ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

গৌতম দাস

০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১২

https://wp.me/p1sCvy-2uC

 

নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকারের পাঁচ বছর শেষ হতে আর ছয় মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। ফলে কেন্দ্রিয় নির্বাচন ২০১৯ সালের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের আইনি ভাষায় এটা “লোকসভা” নির্বাচন। আরও ফরমাল ভাষায় বললে, এটা (ফেডারেল) ইউনিয়ন ভারত-রাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন। ভারতের রাজনীতিতে এখন থেকে সরকার ও বিরোধী দলের যত ততপরতা এবং সাথে যত বিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হচ্ছে – বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সংগঠন, গ্রুপ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সবাই যে যা কিছু গত ছয় মাস ধরে করে চলেছেন এবং আগামী ছয় মাসেও করবেন – ইত্যাদি সব কিছুই আসন্ন এই নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই ঘটছে। এসব ততপরতায় সবার লক্ষ্য এমন কিছু করা যেটা এই নির্বাচনের ফলাফলকে কিভাবে যার যার পছন্দের রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারে – সে কথা মনে রেখেই তাঁরা করে যাচ্ছেন। সেটা অমর্ত সেন বা অরুন্ধতি রায়সহ আরও যারা – জাতপাতের বিরুদ্ধের নিজ অধিকারের লড়াই বা দলিত আন্দোলনে – জড়িয়ে আছেন, তাদের ততপরতাও একইভাবে সংশ্লিষ্ট। এমনকি কোন কোন রাজ্যের বিভিন্ন পকেটে যেসব মাওবাদী ততপরতা চলছে সেগুলোও এখন বেশি ততপর একই কারণে। পুরা ব্যাপারটাই রাজনীতিতে ক্ষমতায় যারা ছিল আর যারা যেতে চায় সবারই একটা স্টক টেকিং বা হিসাব নেয়া ও মিলানোও বটে। ফলাফলে নতুন করে আবার জোট গঠনে কেউ বের হয়ে যাওয়া অথবা কারও প্রবেশের সময় এটা।  তাই এদিক থেকে বিচার করে কেউ হয়তো বলবেন, ভারতের রাজনীতি কেবল “কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনকেন্দ্রিক”।

এমনকি বলতে পারেন, তা পঞ্চম বছর-কেন্দ্রিক, যার প্রথম চার বছর তারা তুলনায় বেখবর থাকেন। কথাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো না হলেও এমন হওয়ার প্রধান কারণ হল – আবার যারা সম্ভাব্য নতুন ক্ষমতার প্রার্থী, ক্ষমতায় যেতে প্রবল আগ্রহী, তারা পঞ্চম বছরেই কেবল ভারতের ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার মুখোমুখি হতে চান বা পারেন। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বিরাট সমাজের বিভিন্ন গ্রুপ, গোষ্ঠী অথবা সামাজিক বা রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের মধ্যে যত বেশি সংখ্যককে তারা তাদের নিজেদের ‘নৌকায় উঠাতে’ সচেষ্ট হন। অন্য সময়ে, মানে আগের চার বছরে এই আমল করার মানে নৌকায় যদিওবা উঠানো যায় কিন্তু চার বছর তাদের ধরে রাখা খুবই কঠিন তাই, কোনো কারণ তারা দেখেন না, হাজিরও থাকেন না। তবে এমন হবার পিছনে এতে বিশাল ভারতে সকলকে এড্রেস করতে গেলে এর একটা বিরাট খরচের দিকও আছে। তাই সব মিলিয়ে এই হল “ভারত” মানে,  প্রতি পঞ্চম বছরের রাজনীতির এক ‘ভারতীয় সমাজ’, এসব সীমাবদ্ধতার ভিতরে থেকেই যার জন্ম ও ততপরতা।

এই পঞ্চম বছরেই দলগুলোর মূল টার্গেট হল, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সমাজের নানা দল ও জোট গড়ে এক ইতিবাচক ঘোঁট পাকিয়ে অর্থপূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে দু’টি বৃহত্তর জোটের পক্ষ হিসেবে নিজেদের হাজির হন বা বলা যায় এভাবেই তাদের হাজির হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সব শেষে দু’টি রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে পুরো ভারতকে মেরুকরণ করে নিতে পছন্দ করা, রাজনীতির এক স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেমন মোটা দাগে গত ৩০ বছরের এমন ‘ফেনোমেনা’ হল – হয় কংগ্রেসকে কেন্দ্রে রেখে ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) আর নয়ত বিজেপিকে কেন্দ্রে রেখে এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স) – এভাবে দু’টি জোট আমরা দেখে আসছি। যদিও এবার সম্ভবত তিনটা জোট অথবা দুটাই জোট তবে ভিন্ন নামে, হতে আমরা দেখব। অর্থাৎ বিজেপির জোট এনডিএ ঠিক থাকছে যদিও জোটের দলের কেউ বের হয়ে অন্য জোটে যাবেন অথবা নতুন কোনো দল এই জোটে ঢুকবে – এমন হবে। কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট ইউপিএ এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও কিছুটা অনিশ্চিত।

যদিও কোন সন্দেহ নাই যে বিজেপির বিরুদ্ধে সব বিরোধীদলের একটা বড় অংশের বড় জোট অবশ্যই হচ্ছে; সে লক্ষ্যে এর তৎপরতা ও উদ্দীপনা বরং অন্যবারের চেয়ে এবার বরং প্রবল। এনিয়ে প্রকাশ্যে প্রাথমিক আলোচনাও হয়ে গেছে, বলা যায় সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে গেছে। তবে এর মধ্যে এখনও অমীমাংসিত কিছু বিষয় আছে। তা হল, বিজেপিবিরোধী এই সম্ভাব্য জোট – এটা ঠিক কংগ্রেসের নেতৃত্বেই হবে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক বেশ গভীরে। অর্থাৎ শুরুতেই ধরে নেয়া যে জোট হবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে, যার মানে হল হবু প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের থেকে বা তিনি রাহুল গান্ধী – তা অনেকে এবার আগেই মেনে নিয়ে শুরু করতে চাচ্ছেন না। এই হল মূল বিতর্কের বিষয়, তাই জোট গঠন শুরু হতে একটু সময় নিচ্ছে। যদিও কংগ্রেস ইতোমধ্যে জোটের নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেও একটা পালটা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে যে  – জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হতে পারেন সেটা কেন্দ্রিয় নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে আলোচনা হবে – সে পর্যন্ত এটা মুলতবি করে রাখা যেতে পারে। কিন্তু জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে সেটাও তো একটা ইস্যু, তাই পুরা ব্যাপারটা আপাতত স্থবির হয়ে আছে।

কিন্তু জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এবারের নির্বাচনের আগেই বিতর্ক উঠল কেন? উঠার মূল কারণ হিসাবে দুটা ইস্যুকে বলা যায়। প্রথমতঃ  গত ২০১৪ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস খুবই খারাপ ফল করেছিল। কংগ্রেসের জন্মের পর থেকে এর আগে সে সরকারে বা বিরোধী দলে যেখানেই থাক, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জোট গঠন করে থেকেছে। কিন্তু কখনই ঐসব জোটে কংগ্রেস দলের আসন সংখ্যা সেখানে ১১৪-এর নিচে (লোকসভার মোট আসন ৫৪৫) যায়নি। অথচ গত (২০১৪) নির্বাচনে তা নেমে আসে ৪৮ আসনে, যা মোট আসনের ১০ শতাংশেরও কম। ফলে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস এবারই প্রথম অন্যান্য আঞ্চলিক দলের আসন সংখ্যার কাতারে নেমে যায়। যেমন, মমতার তৃণমূল দলের (২০১৪ সালে নির্বাচনে) লোকসভায় আসন সংখ্যা ৪২। এছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে এটা সর্বোচ্চ। মানে লোকসভায় আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আসন সংখ্যার দিক দিয়ে একক দল হিসেবে মমতার দলের আসন সংখ্যা ৪২, এটাই সবচেয়ে বড়। ফলে এককালের একক কংগ্রেস দল একালে এসে যেন মমতার আঞ্চলিক দলের কাতারে নেমে গেছে। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে কংগ্রেস আর আগের মত ইজ্জত-সম্মান বা গুরুত্ব আশা করতে পারে না, যেন এটাই আঞ্চলিক দলগুলো বলতে চাইছে।

ইতোমধ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর সম্ভাব্য কোন জোট হলে তাতে কংগ্রেসকে তারা কোথায়, কীভাবে রাখবে – এই অনুমানের একটা মহড়াও হয়ে গেছে ২০১৬ সালে, বিহার রাজ্যের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট ছিল না। বরং বাক্যটা লিখতে হবে এভাবে যে, ঐ নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট হয়েছিল, কংগ্রেস যেখানে নেতা নয়, তবে ঐ জোটের এক অংশীদার হিসাবে ছিল। বিজেপি-বিরোধী “কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট” না কী “আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট” – এদুইয়ের মধ্যে এক বিশাল ফারাক আছে। আর বিহারে গঠিত ঐ আঞ্চলিক জোট বিজেপিকে পরাজিত করেছিল এবং করার পর কংগ্রেস দল থেকে নয়, এক আঞ্চলিক দলের নেতা নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল। ফলে ঐ মহড়াটা যেন কংগ্রেওকে জানিয়ে দিয়েছিল আঞ্চলিক দলগুলো একালে কংগ্রেসকে কীভাবে মাপে, মুল্যায়ন করে কোথায় রাখে।

ভারত ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি প্রদেশে (রাজ্যে) বিভক্ত, যেখানে প্রদেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাজ্য’ বলে পরিচিত। আর কোন রাজ্যের স্থানীয় কোন দলকেই এখানে ‘আঞ্চলিক দল’ বলা হচ্ছে। ‘আঞ্চলিক দল’ শব্দটার বিপরীত শব্দ হল ‘সর্বভারতীয় দল’ (বৃটিশ আমলে এই ধারণাটাকেই “অল ইন্ডিয়া” বা বাংলায় “নিখিল ভারত” বলে শব্দ দলের নামের শুরুতে যুক্ত থাকত। যেমন “নিখিল ভারত মুসলিম লীগ” – বলা হত)। মানে সারা ভারতের সবপ্রদেশের যার শাখা ও সবল ততপরতা আছে এমন দলের ধারণা। আর এর বিপরীতে আঞ্চলিক দল মানে যা মূলত একটা রাজ্য কেন্দ্রিক দল, আর বাকি ভারতজুড়ে মূলত এদের কোনো শাখা বা কর্মতৎপরতা প্রায় থাকেই না। প্রত্যেকটা প্রদেশে সাধারণত কমপক্ষে একটা আঞ্চলিক দল পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসন পায়, ফলে কেন্দ্রে জোট সরকার গড়ার ক্ষেত্রে এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এভাবে সর্বভারতীয় দলের বিপরীতে, ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দল এক নতুন উঠে আসা ফেনোমেনা এবং যা ক্রমশ প্রভাবশালী প্রধান ভূমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত আসন্ন এই নির্বাচন থেকেই বিজেপির বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস দলের ভুমিকা লোপ পেতে থাকবে। না ব্যাপারটা কেবল কংগ্রেসের বেলায় ঘটবে তাই শুধু না সেক্ষেত্রে বিজেপিও বাদ থাকবে না। খুব সম্ভবত “আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট” হবে ভারতীয় আগামি রাজনীতির মূল এবং নতুন ফেনোমেনা। তবে সেই সাথে হয়ত ‘আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট’ হবে দুটা – একের বিরোধী অন্যটা। আর কংগ্রেস ও বিজেপি তাদের পছন্দ অনুসারে এবার একেকটা জোটে যোগ দিবে – এই হবে সম্ভবত নতুন দৃশ্যপট।

জোটের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের দ্বিতীয় কারণঃ কংগ্রেসের প্রভাব “শুকিয়ে আসা” এবং এর বিপরীত ঘটনা হিসাবে আঞ্চলিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা (আর বিজেপি তখন বেখবরিয়া দল ছিল) – গত ৩০ বছর ধরে এটাই ভারতের নির্বাচনী চালচিত্র। ফলে আসন্ন এই সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোটের আঞ্চলিক নেতারা যেমন, তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা উত্তরপ্রদেশের নিম্নবর্গের দল, বহুজন সমাজবাদী পার্টি দলের নেতা মায়াবতী প্রভুদাস – তারা এবার মনে করছেন, তারাও কেন রাহুল গান্ধীর মত “প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার” হবেন না? তারা অযোগ্য কিসে? এ কারণে আঞ্চলিক দলগুলো এবার জোট গঠনের শুরুতেই কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে আগের মত ইউপিএ জোট বাঁধতে দ্বিধা করছে। আর পুরান ধরণে ইউপিএ-জোটের বিপরীতে প্রথম থেকেই এবার সরব হয়েছেন মমতা। তিনি আরো এগিয়ে বলেছেন, তার আলাদা জোটের দাবির অর্থ হল, এবার ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ গড়তে হবে। মানে কংগ্রেসকে ছাড়াই আগে আঞ্চলিক দলগুলোর একটি জোট হবে। এরপর কংগ্রেসকে সাথে নেয়া বা না নেয়ার প্রশ্ন। সার কথায়, বিজেপির এনডিএ নামে জোট থাকলেও এর প্রতিদ্বন্দ্বী জোট কোনটা হবে ইউপিএ নাকি প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’- এটাই নির্ধারিত হতে একটু সময় নিচ্ছে, তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা হয়ে যাবে। ডিসেম্বর এজন্য যে ঐ মাসে পাঁচ রাজ্যের (রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম ) প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল এর নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। ঐ রাজ্য-নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে ওসব রাজ্যের আঞ্চলিক দল ও জোটে আসন ভাগাভাগির বুঝাবুঝি কেমন কী দাড়ায় – এর উপর সব কিছু নির্ভর করছে। সেটা দেখতেই সবার অপেক্ষা।

বিপরীত প্রসঙ্গ হিসাবে বিজেপিঃ
ইতোমধ্যেই এটা স্পষ্ট যে, এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর অবস্থা খুব শোচনীয় হতে পারে। কেন? কারণ মোদীর “ইকোনমিক পারফরম্যান্স” (Economic Performance), অর্থাৎ গত প্রায় পাঁচ বছরে মোদী অর্থনীতিতে কেমন করলেন! কেন্দ্রিয় সরকার অর্থনীতিতে ভালো বা মন্দ করছে কি না এনিয়ে ভারতের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচনে এটা কোন ইস্যু হতে দেখা যায় না বা এর তেমন প্রভাব পড়তে দেখা যায় না বললেই চলে। এটা চলতি মোদী সরকারের আমলনামার ভিত্তিতে বলা খবর। গত সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের বেলায় এটাই দেখা গেছে যে, মোদীর খারাপ “ইকোনমিক পারফরম্যান্স’ (বা অর্থনৈতিক সাফল্য) সেখানে কোথাও কোন ইস্যু হতে পারে নাই। কিন্তু গত দুইবারের (২০০৯ ও ২০১৪) কেন্দ্রের নির্বাচনে দেখা গেছে – আগের (কংগ্রেস ২০০৪-০৯) সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণে পরের বারও কংগ্রেস বিপুল ভোট পেয়ে আবার ক্ষমতায় এসেছিল। আবার ইউপিএ-টু (২০০৯-১৪) সরকারের ব্যর্থতাকে প্রবলভাবে তুলে ধরে দেখিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী (বিজেপি) দল ভোটে নিজে সেই জায়গা নিবে, অর্থনীতিতে ভাল করবে – এই কথায় প্রলুব্ধ করার মত করে ভোটারদের আস্থায় নিজেকে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন মোদী, এই সম্ভাবনা জাগাতে পেরেছিল বলেই মূলত একারণেই মোদী জিতেছিলেন।

এ দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর ছিল “অর্থনৈতিক সাফল্য” – এই ইস্যু। আবার এই সাফল্য প্রদর্শন মানে কেবল জিডিপি অনেক ভাল হলে হবে, তা নয়। সাথে দেখাতে হবে একদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক ‘কাজ সৃষ্টির’ বিষয় সে পেরেছে বা পারবে; অন্য দিকের গুরুত্বপূর্ণ হল, ব্যবসায়ীদের (ম্যানুফ্যাকচারার, বাণিজ্য আর শেয়ার মার্কেটসহ) মধ্যে আস্থার জোশ তুলতে পেরেছে কি না। কংগ্রেস ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে; আবার ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে কংগ্রেসের হাল ছেড়ে দেয়ার মুখে সেটা আবার ঘটাতে মোদির দল ও সরকার পারবে, এই আশা জাগাতে পেরেছিলেন তিনি তাই। এভাবে দুই ক্ষেত্রেই প্রধান ফ্যাক্টর ছিল অর্থনীতিতে পারফরমেন্স। আসলে নিরন্তর গরিব হালে ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধুঁকে মরা দশায় তাদের ফেলে রাখা হয়েছে। তাই, ভারতের নির্বাচনে, “অর্থনীতিতে পারফরমেন্স” মুখ্য ভুমিকায় হাজির হবে – এটাই তো স্বাভাবিক!

তাহলে কেবল এই বিচারে ২০১৯ সালের নির্বাচনে, বিজেপির মোদীর আবার জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, বলতে হয়। কারণ প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সাফল্যের বিচারে মোদী ইতোমধ্যে ব্যর্থ। শুধু তাই না, অর্থনীতিতে সাফল্যের বিচারে – একটু পুরান এবং নতুন (চলতি) – দু ধরণের ইস্যুই আছে; আবার একটু পুরান ইস্যুটা বিরাট বড় ইস্যু। এছাড়া একালের নতুন দগদগে ইস্যুও আছে যা সামনের কয়েক মাসে ‘আরো দগদগে ঘা’ হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা।

একটু পুরনো ইস্যুটা হল, গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে, মোদীর ‘নোট বাতিলের’ (DeMonetization) সিদ্ধান্ত। আগামি দিনের ইতিহাসে এবং আসন্ন নির্বাচনেও মোদী সরকারের বিরাট ব্যর্থতা বলতে অবশ্যই ‘নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত, সামনে আসবে। মানুষের মনে ভেসে উঠবে। নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত কথাটার মানে হল, ভারতের মুদ্রায় সবচেয়ে বড় নোট ছিল ৫০০ ও ১০০০ রুপির। ঐ দিনের শেষে রাত্রে হঠাৎ – এই দুই ধরনের সব নোটই বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন মোদী। যদিও পুরান নোট ব্যাংকে জমা দিলে সেটার বদলে নতুন নোট দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু নাম ঠিকানাসহ কে জমা দিচ্ছেন, তা বলতে হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর হল – মানুষের ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস অথবা দিনমজুরি সব ধরনের কাজ ফেলে ব্যাংকে লাইন দেয়া। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতায় একেবারে এলোমেলো শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়া তো আছেই, সেই সাথে বহু কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়েছিল। আর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব অর্থনৈতিক তৎপরতা ও লেনদেন-বিনিময়ে ভারতের অর্থনীতিতে সচলতার ব্যস্ততা যে পর্যায়ে আগে ছিল অর্থনীতির সেই সাজানো বাগান এবার অর্ধেক হয়ে, বড় স্থবিরতার দিকে গড়াতে থাকে।

দুটা উদাহরণ দিলে এর মারাত্মক প্রভাব বুঝা যাবে। ভারতের অর্থনীতির হাব বলে বুঝানো বা মনে করা হয় মুম্বাইকে আর একালে সাথে পড়শি গুজরাতকেও। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এদুই রাজ্যের অর্থনৈতিক ততপরতা অগ্রসর ও গতি বেশি। ব্যাপারটা কলকাতার স্বর্ণকারদের মাঝে কীভাবে আমল হয়েছিল এর একটা প্রমাণ হল, তারা দল বেধে গুজরাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত এলাকায় দোকান খুলে বসেছিল; একেক জন মুল ওস্তাদ আর সাথে পাঁচ-ছয় জন সাগরেদ এভাবে। তারা সেখানে ভাল আয় করতে পারত ফলে নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গের পরিবারের চলতে তাদের কাছে টাকা পাঠাতেও পারছিল। অর্থনীতিক স্টাডির মুল্যায়নে এগুলো অবশ্যই ‘মূল’ কাজ সৃষ্টি নয়, ইনফরমাল সেক্টর বলা হবে। মানে হল, সরকারের নীতির কারণে যারা কাজ পেয়েছে বা আয় বেড়েছে – এই মূল সুবিধাভোগীদের স্বচ্ছলতার কারণে সৃষ্ট এরা। মুল ফরমাল সেক্টরের কাজ পাওয়া সদস্য তারা নয়। তবে ফরমালদের আয় বাড়াতে ইনফরমালের কিছু লোক তাতে নিজেদের সম্ভাবনা দেখেছিল। তারা নিজেরাই যা পারে তেমন কিছু সার্ভিস নিয়ে ঐ সুবিধাভোগীদের কাছে হাজির হবার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া – এজন্য এটা ইনফরমাল, আর সুবিধাভোগীরা হল ফরমাল সেক্টর। সরকারের খুবই সফল নীতি পলিসি হলে তাতে,  ফরমাল সেক্টরের নিয়োগের চাহিদাই যত বেশি হবে ততই ইনফরমাল সেক্টর ত্যাগ করে মানুষ ফরমাল সেক্টরে চলে যাবে। ফলে তা ঠিক করে দেয় যে একজন চাকরি প্রার্থী বা লেবারকে কতদিন ইনফরমাল সেক্টরে থাকতে হবে। সারকথায় মোদীর অর্থনীতি স্বর্ণকারদের ভাল-সুবিধায়-ভরপুর কাজ দিতে পারে নাই সত্য কিন্তু এর ভিতরেই কলকাতার স্বর্ণকারেরা প্রতি ওস্তাদ পিছু পাচ-ছয় সাগরেদ মিলে ভিন রাজ্যে বেঁচে থাকার অবস্থার (ইনফরমাল) কাজ খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু মোদীর নোট বাতিলের প্রভাবে শ্লথ অর্থনীতির কারণে এদের এটুক স্বপ্নও ভঙ্গ হয়ে যায়। গুজরাতে কাজের অভাবে এরা সবাই সব গুটিয়ে দেশে ফিরে চলে যায়।  তাদের পরিবারসহ তারা এখন সেই আগের দুঃসহ গরীরি হালে ফিরে এসেছে।

আমাদের কাওরান বাজারের মত দিল্লীর পাইকারি বাজারের দিনমজুরঃ পাইকাররা মালামাল কিনলে তা পৌছে দেয়া বা গাড়িতে তুলে দেয়া এই কাজ করে তাদের দৈনন্দিন পাঁচশ রুপির মত আয় করতে পারত। কিন্তু নোট বাতিলের কারণে একই পরিণতি। ঢলে পড়া অর্থনীতির প্রভাব এই পাইকারি বাজারের এতই নিচে পড়েছে যে ঐ মজুরেরা দুই-তিনশ টাকা দৈনিক আয় করতে হিমশিম খেয়েছে। কয়েকদিন তারা উপায়ন্ত না দেখে “বাতিল নোটে মজুরি” নিবে পরে নিজে সময় দিয়ে ব্যাঙ্কে তা বদলে নিবে – এই শর্তে কাজ করেছে। একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে এর প্রভাব কত স্তরে পরে তা বুঝার জন্য এই উদাহরণ দুইটার খুটিনাটি লক্ষ্য করলে অনেক কিছু টের পাওয়া যায়। এছাড়া আসলে এটাই তো স্বাভাবিক, একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে বা যেকোন বিপর্যয় দেখা দিলে সবার চেয়ে বেশি এর চাপ গিয়ে পড়ে স্বল্প আয়ের নিচের মানুষের উপর। মোদী নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এদিকটা আমলই করেন নাই যে তাঁর  টার্গেট লক্ষ্যচ্যুত হলে, তিনি ব্যর্থ হলে পরে এর প্রভাব কত স্তরে কত মারাত্মক হতে পারে।

বরং মোদি আশ্বাসের উপরে চলছিলেন যে, রুপি বদলে নিতে ব্যাঙ্কে আসলে – এতদিন যারা নগদ রুপিতে সম্পদ রাখা কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির সবাই এবার ধরা পড়বেন। অর্থাৎ ধরা পড়ার ও পরে শাস্তির ভয়ে এরা আর ব্যাঙ্কেই আসবে না। সেক্ষেত্রে সরকারের অনুমান ছিল, ৮৫ শতাংশের হয়ত বৈধ আয় বলে রুপি বদলে নিতে আসবে। বাকি ১৫% নোটের মালিক এরা কালোটাকার মালিক বলে ধরা পড়ার ভয়ে তাঁরা আর রুপি বদলে নিতে আসবে না, ফলে প্রায় ২৪০ হাজার কোটি রুপি রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে না, তাই বিপুল লাভ হবে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দেখা গেল, ৯৯ শতাংশ ছাপানো মুদ্রাই ফেরত এসেছে। অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আসেনি। এর মানে, সারা ভারতের জনগোষ্ঠীকে কষ্ট দিয়ে, বিশেষ করে গরিব মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েও কোনো সুফল মেলেনি।

বরং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ রুপি ফেরত আসেনি বলে, ভারতের মিডিয়া লিখছে, ‘‘এ থেকে যা ‘লাভ’ তা মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা। নতুন নোট ছাপা ও বণ্টন এবং অর্থনীতির সামগ্রিক ক্ষতি বিবেচনা করলে অবশ্য সেই লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যাবে!” অথচ সবচেয়ে কষ্টকর অবস্থা স্বল্প আয়, ‘দিনে আনে দিনে খায়’ লোকদের। এ ছাড়া, মূল ক্ষতিটা হয়েছে তাদের কাজ হারানো।

মোদির দ্বিতীয় ব্যর্থতার ইস্যুঃ মোদি গত নির্বাচনে আশ্বস্ত করেছিলেন – নির্বাচিত হলে কংগ্রেসের প্রথম জমানার (২০০৪-০৯) মত ভাল অর্থনীতি তিনি গড়বেন। এ ছাড়া আর আরো বেশি কাজ সৃষ্টি করবেন। তার দেয়া নতুন টার্গেট ছিল, বছরে দুই কোটি লোকের কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু এখন সমালোচকরা বলছেন, বাস্তব পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, উলটো গত চার বছর ধরে গড়ে ৭০ লাখ করে কর্মসংস্থান কমেছে। এটা কাজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গত আট বছরে সর্বনিম্ন। সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন তরুণেরা এখনও বছরে ২ কোটি কাজ সৃষ্টি দেখার অপেক্ষায় আছে। [……said young Indians were waiting for the 20 million jobs promised by the Bharatiya Janata Party (BJP).]

একইভাবে রয়টার্সের এই রিপোর্ট বলছে, যার শিরোনামটাই সাংঘাতিকঃ [No jobs, no vote: Indian town warns Modi ahead of 2019 polls]। ঐ রিপোর্টই আরও বলছে,  কাজ সৃষ্টি দূরে থাক,  ভারতে বেকারত্ব এখন সর্বোচ্চ। [……hit its highest level in 16 months in March at 6.23 percent, according to the Centre for Monitoring Indian Economy (CMIE), an independent think-tank.]

চলতি সময়ে মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ইস্যু – তেলের দামঃ
ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের বিপুল ঘাটতি শুরু হয়েছে, এই ঘাটতিই  সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধির কারণ। ২০১৬ সালে দাম সর্বোচ্চ নেমে যাওয়ার সময়, ৩০ ডলারে নেমে যাওয়া জ্বালানি তেল কিনেছিল ভারত। আর এখন তা (অক্টোবর ২০১৮) ৮৪ ডলার এবং এ দাম ক্রমবর্ধমান। তেলের দাম কমাতে সেই সময় রাজস্ব বিভাগ ১৪০ বিলিয়ন ডলার বাড়তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল। কিন্তু সেই অর্থ থেকে কোন আপতকালীন রিজার্ভ রাখা হয় নাই, বরং পুরা অর্থ অন্য প্রকল্পে লাগিয়ে ফেলায় এখন মোদীর পক্ষে কোন ভর্তুকি আয়োজনের সুযোগ নাই।  তাই ভারতের শহরগুলোতে তেলের পাম্প-স্টেশনে তেলের দাম এখন ওঠানামা করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাথে সম্পর্কিত হয়ে, কোনো সরকারি ভর্তুকি এখানে নেই।
তবুও আগের অবরোধের সময় ভারতের আরও একটা বিশেষ সুবিধা ছিল,  কমমুল্যের ইরানি তেল সরবরাহ কিনতে পারত ভারত (আমেরিকান অবরোধ ভারতের উপর শিথিল থাকত, আর ইরানও কিছুটা সস্তায় তেন বিক্রি করত)  – যেটা খুব সম্ভবত মোদী এবার হাতছাড়া করে ফেলেছেন। ইরান ছিল ভারতে তেল সরবরাহকারি হিসাবে তৃতীয়। এর আগের যেকোন তেল অবরোধের ক্ষেত্রেও আমেরিকার থেকে বিশেষ ছাড় পাবার কারণে ঐ বিশেষ সুবিধার দামে ইরানি তেন কিনতে পেরেছিল ভারত সেটা এবার ব্যতিক্রম কারণ এবার  – রাশিয়ান অস্ত্র আর ইরানি তেল ক্রয় – দুটার ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন জোর আপত্তি জারি করেছিল। খুব সম্ভবত রাশিয়ান অস্ত্র ক্রয়ে ছাড় পেতে আর ট্রাম্পকে খুশি করতে এবারই প্রথম ভারত আমেরিকাকে জানিয়েছে যে, অবরোধ মেনে ইরানি তেল এবার ভারত ক্রয় করবে না। ব্রাকেটে বলে রাখা যায়, চীন এখনও ইরানি তেল কিনছে, তবে ইরানি ট্যাংকার পৌছে দিবে এই শর্তে।

আর মোদীর ক্ষেত্রে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনীতিক গতি বা উন্নতির এক প্রধান নিয়ামক হল জ্বালানি তেলের মুল্য এবং মুল্যের স্থিরতা। ফলে তেলের দাম এবার ভারতের অর্থনীতিকে শ্লথ করার ক্ষেত্রে প্রধান ভুমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে।

ওদিকে আবার তেলের দামের প্রভাবে ভারতে উঠে এসেছে মুদ্রাস্ফীতিও, যেটা তেলের দাম বৃদ্ধির আগে থেকেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী।  এছাড়াও আছে খারাপ ঋণ (নন-পারফরমিং লোন) বিতরণ গত পাঁচ বছরে ৪৫০ গুণ বেড়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্ট করেছে; পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তর থেকে জানা যাচ্ছে তা ১৪৮ বিলিয়ন ডলারের মত।

শেষ বড় আঘাতঃ রুপির দর পতন
সব কিছু মিলিয়ে আবার বাজারের বিরাট অস্থিরতায় রুপি-ডলার বিনিময় হারে রুপির মান কমেই চলেছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা নেয়ার সময় ডলার ছিল ৬০ রুপি, সেটা এখন ৭৪ রুপি। ভারতের ইকনমিক টাইমসের প্রাক্তন সম্পাদকের দাবি রুপির এই মুল্য পতনের পরিমাণ ১২.৫%। [Rupee is Asia’s worst performing currency ..]

তাহলে সার কথাটা হল ‘অর্থনৈতিক সাফল্যের’ ইস্যুতে মোদীর প্রায় সব প্রতিশ্রুতি গত চার বছরে উলটো দিকে হাঁটছে। তাই আর সাফল্য নিয়ে যেন কেউ আর কথা না বলে, এটাই এখন মোদীর কাম্য। তাহলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভারতে যে জাতীয় নির্বাচন আসন্ন – বিজেপি ও মোদিকে যার মুখোমুখি হতে হবে – সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদী বা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ কী করবেন?

অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যু চাপা দেয়া বা পেছনে ফেলে দেয়ার উপায় নিশ্চয় মোদী-অমিত খুঁজবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে এদের একমাত্র ইস্যু এখন হিন্দুত্ব; মুসলমানবিদ্বেষের দামামা সর্বোচ্চ শব্দে বাজানো। এই আলোকেই অমিত শাহের মুসলমান নিধন, বাংলাদেশীদের ‘উইপোকা-তেলাপোকা’ বলে তুচ্ছ করে সম্বোধন এবং মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গালাগালি, তাদের হত্যা করার হুঙ্কার – এসব কিছুকে আমাদের দেখতে ও বিচার করতে হবে। সেই সাথে আসামের নাগরিকত্ব বিল নিয়ে আরো নোংরা হুঙ্কার। আসামের মতো নাগরিকত্ব বাছাইয়ের কর্মসূচি পশ্চিমবাংলা ও ছত্তিশগড় এবং অন্যান্য রাজ্যে চালু করা হবে বলে স্থানীয় বিজেপি হুমকি দিচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই- এ কথা বলে মুসলমানবিদ্বেষী একটা আবহ সৃষ্টি করা। ওদিকে ত্রিপুরায় গিয়ে বিজেপিরই আরেক অসভ্য এমপি সুব্রমানিয়াম স্বামী বাংলাদেশ দখলের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি নাকি হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট, এর নমুনা এটা?

ব্যাপারটা ভারতের আর এক সিনিয়র সম্পাদক,  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গ্রুপের শেখর গুপ্তা, তাঁরও নজরে পরেছে। তিনি নিজেই দ্যা প্রিন্ট এরও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি লিখেছেন, BJP has decided to use Assam as its key to 2019। আবার  রাহুল গান্ধীও হিন্দুত্বের রাজনীতির অনুসারি হয়ে উঠতে চাইছেন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই শেখর লিখছেন, রাহুলেরটা সফট হিন্দুত্ব

সারকথায় এভাবে নাহলে ওভাবে এসব মুসলিমবিদ্বেষী দামামা, ঘৃণা উগরানো আসন্ন হয়ে উঠছে।  এসবেরই উদ্দেশ্য একটাই – মোদীর ডুবে যাওয়া অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের সমস্যাকে আড়াল করে বিজেপি দলকে ভোট চাইবার ‘উপযুক্ত’ করে তোলা। সে কারণে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ভারতের সমাজকে বিভক্ত ও মেরুকরণের ফলে যাতে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে ‘হিন্দুত্ব’। অর্থাৎ আগামী ছয় মাস, অন্তত ভারতের নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মুসলিমবিদ্বেষের বিষ, ঘৃণা উগলানো দেখতেই থাকব, সেই আশঙ্কা হচ্ছে।

শেষ কথাঃ
ভারতের এই ভোটযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক বিচারে আমাদের জন্য “ফেবারিট” বা কাম্য হল, ‘ফেডারল ফ্রন্ট’ গড় উঠে এরা জয় লাভ করুক। এটা মনে রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের নির্বাচন ২০১৯; কী হতে যাচ্ছে?”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

গৌতম দাস

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tY

 

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে

প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party'”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2sO

Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

[Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

[New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

বিজেপির অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন

গৌতম দাস

০৯ জুন ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2s2

 

 

কখনও কখনও কারো কারো কোন কথা বিশ্বাস হতে চায় না। তেমনই এক অবস্থা তৈরি হয়েছে ভারতের কিছু রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীদেরকে নিয়ে। সত্যি কথাও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। ধরা যাক, এমন একটা বাক্য পত্রিকার পাতায় পাওয়া গেল যেখানে ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতা অথবা মন্ত্রী বলছেন, “ধর্মের নামে জনগণের মাঝে বিভক্তি আনার কথা বলা অনুচিত”। অথবা বাক্যটা একটু এরকম যে বলা হয়েছে, “ভারত এমন এক দেশ যেখানে জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারও প্রতি বৈষম্য করার সুযোগ নেই। এটা কখনো বরদাস্ত করা হবে না”। বলাই বাহুল্য এমন বক্তব্য নিশ্চয় ভারতের কোনো সেকুলার বা কমিউনিস্ট নেতার বক্তব্য বলেই আমরা ধরে নিব।

কিন্তু না। এই অনুমান ও ধারণা অবিশ্বাস্যভাবে শতভাগ ভুল। আসলে প্রথম কথাটা বলেছেন, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। আর পরের কথাটা বলেছেন, ভারতের মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এদের দু’জনের বক্তব্য একই প্রসঙ্গে একই দিনে। ভারতের লিডিং সব ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকাতে গত ২২ মে অথবা পরের দিন এই খবর পাওয়া যাবে। এমনকি গ্লোবাল নিউজ এজেন্সি রয়টার্সও একই খবর পাঠিয়েছে। ফলে পাঠককে আশ্বস্ত করে বলা যায়, এখানে দেখতে বা পড়তে কোনো ভুল হয়নি।

ওদিকে আবার, আমরা যদি দেখি কেউ কাউকে “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা” করতে পরামর্শ দিচ্ছেন, আমরা ধরে নিতে পারি যে, ওই পরামর্শদাতা আর যাই হোক বিজেপি কোনো নেতা বা মন্ত্রী নিশ্চয় নন। কিন্তু না, এখানেও বিস্মিত হওয়ার পালা। মোদী সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক এক মন্ত্রী আছেন যার নাম মুক্তার আব্বাস নাকভি। তিনি বলেছেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার। আমরা তাদের এটাই বলতে পারি যে, প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করুন”। এখানেও আগের একই প্রসঙ্গে মন্ত্রী নাকভিও এই বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে কী সেই প্রসঙ্গ, যা থেকে অবিশ্বাস্য সব কথা বের হয়ে আসছে বিজেপির নেতা ও মন্ত্রীদের মুখ দিয়ে?

