হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

হিন্দুত্বের পরে হিন্দি জাতীয়তাবাদ

গৌতম দাস

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ja

          হিন্দিতে ক খ গ লেখা, এনডিটিভি থেকে নেয়া, ১৪ সেপ্টে ২০১৯

[সার-সংক্ষেপঃ আরএসএস -বিজেপি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদের পরে এবার মোদী-অমিত চেষ্টা করছেন হিন্দি জাতীয়তাবাদ মানে, সাথে ভাষার জাতীয়তাবাদও হাজির করার চেষ্টা করছেন। চলতি প্রজন্ম হয়ত জানে না। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রথম দল কংগ্রেস ও এর নেতা জওহরলাল নেহর্‌ এটা আগেই চেষ্টা করে  ও পরাজিত হয়ে গেছিলেন। ১৯৬৩ সালে এরই প্রচেষ্টায় তিনি The Official Languages Act, 1963 করেছিলেন। কিন্তু তা দক্ষিণের দ্রাবিড়ীয়দের আন্দোলনের মুখে ব্যর্থ হয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি ভারতের “জাতীয় ভাষা” আর নয়। মোদী-অমিত আবার সেই পুরানা ব্যর্থ প্রচেষ্টাটাই নতুন করে জবরদস্তিতে আনতে চাইছেন, যা ইতোমধ্যেই নেহরুর হাতে পরীক্ষিত ও পরাজিত। কংগ্রেসের এখনকার বিবৃতিই এর প্রমাণ।]

এবারের ১৪ সেপ্টেম্বর নাকি ভারতের “হিন্দি দিবস” [Hindi Divas] ছিল। মানে পালিতও হল। বুঝা গেল, ভারতের অমিত শাহ এবার হিন্দুত্বের পরে নতুন মোদী-হিটলারি লাঠি – হিন্দি” নিয়ে হাজির হলেন। ব্রিটিশেরা চলে যাবার পরে স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন যখন লেখা হচ্ছিল সেই ১৯৪৯ সালে ১৪ সেপ্টেম্বরকে একটা হিন্দি দিবস ঘোষণা করে রাখা ছিল। রাখা ছিল বলছি এ জন্য যে এটা রেখে কোনো লাভ হয়নি, পরে হিন্দিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। খুব একটা কিছু আগায়নি। কী আগায়নি?

ব্রিটিশ আমল থেকেই, রাজনীতি জিনিসটা কী – তা অস্পষ্ট বোল-এর উচ্চারণে আধা-বুঝাবুঝির সময় থেকেই ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে একমাত্র একটা জাতীয়তাবাদী দলই বুঝা হত। আবার এই জাতীয়তাবাদ বলতে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব ছাড়া আর অন্য কিছু হতে পারে না- এই অনুমান নিয়েই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদিও হিন্দুনেতাদের নিজেদের মধ্যে একটা তফাত বা বিতর্ক ছিল যে, তারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র বলতে যে একটা হিন্দুত্ব-রাষ্ট্র বুঝছেন তা স্পষ্ট করেই বলা হবে, না তা কৌশলে আড়াল রাখা হবে, এ নিয়ে কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভা (একালের নাম আরএসএস) গোষ্ঠির মধ্যে ভিন্নতা ছিল। কিন্তু হিন্দু রাজনীতিক মাত্রই প্রায় সবাই মানত যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া ভিন্ন কোনো রাজনীতি করা এবং রাষ্ট্র গড়া ও থাকা অসম্ভব, তা হতেই পারে না। ঠিক এ কারণেই তারা অ-হিন্দু, বিশেষ করে ভোকাল মুসলমানদের সামনে নিজেদের হিন্দুত্ব চিন্তার ন্যায্যতা কী তা প্রতিষ্ঠা করতে না পারা থেকেই কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

পরিণতিতে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু মুসলমানেরা রাষ্ট্রে আলাদা হয়ে যাওয়া সত্বেও তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের “রাষ্ট্র ধারণা” বুঝের মধ্যে এর কোন প্রভাব পড়েনি। তারা হিন্দুত্ব আঁকড়ে ধরেই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশন বানানোর পরবর্তিতে বাস্তবত ১৯৬৩ সালের মধ্যে,  শুরু হয়ে যায় এর পতন; অর্থাৎ ডিজেনারেশন [degeneration]  বা ভেঙে পড়া। মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের চিন্তা ও রাষ্ট্র বাস্তবায়ন শুরুর পর্যায়েই এরা টের পেতে থাকে যে সব ভেঙে পড়ছে।

অনেকের ধারণা যে, কোনো জনগোষ্ঠীর আশি-নব্বই পার্সেন্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়তে কোনো সমস্যা হয় না। এ ধারণা ভুয়া, ভিত্তিহীন। এর মানে, এই অনুমান অনুসারে ভারতের মুসলমানেরা ভেঙে আলাদা নিজের রাষ্ট্র গড়ে বেরিয়ে গেলে তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গড়তে আর অসুবিধা হবে না, পোক্ত হবে। তাই তো হওয়ার কথা, কিন্তু ভারতে তা হয়নি। মাত্র তেরো বছরের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের নামে দক্ষিণের ওপর হিন্দি-বলয়ের কর্তৃত্ব উপড়ে ফেলে দিয়েছিল। কর্নাটকের প্রধানত কন্নড় ভাষা, কেরালার মালয়ালম ভাষা, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু ভাষা, তামিলনাড় তামিল ভাষা এদেরকে একসাথে দ্রাবিড়িয়ান ভাষা বলে। অনেকে তাই দক্ষিণের এই চার রাজ্যকে দ্রাবিড়িয় রাজ্য বলে। অনেকে আবার ভৌগলিকভাবে (এটা আসলে পুব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটা উঁচা প্লাটো[Plateau] বা মালভুমি যার নাম ডেকান) এটা বুঝাতে দাক্ষিণাত্য বা ইংরেজিতে ডেকান [Deccan] বলে থাকে। এরাই মূল লড়াকু যারা উত্তর ভারতের (হিন্দুভাষী বা হিন্দিবলয়ের) আধিপত্যের চরম বিরোধী।

এমনকি এই বিরোধিতার বা বলা ভাল উত্তরের আর্যদের প্রতিরোধ লড়াইয়ের উৎস হিন্দু ধর্মের মতোই প্রাচীন। উত্তর ভারতে মানে মূলত এখনকার উত্তরপ্রদেশ, এখানে আর্যদের আগমনের পরে আশপাশের রাজ্য-এলাকায় বিস্তার লাভের পরে আরও দক্ষিণ দিকে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রবেশের আগে থেকেই  পরে আর আগাতে পারেনি। আরও দক্ষিণে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে সেই এলাকাটাই দাক্ষিণার্থ বা দ্রাবিড়িয় অঞ্চল। অর্থাত ডেকান মালভুমি পেরিয়ে এরও পরে এখনকার তামিলনারু বা আরও পশ্চিম বরাবর কোস্টাল রাজ্য কেরালায় এদিকে আর আর্যরা বিস্তৃত হতে পারে নাই। একইভাবে পুবদিকে আর্যদের বিস্তার ঘটেছিল মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিহার পর্যন্ত। আর এর পরেই  (পুব ও পশ্চিম) বাংলা অঞ্চল। এখানেও আর্যরা কত ভিতরে এসেছিল বা আসেনি সে তর্ক ছাপিয়ে বলা যায়, বাংলার প্রতিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দূরবর্তী হলেও ভাষা বা কালচারে আর্যদের প্রভাব বাংলার উপর পরেছিল বা আছে এ নিয়ে তর্ক নেই। আর্যদের বিস্তার প্রসঙ্গে এই ফ্যাক্টসটাই একালেও সব ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। সাতচল্লিশের ভারত ভাগের পরের ভারত মূলত হিন্দি-বলয়ের (যেন পুরানা দখলি নিয়ে বসা আর্যদের) ক্ষমতা হয়েই সারা ভারতকে শাসনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে চেয়েছে। পুরা ভারতের উপর এটাই – উত্তরের শাসন, হিন্দি বলয়ের শাসন, হিন্দিভাষীদের শাসন ইত্যাদি নানান থাকে থেকে গেছে।  এটাই মর্ডান ভারতে এক কাশ্মীরি ব্রাক্ষণ জওহরলাল নেহেরু ভুতুড়ে উত্তরের ক্ষমতার শাসন সর্বপ্রথম কায়েম করতে গিয়েছিলেন। যা প্রথম বড় আঘাত পেয়ে থমকে গিয়েছিল ১৯৬৩ সালে, দ্রাবিড়ীয় প্রতিরোধে। আর সেটাই আবার তবে এবার গুজরাতি মোদী-অমিত নেহেরুর ব্যার্থতার জুতা পায়ে গলিয়ে ভুতুড়ে সেই উত্তরের ক্ষমতার শাসনটাই আবার জাগানোর চেষ্টায় নেমেছেন। নেহেরুই প্রথম ১৯৬৩ সালে হিন্দুত্ব পাশে থুয়ে রেখে হিন্দি চাপানোর ভাষা-জাতীয়তা চালু করেছিলেন। বলা বাহুল্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতাকেই আবার কাঁধে উঠায় নিলেন মোদী-অমিত।

