ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী

গৌতম দাস

 ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2VO

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। এখন কোনো দেশী অথবা বিদেশী মিডিয়া যেটাই খুলা যাক, দেখা যাবে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ নিউজের বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে এই ভাইরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। দুনিয়াতে এখন এই ভাইরাসের প্রভাব এতই মারাত্মক। আরেক অদ্ভুত দিক হল – যা আমাদের ঘরে ঘরে ঠিক তা দুনিয়াজুড়েও – আগে দেখা যায়নি এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি।  শুধু আমরাই যার যার ঘরে বন্দি নয়, এটা সারা দুনিয়ারই চিত্র। ভাইরাস দাবি করছে “নো কনটাক্ট”, কোন যোগাযোগ লেনদেন ্সব বন্ধ করতে হবে। অথচ  ব্যবসা বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের যোগাযোগই অর্থনীতি।  তাই সোজা মানে দাঁড়াল, আমরা ভাইরাস মোকাবিলায় যত সচেষ্ট ও সফল ততই যেন অর্থনীতি বিকল হবে – এ’এক অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে এখন আমরা দুনিয়ার সকলে।  সামগ্রিক এই পরিস্থিতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা একটা গ্লোবাল মহামন্দার দিকে যাচ্ছি, কেউ কেউ অবশ্য দাবি করছেন, আমরা ইতোমধ্যেই মন্দায় প্রবেশ করে ফেলেছি [Clear We Have Entered Recession That Will Be Worse Than 2009: IMF Chief]।

জি৭  ও জি২০
মহামন্দার শঙ্কা যে সবাইকে ভীত করে ফেলেছে এর সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হল, অকালে প্রথমে ‘জি৭ [G7]’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠক। আর পরে ‘জি২০’ [G20] অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক। কিন্তু এর আয়োজনের ধরন বলে দিচ্ছে, এ ধরনের গ্লোবাল সামিট হচ্ছে যার যার দেশে বসে ভার্চুয়ালি মানে ভাবের মধ্যে, যা দেড় ঘণ্টার এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ মাত্র। এখনকার আরেক গ্লোবাল হয়ে ওঠা শব্দ হল ‘ডিস্টান্সিং’ [distancing]। এর মানে হল, কাছে এলেও দূরে দূরে থাকা। প্রথমত আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বন্দী হয়ে বাস করতে হবে সবাইকে কিছু দিন বা হয়ত মাস। আর এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে যদি দেখা করতেই হয় তবে পাঁচ-সাত ফুট দূরে দূরে থেকে কথা বলতে বা লেনদেন করতে হবে। স্বভাবতই এমন গ্লোবাল পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার ঘণ্টা বাজারই এমন সময়ে ইমার্জেন্সি গ্লোবাল সামিট হবে দেড় ঘণ্টার, এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ – এটাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রজোট জি৭ সদস্য রাষ্ট্রগুলো হল – আমেরিকা, কানাডা আর সাথে আরো চার ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং এশিয়ার একমাত্র জাপান। এভাবে গ্লোবাল (মুলত) অর্থনীতিক পলিসিতে  সাত রাষ্ট্রের এক সমন্বয় গ্রুপ জি৭। এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপ জি৭-এর কোন রাজনৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা না থাকলেও তারা এক বিশেষ ক্ষমতার। কারণ কোনো ইস্যুতে (সাধারণত অর্থনীতির ও গ্লোবাল ইস্যু) তারা একমত হয়ে গেলে এর প্রভাব বাকি সব রাষ্ট্রের উপর অনেক বড় ও নির্ধারক হয়ে ওঠে। এর একটা বড় কারণ হিসেবে যেমন বিশ্বব্যাংকের মালিকানাই ধরা যাক; জি৭ দেশগুলোর বিশ্বব্যাংকের মালিকানা সব মিলিয়ে মোট ৩৫% এর বেশি হবে, যেখানে আমেরিকার একা মালিকানা  ১৮% এর মত। ফলে স্বভাবতই তাদের ঐক্যমতের সিদ্ধান্ত বাকি সবার জন্য অনেক ভারী ও খুবই নির্ধারক।
তবে উপরের কথাগুলো অতীত ঘটনা হিসেবে বলা সম্ভবত বেশি সঙ্গত।  কারণ এরা ‘পুরান জমিদার’, যার ঠাটবাট আছে কিন্তু বাস্তব মুরোদ আর নেই; শুকিয়ে ফোকলা হয়ে গেছে। পুরানা মাতবর আমেরিকার জায়গায় চীন এসে প্রবেশ করাতে আস্তে আস্তে অনেক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে, রঙ ফিকে হয়ে পড়ছে। আর সেই সাথে নতুনের আভা দেখা যাচ্ছে।
যদিও জি৭ নিয়ে অনেকে সবচেয়ে বিরক্তিকর ভাষায় বলার চেষ্টা করেন, এরা নাকি “সেভেন ডেমোক্রেসিজ”। কেন? চীনের বিরুদ্ধে পুরান ডাট দেখানোর জন্য। এমনিতেই ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটাই তৈরি করা হয়েছিল পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোপানোর জন্য   অ্যামেরিকান শব্দ হিসাবে। অরিজিনাল ক্লাসিক শব্দটা ছিল রিপাবলিক, এর বদলে ডেমোক্রেসি শব্দের আমদানি।  এছাড়া, একালে একা চীনা নেতৃত্বেই পাল্টা বিকল্প-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক হতে চাইবার মত প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে গেছে। জি৭ বা এর সদস্যরা এখনো (মুরোদ না থাকলেও গুণ-মানে) চীনের চেয়ে তারাই ভাল, এমন ভাব ধরার জন্য এটা বলে থাকে। ফ্যাক্টস হল একা চীনের এখন ঋণ- বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি। সে কারণে চীনা নেতৃত্বের নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই মাথা তুলছে, প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। মূলকথা, ইতোমধ্যেই তারা বিকল্প হিসেবে নিজেদের হাজির করে ফেলেছে। যেমন এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিশ্বব্যাংকের বদলে সরাসরি চীনের বা চীনের ‘বিশ্বব্যাংকে’র কাছে অবকাঠামো ঋণ নিতে যেতে পারেন।
আসলে লাশের বাক্সে শেষ পেরেকটা মেরেছে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street]। মানে, গ্লোল্ডম্যান স্যাসের [Goldman Sachs] মত দানবীয় বড় বড় অর্থবিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতীকী উপস্থিতি বা প্রধান অফিস যেখানে। গত ২০০৯ সালে তারা আওয়াজ তুলে বলেছিল জি৭ গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। কারণ এদের অর্থনীতি আর আগের মতো নয়, তাকত নাই বরং ঢলে পড়েছে। আর পালটা ততই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছে “রাইজিং ইকোনমি” [Rising Economy] বলে পরিচিত আরেক ক্যাটাগরির দেশগুলো যাদের জিডিপি সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে দ্রুত বাড়ছে। কাজেই ‘তাদেরও পুরানা জি৭-এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে আলাদা পরিসরে  জি২০ নামে জোট গড়া হোক। এই দাবি ছিল এমনই এক বাস্তবতা, যে তাই জি২০ গ্রুপ কার্যকর হয়ে যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করেন এরা দুনিয়ার টপ ২০টা ইকোনমির একটা গ্রুপ। সেটা যতটা না সত্যি, এর চেয়েও সত্য হল, চীন মানে যার নিজের আছে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাবাজার, সাথে আছে এর চেয়েও বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্য দেশে ঋণ-বিনিয়োগদাতা হয়ে হাজির হবার সক্ষমতা; আর পাশে ভারত যার অভ্যন্তরীণ ১৩৬ কোটির বড় ভোক্তাবাজার আর, উৎপাদন সক্ষমতার পটেনশিয়াল আছে; এ ছাড়া ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকা থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত মিলে গঠিত হয়েছে এই জি২০। তাই গত সপ্তাহে (২৬ মার্চ) জি২০ এর ভিডিও কনফারেন্সের নয় দিন আগে (১৭ মার্চ) জি৭-এর একই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হইয়ে যায়। বলাবাহুল্য, জি৭ জি২০ এর অংশ অবশ্যই। আর প্রতিটি জি২০ বৈঠকের আগে জি৭-এর সভা হয়ে যায়, যাতে ‘জি৭-ওয়ালা’রা মাতবরি নিবার সুযোগ পেয়ে গেলে জি২০-এর বৈঠকে একই স্বরে কথা বলতে পারে।

এদিকে ভাইরাসের ব্যাপকতায় এখন আর লুকানো থাকছে না যে, আসন্ন এক গ্লোবাল মহামন্দার মখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা সকলে। তাই জি২০ অর্থমন্ত্রীদের ভিডিও কনফারেন্সের মূল কথাটা ছিল, তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন অর্থ ঢালবেন যাতে গ্লোবাল বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এনিয়ে তাই রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম G20 leaders to inject $5 trillion into global economy in fight against coronavirus। জি২০ এর এখনকার চেয়ারম্যান সৌদি আরব। তার নেতৃত্বেই এ ঘোষণা দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার মানুষের চাকরি আর আয়ের ক্ষতি থেকে তাদের রক্ষা ও তা ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এনিয়ে আলজাজিরার শিরোনাম হল, ‘কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে গ্লোবাল অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াইয়ে জি২০-এর পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি [G20 pledges $5 trillion to defend global economy against COVID-19]।

কিন্তু তাহলে জি৭-এর বিবৃতি বা রিপোর্ট কই? সেখানে কী বলা হয়েছে?
সরি, সেটা নাই। কেন?  এর কারণ আসলে জি৭-এর সভা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেখান থেকে কোনো যৌথ বিবৃতি দিতেই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে। আর বলতে গেলে, এর কয়েকদিন পরে জি২০ থেকে ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

কেন জি৭ ব্যর্থ হল? কারণ, আমেরিকা একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে।  তাই এর খাড়া জবাব হুল, ট্রাম্পের আমেরিকা এক দায়িত্বজ্ঞানহীন তৎপরতা এর জন্য দায়ী। সেটা কীভাবে? এবার জি৭-এর সভা ছিল মূলত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে ঐ সভায় উপস্থিত মানে ভার্চুয়ালি ওয়েব কনফারেন্সে হাজির ছিলেন। আর তিনি যেন চাকরি রক্ষার্থে পাগলা প্রেসিডেন্টের আনুগত্যের এক চরম দশা দেখাতেই নিজের কোন বিদ্যাবুদ্ধিও খরচ করেন নাই। আর তাতেই বিবৃতি ড্রাফটের সময় তিনি গোঁ-ধরে বসেন যে, ভাইরাসটাকে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নয়, বরং ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলতে হবে। আর এতে স্বভাবতই ইউরোপীয়সহ কোনো সদস্য রাষ্ট্রই তা মানতে রাজি না হওয়ায় সব নস্যাৎ হয়ে যায়। সদস্যরা আর একমত হতে পারে নাই। কারণ তারা মনে করেছিল যখন ভাইরাস সামলাতে ঐক্য দরকার তখন একাজ হবে বিভক্তি তৈরি করা  [viewed it as needlessly divisive at a time when international cooperation is required to slow the global pandemic …]। ফলে ড্রাফট আর ফাইনাল পর্যন্ত যায় নাই। তবে এতে পরবর্তিতে ট্রাম্পকেই এর সব ‘কাফফারা’চুকাতে হয় অবশ্য।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী নভেম্বর মাসে। আর ট্রাম্প এবারো এতে প্রার্থী। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি চীনের বিরুদ্ধে এক বিরাট লড়াকু যিনি এই প্রথম জাতিবাদী-আমেরিকান হয়ে চীনের বিরুদ্ধে কথিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ লড়ছেন। এ্মন ইমেজ আর প্রপাগান্ডা জোরদার করতেই তিনি কোভিড-১৯ কে ‘য়ুহান ভাইরাস’ [চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী য়ুহানে সর্বপ্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়] বলে ডাকার বালকসুলভ আবদার ধরে বসেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, এমন প্রপাগান্ডায় কোন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তা করতে ট্রাম্প পারেন নাই। অক্ষম; তা এখন প্রমাণিত। কেন?
প্রথমত, সারা দুনিয়া মারাত্মকভাবে ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছে; হিমশিম খাচ্ছে যে, কী করে নিজ নিজ দেশের মানুষকে বাঁচানো যায়, মৃতের সংখ্যা কমানো যায়। যাতে এতে ন্যূনতম সফলতা আসা শুরু হলেই, এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা যাতে ভাইরাসের ক্ষতির উপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে না পারে তাই এর মোকাবেলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। অথচ ট্রাম্প এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে তিনি আছেন তার ব্যক্তিগত সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, তথা নির্বাচন নিয়ে। এছাড়া ট্রাম্পের এই অবস্থান নেয়া গ্লোবাল ঐক্যের বদলে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।
দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ী করার জন্য ট্রানপের দাবিই তো ধারাবাহিক নয়। যেমন, ঘটনার শুরুর দিকে তিনিই বিবৃতি দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছেন যে, চীন উদার হয়ে এই ভাইরাস সম্পর্কে সব তথ্য ও আপডেট খোলাখুলিভাবে আমাদেরসহ সবাইকে জানাচ্ছে শেয়ার করছে বলে। নিচের টুইট দেখেন।

কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিক সিনেটর টম কটন “করোনা চীনের জীবাণুযুদ্ধের অস্ত্র” যা “সম্ভবত হাত ছুটে বাইরে এসে পড়েছে” বলে অভিযোগ তোলেন। আর তা থেকেই ট্রাম্পের বয়ান ও অবস্থানও বদলে যায়। অথচ কটন তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি [Cotton provided no evidence for the claim and asserted that it was the Chinese government’s job to disprove it.]। বরং একটা ‘সম্ভবত’ বলেছেন। অর্থাৎ নিশ্চিত করে, এমন শব্দ দিয়ে নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে চীনও আমেরিকাই এই জীবাণু চীনে ছড়িয়েছে বলে পাল্টা দাবি জানায়। এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই ট্রাম্প ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলে তার প্রপাগান্ডা চালু করে দিয়েছিলেন। আর চীন এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয়া শুরু করে ছিল ১৭ মার্চ থেকেই।  কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থানের অসঙ্গতি হল, তাহলে শুরুতে তিনি কেন চীনের প্রশংসা আর ভাইরাস সামলানো ও তথ্য সবার সাথে শেয়ার করার প্রশংসা করেছিলেন।
ট্রাম্পের প্রপাগান্ডা করার ব্যাপারটাকে পাঠকের নিজেই বিচার ও বুঝে দেখার জন্য একটা ভিডিও এখানে আছে আগ্রহিরা এটা দেখতে পারেন
তৃতীয়ত, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপ  অসংলগ্ন অবস্থানের ট্রাম্প-এর হাত ছেড়ে দেয়া ছাড়া নিজেরাই নিরুপায় বোধ করেছিল। সে কারণে ‘জি৭’ ভিডিও কনফারেন্স  হয়ে পড়েছিল অকার্যকর ও স্থবির। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতির দুর্দশার মুখে নতুন উদ্যোগের এক ধারাও শুরু হয়েছিল। এর লিড নিতে আসে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু [WHO, World Health Org]। সংস্থাটি পরিষ্কার করে বলেছে এভাবে ‘উহান ভাইরাস’ বলে চীন-এশিয়া বা কোনো অঞ্চলকে দায়ী করা ঠিক নয়। এ কারণেই আমরা এর নাম কোভিড-১৯ বলে স্থির করেছিলাম”। ’সবচেয়ে কড়া কথাটা বলে ট্রাম্পকে সাবধান করেছেন হু এর এক নির্বাহী পরিচালক ডঃ  মাইক রায়ান। তিনি বলেন, ভাইরাসের কোন রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। আপনি কোন জাতি কোন রেস, গায়ের রঙ কী অথবা ব্যাঙ্কে আপনার কত টাকা আছে ইত্যাদি এসবের পরোয়া করে না। অতএব ভাষা ব্যবহারের সময় সাবধান – এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমরা এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারি না যেটা কোন বিশেষ জনগোষ্ঠির জাত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি তৈরি করে বসতে পারে”।

“Viruses know no borders and they don’t care about your ethnicity, the color of your skin or how much money you have in the bank. So it’s really important we be careful in the language we use lest it lead to the profiling of individuals associated with the virus,”  Dr. Mike Ryan, the executive director of WHO’s emergencies program,

বলতে গেলে ট্রাম্পকে তিনি একেবারে ছেঁচা দিয়ে যেন বলেছেন – আপনি কথা বলার আদব জানেন না; দায়ীত্বজ্ঞানহীন।  এযেন বলা আপনি ট্রাম্প এক রেসিষ্ট[racist], তাই আপনি চীন বা এশিয়ার কোন অঞ্চলের মানুষদেরকে নিচা দেখাতে তাদের দায়ী করছেন। আর এঘটনার পর সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে তাঁর রেসিজম বা বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য ছেঁকে ধরেন। উপরের লিঙ্কটা এক অ্যামেরিকান মিডিয়া CNBC থেকে নেয়া। ওখানে শুরুতে একটা ভিডিও ক্লিপ আছে আগ্রহীরা তা দেখে নিতে পারেন।

এরপরেই আসলে দ্রুততার সাথেই অবশেষে একটা সন্ধি হয়। যার প্রকাশ ঘটানো হয় আমেরিকায় চীনের রাষ্ট্রদূত, অন্য কথা প্রসঙ্গে আমেরিকান এক প্রেসের কাছে কথা বলার সুযোগ নিয়ে “চীন-আমেরিকার পারস্পরিক অভিযোগ তোলা থেকে” তিনি “দূরে থাকতে চান” বলে জানিয়ে দেন।  এই কথাটাকে হংকং এর এক মিডিয়া লিখেছে, “এতে পরিপক্ক আচরণ আবার শুরু হয় যখন চীনা বিবৃতিতে আকুল আবেদন জানানো হয় যে প্যান্ডেমিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, আর এতে ট্রাম্পও তারপর থেকে চাইনিজ ভাইরাস বলা বন্ধ করেন [Adult behaviour resumed as statements out of China urged the world to unify against the pandemic; Trump stopped calling it a “Chinese virus”.]।

ট্রাম্প এবার ২৪ মার্চে  প্রেসের কাছে বলেন যে, “তিনি করোনার জন্য জন্য চীন বা এশিয়ার কেউ দায়ী বলে মনে করেন না”।  মানে পুরা উলটা সুর এবার।  আর তাতে কয়েকদিন কূটনীতিতেই জি৭-এর ব্যর্থতার পরও ২৬ মার্চ জি২০-এর ভার্চুয়াল সভা থেকে সাফল্য আসে, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে ভাইরাসকে সবার জন্য বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে সবার জন্য ‘কমন হুমকি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।  ইতোমধ্যে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ডলার ছাড় করার জন্য তার পরিকল্পনা এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দেন। এক কথায় বললে, ট্রাম্পকেই নিজের ফেলা থুথু চেটে তুলে নিয়ে বিতর্ক শেষ করতে হয়। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো রিপোর্টিং করেছে হংকংয়ের ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। তারা ট্রাম্পের কান্ডকারখানা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনি কখন কী বলেছেন এনিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে।

ঘরের খবরঃ
এবার ‘ঘরের খবরে’র দিক। করোনাভাইরাস মানেই, এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে, যা মানুষ জানে তা হল, মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখা বা থাকা। আইসোলেশন বা ঘরে বন্দী হয়ে থাকা। ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে ছোঁয়া এড়িয়ে থাকা। কিন্তু এটা খুবই ব্যয়বহুল প্রতিকার। কেন?

দেশের মানুষকে তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাস (বা হয়ত এরও বেশি) একনাগাড়ে ঘরে বন্দী করে রাখার সোজা মানে হল, ওই সময়ের জন্য অর্থনীতি স্তব্ধ অচল করে রাখা। প্রতিটা স্থানীয় দেশের এবং গ্লোবাল দুই অর্থেই। অথচ সবার খরচ আগের মতোই। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন এক এস্টিমেট হচ্ছে ভারতের ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ৮০ কোটিকেই তাদের ভর্তুকি বা পুরা রেশন সরবরাহ করতে হবে, তাতে ভারতের রাজস্ব আয়ের ঘরের অবস্থা যাই থাকুক না কেন [The government aims to distribute 5kg of wheat or rice for each person free of cost every month, with 1kg of pulses for every low-income family, helping to feed about 800 million poor people over the next three months.]। ওদিকে পাকিস্তান করোনায় আক্রান্তদের ১২ হাজার রুপি করে অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ঘোষণা খুবই অপ্রতুল বা অগোছালো মনে হয়েছে। সব ঘটনা-দুর্ঘটনা একদিন না একদিন শেষ হয়েই যায়, করোনার প্রভাবও একদিন শেষ হবে। কিন্তু ততদিন আমাদের মানুষদের নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে হবে। এভাবে এথেকে যদি টিকে যেতে পারি, তা হলে আবার নতুন উদ্যোমে অর্থনীতি চালু করার সংগ্রামে নামতে পারব। কিন্তু ততদিন (অন্তত তিন-ছয় মাস) নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।  অথচ  আমাদের সরকার কেবল গার্মেন্টসশ্রমিকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেছেন। এর বাইরে শহরের রিকশাচালক থেকে গ্রামের দিনমজুর পর্যন্ত কথিত ইনফরমাল শ্রমিকদের কথা ভেবে আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা থাকতে হবে যা আমরা দেখছি না। যদিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু আছে হয়ত স্থানীয় উদ্যোগে। কারণ, তাঁরা যদি না খেয়ে ঘরে বা রাস্তায় মরে পড়ে থাকলে সেটা নিশ্চয় আমাদের জন্য ভাল অভিজ্ঞতা হবে না। বরং সেটা মহাবিপর্যয়কর কিছু একটা হবে। নিজের মুখ নিজেকে দেখানো  যাবে না এমন অবস্থা হবে। তাই যেভাবেই হোক এর জন্য ফান্ড জোগাড় করার  দায় আমাদের সরকারকে নিতেই হবে। অন্তত কথা বলতে হবে।

ইতোমধ্যেই মোট প্রায় ১৯০ এর বেশি সদস্যের মধ্যে  ৮০টি সদস্যরাষ্ট্র আইএমএফের কাছে লোন চেয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা কী, ঋণ-অনুদানের ব্যবস্থা কী আছে, জানতে হবে। এসবের মধ্যেই পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকদের দুর্দশা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ওদেরকে পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করে সামলানো যাবে না। এটা কোনো সমাধানই নয়। রাস্তায় গরীব মানুষ কাজে বা কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়লে কী করতে হবে এনিয়ে পুলিশের প্রতি নির্দেশ বাস্তবসম্মত, সম্মানজনক ও উপযুক্ত হতে হবে। এটা ২০২০ সাল। এখনো না খেয়ে মানুষ মরলে তা ঘটবে একমাত্র কুশাসনের কারণে। প্রধানমন্ত্রীকে ইনোভেটিভ হতে হবে। বিকল্প খুজতে হবে প্রোএকটিভ হয়ে। যারা বুড়া বয়েসে নির্বাহী প্রধানের ধামাধরা সুযোগ না পেলে নিজ উদ্যোগে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মসংস্থানের আর যোগ্যতা রাখে না এরা ইনোভেটিভ হবে এটা কষ্টকল্পিত। খেটে খাওয়া মানুষদের বাঁচাতে হবে। এটাই এক সফলতার চিহ্ন হবে। আর তা যদি সফল হই তবেই এরপরে আসন্ন গ্লোবাল মহামন্দা মোকাবিলার যোগ্য হব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ২৮ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  ভাইরাসে বেঁচে গেলেও গ্লোবাল অর্থনীতিতে কী হবে“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

গৌতম দাস

০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Us

 

Shringla’s visit, Independent Online /UNB

ভারত-রাষ্ট্র টিকে থাকার ন্যায়ভিত্তি হেলে গেছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নুন্যতম কিছু নৈতিকতা-সম্পন্ন একটা ন্যায়ের ভিত্তি থাকতেই হয়, নইলে সে প্রতিষ্ঠান টিকে না। রাষ্ট্র বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম একটা ন্যায়ভিত্তির উপর না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে সবার আগে প্রতিষ্ঠান মরাল [moral, নৈতিক শক্তি] হারায়, নৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। ভারত-রাষ্ট্র সেই সঙ্কটে আটকে গেছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেছে। কারণ, মোদীর ভারত নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী, তার সরকার ও দলই এর প্রযোজক বলে অভিযুক্ত। গত ২০০২ সালের গুজরাট ম্যাসাকারের সময় গুজরাট কোনো রাষ্ট্র ছিল না, একালের ভারতও নিছক কোনো রাজ্য নয়, এটা রাষ্ট্র। কাজেই কোনও কিছুই ২০০২ সালের মত ঘটবে না। পুনরাবৃতি ঘটবে না।  এদিকে নরেন্দ্র মোদী দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে এপর্যন্ত মুখ খোলেননি। একটা কথাও বলেন নাই। যে নৈতিক সঙ্কটে ভারত পড়েছে এই নির্বাক থাকায় সেটা আরো জটিল হবে। মোদীর সরকার ভারতের বাসিন্দাদের এই নৈতিক সঙ্কটে ফেলে দিয়ে গেছে যা ক্রমে নাগরিকদের হত্যা ও ম্যাসাকারের দায়বোধের অস্বস্তিতে বেঁধে ফেলবে। তাই সরকারি আমলা হিসেবে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এসময় বাংলাদেশ সফরে এসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা বলার শক্ত নার্ভ দেখিয়ে ফিরে গেলেন! এটাই তাঁর অর্জন! ওদিকে, সিল্লি ঘটনা বিস্তারিত ঠিক কী ঘটেছে এবং তা কিভাবে, এর ফ্যাক্টসের কিছু এর মধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরুও হয়েছে।

কেন শ্রিংলাঃ
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা এবার তাঁর দু’দিনের (২-৩ মার্চ) সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন। কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কোনও দেশ সফরের আগে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশ সফরে আসেন। আর তা মূলত নির্বাহী প্রধানের সফরকে নিশ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এ ছাড়াও, সফরে কেন ও কী কী ইস্যু উঠবে আর তাতে উভয়ের অবস্থান কী হবে এসব চূড়ান্ত করাও এর লক্ষ্য। যদিও এরপরেও অনেক কিছুই থেকে যায়, যাবে বা রেখে দেয়া হয় যা সফরকালে দুই শীর্ষ প্রধানের আলাপে ফাইনাল করা হবে। দেখা যাচ্ছে, মোদীর  বাংলাদেশ সফরের আগে সে উপলক্ষে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সচিবকে পাঠিয়েছিলেন। সেটা কোনো দোষ বা বড় ব্যতিক্রমের বিষয় না হলেও, অনুমান করা যায় সেটা ঘটেছে এই বিবেচনায় যে, ঢাকায় শ্রিংলার ‘তাজা বন্ধু’ অনেক বা তাঁর অন্য ভারতীয় কলিগদের চেয়ে তিনি এগিয়ে। কারণ, এই তো গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর কাটিয়ে  তিনি এদেশ ছেড়ে গেছেন। তার সেসব তৎপরতা ও স্মৃতি এখনো তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি কলিগদের সবার চেয়ে বেশি ‘তাজা’ বলে আর তখন যেসব বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক তিনি জমিয়েছিলেন, তা এখন কাজে লাগানোর বিচারে তিনি অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ঘনিষ্ট বন্ধুদেশ’  গভীর ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ অথবা কখনোবা বলা হচ্ছে এরা নাকি ‘স্বামী-স্ত্রী’ অথবা আরো কত কী যেগুলো সত্যিই ইউনিক, একেবারে তুলনা নাই। দুনিয়ার কোনো কূটনৈতিকপাড়ায় এমন অকূটনৈতিক অর্থহীন ও বোকা বোকা শব্দের ব্যবহার নেই। যদিও তা আসলে বাংলাদেশকেই গায়ে পড়ে নিচে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।

পশ্চিম এখন বুঝছে ‘হিন্দুত্ব’ কেন হুমকির বাপঃ
এই পটভূমিতে, শ্রিংলাকেই বেছে পাঠানোর এই ঘটনা – মোদীর ভারত যে ভালই বিপদে আছে এর আরেকটা প্রকাশ। শ্রিংলাকে এমন একটা সফরে আসতে হয়েছে যখন দুনিয়াজুড়ে মোদীর ভারতরাষ্ট্র নাগরিকের হিউম্যান রাইট রক্ষার দিক থেকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। এদিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ার সঙ্কটে পড়া এক রাষ্ট্র বলে ভারতকে দেখা হচ্ছে।  এধরণের ব্যর্থতাবিষয়ক মামলায়  জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইটস সংগঠন [UN-OHCHR] এই ব্যর্থতা নিয়ে আদালতের শুনানিতে অবজারভার হতে চেয়েছিল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এমিকাস কিউরি (amicus curiae OR  “friend of the court”] হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী আগাম ভয় পেয়ে, আপাতত এটা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণ হবে এই অজুহাত তুলে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং তেমন আলোকে বিবৃতি দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। এছাড়া অন্যদিকে জাতিসংঘের অবজারভার হয়ে চাওয়াকে মিথ্যা করে প্রপাগান্ডা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি মামলায় আবেদনকারি বা পিটিশনার হয়ে চেয়েছে। এনিয়ে দক্ষিণের দৈনিক দ্যা হিন্দুর নিজ লেখা সম্পাদকীয় আগ্রহীরা পরে দেখতে পারেন।

এদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ ভারত-রাষ্ট্রে নিয়ে আলোচনা পশ্চিমে এখন আর সংসদীয় কমিটির ছোট্ট পরিসরে আর নয়। মুসলমান হত্যার মোদীর ভারতকে সামলাতে এখন পশ্চিম সরাসরি স্ব স্ব পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নিয়েই মোদী-অমিতের তান্ডব আর হুমকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে BRUT Debate বা আমেরিকার সংসদে (প্রতিনিধি পরিষদে) দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব এখন একটা হট ইস্যু। ভারত থেকে মুসলমান উদ্বাস্তুর ঢল নামবে কি না আর সেক্ষেত্রে আগাম তা ঠেকানোর উপায় কী, আগানোর কৌশল কী, এটাই মুলত তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ভারত ১৩৫ কোটি মানুষের ভোক্তা-বাজারের এর দেশ। কিন্তু এর প্রতি লোভের চেয়েও ওখান থেকে সম্ভাব্য উদ্বাস্তুর ঢল অনেক বেশি বিপর্যয় আনবে, এটাই এখানে মুখ্য দুঃচিন্তা আর হুমকিবোধ।

দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিল্লিতে ৫৮ জনেরও বেশি মানুষ, মুসলমান বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে তিনি কোনো কথা, বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া কোনো কিছুই দেননি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের পক্ষ থেকে কোন আশ্বাস, ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়ানো, কোন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বসানো, হামলাকারিদেরকে আইনের আওতায় আনা ইত্যাদি যেগুলো এমন পরিস্থিতিতে সব রাষ্ট্রই নুন্যতম রুটিন কাজ হিসাবে করে থাকে – এমন কোন পদক্ষেপ মোদী নেন নাই।

মোদী-অমিত এখন এতই নিলাজ আর বেপরোয়া যে তাঁরা খোলাখুলিই ভারতের পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এতে প্রকারন্তরে ম্যাসাকারের দায় তাদের উপর সরাসরি এলেও তারা বেপরোয়া। অর্থাৎ মোদী তবু মূলত প্রতিক্রিয়া শুন্য। এই প্রতিক্রিয়াহীনতা অ-প্রধানমন্ত্রীসুলভ, তাই অগ্রহণযোগ্য; এমনকি মারাত্মক অস্বাভাবিক। আর এটাই মোদীর আর তাঁর সরকারের এতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে তীব্র করছে। এছাড়া এটাই  তাঁর সরকারকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার এক বিরাট সঙ্কট তৈরি করেছে।  আরও বড় কারণ হল, আপনি মুসলমান হলেই আপনাকে দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগানোর পর এবার তাই আপনাকে নিপীড়ন করে হত্যা করা জায়েজ – এই হল এখনকার নয়া নরমাল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা। এটা ভয়ঙ্কর!

অর্থাৎ মোদীর সরকার এখন নাগরিক বৈষম্যহীনতা কায়েম করা দূরে থাক,  ন্যূনতম ন্যায়নীতি পালন ও রক্ষারও অযোগ্য – এমন এক পরিচয় তুলে ধরতে বেপরোয়া হয়েছে। অথচ শ্রিংলার বিপদ হল, এই নৈতিকতার সঙ্কটে থাকা সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করতে তাকেীই সময় বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ লোক মুসলমান।

এসব বিচারে ভারতের হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে আমরা দেখছি তিনি ব্যাকফুটে ও নিষ্প্রভ। তা না হয়ে তার উপায় কী? এমনকি শ্রিংলার ঢাকায় থাকা অবস্থায় ৩ মার্চ আনন্দবাজারের এক রিপোর্টও তার সঙ্কটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পত্রিকা শিরোনাম করেছে বেসুরো ঢাকায় সফর শ্রিংলার“- আর তাতেই শ্রিংলার দফা-রফা। লিখেছে, “সিএএ-এনআরসি বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। দিল্লির হিংসা, সেই ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে দেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের একাধিক জনের ভারত সফর বাতিল করেছিল হাসিনা সরকার। আজ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন, বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফর”। এই খবর মোদী ও শ্রিংলার জন্য বিরাট অস্বস্তির সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি তারা সেন্সে থাকে!

বাংলাদেশের স্পিকারের ভারত সফর ছিল গত ২-৫ মার্চ। তিনি সফর বাতিলের ঘোষণা দেন মাত্র একদিন আগে, ১ মার্চ; যেনবা শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরে আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি। নিশ্চিত হতেই তিনি শেষ বেলায় এসে ঘোষণা দিয়ে দেন। শ্রিংলা ঢাকা আসেন পরের দিন ২ মার্চ। অর্থাৎ শ্রিংলা বাংলাদেশের স্পিকারের সফর বাতিলের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি বা তা পারেননি। মানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত “বড়ভাই” সুলভ ডাট দেখাবেন এমন অবস্থা – না ভারতের না শ্রিংলার সে মুরোদ আর অবশিষ্ট আছে মনে হচ্ছে না। এমনই করুণ অবস্থা! অর্থাৎ এটা মেনে নিয়ে হলেও ব্যাকফুটে থাকাতেই স্বস্তিবোধ করছেন শ্রিংলা।

শ্রিংলার সেমিনারঃ
শ্রিংলা ২ মার্চ সকালে বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় হাইকমিশনের সহ-আয়োজক হয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করেছিল। এটা ছিল ‘”বাংলাদেশ ও ভারত : একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ” এই শীর্ষক এক সেমিনার।   কিন্তু এবারের সফরে শ্রিংলার দুর্ভাগ্য যে, তাকে সরাসরি ডাহা অসত্য বলেই পার পেতে হবে, অন্য রাস্তা নেই। তাই তিনি আসলে ঐ সেমিনারে  ভান করলেন যে, এনআরসি ইস্যুটা যেন এখনো কেবল আসামেই সীমাবদ্ধ বা  সেখনেই কেবল আটকে আছে।  তাই শ্রিংলা বললেন, “ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে” – এমন ডাহা মিথ্যা চোখ বুঝে বললেন। অথচ  তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেননি যে, তিনি এবার “ভারতজুড়ে এনআরসি করবেন”। অথচ অমিত এটা কোনো জনসভায় বলেননি,  খোদ সংসদে এবং মন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। কাজেই এটা কোনো দলের নয়, ভারতের সরকারি অবস্থান। এছাড়া এটা তো ভারতের কোন বিরোধী দল, এমনকি কোন মিডিয়া মানে নাই। এছাড়া মোদী এমনকি দিল্লিতে নির্বাচনে হারের পরেও বলেছেন, আপাতত এনআরসি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর ভারতজুড়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএর বাস্তবায়নে মেতে উঠবেন তিনি।

তাহলে শ্রিংলা কেন এখনও এনআরসিকে ‘আসামের ঘটনা’ বলছেন? ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা মিডিয়াও তো তার কথা মেনে নেয় না। এযুগে ভারতের সরকারের কে কী প্রতিদিন বলেন তা বাংলাদেশে বসে জানা কি খুবই কঠিন! এনআরসি এখন ভারতজুড়ে বাস্তবায়নের ইস্যু আর এটা এখন এনআরসি-সিএএ ইস্যু। অথচ শ্রিংলা সেমিনারে বলে গেলেন এনআরসি ‘প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায়’ চলছে। তাই তিনি দাবি করলেন, ” … সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের ওপর এর কোনো প্রভাব থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি”।  আসলে তিনি জানতেন কেউ তার এ কথা এ দেশে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু তবু এই চাতুরী ছাড়া কিইবা তিনি করতে পারতেন? সম্ভবত এত অসহায় অবস্থায় হয়ত তিনি এর আগে নিজেকে দেখেননি!

তিনি আরো বানিয়ে বলেছেন, সিএএ বা “নাগরিকত্ব বিল কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়”।  বলেছেন দ্বিতীয়ত, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে এসে যারা ভারতে আছেন, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব দেয়াই এর উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়ত, এটা (বাংলাদেশের) বর্তমান সরকারের সময়ের জন্য কার্যকর হবে না। কার্যকর হবে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসক ও অন্য সরকারগুলোর সময়ে, যারা এখানে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি”। এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। কারণ সিএএ আইন প্রযোজ্য হবে বা এর কাট অফ ডেট হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪। মানে এর আগে যারা ভারতে প্রবেশ করবে তাদের সবার উপরে প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেবল ‘১৯৭৫-পরবর্তী’ সময়টার ক্ষেত্রে  এই আইন প্রযোজ্য হবে এই কথাটাই পুরা ভুয়া, ভিত্তিহীন। বুঝাই যায় হাসিনা সরকারের মন পাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সিএএ আইনের মধ্যে তিন দেশে থেকে আসা সম্ভাব্য হিন্দুদের কথা বলার সময় বাংলাদেশের নাম সরাসরি আইনে উল্লেখ করা আছে এবং তা আছে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ বাংলাদেশ সরকার হিসাবে।  কাজেই এটা সরাসরি হাসিনা সরকারকেও ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ অভিযুক্ত করেই আইনটা লেখা হয়েছে।  অথচ, ভারত এখন বাংলাদেশকে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে’ আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পেশের আগে না দিয়ে আবার উলটা  আইনের ভাষ্যটা শ্রিংলা বা ভারত সেকথা লুকাতেছেন।  মূলত বাংলাদেশের নাম না উল্লেখ করলে  বিজেপি দলের লাভ হয় না। কারণ  আইনের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছে এজন্য যে – পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণ করতে বা হিন্দু ভোট সব নিজের রাজনৈতিক ঝুলিতে পেতে এমনটাই বিজেপির দরকার; সেক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যাটা যাই হোক।

অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বন্টনের মুলাঃ
বাংলাদেশে এই সফরে শ্রিংলা আরেক বিরাট মুলা ঝুলিয়েছেন – তিস্তার পানি তো বটেই, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৪ যৌথ নদীর মধ্যে আরো নাকি ছয়টি নদীর পানি ভারত দিবে এই চুক্তি নাকি প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এটা শ্রিংলার দাবি। এটা অবিশ্বাস্য আর ভারতকে বিশ্বাস করার মত আমাদের আস্থা তারা অনেক আগেই হারিয়েছে। আসলে ঐ সেমিনারে শ্রিংলা এমন সব কথা বলেছেন, যা দেখেই বুঝা যায় বানানো কথা বলছেন। আর মিথ্যা বলে  মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, “এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত”। এটা কোনভাবেই ভারতের মনের কথা না কারণ এটা ভারত অনুসরণ করে আসছে অথবা এখনও করছে এমন নীতি পলিসিই নয়। এককথায় এখন এটা ভারতের অবস্থানই নয়, এ’পর্যন্ত ভারতের অনুসৃত নীতিই নয়। কার্যত তাদের অবস্থানটাই উল্টা।

আমরা দেখছি ‘পরিবেশের’ কথা তিনি বলেছেন। যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনায় টেকনিক্যাল নিয়ম হল, নদীর “অবাধ” প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। অথচ এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশবোধ শূন্য এবং তাদের ভূমিকা পরিবেশবিরোধী। ভারত বহু আগে থেকেই হয় নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়েছে, না হলে আন্তঃনদী যুক্ত করার মতো চরম পরিবেশবিরোধী প্রকল্প নিয়েছে। আর তাও না হলে নদীর মূল প্রবাহ থেকে বড় খাল কেটে পানি বহু দূরে টেনে নিয়ে গেছে। এই হলো ভারতের কথিত পরিবেশবোধের বাস্তব অবস্থা।
আর টেকসই? নদীর উপর যথেচ্ছাচার যেসব বাড়াবাড়ি ভারতে হচ্ছে তাতে নদীর “অবাধ” প্রবাহ ধ্বংস করে যা কিছু করা হয়েছে সেগুলো একটাও টিকবে না, বরং মূল নদীই শুকিয়ে যাবে ক্রমেই। ফারাক্কা ইতোমধ্যেই এ অবস্থায়। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ভারতের বিহারে প্রতি বছর বন্যার কারণ বলে অভিযোগ উঠছে এখন লাগাতর প্রতিবছর।
আর ন্যায়সঙ্গত বণ্টন? মানে যৌথ নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনটা কী ? যেকোন যৌথ নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রাপ্য, সমান হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত আইনত বাধ্য। এছাড়া আমাদের সম্মতি ছাড়া বাঁধসহ নদীর প্রবাহকে যেকোনভাবে বাধাগ্রস্ত করাটাই বেআইনি। অথচ ভারতের সাথে নদীর পানি বণ্টনের যেকোন আলোচনায় তাদের দাবি অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হতে হবে – “ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পরে পানি থাকলে তবেই তা বাংলাদেশ পাবে”। মানে তারা হল জমিদার – এই নীতিতেই ভারত চলে। একারণে  প্রায় সব সময়ের বাড়তি যুক্তি হল ‘এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই আরো কম পানি পাবে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ ভাটির দেশ হিসেবে পানি আমাদের প্রাপ্য এই আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তারা কখনও মানে নাই। কথা হল, ভারতের পানির প্রয়োজনের কী কোনো শেষ  থাকবে?
সোজা কথা ‘পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন’ এই শব্দগুলো শ্রিংলা তুলেছেন- কথার কথা হিসেবে এবং মন ভুলাতে। অথচ না পরিবেশ রক্ষা, না আন্তর্জাতিক নদী আইন – কোনটাই ভারতের চলার ভিত্তি বা সরকারের নীতি নয়। মিথ্যা বলাটা সবাই পারে না, বুক কাঁপে। আসলে শ্রিংলা দেখালেন, পুরো মিথ্যা বানোয়াট কথা বলার মত শক্ত নার্ভ তার আছে। আর সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, বাংলাদেশ তবুও তাকে বিশ্বাস করবে বা আস্থা রাখবে – সেটা যাক তাকে মিথ্যাই বলতে হবে!

দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?
আবার ফিরে যাই, এবার দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?  বাংলাদেশে এসে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লি ম্যাসাকার নিয়ে একটা কথাও বলেননি। এক্ষেত্রে তাঁর অজুহাত সম্ভবত, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তাই। কিন্তু বাস্তবতা হল – লাগাতার তিন দিন ধরে এ হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকার চলেছে; দিল্লি জ্বলেছে, কমপক্ষে ৫৮ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের বাড়িঘর যতটুকু যা যা বাড়িঘর সম্পদ সব কিছু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন সবার একভাবে যায় না। এই প্রথম কারা সুনির্দিষ্টভাবে দিল্লি ম্যাসাকার করেছে তার কিছু তথ্য সামনে আসা শুরু হয়েছে।

দিল্লি ভারতের বিশেষ মর্যাদার টেরিটরি, তা সত্ত্বেও ওর ভিতরেই দিল্লি একটা রাজ্য। তাই রাজ্যের ‘বিধানসভা’ নামের একটা সংসদ (প্রাদেশিক পার্লামেন্ট) আছে। সেখানে রাজ্য নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করতে পারে, যা কেবল নিজ রাজ্যের ওপর প্রযোজ্য। দিল্লির বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে এমনই একটা আইন পাস করা হয়েছিল, যার নাম ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট ১৯৯৯’। ব্যাপারটা তুলনা করে বললে এদিকে বাংলাদেশে একটা ‘মানবাধিকার কমিশন’ আছে। আর তা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যত স্বাধীন নয়। আইনের মারপ্যাঁচ ও দুর্বলতায় এটা আমাদের নির্বাহী ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়েই চলে। সে তুলনায় ভারতের অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কমিশনগুলো এত ঠুঁটো নয়। বরং এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এবং ভারতের আদালতের পর্যায়ে স্বাধীন। যেমন ভারতের “জাতীয় নারী কমিশন” যথেষ্ট প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ব রাখে। তেমনি ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে দিল্লি রাজ্য সরকার এক ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন’ (ডিএমসি) গঠন করে রেখেছে। এখানে ঘোষিত মাইনরিটি হল, – The notified Minority Communities, as per the Act, are Muslims, Christians, Sikhs, Buddhists and Parsis.। আর এর মূল কাজ হল, ‘সংখ্যালঘু বা মাইনরিটিদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা’ [To safeguard the rights and interests], যা যা ভারতের কনষ্টিটিউশন মাইনরিটিদেরও নাগরিক অধিকারে সমতা-সাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই DMC কমিশনের ক্ষমতা পুরোটাই আদালতের পর্যায়ের না হলেও তারা অনেক ক্ষমতাই রাখেন। যেমন গত ২৫ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে নর্থ দিল্লিতে কার্ফু জারি করতে তারাই  অনুমোদন দিয়ে চিঠি দেওয়াতে পুলিশ তা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পরে ম্যাসাকার, তান্ডব কমে আসলে পরে, সেই ডিএমসি সরেজমিন দিল্লির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর শেষে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এছাড়া অচিরেই একটা “ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি” গড়ে তারা মাঠে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, যে কমিটিতে আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছে। এই কমিশন বা ডিএমসির চেয়ারম্যান হলেন জাফরুল ইসলাম খান [Zafarul-Islam Khan] ও অন্য সদস্য হলেন কারতার সিং কোচ্চার [Kartar Singh Kochhar]। এরাই প্রথম সরেজমিন রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ বর্ণনা আছে সেই রিপোর্টে। তাদের প্রথম কথা হল, এই হামলা ‘একপক্ষীয়’ এবং ‘পূর্বপরিকল্পিত’ [‘one-sided, well-planned’]। অর্থাৎ এটা কোনধরণের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি বা রায়ট নয়। অথবা এটা হঠাৎ উত্তেজনায় ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং আগেই পরিকল্পনা করে ঘটানো এক ম্যাসাকার-সন্ত্রাস। এছাড়া এই প্রত্যক্ষ মাঠ-সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তাদের কথা বলার সময় জাফরুল ইসলাম খান সাহেবের করা আরও কিছু মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

তাঁর ফাইন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় মন্তব্য হল, প্রায় দুই হাজার বহিরাগতকে পরিকল্পিতভাবে নর্থ-ইস্ট দিল্লিতে এনে, কয়েকটা স্কুলে রেখে তাদের দিয়ে এই ম্যাসাকার, হত্যা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। [“There were approximately 1,500 to 2,000 people who had come to these areas from outside to create trouble,” ]। এর প্রমাণ হিসেবে এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ান তারা সংগ্রহ করেছেন। তার নাম রাজকুমার। তিনি রাজধানী স্কুলের এক গাড়ির ড্রাইভার। তিনি বলেছেন, এরকম ৫০০ বহিরাগত যাদের মুখে মুখোশ ছিল। এরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই স্কুলে অবস্থান করেছিল। তারা সাথে পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র ছিল আর এক ধরনের ‘বড় গুলতি’ ব্যবহার করেছিল উঁচু দালান থেকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারার জন্য। কমিশনও বলেছে, তারা এমন কিছু ব্যক্তির ফুটেজও সংগ্রহ করেছেন।

“Mr. Kumar told us that some 500 persons barged into his school around 6.30 p.m. on February 24. They wore helmets and hid their faces. They remained there for the next 24 hours and went away next evening after the arrival of police force in the area. They were young people who had arms and giant catapults which they used to throw petrol bombs from the school rooftops,”

এ ছাড়া জাফরুল ইসলামের দাবি, তারা জেনেছেন প্রত্যেক গলি থেকেই স্থানীয় অন্তত দু-একজন সহযোগী ছিল যারা মুসলমানদের বাড়ি , দোকান, গুদাম বা সম্পদ কোনগুলো, তা দেখিয়ে দিয়েছে। যাতে কেবল সেগুলোতেই আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এভাবেই ‘যমুনা বিহার’ এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই কেবল বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পদ পোড়ানো হয়েছে।

Muslim-owned shops like a travel agency and motorcycle showroom were looted and torched while Hindu-owned shops were left untouched.

এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা নিয়ে আবার লুকোচুরি শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ ‘মেনস্ট্রিম মিডিয়া’ এটা ছাপেইনি। সবচেয়ে বিস্তারিত ও সাহসী ভাবে ছেপেছে দক্ষিণের ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। এ ছাড়া ওয়েব পত্রিকা ওয়াইর (wire) আর নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এটা ছেপেছে। আরো কিছু পত্রিকা ছেপেছে, তারা কেবল সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের শর্ট ভার্সনটা ছেপেছে। তবে একটা ইউটিউব ভার্সন পাওয়া যায় এমন এক সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ‘এইচডব্লিউ নিউজ নেটওয়ার্ক (HW News Network) থেকে। সেখানে এ নিয়ে নিউজ ছাড়াও চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ফ্যাক্টস বাইরে আসা শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেও মোদী-অমিত কোনো কৌশল গ্রহণ করবেন, ধামাচাপা দিবার চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০৭ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে নৈতিক ভিত্তি হারানো একটি সফর – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

 ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

গৌতম দাস

 ০২ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2TE

 

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যুবায়ের – রয়টার্স

দিল্লির ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকান্ড ভারত-রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। রাষ্ট্র ‘ভেঙে পড়া’ মানে অকার্যকর হয়ে পড়া বা টুকরো হয়ে যাওয়া। সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন মানে, সিএএ’র বিরোধিতা আর দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় হার এসবের বদলা-প্রতিশোধ নিতে মোদী-অমিত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।  দিল্লি জ্বলছে, ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৪২ জন এই জিঘাংসার বলি।

বৈষম্য বা রাগবিরাগের প্রধানমন্ত্রী মোদী
মোদী-অমিতের মনে কী আছে তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবার। ভারত-রাষ্ট্রের মুখ্য দায়ীত্বে থাকা ব্যক্তিদুজন যে কতটা নৃশংস হয়ে উঠতে পারে সেটা এখন প্রমাণসহ হাজির হয়ে গেছে।  যেমনঃ জেলা শহরের ছোট এক হাসপাতাল [Al Hind Hospital, a nursing home] থেকে কয়েকজন মুসলমান রোগীকে আরও চিকিৎসার প্রয়োজনে বড় হাসপাতালে [GTB বা Guru Tegh Bahadur Hospital ] স্থানান্তর করতে পুলিশ প্রটেকশনের অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে দরখাস্ত দেয়া হয়েছিল। পুলিশ তা সন্ধ্যা পর্যন্ত করেনি। এ দিকে বিবিসির এক ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, রোগী বহনরত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের ওপর হামলা করা হয়েছে। রড দিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে আর এক মেডিক্যাল কর্মী আবেদন করে বলছে – “এটা তো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। তাই হিন্দু-মুসলমান যেই হোক সবার প্রয়োজনে আমাদের সাড়া দিতে হবেই। কাজেই আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার তো কিছু নেই”।
এসব বিবেচনা করেই রোগীর আত্মীয়স্বজনরা উকিলের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর দিল্লি রাজ্য-হাইকোর্টের  প্রধান বিচারপতি এস মুরলীধর [ঐ মামলার পর এখন বদলি করে দেয়া হয়েছে] এর সাথে যোগাযোগ করেন। বিচারক তৎক্ষণাৎ আদালত বসানোর ব্যবস্থা করে রিট আবেদন শুনে এর নিষ্পত্তি করে পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে সহযোগিতা করার আদেশ দেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঐ বিচারককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার হাহকোর্টে বদলি করে দিতে, পেন্ডিং এক বদলির আদেশ চাঙ্গা করে আর প্রেসিডেন্ট কোবিন্দ তাতে সই করেছেন। আর তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করতে নির্দেশ জারি হয়েছে। পরদিন মোদীর এক মন্ত্রী এ ঘটনায় সাফাই দিয়ে বলেছেন, এটা রুটিন বদলি।
মোটেও তা নয়। বরং মোদী সরকারই প্রধান দোষী। অসুস্থতার চিকিৎসায় মানবিক কারণেই রোগীকে সরকারের আগ বাড়িয়ে সহায়তা দেয়া উচিত ছিল। এটা ছাড়াও, নাগরিকের চিকিৎসাকাজে সহায়তা পাওয়া, রোগী মুসলমান হন আর না হন তা রোগীর নাগরিক অধিকার। অথচ তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, মূলত মুসলমান বলে। এভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়েছে। একজন বিচারপতি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক আদেশ দিয়েছেন। অথচ সরকার তাকেই বদলি করে দিয়েছে।
অনুমান করি, আসলে মোদী সরকার ভয় পেয়েছে যে সরকারের বিরুদ্ধে এই বিচারক মুরলীধর এর এমন আদেশ দেয়া চালু রাখলে অমিত শাহের দিল্লির পুলিশের প্রটেকশনে মুসলমানদের উপর হামলার বিরুদ্ধে সবাই দলে দলে ঐ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া শুরু করতে  পারে। কারণ ইতোমধ্যে ঐ রাতেই ঐ একই আদালত আরো দু’টি রিট মামলার নিষ্পত্তি করে রায় দেন। সে কারণেই সকালে যেন ঐ বিচারক আর আদালত বসাতে না পারেন, সে ব্যবস্থাটাই বন্ধ করে দিয়েছে মোদী সরকার। সারা দুনিয়ার অধিকার প্রসঙ্গে সংবেদনশীল কোনো প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের নাগরিক বৈষম্য ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নেয়ার করা চিন্তাই করতে পারে না। অথচ মোদী-অমিত নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা ও নাগরিককে নিরাপত্তাদানের জন্য শপথ নিয়েও তা ভঙ্গের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কেন? এটাই তাদের মন যে রিরি করা ঘৃণায় পরিপুর্ণ হয়ে আছে এরই প্রমাণ।
অমিত-মোদী এখানেই থামেন নাই।  তারা বিচারক মুরলীধরের সিদ্ধান্ত ক্ষুব্ধ হয়ে তাতে আরও বাধা সৃষ্টি করেছেন। হাসপাতালে পৌছানোর পথে পুলিশ বসিয়ে আবার বাধা দিয়েছে। আর এর শক্ত প্রমাণ এর হল দুটা ভিডিও ক্লিপ যা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে আছে।  আর বড় হাসপাতালে [GTB] রোগীদের সাথে যেতে আলহিন্দ হাসপাতাল থেকে আসার সময় একজন ডেন্টিস্ট ডাক্তার তাদের সবাইকে এসকর্ট করে সাথে আসছিল। সে ডাক্তারের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষ্যের বর্ণনা ইংরাজি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়  পয়লা মে “Eyewitness account: Delhi Police beat up wounded riot victims, said if he dies, he dies’ ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছে। তাতে ঐ ডাক্তার [তাঁর নাম, ডাঃ মেরাজ বিন একরাম] ঘোষণা দিয়েছেন তাঁকে যদি আবার সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়া হয় তবে যেকোন পরিণতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। [Ekram added: “This is the truth. If I have to face consequences for telling the truth, I will.”]।

বাংলাদেশে যেমন ফেক বা ভুয়া নিউজ চেক করে সত্যতা যাচাই করার ওয়েব গ্রুপ আছে “ফ্যাক্ট চেক” [Fact Check] নামে; সেরকম ভারতের একটা গ্রুপের নাম অল্ট. নিউজ [Alt.News]। তারা আরও একটা প্রায় একই রকম ভিডিও দেখে বিচার করে নিশ্চিত করে দিয়েছে যে ভাইরাল হওয়া আগের ক্লিপটা ফেক নয়, বরং জেনুইন। ইংরাজী টেলিগ্রাফ পত্রিকা  আরও জানিয়েছে,  তারা পুলিশের মুখপাত্রকে এনিয়ে করা ফোনের বা টেক্স ম্যাসেজের কোন সাড়া তিনি দেয় নাই।  আসলে পুলিশের গ্রুপ যেটা রোগীদের হাসপাতালের পৌছানোর পথে এই গুন্ডামি – অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী বা অজ্ঞান রোগীকে আবারও রড দিয়ে পিটিয়ে জাতীয় সঙ্গিত গাইতে বাধ্য করা ইত্যাদির ন্যুইসেন্স করছিল  সেটা ছিল একটা হাইরাইজ আবাসিক বিল্ডিং এর নিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আর ঐ বিল্ডিংয়ের দুই বাসিন্দাই উপর থেকে মোবাইলে ঐ ভিডিও ধারণ করেছিল।  তাই, পুলিশের কাছে এর সেখবরই ছিল না। সে কারণে এই অকাট্য প্রমাণ রয়ে গেছে।
এই ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সাথে থাকায় শুধু দিল্লি পুলিশের প্রধানই নয়,  এই মারাত্মক অপরাধের সাথে কমিশনার ও পুলিশ প্রধানের সরাসরি বস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শাহের বস প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ জড়িত সকলের নাম জড়িয়ে গেছে এখন। অথচ নাগরিক বৈষম্য দূর করা রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্রসহ যেকোন রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য ও রাষ্ট্রবৈশিষ্ট্য। ঘটেছে উলটা – বৈষম্য করা বা রাগবিরাগের বশবর্তী হয়ে পরিচালিত হওয়ার অপরাধ করে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের মন্ত্রী। এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ও অকার্যকর হয়ে পড়ার আগের লক্ষণ।

এটা দাঙ্গা নয়, পরিকল্পিত ম্যাসাকার
লক্ষণীয় যে, দিল্লির এই ম্যাসাকারগুলো হয়েছে গত দিল্লি নির্বাচনে হাতেগোনা যে ক’টা আসনে বিজেপির প্রার্থীরা জিতেছে কেবল এমন কনস্টিটুয়েন্সিতে। তবুও দিল্লিতে এই ম্যাসাকার, এটা কোনো দাঙ্গা ছিল না। এটা ছিল একপক্ষীয়ভাবে মুসলমানদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন করে জিঘাংসা চরিতার্থ করা, যাতে তারা ভয়ে চুপ করে আরও মার্জিনাল হয়ে বসবাস করতে শুরু করতে বাধ্য হয়, মেনে নেয়। এনিয়ে আনন্দবাজারের এক রিপোর্টের শিরোনাম, – “গুজরাতের মতো দাওয়াই না দিলে চলবে না! শাসানি দিল্লিতে”। অর্থাৎ এটা ছিল গুজরাট স্টাইলে দাওয়াই – দাবড়ে দেয়া!
আগেও বলেছি, প্রশাসনিক কাঠামো হিসাবে  দিল্লি একটা রাজ্য হলেও এটা আবার ভারতের রাজধানী বলে কনস্টিটিউশন অনুসারে দিল্লির পুলিশ প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। তাই  অন্যসব রাজ্যে তাদের মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে রাজ্য পুলিশ প্রশাসন থাকলেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিলালের অধীনে কোন পুলিশই নাই। এটাকেই সুযোগ হিসাবে নিয়ে সদ্য দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় হেরে গেলেও এই অমিত শাহ দিল্লির ওপর ছড়ি ঘুরাতে, ম্যাসাকার করতেই বেছে নিয়েছিলেন এক পুলিশ প্রধান হিসাবে, কমিশনার ‘অমূল্য পট্টনায়েককে’। উনি ইতোমধ্যে রিটায়ার্ড অথচ তাকে এক মাসের এক্সটেনশন দিয়ে অ্যাকটিভ করে দিল্লির পুলিশ কমিশনার করে রেখে দেয়া হয়েছে, কুকামগুলো সম্পন্ন করে নেয়ার জন্য। ইতোমধ্যে তিনি অবসরে চলে যাওয়াতে এখন ঘটনার দায় ঢাকতে সুবিধা হবে – এই হল অমিত শাহের অনুমান।  কয়েক দিন আগে কাপড়ে মুখ ঢেকে জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে [JNU] (ও জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও) একইভাবে পুলিশের প্রটেকশনে বিজেপির কর্মীদের হলে ঢুকতে দিয়ে, সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে এই পট্টনায়েকই হামলা করিয়েছেন বিজেপিবিরোধী ছাত্র সংসদের সদস্যদের ওপর। হামলা সম্পন্ন করার পর পুলিশি প্রটেকশনে হামলাকারি বিজেপির ছাত্র সংগঠনের কর্মিদের বের হয়ে চলে যেতে দেন। এরপর রাস্তার বাতি ফিরে জ্বালিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল।
দিল্লির চলতি ম্যাসাকারের বেলাতেও এই কমিশনারের পুলিশি প্রটেকশনে বিজেপি-বজরং-হিন্দুসেনা কর্মিদেরকে নিরাপত্তা এসকর্ট দিয়ে এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাদের দিয়ে বেছে কেবল মুসলমানদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা নির্যাতন আর তাদের বাড়িঘর, সম্পত্তি লুটপাট ও জ্বালিয়ে দেয়ার তাণ্ডব ঘটিয়েছেন তিনি। দিল্লিতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে যেসব ও যে পরিমাণ উপাদান বা অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখে এক পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, এগুলো সংগ্রহ করতে কমপক্ষে দু’সপ্তাহের প্রস্তুতি লেগেছিল। অর্থাৎ এটা একটা পরিকল্পিত হামলা।

গঙ্গাজল
নৃশংসতা নিয়ে ভারতের বিহারের একজন প্রযোজক-পরিচালক একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন – নাম ‘গঙ্গাজল’। সেখানে ‘গঙ্গাজল’ বলতে এসিড বুঝানো হয়েছিল। মানে, নৃশংসতা হিসেবে জীবন্ত মানুষের চোখ এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া। দিল্লির হামলাতেও বিজেপির কৌশল ছিল ‘গঙ্গাজলের’। এ পর্যন্ত অন্তত চারজন নিরীহ মুসলমানকে হাসপাতালে কাতরানো অবস্থায় পাওয়া গেছে, যারা এখনো বেঁচে আছেন কিন্তু তাদের চোখ এসিড ঢেলে গলিয়ে দেয়া হয়েছে। ভিন্ন ঘটনায়, এসিডসহ এর বহনকারী চার বজরং কর্মীও আটক হয়েছে যারা সিএনজিতে চড়ে যাচ্ছিল [অটোর ভিতর থেকে অ্যাসিডের বোতল-সহ আটক করা হয়েছে চার যুবককে]

আশ্রয় ও নিরাপত্তার খোঁজে – আনন্দবাজার

এদিকে প্রায় সপ্তাহজুড়ে হামলা শেষে দিল্লিতে এখন শুরু হয়েছে মাইগ্রেশন। মুসলমানেরা বাড়িঘর ছেড়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পরিবার নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন শহরের পাড়া বা কনস্টিটুয়েন্সিতে বন্ধু-আত্মীয়ের বাসা খুঁজে ফিরছে।
এসিড হামলা নিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে এক লোমহর্ষক রিপোর্টঃ

“…আর একটি উদ্বেগজনক বিষয়, মুস্তাফাবাদ থেকে আজ বেশ কিছু আহত এসেছেন হাসপাতালে। তাঁদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন। খুরশিদ নামে এক জনের দু’চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তেগ বাহাদুর হাসপাতাল থেকে লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালে আসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও পাননি তিনি। গিয়েছেন রিকশায়। দুই চোখ-সহ পুরো মুখ ঝলসে গিয়েছে ওয়কিলের। …এটা স্পষ্ট, আগুন লাগানো, পাথরবাজি, গুলির সঙ্গে ‘গঙ্গাজল (অ্যাসিড)’-এরও আয়োজন করা হয়েছে রীতিমতো  আট ঘাট বেঁধে।”

আবার অমিত শাহের কৌশল ইতরামিতে এতই প্রখর যে আগেভাগেই আদালতে  মোদীর সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা … দিল্লি হাইকোর্টকে জানিয়েছেন, “পুলিশকে নাকি অ্যাসিড হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে”। মানে আগেই হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন তিনি।

মোদী-অমিত বিপদঃ
পাবলিকের উপস্থিতি যেখানে মদী-অমিতকে চেহারা দেখাতেই হয় সেসব কিছু এড়িয়ে পালিয়ে ফিরছে মোদী-অমিতও।  এই সময়টা মোদী-অমিত বিরাট বিপদের সুতার উপরে হাঁটছেন। ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বাড়ছে দেখে মোদী-অমিত ভয়ও পেয়েছেন মনে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর ছিল ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাও ২৪ তারিখটা সরাসরি গুজরাটে নেমেই। আর ২৫ তারিখটা তিনি ছিলেন দিল্লিতে রাতে ডিনার শেষ করা পর্যন্ত। কিন্তু এটা আর এখন লুকানোর কোনো সুযোগ নেই যে, অমিত শাহ পরিকল্পিত হামলা শুরু করিয়েছিলেন নিজ দলের কপিল মিশ্রকে সামনে রেখে। মিশ্র বড় প্রভাবশালী নেতা হওয়ার উচ্চাকাক্ষী হলেও এবারের দিল্লি নির্বাচনে পরাজিত এক রাজ্য এমএলএ। অমিত শাহ  নিজেকে সুরক্ষিত ও আড়ালে রাখতে তাই কপিলের মুখ দিয়ে বলিয়েই প্রত্যক্ষ হামলার হুমকি দেয়ার বে-আইনি  কাজটা করিয়েছেন।
উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদে, যেটা মূল হামলার কেন্দ্র, সেখানে শাহীনবাগের মতই এক অবস্থান ঘর্মঘট চলছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে সাথে নিয়ে কপিল ২৪ তারিখে এখানে এসে অন ক্যামেরায় হুমকি দেন যে, “পুলিশ এই স্থানীয় অবস্থান সমাবেশ ভেঙে না দিলে তিনি নিজে ট্রাম্পের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করতে পারেন। তিনি এটা ভেঙে দেবেন”। এই হুমকির ভিডিও ক্লিপ এখন  ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এরপর সে রাতেই ঐ সমাবেশের আশপাশে তিনি এক ট্রাক পাথর আনলোড করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে এই পাথর দিয়েই হামলা শুরু হয়েছিল। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া আর পুলিশের উপস্থিতিতে এই হুমকি দেয়া স্পষ্টতই কপিল মিশ্রের করা একটি ক্রিমিনাল অফেন্স।
অথচ প্রকাশ্যে এই ঘোষণা না দিয়েও বিজেপি একই হামলা ও ম্যাসাকার তো করতে পারত। তাহলে ঘোষণা দিয়ে করার মানে কী? তা হল- আমিই (বিজেপি) ক্ষমতা- এই দম্ভ দেখানো; যাতে হামলা খেয়ে ভয়ে মুসলমানেরা এই ক্ষমতার কাছেই নতজানু হওয়া লুটিয়ে পড়া উপায়হীন শ্রেয়কাজ মনে করে। একইভাবে গত নির্বাচনের সময় অমিত শাহ এই কপিলকে দিয়েই মুসলমানরা ‘দেশদ্রোহী’, তাদের ‘গোলি মারো’ বলে স্টেজ থেকে বিবৃতি পড়ে শুনিয়েছিল। অমিতের ধারণা এই হুঙ্কার দেয়ার কাজটা তিনি নিজে না করে কপিলকে দিয়ে করালে তিনি কপিলকেও প্রটেক্ট করতে পারবেন আর নিজেকেও হুকুমদাতা সংগঠক মূল নেতা হয়েও আড়ালে রাখতে পারবেন। কিন্তু বিপরীতে, নিজে করলে আদালতে প্রমাণসহ দায়ী বলে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আর তাতে বলা যায় না, মোদীও অমিতের সাথে সহমরণ থেকে সেক্ষেত্রে সম্ভবত খুব বেশি দূরে থাকতে পারবেন না। এসব বিবেচনা থেকেই মোদী ও অমিত দিল্লির হামলা ইস্যুতে পাবলিক এড়িয়ে চলা বা কোন ঘরোয়া সমাবেশে সামনে নিজেরা মুখ খোলা এড়িয়ে যেতেই ‘কপিল মিশ্র’ ধরনের উচ্চাকাঙ্খী লোকদের সামনে আনছেন।

মানুষের অসহায়ত্ব আর হতাশা – গার্ডিয়ান

এদিকে ম্যাসাকারের চতুর্থ দিনেও মোদী (বা অমিত) মুখ না খুললেও ম্যাসাকার বেশি হয়ে গেছে কি না এই ভীতি থেকে মোদী ঐদিন প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে দিল্লির ‘স্বরাষ্ট্র ইস্যু’ দেখতে দায়িত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু প্রথম আট-দশ ঘণ্টা দোভাল প্রকাশ করেননি  ঠিক কী পরিচয়ে তিনি দিল্লিতে তদারকি কাজে নেমেছেন। ইতোমধ্যে  মিডিয়ায় জল্পনা রিপোর্ট প্রকাশ হয়ে যায় যে, তবে কি এটা ” দিল্লি পুলিশের দায়ীত্বে থাকা মন্ত্রী অমিতের উপর মোদীর অনাস্থার প্রকাশ”? এই জল্পনা আরো বাড়িয়ে দেয় সে সময় সোনিয়া গান্ধীর এক প্রেস কনফারেন্স। তিনি দাবি করেন, দিল্লি্কে রক্ষার ব্যর্থতায় অমিতকে পদত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার সারা দিন ড: মনমোহন সিং অমিতের পদত্যাগ দাবি করেছেন সেটা ভারতের টিভিগুলোর টেলপে স্ক্রল করে দেখিয়ে গেছে। ওদিকে দোভালের বিপদ হল, প্রেসকে যদি বলেন মোদী তাকে পাঠিয়েছেন তাহলে প্রশ্ন উঠবে, অমিত শাহ কি ব্যর্থ? তাই তিনি বলে বসেছেন যে, না অমিত শাহও তাকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কিছু ঢাকা পড়ে নাই।
কিন্তু দোভালের দিল্লির দায়িত্ব নেয়া বা পাওয়া, এটা আবার তাঁর পদ-পদবির দিক থেকেও মিলে না। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাগিরি করা মূলত বহিঃরাষ্ট্রবিষয়ক কাজ অথবা বড়জোর ‘র’সহ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি পর্যন্ত। কিন্তু ভারতের কোন ধরণের সশস্ত্র  “বাহিনীর বা ফোর্সের” উপর কমান্ড করা তার কাজ নয়। কাজেই দিল্লি পুলিশের তাঁর উপর মাতব্বরির দায় নেয়া কাজটা মিলে না। এছাড়া হামলাকারির মূলনেতা অমিত নিজেই যদি দোভালকে এখন সেই হামলা ঠেকাতে পাঠায় তবে এই পরস্পরবিরোধী একই অমিতের মনের কারণে দোভালের কাজে এর ছাপ পড়ারই কথা। যেমন দিল্লির অলিগলিতে একটা বাচ্চা মেয়ের অভিযোগে তিনি বলে বসেন ‘‘যো হো গ্যায়া হো গ্যায়া।… আর এনিয়ে মিডিয়ায় সোরগোল এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলা পুলিশের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মুখে মানায় না।। আসলেই তাই। পুলিশ বলবে আমরা তাকে গ্রেফতার করে আদালতে তুলব – এমন একশনের কথাই হতে হয় পুলিশের কথা।
সম্ভবত এসব বিবেচনায় মোদী-অমিত এক কানপড়া রিপোর্ট ছাপিয়েছেন দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় “বেনামি সূত্র” থেকে  পাওয়া খবর বলে। দাবি করা হয়েছে ‘ট্রাম্পকে বিদায় দেয়ার পর থেকে মোদী নাকি খুবই আপসেট। মোদী মনে করছেন, দেশে-বিদেশে তার ইমেজ ইজ্জত গেছে।’ [ Upset with how the Hindu-Muslim riots in Northeast Delhi overshadowed the visit of US President Donald Trump to India, Prime Minister Narendra Modi ]  গোপন সুত্রের এই দাবির সত্য-মিথ্যা যতটুকুই হোক মোদী-অমিতের এখন উভয় সঙ্কট হল, প্রকাশ্যে দিল্লি ম্যাসাকার ইস্যুতে মিডিয়ার সামনে মুখ খুললেই সরাসরি এর দায় তাঁদের ওপর এসে পড়বেই। কারণ দিল্লি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং দিল্লি পুলিশের বস হলেন অমিত। বলতে গেলে এর দায়িত্ব মোদীর মন্ত্রীসভার। সে জন্য মিডিয়া এড়িয়ে চুপ করে চলতে চাইছেন মোদী-অমিত দু’জনই। এজন্য  দোভালকে দিল্লি পাঠিয়েই দিল্লির অলি-গলিতে দোভাল যাচ্ছেন এর লাইভ ছবি টিভিতে ব্যাপক প্রচার করা হয়েছে। আর  এতে দেখাতে চেয়েছেন মোদী-অমিত অনেক ব্যস্ত মানুষ তাই অজিত দোভালকে পাঠিয়ে ঠিকই খবরাখবর নিচ্ছেন। কিন্তু এর আবার বিপদ হল, বাজারের মোদী-অমিতবিরোধী যেসব বয়ান বা কানাঘুষা চলছে এর বিরুদ্ধে মোদী-অমিত নিজের বয়ান ও গল্প ঠিকঠাক তাঁরা নিজে পাবলিকলি হাজির থেকে তা প্রকাশ করে পালটা সুযোগ নিতে পারছেন না।

মোদী-অমিতের পিছনে টিকটিক করা অন্য বিপদ – আদালতঃ
অন্য দিকে, এই মুহূর্তে মোদী-অমিতের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিপদ হল – আদালত।  ভিকটিম ও ক্ষতিগ্রস্থরা যতজন আদালত পর্যন্ত পৌছাতে পারবেন, প্রতিকার চাইবেন – সেটা কেবল শুধু মোদী-অমিত নয় আদালতের জন্যও যথেষ্ট পরীক্ষার। আদালতকে মোদী-অমিতের বিরুদ্ধে একশনে যাবার  তাকত দেখাতে হবে এই চাপ বাড়তেই থাকবে। সেটা আদালত এড়াবে কী করে? আদালত না চাইলেও এটা  যেকোন সময় যেকোন দিকে টার্ণ নিতে পারে।  তবে যেভাবে চাপ বাড়ছে সেটা অবশ্যই সব পক্ষের জন্য খুবই বিপদের ইঙ্গিত।  ইতোমধ্যে কপিল মিশ্রসহ অন্তত চারজন বিজেপির  ফেল করা বা প্রাক্তন এমএলএ-এর বিরুদ্ধে গত নির্বাচনী আইনভঙ্গের অভিযোগে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল এরই পুর্ণাঙ্গ মামলায় মামলা রুজু [FIR] করার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি ছেড়েছেন দিল্লির সাবেক প্রধান বিচারপতি মুরলীধর। তাতে ইতোমধ্যে মামলা রুজু করাও হয়ে গেছে। এবার যদি আরও উপরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো রিট হয়ে যায়? এসব নিয়ে মোদী-অমিত চিন্তিত। তাই আদালতের ওপর  মোদী-অমিত নিজেদের লোকের মাধ্যমে প্রচণ্ড পাল্টা চাপ সৃষ্টি ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে চলেছেন।

তাহলে কি মোদী-অমিত হেরে যেতে পারেন? পাবলিক রিয়াকশনের চাপ তীব্র হলে অবশ্যই হতে পারেন এবং তা খুবই সহজে। মিডিয়া যে চাপটা বাডাতে বড় ভুমিকা রাখছে। এমনকি এর সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও তা খুবই বিপদের হবে ।  এখানে পরিস্কার করে একটা কথা বলে ও জেনে রাখতে হবে আমাদের।  এখানেই ভারত-রাষ্ট্র ভাঙনের উভয় সঙ্কটে। কারণ যে ম্যাসাকার ঘটে গেছে এতেই রাষ্ট্রের ভাঙন আরও নিশ্চিত করে গেছে। এখন আদালত যদি নুন্যতম প্রতিকারও না দেখায়, মোদী-অমিতের প্রভাবে বা ভয়ে ভীত হয়ে তাদেরকে মাফ করে দেয়, পালানোর সুযোগ করে দেয়;  তবে, এর সোজা মানে হবে আদালতও রাষ্ট্রকে ভাঙনের পথে আগানোকে আরও সহযোগিতা করল। এটাকে দ্রুত করে দিল। আবার যদি নুন্যতম কিছু একশন নেয় সেটাই মোদী-অমিতকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলবে। আর তাতেও ভারত ভাঙ্গন আগাবে। কারণ বিকল্প শক্তি নাই, তৈরি নাই বা হয়নি। যদিও গুজরাট ২০০২ সালের ম্যসাকারের অভিজ্ঞতা বলছে অনেক কষ্ট করে হলেও মোদী-অমিত নিজেদেরকে গুজরাটের মামলাগুলো থেকে শেষে মুক্ত করে ফেলেছেন। কাজেই এবারও পারবে না কেন?। কিন্তু অনেকে এখানে পালটা বলবেন মোদী-অমিত এখন আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়ীত্বে না। এখন তারা কেন্দ্রের সরকারের দায়ীত্বে। অতএব এর ওজন বেশি, সংশিষ্ট বিপরীত স্বার্থের পক্ষগুলো ও তাদের স্টেকও অনেক বেশি। কাজেই এবার একই রকমভাবে ঘটনা শেষে হবে না। না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি হয়ত।

ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়াঃ
সারকথাটা হল, আদালত মোদী-অমিতের কোন অপরাধ আমল ও শাস্তির ব্যবস্থা না করতে পারলেও ভারতের ভাঙন তীব্রভা বাড়বে। তবে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারলেও ভাঙন বন্ধ হবে না যদিও ভাঙ্গার তীব্রতা কমতে পারে। আসলে, একা আদালত ভারতের ভাঙন ঠেকাতে পারবে না। এছাড়া আরও  সবচেয়ে বড় পক্ষ বা ফ্যাক্টর হল অন্য বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বা দলের অনুপস্থিতির কারণে ভাঙনের সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন সিএএ ইস্যুতে এখনও এটা কোন বিকল্প রাজনৈতিক দলের  আন্দোলন নয়।  এটা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক তরুণ মধ্যবিত্ত আর তাদের সহযোগী হল সরাসরি ভিকটিম মুসলমানেরা। (এর বিপরীতে মোদীর পক্ষে তরুণদের আরেক অংশ – মুলত “মফস্বলের তরুণেরা” এরাই বজরং দলসহ বিভিন্ন নামের সেনা এমন বিজেপির অঙ্গ দলগুলোর মুল শক্তি। এমনকি কপিল মিশ্র ধরণের উচ্চাকাঙ্খীদের বয়স লক্ষণীয়। )

এছাড়া একটু দূরে আর কমপ্লেক্স ভাবে আছে আসাম বা নর্থইস্ট রাজ্যগুলো। যারা ঠিক ছাত্র ও ভিকটিম মুসলমানদের মতই সিএএ-বিরোধী কিন্তু  একইভাবে ও কারণে মোদী-অমিতের বিরোধী নয়, তবে নিজেদের অবস্থান হিসাবে বিরোধী। অর্থাৎ বিজেপির এই বিকল্প বিরোধীদের পরিচয়ই বলে তারা কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে বা রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত কেউ নয়।

কংগ্রেস অথবা বিরোধী যেকোন আঞ্চলিক দল সিপিএম বা ডিএমকে, জনতাদল ধরণের যারা – এরা সকলেই মনে করে বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের ক্ষমতা পাওয়া যাবে কী করে সেদিক থেকে এই সাপেক্ষে বিজেপির বিরোধী সিএএ ইস্যুটাকে তাদের দেখতে হবে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস জোট করে তৃণমুলের মমতার  বিরুদ্ধে মাঠে নেমে গেছে। প্রকাশ্যেই বলছে এটা মোদী-মমতার বিরুদ্ধে একসাথে  আন্দোলন। এই জোটের জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি মিথ্যা করে হলেও তারা দেখাতে পারে যে মোদী-মমতার রাজনীতি বা লক্ষ্য এক। এই চেষ্টাটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের মুল কাজ মনে করে করে যাচ্ছে। কারণ আগামি বছর কলকাতার রাজ্য নির্বাচন, সেখানে মমতাকে ফেলানো  এটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের প্রধান লক্ষ্য।  মোদী-অমিতের প্রণীত সিএএ-এর বিরোধিতা এই জোটের কাছে এখানে তুলনায় কিছুই নয়। বড়জোর সেকেন্ডারি। এতে মোদী যদি ভারতকে মুসলমান শুণ্য করে ফেলেও দেয় তাতেও তাদের জোটের লক্ষ্য একই থাকবে। কারণ মোদীকে সরানো তাদের মুখ্য ইস্যু নয়, রাজ্যের ক্ষমতা পাওয়াই ইস্যু। এই একই অবস্থা কমবেশি সব আঞ্চলিক দলেরই।
আবার এসবেরই কিছু উস্কানিমূলক প্রভাব হয়ত আছে ভারতের মুসলমানদের উপর। তারাও সিএএ কে কেবল মুসলমানদের ইস্যু হিসাবে দেখার পক্ষপাতি। যাতে এটাকে কারণ দেখিয়ে সিএএ-বিরোধিতা কেবল মুসলমানদেরই বিরোধীতা হিসাবে তুলে ধরতে পারে।  মুসলমানেরা সিএএ-বিরোধী  ইস্যুতে এলায়েন্স করতে কম আগ্রহী।  মুসলমানেরা ঠিক নাগরিক হিসাবে সিএএ এর বিরোধী হওয়ার চেয়ে বরং মুসলমান হিসাবে এর বিরোধীতার আন্দোলন করতে চায়। মুসলমানেরাই কেবল মুসলমানদের কজে[cause] বা কারণে সোচ্চার হবে – এই রাজনীতি করতে চায়। এটা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতি । এই কৌশলের কারণে ভারতের মুসলমানেরা নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। মূল কারণ, বিজেপি এটাই চায়। মুসলমান হিসাবে মুসলমানেরা সংগঠিত হচ্ছে এটা দেখিয়েই তার হিন্দুদের সহজে  ভয় দেখিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে। বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি তো এটাই, ফলে তাদের ভোটের বাক্স ভরে তুলার কাজ সফল হবে বলে বিজেপির অনুমান।
অন্যদিকে ভারতে মোদীর ম্যাসাকারের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প ও সংগঠিত রাজনৈতিক দল নাই। কমন ইস্যুতে এলায়েন্স নাই।  রাজনৈতিক হবু শক্তি আছে, মানুষও আছে কিন্তু কাঠামো বা উপযোগী  রাজনীতি নাই। শক্তিজোট বা এলায়েন্স নাই। এজন্যই ভারত-রাষ্ট্রের ভাঙন অনিবার্য – তাতে তা ধীরে বা দ্রুত তা যাই হোক।  অথচ একেকটা অঞ্চলিক দলের কেবল রাজ্যকেন্দ্রিক ক্ষমতা পাবার পরিকল্পনা ও রাজনীতি আছে – এটাই তো ভারত ভেঙ্গে ফেলার পক্ষে কাজ করা। অর্থাৎ লড়াইটা আগাচ্ছে  “হিন্দুত্ব” বনাম রাজ্যক্ষমতা দখল – এদুই রাজনীতি; যেটা আসলে মূলত  ভারত ভাঙ্গনের সবচেয়ে বড় তোড়জোড় এক রাজনীতি! অবশ্যই এভাবেই এদিকেই তা যাচ্ছে!

ট্রাম্পের সফরঃ
অনেকে মনে করছেন ট্রাম্পের ভারত সফর সামগ্রিকভাবে মোদীর ম্যাসাকারের পক্ষে একটা আমেরিকান সমর্থন – এই ইমেজ সৃষ্টির আয়োজন করা। কিন্তু এই অনুমান ভিত্তিহীন; এমন মনে করার কারণ আছে। যদিও এমন ক্যাম্পেইন হয়, হতে পারে। এর আলাদা মুল্যও আছে।
ট্রাম্পের এই সফর ছিল মূলত আসন্ন নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে  কিছু সম্ভাব্য বাড়তি মাইলেজ পাওয়া যায় কিনা এরই এক প্রচেষ্টা এটা। যাতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রবাসীরা ট্রাম্পকে সমর্থন বা ভোট দিতে পারে। ঠিক মোদীর শেষ আমেরিকা সফরে “হাউডি মোদী” সমাবেশটা যেই লক্ষ্য হাসিলে আয়োজন করা হয়েছিল। আর বিপরীতে ট্রাম্পের সফরে মোদীর এখনকার লাভ হল যে,  মোদীর বিরুদ্ধে তার দেশের বিরোধীদের অভিযোগ যে, তিনি নানান বিতর্কিত আইন পাস করিয়ে বিদেশে ভারতের ইমেজ নষ্ট করেছেন, ভারতকে বন্ধুশূণ্য করে ফেলছেন ইত্যাদি – এসবের বিরুদ্ধে মোদীর সপক্ষে একটা ভালো জবাব হবে ট্রাম্পের এই সফর। দুই নেতার এমন পরস্পরের ব্যক্তিস্বার্থের, পরস্পর পরস্পরের পিঠচুলকে দেওয়ার – সেই সফর ছিল এটা। এ কারণে, হোয়াইট হাউজ থেকেই সফরের আগে ট্রাম্প নিজে এবং একজন স্টাফ অফিসার পরিষ্কার করে বলে রেখেছিলেন যে, এই সফরে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হবে না। আর প্রকাশ্য অভিযোগ এনেছিলেন যে,  ভারত  “ভাল আচরণ করে না”
এছাড়া ট্রাম্পের একটু ক্ষ্যাপা কথাবার্তাও অশ্যই ছিল।  এমনকি হোয়াইট হাউজের এই উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন যে  “ট্রাম্প ভারতে গিয়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার’ বিষয়টি জোরালো ভাবে তুলবেন। তাঁর কথায়,‘‘সব ধর্মকে সমান সম্মান দেওয়ার বিষয়টি ভারতের সংবিধানের অন্তর্গত। গোটা বিশ্ব এ ব্যাপারে ভারত কি করে সেদিকে তাকিয়ে আছে’’ ।

এছাড়া, ভারতে এসে পাবলিক বক্তৃতায় ট্রাম্প মোদীকে প্রশংসার ছলে বলতে গিয়ে মোদীবিরোধী স্বার্থগুলোও আড়াল থেকে বাইরে এনে ফেলেছিলেন।  যেমন “মোদী ভাল লোক কিন্তু খুব টাফ”। এই টাফ বলতে আসলে এটা মূলত উভয় দেশেরই লেনদেন বাণিজ্যে বাড়তি ট্যারিফ আরোপের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়াতে, সেব্যাপারে বলছিলেন মোদী টাফ। কিন্তু এই বাণিজ্যবিরোধ হাল্কা করার জন্য কোন পক্ষ থেকে  কোন কথাবার্তা চালানো এই সফরের কোনই লক্ষ্য ছিল না। সবকিছুই যেমন ছিল সেখানেই স্থবির হয়ে আছে তাই। এমনকি আমেরিকান নৌজাহাজ থেকে উড়তে পারে এমন হেলিকপ্টার কেনার কথাবার্তাও একইভাবে বিতর্কে স্থবির হয়েই আছে।

কিন্তু যেটা প্রথমে ট্রাম্প ছাড় দিতে চান নাই যে, মুসলমানদের উপর নিপীড়ন বেড়েছে এ নিয়ে “ভারতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলবেন ট্রাম্প” এমন শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল সফর শুরুর আগের দিন।  কেননা এর বহু আগেই আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’ সিএএ ইস্যুতে মোদীর কঠোর সমালোচনা করেছিল। নাগরিক বৈষম্য করার অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু মোদী ট্রাম্পের সফরের আগেই এমন মন্তব্য পেয়েই লবি শুরু করে দেন। শেষে মোদী একটি রফা করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সফরকালে এনিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কোন কথা হবে না। সেটাই বজায় রাখা হয়েছিল আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু শর্ত অনুসারে  ট্রাম্পের বিদায়ের পরের দিনই “দিল্লিতে বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে হামলা চালানো” হয়েছে বলে অভিযোগ করে বসেছে আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’।

ভারতীয় মিডিয়াঃ
মোদীর জাতিবাদী বা পাকিস্তানবিরোধী উস্কানির বিষয় না হলে ভারতীয় মিডিয়া এপর্যন্ত সময়ে সরকারের বিপক্ষে, সময়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এখন শেষবেলায় পুরোপুরি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তা মোদী-অমিতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এবং তাদের ‘ডুবিয়ে’ দেয়ার সামর্থ্য রাখে। এমনকি, আনন্দবাজার গ্রুপেরই ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ সবার আগে লিড নিয়েছে। ম্যাসাকারের দ্বিতীয় দিনেই সবার আগে তাদের মারাত্মক শিরোনামটা হল, “গুজরাটের মডেল দিল্লি পৌঁছিয়েছে তখন নিরো ডাইনিং-এ” [Neros dine as Gujarat Model reaches Delhi]।

রোম পুড়ছিল আর নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল- এর অনুকরণে বা সেটা মনে রেখে এই শিরোনাম। আর ডাইনিং মানে এখানে ঐ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেই  দিল্লিতে আরেকাংশে  চলছিল মোদী-ট্রাম্পের নৈশভোজ; সেটাকেই ইঙ্গিতে বুঝানো হয়েছিল।  বুঝানো হয়েছিল মোদী আর ট্রাম্প দুজনেই এখানে উদাসীন, দায়ীত্বজ্ঞানহীন – রোমের নিরো।  আবার গুজরাট বলতে এখানে এই মোদী-অমিত জুটিই ২০০২ সালে গুজরাটে রাজ্য সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় ২০০০ মুসলমানের হত্যা করিয়েছিলেন। তাই বলা হচ্ছে সেই গুজরাত মডেলের ম্যাসাকার দিল্লিতে এসে গেছে। টেলিগ্রাফের দেখাদেখি বহু পত্রিকাই পরের দিন একই লিড শিরোনামের রিপোর্ট করেছে। এ ছাড়া পরের দিনের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সরাসরিই লিখেছে ‘দিল্লির গণ-নৃশংসতার টার্গেট মুসলমানেরা’ [Express says Muslims target of mob violence in Delhi]।

আনন্দবাজার  পত্রিকাও ছবিতে চিনিয়ে দিয়ে দেখিয়েছিল কিভাবে লাঠি-রড হাতে হামলাকারী আর পুলিশ একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা সক্রিয় হয়ে হামলার পক্ষে কাজ ভুমিকা রাখছে। আর এমন সব রিপোর্টে  সকলেই দাবি করে বলেছে বা প্রমাণ দেখিয়েছে যে, “এই হামলা পুলিশের সহযোগিতায় ও প্রটেকশনে ঘটেছে”। ফলে মিডিয়ায় এই চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি ইনডিপেন্ডেন্ট অর্থে “স্বাধীন বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের কথাও” ফাঁক-ফোকরে উঠে আসছে। যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে “হেট ক্যাম্পেইন” বা মুসলমানের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য রাখা – এর ক্রাইম, এই অভিযোগ উঠেছে। তাই ২৮ ফেব্রুয়ারির দ্য প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় দিল্লি বিজেপি সভাপতির বরাতে এক রিপোর্ট করে বলা হয়েছে, বিজেপি দিল্লি সভাপতি মনোজ তিওয়ারি বলছেন, “কোন কোন বক্তব্য হেট ক্রাইম বা ঘৃণা-ছড়ানোর তা মূল্যায়ন ও চিহ্নিত করতে একটা স্বাধীন কমিশন দরকার”।

এসব কিছু মিলিয়েই ভারতের সরকারব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ার দিকে ধাপে ধাপে আগাচ্ছে!

 লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে ভারত রাষ্ট্র কোন দিকে আরো আগাল – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

 

জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

গৌতম দাস

 ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2T2

সবার মাতৃভাষা রক্ষার পক্ষ নিতে হবে তবে, জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবেঃ
গত শুক্রবার ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই নিজ উন্মেষ ও বিকাশের জন্য নিজ মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ অবাধ ও  নিশ্চিত দেখতে চায়; এটা তাঁর অধিকার আর এই অধিকার রক্ষা করা তাই আমাদের সকলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একুশে ফেব্রুয়ারির সারকথা এটাই। এই দিনটা তাই আমাদের মাতৃভাষা চর্চার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এক স্মরণীয় দিন। উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম হওয়ার প্রাক্কালে সে সময় থেকেই হবু পাকিস্তানে, মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের দিক থেক্‌ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। এতে পুবের ভাগ্য যে পশ্চিমের আধিপত্যের তলায় চাপা পড়ে যাবে – বুঝে না বুঝে  “মুসলিম জাতিবাদের” উচ্ছ্বাসে পড়ে সেটা আমল করতে অনেকের মধ্যেই  অনীহা দেখা দিতে শুরু করেছিল। আর তা থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম বেসুরো হতে শুরু হয়েছিল। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে আমাদের মাতৃভাষা চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে টের পেয়ে আমাদের আপত্তি প্রতিবাদ লড়াইয়ের শুরু এখান থেকেই। আর এখান থেকেই আস্তে আস্তে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের রাষ্ট্রের দিকে চলে যাই আমরা।

তবে একালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ করতে আমাদের দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক ধারাকেই কম-বেশি এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তবুও এর মধ্যে কোথাও জানি একটা ভাগাভাগি বজায় রয়েই গেছে টের পাওয়া যায়। যদিও সব পক্ষ বা ধারার মধ্যে কমন বুঝাবুঝি ঐক্য দেখা যায় তা হল – যেকোন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চার ‘অধিকার’ সমুন্নত রাখতে হবে। পালনের এই ধারার বাইরে অন্য দিকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ অন্য আর ধারাটা হল, ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের দিক থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে তুলে ধরার চেষ্টা।

কারো মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা হয়ে যায়- এটা করে কারা? কেন আসে এরা – এটা বুঝা খুব গুরুত্বপুর্ণ। আসলে একই সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যেকার এথনিক-বিভক্তির কারণে ভিন্নতা বা পড়শি জনগোষ্ঠির উপর আধিপত্য করার আগ্রহ বা সুযোগ নিতে চাওয়া থেকেই অন্যের মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা শুরু হয়।  যদিও শুরুর দিকে “ঐক্য রক্ষার স্বার্থে” এই আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে এমন কথায় অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে স্বেচ্ছায় না বুঝে এই আধিপত্য মেনে নেয়। যেমন আমাদের ভিতর অনেককেই পাওয়া যাবে যারা মনে করে দুনিয়ায় সব মুসলমানের ভাষা আরবী হওয়া উচিত বা না হলেও আরবীর অধীনে সবার আসা উচিত। অথবা এমন হলে খুব ভাল হত এমন মনে করে থাকে।  মানে, ভিন্ন রেস [race] অর্থে জাতি বা ভিন্ন এথনিক [ethnic] গোষ্ঠি অর্থেও জাতি – এমন নির্বিশেষে দুনিয়ার সব ভুগোলের মুসলমানকে আরবী ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে। একথা সত্য যে আরবী ভাষা-সংস্কৃতির অনেক কিছু থেকেই ইসলামকে আলাদা করা মুসকিল। তবু এমন দাবি বা ভাবনার প্রতি সমর্থন তৈরি হয় সাধারণত ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও সৎ আবেগ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাস্তবে এমন সম্ভবত দেখা যাবে না। বরং উলটা পরিস্থিতিই তৈরি করবে।  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে ব্যাপারটা অনারব বা আরব নয় যারা তাদের উপর আরবী ভাষাভাষীদের এক দুর্বিষহ অত্যাচার, প্রবল এক আধিপত্য, সব সুযোগ-সুবিধা আগে আরবেরা পাবে ইত্যাদি এমন এক চরম অবস্থা তৈরি করে তা অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা বা খুনোখুনিতে শেষ হবে। এর মানে কী আমি বলতে চাচ্ছি যে দুনিয়া সব ধারণের মানুষের মধ্যে নুন্যতম কোন ঐক্য রচনা করা বা কাছাকাছি আসা সম্ভবই না। অবশ্যই সম্ভব, তবে একটা পর্যায়ে যখন আমরা আমাদের অপরের রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ রক্ষা করা, যেমন অন্যের মাতৃভাষা রক্ষা করার দায়কর্তব্য – আমি ভিন্ন রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠের হলেও বুঝে যাব এবং রক্ষা করব।  যদিও আর সবার আগে মনে রাখতে হবে কারও মাতৃভাষায় হাত দেওয়া যায় না, যাবে না। আসলে  কারও এথনিক বৈশিষ্টে হাত লাগানো বা চাপিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর এটা অপরাধ হবে সেদিকটা তো আছেই। তাই এই ভুল এড়িয়ে চলতে হবে। মাতৃভাষা মানে মা যে ভাষায় বাচ্চাকে প্রথম কথা শিখায়, কমিউনিকেশন করে। যা বলছিলাম এমন বুঝাবুঝি জাগা সম্ভব হয় এমন সহায়ক  সমাজ ও রাষ্ট্র যা আধিপত্যকে রুখে দেয় তা আগে হাজির থাকতে হবে। অবশ্য দুনিয়ার সব ভাষা আর রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ সবই আল্লাহ সৃষ্টি – এভাবে থিওলজিক্যাল অর্থেও ব্যাপারটা বুঝতে পারি। ফলে একটা ভাষা অন্যটার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা বা চাপিয়ে দেয়া একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
এতসব দিক চিন্তা না করেই সরল মনে ও বিশ্বাসে আমরা অনেকেই এমন সমর্থন দিয়ে ফেলব কারণ তাতে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বাড়বে এমন একটা কিছু চিন্তা করে। অনেকে এটাকে ‘উম্মার শুরু’ বলে ভুলে অতি উতসাহও দেখিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সবকিছুই শেষে অন্যের আধিপত্য মোকাবিলাতেই আমাদের জীবন কাটবে এমন অবস্থাতেই পৌছাবে।
উপরে যেটাকে আধিপত্য বলছি এটাই অন্যের উপনিবেশ বা কলোনি দখলে পড়ে যাওয়া বলতে আমরা যা বুঝি সেই উপনিবেশ ধারণারই ছোট রূপ। মানে আমার উপর কারও বড় ও ব্যাপক আধিপত্য ছেয়ে বসা এটাই তার কলোনি বা উপনিবেশ হয়ে যাওয়া। যদিও শেষ বিচারে কারও আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া এই পুরা ব্যাপারটাই ‘জাতি’ চিন্তার বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সমস্যাজাত। সে কোন এক কল্পিত জাতির স্বার্থে আমার উপরে চেপে বসেছে  এমন সাফাই সেখানে থাকবেই।  যেমন মুসলিম জাতিবাদের স্বার্থে, ইসলামের স্বার্থে  – এই জাতীয় স্বার্থে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া উচিত – এই ছিল পাকিস্তান জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সপক্ষে সাফাই।  অর্থাৎ ব্যাপারটা আসলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তা যাকে অনেক আমরা ‘নেশন-স্টেট’ বলে বুঝি- এই বুঝ থেকে উদ্ভুত সমস্যা।

এই নেশন [nation] বা জাতি ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটা হল এটা অপর জনগোষ্ঠীর ওপর নিজ আধিপত্য বিস্তার ও কায়েমের হাতিয়ার হয়ে যায়। এই আধিপত্য কায়েমের বড় ও প্রবল ধারণাটাই হল অন্য কারও ঘাড়ে উপনিবেশি-কর্তা হয়ে চড়ে বসা অথবা নিজের ঘাড়ে কারও উপনিবেশত্ব কায়েম হতে দেখা।

আধুনিক রাষ্ট্র এই ফেনোমেনার শুরু
আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম এই ফেনোমেনা দুনিয়ায় এসেছিল মোটাদাগে বললে ১৬৫০ সালের দিকে। আধুনিক রাষ্ট্র মানে, মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। অর্থাৎ মনার্কি বা রাজতন্ত্রের শাসনের কবল থেকে বের হতে গিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা শাসন কাঠামো ও ব্যবস্থা দুনিয়ায় কায়েম হতে শুরু করেছিল। কারণ, রাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অগ্রহণযোগ্য দিক ছিল – রাজতন্ত্র বলতে পারে না কে তাকে ক্ষমতা দিয়েছে বা তার ক্ষমতার উৎস কী?
অনেকে অবশ্যই এসব প্রশ্নের অস্বস্তি কাটাতে সমাজের কিছু প্রভাবশালী এলিট তাদের পছন্দের বেছে নেওয়া শাসনকর্তা – এই অর্থে কোন রাজাকে গ্রহণীয় মনে করে বসে। মনকে প্রবোধ দেয়। এই প্রবোধ সম্ভবত স্বীকার করতে চায় না যে আসলে  এগুলোও আরেক ফ্যাকড়ার রাজতন্ত্র মাত্র। কোণ রাজতন্ত্রকে চিনবার সবচেয়ে সহজ চিহ্ন হল এগুলো সার্বজনীনের পছন্দ বা অনুমোদনে তৈরি হয় না, সমাজের সকলে তাকে নির্বাচিত করে না। একটা খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু অবস্থাপন্ন প্রভাবশালী ক্ষমতাবান গোষ্ঠি এই ‘শাসনকর্তা’ খাড়া করে থাকে।  এছাড়া এই শাসনকর্তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন এদের আরেক প্রধান লক্ষণ চিহ্ন হল কিছুদিনের মধ্যেই এটা একটা ডায়নেস্টি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ডায়নেস্টি – মানে রাজার (শাসকের) ছেলে রাজা হবে।

ফিরে যাই মুলকথায় – ক্ষমতার উতস কী? কে দিয়েছে ক্ষমতা? এখানে যদি মেনে নেই যে রাজতন্ত্রে শাসন ক্ষমতার উৎস ‘গায়ের জোর’ মানে, রাজার নিজের বলপ্রয়োগের সক্ষমতাই রাজার ক্ষমতার উৎস, সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে তাহলে রাজাও অন্য কারও যে রাজার উপর আরও বেশি বলপ্রয়োগে সক্ষমতা রাখে তার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হবে ও মারা পড়বে এবং এ কথাটাও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে মানে, এটা জায়েজ তা মানতে হয়।   অর্থাৎ এখানে এসে দেখা যাচ্ছে  ক্ষমতাকে ন্যায়-অন্যায় বা ইনসাফের প্রশ্ন মোকাবেলার সামনে পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে সেকালে উপায় না দেখে রাজা জনসমর্থনকে  ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ভিত্তি বলে খাড়া করতে চায়। যেন যে রাজার পক্ষে ‘জনসমর্থন’ আছে তার সেই ক্ষমতাটা জায়েজ মনে করা হবে। যদিও বেশির ভাগ রাজাই নিজ ক্ষমতার উতস ঐশ্বরিক বা আল্লাহ দিয়েছে ধরণের কথা নিম্নস্বরে বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে  ‘জনসমর্থন’ এর কথা যেটা বলছিলাম, এর যুগটা কম লম্বা নয়। আর এখান থেকে ইংরাজি করোনেশন [Coronation] বা বাংলায় রাজ্যভিষেক বা রাজার ক্ষমতার অভিষেক বা পাবলিক অনুমোদন এর ধারণা হাজির হয়েছিল দেখতে পাই।
কিন্তু সেখান থেকে  বিস্তারে আরও নতুন প্রশ্ন উঠেছিল যে, যদি গণসমর্থনই ক্ষমতার ন্যায্যতার ভিত্তি হয়ে থাকে তাহলে কে রাজা হবে বা কার শাসন-ক্ষমতাকে মেনে নেয়া হবে, অনুমোদিত হবে সেটার সবকিছু ‘পাবলিকই’ ঠিক করে দেক। আর এখান থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ বা নাগরিক। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। এবং জনগণই সেই ক্ষমতা ডেলিগেট [delegate] করে দিবে। মানে, সাময়িক হস্তান্তরিত করতে এক শাসক নির্বাচন করে তার হাতে দিবে- এসব ধারণা বিস্তার লাভ করা শুরু হয়েছিল। যদিও সেটা আরো অনেক কিছুর পরে হয়েছিল। কিভাবে? না, রিপ্রেজেন্টেশন [Representation] বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে নির্বাচিতের হাতে সাময়িকভাবে (পরের নির্বাচন পর্যন্ত) তাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে এসব দিকে ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল। এই হল ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ইনসাফের কার্যকারিতা দিয়ে পাওয়া ক্ষমতা ও এর বৈধতার সমাধান। এক কথায় এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রক্ষমতা, বাংলায় আমরা বলি – গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ধারণা। ফলে স্বভাবতই এখানে রাষ্ট্রক্ষমতার আর কোনও চোরা-ক্ষমতা নয়, বরং এক সুবিন্যস্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়া ডিফাইনড [Defined] ক্ষমতা বা নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো মূলত ইউরোপের ভূখণ্ডে বিকশিত বা পরবর্তিতে তা ফেডারেল রিপাবলিক (১৭৭৬) আমেরিকা্তেও। আর তা থেকে দুনিয়াব্যাপী ব্যাপক রাষ্ট্ররূপগুলোতে এটাই কম-বেশি অনুসরণ করতে দেখা যায়। যেমন নয়া চীনে এসে, চীনের ভাষায় এটা ‘পিউপিলস রিপাবলিক’ [People’s Republic]। এমনকি লেনিনের রাশিয়া তারা নিজেদের রাষ্ট্রকে ভিন্ন দাবি করলেও সোভিয়েত রাষ্ট্র নিজেকে এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র বলেই মেনেছে।

কিন্তু তবু সব সমস্যা মিটে নাই। রিপাবলিক রাষ্ট্রের সাধারণ রেওয়াজ ও রিচুয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে নির্বাচনের দিন থেকে শপথের দিন পর্যন্ত এখানে  ‘গণক্ষমতা’ তৈরির এক প্রক্রিয়া চলে থাকে। এই লক্ষ্যে প্রতিনিধি নির্বাচন ও সাময়িক ক্ষমতা হস্তাস্তর সম্পন্ন করে ক্ষমতার অভিষেক ঘটিয়ে নেয়া অবধি- এই সময়কালটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেয়াল করেন আমরা এখন দাঁড়িয়ে গেছি নির্বাচনেরও আগের ‘এক নিশীথে’। আর চার দিকে হা-হুতাশে।

কলোনি দখল আর জাতিরাষ্ট্রের হাত ধরাধরিঃ
রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও ক্ষমতা তৈরির রেওয়াজ দুনিয়ায় মোটাদাগে চালু হতে দেখা গেছিল ১৬৫০ সালের দিকে; কিন্তু তাতে এর পরেও বড় বিপথগামিতা ঘটেছে, দেখা যায়। মানে চোরাবালিতে পা আটকে যাওয়া বা ভুল রাস্তায় চলে যাওয়া আছে আমরা দেখি। আর এরই নাম হল , নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা। মূলত ‘জাতি’ ধারণাটাই সমস্যার, এটা এক নষ্টা ধারণা হিসেবে হাজির হয়েছিল। রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণার প্রতিশ্রুতি ছিল বা হওয়ার কথা ছিল যে জনগণের সব অংশকেই অন্তর্ভুক্ত করে এখানে এক ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি” নির্মাণ করা হবে। রাষ্ট্রগঠন বা Constitute শব্দের অরিজিনাল অর্থ ছিল এটাই। তাই এটাই আসল রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন হওয়ার কথা। কিন্তু এটা বিপথে চলে যায়। গিয়ে হয়ে যায় জাতি নির্মাণ বা ‘জাতিগঠন’[Nation State]। আর এতে ‘রাজনৈতিক কমিউনিটি’ এভাবে রাষ্ট্র গঠনের ধারণাটাই হারিয়ে যায়।

খেয়াল রাখা দরকার ইউরোপে যখন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বাস্তবায়নের নানা উদ্যোগ কসরত চলছে ঠিক একই সময়ে প্যারালাল আর এক  ফেনোমেনার উত্থানের যুগ সেটা। কলোনি দখলের যুগ সেটা। তাই একই সাথে দুনিয়াতে ব্যাপকভাবে ‘কলোনি দখলের’ শুরু হয়েছিল সেকালে। এটা আরো সম্ভব হয়েছিল সূক্ষ্মমাত্রা [Precision] ও গুণাগুণের স্টিলের আবিষ্কার ও ব্যবহার আর সাথে বারুদ অস্ত্র কম্পাস এসব মিলিয়ে  ব্যাপারটা এক বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ হিসাবে হাজির হয়েছিল। প্রধান বিনিয়োগের আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল যুদ্ধজাহাজ ব্যবসা। যুদ্ধজাহাজ কথার আসল মানে,, পাল তুলে বেরিয়ে পড়া কলোনি দখল ও লুটের কাজে। একাজেরই  এক মডেল ধরণ হল – একেকটা “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” খুলে বসা।  তবে ব্যাপারটা শুধু জাহাজ-বিজ্ঞানের উন্নতি বা বিনিয়োগ ব্যবসার স্বর্ণযুগের নয় বা শুধু তা দিয়ে ঘটেনি। এসবই হতে পেরেছিল এর সাথেই সবচেয়ে নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল এক ভাবাদর্শ বা আইডিয়া। সেটি হলো “জাতি” ধারণা- এর যোগ ঘটা। ব্যাপারটা ইউরোপের যার যার দেশ-রাষ্ট্রের ব্যক্তিমালিক কোম্পানির জাহাজে বিনিয়োগের ব্যবসা হিসেবে তা সে ব্রিটিশ, ফরাসি বা ডাচ ইত্যাদি এরা নিজের একেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলেছিল। আর এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে কলোনি দখলে ঝাঁপিয়ে পড়া ধরনের হয়ে ঘটেছিলও। কিন্তু সাথে আরো কিছু ছিল- তা হলো কলোনি দখলে প্রতিযোগিতা। একে অপরের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া। কিন্তু এরই সাথে ঘটা আরেক বড় ঘটনা ছিল – কোম্পানিগুলো নিজস্ব একান্ত স্বার্থ আর লাভালাভের এই প্রতিযোগিতাকে যেন নিজেদের নিজ নিজ দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে মিথ্যা হলেও তা দেখাতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলোনি দখল প্রতিযোগিতায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ে কতটা বেশি দখল সম্পন্ন করতে পেরেছে – যেন এটা হয়ে যায় কোম্পানিওগুলোর একান্ত বিনিয়োগ স্বার্থ নয়, তা নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ। এই মিথ্যা বয়ান ও তা উপস্থাপনটাই সব কিছু বদলে দিয়েছিল। আর তা করা গিয়েছিল এক ‘জাতি’ ধারণা দিয়ে, দেশ-রাষ্ট্রকে একটা জাতিরাষ্ট্র যেমন, তা এটা ‘জাতীয় স্বার্থ’ এ ধরনের বুলি দিয়ে। এভাবে কোম্পানির স্বার্থ হয়ে যায় কথিত ‘জাতীয় স্বার্থ’। এতে অন্যের দেশকে কলোনি দখলের কাজ এটা যেন আর কোম্পানিগুলোর স্বার্থ নয়- ব্রিটিশ বা ডাচ ‘জাতীয় স্বার্থ’ হয়ে উঠেছিল।
আর তা থেকেই কলোনি দখল আর কোনো ‘অন্যায়’ বা অপরাধ কাজ নয় বরং ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তামাশার দিকটা হল, দেশের অভ্যন্তরে যে রাষ্ট্র নিজের জন্য একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়াকে নিজের কাজকর্তব্য মনে করে, নিজ দেশের বাইরে সেই রাষ্ট্রই আবার অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়াকে জায়েজ মনে করেছিল কিভাবে? এর জবাব কারো কাছে ছিল না। তবে এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যেন নিজেরা একেকটা জাতি, আর তাদের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হল অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়া। এটা জায়েজ মনে করা হতে থাকার মূল কারণ নষ্টা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অথবা তা থেকে উপজাত আরও নষ্টা এক “জাত শ্রেষ্ঠত্বের” ধারণা। [আজকের দিনে যা এক সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হয়ে আবার হাজির হতে দেখা যাচ্ছে] ব্রিটিশরা ফরাসি বা ডাচদের চেয়ে ‘জাতশ্রেষ্ঠ’ শুধু তাই নয় বরং,  অন্য  মহাদেশের যেসব রাষ্ট্র এরা কলোনি-দখল করছিল এমন সবকাজের সপক্ষে সাফাইয়ে সার কত্থাটা হল  জাতিবাদ, জাত শ্রেষ্ঠত্ব অথবা যেমন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব।

অথচ জাতি বা জাতিগঠন ধারণার সাথে মূল রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার ধারণার কোনোই মিল বা সম্পর্ক নাই। একই কথা তো কখনো নয়, ছিল না। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল যেমন ব্রিটেনের বেলায়- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজের ব্যক্তিস্বার্থটাকে কল্পিত এক ‘ব্রিটিশ জাতির’ স্বার্থ বা জাতিরাষ্ট্র স্বার্থ বলে বয়ান তৈরি করে হাজির করেছিল। আর এটাকেই যেন এক ব্রিটিশ রিপাবলিক রাষ্ট্র ও এর স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই ‘জাতি’ ‘জাতিগঠন’ শব্দটাই আসলে কলোনি দখল, অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা – এধরনের কাজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আর এভাবেই ব্রিটিশদের সেকালের ইন্ডিয়াকে কলোনি-দখল যেন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটা কাজ! এভাবে পুরা ইউরোপই রাষ্ট্র গঠনকে কথিত ‘জাতি গঠন’ বুঝেই করে গিয়েছিল; কিন্তু কত দিন?

প্রায় তিনশ বছর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল পর্যন্ত।  এই তিনশ বছর ধরে কলোনি দখল, লুটে খাওয়া আর উদ্বৃত সারপ্লাস পাচার এসবই চলেছিল। কিন্তু এর পরেও হুঁশ এসেছিল কি? হ্যাঁ, অবশ্যই কিন্তু বিশাল খেসারত দেয়ার পরে। জর্মান হিটলারের আগমন ও উত্থান ঘটেছিল সেই খেসারত হিসেবে।

কলোনি দখল যদি জায়েজ হয়, আর  নিজ জাতিরাষ্ট্রের জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখানো আর বড়াই করা যদি সব আকামের সাফাই হয় তাহলে, হিটলারের জার্মানিরও আরো চরম জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে ইউরোপের ব্রিটেন, ফ্রেঞ্চ দেশ-রাষ্ট্রসহ সবার কলোনিগুলা পাল্টা দখল করে নিলে সেটা নাজায়েজ হবে কেন? এভাবে ইউরোপের সব জাতিরাষ্ট্রই হিটলারের তাণ্ডবের ভেতর নিজ জাতশ্রেষ্ঠ বোধের পরিণতি দেখেছিল। এটাই জাতিবাদের পরিণতি, সবার প্রতিচ্ছবি- দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের গ্রেটেস্ট তাৎপর্য। ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তার চরম পরিণতি ইউরোপের সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিল।

অবশ্য এতটুকুই ইউরোপের রাষ্টড়চিন্তায় বদল আসার একমাত্র কারণ না। এর সাথে আরও ভূমিকা রেখেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের (বৃটিশ-ফ্রেঞ্চসহ মিত্রশক্তির) আমেরিকান সামরিক-অর্থনৈতিক সাহায্য পাবার শর্ত যে, ইউরোপকে কলোনি-দখলের দিন শেষ করতে হবে। এটা নাজায়েজ ও অপরাধ মানতে হবে। রাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকারের উপর দাঁড়াতে হবে। সার্বজনীন মানবাধিকার মানবার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ইত্যাদি। যুদ্ধ শেষে ঐ শর্ত মোতাবেক ইউরোপ এভাবে নিজেকে ব্যাপকভাবে বদলে নিয়েছিল।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আরেক অদ্ভুত ঘটনা হল আমাদের এদিকে।, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশগুলোর ট্রেন্ড হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া। কিন্তু কেমন স্বাধীন রাষ্ট্র? বাস্তবে এরা  রাষ্ট্র বলতে তখনও জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বলেই বুঝেছিল। অর্থাৎ একদিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ কলোনি মুক্তির হলেও আর এক দিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ এই তিন মহাদেশে আসলে ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ গড়ার দিকে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের বুঝ তাদের আসেনি। এলোই না।

আর এর সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়েছিল নেহরু-গান্ধীর ভারত। যেমন আজও কাশ্মীর ইস্যুতে, কাশ্মীর আসলে কে শাসন করবে এর একমাত্র নির্ধারক হল খোদ কাশ্মীরের বাসিন্দারা। কোনো রাজা নয়, রাজ যদি কাউকে একসেশন চুক্তি করে) কাশ্মীর দিয়েও দেয় তবুও সে রাষ্ট্রও নয়। এই হল বিশ্বযুদ্ধে শেষের শর্ত ও বুঝাবুঝির কনভেনশন হিসাবে পরের  দুনিয়ার নতুন নীতি। যে নীতি অনুসরণে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল আর সেখানে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে গিয়ে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গিয়েছিল, নেহরু-গান্ধী একটা স্বাধীন ভারত পেয়েছিল। অথচ নেহরু আজীবন ছিল এ সম্পর্কে বেখবর। জবরদস্তিতে তিনি কাশ্মীর দখল করে রেখেছেন।

অন্য বড় বিপর্যয়টা হলো রাষ্ট্র বলতেই তা ‘জাতিরাষ্ট্র’ বলে বুঝা। বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র ধারণা কী পরিণতি হয়েছিল, আর এতে ইউরোপে কী বদল এলো এসব নিয়ে নেহরু-গান্ধীর হুঁশ বা বুঝাবুঝি শূন্য থেকে যায়। তাই ভারত হয় একটা সেই জাতিরাষ্ট্রই। য়ার বলারই বাহুল্য ঘটনা সেখানেই থামে নাই, থামার কথাও না। তাই দেখা যায় ভারত জাতিরাষ্ট্র হয়ে হাজির হওয়ার একটা চেন-রিঅ্যাকশন আছে।

নেহরু-গান্ধীর তথা পুরা কংগ্রেসেরই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝার সমস্যা হল, তারা আসলে একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের কল্পনা করছেন বা এমন ধারণার লালন ও অনুসারি হচ্ছেন। আর এটা গ্রহণে মুসলমানদের মনে অস্বস্তি হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে নাগরিক বৈষম্য তৈরি হবেই- এটাই হল সারকথা। জবরদস্তিতে তাই করতে যাওয়া হয়েছিল। যার সোজা মানে হল বেপরোয়া ভাবে মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র গড়তে সেদিকে ঠেলে দেয়া। এর পরেও ১৯২৮ সালে জিন্নাহর ‘১৪ দফা প্রস্তাব একটা খুবই সুচিন্তিত প্রস্তাব ছিল [ইংরাজিতে পেতে এখানে]। কিন্তু এই সমাধানও আমলই করা হয় নাই। আর তা থেকে জিন্নাহ ফাইনালি কংগ্রেসের সম্ভাবনার হাত ছেড়ে  মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের পাকিস্তান গড়ার দিকে চলে যান। অথবা বলা যায় পরিস্থিতি এদিকে চলে যায়। যদিও তাতেও সমস্যার শেষ হয় না। পরবর্তিতে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে হবে- বলাতে পূর্ব পাকিস্তান ভীত হয়ে পড়ে, বিপদ দেখতে পায় অসাম্যের যে পশ্চিমের আধিপত্যের নিচে সে চাপা পড়তে যাচ্ছে। তাই ক্রমে সেই আবার একই – রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদে পৌঁছায় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু জাতিরাষ্ট্র বুঝ আমাদের কাউকে ছাড়ে নাই। একই প্রশ্ন, একই আধিপত্য কায়েমের অভিযোগ এবার পাহাড়িদের দিক থেকে উঠে। কিন্তু তাজ্জবের ব্যাপার হল, পাহাড়িদের চোখেও এর সমাধান হল আবার সেই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝবার চিন্তা আর তা থেকে এক “জম্মু জাতিবাদ”! দেখাই যাচ্ছে এটা এক লম্বা চেন-রিঅ্যাকশন। কিন্তু দুনিয়ার অভিমুখ আঁচ করা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র চিন্তা আমাদের ছুঁতে পারেনি।

রামমোহন রায় ও তাঁর ব্রাহ্ম প্রকল্পঃ
এর ভিতরে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে  ‘প্রগতিশীলেরা’। কারণ তারাও মূলত জাতিরাষ্ট্রবাদী। আর এরা আবার জাতি বলতে সেটা আবার ছুপা হিন্দু-জাতি বুঝ।
যার আদর্শ প্রমাণ রামমোহন রায় ও তার নতুন করে এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করার প্রচেষ্টা। রামমোহনকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা ভারতে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করেন। কিন্তু রেনেসাঁর গুরু তিনি নতুন ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন কেন? অথচ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত ‘প্রগতিশীলরা’ এতে আপত্তিকর কিছু দেখেনি। চেপে গেছেন। পরবর্তিতে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করে যায়।
এ দিকে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করাতে এই ব্যর্থতাই আবার সাফাই হিসেবে হাজির হয় যে জাতি বলতে হিন্দু-জাতি বুঝি হবে। আর তা থেকে এবার এরা সবাই মিলে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ধারণার অনুসারী হয়ে যান। আর এমনটা তারা এতই অবলীলায় হয়ে যান যে জাতি বলতে যে তারা এক্সক্লুসিভ হিন্দু-জাতি বলে বুঝতেছেন এটাও আর অনুভব করেন না। তাই কোনো জিন্নাহ বা কোনো মুসলমান হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে প্রশ্ন বা আপত্তি তুললে উল্টা তাকেই ‘সাম্প্রদায়িক লোক’ অথবা ‘ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চাওয়া লোক’ ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে ঘৃণাবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন তারা। একাজই তাদের প্রগতিশীলতার শুরু এখান থেকে। অথচ বাস্তবতা হল, সমস্যাটা রাষ্ট্র বলতে তা একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বলে বুঝা থেকে শুরু।

অতএব একালের বড় শিক্ষা হল, সব জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চা সুযোগ থাকা বা রাখা এটা তার মৌলিক অধিকার বলে মানতে হবে। কিন্তু এরপর এ থেকে কোণভাবেই জাতিরাষ্ট্র চিন্তার অনুসারী হওয়ার পথে যাওয়া যাবে না। বরং, জাতিরাষ্ট্র এই চিন্তা বা ধারণাটাই আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র; সবার এক পরিচয়, সবাই নাগরিক এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে। আর সেই সাথে তা হতে হবে- সবাই একই পরিচয় নাগরিক এবং বৈষম্যহীন সমান নাগরিক। সাম্য, মর্যাদা আর ইনসাফের এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘মাতৃভাষার পক্ষ নিলে তা জাতিবাদ নয়”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

গৌতম দাস

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Sm

বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও তার ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতা অব্যাহত আছে তো বটেই বরং বেড়েছে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। মানে, বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বা সংশোধিত নাগরিক আইন পাস করার পরে এ নিয়ে বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি বাড়িয়েই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারা এখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধিদের “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে;  নিজ কর্মীদের নিয়ে গুলি করে মারার শ্লোগান তুলেছে। এরই মধ্যে লন্ডনের ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন এই ইস্যুতে গত সপ্তাহে এক আর্টিকেল ছেপেছে। শিরোনাম “ইকোনমিস্ট এক্সপ্লেনস, দ্যা ইরোশন অব সেকুলার ইন্ডিয়া” [The Economist explains, The erosion of secular India]
‘Explains’ – শিরোনামে উল্লেখ থাকে এমন টাইপের লেখা সাধারণত অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হয় দেখা যায়; যাতে পাঠক ওই ইস্যুর খুঁটিনাটি দিকগুলো ঐ লেখা থেকে জেনে নিতে আগ্রহী হয়। ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেলটা তেমনি ধরনের এক লেখা, যেটার শিরোনাম হল – আমরা “ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা করে বলছি, ভারতের সেকুলারিজমে ক্ষয় ধরে গিয়েছে”।
এই আর্টিকেলের লেখক দিল্লিতে বসে লিখেছেন তা নিজেই জানিয়েছেন। আর এ ধরনের লেখাকে পত্রিকার নিজের অবস্থান, অন্তত কিছু দায়দায়িত্ব নিয়ে লেখা মনে করা হয়ে থাকে।
কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হল “সেকুলার” শব্দের ব্যবহার। সারা ভারতে সেকুলার শব্দের এধরণের বিশেষ আবিষ্কার ও বিরক্তিকর ব্যবহার প্রচলিত আছে সেই ১৯৪৭ সালের আশেপাশের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। সেটা এখন ‘লন্ডন ইকোনমিস্ট’ পর্যন্ত এতে সওয়ার হয়েছে এটা দেখতে পাওয়াটা বড়ই চমকপ্রদ ও তামাশার নিঃসন্দেহে! ইকোনমিস্ট এখানে ধরে নিয়েছে যে, ভারত একটা সেকুলার রাষ্ট্র, অন্তত সেকুলার রাষ্ট্র ছিল – ইকোনমিস্ট এই সার্টিফিকেট এখানে বিতরণ করেছে। কিন্তু ‘সেকুলা’র মানে কী? আর কোনটা সেকুলার কোনটা না, তা চেনার উপায় কী?

যারা দাবি করে থাকে যে সে সেকুলার অথবা তাদের অমুক রাষ্ট্র সেকুলার তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তিনি সেকুলারিজম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কনসেপ্ট সম্পর্কে আসলে খুবই কম কিছুই জানেন। যেমন এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় যে, ওমুক রাষ্ট্র বা ভারত সেকুলার কি না! ইউরোপে কোন রাষ্ট্র সেকুলার আর কোনটা না- এমন প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। এমনকি আমেরিকা কি সেকুলার রাষ্ট্র? এই প্রশ্ন করতে দেখা যায় না কেন? এছাড়া আবার ঠিক কী প্রয়োজন মিটাতে কোন রাষ্ট্রের সেকুলার হওয়া জরুরি কেন? এর জবাব কী তারা জানেন? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন- কোনো রাষ্ট্র সেকুলার কিনা তা বুঝার উপায় কী?

ইকোনমিস্টের এই লেখায় কোথাও অবশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কী অর্থে ভারতে ‘সেকুলারিজম আছে বা ছিল’ বলা হচ্ছে। এটা বলতেই বা আসলে কী বুঝান হয়েছে? তবুও ঐ লেখায় লেখকের এক দাবি হল- “১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত ভারতে সেকুলার ভিশন বজায় ছিল এবং তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নাই” , [“It was the secular vision which prevailed and which remained pretty much unchallenged until the 1980s.”] অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, সেকুলার শব্দের পাশে একটা ‘ভিশন’ শব্দ লাগানো হয়েছে; মানে সেকুলার জিনিসটা একটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে ব্যাখ্যা করতে দেখছি। এমনিতে অবশ্য ভারতের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ভারত সেকুলার কি না’ এই গর্ব বা তর্কের মীমাংসা করার পদ্ধতিটা দেখা যায়, খুবই সহজ। ভারতে একজন মুসলমানকে প্রেসিডেন্ট বানানো হলে এটাই তাদের কাছে সেখানে প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে গৃহীত হয়ে যায় যে, ভারত সেকুলার। অথচ ইস্যুটা অমন লোক দেখানোর মোটেই নয়। রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে যারা সিরিয়াস তাদের কাছে এসব আমলযোগ্য কথা হতে পারে না।

এ ছাড়া ঐ আর্টিকেলের শুরুতে বলা হয়েছে, ভারতের যারা মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ছিল (মানে কংগ্রেসকে কল্পনা করা হয়েছে) এরা নাকি ‘সেকুলারিজমের স্বপ্ন’ ও ‘ইনক্লুসিভ রিপাবলিক’-এর স্বপ্ন দেখতেন, [Whereas the mainstream of India’s independence movement envisioned a secular, inclusive republic……]। কিন্তু সরি, লেখক মহাশয়! আপনার এই কথা বাস্তবের সাথে মিলে না। ফলে, এটা অগ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো ধারণা প্রকাশ করা আমেরিকানদের চালু করা শব্দ। এ ছাড়া কোল্ড ওয়ার যুগ শেষের আগে আমাদের এদিকে এই শব্দ দেখা যায়নি। বিশেষ করে গ্লোবালি ইসলামী রাজনীতিতে একালে তা বাধ্যতামূলক আমলযোগ্য ইস্যু হয়ে পড়ার পর এটা আমেরিকানদের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশের পরই কেবল এটা এক ভাষ্য হয়ে উঠেছে; আগে না। ইসলামী রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র বা শাসন ধারণার “খেলাফত” শব্দে আমেরিকার আপত্তি তারা এভাবেই এই শব্দ দিয়েই প্রকাশ করে থাকে যে রাষ্ট্র মাত্র তাতে বসবসকারি সকল অংশকে সাথে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করতে হবে। কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, উপেক্ষায় ফেলে রাখা সুযোগ নেয়া যাবে না।

এছাড়া মূলত কংগ্রেস কখনই “ইনক্লুসিভ রিপাবলিক” বলে কোনো ধারণা ব্যবহার করে নাই। এমনকি ১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার সময় রুটিন কাজ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা ব্যবহার করা ছাড়া আর ভারতের আর কোথাও শব্দটাই ব্যবহার করা হয়নি। আসলে রিপাবলিক শব্দটাই আমাদের এশিয়ায় এদিকে প্রয়োজনীয় ধারণা মনে করার রেওয়াজ নাই। খুব সম্ভবত আমেরিকানেরা কমিউনিস্ট ঠেকাতে চালু করা এক ভুয়া শব্দ “ডেমেক্রেসি” – এটা চালু করার কারণে গুরুত্বপুর্ণ ‘রিপাবলিক’ ধারণাটা চাপ দিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই  এই দুর্দশা।  আর সোজা হিসাবে এদিকে ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটার ব্যবহার কংগ্রেস দলের নেতা ব্যক্তিত্বরা  যদি বুঝেই থাকত ও মেনে নিত, তবে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার দিকে যেত না। অথবা বলা যায় তাঁরা যেতে দিয়েছিল কী করে? তাহলে নেহরুর “অখণ্ড ভারত” দখলের ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা,  যেটা তাঁর ষোলোআনা ছিল, তার কী হবে? আমরা তো সেটার এখনো সহজেই এর প্রমাণ পাই। মনে রাখতে হবে, অখণ্ড ভারত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সবাইকে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ ভারত রাষ্ট্র গড়া- এ দুটো কারও কারও কাছে অতি উতসাহে শুনতে কাছাকাছি মনে হবে হয়ত। কিন্তু এ দুটো- একই বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও, এরা একেবারেই ভিন্ন বিষয়। আসলে একটা হল, স্রেফ ভূখণ্ডের লোভ। আর একটা হল সবাইকে একই ও সমান নাগরিক মানুষ হিসেবে একত্রে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ও গণ্য করে গড়ে তুলতে চাওয়া।
ওদিকে আবার, গান্ধী ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন; এর প্রমাণ দেখা যায় না।  বরং আসলে তা হবার কথাই না। কারণ  গান্ধী-নেহেরুর রাষ্ট্র-চিন্তা – সেটা এক জাতিরাষ্ট্র পাবার চিন্তা। আর জাতিরাষ্ট্র চিন্তায় “খেলাফত কোন অনিবার্য প্রয়োজনীয় ধারণা নয়।  বরং, তাদের কথিত “দেশপ্রেমিক জাতি” হলেই চলে। গান্ধী বরং তাঁর খামতি চিন্তার অপুষ্টির কারণে  সারাজীবন তিনি “হিন্দু আর মুসলমান’ – এভাবে পরিচয়মূলক শব্দ আওড়ায়ে গেছেন। নন-আইডেনটিটি-মূলক সিটিজেন বা নাগরিক শব্দ কখনই ব্যবহার করতে পারেন নাই।  আসলে মূলত তিনি ‘হিন্দু-মুসলমান এক করতে হবে’ এই হাল্কা ও অর্থহীন ভাষ্য আউড়িয়ে গেছেন। একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে দুটো আলাদা ধর্ম হিন্দু-মুসলমান, এদের এক করতে হবে কেন? এর চেয়েও বড় কথা- দুটো আলাদা ধর্মকে এক করা কি আদৌ সম্ভব, না এর দরকার আছে? এদিকগুলো তিনি ভাবতে সক্ষম ছিলেন মনে হয় না।
দুনিয়াতে ‘আধুনিক রিপাবলিক’ রাষ্ট্রধারণা আসা ও এটা গড়ার চিন্তা এসেছে কবে থেকে? জবাবে সবাই মেনে থাকেন যে, এটা মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর থেকে। একটা ভুল ধারণাও এখানে আছে যা অনেকে ধারণ করে থাকতে পারে। ১৬৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত জন্ম নেয়া সব রাষ্ট্র একই ধরনের রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রধারণা, তা কিন্তু নয়। সহজে চিনবার জন্য বললে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আর পরের ধারণা আলাদা এভাবে মনে রাখলেই চলে। এই যুদ্ধ সব বদলে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে ফারাকটা কী ছিল? তা হল, ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বলতে একমাত্র তা নেশন-স্টেট বলে বুঝা হত। আর পরে সেগুলো সবই হয়েছে অধিকারভিত্তিক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্রের “কাউন্সিল অব ইউরোপ” গঠনকে যদি  লক্ষ্য করা যায়। এর জন্ম-উদ্দেশ্যই ছিল এক হিউম্যান রাইটস কনভেনশন ডাকা (নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস, ECHR)। নিজেদের রাষ্ট্র-ভিত্তি কথিত “জাতি” ধারণা থেকে বদলে হিউম্যান রাইটে রূপান্তরিত করে নেয়া যায়।  যাতে ওই কনভেনশন শেষে একমত হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা, এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোকে জাতিরাষ্ট্র থেকে হিউম্যান রাইটসভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র আকারে ভিত্তি বদলে নেয়া যায়।

অতএব যে ইউরোপের কথা আমরা শুনি জানি, যার এক নমুনা হল সেকালের কলোনি-মালিক ব্রিটিশ রাষ্ট্র; এটা আসলে সেকালে ছিল এক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট; মানে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। আর তাই যে জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে সেকালের রেনেসাঁ-চিন্তা ব্রিটিশের হাত ধরে ভারতবর্ষে এসেছিল সেই রেনেসাঁ ছিল মূলত একটা জাতিরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ও ধারণা। কমিউনিস্ট সার্টিফিকেট অনুসারে সেকালের রাজা রামমোহন রায়কে ‘ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু’ মানা হয়। সেই রামমোহনের সক্রিয়তার কাল (১৮১৫) থেকে পরিশেষে ১৯৪৭ সালের আশপাশের সময়কালের নেহরু-গান্ধীর রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি এখনো সেই রাষ্ট্রধারণাটা মূলত একটা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৪৭ সালের পর  ‘গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত’ আসলে এক নেশন-স্টেট হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু ভারত নেশন-স্টেট বুঝের ভারত হলে, তাতে কী সমস্যা?

এক্কথায় এর জবাব হল, নেশন-স্টেট ধারণা “নাগরিক অধিকার” বা “হিউম্যান” রাইট ধারণা বুঝতেই পারে না। আর নেশন-স্টেট ধারণা এসেছে – রাষ্ট্রগড়া বলতে যেখানে মুল কর্তব্য ছিল একটা “রাজনৈতিক কমিউনিটি” গড়া – এই কাজ থেকে বিচ্যুতি [derailment] হিসাবে।
এছাড়া রাষ্ট্র বলতে এক ‘জাতিরাষ্ট্রে’র স্বপ্ন-কল্পনা থাকলে গঠনকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, কাকে তারা ‘জাতি’ হিসেবে নেবে? যেমন রামমোহন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র দেখে এক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু খেয়াল করতে হবে তার এই জাতি ধারণাটা আসলে (এথনিক অর্থে) এক ধর্মীয়-জাতি ধারণা। ঠিক যেমন এই একই  বিচারে ব্রিটিশরা হল, এঙলো-ক্যাথলিক খ্রিশ্চান, আর এই ধর্মের ভিত্তিতে তারা এক ব্রিটিশ জাতি। আর এখান থেকেই রামমোহন একটা একক ধর্মের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতির কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এতে হিন্দুধর্ম তার ‘ঐ’ প্রয়োজন মিটাতে পারবে, তা তিনি মনে করেননি। কারণ এই হিন্দুধর্ম জাতভেদ প্রথায় ডুবে অসংখ্য জাতে বিভক্ত। এছাড়া ভারতে আরো ধর্মও আছে। এছাড়াও তিনি কোন একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম হলে তা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হবে বলে মনে করতেন। কারণ হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার ধারণাকে তিনি এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনের দিক থেকে দেখে সমস্যা ভাবতেন। এসব চিন্তা থেকেই ১৮১৫ সালে তিনি একেশ্বরবাদী ‘ব্রাহ্মধর্মের’ প্রচলন করেছিলেন।
কিন্তু এই “জাতি” ধারণা প্রয়োজনে ধর্ম-প্রকল্প বাস্তবায়ন রামমোহন বা তার অনুসারীরা কেউ সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আর ১৮৭২ সালের দিকেই, খোদ ব্রাহ্মধর্মই দু’ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ সবাইকে এক ধর্মের অনুসারী করে জাতিরাষ্ট্র বানানো দূরে থাক ব্রাহ্মধর্ম নিজেই বিভক্ত হয়ে যায়। তাই, এটা উদ্যোক্তাদের কাছে অবাস্তব প্রকল্প মনে হতে থাকে আর ততই পরবর্তিকালে বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-বঙ্কিমচন্দ্রসহ সবার কাছেই “ব্রাহ্ম-প্রকল্প বাদ দিয়ে” হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একমাত্র বাস্তবতা বলে নিরুপায় ‘সাফাই’ হয়ে উঠতে থাকে। কংগ্রেসের জন্মের (১৮৮৫) পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা- এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন গান্ধী। পরের বছরের মধ্যে তিনি কংগ্রেসের হাল ধরেন । তখন থেকেই এবং মূলত ১৯২৩ সালের ‘লক্ষৌ প্যাক্ট’-এর ঐক্য ব্যর্থ হয়ে যারার পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একেবারে নির্দিষ্ট হয়ে জায়গা পেয়ে যায়। তবে গান্ধীর কৌশলে, এটা হিন্দুধর্মভিত্তিক বা এটা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সে কথা সরাসরি না বলে আবছা করে রাখা হয়। আর তখন থেকে বিপদে পড়লে হিন্দু শব্দটা ঠিক ধর্ম নয়, সভ্যতা বলে বুঝতে হবে বলে দাবি করার চাতুরী তারা করে গেছেন।

আসলে জাতিরাষ্ট্র বুঝের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এখানে ‘জাতি’ মানেই কোনো একটা আইডেনটিটির জাতি মানে, ভাষা ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়কে ভিত্তিতে জাতি ধরেই এখানে আগাতেই হয়। আর এতেই অন্যান্য ধর্ম অথবা অন্য আইডেনটিটিগুলোও কেন জাতির ভিত্তি হিসেবে তাদেরটা নেয়া হবে না, সে দাবিদারির প্রশ্ন উঠে নতুন অসন্তোষ তো অবশ্যই উঠে কিন্তু সবচেয়ে বড় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব খাড়া হয় যে নাগরিকদের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে একটা না একটা অসাম্য রাষ্ট্র নিয়মিত তৈরি করতে থাকে।

তুলনায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলো মীমাংসিত। যদিও কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার পরে এবার তা বাস্তবায়ন করাটা মূল কাজ যে, ধর্ম বা যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সারকথাটা হল গান্ধী-নেহরুরা হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা আঁকড়ে থাকাতে তারা জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বা কোনো মুসলমানের প্রতি বৈষম্যের কোন সদুত্তর বা সন্তোষজনক জবাব তৈরি করতে পারেননি। পরিণতিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি বড় হয়ে শেষে তারা আলাদা হয়ে যায়; যদিও অনেক মুসলমান দেশত্যাগ করলে নিজের বৈষয়িক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার হবু আশঙ্কায় ভয়ে আপসে ভারতেই থেকে যান।

এর সার কথাটা হল, এখান থেকেই হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণার কারণে ভারতের সব প্রধান দলই কমবেশি ‘হিন্দুত্ব’- এই জাতিবাদের অনুসারী থেকে যায়। এর মধ্যে সেকালের আরএসএস কে (একালের বিজেপি) বলা যায় ‘চরম’ হিন্দুত্ববাদের দল। এ কারণে লক্ষ্যণীয় যে বিজেপির চোখে এখনও ‘নাগরিক’ বলে কোনো ধারণা নেই। তাই সহজেই, মুসলমান বা অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার কোনো দায় অনুভব করে না বিজেপি। তাদের দলের কোনো দলিলেও এর স্বীকৃতি নেই।

তাহলে এটা কী কংগ্রেসের কি আছে? না তাও নেই। কারণ ভারত মূলত ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার দল দিয়েই গঠিত ও পরিচালিত। ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণা ও বোধের দল দিয়ে নয়, তাতে সে দল কমিউনিস্ট হোক কি বিজেপি!

উনিশ শ’ আশির দশকের শেষের দিক থেকে ভারতে কংগ্রেস দলের প্রভাব ও আধিপত্যের পতন শুরু হয়ে যায়। আর এটা লক্ষ্য করেই ইকোনমিস্টের লেখক দাবি করছেন সেকুলারিজমের ক্ষয় তখন থেকে। তিনি ‘কংগ্রেস’ শব্দের জায়গায় ‘সেকুলারিজম’ বসিয়ে কাজ সেরেছেন যেন এর আগে ভারত বিরাট সেকুলার ছিল। এর আগে যেন বছর বছর দাঙ্গা হয়নি। কাশ্মিরে নির্বাচনে ভোটে কারচুপি করে ভোটের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো আর রাজনীতিতে সশস্ত্রতার আমদানি কি ১৯৮৭ সালে কংগ্রেস আমলে হয়নি? তাই, একা বিজেপি সব দোষের ভাগী এ কথা ভিত্তিহীন। রাহুল গান্ধী কি একালে ‘সফট হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছেন না?

তাহলে এখন সত্যিকারভাবে চিনতে হয় কী করে যে, রাষ্ট্র সেকুলার কিনা? রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও বোধের অভাব আর সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে সেকুলারিজম সম্পর্কে সব অদ্ভুত ধারণা আমরা দেখতে পাই। সেটা মুসলমান রাষ্ট্রপতি দেখানো মানে, তা সেকুলারের লক্ষণ পর্যন্ত। এমনকি এটা কনস্টিটিউশনে ওই রাষ্ট্র সেকুলার বলে ঘোষণা দেয়া আছে কিনা অথবা রাষ্ট্রের মূলনীতির একটা সেকুলারিজম কিনা, ইত্যাদি দেখিয়ে যারা দাবি করে, আমার বা অমুকের রাষ্ট্রটা সেকুলার তারা রাষ্ট্র বা সেকুলারিজমের কিছুই বুঝে না। এটা আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। তবে একাজটা তারা করে তাদের একটাই উদ্দেশ্য হল, মূলত ধর্মীয় সংখালঘুদের ভোট এই উপায়ে হাসিল করা।

তাহলে আবার প্রশ্ন সেকুলারিজম বুঝব কেমন করে?  এপর্যন্ত আমরা দেখেছি সেকুলারিজম যেন অবশ্যই ধর্মবিষয়্ক একটা ইস্যু। হা আপতিকভাবে তা মনে হতে পারে কিন্তু এটা মূলত নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষম্যের ইস্যু। কোন দুই নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সাম্য বজায় না রাখার সমস্যা।  যেমন দেখেন, আমাদের রাষ্ট্র এখন ছাত্রলীগের বা আওয়ামি কোন অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইনভঙ্গ করে হলেও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। তাদের কৃত কোন অপরাধ বা রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকে উপেক্ষা বা প্রশ্রয় দিচ্ছে।  রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইন ভঙ্গ করে হলেও ছাড় দিচ্ছে, বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে – এগুলো যথেষ্ট প্রমাণ যে, এই রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষমাই করছে – ফলে বৈষম্যের রাষ্ট্র। নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র নয়। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক বৈষম্য করা মানে তা যদি হয় ধর্ম পরিচয়ের কারণ-সংশ্লিষ্ট তখন এটাকে রাষ্ট্র সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করছে বলা হয়। তাই ‘সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গ’ কথার মূল অর্থ হল নাগরিক বৈষম্য করা।
যেমন মোদীর সিএএ – এই আইনে মুসলমানদের বেলায় বৈষম্য করা হয়েছে তাই এই আইন সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে – এভাবে বলা যায়।  যদিও এখানে মূল কথাটা হল নাগরিকের মধ্যে অধিকার বৈষম্য করা। আর কেমন ধারার বৈষম্য এর উত্তরে বলা যায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিক বলে সংখ্যালঘু বলে তাদের সাথে করা বৈষম্য এটা।
আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এটাও বৈষম্য করা। ধর্মের কারণেসহ যেকোনো কারণে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা, বৈষম্যের চোখে দেখা ও আচরণ করা এটাই মূলত নাগরিক সাম্য বজায় রাখার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।  কেবল ধর্মীয় বৈষম্য নয়, বরং যেকোনো নাগরিক বৈষম্যই নাগরিক-সাম্যের নীতি ভঙ্গ করা।
এরপরে আর একটা দিক আছে। আলাদা করে “আমাদের রাষ্ট্র সেকুলার” – একথা কনস্টিটিউশনে লিখে রাখা বা না রাখাটা গুরুত্বপুর্ণ না। কারণ মূলত রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কারণের বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হয়ে দাড়ানোই  নাগরিক সাম্যনীতি।  তাই  রাষ্ট্র সেকুলার কিনা  এটা বুঝবার আসল জায়গা হল ঐ রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেখানে তাকাতে হবে।  আমার রাষ্ট্র সেকুলার – আলাদা করে একথা লিখা রাখা না রাখা এজন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।  মানে লিখে রাখলেও সেকুলারিজম কায়েম হবে না। এজন্যই যারা এই লিখে রাখাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এরা সেকুলারিজম ইস্যুটা বুঝে কিনা সন্দেহ করা যায়। রাষ্ট্রের চোখে দেশের সবার পরিচয় যাই থাক, মূল বিষয় হবে তাদেরকে কমন “নাগরিক” পরিচয়ে আমল করা হচ্ছে কি না, সে সমান অধিকারের নাগরিক বলে মানা হচ্ছে কি না, কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার সে হচ্ছে কি না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এগুলোর সদুত্তর হল সেকুলার রাষ্ট্রের চিহ্ন। নাগরিক সাম্যের ব্যত্যয় ঘটলেই মানে, অধিকারে বৈষম্য ঘটলেই আসলে  নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ হবে। আর নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ মানে সেখানে সেকুলারিজম নীতিভঙ্গও ঘটবেই। তাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলার লেখা আছে কি না এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেদিকে পরীক্ষা করতে হবে।

ওদিকে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র না হলে নাগরিক সাম্য বজায় থাকা বা বৈষম্যহীনতা রক্ষা করা আশা করা যায় না। আর সেকুলারিজম চিনার উপায় হল রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের বেলায় বৈষম্যমূলক কিনা মানে নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না এটা চেক করে দেখতে হব।

জন্ম থেকেই ভারত হিন্দুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই ভারতের নাগরিক জীবনে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতা বজায় থাকার দাবি বা এই বোধ সরব বা সক্রিয় নয়। একই কারণে তাই সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের উপর নাগরিকের দাবি বা চাপ তেমন নেই। জেলা শহরভিত্তিক মফস্বলে বিজেপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা, মুসলমান বলে কোনো মানুষকে ধরে নির্যাতন করছে, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর লাফ দিয়ে জোড়া পায়ে উঠছে। অথচ গোল হয়ে চার পাশে মানুষ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে এই নির্যাতন উপভোগ করছে। অথচ  কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তাদের। এমন ভিডিও ক্লিপ মোদীর একালে আমরা অনেক দেখেছি। এর মানে হল,  নির্যাতিতকে কেউ তাঁরা তারই মত সমান মর্যাদা ও অধিকারের নাগরিক মনে করছে না। এটাই এর অর্থ তাতপর্য। আবার গত নির্বাচনে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি বা রায় দেয়নি। কেন? বিজেপি দলের ম্যানিফেস্টোতে নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই কেন? নির্বাচন কমিশন কোনো আপত্তি তুলেনি কেন? আবার বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়াতে এই ভাবনার উৎস হিসেবে দলের দলিল তালাশ করে কী কমিশন কখনও দেখেছে?  কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছে?  মনে হয় না। অথচ এগুলো সবই নাগরিক অসাম্যের মামলা। মানে সেকুলারিজমের নীতিও ভঙ্গের মামলা। অথচ ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে সেকুলারিজম শব্দের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ করা ও উল্টা বৈষম্য করা সবই যেন বৈধ।
এখন দিল্লির নির্বাচন চলছে। বিজেপি নেতা কাপিল গুজ্জর গুলি ছুড়ে হুমকি দিয়ে বলেন  এই দেশে কেবল হিন্দুরা যাই বলবে তাই চলবে On 1 February, Kapil Gujjar fired shots at Shaheen Bagh saying, “Iss desh mein sirf Hinduon ki chalegi (Only Hindus will have their say in this country).”। এগুলো গুরুতর নাগরিক বৈষম্য করার মামলা। এবং সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গের মামলা।

এভাবে এক হিন্দুত্ববাদ ছেয়ে বসছে চারদিকে; যেন হিন্দুত্ববাদই, অর্থাৎ এর এই বৈষম্য ও অবিচারের আধিপত্যই একালের নিয়ম!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘ইকোনমিস্টের’ মোদি-পাঠ”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

গৌতম দাস

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2S0

 

মুসলমানবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল ভারতের সংসদের দুই কক্ষেই পাস হয়েছে গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ এর মধ্যে। আর পরদিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা আইনে পরিণত হয়েছে। সংক্ষেপে বিভিন্ন মিডিয়ায় একে ‘সিএএ’ (CAA) (সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) এভাবে ডাকা ও লেখা হচ্ছে। আগামি মার্চ মাসে ব্রাসেলসে ইন্ডিয়া-ইইউ শীর্ষ সামিটে যোগ দিতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। প্রকৃতপক্ষ এটা হয়ে উঠবে ভারত নাগরিক অধিকার কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র বা সরকার হয়ে থাকবে কীনা এর প্রতিশ্রুতিদানের সভা। সম্প্রতি সিএএ- আইন পাশের পর এর নিন্দা বা আপত্তি প্রকাশ নিয়ে প্রস্তাব স্থগিত করে রাখা হয়েছে, মার্চ মাসের এই সামিট পর্যন্ত।

এই বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো তাদের চরম উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়েছে। এবার সুনির্দিষ্ট করে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের (এমইপি বা MEP) সদস্যরা পার্লামেন্টে তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা অনুসারে সংগঠিত ছয়টি গ্রুপের পক্ষ হয়ে প্রথমে ছয়টা আলাদা প্রস্তাব এনেছিল; যাতে এবার তা পার্লামেন্টে সবার আলোচনার পর এক নিন্দা প্রস্তাব হিসেবে পাস হয়। অথবা আরো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আলাদা আলাদা প্রস্তাবের সবগুলোকে একত্রে একটা প্রস্তাব হিসেবে আলোচনার পর তা পাস করা হয়। এভাবে কোন একটা প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে, বলাই বাহুল্য ভারতের জন্য সেটা হবে চরম বিব্রতকর ও লজ্জার। এনিয়ে ভারতের এনডিটিভি লিখেছে, ‘ভারত এখন এক বিরাট কূটনৈতিক বিপর্যয় বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখার মুখোমুখি। কারণ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সিএএ নিয়ে আর কাশ্মিরে ধরপাকড় নিয়ে হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে”। [India is facing a major diplomatic backlash from the European Union (EU) parliament on the Citizenship Amendment Act and the clampdown on Jammu and Kashmir…। এছাড়া ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে যদি আরো কঠোর অবরোধ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাস হয়, তবে তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভারতের জন্য ক্ষতিকর হবে ।
আবার প্রায়ই কথায় কথায় আমরা যেমন দাবি শুনি ভারত নাকি “বৃহৎ গণতন্ত্রের” দেশ  – এমন সেই ভ্যানিটি থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ পালক এখন এথেকে খসে পড়বে তা বলার অপেক্ষা করে না। এই পরিস্থিতিতে ভারতের দিক থেকে এসবের পাল্টা পদক্ষেপে কোথাও হাত জোড় করে নরম অথবা কোথাও ব্যবসা-সুবিধা না দেয়ার গরম হুমকি ইত্যাদি সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতের কূটনীতিকরা মাঠে নেমে পড়েছে, লবি চলছে, সব দিকে সব কিছুর এক বড় তোড়জোড় চলছে।
ভারতকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (EP) এই নড়াচড়াকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কারণ এর ৭৫১ জন (বেক্সিট কার্যকর হবার পর হয়ে যাবে ৭০৫)  সদস্যের  EP মধ্যে সিএএ’র বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছে অন্তত ৬২৬ জনই। যদিও অনেকে বলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের MEP এরা কাগুজে বাঘ মাত্র, যারা হুঙ্কার দেয় যতটা কামড় বসানোর ক্ষমতা বা প্রভাব ততই কম এদের –  পুর্ব অভিজ্ঞতায় এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা অনেকে বলবেন অবশ্যই। কিন্তু ব্যাপারটা এবারও কী তাই হবে? দেখা যাক!

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা এসব প্রস্তাবে আপত্তিগুলোর একেবারে শীর্ষের কথা হল, ভারতের নতুন নাগরিক আইন, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে বৈষম্যমূলক। মানে ‘নাগরিক অধিকার’ হল আনা ঐ প্রস্তাবগুলোর ফোকাস। ‘নাগরিক অধিকার’ ব্যাপারটা আসলে কী ও কোথা থেকে এনিয়ে খুব সংক্ষেপে বললে, আমাদের চলতি বিশ্বের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্টান্ডার্ড এবং এর সবচেয়ে বড় কমন কাম্য দিকটা হল ‘অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ হতে হবে। অর্থাৎ রাজতন্ত্র নয়, কলোনি-মালিকের দখলাধীন কলোনি-রাষ্ট্র নয় বরং স্বাধীন রিপাবলিক ও গণক্ষমতার রাষ্ট্র যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে হবে যেন এগুলো নাগরিকের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হয়।

ফলে এর কমন বৈশিষ্ট্যই শুধু নয়, এক কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং হল নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া। অন্তত নীতিগত ভিত্তি হিসাবে ১৯৪২ সালে  ১ জানুয়ারি সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন (যদিও তখনও তা মাওয়ের চীন নয়) – এই দুই রাষ্ট্র আমেরিকা ও বৃটেনের সাথে একমত হয়ে গ্লোবাল রাজনীতিক ব্যবস্থার নতুন ভিত্তি মানতে লিখিত ঐক্যমত প্রকাশ করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি এমন সময় থেকেই এই মূল মেরুকরণ শুরু হয়েছিল। আমেরিকার নেতৃত্বের কাম্য সেই নতুন দুনিয়াতে কলোনি আর নয়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র – হিটলার ও তার সঙ্গীদের রাষ্ট্রজোটের বিপরীতে এই পক্ষই জয়লাভ করে ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। আর সেই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ সব রাষ্ট্রের এক অ্যাসোসিয়েশনের জন্ম হয় জাতিসঙ্ঘ নামে। এরপর জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবাই বসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ‘আইন ও কনভেনশন’ থেকে অধিকারের চার্টার লেখা হয়েছিল। আর স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশের ওপর আইন ও কনভেনশনগুলো বাধ্যতামূলক পালনীয় হয়ে যায়।

অবশ্য এর সাথে তৈরি হয়ে যায় নানা ফাঁকফোকরও। বিশেষ করে আইন ও কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন কে কার উপর করবে, কিভাবে করবে, কতটা করবে নাকি ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে নিজেকে আড়াল করবে – এসব প্রশ্নে। এছাড়া সবার উপরে তো আছেই রাষ্ট্রের বৈষয়িক লাভালাভের স্বার্থ আর এই ভিত্তিতে পক্ষে-বিপক্ষে থাকা অথবা না থাকার জোট বাঁধা। দেখা গেছে, বৈষয়িক স্বার্থের লোভে কোনো রাষ্ট্র অন্যকে অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে আপস বা ছাড় দিয়ে বসতে দেখা যায়। যেমন, রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেও মায়ানমার যেভাবে বেচে যাচ্ছে। অথবা ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ভারতের বাজার সুবিধা পেতে পশ্চিমের অনেক রাষ্ট্রই ভারতের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে মোদী সরকারকে ছাড় দিয়ে বা উপেক্ষা করে বসে আছে। এসব সমস্যা থেকে দুনিয়া একেবারে মুক্ত হতে পারেনি এখনো, সে কথা সত্য। কিন্তু তাই বলে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড গড়ে বা অধিকার বিষয়ক নানান আইন ও কনভেনশনের প্রটেকশন গড়ে তুলে কোনোই লাভ হয় না অথবা এ নিয়ে ব্যত্যয় ঘটলে কারো বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলা হয় তাকে বিব্রত করার জন্য এমন কথাও ভিত্তিহীন অবশ্যই। এছাড়াও যদিও জাতিসঙ্ঘের অধীনের বিচার বা তদারকি কাঠামো- এই ব্যবস্থার মধ্যে কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও তা প্রমাণ করা বা প্রস্তাব পাস করে আনা খুব সহজ কাজ নয়। অভিযোগ সবটা বা সবার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে কখনো সমর্থ না হলেও কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে এমন উদাহরণের বাস্তবতা নেই।

তবে সবচেয়ে কমন ঝোঁক হল, কোনো রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন বা অধিকার বৈষম্যের অভিযোগে নিন্দা প্রস্তাব উঠলে নিরুপায় সে রাষ্ট্র তখন অন্যের অভিযোগ তোলাটাকে নিজের ‘সার্বভৌমত্বের’ লঙ্ঘন বা ভিন রাষ্ট্রের বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’ বলে দাবি করতে থাকে। এভাবে নিজ মুখ রক্ষার চেষ্টা করে থাকে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে অন্তর্বর্তী রায়ে অভিযুক্ত হয়ে ধরা খেয়ে মিয়ানমারও  এই কাজটা করেছে। আর সিএএ ইস্যুতে এবার ভারতের প্রতিক্রিয়াও তাই। এটা ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ “entirely internal to India” বলে দাবি করা হয়েছে। মানে বলতে যাচ্ছে যেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা প্রস্তাবের কথা তুলে ইউরোপ যেন ভারতের পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন করেছে। এ ব্যাপারে পুরানা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো আরো সরেস। তাদের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসা মাত্রই তারা একে ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বা ‘হস্তক্ষেপ’ বলে প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকে। আবার খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেও কখনও অভিযোগ উঠলে সেও কম যায় না। সে নিজে জাতিসঙ্ঘের ওই অঙ্গসংগঠন থেকে নিজের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়ে অথবা আর কখনো চাঁদা দিব না বলে অথবা  খোদ জাতিসংঘ বা ঐ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে অকেজো করার হুমকি দিয়ে থাকে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে কলোনি ব্যবস্থার সমাপ্তি ও অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক ধারণার রাষ্ট্রের প্রস্তাবক হলেন সেকালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নিজে। শুধু প্রস্তাবকই নয়, যুদ্ধে নিজের অংশ গ্রহণ ও মিত্রদের সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি বলেছিলেন একথাটা।

সেকালে হিটলারের কাছে হেরে যাবার ভয়ে নিরুপায় হয়ে হিটলার-বিরোধী ইউরোপীয় “মিত্র-রাষ্ট্রগুলো” [Allied powers] আমেরিকান প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। তবে এর আগে থেকেই যদিও ইউরোপ দাবি করত যে, তারা সবাই নাকি আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুদ্ধ শেষে সবার আগে তারা নিজেই নিজেদের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা কাঠামো ব্যবস্থা সংস্কার করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়েছিল। অর্থাৎ মানে দাঁড়িয়েছিল যে, আগে নিজেদের আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও সেবার মেনেই নিয়েছিল যে তারা “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র আসলে ছিল না।  যারা অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস অরিস্কার করে বুঝতে চান তাদের জন্য যুদ্ধোত্তর এই নতুন ইউরোপকে চেনা ও বুঝতে চেষ্টা করা খুব গুরুত্বপুর্ণ। ইউরোপের বেশির ভাগ যেসব রাষ্ট্র বিনাবাক্য ব্যয়ে বা কোন ওজর আপত্তি না তুলে এভাবে নবজন্ম লাভ করে নিতে আগিয়ে এসেছিল এমন ৪৭ টা রাষ্ট্রের একটা জোট তখনই গড়ে তোলা হয়েছিল। এর নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe). এবিষয়ে আরও জানতে আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন – Who we are – the Council of Europe ।  আর একই সাথে লক্ষ্যণীয় একই প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষে নাগরিক-অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রের নব-দুনিয়া গড়ার আমেরিকান প্রস্তাবে বৃটেনের চার্চিলসহ স্টালিনের সোভিয্যেন ইউনিয়ন ও চিয়াং কাইসেকের  সমগ্র চীন স্বেচ্ছায় এবিষয়ে একমতের দলিলে স্বাক্ষরকারী। এবং  ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি আমেরিকা, বৃটেন, সোভিয়েন ইউনিয়ন ও চীন এই চার রাষ্ট্র স্বাক্ষরিত এই দলিলকেই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা (Declaration of The United Nations 1942) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম ইউরোপ নিজেকে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe) গঠনের মাধ্যমে সংশোধন বা পুনঃজন্মলাভ করে নিলেও এবং চিয়াং কাইসেকের বা পরবর্তিতে মাওয়ের চীনসহ স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এদুই রাষ্ট্রের মধ্যে  “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র গড়ার ইস্যুতে কোন প্রভাব পড়ে নাই। যদিও সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা  এই দলিলে স্বাক্ষর করে স্টালিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ইউরোপের নিজেকে  নাগরিক অধিকারভিত্তিক করে পুনর্গঠনে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামি সংগঠিত হয়েছিল। আসলে এটা ছিল জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর ভুলকে সংশোধন করে   নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিজেদেরকে পুণর্গঠন। এভাবে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামে ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্রের জোট গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। আর এর মধ্যেকার কেবল ২৮ রাষ্ট্রের আরও ফরমাল ও আরও ঘনিষ্ঠতার রাষ্ট্রজোটে হচ্ছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বা ইইউ (European Union)।  এই হল, ইইউ এর সাথে  কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE এর সম্পর্ক ও  ফারাক।

১৯৫৩ সালে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE শুধু গঠন করা নয়, বরং নিজেদের সব নাগরিকের জন্য এক কমন অধিকারের চার্টার রচনা কাজ করে নিয়েছিল সদস্য রাষ্টড়্গুলোর এক কনভেনশন ডেকে, যার নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অ্ন হিউম্যান রাইট (European Convention on Human Right, ECHR) । আর এটা বাধ্যতামূলক প্রযোজ্য করা হয়েছিল কাউন্সিল অব ইউরোপ নামে নিজেদের নবগঠিত ৪৭ ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোটের সব রাষ্ট্রের ওপর। আর অধিকার সম্পর্কিত ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রের কোন নাগরিকের অভিযোগ তদারকির জন্য আলাদা সুপ্রিম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল যার নাম ইউরোপীয় কোর্ট অব হিউম্যান রাইট বা (ECtHR) নামে। আসলে এটাই ছিল আগামির কোন হিটলারের ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদ বা জাতনিধনের বিরুদ্ধে ইউরোপের নিজেকে রক্ষাকবচ।

মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ অতীতের কারণে আজকের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ-বিরোধিতা করে অধিকারবিষয়ক যেকোনো প্রস্তাব আলাদা গুরুত্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া আরো একটি কারণে এখনকার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে প্রস্তাব আনা আলাদা বিশেষ গুরুত্বের। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন সে জায়গা নিতে চাচ্ছে বা যাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় চীনকে ঘায়েল করতে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে হিউম্যান রাইট ইস্যু ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে চীনের প্রতি ইইউর অবস্থান ভিন্ন। কমিউনিস্ট কাঠামোর রাষ্ট্র হিসেবে চীনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ড সবসময় খারাপ থাকে। আর আমেরিকার পলিসি হল চীনকে দাবড়ে রাখা। তাই আমেরিকা তে চিনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ডের কথা তুলে চিনকে ঘায়েল করতে চায়। কিন্তু ইইউর অবস্থান আমেরিকার মতো ঘায়েল করা নয়। বরং ইইউ এর পলিসি নিয়েছে, চীনকে হিউম্যান রাইট মেনে চলা কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র করে গড়ে উঠতে সাহায্য-সহযোগিতা করা। আর এভাবে চীন-ইইউর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। গত ২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্রাসেলসে চীন-ইইউ এক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখান থেকে ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটাই হিউম্যান রাইট প্রসঙ্গে চীন-ইইউ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়তে চাওয়ার এক প্রামাণ্য দলিল।

কিন্তু মোদির কপাল সত্যিই খারাপ। আগামী মার্চ ২০২০ সালে ভারতের সাথেও একই রকমভাবে ভারত-ইইউ সামিট হতে যাচ্ছে ব্রাসেলসে। তাই ওই সময়ে মোদির ব্রাসেলস সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই যারা ভাবছেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা আগের মতোই কোনো মামুলি ব্যাপার অথবা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে কোনো শক্তিশালী প্রভাব ফেলার মতো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাপার নয় তারা সম্ভবত ভুল প্রমাণিত হবেন। আগের ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট শক্ত অথবা নরম যাই ভূমিকা নিয়ে থাকুক না কেন এবারের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আগের চেয়ে ভিন্ন এটা প্রমাণিত হবেই। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইটের নীতির ভিত্তিতে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন থেকে তারা সাজাবেনই, এ নিয়ে তারা নিজেদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সেটা এ জন্য যে, এমন নীতি ভিত্তিতে আরো আগে না দাঁড়াতে পারার জন্য চীনকে বিশেষ করে বেল্ট-রোড ইস্যুতে চিনের সাথে যুক্ত হওয়া বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ইইউ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রায় সবাই আলাদা এককভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক করতে প্রায় চলেই গিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে সেখান থেকে সরে আসতে সক্ষম হয়েছিল অবশ্য।  এরপর তারা ইইউ হিসেবে একসাথে চীনকে মোকাবেলা করতে সমর্থ হওয়া থেকেই চীনকেও হিউম্যান রাইট মেনে চলতে বাধ্য ও রাজি করানোর পর্যায়ে আসতে পেরেছে তারা। এর ফলেই সব বিপর্যয় এড়িয়ে নিজেদের ভাঙন এড়িয়ে ও শক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে বলে মনে করে। এতে এমনকি এরপর গত বছরের মে মাসে চীনে বেল্ট-রোড টু এর সম্মেলনও এই নীতির ভিত্তিতেই ২৯ রাষ্ট্রপ্রধানের এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল।

সর্বশেষ অবস্থা হল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে এবারের ঐ ছয় প্রস্তাব একসাথে একটা প্রস্তাব হিসেবে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে নিজেদের আরো আলোচনা ও তা পাস হওয়ার ব্যাপারটা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। এর মূল কারণ সম্ভবত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট  নতুন নাগরিকত্ব আইন  ভারতের কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করেছে বা বিরোধী হয়েছে কিনা সে মামলার বিচার করতে গিয়ে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে ৪০ দিন সময় দিয়েছে। অর্থাৎ আদালত এই বিতর্কিত আইন বাতিল করে দেয় কিনা বা কী রায় দেয়  সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছে। কিন্তু ভারতের কিছু পত্রিকা লিখছে এই স্থগিত করাকে মোদি সরকার নিজের কূটনৈতিক বিজয় মনে করছে।

এটাও ভুল প্রমাণিত হবে। কারণ মার্চ মাসেই ভারত-ইইউর সামিট (India-EU Summit 2020) অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে মোদি সিএএ’র ব্যাপারে পিছিয়ে সরে এসে যদি হিউম্যান রাইট মেনে চলার জোরালো অঙ্গীকার না করেন তবে এর পরিণতি খুবই খারাপ দিকে যেতে পারে। তবে বড়জোর ভারত হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য আরো সময় চাইতে পারে। কিন্তু সেটা কেবল এই শর্তে যে, তত দিন নতুন নাগরিক আইন ও এনআরসির বাস্তবায়ন স্থগিত করতে হবে। অন্যথায় চরম খারাপ দিকটা হল, ইইউ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা পর্যন্ত গিয়ে বসতে পারে। এক কথায় সিএএ-এনআরসি বাস্তবায়ন আর ইইউর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক- এই দুটো আর আগের মতো একসাথে চলতে পারবে না।

এমনকি বাংলাদেশের চলতি নির্বাচন নিয়ে যে ‘পর্যবেক্ষণ’ ইস্যুতে তর্কাতর্কি চলছে। এটাকেও হাল্কা বিষয় হিসেবে দেখা হয় যদি, এটাও ভুল হবে। ইইউ হিউম্যান রাইট মেনে চলা বা এর কমপ্লায়েন্স ইস্যু এখন থেকে খুবই কঠোরভাবে অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। কেবল বাস্তবায়নের জন্য সময় বেশি চাইলে অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে তা করতে চাইতে পারি। তবুও সেটা সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতির অধীনেই কেবল হতে পারে।

হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স এটা হতে যাচ্ছে ধীরে ধীরে – অর্ডার অব দ্যা কামিং ডেজ! ফলে এটা এখন দেখার বিষয় মোদী কিভাবে নিজেকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে হাজির করেন!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মানবাধিকার ইস্যুতে সিরিয়াস”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

গৌতম দাস

০৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2QS

           https://gulfnews.com/photos/news

ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” ব্যাপারটা অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে গেছে। যেমন আগে এটা এনআরসি [NRC বা নাগরিক তালিকা প্রণয়ন]  বলেই নিজে বুঝা বা অন্যকে বুঝানো যেত।  এনআরসি ব্যাপারটা ছিল কেবল আসামে আর সেখানে কে নাগরিক কে নয় এরই এক বাছাই প্রক্রিয়া চলছে বলে বুঝলেই চলত।  কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের গোপন লক্ষ্য ও পরিকল্পনার দিকটা ক্রমশ পুরাটাই উদোম হতে শুরু করেছে। এতে পরবর্তিতে তা আর এক নতুন মাত্রার দিকে গেলে সেই বিষয়টা বলা হচ্ছে সিএএ (CAA, Citizen Amendment Act) । যার সোজা মানে হল সংশোধনী বিলে  আফগান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ এভাবে নাম ধরে উল্লেখিত দেশ থেকে মূলত হিন্দুধর্মের লোকদেরকে ডেকে নিয়ে এসে নাগরিকত্ব দেয়ার পরিকল্পনা এটা। যদিও তা আদৌও বিজেপি বাস্তবায়ন করতে পারবে তা আমরা নিশ্চিত নই। এতে এখানে গুরুত্বপুর্ণ দিক যেটা স্পষ্ট করে বলে রাখা হল ঐ তিন দেশের মুসলমানেরা এই সুবিধা পাবে না।  অর্থাৎ ঐ তিন দেশে কোন কারণে  মানবাধিকার হারানো যে কেউ “নাগরিক” নয়, কেবল মূলত হিন্দুধর্মের লোকের জন্যই এই সুবিধা। এটা এতই স্পষ্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বৈষম্যমূলক আইন।
আর এবছর থেকে এবার আরও এক নতুন ইস্যু এনপিআর (NPR বা জাতীয় জনগণনা) এর সাথে যোগ হচ্ছে। ভারতে প্রতি দশ বছর পরপর নিয়ম করে জনগণনা হয়। সেটা শুরু হবে এবছরের এপ্রিল থেকে আর তা কাজ শেষে প্রকাশ হবে ২০২১ সালে।  কিন্তু এবার জনগণনাতে বাড়তি প্রশ্ন ও তথ্য সংগ্রহের কিছু দিক থাকবে এমনভাবে যেন তা পরের এনআরসি ও সিএএ-এর বদ মতলবের কাজকে সাহায্য ও সহজ করে। তাই এখন থেকে ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” বলতে আমাদেরকে – NRC, CAA & NPR – এই তিনের কোন একটাকে না বুঝা তিনের সমন্বয়ে ‘পুরাটাই একটা’ এভাবে বুঝাই সঠিক হবে। তাই এখন থেকে ব্যাপারটাকে একসাথে “নাগরিকত্ব ইস্যু” লিখব।

অনেকের ধারণা, সম্প্রতিকালের “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” ভাল সাড়া ফেলা বিরোধী আন্দোলনের পর এখন বোহয় এর সমাপ্তি ঘটেছে। না, এমন মনে করা একেবারেই ভুল হবে। আর বাস্তবে এটা থেমেও যায়নি। বরং আসলে নতুন নতুন মাত্রা ও অভিমুখ নিয়েছে আর সেসব দিকে ছুটে চলেছে। আর এটা থেমে যেতে পারে যদি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কোন ঘোষণা আসে যে, পুরা ‘নাগরিকত্ব ইস্যুর’ সব কিছুই পরিত্যক্ত এবং আইনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হল। এর আগে নয়। যদিও ব্যাপারটা বিড়ালকে মাছ খাওয়া ছেড়ে দিতে বলার মত। বিজেপি তা করতে পারবে না, বাধ্য না হলে। কারণ, বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিই তো এটা যে, ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো, আর এর মাধ্যমে সাধারণভাবে সবাই নাগরিক বলে গণ্য না করা, বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক – সেটা নয়; বরং হিন্দুধর্মের লোকেরা শ্রেষ্ঠ এবং উপরে – এই হিন্দুত্ববাদের প্রচার তুঙ্গে তোলা যাতে এভাবে সমাজে ধর্মীয় পোলারাইজেশন ঘটে যায় আর তাতে হিন্দু ভোটে একা বিজেপির ভোটের বাক্সই ভরিয়ে তোলা যায়। কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যু নরেন্দ্র মোদীর সরকার কখনই ত্যাগ করতে চাইবে না, যদি না তাকে আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করা না যায়।

যদিও এটা ঠিক যে, স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের তীব্রতা সময়ে কমবে সময়ে তুঙ্গে উঠবে, কখনো সরকার পিছু হটবে, মিথ্যা বলবে আবার মোদী সরকার কিছু সুযোগ পেলেই দ্বিগুণ বেগে ফিরে আসবে – অনুমান করা যায় সাধারণভাবে এটা এভাবেই চলবে। আর তা চলবে অন্তত চলতি সরকারের স্বাভাবিক আয়ু, ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এমন হওয়ার অনেক কারণ আছে। এক নম্বর কারণ হল, বিজেপি সরকারের হাতে এ ছাড়া নিজের মুখরক্ষার আর কোনই ইস্যু নেই। অথচ ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থা খুব খারাপ আর তা দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে। ফলে এই দুর্দশা ঢাকতে উপযুক্ত ইস্যু দরকার। পেটের চিন্তা থেকে আম পাবলিকের মন সরানোর মত অন্য ব্যস্ততায় তাদের মাতিয়ে রাখার মত ইস্যু দরকার; যেটা গত ২০১৬ থেকেই মোদী করে আসছে। এ ছাড়া আরও বড় বিষয় হল, সরকারের বাকি চার বছরের আয়ুতে প্রতি বছরই গড়ে চার-পাঁচটা করে রাজ্য নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। সেখানে বলার মত নির্বাচনী ইস্যু পেতে হবে এমন জোশ তুলতে পারতে হবে সরকারকে।

এমন অনেক কিছুর মধ্যে আগামী বছর (২০২১) দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন আছে – পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম রাজ্যে। এ দুটোতে কী হবে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে; তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির (অমিত শাহ্ বলেছেন দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতবে) হার হলে, তা ‘নাগরিকত্ব ইস্যু’ নিয়ে এর পরে বিজেপির কোনদিন কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শামিল হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আসামের আগে হবার কথা। আর পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম দু’রাজ্যেই হেরে গেলে ভারতে খোদ হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বিপন্ন হয়ে যাবে। “মুসলমানবিদ্বেষী জিগির তুলে বিজেপির ভোট বাক্সে হিন্দু পোলারাইজেশন” – এই ফর্মুলা চিরতরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই এদুই রাজ্যে হারলে মোদী সরকারের সব হিন্দুত্ব-বয়ানেরই নৈতিক [moral] পরাজয় ঘটে যাবে। হিন্দুত্ববাদ-ভিত্তিক কোন বয়ান অনুসারে ব্যাখ্যা বক্তব্য নিয়ে পাবলিকের কাছে গেলেই মানুষের “দূর দূর” করা শুরু হতে পারে।  ফলে বাকি তিন বছর ক্ষমতায় থাকা তখন দুঃসহ হয়ে উঠতে পারে। অতএব, বিশেষ করে এ’দুই রাজ্যে অন্তত রাজ্য নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব ইস্যু থাকবে প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ইস্যু হয়ে।

ইতোমধ্যে, অমিত শাহ আরেক ধাপ পিছু হটে নিজ মুখেই “এনআরসি ‘এখন’ নয়” – বলেই পিঠটান দিয়েছেন। এনিয়ে দৈনিক আনন্দবাজারের এক শিরোনাম হল, “এনআরসি নয় ‘এখন’, শাহের কথায় ফের ধন্দ”। মানে হল, মিডিয়াগুলো এখন মোদী-অমিতের কোনো কথাকেই আর বিশ্বাস না করার লাইন নিয়েছে তাই এদের কোন কথাকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না। মিডিয়া তাই পাবলিকের মনের সাথে মিল রাখতে  প্রতিদিন ও সবসময় সন্দেহ করছে আর খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে চলেছে। কেন? কারণ, ভারতের এখনকার “পপুলার পাবলিক মুডটা এ রকম”- আসলে সেই ইঙ্গিতই তুলে ধরছে মিডিয়াগুলো। ভারতের রাজনীতিতে সহসা এমন ক্ষিপ্ত মুড তৈরি হতে দেখা যায় না। বরং প্রত্যেক পঞ্চম বছরে, মানে কেন্দ্রের নির্বাচনের বছর ছাড়া অন্য বছরগুলোতে বড় মিছিল-মিটিং আয়োজন করে দলগুলো পয়সা খরচ করতে চায় না, তেমন কোনো ফল এতে নেই বা হবে না মনে করে বলে। কিন্তু ব্যতিক্রমে এমন ক্ষিপ্ত মুড কখনও  তৈরি হয়ে গেলে মিডিয়ায় রিপোর্ট লেখার সময় সেই পাবলিক মুডের সাথে তাল না মিলিয়ে লিখলে পত্রিকাই বাজার হারানোর রিস্কে পড়ে যাবে। আনন্দবাজারসহ  এখনকার সব মিডিয়া রিপোর্ট তাই এই মুডে লেখা। এক কথায়, বিজেপির বয়ানের প্রতি কোনো সহানুভূতি প্রকাশ করে ফেলা মিডিয়াগুলোর জন্য রিস্কি হয়ে গেছে। তবে অবশ্যই সেটা ‘টাইমস নাউ’ বা ‘রিপাবলিক’ ইত্যাদি বিজেপি ঘরানার দলীয় মিডিয়াগুলো বাদে।

উত্তরপ্রদেশ বাসা থেকে সোনাদানা লুট শুরু হয়েছে
নাগরিকত্ব ইস্যুতে এখন আরেক তোলপাড় চলছে উত্তরপ্রদেশে। মোট ২৩ কোটি জনসংখ্যার বিরাট রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুসলমান প্রায় ২০ শতাংশ। এবারের নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে প্রাণহানিতে সারা ভারতে মোট মৃতের সরকারি সংখ্যা ২৫ জন, যার ১৭ জনই এই প্রদেশের। আন্দোলনের মুখে রাজ্যসরকার পিছু হটেছিল, আর এখন ঘোষণা দিয়ে প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। এই রাজ্যের একটা আইন ছিল, কোনো আন্দোলনে সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে রাজ্য সরকার এর জন্য  – দায়ী কে, তা সুনির্দিষ্ট চিহ্নিত করে, তাঁর থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে। কিন্তু পরে আবার রিট হওয়াতে সেবার হাইকোর্ট আরও স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, রাজ্য সরকার নয়, হাইকোর্টে প্রমাণ সাপেক্ষে তা কোর্ট আদায় করে দিবে। অর্থাৎ হাইকোর্টের মাধ্যমে রাজ্য সরকার তা আদায় করতে পারবে; নিজেই সরাসরি কাউকে দায়ী করে নয়। সোজা কথায় নির্বাহী ক্ষমতা নিজের মত করে কিংবা আদালতে প্রমাণ হওয়া ছাড়া নিজেই নয়। অথচ উত্তরপ্রদেশ রাজ্য-পুলিশ এখন হাইকোর্টের মামলা করা অথবা রায়ে তা প্রমাণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বেছে বেছে বেশির ভাগ মুসলমান নাগরিকের বাড়িতে প্রবেশ করে হয়রানি ও লুটপাট করে চলেছে- একেবারে সোনাদানা নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। বিবিসি সরেজমিন রিপোর্ট করেছে এ নিয়ে। যার শিরোনাম – “যোগী অদিত্যনাথের ‘বদলা’: বাড়ি বাড়ি সম্পত্তি ক্রোকের নোটিস”।
তাই বলা যায় এক ‘খাঁটি প্রতিশোধ’ আদায়ের পালা চলছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে।

ভারতের বিদেশী কূটনীতিক
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট ছেপেছে। ভারতে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকেরা নাগরিকত্ব ইস্যুতে মোদী সরকারকে কেমনভাবে দেখছেন, এই হল ওর বিষয়। এ নিয়ে তিন মহাদেশেরই প্রায় ১৬ জন কূটনীতিকের সাথে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিপোর্টার। এর শিরোনাম, “দ্রুত বন্ধু হারাচ্ছে ভারত : সিএএ কেউ সমর্থন করছে না, বিদেশী কূটনীতিকদের হুঁশিয়ারি” [No outreach on CAA, foreign diplomats warn: India fast losing friends]। সেখানে এক কূটনীতিকের মন্তব্য খুবই প্রতিনিধিত্বমূলক। ভারতে তিন বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন, এমন সেই কূটনীতিক বলেছেন, “মোদী পুনর্র্নিবাচিত হয়ে এসেছিলেন বলে নিজের স্বপক্ষে যে একটা ‘ফিল-গুড’ বা ‘স্বস্তির-ইমেজ’ [“feel-good” factor ]  তৈরি করতে পেরেছিলেন এত দিন, তার পুরোটাই এখন চলে গেছে” [“feel-good” factor about the re-elected government has “vanished”. ]।

তবে তাঁরা মূলত সবচেয়ে অখুশি এ জন্য যে, নাগরিকত্ব ইস্যু বা এর সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী আন্দোলন কিংবা জনবিভক্তিতে ক্ষোভ ইত্যাদি – এসব নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার আজও কোন কূটনৈতিক ব্রিফিং বা সরকারি ভাষ্য প্রদান করেননি। না, কূটনীতিকদের এই আকাঙ্খা এটা অনধিকার নয় বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়া নয়। কারণ, ইতোমধ্যে মোদী সরকার এ ধরনের কাজকে এর আগেি নিজের সরকারের জন্য রুটিন করে ফেলেছেন। যেমন- ‘পুলওয়ামা-বালাকোট হামলা’র পর, আগস্ট থেকে অক্টোবরে কাশ্মির নিয়ে সিদ্ধান্তের পর এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের ‘অযোধ্যা মামলা’র রায়ের পরও তারা কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছিলেন অথচ এখন নাগরিকত্ব ইস্যুতে চুপ- এ কারণে এবার তারা খুব অবাক হয়েছেন, [They recalled that through 2019, the Ministry of External Affairs (MEA) held several briefings, mostly after Pulwama-Balakot in February-March, followed by Kashmir from August to October — and, to their surprise, even once on the Supreme Court’s Ayodhya verdict.]।

ওদিকে সবচেয়ে বড় কথাটা হল, বিদেশী মিডিয়াতে যেভাবে বিক্ষোভ ও সরকারের সাঁড়াশি অভিযানের ছবি ও প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, তা ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর ভারতের পক্ষে দাঁড়ানোটাকে কঠিন করে তুলেছে। কারণ ওইসব দেশের অনেকেই ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ মানে নাগরিক অধিকার এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যহীনতা রক্ষা করে চলার প্রতিশ্রুতি, যা যেকোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র করে থাকে, তা ভারতে কোথায় গেল সেই প্রশ্ন তুলছেন তারা, [“With each passing day, the government’s position is getting weakened, as these images are not going away. And the action against the protesters and the latest reports of torture and intimidation are giving more credence to the view that the government is intolerant of criticism and dissent,”……. “It doesn’t speak well of the world’s largest democracy,” a diplomat from a G-20 country said”…….The State Department spokesperson had earlier urged India to “protect the rights of its religious minorities” in keeping with its “Constitution and democratic values”.

আসলে, এটা হল হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির মৌলিক সঙ্কট, যেকোন অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এ জন্য এমন মতবাদ অগ্রহণযোগ্য। সোজা কথাটা হল, বিজেপি অথবা আরএসএসের রাজনৈতিক চিন্তায় ‘নাগরিক অধিকার’ বলে কোন ধারণা নেই। কেবল ‘হিন্দু-জাতি’ আছে; নাগরিক বলে কোনো কিছু নেই। খাঁটি হিন্দুরা কেবল কথিত অলীক কোন হিন্দু-জাতির স্বার্থ দেখবেন, এ ধারণা আছে। দরকার হলে এ জন্য তারা অপর অন্যের মাথা ফাটিয়ে দেবেন। সেকারণে তাদের মনে হয়, ‘নাগরিক’ অথবা ‘অধিকার’ এসব শব্দ আবার কী?

দুনিয়া যতদুর পরিক্রম করে পেরিয়ে যে জায়গায় এসেছে তাতে আমরা পছন্দ করি আর নাই করি একালে গ্লোবাল সমাজের মৌলিক ভিত্তি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি। এমনকি তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ রাষ্ট্রও অন্তত মুখে এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে তা বলবার সুযোগ নাই। এবং তা বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে মানে। তাই এককথায় বললে ভারতের আজকের অবস্থা হল আন্তর্জাতিক জগতে সে একঘরে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। এ’কথারই প্রতিধ্বনি দেখা গিয়েছে আগের কংগ্রেস আমলের প্রাক্তন সেই সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের মুখে। তিনি বলছেন, আমাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে “শত্রুপক্ষকে আমরা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছি’।  “দেশের বাইরে থেকে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের তালিকা সত্যিকার অর্থেই দীর্ঘ। প্রেসিডেন্ট মখাঁ (ফ্রান্স) ও চ্যান্সেলর মার্কেল (জর্মানি) থেকে নিয়ে ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস এবং নরওয়ের রাজার মত ব্যক্তিরাও এর সমালোচনা করেছেন, যারা সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে ভদ্র অবস্থানে থাকেন”।

তবুও হয়ত ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা”- রাষ্ট্রের এই অভিন্ন প্রতিশ্রুতি (বা মূল্যবোধ) দেয়া বা রক্ষার কথা বিজেপি বা আরএসএস নিজে মানুক না মানুক তাদের দিয়ে মুখে স্বীকার করানো যেত, যদি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন ও কঠোর হতেন। কিন্তু মনে হয়, সে আশাই আর নেই। কারণ, ও দুই অফিসের নীতি হল, মোদির নির্বাহী ক্ষমতা আগ্রাসী হয়ে ধেয়ে এলেই তারা সবাই গুটিয়ে সরে যাবে। নাগরিককে সুরক্ষা দিতে কিংবা নাগরিককে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা ও প্রতিকার দিতে গেলে নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে- এমন পরিস্থিতির উদয় হলেই কোর্ট বা কমিশন এরা পাশ কাটাতে শুরু করবেন। কখনো পাশ কাটাতে তারা বছরওয়ারি শুনানির সময়ও ফেলতে থাকেন। যেমন, উত্তরপ্রদেশে রাজ্য সরকারের যেখানে এখতিয়ারই নেই সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায়ের, তা সত্ত্বেও নাগরিককে সীমাহীন হয়রানি করে চলছে, ঘোষিতভাবেই ‘প্রতিশোধ’ নেয়া হচ্ছে।

বিজেপি নেতা অমিত শাহের কঠোর সমালোচনা শুরু হওয়াতে দল থেকেই তাঁকে কিছু দিন চুপ থাকতে বলা হয়েছিল। ছিলেনও। কিন্তু আবারো তিনি সরব হয়েছেন। এবার পশ্চিমবঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে তিনি বলছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে (২০২১) ক্ষমতায় আসবে নাকি বিজেপি। এমনকি মমতার সাথে যদি কংগ্রেস ও বামফ্রন্টও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে তবুও এই ফল হবে। এতে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, নাগরিকত্ব ইস্যু যখন তৈরি ও হাজির ছিল না, তখন অমিত এমন বললে মমতা ছাড়া অন্যরা (মানে কলকাতার কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট) কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া শ্রেয় মনে করে এসেছে আমরা দেখেছি। কিন্তু এবার বিরোধীরা সবাই অমিতের মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অর্থাৎ গত বছরের (২০১৯) কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষুব্ধ সিপিএম যেমন মমতাকে হারিয়ে দিতে বেনামে অঘোষিতভাবে বিজেপির পক্ষে কাজ করেছিল এবার আর সে অবস্থা নেই, তা বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিজেপির অবস্থা আর তেমন ভালো নেই- এটা অমিত শাহেরই স্বীকারোক্তি। যেমন অমিত বলছেন, এনআরসি নয় ‘এখন’; মানে তার দল কলকাতার নির্বাচনে ব্যাকফুটে। হয়ত, এনআরসির কথা আর ভোটের আগে বিজেপি তুলে ধরবে না, এ ব্যাপারে পিছিয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ক্ষেপে গেছে, তা অমিত শাহ এভাবে পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের লোক কেমন ক্ষেপে থাকতে পারে, এর এক নমুনার সরেজমিন রিপোর্ট আছে আনন্দবাজারে – আধারের জন্য সারা রাত লাইনে ১১ হাজার।  [এখানে “আধার” মানে AADHAAR – এটা আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের মতন সমতুল্য ডকুমেন্ট। ] আর ওদিকে, আমাদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তের অপর পারে নদীয়া জেলা (ব্রিটিশ আমলে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার এক মহকুমা ছিল), এখনকার নদীয়ার এমন আরেক মহকুমা হল তেহট্ট – এই হল ঘটনাস্থল। সেখানকার একটা ঘটনা হল এই তীব্র শীতে বৃষ্টির রাতে আধার কার্ড সংশোধনের জন্য সারা রাত ১১ হাজার লোক লাইন দিয়ে বসেছিলেন। লোকের মনে আতঙ্ক যে, কার্ড না থাকলে যদি নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারার অপরাধে ভারত থেকে বের করে দেয়া বা ক্যাম্পে ফেলে রাখা হয়! নাগরিকত্ব ইস্যু হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার মনে কী পরিমাণ আতঙ্ক জন্ম দিয়েছে, এর জলজ্যান্ত প্রমাণ এই ১১ হাজার লোকের লাইন। এই লোকগুলো অথবা যারা এদের দুর্দশা দেখছেন, তারা কেউ বিজেপিকে কি আগামীতে ভোট দিবে মনে হয়?  তবে মনে হচ্ছে না অমিত শাহ এই সাধারণ মানুষগুলোর আতঙ্ক আর অমানুষিক কষ্টের দিকটা দেখতে পাচ্ছেন। বুঝা যাচ্ছে মোদী-অমিতেরা নিজের ভোটবাক্সে হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে আদায় ছাড়া আর কোন দিকেই তাদের হুশ নাই, এমনই নিষ্ঠুর অমানুষের চিন্তায় পৌছে গেছে তারা।

তাহলে এখন অমিত শাহ এত বিরাট দাবি করে বললেন, তারা জিতবেনই- এই দাবির মাজেজা কী?
ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় মোদীর কোনও কারচুপির মেকানিজম আছে এমন অনুমান ও অভিযোগ অনেকের। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মমতা এবং উত্তরপ্রদেশের মায়াবতীর সবচেয়ে বেশি। এটা কি সেই ইঙ্গিত যে, অমিত শাহের এখন শেষ ভরসা সেখানে? এই প্রশ্ন দানা বাঁধছে। মমতা ইতোমধ্যে ভোটব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের উভয় সংসদে নোটিশ দিয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার আছেন; তিনি গত নির্বাচনে মোদির নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের জন্য ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন বলে পরে তার পরিবারের সদস্য সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই (আমাদের দুদকের সমতুল্য তবে তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। ) লেলিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠে আছে। মোট কথা, অমিত শাহের দাবি অস্বাভাবিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ০৪ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক ও নাগরিকত্ব ইস্যু এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

গৌতম দাস

১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৫, সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Nl

 

[সার সংক্ষেপঃ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কোন মুল্যায়ন চোখে পড়ে না। ফাঁপা আবেগী কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের পুজা বা স্তুতি দেখা ছাড়া। কেউ সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বোধের চিহ্ন বা রাজনৈতিক অবস্থান – তা নাও হতে পারে। নেতাজী সুভাষ এই তিন গুণের ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্র বা রাজনীতি জ্ঞান বলে কিছু ছিল তা জানা যায় না। জাপানি রেসিস্ট শাসকের ফ্যাসিজমের রাজনীতি ছিল। “নেতাজী” তিনি তাদের ট্রেনিং পেয়েছিলেন। ঠিক যেমন বার্মিজ জেনারেলেরা পেয়েছিলেন। এবং জাপানি সামরিক সহযোগিতায় এই জেনারেলেরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্য-মুক্ত করেছিলেন। কাজেই নেতাজী সুভাষ যদি জাপানি সামরিক সহায়তায় সশস্ত্রভাবে ভারতকে স্বাধীন করে ফেলতেন তবে তিনিও বার্মিজ  জেনারেলদের মত যাদের কৃতিত্ব হল নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো, ক্লিনজিং আর রেসিজম, ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি বৈশিষ্ঠের – এদের মতই নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! ]

ROAR বাংলা থেকে নেয়াঃ হিটলারের সাথেও সাক্ষাত করেছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসু; Source: commons.wikimedia.org

আসল নাম সুভাষচন্দ্র বসু, সংক্ষেপে সুভাষ বোস [Subhas Chandra Bose]। বৃটিশ-ভারতে অবিভক্ত বাংলার এক রাজনীতিবিদ, কংগ্রেস দলের দু’বারের সর্বভারতীয় সভাপতি। কিন্তু কলকাতার হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্তের যারা ঢবঢবে ইমোশনাল, এদের চোখে তিনি ‘নেতাজী’। প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে মধ্যবিত্তের সস্তা আবেগের নেতা হলেন সুভাষ বোস। এদেরই স্বীকার করে নেয়া সুভাষ বসুর খেতাবি নাম হল ‘নেতাজী’।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনসীমা খুবই ছোট, ১৯২১-১৯৪৫ সাল। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর ১৯২০ সালে বৃটিশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে না দিতেই সেই চাকরি ছেড়ে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর অপরপ্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, তিনি  বৃটিশ কলোনির এক বাসিন্দা হয়েও বৃটিশ-প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানি ও জাপানের সামরিক সাহায্য নিয়ে ছোট হলেও এক সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধে বৃটিশদেরকে পরাজিত করবেন ভেবে জাপানি সহযোগিতায় জাপানে বসে নিজস্ব এক সেনাবাহিনী (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা INA) বা আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়েছিলেন। যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ মেরুকরণের দিক বিচার করে বললে,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা-বৃটিশ-রুশ ইত্যাদি ‘মিত্রবাহিনীর’ কাছে জার্মানি, ইতালি ও জাপান ‘অক্ষশক্তির’ জোটের পরাজয় ঘটেছিল। ফলে সুভাষের বাহিনীকেও ১৯৪৫ সালে বৃটিশদের কাছে সারেন্ডার করতে হয়েছিল। কিন্তু এরপর দেশে ফিরতে যে সামরিক বিমানে তিনি উঠেছিলেন, এখান থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ বলেন তাইপেই-য়ের (এখন তাইওয়ানের রাজধানী) আকাশে প্লেন ক্রাশ করে  মারা গেছেন, কিন্তু সেই লাশ কই কেউ জানে না।  এরপর ঠিক কী হয়েছিল সুনিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না বরং ব্যাপারটা রহস্য আবৃতই থেকে যায়। কিন্তু এ’ঘটনাটাই আবার আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগ আরও সপ্তমে তুলতে ভুমিকা রেখেছে।

বয়সের হিসাবে নেহরু সুভাষের চেয়ে ৮-৯ বছরের বড়। তবে একসাথে কাজ করেছেন। যেমন, ১৯২৮ সালের কংগ্রেস দলের সম্মেলনে, গান্ধী আর মতিলাল নেহরু (জওয়াহেরলাল নেহরুর বাবা) এরা হেদায়েত করছিলেন “বৃটিশ ডমিনিয়ান রুল” দাবি করে দলের প্রস্তাব পাস করাতে। ডমিনিয়ান [Dominion] মানে হল, ভারতকে বৃটিশ শাসন কর্তৃত্বের অধীনেই রেখে ও মেনে, কেবল নিজেদের জন্য এক সীমিত স্বায়ত্বশাসন চাওয়া। আর এক্ষেত্রে গান্ধীর বিপরীতে তারুণ্যের অবস্থান নিয়েছিলেন জওয়াহেরলাল নেহরু আর সুভাষ বোষ, তাদের দাবি ছিল”পূর্ণ স্বাধীনতা”। সেকালে ‘পূর্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হত ডমিনিয়ান শব্দটা নাকচ করতে। যদিও নেহরু আর সুভাষ কংগ্রেসের একই উপধারার রাজনীতির লোক ছিলেন না। এটা ছিল তাদের  সিনিয়রদের বিরুদ্ধে কমন এক অবস্থান নেয়া।

সুভাষ বোস ছিলেন মূলত সব সময় আপাত ‘রেডিক্যাল’ বা সশস্ত্রতার রাজনীতির পক্ষে। আর একভাবে বলা যায় তিনি গান্ধীর আপোষকামী ও অহিংস ধারার রাজনৈতিক এপ্রোচের বিপরীতে বৃটিশের বিরুদ্ধে সংঘাত করে করে আগানো – এই লাইনের লোক।

সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই।

এখানে একটা কথা খুব পরিস্কার করে আমাদের মনে পরিস্কার রাখা দরকার। সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই। এই স্বল্প পরিসরে এর কিছু বুঝতে, একটা চিহ্নের কথা বলা যেতে পারে। যেমন সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা দিয়ে কেউ এমনকি “দেশ স্বাধীনও” করে ফেলতে পারে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে এরা দেশ বুঝে কিন্তু রাষ্ট্র বুঝে না। স্বাধীনতা অর্জনের পরে এরা কী রাষ্ট্র গড়বে? কী রাষ্ট্র গড়বে, কেমন? এরা জানে না। কারণ চিন্তা করে নাই। কলকাতার নেতাজী, সুভাষচন্দ্র বসু এমনই দেশপ্রেমী বিপ্লবী!

যদিও সুভাষ তাঁর দল খুঁজে নিয়েছিলেন ঐ কংগ্রেসকেই; তবে সেটা তিনি আসলে তার গুরু চিত্তরঞ্জন দাশের (মৃত্যু হয় ১৯২৫ সালে) কংগ্রেস দলেই এসে যোগ দিয়েছিলেন। এটা বড় প্রভাবক ছিল। কিন্তু আবার রেডিক্যাল যদি তিনি হবেনই, তবে কংগ্রেস দলে যোগ দিতে গিয়েছিলেন কেন? এর কোনো সদুত্তর বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আবার তিনি কোনও কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট রাজনীতিও করতেন না। ফলে এ কারণে তার চিন্তাকে রেডিক্যাল যদি বলি, তবে সে কথা টেকানোও মুশকিল। কোন এক আবছা রংয়ের সোশালিজমও তিনি পছন্দ করতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনটা হলেও ব্রিটানিকাও তাঁকে প্রমাণহীনভাবে সোশালিস্ট বলতে চেয়েছে। তা খুব সম্ভবত সেকালের যেসব ট্রেড ইউনিয়নিস্ট বা কৃষক আন্দোলনের নেতা যারা আবার দল হিসাবে কংগ্রেসেই থাকতেন আর যারা সারাজীবন কংগ্রেস দলের ভিতর গান্ধীর গালমন্দ খেয়ে কোনঠাসা হয়ে থাকতেন – এদেরকে আনুকুল্য দিতেন সুভাষ – এই কারণে।

তবে সুভাষের সশস্ত্রতা এর আরও বৈশিষ্ট আছে। যেমন তা আবার বৃটিশদের শত্রু হিসেবে খোদ হিটলার, তারই সাথে সখ্য গড়ে, সামরিক সাহায্য নিয়ে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেন – এমন লোক হলেন সুভাষ। এমনকি এই ‘নেতাজী সুভাষ’ আবার গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেসের ১৯৩৭ সালের প্রথম (বাংলাসহ সাত প্রদেশে) প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি জার্মান-জাপানের সহযোগিতায় বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে এমনই বদ্ধধারণায় ডুবে মোহাচ্ছন্ন ছিলেন যে, ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভারত ছেড়ে পালিয়ে তিনি জর্মানিতে গিয়ে খোদ হিটলারের সাথে দেখা করেন।

কিন্তু হিটলার, এত দূর সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা এসে জড়িয়ে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন বলে তিনি না করে দিলে, সুভাষ সেখান থেকে হিটলারের সহায়তায় জাপান চলে যান। হিটলারের যুদ্ধের বন্ধু জাপানের শাসক মার্শাল তেজোর [Tōjō Hideki] সাথে দেখা করেন আর সেখান থেকেই নেতাজী সুভাষের সামরিক সহায়তা পাওয়ার কপাল খুলে যায়। জাপানি সহায়তায় বাহিনী গড়ে নিয়ে সুভাষ একসময় বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে যান। তিনি বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর বার্মা সীমান্ত দিয়ে জাপানি বিমান হামলার কাভার বা ছত্রছায়ায় দুটো বৃটিশ সীমান্ত চৌকি আক্রমণ করে (ইম্ফল ও কোহিমা, দুটোই আজকের মনিপুর ও নাগাল্যান্ড ছোট দুই রাজ্যের রাজধানী) দখল করেছিলেন বলা হয়। এটাই তাঁর সর্বসাকুল্যে কৃতিত্ব ধরা হয়।

এর আগে তিনি যে অনেক দিন ধরেই (সম্ভবত ১৯২৭ সাল থেকে) জার্মান-জাপানের শাসকদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন তা কংগ্রেস দলের সিনিয়রেরা অনেকেই জানত। সুভাষ বোস কংগ্রেস দলে নিজ গ্রুপিং শক্তিশালী করে ১৯৩৮ সালে প্রথম কংগ্রেস দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি পরের বছরও একই প্রভাবে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হবার শেষে গান্ধী পরে আলটিমেটাম দেন যে, সুভাষকে পদত্যাগ করতে হবে; না হলে কমিটির বাকি নির্বাহী সদস্যরাও পদত্যাগ করবে। এর মূল কারণ ততদিনে সুভাষের জার্মান-জাপানের সাথে যোগাযোগ-সম্পর্কটা খুবই পরিপক্ক হয়ে উঠে স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তাই কংগ্রেসের রাজনীতিকে সশস্ত্রতার পক্ষে হেদায়েত করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তাই সুভাষের হেদায়েতি ঠেকাতেই গান্ধীর এই আলটিমেটাম এসেছিল। তখনই সুভাষ নিজের গ্রুপকে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ [Forward Bloc] নাম দিয়ে আলাদা দল হিসেবে প্রকাশ করেন। ফরওয়ার্ড ব্লক নামে দলটা এখনো কলকাতায় আছে আর তা “বামফ্রন্ট” নামে কলকাতাকেন্দ্রিক যে কমিউনিস্টদের জোট আছে তারই এক শরিক দল। মজার কথা হল, এই “ফরওয়ার্ড ব্লক” দল নিজেদেরকে এক কিসিমের কমিউনিস্ট দল বলে দাবি করে। কিন্তু কোন সূত্রে তারা কমিউনিস্ট, এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সম্ভবত আবছা জোড়াতালির ভাষ্যটা হবে এ রকম যে, তারা সশস্ত্রভাবে ‘দেশ স্বাধীন’ করার লোক। সুতরাং তারা ‘বিপ্লবী’ না হয়ে যায় না। আর বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিবাদী তো বটেই। অতএব…।

কিন্তু তাহলে আসল কথায় আসি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ মানে অবিভক্ত বাংলার থেকে পূর্ববঙ্গের আলাদা প্রদেশ ও ঢাকা এর রাজধানী হয়ে যাওয়ায় হিন্দু-জমিদারদের এর প্রবল বিরোধিতা শুরু করেছিল, পাগল হয়ে গেছিল। সেই ইস্যুতে অথবা খোদ জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদে পূর্ববঙ্গের দাবির প্রতি সুভাষ বসুর অবস্থান কী ছিল? এক কথায় ভিন্ন কিছুই না। একেবারেই আর পাঁচটা হিন্দু কংগ্রেসের নেতা, গান্ধী-নেহরুর মতই ছিল সুভাষের অবস্থান। অর্থাৎ হিন্দু-জমিদারি স্বার্থের নেতাই তিনিও। মূলত এ কারণেই নেতাজী (সুভাষচন্দ্র বসু) কংগ্রেস দলে গান্ধী-নেহরুর বিরোধী ক্যাম্পের নেতা হলেও তিনি পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তখন বা এখন কেউ হতে পারেন নাই, নন। যদিও সুভাষ কংগ্রেসে যোগ দেন অনেক পরে ১৯২১ সালে আর ততদিনে মানে ১৯০৫ সাল থেকেই এসব ভাগাভাগি ঘটে গিয়েছিল।

এরপরেও আমরা দেখব, বাংলাদেশে খুঁজে পাবো কেউ কেউ সুভাষ বোসের ছবি বা মূর্তি সাজিয়ে রেখেছেন ড্রয়িংরুমের শোকেসে। যেমন বাংলাদেশে টাটা গাড়ির এজেন্ট কোম্পানির মালিক অথবা কোন দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারের কেউ। সম্ভবত তাদের সাধারণ বুঝাবুঝি অবস্থানটা হল – কংগ্রেস দল যে হিন্দুইজমের দল, এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দল, তা অনেকে জেনেও লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। করে বলতে চায় কংগ্রেস  মানে তো প্রগতিশীলতা, কাজেই কংগ্রেস দলের কোনো নেতার চিহ্ন তো ধারণ করাই যায়।  তা দোষের নয়। অথবা উপরে বলা আগের ফর্মুলা যে সশস্ত্রতা মানেই বিপ্লবীপনা মানেই প্রগতিশীলতা। এ রকমই কিছু একটা ধামাচাপা বুঝ!

সম্প্রতি মোদীর এই জমানায় বিজেপির হাতে কিছু পুরানা বিতর্ক টেনে তোলা হয়েছে। মোদী বা বিজেপি দলের ধারণা নেতাজী সুভাষ যেহেতু কংগ্রেসের নেহরু-গান্ধীর বিরোধী ধারার, কাজেই হিন্দু কোলকাতার ‘নেতাজী’ আবেগে কৌশলগত সুড়সুড়িতে সমর্থন দিলে আখেরে বিজেপির তাতে লাভ আছে। তাই গত নির্বাচনে নেতাজীর এক ভাতিজার ছেলে চন্দ্রকুমার বসু, তিনি বিজেপির প্রার্থী হিসেবে কলকাতা থেকে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও জিততে পারেননি। সম্প্রতি সুবীর ভৌমিক এনিয়ে লিখেছেন। তিনিও একই নেতাজী আবেগ আঁকড়ে লিখেছেন – মোদী-বিজেপিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “গেরুয়ারা অপরিহার্যভাবেই বদহজমে ভুগবে”।

কারণ, পরবর্তিতে এসে হঠাৎ সেই চন্দ্রকুমার মোদীর বিজেপিকে এক হুঁশিয়ারির কথা বলে বিপদে ফেলে দিয়েছেন। বলেছেন, “মোদীর দল যদি ঐক্যবদ্ধ ভারতের নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ অনুসরণ না করে, তবে দেশ টুকরা টুকরা হয়ে যাবে”। কথাটা বিজেপির নেতাদের জন্য বিব্রতকর সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু এটা কোন অর্থপূর্ণ কথা তিনি বলেননি। কারণ, চন্দ্রবসু যদি এ কথাই আওড়াবেন তবে বিজেপির টিকিট নেয়ার তো তাঁর কথা নয়। তিনি বিজেপিতে গেছিলেন কেন? আবার বিজেপি যে তাঁর এই বয়ান বা নতুন রাজনীতির কেউ না, সেটা তো সকলেই আগে থেকেই জানে। কাজেই এই তামাশা অর্থহীন। স্টান্টবাজি করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

এ ছাড়া আবার চন্দ্রকুমারের উদ্ধৃত ও কথিত ‘নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ’- এটা আবার কী জিনিস? চন্দ্রবসু নিজেই এর জবাবে বলছেন যেহেতু, “নেতাজীর সেনাবাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম-শিখ ইত্যাদি” সব ধর্মের লোক ছিল তাই এটাই নাকি “নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ”। এসব কথা আসলে সোনার-পাথরের বাটি ধরণের। একজন কথিত মুসলমান প্রেসিডেন্ট থাকলেই ভারত একটা সেকুলার দেশ, এসব পোলাপানি বোকা-বুঝের রাজনীতি অনেক দিন ধরে চলে আসছ্‌ দেখেছি আমরা। এগুলো অর্থহীন, না বুঝে কথা বলা। যারা রাষ্ট্র ধারণা রাখেন না, এই ইস্যুতে কোন বুঝাবুঝি না রেখে আন্দাজে বলা কথা এগুলো। এরা না বুঝে মর্ডান রাষ্ট্র না বুঝে কোন সেকুলারিজম! তবু আন্দাজে কথা বলে যায়।

আসলে ব্যাপারটা হল, শত বিপ্লবীপনা ফলালেও ভারতের স্বাধীনতা কোনও সশস্ত্র আন্দোলনের ফলাফলে অর্জন হয় নাই। টেবিলে বসে আপোষ-আলোচনায় পাওয়া স্বাধীনতা এটা। এই আত্মশ্লাঘা নিয়ে  আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের মনে মেলা আপসোস আছে। এই ফাঁপা আবেগী জোশ মেটাতে “নেতাজী” এক ভাল টোটকার নাম। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা যায়, নেতাজীর অবদান কী? তখন আবার আরেক প্রশ্ন, কারও অবদান মাপে কেমনে? কারণ এটা তো জানা নাই। তবু তাতে যেমন যদি বলা হয়, তিনি জাতীয়তাবাদী ছিলেন? এখন জাতীয়তাবাদী মানে কী? অথবা তিনি কী রাষ্ট্র বুঝতেন? কেউ জানে না। আচ্ছা তাহলে বলেন যে, আপনার নেতাজীর ভারত রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে অবদান কী? এবার কবিরা একেবারেই নীরব হয়ে যাবে। অনেকে বলতে চাইবেন তাঁর মৃত্যুরহস্য কী কিছু না? মানে তিনি বলতে চাইছেন, এখানে গোয়েন্দা গল্পের প্লট আছে। কিন্তু আছে হয়তো তাতে কী?

এতেও নেতাজীর অবদান কী তা দেখানো যায় না। আসেন তাহলে উল্টো জায়গায় তাঁর হিটলারের সাথে দেখা করা বা জাপান যাওয়াকে মূল্যায়ন করি। না, হিটলার খারাপ তাই নেতাজী ভাল হয় কেমনে সেকথা না হয় নাই তুললাম। সেসব বাদ রেখেই আগাই। প্রথমত, জার্মান-জাপান যেতে নেতাজীর ভারত ছেড়ে বের হয়ে পড়া; এটা তার অবসেশন ও এক আবেগ মাত্র। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল  অধিকারভিত্তিক কলোনিমুক্ত রাষ্ট্র ও জাতিসঙ্ঘ জন্ম দেওয়ার এক নতুন ব্যবস্থার দুনিয়া কায়েম বনাম রেসিজম ও ফ্যাসিজমের কলোনি মালিকের দুনিয়া- এ দুয়ের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। যেখানে হিটলাররা দ্বিতীয় বা নেতিপক্ষ। এ দিকটা মূল্যায়নের ক্ষমতা হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগী-গর্বের কলকাতার নেই। আবার সময়ের সেন্সের দিকটা দেখেন। সুভাষ জাপান পৌছেছেন ১৯৪৩ সালের ২ জুলাই। কিন্তু ঘটনা হল ততদিনে যুদ্ধ ঘোরতর জায়গায় পৌছেছে শুধু তাই না। বরং বলা যায় যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেটা হল, হিটলার-তেজো-মুসোলিনির জোটপক্ষ হেরে যাচ্ছেন।  আসলে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকেই আমেরিকান রুজভেল্ট  এর বিজয়ের বাতি জ্বলে উঠে গিয়েছিল। বাকি ছিল তা ঘটতে যে সময়টা লাগে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সুভাষ বোস তা আমল করার যোগ্য বোধবুদ্ধির লোক ছিলেন না।

নেতাজী সুভাষ ভারত স্বাধীন করে ফেললে কী হত?
সবশেষে একটা পরিণতির কথা দেখিয়ে শেষ করব। ধরা যাক নেতাজী সুভাষ ও তাঁর সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিতে গেছেন। তারা ভারত স্বাধীন করে ফেলেছেন।  তাহলে কেমন ভারত দেখতাম আমরা?
আগে বলেছি দুটো সীমান্ত চৌকি তারা দখল করতে পেরেছিলেন, ইম্ফল ও কোহিমায়। কিন্তু এগুলো সবই বার্মা-ভারত সীমান্তে কেন?

এর মূল কারণ বা ঘটনার ভিতরের ঘটনা হলঃ জাপান মানে কলোনি শাসক মার্শাল তেজোর জাপানের সামরিক সহায়তায় ১৯৪২ সালে  বার্মা একবার বৃটিশ শাসনমুক্ত হয়ে গেছিল। ঠিক যেমনটা সুভাষ বোস স্বপ্ন কল্পনা দেখতেছিলেন। সেই জাপানিজ-বার্মায় এবার জাপান থেকে  সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজকে তুলে এনে এর হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিল। আর তাতে এই রাজধানী রেঙ্গুনে বসে ভারত-বার্মা সীমান্তে হামলা করা আর কঠিন কাজ ছিল না। আর তাতেই দুটা সীমান্ত চৌকি মুক্ত করার দাবি।

আসলে আমরা কেমন নেতাজী দেখতাম- এর এককথার জবাব হল, বার্মার এখনকার রোহিঙ্গা-কচুকাটা করা বীরত্মের জেনারেলদের মতই এক নেতাজী সুভাষের জেনারেলদের ভারত – এটাই দেখতে পেতাম আমরা। বার্মা প্রথমবার বৃটিশ কলোনি দখলে চলে যায় ভারত বৃটিশ-দখলে চলে যাওয়ার ৬৭ বছর পরে, ১৮২৪ সালে। যদিও ১৮৮৫ সালে তৃতীয় ও শেষ বৃটিশ-বার্মার যুদ্ধের পরে সেবার বার্মা স্থায়ী দখল হয়ে যায়। আর এতে বার্মা একই বৃটিশ-ভারত শাসক প্রশাসনের অধীনেই ভারতেরই একটা প্রদেশ (বার্মা প্রদেশ নামে) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ও শাসিত হতে শুরু করেছিল। এর ফলে বার্মার ভিতরে পাবলিকের দিক থেকে ধীরে ধীরে যে সর্বব্যাপী মূল অসন্তোষ দেখা দেয় এর লিড নিয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়্কেন্দ্রিক আন্দোলনকারি জনগণ। তাদের তপ্ত ক্ষোভের কেন্দ্রীয় সার বক্তব্য হল এই বলে যে, বৃটিশরা ভারতীয় সহকারীদের সাথে নিয়ে এসেছে আর তাদের দিয়েই বার্মা প্রশাসন চালাচ্ছে। আর এরই সাথে চাকরি-ব্যবসার পুরা বিষয়গুলোতে ভারতীয়রাই বার্মা এসে জেঁকে বসে গেছে, সব কিছুতে দখল দিয়েছে। বৃটিশ শাসকদের এই ভারতপ্রীতি এই প্রেফারেন্স – বার্মিজদের বদলে পুরনো অভ্যস্ততায় ভারতীয়দের অগ্রাধিকার করে ফেলা এটাই জেনোফোবিক বা বিদেশিবিরোধী করে তুলেছিল বার্মিজ এলিটদেরকেও।

অর্থাৎ বার্মিজ মধ্যবিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ভারতীয়রা বার্মায় চাকরি-ব্যবসা করত। এই অসন্তোষ বৃটিশরা টের পেয়ে ব্যবস্থা নিয়েছিল অনেক পরে ১৯৩৭ সালে। এতে  বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয়, বার্মার জন্য আলাদা বৃটিশ শাসক প্রশাসন কায়েক করতে করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই ১৯৩৭ সালে এসে বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয় ঘোষণা করা হয়। বার্মা আলাদা বৃটিশ-বার্মা কলোনি হিসেবে শাসিত হতে শুরু করেছিল।

কিন্তু ততদিনে বিক্ষুব্ধ বার্মা জাপানের তোজোর নাগাল পেয়ে গিয়েছিল। জাপান “ত্রিশজন বিপ্লবী” তরুণকে সবার আগে জাপানে নিয়ে গিয়ে সরাসরি ট্রেনিং দিয়েছিল। Aung San, U Nu এরা ছিল ঐ ত্রিশজনের মূল নেতা। Aung San হল একালে অং সাং সুচির বাবা।  পরে ঐ ত্রিশের তাদের হাতেই একটা পুরা সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এদেরকে সামনে রেখে পেছনে জাপানি আর্মি মিলে একত্রেএরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্যমুক্ত অর্থে স্বাধীন করে ফেলেছিল। পরে নতুন গঠিত সরকারের আজকের সু চির বাবা ওই ৩০ জনের একজন হিসাবে ১৯৪৪ সালে জাপান সমর্থিত বার্মা সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় ঐ বছরই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। মায়ানমারে এখনও ঐ ত্রিশজনকে বিরাট বিপ্লবী জাতীয় বীর মানা হয় যারা জাতীয় গর্বের। যদিও বলা হয় বর্তমানে ঐ ত্রিশজনের মধ্যে মাত্র দুজন জীবিত। যার একজন আবার ব্যাঙ্কক-এ নির্বাসিত জীবনে আছেন। ওদিকে পরবর্তিতে বার্মায় এই ত্রিশজনের-দলের বিরোধী ছিল যারা এদেরকে ১৯৪৪ সালে এক ফ্যাসিবাদবিরোধী জোটে শামিল করে, সম্মীলিতভাবে বৃটিশরা ফিরে বার্মা দখল করেছিল, বিশ্বযুদ্ধ শেষে। পরে অবশ্য ওই ৩০ জনের বেশির ভাগই বার্মার (১৯৪৮ সালে) নতুন ক্ষমতায় আসীন হয়ে যায়।

দুনিয়াতে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তায় জাপানিজদের অবদান রাখার মত কিছু নাই। ওদিকে সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকার সাথে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তার সাথে জানাশুনা পরিচিত থাকার কোন সম্পর্ক নাই।

তাহলে অসুবিধা কী? মানে নেতাজী ভারত মুক্ত করতে পারলে আমাদের কী অসুবিধা হত? অসুবিধা বিরাট।  বৃটিশরা কলোনি মাস্টার, জাপানের মার্শাল তেজোর সাম্রাজ্যও তাই। কিন্তু আরও বিরাট তফাত আছে। তা হল, বৃটিশদের হাত দিয়ে রেনেসাঁ চিন্তাও এসেছিল, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কী তা জানা গেছিল। আর জাপানের মার্শাল তেজোর হাত ধরে এসেছিল রেসিজম আর ফ্যাসিজম-এসবের জয়জয়কারের ধারণা। নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরানা “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরনো “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” শিক্ষা উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

আজ জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী? মার্শাল তেজোর ফ্যাসিজম? না। কারণ মার্শাল তেজো-দের কাছে রাজনীতি শব্দটাই অপরিচিত ছিল। কোন গণক্ষমতা, কোন রিপাবলিক, জনপ্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি সব মিলিয়ে কোন ধরণের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাই তাদের ছিল না। ছিল এক এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য ধারণা আর ছিল নির্মম বর্ণবাদিতা, ফ্যাসিজম -ইত্যাদি এগুলোই একমাত্র সত্য এই ধারণা। আজ জাপানে পার্লামেন্ট, সিনেট নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা ইত্যাদি আছে। যেগুলো সরাসরি কপি করে গড়ে নেয়া হয়েছে। সমাজে এসব নিয়ে কোন পক্ষও নাই এমনকি বিপক্ষও নাই। এজন্য সাথে অবশ্য আছে এরপর থেকে জন্মগতভাবে হতাশ জাপানি নাগরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তাদের কাছে জবাব নেই যে কেন তারা এমন দানব ছিল, কেন তারা সেকালে চীন আর দুই কোরিয়া এই পুরা অঞ্চল জুড়ে  সকলকে তাদের কলোনি বানিয়ে রেখেছিল? কেন কোরিয়ান মেয়েদের যৌন সেবাদাসী বা “গেইসা” বানানো আর নির্মমতার কিছুই করতে তাদের শাসকেরা বাকি রাখেনি! এই লজ্জা থেকে মুখ লুকাতে, জবাবহীনতা থেকে আপাত মুক্তি পেতে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকান মার্শাল প্লানে নতুন  বিনিয়োগ  পেয়ে, মিথ্যা করে নতুন উদ্যম দেখিয়ে জাপানিজরা “কাজপাগল” [workaholic] সাজার সুযোগ নিয়েছিল। নইলে সদলে আত্মহত্যা করার রাস্তাটাই কেবল তাদের জন্য বাকি খোলা ছিল!  রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হতে পারে এনিয়ে এমন রাজনৈতিক চিন্তায় এক কথায় বললে জাপানের অবদান শুণ্য। হয়ত নেগেটিভ। অথচ জাপান তো বৃটিশ এম্পায়ারের মত একই ধরণের কলোনি দখলদার এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য শক্তি।

আর জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত বার্মা? ওর কপালে যুদ্ধের পরে নতুন কিছু শিখবার সেই সুযোগ আর জোটেনি। তাই সেই আপাত সংশোধনও জোটেনি। তাই একালে বার্মা মায়ানমার হলেও এর মানে আসলে পুরনো জাপান। মার্শাল তেজোর জাপান। কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! আর বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে!

কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন হয়ত! অথবা আর নির্মম ও বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে! রেসিজমে বর্ণবাদীদের একটা “অপর” লাগেই, তাতে একটা না একটা ‘অপর’ হলেই চলে!

কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের এক ভগবান নিশ্চয়ই আছেন, বোধ করি! নইলে কার আশীর্বাদে তাঁরা- নেতাজী, এক বার্মিজ জেনারেলের মত- এক নেতাজী, এমনটা দেখার হাত থেকে বেঁচে গেলেন! সত্যিই সে এক বিষ্ময়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত  ১৬ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে নেতাজী সুভাষ কেন বাংলাদেশের কেউ ননএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

Last updated: OCT 28, 2019 @ 23:01:35

https://wp.me/p1sCvy-2LG

 

 

ঢাকায় ইসকনের একটি মিছিল

Ratha Yatra In Dhaka City By Shamibag Iskcon Temple 2017

ইসকন এখন বাংলাদেশে নানান জল্পনা-কল্পনায় প্রবল আলোচ্য বিষয়। এরই মাঝে বাংলাদেশের ২৪ অক্টোবর সকালটা শুরু হয়েছে আনন্দবাজারে প্রকাশিত ইসকন নিয়ে গুজবের গল্প পাঠ করে। গুজব বলছি কারণ যে খবরের সোর্স বা উৎসের ঠিকঠিকানা নাই, এই অর্থে। মানে, আবার সেই কোনো মিডিয়ার পেজ-বিক্রি, যেখানে এবারের মিডিয়া হল কলকাতার আনন্দবাজার, আর পত্রিকার পাতার ক্রেতা হল ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ। কথিত বেনামি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতের নামে বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন গল্প ছড়ানো হয়েছে সেখান থেকে।

এবারের গল্পটা দেখে  বিগত ২০১৪ সালের শেষভাগে কথিত “বর্ধমান জেএমবি বোমার গল্পটার” কথা মনে পড়ে যেতে পারে অনেকের। তখন মোদী কেবল প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছেন (মে ২০১৪), এর প্রায় ছয় মাসের মধ্যকার গল্প। অভিযোগের ফোকাস ছিল, কথিত মমতা-সারদা-জামায়াত-জেএমবি চক্র। আর ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্ট বর্ধমান জেলা। অমিত শাহ খুঁটি গেড়ে কলকাতায় বসে গিয়েছেন। সারদা মানে হল, প্রায় আমাদের দেশের মতই “ডেসটিনি” নামের প্রতিষ্ঠানের পাবলিকের টাকা মেরে ফেরার হয়ে যাওয়ার মত এক ঘটনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম।  তবে বাড়তি হল, এখানে অভিযোগ সাজানো হয়েছিল যে কথিত সারদার টাকা এসেছিল ঐ বোমা হামলার জন্য” বলে অমিত শাহ অভিযোগ তুলেছিলেন। আর পুরা ঘটনায় অমিত শাহের টার্গেট ২০১৬ কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে মমতার তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে পরাজয় ঘটানো, নির্মুল করা। তাই জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলা।  কলকাতার মুসলমানদের এক নেতাকে রাজ্যসভায় মমতার দলের নমিনেশন দেয়া থেকে জ্বলে উঠে এই প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল। কলকাতার মুসলমানেরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে, মমতা তাদের তোষামোদ করছেন ইত্যাদি এই সার অভিযোগ তুলে পরের ২০১৬ সালের রাজ্য সরকার ভোটের কথা মনে রেখে কলকাতার হিন্দু ভোটারদের মনে উস্কানি তৈরি করা। এই ছিল মূল ঘটনা। এমনকি একপর্যায়ে কলকাতার সিপিএম দলও এই একই অভিযোগের বয়ানের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশ-জামায়াত-মুসলমান ও জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে মমতাকে দায়ী করে  কলকাতার ব্রিগেডের মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করেছিল।

অভিযোগের প্রপাগান্ডা ডালি সাজিয়ে ভারতে বলা হয়েছিল, এটা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের খবর। আবার পরে একই গুজব বাংলাদেশে প্রচার করা হয়েছিল এটা ভারতের গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া খবর বলে। আর বাংলাদেশে তাতে শামিল হয়েছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির খালেদ মহিউদ্দিন [যিনি এখন জার্মানিতে বসে উলটা সরকারের বিরুদ্ধে ভোকাল হওয়ার চেষ্টা করছেন], চ্যানেল আই এমনকি প্রথম আলো ইত্যাদি অনেক মিডিয়া। সেকালের মোদীর ভারতের নতুন সংসদে এ নিয়ে ঝড় তোলা হয়েছিল। আর, গায়ক নতুন প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের অভিযোগের ডালি সাজিয়ে বসা আর সর্বশেষ কলকাতায় অমিত শাহের জনসভায় (০১ ডিসেম্বর ২০১৪) মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর আক্রমণের ডালি তুলে ধরা, সবই ঘটেছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎ সব ফুস, বেলুন চুপসে যায়।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটা পারসোনাল বিভাগ বা বাংলায় আমরা বলি সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিসের “আপন বিভাগ” আছে। আমাদের বেলায় এই বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্বাবধানে আর ভারতের বেলায় এর মাঝে আছেন এক প্রতিমন্ত্রী। ঘটনাওগুলোর অনেক কিছু স্মৃতি থেকে লিখা হল। তবে এখন হাতের কাছে একটা ভিডিও রিপোর্ট পাওয়া গেল। এনডিটিভির। তাতে দেখা যাচ্ছে মোদীর অফিসের ঐ প্রতিমন্ত্রীর নাম ছিল জিতেন্দ্র সিং। তাকে দিয়ে হঠাৎ এক বিবৃতির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যার সারকথা ছিল যে আপাতত ওই বর্ধমান মামলা স্থগিত রাখা হচ্ছে, আরো তদন্তের পরে ভবিষ্যতে এটা আবার দেখা যাবে। [Three days after Amit Shah, the president of the BJP, alleged in Bengal that funds involved in the Saradha scam were used for terror, the government appears to have contradicted him] ইতোমধ্যে অমিত শাহ কলকাতা ত্যাগ করেন কারণ জীতেন্দ্র সিং-ই অমিত শাহের দাবির বিরোধিতা করে সংসদে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তবে বাবুল সুপ্রিয়ই সবচেয়ে বেকুব হয়েছিলেন। ধরা খেয়ে বেকুব হয়ে তিনি কী বলেছিলেন সেটাও এনডিটিভিও ভিডিও ক্লিপে পাওয়া যাবে।  কারণ, তার ভুয়া অভিযোগ-আক্রমণই ছিল সবার শেষে মানে প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্রের ঘোষণা ঠিক আগে। কিন্তু কেন হঠাৎ পশ্চাৎপসারণ? খুব সম্ভবত কোনও কারণে বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে লড়বার নির্বাচনী কৌশল বদল করেছিল তাই। তবে এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, পরবর্তীকালে ঐ ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে মমতা আগেরবারের চেয়ে বেশি, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছিলেন। সেই ২০১৪ সাল থেকে আজও আর কখনো সেই জঙ্গিবাদের গল্প আর ঝাঁপি খোলেনি।

অতএব সাধু সাবধান। এসব পেজ বিক্রির আনন্দবাজারি গল্প আমাদের কাছে আবার আনা কি ঠিক হলো? যদিও এবারের ঘটনা মোদীর গুরু প্রতিষ্ঠান আরএসএসের ষ্ট্রাটেজিক ও ধর্মীয় সংগঠন “ইসকন”-কে নিয়ে। অনুমান করি, বাংলাদেশে লিগ্যাল স্ট্যাটাসের দিক থেকে ইসকন এক বিদেশী এনজিও হিসেবে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড ও তৎপর। আর বাংলাদেশের এখনকার মাঠের বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে ইসকন সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে, আধা সত্য-আধা গুজবে মাখামাখিতে ইসকন এক খুবই খারাপ ইমেজ নিয়ে হাজির; যা বাংলাদেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর এই ধারণায় ভরপুর হয়ে উঠছে ক্রমাগত ও দ্রুতগতিতে। সবচেয়ে বড় কথা ইসকনের এই ষড়যন্ত্রকারি ইমেজ এটা খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে, যা যেকোন সময় সামাজিক দাঙ্গা লাগিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে হাজির হওয়ার জন্য খুবই পটেনশিয়াল।

এই পটেনশিয়াল দিকটার কথা যদি মনে রাখি, তবে ভারতের বা কলকাতার এই গুজবের গল্প ছড়ানো খুবই অবিবেচক কাজ হয়েছে। অবশ্য যদি না ডেলিবারেট কোনো দাঙ্গা বাধানোর মধ্যে ভারতের সরকার ও গোয়েন্দাদের কোনো খায়েশ থেকে থাকে যা আমরা জানি না, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা আলাদা।

ইসকন [ISKCON]
ইসকন নিজেদের “ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘ- এভাবে একটি হিন্দু বৈষ্ণবধর্মীয় প্রতিষ্ঠান” বলে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত আমেরিকা ব্যক্তিবাদের ধারণাকে [individualism] চরমতম অর্থের দিক থেকে নেয়াতে আর সেটাই পপুলার ধারণা বলে পরিণতিতে সেখানে ব্যক্তিমাত্রই খুবই একা ও বিচ্ছিন্ন, এক সম্পর্কহীনতার অবস্থার দিকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হয়ে রয়ে যায় সবাই। কিন্তু স্বভাব হিসেবে মানুষমাত্রই রিলেটেড-সম্পর্কিত মানুষ তো বটেই, অন্ততপক্ষে এক জীবনসঙ্গীর “আকাঙ্খাসম্পন্ন” মানুষ। ফলে মানুষ একা তো নয়ই, অন্তত দোকা তো বটেই এবং মানুষের অস্তিত্বই  গভীরভাবে সামাজিকও। এর বাইরের দিকে তাকিয়ে সেটা অমান্য করতে চাইলেও ভিতরে এটা তাই-ই থাকে।  তাই তার গভীর স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদাও আছে। স্পিরিচুয়ালিটিই আসলে মানুষের নানান সম্পর্ক ও এথেকে জাত কামনার অর্থ তাৎপর্য ব্যাখ্যাও তুলে ধরে। এটা মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তি ও স্বভাবে আছে, কিন্তু পশ্চিমা চরমব্যক্তিবাদের সমাজ সেই স্বভাব ও আকাঙ্খাকে চাপা দিয়ে রেখেছে। এই স্পিরিচুয়ালিটি বলতে তা সে দার্শনিক অর্থে স্পিরিট [spirit] বা প্রজ্ঞা হোক অথবা থিওলজির অর্থে বা ভাষ্যে আত্মা-রুহু – সেটা যে যাই করুক বা বুঝুক না কেন – শেষ বিচারে এটা মানুষের অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক করা, সম্পর্কিত থাকা ও সম্পর্কিত অনুভবের আকাঙ্খা-চাহিদার সপক্ষেই দাঁড়িয়ে কথা বলে। এরই বৃহত্তর অর্থ হল মানুষের পরমসত্তা অনুভবের দিক। থিওলজিক্যাল অর্থে ও ব্যাখ্যায় এটাই মানুষের যার যার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভবের অথবা আল্লাহর মাধ্যমে মধ্যস্ততায় জগতের সকল অপর মানুষ ও সত্বার সাথে নিজেকে যুক্ত ও লিপ্ত অনুভব করার দিক। থিওলজি বলবে মানুষ তাই রূহুর চাহিদায় সাড়া না দিয়ে পারে না।

এটাই, ঠিক এটাই পশ্চিমের এক স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদার ক্ষেত্রে এক বড় ভ্যাকুয়াম হয়ে আছে দেখা যায়। তুলনায় এটাই এশিয়ান যেকোনো থিওলজির প্রভাব যথেষ্ট স্যাচুরেটেড বা পুষ্ট হয়ে আছে। অন্তত কোনো ভ্যাকুয়াম-শূন্যতা নেই। এখন এশিয়ান এই থিওলজিক্যাল পূর্ণতাকে এবার পশ্চিমের চাহিদার কথা খেয়াল করে এর উপস্থাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাবে, এক কৃষ্ণপ্রেম বিলিয়ে বেড়ানোর দিক থেকে ইসকন ভালো প্রভাব ছড়িয়ে আমেরিকায় নিজের যাত্রা শুরু বা ভিত গাড়তে পেরেছিল। আবার মানুষের সম্পর্ককে একটু ভিন্ন [সেক্সচুয়ালিটি] উপস্থাপনের দিক থেকে আর এক গুরু রজনীশও ভালই আমেরিকান চাহিদা ধরতে পেরে পসার জমাতে পেরেছিল। ভারতের গুরুরা এসব সহজেই তুলে ধরতে পারে বলে [এমনকি যোগ ব্যায়ামেরও স্পিরিচুয়াল দিক আছে তা ব্যাখ্যা করে থাকে অনেকে] এদের গড়ে তোলা নানান আশ্রম ও ব্যাপক ভক্তকুল আমরা আমেরিকাতে দেখতে পাই। এভাবে এমনই এক উদ্যোগ হল ইসকন – নানান উঠতি পড়তির মধ্যদিয়ে ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইসকন আমেরিকাতে খারাপ চলে নাই। তবে এসব ততপরতাগুলো সেকালে কোনোটাই ভারত-রাষ্ট্রের স্বার্থের কোনো রাজনৈতিক উপস্থাপন ছিল না। কিন্তু এই পরিস্থিতিটাই বদলে যায় ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার পর থেকে। বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে। বুশের আমেরিকা তার ওয়ার অন টেররের পক্ষে এশিয়ার এক কুতুব হিসাবে ভারতের সমর্থন পেতে, ভারতের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমর্থনের এক অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছিল, সেখান থেকে ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে।

কাশ্মীর সংকট ও এর “সীমা পার কী আতঙ্কবাদ” হয়ে উঠা
বলা হয়ে থাকে, ১৯৮৭ সালের জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাদেশিক নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ঘটানো হয়েছিল। পরিণতিতে এটা সেই থেকে  নির্বাচনী ধারার কাশ্মীরের রাজনীতি এর নিজ সমাজেই আস্থা হারিয়ে একে এক সশস্ত্র রাজনৈতিক ধারার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৪৯ সাল থেকে কাশ্মীর ইস্যু বিভক্ত ও অমীমাংসিত এমনই থেকে যাওয়া সত্ত্বেও এর রাজনীতি একটা নির্বাচনী ধারাতেই প্রবাহিত হয়েছিল, যেটা ১৯৮৭ সালের পরে কাশ্মীরে আর তেমন থাকেনি। এনিয়ে প্রচুর একাদেমিক গবেষণা স্টাডি হয়েছে। [যার রিপোর্ট ও ফাইন্ডিংস-গুলো (1987 March kashmir elections rigging লিখে) নেটে সার্চ দিলেই যেকেউ দেখতে পাবে।] আর সশস্ত্রতার রসদ তারা সংগ্রহ করেছিল সেকালে আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী আমেরিকা সমর্থিত লড়াকু মুজাহিদীনদের কাছ থেকে, পাকিস্তান হয়ে।

আর এথেকে কাশ্মীরের রাজনীতি পারস্পরিক খুনোখুনি রক্তারক্তির এক বাস্তবতায় ঢুকে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা হল, বড় সংখ্যায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যা করা আর পরিণতিতে তাদের কাশ্মীরে নিজ ভিটা-সম্পত্তি ত্যাগ করতে হয়েছিল। এতে কে কাকে কী বলে দায়ী করবে সে এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কারণ, সবাই জানত কাশ্মীরের সমস্যার কোন জবরদস্তি বা সামরিক সমাধান নাই, তবু পক্ষগুলো পরস্পরকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। [যেটা আজ আবার সেই একই বেকুবি পথে মোদী-আরএসএস ঠেলতে শুরু করেছে।]  তবু সেকালে পরবর্তী সময়ে নব্বই দশকের অস্থির সময়ে বিজেপি নেতা বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকে এরই পাল্টা সংগঠিত এক প্রপাগান্ডা শুরু হয় – “সীমা পাড় কা আতঙ্কবাদ” বলে। অর্থাৎ কাশ্মীরের সমস্যার মূলে আছে আফগান বা পাকিস্তান থেকে আসা  সশস্ত্রতা (কথিত টেররিজম)। মানে ভারতের রাষ্ট্র বা সরকারের কোন দায় নাই, ভুল বা অন্যায় শুরু করা নাই; সব দায় হল বাইরে থেকে আসা সশস্ত্রতার। কাশ্মীর রাজনীতিতে  নির্বাচনী কারচুপি করা যে বিরাট আত্মঘাতী পদক্ষেপ ছিল, কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতিতে কারচুপি আমদানি করলে যে হতাশগ্রস্থতা শুরু হয় তা থেকে যেকেউ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে নিয়ে চলে যেতে পারে – এটাই সেই আত্মঘাতী পথ। তাই এটা সেই মেসেজ দিয়েছিল যে কাশ্মীরে নির্বাচনী রাজনীতির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ফলে সশস্ত্রতাই একমাত্র বিকল্প- এই ভাবনাই যে পরবর্তীকালে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল, তা কমবেশি সব পক্ষের কাছেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই মনমরা হিন্দুমনে ধীরে ধীরে পাল্টা নতুন মরাল জাগানোর কাজটাই করেছিলেন বাজপেয়ি; এই বলে যে, সব দোষের গোড়া হল, বাইরে মানে পাকিস্তান থেকে আসা সশস্ত্রতা।

তবু এ কথা বলাতেই শুরুতে তখনও তা তেমন পাত্তা পায়নি। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর (১৯৮৯ সাল থেকে ধরলে ) ভারতকে সাফার করতে হয়েছিল, কোনো গ্লোবাল বন্ধু-সাথী রাষ্ট্রকে ভারত পাশে পায়নি। যার মূল কারণ সেকালে কাশ্মীরে পাওয়া সহজ হয়ে যাওয়া অস্ত্রের মূল উৎস তো আসলে আমেরিকা, আর সাথে এছাড়া স্বল্প কিছু ফেলে যাওয়া বা দখলি সোভিয়েত অস্ত্র। তাই এক লম্বা পথ বা ঘটনাক্রম  – সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার, পরে আমেরিকার আফগানিস্তানকে বিশৃঙ্খলতায় ফেলে চলে যাওয়া, শেষে একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে আফগানিস্তানে তালিবানদের আবির্ভাব, আর এতে তালিবানদেরক এক তুলনামূলক স্থিতিশীলতা আনার শক্তি হিসাবে দেখে আমেরিকা তাদের সমর্থন করলেও শেষে ক্রাইসিস মেটেনি। কারণ, পরে তালেবানি শাসকেরা আলকায়েদার প্রভাবে চলে যায়। আর তা থেকে আমেরিকায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলা – এই পুরা চক্র সমাপ্তি শেষ হতে দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। পরে বুশের ওয়ার অন টেরর প্রোগ্রামকে ভারত সমর্থন করেছিল, কাশ্মীরের সশস্ত্রতা পরিস্থিতিতে ভারতের সামরিক অবস্থান এবং ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিকে নষ্ট করা নয়, বরং “সীমা পারকে আতঙ্কবাদ” সবকিছুর জন্য দায়ী এই বয়ানের প্রতি আমেরিকার সমর্থন আদায়ের বিনিময়ে।

আর এথেকে আরও ডালপালা গজিয়ে তখন থেকেই শুরু হয় আমেরিকার সাথে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে ভারতের লম্বা খাতির সম্পর্কের যুগ। আর তা শুধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অফিস স্তরেই নয়, আমেরিকান এমপি (প্রতিনিধি পরিষদ) ও সিনেটেও ভারতের পক্ষে নিরন্তর লবি করার জন্য আমেরিকাতেই বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দেরকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগানোর বেশকিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এরই সমন্বয়কের ভুমিকা নিয়েছিল আমেরিকায় ভারতীয় এমবেসি (গোয়েন্দা বিভাগ)। এই লক্ষ্যে ২০০৩ সালে জন্ম হয় ” হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন”। যারা আমেরিকায় জন্ম নেয়া ভারতীয়-অরিজিন বাবা-মার পরের প্রজন্ম, যদিও তারা আমেরিকান নাগরিক, এরাই এর সদস্য। তারা গর্ব করে বলে আমরা ভারতীয় নই, আমেরিকান হিন্দু। কিন্তু বাস্তবে এরা ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার সংগঠন, ভারতীয় বিদেশনীতির বাস্তবায়ক। তাদের মুরুব্বিরাও তাদের পিছনে, অফ-সিনে। ১২০ মিলিয়ন ভারতের বাজারে ব্যবসা দেয়ার বিনিময়ে আমেরিকান ব্যক্তি ব্যবসায়ী আর এর সাথে এমপি ও সিনেটর মিলিয়ে এক চক্র যা লবি ও প্রেসার গ্রুপ, কোটারি গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল। লবি ও প্রেসার গ্রুপ তৈরি আমেরিকায় বৈধ। তাই আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্রে রেখে এরা আরো সংগঠিত করেছিল এক এমপি তুলসি গাব্বার্ড, ভারতীয় নানান সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন [ইসকন যার মধ্যে একটা বিশেষ] বা প্রবাসী ভারতীয়-অরিজিন আমেরিকান ব্যক্তিত্বকে।

ইসকন আর কৃষ্ণপ্রেম বিলায় না, ভারতরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার, হিন্দুত্ববাদ বিলি করে
এতে স্বভাবতই আগের শতকের আমেরিকান ইসকন, আগের কৃষ্ণপ্রেম বিলানো ইসকন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের খাঁচায় বিরহ একাকিত্বে আটকে থাকা সাদা আমেরিকানদের মুক্ত করতে আসা ইসকন, এমনকি তাই এর আগের নেতৃত্ব কোন কিছুই এক থাকেনি। সেই ইসকনের মৃত্যু হয়। ফোকাস বদলে যায়। নতুন ইসকন জন্ম নেয় যার কাজ ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার হওয়া। [Strategic বা স্ট্রাটেজিক মানে এখানে, রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নেয়া কৌশল ও পরিকল্পনা ]  কংগ্রেস আমলে যেটা ছিল সফট [soft] হিন্দুত্ব তাই এখন হয়ে উঠেছে আরও এগ্রেসিভ, আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদ। প্রথমত এর তৎপরতার ক্ষেত্রে তখন থেকে আর পশ্চিমাদেশ থাকেনি, বাংলাদেশও হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা ভৌগোলিক পকেটের হিন্দুজনগোষ্ঠির উপস্থিতি থাকলেই (যেমন আফ্রিকান অনেক দেশেই ইসকন সংগঠন পাওয়া যাবে) সেখানে ভারত রাষ্ট্র-সরকারের নীতি ও স্বার্থ স্ট্রাটেজির পক্ষে সকলকে জড়ো করা, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের বোধ জাগিয়ে তোলা, কমপক্ষে সহানুভূতিশীল করে তোলা – এসবই ইসকনের মুখ্য কাজ হয়ে ওঠে। এতে ভারত রাষ্ট্রই যে প্রকাশ্যে হিন্দু-রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে – ভারতীয় নাগরিককে সে “হিন্দু হিসাবেই” (এটা ভারত-রাষ্ট্রের কাজ ছিল না) সংগঠিত করছে, সাথে পাশে কোন অন্যদেশের হিন্দু থাকলে তাকেও হিন্দু হিসাবে ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে অবলীলায় শামিল করেছে।

একটা জিনিষ পরিস্কার থাকতে হবে, কোন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক-স্বার্থ বিষয়ক নানান সিদ্ধান্ত সে রাষ্ট্র অবশ্যই নিবে। আমাদের তাতে না করার কিছু নাই। আর বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। ব্যতিক্রম স্বল্প কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বাদে তা কখনও অন্য-রাষ্ট্রেরও পক্ষেও যাবে না। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল অন্য রাষ্ট্রের যে সিদ্ধান্ত যা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক তা প্রত্যাখান ও প্রতিরোধে করতে সক্ষম হতেই হবে। এটা ন্যায়-অন্যায়ে বিষয়ক ইস্যু যত না এর চেয়ে বেশি নিজ স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ও সক্ষম হওয়া, আপোষ করে বিক্রি না হয়ে যাওয়ার বিষয়। ইসকনের ততপরতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনের তদারকি ও লাইসেন্সিং প্রতিষ্ঠান “এনজিও ব্যুরোর” মাধ্যমে আর “ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন এক্ট ১৯৭৮” (যেটা সর্বশেষ ২০১৬ তে সংশোধিত হয়েছে) – এই আইন দিয়েই প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর আমাদের এটা করতে পারতেই হবে। আর সার কথাটা মনে রাখতে হবে ভিন্ন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক প্রতিষ্ঠানকে আমরা আমাদের দেশে ততপরতা চালাতে দিতে পারি না। বিদেশি এনজিও হিসাবে তো আরও নয়, তাও আবার ধর্ম-প্রচারের উসিলায়।

আসলে ইসকনের বাংলাদেশে উপস্থিতিটাই এর কথাকাজের বেমিলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, আমেরিকায় গিয়ে ইসকনের জন্ম হতে পেরেছিল মূলত একাকিত্বের আমেরিকান সমাজের শূন্যতার হাহাকার পূরণে। তাহলে ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ তার কাম্যভূমি হতেই পারে না, ম্যান্ডেটে কাভার করে না। কারণ বাংলাদেশ পশ্চিমাদেশ নয়, অন্তত স্পিরিচুয়ালিটির ভ্যাকুয়াম এখানে নাই। বাংলাদেশে হিন্দুদের ধর্মীয় সংগঠন – মন্ত্র জানা, শাস্ত্র জানা, বামুন পুরুত বা মন্দিরের কমতি এখানে ঘটে নাই – কখনও ছিল না। তাহলে আমেরিকায় যে কারণে ইসকনের জন্ম, ঠিক সে কারণেই বাংলাদেশে ইসকনকে হিন্দুদের দরকারই নেই।  তাই ইসকন ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠিত হওয়া থেকে বাংলাদেশে  ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের জন্যই এর জন্ম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

আর তাই অন্তত এই একটা কারণে, বাংলাদেশের সরকার ইসকনকে বিদেশি এনজিও হিসাবে এনজিও ব্যুরো থেকে রেজিষ্ট্রেশন দিতে পারে না।  ইসকন আসলে ধর্মীয় নয় ভারত রাষ্ট্রের হাতিয়ার রাজনৈতিক সংগঠন। আবার কোন ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠনকে এনজিও ব্যুরোর রেজিষ্ট্রেশন দেয়া হারাম – আপন রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধী বলে নিষিদ্ধ। কেবল রিলিফ বিতরণের কাজ, দাতব্য কাজ করতে পারে – সেজন্য অনুমতি পেতে পারে।

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব, ভারত সরকারের আমাদের সরকারের ওপর সবখানে প্রভাব বিস্তারের বিরোধী  – এমন মনোভাব প্রচন্ড বাড়ছে, এ নিয়ে আমাদের সমাজের কোনো কোণে বা কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বিমত পাওয়া যাবে না। তবে আবার দ্বিমত হবে এর মাত্রা নিয়ে। সরকারি পক্ষের হলে কেউ বলবেন ভারতের প্রভাব অনেক কম বা স্বাভাবিক। বিপরীতে অন্যরা বলবেন ভারতের প্রভাব চরম, সীমাহীন অসহ্য বা অনাকাঙ্খিত ইত্যাদি। আর এরই মধ্যে ইসকনের নাম ও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিরূপ মনোভাব ক্ষোভ ক্রমেই চড়ছে। এরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে চাইছে – এমন এগ্রেসিভ।  ইসকন সাধারণ্যে চোখে পড়া শুরু করে ২০১৬ সালে সিলেটের সঙ্ঘাত থেকে আর এ কালে চট্টগ্রাম শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে ‘প্রসাদ খাইয়ে’ কৃষ্ণনাম গাওয়ার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ হয়ে পড়া থেকে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে সনদ প্রদান বা তারা ইসকনের সদস্য বলে প্রচার চলা থেকে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই হয়ত অনুমান করে বলা, আধা সত্য অথবা প্রপাগান্ডা বা একেবারেই গুজব হয়ত।

গুজবের আসল অর্থ হল ফ্যাক্টসের সাপ্লাই না থাকা। সাধারণত  সরকারের বুঝে না বুঝে বোকা হয়ে খাড়িয়ে থাকা উদাসীন্যতা থেকে এর জন্ম হয়। এছাড়া, যারা বুঝতেই পারে না সঠিক বিশ্বাসযোগ্য ও স্পষ্ট তথ্য সমাজে সহজেই পাওয়া না যাওয়া অবস্থায় রাখা কত আত্মঘাতী। এটা আসলে চাইলেই পাওয়া যায় এমন করে রাখা হয়নি, এই পরিস্থিতি। তাই গুজব মোকাবেলার উপযুক্ত উপায় হচ্ছে, তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয় এভাবে হাজির রাখা। সমাজের বিভ্রান্তি সম্পর্কে খবর রাখা আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে আগে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য হাজির রাখা। নিশ্চুপ থাকলে বা গুজবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা গুজবের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বাড়তে পারে। কখনো তা ফেটে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।

ইসকন ও এনজিও ব্যুরো
বাংলাদেশে আইনে ইসকনের ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে ততপরতা করতে অনুমোদন, বিদেশী অর্থ নিয়ে আসা ও বিতরণের অনুমোদন জোগাড় করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০১৬, এই আইন পেরিয়ে বিদেশী স্বার্থ প্রতিফলিত হয় এমন তৎপরতার ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকে সেজন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন বিদেশী ধর্মীয় এনজিও প্রতিষ্ঠানের দেশে সহজে কোনো তৎপরতা চালানোর বিরুদ্ধে এভাবেই সাজানো। কারণ, তারা যেন কোনো ধর্মান্তকরণ বা ধর্মে প্রভাবিত করার কাজ না করতে পারে।

বাস্তবত ইসকন এখন কৃষ্ণপ্রেম বিলানোর চেয়ে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নের পার্টনার। ওদিকে সাধারণভাবে বললে কোন বিদেশী রাষ্ট্রের কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান অন্য দেশে  নিজ দেশের নীতি বা স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি পেতে বা চাইতেই পারে না। বিশেষত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাজের সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেয়া ছাড়াও বিদেশী অর্থ আনার অনুমোদনই পেতে পারে না। বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থ বলে কিছু নিয়ে তৎপরতা চালানো অথবা [এমনিতেই ইসকন আমেরিকান অরিজিনের] ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুনীতি নিয়ে তৎপরতা- এর কোনোটাই ইসকন বা  কোনো এনজিওকে বাংলাদেশে করতেই দিতে পারে না।  এটা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী হবে, তাই।
অথচ আনন্দবাজারের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে যে, কথিত জঙ্গি হামলা হতে পারে এই অজুহাত তুলে যেন বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থে  “জঙ্গী” মারার অজুহাতে কাজ করতে তৎপর হয়। এতে বাংলাদেশের সরকারের কী হাল হবে? তার নিজের স্বার্থ কোথায় এতে?

আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম কাজটি হল, এব্যাপারে নিজের হাত পরিষ্কার রাখা। সরকারকে নিজ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা, না হতে দেয়া, যেসব গুজব ইতোমধ্যেই উঠেছে তা বিনাশ করা। গুজবের বিনাশ করতে যেটা করতে পারে যে ইসকন কী হিসেবে রেজিস্টার্ড তা পরিষ্কার ও সরাসরি পাবলিককে জানানো। যেমন এটা কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, না রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান? এ কাজটা সরকার নিজে অথবা কোনো বিশাসযোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্বের অধীনে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করতে পারে।

যেমন ইসকন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমতিপ্রাপ্ত হলেও ‘প্রসাদ’ বিতরণ সে করতে পারে না, সেটা পুরোপুরি বেআইনি। ‘প্রসাদ’ বিলানো মানে যেটা ধর্মীয় এনজিও হিসেবে রেজিস্টার্ড (যে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার কথা নয়) কেবল সেই করতে পারে। এছাড়া ‘প্রসাদ’ বিলানো আর কাউকে দুপুরের খাওয়ার প্যাকেট বিতরণ এক কাজ নয়। আবার যেমন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়ে এবং অর্থ ছাড় করে সেই টাকায় ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা বেআইনি হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে পাবলিকের কাছে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ নিয়ে সরকারের কোন দায় নেয়ার অথবা কোন আড়াল টেনে দেওয়া  প্রয়োজন নেই। আমাদের আইন পারমিট না করলে সরকারের কিছুই করার নেই। আবার আমাদেরও ইসকন সম্পর্কে কিছু বুঝে না বুঝে জেনে ইসকন তাবলীগের মত এক সংগঠন ধরনের কোন সাফাই দেওয়ারও কিছু নাই। আর এতে “অসাম্প্রদায়িক” এই সার্টিফিকেট পাইবেনই অথবা এই সার্টিফিকেটের কোন মূল্য থাকবে এসবেরও কোন নিশ্চয়তা নাই। আমাদের দরকার আসলে ফ্যাক্টস – কোন গুজবও না, কোন সাফাইও না।

আবার এক শিক্ষকের ভাই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারের পর দেখা যাচ্ছে সে ইসকনের সদস্য অথবা সরকারি কর্মচারী ইসকনের পদক মেডেল বা সংবর্ধনা নিয়েছে বা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এখন এই ইসকনের সদস্য হওয়া কী জিনিস? কোনো বিদেশী এনজিও এখানে কাউকে ধর্মীয় দল গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য বানানোর কার্যক্রম নিতে পারে না। এনজিও বলতে মূলত বস্তুগত জিনিসের দাতব্য হতে হবে। এটাই কাম্য।

এনজিও করতে আসা চ্যারিটির কথা বলে কোনও “ভাব” (ধর্মীয় বা রাজনীতির) প্রচার করতে অনুমতি দেয়া হয় না, যায় না। তবে বড়জোর সেটা (ধর্মীয় নয়) সামাজিক সচেতনতা ধরনের কাজ যেমন অধিকারবিষয়ক, দক্ষতা শেখানো, স্বাস্থ্য বা পরিবেশবিষয়ক ইত্যাদি এ রকম হতে পারে। সরাসরি রাজনীতি অথবা ধর্ম প্রচার- এটা আমাদের এনজিও আইনে একেবারেই নিষিদ্ধ। আসলে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরে কী কার্যক্রম নেবে এর বিস্তারিত বর্ণনা, কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করবে ইত্যাদির হবু কার্যক্রমের বিস্তারিত সব কিছু কর্মসুচি আগেই এনজিও ব্যুরোতে জমা দিতে হয়। দেওয়ার কথা। আর আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ তা সরেজমিন যাচাই করে ইতি রিপোর্ট দিলে তবেই সে বিদেশী এনজিও অর্থ ছাড়ের অনুমতি পায়। আর এর ব্যতিক্রম করলে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ আইনে জেল-জরিমানার কথা লেখা থাকলে সেটাও প্রয়োগ হতে পারে।

বাংলাদেশের ইসকনের ততপরতা সম্পর্কে সরকারের ভাষ্য দেয়ার পিক আওয়ার চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইসকন নিয়ে এক সরজমিনে রিপোর্ট, যা খুবই ভয়াবহ অবস্থা নির্দেশ করেছে, তা প্রকাশিত হয়েছে। ওর শিরোনামই বাংলাদেশে বেপরোয়া ইসকন,‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’য় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা।

একটা রাষ্ট্র-সরকার চালাতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে নরমে-গরমে অথবা বিশেষ খাতিরের অনেক রূপের সম্পর্ক রাখার দরকার হতে পারে। কিন্তু এসব ডিলিং বা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের যা প্রচলিত আইন তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা বা আইন বাঁকা করে ফেলার তো দরকার নেই বা তা কাম্যও নয়। নিশ্চয়ই প্রতিবেশীসহ যে কোন রাষ্ট্র যার যারটা-সহ সব দেশের আইনি সীমার কথা বুঝবে ও মান্য করবে, এটাই কাম্য। এনজিও প্রসঙ্গে আমাদের প্রচলিত আইন যথেষ্ট স্বচ্ছ। কাজেই রেকর্ড স্পষ্ট রাখা আর সেসব রেকর্ড পাবলিকের জন্য খুলে রাখা হল সব কিছু জটিলতা থেকে পরিত্রাণ ও দূরে থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। বাংলাদেশের মানুষকে জানাতেই হবে বাংলাদেশে ইসকন ঠিক কী কী করার অনুমতি পেয়েছে? কোন আইনে? আর ইসকনের ততপরতা দেশের আইনসম্মত আছে কী না?
তথ্য স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য রাখার পরও কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উত্তেজনা বা বিভেদ তৈরি করার কেউ চেষ্টা করলে সরকারের তা মোকাবেলা সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়। এছাড়া এমন সমাজে গুজব বিভ্রান্তি বা প্রপাগান্ডাও আসলে শুরু করাই কঠিন থাকে। কাজেই স্বচ্ছতা সরকারের সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র। আমরা কী তা বুঝব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২৬ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছেএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

গৌতম দাস

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ja

          হিন্দিতে ক খ গ লেখা, এনডিটিভি থেকে নেয়া, ১৪ সেপ্টে ২০১৯

[সার-সংক্ষেপঃ আরএসএস -বিজেপি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদের পরে এবার মোদী-অমিত চেষ্টা করছেন হিন্দি জাতীয়তাবাদ মানে, সাথে ভাষার জাতীয়তাবাদও হাজির করার চেষ্টা করছেন। চলতি প্রজন্ম হয়ত জানে না। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রথম দল কংগ্রেস ও এর নেতা জওহরলাল নেহর্‌ এটা আগেই চেষ্টা করে  ও পরাজিত হয়ে গেছিলেন। ১৯৬৩ সালে এরই প্রচেষ্টায় তিনি The Official Languages Act, 1963 করেছিলেন। কিন্তু তা দক্ষিণের দ্রাবিড়ীয়দের আন্দোলনের মুখে ব্যর্থ হয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি ভারতের “জাতীয় ভাষা” আর নয়। মোদী-অমিত আবার সেই পুরানা ব্যর্থ প্রচেষ্টাটাই নতুন করে জবরদস্তিতে আনতে চাইছেন, যা ইতোমধ্যেই নেহরুর হাতে পরীক্ষিত ও পরাজিত। কংগ্রেসের এখনকার বিবৃতিই এর প্রমাণ।]

এবারের ১৪ সেপ্টেম্বর নাকি ভারতের “হিন্দি দিবস” [Hindi Divas] ছিল। মানে পালিতও হল। বুঝা গেল, ভারতের অমিত শাহ এবার হিন্দুত্বের পরে নতুন মোদী-হিটলারি লাঠি – হিন্দি” নিয়ে হাজির হলেন। ব্রিটিশেরা চলে যাবার পরে স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন যখন লেখা হচ্ছিল সেই ১৯৪৯ সালে ১৪ সেপ্টেম্বরকে একটা হিন্দি দিবস ঘোষণা করে রাখা ছিল। রাখা ছিল বলছি এ জন্য যে এটা রেখে কোনো লাভ হয়নি, পরে হিন্দিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। খুব একটা কিছু আগায়নি। কী আগায়নি?

ব্রিটিশ আমল থেকেই, রাজনীতি জিনিসটা কী – তা অস্পষ্ট বোল-এর উচ্চারণে আধা-বুঝাবুঝির সময় থেকেই ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে একমাত্র একটা জাতীয়তাবাদী দলই বুঝা হত। আবার এই জাতীয়তাবাদ বলতে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব ছাড়া আর অন্য কিছু হতে পারে না- এই অনুমান নিয়েই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদিও হিন্দুনেতাদের নিজেদের মধ্যে একটা তফাত বা বিতর্ক ছিল যে, তারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র বলতে যে একটা হিন্দুত্ব-রাষ্ট্র বুঝছেন তা স্পষ্ট করেই বলা হবে, না তা কৌশলে আড়াল রাখা হবে, এ নিয়ে কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভা (একালের নাম আরএসএস) গোষ্ঠির মধ্যে ভিন্নতা ছিল। কিন্তু হিন্দু রাজনীতিক মাত্রই প্রায় সবাই মানত যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া ভিন্ন কোনো রাজনীতি করা এবং রাষ্ট্র গড়া ও থাকা অসম্ভব, তা হতেই পারে না। ঠিক এ কারণেই তারা অ-হিন্দু, বিশেষ করে ভোকাল মুসলমানদের সামনে নিজেদের হিন্দুত্ব চিন্তার ন্যায্যতা কী তা প্রতিষ্ঠা করতে না পারা থেকেই কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

পরিণতিতে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু মুসলমানেরা রাষ্ট্রে আলাদা হয়ে যাওয়া সত্বেও তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের “রাষ্ট্র ধারণা” বুঝের মধ্যে এর কোন প্রভাব পড়েনি। তারা হিন্দুত্ব আঁকড়ে ধরেই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশন বানানোর পরবর্তিতে বাস্তবত ১৯৬৩ সালের মধ্যে,  শুরু হয়ে যায় এর পতন; অর্থাৎ ডিজেনারেশন [degeneration]  বা ভেঙে পড়া। মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের চিন্তা ও রাষ্ট্র বাস্তবায়ন শুরুর পর্যায়েই এরা টের পেতে থাকে যে সব ভেঙে পড়ছে।

অনেকের ধারণা যে, কোনো জনগোষ্ঠীর আশি-নব্বই পার্সেন্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়তে কোনো সমস্যা হয় না। এ ধারণা ভুয়া, ভিত্তিহীন। এর মানে, এই অনুমান অনুসারে ভারতের মুসলমানেরা ভেঙে আলাদা নিজের রাষ্ট্র গড়ে বেরিয়ে গেলে তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গড়তে আর অসুবিধা হবে না, পোক্ত হবে। তাই তো হওয়ার কথা, কিন্তু ভারতে তা হয়নি। মাত্র তেরো বছরের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের নামে দক্ষিণের ওপর হিন্দি-বলয়ের কর্তৃত্ব উপড়ে ফেলে দিয়েছিল। কর্নাটকের প্রধানত কন্নড় ভাষা, কেরালার মালয়ালম ভাষা, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু ভাষা, তামিলনাড় তামিল ভাষা এদেরকে একসাথে দ্রাবিড়িয়ান ভাষা বলে। অনেকে তাই দক্ষিণের এই চার রাজ্যকে দ্রাবিড়িয় রাজ্য বলে। অনেকে আবার ভৌগলিকভাবে (এটা আসলে পুব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটা উঁচা প্লাটো[Plateau] বা মালভুমি যার নাম ডেকান) এটা বুঝাতে দাক্ষিণাত্য বা ইংরেজিতে ডেকান [Deccan] বলে থাকে। এরাই মূল লড়াকু যারা উত্তর ভারতের (হিন্দুভাষী বা হিন্দিবলয়ের) আধিপত্যের চরম বিরোধী।

এমনকি এই বিরোধিতার বা বলা ভাল উত্তরের আর্যদের প্রতিরোধ লড়াইয়ের উৎস হিন্দু ধর্মের মতোই প্রাচীন। উত্তর ভারতে মানে মূলত এখনকার উত্তরপ্রদেশ, এখানে আর্যদের আগমনের পরে আশপাশের রাজ্য-এলাকায় বিস্তার লাভের পরে আরও দক্ষিণ দিকে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রবেশের আগে থেকেই  পরে আর আগাতে পারেনি। আরও দক্ষিণে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে সেই এলাকাটাই দাক্ষিণার্থ বা দ্রাবিড়িয় অঞ্চল। অর্থাত ডেকান মালভুমি পেরিয়ে এরও পরে এখনকার তামিলনারু বা আরও পশ্চিম বরাবর কোস্টাল রাজ্য কেরালায় এদিকে আর আর্যরা বিস্তৃত হতে পারে নাই। একইভাবে পুবদিকে আর্যদের বিস্তার ঘটেছিল মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিহার পর্যন্ত। আর এর পরেই  (পুব ও পশ্চিম) বাংলা অঞ্চল। এখানেও আর্যরা কত ভিতরে এসেছিল বা আসেনি সে তর্ক ছাপিয়ে বলা যায়, বাংলার প্রতিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দূরবর্তী হলেও ভাষা বা কালচারে আর্যদের প্রভাব বাংলার উপর পরেছিল বা আছে এ নিয়ে তর্ক নেই। আর্যদের বিস্তার প্রসঙ্গে এই ফ্যাক্টসটাই একালেও সব ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। সাতচল্লিশের ভারত ভাগের পরের ভারত মূলত হিন্দি-বলয়ের (যেন পুরানা দখলি নিয়ে বসা আর্যদের) ক্ষমতা হয়েই সারা ভারতকে শাসনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে চেয়েছে। পুরা ভারতের উপর এটাই – উত্তরের শাসন, হিন্দি বলয়ের শাসন, হিন্দিভাষীদের শাসন ইত্যাদি নানান থাকে থেকে গেছে।  এটাই মর্ডান ভারতে এক কাশ্মীরি ব্রাক্ষণ জওহরলাল নেহেরু ভুতুড়ে উত্তরের ক্ষমতার শাসন সর্বপ্রথম কায়েম করতে গিয়েছিলেন। যা প্রথম বড় আঘাত পেয়ে থমকে গিয়েছিল ১৯৬৩ সালে, দ্রাবিড়ীয় প্রতিরোধে। আর সেটাই আবার তবে এবার গুজরাতি মোদী-অমিত নেহেরুর ব্যার্থতার জুতা পায়ে গলিয়ে ভুতুড়ে সেই উত্তরের ক্ষমতার শাসনটাই আবার জাগানোর চেষ্টায় নেমেছেন। নেহেরুই প্রথম ১৯৬৩ সালে হিন্দুত্ব পাশে থুয়ে রেখে হিন্দি চাপানোর ভাষা-জাতীয়তা চালু করেছিলেন। বলা বাহুল্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতাকেই আবার কাঁধে উঠায় নিলেন মোদী-অমিত।

সারকথায়, উত্তরের শাসন, যেটা নেহেরুর হাতে নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের আড়ালে কার্যকর থাকতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক রেওয়াজ রিনিউ করে এরই প্রবল বিরোধী হল দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চল। একালে গত কয়েক বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার যে মোদী বা হিন্দির বিরোধিতা সেটা পুরানা ঐতিহাসিক বিরোধিতারই এক নব অধ্যায়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, দ্রাবিড়ীয় ও বাংলাএই দুই অঞ্চল থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা উঠে এসেছিল। হিন্দুধর্মের পক্ষে  থেকে নিজের ন্যায্যতা দিতে গিয়ে এর সবচেয়ে দুর্বল দিক হল, এর ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদের বয়ান – এটা উদাম হয়ে যায়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চলের মিল পাওয়া যায়। বাংলায় সুলতান শাসন আমলের (১২০৫-১৫৭৬) শেষের দিকে নদীয়াকেন্দ্রিক চৈতন্যের ও পরবর্তীতে লালনের জাতপাতবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কথা অনেকেই জানি।

আর ওদিকে ব্রিটিশ আমল থেকেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় সরাসরি ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল তামিল সমাজ। আজকের তামিলনাড়ুতে যে দুই স্থানীয় দলের হাতে এই রাজ্য পালটাপালটি শাসিত হয়ে আসছে সে মূল দলের নাম ডিএমকে [DMK]। ইংরেজি আদ্যক্ষরে বলা এই দলের নাম দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম (দ্রাবিড় প্রগেসিভ ফেডারেশন) [Dravida Munnetra Kazhagam ( transl. Dravidian Progress Federation] থেকেই ডিএমকে। আর সেটা থেকে ভেঙে পরে (১৯৭২) অন্য আরেক অংশের দলের নাম এআইএডিএমকে [AIA-DMK]। ততকালীন মাদ্রাজে (তামিলনাড়ু) ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণের ঝগড়া তীব্র উঠেছিল বৃটিশ আমলেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় চরম বৈষম্য থেকে।  সেখান থেকেই  ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল জাস্টিস পার্টি, ১৯২০ সালেরও আগে থেকে।  এই দলেরই কয়েকজন পরে ১৯৪৪ সালে নিজেরা পুনর্গঠিত হয়ে জন্ম দেন দ্রাবিড়া কাজাঘাম [Dravidar Kazhagam, DK] দল। ব্রাহ্মণের সামাজিক আধিপত্যের বিরোধীতা এই ছিল তাদের মূল ইস্যু; তাই তারা সাম্যের সমাজ ছিল তাদের মূল শ্লোগান। কিন্তু প্রধান দুই নেতার বিরোধ থেকে ১৯৪৯ সালে এক অংশ দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম [Dravida Munnetra Kazhagam] ডিএমকে খুলে বসেন। নেতা আনাদুরাই -এর নেতৃত্বের এই দল, এদের ব্রাহ্মণ বিরোধিতা এতই তুঙ্গে ছিল যে এরাই প্রথম কোন ব্রাক্ষণ ছাড়াই সামাজিক-ধর্মীয় বিয়ের নতুন প্রথা চালু করেছিল। এটাকেই আইনি কাঠামো দিয়ে  তারা এর নাম দিয়েছিল আত্মসম্মানের আইনে বিয়ে [Self-respect marriages Act]।

কিন্তু  সবাইকে ছাড়িয়ে ডিএমকে দল বিখ্যাত হয়েছিল নেহেরুর হিন্দি-জাতিবাদের বিরোধীতার আন্দোলনে সফল হয়ে।  নেহরুর যুগে.১৯৬৩ সালে ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের ভারত বানানোর প্রচেষ্টা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল দ্রাবিড়িয়দের বিশেষ করে ডিএমকে দলের হাতেই। দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান পাবার পরে, মূল নেতা মুসলিম লীগের জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তানে ভিলেন হয়ে যান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রশ্নে। কিন্তু মজার কথা হল, ঠিক একই ধরণের ভাষা-জাতিবাদী চিন্তায় জিন্নাহর মতই একই কাজ করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তাঁর আমলেই হিন্দিকে সরকারি ভাষা করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই হিন্দি দিবস বলে একটা দিন চালু ও পালন করা হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।

আর ১৯৪৯ সালে এর আইনটা লেখা হয়েছিল এভাবে, ভারতের জাতীয় ভাষা (National language) হিসাবে হিন্দি, প্রথম সরকারি দফতরের ভাষা (Official language), আর ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু থাকবে”। তবে এখানে দুইটা “কিন্তুও” ছিল। প্রথমত, ভাষার নাম হিন্দি হবে, ঠিক তা বলা হয়নি। বলা ছিল হিন্দুস্থানী ভাষা”। তা আরও ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছিল, তা দেবনাগরি অক্ষরে (এখন ভারতে যে অক্ষরে হিন্দি লেখা হয়) বা ফার্সি অক্ষরে হতে পারবে। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, এই নিয়ম বা আইনটা , পরবর্তি ১৫ বছর পর্যন্ত চালু থাকবে। এরপর পার্লামেন্ট নিজে বসে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এরপরে কী হবে।

এই হিসাবে ১৯৬৩ সালে “হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ” কায়েমের জোশে, মহান সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়ে জিন্নাহর মতনই নেহরুও হিন্দিকে জাতীয় ভাষা ও একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা ঘোষণা করে সংসদে পাস করা এক আইন জারি করেন। এছাড়া এর আগেই অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামে হিন্দি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে অহিন্দি রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে দ্রাবিড়িয় অঞ্চলে। সেখানে ক্ষোভ প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে পাঁচজন মানুষ নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিল। সাথে ঐ আন্দোলনে দুজন পুলিশেরও মৃত্যু হয়েছিল। কেরালায় বহু কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে আগুন দেয়া হয়েছিল। অবশেষে বাধ্য হয়ে কংগ্রেস সরকার আইনটা প্রত্যাহার করে নিয়ে আন্দোলন থামিয়েছিল। পরের বছর ১৯৬৪ [২৭ মে ১৯৬৪] সালে নেহরুর মৃত্যু হয়।  আর ১৯৬৪ সালে [০৯ জুন ১৯৬৪]  নতুন প্রধানমন্ত্রী হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আর স্বভাবতই তাঁর প্রথম কাজ ছিল একটা ভাষা প্রশ্নে একটা আপোষ ফর্মুলা বের করা। তাঁর আমলেই নতুন করে আগের official language act 1963 এর মধ্যে সংশোধন এনে জানুয়ারি ১৯৬৫ সালে এটাকে আগের মতই হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি সরকারি দাপ্তরিক ভাষা ফিরে করা হয়। তবে জাতীয় ভাষা কী হবে তা উহ্য রাখা হয়। আসলে এটাই ছিল দ্রাবিড়িয় রাজ্যগুলোর সাথে আপসনামা রফায় সংশোধিত অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট ১৯৬৩। এইবিষয়টা পড়ে গুজরাত হাইকোর্টের ২০১০ সালের এক রায়েও স্বীকৃত হয়।  সেকালে মামলাটা ছিল্ভিন্ন প্রসঙ্গে যে, এক ব্যক্তি আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মামলা করেছিল যেসব্ব পণ্যের গায়ে হিন্দিতে বর্ণনা লেখা বাধ্যতামূলক করা হোক। কিন্তু আদালত অপারগতা জানিয়ে বলে, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে গুজরাট হাইকোর্টের এক রায়ে এটাই স্বীকার করা হয়েছে যে, ভারতে জাতীয় ভাষা বলে কোনো কিছুই নেই।

সারকথাটা হল, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র গড়ার দাবিদারেরা বিশেষত নেহরুর কংগ্রেস ১৯৬৩ সালেই এই প্রথম সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়। যেটা আসলে হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত  ও উন্মোচিত হয়ে মার খেয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান এসবের জাতীয়তাবাদ আসলে হতভম্ব হয়ে বিভ্রান্ত ও ফিকে হয়ে যেতে থাকে।

বহুবার বলেছি, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান অথবা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের কামনা কেবল কংগ্রেসের নয়, এটা হিন্দু মহাসভা বা পরে এদেরই নতুন নাম আরএসএস-জনসংঘ বা একালের বিজেপির কামনা ছিল সবসময়। তফাত শুধু এই যে, হিন্দুত্বকে কংগ্রেস সেকুলার জামার আড়ালে রেখে ফেরি করতে চায়। আর বিজেপি হিন্দুত্বকে গর্ব করে প্রকাশ্যে বলতে চায়। তবে ১৯৬৫ সালের মধ্যেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে হিন্দি ও হিন্দুত্বের মার খেয়ে যাওয়া- এ প্রসঙ্গটা কংগ্রেসের কাছে প্রচন্ড হতাশার অবশ্যই কিন্তু কোনো বিকল্প করণীয় ছাড়াই।

কংগ্রেসের এই ঢিলেঢালা অবস্থাতেই চলতে চলতে ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকেই হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে ওই ১৯৬৩ সালে কংগ্রেসের প্রথম পরাজয়ের পর থেকে ডিএমকেই কংগ্রেসের পরে প্রথম (আঞ্চলিক) রাজনৈতিক দল, যারা ১৯৬৭ সালের নির্বাচন থেকে এককভাবে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই থেকে দ্রাবিড় অঞ্চল থেকে হিন্দিভাষী দলের হারিয়ে যাওয়া শুরু। তবে ১৯৭২ সালে ডিএমকে তে একদভা ভাঙনে তৈরি হয়েছিল এআইএডিএমকে [AIA-DMK] বা আন্না ডিএমকে। তাই ঐ ১৯৬৭ সাল থেকেই তামিলনাড়ূতে ডিএমকে অথবা আন্নাডিএমকে পাল্টাপাল্টি করে রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসেছে।

কিন্তু এই পরাজয় সম্পর্কে বা সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র কামনা সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির ভাষ্য ও মূল্যায়নটা হলো, কংগ্রেস লিবারেল বা দুর্বল ঈমানের হিন্দুত্ব করে বলেই হেরে গেছে। আগ্রাসী-হিন্দুত্ব নিয়ে আগালে হিন্দুত্ব কখনো হারত না।

অনুমান করা যায় এসব ব্যাকগ্রাউন্ড মনে রাখার কারণেই, মোদীর দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে বিজেপি এবার আস্তে ধীরে নিজেদের মূল্যায়নের ঝাঁপি খুলে ধরতে শুরু করেছে। কাজেই মোদি সরকার-টু, এটা আসলে (১৯৪৭-৬৩) সময়কালের কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও দর্শন যে মিথ্যা, অকেজো ও অকার্যকর প্রমাণ হয়েছিল সেই হিন্দুত্বকেই এবার আবার ধুয়ে মুছে কিন্তু  প্রচন্ড আগ্রাসী-হিন্দুত্ব হিসেবে হাজির করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসছেন মোদি-অমিত গোষ্ঠী। বলাই বাহুল্য, হাস্যকর জিনিস করার উদ্যোগে প্রথমবারের ব্যর্থতার পরও দ্বিতীয়বার তা নিলে সেটা এবার তামাসার পরিণতি নিয়েই ফেরে। এই হাস্যকর জিনিসটা হলো হিন্দুত্বের জাতীয়তবাদ- যা এখন জয় শ্রীরাম বলে পরিচিত!

হিন্দি দিবস এতদিন ধুলা ময়লায় পড়ে কোথাও কোণে অবহেলায় গড়াগড়ি যাচ্ছিল। ওদিকে  এতদিনে সরকারি দপ্তরের ভাষা, হিউম্যান রিসোর্স  বা  বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ডিফল্ট ভাষা হয়ে উঠেছে ইংরাজি। কংগ্রেস হাত-পা ছেড়ে এটাই একবাক্যে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু অমিত শাহ এবার সেই ধুলা ময়লা পড়া “হিন্দি দিবস” তা ঝেড়ে পুছে নিয়ে এবার আবার পালন করে বসলেন। যদিও সেটা বড় তেমন কোন কিছু নয়। কেবল এক টুইটার স্টেটমেন্ট তাও আবার তা হিন্দিতেই হতে হয়েছে। তবে সেই স্টেটমেন্টটাই গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই। সেটার আনন্দবাজারের করা বাংলা অনুবাদটা হল এরকম – ‘‘ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন,যাকে বিশ্ব স্বীকৃতি দেবে ভারতীয় ভাষা হিসেবে। যদি কোনও ভাষা দেশকে বাঁধতে পারে,তা হিন্দি”।

প্রথমত লক্ষণীয় হল, অমিত শাহ কোন প্রধানমন্ত্রী নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কাজেই ভাষা নিয়ে বিবৃতি এটা তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজই নয়। ভারতে হিউম্যান রিসোর্স  বলে মন্ত্রণালয় আছে, সেই মন্ত্রী যদি এই হিন্দি দিবস পালনের বিবৃতি দিতেন তাও একটা কথা ছিল!  তাহলে অমিত শাহ কেন? একটা টেনেটুনে সাফাই অনেকেই করতে চাইবে হয়ত যে অমিত শাহ দলের সভাপতি, তাই। কিন্তু না। কাজটা রাষ্ট্রের তরফের, দল না। খুব সম্ভবত এর আসল অর্থ হল, হিন্দি জাতীয়তাবাদ করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালের কংগ্রেসের মত এবার আগ্রাসী-হিন্দুত্বতে তা করতে গিয়ে যদি এবারও তা মার খেয়ে যায় তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যেন পশ্চাদ-অপসারণটা ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, অমিতের বিবৃতিতে প্রথম দুই বাক্যে বলা হয়েছে, “ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে”। এর মানে হল তারা ১৯৬৩ সালের পরাজয়টা আমল করেছেন। তাই আগাম প্রলেপ দিয়ে নিলেন। কিন্তু আরএসএস-বিজেপির মূল যুক্তিটা জানা গেল পরের বাক্য  – “দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন”।  এছাড়া ইতোমধ্যেই মোদীর খসড়া শিক্ষানীতি ২০১৯-এ দেখা গেছে, হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা আছে সেখানে – যেখানে স্বয়ং নেহেরু পরাজিত হয়ে পিছু হটে গিয়েছিলেন।

অমিত আসলে বলতে চাইছেন “ভারতের একটা হিন্দি-হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন”। কেন? সেই পুরানা বেকুবি যুক্তি। আর সেটাকেই  আনন্দবাজারের তার শিরোনাম করে লিখেছে – [ভারতকে বাঁধতে পারে হিন্দিই”,এক রাষ্ট্র, এক ভাষা চান অমিত শাহ]।
এই যুক্তিটা আসলে রাষ্ট্র না-বুঝ যারা এদের। এরা একই সঙ্গে যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের হিটলার একেকজন – “জয় শ্রীরাম” – এদের যুক্তি।
অমিতের কথা অনুযায়ী ভারতকে বাঁধতে পারে এমন “রশি” বা ভাল “আঠা” দরকার অমিতের। আচ্ছা নাগরিক কী বেধে রাখার জিনিষ? অমিত মনে করেন হাঁ; এজন্য দরকার একটা হিন্দুত্ব মানে, হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ। না হলেও একটা হিন্দি ভাষার জাতীয়তাবাদ।

মোদী-অমিত শাহরা আসলে অসুস্থ চিন্তার লোক।  কোন রাষ্ট্র গড়বার জন্য না হিন্দুত্বের মত কোন আদর্শ, না কোন ধরণের জাতীয়তাবাদ – কোনটার কোনই দরকার নাই। কোন দিন ছিলও না। কিন্তু ভুল বুঝা হয়েছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন –স্টেট বলে এক সোনার পাথর বাটি ধারণা এসেছে। আর নাগরিককে রাষ্ট্রে ধরে রাখার জন্য কোন ভাষাগত ঐক্য বা ধর্মীয় ঐক্য অপ্রয়োজনীয়। যদি তাই হত তবে দ্রাবিড়ীয়রা কী হিন্দু ধর্মের বাইরের? পাঞ্জাব কী বৃহত্তর হিন্দি ধর্ম বা কালচারের বাইরের? এই ডিএমকে ১৯৬২ সালের আগে পর্যন্ত স্বায়ত্বশাসন বা বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়ার দল ছিল। পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতার সমস্যা এখনও একেবারে মিটে গেছে তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমাদের ধর্মীয় ঐক্য থাকা সত্বেও কী আমরা বিচ্ছিন্ন হই নাই! কেন এমন হয়েছিল?

রাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ থাকতে মূল প্রয়োজন, অনিবার্য  দরকার আসলে  –  বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার, নাগরিক নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ – এমন এক “রাজনৈতিক নীতির ঐক্য”। এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি কায়েম। এমন নাগরিক অধিকার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং এর বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রে জুলুম বন্ধ করুন, নাগরিক নির্বিশেষে কোন জুলুমে ভুক্তভোগী সবাইকে একটা ইনসাফ দেন। এমন ব্যবস্থা কায়েম করেন। মানুষকে বেধে রাখতে হবে না, কোনো বাড়তি রশি, আঠা কিছুই লাগবে না।

রাষ্ট্রগড়া প্রসঙ্গে, সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় টেনে আনা শব্দ বা নামটা আসলে নেশন, জাতি বা জাতীয়তাবাদ।
আমেরিকা রাষ্ট্রটা আদর্শ নয়। অনেক খুঁত ও ব্যর্থতাও এর আছে অবশ্যই। তবু খুঁটিয়ে দেখেন তো- আমেরিকান রাষ্ট্র গড়তে কোনও ধরনের জাতীয়তাবাদের ব্যবহার আছে কিনা? আমেরিকানেরা কারা ও কোন ‘জাতি’? পঞ্চাশ রাজ্যের সমাহার আমেরিকা। ভারতের চেয়েও বড়। তবু কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নাই কেন? নাগরিক বা খোদ কোন রাজ্যের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ওখানে রশি বা আঠা বলে কিছু, কোনো জাতীয়তাবাদ কী আছে? খুজে দেখেন!

তাহলে আমেরিকা-রাষ্ট্রটা টিকে আছে কী করে? অনেক দুর্বলতা আছে এর, কিন্তু ভাঙার, ভেঙ্গে পড়ার, এক না থাকার কোন কথা নেই।
আর ভারতের বেলায় দেখেন, কংগ্রেসের নিজের পরাজয় ঘটে গেছে বহু আগেই। আর দলটা এখন শুকিয়ে যাওয়াতে কংগ্রেসের আর ভারত ভাঙার কারণ হওয়ার সুযোগ বা উসিলা নেই। বিপরীতে এ থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুল করতে হিটলারি আগ্রাসী হয়ে হিন্দুত্ব, এক “জয় শ্রীরাম” হাতে এগিয়ে আসছে মোদি-অমিতেরা।

এরা আসলে হিন্দুত্বে ডুবে অসুস্থ হয়ে গেছে, আর ততটাই এরা রাষ্ট্র ধারণা ও চিন্তায় অবুঝ। এদের ধারণা হিন্দুর সবকিছুতে শত্রু হল মুসলমান। আচ্ছা তাহলে দ্রাবিড়ীয় যত নেতা আছেন, ডিএমকে এর নেতা স্টালিনসহ এরা কী মূসলমান? কলকাতার সিপিএম বা মমতা এরা? তা হলে? কথা হল, দ্রাবিড়িয়রা বা বাঙালিরা হিন্দু হলেও তারা অমিত-মোদীদের বিরোধী হবেই। কারণ তারা হিন্দি বলয়ের ক্ষমতার নামে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটার বিরোধী। অমিত-মোদীরা এই চোরা আর ভুতুড়ে ক্ষমতায় বিশ্বাসী, এটাই তো আসল সমস্যা।

যেমন দেখেন, কেন্দ্রের হাতে জমা হওয়া রাজস্ব তা বিলি বন্টনে কোন রাজ্য কত পাবে কিসের ভিত্তিতে? – এটা রেখে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর খেয়ালের হাতে, ব্যক্তি-ইচ্ছার বাইরে নিরপেক্ষতা ও অবজেকটিভ নিয়ম বা সুত্র রাখা হয়নি। যেমন মমতা মোদীর দলের না হওয়াতে তিনি মমতাকে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন? মমতাকে যেকোন বিরোধিতার শাস্তি দিতে পারেন। এটা কি ইনসাফ? এর সোজা মানে এক রাজ্যের কাঁধে চড়ে আরেক রাজ্য খাচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী নিজে অথবা যাকে ইচ্ছা তাকে এটা খাইতে দিবেন। এটারই একমাত্র প্রতিকার ছিল ফেডারেলিজম [Federalism]। আমেরিকার মত ভারতেরও এক ফেডারল রাষ্ট্র হওয়া। এটা তো প্রমাণিত এখন যে “মহান” নেহেরু সাহেবের ভারত রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকেই এনিয়ে কোন বুঝাবুঝি ছিল না। আস্থা ও সাহসের ঘাটতিও ছিল। কোন প্রমাণ রাখেন নাই যে তিনি ফেডারেলিজম বুঝতেন।

আবার মোদীকে দেখেন। ভারতের সিবিআই, ইডি বা গোয়েন্দা র – এসব প্রতিষ্ঠান তো আগে থেকেই ছিল। তাতেও মোদি সন্তুষ্ট নন, সম্ভবত  পুরানগুলাকে ততখানি নিজদলীয় মনে হয় নাই। অথবা দলীয় করতে সময় লাগবে, যে সময় তার নাই। এখন বিজেপির প্রভাবে এন্টি টেররিজমের নামে গড়ে নেয়া হয়েছে অল্প বয়সী (২০০৯) নতুন আরেকটা এনআইএ (NIA)।  আর এরপর এধরণের সব প্রতিষ্ঠানকে মোদী ব্যবহার করছেন (আগে কংগ্রেসও কমবেশি করেছে) বিরোধীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের নামে তাদের শায়েস্তা করতে, এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়রানি করতে পারেন এমন হাতিয়ার হিসেবে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীন সরকারের অপব্যবহার থেকে স্বাধীনভাবে কাজের আইন, নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে দেয়ার বদলে উলটা তা ব্যাহত করে নিজদলীয় স্বার্থে এদের ব্যবহার করছেন মোদী। যেমন দেখেন, মোদীর প্রথম গত পাঁচ বছরে বিরোধীদের সমর্থন ছাড়া রাজ্যসভায় তাঁর সরকার কোন বিল পাস করতে পারেননি। এবার সিবিআই, ইডি, র ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে বিরোধীদের বাগে এনেছেন। আর তা দিয়ে এবার মোদী-টু সরকারের প্রথম তিন মাসের আগেই “কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল” – পাস করে নিয়েছেন। বিরোধীরা যে বাগে এসেছে এটা টেস্ট করার জন্য এর আগে মোদী-টু এর নতুন সরকার, তিনি  “তিন তালাক বিল পাস” করে নিয়েছেন। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র একটা অন্ধকারের ক্ষমতা একটা দাগী ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসেবে রেখে দিতে চান মোদী-অমিতেরা। আর মুখে বুলি জয় শ্রীরাম আর হিন্দুত্ব। হিন্দি বা হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, এটা দিয়ে নাকি রাষ্ট্র এক রাখবেন!

মোদী-অমিত হিন্দি-হিন্দুত্বের আড়ালে এসব যা করছেন মূলত এজন্যই ভারত ভেঙে যাবে। ভারত ভাংবার কারণ হবেই মোদী-অমিত। আর তাদের অন্ধকারের ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ।

ভারতে কেন আঞ্চলিক দলের এত ছড়াছড়ি? মানে, রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন ডিএমকে বা মমতার তৃণমূল – বিভিন্ন রাজ্যে এমন দলের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে কেন? এর সোজা জবাব, মূলত দায়ী নেহেরু ও তার কংগ্রেস। মানে তাদের  রাষ্ট্র-চিন্তায় কিছু মারাত্মক ত্রুটি বা ঘাটতি। তাদের সর্বভারতীয় দলের নামে (১৯৪৭-৮৫) উত্তর ভারতের কোটারি ক্ষমতা দিয়ে সারা ভারতের সব রাজ্যকে দাবড়িয়ে চলেছিলেন। এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, অন্ধকারের একটা দাগী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রথম জনক এরা।  আর এখন একেই একেবারে হুবহু কিন্তু আরও আগ্রাসী-হিন্দুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজিয়ে, এবার কংগ্রেসকেই অনুসরণ করছে বিজেপি। আর  প্রথম জমানায় কংগ্রেসের  কালো ভুতুড়ে ক্ষমতার অত্যাচারেই আঞ্চলিক দল খুলার হিড়িক লেগেছিল। এরই ফলশ্রুতিতে বিগত (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময় কালে লাগাতরভাবে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারই একমাত্র বাস্তবতা ছিল।  মানে কংগ্রেস অথবা বিজেপি একা নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠাতার মুরোদে নয়, আঞ্চলিক দলের সাথে একমাত্র  কোয়ালিশন করেই এরা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। এই সময়কালে রেকর্ড বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি এইদুইয়ের যে দল কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের মোট ৫৪২ আসনের মধ্যে নিজ দলের মুরোদে তা প্রাপ্ত মোট আসন তা ১১৫ ছাড়িয়েছিল তারাই গোটা দশেক আঞ্চলিক দলের সহায়তায় কেন্দ্রে সরকার করেছিল; যেখানে হাফ মার্ক বা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল ২৭২ আসন। এটাই ছিল (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময়কালের ফ্যাক্টস ও রেকর্ড।  এর মানে এই সময় কালে কংগ্রেস বা বিজেপির চেয়ে সরকার গঠনে সবসময় আঞ্চলিক দলগুলো মোট সংখ্যা মানে ভুমিকাটা ছিল মুখ্য ও বেশি।

অথচ অমিত এখন “বাণীদাতা” হয়েছেন। উলটা বলতেছেন “আঞ্চলিক দলগুলোই নাকি ভারতের “অনৈক্যের” কারণ“। এটা হল রোগের লক্ষণকেই রোগ বলে চালানো চেষ্টা। ভারত-রাষ্ট্রগঠন কাঠামোর মধ্যে মূল সমস্যা হল, এখানে এক রাজ্যের অন্য রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে খাওয়ার সুযোগ আছে। এই সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। কারণ উত্তরপ্রদেশের কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ নেহেরু ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। কারণ তার ধারণা ও বুঝ ছিল যে ভারতকে জবরদস্তিতে এক রাখতে চাইলে এমন ক্ষমতা কাঠামোই তাকে মাইলেজ বা বিশেষ সুবিধার ক্ষমতা দিবে।  ভারতকে তথাকথিত এক রাখার ভুয়া ডরে নেহেরু এমন কাঠামোতেই ভারত গড়েছেন। এতে  কেন্দ্র যার হাতে থাকে সে এই নির্ধারণ ক্ষমতাটা পায় যে কে কার ঘারে চড়বে ও খাবে। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ব্যবস্থা গড়ার সময়ের মৌলিক কাঠামোগত ত্রুটির জন্য এটা সম্ভব হয়ে আসছে। আর এর লক্ষণ হিসাবে মাত্র প্রায় ৩৮ বছরের মধ্যে কংগ্রেসের একক ক্ষমতার দল হিসাবে বিদায়, পরাজয় ও রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল জন্মানোর হিড়িক দেখা দিয়েছিল। কংগ্রেসের বদলে ঠিক সে জায়গাটাই নিতে আজ নতুন কুতুব হতে চেষ্টা করছে মোদীর -অমিতের বিজেপি। তাই এখন লক্ষণকেই রোগ বলে চালানোর চেষ্টা করছে। অমিত শাহ রাষ্ট্র-ক্ষমতা “জ্ঞানের” বিরাট তাত্বিক হয়ে উঠেছেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার লিখেছে,
আজ দিল্লির অল ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনএর অনুষ্ঠানের মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা আসলে ব্যর্থ কি না? ওই ব্যবস্থা কি দেশবাসীর লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে?’’ তার পরে নিজেই জবাব দিয়েছেন,‘‘মানুষ আশাহত”। তাঁর দাবি,আঞ্চলিক দলগুলি আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। 

এই ইস্যুটাকে ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া দেশে এক দলীয় শাসনের ইঙ্গিত হিসাবে রিপোর্ট করেছে,। কলকাতার টেলিগ্রাফ একদলীয় পার্টির শাসনের ইঙ্গিত বলেছে। এভাবে ডিএনএ, লাইভমিন্ট, এশিয়ান-এজ অনেকেই।
কংগ্রেস বিবৃতি দিয়ে বিজেপির জোট এনডিএ-এর কোয়ালিশন দলগুলোকে জবাব দিবার দাবি জানিয়েছে।  সারকথায় অমিতের যুক্তি হল, কংগ্রেস শক্তহাতে “হিন্দুত্ব” কায়েম এর এক কর্তৃত্ববাজ শাসন জারি করতে পারে নাই দেখেই এসব ঘটেছিল। কাজেই এখন শক্ত হাতে সেটা পূরণ করতে আগ্রাসী হয়ে বিজেপি  শাসন করবে। কী তামসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে অমিতের হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]