রয়টার্স লিখেছে, “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান। কাগজকলমে ভারত সেকুলার হলেও পাঁচ ভাগের চার ভাগ মানুষ এদেশে হিন্দুধর্ম চর্চা করে”। [Christians constitute less than 3 percent of Hindu-majority India’s 1.3 billion people. India is officially secular, but four-fifths of its population profess the Hindu faith.] এই তিন শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সারা ভারতেই ছড়িয়ে আছে, দক্ষিণ ভারতে তুলনামূলকভাবে এর ঘনত্ব বেশি। আর রাজধানী দিল্লির ক্ষমতা কাঠামোর করিডোরে অথবা একাডেমিক বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিও দৃশ্যমান। বিশেষ করে নাম কামানো মিশনারি স্কুল ও কলেজগুলোর কারণে ঐ সমাজে তারা অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। আবার সারা দুনিয়ার মতো ভারতেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধারা রয়েছে। দিল্লির ক্যাথলিক ধারার আর্চবিশপ হলেন অনিল কুটো (Anil Couto)। তিনি তাঁর ধারার অন্যান্য বিভিন্ন চার্চ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এক অভ্যন্তরীণ চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমরা একটা টালমাটাল রাজনৈতিক আবহাওয়া প্রত্যক্ষ করছি, যেটা আমাদের কনষ্টিটিউশনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং আমাদের জাতীয় সেকুলার নীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে”। [“We are witnessing a turbulent political atmosphere which poses a threat to the democratic principles enshrined in our Constitution and the secular fabric of our nation,”]। তাই ঐ চিঠিতে তিনি আহ্বান জানান আগামী বছরের নির্বাচন পর্যন্ত তাদের অনুসারী শাখাগুলো যেন এ জন্য এক ‘বিশেষ প্রার্থনা কর্মসূচি’ হাতে নেয়। এই চিঠি তিনি লিখেছিলেন গত ৮ মে। সেটা দু’সপ্তাহ পরে হলেও প্রকাশ্যে বিজেপির নজরে আসাতে তারা আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এই চিঠির ‘বিপদ’ টের পেয়ে যান। এই চিঠিটা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী জোট খাড়া করে ফেলার উপাদানে ভরপুর, তা বুঝতে বিজেপির দেরি হয়নি।

যদিও এই চিঠিতে যে একশনের আহ্বান জানানো হয়েছে তা খুবই ‘হেদায়েতি ভাষ্য’। বলা হয়েছে – যিশু ও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে। অর্থাৎ কোনো মিছিল মিটিং করার আহ্বান দূরে থাক, আলোচনা সভাও করতে বলা হয়নি। আর প্রতি শুক্রবার “জাতির জন্য উপাস থাকা’ পালন করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এর সোজা মানে করে বললে এটা হল, বড় জোর আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ধরনের একটা ততপরতা। এর মধ্যে ন্যূনতম কোনো আক্রমণাত্মক ভাষ্য নেই। সাদামাটা এ বক্তব্যের মধ্যে স্পিরিচুয়্যাল শক্তির প্রার্থনা, নালিশ ও আহ্বান আছে অবশ্যই। সেই সাথে, সব ধর্মের লোকদের মাঝে পারস্পরিক ঘৃণা বা হিংসার সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় যেন থাকে, এ কামনায় প্রার্থনা করতে বলেছেন আর্চ বিশাপ।

কিন্তু এটাও সহ্য করার অবস্থায় নাই বিজেপি। কারণ এই চিঠিতে খ্রিস্টান, অখ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার প্রতি আবেদন রেখে সবাইকে মানবিক স্পর্শে ছুয়ে ফেলে মিলিত এক শক্তি হয়ে ওঠার মতো বহু উপাদান ও ক্ষমতা আছে। এটাই এই চিঠির শক্তির দিক। আর আসন্ন (২০১৯ সালে) নির্বাচনে এটা বিজেপির রাজনীতির জন্য বিরাট বিপদের দিক ঠিক ততটাই। তাই, সহজেই অনুমান করা যায় এই ধারণা থেকেই বিজেপি ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসভাবে নিয়ে পাল্টা চাপ তৈরি ও অভিযোগ অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিজেপির মূল আদর্শিক সংগঠন আরএসএস (RSS), সেও উপায়ান্তর না দেখে নিজেই ‘সেকুলার’ হয়ে গেছে। দাবি করেছে, আর্চবিশপের এই চিঠি “ভারতের সেকুলারিজম ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ”। […the RSS claimed it was a “direct attack on Indian secularism and democracy].’ আর তা থেকেই ২২ মে, অমিত শাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথসহ বিজেপি অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীদের সব অবিশ্বাস্য বক্তব্য।

কিন্তু বিজেপির কাছে সমস্যা দেখা দেয় যে, বিজেপি কী বয়ান দিয়ে এই চিঠির বিরোধিতা করবে? কারণ এই চিঠির অভিযোগের বিরোধিতা করতে গেলে খোদ বিজেপির রাজনীতিরই বিরুদ্ধে ও বাইরে চলে যেতে হবে। যেমনঃ এখানে সবচেয়ে বড় তামাশার শব্দ হয়ে উঠেছে ‘পোলারাইজেশন’- যার বাংলা হল, “জনগণের মাঝে বিভক্তি” অথবা “সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্তি”। এখানে আর্চবিশপের চিঠির অভিযোগকে মিথ্যা বলে বিজেপি অস্বীকার করে কোনো পাল্টা বয়ান খাড়া করতে গেলে তাতে ভারত রাষ্ট্র ও সরকারের জাত বা ধর্মের ভিত্তিতে কারো প্রতি বৈষম্য করার বিরোধিতা করতে হবে অথবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি করার বিরোধিতা করতে হবে। এটাই মডার্ন রিপাবলিক কোনো রাষ্ট্রের “সাম্য নীতির” মূল কথাঃ কোনো পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সবাইকে সমান গণ্য করতে হবে, রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ, বা সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে না।

কিন্তু বিজেপির রাজনীতির মূল কথাই হচ্ছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজকে পোলারাইজ করতে বা বিভক্তি টানতে হবে। এটা তারা করে যতটা হিন্দুত্বকে ভালোবেসে এর চেয়েও বেশি হল, ‘হিন্দুত্বের ভোট’ বাক্সের প্রতি ভালোবাসা। প্রধানত, হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশে ‘হিন্দুত্বের ভোট’-এর জোর অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এটাই দলটা সবচেয়ে ভাল করে জানে। তাই বিজেপি মানেই সমাজকে হিন্দুত্বে উসকে পোলারাইজ করা; ভোটের বাক্স ভর্তি করা।

কিন্তু আর্চবিশপের অভিযোগ বিজেপিকে কুপোকাত করে দিয়েছে। তাই উপায় কী, নরম ভাষায় হলেও, বিজেপিকে নির্বাচনের বছরে খ্রিষ্টান কমিউনিটির অভিযোগ তো ঝেড়ে অস্বীকার করতেই হবে। নিরুপায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবার তাই সুশীল ভদ্র হয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘It’s not appropriate if anyone is talking about polarising people in the name of religion । আসলে নিজেরই দলের স্বভাব ও রাজনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, “পোলারাইজেশন হারাম”। একইভাবে, অগত্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং কনস্টিটিউশনের সাম্যনীতি আঁকড়ে ধরে হুঙ্কার (আসলে নিজের বিরুদ্ধেই) দিচ্ছেন, “… no discrimination against anyone on the basis of caste, sect or religion. Such a thing cannot be allowed,” – কোনো বৈষম্য বরদাস্ত করা হবে না। আর বিজেপি সরকারের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নাকভি সোজা মিথ্যা বলেন, “ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি ভেঙে কোনো রকম ভেদাভেদ না করে উন্নয়নের চেষ্টা করছে মোদি সরকার”। আর সেই সাথে তিনি আবার ‘প্রগতিশীল’ বলে শব্দটাও ধার করেছেন, তা বিজেপি রাজনীতির পরিভাষা নয় অবশ্যই। বলেছেন, “প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুন”।  আসলে বিজেপির মূল অবস্থান হল, আর্চবিশপ অনিল কুটোর অভিযোগ যেভাবেই হোক অস্বীকার করতে হবে, তাতে বিজেপির নিজ রাজনীতির বিরোধিতা করে হলেও। দলটার এতই দিশেহারা অবস্থা। তবে আর একটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা হল – উল্টা আর্চবিশপের ওপর অভিযোগ আনা যে, তিনি খ্রিষ্টান-অখ্রিষ্টান বিভেদ তুলছেন এবং বিশপের বক্তব্য রাজনৈতিক, এই অভিযোগ তোলা।

এদিকে ভারতের মিডিয়ার অবস্থা ‘ভয়াবহ’ বললে কম বলা হয়। সম্প্রতি বিজেপির এক ছদ্ম সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে [sting operation] শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২৫ টিভি চ্যানেলকে তারা বিজেপির হিন্দুত্বের পক্ষে টাকার বিনিময় প্রচার চালাতে চায় কী না – এই অফার দিলে দেখা গেছে দুইটা বাদে তারা প্রায় সবাই রাজি। এই অপারেশন চালানোর পর ‘কোবরাপোস্ট’ https://www.cobrapost.com    নামে এক ওয়েবসাইট থেকে ইউটিউবে সব কথোপকথন ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। তেমনি এক নিউজ এজেন্সি এএনআই টিভি, (ANI TV) তারা এই ইস্যুতে বিজেপিকে সার্ভিস দিতে নিউজ ক্লিপ তৈরি করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো আসলে বিজেপির দিক থেকে আর্চবিশপকে দেয়া হুমকিমূলক বার্তায় ভরপুর বলা যায়। বিজেপির আর এক মন্ত্রী গিরিজা সিং সেখানে আর্চবিশপের চিঠির ঘটনাতে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘সব ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে।’ [Giriraj Singh as saying that “every action has a reaction”]। বিজেপির আর এক নেতা বিনয় কাতিয়ার বলছেন, আর্চবিশপের মন্তব্য বিভিন্ন ‘সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা, অসন্তোষ তৈরি’ করতে পারে [archbishop’s comments could lead to “communal tensions”.]। মোদী সরকারের টুরিজম মন্ত্রী বলেছেন, Union minister of tourism KJ Alphons said Couto’s remarks were “unfair” to the government and that “godmen” should stay away from politics. অর্থাৎ এটা হলো দাঙ্গা তৈরির অপবাদ দিয়ে ভয় দেখানো। স্বভাবতই এতে খ্রিষ্টান ধর্মের অন্য প্রায় সব ধারার নেতারা আর্চবিশপের পদক্ষেপ ও অভিযোগকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।

আর্চবিশপের অভিযোগের ফলে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির হেরে যাওয়ার পক্ষে তা ভূমিকা রাখতে পারে ভেবে বিজেপি আজ ‘ভেজা বিলাই’ সাজছে, সব অভিযোগ অস্বীকার করছে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ২০১৫ সাল থেকেই নিয়মিতভাবে বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠন, ‘ঘর ওয়াপাসি’ প্রোগ্রামের নামে নির্বিচারে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, সম্পত্তি দখল, চার্চ ও মসজিদে হামলা, হত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছে। গত ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসীন হবার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় ও পরবর্তিতে, তিনি সরবে ও প্রকাশ্যে মোদি সরকারের খ্রিস্টান ও মুসলমান দলনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভারত রাইজিং ইকোনমির দেশ হয়ে চাইলে এগুলো বন্ধ করতে হবে, এগুলো নেতি ইমেজ তৈরি করে। ওবামা বলেছিলেন,  “ভারত সফল হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ধর্মীয় লাইনে বিচ্ছিন্নতা বিভক্ত হয়ে পড়া ঠেকাতে পারবে [India will succeed as long as it is not ‘splintered’ on religious lines: Obama]

ফলে পরে চাপের মুখে মোদী এবিষয়ে তাঁর সরকারের নীতি কী তা পাবলিকলি ঘোষণা করেছিলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। তিনি বলেছিলেন,  “যেকোন নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা রক্ষা’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব” – এটাই নিজের সরকারি নীতি বলে দিল্লির এক চার্চে্র অনুষ্ঠানে তিনি লিখিতভাবে এই বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছিলেন। কথাগুলো মোদীর মুখ থেকে বের হয়েছে ভেবে অবাক অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু এই লিখিত কথাগুলা মোদীর নিজস্ব ওয়েব সাইটে এখনও আছে। সেখান থেকে আমি এখনই টুকে আনলাম। অন্যান্য নিউজ অন লাইনেও পাবেন।

My government will ensure that there is complete freedom of faith and that everyone has the undeniable right to retain or adopt the religion of his or her choice without coercion or undue influence. My government will not allow any religious group, belonging to the majority or the minority, to incite hatred against others, overtly or covertly. Mine will be a government that gives equal respect to all religions.

উপরের অংশটুকুর বাংলা অনুবাদ আমার করাঃ ভারতের পক্ষ থেকে, আমার সরকারের পক্ষ থেকে বললে আমি ঘোষণা করছি আমার সরকার ওপরের ঘোষণার প্রতিটা শব্দ ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমার সরকার ধর্মবিশ্বাসের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে যে প্রত্যেক নাগরিক সে কোনো ধর্ম ধরে রাখা অথবা গ্রহণ করা তার পছন্দের বিষয় এবং এটা কোনো ধরনের কারো বলপ্রয়োগ অথবা অন্যায্য প্রভাব ছাড়াই সে করবে এটা নাগরিকের অ-অমান্যযোগ্য অধিকার। আমার সরকার কোনো ধর্মীয় গ্রুপ, তা সে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যে ধরনেরই হোক, সঙ্গোপনে অথবা খোলাখুলি অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহ্য করবে না। সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান দেবে আমার এই সরকার।

মোদীর পুরা বক্তৃতার টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করা পাবেন এখানে, আমার আগের লেখায় শেষ অংশ।

কিন্তু তার এই কথায় যে ফাঁক ছিল তা হল, তিনি “মোদী সরকারের” নীতি শুনিয়েছিলেন। “মোদীর দল বিজেপির” নীতি নয়। এছাড়া  আসলে দুঃখের বিষয়, মোদী নিজেই এরপরে বিজেপি দলে, বিশেষ করে আরএসএসে নিজ প্রতিদ্বন্দ্বিদের ঠেলাগুতা চাপ পড়ে নিজেই “সংখ্যালঘু মত” হয়ে যান। বিশেষ করে  ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির মূল পরিচালক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (আরএসএস এর অঙ্গ সংগঠন) প্রভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে হেরে যান। ‘ঘর ওয়াপসি’ কথার আক্ষরিক মানে হল “ঘরে ফিরিয়ে আনা”। সোজা মানে হল, এর আগে কোন ভারতীয় যে কেউ খ্রিষ্টান বা মুসলমান হয়েছে তাকে এবার বাধ্য করে হিন্দুত্বে ফিরিয়ে আনার তাণ্ডব তৈরি করা। অথবা সুনির্দিষ্ট ঘটনা অভিযোগ থাকুক না থাকুক, ভুয়া অভিযোগে চার্চ বা মসজিদে আক্রমণ করা, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কিংবা জোর করে কোনো মুসলমান নাগরিককে নির্যাতনে বাধ্য করে “জয় শ্রীরাম” বলানো ইত্যাদি। এরই বর্ধিত আর এক রূপ হল গোমাংসকে নিয়ে তান্ডব তৈরি করা। [‘মাংসমাত্রই তা গরুর মাংস’; এই অনুমান ও এই অভিযোগে মাংস খাওয়া, রাখা, বহন করা নিয়ে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো। ]

ফলে মোদী সরকারের “ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার নীতি” নিছকই তা কাগুজে ঘোষণা হয়ে থেকে যায়। আর বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ আরএসএসের সহযোগী সব দলের ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি আগের মতোই সরকারের দিক থেকে প্রশাসনিক বাধাহীন, অবাধে চলতে থাকে। কেবল গরুর মাংসের বিরুদ্ধে করা মোদির আইন (জবাই, কেনাবেচা, বহন ও খাওয়া ইত্যাদি) ও বিতর্কের ব্যাপারে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আপত্তির কারণে শেষে সরকার নিজেই “আইনটা আপাতত প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে আদালতকে জানিয়ে নিষ্পত্তি করেছিল। কিন্তু তাতে কমিউনিটিতে ত্রাস সৃষ্টি করে দল বেঁধে পিটিয়ে অভিযুক্তের মৃত্যু ঘটানো – এগুলো বন্ধ হয় নাই। এই তো গত মাসেই (২৮ মে ) উত্তরপ্রদেশের কাইরানা নির্বাচনি এলাকায় উপ-নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বিজেপির পুরানা কৌশল গরুর মাংস খাওয়ার ভুয়া অপরাধে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। যাতে এই টেনশনে হিন্দুত্ব ভোটের জিগির উঠে, পোলারাইজেশন ঘটে। যদিও আগে এটা বিজেপির আসন ছিল। তবুও এই উপনির্বাচনে বিজেপি হেরে যায়।

আসলে বিজেপির মূল রাজনৈতিক কৌশলই হল, এভাবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সমাজে পোলারাইজেশন ঘটানো, ‘জোশ-জজবা’ তোলা – একাজ করেই বিজেপি আগিয়ে চলেছে। এভাবে ভোটের বাক্সে হিন্দুত্বের ভোট জোগাড় করে ভরে তোলা। এই নীতিতেই মোদির ভারত গত চার বছর পার করেছে। তাই, সার কথাটা হল, মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লির আর্চবিশপের অভিযোগ শতভাগ সঠিক। তবে তাঁর এখনকার এই পদক্ষেপ ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদীকে কতটা ঠেকাতে পারবে তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে নগদ লাভ হল, অমিত শাহ আর রাজনাথের ‘পোলারাইজেশন বিরোধিতা’র ‘ভক্ত’ হয়ে যাওয়া, এই তামশা দেখার সুযোগ হলো আমাদের।

আর একটা দিক আছে, অনেকেই ইস্যুটাকে (পোলারাইজেশন বিরোধী অবস্থান নেয়া) সেকুলারিজম বা প্রগতিশীলতা বলে বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করছেন। এটা শতভাগ ভুল। আসলে এটাই এদের নিজ ইসলামবিদ্বেষী অবস্থানের লুকানোর জায়গা। বিষয়টার মূলধারণাটা হচ্ছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাম্যের নীতি রক্ষা, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি পালন করে চলল কিনা। নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এই হলো ইস্যু। অথচ রাষ্ট্র ধারণা বুঝে না বুঝে বিভ্রান্তিকরভাবে এই ইস্যু ও ভাবটাকে ‘সেকুলার’ শব্দ দিয়ে খামোখা বুঝা ও বুঝানোর চেষ্টা করতে দেখা হয়। আর এই ‘সেকুলার’ শব্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ।

অনিল কুটো ধরনের ব্যক্তিরাও বুঝে না বুঝে ‘জাতীয় সেকুলার নীতির’ কথা তুলে নিজেদের বিভ্রান্তিতে ও অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় ঢুকিয়ে রাখেন। এভাবে ভুতুড়ে না-বুঝা এক ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আড়ালে ধর্মবিদ্বেষ জারি থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অপরিচ্ছন্ন চিন্তায় এটাকে ‘ধর্মের সাথে রাজনীতি’ মেলানো বা না-মিলানোর বাজে বিতর্ক হিসেবে হাজির হতে দেন। অথচ পরিষ্কার ভাষায় বললে, রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি, নাগরিকের জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যহীনতার নীতি, সুরক্ষার নীতি পালন করে চলল কিনা; এবং নাগরিকের যে কোনো ধর্মপালনের স্বাধীনতা রাষ্ট্র রক্ষা করল কিনা- এটাই হলো দাবি ও মূল ইস্যু।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৭ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “অমিত শাহ ও ধর্মীয় পোলারাইজেশন”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ


ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ

গৌতম দাস

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2qj

 

 

সম্ভবত এক ‘বিরাট জ্ঞানী’ জেনারেলের সাক্ষাৎ পেয়েছে ভারত। কোন কথা কোথায় বলতে হয় আর কোথায় তা বলা উচিত নয় – এই বিবেচনা তার লোপ পেয়েছে বলেই মনে হয়। ইতিহাস-ভূগোল বোধ থাকলে এমন করার কথা নয়। কোনটা সামরিক অপারেশনাল বোর্ডরুমে বসে বলার কথা আর কোনটা পাবলিক মিটিংয়ে বা স্টেডিয়ামে, এমন হুঁশজ্ঞান যার নেই – এমন ব্যক্তি হলেন ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। কিন্তু অনেকে আবার বলছেন, এটা আসলে বোকা ও গাড়োল মানুষের চালাকি।

যাই হোক ঘটনা হল, রাওয়াত এবার নয়াদিল্লিতে ‘নর্থ ইস্ট রিজিয়ন অব ইন্ডিয়া- ব্রিজিং গ্যাপ অ্যান্ড সিকিউরিং বর্ডার্স’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে কিছু মন্তব্য করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের সিনিয়র ব্যক্তিরাও ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

‘প্রথম আলো’র ভাষ্য দিয়েই বলা যাক। কারণ, অনেকের অনুমান হল, এদের অনুবাদভাষ্য তুলনামূলকভাবে নমনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য, এমন অনুমানের একদল পাঠক আছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি “চীনের মদদে পাকিস্তান বাংলাদেশিদের ভারতে ঢোকাচ্ছে: ভারতীয় সেনাপ্রধান” – এই শিরোনামে প্রথম আলো লিখেছে, “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তার অভিযোগ, এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে”। এটা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, শুনতে কেউ কোথাও ভুল করেছে কি না। তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু উদ্ধৃতি আনা যাক। এ ব্যাপারে আনন্দবাজারের বক্তব্য এ রকম – “ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই সুপরিকল্পিতভাবে এমন করছে ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ এবং তাতে সমর্থন জোগাচ্ছে উত্তর সীমান্তের দেশটি, যাতে ওই অঞ্চলে গোলযোগ বজায় রাখা যায়”। রাওয়াত আসলেই সরাসরি  ‘পাকিস্তান’ বলেননি। তিনি কূটনৈতিক দায় এড়াতে সরাসরি নাম না নিয়ে ইঙ্গিত করে ‘ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ’ বলেছেন। আর ‘চীন’ও বলেননি, এর বদলে বলেছেন ‘উত্তর সীমান্তের দেশটা’।

রাওয়াত আরো বলেছেন, আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারত পাকিস্তান দখলে (‘taken over’) নিতে চায়। সেজন্য নাকি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের নিয়ে গিয়ে এরা আসামের জেলাগুলো ভরে ফেলছে। এখানে রাওয়াতের ‘দখল’ কথাটির অর্থ বুঝে নিতে হবে। ভূগোল হিসেবে আসামের জেলাগুলো কোনোভাবেই পাকিস্তানের পড়শি নয়। ফলে পাকিস্তানের পড়শি হিসেবে ভুখন্ড দখল ধরনের কিছু করে ফেলার প্রশ্ন নেই। কারণ, পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে সারা ভারতের সুদীর্ঘ বুক পেরিয়ে এরপর বাংলাদেশে ঢুকে তারও উত্তরে গেলে আসামের দেখা মিলতে পারে। বিপিন রাওয়াতের এটা অজানা নয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, একটা অঞ্চলে বা কয়েক জেলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে গেলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে, এর মানে হল – ওই অঞ্চল পাকিস্তানের দখলে চলে যাওয়া, ‘পাকিস্তান’ হয়ে যাওয়া। এটা খুবই অবাস্তব বক্তব্য, রাস্তার ধারের টঙের চা-দোকানের যে লেবেলের আলাপ হয় এটা সেই তুল্য। কোনো রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান এভাবে লুজ টক করতে পারেন না। মুসলমান মানেই পাকিস্তান, মুসলমান মানেই ভারতের শত্রু –  এতগুলো লুজ টক করে কীভাবে বলেন তিনি। এই অনুমানের কারণে তিনি পাকিস্তান-চীনের কথিত পরিকল্পনার ভেতরে ভারতের জন্য হুমকি দেখেছেন। বলছি না চীন বা পাকিস্তান ভারতের প্রতিপক্ষ নয় বা হতে পারে না। নানা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ-সঙ্ঘাতে তা হতেই পারে; কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে এরা ভারতের শত্রু, এগুলো মূর্খতা বললেও কম বলা হয়। তবে হ্যাঁ, বিজেপির ভোটের রাজনীতি এমন হয় আমরা প্রায়ই হতে দেখি। রাস্তায় মুসলমান লোক ধরে চর থাপ্পর মেরে “হরে রাম” বলায় নিচ্ছে। অথবা দ্রিজে গরুর মাংস রেখে ছে অজুহাতে খুনই করে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে, এর মানে হল,  বিজেপির তৃতীয় শ্রেণীর এসব মাঠকর্মির চিন্তা ও ভাষায় বিপিন কথা বলছেন তা মনে রাখতে হবে। যেমন এখানে রাওয়াতের ঘিন ঘিন করে বের হওয়া মুসলমান ঘৃণা গুলো দেখেন। তাঁর চিন্তার ফর্মুলার মধ্যে ধরে নেওয়া আগাম অনুমানটা হল – বাংলাদেশের মুসলমান = মানেই তারা পাকিস্তানের দালাল কারণ তারা মুসলমান = মানে তারা ভারত শত্রু। এগুলোকে একেবারে গো-মুত্র এর রাজনীতিক চেতনা – বলাই শ্রেয়।

আবার রাওয়াত নিজের কথাগুলো বলতে দুটো বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, এটা “পরিকল্পিত মাইগ্রেশন” (planned immigration)। আর এভাবে তারা চীন-পাকিস্তান এক “প্রক্সিযুদ্ধ” (proxy war) চালাচ্ছে। রাওয়াত একজন সেনাপ্রধান। ফলে ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ বা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’ শব্দের সামরিক অর্থ তিনি না বুঝে লেখেননি। এগুলো তার সচেতনভাবে বেছে নেয়া শব্দ বলে আমাদের মানতেই হয়। তবে হাসিনা সরকার বা আওয়ামী লীগের খুশি হওয়ার কারণ নেই। কারণ, মুসলমানদের ‘পরিকল্পিত মাইগ্রেশনে’ চীন-পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের এখনকার সরকারও জড়িত, এটাই রাওয়াতের দাবি।

ভারতের মিডিয়াতেও অনেকে বলছেন, রাওয়াত আসাম নিয়ে মন্তব্য করতে গেলেন কেন? বিশেষ করে আসামে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী কারা এবং কতজন, তা যখন সরেজমিন সার্ভে করে দেখার কাজ চলছে এবং এর নিবন্ধন তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। গত সপ্তাহে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও আগামী জুন মাসের মধ্যে সে তালিকা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমাদের প্রশ্ন আরো গোড়ায়। রাওয়াত ভারতের মতো দেশের সেনাপ্রধান। এই ইনস্টিটিউশন বাই ডিফল্ট নিজগুণে ও নিজ স্বার্থে অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকার কথা। ফলে প্রমাণিত ডাটা বা ফ্যাক্টস ছাড়া কোন অনুমিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া, সেনাপ্রধানের মুখ থেকে বের হওয়া শুধু খুবই বিপজ্জনক তা নয়, এটা অপরাধ। তাই প্রশ্ন করতে হয়, বাংলাদেশ থেকে ‘স্রোতের মতো (ইনফ্লাক্স)’ এবং ‘মুসলমানেরা’ আসামে গিয়েছে বা যাচ্ছে- এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? আসামের জনগণনা, নাগরিকত্ব যাচাই ও নিবন্ধন  তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আদালতও আগামী জুনে সে তালিকা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এর সোজা অর্থ- কারো কাছে এ বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই, তৈরি হচ্ছে। মানে এযাবৎ যা উল্লেখ হচ্ছে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণিত তথ্য বা সত্য কোথাও নেই, সব অনুমাননির্ভর। তবুও একজন সেনাপ্রধান নেহায়েত অনুমাননির্ভর কথা বলেন কী করে? দ্বিতীয়ত, ওই নিবন্ধন তালিকা তৈরি করতে যাচাই হচ্ছে কেবল কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, এতটুকুই।  আর কেউ ভারতীয় নাগরিক না হলেই সে বাংলাদেশি এই অনুমান ভিত্তিহীন। কারণ কেউ বাংলাদেশী কি না এমন কোন কিছু সেখানে যাচাই করা হচ্ছে না। তাদের কাজও নয় সেটা। তাহলে প্রমাণ ছাড়া, অনুমাননির্ভর বলা যে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসীর স্রোত আসছে, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের উৎস কোথায়? এসব মনগড়া তথ্যের প্রপাগান্ডায় রাওয়াত নেমেছেন কেন? তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তাকে বাংলাদেশকে অবশ্যই দিতে হবে। আসলে এ ধরনের প্রপাগান্ডা আসামে চলছে আর তাতে প্রধান মদদদাতা হল মোদির বিজেপি এবং তাদের সাথে কিছু স্থানীয় দল, আমরা জানি। এগুলা তারা করে চলেছে তাদের সস্তা ভোটের রাজনীতির স্বার্থে। রাওয়াত নিশ্চয়ই জানেন, রাজনৈতিক দলের বিভেদমূলক প্রপাগান্ডায় একজন সেনাসদস্যের যোগদানের অর্থ কী।

রাওয়াত আসামের অনুপ্রবেশ ইস্যুতে নিজের আপত্তির কারণ নিজেই প্রকাশ করেছেন এভাবে – ‘যেহেতু মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে’। লক্ষ করেন, রাওয়াতের বক্তব্য ওরা ভারতীয় অথবা অনুপ্রবেশকারী কি না, সেটা নয়। তার আপত্তি বা ভারতের কথিত নিরাপত্তার হুমকি দেখতে পাওয়ার একমাত্র কারণ, ওরা মুসলমান। সেই মুসলমানেরা বেড়ে যাচ্ছে সংখ্যায়। এর সোজা অর্থ – আসলে তিনি এক চরম মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তিত্ব। তার বিচার্য পয়েন্ট হওয়ার কথা ছিল, ওরা ভারতীয় নাগরিক নাকি অনুপ্রবেশকারী! এটাই। আসামের নাগরিক নিবন্ধনের কাজেও এটাই যাচাই চলছে। ওরা মুসলমান কীনা এটা সেখানে অবান্তর প্রশ্ন।

থ্যাঙ্কস জেনারেল বিপিন রাওয়াত। এ রকম স্পষ্ট ‘বিদ্বেষ’ অনেকেই দেখাতে পারেন না, মনের মাঝে লুকিয়ে রাখেন; কিন্তু আপনি পেরেছেন। এর অর্থ – ভারতের মুসলমান নাগরিকেরাও আপনার চোখে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। যা হোক, সে বিচার ভারতের রাষ্ট্র ও নাগরিকেরা করবেন। আমতা আর কী বলতে পারি! ‘সেকুলার’ ভারতের সেনাপ্রধান একজন মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তি – এই তথ্য আমাদের জন্য আসলে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক না আসলে একটা সার্কাস। তবে উদ্বেগেরও এ জন্য যে, বাংলাদেশ থেকে মুসলমানেরা নাকি স্রোতের মতো আসামে চলে যাচ্ছে; কোনো প্রমাণ ছাড়া এ কথা তিনি বলছেন। বাংলাদেশ যদি অর্থনীতির দিক থেকে আসামের চেয়ে পিছিয়ে পড়া হয়, তবেই বাংলাদেশ থেকে বেটার লাইফের আকর্ষণে আসামে ‘মুসলমান’ মাইগ্রেশন হতে পারে। এটা যেকোন মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে এই মৌলিক শর্ত পূরণ হতে দেখা যায়। কাজেই রাওয়াতকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে বাংলাদেশের চেয়ে আসামের অর্থনীতি আগিয়ে আছে, অথবা কাজ পাবার সুবিধা আর ভোগ্যপণ্য উপভোগের সুযোগের দিক থেকে জীবনযাত্রার মান বা  লাইফ স্টান্ডার্ড বাংলাদেশের চেয়ে আসাম লোভনীয়। এটা না পারলে আমাদেরকে রাওয়াতের বক্তব্য ফালতু কথা মনে করতেই হবে।

‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ ও ‘প্রক্সিযুদ্ধ
মি. বিপিন রাওয়াত, আপনি বলছেন, চীন ও পাকিস্তান নাকি ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ চালাচ্ছে আর এর মধ্য দিয়ে এটা একটা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’। একজন ভারতীয় সেনাপ্রধানের জানা থাকার কথা, বাংলাদেশে একটা সরকার আছে। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি দাবি করছেন, আমাদের সরকারসহ আমরা জনগণ সবাই চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা পুতুল, পাপেট। নইলে আমরা চীন-পাকিস্তানের কথায় আসামে ‘মুসলমান’ পাঠিয়ে দেয়ার কাজ করলাম কেমনে! অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়ার ভাষ্য হল – গত ১০ বছরে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভারতবান্ধব সরকার। তাহলে বোঝা গেল ভারতের মিডিয়া ও সরকার রাওয়াতের ভাষ্যের সাথে একমত নয়, বরং উলটা। আচ্ছা মিস্টার  রাওয়াত আপনার কথা অনুসারে আমরা আসলে ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- তাই তো? ঠিক আছে, আমরা জনগণের বেশির ভাগ আপনার দাবিমতো না হয় কাঠপুতলি হলাম। আমরা সারাক্ষণই শুনছি বাংলাদেশের সরকারের বিরোধীদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হবে, ‘পাকিস্তানি মন’ আমাদের ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে এ আর নতুন কী? কিন্তু রাওয়াতের ভাষায় আওয়ামী লীগের হাসিনা সরকারও ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- এ কথা বেশ কৌতুককর। কথা আরো আছে। রাওয়াত বলছেন, “বাংলাদেশী মুসলমানদের অনুপ্রবেশে আসামের চারটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা থেকে বেড়ে এখন ৯টি জেলা হয়ে গেছে, আর এই পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন” – (inversion has taken place whichever be the government)। এ অংশটি বেশ উপভোগ্য। এর সোজা অর্থ – রাওয়াত আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে কোনো ফারাক করেননি। দু’টি দলই সমানে নাকি আসামে মুসলমানের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে মুসলিমবিদ্বেষী বিপিন রাওয়াতের চোখে হাসিনা সরকার কী তা জানা গেল। অর্থাৎ এ সরকার যতই ভারতকে সার্ভিস দিক, ভারতবান্ধব সরকারের খেতাব পাক না কেন, কাকাবাবুকে চেয়ারে বসিয়ে দাস হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে বসে ছবি তুলুক না কেন,  জেনারেল রাওয়াতের চোখে হাসিনাও খালেদার মতো একজন মুসলমানই। তদুপরি, তিনি এমন মুসলমান যে, আসামের জেলাগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সব জেলাকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা করে তুলছেন; ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুলের’ মত আচরণ করছে, ‘প্লান্ড ইমিগ্রেশন আর প্রক্সিযুদ্ধ’ করছেন।

আসলে রাওয়াত এক ঘোরতর মুসলমানবিদ্বেষী অসুখে ভুগছেন, এমন আরও একটা বড় প্রমাণের দিক নজর করা যাক।  আসামের স্থানীয় রাজনীতিতে বারবার মুসলমান নিধনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে বোড়ো পাহাড়িদের হাতে স্থানীয় মুসলমানদের হত্যা ও বিচারহীনতার পটভূমিতে ২০০৫ সালে All India United Democratic Front, AIUDF নামে একটা দলের জন্ম হয়েছিল। দলটির প্রধান নেতা সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল এবং দলটির প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের সমর্থন বেশি।  এটাই হল অপরাধ। ঐতিহ্যগত ও পারিবারিকভাবে সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল আতরের ব্যবসা করেন। তার আতর বিখ্যাত কারণ এটা আসামের জঙ্গলের বিশেষ আগর গাছ থেকে  সংগৃহিত। সবচেয়ে বড় কথা AIUDF কেবল মুসলমানদের দল নয় অথবা ‘ইসলাম কায়েম’ তার লক্ষ্য এমন দল নয়। অর্থাৎ এটা কেবল একটি সম্প্রদায়ের দল নয়। তাদের ঘোষিত আদর্শ : ‘National Inclusiveness with a regionalist political position’ । এ ছাড়া দলটা নামের মধ্যেও নিজেদেরকে মুসলমানের দল বলে কোনো দাবি করা হয়নি। ফলে এটা একেবারে ভারতের কনষ্টিটিশন মানা রেজিষ্টার্ড আইনসম্মত লিবারেল রাজনৈতিক দল।  গত ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় আসামের জন্য বরাদ্দ ১৪টি আসনের মধ্যে তিনটাতে দলটি জয়ী হয়েছে। তারা হলেন- বদরুদ্দিন (ধুবড়ি) এবং তার ভাই সিরাজউদ্দিন (বড়পেটা)। আর তৃতীয় আসনটিতে জয়ী হয়েছেন রাধেশ্যাম বিশ্বাস। ইনি বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। এতসব তথ্য সত্বেও, রাওয়াত AIUDF দলের দ্রুত বিকাশকে মুসলমানদের আসামে সংখ্যা বৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ বলে হাজির করেছেন, প্রকাশ করেছেন উষ্মা। বলেছেন, ১৯৮৪ সালে বিজেপির (তখনকার নাম ছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ) আসন ছিল দু’টি, সেই দলও এত দ্রুত বাড়েনি। (‘AIUDF have grown in a faster time-frame than the BJP grew over the years. When we talk of Jan Sangh with two MPs & where they have reached, AIUDF is moving at a faster pace in the state of Assam,’ said Rawat.)। আসলেই এক বিরাট জ্ঞানীর জ্ঞানের কথা এটা।  রাওয়াত মুসলমানদেরকে কী ও কেমন ঘৃণার চোখে দেখেন, মুল্যায়ন করেন এর এক আদর্শ প্রমাণ এটা।

প্রথমত, তার এই তুলনাই মুসলিমবিদ্বেষের প্রকাশ। AIUDF আইনসম্মত দল কি না, কোনো আইন ভঙ্গ করেছে কি না – সেটা দেখার সরকারি দফতর আছে। যেমন আমাদের বেলায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন । কিন্তু ভারতের সেই দফতরের পক্ষ থেকে এই দলের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি করা হয়নি। এই দল দ্রুত না ধীরে বাড়ল, দলটা ইসলামি কি না এমন কোন অভিযোগ ঐ দফতরের আছে এমন নয়। আর তা থাকলেও তাতে কোন অপরাধ হয়েছে কি না সেগুলো বিচার বিবেচনা করে দেখার দায়িত্ব ভারতের সেনাপ্রধানের নয়। তবে সেনাপ্রধানের কোনো আপত্তি থাকলে ওই দফতরে গিয়ে তিনিও অভিযোগ জানাতে পারেন। তা তিনি করেন নাই। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোনো দলের দ্রুত বাড়া কি অপরাধ? অথবা, ব্যাপারটা কী এরকম যে, এই দলটা কথিত অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে গড়া দল? রাওয়াত কিন্তু এ অভিযোগ পরিষ্কার করে আনছেন না। কেবল অমূলক ইঙ্গিতে বলা সন্দেহ ছড়িয়ে কথা বলছেন। দলের সভাপতি আজমল একজন মুসলমান, এটাই যেন তার বিরাট অপরাধ। আর দ্রুত বাড়াই যদি সমস্যা হয় তাহলে সেনাবাহিনী কি গত ১৯৮৪ সালে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির সময় এমন একই প্রশ্ন তুলেছিল? নাকি সেটা বিজেপি বলে খুশি হয়ে চুপ ছিল? এই প্রশ্নে রাওয়াতের জবাব কী? ইন্ডিয়া যদি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তাহলে কয়েকটা জেলায় মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমস্যা কী? এতে কী এসে যায়? এ ক্ষেত্রে আইনি সমস্যাই বা কী?

আসলে বিজেপি বা বিপিন রাওয়াত যদি অহিন্দু কোনো ধর্মের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করেন, তবে বুঝতে হবে তারা ভারতকে হিন্দুত্ব রাষ্ট্রের ভারত বলে অনুমানে ধরে নিয়েছেন, এমনটাই কামনা করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আরএসএস বা শিবসেনার রাজনৈতিক লোক কীংবা কোন রেসিস্ট কীট হন তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু নিজ পদ পদবির সাথে এসব নোংরা অবস্থান তিনি অবলীলায় জড়াচ্ছেন। বরং সাংবিধানিক পদে থেকে কোনো ধর্মের (যেমন মুসলমানের) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করে ইঙ্গিত করে কথা বলা – এটা ঐ জনগোষ্ঠি-বিদ্বেষী আচরণ ফলে তা অসাংবিধানিক এবং তা ফৌজদারি অপরাধ। ভারত যদি রাজনৈতিক সাম্যের দেশ হয়ে থাকে, ভারতে ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকারের সাম্য যদি বিজেপি বা রাওয়াত মানেন, তাহলে তারা শুধু হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চাইতে পারেন না। রাওয়াতের উচিত, আগে ভারতের কনস্টিটিউশনে এ কথা লিখিয়ে নেয়া যে, ‘এখানে নাগরিক নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান নয়।’ আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, মোদির বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া এতে কী হয়, কী তামাশা সেখানে করে!
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা যায়, বিজেপি বা বিপিন রাওয়াতরা মুসলমান অথবা যেকোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যখনই কোনো এক ‘ভারত’ (যেমন হিন্দুত্বের ভারত) গড়তে চাইবেন, আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, ওই বৈষম্য ও বিভাজনই মহাবিপদ ডেকে আনবে। ১৯৪৭ সালে এটাই হয়েছিল। যে মুসলমান ইনক্লুসিভ ভাবে, ভারতে সমান মর্যাদায় নাগরিক থাকবে, সে কখনো ভারতের জন্য হুমকি হবে না। একথার বিপরীতে যখন ভাবা হবে মুসলমান তাই ওরা ভারতের শত্রু বা হুমকি – এটাই রেসিজম। মনের গভীর গহীনে এক দগদগে ঘৃণার অসুখ! মনে এত ঘৃণা নিয়ে উনি ঘুমান কী করে!

তবে একথা মনে করার কোন কারণ নাই যে ভারতে জ্ঞানবুদ্ধি-ওয়ালা লোকের কোন অভাব আছে। বরং এটা বুঝা যায় যে তাদের চাপিয়ে পিছনে ফেলে রাখা হয়েছে। যেমন এক ‘শ্রীনাথ রাঘবন’ এক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ। তিনি দিল্লীরই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ’ এর সিনিয়র গবেষক সদস্য। রাওয়াতের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,… “চীন-পাকিস্তানের তত্বাবধানে এক পরিকল্পিত মাইগ্রেশন আমরা নাকি দেখতে পাচ্ছি – এটা এক অবান্তর বাড়িয়ে চাড়িয়ে বলা কথা”। [To suggest that we are witnessing “planned immigration” overseen by Pakistan and China appears to be an absurd overstatement.] হিন্দুস্তান টাইমসে লেখা এক মন্তব্য কলামে তিনি এটা লিখেছেন। তাঁর লেখার শিরোনামে তিনি দুটো শক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন – বলেছেন রাওয়াতের বক্তব্য ‘অ-ইতিহাস’ [ইতিহাসের সত্যতা নাই] এবং ‘অপুষ্টির বিচার’ [ahistorical, poorly judged]। পুরা লেখায় একজনের গবেষকের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তিনি সেখানে রাওয়াতকে ন্যাংটা করে তাঁর সমস্ত দাবি প্রচুর যুক্তি তুলে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন। আগ্রহিরা পড়ে দেখতে পারেন।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

গৌতম দাস

১৯ অক্টোবর ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2kt

 

 

আমাদের একজন সিনিয়র সিটিজেন ড. আকবর আলি খান। তার মূল যে পরিচয়, যে কারণে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তা হল, তিনি একজন দক্ষ আমলা বা বুরোক্র্যাট। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তিনি পেশাজীবন শেষ করেছেন। একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে তিনি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। গত ২৬ মার্চ ২০১৭ দৈনিক প্রথম আলোতে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। অনুমান করি, তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইটির কথা মাথায় রেখে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের জন্য একটা কার্যকর ও দক্ষ প্রশাসন গড়তে কী কী করা উচিত, তা নিয়ে যারা কিছু চিন্তাভাবনা করেছেন, করেন অথবা কিছু প্রয়োগ করেছেন, বদলিয়েছেন ও উদ্যোগ নিয়েছেন – এমন কাজের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন আকবর আলি খান। তার সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ ও কৌতূহল এখান থেকেই। অবশ্য ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে আমরাই আবার বেশ খানিকটা যেন হতাশ হতে যাই।

ওই সাক্ষাৎকারে আকবর আলি খানের রাষ্ট্রবিষয়ক বিভিন্ন মন্তব্য আছে। সেগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করি, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাকে তিনি এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। ইংরাজি নেশন স্টেট (nation-state) শব্দের বাংলা আমরা করে নিয়েছি জাতিরাষ্ট্র। একথা  সত্য যে, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে প্রবল প্রতাপে মডার্ন রাষ্ট্র মানেই তা জাতিরাষ্ট্র, এ ধারণা ছেয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেখানে নাগরিকেরা সবাই একই জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্টের একই ভাষা, একই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত এবং সম্ভবত একই ধর্ম বা মেজরিটির ধর্ম একই এমন একটা অবস্থা থাকে সেখানে জাতিরাষ্ট্র শব্দটার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। আসলে একটা বহুল প্রচলিত শব্দ এখানে সাধারণত ব্যবহৃত হতে দেখা যায় যেটা আমরা ব্যবহার করিনি, সেটা হল ‘জাতি’, যা ইংরাজি নেশন শব্দের বাংলা। ভুখন্ডে বসবাসরত নাগরিক সকলকে বুঝাতে বহুল প্রচলিত শব্দ হল ‘জাতি’, যা এখানে ব্যবহার করা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তার বদলে এখানে আরও সাধারণ অর্থবোধক শব্দ ‘জনগোষ্ঠিগত’ দিয়ে তা বুঝানো হয়েছে। কী হলে জনগোষ্ঠি ‘জাতি’তে রূপান্তরিত হয়ে যায়? সে প্রশ্ন এখানে তুলব।

আবার একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করা গেলেই কী সেটাই কী জাতিরাষ্ট্র কায়েম হয়ে যাওয়া?  তাহলে রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই কী জাতিরাষ্ট্র?  সে প্রশ্নও তো আছেই।

তবে এই শতাব্দি এসে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। ধারণা ও উপলব্ধি ততদিনে থিতু হতে সময় পেয়ে যায় যে, না, জাতিরাষ্ট্র’ কথাটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ধারণা বা বিষয় নয়; বরং এক উটকো ধারণার অংশ।

আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যাপারে সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ‘রিপাবলিক’। আর রিপাবলিক ধারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিক সাম্য, মানুষের মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার। কিন্তু রাষ্ট্র গঠন বা রাষ্ট্রধারণার বাস্তবায়নের কালে দেখা সব সংশ্লিষ্ট ধারণাকে তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান ও গণ্য করে সব কিছু পর্যবসিত হয়েছে শুধু ‘জাতিরাষ্ট্র’ শব্দ ও ধারণায়। রাষ্ট্রমাত্রই যেন জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। অথচ অষ্টাদশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী শব্দ ও ধারণা এখনো রিপাবলিক। সে তুলনার সাথে জাতিরাষ্ট্র বলে একটা ধারণা এসে যাওয়া যেন হাতছুট ঘটনা। কারণ সেই থেকে এখনো নেশন কী, নেশন মানে কী, এগুলো অস্পষ্ট। এখনো তা নিজেকে প্রোথিত করতে পারেনি।

আবার লক্ষ্য করলে দেখব সেকালেও মানে অন্তত বিংশ শতকের শুরুতেও সবাই জাতিরাষ্ট্র বলতে রিপাবলিক বোঝেনি। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জন্ম নেয়া সোভিয়েত রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯১৭), মাওয়ের চীনের পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯৪৯), এমনকি ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)- এগুলোর একটিতেও জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র বলতে যা সেকালে বুঝা হত, তা বুঝে এসব রাষ্ট্র ও বিপ্লব কায়েম করা হয়নি। ফলে এগুলো জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কায়েম হয়েছে, এমন কোনো দাবি তাদের নেই; বরং প্রত্যেকে নিজ রাষ্ট্রের নামের সাথে গৌরবোজ্জ্বলভাবে রিপাবলিক শব্দ ও ধারণা বয়ে বেড়াতে পিছপা হচ্ছে না বা ভুল করেনি। একেবারে রাষ্ট্রের নামের মধ্যেই তা খোদাই করে দিয়েছিল।

আবার আধুনিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ১৭৭৬ সালের ইউএসএ পর্যন্ত নিজেকে কোনো জাতিরাষ্ট্র দাবি করে না। আবার লক্ষণীয় হল, ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে সব আধুনিক রাষ্ট্রই রিপাবলিক ধারণাকে মুখ্য রেখে তৈরি হয়েছে। এর প্রমাণ লেনিনের ইউএসএসআর (১৯১৭) রাষ্ট্রের নামের শেষের রিপাবলিক। মাওয়ের চীন পিআরসি (পিপলস রিপাবলিক অব চায়না, ১৯৪৯) আর ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)। বিশ শতকের এই তিন রাষ্ট্র রিপাবলিক হয়ে আধুনিক রাষ্ট্র বলে নিজেদের দাবি করলেও কেউই জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র নয়, সে দাবিও করেনি। এই উদাহরণগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে আর রাষ্ট্রমাত্রই সেটা জাতিরাষ্ট্র, এমন ভুল বা পশ্চাৎপদ ধারণা আঁকড়ে থাকার কথা নয়। কিন্তু আকবর আলি খান জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে আঁকড়ে এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন; দাবি করছেন- “জাতিরাষ্ট্র বিষয়টি আধুনিক ধারণা। ‘ …’ পৃথিবীর সবখানেই জাতিসত্তা পরে জন্ম নিয়েছে।”

সারকথায়, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই যে তাকে জাতিরাষ্ট্রও বলা ঠিক হবে না এটা ক্রমশ মানুষের মধ্যে সতর্কতা আসতে শুরু করেছিল। তবুও এরপরেও অনেকে এখনও একাকার করে দেখে থাকেন। আকবর আলি খান তাদের একজন থেকে গেছেন দেখা যাচ্ছে। আর সব নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণাধারী যে বিপদে পড়েন, তিনিও সে একই ‘বিপদে’ পড়েছেন। একই সূত্র অনুসারে ‘জাতিসত্তা’ বলে শব্দটি তিনিও এনেছেন। এতে যে বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তা হল – ‘জাতি’ জিনিসটি কী তা ব্যাখ্যা করতে হবে তাদের। এখন , এই ‘জাতি’ মানে কী? সেটা কি ইংরেজি (race) রেস নাকি (ethnicity) এথনিসিটি? নাকি কমন কালচারাল কোন বৈশিষ্ট্য অর্থে এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা? কোনটা? এরা সেটা পরিষ্কার করে বলেন না। তা সত্ত্বেও তারাই আবার জাতিসত্তা শব্দটি ব্যবহার করে আরও অস্পষ্টতা বাড়ান। আকবর আলি বলছেন, ‘কাজেই বাংলাদেশের উৎস প্রাচীন বা মধ্যযুগে খুঁজলে হবে না, বাংলাদেশের আদিসত্তার উৎস খুঁজতে হবে ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতকে।’ আর প্রশ্নকর্তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি বইয়ে আপনি লিখেছেন, …. সেদিক থেকে বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ মধ্যযুগ থেকে।’

অর্থাৎ দু’জনেই খুঁজছেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে থেকে উত্থিত। কারণ এ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তারা এরপর তাদের পছন্দের জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট ধারণাকে পোক্ত করবেন সম্ভবত। কিন্তু আসলে এই অনুমান অর্থহীন। কারণ মূল বিষয় জাতি কী, নেশন বলতে তারা কী বুঝাচ্ছেন তা তো অস্পষ্টই রয়ে গেছে। জাতি মানে কী – রেসিয়াল অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা কী? অথবা অন্য কোনো ধারণা? তারা এদিকে খোঁড়াখুঁড়ি করেছেন বা করতে চান বলে মনে হয় না।
কিন্তু এই জট আমরা কী করে সহজে খুলতে পারি? একটি দিক লক্ষ করলেই সবাই এই জট খুলতে পারব।

রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক যে ধারণাই হোক, ব্যাপারটাকে একটা কমন বৈশিষ্ট্য হিসাবে অবশ্যই দেখা যায়। কিন্যেতু সবচেয়ে গুরুত্মবপুর্নণ যেটা  লক্ষ করলে দেখব, ‘জাতি’ বলতে যাই বুঝাতে চাই, তা আসলে এক ধরনের (given) গিভেন বৈশিষ্ট্য বা গিভেন ধারণা। তা কী অর্থে? মানে হল যে, “আগে থেকে দেয়া আছে”। যেমন দুনিয়ার কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজের রেসিয়াল (অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক) বৈশিষ্ট্য বেছে নিতে পারে না, সম্ভব নয় বলে। রেসিয়াল বৈশিষ্ট মানুষের পছন্দ করে বেছে নিবার জিনিষ না।  জন্মানোর আগে কেউ আল্লাহর সাথে চুক্তি করে, চয়েজে টিক দিয়ে বাঙালি হয় না, বিহারি হয় না; বরং বাঙালির ঘরে জন্মানোর পরে ওই ঘর মোতাবেক অর্থাৎ (given) গিভেন হিসেবে বাঙালি হয়। ফলে রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি যাই হোক না কেন, এগুলোর মূল পরিচয় আসলে গিভেন ধারণার অন্তর্গত। সোজা কথা হলো, আমি জাতে বাঙালি হতে চাইছি বলে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাঙালি হতে পারি না। হই নাই। এখন একটা কথা স্পষ্ট করতে হবে। এর মানে কি এই যে, এখন তাহলে যার যার (আল্লাহর দেয়া) বা গিভেন পরিচয় অনুসারে তাকে এখন ওই পরিচয়ের রাজনীতিই করতে হবে? মানে এথনিক বাঙালিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই করতে হবে?

এর জবাব-ফয়সালা পেতে আমাদের শেষ বাক্যে মনোযোগ দিতে হবে। ওই বাক্যে দুইবার বাঙালি শব্দটি ব্যবহার করেছি- এথনিক বাঙালি আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী। অথচ লক্ষ করুন, এ দুই বাঙালি শব্দের অর্থ এক নয়। কেন? প্রথমে ব্যবহৃত বাঙালি শব্দটি গিভেন অর্থে বাঙালি। সেজন্য ওটা আমার গিভেন পরিচয় বা প্রাকৃতিক পরিচয়। তাহলে পরেরটা?

পরেরটা হল বেছে নিয়েছি, ইচ্ছামতো যেটা ভালো লেগেছে সেই রাজনীতি- নিজের রাজনৈতিক পরিচয়। স্বেচ্ছায় সচেতনে যেটা মানুষ করে কিংবা বেছে নেয়, সেটাকে রাজনৈতিক কাজ বা সিদ্ধান্ত বলে। এই পরিচয় বা রাজনীতি আবার শুধু আমার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটা আমরা যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা বদলাতেও পারি। যেমন ১৯৪৭ সালে আমরা একই জনগোষ্ঠী ‘ইসলামি জাতিবাদী’ হয়েছিলাম। সে পরিচয় নিয়েছিলাম। আবার আমরাই ১৯৭১ সালে নতুন পরিচয় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ হয়েছিলাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছাড়াও আরো যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনীতি আমরা আগামীতে করতে পারি, বেছে নিতে পারি। একটার বদলে আরেকটা রাজনীতি করতে পারি। মূল কথা, এথনিক বাঙালি হয়েও আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতে পারি, না-ও করতে পারি। এর অর্থ, তাহলে এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠী এক আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে গেলে সেটা একটা জাতিরাষ্ট্রই হয়ে যাবে, বাঙালি জাতিবাদী (অথবা বাংলাদেশী জাতিবাদী) জাতিরাষ্ট্র হয়ে যাবেই- এমন ধারণা ভিত্তিহীন।

আকবর আলি খান এবং প্রশ্নকর্তা দু’জনই খুঁজছিলেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে হয়েছে, মধ্যযুগে কি না- এই খোঁজাখুঁজি অর্থহীন। কারণ এটা নৃতাত্ত্বিক বা থিনিক খোঁড়াখুঁড়ি গিভেন পরিচয়ের খোঁড়াখুঁড়ি। এর সাথে রাজনৈতিক পরিচয় মিলিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলা অর্থহীন। কারণ দুটো আলাদা জিনিস। রাজনীতি সচেতন হওয়া বা রাজনীতি মানে কী সেসব বোঝার বহু আগেই ‘গিভেন’ পরিচয় আমরা পেয়ে যাই। আমাদের জানা না থাকলে প্রাকৃতিক পরিচয় আর রাজনৈতিক পরিচয়- এ দুটোকে গুলিয়ে ফেলে কথা বলতে থাকি। শেখ মুজিব সর্বপ্রথম রাজনৈতিক বাঙালি বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি হাজির করেন। স্পষ্ট আকারে তা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ছয় দফায়। অর্থাৎ এর সাথে গিভেন বাঙালি কবে থেকে শুরু হয়েছিল, এর কোনোই সম্পর্ক নেই। যেমন অনেকে ‘আবহমান বাঙালি’ বলে একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। এই শব্দের সাথে বাঙালি জাতিবাদী ধারণার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আবহমান বাঙালি একটি এথনিক বা প্রাকৃতিক বা গিভেন পরিচয়ের ধারণা।
এই কারণে আকবর আলি খানের ওই সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর শব্দ ও ধারণা হলো ‘জাতি’। প্রথমত, ওটা অস্পষ্ট যে, তা গিভেন না পলিটিক্যাল। তাই এটা অস্পষ্ট রয়েছে বলে পুরো আলোচনাই সেখানে অর্থহীন হয়ে গেছে।

তিনি বলছেন, ‘বাঙালিদের জন্য পরিচয়ের ভুল ঠিকানা ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবির্ভাব ছিল এক আকস্মিক ঘটনা। ভারতীয় উপমহাদেশে যত মুসলমান ছিল, তারা এক জাতি; হিন্দু যারা তারা আরেক জাতি- এমন ভাবনা থেকে এর সৃষ্টি। কার্যত মুসলমান বা হিন্দুদের সবাই এক ভাষা, এক জাতি, এক অঞ্চলের মানুষ ছিল না। … সেজন্য আমি মনে করি, আধুনিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া ছিল অনিবার্য।’

তার এই বয়ানের পর্যালোচনা করে বলতে হয়- প্রথমত, মানতে হবে যে, দেশ ভাগ সবার জন্য খারাপ অভিজ্ঞতা। আসলে এ কথা বাস্তবে সত্যি ছিল না। যেমন পূর্ববঙ্গের প্রজাদের কাছে দেশ ভাগ ছিল অনিবার্য এবং তাদের খুবই কাম্য। তাই এককাতারে প্রজারা তাতে খুশি হয়েছিল। হিন্দু বাঙালিরা জমিদারির পক্ষ নিয়ে, তা আঁকড়ে থেকে এ থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষমতার আধিপত্যের শেয়ার ভোগ করতে চাইল। জমিদারেরা এমন একক মোড়লিপনা চালিয়ে যেতে চাইলো প্রজাদের সাথে- দেশ ভাগ করা মানেই, প্রাকটিক্যালি জমিদারি উচ্ছেদ- এই পথে যেতে চাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

দ্বিতীয় কথা, দ্বিজাতির ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়নি। মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে আলাদা পাকিস্তান হওয়া আর মুসলমানেরা আলাদা জাতি বলে পাকিস্তান হওয়া এককথা নয়। যদিও দেশ ভাগের পর এমন সাফাই কেউ কেউ দিয়েছিলেন। আর কলকাতার জমিদারদের পক্ষের সাফাই হিসেবে অনেকে বলে- ‘মুসলমান যেহেতু জাতি নয়, একটা ধর্মের নাম; কাজেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি- এটা হয় না। এটা করা ভুল।’ এটাকে বিরাট জ্ঞানগর্ভ আরগুমেন্ট মনে করে অনেকে খুশি হয়ে যায়। ধরা যাক, ইসলামি জাতিবাদ ধারণা ভুল। তাহলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা সঠিক হয় কিভাবে?

বাস্তবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত রাষ্ট্র হয়েছে। তবে সেটা তারা অকপটে স্বীকার করেছে, না ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ শব্দের আড়াল নিয়েছে সে কথা আলাদা। কিন্তু হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই ৫০০-এর বেশি করদরাজার রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়ে আর ২৯ রাজ্যকে একসাথে বেঁধে আজকের ভারত রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছে। আর একটি ফ্যাক্ট হলো, কংগ্রেস হিন্দু জাতিবাদী রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দল হিসেবে খাড়া হয়ে ছিল। সে কারণেই এর ভেতর মুসলমানেরা নিজেদের খুঁজে না পেয়েই কংগ্রেস দল খোলার পর ২০ বছর অপেক্ষা করে শেষে মুসলিম লীগ গঠন করেছিল।
আসলে পুরো বিষয়ে মূল সমস্যা পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্স। সব জাতীয়তাবাদ, সব জাতি ধারণাই একেকটা পরিচয়ের রাজনীতি; সেক্টেরিয়ান পলিটিক্স। সেটা কংগ্রেস হিন্দুত্বের জাতিবাদ করলেও যা, মুসলিম লীগের ইসলামি জাতীয়তাবাদ করলেও তা। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ করলেও একই সমস্যা থেকেই যাবে। বাংলাদেশে কেউ বাঙালি জাতিবাদ করতে চাইলে আরেকজন বলবে তিনি ইসলামি জাতীয়তাবাদ করবেন। আপনি ভাষার জাতীয়তাবাদ চাইলে আর একজন ভুখণ্ডের জাতিবাদ চেয়ে বসবেন। জাতিবাদী রাজনীতি মানেই পরিচয়ের রাজনীতি, মানে বিভক্তির রাজনীতি। অথচ এর বাইরে আসতে হবে আমাদের।
অতএব ‘জাতি’ ধারণা, জাতিবাদী রাজনীতির ধারণা ইত্যাদি আগে স্বচ্ছ করে না নিলে প্রাসঙ্গিক আলোচনা অর্থহীন থেকে যাবে।

আকবার আলি খানের বক্তব্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হলো তিনি বলছেন, জাতির পিতা স্বয়ং মনে করতেন আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদান রয়েছে। একটি হলো ধর্ম, আরেকটি হলো ভাষা। তিনি যদি সত্যি সত্যিই মনে করে থাকেন, জাতির পিতার জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদানের একটা ধর্ম; তাহলে দ্বিজাতিতত্ত্বকে মানে ধর্মীয় পরিচয়কে সমালোচনা করার তো সুযোগ নেই। দেশ ভাগের ব্যাপারে কলকাতার বয়ানের পক্ষে দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কই? এটা তো স্ববিরোধিতা। ফলে ‘পাকিস্তান হওয়া এক দুর্ঘটনা আর বাংলাদেশ হওয়া এরই সংশোধন!’-কথাটা খুবই স্ববিরোধী বক্তব্য হয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

গৌতম দাস

২৬ জুলাই ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gz

 

কখন কোন জিনিষ যে কার প্রতীক হয়ে উঠে বলা মুশকিল। যেমন, ভারতের গরু প্রীতি ও পূজা। এটাই এখন ভারতের হিন্দুত্ব-ভিত্তিক রাষ্ট্র ও মোদির বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি দুটোরই মুখ্য প্রকাশ ও প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই মাস আগে গত ২৫ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি, ভারতের গ্রাম বা শহরের কোন হাট-বাজারে  জবাইর উদ্দেশ্যে নিয়ে গরু কেনাবেচা করা যাবে না; এটা নিষিদ্ধ বলে এক আইন জারি করেছিলেন। গরু কেনাবেচার আগে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে এক কমিটি বিস্তর ফর্ম পুরণ করে নেয়, তাতে প্রায় শপথ করিয়ে নেওয়ার মত যে ঐ গরু জবাই করার জন্য কেনাবেচা হচ্ছে না; কৃষিকাজ বা অন্যকিছুর জন্য কেনাবেচা হচ্ছে। সেই আইনে (ঐ আইনের এক পিডিএফ কপি আগ্রহিরা এখানে দেখতে পারেন) গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সমাজের এর প্রবল প্রভাব পড়েছিল মুখ্যত  দুই জায়গায়। চামড়া ও মাংস সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ দিনের সব ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে (রপ্তানি বাণিজ্যসহ) এবং এসব সংশ্লিষ্ট কসাইসহ নানান পেশাজীবিদের জীবনে। আর অপর সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া হয়েছিল যে, এক পাবলিক লিঞ্চিং উন্মাদনা দেখেছিল সারা ভারত। পাবলিক লিঞ্চিং যাকে আমরা গণপিটুনি, হাটুরে মার ইত্যাদি বলি। যার সার কথা হল মানুষ খেপিয়ে কাউকে কাউকে বিচার বহিবহির্ভুতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অথবা আরএসএসের সমর্থক হিন্দুত্ববাদী নানান ব্রান্ডের সংগঠনের সদস্যদেরকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয় এই আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কী না এর তদারকি বা ভিজিলেন্সের নামে। স্বভাবতই গরু অথবা মাংস নিয়ে চলাচলকারি কেউ এদের হাতে পড়লে সে পাবলিক লিঞ্চিং তাণ্ডবের শিকার হবেই। ভিজিলেন্স শব্দটা ইংরাজি পত্রিকা আর মোদির বক্তৃতার ভাষ্য থেকে এসেছে।  মোদির ঘোষিত জবাই নিষিদ্ধ আইন বাস্তবায়িত কারি দলীয় ক্যাডারদের ভাষায় এই ভিজিলেন্স টিমের সদস্যদের আদর করে এরা ‘গোরক্ষক’ ডাকত। এই নামে তারা শুরুতে হাজির হয়েছিল। এক কথায় বললে, এরা ছিল এক ফ্যাসিজমের তাণ্ডব বাহিনী। ‘আইনকানুন হীনতা’র এক চরম প্রকাশ। এতে যে কেউ যখন তখন একদল লোকের হাতে পরিকল্পিতভাবে আক্রান্ত, নিগৃহীত বা নিহত হয়ে যেতে পারেন; বিশেষ করে তিনি যদি মুসলমান নাগরিক হন অথবা কোনো মুসলমান ধর্মীয় চিহ্ন শরীরে প্রকাশিত থাকে। ভারতের নিউজ টিভিমিডিয়া এনডিটিভির হিসাবে গত ২২ মাসে ১৭ ব্যক্তি হত্যা অথবা আক্রান্ত হয়েছে এই গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স টিমের হাতে। প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ভিতর বসে থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় নাই, নিহত হয়েছেন।

গত দুই মাস ধরে এই পরিস্থিতি চলে আসার পর এখন সাময়িক হলেও এক ইতিবাচক খবর হল, মোদির ওই আইন গত ১১ জুলাই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘স্থগিত’ ঘোষণা করেছে। এর সাথে সরকারি সলিসিটর জেনারেল আদালতকে জানিয়েছেন, সরকার আদালতে উঠা আপত্তিগুলোকে আমলে নিয়ে সংশোধিতরূপে আইনটা আবার চালু করবে।

এখানে আদালতের আদেশটা পরিস্কার করে বলা ভাল। এটা ছিল সুপ্রীম কোর্টের আদেশ। আর এর আগে গরুজবাই নিষিদ্ধ আইন প্রথমে মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ পেয়েছিল। সে আদেশ এরপর সুপ্রীম কোর্টে আপিলের জন্য এসে এবার সর্বভারতীয় স্তরে প্রযোজ্য বলে মোদির আইন স্থগিতাদেশ পেল। তবে এবার আদালতে উঠা আপত্তিগুলো আমলে নিয়ে পুরান আইনটাকেই ঝেড়েপিছে মোদি যে  আবার নতুন করে আনবেন এটা পরিস্কার।

শুরুতে বলেছিলাম, মোদির জবাই নিষিদ্ধ আইনটা ২৫ মে ২০১৭ চালু হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ১৯৬০ সালের একটা আইনকেই (Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960) নতুন করে মোদির হাতে ঝেড়ে মুছে হাজির করা আইন; ঠিক নতুন আইন নয়। অর্থাৎ বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আইনটা ১৯৬০ সালে কংগ্রেসের শাসন আমলে করা হয়েছিল এবং খুবই চতুরভাবে, পশুদের কষ্ট নিবারণের উদ্যোগ হিসেবে। ‘পশুদের অনেক কষ্ট, তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা করা হচ্ছে, মানুষ (মুসলমান) নিষ্ঠুর’ …… এসব বয়ানের আড়ালে এই আইন সেকালে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এখন কংগ্রেসের কাঁধে চড়ে মোদি সেটাতেই একালে নতুন শব্দ বাক্য সংযোজন করে নিয়ে বলছেন – জবাই করার উদ্দেশ্যে গরু কোনো হাটে কিনতে পাওয়া যাবে না; জবাইয়ের এর কাজে গরু কিনবে এমন কোন হাটবাজারই আর কার্যকর নাই অথবা নিষিদ্ধ।

এখন কথা হল, এই বছরে মোদি এই আইন করতে উৎসাহী হলেন কেন? অথবা আদালতে সদ্য স্থগিত হওয়া আইন আবার নতুন করে আপত্তিগুলো সামলিয়ে চালু করার তাড়া বা তাগিদ বিজেপির কেন?
এককথায় বললে, এর পেছনের মূল বিষয়, সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচন। সদ্য অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ঐ নির্বাচনে, গত মার্চ মাসে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছিল। ওই নির্বাচনের পর থেকেই বিজেপির নীতিনির্ধারকেরা বলা শুরু করেছিলেন ‘আমরা এতদিন যে নির্বাচনী ফর্মুলা খুঁজে ফিরছিলাম সেটা এবার পেয়ে গেছি’। যেমন গত ১৯ মার্চ আনন্দবাজার লিখেছিল, “বিজেপি সূত্রের মতে, এ বার উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, মেরুকরণের তাস খেলেই জাত-পাতের অঙ্ককে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া গিয়েছে। হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে একজোট করা গিয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে সেটিকেই আরও কাজে লাগাতে চাইছে দল”।  কিভাবে সেটা? বাইরে থেকে দেখতে শুনতে ভারতে হিন্সদু জনগোষ্ঠির সবাইকে একাট্টা হিন্দু মনে হলেও আসলে ভেতরে জাত-পাতের বিভক্তি, ছোঁয়াছুঁয়ি, ক্ষমতা কাঠামোতে অবস্থান ইত্যাদির বিভক্তিতে একাট্টা হিন্দু-স্বার্থ বলে ভোটের বাজারে সব না হলেও মেজরিটি ভোট এক জায়গায় করা বিজেপির জন্য সবসময় খুবই কঠিন কাজ মনে করা হয়ে এসেছে। এবং আসলেই তা কঠিন। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের মতো এত বড় অঞ্চল (ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ ৫৪১ টা এর মধ্যে একাই উত্তরপ্রদেশ ৮০ টি আসনের) যা নানা জাত-উপজাত, এর ওপর আবার রয়েছে মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সিতে (কোন কোন কনষ্টিটুয়েন্সিতে ৩০% পর্যন্ত মুসলমান ভোটার) এর বিভক্ত হয়ে থাকা।  উত্তর প্রদেশে এছাড়া আবার অব্রাক্ষ্মণ যাদব, মুসলমান, দলিত এবং  ব্রাহ্মণ ইত্যাদি সব বড় বড় ভাগের জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল আছে। এর মধ্যে মুসলমান বাদে অভিন্ন সব জাতের দল হিসেবে বিজেপিকে কেবল সব হিন্দুদের দল হিসেবে হাজির করার ফর্মুলাটাই বিজেপি খুঁজছিল। তাই বিজেপি এবার দাবি করছে যে তারা সেটা এবার পেয়ে গেছে। ফলে এরই প্রকাশ দেখেছি আমরা। তা হল, যেমন দাঙ্গাবাজ যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কিন্হতু এর চেয়েও তাতপর্লেযের ঘটনা হল সাথে উপ-মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন দু’জন। দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য এবং দীনেশ শর্মা। এদের একজন ব্রাহ্মণ আর একজন দলিত। অর্থাৎ সব হিন্দু্দের মধ্যেই কিছু না কিছু সুবিধা বা  ক্ষমতা বিতরণ, এটাকেই বিজেপি সম্ভবত ‘সেই ফর্মুলা পেয়ে যাওয়া’ মনে করেছিল। এটাকে বলা যায়, সব জাতের সব হিন্দু ভোটকে একই বিজেপি প্রার্থীর পক্ষে জড়ো করা, তারা এভাবেই উত্তর প্রদেশে জিতেছে- এটাই হল বিজেপির দাবি।

কিন্ততু বিজেপির এই দাবি সত্ত্বেও আমরা আগের মতোই বর্ণহিন্দুদের অত্যাচারে দলিতদের ধর্মান্তরিত হয়ে বৌদ্ধ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে আমরা দেখিনি।  বরং ওই নির্বাচনের পরেও তা বন্ধ হয়নি। দলিতদের পালটা সংগঠন ভীমসেনার ততপরতা নিয়ে রিপোর্টটা দেখুন।   তবু বিজেপির উপলব্ধি হল, এটা তাদের জন্য গরু রক্ষার রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব উথাল পাথাল করে ফেলার সময়। এতে সহজেই মুসলমানকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে ভোটবাক্স ভরাট করার রাজনীতি খোলাখুলি করতে হবে। এই বিচার থেকেই এখন গরু জবাই নিষেধ বা হাটে গরু কেনাবেচা নিষিদ্ধের আইন; মোদিকে এমন আইন চালু করতে হয়েছিল। বিশেষ করে এখন ছয়টা রাজ্যসরকার বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড। এসব এলাকায় আইনের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এই ছয় রাজ্যকে চিহ্নিত করেছে যাতে এখানে বাড়তি কিছু পদক্ষেপ আদালত নিতে বাধ্য করতে পারে ভিজিলেন্সের বিরুদ্ধে। আদালতে আইনটা স্থগিত হয়ে এক্সাবার পরও এবার আনন্দবাজার লিখছে, “গো-রক্ষকদের তাণ্ডব কী করে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে কেন্দ্র ও ছ’টি বিজেপি শাসিত রাজ্যের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট”।

তার মানে সবখানে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল জবাই নিষিদ্ধ আইন স্থগিতের আগে অথবা পরে, তা হল ‘ভিজিলেন্স’। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলের ভিজিলেন্স টিম আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাবলিক লিঞ্চিং (গণনির্যাতন) শুরু করাতে এটা এমন বড় হইচই সৃষ্টি করে যে, এনডিটিভির মতে, গত ২২ মাসে ১৭ জন নিহত বা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উপায়ন্তর না দেখে ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী মোদি তখন নিজেই ভিজিলেন্সের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করা শুরু করেন। নিজেই এদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি, নিন্দা শুরু করে দেন। হাত-পা ধুয়ে ফেলা শুরু করেছিলেন। এছাড়া গত ১৬ জুলাই দ্বিতীয়বার তিনি একইভাবে এসবের বিরুদ্ধে আবার হুঁশিয়ারি দেন।   কারণ ততদিনে আদালতে তিনি হেরে গেলেছে ফলে সর্বদলীয় বৈঠক করছেন। মূলত  রাস্তায় রাস্তায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর সদস্যকে হয়রানি জনমত বিগড়ে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে সাহায্য করেছিল। আর ঠিক এ সময়ই সুপ্রিম কোর্টে শুনানিগুলো চলছিল বলে আদালতের পরিস্থিতি জবাই নিষিদ্ধ আইনটির বিপক্ষে চলে যায়। ওদিকে আদালতে শুনানি চলাকালে তথাকথিত ভিজিলেন্স কমিটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কার দায়িত্ব? কেন্দ্র না রাজ্য- এই প্রশ্নে মোদি সরকার দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাজ্যসরকারের, কেন্দ্রের নয়। এই কথা বলে নিজের দায় এড়ানোর সুযোগ করে নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এ কথা সত্যি, ভারতে প্রাথমিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কর্তব্য রাজ্যের। আর রাজ্য সেকাজ  নিজে না পারলে সে কেন্দ্রের কাছে বাড়তি ফোর্স চাইবে। তাতে কেন্দ্রীয় ফোর্স বাড়তি হিসেবে এলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায় আসলে রাজ্যের।

এদিকে সব ভিজিলেন্স টিমের তাণ্ডবের দায় আদালতের চোখ এড়িয়ে মোদি সরকার রাজ্যের ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হলেও আসলেই কি মোদি সরকার দায়শূন্য? হাত-পা ধোয়া?
একেবারেই না। কারণ প্রথমত, যাদেরকে ভিজিলেন্স টিম বলা হচ্ছে, যতই তাদেরকে উৎসাহী সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখানো হোক না কেন, এরা মূলত বিজেপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। কিন্তু তাতেো মোদির দায় কি অতটুকুই যে, মোদি বিজেপি দলের নেতা, তাই? না অতটুকু নয়, বরং ওই টুক দায়িত্ব মোদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফেলে দিতেই পারেন। কারণ ওর চেয়েও মোদির বড় পরিচয় হলো, উনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

মোদি প্রধানমন্ত্রী। এবং তার সরকারের আনা আইনের কারণেই এককভাবে মোদিকে ভিজিলেন্স টিমের জন্য দায়ী করা যায়। কিভাবে? মোদির ‘গরু জবাই নিষিদ্ধ’ আইনের পিডিএফ কপি নেটে পাওয়া যায়। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি। ঐ আইনে একটা শব্দ আছে Society for Prevention of Cruelty to Animals (SPCA)। এটাই এর প্রমাণ। আসলে এই আইন বাস্তবায়নের সময় জনসম্পৃক্ততার অজুহাতে একটা ‘গণকমিটি’ গড়ে নেয়ার কথা আছে যাদের কাজ হবে ওই আইন বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতা করা। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এলাকার জনগণ নিয়ে ওই SPCA গঠন করে নিতে হবে। আর বাস্তবে বিজেপির অঙ্গসংগঠনের লোকজন নিয়েই গঠিত হয় ওই SPCA কমিটি। আর এই কমিটিই কার্যত ‘ভিজিলেন্স টিম’; এভাবেই আইনটি বাস্তবায়নের সব ক্ষমতা দলীয় লোকদের হাতে।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার হবে। আমাদের দেশে সরকার যদি বলে, কাল থেকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নামবে আর তাদেরকে জনগণের পক্ষ থেকে সহায়তা করবে ছাত্রলীগ, এ কথা বললে যা হবে তাই হয়েছে ওখানে। আর স্বভাবতই গণপিটুনির নামে ওখানে লীগের পিটুনিই হবে।
অতএব, ওই আইনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এই ‘SPCA কমিটি’। এটাই কার্যত সেই পাবলিক লিঞ্চিং কমিটি। ভারতের একজন একাডেমিক শিক্ষক লিখছেন, Public lynching, a barbaric form of political expression, seems to have become the new norm in India since the Modi government came to power at the centre. কিন্তু মোদি যদি আইনেই ওই লিঞ্চিং কমিটি গড়ার বৈধ ব্যবস্থা রেখে দেন, তবে পিটুনি ঠেকাবে কে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৫ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার

গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-2go

 হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গড়া ও দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হল ভারত। এই রাষ্ট্র গঠনের সময় মনে করে করা হয়েছিল যে, বিভিন্ন প্রাদেশিক বৈশিষ্টে বিভক্ত রাজ্যের (এখন ২৯ রাজ্যে বিভক্ত) ভারতকে ‘হিন্দুত্ব’ এই আঠা না থাকলে একে এক রাখার আর কোনো উপায় নেই; এই ধারণাটা ভুল যদিও। ভারতের উগ্র হিন্দুসমাজ মুসলমানসমাজকে নিজের অধীনে আনা ও চাপে রাখার জন্য কী না করতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এরই আদর্শ নমুনা। ভারতে গরুর (মহিষ উট গবাদিসহ সব পশু) গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ। [The notification covers bulls, bullocks, cows, buffaloes, steers, heifers and calves, as well as the camel trade.] মানে, বেচাবিক্রি, জবাই ও খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য হল, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে আধিপত্যে থাকা সংখ্যাগুরু কমিউনিটির পছন্দসই বিধিব্যবস্থার অধীনে মুসলমান কমিউনিটিকে আনা, দাবড়ানো। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নয়, জারি করা হয়েছে এক অদ্ভুত কায়দায়। কংগ্রেসের নেহরু আমলে তারা এর প্রথম কায়দাটা বের করেছিলেন। তা হল ভারতীয় রাষ্ট্র “পশু-প্রেমী” হয়ে গিয়েছিল। তারা ‘প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেল অ্যাক্ট ১৯৬০’ নামে এক আইন পাস করে ফেলেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য ‘সোসাইটি ফর প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেলস’ নামে সমিতি গড়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মুল কথা ছিল, “পশুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যথা বা কষ্ট দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা করা যাবে না” এর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এই আইনটা লেখা হয়েছিল। আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব জায়গায় একই কথা বলা হয়েছিল যে, ‘পশুকে অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও কষ্ট দেয়া রোধ’ করাই উদ্দেশ্য। আইনটি কেমন তা বোঝার সবচেয়ে ভালো এক উপায় হল, এতে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ লক্ষ করতে হবে। যেমন ‘পশুর কল্যাণ, ‘পশুর ব্যথা’, ‘পশুর কষ্ট’, ‘পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ বোধ বা অনুভূতিগুলো (ফলে শব্দগুলো) আসলে মানুষের, মানুষ সম্পর্কিত। কিন্তু সেগুলোকে অবলীলায় পশুর ওপর প্রয়োগ করে ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর এখানে সবচেয়ে তামাশার শব্দ হল, ‘পশুর কল্যাণ বা ওয়েলফেয়ার’। বিগত ১৯৬০ সালের ভারতে তো বটেই, এখনকার ভারতেও কোনো কোনো আম-মানুষের অবস্থা এমন যে, পশুর ওপর তো বটেই, আপন সন্তান বা স্ত্রীসহ পরিবারের আপন সদস্যদের ওপর “ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা” দেখানো ছাড়া নিজের পেটের ভাত জোগাড়ের আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ সেই দেশে মানুষের বদলে পশুর ওয়েলফেয়ার নিয়ে আইন করা হয়েছিল, চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। আসলে আইনটি করেছিল অবস্থাপন্ন শ্রেণী। করেছিল মুসলমান কমিউনিটিকে হেয় করে দেখাতে যে, তারা ‘ব্যথা ও কষ্ট দিয়ে বা নিষ্ঠুরতা করে’ গরুর গোশত খায়। অতএব এটা বন্ধ করতে হবে। এক কথায় একটা ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছিল। তবে অবশ্য এটা ছিল এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি-কিক, এক পরোক্ষ আইন। কারণ এই আইনের সেকশন ২৮-এ এক ফাঁকে একটা ছাড় দেয়া ছিল। [Section 28 of the Act 1960, mandates that “nothing contained in this Act (1960 Act) shall render it an offence to kill any animal in a manner required by the religion of any community.”]। বাংলা করলে বলা হয়েছিল, “কোনো কমিউনিটির ধর্মীয় আচার হিসেবে বিধান মতে যদি জবাই করা হয়, পশুকে ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়, তবুও সে ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না”।

কিন্তু গত ১৯৬০ সালের সেই আইনের ওপরে এবং সেই আইনের সীমার মধ্যে থেকে নতুন করে দু’টি বিধি তৈরি করেছে মোদি সরকার। এর একটা হল,
Prevention of Cruelty to Animals (Regulation of Livestock Markets) Rules, 2017, &
Prevention of Cruelty to Animals (Care and Maintenance of Case Property Animals) Rules, 2017

সোজা বাংলায় বললে, প্রথমটা মুল অর্থ হল, পশুর হাট বা মার্কেট ভেঙে দেয়া। অর্থাৎ জবাই করার উদ্দেশ্যে মার্কেটে থেকে কোন পশু কেনা অথবা বেচা যাবে না- এরই আইন এটা। কারণ দেখা গেছে, প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে জবাইয়ের গরুটা হাট/মার্কেট হয়ে আসে। তাই প্রথম আইনটার ২২ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো পশু কোনো মার্কেটে তোলা, কেনাবেচা করা যাবে না’। [22 (iii) stating that the cattle has not been brought to market for sale for slaughter;] আর সাথে এই কথাটাই হাটে যে কোন গরু উঠানোর পর  ‘রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে আর সেখানে শপথ করে বলতে হবে” ইত্যাদি তো আছেই। আর দ্বিতীয় আইন হলটা হল কেয়ার মেন্টেনেন্স না করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সেসব সংক্রান্ত।

হাটে পশু উঠবে, রেজিস্ট্রেশন হবে, কানে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার লাগবে, কেনাবেচা হবে; তবে তা কেবল পশু কৃষিকাজের ব্যবহারের উদ্দেশ্য। গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতা এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেবল হাটে গরু বেচা ও ক্রয় করতে পারবে।  তাহলে মূল কথাটা হল,  গরুর গোশতের জন্য গরু কেনাবেচা করা যাবে না। এমনকি পশু মারা গেলে বা পশু অসুস্থ হয়ে মরা অথবা আয়ু শেষে মরা যা-ই হোক, সব ক্ষেত্রেই মরা গরু একেবারে সোজা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন ভাবেই মরা গরুর বা মারা গরুর চামড়া ছিলানো যাবে না। অথবা মারা বা কাটা গরুর হাড়গোড়সহ কোনো অবশেষই সংগ্রহ ও বিক্রি করা যাবে না। চামড়াও বিক্রি করা যাবে না।

এই হলো মোটা দাগে আইনটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া যেখানে দেখা যাচ্ছে শুরু থেকেই এই আইনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবোধক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায়, “পশুর উপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর” নামে কংগ্রেস আমলেই মুসলমানের প্রতি বৈষম্যটা করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্বলভাবে। আর সেটাকেই এখন সবলভাবে করতে চাইছেন বিজেপি-আরএসএসের নেতা মোদি। গত ২৩ মে গেজেটেড বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন আইন সম্পর্কে মোদি সরকার সবাইকে “নোটিফাই করে” জানিয়েছে। আর এই আইন জারি করে তা সেই পুরনো আইনের ওপর দাঁড় করানো বলে এটা কংগ্রেসকেও বেকায়দায় ফেলতে পেরেছে, যাতে কংগ্রেস মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে থেমে যায়। কারণ তাতে ১৯৬০ সালের নেহরুকেই সমালোচনা করা হয়ে যায়। আবার ‘পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানো’র নামে এবার সবলভাবে ইসলামবিদ্বেষটা মোদি সফলভাবে দেখাতে পারেন। তবে আরো কারণও আছে।

একটা কথা পরিস্কার রাখা দরকার। এতদিন গরু জবাই দেয়া, বেচাকেনা ও খাওয়া সম্পর্কে যেসব খবর আমরা শুনে আসছিলাম তা কেন্দ্রীয় বা মোদি সরকারের কোনো আইন ছিল না। এমনকি ২০১৫ সালে মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফকে ‘বাংলাদেশের গরু খাওয়া বন্ধ করা’র যে তাতানো বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটাও আসলে মন্ত্রীর অনধিকারচর্চা ছিল। কারণ গরু জবাই বন্ধ করা কেন্দ্রের বা রাজনাথদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন ছিল না, আবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারেরও কোনো আইন ছিল না সেটা। তবে দুই বছর আগে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখানে এ আইন পাস করা হয়েছিল। আর তা সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছিল বা বিজেপি প্রচার করেছিল। এজন্য এটা যে কোন কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর জন্য অনধিকার ছিল।  তবে এবার প্রথম কেন্দ্র নিজেই আইন জারি করা হলো। কিন্তু এতে বিভিন্ন অ-বিজেপি রাজ্যসহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকেও বিরোধিতা প্রবল হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজ সংশ্লিষ্ট এই বিষয় ‘রাজ্যসরকারের এখতিয়ার’ এমন দাবি বা এই প্রশ্ন উঠিয়েছে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। কথা সত্য ইস্যুটায় রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিবার এক্তিয়ার।  মমতা ব্যানার্জি এই আইনকে কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্য রাজ্যকেও তারা আপত্তি তোলার আহ্বান রেখেছিলেন। শেষে গত ২ জুন ‘মোদির সেনাপতি’ অরুণ জেটলি বলেন, ‘নতুন বিজ্ঞপ্তি রাজ্যসরকারের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়।’ দৈনিক আনন্দবাজার এই কথার অর্থ করেছে, ‘গবাদিপশু জবাইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাজ্যের হাতেই থাকছে’। মোদির খাস লোক তার অর্থমন্ত্রী জেটলির মন্তব্যের একটা ব্যাখ্যা আনন্দবাজার হাজির করে বলছে, ‘এখন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, তাতে রাজ্যের আইনে হস্তক্ষেপ হচ্ছে না। এটি শুধু গবাদিপশুর কেনাবেচার স্থানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। কৃষকেরা গবাদিপশু শুধু বাজারে বেচতে পারবেন নাকি বাজারের বাইরে থেকেও কেনা যাবে, বিজ্ঞপ্তি শুধু সেটি নিয়েই। কিন্তু তাদের জবাই করার জন্য রাজ্যের আইনই বলবৎ থাকবে”।

কিন্তু আইনগত দিক থেকে মোদির এই আইন কি আদালতে টিকবে, নাকি কনস্টিটিউশনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বাতিল হয়ে যাবে? গুজরাটের হাইকোর্টের (ময়ূর) বিচারপতি গোমূত্র পানে ও প্রশংসায় বেহুঁশ, তা আমরা জেনেছি। কিন্তু শক্ত তর্ক উঠেছে দক্ষিণে তামিলনাড়–তে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চে। সেখানকার রিট পিটিশনের পয়েন্ট খুবই শক্তিশালী। যেমন তারা বলছেন, “নতুন আইনটা প্যারেন্ট আইনের বাইরে যেতে পারে না”। ১৯৬০ সালের আইনে যেকোনো কমিউনিটির ধর্মীয় শরিয়ত বা রিচুয়াল হিসেবে পশু কেনাবেচা, কোরবানি এবং গোশত খাওয়ার ওপরে এই আইন প্রযোজ্য করা হয় নাই, বাইরে ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছিল। কাজেই এখনও কেন্দ্রের কোনো এখতিয়ার নেই সেটা লঙ্ঘন করার। এ ছাড়া ভারতীয় কনস্টিটিউশনে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারবিষয়ক ২৫ ধারায় ‘অবাধে ধর্মপালন নাগরিকের অধিকার’ এবং ২৯ ধারায় ‘সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অধিকারই মোদির নতুন আইনে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া আর একটা পয়েন্ট আনা হয়েছে তা হলো, ভারতীয় কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১৯ (১)(জি) অনুসারে কোনো পেশার লোককে বেকার করে দেয়া যাবে না। এখানে কসাইসহ চামড়া ইত্যাদির প্রক্রিয়াজাত করা যাদের পেশা তাদেরকে কাজ-পেশাহীন করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটাও অভিযোগের একটি জোরালো যুক্তি।
ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও একটা জনস্বার্থ বা পাবলিক লিটিগেশনের মামলা হয়েছে। সেখানেও উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও একটা বাড়তি পয়েন্ট হল, পুরনো আইনের ১১ অনুচ্ছেদ। সেখানে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশু জবাইকে খাদ্য জোগাড় হিসেবে দেখা হয়েছিল, নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা হয়নি। তবে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া ও নিষ্ঠুরতা না করা সাপেক্ষে তা করতে হবে। তাই এবার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ১১ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেছেন আর সরকারকে জবাব তৈরি করে আসতে বলেছেন। এই মামলার বাদি হলো হায়দরাবাদের এক এনজিও, বাদির দাবি- মোদির দুই নতুন আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিতে হবে।

তবে আগেই বলেছিলাম মোদির আইনে ‘পশুর ওয়েলফেয়ার’ কথাটার সত্যিই বিষ্ময়কর। এক ধরনের ওয়েলফেয়ার সংগঠনের কথা আইনে অনেকবার রেফার করা হয়েছে। আর এটাই হল, বিজেপি- আরএসএসের লোকাল ‘পশুর ওয়েলফেয়ার কমিটি’ যাদের হাতে পশু ব্যবসায়ীরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং তারা পাবলিক লিঞ্চিং বা প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। আশা করা যায়, এ বিষয়গুলোও আদালত আমলে নেবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মোদির আইন দু’টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি তা হয়, তবে এটা ভারত রাষ্ট্রকে বাড়তি কিছু আয়ু দেবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৯ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের নির্বাচনে উদোম হিন্দুত্ব পরিচয়

ভারতের নির্বাচনে উদোম হিন্দুত্ব পরিচয়

গৌতম দাস

মার্চ ২৩, ২০১৭ বিকেল সাড়ে পাঁচটা

http://wp.me/p1sCvy-2dN

 

 

ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে। মুখে বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। কিন্তু নিজেদের আস্থাই তত গভীর ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান সমাজ গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথায় ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, তারা কোনো সমস্যা দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন? কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ? তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে নতুন নাম নেন- যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামে একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা একই নামে চালানো হতো। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়ে পড়েন। তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরেই স্বাধীন থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এরপর ২০০২ সালে যোগী বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ গঠন করেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’। আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য আর ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা। যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে- ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগে তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হতো। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

 

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে পরিবর্তন অনলাইন পত্রিকায় ২০ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

মোদির আগামি দুবছরের রাজনীতি হবে কেবল হিন্দুত্ব

মোদির আগামি দুবছরের রাজনীতি হবে কেবল হিন্দুত্ব

গৌতম দাস

২৩ মার্চ ২০১৭, বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2dG

ভারতের ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন সম্পন্ন হবার পর এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ মার্চ। এই নির্বাচন ছিল রাজ্য সরকারের অর্থাৎ প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচন। ভারতের সংবিধানে ইংরেজিতে একে রাজ্য অ্যাসেম্বলি ইলেকশন (State Assembly Election) বা বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন নামে অভিহিত করা হয়েছে। জন্মের শুরু থেকেই ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য ছিল উত্তর প্রদেশ। সেখান থেকে কিছু জেলা (উত্তরপ্রদেশেরও উত্তর অংশের) আলাদা করে নিয়ে গত ২০০০ সালে বানানো নতুন রাজ্যের নাম ‘উত্তরখণ্ড’। এরপরে এখনও উত্তর প্রদেশ সবচেয়ে বড় রাজ্য। এই দুই রাজ্য এবং পাঞ্জাব, গোয়া ও মনিপুর মিলে মোট এই পাঁচ রাজ্যে এবার প্রায় এক মাস ধরে সাত পর্বে নির্বাচন শেষ হয় গত ৮ মার্চ। এরপরেই ১১ মার্চ সকাল থেকে সবগুলো রাজ্যের একযোগে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ শুরু হয়। উত্তর প্রদেশ ও উত্তরখণ্ড রাজ্যে বিজেপি আর পাঞ্জাবের রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করেছে।
বাকি দুই রাজ্য গোয়া ও মনিপুরে কেউ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে কংগ্রেস অন্য সব দলের চেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজেপি প্রবল তৎপরতায় কংগ্রেস বাদে আর সব ছোট দল ও স্বতন্ত্র সদস্য যারা জিতেছে তাদের সবাইকে বিজেপি সাথে নিয়ে জোট বেঁধে এই দুই রাজ্যে সরকার গঠন করে ফেলেছে। অর্থাৎ বিজেপির নেতৃত্বে গোয়া ও মনিপুরে কোয়ালিশন গর্ভমেন্ট গড়তে সফল হয়েছে বিজেপি।  এখানে ‘তৎপরতা’ কথাটা অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে, বিজেপি যখন কংগ্রেস বাদে আর সব নির্বাচিত ছোট দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সাথে সরকার গঠনের দেনা-পাওনা আলাপ আলোচনা চালিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনের ‘চুক্তি’ সম্পন্ন করে ফেলছিল, কংগ্রেস তখন কে তাদের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হবে এ নিয়ে ঝগড়া ও মনকষাকষিতে মত্ত থেকে সরকার গঠনের সুযোগ হারিয়েছিল।

ওদিকে প্রায় এরকমই অন্য কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল উত্তরপ্রদেশ। এর মূল কারণ রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ জনসংখ্যায় সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী এলাকার – কেন্দ্রিয় লোকসভা আসন ৮০। ভারতের জন্মের পর থেকে (১৯৮৫ পর্যন্ত) পুরো নেহরু পরিবারের কাল পর্বে ভারতের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশ থেকেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসতাণ্ডব, গোধন ট্রেনে আগুন ও ব্যাপক দাঙ্গার ঘটনাপর্ব সামগ্রিকভাবে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছে। আর সে সবের বেশির ভাগ এই উত্তরপ্রদেশই। সেই উত্তরপ্রদেশে মোট ৪০৩ আসনের বিধানসভা নির্বাচনে এবারই প্রথম বিজেপি ৩২৬ আসনে জয়লাভ করেছে। এর আগে গত ২০১৪ সালে মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লোকসভা নির্বাচনে অবশ্য বিজেপি প্রথম মোট ৮০ আসনের মধ্যে ৭৩ আসনের বিজয় লাভ করেছিল। সেটাই উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পা রেখে পেখম মেলার শুরু বলা যায়। পরে কেবল দিল্লি রাজ্য সরকারের নির্বাচনে এবং বিহারের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির খুব খারাপ হার হওয়াতে এবারের নির্বাচনে বিজেপি আবার উত্তরপ্রদেশে আগের মতো বিরাট ব্যবধানে জিতবেই এটা কোনো পক্ষই নিশ্চিত ধরেনি। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এমন বিজয়ের দাবি বরাবর করে যাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া চার মাস আগে মোদি ভারতের মোট ছাপা নোটের ৮৫ শতাংশ মূল্য ধারণ করে এমন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট দুটা বাতিল করে দিয়েছি, আর নতুন নোটে তা বদলে দিয়ে ছিল। তবে এথেকে কালো টাকা উদ্ধারের কোনো সুফল মোদি দেখাতে পারেননি। আবার নোট বাতিলের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো খুবই কষ্টের হয়ে পড়েছিল। এর চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হল, সেই থেকে ভারতের অর্থনীতি প্রচণ্ড খারাপ অবস্থায় পড়েছে। ব্যাংক গভর্ভর থেকে সরকারি টেকনিক্যাল উপদেষ্টারাও তা অস্বীকার করে পারে নাই। এতে  নির্বাচন বিশেষজ্ঞসহ সব পক্ষই আশঙ্কা করছিল, এই নির্বাচনের দেওয়া ভোটে সেটা বড় ছাপ ফেলতে পারে এবং মোদি একটা বড় ধাক্কা খেতে পারেন। শুধু তাই না, সেটা হলে তা ২০১৯ সালের মোদির দ্বিতীয় নির্বাচনী ফলাফলকেও প্রভাবিত করবে। কিন্তু মোদির কপাল ভাল তা হয় নাই। ভারতের রাজনীতির বিচারে নোট বাতিল কেন্দ্রের রাজনীতির ইস্যু; স্থানীয় রাজনীতির নয়। তাই এক কথায় বললে, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে ভোটদাতারা ভোট দিয়েছে কেন্দ্রীয় ‘নোট বাতিল ও এর প্রভাবকে’ উপেক্ষা করে বরং স্থানীয় নানা ইস্যুতে। এসব আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করার পটভূমিতে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পালটা বিপুল জয়লাভ ভিন্ন অনেক কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল বিজয়ের অর্থ হল, কংগ্রেসের জায়গা দখল করে কংগ্রেসের মতোই সর্বভারতীয় দল হিসেবে বিজেপি ভারতীয় রাজনীতিতে উত্থিত হয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফল তাই প্রমাণ করছে। এই দাবি অনেক বিশ্লেষকও করছেন। আগামী দিনের ঘটনাবলী তা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু এসবের বাইরে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল বিজয় সাময়িক হতাশ থাকা মোদিকে আরো চাঙ্গা ও আস্থাবান করে তুলেছে। এই বিজয়কে কেন্দ্র করে মোদি ও বিজেপি আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রে নির্বাচনে জয়লাভের ছক সাজানো শুরু করেছে। কারণ বিজেপির মূল্যায়ন হল, হিন্দুত্ববাদকে মুখ্য করে পরিচালিত রাজনীতি হল, ভোটের বাক্স ভরানোর উপযুক্ত এবং বিজেপির জন্য পারফেক্ট রাজনীতি।
মোদির পরপর তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী থেকে পরে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত এবং সেই সাথে বিজেপির উত্থানপর্বে সবসময় আগ্রাসী নীতিতে পরিচালিত হয়েছেন। বাজি ধরে ধরে এগিয়েছেন। যত ঝুঁকি নিয়েছেন, প্রায় সব ফলাফলই তার পক্ষে গেছে। ফলে সাহসী হয়ে উঠছেন অথবা বলা যায় বাজি ধরে ঝুঁকি নেওয়াই তাঁর একমাত্র বিকল্প তার হাতে আছে ধরে নিয়ে এগিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার কুড়ি শতাংশ মুসলমান। এবারে বিজেপি যে কৌশলের ওপর এককভাবে দাঁড়িয়ে সে ৭৮ ভাগ আসন জিতেছে তা হল, ২০ শতাংশ মুসলমান ভোটারের পরোয়া না করে এর বিপরীতে ব্রাহ্মণ থেকে যাদব ও আরো নিচু জাত – এভাবে সব হিন্দু জনসংখ্যার নানা অংশকে যতদূর সম্ভব ভোটের একই বাক্সে ভরে আনা। এমন এক বড় রেঞ্জের হিন্দু-কোয়ালিশন গড়ে নির্বাচন লড়া।
যোগী আদিত্যনাথকে বিজেপি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উগ্র আগ্রাসী ও বিতর্কিত মন্তব্যকারী মাত্র ৪৪ বছর বয়সের বিজেপি নেতা আদিত্যনাথ। বিগত ১৯৯৮ সালে সবচেয়ে কম বয়স, মাত্র ২৬ বছরে তিনি প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং সেই থেকে পরপর পাঁচবার তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ বা লোকসভার এমপি। যদিও  এই আসনটা ছিল তার গুরু অবৈদ্যনাথ মোহন্ত এর, যিনি এই আসন থেকে নির্বাচিত হতেন। উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষনাথে এক প্রাচীন মঠ আছে, গুরু অবৈদ্যনাথ যার প্রধান পুরোহিত ছিলেন। গুরুর মৃত্যুর আগেই ১৯৯৪ সালে যোগীকে এই মঠের প্রধান পুরোহিত করে যান। আর এই মঠকে নিজেদের প্রভাবে এলাকায় নতুন মাত্রার রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিলেন যোগী। এখানে পুরনো গোরক্ষনাথ কলেজও হয়ে পড়ে তরুণদের প্রভাবিত করার উপায়। কলেজকে কেন্দ্র করে বিজেপি রাজনৈতিক তৎপরতা, বিশেষ করে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে চলা তৎপরতা জোরদার হয়েছিল এই কলেজকে ঘিরেই। গত ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ এখানে তরুণদের নিয়ে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ নামে এক নতুন সংগঠনের জন্ম দেন। আসলে উগ্র ও আক্রমণাত্মক ভাষায় মুসলমান ও ইসলাম অথবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য ও বয়ান দি্তে এই আগ্রাসী সংগঠন তিনি গড়ে তোলেন। তিনি প্রায়ই বক্তৃতায় হিন্দুত্বের রাজনীতির পক্ষে তার সাফাই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘হিন্দুত্ব কখনোই ত্যাগ করতে পারব না। কিছু জায়গায় হিন্দুরা নির্যাতিত। হিন্দুদের দেশে এটা হতে পারে না। তাই আমি হিন্দুত্বের পক্ষে কথা বলি। আমাকে বলতেই হবে”। এবারের রাজ্য নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রসঙ্গে তার এক আজব দাবি আছে। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প মোদিকে অনুসরণ করে জিতেছেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলে ট্রাম্প জিতেছেন। রাশিয়ার পুতিনও মুসলমানদের বিরোধী। বিষয়গুলোতে নাকি তাদের চোখ খুলে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। বিভিন্ন সময়ে তাঁর চরম উত্তেজক ও মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো মন্তব্যগুলো এক জায়গায় এনেছে আনন্দবাজার পত্রিকা এখানে। 
সেই যোগী আদিত্যনাথ উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন শুরুর দু’বছর আগে থেকেই  – মুসলমানদের ভারত থেকে বিতাড়িত করতে হবে, পাকিস্তান পাঠিয়ে দিতে হবে বলে দাবি জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। নির্বাচনের ফলাফলের পরে উত্তরপ্রদেশের কয়েকটা জেলায় ইতোমধ্যে মুসলমান বিতাড়নের পক্ষে পোস্টার পড়েছে। কয়েকটা ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক এর ছবি ছেপেছে। এরপরই বিজেপির সংসদীয় বোর্ড মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদিত্যনাথের নাম ঘোষণা করেছে।
আদিত্যনাথের তৎপরতার একটা প্যাটার্ন লক্ষ করা যায়। তার কাজের ধরন হল, মুসলমানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে উসকানিমূলকভাবে কথা বলা। এরপর এতে গ্রেফতার হলে তাকে মুক্ত করে আনার জন্য শহরে দাঙ্গা হাঙ্গামা তৈরি করা যাতে এই চাপে প্রশাসন তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ক্রমাগত আগ্রাসীভাবে েকের পর এক পদক্ষেপে চাপ বাড়িয়ে চলা। এভাবেই মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল তার ‘হিন্দু যুব বাহিনীর’ হাতে। এখানে এই তথ্যগুলোর বেশির ভাগ ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এভাবে যোগীর চাপ প্রয়োগ এবং ইচ্ছামতো কাজ করিয়ে নিয়ে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে  প্রধান হাতিয়ার হল তাঁর ‘হিন্দু যুব বাহিনী’। একই প্রক্রিয়ার চাপ তিনি কখনো কখনো খোদ বিজেপির ওপরও প্রয়োগ করেছেন। এবারের নির্বাচনে এই বাহিনী এত ক্ষমতাবান বোধ করে যে, তারা নিজস্ব ১৪ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে দাবি জানিয়েছিল। বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ তা মানেননি। ফলে মনকষাকষি চলছিল। এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদিত্যনাথের নামের ঘোষণা আসে।
ভেতরের এসব বিতর্ক যতই থাকুক বিজেপির এই নির্বাচনের মূল্যায়ন হল, হিন্দুত্বের জাতিবাদ আর মুসলমানবিরোধী গলাবাজি তবে – এটা সঠিক অনুপাতে ব্যবহার করার কৌশল নিতে পারলে ২০১৯ সালের নির্বাচনেও আবার তাদের জিতিয়ে আনতে পারে – এই বিশ্বাস তাদের দৃঢ় হয়েছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই অর্থে এবারের নির্বাচন আর বিজেপির বিপুল বিজয় হলো প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে শেষবার দপ করে জ্বলে ওঠা। দেখা যাক আগামিতে ২০১৯ এর নির্বাচন পর্যন্ত হিন্দুত্বকে পুরাপুরি আকড়ে ধরলে সেই রাজনীতি কতটা ভারতের আর কতটা বিজেপিকে সফলতা দেয়।

[এই নির্বাচন প্রসঙ্গ কভার করে আরও বিস্তারিত একটা লেখা আজ এখনই ছাপা হইয়েছে এখানে দেখুন।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনের ১৯ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]