সারকথায়, উত্তরের শাসন, যেটা নেহেরুর হাতে নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের আড়ালে কার্যকর থাকতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক রেওয়াজ রিনিউ করে এরই প্রবল বিরোধী হল দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চল। একালে গত কয়েক বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার যে মোদী বা হিন্দির বিরোধিতা সেটা পুরানা ঐতিহাসিক বিরোধিতারই এক নব অধ্যায়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, দ্রাবিড়ীয় ও বাংলাএই দুই অঞ্চল থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা উঠে এসেছিল। হিন্দুধর্মের পক্ষে  থেকে নিজের ন্যায্যতা দিতে গিয়ে এর সবচেয়ে দুর্বল দিক হল, এর ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদের বয়ান – এটা উদাম হয়ে যায়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চলের মিল পাওয়া যায়। বাংলায় সুলতান শাসন আমলের (১২০৫-১৫৭৬) শেষের দিকে নদীয়াকেন্দ্রিক চৈতন্যের ও পরবর্তীতে লালনের জাতপাতবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কথা অনেকেই জানি।

আর ওদিকে ব্রিটিশ আমল থেকেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় সরাসরি ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল তামিল সমাজ। আজকের তামিলনাড়ুতে যে দুই স্থানীয় দলের হাতে এই রাজ্য পালটাপালটি শাসিত হয়ে আসছে সে মূল দলের নাম ডিএমকে [DMK]। ইংরেজি আদ্যক্ষরে বলা এই দলের নাম দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম (দ্রাবিড় প্রগেসিভ ফেডারেশন) [Dravida Munnetra Kazhagam ( transl. Dravidian Progress Federation] থেকেই ডিএমকে। আর সেটা থেকে ভেঙে পরে (১৯৭২) অন্য আরেক অংশের দলের নাম এআইএডিএমকে [AIA-DMK]। ততকালীন মাদ্রাজে (তামিলনাড়ু) ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণের ঝগড়া তীব্র উঠেছিল বৃটিশ আমলেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় চরম বৈষম্য থেকে।  সেখান থেকেই  ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল জাস্টিস পার্টি, ১৯২০ সালেরও আগে থেকে।  এই দলেরই কয়েকজন পরে ১৯৪৪ সালে নিজেরা পুনর্গঠিত হয়ে জন্ম দেন দ্রাবিড়া কাজাঘাম [Dravidar Kazhagam, DK] দল। ব্রাহ্মণের সামাজিক আধিপত্যের বিরোধীতা এই ছিল তাদের মূল ইস্যু; তাই তারা সাম্যের সমাজ ছিল তাদের মূল শ্লোগান। কিন্তু প্রধান দুই নেতার বিরোধ থেকে ১৯৪৯ সালে এক অংশ দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম [Dravida Munnetra Kazhagam] ডিএমকে খুলে বসেন। নেতা আনাদুরাই -এর নেতৃত্বের এই দল, এদের ব্রাহ্মণ বিরোধিতা এতই তুঙ্গে ছিল যে এরাই প্রথম কোন ব্রাক্ষণ ছাড়াই সামাজিক-ধর্মীয় বিয়ের নতুন প্রথা চালু করেছিল। এটাকেই আইনি কাঠামো দিয়ে  তারা এর নাম দিয়েছিল আত্মসম্মানের আইনে বিয়ে [Self-respect marriages Act]।

কিন্তু  সবাইকে ছাড়িয়ে ডিএমকে দল বিখ্যাত হয়েছিল নেহেরুর হিন্দি-জাতিবাদের বিরোধীতার আন্দোলনে সফল হয়ে।  নেহরুর যুগে.১৯৬৩ সালে ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের ভারত বানানোর প্রচেষ্টা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল দ্রাবিড়িয়দের বিশেষ করে ডিএমকে দলের হাতেই। দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান পাবার পরে, মূল নেতা মুসলিম লীগের জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তানে ভিলেন হয়ে যান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রশ্নে। কিন্তু মজার কথা হল, ঠিক একই ধরণের ভাষা-জাতিবাদী চিন্তায় জিন্নাহর মতই একই কাজ করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তাঁর আমলেই হিন্দিকে সরকারি ভাষা করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই হিন্দি দিবস বলে একটা দিন চালু ও পালন করা হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।

আর ১৯৪৯ সালে এর আইনটা লেখা হয়েছিল এভাবে, ভারতের জাতীয় ভাষা (National language) হিসাবে হিন্দি, প্রথম সরকারি দফতরের ভাষা (Official language), আর ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু থাকবে”। তবে এখানে দুইটা “কিন্তুও” ছিল। প্রথমত, ভাষার নাম হিন্দি হবে, ঠিক তা বলা হয়নি। বলা ছিল হিন্দুস্থানী ভাষা”। তা আরও ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছিল, তা দেবনাগরি অক্ষরে (এখন ভারতে যে অক্ষরে হিন্দি লেখা হয়) বা ফার্সি অক্ষরে হতে পারবে। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, এই নিয়ম বা আইনটা , পরবর্তি ১৫ বছর পর্যন্ত চালু থাকবে। এরপর পার্লামেন্ট নিজে বসে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এরপরে কী হবে।

এই হিসাবে ১৯৬৩ সালে “হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ” কায়েমের জোশে, মহান সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়ে জিন্নাহর মতনই নেহরুও হিন্দিকে জাতীয় ভাষা ও একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা ঘোষণা করে সংসদে পাস করা এক আইন জারি করেন। এছাড়া এর আগেই অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামে হিন্দি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে অহিন্দি রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে দ্রাবিড়িয় অঞ্চলে। সেখানে ক্ষোভ প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে পাঁচজন মানুষ নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিল। সাথে ঐ আন্দোলনে দুজন পুলিশেরও মৃত্যু হয়েছিল। কেরালায় বহু কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে আগুন দেয়া হয়েছিল। অবশেষে বাধ্য হয়ে কংগ্রেস সরকার আইনটা প্রত্যাহার করে নিয়ে আন্দোলন থামিয়েছিল। পরের বছর ১৯৬৪ [২৭ মে ১৯৬৪] সালে নেহরুর মৃত্যু হয়।  আর ১৯৬৪ সালে [০৯ জুন ১৯৬৪]  নতুন প্রধানমন্ত্রী হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আর স্বভাবতই তাঁর প্রথম কাজ ছিল একটা ভাষা প্রশ্নে একটা আপোষ ফর্মুলা বের করা। তাঁর আমলেই নতুন করে আগের official language act 1963 এর মধ্যে সংশোধন এনে জানুয়ারি ১৯৬৫ সালে এটাকে আগের মতই হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি সরকারি দাপ্তরিক ভাষা ফিরে করা হয়। তবে জাতীয় ভাষা কী হবে তা উহ্য রাখা হয়। আসলে এটাই ছিল দ্রাবিড়িয় রাজ্যগুলোর সাথে আপসনামা রফায় সংশোধিত অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট ১৯৬৩। এইবিষয়টা পড়ে গুজরাত হাইকোর্টের ২০১০ সালের এক রায়েও স্বীকৃত হয়।  সেকালে মামলাটা ছিল্ভিন্ন প্রসঙ্গে যে, এক ব্যক্তি আদালতের নির্দেশনা চেয়ে মামলা করেছিল যেসব্ব পণ্যের গায়ে হিন্দিতে বর্ণনা লেখা বাধ্যতামূলক করা হোক। কিন্তু আদালত অপারগতা জানিয়ে বলে, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে গুজরাট হাইকোর্টের এক রায়ে এটাই স্বীকার করা হয়েছে যে, ভারতে জাতীয় ভাষা বলে কোনো কিছুই নেই।

সারকথাটা হল, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র গড়ার দাবিদারেরা বিশেষত নেহরুর কংগ্রেস ১৯৬৩ সালেই এই প্রথম সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়। যেটা আসলে হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত  ও উন্মোচিত হয়ে মার খেয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান এসবের জাতীয়তাবাদ আসলে হতভম্ব হয়ে বিভ্রান্ত ও ফিকে হয়ে যেতে থাকে।

বহুবার বলেছি, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান অথবা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের কামনা কেবল কংগ্রেসের নয়, এটা হিন্দু মহাসভা বা পরে এদেরই নতুন নাম আরএসএস-জনসংঘ বা একালের বিজেপির কামনা ছিল সবসময়। তফাত শুধু এই যে, হিন্দুত্বকে কংগ্রেস সেকুলার জামার আড়ালে রেখে ফেরি করতে চায়। আর বিজেপি হিন্দুত্বকে গর্ব করে প্রকাশ্যে বলতে চায়। তবে ১৯৬৫ সালের মধ্যেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে হিন্দি ও হিন্দুত্বের মার খেয়ে যাওয়া- এ প্রসঙ্গটা কংগ্রেসের কাছে প্রচন্ড হতাশার অবশ্যই কিন্তু কোনো বিকল্প করণীয় ছাড়াই।

কংগ্রেসের এই ঢিলেঢালা অবস্থাতেই চলতে চলতে ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকেই হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে ওই ১৯৬৩ সালে কংগ্রেসের প্রথম পরাজয়ের পর থেকে ডিএমকেই কংগ্রেসের পরে প্রথম (আঞ্চলিক) রাজনৈতিক দল, যারা ১৯৬৭ সালের নির্বাচন থেকে এককভাবে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই থেকে দ্রাবিড় অঞ্চল থেকে হিন্দিভাষী দলের হারিয়ে যাওয়া শুরু। তবে ১৯৭২ সালে ডিএমকে তে একদভা ভাঙনে তৈরি হয়েছিল এআইএডিএমকে [AIA-DMK] বা আন্না ডিএমকে। তাই ঐ ১৯৬৭ সাল থেকেই তামিলনাড়ূতে ডিএমকে অথবা আন্নাডিএমকে পাল্টাপাল্টি করে রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসেছে।

কিন্তু এই পরাজয় সম্পর্কে বা সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র কামনা সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির ভাষ্য ও মূল্যায়নটা হলো, কংগ্রেস লিবারেল বা দুর্বল ঈমানের হিন্দুত্ব করে বলেই হেরে গেছে। আগ্রাসী-হিন্দুত্ব নিয়ে আগালে হিন্দুত্ব কখনো হারত না।

অনুমান করা যায় এসব ব্যাকগ্রাউন্ড মনে রাখার কারণেই, মোদীর দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে বিজেপি এবার আস্তে ধীরে নিজেদের মূল্যায়নের ঝাঁপি খুলে ধরতে শুরু করেছে। কাজেই মোদি সরকার-টু, এটা আসলে (১৯৪৭-৬৩) সময়কালের কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও দর্শন যে মিথ্যা, অকেজো ও অকার্যকর প্রমাণ হয়েছিল সেই হিন্দুত্বকেই এবার আবার ধুয়ে মুছে কিন্তু  প্রচন্ড আগ্রাসী-হিন্দুত্ব হিসেবে হাজির করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসছেন মোদি-অমিত গোষ্ঠী। বলাই বাহুল্য, হাস্যকর জিনিস করার উদ্যোগে প্রথমবারের ব্যর্থতার পরও দ্বিতীয়বার তা নিলে সেটা এবার তামাসার পরিণতি নিয়েই ফেরে। এই হাস্যকর জিনিসটা হলো হিন্দুত্বের জাতীয়তবাদ- যা এখন জয় শ্রীরাম বলে পরিচিত!

হিন্দি দিবস এতদিন ধুলা ময়লায় পড়ে কোথাও কোণে অবহেলায় গড়াগড়ি যাচ্ছিল। ওদিকে  এতদিনে সরকারি দপ্তরের ভাষা, হিউম্যান রিসোর্স  বা  বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ডিফল্ট ভাষা হয়ে উঠেছে ইংরাজি। কংগ্রেস হাত-পা ছেড়ে এটাই একবাক্যে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু অমিত শাহ এবার সেই ধুলা ময়লা পড়া “হিন্দি দিবস” তা ঝেড়ে পুছে নিয়ে এবার আবার পালন করে বসলেন। যদিও সেটা বড় তেমন কোন কিছু নয়। কেবল এক টুইটার স্টেটমেন্ট তাও আবার তা হিন্দিতেই হতে হয়েছে। তবে সেই স্টেটমেন্টটাই গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই। সেটার আনন্দবাজারের করা বাংলা অনুবাদটা হল এরকম – ‘‘ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন,যাকে বিশ্ব স্বীকৃতি দেবে ভারতীয় ভাষা হিসেবে। যদি কোনও ভাষা দেশকে বাঁধতে পারে,তা হিন্দি”।

প্রথমত লক্ষণীয় হল, অমিত শাহ কোন প্রধানমন্ত্রী নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কাজেই ভাষা নিয়ে বিবৃতি এটা তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজই নয়। ভারতে হিউম্যান রিসোর্স  বলে মন্ত্রণালয় আছে, সেই মন্ত্রী যদি এই হিন্দি দিবস পালনের বিবৃতি দিতেন তাও একটা কথা ছিল!  তাহলে অমিত শাহ কেন? একটা টেনেটুনে সাফাই অনেকেই করতে চাইবে হয়ত যে অমিত শাহ দলের সভাপতি, তাই। কিন্তু না। কাজটা রাষ্ট্রের তরফের, দল না। খুব সম্ভবত এর আসল অর্থ হল, হিন্দি জাতীয়তাবাদ করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালের কংগ্রেসের মত এবার আগ্রাসী-হিন্দুত্বতে তা করতে গিয়ে যদি এবারও তা মার খেয়ে যায় তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যেন পশ্চাদ-অপসারণটা ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, অমিতের বিবৃতিতে প্রথম দুই বাক্যে বলা হয়েছে, “ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে”। এর মানে হল তারা ১৯৬৩ সালের পরাজয়টা আমল করেছেন। তাই আগাম প্রলেপ দিয়ে নিলেন। কিন্তু আরএসএস-বিজেপির মূল যুক্তিটা জানা গেল পরের বাক্য  – “দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন”।  এছাড়া ইতোমধ্যেই মোদীর খসড়া শিক্ষানীতি ২০১৯-এ দেখা গেছে, হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা আছে সেখানে – যেখানে স্বয়ং নেহেরু পরাজিত হয়ে পিছু হটে গিয়েছিলেন।

