ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

গৌতম দাস

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Sm

বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও তার ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতা অব্যাহত আছে তো বটেই বরং বেড়েছে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। মানে, বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বা সংশোধিত নাগরিক আইন পাস করার পরে এ নিয়ে বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি বাড়িয়েই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারা এখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধিদের “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে;  নিজ কর্মীদের নিয়ে গুলি করে মারার শ্লোগান তুলেছে। এরই মধ্যে লন্ডনের ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন এই ইস্যুতে গত সপ্তাহে এক আর্টিকেল ছেপেছে। শিরোনাম “ইকোনমিস্ট এক্সপ্লেনস, দ্যা ইরোশন অব সেকুলার ইন্ডিয়া” [The Economist explains, The erosion of secular India]
‘Explains’ – শিরোনামে উল্লেখ থাকে এমন টাইপের লেখা সাধারণত অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হয় দেখা যায়; যাতে পাঠক ওই ইস্যুর খুঁটিনাটি দিকগুলো ঐ লেখা থেকে জেনে নিতে আগ্রহী হয়। ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেলটা তেমনি ধরনের এক লেখা, যেটার শিরোনাম হল – আমরা “ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা করে বলছি, ভারতের সেকুলারিজমে ক্ষয় ধরে গিয়েছে”।
এই আর্টিকেলের লেখক দিল্লিতে বসে লিখেছেন তা নিজেই জানিয়েছেন। আর এ ধরনের লেখাকে পত্রিকার নিজের অবস্থান, অন্তত কিছু দায়দায়িত্ব নিয়ে লেখা মনে করা হয়ে থাকে।
কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হল “সেকুলার” শব্দের ব্যবহার। সারা ভারতে সেকুলার শব্দের এধরণের বিশেষ আবিষ্কার ও বিরক্তিকর ব্যবহার প্রচলিত আছে সেই ১৯৪৭ সালের আশেপাশের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। সেটা এখন ‘লন্ডন ইকোনমিস্ট’ পর্যন্ত এতে সওয়ার হয়েছে এটা দেখতে পাওয়াটা বড়ই চমকপ্রদ ও তামাশার নিঃসন্দেহে! ইকোনমিস্ট এখানে ধরে নিয়েছে যে, ভারত একটা সেকুলার রাষ্ট্র, অন্তত সেকুলার রাষ্ট্র ছিল – ইকোনমিস্ট এই সার্টিফিকেট এখানে বিতরণ করেছে। কিন্তু ‘সেকুলা’র মানে কী? আর কোনটা সেকুলার কোনটা না, তা চেনার উপায় কী?

যারা দাবি করে থাকে যে সে সেকুলার অথবা তাদের অমুক রাষ্ট্র সেকুলার তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তিনি সেকুলারিজম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কনসেপ্ট সম্পর্কে আসলে খুবই কম কিছুই জানেন। যেমন এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় যে, ওমুক রাষ্ট্র বা ভারত সেকুলার কি না! ইউরোপে কোন রাষ্ট্র সেকুলার আর কোনটা না- এমন প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। এমনকি আমেরিকা কি সেকুলার রাষ্ট্র? এই প্রশ্ন করতে দেখা যায় না কেন? এছাড়া আবার ঠিক কী প্রয়োজন মিটাতে কোন রাষ্ট্রের সেকুলার হওয়া জরুরি কেন? এর জবাব কী তারা জানেন? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন- কোনো রাষ্ট্র সেকুলার কিনা তা বুঝার উপায় কী?

ইকোনমিস্টের এই লেখায় কোথাও অবশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কী অর্থে ভারতে ‘সেকুলারিজম আছে বা ছিল’ বলা হচ্ছে। এটা বলতেই বা আসলে কী বুঝান হয়েছে? তবুও ঐ লেখায় লেখকের এক দাবি হল- “১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত ভারতে সেকুলার ভিশন বজায় ছিল এবং তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নাই” , [“It was the secular vision which prevailed and which remained pretty much unchallenged until the 1980s.”] অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, সেকুলার শব্দের পাশে একটা ‘ভিশন’ শব্দ লাগানো হয়েছে; মানে সেকুলার জিনিসটা একটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে ব্যাখ্যা করতে দেখছি। এমনিতে অবশ্য ভারতের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ভারত সেকুলার কি না’ এই গর্ব বা তর্কের মীমাংসা করার পদ্ধতিটা দেখা যায়, খুবই সহজ। ভারতে একজন মুসলমানকে প্রেসিডেন্ট বানানো হলে এটাই তাদের কাছে সেখানে প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে গৃহীত হয়ে যায় যে, ভারত সেকুলার। অথচ ইস্যুটা অমন লোক দেখানোর মোটেই নয়। রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে যারা সিরিয়াস তাদের কাছে এসব আমলযোগ্য কথা হতে পারে না।

এ ছাড়া ঐ আর্টিকেলের শুরুতে বলা হয়েছে, ভারতের যারা মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ছিল (মানে কংগ্রেসকে কল্পনা করা হয়েছে) এরা নাকি ‘সেকুলারিজমের স্বপ্ন’ ও ‘ইনক্লুসিভ রিপাবলিক’-এর স্বপ্ন দেখতেন, [Whereas the mainstream of India’s independence movement envisioned a secular, inclusive republic……]। কিন্তু সরি, লেখক মহাশয়! আপনার এই কথা বাস্তবের সাথে মিলে না। ফলে, এটা অগ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো ধারণা প্রকাশ করা আমেরিকানদের চালু করা শব্দ। এ ছাড়া কোল্ড ওয়ার যুগ শেষের আগে আমাদের এদিকে এই শব্দ দেখা যায়নি। বিশেষ করে গ্লোবালি ইসলামী রাজনীতিতে একালে তা বাধ্যতামূলক আমলযোগ্য ইস্যু হয়ে পড়ার পর এটা আমেরিকানদের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশের পরই কেবল এটা এক ভাষ্য হয়ে উঠেছে; আগে না। ইসলামী রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র বা শাসন ধারণার “খেলাফত” শব্দে আমেরিকার আপত্তি তারা এভাবেই এই শব্দ দিয়েই প্রকাশ করে থাকে যে রাষ্ট্র মাত্র তাতে বসবসকারি সকল অংশকে সাথে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করতে হবে। কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, উপেক্ষায় ফেলে রাখা সুযোগ নেয়া যাবে না।

এছাড়া মূলত কংগ্রেস কখনই “ইনক্লুসিভ রিপাবলিক” বলে কোনো ধারণা ব্যবহার করে নাই। এমনকি ১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার সময় রুটিন কাজ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা ব্যবহার করা ছাড়া আর ভারতের আর কোথাও শব্দটাই ব্যবহার করা হয়নি। আসলে রিপাবলিক শব্দটাই আমাদের এশিয়ায় এদিকে প্রয়োজনীয় ধারণা মনে করার রেওয়াজ নাই। খুব সম্ভবত আমেরিকানেরা কমিউনিস্ট ঠেকাতে চালু করা এক ভুয়া শব্দ “ডেমেক্রেসি” – এটা চালু করার কারণে গুরুত্বপুর্ণ ‘রিপাবলিক’ ধারণাটা চাপ দিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই  এই দুর্দশা।  আর সোজা হিসাবে এদিকে ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটার ব্যবহার কংগ্রেস দলের নেতা ব্যক্তিত্বরা  যদি বুঝেই থাকত ও মেনে নিত, তবে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার দিকে যেত না। অথবা বলা যায় তাঁরা যেতে দিয়েছিল কী করে? তাহলে নেহরুর “অখণ্ড ভারত” দখলের ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা,  যেটা তাঁর ষোলোআনা ছিল, তার কী হবে? আমরা তো সেটার এখনো সহজেই এর প্রমাণ পাই। মনে রাখতে হবে, অখণ্ড ভারত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সবাইকে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ ভারত রাষ্ট্র গড়া- এ দুটো কারও কারও কাছে অতি উতসাহে শুনতে কাছাকাছি মনে হবে হয়ত। কিন্তু এ দুটো- একই বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও, এরা একেবারেই ভিন্ন বিষয়। আসলে একটা হল, স্রেফ ভূখণ্ডের লোভ। আর একটা হল সবাইকে একই ও সমান নাগরিক মানুষ হিসেবে একত্রে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ও গণ্য করে গড়ে তুলতে চাওয়া।
ওদিকে আবার, গান্ধী ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন; এর প্রমাণ দেখা যায় না।  বরং আসলে তা হবার কথাই না। কারণ  গান্ধী-নেহেরুর রাষ্ট্র-চিন্তা – সেটা এক জাতিরাষ্ট্র পাবার চিন্তা। আর জাতিরাষ্ট্র চিন্তায় “খেলাফত কোন অনিবার্য প্রয়োজনীয় ধারণা নয়।  বরং, তাদের কথিত “দেশপ্রেমিক জাতি” হলেই চলে। গান্ধী বরং তাঁর খামতি চিন্তার অপুষ্টির কারণে  সারাজীবন তিনি “হিন্দু আর মুসলমান’ – এভাবে পরিচয়মূলক শব্দ আওড়ায়ে গেছেন। নন-আইডেনটিটি-মূলক সিটিজেন বা নাগরিক শব্দ কখনই ব্যবহার করতে পারেন নাই।  আসলে মূলত তিনি ‘হিন্দু-মুসলমান এক করতে হবে’ এই হাল্কা ও অর্থহীন ভাষ্য আউড়িয়ে গেছেন। একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে দুটো আলাদা ধর্ম হিন্দু-মুসলমান, এদের এক করতে হবে কেন? এর চেয়েও বড় কথা- দুটো আলাদা ধর্মকে এক করা কি আদৌ সম্ভব, না এর দরকার আছে? এদিকগুলো তিনি ভাবতে সক্ষম ছিলেন মনে হয় না।
দুনিয়াতে ‘আধুনিক রিপাবলিক’ রাষ্ট্রধারণা আসা ও এটা গড়ার চিন্তা এসেছে কবে থেকে? জবাবে সবাই মেনে থাকেন যে, এটা মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর থেকে। একটা ভুল ধারণাও এখানে আছে যা অনেকে ধারণ করে থাকতে পারে। ১৬৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত জন্ম নেয়া সব রাষ্ট্র একই ধরনের রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রধারণা, তা কিন্তু নয়। সহজে চিনবার জন্য বললে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আর পরের ধারণা আলাদা এভাবে মনে রাখলেই চলে। এই যুদ্ধ সব বদলে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে ফারাকটা কী ছিল? তা হল, ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বলতে একমাত্র তা নেশন-স্টেট বলে বুঝা হত। আর পরে সেগুলো সবই হয়েছে অধিকারভিত্তিক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্রের “কাউন্সিল অব ইউরোপ” গঠনকে যদি  লক্ষ্য করা যায়। এর জন্ম-উদ্দেশ্যই ছিল এক হিউম্যান রাইটস কনভেনশন ডাকা (নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস, ECHR)। নিজেদের রাষ্ট্র-ভিত্তি কথিত “জাতি” ধারণা থেকে বদলে হিউম্যান রাইটে রূপান্তরিত করে নেয়া যায়।  যাতে ওই কনভেনশন শেষে একমত হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা, এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোকে জাতিরাষ্ট্র থেকে হিউম্যান রাইটসভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র আকারে ভিত্তি বদলে নেয়া যায়।

অতএব যে ইউরোপের কথা আমরা শুনি জানি, যার এক নমুনা হল সেকালের কলোনি-মালিক ব্রিটিশ রাষ্ট্র; এটা আসলে সেকালে ছিল এক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট; মানে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। আর তাই যে জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে সেকালের রেনেসাঁ-চিন্তা ব্রিটিশের হাত ধরে ভারতবর্ষে এসেছিল সেই রেনেসাঁ ছিল মূলত একটা জাতিরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ও ধারণা। কমিউনিস্ট সার্টিফিকেট অনুসারে সেকালের রাজা রামমোহন রায়কে ‘ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু’ মানা হয়। সেই রামমোহনের সক্রিয়তার কাল (১৮১৫) থেকে পরিশেষে ১৯৪৭ সালের আশপাশের সময়কালের নেহরু-গান্ধীর রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি এখনো সেই রাষ্ট্রধারণাটা মূলত একটা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৪৭ সালের পর  ‘গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত’ আসলে এক নেশন-স্টেট হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু ভারত নেশন-স্টেট বুঝের ভারত হলে, তাতে কী সমস্যা?

এক্কথায় এর জবাব হল, নেশন-স্টেট ধারণা “নাগরিক অধিকার” বা “হিউম্যান” রাইট ধারণা বুঝতেই পারে না। আর নেশন-স্টেট ধারণা এসেছে – রাষ্ট্রগড়া বলতে যেখানে মুল কর্তব্য ছিল একটা “রাজনৈতিক কমিউনিটি” গড়া – এই কাজ থেকে বিচ্যুতি [derailment] হিসাবে।
এছাড়া রাষ্ট্র বলতে এক ‘জাতিরাষ্ট্রে’র স্বপ্ন-কল্পনা থাকলে গঠনকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, কাকে তারা ‘জাতি’ হিসেবে নেবে? যেমন রামমোহন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র দেখে এক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু খেয়াল করতে হবে তার এই জাতি ধারণাটা আসলে (এথনিক অর্থে) এক ধর্মীয়-জাতি ধারণা। ঠিক যেমন এই একই  বিচারে ব্রিটিশরা হল, এঙলো-ক্যাথলিক খ্রিশ্চান, আর এই ধর্মের ভিত্তিতে তারা এক ব্রিটিশ জাতি। আর এখান থেকেই রামমোহন একটা একক ধর্মের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতির কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এতে হিন্দুধর্ম তার ‘ঐ’ প্রয়োজন মিটাতে পারবে, তা তিনি মনে করেননি। কারণ এই হিন্দুধর্ম জাতভেদ প্রথায় ডুবে অসংখ্য জাতে বিভক্ত। এছাড়া ভারতে আরো ধর্মও আছে। এছাড়াও তিনি কোন একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম হলে তা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হবে বলে মনে করতেন। কারণ হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার ধারণাকে তিনি এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনের দিক থেকে দেখে সমস্যা ভাবতেন। এসব চিন্তা থেকেই ১৮১৫ সালে তিনি একেশ্বরবাদী ‘ব্রাহ্মধর্মের’ প্রচলন করেছিলেন।
কিন্তু এই “জাতি” ধারণা প্রয়োজনে ধর্ম-প্রকল্প বাস্তবায়ন রামমোহন বা তার অনুসারীরা কেউ সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আর ১৮৭২ সালের দিকেই, খোদ ব্রাহ্মধর্মই দু’ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ সবাইকে এক ধর্মের অনুসারী করে জাতিরাষ্ট্র বানানো দূরে থাক ব্রাহ্মধর্ম নিজেই বিভক্ত হয়ে যায়। তাই, এটা উদ্যোক্তাদের কাছে অবাস্তব প্রকল্প মনে হতে থাকে আর ততই পরবর্তিকালে বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-বঙ্কিমচন্দ্রসহ সবার কাছেই “ব্রাহ্ম-প্রকল্প বাদ দিয়ে” হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একমাত্র বাস্তবতা বলে নিরুপায় ‘সাফাই’ হয়ে উঠতে থাকে। কংগ্রেসের জন্মের (১৮৮৫) পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা- এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন গান্ধী। পরের বছরের মধ্যে তিনি কংগ্রেসের হাল ধরেন । তখন থেকেই এবং মূলত ১৯২৩ সালের ‘লক্ষৌ প্যাক্ট’-এর ঐক্য ব্যর্থ হয়ে যারার পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একেবারে নির্দিষ্ট হয়ে জায়গা পেয়ে যায়। তবে গান্ধীর কৌশলে, এটা হিন্দুধর্মভিত্তিক বা এটা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সে কথা সরাসরি না বলে আবছা করে রাখা হয়। আর তখন থেকে বিপদে পড়লে হিন্দু শব্দটা ঠিক ধর্ম নয়, সভ্যতা বলে বুঝতে হবে বলে দাবি করার চাতুরী তারা করে গেছেন।

আসলে জাতিরাষ্ট্র বুঝের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এখানে ‘জাতি’ মানেই কোনো একটা আইডেনটিটির জাতি মানে, ভাষা ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়কে ভিত্তিতে জাতি ধরেই এখানে আগাতেই হয়। আর এতেই অন্যান্য ধর্ম অথবা অন্য আইডেনটিটিগুলোও কেন জাতির ভিত্তি হিসেবে তাদেরটা নেয়া হবে না, সে দাবিদারির প্রশ্ন উঠে নতুন অসন্তোষ তো অবশ্যই উঠে কিন্তু সবচেয়ে বড় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব খাড়া হয় যে নাগরিকদের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে একটা না একটা অসাম্য রাষ্ট্র নিয়মিত তৈরি করতে থাকে।

তুলনায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলো মীমাংসিত। যদিও কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার পরে এবার তা বাস্তবায়ন করাটা মূল কাজ যে, ধর্ম বা যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সারকথাটা হল গান্ধী-নেহরুরা হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা আঁকড়ে থাকাতে তারা জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বা কোনো মুসলমানের প্রতি বৈষম্যের কোন সদুত্তর বা সন্তোষজনক জবাব তৈরি করতে পারেননি। পরিণতিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি বড় হয়ে শেষে তারা আলাদা হয়ে যায়; যদিও অনেক মুসলমান দেশত্যাগ করলে নিজের বৈষয়িক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার হবু আশঙ্কায় ভয়ে আপসে ভারতেই থেকে যান।

এর সার কথাটা হল, এখান থেকেই হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণার কারণে ভারতের সব প্রধান দলই কমবেশি ‘হিন্দুত্ব’- এই জাতিবাদের অনুসারী থেকে যায়। এর মধ্যে সেকালের আরএসএস কে (একালের বিজেপি) বলা যায় ‘চরম’ হিন্দুত্ববাদের দল। এ কারণে লক্ষ্যণীয় যে বিজেপির চোখে এখনও ‘নাগরিক’ বলে কোনো ধারণা নেই। তাই সহজেই, মুসলমান বা অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার কোনো দায় অনুভব করে না বিজেপি। তাদের দলের কোনো দলিলেও এর স্বীকৃতি নেই।

তাহলে এটা কী কংগ্রেসের কি আছে? না তাও নেই। কারণ ভারত মূলত ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার দল দিয়েই গঠিত ও পরিচালিত। ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণা ও বোধের দল দিয়ে নয়, তাতে সে দল কমিউনিস্ট হোক কি বিজেপি!

উনিশ শ’ আশির দশকের শেষের দিক থেকে ভারতে কংগ্রেস দলের প্রভাব ও আধিপত্যের পতন শুরু হয়ে যায়। আর এটা লক্ষ্য করেই ইকোনমিস্টের লেখক দাবি করছেন সেকুলারিজমের ক্ষয় তখন থেকে। তিনি ‘কংগ্রেস’ শব্দের জায়গায় ‘সেকুলারিজম’ বসিয়ে কাজ সেরেছেন যেন এর আগে ভারত বিরাট সেকুলার ছিল। এর আগে যেন বছর বছর দাঙ্গা হয়নি। কাশ্মিরে নির্বাচনে ভোটে কারচুপি করে ভোটের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো আর রাজনীতিতে সশস্ত্রতার আমদানি কি ১৯৮৭ সালে কংগ্রেস আমলে হয়নি? তাই, একা বিজেপি সব দোষের ভাগী এ কথা ভিত্তিহীন। রাহুল গান্ধী কি একালে ‘সফট হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছেন না?

তাহলে এখন সত্যিকারভাবে চিনতে হয় কী করে যে, রাষ্ট্র সেকুলার কিনা? রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও বোধের অভাব আর সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে সেকুলারিজম সম্পর্কে সব অদ্ভুত ধারণা আমরা দেখতে পাই। সেটা মুসলমান রাষ্ট্রপতি দেখানো মানে, তা সেকুলারের লক্ষণ পর্যন্ত। এমনকি এটা কনস্টিটিউশনে ওই রাষ্ট্র সেকুলার বলে ঘোষণা দেয়া আছে কিনা অথবা রাষ্ট্রের মূলনীতির একটা সেকুলারিজম কিনা, ইত্যাদি দেখিয়ে যারা দাবি করে, আমার বা অমুকের রাষ্ট্রটা সেকুলার তারা রাষ্ট্র বা সেকুলারিজমের কিছুই বুঝে না। এটা আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। তবে একাজটা তারা করে তাদের একটাই উদ্দেশ্য হল, মূলত ধর্মীয় সংখালঘুদের ভোট এই উপায়ে হাসিল করা।

তাহলে আবার প্রশ্ন সেকুলারিজম বুঝব কেমন করে?  এপর্যন্ত আমরা দেখেছি সেকুলারিজম যেন অবশ্যই ধর্মবিষয়্ক একটা ইস্যু। হা আপতিকভাবে তা মনে হতে পারে কিন্তু এটা মূলত নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষম্যের ইস্যু। কোন দুই নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সাম্য বজায় না রাখার সমস্যা।  যেমন দেখেন, আমাদের রাষ্ট্র এখন ছাত্রলীগের বা আওয়ামি কোন অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইনভঙ্গ করে হলেও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। তাদের কৃত কোন অপরাধ বা রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকে উপেক্ষা বা প্রশ্রয় দিচ্ছে।  রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইন ভঙ্গ করে হলেও ছাড় দিচ্ছে, বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে – এগুলো যথেষ্ট প্রমাণ যে, এই রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষমাই করছে – ফলে বৈষম্যের রাষ্ট্র। নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র নয়। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক বৈষম্য করা মানে তা যদি হয় ধর্ম পরিচয়ের কারণ-সংশ্লিষ্ট তখন এটাকে রাষ্ট্র সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করছে বলা হয়। তাই ‘সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গ’ কথার মূল অর্থ হল নাগরিক বৈষম্য করা।
যেমন মোদীর সিএএ – এই আইনে মুসলমানদের বেলায় বৈষম্য করা হয়েছে তাই এই আইন সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে – এভাবে বলা যায়।  যদিও এখানে মূল কথাটা হল নাগরিকের মধ্যে অধিকার বৈষম্য করা। আর কেমন ধারার বৈষম্য এর উত্তরে বলা যায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিক বলে সংখ্যালঘু বলে তাদের সাথে করা বৈষম্য এটা।
আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এটাও বৈষম্য করা। ধর্মের কারণেসহ যেকোনো কারণে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা, বৈষম্যের চোখে দেখা ও আচরণ করা এটাই মূলত নাগরিক সাম্য বজায় রাখার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।  কেবল ধর্মীয় বৈষম্য নয়, বরং যেকোনো নাগরিক বৈষম্যই নাগরিক-সাম্যের নীতি ভঙ্গ করা।
এরপরে আর একটা দিক আছে। আলাদা করে “আমাদের রাষ্ট্র সেকুলার” – একথা কনস্টিটিউশনে লিখে রাখা বা না রাখাটা গুরুত্বপুর্ণ না। কারণ মূলত রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কারণের বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হয়ে দাড়ানোই  নাগরিক সাম্যনীতি।  তাই  রাষ্ট্র সেকুলার কিনা  এটা বুঝবার আসল জায়গা হল ঐ রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেখানে তাকাতে হবে।  আমার রাষ্ট্র সেকুলার – আলাদা করে একথা লিখা রাখা না রাখা এজন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।  মানে লিখে রাখলেও সেকুলারিজম কায়েম হবে না। এজন্যই যারা এই লিখে রাখাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এরা সেকুলারিজম ইস্যুটা বুঝে কিনা সন্দেহ করা যায়। রাষ্ট্রের চোখে দেশের সবার পরিচয় যাই থাক, মূল বিষয় হবে তাদেরকে কমন “নাগরিক” পরিচয়ে আমল করা হচ্ছে কি না, সে সমান অধিকারের নাগরিক বলে মানা হচ্ছে কি না, কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার সে হচ্ছে কি না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এগুলোর সদুত্তর হল সেকুলার রাষ্ট্রের চিহ্ন। নাগরিক সাম্যের ব্যত্যয় ঘটলেই মানে, অধিকারে বৈষম্য ঘটলেই আসলে  নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ হবে। আর নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ মানে সেখানে সেকুলারিজম নীতিভঙ্গও ঘটবেই। তাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলার লেখা আছে কি না এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেদিকে পরীক্ষা করতে হবে।

ওদিকে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র না হলে নাগরিক সাম্য বজায় থাকা বা বৈষম্যহীনতা রক্ষা করা আশা করা যায় না। আর সেকুলারিজম চিনার উপায় হল রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের বেলায় বৈষম্যমূলক কিনা মানে নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না এটা চেক করে দেখতে হব।

জন্ম থেকেই ভারত হিন্দুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই ভারতের নাগরিক জীবনে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতা বজায় থাকার দাবি বা এই বোধ সরব বা সক্রিয় নয়। একই কারণে তাই সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের উপর নাগরিকের দাবি বা চাপ তেমন নেই। জেলা শহরভিত্তিক মফস্বলে বিজেপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা, মুসলমান বলে কোনো মানুষকে ধরে নির্যাতন করছে, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর লাফ দিয়ে জোড়া পায়ে উঠছে। অথচ গোল হয়ে চার পাশে মানুষ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে এই নির্যাতন উপভোগ করছে। অথচ  কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তাদের। এমন ভিডিও ক্লিপ মোদীর একালে আমরা অনেক দেখেছি। এর মানে হল,  নির্যাতিতকে কেউ তাঁরা তারই মত সমান মর্যাদা ও অধিকারের নাগরিক মনে করছে না। এটাই এর অর্থ তাতপর্য। আবার গত নির্বাচনে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি বা রায় দেয়নি। কেন? বিজেপি দলের ম্যানিফেস্টোতে নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই কেন? নির্বাচন কমিশন কোনো আপত্তি তুলেনি কেন? আবার বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়াতে এই ভাবনার উৎস হিসেবে দলের দলিল তালাশ করে কী কমিশন কখনও দেখেছে?  কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছে?  মনে হয় না। অথচ এগুলো সবই নাগরিক অসাম্যের মামলা। মানে সেকুলারিজমের নীতিও ভঙ্গের মামলা। অথচ ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে সেকুলারিজম শব্দের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ করা ও উল্টা বৈষম্য করা সবই যেন বৈধ।
এখন দিল্লির নির্বাচন চলছে। বিজেপি নেতা কাপিল গুজ্জর গুলি ছুড়ে হুমকি দিয়ে বলেন  এই দেশে কেবল হিন্দুরা যাই বলবে তাই চলবে On 1 February, Kapil Gujjar fired shots at Shaheen Bagh saying, “Iss desh mein sirf Hinduon ki chalegi (Only Hindus will have their say in this country).”। এগুলো গুরুতর নাগরিক বৈষম্য করার মামলা। এবং সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গের মামলা।

এভাবে এক হিন্দুত্ববাদ ছেয়ে বসছে চারদিকে; যেন হিন্দুত্ববাদই, অর্থাৎ এর এই বৈষম্য ও অবিচারের আধিপত্যই একালের নিয়ম!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘ইকোনমিস্টের’ মোদি-পাঠ”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য

বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-aR

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে গত মাসের ২৩ জুন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায়। বিগত আশি’র দশকে তাকে আমরা নিজেদের মধ্যে সংক্ষেপে SIC বা সিক স্যার বলে ডাকতাম। সে সময়ে উনি কী বলেন তা শোনার, কী লিখতেন তা পড়ার একটা আগ্রহ কাজ করত, ফেসবুকের ভাষায় যাকে বলে, তাকে ফলো করতাম। যদিও গত কয়েক বছর ধরে তার কোনো লেখা ধৈর্য ধরে পড়েছি বলে আর মনে পড়ে না। গত ৮০’র দশকের শেষ থেকে আগ্রহে ভাটা পড়ে গেছে। এর কারণ সম্ভবত ওই সময় থেকে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বুঝতে তার কথা আর কোনই কাজে লাগছিল না। অর্থাৎ ৮০’র দশকের প্রথম দিকে মনে হতো যে, বোধহয় কাজে লাগছে। ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে নিঃসন্দেহে আবার নতুন এক ধরনের আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। যা থেকে এ’লেখার সুত্রপাত।

বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম নিয়ে তত্ত্ব করা ও পক্ষে তত্ত্ব দেয়া তার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ করেননি। বদরুদ্দীন উমরসহ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লিটারেচারে যারা লিখেছেন ‘সেক্যুলারিজম’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রসঙ্গ হিসেবে সেখানে ছিল অবশ্যই। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর “সেক্যুলারিজম” এর বয়ান তফসির সেগুলো থেকে আলাদা। কেন আলাদা, কোথায় আলাদা তা তখন বুঝতে বা বুঝিয়ে বলতে পারতাম না, শুধু ফারাকটা টের পেতাম। পেছন ফিরে দেখলে এখন মনে হয় সম্ভবত ফারাকটা বুঝতে পারি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা ইউরোপকে, ইউরোপের ইতিহাসকে যা জেনেছে তা শুধু লাল বই পড়ার ভেতর দিয়ে। লাল বইয়ের বাইরে দিয়ে অন্য কোনো বই পড়ে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্ট রেওয়াজে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাই। অর্থাৎ ইউরোপের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব লেখা পড়ে সেখান থেকে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্টদের চর্চা-অভ্যাসে নেই। নেই এজন্য যে, লাল বইয়ের বাইরের কোনো কিছু মানে ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান; যা কমিউনিস্টদের চোখে শত্রুর বয়ান, মানে অনাস্থা রাখতে হবে তাতে – এই ধারণা প্রবলভাবে কাজ করে। এটা করত বলা ভাল কারণ এখন সব আউলায়া গেছে, কমিউনিস্টরা আর সে ধারণা ধরে রাখতে, টিকাতে পারে নাই।

বিপরীতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঠিক কোনো দলীয় ধারার কমিউনিস্ট নন, আর নিজেকে তিনি কমিউনিস্ট বলার চেয়ে ‘প্রগতিশীল’ বলতে পছন্দ করেছেন দেখা গেছে। এছাড়া তিনি লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন, সেখানে বসে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন। ইংরেজি সাহিত্য বোঝার প্রয়োজনে ইংলিশ সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমি তিনি জানতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি ইউরোপের ঘরের বই শুধু নয়, তিনি ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন “এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতা” সম্পর্কে জেনেছেন, নিজের শখের পড়াশোনা সূত্রে নয়, বরং বাধ্য হয়ে, ইংরেজি ভাষার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ঘটনা ও এর ফলে ভাষায় বদলকে বোঝার প্রয়োজনে। একজন কমিউনিস্টের চোখে এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতাকে বুঝা, পারলে তত্ত্বের দিকসহ বিস্তার করে বুঝা, জানা ও পড়াশোনা কোন কাজের বিষয় নয়। কারণ মোটা দাগে এগুলো সবকিছুই ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান যা শত্রুর বয়ান, যা এত জানার কিছু নয়। ফলে এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন সক্রিয় কমিউনিস্টের চেয়ে একেবারেই আলাদা। অতএব তাঁর আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজমের বর্ণনা কমিউনিস্টদের চেয়ে বিস্তারিত ও ভিন্ন হতে বাধ্য। এখন বুঝি, এই ফারাকটাই পাঠক হিসেবে আমাকে আকর্ষণ করত। তবে অবশ্যই তিনি যাই লিখতেন তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকেই সমাজে পুষ্ট করত। নিজের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রগতিশীল, আধুনিক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য রাজনীতির মতাদর্শ সরবরাহকারী, পোক্তকারী।

ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের এই সাক্ষাৎকার নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতাদর্শ সরবরাহকারী, তাদের আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজম সম্পর্কে বয়ান যার কারণে পোক্ত হয়েছে, তিনি একালে এসে যখন সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদের এখন আর দেয়ার কিছু নেই” তখন এটা খুবই ইন্টারেস্টিং ও কৌতূহল উদ্রেককারী।

পত্রিকার সম্পাদকের চোখে সাক্ষাৎকারের এদিকটা শিরোনাম হওয়ার যোগ্য হওয়ারই কথা। হয়েছেও তাই। কিন্তু আমার মন আকর্ষিত হয়েছে শুধু এদিকটার কারণে নয়। অন্য কারণে। যারা বয়সে ১৯৪৭ সালে কমপক্ষে সজ্ঞান কিশোর বা টিনএজে ছিল, তাদের নিয়ে আমার এক বিশেষ কৌতূহল আছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালে, বয়স এখন ৮০ বছর। তাঁর প্রজন্মের সদস্যরা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথবা দেহ রেখেছেন। এদের সেকালের প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন হল “পাকিস্তান আন্দোলন”, যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী ছিলেন তাদের প্রজন্ম। এ সাক্ষাৎকারেও আমরা সেটাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু “পাকিস্তান আন্দোলনের” প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী এই প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ ষাটের দশকের পর থেকে পুর্ববঙ্গের বা পুর্ব-পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘পাকিস্তান আন্দোলনকে’ আর নিজের মনে না করা এবং এর সাথে সম্পর্ককে অস্বীকারের নতুন বয়ান খাড়া করা শুরু হয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৭১-২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিক স্যারের প্রজন্ম সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেও ‘পাকিস্তান আন্দোলনের’ কথা ঘুণাক্ষরেও যেন রেফারেন্স হিসেবে না এসে যায় সেজন্য মুখে কুলুপ আঁটেন, একাজে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে নেন। কারণ তাদের কৈশোর বা তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা, তখন যা তাদের আন্দোলিত করেছিল, চরম সত্য মনে হয়েছিল তা স্বাধীনতার পরের কালে উচ্চারণ করলে নিজ পরিবারের তরুণের হাতে নিগৃহীত না হলেও কটুকথা শোনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কারণ তারা রক্ষণশীল, প্রাচীনপন্থী শুধু নয়, পরাজিত চিন্তাধারার প্রতীক বলে চিহ্নিত হতে পারেন। এভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম কিন্তু সেই যে ঐকালে মুখে কুলুপ আঁটলেন সে অভিজ্ঞতা কাউকে আর তাঁরা বলেন না। এমনকি নাতি-নাতনিদেরকেও না। যদিও শুধু রাজনীতির মাঠে নয়, সেসময়ের পুর্ববঙ্গের প্রতিটা মুসলমান পরিবারের ঘরে ঘরে প্রত্যেক সদস্যের কাছে পাকিস্তান আন্দোলনে কোথায় কি হচ্ছে তা সকলের জীবনের আপন ঘটনাবলী হিসাবে লেগে ছিল। সেই প্রজন্মের এরা আজ বয়সের ভারে একে একে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রজন্ম শেষ হয়ে যাওয়ার আগে, আমরা তাদের অভিজ্ঞতাকে মানি আর নাই মানি, তাদের অভিজ্ঞতা একালে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে আমাদের ইতিহাস বয়ান শুরু হয় ১৯৫২ সাল থেকে। যেন এর আগে পুর্ববঙ্গে আমরা কেউ ছিলাম না। ভুঁইফোঁড়ের মতো ১৯৫২ সাল থেকে যেন আমাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এর আগে পাকিস্তান আন্দোলন বলে যেন কিছুই ঘটেনি। অথচ মানুষ তো ভুঁইফোঁড় নয়, হতে পারে না। অতীতের সবই ভালও নয় আবার সবই মন্দও নয়। এমন অতীতের উপরেই বর্তমান জন্মায়, দাঁড়িয়ে থাকে। আবার ফাউন্ডেশনাল কিছু বৈশিষ্ট্য থাকেই, যার ওপর বর্তমান খাড়া হয়ে থাকে। পাকিস্তান আন্দোলন তেমনই একটা কিছু। এটা ভীষণ আগ্রহ ও কৌতূহলের যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার নিজের পাকিস্তান আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। আমাদের সঙ্গে শেয়ার করছেন। এখানে নিচে সেসব নিয়ে কিছু অবজারভেশন ও মন্তব্য বলে এই লেখা শেষ করব।

এক. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাকিস্তান আন্দোলন ওন করছেন বা আপন বলে ধারণা দিচ্ছেন।
তিনি বলছেন, ‘ব্রিটিশ ভারতে আমাদের জন্ম, ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই, পাকিস্তান আন্দোলন দেখে বড় হচ্ছি। ফলে বেড়ে ওঠার মধ্যেই একটা রাজনীতি সচেতনতা ছিল।’ অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলন খারাপ কিছু ছিল না, যা তিনি সে সময় দেখেছেন এবং এখন স্মরণ করার মতো তা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। যদিও পরের প্রশ্নের জবাবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে নতুন গড়ে ওঠা মুসলমান মধ্যবিত্তের আকাঙ্খার বাহক হিসেবে দেখছেন। তার এ’কথাটা সত্য, তবে আংশিক ও খন্ডিত। খুব সম্ভবত তার কাছে যা ইমিডিয়েট বা চোখের সামনে, শুধু সেই শহুরে মধ্যবিত্তের কথাই তিনি এখানে ফোকাসে এনেছেন। কেন খন্ডিত বলছি?

আসলে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান এবং একনিষ্ঠ শক্ত সমর্থক ছিল গ্রামের কৃষক-প্রজা। সব সমাজে সব কালের রাজনীতিতে কোনো না কোনো একটা প্রধান বা মুখ্য স্বার্থ দ্বন্দ্ব থাকে। যাকে ঘিরে সমাজের বাকি সব স্বার্থ দ্বন্দ্বের সংঘাত আবর্তিত হয়, আকার নেয়, অ্যালায়েন্স করে। পাকিস্তান আন্দোলনের কালে সে সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল জমিদার-প্রজা; এমন প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে তা বিরাজিত ছিল পেছনের দেড়শ’ বছরের বেশি। কলকাতা কেন্দ্রিক বা কলকাতাগামী দৃশ্যমান মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান বা জন্ম ১৯০০ সালের পর থেকে। এরপরেই একমাত্র এর আগে থেকে চলে আসা গ্রামের কৃষক-প্রজার জমি পাওয়ার আন্দোলনের সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তের যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্স গঠিত হয় সেটাকেই আমরা অন্য ভাষায় পাকিস্তান আন্দোলন বলে চিনি। এই শ্রেণীমৈত্রীর রাজনৈতিক শক্তির বাহকের নাম মুসলিম লীগ। স্মরণ করিয়ে দেয়ার দরকার আছে যে, এটা ১৯৭১ সালের মুসলিম লীগ নয়। এমনকি এটা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরের সব ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কুক্ষিগত করে সাজানো দাপটে চাপা পড়া পূর্ব পাকিস্তান, এমন সময়কালের মুসলিম লীগের কথাও বলা হচ্ছে না। ১৯৪৭ সালের আগের কথা বলছি, যখন পূর্ববঙ্গের গ্রাম-শহরের এমন কোনো মুসলিম প্রজন্ম পাওয়া যাবে না যারা সেকালের মুসলিম লীগকে তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের সব আকাঙ্খার বাহক সংগঠন মনে না করত। তৎকালের জমিদারি উচ্ছেদের প্রধান এবং একমাত্র দাবিদার সংগঠন মুসলিম লীগ। এ অর্থে মুসলিম লীগ বিপ্লবী। পূর্ববঙ্গের চোখের মণি এই আন্দোলনের নাম “পাকিস্তান আন্দোলন”। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই স্মৃতির কথা বলছেন।

দুই. মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন
এটা খুবই ইন্টারেস্টিং যে, তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন। কথাটা বলছি এজন্য যে, ১৯৪৭ বা পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে ভারতের ঐতিহাসিকদের সাধারণ মূল্যায়ন বয়ান এবং অভিযোগ হলো এটা ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের আন্দোলন’, ‘জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব’ ইত্যাদি। অতএব মুসলিম লীগের এই রাজনীতি নেতিবাচক, ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ঘৃণিত। পূর্ববঙ্গের অনেক কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল এই বয়ান অনুমোদন করেন বা আপন মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলারিজম নিয়ে বই-পুস্তক, কলাম লিখে যিনি বিখ্যাত সেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তা আজও মনে করছেন না। পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন এটা নিঃসন্দেহে ইন্টারেস্টিং। অনেকের মনে হতে পারে, এটা তার হাতছুট বা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কথা। তাদের নিশ্চিত করার জন্য বলছি – না তা নয়। তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্নের লম্বা জবাবের শেষ প্যারায় তিনি আবার পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে আর একটু পরিষ্কার করে বলছেন, এটা ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’। বলছেন জিন্নাহর বক্তৃতার (১৯৪৮) প্রতিক্রিয়ায় “… এই সূত্রেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যাত্রা শুরু হলো।”

অর্থাৎ এখানে তার সার মূল্যায়ন হলো, পাকিস্তান আন্দোলন কোনো নেতিবাচক আন্দোলন তো নয়ই, কোনো ‘ঘৃণিত’ বা “সাম্প্রদায়িক” ধর্মভিত্তিক আন্দোলনও নয়; বরং জনগণের আকাঙ্খার ধারক, জনগণকে দেয়া এক প্রতিশ্রুতির আন্দোলন। তবে ১৯৪৮ সালের পর থেকে জিন্নাহর বক্তৃতায় এটা বিপথগামী বা বিচ্যুত হয়ে যায়।

তিন. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ সাক্ষাৎকারেও নিজে একটা প্রগতিশীল পজিশন নিচ্ছেন বলে মনে করছেন।
তিনি কোনো দলীয় কমিউনিস্ট সদস্য বলে আমার জানা নেই। তবে তিনি নিজেকে কমিউনিস্টদের প্রতি নেক আছে এমন ধারণার প্রগতিশীল বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, দেখেছি। চতুর্থ প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু মধ্যবিত্তেরই পার্টি আসলে। কমিউনিস্ট পার্টির এখানে প্রধান দুর্বলতা হলো, তারা কৃষকের কাছে যেতে পারেনি। এজন্য দেশে বিপ্লব হয়নি।”

এখানে আমরা দেখছি মূলত তার অভিযোগ দুইটাঃ ‘মধ্যবিত্তেরই পার্টি’ আর ‘তারা কৃষকের কাছে যেতে পারে নাই।’ খুবই মারাত্মক অভিযোগ, সন্দেহ নেই। তবে অভিযোগ অবশ্যই জেনুইন এজন্য যে, কমিউনিস্ট পার্টি কখনও ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এর পক্ষে কখনও কোনো অবস্থান নেয়নি। তবু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কমিউনিস্টদের প্রতি যথেষ্ট সিমপ্যাথিটিক। তাই সাতচল্লিশের পরের কথা বলছেন, ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রও কমিউনিস্টদের খুব অত্যাচার করতে শুরু করল।’ তার মতো অনেক কমিউনিস্ট বা একাদেমিসিয়ানরাও তাই মনে করে থাকেন যে, স্বাধীন পাকিস্তানেও কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এগুলো বাস্তব সত্য কিন্তু সবটা সত্যি না এবং একপেশে। সেকালের এবং একালের আমাদের অনেকে মনে করতে পারেন, আয়ুব খানই পাকিস্তানে প্রথম ক্যু করেন। এ কথাটাও সঠিক নয়। প্রথম ক্যু করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন কমিউনিস্টরা মার্চ ১৯৫১ সালে এবং তাতে ব্যর্থ হলে তাদের দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়, এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পর লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রীর আমলের ঘটনা। ইতিহাসের খাতিরে “রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র” নামে খ্যাত এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রসঙ্গ সামনে আনার দরকার আছে। ফলে একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সারা পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টরা ধর্মবিরোধী বলে অজুহাতে বা আমেরিকার প্ররোচনাতে নিষিদ্ধ ছিল না।

চার. “পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্র হবে এমনটা তারা চায় নাই”
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বক্তব্য পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ সম্পর্কে বহু অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে। পঞ্চম প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের এ গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন পেশ করছেন। আবার একদিকে স্বীকার করছেন, ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ধর্ম।’ কিন্তু এই পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে আবার শক্ত ন্যায্যতা নিজেই দিয়েছেন। বলছেন, “তারা একটা রাষ্ট্র (অর্থাৎ পাকিস্তান) চেয়েছে, যেখানে তারা মুক্ত হতে পারবে। তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছে। জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দু, চাকরি-বাকরিতে হিন্দু, ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু ওদের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য পাকিস্তান দরকার”।
তবু তাঁর এই শক্ত ন্যায্যতার প্রশংসা করার পরেও একটা ক্রিটিক্যাল সমালোচনার দিক মনে রাখার দরকার আছে। একথা সত্যি সেসময়ের সমাজ বলতে সেটা ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একচেটিয়া ক্ষমতা আধিপত্যের সমাজ। বিপরীতে মুসলমানদের অবস্থান হিন্দু জাত-বর্ণপ্রথায় নমশুদ্রেরও নীচে, এমনকি মুসলমানেরা বাঙালি বলেও কোন স্বীকৃতি ছিল না। এরপরেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেভাবে পরিস্থিতিটাকে হাজির করেছেন যে জমিদারগিরি, মহাজনগিরি, চাকরি-বাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ইত্যাদি সবকিছুতে হিন্দু প্রাধান্যে ছিল বলে পাকিস্তান আন্দোলন জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দুকে সরিয়ে মুসলমান জমিদার, মুসলমান মহাজন কায়েমের আন্দোলন ছিল না। ফলে কমিউনিষ্টদের মধ্যে যেমন সব কিছুকে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা থাকে এটা তা ছিল না। বরং খোদ জমিদার-প্রজা সম্পর্কটাই উতখাত, ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের দাবি এবং এক ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরে পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কমিটি বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধীনস্ত, উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে পড়ে একথা সত্য। ফলে অচিরেই (১৯৪৯) আওয়ামি মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। কিন্তু সেজন্য পাকিস্তান আন্দোলনের বিখ্যাত অর্জন ১৯৫১ সালের ১৫ মে জমিদারি উচ্ছেদ আইন (THE STATE ACQUISITION AND TENANCY ACT, 1950) পাশ করা সবচেয়ে বিপ্লবী ঐতিহাসিক ঘটনা। একে খাটো করতে পারি না। আজও স্বাধীন বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে আমাদের জন্য এটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ফলে এটা হিন্দু জমিদারের জায়গায় মুসলমান জমিদার বসানোর আন্দোলন ছিল না। এই তাতপর্য যেন আমাদের চোখ না এড়ায়।

পাঁচঃ “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”
এতক্ষণ রাষ্ট্র আলোচনায় ধারণাটাকে তিনি ‘আধুনিক রাষ্ট্র বনাম ধর্ম রাষ্ট্রের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু এবার ষষ্ঠ প্রশ্নে এসে ‘পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ বলে এক নতুন ধারণা আমদানি করেছেন। তিনি বলছেন, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”। ‘নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ এ কথার একটাই অর্থ হতে পারে যে, নিপীড়ন বলতে তিনি শ্রেণী বা অর্থনীতিবিষয়ক নিপীড়নের কথা বলছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক ছাড়াও ভিন্ন ধরণের নিপীড়ন হতে পারে। যেমন জাতিগত নিপীড়ন বলতে মুখ্যত তা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনাই বোঝায়।
তবে এর চেয়েও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক মারাত্মক মন্তব্য এখানে আছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বিষয়ে। তিনি ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় দাবি করে বলছেন, ‘পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্র নেই। এখানে (বাংলাদেশ) একটা জাতিপ্রধান আছে বটে, কিন্তু অন্য জাতিগোষ্ঠীও আছে।’ তার কথা হয়তো সঠিক। তবে ইংরেজি শব্দ ‘রেস’ ও ‘নেশন’ ধারণার বিভ্রান্তি থেকে এসবের ভুল ধারণার উৎপত্তি। তিনিও এই বিভ্রান্তি নতুন করে ছড়ালেন। মুল সমস্যা হল, ‘রেস’ ও ‘নেশন’ দুইটি শব্দকেই বাংলায় ‘জাতি’ অনুবাদ করে সে বিভ্রান্তিকে আরও উসকে দেয়া হয়েছে। ফলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব বিভ্রান্তির বাইরে এমন দাবি করা যাচ্ছে না। যেমন তিনি বলছেন, ‘রাষ্ট্র এবং জাতি এক না। একটা রাষ্ট্রে একাধিক জাতি থাকতে পারে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, আর ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’। এর প্রথম দুই ছোট বাক্য হয়ত সঠিক। কিন্তু “জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ” এ কথাটা তিনি যথেষ্ট ভেবে বলেছেন বলে মনে হয় না। কারণ এ বাক্যটাও ‘রেস‘ ও ‘নেশন’ বিষয়ক বিভ্রান্তির বাইরে নয়। রেস অর্থে ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, কথাটা সঠিক। কিন্তু নেশন কথাটার বেলায় “নেশন অর্থে জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, এই কথাটা সঠিক নয়। ‘নেশন’ অবশ্যই পলিটিক্যাল ক্যাটাগরি। রাজনৈতিকভাবে কনস্ট্রাকটেড বর্গ ও ধারণা। রেস ধারণার মতো তা প্রাকৃতিক বা ‘নৃতাত্ত্বিক বর্গ’ নয়, বরং রাজনৈতিক বর্গ।
তবে হয়তো এটা বলা যায় যে, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা অপ্রতুল ও অস্পষ্টই শুধু নয়, বেকুবি এবং অনিবার্যভাবেই তা বর্ণবাদিতায় ঢলে পড়বেই, এমন ধারণা।
এই প্রসঙ্গটা শেষ করার আগে, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের…” প্রসঙ্গে –
বাংলাদেশে পাহাড়িদের ওপর বাঙালি রাষ্ট্রের নিপীড়ন, এটা কি ‘পুজিবাদী রাষ্ট্রের’ কারণে ঘটছে? আমরা কি তাই বলতে পারি না এগুলো অর্থহীন কথাবার্তা হবে? আসলে এসব ‘শ্রেণী বিলাসী’ চিন্তা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। অনেক হয়েছে। তবে তার শেষ বাক্য, তাই, “জাতিরাষ্ট্র নয়, আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” – এ কথা বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা কখনও মানবে না। বোঝা যাচ্ছে, শেষ বয়সে এসে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে হাত ছেড়ে দিতে চাইছেন। প্রসঙ্গটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, এ স্বল্প পরিসরের বাইরে সময় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ তুলতে হবে।

ছয়ঃ “হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব”
গত ২০১৩ থেকে শাহবাগ অন্দোলন সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিছু সাহসী মন্তব্য করেছেন। সাধারণ কমিউনিষ্টদের থেকে ব্যাতিক্রমী মন্তব্য করেছেন তিনি। বলেছেন, “শাহবাগ আন্দোলন পর্বে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে আমার কাছে বড় দিক মনে হয়েছে শ্রেণী পরিচয়। শ্রেণী-বিভাজনটাই সেখানে ছিল প্রধান ইস্যু। হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব। গ্রামে মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়ছে তারা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত। আমরা এখানে যারা পড়ছি তারা সুবিধাপ্রাপ্ত। এখানে দূরত্ব আছে। গণজাগরণ মঞ্চে তুমি কিন্তু শ্রমজীবীকে টানতে পারছ না। যে রিকশাঅলা তোমাকে ওখানে পৌছে দিয়ে যায় সে কিন্তু মঞ্চে যাচ্ছে না। রাস্তায় যেসব শ্রমিকরা আছে তারাও কিন্তু আসছে না। এমনকি তোমরা ভদ্রলোকরা যে সভা করছে সে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। যে ওটা বড়লোকদের ব্যাপার, নাচানাচি করতেছে, গান বাজনা করতেছে। শ্রেণীর সমস্যাটাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না”। তাঁর কথায় হয়ত পয়েন্ট আছে কিন্তু কোন কমিউনিষ্ট এমনকি “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ” করার সুযোগ হিসাবে যারা “শাহবাগকে” দেখেছেন, নিয়মিত সাময়িকী বের করেছেন, টক শোতে কমিউনিষ্ট হয়েও লীগ ও সরকারের পক্ষে সাফাই, তত্ত্ব দিয়েছেন এমন কাউকেই এমন অবস্থান নিতে দেখা যায় নাই। সে হিসাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এমন মন্তব্য সাহসী ও ব্যতিক্রমী অবশ্যই।

সাতঃ “আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা”
কোন রাখঢাক না রেখে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদ আছে, কিন্তু তার এখন আর দেওয়ার কিছু নাই। আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা। আমাদের চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ যে শুকিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কি জাতীয়তাবাদীরা কথা বলছে? হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কি তারা কথা বলছে? নরেন্দ্র মোদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। পাকিস্তানের কেউ যদি উর্দুতে বক্তৃতা দিত আমরা মানতাম? অথচ মোদিকে আমরা হাততালি দিলাম। জাতীয়তাবাদের কথা বললে। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান তো ভাষা”।
এটা খুবই তাতপর্যপুর্ণ যে “প্রগতিশীল” আশি বছরের তরুণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সরাসরি ভারতের বাংলাদেশ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ এখনও অনেক কমিউনিষ্টকে আমরা পাই যারা এমন সমালোচনাকে “সাম্প্রদায়িক” হিন্দু বিরোধীতার কাজ মনে করেন। এর আগেই কখনও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে “চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ” নিয়ে কথা বলতে শুনেছি বলে মনে করতে পারলাম না। তাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাই সকলকে সাহস যোগানোর জন্য। মনে হচ্ছে টেক্কা কে টেক্কা বলতে চাইছেন তিনি। আপাতত সবাইকে এর তাতপর্য অনুধাবণ করতে বলব।

[লেখাটা এর আগে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল গত ২৭ জুলাই ২০১৫ তারিখে। এখানে পরিপুর্ণভাবে আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

[কোন ব্যাপার নজরে আনতে বা লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে goutamdas1958@hotmail.com এই ঠিকানায় মেল করতে পারেন।]