ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sc

 

 

আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়

লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

Advertisements

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

গৌতম দাস

২৬ এপ্রিল ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2eM

 

Trump and Xi get down to talks in Mar-a-Lago. Photo: AFP

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি, গত ৬-৭ এপ্রিল ছিল বহু প্রতীক্ষিত তাদের প্রথম সামিট বা শীর্ষ প্রধানদ্বয়ের সাক্ষাৎ। ট্রাম্পের সাথে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়েছিল ফ্লোরিডা স্টেটে ট্রাম্পের আবাসে, পাল্ম বিচ শহরে  মার-আ-লাগো এস্টেটে। [Trump’s Mar-a-Lago estate in Palm Beach, Florida]। এই সফর সবার খুব মনোযোগের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কারণ নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প নিয়মিত চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝড় তুলে যাচ্ছিলেন যে, চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখে নিজের পক্ষে মার্কিন বাজার ধরে রাখছে, চীন পরিবেশবাদীদের পক্ষে গিয়ে তাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ক্ষেপিয়ে তুলছে ইত্যাদি। সেই চীন এরই শীর্ষ ব্যক্তির সাথে খোদ ট্রাম্পের বৈঠক হতে যাচ্ছিল তাই স্বভাবতই এটা সবার মনোযোগের কারণ। এছাড়া  আমেরিকা আর চীন এই  রাষ্ট্র-জোড়ার অর্থ তাতপর্য হল, প্রথমটা এখনও দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হয়ে আছে তবে হারিয়ে যাচ্ছে, আর দ্বিতীয়টা সে জায়গা নিতে উঠে আসছে। তবে ঐ সাক্ষাত থেকে এটা সবার জন্য আরও বড় মনোযোগের কারণ হয়ে যায় আরও অন্য কিছু কারণে। ঐ সাক্ষাতে বড় ইস্যু ছিল মূলত পাঁচটা। চীনের সাথে আমেরিকার ১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দেনা-পাওনার ঝগড়া নরম করা, ২. তাইওয়ান ইস্যু বা একচীন নীতির পক্ষে অবস্থান স্থায়ী করে জানানো, ‘৩. সাউথ চায়না সি’ দ্বীপ বিতর্ক অন্তত থিতু করা, ৪. চীন মুদ্রা ম্যানিপুলেটর না (নিজ মুদ্রামানের কারসাজি করে না) [চীনা মুদ্রা ইউয়ানের গড় মান, নিচে ফুট নোটে দেখুন, ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে ], ফলে আমেরিকার সে অভিযোগ প্রত্যাহার করেছে জানানো, আর উত্তর কোরিয়া ইস্যু সামলানো। এসবের মধ্যে প্রথমটা আর শেষেরটা মুখ্য। বাকিগুলো বর্তমানে দুর্বল হয়ে গেছে অথবা আধা মিটে গেছে এমন।
প্রথম ইস্যুর ক্ষেত্রে  – চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে,অথবা চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখেছে –  ট্রাম্প প্রশাসন এগুলা তার অভিযোগ বলে হাজির করে আসছিল। কিন্তু সমাধানে ঠিক কী চায়, দাবি কী সুনির্দিষ্ট করে তা জানে না বা বলতে পারছিল না।  হোমওয়ার্কে সে দুর্বলতা ছিল। কেবল ‘ট্যাক্স বসাবে’ ইত্যাদি বলে ট্রেড ওয়্যার বা বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দিত। অথচ এমনকি ওবামার দ্বিতীয় টার্মে নির্বাচনের আগে ২০১২ সালেও, একই পথ নিয়েছিলেন। কিন্তু টিকাতে পারেননি, বুমেরাং প্রভাব পড়েছিল তাই। অথচ বিপরীতে চীনের দিকে, তাদের বড় হোমওয়ার্ক করে আসা করিতকর্মা লোকজন ছিল। আর বাস্তবতা সম্পর্কে চীন সরকারের স্পষ্ট মূল্যায়ন তার ছিল। ফলে আমেরিকাকে সে কী দিতে চায়, কেন দিতে চায়, কতটুকু দিতে হবে পারবে ইত্যাদি সব বিষয়ে সে নিজে পরিষ্কার ছিল। তাই আমেরিকার নাকি কান্না বন্ধ করিয়ে কাজের টেবিলে নিয়ে বসিয়ে যখন কী কী চীন দিবে, সে ঝাঁপি মেলে ধরল তাতে ট্রাম্পসহ তার দল বেজার হয়ে থাকার বদলে অভিভূত হয়ে যায়। চীনের এমন আচরণের মূল কারণ আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে ঠিক মেরে ফেলা – এটা চীনা-স্বার্থ নয়। চীনের কাছে আমেরিকা এখনও এক বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ক এখনও বড় বিনিয়োগ-দাতার। আমেরিকান উতপাদক ও বাজারজাতকারী কোম্পানী চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি খলে সে পণ্য নিজে দেশে বাজারে বিক্রি করে। কখনও চীনা উতপাদক স্রেফ কেবল কমিশন মার্জিন ধার্যকারি উতপাদক, বাকী সবকিছু আমেরিকান কোম্পানীর।  আমেরিকা চীনের কাছে কেন  প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপুর্ণ সে সম্পর্কে চীনা মূল্যায়ন এটাই। এ জন্য এই সামিট আয়োজনের বহু আগে থেকেই চীনা প্রেসিডেন্ট বলে যাচ্ছিলেন, আমেরিকা ও চীনের ভাগ্য একসুতায় গাঁথা। ট্রাম্প যেন সে দিকটার গুরুত্ব আমল করে আর নাকি-কান্না শুরু না করে কথা বলেন। গত ৩৩ বছর চীন বিষয়ক অর্থনৈতিক নানা পলিসি-নীতি নিয়ে একাদেমিক কাজে জড়িয়ে আছেন কানাডার এমন এক অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে  অধ্যাপক কেন মোক (KEN MOAK), বর্তমানে সিঙ্গাপুরের এশিয়ান টাইমসে লিখেন; তার ভাষায় বললে,  ‘ট্রাম্পের এই ইউটার্ন এক বিরাট কাজের কাজ হয়েছে’। এ যেন নিজাম ডাকাতের সাধু হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। কারণ ট্রাম্প মন্তব্য করে বসেছেন, “প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে”।

আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে প্রথম বৈঠক নির্ধারিত ছিল ১৫ মিনিটের; সেটা বর্ধিত হয়ে গিয়ে ঠেকে ৩ ঘণ্টায়।’ এ এক বিরাট ওলট-পালট ঘটনা। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প নিজেই আমাদের আরো জানাচ্ছেন, ‘সাক্ষাতের দ্বিতীয় দিনে আর এক সভা ছিল মাত্র ১০ মিনিটের যেটা ২ ঘণ্টা ধরে চলেছিল’। ট্রাম্পের ভাষায় …‘আসলে আমাদের দু’জনের রসায়নটা জমে গিয়েছে’। অর্থাৎ তিনি যে শুধু বিগলিত হয়ে গিয়েছিলেন তাই নয়। সেটা আবার তিনি সবার কাছে প্রকাশ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
খুব সম্ভবত চীন-আমেরিকা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক ইস্যুতে আলাপের ‘রসায়ন যতই জমে যায়’, ততই উত্তর কোরিয়া বিষয়ে চীনের ভূমিকা আছে, চীনের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে ট্রাম্পের আশা আকাঙ্খা আরো বড় হয়ে যায়। সেটা এতই বড় হয়ে যায় যে, প্রেসিডেন্ট শি ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের অতিথি থাকা অবস্থায় ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর বোমা হামলা করে বসেন; সিরিয়া কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করছে – এই অভিযোগে। দু’দিন পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন এই হামলার আরও একটা কারণ বলছেন। বলছেন, উত্তর কোরিয়াকে শিক্ষা দিতে আর একটা মেসেজ দিতেও এই বোমা হামলা করা হয়েছিল। এ ছাড়া এরপর ট্রাম্প নিয়মিত এই প্রসঙ্গে নানান কথা বলে চলেছেন। যেমন টুইট করে বলছেন, ‘চীনা প্রেসিডেন্টকে ব্যাখ্যা করে বলেছি, উত্তর কোরিয়া সমস্যাটা তারা (চীন) মিটিয়ে দিতে পারলে আমরা অনেক ভালো এক বাণিজ্য সম্পর্ক করতে পারতাম’।

ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র (WMD) আছে- এই মিথ্যা অজুহাতে ২০০৩ সালে বুশ-ব্লেয়ার ইরাকে হামলা করেছিল। অতীতে (১৯৫০-৩ সালে) ঠিক একই রকম ‘কোরিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানো’ এই অজুহাতে পঞ্চাশের দশকে শুরুতে আমেরিকা কোরিয়ায় হামলা করেছিল। কিন্তু সে যুদ্ধ কোন জয়-পরাজয়ের লড়াই দিয়ে মীমাংসা হয়নি। বরং কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি টানা হয়েছিল। আমেরিকা পালিয়ে বেঁচেছিল। আর ওই ঘটনার লেজ ধরে পরে ভিয়েতনামকেও আমেরিকা হামলা ও দুভাগ করেছিল। যেটা ১৯৭৫ সালে একক ভিয়েতনামের স্বাধীনতায় সমাপ্ত হয়েছিল। আর কোরিয়ার বেলায়, কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি ওই অঞ্চলে তখনকার মত যুদ্ধ থামাতে পারলেও যুদ্ধের টেনশন সেই থেকে এখন পর্যন্ত কখনই মিটানো যায়নি। বরং সেই থেকে আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে স্থায়ী সেনাঘাঁটি করে বসে যায়। এর পালটা হিসেবে, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজেকে সুরক্ষা করতে গিয়ে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ করে ফেললে ঐ অঞ্চলের ভারসাম্য বদলে পরিস্থিতি সেই থেকে আরো জটিল হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে একালে চীনের সমাধান প্রস্তাব হল,ওই অঞ্চলের সবাইকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যেতে হবে। আর আমেরিকান এখনকার প্রস্তাবের মূল কথা হল, বলপ্রয়োগে কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র-ছাড়া করানো সম্ভব।’ এটা সম্ভবত মুখে বলা কথা। কিন্তু মনে মনে চায় চীন উত্তর কোরিয়াকে আমেরিকার সাথে টেবিলে আলোচনায় এনে বসিয়ে দেক। একটা রফা হোক।  ট্রাম্পের কথায় সে ইঙ্গিতও আছে যদিও। ফলে চীন-আমেরিকার উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে নীতির মূল ফারাক হল – চীন কোরিয়াকে টেবিলে ডেকে আনবে, আমেরিকাসহ সকলে বল প্রয়োগের পথ ছেড়ে সবাই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যাবে। নাকি আমেরিকা বোমা মারতে যাবে – এই হলো মূল তর্ক।

এখনকার এই সময় উত্তর কোরিয়া সুনির্দিষ্ট করে ইস্যু হয়ে উঠার পিছনের মূল কারণ অবশ্য আলাদা। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপান  উত্তর কোরিয়ার হামলার আয়ত্ত-সীমার ভেতর বহুদিন থেকেই আছে। তা থাকলেও খোদ আমেরিকা থেকে গেছে উত্তর কোরিয়ার নাগাল-সীমার বাইরে অনেক দূরে অন্য মহাদেশে। ফলে উত্তর কোরিয়ার  খায়েশ হামলার জন্য  আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল জোগাড় করা। সে বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সফলতা উত্তর কোরিয়া নাকি পেতে চেষ্টা করছে, কিছু একটা পেয়েছে যা এখন পরীক্ষা করতে পারে, দেখতে চায় – এমন জল্পনা কল্পনার তথ্য এই হলো এখনকার টেনশনের উৎস। অবশ্য অনেকে এমন তত্ত্ব দিচ্ছেন যে, এটা আসলে  ট্রাম্পের আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে জড়ানোর খায়েস বা উছিলা। একটা যুদ্ধ লাগিয়ে নিজ অর্থনীতির দশা ফিরানোর আকাঙ্খা ট্রাম্পের নাকি আছে। এসব ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ সত্য-মিথ্যা যাই হোক, নিউ ইয়র্ক টাইমস অন্য এক তথ্য জানিয়ে লিখছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর সঙ্গের এই সফরে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে কিছু একটা সমঝোতা হয়েছে, যেটা আস্তে ধীরে সামনে আসবে। [the Chinese have agreed to crack down on their second-tier banks that have helped finance the North’s trade.] অনুমিত এই খবর সত্যতা স্বীকার-অস্বীকার কোনটাই কেউ করে নাই। তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর ট্রাম্প সাক্ষাতের মাত্র দশদিনের মাথায় ইতোমধ্যেই দুবার তাদের দুজনের ফোনালাপ হয়েছে।

তবে কার্যত ও বাস্তবে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হল, স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে প্রয়োজন হয় বিশেষ গুণসম্পন্ন এক কয়লা, সে কয়লার খনি উত্তর কোরিয়ার আছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এর বড় ব্যবহারকারী। এমন কয়লাভর্তি প্রায় ১০টা জাহাজ চীনা বন্দর থেকে ফেরত দেয়া হয়েছে এবং উত্তর কোরিয়ায় তা ফিরিয়ে এনেছে। বার্তা সংস্থা রয়টারের জাহাজ চলাচলবিষয়ক বিশেষ স্যাটেলাইট মনিটরিং সার্ভিস এই তথ্য দিয়েছে। অর্থাৎ চীন উত্তর কোরিয়া থেকে এই কয়লা আমদানি এবার প্রথম বন্ধ করল। যদিও এ সম্পর্কে কোন কিছুই সাংবাদিকদের প্রশ্নে্র জবাবে  চীন এখনও কিছু জানায় নাই। এছাড়া  কিছুদিন আগে জাতিসঙ্ঘের উত্তর কোরিয়া বিরোধী অর্থনৈতিক অবরোধের সিদ্ধান্তের পক্ষে চীন অবস্থান জানিয়েছিল; বলে সেই থেকে উত্তর কোরিয়ার সাথে চীনের সম্পর্ক ঝুলেই আছে। অর্থাৎ যেটা অনুমানের তা হল, উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকরভাবে প্রয়োগে জন্য  চীনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে  আমেরিকার ট্রাম্প।

ওদিকে উত্তর কোরিয়ার শাসকের অবস্থান হল, পরিস্থিতি কোনো আলোচনার টেবিল পর্যন্ত গেলেও শর্তসাপেক্ষে তা কেবল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের চুক্তি টুক্তির মধ্যেই সবকিছু যেন সীমাবদ্ধ থাকে। অনুষঙ্গীভাবে কোনো পণ্অয বিনিময়, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক সবার সাথে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে, তা সে একেবারেই চায় না। কারণ সে ক্ষেত্রে তার সরকার চিরতরে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আবার চলতি পরিস্থিতিতে আমেরিকার জন্য এর নেতিবাচক দিকটা হল, সে দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের প্রতিরক্ষা-দাতা হলেও (এই দুই দেশেই আমেরিকার সেনাঘাঁটি আছে) এই দেশ দুটার কেউ আমেরিকার সাথে মিলে যুদ্ধে শামিল হতে রাজি নয়। এককথায় বললে,আমেরিকা ছাড়া ঐ অঞ্চলের কেউই যুদ্ধের পথে যেতে আগ্রহী নয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন  প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আসন্ন। তাই সব প্রার্থীই দাবি জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতামত না নিয়ে যেন আমেরিকা কোনো যুদ্ধ ঘোষণা না করে বসে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি আরো একটু খোলাখুলি। তিনি বলছেন, ‘ছোড়া গুলির প্রতিটার ঐতিহাসিক দায়দায়িত্ব ক্ষয়ক্ষতি ও শাস্তির কথা মনে রেখে যেন সবাই আচরণ করে’।  [they must shoulder that historical culpability and pay the corresponding price for this,”]  চীনা হুশিয়ারির মূল কথা হল, এরকম উত্তেজনার মধ্যে দীর্ঘ সময় বসবাস করার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়া কোন ভুলবশত “(accidental conflict)’ সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। চীন এদিকটা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।  বিশেষ করে চীন মনে করে ‘উত্তর কোরিয়ার সাথে আবার অস্ত্র কর্মসূচিতে নিগোসিয়েশন হতে পারে বলে চীন আস্থা রাখে এখনও’। কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চল কী এ যাত্রায় যুদ্ধ এড়াতে পারবে, সে উদ্বিগ্নতায় এশিয়ার সবাই। যুদ্ধ মানে এশিয়ায় উদীয়মান অর্থনীতিতে যার যেটুকু অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি হয়ে আছে তা ধুলিস্যাত হয়ে যাওয়া। ফলে মাথা গরম নয়, নিগোশিয়েশন।

সর্বশেষ হল, ট্রাম্প আমেরিকার সিনেটের সকলকে কংগ্রেসে ডেকেছেন, যৌথভাবে সকলকে উত্তর কোরিয়া বিষয়ে প্রেসিডেন্টের বিফ্রিং জানানোর জন্য।  স্বভাবতই ট্রাম্পের এই  সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়ায় আমেরিকার হামলা আসন্ন – এমন জল্পনা-কল্পনাকেই আরও বাড়িয়ে তুলল।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ২৩ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন আপডেট ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

ফুট নোটঃ চীনা মুদ্রার নাম ইউয়ান (RMB) । এক আমেরিকান ডলার=৬.৮৮ ইউয়ান। [অর্থাৎ এক ইউয়ান মানে আমাদের প্রায় ১২ টাকা।]  ঐতিহাসিকভাবে গত ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে, ডলার-ইউয়ান এর মান সবচেয়ে বেশি ছিল ১৯৯৪ সালে ৮.৭৩ ইউয়ান, আর সর্বনিম্ন ১৯৮১ সালে ১.৫৩ ইউয়ান। 

Historically, the Chinese Yuan reached an all time high of 8.73 in January of 1994 and a record low of 1.53 in January of 1981.

ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” এর ভিতর বাংলাদেশী টুপি

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর ভিতরে বাংলাদেশী টুপি

গৌতম দাস

২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cx

 

 

 

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ম মোতাবেক গত ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। শপথ নেয়ার দিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে দাঙ্গাহাঙ্গামা প্রতিবাদ বিক্ষোভ যেমন হয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের শপথের সব আনুষ্ঠানিকতাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্বভার বুঝে নেয়ার জন্য গঠিত ট্রাম্পের দলবল গত দুই মাসে তাদের সব কাজের মধ্যে একধরনের প্রতিহিংসা মাখানো পদক্ষেপের চিহ্ন রেখেছে। সেই সাথে প্রবল চাপাবাজি, আর প্রপাগান্ডায় সব কাজে “আমরাই শ্রেষ্ট, আমরাই একমাত্র” ধরনের লোক-দেখানো কর্মতৎপরতায় ভরপুর। সেসব আচরণ শপথ নেয়ার সময় পর্যন্ত বজায় ছিল। এমনকি ট্রাম্পের প্রশাসনের হবু উপদেষ্টারা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) যাদেরকে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন কিন্তু সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন, তারাও সিনেটের শুনানিতে প্রশ্নের জবাবের সময়ও একই প্রপাগান্ডা, চাপাবাজি আর জনপ্রিয়তাবাদি ভাষায় কথা বলা চালিয়ে গেছেন। যেমন ট্রাম্পের হবু পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হলেন শীর্ষ তেল কোম্পানী Exxon Mobil Corp এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী রেক্স টিলারসন। তিনি সিনেটের শুনানি চাপাবাজি হুঙ্কার দিয়ে বলছেন সাগরপথে  চীনের প্রবেশপথ “দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না”। কিন্তু কিভাবে তিনি এই আওয়াজ বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে তিনি বা ট্রাম্পের মুখপাত্ররা কেউ আর মুখ খুলতে নারাজ। ওদিকে এসব ছাড়া ট্রাম্পসহ সবাই এমন একটা ভাব বজায় রেখে কথা বলে গেছেন, যেন ট্রাম্পের আগে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট নির্বিশেষে ওবামাসহ যত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ছিলেন এরা স্কলে ছিলেন এক একজন বিদেশি শোষক, বিদেশীদের স্বার্থের প্রতীক। বিশেষ করে ওবামা হল ট্রাম্পের বিশেষ টার্গেট। তাই শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতার শুরুতেই ট্রাম্প বলছেন, “আজকের এই ক্ষমতা হস্তান্তর বিশেষ অর্থপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের এক ক্ষুদ্র অংশ রাজধানীতে বসে সব মাখন খেয়েছে। ওয়াশিংটন ঝলমল করে উঠেছে কিন্তু জনগণের সাথে তারা সম্পদ শেয়ার করেনি। রাজনীতিবিদরা উন্নতি করেছেন আর ওদিকে চাকরি হারিয়ে গেছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা একদল আর একদলকে অথবা এক সরকার আর এক সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিন নয়। আজ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার দিন”। যেন ট্রাম্প হয়ে গেছেন শ্রমিকের দুঃখ বেচে সহানুভুতি জড়ো করা ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্ট নেতা। আর টাম্পের সবকথার শেষ কথা হল, “এখন ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে এসে গেছেন, ফলে সব ঠিক হয়ে যাবে”। এ কারণেই যেন তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও কর্মচারীরা যেন খুবই দ্রুত বিদায় নেন, পারলে ওবামা চলে যাওয়ার পরপরই আর তাদের কাউকে দেখা না যায়। তিনি ইঙ্গিত দিতে চান যেন, এরা সবাই গণস্বার্থবিরোধী তৎপরতার প্রতীক । । ট্রাম্পের এই বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে ব্রিটিশ কলোনি আমলে নেটিভ কোনো নেতা বক্তৃতা দিচ্ছে যেখানে ওবামা যেন লর্ড ক্লাইভ। আর ট্রাম্প হলেন জনদরদি একমাত্র দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী।

এগুলো নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি রকমের লোকরঞ্জন ততপরতা। ট্রাম্প আর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওবামা আমলের যত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিশেষ করে যারা পেশাদার কূটনীতিক নন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল যেন তারা ২০ জানুয়ারির আগেই বিদেশে চাকরির দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এই নির্দেশনা প্রতিহিংসার উদাহরণ। এই রাষ্ট্রদূতেরা এক-দুই মাস অথবা অন্তত দুই সপ্তাহ স্বপদে বেশি থেকে গেলে তাতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকার প্রশাসনিক রেওয়াজও এটাই। অর্থাৎ রেওয়াজ ভাঙার অপ্রয়োজনীয় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইঙ্গিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যে- ওবামাসহ পুরনো রাজনীতিবিদেরা সব বিদেশী চর। তাই তাদের ছায়া যেন ট্রাম্পের ওপর না পড়ে। এ নিয়ে অনেক কার্টুন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প একটা বড় খেলনা রঙের পিচকারি বন্দুক নিয়ে ওবামার অফিসে ঢুকে ওবামাসহ সবাইকে তাড়া করছেন, রঙ ছিটাচ্ছেন আর বলছেন অফিস থেকে বের হয়ে যেতে।
এখানে ট্রাম্পের বক্তৃতা থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক অংশ হুবহু অনুবাদ হাজির করব যেখানে ট্রাম্পের সস্তা জাতিবাদী বুঝ এবং সুড়সুড়ি কত ভয়ানক হতে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে, এ’থেকে। ট্রাম্প বলছেন, “বহু যুগ ধরে আমরা আমেরিকান শিল্পের ঘাড়ে চড়ে বিদেশী শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি। অন্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়ে পালছি আর আমাদের বাহিনী শুকিয়ে মেরেছি। বিদেশী অবকাঠামোর পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছি আর আমেরিকার বেলায় সেগুলো রিপেয়ার না করায় ক্ষয়ে গেছে। আমরা অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করেছি অথচ তা করতে গিয়ে নিজেদের সম্পদ, সামর্থ্য, আস্থা সব লোপাট করেছি। একটা একটা করে আমাদের ফ্যাক্টরি ভেঙে পড়ছে, আমাদের উপকূল ছেড়ে গেছে আর আমাদের লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার ফেলে রেখে গেছে। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘর থেকে তাদের সব সম্পদ টেনে বের করে সাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দিন শেষ। এগুলো এখন অতীত। আমরা এখন শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকাব। আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি এবং এক ডিক্রি জারি করছি, যা দুনিয়ার সব রাজধানীতে প্রতিটা ক্ষমতার কেন্দ্রে শোনা যাবে। আজ থেকে এক নতুন স্বপ্ন আমাদের ভূমিকে শাসন করবে। এখন এই মুহূর্ত থেকে সবসময় “সবার আগে আমেরিকা, আমেরিকার স্বার্থ”। বাণিজ্য, ট্যাক্স, ইমিগ্রেশন, বিদেশনীতি ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তা আমেরিকার শ্রমিক ও আমেরিকান পরিবারের বেনিফিটের দিকে তাকিয়ে নেয়া হবে”।

এখানে তামাশার দিকটা হল, কমবেশি এই বক্তৃতাটাই এত দিন আমাদের মতো কম আয়ের বিভিন্ন রাষ্ট্রে জাতিবাদী বা কমিউনিস্টরা “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে দিয়ে এসেছে। আজ ট্রাম্প তা নিজ দেশের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে উগড়িয়েছেন।

আসলে ট্রাম্প নির্বাচনে দাঁড়ানোর শুরু থেকে পুরো ব্যাপারটাই এমন। যেমন, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল স্লোগান – “Making America Great Again” বা অনুবাদ করে বললে, “আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান বানাব”- এটাই সবচেয়ে বড় চাপাবাজি; অর্থহীন কথাবার্তা। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্পের শ্লোগান – এখানে যে গ্রেট বলা হয়েছে, এই গ্রেট মানে কী? কী হলে তা গ্রেট হবে, এর সংজ্ঞাই বা কী? যদি এ শব্দ দিয়ে সম্পদ বা সম্পদের দিক থেকে গ্রেট বোঝানো হয়ে থাকে তবে তিনি এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন, ‘১৯৮০ থেকে ২০১৪, মাত্র এই ৩৪ বছরেই আমেরিকার সম্পদ বেড়েছে ২১ গুণ। এর অর্থ আবার আমেরিকান ধনী মাত্র এক শতাংশ, এদের সম্পদের ১৯৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া। তার অর্থ আমেরিকা গ্রেট ছিল না, এ কথা তো সত্যি নয়। কিন্তু সে আর কত গ্রেট হবে! তাই ধরে নেয়া যায়, সম্পদের চেয়েও ভিন্ন, সম্পদ ছাড়িয়ে আরো বড় কিছুর দিক থেকে গ্রেট হওয়ার কথা ট্রাম্প বলছেন। তা হল, সম্পদের সঞ্চয় নয়, সম্পদের বিতরণ। ওই প্রফেসর বলছেন, এ কথা দিয়ে আসলে ব্যাখ্যা করা যায় ট্রাম্প কাদের পটিয়ে ভোট নিয়েছেন; কলেজ-না-পৌঁছানো যে শ্রমগোষ্ঠী আছে প্রকারান্তরে তাদের কথা বলছেন। যাদের কথা বলছেন তাদের বেলায় হয়ত  কথা ঠিক কিন্তু তাদের জন্য তিনি তা আনতে পারবেন না। কারণ বিষয়টা এত সহজ-সরল নয়।’
কোল্ড ওয়্যার যুগের সস্তা জাতিবাদী বুঝি। সব ধরনের আমদানি করা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করলেই সব কিছু আমেরিকায় উৎপাদন করা আবার শুরু হয়ে যাবে এটা বোকার মতো কথাবার্তা। যদি তা-ই হতো তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সত্তর দশকের মধ্যে, এর আগে সুন্দর দিন কাটানোর আমেরিকা ভেঙে গ্লোবালাইজেশনে যাওয়া হয়েছিল কেন? খামোখা? নিজের পায়ে কুড়াল মারার জন্য? আমেরিকা নিশ্চয় বাংলাদেশ নয়। ফলে কে এবং কী তাকে বাধ্য করেছিল? নাকি আসলে প্রলুব্ধ করেছিল?
আঙুর ফল মিঠা হলেও সময়ে তা হয় উল্টা, আঙুর ফল খাট্টা বলার সময় হয়ে যায় একটা সময়। আপনি অন্যকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেয়া মানে, সেও তার বাজারে অন্য পণ্যে আপনাকে প্রবেশে বাধা দেবে। আবার খুব সাবধান, এখানে বাজার বলতে শুধু ‘তৈরী ভোগ্যপণ্যের বাজার’ বুঝানো হয় নয়। ‘বাজার’ মানে আসলে বিনিয়োগপুঁজি, কাঁচামাল, টেকনোলজি, মেশিনারি, শ্রম ইত্যাদি সব কিছুরই বাজার। ‘বাজার’ মানে শুধু প্রান্তিক ভোগ্যপণ্য যা কনটেইনার জাহাজে ভরে আনা-নেয়া করে শুধু তা-ই নয়  – বরং সব কিছুই। এমনকি পুঁজি এবং শ্রমও। ফলে আমেরিকা শুধু সে তার নিজ দেশে বিদেশী পণ্য রফতানি হতে দেবে না, তা বাস্তবে করা সম্ভব নয়। কারণ যে দেশ পণ্য রফতানি করবে সে পুঁজিবিনিয়োগও করবে। এটা ঠেকানো যাবে না সবকিছুই করবে – এর ব্যতয় ঘটানো এক কথায় অসম্ভব। যেমন আমেরিকা সরকারের আয়-ব্যয়ের এক বড় উৎস সরকারি বন্ড। দেশি বা বিদেশিরা এই বন্ড কিনে। আজ যেখানে চীন ও জাপান প্রত্যেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি (চীনেরটা আরো বেশি) করে বন্ড কিনে রেখেছে, সেখানে পণ্য প্রবেশ বন্ধ করার যুদ্ধ কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?