অমিত আসলে বলতে চাইছেন “ভারতের একটা হিন্দি-হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন”। কেন? সেই পুরানা বেকুবি যুক্তি। আর সেটাকেই  আনন্দবাজারের তার শিরোনাম করে লিখেছে – [ভারতকে বাঁধতে পারে হিন্দিই”,এক রাষ্ট্র, এক ভাষা চান অমিত শাহ]।
এই যুক্তিটা আসলে রাষ্ট্র না-বুঝ যারা এদের। এরা একই সঙ্গে যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের হিটলার একেকজন – “জয় শ্রীরাম” – এদের যুক্তি।
অমিতের কথা অনুযায়ী ভারতকে বাঁধতে পারে এমন “রশি” বা ভাল “আঠা” দরকার অমিতের। আচ্ছা নাগরিক কী বেধে রাখার জিনিষ? অমিত মনে করেন হাঁ; এজন্য দরকার একটা হিন্দুত্ব মানে, হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ। না হলেও একটা হিন্দি ভাষার জাতীয়তাবাদ।

মোদী-অমিত শাহরা আসলে অসুস্থ চিন্তার লোক।  কোন রাষ্ট্র গড়বার জন্য না হিন্দুত্বের মত কোন আদর্শ, না কোন ধরণের জাতীয়তাবাদ – কোনটার কোনই দরকার নাই। কোন দিন ছিলও না। কিন্তু ভুল বুঝা হয়েছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন –স্টেট বলে এক সোনার পাথর বাটি ধারণা এসেছে। আর নাগরিককে রাষ্ট্রে ধরে রাখার জন্য কোন ভাষাগত ঐক্য বা ধর্মীয় ঐক্য অপ্রয়োজনীয়। যদি তাই হত তবে দ্রাবিড়ীয়রা কী হিন্দু ধর্মের বাইরের? পাঞ্জাব কী বৃহত্তর হিন্দি ধর্ম বা কালচারের বাইরের? এই ডিএমকে ১৯৬২ সালের আগে পর্যন্ত স্বায়ত্বশাসন বা বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়ার দল ছিল। পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতার সমস্যা এখনও একেবারে মিটে গেছে তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমাদের ধর্মীয় ঐক্য থাকা সত্বেও কী আমরা বিচ্ছিন্ন হই নাই! কেন এমন হয়েছিল?

রাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ থাকতে মূল প্রয়োজন, অনিবার্য  দরকার আসলে  –  বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার, নাগরিক নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ – এমন এক “রাজনৈতিক নীতির ঐক্য”। এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি কায়েম। এমন নাগরিক অধিকার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং এর বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রে জুলুম বন্ধ করুন, নাগরিক নির্বিশেষে কোন জুলুমে ভুক্তভোগী সবাইকে একটা ইনসাফ দেন। এমন ব্যবস্থা কায়েম করেন। মানুষকে বেধে রাখতে হবে না, কোনো বাড়তি রশি, আঠা কিছুই লাগবে না।

রাষ্ট্রগড়া প্রসঙ্গে, সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় টেনে আনা শব্দ বা নামটা আসলে নেশন, জাতি বা জাতীয়তাবাদ।
আমেরিকা রাষ্ট্রটা আদর্শ নয়। অনেক খুঁত ও ব্যর্থতাও এর আছে অবশ্যই। তবু খুঁটিয়ে দেখেন তো- আমেরিকান রাষ্ট্র গড়তে কোনও ধরনের জাতীয়তাবাদের ব্যবহার আছে কিনা? আমেরিকানেরা কারা ও কোন ‘জাতি’? পঞ্চাশ রাজ্যের সমাহার আমেরিকা। ভারতের চেয়েও বড়। তবু কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নাই কেন? নাগরিক বা খোদ কোন রাজ্যের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ওখানে রশি বা আঠা বলে কিছু, কোনো জাতীয়তাবাদ কী আছে? খুজে দেখেন!

তাহলে আমেরিকা-রাষ্ট্রটা টিকে আছে কী করে? অনেক দুর্বলতা আছে এর, কিন্তু ভাঙার, ভেঙ্গে পড়ার, এক না থাকার কোন কথা নেই।
আর ভারতের বেলায় দেখেন, কংগ্রেসের নিজের পরাজয় ঘটে গেছে বহু আগেই। আর দলটা এখন শুকিয়ে যাওয়াতে কংগ্রেসের আর ভারত ভাঙার কারণ হওয়ার সুযোগ বা উসিলা নেই। বিপরীতে এ থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুল করতে হিটলারি আগ্রাসী হয়ে হিন্দুত্ব, এক “জয় শ্রীরাম” হাতে এগিয়ে আসছে মোদি-অমিতেরা।

এরা আসলে হিন্দুত্বে ডুবে অসুস্থ হয়ে গেছে, আর ততটাই এরা রাষ্ট্র ধারণা ও চিন্তায় অবুঝ। এদের ধারণা হিন্দুর সবকিছুতে শত্রু হল মুসলমান। আচ্ছা তাহলে দ্রাবিড়ীয় যত নেতা আছেন, ডিএমকে এর নেতা স্টালিনসহ এরা কী মূসলমান? কলকাতার সিপিএম বা মমতা এরা? তা হলে? কথা হল, দ্রাবিড়িয়রা বা বাঙালিরা হিন্দু হলেও তারা অমিত-মোদীদের বিরোধী হবেই। কারণ তারা হিন্দি বলয়ের ক্ষমতার নামে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটার বিরোধী। অমিত-মোদীরা এই চোরা আর ভুতুড়ে ক্ষমতায় বিশ্বাসী, এটাই তো আসল সমস্যা।

যেমন দেখেন, কেন্দ্রের হাতে জমা হওয়া রাজস্ব তা বিলি বন্টনে কোন রাজ্য কত পাবে কিসের ভিত্তিতে? – এটা রেখে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর খেয়ালের হাতে, ব্যক্তি-ইচ্ছার বাইরে নিরপেক্ষতা ও অবজেকটিভ নিয়ম বা সুত্র রাখা হয়নি। যেমন মমতা মোদীর দলের না হওয়াতে তিনি মমতাকে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন? মমতাকে যেকোন বিরোধিতার শাস্তি দিতে পারেন। এটা কি ইনসাফ? এর সোজা মানে এক রাজ্যের কাঁধে চড়ে আরেক রাজ্য খাচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী নিজে অথবা যাকে ইচ্ছা তাকে এটা খাইতে দিবেন। এটারই একমাত্র প্রতিকার ছিল ফেডারেলিজম [Federalism]। আমেরিকার মত ভারতেরও এক ফেডারল রাষ্ট্র হওয়া। এটা তো প্রমাণিত এখন যে “মহান” নেহেরু সাহেবের ভারত রাষ্ট্রের জন্মের শুরু থেকেই এনিয়ে কোন বুঝাবুঝি ছিল না। আস্থা ও সাহসের ঘাটতিও ছিল। কোন প্রমাণ রাখেন নাই যে তিনি ফেডারেলিজম বুঝতেন।

আবার মোদীকে দেখেন। ভারতের সিবিআই, ইডি বা গোয়েন্দা র – এসব প্রতিষ্ঠান তো আগে থেকেই ছিল। তাতেও মোদি সন্তুষ্ট নন, সম্ভবত  পুরানগুলাকে ততখানি নিজদলীয় মনে হয় নাই। অথবা দলীয় করতে সময় লাগবে, যে সময় তার নাই। এখন বিজেপির প্রভাবে এন্টি টেররিজমের নামে গড়ে নেয়া হয়েছে অল্প বয়সী (২০০৯) নতুন আরেকটা এনআইএ (NIA)।  আর এরপর এধরণের সব প্রতিষ্ঠানকে মোদী ব্যবহার করছেন (আগে কংগ্রেসও কমবেশি করেছে) বিরোধীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের নামে তাদের শায়েস্তা করতে, এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়রানি করতে পারেন এমন হাতিয়ার হিসেবে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীন সরকারের অপব্যবহার থেকে স্বাধীনভাবে কাজের আইন, নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে দেয়ার বদলে উলটা তা ব্যাহত করে নিজদলীয় স্বার্থে এদের ব্যবহার করছেন মোদী। যেমন দেখেন, মোদীর প্রথম গত পাঁচ বছরে বিরোধীদের সমর্থন ছাড়া রাজ্যসভায় তাঁর সরকার কোন বিল পাস করতে পারেননি। এবার সিবিআই, ইডি, র ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে বিরোধীদের বাগে এনেছেন। আর তা দিয়ে এবার মোদী-টু সরকারের প্রথম তিন মাসের আগেই “কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল” – পাস করে নিয়েছেন। বিরোধীরা যে বাগে এসেছে এটা টেস্ট করার জন্য এর আগে মোদী-টু এর নতুন সরকার, তিনি  “তিন তালাক বিল পাস” করে নিয়েছেন। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র একটা অন্ধকারের ক্ষমতা একটা দাগী ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসেবে রেখে দিতে চান মোদী-অমিতেরা। আর মুখে বুলি জয় শ্রীরাম আর হিন্দুত্ব। হিন্দি বা হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, এটা দিয়ে নাকি রাষ্ট্র এক রাখবেন!

মোদী-অমিত হিন্দি-হিন্দুত্বের আড়ালে এসব যা করছেন মূলত এজন্যই ভারত ভেঙে যাবে। ভারত ভাংবার কারণ হবেই মোদী-অমিত। আর তাদের অন্ধকারের ক্ষমতার প্রতি আগ্রহ।

ভারতে কেন আঞ্চলিক দলের এত ছড়াছড়ি? মানে, রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন ডিএমকে বা মমতার তৃণমূল – বিভিন্ন রাজ্যে এমন দলের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে কেন? এর সোজা জবাব, মূলত দায়ী নেহেরু ও তার কংগ্রেস। মানে তাদের  রাষ্ট্র-চিন্তায় কিছু মারাত্মক ত্রুটি বা ঘাটতি। তাদের সর্বভারতীয় দলের নামে (১৯৪৭-৮৫) উত্তর ভারতের কোটারি ক্ষমতা দিয়ে সারা ভারতের সব রাজ্যকে দাবড়িয়ে চলেছিলেন। এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, অন্ধকারের একটা দাগী রাষ্ট্রক্ষমতার প্রথম জনক এরা।  আর এখন একেই একেবারে হুবহু কিন্তু আরও আগ্রাসী-হিন্দুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজিয়ে, এবার কংগ্রেসকেই অনুসরণ করছে বিজেপি। আর  প্রথম জমানায় কংগ্রেসের  কালো ভুতুড়ে ক্ষমতার অত্যাচারেই আঞ্চলিক দল খুলার হিড়িক লেগেছিল। এরই ফলশ্রুতিতে বিগত (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময় কালে লাগাতরভাবে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারই একমাত্র বাস্তবতা ছিল।  মানে কংগ্রেস অথবা বিজেপি একা নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠাতার মুরোদে নয়, আঞ্চলিক দলের সাথে একমাত্র  কোয়ালিশন করেই এরা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। এই সময়কালে রেকর্ড বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি এইদুইয়ের যে দল কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের মোট ৫৪২ আসনের মধ্যে নিজ দলের মুরোদে তা প্রাপ্ত মোট আসন তা ১১৫ ছাড়িয়েছিল তারাই গোটা দশেক আঞ্চলিক দলের সহায়তায় কেন্দ্রে সরকার করেছিল; যেখানে হাফ মার্ক বা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল ২৭২ আসন। এটাই ছিল (১৯৮৫- ২০১৮) এই সময়কালের ফ্যাক্টস ও রেকর্ড।  এর মানে এই সময় কালে কংগ্রেস বা বিজেপির চেয়ে সরকার গঠনে সবসময় আঞ্চলিক দলগুলো মোট সংখ্যা মানে ভুমিকাটা ছিল মুখ্য ও বেশি।

অথচ অমিত এখন “বাণীদাতা” হয়েছেন। উলটা বলতেছেন “আঞ্চলিক দলগুলোই নাকি ভারতের “অনৈক্যের” কারণ“। এটা হল রোগের লক্ষণকেই রোগ বলে চালানো চেষ্টা। ভারত-রাষ্ট্রগঠন কাঠামোর মধ্যে মূল সমস্যা হল, এখানে এক রাজ্যের অন্য রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে খাওয়ার সুযোগ আছে। এই সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। কারণ উত্তরপ্রদেশের কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ নেহেরু ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। কারণ তার ধারণা ও বুঝ ছিল যে ভারতকে জবরদস্তিতে এক রাখতে চাইলে এমন ক্ষমতা কাঠামোই তাকে মাইলেজ বা বিশেষ সুবিধার ক্ষমতা দিবে।  ভারতকে তথাকথিত এক রাখার ভুয়া ডরে নেহেরু এমন কাঠামোতেই ভারত গড়েছেন। এতে  কেন্দ্র যার হাতে থাকে সে এই নির্ধারণ ক্ষমতাটা পায় যে কে কার ঘারে চড়বে ও খাবে। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ব্যবস্থা গড়ার সময়ের মৌলিক কাঠামোগত ত্রুটির জন্য এটা সম্ভব হয়ে আসছে। আর এর লক্ষণ হিসাবে মাত্র প্রায় ৩৮ বছরের মধ্যে কংগ্রেসের একক ক্ষমতার দল হিসাবে বিদায়, পরাজয় ও রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল জন্মানোর হিড়িক দেখা দিয়েছিল। কংগ্রেসের বদলে ঠিক সে জায়গাটাই নিতে আজ নতুন কুতুব হতে চেষ্টা করছে মোদীর -অমিতের বিজেপি। তাই এখন লক্ষণকেই রোগ বলে চালানোর চেষ্টা করছে। অমিত শাহ রাষ্ট্র-ক্ষমতা “জ্ঞানের” বিরাট তাত্বিক হয়ে উঠেছেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার লিখেছে,
আজ দিল্লির অল ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনএর অনুষ্ঠানের মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা আসলে ব্যর্থ কি না? ওই ব্যবস্থা কি দেশবাসীর লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে?’’ তার পরে নিজেই জবাব দিয়েছেন,‘‘মানুষ আশাহত”। তাঁর দাবি,আঞ্চলিক দলগুলি আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। 

এই ইস্যুটাকে ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া দেশে এক দলীয় শাসনের ইঙ্গিত হিসাবে রিপোর্ট করেছে,। কলকাতার টেলিগ্রাফ একদলীয় পার্টির শাসনের ইঙ্গিত বলেছে। এভাবে ডিএনএ, লাইভমিন্ট, এশিয়ান-এজ অনেকেই।
কংগ্রেস বিবৃতি দিয়ে বিজেপির জোট এনডিএ-এর কোয়ালিশন দলগুলোকে জবাব দিবার দাবি জানিয়েছে।  সারকথায় অমিতের যুক্তি হল, কংগ্রেস শক্তহাতে “হিন্দুত্ব” কায়েম এর এক কর্তৃত্ববাজ শাসন জারি করতে পারে নাই দেখেই এসব ঘটেছিল। কাজেই এখন শক্ত হাতে সেটা পূরণ করতে আগ্রাসী হয়ে বিজেপি  শাসন করবে। কী তামসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে অমিতের হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

গৌতম দাস

২৭ মে ২০১৯, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AB

 

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। তাতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং গত ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনের চেয়েও এবার আরও বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance (NDA)]। গত এমন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা মোট ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ২৮২ ও ৩৩৬।

এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’ [Hindutto]- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচনটা হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হল ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচনে সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এক প্রধান প্রশ্ন ছিল যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? অর্থাৎ বৃটিশ-ভারত নামেই বাইরে থেকে একে এককাট্টা ভারত মনে হয়। কিন্তু আসলে তা অসংখ্য রেসিয়াল বৈশিষ্ঠের জনগোষ্ঠির ভারত। এছাড়া বৃটিশ্বরা এই ভারতকে শাসন করে গেছে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে। ফলে ভারত বলতে বিভিন্ন ধরণের জনগোষ্ঠির ভিন্নতাগুলো আবার যেমন তেমন না। যেমন ভারতে এখনও ২৯টা রাজ্য। মানে অন্তত ২৯ রকমের বড় বড় বিভক্তি এখানে আছে। এরকম আর কত কত ধরণের আইডেনটিটিতে এখনও বিভক্ত হয়ে আছে ভারতের নাগরিকেরা।  এই ভিন্নতাগুলো সত্বেও তাদের একটা রাষ্ট্রে ধরে রাখার উপায় কী? এই ছিল নেহেরুর কাছে মুখ্য প্রশ্ন। সে  কোন বন্ধন, যা দিয়ে তাদের আটকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায়?

এই কঠিন জটিলতার সবচেয়ে সহজ জবাব নেহেরু খুজে নিয়েছিলেন যেটা তা হল “হিন্দুত্ব”। মানে হিন্দুত্ব হল সেই আঠা বা গ্লু [glue] যার ভিত্তিতে নাগরিকেরা জোটে বেধে একতায় তাদের এক থাকার উপায়। সেই থেকে নব গঠিত ভারত হিন্দুত্ব হল নাগরিক ঐক্যে এভাবে গড়ে উঠেছে।বলাই বাহুল্য এটাই ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে একক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, the biggest disasterous decision.

প্রশ্নটা আসলে অরিজিনালি ছিল মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বুঝাবুঝির বা বলা যায় বুঝাবুঝিতে ঘাটতি থাকলে সেই অভাব থেকে উত্থিত এবং বিপথগামী প্রশ্ন। যেমন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে বা করার কালে আদৌ এমন ভিত্তি খুজে ফেরা  জরুরি কিনা? সরাসরি উত্তর হল যে – একেবারেই না। কিন্তু তবু নেহেরুর এই বিপথগামী পথই ধরেছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে এটা ১৯৪৭ সালের আগষ্টের পরে উদয় হওয়া প্রশ্ন নয়। এটা এর আগের পুরা উনিশ শতক (১৮১৫-১৮৯৯) এই সারাটা সময় চিন্তার বিপথগামী গমণ বজায় ছিল।  সেদিকে একটু পরে আবার আসছি।

নেহেরুর কাছে ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না – এটাই ছিল তাঁর চোখে সদুত্তর। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অ-হিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে, মারজিনাল করে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানের দিকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। তা হল, হিন্দুত্ব একটা কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়। এরই প্রতিভূ বা সব বৈশিষ্ট-চিহ্ন নিজেই হাজির হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’।

কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যেই সরাসরি হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে আরএসএসের নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে। দক্ষিণ ভারতের কমল হাসানকে অনেকে চিনে থাকতে পারেন যারা ভারতীয় সিনেমার খবর রাখেন। তিনি সিনেমার খ্যত নায়ক। তিনি সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু নাথুরাম সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি মামলা খেয়েছেন। পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জামিন চেয়ে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন,  “Godse himself, in his book Why I killed Gandhi, had categorically stated that Mahatma Gandhi had acted against the interest of Hindus, and had blamed him for partition, Mr. Haasan said.”। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস-বিজপি দুপক্ষই ইস্যুটা কার্পেটের নিচে ফেলে চেপে যেতে চান। আরএসএস তাদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্ট বা কর্মিসভায় নাথুরামকে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাদের হিরো বলে তুলে ধরে। যদিও বাইরে খুব বেশি এই ভাবনা প্রচারে আনতে চায় না। আর যে মোদী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নাথুরাম তর্কে ঢুকতেই চান না।

যে যাই হোক, ১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ গড়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা একালের নেতা এলকে আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে [… providing a fresh ideological narrative to the people,” ] বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদী নির্বাচনে নেমেছিলেন?  ছোট্ট করে এনিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যাক। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে আমরা তুলনা করলে বুঝব, ২০১৪ সালে মোদীর মুখ্য (catchy) ইস্যু ছিল মূলত “অর্থনৈতিক”। অথচ এবার অর্থনৈতিক শব্দটাই তিনি কোথাও উচ্চারণই করেন নাই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চলতি শতকের প্রথম দশক (২০০১-০৯) থেকে। যেখান থেকে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংকের ধারণা উঠে এসেছে। তো “রাইজিং অর্থনীতির” ইন্ডিয়া এর একটা। মোদীর আগের কংগ্রেস (২০০৪-১৪) সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে এর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশাআকাঙ্খাও চরমভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। সেদিকটা খেয়াল করে মোদী ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ঐ অর্থনৈতিক ইস্যু সেটাকেই আবার উস্কে চাঙ্গা করে তুলে ধরে দাবি করেছিলেন তিনি এটা আবার তুলে সচল করতে পারবেন, কারণ গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখমন্ত্রী তিনি। তিনি তখনও থার্ড টার্মের মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই খাতিরে যেন তাঁকে ২০১৪ নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল কিন্তু তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তাঁর নাই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি [demonitization & GST]  ইস্যুতে তার কপাল খুলে নাই, তা যতই ভাল প্রোগ্রাম হোক বা না হোক। ডিমনিটাইজেশন মানে নোট বাতিল আর জিএসটি মানে ভারতের এক রাজ্যের পণ্য আর রাজ্যে ঢুকলে টাক্স আরোপ করা হয়, এসব পাল্টাপাল্টি ট্যাক্সকে উঠিয়ে নেয়া, সরল নিয়ম করা আর আদায়কৃত ট্যাক্স শেয়ার করার ফর্মুলা চালু – এককথায় বিশেষ করে পরেরটা খুবই ভাল কাজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন, প্রথম তিন বছরের সাফারিং এর কারণে নগদ অর্থনীতিক পারফরমেন্সের বিচারে তিনি ফেল করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি একেবারেই ফেল করেছেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, মোদীই ভারতের এক ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে তিনি নিজের দল এবং বিশেষ করে নিজ সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যেটা যে, দলীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে একটা দল -অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বা প্রশাসন বিষয়ক একাদেমিক যারা দলের খাতায় নাম লেখানো – এমন  এদেরকে নিয়ে গঠিত কোন টিমের পরামর্শের দিয়ে সরকার চলছে। না মোদী এসব এমেচার করতে রাজী না।  বরং তিনি তা করে থাকেন ও ভরসা করেন তা হল প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানী নিয়োগ দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদী-অমিতের বিশেষ “রাজনৈতিক ব্রান্ড” এটাই। এজন্য তারা বিজেপির মত দল করলেও খুবই স্মার্ট। এমনকি নির্বাচনও তিনি করেন এমন কোম্পানীকে পরামর্শক রেখে। এই জায়গায় মোদীর বিজেপিকে ধর্মতাত্বিক নেতা বা মফস্বলী কোন নেতা জ্ঞান করা খুবই ভুল হবে ও খাটো করে দেখা হবে।

আর সেই কন্সাল্টেন্টদের পরামর্শেই এবার তিনি একক – কেবল “হিন্দুত্ব” ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। তবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ যেটা উপরে বলেছি যে, এটা সম্ভব হল কারণ ভিত্তি হিসাবে ভারত-রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠিত। কিন্তু যে উত্তর এখনও অমীমাংসিত তা হল – বিভিন্ন আত্ম-পরিচয় বা বৈশিষ্টের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কেন কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে – আটকে ধরে রাখার কোন আঠা বা গ্লু যেমন একটা হিন্দুত্ব – এর প্রয়োজন আদৌও কী অনিবার্য, এসেনসিয়াল? না কী অপ্রয়োজনীয় এবং বিকল্প আছে?  এছাড়া কবে থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টাকে “এসেনশিয়াল” মানে হিন্দুত্বকে এসেনশিয়াল বলে বুঝে এসেছেন, সেটাও খুজে দেখা ও লক্ষ্য করা খুবই জরুরি।

এই প্রশ্নটা ভারতে তো বটেই,উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, তাই স্পষ্ট উত্তর নাই। এবং এক ভারতের কারণেই উপমহাদেশের সবখানেই এটা অমীমাংসিত ও সব অসন্তোষের উতস এটা।

আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক রূপ বৈশিষ্ট হল “রেনেসাঁ” [Renaissance] চিন্তা। ইউরোপের এই রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বৃটিশ-ভারতের রাজধানী, বাংলায় নিয়ে এসেছিল বৃটিশ-শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে থাকেন সকল রেনেসাঁবাদীরা। তার সক্রিয়তার প্রধান সময়কালটা হল (১৮১৫-৩৩)। তিনিই প্রথম এবং তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পিছনে পুরা ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, একটা “হিন্দুত্ব” থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাক্ষ্ম ধর্ম-এর প্রবর্তক যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই – এক হিন্দু নাশনালিজম। তবে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়গুলোতে এটার কার্যকারিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে পরবর্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দের ইত্যাদি্র মত কিছু ব্যক্তিত্বের হাত ঘুরে আরও রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের জন্মের সময় (১৮৮৫) থেকেই এর  হাতে পৌছাতে শুরু করেছিল। আরও পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদ করা ও পরবর্তিতে তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলন – এসবের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। আর সবশেষে দেশভাগের পরে নেহেরুর হাতে সেই একই “হিন্দুত্ব” কিন্তু এবার নতুন প্রয়োজনে – এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। আর  সেই থেকে আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই পুরা সময়ে  হিন্দুত্ব চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সমস্ত বিভক্তির উতস এখানেই। এটাকে একটা অন্ধের হাতড়ানোও বলতে পারি! কারণ লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ভারত যদি একটা মর্ডান রিপাবলিকই হতে চেয়েছিল বা চেয়ে থেকে থাকে তবে তার আবার “হিন্দুত্ব” এর, হিন্দু নাশনালিজমের দরকার কেন? কিভাবে তা হয়? এর জবাব কংগ্রেস বা আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি কখনো দেয় নাই, দিবে না – খুঁজবে না। অথচ অনিবার্য এসেনশিয়াল মনে করে রাখবে।  এতেই তারা এর সাহায্যে অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠির উপরে আধিপত্য কায়েম করতে পারার সুবিধার দিকটা মুখ্য – এই সুবিধার দিকটাই তাদের জন্য সব চেয়ে লোভণীয় ছিল বলে। যদিও মর্ডান রিপাবলিক বলতে একে ধর্মীয় নাশনালিজম বলে মানে করা – এই সুবিধাবাদি ভুল বুঝার ঝোঁক ইউরোপেও ছিল।

সবচেয়ে বড় তামাশার দিকটা হল, হবু  “মর্ডান রিপাবলিক” ভারত বলতে একে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম বলে বুঝা ও মানে দেওয়া কিন্তু একে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ” বা “স্বদেশি আন্দোলন” বলে নাম দেয়া আর ওদিকে এভাবে এর আসল পরিচয় হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম লুকিয়ে রাখা ফেলা হয়েছে। শুধু তাই না। এর প্রভাব এখানেই শেষ না। এভাবে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম এর রাজনীতি করা এটাই মুসলমানদের জবরদস্তি ঠেলে দেয়া হয়েছে যেন তাঁরাও ইসলামি নাশনালিজমই করে – মুসলিম লীগ করে আবির্ভুত হয়। আর এইবার সেই কঠিন তামাশাটা! এই মুসলমান আর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ লটকে দেয় যে এরা ধর্মীয় রাজনীতি করে, এরা সাম্প্রদায়িক, এরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চায় ইত্যাদি। ফ্যাক্টস হল, হিন্দুরা যদি হিন্দু নাশনালিজমের রাস্তা ধরে  তাহলে এরপর মুসলমানেরা যাই করবে তা এক ইসলামি নাশনালিজমই তো হবেই!

অতএব সেই হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম – এটাই একালে মোদীর হাতে স্বরূপে হাজির হতে চাইছে।
এমন কী মোদীর গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে সামাজিক বিভাজন তো বটেই যেভাবে সংগঠিতভাবে  সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল,  “মুসলমানকে ধরে জয় শ্রীরাম বলাতে হবে” এর নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে, [এই মাত্র দ্য হিন্দু পত্রিকার খবর এটা এবারও শুরু হয়র গেছে – মুসলমান তরুণ দর্জি বাসায় ফিরছিল, তাঁকে ঘিরে ধরে বলা হয়েছে, মাথার টুপি খুলে ফেলতে, এরপর জবরদস্তিতে জয় শ্রীরাম বলতে বলে পিটানো হয়েছে।] গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে তারা নাজেহাল “সামাজিক ন্যুইসেন্স” তৈরি করতে নেমে পড়েছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে একইভাবে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা ঐ মুসলমান গৃহস্থকে খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ এরপরেও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে? কেঁউ মাথা ঘামায় নাই। কংগ্রেসের নেতাকর্মি অথবা কোন কমিউনিস্ট এনিয়ে প্রশ্ন করার মুরোদ আছে দেখি নাই আমরা।  মর্ডান রিপাবলিকের অর্থ তাতপর্য তারা নুন্যতম কিছু বুঝে অথবা চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ হচ্ছে এটা – এই বুঝ থেকে তারা কখনও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারে নাই। এটাই একটা বিরাট প্রমাণ যে ভারত আসলেই এবং বরাবরই একটা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র। এর বাইরে রাষ্ট্র কী, অন্য কোন রাষ্ট্রের রূপ কী – এনিয়ে ভারতের কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা কোন প্রগতিবাদীদের কোন বুঝ, কোন স্টাডি কোন বুঝাপড়া কিচ্চু নাই।

এই কথার আরও প্রমাণ পেতে চাইলে  আরও লক্ষ্যণীয় হল, যেমন এখনকার কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী – এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত। মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও কংগ্রেস নুন্যতম অন্তত প্রতীকী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। কংগ্রেসে তা না হয়ে, আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই তথাকথিত সেকুলারিজমের জামাখুলে প্রকাশ্যেই নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে এটা নাকি মোদীর মত হার্ড হিন্দুত্ববাদ না,”সফট হিন্দুত্ববাদ”। এই দাড়িয়েছে এখন কংগ্রেসের ‘সেকুলারিজম’। অর্থাৎ  তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস এখন আর হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদীর হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। ওদিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে তারাও সব আসন হারিয়েছে শুধু তাই না, নিজেদের ভাগের ২২% ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদের নির্বাচনে, মোদীর দলকে। তাতে ব্যাপারটা এখন দাড়িয়েছে এই যে, হিন্দুত্ববাদ ঠেকানোর বোলচালের দলগুলাকে মোদী এবার তাদেরকে আসল চেহারায় এনে ছেড়েছে, এটাই আসলের মোদীর ক্ষমতার আসল সাফল্য!

