কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

গৌতম দাস

১৭ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Bb

 

 

ARTICLE 356, The Colonial Legacy & the deep Love to Colonial Power of NEHRU &…

রিভিউ বা ফিরে দেখা মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। জওহরলাল নেহেরু কেবল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ১৯৪৭ সালের আগষ্টে স্বাধীন দুই রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তানের জন্মের সময়ের রাজনীতির এক মুখ্য চরিত্র। ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক থেকে বহু ঘটনার নির্ধারক নির্ণায়ক ছিলেন তিনি। আমাদের রাজনীতির বহুকিছুর হাল ‘এমন বা ওমন’ কেন এর জবাব পেতে আমাদেরকে বারবার সেসব পুরান দিনের ঘটনা রিভিউ বা ফিরে দেখায় যেতে হয়। সেকাজে বলাই বাহুল্য নেহেরু এক বড় চরিত্র হয়ে হাজির থাকে।

সেখানে বহুবার আমরা দেখেছি, নেহেরুর চিন্তায় “গণপ্রজাতন্ত্রী” রাষ্ট্র ও ক্ষমতা  এই ধারণাটা যতটা না ‘মর্ডান রিপাবলিক’ প্রসুত তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেকে কলোনিয়াল মাস্টার মনে করা প্রসুত।  বারবার তিনি উপনিবেশ বা কলোনিয়াল সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ধারণা দিয়ে আপ্লুত হয়ে থেকেছেন, তা দেখতে পাই। যেমন নেপাল বা ভুটানের সাথে, ১৯৪৭ সালের পরবর্তি স্বাধীন ভারতের তথাকথিত ‘শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তির’ ধারাগুলোতে আমরা তা দেখতে পাই। অথচ ভারত তখন ইতোমধ্যেই এক স্বাধীন রিপাবলিক হওয়া সত্বেও নেপাল বা ভুটানের ভারতের সাথে চুক্তিতে নেহেরু একাজ পুরাটাই করেছেন আগের কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার সাথে নেপাল বা ভুটানের যে চুক্তি ছিল ওর ধারাগুলোই কপি করে; যেন স্বাধীন ভারত পুরান বৃটিশের জায়গায় এক নতুন “কলোনিয়াল পাওয়ার” হয়ে হাজির। অর্থাৎ কলোনি-শাসনমুক্ত হয়ে যাবার পরেও স্বাধীন “গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তখনও নিজেকে বৃটিশ জুতা পায়ে গলানো এক “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবছেন।  একালের ভারত বিশেষ করে চলতি মোদীকে ব্যাখ্যা করতে পারতে হলে, নেহেরুকেও বুঝতে হবে। আর তাতে সক্ষম হতে গেলে নেহেরুর এই বিশেষ বৈশিষ্ট পাঠ করতে পারতে হবে। আগা-পাছ-তলা এই নেহেরু আসলে কলোনিয়াল ধরণের সম্পর্ক ও ক্ষমতা প্রতি  প্রবল লোভ এবং চিন্তার ঝোঁকের এক নেহেরু; তাতে তিনি এটা “গণপ্রজাতন্ত্রী” ভারত গড়তেছেন বলে যত চিল্লাই দিয়ে থাকেন না কেন!

ভারত রাষ্ট্রগঠন বা ওর কনষ্টিটিউশন রচনাকালে, ওর বিভিন্ন আর্টিকেল বা ধারায় – নেহেরু এবং তাঁর চিন্তার বন্ধুদের নিজেদেরকে এমন “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবনা-চিন্তার ছাপ অনেক স্তরেই পাওয়া যাবে। তেমনই গভীর ছাপ ফেলা এক  বিতর্কিত আর্টিকেল হল ৩৫৬; যা কোন নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ভেঙ্গে দিয়ে ঐ রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ক্ষমতা সংক্রান্ত।

গত মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। প্রথম কথা হল, হ্যাঁ বিপদে তো তিনি আছেনই; তার কপালে শনি লেগেছে – লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ যেদিন হয়েছে সে দিন থেকেই। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৫৬ হল অদ্ভুত এক আর্টিকেল,  এটাই আপাতত মমতার সেই “শনির বিপদের” নাম। এটা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়ে মোদির কেন্দ্রীয় সরকার ছলে-বলে-কৌশলে চাইলে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। কনস্টিটিউশন অনুসারে এটাই “রাষ্ট্রপতির শাসন”।

ভারতে রাজ্য মানে, সেখানেও নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ ও সরকার আছে। যারা স্বতন্ত্র টাক্স আরোপ করতে পারে  এবং কনষ্টিটিউশনে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া যেসব বিষয় আছে ওর তদারকি করা ও যেসব সার্ভিস জনগণকে দেয়ার আছে , আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ইতাদি এসবই তার কাজের এক্তিয়ার। এছাড়া শহুরে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা মিউনিসিপাল্টি ব্যবস্থাও আছে। এখন প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের কোন অভিযোগ থাকলে এর প্রতিকার পেতে প্রত্যেক রাজ্যেই সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে হাইকোর্ট – সেখানে কেউ নালিশ দিতে পারে। এছাড়া মিছিল মিটিং প্রতিবাদ দিয়ে প্রতিকার দাবি সে তো আছেই। আরও সর্বোচ্চ তবে পরোক্ষ এক পদক্ষেপ হল, নিয়মিত বিরতিতে পরের নির্বাচনে প্রার্থী বা তার দলকে ভোট না দিয়ে শাস্তি দেয়া – সে সুযোগ তো আছে।

কিন্তু এসব সত্বেও আর্টিকেল ৩৫৬ তে রাষ্ট্রপতিকে রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েমের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।এখানে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির এই ভুমিকা কার্যত ব্যবহার ও প্রয়োগ হবে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার মাধ্যমে। যদিও রাষ্ট্রপতির নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ হবে তার প্রতিনিধি রাজ্যপালের মাধ্যমে কিন্তু তা আবার কাজ করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে। তাই সোজা সাপ্টা বললে, এটা রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে এর উপর কেন্দ্রীয় সরকারের দখল নেয়া।

তবে এই আর্টিকেলে এখন কিছু সংশোধনী আনার পর, ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় সংসদে অনুমোদন করিয়ে আনতে হয়। অর্থাৎ এই আর্টিকেল অনুসারে মোদীর সরকার মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দিতে পারে।  আর এখন কেন্দ্রীয় সংসদে মোদীর নিজ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এই চর্চা ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের, নেহরুর আমল থেকেই এভাবে চলে আসছে। দেখা গিয়েছে যখনই মোদী-মমতার মত রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার একই দলের থাকে না, তখনই এই অসুস্থ চর্চা শুরু হতে দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে ভারতে কনষ্টিটিউশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত মোট ১১৫ বার এভাবে এই আইন প্রয়োগ করে নানান রাজ্যে সরকার ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ১৯৭৫-৭৯ সালের মধ্যে ২১ বার, আর ১৯৮০-৮৭ সালের মধ্যে ১৮ বার। এর বেশির ভাগটাই নেহেরু বা কংগ্রেস ব্যবহার করেছে। যেটা এখন করছে বিজেপির মোদী।

একবার ক্ষমতা নিলে পরে এটা ছয়মাস করে করে বাড়িয়ে তিন বছর পর্যন্ত রাখা যায়। যদিও পাঞ্জাবে এরচেয়েও বেশি বছর প্রয়োগের “বিশেষ” উদাহরণ আছে। এতে কেন্দ্রের সরকারি দলের আসল সুবিধাটা হল, একবার বিরোধী রাজ্য সরকার ও প্রাদেশিক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল রাজ্যে নিজস্ব এক অনির্বাচিত সরকার কায়েম করে নিতে পারে। আর পরবর্তিতে ঐ তিনবছর সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে্র রাজনৈতিক দল  নিজ ‘সুবিধাজনক’ সময়ে – মানে রাজ্যে যখন নির্বাচন দিলে নিজে জিতে আসবে বলে আস্থা পায় – তখন নির্বাচন করিয়ে নিজ দলের রাজ্যসরকার কায়েমের সবচেয়ে সহজ উপায় হয় এটা। তাই, সদ্য লোকসভা নির্বাচন শেষে ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০ মে সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অজুহাত তৈরি করছে বিজেপি!”।

কিন্তু ভারতের কনস্টিটিউশনে কেন এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, এর পক্ষে যুক্তি কী? যেখানে আমেরিকায় এর কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট  ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কোন একটায় ক্ষমতা দখল করেছেন, এটা কেউ কল্পনাও করে না। কিন্তু ভারতে ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ জারি খুব কমন অভ্যাস বা চর্চা। এককথায় বললে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ একটা ব্যাপক ‘অপব্যবহারযোগ্য’ এক দাগী-ক্ষমতা।

প্রথমত এই আর্টিকেল-৩৫৬ ভারতের কনস্টিটিউশনে এল কীভাবে? গত ২০০১ সালে আর্টিকেল-৩৫৬ নিয়ে – বিচারক ও একাদেমিকদের  সমন্বয়ে এক ‘রিভিউ কমিশন’ বসেছিল। ঐ স্টাডির শেষে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আদৌও আর্টিকেল-৩৫৬ একটা মর্ডান রিপাবলিকের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ পুর্ণ কী না, ফলে ভারতের কনষ্টিটিউশনে এই আর্টিকেল থাকতে পারে না – অতএব বাতিলের সুপারিশ – এসব প্রশ্নের দিকে তারা যান নাই। [আইন পেশায় একাদেমিক আগ্রহ যাদের তারা এই রিভিউ রিপোর্ট এখানে পেতে পারেন।]  তবে ঐ রিভিউ রিপোর্টে এক জব্বর স্বীকারোক্তি আছে – এই আর্টিকেল-৩৫৬ কেন, কীভাবে এসেছিল সেই জন্ম ইতিহাস প্রসঙ্গে।

সোজা কথাটা হল বৃটিশ-ভারতে বৃটিশেরা ভারতের ঠিক নাগরিক নয় বরং ছিল এক “কলোনি দখলদার শক্তি”। আর কিভাবে বৃটিশ-ভারতকে তারা শাসন করা হবে এনিয়ে ই্ংল্যান্ডের বৃটিশ সরকার অধ্যদেশ জারি করত – সাধারণভাবে এটা “ভারত শাসন আইন [Govt of India Act] নামে পরিচিত, যা বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এটার প্রথম ভাষ্য শুরু হয়েছিল “Govt of India Act 1858” দিয়ে। আর অনেকবার সংশোধিত হবার পর শেষেরটা সম্ভবত “Govt of India Act 1935″। এই শেষের (১৯৩৫ সালের) সংশোধনীতেই তারা প্রথম ভারতীয় নেটিভ নিজেরা বড়জোর নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার গড়তে পারবে, এই অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তব কথাটা হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন ভারত-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এর পটভুমিতে দাঁড়িয়ে দেখলে Govt of India Act মূলত এক দাগী কালো আইন। কারণ এই আইন দিয়ে বৃটিশেরা বৃটিশ-ইন্ডিয়া চালালেও, এই শাসকেরা আসলে তো “কলোনি দখলদার শক্তি”। ফলে অবৈধ। ভারতের নাগরিকেরা তাদেরকে শাসন ক্ষমতার কোন অনুমতি দেয় নাই। ক্ষমতা বৃটিশেরা জবরদস্তিতে নিয়েছে। তাই এই ক্ষমতা অবৈধ।

এখন, এই অবৈধ ক্ষমতা জানত যে সে অবৈধ, বাপ-মায়ের ঠিকানা নাই, ভারতীয় নাগরিকেরা কখনও তাকে শাসন ক্ষমতা দেয় নাই। তাই ১৯৩৫ সালের সংশোধনিতে কেবল তিন প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগগুলোতে, তাই সেই সুত্রে  প্রথম বাংলা প্রেসিডেন্সিতে, ভোটে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাদেশিক পর্যায়ে এভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে দিয়ে বৃটিশ শাসকেরা না কোন বিপদে পড়ে এই ভয়ও তাদের মনে উদয় হয়েছিল। কারণ, এই সরকার প্রাদেশিক হলেও কখনও যদি কলোনি দখলদার শক্তি খোদ বৃটিশ কর্তৃত্বকে মানতে অস্বীকার করে বসে – তাহলে কী হবে? অতএব সম্ভাব্য সেটা ঠেকাতে, নিজেরা আশঙ্কা মুক্ত হতে বৃটিশ ভাইসরয়-এর হাতে এক নতুন আইনি ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার নির্বাচিত হলেও তিনি যেকোন সময় নির্বাচিত ঐ সরকার ভেঙ্গে দিতে পারবেন। Govt of India Act 1935 এর আইনে এটাই ৯৩ ধারা।

শুরুতে বলেছি নেহেরু আর তার বন্ধুরা  কলোনিয়াল “দাগী ক্ষমতা” খুবই পছন্দ করত, বৃটিশেরা কলোনি ত্যাগ করে চলে গেলেও এরা নিজেদের  “ভাইসরয়” ভাবতে চাইত। তাই তাঁরা Govt of India Act 1935 এই আইনের ৯৩ ধারাটাকে ভারতের নতুন কনষ্টিটিউশনে কপি করে তুলে এনে ঢুকিয়ে ফেলেছিল। এটাই নতুন নামে, আর্টিকেল ৩৫৬। আমাদেরকে পরিস্কার থাকতে হবে আগের ৯৩ ধারা ছিল কলোনি দখলদার শক্তির পক্ষে শাসিত নেটিভেরা যেন স্বাধীন হয়ে যায় তা ঠেকানোর জন্য তাদের উপর বৃটিশদের অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন। অথচ ১৯৪৯ সালের ভারত সে তো তখন স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্র। তাই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক কোন কলোনি দখলদার শক্তির, ক্ষমতা-সম্পর্ক আর নয়। কিন্তু তবু আমাদের নেহেরু ও অম্বেদকারের মত তাঁর বন্ধুদের কলোনিক্ষমতার প্রতি প্রীতিভালবাদা ও লোভ এতই তীব্র যে পুরানা অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন স্বাধীন ভারত রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে ঢুকিয়ে রেখেছেন অবলীলায়। ঐ রিভিউ রিপোর্টে তাই সোজা স্বীকার ও ছোটখাট কিছু বর্ণনা দিয়ে লিখেছে, “Article 356 is inspired by sections 93 of the Government of India Act, 1935অর্থাত এর সোজাসাপ্টা মানে দাঁড়াল, নেহেরু ও অম্বেদকারেরা কলোনি শাসন ক্ষমতার অনুরাগী ছিলেন। ভারতীয় নাগরিকদের সাথে তাঁরা নিজেদের সম্পর্ককে তারা তাহলে নিজেরা “কলোনি দখলদার শক্তি” ভেবে নিয়েছিলেন। তাই একটা “কলোনি শাসিত রাষ্ট্র” আর একটা “স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র” এদুইয়ের কোন ফারাক তারা দেখতে পান নাই, ফারাক করেন নাই। স্বাধীন রিপাবলিক ভারতে অবলীলায় আর্টিকেল ৩৫৬ ঢুকিয়ে রেখেছেন। যে আর্টিকেল কেন্দ্রীয় সরকার যেকোন রাজ্য সরকারকে উলটে দিতে পারে এই “উপনিবেশী ক্ষমতা” জারি রেখেছে।

এখানে মজার দিক হল, রাষ্ট্রপতি কী অজুহাতে রাজ্য সরকার ভাঙতে পারবেন – সেই ভাষাটাই দখলদারের ভাষা। এর সাধারণ লক্ষণ হল, এই ক্ষমতা প্রয়োগের অজুহাতের কথাগুলো দেখা যাবে অস্পষ্ট, আবছা রেখে দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন আর্টিকেল-৩৫৬ তে বলা হয়েছে, রাজ্যে “সরকার চালাতে পারেনি” বা “সরকার কনষ্টিটিউশন অনুসারে পরিচালিত হয়নি” বলে রাষ্ট্রপতির মনে হলেই হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কী দেখতে পেলে রাষ্ট্রপতি এমন মনে করবেন তা উহ্য রেখে দেখা হয়েছে। এভাবে ‘আবছা’ রেখে দেয়াতেই ইচ্ছামতো রাষ্ট্রপতির (কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের) পদক্ষেপকে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়া থাকছে। বলা হয়ে থাকে নেহরু রাজ্য সরকারগুলোকে নিজের, মানে কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতেই’ এভাবে বৃটিশ শাসকের মত ক্ষমতা পেতে আর্টিকেল-৩৫৬ লিখিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই ভারতে ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে, এর এক অন্যতম উৎস হয়ে আছে আর্টিকেল-৩৫৬।

নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা বা ডিফাইন্ড (defined) পাওয়ার
রিপাবলিক মানে, রাজতন্ত্র অথবা কলোনি দখলি শাসনের বিপরীতে এক উপযুক্ত বিকল্প ধারণা। কলোনি দখলদারি ক্ষমতার বিপরীতে এক ‘গণসম্মতির’ ক্ষমতা। রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের সময়  অভিজ্ঞতালব্ধ একটা গভীর মৌলিক ধারণা মেনে চলা হয়ে থাকে। তা হল – যে কোন ক্ষমতাকে অবশ্যই “ডিফাইন” করে রাখা ক্ষমতা হতে হবে। তা না হলে এটা দাগী ডাকাতের মত “দাগী ক্ষমতা” বা ‘ডেসপটিক পাওয়ার’ [Despotic Power] তৈরি করবে বা হাজির হবে। তাই ডিফাইন করা বলতে এখানে বুঝতে হবে – কোন ক্ষমতার উৎস কী, ক্ষমতা কে তাকে দিল  মানে কোথা থেকে পেয়েছে [how the power is drawn], অথবা কিভাবে এই ক্ষমতা হাজির হয়েছে – তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথেষ্ট বর্ণনায় পরিস্কার করে রাখা হতে হবে। নাগরিকদের যে সম্মিলিত ক্ষমতা আছে তা থেকে উৎসারিত এক গণসম্মতি প্রকাশিত হলে; এভাবে তৈরি হওয়া ক্ষমতা কাউকে অনুমোদন দিলে, সেটাই “গণসম্মতির ক্ষমতা”। এটা ডিফাইনড ক্ষমতা। নিজ ক্ষমতার উৎস নিজেই স্পষ্ট বয়ান করতে পারে এমন ক্ষমতা। এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্র ক্ষমতা।

আর্টিকেল-৩৫৪-এর অস্পষ্টতার দিক হল – কী হলে বা কী দেখলে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন, ওই রাজ্য সেখানকার “সরকার চালাতে পারেনি”? বলা হয়েছে, [……government of the State cannot be carried on in accordance with he provisions of this Constitution]। কিন্তু মানা যে হয়নি তা কী দেখে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন তা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নাই। এ পর্যন্ত এই আর্টিকেল ব্যবহার করে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন অজুহাত দেখা গেছে – “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি”। কিন্তু কী দেখিয়ে বুঝা বা বুঝানো হয়েছে যে, কোনো “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” ঘটেছে? সাধারণত এর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, শহরে কোনো দাঙ্গা হয়েছে কি না অথবা তাতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই ফিগার। এই সেই কমন অজুহাত। এটা আবছা রাখা হয়েছিল কারণ বৃটিশ কলোনি শাসকদের তো এমনটাই দরকার যাতে যেকোন অজুহাত তুলে নিজেদের অবৈধ ক্ষ্মতার নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা যায়।

এজন্য এই আর্টিকেলের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, যদি কোনো রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ বলে দাবি ওঠে তবে তা যাচাইয়ের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো লিগ্যাল বডি বা কনস্টিটিউশনাল আদালতকে দিয়ে তা যাচাই, এমন কোন সুযোগ ৩৫৪ আর্টিকেলে রাখা নাই। অর্থাৎ জুডিশিয়াল যাচাই না, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কেবল নিজে “মনে করলেই” হবে, ফলে দেখাই যাচ্ছে এটা অবাধ এক খেয়ালি – আন-ডিফাইনড [un-defined] ক্ষমতা। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, যা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা – এই দলীয় ক্ষমতার (মোদী) তার বিরোধী (মমতা) রাজনীতিকে দমনের এমন সুযোগ ছেড়ে দেয়ার কারণই নেই। তাই স্বাধীন ভারতের জন্মের পর থেকে এটা অপব্যবহার করে গেছে কংগ্রেস আর এখন তা মোদীর হাতে এসেছে।

এদিকে ভারতীয় মনও এই অপব্যবহার দেখতে এতই অভ্যস্ত যে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছিল, কবে পশ্চিমবঙ্গে কোথায় দাঙ্গা লাগানো হছে বা হয় কি না। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের পরে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসনের এক কমন প্রয়াস দেখা যায়, নির্বাচনকালে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও জন-বিভক্তিগুলোকে এবার বিদায় দেয়া। কিন্তু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এটা ছিল অনুপস্থিত। মূল কারণ, মোদী-অমিত অস্থির হয়ে মুখিয়ে আছেন মমতাকে এখনই সরিয়ে কীভাবে রাজ্য সরকার দখল করা যায়; অথচ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে।

‘সন্দেশখালি’ ইস্যু
রাজ্যে “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” হয়ে গেছে অথবা সরকার “রাজ্য চালাতে পারছে না” – এই অজুহাত তুলে “রাষ্ট্রপতির তা মনে হওয়ানোর” রাজনীতি চলছে এখন পশ্চিমবঙ্গে। লোকসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এভাবে অজুহাত তুলার যে মঞ্চ প্রথম তৈরি করা হয়েছিল এমন মোক্ষম কেস হল – “সন্দেশখালি” ইস্যু। উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার এক এলাকার নাম সন্দেশখালি। সেখানে তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলাজনিত সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য, ঘটনার পরস্পরবিরোধী বয়ান আমরা এখানে পাবো। এছাড়া এখানে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, এই ফিগার যেহেতু রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের সাফাইয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর – তাই ওই দাবি বেড়ে পরে হয়েছে আটজন। এর ওপর আবার বিজেপির নিখোঁজ বলে  দাবি ১৮ জন পর্যন্ত উঠেছে।

হামলার ঘটনার সেই সন্ধ্যাতেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কাছে কলকাতার বিজেপি নেতারা সরাসরি রিপোর্ট করেছেন, সেকথা টুইটও করেছেন। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতিরা যেভাবে অপেক্ষা করেছেন, সেভাবেই এবারের অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতিও কলকাতার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে রিপোর্ট চাইলে তিনি দিল্লি গিয়ে রিপোর্ট পেশ করেন এবং মোদী-অমিতের সাথে দেখা করেছেন।

মৃত্যুর ফিগার যথেষ্ট বড় নয়
তবে খুব সম্ভবত ঘটনা শুনেবুঝে বিজেপির মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য মৃত্যুর এই ফিগার যথেষ্ট নয়। এছাড়া শুরু থেকেই সমস্যা হল, বিজেপির এখনকার ম্যাজিক্যাল নেতা মুকুল রায়, হামলার সন্ধ্যাতেই নিজ টুইটে সংখ্যা বলে ফেলেছিলেন মাত্র তিনজন, [3 BJP workers shot dead……]। এ ছাড়া তৃণমূলের ক’জন মারা গেছে সেই সংখ্যা তিনি উল্লেখ করতে পারছেন না। ওদিকে রাজ্যপাল দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর মিডিয়ায় “রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে দিল্লির আপাত নেতি” অবস্থানের ধারণা দিয়েছিলেন। ১১ জুন আনন্দবাজার লিখেছে, প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল কেশরী বলেছিলেন, “এটি (৩৫৬ ধারা জারি) আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না”। কিন্তু পরে একটি বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “(৩৫৬ ধারা জারি) হতেও পারে। যখন দাবি উঠবে, তখন কেন্দ্র তা ভেবে দেখবে”।

ওদিকে মৃত্যুর ফিগার নিয়ে ঝগড়াটা ‘ন্যাংটা’ হতে চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেন, তিনি “নির্বাচনোত্তর হিংসায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে অমিত শাহকে জানিয়েছেন। অথচ মমতার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোকসভা ভোটের পর দিনহাটা, নিমতা, সন্দেশখালি, হাবড়া ও আরামবাগে পাঁচজন তৃণমূল কর্মী এবং সন্দেশখালিতে দু’জন বিজেপি কর্মী মারা গেছেন। তাই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, “নিয়মমাফিক রাজ্যসরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই রাজ্যপালের রিপোর্ট পাঠানোর কথা। কিন্তু এখানে বিজেপির দেয়া সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে”। তাই ঘটনার সারাংশ হল, সন্দেশখালি যথেষ্ট নয়, আরো ইস্যু লাগবে। ফলে  দ্বিতীয় ইস্যুতে চেষ্টা, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাফাইটা এবার শক্তভাবে পাওয়া যায়।

হাসপাতাল ইস্যু
দ্বিতীয় ইস্যুকে আমরা “হাসপাতাল ইস্যু” বলতে পারি। এটা আপাতত অনেক ছোট ইস্যু, কিন্তু বিরাট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনা আমাদেরও খুবই পরিচিত। কলকাতার (রাজ্য পরিচালিত) প্রাচীন সরকারি হাসপাতাল – নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানে “ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্য” হয়েছে – এজাতীয় উত্তেজনায় ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়া, তা থেকে ডাক্তারদের ধর্মঘট – এই হল মোটাদাগে বলা কাহিনীটা। ঘটনা ছিল আসলে আরো ছোট। এক রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের পরামর্শে রোগীর আত্মীয় কোন সিনিয়র ডাক্তার খুঁজে আনতে বের হন। কিন্তু কয়েকজনকে অনুরোধ করে, অপমানিত হয়েও  আনতে না পেরে শেষে একজন সিনিয়রকে একটু জোরাজুরি করে কব্জিতে ধরে তাকে আনেন। এই হলো “মূল অপরাধ”। ইতোমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে লাশ আনতে গেলে এবার ডাক্তারেরা “ক্ষমা না চাইলে লাশ দেয়া হবে না” বলে জানিয়ে দেন।

এটা আনন্দবাজারের রিপোর্ট। উত্তেজনা-মারামারি যা কিছু তা কিন্তু কেবল এরপর থেকে শুরু হয়েছিল। রোগীর বাড়ি হাসপাতাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। তাই ট্রাকে করে লোক জড়ো করে তাঁরা এবার ফিরে আসে। এসে সামনে পড়া দুই জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে আত্মীয়েরা মৃতরোগীর লাশ নিয়ে ফেরত যায়। আর ঐ হামলায় ডাক্তারদের একজনের আঘাত একটু গুরুতর ছিল, তবে এখন তিনি বিপদমুক্ত, তাই হাসপাতালের সাধারণ বেডে আছেন। আর ঞ্ছোট বড় ডাক্তাররা সবাই ধর্মঘটে। কিন্তু সময়টা ‘রাষ্ট্রপতির শাসন জারি’ করার ইস্যু খোঁজার অনুকূল; তাই এখন ‘বিরাট’ ঘটনা বানাতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ধর্মঘট ডেকে দেওয়া পর্যন্ত বিজেপি ঘটনা গড়িয়ে নিতে পেরেছে।

এসব ক্ষেত্রে  ডাক্তারেরা বা আমাদের পাবলিক মাইন্ডসহ সবাই – ঘটনাকে দেখে থাকে সাধারণত এভাবে যে, ঘটনার জন্য ‘সরকার দায়ী ’ – ঠিক তা নয়, তবে কেন সরকার মধ্যস্থতা করে বা পদক্ষেপ নিয়ে ইস্যুটা তাড়াতাড়ি মেটাচ্ছে না?  কিন্তু “হাসপাতাল ইস্যুতে” ঘটনা এখানে উল্টা। ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দায়ী করছেন। তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের  শিরোনাম “মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলুন, এই ঘটনা আর ঘটবে না, দাবি চিকিৎসক মহলের”। আসলে এই দাবি দেখে বুঝা যাচ্ছে ডাক্তারেরা কত গভীরে বিজেপির কব্জায় চলে গেছে। বিজেপির টার্গেট মমতার বেইজ্জতি, ইমেজ নষ্ট। আর সম্ভব হলে ঘটনাকে পাকিয়ে উঠাতে পারলে, এটাকেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ইস্যু করা।  কিন্তু ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী বা অপমান করতে হবে –  বিজেপির এমন ইচ্ছা, এদিকে যেতে পারল কেন? আর সবাই জানে বাস্তবত “এমন ঘটনা আর ঘটতেই পারবে না” এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারবে না। তবে যাতে না ঘটে এই লক্ষ্যে সিরিয়াস হয়ে কাজ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী – এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তেজনা মিটানোর দিকে ঘটনা গেল না কেন?

মৃত রোগী ছিলেন মুসলমান, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আর যারা এসে মাথা ফাটিয়ে লাশ মুক্ত করে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, এদের এই একশনকে নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে একটা বিরূপ কানে-কানে বলাবলি করে এক প্রচার [whispering campaign] হয়েছিল যে, “দেখেছিস, মুসলমানদের কত্ত বড় সাহস!”। “এদের খুব বাড় বেড়েছে” – এধরণের। তবে এঘটনার বহু আগে থেকেই সাধারণভাবে “মুসলমানদের আশকারা” দেয়ার জন্য গত কয়েক বছর ধরে মমতাকে দায়ী করে থাকেন তার সব বিরোধী। কলকাতা বিজেপির ফেসবুক পেজগুলো এই ভাষ্যে ভর্তি থাকতে দেখা যায়। কলকাতাজুড়ে এর মূল প্রকাশ্য ক্যাম্পেইন করে থাকে বিজেপি। আর তৃণমূলবিরোধী সিপিএমসহ বাকি অন্যান্য বেশির ভাগ সব ব্যক্তি ও দল এর প্রতি প্রকাশ্য বা মৌন সমর্থন দিয়ে থাকে। ঠিক একারণের ডাক্তারেরা দাবি করছেন মমতাকেই [মূলত মুসলমানদের সাহস বা বাড় বাড়ানোর পক্ষে তিনি নেপথ্য ব্যক্তিত্ব বলে] মাফ চাইতে হবে। যেমন এই কথাটাই আর একটু নেপথ্যে রেখে হাসপাতালের পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় [মুসলমান শব্দ উচ্চারণ না করে]  বলছেন, “জুলুমবাজদের ক্ষেপিয়ে তোলা” এবং “লেলিয়ে দেওয়া” বন্ধ হবে কবে? কিন্তু তিনি কে কাকে লেলিয়ে দিবার কথা বলছেন? বলতে চাইছেন, মমতা মুসলমানদেরকে লেলিয়ে দিয়েছেন।

মমতা মুসলমানদের “সাহস” “বাড় বাড়ানো” আশকারা দেয়া ইত্যাদি করেছেন কী না – এসব খুবই ঘৃণাবিদ্বেষী ও অরাজনৈতিক বক্তব্য। মমতা কী মুসলমানেরা মুসলমান হন আর যাই হন তিনি কী কিছু নাগরিককে যারা মারজিনাল কোনায় হয়ে পড়েছিল তাদের অধিকার ফিরে পেতে সাহায্য করেছেন? আর সেটা কী কোন নতুন বৈষম্য করে, অন্যদের অধিকার কেড়ে নিয়ে? বা, বেআইনিভাবে? এগুলোই একমাত্র হতে পারে মমতার পদক্ষেপগুলোকে বিচার করার নির্ণায়ক? কিন্তু বিজেপি তা করছে না। তাদের অভিযোগ হল মুসলমানেরা সমাজে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? কেউ কম বা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এটা অরাজনৈতিক বক্তব্য। বিজেপিকে বলতে পারতে হবে এটা মমতার পদক্ষেপ কেন বেআইনি? তা কি কোন অধিকার বৈষম্যের? কিভাবে? সবচেয়ে অধপতিত বিষয় হল, সিপিএম বা কংগ্রেসও বিজেপির উস্কানিতে মৌন বা প্রকাশ্য সমর্থন দিচ্ছে। একই অরাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। মমতার কোন পদক্ষেপ – মুসলমানদের কোনায় ফেলে রাখা থেকে বের করে আনা কী অন্য কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া? হলে কিভাবে? যদি তাই হয়ও তা নিয়ে হাইকোর্টেও তো যাওয়া যেতে পারে। তা না। সবাই বিজেপির হিন্দুত্ব আর ধর্মীয় মেরুকরণের উস্কানিতে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই মরিয়া।

কিন্তু ঘটনাবলীর পিছনে বিজেপির সমর্থন ও ততপরতা কত তীব্র তা বুঝবার এক ব্যবস্থা  করেছে আনন্দবাজার। অবস্থা দেখে তারা মন্তব্য করেছে, “এবারই প্রথম হাসপাতালের মূলগেটে তালা দিয়ে ধর্মঘট চলছে। মূলগেটে তালা দেয়া আগে কখনও হয় নাই”। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরিচালক অথবা প্রশাসনিক স্টাফ নিজে ডাক্তার হলেও তারা কখনই ধর্মঘটে যোগ দেন না। কারণ তারা দায়িত্ববান কর্মকর্তা ফলে বিরোধ মিটাতে দুতয়ালির ভুমিকা তাদের নিতে হয় বলে।  কিন্তু কলকাতায় এসব স্টাফেরাই মূল নেতা, সক্রিয়। অর্থাৎ স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাহস যোগান তখন আর কে কাকে পরোয়া করবে!

ওদিকে ক্ষমতা হারিয়ে ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া সিপিএমের এ্মন মরিয়া দশা দেখা গেছিল সেই ২০১৪ সালের শেষে, যখন অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। বর্ধমানে বোমায় কথিত  জেএমবি, জামাত, বাংলাদেশ, জঙ্গি ইত্যাদি মিলিয়ে যে প্রপাগান্ডা-গল্প যে সব কিছুর সাথে মমতা আছেন – এই প্রপাগান্ডার ঝাঁপি নিয়ে এসেছিলেন অমিত শাহ। সেকালে সিপিএম কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে যে জনসভা ডেকেছিল, তাতে অমিতের দেয়া ঐ একই বয়ানে তারা মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। পরে অবশ্য মোদি-অমিত কৌশল বদলান, এই গল্প নিয়ে আর আগাতে চান নাই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস থেকে এক বিবৃতি সংসদে দিয়ে বলা হয়েছিল, অমিতের দাবি আর সরকারের অবস্থান এক নয়।

আমাদের প্রথম আলোতেও এমন এক কলকাতার কমিউনিস্টের (শান্তনু দে) লেখা ছাপা হয়েছে, শিরোনাম, “বাঁকের মুখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি”। তিনি সিপিএম কত ভাল ছিল এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু কলকাতায় ধর্মীয় মেরুকরণ হয়ে যাবার জন্য শেষে বিজেপি না মমতাকেই দায়ী করেছেন। লিখছেন, …… দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি”।কিন্তু বিজেপির ঘোষিত নীতিই যেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ সেখানে মমতা কিভাবে দোষী? কারণ সিপিএমও “মুসলমানদের সাহস” বা “বাড় বাড়ানোর” জন্য  মমতাকে দায়ী করার জন্য তৈরি, তাই বুঝা যাচ্ছে এখানে।

যা হোক, “রোগী মুসলমান” বা “মুসলমানদের সাহস!” -এভাবে তোলা ডাক্তারদের সেন্টিমেন্টের পক্ষে প্রথম ইঙ্গিত তুলে হাজির হতে ক্ষেপিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছিলেন, এর ‘পেছনে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত’ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সরাসরি ঘটনা ক্যাশ করার লোভ না সামলে বলে বসেন, “হামলাকারীরা সেই সম্প্রদায়ভুক্ত, রাজ্যে যাদের ২৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। হাসপাতালসহ রাজ্যে যেকোনো গোলমালের নেপথ্যেই ওই সম্প্রদায় রয়েছে”। মমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, “তৃণমূল সরকার ওদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অনুরোধ, তৃণমূলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না”।

তবে ডাক্তাররা বিজেপির চেয়ে বুদ্ধিমান থাকতে চেয়েছেন। তাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বিজেপির অবস্থানকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে তারা বলেন, “যারা আক্রমণ করে তারা সমাজের দুষ্কৃত। এখানে কোনো জাতি-ধর্মের বিচার নয়”। ওদিকে কংগ্রেস-সিপিএমও এই দায় না নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কলকাতার হাসপাতালে রোগী-ডাক্তার এই সঙ্ঘাত প্রায় আমাদের দেশের মতই। অথচ এর সবচেয়ে সহজ ও আসল সমাধান হতে পারত – সবপক্ষকেই যার যার আচরণ এক জবাবদিহিতার মধ্যে আনা। প্রথম কাজ, রোগী বা তার আত্মীয়দের মনে সত্য বা মিথ্যা যত ক্ষোভই থাক তাকে বের হতে ‘জানালা খুলে দেয়া” [ventilation]। এ জন্য হাসপাতালের পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে “তদারকি ও সান্ত্বনাদান” জাতীয় উইং খোলা যেতে পারে। এর মূল কাজ হবে রোগীর আত্মীয়দের ক্ষোভ মনোযোগ দিয়ে শোনা। হাসপাতালের কারও গাফিলতি থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া। এ ছাড়া সময় নিয়ে আর মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সাথে নিয়ে  (সর্ট ও লং) দুই ধরনের তদন্তের ব্যবস্থা রাখা। তবে অবশ্যই কেস কিছু থাকবে, যা মূলত হাসপাতালের রিসোর্সের সীমাবদ্ধতার কারণ ঘটেছে, সে অপারগতাগুলো রোগীকে বুঝিয়ে বলার মতো প্রফেশনালদেরকে রাখতে হবে। ফলে মমতাকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে যারা চাচ্ছেন, এরা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট বোঝেন না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা প্রফেশনাল ডাক্তার। বরং উলটা বিজেপির মমতাকে বেইজ্জতি করার প্রোগ্রামে তারা মিশে গেছেন বুঝে না বুঝে।আর মূলত তা ঘটেছে [whispering campaign] এর কারণে।

ডাক্তারের মাথা ফাটানো নিশ্চয়ই কোনো সমাধান নয়। কিন্তু সাবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ – “ক্ষমা না চাইলে মরদেহ দেয়া হবে না”, এটা বলার তাঁরা কে? এটাই তো মূল ক্রাইম। অথচ সরকারি/বেসরকারি কোন ডাক্তার রোগীর আত্মীয়দের এ কথা বলার অধিকার বা এখতিয়ার নেই। আর এ কথা বলে ডাক্তারেরা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া আর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে ।

আর পুরা ঘটনায় ডাক্তারদের মধ্যে, তারা নিজেরা একটা উচ্চ এলিট শ্রেণীর (ধর্মীয় পরিচয় আর গরীব-বড়লোক শ্রেণী পরিচয় এই দুই অর্থেই)- এমন ধারণা কাজ করছে।  বিজেপির প্ররোচনায় ডাক্তারেরা এলিট ভুমিকায় অন্যদের সাথে এই বৈষম্য করে গেছে অবলীলায়। আবার বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে এমনই ঘটনায় এক আইন প্রচলন করা হয়েছিল যে, “হাসপাতালে এমন হাঙ্গামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে”। তাই ডাক্তারদের সঠিক পদক্ষেপ হত বড়জোর পুলিশের কাছে যাওয়া মামলা করা, আইনের আশ্রয় নেয়া। বাস্তবে কিন্তু  রোগীর সেই হামিলাকারি আত্মীয়ের নামে মামলা হয়েছে, এখন সে জেলে আটক আছে। এছাড়া আর এক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য যে, রোগীর আত্মীয়রা স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশকে দিয়ে লাশ ছেড়ে দিতে ডাক্তারদের অনুরোধ করিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা তবু লাশ আটকে রেখেছিলেন। [এন্টালি থানার পুলিশ গিয়ে চিকিৎসকেদের বোঝান। তাতেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। ] তাদের এই উদ্ধত্ব দেখে বুঝা যায় বিজেপি কী পরিমাণ ডাক্তারদের বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি পিছনে থাকলে – যারা নিজেরাও একটা রাষ্ট্রপতির শাসন জারির জন্য বেপরোয়া – এসব মিলিয়ে সবকিছুই বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন না হলে সেটাই অস্বাভাবিক হত।

অর্থাৎ বিজেপি ডাক্তারদের এতই প্রটেকশন দিয়ে বেপরোয়া হতে উসকানি দিয়েছিল যে, তারা তাদের আইনি সীমা ও দায় সব ভুলে গেছিলেন। ওই দিকে কলকাতার কমিউনিস্ট ভাইয়েরা, তারাও ডাক্তারের পক্ষে, মানে নির্বাচনকালের মতই বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছেন, হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার ইমেজ ভাঙলে তাদের দিন ফিরবে।

না ফিরবে না। এবারের নির্বাচন তাদের কেটেছে নিজের দলীয় পরিচয়ে, কিন্তু বিজেপির ক্যাম্পে বসে। এই সহযোগিতায় বিজেপি এবার একলাফে ১৮ আসন পেয়েছে। আর কমিউনিস্টদের ভোট গিয়ে ঠেকেছে ৭%। এটাই তাদের শেষ কমিউনিস্ট পরিচয়। কারণ, ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে এই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবেন সরাসরি বিজেপি নাম নিয়ে, এটা দেখতে পাবার সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ বাস্তবতা হল, কমিউনিস্ট পরিচয়ে আর না আছে আইডিয়ার ধার বা ভার, না আছে পকেটে টাকা। বরং পকেট ভরা টাকা আছে বা দিবে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিতে যোগ দেয়া খারাপ, এটা বলার মত নৈতিক সাহসও কমিউনিস্ট নেতাদের আর নেই। কাজেই…।

বিজেপি কতদুর বেপরোয়া হয়ে গেছে এর এক উদাহরণ হল, মমতাকে নিয়ে বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের মন্তব্য। তিনি নিজের আঞ্চলিক দল জেডিইউ এর সভাপতি। তার দল গত রাজ্য নির্বাচনে (২০১৬ সালে) বিজেপিবিরোধীদের সাথে নির্বাচনি জোট করে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তিতে তিনি মেরু বদল করে বিজেপির জোট যোগ দিয়েছেন। আর এখন বিজেপির কোলে উঠে একেবারে সরাসরি বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষী রাজনীতি করছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ “মিনি পাকিস্তানে”(mini Pakistan) পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে  “বিহার থেকে “রোহিঙ্গারা” বিহারিদের তাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য” করল তার বিহারে এনডিএ-সরকারের মূল দল জেডিইউ (JDU)। মোদীর মন পেতে ইসলামবিদ্বেষের যেকোন পর্যায়ে নামতে তিনি রাজি। ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে এরই এক প্রতীকী প্রকাশ এটা।

মমতারও দোষ, ভুল বা গোঁয়ার্তুমিও যে নাই তা নয়। ডাক্তারদের পিছনে বিজেপি-সিপিএমের সমর্থন আছে কিন্তু এদেরকে বহিরাগত বলে ঘটনা তার দিকে ফিরে নাই। আবার চার ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারদের কাজে যোগ দিতে বলাও তার বিরুদ্ধে গিয়েছে। প্রশাসক আর রাজনৈতিক নেতার ভুমিকা মাখায় ফেলেছেন তিনি। উচিত ছিল কেবল মুখ্যমন্ত্রীর ভুমিকায় থাকা, তাহলে ফল পেতেন। এছাড়া গত পঞ্চায়েত ভোটে ৩৪ শতাংশ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা’র কাফফারাও আছে। তবে হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার আপোসী ধারার আর একটা সফট লাইন কার্যকর আছে বলেই মনে হচ্ছে – মেয়র ফিরহাদ, তার ডাক্তার মেয়ে, আর মমতার আরেক ডাক্তার ভাইপো প্রমুখের মাধ্যমে। সম্ভবত হাসপাতাল ইস্যু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আগেই তিনি আপসে এসব মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এতে বিজেপি্র হাতে তাঁকে কোণঠাসা করার সব চেষ্টা মাঠে মারা যেতেও পারে। দেখা যাক, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনতে ‘হাসপাতাল ইস্যু’ ব্যবহার হয় কি না। নাকি নতুন অন্য ইস্যুর খোজ পড়ে!

সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এর পক্ষে তখন বিপক্ষে লোক দেখতে পাওয়া ত আসলেই কঠিনই হবে! ধর্মীয় মেরুকরণ তাতিয়ে ক্ষমতাদখলের প্রচেষ্টা – এটা সবপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে, এক মারাত্মক আত্মঘাতি পরিস্থিতি আনবে, যা এখন বিজেপি ও গংয়ে্রা আমল করার অবস্থায় নাই। পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ সেই ভয়ংকর দিকে আগাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসনআনার জন্য এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

গৌতম দাস

২৭ মে ২০১৯, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AB

 

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। তাতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং গত ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনের চেয়েও এবার আরও বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance (NDA)]। গত এমন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা মোট ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ২৮২ ও ৩৩৬।

এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’ [Hindutto]- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচনটা হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হল ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচনে সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এক প্রধান প্রশ্ন ছিল যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? অর্থাৎ বৃটিশ-ভারত নামেই বাইরে থেকে একে এককাট্টা ভারত মনে হয়। কিন্তু আসলে তা অসংখ্য রেসিয়াল বৈশিষ্ঠের জনগোষ্ঠির ভারত। এছাড়া বৃটিশ্বরা এই ভারতকে শাসন করে গেছে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে। ফলে ভারত বলতে বিভিন্ন ধরণের জনগোষ্ঠির ভিন্নতাগুলো আবার যেমন তেমন না। যেমন ভারতে এখনও ২৯টা রাজ্য। মানে অন্তত ২৯ রকমের বড় বড় বিভক্তি এখানে আছে। এরকম আর কত কত ধরণের আইডেনটিটিতে এখনও বিভক্ত হয়ে আছে ভারতের নাগরিকেরা।  এই ভিন্নতাগুলো সত্বেও তাদের একটা রাষ্ট্রে ধরে রাখার উপায় কী? এই ছিল নেহেরুর কাছে মুখ্য প্রশ্ন। সে  কোন বন্ধন, যা দিয়ে তাদের আটকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায়?

এই কঠিন জটিলতার সবচেয়ে সহজ জবাব নেহেরু খুজে নিয়েছিলেন যেটা তা হল “হিন্দুত্ব”। মানে হিন্দুত্ব হল সেই আঠা বা গ্লু [glue] যার ভিত্তিতে নাগরিকেরা জোটে বেধে একতায় তাদের এক থাকার উপায়। সেই থেকে নব গঠিত ভারত হিন্দুত্ব হল নাগরিক ঐক্যে এভাবে গড়ে উঠেছে।বলাই বাহুল্য এটাই ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে একক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, the biggest disasterous decision.

প্রশ্নটা আসলে অরিজিনালি ছিল মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বুঝাবুঝির বা বলা যায় বুঝাবুঝিতে ঘাটতি থাকলে সেই অভাব থেকে উত্থিত এবং বিপথগামী প্রশ্ন। যেমন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে বা করার কালে আদৌ এমন ভিত্তি খুজে ফেরা  জরুরি কিনা? সরাসরি উত্তর হল যে – একেবারেই না। কিন্তু তবু নেহেরুর এই বিপথগামী পথই ধরেছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে এটা ১৯৪৭ সালের আগষ্টের পরে উদয় হওয়া প্রশ্ন নয়। এটা এর আগের পুরা উনিশ শতক (১৮১৫-১৮৯৯) এই সারাটা সময় চিন্তার বিপথগামী গমণ বজায় ছিল।  সেদিকে একটু পরে আবার আসছি।

নেহেরুর কাছে ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না – এটাই ছিল তাঁর চোখে সদুত্তর। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অ-হিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে, মারজিনাল করে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানের দিকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। তা হল, হিন্দুত্ব একটা কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়। এরই প্রতিভূ বা সব বৈশিষ্ট-চিহ্ন নিজেই হাজির হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’।

কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যেই সরাসরি হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে আরএসএসের নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে। দক্ষিণ ভারতের কমল হাসানকে অনেকে চিনে থাকতে পারেন যারা ভারতীয় সিনেমার খবর রাখেন। তিনি সিনেমার খ্যত নায়ক। তিনি সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু নাথুরাম সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি মামলা খেয়েছেন। পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জামিন চেয়ে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন,  “Godse himself, in his book Why I killed Gandhi, had categorically stated that Mahatma Gandhi had acted against the interest of Hindus, and had blamed him for partition, Mr. Haasan said.”। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস-বিজপি দুপক্ষই ইস্যুটা কার্পেটের নিচে ফেলে চেপে যেতে চান। আরএসএস তাদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্ট বা কর্মিসভায় নাথুরামকে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাদের হিরো বলে তুলে ধরে। যদিও বাইরে খুব বেশি এই ভাবনা প্রচারে আনতে চায় না। আর যে মোদী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নাথুরাম তর্কে ঢুকতেই চান না।

যে যাই হোক, ১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ গড়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা একালের নেতা এলকে আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে [… providing a fresh ideological narrative to the people,” ] বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদী নির্বাচনে নেমেছিলেন?  ছোট্ট করে এনিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যাক। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে আমরা তুলনা করলে বুঝব, ২০১৪ সালে মোদীর মুখ্য (catchy) ইস্যু ছিল মূলত “অর্থনৈতিক”। অথচ এবার অর্থনৈতিক শব্দটাই তিনি কোথাও উচ্চারণই করেন নাই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চলতি শতকের প্রথম দশক (২০০১-০৯) থেকে। যেখান থেকে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংকের ধারণা উঠে এসেছে। তো “রাইজিং অর্থনীতির” ইন্ডিয়া এর একটা। মোদীর আগের কংগ্রেস (২০০৪-১৪) সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে এর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশাআকাঙ্খাও চরমভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। সেদিকটা খেয়াল করে মোদী ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ঐ অর্থনৈতিক ইস্যু সেটাকেই আবার উস্কে চাঙ্গা করে তুলে ধরে দাবি করেছিলেন তিনি এটা আবার তুলে সচল করতে পারবেন, কারণ গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখমন্ত্রী তিনি। তিনি তখনও থার্ড টার্মের মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই খাতিরে যেন তাঁকে ২০১৪ নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল কিন্তু তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তাঁর নাই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি [demonitization & GST]  ইস্যুতে তার কপাল খুলে নাই, তা যতই ভাল প্রোগ্রাম হোক বা না হোক। ডিমনিটাইজেশন মানে নোট বাতিল আর জিএসটি মানে ভারতের এক রাজ্যের পণ্য আর রাজ্যে ঢুকলে টাক্স আরোপ করা হয়, এসব পাল্টাপাল্টি ট্যাক্সকে উঠিয়ে নেয়া, সরল নিয়ম করা আর আদায়কৃত ট্যাক্স শেয়ার করার ফর্মুলা চালু – এককথায় বিশেষ করে পরেরটা খুবই ভাল কাজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন, প্রথম তিন বছরের সাফারিং এর কারণে নগদ অর্থনীতিক পারফরমেন্সের বিচারে তিনি ফেল করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি একেবারেই ফেল করেছেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, মোদীই ভারতের এক ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে তিনি নিজের দল এবং বিশেষ করে নিজ সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যেটা যে, দলীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে একটা দল -অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বা প্রশাসন বিষয়ক একাদেমিক যারা দলের খাতায় নাম লেখানো – এমন  এদেরকে নিয়ে গঠিত কোন টিমের পরামর্শের দিয়ে সরকার চলছে। না মোদী এসব এমেচার করতে রাজী না।  বরং তিনি তা করে থাকেন ও ভরসা করেন তা হল প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানী নিয়োগ দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদী-অমিতের বিশেষ “রাজনৈতিক ব্রান্ড” এটাই। এজন্য তারা বিজেপির মত দল করলেও খুবই স্মার্ট। এমনকি নির্বাচনও তিনি করেন এমন কোম্পানীকে পরামর্শক রেখে। এই জায়গায় মোদীর বিজেপিকে ধর্মতাত্বিক নেতা বা মফস্বলী কোন নেতা জ্ঞান করা খুবই ভুল হবে ও খাটো করে দেখা হবে।

আর সেই কন্সাল্টেন্টদের পরামর্শেই এবার তিনি একক – কেবল “হিন্দুত্ব” ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। তবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ যেটা উপরে বলেছি যে, এটা সম্ভব হল কারণ ভিত্তি হিসাবে ভারত-রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠিত। কিন্তু যে উত্তর এখনও অমীমাংসিত তা হল – বিভিন্ন আত্ম-পরিচয় বা বৈশিষ্টের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কেন কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে – আটকে ধরে রাখার কোন আঠা বা গ্লু যেমন একটা হিন্দুত্ব – এর প্রয়োজন আদৌও কী অনিবার্য, এসেনসিয়াল? না কী অপ্রয়োজনীয় এবং বিকল্প আছে?  এছাড়া কবে থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টাকে “এসেনশিয়াল” মানে হিন্দুত্বকে এসেনশিয়াল বলে বুঝে এসেছেন, সেটাও খুজে দেখা ও লক্ষ্য করা খুবই জরুরি।

এই প্রশ্নটা ভারতে তো বটেই,উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, তাই স্পষ্ট উত্তর নাই। এবং এক ভারতের কারণেই উপমহাদেশের সবখানেই এটা অমীমাংসিত ও সব অসন্তোষের উতস এটা।

আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক রূপ বৈশিষ্ট হল “রেনেসাঁ” [Renaissance] চিন্তা। ইউরোপের এই রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বৃটিশ-ভারতের রাজধানী, বাংলায় নিয়ে এসেছিল বৃটিশ-শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে থাকেন সকল রেনেসাঁবাদীরা। তার সক্রিয়তার প্রধান সময়কালটা হল (১৮১৫-৩৩)। তিনিই প্রথম এবং তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পিছনে পুরা ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, একটা “হিন্দুত্ব” থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাক্ষ্ম ধর্ম-এর প্রবর্তক যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই – এক হিন্দু নাশনালিজম। তবে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়গুলোতে এটার কার্যকারিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে পরবর্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দের ইত্যাদি্র মত কিছু ব্যক্তিত্বের হাত ঘুরে আরও রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের জন্মের সময় (১৮৮৫) থেকেই এর  হাতে পৌছাতে শুরু করেছিল। আরও পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদ করা ও পরবর্তিতে তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলন – এসবের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। আর সবশেষে দেশভাগের পরে নেহেরুর হাতে সেই একই “হিন্দুত্ব” কিন্তু এবার নতুন প্রয়োজনে – এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। আর  সেই থেকে আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই পুরা সময়ে  হিন্দুত্ব চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সমস্ত বিভক্তির উতস এখানেই। এটাকে একটা অন্ধের হাতড়ানোও বলতে পারি! কারণ লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ভারত যদি একটা মর্ডান রিপাবলিকই হতে চেয়েছিল বা চেয়ে থেকে থাকে তবে তার আবার “হিন্দুত্ব” এর, হিন্দু নাশনালিজমের দরকার কেন? কিভাবে তা হয়? এর জবাব কংগ্রেস বা আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি কখনো দেয় নাই, দিবে না – খুঁজবে না। অথচ অনিবার্য এসেনশিয়াল মনে করে রাখবে।  এতেই তারা এর সাহায্যে অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠির উপরে আধিপত্য কায়েম করতে পারার সুবিধার দিকটা মুখ্য – এই সুবিধার দিকটাই তাদের জন্য সব চেয়ে লোভণীয় ছিল বলে। যদিও মর্ডান রিপাবলিক বলতে একে ধর্মীয় নাশনালিজম বলে মানে করা – এই সুবিধাবাদি ভুল বুঝার ঝোঁক ইউরোপেও ছিল।

সবচেয়ে বড় তামাশার দিকটা হল, হবু  “মর্ডান রিপাবলিক” ভারত বলতে একে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম বলে বুঝা ও মানে দেওয়া কিন্তু একে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ” বা “স্বদেশি আন্দোলন” বলে নাম দেয়া আর ওদিকে এভাবে এর আসল পরিচয় হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম লুকিয়ে রাখা ফেলা হয়েছে। শুধু তাই না। এর প্রভাব এখানেই শেষ না। এভাবে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম এর রাজনীতি করা এটাই মুসলমানদের জবরদস্তি ঠেলে দেয়া হয়েছে যেন তাঁরাও ইসলামি নাশনালিজমই করে – মুসলিম লীগ করে আবির্ভুত হয়। আর এইবার সেই কঠিন তামাশাটা! এই মুসলমান আর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ লটকে দেয় যে এরা ধর্মীয় রাজনীতি করে, এরা সাম্প্রদায়িক, এরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চায় ইত্যাদি। ফ্যাক্টস হল, হিন্দুরা যদি হিন্দু নাশনালিজমের রাস্তা ধরে  তাহলে এরপর মুসলমানেরা যাই করবে তা এক ইসলামি নাশনালিজমই তো হবেই!

অতএব সেই হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম – এটাই একালে মোদীর হাতে স্বরূপে হাজির হতে চাইছে।
এমন কী মোদীর গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে সামাজিক বিভাজন তো বটেই যেভাবে সংগঠিতভাবে  সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল,  “মুসলমানকে ধরে জয় শ্রীরাম বলাতে হবে” এর নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে, [এই মাত্র দ্য হিন্দু পত্রিকার খবর এটা এবারও শুরু হয়র গেছে – মুসলমান তরুণ দর্জি বাসায় ফিরছিল, তাঁকে ঘিরে ধরে বলা হয়েছে, মাথার টুপি খুলে ফেলতে, এরপর জবরদস্তিতে জয় শ্রীরাম বলতে বলে পিটানো হয়েছে।] গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে তারা নাজেহাল “সামাজিক ন্যুইসেন্স” তৈরি করতে নেমে পড়েছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে একইভাবে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা ঐ মুসলমান গৃহস্থকে খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ এরপরেও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে? কেঁউ মাথা ঘামায় নাই। কংগ্রেসের নেতাকর্মি অথবা কোন কমিউনিস্ট এনিয়ে প্রশ্ন করার মুরোদ আছে দেখি নাই আমরা।  মর্ডান রিপাবলিকের অর্থ তাতপর্য তারা নুন্যতম কিছু বুঝে অথবা চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ হচ্ছে এটা – এই বুঝ থেকে তারা কখনও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারে নাই। এটাই একটা বিরাট প্রমাণ যে ভারত আসলেই এবং বরাবরই একটা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র। এর বাইরে রাষ্ট্র কী, অন্য কোন রাষ্ট্রের রূপ কী – এনিয়ে ভারতের কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা কোন প্রগতিবাদীদের কোন বুঝ, কোন স্টাডি কোন বুঝাপড়া কিচ্চু নাই।

এই কথার আরও প্রমাণ পেতে চাইলে  আরও লক্ষ্যণীয় হল, যেমন এখনকার কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী – এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত। মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও কংগ্রেস নুন্যতম অন্তত প্রতীকী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। কংগ্রেসে তা না হয়ে, আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই তথাকথিত সেকুলারিজমের জামাখুলে প্রকাশ্যেই নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে এটা নাকি মোদীর মত হার্ড হিন্দুত্ববাদ না,”সফট হিন্দুত্ববাদ”। এই দাড়িয়েছে এখন কংগ্রেসের ‘সেকুলারিজম’। অর্থাৎ  তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস এখন আর হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদীর হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। ওদিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে তারাও সব আসন হারিয়েছে শুধু তাই না, নিজেদের ভাগের ২২% ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদের নির্বাচনে, মোদীর দলকে। তাতে ব্যাপারটা এখন দাড়িয়েছে এই যে, হিন্দুত্ববাদ ঠেকানোর বোলচালের দলগুলাকে মোদী এবার তাদেরকে আসল চেহারায় এনে ছেড়েছে, এটাই আসলের মোদীর ক্ষমতার আসল সাফল্য!

আবার লক্ষ্য করা যাক, এই নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হয়ে হলে, পরদিন (২০ মে) মোদী হিন্দু তীর্থস্থান উত্তরপ্রদেশের পাহাড়ে প্রাচীন কেদারনাথের মন্দির গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে বসে গেলে তা দেখে কংগ্রেসীদের জবাব হল আমাদের রাহুল তো সেখানে কেদারনাথের মন্দিরে পায়ে হেঁটে গেছিলেন আর মোদী গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে, কাজেই আমরা শ্রেষ্ট।  আসলে এইখানেই মোদীর হিন্দুত্ব অনেক আগেই বিজয় লাভ করে গেছে। তাই ভোটের ফলাফলে না, মোদী আসলে এখানেই বহু আগেই কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন।

হিন্দুত্ব কত ভারী এর লক্ষ্যণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন। মোদীর হিন্দুত্ব কত পাওয়ারফুল,বাকি সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে, পিছনে ফেলে নিজে সবার উপরে উঠে যেতে পারে এরই প্রাণ এগুলো।

যেমন, সবপর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদী-অমিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তাদের জোট ৩০০ এর আশেপাশের আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তব ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও ভালমত ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ শুরু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেছে তা নয়, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করে নাই, এটা এমনই ফলাফল।

আবার, সাধারণত রাজ্য সরকারে (যেমন রাজস্থানে কংগ্রেস ) কোন দল সরকারে আছে এটা লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল  সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথায় এমন ফ্যক্টর এবার কাজ করে নাই। এমনকি যেখানে গত মাত্র পাঁচ মাসে আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা কোন বিজেপি বিরোধী দল জিতেছে সেখানেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই এবার বিজেপি আবার ফিরে ঐ রাজ্যের প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এই অবস্থা দেখা গিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় বা কর্ণাটক এমন রাজ্যে। এসব রাজ্যের ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। খুব ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এমন দেখা যায় না। অথচ বিজেপি এবার এমন হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই জিতেছে।

আবার,নর্থ-ইষ্ট মানে আসাম-ত্রিপুরাসহ ছোট ছোট ট্রাইবাল সাত রাজ্য। আসামে এনআরসি [National Register of Citizens (NRC) ] অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর সর্বশেষ চল্লিশ লাখ হিন্দু-মুসলমান লোক নানান কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ জোগাড় করতে ফেল করেছে। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। গতবছর জুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। কারণ নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছিল। মিজোরামে “বাই বাই ইন্ডিয়া” বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর চলতি হিন্দুত্বের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এজাতীয় সব “কথিত নাগরিক আপত্তি” হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি সাত রাজ্যেই বেশিরভাগ আসন নিয়েছে, কোন রাজ্যে সবগুলোই।

আবার, কলকাতার মানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রচন্ড রকমভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তাঁর তৃণমুল দলের লোকসভার ৩৪ আসন এবার নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি দুইটা থেকে এক লাফে ১৮ আসন  পেয়ে গেছে। তৃণমুল বা মমতা রাজনীতি ও তাঁর সরকারের অনেক দোষ বা অভিযোগ থাকতে পারে, অনেকের অপছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রধান বাধা এখনো এই মমতাই। বিশেষ করে বিজেপির এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে আরও সফল হতে গেলে মোদীর প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানোর ব্যবস্থা করা – তা বলাই বাহুল্য।

ফলাফল প্রকাশের দিন, নিজের বিজয় নিশ্চিতের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছেন। এখনও করছেন। কিন্তু এসব জায়গায় সেখানে তিনি আগে নির্বাচনি প্রচারের সময়ে কত কী বলেছেন ঘৃণা ছড়িয়েছেন সব ভুলে এমনকি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে নির্বাচনের পরে এখন “তিনি সবার নেতা” বলে দাবি করেছেন। তিনি নিজেই  গত ২০১৪ নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – সেই শ্লোগান ওদিন তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হবার পরে প্রথম এবার উচ্চারণ করলেন। এবার নির্বাচনের পর ভোল পাল্টায়ে তিনি নিজেই “সংখ্যালঘুদের” সহানুভুতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, বলছেন”He said if his first term was about “Sabka sath, sabka vikas (Alongside all, development for all)”, his second would stand for “Sabka sath, sabka vikas, sabka vishwas (Alongside all, development for all, trust of all)”।  এই নির্বাচনি বিজয়ে পুরা সময় তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলার সাফল্য গাথা দিয়ে। “পাকিস্তান” = “মুসলমানের” বিরুদ্ধে তিনিই একমাত্র “ভারত-রক্ষক” – এই ছিল তার বয়ানের পাঞ্চ লাইন। আর দ্যা হিন্দু পত্রিকা তাদের নির্বাচন উত্তর গবেষণার ভিত্তিতে বলছে এই বক্তব্যের প্রভাব এমন ছিল যে এক্সিট পোলে অংশ নেয়া মানুষ  বলেছে অর্থনীতি মোদীর ঘাটতি আছে, সাফল্য নাই কিন্তু তবুও তারা মনে করে বালাকোট ইস্যুটাও গুরুত্বপুর্ণ – তাই মোদীকে ভোট দিয়েছেন। দা হিন্দু Balakot plank বলে উপশিরোনামে বলছে, বালাকোটকে ইস্যু করে মোদী রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ আর উত্তরাখন্ডের সব আসনের দখল পেয়েছে [all seats in Rajasthan, Gujarat, Madhya Pradesh, Haryana, Himachal Pradesh and Uttarakhand.]

আমাদের মনে রাখতে হবে, একথাটাও সঠিক যে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির মুখ্য টার্গেট – প্রধান উদ্দেশ্য পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে শেয়ার না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে এখন সুশীল হয়ে বলছে  নির্বাচনের সময় “মোদী একটু হিন্দুত্বের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু এখন সে এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল হয়ে যাবে” ভাবতে পারেন, একথা বলেছেনও। ইতোমধ্যে অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। যেমন কলকাতার টেলিগ্রাফ লিখছে Narendra Modi tried to shake off his divisive image and reach out to the minorities on Saturday। এছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি, একথাও ঠিক। কিন্তু একটা জিনিষ এখনই সবাই নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারে। তা হল – হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদীর পক্ষে আর সামনে আগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজনীতিতে – এটা আর সম্ভব নয়।

অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির “আগানোর” প্রধান কর্মসুচী হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মত “নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি” করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এনিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কিন্তু তাতে কী হতে পারে?

কলকাতায় যদি আসামের মত এনআরসি-ততপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোন হিন্দু নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে মোদী সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দিবার ব্যবস্থা নিবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহালে শেষ করা হবে। মুসলমানদের বেলায় কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয় অন্তত ক্যাম্পে নিয়ে ফেলে রাখবে। কপাল ভাল থাকলে তাকে আগের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন কোন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে! এতদিন এককথায় গরীবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল সেসব ছিনে এখন  সকলের জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করবে।

ওদিকে লক্ষ্যণীয় আর এক বিষয় হল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের বাংলায় নতুন করে এনআরসি-ততপরতা বা বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে ডেকে আনার রাজনীতিটা ঠিক পছন্দ করছে, তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হতে পারে এটা কাজ বেড়ে যাবে অনেক, অথবা অজানা বহু অভিমুখ গতিমুখ তৈরি হয়ে যাবে তা কোথায় গিয়ে না ঠেকে সে আশঙ্কায়, হতে পারে। অথবা হতে পারে ভান করা। যাতে এর প্রতিক্রিয়া কোথায় কোন পর্যায়ে হচ্ছে আগামিও হতে পারে তা জেনেবুঝে নেওয়ার সুযোগ নেয়ার কারণ। সারকথা তারা স্বস্তিদায়ক ঘটনা হিসাবে দেখছে না।

(ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫ টা। এখানে মোদীর টার্গেট হবে [উত্তর প্রদেশের মত এটা আশিটা না হলেও] এই ৬৫ আসন এটার গুরুত্ব কম হবে না – এগুলো বিজেপির পক্ষে হাসিল করা। এক এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসন গুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদীর আশু লক্ষ্য।

মতুয়াঃ
বাংলাদেশে ট্রাইবাল বলতে পাহাড়ি বা সাঁওতালদের মত বিক্ষিপ্ত নানান পকেট আছে এগুলাই। এছাড়া সমতলিদের মধ্যে কোন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠি  এখনও টিকে বা বজায় থাকার কথা এখন আর জানা যায় না। বুঝা যায় তারা বিভিন্ন মানুষ মিলেমিশে এখন একই সমা্জে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা গড়ে পুরান ট্রাইবাল পরিচয়্টা ঘুটা দিয়ে গুলিয়ে দিয়েছে। তবু আমাদের গোপালগঞ্জের জেলার “মতুয়া” বলে এক হিন্দু জনগোষ্ঠির কথা জানা যায়। বাংলাপিডিয়া “মতুয়া”দের কথা বলছে। বলেছে, “গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারা” বলে এদের চিনিয়েছে। বলেছে ,“গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত”। এই জনগোষ্ঠিরই প্রধান বা বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বণগাঁও মহুকমাতে সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে।

গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠি বর্তমানে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘদিনের এমপি ছিল মমতা ঠাকুর। সে তৃণমুল দলের এমপি ছিল, কিন্তু সে এবার হেরে গেছে। আর সে জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন [তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাল মতুয়া, বনগাঁয় জয়ী শান্তনু]। এই দুই প্রার্থীই যদিও মুল গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। কিন্তু কেন মুখ ফেরাল? আনন্দবাজার লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে এখানে সভা করে গেছেন। “মোদীজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে”। আর সেই থেকে এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাতাল শুরু হয়েছে। পুরা ব্যাপারটাই ইঙ্গিত দেয় যে মোদী এনআরসি আন্দোলন নিয়ে কিভাবে আগাতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও একারণেই এবার দুহাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মতুয়াদের নড়াচড়াটা হিন্দুদের অবস্থা বুঝার জন্য প্রতীকী।

আসামের এনআরসি ততপরতা শুরু করার সময় মোদী সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা “ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” হয়ে থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষ্য দিয়ে সেকথার অনুরণন করে বিবিসিকে বলছেন, “নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন মি: মোমেন”। কিন্তু তাঁর পরচুলার মতই একথাও আসলে নকল, কোন ভরসা নাই। অন্তত নির্বাচন পরবর্তি নড়াচড়াগুলা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর হল তার কথায়, “বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোন কারণ নেই” । আচ্ছা মোদীর মুখপাত্র হয়ে তাঁর এই সাফাই দেয়াটা কেন প্রয়োজনীয়? কিছু না বলে “দেখছি” বলে থাকা যেত না?  সত্যি অদ্ভুত!

কিন্তু আর একটা দিক যখন আগে ভারত “আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” বলেছিল তখন “বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে” এমন কোন আইন বা ইস্যু ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা এই আইন এখন আছে। যা এখন নড়াচড়া করে উঠবে, সচল হবে অনুমান করা যায়। এটা নিয়ে বাংলাদেশেও একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। তবে দুই তরফে। এক, একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ততপরতা শুরু হলে সেখানে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার এই ততপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোন খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হলে এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, তা বলাই বাহুল্য। তারা খুবই ক্ষুব্ধ হবে অনুমান করতে পারি। তাই পুরা বিষয়টা নিয়ে মোদী সরকার ঠিক কী কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে এর একটা এসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কোথায় এবং কী কী তা নিয়ে কথা বলা, সম্ভাব্য স্বার্থবিঘ্ন কী হতে পারে তা নিয়ে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও ততপর হওয়া জরুরি। আমাদের সকলেরই সুস্থ শরীর ব্যস্ত হয়ে উঠার, অস্থির হয়ে উঠার দিন কী সামনে! সত্যি কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য কে জানে! আমরা সবাই কী বলি হয়ে যাব এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৫ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি! এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

গৌতম দাস

২০ মে ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ap

 

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচন প্রায় শেষ। এটা ভারতের ১৭তম লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন।  নির্বাচনের ছয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছিল আগেই। আজ ১৯ মে রোববার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এরপর ২৩ মে সকাল থেকে একযোগে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। ঐদিনই দুপুর ১২টা নাগাদ কোন প্রার্থী কে কোথায় এগিয়ে থাকছেন তা আঁচ পাওয়া শুরু হয়ে যাবে। কোন দল সরকার গড়তে যাচ্ছে এর অভিমুখ আন্দাজ করাও ঐদিনই সন্ধ্যার পর থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কে কোন আসনে জিততে যাচ্ছে; কোন দলের প্রাপ্ত মোট আসন সংখ্যা কেমন হবে ইত্যাদিও। আর প্রাপ্ত সে ফলাফলের ভিত্তিতে পরেরদিন ২৪ মে থেকে প্রত্যেক দলের জোট গড়ার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যাবে। ফলাফল কী হতে পারে এপ্রসঙ্গে প্রায় সবারই অনুমান ভারতে একটা কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

আসলে ভারতে কোয়ালিশন সরকার এবারই নতুন না। বরং গত ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সব সরকারই ছিল আসলে কোয়ালিশন সরকার। এমনকি মোদীর চলতি সরকারে বিজেপির মারজিনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এটাও ছিল এক কোয়ালিশন সরকার। তবে এ পর্যন্ত এসব কোয়ালিশন সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল হয় কংগ্রেস না হয় বিজেপির নেতৃত্বে। সেকালে এ’দুই পার্টির কোন একটা কোয়ালিশনের নেতা না থাকলে সরকার টিকে নাই। যেমন, ১৯৯৬ সালে দেবগৌড়া-জ্যোতি বসুর কোয়ালিশন ছিল এমন এক ব্যতিক্রম যা ১৮ মাসের বেশি টিকে নাই। তবে এবারই কংগ্রেস অথবা বিজেপিকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও এরকম আরও কয়েকজন যেমন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা মায়াবতী বা অন্ধ্রপ্রদেশের সিটিং মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুও আছেন যারা এমন সরকারের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। আর মমতাই এমন ভিন্ন ধরণের কোয়ালিশন সরকারের বিশেষত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে একে আলাদা নাম, ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর সরকার বলে ডাকছেন।

দুনিয়াতে  রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিপরীত ধারণা হিসেবে ইতিহাসের একপর্যায়ে উঠে আসে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা। যার মূল বৈশিষ্টগত ফারাক ও নতুনদিকটা হল,  রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার বলতে এটা পাবলিকের গণসম্মতির রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রে এর ক্ষমতার উতস – নাগরিক লোকক্ষমতা।  এছাড়াও এমন রাষ্ট্রের আবার আরও একটা রূপ আছে। বিশেষত কাঠামোর দিক থেকে বিচারে দুনিয়ায় সেই রাষ্ট্র-রূপটার নাম – ফেডারেল রিপাবলিক রাষ্ট্র। একে ফেডারেল বলার কারণ হল, এখানে রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রদেশ নিয়ে গঠিত বা বলা যায় রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রাদেশিক ইউনিট বা রাজ্যে বিভক্ত থাকে। তবে ফেডারল রাষ্ট্রের  বৈশিষ্টের মূল জায়গাটা হল, এখানে রাষ্ট্রের  কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও সম্পদ ইত্যাদি কী ভিত্তিতে রাজ্যগুলোও এসব উতস ব্যবহারের সমান সুযোগ [access] পাবে তা আগেই বিস্তারিত এর লিখিত নিয়ম বলা থাকে, একটা ন্যায্যতার ভিত্তিও যেন সেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাজ্য বা রাজ্য-সরকারকে দেয়া বরাদ্দ যেন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানের পছন্দের বা অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে, এভাবে এখানে রাজস্বসহ সব বরাদ্দ হতে হয়। রাজস্ব, সম্পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদিতে কোনো কোনো রাজ্য যেন কোন বৈষম্যের শিকার না হয়- এমন কাঠামোগত প্রটেকশন ব্যবস্থা থাকাই ফেডারেল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। ভারত আমেরিকার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় দলগুলোর সমন্বয়ে একটা কেন্দ্রীয় সরকার গড়া অর্থে মমতা এটাকে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ [Fedaral Front]- এর সরকার বলছেন।

গত ১৭ মে ছিল শেষপর্বের এবং পুরা নির্বাচনের প্রচারণার সর্বশেষ দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী ততপরতা ও কার্যক্রমের সমাপ্তি হিসেবে দলের প্রধান অমিত শাহকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। অমিত শাহ মুখস্থ কথার মত সেখানে বিজেপির জোট তিন শতাধিক আসন পাবে বলে দাবি করে আসছিলেন। মজার কথা হল, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক পাশে বসা মোদীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বলছিল না। ঐ সাংবাদিক সম্মেলনের পুরা সভা পরিচালনা ও শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সবই অমিত একাই করছিলেন, মাঝে মোদী কেবল একবার তার প্রশাসনের পাঁচ বছর সমাপ্ত হল বলে নিজের কিছু অনুভূতি প্রকাশ ও শেয়ার করেছিলেন। তবে কোনো কারণে তিনি এদিন সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি, সব অমিত একাই সামলেছেন। দ্যা হিন্দু পত্রিকা বলছে, এটা গত পাঁচ বছরের শেষে এক বড় ব্যতিক্রম [At his first press conference in 5 years, Modi says Amit Shah will take questions]। তবে মোদীর বক্তব্যের শরীরী-ভাষ্য ছিল ভিন্নররকম। যেন তিনি বলতে চাইছিলেন, গত পাঁচ বছরের শাসন আর এই নির্বাচনী প্রচারণা মিলিয়ে যা কিছু পেরেছি সব করলাম। যেন তিনি এখন ভগবান ভরসায় আছেন যদি তিনি আবার তাঁকে ক্ষমতায় আনেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় তিনি আবার ফিরে আসছেনই এমন কনফিডেন্স, গত ২০১৪ সালের মত, মোদির নিজের ওপর আস্থা বা মোদি-জ্বর ইত্যাদি কোনটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিবিসি (১৮ মে দিবাগত) রাত দশটায় এক খবর ছেপেছে যেখানে বলা হয়েছে মোদী উত্তরপ্রদেশেরও আরও উত্তরে প্রাচীন কেদারনাথ মন্দিরে ধ্যানে বসেছেন। বিবিসি শিরোনামে বলেছে এটা মোদীর “স্পিরিচুয়াল ব্রেক” [spiritual break]। ঘটনা হল তিনি নিজেই বা তাঁর দল টুইটারে ছবিসহ এই খবর দিয়েছে। একই ছবি দিয়ে তবে বিবিসির একটু আগে মধ্যপ্রাচ্যের এক ইংরাজি দৈনিক গালফ টুডে রিপোর্ট করেছে যে এই  ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। টুইটারেও অনেকে  মন্তব্য লিখেছে। একজন বলছে তিনি গতদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের সময় থেকেই তিনি ধ্যানে [@Bhai_saheb: Yesterday modiji was meditating in press conference and today at kedarnath]। সে যাই হোক মোদীর “মন অশান্ত” এটা স্বপ্রকাশিতভাবে বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ আগেরদিনের সাংবাদিক সভায় মোদীর শরীরী ভাষায় যে তিনি নিজেকে “হবু বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী” হিসাবে কনফিডেন্ট মনে করতে পারছিলেন মনের সেই অস্থিরতার কথাই আজকের টুইটারের ম্যাসেজ থেকেও প্রতিষ্ঠিত হল। এমনিতেই মোদী চরম মিথ্যাবাদী বলে মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করেছিল দুদিন আগে যে – ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট তিনি অনেক আগেই ব্যবহার জানতেন বলে এমন আগের সময়ে তিনি দাবি করেছেন সেটা ভারতে বাণিজ্যিকভাবে  ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট চালু হবার বছর পাঁচেক আগের ঘটনা হয়ে যায়।

   ______________________

সর্বশেষঃ  আজ ১৯ মে সন্ধ্যা থেকে এই প্রথম এক্সিট পোলের মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য আসতে শুরু করেছিল। এক্সিট পোল মানে ভোটের বুথ ফেরত কিছু সংখ্যক লোকের সাথে কথা বলা – এমন নমুনার ভিত্তিতে সংগৃহিত তথ্যের বিশ্লেষণ মন্তব্য। এমন আটটা  কোম্পানি থেকে প্রকাশিত আট এক্সিট পোলের ফলাফল  মানে অনুমান-মন্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ছয়টাই বলেছে মোদীর জোট  আবার ক্ষমতায় ফিরবে। মানে ২৭২ এর বেশি আসন পাবেন। কেবল দুটা এক্সিট পোলের ফলাফল-অনুমান-মন্তব্যে একটা বলছে ২৪২, অন্যটা বলছে ২৬৭ আসন পাবে। বলাই বাহুল্য এগুলো খাটি অনুমান মাত্র, সত্যি ফলাফল নয়। আর ভারতের নির্বাচনে এর আগে এক্সিট পোলের অনুমানের পুরা উলটা ফলাফল বাস্তবে হয়েছে এমন রেকর্ডও আছে। তাই  আসল ফলাফল পেতে ২৩ মে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আমরা সতর্কতা হিসাবে ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি
(প্রাক্তন বিজেপি নেতা) ভেঙ্কায় নাইডু বলছেন, “Exit polls do not mean exact polls...Since 1999, most of the exit polls have gone wrong”- উনার এই কথাটা মনে রাখতে পারি।______________________

ওদিকে  কেবল নন-কনফিডেন্ট মোদী কেবল চেহারাতেই নয়, মোদী সম্ভবত যে ফিরে ক্ষমতায় আসতে পারছেন না সে ব্যাপারটা চার দিকে সেভাবেই খবর ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অন্তত নির্বাচন শুরুর পর থেকে। প্রায় পাঁচ জোড়া নির্বাচনী-বিশ্লেষক গ্রুপ কেউই নির্বাচন শুরুর (১১ এপ্রিলের) পর থেকে আর ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে, মোদী আবার ক্ষমতায় আসছেন। শুধু তাই না, এবার মিডিয়াগুলোও তাদের মূল্যায়নে বলা শুরু করেছে, মোদির বিজেপি ও তাঁর জোট এনডিএ-কে সাথে নিলেও সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসন ) বিজেপি পাচ্ছে না। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোকে ভাগিয়ে নিজ নিজ জোটে ঢুকিয়ে নিতে ফলাফল ঘোষণা হবার পরে হর্সেস ট্রেডিং বা  এমপি কেনা-বেচার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠল। আর কংগ্রেসের বেলায় বলা হচ্ছে, ফলাফলে যদি তার মোট প্রাপ্ত আসন এক শ’র নিচে হয়, তবে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি ছেড়ে দেবেন আগেই; আর সেই সাথে জোটের অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবেন [কুর্সিতে অনড় নয় কংগ্রেস,বার্তা আঞ্চলিক দলগুলিকে]। আর যদি দেড় শ’র বেশি আসন পান, সে ক্ষেত্রেই কেবল জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল দরকষাকষিতে নামবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস যদি এক শ’র নিচে আসন পায় তবে আর কংগ্রেসের পক্ষের জোট ইউপিএ-এর পক্ষের কাউকে ভাগিয়ে মোদী তার এনডিএ জোটকে মোট ২৭২ এর উপরে নিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরাই ফেডারেল ফ্রন্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন করার সম্ভাবনা হাজির হয়ে যাবে।

নির্বাচন কেমন হলো?
এবারের নির্বাচন কেমন হলো? এক কথায় জবাব, খুবই খারাপ। ভারত-রাষ্ট্র আরেকবার আরেক ধাপ দুর্বল হয়ে গেল। এটা বলাই বাহুল্য যে কোন নির্বাচন কমিশন যখন নিরপেক্ষতা সততা স্বচ্ছতায় একটা সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাতে সবচেয়ে সবল হয়ে উঠে খোদ রাষ্ট্রটাই। ওর প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যত দৃঢ় হয়।  কিন্তু এবারের ভারতের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই এসব ক্ষেত্রেই অসফল; ফলে এই কমিশনই  ভারত-রাষ্ট্রকে পরাজিত করে দিল। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেল।

কিন্তু “আরেকবার” কেন? আর দুর্বল হওয়া মানেইবা কী?
সাধারণভাবে বললে, ভারত-রাষ্ট্র মূলত চালায়, চালিয়ে আসছে এর ব্যুরোক্র্যাটেরা। সেটাই হবার কথা এবং একমাত্র বিকল্প। কারণ ১৪০ কোটির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এক রাষ্ট্র, একে দক্ষ ব্যুরোক্র্যাটরাই একমাত্র চালাতে পারবে – এটাই স্বাভাবিক। অনেকে ভাবতে পারেন যে, কেন এভাবে বলা হচ্ছে যেখানে বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা তো সমাজে নেতিবাচক ধারণার বলে মনে করা হয়। হা তা থাকলেও মনে রাখতে হবে  বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা আসলে ইতিবাচক পজিটিভ এবং প্রয়োজনীয় শব্দ। প্রথমে এর সেই ইতিবাচক অর্থ বুঝতে হবে বুর‍্যোক্রাসির আসল মানে কী? আমাদের পরিবারগুলোর প্রধান ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা আমাদের মায়েরা। মা সন্তান, স্বামীসহ সব মেম্বারদের নিয়ে সবাইকে ভাত বেরে খাওয়ায় এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু ধরা যাক পরিবার বড় হয়ে যাবার কোন কারণে মা সন্তানদের মাথার কাছে নিয়ে হাত বুলিয়ে ভাল বেড়ে আর ভাত খাওয়াতে পারছেন না। তাই ম্যানেজ করার সুবিধার্থে মা নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছেন। এতে খাবার সবার পাতে পাতে আর তুলে না দিয়ে বাটিতে বাটিতে তরকারি বেড়ে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যেখানে কোনটা কার বাটি তা বুঝতে বাটির নিচে চিরকুটে নাম লিখে রাখা হয়ছে। এতে মার পক্ষে বড় সংসারটা ম্যানেজ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে, স্বাশ ফেলার সময় পাচ্ছেন। আর এখানেও মায়ের স্নেহ-মমতা প্রকাশ আছে অবশ্যই, তা টের পাওয়া যায় কিন্তু একটু পরোক্ষে। এটাই বুর‍্যোক্রেসি, এক বুর‍্যোক্রেটিক ম্যানেজমেন্ট।  বড় হয়ে যাওয়া যে কোন কাজ একমাত্র এভাবেই ম্যানেজ করা সম্ভব। এক লিখিত নির্দেশিকা বইয়ের মাধ্যমে বড় কাজ পরিচালনা।
এখন মা যাকে ম্যানেজার বা কেয়ারটেকার রেখে এই নতুন ব্যবস্থাপনা চালু রেখেছেন সেই ম্যানেজার এবার নিজের অসৎ কোন স্বার্থে মায়ের নির্দেশের উলটা মানে করল বা প্রয়োগ করল, আর মাও আবার তদারকি মনিটরিং করা ঢিলা দিল বা ভুলে গেল। অথবা মায়ের এক দুষ্ট সন্তান যে জানে, ডাক্তারের নির্দেশে তার এক বোনের বিশেষ যত্ন নিতে সেই  ভাগের বাটিতে বেশি মাংস থাকছে আজকাল  তাই  সেই দুষ্টু সন্তান এবার ম্যানেজারের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বাটি অদলবদল করে নিয়েছে ইত্যাদি  – এই যে পরিস্থিতি এখানে এসে এবার বুর‍্যোক্রাসির অর্থ হয়ে দাড়াবে নেগেটিভ। বুর‍্যোক্রাসির মানে হয়ে যাবে এবার অবহেলা, হ্যারাসমেন্ট দুর্নীতি ইত্যাদির এক ব্যবস্থা। তাহলে সারকথায় কোন কাজ ততপরতা যখ্ন বড় হয়ে যায় তা ম্যানেজ করতে বুর‍্যোক্রাসির বিকল্প কোন উপায় নাই। তাই আবার তদারকি মনিটারিং এর ভাল ব্যবস্থাপনা দিয়েই একে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বুর‍্যোক্রাসির অর্থ ইতিবাচক করাই একমাত্র পথ।

কাজেই যেখান থেকে কথা উঠেছিল,.১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতকে পরিচালনা করতে পারে কেবলমাত্র এক দক্ষ ও করিৎকর্মা এক বুর‍্যোক্রাসিই।  তবে এদের উপরে বসে রাজনৈতিক নির্দেশ দিতে, ভালো রাজনীতি ও রাজনীতিবিদও অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র চালানো শুধু ব্যুরোক্র্যাটদের কাজ নয়। এ ছাড়া শক্ত এক বিচার বিভাগও আরেকটা খুবই প্রয়োজনীয় অঙ্গ। ওদিকে নির্বাচন কমিশনও আছে – এরাও মূলত ব্যুরোক্র্যাটেরই অংশ। তাই তাদেরও শক্ত ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বলা হয়ে থাকে, সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (১৯৯০-৯৬) টিএন সেশন – তিনি তার আমলে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ও কঠোর সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে, আর সেটাই নির্বাচন কমিশনের আজকের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রধান উৎস। কিন্তু তবু এবারের নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশন ‘পরাজিত’।  অনুমান করা হচ্ছে রাজনীতিবিদের কারণে প্রভাবিত হয়ে দ্বিতীয়বার ভারত-রাষ্ট্রের পরাজয় ও দুর্বল হওয়ার ঘটনা ঘটল। চলতি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনাস্থা জমেছে পাহাড় প্রমাণ।

এবারের নির্বাচন ছিল পরিচালনের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এক নির্বাচন। যার মূল কারণ হল, মোদীর অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। আর তা থেকে পালাতে আড়ালে যেতে তিনি নির্বাচনকে সাজিয়েছেন “হিন্দুত্বকে” মুখ্য বা কেন্দ্র করে। হিন্দুত্বই শ্রেষ্ট এবং সবকিছু – এই বক্তব্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান হিসাবে মোদী তাঁর সব সংজ্ঞায়িত বা অসংজ্ঞায়িত ক্ষমতাকে অপব্যাবহারে কাজে লাগাতে নেমে গেছেন যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ভোটের স্বার্থে মুচড়ে ব্যবহার করা যায়। এতে তাঁর সৃষ্ট এই অযাচিত চাপ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা দ্বিধাগ্রস্থতা থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই বিশেষত মোদীর বিরুদ্ধে একশন নেবার ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে গেছে।  দ্বিতীয় সদস্য তাঁকে কোনঠাসা ও উপেক্ষা করে রেখেছে প্রধানসহ অন্য জন – মিডিয়াতেই এই অভিযোগ এসে গেছে।
এককথায় বললে, রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান যখন আইন মানতে চান না বা তাঁর বিরুদ্ধে যখন আইন প্রয়োগ করা যায় না বা প্রয়োগ কর্তা ভীত হয়ে এড়িয়ে চলতে চায় – এটা হল সেই অবস্থা। মূলত এটা রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া, অকেজো নন-ফাইশনাল হয়ে পড়ার পুর্বলক্ষণ। এমন অসহায় অবস্থার প্রকৃত  মানে বা ইঙ্গিতটা হল, রাষ্ট্রকে আবার ঢেলে সাজানো, নতুন করে প্রজাতন্ত্র গড়বার মুরোদ দেখানোর জন্য রাষ্ট্র আহবান জানাচ্ছে।

এমনই, প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি আসন থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘কারচুপি করে’ জিতেছিলেন – এই অভিযোগে ১৯৭১ সালেই মামলা হয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টে। এরই রায় এসেছিল ১২ জুন ১৯৭৫ সালে। সেবার আদালত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে সশরীরে এসে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিলেন, এমনকি আদালত পুলিশের নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর আদালতে প্রবেশ অনুমোদন করে নাই। বরং আইন সংশ্লিষ্ট সব পেশার লোক যারা আদালতে আসেন তাদের নিয়ে গড়া এক হিউম্যান চেইন – এর ভিতরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে রেখে আদালতের এমন নিজস্ব নিরাপত্তায় ইন্দিরা গান্ধী এজলাসে উঠে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু  রায় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে যায়, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাতে ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আপিল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত করেছিল আর কয়েকমাস পরে, ৭ নভেম্বর বিস্তারিত শুনানিতে সব শাস্তি রদ করে দেন। কিন্তু এর অনেক আগেই ঘটনা অন্য দিকে গড়ায় ও গতিমুখ বদলে যায় ।

হাইকোর্ট তার মূল রায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনে জিতবার দায়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওই কারচুপির নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে দেন। এছাড়া ইন্দিরার প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এর আগেই অন্য কাউকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়ার সংসদীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী ২০ দিন সময় দিয়ে ঐ নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু এখানেই নির্বাহীপ্রধান ইন্দিরা আইনের উর্ধে উঠে যেতে চাইলেন।

ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে যেন ক্ষমতা ছাড়তে বা সাজা খাটতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে পরবর্তি ২০ দিন শেষ হওয়ার আগেই ২৫ জুন ১৯৭৫ সারা দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে বসেন। এতে তিনি নাগরিক মৌলিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার, মিডিয়ায় সেন্সরশিপ আরোপ ইত্যাদি প্রায় সবকিছু করার সুযোগ নেন, সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। কনস্টিটিউশনাল জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে তিনি পাল্টা দাবি করেছিলেন যে, ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং তা ঠেকাতে’ এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। এভাবে স্রেফ নিজেকে বাঁচাতে তিনি রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশনকে অকার্যকর ও দুর্বল করে ফেলেন, খরচের খাতায় ঠেলে  দেন।
প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতাকে বা ক্ষমতাকেন্দ্র একক রাখতে হয় বিভাজ্য করা যায় না। একে বিভক্ত বা কোনো শরিকানা করার ভুল করা যায় না। একথা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে এই ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্যও কিছু পদক্ষেপ থাকতে হয়। যেমন কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও নির্বাহী প্রধানের বৃহত্তর অধীনেই রেখে; তবে ব্যক্তি না বরং নন-পারসনাল, অবজেকটিভভাবে ওর ক্ষমতা স্ট্যাটুটরি বিধানে বর্ণিত করে রেখে দেয়া হয়। যেমন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিষ্ঠান, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কম্প্রোটোলার জেনারেল নিয়োগ ইত্যাদির বেলায়। অথবা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে (তুলনামূলক অর্থে) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে স্বাধীন করে রেখে দেয়া খুবই দরকার হয়; যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া বা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় এবং যাবেই। কারণ শত আইন করে, লিখে রেখে এমন বিপর্যয়গুলোকে বন্ধ করা যাবে না। কারণ নির্বাহীপ্রধানই যদি আইনের উর্ধে উঠে যেতে চান তখন কী হবে! এর জবাবে বলা হয়, যাদের দিয়ে ক্ষমতার এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হবে, ক্ষমতার চর্চা হবে তারা নিজেরা প্রজ্ঞাবান হবেন – এটাই এর একমাত্র প্রতিকার। বিশেষ করে নির্বাহী প্রধানের হাতে এবং যার যার এখতিয়ার পেরিয়ে অন্যের সীমানায় ঢুকে পড়া, কোনো সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। আর সর্বোপরি, কেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে এমন করে রাখা হয়েছে, এর সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

কিন্তু না হলে?  অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন (যেটা সাধারণত নির্বাহী প্রধানের হাতে ঘটে থাকে, সেই ইংল্যান্ডের রাজার আমল থেকেই) ঘটলে তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা ও ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার কারণে রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়বে। তাই ঘটেছিল।

ভারতের জরুরি আইন জারির প্রায় দুবছর পরে ইন্দিরা গান্ধী (২১ মাসের) জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে, ১৯৭৭ সালে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিলেন এবং গোহারা হেরেছিলেন। তিনি নিজে এবং বড় সন্তান সঞ্জয় গান্ধী এতে পরাজিত হন অর্থাৎ পরোক্ষে শাস্তি পেয়েছিলেন বলা হয়। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতার দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এরই একটা দাগ হল এবারের নির্বাচনে এই দুরবস্থা।

কারণ ইন্দিরার ঐ ঘটনা এরপর থেকে ভারতের বিচার বিভাগ বা প্রশাসনে জড়িয়ে থাকা পেশাদার ব্যক্তিরা একটা শিক্ষা নিয়ে থাকবেন সম্ভবত – সেটা হলঃ  তারা কোনো দুর্দমনীয় নির্বাহী প্রধান মানে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে যাবেন না। বরং পরোক্ষে (কমন বন্ধুকে পাঠিয়ে) তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকবেন; আর বাস্তবে মুখোমুখি কোনো সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টা করবেন। খুব সম্ভবত ইন্দিরার ঐ ঘটনা সম্পর্কে তাদের মুল্যায়ন হল আদালতের ঐ একশন শেষ বিচারে কাউন্টার প্রডাকটিভ। তাই মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে মুখ বাঁচাতে হবে, সেটাই বেটার।  যেমন ওই মামলাতেই লক্ষণীয় হল, সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই সাজার রায় উল্টে দিয়েছিলেন। যদিও জরুরি আইন জারি থাকায় সে আমলে এটা করা তত জরুরি ছিল না। কিন্তু আসলেই কী এটা “বেটার”!

নরেন্দ্র মোদীর এই পাঁচ বছরে নির্বাহী ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অনেকবার তিনি ঘটিয়েছেন।  রিজার্ভ ব্যাংকের গর্ভনরের উপর চাপ সৃষ্টি অথবা নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা সিবিআই এর প্রধানকে অপসারণ করা নিয়ে বেপরোয়া হয়ে অনেক জল ঘোলা করেছেন। সেসব রেখে কেবল এবারের নির্বাচনের কথায় আসি। অন্যান্য বারের মত এবারের নির্বাচনের আগেও ভারতের নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ এক আচরণবিধি জারি করেছিল। সেখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে কোনো নির্বাচনী বক্তব্য দেয়া যাবে না, কাশ্মিরে পুলওয়ামায় প্যারামিলিটারি গাড়িবহরে হামলা বা এরপরে পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত ভারতের বিমান হামলা – এগুলোকে নির্বাচনী বক্তব্য বা পোস্টারে আনা যাবে না। বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু মোদী নিজেই  এসবগুলো আচরণবিধির সবই ভঙ্গ করেছেন। যেমন তিনি “তাঁর সেনাবাহিনীর” সাফল্য, যারা বালাকোটে সন্ত্রাসীদের বোমা মেরে ধ্বংস করে এসেছে “তাদের সম্মানে দেশপ্রেমে” এবারই প্রথম ভোটার’ যারা সে তরুণেরা যেন মোদীকে ভোট দেয়- এরকম প্রচারণার সব অভিযোগ মোদীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল।

কমপক্ষে পাঁচটা এমন সিরিয়াস আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এসেছিল মোদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক গড়িমসির পরে সব অভিযোগ থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীকে খালাস দিয়ে দেয় [EC’s clean chit to PM came amid dissent]। এটা দ্যা হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ঐ খালাস দেয়াটাই শেষ কথা নয়। কোনায় একতা শব্দ আছে “amid dissent”। যার মানে হল, Ashok Lavasa নামে এক নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে।

এছাড়া প্রথম দু-তিনটা অভিযোগ বা মামলার ক্ষেত্রে সে অভিযোগ প্রায় মাসখানেক ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রায় কাছাকাছি অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ৪৮ ঘণ্টা, আর এক বিরোধী নেতা মায়াবতীকে ৩৬ ঘন্টা নির্বাচনি প্রচার ততপরতা চালানো থেকে বিরত থাকার শাস্তি দেয়া হয়েছিল। যোগী আদিত্যনাথও ঐ একই “মোদি কা আর্মি” বলে সম্বোধন করে মোদীর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। এছাড়া আবার অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ যেখানে রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন কমিশন শাস্তি দিয়েছিল, সেখানে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে কমিশনের কেন্দ্র দিল্লির অফিসে।

ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল তাদের পদক্ষেপ-হীন অভিযোগ ফেলে রাখার  নানান উদাহরণ দিয়ে। কিন্তু তবু আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক রায় শুনাতে যায় নাই। এর স্বপক্ষে অবশ্য আদালতের শক্ত যুক্তি আছে যা ভ্যালিড। তাই আদালত রায়ে বলেছে,  ‘কমিশন স্বাধীনভাবে এসব ব্যাপার নিজেই বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি দিতে পারে’  – এভাবে বলে এক উৎসাহিত করার রায় দিয়েছে। এর পেছনের সুপ্রিম কোর্টের শক্ত অবস্থান আছে বলে  আমরা নিজেরাই অনুমান করতে পারি। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের মতোই নির্বাচন কমিশনের নিজেরও বিচারিক ক্ষমতা আছে। ফলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হল, আগেই নিজে হস্তক্ষেপ না করা, বরং কমিশনের নিজের বিচারিক ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালনের জন্য যে ক্ষমতা আছে, তা ব্যবহার প্রয়োগ করতে পর্যাপ্ত সময় সুযোগ করে দেয়া, যাতে কমিশন তা ব্যবহার করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট আগেই হস্তক্ষেপ করতে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠত। ফলে এটা এড়ানো সুপ্রীম কোর্টের সঠিক পদক্ষেপ।

কিন্তু আমরা দেখছি, নির্বাচন কমিশন মোদীর নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাত করতে চায় নাই, এড়িয়ে যাবার পথ ধরেছে গেছে। এটা এখন দগদগেভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা মিডিয়াও প্রসঙ্গটা তুলেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে  যথেষ্ট সক্ষম ও দক্ষ এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। যদিও বাংলাদেশের গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি দল হয়ে এসে কী ভূমিকা নিয়েছিল আমরা জানতেই পারি নাই। বলাই বাহুল্য তাদের সফর কূটনীতির বুদ্ধিতেই পরিচালিত হয়েছিল, কমিশন পর্যায়ের বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ হয়নি।

সাম্প্রতিককালে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অপব্যবহার করে কিছু স্টাটুটারি প্রতিষ্ঠান যেমন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা তদন্ত প্রতিষ্ঠান সিবিআইর প্রধানসহ অনেকের সাথে, তাদের তুলনামূলক স্বাধীন থাকার ক্ষমতা ক্ষুন্ন করতে গিয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছিলেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হয়তো বিজেপি দলের; কিন্তু স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও ক্ষতযুক্ত করে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী দাগ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় এর ‘কাফফারা’ দিতে হতে পারে।

খুব সম্ভবত মোদীর আগের এসব তৎপরতা দেখেই এর প্রতিক্রিয়ায় এবার নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে। কিন্তু তাতে কী? ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল করে ফেলার দুর্ঘটনা কী এড়াতে পেরেছে – সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে! এটা ভারত-রাষ্ট্রকে অনবরত তাড়া করতেই থাকবে; সম্ভবত কখন কোন কাফফারা আদায় করে নিবে, কে জানে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৮ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)মোদির শরীরী ভাষা তা নয় এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

গৌতম দাস

২২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2zq

 

নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী ও সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তি – ছবি : TOI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, যা ভারতের ভাষায় “লোকসভার নির্বাচন” [General Election To Lok Sabha, 2019], তা অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় পর্ব গত ১৮ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। এভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ ভারতের ভোটপ্রদান  এবারও মোট সাত পর্বে এক মাসেরও বেশি দিন ধরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা করে পর্বের নির্বাচনের সমাপ্ত হবে। এভাবে নির্বাচন শেষ হবে সপ্তম পর্বটা আগামী মাসে, ১৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে। এরপর বাক্সবন্দী করে সব যার যার কেন্দ্রেই রাখা ভোট, ২৩ মে সকাল থেকে একসাথে গণনা শুরু হবে। এতে আশা করা যায়, ঐদিন বেলা ১১টার পর থেকে কে কোন আসনে এগিয়ে আছে, সেই অভিমুখ স্পষ্ট হতে শুরু করবে, আর সেখান থেকে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, সেই অভিমুখ বা ইঙ্গিতও জানা শুরু হয়ে যাবে। এভাবে দিন শেষে সন্ধ্যার পরে সব ফলাফল না এলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসছে।

এটা ভারতজুড়ে ৫৪৩ আসনের লোকসভা নির্বাচন; অর্থাৎ ভারতে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় যেতে হলে কোন দল বা জোটকে মোট ২৭২ ছাড়িয়ে (২৭২+) এরও বেশি আসন পেতে হয়। কারণ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত আরো দু’টি আসনও আছে তা যোগ হলে মোট আসন ৫৪৫ হবে।

ভারতের টিভি মিডিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন ড. প্রণয় রায়। তাঁর মিডিয়া প্রফেশনাল স্ত্রী রাধিকা রায় এনডিটিভি গ্রুপ কোম্পানি খোলার প্রথম উদ্যোক্তা। এর একমাস পরে প্রণয় রায় তাতে সহ-উদ্যোক্তা হিসাবে যোগ দেন। এভাবে দুজনে মিলে ১৯৮৮ সালে ‘এনডিটিভি’ মিডিয়া গ্রুপ চালু করেছিলেন। দু’জনে মিলে তাঁরা এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের শেয়ার মালিক। এই প্রণয় রায় ব্যতিক্রম অনেক অর্থে। তিনি অন্য মিডিয়া মালিক বা সম্পাদনার নির্বাহীদের সবার থেকে আলাদা এ জন্য যে, তিনি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, অর্থনীতির ডক্টরেট সেই সাথে ব্রিটেনে পড়ালেখা করা পেশাদার চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট।

এ ছাড়া যখন টিভি বলতে একমাত্র সরকারি টিভি বুঝত মানুষ, সেই যুগে তিনি ভারতীয় “দূরদর্শনে” অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করতেন। আরও সেই সাথে ভারতের নির্বাচনের সময় প্রাপ্ত নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য এবং অভিমুখ বিশ্লেষণ – এটা তখ থেকেই তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।ইংরাজিতে psephologist (উচ্চারণ “সিফোলজিস্ট”) বলে একটা শব্দ আছে। যার অর্থ নির্বাচনতাত্বিক; অর্থাৎ যিনি দক্ষতার সাথে  নির্বাচনে ভোটারেরা কোনদিকে ও কেন ভোট দিল সে তাতপর্য ও প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ভারতের মিডিয়া একমাত্র তাকেই নামের আগে ‘সিফোলজিস্ট’ বিশেষণ লাগিয়ে বলে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখা যায়।  যেমন  তামিলনারু ভিত্তিক দক্ষিণী ১৪০ বছরের প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক “দ্যা হিন্দু” লিখেছে, প্রণয় রায় সম্পর্কে –  “১৯৮০ সাল থেকে প্রণয় আর ভারতের নির্বাচন প্রায় সমার্থক কথা হয়ে গেছে। তাকে দিয়েই ভারতে “নির্বাচনতাত্বিক” শব্দটার ব্যবহার শুরু”। [“Prannoy Roy has been synonymous with elections since 1980. He pioneered opinion polls in India and introduced psephology to the country.”]।

পরবর্তীকালে ১৯৮৮ সালে নিজের “এনডিটিভি” চালু হলে ‘নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য ও অভিমুখ বিশ্লেষণ” করার ভারতের বাজারে তিনি আরও বিস্তারে পাইওনিয়ার বা অগ্রগামী বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। ইনি চলতি নির্বাচনের আগে এপ্রসঙ্গ নিয়ে তার বই [দ্যা ভারডিক্ট : ডিকোডিং ইন্ডিয়ান ইলেকশন… (The Verdict: Decoding India’s Elections. প্রকাশ করেছেন। বইটি হল, ভারতের নির্বাচনে ভোট প্রদানের অর্থ-তাতপর্য কী করে বের করতে হয়, তা নিয়ে। এরই এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

প্রণয়ের সেই বিচারে ১৯৫২ সাল  ভারতের লোকসভা নির্বাচনে শুরু হওয়ার পর থেকে, ভারতের ভোটারদের ভোট দেয়ার প্যাটার্নকে তিন আলাদা যুগে (একেকটা প্রায় ২৫ বছরে) তিনি ভাগ করতে চান। প্রথম ২৫ বছর ধরে (১৯৫২-১৯৭৭) ভোটারেরা একনাগাড়ে, স্বাধীন ভারত পাওয়ার আবেগ ও জোশে কংগ্রেসকেই মানে সরকারের পারফরম্যান্স যেমন হোক তাদেরকেই আবার জেতাতে হবে- এই ছিল তখনকার আবেগ বা ফর্মুলা। তাই ৮০% ক্ষেত্রে আগের সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছিল। এটার নাম তিনি দিয়েছেন পুরান “ক্ষমতাসীন-মুখি ভোট”। একবার জিতে যাবার পর সারা পাঁচবছর এলাকায় চেহারা না দেখালেও পরের বার আবার তিনি নির্বাচিত হতে পারতেন। কারণ সেটা ছিল বিশ্বস্ত ভোটারদের যুগ। ভোটারদের নেতাদের উপর অগাধ বিশ্বাস কাজ করত। প্রণয় বলছেন, এটাকে আপনারা “বোকা ভোটার” বা “গভীর আশাবাদী” ভোটারও বলতে পারেন।

প্রণয় বলছেন এরপর ১৯৭৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব – যার নাম তিনি দিয়েছেন – “ক্রুদ্ধ ভোটারদের [angry voter] যুগ”, ১৯৭৭-২০০২ সাল পর্যন্ত। এটা শুরু হয়েছিল  ১৯৭৭ সালের মার্চের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচন থেকে। এই নির্বাচন ছিল আগের ২১ মাসের (১৯৭৫-৭৭) ধরে ইন্দিরার “জরুরি আইন জারি” করে বিরোধী দমন নির্যাতন চালানোর সমাপ্তিতে। তাই সেটাই ছিল প্রথম  কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে পুনরায় বিজয়ী না করে শুরু হয় দ্বিতীয় যুগ পর্ব। অর্থাৎ এই ক্রদ্ধ ভোটার যুগের বৈশিষ্ঠ ছিল, যার পারফরম্যান্স খারাপ তাকে পরের নির্বাচনে নির্বিচারে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়া। প্রণয় বলছেন এই দ্বিতীয় যুগে যেকোন ক্ষমতাসীন সরকার [incumbency] পরের বার নির্বাচনে ৭০% ক্ষেত্রে উতখাত হয়ে গেছে। প্রণয়ের ব্যাখ্যা হল পাবলিক এতই ক্রুদ্ধ থাকত যে একট ভাল অথবা একটু খারাপ বলেও কাউকে মাফ করে নাই, নির্বিচারে পুরান হলেই তাকে বাদ – এই ছিল ফর্মুলা বা নীতি।

আর সর্বশেষ এখনকার যুগপর্ব, নতুন শতকের শুরুতে ২০০২ সাল থেকে যার উত্থান। তখন থেকে শুরু হয় আর একেবারে নির্বিচার নয়, এবার বিচার করে দেখেশুনে পুরান কোনো সরকারকে রেখে দেয়াও শুরু হয়েছে, যদিও কাউকে কাউকে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়াও, সে তো আছেই। প্রণয়ের রায়ের ভাষায়, এরা অনেক “বিবেচক ভোটার”। এখানে এপর্যন্ত ৫০% ক্ষেত্রে দেখা গেছে  ভোটাররা নেতাকে পুণর্নিবাচিত আর ৫০% ক্ষেত্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।   অর্থাৎ একথার সুত্র ধরে বললে, প্রণয় রায় মোদীর আবার বিজয় সম্ভাবনাকে তিনি একেবারে অসম্ভব বলে ঠিক ফেলে দেননি। ভারতের মিডিয়া জগতে প্রণয় ও তার টিভির চলতি বা সাবেক কলিগরা সবাই যারা এখন ভারতের মিডিয়া জগতের প্রভাবশালী ও মাথা পরিচালক। আর সম্ভবত একজন বাদে (অর্ণব গোস্বামি যে প্রকাশ্যেই বিজেপির পক্ষে) বাকিরা সবাই মোদি-বিরোধী বা কঠোর সমালোচক বলে মনে করা হয়।
তবে তিনি এই তৃতীয় পর্বে আর এক নতুন উপাদানের কথা বলেছেন; জানাচ্ছেন, এই পর্বে বিপুলভাবে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ঘটেছে। তাই তাদের সংখ্যার কারণে তারা এখন ভোটের ফলাফলে অন্তত এটাও আর একটা নির্ধারক উপাদান।

প্রণয় রায়ের বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হল, ভারতে সরকার গঠন এখন সরাসরি ঠিক ভোটারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সেটা ভোটারের ভোটের চেয়েও “জোট” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কেমন করে আপনি জোট করছেন, কাকে জোটসঙ্গি বেছে নিচ্ছেন, কেন, কী বুঝে – এভাবে জোটবন্ধু বেছে নেয়া – এটাই এখন মুখ্য নির্ধারক যে, শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে।

উল্টা করে বললে প্রণয় আসলে বলতে চাইছেন, ভারতে কোনো একক দলের একা নিজের সামর্থ্যে সরকার গঠনের দিন শেষ। সারা ভারতের ভোটারদের আস্থা আছে এমন কোন দল বলতে আর কেউ বাকি নাই। আর একটু এগিয়ে বললে তাহলে এখন কিসের দিন? অর্থাৎ কিসের ভিত্তিত্ব সরকার গঠন হয় বা হবে? এর জবাব হবে, এখনকার ভোট দেয়া ও সরকার গঠনে সমর্থ হওয়ার অভিমুখ হল সঠিক “জোট” টা গড়া। কিন্তু কার সাথে কার জোট? ভারতে সর্বভারতীয় বা ভারত-জুড়ে আছে এমন দল আছে মাত্র দুটা, আর তারা পরস্পর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি – বিজেপি ও কংগ্রেস। কাজেই এদের দুইয়ের মধ্যে জোট হবার প্রশ্নই আসে না, তা বলা হচ্ছে না। তাহলে জোট কাদের সাথে?

ভারতে আঞ্চলিক বা রিজিওনাল দল কথাটার মানে হল ঠিক কোন অঞ্চল নয় আসলে সেগুলো একেকটা রাজ্যভিত্তিক (প্রাদেশিক) দল। যেমন মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এর ততপরতা নাই বললেই চলে, অন্তত প্রার্থী দিবার মত অবস্থা নাই। এভাবে  ২৯ রাজ্যের ভারতে, প্রায় প্রত্যেক রাজ্যেই অন্তত দুই বা এর বেশি সংখ্যক আঞ্চলিক দল আছে। এরা মূলত প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনেও এরা দাঁড়িয়ে গিয়ে বিপর্যয় তৈরি করে ফেলতে পারে, ফেলে থাকে। বিশেষত এমন আঞ্চলিক দলগুলো যারা রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় থাকে। তাই তাদের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে বড় আসন পেয়ে যাবার সম্ভাবনাও তৈরি থাকে। যেমন তৃণমুল গত ২০১৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ মোট ৪২ আসনের মধ্যে ৩৪টাই পেয়েছিল। এ’কারণে আঞ্চলিক দলগুলোকে -কংগ্রেস না বিজেপি- কে আগে নিজের জোটে জুড়ে নিবে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কংগ্রেসের এমন জোটের নাম ইউপিএ [United Progressive Alliance, UPA] আর বিজেপির এমন জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance, NDA]। ভারতের নির্বাচনি রাজনীতির এই ঝোঁক একেই প্রণয় রায় বলছেন ভোটের চেয়েও সঠিক “জোট” গড়তে পারা – এটা বেশি নির্ধারক। ভারতে রাজনীতির এই নতুন ঝোঁক তৈরি ও তা স্থায়ী হয়ে গেছে সেই ১৯৮৫ সাল থেকে।

এজন্য বলা হচ্ছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকেই ভারতজুড়ে দল বলতে কংগ্রেস বা বিজেপির একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আসার দিন শেষ হয়েছে। আর শুরু হয়েছে, তাই “জোটের” সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসার দিন।  কিন্তু এই নতুন ধারাবাহিকতাতেও গতবার  মানে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস আর এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। ভোট পরিসংখ্যান বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি একা তো নয়ই, জোট হিসাবে ক্ষমতায় যেতে চাইলেও নিজ দলকে নুন্যতম কিছু আসন পেতেই হয়। এপর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে সেই সংখ্যাটা হল ১১৫। আর এই বিচারে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস নিজে পেয়েছিল মাত্র ৩৮ আসন আর, জোট হিসেবে সর্বনিম্ন, মাত্র ৬০ আসন। অর্থাৎ কংগ্রেসের ঝোঁক এবার আরও পতনের দিকে। আর ওদিকে এবারের চলতি নির্বাচন থেকে একইভাবে বিজেপিরও পতন শুরু হয়ে যেতে পারে।

তাই যদি এবারও কংগ্রেসের এই ট্রেন্ড অব্যাহত থাকে, তবে সেটা হবে জোট হিসাবেও কংগ্রেস আর লায়েক থাকবে না, এমন স্থায়ী পতন। অর্থাৎ আঞ্চলিক দলগুলোও আর কংগ্রেসের সাথে কোন জোট করতে চাইবে না। নতুন সেই অভিমুখের অর্থ হবে আঞ্চলিক দল বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দল – এমন ছোট দলগুলোই এবার উল্টা বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে না নিয়ে নিজেরা নিজেরাই জোট সরকার গঠন করার শুরুর দিন। কলকাতার মমতার ভাষায় এটাই, “ফেডারেল ফ্রন্ট” এর সরকার গড়া। এই রচনার শুরুতে যে ছবি ব্যবহৃত হয়েছে তাতে, তৃতীয় ফ্রন্ট বা থার্ড ফ্রন্ট বলতে এর কথাই বুঝানো হয়েছে। এদিকটাই আরেক ভাষায় আমলে নিয়ে প্রণব রায় বলছেন ভারতের এবার “এটা কোন জাতীয় নির্বাচন নয়”। বরং এটা হল রাজ্যগুলোর এক ফেডারেশনের নির্বাচন। [“2019 is not a national election at all, it’s a federation of states election,”]। মমতার “ফেডারল” শব্দের সাথে মিলের দিকটা লক্ষ্যণীয়।

বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রণয় রায়ের তৃতীয় মন্তব্য ছিল সরাসরি কংগ্রেস সম্পর্কে; এবং বলা বাহুল্য তা খুবই করুণ! তিনি বলছেন, ‘কংগ্রেস সম্ভবত ২০৫০ সালের নির্বাচনের কথা চিন্তা করে এবারের নির্বাচন লড়ছে”। এ কথার সোজা মানে হল, কংগ্রেস দিশা হারিয়েছে। তাই কারো সাথে জোট করতে চাচ্ছে না, বুঝছে না অথবা পারছে না। এমনকি সম্ভবত অন্যরাও কংগ্রেসকে তাদের জোটে নিলে কোনো লাভ হবে না, কংগ্রেসকে এমন অযোগ্য দল মনে করছে। তবে প্রণয় সব কারণের জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করছেন। বলতে চাইছেন কংগ্রেসের নিজের ওজন সম্পর্কেই নিজেরই কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা ধারণা নেই। যেন রাহুল দলের সভাপতি হয়ে যাওয়ার পরে তার মনে একটা ভাব এসেছে যে, এবার বাপ-দাদার কংগ্রেসের যুগ ফিরে এসেছে বা আসবেই। অথচ নিজের পায়ের নিচে মাটিই নেই, বেখবর!

ভারতের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে একা উত্তর প্রদেশ এই রাজ্যে সর্বোচ্চ আসন, একমাত্র রাজ্য যেখানে আসন সংখ্যা ৮০টি। এর পরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন অনেক নিচে; তা হলো মহারাষ্ট্র ৪৮, আর এর পরে তৃতীয় সর্বোচ্চ পশ্চিমবঙ্গ ৪২, এভাবে। অর্থাৎ উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে খুবই নির্ধারক, গত নির্বাচনে একা বিজেপিই এখানে পেয়েছিল ৭২টি। অর্থাৎ একা এখানে বেশি আসন পাওয়ার সাথে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারা সম্পর্কিত ফেনোমেনা। সেই উত্তর প্রদেশে এবার দুই প্রধান আঞ্চলিক দল [এসপি (সমাজবাদী পার্টি) আর বিএসপি (বহুজন সমাজবাদী পার্টি)] যারা মূলত গরিব, অন্তজ, দলিত ও মুসলমানদেরকে প্রতিনিধিত্ব করে, – ঠাকুরদের বিরুদ্ধে যাদব-  এমন দল। এরা সবার আগে এবার নিজেরাই বিজেপিকে ঠেকাতে প্রথম কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে জোট বাঁধে। প্রত্যেকে সমান ৩৮ আসন নিয়ে দুদলে মোট ৭৬। আর বাকি চারের কংগ্রেস নিতে চাইলে দু’টি গান্ধী পরিবারের মা-ছেলের জন্য। আর অন্য দু’টি আর এক ছোট আঞ্চলিক দলের (রাষ্ট্রীয় লোকদল) জন্য। এই জোট গড়তে সবচেয়ে নমনীয় হল সমাজবাদী পার্টি। তাই নিজের ভাগের ৩৮ সিট থেকে সে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার আগ্রহ যে দেখাতে পারছে।

কিন্তু মূল কথা যেটা, বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়ে সব রাজ্যেই এক “জোট” গড়তে না পারার জন্য আঞ্চলিক দলগুলো মূলত দায়ী করছে কংগ্রেসকে। কারও পাটাতনে না দাঁড়িয়ে উপর থেকে দেখলে, খুব সম্ভবত আসল জটিলতাটা হল – কংগ্রেসের স্বার্থের সাথে প্রতিটি আঞ্চলিক দলের স্বার্থই সঙ্ঘাতমূলক। অন্তত কংগ্রেস সেখান থেকেই দেখছে। এ ছাড়া সাথে আরও আছে কংগ্রেসের নিজের সম্পর্কে অতি-মূল্যায়ন। ফলে এ জন্য কোনো আঞ্চলিক দলের সাথেই এবার কংগ্রেসের কোনো রাজ্যে কোনো আসন সমঝোতা করতে সক্ষম হয়নি। যেমন এখন রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন দিল্লিতে এমন আঞ্চলিক দল হল আম আদমি পার্টি, ওদিকে কলকাতা, কেরালা বা ত্রিপুরায়  এমন দল হল সিপিএম, পাঞ্জাবেও প্রভাব আছে এমন দল আম আদমি, এছাড়া আর উত্তর প্রদেশের অবস্থা তো জানলাম উপরে ইত্যাদি; এভাবে আঞ্চলিক দলগুলো সকলে কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ। কারণ কোথাও কংগ্রেসের সাথে কারো শেষ পর্যন্ত কোনো জোট, বা আসন ভাগাভাগি হয়নি। এমনকি উত্তর প্রদেশে এসপি আর বিএসপির জোট ঘোষিত হওয়ার পরে সেটাকেও উপেক্ষায় এরপরেও আবার কংগ্রেস ঘোষণা করেছিল যে, রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা এবার প্রথম নির্বাচন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল, তাতে কংগ্রেস সবখানেই এবার একা নির্বাচন করছে। আবার প্রিয়াঙ্কার নিজে নির্বাচন করাও অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে যার সোজা মানে হল, কংগ্রেসের একা চলার এমন ততপরতার কারণে  এবার সবখানেই বিজেপি-বিরোধী ভোটগুলো কংগ্রেসের কারণেই সবচেয়ে বেশি ভাগ হবে। যার পুরা সুফলটা ভোগ করবে বিজেপি। এজন্য অনেকে টিটকিরি দিয়ে বলছে প্রিয়াংকার আগমনটা মূলত মোদীকে সহায়তা করতে।

অর্থাৎ কংগ্রেস যত আঞ্চলিক দলগুলোর ভোট কাটবে ঠিক তত ভোটই বিজেপির এগিয়ে যাবে। আর ততটাই বিজেপির জন্য তা সুবিধা বয়ে আনবে। এমনকি কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও মারাত্মক। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তর প্রদেশের ৩০টি আসনে কংগ্রেস একক ও শক্ত প্রার্থী দিবে, তাদের নাকি বিপুল সম্ভাবনা। মানে ওই ৩০ আসনে সে ‘শক্ত’ করে ভোট নষ্ট করবে আর বাকি ৫০টি আসনে ‘দুর্বল’ভাবে নষ্ট করবে। এ কারণে কংগ্রেসের এবারের ভোট কৌশলের কোনো তাল নেই বেতাল দশা; উদ্দেশ্যবিহীনের মতো আচরণ করছে কংগ্রেস। এ দিকটা খেয়াল করে প্রণয় রায় বলছেন সঠিকভাবে “জোট” করা যেখানে জেতার জন্য নির্ধারক বিষয়, কংগ্রেস সেখানে ততটাই যেন বেখবর, ভবঘুরে। তাই কংগ্রেসের লক্ষ্য চলতি ২০১৯ সাল না যেন সুদুর ২০৫০ সালের নির্বাচনের লক্ষ্যে এক অস্পষ্ট সময়ের দিকে তাকিয়ে কংগ্রেসের সব সিদ্ধান্ত।

প্রণয় রায়ের তিন মন্তব্য নিয়ে কথা শেষ, এখন অন্যান্য প্রসঙ্গ। ভারতের নির্বাচন তাই স্বভাবতই আমরা অনেকেই আগ্রহ নিয়ে সময় দিব, জানতে চাইব। বিশেষ করে নানান কারণ যারা আবার নিয়মিত ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিক-অভিমুখ জানতে ততটা সময় দিতে পারিনি, তারাও এখন জানতে চাইব। সব নির্বাচনেই মূল দু’টি দল থাকে, অনেকটা আমাদের লীগ-বিএনপির মত। আর ভারতের এমন দুই দল হল বিজেপি ও কংগ্রেস। এটাই আমাদের বহু পুরনো সময় থেকে চেনা ধারণা। কিন্তু সরি! এবার এই অনুমান নিয়ে ভারতের নির্বাচন বুঝতে গেলে সব হিসাবে ভুল হবে। কেন?

Source: Election Commission data | Shivam Vij/ThePrint

গত প্রায় ৩০ বছরের (১৯৮৪-২০১৪) একটা ভোটের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ বলছে, যে আসন কখনো কংগ্রেস হারাচ্ছে তা বিজেপি বা আঞ্চলিক দল পাচ্ছে; বেশি সময়ে বিজেপি পাচ্ছে। কিন্তু বিজেপি যে সিট হারাচ্ছে তা কংগ্রেস ফিরে পাচ্ছেই না। বেশির ভাগই আঞ্চলিক দল পাচ্ছে। তাই আগ্রহিরা এই খবর অনুসরণ করতে পারেন যে বলছে – ২০১৯ সালের নির্বাচন থেকে “কংগ্রেসমুক্ত ভারত” – বিজেপির এই শ্লোগান বাস্তবে ত্বরান্বিত হয়ে উঠতে পারে।

এর সোজা মানে হল, বিজেপির বিকল্প দল বলতে সেটা আর কংগ্রেস নয়, আঞ্চলিক দল। এক কথায় আঞ্চলিক দলের প্রভাব ক্রমশ বড় করে বেড়ে চলা – এটাই ভারতের রাজনীতির মূল অভিমুখ। আর এটাই কংগ্রেসের কথিত অনুমিত স্বার্থের সাথে প্রত্যেক আঞ্চলিক দলের অনুভূত স্বার্থবিরোধ অথবা বিজেপি-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কারো সাথেই কংগ্রেসের জোট না হওয়া। তাই এবার বিজেপি ফল খারাপ করলে এর অর্থ কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে তা নয়। এবারো তা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর মমতা ঠিক এই কারণের বেশির ভাগ আঞ্চলিক দলের কংগ্রেসবিরোধিতার ভোকাল মুখপাত্র। ভোট চাইতে গিয়ে তিনি পাবলিক মঞ্চে উঠে সরাসরি বলছেন, কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। প্রবল উত্তেজিত মমতার আরো একধাপ এগিয়ে দাবি এবার বিজেপি ১০০ আসনও পাবে না: মমতা।

জনমত সমীক্ষা
ভারতের নির্বাচনের ফল সম্পর্কে জনমতের সমীক্ষা (বা বুথ ফেরত ভোটার সমীক্ষা) চালিয়ে আগাম অনুমান করা সব সময় খুবই কঠিন একটা কাজ। এর মূল কারণ বিপুলসংখ্যক ভোটার (প্রায় ১০০ কোটি) যার তুলনায় স্যাম্পল সাইজ যত বড় আর ছড়ানো হওয়া উচিত তা না হওয়া বা নেয়া। তবুও এই নির্বাচনের ভারতের অন্তত পাঁচটা সমীক্ষা গ্রুপের কথা জানা যায়, যারা গত বছর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে (মোদির পক্ষে) সে অনুমান দিয়ে যাচ্ছে। আগে যাই থাক, গত ১৯ মার্চ এমনই এক অনুমিত গণনা রিপোর্ট বলে চলছিল বিজেপির-বন্ধু জোট আবার সরকার গঠন করে ফেলবে ২৮৩ আসন পেয়ে।

এই জনমত সমীক্ষা চালিয়েছিল “টাইমস নাউ ও ভিএমআর”। যারা অবশ্য প্রো-বিজেপি সমীক্ষা গ্রুপ বলে প্রচার আছে। আমরা লক্ষ্য করছি এদের প্রচারটাই আমাদের প্রথম আলোতে বেশি আসছে। কিন্তু ১১ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে সবার হাতে আর অনুমিত ডাটা নয়, অন্তত মোট ভোট প্রদানের শতকরা হার কত সে ফ্যাক্টস এখন প্রকাশিত। এর ফলে দেখা গেছে অন্তত দু’টি সমীক্ষা গ্রুপ এখন পিছু হটছে। এমনই একটা গ্রুপ ‘সিএসডিএস’ তাদের প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হল, ‘প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি কী অসুবিধায় পড়ছে?’ [Is it disadvantage BJP post first phase polling?] তারা এবার বিশ্লেষণে বলছে, প্রথম পর্যায়ে উত্তর প্রদেশের আট আসনে নির্বাচন হয়েছে। যার দু’টি বাদে বাকি ছয়টাতে বিজেপির অবস্থা খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা, যেখানে গত ২০১৪-তে এই আট আসনই বিজেপির ছিল। এখানে এবার ভোট প্রদানের হার কম আর ওই ছয়টা আসনেই মুসলমান ভোটার সংখ্যায় আধিক্য বলে এই যুক্তি তুলে এরা এখন সরে এসে বলছে- এই আট আসনের ছয়টাতেই বিজেপি খারাপ করবে।……the BJP would be down six in UP in the first round.

একইভাবে আরেক সমীক্ষা গ্রুপ ‘সি-ভোটার’- যারা মোদির ‘পাবলিক রেটিং’ কেমন যাচ্ছে তা নিয়ে কথা বলে এসেছে। আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি এরা দাবি করেছিল পাকিস্তানে কথিত ‘বিমান হামলা’ করে আসাতে মোদির রেটিং বেড়ে ৬২ শতাংশ হয়েছিল। এরপর এক মাসে তা অল্প করে কমলেও তা হয়েছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর এবার তারা বলছে, সেটা আরো কমে এবার ৪৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মোদির গ্রহণযোগ্যতা এখন ১৯ শতাংশই কমে গেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটপ্রদান অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত ১৮ এপ্রিল। তাতেও দেখা গেছে ভোট প্রদানের হার ২০১৪ সালের চেয়ে বাড়েনি, তবে অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। [On 7 March, the Modi government’s approval rating was at 62.06 percent. Despite a minor decrease it remained in the 50s till 22 March. But on 12 April, a day after the first phase of polling, the Modi government’s approval rating had fallen to 43.25 percent, a fall of almost 19 percent in about five weeks.] মোটকথা সমীক্ষা গ্রুপগুলোই আর জোর দিয়ে মোদির সম্ভাব্য ভালো ফল করার কথা বলতে চাচ্ছে না। তাতে আসল ফলাফল আগামী মাসে যাই আসুক না কেন।

এই নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য তার আশা কী? তার আশা হবে এই লেখার শুরুতে যে ছবি তৃতীয় শক্তি বা ফেডারল ফ্রন্টের কথা বলা হয়েছে এর সাফল্য ও বিজয়। এতে  নাগরিকদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ভারত রাষ্ট্র কোন কোটারি নয়, কোন ভুতুড়ে ক্ষমতার “কেন্দ্র” এর রাষ্ট্র নয় – এই বিচারে এখানকার চেয়ে তুলনায় ভাল গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র হবে। দানব ভারত, হিন্দুত্বের ভারতের বদলে এর তুলনামূলক গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে।  তার তাতেই বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২০ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের নির্বাচনে কী হচ্ছে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বফিরানোর খোয়াব

গৌতম দাস

১৮ মার্চ ২০১৯, সোমবার ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yu

The judge ruled images of the suspect in court must blur his face. Photo: Mark Mitchell-Pool/Getty Images,  from this link.

প্রায় লাগোয়া দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ নিউজিল্যান্ড। এর উত্তরের দ্বীপে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী শহর ওয়েলিংটন আর দক্ষিণের দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ক্রাইস্টচার্চ [Christchurch]। এবার ১৫ মার্চ ২০১৯, সেই ক্রাইস্টচার্চ উঠে আসে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া শিরোনামে – “মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা”। শহরের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে আসতে ১০ মিনিট লাগে এমন দুরত্বে দুটো মসজিদ আছে – আল নুর [Al Noor Mosque] আর লিনউড [Linwood mosque] মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় একের পরে অন্যটায় পরপর, হামলাকারী মারাত্মক ও বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা চালায়।  মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম ‘ব্রেনটন ট্যারান্ট’ [Brenton Tarrant]। সে মূলত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে প্রায়ই পাশের নিউজিল্যান্ডে আসেন। চিন্তার দিক থেকে “খ্রিষ্টান এবং ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা চামড়ার লোকদের কথিত শ্রেষ্ঠত্বে” বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ব্রেনটনের পরিচয় হল – ২৮ বছর বয়সী এই সাদাচামড়ার পুরুষ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারের [28-year-old white male from a low-income, working-class family]। আর সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৪৯ জন ইতোমধ্যেই মৃত, আরো প্রায় ২০ জন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মিডিয়ায় বলছেন, ‘এটা খুবই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ [“well-planned terrorist attack”]।

Jacinda Ardern, prime minister of New Zealand, described the shootings as a “well-planned terrorist attack”, and said this is one of the country’s “darkest days”..

অর্থাৎ আমরা দেখলাম তিনি এখানে “মুসলমানেরাই ভিকটিম” বলে এটাকে ‘টেররিজম’ বলবেন কি না এমন দ্বিধা দেখাননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এটাকে “সন্ত্রাসী হামলা’ [extremist terrorist attack] বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতিতে এটাকে “টেররিজম” বলা হয়েছে। এমনকি ভারতের বিদেশমন্ত্রী বা কানাডার সরকারও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে “খুবই পরিকল্পিত” [well-planned] বলছেন কেন? আর একটা বিশেষ দিক হল, এই হামলার পুরো সময় ১৭ থেকে ২০ মিনিটের; যার ১৭ মিনিটেরই লাইভ শো ফেসবুকে অন-লাইনে দেখানো হয়েছে। আর তা এমন ভয়ডর-পরোয়াহীন তাণ্ডব যে, রাইফেলের মাথায় বসানো ক্যামেরা থেকে নেয়া অনলাইন লাইভ ছবি নামাজ পড়তে আসা অসহায় মুসল্লিদের প্রতি গুলি ছোড়ার লাইভ ছবি – সাথে সাথেই ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল। এ ছবিগুলো যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তা এএফপি নিজেরা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করে [AFP determined the video was genuine] এই রিপোর্ট ছেপেছে।

হামলাকারী কে বা কারা? তাদের রাজনৈতিক বা চিন্তাগত পরিচয় কী? পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা মোট চারজন, যার তিনজনই সম্ভাব্য সহযোগী। আর চতুর্থজন যে দৃশ্যমান হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হামলার পরই এবং মানুষ হত্যার মামলায় অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অন্যদের নিয়ে তদন্ত চলছে। গত ২০১১ সালে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষ হত্যা করেছিল এন্ডার্স ব্রেইভিক [Anders Breivik]। হামলাকারী ব্রেনটনের পছন্দের ব্যক্তিত্ব যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানিয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির একজন হলেন এই ব্রেইভিক আর অন্যজন হলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ব্রেনটন এই দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের চিন্তা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। অনুমান করা যায়, এর মূল কারণ এরা দু’জনই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white supremacist] চিন্তা ধারণ করেন।

White Supremacist কারা?
“দুনিয়ায় সাদাচামড়ার লোকেদের শাসন-কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে কারণ সেটা ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ যুগ” – এই বক্তব্য বিশ্বাসে চলা পাশ্চাত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক গ্রুপ এরা।  মূলত এরা ইনসাফ বা ন্যায়-অন্যায় মুল্যবোধ থেকে বিচার করে পথ চলে না, এমনই মানুষ। “আমি আর এক মানুষের সহায়-সম্পত্তি বা ওর পুরা দেশটাই দখল করে নিব – কারণ আমি সুপার – আমি ক্ষমতাবান, বলশালী” – এই সাফাই বয়ানের উপর দাঁড়ানো এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তারা বলতে চায় পশ্চিমের সাদা চামড়ার লোকেরা আমরা এটাই করে এসেছি, কলোনি দখল করেছি, দুনিয়া লুটে শাসন করেছি, দাবড়ায় রেখেছি – কাজেই আমরা শ্রেষ্ট। তাই আবার “সেদিন” ফেরত আনতে হবে। তাদের মুল বক্তব্য এটাই।  এক ধরণের ‘সাদাদের ক্ষমতা’ বা হোয়াইট পাওয়ারের [White Power] পুজারি তাঁরা।
এছাড়া এরা দাবি করে তারা মাইগ্রেন্টবিরোধী। মানে গরিব দেশ থেকে মানুষের (যুদ্ধের শরণার্থী হওয়াসহ) নানা কারণে পশ্চিমের দেশে বসবাস করতে আসাকে (ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট) অনুমোদন দেয়ার এরা তীব্র বিরোধী।
কোন তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ না থাকলেও এরা প্রচার প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসেন যে মাইগ্রেন্টরা “নোংরা”, এরা তাদের শহর নোংরা করে থাকে আর শহরে সব অপরাধের জন্য দায়ী হল এই মাইগ্রেন্টরা। এককথায় যারা তাদের মত নয় এমন “অপর” [other] যেকোন মানুষই নিকৃষ্ট, খারাপ। তাদের আচার আচরণ কালচার সব খারাপ। শুধু তাই না।  এখানে  হোয়াইট-সুপ্রিমিস্টদের পরিচয়ের আর এক অর্থ আছে। তারা বিশ্বাস করে সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠিরা ছাড়া বাকি অন্যেরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। আর তাতে কোন সাদা চামড়ার দেশে এরা সহজেই তাদের ছাড়িয়ে জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যায়। (মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের মোদীর বিজেপি-আরএসএস সংগঠন ও তাদের কর্মীদের বিশ্বাস ও ভাষ্যও প্রায় একই রকম মিল দেখতে পাওয়া যায়।) তাই, সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠি ছাড়া এমন “অপর” লোকেদেরকে বুঝাতে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকে – “ইনভেডর” [invader] – মানে অনুপ্রবেশকারি-দখলদার। হামলাকারি ব্রেনটন ও তাঁর বন্ধুরা কথিত অনুপ্রবেশকারিদেরকে হত্যা করা তাদের টার্গেট ও একাজ জায়েজ মনে করে থাকে। যদিও এরা সাধারণভাবে “ইনভেডর” বলে ডাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা ইনভেডর বলতে মূলত কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই বুঝিয়েছে। অনেকটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর  মত। আমরা মনে রাখতে পারি, তিনি ও তাঁর দল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত মাইগ্রেন্টদের “মুসলমান” এবং কখনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা “তেলাপোকা” ইত্যাদি মানুষের জন্য অমর্যাদাকর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

হামলাকারি ব্রেনটন সম্পর্কে উপরের এতকিছু তথ্য জানার উপায় বা উতস কী? হামলা ঘটে যাবার পরে ব্রেনটন সম্পর্কে খোঁজ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি [AFP] আমাদের জানাচ্ছে যে, এক মাস ধরে ফেসবুক ও টুইটারে ব্রেন্টন একটা গ্রুপ হিসেবে প্রকাশ্যেই সক্রিয় ছিল। [The Twitter profile had 63 tweets, 218 followers and was created last month.] ‘যে কেউ’ বা এনোনিমাস হিসেবে তারা একটা গ্রুপ চালিয়ে গেছে, যে গ্রুপের নাম ‘8chan’ ফোরাম [Politically Incorrect” forum on 8chan, a online discussion site ]। এই গ্রুপ যে খুলেছে, তার নাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের নাম। একই ‘মালিক’ হিসেবে একই নামে এক টুইটার অ্যাকাউন্টও [@brentontarrant] আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলার পুরো বর্ণনা এখান থেকেই প্রচারে দেয়া হয়েছে। কেন এই হামলা তা বিস্তারে বর্ণনা করতে তাদের ‘ম্যানিফেস্টো’ বলে ৭৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এই সাইট থেকে নামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ ডকুমেন্টের শিরোনাম হল- ‘The Great Replacement’ বলা হয়েছে, এই ম্যানিফেস্টো লিখতে প্রণোদনাদাতাদের নাম হল ‘হোয়াইট জেনোসাইড’। মানে এরা নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে ডাকছে। সাধারণত ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা’ নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে থাকে। এ ছাড়া, নিজেদের বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কিছু শব্দ ও ধারণা যেমন, ডাইভারসিটি (Diversity বা বহুমুখিতা) বা মাল্টিকালচারিজমের [Multi-culturalism বা সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা] এসবের ঘোরতর বিরোধী বলে দাবি করে থাকে।

ডাইভারসিটি বা মাল্টিকালচারিজম ধারণার এখানে সারকথা হলটা – অনেক ধরণের দেশের ভুগোল ও সংস্কৃতির মানুষের একসাথে এক শহরে এই রাষ্ট্রে এসে বসবাস করা – একই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর ‘বৈষম্যহীন’ এক “নাগরিক সাম্য” বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশনের অধীনে।

এনিয়ে ইউরোপের তর্কবিতর্কের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেন রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ‘মাল্টিকালচারিজম’ মেনে চলা তাদের জন্য সঠিক নীতি বলে মনে করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্স ঘোষিতভাবেই মাল্টিকালচারিজম অপছন্দ করে থাকে। এর বদলে তাদের পছন্দ হল ‘এসিমিলিয়েশন’[assimilation] নীতি। যার বাংলা ও খুলে বলা অর্থ হল – ইংরেজি assimilate (বাংলায় সব-একই-ধরণ বা এককরণ করা) থেকে এসিমিলিয়েশন। এই এসিমিলিয়েশন শব্দের মূল বিষয়টা হল, ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিসহ সব কলোনি-দখলদারেরা আমাদের মত দেশকে এককালে কলোনি বানিয়ে, দখল করে লুটতে গিয়েছিল। পরবর্তিতে সেই সূত্রে আবার সস্তা শ্রম পাওয়ার লোভে তারা আমাদেরকে (কালো চামড়ার নেটিভদেরকে) কালক্রমে নিজ নিজ ইউরোপীয় দেশেও নিয়ে গিয়েছিল। “নেটিভরা” একসময়ে কলোনি মালিকের দেশেই তারা স্থায়ীভাবে পরিবারসহ  নাগরিক হিসাবে বসবাসও শুরু করেছিল। কারণ যেমন কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়াকে কার্যত মূল বৃটিশ ভুমিরই এক্সটেনশন মনে করা হত। কিন্তু একালে এসে ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়াতে ব্যবসা বানিজ্যের ভাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এই নেটিভরাই তখন চক্ষুশুল হয়ে গেলে যা হয়, তাই। কলোনি মালিকের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের দেশে যাওয়া নেটিভদেরকেই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বি গণ্য করছে। এই ব্যাপারটা বৃটিশেরা যেমন সহনীয়ভাবে দেখে ফরাসীরা তেমন নয়। তাই ফরাসি নীতি হল, নেটিভদের সবাইকেই ফরাসি কালচারই অনুসরণ করতে হবে। নেটিভরা নিজ দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্তন হতে হবে। তদুপরি, নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্ম পালনও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্তন হয়ে পালন করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই । ফরাসি দেশে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ এ ‘যুক্তি’তেই। জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে,নেটিভেরা নিজ দেশ থেকে আনা শুধু সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্থন হতে হবে তাই না। নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্মপালনটাও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্থন হয়ে করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই assimilation নীতি। যেমন ফরাসি দেশে বোরখা পড়া আইনত নিষিদ্ধ, এই যুক্তিতেই। এটাকেই ফরাসি রাষ্ট্র তার “এসিমিলিয়েশন” এর নীতি বলে সাফাই দিয়ে চলে থাকে। এই দুই নীতির তুলনা নিয়ে গত ২০১৫ সালে আমার এক পুরানা লেখা এখানে সময় করে আবার পড়তে পারেন।

হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা হিটলারেরও ভক্ত। যেমন এরা হিটলার বা তার সংগঠন নাৎসি পার্টির নানান চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে থাকে। হিটলারের বাণী নিজেরা পুনর্ব্যবহার করে। হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের রাইফেলের গায়ে এর ওপরে কমপক্ষে ছয়টা নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আঁকা আছে। এর একটি হল, ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ (Fourteen Words) চৌদ্দ শব্দের এক বাণী। আর তা হল – আমাদেরকে অবশ্যই “আমাদের মানুষের” অস্তিত্ব ও আমাদের “সাদা সন্তানদের” ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে। [“We must secure the existence of our people and a future for white children.”]।  এটাকে অনেকে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের একটা মূল ‘মন্ত্র’ বলে থাকে। এখানে ‘our people’ বা ‘white children’ বলে এরা বর্ণবিদ্বেষ জাগানোর চেষ্টা করে থাকে।

ব্রেন্টনের মত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা বলতে চায় তারা মাইগ্রেশনবিরোধীকিন্তু আসলেই কি তাই?
আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড এসব রাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা কারা? আর কারা এর অবৈধ দখলদার? অথবা তাঁদের ভাষায় অনুপ্রবেশকারি-দখলদার? নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী [aborigine] হল ‘মাউরি’-রা [Māori]। ইউরোপ থেকে বিশেষত ডাচ বণিক ‘আবেল তাসমান’ [Abel Janszoon Tasman] প্রথম ইউরোপীয়, যিনি মাউরি সভ্যতা ও এর ভূমির সন্ধান পাওয়ায় (১৬৪২) পরবর্তী সময়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নাম দিয়ে দখল করে, কালক্রমে নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের কলোনি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে ইউরোপীয় সাদা চামড়ার লোকজনই কি অনুপ্রবেশকারী-দখলদার নয়? হামলাকারী ব্রেনটন নিজেই (বা তাঁর পূর্বপ্রজন্ম) অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের আসল অনুপ্রবেশকারী-দখলদার। অতএব, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিজেকে না বলে (মুসলমানসহ) অন্য কাউকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা প্রহসন মাত্র। ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানদেরকে “হোয়াইট জেনোসাইডার” ব্রেনটন এর বিদেশি বা তথাকত্থিত “মাইগ্রেশনবিরোধীতার” তামাশা হল এটাই যে খোদ মাইগ্রেন্ট মাইগ্রেশনবিরোধীতার ভান করতে নেমে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে।

তবে এখানে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে যে বুশ-ব্লেয়ারের “ওয়ার অন টেরর” আর হোয়াইট বা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামার” উত্থান  – এদুটো একই ফেনোমেনা নয়। বরং একেবারেই আলাদা। তবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামাকারিরা” ইচ্ছা করে ইনভেডর বা অনুপ্রবেশকারী-দখলদার বলতে কথাটা সংকীর্ণ করে কেবল “মুসলমান” বুঝাচ্ছে – যাতে তারা খ্রীশ্চান-পশ্চিমাবাসীদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করা সহজ হয়।

সারকথা : আমাদের যথেষ্ট মাথা তুলে যেটা দেখতে হবে যে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান কেন এখন দেখা যাচ্ছে? তারা অটোমানদের সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা অথবা ইউরোপিয়ান খ্রিশ্চানিটির জেরুসালেম দখল চেষ্টার অতীত লড়াইগুলোকে এখন কেন রেফারেন্সে আনছে?

আমরা গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটা পর্বে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম পর্ব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। যেটাকে “কলোনি অর্থনীতির যুগ” বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্ব হল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে গত শতাব্দী (বিশ শতক) পর্যন্ত, যেটা  আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্লোবাল অর্থনীতির যুগ”। আর তৃতীয় পর্বকে বলা যায়, চলতি শতকে আমেরিকান নেতাগিরির পতন আর ক্রমেই সেই জায়গা নিতে “চীনের উত্থিত গ্লোবাল নেতৃত্ব”।

পশ্চিমের, বিশেষত ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চলছে কি না তা বুঝবার সহজ তরিকা বা নির্ণায়ক হল – মাইগ্রান্ট ইস্যু। অর্থনীতি ভাল চললে দেখা যাবে, তারা সবাই ভুলে যায় যে মাইগ্রান্ট তাদের একটি সমস্যা। কারণ, তখন পশ্চিমের বাড়তি শ্রম দরকার; ফলে মাইগ্রান্ট শ্রমিক খুব দরকারি। আবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলেই মাইগ্রান্ট বিষয়টিকে মানে, ওই বাড়তি শ্রমের বিষয়টিকে পাশ্চাত্য এক বিরাট সমস্যা মনে করে থাকে। তারা তাদের মধ্যবিত্তদেরকে মাইগ্রান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে উঠায়। অথবা যেমন আমরা এখন ফ্রান্সে দেখছি। ফরাসি নেতা মেরিন লি পেনের National Front পার্টির উগ্র ন্যাশনালিস্টরা (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) তাদের মধ্যবিত্তকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন। তবে তারা আসলে “কী রাজনীতি” করছেন তা বুঝবার কিছু ইঙ্গিত দেয়া যাক। তার দলের দুই ভাইস-প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিপো [Florian Philippot] সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। যা তিনি বলছেন বাধ্য করা হয়েছে। ফিলিপোর দাবি তাদের দলের আভ্যন্তরীণ বিতর্ক আসলে এখন এক সরে যাওয়া ইস্যু। “আমরা আগে আসলে দাবি করতাম এক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। যেটা এখন “মাইগ্রান্ট আর ফরাসি আইডেন্টিটি” – তার এই পুরানা ট্রাডিশনাল অবস্থানকেই মুল রানোইতিক ফোকাস বলে হাজির করেছে। এটা আসলে এক ভয়ঙ্কর পিছনের দিকে পিছলে পড়া”। [Philippot said the debate within the FN about a shift away from his focus on economic nationalism back to its traditional priorities of immigration and French identity were “a terrible backward slide”].
এই বক্তব্য থেকে আমরা “অর্থনৈতিক জাতীবাদ” থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদ কোথায় আলাদা তা বুঝে নিতে পারি।

গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে এসে আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে ইউরোপ এর আগে নিজেদের কলোনি শাসনের অর্থনীতির সমাপ্তি সমর্পণের ঘোষণা দিতে হয়েছিল
এখন চীনা উত্থানের পর্বে এসে ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্স আরেক দফা (তবে এবার আমেরিকাসহ) চীনেরও পেছনে থাকতে শুরু করতে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এই  সাদা চামড়ার আইডেনটিটি- ধরনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। দাবি উঠছে তাদের আগের “কলোনি যুগ” সবচেয়ে ভালো ছিল। কারণ, সেটা ছিল শান-শওকতের যুগ। তাই কলোনি লুণ্ঠনের সেকালে ফিরে যেতে হবে”। ইউরোপের প্রবীণ প্রজন্ম এখন তরুণদের কাছে সাদা চামড়ার সুপ্রিমেসির গল্প শুনিয়ে উসকানি দিচ্ছে।

সময় কখনো পেছনে ফেরে না। যেমন আমরা চাইলেই এখন “দাস-প্রথা” আবার ফিরে দুনিয়াতে চালু করতে পারব না। একইভাবে কলোনি লুণ্ঠন একালে আবার বৈধ বলে দাবি করা, সাদা চামড়ার বর্ণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব একালে আবার ন্যায্য বলে সাফাই গাওয়া- এসব অসম্ভব। দুনিয়ার অভিমুখ আর সেটা নয়। এগারো-বারো শতকের জেরুসালেম দখলের জোশ- ক্রুসেডের সেই উসকানি একালে আবার তৈরি করা, সেটাও অসম্ভব। মডার্ন রাষ্ট্র ও শাসন দুনিয়ায় এসে যাওয়ার পরে পুরনো ‘ক্রুসেড’ আর হবে না। যদি তাই হত তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ব্রিটেন জেরুসালেম দখলের চেষ্টায় বারবার হেরে যাওয়ার শোধ তুলতে আবার ক্রুসেড লড়ে জেরুসালেমের দখল করতে চেষ্টা করত। “কামাল তুনে কামাল কিয়ার” তুরস্ক গড়ার পথে হাঁটত না। বরং আমরা দেখেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রুসেড’ শব্দটি মুখেও আনেনি।

আমরা এখন যেমন চাকরি, পড়াশোনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পশ্চিমমুখী হই। সামনের দিনে ইউরোপীয়দের অন্তত চাকরি বা অধিকতর সুযোগ-সুবিধার জন্য এশিয়ামুখী হয়ে ধাবমান হতে দেখা অসম্ভব নয়। এটাকেই তারা হার মনে করছে। পাশ্চ্যাতের সমাজে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার” নামে অস্থিরতার কারণ এখানেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ কি ফিরবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

গৌতম দাস

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xP

 

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন

গৌতম দাস

১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৭

https://wp.me/p1sCvy-2wt

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে; যার শিরোনাম হল, “সংসদ নির্বাচন: গত দশ বছরের যে পাঁচটি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে”। সেখানে গত ২০০৮ সালের সাথে এখনকার বাংলাদেশের একটা তুলনা টানা হয়েছে- পাঁচটা ইস্যুতে। দাবি করা হয়েছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। বিবিসির চোখে ১০ বছর পরে বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হল – ১. কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২. সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, ৩. বিকাশমান অর্থনীতি, ৪. নয়া প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার বিস্তার, ৫. বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার। তাদের অনুমান হল আমাদের আসন্ন নির্বাচনে এই পরিবর্তগুলো গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চোখে পড়ার মত ঘটনা হল, এক ফাইন মর্নিং বা সুবহে সাদেকে যেন বিবিসি চোখ কচলে ‘আবিষ্কার’ করেছে, বাংলাদেশে নাকি ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। আর এরপর রিপোর্টের বাকি অংশ হল, এই ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ নিয়েই কচকচানি। এসব তৎপরতা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে “কর্তৃত্ববাদী শাসন” চলছে বলে একটা স্বীকারোক্তিকে প্রাধান্যে আনা হয়েছে যেন এতে সংশ্লিষ্টরা এখন এতে নিজেদের দায় ধুয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি ১০ বছর ধরে এই শাসন আনা ও চলার ক্ষেত্রে যেন বিবিসিরও কোনো দায় নেই!এমনকি বিবিসি যার রেফারেন্সে বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে চলে গেলে সেটা হল এক জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক সংগঠন বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন [[Bertelsmann Stiftung]; কিন্তু তাদের রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল গত মার্চ ২০১৮ সালে। এরা গ্লোবে সব রাষ্ট্রের শাসন কেমন সে বিষয়ে স্টাডি করে সুচক তৈরি করে প্রকাশ করে থাকে। তাদের করা স্টাডিও ২০১৫-১৭ সালের। এই দুই বছর ধরে মাঠে সংগ্রহ করে এরপর তা থেকে স্টাডি করে তৈরি রিপোর্ট। দুনিয়ার ১২৯ রাষ্ট্রের উপর করা স্টাডিতে বাংলাদেশের শাসন অবস্থান ছিল ৮০ তম খারাপ অর্থাৎ ৮০ টা রাষ্ট্রের নিচে।

এখানে যদিও বলা হচ্ছে এই পরিবর্তনের সময়কাল “দশ বছর”; অর্থাৎ হাসিনার শাসন কাল। কিন্তু যেকেউ নির্মোহ মুল্যায়ন করতে চাইলে মানবেন যে সত্যিকার ভাবে সাথে জড়িয়ে আছে আর দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ফলে এটা মোট ১২ বছরের। কারণ আসলে পরের ১০ বছর বা হাসিনার কালে যা কিছু হয়েছে, এর সব কিছুর ভিত গাঁথা, অভিমুখ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল ওই দুই বছরের আমলে। কেউ অস্বীকার করবে না যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর ওই দুই বছর আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও যেকোন গভীরে সীমাহীন। তাই সুবিবেচনা করতে চাইলে, লজ্জা বা দ্বিধা ভুলে মোট ১২ বছরের হিসাবই করতে হবে।

ঐ রিপোর্টের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তারা (মানে বিবিসি ও রিপোর্টে ইনপুট দাতারা) কেবল তত্ত্বাবধায়ক শাসনের দুই বছরসহ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের দায় বহন করেন। মানে, ওই সাত বছর যেন তাদের খানিকটা দায় সংশ্লিষ্টতা আছে – সেটা ভাবভঙ্গিতে ও প্রচ্ছন্নে হলেও সেটি কবুল করে কথা বলেছেন। তবে সেটা বুঝা গেলেও বুঝবার কোনো উপায় রাখেননি যে, ঠিক প্রথম কবে থেকে তারা ঠাহর করলেন যে, বাংলাদেশে এক ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। সেটা একেবারে যত্ন করে উহ্য রেখে দিয়েছেন। তবে মূল কথা – বিবিসির এই রিপোর্ট পড়ে আমরা নিশ্চিত যে, তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরের ‘মজা’ ও দায় তারা অন্তত অস্বীকার করছেন না। তবে আসলে মুল কথা যে প্রশ্নের জবাব দূরে থাক প্রশ্নটাই তারা পুরাই লুকিয়ে ফেলেছে তা হল, এই কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম নিল – কারা কারা দায়ী? তত্ববধায়কের গাঁথা ভিত ও ঠিক করা অভিমুখ থেকে কেন “কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম” হল – এই প্রশ্নটাই তারা গায়েব করে দিয়েছে।

বিবিসির চোখে ঐ পাঁচ পরিবর্তনের যা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, তা হল – বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটে যাওয়া। আসলে প্রথম পরিবর্তন ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনের’ সাথে দ্বিতীয়টি সহ-সম্পর্কিত বা কো-রিলেশনাল। এখানে বিবিসি এবং যাদের সাথে আলাপ করে বা ইনপুট নিয়ে তারা রিপোর্টটা তৈরি করেছেন, উভয়ের চোখে ‘ইসলামীকরণ’ – একটা নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ করে বা হয়ে গিয়ে খুব খারাপ হয়েছে – এই আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সবাই কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন এই ইস্যুতে পাল্টা কথা বলব, তখন শব্দটি ব্যবহার করলেও তা নেতি ধরে নেওয়া জরুরি নয়, বরং বর্ণনামূলক অর্থে এর ব্যবহার করব।

আর শব্দটাকে কখনও লিখব ‘ইসলামিস্ট’। যেমন – “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বেড়েছে” – সেটা এই অর্থে যে “রাজনীতিতে ইসলাম” দেখতে চাওয়া সব ধারার সকলে মিলে যারা এরা এখন সবচেয়ে এক বড় গোষ্ঠী; আর এরই বর্ণনামূলক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে বলা যায়, বাংলাদেশে এমন ‘ইসলামিস্টদের’ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। একথাতার সম-উদাহরণ হতে পারে যেমন, সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে নানা ফ্যাঁকড়ার ‘কমিউনিস্ট’, তারা সেযুগে সংখ্যায় ছিল সবচেয়ে বেশি – ঠিক তেমনি একালে ইসলামিস্ট। আবার কমিউনিস্টদের মতই ইসলামিস্টরাও তারা আসলে কী চান, এ ব্যাপারে সবাই একই কথা বলবেন, ব্যাপারটা তা না হলেও – বাংলাদেশের রাজনীতি ইসলাম ছুঁয়ে থাকলে, কি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তা দরকার – এ রকম একটা কথার পক্ষে এরা সবাই একমত হবেন – এমন অনুমান করা যায়। যাই হোক, আমাদের বর্ণনাত্মক ও অ-নেতিবাচক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ বুঝ নিয়েই আমরা নেতিবাচক ‘ইসলামীকরণ’ ধারণা নিয়ে কথা বলব।

আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ১/১১-এর ক্ষমতা দখল পছন্দ বা সমর্থন করেছিলেন কেন? কী সে কারণ ছিল? নীতি নির্ধারকদের পলিসি-চিন্তাকে নিয়ে এই প্রশ্ন করা বা বুঝবুঝির জগতে আলোচনা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান কী ছিল – এর ফরমাল অথবা ইনফরমাল ভাষ্য অথবা উইকিলিকস থেকে জানা ভাষ্য ইত্যাদি নানা কিছু থাকলেও বাস্তবে আমরা যা দেখেছি, সেখান থেকে তেমন এক অভিন্ন ভাষ্য মোটামুটি যা দাঁড়াতে পারে, তাই এখানে বলা হবে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে সে অনুমিত ভাষ্যটা হবে এরকমঃ বাংলাদেশ তার নিজ ভূখণ্ডে গ্লোবাল টেররিজমের প্রভাব প্রতিরোধে, বিএনপি তার শাসন আমলে অনেক করলেও যথেষ্ট করেনি বা সিরিয়াস ছিল নয়। আমেরিকার মত করে সিরিয়াসলি দেখে নাই। এছাড়া, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশকেও প্রতিরোধের রাষ্ট্র হিশাবে সেভাবে গুছিয়ে তৈরি করে নেয়নি। ‘সীমাহীন’ দুর্নীতিও ছিল। তাই দুর্নীতি তাড়ানোর অজুহাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দিতে বাংলাদেশে ঐ সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেছিল, যা আমেরিকার পছন্দ ও সমর্থিত। আলোচনার করার সুবিধার্থে এই ভাষ্যটা ধরে নিয়েই কথা আগাবো।

মানে, খোলাখুলি বলার সুযোগ থাকলে বা আইনি বিপদ ও সমস্যা না থাকলে, ১/১১-এর পক্ষে আমেরিকার অবস্থানের সাফাই মোটামুটি এমনই হত। [এটা আমেরিকার সাফাই ফলে বিএনপিকে এর সাথে একমত হতেই হবে তা নয়।] তার মানে দাঁড়াল, বিবিসির এই রিপোর্টে বাংলাদেশের ১০ বছরকে মূল্যায়ন করে পাঁচ ফ্যাক্টর বা বিপদ নিয়ে কথা বলতে বসেছে, সেই ১০ বছর হল আসলে এরও আগের দুবছরে আমেরিকার ‘তৈরি করে দেয়া’, রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দেয়ার পরের বাংলাদেশ। আর সেই সাথে ওই সাজানো রাষ্ট্র কে চালাবে, তেমন একজন শাসকও আমেরিকা পছন্দ করে তার পিঠে হাত রেখেছিল। ওই শাসক বা পরিচালক ছিল দল হিসেবে হাসিনার [RATS নয়] আওয়ামী লীগ। তবে এটা হতে পারে যে, আমেরিকা শেখ হাসিনার শাসনের ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় পাঁচ বছরের দায় নিয়ে আপত্তি করলেও প্রথম পাঁচ বছরের দায় আমেরিকার; সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।

এবার আমরা দেখব, তাহলে বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুট দেয়া আলোচকদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ”, এর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এর সোজা মানে হল, আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে সাজানো রাষ্ট্র আর শাসক ঠিক করে দিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের ১০ বছরের শাসনে হাসিনা সরকারের ‘টেররিজম মোকাবেলা’ করায় তা খামোশ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে ফলাফলে উল্টো ব্যাপক “ইসলামীকরণ” হয়েছে- এটাই বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুটদাতাদের পর্যবেক্ষণ – তাই নয় কি? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” হয়ে যাওয়া, এই ফেনোমেনা তাদের অপছন্দের; কিন্তু অপছন্দ করলেও এটাই আমেরিকার বেধে নেওয়া নীতি-পলিসি আর বেছে দেয়া শাসক – এসব মিলিয়ে তাদের ঐ শাসনের প্রডাক্ট বা ফলাফল। লক্ষ করতে হবে, ইসলামীকরণ তাদের অপছন্দের ফেনোমেনা কি না সেটার চেয়েও বড় বাস্তবতা হল, এই ‘ইসলামীকরণ’ আমেরিকার নীতি আর মনোনীত শাসকের শাসনেরই (অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের) প্রডাক্ট। কিন্তু কেন এমন প্রডাক্ট বা ফলাফল প্রসব করল আমেরিকার নীতি-পলিসি? সেই প্রশ্ন আর পাল্টা মূল্যায়নে যাওয়া উচিত নয় কী বিবিসি ও তার ইনপুটদাতা আলোচকদের? কিন্তু তারা এদিকে একেবারেই আগ্রহী নয়।

DEEP STATE

What does Deep State mean?

The Deep State is believed to be a clandestine network entrenched inside the government, bureaucracy, intelligence agencies, and other governmental entities. The Deep State supposedly controls state policy behind the scenes, while the democratically-elected process and elected officials are merely figureheads.

এছাড়া, বিবিসি জানিয়েছে আলী রিয়াজের ভাষ্যে বললে ‘ডীপ স্টেট’ হল, “যে কোন পরিস্থিতিতে যখনই রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়, তখন শক্তিপ্রয়োগের ধারা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। তখন যাদেরকে ‘ডীপ স্টেট’ বলে চিহ্ণিত করা হয়, তাদের ভূমিকা বাড়াটা স্বাভাবিক”। পাঠকের সুবিধার জন্য সেটাও এখানে দেয়া হল।

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেটে’ চলে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাকে ওয়েলকাম! কিন্তু এই উপলব্ধি কবে থেকে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। অথচ শুরু থেকেই হাসিনার ক্ষমতার ট্রেন্ড ছিল “ডিপ স্টেটে” বা দানব হওয়ার পথে রওনা দেওয়ার, এটা তো দেখাই যাচ্ছিল। তাই এই যাওয়া আমাদের অনুমান শুরু থেকেই, এটাই তো “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার” নামে ফ্যাসিজম। “মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা-শ্রেণীর’ একনায়কতন্ত্র”। এই জয়ধ্বনিতে, ক্ষমতার বিরোধী বাকি “সকল শ্রেণীকে” গুম-খুন-পঙ্গুতে পিষে দাবড়ে রাখা।

গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনের একটা মূল বৈশিষ্ট্য – তা হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, যেন যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন তিনি এই আড়ালে থেকে এইবার – ইসলামের নামে প্রকাশিত বাংলাদেশের – সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং ততপরতাকে “নির্মুল” করতে গেছে এরা। এই ছিল মুল রাজনৈতিক লাইন। সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক যেকোন ইসলামের নামে প্রকাশিত যেকোন ততপরতাকে “নির্মুল” করতে হবে – এই ছিল লাইন। এটাকেই “যুদ্ধাপরাধের বিচার” করা হচ্ছে এই আড়ালে সম্পন্ন করতে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে এই আড়ালে বসে – ইসলামের নামে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং তৎপরতাকে ‘নির্মূল’ করতে চেয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, এটাই তো বুশ প্রশাসনের (২০০১-৯) ‘টেররিজম’ মোকাবেলা যে, ইসলামের নামে প্রকাশিত ও তৎপর যেকোন ফেনোমেনাকে দমন-নির্মূল করো। আর পরবর্তিতে ২০০৭ সালে এসে কী লাভালাভ হল এই মুল্যায়নে নীতি-নির্ধারকেরা দেখল সব-ভুল। তেমন কিছু অর্জিত হয় নাই। শত্রু কিছুই মরে নাই। উলটা রাষ্ট্র অন্তহীন যুদ্ধে ঢুকে গেছে, মানে যুদ্ধের খরচ বইবার দাইয়ে আটকে গেছে। আর বাড়তি উপহার গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা। তাই বুশ প্রশাসনের টেররিজম নীতি ছিল পরাজয়ের ও অকেজো – সকলে একমত হয়। এরপর থিংকট্যাংক র‌্যান্ডের [RAND] গবেষণা প্রস্তাব [ইতোমধ্যে ২০০৭ সালের শুরুতেই হাতে আসা] অনুসরণ করে বুশ প্রশাসনের শেষ আমলে পুরানা নীতির পথ থেকে সরে ২০০৮ সাল থেকেই বুশ প্রশাসন নতুন ‘টেররিজম’ মোকাবিলার নীতি চালু হয়। পরে ২০০৯ সাল থেকে আরও ভালোভাবে ওবামা প্রশাসন টেররিজম প্রসঙ্গে তাদের নীতি-পলিসিতে বড় সংশোধন আনে। যদিও ইসলামের ‘সশস্ত্র’ ধারাগুলোর বেলায় নীতি মোটা দাগে আগেরটাই থাকে। তবে অন্যান্য ধারা, নিরস্ত্র বা আইনি রাজনৈতিক ধারা – এদের প্রতি সহনশীল এবং একসাথে কাজ করতে হবে। মিসরে হোসনি মোবারককে সরিয়ে নির্বাচনে শাসক ও শাসন বদলানো এবং তাদের সাথে আমেরিকার কাজ করা, এটাই নতুন নীতির (র‍্যান্ড প্রস্তাবের) বৈশিষ্ট্য। টেররিজম নিয়ে আমেরিকার বদলে যাওয়া এই নীতি, এটাই ‘আরব স্প্রিং’ পলিসি বলে পপুলারলি পরিচিত। এসবের বিপরীতে বুশ প্রশাসনের টেররিজমের ‘বাংলাদেশ ভার্সন’ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে থেকে ইসলামের নামে প্রকাশিত সকল সক্রিয় ফেনোমেনাকে নির্মুল ও দমন। আর সুকৌশলে যেকোনো বিরোধী রাজনীতি যেটা ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তাকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দমন-নির্মূল করা। মানে দাঁড়ালো জর্জ বুশের আমেরিকা যে নীতিকে ভুল মেনে সংশোধন করে সরে গেছে বাংলাদেশে সরকার সেই নীতিতে চলেছে। আর ২০০৯ সালের পর থেকে আমেরিকা সেটি উপেক্ষা করে গেছে, দেখেও না দেখে।

আমেরিকার এই অভিজ্ঞতাগুলো তো সকলেরই জানা ছিল। তার মানে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে গত ২০০৯ সালের শুরু থেকেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকারে এই পথই যে নিবে তা আমেরিকার অজানা ছিল না। আর তা মনে করার কোনো কারণও নাই। অথচ তামাশার দিকটি হল – বুশ প্রশাসনের পুরান নীতিটা অনুসরণেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকার পথ নিয়েছিল ।

সেই থেকে ক্ষমতাসীনেরা নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে – উদ্দেশ্য ও কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘ডিপ স্টেটে’ নিয়ে গেছেন। আজ আলী রিয়াজ অভিযোগ করে লিখছেন, “ডিপ স্টেটে” চলে যাবার কথা। বলছেন, বাংলাদেশে “গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা’র ব্যাপক বিস্তার এক ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে”। অথচ সরকার কি এটা ২০০৯ সাল থেকেই শুরু করেনি? শুরুতে এটা কেবল জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনকে প্রবোধ দিয়ে আমেরিকান নীতিনির্ধারক বা থিংকট্যাংকগুলো অন্য দিকে তাকিয়ে এ বিষয়কে উপেক্ষা করে গেছে। কিন্তু এটা কার অজানা যে, হিটলারও শুরুতে তার নাজিজমে নির্মূল তৎপরতা কেবল ইহুদিদের ওপর চালিয়েছিলেন। আর যারা ইহুদি নির্মূল করাকে দেখেও উপেক্ষা করেছিলেন, পরবর্তিতে তারাসহ যাকে হিটলারের শত্রু মনে হত সকলে একইভাবে সকলকে, তাদের সবাইকে নির্মূল করা হয়েছিল। শাসন ‘ডিপ স্টেটে’ চলে গেলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই হয়ে থাকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই আমেরিকার অজানা ছিল না, বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পলিসি কী, সে কোথায় যাবে ও যাচ্ছে। আসল কথাটা হল, ১/১১ ঘটানোর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশকে কোন গন্তব্যে, কোন অভিমুখে যাবে – অর্থাৎ বাংলাদেশের টেররিজম পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকা আর সিরিয়াস থাকে নাই। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমেরিকার কাছে তা অ-গুরুত্বপূর্ণ বা কিছু আসে-যায় না, এমন হয়ে গেছিল। কিন্তু কেন? কারণ, আমেরিকার তার স্বার্থের দিক থেকে আরও গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ দেখতে পেয়েছিল।

বাংলাদেশের টেররিজম ইস্যুর চেয়েও আমেরিকার গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ হাজির হয়েছিল। আমেরিকার যেটাকে দুনিয়াব্যাপী “ওয়ার অন টেরর” বা “টেররিজম ঠেকানো” বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর লক্ষ্যে কাজ করার চেয়েও আমেরিকার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরেক ইস্যু। সেটা হল, ‘চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো’ এই মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতকে কাজ করতে রাজি করানো। বাংলাদেশের টেররিজম নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এর প্রতি ভারতের সমর্থন চাইতে গিয়ে আমেরিকার জন্য নতুন দুয়ার খুলে যায়। ‘চীন ঠেকানো’ হয়ে যায় মুল আলাপের ইস্যু। আর ভারতকে তাতে রাজি করাতে বিনিময় আমেরিকা সওদা করেছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে। এর সাথে অবশ্য ভারত আরও কিছু আদায় করে নিয়েছিল। আমেরিকায় বাজারে নিজের রফতানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে আমেরিকার ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়েছিল। অবশ্য এই সুবিধা ২০১৭ সালের শুরুতে ট্যারিফ আরোপ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রত্যাহার করে নিয়েছে; চুক্তিতেও তাই ছিল।

বাংলাদেশ-ভারত-আমেরিকা কী গত দশ বছর সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম ইস্যুতে একসাথে কাজ করেছে? না সরি; এটা ধরে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, তাহলে এই টেররিজম ইস্যুর সাথে ভারতকে বাংলাদেশের ‘বিনা পয়সা’য় ট্রানজিট দেয়ার কী সম্পর্ক? তা বলতে বা দেখাতে পারতে হবে আগে। কেন ভারত যা চায় তা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের এই নীতি কেন? এটা বাংলাদেশের কোন টেররিজমের, কার টেররিজমের পক্ষে থাকা? কোন বলিদান?
টেররিজমের ইস্যুর আড়ালে আমেরিকা নিজের চীন ঠেকানো ইস্যুতে ভারতকে পাওয়া হাসিল করেছিল। আর আমরা এই সওদার বুটি হয়েছি, আর ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভারতকে সব ধরণের ট্রানজিট দেয়া আর ভারতের দিকে ঝুকে থাকা সরকার কায়েম ইত্যাদি……

আমেরিকা গত ১০ বছর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে একরকম অন্ধ ও উদাসিন হয়ে থেকেছে। আর আমাদের সরকার ‘চেতনার’ শাসনের আড়ালে ইসলাম জঙ্গি দমনের নামে তার ক্ষমতার বিরোধীদের নির্মুল করে চলেছে। রাষ্ট্র তার ফাংশনাল সব প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যাঙ্ক প্রশাসন আদালত সব। তাই এখন বিবিসি ও এর আলোচকেরা গত ১০ বছরে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” বলে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ তুলছেন তা যদি কিছু হয়ে থাকে বা যা যা কিছু হয়েছে – প্রথমত এটা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ আমেরিকা ত টেররিজম মোকাবিলাযোগ্য করে রাষ্ট্র তৈরি করে দিয়েছিল সাথে শাসকও ঠিক করে দিয়েছিল। তাহলে দশ বছর পরে ইসলামিকরণ প্রডাক্ট আসবে না। আর যদি আসে এর জন্য দায়ী কে? এটা কী আমেরিকার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়েই ঘটেছে তা বলা যাবে না! অথচ এরা কেউ বাংলাদেশ সরকার বা আমেরিকার নীতিকে দায়ী করছেন না। আজ হঠাৎ বাংলাদেশ ডিপ স্টেটে চলে গেছে বলে আঙুল তুললেও যেন এর দায় অন্য কারও বলে ব্যাখ্যা দেয়া্র চেষ্টা করছেন। কেন? এটা কি সঠিক? নাকি আমেরিকান পলিসিকে প্রশ্ন করতে হবে, মুরোদ থাকলে পলিসি নির্মাতাদের দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ, সত্যিকার পুনঃমূল্যায়নে যেতে হবে।

মূলকথাটা হল, ভারতের আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’র ঠিকাদারি নেয়াতেই বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে গেল না কোথায় গেল তা নিয়ে আমেরিকার অনাগ্রহের শুরু। আর এসবের ফলাফলেই কালক্রমে আজ আমেরিকাকে পাত্তা না দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ভারত-হাসিনার, দুজনে দুজনার, এমন শাসন হয়ে যাওয়ার গ্রাউন্ড হয়ে দাড়িয়েছিল।

অথচ এক শুভ সকালে বসে আলী রিয়াজ ডিপ স্টেটে চলে যাওয়া বা ইসলামিকরণ – এসব লক্ষ করেছেন করছেন কিন্তু আমেরিকান নীতি ও পদক্ষেপের সাথের এর সম্পর্কের দিকে দেখতে পাচ্ছেন না। যতক্ষণ বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কী এবং কেন – তা না বলতে পারবেন ততদিন এসব আবিস্কার অর্থহীন। যদিও তাতে ইসলামিস্টরা কত খারাপ তা প্রমাণে একে ব্যবহার করা যাবে অবশ্যই।

ওদিকে আর এক বড় কথা, বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করতে চাইছেন। কিন্তু কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করবেন? শুরু থেকেই হাসিনা লাগাতর এক অপ্রয়োজনীয় ইসলামবিদ্বেষী নীতি চালিয়ে গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। অথচ ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ দু’টির মধ্যে ১৯৭১ সালেও কোনো বিরোধ ছিল না। কেউ বিচার এড়ানো যুদ্ধাপরাধী হলে তাকেও সুস্থ পক্ষপাতহীন বিচারপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে কাঠগড়ায় নেয়া যেত। কিন্তু তা বলে যুদ্ধাপরাধীর সাথে ইসলামের কী সম্পর্ক? জামাতের কোন অপরাধ দোষত্রুটি মানে সেটাকে ইসলামের ত্রুটি হিসাবে দেখানো্র ইঙ্গিত করা – এটা তো চরম অসততা। এভাবে কী ইসলামের গায়ে কালি লাগিয়ে দেওয়া যাবে? এটা কী কোন পথ হতে পারে? এর সাথে ইসলামপন্থী রাজনীতি মোকাবিলার পথ ও উপায় হিসাবে একে ব্যবহার করা – এটাই তো চরম ইসলামবিদ্বেষী কাজ। এরচেয়ে আত্মঘাতি কাজ আর কী হতে পারে? এই রাজনীতি তো আজ অথবা কাল নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ ও পরাজিত হবেই।

আর এসব অবিবেচক তৎপরতারই সামাজিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। মানুষ এটাকে সরকারের জুলুম আর চরম বে-ইনসাফি হিশাবে দেখেছে। উলটা ইসলামের প্রতি আরও আগ্রহি ও সহানুভুতিশীল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা যেন রোমের মত। ঠিক এইভাবেই রোম সাম্রাজ্যে ক্রিশ্চানিটির প্রভাব উতখাতে লড়তে গিয়ে শেষে তা সামলাতে না পেরে সম্রাট কনস্টানটিনসহ নাগরিকেরা ক্রিশ্চান হয়ে গিয়ে রোমকে সেই প্রথম ৩৩২ খ্রীষ্টাব্দে ‘ক্রিশ্চান রোমে’ পরিণত করেছিল। আর এখানে গত দশ বছরের হাসিনার শাসনে কার্যত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা আগের চেয়েও আরো বেশি থাকার পক্ষে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এটাকেই বিবিসি ও তার বন্ধুরা বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে আক্ষেপ করছে।

বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে গেছে বলে কারো দিকে আঙুল তোলার আগে তাদের উচিত হবে, আমেরিকার বিদেশ নীতি আর সেই সূত্রে ভারতের নীতির পুনঃমূল্যায়ন থেকে দেখা শুরু করতে হবে। আর সম্ভবত তাতে দেখা যাবে যে, কথিত ‘ইসলামীকরণ’ আসলে আর কিছু নয়, আমেরিকান ফরেন পলিসি, তা থেকে ভারতের পলিসির অপর পীঠ। তাদের পলিসির কারণে ঢাকার সরকার কী করছে তা সকলেই উপেক্ষা করে গিয়েছে। আর ঢাকার সরকারের সবার ওপরে ডিপ স্টেট কায়েম আর চরম ইসলামবিদ্বেষী পলিসির চর্চা যা কিছু করেছে এসবের ফলাফলের অপর পিঠ হচ্ছে কথিত “ইসলামিকরণ”। আর আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এখনকার বাংলাদেশের এই অবস্থাটা শেষ বিচারে আমেরিকার বা ভারতের কোন স্বার্থের পক্ষে যায় নাই। বরং তাদেরকে এর কাফফারা চুকাইতে এখন রেডি থাকতে হবে!

এই পরিস্থিতিতে যারা বাংলাদেশ এক্সপার্ট হয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের কাজে নিজের নাম কামাতে চায় তাদের প্রথম কাজ হবে “ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে অস্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান ত্যাগ করা। বরং আমেরিকার নীতির কোন ভুলে এটা ঘটল তা পুনঃমূল্যায়িত করা এবং সেই পুনঃমূল্যায়িত নীতি, সংশোধিত নীতি নিয়ে এখনও ইতিবাচকভাবে আগালে, পুরান নীতিতে জমে যাওয়া আবর্জনা সাফসুতারা করতে বাংলাদেশের মানুষ এখনও তার পক্ষে সাড়া দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার কি নিজের পলিসি পুনঃমূল্যায়নের সাহস আছে? এই ট্রাম্প আমলে এসে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। আমাদের আস্থায় কমে গেছে।

বিবিসির আলোচ্য রিপোর্টে নির্বাচনে প্রভাব রাখার মতো পাঁচটা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আসল এক ফ্যাক্টরের কথাটাই তারা বলতে পারেননি। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারবে কী বা সুস্থ নির্বাচন কে নিশ্চিত করবে? এটাই তো সবচেয়ে বড় আর নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর সবচেয়ে বড় এই ফ্যাক্টরের ব্যাপারে বিবিসির রিপোর্ট বেখবর।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

গৌতম দাস

০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2we

 

 

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

শেষ কথাঃ
কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

গৌতম দাস

০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১২

https://wp.me/p1sCvy-2uC

 

নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকারের পাঁচ বছর শেষ হতে আর ছয় মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। ফলে কেন্দ্রিয় নির্বাচন ২০১৯ সালের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের আইনি ভাষায় এটা “লোকসভা” নির্বাচন। আরও ফরমাল ভাষায় বললে, এটা (ফেডারেল) ইউনিয়ন ভারত-রাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন। ভারতের রাজনীতিতে এখন থেকে সরকার ও বিরোধী দলের যত ততপরতা এবং সাথে যত বিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হচ্ছে – বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সংগঠন, গ্রুপ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সবাই যে যা কিছু গত ছয় মাস ধরে করে চলেছেন এবং আগামী ছয় মাসেও করবেন – ইত্যাদি সব কিছুই আসন্ন এই নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই ঘটছে। এসব ততপরতায় সবার লক্ষ্য এমন কিছু করা যেটা এই নির্বাচনের ফলাফলকে কিভাবে যার যার পছন্দের রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারে – সে কথা মনে রেখেই তাঁরা করে যাচ্ছেন। সেটা অমর্ত সেন বা অরুন্ধতি রায়সহ আরও যারা – জাতপাতের বিরুদ্ধের নিজ অধিকারের লড়াই বা দলিত আন্দোলনে – জড়িয়ে আছেন, তাদের ততপরতাও একইভাবে সংশ্লিষ্ট। এমনকি কোন কোন রাজ্যের বিভিন্ন পকেটে যেসব মাওবাদী ততপরতা চলছে সেগুলোও এখন বেশি ততপর একই কারণে। পুরা ব্যাপারটাই রাজনীতিতে ক্ষমতায় যারা ছিল আর যারা যেতে চায় সবারই একটা স্টক টেকিং বা হিসাব নেয়া ও মিলানোও বটে। ফলাফলে নতুন করে আবার জোট গঠনে কেউ বের হয়ে যাওয়া অথবা কারও প্রবেশের সময় এটা।  তাই এদিক থেকে বিচার করে কেউ হয়তো বলবেন, ভারতের রাজনীতি কেবল “কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনকেন্দ্রিক”।

এমনকি বলতে পারেন, তা পঞ্চম বছর-কেন্দ্রিক, যার প্রথম চার বছর তারা তুলনায় বেখবর থাকেন। কথাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো না হলেও এমন হওয়ার প্রধান কারণ হল – আবার যারা সম্ভাব্য নতুন ক্ষমতার প্রার্থী, ক্ষমতায় যেতে প্রবল আগ্রহী, তারা পঞ্চম বছরেই কেবল ভারতের ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার মুখোমুখি হতে চান বা পারেন। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বিরাট সমাজের বিভিন্ন গ্রুপ, গোষ্ঠী অথবা সামাজিক বা রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের মধ্যে যত বেশি সংখ্যককে তারা তাদের নিজেদের ‘নৌকায় উঠাতে’ সচেষ্ট হন। অন্য সময়ে, মানে আগের চার বছরে এই আমল করার মানে নৌকায় যদিওবা উঠানো যায় কিন্তু চার বছর তাদের ধরে রাখা খুবই কঠিন তাই, কোনো কারণ তারা দেখেন না, হাজিরও থাকেন না। তবে এমন হবার পিছনে এতে বিশাল ভারতে সকলকে এড্রেস করতে গেলে এর একটা বিরাট খরচের দিকও আছে। তাই সব মিলিয়ে এই হল “ভারত” মানে,  প্রতি পঞ্চম বছরের রাজনীতির এক ‘ভারতীয় সমাজ’, এসব সীমাবদ্ধতার ভিতরে থেকেই যার জন্ম ও ততপরতা।

এই পঞ্চম বছরেই দলগুলোর মূল টার্গেট হল, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সমাজের নানা দল ও জোট গড়ে এক ইতিবাচক ঘোঁট পাকিয়ে অর্থপূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে দু’টি বৃহত্তর জোটের পক্ষ হিসেবে নিজেদের হাজির হন বা বলা যায় এভাবেই তাদের হাজির হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সব শেষে দু’টি রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে পুরো ভারতকে মেরুকরণ করে নিতে পছন্দ করা, রাজনীতির এক স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেমন মোটা দাগে গত ৩০ বছরের এমন ‘ফেনোমেনা’ হল – হয় কংগ্রেসকে কেন্দ্রে রেখে ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) আর নয়ত বিজেপিকে কেন্দ্রে রেখে এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স) – এভাবে দু’টি জোট আমরা দেখে আসছি। যদিও এবার সম্ভবত তিনটা জোট অথবা দুটাই জোট তবে ভিন্ন নামে, হতে আমরা দেখব। অর্থাৎ বিজেপির জোট এনডিএ ঠিক থাকছে যদিও জোটের দলের কেউ বের হয়ে অন্য জোটে যাবেন অথবা নতুন কোনো দল এই জোটে ঢুকবে – এমন হবে। কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট ইউপিএ এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও কিছুটা অনিশ্চিত।

যদিও কোন সন্দেহ নাই যে বিজেপির বিরুদ্ধে সব বিরোধীদলের একটা বড় অংশের বড় জোট অবশ্যই হচ্ছে; সে লক্ষ্যে এর তৎপরতা ও উদ্দীপনা বরং অন্যবারের চেয়ে এবার বরং প্রবল। এনিয়ে প্রকাশ্যে প্রাথমিক আলোচনাও হয়ে গেছে, বলা যায় সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে গেছে। তবে এর মধ্যে এখনও অমীমাংসিত কিছু বিষয় আছে। তা হল, বিজেপিবিরোধী এই সম্ভাব্য জোট – এটা ঠিক কংগ্রেসের নেতৃত্বেই হবে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক বেশ গভীরে। অর্থাৎ শুরুতেই ধরে নেয়া যে জোট হবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে, যার মানে হল হবু প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের থেকে বা তিনি রাহুল গান্ধী – তা অনেকে এবার আগেই মেনে নিয়ে শুরু করতে চাচ্ছেন না। এই হল মূল বিতর্কের বিষয়, তাই জোট গঠন শুরু হতে একটু সময় নিচ্ছে। যদিও কংগ্রেস ইতোমধ্যে জোটের নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেও একটা পালটা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে যে  – জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হতে পারেন সেটা কেন্দ্রিয় নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে আলোচনা হবে – সে পর্যন্ত এটা মুলতবি করে রাখা যেতে পারে। কিন্তু জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে সেটাও তো একটা ইস্যু, তাই পুরা ব্যাপারটা আপাতত স্থবির হয়ে আছে।

কিন্তু জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এবারের নির্বাচনের আগেই বিতর্ক উঠল কেন? উঠার মূল কারণ হিসাবে দুটা ইস্যুকে বলা যায়। প্রথমতঃ  গত ২০১৪ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস খুবই খারাপ ফল করেছিল। কংগ্রেসের জন্মের পর থেকে এর আগে সে সরকারে বা বিরোধী দলে যেখানেই থাক, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জোট গঠন করে থেকেছে। কিন্তু কখনই ঐসব জোটে কংগ্রেস দলের আসন সংখ্যা সেখানে ১১৪-এর নিচে (লোকসভার মোট আসন ৫৪৫) যায়নি। অথচ গত (২০১৪) নির্বাচনে তা নেমে আসে ৪৮ আসনে, যা মোট আসনের ১০ শতাংশেরও কম। ফলে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস এবারই প্রথম অন্যান্য আঞ্চলিক দলের আসন সংখ্যার কাতারে নেমে যায়। যেমন, মমতার তৃণমূল দলের (২০১৪ সালে নির্বাচনে) লোকসভায় আসন সংখ্যা ৪২। এছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে এটা সর্বোচ্চ। মানে লোকসভায় আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আসন সংখ্যার দিক দিয়ে একক দল হিসেবে মমতার দলের আসন সংখ্যা ৪২, এটাই সবচেয়ে বড়। ফলে এককালের একক কংগ্রেস দল একালে এসে যেন মমতার আঞ্চলিক দলের কাতারে নেমে গেছে। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে কংগ্রেস আর আগের মত ইজ্জত-সম্মান বা গুরুত্ব আশা করতে পারে না, যেন এটাই আঞ্চলিক দলগুলো বলতে চাইছে।

ইতোমধ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর সম্ভাব্য কোন জোট হলে তাতে কংগ্রেসকে তারা কোথায়, কীভাবে রাখবে – এই অনুমানের একটা মহড়াও হয়ে গেছে ২০১৬ সালে, বিহার রাজ্যের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট ছিল না। বরং বাক্যটা লিখতে হবে এভাবে যে, ঐ নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট হয়েছিল, কংগ্রেস যেখানে নেতা নয়, তবে ঐ জোটের এক অংশীদার হিসাবে ছিল। বিজেপি-বিরোধী “কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট” না কী “আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট” – এদুইয়ের মধ্যে এক বিশাল ফারাক আছে। আর বিহারে গঠিত ঐ আঞ্চলিক জোট বিজেপিকে পরাজিত করেছিল এবং করার পর কংগ্রেস দল থেকে নয়, এক আঞ্চলিক দলের নেতা নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল। ফলে ঐ মহড়াটা যেন কংগ্রেওকে জানিয়ে দিয়েছিল আঞ্চলিক দলগুলো একালে কংগ্রেসকে কীভাবে মাপে, মুল্যায়ন করে কোথায় রাখে।

ভারত ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি প্রদেশে (রাজ্যে) বিভক্ত, যেখানে প্রদেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাজ্য’ বলে পরিচিত। আর কোন রাজ্যের স্থানীয় কোন দলকেই এখানে ‘আঞ্চলিক দল’ বলা হচ্ছে। ‘আঞ্চলিক দল’ শব্দটার বিপরীত শব্দ হল ‘সর্বভারতীয় দল’ (বৃটিশ আমলে এই ধারণাটাকেই “অল ইন্ডিয়া” বা বাংলায় “নিখিল ভারত” বলে শব্দ দলের নামের শুরুতে যুক্ত থাকত। যেমন “নিখিল ভারত মুসলিম লীগ” – বলা হত)। মানে সারা ভারতের সবপ্রদেশের যার শাখা ও সবল ততপরতা আছে এমন দলের ধারণা। আর এর বিপরীতে আঞ্চলিক দল মানে যা মূলত একটা রাজ্য কেন্দ্রিক দল, আর বাকি ভারতজুড়ে মূলত এদের কোনো শাখা বা কর্মতৎপরতা প্রায় থাকেই না। প্রত্যেকটা প্রদেশে সাধারণত কমপক্ষে একটা আঞ্চলিক দল পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসন পায়, ফলে কেন্দ্রে জোট সরকার গড়ার ক্ষেত্রে এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এভাবে সর্বভারতীয় দলের বিপরীতে, ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দল এক নতুন উঠে আসা ফেনোমেনা এবং যা ক্রমশ প্রভাবশালী প্রধান ভূমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত আসন্ন এই নির্বাচন থেকেই বিজেপির বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস দলের ভুমিকা লোপ পেতে থাকবে। না ব্যাপারটা কেবল কংগ্রেসের বেলায় ঘটবে তাই শুধু না সেক্ষেত্রে বিজেপিও বাদ থাকবে না। খুব সম্ভবত “আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট” হবে ভারতীয় আগামি রাজনীতির মূল এবং নতুন ফেনোমেনা। তবে সেই সাথে হয়ত ‘আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট’ হবে দুটা – একের বিরোধী অন্যটা। আর কংগ্রেস ও বিজেপি তাদের পছন্দ অনুসারে এবার একেকটা জোটে যোগ দিবে – এই হবে সম্ভবত নতুন দৃশ্যপট।

জোটের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের দ্বিতীয় কারণঃ কংগ্রেসের প্রভাব “শুকিয়ে আসা” এবং এর বিপরীত ঘটনা হিসাবে আঞ্চলিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা (আর বিজেপি তখন বেখবরিয়া দল ছিল) – গত ৩০ বছর ধরে এটাই ভারতের নির্বাচনী চালচিত্র। ফলে আসন্ন এই সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোটের আঞ্চলিক নেতারা যেমন, তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা উত্তরপ্রদেশের নিম্নবর্গের দল, বহুজন সমাজবাদী পার্টি দলের নেতা মায়াবতী প্রভুদাস – তারা এবার মনে করছেন, তারাও কেন রাহুল গান্ধীর মত “প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার” হবেন না? তারা অযোগ্য কিসে? এ কারণে আঞ্চলিক দলগুলো এবার জোট গঠনের শুরুতেই কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে আগের মত ইউপিএ জোট বাঁধতে দ্বিধা করছে। আর পুরান ধরণে ইউপিএ-জোটের বিপরীতে প্রথম থেকেই এবার সরব হয়েছেন মমতা। তিনি আরো এগিয়ে বলেছেন, তার আলাদা জোটের দাবির অর্থ হল, এবার ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ গড়তে হবে। মানে কংগ্রেসকে ছাড়াই আগে আঞ্চলিক দলগুলোর একটি জোট হবে। এরপর কংগ্রেসকে সাথে নেয়া বা না নেয়ার প্রশ্ন। সার কথায়, বিজেপির এনডিএ নামে জোট থাকলেও এর প্রতিদ্বন্দ্বী জোট কোনটা হবে ইউপিএ নাকি প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’- এটাই নির্ধারিত হতে একটু সময় নিচ্ছে, তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা হয়ে যাবে। ডিসেম্বর এজন্য যে ঐ মাসে পাঁচ রাজ্যের (রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম ) প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল এর নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। ঐ রাজ্য-নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে ওসব রাজ্যের আঞ্চলিক দল ও জোটে আসন ভাগাভাগির বুঝাবুঝি কেমন কী দাড়ায় – এর উপর সব কিছু নির্ভর করছে। সেটা দেখতেই সবার অপেক্ষা।

বিপরীত প্রসঙ্গ হিসাবে বিজেপিঃ
ইতোমধ্যেই এটা স্পষ্ট যে, এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর অবস্থা খুব শোচনীয় হতে পারে। কেন? কারণ মোদীর “ইকোনমিক পারফরম্যান্স” (Economic Performance), অর্থাৎ গত প্রায় পাঁচ বছরে মোদী অর্থনীতিতে কেমন করলেন! কেন্দ্রিয় সরকার অর্থনীতিতে ভালো বা মন্দ করছে কি না এনিয়ে ভারতের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচনে এটা কোন ইস্যু হতে দেখা যায় না বা এর তেমন প্রভাব পড়তে দেখা যায় না বললেই চলে। এটা চলতি মোদী সরকারের আমলনামার ভিত্তিতে বলা খবর। গত সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের বেলায় এটাই দেখা গেছে যে, মোদীর খারাপ “ইকোনমিক পারফরম্যান্স’ (বা অর্থনৈতিক সাফল্য) সেখানে কোথাও কোন ইস্যু হতে পারে নাই। কিন্তু গত দুইবারের (২০০৯ ও ২০১৪) কেন্দ্রের নির্বাচনে দেখা গেছে – আগের (কংগ্রেস ২০০৪-০৯) সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণে পরের বারও কংগ্রেস বিপুল ভোট পেয়ে আবার ক্ষমতায় এসেছিল। আবার ইউপিএ-টু (২০০৯-১৪) সরকারের ব্যর্থতাকে প্রবলভাবে তুলে ধরে দেখিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী (বিজেপি) দল ভোটে নিজে সেই জায়গা নিবে, অর্থনীতিতে ভাল করবে – এই কথায় প্রলুব্ধ করার মত করে ভোটারদের আস্থায় নিজেকে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন মোদী, এই সম্ভাবনা জাগাতে পেরেছিল বলেই মূলত একারণেই মোদী জিতেছিলেন।

এ দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর ছিল “অর্থনৈতিক সাফল্য” – এই ইস্যু। আবার এই সাফল্য প্রদর্শন মানে কেবল জিডিপি অনেক ভাল হলে হবে, তা নয়। সাথে দেখাতে হবে একদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক ‘কাজ সৃষ্টির’ বিষয় সে পেরেছে বা পারবে; অন্য দিকের গুরুত্বপূর্ণ হল, ব্যবসায়ীদের (ম্যানুফ্যাকচারার, বাণিজ্য আর শেয়ার মার্কেটসহ) মধ্যে আস্থার জোশ তুলতে পেরেছে কি না। কংগ্রেস ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে; আবার ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে কংগ্রেসের হাল ছেড়ে দেয়ার মুখে সেটা আবার ঘটাতে মোদির দল ও সরকার পারবে, এই আশা জাগাতে পেরেছিলেন তিনি তাই। এভাবে দুই ক্ষেত্রেই প্রধান ফ্যাক্টর ছিল অর্থনীতিতে পারফরমেন্স। আসলে নিরন্তর গরিব হালে ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধুঁকে মরা দশায় তাদের ফেলে রাখা হয়েছে। তাই, ভারতের নির্বাচনে, “অর্থনীতিতে পারফরমেন্স” মুখ্য ভুমিকায় হাজির হবে – এটাই তো স্বাভাবিক!

তাহলে কেবল এই বিচারে ২০১৯ সালের নির্বাচনে, বিজেপির মোদীর আবার জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, বলতে হয়। কারণ প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সাফল্যের বিচারে মোদী ইতোমধ্যে ব্যর্থ। শুধু তাই না, অর্থনীতিতে সাফল্যের বিচারে – একটু পুরান এবং নতুন (চলতি) – দু ধরণের ইস্যুই আছে; আবার একটু পুরান ইস্যুটা বিরাট বড় ইস্যু। এছাড়া একালের নতুন দগদগে ইস্যুও আছে যা সামনের কয়েক মাসে ‘আরো দগদগে ঘা’ হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা।

একটু পুরনো ইস্যুটা হল, গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে, মোদীর ‘নোট বাতিলের’ (DeMonetization) সিদ্ধান্ত। আগামি দিনের ইতিহাসে এবং আসন্ন নির্বাচনেও মোদী সরকারের বিরাট ব্যর্থতা বলতে অবশ্যই ‘নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত, সামনে আসবে। মানুষের মনে ভেসে উঠবে। নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত কথাটার মানে হল, ভারতের মুদ্রায় সবচেয়ে বড় নোট ছিল ৫০০ ও ১০০০ রুপির। ঐ দিনের শেষে রাত্রে হঠাৎ – এই দুই ধরনের সব নোটই বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন মোদী। যদিও পুরান নোট ব্যাংকে জমা দিলে সেটার বদলে নতুন নোট দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু নাম ঠিকানাসহ কে জমা দিচ্ছেন, তা বলতে হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর হল – মানুষের ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস অথবা দিনমজুরি সব ধরনের কাজ ফেলে ব্যাংকে লাইন দেয়া। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতায় একেবারে এলোমেলো শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়া তো আছেই, সেই সাথে বহু কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়েছিল। আর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব অর্থনৈতিক তৎপরতা ও লেনদেন-বিনিময়ে ভারতের অর্থনীতিতে সচলতার ব্যস্ততা যে পর্যায়ে আগে ছিল অর্থনীতির সেই সাজানো বাগান এবার অর্ধেক হয়ে, বড় স্থবিরতার দিকে গড়াতে থাকে।

দুটা উদাহরণ দিলে এর মারাত্মক প্রভাব বুঝা যাবে। ভারতের অর্থনীতির হাব বলে বুঝানো বা মনে করা হয় মুম্বাইকে আর একালে সাথে পড়শি গুজরাতকেও। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এদুই রাজ্যের অর্থনৈতিক ততপরতা অগ্রসর ও গতি বেশি। ব্যাপারটা কলকাতার স্বর্ণকারদের মাঝে কীভাবে আমল হয়েছিল এর একটা প্রমাণ হল, তারা দল বেধে গুজরাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত এলাকায় দোকান খুলে বসেছিল; একেক জন মুল ওস্তাদ আর সাথে পাঁচ-ছয় জন সাগরেদ এভাবে। তারা সেখানে ভাল আয় করতে পারত ফলে নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গের পরিবারের চলতে তাদের কাছে টাকা পাঠাতেও পারছিল। অর্থনীতিক স্টাডির মুল্যায়নে এগুলো অবশ্যই ‘মূল’ কাজ সৃষ্টি নয়, ইনফরমাল সেক্টর বলা হবে। মানে হল, সরকারের নীতির কারণে যারা কাজ পেয়েছে বা আয় বেড়েছে – এই মূল সুবিধাভোগীদের স্বচ্ছলতার কারণে সৃষ্ট এরা। মুল ফরমাল সেক্টরের কাজ পাওয়া সদস্য তারা নয়। তবে ফরমালদের আয় বাড়াতে ইনফরমালের কিছু লোক তাতে নিজেদের সম্ভাবনা দেখেছিল। তারা নিজেরাই যা পারে তেমন কিছু সার্ভিস নিয়ে ঐ সুবিধাভোগীদের কাছে হাজির হবার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া – এজন্য এটা ইনফরমাল, আর সুবিধাভোগীরা হল ফরমাল সেক্টর। সরকারের খুবই সফল নীতি পলিসি হলে তাতে,  ফরমাল সেক্টরের নিয়োগের চাহিদাই যত বেশি হবে ততই ইনফরমাল সেক্টর ত্যাগ করে মানুষ ফরমাল সেক্টরে চলে যাবে। ফলে তা ঠিক করে দেয় যে একজন চাকরি প্রার্থী বা লেবারকে কতদিন ইনফরমাল সেক্টরে থাকতে হবে। সারকথায় মোদীর অর্থনীতি স্বর্ণকারদের ভাল-সুবিধায়-ভরপুর কাজ দিতে পারে নাই সত্য কিন্তু এর ভিতরেই কলকাতার স্বর্ণকারেরা প্রতি ওস্তাদ পিছু পাচ-ছয় সাগরেদ মিলে ভিন রাজ্যে বেঁচে থাকার অবস্থার (ইনফরমাল) কাজ খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু মোদীর নোট বাতিলের প্রভাবে শ্লথ অর্থনীতির কারণে এদের এটুক স্বপ্নও ভঙ্গ হয়ে যায়। গুজরাতে কাজের অভাবে এরা সবাই সব গুটিয়ে দেশে ফিরে চলে যায়।  তাদের পরিবারসহ তারা এখন সেই আগের দুঃসহ গরীরি হালে ফিরে এসেছে।

আমাদের কাওরান বাজারের মত দিল্লীর পাইকারি বাজারের দিনমজুরঃ পাইকাররা মালামাল কিনলে তা পৌছে দেয়া বা গাড়িতে তুলে দেয়া এই কাজ করে তাদের দৈনন্দিন পাঁচশ রুপির মত আয় করতে পারত। কিন্তু নোট বাতিলের কারণে একই পরিণতি। ঢলে পড়া অর্থনীতির প্রভাব এই পাইকারি বাজারের এতই নিচে পড়েছে যে ঐ মজুরেরা দুই-তিনশ টাকা দৈনিক আয় করতে হিমশিম খেয়েছে। কয়েকদিন তারা উপায়ন্ত না দেখে “বাতিল নোটে মজুরি” নিবে পরে নিজে সময় দিয়ে ব্যাঙ্কে তা বদলে নিবে – এই শর্তে কাজ করেছে। একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে এর প্রভাব কত স্তরে পরে তা বুঝার জন্য এই উদাহরণ দুইটার খুটিনাটি লক্ষ্য করলে অনেক কিছু টের পাওয়া যায়। এছাড়া আসলে এটাই তো স্বাভাবিক, একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে বা যেকোন বিপর্যয় দেখা দিলে সবার চেয়ে বেশি এর চাপ গিয়ে পড়ে স্বল্প আয়ের নিচের মানুষের উপর। মোদী নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এদিকটা আমলই করেন নাই যে তাঁর  টার্গেট লক্ষ্যচ্যুত হলে, তিনি ব্যর্থ হলে পরে এর প্রভাব কত স্তরে কত মারাত্মক হতে পারে।

বরং মোদি আশ্বাসের উপরে চলছিলেন যে, রুপি বদলে নিতে ব্যাঙ্কে আসলে – এতদিন যারা নগদ রুপিতে সম্পদ রাখা কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির সবাই এবার ধরা পড়বেন। অর্থাৎ ধরা পড়ার ও পরে শাস্তির ভয়ে এরা আর ব্যাঙ্কেই আসবে না। সেক্ষেত্রে সরকারের অনুমান ছিল, ৮৫ শতাংশের হয়ত বৈধ আয় বলে রুপি বদলে নিতে আসবে। বাকি ১৫% নোটের মালিক এরা কালোটাকার মালিক বলে ধরা পড়ার ভয়ে তাঁরা আর রুপি বদলে নিতে আসবে না, ফলে প্রায় ২৪০ হাজার কোটি রুপি রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে না, তাই বিপুল লাভ হবে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দেখা গেল, ৯৯ শতাংশ ছাপানো মুদ্রাই ফেরত এসেছে। অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আসেনি। এর মানে, সারা ভারতের জনগোষ্ঠীকে কষ্ট দিয়ে, বিশেষ করে গরিব মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েও কোনো সুফল মেলেনি।

বরং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ রুপি ফেরত আসেনি বলে, ভারতের মিডিয়া লিখছে, ‘‘এ থেকে যা ‘লাভ’ তা মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা। নতুন নোট ছাপা ও বণ্টন এবং অর্থনীতির সামগ্রিক ক্ষতি বিবেচনা করলে অবশ্য সেই লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যাবে!” অথচ সবচেয়ে কষ্টকর অবস্থা স্বল্প আয়, ‘দিনে আনে দিনে খায়’ লোকদের। এ ছাড়া, মূল ক্ষতিটা হয়েছে তাদের কাজ হারানো।

মোদির দ্বিতীয় ব্যর্থতার ইস্যুঃ মোদি গত নির্বাচনে আশ্বস্ত করেছিলেন – নির্বাচিত হলে কংগ্রেসের প্রথম জমানার (২০০৪-০৯) মত ভাল অর্থনীতি তিনি গড়বেন। এ ছাড়া আর আরো বেশি কাজ সৃষ্টি করবেন। তার দেয়া নতুন টার্গেট ছিল, বছরে দুই কোটি লোকের কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু এখন সমালোচকরা বলছেন, বাস্তব পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, উলটো গত চার বছর ধরে গড়ে ৭০ লাখ করে কর্মসংস্থান কমেছে। এটা কাজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গত আট বছরে সর্বনিম্ন। সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন তরুণেরা এখনও বছরে ২ কোটি কাজ সৃষ্টি দেখার অপেক্ষায় আছে। [……said young Indians were waiting for the 20 million jobs promised by the Bharatiya Janata Party (BJP).]

একইভাবে রয়টার্সের এই রিপোর্ট বলছে, যার শিরোনামটাই সাংঘাতিকঃ [No jobs, no vote: Indian town warns Modi ahead of 2019 polls]। ঐ রিপোর্টই আরও বলছে,  কাজ সৃষ্টি দূরে থাক,  ভারতে বেকারত্ব এখন সর্বোচ্চ। [……hit its highest level in 16 months in March at 6.23 percent, according to the Centre for Monitoring Indian Economy (CMIE), an independent think-tank.]

চলতি সময়ে মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ইস্যু – তেলের দামঃ
ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের বিপুল ঘাটতি শুরু হয়েছে, এই ঘাটতিই  সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধির কারণ। ২০১৬ সালে দাম সর্বোচ্চ নেমে যাওয়ার সময়, ৩০ ডলারে নেমে যাওয়া জ্বালানি তেল কিনেছিল ভারত। আর এখন তা (অক্টোবর ২০১৮) ৮৪ ডলার এবং এ দাম ক্রমবর্ধমান। তেলের দাম কমাতে সেই সময় রাজস্ব বিভাগ ১৪০ বিলিয়ন ডলার বাড়তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল। কিন্তু সেই অর্থ থেকে কোন আপতকালীন রিজার্ভ রাখা হয় নাই, বরং পুরা অর্থ অন্য প্রকল্পে লাগিয়ে ফেলায় এখন মোদীর পক্ষে কোন ভর্তুকি আয়োজনের সুযোগ নাই।  তাই ভারতের শহরগুলোতে তেলের পাম্প-স্টেশনে তেলের দাম এখন ওঠানামা করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাথে সম্পর্কিত হয়ে, কোনো সরকারি ভর্তুকি এখানে নেই।
তবুও আগের অবরোধের সময় ভারতের আরও একটা বিশেষ সুবিধা ছিল,  কমমুল্যের ইরানি তেল সরবরাহ কিনতে পারত ভারত (আমেরিকান অবরোধ ভারতের উপর শিথিল থাকত, আর ইরানও কিছুটা সস্তায় তেন বিক্রি করত)  – যেটা খুব সম্ভবত মোদী এবার হাতছাড়া করে ফেলেছেন। ইরান ছিল ভারতে তেল সরবরাহকারি হিসাবে তৃতীয়। এর আগের যেকোন তেল অবরোধের ক্ষেত্রেও আমেরিকার থেকে বিশেষ ছাড় পাবার কারণে ঐ বিশেষ সুবিধার দামে ইরানি তেন কিনতে পেরেছিল ভারত সেটা এবার ব্যতিক্রম কারণ এবার  – রাশিয়ান অস্ত্র আর ইরানি তেল ক্রয় – দুটার ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন জোর আপত্তি জারি করেছিল। খুব সম্ভবত রাশিয়ান অস্ত্র ক্রয়ে ছাড় পেতে আর ট্রাম্পকে খুশি করতে এবারই প্রথম ভারত আমেরিকাকে জানিয়েছে যে, অবরোধ মেনে ইরানি তেল এবার ভারত ক্রয় করবে না। ব্রাকেটে বলে রাখা যায়, চীন এখনও ইরানি তেল কিনছে, তবে ইরানি ট্যাংকার পৌছে দিবে এই শর্তে।

আর মোদীর ক্ষেত্রে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনীতিক গতি বা উন্নতির এক প্রধান নিয়ামক হল জ্বালানি তেলের মুল্য এবং মুল্যের স্থিরতা। ফলে তেলের দাম এবার ভারতের অর্থনীতিকে শ্লথ করার ক্ষেত্রে প্রধান ভুমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে।

ওদিকে আবার তেলের দামের প্রভাবে ভারতে উঠে এসেছে মুদ্রাস্ফীতিও, যেটা তেলের দাম বৃদ্ধির আগে থেকেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী।  এছাড়াও আছে খারাপ ঋণ (নন-পারফরমিং লোন) বিতরণ গত পাঁচ বছরে ৪৫০ গুণ বেড়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্ট করেছে; পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তর থেকে জানা যাচ্ছে তা ১৪৮ বিলিয়ন ডলারের মত।

শেষ বড় আঘাতঃ রুপির দর পতন
সব কিছু মিলিয়ে আবার বাজারের বিরাট অস্থিরতায় রুপি-ডলার বিনিময় হারে রুপির মান কমেই চলেছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা নেয়ার সময় ডলার ছিল ৬০ রুপি, সেটা এখন ৭৪ রুপি। ভারতের ইকনমিক টাইমসের প্রাক্তন সম্পাদকের দাবি রুপির এই মুল্য পতনের পরিমাণ ১২.৫%। [Rupee is Asia’s worst performing currency ..]

তাহলে সার কথাটা হল ‘অর্থনৈতিক সাফল্যের’ ইস্যুতে মোদীর প্রায় সব প্রতিশ্রুতি গত চার বছরে উলটো দিকে হাঁটছে। তাই আর সাফল্য নিয়ে যেন কেউ আর কথা না বলে, এটাই এখন মোদীর কাম্য। তাহলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভারতে যে জাতীয় নির্বাচন আসন্ন – বিজেপি ও মোদিকে যার মুখোমুখি হতে হবে – সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদী বা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ কী করবেন?

অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যু চাপা দেয়া বা পেছনে ফেলে দেয়ার উপায় নিশ্চয় মোদী-অমিত খুঁজবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে এদের একমাত্র ইস্যু এখন হিন্দুত্ব; মুসলমানবিদ্বেষের দামামা সর্বোচ্চ শব্দে বাজানো। এই আলোকেই অমিত শাহের মুসলমান নিধন, বাংলাদেশীদের ‘উইপোকা-তেলাপোকা’ বলে তুচ্ছ করে সম্বোধন এবং মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গালাগালি, তাদের হত্যা করার হুঙ্কার – এসব কিছুকে আমাদের দেখতে ও বিচার করতে হবে। সেই সাথে আসামের নাগরিকত্ব বিল নিয়ে আরো নোংরা হুঙ্কার। আসামের মতো নাগরিকত্ব বাছাইয়ের কর্মসূচি পশ্চিমবাংলা ও ছত্তিশগড় এবং অন্যান্য রাজ্যে চালু করা হবে বলে স্থানীয় বিজেপি হুমকি দিচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই- এ কথা বলে মুসলমানবিদ্বেষী একটা আবহ সৃষ্টি করা। ওদিকে ত্রিপুরায় গিয়ে বিজেপিরই আরেক অসভ্য এমপি সুব্রমানিয়াম স্বামী বাংলাদেশ দখলের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি নাকি হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট, এর নমুনা এটা?

ব্যাপারটা ভারতের আর এক সিনিয়র সম্পাদক,  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গ্রুপের শেখর গুপ্তা, তাঁরও নজরে পরেছে। তিনি নিজেই দ্যা প্রিন্ট এরও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি লিখেছেন, BJP has decided to use Assam as its key to 2019। আবার  রাহুল গান্ধীও হিন্দুত্বের রাজনীতির অনুসারি হয়ে উঠতে চাইছেন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই শেখর লিখছেন, রাহুলেরটা সফট হিন্দুত্ব

সারকথায় এভাবে নাহলে ওভাবে এসব মুসলিমবিদ্বেষী দামামা, ঘৃণা উগরানো আসন্ন হয়ে উঠছে।  এসবেরই উদ্দেশ্য একটাই – মোদীর ডুবে যাওয়া অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের সমস্যাকে আড়াল করে বিজেপি দলকে ভোট চাইবার ‘উপযুক্ত’ করে তোলা। সে কারণে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ভারতের সমাজকে বিভক্ত ও মেরুকরণের ফলে যাতে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে ‘হিন্দুত্ব’। অর্থাৎ আগামী ছয় মাস, অন্তত ভারতের নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মুসলিমবিদ্বেষের বিষ, ঘৃণা উগলানো দেখতেই থাকব, সেই আশঙ্কা হচ্ছে।

শেষ কথাঃ
ভারতের এই ভোটযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক বিচারে আমাদের জন্য “ফেবারিট” বা কাম্য হল, ‘ফেডারল ফ্রন্ট’ গড় উঠে এরা জয় লাভ করুক। এটা মনে রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের নির্বাচন ২০১৯; কী হতে যাচ্ছে?”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

গৌতম দাস

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tY

 

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে

প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party'”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]