তত্ত্ব দিয়ে এই প্রসঙ্গে আলোচনা অনেক করা যায়। দেখানো যায়, এটা কেন অসম্ভব। তবে এর চেয়ে বরং ট্রাম্পের শপথের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ট্রাম্পের সমর্থক তরুণ যারা নানান রাজ্য পেরিয়ে ট্রাম্পের ‘ভোট দেয়ার বিপ্লবে’ যোগ দিতে ওয়াশিংটনে এসেছিলেন তাদের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যাক। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ ট্রাম্পের নির্বাচনে নানা ইস্যুতে শুরু থেকেই সমালোচক। বিশেষ করে, ট্রাম্পের ভোটে জয়লাভের পর থেকে যেসব ক্যারিকেচারও স্ববিরোধিতা ফুটে বের হচ্ছে সেগুলো তুলে আনার ক্ষেত্রে। শপথ নেয়ার দিনে রয়টার্সের এমন এক নিউজ হল, ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ প্রচার অভিযান নিয়ে। ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ বা লাল টুপির ঘটনা হল, উগ্র জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণীর বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হয়েছে লাল টুপি পরে। রয়টার্স ওই তরুণদের টুপি খুলিয়ে দেখাচ্ছে যে, তাদের সব টুপিই বিদেশে তৈরি, হয় বাংলাদেশের, না হয় ভিয়েতনামের, না হয় চীনের। কেন? কারণ ট্রাম্পের টুপি প্রচারাভিযানের মূল প্রপাগান্ডা অফিসে যেসব টুপি বিক্রির জন্য রাখা ছিল ওগুলো খোদ আমেরিকায় তৈরি ফলে এর দাম বেশী, কমপক্ষে ত্রিশ ডলার বা তারও বেশি। কত বেশি? বিদেশী (বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা চীনের) টুপির  তুলনায় বেশি, বিদেশী ওই তিন দেশের টুপির দাম বিশ ডলার বা এর নিচে। ফলে স্বভাবতই ঐ প্রচারাভিযানে সবাই সস্তা নামে পাওয়া টুপি পড়েই এসেছে – বাজারের স্বভাব অনুসারে। অর্থাৎ আমেরিকার তৈরি টুপি নিজ সমর্থকেরাই কম পরেছে। এই হলো ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর তামাশা এবং পরিণতি।

মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের এই আমেরিকাই গত সত্তরের দশক থেকে দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশন যেতে বাধ্য করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক-আইএমএফ আমাদেরকে নিজ বাজারের রক্ষণশীলতা ছেড়ে গ্লোবালাইজেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাপাচাপির মাধ্যমে বাধ্য করে এসেছিল। আজ ট্রাম্প নিজেই গ্লোবালাইজেশন ছেড়ে উলটা সংরক্ষণবাদিতা বা প্রোটেকশনিজমে যাওয়ার কথা বলছেন।

আজ সোজা কথাটা হল, গ্লোবাল বাণিজ্য বেচাকেনা বিনিময়ের মাধ্যমে একটা পরস্পর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে গেছে এবং তা যে স্তরে যে জায়গায় চলে গেছে, এ থেকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কঠিন। চাল-ডাল মিশে গেলে যেমন এগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। ট্রাম্পের জয়লাভের পর গত দুমাসে গ্লোবাল অর্থনীতির সমন্বয় আর গ্লোবাল বাণিজ্যবিষয়ক দু’টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রথমটা ল্যাটিন আমেরিকার পেরুর লিমা শহরে ‘এপেক’ (বাণিজ্য) সম্মেলন। আর দ্বিতীয়টা সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন, যেটার অংশগ্রহণকারি গ্লোবাল। তবে দুটোতেই সুর পরিষ্কার, আমেরিকা সংরক্ষণবাদী হতে চাইলে তাকে পেছনে ফেলে বা উপায়ান্তে তার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও চীনের নেতৃত্বেই দুনিয়া গ্লোবালাইজেশনে এগিয়ে যাবে। যেতে হবে। জাপান ট্রাম্পের ওপর হতাশ হয়ে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক উষ্ণ হতে যাচ্ছে। দুনিয়া সাজানোর সব হিসাব নতুন করে সাজতে বাধ্য। আসলে বিষয়টা হল- গ্লোবাল বাজার নিজের শেয়ার বাড়ানোর, নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২২ জানুয়ারী ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে যেকোন যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

সাবধান, ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

সাবধান,  ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

গৌতম দাস
১৬ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-26g

গত সপ্তাহে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প । প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- এই দুই দলেরই (বাইপার্টিজান) এলিটরা মিলিতভাবে নিজ নিজ দলের কথা চিন্তা বাদ দিয়ে ‘ট্রাম্প ঠেকাও’-এর কাজে নেমে পড়েছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ০২ নভেম্বর  সিএনএন রিপোর্ট করেছিল ৩৭০ জন অর্থনীতিবিদ (যাদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়া অর্থনীতিবিদও আছেন), তারা সবাই এক বিবৃতিতে কেন ট্রাম্পকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না, তা জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের আগেই একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যে  ট্রাম্পের বোধ হয় আর কোনো সম্ভাবনা নেই; তাকে হারিয়ে হিলারিই জিতে যাইতেছেন। রয়টার্সের মতো মিডিয়া বলা শুরু করেছিল, হিলারি জিততেছেন এটা নাকি প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের জেতার আর যেন কোনো সম্ভাবনা নেই, চার দিকে সে কথাই কেবল প্রচার হচ্ছিল। কিন্তু ফলাফল এখন সবাই জানেন, মিডিয়ার সবার সব অনুমান সেখানে উল্টে গেছে।  তাহলে এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল কেন, আর প্রপাগান্ডার সব কিছু আসলে এক মিথ্যা ফানুস ছিল – এমনইবা শেষে প্রমাণ হলো কেন?

এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা সেই আমেরিকা যে এখনো গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, নির্ধারক রাষ্ট্র – যদিও এটা শেষযুগে যৌবন ঢলে পড়ার কালে। সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, তারই নির্বাচন এটি। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে একে প্রভাবিত করতে সরব মুখ খোলার কথা সমগ্র দুনিয়ার নানান স্বার্থের গোষ্ঠী-মানুষের। তবে মনে রাখতে হবে, সামগ্রিক দিক বিচারে বললে এই নির্বাচনে আসলে মোটা দাগে তিনটি পক্ষ ছিল। এক পক্ষ হল আমেরিকার বাইরের গ্লোবাল স্বার্থ-সুত্রে সম্পর্কিত মানুষ। অন্য দিকে যারা আমেরিকার ভেতরের, এদের মধ্যে আবার আরও দুই পক্ষ। এভাবে মোট তিনটা পক্ষ। মুল প্রসঙ্গটা আমেরিকান ভোটারের, ফলে এখানে ভেতরের মানে আমেরিকান নাগরিক যে ভোটার আর, বাইরের অ-নাগরিক মানে না-ভোটারের। ভেতরের মধ্যে মোটা দুই পক্ষের এক পক্ষ – এই দলে পড়বেন যারা আমেরিকাকে চালায় এমন বড়লোক, এলিট, নীতিনির্ধারক, ইন্টেলেক্ট, ওয়াল স্ট্রিটসহ ব্যবসায়ী জগৎ প্রভৃতি, যাদেরকে এখানে বলার সুবিধার্থে এখন থেকে একসাথে অভ্যন্তরীণ ‘এলিট’ বলে ডাকব। এলিট অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরের ‘আম-ভোটার’দের থেকে যারা আলাদা। এই এলিটরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ রাখেন। সাধারণ সময়ে আমেরিকার বাইরের অ-নাগরিক আর ভেতরের এই এলিট অংশ এরাই মূলত মিডিয়া দখল করে রাখেন, কেবল এদের বয়ানই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেটা একমাত্র নির্বাচনের সময়। এই সময় এই দুই কুতুবের বাইরে নিরব কুতুব যারা সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।  মিডিয়ার বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেরও ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ওদের বাইরেও তৃতীয় (অভ্যন্তরীণভাবে দেখলে দ্বিতীয়) পক্ষ, এঅংশটি হল ‘আম-ভোটার’। ভোটে এরাই নির্ধারক, প্রবল সংখ্যাধিক্যের কারণে। আর সবচেয়ে বড় এই অংশটাই  মিডিয়ার অগোচরেই থেকে যায়, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। অতএব ভোটের সময় এরা স্থানীয় মিডিয়ায় যদি থেকে যায় সেকথা বাইরে থেকে আমরা জানতে পারি না। এই ‘আম-ভোটার’ অংশটি সবচেয়ে বড় বলে ভোট দেয়া ও গণনায় সময় তাদের ভূমিকা নির্ধারক। অন্য যেকোনো গ্রুপের চেয়ে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর ভোটের সময়ের ঠিক এর উলটা দশা হল প্রথম দুই পক্ষের (বাইরের অনাগরিক আর ভেতরের এলিট)। কারণ এদের মধ্যে কেবল ভেতরের এলিটদের কিছু ভোট দেয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যটার ভোট নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকান নির্বাচনে একমাত্র নির্বাচনের সময়ই সবচেয়ে নির্ধারক হল – আম-ভোটার। অথচ আম-ভোটারদের চেয়ে যাদের ভোটই নেই অথবা ন্যূনতম কিছু ভোট আছে  এরাই নির্বাচনে পুরো মিডিয়া দখল করে রাখে এবং সেখানে কেবল তাদের স্বার্থের বা গ্লোবাল স্বার্থের কথা বয়ানগুলোকে মুখ্য করে রাখে। অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আম-ভোটারকে অ্যাড্রেস করতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা কী ভাষায়, কী চাতুরীতে বা কী কৌশলে কথা বলবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে এই আম-ভোটারের কাছে পৌঁছবে, প্রভাবিত করবে, এটা খুবই নির্ধারক। জিততে চাইলে প্রভাবিত করার সেই ভাষ্য অবশ্যই মিডিয়ার আমেরিকার বাইরের ও ভেতরের এলিটদের ভাষ্য থেকে ভিন্ন করাই হবে সহজ কৌশল। ট্রাম্প সম্ভবত তাই করেছেন। তিনি ব্যাপক আম-ভোটারের ভাষারপ্ত করে তাদের তাতিয়ে কথা বলেছেন। তার সেসব কথা মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের চোখে হয়তো অচল। তবুও তা পরোয়া না করে এই ভোটারদের জীবনধারায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি, চাওয়া-পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভোট চেয়ে কথা বলেছেন। কারণ মনে রাখতে হবে, আম-ভোটারদের কাছে তাদের নেতারা বিষয়ে তাদের মুখ্য বিবেচ্য একটাই – তা হল, সরকার তাদের জন্য অনেক কাজ আর ভাল বেতনের ব্যবস্থা করতে পারছেন কিনা, অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পেরেছেন কিনা ইত্যাদি। যদি পারেন আর তা পারতে গিয়ে অন্য দেশের তেল লুট করে নাকি মানুষ খুন করে সব সাফা করে এনেছেন এসব তাদের বিবেচনার কোন বিষয় হয় না। কারণ তারা জানে এলিটরা হার-হারামজাদা। এলিটরা একমাত্র নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের ধান্ধায় পরিচালিত। আর এটাই আম-ভোটারদেরকেও বিপরীত এক সংকীর্ণ স্বার্থের ভিতর দিয়ে নিজেদের দেখতে বাধ্য করে থাকে। ফলে ভিন দেশে গিয়ে আমেরিকান নেতা বা সরকার খারাপ বা অনৈতিক কী করছেন সে বিচারে বসার অবস্থায় তাঁরা থাকেন না। অন্তত নেতাদের আকামের বিচারে বসার চেয়ে বরং তাদের নিজের জন্য অনেক কাজ ও ভাল বেতনের বিষয় – এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যেমন ট্রাম্প কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বললেন; মেক্সিকো বা চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড বেরিয়ার (আমদানি বাণিজ্যে বাধার নীতি) ইত্যাদিতে কথা বলেছেন। সে বিষয়গুলো আম-ভোটাররা নিজের স্বার্থের দিক থেকে দেখবেন, গ্লোবাল মিডিয়ার দিক থেকে নয়। এ ছাড়া আরেকটা বিরাট দিক আছে – মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী শ্রমিক। অথবা রিফিউজি নামে প্রবাসী বা বিদেশী শ্রমিক। এটা এমন এক জিনিস, যখন অর্থনীতি ভাল চলে তখন সরকার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশী শ্রমিকও কাজের প্রাচুর্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে না। কোন সমস্যা দেখে না। বরং সুবিধার দিকটা দেখতে পায়। ফলে কে দেশের বাইরে থেকে এল, বিদেশী কিনা  তা তার কাছে বিবেচ্য হয় না। অর্থনীতি ভালো চললে, বাইরের শ্রম মানেই তুলনায় সস্তায় পাওয়া শ্রম, যে শ্রম তখন সবার দরকারও। তাই তা আদরণীয়। অথচ অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেলে ঠিক এর উল্টো। তখন মনে হয়, কালো বা বাদামি, বিদেশী বা মুসলমান সব খেদাও, এরাই নিয়ে গেল সব। জাতীয়তাবাদের জিগির উঠবে। এসব ক্রাইসিসের দিক খেয়াল রেখে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ট্রাম্প জেতার উপযুক্ত ভাষ্যটি সঠিক বানিয়েছিলেন। সেই ভাষায় কথা তুলে যিনি ভোট চাইবেন, স্বভাবতই তিনি সফল হবেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল শ্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” (make America Great again) – ’। আম-ভোটারদের আকৃষ্ট করার ভাষ্য হিসাবে, এটাই সঠিক শ্লোগান। শেষের ঐ ‘এগেইন’ শব্দটা গুরুত্বপুর্ণ। হৃত-গৌরব মনে করিয়ে দিয়ে সুরসুরি দেয়া। আন্তর্জাতিক দিক নয়, জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। আমরা ট্রাম্পের যত রকম কথা শুনেছি, সেগুলো আমরা আসলে ট্রাম্পের আম-ভোটারের চোখ দিয়ে না দেখে বরং ওর বাইরের অন্য দুই পক্ষের দিক থেকে দেখেছি। সমগ্র দুনিয়ার আমরা প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ স্থানীয় প্রেক্ষিত থেকে অথবা গ্লোবাল প্রেক্ষিতে। আমরা ভুলে গেছি, আমেরিকার বাইরের যারা, তারা যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তারা তো ভোটার নন। আর এটা তো আসলে কেবল ভোটেরই লড়াই। ফলে যারা বাইরের লোক বা সংখ্যায় ক্ষুদ্র দেশি-এলিট এদের নিন্দা-মন্দ কথা আমল করার কী আছে? কিছু নেই। নিন্দা-মন্দ আমল করলে তাতে ভোট সংখ্যা বাড়বে না।  ট্রাম্প এটা ঠিকই ধরেছেন। আর তাঁর জয়লাভের মূল কারণ সম্ভবত এখানে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আমেরিকার বাইরের অনাগরিক বা ভেতরের এলিট এসব স্বার্থ সন্তুষ্ট করে ভাষ্য তৈরি করে কোনো লাভ নেই। ভোটের বাক্সে এর কোনো প্রভাব নেই। তাই এ’দুই পক্ষের দিকে তাকিয়ে তিনি কথা বলেননি। দ্বিতীয়ত, একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল, হাতির দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবায়ও না, খায়ও না। চিবানোর দাঁত আলাদা। অথচ আমরা দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবানো দেখতে চাচ্ছি। ট্রাম্প ভোটে জিতে যাবার পর আমরা এখন চাচ্ছি ট্রাম্প যেন ভোট চাইবার ভাষাতেই তার হবু সরকারের নীতি সাজাক। আর তাতে আমরা যেন আরামে ট্রাম্পের গুষ্ঠি উদ্ধাস্র করতে পারি। আমরা ভোট পাওয়ার জন্য দেয়া পপুলার শ্লোগান (বা বয়ান) আর জিতে যাবার পর তা ‘হুবহু’ সরকারের নীতি-পলিসি করা যেন বাধ্যবাধকতা! অথচ দেখানো আর চিবানোর দাঁত তো আলাদা, তা আলাদাও হতে পারে, হয়। এটা খেয়াল করে দেখি নাই।
আমেরিকা রাষ্ট্রের বাইরের মানুষ, ভিনদেশী আর সাথে ভিতরের কেউ কেউ এমন অনেকেই মনে করে যে ট্রাম্প খুবই খারাপ মানুষ – রেসিস্ট, রেপিস্ট ইত্যাদি ধরনের সব কিছু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে আনা যায়, নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ তারা এখানে এথিকস এবং স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন ভঙ্গের কথা তুলছেন, তুলবেন। এ কথাও ঠিক যে ট্রাম্পের অনেক কথায় এথিকস ও আইনের ফিল্টার পার হবে না, আটকে যাবে এবং তা আসলে খুবই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে?

ট্রাম্পের বয়ান-অবস্থানের কী সমালোচনা করা যাবে না? সমালোচনা করা কি ভুল হবে? এক কথায় এর জবাব, অবশ্যই যাবে। তবে থিতু হতে একটু অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে তিনি কী কী বলেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত নোট নেন। কিন্তু কোনোভাবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেয়া ঠিক হবে না। আগামী বছর ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেবেন। এর আগেই ও পরে কিছু কিছু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘আসল’ (অর্থাৎ খাবার দাঁত) নীতি-পলিসি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচনে দেয়া তার বিভিন্ন বক্তব্যে কোথায় কোথায় এখন তিনি ফিল্টার দেবেন, ফাইন টিউন করে এরপর তা তার সরকারের নীতি-পলিসি হিসেবে ঘোষণা করবেন, তা বোঝা যাবে। এর আগে ট্রাম্প প্রসঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল হবে। এ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যেমন, ইতোমধ্যে ট্রাম্প তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্য সেটা তিনি নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে সর্বশেষ আর এক খবর হল – ওবামার স্বাস্থ্য বীমা পলিসি (অনেকে যেটা তামসা করে ওবামা-কেয়ার বলে), সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘রিপিল’ করবেন বলেছিলেন। ইংরেজি রিপিল মানে ফিরিয়ে নেয়া, প্রত্যাহার করা বা উল্টো আইন করে বাতিল করে দেয়া। এখন তিনি জানাচ্ছেন, “আমি সম্ভবত রিপিল করছি না। তবে কিছু সংস্কার করব”। এই গুমোর খুলেছেন তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া ট্রাম্পের প্রথম ইন্টারভিউয়ে। এর কিছু পরে ১২ নভেম্বর বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঐ ইন্টারভিউয়ের উপর একটা রিপোর্ট করে বিস্তারিত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাষায় এটা ট্রাম্পের ইউটার্ণ; খবরের শিরোনাম হল, “Donald Trump: I may not repeal Obamacare, President-elect says in major U-turn”।

একটা অবজারভেশন হিসাবে বলা যায়, নির্বাচনের সময় সমগ্র দুনিয়ায় প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা চাঁছা-ছোলা খোলা কথা বলে থাকে। কিন্তু জিতলে পরে যেটার ওপর কম অথবা বেশি ফিল্টার চড়ানো হয়, টোপর পরানো হয় বা ফাইন টিউনে একে বিচার-বিবেচনা করে বদলে নেবার পরেই কেবল তা  সরকারের নীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দেখা গেছে, সময়ে কোন রাষ্ট্রের ক্রাইসিস যত তীব্র থাকে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা তখন চাঁছা-ছোলা আনফিল্টার করে বলা হতে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কথার প্রতিশ্রুতির সাথে এরপর জিতে তা সরকারের নীতি হুবহু না হওয়াতে তা নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনের ফল হবার পরে তা নিয়ে খুব বেশি আগানো যায় না বা কাজে লাগে না। আর একটা প্রশ্ন থেকেই যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যাই তাই পরে সেটা তখনও কল্পনা তা সবাই মনে রাখে। তুলনায় পরে কংক্রিট ভাষায় সরকারের নীতিতে কী থাকছে সেটাই আসল, বাস্তব। ফলে নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষ কল্পনার চেয়ে বাস্তব নিয়েই কথা বলা অর্থপুর্ণ মনে করে। তবে হ্যা নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে  কোনো প্রার্থীর সমালোচনা একমাত্র তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাজে লাগে। এবং সেটা কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে , পরে আর নয়।  তাই আমাদের উচিত, চোখ-কান খুলে অপেক্ষা করা।

তাহলে ট্রাম্পই কি প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে দেয়া ‘হুবহু’ প্রতিশ্রুতিতে চলেন না? বরখেলাপ করেন? না, তা একেবারেই নয়। লিবারেল সুশীলদের প্রতিভূ শ্রী ওবামার কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর নির্বাচন চলাকালীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিতলে তিনি রেনডিশন প্রথা (আমাদের মতো দেশে তাদের আসামি পাঠিয়ে টর্চার করিয়ে আনা, কারণ ওমন টর্চার নির্যাতন করা আমেরিকান আইনে নিষিদ্ধ ) বন্ধ করে দেবেন, গুয়ানতানামো বে কুখ্যাত কারাগার উঠিয়ে দেবেন, আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবেন ইত্যাদি। যার একটিও তিনি করেননি এবং পরবর্তিতে তিনি নিজে সরাসরি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে আফগানিস্তানে ১০ হাজার আমেরিকান সৈন্য রেখে হলেও বাকিটা প্রত্যাহার করেছেন। আর এক উদাহরণঃ গত ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে মোদি হুঙ্কার ও ভয় পাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জিতলে জেতার পরের দিন থেকে ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত মোদির সে কথার পরবর্তী কথা কাজ বা তৎপরতা নেই। যেন এমন কথা তিনি কখনও বলেননি অথবা নিজেই ভুলে গেছেন।

তাহলে আমি কি বলতে চাইছি ট্রাম্পের ওবামা বা মোদীর মতই সব কথা ভুয়া, তাল ঠিক নেই? না, তাও একেবারেই সত্যি নয়। বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প দিচ্ছেন যে খুব সম্ভবত আমেরিকান রাষ্ট্রনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসন্ন। আজকের যে আমেরিকাকে আমরা দেখে অভ্যস্ত, চিনি এই আমেরিকার গড়ন আকার লাভ করে থিতু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে; আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়া নতুন অর্ডারে সাজিয়ে হাজির হয়ে আছে তখন থেকে। সে অবস্থাকে বলা হয় আমেরিকা দুনিয়ার এক এম্পায়ারের (সাম্রাজ্যবাদ নয়) ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছিল। এরপর থেকে তা সরাসরি আমেরিকার  নিজের প্রত্যক্ষ ভোগে বা কাজে লাগুক আর  নাই লাগুক – এমন বহু বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম এরপর থেকে তা চলে এখনও টিকে আছে। আর এর পরিচালন চালিয়ে টিকিয়ে রাখার পুরা দায়ভার আমেরিকাকেই বইতে হয়ে আসছে। মুখস্ত বা অভ্যাসের মত, সেই থেকে কোন রিভিউ ছাড়াই এগুলো চলে আসছে। এমন সব প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের দায়দায়িত্ব এই প্রথম রিভিউ করে কাটছাঁট ও পুনর্গঠন করা হতে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে যেমন, ন্যাটো। এর ৭৩ শতাংশ খরচ আমেরিকা একা বহন করে। ট্রাম্প এটা রিভিউ করার পর ঠিক করতে চান, এটা নিয়ে কী করা হবে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কোল্ড ওয়ার লড়াইয়ের যুগ শুরুর শুরুতেই ১৯৪৯ সালে গঠন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক মোকাবোলায় ন্যাটোর সদস্য সকল রাষ্ট্রের একসাথে এক্ট করতে একটা বাধ্যবাধকতা চালু করা, যাতে তা বড় এক রক্ষাকবজ নয়। ট্রাম্প যাকে আমাদের পাগল বেতাল লোক বলে প্রমাণ করতে চাইছি, বা যা মনে চায় তা বলে নির্বাচনে জিতার লোক মনে হচ্ছে – এমন প্রপাগান্ডা হয়েছে হচ্ছে যার নামে  – সেই ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই কবে ভেঙ্গে গেছে, দুনিয়াতে এখন সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে সম্পর্কিত হয়ে আছে – অর্থাৎ সেই শত্রুতাও আর তেমন নাই। উলটা এখনকার একমাত্র জলন্ত হুমকি হল “টেররিজম”। তাহলে ন্যাটোকে একইভাবে রেখে দেওয়ার মানে কী? ন্যায্যতা কোথায়? অন্তত এবিষয়ে একটা  রিভিউ  করে এটা ভেঙ্গে দেয়া যায় কী না তা দেখা উচিত। আর দরকার হলে “টেররিজমের” মোকাবোলায় উপযোগী কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম দেয়া হক।  ব্যাপারটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ইউরোপের অনেকের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কথা ফেলনা নয়, যুক্তি আছে।

একইভাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন – ট্রেড ব্যারিয়ার বা অবাধ পণ্য চলাচলে বাধা প্রসঙ্গে। চীনের সাথে বাণিজ্যে তিনি সস্তা জাতীয়তাবাদী হয়ে বাধা দেবেন না। তবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় নেগোশিয়েট করে একটা তুলনামূলক ভালো ডিল (আমেরিকানদের জন্য চাকরি বা আউটসোর্সিং) তিনি পেতে চাইবেন। স্বভাবতঅই এটাই নির্বাচন উত্তর থিতু ভাষ্য। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোটের লোভে এই বিষয়টাকেই তিনি চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কারের মত শোনায় একন ভাষাতেই বলেছিলেন।

আবার সিরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। তাতে আসাদ থাকল না গেল, সেখান থেকে সরে আসবেন। রাশিয়ার ওপর আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রের অবরোধ উঠানো নিয়ে কথা আগাবেন। আইএস মোকাবেলা ও দমনে রাশিয়ার সাথে দায় শেয়ার করবেন সম্ভবত। এগুলো সবই বিশ্বাযোগ্য কথা ও পদক্ষেপ তিনি নিতে যাচ্ছেন।  কেবল একটা জায়গায় ফাঁকি দিক ছিল। খুব সম্ভবত তিনি হিলারির বিরুদ্ধে পুতিনের দেয়া ইন্টেরলিজেন্স ব্যবহার করতে পুতিনের সাথে অপ্রমাণিত ডিল করেছিলেন। ট্রাম্প বলতে পারেন যে হিলারিও তো ওবামার প্রভাব ব্যবহার করে “সরকারী মেল ব্যক্তিগত সার্ভারে রেখে” তিনি ঠিক করেন নাই তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ হয় এমন কিছু ঘটান নাই বলে ছাড়পত্র এনেছিলেন। অর্থাৎ ওবামা-হিলারি এসব তথাকথিত লিবারেলরা কোন ধোয়া তুলসিপাতা নয় এটা মনে রাখতে হবে।  ওবামা-হিলারিরা কোন স্টান্ডার্ড বা আদর্শ নয়।

সৌদি, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যেখানে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে সে ঘাঁটি রাখার খরচ কে বইবে – এই প্রশ্নটা  ট্রাম্প সামনে আনতে চান।  অথবা রাখা আদৌ আমেরিকার জন্য কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান। এটা খুবই জেনুইন প্রশ্ন। এককালে আমেরিকার অর্থভান্ডারের অবস্থা ভাল ছিল পরে নিজ খরচে ভিন দেশে ঘাঁটি পোষা হয়ত গায়ে লাগত না। এখন লাভ-ক্ষতি হিসাব করা, বাস্তববাদী হওয়া অবশ্যই জায়েজ।

আমরা যদি মনে রাখি, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, তাহলে ট্রাম্পকে বুঝতে আমাদের তা কাজে লাগতে পারে।  উপরের সবগুলো প্রসঙ্গের একটা কমন দিক আছে। সেই বিচারে সবগুলো ইস্যু সম্পর্কিত। আমেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা খাটো হয়েও গেছে, শুকিয়েছে। ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি মোতাবেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার নতুন করে সাজানোর সময় পার হয়ে গেছে।  সারকথায় আমেরিকার এখনকার মানে শুকানো ভুমিকা মোতাবেক বড় খরুচে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ঢেলে সাজানো যায়। এককথায় যেটাকে দক্ষ সরকার – ম্যানেজমেন্ট এবং খরচের দিক থেকে স্মার্ট চটপটে সরকার কায়েম করার উদ্যোগ – নিঃসন্দেহে অনেক সুদুর প্রসারি ও বাস্তব চিন্তা।

আর একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর এক মজার মন্তব্য করেছেন। তিনি চীনা নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক এআইআইবি (AIIB), এই ব্যাংক জন্মের সময় ওর গঠন উদ্যোগের বিরোধিতা করা আমেরিকার দিক থেকে  ‘স্ট্র্যাটেজিক মিসটেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমন মন্তব্য খুবই উলটা বাওয়া মন্তব্য হলেও কথা মিছা না। বাস্তবতা হল এক আমেরিকা আর তাঁর পার্টনারস ইন ক্রাইম জাপান – এই দুই দেশ ছাড়া এখন AIIB সদস্য হতে কোন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ দেশ বাকী নাই। সর্বশেষ আমেরিকার পিছনে পিছনে চলা কানাডাও ঐ ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে। আর সেই বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে পিছেপিছে চলা শুরু করেছিল ইউরোপ। এই প্রথম নিজের স্বার্থ আমেরিকার চেয়ে আলাদা বলে অনুভব ও দাবি করে এরাও (মানে ইউরোপের প্রধান তিন প্রভাবশালী – জর্মন, বৃটিশ ও ফরাসী) চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগে পতাকা তুলতে দেরি করে নাই।  যদিও এই প্রসঙ্গে খোস ট্রাম্প কী অবস্থান নিবেন এখনও কিছুই জানা যায় নাই।

ওবামার এক আদরের নীতি হল বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি বা চুক্তি জোট গড়া। ওসব উদ্যোগে ওবামা মুখ্য বিশেষ্যত্ব হল ঐ চুক্তি বা বাণিজ্য জোট গুলোতে চীনকে বাদ রাখতে হবে।  চীনকে বাদ দিয়ে এরপর বাকিদের নিয়ে আমেরিকাসহ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি অথবা নাফটা) – এগুলো পুনর্গঠনের পক্ষে ট্রাম্প কথা বলছেন।খুব সম্ভবত চীনকে বাদ রাখা এটা খুব কাজের মানে কার্যকর সুবিধা আমেরিকাকে দিবে না অসুবিধা ডেকে আনবে – এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের কাছে ইস্যু।

এক কথায় বললে চীনের উত্থানে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন বিন্যাস ও অবস্থানের দিক থেকে আমেরিকার ভূমিকা কী? আর যাই হোক এতা নিশ্চয় আর আগের মত জায়গায় নাই। ফলে যে সব কোর বিশ্বাস বুঝাবুঝির উপরত আমেরিকার গত সত্তর বছর ধরে দাড়িয়ে ছিল তা বদলবার স্ময় হয়েছে।  ট্রাম্প সম্ভবত এ বিষয়গুলো এই প্রথম ঢেলে ভিন্ন দিক থেকে দেখে নতুন কিছু করতে চাইছেন। স্বভাবতই ট্রাম্পের প্রসঙ্গগুলো যত বিশাল, সে তুলনায় আমাদের কাছে তথ্য যেন আপাতত ততই কম। ফলে কোথায় তা কত দূর যেতে পারবে, আদৌ সম্ভব কি না তা দেখা-বোঝার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনোভাবেই বিষয়গুলোকে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব রেঠরিক মাত্র এই সংকীর্ণতা দিয়ে বুঝতে চাওয়া অর্থহীন হবে। একবাক্যে বললে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইছেন যেদিক থেকে আগে কখনই দেখা হয় নাই। যদিও বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রকাধ্য হয় নাই এখনও।

এ প্রসঙ্গের লেজ ধরে আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহলে সামনে উদয় হয়। চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে এখন থেকে কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইলে স্বভাবতই ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে ভারতের অথবা বাংলাদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। কারণ চীন দাবড়াতে হবে – এই অনুমানের উপরেই বর্তমান বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলো সাজানো। অতএব ট্রাম্পের নতুন দৃষ্টভঙ্গীতে এর ভেতর কোনো বিশেষ এবং নতুন দিক থাকবে কি না সে বিষয় এশিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ এই দুই দেশেই আপাতত ক্লুহীন। হাসিনার দ্বিধা মনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোটা সে আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে চীনের সাথে ট্রাম্পের নতুন সম্পর্ক সাজানোর দিকটি মাথায় রাখলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ওপর তার কিছু কিছু ছাপ, নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়ার কথা। সম্ভবত ওবামার ‘চীন ঠেকানো’ টাইপের অবস্থান – – এটাকেই  ট্রাম্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। ট্রাম্প এ রকম বহু প্রসঙ্গ তুলেছেন তা চূড়ান্ত নয়, বরং এগুলো ডেভেলপিং বলাই ভাল। তাই এক কথায় সব কিছুই  – ওয়েট অ্যান্ড সি, ডোন্ট কনক্লুড।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল।  আজ ১৬ নভেম্বর ঐ লেখা আরো সংযোজন ও এডিট করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

 

ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1pe

ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলে জানা গেল সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যাওয়ার পক্ষে হয়েছে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটের ফলাফলে ত্যাগের পক্ষ জয়ী হয়েছে শতকরা ৫২-৪৮ অনুপাতে। এতে গণভোট-উত্তর পরিস্থিতি যা হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল তা একের পর এক ঘটা শুরু হয়েছে। ফলাফলের নেতিবাচক গ্লোবাল প্রভাব পড়েছে সর্বব্যাপী। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে তা সংশ্লিষ্টরা মানছেন। গতকাল  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদকে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের “পোশাক খাত চ্যালেঞ্জের মুখে” পড়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যে প্রতি বৃটিশ পাউন্ড গণভোটের আগের তুলনায় দশ টাকা করে মূল্য হারিয়েছে। পরিস্থিতি আরো কতটা খারাপের দিকে যাবে তা নিয়ে অনুমান চলছে।
এ নিয়ে গভীরে প্রবেশের আগে কিছু ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। যেমন- ব্রিটেনের ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া মানে কী? ব্যাপারটা কী, বিভিন্ন রাষ্ট্র যেমন নানান কিসিমের রাষ্ট্রজোটে অন্তর্ভুক্ত হয় যার কোনটা অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক বা সামরিক ইত্যাদি সে রকম কোনো রাষ্ট্র-জোট ত্যাগ করা? অথবা ধরা যাক,  জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় জোট প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের তা ছেড়ে যাওয়া সেরকম?  অথবা  বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিল্যাটারাল) ক্যাটাগরির আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কে ওর কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ছেড়ে যাওয়া, এ ধরনের? অথবা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন ধরা যাক, আমাদের সার্ক জোট ছেড়ে গেলে কী হবে তেমন একটা কিছু? এরকম নানা ধরনের রাষ্ট্রজোটের উদাহরণ আর না বাড়িয়ে এবার উত্তরের দিকে যাওয়া যাক। প্রথমত কোনো সদস্য রাষ্ট্রের জোট ত্যাগ করার উদাহরণ খুব একটা নেই, তুলনায় জোটের অকার্যকর হয়ে পড়ার উদাহরণ পাওয়া যাবে। তবে আলোচনা সেদিকে নিব না। তাহলে আমরা এখানে কথা বলছি – ইইউ ধরণের বিশেষ রাষ্ট্রজোটের।
ব্রিটেনসহ ধরলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছিল মোট ২৮ সদস্য-রাষ্ট্রের। এখন এই ইইউ ধরনের রাষ্ট্রজোটের সাথে অন্য আর সব ধরনের রাষ্ট্রজোটের একটা প্রধান ফারাক আমরা এখন টানব। তা হল, ইইউ ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রজোটের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্র একেকটা সার্বভৌম ইউনিট, এটা বজায় রেখে বা মেনে নেয়ার পরই এসব রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক রাষ্ট্র নিয়ে জোট অথবা জাতিসঙ্ঘের মতো প্রায় সব (বর্তমানে ১৯৩ সদস্যের) রাষ্ট্রের রাষ্ট্রজোট হবার পরও জাতিসংঘ নিজে এর যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্বধারী কোনো সুপার স্টেট নয়। যেমন বাংলাদেশ সম্পর্কে যেকোনো ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, জাতিসঙ্ঘ অথবা এর অধীনস্থ কোনো প্রতিষ্ঠান বা কমিটির নয়। জাতিসঙ্ঘ কি সার্বভৌম – এই ধারণার উপরে জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান? যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপরে কী জাতিসংঘ সার্বভৌম ক্ষমতা, এখতিয়ার রাখে? এককথায় জবাব মোটেও না। প্রশ্নই আসে না। প্রত্যেক সদস্য-রাষ্ট্রই কেবল সার্বভৌম যার উপর কেউ নাই, আর কোন মাতব্বর নাই।  ফলে জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্ত মানার ব্যাপারটি কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটে কী এই অর্থে যে, ওই সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে জাতিসঙ্ঘের সব সদস্যের সম্মতিতে অনুমোদিত হয়েছে শুধু সেজন্য? না সেজন্য নয়। বরং ওই আইনের অনুরূপ করে লেখা একটা আইন (যেটা রেটিফিকেশন বলে পরিচিত) আমরা আমাদের সংসদে পাস করিয়ে নিয়েছি সেজন্য। সারকথায় জাতিসঙ্ঘের কোনো আইন বা কনভেনশন ইত্যাদি আমরা মানি এ জন্য যে, সেটার অনুরূপ এক আইন আমাদের নিজের সংসদ পাস করে নিয়েছে, তাই। নিজের আইন তো নিজে মানবই। জাতিসঙ্ঘ কখনোই এমন কোনো তৎপরতা দেখায় না বা এমন কোনো রেওয়াজ নেই, যা থেকে আমরা অর্থ করতে পারি যে সে আমাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে অথবা আমাদের রাষ্ট্রের ওপরে অবস্থিত এক চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কর্তৃপক্ষ হল জাতিসঙ্ঘ। বরং রাষ্ট্রই সার্বভৌমত্বের শেষ কথা। এর ওপর কাউকে রাখা হয়নি। এভাবে দুনিয়ার যেকোনো রাষ্ট্রজোট তার আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অটুট রেখেই নানান রাষ্ট্রজোটের অংশ হয়।

কিন্তু এই ধারণার একমাত্র ব্যতিক্রম বা ব্যতিক্রম হওয়ার উদ্যোগ হল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কী অর্থে? যেহেতু ইইউ গড়ার লক্ষ্য হল সদস্যরাষ্ট্রগুলো একটা লম্বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিন প্রত্যেকের আলাদা রাষ্ট্ররূপ বিলুপ্ত করে সবাই মিলে একক এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে এখনই সেই প্রক্রিয়ার পুরোটা সম্পন্ন হয়ে যায়নি। তাই ইইউ এখনই কোনো সার্বভৌম অস্তিত্ব নয়। তবে ইইউর কিছু কিছু ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক হয়েছে। এই অর্থে ওসব জায়গায় ইইউ নিজের সদস্যরাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম কর্তৃপক্ষ।  যেমন ইইউর ফোরামে গৃহীত প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রে কাজের দৈনিক শ্রমঘণ্টা  কত হবে- এ বিষয়ক ইইউ ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য এখনই বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট এখানে ইইউর ভূমিকা সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সুপার স্টেট ধরনের। আর এটাই প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র তার নিজ নিজ সংসদে আগে অনুমোদন দিয়েছে যে ঐসব ক্ষেত্রে ইইউ এর সিদ্ধান্ত সদস্য-রাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম, তাই এটা বৈধ। সারকথায় রাষ্ট্রজোটের নানা ধরনের মধ্যে একমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন হল আলাদা ধরণের কারণ এটা হবু সুপার স্টেট। এক সুপার ষ্টেট হবার লক্ষ্যে সে আগাচ্ছে তাই।
ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণ সিদ্ধান্ত জানাল যে ব্রিটেন ইইউর মধ্যে নিজ রাষ্ট্র একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিলীন করার যে সিদ্ধান্ত সে আগে নিয়েছিল (ব্রিটেন ১৯৭৩ সালে ইইউতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল) সে সিদ্ধান্ত বদল করে তারা এবার নিজের ব্রিটেন রাষ্ট্রই অটুট রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটেনের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রক্ষণশীল টোরি আর লিবারেল লেবার- এরা কেউই ইইউ ত্যাগের পক্ষে নয়, বরং ইইউর সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষে বলে দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রচারও করেছিল। ফলে আর অন্য ছোট দল হিসেবে যারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ও প্রচার চালিয়েছিল, তেমন এক দল হলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি)। গণভোটের ফলাফল ত্যাগের পক্ষে যাওয়ার পর মিডিয়া এই পার্টির সেক্রেটারিকে প্রশ্ন রেখেছিল- কেন তারা জিতলেন বলে মনে করেন? তিনি বললেন, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা জনগণ নিজেরাই নিতে চাই, তাই। এটা অবশ্যই সঠিক জবাব নয়। একই ভাবে আর এক নেতা তিনি “না-ভোট প্রচারক” কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক। নাম (Michael Gove) বা মাইকেল গভ। কিন্তু তিনি আসলে আবার মাইকেল ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল টোরি পার্টির এমপি। তিনি তার ওয়েব সাইটে তাঁর নাভোটের পক্ষে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে তিনিও UKIP দলের মত বললেন। এককথায় বললে, যেসব নেতারা ইইউ-ত্যাগের পক্ষে কাজ করেছেন, এরা মূলত সাধারণ মানুষের নানান ক্ষোভ অসন্তোষকে সস্তা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী সুরসুরি দিয়ে আরও বড় করে কাজে লাগিয়েছেন। যেমন মাইকেল লিখছেন, তার আপত্তি্র পয়েন্ট হল তাঁর “রাষ্ট্র বৃটেনের ভাগ্য অন্য জাতেই রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদের ঠিক করছেন “decided by politicians from other nations”। এটা খুবই বাজে ও ফালতু যুক্তি। এক রংপুরের রাজনীতিবিদ যদি বলে, বাংলাদেশের বাজেট দিচ্ছেন এক (ভিন্ন জেলা অর্থে ভিনজাতের) সিলোটি নেতা … এটা বললে যেমন বুঝতে হবে এগুলো মাথায় শয়তান ভর করা লোকের সস্তা সুরসুরি মার্কা কথা – ঠিক তেমনি। আমরা নানা জেলার মানুষ মিলিয়েই বাংলাদেশ গঠন করেছি। ফলে কেউ যদি সংসদে সিলেটি হয়ে রংপুরের ভাগ্য নির্ধারণ করে তবে কোথাও আবার রংপুরিয়াও সিলটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ইইউ তে বৃটিশ না হয়েও ধরা যাক সে জর্মন, যাদের সিদ্ধান্ত বৃটেনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে, বৃটিশের সিদ্ধান্তও অন্য কোথাও জর্মনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে। সুতরাং এটা কোন পয়েন্টই না। পরিস্কার দগদগে উগ্র জাতিবাদি বিদ্বেষ, রেসিজম। যদি ইইউ ভাইস ভারসা ভাবে জর্মনী বা অন্য জাতি রাষ্ট্রের উপর বৃটিশ (ইইউ এমপি বা MEP )র সিদ্ধান্ত কার্যকর না হত তাহলে এসব কথা বলার সুযোগ থাকত। এছাড়া সবার উপরে বৃটেন কী স্ব-ইচ্ছায় ১৯৭৩ সালে ইইউ তে যোগ দেয় নাই? স্ব-ইচ্ছায় যোগ দেয়ার মানে কী  এটা না যে অ-বৃটিশেরও মতামত মাতব্বরি শুনতে ইউ তে যোগ দিতে যাওয়া হচ্ছে?  অতএব এসব ফালতু জাত-বিদ্বেষী বক্তব্যকে যদি জবাব হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হয়, তবে মানতে হবে এত দিন বেআইনি বা অবৈধভাবে ব্রিটেনবাসীকে বঞ্চিত করে, তাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইইউ সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, যেন সেটার অবসান ঘটালেন তারা গণভোটে ভোট দিয়ে। কিন্তু না তা তো নয়। আইনে যা লেখা আছে তা মেনেই সেই ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হওয়া এক ক্রমপ্রক্রিয়ায় ব্রিটেন ইইউর ভেতরে বিলুপ্ত হওয়ার লক্ষ্যে ও সেজন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। ইইউ তো কোন জবরদস্তি প্রক্রিয়া তো ছিল না।
আবার সেই ইইউ প্রক্রিয়া যেহেতু এখনো শেষ বা সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি, ফলে ২০০৭ সালের লিসবন চুক্তি, যার আরেক নাম ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি, যেটা তার আগের করা ইইউ বিষয়ক সব চুক্তির আপডেটেড বা সর্বশেষ রূপ, এর আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রক্রিয়া থেকে এখনও যেকোনো সদস্যের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ বৈধভাবেই ছিল। যেটার সুযোগ নিতেই ব্রিটেনের জনগণ তাদের আগের সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ নিয়েছে এই গণভোট করে। এটাও বৈধ। ফলে ১৯৭৩ সালে ইইউতে ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত এবং এই গণভোটে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুটোই আইনি দিক থেকে বৈধ সিদ্ধান্ত। তাহলে আসলে এখন কী ঘটেছে? আর কেন সেটা ঘটল?

সাধারণ নির্বাচন বা গণভোট মানে ঐ একবারই যখন সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণের পর্যায়ে নেমে আসে। কার তুলনায়? সরকার গঠন হয়ে গেলে যে সংকীর্ণ গোষ্ঠি এবার সরকারের নীতি-সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের ক্ষমতার তুলনায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে বা গ্লোবাল কাপিটালিজমে অনেক প্রভাবশালী অর্থনীতি আছে। এরাসহ সব আধুনিক রাষ্ট্রেই পুঁজি ব্যবসায়ী, শিল্পকারখানা বা ট্রেডার ব্যাংকার সমাজের এ অংশটিই তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে। নির্বাচন একবার হয়ে গেলে পরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত এসময়গুলোতে রাষ্ট্র কার্যত থাকে এই গোষ্ঠির প্রভাবে। মূলত এসব সময়গুলোতে নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ জনগণ ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিল। যেমন ২০০৮ সাল থেকে চলে আসা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এখনো গ্লোবাল অর্থনীতিতে কাটেনি। আর ওই মন্দা আসলে ডেকে এনে ছিল যেন এক প্রতিযোগিতা! কীসের? ঐ মহামন্দায় দেইলিয়া হয়ে পড়া কোম্পানী পুঁজির কারবারিদের দায়দেনা ও ক্ষতি জনগণ বা রাষ্ট্রের কাঁধে কেমন লটকিয়ে দেয়া যায় এরই প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ঢেলে সব ব্যক্তি কর্পোরেট কোম্পানীর দায়দেনা ও ক্ষতি মিটানো হয়েছিল। এরপর আবার শুরু হল (austerity) অস্টারিটি মানে অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন। অর্থাৎ রাষ্ট্র তখন আর সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিবে আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ধরনের সামাজিক বেনিফিটে কাটছাঁট করবে, যার সবচেয়ে আর সব দিক থেকে চাপটা এসে পড়বে কেবল শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সমাজের নিচের কম আয়ের জনগণের ওপর। এর ওপর আবার বিগত ২০০১ সাল থেকেই –  ‘ইসলামি জঙ্গি’ মারতে গিয়ে লম্বা শেষ নাই এমন যুদ্ধে আটকে গিয়েছে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। এর অর্থনৈতিক দায় বইতে পশ্চিমা রাশ্ট্রগুলোর অসমর্থ হওয়া ছিল সব কিছুর  প্রধান ফ্যাক্টর।  ঐ যুদ্ধের ঘটনার লেজে লেজে যেখান থেকে আবার দুনিয়াতে রিফিউজি বা উদ্বাস্তু সমস্যা খাড়া হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ইউরোপেরই নিচের মানুষদের চেয়েও কম বেতনে রিফিউজিরা খারাপ দুস্থদশায় বলে কাজ করতে রাজি – ফলে এরাই প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রমজীবীদের বাজারে হাজির হতে চাইছে। ফলে ইউ যেটাকে যুদ্ধের রিফুইজি ঠেলে ফেলতে পারে না, জাতিসংঘ উদ্বাস্তু কমিশনে কমিটমেন্ট ইত্যাদির কারণে রফুইজি নিচ্ছে বা প্রতিদানে অর্থের সংস্থান করেদিচ্ছে। এগুলো প্রতিটার ক্ষেত্রে  ইউরোপেরই নিচের মানুষদের স্বার্থ আর তাদের শাসকদের স্বার্থ পরস্পুর মুখোমুখি। ফলে শ্রমজীবিদের চোখে ইইউ এক ভিলেন। ফলে সব কিছুকে উল্টে ফেলে দেয়ার অছিলা খুঁজছিল ইউরোপেরই নিচা আয়ের জনগণ। কারণ স্ব স্ব রাষ্ট্রে এসব সিদ্ধান্ত ও কাজ করা হচ্ছিল ইইউর আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, ইইউ এর ওমুক আইনের বাধা আছে অথবা যেমন- ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের রুল আছে তাই অস্টারিটি করতে হচ্ছে অথবা ইইউর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাই উদ্বাস্তু নিতে হবে- এভাবে ইইউকে দেখিয়ে সামনে রেখে নিজের রাষ্ট্র এগুলো করছিল। ফলে স্বভাবতই জনগণ সেই ইইউ নামে ভুতুড়ে ক্ষমতাকেই উপড়ে ফেলার পক্ষে চলে যায়। অর্থাৎ সমাজে এসব অসন্তোষ বাড়ছিল। এই অসন্তোষ নিরসন বা আমলে নেয়ার নামে ক্যামেরন ভেবেছিলেন ইইউতে থাকা না থাকাকে গণভোটে দিলে আবার ইইউতে থাকাই জিতবে। ফলে গণক্ষোভ প্রশমিত করার রাস্তা তার নাগালেই আছে। তাই আগবাড়িয়ে ২০১৩ সালে তিনি গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ দিকে সমাজের ওপরের অংশ এবং দুই প্রধান দল ধরেও নিয়েছিল, গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ জিততেই পারে না। এটা তাদের কাছে অসম্ভব কল্পনা মনে হয়েছিল। কিন্তু যত গণভোটের নির্ধারিত দিন এগিয়ে আসতে থাকে ততই গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে পরিচালনের রাষ্ট্রনেতা, বিভিন্ন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান নেতারা ততই ইইউ ত্যাগ করে গেলে কী বিপর্যয় ঘটবে, একের পর এক এর ভয়াবহতা উল্লেখ করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়া হয় আরো নেতিবাচক। বিবিসি যে আটটা কারণ তুলে ধরেছে, তার এক নম্বর কারণ হিসেবে “ব্রেক্সিটের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবে উল্টো ফলকে” । ব্রিটিশ সাধারণ ভোটাররা ব্যাপারটিকে তাদেরকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়া হিসেবে দেখেছিল। ফলে চাপের ভেতরে তাদের দিশেহারা অবস্থা। এর ওপর আবার সর্বক্ষণ হবু সুপার স্টেট ইইউর দোহাই দেয়াতে এই ভুতুড়ে আড়ালি ক্ষমতাকেই মাস জনগণ সবার আগে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা মনে করা যেতে পারে।
ব্রিটেনের ভাষায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি) হলো এক ‘ডানপন্থী’ পার্টি। এরা এই গণভোটকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিটানোর মহাসুযোগ পাওয়া গেছে হিসেবে নিয়েছিল। এভাবে তারা জনগণকে মিথ্যা আওয়াজ তুলেছে যেন উগ্র জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুললে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সব সঙ্কট দূর হয়ে যাবে। ইসলামি জঙ্গি মারার নামে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যে সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তোলা হয়েছে, তা আপনাআপনিই মিটে যাবে, এই মিথ্যা স্লোগান দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংস্কৃতি মূল্যবোধ সবার চেয়ে ভালো এই উগ্র প্রচার করেছে। ফলে বৃটিশরা  নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে মূল সমস্যা থেকে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণের দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হয়েছিল। এসব কিছুর নিট ফলাফল হলো গণভোটের ইইউর ত্যাগের সিদ্ধান্তের জয় লাভ।

ইইউ ত্যাগের পক্ষের প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসন ও অন্য প্রবক্তারা জানেন, যে তারা মিথ্যা প্রলোভনে ত্যাগের পক্ষকে জিতিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসনকে মিথ্যা বলার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বরিস জনসনের ছবিসহ ঐ সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল ব্রেক্সিটের প্রবক্তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।   অথচ সবাই জানত ইইউ-ত্যাগের পক্ষে জিতলেও গরিব শ্রমজীবীর মূল ক্ষোভ অসন্তোষ এতে কাটবে না। তাই নিউইয়র্ক টাইমস গত ২৬ জুন আর এক রিপোর্টে বলছে ইইউ-ত্যাগ ভোটের জিতার পরে অনেক নেতা উলটা প্যাডেল মেরে ভাগতেছে কারণ জিতলে তারা কী করবে এনিয়ে তাদের কোন অর্থনৈতিক পরকল্পনা ছিল না।  প্রতিদিন ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড নাকি ইইউকে দিতে হত খামোখা বলে বরিস জনসনরা প্রচার চালিয়েছিল। এখন স্বীকার করছে ওটা ভুল ছিল।  তাই তারা এখন ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যত দেরিতে শুরু করা যায়, এর পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যেমন ইইউ ত্যাগের আইনগত পদ্ধতি হলো কোনো সদস্যরাষ্ট্র নিজ রাষ্ট্রের আইন বা কনস্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা পালনের মুখোমুখি হয়ে পড়লে (যেমন- বৃটেন এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য) সে ইইউ ছেড়ে যাওয়ার জন্য সবার আগে ইইউকে নোটিশ দেবে। এটাই সর্বশেষ লিসবন ইইউ চুক্তির আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইইউ ত্যাগ করতে চাওয়া দেশের ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। অর্থাৎ বৃটেনে গণভোট হয়ে ফলাফল চলে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ এখনো বৃটেনের কাছ থেকে ত্যাগের ইচ্ছার কথা জানে না। আর এই ইচ্ছা জানানোর এখতিয়ার বা জানানোর পার্টি হল, যে ত্যাগ করতে চায়। সে হিসেবে কেবল ব্রিটেন। তাই সাবেক মেয়র বরিস জনসন আর্টিকেল ৫০ স্মরণ করিয়ে বলছেন, এটা তাদের এখতিয়ার এবং তারা আগামী অক্টোবরের আগে ইইউকে আনুষ্ঠানিক নোটিফাই করতে চিঠিই দেবেন না। ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে আর্টিকেল ৫০-কে সক্রিয় করে জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করলে এর পরের কমপক্ষে দুই বছরের আগে এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শেষ হবে না। ফলে যারা ইইউ-ত্যাগ পক্ষকে জিতিয়েছেন, সেই প্রবক্তারা তাই যদ্দুর সম্ভব আগামীতে নিজেদের সম্ভাব্য ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নিতে চান। বিপরীতে যে ছয় রাষ্ট্র ১৯৫১ সালে ইইউর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল সেই মূল ছয় রাষ্ট্র- জর্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লেদারল্যান্ডস, ইতালি ও লুক্সেমবার্গ- এদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিলিত হয়ে এক যৌথ আহ্বান রেখেছেন ব্রিটেনের প্রতি। দাবি করেছেন ইতোমধ্যেই গণভোটের ফলাফল গ্লোবাল বাজারের আনাচে-কানাচে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মার্কেটে উথাল পাথাল ঘটা শুরু হয়েছে। ফলে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করতে ব্রিটেন যেন দ্রুত শুরু করে, যাতে ব্রিটেন বাদে ইইউ (২৭ সদস্যরাষ্ট্র) নিজেদের আরো কোনো বিপর্যয়ের হাতে না পড়ে এর বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এই বিচ্ছেদ কি সহজেই ঘটতে পারবে, নাকি আরো গ্লোবাল বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে দুনিয়ার সবাইকে- এটাই এখন দেখার বিষয়!
দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের এখানেই শেষ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখার প্রথম পর্ব যার শিরোনাম ছিল, “ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু” ঐ লেখা বিগত ১৯ জুন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় আগে ছাপা হয়েছিল। আর চলতি শেশাহ পর্বের লেখাটা আগে ২৬ জুন ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তে ছাপা হয়েছিল। দুটো লেখায় আবার নানান সংযোজন ও সম্পাদনার পর এখানে ছাপা হল।

আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন

আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
গৌতম দাস

২৬ জানুয়ারি ২০১৬,মঙ্গলবার
http://wp.me/p1sCvy-D3

আধুনিক রাষ্ট্রের জমানায় বাণিজ্য চুক্তি করার রেওয়াজ উঠেছিল আশির দশকের শুরু থেকে। অর্থাৎ যারা গরিব দেশ বা ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্র বলা হয়, এদের সাথেও বাণিজ্য চুক্তি করার দরকার-বোধের শুরু তখন থেকে। বাণিজ্য চুক্তি বলে এটিকে বাড়িয়ে বলার অর্থ হয় না। সারকথায় বললে আমেরিকা তার নিজ বাজারে নিজ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় গরিব দেশগুলোকে পণ্য রফতানি করতে দেয়া শুরু করেছিল। কথাটিকে আরেকভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক পর মূলত ইউরোপের বাজার বিনিয়োগ-পুঁজিতে পরিপূর্ণ সয়লাব হয়ে গেলে উন্নত অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো মনে করা শুরু করেছিল, তাদের কেবল গরিব দেশে নিজ পণ্য রফতানিকারকের এত দিনের একক ভূমিকায় থাকা বোকামি হচ্ছে। ইউরোপের বাজার স্যাচুরেটেড হওয়ার এর পরে কে? তাই এশিয়ায় আসতে সময় লেগেছিল। অন্তত গ্লোবাল বিনিয়োগ-পুঁজির খাতক হতে পুঁজিবাজারের ক্রেতা বা ঋণগ্রহীতা আরো বাড়াতে চাওয়া- এ দরকারি দিক থেকে দেখে মূলত আমেরিকা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য স্লোগান হয়েছিল- গরিব দেশকে “রফতানিমুখী অর্থনীতি” করে ঢেলে সাজাতে হবে। বাংলাদেশে সে সময়ের এ’বিষয়টার  দুটো ঘটনায় চিহ্নিত করা আছে।

বাংলাদেশে ‘রফতানিমুখী অর্থনীতি’ করতে বিশ্বব্যাংক ১৯৮২ সালে এরশাদ দিয়ে ক্ষমতা দখল করিয়ে বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচি চালু করে দিয়েছিল। এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বা সংক্ষেপে ইপিজেড ধারণা সাথে আসে সেই থেকে। অন্যদিকে সে ঘটনা-সময়ের দ্বিতীয় চিহ্নটি সামাজিক সাংস্কৃতিক ধরনের। কবি ফরহাদ মজহারের এক কবিতার বই আছে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় বেরিয়েছিল, বইটার নামই “অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারী মেশিন”। বইয়ের তাতপর্যপুর্ণ এ’নামটাই অনেক কিছুর নির্দেশক। কলোনি আমল থেকেই আমাদের প্রচলিত রফতানি পণ্য ছিল পাট, কাঁচা পাট অথবা পাটজাত পণ্য। সে আমলে যাকে বলা হত অর্থকরি ফসল। বিশ্বব্যাংকের ওই সংস্কার কর্মসূচিতে এই প্রথম আমাদের সেখান থেকে সরিয়ে এনে মুখ্য রফতানি পণ্য করা হয় রেডিমেড গার্মেন্টস, আর আমাদের পরিচিতি দাঁড়ায় এরই রফতানিকারক দেশ। গার্মেন্ট রফতানির অর্থনীতিতে রূপান্তর করে দেয়া হয়।

এখানে একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার। বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতিকে রফতানিমুখী করে সাজানো শুরুর আগে আমরা আমেরিকায় কোনো পণ্য রফতানি করতে চাইলে তাতে আইনগত কোনো বাধা ছিল তা নয়। তাহলে রফতানিমুখী করে সাজানো – এই পরিস্থিতিতে নতুন যে বিষয়টি তা হলো, আমেরিকাতে কোন কোন পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ কর মওকুফ বা ছাড় পাবে, এমন কিছু পণ্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য সেই পণ্যই রেডিমেড গার্মেন্ট। আর এর সাথে কর মওকুফের এক কোটা ব্যবস্থা। এই হল আমাদের মতো দেশের সাথে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় রফতানিকারকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বাণিজ্য চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট হওয়া। আমাদের মতো দেশের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি করার ইতিহাসের শুরু। এর মূল বৈশিষ্ট্য হল, আমাদের মতো দেশকে আমেরিকা কতটা এবং কী কী পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে দেবে, এমন একপক্ষীয় করে নেয়া ব্যাপারের উপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ।

তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইস্যুতে ১৯৪৭ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের ব্যানারে নানান বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ শুরুল হয়েছিল। জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস এন্ড ট্রেড, গ্যাট (GATT) থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৪ সালে ডব্লিউটিও-তে এসে যা শেষ হয়। এতে আমাদের দিক থেকে পড়ে পাওয়া কিছু সুবিধার রাস্তা তো অবশ্যই খুলেছিল। যেমন আমরা উন্নত দেশের তৈরি সব ধরনের পণ্যের ক্রেতা হওয়া সত্ত্বেও উল্টো খোদ আমেরিকায় কিছু পণ্যের রফতানিকারক হয়ে গিয়েছিলাম। স্বভাবতই তা শুধু সেসব রফতানি পণ্য, তুলনামূলকভাবে যা টেকনোলজির দিক থেকে কম জটিল আর একেবারেই কম দক্ষ শ্রম লাগে আর তা প্রচুর গা-গতরের শ্রম, এমন। কিন্তু সেটাও এমনি আসেনি। অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যেন তারা আমাদের তাদের বাজারে মহান প্রবেশদাতা হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ বাজারে আমাদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ যেন আমেরিকার হাতে থাকে। কথাটা বলার কারণ বিষয়টি রেসিপ্রোকাল নয় বা পাল্টাপাল্টি ধরনের নয়। যেমন আমাদের বাজারে আমেরিকার প্রবেশের ক্ষেত্রে তো এটা খাটে না। আমরা সেখানে কোনো দাতা হিসেবে হাজির নই। আমাদের বাজারে প্রবেশে আমেরিকার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণের বালাই নেই। যা হোক, এসবের ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সেই থেকে প্রবল কথাবার্তার জোয়ার উঠেছিল। ‘গ্রুপ-৭৭’ বা ‘উরুগুয়ে রাউন্ড’, ‘দোহা রাউন্ড’ ইত্যাদিতে সাতটি রাউন্ড বিস্তর আলোচনা দরকষাকষির পরে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও হিসেবে হাজির হয়েছিল। কিন্তু এভাবে হাজির হতে হতে আমেরিকা আবার এ ধরনের গ্লোবাল বাণিজ্য সংস্থায় আস্থা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এর মূল কারণ মনে করা হয়, ডব্লিউটিও’র কার্যকারিতা যত বাড়ছিল ততই অর্থনৈতিকভাবে গরিব এলডিসি বা লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজসহ নানা ক্যাটাগরির জোটবদ্ধতা শুরু হতে দেখা যায়। আমেরিকার বিরুদ্ধে সবার জোটবদ্ধ হয়ে যাওয়া- এটাই আমেরিকার নিরুৎসাহিত হয়ে যাওয়ার কারণ। আর এর বদলে সেই সাথে আমেরিকার নতুন উৎসাহের বিষয় হয়ে ওঠে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি- বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। এর ভেতরে মুক্ত শব্দটি যত জ্বলজ্বল করে, ততটাই এটা বন্দিত্বের ফাঁদ।
আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে নতুন উৎসাহের ফলে ডব্লিউটিও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেনি ঠিকই; তবে আমেরিকার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমেরিকার সাথে বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। দ্বিপক্ষীয় ধরনের চুক্তি আমেরিকার দিক থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে ধারণা প্রবল হতে থাকে। এর কারণ ভিন্ন এক পরিস্থিতি। যেকোনো বাণিজ্য চুক্তি আসলে আইডিয়ালি ‘উচিত অর্থে’- রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতেই হওয়ার কথা। কিন্তু একটা চুক্তির মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রস্বার্থে বাণিজ্য’ ঘটানো ব্যাপারটা বাস্তবে অলীক না বললেও খুবই কঠিন। ফলে গণস্বার্থের বদলে নামেই এখানে একটা কোটারি স্বার্থ তৈরির সম্ভাবনা থাকে সব সময়। মূলত পুঁজিমালিক বা ব্যবসায়ীর স্বার্থটাই জনস্বার্থের নামে হাজির হয়ে যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেক বিপদ দেখা যায়।

যেমন- বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধরা যাক। এখানে সরকারের স্বার্থ মানে আসলে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থ অথবা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। জনস্বার্থের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে কোনো বাণিজ্য চুক্তির বেলায় ক্ষমতাসীন সরকারের দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগায়। বিশেষ করে জনগণের রাজনৈতিক মানবিক মৌলিক অধিকার রক্ষা না করা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার রক্ষা না করার মতো ব্যাপার থাকলে তা আড়াল, উপেক্ষা অথবা ন্যায্যতা আমেরিকার দেয়া অথবা না দেয়াকে ব্যবহার করে যেকোনো বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করে নেয়া সম্ভব। কারণ, এখানে ক্ষমতাসীন সরকার নিজের সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে অথবা নিজের ক্ষমতাসীন থাকার স্বার্থে খোদ রাষ্ট্রস্বার্থ বা গণস্বার্থকে বিক্রি করে দেয়া সম্ভব। কারণ আমাদের মত দেশের রাজনৈতিক সাংবিধানিক ব্যবস্থা, পাবলিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আর এটাই আমেরিকার জন্য সুযোগ। অথচ আমেরিকাকে একই বিষয়ে চুক্তি ডব্লিউটিও’র ভেতর জোটবদ্ধ এলডিসি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে করতে হলে, সেখানে কোনো একটা রাষ্ট্রের ‘সরকারের দুর্বলতা’কে ব্যবহার করা যেত না। কারণ সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ স্বার্থের সাথে সমঝোতা চুক্তি, ফলে শুধু একটা রাষ্ট্রের ও শাসকের দুর্বলতাকে পুঁজি করার সুযোগ সেখানে নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকার পছন্দ দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি। এটা হলো এমনই ফ্রি বা স্বাধীন যে, নিজে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে, দলবাজির স্বার্থে স্বাধীনভাবে দেশ বা গণস্বার্থ বেচে দেয়া যায়।
এখানে দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি বলতে তা শুধু দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যেই এটা হতে হবে এমন বোঝা ভুল হবে। এর আরেক রূপও আছে, যেটা প্রায় যেন একটা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি- ওই ফরম্যাটই কয়েক রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার – এভাবে একসাথে করা হয়ে থাকে। সাধারণত একই স্তর বা মানের অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমেরিকা এমন দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি জোট করে থাকে। অথবা অনেক সময় ভৌগোলিক এলাকা বা অঞ্চলের কয়েকটা রাষ্ট্রের সাথে এমন বাণিজ্য চুক্তি করেছে আমেরিকা। যেমন ল্যাটিন আমেরিকার এমন দু’টি বাণিজ্য চুক্তি হল- উত্তর আমেরিকা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ১৯৯১ (নাফটা) এবং সেন্ট্রাল আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ২০০৬ (সাফটা)। আমেরিকার করা এ ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোকেও তারা বাই-লেটারেল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা দ্বিপক্ষীয় এফটিএ বলে ক্যাটাগরি,  নামকরণ করে ফেলেছে।

এ ছাড়া একই ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ধরনেরই ইদানীং আরেক সর্বশেষ ধাপ হলো, যেমন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা সংক্ষেপে টিপিপি এবং ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি। তবে এখানে এবার ‘পার্টনারশিপ’ শব্দটি নামের শেষে রাখার একটা রেওয়াজ চালু হয়েছে।

পার্টনারশিপ
শব্দটির প্রতীকী কিন্তু এর গুপ্ত বা অনুচ্চারিত দিক হল, রাইজিং ইকোনমির চীন বা আগামী দিনের নতুন গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের নেতা চীনের বিরুদ্ধের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একসাথে আমেরিকার করা দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি- এরই জোট এটা। এর আগে সাধারণভাবে আমেরিকা দ্বিপক্ষীয় ধরনের যেসব বাণিজ্য চুক্তি করে চলছিল, এমনকি চলতি শতকে এসেও সে একই কাজ করছিল; তবে একই ধরনের এবারের চুক্তিগুলোতে চীনবিরোধী এক বাড়তি বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। যেমন- টিপিপি, এটা করা হয়েছে মূলত চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের চার পাশের পড়শি কাছে-দূরের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে। মূলত এমন রাষ্ট্রগুলো হল- অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম আর স্বাগতিক আমেরিকা। তবে ব্যতিক্রমভাবে এখানে কানাডা আর কিছু ল্যাটিন আমেরিকান দেশ, যেমন- চিলি, মেক্সিকো ও পেরুও আছে। এ ছাড়া অন্য যে দ্বিতীয় বাণিজ্য চুক্তি ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি – এটা হলো আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার হবু বাণিজ্য চুক্তি।

টিপিপি আর টিটিআইপি এ দুই চুক্তির মধ্যে নামের শেষ পার্টনার শব্দ যোগ হয়ে আছে সে কথা ছাড়াও এ দুই চুক্তির বড় মিলের দিক হল, এটা চীনবিরোধী বৈশিষ্ট্যের জোট। এ ছাড়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিলের দিক হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেমন- এ দুই চুক্তিরই প্রস্তুত প্রক্রিয়া চলছে অত্যন্ত সঙ্গোপনে। নিজ জনগণকে দূরে রেখে। লন্ডনের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার ভাষায়, ‘এ গোপনীয় ধরনের অগণতান্ত্রিক চুক্তি প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং এ রিপোর্টে তুলে ধরা চুক্তিবিষয়ক প্রায় সব তথ্যই লিকেজ হয়ে আসা তথ্য অথবা তথ্য পাওয়ার অধিকার- ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ আইনে অনুরোধ পাঠিয়ে সংগ্রহ করা তথ্য’। অন্য দিকে এ চুক্তির বিরুদ্ধে ব্রিটেনে জনমত সংগঠিত করার সংগঠন ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’-এর নির্বাহী পরিচালকের ভাষায়, তিনি মনে করেন এ হবু চুক্তি ইউরোপ ও আমেরিকান সমাজের সাধারণ মানুষের ওপর বহুজাতিক কোম্পানির আক্রমণ।

এই হলো সংক্ষেপে আমেরিকার করা ধারাবাহিক বাণিজ্য চুক্তির ইতিহাস। সাধারণভাবে বললে, আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করার উদ্দেশ্য হল, বড় বড় বিজনেস হাউজ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে যেসব রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন-রীতি মেনে চলতে বাধ্য হয় এমন নিয়ন্ত্রণ আইনগুলোর যে আইনি বাধা আছে, সেগুলো আলগা করে দেয়া। চুক্তি করার আগে প্রায়ই আমেরিকার ‘পার্টনার’ রাষ্ট্র ওই চুক্তি করার খাতিরে নিজ আইনের নিয়ন্ত্রণ আলগা করে ফেলে থাকে। যেমন নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, পরিবেশবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, ব্যাংকবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন অথবা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা বিষয়ক আইন- এগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছামতো ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুবিধা নেয়া এসব চুক্তির সাধারণ উদ্দেশ্য। আর এই মূল উদ্দেশ্যের অধীনে অন্যান্য উপ-উদ্দেশ্যে যেমন চীনবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি জোট অথবা আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি (জিএসপি’র মতো) করা হয়ে থাকে।

নতুন ফেনোমেনা : মানবাধিকার
প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে আমেরিকা এমন বাণিজ্য চুক্তি করে যাচ্ছিল, কোনো সমস্যা বা আপত্তি দেখা যায়নি। কিন্তু এবারই প্রথম এসবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার এক পাল্টা প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রথম টিপিপি এবং টিটিআইপি- এ দুই চুক্তির বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সাবধান করেছেন জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের (ইউএন-এইচআরসি) হেডকোয়ার্টার জেনেভা থেকে এর র‌্যাপোটিয়ারেরা বা র‌্যাপোরচারেরা। ফরাসি শব্দ ‘র‌্যাপোটিয়ার’-এর তুল্য ইংরেজি শব্দ ইনভেস্টিগেটর। অর্থাৎ নিরপেক্ষ তদন্ত অনুসন্ধান করে রিপোর্টদাতা। বিভিন্ন দেশের হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ঘটনায় অথবা কোনো সদস্য রাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটসের দশা পরিস্থিতি বিষয়ক ঘটনাকে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার জন্য জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের নিয়োগ দেয়া বিভিন্ন বিষয়ের র‌্যাপোটিয়ার আছেন। কাউন্সিল থেকে এরা এক ধরনের নিয়োগ নেন বটে, কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক নেন না বা পান না। তবে কোনো ব্যক্তি সহকারী বা বস্তুগত লজিস্টিক সাপোর্ট লাগলে তা কাউন্সিল থেকে নিতে পারেন। সে জন্য এদের নিরপেক্ষ র‌্যাপোটিয়ার বলা হয়। যেকোনো ইস্যুতে এই র‌্যাপোটিয়ারদের সরজমিনে সংগ্রহ ও পেশ করা রিপোর্টকে মাঠের ফ্যাক্টস বা ভিত্তি মেনে এর ওপর এরপর সদস্যদের আলোচনা শুরু হয় ও সিদ্ধান্ত রেজুলেশনে পৌছানো হয়। এমন কাজ করে সুনাম কামিয়েছেন, এমন নামকরা ১০ জন র‌্যাপোটিয়ার উদ্বেগ জানিয়ে এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন গত ২০১৫ সালের জুন মাসে। ওই বিবৃতিতে সবার আগে তারা স্পষ্ট করে নিয়েছেন যে, তারা যেকোনো বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজন বোঝেন। ফলে তাদের ইস্যু কোন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধীতা করা নয় বরং ওই চুক্তি করতে গিয়ে করা মানবাধিকার লঙ্ঘন।

এ ছাড়া শুধু উদ্বেগ জানানো নয়, ওই বিবৃতিতে সবশেষে কী করা উচিত সে বিষয়েও কিছু পরামর্শ তাঁরা দিয়েছেন। যেমন- কাজ গোপনে না করে কাজে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা আনা, জনপ্রতিনিধিদের সামনে সব কিছু উন্মুক্ত রাখা, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে-পরে মানবাধিকারের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে তা বিবেচনায় নেয়া, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা কী থাকছে সেদিকে নজর দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া ইত্যাদি।

ওই বিবৃতির প্রায় ছয় মাস পরে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৬ আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় হিউম্যান রাইটসবিষয়ক দাতব্য সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ বা সংক্ষেপে এইচআরডব্লিউ একই ইস্যুতে নিজেরই তৈরি আটটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ছলে টিপিপি’র কার্যক্রমকে প্রশ্ন করেছে। টিপিপি চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানিয়ে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছে সেখানে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যদিও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং আমেরিকান কোনো সরকারি দান তারা গ্রহণ করে না বলে জানিয়েছে। এছাড়া এরা নিজ সরকারি নীতি অনুসরণ করে কাজ করে সিদ্ধান্ত নেয় এমন নয়। যেমন- মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ইস্যুতে এইচআরডব্লিউ শক্ত সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষত যেখানে ওবামা প্রশাসনসহ সারা পশ্চিম জগৎ ব্যবসার লকলকে লোভে এই ইস্যুতে চুপচাপ ছিল। পরবর্তীকালে ওবামা দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জেতার পরের সপ্তাহে প্রথম মিয়ানমার সফরে এসে মানবাধিকার বিষয়ে নিজ সরকারের অবস্থানের বদল ঘটিয়েছিলেন। তবে স্বভাবতই এই সংগঠন প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাতের ভাষায় না বললেও স্পষ্ট আপত্তির ভাষায় টিপিপি ইস্যুতে নিজের আলাদা অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ফলে সুযোগ রেখেছে যেন চাইলে ওবামা সরকার নীতি বদলিয়ে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারে। যেমন- দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের শুরুতে এইচআরডব্লিউ বলছে, আমেরিকার ফ্রি টেড অ্যাগ্রিমেন্ট ভালো না মন্দ- এ বিষয়ে তাদের কোনো অবস্থান নেই। কিন্তু টিপিপি চুক্তিতে কিছু মারাত্মক হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ইস্যু উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে তারা মনে করে। বিশেষত “শ্রমিকের অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ, সুস্বাস্থ্য থাকার অধিকার, মুক্তভাবে নিজেকে প্রকাশ এবং ইন্টারনেটে প্রাইভেসির অধিকার” বিষয়ে। তবে তাদের অবস্থান হল, টিপিপিতে হিউম্যান রাইটস বিষয়ক যে সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তা সংশোধনযোগ্য। এছাড়া একটা হিউম্যান রাইটস ফ্রেন্ডলি টিপিপি কেমন হতে পারে এর একটা ধারণাও তারা রেখেছে। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার স্বভাবতই। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট রাজনীতির শক্তিতে সংগঠিত না করে কেবল মানবাধিকার সংগঠনের মুখ চেয়ে থাকা পরিস্থিতি তৈরি করে রাখলে তা আমেরিকার জন্য এমন আরো টিপিপি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া সহজ হয়ে যেতে পারে।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদশ পত্রিকা ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় এবং দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকা ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান আকারে আবার ছাপা হল। ]

ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী

ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী
গৌতম দাস
২৩ নভেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-d1

বাংলাদেশে যোগ দেয়া শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিকাব) সাথে এক মতবিনিময়-বিষয়ক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে দৈনিক মানবজমিনে এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে পরের দিন, গত ১৩ নভেম্বর। মানবজমিন লিখেছে, “ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে” বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা।
রাষ্ট্রদূতের এই বাক্যের কথা আপাতভাবে খুবই সাদামাটা মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে তা নয়। ওই বাক্যে গুরুত্বপুর্ণ শব্দ হলো, সমান বা সমান সম্পর্ক। অর্থাৎ তিনি চীন ও ভারতের সাথে শুধু সম্পর্ক রক্ষা নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন ‘সমান সম্পর্ক’ রাখার কথা। আর সমান সম্পর্ক রাখাটা হবে ‘বেশি সুফলের’, সে কথা তিনি বলছেন। কেন? সেটাই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদলের কালে
এই শতকে দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদল চলছে। আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার কথা আগেই শুনা গিয়েছিল এখন বাস্তবে ফলতে শুরু করেছে। কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তিগত অবস্থান পায় বা দেখাতে পারে, যখন এর আগেই  অর্থনীতি শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে দেশটির অর্থনীতি প্রথম দুই বা বড়জোর তিন রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গিয়ে থাকে। বলা যায়, দুনিয়ায় অর্থনীতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানের ওপর ভর করে কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অর্থনীতিগত অবস্থানের দিক থেকে চীন আমেরিকাকে কয়েক বছর ধরে ছাড়িয়েই যাচ্ছে বলেই আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় আর এক ঘটনা হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ পশ্চিম থেকে পুব দিকে এশিয়ামুখী হয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় অর্থনৈতিক তৎপরতার মোকাম বা ভারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এশিয়া। এসবের মিলিত ফলাফলে এশিয়ায় আরো দুটো ইস্যু তৈরি হয়েছে। একটা আমাদের সাউথ এশিয়া অঞ্চলের ধরাধরি আর অন্যটা সাউথ চায়না সি বা চীনের প্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের উত্তেজনা। এমন উত্তেজনার মূল কারণ বিশ্বে আমেরিকার পরাশক্তিগত প্রভাব কমে যাওয়া টের পেয়ে আমেরিকা নিজেই এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজের সামরিক ক্ষমতাজাত সার্ভিস বিক্রির চেষ্টা করছে। সে এই বলে  এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যে, চীনের নব উত্থান ও এর কোনো সম্ভাব্য খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচতে তোমাদের সামরিক সহযোগিতা দরকার হবে। এই বরকন্দাজ হতে সার্ভিস দিতে চাই আমি। বিনিময়ে তোমরা আমার সাথে এক টিপিপি (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আমাকে ব্যবসায় দিবে। সাউথ চায়না সিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার তৈরি করা দ্বন্দ্ব ও টেনশন ছড়ানোর বৈশিষ্টটা এ রকম।
আর অন্য দ্বিতীয় বিষয়টা হল, আমাদের অঞ্চলে মানে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেরটা আর একটু অন্য রকম। বাড়তি আরো কিছু বৈশিষ্টের কারণে। সেটা হলো, আমেরিকা ভারতকে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে বা পাশে আছে ধরনের ধারণা তৈরি করে  ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব উসকে দিতে চাইছে। এটা করার সুযোগ নিতে পারছে কারণ ভারত ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বন্দ্বের ইস্যু আছে। আর তা মূলত অসম সামরিক সক্ষমতার কারণে। ভারতের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি – যেটা আমেরিকা বিক্রি ও সরবরাহ দিবার উছিলায় সে ভারতের ঘনিষ্টতা চাইছে। আবার ভারতও সম্ভাব্য সামরিক বিরোধের কথা ভেবে আমেরিকাকে অস্ত্রের উৎস এবং বিরোধে অন্তত মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা নিতে পারে – এমন দরকার অনুভব করছে। এছাড়া ১৯৬২ সালের অভিজ্ঞতা ভারতের ভাল নয়। এসব মিলিয়ে সারকথায় চীন নিয়ে ভারতের ভীতি ও সন্দেহ আছে, আর আমেরিকা সেটাকেই ভালোমতো ব্যবহার ও উসকে দিয়ে রাখতে চায়। আবার চীন-ভারতের সম্পর্ক সবটাই বিরোধাত্মকতা নয়। বরং আর বিপরীত দিকে ভারত-চীনের পারস্পরিক ব্যবসায়িক সহযোগিতার প্রয়োজন এবং স্কোপ আছে। এবং সে সুযোগ পরস্পর নিচ্ছে। বাণিজ্য-ব্যবসায়ের দিক থেকে উভয়ের উভয়কে দরকার। কিন্তু আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আর এক দিক আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা যেটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। BRICS ও AIIB ধরণের উদ্যোগের আবির্ভাব এর প্রমাণ। পুরানা অর্ডারটাকে ভেঙে আমেরিকার কর্তৃত্বের বাইরে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করাতে ভারত ও চীনের একসাথে কাজ করা উভয়ের ভবিষ্যতের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকটা খেয়াল করে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের দিকগুলো উদোম করে উসকানি দিয়ে প্রধান ও মুখ্য করে তোলার নীতি নিয়েছে। এসবের মিলিত প্রভাব ও ফলাফলে এশিয়া, বিশেষত আমাদের অঞ্চলে মূল তিন শক্তি আমেরিকা, ভারত ও চীন – এশিয়ায় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে, টানাহিঁচড়া করছে, এশিয়ার বাদবাকি প্রত্যেকটা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার প্রবল চেষ্টা করছে। এ অঞ্চলের প্রতিটা দেশের রাজনীতিতে এই তিন শক্তির প্রভাব তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রবল। অন্য দিকে প্রতিটা দেশের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী মুল দু-তিনটা রাজনৈতিক দল থাকে, সম্পর্কের দিক থেকে এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও এটাই স্বাভাবিক। তবু অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব বিদেশী তিন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের আলোকে সাজানো হয়ে যায়, জড়িয়ে যায়। যা হওয়া উচিত নয়। কারণ যার যার নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে এমন অবস্থা মারাত্মক আত্মঘাতী।
আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের স্বার্থের লড়াই, পারস্পরিক শত্রুতা ইত্যাদি প্রত্যেকেই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে করছে, লড়ছে; এগুলো করারই কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল একটা বিষয় বাদে তা হবার কথা। তা হলো, আমেরিকার নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা ভেঙে নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করানো – এ বিষয়টায় চীন ও ভারতের কোর স্বার্থ একই।
কিন্তু এতে আমাদের কী? এটা কী শুধুই আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই যেখানে আমরা দর্শকমাত্র যার কিছুই আসে যায় না? না একেবারেই তা নয়। এটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখা পরাশক্তিগত লড়াইয়ের মত নয়। আমাদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে। এটাতে আমাদের মতো গরিব রাষ্ট্রসহ সবারই এখানে গভীর ও এক  কমন স্বার্থ আছে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের চলতি বিশ্বব্যবস্থা যেটা আমেরিকার মত মোড়ল ও তার সাগরেদদের দিকে কান্নি মেরে সাজানো ও দাঁড়ানো ব্যবস্থা বলে যেটাকে আমরা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করি – এরই তো ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অল্প বিস্তর ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। এটা পুরা ভেঙ্গে নতুন আসন্ন ব্যবস্থাটায় আমাদের জন্য কতটুকু কী রিলিফ দিবে তা তো কেউ এমনি দিবে না, আর তা বুঝে নিবার ব্যাপার ও কাজ আছে। সেজন্য আমাদের প্রথম কাজ হল, পরিবর্তনের অভিমুখ রবং কোথায় কী পরিবর্তন হতে পারে কতটুকু তা ঠিকমত বুঝে পদক্ষেপ নেয়া, নিজের অবস্থান নেয়া, দল জোট পাকানো ইত্যাদি। ফলে চীন ও ভারতসহ এই ইস্যুতে যারাই নতুন গ্লোবাল অর্ডার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিনিময়ব্যবস্থা দাঁড় করানোর পক্ষে থাকবে তাদের পক্ষে থাকা আমাদের কাজ। এই ইস্যু বাদে অন্য সব বিষয়ে আমেরিকা, ভারত ও চীনের লড়াই আসলে তাদের নিজ নিজ একান্ত স্বার্থে নিজের লড়াই। আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ তাতে নেই। অতএব সাবধান, এসব ধরনের লড়াইয়ে এই তিন শক্তির কোনো একটার পক্ষ নেয়া আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য বিপজ্জনক। বিশেষত এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার কোলে ঢুকে অপর দুই অথবা কোনো একটার পক্ষে দাঁড়ানো আরো বিপজ্জনক। যেমন, চীনের কোলে বসে চীন-ভারতের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীনের পক্ষ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। অথবা ঠিক একই কাজ কিন্তু উল্টা ভাইস ভারসা – ভারতের পক্ষে জোটবদ্ধ হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ভারত অথবা চীন কোনো একটার পক্ষ নিয়ে নিজের স্বার্থে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বা খেলার চেষ্টা – এটা অতিবুদ্ধিমানের গলায় দড়ির অবস্থাই তৈরি করবে।
এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী দেশ হলো শ্রীলঙ্কা। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে আমরা খুঁজছি রাষ্ট্রদূতের ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ ঠিক কী হতে পারে বা হওয়া উচিত।

কী কী নির্ণায়ক মেনে চললে সেটা ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ হবে :
০১. আমেরিকা, ভারত ও চীন – কোনো এক রাষ্ট্র অন্য দুইয়ের যে কারো উপর বাড়তি সামরিক স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা পায়, এমন কাজে সহযোগিতা করার বিষয়কে বাংলাদেশের জন্য হারাম জ্ঞান করতে হবে।
০২. তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অবশ্যই গভীরে নেয়া যাবে। কেবল কাউকে একচেটিয়া, বিশেষ করে অন্যকে বঞ্চিত করে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক করা বা দেয়া যাবে না।
০৩. এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মাপকাঠি হিসেবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের মুখ্য বিষয় অবশ্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ হতে হবে। এদিক থেকে তাকিয়ে কাজ করলেই তখন আর কোনো সিদ্ধান্তকে ‘কারো বিরুদ্ধে কাউকে বাড়তি সুবিধা’ দেয়ার জন্য করা হচ্ছে এমন হবে না। কেউ আঙুল তুলতেও পারব না।
০৪. এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার সামরিক স্বার্থকে বাংলাদেশের সাথে করা ওর বাণিজ্যের সম্পর্ক আলাপ ডিলের ভেতর আনা যাবে না। সযত্নে দূরে রাখতে হবে। যেমন গভীর সমুদ্রবন্দর এটা একমাত্র বাণিজ্যিক বিষয়, পারস্পরিক একমাত্র বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয় হিসেবে আসতে হবে। এর ভেতর কোনো ধরনের ইস্যু যেমন, সামরিক বিষয় আনা যাবে না। মিলানো যাবে না, হারাম জ্ঞান করতে হবে। বন্দর প্রজেক্টকে পরবর্তিতে কখনও প্রয়োজনে বা সময়েও সামরিক ব্যবহার করা যাবে না এই সুযোগ আগে থেকেই মুখবন্ধেই ঘোষণা দিয়ে নাকচ করে রাখতে হবে।
০৫. তিন রাষ্ট্রের কারো সাথে এমন কোনো সম্পর্কে যাওয়া যাবে না, যেটা দেশের নয় বরং ক্ষমতাসীন নিজ দলকে ক্ষমতা রাখতে সুবিধা পাওয়ার জন্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে – কারণ এর অর্থ হবে, নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেও একই কাজ করতে উসকানি দেয়া ও আগাম নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট দিয়ে রাখা।
০৬. এই তিন রাষ্ট্রের যেকোন কারো কাছ থেকেই যেকোনো সামরিক হার্ডওয়ার অবশ্যই কেনা যাবে; কিন্তু কোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, যেটা বিশেষত অন্য দুইয়ের যেকোনো এক অথবা দুটোরই বিরুদ্ধে তৎপরতা মনে হয় এমনটতে জড়ানো যাবে না। যেমন, চীনা সাবমেরিন বা আমেরিকান হার্ডওয়ার বা পুরান নেভি আইটেম কেনা, বা অল্প দামে পাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু এর বদলে অন্য দুই যে কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি বিশেষত যেটা এই তিনের অন্য যেকোন রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তা করা যাবে না।
০৭. কোনো “প্রতিহিংসায়” তিনের কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, পথ চলা বা পরিচালিত হওয়া যাবে না। তাতে অতীতে ওই রাষ্ট্র আমাদের নিজ দেশেরই কোনো এক রাজনৈতিক দলের সাথে বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক রক্ষা করে থাকুক না কেন। এর কারণ, আমাদের কোথাও না কোথাও ফুলস্টপ বলতে হবে। কেয়ামত সে কেয়ামত সেটা চলতে দেয়া যাবে না। কারণ প্রতিহিংসার সূত্রে আবার ভবিষ্যতে এই তিনের আর এক রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ ফেবার দেয়া অথবা বঞ্চিত কোনোটাই দিতে করতে শুরু হতে দেয়া যাবে না। যেমন ভারতের এখনকার ভূমিকার জন্য প্রতিহিংসা করা যাবে না। ভারত অথবা চীনকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক সহযোগিতায় জড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

ওপরের এই সাতটা পয়েন্ট দিয়ে যা বলতে চাচ্ছি তা হল পুরা বিষয়টা বুঝিয়ে বলার সুবিধার জন্য কেবল। এটা অবশ্যই এই সাত পয়েন্টই সব কথা বা শেষ কথা, তা মনে করে নেয়া ভুল হবে।

ঘটনার ব্যকগ্রাউন্ড শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার পরপর দু’বারের বিগত সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজা পাকসে। তার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহকে তাঁর কালে প্রথম বলপ্রয়োগে দমন ও বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপকে সমূলে উৎখাত করে দেয়া হয়েছিল। এ কাজে চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল। জাতিসংঘে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও এসংক্রান্ত চাপ সামলাতে ভূমিকা রেখেছিল দেশটি। ফলে বিদ্রোহ দমন-উত্তর পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার পাকসের সরকারকে চাপ সামলানোর দিক থেকে চীনের খুবই উল্লেখযোগ্য সহযোগিতার ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া আবার ঐ আমলে চীনের বিপুল বিনিয়োগও শ্রীলঙ্কায় এসেছিল। আর সর্বশেষ চীনের দুই সাবমেরিনের বহর তিনি শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করতে দিয়েছিলেন। কী বয়ানে কী সম্পর্কে চীনা সাবমেরিন এসেছিল, তা সাধারণ্যে যথেষ্ট স্পষ্ট জানা না গেলেও ভারতের সরকারের ও মিডিয়ায় এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল প্রবল। কারণ টেনশন কমিয়ে দূরে রাখার জন্য অনেক সময় ‘শুভেচ্ছা সফরেও’ নৌজাহাজ আমেরিকারটা চীনে অথবা চীনেরটা আমেরিকায় যায়। এমনকি আবার ‘যৌথ সামরিক মহড়াও’ হতে দেখা যায়।

মুক্তামালায় ঘিরে ধরার গল্প
এছাড়া  এ প্রসঙ্গে আর এক কথা বলা ভালো। বিগত ২০০৫ সালে বুশের আমলে ভারত-আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক শুরু হয়। এমনটা শুরু হওয়ার আগে ভারত সরকারের সামরিক, স্ট্র্যাটেজিক, নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোয় থিংক ট্যাংক বা এমন বিষয়ে গবেষণা খাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভারত সরকারি বিনিয়োগ খুবই কম ছিল। এরই অবসান ঘটেছিল, সামরিকসহ বহুবিধ খাতে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা চুক্তির যুগ ২০০৫ সালে শুরু হলে থিংক ট্যাংক বা গবেষণা খাতেও আমেরিকা সহযোগিতা দেবে এমন চুক্তি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান গড়তে সহযোগিতা দেবে বা আমেরিকান থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলবে, আমেরিকান পিএইচডি স্কলারশীপে বা কাজের খরচ যোগাতে স্কলারশিপে যৌথ গবেষণার কাজ করবে,   ইত্যাদি নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এতে আসল যে ঘটনাটা ঘটে যায় তা হল, আমেরিকান থিংক ট্যাংক-গুলোর বয়ান, দৃষ্টিভঙ্গি এরপর থেকে ভারতীয় ইনটেলেক্টদেরও বয়ান দৃষ্টিভঙ্গি হতে শুরু করে যায়। বিশেষত আমেরিকার চীনবিরোধী বা ক্যাম্পেইনমূলক যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর বয়ান ভারতে ভালোমতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেসব বয়ানগুলোই আবার এদের লেখা কলাম বা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সুত্রে ভারতীয় মিডিয়াতে ছেয়ে ফেলে। যেমন চীন নাকি গভীর সমুদ্রবন্দর বানিয়ে ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অথবা চীন ভারতকে সামরিক দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে। লাফলে ভারতীয় মিডিয়ার কল্যাণে এগুলো অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও পপুলার প্রপাগান্ডা এবং একচেটিয়া বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই প্রপাগান্ডা বয়ানের দুর্বল দিক হল, যেন গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো বিষয়টা সামরিক উদ্দেশ্যেই একমাত্র হয়, এটা ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ বন্দর বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্যই হতেই হয় বাণিজ্য। বাণিজ্য উদ্দেশ্য সাধিত হবার পরে পড়ে পাওয়া সুবিধা হিসাবে সামরিক কাজে এর ব্যবহার এটা অপ্সহনাল ব্যাপার। কখনই মুল উদ্দেশ্য হয় না। কারণ একমাত্র বাণিজ্যিক আয় দিয়েই কোন বন্দর বানানোর কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিপুল খরচ তুলে আনা সম্ভব। সে জন্য বাণিজ্যই একমাত্র ও  মুখ্য উদ্দেশ্য হতে বাধ্য। যদিও এরপর বন্দর মালিক রাষ্ট্রের অভিপ্রায় থাকলে এর দ্বৈত ব্যবহার হিসেবে সামরিক কাজে তা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় কেবল ভারতকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো করা হচ্ছে, তবে তা সত্যের অপলাপ এবং প্রপাগান্ডাই হবে। এ ছাড়া মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বলতে যে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, সেটাও কতটা সত্যি তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
এপর্যন্ত পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় দুটো গভীর সমুদ্রবন্দর হয়েছে, তাতেই মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বয়ান শুরু হয়। বাংলাদেশের সোনাদিয়া তখনো আলাপে আসেনি।বা এখনও বাস্তবায়নের আলাপ নাই। কিন্তু এই প্রপাগান্ডায় যে ফ্যাক্টসকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয় তা হল, চীনের উত্তরপুর্ব দিক ছাড়া বাকি তিন দিকের ভুখন্ড ল্যান্ড লকড – ভুবেষ্টিত। সমুদ্রে বের হবার পথ নাই। বিশেষ করে চীনের পুরা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পুর্ব দিক পাহাড় পর্বতে অগম্য। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পুর্ব সীমান্ত পুরাপুরিভাবে ল্যান্ড লকড হলেও তা ছুটাবার কিছু সুযোগ আছে। যদিও ওসব দিক দিয়ে কোন সমুদ্রে বের হওয়ার উপায় নেই, কিন্তু চীনের পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব (কুনমিং) অঞ্চলের মানুষকে পুরা চীনের সাথে সমানতালের বিকাশে আনতে চাইলে চীনকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে বন্দর বানিয়ে দিয়ে ওই বন্দর নিজেরও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্রেতা হিসেবে হাজির হলে তা উভয় দেশেরই লাভ হতে পারে। যার মূল কারণ চীনও ওসব বন্দরের ব্যবহারকারি হবে বলে এই অর্থে বিনিয়োগ পরিকল্পনার খরচ তুলে আনা ভায়াবল হয়, তাই। অন্য দিকে চীনেরও ল্যান্ড লকড দশা ঘোচে। অর্থাৎ মুক্তোমালার গল্প থুয়েও আমরা এর ভিন্ন ও আর এক বয়ান পেতে পারি। অর্থাৎ পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ চীনকে দেয় তবে সবারই বাণিজ্যিক লাভ হয়। তাই চীনের ল্যান্ড-লকড দশার দিকে নজর না দিয়ে কেবল ভারতকে ঘিরে ধরার জন্য এই বন্দর নির্মাণ করছে এই বয়ান খুবই নিম্নমানের প্রপাগান্ডা। এখন এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগের উপরে চীনকে সামরিক ব্যবহারের সুযোগ খুলে তখন ভারতের প্রপাগান্ডা অর্থপুর্ণ হতে পারে। আপাতত এবিষয়ে  কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ছায়া চিহ্নও নাই।

গল্পের বিকল্প ও বুদ্ধিমান হওয়া
তবু ভারতের মনে সন্দেহ আছে এটা বাস্তবতা। এই আলোকে ভারত বুদ্ধিমানভাবে ইতিবাচক হতে পারে। যেমন এসব বন্দর ব্যবহারের চুক্তি যেন অ-সামরিক থেকে যায় এই স্বার্থকে লবি বা পারশু করা। বিশেষত ভারতও ওসব বন্দর ব্যবহারকারি হয়ে নাম লিখানো সবচেয়ে ভাল। সেক্ষেত্রে ঐ বন্দর “কেবল বাণিজ্যিক কাজেই” ব্যবহারকারি সকলে ব্যবহার করবে একথা মুখবন্ধ ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া সহজ। যেমন  বাংলাদেশের বেলায় তো এটাই সহজ পথ।
বিশেষ করে যেমন, বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর যদি হয়, তবে বাস্তবতই এর ব্যবহারকারী হবে চীন ও ভারত উভয়েই। কারণ এরা উভয়েই – চীনের বেলায় ওর দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশ (কুনমিং) এবং ভারতের বেলায় ওর পুরা সাতভাই পূর্ব দিক ল্যান্ড লকড। কারণ এখানেও আবার বন্দরের ব্যবহারকারী বেশি হবে বলে বন্দর বানানোর বিনিয়োগ খরচ তুলে আনার সম্ভাব্যতা সম্ভাব্য এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো এবং কম সময়ে ঘটবে। আর সে জন্য এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশকে আগেই ঘোষণা করে বলতে হবে এবং বলা সম্ভব যে বিদেশীদের এই বন্দরের সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ যে বন্দরের সম্ভাব্য ব্যবহারকারী চীন ও ভারত উভয়েই, সেখানে একমাত্র আগেই নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে তবেই এই প্রকল্প নেয়ার পথে আগানো সম্ভব।

যা-ই হোক, আমাদের শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে ফিরে যাই।  শ্রীলঙ্কার হাম্বনটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর এমনিতেই অনেক আগে থেকেই ‘মুক্তামালায় ঘিরে ধরার’ প্রপাগান্ডার শিকার। এর ওপর আবার শ্রীলঙ্কায় চীনা সাবমেরিন আসাটা, বোঝা যায় এটা যথেষ্ট সেনসিটিভিটি বা সতর্কতার সাথে করা হয়নি, তা আজ বলাই বাহুল্য। এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচনে রাজাপাকসেকে সরাতে ভারতের বিশেষ হস্তক্ষেপ তৎপরতার অভিযোগ পাকসে ক্যাম্প থেকে উঠেছিল। শ্রীলঙ্কায় পরপর দু’বার নির্বাচন ঘটিয়ে পাকসের বিপরীত ক্যাম্প ‘চীনের সে বাড়তি প্রভাব’ দূর করেছে। আপাতত নতুন সরকার থিতু হয়েছে। সেসবের বিস্তারে এখানে না গিয়েও বলা যায়, রাজা পাকসের অতিরিক্ত চীনের দিকে ঢুকে যাওয়ার অভিযোগ কমবেশি সত্য। এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেই শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত সম্ভবত বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সাথে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে।’
আবার সমান সম্পর্ক বলতে এক ধরণের ভারসাম্যমূলক এক সম্পর্কের কথা তিনি বলছেন। কিন্তু এখানে সমান মানে ‘সমান দূরে’ ঠিক তা নয়। আবার ভারসাম্য বলতেও লাঠির এক দিকে চীনকে, অন্য দিকে ভারতকে বেঁধে কাঁধে নেয়ার ভারসাম্য ঠিক তাও নয়। বরং ওপরে যে সাতটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছি সে আলোকে এটা বোঝা যেতে পারে। যার সারকথা হলো, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাকে ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব অবিশ্বাস ও সন্দেহের ভেতরে, ওর অংশ হওয়া যাবে না। এটা ভুল হবে। এই অর্থে এটা সমান সম্পর্ক বা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক।

সতর্কতা
এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, এ কালের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সম্পর্ক সব সময় বিশেষ। েই অর্থে যে, তা কোনভাবেই আর আগের দিনের (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার আগের) মত নয়। কোনোভাবেই তা রাশিয়া-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের কালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা যাবে না, গেলে ভুল হবে। স্পষ্টতই কারণ এখানে চীন-ভারতের দ্বন্দ্বের কথা যেমন বলা হচ্ছে ঠিক, তেমনই সেই চীনের সাথেই আবার মোদি সরকারের আমলে ভারতের ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, কাজ চলছে। চীন-ভারত উভয় পক্ষের বাণিজ্যের বাজার ৭০ বিলিয়ন ডলারের কম নয়। এ দিকগুলো মনে রেখে ভারত-চীন সম্পর্ক বুঝতে হবে।

অস্থির উথালপাথাল সময়ে বুদ্ধিমান প্রুডেন্ট হওয়াই একমাত্র ভরসা।

[এই লেখাটার আগের ভার্সান দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটা আরও পরিবর্তন, সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল]

নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন

নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন
গৌতম দাস

০৯ এপ্রিল ২০১৫

https://wp.me/p1sCvy-9Y

আগামী দিনের ইতিহাসে ১২ মার্চ ২০১৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে সম্ভবত বিবেচিত হবে। ঘটনাটার শুরু, গত বছরের অক্টোবরে চীনের সাংহাইয়ে চীন কর্তৃক প্রস্তাবিত Asian Infrastructure Investment Bank (সংক্ষেপে AIIB), এর উদ্যোক্তা সদস্য হতে আগ্রহী দেশগুলোর আহূত এক সম্মেলন থেকে এই ব্যাংকের কার্যক্রমের হাজিরা ঘোষণা করেছিল। AIIB কার্যকর হলে তা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখতে শুরু করবে। ওই সম্মেলন থেকে উদ্যোক্তা পত্র বা Memorandum of Understanding (MOU)-এ স্বাক্ষর করা শুরু হয়েছিল। উদ্যোক্তা সদস্য কারা কারা হতে চায় সেই সম্মতি জানানোর খাতা তখন থেকে খোলা হয়েছিল। উদ্যোক্তা স্বাক্ষরদান বন্ধ হওয়ার শেষ দিন ৩১ মার্চ ২০১৫। উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় ১৩ মার্চ ২০১৫ হঠাৎ করে ব্রিটেন ওই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়ার ওপর মাতবরি, আধিপত্য প্রভাব জারি রাখার উদ্দেশ্যে মাতবর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় আলোচনার জন্য ‘জি৭’ বা গ্রুপ সেভেন নামে একটি সংগঠন আছে। গ্রুপ সেভেন অন্তর্ভুক্ত সাত রাষ্ট্রের সবাই তবে আলাদা আলাদা করে AIIB-এর ঘোষণার সময় ঘটনাটিকে বাঁকা চোখে দেখেছিল। এখন ‘জি৭’-এর ব্রিটেন একমাত্র রাষ্ট্র যে দলছুট হয়ে বিপরীত ক্যাম্পে যোগদানের সিদ্ধান্ত জানাল। ওদিকে ব্রিটেনের এ সিদ্ধান্তে আমেরিকা সবচেয়ে অখুশি ও অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। জবাবে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে আমেরিকার সঙ্গে আমাদের অবস্থান নিয়ে কথা হয়েছে।’ আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় ‘এটা সারপ্রাইজ সিদ্ধান্ত’। বোঝাই যাচ্ছে, AIIB-এর উত্থান বা আবির্ভাব কোনো সাধারণ ব্যাংক আবির্ভাবের মতো ফেনোমেনা নয়। এটি ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েই ফাংশনাল হতে যাচ্ছে, ফলে স্বভাবতই তা হবে এ দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের ভেতর দিয়ে ওই যুদ্ধের পর থেকে (১৯৪৪) ইউরোপকেন্দ্রিক কলোনি শাসনের যুগের সমাপ্তি টেনে অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন করে পশ্চিমা শাসন দুনিয়াতে কায়েম হয়েছিল। এর সবচেয়ে তাৎপর্যময় দিকটি ছিল, আমেরিকা নিজের আধিপত্যের নতুন কাল শুরু করেছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে – আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসংঘ আর ডবিস্নউটিও এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। এ চার প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুইটি গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য, তৃতীয়টি গ্লোবাল রাজনৈতিক (পরাশক্তিগত) ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য আর চতুর্থটি গ্লোবাল পণ্য রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য। এভাবেই দুনিয়াতে নিজের অধীনস্থ নিজেদের দিকে কান্নি মারা এক গ্লোবাল আধিপত্য ব্যবস্থা কায়েম ও যাত্রা শুরু করা হয়েছিল। গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দুনিয়ায় আধিপত্য করার এ ফেনোমেনা এর আগের ৩০০ বছরের কলোনি যুগেও দেখা যায়নি। কলোনি যুগ সেটা পারেনি। যেমন আইএমএফের প্রধান ভূমিকা বা ম্যান্ডেট হলো, আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা চালু রাখা। সে কাজে মুখ্য প্রয়োজনীয় হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিনিময় মুদ্রা। আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে আয়ব্যয়ের ঘাটতিতে পড়া সদস্য কোনো রাষ্ট্রকে ধার দিয়ে ঘাটতি পূরণ – এ দুই মূল কাজের মাধ্যমে গ্লোবাল মুদ্রা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ করে আইএমএফ সে ভূমিকা বাস্তবায়ন করে থাকে। মানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের সঙ্গে আর তিনটি প্রধান মুদ্রার তুল্য বিনিময় হার নির্ধারণ করে, এরপর বাকি সব সদস্য রাষ্ট্রের মুদ্রার বিনিময় হার সেই নিরিখে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করে থাকে। এটা বলা বাহুল্য যে, এ প্রাতিষ্ঠানিকতা একচেটিয়া আমেরিকা বা এর মুদ্রা ডলারের অধীনে নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো গরিব বা ছোট অর্থনীতির দেশের ওপর আধিপত্য কায়েম করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ অস্বস্তি সত্ত্বেও এর ভেতর দিয়ে পড়ে পাওয়া সুবিধার দিকটি হলো, আমেরিকার দিকে কান্নি মারা হলেও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা, যেটাকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বলছি তা দুনিয়ায় সেই থেকে চালু হয়ে আছে। চলতি এ গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি যুগের মুদ্রা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও মান নির্ধারণের লক্ষ্যে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম ঘটেনি। এমনকি কোনো কলোনি মাস্টার যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রাষ্ট্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কিছু ছিল না। আর মুদ্রার মান বা হার নির্ধারণ নিয়ন্ত্রণও কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করত না। ব্যাংক অব ইংল্যাল্ডকে মাত্র ১৯৪৬ সালে সরকার অধিগ্রহণ করে ব্রিটেনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের দায়িত্বে হাজির করে। দেশের ব্যাংক ব্যবসা ও স্থানীয় মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ সেন্ট্রাল ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নিতে হবে – এ ধারণাটি ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সমসাময়িক ঘটনা। কারণ আইএমএফ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমেই নিজের উপস্থিতি, কর্তৃত্ব তৎপরতা ও কার্যকারিতা কায়েম করে থাকে। সে সময় এসবের কোন বালাই ছিল না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ছিল খুবই সীমিত পর্যায়ে। ফলে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হতো কোনো প্রাইভেট ব্যাংকে নয়, যেমন হত রথশিল্ড-পরিবার ধরনের পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে; বাবা রথশিল্ড আর তার তিন ছেলে ইউরোপের চার শহরে বসে পরস্পরের যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে বিনিময় হার নির্ধারণ করে দিতেন। এভাবেই এক মুদ্রা বিনিময় হার ও মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফলে সীমিত পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ব্যবস্থা সে সময় চালু ছিল। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় কথা হলো, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মুদ্রা বিনিময় হারের এই ব্যবস্থার প্রতি বাজারের আস্থাহীনতার কারণে ভেঙে পড়েছিল চিরদিনের জন্য। পরে শেষমেশে এ প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে ১৯১৪ থেকে ১৯৪৪ এই ৩০ বছর কোনো আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা বলে কিছু ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। এরপর এমন দুর্দশায় পৌঁছানো ইউরোপ বারবার অনুরোধ করে একেবারে হাতে-পায়ে ধরার অবস্থায় পৌঁছে, আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় (আইএমএফ) আমেরিকান ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সূচনা হয়। আমেরিকার হাতে-পায়ে ধরা আর ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো – এসবের মূল কারণ একটাই। তা হলো ১৯১৪ সাল থেকেই যুদ্ধে জড়িয়ে ইউরোপের প্রতিটি রাষ্ট্র যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় আয়ব্যয়ের মারাত্মক অসামঞ্জস্য ঘাটতির মুখোমুখি হয়। পরিণতিতে প্রত্যেকেই জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েও অন্য দেশের মুদ্রার তুলনায় নিজ মুদ্রার একটি স্থিতিশীল মান বা হার ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতে সে সময়ের একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। তাই ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা মেনে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো, ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা সাজানো ছাড়া কারও উপায় ছিল না। আইএমএফের জন্ম হয় এভাবেই। সে থেকে ডলারকেন্দ্রিক অন্য মুদ্রার হার নির্ণয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্যের খাতায় ডলার হিসাবের মুদ্রা হয়ে পড়া ও অন্যান্য মুদ্রার হার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করে আসছিল আইএমএফ। সংক্ষেপে এ হলো ডলারের উত্থান ও শাসন কাহিনী। কিন্তু ১০ বছরে ক্রমেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সে কাহিনীতে নয়া ওলটপালট আসন্ন হওয়ার আলামত দেখা দিতে শুরু করেছে।

শুরু করেছিলাম ইতিহাসের কথা তুলে। সে আগামী দিনের ইতিহাস মানে কোন ইতিহাসে- ‘গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক’ অর্থনৈতিক ইতিহাসে। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা বা অর্ডার শৃঙ্খলের ওপর এবার চীনের নতুন করে নতুন প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়ার প্রভাব  – এটা  শুধু গ্লোবাল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এ প্রভাব পড়বে ও ধীরে ধীরে বাড়বে- দুনিয়ার পরাশক্তিগত ভারসাম্যে, গ্লোবাল রাজনীতিতে, স্ট্র্যাটেজিক ও সামরিক ইত্যাদি সব গ্লোবাল ফেনোমেনাকে তা প্রভাবিত করবে। চলতি একুশ শতকের প্রথম দশক (২০০১-২০১০) গ্লোবাল পরাশক্তিগত পরিস্থিতিতে দুইটি নতুন ইঙ্গিত হাজির হতে দেখা দিয়েছিল। প্রথমটি গ্লোবাল রাজনৈতিক ফেনোমেনা আকারে। দুনিয়ায় পশ্চিমের ক্ষমতা আধিপত্যের শাসনকে চ্যালেঞ্জকারী ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে সামনে আনা বা তুলে ধরার নতুন রাজনৈতিক ফেনোমেনা। গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের এ নয়া প্রভাব আর এর পাল্টা পশ্চিমের ‘ওয়ার অন টেরর’ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, পরিণতিতে আগামীতে দুনিয়া দেখতে কেমন হবে তা এখনও ফয়সালা হয়নি। তা আদৌ হবে কিনা, নাকি কে হেরে যাবে তা এখনও অমীমাংসিত অসমাপ্ত। তবে ছড়িয়ে পড়া বা বিস্তৃতির দিক থেকে বললে গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব ভালোই ছড়িয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকা বাদে সব মহাদেশকেই তা স্পর্শ করে ফেলেছে বলা যায়। এছাড়া ওদিকে ঐ দশকের দ্বিতীয় ফেনোমেনাটা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের উত্থান। আর এর প্রভাবে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভূমিকা নড়বড়ে হয়ে নতুন এক পরাশক্তিগত ভারসাম্য আসন্ন হওয়ার ইঙ্গিত। এর রাজনৈতিক ইঙ্গিতগুলো অনুভূত হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই; কিন্তু আমেরিকার সরকারি গবেষণা, স্টাডি এবং প্রাপ্ত নিউমেরিক্যাল ডাটা প্রজেকশন থেকে প্রথম নতুন চিত্র স্পষ্ট হয় ২০০৭-৮ সাল থেকে। অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজির প্রবাহ পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী হতে শুরু করেছে- এ তথ্যগত স্বীকৃতি তখনকার প্রকাশিত রিপোর্ট থেকেই প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, পুঁজির এ প্রবাহের ধরন কেবল একমুখী অর্থাৎ ভবিষ্যতে আবার কোনোদিন এর বিপরীতমুখী হওয়ার সম্ভাবনা নেই- এটাও সেই গবেষণালব্ধ ফলে প্রকাশিত হয়। এ গবেষণা হয়েছিল আমেরিকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের’ অধীনে এবং ২০০৮ সালে জনসমক্ষে প্রকাশিত রিপোর্টে। এমনিতেই এমন পরিসংখ্যানগত গবেষণা রিপোর্ট প্রতি চার বছর অন্তর প্রকাশিত হওয়া এক চলমান ঘটনা। তবে ২০০৮ সালের রিপোর্ট ছিল স্বভাবতই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওই রিপোর্টকে বলা যেতে পারে, গ্লোবাল অর্থনীতি ও পরাশক্তিগত পরিস্থতিতে আসন্ন নতুন করে সাজানো ভারসাম্যের ইঙ্গিত। এসব ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান কী হতে যাচ্ছে সেসব জানা ও জানানো। কিন্তু বাস্তবে সে জায়গায় চীন পৌঁছাবে কী করে আর তাতে উপস্থিত মাতবররা কে কি ভূমিকা নেবেন এসবের বাস্তব রূপ আকার দিতে যাচ্ছে AIIB-এর আবির্ভাব। কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের চীন যে এমন কিছু করতে যাচ্ছে তা অনেক আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। যেমন- নিজ বাণিজ্যের উদ্বৃত্তের অর্থ নিয়ে চীন চুপচাপ পুরনো কান্নি মারা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক যেমন আছে, তেমনি রেখে এতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুনিয়াতে নিজের নতুন প্রভাব যোগ করার চেষ্টা করা – এটাকে চীন সঠিক মনে করেনি। তাই এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটিং রাইট ইত্যাদিতে সংস্কারের দাবি করেছিল। প্রতিষ্ঠান দুইটি ২০০৯ সালের বার্ষিক সম্মেলন থেকেই এ ব্যাপারে নিজের সম্মতির কথা জানান দিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতে সাড়া দেয়নি। প্রতিষ্ঠান দুটোর সংস্কার প্রস্তাবের ফাইল সেই থেকে আমেরিকান কংগ্রেসে পড়ে আছে। ফলে ২০০৯ সাল থেকেই চীন বিকল্প উদ্যোগ নেয়ার পথে চলতে শুরু করে। আর এতে বিশেষত রাশিয়ার প্রবল আগ্রহে BRICS ব্যাংক নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ শুরু হয়। রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকাকে নিয়ে রাশিয়াতে প্রথম ব্রিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সে থেকে প্রতিবছর ব্রিক সম্মেলন হওয়া সত্ত্বেও ইন্ডিয়ার নড়বড়ে হাফ-হার্টেড ভূমিকার জন্য ব্রিক কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে এখনও অনেক দূরে থেকে যায়। এ অবস্থা দেখে চীন আর এক বিকল্প উদ্যোগে আগানো শুরু করে। মাত্র ২০১৩ সালে AIIB-এর ঘোষণা দিয়েই পরের বছর ২০১৪ সালে AIIB এর উদ্যোক্তা সম্মেলন ডেকে বসে চীন। ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের চেয়েও AIIB-এর উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনেক গতিশীল। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ব্রিটেনের এতে যোগদানের সিদ্ধান্ত বিরাট সাড়া ফেলতে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া অক্টোবরের AIIB-এর উদ্যোক্তা সম্মেলনে প্রায় যোগ দিয়েই ফেলেছিল; কিন্তু ওবামার কড়া হুমকি ও লবিংয়ের কারণে এরা শেষে থমকে যায়। এবার ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের প্রভাবে ওবামার বাধা পেরিয়ে দেশ দুইটি এবার সম্ভবত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। এ বছরের শেষ থেকে উদ্যোক্তারা AIIB-কে কার্যকর করে ফেলতে চান। AIIB-এর উত্থান ৭০ বছরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর ওলটপালট ঘটনা হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে।

দুইঃ

চীনের বিশ্বব্যাংক, এবার “উন্নয়ন” এর অর্থ কি বদলে যাবে
আগের পর্বে বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং একে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনের নেতৃত্বে AIIB ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে বলেছিলাম। AIIB ব্যাংক গড়ার লক্ষ্যে চীনের সাংহাইয়ে প্রথম উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়েছিল গত বছর ২৬ অক্টোবর। ওই সম্মেলনে এশিয়ার বাইরের কোনো রাষ্ট্র যোগ দিতে আসেনি। AIIB প্রসঙ্গে আগের লেখাতে ফোকাস করেছিলাম ১২ মার্চ, আচমকা ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে। এবারের ফোকাস অন্যদিকে। AIIB-তে বিশ্বব্যাংকের মতোই শুধু কোনো রাষ্ট্রই এর সদস্য হতে পারে, কোনো প্রাইভেট কোম্পানি বা ব্যক্তি নয়। আর সম্মেলনের দিনেই কে কে উদ্যোক্তা হতে চায় এমন রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি স্বাক্ষর বইয়ে সই করেছিল এশিয়ার ২০টি রাষ্ট্র। এরপর সে স্বাক্ষর খাতা খুলে রাখা হয় পরবর্তী পাঁচ মাস, ৩১ মার্চ পর্যন্ত। মঙ্গলবার শেষ দিন গত হয়েছে। এর মানে কি এখন আর কেউ সদস্য হতে আবেদন জানাতে পারবে না? না ঠিক তা নয়। ৩১ মার্চের পরের আবেদনে কেউ সাধারণ সদস্য হতে পারবে, কিন্তু আর উদ্যোক্তা সদস্য হতে পারবে না। যেমন- বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল, স্বাক্ষর করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সদস্যদের একজন। তাতে বাংলাদেশের বাড়তি কী লাভ হতে পারে? লাভ হল। এখন শুধু উদ্যোক্তা সদস্যরাই বসে আগামী বছর থেকে কাজে নেমে যেতে চাওয়া AIIB ব্যাংকের ম্যান্ডেট অর্থাৎ এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেল লিখবে। আর একটু সোজা কথায়, কে কত শেয়ার মালিকানা নেবে, পরিচালনায় কে কোন পদপদবি নেবে-পাবে, দায় নেবে, পরিচালনার নীতি, সদস্যপদের চাঁদা ধার্যের নীতি, ঋণ দেয়ার নীতি ইত্যাদিসহ পরিচালনার সব বিষয়ে নির্ধারণ করতে পরস্পরের সঙ্গে নিগোসিয়েশনের টেবিলে বসবে, নিজ নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে, নীতি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। যারা ৩১ মার্চের পর সদস্যপদের আবেদন করবে তারা আর এই টেবিলে বসার সুযোগ পাবে না। এ হলো ফারাক। তবে একথা থেকে বোঝাই যাচ্ছে, ওই টেবিলে বসাটাই আবার শেষ কথা নয়, নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা, আরও স্পষ্ট করে বললে মূলত কী পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের অর্থনীতি আমার রাষ্ট্রের আছে এবং তা কতটা দীর্ঘ লাগাতার- এসবই ঠিক করে দেবে নেগোসিয়েশন টেবিলে আমার গলার স্বরের ওজন কেমন হবে। তবে আবার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার মতো ইস্যুগুলো নেগোসিয়েশনের মতো বিষয় নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের নিজের দক্ষ ও স্বচ্ছ হয়ে টিকে থাকা না থাকার বিষয়। তাই এসব বাস্তবে বেস্ট যা করা সম্ভব তাতে সবার ঐকমত্যই ঘটবে তা আশা করা যেতে পারে। আর কিছু প্রসঙ্গে সিরিয়াস বিতর্ক দেখা দেবেই, তা বলা বাহুল্য।

যেমন ‘উন্নয়ন’ বা ইংরেজিতে ‘ডেভেলপমেন্ট’ শব্দের কথাই ধরা যাক। অনেকে আমরা হয়তো খেয়াল করেছি অথবা না, তবে এটা বুঝি এ শব্দটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে চলে এমন এক শব্দ। এ শব্দের বিশেষ অর্থ ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে নতুন বিশেষ অর্থে কয়েন করে নেয়া হয়। বিশেষ কিছু বোঝানোর শব্দ হয়ে যায় এটা। এ শব্দ আর এর ভাবের প্রভাবে আমাদের রাজনীতির ভোকাবুলারিও বদলে গেছে। যেমন বলা হয়, আমরা ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ করি বা করব। এমন ভাবের বাক্য ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্ব্বার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত চালু এবং সরকার বা বিরোধী সবাই ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, অহরহ ব্যবহার করি। ভোটার, জনগণের কাছেও এর অর্থ আছে, নিজের মতো করে বুঝে, কমিউনিকেটেডও হয়, পৌঁছায়। ভোটার-জনগণও কিছু একটা বোঝে। তাহলে এমন প্রশ্ন তুললাম কেন যে, AIIB ব্যাংক গঠনের নেগোসিয়েশনের কালে উন্নয়ন শব্দটা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিতে পারে? সে প্রসঙ্গ হলো এ পর্বের রচনার ফোকাস। কিন্তু সরাসরি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং কিছু বিষয় ধারণা পরিষ্কার করার ভেতর দিয়ে যাব। যেমন- AIIB ব্যাংক কী? এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলতে হচ্ছে এটা বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হতে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও সেই সূত্রে আইএমএফ এরা কেমন প্রতিষ্ঠান, কী করে, কেমনে করে ইত্যাদি সম্পর্কে সোজা ভাষায় কিছু ধারণা দেয়া ছাড়া AIIB ব্যাংক নিয়ে কোনো ধারণা স্পষ্ট করা যাচ্ছে না। তাই এবারের সেকেন্ডারি প্রসঙ্গ হলো এ দুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সংক্ষেপে একটা ধারণা দেয়া।

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বাস্তবিক কার্যকারিতার দিক থেকে এর তাৎপর্য বলা হয়, এটা যেন আমেরিকা রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির বর্ধিত হাত ধরনের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো প্র্যাকটিক্যাল অর্থে বলা কথা, আইনি নয় বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যান্ডেট বা এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেলে সরাসরি এমন কথা লেখা নেই। কিন্তু আমরা সবাই জানি, টের পাই যে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর যে কোনো সিদ্ধান্তের ওপর আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রবল শুধু নয়, একচেটিয়া।

আইএমএফের বেলায়, এরকমটা সম্ভব করে তোলা হয়েছিল সদস্যপদ লাভের নিয়ম বা শর্ত যেভাবে আরোপ করা হয়েছে সেখান থেকে। প্রত্যেক রাষ্ট্রকে তার অর্থনীতির সাইজের অনুপাতে নির্ধারিত-ধার্য সদস্য চাঁদা দিয়ে তবেই সদস্যপদ পেতে হয়। যেহেতু এটি ঠিক ব্যাংক নয়, সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ধার্য বিভিন্ন পরিমাণ চাঁদা একাট্টা করে তৈরি একটি ফান্ডমাত্র, ফলে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা শেয়ার যার বেশি পরিচালনা সিদ্ধান্তে তার বক্তব্যের মূল্য তত বেশি। এ কায়দায় আইএমএফের ওপর আমেরিকান প্রভাব বেশি নিঃসন্দেহে; কিন্তু সেটা কায়েম করা হয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি আমেরিকার, ফলে সদস্য পদে প্রবেশের চাঁদা তার সবচেয়ে বড়, এই কায়দা করে। তবে এভাবে সংগৃহীত আইএমএফের ফান্ড ঠিক বাণিজ্য বিনিয়োগের পুঁজি হিসেবে বা মুনাফা লাভের উদ্দেশে খাটানো হবে এমন ফান্ড নয়। এ ফান্ড ব্যবহার করা হয় শুধু কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ব্যয়ে ঘাটতি থেকে গেলে। সেক্ষেত্রে ওই বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য এ ফান্ড থেকে শর্তসাপেক্ষে তাকে ঋণ দেয়া হয়। তবে মাত্র ০.৭৫% সুদে, অর্থাৎ ওই ঋণ সুদে খাটানোর জন্য বা মুনাফা কামানোর জন্য নয় বরং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় তুলতে সার্ভিস চার্জ হিসেবে নেয়া হয়। তাই এত স্বল্প পরিমাণ। এটাই আমাদের মতো এলডিসি বা স্বল্পোন্নত (অর্থনীতির) দেশের বেলায় দেয়া কনসেশনাল আইএমএফ ঋণ সুবিধা। আর মধ্যম আয়ের দেশ হলে সার্ভিস চার্জের ওপর কিছু মুনাফাও ধার্য হবে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে ধার দেয়ার পূর্বশর্ত হলো, সদস্য দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে আইএমএফের ফর্দ অনুসারে সংস্কার আনতে হবে। এমন এক চুক্তিতে রাজি হতে হবে, আর তা মনিটরিং ও সঠিক পালন সাপেক্ষে কিস্তিতে ধাপে ধাপে ঋণের অর্থ ছাড় করা হবে। এ হলো আইএমএফের একটি প্রধান দায়িত্ব- ম্যান্ডেট বা ঘোষিত উদ্দেশ্য। আইএমএফের দ্বিতীয় করণীয় বা ম্যান্ডেট হলো, প্রত্যেক রাষ্ট্রের মুদ্রার মান-হার অন্য মুদ্রার তুলনায় কত তা প্রতিদিন সকালে প্রকাশ করা। এখানে অন্য মুদ্রা মানে, সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক লেনদেন হয় এমন চারটি মুদ্রা- ডলার, ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েন। এ চারের গড় করে প্রতিদিন তা ডলারে প্রকাশ করা হয়। আইএমএফের ভাষায় আর তার খাতাপত্রে প্রতিদিনের এ গড় মূল্যের নাম SDR, এমনকি প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের আইএমএফ অ্যাকাউন্টের অবস্থা কি, এর হিসাবকিতাব করা ও রাখা হয় SDR মূল্যে। এ অর্থে বলা হয়, আইএমএফের নিজস্ব মুদ্রার নাম SDR. আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের SDR-এর দাম লটকানো থাকে। যেমন ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে এক USD = 0.724763 SDR। আগেই বলেছি, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দাতা বা খাতক সদস্য শুধু কোনো রাষ্ট্রই হতে পারে। কারণ এর লক্ষ্য রাষ্ট্র মানে রাষ্ট্রের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এভাবেই আমেরিকার দুনিয়ার অর্থব্যবস্থার ওপর প্রভাব, কর্তৃত্ব আইএমএফের মাধ্যমে রাখার অবস্থা তৈরি হয়। তবে একটি সুবিধার দিকও আছে, কোনো রাষ্ট্র বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি বাধিয়ে না ফেললে আইএমএফের কাছে বন্ধক বা শর্তের বন্ধনে পড়ার দরকার হয় না।

এবার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তির আয়োজন প্রসঙ্গে। কোনো কোনো ব্যাংকের নামের মধ্যে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’, ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘রিকনস্ট্রাকশন’ ইত্যাদি থাকতে দেখা যায়। নামের মধ্যে কামের অর্থাৎ ওই ব্যাংক কী ধরনের ব্যাংক, এর চিহ্ন ধারণ থাকে, ইতিহাসও লুকিয়ে থাকে। যেমন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘ইউরোপিয়ান ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আবার বিশ্বব্যাংকের পুরো নাম IBRD, ভেঙে বললে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আমাদের রাজনীতি ও সমাজে ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন শব্দটা আমাদের এদিকে সত্তর দশক থেকে আমদানি ঘটেছিল, পরিচিত হতে শুরু করেছিল। পশ্চিমা দেশেও এ শব্দটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পরিচিতি পেতে শুরু করে। যত জায়গাতেই ডেভেলপমেন্ট শব্দের ব্যবহার দেখা যাক না কেন ওই শব্দ আসলে অর্থ করে, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। অর্থাৎ ডেভেলপমেন্ট মানেই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বুঝলে তবে ডেভেলপমেন্ট শব্দের অর্থের তালাশ মিলবে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কথাটা সংক্ষিপ্তি পেয়েছে শুধু “ডেভেলপমেন্ট” বা ‘উন্নয়ন’ উচ্চারণ করে। কিন্তু ইনফ্রাস্ট্রাকচার মানে আবার কী? বাংলায় এর প্রতিশব্দ আমরা করে নিয়েছি ‘অবকাঠামো’। প্রতিশব্দ জানলেও তবু প্রশ্ন থেকে গেল, অবকাঠামো মানে আবার কী, কার অবকাঠামো, কী সূত্রে – এসব বুঝতে আমাদের যেতে হবে ক্যাপিটাল বা ‘পুঁজি’ ধারণায়। কারণ এসব শব্দ পুঁজি ধারণার চোখে দেখা এবং দেখে তৈরি হওয়া সংশ্লিষ্ট আরও ধারণা এবং ডেরিভেটিভ বা অনুসৃত শব্দ। অর্থাৎ পুঁজি এ ফেনোমেনার চোখ দিয়ে না দেখলে তা থেকে অনুসৃত শব্দগুলোর অর্থ খুলবে না। অবকাঠামো ঋণ বলতে ফিজিক্যাল (রাস্তাঘাট, ব্রিজ ইত্যাদি খাতে) ও হিউম্যান (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে) এ দুই ধরনের অবকাঠামো খাতেই ঋণ বুঝায়। অবকাঠামো বলার বা এ শব্দে চেনানোর কারণ এগুলো ঠিক বাণিজ্যিক তৎপরতা হিসেবে দেখে দেয়া ঋণ নয়। ঋণ ব্যবসার বাজারের তৎপরতায় টার্মোনোলজি হিসেবে যা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তা বোঝাতে অবকাঠামো ঋণ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কোনো ঋণ বাণিজ্যিক কিনা, তা বোঝার মূল নির্ণায়ক সুদের হার। বিশ্বব্যাংকের অবকাঠামো ঋণের সুদ ০.৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ শতাংশের নিচে। এটা ঠিক ঋণের অর্থের ওপর সুদ নয় বরং ঋণ দিবার বিষয়টা পরিকল্পনা, প্রজেক্ট নেয়া, তা বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যে অফিস পালতে হয় সেই অফিস পালা-পরিচালনার খরচ। ব্যাংকের ভাষায় এটাকে সুদ না বলে সার্ভিস চার্জ বলে। এতক্ষণ সব শুনে তো বিশ্বব্যাংকের সবই ভালো মনে হচ্ছে। তাহলে বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো ঋণ দেয় কেন? কী ঠেকা তার? এককথায় বললে, গ্লোবাল পুঁজিবাজারে (আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট, সিঙ্গাপুর বা দুবাই থেকে মূলত পরিচালিত) আমরা যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরও বড় বাণিজ্যিক বিনিয়োগের খাতক হই। যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে, বৈদেশিক ঋণ চাহিদা যত বাড়বে, আমরা ততই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের চোখে আকর্ষণীয় বাজার হয়ে ধরা দেব। অবকাঠামো খাতে ঋণ দিয়ে বিশ্বব্যাংক মূলত আমাদের অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজিবাজারের থেকে বাণিজ্যিক পুঁজি পাওয়ার চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। এটাই তার মূল কাজ, ম্যান্ডেট। কিন্তু অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয় বলে সে ব্যাপারটিকে এদিক থেকে হাজির করে বলবে সে ‘দারিদ্র্যদূরীকরণ’ করছে। তবে কথা ঠিক বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উপযুক্ত খাতক হয়ে যাওয়ার পড়ে পাওয়া (এটা টার্গেট নয় এই অর্থে) এবার পাওয়া বৈদেশিক ঋণের অবকাঠামোর খাতে ব্যয়, ফলে নতুন কাজ সৃষ্টির শর্ত তৈরি। এভাবে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা এমনভাবে সাজানো এক সিস্টেম যার কারণে এর বিভিন্ন শর্তের ফেরে পড়ে আমাদের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর পরাশক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।

এ ব্যাপারে এত দিন একচেটিয়া কর্তৃত্ব পেয়েছে আমেরিকা। এখন চীনের নেতৃত্বে AIIB বা গ্লোবাল অর্থ ব্যবস্থার পাল্টা প্রতিষ্ঠান হাজির হয়ে যাওয়া মানে আমেরিকার কর্তৃত্বের ভাগে টান পড়া। শুধু তাই নয়, ‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ আমেরিকা যেভাবে নির্ধারণ করে রেখেছে তা বদল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন- উন্নয়ন লোনের পাবার সঙ্গে হিউম্যান রাইট পরিস্থিতি ভাল কি না তা শর্তযুক্ত করে হিউম্যান রাইট নাই এর উসিলায় হস্তক্ষেপ করার সুবিধা এখন আমেরিকার আছে। এখন লোন পাওয়ার বিকল্প উৎস চীন হাজির হয়ে গেলে সেখানে উন্নয়ন শব্দের অর্থ কী দাঁড়াবে? অন্ততপক্ষে চীনের নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে উন্নয়ন শব্দের নতুন অর্থ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সে হিউম্যান রাইট বা পরিবেশকে কি ঋণ বিতরণের সাথে শর্তযুক্ত করবে অথবা করবে না? এটা কী হয়, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

[এখানে প্রকাশ করা লেখাটা এর আগে বাংলা দৈনিক “আলোকিত বাংলাদেশ” এর উপ-সম্পাদকীয় হিসাবে আমার নামেই ছাপা হয়েছিল। এখানে একদুই পর্ব আকারে তেমন কোন নতুন এডিট না করেই এই ওয়েবে সংরক্ষণের জন্য সংকলিত করে প্রকাশ করা হল।]

বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

গৌতম দাস

ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-99

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ phil reiner

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার (Phil Reiner) গত ০৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন। বিষয় ছিল সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফর সম্পর্কে প্রেসকে অবহিত করা। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি। এ বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে ওবামা ২৫-২৭ জানুয়ারি ভারত সফরে এসেছিলেন। ফিল রেইনার ওবামার ভারত সফরে সঙ্গী ছিলেন। ঐ প্রেস কনফারেন্স ছিল মূলত ভারত সফরে ওবামার দিক থেকে নিজের তাৎপর্য বিশেষত অর্জনগুলো তুলে ধরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটের ওয়েবসাইটে রেইনারের প্রেস কনফারেন্সটিকে সেই ভাবেই পেশ করা হয়েছে। (আগের লিঙ্কে দেখুন, From President Obama’s Trip to India: Perspectives on U.S.-India Relations।
গত কংগ্রেস সরকারের শেষ তিন বছর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমশ অমীমাংসিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিরোধে জড়িয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল। এসব বিরোধগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিশেষত বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে উভয়ের বিরোধ আরও প্রকাশ্য ও চরমে উঠেছিল। জানুয়ারি ২০১৪ সফরটা ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে ওবামা-মোদীর দ্বিতীয় মুলাকাত। গতবছর মে মাসে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠনকে ভারত এবং আমেরিকা উভয়েই তাদের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বিরোধ মিটানোর উপায় হিসাবে দেখেছিল। কারণ উভয়ে অনুভব করছিল যে সম্পর্ক স্থবির রাখাতে উভয়েই ভালোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে মোদীর দিক থেকে আটমাসের সরকারের সাফল্য হল, দ্রুততর সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি। সেখানে ওবামা-মোদীর নানান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রসঙ্গে আলাপের সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল।

ফিল রেইনার এর প্রেস কনফারেন্সের খবরটা আমাদের মিডিয়ায় প্রচার হতে শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে, ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। খবরটা হল, গত মাসের শেষে ওবামার ভারত সফরে ওবামা-মোদী দুজনের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল। আসারই কথা, এটা অনুমান করা খুব কষ্টকল্পিত কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে ব্যাপারটা তথ্য হিসাবে কোন সংবাদপত্রে আসা এক কথা আর যেচে তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ভিন্ন। শেষেরটা অবশ্যই কষ্টকল্পিত। যদিও ভারত অথবা আমেরিকার দিক থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া বা না দেয়াটা খুব জরুরি নয়। এমনকি ভারত-আমেরিকার শীর্ষ আলাপে ভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মন্তব্য রেওয়াজ সম্মতও নয় বলে কেউই এ বিষয়ে তেমন কিছু প্রকাশ্যে আশা করে নাই। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে কোন কথা হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে হয়ত আমরা ভারত বা আমেরিকার সরকারি ভাবে না, বরং শুনতাম বড়জোর কোন অনুসন্ধানী দেশি বা বিদেশি মিডিয়া কর্মীর বিশেষ রিপোর্ট থেকে। এভাবেই কূটনৈতিক বিষয়গুলো প্রকাশিত হওয়া রেওয়াজ।

কিন্তু আমরা ব্যতিক্রম দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার না চাইতে বৃষ্টির মত অনেক তথ্য আমাদের ঢেলে দিয়ে জানাচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও আছে। লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, তিনি প্রেসিডেন্টের হোয়াট হাউস অথবা স্টেট বা পররাষ্ট্র ডিপার্টমেন্টের নেহায়েতই কোন মুখপাত্র নন। অর্থাৎ আমেরিকা তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের কোন মুখপাত্রের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ বা প্রচার করতে চাইছেন না। সাদামাটা রুটিনের বদলে চাইছেন এই প্রকাশ ও প্রচার গুরুত্ব পাক। তাই বক্তব্য এসেছে একজন একজিকিউটিভ কর্মকর্তার মুখ দিয়ে। ফিল রেইনার মিডিয়াতে এসে অনেক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিচ্ছেন। এটাও একটা ব্যতিক্রম। যেমন “বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না” । এই তথ্য বড়জোর মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে প্রকাশ্যে এলেই যেখানে যথেষ্ট হত। তা ছাড়িয়ে — অফিসের মুখপাত্রও না — একেবারে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের এক পরিচালকের মুখ দিয়ে প্রকাশ করা হল। এখানে কেবল একটাই স্বাভাবিক অথবা বলা যেতে পারে দৃশ্যমান ছুতা: সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফরে তাঁর অর্জন প্রেসকে অবহিত করা। এখানে ইংরেজি ‘রিড আঊট’ কথাটা ‘তাৎপর্য “অর্জন” ইত্যাদি অনুবাদে সতর্কভাবেই ব্যবহার করতে হচ্ছে কারণ এটা আমেরিকার দিক থেকে শুধু বিরাট অর্জনই নয়, ওবামার এই সফরকে রেইনার ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ পাশা খেলায় দান বা চাল দিয়ে খেলার অভিমুখ উলটানোর মত ঘটনা। তা সেটা ছিল অবশ্যই। অনেক মিডিয়াতেও এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাব না। তবে ঐ প্রেস কনফারেন্স বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসেছিল অবশ্য সাইড টক হিসাবে। তবু সেই “সাইড টকের” প্রসঙ্গেই ফিল রেইনার অনেক বেশি লম্বা সময় ব্যয় করেছেন। আর সেসব কথা বলতে গিয়ে ফিল রেইনার অনেকটা যেচে বাড়তি তথ্য দিয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতি বুঝতে হলে সরকারী ভাষ্যগুলো সরাসরি ইংরেজিতে মূল দলিলে পড়াই ভাল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা নয়। মুল মানে অরিজিনাল ইংরাজি হুবহু বক্তব্য পাঠ করার পিছনে আরও একটা কারণ আছে। মানবজমিন তাদের প্রতিবেদনে “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে একটা কথার অনুবাদ যেভাবে ব্যবহার করেছে তাতে বিভ্রান্তির সুযোগ আছে। ফিল রাইনার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” মানে ইংরাজিতে “পারটিসিপেটরি ইলেকশন” বা “অল পার্টি ইলেকশন” ধরণের কোন কথা বলেন নাই। বরং তাঁর বক্তব্যে তিনি কখনও “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” আবার কখনও “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” শব্দ ব্যবহার করেছেন । অর্থাৎ তিনি গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে ওর শক্তি দেখিয়ে -এই পথে দেশি-বিদেশি সবার অন্তর্ভুক্তির তাগিদ নিয়ে আগাতে চান। যাতে আওয়ামি লীগ, বিএনপিসহ কোন ‘গণতান্ত্রিক’ পক্ষ বাদ না পড়ে। আবার ওদিকে ভারত ও আমেরিকাও ঐক্যমত্যে আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মানবজমিন এটাকেই তার পাঠকের জন্য “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে অনুবাদ করেছে। গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আর ওর শক্তি দেখানোর কথা বলে আসলে ফিল রাইনার বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন করার সমালোচনা করেছেন। নিজ দেশে কোন দলকে কায়দা করে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার কথা ভারত যেমন ভাবতেই পারবে না সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি দলকে ভারতের জিতিয়ে আনার কথাও ভাবা যায় না। কিন্তু এ ধরনের নীতি দিল্লি নিল কি করে? এই দিকটা নিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশংসা করে আর এর সাথে তুলনা করে ফিল রেইনার প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনের প্রতি ভারতের সমর্থন করারই সমালোচনা করেছেন। আবার “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” বা “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবার আহ্বান জানিয়ে ভারত-আমেরিকার ঐকমত্যের ভিত্তি দাঁড় করাতে চাইছেন। ফিল রেইনার বলছেন,
“আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলংকায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি ও নাগরিক শক্তির যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন”(দেখুন, মানব জমিন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
অনেক লম্বা বক্তব্য। আর এতে প্রথমেই তার বক্তব্য নিবদ্ধ করেছেন “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়নি – কথা সেদিক নিবার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। সাধারণভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের” উদাহরণ তুলে তিনি বলতে চেয়েছেন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।

ফিল রেইনারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রসঙ্গ করার আর এক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আর ওবামা সরকারের মধ্যে বড় ধরণের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রশ্নে আমেরিকা পক্ষে আর ভারত বিপক্ষে অবস্থান প্রকাশ করে। শুধু তাই না ভারতের এই অবস্থানের প্রাকটিক্যাল মানে হল, হাসিনার পাবলিক রেটিং যত নিচেই হোক, নির্বাচনের নামে যা হয় হোক, বাংলাদেশের মানুষ কাকে ভোট দিতে চায় তাতেও ভারতের কিছুই আসে যায় না, যে কোনো উছিলায় দিল্লি আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। রেইনার সম্ভবত সেকথা স্মরণ করে আমাদের জানালেন যে, এসব নিয়ে ভারত-আমেরিকার বিরোধ আগে যে জায়গায়ই থাক এবারের মোদী-ওবামা আলোচনায় ভারত-আমেরিকার নীতি ও স্বার্থ বিষয়ে পুরানা অনেক বিরোধে এলোমেলো সংঘাতময় অবস্থান এবার ইস্ত্রি করে সোজা করা হয়েছে। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” এই কমন নীতিগত অবস্থান তেমনি একটা। কিন্তু রেইনার এখানেও থামেন নাই। আরও বাড়তি বলছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে (দুটি দেশ) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” নিয়েছেন। অর্থাৎ অতীতের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে এখন ভারত-আমেরিকা একমত হয়েছে শুধু তাই নয়, বরং ঐ ভুয়া নির্বাচনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বর্তমান “অস্থিতিশীল পরিস্থিতির” দিকেও তারা নজর রেখেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ বাক্য –“বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে”। অর্থাৎ তাদের অতীতের গুরুতর অনৈক্য ঘটে যাওয়া বিষয়ে এখন শুধু ঐকমত্য প্রকাশ করা নয়, বরং এখন সেই ঐকমত্যের বাস্তবায়ন বা কারেকশনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

যেচে এসে ফিল রেইনারের এসব তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের আর এক উদ্দেশ্য সম্ভবত আছে। বাংলাদেশ নীতি প্রশ্নে আমেরিকা-ভারতের অবস্থানের সংঘাত ২০১১ সাল থেকে। এরপর সেই স্বার্থ বিরোধ ২০১৩ সালে এসে চরম স্থবির অবস্থায় পড়ার কথা আমরা সবাই জানতাম। এই স্থবির দশা এরপর কোনদিকে যাবে আদৌ কোনো দিকে যাবে কিনা, নাকি কতদিন এমনই দিশাহীন পড়ে থাকবে এসব কেউ জানত না। পরবর্তিতে ২০১৪ সালের মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসা, আর আস্তে আস্তে ভারত-আমেরিকার পুরান স্থবির বিরোধের ঝাঁপি খুলে দেখতে দেখতে এটা ছিল মোদী-ওবামার খুবই স্বল্প সময় মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে মোদীর দ্বিতীয়বার ওবামার সাথে সাক্ষাত। এর আগের লেখায় বলেছিলাম, ভারত-আমেরিকার বিরোধ যতটা না ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও রাজনীতিবিদের এর চেয়ে সম্ভবত আরও বেশি আমেরিকার সাথে ভারতের গোয়েন্দা-আমলার পর্যায়ের বিরোধ। এপ্রসঙ্গে আমরা আমেরিকায় ভারতের কূটনৈতিক দেবযানী খেবড়াগোড়া কাহিনী আর এর পালটা ভারতে আমেরিকান কূটনীতিকদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেওয়া এমনকি নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টা স্মরণ করতে পারি।
ভারতের ২০১৪ নির্বাচনের আগে এবং পরে বহুবার আমরা বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ কে বলতে শুনেছি যে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস-ভিন্ন অন্য দলের বিজয়ে সরকার বদল হলেও ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়ে না, বদল হয় না, হবে না। একথার অর্থ আরও পরিষ্কার করে তিনি গত জুন ২০১৪ সালে অর্থাৎ মোদীর জয়লাভে প্রধানমন্ত্রীত্ব নিবার পরেও বলেছিলেন, বাংলাদেশে “০৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে। আমরা ঐ ইস্যু এখন আর আবার ফিরে মূল্যায়ন করতে চাই না কারণ এখন এজেন্ডা ভিন্ন হয়ে গেছে”।( About the January 5 elections, Pankaj Saran said that was a constitutional requirement. “I do not see that issue will be revisited today because today the agenda is different.” – ১৫ জুন ২০১৪ ঢাকা ট্রিবিউন।)
পঙ্কজ শরণের এমন কথার অর্থ কি? এর মুল উদ্দেশ্য হাসিনাকে সাহায্য করা এভাবে যে, কংগ্রেস সরকার আবার জিতে না আসতে পারছেনা টের পেয়ে যাতে হাসিনার কর্মি-সমর্থক নিজের নিজের ভাগ্য গুছাতে হাসিনাকে ফেলে কেটে না পড়ে। বলাবাহুল্য এটা একজন হাইকমিশনারের সীমাছাড়ানি কাজ । পঙ্কজের বাড়াবাড়ি। অথচ পঙ্কজ জানেন, একদিকে ভারত-আমেরিকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে, বাংলাদেশ নীতিতে উভয়ে দুই মেরুতে আছে, পরবর্তীতে এই সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু উভয়পক্ষের জন্য এক জায়গায় আসা জরুরি এই তাগিদ আছে। সেটা আদৌ হবে অথবা হবে না তার কোন দিশা নাই। অন্যদিকে মে মাসের ২০১৪ সালেই ভারতের নতুন দল ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের আগেথেকেই জানা যাচ্ছিল নতুন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রায়োরিটি ও এজেন্ডা কংগ্রেস থেকে একেবারেই আলাদা হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (এবং এরই ফাঁকে বাংলাদেশ নীতিতে বিরোধ) নিয়ে ভারতের নিজের কারণেও নতুন করে সমাধানে উদ্যোগী হতে বাধ্য । ফলে তা কোনদিকে মোড় নিয়ে কিভাবে কোথায় গিয়ে দাড়ায়, ঐক্যমত্যে আসে কি না সেসব আগাম অনুমান করা কঠিন। কিন্তু সে যাই হোক পঙ্কজ শরণ এর জন্য অপেক্ষা করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি আগেই হাসিনার সমর্থকদের চাঙ্গা করে রাখতে চান। সেজন্য আগেই নিজ দায়িত্বে জবরদস্তিতে ঘোষণা দিয়ে রাখলেন যে মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাতে ভারতের নীতিতে কোন বদল হবে না, ভারত যেভাবেই হোক হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষেই থাকবে, ইত্যাদি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের গোয়েন্দা-আমলা যতই শক্তিশালী হোক না কেন রাজনীতিকরাই শেষ কথা বলার ক্ষমতা রাখেন এবং এটা আইনি, আমলাদের বিজনেস রুল ও রেওয়াজের দিক থেকেও সত্য। ভারতের গোয়েন্দা-আমলারাও এটা মেনে চলতে অভ্যস্ত। তবু পঙ্কজ যেন কি বিশেষ কারণে মরিয়া। তিনি ধরেই নিতে চান এবং প্রমাণ করতে চান নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সাথে স্থবির অমীমাংসিত ইস্যুতে যাই করেন, যেভাবে নতুন আকার দেন না কেন তা পঙ্কজ তথা গোয়েন্দা-আমলাদের হিসাব, পথ ও কথা না শুনে মোদী করতে পারবেন না। যেন করতে দেয়া হবে না। এককথায় বললে, এটা রাজনীতিবিদদের উপর আমলাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বালখিল্য ধারণা প্রসূত এক কল্পনা। রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য খোলা স্পেস ছেড়ে না দিয়ে উলটা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা।
বালখিল্য ওমন কাজের ফলাফলেই কি ইতোমধ্যেই মোদীর হাতে সচিব পর্যায়ের তিনজনের বাধ্যতামূলক অপসারণ? এমন মনে করার কারণ আছে। যাই হোক আপাতত আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকে এসবের সারকথা হল, গোয়েন্দা-আমলা বিশেষত সুজাতা সিং বা পঙ্কজ শরণ ধরণের ব্যক্তিত্বের মনোভাব এবং ভারতের বিদেশনীতিতে সাধারণ ভাবে গোয়েন্দা-আমলাদের প্রভাবের একটা ফলাফল হল মোদী ক্ষমতায় আসার পর দিল্লী তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক রচনা করতে চায় সেই বিষয়ে অ্নিশ্চয়তা। দৃশ্যত মোদী কংগ্রেসের চেয়ে আলাদা এবং নতুন এজেন্ডা নিয়ে আবির্ভূত হাজির। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দু’বার ওবামার সঙ্গে সাক্ষাত করে এক নতুন নীতিগত ঐক্যমত্যের আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি নীতিতে ভারত-আমেরিকা কোন ঐকমত্যে আসতে পেরেছে কি না সেটা এরপরও বোঝা যাচ্ছিল না। বিশেষত সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে। যদিও বোঝা যাচ্ছিল তাঁরা একটা একমতে এসেছেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু আলামত দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এতদিন নিশ্চিত হয়ে কেউই কিছু বলতে পারছিলেন না। পুরানা এক ষ্টেলমেট পরিস্থিতিই বিরাজ করছিল। কোনদিকে নড়াচড়া করছিল না। এমনকি গত ২৬ জানুয়ারি ওবামা-মোদীর মধ্যে এইসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করলেও এর কোন ছাপ অন্তত বাংলাদেশে পড়ছিল না। দৃশ্যমান হচ্ছিল না। ফিল রেইনার যেন ওবামা-মোদীর নীতিগত ঐকমত্যের দিকটা দৃশ্যমান করতেই ঐ প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট ও বিস্তৃত স্বীকারোক্তি হাজির করেছিলেন।
এতে একটা জিনিষ পরিষ্কার হয়েছে। মোদীর জয়লাভের পরও পঙ্কজ শরণের “সাংবিধানিক প্রয়োজনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন” হয়েছিল, অথবা “এটা অতীতের মৃত ঘটনা এটা নিয়ে আবার ভেবে দেখার কিছু নাই” – এধরণের বক্তব্য যেটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এখন চাকরি হারানো পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর বক্তব্যেরই কপি – এই সব কিছুকে ফিল রেইনারের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে। বিশেষ করে রেইনারের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে বক্তব্য পঙ্কজ শরণের ভারতের অবস্থান বলে যা প্রচার করছেন তাকে সরাসরি নাকচ করে। গত ৩ জানুয়ারি রেইনারের বক্তব্য প্রচারের পর দশ দিনের বেশি দিন গত হতে চলল, কিন্তু এখনও খোদ পঙ্কজ শরণ নিজে অথবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেইনারের বক্তব্য নিয়ে কোন আপত্তি অথবা ভিন্ন বক্তব্য জানাতে আমরা দেখি নাই।

ফিল রেইনারের বক্তব্যের সারকথার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি দাবি করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় “শান্তি ও স্থিতিশীলতার” ব্যাপারে দুই নেতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিষয়টা ওবামা-মোদীর স্বাক্ষরিত ৫৯ দফা “যৌথ ঘোষণার” ৪৬ নম্বর দফায় এবং আলাদা করে স্বাক্ষরিত “এশিয়া নীতি বিষয়ে যৌথ ষ্ট্রাটেজিক ভিশন”র শুরুতেও উল্লেখিত হয়েছে। এগুলো ভারত-আমেরিকার নীতিগত ঐকমত্যের দিক। কিন্তু কি উপায়ে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এপ্রসঙ্গে ফিল রেইনার দাবি করছেন, -ওবামা ভারতের সক্রিয় “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া” ও “এর নির্বাচন” এবং “এটা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে” এবং এর মাধ্যমে “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা”, এবং “জনগণের সব অংশের ক্ষমতাবান হয়ে উঠা” এসব কিছু হতে পারে সেই উপায়। এব্যাপারে উভয় নেতা একমত হয়েছেন। তাই এই ‘উপায়কে’ তারা উভয়ে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং উৎসাহিত করতে থাকবেন। “উভয় নেতার কথোপকথন দেখে (I was able to see in terms of the conversation)” এটাই ফিল রেইনারের অনুভব ও মন্তব্য।
মোদী-ওবামার মিটিংয়ে সম্পর্কের অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বসিত ফিল রেইনার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপনের আর একটা কারণ আছে। ওবামার ভারত সফরের পরে সিএনএনের ফরিদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে, ওবামা চীন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। কারণ ইতোমধ্যে এই সফর চীনের বিরুদ্ধে ভারত-আমেরিকার জোট পাকানো কিনা তা নিয়ে মিডিয়ায় কথা উঠে গিয়েছিল। ওবামা জানিয়েছেন, এসব “বুলি” বা উস্কানিমূলক ধরণের আলোচনা থেকে দূরে থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের বন্ধনের পক্ষে কাজ করে যেতে চান তিনি।
এশিয়ায় চীন-আমেরিকা-ভারতের অবস্থা এখন এমনই যে কোন দৈব ঘটনাবলে এরা তিন পক্ষ মিলে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারলে এরপরেও পারস্পরিক কিছু সন্দেহ অবিশ্বাসের বাস্তবতা থেকেই যাবে। এর মূল কারণ বাকি দুপক্ষের তুলনায় চীনের উত্থিত অদম্য “অর্থনৈতিক সক্ষমতা” এবং তীব্র প্রতিযোগিতা। এর ফলাফলে এই তিন পক্ষের যে কেউ অন্য দুইয়ের চেয়ে, তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ভাল অবস্থানে থাকার চেষ্টা করবেই। এক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত ও আমেরিকার অন্তত একটা বাড়তি সুবিধা হল, ভারত ও আমেরিকা নিজেদেরকে “আভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনুসরণের শক্তি” মনে করে। তাদের বিচারে যা চীনের নাই। ফলে যদি তারা উভয়ে মিলে একাগ্রভাবে এশিয়ার জন্য প্রত্যেক দেশে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের পক্ষে’ থাকে তবে এশিয়ায় জোট পাকানোর ক্ষেত্রে তারা চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে তাদের উভয়ের দৃঢ় অনুমান। চীনের উত্থান দেখে পালটা যতদূর সম্ভব গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকা, ড্রাম বাজানো – এই অনুমানের অরিজিনাল উদ্গাতা হলেন এখনও সক্রিয় তবে বুড়ো তাত্ত্বিক হেনরি কিসিঞ্জার। যদিও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের এইকালে পাশাপাশি একই সাথে ইসলাম কিছু প্রশ্ন তুলে সামগ্রিকভাবে পশ্চিমকে কুপোকাত করে ফেলেছে। আর একে ওয়ার অন টেররের নীতিতে মোকাবিলা করতে গিয়ে কিসিঞ্জারের তত্ত্বও অকেজো এবং কথার কথা হয়ে আছে। এসব আমেরিকাসহ পশ্চিমের অজানা নয়। তবু যেসব অঞ্চলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বিষয় আছে সেসব জায়গায় কিসিঞ্জারের তত্ত্ব কিছু কাজে লাগতে পারে এই আশা আমেরিকা ছেড়ে দেয় নাই। যেমন, ভারত-আমেরিকার প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা কূটনীতিতে সেখানে দেখব বলা হচ্ছে দুনিয়ার দুই “বৃহৎ কার্যকর গণতন্ত্র চর্চার দেশ”, “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা” – ইত্যাদি। অর্থাৎ ওবামা তাঁর চীনকে ঘায়েল করার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির ফাঁদের মাহাত্ম ও সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভারতকে কাছে টানতে চাচ্ছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ভারত-আমেরিকার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির কমননেস বা সাধারণ দিক এরই ভিত্তি বলে ড্রাম পিটতে চাইছে।
তবে ভারত-আমেরিকা ড্রাম বাজাতে চাইছে কথা সত্য হলেও এতে ভারতের কিছু পুরান জামা খুলে পড়ারও লক্ষণ এটা। যেমন, নেহেরু আমলের ভারত তখনও বৃহৎ “গণতান্ত্রিক” নাকি তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র ছিল এর ফয়সালায় কোন স্পষ্ট উচ্চারণ আজ এখনও নাই। কেউ সাহস করে নাই এখনও । তবু মাঝামাঝি ষাটের দশকের সময়ে রাশিয়া-আমেরিকার বাইরে “জোটনিরপেক্ষ দেশের” একটা তকমা নেহেরুর ভারতের ছিল অনেকদিন। তাসত্ত্বেও ঐ অবস্থাতেই কালক্রমে নেহেরুর আমল থেকেই অস্ত্রের চালানের প্রয়োজনে ভারত যতই রাশিয়া মুখি হয়েছিল ততই ভারতের মুখে আর “আমাদের বৃহৎ গণতন্ত্রের” ঢাক শোনানোর দরকার দেখা যায় নাই। বরং সত্তর দশক থেকে ইন্দিরা আমলে “সমাজতন্ত্র” আর “সেকুলারিজম” ভারতের প্রধান পরিচয় বলে তিনি স্পষ্ট দাবি করতে শুরু করেন। তামাশার দিকটা হল, সেটাই আবার ইন্দিরার “জরুরী আইন” জারি করে ভারত চালানোর কাল। এরপর ১৯৮৫ সালের পর থেকে নেহেরুর নাতি রাজীবের আমলে ক্রমশ “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র কথাটা কার্পেটের তলে চলে যেতে থাকে আর “বৃহৎ গণতন্ত্র” কথাটা প্রথম সামনে আসতে থাকে। তবুও তখনও একটা জিনিষ – আমেরিকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিনা এই সার্টিফিকেট ভারত আমেরিকাকে দেয় নাই, মূলত রাশিয়ান ব্লক রাজনীতির পুরান দায় বা লিগ্যাসির কারণে। না দিয়ে চলতে হয়েছিল। শেষে গত ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের ইউপিএ এর সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে আমেরিকার সাথে ষ্ট্রাটেজিক এলায়েন্সের দিকটা স্পষ্ট আকার নিতে থাকে। কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির মুখে আমরা ভারত দুনিয়ার “বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ” এই বয়ান শুনেছি। অর্থাৎ তিনি আর ভুয়া “সমাজতন্ত্রের” জামা পড়তে চাচ্ছেন না। ভারত এবার পরিষ্কার করে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” ভারত হল। আর এর সম্ভবত আরও চূড়ান্ত দিকটা ঘটল এবারের মোদী সরকারের হাতে। ভারতের কনষ্টিটিউশন গ্রহণ ও কার্যকর হবার দিন ২৬ জানুয়ারি, যেটা তাদের ভাষায় প্রজাতন্ত্র দিবস। সম্ভবত ২০০৪ সাল থেকে ভারতে গত কয়েক বছরের এক নতুন রেওয়াজ চালু করা হল যে, ঐদিন কোন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রধান অতিথি করে আনা হবে। আর গত বছর থেকে। আমেরিকার সাথে ভারতের জটিল ও জট পাকিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গিট-ছুটাতে একটা শো-আপ করা মোদীর খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। মোদী তাই ওবামার প্রতি আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়ে থাকার ইমেজ দেখাতে ওবামাকে হঠাৎ করে প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল অতিথি হিসাবে এবার দাওয়াত দেন। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য এই ঘোষণা প্রথম তিনি নিজেই প্রকাশ করেন নিজের টুইটার একাউন্ট বার্তা থেকে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবস তো নিজেই রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী। “প্রগতিশীলতার” শ্লোগান ধরে রাখার লোভে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে নিজের প্রজাতন্ত্র দিবসে দাওয়াত দিবার কথা এর আগে সম্ভবত ভারতের কোন নেতা কেউ ভাবতেও চায়নি। মোদী সেটাই করে দেখায়ে দিলেন। কিন্তু এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ তকমার বদলে গণতন্ত্রী বলে সার্টিফিকেট দিতে চান বলে এটা করেছেন। মনে রাখতে হবে, এবারের মোদী-ওবামা সাক্ষাতে যৌথ ঘোষণায় যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এর প্রায় সব ইস্যুগুলোই গত কংগ্রেসের আমলে ২০০৫ থেকে চালু ছিল তবে অকেজো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এবার সেগুলোই অর্থাৎ আমেরিকার সাথে সব পুরান চুক্তিই এবারের চুক্তিগুলোর বিষয়। কারণ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানান বিরোধ সংঘাত একটা করে বের হতে হতে গত দশ বছরে ভারত-আমেরিকা সামগ্রিক সম্পর্কই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। ভারতের দিক থেকে মোদীর সাফল্য এই যে তিনি মাত্র আট মাসে ওবামার সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই প্রত্যেক ইস্যুতে জটগুলো মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, চুক্তিগুলো নবায়ন করেছেন। ভারতের বৈদেশিক সম্পর্কের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যেমন, চীন বা জাপানের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক মুখ্য ইস্যু, আমেরিকার সাথে ঠিক তেমনটা নয়। আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক অর্থনৈতিকও বটে তবে মুখ্য ইস্যুগুলো হল সামরিক, ষ্ট্রাটেজিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ-ঝগড়া বিষয়ক নীতি নিয়ে। ফলে তা যথেষ্ট জটিলও। মোদীর দিক থেকে, আমেরিকার সাথে এসব মুখ্য ইস্যুগুলোকে সুরাহা করে, পার হয়ে তবেই নিজের মুখ্য ফোকাস – অর্থনীতি বা ইনফ্রাষ্টাকচার উন্নয়নের দিকে তাঁকে যেতে হবে। তাই কাজের মানুষ মোদীর এই তাড়া। কিন্তু এই বিষয়গুলো ভারতের জন্য কি লাভালাভ আনবে, কতটুকু কাজে লাগবে সেই বিস্তারিত আলোচনা এখন না অন্য কোথাও তুলতে হবে।
এখনকার প্রসঙ্গে আমাদের জন্য এতটুকুই প্রাসঙ্গিক যে এযাত্রায় মোদী ওবামার সাথে মিলে “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির মাহাত্মে যদি মেতে উঠেন, ফিল রেইনারের বক্তব্য যদি অর্থপূর্ণ হয় তাহলে অন্তত – বাংলাদেশের ভোট, ভোটার বা নির্বাচন আমরা কিছু বুঝি না, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওমুক দলকেই আমরা ক্ষমতায় দেখতে চাই ভারতের এই অন্যায় দুঃসহ আবদার থেকে আমাদের আপাতত মুক্তি মিলতে পারে। আমাদের নগদ লাভ এখানেই। তবে এখানে এসব কথার অর্থ আরও পরিষ্কার করার দরকার আছে। যেমন এর অর্থ এমন নয় যে আমাদেরকে চীনের বা আমেরিকার পক্ষপুষ্ট হয়ে বা যেয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া। এমন মনে করা ভুল হবে। সাধারণভাবে বললে, এশিয়ায় ভারত, চীন বা আমেরিকা এই তিন শক্তির কোন একটার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকে ঢলে পড়ে অপর দুটোর কোন একটার বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করার চিন্তা করাই যাবে না। বরং কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে বিশেষত কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিপক্ষে অন্যকে সুবিধা দিবার আত্মঘাতী পথে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই নিতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা আমাদের টিকে থাকার জন্য খোলা আছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের দশা এক্ষেত্রে সেরকমের উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ক্ষমতার দল করা যাবে না যে, নিজের জনসমর্থন হারিয়ে, আকণ্ঠ লুটপাটে নিমজ্জিত হয়ে এরপর চীন অথবা ভারতকে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নিজে ক্ষমতায় থাকতে চায় – এই দুর্গতির পথে হাটা যাবে না। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার, আগামী সম্ভাব্য বিএনপি অথবা আসন্ন যেকোনো দলের বেলায় কঠিন ভাবে সত্যি। এদিকটা খেয়াল রেখে এজন্য উপযোগী রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ্ধতি কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তবেই আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি। এছাড়া আভ্যন্তরীণ কোন বিভাজনের ইস্যু যেমন সেকুলারিজম বনাম ইসলাম ধরণের বিভাজন পরিহার করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।
এসব ঘটনাবলী ঘটছে খুবই দ্রুত। স্বভাবতই ফিল রেইনারের এই প্রেস বক্তব্য হাসিনা সরকার ও সমর্থকদের মনোবল ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট। ফলে এর পালটা কিছু প্রোপাগান্ডাও আমরা লক্ষ্য করছি। দৃশ্যত এর কেন্দ্রবিন্দু বিবিসি, তবে বিবিসি কলকাতার বাংলা বিভাগ। প্রথম রিপোটটা এসেছিল কেন্দ্রীয় বিজেপি নয়, কলকাতা বিজেপি সুত্রে। দুদিন পরে, এরপর ছাপা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার পঙ্কজ সরণকে আশ্বস্ত করেছেন”। পঙ্কজের নামে চালানো তবে পঙ্কজ নয় “বিশেষ সুত্রে পাওয়া” এমন বরাতে, যে পঙ্কজ সরণকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার কি বলেছেন। অর্থাৎ যেন পঙ্কজ সেটা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে কিভাবে রিপোর্ট করেছেন সেই ভঙ্গিতে। আদৌও পঙ্কজ সেটাই রিপোর্ট করেছেন কি না তা আমরা কেউ জানি না। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের কোন সরকারই ফরমালি পঙ্কজ সরণকে এটা বলবে না যে নিজ সরকারের হাতে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে বাংলাদেশের সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছেন, ড্রাইভিং সিটে আছেন এমনটাই স্বাভাবিকভাবে হাসিনা পঙ্কজকে বলবেন। আস্থা রাখতে বলবেন। কিন্তু তাতে ভারতের হাইকমিশনার আশ্বস্ত হয়ে গেছেন কিনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব রিডিং কি সেটা একেবারেই আলাদা বিষয়। এরপর আবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পঙ্কজের রিডিং কতটুকু কিভাবে গ্রহণ করবেন, একমত হবেন বা হয়েছেন সেটা আরও আলাদা। কিন্তু বাংলা বিবিসির রিপোর্টে এই পুরা বিষয়টাকে প্রোপাগান্ডা করতে শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, “আশ্বস্ত করেছেন” বলে দাবি করে। একথা সত্যি যে হাসিনা সরকার পঙ্কজকে “আশ্বস্ত করাতেই চাইবেন”। কিন্তু সেটাকে পঙ্কজের আশ্বস্ত হওয়া এবং তাতে ভারতের সচিব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও “আশ্বস্ত হয়েছেন” বলে ইঙ্গিত করে চালিয়ে দেয়া মিডিয়া টুইষ্টিং। এটা আর নিউজ নয়, বড় জোর এক লেখকের কলাম বা ভিউজ। কারও রাজনীতির প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হওয়া এমনটা হয়ত মিডিয়ায় হয়, করে থাকে কিন্তু সেটাকে অন্তত নিউজ দাবি করে করা যায় না। তবু আপাতত এসব প্রোপাগান্ডার চল আমরা দেখছি।

[লেখা এই রচনা এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫  চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সামান্য এডিট করে আবার ছাপা হল।]

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩), তৃতীয় কিস্তি

তৃতীয় কিস্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩)

চীনের বাংলাদেশ নীতি ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের ভুমিকা

গৌতম দাস

১৮ এপ্রিল ২০১৪

http://wp.me/p1sCvy-5E

বাংলাদেশে বসে চীন প্রসঙ্গে প্রায় সব আলোচনায় সবচেয়ে যেটা সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, লেখক ও পাঠক উভয়েই প্রসঙ্গে প্রবেশ ও পাঠ শুরু করে এটা ধরে নিয়ে যে চীন একটা ‘কমিউনিষ্ট’ বা ‘সমাজতন্ত্রী’ রাষ্ট্র। কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র বলতে প্রচলিতভাবে কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র শব্দটা সম্পর্কে যে পপুলার বুঝ আছে এর উপর দাঁড়ানো ধারণাটাকে বুঝিয়েছি। আর সেই সাথে, কমিউনিষ্ট চোখে দেখা অর্থাৎ ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক রাজনীতির যুগে আশির দশক পর্যন্ত দুনিয়াকে যেমন বলে মনে করা হত, যে চোখে দেখা ও ব্যাখ্যা করা হত সেই বুঝ দিয়ে চীনকে বুঝা বা ব্যাখ্যা করার অভ্যাস – এই সবটাকে বুঝিয়েছি। কিন্তু ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার কারণে পুরানা সেই চিন্তার ফ্রেম ও অভ্যাস যার উপর দাঁড়ানো ছিল সেই বাস্তবতাই আমুল বদলে গেছে, দুনিয়ার অজস্র পরিবর্তন এসেছে। আবার আমূল পরিবর্তন শুধু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে দুনিয়ায় ঘটেছে তাই নয়। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে পড়ার অন্তত ১৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের আর এক ঘটনা ছিল সেটা। ১৯৭১ সালের পর থেকে ক্রমশ চীন-আমেরিকার সম্পর্কের বাস্তব প্রেক্ষিতটাই যখন বহু কিছুকে আমুলে পরিবর্তিত করে দিয়ে গেছে। খুব কম মানুষই বিশেষ করে ‘কমিউনিষ্ট’ মহলে এই গুরুত্বপুর্ণ বদল নজর আমলে এসেছে। অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার ঘটনাটা ঘটলে বা না ঘটলেও এর থেকে স্বধীন ভাবে ঘটেছিল সেই ঘটনা। এসবের দিকে বেশিরভাগ লেখক ও পাঠকের কোন নজর হুশ সেখানে থাকেনি। সেসব বিস্তারে এখানে না যেয়ে বিষয়টাকে এককথায় বললে, এখন চীন আমেরিকা উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত একক অর্থনীতিতে গভীরভাবে সম্পর্কিত দুটা রাষ্ট্র। এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়লে অথবা না পড়লেও এটা একইভাবে সত্য – এই বাস্তব দিকটায় নজরে আনতে চায় না কেউ। বরং আশির দশকের ধারণা ও ব্যাখ্যা দিয়েই দুনিয়ার ঘটনাবলিকে এখনও ব্যাখ্যা ও বুঝবার কসরত করতে দেখা যায়। এমনকি সর্বশেষ গত ২৫ বছরের রাইজিং চীনের পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে মৌলিক তথ্য সংগ্রহের ও তাতে নজর দেবার বিষয়ে সবাই পিছিয়ে। অথচ পুরান কায়দায় বাস্তবতাহীন দৃষ্টিভঙ্গির ও অকেজো তত্ত্ব ও ব্যাখ্যার বিপরীতে একেবারে গোড়ার কথাটা হলো, চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত হবার ভিত গাড়া ঘটেছিল সেই সত্তরের দশকের শুরু থেকে। আবার রাষ্ট্র দুটার সম্পর্কিত হওয়া মানে আর তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধ নাই তা একেবারেই নয়। আগে অনুমান করা হত রাশিয়া-আমেরিকা অথবা চীন-আমেরিকা ব্যাপারটা “সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিতন্ত্র” ধরণের বিরোধ, যেটা ইডিওলজিক্যাল। সেই অনুমান মিথ্যা নয়। কিন্তু এব্যাপারে এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্টটা আমাদের চোখের আড়ালে থেকে গেছে। তা হল, বিরোধটা ইডিওলজিক্যাল কি না এরচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হলো তখন চীন-আমেরিকা (অথবা রাশিয়া-আমেরিকা) এমন দুই রাষ্ট্র ছিল নিজেদের মধ্যে কোন লেনদেন বাণিজ্যের সম্পর্কহীন এবং প্যারালাল, ফলে দুই আলাদা অর্থনীতির। আর সত্তরের দশকের পর থেকে চীন-আমেরিকা (এবং রাশিয়ার বেলায় তা ১৯৯১ সালের পর থেকে) ক্রমশ হয়ে পড়েছে সবাই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত। উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে থাকলেও সেই সাথে তাদের মধ্যে ভালরকমের স্বার্থগত বিরোধ প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তাতে আছে। কিন্তু হাতে গুণে মনে রাখতে হবে সেটা আর ‘পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র’ ধরনের ইডিওলজিক্যাল নয়। আবার আগের মতই কিন্তু নতুন রূপে পরাশক্তিগত বিরোধ আছে তাদের মধ্যে শুধু তাই না, তা বাড়ছে কিন্তু কোনভাবেই তার ভিত্তি আগের মত ইডিওলজিক্যাল নয়। এটা “রাইজিং ইকোনমির” চীন বা রাশিয়া।

“রাইজিং ইকোনমির” চীন অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা
লেখার শুরুতে নতুন পাঁচ পরাশক্তির উত্থানের কথা তুলেছিলাম। এই পাঁচের – ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকা – মধ্যে আবার সবাই “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে একদর হলেও এক মোটা দাগে চীন অন্য চারটার চেয়ে ভিন্ন, আলাদা গুরুত্ত্ব বিবেচনা রাখে। রাইজিং ইকোনমি মানে যার জিডিপি ভাল, দুই ডিজিটের দিকে তরতর করে আগাচ্ছে, প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ যেখানে ছুটে যাচ্ছে, গ্লোবাল বাজার শেয়ার যার বাড়ছে ইত্যাদি। কিন্তু ভিতরে হাত দিয়ে দেখলে বুঝা যাবে, এক চীন ছাড়া আর চার রাষ্ট্রের কারও অর্থনীতির ভিত্তি ম্যানুফাকচারিং বা ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশন নয়। অবস্থাটা হলো, ঐ চার রাষ্ট্রের অর্থনীতিও চীনের মতই বিদেশি বিনিয়োগ হজম করছে কিন্তু তা মূলত মাটির নিচের সম্পদ (তেল, কয়লা, মিনারেল ইত্যাদি) তুলে আনা আর তা বিদেশে রপ্তানী বিক্রি করতে। এরপর তা বেচে-খেয়ে শেষ। ইন্ডাষ্টি বলে নতুন কোন অর্থনীতির চক্র শুরু সেখান থেকে আবার হয় নাই। যদিও বৈদেশিক রিজার্ভ আনার তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে তা এদের সবার শক্ত হচ্ছে, উদ্বৃত্বের অর্থনীতি বলেও তা আপাতত হাজির হচ্ছে। কিন্তু ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের কোন ভিত্তি এর নাই। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের রাষ্ট্রের মাটির নিচের সম্পদের অন্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির কারণে বিপুল চাহিদা তৈরি করে আছে, বাজার আছে, বিক্রি হচ্ছে, তবেই সেগুলো ‘সম্পদ’ বলে বিবেচিত হচ্ছে। নইলে তা মাটির নিচের আবর্জনা বৈ কিছু নয়। রাশিয়ার কথাই ধরা যাক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০০৭-৮ সাল পর্যন্ত ১৭০ ডলার ব্যারেল ছিল। এরপর মহামন্দা দেখা দিলেও এখনও তা ১০০ ডলারের আশেপাশে, এর নিচে যায় নাই। ফলে রাশিয়ান উদ্বৃত্ত্ব অর্থনীতি বলে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। আভ্যন্তরীণ বাজারমুখি ইন্ডাষ্টিয়াল ভিত্তি একটা ওর আছে ঠিকই কিন্তু উতপাদন দক্ষতা, মান ও ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা চরমে ফলে তা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানীযোগ্য নয়; একারণে রাশিয়ার ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ভিত্তি কোরিয়ারও সমতুল্য নয়। ফলে রপ্তানী দূরে থাক তা টিকে থাকার জন্য ধুকছে। এসবের বিপরীতে চীনের ভিত্তি একই সাথে ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের এবং তা রপ্তানীর আর নিজ ব্যাপক জনসংখ্যার গুণে নিজের আভ্যন্তরীণ বিশাল ভোক্তা বাজারের উপর দাঁড়ানো। তাহলে মুল কথা হল, রাইজিং অর্থনীতির চীন অন্য চার রাইজিং অর্থনীতির চেয়ে বিশেষ। আবার অন্য দিক থেকে, এখন সারা দুনিয়া জুড়েই প্রায় রাইজিং অর্থনীতিরসহ সব রাষ্ট্রই একই এবং একটাই – এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে ও পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল। এই কথাটা মনে রেখে ঘটনাবলির দিকে তাকানো, মাঠের তথ্য সংগ্রহ ও এর ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হতে হবে আমাদের। এর ভিতরেই এবার পরাশক্তিগত পাশ ফেরা অদলবদল নতুন কি ঘটছে তাই এই লেখার প্রসঙ্গ। ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব করলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রপ্তানী বাজারমুখি দখলের প্রতিযোগিতায় বড় প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়ার হয়ে চীন প্রায় পঁচিশ বছর কাটিয়েছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রীয় ঋণে চীনের কাছে ঋণী। এক আমেরিকায় চীন রাষ্ট্র তিন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের (ক্রয় করা আমেরিকান সরকারি বন্ড, অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি) মালিক।
কিন্তু যেটা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় তা হল, (১) এখন পর্যন্ত চীনের এই প্রচেষ্টা পশ্চিমের এম্পেরিয়াল কায়দায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজার দখলের মত নয়। এম্পেরিয়াল কায়দা মানে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক সামরিক শক্তি বা যাতাকাঠি ব্যবহার করে, প্রভাব বিস্তার করে জবরদস্তি খাটিয়ে সস্তায় কাচামাল সংগ্রহ ও সেই দেশে নিজের জন্য পণ্যবাজার দখল করে আগানো। বৃহত্তর অর্থে, দুনিয়ায় আগের মতই পরাশক্তিগত এম্পেরিয়াল কায়দাই চালু আছে। কিন্তু এর ভিতরেই চীন একটু আলাদা তুলনামূলকভাবে, কোন পলিটিক্যাল যাতাকাঠি ব্যবহার না করেই এক ধরনের প্রতিযোগিতাপুর্ণ “ভাল ডিল” দিয়ে ব্যবসা বাগানোর যে সুযোগ আছে তাকেই ব্যবহার করে এগিয়ে চলছে চীন। এতটুকু তুলনামূলক অর্থে এটা ভিন্ন। এককথায় বললে অন্য রাষ্ট্রের সরকারে কে থাকবে, কাকে উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে -একাজে ‘পলিটিক্যাল লিভারেজ’ ব্যবহার করে নিজের অর্থনীতি আগিয়ে নেয়ার নীতি এখন পর্যন্ত চীনের নয়। এখনও পর্যন্ত তাই আমাদের মত ভিন দেশে চিনের স্বার্থের প্রকৃতি রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক। এই নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে চীন আগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। (২) দুনিয়ায় চলমান গ্লোবাল দ্বন্দ্ব বিরোধে তা কোন ধরনের সামরিক ঝগড়া বিরোধের দিকে মোড় নিলে সেখানে আর নিজেকে জড়িত না করা। বড় জোর কূটনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা। এটা রাইজিং চিনের আর এক লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট। চীনের এই নীতিতে ব্যতিক্রম আছে তা হল, নিজ রাষ্ট্রের ভুখন্ডগত স্বার্থের (তাইওয়ান ইস্যু সহ) বিষয় হলে তবেই সামরিক দিকও সেখানে একটা অপশন। এককথায় বললে পলিটিক্যাল খবরদারী ও সামরিক ষ্টেক বা ভাগীদার হিসাবে নিজেকে না জড়িয়ে কেবল ব্যবসা, নিজের অর্থনীতি এগিয়ে নেয়া – এই হল এখন পর্যন্ত চীনা বৈশিষ্ট। এথেকে এমন বুঝা বা দাবী করা ভুল হবে যে এই নীতি চীন আগামিতে সবসময় বজায় রাখবে। তবে এখন পর্যন্ত এটা চিনের আগাবার লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট – এদিকটা যেন আমাদের নজর না এড়ায়।
উপরের যে দুটো গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় আমলে আনলাম, গত ২০০৯ সালের পর থেকে ওর প্রথম বিষয়টায় চীন আরও কিছু পালক লাগিয়েছে। এককথায় বললে তা হল, পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে পুব বা এশিয়ামুখি হয়ে অর্থনীতিকে আগানো। এশিয়ামুখি মানে? এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্র করে কোন এম্পেরিয়াল কায়দার মত করে ব্যবসা ও অর্থনীতি? না অবশ্যই তা নয়। কারণ, (১),পলিটিক্যাল খবরদারী বা লিভারেজ ছাড়াই প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা এই নীতি এখনও অটুট। (২) চীন এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে এক পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে উঠার অর্থনীতি দাঁড় করাতে চায়। লো টেকনোলজি এবং শ্রমঘন গার্মেন্টসের আমাদের মত পিছিয়ে থাকা দেশের রপ্তানী শিল্পের ক্রেতা হতে চায় সে নিজে। আর এর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ মূল মেশিনারিজ, কাপড়ের মেশিনারি ও কাচামাল তৈরি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ ইত্যাদি আমাদের দেশের অবকাঠামোগত খাতগুলোতে সব বিষয়ে বড় বিনিয়োগ চীন এগিয়ে আসবে, প্রবেশ করবে। অর্থাৎ এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলো যে যা রপ্তানী করতে সক্ষম এমন পণ্যগুলোর ক্রেতা হবে সে নিজে, নিজের বাজারে তাদের প্রবেশ সহজ করবে আর তুলনায় হাইটেক কারখানা বা অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগে সে এগিয়ে প্রবেশ করবে। এভাবে লেনদেন বিনিময়ের এক নতুন যুগের এশিয়া গড়তে চায় চীন। এভাবেই এশিয়ায় পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে ঊঠার এক এশিয়া ভারকেন্দ্রের অর্থনীতির সুচনা করতে চায় চীন। এই ইচ্ছা ও পরিকল্পনা সম্ভব হবার বা তা যে কাজ করবে এর কারণ বা পিছনে মুল শর্ত উপস্থিত আছে। ইতোমধ্যেই চীনের শ্রমমুল্য পিছিয়ে পড়া এশিয়ার দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। ফলে আমরা সেসব রপ্তানী পণ্যের ক্রেতা হবে চীন যেসব সে নিজে উতপাদন করতে চাইলে চীনের শ্রমমুল্য বেশি বলে তা তাদের পোষাবে না। এসবেরই সারকথা হলো, চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে আসার জন্য আমাদের পলিটিক্যাল ষ্টাবলিটির অপেক্ষায় আছে। একথাগুলো মাথায় রেখে এই প্রসঙ্গে ২০১২ সালের অক্টোবরে ডেইলি ষ্টার পত্রিকায় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের এক সাক্ষাতকার ও একই প্রসঙ্গে পত্রিকার নিজস্ব একটা রিপোর্ট এর লিঙ্ক দেখা যেতে পারে। উপরে বাংলাদেশের প্রতি চীনা নীতির এপ্রোচ বা পেশ হওয়া প্রসঙ্গে যে ছবি এঁকেছি ডেইলি ষ্টারের এই দুই লিঙ্ক থেকে এর স্বপক্ষে কিছু যুক্তি প্রমাণ পাওয়া যাবে।

আমেরিকা বিদেশনীতি ও সেই সুত্রে ভারতের বিদেশনীতি ক্রিয়ার চীনের প্রতিক্রিয়া
উপরে যেদিকের কথা দিয়ে শুরু করেছি তা, অবশ্যই চীনের প্রতিক্রিয়া। মানে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া। কোন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া? লেখার শুরুতে বলা পরাশক্তিগত ওলটপালট আসন্ন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ও ভারতের ক্রিয়ার বিরুদ্ধে। কথা শুরু করেছিলাম ২০০৭ সালের আমেরিকার বিদেশ নীতির বৈশিষ্ট – এই ক্রিয়া থেকে। শুরুতে ভারতের পিঠে হাত রাখার জন্য আমেরিকান ক্রিয়ার কথা বলেছিলাম। আজকের একই পুঁজিতন্ত্রে গাথা দুনিয়ায় প্রত্যেক রাষ্ট্রের বিদেশনীতি মতিগতি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে একেবারেই উদোম হয়ে চলে। ফলে আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতিতে কি আছে কি বদল এসেছে তা আর কোন গোপন বিষয় নয়। বিপরীতে চীনা প্রতিক্রিয়া এবং নীতিও। পরাশক্তিগত পালাবদলের পুরা সার্ভে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর গত ২০০৯ সালে ওবামা চীন সফরে গিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য শুরুতে মিডিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে হম্বিতম্বি দামামা ছিল। কিন্তু যখন ওবামা ফিরলেন তখন মিডিয়া জুড়ে কেবল অর্থনীতির নানান ক্ষেত্রে চীন-আমেরিকা সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি আর সেই সাথে ওবামার ব্যাগে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার খবর। সাধারণ্যে আমরা চীন-ভারত ব্যবসায় খবর খুব কম রাখি, বিরোধ দ্বন্দ্বের খবরই ছেয়ে থাকে উপরে। চীন-ভারতের ব্যবসা বা বাজারের আকার ছিল ২০০২ সালে ৫ বিলিয়ন ডলার, আর ২০১১ সালে তা বেড়ে দাড়ায় প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতি পরাশক্তিগত পাস-ফেরার ইঙ্গিতে যতই মারমুখি সামরিক হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছে এর বিরুদ্ধে চীনা প্রতিক্রিয়া ততই এদের প্রতি ব্যবসায়িক ও সহযোগিতামূলক, গরম ক্রিয়াকে ঠান্ডা করতে ঠান্ডা পানি ছিটানোর প্রতিক্রিয়া। বড়ভাই আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় ভারত ২০০৭ সাল থেকেই নিজেকে পরাশক্তি ভাবা শুরু করে। অপ্রয়োজনীয় মাসল দেখানোর ভিতর দিয়েই সব সমস্যা বিরোধের মীমাংসা হবে এমন ভাবা শুরু করেছিল। “এই চীন আসছে” ধরণের খবরে ভারতের মিডিয়াগুলো মুখর হয়ে থাকত। এমনিতেই সবাই জানে ভারতের মিডিয়া বা থিঙ্কটাংকগুলোও স্বীকার করে যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ ভারতীয় বাহিনীর মনে একটা ট্রমাটিক অবস্থা তৈরি করে দিয়ে গেছে। যদিও সেই থেকে চীন-ভারতের বাস্তব বিরোধ মূলত অরুণাচল প্রদেশের সীমানা নিয়ে, মূলত এই এক ইস্যুতে। সর্বশেষ গত বছর ২০১৩ এর শেষে, সীমান্ত বিষয়ক সেই সন্দেহের গোড়া উতখাত করেছে চীন। প্রথমে গত ২০১৩ সালের মে মাসে চীনা প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেছিলেন আর এর পাঁচ মাস পরে পালটা সফরে অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর চীন সফরে, সেখানেই চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ মিটানো বিষয়ে Border Defence Cooperation Agreement (BDCA) নামের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীন-ভারত সহযোগিতা সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তি সুদুরপ্রসারি ইঙ্গিতময়। এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের যুগ খুলেছে। আর এটা ঠিক ততটাই ভারতের যুদ্ধংদেহী বাজপাখি নীতির অনুসারিদের এবং সারা পশ্চিমা মিত্রসহ আমেরিকার জন্য চপেটাঘাত।
এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম আমেরিকার সার্ভ রিপোর্টের কথা। আমেরিকা নিজের একক পরাশক্তিগত ভুমিকার পতন আসন্ন রিপোর্টের এই ইঙ্গিতে দিশেহারা হয়ে এশিয়ার রাইজিং চীন-ভারত দুই ইকোনমির মধ্যে পরস্পর লাগালাগি যত তীব্র করে রাখতে পারবে ততদিন নিজের সম্ভাবনা তার আশা জীবিত থাকবে অনুমান করে আমেরিকা নিজের এশিয়া-নীতি রচনা করেছিল। ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে দাবড়ানো –এভাবে সাজাতে মনস্ত করেছিল। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান চীন-ভারতের মাঝখানে বলে সর্বশেষ ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশকে নিজের ষ্ট্রাটেজিক গুরুত্বে আমল করতে শুরু করতে ততপর হয়েছিল। স্বভাবতই চীন-ভারতের এই সীমান্ত চুক্তি সেসব পরিকল্পনার আগুনে পানির ছিটা দেবার মত। এরই কিছুটা ঝলক পাওয়া যাবে foreignpolicy জার্ণালের এই রিপোর্টে। [দেখুন,India-China Border Agreement: Much Ado about Nothing]। এর শিরোনামটাই অদ্ভুত অর্থপুর্ণ, সব বলে দেওয়া। Much Ado about Nothing – এই বাক্যাবলী আসলে সেক্সপিয়ারের এক কমেডি নাটকের শিরোনাম। দুলাইনে বললে ওর কাহিনীটা হলো, এক রাজ-সৈনিকের রাজকন্যার সাথে প্রেম। ক্লোডিয়া নামে ঐ সৈনিকের এই প্রেমে বন্ধুবেশি তার শত্রু ডন জন সবরকমভাবে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সৈনিক ও রাজকন্যার মিলন ও বিয়ে হওয়া ঠেকাতে পারে নাই। বিয়ে মিলন হয়েছিল। আশা করি পাঠক বুঝতে পারছেন কেন শিরোনামটা বহু অর্থবোধক।
সে যাই হোক, ভারত ও চীন উভয় পক্ষও পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তিকে “landmark legal document” অথবা “strategic benchmark” বলে উল্লেখ করেছে। চুক্তির সারকথা হল, উভয়ে ভূমিতে যে যেখানে দখল অবস্থানে আছে তা অমীমাংসিত অবস্থায় রেখেও পরস্পর মুখোমুখি হয়ে গেলে একটাও গুলি না ছুড়ে পরস্পরের প্রতি সৌজন্য দেখিয়ে পরিস্থিতি যেন কোন ধরনের সশস্ত্র বিরোধের দিকে না যায় তা নিশ্চিত করবে – এভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

চীন কি আসলেই ভারতকে মুক্তার মালার মত ঘিরে ফেলার পরিকল্পনায়
তবে শুধু সীমান্ত চুক্তিই নয়, চীন-ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠতার দিক থেকে নতুন মোড় ফেরার উপাদানও মনমোহনের ঐসফরে অন্য আর চুক্তির ফলে তৈরি হয়েছে। এটা আমেরিকার জন্য চপেটাঘাতের অনুভুতি আরও তীব্র হয়েছে।
গত ২০০৭ সালের দিকে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহের বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট দুটা গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রকল্প ছিল, (১) মাঝখানে প্রায় ৪৩ কিমি বার্মা পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে পুর্ব চীনের কুয়েমিন প্রদেশ পর্যন্ত যোগাযোগের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প আর (২) বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প। দুটো প্রকল্পই নিজস্ব বিনিয়োগে করে দেবার ব্যাপারে চীন আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া ও থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এই আগ্রহকে ব্যাখ্যা করেছিল চীন নাকি ভারতকে মুক্তার মালার মত চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে, এমন ভীতি ছড়িয়েছিল। অর্থাৎ চিনের বিদেশনীতির লক্ষ্য ও ফোকাস অর্থনীতি নয় বরং ভারতকে ঘিরে ধরার মত সামরিক-ষ্ট্রাটেজিক। কিন্তু এভাবে ব্যাখ্যা করে ভীতি ছড়িয়ে যা আড়াল করে ফেলা হয়েছিল তা হল এই প্রকল্প দুটার প্রতি আগ্রহ চিনের নিজেরই অর্থনীতি বা অবকাঠামোগত স্বার্থ। ম্যাপের দিকে তাকালে আমরা দেখব চিনের কেবলমাত্র পুর্বদিকে সমুদ্রের সীমানা আছে, প্রায় পুরা পুবদিক (পুব চীন সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত) নৌপথের জন্য খোলা, এটাই চিনের একমাত্র নৌ গেটওয়ে। বাকি তিন (পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ) দিক ল্যান্ডবর্ডারে আবদ্ধ – নৌ পথে বাইরে বের হবার সুযোগ নাই। চীনের সব অঞ্চলে সুষম সুযোগ সৃষ্টির জন্য বিশেষ করে দক্ষিণ দিকে (kunming Province) ও পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলোকে কাছাকাছি নৌপথের যোগাযোগের আওতায় নিয়ে আসা – এটা প্রধানত চীনের নিজের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থ। এর উপায় হিসাবে চীন তার দক্ষিণ ও পশ্চিম দুটা দিক থেকেই কাছাকাছি কোথাও গভীর সমুদ্রবন্দরের কথা চিন্তা করে। এর একটা পাকিস্তানের বেলুচিস্থানের গোয়াদার (Gwadar port) আর অন্যটা বাংলাদেশের মহেশখালির সোনাদিয়ায়। প্রথমটা চিনের পশ্চিম দিক (Xinjiang and Tibet Province) আর দ্বিতীয়টা দক্ষিণ দিকের (kunming Province) প্রদেশগুলোকে নৌপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছের হয়। গোয়াদার পোর্ট চীনা বিনিয়োগে এবং চীনা কোম্পানীর হাতে ২০০৭ সালে কনস্ট্রাকশন শেষ হয়েছে, কিন্তু পোর্টকে কেন্দ্র করে আশেপাশে রপ্তানীর জন্য উতপাদন এলাকা গড়ে তোলা আর পোর্ট অপারেশনের দায়িত্ত্ব দিয়ে চুক্তি হয় সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটির সাথে। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনকভাবে তা চালাতে না পারার কারণে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই চুক্তির দায়দেনাসহ নতুন হস্তান্তরের চুক্তি হয় এক চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানীর সাথে। সেই থেকে গোয়াদার পোর্ট চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এখন অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে গোয়াদার পোর্ট থেকে সবার চেয়ে বেশি লাভবান হবে চীনের অর্থনীতি। না সেটা পোর্ট পরিচালনা থেকে ব্যবসায় মুনাফা করার কারণে নয়। মুনাফা অবশ্যই হবে তবে আসল অর্থনৈতিক লাভের তুলনায় এটা নস্যি। চীন আরব দেশগুলো থেকে বছরের তার মোট চাহিদার ৬০% তেল কিনে। এই তেল আরব সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর মানে ভারত-শ্রীলঙ্কা ঘুরে, এরপর আরও দক্ষিণে নেমে, ডানে ইন্দোনেশিয়া বায়ে মালয়েশিয়ার মাঝের চিকণ মালাক্কা প্রণালি নৌপথ ধরে সিঙ্গাপুর পেরিয়ে একেবারে বায়ে মোড় নিলে তবেই দক্ষিণ চীন সাগরে মানে চীনের বন্দরে পৌছাবে। আর ভুখন্ডগত দেখলে এটা পুরাপুরি চিনের পশ্চিম অঞ্চল থেকে চিনের পুবে ভ্রমণ। কিন্তু গোয়াদার পোর্ট মূলত আরব সাগরের মুখে (এককালে তা ওমানের অধীনস্ত এলাকা ছিল। বেশিদিন নয় গত ১৯৫৮ সালে ওমানের কাছ থেকে তিন মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।) ফলে নৌপথে মধ্যপ্রাচ্যের তেল আরব সাগর থেকে বের হবার মুখেই গোয়াদার পোর্টে নামিয়ে তা পাকিস্তানের কারাকোরাম হাইওয়ে সড়ক ধরলে উত্তর-পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলো যাওয়া সবচেয়ে সহজ, কম খরচে ও কম সময়ে। এটাই চীনের অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক বিরাট লাভ। এজন্য ভবিষ্যতে পাইপ লাইন স্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে গোয়াদার হয়ে সরাসরি তেল কেনা ও পাইপলাইনে পরিবহণ করে নেবার পরিকল্পনা চীনের আছে।
তার মানে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে বিনিয়োগে যাওয়া সবার উপরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট গুরুত্বপুর্ণ। এটা ছাড়াও তুলনায় গৌণ স্বার্থ হলেও বিষয়টাকে সামরিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে অবশ্যই চীনের সেই সুবিধাও আছে সন্দেহ নাই। তবে এটা বাড়তি পরে পাওয়া সুবিধা। বাড়তি পরে পাবার সুবিধা নিয়ে অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যেকার প্রতিযোগিতা সবসময় থাকে এবং চলছে। যেমন, আগেই বলেছি আইনীভাবে গোয়াদার পোর্টের অবস্থান পাকিস্তানের নৌসীমান্তের ভিতর অন্তর্ভুক্ত হলেও ঐ সীমান্ত ডাঙ্গার দিক থেকে একই সঙ্গে তা পাশের ইরানের সাথে পাকিস্তানেরও সীমান্ত। আর ঠিক ইরানী ঐ সীমান্তে আর একটি নৌবন্দর তৈরি হয়েছে প্রায় সমকালীন সময়। ইরানের ঐ নৌবন্দরের নাম চাহ-বাহার (Port of Chabahar), প্রশাসনিকভাবে এটা ইরানের সিসতান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। আর এই পোর্ট তৈরির অর্ধেক বিনিয়োগ করেছে ভারত সরকার এবং এই পোর্ট মূলত ভারত ব্যবহার করে ইরানের ভিতর দিয়ে সড়ক পথে আফগানিস্তানে ভারতীয় পণ্য আনা-নেয়ার জন্য। ফলে স্বভাবতই ভারতের অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ ঐ চাহ-বাহার পোর্টের কারণে এসেছে। তাহলে সামরিক ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে ঐ পোর্টের কারণে যেন ভারতও পাকিস্তানকে (ফলে ভারতের চীনে প্রবেশেরও) ঘিরে টুটি চেপে ধরেছে (মুক্তামালার মত) এমন অর্থও করা সম্ভব। কিন্তু তুলনায় এই ধরনের অর্থ করে মিডিয়া প্রচারণা আমরা দেখিনা। আসলে পরাশক্তিগত পারস্পরিক অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের প্রতিযোগিতা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু কোনটাকে ভয়ভীতির বিষয় বলে আভ্যন্তরীণভাবে নিজের নাগরিক বা অনেক সময় আঞ্চলিক শ্রোতাকে লক্ষ্য করে প্রপাগান্ডা করবে সেটাই গুরুত্বপুর্ণ দিক। আর এর ভিতর দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের বিদেশনীতির একটা প্রকাশ আমরা দেখি। আমার কথা আরও স্পষ্ট হবে, বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে ভারতের আগের অবস্থান আর এখনকার অবস্থান লক্ষ্য করলে।

বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে চীনা আগ্রহঃ
এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ আগ্রহের মুল কারণ চীনের কুনমিং প্রদেশের যোগাযোগ সহজ করা এই অর্থনৈতিক স্বার্থ। কিন্তু ভারত এই ব্যাপারটাতে নিজের পুবের রাজ্যগুলোর সাথে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট লাভজনক ও প্রয়োজনীয় মনে করলেও তা চীনের উদ্যোগ আগ্রহের, ফলে ষ্ট্রাটেজিক সামরিক দিক বিবেচনা থেকে ২০০৭ সালে থেকেই প্রবল সন্দেহের চোখে তা দেখতে থাকে। সে সন্দেহ মিডিয়ায় প্রকাশ করতে থাকে। শুধু তাই না, যতদুর সম্ভব বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে তাকে বিরত বা অনাগ্রহী রাখার চেষ্টা করে। বার্মাকেও প্রভাবিত করেছিল একই অবস্থান নিতে। বার্মা ভারতের দ্বারা প্রভাবিতও হয়েছিল। কারণ বার্মার জন্য সেসময়টা ছিল দীর্ঘ কয়েকযুগ আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবরোধে একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেখতে পাবার সময়। সুযোগটা এসেছিল ভারতের মধ্যস্থতায়। কারণ ভারতের মাধ্যমে পশ্চিমের সাথে রফা করে অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছিল তখন সেখানে। ফলে সেদিকে তাকিয়ে ভারতের প্রভাবে বার্মাও চীনা প্রকল্পে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল। আর এই ঘটনায় তখন চীন প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ মজার। দুরদর্শী তো বটেই। চীনের পররাষ্ট্র অফিস বলেছিল, যেদিন বার্মিজ জনগণ আগ্রহ বোধ করবে সেদিনের জন্য এই প্রকল্প-প্রস্তাব আপাতত তুলে রাখা হল।

ভারত কি হুশে ফিরেছে নাকি এখনও দ্বিধান্বিত ও কৌশলী প্রকাশেই আছে
গত দেড় দুই বছর ধরে এখন ভারতই এই দুই প্রকল্পের ব্যাপারে উল্টা আগ্রহ দেখানো শুরু করেছে। এমনকি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মনমোহনের ঐ সীমান্তচুক্তি বিষয়ক চীন সফরে এক জয়েন্ট ষ্টেটমেন্টে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাতে আরও আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে নতুন এক চুক্তি করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখিত হয়েছে।
এর মানে দাঁড়াল এতদিন চীনা প্রকল্প-প্রস্তাব নিয়ে তা নাকি মুক্তামালার মত ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনা ষড়যন্ত্র বলে ভারত যে গল্প ছড়িয়েছিল তা ভিত্তিহীন ছিল -এটা ভারত নিজেই স্বাক্ষ্য দিল। তবে মূল বিষয় হল, ভারতের একটা অনাস্থা চীনের উপর ছিল যদিও তা তৈরি করার পিছনে দায়ী খোদ ভারতের আমেরিকান নীতি। বিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে বললে এবিষয়টা হল এই যে পাঁচ রাইজিং ইকোনমির উত্থান এই ফেনোমেনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভুমিকার সমাপ্তি এবং তা উলটপালট ঘটিয়ে দুনিয়ার নতুন পরাশক্তিগত বিন্যাস আসন্ন -একথা লেখার শুরু থেকে বলে আসছি। কিন্তু এটা শুধু পরাশক্তিগত নতুন বিন্যাস নয়, এই ফেনোমেনার মূল তাতপর্য হলো, এটা ১৯৪৪ সাল থেকে তৈরি ও চলে আসা আমেরিকার নেতৃত্ত্বে যে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার চালু হয়েছিল (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ বা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে) তার আয়ু শেষ হতে চলছে আর এটা প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। চলতি অর্ডারটাকে যদি অতীত বলি তবে দুনিয়ার গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের আগামি আসছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। এটা চারদিক থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। এবং এটা কোনভাবেই পুরানা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেখেই এর পুনর্গঠন (চীন, রাশিয়া বা ভারতকে আরও বেশি জায়গা ছেড়ে দিয়ে) এভাবে হচ্ছে না। হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমশ ননফাংশনাল বা অকেজো প্রভাবহীন হয়ে পড়া আর চীনের নেতৃত্ত্ব নতুন সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার মধ্যদিয়ে। এটা শুধু আমেরিকা তার সার্ভে রিপোর্টে টের পেয়েছে তাই নয়, ২০০৯ সালে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর বার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল তুরস্কে। সে সভায় ঐ প্রতিষ্ঠান দুটো আসন্ন গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন টের পেয়ে বা ব্যাপারটাকে পরোক্ষে স্বীকৃতি দিয়ে ঐ সম্মেলন আহবান জানিয়েছিল চীনকে। চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ের মুদ্রা হিসাবে (ডলার, পাউন্ড, ইউরো ও ইয়েনের পাশাপাশি) জায়গা দিতে রাজি বলে জানিয়েছিল। কিন্তু এপর্যন্ত চীন সেই পথে সাড়া দেয় নাই। না দেবার পিছনের কারণ হল, (১) চীনের প্রতি এই প্রস্তাবের অর্থ হল আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো যেগুলো আমেরিকার নেতৃত্ত্বে ও নিয়ন্ত্রণে এখন যেমন আছে ওর ভিতরেই চীনকে জায়গা দেয়া কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ অটুট থেকে যাওয়া যা চীনের স্বার্থ নয়। (২) চীনের স্বার্থ এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো এবং ঐ নিয়ন্ত্রণ সম্পুর্ণ ভেঙ্গে (নতুন ম্যান্ডেটে) নতুন ভারসাম্যের প্রতিষ্ঠান দেখতে চাওয়া। (৩) চীনের কাছে এবং বাস্তবত ব্যাপারটা গায়ের জোরের বা চাপ দিয়ে দাবী আদায় করে নেবার বা কারও অনুগ্রহে তা পাবার বিষয় নয়। চীন সেজন্য তার আন্তর্জাতিক বিনিময় বাণিজ্য যত বেশি সম্ভব ইউয়ানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়। এবছর ২০১৪ জানুয়ারিতে ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রার তালিকায় সপ্তম স্থান দখল করে। বিশেষ করে হংকং মার্কেটে লেনদেনের ৭৩% এককভাবে সম্পন্ন হয় ইউয়ানে।
আমরা মনে রাখতে পারি, ১৯৪৪ সালে আইএমএফ গঠনের সময় তা আমেরিকান ডলারের ভিত্তিতে সাজানো ও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ নেতৃত্ত্ব সম্পন্ন হয়েছিল, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র তা মানতে বাধ্য হবার পিছনে মুল কারণ সেসময় আন্তর্জাতিক লেনদেন বাণিজ্যে ডলারে বিনিময় ছিল সর্বোচ্চ ও একক আধিপত্যে এবং আমেরিকা একমাত্র উদ্বত্ত্ব বাণিজ্য অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল তাই। ফলে আইএমএফে আমেরিকান কর্তৃত্ত্ব ও নেতৃত্ত্ব এসেছিল সামরিক বা পরাশক্তিগত আধিপত্যের কারণে নয়। যদিও প্রতিষ্ঠানগতভাবে পুরানা গ্লোবাল অর্ডার ভেঙ্গে পড়া আর বদলে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রতিস্থাপন যা নতুন গ্লোবাল অর্ডারের জন্ম দিবে তা ঠিক (আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংকের মত) কোন প্রতিষ্টানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে ঘটবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার এই ফেনোমেনা কে BRICS ফেনোমেনা অথবা ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রতি বছরের BRICS সামিট এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত করা যায়। আর এই সামিট থেকে BRICS ব্যাংক নামে কার্যক্রম যা মূলত বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসাবে ধেয়ে আসছে। আমাদের এখনকার আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক অংশ হিসাবে সারকথাটা হল, চলতি গ্লোবাল পুজিতান্তিক অর্ডারটাকে দুনিয়ার অতীত বললে দুনিয়ার আগামি হল BRICS ফেনোমেনা।
কিন্তু আমেরিকার দেয়া প্রলোভনে পড়ে BRICS ফেনোমেনাকে মনোযোগে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা সবচেয়ে নেতিবাচক। এককথায় বললে এখন পর্যন্ত কংগ্রেস দলের নেতৃত্ত্বে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা দ্বিধাগ্রস্থ। একদিকে তারা বুঝে স্বীকার করে বলেই মনে হয় যে দুনিয়ার আগামি ফলে শেষ বিচারে ভারতের মূল স্বার্থেরও আগামি হল BRICS ফেনোমেনা এবং একে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করা। কিন্তু আমেরিকার অফার করা সুবিধাদির লোভে অর্থাৎ পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে কেবল নিজের জন্য কিছু সুবিধা নিংড়ে নিতে গিয়ে সে BRICS ফেনোমেনাকে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করতে গড়িমসি করে চলেছে। এরই বাইরের প্রকাশ হল, এতদিন খামোখা চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জুজুর ভয় দেখিয়ে আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাধাটাকে নিজের জনগণ ও নিজের দ্বিধাগ্রস্থ ভুয়া নীতির পক্ষে ন্যায্যতা হিসাবে দেখানো। এই হোল তার মারাত্মক দ্বিধার দিক। ওদিকে ভারতের এই দ্বিধার দিকটা, খামোখা চীনের সাথে “আগামির সম্পর্কটাকে” সামরিক সংঘাতপুর্ণভাবে দেখানোর চেষ্টাটা চীনের কাছে পরিস্কার। কিন্তু চীন জানে এবং বাস্তবতই তাই যে BRICS ফেনোমেনাকে এগিয়ে নেয়া এটা জবরদস্তির বিষয় নয়, প্রতিহিংসার বিষয় নয় ভারতের সম্পুর্ণ স্বইচ্ছার বিষয়, নিজের স্বার্থ বিষয়ে হুশে আসার বিষয়। তাই এবিষয়ে চীনা নীতি অবস্থান ধৈর্য ধরার নীতি। এবং চীন তাতে বিজয় লাভ করছে। একদিকে বাংলাদেশ নীতিতে ভারত-আমেরিকার হানিমুনের জায়গায় বিরোধ সংঘাত হাজির হবার কারণে আর ওদিকে চীন-ভারতের সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে চায় ভারত। অথচ এই অর্থনৈতিক করিডরের উদ্যোগের কাজটা এতদিন ফেলে রেখেছে ভারতের আমেরিকার সাথে এতদিনের গাটছাড়া বেধে চলার নীতি, পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে স্বার্থপরের মত একা নিজের জন্য সুবিধা নিংড়ে নেয়া যাবে বলে অনুমানে চলার নীতি। এছাড়া ভারতের নীতিনির্ধারকেরা কি আসলে কতটা সিনিসিয়ারলি মনস্থির করেছে যে আমেরিকান দেখানো লোভ ছেড়ে গ্লোবাল অর্ডারের আগামির পক্ষে তার নিরলস কাজ করা উচিত? আমরা এখনও নিশ্চিত নই। যতদুর বুঝা যাচ্ছে ভারত এখনও ব্যাপারটাকে আমেরিকাকে শায়েস্তা করার বিষয় হিসাবে দেখছে। হয়ত ভাবছে এভাবে আমেরিকাকে চাপে ফেলতে পারলে ২০০৭ সালের মত আবার আমেরিকার যাতা কাঠি ব্যবহার করার সখ্যতায় আমাদের মত দেশের উপর রুস্তমি চালিয়ে যাওয়া যাবে। ফলে একদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সালমন খুরশিদের সর্বশেষ ডিসেম্বর ২০১৩ তে ওয়াশিংটন সফর থেকে ফিরে জানিয়েছিলেন আমেরিকা যেন ভারতের চোখে দক্ষিণ এশিয়ার নিজের নিরাপত্তা স্বার্থকে দেখে – অর্থাৎ ভেঙ্গে অকেজো হয়ে পড়া এই পুরানা ২০০৭ সালের ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তিটাই আবার ফিরে আসুক সালমন খুরশিদ সে আকাঙ্খার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। অথচ একই সময়ে মনমোহন চীন সফরে গিয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে তাগিদ দিয়ে চীনের সাথে যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা দিচ্ছেন। এই হল ভারতের মারাত্মক স্ববিরোধী বিদেশনীতি।ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি নতুন মন্ত্রী হবার পর তোফায়েল আহমেদ ভারত সফরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তাকেও ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারে প্রবল সোচ্চার হতে দেখেছিলাম আমরা প্রেস মিটিংয়ে। যদিও গুরুত্ত্বপুর্ণ একটা টুইষ্ট ছিল সেখানে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনটা পার হয়েছিল একা ভারত এর পক্ষে আর অন্য পক্ষ সব দেশ, যারা বাংলাদেশে কি হয় তাতে তাদের ষ্টেক বা স্বার্থ আছে বলে অনুভব করে তারা এমন নির্বাচন দেখতে চায়নি এমন পরিস্থিতিতে। অন্যভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বললে ভারত আর আমেরিকার মুখোমুখি অবস্থানের চরম প্রকাশ ঘটেছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও নির্মম। সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ফেল করায় আমাদের চলতি বাজেট ঘাটতি ফলে এডিপিতে কাটছাট আর আগামি জুনের বাজেটেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চলতি সরকার। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাজেটের ঘাটতি পূরণ আর স্থবির বিদেশি বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে যেন চীন বিশাল ত্রাতা হিসাবে এখনই হাজির হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশ যেন পশ্চিমের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে অথবা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য কিছুই যায় আসে না। এমনই ধারণা ছুড়েছিলেন সেদিন তোফায়েল আহমেদ।
নিজের নয় ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর পুরা ঠেস দিয়ে দাড়ানো হাসিনা সরকার বা এর কোন মন্ত্রী আমাদের এই ধারণা দিতে শুরু করেছিল অর্থনৈতিক সমস্যা মিটানোর জন্য এই তো চীন এসে গেছে। যেন এতদিন পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে বড়ভাই আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা, যাতাকাঠি ধার দেয়া, নিজেকে পরাশক্তি ভাবতে শুরু করা ইত্যাদির লোভ ভারত ত্যাগ করেছে, সেই সুবাদে আমাদের উপর আমেরিকার ধার দেয়া যাতাকাঠি ব্যবহার করে সরকারে কে থাকবে তা নির্ধারণের লোভ ত্যাগ করেছে? যেন ভারত এতদিন দ্বিধা শুণ্য একাগ্র মনে আগামি গ্লোবাল অর্ডারের পক্ষে চীনের সাথে কাজ করেছে। অথচ এটা সোনার পাথরের বাটির মত। কংগ্রেসের ভারত নিজেকে পরাশক্তি ভাবার ভান করে আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখাতে চায়, আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ নীতিতে সাংঘার্ষিক করে, একলাই রাজা ভাব দেখাতে চায়। এই হলো তার স্ববিরোধী নীতি। আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখানোর সময় ভুলে যায় ঐ রুস্তমির পিছনের যাতাকাঠিটা নিজের নয়, নিজে সে কোন পরাশক্তি নয়, ওটা আমেরিকার ধার দেয়া। আবার, চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি এবং Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor যদি আজ এতই গুরুত্বপুর্ণ মাইলষ্টোন বলে অনুভুত হবে তাহলে আমেরিকার পাল্লায় পড়ে গত সাত বছরের চীন বিদ্বেষী নীতি – চীন আসতেছে, এই সীমান্ত হামলা দিল বলে আমেরিকার কোলে উঠে পড়া – সম্পর্ককে খামোখা শত্রুতামূলক করে দেখা এসব তাহলে মারাত্মক ভুল পথ ছিল – এটা নিজেই প্রকারন্তরে স্বীকার করছে। এককথায় বললে গত সাত বছর কংগ্রেসের ভারত এক যুদ্ধবাজ মুই কি হনু রে নীতি অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশকেও বিপদের মুখে রেখেছে। কোন হোমওয়ার্ক ছাড়া ভারতের এসব কাজকে পোলাপানি নাদান নীতি বললেও সম্ভবত কম বলা হবে। অথচ আমাদের মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব বানিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে ভারতের ইকোনমিক করিডর প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হবার কারণে আর চিন্তা নাই চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সমস্যা সমাধান করে দিচ্ছে। আর মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব হয়ে এবার আমাদেরকেও বেকুব বানাতে ঐ প্রেস ব্রিফিংয়ে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা যেন আমাদের উদ্ধারকর্তা ঘটনা। একথা ঠিক যে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে। কিন্তু কঠিন সত্যটা হল ভারতের আমেরিকার কোলে চড়ে বসে থাকা আর চীন প্রসঙ্গে ভয়ভীতি ছড়িয়ে রাখার নীতির কারণেই ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা শুরুই করা যায়নি, এখন হোমওয়ার্ক শুরু হয়েছে মাত্র। যার ফল আসতে কমপক্ষে ১০ বছর পিছনে আমরা।
আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক চীনের বিদেশ নীতির সারকথাগুলো দাঁড়াচ্ছে, ভারতের বাংলাদেশ নীতির বিপরীতে চীনের নীতির মৌলিক দিকগুলো গত প্রায় দুই দশক ধরে কোন এদিক ওদিক চড়াই উতরাই ছাড়াই একতালের। আর এর সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ ও নতুন বৈশিষ্টের দিক হল, চীনের নীতি কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা রাজনৈতিক খবরদারি পাবার দিকে না তাকিয়ে মুলত অর্থনৈতিক। কোন কাজের চুক্তি পাবার জন্য রাজনৈতিক লিভারেজের উপর ভরসা করে তা পাবার চেষ্টা করা নয়। সরকারে কে থাকবে না থাকবে সে ব্যাপারে কোন মাথা সে ঘামায় না। গত একবছরে চীনা এমবেসি ছয়বার বিবৃতি দিয়েছে। এমন প্রতিটা বিবৃতিতেই এই নীতির প্রতিফলন থেকেছে।
তবে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে গতবছরের শেষ দিকে জাতিসংঘের কোন ভুমিকা বা মধ্যস্থতায় একটা সমাধান আনা যায় কি না এনিয়ে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে পশ্চিমা কুটনৈতিকদের প্রচেষ্টা ছিল। ঐ প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানটা জাতিসংঘ বলেই ভেটো ক্ষমতাওয়ালা চীনকেও ঐ উদ্যোগে জড়িত ও অন বোর্ড বা নৌকায় তোলার তাগিদবোধ করেছিল পশ্চিম। সেই সুত্রে আমরা চীনকে দেখেছিলাম বিবৃতি দিতে। আবার পশ্চিম একা কোন উদ্যোগ নিলে তা যেন চীনের কাছে নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে সন্দেহজনক বা বিরোধাত্মক বলে মনে না হয় সেটা এড়ানোর কথা ভেবে পশ্চিমা উদ্যোগ নিজেই চীনকে অন বোর্ড করার তাগিদবোধ করেছিল। এছাড়া আরও একটা দিক আছে চীনকে অন বোর্ড করা মানে রাশিয়াকেও অন বোর্ডে পাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া।
চীন প্রসঙ্গে এখানেই শেষ করছি। পরের চতুর্থ ও শেষ কিস্তি রাশিয়া প্রসঙ্গে।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি