাকবে এবিষয়ে কোন নতুন চুক্তি কারজাই করেন নি। আফগানিস্থানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে চলতি মাসে কিন্তু ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, প্রক্রিয়াধীন। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন নতুন আয়োজনে কিছু আমেরিকান সৈন্য রাখার চুক্তি কেমন হবে বা আদৌও হবে কি না। বাস্তব এই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে SCO ভাবনা-চিন্তা করছে এবছরের শেষে ন্যাটো ও আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে তারা সামরিক নয় বরং এক ব্যাপক বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রবেশ করতে চায় আফগানিস্তানে। SCO তে অবজারভার ষ্টেটাসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর উপস্থিতিতে গত কয়েক বছর তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারত এই পাঁচ রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত SCO এর অবজারভার সদস্য, পুর্ণ সদস্য নয়। তবে প্রতি বছরের SCO সম্মেলনে তারা গুরুত্ব দিয়ে অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়ে থাকে। গত বছর ২০১৩ সেপ্টেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমন খুরশিদ কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত SCO সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং ভারত পুর্ণ সদস্য হতে চায় সে ইচ্ছা ব্যক্ত করে এসেছেন। (দেখুন, India aspires to become full SCO member) কিন্তু একই সাথে তার স্ববিরোধীতা বা পিছুটানও ব্যক্ত করেছেন ঐ রিপোর্টে। বলেছেন, We are not sure of a timeline অর্থাৎ সময়সীমা বা কবের মধ্যে হব জানি না। এককথায় ব্যাপারটা হল, পুরানা গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণ হিসাবে আমরা দেখছি পালটা উদ্যোগগুলো একটা যেমন “ব্রিকস ফেনোমেনা” ঠিক তেমনই আর এক উদ্যোগ হল এই SCO গঠন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, “ব্রিকস ফেনোমেনা” এই উদ্যোগের মতই SCO গঠন উদ্যোগেও ভারতের ভুমিকা দোলাচালে, আছি আবার নাই এমন দোদুল্যমান নন-কমিটেড। কিন্তু ধীরস্থির চীন বরাবরের মতই; ভারতের চিন্তা ও ভুমিকা সে জানে কিন্তু সেজন্য চীন ভারতকে তাড়া লাগায় নি, কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি, নিজে কায়দা কৌশল করে চাপ বা শর্ত তৈরি করেনি ভারতের উপর। বরং ছেড়ে দিয়ে রেখেছে ভারতের ভলিন্টারি ও আপন ইচ্ছার উপর। পরিস্থিতি পরিপক্ক হতে যতটা সময় লাগছে, দিচ্ছে। আবার আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিকঃ চীন বা রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের নৌকা ভাসানো মানে ব্যাপারটা যে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অথবা তাদেরকে একঘরে করা তা যে নয় এটা চীন সযত্নে খেয়াল রাখতে চায়। সকলকে মনে করায় রাখতে চাই। রাশিয়ার মত তাই চীন ব্যাপারটাকে প্রতিহিংসায় রি রি করে উঠার বিষয় মনে করে না, কারণ আসলে তো ব্যাপারটা পশ্চিমের উপরে প্রতিশোধ নেয়ারও নয়। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ইউরোপের কলোনী মালিক (বৃটিশ, ফরাসী, স্প্যানিস, ডাচ, পর্তুগীজ ইত্যাদি) যাদের সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কখনই অস্ত যাবে না বলে বড়াই শোনা যেত একদিকে তা ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল আর অন্যদিকে এর বদলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের সুচনা হয়েছিল কিন্তু আমেরিকা ব্যাপারটাকে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রতিশোধ হিসাবে ঘুর্ণাক্ষরেও দেখেনি, ইউরোপকে একঘরে করা হিসাবেই দেখেনি। কারণ আমেরিকা মানে তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (১৯৩৩-৪৫ পরপর চারবারের প্রেসিডেন্ট) এটা পরিস্কার ছিলেন যে এই পালাবদলের অর্থ প্রতিশোধ বা একঘরে করার মত তা একেবারেই নয়। বরং তাঁর নেতৃত্ত্বে এটা আরও সকলের সাথে ইউরোপকেও সাথে নিয়েই নতুন এক গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার সুচনা করার কাজ। ব্যাপারটা রুজভেল্টের দয়া বা উদারতার চোখে দেখার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা ও ঘটনাবলির বাস্তব অর্থও এটাই। এমনকি নীতিগতভাবে ষ্টালিনের রাশিয়াকেও কোন নীতিগত কারণে (যেমন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র বলে) বা কোন প্রিযুডিস বা আগাম অনুমানে ধরে তার নেতৃত্বে আসন্ন নতুন গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের বাইরে রাশিয়াকে রাখার কথা তিনি ভাবেননি। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় টানা ২২ দিনের ব্রেটনহুড সম্মেলনে রাশিয়া উপ্সথিত ছিল। এনিয়ে বিস্তার করে অন্য কোথাও লিখতে হবে। এবারের পালাবদলেও ব্যাপারটাও তাই, এখানে সাদৃশ্য আছে। এখনকার প্রসঙ্গের জন্য সারকথা এতটুকুই যে রাশিয়ার ইতিউতি উঁকি মারা বা অস্থিরতায় থাকলেও অন্তত চীনকে বাদ দিয়ে এককভাবে হাসিনাকে চোখবন্ধ সমর্থন দিয়ে রাশিয়া এগিয়ে যাবে এই অনুমান ভিত্তিহীন। হাসিনার সাথে ৫ জানুয়ারির পরের পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাশিয়ান বিবৃতিতেও এমন কিছু নাই যেটা একই প্রসঙ্গে আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে নাই। ফলে রাশিয়াকেও জড়িয়ে লিসা কার্টিসের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অনুমানের।

হাসিনাকে দানব বানানোর তিন দেশীয় সমর্থনের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোন সূত্র থেকে
একটা কথা বলে রাখা ভাল, লিসা কার্টিসের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোথা থেকে? একেবারেই কি তা সুত্রহীন? না, সুত্র সম্ভবত একটা আছে। সেই সুত্র ভারত নিজে। একটা হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন বা কানকথা ভারত ছড়িয়েছে। ধীরস্থির চীনের বিপরীতে অস্থির প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে যেমন রাশিয়া ঠিক তেমনই আর এক প্রান্ত হল ভারত, হাত নিশপিশ করা ভারত। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে তার সুখের হানিমুন ভেঙ্গে যাওয়াতে এই হাত নিশপিশ, পারলে আমেরিকাকে এখনই একটা শিক্ষা দিয়ে দেয় এমন ভাব। উপরে বলেছি, এতদিন ভারত আমেরিকার লোভের ফাঁদে পড়ে কেবল নিজের জন্য পুরানো বা চলতি অর্ডা্রটা ও এর সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিগত ভারসাম্যটাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকলে আমেরিকার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাবে এই বেকুবি লোভে ও আশায় ব্রিক ব্যাংকের উদ্যোগকে ধীরে চল নীতিতে আটকে রেখেছিল। আজ আমেরিকার সাথে বিরোধে হঠাত স্বপ্নভঙ্গ হওয়াতে সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছে। মিথ্যা ভয় ছড়িয়েছে, প্রপাগান্ডায় মেতেছে যে ভারত, চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে উঠতেছে ফলে এবার আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়া হবে। যদিও এই বাস্তবতা পরিপক্ক হতে এখনও ঢেড় সময় লাগবে এবং ব্যাপারটা মোটেও ঠিক শিক্ষা দেবার বা প্রতিশোধ নেবার মত নয়। কিন্তু সার কথা সেটা অন্তত একদুই কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবার মত তো নয়ই। আর সেকাজটাও তো খোদ ভারতই ধীরে চল নীতিতে ফেলে রেখেছে, দোদুল্যমান ও লোভী হয়ে মনোযোগ দেয়নি। এটা সে ভাল করেই জানে। এবং এখনও মনস্থির কিনা আমাদের জানা নাই। ফলে কানকথা ছড়িয়ে শত্রু আমেরিকার যদি কিছু ক্ষতি করা যায়, ভয় দেখিয়ে কিছু বাগে আনা যায় – তো তাতেই মনের সুখ ভারতের। আর এই কান কথা ছড়ানোর প্রপাগান্ডা মেশিনের দায়িত্ত্ব দিয়েছে বা নিয়েছে হাসিনা সরকার। মন্ত্রী হবার পর, ভারত সফর করা (১৮-২২ জানুয়ারী, ২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রী হলেন তোফায়েল আহমেদ। ভারত সফর থেকে ফিরে ঢাকায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেই এই কানকথাগুলো ছড়িয়েছেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই লিসা কার্টিজের – ভারত, চীন রাশিয়া – এই তিন “অক্ষশক্তিকে” হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখার খলনায়ক হিসাবে প্রপাগান্ডা। এটাকে ভারতের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লিসা কার্টিসের প্রপাগান্ডার কৌশল বলা যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ দিকটা হল, প্রপাগান্ডার লড়াই করা – এই কাজ কোন গবেষকের হতে পারে না। লিসা এখানে গবেষক মর্যাদা থেকে পতিত স্খলিত হয়েছেন।

সত্য লুকানো
লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। একথা বলে লিসা সত্য লুকালেন। বেশিদিন আগে নয় ২০০৭ সালে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল বৈঠকে “দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ভারতের চোখে নিজের নিরাপত্তা ইস্যুটাকে দেখবে” বিষয়টা সাব্যস্ত হয়েছিল সেসময়ের আন্ডার সেক্রেটারী অব ষ্টেট (২০০৫ – ৮) নিকোলাস বার্ণসের উপস্থিতিতে। নিকোলাস বার্নসকে বলা হয় ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকান নতুন ও বিশেষ সম্পর্কের (বিশেষ করে পারমানবিক টেকনোলজি, অন্য অস্ত্র ভারতকে সরবরাহ এবং নিরাপত্তা চুক্তির প্রধান নিগোশিয়েটর) কারিগর। আমেরিকা নিজের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে কি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক রাখেনি, সারাজীবন আমাদের মত দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ঠিক করার যাতাকাঠিটা কি ভারতে হাতে ব্যবহার করতে ধার দেয়নি? এসবই ২০০৭-৮ সালের ঘটনা, আমাদের তা ভুলে যাবার কোন কারণ নাই, লিসারও নয়।
অর্থাৎ চীনের রাইজিং ইকোনমি তথা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে দাড়াবার বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে টেনে তার মন পাবার জন্য আমেরিকা কেবল “ভারতের প্রেসক্রিপসনের” নয়, বাচ্চা যা চায় তা সব পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর তাতে বাংলাদেশের জন্য এমন দানব ভারতের আবির্ভাব ঘটিয়েছে যে তার একক স্বার্থে গড়া যেন এক কলোনি বাংলাদেশ সরকার হাজির করেছে ২০০৯ সাল থেকেই। আজ খোদ ভারত ও হাসিনা সরকার লিসার আমেরিকাকে কলা দেখিয়েছে, তুচ্ছ করছে – এতে এখন বেয়ারা বাচ্চা কথা শুনে না বলে লিসার গোস্যা করার কি আছে? এমনটাই কি হবার সম্ভাবনা সবসময় ছিল না অথবা কথা নয়।
তবে এটা ঠিক সর্বশেষ গত তিন বছর ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে মুখোমুখি সংঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে লিসার কথা কেবল এখন অর্থে সঠিক যে “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাচন-মরণ এমন নির্ধারক ভারত ফ্যাক্টর হয়ে উঠল কবে থেকে? তা কি আমেরিকার প্ররোচনাতেই হয় নাই?
যদি মানবজমিনের অনুবাদের কিছু বাদ পরে না যেয়ে থাকে তবে দেখা যাচ্ছে লিসা বলছেন “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। অর্থাৎ বাক্যটা আমেরিকা “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর কখনও নির্ভর করে নি অথবা করে না” – এমন নয়। লিসা সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যেন প্রছন্নে ধরে নিয়ে বলতে চাইছেন – “আগে করত এখন করছে না”। তো সেক্ষেত্রে “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর” আগে নির্ভর করা আর এখন না করা সবকিছুর দায়ভার কাফফারা সবই তো আমেরিকারই।
এছাড়া এখন লিসা আবিস্কার করে বলছেন, “মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। খুবই ভাল কথা, সত্যি কথা। কিন্তু সত্যি কথাটা অনুভব করতে আমেরিকা বড্ড দেরি করে ফেলেছে। এর দায় এবং দুর্ভোগ দুটার জন্য আমেরিকার তৈরি হওয়াটাই লিসার কপাল! নয় কি? আমেরিকান নীতির দায় খেসারত তো আমেরিকারই। এতে বাংলাদেশে আমাদের দুর্দশার কথা তাকে আর নতুন করে কিইবা বলার আছে এখানে!
তবে লিসা এখন হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। মানবজমিন জানাচ্ছে, “লিসা বলেন, “যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে”। “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না,এটা সত্য”। অর্থাৎ লিসা হাসিনা সরকারকে এখন চিহ্নিত করছেন, “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” সরকার বলে। বিগত ৫ বছর অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারির ইলেকশনের আগে পর্যন্ত কি এটা ভিন্ন কিছু ছিল? লিসা বাক্যের মধ্যে অর্থের একটা ফাঁক রেখে দিতে চেয়েছেন, পরিস্কার করেননি। বাংলাদেশের আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটা ২০০৯ সাল থেকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই,আমাদের কাছে কোন কিছুই নতুন ঠেকে নাই। তাহলে কি লিসা এতদিন খবর নেন নাই, রাখেন নাই? না, আসলে ব্যাপারটা তা না। পুরা প্রশ্নোত্তরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে লিসার বক্তব্যে ছত্রে ছত্রে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতির উপর হতাশা ফুটে বের হয়ে আছে। এটা আসলে নিজ কর্মফলের উপর নিজেরই হতাশা। সেই হতাশা থেকে এখন “দায়ী কে” বলে নিজের দিকে না তাকিয়ে বাইরের শত্রু খোজার চেষ্টা আছে। যেমন যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, “লিসা কার্টিস বলেন,শেখ হাসিনা সরকারকে চীন,রাশিয়া ও ভারতের এই নিঃশর্ত সমর্থন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে”। অর্থাৎ তিনি দোষী খুজে পেয়েছেন, ভারত চীন ও রাশিয়াকে। এই তিন রাষ্ট্রের তাদের স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে। কেন তিনি এভাবে বাইরের শত্রু খুজছেন?

আমেরিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান
লিসার দরকার থাপ্পড় খাবার পরও আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিকে একটা ইতিবাচক ভাবাদর্শগত টোপড় পড়িয়ে আড়াল টানা। যেটাকে বলে আমেরিকান নীতির পক্ষে ইডিওলজিক্যাল ন্যায্যতা জোগাড় করা। লিসার দিক থেকে তিনি জানেন, আমেরিকান নীতির সততা প্রমাণ করতে চাইলে আসলে আগে দরকার বিপরীতে ভিলেন ক্যারেকটার চিহ্নিত ও চিত্রিত করা। ভিলেনকে যত নোংরাভাবে আঁকা তিনি আঁকতে পারবেন আপনাআপনি নায়ক আমেরিকা বা ওর নীতির সততা ততোই উজ্জ্বল হবে। সিনেমার মত এই হল তাঁর ফর্মুলা।
লিসার সম্ভাব্য বা হবু প্রমাণিতব্য বিষয় হল এতদিনের আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যেন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার ততপরতাই এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভিতর দিয়ে এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” খপ্পরে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করার ততপরতা। এখানে তাঁর ফোকাস শব্দ গণতন্ত্র। আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে হাজির করা।
এই প্রসঙ্গে তিনি চিন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির ‘নোংরা’ বা ভিলেন ভুমিকার পিছনের কারণ সম্পর্কে বলছেন। মানবজমিন লিখছে, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যত ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক বিষয়ে লিসা বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন শেখ হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়াবে- এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা, এই দেশ দু’টির নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার কিংবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব কমই উদ্বিগ্ন”। এটা লিসার দেয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা তথ্য সন্দেহ নাই । চিন ও রাশিয়ার “নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই”। তাই তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না, দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন তারা কায়েম করল। এবং তা আবিস্কার করে লিসা আশ্চর্য হন নাই। লিসার এই যুক্তির পাটাতনটা আমেরিকা-রাশিয়ার ঠান্ডা-যুদ্ধের সময়কালের। যখন আমেরিকা রাশিয়ার ‘গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ভিত্তি নাই, ফলে বুঝল না’ বলে প্রপাগান্ডা করত আর বিপরীতে নিজে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন প্রমাণ করতে আমাদের মত সবদেশেই মার্শাল ল’ এর দানব শাসনের সরকার কায়েম করত। পুরা ঠান্ডা যুদ্ধের কালেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের মত সব দেশগুলো চলেছে আমেরিকান সমর্থিত সামরিক শাসনে। এটা বেশ মজার যে লিসা কার্টিজ সেই ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি একালে সবাই যেখানে একই গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রে সম্পর্কিত সেকালে আবার হাজির করছেন। সেসব বাজে ফালতু কথা থাকুক। আমরা বরং প্রশ্ন করি, যে কোন রাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে মুল পরিচালক নির্ধারক ফোকাস কোনটা? আরেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নাকি নিজের পরাশক্তিগত অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অথবা ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ হাসিল করা? এটা লুকিয়ে লাভ নাই যে প্রশ্নাতীতভাবে এর জবাব দ্বিতীয়টা। এবং এটা ঠান্ডাযুদ্ধের সেকাল এবং একাল যেটাই হোক সবকালেই অর্থাৎ সবসময় এটা সত্য। তবে হ্যা এটা কাঁচা সত্য অর্থাৎ কূটনৈতিক ভাষায় এই সত্য এই লক্ষ্য বা ফোকাসের কথা সরাসরি বলা হয় না, বলা যাবে না। বলা হবে মোড়ক, রেঠরিক বা বাকচাতুরি দিয়ে। যেমন ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, কিংবা ‘গণতন্ত্র মহান’ এসব বাকচাতুরির ভাষায়। বেশিদিন আগের নয়, ‘সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ তো আমরা সেদিনও বাংলাদেশে দেখেছি।
তাহলে দাড়ালো এই যে বাংলাদেশের জন্য লিসার আমেরিকা গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আর চীন বা রাশিয়ার নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই বলে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না – এই তত্ত্বের বেইল নাই। এটা ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি। কিন্তু তবু লিসার তত্ত্বে আর একটা জিনিষ কিছুতেই বেড় পায় নাই মানে চওড়ায় আটাইতে পারে নাই। লিসার এই তত্ত্ব ভারতের বেলায় খাটাতে গিয়ে তিনি বিপদ টের পেয়েছেন। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নরা ভারতকে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” পরাকাষ্ঠা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলে ফেলে থাকে। ফলে চীন বা রাশিয়ার মত ‘নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই’ বলে সব সমস্যাকে এসেন্সিয়াল করার লিসার বিগতযৌবনা যুক্তি বা তত্ত্বটা এখানে খাটছে না। তাই এবার নতুন পাঞ্চ, নতুন টুইষ্ট বা প্যাঁচ। মানবজমিন লিখছে, “লিসা কার্টিস বলেন, ভারতে যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ গতিশীল এবং দেশটি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে থাকে, কিন্তু নিজ দেশের গণ্ডির বাইরে গণতন্ত্র উত্তরণে নয়া দিল্লিকে কখনও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি”।
আগে বলেছি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চাওয়া না চাওয়াটা এমনকি কোনটাকে গনতন্ত্র করা হচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়া হবে এর সবটাই নির্ভর করে ভারতসহ যেকোন বিদেশীদের বিদেশনীতিতে কোনটা তাদের নিজেদের আপন স্বার্থে যায় এর উপর। অর্থাৎ সুপ্রিম হল, ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন স্বার্থ। কেউই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য নিজের রাষ্ট্রে দোকান খুলে নাই। বাংলাদেশের জনগণও তা করতে কাউকে দিতেও পারে না। প্রশ্নও উঠে না। য়ার ২০০৯ সালে কি আমেরিকা ভারতের হাত দিয়ে আমাদেরকে হাসিনার মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন উপহার দেয়নি? আসলে লিসা এই প্রশ্নোত্তর লিখার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, লিসা কার্টিজ একজন কূটনৈতিক নন বরং গবেষক, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। গবেষক হিসাবে তাঁর কাজ কোন বিদেশনীতিকে ক্রিটিক্যাল ও এনালাইটিক্যাল চোখে অর্থাৎ বিশ্লেষক হিসাবে ঘটনাবলিকে দেখার বিরাট সুযোগ তার ছিল এবং আছে। বিদেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বাস্তবের মুখোমুখিতে পড়লে ওর সমস্যাগুলো কি, কি চেহারা নিয়ে তা দাড়ায় তা নিয়ে বিশ্লেষক অন্তর্দৃষ্টি হাজির করা হত পারত তার আসল ভুমিকা। সম্ভবত একাজে তাঁর ঘাটতি খামতি ঢাকতেই তিনি গবেষকের বদলে স্বচ্ছন্দে তিনি যেন কূটনৈতিক – এই ভুমিকায় নেমে পড়েছেন।

আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক
মানবজমিনের প্রশ্নোত্তরের রিপোর্টিংয়ের শুরুতে বলেছে, “গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্বার গণআন্দোলনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে। গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না”। একথাগুলো লিসা কার্টিজের প্রশ্নোত্তরে বলা তার নিজেরই কথা কি না আমরা পরিস্কার হতে পারিনি। হতে পারে তা লিসা কার্টিজের লেখা জবাবের কোন অংশ পড়ে মানবজমিন রিপোর্টারের মনে যে ছাপ তৈরি হয়েছে সেই সুত্রে লেখা। যাই হোক সেটা, এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত একবছরের বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথাই যদি বলি যখন গণবিক্ষোভ আন্দোলনের তোড়ে এক পর্যায়ে ঢাকা ঢাকার বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল সেসময় এর প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি। চলমান ঐ গণআন্দোলন যতই মাত্রা লাভ করছিল আমেরিকাসহ বাংলাদেশের পশ্চিমা কূটনীতিকরা ততোই একে ‘সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করছিল বললে কম বলা হবে। বলতে হবে অভিযুক্ত করেছে একতরফা ভাবে। আর তথাকথিত ‘অহিংস’ প্রতিবাদের কথা নসিহত করছিল আমাদের। কিন্তু এই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে হাসিনা সরকারের রাস্তায় প্রতিবাদ “বিক্ষোভ দেখা মাত্রই আর্মড গাড়িতে চড়ে সরাসরি গুলি” এই মারাত্মক মোকাবিলার ধরণ সম্পর্কে কোন কার্যকর নোটিশ তারা করেছে এমন প্রমাণ তারা রাখে নাই। অর্থাৎ সরকারের সরাসরি গুলি এটা সহিংসতা নয়, নৃশংসতা নয়। যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সেটা সহিংসতা করা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্যের পিছনে এমন নীতিটাই আমরা দেখেছি।
অর্থাৎ দেখা গেছে আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে হাসিনা এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে তবে সততার সাথে তা বলতে হত, করতে হত। উলটা জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংসতা’ বলে লেবেল লাগিয়ে পালটা প্রচারণায় তাদের নামার কথা নয়। কিন্তু তারা সেটাই করেছে। নিজেদের স্ববিরোধী নীতিটারই বাইরে সরব প্রকাশ ঘটিয়েছে। কূটনীতিকদের কথা সে জগতে থাক। লিসা কার্টিজ বা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গে সেদিকে আর না যাই। কূটনীতিকদের কথা বাদ রেখে এনিয়ে খোদ লিসার আর এক লেখা (৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগে লেখা) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু সারকথা বলা যাক। লেখার শিরোনাম, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াঃ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে রাখা। এখানে দেখুন। [Combating Islamism in South Asia: Keeping Bangladesh on the Democratic Path] এই লেখা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে স্পনসর করা লিসা কার্টিজের কাজ। ওর সারাংশ দেয়া আছে রিপোর্টের শুরুতে সেখান থেকে একটা বাক্য, “While the threat from terrorism had diminished to some extent under the government of Prime Minister Sheikh Hasina, the recent execution of an Islamist politician and the sentencing to death of other opposition leaders accused of war crimes during Bangladesh’s war of independence in 1971 have unleashed furor among Islamists.”। অর্থাৎ লিসা দাবি করছেন হাসিনা সরকারের অধীনকালে নাকি সন্ত্রাসবাদের বিপদ কিছুটা কমেছে। কিন্তু লিসা কিভাবে বুঝলেন যে বিপদ কমেছে। তাঁর বুঝাবুঝির নির্ণায়ক, মানে কি দেখে তিনি বুঝলেন? আমরা জানি না। কিন্তু এক নিশ্বাসে একই বাক্যের পরের অংশে বলছেন, “একজন ইসলামিষ্ট রাজনীতিকের ফাঁসি দেয়া হয়েছে”। অর্থাৎ লিসা সরাসরি বলছেন না তবে তার নির্ণায়ক কি সেটা তিনি ইঙ্গিতে বলছেন।
কিন্তু কোন ‘ইসলামি রাজনীতিকের’ ফাঁসির সাথে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কি? হাসিনা কি তাঁকে ফাঁসি দিয়েছেন “সন্ত্রাসবাদের” জন্য? আমেরিকা “সন্ত্রাসবাদ” মনে করে তেমন কোন ততপরতার জন্য এই ফাঁসি দেয়া? লিসা সেটা খোলসা করে না বরং ইঙ্গিতে ধরে নিতে বলেছেন। চিন্তার এই ফাঁকি ও অসততাটা লক্ষণীয়। আবার তিনি বলছেন ফাঁসিটা “‘৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত হিসাবে তবে এটা ইসলামিষ্টদের বিক্ষুব্ধ করেছে”।
তিনি যদি বুঝাতে চেয়ে থাকতেন, ৭১ সালের একটা কৃত যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি এটা তাহলে এটা কোনই সমস্যার হত না। যদিও সেক্ষেত্রে সেই অপরাধী ইসলামিষ্ট কিংবা ইসলামিষ্ট নয় তাতে কিছুই এসে যাবার কথা নয় কারণ এটা গৌণ দিক। মুখ্য দিক হবার কথা তিনি যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তিনি এই ফাঁসির ঘটনাকে সম্পর্কিত করছেন ১) হাসিনাকে “সন্ত্রাসবাদের হুমকি” কমানোর নায়িকা হিসাবে। (২) ফাঁসির কারণে যারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরকে বিক্ষোভকে “ইসলামিষ্টদের বিক্ষোভ” হিসাবে চিহ্নিত করে।
একটা কথা লিসাসহ এমনভাবে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে পরিস্কার করে বলতে হবে। ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ কি একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ? যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার? আমাদের মনে রাখতে হবে, আলকয়েদা বা তা সংশ্লিষ্ট দল বা গ্রুপের ততপরতা অথবা আলকায়েদার মত ততপরতাকে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার
কোন প্রশ্ন না রেখে ধরে নিচ্ছি আমেরিকায় সংজ্ঞায় যেটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয় সেটাই সন্ত্রাসবাদ। আদালতে কোন অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়ে গেলে তা থেকে বুঝার উপায় কি যে ঐ অপরাধ সন্ত্রাসবাদের অপরাধ ছিল কি না? তার আগে একটা কথা পরিস্কার করে নেই। অপরাধটা যদি কোন “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” করেন (লিসা কার্টিস Islamist politician বলে এক শব্দ ব্যবহার করেছেন) তাহলেই কি সেটাকে সন্ত্রাসবাদের অপরাধ বলে বুঝব? না তা অবশ্যই বুঝা যাবে না, বুঝা ঠিকও হবে না। কারণ মূল বিষয় হল, দেশের কোন আইনে অভিযোগটা দায়ের করা হয়েছে এটাই সবকিছুর নির্ধারক। এটাই এবিষয়ে সব তর্কের অবসানের মুখ্য উপায়। ফলে অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে “যুদ্ধাপরাধ আইনে” (আমাদের মূল ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ যা সংশোধিত হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার তার সর্বশেষ সংশোধনীসহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। আর অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে আমাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (আমাদের মূল সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে তা সহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র সন্ত্রাসবাদের অপরাধ করেছেন, অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। এই কথা থেকে পরিস্কার যে, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ কোনভাবেই নয়। এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচা্র তাও কোনমতেই নয়। যেসব জামাতের নেতাদের বিচার চলছে বা ফাঁসি হয়ে গেছে এরা কেউই “সন্ত্রাসবাদের অপরাধে” এখনও বিচারের কাঠগড়ায় অথবা বিচার শেষে রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত বা ফাঁসিপ্রাপ্ত তা একেবারেই নয়। মুল কারণ তাদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ – এই আইনে। এরপর আশা করি জামাতের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধাপরাধের (আসলে সঠিক আইনী ভাষায় ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’) বিচার বা শাস্তিকে কেউ “সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে” বিচার হচ্ছে বলে বুঝবেন না, ভুল করবেন না, মিথ্যা ছড়াবেন না। এমনকি জামাতের কোন নেতাকে (লিসা কার্টিসের মত করে) কেউ Islamist politician বলে মনে করেন কিংবা না করেন তাতে কোন ফারাক পড়বে না।
এখান লিসা কার্টিসের চিন্তার ফাঁকিটা গ্রেফতার করা যায়। এরপরেও জবরদস্তিতে লিসা কার্টিজ যদি মনে করেন, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধটাও একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ। তাতেও আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু লিসা কার্টিজসহ যারা এভাবে মনে করবেন তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তাহলে আমেরিকা নিজেই ঐ “সন্ত্রাসবাদের” অংশ। আজ ৭১ সালের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলেন অথবা “সন্ত্রাসবাদ” বলেন যে নামেই লিসা কার্টিজ ডাকেন এর দায়ভার আমেরিকারও। কারণ তখন আমেরিকান অবস্থান মুসলিম লীগ বা জামাতে ইসলামসহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকের পক্ষে ছিল, সমর্থন ছিল।
ধরে নিচ্ছি আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নের এসব বিপদ টের পেয়ে এবার হয়ত লিসা কার্টিজ জোর দিবেন তাঁর ব্যবহৃত “ইসলামিষ্ট” শব্দটার উপর। অর্থাৎ ইসলামিষ্ট রাজনীতি মানেই “সন্ত্রাসবাদ”, ফলে সন্ত্রাসবাদের বিপদ দেখতে পাওয়া। লিসাদের জেনে অথবা না জেনে অথবা চিন্তায় ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভুত দেখে বেড়ানোটাও আরও মারাত্মক বিপদের। কারণ জামাত ইসলামি ইসলামি রাজনীতি করে তাতে সন্দেহ নাই। এই অর্থে লিসা যদি “ইসলামিষ্ট” শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই বিচারটা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের আইনে কোন এন্টি-টেরর ল জাতীয় কোন “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” নয়। ফলে আমেরিকার “সন্ত্রাসবাদ” খুজে ফেরা চোখে লিসা কার্টিজ বড়জোর একজন আমেরিকান নাশনালিষ্ট নাগরিক, কোন মতেই কোন গবেষক নন। এছাড়া আমরা আরও বুঝব লিসাও হাসিনার বাকচাতুরির ফাঁদে পড়েছেন। এই ফাঁসি কোন এন্টি-টেরর এক্টে হচ্ছে কি না – এই সহজ দিকটা খেয়াল করার মত বুদ্ধি তিনি দেখাতে পারেন নাই। যদি লিসা দেখতেন, জানতেন তবেই সেটা খুব সহজেই আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী ঘটনা তিনি বলতে পারতেন ও সে ঘটনাকে তাঁর ‘ইসলামিষ্টের বিচার’ কথার কোন অর্থ হত।
হুশ হারানো বুদ্ধি বিবেচনার এই স্ববিরোধ লিসা কার্টিজের একার নয়। আমেরিকাসহ প্রায় সব পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও একই অবস্থা। ইসলামিষ্ট কথাটাকে তারা জবরদস্তি তাদের সংজ্ঞার সন্ত্রাসবাদ বলে ইঙ্গিত মেরে প্রচ্ছন্নে বুঝাতে চান। এভাবে তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া তারা নিজেরাই গুলিয়ে ফেলেন। অথবা ইচ্ছা করে করে রাখেন। কিন্তু বটম লাইন হল, জামাত আওয়ামি লীগের মতই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটুশনাল আইনী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাদের উভয় দলের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা পাড়ায় আওয়ামি লীগের মতই জামাতও চাপাতি ধরণের সন্ত্রাস করে। কিন্তু চাপাতির সন্ত্রাস করলেও যেমন আওয়ামি লীগ সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের কোন রাজনৈতিক দল নয় ঠিক তেমনি জামাতও আওয়ামি লীগের মতই কোন সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের রাজনৈতিক দল নয়। এমনকি একথা ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মওলানা মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তার ও দলের ক্ষেত্রেও সমান সত্য ও প্রযোজ্য।

যদিও সমস্যাটা কেবল লিসা কার্টিজের নয়, কেবল পশ্চিমা কূটনৈতিকদেরও নয়। এমনকি আমাদের অনেকেই ইসলামি রাজনীতি অপছন্দ করি বলে এই জবরদস্তি জেনে অথবা না জেনে করি। সে যাক, পশ্চিমা কূটনৈতিকরা মনে করতেই পারেন তারা তাদের সন্ত্রাসবাদের লড়াই করবেন আর সেকাজে বাংলাদেশে একটা “গণতান্ত্রিক” মেকানিজম ও প্রক্রিয়া চালু রেখে বা দেখতে চেয়ে তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করবেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার আগে তাদের মনে খোলা হতে হবে। “ইসলামিষ্ট” শব্দটা শুনে কোন আগাম ধারণার বশবর্তি হয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার কিছু নাই। অন্তত আইডিয়ালি বললে একাজে তারা কোন ব্রান্ডের “ইসলামিষ্টদেরকেও” না পাবার কোন কারণ নাই। কারণ শুনে ইসলামিষ্ট লাগলেও মর্ডান রাষ্ট্রের মত এক লিবারেল রাষ্ট্রই তাদের কল্পনা – এটুকু আছে কিনা সেটাই তো মূল বিবেচ্য হওয়ার কথা।
তাহলে, মুল সমস্যাটা পশ্চিমা মনের। এই স্ববিরোধের কারণে তাই একদিকে লিসা কার্টিজ হাসিনা সরকারকে সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ে খামোখা সার্টিফিকেট দেন আবার অভিযোগ করেন হাসিনার বাংলাদেশ এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে।

একটা সতর্কবাণী দিয়ে শেষ করি। এতক্ষণ কথাগুলো বলেছি, বাইরের মানুষ আমাদেরকে কি করে দেখে সেদিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজটা আমাদের। এবং একান্তই আমাদের। একমাত্র আমাদেরকেই তা বাস্তব করে তুলতে হবে। সেকাজে আন্দোলন সংগ্রামই আমাদের পথ। লিসা কার্টিস সহ বাইরের কেউ আমরা কি করি জানতে আগ্রহ থাকতে পারে। তাতে তাদের দেখার স্ববিরোধীতাটা কোথায় তা তারা ঠিক জানুক আর নাই জানুক, আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আশা করি সেদিকটা আমলে রেখে আমরা লেখাটা পাঠ করব।

SHORT LINK:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩), তৃতীয় কিস্তি

তৃতীয় কিস্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩)

চীনের বাংলাদেশ নীতি ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের ভুমিকা

গৌতম দাস

১৮ এপ্রিল ২০১৪

http://wp.me/p1sCvy-5E

বাংলাদেশে বসে চীন প্রসঙ্গে প্রায় সব আলোচনায় সবচেয়ে যেটা সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, লেখক ও পাঠক উভয়েই প্রসঙ্গে প্রবেশ ও পাঠ শুরু করে এটা ধরে নিয়ে যে চীন একটা ‘কমিউনিষ্ট’ বা ‘সমাজতন্ত্রী’ রাষ্ট্র। কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র বলতে প্রচলিতভাবে কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র শব্দটা সম্পর্কে যে পপুলার বুঝ আছে এর উপর দাঁড়ানো ধারণাটাকে বুঝিয়েছি। আর সেই সাথে, কমিউনিষ্ট চোখে দেখা অর্থাৎ ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক রাজনীতির যুগে আশির দশক পর্যন্ত দুনিয়াকে যেমন বলে মনে করা হত, যে চোখে দেখা ও ব্যাখ্যা করা হত সেই বুঝ দিয়ে চীনকে বুঝা বা ব্যাখ্যা করার অভ্যাস – এই সবটাকে বুঝিয়েছি। কিন্তু ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার কারণে পুরানা সেই চিন্তার ফ্রেম ও অভ্যাস যার উপর দাঁড়ানো ছিল সেই বাস্তবতাই আমুল বদলে গেছে, দুনিয়ার অজস্র পরিবর্তন এসেছে। আবার আমূল পরিবর্তন শুধু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে দুনিয়ায় ঘটেছে তাই নয়। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে পড়ার অন্তত ১৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের আর এক ঘটনা ছিল সেটা। ১৯৭১ সালের পর থেকে ক্রমশ চীন-আমেরিকার সম্পর্কের বাস্তব প্রেক্ষিতটাই যখন বহু কিছুকে আমুলে পরিবর্তিত করে দিয়ে গেছে। খুব কম মানুষই বিশেষ করে ‘কমিউনিষ্ট’ মহলে এই গুরুত্বপুর্ণ বদল নজর আমলে এসেছে। অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার ঘটনাটা ঘটলে বা না ঘটলেও এর থেকে স্বধীন ভাবে ঘটেছিল সেই ঘটনা। এসবের দিকে বেশিরভাগ লেখক ও পাঠকের কোন নজর হুশ সেখানে থাকেনি। সেসব বিস্তারে এখানে না যেয়ে বিষয়টাকে এককথায় বললে, এখন চীন আমেরিকা উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত একক অর্থনীতিতে গভীরভাবে সম্পর্কিত দুটা রাষ্ট্র। এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়লে অথবা না পড়লেও এটা একইভাবে সত্য – এই বাস্তব দিকটায় নজরে আনতে চায় না কেউ। বরং আশির দশকের ধারণা ও ব্যাখ্যা দিয়েই দুনিয়ার ঘটনাবলিকে এখনও ব্যাখ্যা ও বুঝবার কসরত করতে দেখা যায়। এমনকি সর্বশেষ গত ২৫ বছরের রাইজিং চীনের পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে মৌলিক তথ্য সংগ্রহের ও তাতে নজর দেবার বিষয়ে সবাই পিছিয়ে। অথচ পুরান কায়দায় বাস্তবতাহীন দৃষ্টিভঙ্গির ও অকেজো তত্ত্ব ও ব্যাখ্যার বিপরীতে একেবারে গোড়ার কথাটা হলো, চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত হবার ভিত গাড়া ঘটেছিল সেই সত্তরের দশকের শুরু থেকে। আবার রাষ্ট্র দুটার সম্পর্কিত হওয়া মানে আর তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধ নাই তা একেবারেই নয়। আগে অনুমান করা হত রাশিয়া-আমেরিকা অথবা চীন-আমেরিকা ব্যাপারটা “সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিতন্ত্র” ধরণের বিরোধ, যেটা ইডিওলজিক্যাল। সেই অনুমান মিথ্যা নয়। কিন্তু এব্যাপারে এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্টটা আমাদের চোখের আড়ালে থেকে গেছে। তা হল, বিরোধটা ইডিওলজিক্যাল কি না এরচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হলো তখন চীন-আমেরিকা (অথবা রাশিয়া-আমেরিকা) এমন দুই রাষ্ট্র ছিল নিজেদের মধ্যে কোন লেনদেন বাণিজ্যের সম্পর্কহীন এবং প্যারালাল, ফলে দুই আলাদা অর্থনীতির। আর সত্তরের দশকের পর থেকে চীন-আমেরিকা (এবং রাশিয়ার বেলায় তা ১৯৯১ সালের পর থেকে) ক্রমশ হয়ে পড়েছে সবাই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত। উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে থাকলেও সেই সাথে তাদের মধ্যে ভালরকমের স্বার্থগত বিরোধ প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তাতে আছে। কিন্তু হাতে গুণে মনে রাখতে হবে সেটা আর ‘পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র’ ধরনের ইডিওলজিক্যাল নয়। আবার আগের মতই কিন্তু নতুন রূপে পরাশক্তিগত বিরোধ আছে তাদের মধ্যে শুধু তাই না, তা বাড়ছে কিন্তু কোনভাবেই তার ভিত্তি আগের মত ইডিওলজিক্যাল নয়। এটা “রাইজিং ইকোনমির” চীন বা রাশিয়া।

“রাইজিং ইকোনমির” চীন অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা
লেখার শুরুতে নতুন পাঁচ পরাশক্তির উত্থানের কথা তুলেছিলাম। এই পাঁচের – ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকা – মধ্যে আবার সবাই “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে একদর হলেও এক মোটা দাগে চীন অন্য চারটার চেয়ে ভিন্ন, আলাদা গুরুত্ত্ব বিবেচনা রাখে। রাইজিং ইকোনমি মানে যার জিডিপি ভাল, দুই ডিজিটের দিকে তরতর করে আগাচ্ছে, প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ যেখানে ছুটে যাচ্ছে, গ্লোবাল বাজার শেয়ার যার বাড়ছে ইত্যাদি। কিন্তু ভিতরে হাত দিয়ে দেখলে বুঝা যাবে, এক চীন ছাড়া আর চার রাষ্ট্রের কারও অর্থনীতির ভিত্তি ম্যানুফাকচারিং বা ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশন নয়। অবস্থাটা হলো, ঐ চার রাষ্ট্রের অর্থনীতিও চীনের মতই বিদেশি বিনিয়োগ হজম করছে কিন্তু তা মূলত মাটির নিচের সম্পদ (তেল, কয়লা, মিনারেল ইত্যাদি) তুলে আনা আর তা বিদেশে রপ্তানী বিক্রি করতে। এরপর তা বেচে-খেয়ে শেষ। ইন্ডাষ্টি বলে নতুন কোন অর্থনীতির চক্র শুরু সেখান থেকে আবার হয় নাই। যদিও বৈদেশিক রিজার্ভ আনার তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে তা এদের সবার শক্ত হচ্ছে, উদ্বৃত্বের অর্থনীতি বলেও তা আপাতত হাজির হচ্ছে। কিন্তু ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের কোন ভিত্তি এর নাই। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের রাষ্ট্রের মাটির নিচের সম্পদের অন্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির কারণে বিপুল চাহিদা তৈরি করে আছে, বাজার আছে, বিক্রি হচ্ছে, তবেই সেগুলো ‘সম্পদ’ বলে বিবেচিত হচ্ছে। নইলে তা মাটির নিচের আবর্জনা বৈ কিছু নয়। রাশিয়ার কথাই ধরা যাক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০০৭-৮ সাল পর্যন্ত ১৭০ ডলার ব্যারেল ছিল। এরপর মহামন্দা দেখা দিলেও এখনও তা ১০০ ডলারের আশেপাশে, এর নিচে যায় নাই। ফলে রাশিয়ান উদ্বৃত্ত্ব অর্থনীতি বলে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। আভ্যন্তরীণ বাজারমুখি ইন্ডাষ্টিয়াল ভিত্তি একটা ওর আছে ঠিকই কিন্তু উতপাদন দক্ষতা, মান ও ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা চরমে ফলে তা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানীযোগ্য নয়; একারণে রাশিয়ার ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ভিত্তি কোরিয়ারও সমতুল্য নয়। ফলে রপ্তানী দূরে থাক তা টিকে থাকার জন্য ধুকছে। এসবের বিপরীতে চীনের ভিত্তি একই সাথে ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের এবং তা রপ্তানীর আর নিজ ব্যাপক জনসংখ্যার গুণে নিজের আভ্যন্তরীণ বিশাল ভোক্তা বাজারের উপর দাঁড়ানো। তাহলে মুল কথা হল, রাইজিং অর্থনীতির চীন অন্য চার রাইজিং অর্থনীতির চেয়ে বিশেষ। আবার অন্য দিক থেকে, এখন সারা দুনিয়া জুড়েই প্রায় রাইজিং অর্থনীতিরসহ সব রাষ্ট্রই একই এবং একটাই – এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে ও পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল। এই কথাটা মনে রেখে ঘটনাবলির দিকে তাকানো, মাঠের তথ্য সংগ্রহ ও এর ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হতে হবে আমাদের। এর ভিতরেই এবার পরাশক্তিগত পাশ ফেরা অদলবদল নতুন কি ঘটছে তাই এই লেখার প্রসঙ্গ। ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব করলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রপ্তানী বাজারমুখি দখলের প্রতিযোগিতায় বড় প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়ার হয়ে চীন প্রায় পঁচিশ বছর কাটিয়েছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রীয় ঋণে চীনের কাছে ঋণী। এক আমেরিকায় চীন রাষ্ট্র তিন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের (ক্রয় করা আমেরিকান সরকারি বন্ড, অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি) মালিক।
কিন্তু যেটা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় তা হল, (১) এখন পর্যন্ত চীনের এই প্রচেষ্টা পশ্চিমের এম্পেরিয়াল কায়দায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজার দখলের মত নয়। এম্পেরিয়াল কায়দা মানে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক সামরিক শক্তি বা যাতাকাঠি ব্যবহার করে, প্রভাব বিস্তার করে জবরদস্তি খাটিয়ে সস্তায় কাচামাল সংগ্রহ ও সেই দেশে নিজের জন্য পণ্যবাজার দখল করে আগানো। বৃহত্তর অর্থে, দুনিয়ায় আগের মতই পরাশক্তিগত এম্পেরিয়াল কায়দাই চালু আছে। কিন্তু এর ভিতরেই চীন একটু আলাদা তুলনামূলকভাবে, কোন পলিটিক্যাল যাতাকাঠি ব্যবহার না করেই এক ধরনের প্রতিযোগিতাপুর্ণ “ভাল ডিল” দিয়ে ব্যবসা বাগানোর যে সুযোগ আছে তাকেই ব্যবহার করে এগিয়ে চলছে চীন। এতটুকু তুলনামূলক অর্থে এটা ভিন্ন। এককথায় বললে অন্য রাষ্ট্রের সরকারে কে থাকবে, কাকে উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে -একাজে ‘পলিটিক্যাল লিভারেজ’ ব্যবহার করে নিজের অর্থনীতি আগিয়ে নেয়ার নীতি এখন পর্যন্ত চীনের নয়। এখনও পর্যন্ত তাই আমাদের মত ভিন দেশে চিনের স্বার্থের প্রকৃতি রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক। এই নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে চীন আগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। (২) দুনিয়ায় চলমান গ্লোবাল দ্বন্দ্ব বিরোধে তা কোন ধরনের সামরিক ঝগড়া বিরোধের দিকে মোড় নিলে সেখানে আর নিজেকে জড়িত না করা। বড় জোর কূটনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা। এটা রাইজিং চিনের আর এক লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট। চীনের এই নীতিতে ব্যতিক্রম আছে তা হল, নিজ রাষ্ট্রের ভুখন্ডগত স্বার্থের (তাইওয়ান ইস্যু সহ) বিষয় হলে তবেই সামরিক দিকও সেখানে একটা অপশন। এককথায় বললে পলিটিক্যাল খবরদারী ও সামরিক ষ্টেক বা ভাগীদার হিসাবে নিজেকে না জড়িয়ে কেবল ব্যবসা, নিজের অর্থনীতি এগিয়ে নেয়া – এই হল এখন পর্যন্ত চীনা বৈশিষ্ট। এথেকে এমন বুঝা বা দাবী করা ভুল হবে যে এই নীতি চীন আগামিতে সবসময় বজায় রাখবে। তবে এখন পর্যন্ত এটা চিনের আগাবার লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট – এদিকটা যেন আমাদের নজর না এড়ায়।
উপরের যে দুটো গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় আমলে আনলাম, গত ২০০৯ সালের পর থেকে ওর প্রথম বিষয়টায় চীন আরও কিছু পালক লাগিয়েছে। এককথায় বললে তা হল, পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে পুব বা এশিয়ামুখি হয়ে অর্থনীতিকে আগানো। এশিয়ামুখি মানে? এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্র করে কোন এম্পেরিয়াল কায়দার মত করে ব্যবসা ও অর্থনীতি? না অবশ্যই তা নয়। কারণ, (১),পলিটিক্যাল খবরদারী বা লিভারেজ ছাড়াই প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা এই নীতি এখনও অটুট। (২) চীন এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে এক পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে উঠার অর্থনীতি দাঁড় করাতে চায়। লো টেকনোলজি এবং শ্রমঘন গার্মেন্টসের আমাদের মত পিছিয়ে থাকা দেশের রপ্তানী শিল্পের ক্রেতা হতে চায় সে নিজে। আর এর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ মূল মেশিনারিজ, কাপড়ের মেশিনারি ও কাচামাল তৈরি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ ইত্যাদি আমাদের দেশের অবকাঠামোগত খাতগুলোতে সব বিষয়ে বড় বিনিয়োগ চীন এগিয়ে আসবে, প্রবেশ করবে। অর্থাৎ এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলো যে যা রপ্তানী করতে সক্ষম এমন পণ্যগুলোর ক্রেতা হবে সে নিজে, নিজের বাজারে তাদের প্রবেশ সহজ করবে আর তুলনায় হাইটেক কারখানা বা অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগে সে এগিয়ে প্রবেশ করবে। এভাবে লেনদেন বিনিময়ের এক নতুন যুগের এশিয়া গড়তে চায় চীন। এভাবেই এশিয়ায় পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে ঊঠার এক এশিয়া ভারকেন্দ্রের অর্থনীতির সুচনা করতে চায় চীন। এই ইচ্ছা ও পরিকল্পনা সম্ভব হবার বা তা যে কাজ করবে এর কারণ বা পিছনে মুল শর্ত উপস্থিত আছে। ইতোমধ্যেই চীনের শ্রমমুল্য পিছিয়ে পড়া এশিয়ার দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। ফলে আমরা সেসব রপ্তানী পণ্যের ক্রেতা হবে চীন যেসব সে নিজে উতপাদন করতে চাইলে চীনের শ্রমমুল্য বেশি বলে তা তাদের পোষাবে না। এসবেরই সারকথা হলো, চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে আসার জন্য আমাদের পলিটিক্যাল ষ্টাবলিটির অপেক্ষায় আছে। একথাগুলো মাথায় রেখে এই প্রসঙ্গে ২০১২ সালের অক্টোবরে ডেইলি ষ্টার পত্রিকায় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের এক সাক্ষাতকার ও একই প্রসঙ্গে পত্রিকার নিজস্ব একটা রিপোর্ট এর লিঙ্ক দেখা যেতে পারে। উপরে বাংলাদেশের প্রতি চীনা নীতির এপ্রোচ বা পেশ হওয়া প্রসঙ্গে যে ছবি এঁকেছি ডেইলি ষ্টারের এই দুই লিঙ্ক থেকে এর স্বপক্ষে কিছু যুক্তি প্রমাণ পাওয়া যাবে।

আমেরিকা বিদেশনীতি ও সেই সুত্রে ভারতের বিদেশনীতি ক্রিয়ার চীনের প্রতিক্রিয়া
উপরে যেদিকের কথা দিয়ে শুরু করেছি তা, অবশ্যই চীনের প্রতিক্রিয়া। মানে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া। কোন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া? লেখার শুরুতে বলা পরাশক্তিগত ওলটপালট আসন্ন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ও ভারতের ক্রিয়ার বিরুদ্ধে। কথা শুরু করেছিলাম ২০০৭ সালের আমেরিকার বিদেশ নীতির বৈশিষ্ট – এই ক্রিয়া থেকে। শুরুতে ভারতের পিঠে হাত রাখার জন্য আমেরিকান ক্রিয়ার কথা বলেছিলাম। আজকের একই পুঁজিতন্ত্রে গাথা দুনিয়ায় প্রত্যেক রাষ্ট্রের বিদেশনীতি মতিগতি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে একেবারেই উদোম হয়ে চলে। ফলে আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতিতে কি আছে কি বদল এসেছে তা আর কোন গোপন বিষয় নয়। বিপরীতে চীনা প্রতিক্রিয়া এবং নীতিও। পরাশক্তিগত পালাবদলের পুরা সার্ভে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর গত ২০০৯ সালে ওবামা চীন সফরে গিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য শুরুতে মিডিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে হম্বিতম্বি দামামা ছিল। কিন্তু যখন ওবামা ফিরলেন তখন মিডিয়া জুড়ে কেবল অর্থনীতির নানান ক্ষেত্রে চীন-আমেরিকা সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি আর সেই সাথে ওবামার ব্যাগে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার খবর। সাধারণ্যে আমরা চীন-ভারত ব্যবসায় খবর খুব কম রাখি, বিরোধ দ্বন্দ্বের খবরই ছেয়ে থাকে উপরে। চীন-ভারতের ব্যবসা বা বাজারের আকার ছিল ২০০২ সালে ৫ বিলিয়ন ডলার, আর ২০১১ সালে তা বেড়ে দাড়ায় প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতি পরাশক্তিগত পাস-ফেরার ইঙ্গিতে যতই মারমুখি সামরিক হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছে এর বিরুদ্ধে চীনা প্রতিক্রিয়া ততই এদের প্রতি ব্যবসায়িক ও সহযোগিতামূলক, গরম ক্রিয়াকে ঠান্ডা করতে ঠান্ডা পানি ছিটানোর প্রতিক্রিয়া। বড়ভাই আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় ভারত ২০০৭ সাল থেকেই নিজেকে পরাশক্তি ভাবা শুরু করে। অপ্রয়োজনীয় মাসল দেখানোর ভিতর দিয়েই সব সমস্যা বিরোধের মীমাংসা হবে এমন ভাবা শুরু করেছিল। “এই চীন আসছে” ধরণের খবরে ভারতের মিডিয়াগুলো মুখর হয়ে থাকত। এমনিতেই সবাই জানে ভারতের মিডিয়া বা থিঙ্কটাংকগুলোও স্বীকার করে যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ ভারতীয় বাহিনীর মনে একটা ট্রমাটিক অবস্থা তৈরি করে দিয়ে গেছে। যদিও সেই থেকে চীন-ভারতের বাস্তব বিরোধ মূলত অরুণাচল প্রদেশের সীমানা নিয়ে, মূলত এই এক ইস্যুতে। সর্বশেষ গত বছর ২০১৩ এর শেষে, সীমান্ত বিষয়ক সেই সন্দেহের গোড়া উতখাত করেছে চীন। প্রথমে গত ২০১৩ সালের মে মাসে চীনা প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেছিলেন আর এর পাঁচ মাস পরে পালটা সফরে অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর চীন সফরে, সেখানেই চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ মিটানো বিষয়ে Border Defence Cooperation Agreement (BDCA) নামের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীন-ভারত সহযোগিতা সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তি সুদুরপ্রসারি ইঙ্গিতময়। এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের যুগ খুলেছে। আর এটা ঠিক ততটাই ভারতের যুদ্ধংদেহী বাজপাখি নীতির অনুসারিদের এবং সারা পশ্চিমা মিত্রসহ আমেরিকার জন্য চপেটাঘাত।
এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম আমেরিকার সার্ভ রিপোর্টের কথা। আমেরিকা নিজের একক পরাশক্তিগত ভুমিকার পতন আসন্ন রিপোর্টের এই ইঙ্গিতে দিশেহারা হয়ে এশিয়ার রাইজিং চীন-ভারত দুই ইকোনমির মধ্যে পরস্পর লাগালাগি যত তীব্র করে রাখতে পারবে ততদিন নিজের সম্ভাবনা তার আশা জীবিত থাকবে অনুমান করে আমেরিকা নিজের এশিয়া-নীতি রচনা করেছিল। ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে দাবড়ানো –এভাবে সাজাতে মনস্ত করেছিল। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান চীন-ভারতের মাঝখানে বলে সর্বশেষ ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশকে নিজের ষ্ট্রাটেজিক গুরুত্বে আমল করতে শুরু করতে ততপর হয়েছিল। স্বভাবতই চীন-ভারতের এই সীমান্ত চুক্তি সেসব পরিকল্পনার আগুনে পানির ছিটা দেবার মত। এরই কিছুটা ঝলক পাওয়া যাবে foreignpolicy জার্ণালের এই রিপোর্টে। [দেখুন,India-China Border Agreement: Much Ado about Nothing]। এর শিরোনামটাই অদ্ভুত অর্থপুর্ণ, সব বলে দেওয়া। Much Ado about Nothing – এই বাক্যাবলী আসলে সেক্সপিয়ারের এক কমেডি নাটকের শিরোনাম। দুলাইনে বললে ওর কাহিনীটা হলো, এক রাজ-সৈনিকের রাজকন্যার সাথে প্রেম। ক্লোডিয়া নামে ঐ সৈনিকের এই প্রেমে বন্ধুবেশি তার শত্রু ডন জন সবরকমভাবে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সৈনিক ও রাজকন্যার মিলন ও বিয়ে হওয়া ঠেকাতে পারে নাই। বিয়ে মিলন হয়েছিল। আশা করি পাঠক বুঝতে পারছেন কেন শিরোনামটা বহু অর্থবোধক।
সে যাই হোক, ভারত ও চীন উভয় পক্ষও পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তিকে “landmark legal document” অথবা “strategic benchmark” বলে উল্লেখ করেছে। চুক্তির সারকথা হল, উভয়ে ভূমিতে যে যেখানে দখল অবস্থানে আছে তা অমীমাংসিত অবস্থায় রেখেও পরস্পর মুখোমুখি হয়ে গেলে একটাও গুলি না ছুড়ে পরস্পরের প্রতি সৌজন্য দেখিয়ে পরিস্থিতি যেন কোন ধরনের সশস্ত্র বিরোধের দিকে না যায় তা নিশ্চিত করবে – এভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

চীন কি আসলেই ভারতকে মুক্তার মালার মত ঘিরে ফেলার পরিকল্পনায়
তবে শুধু সীমান্ত চুক্তিই নয়, চীন-ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠতার দিক থেকে নতুন মোড় ফেরার উপাদানও মনমোহনের ঐসফরে অন্য আর চুক্তির ফলে তৈরি হয়েছে। এটা আমেরিকার জন্য চপেটাঘাতের অনুভুতি আরও তীব্র হয়েছে।
গত ২০০৭ সালের দিকে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহের বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট দুটা গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রকল্প ছিল, (১) মাঝখানে প্রায় ৪৩ কিমি বার্মা পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে পুর্ব চীনের কুয়েমিন প্রদেশ পর্যন্ত যোগাযোগের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প আর (২) বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প। দুটো প্রকল্পই নিজস্ব বিনিয়োগে করে দেবার ব্যাপারে চীন আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া ও থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এই আগ্রহকে ব্যাখ্যা করেছিল চীন নাকি ভারতকে মুক্তার মালার মত চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে, এমন ভীতি ছড়িয়েছিল। অর্থাৎ চিনের বিদেশনীতির লক্ষ্য ও ফোকাস অর্থনীতি নয় বরং ভারতকে ঘিরে ধরার মত সামরিক-ষ্ট্রাটেজিক। কিন্তু এভাবে ব্যাখ্যা করে ভীতি ছড়িয়ে যা আড়াল করে ফেলা হয়েছিল তা হল এই প্রকল্প দুটার প্রতি আগ্রহ চিনের নিজেরই অর্থনীতি বা অবকাঠামোগত স্বার্থ। ম্যাপের দিকে তাকালে আমরা দেখব চিনের কেবলমাত্র পুর্বদিকে সমুদ্রের সীমানা আছে, প্রায় পুরা পুবদিক (পুব চীন সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত) নৌপথের জন্য খোলা, এটাই চিনের একমাত্র নৌ গেটওয়ে। বাকি তিন (পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ) দিক ল্যান্ডবর্ডারে আবদ্ধ – নৌ পথে বাইরে বের হবার সুযোগ নাই। চীনের সব অঞ্চলে সুষম সুযোগ সৃষ্টির জন্য বিশেষ করে দক্ষিণ দিকে (kunming Province) ও পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলোকে কাছাকাছি নৌপথের যোগাযোগের আওতায় নিয়ে আসা – এটা প্রধানত চীনের নিজের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থ। এর উপায় হিসাবে চীন তার দক্ষিণ ও পশ্চিম দুটা দিক থেকেই কাছাকাছি কোথাও গভীর সমুদ্রবন্দরের কথা চিন্তা করে। এর একটা পাকিস্তানের বেলুচিস্থানের গোয়াদার (Gwadar port) আর অন্যটা বাংলাদেশের মহেশখালির সোনাদিয়ায়। প্রথমটা চিনের পশ্চিম দিক (Xinjiang and Tibet Province) আর দ্বিতীয়টা দক্ষিণ দিকের (kunming Province) প্রদেশগুলোকে নৌপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছের হয়। গোয়াদার পোর্ট চীনা বিনিয়োগে এবং চীনা কোম্পানীর হাতে ২০০৭ সালে কনস্ট্রাকশন শেষ হয়েছে, কিন্তু পোর্টকে কেন্দ্র করে আশেপাশে রপ্তানীর জন্য উতপাদন এলাকা গড়ে তোলা আর পোর্ট অপারেশনের দায়িত্ত্ব দিয়ে চুক্তি হয় সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটির সাথে। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনকভাবে তা চালাতে না পারার কারণে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই চুক্তির দায়দেনাসহ নতুন হস্তান্তরের চুক্তি হয় এক চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানীর সাথে। সেই থেকে গোয়াদার পোর্ট চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এখন অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে গোয়াদার পোর্ট থেকে সবার চেয়ে বেশি লাভবান হবে চীনের অর্থনীতি। না সেটা পোর্ট পরিচালনা থেকে ব্যবসায় মুনাফা করার কারণে নয়। মুনাফা অবশ্যই হবে তবে আসল অর্থনৈতিক লাভের তুলনায় এটা নস্যি। চীন আরব দেশগুলো থেকে বছরের তার মোট চাহিদার ৬০% তেল কিনে। এই তেল আরব সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর মানে ভারত-শ্রীলঙ্কা ঘুরে, এরপর আরও দক্ষিণে নেমে, ডানে ইন্দোনেশিয়া বায়ে মালয়েশিয়ার মাঝের চিকণ মালাক্কা প্রণালি নৌপথ ধরে সিঙ্গাপুর পেরিয়ে একেবারে বায়ে মোড় নিলে তবেই দক্ষিণ চীন সাগরে মানে চীনের বন্দরে পৌছাবে। আর ভুখন্ডগত দেখলে এটা পুরাপুরি চিনের পশ্চিম অঞ্চল থেকে চিনের পুবে ভ্রমণ। কিন্তু গোয়াদার পোর্ট মূলত আরব সাগরের মুখে (এককালে তা ওমানের অধীনস্ত এলাকা ছিল। বেশিদিন নয় গত ১৯৫৮ সালে ওমানের কাছ থেকে তিন মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।) ফলে নৌপথে মধ্যপ্রাচ্যের তেল আরব সাগর থেকে বের হবার মুখেই গোয়াদার পোর্টে নামিয়ে তা পাকিস্তানের কারাকোরাম হাইওয়ে সড়ক ধরলে উত্তর-পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলো যাওয়া সবচেয়ে সহজ, কম খরচে ও কম সময়ে। এটাই চীনের অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক বিরাট লাভ। এজন্য ভবিষ্যতে পাইপ লাইন স্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে গোয়াদার হয়ে সরাসরি তেল কেনা ও পাইপলাইনে পরিবহণ করে নেবার পরিকল্পনা চীনের আছে।
তার মানে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে বিনিয়োগে যাওয়া সবার উপরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট গুরুত্বপুর্ণ। এটা ছাড়াও তুলনায় গৌণ স্বার্থ হলেও বিষয়টাকে সামরিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে অবশ্যই চীনের সেই সুবিধাও আছে সন্দেহ নাই। তবে এটা বাড়তি পরে পাওয়া সুবিধা। বাড়তি পরে পাবার সুবিধা নিয়ে অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যেকার প্রতিযোগিতা সবসময় থাকে এবং চলছে। যেমন, আগেই বলেছি আইনীভাবে গোয়াদার পোর্টের অবস্থান পাকিস্তানের নৌসীমান্তের ভিতর অন্তর্ভুক্ত হলেও ঐ সীমান্ত ডাঙ্গার দিক থেকে একই সঙ্গে তা পাশের ইরানের সাথে পাকিস্তানেরও সীমান্ত। আর ঠিক ইরানী ঐ সীমান্তে আর একটি নৌবন্দর তৈরি হয়েছে প্রায় সমকালীন সময়। ইরানের ঐ নৌবন্দরের নাম চাহ-বাহার (Port of Chabahar), প্রশাসনিকভাবে এটা ইরানের সিসতান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। আর এই পোর্ট তৈরির অর্ধেক বিনিয়োগ করেছে ভারত সরকার এবং এই পোর্ট মূলত ভারত ব্যবহার করে ইরানের ভিতর দিয়ে সড়ক পথে আফগানিস্তানে ভারতীয় পণ্য আনা-নেয়ার জন্য। ফলে স্বভাবতই ভারতের অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ ঐ চাহ-বাহার পোর্টের কারণে এসেছে। তাহলে সামরিক ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে ঐ পোর্টের কারণে যেন ভারতও পাকিস্তানকে (ফলে ভারতের চীনে প্রবেশেরও) ঘিরে টুটি চেপে ধরেছে (মুক্তামালার মত) এমন অর্থও করা সম্ভব। কিন্তু তুলনায় এই ধরনের অর্থ করে মিডিয়া প্রচারণা আমরা দেখিনা। আসলে পরাশক্তিগত পারস্পরিক অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের প্রতিযোগিতা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু কোনটাকে ভয়ভীতির বিষয় বলে আভ্যন্তরীণভাবে নিজের নাগরিক বা অনেক সময় আঞ্চলিক শ্রোতাকে লক্ষ্য করে প্রপাগান্ডা করবে সেটাই গুরুত্বপুর্ণ দিক। আর এর ভিতর দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের বিদেশনীতির একটা প্রকাশ আমরা দেখি। আমার কথা আরও স্পষ্ট হবে, বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে ভারতের আগের অবস্থান আর এখনকার অবস্থান লক্ষ্য করলে।

বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে চীনা আগ্রহঃ
এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ আগ্রহের মুল কারণ চীনের কুনমিং প্রদেশের যোগাযোগ সহজ করা এই অর্থনৈতিক স্বার্থ। কিন্তু ভারত এই ব্যাপারটাতে নিজের পুবের রাজ্যগুলোর সাথে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট লাভজনক ও প্রয়োজনীয় মনে করলেও তা চীনের উদ্যোগ আগ্রহের, ফলে ষ্ট্রাটেজিক সামরিক দিক বিবেচনা থেকে ২০০৭ সালে থেকেই প্রবল সন্দেহের চোখে তা দেখতে থাকে। সে সন্দেহ মিডিয়ায় প্রকাশ করতে থাকে। শুধু তাই না, যতদুর সম্ভব বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে তাকে বিরত বা অনাগ্রহী রাখার চেষ্টা করে। বার্মাকেও প্রভাবিত করেছিল একই অবস্থান নিতে। বার্মা ভারতের দ্বারা প্রভাবিতও হয়েছিল। কারণ বার্মার জন্য সেসময়টা ছিল দীর্ঘ কয়েকযুগ আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবরোধে একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেখতে পাবার সময়। সুযোগটা এসেছিল ভারতের মধ্যস্থতায়। কারণ ভারতের মাধ্যমে পশ্চিমের সাথে রফা করে অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছিল তখন সেখানে। ফলে সেদিকে তাকিয়ে ভারতের প্রভাবে বার্মাও চীনা প্রকল্পে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল। আর এই ঘটনায় তখন চীন প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ মজার। দুরদর্শী তো বটেই। চীনের পররাষ্ট্র অফিস বলেছিল, যেদিন বার্মিজ জনগণ আগ্রহ বোধ করবে সেদিনের জন্য এই প্রকল্প-প্রস্তাব আপাতত তুলে রাখা হল।

ভারত কি হুশে ফিরেছে নাকি এখনও দ্বিধান্বিত ও কৌশলী প্রকাশেই আছে
গত দেড় দুই বছর ধরে এখন ভারতই এই দুই প্রকল্পের ব্যাপারে উল্টা আগ্রহ দেখানো শুরু করেছে। এমনকি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মনমোহনের ঐ সীমান্তচুক্তি বিষয়ক চীন সফরে এক জয়েন্ট ষ্টেটমেন্টে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাতে আরও আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে নতুন এক চুক্তি করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখিত হয়েছে।
এর মানে দাঁড়াল এতদিন চীনা প্রকল্প-প্রস্তাব নিয়ে তা নাকি মুক্তামালার মত ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনা ষড়যন্ত্র বলে ভারত যে গল্প ছড়িয়েছিল তা ভিত্তিহীন ছিল -এটা ভারত নিজেই স্বাক্ষ্য দিল। তবে মূল বিষয় হল, ভারতের একটা অনাস্থা চীনের উপর ছিল যদিও তা তৈরি করার পিছনে দায়ী খোদ ভারতের আমেরিকান নীতি। বিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে বললে এবিষয়টা হল এই যে পাঁচ রাইজিং ইকোনমির উত্থান এই ফেনোমেনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভুমিকার সমাপ্তি এবং তা উলটপালট ঘটিয়ে দুনিয়ার নতুন পরাশক্তিগত বিন্যাস আসন্ন -একথা লেখার শুরু থেকে বলে আসছি। কিন্তু এটা শুধু পরাশক্তিগত নতুন বিন্যাস নয়, এই ফেনোমেনার মূল তাতপর্য হলো, এটা ১৯৪৪ সাল থেকে তৈরি ও চলে আসা আমেরিকার নেতৃত্ত্বে যে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার চালু হয়েছিল (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ বা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে) তার আয়ু শেষ হতে চলছে আর এটা প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। চলতি অর্ডারটাকে যদি অতীত বলি তবে দুনিয়ার গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের আগামি আসছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। এটা চারদিক থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। এবং এটা কোনভাবেই পুরানা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেখেই এর পুনর্গঠন (চীন, রাশিয়া বা ভারতকে আরও বেশি জায়গা ছেড়ে দিয়ে) এভাবে হচ্ছে না। হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমশ ননফাংশনাল বা অকেজো প্রভাবহীন হয়ে পড়া আর চীনের নেতৃত্ত্ব নতুন সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার মধ্যদিয়ে। এটা শুধু আমেরিকা তার সার্ভে রিপোর্টে টের পেয়েছে তাই নয়, ২০০৯ সালে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর বার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল তুরস্কে। সে সভায় ঐ প্রতিষ্ঠান দুটো আসন্ন গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন টের পেয়ে বা ব্যাপারটাকে পরোক্ষে স্বীকৃতি দিয়ে ঐ সম্মেলন আহবান জানিয়েছিল চীনকে। চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ের মুদ্রা হিসাবে (ডলার, পাউন্ড, ইউরো ও ইয়েনের পাশাপাশি) জায়গা দিতে রাজি বলে জানিয়েছিল। কিন্তু এপর্যন্ত চীন সেই পথে সাড়া দেয় নাই। না দেবার পিছনের কারণ হল, (১) চীনের প্রতি এই প্রস্তাবের অর্থ হল আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো যেগুলো আমেরিকার নেতৃত্ত্বে ও নিয়ন্ত্রণে এখন যেমন আছে ওর ভিতরেই চীনকে জায়গা দেয়া কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ অটুট থেকে যাওয়া যা চীনের স্বার্থ নয়। (২) চীনের স্বার্থ এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো এবং ঐ নিয়ন্ত্রণ সম্পুর্ণ ভেঙ্গে (নতুন ম্যান্ডেটে) নতুন ভারসাম্যের প্রতিষ্ঠান দেখতে চাওয়া। (৩) চীনের কাছে এবং বাস্তবত ব্যাপারটা গায়ের জোরের বা চাপ দিয়ে দাবী আদায় করে নেবার বা কারও অনুগ্রহে তা পাবার বিষয় নয়। চীন সেজন্য তার আন্তর্জাতিক বিনিময় বাণিজ্য যত বেশি সম্ভব ইউয়ানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়। এবছর ২০১৪ জানুয়ারিতে ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রার তালিকায় সপ্তম স্থান দখল করে। বিশেষ করে হংকং মার্কেটে লেনদেনের ৭৩% এককভাবে সম্পন্ন হয় ইউয়ানে।
আমরা মনে রাখতে পারি, ১৯৪৪ সালে আইএমএফ গঠনের সময় তা আমেরিকান ডলারের ভিত্তিতে সাজানো ও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ নেতৃত্ত্ব সম্পন্ন হয়েছিল, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র তা মানতে বাধ্য হবার পিছনে মুল কারণ সেসময় আন্তর্জাতিক লেনদেন বাণিজ্যে ডলারে বিনিময় ছিল সর্বোচ্চ ও একক আধিপত্যে এবং আমেরিকা একমাত্র উদ্বত্ত্ব বাণিজ্য অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল তাই। ফলে আইএমএফে আমেরিকান কর্তৃত্ত্ব ও নেতৃত্ত্ব এসেছিল সামরিক বা পরাশক্তিগত আধিপত্যের কারণে নয়। যদিও প্রতিষ্ঠানগতভাবে পুরানা গ্লোবাল অর্ডার ভেঙ্গে পড়া আর বদলে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রতিস্থাপন যা নতুন গ্লোবাল অর্ডারের জন্ম দিবে তা ঠিক (আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংকের মত) কোন প্রতিষ্টানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে ঘটবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার এই ফেনোমেনা কে BRICS ফেনোমেনা অথবা ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রতি বছরের BRICS সামিট এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত করা যায়। আর এই সামিট থেকে BRICS ব্যাংক নামে কার্যক্রম যা মূলত বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসাবে ধেয়ে আসছে। আমাদের এখনকার আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক অংশ হিসাবে সারকথাটা হল, চলতি গ্লোবাল পুজিতান্তিক অর্ডারটাকে দুনিয়ার অতীত বললে দুনিয়ার আগামি হল BRICS ফেনোমেনা।
কিন্তু আমেরিকার দেয়া প্রলোভনে পড়ে BRICS ফেনোমেনাকে মনোযোগে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা সবচেয়ে নেতিবাচক। এককথায় বললে এখন পর্যন্ত কংগ্রেস দলের নেতৃত্ত্বে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা দ্বিধাগ্রস্থ। একদিকে তারা বুঝে স্বীকার করে বলেই মনে হয় যে দুনিয়ার আগামি ফলে শেষ বিচারে ভারতের মূল স্বার্থেরও আগামি হল BRICS ফেনোমেনা এবং একে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করা। কিন্তু আমেরিকার অফার করা সুবিধাদির লোভে অর্থাৎ পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে কেবল নিজের জন্য কিছু সুবিধা নিংড়ে নিতে গিয়ে সে BRICS ফেনোমেনাকে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করতে গড়িমসি করে চলেছে। এরই বাইরের প্রকাশ হল, এতদিন খামোখা চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জুজুর ভয় দেখিয়ে আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাধাটাকে নিজের জনগণ ও নিজের দ্বিধাগ্রস্থ ভুয়া নীতির পক্ষে ন্যায্যতা হিসাবে দেখানো। এই হোল তার মারাত্মক দ্বিধার দিক। ওদিকে ভারতের এই দ্বিধার দিকটা, খামোখা চীনের সাথে “আগামির সম্পর্কটাকে” সামরিক সংঘাতপুর্ণভাবে দেখানোর চেষ্টাটা চীনের কাছে পরিস্কার। কিন্তু চীন জানে এবং বাস্তবতই তাই যে BRICS ফেনোমেনাকে এগিয়ে নেয়া এটা জবরদস্তির বিষয় নয়, প্রতিহিংসার বিষয় নয় ভারতের সম্পুর্ণ স্বইচ্ছার বিষয়, নিজের স্বার্থ বিষয়ে হুশে আসার বিষয়। তাই এবিষয়ে চীনা নীতি অবস্থান ধৈর্য ধরার নীতি। এবং চীন তাতে বিজয় লাভ করছে। একদিকে বাংলাদেশ নীতিতে ভারত-আমেরিকার হানিমুনের জায়গায় বিরোধ সংঘাত হাজির হবার কারণে আর ওদিকে চীন-ভারতের সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে চায় ভারত। অথচ এই অর্থনৈতিক করিডরের উদ্যোগের কাজটা এতদিন ফেলে রেখেছে ভারতের আমেরিকার সাথে এতদিনের গাটছাড়া বেধে চলার নীতি, পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে স্বার্থপরের মত একা নিজের জন্য সুবিধা নিংড়ে নেয়া যাবে বলে অনুমানে চলার নীতি। এছাড়া ভারতের নীতিনির্ধারকেরা কি আসলে কতটা সিনিসিয়ারলি মনস্থির করেছে যে আমেরিকান দেখানো লোভ ছেড়ে গ্লোবাল অর্ডারের আগামির পক্ষে তার নিরলস কাজ করা উচিত? আমরা এখনও নিশ্চিত নই। যতদুর বুঝা যাচ্ছে ভারত এখনও ব্যাপারটাকে আমেরিকাকে শায়েস্তা করার বিষয় হিসাবে দেখছে। হয়ত ভাবছে এভাবে আমেরিকাকে চাপে ফেলতে পারলে ২০০৭ সালের মত আবার আমেরিকার যাতা কাঠি ব্যবহার করার সখ্যতায় আমাদের মত দেশের উপর রুস্তমি চালিয়ে যাওয়া যাবে। ফলে একদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সালমন খুরশিদের সর্বশেষ ডিসেম্বর ২০১৩ তে ওয়াশিংটন সফর থেকে ফিরে জানিয়েছিলেন আমেরিকা যেন ভারতের চোখে দক্ষিণ এশিয়ার নিজের নিরাপত্তা স্বার্থকে দেখে – অর্থাৎ ভেঙ্গে অকেজো হয়ে পড়া এই পুরানা ২০০৭ সালের ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তিটাই আবার ফিরে আসুক সালমন খুরশিদ সে আকাঙ্খার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। অথচ একই সময়ে মনমোহন চীন সফরে গিয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে তাগিদ দিয়ে চীনের সাথে যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা দিচ্ছেন। এই হল ভারতের মারাত্মক স্ববিরোধী বিদেশনীতি।ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি নতুন মন্ত্রী হবার পর তোফায়েল আহমেদ ভারত সফরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তাকেও ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারে প্রবল সোচ্চার হতে দেখেছিলাম আমরা প্রেস মিটিংয়ে। যদিও গুরুত্ত্বপুর্ণ একটা টুইষ্ট ছিল সেখানে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনটা পার হয়েছিল একা ভারত এর পক্ষে আর অন্য পক্ষ সব দেশ, যারা বাংলাদেশে কি হয় তাতে তাদের ষ্টেক বা স্বার্থ আছে বলে অনুভব করে তারা এমন নির্বাচন দেখতে চায়নি এমন পরিস্থিতিতে। অন্যভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বললে ভারত আর আমেরিকার মুখোমুখি অবস্থানের চরম প্রকাশ ঘটেছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও নির্মম। সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ফেল করায় আমাদের চলতি বাজেট ঘাটতি ফলে এডিপিতে কাটছাট আর আগামি জুনের বাজেটেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চলতি সরকার। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাজেটের ঘাটতি পূরণ আর স্থবির বিদেশি বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে যেন চীন বিশাল ত্রাতা হিসাবে এখনই হাজির হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশ যেন পশ্চিমের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে অথবা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য কিছুই যায় আসে না। এমনই ধারণা ছুড়েছিলেন সেদিন তোফায়েল আহমেদ।
নিজের নয় ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর পুরা ঠেস দিয়ে দাড়ানো হাসিনা সরকার বা এর কোন মন্ত্রী আমাদের এই ধারণা দিতে শুরু করেছিল অর্থনৈতিক সমস্যা মিটানোর জন্য এই তো চীন এসে গেছে। যেন এতদিন পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে বড়ভাই আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা, যাতাকাঠি ধার দেয়া, নিজেকে পরাশক্তি ভাবতে শুরু করা ইত্যাদির লোভ ভারত ত্যাগ করেছে, সেই সুবাদে আমাদের উপর আমেরিকার ধার দেয়া যাতাকাঠি ব্যবহার করে সরকারে কে থাকবে তা নির্ধারণের লোভ ত্যাগ করেছে? যেন ভারত এতদিন দ্বিধা শুণ্য একাগ্র মনে আগামি গ্লোবাল অর্ডারের পক্ষে চীনের সাথে কাজ করেছে। অথচ এটা সোনার পাথরের বাটির মত। কংগ্রেসের ভারত নিজেকে পরাশক্তি ভাবার ভান করে আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখাতে চায়, আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ নীতিতে সাংঘার্ষিক করে, একলাই রাজা ভাব দেখাতে চায়। এই হলো তার স্ববিরোধী নীতি। আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখানোর সময় ভুলে যায় ঐ রুস্তমির পিছনের যাতাকাঠিটা নিজের নয়, নিজে সে কোন পরাশক্তি নয়, ওটা আমেরিকার ধার দেয়া। আবার, চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি এবং Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor যদি আজ এতই গুরুত্বপুর্ণ মাইলষ্টোন বলে অনুভুত হবে তাহলে আমেরিকার পাল্লায় পড়ে গত সাত বছরের চীন বিদ্বেষী নীতি – চীন আসতেছে, এই সীমান্ত হামলা দিল বলে আমেরিকার কোলে উঠে পড়া – সম্পর্ককে খামোখা শত্রুতামূলক করে দেখা এসব তাহলে মারাত্মক ভুল পথ ছিল – এটা নিজেই প্রকারন্তরে স্বীকার করছে। এককথায় বললে গত সাত বছর কংগ্রেসের ভারত এক যুদ্ধবাজ মুই কি হনু রে নীতি অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশকেও বিপদের মুখে রেখেছে। কোন হোমওয়ার্ক ছাড়া ভারতের এসব কাজকে পোলাপানি নাদান নীতি বললেও সম্ভবত কম বলা হবে। অথচ আমাদের মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব বানিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে ভারতের ইকোনমিক করিডর প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হবার কারণে আর চিন্তা নাই চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সমস্যা সমাধান করে দিচ্ছে। আর মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব হয়ে এবার আমাদেরকেও বেকুব বানাতে ঐ প্রেস ব্রিফিংয়ে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা যেন আমাদের উদ্ধারকর্তা ঘটনা। একথা ঠিক যে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে। কিন্তু কঠিন সত্যটা হল ভারতের আমেরিকার কোলে চড়ে বসে থাকা আর চীন প্রসঙ্গে ভয়ভীতি ছড়িয়ে রাখার নীতির কারণেই ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা শুরুই করা যায়নি, এখন হোমওয়ার্ক শুরু হয়েছে মাত্র। যার ফল আসতে কমপক্ষে ১০ বছর পিছনে আমরা।
আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক চীনের বিদেশ নীতির সারকথাগুলো দাঁড়াচ্ছে, ভারতের বাংলাদেশ নীতির বিপরীতে চীনের নীতির মৌলিক দিকগুলো গত প্রায় দুই দশক ধরে কোন এদিক ওদিক চড়াই উতরাই ছাড়াই একতালের। আর এর সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ ও নতুন বৈশিষ্টের দিক হল, চীনের নীতি কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা রাজনৈতিক খবরদারি পাবার দিকে না তাকিয়ে মুলত অর্থনৈতিক। কোন কাজের চুক্তি পাবার জন্য রাজনৈতিক লিভারেজের উপর ভরসা করে তা পাবার চেষ্টা করা নয়। সরকারে কে থাকবে না থাকবে সে ব্যাপারে কোন মাথা সে ঘামায় না। গত একবছরে চীনা এমবেসি ছয়বার বিবৃতি দিয়েছে। এমন প্রতিটা বিবৃতিতেই এই নীতির প্রতিফলন থেকেছে।
তবে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে গতবছরের শেষ দিকে জাতিসংঘের কোন ভুমিকা বা মধ্যস্থতায় একটা সমাধান আনা যায় কি না এনিয়ে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে পশ্চিমা কুটনৈতিকদের প্রচেষ্টা ছিল। ঐ প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানটা জাতিসংঘ বলেই ভেটো ক্ষমতাওয়ালা চীনকেও ঐ উদ্যোগে জড়িত ও অন বোর্ড বা নৌকায় তোলার তাগিদবোধ করেছিল পশ্চিম। সেই সুত্রে আমরা চীনকে দেখেছিলাম বিবৃতি দিতে। আবার পশ্চিম একা কোন উদ্যোগ নিলে তা যেন চীনের কাছে নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে সন্দেহজনক বা বিরোধাত্মক বলে মনে না হয় সেটা এড়ানোর কথা ভেবে পশ্চিমা উদ্যোগ নিজেই চীনকে অন বোর্ড করার তাগিদবোধ করেছিল। এছাড়া আরও একটা দিক আছে চীনকে অন বোর্ড করা মানে রাশিয়াকেও অন বোর্ডে পাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া।
চীন প্রসঙ্গে এখানেই শেষ করছি। পরের চতুর্থ ও শেষ কিস্তি রাশিয়া প্রসঙ্গে।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি