মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

গৌতম দাস

০১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ur

 

মূলকথাঃ ব্যাপারটা মোটেও প্রো-ইন্ডিয়ান থেকে প্রো-চাইনিজ হওয়া নয়।
১। গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলের কাল এটা। একালে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কোন একটার দিকে কান্নি মেরে বাংলাদেশের স্বার্থকে একদড়িতে বাধবার বা একলাইন নেওয়ার চেষ্টায় প্রো-ইন্ডিয়ান, বা প্রো-চাইনিজ হওয়া হবে আত্মঘাতি।
২। ক্ষমতায় থাকার লোভে কারো-মুখি হওয়া, এতে শুধু নিজের দলের বা সরকারের না; পুরা দেশকেই ভালনারেবল বা দুস্থ করে ফেলা হবে। অন্যের হাতের পিংপং বল হওয়া এটা। সোজা রাস্তটা হল, সব সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখা ও প্রাধান্যে রাখা শুরু করতে হবে। এতে আপনা আপনিই ঐ তিন রাষ্ট্রের থেকে প্রয়োজনীয় আমাদের জন্য আলাদা একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যাবে। অর্থাৎ ঐ তিন রাষ্ট্রের সাথেই নানান সম্পর্কে জড়ানো যাবে কিন্তু সেটা বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখে এবং অবশ্যই ক্ষমতার থাকার লোভে নয়।
৩। তবে গুরুত্বপুর্ণ, একাজে তখনই সফলতা আসবে যখন নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীন ও সচল রাখা যাবে। আর তা করতে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সংসদসহ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযাচিত নির্বাহি হস্তক্ষেপ ছাড়াই কার্যকর হতে দিতে হবে। কার্যকর এসব প্রতিষ্ঠানগুলোই জনগণকে ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট করে রাখতে সহায়তা দিবে, তবেই একমাত্র বিদেশি আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব।

 

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ছিল মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ছোট দেশ, মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে চার লাখের (৪৪৪,২৫৯) মত, যার মধ্যে এবারের রেজিস্টার্ড ভোটার প্রায় আড়াই লাখ (২৬২,১৩৫)। এই নির্বাচনে মাত্র দু’জন প্রার্থী ছিলেন, চলতি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন [Abdulla Yameen] ও বিরোধী দলের জোট থেকে প্রার্থী [যিনি এখন বিজয়ী নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত] ইব্রাহিম মোহম্মদ সলিহ [Ibrahim Mohamed Solih]। সলিহ ছিলেন চারদলীয় এক জোটের প্রার্থী, ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি জিতেছেন। যদিও ভোটদানের সুযোগ ছিল ভোটের দিন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। তবু আড়াই লাখ ভোট গুনতে বেশি সময় লাগার কথা নয়, তাই নির্বাচনের দিন না হোক পরের দিন মালদ্বীপের রাজধানী মালের একেবারে সকাল (২৪ সেপ্টেম্বর) থেকেই দেশী-বিদেশী সবাই জেনে যায় ভোটের ফলাফল। যদিও তখনও সেটা আনুষ্ঠানিক ফলাফল নয়, মানে মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে এমন ফলাফল নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের প্রকাশ্য অস্থিরতা ও নড়াচড়া ছিল খুবই অকূটনীতিসুলভ। কূটনৈতিক আচার-আচরণ ভেঙে আনুষ্ঠানিক ফলাফল আসার আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে সলিহকে শুধু অভিনন্দন জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন কি না, মনগড়া সে আশঙ্কা ভারত সৃষ্টি করে আর তা প্রপাগান্ডায় ছড়িয়ে দেয়। ভারতের বিবৃতিটা লেখা হয়েছে এভাবে যে, “আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন এখন এই ফলাফল নিশ্চিত করে তাড়াতাড়ি অফিসিয়াল ঘোষণা দেবে। এই নির্বাচন কেবল মালদ্বীপের গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয়ের চিহ্ন নয় বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রতি কমিটমেন্টের প্রকাশ”। [We heartily congratulate Ibrahim Mohamed Solih on his victory and hope that the Election Commission will officially confirm the result at the earliest. This election marks not only the triumph of democratic forces in the Maldives, but also reflects the firm commitment to the values of democracy and the rule of law.] টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া

এই বিবৃতিটা স্পষ্টতই ভারতের এক চরম হস্তক্ষেপমূলক কাজ। ব্যাপারটা শুধু আমরা পাঠকেরাই নই, টাইমস অব ইন্ডিয়াও আমল না করে পারেনি। তাঁরা নিজ মন্তব্যে লিখেছে, ফলাফলের “অফিসিয়াল ঘোষণা দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে” [not waiting for official announcement] ভারত বিবৃতি দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন সলিহ-এর নির্বাচনে বিজয়ের ফলাফল ঘোষণা নাও করতে পারে – এই বিবৃতিতে ভারত আগাম এ ধরনের এক সন্দেহ ও ইঙ্গিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে স্বভাবতই এই বিবৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, পরিস্থিতিকে খামোখা উত্তেজিত করার চেষ্টার এক সীমা ছাড়ানি হস্তক্ষেপ।

বিবৃতির ভাষাও লক্ষণীয় যে, বিবৃতিতে ভারত সাজেশনে বলতে চাচ্ছে নির্বাচনী “ফলাফল” তো এসেই গেছে, এখন কমিশনের কাজ হল কেবল ঘোষক-এর ভুমিকা পালন করার; তাই তাড়াতাড়ি ওই ফলাফল ঘোষণা করে দিক। ভারতের এমন বক্তব্য, এটা আসলে অপর রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশনের কাজ ও এখতিয়ারের মধ্যে ঢুকে পড়া। আর এর চেয়ে বড় কথা, এতে কমিশনকে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরিচালক নয় যেন কেবল ফলাফল ঘোষক – এরকম এক আপত্তিকর সাজেশন ও অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা হয়েছে। ভারতের বিবৃতিতে দাবি করছে নির্বাচনের ফলাফলে সলিহ জিতে গেছে – অথচ এটা ভারতের দাবি করার সে কেউ নয়, ফলে অনধিকার চর্চা। এটা ভিন্ন রাষ্ট্রের ইস্যু বা বিষয়। অতএব এই দাবি করাটাই অবৈধ হস্তক্ষেপ। কারণ নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণার (গেজেট নয়) আগে কোনো ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষিত হয়ে গেছে বলে বিবেচিত হতে পারে না। ফলে কমিশনের ঘোষণার আগেই কোন বিদেশী রাষ্ট্র, ফলাফল সে জানে এই দাবি করে বিবৃতি দেয়া এক বিরাট অনধিকার চর্চা। কিন্তু ভারত সেটাই করেছে।

চলতি বছরের শুরুর আগে পর্যন্ত বিগত দশ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি” নিয়ে কাজ করে গেছে। কিন্তু এবছর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের আমেরিকায় রফতানির ওপর শুল্ক আরোপ করার কারণে বস্তুত সেসব আন্ডারহ্যান্ড  সম্পর্ক অকার্যকর হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এতে আগের সব বোঝাপড়া যে, ভারত কী সার্ভিস দিলে বিনিময়ে কী পাবে, তা অকেজো হয়ে যায়। তবুও ভারত চীন বিরোধী কোনো স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান নিলে আমেরিকা তাতে চোখ বন্ধ করে সমর্থন দেবে – এমন একটা কাঠামো এখনও থেকে গেছে দেখা যাচ্ছে। তাই মালদ্বীপ প্রসঙ্গে ভারতের বিবৃতির পর, ভারতের আবদারে আমেরিকাকেও একই লাইনে একটা বিবৃতি দিতে দেখা যায়। মালদ্বীপের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে এটাও আমেরিকার হস্তক্ষেপমূলক এক বিবৃতি। যদিও ভারতের বিবৃতির সাথে এর তফাত এতটুকু যে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র হিদার নওরট [Heather Nauert]  সবকিছুর আগে নিজেই বলে নিয়েছেন, “অফিসিয়াল ফলাফল এখনো ঘোষিত হয় নাই”’ তবে “স্থানীয় মিডিয়া ও এনজিও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি” করে তিনি কথা বলছেন।  [“Although the Election Commission has not yet announced the final tally, we note Maldives’ media and NGO reports ………] এটাও টাইমস অব ইন্ডিয়ার আর এক রিপোর্ট।

অর্থাৎ আমেরিকা তাদের একটু হলেও আক্কেল আছে যে, কোনো রাষ্ট্রের নির্বাচনে কে জিতেছে এই ফলাফলের নির্ধারণের একমাত্র অথরিটি ঐ রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন। ভিন রাষ্ট্র এর বাইরে যেতে পারে না। যদি যায় অর্থাৎ তারা যদি ধরে নিয়ে বিবৃতি দেয়া শুরু করে যে, “অমুকে জিতেছে” তাতে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের বড় নজির হবে সেটা, আমেরিকা তা আমল করেছে।

কিন্তু তবু আর একটা বাক্যে আমেরিকাও ভারতের প্ররোচনায় অযাচিত নোংরা হাত ঢুকিয়েছে এবং বেকুবও হয়েছে। সেই বাক্যটা হল, “We urge calm and respect for the will of the people as the election process concludes,” Nauert said. অর্থাৎ “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে তাই আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো ও শান্ত থাকার আহবান জানাই” – নওরট বলেন।

এখানে ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে”, অথবা “ফলাফল হয়ে গেছে” – এভাবে বাক্য লেখার মূল কারণ হল, মূলত ভারতের ধারণা, “এটা দাবি করা যে সলিহ জিতে গেছে” – এটা ব্যাপক প্রচার করে দাবি না করলে যদি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রভাবে কমিশন ফল প্রকাশ না করে! তাই  (এবং প্রভাবিত করে আমেরিকাকেও) নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণার আগে থেকেই ভারতকে দাবি করতে থাকতে হবে যে “সলিহ জিতে গেছে”। কিন্তু গুরুতর সমস্যা হল, বাইরের রাষ্ট্র এটা করলে তা অনধিকার হয়, অকুটনীতিক আচরণ হয়। কিন্তু ভারত একেবারে ইজ্জত-জ্ঞান শুন্য বেপরোয়া হয়ে তাই করেছে।

আবার লক্ষ্যণীয় আসলে ব্যাপারটা এমনও ছিল না যে, কমিশনের কাজে কোনো গড়িমসি দেখা গেছে। কারণ নির্বাচনের পরের দিন অর্থাৎ ঐ ২৪ তারিখেই বেলা বাড়তেই নির্বাচন কমিশন নিয়ম মাফিক সলিহকে নির্বাচিত বলে ফলাফল ঘোষণা করেছিল। আর এর দু-এক ঘণ্টা পরেই প্রেসিডেন্ট  ইয়ামিন নিজ অফিসে নির্বাচিত প্রার্থী সলিহকে আমন্ত্রিত করে ডেকে নিয়ে বিজয়ের অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর এর পরেই প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন  নিজে মিডিয়ার সামনে ঘোষণা  দিয়ে বলেন, “মালদ্বীপের জনগণ তারা যা চায় সেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আমি গতকালের সেই ফল মেনে নিয়েছি। ইতোমধ্যে আমি সলিহর সাথে দেখা করেছি, যাকে ভোটাররা পরবর্তি প্রেসিডেন্ট হিসাবে বেছে নিয়েছে। আমি তাকে অভিনন্দনও জানিয়েছি”। [“Maldivian people have decided what they want. I have accepted the results from yesterday. Earlier today, I met with Ibrahim Mohamed Solih, who the Maldivian electorate has chosen to be their next president. I have congratulated him,” Yameen said in a televised press conference.]। এটা রয়টারের রিপোর্ট, থেকে নেওয়া। অর্থাৎ কোন নির্বাচনে একজন প্রেসিডেন্টের পরাজিত হওয়ার পর এর চেয়ে স্পষ্ট ও সবল স্বাভাবিক ঘোষণা আর কী হতে পারে!

অথচ ভারত নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর বহু আগে থেকেই নিয়মিতভাবে ইয়ামিনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে গিয়েছে যে, “নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি সবকিছু। আর অনুসারী হয়ে আমেরিকাও ভারতকে সমর্থ করে নিজের খারাপ কূটনৈতিক ইমেজ আর বেকুবির নজির সৃষ্টি করেছে। অথচ  নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া দেখার জন্য অন্তত ২৪ সেপ্টেম্বর দিনটা পার হওয়া পর্যন্ত ভারত ও আমেরিকা অপেক্ষা করতে পারত। আর সেটাই সবাই আশা করে আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই অতি উৎসাহ দেখিয়ে দুই রাষ্ট্র নিজেরাই এক হস্তক্ষেপের নজির সৃষ্টি করে রেখেছে, আর নিজের মুখে কালি লাগিয়েছে। কারণ, এপর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত কোথাও কোন ধরণের গোলযোগ ছাড়াই মালদ্বীপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি ভারতীয় প্রপাগান্ডার ফাঁদে পড়ে, গোলযোগের আশঙ্কা করে নির্বাচনের তিনদিন আগে ২০ সেপ্টেম্বর আলজাজিরা-এর মত মিডিয়া এক পক্ষপাতিত্বের রিপোর্ট ছেপেছিল।  অথচ ফলাফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত ভারত, আমেরিকা বা কোন মিডিয়া তাদের কারচুপি বা গোলযোগের মনগড়া প্রপাগান্ডার কোন সত্যতা তারা দেখাতে পারে নাই।

বরং প্রতিক্ষেত্রে  ভারত ও আমেরিকার প্রপাগান্ডার উল্টা – নির্বাচন এতই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মমাফিক হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা আমলা ঘনিষ্ট এক কলামিস্ট নিজেই ২৪ তারিখ সকালেও নিজের “ফলাফল ঘোষণা ও ক্ষমতা হস্তান্তর” নাও হতে পারে – এ ধরনের মনগড়া আশঙ্কা যাচাই করতে মালদ্বীপে দু’জন গুরুত্বপূর্ণ এমপির সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন। ওই এমপি দু’জন এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিলে এবার তিনি আশ্বস্ত হন বলে তাও লিখেছেন।
সবশেষ নিজেই লিখছেন, “সলিহ যেহেতু জিতেছে অতএব মালদ্বীপের নির্বাচনে কারচুপি হয়নি”। এই হল মালদ্বীপের নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় প্রপাগান্ডার মুখ থুবড়ে পড়া পরিণতি!

মালদ্বীপের ফলাফল দেখে ফেসবুকে একটা ছোট মন্তব্যে লিখেছিলাম, ‘এটা বিপর্যয়’। কিন্তু কীসের? মালদ্বীপের থেকে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কী শেখার আছে, তা বোঝার উদ্দেশ্যে সেখানকার রাজনৈতিক ঘটনাবলির এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে আনব।

মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি স্পষ্ট পরস্পরবিদ্বেষী দুই ভাগে বিভক্ত। এটা আর বিরোধী নয় বিদ্বেষী জায়গায় চলে গেছে। তবু ঘটনাবলির একটা বর্ণনা মানে বর্ণনার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই করতে হবে। আর তাতে কোন পক্ষ সঠিক ছিল অথবা এর কোনো একটা পক্ষের প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলাটা এখানে এর একেবারেই উদ্দেশ্য নয়। তাই এই রচনায় কোনো পক্ষকে “ভাল” বললাম কি না, তা খোঁজা অথবা সেদিক থেকে বুঝতে যাওয়া খুবই ভুল হবে। আর এতে লেখাটার সুবিচার বঞ্চিত হবে।

প্রথমত, মালদ্বীপের রাজনৈতিক অসন্তোষ, অস্থিরতা অনেক পুরনো, গত শতক থেকে। এর একটা বড় উৎস হল, ক্ষমতাসীন পরিবারের প্রভাবশালী দুই সৎ ভাইয়ের রেষারেষি আর স্বার্থ ঝগড়াকে কেন্দ্রে রেখে এবার এর সাথে সমাজের অন্যান্য নানান স্বার্থগুলো একেক ভাইয়ের পক্ষ বেছে নেওয়াতে এটাকেই মালদ্বীপের রাজনৈতিক পোলারাইজেশন হিসেবে মনে করা হচ্ছে – এ ধরনের। অর্থাৎ রাজনীতি কম আর স্বার্থবিরোধ ভার বেশি। দ্বিতীয়ত, ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপে ভারত “অপারেশন ক্যাকটাস” নামে নিজ সামরিক বাহিনী নামিয়ে পছন্দের সরকার বসিয়ে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছিল; এই বিরাট খারাপ নজির সেই থেকে জ্বলজ্বল করছে। তৃতীয়ত, ২০১২ সালের পর থেকে চলতি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সাথে অপর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের রাজনৈতিক বিবাদ তৈরি হওয়া, এক পর্যায়ে ‘টেরোরিজমের অভিযোগে’ নাশিদকে আদালতে নিয়ে শাস্তি দেয়া, এরপরে পার্লামেন্টকে কার্যকরভাবে কাজ করতে না দেয়া, বিচারককে গ্রেফতার, দুবার অপ্রতিষ্ঠিত-সাফাই দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি ইত্যাদি ঘটনা ঘটেছে যা মালদ্বীপের রাজনৈতিক তৎপরতা ও চর্চা হিসেবে খুবই খারাপ সব উদাহরণ।

কিন্তু এসবের বিপরীতে আদালতের ঘটনার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের (Mohamed Nasheed, যিনি প্যারোলে চিকিতসার জন্য বাইরে লন্ডনে গিয়ে সেখান থেকে দেশে না ফিরে এখন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসাবে শ্রীলঙ্কায় বসবাস করেন) খোলাখুলি ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপে ক্ষমতা দখলের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা আরো খারাপ এক উদাহরণ। সৌভাগ্যবশত এটা গত শতক নয়। অল্প কথায় বললে, জাপানি টাইমস আর রয়টা্র্সের খবর অনুযায়ী , নাশিদের খোলাখুলি ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের প্রতিক্রিয়ায় পরে,  চীন ১১ জাহাজের এক বহর নিয়ে ভারত মহাসাগরে হাজির হয়েছিল। এতে চীনের সাথে কোন মুখোমুখি সঙ্ঘাত পরিস্থিতি এড়াতে ভারত মালদ্বীপে হস্তক্ষেপে নাশিদের আহবান উপেক্ষা করে, আর বিষয়টা এবার চিন্তা থেকে বাদ দেয়। ফলে আরো খারাপ কিছুর হাত থেকে নাশিদ এবং মালদ্বীপও বেঁচে যায়। তবে ভারতের কোন কোন মিডিয়া অহেতুক “ভারতের মুখরক্ষা করার তাগিদ” থেকে একটা স্টোরি প্রচার করতে থাকে যে নাশিদ তো এখন বিরোধী দলে – ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নয় (১৯৮৮ সালের মালদ্বীপ প্রেসিডেণ্ট গাইয়ুমের ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের সাথে মনে মনে তুলনা করে এরা কথা বলছে) তাই ভারত এবারের আহবান উপেক্ষা করেছে। যদিও আমরা ভারত মহাসাগরে চীনা মেরিন ও ভারতীয় নৌবাহিনীর তাদের পরস্পরের জাহাজ কত দূরে এনিয়ে বিবৃতি দেখেছি। ভারত বলেছিল আমার হাজার খানেক মাইলেরও দূরে। আর চীনা এক নৌ ওয়েবসাইট বলেছিল, না আমরা বেশ কাছাকাছিই। এরপর এতটুকুতেই ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, কারণ ……।

নাশিদের ভারতকে আহবান এর ঘটনা এই বছর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে। আর চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারীর। আর ওদিকে আর এক বিশাল বেড়ে চলা নয়া স্টোরি হল, ভারতের চলতি বিদেশ সচিব বিজয় কেশব গোখলে ঐ ৩০ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে তাঁর প্রথম বিদেশ ঘটান চীনে, ২৪ ফেব্রুয়ারি। ফলে যে যাই গালগপ্প দেক এবার সব টেনশন ফুস! আর এর পরেই আমরা পেয়েছিলাম ২৮ মার্চ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সিনিয়র সরকারি কর্তার  স্বীকারোক্তি – “দক্ষিণ এশিয়া কি আর ভারতের সেই বাগানবাড়ি আছে, চীন এসে গেছে না! আমরা এখন বড় জোর আমাদের মনোবাঞ্ছা চীনকে বলতে পারি। চীনের উচিত হবে আমাদের সাথে স্ট্রাটেজিক ট্রাস্ট তৈরি করা। ………আমরা চীনকে জানিয়েছি যে মালদ্বীপে আমরা হস্তক্ষেপ করব না”। এটা ছিল ঐ পত্রিকা রিপোর্টের সাব-হেডিং। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার বরাতে এটা ছাপা হয়েছিল। সারকথায় নাশিদের আহবান সত্ত্বেও বরং ভারত খোলাখুলি সংযত হয়েছিল।

কিন্তু মালদ্বীপের ঘটনাবলিকে মালদ্বীপ-রাষ্ট্রের নিজ স্বার্থের দিক থেকে যদি বিচার করা হয় তাহলে, ইয়ামিনের ক্ষেত্রে অপরাধ হলঃ যেসব প্রতিষ্ঠানের কারণে রাষ্ট্র কার্যকর ও প্রাণবন্ত থাকে – কিন্তু কেউ ক্ষমতায় আছে বলে সেগুলো প্রত্যেকটার (যেমন আইনশৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ইত্যাদি) স্বাধীন বা কনষ্টিটিউশন নির্ধারিত এখতিয়ার ও আইনসম্মত কাজে নির্বাহী প্রধানের অযাচিত ও বেআইনি হস্তক্ষেপ ঘটানো – এটা এক চরম আত্মঘাতী কাজ। ইয়ামিন বেপরোয়াভাবে সেই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর কাজগুলোই করে গেছেন। আর বিপরীতে নাশিদের ক্ষেত্রে, নিজ তথাকথিত রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবান রেখে পুরো মালদ্বীপ রাষ্ট্রকেই অস্তিত্বহীন দুস্থ করে ফেলার আরও এক অপরাধ করেছেন নাশিদ।

সব দেশেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থের নানা লড়াই, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সকলের জন্য পালনীয় এর কিছু ‘নো গো এরিয়া’ থাকে, যা থেকে দলগুলো সকলকে দূরে থাকতে হয়।

মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বা এর শৃঙ্খলায় ব্যাপক উলটপালট পরিবর্তন আসন্ন। আমার প্রায় সব লেখাই যেখানে দাঁড়িয়ে দেখে লেখা। গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও এর শৃঙ্খলা এবারের অভিমুখ চীনের নেতৃত্বে পরিবর্তন হতেই থাকবে। আর নতুন করে সাজানো হতে থাকবে। দুনিয়ায় আমেরিকান নেতৃত্ব ও প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে; একেবারে নাই না হলেও। আর তাতে পশ্চিম বা ইউরোপ নয়, দুনিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নাট্যশালা হয়ে উঠছে এশিয়া। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এশিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই কাঁধ-বদল বা শিফটিং – এর ভাল এবং মন্দ দুটো দিকই আছে। একদিকে ভাল কিছু সুযোগ পাওয়ার আছে আবার ঠিকমত ব্যবহার না করলে জানলে একইসাথে নিজে তছনছ হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনাও আছে – দুটোই।

সবচেয়ে মন্দের দিকটা হল, অস্থির ও চলতি এই শিফটিংয়ের প্রাথম দিককার সময়কালটা। দুনিয়া নতুন করে সাজানো আর সম্পর্কগুলো ঢেলে সাজিয়ে গড়ার এই কালেঃ
১. চীন, আমেরিকা আর ভারত এই তিন পক্ষের রেষারেষি থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে দূরে থাকতে পারতে হবে। কোন পক্ষকে নিজের পক্ষ ভাবা যাবে না, এলাইন হয়ে যাওয়া যাবে না। ঐ তিন পক্ষের কারও স্বার্থে নিজেরা বিভক্ত হলে ঐ বিভক্ত হওয়া থেকে ক্ষতি শুরু হবে।
২. দেশের দলগুলোর মধ্যে আভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও স্বার্থবিরোধে ওই তিন রাষ্ট্রকে ডেকে আনা যাবে না, সংশ্লিষ্ট করে ফেলা যাবে না।
৩. অথবা উল্টা করে বললে, ওই তিন রাষ্ট্র স্বার্থের কোনো একটার পক্ষ নিয়ে আমাদের কোনো রাজনৈতিক দল দেশের ভেতর কাজ করতে পারবে না। ‘প্রো-ইন্ডিয়ান বা প্রো-চাইনিজ দল ক্ষমতায়’- এ ধরনের পরিচিতি আমাদের পতনের ইঙ্গিত।
৪. একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই প্রধান, এটাকে সব সময় প্রাধান্যে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেই হবে।
৫. যে দলই ক্ষমতায় থাকুক – তার ভারত, আমেরিকা অথবা চীনকে কোনো সুবিধা দেয়া বা ঋণ নেয়া তা করতে হবে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে রেখে; অবিতর্কিত এবং স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়ায় যাতে অহেতুক তর্ক-বিতর্কের সুযোগ কেউ না নিতে পারে ইত্যাদি।

কিন্তু এসবই বজায় রাখা যাবে যদি নিয়মিত ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ও ক্ষমতাহস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে এক স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ দেয়া যায়। এ ছাড়া ক্ষমতাসীনের চোখে যে সরকার বিরোধী তারও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করতে ক্ষমতাসীনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।

এক কথায় বললে, মালদ্বীপের রাজনীতি ও দল এসব মৌলিক করণীয়গুলো করতে সবাই ব্যর্থ হয়েছে। ইয়ামিনের দিক থেকেও এই রাজনৈতিক ফলাফল বিপর্যয়কর এজন্য যে, হয়ত সে বলবে বিদেশীকে হস্তক্ষেপ ডেকে আনা নাশিদের উদ্যোগকে ঠেকাতে পেরেছে। কিন্তু ইয়ামিন তা এমন প্রক্রিয়ায় করেছে তাতে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন আদালত ও পার্লামেন্টকে) অকেজো করে ফেলেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা জনগণই এই কাজ পছন্দ করেনি। অনুমোদন করেনি। উল্টা করে বললে ইয়ামিন তার কাজকে জনগণ সাথে নিয়ে করতে পারেনি। এরই ফলাফল হল নির্বাচনে সব পাবলিক সহানুভূতি বিরোধী দলের দিকে চলে গেছে, যার প্রকাশ নাশিদের প্রার্থী বেশি ভোট পাওয়া বা ইয়ামিনের পরাজয়। তবে অবশ্যই আবার ইয়ামিন প্রশংসার দাবি রাখে যে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত ও তার বন্ধুদের নিয়মিত শত প্রপাগান্ডা [যে নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি] এসব সত্ত্বেও এগুলোর প্রতিটা যে ডাহা মিথ্যা তা ইয়ামিন প্রমাণ করে দিয়েছেন – একটা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্পন্ন করে দিয়ে। যা ভারত ও আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত। ওদিকে ভারতকে আহবান জানিয়ে নাশিদ যা করেছে তাতে তাঁর এখন রাজনীতি ত্যাগ করে অবসরে যাওয়া উচিত।

এখন নিয়ম অনুযায়ি আগামী ১৭ নভেম্বর হল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন। এরপরে এবার পালটা সলিহ ও নাশিদের দল বা জোট কী প্রতপক্ষের উপর পালটা প্রতিশোধ নেয়া শুরু করবে আর একইভাবে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকেজো করে রাখবে? জবাব সম্ভবত হ্যাঁ, সেই সম্ভাবনাই বেশি। এক ভারতীয় ‘বিদ্বজ্জন’ অধীর আগ্রহে কি লিখেছেন লক্ষ করা যাক। তিনি বলছেন, “নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মালদ্বীপ এবার ভারতের দিকে ফিরতে পারে এবং অবশ্যই ফিরবে”। [For new development projects, Maldives can turn to India and will.] তিনি এয়ারপোর্ট পুননির্মান প্রকল্প আবার ভারতের ফিরে পেয়ে যাবার স্বপ্ন দেখছেন।  অর্থাৎ সে সম্ভাবনা বাস্তব হলে তা হবে, নাশিদ ও তার দলবলের মালদ্বীপকে চীন-ভারতের হাতে পিংপং বল করে ফেলা- যা এক বিরাট অযোগ্যতা আর তা, আনফিট রাজনীতিক হওয়া হবে।

শেষ বিচারে আবার মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের এখনই উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই। একটা কারণ, মালদ্বীপে পার্লামেন্টারি নির্বাচন হবে ২০১৯ সালের মে মাসে। অতীতের রেকর্ড বলে, সে নির্বাচনে ইয়ামিনের দল আবার পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ে ফিরে এসে যেতে পারে। এ ছাড়া নাশিদের জন্য আরো বড় বিপদ হল, তারা জিতেছে একটা জোট হিসেবে। কিন্তু একদিকে জোটের মেনিফেস্টো অসম্পূর্ণ, আবার তাতে বলা আছে জোটের এগ্রিমেন্ট পার্লামেন্ট বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনু-স্বাক্ষরিত হতে হবে।
আরও আছে। এছাড়া নাশিদের দল চায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা উঠিয়ে দিয়ে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকারে চলে যায়। কিন্তু জোট শরিকেরা এতে একমত নয়। ফলে বহু – যদি, কিন্তু ও অনিশ্চয়তা – অপেক্ষা করছে।

তবে আমাদের জন্য সারকথাটা হল, আমাদের দলগুলো একেকটা চীন অথবা ভারতের এজেন্সি নিয়ে বিভক্ত হয়ে যেতে পারবে না। চীন, ভারত অথবা আমেরিকার আগে সবসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে ও স্বচ্ছতায় নিয়ে হাজির হতে হবে। নইলে নিজেরাই তছনছ হয়ে যাওয়ার শুরু হবে সেখান থেকেই।

একটা তামাসার বাক্য দিয়ে শেষ করা যাক। ভারত মালদ্বীপ ইস্যুতে ইয়ামিনকে “একনায়ক” আর তাঁর বিরুদ্ধে  নাশিদ-সলিহদেরকে “গণতন্ত্রপন্থিদের” বিজয় হিসাবে এক “মরাল” দাড় করাবার কোশিশ করে গেছে। আচ্ছা বাংলাদেশের বেলায় কী করবে? কাকে একনায়ক আর কাকে “গণতন্ত্রী” হিসাবে রঙ লাগাবে! ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য যারা আহবান করে সে অবশ্যই “বিরাট গণতন্ত্রী” দেখা যাচ্ছে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপের নির্বাচন ও আমাদের জন্য শিক্ষা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

গৌতম দাস || Wednesday 27 June 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tI

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা প্রথম পর্ব।]

ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন শেষ হবার পর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ২৫ জুন সন্ধ্যায় ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহম্মদ মোরসিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবু দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সব জায়গায় মূল আলোচনার বিষয় মোরসির ক্ষমতা কি কি, কত দিনের প্রেসিডেন্ট, কি তাঁর কাজ এবং কাজের সীমা ইত্যাদি। কোন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) বলতে প্রচলিত যে ধারণা দুনিয়ায় আছে সেই রকম একটা ভাবের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলতে দুনিয়াতে প্রচলিত ভাবটা কে কি বুঝে তা দিয়ে কোন কাজ চলতে পারে না, বরং ঐ সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট-এর মানে কি, কি তাঁর ক্ষমতা, কোনটা তার নয়, কতদিনের জন্য ক্ষমতা ইত্যাদি স্পষ্ট করে বলা থাকতে হয়। তা বলা থাকতে হয় কনষ্টিটিউশনে এবং নির্বাচনের আয়োজন শুরুরও আগেই । একটা কনষ্টিটিউশন কোন রাষ্ট্রের থাকার মানে হল ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক-জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত (কনষ্টিটিউটেড) হয়েছে; এভাবে হলে, হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে রাষ্ট্র বলা চলে। অন্যভাবে বললে জনগণ রাজনৈতিকভাবে কনষ্টিটিউটেড হওয়া আর রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যাওয়া একই কথা। আর সেই সাথে জনগণ কিসের ভিত্তিতে একত্র হলো, কনষ্টিটিউটেড হলো সেই ভিত্তি – জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার কোন ভিত্তি – সেকথার লিখিত দলিলটা হলো কনষ্টিটিউশন। ঐ কনষ্টিটিউশনে বলে দেয়া থাকে, রাষ্ট্র যে পরিচালনার করবে সেই নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাজ, ক্ষমতা কি, কতদিনের, রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা হবে ইত্যাদি। এরপর সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনস্ততা মেনে রাষ্ট্রের বাকি সমস্ত  প্রতিষ্ঠান এমনকি খোদ নির্বাহী প্রধান, পার্লামেন্ট অথবা বিচার বিভাগ সবাই আনুগত্য প্রকাশ করেই একমাত্র তারা যার যা ভুমিকা পালন করতে পারে। ফলে রাষ্ট্র দৃশ্যমান হয়। খেয়াল রাখতে হবে আমি রাষ্ট্রের কথা বলছি, দেশ না। দেশ বলতে ওর মাটি সীমানা মানুষ ইত্যাদি সবই থাকতে পারে – এতে দেশ হয়ে থাকলেও তা রাষ্ট্র নাও হতে পারে। সোমালিয়া একটা দেশ বটে কিন্তু রাষ্ট্র নয় সেটা। আবার কোন দেশ একই থাকে কিন্তু ওর রাষ্ট্র আবার কনষ্টিটিউট বা গঠন করে নেবার দরকার হতে পারে। দরকারের মূল কারণ, পুরানা রাষ্ট্র আর জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না তাই। রাজনৈতিক শব্দে একে কোন দেশের নতুন করে রিপাবলিক গড়া বলে। আবার অনেকের মনে হতে পারে এতক্ষণ রাষ্ট্র বা রিপাবলিক (গণ)রাষ্ট্র বলতে আমি বোধহয় আগাম ধরেই নিয়েছি যে আমি “গণতন্ত্র” ধরনের রাষ্ট্রের কথাই বলছি। না আমি তা বলছি না। আমি  রাষ্ট্রের কথা বলছি, রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। এই রাষ্ট্র ইসলামি, কমিউনিষ্ট, লিবারেল ইত্যাদি অথবা এসবেরও বাইরে নতুন কোন রাষ্ট্র হতে পারে। আর এসব রাষ্ট্র শব্দের আগে বিশেষণে রিপাবলিক কথাটা যোগ করেছি এজন্য যে এটা অন্তত রাজা, বাদশা সম্রাটের রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য নয়; এসবের বিপরীতে জনগণের কর্তৃত্বের রাষ্ট্র কেবল সেটা পরিস্কার রাখার জন্য।

  • ইজিপ্টের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রের কোন কনষ্টিটিউশন বর্তমানে নাই।  মোবারকের পুরানা কনষ্টিটিউশন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর, পার্লামেন্ট বসার আগে এবং SCAF (সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স)-এর ঘোষণায় নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতার জোরে ।
  • এর মানে ইজিপ্ট একটা অন্তর্বতীকালিন বা মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে, পুরানা রাষ্ট্র নাই আবার নতুন রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা হয়নি – এদুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা।
  • তাহলে নতুন কোন কনষ্টিটিউশনের আগেই একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইজিপ্টে ঘটেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ীর মত। আবার এর আগে একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত এপ্রিলে; ব্রাদারহুড যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়েছে। সাথে ইসলামি সালাফি রাজনীতির নূর পার্টি (২৫%) মিলিয়ে মোট ৫৪% আসন এই দুই ইসলামী ব্যকগ্রাউন্ডের রাজনীতিক দলের হাতে। সাধারণভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচন মানে আগাম একটা কনষ্টিটিউশন আছে; সে কনষ্টিটিউশনের অধীনে সীমায় থেকে প্রতিদিনের নানান প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ওর কাজ। কিন্তু ইজিপ্টের বিশেষ ক্ষেত্রে নামে বলা হচ্ছে এটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট কিন্তু এর কাজ হবে একটা কনষ্টিটিউশন খাড়া করা। কিন্তু তাও আবার সরাসরি নয়। পার্লামেন্টের দ্বারা একশ মনোনিত (নির্বাচিত নয়) সদস্যের এক কমিটি ইজিপ্ট রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন (খসড়া বা প্রস্তাবিত) খাড়া করবে। যেটা পরে হয়ত পার্লামেন্ট পাশ বা অনুমোদন করলেই হবে; অথবা আবার গণভোটে দেয়া হবে।(“হয়ত” বলে আমাকে বাক্য লিখতে হচ্ছে এজন্য যে এগুলোর কোনটাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে পরিস্কার করা হয় নাই।) কিন্তু তাই যদি হয় তবে পুরানা বা নতুন কোন কনষ্টিটিউশনই না থাকা অবস্থায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের কাজ, উদ্দেশ্য লক্ষ্য কী? কেনই বা কথাটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট বলা হচ্ছে; যেখানে হবার কথা একটা কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বী (কনষ্টিটিউশন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সভা) বা আমাদের বাংলায় সমতুল্য প্রতিশব্দ ‘গণ পরিষদ’; ফলে ঠিক পার্লামেন্ট মেম্বার বা নির্বাচন নয়, বরং গণ পরিষদের সদস্য কে হবেন তাঁর নির্বাচন – এটাই হবার কথা। এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনেরও আগের কাজ। প্রথম কাজ কনষ্টিটিউশন বা রাষ্ট্র গঠন – জনগণের কনষ্টিটিউটেড হওয়া – সেটা ঘটানো। এরপর ঐ কনষ্টিটিউশনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে বড় ধরনের এক গোজামিল এখানে চলছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উপরে বারবার দেখিয়েছি কোন কিছুই স্পষ্ট না করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আওয়াজে ঘটনা চলছে। এমনকি ঐ একশজন কারা কিভাবে মনোনিত হবেন তাও স্পষ্ট করে রাখা হয় নাই। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ঐ পার্লামেন্ট এনিয়ে বিরোধ মীমাংসা শেষ করতে না পেরে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। ব্রাদারহুড সালাফি বাদে সমাজের বাকি সবাই পার্লামেন্ট থুয়ে আবার তাহরির স্কয়ারমুখী জমায়েত হয়। এই অবস্থা অবশ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগেও হয়েছিল। নির্বাচন বর্জনের ডাক এসেছিল। কিন্তু এর ভিতরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘটেছিল। আর পরে দেখলাম পার্লামেন্টের বিরোধ মীমাংসা যখন হলো না তখন ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে যাওয়ায় সবাই তাতেই মত্ত হয়ে গেল এই ভেবে যে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা দিয়েই তারা সব বিরোধের মীমাংসা করে নিবেন।

গণ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বা যেকোন বিপ্লব সফল করতে গেলে কনষ্টিটিউশন থাকা আর না থাকার মাঝের অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার হাতে থাকছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় সব কিছুর নির্ধারক এবং লক্ষণও বটে। র‍্যাডিকাল কোন পরিবর্তন বিপ্লবের ভাব তুলে এর বদলে তা উদারতাবাদী লোক দেখানো কোন ঘটনা হিসাবে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়ে যাবে কি না তা সহজে বুঝবার উপায় হলো অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতাটার দিকে লক্ষ্য রাখা। উপরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের নামে তামাশা আর পরে একইভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের নামে যে রহস্য ইজিপ্টের আমরা দেখছি – মোরসি নির্বাচিত এটা জানার পরও সাথে সাথে যে প্রশ্ন উঠছে যে তাঁর ক্ষমতা কি কি, আর সমানে পিছন থেকে SCAF সমানে প্রম্পট করছে, এক এক সময় এক এক ভাবে ফরমান জারি করে প্রেসিডেন্টকেই সাইজ করছে – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার এটা কত গুরুত্বপূর্ণ, সেন্ট্রাল পয়েন্ট। কিন্তু SCAF কিভাবে কেন অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা হয়ে গেল? এরমানে আরব জাগরণ আন্দোলন বা বিপ্লবের আওয়াজই কি  SCAF কে ক্ষমতায় আনে নাই? ঘটনা ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু এই সত্যি ঘটনা ঘটতে পারল কেন? কেন এমন হলো, এদিকটা এখন বুঝাবুঝির দিকে যাব।

ইজিপ্টের ঘটনায় মূল তিন প্লেয়ার – ১) SCAF, ২) স্থানীয় ব্রাদারহুড আর ৩)পশ্চিমের লিবারেল ইসলাম (RAND প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ধারা)। এর বাইরে সেকুলার, কমিউনিষ্ট বা লিবারেল ধারার ছোট টুকরা যারা আছে এরা ঠিক গোনায় ধরা প্লেয়ার হতে পারেনি তাই এদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা না করে তাহরিরের মাঠের সাধারণ গণ আন্দোলনের কর্মীদের ভিতরে ধরেছি, সবমিলিয়ে যারা চতুর্থ ধারা বলতে পারি।

[এই লেখাটা শুরু করেছিলাম ১৬-১৭ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে। লেখার প্রসঙ্গ ক্রমশ বিস্তার হতে থাকে কারণ, যেটাকে গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম বলছি – এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টরটা কোথাও আলোচনা হতে দেখিনি। “আরব স্প্রিং” বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম জিনিষটা কি কেন, এর প্রভাবে ইজিপ্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সম্পর্কটা কি এটা বাদ  রেখেই সব আলোচনা চলছে। মিডিয়াগুলোর ফোকাস হলো ব্রাদারহুড ইসলাম নিয়ে তেড়ে আসছে এবার কপটিক খ্রীশ্চানদের কি দশা ঘটে এটাই যেন মূল বিষয়। অথচ তুলনায় এটা সবচেয়ে তুচ্ছ দিক। ফলে কেন তুচ্ছ বলছি সেকথাগুলো ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে লেখা শেষ করতে পারিনি। এদিকে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। এই দেখে ঐ ২৫ তারিখেই ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে তাড়াহুড়া তবে আলাদা করে “কয়েক ঘন্টা পর ইজিপ্ট – কি ঘটতে পারে? কি হতে যাচ্ছে?” শিরোনামে লেখাটা দিয়ে দেই। এখন মুল লেখাটা আবার সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, কয়েক পর্বে। ]

 

বিপ্লবী রাজনীতি না উদারবাদী রাজনীতি

কোন গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে, বিপ্লব সফল করতে গেলে পুলিশ-মিলিটারীর মার নির্যাতন সহ্য করা, অঙ্গ হারানো, নিহত বা গুম হয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে দমনের সব পথ মোকাবিলায় পাড়ি দিয়েই একমাত্র সেটা ঘটতে পারে—এটা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু কোন প্রতিরোধ আন্দোলন সেটা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব হলো বা হবে কি না, পৌছাবে কি না তা – কতটা মাত্রার দমন নির্যাতন সহ্য করা হয়েছে তা মেপে ঠিক হয় না; বলা ভাল নির্যাতনের মাত্রা আর বিপ্লব – এদুটোর আসলে কোন সম্পর্কই নাই, সম্পর্ক আছে মনে করে কোন মনবুঝ দেয়াটাও বেকুবি, নিজেকে ধোকা দেয়া। বাংলাদেশেও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা ১৯৯০ সালে নিজেদের সাথে এমন ধোকাবাজি করেছিল, দাবি করেছিল প্রেসক্লাবের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে তারা নাকি এক গণঅভ্যুত্থান করে ফেলেছিল। ইজিপ্টের আরব জাগরণের বিপ্লবীরা একই সমস্যায় পড়েছে। গত আঠারো মাস ধরে আন্দোলনে তাদেরও ধারণা হয়েছিল তারা বিপ্লবের স্বাদ পেয়েছে, নিচ্ছে। আজ (১৬-১৭ জুন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড মানে রান-অফ চলছে। দুমাস আগের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (সামরিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত এক ধরণের কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট) “অবৈধ” ঘোষণায় ভেঙ্গে দিয়েছে ঠিক এর দুদিন আগে ১৪ জুন। দিন দশেক আগে ঐ একই আদালত (প্রায় একই বিচারকেরা তবে কোর্টের নাম আলাদা) হোসেনী মুবারক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ছয়জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ৮০০ এর মত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগ থেকে “প্রমাণাভাবে” তাদের খালাস বলে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ এই ৮০০ জনকে কারা মেরেছে, কাদের হুকুমে পুলিশ গুলি ছুড়েছে তা আইনের চোখে আন-আইডেনটিফায়েড”, তাই বেকসুর খালাস। কিন্তু সাথে এক তামাশা আছে এখানে। ঐ ৮০০ জনকে হত্যা রাষ্ট্র কেন প্রটেক্ট করতে পারেনি এই অভিযোগে কেবল প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। এর আগে এতদিন ইজিপ্টের বিপ্লবী তরুণেরা খুশিতেই ছিল বিপ্লবের কিছু একটা হচ্ছে মনে করে। বিপ্লব প্রায় শেষ মনে করে, বিপ্লবের গাথা লিখাতেও তারা উদ্যোগী হয়ে গিয়েছিল। গান ছড়া, কার্টুন ডকুমেন্টারীতে সমাজ সয়লাব হচ্ছিল, যেমন হয়। কিন্তু এই রায়ের পরেই কেবল তারা প্রথম টের পাওয়া শুরু করে যে তারা প্রতারিত, ঠকেছে তারা। সবকিছু হাতছাড়া তাদের, আঙ্গুলের ফাঁক গলে সব বেরিয়ে গেছে। কবে কিভাবে বের হয়ে গেছে টেরও পায়নি। এতদিন খুশিতে আশা ভরশায় বুঁদ হয়ে মগ্ন থাকছিল আর ভেবে ছিল মোবারক আর তার সঙ্গী সাগরেদদের বিচার হচ্ছে, হবে। আসলে তরুণ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদেরই ঠকিয়েছে; কারণ বিপ্লব কি, কি করে বুঝা যায় বিপ্লব হচ্ছে কি না, হবে কি না সে সম্পর্কে তাদের ভাবনা কত নাদান সে খবর রাখতে চায়নি। প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের নির্যাতন কম হয় নাই, ৮০০-৯০০ এর মত বিপ্লবী মারা গেছে এই ১৮ মাসে, ফলে অনুমান করে নেয়া যায় নিহতের সাথে আহত পঙ্গু হয়ে যাবার সংখ্যাটাও অনুপাতে কত হতে পারে এবং যারা নির্যাতনে ট্রমাটাইজ মানসিক বিকলাঙ্গ সদমা নিয়ে আছেন হয়েছেন এই সংখ্যাটাও। ফলে পুরা সমাজে উথাল পাথাল করা ১৮ মাসের এই আন্দোলন সংগ্রাম মানে সামাজিকভাবে গণ-মনকে ঝাকুনি দেয়ার ঘটনা এটা। এতেও ঝাকুনি খায়নি বাইরে রয়ে গেছে  এমন লোকজন সমাজে খুব কমই অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি নির্যাতন হত-নিহত হওয়া আর সবার উপরে সামাজিক ঝড়ের প্রভাব আন্দোলিত হয়ে যাওয়া এর সব শর্তই এখানে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এত কিছুর পরও সবাই টের পাচ্ছে এটা বিপ্লব হয় নাই; বিপ্লবের দেখা নাই। আর তরুণেরা সেটা টের পাচ্ছে এখন। এখানে তরুণ বলতে সবাই, এককথায় সামরিক কাউন্সিল SCAF বাদে রাজনৈতিক কমিউনিটি, সমাজের সব অংশে সব দল মতের সব জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বুঝিয়েছি। বিপ্লব যে ঘটেনি এটা আমি এখানে বলছি বলে না, ইজিপ্টের সবার মুখে আর মনের অনুভবের কথা, কারও বুঝতে বাকি নাই। সারা রাজনৈতিক কমিউনিটি হতাশ শুধু নয়,  নতুন করে সমাগত নির্যাতন নিপীড়নের দিন আবার ফিরে আসছে এটা ভেবে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেটা সবার আগে ঘটে রাজনৈতিক পাড়ায় পরস্পরকে ব্যর্থতায় দোষারোপ করা, বিভক্তি বড় হওয়া, যা আগেও ছিল এখন তা আরও বড় হতেও শুরু করেছে।

তাহলে মূল কথাটা, ব্যাপারটা কি এই যে, বুঝব কি করে ঘটনা বিপ্লবের দিকে হাটছে নাকি উদারবাদী রাজনীতির দিকে যাচ্ছে—এটা কেবল ঘটনা ঘটার শেষে  কি দাড়ালো সেটা দেখার পরে জানতে পারা ছাড়া আগাম বুঝবার কোন উপায়  নাই যে বিপ্লব হচ্ছে কি না? বিপ্লব কী আগে বুঝার কোন উপায় আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু কি সেটা? লেনিন সাহেব বলেছিলেন, বিপ্লব করা নাকি একটা আর্ট। এবং অভুত্থান নাকি উপযুক্ত দিন তারিখের আগেও করা যায় না পরেও না। আরও এগিয়ে বলা কথাও আছে। পুরান রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ভেঙ্গে না পরে তাহলে বুঝতে হবে বিপ্লব হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক অনেক কথাবার্তা। তবু আমি সেদিকে যাব না, কোন চর্বিত চর্বন বা আপ্তকথা আউড়াব না, সেসব আশ্রয় করে আমার কথা সাজাব না। কিছু খাস কথা খাসভাবে বলার চেষ্টা করব।

 

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

গৌতম দাস || Sunday 01 July 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tF

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা দ্বিতীয় পর্ব।]

 

আগের পর্বে বলেছিলাম, গণ-আন্দোলনের চাপে মোবারকের সরে যাওয়ার পর ট্রানজিশনাল বা অন্তর্বতীকালিন সরকার কে হচ্ছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বতীকালিন সরকার হিসাবে যা তৈরি হবে তা গঠন করার সময় ও পরে এর উপর রাস্তার আন্দোলনের যদি একক কোন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বই না থাকে তবে বুঝতে হবে গণ-আন্দোলন একটা গর্ভস্রাবে পরিণত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বতীকালিন সরকারে কে থাকবে, কারা সদস্য হবে তা নিয়ে গণ-আন্দোলনের কাউকেই প্রকাশ্যে বা ড্রয়িং রুমে ডেকেও মতামত চাওয়া হয় নাই। অন্তর্বতীকালিন সরকার কিভাবে হচ্ছে সেই পুরা ব্যাপারটাই ঘটেছে, বলা ভাল ঘটতে সক্ষম হয়েছে মোবারক ও সামরিক কাউন্সিলের কর্তৃত্বে, নিয়ন্ত্রণে। মাঠের আন্দোলনের নেতাদেরকে গোনায়ও ধরা হয় নাই। আর একভাবে বলা যায় তাদেরকে গণায় ধরতে বাধ্য করা যায় মাঠের আন্দোলন নিজেকে সে তীব্রতায় এবং উচ্চতায় নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে সামরিক কাউন্সিলের পক্ষে কেবল মোবারককে সরিয়ে দিয়ে পুরা ক্ষমতা ও ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলো (সামরিক কাউন্সিল SCAF আর এর দুই সহযোগী—আদালত কেন্দ্রিক সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আর এরই বর্ধিত রূপ সুপ্রীম ইলেকশান কাউন্সিল) ঠিক যেমন ছিল সেভাবে অটুট রেখে নতুন করে পুরানা ক্ষমতাটাই আবার সাজিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছিল। পুরান ক্ষমতা অথবা এর নব উত্থানকে দমন করে এর উপর গণ-আন্দোলন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিবে এমন কোন কাজ, ইচ্ছা, আলামত কিছুই ঘটতে দেখা যায় নাই। কেবল মোবারকের সরে যাওয়া—এই দাবি আদায়ের খুশিতে জনগণকে মাতোয়ারা রাখার কাজেই গণ-আন্দোলনের শক্তিকে সীমিত রাখা হয়েছিল। গণ-আন্দোলন কেবল একটাই প্রতীকী কাজ করেছিল—মোবারকের রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সদর দপ্তর জ্বালিয়ে দেয়া। জনগণের এই ক্ষোভের প্রতিকী অর্থ হলো, কেবল একটা শত্রুকে চিনানো তা হলো, মোবারকের ছেলে গামালকে কেন্দ্র করে মোবারকের বউয়ের যে খায়েস, যে ছোট ছেলেকে প্রেসিডেন্ট বানাবে, সেই ইচ্ছার সম্ভাবনা চিরতরে নাকচ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই ইচ্ছা কেবল গণ-আন্দোলনের নয় এটা সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ইচ্ছা ও স্বার্থ ছিল। ফলে সহজেই ঘটানো গিয়েছিল। ফলাফলে পুলিশ বাহিনী প্রত্যাহার করে ট্যাঙ্কে চড়ে সামরিক বাহিনী শহরের দখল নিয়েছিল। আর রাস্তার জনগণ তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। এর অর্থ হলো গণ-আন্দোলনের কাঁধে সওয়ার হয়ে সামরিক কাউন্সিল SCAF নিজের খায়েস পূরণ করে নেয়া । এই অর্থে তথাকথিত বিপ্লবে সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ভাগীদারী প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পেরেছিল

ক্ষমতা হস্তান্তরের আইনী বা লিগ্যাল দিক বিবেচনা করলে, মোবারকের কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের অপারগতায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা ভাইস-প্রেসিডেন্টের হাতে, তিনিই একটিং প্রেসিডেন্ট হবেন এবং মোবারকের মতই তার সব ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। কিন্তু মোবারক কোনভাবেই কোন সামরিক কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা দিয়ে যেতে পারেন না। কনষ্টিটিশন তাকে সে ক্ষমতা ও এক্তিয়ার দেয় নাই। এটা হলো পুরানা কনষ্টিটিউশনের দিক থেকে ক্ষমতাকে বুঝা ও বিচারের মানদণ্ড, বলবৎ আইনী সীমার মধ্যে থাকছে কিনা তা বুঝার কষ্টিপাথর। কিন্তু কোন গণ-আন্দোলনের বিপ্লব হিসাবে নতুন স্তরে (গণ-আন্দোলন উদারবাদী সীমায় থাকবে না বিপ্লবী র্যা ডিক্যাল হবে তাঁর প্রথম পরীক্ষা এটা ) আবির্ভাবের ন্যূনতম শর্ত হলো, নিজেই নিজেকে নতুন ক্ষমতা হিসাবে হাজির করা, কোন পুরান কনষ্টিটিউশন থেকে তাঁর ক্ষমতা উৎসারিত হচ্ছে এমন কোন ধারণা তৈরি হতে দেয়া বা ভুলে তা মেনে নেওয়া মানেই গণ-আন্দোলনের বিপ্লবী সম্ভাবনার ইতি টেনে দেয়া। ক্ষমতা থেকে বা আয়ত্বে থাকলে কনষ্টিটিশনের জন্ম দেয়া যায় কিন্তু কোন তৈরি কনষ্টিটিশন থেকে ক্ষমতা ডিরাইভ করা যায় না, উৎস মনে করে ভুল করা যায় না, পাওয়া যায় না। ক্ষমতা বিষয়ক এই মৌলিক ধারণা হাতের কড়ায় গুনে সবসময় নিজের কাছে পরিস্কার রাখতে হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি, মোবারক জেনারেল সোলায়মানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা দিলেন বটে কিন্তু সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স বা SCAF বলে কিছু একটা খাড়া হয়ে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের সব ক্ষমতা নিয়ে জেঁকে বসে গেল। গণ-আন্দোলন নিজেই নিজেকে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বলে দাবি করার বদলে হয়ে গেল SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিয়ে নেয়া; আবার এটা অবশ্যই এক নতুন ক্ষমতা কারণ কার্যত সে আর পুরানা কনষ্টিটিউশন মেনে নিজেকে তৈরি করে নাই, নিজেই নিজেকে ক্ষমতা বলে দাবি করেছে। এটাই হলো তামাশার দিক। গণ-আন্দোলনের সম্ভাব্য ক্ষমতাটা ছিনতাই হয়ে যাওয়া। SCAF যে ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা দখলে নিল এটা তাঁর নিজের তৈরি না, ছিনতাই করে নেয়া ক্ষমতা, এটা SCAF-এর অজানা নয়। এর প্রমাণ হলো, টিভিতে ক্যামেরার সামনে মানে দেশবাসীর সামনে জেনারেল সোলায়মান একেবারে সামরিক কায়দায় তাহরির স্কয়ারকে বিশাল এক স্যালুট ঠুকে বিপ্লব বিপ্লব বলে চিৎকার শুরু করে দিতে দেখলাম আমরা। কারণ তারা বুঝে তাহরির স্কয়ারের কারণেই SCAF নামে তারা ক্ষমতায়। তারাই তাহরির স্কয়ারের (চোরাই করে আনা) ক্ষমতা। এটা SCAF-এর পক্ষে ক্ষমতা ছিনতাই করে আনার এক বিপ্লবই বটে। SCAF-এর ক্ষমতার ভিত্তি কোন পুরানা কনষ্টিটিউশন না, চুরি করে আনা ক্ষমতাটাই তাঁর ভিত্তি। আর নতুন ক্ষমতা তো কনষ্টিটিউশন থেকে আসে না, আসার কথাও না।

আমার এই লেখা পড়ে যারা ব্রাদারহুডের রাজনীতি ভালবাসেন তারা ফ্যাকচুয়াল যুক্তি তুলতে পারেন যে ব্রাদারহুড তো আন্দোলনের শুরু থেকে শামিল ছিল না। তারা বড়জোর বাইরে থেকে ধাত্রির ভূমিকায় ছিল যেন গন-আন্দোলনটা (বিপ্লব?) প্রসব করে, তারা আন্দোলনের আহতদের মেডিক্যাল সেবা বা খাবারদাবার সরবরাহের ভূমিকা নিয়েছিল, মোবারকের এনডিপি সদর দপ্তরে আগুন দিয়ে এটাকে গণক্ষোভের প্রতীকে প্রতিষ্ঠার কাজটা করেছিল, ঘোড়া উটে বা উটের গাড়ি চড়ে এনডিপি-সামরিক মদদে গুন্ডারা তাহরির স্কয়ারের জমায়েতের উপর দিয়ে বিপ্লব মাড়িয়ে দাবড়ানোর যে গুন্ডামী করতে এসেছিল তা প্রতিরোধের সময় ব্রাদারহুড নির্ধারক ভূমিকায় প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করেছিল। এছাড়া আর একটা যুক্তি তাদের হতে পারে, যে মোবারকের পতনের পর নির্বাচন দেবার ব্যাপারে ব্রাদারহুডের বাইরে আন্দোলনে যে সব রাজনৈতিক ধারা আছে [সেকুলার কমিউনিষ্ট ও আমেরিকার ফ্রিডম হাউস জাতীয় এনজিও এর উৎসাহ প্রভাবের লিবার্টির শ্লোগান দেয়া তরুণেরা, যেমন সিক্সথ এপ্রিল গ্রুপ ইত্যাদি; এছাড়া সাধারণ জনগণ] তাদের চাপেই SCAF ট্রানজিশনাল ক্ষমতা তৈরি করে জেঁকে বসার পরপরই নির্বাচন দাবি করা যায় নাই। তাদের ধারণা ছিল যত দ্রুত নির্বাচন হবে ততই ব্রাদারহুডের (আগে থেকেই সংগঠিত সংগঠন হয়ে থেকেছে বলে) জিতে আসার সম্ভবনা।

এই যুক্তির অসার দিকটা হলো, এটা ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা কে কিভাবে তৈরি করছে এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা নজর করতে অক্ষম, এটা কোন বিষয়ই না এদের কাছে; বিষয় হলো মোবারকের সরে যাওয়া মানে একটা নির্বাচন আর নির্বাচন হলেই সেটা মোবারক বা SCAF-এর বিরুদ্ধে ও বাইরে একটা ক্ষমতা তৈরি করবে। এটাই ব্রাদারহুড এর দৃষ্টিতে ক্ষমতা পাবার ধারণা, ক্ষমতা ধারণা। ফলে ট্রানজিশনাল সময়ে ক্ষমতাটা কে নিচ্ছে কার হাতে যাচ্ছে তাতে কিছুই যায় আসে না। ক্ষমতা ধারণার কোন ন্যূনতম বুঝ না থাকার জন্য নির্বাচনে দেরি করিয়ে দেওয়াটাকে ক্ষমতা না পাওয়া, ক্ষমতা পেতে দেরি হওয়ার কারণ বলে মনে করছে।

উপরে আমি বারবার জোর দিয়েছি কেন ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, তার উপর। কারণ এই নতুন ক্ষমতাটাই ঘটনা পরবর্তী সমস্ত ঘটনার গতি, অভিমুখ ঠিক করে দিবে। এটা স্রেফ এক নতুন ক্ষমতা নয়, এটা আসলে সব ঘটনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ইজিপ্টে আজ পর্যন্ত এটা তাই ঘটিয়েছে। SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হওয়াটাই আজ পর্যন্ত সব ঘটনা আর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। এমনকি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কেউ হয়ে আসলেও সে ক্ষমতা নাও পেতে পারে, নির্বাচিত পার্লামেন্ট হলেও সে পার্লামেন্ট এক ঘোষণা দিয়ে তুড়ি মেরে অবৈধ বাতিল বলে দিতে পারে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কি হবে তা সে ঠিক করে দিতে পারে, প্রেসিডেন্ট নিজে সরকার গঠন—মন্ত্রীসভা গঠন করার আগেই SCAF নিজেকে নিজেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলে ঘোষণা দিতে পারে ইত্যাদি। এককথায় প্রেসিডেন্ট বা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতার যে প্রাতিষ্ঠানিকতা তৈরি হবে সেটা SCAF ক্ষমতার অধীনস্ততা মেনেই ডিকটেশনে কেবল একটা সীমিত ক্ষমতা চর্চা করতে পারবে।

কথাগুলো সোজা-সিদা করে বললে, ক্ষমতা কি জিনিষ, এর কোন ধারণার বালাই এদের নাই। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টাকেই বুঝতে পারেনি। আর তৃতীয়ত, ধরে নিয়েছে নির্বাচনের মাধম্যে ক্ষমতা পাওয়া যায়।

নির্বাচন ক্ষমতা তৈরি করে না। বরং নির্বাচনেরও আগে নির্বাচন আহবান করার মুরোদ—এটাই ক্ষমতা; [আলোচ্য ক্ষেত্রে SCAF যেটা আগেই হাসিল করে নিয়েছে।] গণ-অভ্যুত্থান বিপ্লবী এই ক্ষমতার উৎস, সেটাই ট্রানজিশনাল বা সাময়িক ক্ষমতা। সাময়িক কেন? এরপর নির্বাচন ইত্যাদিতে যেটা তৈরি হয় সেটা হলো এই ক্ষমতা কি করে বাস্তবে পরবর্তীকালে ব্যবহার করা হবে, বাইরের কেউ নয় বিপ্লবের ভিতরকার কেউঁ প্রতিনিধি হয়ে কেবল ঐ ক্ষমতা সবার পক্ষ থেকে প্রয়োগ করবে এরই নিয়ম, আইন কানুন ইত্যাদির জন্য প্রতিনিধি কে হবে তারই নির্বাচন। নির্বাচন নিজে ক্ষমতার উৎস নয়, ক্ষমতা সে জন্ম দিতে পারে না। ক্ষমতা থাকলে, অর্জিত হলে, নিয়ন্ত্রণে আসলে তবে নির্বাচন আয়োজন বা আহবান করা যায়। অর্জিত ক্ষমতা কি করে ব্যবহার প্রয়োগ করা হবে এরই নির্বাচন। ক্ষমতা এক্সারসাইজের পথে [প্রতিনিধি] নির্বাচন এক উপায় মাত্র, নির্বাচন নিজে ক্ষমতা নয়।

এই লেখা শুরু করেছিলাম এই প্রশ্ন রেখে যে কি করে বুঝা যাবে ঘটমান বিপ্লবের অভিমুখ ঠিক আছে কিনা? গণ-আন্দোলন যদি নিজেই ঐ দেশ বা রাষ্ট্রের প্রচলিত সব ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেকে একমাত্র প্রাধান্য বিস্তারি ক্ষমতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, পুরানা সব ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানকে সবাইকে অধীনস্ত হতে বাধ্য করতে পারে তবে বুঝতে হবে অন্তত অভিমুখ ঠিক আছে। কিন্তু আর এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আছে, কাঠামোর দিক থেকে পুরানা ক্ষমতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে কারণে দাড়িয়েছিল, ফাংশনাল থাকতে পেরেছিল [ সামরিক, আদালত, সংসদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে] সেগুলো ভেঙ্গে দিতে হবে। এই ভেঙ্গে দেয়া মানে ব্যক্তিগতভাবে তাদের হত্যা করা একেবারেই নয়। প্রথম কথা, আগের মত করে নির্বাহী রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে আর ফাংশনাল থাকা নয়, তাঁরা তখন থেকে নতুন মাঠের ক্ষমতা [তাহরির স্কয়ার] কাছে আনুগত্য প্রকাশ করবে এবং সীমিতভাবে সাময়িক কাজ চালিয়ে যাবার মত ফাংশনাল থাকবে কিন্তু মাঠের নতুন ক্ষমতার ইচ্ছা সাপেক্ষে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পুরান ক্ষমতার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান পুরানা কনষ্টিটিউশন ভেঙ্গে দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে দিতে হবে। এতে মাঠের নতুন ক্ষমতা যেটাকে বলছি এটাই ট্রানজিশনাল ক্ষমতা। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিজে ঘোষণায় কনষ্টিটিউশন সহ পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠাঙ্গুলোকে নিজের আনুগত্যে নিতে পারতে হবে। তবেই জেনারেল সোলায়মান বা SCAF এর স্যলুট ঠুকে দেওয়াটা মিনিংফুল হবে। কিন্তু ইজিপ্টের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে মাঠের ক্ষমতা হাইজাক করে SCAF নামে নিজেই নিজে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েম করে ফেলেছে। ফলে স্যালুট নিজেই নিজেকে করেছে, ওর সাথে জনগণের কোন সম্পর্কই আর নাই।

মোরসির প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবার সময়ে প্রধান বিচারপতি শপথ পড়ানোর আগের উদ্বোধনী বক্তৃতায় একটা মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, “এই অনুষ্ঠিতব্য শপথের পর থেকে ইজিপ্ট এক দ্বিতীয় রিপাবলিক হিসাবে জন্ম নিতে যাচ্ছে”। রাষ্ট্রতত্ত্বের দিক থেকে এটা একটা খুবই সঠিক উচ্চারণ। তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন একই ইজিপ্ট দেশ, নতুন করে এক রাষ্ট্রে [আগের একই দেশ কিন্তু একই রাষ্ট্র নয়] নিজেকে কনষ্টিটিউট করতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের রি-কনষ্টিটিউশন মানে জনগণের নিজের নতুন শপথ নতুন করে রি-কনষ্টিটিউশন পুনর্গঠন এবং নাগরিক-জনগণের এই পুনর্গঠিত হওয়া মানে রাষ্ট্রে পুনর্গঠিত হওয়া – একই কথা। এই হলো মোরসির শপথ কথার তাৎপর্য। কিন্তু এত তাত্ত্বিক তাৎপর্য থাকা এবং এর প্রকাশ্য উচ্চারণ সত্ত্বেও এটা একটা তামাশার বেশি কিছু নয়। কারণ, ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট যারা শপথ পড়াতে এসেছেন তারা কারা? মোরসি যদি নতুন রিপাবলিকের ক্ষমতা হয়ে থাকেন, নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হয়ে থাকেন, তাহরিরের মাঠের ক্ষমতার প্রতিনিধি হয়ে থাকেন তবে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের আনুগত্য সেই মাঠের ক্ষমতা, জনগণের ক্ষমতার কাছে নেই কেন? কেন তাঁর আনুগত্যের উৎস SCAF? SCAF-এর ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে তিনি তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টে হয়ে হাজির আছেন, শপথ পড়াতে এসেছেন। তাদের তাহরির মাঠের ক্ষমতার প্রতি কোন আনুগত্য নাই। ফলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথা উচ্চারণের আগে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট প্রধান বিচারকের নিজের আনুগত্য কোথায় সেই প্রশ্ন নিজেকে নিজে করতে হত। SCAF-এর আনুগত্য মেনে কোন বিচারক সেকেন্ড রিপাবলিক বলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথায় নিজের জনগণের সাথে ঐতিহাসিক গাদ্দারি ঢাকা দিতে পারবেন না। তাই এই তামাশার নাটক আমরা ওখানে মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। এই পর্যায়ে এসে মোরসি বেচারা আসলে, ঘ্যাতঘোত করতে পারেন কিন্তু এর বাইরে কিছুই করার আর অবশিষ্ট তিনি নিজেই রাখেননি। কারণ তিনি আগেই জনগণের ক্ষমতা, ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAF-এর হাতে তুলে দিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন। তিনি একমাত্র SCAF অনুগ্রহেই প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, এটা বহু আগেই মেনে নেয়া হয়ে আছে।

সে কথা থেকে শুরু করেছিলাম, ব্রাদারহুডের যুক্তি যে SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পর বাম সেকুলারদের কারণে নির্বাচনটা তাড়াতাড়ি হতে পারে নাই, ফলে আজ মোরসির এই দুর্গতির কারণ সেটা। উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম সমস্যাটা নির্বাচন কত আগে ডাকা হবে তাতে কিছুই আসে যায় না, এমনকি SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পরেরদিন কোন নির্বাচন হলেও ওর পরিণতি আজকের মতই হত, বাস্তবতা থেকে আমাদের কারোই পালানোর কোন পথ নাই। মূল ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAFকে দিয়ে দেয়া বা মেনে নেবার পর পরবর্তী সব অভিমুখ গতিপথ নির্ধারিত হয়ে গেছে ওখানেই। সারকথায় নির্বাচন কবে এটা বিষয়ই নয়, বিষয় হলো ক্ষমতা, ক্ষমতা কি তা আঙুলে গুণে বুঝা, মনে রাখা—এই কাজে অযোগ্যতা ব্যর্থতা। যেটা ব্রাদারহুড শুধু নয় ওর বাইরের সব রাজনৈতিক শক্তিরও অযোগ্যতা, ব্যর্থতা।

আমি বহু লেখায় এই দিকটা নিয়ে কথা তুলেছি যে ইসলামি রাজনীতি যেটা জাগছে এদের রাষ্ট্র ধারণা ও ক্ষমতা ধারণা নিয়ে চিন্তা ভাবনা হোম-ওয়ার্ক একেবারেই অপরিণত। সবটাই ষ্টেজে দেখা যাবে, উপস্থিত সময় কিছু একটা করে ফেলা যাবে ধরনের। আবার অনেকের ধারণা রাষ্ট্র ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে। ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাধারণভাবে ইসলামি রাজনীতি বড় জোর একটা খেলাফত রাষ্ট্র করব [যেটা আসলে বৃটিশ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের মত কলোনী মাষ্টারীর সাথে বেশি খাপ খায় ধরনের অটোমান সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের এক ভাসাভাসা ধারণার বাইরে গিয়ে কিছু বুঝায় কিনা সেটা স্পষ্ট করতে পারে না] ধরনের এক স্বপ্ন কাজ করে। এমনকি ঐ যুগে সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র জন্ম ও টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত ছিল অন্য অনেক দেশকে ঐ সাম্রাজ্যের অধীনে কলোনী হয়ে থাকতে হবে। অর্থাৎ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র নিজেই নিজ ক্ষমতায়, নিজ জনগণের এবং নিজ রাষ্ট্র সীমানার কোন রাষ্ট্র না। অন্য দেশ দখল ও তাদেরকে কলোনী বানিয়ে রাখা সাপেক্ষে একটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র এ যুগে আবার বাস্তবে কায়েম সম্ভব। তাঁর মানে কি ইসলামের নামে মুসলমান জনগোষ্ঠির দেশগুলো ইসলামি রাজনীতিতে কোন একটা রাষ্ট্রের সবাই কলোনী হয়ে যাবে? খুব জোরালো না হলেও এক খলিফার নেতৃত্বে [ইসলামি রাজনীতিতে এটাকে গাইডেন্স বলা হয়] খেলাফত কায়েমের ভাসাভাসা স্বপ্নটা এরকম বলেই আমার ধারণা হয়েছে। এসব দেখে পঞ্চাশের দশকে কমিউনিজমের শ্লোগানের আড়ালে দলে দলে সদ্য কলোনীমুক্ত দেশগুলোর সোভিয়েত ব্লকের সদস্য হয়ে যাওয়া আমরা দেখেছি সেই মিলের দিকটা মনে পড়ে যায়। আজ ইসলামি রাজনীতিতে যে সঙ্কট, রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তায় সঙ্কট সেই একই ঘাটতি কাজ করেছিল সদ্য কলোনীমুক্ত কমিউনিষ্ট প্রীতির ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির দেশগুলোতে। রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তার হোম-ওয়ার্ক কেউ করতে চায়নি। প্রায় সবাই যেটা মনে করেছিল, রাষ্ট্রভাবনা? সেটা আবার কি? এসব বুর্জোয়াদের গরীবদের দমিয়ে রাখার চাতুরি ব্যাপার স্যাপার। [তুলনায় ইসলামি রাজনীতিতে একই কথা তবে ভিন্ন ভাষায়, “রাষ্ট্র বা ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে; ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়” ধরনের।] কমিউনিষ্টরা ভেবেছিল, “পুজিবাদ বা ধনিক শ্রেণী” কে মুছে ফেলতে পারলেই মোক্ষ লাভ হবে। আর এর পরিণতি হয়েছিল এক খোদ সোভিয়েত রাষ্ট্রকে সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা দিয়ে টিকিয়ে রাখার কাজে ওর নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ অনুযায়ী ব্লকের বাকি সব রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে, পিছনে ফেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসাবে নিজেকে নামিয়ে নেয়া। পরবর্তীতে ষাটের দশকে নয়া-চীন এটাতে বিদ্রোহ করে বসল, অভিযোগ তুলল এটা সোভিয়েত রাষ্ট্রের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” হয়ে যাওয়া। কিন্তু মজার কথা হলো, আবার সে নিজেই চীনা বলয়ের এক ব্লক তৈরি করে নিজের ব্রান্ডের কমিউনিজমের নামে একই চীনা রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষার ভূমিকায় নেমে পড়েছিল । এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ, ১৯৭১ এর বাংলাদেশের নিজ স্বার্থ এভাবেই স্থানীয় চীনা কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোর হাতে চীনা রাষ্ট্রের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে বলি হয়ে গিয়েছিল।

আমার সার কথা হলো, রাষ্ট্র ধারণা – কি রাষ্ট্র আমরা চাচ্ছি গ্লোবাল পরিস্থিতিতে সে ধারণার মানে কি দাঁড়ায় সেসব নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা হোমওয়ার্ক তত্ত্বীয় প্রস্তুতির কাজটা আমরা কেউ এড়াতে পারব না। এটা ষ্টেজে মেরে দেবার বিষয় না। ফলে ইসলামি রাজনীতিও কি একই “কমিউনিষ্ট” অভিজ্ঞতা ও পরিণতি নিতে যাচ্ছে? ইজিপ্টের পরিস্থিতি পরিণতি দেখে, ব্রাদারহুডের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বুঝবার অপরিণত রাজনীতি দেখে এই আশঙ্কা আমি দেখি। এমনিতেই ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে এক অমীমাংসিত বিতর্ক আছে যে, কোন মুসলমান রাষ্ট্রের [রুলার বা শাসক অর্থে] আনুগত্য করতে পারে কি না? সংক্ষেপে একে “আনুগত্য বিতর্ক” নামে ডাকতে পারি। এটুকু বুঝি, যুগের পর যুগ ব্যাপারটাকে অমীমাংসিত করে ফেলে রাখতে পারি না। এটা আত্মঘাতি। তাই তর্ক-বিতর্ক উস্কে দেবার জন্য আমি মোরসির একটা বক্তৃতা যেটা গত শুক্রবার তাঁর শপথ নেবার আগের দিন তাহরির স্কয়ারের জমায়েতে তিনি দিয়েছিলেন সেটা সামনে আনতে চাই। এই বক্তৃতার গুরুত্ব অনুভব করে ফেসবুকে আমি এর ভিডিও লিঙ্ক দিয়েছি। যাতে বডি ল্যাঙ্গুয়েজসহ তা বুঝা যায়। আগ্রহীরা তা দেখতে পারেন। ওর সারকথা হলো,

In the context before sworn in as Egypt’s president Mohamed Morsi : “I am here because of you. No institution, no Authority none can be above this will, the will of you, your will. You are the source of power. The nation is the source of power. The nation is the one to decide, the nation is the one to give unity, nation is the one to give appoint and hire and the nation is the one to fire…….” – Historical speach in Tahrir square.

এই বক্তৃতায় মোরসি প্রতীকীভাবে তাহিরর স্কয়ার ও ঐ মাঠের জনগণকে তাঁর ক্ষমতার উৎস বলে সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি জনগণের ক্ষমতার প্রেসিডেন্ট। জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক তিনি। ফলে যে রাষ্ট্রের তিনি প্রেসিডেন্ট সেই রাষ্ট্র জনগণের নিজেরই ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা। ফলে “রাষ্ট্র মানে আনুগত্য” এই আনুগত্য কথার এক বিশেষ অর্থ তিনি দাড় করিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই। ব্যাপারটা হয়ে গেছে নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপের প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ। যেটা মুসলমান পরিচয়ে বা ইসলামের চোখে অসঙ্গতির নয় এমন একটা মানে করা যায়। ফলে আনুগত্য বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান মোরসি নিজে এবং তাঁর মুসলমান জনগণের সম্পর্ক আর এর ভিতর দিয়ে নিজেকে, নিজের ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করার উপায় বের করতে হয়েছে তাঁকে; বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান, পথের ইঙ্গিত এখানে এসেছে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা কি মোরসির কৌশলী কথা, নাকি ক্ষমতা রাষ্ট্র আনুগত্য প্রসঙ্গে তাঁর নীতিগত অবস্থান? আবার এই অবস্থান কি কেবল তাঁর নিজের? ব্যক্তিগত ও প্রেসিডেন্ট হিসাবে, বিশেষ পরিস্থিতি SCAF-এর অধীনের প্রেসিডেন্ট তিনি তাই? এর সাথে পার্টি ব্রাদারহুড এই অবস্থান নিজেরও বলে স্বীকার করে কি না? এসব বহু প্রশ্নের জবাব কি তা আমরা এখনও জানি না।

রাষ্ট্র ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে ইসলামি রাজনীতির সঙ্কট নিয়ে মূল কথা আপাতত এতটুকুই। তবে একটা সহযোগী প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হলো, ব্রাদারহুডের SCAF-এর হাতে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া ও মেনে নেওয়া – এই ব্যাপারটা কি শ্রেফ রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা না বুঝা হোমওয়ার্ক না করার থেকে জন্ম নেয়া? আমার জবাব হবে, না; অন্য আরও বড় কারণ আছে। সেদিকটা এখানে এখনও আনিনি। সেটা গ্লোবাল দিক বা ফ্যাক্টর। সেটা আমরা খুজে পাব, আমেরিকান চলতি ষ্ট্রাটেজিক ও বৈদেশিক নীতি, ইসলাম ইস্যুটাকে নিজের নিরাপত্তার ইস্যু হিসাবে মনে করা (আগের বুশের আমল থেকে চলে আসা ওয়ার অন টেররের সেকুলারিজমের আড়ালে দুনিয়াকে নিজের পক্ষে নিয়ে নিজ রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় করে নেবার লাইন – যেটা ছিল এর বিপরীত লাইন) সেই সুত্রে RAND এর ইসলামি প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম প্রসঙ্গের ভিতরে। এনিয়ে আলাপ করতে করতে পরের পর্ব শুরু করার ইচ্ছা রাখি।

 

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

গৌতম দাস
১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০০:২১

https://wp.me/p1sCvy-2oW

 

অবশেষে এখন এ’কথা বলা যায় যে, নেপাল এখন নিজ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কায়েম করতে পেরেছে এবং তা এগিয়ে যেতে পারবে। নেপালের প্রধান তিন দলের মধ্যকার দুটোই কমিউনিস্ট পার্টি। দুই কমিউনিস্ট পার্টি এবারের নির্বাচনে এক কমিউনিস্ট  জোট (‘লেফট অ্যালায়েন্স’) গড়ে নির্বাচনে লড়ে জিতেছে। অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় এক কমিউনিস্ট, মাওবাদী দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছিলেন, এই অ্যালায়েন্স তাঁরা করছেন নেপালের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য, স্থিতিশীল সরকার দেয়ার জন্য [grand Left alliance will “end Nepal’s elongated political instability” ]। নেপাল গত ৯ বছরে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে গেছে। এখন দাহালের আকাঙ্খা ও অনুমান সঠিক প্রমাণ হল। নেপালের এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স সংসদে ৭১ শতাংশের মতো আসন লাভ করেছে।

গত ১৯৯৬ সাল থেকে যদি ধরি, সশস্ত্র রাজনৈতিক লাইনে চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহালের ‘মাওবাদী সেন্টার’ দল অথবা CPN (Maoist Centre)  প্রথম যখন রাজতন্ত্র উৎখাত ও ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিল। সেই থেকে হিসাব কষতে বসলে গত ২০ বছরের বেশি সময়, এটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই নেপালের জনগণের এক বিরাট লম্বা পথপরিক্রমা। আর কে না জানে লক্ষ্যে পৌঁছানোতে পথ যত লম্বা হয়ে যায়, ততই সেখানে আরো বেশি অনিশ্চয়তা হাজির হয়ে যায়, আর তা বিপজ্জনক হয়। তবুও আজ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে এক কথায় বললে নেপালের সাফল্য অনেক। আর এতে অন্তত তিনটি বড় অর্জন আছে।

এক. শত বছরেরও বেশি পুরনো নেপালি রাজতন্ত্রের শাসনকে উৎখাত ও অবসান ঘটানো। দুই. দুইবারের চেষ্টায় অনিশ্চয়তার সাত বছরের শেষে নেপালকে সর্বপ্রথম একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ রাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে রিপাবলিক বা লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সফল হয়। কনস্টিটিউশন রচনার কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করা এবং এই কাজ শেষে প্রথম কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন – ২০১৫ ঘোষণা দিতে নেপাল সফল হয়। আর তিন. নতুন কনস্টিটিউশনের অধীনে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ভোটের ফলাফলে নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কিছু কম (গণনার প্রাথমিক পর্যায়ের ১৬৫ আসনের মধ্যে ৮০ আসন) পেয়েছে। এই দল হল, চেয়ারম্যান খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির কমিউনিস্ট পার্টি (CPN-UML)  । আর এরা অপর কমিউনিস্ট ‘মাওবাদী সেন্টার’ দলের সাথে মিলে প্রায় ৭১ শতাংশ আসন পেয়েছে। অর্থাৎ এই তৃতীয় অর্জন সম্পর্কে বলা যায়, এখন সহজেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির নেতৃত্বে নেপাল এক নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।

প্রায় ২০ বছর পরের নেপাল এই প্রথম স্থিতিশীলভাবেই পূর্ণ সময়কালের সরকার কায়েম করতে পারবে, আর সেই সরকার দৃঢ়তার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর পিছনের প্রধান কারণ হল, অপর কমিউনিস্ট পার্টি  ‘মাওবাদী সেন্টার’-এর সাথে ইতোমধ্যে গত অক্টোবরে এরা যে জোটটা গঠন করেছে, সেটা শুধু কোনো নির্বাচনী জোট নয়,  বরং একটা এক দলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটা জোট। [The two parties also said they would work for their formal merger……]।   ফলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি মিটানো নয়, সরকারের নানান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতের অমিলগুলো সামলে এক সিদ্ধান্ত পৌছানোর সুযোগ এখানে বেশি থাকবে। এই নির্বাচনে মাওবাদীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল (১৬৫ আসনের মধ্যে ৩৬ আসন), আর তৃতীয় নেপালি কংগ্রেস (১৬৫ আসনের মধ্যে ২৩ আসন)। তবে নতুন গঠিত এই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্সে আরো একটা দল আছে। সেটা বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি পার্টি, এই দলের একা তিনি জিতেছেন। তিনি আসলে ছিলেন মাওবাদী দলের সাবেক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর ২০১১ সালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন, পরে দল ছেড়ে বের হয়ে যান। এখন জোটে ফিরে আসলেন। প্রথম কনষ্টিটিউশন গঠনকালীন সরকারের (২০০৮-২০১১) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠন করে ছিল মাওবাদীরা। ফলে ঐ সময়ে ভারতের সাথে স্বার্থ বিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া ও চাপ সামলানোর বিপদের ঝড়ঝাপ্টা গুলো সবচেয়ে তাদের উপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়দের চাপের মুখে তা মোকাবিলা করতে গিয়ে বাবুরাম  “ভারতীয়দের সাথে পারা যাবে না” ফলে “নরম পথে আগাতে হবে” ধরণের অবস্থানের কারণে দাহালের সাথে বিরোধে, শেষে দল থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে যান। পরে আলাদা দল করেন, তিনি এবার জোটে ফিরে এসেছেন। তাহলে অল্পকথায় তিনটি গুরুত্বপুর্ণ অর্জন হলঃ রাজতন্ত্রের উৎখাত, নতুন লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা আর শেষে এক স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার গঠন পথে এসে পৌছানো।

নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট – ফেডারল (কেন্দ্র), প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার – এভাবে এবং এভাবেই নতুন কনস্টিটিউশন অনুসারে গঠিত। বিশেষ দিকটা হল, তিন স্তরের নির্বাচন এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক বিরাট সাফল্য। কারণ গত বছরের এই সময়েও নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এত চরম অবস্থায় ছিল যে, এক বছর পরে সরকারের আয়ু শেষ হবার পরে এই সময়ে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অর্জন আজ এই উচ্চতায় উঠবে তা তখন বিশ্বাস করা যেত না।

আচ্ছা, গত ২০ বছরের পথপরিক্রমায় কারা নেপালের গণস্বার্থের দিক থেকে বিচারে এর রাজনীতিক-ভিলেন ছিল? এই প্রশ্নের জবাব হবে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বভাবতই সেই ভিলেন, তিনি ছিলেন নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তবে এরপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে  পাল্টা মাওবাদীসহ নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধা ও এর উপরে ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আনা ইত্যাদি – এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় নির্ধারক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল ভারত। হ্যা, ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলে কনস্টিটিউশন গঠনের কাল থেকে ক্রমেই ভারত নেতিবাচক বিরাট ভিলেনের ভূমিকায় হাজির হতে থাকে। সেই থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে এক ভিলেন হয়ে আছে ভারত। গানের ভাষায় বললে- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। ভারত চাইতেই জানে না। নেপালের কাছে ‘কিভাবে’ আর ‘কী’ চাইতে হয় – কী চাওয়া যায় না – তা জানে না। নেহরুর হাতে ভিত্তি পাওয়া ও গড়া স্বাধীন ভারত, আর এ থেকে সবচেয়ে বাজে ও ভুল শিক্ষা পাওয়া আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভারত, এরাই মূলত সেই ভিলেন। নেহরু ভেবেছিলেন কলোনি-উত্তর স্বাধীন ভারত, একালে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া সুবিধাগুলো তিনি ব্রিটিশদের মতই নিজেও ব্যবহার করবেন। এটা তার প্রিরোগেটিভ (prerogative) বা পড়ে পাওয়া চারআনা বিশেষ সুবিধা, প্রাধিকার। তিনি বুঝতেই পারেননি যে, এর অর্থ হল, তাতে ভারত এক কলোনিয়াল ক্ষমতা বলে আগাম কল্পনা করে নিতে হবে বা করা হয়ে যায়। এর চেয়েও আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। তিনি সে সময়কে মানে এর তাতপর্যকেও বুঝতে পারেন নাই। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যে নতুন দুনিয়া গড়ে তোলা হচ্ছিল, সেটা আর যুদ্ধের আগের মত কলোনি-শাসিত দুনিয়া নয়, কোনো ইউরোপীয় কলোনি-শাসকের দুনিয়া নয়। বরং এক বিরাট ভিন্নতায় আমেরিকার  নেতৃত্বের এক নতুন দুনিয়া। মৌলিকভাবে এটা বরং খোদ পুরনো কলোনি-অর্থনৈতিক-সম্পর্কেরই অবসান। আর আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের-অর্থনীতিক-সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ আমেরিকার গড়ে তোলা এটা নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি সম্পর্কের দুনিয়া। যেখানে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান – ইত্যাদির মত বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিলেটারাল) প্রতিষ্ঠান এবারের নতুন দুনিয়ায় আছে।

মূল কথায় এখানে অপর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও সম্পর্ক রাখা এবং সুবিধা নেয়া ও কিছু দেয়ার তরিকাই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিনিময় সম্পর্ক আর পুরান কলোনিয়াল একেবারেই নয়, বরং আলাদা। নেহরু এর খবর নেন নাই বা রাখেননি। এ কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, নেহরুর করা ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’। যেটা আসলে এর আগে ব্রিটিশদের করা ‘নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি ১৯২৩’ এর কার্বন কপি। এই চুক্তি থেকে এটা পরিষ্কার, নেহেরু ভারতকে কলোনি-শাসকের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, দেখেছিলেন। আগে ব্রিটিশ কলোনির এক ভেসেল রাষ্ট্র বা করদরাজ্য ছিল নেপাল। ব্রিটিশদের নেপালকে সরাসরি কলোনি না করে ভেসেল রাষ্ট্র করে সুবিধা দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। পরবর্তিতে যোগ হওয়া নতুন এক কারণ হল, সিপাহী বিদ্রোহ কালে নেপালের রাজাদের বৃটিশের পক্ষে গোর্খা সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেওয়া। এই বিদ্রোহের আগে পুরো নেপাল ব্রিটিশরা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়াতে বিদ্রোহ পরাজিত করার শেষে এই ভেসেল রাষ্ট্রের জন্ম আরও পাকাপোক্ত হয়। তাই নেপাল-ব্রিটেন এর মধ্যে আগের অনেক চুক্তি ছিল, আমরা জানতে পাই। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশরা তাতে নতুন নতুন অনেক ছাড় যোগ করেছিল। এমন সর্বশেষের চুক্তিটিই হল, ১৯২৩ সালের চুক্তি। কিন্তু নেপালের ল্যান্ডলকড অবস্থার সুযোগ নিয়ে, পুরান সেই চুক্তি অনুসরণ বা অনুকরণ করে একই দাসত্ব চুক্তি করেছিল নেহরুর ‘রিপাবলিক ভারত’। ওই চুক্তিটিই এখনো বহাল আছে। প্রশ্নটা আসলে, একালে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে দাস বানানোর সুযোগ পেলেও আপনি তা নেবেন কি না? নেহরু সেটা দাবির সাথে নিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ নেহরুর মৌলিক আগাম অনুমান হল, “স্বাধীন ভারত সেটা বৃটিশ কলোনি ভারতেরই উত্তরসুরি ও ধারাবাহিকতা”। অর্থাৎ ভারত নিজে স্বাধীন তবে এটা এখন নিজেই এক কলোনি শাসক। ফলে কন্টিনিউয়েশন বা ধারাবাহিকতা।  তাই, এই কলোনি ওরিয়েন্টেশনে বা ধাঁচে নিজ নতুন আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গড়েছিলেন নেহেরু। নেহেরুর সেট করে দেওয়া ‘সেই ট্রাডিশন’ এখনও চলছে।

গত অক্টোবরে কমিউনিস্টদের লেফট অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর তাদের যৌথ নির্বাচনী ম্যানুফেস্টো প্রকাশিত হয়। জাপান থেকে প্রকাশিত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন ১ ডিসেম্বর বলছে, ঐ ম্যানুফেস্টোতে বলা হয়েছে – লেফট অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতলে পরে তাদের দ্বারা গঠিত অ্যালায়েন্স সরকার এরপর ‘ইন্ডিয়া-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি-১৯৫০’ বাতিল করবে এবং একটা নতুন চুক্তি করবে। এখন নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ওই আকাঙ্খা মত অ্যালায়েন্সের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে। ফলে এখন স্বভাবতই ঐ চুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সংঘাতে আর এক পর্ব শুরু হবে, আর এক খাতা খোলা হবে।

এই নির্বাচনের শুরু থেকে নয়াদিল্লি খুবই অস্বস্তিতে ছিল। আর ফল প্রকাশের পর সেটা আরো বেশি হয়ে এখন উলটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। এমনিতেই গত অক্টোবরে নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য নানান বিপদ আসন্ন বলে আঁচ করতে শুরু করেছিল। যেমন সুবীর ভৌমিকের নেপালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ অনলাইনে তার লেখা দিয়েছেন। সেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নেপালের নির্বাচনকে ভারতের নিজের পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত!’  তবে সুবীরের এবারের লেখাটি ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে লেখা। তাই সম্ভবত ভারতের অনেক ভুলত্রুটি এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ভারতকে আমল না করে ২০১৫ সালের অক্টোবরে নেপালের কনস্টিটিউশন ঘোষণা করে দেওয়াতে টানা ছয় মাস ল্যান্ডলক নেপালে সকল ‘পণ্য  আমদানি অবরোধ’ করে রেখেছিল নয়াদিল্লি। নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাস থেকে যানবাহনের জ্বালানিসহ সব কিছু ছয়মাস বন্ধ রাখলে গরীব মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে তা অনুমেয়। তাই বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়েছে।  প্রচ্ছন্নে সুবীরের লেখায় ভারতের সিদ্ধান্ত ভুল এটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ঐ ঘটনাই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কঠোরভাবে বিমুখ করে তোলে, যার প্রভাব এখনো প্রবল।  আর খুব সম্ভবত, এসব ভোটারদেরই নিজের ব্যাগে তুলে নিতে পেরেছে,  চরম ভারত-বিরোধিতার লাইনের চেয়ারম্যান অলির কমিউনিস্ট দল। মোট ১৬৫ এর মধ্যে ৮০ আসন – এভাবে বিপুল সংখ্যার আসন পেয়েছে এই নির্বাচনে।ওদিকে সুবীর তাঁর লেখায়, আবার শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির সাথে নয়াদিল্লি এখন নেপালকে তুলনা করে দেখছে সে খবর জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে তাদের এখনকার মূল্যায়ন নাকি – শেষ বিচারে শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অন্যান্য ইস্যুতে চীনকে আসলে ঠেকানো যায়নি। নেপালেও গেল না। তাই সুবীর যেন শিরোনামে বলছেন, হতাশ হয়েন না 

শ্রীলঙ্কার মত নেপালের বেলায় কোন সমুদ্রবন্দর নির্মাণ তার ইস্যু ছিল না। শ্রীলঙ্কার হাম্মনটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ২০১০ সালে শেষ হবার পরও তা ভারত চালু না করতে দিয়ে পাঁচ বছর আটকে রাখতে পেরেছিল, নির্বাচন রাজনীতিতে, সরকার গঠনে হাত ঢুকিয়ে। কিন্তু শেষ বিচারে বন্দর চালু হওয়া ভারত ঠেকাতে পারে নাই। ভারত ঘেঁষা চলতি সরকারই চীনের সাথে সংশোধিত চুক্তি করে বন্দর চালু করে ফেলেছে। তাই ভারত এখন এটাকে নিজের হার মনে করে, সেকথাই সুবীর তুলে এনেছে। তুলনায় নেপালে বন্দর না হলেও চীনের সাথে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আড়াই বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প আছে বা ছিল। যে সরকারের অধীনে চলতি নির্বাচন সমাপ্ত হল সেটা নেপালি কংগ্রেস দলের। তবে তা মাওবাদী দলের সমর্থনে গড়া এক কোয়ালিশন সরকার। নেপালে পানিবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুবীর বলছেন, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ৭৫৩ মেগাওয়াটের মত। ২০১৫ সালের শেষে কমিউনিস্ট অলির সরকারের আমলে চীনের সাথে তিনি ১২০০ মেগাওয়াটের ঐ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছিলেন, সেটাই আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির। কিন্তু চলতি নেপালের প্রথমপর্যায়ের নির্বাচন শুরুর কয়েক দিন মা্ত্র আগে গত নভেম্বরে নেপালি কংগ্রেস সরকার ঐ চুক্তি বাতিল করে দেয়। তাই আইনত সেই চুক্তি ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে। অজুহাত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার করা হয় নাই। এতে নেপালকে ঘিরে চীন-ভারত রেষারেষি আরো সরাসরি নির্বাচনে হাজির হয়ে পড়ে তখন থেকেই। স্বভাবতই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স এখন নির্বাচনে বিজয় লাভ করাতে ওই প্রকল্প ও চুক্তি আবার জীবিত হবে বলে সবাই অনুমান করছেন। মজার কথা হচ্ছে, সুবীর ভৌমিক ওই চুক্তি জীবিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। বলছেন এটাই নেপালের স্বার্থ। এই প্রকল্প চীনের চীনের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে অংশ বলে ঘোষণা করা ছিল। এমনকি তা সত্ত্বেও চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আরো অবকাঠামো প্রকল্প নেপালের আনার পক্ষে তিনি কথা বলছেন।

নয়াদিল্লি ঘোরতরভাবে চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পের বিরোধী। এটা ভারতের প্রকাশ্য বিদেশ নীতি ও অবস্থান। ভারতের কোনো ‘বন্ধু’ বা পড়শি রাষ্ট্র বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত থাকুক এটা দেখতে বা সহ্য করতে সে একেবারেই রাজি নয় (ফলে বাংলাদেশের সাথেও এটা এক অনৈক্যের বিরাট ইস্যু)। কিন্তু নেপালের বেলায় সুবীর বলতে চাইছেন, নেপালের এখন দরকার বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। না হলে নেপালের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। ইতোমধ্যে সদ্যগঠিত নেপালে জয়লাভ করা কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স, আগামী ১০ বছরের মধ্যে নেপালকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার আয়ের অর্থনীতির দেশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে চীনের মতই ভারতকেও নেপাল কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে দিয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু আজও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু হয়নি বলে সুবীর জানাচ্ছেন। অর্থাৎ একদিকে ভারতের সক্ষমতা দক্ষতা সামর্থ্য নেই, অন্য দিকে চীনের আছে, সুবীর এই তুলনা আনছেন। আবার চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার তুলনায় ভারত যে কিছুই না, সেটা শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে। ফলে সুবীর ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের কাছে ‘স্মার্ট হতে’ পরামর্শ রেখেছেন। আসলে সুবীরেরই খুবই স্মার্ট পরামর্শ এটা। কারণ তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, প্রশাসনের উচিত চীন-নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করা। পরামর্শ খুবই অ-ভারতীয় অথবা অ-চিরাচরিত ভারতীয় পরামর্শ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবীর বুদ্ধি দিচ্ছেন, এইবার যে বাড়তি বিদ্যুৎ তৈরি হবে তা যেন ভারত কিনে নেয়। আর এইবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ওই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিক্রি করে দিবার টাউটারি নিতে, নগদ লাভ এখানেই। অর্থাৎ ভারত যে উতপাদন আয়োজনে অক্ষম তা স্বীকার করে নিয়ে সুবীর টাউটারিতে নামতে বলছেন, তাই কী? তবে টাউট মারচেন্ডাইজ (tout merchandise ) খারাপ ব্যবসা নয়, ভারত যেটুকু ভাল পারে। এখানে আমাদের জানা থাকা ভাল যে, ভারত নেপালকে এমন ‘কলোনি-চুক্তির’ মধ্যে রেখেছে যে, ভারতের অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে নেপাল নিজ উতপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে না।

তবে আমাদের মতো দেশের বেলায় পাল্টা আরেকটা কথা সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে (যেমন বাংলাদেশেও) এক বিরাট কালো দাগ আছে। কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাই, কোনো ওপেন টেন্ডার হয় না। শুধু তাই না প্রকল্পের কোনো টেন্ডার করতে যাতে না হয়, বালাই যেন না থাকে, টেন্ডার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যাতে এড়ানো যায়; তাই প্রকল্পগুলো জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)-এর অধীনে সম্পন্ন করার চুক্তি করা হয়। আর এতে টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় বলে স্বভাবতই প্রকল্প মূল্যের কোনো মা-বাপ থাকে না। এ ছাড়া লোকাল এজেন্টের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা সুযোগও থাকে। বিশ্বব্যাংকের অনেক বদনাম আছে বা ছিল। তা সত্ত্বেও তুলনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অন্তত কোনো ওপেন আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়া সেক্ষেত্রে কো্ন প্রকল্প নিতে দেয়না।  বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটুকু অগ্রগতি তাদের ঝুলিতে আছে। এমনকি জাপান সরকার দাতা হলেও জাপানি ঠিকাদারকেই কাজ দেয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই নীতি কার্যকর করার সক্ষমতা তাদের আছে, ইতোমধ্যেই সেটা দেখিয়েছে। চীনের বিশ্বব্যাংক AIIB গঠনের প্রাক্কালে একে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করাতে এর বিরুদ্ধে মোক্ষম এই অভিযোগই তুলেছিল আমেরিকা। যদিও আমেরিকা নিজের বিরাট স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার কারণে নিয়মিতভাবে AIIB গঠনের বিরোধিতা করে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান অভিযোগ মিথ্যা ছিল না, তা বাস্তব।

তবে সেটা যাই হোক, সুবীরের লেখায় এই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা-দক্ষতা সামর্থের অযোগ্যতা বা ঘাটতির দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দিতে দেখা গেল। সুবীরের এই লেখা থেকে মনে করার কারণ আছে যে, ভারতের প্রশাসন বিপদে আছে বলে অন্তত কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে টনক নড়ারও কেউ কেউ আছে। আসলে ভারত বিপদ দেখছে; একের পর এক ভারতের পড়শি রাষ্ট্রে চীন প্রকল্প নিয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভারতের কিছু করার থাকছে না। এটা না দেখতে পাবার কারণ নাই, তবে স্বীকার করতে দেখা যায় না। সুবির তাই পরিস্কার করেই বলছে, ভারত এখন শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও আসলে শেষে কিছু ঠেকানো যায়নি বলে তারা মনে করে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ নীতিতে করণীয় – “শ্রীলঙ্কা মডেল বলেও কিছু দাড়ালো না।

কিন্তু আসলেই ব্যাপারটি এমন হওয়ার কথা নয় কি? ভারতের যদি সক্ষমতা-দক্ষতা-সামর্থ্য না থাকে, আর তা থেকে সৃষ্ট নানা দুর্বলতা তাকে ঘিরে রাখে, তবে এমনই কি হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রথম প্রশ্ন করা উচিত যে, ভারত কেন অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক সক্ষমতার দিক থেকে নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য বলে বিবেচনা করছে? কিসের ভিত্তিতে?

দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিহীন সব অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসন পড়শিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর ধপাধপ পড়ছে – শ্রীলঙ্কা আর এরপর নেপাল…। সুবীর ভৌমিকই বলছেন, শ্রীলঙ্কার পর নেপালেও নাকি নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার ভূত দেখতে পাচ্ছে। [But again, the ghosts of Sri Lanka may return to haunt Delhi…] তা হলে? এরপর কোথায়?

পাঠকের জন্য একটা সতর্কতা দিয়ে শেষ করব। বাইরের মিডিয়ার মত দেশেরও অনেক মিডিয়া – নেপালে একটা কমিউনিস্ট এলায়েন্স তৈরি হয়েছে আর চীন (মানে সেটাও তো কমিনিস্ট) – এভাবে সব মিলিয়ে বিষয়টাকে “চীনপন্থী”, বা “কমিউনিস্ট” ঘটনা বলে ইঙ্গিত হাজির করার চেষ্টা করছে। এই অনুমান ইঙ্গিত শতভাগ ভুল, ভিত্তিহীন। যে চিন্তা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে তা কোল্ড ওয়ারের যুগের; যেন ষাটের দশকের দুনিয়ায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি – এই ভিত্তিহীন অনুমানে বলা কথা। আমরা এখন একুশ শতকে, সকল রাষ্ট্র যখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে পরস্পরের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে লেপ্টে গেছি ও আছি। সবচেয়ে বড় কথা এই লেপ্টে যাওয়া আর কখনও  কোল্ড ওয়ারের মত আগের যুগে ফেরত যাবে না। তাই পুরানা চিন্তা কাঠামো আর বাস্তবতায় পুরানি টার্ম ব্যবহার করে কথা বলা আর সঠিক নয়। তাই এই ঘটনা কোনভাবেই আর “নেপালি কমিউনিস্ট আর চীনের” কোন বামপন্থা ততপরতা একেবারেই নয়। যেমন আগামিতে নেপালে দুই কমিউনিস্টকেই বাদ দিয়ে নেপালি কংগ্রেসের সাথে চীনের ঘনিষ্ট হওয়া খুবই সম্ভব। আসলে একালে ‘বামপন্থা’ বা ‘ডানপন্থা’ বলে কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা অর্থহীন।

আর একটা তথ্যঃ নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন শেষ হয় নাই। মোট আসন ২৭৫ যার মধ্যে ১৬৫ আসন আসবে সরাসরি প্রত্যেক আসনের ভোট কাউন্টে, একজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে প্রাপ্ত ১৬৫ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে।  আর বাকি ১১০ আসনের ফলাফল পুরণ হবে দলগুলোর আনুপাতিক ভোট প্রাপ্তি থেকে। অর্থাৎ সব আসন মিলিয়ে একটা দল মোট ভোটারের কত পার্শেন্ট ভোট পেয়েছে সে অনুপাতে এই ১১০ আসন ভাগ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন দল একটা আসনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জিততে না পারে যদি, তাহলেও এবার আনুপাতিক ১১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার সুযোগ আছে।  আনুপাতিক ১১০ আসনের গণনা এটা ঘরে বসে গণনা করে কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে দিবে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে ১৬৫ আসনের ভিত্তিতে বলে আনুপাতিক আসন এরপর যোগ হলে আনুপাতিক ভাবেই সব দলের আসন বাড়বে, তাই তেমন কোন হরফের হবে না। এভাবে নেপালের (ফেডারেল) সংসদে মোট আসন বা সংসদ সদস্য ২৭৫ জনেরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘নেপালে নির্বাচনের ফলাফল : শ্রীলঙ্কার ভূত দেখছে নয়াদিল্লি’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

গৌতম দাস

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার,  ০০ঃ১৫

http://wp.me/p1sCvy-2id

বাজার মানে, চাহিদা-যোগানের লড়াইয়ে এক পর্যায়ে দরদাম কোথাও যেখানে থিতু স্থির হয়। বাংলাদেশের চালের বাজার কোন “তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতির” ফেনোমেনা নয়। এখানে বাজার আছে, তা ফাংশন করে ঠিক যেভাবে কোন বাজারের করার কথা, নিয়ম মত। তবে ছাড়া-গরুর মত এই বাজারে সরকার অর্থাৎ আমাদের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে এক মেকানিজম আছে যা দিয়ে সে বাজারের সবচেয়ে বড় কুতুব-প্রভাবক। সব মজুতদারের বাপ হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সরকার সেই মেকানিজম নিজেই নষ্ট করে ফেলাতে  এখন খোদ সরকারই বাজার থেকে আউট। বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সরকার।

‘চড়া চালের বাজার’, ‘চালের দাম নাগালের বাইরে’ বা এর চরম অবস্থা ‘দুর্ভিক্ষ’ শব্দগুলোর ব্যবহার বাংলাদেশে কমবেশি লোপ পেতে শুরু করেছিল। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের পর তুলনামূলকভাবে ভাল লম্বা সময় কাটলেও দাম চড়া বা চালের অভাব ঘটার মত উল্লেখযোগ্য বছর ছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর। ওই বছরের মাইলস্টোন বা রেকর্ড হল, মোটা চালের দাম ৪২ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া। কিন্এতু এর দশ বছর পরে এবার ২০১৭ সালে আবার অনাকাঙ্খিতভাবে চালের দাম চড়া। আর এবারের নতুন রেকর্ড হল – মোটা চালের দাম বেনাপোল বন্দরেই ৪৮ টাকা বা এর উপরে উঠেছিল।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, অনেকে খেয়াল করেন নাই হয়ত, চুয়াত্তরের চালের বাজার আর আজকের চালের বাজারের মধ্যে বিরাট এক মৌলিক ফারাক আছে। তা হল, সেকালে চালের বাজার ছিল ‘কমিউনিস্ট সোভিয়েত মডেলে কথিত পরিকল্পিত অর্থনীতির’ আলোকে সাজানো – যার অর্থ আমরা সমাজে তখন চাল বিতরণ করা হত  – ‘রেশনে’ মানে ভর্তুকী দামের চাল। একালের অনেকের কাছে বিশেষত তরুণদের কাছে ‘রেশন’ শব্দটা অপরিচিত হয়ত। ‘রেশন’ শব্দের অর্থ হল, বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বাজারের চালের দাম নামিয়ে রাখে সরকার। আর প্রত্যেক পরিবারের সদস্য গুণে সে অনুযায়ী, পরিবারের সাপ্তাহিক চাহিদার পরিমাণ চাল নির্দিষ্ট দোকান (ডিলারের) থেকে বাজারের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করা।

কমিউনিস্ট অনুমানের অর্থনীতির জ্ঞানে তাদের এক বিরাট ক্ষোভের জায়গা হল – ‘বাজার’ ও এই ধারণার উপরে। বাজার তাদের কাছে নাকি শত্রু, সম্ভবত শ্রেণীশত্রু। ফলে দেশ সমাজে বাজারকে কার্যকর বা ফাংশনাল হতে না দেয়া, কাবু করে রাখতে হবে। এই হল তাদের অনুমান। কারণ তাদের চোখে বাজার জিনিষটা  ম্যানেজেবল না। নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাই বাজার ভেঙে দিতে হবে। আর তাদের কাছে এরই বিকল্প হল রেশনিং বা ভর্তুকিব্যবস্থা। আর বাজার ধারণার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ আপত্তি হল, ‘বাজার’ মুনাফা বা শোষণে সহায়তা করে। এটা সম্ভব হয়, কারণ মজুদদারেরা বাজারের মধ্যে ‘নোঙরা অযাচিত হাত’  ঢুকিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। অর্থাৎ চাহিদা ও জোগানের লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে পণ্যের মূল্য থিতু বা স্থির হওয়ার ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণের ফ্যাক্টরগুলোকে অবজেকটিভ না থাকতে দিয়ে সাবজেকটিভ ইচ্ছার হাত ঢুকিয়ে দেয়ার সুযোগ নেয়া হয়। এটা সত্যি যে, বাজারকে অবজেকটিভ রেখে দেয়া খুবই কঠিন। কে কোথা থেকে বাজারের মূল্যকে প্রভাবিত করতে হস্তক্ষেপ করে বসে, তা ঠেকানো শক্ত আইনকানুন ও মেকানিজম তৈরি করেও এটা সহজে সম্ভব হয় না। এই সমস্যা তো আছেই, কিন্তু অন্য দিকে আবার পালটা সমস্যাও তো আছে। চাল আমাদের মত দেশে মানুষের প্রধান খাদ্য, ফলে এই মুখ্য ভোগ্যপণ্যে ভর্তুকী ঢেলে এক ভর্তুকীর অর্থনীতি জারি রাখলে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণে অর্থ সংস্থান জোগাড় করতে হয়। তা জোগাড় করতে যেকোনো সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভর্তুকি কোথা থেকে আসবে? সরকারের আয়ের কোন খাত থেকে?

স্বাভাবিকভাবেই এটা রাজস্ব আয়ের ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সরকারি ব্যয়ের অন্যান্য খাতকে প্রায় সময় ছেঁটে ফেলতে হয়। কারণ চালে ভর্তুকি দেয়ার অন্য সব কিছুর চেয়ে চাল বেশি দরকারি। এর প্রায়োরিটি অন্য খরচের প্রয়োজনগুলোর চেয়ে বেশি। অন্যদিকে আবার, চালের মূল্যের সাথে শ্রমের ন্যূনতম মজুরি সরাসরি সম্পর্কিত। চালের মূল্য কম তো, ন্যূনতম মজুরি তুলনামূলকভাবে কম হবে। তাই সমাজে মোট উৎপাদনের বেশির ভাগ অংশই যদি বেসরকারি খাতে হয়, তাহলে চালে ভর্তুকির সুফল আসলে যাবে কারখানা মালিকের ঘরে, কম মূল্যে শ্রম কিনবেন তিনি। মানে, পাবলিক মানি যাবে ব্যক্তি মালিকের ঘরে। এ ছাড়া ভর্তুকির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল, এর ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা। ঠিক যার ভর্তুকি দরকার তিনি ছাড়াও অজস্র লোক যাদের দরকার নেই, তারাও ভর্তুকির আওতায় এসে যায়। ফলে ভর্তুকির চাল উঠিয়ে নেয়, বাজারে বিক্রি করে, ভুয়া নামের রেশন কার্ড থাকে ইত্যাদি এক বিরাট অপচয় ও বোঝা হয়ে হাজির হয়। তবে ভর্তুকির বিরুদ্ধে অথবা স্বপক্ষের যুক্তি আর যাই থাক, আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে খাদ্যে ভর্তুকি বা রেশনিং ব্যবস্থা একেবারেই উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

এর মূল কারণ, সরকার চালানোর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনা আর সরকার চালাতে ব্যয় কমানো, এটা করতে খরচের খাত ও  প্রয়োজনগুলোকে সুনির্দিষ্ট করা আর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করা, এভাবে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো যাতে খরচ কম হয় আর সেই সাথে ব্যবস্থাপনা দক্ষ হয়, ইত্যাদি এসব করতে নেয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের এক প্রকল্প। এর শর্ত মান্য করতে গিয়ে বাংলাদেশের রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এতটুকু পড়ার পর অনেকে সিদ্ধান্তে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠতে পারেন যে, ‘দেখছ, বিশ্বব্যাংক কত খারাপ’ ইত্যাদি।  না এমন চিন্তা অতিসরলীকরণের দোষে দুষ্ট হবে।  আসলে উঠিয়ে দিবার এই ব্যাপারটাকে বলা যায়, চালের বাজারকে ভিন্নভাবে ম্যানেজ করার দিকে চলে যাওয়া, ঠিক রেশনিং উঠানো বা ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়া নয়।

যেসব মূল কথার উপরে নতুন ব্যবস্থাটা কাজ করে সে তত্ত্বটা হল- ১. চালের বাজারকে ফিরে ফাংশন করতে দেওয়া। ২. সরকার হবে নতুন এই সিস্টেমের মনিটরিং আর ম্যানেজমেন্ট কর্তা। ৩. কোন মজুদদারি মোকাবেলার সবচেয়ে সহজ পথ হবে যে, সরকার নিজেই হবে সবচেয়ে বড় এক বিরাট মজুদদার; ফলে ব্যক্তি-মজুদদারের হয়ে যাবে অকার্যকর ক্ষমতার চুনোপুঁটি। ছোট মজুদদারিও লাভজনক হবে কি না সে সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে আসবে। ৪. ধান ওঠার পর সংগ্রহমূল্য সরকার নিজে নির্ধারণ করে দিয়ে চালের দাম কোন সীমার মধ্যে থাকবে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিবে। ৫. আর সবশেষে একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে।
অর্থাৎ এর আগে বলা সব ব্যবস্থাগুলো নেয়ার পরেও যদি বাজারে চালের দাম সরকারের কাঙ্খিত রেঞ্জের বাইরে চলে যায় তাহলে এই ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেমন এক সপ্তাহে চালের দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গেলে সরকার ডিলারের মাধ্যমে ট্রাকে করে বাজারে চাল ছাড়বে। এভাবে সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করতে নেমে পড়বে। শুধু তাই না বাজারে আগে যে কম দাম ছিক সেই দামে সে চাল বেচা শুরু করবে। এভাবে চাল ছাড়তেই থাকবে যতক্ষণ বাজারে চালের দাম আগের পর্যায়ে না নেমে আসবে। এই জায়গাটায়ই হলো আসল লড়াই। বাজারের মোট মজুদের চেয়ে সরকারের মজুদ সবসময় অনেক বেশি বলে একপর্যায়ে বাজারের ব্যক্তি মজুদদার হেরে যাবে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার হিসাবে দশ থেকে চৌদ্দ লাখ (দশ লাখের নিচে নয়) টনের খাদ্য মজুদ থাকলে ব্যক্তি-মজুদদারেরা সরকারের কাছে হারবেই।  বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার এই নিয়ম ও মাপকাঠিই সাব্যস্ত হয়েছিল আশির দশকের প্রথমার্ধ থেকে। আর কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই নতুন ব্যবস্থা ফলদায়কভাবে চলেছিল ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত। এই হিসাবে বলা যায় পুরনো রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে বাস্তবায়িত, বিকল্প এই পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল সফল। কিন্তু ব্যাপারটার তাৎপর্য কী? একবাক্যে বললে, কমিউনিস্টরা বাজার ম্যানেজেবল নয় সিদ্ধান্তে গিয়ে বাজারকে অকেজো করে দিয়েছিল, ভর্তুকীর এক রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। এর বিকল্প হল, চালের বাজার ফিরিয়ে আনা। আর বাজারের চাহিদা-জোগানোর খেলায় সরকার নিজেই এই বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হিসেবে নেমে সব ছোট খেলোয়াড়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটাকে আমরা এখন থেকে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে অভিহিত করব।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান চালের বাজারের হাল এটা প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠিত এবং প্রমাণিতভাবে কার্যকর ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ এবার দ্বিতীয়বার পরাজিত হয়েছে, ব্যক্তি মজুদদারদের কাছে। এটা ঠিক যেমন ২০০৭ সালে পরাজিত হয়েছি্‌ তেমনই। কিন্তু কেন এটা হল?

দুইবারের পরাজয়ে একটা অভিন্ন বিষয় আছে। তা হল, সরকারি চালের মজুদ ১০ লাখ টনের অনেক নিচে নেমে যেতে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে আইলা ঘূর্ণিঝড়ের পর এটা মাত্র দেড় লাখ টনে নেমে গিয়েছিল। অথচ এর আগেই খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের উপদেষ্টা প্রকাশ্যে টিভিতে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন যে, সরকারি গুদামে মজুদের পরিমাণ মাত্র দেড় লাখ টন। আর সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন, এখন সরকারের কিছু করার নেই।

আর এবারও সরকারের চাল মজুদের পরিমাণ তিন লাখ টনের নিচে নেমে গেছে। এর অর্থ ব্যক্তি মজুদদারেরা বাজারের ডমিনেটিং কর্তা হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে আরো কারণ আছে। ২০০৭ সালে বাজারে হেরে যাওয়ার পরেও সরকার কিছু গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই নিজের পক্ষে এনে ফেলেছিল যীগুলো এবার মারাত্মকভাবে অনুপস্থিত। অথচ ২০০৭ সালের রিকভারি বা নিয়ন্ত্রণ পুণরুদ্ধারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে বাজারে নিজের নিয়ন্ত্রণ  ফিরিয়ে আনতে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও সফল হয়েছিল, যা বেঞ্চমার্ক হয়ে আছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে, সেসব বেঞ্চমার্ক বা অভিজ্ঞতা থেকে এবার শিক্ষা নেয়া হয়নি।

সেটা হল একঃ চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। কিন্তু তা করতে পারার পেছনে আরেক শর্ত মানতে হয়। তা হল, সরকারের হাতে যথেষ্ট বিদেশী মুদ্রা থাকতে হবে। এর ঘাটতি থাকলে হবে না। ব্যাপারটা আমরা তুলনা করতে পারি চুয়াত্তর সালের সাথে। সেবার দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ, কোষাগারে বিদেশী মুদ্রা ছিল না যে চাল দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কমিউনিস্ট পরিকল্পিত অর্থনীতির আরেক সাধারণ ও মারাত্মক নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য থাকে যে, ওমন সরকারগুলো সবসময় বিদেশী মুদ্রার বিপুল অভাবের মধ্যে থাকে। ফলে সে সময় খাদ্য আমদানি উন্মুক্ত হওয়া দূরে থাক, আমদানির এলসি পর্যন্ত খুলতে দেয়া যায়নি। এখানে ‘উন্মুক্ত’ বলতে বুঝতে হবে যে, যে নিয়মিত চাল আমদানিকারক নয় তাকেও আমদানির এলসি খুলতে দেয়া। এককথায় বললে ২০০৭ সালের সরকার, যে-ই আগ্রহী তাকেই এলসি খুলতে দিতে পেরেছিল – এটাই ছিল ক্রাইটেরিয়া। কেন? তাতে কী সুবিধা পাওয়া গিয়েছিল?

