“সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

“সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

গৌতম দাস

১৮ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-30x


গত ১৪ মে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ঢাকার একটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে করা পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে তিনি করোনাভাইরাসেও আক্রান্ত ছিলেন। তবে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও ভুগছিলেন। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পাওয়া বাংলাদেশী একজন একাডেমিক। যে কোনো মৃত্যুই শোকের। আমরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।

তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের প্রথমেই যে কথাটা বলতে হয় তা হল বাংলাদেশ সরকারের যত সর্বোচ্চ পদক বা সম্মাননা আছে তার সম্ভবত কোনো কিছুই লাভ বা অর্জন করা থেকে তিনি বাদ যাননি। তাই বর্তমান সরকারের ‘ইডিওলজিক্যাল আইকন’ মনে করা যেতে পারে তাকে। শুধু তাই না, তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা – ‘পদ্মভূষণ’ পদকও লাভ করেছেন।

গত বারো বছরের নানান রাজনৈতিক উলটপালটে বাংলাদেশের সমাজ এখন মতভিন্নতার এক বিপদজনক জায়গায় পৌছে গেছে। যদিও কোন দেশের সমাজে রাজনৈতিক মতামতে নানাবিধ ভিন্নতা থাকে, এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় এটা আর এখন নিছক মতভিন্নতা নয় বরং তীব্র এক সামাজিক পোলারাইজেশনের পর্যায়ে চলে গেছে। ড. আনিসুজ্জামান এই মেরুকরণে একটা পক্ষের অন্যতম আইকন ছিলেন, এটা তার ভূমিকায় প্রমাণিত।

পাকিস্তান কায়েমের সুবিধাভোগী কে নয় কিন্তু, ঘটনা ইতিহাসে স্বীকার নাইঃ
১৯৪৭ সালের আগষ্টে পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান  আর কোন আইডিয়েল [ideal] বা কল্পনা থাকে না, ছুয়ে-ছেনে দেখা ও স্পর্শ করা যায় এমন রিয়েল [real] বা বাস্তব সত্য হয়েছিল। কিন্তু তবু সেই থেকে বুঝে না বুঝে পাকিস্তান এক নিন্দার জিনিষ, খারাপ কাজ হয়ে আছে আমাদেরই অনেকের কাছে। সে সময় থেকেই আমরা পাকিস্তান পছন্দ করি আর না করি এমন নির্বিশেষে আমাদের জন্য কঠিন সত্যটা হল, পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা প্রত্যেকেই পাকিস্তান জন্মের বেনিফিসিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়েছিলাম।  এতে ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল কেবল জমিদার ও জমিদার হিন্দুরস্বার্থ ও হেজিমনি বজায় থাকলে ওরই ভিতরে যারা নিজের স্বার্থ দেখতেন, এরাই সেই ব্যতিক্রম।  জুলুম অত্যাচার ও লুন্ঠনকারীরা তো সংখ্যাল্প ও ব্যতিক্রম হবেনই। এতদিন এভাবে রাজত্ব ও রুস্তমি করা এই গোষ্ঠি – এদেরকে বাদে একজনও কেউ সুবিধাভোগের বাইরে ছিল না। বিশেষ করে এই মহাসত্যের কারণে যে, সাতচল্লিশের আগে এই বাসিন্দারাই যেখানে ছিলেন জমিদারের প্রজা অথচ পাকিস্তান কায়েমের পরে তাদের সেই প্রজা- মুক্তি ঘটে গিয়েছিল। প্রজা-পরিচয় থেকে মুক্তি বলতে শুধু জমিদারি উচ্ছেদই নয়, ১৯৫১ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950  ইংরাজিতে মুল আইনটা  [The State Acquisition And Tenancy Act, 1950] গৃহিত হইয়ে যাওয়াতে স্বাধীন পাকিস্তানে আগে প্রজা হিসাবে  চাষাবাদের জমির ভোগদখলের দলিল ‘চাষা’রা এবার নিজের নামে পেয়ে গেছিলেন।  ধর্ম বা দল নির্বিশেষে মূলত সবাই প্রত্যেকেই এতে লাভবান। এমনকি যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেননি, করা পছন্দ করেন নাই অথবা পাকিস্তান কায়েম হওয়া পছন্দ করেননি তারাও হয়েছেন লাভবান। এককথায়, অতএব আপনি-আমি স্বাধীন পূর্ব-পাকিস্তানের বাসিন্দা, নাগরিক হওয়াতে, পাকিস্তান কায়েমের বাস্তবতায় এদের চেয়ে বড় লাভবান হওয়া বেনিফিসিয়ারি আর কেউ নাই।
কিন্তু আজব ঘটনাটা হল, স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হবার পরবর্তী কালের বাস্তব পাকিস্তানে ‘সাতচল্লিশের দেশভাগ’ যে সঠিক কাজ হয়েছিল এমন কোনো বয়ান ইতিহাসে দেখা যায় না। পাকিস্তান কায়েম ‘সঠিক’ বলে ইতিহাসে তা লিখতে তাদের দ্বিধা ছিল। তাই টেক্সটবুকে পাকিস্তান কায়েমের পক্ষে সাফাই বক্তব্যের দেখা মেলে না। সেটা এখনো এমনই আছে।  যেমন এটা কী সম্ভব যে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পরের লিখিত ইতিহাসে টেক্সটবইতে এই স্বাধীনতার পক্ষে সাফাই থাকবে না! কিন্তু পাকিস্তানের বেলায় তাই হয়েছিল।  যেন পাকিস্তানের জন্ম ‘অবৈধ’, আর অবৈধ  সন্তান বলে যেন এর দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না । অথচ এর বাসিন্দারাই  এর আসল সুবিধাভোগী। জমিদারি আইন উচ্ছেদের সুবিধা আমাদের বাপ-দাদা পুর্বসূরিরা প্রত্যেকে ভোগ করে গেছেন, এখনো করছে। তবুও ১৯৪৭-১৯৭১ এ সময়টা আমাদের ইতিহাসে যেন একটা ভ্যাকুয়াম, ফাঁকা কিছু ঘটেনি। অথবা যা ঘটেছে তা ঘটা উচিত ছিল না। তার মানে কী এরও আগের জমিদারি শাসনটাই (১৭৯৩-১৯৪৭) কী সঠিক ও বৈধ ছিল, কাম্য ছিল?

অথচ এ্মনকি পাকিস্তান আমলের (১৯৪৭-৭১) এই পঁচিশ বছরের মধ্যে  চুয়ান্ন সাল পর্যন্ত না হলেও অন্ততপক্ষে যেখানে একান্ন সালের জমিদার উচ্ছেদ আইন পাস এই অর্জনকে যদি আমরা আপন না করে নেই, তবে এর মানে হবে আমাদের আত্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়া। পাকিস্তানের জন্ম যদি আমাদের কাছে অগ্রহণীয় হয়, কাম্য নয় ও অবৈধ মনে হয় আমাদেরকে তাহলে এই উত্তর দিতে হবে যে আমাদের বাপ-দাদারা সকলে জমি কোথা থেকে পেয়েছেন? কারণ ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের নিরানব্বই ভাগই ত জমিদারের প্রজা ছিলেন?

আমাদের প্রগতিবাদীসহ সকলের চিন্তায় অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি হল আমরা যদি পাকিস্তান জন্মানোকে আপন মনে না করি তবে এটা  তখন কী ছিল? অথবা কী হয়েছিল সেটা কী আমরা কেউ বলতে স্বীকার করতে চাই না! তাহলে এককালে জমিদারের প্রজা চাষা  ‘এরা’ জমির মালিকানা পেলেন কী করে? কেউ বলতে চান না। তারা সম্ভবত বলতে চান, পাকিস্তান কায়েম হওয়াটাই ভুল ছিল।  সেক্ষেত্রে প্রকারন্তরে এর মানে নয় তাহলে জমিদারি শাসনটাই ভাল ছিল। অথচ পাকিস্তান জন্মানোর পরে আমাদের অন্যান্য নতুন রাজনৈতিক চাহিদা বা অভিমুখ তৈরি হতেই পারে। এই আমরাই আবার খোদ পাকিস্তানই ভাঙতেও চাইতে পারি। কিন্তু সে জন্য তো পাকিস্তান কায়েম হবার ঘটনাটা মিথ্যা নয়। তা মিথ্যা একথা বলার কোন দরকারও পড়ে না। আসলে আগের সেই জমিদার হিন্দুর স্বার্থ ও হেজিমনি – সামাজিক কালচারাল আধিপত্য সেটাকেই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে কেউ অলক্ষ্যে।
ইতিহাস জিনিসটা এমন যে নানান দেশ, রাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপটে, এর ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য তৈরি হবেই। এমনকি একই দেশের ভেতরেও কমপক্ষে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্য সাধারণত দেখা যায়। সব দেশেই এমন হয়ে থাকে।  ঐতিহাসিকদের মধ্যে তা নিয়ে বিভক্তি ও বিতর্কও চলতে থাকে।  যেকথা বলছিলাম বুদ্ধিমান হলে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্যই টিকে থাকতে পারে আর সেক্ষেত্রে সবগুলো ভাষ্যেরই মৌলিক গল্পকাঠামোটা মোটামুটি একই থাকে, আর কিছু অংশ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে। আর ঐতিহাসিকেরা সতিকারের পেশাদার হলে বুঝমান ও দায়ীত্ববান হলে একসময় ভাষ্য-ভিন্নতা নিরসিত হয়ে কোন ইতিবাচক ব্যাখ্যা বয়ানে পৌছাতে পারি, নইলে দেশ ইতর-বয়ানে শার্প বিভক্ত হোয়ার দিকেও যেতে পারে।  আদালতকে দিয়ে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করার ঘটনাও দেখা যেতে পারে।  যদিও আবার দুটো ভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই পুরা বয়ানই ভিন্ন হয়ে যাবে। যেমন ১৯৭১ নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভাষ্য-বয়ান ভিন্ন তো হবেই। ১৯৭১ সাল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাষ্যও হবে ভিন্ন। যেমন ভারত  ১৯৭১ কে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ বলে তাদের সরকারি ইতিহাস লিখেছে।

বাস্তব পাকিস্তান কায়েমের পরে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজের লিখিত ভাষ্য-বয়ান না থাকায়, মানে পূর্ব পাকিস্তানিরা আপন করে নেয় এমন কোনই বয়ানভাষ্য না থাকায় এর পরিণতি কী হয়েছে? এমন লিখিত ইতিহাস ভাষ্য না থাকলে যেটা হবার কথা, কলকাতায় প্রচলিত টেক্সটবুকের ভাষ্যবয়ান কিছু দিন পরে এখানে চালু হয়ে গেছে। কারণ, বয়ান তো খালি থাকে না। একপর্যায়ে বাংলাদেশেরই কেউ হয়ত কলকাতার সেসব বই পড়ে তা থেকে নিজেই কলকাতার বয়ানে বাংলাদেশের ইতিহাস লিখে বসেছে। আর তা চালু হয়ে গেছে। এসব শুনে এখন কেউ বোকাবোকা উদার বুঝ থেকে জানতে চাইতে পারে আমরা কলকাতার বয়ানে ইতিহাস পড়লে অসুবিধা কী?  ক্ষতি কী?  আমরা একই বাংলা, একই দেশ তো ছিলাম? তাহলে? আসলে কথাটা হল এমন যেন বলা যে ১৯৭১ সালের আগে তো পাকিস্তান আর বাংলাদেশ  “তো একই দেশ ছিলাম” কাজেই একাত্তরের পরেও আমরা পাকিস্তানের পাঠ্য ইতিহাসটাই গ্রহণ করে নিয়ে আমাদের পাঠ্য করে নিলে অসুবিধা কী? এখন নিশ্চয় এই জবাব প্রশ্নকর্তার ভাল লাগবে না।
কলকাতার বয়ানে ইতিহাস নিয়ে আমাদের অসুবিধাটা হল, ওটা আসলে কলকাতার জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে এক সাফাই-ভাষ্য হবে।  আরও স্পষ্ট করে বললে ভারত বা কলকাতা যেটাকে বলে “স্বদেশি আন্দোলন –  সোজা সাপ্টা জমিদারি স্বার্থবয়ানের উপর আধারিত ইতিহাস হবে সেটা। কাজেই এটা আমরা প্রজাদের নিজের স্বার্থবয়ান করে লেখা ইতিহাস হতেই পারে না। দুঃখের কথা আর কারে বলব, পাকিস্তান কায়েমের পর থেকে সাতচল্লিশের আগের শাসক জমিদারহিন্দুরা  শাসন আধিপত্য হারিয়ে কমিউনিস্ট রূপ ও রাজনীতি ধারণ করে সমাজে হাজির থেকেছে। ফলে আগের জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে সাফাই-ভাষ্যটাই  এবার নব্য প্রগতিবাদী কমিউনিস্টরা গ্রহণ ও প্রচার শুরু করেছিল। আমাদের ইসলামবিদ্বেষের শুরু এখান থেকেই। কমিউনিজমের নামে তারা ইসলামবিদ্বেষ করে পাকিস্তানের জমিদার উচ্ছেদের প্রতিশোধ নিয়েছে।
আরও কঠিন সত্য মানে ফ্যাক্টস হল, ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ আইন  অর্থাৎ বড় হয়ে যাওয়া আগের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রশাসনের নজর প্রধাণত কেবল কলকাতা ও এর আশেপাশে আটকে পড়েছিল, এতে ওদিকে পুর্ববঙ্গ অংশে বা এরও বাইরে আসাম পর্যন্ত এলাকায় প্রশাসন আরো শিথিল হয়ে পড়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিকশিত হয় নাই।  তাই প্রশাসন চালানোতে দক্ষতা আনতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বাংলা প্রদেশ আর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বলে ভাগ করাকে কেন্দ্র করে হিন্দু জমিদারেরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।  কারণ এতে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়াত ঢাকা।  আবার জনসংখ্যার দিক থেকে পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট ছিল।  অর্থাৎ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কায়েমের পর থেকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থ আর কলকাতার অধীনস্ততায় না থেকে  বের হয়ে নিজেই কলকাতার সমান্তরাল ক্ষমতা ও শাসন হয়ে উঠতে সুযোগ পেয়ে গেছিল। এটাই  জমিদার হিন্দু আধিপত্যের কলকাতা সহ্য করতে পারে নাই, চায় নাই।  এই দ্বন্দ্ব খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়।  এখানে জমিদারহিন্দু শাসন আধিপত্য এতই বড় ক্ষুন্ন হয়েছিল যে তারা বৃটিশদের বা বঙ্গভঙ্গ করার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার ফ্যান্টাসিও করতে গিয়েছিল – যেটা অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুটা গ্রুপের কথা জানা যায়।  কাজেই অনুশীলন ও যুগান্তর ছিল জমিদার স্বার্থেরই সশস্ত্র উদ্যোগ। অথচ কোন সশস্ত্র উদ্যোগ মানে তা “বিপ্লবী” এমন ধরে নেওয়ার কিছু নাই। কিন্তু প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ঢেকে দেয়া হয়েছিল। কারণ অনুশীলন ও যুগান্তর পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে বিলিন হয়েছিল। এমন তামাসা সম্ভবত দুনিয়ার কোথায় দেখা যাবে না যে  বাংলার জুলুমবাজ  খোদ জমিদারেরাই এখানে সশস্ত্র।  এরাই কমিউনিস্ট নামে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই জুলুম নিপীড়নে অত্যাচারি  জমিদারদের সশস্ত্র স্বার্থ-ততপরতাকেই বলা হয়েছে এটা নাকি “স্বদেশি আন্দোলন” – এটা নাকি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা?  জমিদারের স্বার্থহানি ঘটেছে কলোনি প্রশাসনিক পরিবর্তনে। অতএব এটাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা বলে চালায় দিতে হবে – কি ফকফকা তামসা! পুর্ববঙ্গের স্বার্থ  এমন জমিদারদের স্বার্থ ও তাদের সশস্ত্র ততপরতার বিপক্ষে ছিল বলে তারা এটাকে কোন “স্বদেশি আন্দোলন” বলে মানে নাই। অতএব তারা কলকাতার লিখিত ইতিহাস পড়তে পারে না। এত কড়া সত্য কথা অনেকের মানতে কষ্ট হতে পারে। অথচ কড়া সত্য হল, দুই দুবারই বাংলা ভাগ হলে (১৯০৫ ও ১৯৪৭ সালে) এটাকে পুর্ববঙ্গ তাদের জন্য ভাল হয়েছেই মনে করেছিল। যেটা জমিদারদের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ছিল। আমরা জমিদার আর প্রজার স্বার্থ দৃষ্টিভঙ্গি এক হলনা কেন এমন আবদার বা জবরদস্তি তুলতে পারি না! কিন্তু তাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। পুর্ববঙ্গ অবশ্যই চাইবে ঢাকা কলকাতার মত ও কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি এক শহর হোক, সমান হোক, কাছাকাছি হোক। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাতই সব গল্পের মুখ্য বিষয় যেখানে সবসময় আমাদেরকে দাবড়িয়ে অধস্থন করে রাখার অপচেষ্টা আছে।

কিন্তু আনিসুজ্জামানের মুল্যায়ন প্রসঙ্গে এসে জমিদার স্বার্থবিরোধী পুর্ববঙ্গের কথা উদাম করছি কেন?
ড. আনিসুজ্জামান আমাদের কাজ কিছুটা সহজ করে দিয়েছেন প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ২০১৪ সালে, যা আসলে তার লিখিত বই তিনটারই কিছু সারকথা।  আর সেলেখা  উনার মৃত্যুদিনেই বিকেলে নতুন শিরোনামে প্রথম আলোতে পুনঃমুদ্রিত হয়েছে।  ড. আনিসুজ্জামানের প্রকাশিত তিনটা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা ধরণের বইয়ে তাঁর সবকথাই ছড়িয়ে আছে । প্রথম আলোতে ২০১৪ সালে যার পুরানা শিরোনাম ছিল, “বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার“;  আর এরই পুনঃমুদ্রিত ১৪ এপ্রিল ২০২০ এর শিরোনাম হল, মানুষের ভালোবাসা যথেষ্ট পেয়েছি: আনিসুজ্জামান। এই সাক্ষাতকারে যা তিনি বলছেন এর সারাংশ হল, বাবা-মাসহ তার পরিবার কলকাতায় থাকার সময় তারা সকলে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষেই ছিলেন, স্লোগান দিয়েছেন। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পরে পরে পশ্চিমবাংলার ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও পুরা পরিবারই নতুন পাকিস্তানে এসে পড়েছিলেন। নতুন পাকিস্তানের নানা সুযোগ- সুবিধা নিতে খুলনায় পুরা পরিবার মোহাজের হয়ে বসবাস শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে আসার পর এবার মুসলিম লীগের সমর্থন ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। মেরু বদল করে নেন তিনি। কেন?

তিনি বলছেন, কলকাতার “১৯৪৬ সালে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার সময়” থেকে “আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল”। তিনি বলছেন, “হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু, এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়”। এর পরের প্যারায় আরেকটু পরিষ্কার করে বলছেন, “একদিকে সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি”। তার মানে, পাকিস্তানের টিকে থাকাটাকে তিনি নেতিবাচক বলছেন আর দাবি করছেন এই টিকে থাকাটা এক “সাম্প্র্রদায়িকতা”। আর শেষে বলছেন, “তখন সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে”। অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি তার চিন্তা ও মনের হিসাবে ‘শত্রু’ বলে তিনি যাকে চিনেছেন তা হলো ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা বলে তিনি কি আসলেই কিছু চিনেছেন? জবাব হল, একেবারেই না। মনে হয় না। তিনি বরং সাম্প্র্রদায়িকতা বলে আবছা এক আড়ালে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। কেন?

আনিসুজ্জামানের ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’ মানে কী?
বুঝা যাচ্ছে সেটাই বুঝতে হবে আগে।
তিনি কী বলতে চাইছেন ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা থেকে আজ পর্যন্ত যত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঘটেছে, তার সবগুলোর জন্য দায়ী একেচেটিয়াভাবে মুসলমানরাই? হা, আনিসুজ্জামান হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘটা দাঙ্গাকেই ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ বলতে ভালোবাসেন এবং কেবল মুসলমানদেরকেই এই দাঙ্গার দায়ী জন্য করেন। এটাই তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে অভিযোগে তোলা।
প্রথমত, সমাজে দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট পাড়া বা এলাকায় যে আগে থেকেই আধিপত্য ও বড় প্রভাব অবস্থানে থাকে, সেই ‘অপরপক্ষ’কে উৎখাত ও বিনাশ করে তাকে ঐ এলাকা ছাড়া করার উদ্যোগ নিতেই আমরা সব জায়গায় দেখে থাকি, প্রায় অবশ্যম্ভাবী ঘটনার মত। এটাই সাধারণ ঝোঁক হতে দেখা গেছে।  এর কারণ হল, সমাজ দুটো সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানে, তারা তখন উভয়েই পরস্পরের কাছে থাকা অনিরাপদ বোধ করা শুরু করে। এই নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে যারা শক্তির আধিপত্যে আছে, তারা বিপক্ষকে প্রথমে নির্মূল করে এলাকায় কেবল নিজেরা, নিজেদের একক হুকুমে এলাকা চলবে এই ভিত্তিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা – এটা একমাত্র পথ বলে সাব্যস্থ করে থাকে। আর এতেই  তারা আগে দাঙ্গার সুত্রপাত করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনেও ভয় থাকে যদি দুর্বল হলেও অপরপক্ষে আগে আক্রমণ করে বসে। এই অজানা টেনশন দ্বিমুখি নিরাপত্তাবোধের অভাব থেকেই সাধারণত বলশালিরাই আগে হামলা করে থাকে যদিও  তাতে শেষে কে মরবে-বাঁচবে তা অন্য কথা। কাজেই দাঙ্গা হলেই তাতে হিন্দু অথবা মুসলমান কোনো একটা সম্প্রদায়কে আগাম ও একচেটিয়াভাবে দায়ী করা ভিত্তিহীন ও ভুল। আমরা  আগেই যেকোন একটা সম্প্রদায়কে দায়ী বলে প্রিজুডিস হয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে পারি না। এমন চিন্তা করতে থাকলে একসময় এমন চিন্তাই এক রেসিজমে পৌছাবেই যে ঐ জাতটাই খারাপ, ওদের রক্তের দোষ ইত্যাদি এসব। সারকথায়  এটা আগাম নির্ধারিত পক্ষপাতিত্ব। আর কোথায় একটা দাঙ্গা হয়ে গেলে পরস্পর পরস্পরকে দায়ী করবে এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের মধ্যে মুল কথা এটা না যে কে দায়ী – এটা জানলে আমরা কোনদিকে আগাতে পারব। কারণ মূল কথাটা হল পরস্পর থেকে পরস্পর নিজ নিজ নিরাপত্তার অভাববোধ করার অবস্থায় চলে গেছে – এই সামাজিক পরাজয়  আগে ঠেকাতে হবে বা রিপেয়ার করতে হবে।
কিন্তু এসবেরও আগে আরেক কথা মনে রাখতে হবে। দাঙ্গার মত অবস্থা কেন তৈরি হচ্ছে  সেটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।  যেমন এক্ষেত্রে দাঙ্গার পিছনের কারণ হল আগের ২০০ বছর ধরে জমিদারি জুলুম অত্যাচার নির্যাতনে ফলে যে ক্ষোভগুলোর জন্ম ও এর নানান মাত্রা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছিল তা গ্রাহ্য না করে জমিদারি চালিয়ে যাওয়াতে  একদিন এমন পরিণতিই তো হবে। আমরা এটা আমল করি নাই।  তা কেন কেউ ভাবেনি? এখন কোন একটা পক্ষের প্রতি ভিকটিমহুড দেখিয়ে সহানুভূতি পাইয়ে দিতে চাইলে তা কতটা কাজের হবে? কাজেই ডঃ আনিসুজ্জামানের সাম্প্রদায়িকতা এই বয়ান মারাত্মক মুসলমানবিদ্বেষী ও  সুক্ষভাবে জমিদারের পক্ষপাতিত্ব করা। ভিকটিমহুডের নেকাব চড়িয়ে। কিন্তু তবু নিশ্চয় কোন দাঙ্গাই পবিত্র নয় হতে পারে না। আমাদের অবস্থান হতে পারে না।  কোন পক্ষকে জিতিয়ে দেয়ার দাঙ্গাই কাম্য নয় হতে পারে না, জায়েজ নয়  এবং সাফাই অযোগ্য।

বুঝা যাচ্ছে এই দাঙ্গার পুরা ঘটনায় এক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের কাছে তার কয়েন করা শব্দ  ‘সাম্প্রদায়িকতার’ অর্থ হল, তার চোখে “সাম্প্রদায়িকতা” মানেই মুসলমানরা দায়ী। অথচ হিন্দু ডোমিনেটিং এলাকায় সে মুসলমানকে কোপাবে- এটাও স্বাভাবিক। আর যদি কোন মুসলমানেরা বেশি এমন এলাকা হয় তবে এর ঠিক উল্টাটাই হবে – স্বাভাবিক।   ঐ একই পরস্পরকে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধের অভাব। তাই আগাম আক্রমণ – সেই একই ফর্মুলা। অনেকে আবার এসব মেনে নিয়েও এবার কায়দা করে কে কম কে বেশি, এসব কূট তর্ক শুরু করতে পারে। তবে দেখা গেছে প্রশাসনের ভুমিকা গুরুত্বপুর্ণ। আদর্শ হল, কোন দাঙ্গা সংগঠিত হতে দেয়া ছাড়াই প্রশাসন যদি উত্তেজনা নিরসন করতে পারে।   এভাবে সব ক্ষোভ নিরসন করতে পারা একটা সাফল্য হতে পারে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি প্রশাসনের ইতি ভুমিকার কারণ দুই সম্প্রদায় নিজ নিজ নিরাপত্তাবোধ ফিরে পেয়েছে – এটাও হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অতএব আনিসুজ্জামানের এই ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বুঝ কোন ভাল বা কার্যকর কিছু আনতে পারে না। শুধু তাই না এটা একপেশেও তাই অর্থহীন।  এছাড়া এর আরেক মস্ত ভ্রান্তির দিক আছে।  আমাদের জ্বর হওয়া হল রোগের লক্ষণ,  তা  আসলে রোগ নয়। জ্বর হলে বুঝতে হবে আমার অন্য কোন রোগ হয়েছে। শরীরের কোন ইন্টারনাল অঙ্গ ডিসওর্ডার আছে, ঠিক্ মত কাজ করছে না। সেটা খুজে বের করতে হবে আগে ও সেরে উঠতে হবে। শুধু প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর তারানো যাবে রোগ তাড়ানোর কিছু হবে না।  ঠিক তেমনি কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ সমাজের কোন মূল সমস্যা নয়, এটা কোন গভীর সমস্যার বাইরের লক্ষণ। তাই কেন দাঙ্গা লেগেছে সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বলে হিন্দু অথবা মুসলমানকে অভিযুক্ত করা নিরর্থক। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করেই একমাত্র স্থায়ী সমাধান পেতে হবে।
তৃতীয়ত, এটা একটু বড় আর সিরিয়াস। কলোনিমুক্ত স্বাধীন অখণ্ড ভারত গড়তে ১৮১৫ সাল থেকেই রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগ আর সেখান থেকে শুরু করে  মাঝে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম পেরিয়ে ১৯৪৭ পর্যন্ত –  ভারতের ‘সকলকে’ নিয়ে কখনও নেহরু-গান্ধীসহ কেউই একটা ভারত গড়ার কোনো কার্যকর প্রস্তাব তারা করতেই পারেন নাই। কারণ তাদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটির দিকটা হল, তারা মনে করেন ধর্মই তাদের কথিত জাতি ধারণার মূল ভিত্তি, আর এটা ধরে নিয়ে একটা হিন্দু-নেশন স্টেট গড়তে প্রস্তাব করে যাচ্ছিলেন তারা। কারণ তাদের সকলের কাছেই রাষ্ট্র গড়া বলতে তা এক জাতি-রাষ্ট্র গড়াই একমাত্র তারা বুঝতেন। রামমোহনের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রবর্তনের চিন্তাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। কিন্তু পরবর্তিতে ব্রাহ্মধর্ম প্রকল্প পরের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই ব্যর্থ ও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে হাজির যায়।  এই ব্যর্থতাই তাদের মনে এক সাফাই হিসাবে হাজির হয় যে কথিত ব্রাহ্মধর্ম ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র যেহেতু চেষ্টা করে তারা পারেন নাই, তাই নিরুপায় হয়েই এবার এক “হিন্দু নেশন স্টেট” করতেই তারা এগিয়ে গেছেন। একাজটাই পরবর্তিতে করে গেছেন বঙ্গিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রমুখ সকলেই।  যদিও কংগ্রেসের জন্ম হয়েছেও যতটা সম্ভব এই “হিন্দু নেশন স্টেট” কামনা আড়াল করে, কিন্তু কার্যন্ত তা প্রকাশিত থেকেই গেছে। কিন্তু এই ঝুটা সাফাইয়ের উপর  যে আমরা বিকল্প চেষ্টা করেছিলাম পারি নাই।  কিন্তু মুখ্য প্রশ্ন, অন্য ধর্মের লোকেরা কেন “হিন্দু নেশন স্টেট” এর কল্পনা মানবে এর স্বপক্ষে কোন জবাব কোন সাফাই দেওয়ারও চেষ্টাই করে নাই কংগ্রেসের কোন নেতা। যার সোজা অর্থ হল  তারা জবরদস্তিতে এটা করবেন, চাপিয়ে দিবেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  এখানেই কংগ্রেসের সাথে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের দারুন মিল। অতএব কলকাতাসহ সারা ভারত জানত  বাস্তবে তাদের “হিন্দু নেশন স্টেট” চিন্তা আর এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।  আর এরই পরিণতিতে কংগ্রেসের দেখানো পথে এখান থেকেই আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দাবি ওঠে এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল মুসলিম লীগের হাতে। “হিন্দু নেশন স্টেট” এই চিন্তা ও কামনার কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে দেখানো পথেই তাই মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

মজার কথা হল রাষ্ট্র বলতে যে “হিন্দু নেশন স্টেট” মানে ধর্ম ছাড়া নেশন হয় না আর নেশন স্টেট ছাড়া আর রাষ্ট্র ধারণা হয় না – এই দুই ভুল চিন্তা আমাদের উপমহাদেশের রূট সমস্যা। কিন্তু এটা  চিন্তা করে ধরতে ও বুঝবার অসমর্থতা আজও যায় নাই।  কংগ্রেস নেতারা হয়ত সীমাবদ্ধতাটা বুঝত কিন্তু তারা আবার নিজেদের নিরুপায়ও মনে করে মিথ্যা  সাফাই খাড়া করতেন। আর সবচেয়ে বড় কথা তাদের “কথিত হিন্দুস্বার্থ” – এর বাইরে তারা যেতে পারেন না এটাই মনে করতেন। আর কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা “নেশন স্টেট” চিন্তাটাই যে সমস্যার আর তা যে মারাত্মক ভুল তা ই বুঝতে সক্ষম তা কোথাও প্রমাণ রাখেন নাই।  তামসার কথা হল তাদের দাবি অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্র-বুঝ নাকি “শ্রেণীরাষ্ট্র” বুঝের। যদি তাই হয় তবে “নেশন স্টেট” এর পক্ষে চলে যাওয়া আর তার উপর আবার তলে তলে সেটা “হিন্দু নেশন স্টেট”  – এই ধারণা তারা হজম করেন কী করে?   অর্থাৎ “শ্রেণীরাষ্ট্র” কথাটা বইয়ের ভিতর তাত্বিক রেখে দিয়েছেন আর বাস্তবের ভারতে কার্যত “হিন্দু নেশন স্টেট” ধারণা কাঁধে নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির সাথে পেস মিলিয়ে এখনও হাটছেন।

ওদিকে এসব প্রগতিবাদী দাবি করেন তারা নাকি সবার আগে ও উপরে রেনেসাঁ-বুঝের প্রগতিপন্থি। যদি তাই হয় তবে তাদের ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু রাজা রামমোহন কেন এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন?  এদিকটা কোন বামপন্থি বা কমিউনিস্ট কখনও টের পেয়েছেন, ঝামেলাটা ধরতে পেরেছেন তাই জানা যায় না। অথচ কমিউনিস্টদের মধ্যে  ইসলামবিদ্বেষ তাদের মজ্জাগত। আর এই সুত্রে এরা উলটা জিন্নাহকে দায়ী করে যে তিনি “ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান’ কায়েম করেছে বলে।

কমিউনিস্টদের মাথায় আরেক আজব চিন্তা লক্ষ্য করা যায় ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ বলে একটা ধারণা।  তারা “নেশন স্টেট” কথাটা শুনলেও এর সাথে জাতীয়তাবাদ ধারণাকে মিলায় না। বরং জাতীয়তাবাদ ধারণাটা নেশন-স্টেট ধারণা থেকা আলাদা এবং তাদের কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বন্ধু মনে করে।  অনেক মনে করে জাতিয়তাবাদ হল  কমিউজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বাস্তবায়নে যাবার আগের ধাপ তাই এটা বন্ধু ধারণা।  অথচ ইউরোপের তিনশ বছরের মর্ডানিটি ও রাষ্ট্র ধারণাটা বলতে তা সব সময়ই নেশন স্টেট ধারণা। জাতীয়তাবাদ শব্দটা ইউরোপে তেমন ব্যবহার নাই তবে কেউ তা করলে সেটাও নেশন স্টেট ধারণা অর্থেই। খুব সম্ভবত এর কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলোনি্মুক্তির যুগে এরা সোভিয়েত ব্লকে গিয়ে ঢুকলে তাদেরকে ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে প্রশ্রয়ের খেতাব ও বন্ধু মানা হত।  তারা সমাজতন্ত্রে পৌছানোর আগের ধাপে থাকা রাষ্ট্র বলে সার্টিফিকেট দেয়া হত। এই সার্টিফিকেট অনুসারে নেহেরু-গান্ধীর কংগ্রেস হল ‘জাতীয়তাবাদী’  কিন্তু জিন্নাহর পাকিস্তান? না না। এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, তাই অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়।

তবু মনে রাখতে হবে  সব সম্ভাবনা শেষ হবার এর আগে ১৯২৮ সালে সর্বশেষ একটা প্রস্তাব ছিল।  সেটা জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’। বাংলাদেশের একমাত্র বদরুদ্দিন উমরকে দেখা যায় এর জিকির করেছেন। ওর প্রথম দফা ছিল যে প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে এরপর ফেডারেল আমেরিকার মত প্রদেশগুলোর এক অখণ্ড ‘কনফেডারেটেট ইন্ডিয়া’ গড়ার দাবি তুলেছিলেন। বলাই বাহুল্য, নেহরু-গান্ধীরা জিন্নাহর এহেন প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। প্রস্তাব বাতিল করে দেয়া সহজ কাজ। কিন্তু এর অর্থ যে, পরিস্থিতিকে দাঙ্গার দিকে ঠেলে দেয়া, এ দিকটা কেউ ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না।
এত দূর পর্যন্ত চিন্তা করতে পারেননি ড. আনিসুজ্জামানরা।  ডঃ আনিসুজ্জামানদের মত যারা চিন্তা করেন তাদের সমস্যা হল,তারা মুসলমানদের উপর সব দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চান। “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা” শব্দটা তাদের কাছে ভাল ওজনদার ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডার এক শব্দ। ্তাই দাঙ্গার পিছনের কারণ কী সেদিকে এরা কোনভাবেই যাবেন না।  অথচ “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা”  বলতে যদি সব মুসলমানরাই দায়ী হয় তাহলে ভারতের সব দাঙ্গাগুলোর জন্যও মুসলমানরাই দায়ী এটাই কী আনিসুজ্জামান মনে করতেন!

তবে দাঙ্গার পিছনের কারণ কী এতদুরে আনিসুজ্জামান যাবেন ক্ষতিয়ে দেখতে সক্ষম হবেন এটা আশা করাও ঠিক হবে না। কারণ তিনি রাজনীতিবিদ তো নন বা এ বিষয়ে ভাবার উপযুক্ত কোন একাদেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিও তিনি এমন ধারণা আমাদের নাই। যদিও  এটা ব্যক্তি আনিসুজ্জামানের জন্য দোষেরও নয়। কিন্তু এটা  অবশ্যই এক বিরাট সমস্যা হয়ে হাজির হল, যখন তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে রোগের এক লক্ষণকেই রোগ বলে ঠাউরে বসতে চাইছেন। বরং ‘সাম্প্রদায়িকতা’ কে সব সমস্যার গোড়া বলে প্রপাগান্ডা দিয়ে হারানো জমিদার হিন্দুর রাজনীতি ও স্বার্থের পক্ষে থাকা – এভাবে খাড়া হয়ে যাওয়া তাঁর অনুচিত।

কিন্তু এত শব্দ থাকতে “সাম্প্রদায়িকতা”, এই শব্দটাকেই তাঁরা এত পছন্দের বিষয় করলেন কেন? এছাড়া অবশ্য তাঁরা সময়ে আরো সামনে বাড়েন। যেমন তাদের আরেক শব্দ আছে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ (অথবা সময়ে বলেন ‘সেকুলারিজম’), যেটা আরেক ভুয়া শব্দ এবং তা জমিদারের রাজনীতি ও স্বার্থ লুকানোর এক কৌশল।

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’। জমিদারেরা বেশির ভাগ বর্ণহিন্দু ছিলেন বলে জমিদারি সামাজিক ব্যবস্থাটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপ্রথারও ধারাবাহিকতা হয়ে উঠেছিল সহজেই। মুসলমানেরা বাঙালি নয় সেটা না হয় ফতোয়া দেয়া গেল। কিন্তু এদিকে মুসলমানরা তো হিন্দু বাঙালি সমাজেই পাশাপাশি বসবাস করত, তাই চাইলেই ফেলে দিতেও পারেনি। তবে বর্ণহিন্দুর জাতিভেদপ্রথায় মুসলমানদের জন্যও তাদের জাত-অবস্থান ঠিক করে দেয়া হয়। আর সেটা বলাই বাহুল্য তা ছিল নমঃশূদ্র, চর্মকারদেরও দু’ধাপ নিচে। এভাবেই জমিদারি ক্ষমতার হাতেই কথিত “বাঙালিয়ানা” যাত্রা শুরু করেছিল, মুসলমানদের বাইরে উপেক্ষিত রেখে। এওখন এই কলকাতার বাঙালিয়ানা এরা কেমন করে আশা করে যে, তাদের এই সাজানো বাগানে আগুন লাগবে না , ব্যাকফায়ার করবে না? এসব তৎপরতার কোনো চরম ব্যাকফায়ার লন্ডভন্ড প্রতিক্রিয়া হবে না? তাহলে দাঙ্গা জিনিষটা কী যেন?

তাহলে সেই থেকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এই যে সাজানো মনোরম বাগান মানে জমিদার বাবুর “বাঙালি সমাজ”, এতে প্রবেশ করতে গেলে মুসলমানদের “অনুমতি” নিতে হবে। ঘটনাচক্রে কোনো মুসলমানকে যদি এই ‘বাঙালি সমাজ বসতে উঠতে জায়গা পেতে হত, অফিসে বা ক্লাসরুমে যেমন ততদিনে আবার বৃটিশ ইন্ডিয়াতে মডার্ন এডুকেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরি এসে গেছিল, মাস্টারি ওকালতি পেশকার ধরণের নানান কাজও। এসব কিছুর সুযোগ যদি পেতে হত তবে মুসলমানদের প্যান্ট বা ধুতি পরতে হত, মাথায় টুপি চাপাতে পারতেন না। এই ইতিহাস আমাদের সকলের জানা  অন্তত ষাটের উপরে যাদের বয়স।  এটা কি এনাফ নয় সে সময়টাকে ধরবার জন্য! মডার্নিটি নামের আড়ালে জমিদার হিন্দুর কালচার বা তাদের ঠিক করে দেয়া বৈশিষ্ট্য মুসলমানদের অনুসরণ করতেই হবে, কেন? নইলে? নইলে আপনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ডাকা হবে। আর মনে রাখবেন, একবার সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগিয়ে দিলে ‘বাঙালি সমাজে’ আপনার প্রবেশ নিষিদ্ধ, অচল হয়ে যাবেন সেখানে। শিক্ষা, চাকরি কিছুই জোগাড় করতে না পেরে এখন না খেয়ে মরবেন, আপনি! আর যারা এখনকার ২০-৩০ বছর বয়সের তাদেরও দুঃশ্চিন্তার কারণ নাই। মমতার আমলে কিছু হয়ত বদলাতে চাইছে। তবু এখনও কলকাতা চলে যান, দেখে আসেন মনোযোগ দিয়ে। তাহলে আনিসুজ্জামান আমাদের কী অসাম্প্রদায়িকতা শিখাতে এসেছেন?

আর  ‘অসাম্প্রদায়িক’ হওয়া মানে কী? জমিদারির আধিপত্যে সাজানো ‘বাঙালি সমাজে’ প্রবেশ ওঠা-বসার সুযোগ ও অধিকার পেতে হলে শাসক জমিদার বাবুর নির্ধারিত যে কোড আপনাকে মেনে চলতে হবে, অভ্যস্ত হতে হবে, এটাই “অসাম্প্রদায়িকতা”। আবার অসাম্প্রদায়িকতার ট্রেনিং ও ওরিয়েন্টেশন শেষে ওই সমাজে প্রবেশ করতে পারলে ভেবেন না আপনি তখন বাঙালিও হয়েছেন। আপনি সেই তখন বড় জোর হিন্দু বাঙালির এক পড়শি কেবল।

অনেকের মনে আছে হয়ত ২০১৩ সালের আগষ্টে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের একাত্তর টিভির এক টকশো ক্লিপ পাওয়া যায় ইউটিউবে, সেখানে “বাঙালি মেয়ে কারা” তা নিয়ে মিতা হকের দেয়া এর বর্ণনা আছে। তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর ঐ বক্তব্যের টেক্সট পাবেন এখানে। সেটি মিলিয়ে দেখতে পারেন, তাতে আমার কথা আরো ভাল বাস্তব উদাহরণে বুঝা যেতে পারে। মিতা হকের বক্তব্য আমে দেখতে বলছি আমি যা বলতে চাইছি এর রেফারেন্স বা উদাহরণ হিসাবে।  তার বক্তব্যের পক্ষ নেয়া বা নিন্দা করা কোনটাই এখানে উদ্দেশ্য নয়। ওথচ কেউ বাঙালি কি না এর সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা হল, সে তার মায়ের সাথে কী ভাষায় কথা বলে, কিভাবে ডাকে ইত্যাদি। অথচ আনিসুজ্জামানের মত যারা চিন্তা করেন তারা ধর্ম বা পোশাক ইত্যাদির একধরনের লাইন টেনে দিতে চায় জমিদার কর্তৃক নির্ধারিত অসাম্প্রদায়িকতার কোড বলে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে।এটাও কি ব্যাকফায়ার করবে না? আসলে ‘মাদার টাঙ’ তো লুকানো যায় না, ভুলা যায় না।

কিন্তু তা না হয় বুঝা গেল, তবু কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক বা সম্প্রদায়, এসব ডাকাডাকির ট্যাগ দেয়া কেন? কারণ খুব সহজ। জমিদারির হিন্দু কালচার বলতে চায় তারা তাদের বাঙালি সমাজ বলে এক বাগান সাজিয়েছে। সেখানে তাদের কোডের বাইরে আলাদা পোষাক বা আচার অথবা কোন চিহ্ন হাজির করা মানে হল তাদের সম্প্রদায়ের সেট আপের মধ্যে আমি আমার মুসলমান সম্প্রদায়েরও  চিহ্ন দেখিয়ে মাথা তুলতে চাচ্ছি। অতএব তাদেরটা নয় আমারটাই কেবল ‘সম্প্রদায়গত বিভক্তি’ চিহ্ন, যা আমি শো করছি বলে তারা দাবি করবে। কারণ রাজত্ব তো তাদের, আমরা তো প্রজা। তাদের সাজানো বাগানে আমরাই যেন হস্তক্ষেপ করছি! এটাকে তারা তাদের সাজানো বাগানে অন্যরাই যেন হস্তক্ষেপ করছে – এভাবে দেখতে চাচ্ছে। অতএব আমরা সাম্প্রদায়িক! এই হল ডঃ আনিসুজ্জামানের রপ্ত করে নেয়া ভাষ্য।
সেই জমিদার শ্রেণীর আধিপত্যে ও নেতার হাতে চালু করা সমাজ আজও একইভাবে চলছে। আর পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা আজো ‘অসাম্প্রদায়িক’ চিহ্ন রপ্ত করতে করতে একেবারে ট্রেইন্ড। কারণ সে জানে এটাই এখনো তার পাসপোর্ট, না হলে বাঙালি সমাজে উঠতে দেয়া হবে না।

আনিসুজ্জামান সম্ভবত আমরা অনুমান করতে পারি “কলকাতার মুসলমান” হিসেবে ছোট থেকেই কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠতে ট্রেইন্ড হয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর মনে অজানা ভয় কাজ করেছে যে, গোষ্ঠী বিশেষের আধিপত্যের তৈরি করা কোনো গাইড লাইন বা কোড ভঙ্গ করলে সমাজের কোথায় না আবার অপমানিত হতে হয়। মজার কথা হল, কলকাতার মুসলমান যখন পূর্ব-পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে আসেন, তখনও তাদের ‘ট্রমা’ যায় না। পিছু ছাড়ে না। কারণ ব্যাপারটা অভ্যাসের গভীরে ঢুকে গেছে – গভীর ট্রমা আর ভয়ে।  উল্টো তারা বাংলাদেশের মুসলমানদেরও ঐ একই ধরনের তথাকথিত মাই ফুট “অসাম্প্রদায়িক” হতে সবক দিয়ে বসেন।

ঠিক এটাই প্রবলভাবে ঘটেছিল বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের দিকে আওয়ামি লীগের জন্মের সময়। কলকাতায় পড়ালেখা করে ফেরত শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত হয়ে যায় লীগের বুদ্ধিজীবী অথবা কালচারাল ভ্যানগার্ড। একারণেই সেকাল থেকেই লীগের অসাম্প্রদায়িক বা কথিত ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার অহেতুক কসরত দেখেছিলাম আমরা।

ব্যাপারটা হল কোন মডার্ন ভ্যালু বা সরাসরি ইন্ডিভিজুয়ালিজম যদি চর্চা করতেই হয় তো করেন না? সমস্যার তো কিছু নাই।  তবে বুঝে শুনে করেন, মন লাগিয়ে। কিন্তু পুরানা জমিদার বা সামন্ত আধিপত্যের ভ্যালুর জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘোরা তো একেবারেই অপ্রয়োজনীয় আর হাস্যকর! কেবল খেয়াল রাখবেন, সহনাগরিক কারো অধিকার লঙ্ঘন করে যেন না বসেন, পায়ে মাড়াবেন না কাউকে। কারণ তারাও আপনারই সমান অধিকার; তাদেরও বৈষম্যহীন অধিকার আছে। এটা খুবই শক্তভাবে মেনে চললে দেখেন ভুয়া কথাবার্তার কবল থেকে বহু আগেই আর সহজেই রেহাই পেয়ে যেতে পারেন। খেয়াল রাখবেন কারণ সাবর্ডিনেট হওয়া যাবে না, মানা যাবে না।

এবার কিছু সারকথা। বাঙালি মুসলমান তা সে যেখানকারই হোক, তার আর কারো কাছ থেকে সে ‘বাঙালি’ কি না, এই স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট অপ্রয়োজনীয়। পুরানা জমিদার গোষ্ঠীর আধিপত্যের কোনো কিছুকে সে আর গুরুত্ব দেয় না বিশেষত ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। দিলে তো সে সেই থেকে কলকাতার অধীনেই থেকে যেত। প্রধান কারণ পাকিস্তান কায়েমের পরই পুরা পুর্ব-পাকিস্তান থেকেই জমিদারি উৎখাত করে হয়েছিল। তাই এই জমিদারি-হারানি পরাস্ত স্ট্যাটাস আর তাকে কাউকে বাঙালি সনদ দেবার-না- দেবার কোনো মুরোদ রাখে না। তবে ওই জমিদার ও তার স্বধর্মী সঙ্গীরাই এখন সব ক্ষমতা আর আধিপত্য হারালেও বাম ভেক নিয়ে নতুন করে হাজির আছে। তারা মাঝে মাঝে বাঙালি মুসলমানকে এইবার কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িকতা শেখানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু বাঙালিয়ানা? না সে মুরোদ বা বাস্তবতা আর নেই। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে প্রধানত মুসলমান বাঙালি প্রমাণ করে রেখেছে যে, নিজের বাঙালি স্বীকৃতি আর অপরের কাছে নয়, নিজেই নিজের বাঙালি স্বীকৃতি, নিজেই তা হাসিল করে নিয়েছে। এরজন্য এই জায়গায় এসে শেখ মুজিব আমাদের একটা প্রশংসার দাবি রাখেন। দেখেন তিনিও কলকাতায় বড় হওয়া, পড়তে যাওয়া তাদেরই আরেকজন। কিন্তু কোয়ালিটি একেবারে উলটা। জেনুইন কোর মুসলিম লীগার। ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ কাহিনী তিনি গুমোর ফাঁক করে বুঝতেন। তাই মোহ ছিল না।

তাহলে ডঃ আনিসুজ্জামান তিনি আসলে কে?
তিনি হলেন পতিত কিন্তু হার স্বীকার না করা জমিদার হিন্দুর রিয়েল রিপ্রেজেন্টেটিভ।  কলকাতায় জমিদারি এখন আর নাই। আমাদের দেখাদেখি ১৯৫৫ সালের তারাও উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কলকাতার হিন্দুমনের ফাউন্ডেশন  ও মেজাজ এই জমিদারের হাতে শুরুর দিকে তার রমরমা আমলেই এর নির্ধারক টাচগুলো হস্তান্তর করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের উপর থেকে চরম ও প্রাকটিক্যাল অর্থে হারানি জমিদার হিন্দুর আধিপত্য বা সমস্ত ধরণের প্রতিপত্তির কিছু অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু কলকাতা (বৃহত্তর অর্থে এটা এখন সারা ভারত) হাল ছেড়ে দেয় নাই , হার স্বীকার করে নাই।  চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে হারানি জমিদারের খাসিলতের কথা বললাম ডঃ আনিসুজ্জামান আধিপত্য প্রতিপত্তি হারানো হিন্দু মনের প্রতিটা রক্তফোটার গতিবিধি আকাঙ্খা তিনি বুঝতেন। একারণে বাংলাদেশের কেউ যদি একালে ভারতের সাথে গাটছাড়া বেধে চলতে চান তাহলে তাকে দেখাতে হত যে তিনি ডঃ আনিসুজ্জামানকে আদর খাতির কেমন করেন, কোথায় রাখেন।  আবার ডঃ আনিসুজ্জামান এর দিক থেকে দেখলে তিনিও এসব জানতেন, বুঝতেন তার কোয়ালিটির বাজারদর কোথায় ও কত। ফলে তিনি সে মোতাবেক দাম চাইতেন ও পেতেন। ডঃ আনিসুজ্জামানের মৃত্যতে এই যুগের সমাপ্তি ঘটল।

কিন্তু কলকাতায় বড় হওয়া মুসলমানরা এখনো এক ট্রমায় ভুগছেন। যেমন মনে করুন, ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের অনেক বন্ধু মিলে কোনো আলাপ করছেন। সেখানে নিজেদের মনের মধ্যে কারো কোনো অসাম্য বা নিচু বোধ নেই। ফলে  যা বলতে ও লিখতে ইচ্ছা করছে, তাই করতে তারা অভ্যস্থ অর্থে মুক্ত। কিন্তু যদি আপনারই কোনো কলকাতার মুসলমান বন্ধু এসে গেছে সেখানে এমন হয়! লক্ষ্য করবেন, সে আপনার সাহস ও মর্যাদাবোধ দেখে তো কাঁপছে আর হয়তো বারবার আপনাকে, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে, জামা টেনে ধরছে। তাহলে বুঝতে হবে, কলকাতায় থাকতে থাকতে এটা আপনার বন্ধুর ট্রমা, কোড মেনে চলার তাগিদের ট্রমা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ১৭ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  ডঃ আনিসুজ্জামান ও “সাম্প্রদায়িকতা” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য

বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-aR

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে গত মাসের ২৩ জুন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায়। বিগত আশি’র দশকে তাকে আমরা নিজেদের মধ্যে সংক্ষেপে SIC বা সিক স্যার বলে ডাকতাম। সে সময়ে উনি কী বলেন তা শোনার, কী লিখতেন তা পড়ার একটা আগ্রহ কাজ করত, ফেসবুকের ভাষায় যাকে বলে, তাকে ফলো করতাম। যদিও গত কয়েক বছর ধরে তার কোনো লেখা ধৈর্য ধরে পড়েছি বলে আর মনে পড়ে না। গত ৮০’র দশকের শেষ থেকে আগ্রহে ভাটা পড়ে গেছে। এর কারণ সম্ভবত ওই সময় থেকে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বুঝতে তার কথা আর কোনই কাজে লাগছিল না। অর্থাৎ ৮০’র দশকের প্রথম দিকে মনে হতো যে, বোধহয় কাজে লাগছে। ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে নিঃসন্দেহে আবার নতুন এক ধরনের আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। যা থেকে এ’লেখার সুত্রপাত।

বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম নিয়ে তত্ত্ব করা ও পক্ষে তত্ত্ব দেয়া তার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ করেননি। বদরুদ্দীন উমরসহ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লিটারেচারে যারা লিখেছেন ‘সেক্যুলারিজম’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রসঙ্গ হিসেবে সেখানে ছিল অবশ্যই। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর “সেক্যুলারিজম” এর বয়ান তফসির সেগুলো থেকে আলাদা। কেন আলাদা, কোথায় আলাদা তা তখন বুঝতে বা বুঝিয়ে বলতে পারতাম না, শুধু ফারাকটা টের পেতাম। পেছন ফিরে দেখলে এখন মনে হয় সম্ভবত ফারাকটা বুঝতে পারি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা ইউরোপকে, ইউরোপের ইতিহাসকে যা জেনেছে তা শুধু লাল বই পড়ার ভেতর দিয়ে। লাল বইয়ের বাইরে দিয়ে অন্য কোনো বই পড়ে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্ট রেওয়াজে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাই। অর্থাৎ ইউরোপের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব লেখা পড়ে সেখান থেকে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্টদের চর্চা-অভ্যাসে নেই। নেই এজন্য যে, লাল বইয়ের বাইরের কোনো কিছু মানে ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান; যা কমিউনিস্টদের চোখে শত্রুর বয়ান, মানে অনাস্থা রাখতে হবে তাতে – এই ধারণা প্রবলভাবে কাজ করে। এটা করত বলা ভাল কারণ এখন সব আউলায়া গেছে, কমিউনিস্টরা আর সে ধারণা ধরে রাখতে, টিকাতে পারে নাই।

বিপরীতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঠিক কোনো দলীয় ধারার কমিউনিস্ট নন, আর নিজেকে তিনি কমিউনিস্ট বলার চেয়ে ‘প্রগতিশীল’ বলতে পছন্দ করেছেন দেখা গেছে। এছাড়া তিনি লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন, সেখানে বসে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন। ইংরেজি সাহিত্য বোঝার প্রয়োজনে ইংলিশ সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমি তিনি জানতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি ইউরোপের ঘরের বই শুধু নয়, তিনি ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন “এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতা” সম্পর্কে জেনেছেন, নিজের শখের পড়াশোনা সূত্রে নয়, বরং বাধ্য হয়ে, ইংরেজি ভাষার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ঘটনা ও এর ফলে ভাষায় বদলকে বোঝার প্রয়োজনে। একজন কমিউনিস্টের চোখে এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতাকে বুঝা, পারলে তত্ত্বের দিকসহ বিস্তার করে বুঝা, জানা ও পড়াশোনা কোন কাজের বিষয় নয়। কারণ মোটা দাগে এগুলো সবকিছুই ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান যা শত্রুর বয়ান, যা এত জানার কিছু নয়। ফলে এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন সক্রিয় কমিউনিস্টের চেয়ে একেবারেই আলাদা। অতএব তাঁর আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজমের বর্ণনা কমিউনিস্টদের চেয়ে বিস্তারিত ও ভিন্ন হতে বাধ্য। এখন বুঝি, এই ফারাকটাই পাঠক হিসেবে আমাকে আকর্ষণ করত। তবে অবশ্যই তিনি যাই লিখতেন তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকেই সমাজে পুষ্ট করত। নিজের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রগতিশীল, আধুনিক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য রাজনীতির মতাদর্শ সরবরাহকারী, পোক্তকারী।

ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের এই সাক্ষাৎকার নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতাদর্শ সরবরাহকারী, তাদের আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজম সম্পর্কে বয়ান যার কারণে পোক্ত হয়েছে, তিনি একালে এসে যখন সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদের এখন আর দেয়ার কিছু নেই” তখন এটা খুবই ইন্টারেস্টিং ও কৌতূহল উদ্রেককারী।

পত্রিকার সম্পাদকের চোখে সাক্ষাৎকারের এদিকটা শিরোনাম হওয়ার যোগ্য হওয়ারই কথা। হয়েছেও তাই। কিন্তু আমার মন আকর্ষিত হয়েছে শুধু এদিকটার কারণে নয়। অন্য কারণে। যারা বয়সে ১৯৪৭ সালে কমপক্ষে সজ্ঞান কিশোর বা টিনএজে ছিল, তাদের নিয়ে আমার এক বিশেষ কৌতূহল আছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালে, বয়স এখন ৮০ বছর। তাঁর প্রজন্মের সদস্যরা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথবা দেহ রেখেছেন। এদের সেকালের প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন হল “পাকিস্তান আন্দোলন”, যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী ছিলেন তাদের প্রজন্ম। এ সাক্ষাৎকারেও আমরা সেটাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু “পাকিস্তান আন্দোলনের” প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী এই প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ ষাটের দশকের পর থেকে পুর্ববঙ্গের বা পুর্ব-পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘পাকিস্তান আন্দোলনকে’ আর নিজের মনে না করা এবং এর সাথে সম্পর্ককে অস্বীকারের নতুন বয়ান খাড়া করা শুরু হয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৭১-২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিক স্যারের প্রজন্ম সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেও ‘পাকিস্তান আন্দোলনের’ কথা ঘুণাক্ষরেও যেন রেফারেন্স হিসেবে না এসে যায় সেজন্য মুখে কুলুপ আঁটেন, একাজে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে নেন। কারণ তাদের কৈশোর বা তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা, তখন যা তাদের আন্দোলিত করেছিল, চরম সত্য মনে হয়েছিল তা স্বাধীনতার পরের কালে উচ্চারণ করলে নিজ পরিবারের তরুণের হাতে নিগৃহীত না হলেও কটুকথা শোনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কারণ তারা রক্ষণশীল, প্রাচীনপন্থী শুধু নয়, পরাজিত চিন্তাধারার প্রতীক বলে চিহ্নিত হতে পারেন। এভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম কিন্তু সেই যে ঐকালে মুখে কুলুপ আঁটলেন সে অভিজ্ঞতা কাউকে আর তাঁরা বলেন না। এমনকি নাতি-নাতনিদেরকেও না। যদিও শুধু রাজনীতির মাঠে নয়, সেসময়ের পুর্ববঙ্গের প্রতিটা মুসলমান পরিবারের ঘরে ঘরে প্রত্যেক সদস্যের কাছে পাকিস্তান আন্দোলনে কোথায় কি হচ্ছে তা সকলের জীবনের আপন ঘটনাবলী হিসাবে লেগে ছিল। সেই প্রজন্মের এরা আজ বয়সের ভারে একে একে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রজন্ম শেষ হয়ে যাওয়ার আগে, আমরা তাদের অভিজ্ঞতাকে মানি আর নাই মানি, তাদের অভিজ্ঞতা একালে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে আমাদের ইতিহাস বয়ান শুরু হয় ১৯৫২ সাল থেকে। যেন এর আগে পুর্ববঙ্গে আমরা কেউ ছিলাম না। ভুঁইফোঁড়ের মতো ১৯৫২ সাল থেকে যেন আমাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এর আগে পাকিস্তান আন্দোলন বলে যেন কিছুই ঘটেনি। অথচ মানুষ তো ভুঁইফোঁড় নয়, হতে পারে না। অতীতের সবই ভালও নয় আবার সবই মন্দও নয়। এমন অতীতের উপরেই বর্তমান জন্মায়, দাঁড়িয়ে থাকে। আবার ফাউন্ডেশনাল কিছু বৈশিষ্ট্য থাকেই, যার ওপর বর্তমান খাড়া হয়ে থাকে। পাকিস্তান আন্দোলন তেমনই একটা কিছু। এটা ভীষণ আগ্রহ ও কৌতূহলের যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার নিজের পাকিস্তান আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। আমাদের সঙ্গে শেয়ার করছেন। এখানে নিচে সেসব নিয়ে কিছু অবজারভেশন ও মন্তব্য বলে এই লেখা শেষ করব।

এক. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাকিস্তান আন্দোলন ওন করছেন বা আপন বলে ধারণা দিচ্ছেন।
তিনি বলছেন, ‘ব্রিটিশ ভারতে আমাদের জন্ম, ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই, পাকিস্তান আন্দোলন দেখে বড় হচ্ছি। ফলে বেড়ে ওঠার মধ্যেই একটা রাজনীতি সচেতনতা ছিল।’ অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলন খারাপ কিছু ছিল না, যা তিনি সে সময় দেখেছেন এবং এখন স্মরণ করার মতো তা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। যদিও পরের প্রশ্নের জবাবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে নতুন গড়ে ওঠা মুসলমান মধ্যবিত্তের আকাঙ্খার বাহক হিসেবে দেখছেন। তার এ’কথাটা সত্য, তবে আংশিক ও খন্ডিত। খুব সম্ভবত তার কাছে যা ইমিডিয়েট বা চোখের সামনে, শুধু সেই শহুরে মধ্যবিত্তের কথাই তিনি এখানে ফোকাসে এনেছেন। কেন খন্ডিত বলছি?

আসলে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান এবং একনিষ্ঠ শক্ত সমর্থক ছিল গ্রামের কৃষক-প্রজা। সব সমাজে সব কালের রাজনীতিতে কোনো না কোনো একটা প্রধান বা মুখ্য স্বার্থ দ্বন্দ্ব থাকে। যাকে ঘিরে সমাজের বাকি সব স্বার্থ দ্বন্দ্বের সংঘাত আবর্তিত হয়, আকার নেয়, অ্যালায়েন্স করে। পাকিস্তান আন্দোলনের কালে সে সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল জমিদার-প্রজা; এমন প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে তা বিরাজিত ছিল পেছনের দেড়শ’ বছরের বেশি। কলকাতা কেন্দ্রিক বা কলকাতাগামী দৃশ্যমান মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান বা জন্ম ১৯০০ সালের পর থেকে। এরপরেই একমাত্র এর আগে থেকে চলে আসা গ্রামের কৃষক-প্রজার জমি পাওয়ার আন্দোলনের সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তের যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্স গঠিত হয় সেটাকেই আমরা অন্য ভাষায় পাকিস্তান আন্দোলন বলে চিনি। এই শ্রেণীমৈত্রীর রাজনৈতিক শক্তির বাহকের নাম মুসলিম লীগ। স্মরণ করিয়ে দেয়ার দরকার আছে যে, এটা ১৯৭১ সালের মুসলিম লীগ নয়। এমনকি এটা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরের সব ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কুক্ষিগত করে সাজানো দাপটে চাপা পড়া পূর্ব পাকিস্তান, এমন সময়কালের মুসলিম লীগের কথাও বলা হচ্ছে না। ১৯৪৭ সালের আগের কথা বলছি, যখন পূর্ববঙ্গের গ্রাম-শহরের এমন কোনো মুসলিম প্রজন্ম পাওয়া যাবে না যারা সেকালের মুসলিম লীগকে তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের সব আকাঙ্খার বাহক সংগঠন মনে না করত। তৎকালের জমিদারি উচ্ছেদের প্রধান এবং একমাত্র দাবিদার সংগঠন মুসলিম লীগ। এ অর্থে মুসলিম লীগ বিপ্লবী। পূর্ববঙ্গের চোখের মণি এই আন্দোলনের নাম “পাকিস্তান আন্দোলন”। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই স্মৃতির কথা বলছেন।

দুই. মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন
এটা খুবই ইন্টারেস্টিং যে, তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন। কথাটা বলছি এজন্য যে, ১৯৪৭ বা পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে ভারতের ঐতিহাসিকদের সাধারণ মূল্যায়ন বয়ান এবং অভিযোগ হলো এটা ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের আন্দোলন’, ‘জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব’ ইত্যাদি। অতএব মুসলিম লীগের এই রাজনীতি নেতিবাচক, ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ঘৃণিত। পূর্ববঙ্গের অনেক কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল এই বয়ান অনুমোদন করেন বা আপন মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলারিজম নিয়ে বই-পুস্তক, কলাম লিখে যিনি বিখ্যাত সেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তা আজও মনে করছেন না। পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন এটা নিঃসন্দেহে ইন্টারেস্টিং। অনেকের মনে হতে পারে, এটা তার হাতছুট বা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কথা। তাদের নিশ্চিত করার জন্য বলছি – না তা নয়। তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্নের লম্বা জবাবের শেষ প্যারায় তিনি আবার পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে আর একটু পরিষ্কার করে বলছেন, এটা ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’। বলছেন জিন্নাহর বক্তৃতার (১৯৪৮) প্রতিক্রিয়ায় “… এই সূত্রেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যাত্রা শুরু হলো।”

অর্থাৎ এখানে তার সার মূল্যায়ন হলো, পাকিস্তান আন্দোলন কোনো নেতিবাচক আন্দোলন তো নয়ই, কোনো ‘ঘৃণিত’ বা “সাম্প্রদায়িক” ধর্মভিত্তিক আন্দোলনও নয়; বরং জনগণের আকাঙ্খার ধারক, জনগণকে দেয়া এক প্রতিশ্রুতির আন্দোলন। তবে ১৯৪৮ সালের পর থেকে জিন্নাহর বক্তৃতায় এটা বিপথগামী বা বিচ্যুত হয়ে যায়।

তিন. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ সাক্ষাৎকারেও নিজে একটা প্রগতিশীল পজিশন নিচ্ছেন বলে মনে করছেন।
তিনি কোনো দলীয় কমিউনিস্ট সদস্য বলে আমার জানা নেই। তবে তিনি নিজেকে কমিউনিস্টদের প্রতি নেক আছে এমন ধারণার প্রগতিশীল বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, দেখেছি। চতুর্থ প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু মধ্যবিত্তেরই পার্টি আসলে। কমিউনিস্ট পার্টির এখানে প্রধান দুর্বলতা হলো, তারা কৃষকের কাছে যেতে পারেনি। এজন্য দেশে বিপ্লব হয়নি।”

এখানে আমরা দেখছি মূলত তার অভিযোগ দুইটাঃ ‘মধ্যবিত্তেরই পার্টি’ আর ‘তারা কৃষকের কাছে যেতে পারে নাই।’ খুবই মারাত্মক অভিযোগ, সন্দেহ নেই। তবে অভিযোগ অবশ্যই জেনুইন এজন্য যে, কমিউনিস্ট পার্টি কখনও ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এর পক্ষে কখনও কোনো অবস্থান নেয়নি। তবু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কমিউনিস্টদের প্রতি যথেষ্ট সিমপ্যাথিটিক। তাই সাতচল্লিশের পরের কথা বলছেন, ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রও কমিউনিস্টদের খুব অত্যাচার করতে শুরু করল।’ তার মতো অনেক কমিউনিস্ট বা একাদেমিসিয়ানরাও তাই মনে করে থাকেন যে, স্বাধীন পাকিস্তানেও কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এগুলো বাস্তব সত্য কিন্তু সবটা সত্যি না এবং একপেশে। সেকালের এবং একালের আমাদের অনেকে মনে করতে পারেন, আয়ুব খানই পাকিস্তানে প্রথম ক্যু করেন। এ কথাটাও সঠিক নয়। প্রথম ক্যু করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন কমিউনিস্টরা মার্চ ১৯৫১ সালে এবং তাতে ব্যর্থ হলে তাদের দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়, এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পর লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রীর আমলের ঘটনা। ইতিহাসের খাতিরে “রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র” নামে খ্যাত এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রসঙ্গ সামনে আনার দরকার আছে। ফলে একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সারা পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টরা ধর্মবিরোধী বলে অজুহাতে বা আমেরিকার প্ররোচনাতে নিষিদ্ধ ছিল না।

চার. “পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্র হবে এমনটা তারা চায় নাই”
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বক্তব্য পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ সম্পর্কে বহু অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে। পঞ্চম প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের এ গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন পেশ করছেন। আবার একদিকে স্বীকার করছেন, ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ধর্ম।’ কিন্তু এই পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে আবার শক্ত ন্যায্যতা নিজেই দিয়েছেন। বলছেন, “তারা একটা রাষ্ট্র (অর্থাৎ পাকিস্তান) চেয়েছে, যেখানে তারা মুক্ত হতে পারবে। তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছে। জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দু, চাকরি-বাকরিতে হিন্দু, ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু ওদের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য পাকিস্তান দরকার”।
তবু তাঁর এই শক্ত ন্যায্যতার প্রশংসা করার পরেও একটা ক্রিটিক্যাল সমালোচনার দিক মনে রাখার দরকার আছে। একথা সত্যি সেসময়ের সমাজ বলতে সেটা ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একচেটিয়া ক্ষমতা আধিপত্যের সমাজ। বিপরীতে মুসলমানদের অবস্থান হিন্দু জাত-বর্ণপ্রথায় নমশুদ্রেরও নীচে, এমনকি মুসলমানেরা বাঙালি বলেও কোন স্বীকৃতি ছিল না। এরপরেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেভাবে পরিস্থিতিটাকে হাজির করেছেন যে জমিদারগিরি, মহাজনগিরি, চাকরি-বাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ইত্যাদি সবকিছুতে হিন্দু প্রাধান্যে ছিল বলে পাকিস্তান আন্দোলন জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দুকে সরিয়ে মুসলমান জমিদার, মুসলমান মহাজন কায়েমের আন্দোলন ছিল না। ফলে কমিউনিষ্টদের মধ্যে যেমন সব কিছুকে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা থাকে এটা তা ছিল না। বরং খোদ জমিদার-প্রজা সম্পর্কটাই উতখাত, ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের দাবি এবং এক ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরে পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কমিটি বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধীনস্ত, উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে পড়ে একথা সত্য। ফলে অচিরেই (১৯৪৯) আওয়ামি মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। কিন্তু সেজন্য পাকিস্তান আন্দোলনের বিখ্যাত অর্জন ১৯৫১ সালের ১৫ মে জমিদারি উচ্ছেদ আইন (THE STATE ACQUISITION AND TENANCY ACT, 1950) পাশ করা সবচেয়ে বিপ্লবী ঐতিহাসিক ঘটনা। একে খাটো করতে পারি না। আজও স্বাধীন বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে আমাদের জন্য এটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ফলে এটা হিন্দু জমিদারের জায়গায় মুসলমান জমিদার বসানোর আন্দোলন ছিল না। এই তাতপর্য যেন আমাদের চোখ না এড়ায়।

পাঁচঃ “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”
এতক্ষণ রাষ্ট্র আলোচনায় ধারণাটাকে তিনি ‘আধুনিক রাষ্ট্র বনাম ধর্ম রাষ্ট্রের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু এবার ষষ্ঠ প্রশ্নে এসে ‘পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ বলে এক নতুন ধারণা আমদানি করেছেন। তিনি বলছেন, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”। ‘নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ এ কথার একটাই অর্থ হতে পারে যে, নিপীড়ন বলতে তিনি শ্রেণী বা অর্থনীতিবিষয়ক নিপীড়নের কথা বলছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক ছাড়াও ভিন্ন ধরণের নিপীড়ন হতে পারে। যেমন জাতিগত নিপীড়ন বলতে মুখ্যত তা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনাই বোঝায়।
তবে এর চেয়েও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক মারাত্মক মন্তব্য এখানে আছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বিষয়ে। তিনি ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় দাবি করে বলছেন, ‘পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্র নেই। এখানে (বাংলাদেশ) একটা জাতিপ্রধান আছে বটে, কিন্তু অন্য জাতিগোষ্ঠীও আছে।’ তার কথা হয়তো সঠিক। তবে ইংরেজি শব্দ ‘রেস’ ও ‘নেশন’ ধারণার বিভ্রান্তি থেকে এসবের ভুল ধারণার উৎপত্তি। তিনিও এই বিভ্রান্তি নতুন করে ছড়ালেন। মুল সমস্যা হল, ‘রেস’ ও ‘নেশন’ দুইটি শব্দকেই বাংলায় ‘জাতি’ অনুবাদ করে সে বিভ্রান্তিকে আরও উসকে দেয়া হয়েছে। ফলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব বিভ্রান্তির বাইরে এমন দাবি করা যাচ্ছে না। যেমন তিনি বলছেন, ‘রাষ্ট্র এবং জাতি এক না। একটা রাষ্ট্রে একাধিক জাতি থাকতে পারে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, আর ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’। এর প্রথম দুই ছোট বাক্য হয়ত সঠিক। কিন্তু “জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ” এ কথাটা তিনি যথেষ্ট ভেবে বলেছেন বলে মনে হয় না। কারণ এ বাক্যটাও ‘রেস‘ ও ‘নেশন’ বিষয়ক বিভ্রান্তির বাইরে নয়। রেস অর্থে ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, কথাটা সঠিক। কিন্তু নেশন কথাটার বেলায় “নেশন অর্থে জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, এই কথাটা সঠিক নয়। ‘নেশন’ অবশ্যই পলিটিক্যাল ক্যাটাগরি। রাজনৈতিকভাবে কনস্ট্রাকটেড বর্গ ও ধারণা। রেস ধারণার মতো তা প্রাকৃতিক বা ‘নৃতাত্ত্বিক বর্গ’ নয়, বরং রাজনৈতিক বর্গ।
তবে হয়তো এটা বলা যায় যে, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা অপ্রতুল ও অস্পষ্টই শুধু নয়, বেকুবি এবং অনিবার্যভাবেই তা বর্ণবাদিতায় ঢলে পড়বেই, এমন ধারণা।
এই প্রসঙ্গটা শেষ করার আগে, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের…” প্রসঙ্গে –
বাংলাদেশে পাহাড়িদের ওপর বাঙালি রাষ্ট্রের নিপীড়ন, এটা কি ‘পুজিবাদী রাষ্ট্রের’ কারণে ঘটছে? আমরা কি তাই বলতে পারি না এগুলো অর্থহীন কথাবার্তা হবে? আসলে এসব ‘শ্রেণী বিলাসী’ চিন্তা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। অনেক হয়েছে। তবে তার শেষ বাক্য, তাই, “জাতিরাষ্ট্র নয়, আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” – এ কথা বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা কখনও মানবে না। বোঝা যাচ্ছে, শেষ বয়সে এসে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে হাত ছেড়ে দিতে চাইছেন। প্রসঙ্গটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, এ স্বল্প পরিসরের বাইরে সময় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ তুলতে হবে।

ছয়ঃ “হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব”
গত ২০১৩ থেকে শাহবাগ অন্দোলন সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিছু সাহসী মন্তব্য করেছেন। সাধারণ কমিউনিষ্টদের থেকে ব্যাতিক্রমী মন্তব্য করেছেন তিনি। বলেছেন, “শাহবাগ আন্দোলন পর্বে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে আমার কাছে বড় দিক মনে হয়েছে শ্রেণী পরিচয়। শ্রেণী-বিভাজনটাই সেখানে ছিল প্রধান ইস্যু। হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব। গ্রামে মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়ছে তারা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত। আমরা এখানে যারা পড়ছি তারা সুবিধাপ্রাপ্ত। এখানে দূরত্ব আছে। গণজাগরণ মঞ্চে তুমি কিন্তু শ্রমজীবীকে টানতে পারছ না। যে রিকশাঅলা তোমাকে ওখানে পৌছে দিয়ে যায় সে কিন্তু মঞ্চে যাচ্ছে না। রাস্তায় যেসব শ্রমিকরা আছে তারাও কিন্তু আসছে না। এমনকি তোমরা ভদ্রলোকরা যে সভা করছে সে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। যে ওটা বড়লোকদের ব্যাপার, নাচানাচি করতেছে, গান বাজনা করতেছে। শ্রেণীর সমস্যাটাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না”। তাঁর কথায় হয়ত পয়েন্ট আছে কিন্তু কোন কমিউনিষ্ট এমনকি “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ” করার সুযোগ হিসাবে যারা “শাহবাগকে” দেখেছেন, নিয়মিত সাময়িকী বের করেছেন, টক শোতে কমিউনিষ্ট হয়েও লীগ ও সরকারের পক্ষে সাফাই, তত্ত্ব দিয়েছেন এমন কাউকেই এমন অবস্থান নিতে দেখা যায় নাই। সে হিসাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এমন মন্তব্য সাহসী ও ব্যতিক্রমী অবশ্যই।

সাতঃ “আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা”
কোন রাখঢাক না রেখে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদ আছে, কিন্তু তার এখন আর দেওয়ার কিছু নাই। আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা। আমাদের চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ যে শুকিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কি জাতীয়তাবাদীরা কথা বলছে? হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কি তারা কথা বলছে? নরেন্দ্র মোদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। পাকিস্তানের কেউ যদি উর্দুতে বক্তৃতা দিত আমরা মানতাম? অথচ মোদিকে আমরা হাততালি দিলাম। জাতীয়তাবাদের কথা বললে। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান তো ভাষা”।
এটা খুবই তাতপর্যপুর্ণ যে “প্রগতিশীল” আশি বছরের তরুণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সরাসরি ভারতের বাংলাদেশ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ এখনও অনেক কমিউনিষ্টকে আমরা পাই যারা এমন সমালোচনাকে “সাম্প্রদায়িক” হিন্দু বিরোধীতার কাজ মনে করেন। এর আগেই কখনও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে “চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ” নিয়ে কথা বলতে শুনেছি বলে মনে করতে পারলাম না। তাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাই সকলকে সাহস যোগানোর জন্য। মনে হচ্ছে টেক্কা কে টেক্কা বলতে চাইছেন তিনি। আপাতত সবাইকে এর তাতপর্য অনুধাবণ করতে বলব।

[লেখাটা এর আগে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল গত ২৭ জুলাই ২০১৫ তারিখে। এখানে পরিপুর্ণভাবে আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

[কোন ব্যাপার নজরে আনতে বা লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে goutamdas1958@hotmail.com এই ঠিকানায় মেল করতে পারেন।]