ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু মনে করতে পারি না, এটা অবৈধঃ

গৌতম দাস

২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৭ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2GL

 

20 Aug 2019, Dhaka, Press Conference.

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তাঁর দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য চলে আসছে, তা আমাদের কারও অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে সব ছেড়ে দিয়ে আরেকবার লুঠ হবার বা হেরে যারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন নির্বাচন করেই হোক, চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও চলতি বছরের মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে ইতোমধ্যে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। ওদিকে রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হল, আসামের এনআরসি [NRC] ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও উৎপাত তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ’ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি, এখন মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন – এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিয়ে চলছিলেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রায় দুসপ্তাহ আগে ভারতে গত ৭ আগস্ট দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক  আলোচনার এজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু তা সত্বেও ভারতের [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart] কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই আমরা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও আমাদের সরকারকে সতর্ক [আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না] করেছিলাম।  ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছিলাম দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় [‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মতান্তর, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি] কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠক নিয়ে আলাদা আলাদা যার যার দেশের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ’প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১৪ দিনের মাথায় এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ [Assam NRC is India’s internal matter: Jaishankar] বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এই এক ইস্যু আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট, আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু যতই উত্তেজনা আর উস্কানি তৈরির চেষ্টা হোক না কেন ভারতের সরকারী অবস্থান হল, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যার মানে হল আসামের এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণ প্রক্রিয়ায় কেউ নিজেকে নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলেও এজন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না, কারণ, বাংলাদেশ এব্যাপারে সংশ্লিষ্টই নয় বলে ভারত মনে করে। তাই এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করার চেষ্টা কমে আসবে হয়ত, এছাড়া কোন সরকার সংশ্লিষ্ট সদস্য এমন অভিযোগ তোলার কথাই না। তাও কেউ তুললে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি এই প্রথম আমাদের হাতে এল, যা আমাদের সরকার বা যে কেউ ব্যবহার করতে পারব। একটা উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া যাওয়াতে আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ নই।

NRC in Assam is India’s internal matter, says MEA S Jaishankar, S External Affairs Minister. File photo   –  The Hindu

দুঃখের কথা হল, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” [Mr. Jaishankar said, “It’s an internal matter.” – এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার প্রায় কেউই ধরতেই পারেন নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জয়শঙ্করের এই সফরে কোন কোন ইস্যুগুলো মুখ্য হয়ে উঠবে এসব আগেই জানা না থাকার কোন কারণ নাই। বুঝা যাচ্ছে এনিয়ে মিডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিটের কারও এব্যাপারে কোন হোমওয়ার্ক নাই।  জয়শঙ্করের এই সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে ভেসে উঠা বা উঠতে পারত এমন ইস্যুগুলো হল, ১। তিস্তা বা ৫৪ নদীর পানি,  ২। সীমান্ত হত্যা, ৩। অসম বাণিজ্য, ৪। আসাম এনআরসি ইস্যু, আর ভারতের দিক থেকে ৫। বাংলাদেশের পোর্টগুলো ব্যবহারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, ৬। ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ, ৭।  কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি অন্য কিছু। এসবের মধ্যে আসাম এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের মিডিয়ার চোখে হওয়া উচিত ছিল এক নম্বর ইস্যু। কারণ, ৩১ আগষ্ট তারিখে আসামে ফাইনাল নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশবিরোধী প্রচার আর অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে শ্লোগানে সব ছেয়ে ফেলার হতে পারে যে “অনুপ্রবেশকারিরা ফেরত যাও” । কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের মিডিয়াও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে এব্যাপারে ছিল পুরাই উদাসীন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, এমনকি জয়শঙ্করের সফরে সাংবাদিক সম্মেলন কাভার করে যে মিডিয়া রিপোর্ট পরদিন ছাপা হয়েছে সেখানেও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে প্রায় কিছুই নাই বললেই চলে। অথচ জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” সংলগ্ন যেকোন বক্তব্য হওয়ার কথা ছিল শিরোনাম। পারলে এই কয়েক শব্দে দেয়া জয়শঙ্করের বক্তব্যের ভিডিওসহ রিপোর্টিং হত সবচেয়ে উপযুক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন কোন জায়গায় আছে এর এক বিরাট মাপকাঠি হয়ে গেল – জয়শঙ্করের সফর বা “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” নিয়ে রিপোর্ট। কোনভাবেই এখানে হাসিনার ফ্যাসিজমের শাসন, মিডিয়ার উপর সরকারি চাপ ইত্যাদির অজুহাত তোলারও সুযোগ নাই। কারণ মিডিয়া মূলত ১. কোন ইস্যুটা এই সফরে এক নম্বরের সে ইস্যুটাই বুঝে নাই, এটা প্রমাণিত। ২. ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয় যে আমাদের মিডিয়ায় জয়শঙ্কর বলেছেন “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” এটাকে প্রধান শিরোনাম করলে বা ভিডিওওতে দেখালে সরকারের বা ভারতের দিক থেকে আপত্তির কিছু আছে। কাজেই এটা ছিল সরকারি কোন চাপ ছাড়া ইস্যু। ৩. এটা ছিল বাংলাদেশের বার্ণিং আর জেনুইন স্বার্থের ইস্যু। ৪। এমন রিপোর্ট হাসিনার পক্ষেই যায়। কাজেই হাসিনাকে দোষ দিয়ে মিডিয়ার নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার কোন সুযোগই নাই।
এছাড়া উলটা করেও দেখানো যায়  – আমাদের মিডিয়া বিকল্প কী বা কাকে তারা শিরোনাম করেছে? – এটা থেকেও প্রমাণ হয় যে মিডিয়া ইস্যুটা বুঝেই নাই। দেখা গিয়েছে বেশির ভাগের কাছে ইস্যু হয়েছে  – তিস্তা ইস্যু। যার সার কথা হল তিস্তা নিয়ে কিছু হল না এটা দেখিয়ে ভারতকে বেইজ্জতি করব, হাসিনা কত অযোগ্য তা দেখাব। এগুলো সম্ভবত বামপন্থি মধ্যবিত্তের চোখ ও সেই মাপের বুঝাবুঝি। যেমন দেখেন বাম গণতান্ত্রিক জোট – এদের কারবার [জয়শঙ্করের সফর : তিস্তা চুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস না থাকায় বাম জোটের ক্ষোভ]। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা নিজেদের সবার উপরের নিজেদের বুঝমান মনে করে। তাই তাদের বুঝে আসাম এনআরসিতে কি হচ্ছে সেটা না, তিস্তা এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ।  কেউ কেউ আরও বাম বুদ্ধিমান হতে চেয়ে  – “ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ” এটাকে মূল শিরোনাম করেছে। এমনকি যাকে প্রফেশনাল পত্রিকা বলে মানতে চায় অনেকে সেই প্রথম আলোও  দেখা গেছে ইস্যুটা বুঝেই নাই। তাদেরও আমলে আসে নাই। তাই  শিরোনাম, ২২ আগষ্টের –  “জয়শঙ্করের সফর: বাংলাদেশের বিষয়গুলো আসেনি, ভারত স্বস্তি পেয়েছে—বামজোট”। ২২ আগষ্টের  শিরোনাম,  “মোদির কিছু বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”

জয়শঙ্করের নিজে যেচে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে স্বীকার করে নিবার অর্থ হল, যে ভারত নীতিগতভাবে মানল যে ১। ভারতে কেউ নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণে করতে না পারলেও – এর পরের বাক্য হবে – সেটাও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।  ২। ভারত অফিসিয়ালি বলতে পারবে না যে ঐ লোক তাহলে বাংলাদেশের; অথবা বাংলাদেশের থেকে আসা গোপনে প্রবেশকারি বা অনুপ্রবেশকারি। ৩। বাংলাদেশকে বলতে পারবে না যে আসেন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি।

তাহলে দাড়াঁলো কী? যেটা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল যে, জয়শঙ্করের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরের দিনে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার লীড হেডলাইন হত – আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর। সেটা হয় নাই। এতে আমাদের মিডিয়া সেন্সের করুন হাল আমরা দেখলাম। এমনকি পুরা জয়শঙ্করের সফর কাভার ছাড়াও আলাদা করে আর একটা রিপোর্ট দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। আমার কথাটা বুঝা যাবে শুধু Jaishankar bangladesh NRC – এই তিনটা শব্দ লিখে গুগুলে সার্চ দেন দেখবেন সার্চের ফলাফলে প্রথম দুই পাতা জুড়ে ভারতীয় পত্রিকার নাম আসবে যাদের রিপোর্টের শিরোনাম হল, “NRC in Assam India’s internal matter: Jaishankar”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের মিডিয়া কিন্তু ঠিকই বুঝেছে তাদের রিপোর্টের শিরোনাম কী করতে হবে।  এমনকি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য আরও কী নতুন অর্থ-তাতপর্য তৈরি করছে সেটা নিয়ে দ্যা হিন্দু পত্রিকা লিখেছে,   His statement is significant as it indicates India’s official position just days before the final NRC list is to be published on August 31. In July, Mr. Momen had expressed concern about the possible fallout of the final list on Bangladesh.

তাহলে দাঁড়ালো যা তা হল, আমরা কমিউনিস্ট প্রগতিশীল ধরণের বুঝমান খেতাব পেতে যত আগ্রহী, সাধারণ কান্ডজ্ঞান দেখাতে ততটাই বেখবর। কি আর করা – কাজেই এখন আসেন আমরা আপাতত দোয়া-কামনা করি যাতে কান্ডজ্ঞান জাগে। আর এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। এখনও বিরাট এক কাজ রয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আসামের এনআরসি ইস্যুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন আগামী ৩১ আগস্ট। কাজেই ভারতের সরকারী অবস্থান বাংলাদেশকে জড়ানো বা দায়ী করার না হলেও বাংলাদেশবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী পিছন থেকে সংগঠিত তথাকথিত “অসমিয়া স্বার্থের” দাবি তোলা হতে পারে।  তাই আগে থেকেই এর পাল্টা আমাদের বয়ান অবস্থান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। এছাড়া জয়শঙ্করের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কেমন গুরুত্ব দিতে হবে সেখানে এব্যাপারটা বুঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এর আলোকে কোন মিডিয়া রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।
যেমন বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “আসামের নাগরিকত্ব ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। ভিতরে লিখেছিল – “সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি”।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে – ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান …’। এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বুঝানো হচ্ছে যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর কেন এত সহজে ‘এনআরসি অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানলেন?
জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হল, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হল, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে শহরের বাইরের ক্যাম্পে রাখবে তারা; এসব ক্যাম্প ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে; আর যদিও অনেক পরে এদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মত নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। আর সম্ভবত অ-মুসলমানদের বেলায় এটা ঘটবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ এমনভাবে  করতে চান।
দুই. সামনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কাজ, দম ফেলার সময় নাই। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে এবার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা নিজের অবস্থানের পক্ষে রাষ্ট্রগুলোকে আনার কাজে – মুখোমুখি হবার সময় তাদের। তাই  অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হল ভারতের কাছে এখনকার আসাম এনআরসির চেয়েও আরেক বড় ইস্যু হল কাশ্মীর, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে  এখন থেকেই আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,  ২৪-২৬ আগষ্টে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক চলছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, সে এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদী দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা নেতারা কথা বলতে চায়। মোদী সেখানে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, এখন অলরেডি তিনি প্যারিসে, যেখানে এবারের জি৭ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

India’s risky Kashmir power grab, VOX

এর এক সোজা অর্থ কাশ্মীর আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু একেবারেই নয়, তা প্রকারান্তরে এখানে মেনে নেয়া হয়েছে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথের এক দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আরও রাষ্ট্রকে পক্ষে আনতে ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভাগুলো শুরু হয়ে যাবে; যেখানে বলাই বাহুল্য কাশ্মীর সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু-সমর্থক জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে – ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। এছাড়া আর একটা দিক আছে। ভারতের হিন্দু-মনের চোখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আসলে পুরান একক পাকিস্তান – “মুসলমানের” পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু বলে মেনে নেওয়া – এর অর্থ বাংলাদেশ যতটা ভাল দেশ ইমরানের পাকিস্তান ততই খারাপ, সহি না – এমন ইঙ্গিত তৈরি হয় এখানে। এটাকে ভারত তার বড় পাওয়া মনে করে, আর যেখানে কাজে লাগবে সেখানে ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি।

কিন্তু কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, একেবারেই না। সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং যে কোন জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু আমরা মনে করতে পারি না, কারণ জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী এটা অবৈধঃ
কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। মুল কারণ, কাশ্মীর সমস্যা আসলে জাতিসংঘের চার্টারের [Charter of the United Nations] আলোকে মিটাতে আমরা বাধ্য। আর কাশ্মীর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হল, কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কোন রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরি দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে এটা মেনে নেওয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের কেউ নয়। বরং কাশ্মীরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক। কাজেই হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, কোন চুক্তি করে দিয়েছে – এই তুলে দেওয়া বা চুক্তি আইনত অকেজো, মুল্যহীন। কারণ জাতিসংঘের দৃষ্টিতে কোন রাজা অথবা উপনিবেশ মালিকপ্রভু কোন ভুখন্ডের মালিক হতে পারে না। ঐ ভুখন্ডের মালিক, শাসক কে তা নির্ধারণের একমাত্র হকদার ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়ার মত হয়ে যাবে। এর ফলশ্রুতিতে ঐ দখলকারি দেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যেতেও পারে। সাদ্দামের ইরাকের কুয়েত দখল করা যেভাবে অবৈধ গণ্য হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। নিজ ভুখন্ডের শাসক নাগরিক নিজে অথবা তার সম্মতি নেয়া এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকার। নিজ ভুখন্ডের শাসক হল নাগরিক নিজে বা তার সম্মতি নেয়া প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।  তাই কোন ভুখন্ডের উপরে ওর বাসিন্দাদের বাইরে অন্য কোন রাজতন্ত্রী (Monarchy) অথবা কলোনিয়াল (Colonial) মালিকানা শাসক দাবি করাকে জাতিসংঘ অবৈধ মনে করে। অবৈধ দখলদার মনে করে।

UN Declaration 1942

জাতিসংঘের জন্ম দলিল ও ভিত্তি

  • ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই নীতি মেনে ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
  • পরে ঐ বছর শেষে ১৯৪২ সালের ০১ জানুয়ারি এতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। অর্থাৎ ঐদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এবং আগের চার্চিল ও রুজভেল্ট এভাবে মোট চার রাষ্ট্র আর এক ছোট দলিলে লেখেন ও স্বাক্ষর করেন এই বলে যে তারা আগের  Atlantic Charter  এর যৌথ ঘোষণার সাথে একমত হয়ে এই স্বাক্ষর করছেন।
    পরবর্তিতে এই চার রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত দলিল এটাই জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা [1942: Declaration of The United Nations] মানা হয়।
  • পরের দিন ০২ জানুয়ারি ১৯৪২, আরও ২২ রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেছিল। জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করা হয় এভাবে।
  • পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালে পুর্ণ গঠন দলিল লেখা শেষ হলে যেটাকে জাতিসংঘের চার্টারের [UN Charter]  বলা হয়, ওর ১১০ নম্বর ধারা মতে ঐ গঠন দলিলে অন্যান্য রাষ্ট্গুলো স্বাক্ষর করাতে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছে

এই ভিত্তিতেই পরবর্তিতে অসংখ্য গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থগত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। একালে সেসব কনভেনশন, আইন ইত্যাদির হেফাজতকারি ও তদারককারি হল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিল (UNHRC)। কাজেই জাতিসংঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

এছাড়া আর সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীর প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ
১। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,  রাজা হরি সিং ভারতের নেহেরুর সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে  কাশ্মীরের বৈধ প্রতিনিধি না।
কাশ্মীরের জনগণের কোন রায় নিয়ে তিনি নেহেরুর কাছে যান নাই।
২। গিয়েছিলেন রাজা হিসাবে, একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন রাজা হিসাবে।
তাই জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,এই চুক্তি অবৈধ, অকেজো মুল্যহীন।
৩। যদি ধরেও নেই এই দলিল বৈধ তাতেও সমস্যা হল এটা ঠিক কোন একসেশন চুক্তি নয়। এটা আসলে করদ রাজ্য চুক্তি। ঠিক যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে হরি সিংয়ের প্রিন্সলি স্টেট চুক্তি ছিল – হরি সিং নেহেরুর সাথে তেমনই এক চুক্তি করেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘের চোখে করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি সেটা আরও অগ্রহণযোগ্য, তাই অবৈধ। কারণ এর ভিত্তি কলোনি বা কলোনিয়ালিজম। নেহেরুর রিপাবলিক ভারত কী করে কাশ্মীরের জনগণকে এক কলোনিয়ান করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি করতে পারেন?
৪। আটল্যান্টা চুক্তি বা জাতিসংঘ ঘোষণার সারকথা ও মূখ্য ভিত্তি হল “কলোনিয়ালিজম অবৈধ, তাই বাতিল”। ভুখন্ডের শাসক বা মালিক ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা। বিদেশি কলোনি মাস্টার ভুখন্ডের কেউ নয়।  মনে রাখতে হবে আটল্যান্টিক চার্টারের কথা। কলোনি মাস্টার চার্চিল সেখানে তৃতীয় ধারায় স্বীকার করে নিচ্ছেন যে – ” Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them; । অর্থাৎ কোন ভুখন্ডের মালিক সেই ভুখন্ডের বাসিন্দা এই নীতি মেনেই ঐ চার্টার চুক্তিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দাসখতের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে নিয়েছিলেন রুজভেল্ট। আর এই শর্তেই তিনি হিটলারের হাতে থেকে বৃটিশসহ ইউরোপকে বাচিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারাই ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদেরককে অর্থ ও অস্ত্রসহ সবরকম সহায়তা করেছিলেন।

অতএব ভারতের কনষ্টিটিউশনে বা ৩৭০ ধারাতে যাই লেখা থাক, অথবা এই মাসে এখন ৩৭০ ধারা রদ -বাতিল করে ভারতের রাষ্ট্রপতির যে ঘোষণাই দেয়া হোক কাশ্মীর নিয়ে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিসহ সবই অবৈধ। মূল কারণ, কোথাও কাশ্মীরের জনগণ – সেই মুল বাসিন্দাদের – কোন ম্যান্ডেট বা রায় নেয়া হয় নাই কোথাও।

তাই কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘ চার্টার, জাতিসংঘের নানান গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসংঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। অন্তত জাতিসংঘের সদস্যপদ বজায় রেখে। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগই নেই যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মিটাতে হবে।

সুতরাং জাতিসংঘ চার্টার অমান্য করে বাংলাদেশেরও – কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু মনে করা, ঘোষণা করা ভিত্তিহীন। শুধু তাই না এটা আত্মঘাতি। এটা যেকোন পর্যায়ে বাংলাদেশেরই সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

গৌতম দাস

২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2DQ

 

-একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

[বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

“বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

২.
এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

আইনি কারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

অর্থনৈতিক কারণঃ
জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

প্রিয়া সাহা ইস্যুঃ জনগণের মন পড়তে ভুল করেন না

প্রিয়া সাহা ইস্যুঃ জনগণের মন পড়তে ভুল করেন না

গৌতম দাস

২৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০৫ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Dg

প্রিয়া সাহা অন্তত একটা ভাল কাজ করেছেন যে, বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আধাপ্রমাণিত-অপ্রমাণিত যেসব উদ্ভট তথ্যের ওপর এত দিন দাঁড়ানো ছিল, যা তাদের নিজেকে ভিকটিম হিসেবে দাঁড় করিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ করত – এমন যেসব বয়ান দীর্ঘ যুগ ধরে চালু আছে, তা এবার সরাসরি পাবলিক ডোমেনে সবার নজরে চলে এসেছে। আর তাতে সেসব বয়ান এক বিরাট সামাজিক আতসী-কাঁচের নিচে এসে পড়েছে। ফলে এবার আম-পাবলিকের সামনে আসল যাচাই-বাছাইয়ে তাকে নিজেকে প্রমাণ করতে পারতেই হবে, না হলে চিরতরে এসব বয়ানসহ বিদায় হওয়ার অবস্থা এসে গেছে।

প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে যা বলেছিলেন তা তিনি এর আরও অন্তত ৭২ ঘণ্টা পরে ঠাণ্ডা মাথায় আবার চিন্তা করে তা বলবার বা হাজির করার সুযোগ পেয়েছেন ও নিয়েছেন। বিডিনিউজ২৪ সেই ভিডিও বয়ান সংগ্রহ করে ট্রান্সস্ক্রিপ্ট ছাপিয়েছে, “নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন প্রিয়া সাহা” এই শিরোনামে,  আমি সেই ছাপানো রিপোর্ট ধরে কথা বলছি। বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, “প্রিয়া সাহা বলেন, সরকারের আদমশুমারি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী- দেশভাগের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৯.৭ শতাংশ ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক। ওই হার এখন নেমে এসেছে ৯.৭ শতাংশে”। এ ছাড়া আরও বলেন, ‘এখন দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ মিলিয়ন। সংখ্যালঘু জনসংখ্যা যদি একই হারে বৃদ্ধি পেত, তাহলে অবশ্যই যে জনসংখ্যা আছে, এবং যে জনসংখ্যার কথা আমি বলেছি ‘ক্রমাগত হারিয়ে গেছে’, সেই তথ্যটা মিলে যায়”।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “দেশভাগের সময়” আর “যদি” একই হারে বৃদ্ধি পেত। এককথায় বললে, প্রিয়া সাহা আসলে একটা “যদি” এর উপরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। মানে বাস্তবের জনসংখ্যা না, হাইপথিটিক্যাল ধরে নেয়া। অনেকটা দেশের কোন এক একর জমিতে যদি গুণে ১০টা গরু  পাওয়া যায় তাহলে দেশের মোট ১৪৭ হাজার বর্গকিমি ভূমিতে, ঐকিক নিয়মে ফেলে, গরুর সংখ্যা বের করে ফেলার মত।

এখন জানা যাচ্ছে, যে বই থেকে প্রিয়া এই তথ্য নিয়েছেন সে বইয়ের লেখক ডঃ আবুল বারাকাত। কিন্তু দেশে এখন প্রিয়ার দায় নিবার অথবা প্রিয়ার সাথে – আমি সম্পর্কিত বলে স্বীকার করার- লোকের সংখ্যা খুবই কম। কারণ দল নির্বিশেষে প্রায় সকলে প্রিয়ার বক্তব্যের বিরুদ্ধে যে নিন্দার ঝড় উঠেছে এরা সকলেই সেই ঝড়, বা সেই স্রোতের বাইরে থাকার বোকামি করতে একেবারেই নারাজ।  তাই বরং সম্পর্ক ত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে। সেটা মূল নেতা এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এর বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রিয়াকে বহিস্কার করে হাত ধুয়ে ফেলা থেকে শুরু করে, প্রিয়া সাহার নিজ এনজিও “শারি” এর কর্মীরা,    প্রিয়ার বক্তব্যের দায় না নিতে বইয়ের লেখক ডঃ আবুল বারাকাত বিবৃতি – এভাবে সকলে সামিল আছেন। বারাকাত এখন বলেছেন, প্রিয়া তাঁর “তথ্য-উপাত্ত বিকৃতভাবে উপস্থাপন” করেছেন। তাঁর দাবি,  “প্রিয়া সাহার বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক ও নীতি গর্হিত: বারকাত“।

হ্যাঁ, কেবল তথ্যের দিক বিবেচনায় বারাকাত তা বলতেই পারেন। যেমন- প্রিয়া দাবি করেছেন, ওই ২৯.৭ শতাংশ নাকি দেশভাগের সময়ের হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত। কিন্তু বারাকাত বলছিলেন, তার বইয়ে যা বলা আছে তাতে আসলে  ঐ অনুপাতটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ের নয়, বরং ১৯৬৪ সালের, প্রায় ১৭ বছর পরের। এটা বিরাট ভুল রেফারেন্স অবশ্যই। কিন্তু বারাকাত যে পদ্ধতিতে তাঁর হিসাব কষেছেন, যা এক – “যদি” এর উপর – দাঁড়ানো ঐকিক নিয়ম, প্রিয়া কিন্তু আসলে সে পদ্ধতিটাই অনুসরণ করেছেন। এব্যাপারে বারাকাত নিশ্চুপ।

এক স্বামী বাজারের ভেতর দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বড় বড় কৈ মাছ দেখে এসেছেন। বাড়ি ফিরে তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আদুরে গলায় গল্প আলাপ শুরু হয়েছিল, এক ‘যদি’র ওপরে। ‘যদি’ স্বামী বড় কৈ মাছ বাসায় আনতেন, সেখান থেকে স্ত্রী কত পদে কিভাবে তা রান্না করতেন সে আলাপ করতে যেয়ে স্ত্রীর আরও আহ্লাদ করতে ইচ্ছা করাতে তিনি বলে বসেন, ‘আমি ওই মাছ খেতাম না’। এতে স্বামী অগ্নিমূর্তি হয়ে বউ পেটানো শুরু করেছিলেন। তো মাছ বাজার থেকে বাসায় ঢোকার ব্যাপারটাই হাইপথিটিক্যাল থেকে গেলেও বাসায় বউ পিটানি ছিল কিন্তু জেনুইন। প্রিয়া-বারাকাতদের কাণ্ডটা প্রায় সেরকম।

এই তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক দিক হল, সরকারের পরিসংখ্যান দেখিয়েছে – হিন্দু জনসংখ্যাও নয়, বরং হিন্দু জনসংখ্যার (অন্যান্য ধর্মীয়-গোষ্ঠির তুলনায়) অনুপাত কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে ড. আবুল বারাকাত কেবল এতটুকুই জানছেন যে, অনুপাতে “কমেছে”, এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু এ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত টানতে গিয়ে আর “কমেছে” লিখছেন না। বরং তা না লিখে এর বদলে লিখছেন, এরা “নিরুদ্দিষ্ট”। বাক্যে লিখছেন এভাবে – যদি একই অনুপাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ধরা হয়, তাহলে ‘আনুমানিক ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নিরুদিষ্ট হয়েছেন“। এভাবে – কমেছে মানেই নিরুদ্দিষ্ট – এমন অর্থ তৈরি করছেন।

এটা কোন একাডেমিকের কাজ হতে পারে না। কোন একাদেমিক এভাবে ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত বা  উটকো অর্থ তৈরি করেন না। এটা আসলে নিজের একাদেমিক যোগ্যতাকে নিচা করে ফেলা কাজ। এছাড়া, যেহেতু বারাকাতের বাক্যটা ‘যদি’র ওপর দাঁড়ানো, তাই তাকে লিখতে হতো – নিরুদিষ্ট “হয়ে গেছে” না, নিরুদিষ্ট ‘হত’। পরিসংখ্যানে জনসংখ্যা কম দেখতে পাওয়া মানেই কি তাদের ‘নিরুদ্দিষ্ট’ হওয়া বলে চালিয়ে দেয়া যায়? কিসের ভিত্তিতে বারাকাত এই দাবি করছেন?

এছাড়া আমাদের সরকারি পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করে সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় ছাপা রিপোর্টে দেখেছি, ব্রিটিশ আমলেও হিন্দু জন্মহারের অনুপাত কখনো কখনো কমে গিয়েছিল। বিবিসি লিখেছে, বরং ব্রিটিশ আমলেও এই অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক হার কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়”। এর মানে “হিন্দুরা ভিকটিম” বলে দেখিয়ে সমাজের সহানুভুতি টানা আর যা প্রকারন্তরে সহ-জনগোষ্ঠি মুসলমানদের মনে অপরাধীর অনুভুতি তৈরি করা টাই বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতি। দেখা যাচ্ছে এর ফাউন্ডেশন নড়বড়ে।  আর এই নড়বড়ে ফাউন্ডেশনকে তবু খাড়া করে ধরে রাখতে আমরা এখন দেখছি আসলে, ড. আবুল বারাকাতের এই ‘নিরুদ্দিষ্ট’ শব্দ ব্যবহার খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

আরও আছে। এরপর বারাকাতের ‘নিরুদ্দিষ্ট’ শব্দটাকে আরও এককাঠি চড়িয়ে প্রিয়া এর ইংরেজি করেছেন ‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ [Disappear], মানে যাকে আমরা ‘গুম হওয়া’ বলি।  কিন্তু লিগাল টার্ম হিসাবে গুম [disappeared] শব্দটি হিউম্যান রাইটস্-এ খুব সিরিয়াস শব্দ, যেখানে রাষ্ট্র বিরাট অপরাধী গণ্য হয়ে যায়। তাই, নিজেকে মানবাধিকার কর্মী দাবি করা প্রিয়া সাহার এই ‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ শব্দ ব্যবহার করা, একটা ক্রিমিনাল কাজ হয়েছে। মানে তিনি বলতে চাইছেন, হাসিনা সরকারসহ বাংলাদেশের সরকারগুলো ৩.৭ কোটি হিন্দু লোককে গুম করে ফেলেছে!  অথচ কথাটা সিম্পলি তিনি বলতে পারতেন, তারা দেশ ছেড়ে গেছে, ‘ভারতে’ যদি নাও বলতে চান!

কিন্তু প্রিয়ার মত ড. আবুল বারাকাতও এই অভিযোগের বাইরে নন। তাতে যতই তিনি এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চান না কেন! তিনি সরকারি পরিসংখ্যান বইয়ে জনসংখ্যা কম দেখতে পেয়েছেন, এর মানে কি তিনি একে ‘নিরুদ্দিষ্ট’ হওয়া বলে দাবি করতে পারেন? ফলে শব্দের আসল “উসকানি” তো প্রথম তিনিই দিয়েছেন। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আধাপ্রমাণিত-অপ্রমাণিত যেসব তথ্যের বয়ান আছে, এই বয়ানদাতারা যেন তার কথাটা লুফে নেন, সে কাজই তিনি করেছেন। হাতে হাতে ফলও পেয়েছেন। নিশ্চয়ই বিজেপি-আরএসএস বারাকাতের এমন বই ও তথ্য হাজার হাজার কপি বিলির জন্য ছেপে নিবেন। তাই ড. আবুল বারাকাত খুবই সফল বিরাট “অর্থনীতিবিদ” বলতেই হয়!

তাহলে একা বাংলাদেশ না, ভারত ও পাকিস্তানও গুম-কা্রবারিঃ
আজকের বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান তিন দেশের জন্যই ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সবাইকে এক উথালপাথাল সময়ের ভেতরে যেতে হয়েছিল। কেন?
কারণ, ব্যাপক মাইগ্রেশন [Migration] বা পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশান্তর ঘটেছিল এ তিন দেশেই,  যা থেকে আজকের এই তিন রাষ্ট্রের কেউ বাদ নয়। যদিও এগুলো কারও জন্যই কোনো সুখকর স্মৃতি নয়। তবে মুলকথা, এটা কেবল যে বাংলাদেশ থেকেই হিন্দুরা দেশত্যাগ করে ভারতে গেছে তা একেবারেই নয়; বরং তিনটি দেশ থেকেই কোথাওই তা একমুখী নয়, প্রতি দুই দেশের মধ্যে উভয়মুখী দেশান্তর ঘটেছিল। আর কেবল বাংলাদেশের কথাই যদি তুলি, তবে বলা যায় – হিন্দুদের দেশান্তর হয়ে ভারতে যাওয়ার পাশাপাশি সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠী নিরাপদ জীবনযাপনের আশায় বাংলাদেশে চলে এসেছিল।

সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) সমগ্র সীমান্ত এলাকাজুড়েই এটা ঘটেছিল। বিশেষ করে এখনকার সাতক্ষীরা, বাগেরহাট আর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাগুলোতে অনেক বেশি করে। অথবা পশ্চিমবঙ্গের জল্পাইগুড়ি, কোচবিহার থেকে দিনাজপুর বা রংপুরে বাঙালি মুসলমানদের আসা। [দিনহাটা থেকে আসা এরশাদের পরিবারের কথা মনে করতে পারেন] এছাড়া আরো আছে। বিহার থেকে আমাদের দিনাজপুর কাছে বলে ব্যাপকসংখ্যক বিহারি-মুসলমান এসেছিল, যাদেরকে পুনর্বাসিত করতেই আমাদের সৈয়দপুরের জন্ম। দিনাজপুর-রংপুরের পঞ্চাশ মাইল দুরত্বের ঠিক মাঝখানে ২৫ মাইলে জায়গা বেছে নেয়া হয়েছিল। সেকালের মিল কারখানা প্রায় নাই পরিবেশে সৈয়দপুরের কয়েক কিলোর মধ্যে পার্বতিপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপকে মনে করা হয়েছিল পুণর্বাসনের এক বড় উপায়, তাই। তবে যেসব বিহারি অনেক আগেই বিহার ছেড়ে ততকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতায় কোন হাতের কাজ করত, ১৯৪৭ সালে এদের অনেকে আবার সেখান থেকে সরাসরি ঢাকায় চলে এসেছিল। ঢাকায় হাতের কাজ জানা কারিগরেরা গাড়িসহ যেকোন মেরামতি কাজ, ধুপবাতি তৈরি, নানান ডিজাইনের চটের হাতব্যাগ তৈরি, সেলুনের কারিগর ইত্যাদিতে – সর্বপ্রথম এভেলেবল কারিগর এরাই।  যেমন ঢাকার সেলুনগুলো চালানোর আদি কারিগর হল এরা।

সারকথায় বাংলাদেশের হিন্দুরাই একমাত্র [ভারতে] দেশান্তরি জনগোষ্ঠি নয়। দেশান্তরটা ঘটেছিল ক্রসবর্ডার মানে দুদিক থেকেই। কাজেই বাংলাদেশ কেবল হিন্দু জনগোষ্ঠিই ভিকটিম আর মুসলমানেরা সব এরজন্য দায়ী অপরাধী – এই বয়ান একচোখা। এই একই যুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে [পালিয়ে] আসা মুসলমানেদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদেরকেও কেউ দায়ী করতেই পারে। কিন্তু আমরা তা দেখি না। মানে এরা অভিযোগের বয়ান তৈরিতে দুর্বল, বুঝা যাচ্ছে। আবার তামসাও আছে। যেমন ধরেন, ডঃ আনিসুজ্জমান। কলকাতা থেকে প্রথম দেশান্তরি হন তার দুই সিনিয়র দুলাভাই [বাবার প্রথম পক্ষের দুই মেয়ের জামাই] সরকারি কর্মচারি, বাগেরহাটে। আনিসুজ্জামানের হোমিওপ্যাথি চিকিতসক বাবা এদেরকেই অনুসরণ করেন। একথাগুলো তাঁর আত্মজীবনী ধরণে লেখা বইতে পাওয়া যাবে। হাতের সামনে বইটা এখন নাই, আগে পড়ার স্মৃতি থেকে লিখলাম। কীন্তু তামসাটা হল তিনি এখন ঢাকার হিন্দু রাজনীতির বয়ান তৈরিকারিদের অংশ।

এখন তাহলে, প্রিয়া-বারাকাতদের তত্ব ও ফর্মুলা অনুসারে, ভারতের যে মুসলমান জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে চলে আসলো এতে ভারতের পরিসংখ্যান দেখে ভারতের কোন ডঃ ভট্টাচার্য অথবা কোন প্রিয়া রহমান কী এদেরকে  “নিরুদ্দিষ্ট” বা “ডিজঅ্যাপিয়ার্ড” বলে দাবি করছে? না, এটা বলবে? ভারতের কেউ কি তাদেরকে ভারত সরকারের হাতে “ডিজঅ্যাপিয়ার্ড” বলে দাবি করবে? আর কোনো এক প্রিয়া রহমান কী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গিয়ে আরো ৩.৭ কোটি মুসলমান ভারতের হাতে ডিজঅ্যাপিয়ার্ড বলে নালিশ দিবে? আর এতে নিশ্চয়ই প্রিয়া, বারাকাত এমনকি খোদ মোদী বা আরএসএস খুবই খুশি হবে! আদর করবে!

লুজ-টক, ‘দেশভাগ’ নাকি ভুলঃ
অনেকে প্রায়ই লুজ-টকের মতো করে বলে থাকেন, ১৯৪৭ সালের ‘দেশভাগ ভুল’। বিশেষত এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে করা হয়েছে, তাই। আসলে মূলকথাটা হল, এগুলো জমিদারদের স্বার্থের উপর দাঁড়িয়ে জেনে না জেনে বলা কথা। সেই বয়ান আপন করে নিয়ে বলা কথা। সেকালের জমিদার মানে হল, ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশরা যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তাদের কথা। অবিভক্ত সেই বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলতে ‘জমিদারি ভুমিমালিকানা ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাকেই বুঝাত, যা আবার ছিল কলোনি শাসকের স্বার্থের অধীনে। এই জমিদারদের সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিল বর্ণহিন্দু জমিদার।  ‘বর্ণ’ মানে জাতিভেদ প্রথা [Cast System]। এটা ব্রাক্ষ্মণদের সমাজে শীর্ষে রেখে বাকি মানুষদেরকে তাদের অধস্তন বিভিন্ন জাতের ক্যাটাগরিতে ফেলে একটা ‘কাস্ট সিস্টেম’ বা জাতপ্রথায় সাজিয়ে সমাজ পরিচালনা করা। প্রাচীন ভারত বলতে এই জাতপ্রথা ব্যবস্থার ব্রাক্ষ্মণ্যবাদের ভারতই বুঝাত।  ভারতে আজও যাই নতুন কিছু করতে চাওয়া হয়েছে তা শেষমেশে বর্ণহিন্দুদের শীর্ষে রেখে তাদের আধিপত্য বা হেজিমনিতে তৈরি এক ব্যবস্থা হয়েই দাড়িয়েছে। বৃটিশদের জমিদারি ব্যবস্থাও তাই বর্ণহিন্দুর জমিদারি ব্যবস্থা হয়ে দাড়িয়েছিল।
এতে অবিভক্ত সারা বাংলা মানে হয়ে যায় একচেটিয়াভাবে এই জমিদার শ্রেণীর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব – এক হেজিমনি। আবার অবিভক্ত বাংলা সেই প্রথম শহুরে-আরবান হতে শুরু করেছিল। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল ঐ জমিদারি ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই। ওরই ঔরসে। ‘শহর’ কথাটা আলাদা বিশেষ মনোযোগে বুঝতে হবে। অবিভক্ত বাংলার প্রথম “শহর” হওয়া খুব গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। তাও আবার বৃটিশ কলোনির সারা ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা ফলে সেই মাত্রার পুঁজি পুঞ্জীভবনের রাজধানী শহর কলকাতা –   বাংলার শহর হওয়ার শুরু সেই সারা ভারতের রাজধানী কলকাতা হবার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে। কিন্তু হলে কী হবে এই কলকাতা গড়ে উঠতেছিল এক বর্ণহিন্দু জমিদারের কর্তৃত্বেই।
একারণেই বাংলা ভাষা, বাঙালি বলে ‘জাতি’ ও সংস্কৃতিগত ধারণা, বাঙালির শহর, বাঙালির আধুনিকতা ইত্যাদি যাকিছু ঐ প্রথম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তা সব ঐ সময়েই এবং তা বর্ণহিন্দু জমিদার শ্রেণীর ঔরসে, পৃষ্ঠপোষকতায় ও স্বার্থে। বলা বাহুল্য, বাঙালি বিষয়ক এসব ধারণা তৈরি হয়েছিল ও আকার পেয়েছিল এই অনুমানে যে, বাংলার মুসলমানেরা বাঙালিই নয়, সুতরাং ‘এক্সক্লুডেড’। তাই জমিদারদের ‘বাঙালি’ ধারণায় কোথাও মুসলমানদের গোনায় ধরার দরকারই মনে করা হয়নি। এরই এক প্রবল প্রমাণ – উপন্যাসিক শরতচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখা। তিনি অবলীলায় তাই “বাঙালি বনাম মুসলমানের” ফুটবল খেলার গল্প বলেছেন। কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরী মরার আগে পর্যন্ত (একালে এরশাদের আমলেও) নিজের লেখায় স্বীকার করেন নি যে মুসলমানেরা বাঙালি।

এসব চিন্তা-ততপরতারই সার ফলাফল আমরা দেখেছিলাম সেকালে, সারা বাংলাতেই সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ইত্যাদি সব কিছুতে ছিল জমিদার হিন্দুর আধিপত্য। এতে সমাজে যে মুসলমান, তাকে মার্জিনাল করে কোণায় ফেলে রাখাই রেওয়াজ হয়ে যায়। আবার একই হিন্দু জমিদারের মুসলমান প্রজার জায়গায় হিন্দু প্রজার বেলায় দেখা যেত সামাজিক সাংস্কৃতিক ট্রিটমেন্ট আলাদা অর্থাৎ তুলনায় ভাল। যেমন জমিদারের বাড়িতে বসবার জায়গা থাকত আলাদা। বসার জায়গায় পাটি পাতা থাকত তাদের জন্য। অর্থাৎ মুসলমানদের মত খোলা মাটিতে তাদের বসতে হতো না। ভাল হুকোতে তামাক টানার ব্যবস্থা থাকত তাদের জন্য। আর এর ফলে হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজার চেয়ে  সামাজিকভাবে একটু উন্নত, উপরে এই ভাবটা সহজেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এই স্ট্যাটাসের কারণ তারা অন্তত সাংস্কৃতিকভাবে বর্ণহিন্দু জমিদারদের সাথে এক ছাঁচে লীন হয়ে যাওয়া, গণ্য হওয়া অনুভব করত। আবার যেমন, এমনকি বিশ শতকে এসেও ‘শেখ মুজিবের আত্মজীবনী’ বইতে যে সামাজিক বৈষম্য দেখি, সেটা তখনো খুবই প্রখর, মার্জিনালাইজড মুসলমানের এক মফস্বল শহরের। তবে একটা কাউন্টার ফ্যাক্ট ছিল সব সময় যে, পূর্ববঙ্গে মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।

একারণে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের দৃষ্টিতে দেখলে, তাই ১৯০৫ কিংবা ১৯৪৭ সালে তাদের কাছে বাংলার বিভক্তিজাত আলাদা প্রদেশ, কিংবা আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান – দুবারই তা খুবই কাম্য ছিল। আর এর ঠিক উল্টোটা হল, বৃটিশদের প্রশাসনিক পদক্ষেপে ১৯০৫ সালের বাংলার বিভক্তি থেকেই জমিদার হিন্দুদের চরম নাখোশ হওয়া। এর মূল কারণ পূর্ববঙ্গের ওপর তাদের কর্তৃত্ব হাতছাড়া হওয়ার ভয়। ব্রিটিশরা বড় হয়ে যাওয়া নিজেদের প্রশাসনিক ম্যানেজমেন্ট সহজ করার জন্য আর মুসলমানদের একটু স্বস্তি দেয়ার জন্য পূর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েছিল। কিন্তু জমিদারের কায়েমি স্বার্থের কাছে এটা অসহ্য লেগেছিল। কারণ, এতে মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে তারা হাতছুট হয়ে যায় কি না।

এদেরই লেখা ইতিহাসের আর এক বেছে নেয়া চালু শব্দ “ডিভাইড এন্ড রুল”।  মানে জমিদারী স্বার্থের দিক থেকে দেখে অভিযোগের সারকথাটা হচ্ছে, “বৃটিশ শাসক তুমি আমার পাশের মার্জিনাল মুসলমানদের উপরে উঠে যেতে সাহায্য করতে যাচ্ছ – এটাকে আমার বিরুদ্ধের কাজ, ওদের সুযোগ করে দেয়া বলে আমি দেখছি”। এই ডিভাইড করা তাই খারাপ কাজ।  কিন্তু যদি জমিদারকে জিজ্ঞাসা করা যেত তুমি কাকে ডিভাইড করে ফেলার কথা বলছ? মুসলমানদের তো তুমি ইতোমধ্যেই মার্জিনালাইড বলে আলাদা ডিভাইড করে রাখছ!  আসলে তামসাটা হল ডিভাইড বলার সময় সে মুসলমান প্রজাদের নিজের সাথে বলে ধরে নিয়েছে! আবার এখান থেকেই তাদের তথাকথিত স্বদেশী এবং বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের শুরু। কেন? না বৃটিশেরা মুসলমানদের একটু স্বস্তি দিবার জন্য পুর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ করতে গিয়েছে।

আসলে ১৯০৫ সালের পুর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হবার বিরুদ্ধে তথাকথিত বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন – খারা করে ফেলতে পারে, এটাই প্রমাণ করে জমিদারদের স্বার্থকেই হিন্দু প্রজারাও তাদের স্বার্থ গণ্য করেছিল। হিন্দুস্বার্থ বলে এক মিথ – এর ঘোল খেয়ে। এটাই বলে যে সে সমাজটা ছিল আসলে হিন্দুস্বার্থ বলে এক মিথ এর উপর দাঁড়ানো। মুসলমানেরা ঐ সমাজের কোন শক্তিই নয়।

তার মানে এটা কোন উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ছিল না। ছিল পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে  মুসলমানদের সম্ভাব্য প্রভাব বেড়ে যেতে পারে – এটা ঠেকানোর আন্দোলন। “অনুশীলন” বা “যুগান্তর” গোষ্ঠির মা-কালীর পুজা করে স্বদেশী আন্দোলন করতে বেরিয়ে পড়া এখান থেকে। উপন্যাসিকদের গল্প লিখে একে উতসাহ দেয়াও এখান থেকে। এটা মূলত জমিদার কায়েমি স্বার্থের বাইরে মুসলমানদের একটু হাতছুট হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন। অথচ  তারা ইতিহাস লিখেছে, এটাই নাকি ‘স্বদেশী আন্দোলন’। কার স্বদেশ? এই কারণে, বাংলাদেশের আম মুসলমানদের কাছে এখনো এর কোনো আবেদন নেই। অবশ্য এডুকেটেড মুসলমান ‘প্রগতিবাদী বুঝ’ থেকে অনেক সময়ে একে খুব বিরাট ঘটনা মনে করতে চায়। তাই আজ পুনোর্মুল্যায়ন করে দেখা দরকার এই আন্দোলনের কনটেন্ট, এর সারকথা কী? এটা কতটা আদৌও উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন নাকি বর্ণহিন্দুর জমিদারী ক্ষমতাকে যারা চ্যালেঞ্জ করছে তাদের দমানো মোকাবিলার আন্দোলন। পুর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ করানোর বৃটিশ এক প্রশাসনিক ঘোষণা – এর বিরোধিতা করার আন্দোলনকে কী কারণে “উপনিবেশবিরোধী” আন্দোলন মনে করতে হবে?

কিন্তু বাস্তবতা হল, পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজাদের কাছে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ ছিল সেই টুলস, যা দিয়ে সে জমিদারি উচ্ছেদ করে জমি পাওয়ার আন্দোলন বাস্তব করতে পারে। এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের গূঢ়ার্থ। বাইরে থেকে এটাকে ইসলাম কায়েম, মুসলমানরা দেশ পেয়েছে, ‘এটা মুসলিম জাতীয়তাবাদ কিংবা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়ে ফলে এটা নষ্ট, ইত্যাদি যাই বলা হোক না কেন, সারকথা ছিল জমিদারি উচ্ছেদ করে দেয়ার বাস্তব ক্ষমতা তারা হাতে পেয়ে যায়। তাই, ‘এস্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনেন্সি অ্যাক্ট ১৯৫০’ [The state acquisition and tenancy act, 1950 (East Bengal act no. Xxviii of 1951)]- যেটা পাস হয়েছিল ১৬ মে ১৯৫১ তারিখে, এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান ফলাফল হিসাবে সবচেয়ে সেই ‘বিপ্লবী ঘটনা’।

এই আইনের বলে জমিদারি পূর্ববঙ্গ থেকে উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। এতে অ্যাকুইজিশন মানে হল, বাংলাদেশ রাষ্ট্র দেশের সব জমিমালিকানা নিজের করে নিয়েছিল। এই আইনের ঘোষণাই সেটা। তাই এটাই জমিদারি উচ্ছেদ। এরপর যে যে জমি আগে চাষাবাদ করত এখন সরকারকে নির্ধারিত খাজনা দেয়া সাপেক্ষে সে সেই জমির মালিক। এটাই ছিল বাংলাদেশের (পুর্ব পাকিস্তান) অর্থনীতিতে “ক্যাপিটাল ফর্মেশনের’ দিক থেকে প্রথম সুদূরপ্রসারী কালজয়ী পদক্ষেপের ঘটনা। নিপীড়ন নিষ্পেষণের মধ্যে যুগ যুগ নিরন্তর ফেলে রাখা চাষা-প্রজার আত্মমুক্তির প্রথম পদক্ষেপ। বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন, আমাদের অর্থনীতির প্রথম ভিত্তি গেড়ে দেওয়ার এক আইন। সেটা হয়েছিল বলেই আজ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের এক্সপোর্ট গ্লোবাল বিজনেস, এক জটিল ব্যবস্থাপনার ব্যবসা সে  সামলাতে পারে মাথা তুলে, সেকালের সেই চাষার সন্তানরাই।

কোথাও বিপ্লব ঘটেছে বলে এমন কোনো কিছুকে চিনবার নির্ণায়ক যদি হয় নতুন রাষ্ট্র, মালিকানার ধরনে বদল, ক্ষমতায় বদল ইত্যাদি, তাহলে অন্তত এ তিন কারণে “পাকিস্তান আন্দোলন” ছিল একটা বিপ্লব। অনেকে বলবেন এর ধর্মীয় পরিচয়ের দিকটার কথা [এই আপত্তির অসারতার দিক নিয়ে আরেক সময় বলা যাবে]। কিন্তু এই জমিদারি উচ্ছেদের কাজটা খারাপ হয়েছে – এ কথা কেউ বলুক দেখি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে দুনিয়ার কলোনি শাসকের “শর্ত অনুযায়ী” কলোনি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এতে কলোনি শাসকেরা যত দেশ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, সব দেশেই এর সাধারণ ধারা ছিল, সবসম্পত্তি রেখে যাওয়া। যেমন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান রেলওয়ে, আমরা কেউ ব্রিটিশেরা চলে গেলেও তাদেরকে এর কোন মালিকানা শেয়ারও দেইনি। মিসরের নাসের সুয়েজ খালের মালিকানা নিয়ে কলোনি শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন ও জিতে এসেছিলেন। একাত্তর সালের পরে আমরাও পাকিস্তানি সম্পত্তি বায়োজাপ্ত করেছি ফেরত দেইনি। পাকিস্তানের ভুট্টো ১৯৭২ সালে পুরনো ব্যাংক বীমা কোম্পানির পুরানা আয়ুব আমলে প্রতিষ্ঠিত মালিকদের সম্পত্তি জাতীয়করণ করেছিলেন। তবে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, এথেকে পাওয়া মালিকানা সরকারের হাতে রাখতেই হবে, ব্যক্তির নয়।

তবে কলোনির ক্ষেত্রে সম্পত্তি বায়োজাপ্ত না করার একটাই উদাহরণ আছে, ওবামার প্রিয়জন  নেলসন ম্যান্ডেলার সাউথ আফ্রিকা। ১৯৯৪ সালে তিনি শ্বেতাঙ্গদের সম্পত্তি যেমন ছিল তাতে তিনি হাত দিতে দেননি। অথচ স্বাধীন হয়েছেন বলে ভান করেছেন, পশ্চিমারাও পিঠ চাপড়ে দিয়েছে। আর এরই ফলাফল হল, এখন সে দেশে খনি শ্রমিকের বেতন ১৬০০ ডলার, কিন্তু তারা বস্তির জীবনযাপন করে। কারণ, জীবনযাপন লন্ডনের মতো খুবই ব্যয়বহুল। আর ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষমতা আগের মতোই সাদাদের আধিপত্যে। কাজেই কাকে কী ফেরত দেয়া যাবে, এর নির্ণায়ক এগুলো। এক্ষেত্রে সম্পত্তি ও নাগরিকত্ব সাদাদের দিয়ে দেয়া মনে তাদেরকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাই দিয়ে দেওয়া। ক্ষমতার সাথে সম্পত্তির সম্পর্কটা এখানে এতই সিরিয়াস।

অতএব ধরা যাক, জমিদার রবীন্দ্রনাথ কবির চাদর গায়ে ফেরত এসেছেন বলে কিংবা গদ্য সাহিত্যের প্রমথ চৌধুরী যশোরের জমিদারি ফেরত চান বা লেখক সাহিত্যিক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী কিশোরগঞ্জ ফেরত চান বললেই আমরা ফেরত দিতে পারব না, দেওয়া যায় না, তাই না! আমাদের সাথে জমিদার-প্রজার সম্পর্কটা আমল না আড়ালে বাদ রেখে দেয়া যাবে না, মুল্যায়নে যাওয়া যাবে না। আমাদেরকে বুঝতে হবে কী দেয়া যায়, কী যায় না।

আমাদের এক মুরব্বি বদরুদ্দিন উমর, সেই ১৯৭০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কোথায় রাখব, এর একটা নির্ণায়কের কথা তুলেছিলেন। তিনি “…… আন্দোলনের এক প্রান্তে থাকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতিকে অবতার হিসেবে খাড়া করার স্থূল ও হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা” – এর নিন্দা করেছেন। আসলে এরাই হল তথাকথিত “বেঙ্গল রেনেসাঁবাদী”। এরাই একদিকে রেনেসাঁ বলতে ধর্ম বা পশ্চাদপদতা কোপানোর কথার আড়ালে ইসলামবিদ্বেষী হয়ে ইসলামকে কোপ দিয়ে গেছে। অন্যদিকে এদেরই মূল স্বার্থ বর্ণহিন্দুর জমিদারি কায়েমি স্বার্থকে রক্ষা করা। তাই তারা জমিদারী শাসনের বিরুদ্ধে কখনও কোন কথা বলে নাই। যেন এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যবস্থা – এটা ধরে নিয়েছে। আবার জমিদারি কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে আঁচও যেন না লাগে সে চেষ্টা করে গেছে। বরং আঁচ লাগা থেকেই তাদের তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলনের শুরু। এজন্য পুর্ববঙ্গের মানুষের প্রজা মুসলমানেরা “বেঙ্গল রেনেসাঁগিরি” কথিত এক আধুনিকতার নামে কায়েমি স্বার্থকে আমল করে নাই। নিজের মনে করে নাই। তাই আমাদের মূল্যায়নে মূল নির্ণায়ক হল,  উনিশ শতক (১৮০০-১৮৯৯) থেকে একালেও কোন ব্যক্তিত্বের  সেকালের জমিদারি শাসনের প্রতি মনোভাব কী ছিল? এর উচ্ছিষ্টভোগী থেকে চুপ ছিলেন কী না এগুলো। আসলে এসব দেখেই বাংলাদেশের স্বতন্ত্র মূল্যায়নের ধারাটাই প্রধান হয়ে উঠবে।

প্রিয়া সাহা কোন প্লাটফর্ম থেকে কথা তুললেন?
একালে এ’ঘটনার শুরু ২০০১ সালে আমেরিকায় ৯/১১, মানে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে। এর এক মাসেরও কম সময় পর ৭ অক্টোবরে তখনকার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সাথে মূল সাগরেদ তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে নিয়ে আফগানিস্তানের ওপর যুদ্ধবিমান হামলা শুরু করেছিলেন। আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি কমন প্র্যাকটিস হল, এসব ক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরু বা বিমান হামলার সাথে সাথেই আর একটা কাজ তারা শুরু করে। তা হল, দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই পররাষ্ট্-দূত পাঠানো। এর উদ্দেশ্য আমেরিকান ওই হামলার সিদ্ধান্তের পক্ষে বিশ্বজনমতকে নিজের পক্ষে জড়ো করা। কারণ, যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে চলে না, যদি না সাথে এর পক্ষে বয়ান ও জনমত তৈরি করে নেয়া যায়। অবশ্য এর আগে এই যুদ্ধ ও হামলার এক খুবসুরত ছোট নাম প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ দিয়ে নিয়েছিলেন – ‘ওয়্যার অন টেরর’। ফলে তৈরি হয় ‘ওয়্যার অন টেরর’-এর বয়ান। গ্লোবাল নেতা হিসেবে আমেরিকা দুনিয়ার ছোট-বড় বিভিন্ন রাষ্ট্রের ওপর যতটুকু প্রভাব অথবা চাপ তৈরিতে সক্ষমতা, তা দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্রের ওপর এর সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রয়োগ করে আমেরিকান কূটনীতিক পাঠিয়ে বুশ এই পুরো কাজটা সম্পন্ন করেছিলেন।

তবে এর অন্য একটা দিক আছে। আমেরিকান কূটনীতিকদের এই সফরের মধ্য দিয়ে আসলে যা ঘটে তা হল, স্থানীয় নানান দ্বন্দ্বগুলোর সাথে গ্লোবাল এ রকম ইস্যুর এলায়েন্স। মানে এতে নতুন করে এক পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ শুরু হয়ে যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেমন কাশ্মির, পাকিস্তান বা একটু দূরে হলেও বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ আছে। একে ভারতের চোখ দিয়ে দেখে তাতে সমর্থন দিয়ে আমেরিকা তা আমলে নিলে, এবার ভারত ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নৌকায় উঠতে রাজি বলে জানায়। তাই রফাটা মোটামুটি এখানেই হয়েছিল এভাবে যে আসলে আমেরিকাই হিন্দুত্বের স্বার্থকে ‘ওয়্যার অন টেরর’-এর সাগরেদ বানিয়ে নিয়েছিল। আর সেখান থেকেই  আমেরিকায় “হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন” এর জন্ম ২০০৩ সালে।

তারা মূলত পারিবারিকভাবে হিন্দু হলেও আমেরিকায় জন্ম নেয়া হিন্দু প্রজন্ম, নিজেদের পরিচয়ে এটাই তারা ফোকাস করে থাকেন। এদের বোর্ড অব ডিরেক্টরদের তালিকায় এদের পরিচয় ও বয়েস দেখলে বুঝা যাবে। চলতি ইস্যুতে এদের মধ্য সবচেয়ে প্রভাবশালী জয় কানসারা [Jay Kansara]।

এছাড়া আছেন, হাওয়াই এর প্রতিনিধি পরিষদ নেতা বা কংগ্রেসম্যান (আমাদের ভাষায় এমপি)  তুলশি গাব্বার্ড  [Tulsi Gabbard] যাকে প্রথম হিন্দু (প্রাকটিসিং হিন্দু) কংগ্রেসম্যান বলে দেখানো হয় [ first Hindu member of the United States Congress]। ডেমোক্রেট দলীয় এই এমপি ভাগবদ গীতার উপর হাত রেখে কংগ্রেসম্যান হতে হাউজে শপথ নিয়েছিলেন। বাবা হাওয়াই সিনেট সদস্য।

আমেরিকার ইসকনসহ যত হিন্দু প্রতিষ্ঠান আছে ইত্যাদি সব মিলিয়ে ওরা এক প্রেসার ও লবি গ্রুপ, যারা হাউজে বা সিনেট লবিতে তৎপর থাকে কথিত হিন্দুস্বার্থের পক্ষে। শেষ বিচারে এর ‘মাখন’টা যায় ভারতের বিদেশনীতির পক্ষেই। তাই এই গ্রুপ বা ব্যক্তিগুলোর সমন্বয় করে থাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা। আর হোয়াইট হাউজ পর্যন্ত তা হাজির করে আমেরিকার ‘ফ্রিডম হাউজ’-এর মত পুরোপুরি সরকারি ফান্ডে চলা এনজিও।

এসব তথ্যগুলোকে স্রেফ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসাবে পড়লে অতি-সরলিকরণ দোষে পড়তে হবে। এরচেয়ে বরং এসব লবিগ্রুপ তৈরি হচ্ছে কিভাবে সে প্রক্রিয়া, এদের খেলাস্র নিয়ম ইত্যাদি খুবই মনোযোগে স্টাডি করার বিষয়। চাইলে এখেলায় আপনিও নামতে পারেন। কিন্তু কী করে এগুলো কাজ করে, এই খেলার নিয়ম কী সব বুঝতে হবে আগে। নিজের স্বার্থ গ্রুপ খারা করতে পারেন। আমেরিকন আইনে আইন মেনে লবি বা প্রেসার গ্রুপ বানানো বৈধ। আপনাকে নিজের গ্রুপ বানাতেই হবে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। কিন্তু আপনাকে এদের সম্পর্কে কতদুর কী করতে পারে জানা থাকতে হবে। আবার শত্রুর শত্রু তত্ব অনুসারে যেহেতু এরা হিন্দুস্বার্থের পক্ষে গ্রুপ, মানে এরা ‘ওয়্যার অন টেররে’ মুসলমান স্বার্থের বিপক্ষে; অতএব মাছি আসবেই। ইসরায়েলি সাফাদি-কেও এখানে পাবেন।

তাহলে এবার একটু সার করি। ‘ওয়্যার অন টেরর’ থেকে জন্ম নেয়া এই হিন্দুস্বার্থ গ্রুপ (শব্দগুলো ওদের, লিখেছেন হিন্দুইজম প্রমোট করেন তারা, HAF’s work impacts a range of issues — from the portrayal of Hinduism to…….) এদের বেশকিছু ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পেছনে। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতি এখন যা মূলত বিজেপির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে; মূলত গত নির্বাচনের সময় থেকে। এরাও এরই অংশ, যোগাযোগ সম্পর্ক আছে, রাখে। ক্ষমতায় আসার সময় এদের সমর্থন আওয়ামি লীগের ভাল লেগেছিল। কিন্তু খবর নেয় নাই এরা কারা কার সাথে কে কীভাবে কাজ করে। এ’দিকটা সম্ভবত সরকার যথাযথ আমল না করায় এখন ‘সেম সাইডে গোল’ খেতে হলো।

ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিবার পর থেকে গত দুবছর ধরে আমেরিকার ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার আছে কিনা এনিয়ে আওয়াজ তোলা প্রেসার গ্রুপ প্রায় চুপসে গেছিল। কারণ ট্রাম্প আমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা ফেলে আমেরিকা ফাস্টের ন্যাসনালিজম করতে গেছিল। তাই গত দুবছর নামকাওয়াস্তে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার আছে কিনা – এসবের বার্ষিক রিপোর্ট হয়েছিল। এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে এতে ট্রাম্প বাবাজীবন হাজির। হতে পারে আগামি বছর নির্বাচন, তিনি আবার দাড়াতে চান, সেটা এর কারণ। ট্রাম্পের ন্যাশনালিজমের খোলস থেকে মাথা বের করা। তবে যে কারণেই হোক মনে হচ্ছে ভারত পুরানা মেকানিজমটাকে ততপর করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বিপদজনক হচ্ছে হাসিনা নিজেকে রক্ষা করতে বিব্রত না হতে চারদিকে খোঁজ রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ঠিক ঠিক কাজের লোক তার নাই না ছিল না। দৃশ্যত হাসিনাকে এখানে পরাজিত করে ফেলা হয়েছে, আশপাশের অকাজের লোকের জন্য। দু-একটা শাহরিয়ার কবির বা প্রিয়া সাহা পাওয়া কোন ব্যাপার না। এগুলা ঘটনার পেটি-দিক।
এরপর অন্যদিকে যাবার আগে বলে রাখি। আবার বিএনপিরও বিরাট ওস্তাদ ভাবার কোন কারণ নাই। এরাও প্রায় সমান বেকুব। গত নির্বাচনে আরএসএস আমাদের দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। দু দলই বোকার মত মোদীর সমর্থন পাবার সাথে ব্যাপারটাকে সম্পর্কিত করে  দুই দলের ভিতরেই কিছু লোক এই হিন্দুস্বার্থকে পঞ্চাশ আসন দেয়ার জন্য লবি ও রাজী করিয়েছিল। অথচ আরএসএস মোকাবিলার জন্য পাবলিকই যথেষ্ট ছিল। অথচ কেউ ব্যবহার চিন্তা করে নাই। হাস্না পীয্যুষকে লাগিয়েছিল, অযথা দাগ লাগানোর জন্য। আর বিএনপির ভিতরে যারা বিরাট বুদ্ধিমান কিন্তু আসলে কথিত হিন্দুস্বার্থের জন্য লবী করেছিল, এরাও কোণঠাসা হওয়া আর শক্ত ওয়ার্নিং পাওয়ার যোগ্য।

তবে আমরা পাবলিককে যে নীতির পক্ষে সবার হাত ধরে দাড়াতে হবে তা হল, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি। নাগরিক যেই হোক যে ধর্মের যে পরিচয়েরই হোক তার সাথে কোনই নাগরিক অধিকার বৈষম্য করা যাবে না। কাউকে বাড়ি সুযোগ, ক্ষমতাও দেয়া যাবে না। আইনের চোখে সবাই সমান হতে হবে। আমাদের সমস্যা এটা আসলে সেকুলারিজমের কোন ইস্যুই না। নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি অনুসরণ করলে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে ছলাকলা প্রয়োজনীয় হয়ে যাবে।  আবার আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়া ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।  হাসিনার উচিত হবে ইমিডিয়েট এসব নীতি অনুসরণ করে সব সমস্যাকে দেখা। আর সর্বোপরি জনগণের শক্তির উপর ভরসা করে খাড়ায় যাওয়া।
এসব অনুসরণ করলে কোন ট্রাম্প বা প্রিয়া, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বা বাংলাদেশকে কখনও ভয় দেখাতে, বিব্রত করতে পারবে না।  এক পেটি স্বার্থে, এক হিন্দুর বাড়ি জমি এনক্রোচমেন্ট করতে পড়শি আরেক হিন্দু বা মুসলমানকে দেয়া হয়েছে। এতে বদনাম ছাড়া, কোন দলের কার কী লাভ হয়েছে? এগুলোই এখন প্রধান অভিযোগ। আর তা এমনভাবে প্রিয়াদের হাতে উপস্থাপিত যেন বিশেষ করে ইসলামী দলসহ আমাদের সব রাজনৈতিক দলগুলোর  প্রধান কর্মসুচি যেন পড়শি এনক্রোচমেন্ট যেন হিন্দুর সম্পত্তি দখল। অথচ ১২% বিশেষ জনগণকে ২৫% চাকরি দেয়া যে কোন কাজে আসে না, এটাই আজ দেখা যাচ্ছে। এটা কোন পথই না।
অথচ দরকার ছিল নুন্যতম আইনের শাসন। তা দিয়েই এগুলো সমাধান করা যায়। আমাদের সরকার চালানো এমনই কেলাস, পেটিস্বার্থে ভরপুর। যার মুল কারণ শাসন-হীনতা। খোদ প্রভাবশালী হিন্দুরই দেবোত্তর পুজামন্ডপের সম্পত্তি গ্রাস করা থেকে যা বুঝা যায়। আসলে সরকারের জমিজমা সম্পত্তিই যখন দলের লোকেদের দখলে চলে যাওয়া র‍্যানডাম হয়ে যায়, তখন দুর্বল হিন্দুরটা এর বাইরে থাকবে কেন?

তবু প্রিয়া সাহার ঘটনা প্রমাণ করল, এ সরকারের জন্য বাংলাদেশের হিন্দুত্বের রাজনীতি আর নির্ভরযোগ্য নয়। ‘ফলে রি-অ্যাসেসমেন্ট’ দরকার বলে মনে করা যায়। আমরা সবার সাথে ভারসাম্য সম্পর্ক রাখব – এগুলো তো আসলে মুখে বলে কিছু হবে না। প্রিয়ার ঘটনা যে গওহর রিজভীও আগাম অনুমান বা বুঝেন নাই তা বলাই বাহুল্য। বরং আমরা দেখছি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ঐ “ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সম্মেলনে” যোগ দিতে পাঠানো হয়েছে। কেন? কী বুঝে?

এখন আবার কী হাসিনার ক্ষমতার লোভে ভুল জায়গায় পা দেয়া হবে? প্রিয়া ইস্যুটা ভারতের মধ্যস্থতায় আপোষ করে নিবে? হতে পারে এটাই সম্ভবত ভারতের আকাঙ্খা। অথচ নিজেদের শক্তি সামর্থের খবর না নিয়ে কেন রাজনীতি করতে যাওয়া! বাংলাদেশের পাবলিক মাইন্ড কানখাড়া করে একটা ডাকের অপেক্ষা করছে। ওদিকে একটা ইতি আলামত বলছে – ভারত এখন আমেরিকাকে হাসিনার বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারছে না। সুযোগ যেকারণেই হোক, নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু হাসিনা কী সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারবে?

একই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের লেখায় যেতে হলে এখানে ক্লিক করেন

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সরকারের বিরাট পরীক্ষা প্রিয়া সাহা ইস্যু এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

গৌতম দাস

০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Co

 

Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

গৌতম দাস

১৭ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Bb

 

 

ARTICLE 356, The Colonial Legacy & the deep Love to Colonial Power of NEHRU &…

রিভিউ বা ফিরে দেখা মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। জওহরলাল নেহেরু কেবল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ১৯৪৭ সালের আগষ্টে স্বাধীন দুই রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তানের জন্মের সময়ের রাজনীতির এক মুখ্য চরিত্র। ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক থেকে বহু ঘটনার নির্ধারক নির্ণায়ক ছিলেন তিনি। আমাদের রাজনীতির বহুকিছুর হাল ‘এমন বা ওমন’ কেন এর জবাব পেতে আমাদেরকে বারবার সেসব পুরান দিনের ঘটনা রিভিউ বা ফিরে দেখায় যেতে হয়। সেকাজে বলাই বাহুল্য নেহেরু এক বড় চরিত্র হয়ে হাজির থাকে।

সেখানে বহুবার আমরা দেখেছি, নেহেরুর চিন্তায় “গণপ্রজাতন্ত্রী” রাষ্ট্র ও ক্ষমতা  এই ধারণাটা যতটা না ‘মর্ডান রিপাবলিক’ প্রসুত তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেকে কলোনিয়াল মাস্টার মনে করা প্রসুত।  বারবার তিনি উপনিবেশ বা কলোনিয়াল সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ধারণা দিয়ে আপ্লুত হয়ে থেকেছেন, তা দেখতে পাই। যেমন নেপাল বা ভুটানের সাথে, ১৯৪৭ সালের পরবর্তি স্বাধীন ভারতের তথাকথিত ‘শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তির’ ধারাগুলোতে আমরা তা দেখতে পাই। অথচ ভারত তখন ইতোমধ্যেই এক স্বাধীন রিপাবলিক হওয়া সত্বেও নেপাল বা ভুটানের ভারতের সাথে চুক্তিতে নেহেরু একাজ পুরাটাই করেছেন আগের কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার সাথে নেপাল বা ভুটানের যে চুক্তি ছিল ওর ধারাগুলোই কপি করে; যেন স্বাধীন ভারত পুরান বৃটিশের জায়গায় এক নতুন “কলোনিয়াল পাওয়ার” হয়ে হাজির। অর্থাৎ কলোনি-শাসনমুক্ত হয়ে যাবার পরেও স্বাধীন “গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তখনও নিজেকে বৃটিশ জুতা পায়ে গলানো এক “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবছেন।  একালের ভারত বিশেষ করে চলতি মোদীকে ব্যাখ্যা করতে পারতে হলে, নেহেরুকেও বুঝতে হবে। আর তাতে সক্ষম হতে গেলে নেহেরুর এই বিশেষ বৈশিষ্ট পাঠ করতে পারতে হবে। আগা-পাছ-তলা এই নেহেরু আসলে কলোনিয়াল ধরণের সম্পর্ক ও ক্ষমতা প্রতি  প্রবল লোভ এবং চিন্তার ঝোঁকের এক নেহেরু; তাতে তিনি এটা “গণপ্রজাতন্ত্রী” ভারত গড়তেছেন বলে যত চিল্লাই দিয়ে থাকেন না কেন!

ভারত রাষ্ট্রগঠন বা ওর কনষ্টিটিউশন রচনাকালে, ওর বিভিন্ন আর্টিকেল বা ধারায় – নেহেরু এবং তাঁর চিন্তার বন্ধুদের নিজেদেরকে এমন “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবনা-চিন্তার ছাপ অনেক স্তরেই পাওয়া যাবে। তেমনই গভীর ছাপ ফেলা এক  বিতর্কিত আর্টিকেল হল ৩৫৬; যা কোন নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ভেঙ্গে দিয়ে ঐ রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ক্ষমতা সংক্রান্ত।

গত মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। প্রথম কথা হল, হ্যাঁ বিপদে তো তিনি আছেনই; তার কপালে শনি লেগেছে – লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ যেদিন হয়েছে সে দিন থেকেই। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৫৬ হল অদ্ভুত এক আর্টিকেল,  এটাই আপাতত মমতার সেই “শনির বিপদের” নাম। এটা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়ে মোদির কেন্দ্রীয় সরকার ছলে-বলে-কৌশলে চাইলে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। কনস্টিটিউশন অনুসারে এটাই “রাষ্ট্রপতির শাসন”।

ভারতে রাজ্য মানে, সেখানেও নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ ও সরকার আছে। যারা স্বতন্ত্র টাক্স আরোপ করতে পারে  এবং কনষ্টিটিউশনে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া যেসব বিষয় আছে ওর তদারকি করা ও যেসব সার্ভিস জনগণকে দেয়ার আছে , আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ইতাদি এসবই তার কাজের এক্তিয়ার। এছাড়া শহুরে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা মিউনিসিপাল্টি ব্যবস্থাও আছে। এখন প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের কোন অভিযোগ থাকলে এর প্রতিকার পেতে প্রত্যেক রাজ্যেই সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে হাইকোর্ট – সেখানে কেউ নালিশ দিতে পারে। এছাড়া মিছিল মিটিং প্রতিবাদ দিয়ে প্রতিকার দাবি সে তো আছেই। আরও সর্বোচ্চ তবে পরোক্ষ এক পদক্ষেপ হল, নিয়মিত বিরতিতে পরের নির্বাচনে প্রার্থী বা তার দলকে ভোট না দিয়ে শাস্তি দেয়া – সে সুযোগ তো আছে।

কিন্তু এসব সত্বেও আর্টিকেল ৩৫৬ তে রাষ্ট্রপতিকে রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েমের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।এখানে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির এই ভুমিকা কার্যত ব্যবহার ও প্রয়োগ হবে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার মাধ্যমে। যদিও রাষ্ট্রপতির নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ হবে তার প্রতিনিধি রাজ্যপালের মাধ্যমে কিন্তু তা আবার কাজ করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে। তাই সোজা সাপ্টা বললে, এটা রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে এর উপর কেন্দ্রীয় সরকারের দখল নেয়া।

তবে এই আর্টিকেলে এখন কিছু সংশোধনী আনার পর, ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় সংসদে অনুমোদন করিয়ে আনতে হয়। অর্থাৎ এই আর্টিকেল অনুসারে মোদীর সরকার মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দিতে পারে।  আর এখন কেন্দ্রীয় সংসদে মোদীর নিজ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এই চর্চা ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের, নেহরুর আমল থেকেই এভাবে চলে আসছে। দেখা গিয়েছে যখনই মোদী-মমতার মত রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার একই দলের থাকে না, তখনই এই অসুস্থ চর্চা শুরু হতে দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে ভারতে কনষ্টিটিউশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত মোট ১১৫ বার এভাবে এই আইন প্রয়োগ করে নানান রাজ্যে সরকার ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ১৯৭৫-৭৯ সালের মধ্যে ২১ বার, আর ১৯৮০-৮৭ সালের মধ্যে ১৮ বার। এর বেশির ভাগটাই নেহেরু বা কংগ্রেস ব্যবহার করেছে। যেটা এখন করছে বিজেপির মোদী।

একবার ক্ষমতা নিলে পরে এটা ছয়মাস করে করে বাড়িয়ে তিন বছর পর্যন্ত রাখা যায়। যদিও পাঞ্জাবে এরচেয়েও বেশি বছর প্রয়োগের “বিশেষ” উদাহরণ আছে। এতে কেন্দ্রের সরকারি দলের আসল সুবিধাটা হল, একবার বিরোধী রাজ্য সরকার ও প্রাদেশিক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল রাজ্যে নিজস্ব এক অনির্বাচিত সরকার কায়েম করে নিতে পারে। আর পরবর্তিতে ঐ তিনবছর সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে্র রাজনৈতিক দল  নিজ ‘সুবিধাজনক’ সময়ে – মানে রাজ্যে যখন নির্বাচন দিলে নিজে জিতে আসবে বলে আস্থা পায় – তখন নির্বাচন করিয়ে নিজ দলের রাজ্যসরকার কায়েমের সবচেয়ে সহজ উপায় হয় এটা। তাই, সদ্য লোকসভা নির্বাচন শেষে ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০ মে সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অজুহাত তৈরি করছে বিজেপি!”।

কিন্তু ভারতের কনস্টিটিউশনে কেন এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, এর পক্ষে যুক্তি কী? যেখানে আমেরিকায় এর কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট  ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কোন একটায় ক্ষমতা দখল করেছেন, এটা কেউ কল্পনাও করে না। কিন্তু ভারতে ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ জারি খুব কমন অভ্যাস বা চর্চা। এককথায় বললে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ একটা ব্যাপক ‘অপব্যবহারযোগ্য’ এক দাগী-ক্ষমতা।

প্রথমত এই আর্টিকেল-৩৫৬ ভারতের কনস্টিটিউশনে এল কীভাবে? গত ২০০১ সালে আর্টিকেল-৩৫৬ নিয়ে – বিচারক ও একাদেমিকদের  সমন্বয়ে এক ‘রিভিউ কমিশন’ বসেছিল। ঐ স্টাডির শেষে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আদৌও আর্টিকেল-৩৫৬ একটা মর্ডান রিপাবলিকের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ পুর্ণ কী না, ফলে ভারতের কনষ্টিটিউশনে এই আর্টিকেল থাকতে পারে না – অতএব বাতিলের সুপারিশ – এসব প্রশ্নের দিকে তারা যান নাই। [আইন পেশায় একাদেমিক আগ্রহ যাদের তারা এই রিভিউ রিপোর্ট এখানে পেতে পারেন।]  তবে ঐ রিভিউ রিপোর্টে এক জব্বর স্বীকারোক্তি আছে – এই আর্টিকেল-৩৫৬ কেন, কীভাবে এসেছিল সেই জন্ম ইতিহাস প্রসঙ্গে।

সোজা কথাটা হল বৃটিশ-ভারতে বৃটিশেরা ভারতের ঠিক নাগরিক নয় বরং ছিল এক “কলোনি দখলদার শক্তি”। আর কিভাবে বৃটিশ-ভারতকে তারা শাসন করা হবে এনিয়ে ই্ংল্যান্ডের বৃটিশ সরকার অধ্যদেশ জারি করত – সাধারণভাবে এটা “ভারত শাসন আইন [Govt of India Act] নামে পরিচিত, যা বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এটার প্রথম ভাষ্য শুরু হয়েছিল “Govt of India Act 1858” দিয়ে। আর অনেকবার সংশোধিত হবার পর শেষেরটা সম্ভবত “Govt of India Act 1935″। এই শেষের (১৯৩৫ সালের) সংশোধনীতেই তারা প্রথম ভারতীয় নেটিভ নিজেরা বড়জোর নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার গড়তে পারবে, এই অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তব কথাটা হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন ভারত-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এর পটভুমিতে দাঁড়িয়ে দেখলে Govt of India Act মূলত এক দাগী কালো আইন। কারণ এই আইন দিয়ে বৃটিশেরা বৃটিশ-ইন্ডিয়া চালালেও, এই শাসকেরা আসলে তো “কলোনি দখলদার শক্তি”। ফলে অবৈধ। ভারতের নাগরিকেরা তাদেরকে শাসন ক্ষমতার কোন অনুমতি দেয় নাই। ক্ষমতা বৃটিশেরা জবরদস্তিতে নিয়েছে। তাই এই ক্ষমতা অবৈধ।

এখন, এই অবৈধ ক্ষমতা জানত যে সে অবৈধ, বাপ-মায়ের ঠিকানা নাই, ভারতীয় নাগরিকেরা কখনও তাকে শাসন ক্ষমতা দেয় নাই। তাই ১৯৩৫ সালের সংশোধনিতে কেবল তিন প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগগুলোতে, তাই সেই সুত্রে  প্রথম বাংলা প্রেসিডেন্সিতে, ভোটে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাদেশিক পর্যায়ে এভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে দিয়ে বৃটিশ শাসকেরা না কোন বিপদে পড়ে এই ভয়ও তাদের মনে উদয় হয়েছিল। কারণ, এই সরকার প্রাদেশিক হলেও কখনও যদি কলোনি দখলদার শক্তি খোদ বৃটিশ কর্তৃত্বকে মানতে অস্বীকার করে বসে – তাহলে কী হবে? অতএব সম্ভাব্য সেটা ঠেকাতে, নিজেরা আশঙ্কা মুক্ত হতে বৃটিশ ভাইসরয়-এর হাতে এক নতুন আইনি ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার নির্বাচিত হলেও তিনি যেকোন সময় নির্বাচিত ঐ সরকার ভেঙ্গে দিতে পারবেন। Govt of India Act 1935 এর আইনে এটাই ৯৩ ধারা।

শুরুতে বলেছি নেহেরু আর তার বন্ধুরা  কলোনিয়াল “দাগী ক্ষমতা” খুবই পছন্দ করত, বৃটিশেরা কলোনি ত্যাগ করে চলে গেলেও এরা নিজেদের  “ভাইসরয়” ভাবতে চাইত। তাই তাঁরা Govt of India Act 1935 এই আইনের ৯৩ ধারাটাকে ভারতের নতুন কনষ্টিটিউশনে কপি করে তুলে এনে ঢুকিয়ে ফেলেছিল। এটাই নতুন নামে, আর্টিকেল ৩৫৬। আমাদেরকে পরিস্কার থাকতে হবে আগের ৯৩ ধারা ছিল কলোনি দখলদার শক্তির পক্ষে শাসিত নেটিভেরা যেন স্বাধীন হয়ে যায় তা ঠেকানোর জন্য তাদের উপর বৃটিশদের অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন। অথচ ১৯৪৯ সালের ভারত সে তো তখন স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্র। তাই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক কোন কলোনি দখলদার শক্তির, ক্ষমতা-সম্পর্ক আর নয়। কিন্তু তবু আমাদের নেহেরু ও অম্বেদকারের মত তাঁর বন্ধুদের কলোনিক্ষমতার প্রতি প্রীতিভালবাদা ও লোভ এতই তীব্র যে পুরানা অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন স্বাধীন ভারত রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে ঢুকিয়ে রেখেছেন অবলীলায়। ঐ রিভিউ রিপোর্টে তাই সোজা স্বীকার ও ছোটখাট কিছু বর্ণনা দিয়ে লিখেছে, “Article 356 is inspired by sections 93 of the Government of India Act, 1935অর্থাত এর সোজাসাপ্টা মানে দাঁড়াল, নেহেরু ও অম্বেদকারেরা কলোনি শাসন ক্ষমতার অনুরাগী ছিলেন। ভারতীয় নাগরিকদের সাথে তাঁরা নিজেদের সম্পর্ককে তারা তাহলে নিজেরা “কলোনি দখলদার শক্তি” ভেবে নিয়েছিলেন। তাই একটা “কলোনি শাসিত রাষ্ট্র” আর একটা “স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র” এদুইয়ের কোন ফারাক তারা দেখতে পান নাই, ফারাক করেন নাই। স্বাধীন রিপাবলিক ভারতে অবলীলায় আর্টিকেল ৩৫৬ ঢুকিয়ে রেখেছেন। যে আর্টিকেল কেন্দ্রীয় সরকার যেকোন রাজ্য সরকারকে উলটে দিতে পারে এই “উপনিবেশী ক্ষমতা” জারি রেখেছে।

এখানে মজার দিক হল, রাষ্ট্রপতি কী অজুহাতে রাজ্য সরকার ভাঙতে পারবেন – সেই ভাষাটাই দখলদারের ভাষা। এর সাধারণ লক্ষণ হল, এই ক্ষমতা প্রয়োগের অজুহাতের কথাগুলো দেখা যাবে অস্পষ্ট, আবছা রেখে দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন আর্টিকেল-৩৫৬ তে বলা হয়েছে, রাজ্যে “সরকার চালাতে পারেনি” বা “সরকার কনষ্টিটিউশন অনুসারে পরিচালিত হয়নি” বলে রাষ্ট্রপতির মনে হলেই হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কী দেখতে পেলে রাষ্ট্রপতি এমন মনে করবেন তা উহ্য রেখে দেখা হয়েছে। এভাবে ‘আবছা’ রেখে দেয়াতেই ইচ্ছামতো রাষ্ট্রপতির (কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের) পদক্ষেপকে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়া থাকছে। বলা হয়ে থাকে নেহরু রাজ্য সরকারগুলোকে নিজের, মানে কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতেই’ এভাবে বৃটিশ শাসকের মত ক্ষমতা পেতে আর্টিকেল-৩৫৬ লিখিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই ভারতে ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে, এর এক অন্যতম উৎস হয়ে আছে আর্টিকেল-৩৫৬।

নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা বা ডিফাইন্ড (defined) পাওয়ার
রিপাবলিক মানে, রাজতন্ত্র অথবা কলোনি দখলি শাসনের বিপরীতে এক উপযুক্ত বিকল্প ধারণা। কলোনি দখলদারি ক্ষমতার বিপরীতে এক ‘গণসম্মতির’ ক্ষমতা। রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের সময়  অভিজ্ঞতালব্ধ একটা গভীর মৌলিক ধারণা মেনে চলা হয়ে থাকে। তা হল – যে কোন ক্ষমতাকে অবশ্যই “ডিফাইন” করে রাখা ক্ষমতা হতে হবে। তা না হলে এটা দাগী ডাকাতের মত “দাগী ক্ষমতা” বা ‘ডেসপটিক পাওয়ার’ [Despotic Power] তৈরি করবে বা হাজির হবে। তাই ডিফাইন করা বলতে এখানে বুঝতে হবে – কোন ক্ষমতার উৎস কী, ক্ষমতা কে তাকে দিল  মানে কোথা থেকে পেয়েছে [how the power is drawn], অথবা কিভাবে এই ক্ষমতা হাজির হয়েছে – তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথেষ্ট বর্ণনায় পরিস্কার করে রাখা হতে হবে। নাগরিকদের যে সম্মিলিত ক্ষমতা আছে তা থেকে উৎসারিত এক গণসম্মতি প্রকাশিত হলে; এভাবে তৈরি হওয়া ক্ষমতা কাউকে অনুমোদন দিলে, সেটাই “গণসম্মতির ক্ষমতা”। এটা ডিফাইনড ক্ষমতা। নিজ ক্ষমতার উৎস নিজেই স্পষ্ট বয়ান করতে পারে এমন ক্ষমতা। এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্র ক্ষমতা।

আর্টিকেল-৩৫৪-এর অস্পষ্টতার দিক হল – কী হলে বা কী দেখলে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন, ওই রাজ্য সেখানকার “সরকার চালাতে পারেনি”? বলা হয়েছে, [……government of the State cannot be carried on in accordance with he provisions of this Constitution]। কিন্তু মানা যে হয়নি তা কী দেখে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন তা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নাই। এ পর্যন্ত এই আর্টিকেল ব্যবহার করে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন অজুহাত দেখা গেছে – “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি”। কিন্তু কী দেখিয়ে বুঝা বা বুঝানো হয়েছে যে, কোনো “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” ঘটেছে? সাধারণত এর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, শহরে কোনো দাঙ্গা হয়েছে কি না অথবা তাতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই ফিগার। এই সেই কমন অজুহাত। এটা আবছা রাখা হয়েছিল কারণ বৃটিশ কলোনি শাসকদের তো এমনটাই দরকার যাতে যেকোন অজুহাত তুলে নিজেদের অবৈধ ক্ষ্মতার নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা যায়।

এজন্য এই আর্টিকেলের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, যদি কোনো রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ বলে দাবি ওঠে তবে তা যাচাইয়ের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো লিগ্যাল বডি বা কনস্টিটিউশনাল আদালতকে দিয়ে তা যাচাই, এমন কোন সুযোগ ৩৫৪ আর্টিকেলে রাখা নাই। অর্থাৎ জুডিশিয়াল যাচাই না, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কেবল নিজে “মনে করলেই” হবে, ফলে দেখাই যাচ্ছে এটা অবাধ এক খেয়ালি – আন-ডিফাইনড [un-defined] ক্ষমতা। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, যা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা – এই দলীয় ক্ষমতার (মোদী) তার বিরোধী (মমতা) রাজনীতিকে দমনের এমন সুযোগ ছেড়ে দেয়ার কারণই নেই। তাই স্বাধীন ভারতের জন্মের পর থেকে এটা অপব্যবহার করে গেছে কংগ্রেস আর এখন তা মোদীর হাতে এসেছে।

এদিকে ভারতীয় মনও এই অপব্যবহার দেখতে এতই অভ্যস্ত যে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছিল, কবে পশ্চিমবঙ্গে কোথায় দাঙ্গা লাগানো হছে বা হয় কি না। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের পরে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসনের এক কমন প্রয়াস দেখা যায়, নির্বাচনকালে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও জন-বিভক্তিগুলোকে এবার বিদায় দেয়া। কিন্তু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এটা ছিল অনুপস্থিত। মূল কারণ, মোদী-অমিত অস্থির হয়ে মুখিয়ে আছেন মমতাকে এখনই সরিয়ে কীভাবে রাজ্য সরকার দখল করা যায়; অথচ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে।

‘সন্দেশখালি’ ইস্যু
রাজ্যে “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” হয়ে গেছে অথবা সরকার “রাজ্য চালাতে পারছে না” – এই অজুহাত তুলে “রাষ্ট্রপতির তা মনে হওয়ানোর” রাজনীতি চলছে এখন পশ্চিমবঙ্গে। লোকসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এভাবে অজুহাত তুলার যে মঞ্চ প্রথম তৈরি করা হয়েছিল এমন মোক্ষম কেস হল – “সন্দেশখালি” ইস্যু। উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার এক এলাকার নাম সন্দেশখালি। সেখানে তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলাজনিত সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য, ঘটনার পরস্পরবিরোধী বয়ান আমরা এখানে পাবো। এছাড়া এখানে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, এই ফিগার যেহেতু রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের সাফাইয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর – তাই ওই দাবি বেড়ে পরে হয়েছে আটজন। এর ওপর আবার বিজেপির নিখোঁজ বলে  দাবি ১৮ জন পর্যন্ত উঠেছে।

হামলার ঘটনার সেই সন্ধ্যাতেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কাছে কলকাতার বিজেপি নেতারা সরাসরি রিপোর্ট করেছেন, সেকথা টুইটও করেছেন। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতিরা যেভাবে অপেক্ষা করেছেন, সেভাবেই এবারের অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতিও কলকাতার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে রিপোর্ট চাইলে তিনি দিল্লি গিয়ে রিপোর্ট পেশ করেন এবং মোদী-অমিতের সাথে দেখা করেছেন।

মৃত্যুর ফিগার যথেষ্ট বড় নয়
তবে খুব সম্ভবত ঘটনা শুনেবুঝে বিজেপির মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য মৃত্যুর এই ফিগার যথেষ্ট নয়। এছাড়া শুরু থেকেই সমস্যা হল, বিজেপির এখনকার ম্যাজিক্যাল নেতা মুকুল রায়, হামলার সন্ধ্যাতেই নিজ টুইটে সংখ্যা বলে ফেলেছিলেন মাত্র তিনজন, [3 BJP workers shot dead……]। এ ছাড়া তৃণমূলের ক’জন মারা গেছে সেই সংখ্যা তিনি উল্লেখ করতে পারছেন না। ওদিকে রাজ্যপাল দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর মিডিয়ায় “রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে দিল্লির আপাত নেতি” অবস্থানের ধারণা দিয়েছিলেন। ১১ জুন আনন্দবাজার লিখেছে, প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল কেশরী বলেছিলেন, “এটি (৩৫৬ ধারা জারি) আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না”। কিন্তু পরে একটি বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “(৩৫৬ ধারা জারি) হতেও পারে। যখন দাবি উঠবে, তখন কেন্দ্র তা ভেবে দেখবে”।

ওদিকে মৃত্যুর ফিগার নিয়ে ঝগড়াটা ‘ন্যাংটা’ হতে চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেন, তিনি “নির্বাচনোত্তর হিংসায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে অমিত শাহকে জানিয়েছেন। অথচ মমতার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোকসভা ভোটের পর দিনহাটা, নিমতা, সন্দেশখালি, হাবড়া ও আরামবাগে পাঁচজন তৃণমূল কর্মী এবং সন্দেশখালিতে দু’জন বিজেপি কর্মী মারা গেছেন। তাই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, “নিয়মমাফিক রাজ্যসরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই রাজ্যপালের রিপোর্ট পাঠানোর কথা। কিন্তু এখানে বিজেপির দেয়া সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে”। তাই ঘটনার সারাংশ হল, সন্দেশখালি যথেষ্ট নয়, আরো ইস্যু লাগবে। ফলে  দ্বিতীয় ইস্যুতে চেষ্টা, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাফাইটা এবার শক্তভাবে পাওয়া যায়।

হাসপাতাল ইস্যু
দ্বিতীয় ইস্যুকে আমরা “হাসপাতাল ইস্যু” বলতে পারি। এটা আপাতত অনেক ছোট ইস্যু, কিন্তু বিরাট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনা আমাদেরও খুবই পরিচিত। কলকাতার (রাজ্য পরিচালিত) প্রাচীন সরকারি হাসপাতাল – নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানে “ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্য” হয়েছে – এজাতীয় উত্তেজনায় ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়া, তা থেকে ডাক্তারদের ধর্মঘট – এই হল মোটাদাগে বলা কাহিনীটা। ঘটনা ছিল আসলে আরো ছোট। এক রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের পরামর্শে রোগীর আত্মীয় কোন সিনিয়র ডাক্তার খুঁজে আনতে বের হন। কিন্তু কয়েকজনকে অনুরোধ করে, অপমানিত হয়েও  আনতে না পেরে শেষে একজন সিনিয়রকে একটু জোরাজুরি করে কব্জিতে ধরে তাকে আনেন। এই হলো “মূল অপরাধ”। ইতোমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে লাশ আনতে গেলে এবার ডাক্তারেরা “ক্ষমা না চাইলে লাশ দেয়া হবে না” বলে জানিয়ে দেন।

এটা আনন্দবাজারের রিপোর্ট। উত্তেজনা-মারামারি যা কিছু তা কিন্তু কেবল এরপর থেকে শুরু হয়েছিল। রোগীর বাড়ি হাসপাতাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। তাই ট্রাকে করে লোক জড়ো করে তাঁরা এবার ফিরে আসে। এসে সামনে পড়া দুই জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে আত্মীয়েরা মৃতরোগীর লাশ নিয়ে ফেরত যায়। আর ঐ হামলায় ডাক্তারদের একজনের আঘাত একটু গুরুতর ছিল, তবে এখন তিনি বিপদমুক্ত, তাই হাসপাতালের সাধারণ বেডে আছেন। আর ঞ্ছোট বড় ডাক্তাররা সবাই ধর্মঘটে। কিন্তু সময়টা ‘রাষ্ট্রপতির শাসন জারি’ করার ইস্যু খোঁজার অনুকূল; তাই এখন ‘বিরাট’ ঘটনা বানাতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ধর্মঘট ডেকে দেওয়া পর্যন্ত বিজেপি ঘটনা গড়িয়ে নিতে পেরেছে।

এসব ক্ষেত্রে  ডাক্তারেরা বা আমাদের পাবলিক মাইন্ডসহ সবাই – ঘটনাকে দেখে থাকে সাধারণত এভাবে যে, ঘটনার জন্য ‘সরকার দায়ী ’ – ঠিক তা নয়, তবে কেন সরকার মধ্যস্থতা করে বা পদক্ষেপ নিয়ে ইস্যুটা তাড়াতাড়ি মেটাচ্ছে না?  কিন্তু “হাসপাতাল ইস্যুতে” ঘটনা এখানে উল্টা। ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দায়ী করছেন। তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের  শিরোনাম “মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলুন, এই ঘটনা আর ঘটবে না, দাবি চিকিৎসক মহলের”। আসলে এই দাবি দেখে বুঝা যাচ্ছে ডাক্তারেরা কত গভীরে বিজেপির কব্জায় চলে গেছে। বিজেপির টার্গেট মমতার বেইজ্জতি, ইমেজ নষ্ট। আর সম্ভব হলে ঘটনাকে পাকিয়ে উঠাতে পারলে, এটাকেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ইস্যু করা।  কিন্তু ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী বা অপমান করতে হবে –  বিজেপির এমন ইচ্ছা, এদিকে যেতে পারল কেন? আর সবাই জানে বাস্তবত “এমন ঘটনা আর ঘটতেই পারবে না” এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারবে না। তবে যাতে না ঘটে এই লক্ষ্যে সিরিয়াস হয়ে কাজ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী – এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তেজনা মিটানোর দিকে ঘটনা গেল না কেন?

মৃত রোগী ছিলেন মুসলমান, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আর যারা এসে মাথা ফাটিয়ে লাশ মুক্ত করে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, এদের এই একশনকে নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে একটা বিরূপ কানে-কানে বলাবলি করে এক প্রচার [whispering campaign] হয়েছিল যে, “দেখেছিস, মুসলমানদের কত্ত বড় সাহস!”। “এদের খুব বাড় বেড়েছে” – এধরণের। তবে এঘটনার বহু আগে থেকেই সাধারণভাবে “মুসলমানদের আশকারা” দেয়ার জন্য গত কয়েক বছর ধরে মমতাকে দায়ী করে থাকেন তার সব বিরোধী। কলকাতা বিজেপির ফেসবুক পেজগুলো এই ভাষ্যে ভর্তি থাকতে দেখা যায়। কলকাতাজুড়ে এর মূল প্রকাশ্য ক্যাম্পেইন করে থাকে বিজেপি। আর তৃণমূলবিরোধী সিপিএমসহ বাকি অন্যান্য বেশির ভাগ সব ব্যক্তি ও দল এর প্রতি প্রকাশ্য বা মৌন সমর্থন দিয়ে থাকে। ঠিক একারণের ডাক্তারেরা দাবি করছেন মমতাকেই [মূলত মুসলমানদের সাহস বা বাড় বাড়ানোর পক্ষে তিনি নেপথ্য ব্যক্তিত্ব বলে] মাফ চাইতে হবে। যেমন এই কথাটাই আর একটু নেপথ্যে রেখে হাসপাতালের পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় [মুসলমান শব্দ উচ্চারণ না করে]  বলছেন, “জুলুমবাজদের ক্ষেপিয়ে তোলা” এবং “লেলিয়ে দেওয়া” বন্ধ হবে কবে? কিন্তু তিনি কে কাকে লেলিয়ে দিবার কথা বলছেন? বলতে চাইছেন, মমতা মুসলমানদেরকে লেলিয়ে দিয়েছেন।

মমতা মুসলমানদের “সাহস” “বাড় বাড়ানো” আশকারা দেয়া ইত্যাদি করেছেন কী না – এসব খুবই ঘৃণাবিদ্বেষী ও অরাজনৈতিক বক্তব্য। মমতা কী মুসলমানেরা মুসলমান হন আর যাই হন তিনি কী কিছু নাগরিককে যারা মারজিনাল কোনায় হয়ে পড়েছিল তাদের অধিকার ফিরে পেতে সাহায্য করেছেন? আর সেটা কী কোন নতুন বৈষম্য করে, অন্যদের অধিকার কেড়ে নিয়ে? বা, বেআইনিভাবে? এগুলোই একমাত্র হতে পারে মমতার পদক্ষেপগুলোকে বিচার করার নির্ণায়ক? কিন্তু বিজেপি তা করছে না। তাদের অভিযোগ হল মুসলমানেরা সমাজে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? কেউ কম বা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এটা অরাজনৈতিক বক্তব্য। বিজেপিকে বলতে পারতে হবে এটা মমতার পদক্ষেপ কেন বেআইনি? তা কি কোন অধিকার বৈষম্যের? কিভাবে? সবচেয়ে অধপতিত বিষয় হল, সিপিএম বা কংগ্রেসও বিজেপির উস্কানিতে মৌন বা প্রকাশ্য সমর্থন দিচ্ছে। একই অরাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। মমতার কোন পদক্ষেপ – মুসলমানদের কোনায় ফেলে রাখা থেকে বের করে আনা কী অন্য কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া? হলে কিভাবে? যদি তাই হয়ও তা নিয়ে হাইকোর্টেও তো যাওয়া যেতে পারে। তা না। সবাই বিজেপির হিন্দুত্ব আর ধর্মীয় মেরুকরণের উস্কানিতে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই মরিয়া।

কিন্তু ঘটনাবলীর পিছনে বিজেপির সমর্থন ও ততপরতা কত তীব্র তা বুঝবার এক ব্যবস্থা  করেছে আনন্দবাজার। অবস্থা দেখে তারা মন্তব্য করেছে, “এবারই প্রথম হাসপাতালের মূলগেটে তালা দিয়ে ধর্মঘট চলছে। মূলগেটে তালা দেয়া আগে কখনও হয় নাই”। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরিচালক অথবা প্রশাসনিক স্টাফ নিজে ডাক্তার হলেও তারা কখনই ধর্মঘটে যোগ দেন না। কারণ তারা দায়িত্ববান কর্মকর্তা ফলে বিরোধ মিটাতে দুতয়ালির ভুমিকা তাদের নিতে হয় বলে।  কিন্তু কলকাতায় এসব স্টাফেরাই মূল নেতা, সক্রিয়। অর্থাৎ স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাহস যোগান তখন আর কে কাকে পরোয়া করবে!

ওদিকে ক্ষমতা হারিয়ে ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া সিপিএমের এ্মন মরিয়া দশা দেখা গেছিল সেই ২০১৪ সালের শেষে, যখন অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। বর্ধমানে বোমায় কথিত  জেএমবি, জামাত, বাংলাদেশ, জঙ্গি ইত্যাদি মিলিয়ে যে প্রপাগান্ডা-গল্প যে সব কিছুর সাথে মমতা আছেন – এই প্রপাগান্ডার ঝাঁপি নিয়ে এসেছিলেন অমিত শাহ। সেকালে সিপিএম কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে যে জনসভা ডেকেছিল, তাতে অমিতের দেয়া ঐ একই বয়ানে তারা মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। পরে অবশ্য মোদি-অমিত কৌশল বদলান, এই গল্প নিয়ে আর আগাতে চান নাই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস থেকে এক বিবৃতি সংসদে দিয়ে বলা হয়েছিল, অমিতের দাবি আর সরকারের অবস্থান এক নয়।

আমাদের প্রথম আলোতেও এমন এক কলকাতার কমিউনিস্টের (শান্তনু দে) লেখা ছাপা হয়েছে, শিরোনাম, “বাঁকের মুখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি”। তিনি সিপিএম কত ভাল ছিল এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু কলকাতায় ধর্মীয় মেরুকরণ হয়ে যাবার জন্য শেষে বিজেপি না মমতাকেই দায়ী করেছেন। লিখছেন, …… দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি”।কিন্তু বিজেপির ঘোষিত নীতিই যেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ সেখানে মমতা কিভাবে দোষী? কারণ সিপিএমও “মুসলমানদের সাহস” বা “বাড় বাড়ানোর” জন্য  মমতাকে দায়ী করার জন্য তৈরি, তাই বুঝা যাচ্ছে এখানে।

যা হোক, “রোগী মুসলমান” বা “মুসলমানদের সাহস!” -এভাবে তোলা ডাক্তারদের সেন্টিমেন্টের পক্ষে প্রথম ইঙ্গিত তুলে হাজির হতে ক্ষেপিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছিলেন, এর ‘পেছনে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত’ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সরাসরি ঘটনা ক্যাশ করার লোভ না সামলে বলে বসেন, “হামলাকারীরা সেই সম্প্রদায়ভুক্ত, রাজ্যে যাদের ২৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। হাসপাতালসহ রাজ্যে যেকোনো গোলমালের নেপথ্যেই ওই সম্প্রদায় রয়েছে”। মমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, “তৃণমূল সরকার ওদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অনুরোধ, তৃণমূলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না”।

তবে ডাক্তাররা বিজেপির চেয়ে বুদ্ধিমান থাকতে চেয়েছেন। তাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বিজেপির অবস্থানকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে তারা বলেন, “যারা আক্রমণ করে তারা সমাজের দুষ্কৃত। এখানে কোনো জাতি-ধর্মের বিচার নয়”। ওদিকে কংগ্রেস-সিপিএমও এই দায় না নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কলকাতার হাসপাতালে রোগী-ডাক্তার এই সঙ্ঘাত প্রায় আমাদের দেশের মতই। অথচ এর সবচেয়ে সহজ ও আসল সমাধান হতে পারত – সবপক্ষকেই যার যার আচরণ এক জবাবদিহিতার মধ্যে আনা। প্রথম কাজ, রোগী বা তার আত্মীয়দের মনে সত্য বা মিথ্যা যত ক্ষোভই থাক তাকে বের হতে ‘জানালা খুলে দেয়া” [ventilation]। এ জন্য হাসপাতালের পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে “তদারকি ও সান্ত্বনাদান” জাতীয় উইং খোলা যেতে পারে। এর মূল কাজ হবে রোগীর আত্মীয়দের ক্ষোভ মনোযোগ দিয়ে শোনা। হাসপাতালের কারও গাফিলতি থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া। এ ছাড়া সময় নিয়ে আর মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সাথে নিয়ে  (সর্ট ও লং) দুই ধরনের তদন্তের ব্যবস্থা রাখা। তবে অবশ্যই কেস কিছু থাকবে, যা মূলত হাসপাতালের রিসোর্সের সীমাবদ্ধতার কারণ ঘটেছে, সে অপারগতাগুলো রোগীকে বুঝিয়ে বলার মতো প্রফেশনালদেরকে রাখতে হবে। ফলে মমতাকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে যারা চাচ্ছেন, এরা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট বোঝেন না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা প্রফেশনাল ডাক্তার। বরং উলটা বিজেপির মমতাকে বেইজ্জতি করার প্রোগ্রামে তারা মিশে গেছেন বুঝে না বুঝে।আর মূলত তা ঘটেছে [whispering campaign] এর কারণে।

ডাক্তারের মাথা ফাটানো নিশ্চয়ই কোনো সমাধান নয়। কিন্তু সাবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ – “ক্ষমা না চাইলে মরদেহ দেয়া হবে না”, এটা বলার তাঁরা কে? এটাই তো মূল ক্রাইম। অথচ সরকারি/বেসরকারি কোন ডাক্তার রোগীর আত্মীয়দের এ কথা বলার অধিকার বা এখতিয়ার নেই। আর এ কথা বলে ডাক্তারেরা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া আর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে ।

আর পুরা ঘটনায় ডাক্তারদের মধ্যে, তারা নিজেরা একটা উচ্চ এলিট শ্রেণীর (ধর্মীয় পরিচয় আর গরীব-বড়লোক শ্রেণী পরিচয় এই দুই অর্থেই)- এমন ধারণা কাজ করছে।  বিজেপির প্ররোচনায় ডাক্তারেরা এলিট ভুমিকায় অন্যদের সাথে এই বৈষম্য করে গেছে অবলীলায়। আবার বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে এমনই ঘটনায় এক আইন প্রচলন করা হয়েছিল যে, “হাসপাতালে এমন হাঙ্গামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে”। তাই ডাক্তারদের সঠিক পদক্ষেপ হত বড়জোর পুলিশের কাছে যাওয়া মামলা করা, আইনের আশ্রয় নেয়া। বাস্তবে কিন্তু  রোগীর সেই হামিলাকারি আত্মীয়ের নামে মামলা হয়েছে, এখন সে জেলে আটক আছে। এছাড়া আর এক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য যে, রোগীর আত্মীয়রা স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশকে দিয়ে লাশ ছেড়ে দিতে ডাক্তারদের অনুরোধ করিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা তবু লাশ আটকে রেখেছিলেন। [এন্টালি থানার পুলিশ গিয়ে চিকিৎসকেদের বোঝান। তাতেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। ] তাদের এই উদ্ধত্ব দেখে বুঝা যায় বিজেপি কী পরিমাণ ডাক্তারদের বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি পিছনে থাকলে – যারা নিজেরাও একটা রাষ্ট্রপতির শাসন জারির জন্য বেপরোয়া – এসব মিলিয়ে সবকিছুই বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন না হলে সেটাই অস্বাভাবিক হত।

অর্থাৎ বিজেপি ডাক্তারদের এতই প্রটেকশন দিয়ে বেপরোয়া হতে উসকানি দিয়েছিল যে, তারা তাদের আইনি সীমা ও দায় সব ভুলে গেছিলেন। ওই দিকে কলকাতার কমিউনিস্ট ভাইয়েরা, তারাও ডাক্তারের পক্ষে, মানে নির্বাচনকালের মতই বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছেন, হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার ইমেজ ভাঙলে তাদের দিন ফিরবে।

না ফিরবে না। এবারের নির্বাচন তাদের কেটেছে নিজের দলীয় পরিচয়ে, কিন্তু বিজেপির ক্যাম্পে বসে। এই সহযোগিতায় বিজেপি এবার একলাফে ১৮ আসন পেয়েছে। আর কমিউনিস্টদের ভোট গিয়ে ঠেকেছে ৭%। এটাই তাদের শেষ কমিউনিস্ট পরিচয়। কারণ, ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে এই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবেন সরাসরি বিজেপি নাম নিয়ে, এটা দেখতে পাবার সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ বাস্তবতা হল, কমিউনিস্ট পরিচয়ে আর না আছে আইডিয়ার ধার বা ভার, না আছে পকেটে টাকা। বরং পকেট ভরা টাকা আছে বা দিবে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিতে যোগ দেয়া খারাপ, এটা বলার মত নৈতিক সাহসও কমিউনিস্ট নেতাদের আর নেই। কাজেই…।

বিজেপি কতদুর বেপরোয়া হয়ে গেছে এর এক উদাহরণ হল, মমতাকে নিয়ে বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের মন্তব্য। তিনি নিজের আঞ্চলিক দল জেডিইউ এর সভাপতি। তার দল গত রাজ্য নির্বাচনে (২০১৬ সালে) বিজেপিবিরোধীদের সাথে নির্বাচনি জোট করে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তিতে তিনি মেরু বদল করে বিজেপির জোট যোগ দিয়েছেন। আর এখন বিজেপির কোলে উঠে একেবারে সরাসরি বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষী রাজনীতি করছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ “মিনি পাকিস্তানে”(mini Pakistan) পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে  “বিহার থেকে “রোহিঙ্গারা” বিহারিদের তাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য” করল তার বিহারে এনডিএ-সরকারের মূল দল জেডিইউ (JDU)। মোদীর মন পেতে ইসলামবিদ্বেষের যেকোন পর্যায়ে নামতে তিনি রাজি। ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে এরই এক প্রতীকী প্রকাশ এটা।

মমতারও দোষ, ভুল বা গোঁয়ার্তুমিও যে নাই তা নয়। ডাক্তারদের পিছনে বিজেপি-সিপিএমের সমর্থন আছে কিন্তু এদেরকে বহিরাগত বলে ঘটনা তার দিকে ফিরে নাই। আবার চার ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারদের কাজে যোগ দিতে বলাও তার বিরুদ্ধে গিয়েছে। প্রশাসক আর রাজনৈতিক নেতার ভুমিকা মাখায় ফেলেছেন তিনি। উচিত ছিল কেবল মুখ্যমন্ত্রীর ভুমিকায় থাকা, তাহলে ফল পেতেন। এছাড়া গত পঞ্চায়েত ভোটে ৩৪ শতাংশ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা’র কাফফারাও আছে। তবে হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার আপোসী ধারার আর একটা সফট লাইন কার্যকর আছে বলেই মনে হচ্ছে – মেয়র ফিরহাদ, তার ডাক্তার মেয়ে, আর মমতার আরেক ডাক্তার ভাইপো প্রমুখের মাধ্যমে। সম্ভবত হাসপাতাল ইস্যু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আগেই তিনি আপসে এসব মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এতে বিজেপি্র হাতে তাঁকে কোণঠাসা করার সব চেষ্টা মাঠে মারা যেতেও পারে। দেখা যাক, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনতে ‘হাসপাতাল ইস্যু’ ব্যবহার হয় কি না। নাকি নতুন অন্য ইস্যুর খোজ পড়ে!

সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এর পক্ষে তখন বিপক্ষে লোক দেখতে পাওয়া ত আসলেই কঠিনই হবে! ধর্মীয় মেরুকরণ তাতিয়ে ক্ষমতাদখলের প্রচেষ্টা – এটা সবপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে, এক মারাত্মক আত্মঘাতি পরিস্থিতি আনবে, যা এখন বিজেপি ও গংয়ে্রা আমল করার অবস্থায় নাই। পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ সেই ভয়ংকর দিকে আগাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসনআনার জন্য এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

গৌতম দাস

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2xm

 

ডান-বামের রাজনীতির কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি, শুনেছি। কিন্তু এর পিছনের কথা কী? প্রথমত বাম ও দান বলে শ্রেণী ভাগ করা তা বামপন্থীদের করা, তাদের চোখে দেখে চালু করা হয়েছিল। প্রায়ই আমরা বলতে শুনি, অমুকে বামপন্থী রাজনীতি করেন। যেমন, কেউ কাউকে অপছন্দ করলে, তার গায়ে “কালো দাগ” লাগিয়ে দিতে চাইলে শোনা যায়, সে লোকের নামের আগে তিনি ‘ডানপন্থী’ শব্দ বসিয়ে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অথবা দাবি করে বলেন, “উনি তো ডানপন্থী”। আসলে বলতে চান ইনি নেতি বা খারাপ চিন্তার লোক। অর্থাৎ শেষে সার কথা দাঁড়াল, যারা ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ কথাগুলো ব্যবহার করেন তারা বলতে চাচ্ছেন- বামপন্থী মানে ভাল আর ডানপন্থী মানে খারাপ লোক। কিন্তু এই নামকরণ কী সঠিক? আর কিসের ভিত্তিতে এই নামকরণ? কাকে ডান বলব আর কাকে বাম? এই ডান-বাম কোথা থেকে এল?

এ প্রসঙ্গে এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে বটে; কিন্তু এর জবাব আমরা যথার্থ পাই আর না পাই, শেষ বিচারে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্টই রয়ে যায়। তবে, ইতিহাসে এমন ধারণার প্রথম উদ্ভব কবে, কখন, কিভাবে – এই বিচারে বলা যায়, ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ‘ফরাসি বিপ্লবের’ পর তার সোস্যালিস্ট প্রতিনিধিরা সংসদে স্পিকারের বামদিকে সদলবলে একসাথে বসতেন। ফলে বাম দিকে যারা বসেন তাদের রাজনীতি অর্থে বামপন্থা শব্দের উদ্ভব। আর সেখান থেকেই পরে বামপন্থী (left), লেফটিস্ট (leftist), লেফট উইং (left wing) ইত্যাদি বাম-বিষয়ক নানা নামের পরিচিতি চালু হয়ে যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাও এই ব্যাখ্যাকে মেনে সায় দেয়। আর যারা বামেদের বিরোধী, স্বভাবতই বামপন্থীরা তাদের ডানপন্থী নামে ডাকার রেওয়াজও এখান থেকে চালু করে দেন। তবে সাধারণভাবে বললে, এভাবে ডান-বাম শ্রেণীকরণ করা খুবই হালকা চিন্তা বা লুজ টক (loose talk) ধরণের কথা; মানে যথেষ্ট না ভেবে চিন্তা করা বা দুর্বল-চিন্তার ভিত্তিতে দাঁড় করানো বক্তব্য।

এই নামকরণের  ভিতর অনেক ধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলোর মধ্যে প্রধান হল, এই বাম-ডান শ্রেণীকরণ (category) করা – এটা এক ‘বাইনারি’ (binary) ভাবনা। অর্থাৎ যার কেবল দুইটা রূপই হতে পারে বলে আগের সীমা টেনে রাখা হয়। এজন্য অঙ্কের ভাষাতেও বাইনারির অর্থ – শূন্য আর এক এই দুই অঙ্ক। মানে আমাদের পরিচিত (এক দুই থেকে নয় আর শুন্য) এভাবে দশটা অঙ্ক দিয়ে সংখ্যা লেখা নয়। কেবল শুন্য আর এক ব্যবহার করে সংখ্যা লেখা। এই ‘বাইনারি’ কথার সোজা মানে হল – হয় এটা, না হলে ওটা; এর বাইরে কিছু নাই, একথা বলা। হয় তুমি আমার বন্ধুর দলে আসো নইলে, তুমি আমার শত্রু – সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও তাঁর বন্ধুরা এমন বাইনারি বিভাজনের ভাষায় কথা বলতেন। অর্থাৎ এমন দুই অবস্থার বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না বলে আগে থেকেই ধরে নেয়া হয়। অথবা বলা যায়, কাউকে হয় সাদা না হলে কালো হতে হবে- এমন মনে করা। অথচ বাস্তবে সাদা আর কালোর মাঝখানে অনেক রঙ আছে, হতে পারে। কারণ হরেক অনুপাতের সাদা ও কালোর মিশ্রণে আলাদা আলাদা বহু রঙ হতে পারে। তাই কেউ কালো না হলে তা সাদা হবেই, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; তা সহজেই বুঝা যায়। কোনো কিছু সাদা অথবা কালো না হলে, মিশ্রণের হলে তাকে ধূসর বলা যায়। আর ধূসর বলতে আবার একটা নয় অনেক ধরনের ধুসর হতে পারে – যাকে আমরা সাদা-কাল মিশ্রণের নানা শেড (shade) বলি, এমন অসংখ্য শেডের ধূসর আছে, হতে পারে। কম সাদা কিন্তু বেশি কালো, অথবা বেশি সাদা কিন্তু কম কালো এমন বিভিন্ন ধরন বা শেডের ধূসর হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পুরা ব্যাপারটাকে কেবল ‘সাদা না হলে কালো’ বলে জোর করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা – এটাই বাইনারি দাবি করার চেষ্টার মতই অস্পষ্ট কাণ্ড হল – কাউকে ‘বামপন্থী না হলে, ডানপন্থী’ বলা বা নাম দেয়ার মত।

তবে এটা ঠিক যে, ফরাসি বিপ্লবের কিছু বৈশিষ্ট্যও এই ধরণের শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। এমনিতে ফরাসি বিপ্লবের এক বৈশিষ্ট্য হল, সেটা ছিল গরিব ও সাধারণ মানুষের প্রাধান্যে ঘটা একটা বিপ্লব-বিদ্রোহের ঘটনা; আর বিশেষত তা ঘটেছিল সমাজের এলিট, অবস্থাপন্ন, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধেও। তবে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই বিদ্রোহ অভিমুখ-বিহীন ছিল না। আবার অনেকেরই ধারণা, “মডার্ন রিপাবলিকান রাষ্ট্রের” সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল ফরাসি বিপ্লব। যদিও উল্লেখ করার মত ব্যাপার হল, আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬) মানে যেটা কলোনিবিরোধী চরিত্রের প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লব, সেটা ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) চেয়ে তা অন্তত ১৩ বছর আগের ঘটনা। আর রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার মধ্যে যেসব ভিত্তিমূলক চিন্তা – এমন ভিত-উপাদান খুঁজে পাবার দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব যথেষ্ট সমৃদ্ধ; অন্তত ফরাসি বিপ্লবের সাথে তুলনায়। আমেরিকান বিপ্লব এক্ষেত্রে তা কোথাও কোথাও অনন্য ও চমৎকার বটে। তবু অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা ফরাসি বিপ্লবের রেফারেন্স দেন প্রায়ই এবং সহজেই; এর তুলনায় আমেরিকান বিপ্লবের নাম প্রায় নেয়াই হয় না, তাদের। বাস্তবতা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার ভাবনা ও এর বাস্তবায়নের দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কোনো অংশেই কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ফরাসি বিপ্লবের ফলে বাম-ডান ক্যাটাগরি করে কথা বলার ভাবনা আসার পিছনের সম্ভাব্য কারণ হল – গরিব বনাম বড়লোক, এমন ভাবনা ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে ছিল। তাই সেখানে স্বভাবতই গরিব পক্ষকে আপন ও কাম্য বা ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিপরীতে, দেখা যায় আমেরিকান বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় বিষয় হল – অধিকার (ইংরেজিতে right); মানে, মানবিক-নাগরিক অধিকার (human rights) মানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার। [এটাই ফরাসি বিপ্লব আর আমেরিকান বিপ্লবের মুল ফারাকও বটে]। বলা যায়, সাধারণভাবে নাগরিক মাত্রই তাঁর “অধিকার” ধারণার চেয়ে বাম বা কমিউনিস্টদের চিন্তা (গরিব-বড়লোক এমন ভাগে) গরিব দশার প্রতি বেশি আগ্রহী, সহানুভূতি বেশি। এটাই মৌলিক পার্থক্য। যদিও বাম-ডান বলে ভাগ করে মানুষের নামের আগে বিশেষণ লাগানো নিঃসন্দেহে খুবই অস্পষ্ট ও দুর্বল-চিন্তায় আচ্ছন্ন।

আর একটু সরাসরি এবং স্পষ্ট করে বললে, ফরাসি বিপ্লবের সারবস্তু যদি সমাজের এলিট, অবস্থাবান, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধে গরিবদের উঠে দাঁড়ানো হয় এবং এই অর্থে একে বিপ্লব বলি – তা বলতে পারি অবশ্যই। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে, সমাধান পেতে চাইলে কেমন রাষ্ট্র চাই এই অর্থে, “অধিকার” ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের দরকার – এই বোধ সেখানে অস্পষ্ট করে রাখা ছিল। যাদের ভেতর এই বোধ অস্পষ্ট, তারাই মূলত বাম-ডান ভাগের ভক্ত। অথচ নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকারের ভিত্তিতে এবং নাগরিক সাম্যের নীতিতে একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন – এটাই রিপাবলিক ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আগেই বলেছি, বাম-ডান হল এক বাইনারি চিন্তাব্যবস্থা। এর মানে কোন ‘বামপন্থীর’ চোখে আপনি তার গ্রুপের নন, এ কথার মানে হল তিনি বলবেন, আপনি ডানপন্থী। সবকিছুই যেন বাম অথবা ডান হতেই হবে। যদিও বাম ও ডান উভয়েরই আবার উপবিভাগ আছে, করা হয়ে থাকে। যেমন – চরম বাম (extreme left), অতি বাম (far left) – বা ultra left। বাংলায় এখান থেকে ‘চরমপন্থী’ শব্দটা এসেছে। তাই আসলে, বাম-ডান বলে একটা শ্রেণীকরণ আগে আছে- এই বলে আগেই ধরে নেয়া একটা ধারণা আছে বলে ধরে নিলে এর ওপর ‘চরমপন্থী’ শব্দটা দাঁড়ানো পাওয়া যাবে। বামপন্থা ধারণাটার চরম রূপটাকে বুঝাতে এর নাম হয়েছে ‘চরমপন্থী’ (এক্সট্রিমিস্ট, extremist)। এই হল বামপন্থার উপবিভাগ। ওদিকে একইভাবে অতি-ডান (far right) বা চরম ডান (ultra right)- এগুলো ডানেরই নানা উপবিভাগ। এজন্য বামপন্থীদের করা এই চিন্তাব্যবস্থায় ডানের বেলায় – কোনো ধর্মীয় গণতন্ত্রী দল, রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী ইত্যাদিকে তারা ডানপন্থী খাপে ফেলেছে। এ ছাড়া রেসিস্ট (racist) বা ফ্যাসিস্টদের (facist)  বামপন্থিরা ‘চরম ডানপন্থী’ বলে মনে করে খাপে ফেলেছে। আবার সোশ্যালিস্ট, লিবারেল বা কমিউনিস্ট- এদেরও বামের উপবিভাগ বলে মনে করা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ‘বাম-ডান এই শ্রেণীকরণের’ প্রবক্তারা রেসিজম (বর্ণবাদ) এবং ফ্যাসিজমকে ‘ডানপন্থী’ ভাগে ফেলেছেন। কিন্তু এতে চিন্তার বিরাট ঘাপলাটা হল, কমিউনিস্টদের মধ্যে কি রেসিজম এবং ফ্যাসিজমের ছায়া নেই? মুখের দাবিতে তারা হয়ত কমিউনিস্ট, নিজেদের বাম বলে দাবি করছেন। অথচ বাস্তব কাজ ও পদক্ষেপ পরিচয়ে কি তাদের কেউ রেসিস্ট অথবা ফ্যাসিস্ট নন? সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রক্ষমতা মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে অথরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্ববাদিতার কিংবা এমন ক্ষমতার অভিযোগ আছে। অতএব রেসিজম এবং ফ্যাসিজমকে ডানপন্থী ভাগে ফেলা – এটাই আর এক জোরালো প্রমাণ যে, বাম-ডানে ভাগ করা মূলত বামপন্থীদের চালু করা পদ্ধতি। অর্থাৎ বামপন্থীরাই মূলত এই শ্রেণীকরণের প্রবক্তা।

এর আর একটা প্রমাণ হল, যাদেরকে কোন কোন মিডিয়া বা বামপন্থীরা  ডানপন্থী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, বিশেষণ লাগায়- কথিত সেই ডানপন্থীরা কিন্তু নিজেদের ‘ডানপন্থী’ বলে অভিহিত করেন না। এছাড়া, আমেরিকার ভেতরে বাম-ডান বলে কাউকে ডাকার, বিশেষণ লাগানোর সাধারণত তেমন চল নাই। বরং আছে উদার (লিবারেল বা liberal) আর এর বিপরীতে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ বা conservative) বলে ভাগ ও চিহ্নিত করার রেওয়াজ। আবার সেখানে উদারেরা নিজেই নিজেকে উদার এবং তাদের বিপরীতে রক্ষণশীলেরা নিজেকে রক্ষণশীল বলেই পরিচয় দিতে কোনো আপত্তি করেন না। শেষ বিচারে বাম-ডান বলে ডাকার আর এক বড় নেতিবাচক দিক হল – এটা ‘নাগরিক-মানবিক’ অধিকার বিষয়টাকে গৌণ, এমনকি অনেক সময়ে তুচ্ছই মনে করে।

ওদিক আর এক মজার দিক হল – লক্ষ করলে আমরা দেখব, বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রের নামের সাথেও কিন্তু ‘রিপাবলিক’ শব্দটা আছে। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রের নামের মধ্যে (যেমন “চীনের পিপলস রিপাবলিক” অথবা “ইউনাইটেড সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিক” ) এই ‘রিপাবলিক’ শব্দটা লিখে রাখা আসলে তা যেন অভ্যাসবশত, নেহায়েত এক রেওয়াজ যেন। এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিশেষ অর্থ তাতপর্য নেই। তবে এর চেয়েও আরও বড় গুরুত্বের দিকটা হল, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নামে ‘রিপাবলিক’ শব্দ থাকলেও ঐনামের ভিতর ‘অধিকার’ বলে অর্থ অন্তর্ভুক্ত নাই। মানে, “নাগরিকের অধিকার” বলে কোনো ধারণাকে রাখা হয় নাই বা অনুসরণ করে লিখা হয়নি। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার বা মৌলিক অধিকার বলে আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না তাই অস্পষ্ট এবং বাস্তবত তা নেই। বরং “শ্রেণীর” কথা তুলে এগুলো সব ঢেকে ফেলা হয়েছে। বরং কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে দেখা যায় নাগরিকদের বহু বস্তুগত জিনিষ পাওয়ার বা ভোগের “অধিকার” আছে। অন্ন, বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা বাসস্থান যোগানো এগুলো সবই যেন রাষ্ট্রের দায়।  কিন্তু গুম-খুন অথবা নিপীড়িত হওয়া – এগুলো থেকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দিবে কিনা এমন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা নেই। আর এমন চিন্তাভাবনা প্রসূত ধারণারই এক অনুষঙ্গ হল ‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ।

‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ বা কমিউনিস্ট আইডিয়ার আধিপত্য – এটা গত শতক পর্যন্ত ভালই দর্পের সাথে চলতে পেরেছিল বলা যায়। গত শতক ছিল মূলত ‘জাতীয়তাবাদী’ চিন্তার শতক। যদিও “জাতীয়তাবাদের রাজনীতি” বলে এর চলা শতকের শুরু থেকে শুরু হয় নাই। কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এর প্রবল উপস্থিতি শুরু হয়। কারণ এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল পরিণতিতে উপনিবেশ ব্যবস্থা দুনিয়া থেকে উঠে গিয়েছিল। এর পর থেকে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমন আইডিয়া বা ভাবনা হল নানা কিসিমের ‘জাতীয়তাবাদের রাজনীতি’।  আসলে (কমিউনিস্টসহ) যেকোন সার্বভৌম রাষ্ট্র মাত্রই, জাতিবাদের ইঙ্গিত সেখানে থাকবেই। আবার এই সময়ের রাজনীতিতে  মূলত রিপাবলিক রাষ্ট্র হতেই হবে এই মূলসুরের সাথে অনেক জায়গায় আবার অনুসঙ্গে ইসলামও ছিল। তবে তা “জাতীয়তাবাদী ইসলাম” এই ধরনের জাতীয়তাবাদ অর্থে [যেমন, ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান (১৯৪৭) অথবা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান (১৯৭৯)]। তবে সবার উপরেই চিন্তাধারা হিশাবে ‘ডান-বাম বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ’- গত শতক পর্যন্ত এটা ভালোভাবেই ছিল। কিন্তু এখন চলতি নতুন শতকে?

এই শতকের শুরুতে আমরা দেখেছি ‘আলকায়েদা’ ফেনোমেনা। মানে ইসলামও কোন বিপ্লবী তত্ত্বের এক উৎস হতে পারে, এই দাবি। যদি এর viable বা টিকে যাবে এমন রূপটা এখনই পাওয়া গেছে কি না তা স্পষ্ট নয় বা প্রমাণিত হয়নি। তবে এর ফলে মোটের উপর  দুনিয়ার সব রাজনৈতিক চিন্তাতেই “ইসলাম প্রশ্ন” – একটা নতুন শক্ত অনুষঙ্গ হয়ে হাজির হয়ে গেছে। সব রাজনৈতিক চিন্তাকেই এখন  “ইসলাম প্রশ্নে” তার অবস্থান দৃষ্টিভঙ্গি বলতে পারতে হবে – এই বাড়তি দিকটা তৈরি হয়েছে। তাই এই কালে এসে ম্রিয়মান হয়ে পড়া বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া অস্পষ্ট আরো অনেক চিন্তার মত ‘ডান-বাম’ বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ – ক্রমশ ম্লান হয়ে  যাচ্ছে। এর যৌবনের সেই ধার বা সক্ষমতা আর নেই। এর বড় কারণ খোদ ‘আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণাটাও এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে, এর পর্যালোচনার দাবি উঠে গেছে। ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে আমল কতে নিবার দাবি উঠে গেছে। এভাবে এক ‘রিভিউড’ বা ‘ক্রিটিক্যাল রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণা পুনরায় হাজির করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করা হয়। এদিকে, বাম-ডান বলাসহ কোনো অস্পষ্ট বা আধো বোলের কোনো ধারণা – একালে এদের খাতক একেবারেই কমে গেছে, যাচ্ছে।

বরং একালে এসে কেউ যদি কেবল বাম-ডান প্রগতিতে আঁকড়ে পড়ে আছে, থাকে এমন দেখি, সর্বোচ্চ প্রগতির চিন্তা বলে বড়াই করতে দেখি তবে বুঝতে হবে এই শতকে দুনিয়া কোথায় চলে গেছে এই খবর সে রাখে না। দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তাদের চিন্তাব্যবস্থায় প্রগতির বড়াইয়ে বুঁদ হয়ে, এর বাইরে কোন খোঁজ না রাখায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে সেই হিশাবে শীর্ষে উঠে আসা এমন রাষ্ট্র হল ভারত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাম-ডান’ ভাবনার তাৎপর্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

গৌতম দাস

০১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ur

 

মূলকথাঃ ব্যাপারটা মোটেও প্রো-ইন্ডিয়ান থেকে প্রো-চাইনিজ হওয়া নয়।
১। গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলের কাল এটা। একালে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কোন একটার দিকে কান্নি মেরে বাংলাদেশের স্বার্থকে একদড়িতে বাধবার বা একলাইন নেওয়ার চেষ্টায় প্রো-ইন্ডিয়ান, বা প্রো-চাইনিজ হওয়া হবে আত্মঘাতি।
২। ক্ষমতায় থাকার লোভে কারো-মুখি হওয়া, এতে শুধু নিজের দলের বা সরকারের না; পুরা দেশকেই ভালনারেবল বা দুস্থ করে ফেলা হবে। অন্যের হাতের পিংপং বল হওয়া এটা। সোজা রাস্তটা হল, সব সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখা ও প্রাধান্যে রাখা শুরু করতে হবে। এতে আপনা আপনিই ঐ তিন রাষ্ট্রের থেকে প্রয়োজনীয় আমাদের জন্য আলাদা একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যাবে। অর্থাৎ ঐ তিন রাষ্ট্রের সাথেই নানান সম্পর্কে জড়ানো যাবে কিন্তু সেটা বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখে এবং অবশ্যই ক্ষমতার থাকার লোভে নয়।
৩। তবে গুরুত্বপুর্ণ, একাজে তখনই সফলতা আসবে যখন নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীন ও সচল রাখা যাবে। আর তা করতে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সংসদসহ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযাচিত নির্বাহি হস্তক্ষেপ ছাড়াই কার্যকর হতে দিতে হবে। কার্যকর এসব প্রতিষ্ঠানগুলোই জনগণকে ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট করে রাখতে সহায়তা দিবে, তবেই একমাত্র বিদেশি আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব।

 

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ছিল মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ছোট দেশ, মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে চার লাখের (৪৪৪,২৫৯) মত, যার মধ্যে এবারের রেজিস্টার্ড ভোটার প্রায় আড়াই লাখ (২৬২,১৩৫)। এই নির্বাচনে মাত্র দু’জন প্রার্থী ছিলেন, চলতি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন [Abdulla Yameen] ও বিরোধী দলের জোট থেকে প্রার্থী [যিনি এখন বিজয়ী নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত] ইব্রাহিম মোহম্মদ সলিহ [Ibrahim Mohamed Solih]। সলিহ ছিলেন চারদলীয় এক জোটের প্রার্থী, ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি জিতেছেন। যদিও ভোটদানের সুযোগ ছিল ভোটের দিন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। তবু আড়াই লাখ ভোট গুনতে বেশি সময় লাগার কথা নয়, তাই নির্বাচনের দিন না হোক পরের দিন মালদ্বীপের রাজধানী মালের একেবারে সকাল (২৪ সেপ্টেম্বর) থেকেই দেশী-বিদেশী সবাই জেনে যায় ভোটের ফলাফল। যদিও তখনও সেটা আনুষ্ঠানিক ফলাফল নয়, মানে মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে এমন ফলাফল নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের প্রকাশ্য অস্থিরতা ও নড়াচড়া ছিল খুবই অকূটনীতিসুলভ। কূটনৈতিক আচার-আচরণ ভেঙে আনুষ্ঠানিক ফলাফল আসার আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে সলিহকে শুধু অভিনন্দন জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন কি না, মনগড়া সে আশঙ্কা ভারত সৃষ্টি করে আর তা প্রপাগান্ডায় ছড়িয়ে দেয়। ভারতের বিবৃতিটা লেখা হয়েছে এভাবে যে, “আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন এখন এই ফলাফল নিশ্চিত করে তাড়াতাড়ি অফিসিয়াল ঘোষণা দেবে। এই নির্বাচন কেবল মালদ্বীপের গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয়ের চিহ্ন নয় বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রতি কমিটমেন্টের প্রকাশ”। [We heartily congratulate Ibrahim Mohamed Solih on his victory and hope that the Election Commission will officially confirm the result at the earliest. This election marks not only the triumph of democratic forces in the Maldives, but also reflects the firm commitment to the values of democracy and the rule of law.] টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া

এই বিবৃতিটা স্পষ্টতই ভারতের এক চরম হস্তক্ষেপমূলক কাজ। ব্যাপারটা শুধু আমরা পাঠকেরাই নই, টাইমস অব ইন্ডিয়াও আমল না করে পারেনি। তাঁরা নিজ মন্তব্যে লিখেছে, ফলাফলের “অফিসিয়াল ঘোষণা দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে” [not waiting for official announcement] ভারত বিবৃতি দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন সলিহ-এর নির্বাচনে বিজয়ের ফলাফল ঘোষণা নাও করতে পারে – এই বিবৃতিতে ভারত আগাম এ ধরনের এক সন্দেহ ও ইঙ্গিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে স্বভাবতই এই বিবৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, পরিস্থিতিকে খামোখা উত্তেজিত করার চেষ্টার এক সীমা ছাড়ানি হস্তক্ষেপ।

বিবৃতির ভাষাও লক্ষণীয় যে, বিবৃতিতে ভারত সাজেশনে বলতে চাচ্ছে নির্বাচনী “ফলাফল” তো এসেই গেছে, এখন কমিশনের কাজ হল কেবল ঘোষক-এর ভুমিকা পালন করার; তাই তাড়াতাড়ি ওই ফলাফল ঘোষণা করে দিক। ভারতের এমন বক্তব্য, এটা আসলে অপর রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশনের কাজ ও এখতিয়ারের মধ্যে ঢুকে পড়া। আর এর চেয়ে বড় কথা, এতে কমিশনকে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরিচালক নয় যেন কেবল ফলাফল ঘোষক – এরকম এক আপত্তিকর সাজেশন ও অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা হয়েছে। ভারতের বিবৃতিতে দাবি করছে নির্বাচনের ফলাফলে সলিহ জিতে গেছে – অথচ এটা ভারতের দাবি করার সে কেউ নয়, ফলে অনধিকার চর্চা। এটা ভিন্ন রাষ্ট্রের ইস্যু বা বিষয়। অতএব এই দাবি করাটাই অবৈধ হস্তক্ষেপ। কারণ নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণার (গেজেট নয়) আগে কোনো ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষিত হয়ে গেছে বলে বিবেচিত হতে পারে না। ফলে কমিশনের ঘোষণার আগেই কোন বিদেশী রাষ্ট্র, ফলাফল সে জানে এই দাবি করে বিবৃতি দেয়া এক বিরাট অনধিকার চর্চা। কিন্তু ভারত সেটাই করেছে।

চলতি বছরের শুরুর আগে পর্যন্ত বিগত দশ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি” নিয়ে কাজ করে গেছে। কিন্তু এবছর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের আমেরিকায় রফতানির ওপর শুল্ক আরোপ করার কারণে বস্তুত সেসব আন্ডারহ্যান্ড  সম্পর্ক অকার্যকর হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এতে আগের সব বোঝাপড়া যে, ভারত কী সার্ভিস দিলে বিনিময়ে কী পাবে, তা অকেজো হয়ে যায়। তবুও ভারত চীন বিরোধী কোনো স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান নিলে আমেরিকা তাতে চোখ বন্ধ করে সমর্থন দেবে – এমন একটা কাঠামো এখনও থেকে গেছে দেখা যাচ্ছে। তাই মালদ্বীপ প্রসঙ্গে ভারতের বিবৃতির পর, ভারতের আবদারে আমেরিকাকেও একই লাইনে একটা বিবৃতি দিতে দেখা যায়। মালদ্বীপের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে এটাও আমেরিকার হস্তক্ষেপমূলক এক বিবৃতি। যদিও ভারতের বিবৃতির সাথে এর তফাত এতটুকু যে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র হিদার নওরট [Heather Nauert]  সবকিছুর আগে নিজেই বলে নিয়েছেন, “অফিসিয়াল ফলাফল এখনো ঘোষিত হয় নাই”’ তবে “স্থানীয় মিডিয়া ও এনজিও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি” করে তিনি কথা বলছেন।  [“Although the Election Commission has not yet announced the final tally, we note Maldives’ media and NGO reports ………] এটাও টাইমস অব ইন্ডিয়ার আর এক রিপোর্ট।

অর্থাৎ আমেরিকা তাদের একটু হলেও আক্কেল আছে যে, কোনো রাষ্ট্রের নির্বাচনে কে জিতেছে এই ফলাফলের নির্ধারণের একমাত্র অথরিটি ঐ রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন। ভিন রাষ্ট্র এর বাইরে যেতে পারে না। যদি যায় অর্থাৎ তারা যদি ধরে নিয়ে বিবৃতি দেয়া শুরু করে যে, “অমুকে জিতেছে” তাতে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের বড় নজির হবে সেটা, আমেরিকা তা আমল করেছে।

কিন্তু তবু আর একটা বাক্যে আমেরিকাও ভারতের প্ররোচনায় অযাচিত নোংরা হাত ঢুকিয়েছে এবং বেকুবও হয়েছে। সেই বাক্যটা হল, “We urge calm and respect for the will of the people as the election process concludes,” Nauert said. অর্থাৎ “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে তাই আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো ও শান্ত থাকার আহবান জানাই” – নওরট বলেন।

এখানে ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে”, অথবা “ফলাফল হয়ে গেছে” – এভাবে বাক্য লেখার মূল কারণ হল, মূলত ভারতের ধারণা, “এটা দাবি করা যে সলিহ জিতে গেছে” – এটা ব্যাপক প্রচার করে দাবি না করলে যদি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রভাবে কমিশন ফল প্রকাশ না করে! তাই  (এবং প্রভাবিত করে আমেরিকাকেও) নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণার আগে থেকেই ভারতকে দাবি করতে থাকতে হবে যে “সলিহ জিতে গেছে”। কিন্তু গুরুতর সমস্যা হল, বাইরের রাষ্ট্র এটা করলে তা অনধিকার হয়, অকুটনীতিক আচরণ হয়। কিন্তু ভারত একেবারে ইজ্জত-জ্ঞান শুন্য বেপরোয়া হয়ে তাই করেছে।

আবার লক্ষ্যণীয় আসলে ব্যাপারটা এমনও ছিল না যে, কমিশনের কাজে কোনো গড়িমসি দেখা গেছে। কারণ নির্বাচনের পরের দিন অর্থাৎ ঐ ২৪ তারিখেই বেলা বাড়তেই নির্বাচন কমিশন নিয়ম মাফিক সলিহকে নির্বাচিত বলে ফলাফল ঘোষণা করেছিল। আর এর দু-এক ঘণ্টা পরেই প্রেসিডেন্ট  ইয়ামিন নিজ অফিসে নির্বাচিত প্রার্থী সলিহকে আমন্ত্রিত করে ডেকে নিয়ে বিজয়ের অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর এর পরেই প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন  নিজে মিডিয়ার সামনে ঘোষণা  দিয়ে বলেন, “মালদ্বীপের জনগণ তারা যা চায় সেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আমি গতকালের সেই ফল মেনে নিয়েছি। ইতোমধ্যে আমি সলিহর সাথে দেখা করেছি, যাকে ভোটাররা পরবর্তি প্রেসিডেন্ট হিসাবে বেছে নিয়েছে। আমি তাকে অভিনন্দনও জানিয়েছি”। [“Maldivian people have decided what they want. I have accepted the results from yesterday. Earlier today, I met with Ibrahim Mohamed Solih, who the Maldivian electorate has chosen to be their next president. I have congratulated him,” Yameen said in a televised press conference.]। এটা রয়টারের রিপোর্ট, থেকে নেওয়া। অর্থাৎ কোন নির্বাচনে একজন প্রেসিডেন্টের পরাজিত হওয়ার পর এর চেয়ে স্পষ্ট ও সবল স্বাভাবিক ঘোষণা আর কী হতে পারে!

অথচ ভারত নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর বহু আগে থেকেই নিয়মিতভাবে ইয়ামিনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে গিয়েছে যে, “নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি সবকিছু। আর অনুসারী হয়ে আমেরিকাও ভারতকে সমর্থ করে নিজের খারাপ কূটনৈতিক ইমেজ আর বেকুবির নজির সৃষ্টি করেছে। অথচ  নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া দেখার জন্য অন্তত ২৪ সেপ্টেম্বর দিনটা পার হওয়া পর্যন্ত ভারত ও আমেরিকা অপেক্ষা করতে পারত। আর সেটাই সবাই আশা করে আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই অতি উৎসাহ দেখিয়ে দুই রাষ্ট্র নিজেরাই এক হস্তক্ষেপের নজির সৃষ্টি করে রেখেছে, আর নিজের মুখে কালি লাগিয়েছে। কারণ, এপর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত কোথাও কোন ধরণের গোলযোগ ছাড়াই মালদ্বীপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি ভারতীয় প্রপাগান্ডার ফাঁদে পড়ে, গোলযোগের আশঙ্কা করে নির্বাচনের তিনদিন আগে ২০ সেপ্টেম্বর আলজাজিরা-এর মত মিডিয়া এক পক্ষপাতিত্বের রিপোর্ট ছেপেছিল।  অথচ ফলাফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত ভারত, আমেরিকা বা কোন মিডিয়া তাদের কারচুপি বা গোলযোগের মনগড়া প্রপাগান্ডার কোন সত্যতা তারা দেখাতে পারে নাই।

বরং প্রতিক্ষেত্রে  ভারত ও আমেরিকার প্রপাগান্ডার উল্টা – নির্বাচন এতই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মমাফিক হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা আমলা ঘনিষ্ট এক কলামিস্ট নিজেই ২৪ তারিখ সকালেও নিজের “ফলাফল ঘোষণা ও ক্ষমতা হস্তান্তর” নাও হতে পারে – এ ধরনের মনগড়া আশঙ্কা যাচাই করতে মালদ্বীপে দু’জন গুরুত্বপূর্ণ এমপির সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন। ওই এমপি দু’জন এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিলে এবার তিনি আশ্বস্ত হন বলে তাও লিখেছেন।
সবশেষ নিজেই লিখছেন, “সলিহ যেহেতু জিতেছে অতএব মালদ্বীপের নির্বাচনে কারচুপি হয়নি”। এই হল মালদ্বীপের নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় প্রপাগান্ডার মুখ থুবড়ে পড়া পরিণতি!

মালদ্বীপের ফলাফল দেখে ফেসবুকে একটা ছোট মন্তব্যে লিখেছিলাম, ‘এটা বিপর্যয়’। কিন্তু কীসের? মালদ্বীপের থেকে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কী শেখার আছে, তা বোঝার উদ্দেশ্যে সেখানকার রাজনৈতিক ঘটনাবলির এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে আনব।

মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি স্পষ্ট পরস্পরবিদ্বেষী দুই ভাগে বিভক্ত। এটা আর বিরোধী নয় বিদ্বেষী জায়গায় চলে গেছে। তবু ঘটনাবলির একটা বর্ণনা মানে বর্ণনার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই করতে হবে। আর তাতে কোন পক্ষ সঠিক ছিল অথবা এর কোনো একটা পক্ষের প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলাটা এখানে এর একেবারেই উদ্দেশ্য নয়। তাই এই রচনায় কোনো পক্ষকে “ভাল” বললাম কি না, তা খোঁজা অথবা সেদিক থেকে বুঝতে যাওয়া খুবই ভুল হবে। আর এতে লেখাটার সুবিচার বঞ্চিত হবে।

প্রথমত, মালদ্বীপের রাজনৈতিক অসন্তোষ, অস্থিরতা অনেক পুরনো, গত শতক থেকে। এর একটা বড় উৎস হল, ক্ষমতাসীন পরিবারের প্রভাবশালী দুই সৎ ভাইয়ের রেষারেষি আর স্বার্থ ঝগড়াকে কেন্দ্রে রেখে এবার এর সাথে সমাজের অন্যান্য নানান স্বার্থগুলো একেক ভাইয়ের পক্ষ বেছে নেওয়াতে এটাকেই মালদ্বীপের রাজনৈতিক পোলারাইজেশন হিসেবে মনে করা হচ্ছে – এ ধরনের। অর্থাৎ রাজনীতি কম আর স্বার্থবিরোধ ভার বেশি। দ্বিতীয়ত, ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপে ভারত “অপারেশন ক্যাকটাস” নামে নিজ সামরিক বাহিনী নামিয়ে পছন্দের সরকার বসিয়ে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছিল; এই বিরাট খারাপ নজির সেই থেকে জ্বলজ্বল করছে। তৃতীয়ত, ২০১২ সালের পর থেকে চলতি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সাথে অপর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের রাজনৈতিক বিবাদ তৈরি হওয়া, এক পর্যায়ে ‘টেরোরিজমের অভিযোগে’ নাশিদকে আদালতে নিয়ে শাস্তি দেয়া, এরপরে পার্লামেন্টকে কার্যকরভাবে কাজ করতে না দেয়া, বিচারককে গ্রেফতার, দুবার অপ্রতিষ্ঠিত-সাফাই দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি ইত্যাদি ঘটনা ঘটেছে যা মালদ্বীপের রাজনৈতিক তৎপরতা ও চর্চা হিসেবে খুবই খারাপ সব উদাহরণ।

কিন্তু এসবের বিপরীতে আদালতের ঘটনার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের (Mohamed Nasheed, যিনি প্যারোলে চিকিতসার জন্য বাইরে লন্ডনে গিয়ে সেখান থেকে দেশে না ফিরে এখন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসাবে শ্রীলঙ্কায় বসবাস করেন) খোলাখুলি ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপে ক্ষমতা দখলের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা আরো খারাপ এক উদাহরণ। সৌভাগ্যবশত এটা গত শতক নয়। অল্প কথায় বললে, জাপানি টাইমস আর রয়টা্র্সের খবর অনুযায়ী , নাশিদের খোলাখুলি ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের প্রতিক্রিয়ায় পরে,  চীন ১১ জাহাজের এক বহর নিয়ে ভারত মহাসাগরে হাজির হয়েছিল। এতে চীনের সাথে কোন মুখোমুখি সঙ্ঘাত পরিস্থিতি এড়াতে ভারত মালদ্বীপে হস্তক্ষেপে নাশিদের আহবান উপেক্ষা করে, আর বিষয়টা এবার চিন্তা থেকে বাদ দেয়। ফলে আরো খারাপ কিছুর হাত থেকে নাশিদ এবং মালদ্বীপও বেঁচে যায়। তবে ভারতের কোন কোন মিডিয়া অহেতুক “ভারতের মুখরক্ষা করার তাগিদ” থেকে একটা স্টোরি প্রচার করতে থাকে যে নাশিদ তো এখন বিরোধী দলে – ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নয় (১৯৮৮ সালের মালদ্বীপ প্রেসিডেণ্ট গাইয়ুমের ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের সাথে মনে মনে তুলনা করে এরা কথা বলছে) তাই ভারত এবারের আহবান উপেক্ষা করেছে। যদিও আমরা ভারত মহাসাগরে চীনা মেরিন ও ভারতীয় নৌবাহিনীর তাদের পরস্পরের জাহাজ কত দূরে এনিয়ে বিবৃতি দেখেছি। ভারত বলেছিল আমার হাজার খানেক মাইলেরও দূরে। আর চীনা এক নৌ ওয়েবসাইট বলেছিল, না আমরা বেশ কাছাকাছিই। এরপর এতটুকুতেই ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, কারণ ……।

নাশিদের ভারতকে আহবান এর ঘটনা এই বছর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে। আর চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারীর। আর ওদিকে আর এক বিশাল বেড়ে চলা নয়া স্টোরি হল, ভারতের চলতি বিদেশ সচিব বিজয় কেশব গোখলে ঐ ৩০ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে তাঁর প্রথম বিদেশ ঘটান চীনে, ২৪ ফেব্রুয়ারি। ফলে যে যাই গালগপ্প দেক এবার সব টেনশন ফুস! আর এর পরেই আমরা পেয়েছিলাম ২৮ মার্চ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সিনিয়র সরকারি কর্তার  স্বীকারোক্তি – “দক্ষিণ এশিয়া কি আর ভারতের সেই বাগানবাড়ি আছে, চীন এসে গেছে না! আমরা এখন বড় জোর আমাদের মনোবাঞ্ছা চীনকে বলতে পারি। চীনের উচিত হবে আমাদের সাথে স্ট্রাটেজিক ট্রাস্ট তৈরি করা। ………আমরা চীনকে জানিয়েছি যে মালদ্বীপে আমরা হস্তক্ষেপ করব না”। এটা ছিল ঐ পত্রিকা রিপোর্টের সাব-হেডিং। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার বরাতে এটা ছাপা হয়েছিল। সারকথায় নাশিদের আহবান সত্ত্বেও বরং ভারত খোলাখুলি সংযত হয়েছিল।

কিন্তু মালদ্বীপের ঘটনাবলিকে মালদ্বীপ-রাষ্ট্রের নিজ স্বার্থের দিক থেকে যদি বিচার করা হয় তাহলে, ইয়ামিনের ক্ষেত্রে অপরাধ হলঃ যেসব প্রতিষ্ঠানের কারণে রাষ্ট্র কার্যকর ও প্রাণবন্ত থাকে – কিন্তু কেউ ক্ষমতায় আছে বলে সেগুলো প্রত্যেকটার (যেমন আইনশৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ইত্যাদি) স্বাধীন বা কনষ্টিটিউশন নির্ধারিত এখতিয়ার ও আইনসম্মত কাজে নির্বাহী প্রধানের অযাচিত ও বেআইনি হস্তক্ষেপ ঘটানো – এটা এক চরম আত্মঘাতী কাজ। ইয়ামিন বেপরোয়াভাবে সেই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর কাজগুলোই করে গেছেন। আর বিপরীতে নাশিদের ক্ষেত্রে, নিজ তথাকথিত রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবান রেখে পুরো মালদ্বীপ রাষ্ট্রকেই অস্তিত্বহীন দুস্থ করে ফেলার আরও এক অপরাধ করেছেন নাশিদ।

সব দেশেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থের নানা লড়াই, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সকলের জন্য পালনীয় এর কিছু ‘নো গো এরিয়া’ থাকে, যা থেকে দলগুলো সকলকে দূরে থাকতে হয়।

মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বা এর শৃঙ্খলায় ব্যাপক উলটপালট পরিবর্তন আসন্ন। আমার প্রায় সব লেখাই যেখানে দাঁড়িয়ে দেখে লেখা। গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও এর শৃঙ্খলা এবারের অভিমুখ চীনের নেতৃত্বে পরিবর্তন হতেই থাকবে। আর নতুন করে সাজানো হতে থাকবে। দুনিয়ায় আমেরিকান নেতৃত্ব ও প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে; একেবারে নাই না হলেও। আর তাতে পশ্চিম বা ইউরোপ নয়, দুনিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নাট্যশালা হয়ে উঠছে এশিয়া। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এশিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই কাঁধ-বদল বা শিফটিং – এর ভাল এবং মন্দ দুটো দিকই আছে। একদিকে ভাল কিছু সুযোগ পাওয়ার আছে আবার ঠিকমত ব্যবহার না করলে জানলে একইসাথে নিজে তছনছ হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনাও আছে – দুটোই।

সবচেয়ে মন্দের দিকটা হল, অস্থির ও চলতি এই শিফটিংয়ের প্রাথম দিককার সময়কালটা। দুনিয়া নতুন করে সাজানো আর সম্পর্কগুলো ঢেলে সাজিয়ে গড়ার এই কালেঃ
১. চীন, আমেরিকা আর ভারত এই তিন পক্ষের রেষারেষি থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে দূরে থাকতে পারতে হবে। কোন পক্ষকে নিজের পক্ষ ভাবা যাবে না, এলাইন হয়ে যাওয়া যাবে না। ঐ তিন পক্ষের কারও স্বার্থে নিজেরা বিভক্ত হলে ঐ বিভক্ত হওয়া থেকে ক্ষতি শুরু হবে।
২. দেশের দলগুলোর মধ্যে আভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও স্বার্থবিরোধে ওই তিন রাষ্ট্রকে ডেকে আনা যাবে না, সংশ্লিষ্ট করে ফেলা যাবে না।
৩. অথবা উল্টা করে বললে, ওই তিন রাষ্ট্র স্বার্থের কোনো একটার পক্ষ নিয়ে আমাদের কোনো রাজনৈতিক দল দেশের ভেতর কাজ করতে পারবে না। ‘প্রো-ইন্ডিয়ান বা প্রো-চাইনিজ দল ক্ষমতায়’- এ ধরনের পরিচিতি আমাদের পতনের ইঙ্গিত।
৪. একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই প্রধান, এটাকে সব সময় প্রাধান্যে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেই হবে।
৫. যে দলই ক্ষমতায় থাকুক – তার ভারত, আমেরিকা অথবা চীনকে কোনো সুবিধা দেয়া বা ঋণ নেয়া তা করতে হবে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে রেখে; অবিতর্কিত এবং স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়ায় যাতে অহেতুক তর্ক-বিতর্কের সুযোগ কেউ না নিতে পারে ইত্যাদি।

কিন্তু এসবই বজায় রাখা যাবে যদি নিয়মিত ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ও ক্ষমতাহস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে এক স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ দেয়া যায়। এ ছাড়া ক্ষমতাসীনের চোখে যে সরকার বিরোধী তারও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করতে ক্ষমতাসীনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।

এক কথায় বললে, মালদ্বীপের রাজনীতি ও দল এসব মৌলিক করণীয়গুলো করতে সবাই ব্যর্থ হয়েছে। ইয়ামিনের দিক থেকেও এই রাজনৈতিক ফলাফল বিপর্যয়কর এজন্য যে, হয়ত সে বলবে বিদেশীকে হস্তক্ষেপ ডেকে আনা নাশিদের উদ্যোগকে ঠেকাতে পেরেছে। কিন্তু ইয়ামিন তা এমন প্রক্রিয়ায় করেছে তাতে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন আদালত ও পার্লামেন্টকে) অকেজো করে ফেলেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা জনগণই এই কাজ পছন্দ করেনি। অনুমোদন করেনি। উল্টা করে বললে ইয়ামিন তার কাজকে জনগণ সাথে নিয়ে করতে পারেনি। এরই ফলাফল হল নির্বাচনে সব পাবলিক সহানুভূতি বিরোধী দলের দিকে চলে গেছে, যার প্রকাশ নাশিদের প্রার্থী বেশি ভোট পাওয়া বা ইয়ামিনের পরাজয়। তবে অবশ্যই আবার ইয়ামিন প্রশংসার দাবি রাখে যে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত ও তার বন্ধুদের নিয়মিত শত প্রপাগান্ডা [যে নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি] এসব সত্ত্বেও এগুলোর প্রতিটা যে ডাহা মিথ্যা তা ইয়ামিন প্রমাণ করে দিয়েছেন – একটা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্পন্ন করে দিয়ে। যা ভারত ও আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত। ওদিকে ভারতকে আহবান জানিয়ে নাশিদ যা করেছে তাতে তাঁর এখন রাজনীতি ত্যাগ করে অবসরে যাওয়া উচিত।

এখন নিয়ম অনুযায়ি আগামী ১৭ নভেম্বর হল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন। এরপরে এবার পালটা সলিহ ও নাশিদের দল বা জোট কী প্রতপক্ষের উপর পালটা প্রতিশোধ নেয়া শুরু করবে আর একইভাবে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকেজো করে রাখবে? জবাব সম্ভবত হ্যাঁ, সেই সম্ভাবনাই বেশি। এক ভারতীয় ‘বিদ্বজ্জন’ অধীর আগ্রহে কি লিখেছেন লক্ষ করা যাক। তিনি বলছেন, “নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মালদ্বীপ এবার ভারতের দিকে ফিরতে পারে এবং অবশ্যই ফিরবে”। [For new development projects, Maldives can turn to India and will.] তিনি এয়ারপোর্ট পুননির্মান প্রকল্প আবার ভারতের ফিরে পেয়ে যাবার স্বপ্ন দেখছেন।  অর্থাৎ সে সম্ভাবনা বাস্তব হলে তা হবে, নাশিদ ও তার দলবলের মালদ্বীপকে চীন-ভারতের হাতে পিংপং বল করে ফেলা- যা এক বিরাট অযোগ্যতা আর তা, আনফিট রাজনীতিক হওয়া হবে।

শেষ বিচারে আবার মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের এখনই উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই। একটা কারণ, মালদ্বীপে পার্লামেন্টারি নির্বাচন হবে ২০১৯ সালের মে মাসে। অতীতের রেকর্ড বলে, সে নির্বাচনে ইয়ামিনের দল আবার পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ে ফিরে এসে যেতে পারে। এ ছাড়া নাশিদের জন্য আরো বড় বিপদ হল, তারা জিতেছে একটা জোট হিসেবে। কিন্তু একদিকে জোটের মেনিফেস্টো অসম্পূর্ণ, আবার তাতে বলা আছে জোটের এগ্রিমেন্ট পার্লামেন্ট বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনু-স্বাক্ষরিত হতে হবে।
আরও আছে। এছাড়া নাশিদের দল চায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা উঠিয়ে দিয়ে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকারে চলে যায়। কিন্তু জোট শরিকেরা এতে একমত নয়। ফলে বহু – যদি, কিন্তু ও অনিশ্চয়তা – অপেক্ষা করছে।

তবে আমাদের জন্য সারকথাটা হল, আমাদের দলগুলো একেকটা চীন অথবা ভারতের এজেন্সি নিয়ে বিভক্ত হয়ে যেতে পারবে না। চীন, ভারত অথবা আমেরিকার আগে সবসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে ও স্বচ্ছতায় নিয়ে হাজির হতে হবে। নইলে নিজেরাই তছনছ হয়ে যাওয়ার শুরু হবে সেখান থেকেই।

একটা তামাসার বাক্য দিয়ে শেষ করা যাক। ভারত মালদ্বীপ ইস্যুতে ইয়ামিনকে “একনায়ক” আর তাঁর বিরুদ্ধে  নাশিদ-সলিহদেরকে “গণতন্ত্রপন্থিদের” বিজয় হিসাবে এক “মরাল” দাড় করাবার কোশিশ করে গেছে। আচ্ছা বাংলাদেশের বেলায় কী করবে? কাকে একনায়ক আর কাকে “গণতন্ত্রী” হিসাবে রঙ লাগাবে! ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য যারা আহবান করে সে অবশ্যই “বিরাট গণতন্ত্রী” দেখা যাচ্ছে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপের নির্বাচন ও আমাদের জন্য শিক্ষা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

গৌতম দাস || Wednesday 27 June 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tI

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা প্রথম পর্ব।]

ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন শেষ হবার পর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ২৫ জুন সন্ধ্যায় ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহম্মদ মোরসিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবু দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সব জায়গায় মূল আলোচনার বিষয় মোরসির ক্ষমতা কি কি, কত দিনের প্রেসিডেন্ট, কি তাঁর কাজ এবং কাজের সীমা ইত্যাদি। কোন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) বলতে প্রচলিত যে ধারণা দুনিয়ায় আছে সেই রকম একটা ভাবের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলতে দুনিয়াতে প্রচলিত ভাবটা কে কি বুঝে তা দিয়ে কোন কাজ চলতে পারে না, বরং ঐ সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট-এর মানে কি, কি তাঁর ক্ষমতা, কোনটা তার নয়, কতদিনের জন্য ক্ষমতা ইত্যাদি স্পষ্ট করে বলা থাকতে হয়। তা বলা থাকতে হয় কনষ্টিটিউশনে এবং নির্বাচনের আয়োজন শুরুরও আগেই । একটা কনষ্টিটিউশন কোন রাষ্ট্রের থাকার মানে হল ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক-জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত (কনষ্টিটিউটেড) হয়েছে; এভাবে হলে, হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে রাষ্ট্র বলা চলে। অন্যভাবে বললে জনগণ রাজনৈতিকভাবে কনষ্টিটিউটেড হওয়া আর রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যাওয়া একই কথা। আর সেই সাথে জনগণ কিসের ভিত্তিতে একত্র হলো, কনষ্টিটিউটেড হলো সেই ভিত্তি – জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার কোন ভিত্তি – সেকথার লিখিত দলিলটা হলো কনষ্টিটিউশন। ঐ কনষ্টিটিউশনে বলে দেয়া থাকে, রাষ্ট্র যে পরিচালনার করবে সেই নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাজ, ক্ষমতা কি, কতদিনের, রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা হবে ইত্যাদি। এরপর সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনস্ততা মেনে রাষ্ট্রের বাকি সমস্ত  প্রতিষ্ঠান এমনকি খোদ নির্বাহী প্রধান, পার্লামেন্ট অথবা বিচার বিভাগ সবাই আনুগত্য প্রকাশ করেই একমাত্র তারা যার যা ভুমিকা পালন করতে পারে। ফলে রাষ্ট্র দৃশ্যমান হয়। খেয়াল রাখতে হবে আমি রাষ্ট্রের কথা বলছি, দেশ না। দেশ বলতে ওর মাটি সীমানা মানুষ ইত্যাদি সবই থাকতে পারে – এতে দেশ হয়ে থাকলেও তা রাষ্ট্র নাও হতে পারে। সোমালিয়া একটা দেশ বটে কিন্তু রাষ্ট্র নয় সেটা। আবার কোন দেশ একই থাকে কিন্তু ওর রাষ্ট্র আবার কনষ্টিটিউট বা গঠন করে নেবার দরকার হতে পারে। দরকারের মূল কারণ, পুরানা রাষ্ট্র আর জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না তাই। রাজনৈতিক শব্দে একে কোন দেশের নতুন করে রিপাবলিক গড়া বলে। আবার অনেকের মনে হতে পারে এতক্ষণ রাষ্ট্র বা রিপাবলিক (গণ)রাষ্ট্র বলতে আমি বোধহয় আগাম ধরেই নিয়েছি যে আমি “গণতন্ত্র” ধরনের রাষ্ট্রের কথাই বলছি। না আমি তা বলছি না। আমি  রাষ্ট্রের কথা বলছি, রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। এই রাষ্ট্র ইসলামি, কমিউনিষ্ট, লিবারেল ইত্যাদি অথবা এসবেরও বাইরে নতুন কোন রাষ্ট্র হতে পারে। আর এসব রাষ্ট্র শব্দের আগে বিশেষণে রিপাবলিক কথাটা যোগ করেছি এজন্য যে এটা অন্তত রাজা, বাদশা সম্রাটের রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য নয়; এসবের বিপরীতে জনগণের কর্তৃত্বের রাষ্ট্র কেবল সেটা পরিস্কার রাখার জন্য।

  • ইজিপ্টের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রের কোন কনষ্টিটিউশন বর্তমানে নাই।  মোবারকের পুরানা কনষ্টিটিউশন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর, পার্লামেন্ট বসার আগে এবং SCAF (সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স)-এর ঘোষণায় নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতার জোরে ।
  • এর মানে ইজিপ্ট একটা অন্তর্বতীকালিন বা মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে, পুরানা রাষ্ট্র নাই আবার নতুন রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা হয়নি – এদুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা।
  • তাহলে নতুন কোন কনষ্টিটিউশনের আগেই একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইজিপ্টে ঘটেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ীর মত। আবার এর আগে একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত এপ্রিলে; ব্রাদারহুড যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়েছে। সাথে ইসলামি সালাফি রাজনীতির নূর পার্টি (২৫%) মিলিয়ে মোট ৫৪% আসন এই দুই ইসলামী ব্যকগ্রাউন্ডের রাজনীতিক দলের হাতে। সাধারণভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচন মানে আগাম একটা কনষ্টিটিউশন আছে; সে কনষ্টিটিউশনের অধীনে সীমায় থেকে প্রতিদিনের নানান প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ওর কাজ। কিন্তু ইজিপ্টের বিশেষ ক্ষেত্রে নামে বলা হচ্ছে এটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট কিন্তু এর কাজ হবে একটা কনষ্টিটিউশন খাড়া করা। কিন্তু তাও আবার সরাসরি নয়। পার্লামেন্টের দ্বারা একশ মনোনিত (নির্বাচিত নয়) সদস্যের এক কমিটি ইজিপ্ট রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন (খসড়া বা প্রস্তাবিত) খাড়া করবে। যেটা পরে হয়ত পার্লামেন্ট পাশ বা অনুমোদন করলেই হবে; অথবা আবার গণভোটে দেয়া হবে।(“হয়ত” বলে আমাকে বাক্য লিখতে হচ্ছে এজন্য যে এগুলোর কোনটাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে পরিস্কার করা হয় নাই।) কিন্তু তাই যদি হয় তবে পুরানা বা নতুন কোন কনষ্টিটিউশনই না থাকা অবস্থায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের কাজ, উদ্দেশ্য লক্ষ্য কী? কেনই বা কথাটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট বলা হচ্ছে; যেখানে হবার কথা একটা কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বী (কনষ্টিটিউশন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সভা) বা আমাদের বাংলায় সমতুল্য প্রতিশব্দ ‘গণ পরিষদ’; ফলে ঠিক পার্লামেন্ট মেম্বার বা নির্বাচন নয়, বরং গণ পরিষদের সদস্য কে হবেন তাঁর নির্বাচন – এটাই হবার কথা। এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনেরও আগের কাজ। প্রথম কাজ কনষ্টিটিউশন বা রাষ্ট্র গঠন – জনগণের কনষ্টিটিউটেড হওয়া – সেটা ঘটানো। এরপর ঐ কনষ্টিটিউশনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে বড় ধরনের এক গোজামিল এখানে চলছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উপরে বারবার দেখিয়েছি কোন কিছুই স্পষ্ট না করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আওয়াজে ঘটনা চলছে। এমনকি ঐ একশজন কারা কিভাবে মনোনিত হবেন তাও স্পষ্ট করে রাখা হয় নাই। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ঐ পার্লামেন্ট এনিয়ে বিরোধ মীমাংসা শেষ করতে না পেরে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। ব্রাদারহুড সালাফি বাদে সমাজের বাকি সবাই পার্লামেন্ট থুয়ে আবার তাহরির স্কয়ারমুখী জমায়েত হয়। এই অবস্থা অবশ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগেও হয়েছিল। নির্বাচন বর্জনের ডাক এসেছিল। কিন্তু এর ভিতরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘটেছিল। আর পরে দেখলাম পার্লামেন্টের বিরোধ মীমাংসা যখন হলো না তখন ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে যাওয়ায় সবাই তাতেই মত্ত হয়ে গেল এই ভেবে যে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা দিয়েই তারা সব বিরোধের মীমাংসা করে নিবেন।

গণ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বা যেকোন বিপ্লব সফল করতে গেলে কনষ্টিটিউশন থাকা আর না থাকার মাঝের অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার হাতে থাকছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় সব কিছুর নির্ধারক এবং লক্ষণও বটে। র‍্যাডিকাল কোন পরিবর্তন বিপ্লবের ভাব তুলে এর বদলে তা উদারতাবাদী লোক দেখানো কোন ঘটনা হিসাবে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়ে যাবে কি না তা সহজে বুঝবার উপায় হলো অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতাটার দিকে লক্ষ্য রাখা। উপরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের নামে তামাশা আর পরে একইভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের নামে যে রহস্য ইজিপ্টের আমরা দেখছি – মোরসি নির্বাচিত এটা জানার পরও সাথে সাথে যে প্রশ্ন উঠছে যে তাঁর ক্ষমতা কি কি, আর সমানে পিছন থেকে SCAF সমানে প্রম্পট করছে, এক এক সময় এক এক ভাবে ফরমান জারি করে প্রেসিডেন্টকেই সাইজ করছে – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার এটা কত গুরুত্বপূর্ণ, সেন্ট্রাল পয়েন্ট। কিন্তু SCAF কিভাবে কেন অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা হয়ে গেল? এরমানে আরব জাগরণ আন্দোলন বা বিপ্লবের আওয়াজই কি  SCAF কে ক্ষমতায় আনে নাই? ঘটনা ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু এই সত্যি ঘটনা ঘটতে পারল কেন? কেন এমন হলো, এদিকটা এখন বুঝাবুঝির দিকে যাব।

ইজিপ্টের ঘটনায় মূল তিন প্লেয়ার – ১) SCAF, ২) স্থানীয় ব্রাদারহুড আর ৩)পশ্চিমের লিবারেল ইসলাম (RAND প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ধারা)। এর বাইরে সেকুলার, কমিউনিষ্ট বা লিবারেল ধারার ছোট টুকরা যারা আছে এরা ঠিক গোনায় ধরা প্লেয়ার হতে পারেনি তাই এদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা না করে তাহরিরের মাঠের সাধারণ গণ আন্দোলনের কর্মীদের ভিতরে ধরেছি, সবমিলিয়ে যারা চতুর্থ ধারা বলতে পারি।

[এই লেখাটা শুরু করেছিলাম ১৬-১৭ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে। লেখার প্রসঙ্গ ক্রমশ বিস্তার হতে থাকে কারণ, যেটাকে গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম বলছি – এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টরটা কোথাও আলোচনা হতে দেখিনি। “আরব স্প্রিং” বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম জিনিষটা কি কেন, এর প্রভাবে ইজিপ্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সম্পর্কটা কি এটা বাদ  রেখেই সব আলোচনা চলছে। মিডিয়াগুলোর ফোকাস হলো ব্রাদারহুড ইসলাম নিয়ে তেড়ে আসছে এবার কপটিক খ্রীশ্চানদের কি দশা ঘটে এটাই যেন মূল বিষয়। অথচ তুলনায় এটা সবচেয়ে তুচ্ছ দিক। ফলে কেন তুচ্ছ বলছি সেকথাগুলো ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে লেখা শেষ করতে পারিনি। এদিকে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। এই দেখে ঐ ২৫ তারিখেই ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে তাড়াহুড়া তবে আলাদা করে “কয়েক ঘন্টা পর ইজিপ্ট – কি ঘটতে পারে? কি হতে যাচ্ছে?” শিরোনামে লেখাটা দিয়ে দেই। এখন মুল লেখাটা আবার সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, কয়েক পর্বে। ]

 

বিপ্লবী রাজনীতি না উদারবাদী রাজনীতি

কোন গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে, বিপ্লব সফল করতে গেলে পুলিশ-মিলিটারীর মার নির্যাতন সহ্য করা, অঙ্গ হারানো, নিহত বা গুম হয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে দমনের সব পথ মোকাবিলায় পাড়ি দিয়েই একমাত্র সেটা ঘটতে পারে—এটা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু কোন প্রতিরোধ আন্দোলন সেটা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব হলো বা হবে কি না, পৌছাবে কি না তা – কতটা মাত্রার দমন নির্যাতন সহ্য করা হয়েছে তা মেপে ঠিক হয় না; বলা ভাল নির্যাতনের মাত্রা আর বিপ্লব – এদুটোর আসলে কোন সম্পর্কই নাই, সম্পর্ক আছে মনে করে কোন মনবুঝ দেয়াটাও বেকুবি, নিজেকে ধোকা দেয়া। বাংলাদেশেও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা ১৯৯০ সালে নিজেদের সাথে এমন ধোকাবাজি করেছিল, দাবি করেছিল প্রেসক্লাবের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে তারা নাকি এক গণঅভ্যুত্থান করে ফেলেছিল। ইজিপ্টের আরব জাগরণের বিপ্লবীরা একই সমস্যায় পড়েছে। গত আঠারো মাস ধরে আন্দোলনে তাদেরও ধারণা হয়েছিল তারা বিপ্লবের স্বাদ পেয়েছে, নিচ্ছে। আজ (১৬-১৭ জুন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড মানে রান-অফ চলছে। দুমাস আগের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (সামরিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত এক ধরণের কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট) “অবৈধ” ঘোষণায় ভেঙ্গে দিয়েছে ঠিক এর দুদিন আগে ১৪ জুন। দিন দশেক আগে ঐ একই আদালত (প্রায় একই বিচারকেরা তবে কোর্টের নাম আলাদা) হোসেনী মুবারক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ছয়জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ৮০০ এর মত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগ থেকে “প্রমাণাভাবে” তাদের খালাস বলে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ এই ৮০০ জনকে কারা মেরেছে, কাদের হুকুমে পুলিশ গুলি ছুড়েছে তা আইনের চোখে আন-আইডেনটিফায়েড”, তাই বেকসুর খালাস। কিন্তু সাথে এক তামাশা আছে এখানে। ঐ ৮০০ জনকে হত্যা রাষ্ট্র কেন প্রটেক্ট করতে পারেনি এই অভিযোগে কেবল প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। এর আগে এতদিন ইজিপ্টের বিপ্লবী তরুণেরা খুশিতেই ছিল বিপ্লবের কিছু একটা হচ্ছে মনে করে। বিপ্লব প্রায় শেষ মনে করে, বিপ্লবের গাথা লিখাতেও তারা উদ্যোগী হয়ে গিয়েছিল। গান ছড়া, কার্টুন ডকুমেন্টারীতে সমাজ সয়লাব হচ্ছিল, যেমন হয়। কিন্তু এই রায়ের পরেই কেবল তারা প্রথম টের পাওয়া শুরু করে যে তারা প্রতারিত, ঠকেছে তারা। সবকিছু হাতছাড়া তাদের, আঙ্গুলের ফাঁক গলে সব বেরিয়ে গেছে। কবে কিভাবে বের হয়ে গেছে টেরও পায়নি। এতদিন খুশিতে আশা ভরশায় বুঁদ হয়ে মগ্ন থাকছিল আর ভেবে ছিল মোবারক আর তার সঙ্গী সাগরেদদের বিচার হচ্ছে, হবে। আসলে তরুণ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদেরই ঠকিয়েছে; কারণ বিপ্লব কি, কি করে বুঝা যায় বিপ্লব হচ্ছে কি না, হবে কি না সে সম্পর্কে তাদের ভাবনা কত নাদান সে খবর রাখতে চায়নি। প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের নির্যাতন কম হয় নাই, ৮০০-৯০০ এর মত বিপ্লবী মারা গেছে এই ১৮ মাসে, ফলে অনুমান করে নেয়া যায় নিহতের সাথে আহত পঙ্গু হয়ে যাবার সংখ্যাটাও অনুপাতে কত হতে পারে এবং যারা নির্যাতনে ট্রমাটাইজ মানসিক বিকলাঙ্গ সদমা নিয়ে আছেন হয়েছেন এই সংখ্যাটাও। ফলে পুরা সমাজে উথাল পাথাল করা ১৮ মাসের এই আন্দোলন সংগ্রাম মানে সামাজিকভাবে গণ-মনকে ঝাকুনি দেয়ার ঘটনা এটা। এতেও ঝাকুনি খায়নি বাইরে রয়ে গেছে  এমন লোকজন সমাজে খুব কমই অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি নির্যাতন হত-নিহত হওয়া আর সবার উপরে সামাজিক ঝড়ের প্রভাব আন্দোলিত হয়ে যাওয়া এর সব শর্তই এখানে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এত কিছুর পরও সবাই টের পাচ্ছে এটা বিপ্লব হয় নাই; বিপ্লবের দেখা নাই। আর তরুণেরা সেটা টের পাচ্ছে এখন। এখানে তরুণ বলতে সবাই, এককথায় সামরিক কাউন্সিল SCAF বাদে রাজনৈতিক কমিউনিটি, সমাজের সব অংশে সব দল মতের সব জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বুঝিয়েছি। বিপ্লব যে ঘটেনি এটা আমি এখানে বলছি বলে না, ইজিপ্টের সবার মুখে আর মনের অনুভবের কথা, কারও বুঝতে বাকি নাই। সারা রাজনৈতিক কমিউনিটি হতাশ শুধু নয়,  নতুন করে সমাগত নির্যাতন নিপীড়নের দিন আবার ফিরে আসছে এটা ভেবে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেটা সবার আগে ঘটে রাজনৈতিক পাড়ায় পরস্পরকে ব্যর্থতায় দোষারোপ করা, বিভক্তি বড় হওয়া, যা আগেও ছিল এখন তা আরও বড় হতেও শুরু করেছে।

তাহলে মূল কথাটা, ব্যাপারটা কি এই যে, বুঝব কি করে ঘটনা বিপ্লবের দিকে হাটছে নাকি উদারবাদী রাজনীতির দিকে যাচ্ছে—এটা কেবল ঘটনা ঘটার শেষে  কি দাড়ালো সেটা দেখার পরে জানতে পারা ছাড়া আগাম বুঝবার কোন উপায়  নাই যে বিপ্লব হচ্ছে কি না? বিপ্লব কী আগে বুঝার কোন উপায় আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু কি সেটা? লেনিন সাহেব বলেছিলেন, বিপ্লব করা নাকি একটা আর্ট। এবং অভুত্থান নাকি উপযুক্ত দিন তারিখের আগেও করা যায় না পরেও না। আরও এগিয়ে বলা কথাও আছে। পুরান রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ভেঙ্গে না পরে তাহলে বুঝতে হবে বিপ্লব হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক অনেক কথাবার্তা। তবু আমি সেদিকে যাব না, কোন চর্বিত চর্বন বা আপ্তকথা আউড়াব না, সেসব আশ্রয় করে আমার কথা সাজাব না। কিছু খাস কথা খাসভাবে বলার চেষ্টা করব।