যখনই আমাদের দেশে চালের অভাব হয় তখন পড়শি রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ভারত, সরকারি পর্যায়ে চাল বেচতে আর দরদাম ঠিক করতে নানা গড়িমসি করে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি করে থাকে। আর এসব বাধা টপকে তা উপেক্ষা করার সবচেয়ে ভাল উপায় হল, আমাদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের দিয়ে ওদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দ্রুত চাল কিনে আনা। এ ছাড়া এই পথেই সবচেয়ে কম দামে আমদানিকারকেরা  চাল আমদানি করতে পারেন। ব্যক্তি ব্যবসায়ীরা যদি প্রতি টন ৩৮৪ ডলারে আনেন, তবে সরকারি পর্যায়ে এর দাম ৪৫০ ডলারের কম হবে না। তাই সব মিলিয়ে এসব বাধা টপকানোর সবচেয়ে ভাল মেকানিজম হল, চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। ২০০৭ সালে তো ভারতের সরকারি পর্যায়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া পাঁচ লাখ টন চাল আজও ভারতের সরকার আনতে দেয়নি, সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে ভারত থেকে যা চাল এসেছিল এর সব চালই আনা সম্ভব হয়েছিল ব্যক্তিপর্যায়ে। সেটাও ভারত সরকার একপর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিল ভারতের কাস্টমসের একের পর এক নতুন আরোপিত নিষেধাজ্ঞায়। যেমন সার্কুলারে বলা হয়েছিল – প্রথমে ৪০০, কয়েকদিন পরে ৫০০ আর সবশেষ ১০০০ ডলারের নিচে কোনো এলসির রফতানি ছাড়পত্র দেয়া হবে না।

২০০৭ সালের দ্বিতীয় বেঞ্চমার্ক সিদ্ধান্ত ছিল নতুন চালের সংগ্রহমূল্য প্রসঙ্গে। এর আগে বোরো ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২১-২২ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। বন্যা দুর্যোগে চাল মজুদ কমের সমস্যার চার মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠতে শুরু করেছিল। আর ঐবারই প্রথম থেকেই কোনো দ্বিধা না রেখে সরকারের সংগ্রহমূল্য এক লাফে ২৮ টাকা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য একই। মজুদদার বা চালের মিলারদের চেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে সরকারের বাজারে প্রবেশ করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিদের হারিয়ে দিয়ে নিজে মুখ্য ক্রেতা হওয়া। ঐ ঘটনার সাথে একটা তুলনা করা যাক। এবারের বোরো চাল ক্রয় শুরু হয়েছিল বিগত মে মাসের শুরু থেকে, লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত লাখ টন। ২৫ জুন বণিকবার্তা পত্রিকার রিপোর্ট হল, সংগ্রহ অভিযান শুরুর পর এক মাস ২৫ দিন পার হয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রার এক শতাংশ চালও সংগ্রহ করা যায়নি। কেন? কারণ, ধানের সংগ্রহমূল্য করা হয়েছিল ২৪ টাকা। এটা খুবই কম। আসলে সংগ্রহমূল্য কম না বেশি, তা বুঝবার পেছনে আরেকটা ফ্যাক্টর আছে, সেদিক থেকে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চালের উৎপাদন খরচ আমদানি করা চালের চেয়ে কম। কম দাম পড়ে  কিন্তু আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ যদি কোনো বছর ফেল করে তবে এর অর্থ হল, তখন ঐ বছর ব্যক্তিপর্যায়ে চাল আমদানি করতে দিতেই হবে। এর ফলে ওই বছর স্থানীয় উৎপাদন খরচ নয়, বরং আমদানির মূল্যই চালের বাজারে মুল মুল্যনির্ধারক হয়ে যায়। স্থানীয় চাল-ধান কী দামে বেচাকেনা হবে তাও আমদানি মুল্য দিয়ে বিবেচিত হতে শুরু করে। আমাদের উতপাদন খরচ কত পরছে এটা কোন বিবেচ্যই থাকে না। অর্থাৎ তখন গত বছরের দামের চেয়ে চালের সংগ্রহ মুল্য বেশি হয়ে যায়। বেশি রাখতে হয়। এই বিচারে (২৪ টাকা ধান অথবা) ৩৪ টাকা চালের সংগ্রহমূল্য কম বলে বিবেচিত হয়েছে। এটা সম্ভবত কমপক্ষে ৩৬ টাকা হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ সরকারের গুদামে মজুদ কম বলে আগ্রাসী দাম অফার করে সরকারকে বাজারে ঢুকতে হত – এই বাজার নীতি সরকার অনুসরণ করেনি। এক কথায় সরকার বাজার বুঝে না, তাই প্রমাণ করেছে। এমনকি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে অক্ষম হলে তো সরকারকে নিজ সংগ্রহমূল্যের চেয়েও  অনেক বেশি দামে আমদানি করতেই হবে। এই বিচারে আগেই সংগ্রহমূল্য বেশি অফার করে রাখাটাই স্বাভাবিক হত, বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত হত। অথচ সেটা সরকার করেনি।

তৃতীয়ত, এর আগে কখনো চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। তবে অযথা ব্যক্তির আমদানি ঠেকাতে ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থা হয়ে গেছে, তখন শুল্ক কমাতে দ্বিধা ও দেরি করানো অদক্ষতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ।

চাল ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দাবি করেছেন দেশে চালের কোনো সঙ্কট নেই এবং সারা দেশে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় এক কোটি টন চাল আছে। মন্ত্রী তার এই দাবির ভিত্তি কী তা কোথাও বলেন নাই।   অবশ্যি চালের সঙ্কট আছে। আর সেসব কথা বাদ রাখতে হবে।  কারণ ব্যবসায়ীদের কাছে যে পরিমাণই থাকুক, সরকারের গুদামে ১০-১৪ লাখ টন খাদ্য মজুদ থাকতে হয়। তবেই তো কথিত এক কোটি টন মজুদের ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করা যাবে চাল ছাড়তে। সরকারের হাতে ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করার  কোন মেকানিজম নাই, নিজের বেকুবিতে সে অস্ত্রহীন, ঠুটো জগন্নাথ। এভাবে নিজের হাতের অস্ত্র হারানো এটা তো একটা ক্ষমাহীন অপরাধ। যে বাজার মেকানিজম বুঝে না সে মন্ত্রী হতে আসে কেন? এটা কতটা ইচ্ছাকৃত তা হোক আর নাই হোক এই ব্যর্থতা এক অপরাধ।  সরকারের হাতের বাজার নিয়ন্ত্রণের মেকানিজম একমাত্র সেই ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ কোন যুক্তিতেই সরকার হাতছাড়া করতে পারে না।  কিন্তু তা রাখতে মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা, এই সঙ্কটের দায় মন্ত্রণালয় নিতে হবে।

এই বিচারে আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ চালানোর ক্ষেত্রে বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী ব্যর্থ ও অযোগ্য। সে তুলনায় আগের খাদ্যমন্ত্রী (হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের) ড. আবদুর রাজ্জাক সফল ছিলেন। অন্কাতত বড় কোন বিপর্রযয় হয় নাই এই অর্থে।  তিনি সিস্টেমটা বুঝেছিলেন।

শিক্ষাগুলো কীঃ
এর আগে কখনও চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। অথবা থাকলেও যে মুহুর্ততে জানা যায় যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম অকার্যকর হয়ে গেছে সেই মুহুর্তে সবার আগে আমদানি শুল্ক (তা জারি থাকলে) প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত।  এটা হতে পারে অযথা ব্যক্তি আমদানী ঠেকাতে সাধারণ সময়ে ৩০% শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থায় পৌছে গেছে তখন শুল্ক উঠিয়ে নিতে দ্বিধা ও দেরি করানো এক চরম অদক্ষতা ও অযোগ্যতা। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ। দেরি হওয়াতে সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়েছে যে চাল ভারতীয় সীমান্তে আনার পরও তা কাস্টমসে ক্লিয়ার করা হয় নাই যে দু একদিনে শুল্ক উঠে যাবে। এতে বাজারে খুবই খারাপ ম্যাসেজ গিয়েছে। বাজার উলটাপালটা তোলপাড় হয়ে গেছে।

অনলাইন “সাপ্তাহিক” পত্রিকার গোলাম মোর্তোজা বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসুর নাকি টক শো তে বলেছেন, ‘দাম কে বাড়িয়েছে, সরকার বাড়িয়েছে? মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বাজার পরিস্স্থিতি দাম নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই ওএমএসের চালের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ শুভাশীষের এই বক্তব্য আপাত দৃষ্টিতে খুব স্মার্ট মনে হলেও এই বক্তব্য মিথ্যা আর এটা আসলে সচিব হিসাবে তাঁর অজ্ঞতার প্রমাণ। মিথ্যা এজন্য যে সরকারের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের শক্ত মেকানিজম আছে যেটাকে উপরে এখানে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে ব্যাখ্যা করেছি। হয় তিনি এই মেকানিজম সম্পর্কে জানেনই না। অথবা জেনেই পাবলিক মাইন্ডে এর পরিস্কার তথ্য ও চিত্র না থাকার সুবিধা নিয়ে চমক লাগানো ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ কথা বিরাট জ্ঞানী ভাব ধরে আউড়ালেন। ফেক্টস হল, বাংলাদেশের চালের বাজারে কোন ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ নাই। বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম আছে। কেবল অযোগ্য, অদক্ষ দুর্নীতিবাজ না হলে এই মেকানিজম ব্যবহার করতে পারলে সরকারের কখনও চালের বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সুযোগ নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

গৌতম দাস

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

http://wp.me/p1sCvy-2hx

 

গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

[প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে, দুনিয়া মজলুমের পক্ষেই দাঁড়াবে

গৌতম দাস

১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার ০০ঃ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2g5

 

ট্রাম্পের সৌদি সফরে (২০-২১ মে ২০১৭) সৌদি ড্যান্সের তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরব আবার খবরের প্রধান শিরোনাম। যদিও এবার সাথে নিয়েছে বা বলা ভাল এবারের সৌদি টার্গেট কাতার। কাতারকে সাইজ করা। সংক্ষিপ্ত করে বললে খবরটা হল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজাতন্ত্রী ছয় রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্র-জোট আছে নাম GCC জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল।  কাতার, সৌদি আরব, ইউএই (এটা আবার দুবাই ও আবুধাবিসহ সাত আমির-শাসিত রাষ্ট্র বা আমিরাতের এক ফেডারেশন), ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এই ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে জিসিসি গঠিত। হঠাৎ করে গত ৫ জুন ২০১৭ এর খবর হল,  জিসিসির সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন আর জিসিসির বাইরের মিসর, এই চার রাষ্ট্র কাতারের সাথে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করেছিল। আর, নৌ, আকাশ ও সড়ক পথ ও সীমান্ত বন্ধ করে সব বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।  কাতারি কূটনীতিকদেরকে এই চার রাষ্ট্র, তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিল।  প্রাথমিক খবর হিসাবে প্রথম কয়েক ঘন্টা আমরা শুনেছিলাম যে, সরকারি ‘কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি বাদশাকে নিন্দা করে কিছু খবর প্রচার করা হয়েছিল। তা থেকেই নাকি ক্ষুব্ধ সৌদি প্রতিক্রিয়া এটা। গত ২৩ মে, সেঘটনার ধোঁয়া থেকে সব শুরু। খুব সংক্ষেপে মুল ঘটনাটা বললে, ট্রাম্পের সৌদি সফরের পরের দিন কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি কাতারের মিলিটারি একাদেমি সফর করতে গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি ট্রাম্পের ঐ সফর আর সৌদি বাদশার সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন আর সেটাই সরকারী কাতার নিউজ এজেন্সী প্রচার করেছিল। আর এই খবরকে রেফার করে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে খবর প্রচার করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পালটা বার্তা দিয়ে কাতারের আমির জানায়, এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা। হ্যাকারের হাতে কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাকড হয়ে এটা একটা মিথ্যা খবর প্রচার করা থেকে এটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা রয়টার নিউজ এজেন্সীকে কাতারী আমীর জানিয়েছিলেন যে তিনি মিলিটারি একাদেমিতে গেছিলেন কথা সত্য কিন্তু তিনি সেখানে কোন বক্তৃতাই সেখানে দেন নাই, অথবা কোন বিবৃতিও দেন নাই।  এদিকে জুনের ঐ ৫ তারিখেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনলাম ‘কাতার নিউজ এজেন্সীর ওয়েব সাইট হ্যাকের ঘটনার সাথে – আমেরিকায় দুবাইয়ের রাষ্ট্রদুতের ইমেল একাউন্ট – এর সংশ্লিষ্টতা আছে এর প্রমাণ মিলেছে।  কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টার মধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে ঐ চার রাষ্ট্রের সরব অভিযোগ যেমন – কাতার নিউজ এজেন্সীর কথিত খবর, কাতারের আমীরের সৌদি বাদশার নিন্দা ইত্যাদি সব ছেড়ে এবার সৌদিসহ অভিযোগকারিরা তাদের ‘আসল’ অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করে।

সার কথায় সেসব অভিযোগ হল, কাতার এক “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র”, কারণ সে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। যেমন বিবিসি [যদিও বিবিসির রিপোর্ট ও ভুমিকা বড়ই তামাসাময়  ও খুবই নিচা স্টান্ডার্ডের। কাতারের আমীরের কোন বক্তব্যই না দিয়ে কেবল সৌদি বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে পুরা স্টোরি তৈরি করে হয়েছে।] তারা কেবল সৌদি বয়ানের উপর ভর করে এসম্পর্কে সৌদি সরকারি এজেন্সীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল,”সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিপদ থেকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংরক্ষণকে নিরাপদ করতে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে”। ঐ একই বিবিসি রিপোর্টে আবুধাবিও একই রকম মন্তব্যে জানিয়েছিল, “তারা মনে করে কাতারের দোহা সরকার, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে চলে ও তাদেরকে সমর্থন ও অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে”। অর্থাৎ কে কী প্রচার করেছে সেটা আর প্রসঙ্গ নয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, অর্থ দেয়া প্রশ্রয় দেয়া ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এটাই আসল ইস্যু, আর তা সামনে এসে গেছে।

কিন্তু কাতার ‘সন্ত্রাসবাদী’, এটা আবার কোন সন্ত্রাসবাদ? কাছকাছি সময়ের ঘটনায় “এই সন্ত্রাসবাদের” স্পষ্ট হদিস রেফারেন্স পাওয়া যায় গত ২০-২১ মে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরকালে। “ইরান সন্ত্রাসবাদ করে” আর এর বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। আর এটা বলতেই যেন সৌদি বাদশা তাকে হায়ার করে এনেছিলেন। আর এই সন্ত্রাসবাদ বলতে – প্যালেস্টাইনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড এদের ততপরতাকে ট্রাম্পের আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে। এটা আমেরিকার অনেক পুরানা বয়ান, [যদিও মাঝে “আরব স্প্রিংয়ের চলার সময়” আমেরিকা ও সৌদি আরব উভয়েই ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করা ভুলে গেছিল, বলা যায় সন্ত্রাসী মনে করতে বিরতি বা ক্ষমা দিয়েছিল। তারা ব্রাদারহুডকে মিসরে ক্ষমতায় আনতে একসাথে কাজ করেছিল। যাই হোক, সৌদি আরবের যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা ফর্মুলায় আমেরিকাকে অনুসরণ করে যাকে পছন্দ হয় না, হুমকি মনে হয় তার গায়ে সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগায় দেয় তারা। ফলে ইরান সন্ত্রাসী, আর কাতার সন্ত্রাসী। এই “বাড়তি সন্ত্রাসবাদ”  ধারণা, সৌদি আরব ট্রাম্পকে তাল দিতে নিজে দেশে ডেকে এনে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছিল। ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ রাষ্ট্র + জার্মানি এই (পি৫+১) এরা একসাথে এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ইরানের সাথে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছিল কী করে?

কিন্তু কাতার জিসিসির সদস্য হয়েও এসব প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনকে, বিশেষ করে হামাসকে সর্বতভাবে সমর্থন করে, তাদের ততপরতার  প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সমর্থন দেয়, আশ্রয় দেয় সহযোগিতা করে। এই সুত্রে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ। আমেরিকান “সন্ত্রাসবাদ” ধারণাকেও নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ মোতাবেক টেনে লম্বা করে নেওয়া।

এখন তাহলে পুরা ঘটনায় একেবারে আসল, মূল বিষয়টা কী? এক শব্দে বললে, বিষয়টা হল, সৌদি রাজতন্ত্রের আয়ু সমস্যা। এখানে রাষ্ট্র বা ভুখন্ড হিসাবে সৌদি আরবের আয়ুর কথা বলা হচ্ছে না। ঐ রাষ্ট্র পরিচালনের সিস্টেম হিসাবে “রাজতন্ত্র” – এর ভবিষ্যত বা আয়ুর কথা বলা হচ্ছে। সম্ভবত আরও সঠিক ভাষ্য হবে – সৌদি রাজ-সরকার নিজের ভবিষ্যত, আয়ূ বা হুমকি প্রসঙ্গে নিজের পারসেপশন বা ধারণা কী সেটাই এখানে মূল ইস্যু বা সমস্যা।

সৌদি আরব মনে করে তার রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরের ইরান। দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামি জনগোষ্ঠি নিজেদের মাঝে ইসলামের নানা ফ্যাকড়ায় তাদের বিভক্তি বা ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠিই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রথম আর সবচেয়ে কমন অবস্থান হল – কাম্য সিস্টেম হিসাবে তারা রাজতন্ত্রকে নাকচ করা। আর খুবই সহজে ইরান এই কথাটাই তাদের মনে করিয়ে দেবার কাজ করে ফেলতে পারে — এটাই সৌদি আরবের চোখে সবচেয়ে বড় “সন্ত্রাসী” কাজ। সবাই জানেন ইরান সুন্নি নয়, তাসত্ত্বেও হামাস, হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের মত দলের রাজনৈতিক প্রতিরোধ  লড়াই সংগ্রামের প্রতি ইরানের সক্রিয় সমর্থন অবস্থান এটা ইরান মুল্যায়নে খুবই নির্ধারক।  কারও ইরানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন থাকলেও তাসত্ত্বেও ইরানের সারা দুনিয়ার মজলুমদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয়  সমর্থন দেয় এই কারণে – এই ভুমিকাকে মুসলমানেরা অন্তর থেকে ইতিবাচক মনে করে।

তবে সৌদি আরবের ইরান মুল্যায়ন শেষে তার দ্ব্যার্থহীন অবস্থান হল,

একঃ যে কেউ শিয়া বা সুন্নি যাই হোক, ইরানের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখে সে সৌদি আরবের শত্রু। তাকে কোন ধরণের সহানুভুতি বা সমর্থন, অনুমোদন কিছুই দেয়া যাবে না। শুধু তাই নয় তাকে উচ্ছেদ করে দেওয়াতেই সৌদি আরবের শান্তি, এটাই তার নীতি।

দুইঃ সৌদি রাজতন্ত্রের ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স স্বভাবতই তার নিজ সেনা বাহিনী। আর এর পরের বলয় হল জিসিসি; যার মূল পরিচয় এরা সৌদির  মতই মধ্যপ্রাচ্য ভুগোলের রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র। এছাড়া জিসিসি কেবল সাধারণ কোন রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এই ছয় রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক সক্ষমতাগুলোকে একপাত্রে নিয়ে কমন একটা অবস্থান থেকে পরস্পরকে রক্ষায় তা ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য জিসিসির স্টিয়ারিং হাতে রাখা সৌদি আরব  – মূলত সৌদি প্রভাবে, ইয়েমেনে হুতিদের দমনে কাতারের ভিন্নমত দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও নিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে যোগ দিতে সেও বাধ্য হয়েছে। তাতে বিষয়টাতে কাতারের যতই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাক। আর ওদিকে জিসিসির পরের লাইন অব ডিফেন্স হল, একদিকে অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যা-প্রধান রাষ্ট্রগুলো (তবে খোদ জনগোষ্ঠি নয়, কেবল সরকার) আর অন্যদিকে বড় কুতুব আমেরিকা।

তিনঃ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অস্বস্তিকর দুস্থবোধ এনে দিয়েছিল ওবামা, ২০১৪ সাল থেকে। এবিষয়ে আরও বিস্তারিতের জন্য আগের লেখা  এখানে দেখুন।  সে বছর থেকে ইরান বিপ্লবের পরে এই প্রথম প্রকাশ্য সমঝোতায়  ইরান-আমেরিকা ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’ (পি+৫) করার আলাপ শুরু হয়েছিল। যদিও ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের এতদিন পরে ওবামা প্রশাসনের হঠাত এই মতি বদলের পিছনে প্রধান কারণ ছিল ইরাকে আইএস ততপরতা বৃদ্ধি আর তা নিজে সামলাতে গেলে আমেরিকাকে আবার মাঠে আমেরিকান মেরিন নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হত। যে খরচ বিতে সে অপারগ। তাই এই কাজটা সে ইরান এবং ইরান প্রভাবিত ইরাক এবং শিয়া মিলিশিয়া ইত্যাদি দিতে করাতে চাওয়ার আমেরিকান  স্বার্থ এটাই ইরানের সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক পাতানোর তাগিদ অনুভবের  মূল কারণ ছিল। তাই ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’  মানে নিউক্লিয়ার অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা সে আর করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আর তা মনিটরিং করতে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে আমেরিকাসহ পশ্চিম এবার সব অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নিবে এই নিগোশিয়েশন শুরু হয়েছিল। এই সফল নিগোশিয়েশন  আলাপের সমাপ্তিতে গত  ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়ে যায়। মনিটরিংসহ নানা শর্ত সাপেক্ষে হলেও এতে অবরোধ তুলে নেওয়াতে ইরান বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে উঠে আসতে থাকে। অর্থনীতি আবার প্রাণ পায়। আর তাই উলটা দিকে সৌদি আরবের ভালনারেবল অবস্থা ভীতি অস্বস্তি বোধ – সেখান থেকে।  গত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরও সৌদি আরব এমন দুস্থ অসহায় বোধ করে নাই। অথচ এই চুক্তির কারণে, ইরানের সাথে আমেরিকার নীতি অবস্থান স্বার্থবিরোধ কিছু কিন্তু মিটে যায় নাই। কেবল একটা একসাথে সহবস্থানের একটা ওয়ার্কেবল অবস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র। যা আবার স্থায়ী নয়, প্রতি বছর মনিটরিং মুল্যায়নের অধীনে ও ভাল রিপোর্ট সাপেক্ষে চালু থাকবে, আছে। তবু এটাও সহ্য করা সৌদি আরবের কাছে অসম্ভব, অগ্রহণযোগ্য।
আমেরিকা-ভিত্তিক ‘সৌদি-আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এফেয়ার্স কমিটি’  – এটা এক লবিষ্ট ফার্ম এর নাম। এর সভাপতি  সালমন আল-আনসারি। তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট সৌদি আরবের পক্ষে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে বলেছেন, “কাতারের আমীর – সন্ত্রাসবাদী ইরান সরকারের পক্ষে তোমার অবস্থান আর কাস্টডিয়ান অব টু হলি মস্ক – তাকে অপমান করেছ। আমি তোমাকে মনে করায় দিয়ে চাই মিসরের মোরসি ঠিক একই কাজ করেছিল আজ সে খতম হয়ে গেছে, জেলে পচতেছে”।   আনসারির এই কথা গুলো খুবই প্রতীকী, সৌদি মনোভাব অবস্থানের আসল প্রতিফলন। এভাবে বলা কথাটা ‘সহি কিনা’ সেটা এখানে একেবারেই বিচার্য নয়।

চারঃ সৌদি আরব যা বলতে চাইছে এর সারকথা হল,  কাতারে বিদেশনীতি আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারবে না। কাতার নুন্যতম ভিন্ন চোখে ইরানকে দেখতে পারবে না।  কাতার সেটা করার চেষ্টা করেছে তাই সে কাতারকে আসলে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ না, কাতারকে সে সাধারণ খাদ্য ও পণ্যেও সরবরাহের বিরুদ্ধে অবরোধ করবে। কোন ব্যবসা করতেও দিব না। আমার কথা না শুনলে এমনকি তোমাকে সরিয়ে তোমার কোন জ্ঞাতি ভাইকেও ক্ষমতার আনার চেষ্টা করব।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-যুবেইর প্যারিস সফরে ছিলেন। সেখান থেকে রয়টারের সংগৃহিত তাঁর বক্তব্য পরের দিন ছয় জুন ছাপা হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে সৌদিদের মনের অনেক কথা বলে দিয়েছেন।  তার সোজা কথা, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে কাতারকে অবশ্যই হামাস এবং ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক ছিন্নসহ আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। [Qatar must take several steps, including ending its support for the Palestinian group Hamas and the Muslim Brotherhood, to restore ties with other Arab states.]  তিনি আরও বলছেন, “সন্ত্রাসবাদী চরমপন্ন্থা (এটা বলতে হামাস, ব্রাদারহুড বুঝতে হবে),  হোস্টাইল বা বেয়াদব মিডিয়াকে সোজা করা (আল জাজিরা পড়তে হবে) আর ভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ (এটা বলতে বাহারাইনের আন্দোলনকারিদের প্রতি সহানুভুতি বুঝতে হবে) বন্ধ করবে“ – বিগত কয়েক বছরে আমরা এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছি আর কাতার তাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন কাতার এগুলো বাস্তবায়ন করেছে আমরা দেখতে চাই”। এই বক্তব্য রয়টার থেকে কোট-আনকোট নেয়া। সরাসরি ইংরাজিটা তুলে দিচ্ছি, “We want to see Qatar implement the promises it made a few years back with regard its support of extremist groups, regards its hostile media and interference in affairs of other countries,” Jubeir told reporters in Paris.

যুবেইরের এসব মন্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ হল, তিনি বলছেন কাতার “প্যালেস্টাইন অথরিটি আর মিসর সরকারকে আন্ডারমাইন” করেছে বা নীচা দেখিয়েছে।  আসলে তিনি বলতে চাইছেন আমাদের ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অবস্থানের ফলে পরে পাওয়া সুবিধায় মিসরের সিসি এখন আরামে ক্ষমতায় আছে। আর আমরা সেই সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে সিসির চোখ বন্ধ করা সমর্থন আমাদের পক্ষে পেয়েছি। আসলে  তিনি স্পষ্ট করেই বলছেন, হামাসের নেতা মিশেল অথবা ব্রাদারহুডের কোন নেতা-কর্মীকে ভাত-কাপড়-আশ্রয় কিছু দেয়া যাবে। বাস্তবে আসলে চাপে পড়ে, কাতারের আমীর  অনেক আগেই সবাইকে বের করে দিতে হয়েছে। সম্ভবত এখন ইসলামি স্কলার কারযাভিকেই একমাত্র আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাতেও সৌদিরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। বেচারা থানি, তিনি কাতারের আমীর হলেও তার একটা শক্ত নীতি হল, কোন মানুষ সে যেই হোক সে আশ্রয় চাইলে তাকে তিনি ভাত-কাপড় আশ্রয় দিতে নিজের কাছেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমীর থানির মেহমানেরা সৌদি চাপে আশ্রয়দাতার দুরবস্থা দেখে আমীর তাদেরকে কিছুই না বললেও  নিজেই নিজের করণীয় হিসাবে কাতার ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন।  এরপরেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঐ বক্তব্য শেষে হুমকি দিয়ে বলছেন,   “সঠিক পথ নিতে কাতারের ‘কমন সেন্স ও লজিক’ জাগবে। আর যদি না হয় তবে আমার মনে হয় না কাতারিরা এর মুল্য পরিশোধ করতে পারবে”। আসলে পুরা পরিস্থিতিতে সৌদি-ইচ্ছার সারকথা এখানে আছে।

কিন্তু বিরাট একটা লিগ্যাল প্রশ্ন আছে। যুবেইরের ফরমাল এই অবস্থান এটা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, ফলে একারণে সৌদি আরবকেই অভিযুক্ত করা সম্ভব। কাতার কী বিদেশ নীতি নিবে তা করতে বাধ্য করার চেষ্টা এটা কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এছাড়া সৌদি ইচ্ছায় বিদেশনীতি না সাজালে কাতারের বাসিন্দাদেরকে খাদ্য পাণীয়ের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে – এটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। WTO এর আইন অনুযায়ী না-হক কাজ।  উপরে ম্যাপের ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখবে কাতার আসলে ঠিক ল্যান্ড-লকড দেশ নয়। বরং সৌদি আরবের তীরে, পারস্য উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে কাতারের চারদিকের প্রায় ৮০ ভাগ  সীমানা এলাকাই উপসাগরের স্পর্শে। অর্থাৎ পোর্ট সুবিধা চাইলে তৈরি করা সম্ভব। আর ২০ ভাগ এলাকা সরাসরি ভুমিতে সৌদি আরবের সাথে সীমান্ত। সম্ভবত নিজ জনসংখ্যা মাত্র ২৩ লাখ (2.235 million (2015) World Bank) বলে নিজ খরচে আলাদা এক্সক্লুসিভ নিজ ভুখন্ডে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে যায় নাই। এর চেয়ে খুবই চালু  গভীর সমুদ্র বন্দর পাশের দুবাইয়ে বলে, সেই পোর্টে মালামাল নামিয়ে ট্রাকে করে সৌদি আরব হয়ে সে পণ্য নিজ দেশে প্রবেশ করে নেয়।  কিন্তু এখন  সৌদি ভুমি দিয়ে ট্রাক প্রবেশ এটাকেই চাপ দিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে – এই সুবিধা নিয়ে সৌদি আরব ট্রাক চলাচল আটকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি করার সুবিধা নিচ্ছে। যাহোক, তবে দেরিতে হলেও এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আল জাজিরা কিছু প্কিরচার রিপোর্ছুট তৈরি করাতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছে। এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাতে  খোদ ট্রাম্প সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।  কাতারে বসবাসকারি দেশি বিদেশি সাধারণ মানুষের স্বার্থে ট্রাম্প নিজেই শিথিলভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আহবান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে এটা ছিল ট্রাম্পের সৌদি সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘনের দায় তিনি সৌদিদের কাধে ফেলায় দিলেন। ট্রাম্প এটা কেন করলেন? কারণ ইতোমধ্যে তিনি এক বিরাট কেলেঙারির

পাঁচঃ ট্রাম্পের আমেরিকা; অনেকেই বিভ্রান্ত আমেরিকার অবস্থান ঠিক কোথায়? এনিয়ে। হা ট্রাম্প, নিজ অবস্থানের সবচেয়ে উপর পর্দা দিয়ে সেটা বিভ্রান্ত করে রেখেছেন। সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা আমেরিকান রাজনীতিতে   “লবি ব্যবসা” (বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশাসনে লবি করে দেওয়ার জন্য ভাড়া খাটার ব্যবসা”) এর স্বার্থের ভিতরেই বসবাস করেন ও আর এর মধ্যেই কাজ করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সেটা খুবই এক বাড়াবাড়ি জায়গায় গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দোস্ত-বেরাদরেরা  বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে  লবির ফি এর নামে কমিশন নিয়েছেন (আমেরিকান আইনে এটা আইন বিভাগের রক্ষিত খাতায় নিজে গিয়ে লিখিত বলে দিতে হয় এবং তাহলে এটা আর অবৈধ না। ইতোমধ্যে ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাহিনী আমরা নিইয়র্ক টাইমসে দেখেছি।)  এমন দোস্ত-বেরাদরেরা ট্রাম্পের একদম চারপাশে ও কোলের মধ্যে বসে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য  এমনকি মনে হয়, ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকেও বলে দিয়েছেন যে, এডমিনিষ্ট্রেশনের অবস্থান-বক্তব্যেরও থেকে দূরে তিনি ভান করে কখনও কখনও সরে যাবেন, কখনও ভুয়া কথার কথায় “লিপ-সার্ভিস” দিবেন। যেন ট্রাম্পের দোস্ত বেরাদরেরা যে ফি নিয়েছেন তা কাভার দিয়ে যায়েজ করে নিতে পারেন – তা বলে দিয়েছেন তিনি। তবে  মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকে তিনি বলতে চাচ্ছেন  কিন্তু তাসত্ত্বেও তোমরা তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের মুল অবস্থান-বক্তব্যের মধ্যেই থেকে যাবা, কাজ করে যাবা। এখানে মজার কথা হল, এতদিন আমেরিকান রাজনীতির ভোকাবুলারিতে – ‘এডমিনিষ্ট্রেশন’ বলতে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির ফরমাল নীতি-অবস্থান বুঝাত। যেমন ‘ওবামা প্রশাসন’ কথাটার মানে ওবামার নিজের কথা আর তাঁর আমলা, নীতি-নির্ধারকদেরসহ সবারই ফরমাল অবস্থান – এটা  বুঝাত। তবে যদিও এই ফরমাল অবস্থানের নিচে আবার ‘আন্ডারকারেন্ট’ হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর পেন্টাগণের অবস্থানের লড়াই ঝগড়ায় খুচরা নানা অবস্থান ভিন্নতাও থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে আমরা দেখছি,  ট্রাম্পের বক্তব্য (লিপ সার্ভিস) আর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান-বক্তব্য এই দুটা এক নাও হতে পারে। ফলে ট্রাম্প – এটা ভুয়া কথা বলে লবি ব্যবসা ধরার এক স্বর্ণযুগ তৈরি করেছেন বলা যায়।
তাই এর আরেক তামাসার দিকটা হল, সৌদি আরবেরও সেটা অজানা নয়। তাঁরা ট্রাম্পের লিপ-সার্ভিসও জেনে শুনে কিনতে চায়। সেটাই তাদের কাছে নাকি অনেক। গত মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরে এসে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” – এই ফাঁপা বাড়তি বা এক্সটেনডেড মিথ্যা সংজ্ঞা আউড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ এটা আমেরিকা প্রশাসনের অবস্থান নয়। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ওবামা আমলের শেষ বছরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে করা ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ – এটা “সঠিকভাবেই চুক্তির শর্ত মোতাবেক কোন ব্যার্তয় না ঘটিয়ে” আগিয়ে যাচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারশনের লিখিত স্বাক্ষ্য- রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে  জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের যে চাপাবাজি ছিল যে নির্বাচিত হলে তিনি ‘ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’  বাতিল করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখন ইতোমধ্যেই ঐ চুক্তি “ঠিকঠাক” চলছে, মানে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে স্বাক্ষ্য-রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেসকে।
ফলে ট্রাম্পের ইরান বিরোধী চাপাবাজি নির্বাচনের আগের অবস্থান যাই থাক তিনি এখন ওবামার ইরানী “নিউক্লিয়ার ডিল” সহি বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। এটা গত ১৮ মে এর খবর। তাই, ২০ মে সৌদি আরবে গিয়ে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” বলে যা কিছু চাপাবাজি করেছেন সেটা তাহলে আসলে লিপ সার্ভিস ছাড়া কিছু ছিল না। আর এটাই সৌদি আরব ‘কিনেছে’।

এমনকি কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার পর সৌদি আরব আবার লিপ সার্ভিস কিনতে এসেছে, দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের এবারের চাপাবাজি হল তিনি টুইট করছেন আর এই ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিজে নিবার চেষ্টা করছেন।  টুইট করতে আমোদ পাওয়া ট্রাম্প এক টুইট করে  বলছেন যে, “আমার সৌদি সফর ফল দেওয়া শুরু করেছে। কাতারের দিকে আঙ্গুল তুলে টেররিষ্ট ফান্ডিং এর বিরুদ্ধে তারা সবাই শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অচিরেই টেররিজমের ভীতিকর দিন শেষ হবে”। “So good to see the Saudi Arabia visit with the King and 50 countries already paying off. They said they would take a hard line on funding extremism, and all reference was pointing to Qatar. Perhaps this will be the beginning of the end to the horror of terrorism!” Trump wrote on Twitter.     একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কত নিচে নামতে পারে এর উদাহরণ হয়ে থাকল এটা। কিন্তু এটাও ট্রাম্পের নীচা হবার শেষ নয়। তিনি ঐদিক শুধু টুইট নয়, বক্তৃতা করে বলেছিলেন, কাতারকে নাকি টেররিজম ফাইন্যান্সিং করে আর এটা তাকে ছাড়তেই হবে। কিন্তু পরের দিনই তার একেবারে উলটা মুর্তি। সিএনএনের ভাষায় অলিভ গাছের ডাল মাথায় বেধে নিয়ে (এটা শত্রু বা বিরোধীকে ইঙ্গিত দেয়া যে বিরোধীর সাথে আপনি এখন আপোষ করতে চান।) ট্রাম্প কাতারের আমীরকে ফোন করেছেন। নানান মিঠা কথা বলেছেন কারণ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাটি আছে কাতারে। এছাড়া আর এক কারণ হল, ঐদিক তিনি যখন কাতারকে ধুয়ে ফেলতেছিলেন, সৌদিদের কোলে উঠে প্রশংসা করতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলার সন ঠিক তার উলটা কথা বলছিলেন, যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে আরবদের অবরোধ শেষ করা উচিত কারণ এতে ঐ “সামরিক ঘাটির ততপরতা ব্যহত হচ্ছে”। অর্থাৎ টিলারসন কাতার ক্রাইসিস থেকে আমেরিকাকে নিউট্রাল জোনে নিতে চাচ্ছেন। আর ট্রাম্প সেখানে কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিচ্ছেন। এই স্ববিরোধীতা সামলে নিতে, বেকুবি আড়াল করতে ট্রাম্প তাই মিষ্ট কথায় ফোন করেছেন কাতারের আমীরকে। এছাড়া রয়টার্স লিখছে,  ট্রাম্প যখন কাতার ইস্যুতে এভাবে আরবদের পিঠ চাপড়াচ্ছিলেন, পেন্টাগন ঠিক তখন  কাতারের সাথে ফোনে ছিলেন আর প্রশংসা করছিলেন যে, “কাতার সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কাতারে আমেরিকান সামরিক ঘাটির হোস্ট হিসাবে নিরলস খেদমত করে যাচ্ছেন আমরা এর প্রশংসা করি”। এভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাতারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে আমেরিকান মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। [U.S. Defense Secretary Jim Mattis spoke on Tuesday by phone with his Qatari counterpart, a Pentagon spokesman said, without disclosing the details of their discussion] রয়টার্স আমেরিকান এক কূটনৈতিকের বরাতে জানাচ্ছে, “ট্রাম্পের টুইট একটু অস্বস্তিকর হলেও আমেরিকা নিরবে সৌদি আর কাতারের উত্তেজনা ঠান্ডা করার পক্ষে কাজ করছে কারণ কাতার আমাদের কাছে সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপুর্ণ”।

এই হল লিপ সার্ভিসের কথা। তবু কাতার সরকারকে সৌদিরা উঠিয়ে ফেলে দিতে পারে, নিজ পছন্দের যে কাউকে আমীর বানাতে পারে। এককথাট বললে সৌদিরা কাতারে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, তা মিটিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তুরস্কের এরদোগান। প্রথম দিন তিনি এক বিবৃতি দিয়ে বয়ানে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। বলেন যে কাতারের বিরুদ্ধে ‘টেররিজমের অভিযোগ সত্য’ হলে তিনি নিজেই আগে ব্যক্তিগতভাবে আমল ও হস্তক্ষেপ করতেন। [ “Presenting Qatar as a supporter of terrorism is a serious accusation,” the Turkish leader said. “I know [Qatar’s leaders] well and if that had been the case, I would have been the first head of state to confront them.”] অর্থাৎ তিনি আসলে বলছেন, টেররিজমের অভিযোগ ছাড়েন, কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আমি দিব না।

এটাকে বলা যায়, সৌদিরাই কী দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রধান নেতা হবেন? নাকি নাকি তিনি কেউ নন?  – এই প্রশ্নে এরদোগানের জিত হয়েছে। তিনি আসলে বলেছেন আমি দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মনঃকামনা পুরণের নেতা।  আর তাই পরেরদিন তুরস্ক ২০১৪ সালের এক চুক্তি মোতাবেক কাতারে এক সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে, জানতে পারি।  তুরস্কের পার্লামেন্ট এটা অনুমোদন দিয়েছে।  আর এটাই সম্ভাব্য যে কোন সৌদি সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক বিরাট ডিটারেন্ট, পাল্টা অবস্থান যা সৌদিদের যে কোন গোপন-প্রকাশ্য ইচ্ছাকে একাবারে নাকচ করে ফেলেছে। তাই এক কথায় বলা পরিস্থিতি এখন স্টেলমেট। অর্থাৎ গায়ের জোর বা সামরিক মাসল দেখানোর আর সুযোগ নাই। এখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতি বাতচিত ডায়লগ এই লাইনে আগাবে ও শেষ হবে – বিবদমান সবপক্ষের জন্য এটাই একমাত্র খোলা পথ।  ওদিকে জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পকে কাতার পরিস্থিতির জন্য এক হাত নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাসহ ট্রাম্পের এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এটাও কম তাতপর্যপুর্ণ নয়।

খুব সম্ভবত সৌদিদের হার এখন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকবে। রাশিয়া সফররত কাতারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সন্তান থানি) যখন মিডিয়া সাক্ষাতে বলেন “হামাস রাজনৈতিকভাবে এক বৈধ  প্রতিরোধ আন্দোলন” – এই বয়ানের ওজন ভয়ানক। মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠি এই বয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

এঘটনায় সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে সৌদি বাদশার। তিনি চাইলে ছেলের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা নিতে পারেন। নাকি ২০৩০ সালে সব শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান! আমরা অপেক্ষা করব হয়ত দেখার জন্য।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

গৌতম দাস

০২ মার্চ ২০১৭, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2db

Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star
Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star

গত বছর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক” বিষয়ে ঢাকায় এক ‘সংলাপ’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার এবং আইপিএজি (ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড গভর্নেন্স) নামে এক সংগঠনের যৌথ নামে  ও উদ্যোগে তা করা হয়েছিল। দিনব্যাপী ভারত ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, কূটনীতিক, সরকারি প্রতিনিধি ও একাডেমিকরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি গত ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই ভারতকে করিডোর দেয়ার পক্ষে কখনো ট্রানজিটের কথা তুলে, কখনো কানেকটিভিটির কথা তুলে সবার আগে থেকে যুক্তির হাল ধরার কাজ করে এসেছেন।
গ্লোবাল অর্থনীতিতে সত্তরের দশক থেকেই গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ঝাণ্ডা উড়তে শুরু করেছিল।  আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ব্যাপক তাগিদ তৈরিতে নেমে পড়েছিল। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানে। ইতিবাচকভাবে বললে, এরই প্রকাশ্য দিক হল – আমাদের মনে আছে নিশ্চয়, “রফতানিমুখী অর্থনীতির” শ্লোগান। মানে, কেবল জাতিবাদী অভ্যন্তরীণ বাজারমুখিতা আর নয়; এর বদলে রফতানিমুখী করে নিজ অর্থনীতি সাজানো। এর এক মৌলিক স্বীকৃত দিক হল, নিজের বাজারে অন্যকে ঢুুকতে দেয়া এবং অন্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ নেয়া। তবে বাস্তবে এই দেয়া-নেয়ার কোনো কিছুই একেবারে অবাধ নয়। মূল কথাটা  বললে, গ্লোবাল অর্থনীতি কেবল কিছু পরাশক্তিগত বিশেষ ক্ষমতার অধীনেই কার্যকর, ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময় এক বাস্তবতা। সুতরাই এখানে এ ক্ষেত্র ‘অবাধ’ বলে কিছু নেই। দুনিয়ায় উপস্থিত সেসব ক্ষমতাবান রাষ্ট্র ও তাদের অর্থনীতির আধিপত্যের অধীনে এবং তাদের মাতব্বরি মেনে নিয়েই এটা কেবল ঘটতে পারে। এই “রফতানিমুখী অর্থনীতির” ফাংশনাল দিকটাই এমন। যেমন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ঢুকতে গেলে  সেটা অবাধে নয়; বরং কোটা, মাল্টি ফাইবার এগ্রিমেন্ট বা তেমন অনুমতি থাকলেই কেবল ঢুকতে পারে। নইলে রক্ষণশীল প্রটেকটিভ বিশাল অঙ্কের শুল্ক দিয়ে “অবাধে” ঢুকতে হবে। বিপরীতে বাংলাদেশে আমেরিকার পণ্যের বেলায় সেটা অবাধ। এই সমস্যা ছিল এখনও আছে। ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময়ে আছে। এমন অসাম্যের পরও বাজার যতটুকু আমাদের দখলে থেকে যায়, সে ফ্যাক্টর হল নিজ শ্রম-দক্ষতা আর কোয়ালিটি পণ্য বা সস্তা প্রতিযোগী পণ্য দিয়ে নিজের জন্য তুলনামূলক বাড়তি সুবিধা যেখানে যার বেশি, সে ভিত্তিতে ও কারণে। এসব সীমিত অর্থে এই গ্লোবালাইজেশন – তবু এটা রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ধারণা ও অবস্থানের বিপরীত একটা অবস্থান অবশ্যই। এটাকে অনেকে পশ্চিমের “মার্কেট লিবারালাইজেশন” বলেও চেনাতে চান। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই গ্লোবালাইজেশনের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান হল, দুনিয়াজোড়া সবার মধ্যে এক এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা- এক গ্লোবাল পণ্যবাণিজ্য, পণ্যবিনিময় ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলছে এটা। আর ইতোমধ্যেই এটা যে জায়গায় বিকশিত হয়ে বা পৌছে  গেছে তাতে এটা আর আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব।
গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে তত্ত্বগত ও প্রচারের দিকগুলো যখন প্রথম আনা হয়েছিল, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, তখন এখানে ১৯৮২ সালের সামরিক ক্ষমতা দখল ও সংস্কার কর্মসূচি চালু করার সময় ছিল। রফতানিমুখী অর্থনীতির নেতিবাচক দিকগুলো বাদ রেখে কেবল  ইতিবাচক দিকগুলো আদর্শিকভাবে হাজির করলে যা হবার কথা, সে প্রসঙ্গে সে সময় একাডেমিক জগতে এক বয়ান চালু ছিল। যেমন, বলা হত – কল্পনা করুন, প্রত্যেক রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠী একটা বা কয়েকটা করে পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে দক্ষ হয়ে উঠলে, সারা দুনিয়ার বাজারের জন্য তৈরি করে এরপর সেসব পণ্য প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজেদের পরস্পরের মধ্যে বাধাহীন বিনিময় ঘটাতে পারলে এই বেনিফিট সব জনগোষ্ঠীই পেতে পারে। সবাই কোনো-না-কোনো পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করবে এবং দক্ষ শ্রমের অধিকারী হয়ে উঠবে। এতে একটা গ্লোবাল বাজার ও বিনিময়ের মধ্য দিয়ে এবং এর মাধ্যমে এক গ্লোবাল বাণিজ্য গড়ে ওঠার কারণে গ্লোবালাইজেশন ঘটানো সম্ভব। সবাই যার সুফল ভোগ করবে। জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীল ক্যাপিটালিজমের বিপরীতে এটাই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার (বাস্তবায়ন করতে হবে এমন) মডেল ধারণা।

গত বছর ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ বিষয়ে ঐ সংলাপে রেহমান সোবহান এই গ্লোবালাইজেশনেরই আরোও এক কোয়ালিফায়েড বৈশিষ্ট্য আরোপ করে কথাটা পেড়েছিলেন। সে কথাটা হল – ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ (value addition chain) তৈরির দিক থেকে প্রসঙ্গটাকে বিচার করা। ভ্যালু এড মানে কোন কাঁচামালে অথবা আধা-সম্পুর্ণ পণ্যে আবার শ্রমের প্রবেশ ঘটিয়ে তাকে আরও-সম্পুর্ণ পণ্য বা একেবারে সম্পন্ন পণ্যে রূপান্তর করা। একই দেশে কাঁচামাল থেকে সম্পুর্ণ পণ্যে রূপান্তর না ঘটিয়ে নানান দেশে তা সম্পন্ন করা এটাকে ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ পণ্য উতপাদন বলা হয়।   গ্লোবালাইজেশনের মধ্যে এটা আর এক জটিল ধাপ উপরে উঠে এটা এক ধরণের পণ্য উতপাদন ও  বিনিময়। রেহমান সোবহান বলছিলেন  ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর দিক থেকে দেখে তুলনা করে বলছিলেন সিনসিয়ার মনোযোগী হওয়ার কারণে চীন কেন সফল আর ভারত কেন বিফল, সে আলোচনা তুলেছিলেন। চীনের ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ মানে হল, একটা প্রডাক্টের কয়েকটা অংশ কয়েকটা চীনের পড়শি দেশ থেকে তৈরি হয়ে আসার পর অর্থাৎ ভ্যালু যোগ হয়ে আসার পর সেগুলো চীনে জড়ো হবে, এরপর সেগুলো সব চীনে অ্যাসেম্বল বা সংযুক্ত হয়ে একটা ফাইনাল প্রডাক্ট হিসাবে বের হবে। অর্থাৎ চীন পড়শি কয়েকটা দেশকে সাথে নিয়ে একটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর মাধ্যমে তৈরী প্রডাক্ট এবার রফতানি করবে। এতে সংশ্লিষ্ট সব অর্থনীতিই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে একসাথে বেড়ে উঠবে, সবাই লাভবান হবে। এ ছাড়া, পুরাটাই চীনে করতে হবে এমন জাতীয়তাবাদী ধারণা নয় এটা। ফলে এটা শুধু সবার ফিনিসড পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ক্রবে তা নয়। পণ্য উতপাদনেই শেয়ার করা এক পণ্য উতপাদন। তিনি চীনের প্রশংসা করছিলেন চীনের পড়শিদের সাথে এমন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ প্রডাক্ট তৈরির সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে সে জন্য। প্রফেসর রেহমান সোবহানের বক্তব্যসহ পুরা অনুষ্ঠানের প্রায় এক ঘন্টার ভিডিও ক্লিপ ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
চীনের পথ ধরে বাংলাদেশের সাথে ভারত ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর সম্পর্ক গড়তে পারেনি বলে তিনি ভারতের সমালোচনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ৩৯০ বিলিয়ন ডলারের ভারতের আমদানি ব্যবসার ০.২ শতাংশও বাংলাদেশ পায়নি। এই তথ্য হাজির করে তিনি সমালোচনা করছিলেন। বলছিলেন, “অথচ বাংলাদেশ নাকি ভারতে বিনা কোটায় ও বিনাশুল্কে পণ্য রফতানির সুবিধাপ্রাপ্ত” “বন্ধুরাষ্ট্র”। এই হল ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বন্ধুরাষ্ট্রের”  দশা। আসল বাংলাদেশের দশা বুঝানোর জন্য তিনি আরো শক্ত উদাহরণ তুলেছিলেন। তিনি তুলনা দিয়ে বলেছিলেন, ভারত নানা পণ্য রফতানিকারী যেসব দেশ ভারতে বাংলাদেশের মত কথিত কোনই ফ্রি ট্রেড সুবিধাপ্রাপ্ত নয়, যেমন- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, এমনকি মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার মতো এসব রাষ্ট্রও ভারতে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রফতানি করে থাকে।
অর্থাৎ, রেহমান সোবহান এখন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর জায়গায় দাঁড়িয়ে ভারতের সমালোচক হতে চাইছেন। সেটা প্রশংসনীয় সন্দেহ নাই। তবে ২০০৭ সাল থেকেই আমরা তাঁর মুখ থেকে  ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটির কথা শুনে আসছি, কিন্তু কখনো ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমন শোনা যায়নি। এখন সমালোচক হওয়াতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান দশার দায় তার ওপর কি কমে আসবে? তা দেখতে হবে।

তবে রেহমান সোবহান এখন কড়া সমালোচক হলেও পুরনো স্টাইলে ভারতের প্রশংসা করা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে পঞ্চমুখ হওয়ার লোক অনেকে এখনো বোধ হয় আগের মতোই আছেন। এদের একজন হলেন সাবেক কূটনীতিক ফারুক সোবহান। তিনি আমেরিকাকেন্দ্রিক থিংকট্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী। তিনি গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যেখানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চারটি উন্নতি তিনি দেখেছেন বলেন। জানিয়েছেন, উন্নতির ক্ষেত্র এর চেয়ে বেশি থাকলেও তিনি সদয় হয়ে বেছে কেবল চারটি উল্লেখ করেছেন; যার প্রথম আর সবচেয়ে বড় সফলতার ক্ষেত্রটা নাকি “বিদ্যুৎ সহযোগিতা”। অথচ সোজা কথায় বললে, আসলে ভারতকে “বিদ্যুৎ ট্রানজিট” দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ভারতের এপার ওপার যোগ করে নেয়া হয়েছে। অথচ তিনি বলছেন, এই অবকাঠামো নাকি আমাদেরকে ভারতীয় বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য সদয় হয়ে করা হয়েছে। ফলে এটাই নাকি আমাদের স্বার্থে উন্নয়ন। আর ভবিষ্যতে নেপাল ও ভুটানে আকাশকুসুমে কল্পিত বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে কল্পিত সেই বিদ্যুৎ আমাদের কেনার পথ সুগম হয়েছে এতে। এটাই ‘সফলতা’। অথচ এখনই নেপালে যেসব বিদ্যুৎ কোম্পানী ভারতীয় মালিকানায় নয় তাদের বিদ্যুৎ বিক্রিতে জটিলতা শুরু হয়েছে।  তাঁর দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ভারতের বাজারে বাংলাদেশ নাকি  কোনো শুল্ক অথবা কোটা ছাড়াই অবাধ রফতানি সুবিধা ভোগ করছে। এমনকি নন-ট্যারিফ যেসব বাধা ছিল সেগুলোও নাকি অপসারণ হয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি যে পুরা উল্টা, সেটা আমরা ওপরে খোদ রেহমান সোবহানের বরাতে জেনেছি। তিনি পরিসংখ্যান হাজির করে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের তৃতীয় ও চতুর্থ অর্জন হিসেবে ফারুক সোবহান এনেছেন বাংলাদেশ ভারতকে নিজের দু’টি পোর্ট ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছে। আর চতুর্থ হল ভারতের নর্থ-ইস্ট নাকি এখন আমাদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। অথচ হয়েছে ঠিক উল্টা। ট্রানজিট দেয়াতে বাংলাদেশী পণ্যের চেয়ে ভারতের অপর অংশের পণ্য তার নর্থ-ইস্টে আমাদের বেশি প্রতিযোগী হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের দু’টি পোর্টই বিনা শুল্কে ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়ায় তাতে আমাদের কিভাবে উন্নতি হয়েছে তা তিনি ব্যাখ্যা করে কিছুই বলেননি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[লেখাটা এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ট্রাম্পের পর ভারতও – ‘এক-চীন’ নীতিতেই

ট্রাম্পের পর ভারতও, ‘এক-চীন’ নীতিতেই

গৌতম দাস

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2d3

ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একচীন নীতি মানে হল, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। ‘এক চীন নীতি’ মেনে নিয়ে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করেছেন, সে খবর জেনে দুনিয়া হাঁফ ছেড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিল। কারণ চীন-আমেরিকার কোন স্বার্থ সংঘাত থেকে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করুক সেটার মুখোমুখি হতে দুনিয়ার বেশির ভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষ এখন চায় না।  কিন্তু এ খবর শুনে কেউ কেউ দুঃখে হতাশও হয়েছিল। সম্ভবত তেমন রাষ্ট্র হল ভারত। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে বিশেষ করে জয় লাভের পরে, আরও শক্ত করে ক্রমাগত চীনবিরোধী ‘রেঠরিক’ তুলে চলছিল। যেমন- আমেরিকায় চীনা পণ্যের প্রবেশের উপর ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাব, চীন কারেন্সি ম্যানিপুলেটর (মুদ্রা বিনিময় হারের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ করা), চীন আমেরিকানদের চাকরি নষ্ট করছে, পরিবেশবাদীদের পরিবেশ ক্ষতির আওয়াজ আসলে চীনা প্রচারণা, এক চীন নীতি মানতে আমরা বাধ্য নই ইত্যাদি আপত্তির বোলচাল হাজির করেছিল। এভাবে এক কথায় বললে ট্রাম্প যেন বিশাল এক ‘চীন-লড়ানি’ দিতে আসতেছেন বক্তব্যের এমন ভাব তৈরি করে ট্রাম্প দুনিয়াকে উদ্বিগ্নতায় অস্থির করে ফেলেছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেসব তৎপরতা ও বোলচালে সবচেয়ে বেশি আস্থা স্থাপন করেছিল ভারত। ট্রাম্প এভাবে  সামনে খাড়ায় গেলে তাঁকে আড়াল হিসেবে রেখে সে আড়ালকে ব্যবহার করার সুযোগ দেখেছিল ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ট্রাম্পের আমেরিকার ওপর ভারতের আস্থা রাখা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে খায়, কথা সত্য। কিন্তু বুদ্ধিমানেরা কেবল এই সুবিধার দিকটাই দেখে না, সম্ভাব্য অনুষঙ্গি অসুবিধা বা ক্ষতির দিকেও চোখ রাখে। মনে হচ্ছে, ভারত সেটা রাখতে পারেনি।  দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ‘পল্টি’ দিয়ে অবস্থান বদল করলে কী হবে, সেটা নিয়ে কমই ভেবেছিল ভারত। তাই ভারত তাইওয়ানের এক সরকারি প্রতিনিধিদলকে (তিনজন এমপিসহ ব্যবসায়ীরা) ভারতে তিন দিনের সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সফরের আয়োজন করেছিল। ইতোমধ্যে সে সফর সম্পন্নও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আফটার এফেক্ট বা পরবর্তি-প্রতিক্রিয়া রেখে গেছে।

বিগত ’৭০-এর দশক থেকেই এক চীন নীতি মেনে চলার আমেরিকান প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে ট্রাম্প তা মানতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন- এই মাসল ফুলানো দেখে ভারত সেটাকে নিজের মাসল মনে করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিল যে ভারতও এক চীন নীতি মেনে এই শর্তেই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ও সে সম্পর্কে আছে। ফলে স্বভাবতই ভারত তাইওয়ানকে স্বাধীন সরকার গণ্য করতে পারে না। অর্থাৎ তাইওয়ানের সাথে ভারতের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে, যেটা চীন সরকারও আপত্তি করে না।
যেমন তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে ভারতের ‘কার্যত এক অ্যমবেসি’ আছে যেটার আনুষ্ঠানিক নাম হল ইন্ডিয়া-তাইপে সমিতি (ভারত-বাংলাদেশ সমিতির মত)। কারণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি সম্পর্ক নেই বলে তাইপে-তে ভারতীয় অ্যামবেসি খোলা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ করার বিষয় রাষ্ট্র পরিচয়ে ইন্ডিয়া বলা হলেও এর সমান্তরালে ‘তাইওয়ান’ বলা হয়নি, ধরা হয়নি। তাইওয়ানকে রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়নি। (রাষ্ট্রের নামের জায়গায় রাজধানীর নাম) তাইপে বলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এখানে নাম বলার লজিকে মিল নেই, ইচ্ছা করে রাখা হয়নি। কারণ বলতে হত হয় ইন্ডিয়া-তাইওয়ান, না হলে দিল্লি-তাইপে। এর কোনোটাই না হয়ে নাম রাখা হয়েছে ইন্ডিয়া-তাইপে অ্যাসোসিয়েশন (সমিতি)। আর এর বিপরীতে  দিল্লিতে তাইওয়ানের সমিতি অফিসের সমতুল্য হিসাবে তাইপে-তে অফিসটির নাম রাখা হয়েছে – ‘তাইপে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, মাত্র ১৯৯৫ সালে যা প্রতিষ্ঠিত। চীনের সাথে অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়ের শর্ত হলো তাইওয়ান চীনের অংশ, এটা মানতে হবে। ফলে কোন রাষ্ট্র তাইওয়ানের সাথে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে তাইওয়ানের সাথে ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ সম্পর্ক রাখা যাবে। যেমন, তাইওয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসলে এটাই কোনো রাষ্ট্রের একই সাথে তাইওয়ান ও চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায় – এই একটাই উপায়  চীন খুলে রেখেছে। আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশসহ সবাই তাই এই পথের পথিক।

যেটা বলছিলাম ভারত ট্রাম্পের আড়ালে সুযোগ নিতে চেয়েছিল। তাইওয়ানের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিন এমপিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং গত সপ্তাহে তাদের ভারত সফর সমাপ্ত হয়। এরপরই চীনা কড়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিশ্রুত এক চীন নীতি থেকে ভারতের সরে যাওয়ার কথা চীন স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কড়া’ আপত্তি জানায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের আপত্তি তোলাকে ‘সলেম রিপ্রেজেন্টেশন’ (solemn representation) বলে। অর্থ হল, যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে শপথ করে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলার জন্য দেখা করা।  দু’টি উৎস থেকে চীনের এই আপত্তির খবর জানা যায়। এক. চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের প্রেস-ব্রিফিংয়ের প্রশ্ন-উত্তরে। আর দুই. চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা থেকে। এটা ‘বিশেষ’ এক সরকারি পত্রিকা। চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় যেসব কথা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব যেটা তাদের মনের আসল কথা কিন্তু নানান জটিলতা এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাইরে বলতে চায় না অথচ চীনা সরকারি অবস্থান কী, কী ভাবছে তারা এটা দেশে-বিদেশে সবাইকে জানাতে চায়, সেই প্রয়োজন আর এমন সব পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে। দেশী-বিদেশী মিডিয়া পাঠকেরা তাই এই চোখেই গ্লোবাল টাইমস পাঠ করে থাকে। বিশেষ করে এই পত্রিকার নিয়মিত সম্পাদকীয় এর মাধ্যমে চীনা সরকারি অবস্থান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। গ্লোবাল টাইমস ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এক সম্পাদকীয়তে তাইওয়ানিজ প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে চীনের বিস্তারিত মনোভাব ও আপত্তির দিক জানিয়েছে। এর শিরোনাম হল – “নয়াদিল্লি তাইওয়ান কার্ড খেললে হারার ক্ষতিতে ভুগবে”। (New Delhi will suffer losses if it plays Taiwan card)।

ইতোমধ্যে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেছেন,  “We hope India would understand and respect China’s core concerns and stick to the One-China principle and prudently deal with Taiwan-related issues and maintain sound and steady development of India-China relations.”। বাংলা করে বললে, “আমরা আশা করি, এক চীন নীতি চীনের মুখ্য স্বার্থ এটা ভারত জানে। ফলে তা ভারতের বোঝা ও সম্মান করা উচিত। অতএব বুদ্ধিমানের মতো করে সে তাইওয়ান সম্পর্কিত ইস্যু নাড়াচাড়া করবে এবং চীন-ভারতের সম্পর্ককে নিস্তরঙ্গে ও ধারাবাহিকতায় বিকশিত করবে”। ওই মুখপাত্র এক চীন নীতিতে তাইওয়ান সম্পর্কিত ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা সব সময় (তাইওয়ানের সাথে) সরকারি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ার বিরোধিতা করে এসেছি”। এ বিষয়টা মিডিয়ায় সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসের বেইজিং প্রতিনিধি- সুতীর্থ পত্রনবীশের এক বিস্তারিত রিপোর্টে। যেটা হিন্দুস্তান টাইমসসহ অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাতেও অনুমতি নিয়ে কপি ছাপা হয়েছে।

চীনা গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা প্রথম বাক্য হল – এক চীন নীতিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টে গেছেন তখন ভারত উসকানিদাতা (‘provocateur’) হতে চাচ্ছে। এ সফর আয়োজনে ভারতের মতলব কী ছিল, সে সম্পর্কে চীন কী মনে করে তা জানা যায় পরের প্যারা থেকে। এখানে তা অনুবাদ করে তুলে আনছি : ‘কিছু ভারতীয় তাইওয়ান প্রশ্নকে চীনের গোড়ালিতে কাঁটা মনে করে। এরা দীর্ঘ দিন ধরে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও দালাই লামা ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর [এটা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প; পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর Gwadar Port থেকে দক্ষিণ-উত্তর এভাবে সারা পাকিস্তানের বুক চিরে যে সড়ক চীনের ল্যান্ড লকড পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে – এই ব্যাখ্যা আর্টিকেল লেখকের] প্রকল্পের অগ্রগতিতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্রাটেজিক সন্দেহ বাতিকতা বাড়ছে। ভারত জেনেশুনে গোঁয়ারের মতো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেটা আসলে যেসব রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যাবে তাদের সবাইকে সুবিধা দেবে- এমনকি ভারতকেও একইভাবে (যদি ভারত চায়)। ওই অর্থনৈতিক করিডোর যেহেতু পাকিস্তান কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে কিছু অংশ যাবে (কাশ্মিরের পাকিস্তান অংশ তুলনায় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও ভারতের চোখে যেহেতু পুরো কাশ্মিরই বিতর্কিত) ফলে সেটা বিতর্কিত ভারতের কিছু কূটবুদ্ধিদাতা এই যুক্তিতে মোদি সরকারকে তাইওয়ানিজ কার্ড খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হল, ভারত চীনের এক চীন নীতি মেনে চীনের সাথে সম্পর্ক করেছে তাই এর বিনিময়ে (পুরো কাশ্মির ভারতের এই) ‘এক ভারত’-এর পক্ষে চীন সমর্থন চেয়ে বসুক। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত আসলে আগুন নিয়ে খেলছে। এই দ্বীপ (তাইওয়ান) ভারতের কোনো কাজে আসবে না, না তাকে ব্যবসা বিনিয়োগের উন্নতিতে, না মেনল্যান্ড চীনকে ঠেকিয়ে দিতে। ওদিকে স্টিল, টেলিকম ও আইটি ব্যবসায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে তাইওয়ানিজ বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে মেনল্যান্ড-চীন ভারতের এক মেজর ট্রেডিং পার্টনার আর এই সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও কিছু পুরনো ঝগড়ার কারণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সময়ে কঠিন হয়ে যায়”।

এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প
এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প

এত দূর বলে সম্পাদকীয় এবার দুটো বাক্যে – একটি সাবধান বাণী আরেকটিতে পরামর্শ রেখেছে। সাবধান বাণী হল, তাইওয়ান ও মেনল্যান্ড চীনের বিবাদে ভারত যেন ব্যবহৃত না হয়ে যায়, তাইওয়ানের এমন উদ্দেশ্য আছে। আর পরামর্শ হল – ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে [যেটা এশিয়া (পাকিস্তান) থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দরের কানেকশন থাকবে] যোগদানের সুবিধা নিয়ে ভারত চীন থেকে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারে।
এ তো গেল চীনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের পিছু হটার পর এবং ভারতের কেসে চীনের শক্ত আপত্তি তোলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? চীনের একটা শক্ত আপত্তির পয়েন্ট ছিল তাইওয়ান-ভারতের সম্পর্ককে কখনোই সরকারি ছাপ দেয়ার চেষ্টা বা সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। এখন কেন ভারত দাওয়াত দিচ্ছে? এ প্রশ্নে বাস্তবতা কী তা সহজে সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা জানতে পারি হিন্দুস্তান টাইমসের পত্রনবীশের লেখা রিপোর্ট থেকে। সবচেয়ে মুল্যবান রিপোর্ট সেটা। তিনি জানাচ্ছেন এই গত বছর মে মাসের কাহিনী, সময়টা ছিল এখনকার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের। তিনি ভারতকে সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। এই উদ্ধৃতি দেয়ার পর পত্রনবীশ প্রশ্ন তুলে বলছেন, তাই এখন “তাইওয়ানিজ ডেলিগেশনকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ ভারত তার নীতি থেকে সরে গেছে, বদল ঘটিয়েছে”। অর্থাৎ পত্রনবীশের চোখেও ভারতের আচরণ অস্বাভাবিক ও বেমিল।
ভারতের দিক থেকে চীনা অভিযোগের জবাবে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপের সাফাই বক্তব্য আছে। ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা থেকে নিয়ে তা অনুবাদ করে বললে তা এ রকম : “ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে এমন বেসরকারি (ইনফরমাল) ভারত সফর এর আগেও হয়েছে। আমার জানা মতে তাঁরা এমন সফরে চীনেও যায়। তাই এই সফরের মধ্যে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর এর ভেতরে রাজনৈতিক মানে খোঁজারও কিছু নেই”।

কূটনীতির ভাষা হয় ক্যালকুলেটিভ, আগেভাগে হিসাব-কিতাব করে বলা কথা। বিকাশ স্বরূপ তাই করেছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ বহনকারী শব্দগুলো হল – ‘ইনফরমাল’, ‘নতুন বা অস্বাভাবিক’, ‘রাজনৈতিক মানে’ ইত্যাদি। তিনি প্রথমেই সব কিছু ঠাণ্ডা করতে এই সফর বা দাওয়াত সরকারি নয়, ‘ইনফরমাল’- এই অস্ত্র চেলে দিয়েছেন। এভাবে সব অভিযোগ নাল ও ভয়েড করে দিয়েছেন তিনি।  যদিও ডেলিগেশনে ‘সংসদীয় প্রতিনিধি কেন’ এই প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে না পারায় এটা তাঁর সাফাইকে একটু দুর্বল করেছে। তাই তিনজন ‘সংসদীয় এমপি’ এদের এই পরিচয়টি উহ্য রেখে আড়াল করে তিনি বলতে ছেয়েছেন – ওরা ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা লোকজন। এই বলে পরিচয়টি হালকা করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানিজরা চীন সফরে যায় এ কথাও সত্য। এমনকি তারা চীনের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য যে নতুন ব্যাংক (AIIB) হয়েছে, তারও আলাদা সদস্য হয়েছে তাইওয়ান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ কথাগুলো সত্ত্বেও একটাই ফারাক যে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা বা সফরের একটাও চীনের সরকারি পর্যায়ে দেয়া দাওয়াত নয়। চীনা নীতি হল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বা স্বীকৃতি না হলেই হল। মূলত ব্যবসায়ী যোগাযোগ, এটা করা জায়েজ। বিকাশ স্বরূপ তাই ব্যবসার কথা এনে সবশেষে তাইওয়ানিজদের সাথে এই যোগাযোগের কোনো ‘রাজনৈতিক মানে’ নেই দাবি করছেন। অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক নয়, তাই তিনি বলে সাফাই আনতে চাইছেন।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ার অনেকে এটা ভারতের নীতি পরিবর্তন বলে ভারত সরকারকে অভিযোগ করেছে। আবার অনেকে এটাকে – চীনা দাবি ভারতের ‘উড়িয়ে দেয়া’ এমন বিশেষণ লাগিয়ে হাজির করেছেন। স্বভাবতই ‘উড়িয়ে দেয়া’ বিশেষণ এটা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা। কিন্তু আসলেই কি এটা বিকাশ স্বরূপের চীনকে ‘উড়িয়ে দেয়া’?
অবশ্যই নয়। প্রথমত, ভারতের বক্তব্যের সারকথা হল, আমরা এক চীন নীতি ভাঙিনি, নীতির বাইরে যাইনি, নতুন কিছু করিনি। এটা আগের মতোই। এবং সর্বপরি, এটা ইনফরমাল” – এই কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।  কথার সোজা অর্থ হলো ভারত এক চীন নীতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে চায়, চলেছে এবং মেনে চলা দরকার মনে করে। অমান্য করতে চায় না। ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ভারত। ফলে তাইওয়ানের সাথে সরকারি যোগাযোগ ভারত করতে চায় না। অর্থাৎ আমি আইন মানা ভারত- এটাই বলতে চাওয়া। ভারত চীনকে চ্যালেঞ্জও করছে না। ট্রাম্পের মতো উড়িয়ে দেয়া নয় এটা।
অতএব এটা ট্রাম্পের মতো অবস্থান নয়। ভারত বলছে না এক চীন নীতি মানতে হবে কেন? অথবা মানব কি না তা নিয়ে দরকষাকষি করতে চাই; অথবা আমাকে অমুকটা দিলে তাহলে মানব- এমন অবস্থান এটা নয়। তাহলে এটা উড়িয়ে দেয়া হয় কী করে? এটা উড়িয়ে দেয়া নয়।
আরো স্পষ্ট করে বললে ভারত মনে করে, মেনল্যান্ড চীনের সাথে সম্পর্ক ভারতের কাছে তাইওয়ানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবটাই ভারত প্রকাশ করেছে। ব্যাপারটা বাস্তবেও তাই।
আসলে ব্যাপার হল, চীনের সাথে কোন রাষ্ট্রের এক চীন নীতি মানতে না চাওয়ার মানে হল ওই রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে পরোয়া করে না। ক্ষেপাটে ট্রাম্প চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন অনেক কথা বলতেই পারেন। কারণ পরিণতি চিন্তা না করে তা বলা একেবারেই সহজ। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ চীনে আমেরিকার যেসব ছোট বা বড় ব্যবসায়ী, ওয়ালস্ট্রিট বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। যারা  চীনে ব্যবসা করে টিকে আছেন, এখন তাদের সবাইকে চীনের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা কেউ কি রাজি হবেন? অর্থাৎ এই এখানে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেয়ার আসলে কেউই নন। আর ভারতের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কম-বেশি এমন নয়? বাস্তবতা হল চীনের বিনিয়োগ, ভারতে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভাইটাল। অবশ্যই চীনের কাছেও এই সম্পর্ক কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। ছয় মাস আগে ভারতের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল চীনা বিনিয়োগ আনতে চীন সফরে গিয়েছিল। চীনের সাথে ভারতের বিনিয়োগ আনার সম্পর্ক এটা রিয়েলিটি। আসলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ পুঁজি, সক্ষমতা যে কালে যেখানে যে রাষ্ট্রে আছে, বিনিয়োগ সেখান থেকেই আসবে। সেদেশ সবচেয়ে অপছন্দের হলেও। এটাই স্বাভাবিক। তবুও ট্রাম্পের কোলে চড়ে কিছু যদি বাড়তি ভারতের হাতে লেগে যায়- এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমও আমরা দেখতে পাবো।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]