আবার লক্ষ্য করা যাক, এই নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হয়ে হলে, পরদিন (২০ মে) মোদী হিন্দু তীর্থস্থান উত্তরপ্রদেশের পাহাড়ে প্রাচীন কেদারনাথের মন্দির গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে বসে গেলে তা দেখে কংগ্রেসীদের জবাব হল আমাদের রাহুল তো সেখানে কেদারনাথের মন্দিরে পায়ে হেঁটে গেছিলেন আর মোদী গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে, কাজেই আমরা শ্রেষ্ট।  আসলে এইখানেই মোদীর হিন্দুত্ব অনেক আগেই বিজয় লাভ করে গেছে। তাই ভোটের ফলাফলে না, মোদী আসলে এখানেই বহু আগেই কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন।

হিন্দুত্ব কত ভারী এর লক্ষ্যণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন। মোদীর হিন্দুত্ব কত পাওয়ারফুল,বাকি সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে, পিছনে ফেলে নিজে সবার উপরে উঠে যেতে পারে এরই প্রাণ এগুলো।

যেমন, সবপর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদী-অমিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তাদের জোট ৩০০ এর আশেপাশের আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তব ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও ভালমত ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ শুরু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেছে তা নয়, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করে নাই, এটা এমনই ফলাফল।

আবার, সাধারণত রাজ্য সরকারে (যেমন রাজস্থানে কংগ্রেস ) কোন দল সরকারে আছে এটা লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল  সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথায় এমন ফ্যক্টর এবার কাজ করে নাই। এমনকি যেখানে গত মাত্র পাঁচ মাসে আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা কোন বিজেপি বিরোধী দল জিতেছে সেখানেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই এবার বিজেপি আবার ফিরে ঐ রাজ্যের প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এই অবস্থা দেখা গিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় বা কর্ণাটক এমন রাজ্যে। এসব রাজ্যের ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। খুব ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এমন দেখা যায় না। অথচ বিজেপি এবার এমন হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই জিতেছে।

আবার,নর্থ-ইষ্ট মানে আসাম-ত্রিপুরাসহ ছোট ছোট ট্রাইবাল সাত রাজ্য। আসামে এনআরসি [National Register of Citizens (NRC) ] অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর সর্বশেষ চল্লিশ লাখ হিন্দু-মুসলমান লোক নানান কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ জোগাড় করতে ফেল করেছে। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। গতবছর জুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। কারণ নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছিল। মিজোরামে “বাই বাই ইন্ডিয়া” বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর চলতি হিন্দুত্বের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এজাতীয় সব “কথিত নাগরিক আপত্তি” হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি সাত রাজ্যেই বেশিরভাগ আসন নিয়েছে, কোন রাজ্যে সবগুলোই।

আবার, কলকাতার মানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রচন্ড রকমভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তাঁর তৃণমুল দলের লোকসভার ৩৪ আসন এবার নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি দুইটা থেকে এক লাফে ১৮ আসন  পেয়ে গেছে। তৃণমুল বা মমতা রাজনীতি ও তাঁর সরকারের অনেক দোষ বা অভিযোগ থাকতে পারে, অনেকের অপছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রধান বাধা এখনো এই মমতাই। বিশেষ করে বিজেপির এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে আরও সফল হতে গেলে মোদীর প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানোর ব্যবস্থা করা – তা বলাই বাহুল্য।

ফলাফল প্রকাশের দিন, নিজের বিজয় নিশ্চিতের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছেন। এখনও করছেন। কিন্তু এসব জায়গায় সেখানে তিনি আগে নির্বাচনি প্রচারের সময়ে কত কী বলেছেন ঘৃণা ছড়িয়েছেন সব ভুলে এমনকি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে নির্বাচনের পরে এখন “তিনি সবার নেতা” বলে দাবি করেছেন। তিনি নিজেই  গত ২০১৪ নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – সেই শ্লোগান ওদিন তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হবার পরে প্রথম এবার উচ্চারণ করলেন। এবার নির্বাচনের পর ভোল পাল্টায়ে তিনি নিজেই “সংখ্যালঘুদের” সহানুভুতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, বলছেন”He said if his first term was about “Sabka sath, sabka vikas (Alongside all, development for all)”, his second would stand for “Sabka sath, sabka vikas, sabka vishwas (Alongside all, development for all, trust of all)”।  এই নির্বাচনি বিজয়ে পুরা সময় তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলার সাফল্য গাথা দিয়ে। “পাকিস্তান” = “মুসলমানের” বিরুদ্ধে তিনিই একমাত্র “ভারত-রক্ষক” – এই ছিল তার বয়ানের পাঞ্চ লাইন। আর দ্যা হিন্দু পত্রিকা তাদের নির্বাচন উত্তর গবেষণার ভিত্তিতে বলছে এই বক্তব্যের প্রভাব এমন ছিল যে এক্সিট পোলে অংশ নেয়া মানুষ  বলেছে অর্থনীতি মোদীর ঘাটতি আছে, সাফল্য নাই কিন্তু তবুও তারা মনে করে বালাকোট ইস্যুটাও গুরুত্বপুর্ণ – তাই মোদীকে ভোট দিয়েছেন। দা হিন্দু Balakot plank বলে উপশিরোনামে বলছে, বালাকোটকে ইস্যু করে মোদী রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ আর উত্তরাখন্ডের সব আসনের দখল পেয়েছে [all seats in Rajasthan, Gujarat, Madhya Pradesh, Haryana, Himachal Pradesh and Uttarakhand.]

আমাদের মনে রাখতে হবে, একথাটাও সঠিক যে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির মুখ্য টার্গেট – প্রধান উদ্দেশ্য পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে শেয়ার না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে এখন সুশীল হয়ে বলছে  নির্বাচনের সময় “মোদী একটু হিন্দুত্বের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু এখন সে এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল হয়ে যাবে” ভাবতে পারেন, একথা বলেছেনও। ইতোমধ্যে অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। যেমন কলকাতার টেলিগ্রাফ লিখছে Narendra Modi tried to shake off his divisive image and reach out to the minorities on Saturday। এছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি, একথাও ঠিক। কিন্তু একটা জিনিষ এখনই সবাই নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারে। তা হল – হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদীর পক্ষে আর সামনে আগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজনীতিতে – এটা আর সম্ভব নয়।

অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির “আগানোর” প্রধান কর্মসুচী হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মত “নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি” করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এনিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কিন্তু তাতে কী হতে পারে?

কলকাতায় যদি আসামের মত এনআরসি-ততপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোন হিন্দু নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে মোদী সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দিবার ব্যবস্থা নিবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহালে শেষ করা হবে। মুসলমানদের বেলায় কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয় অন্তত ক্যাম্পে নিয়ে ফেলে রাখবে। কপাল ভাল থাকলে তাকে আগের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন কোন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে! এতদিন এককথায় গরীবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল সেসব ছিনে এখন  সকলের জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করবে।

ওদিকে লক্ষ্যণীয় আর এক বিষয় হল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের বাংলায় নতুন করে এনআরসি-ততপরতা বা বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে ডেকে আনার রাজনীতিটা ঠিক পছন্দ করছে, তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হতে পারে এটা কাজ বেড়ে যাবে অনেক, অথবা অজানা বহু অভিমুখ গতিমুখ তৈরি হয়ে যাবে তা কোথায় গিয়ে না ঠেকে সে আশঙ্কায়, হতে পারে। অথবা হতে পারে ভান করা। যাতে এর প্রতিক্রিয়া কোথায় কোন পর্যায়ে হচ্ছে আগামিও হতে পারে তা জেনেবুঝে নেওয়ার সুযোগ নেয়ার কারণ। সারকথা তারা স্বস্তিদায়ক ঘটনা হিসাবে দেখছে না।

(ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫ টা। এখানে মোদীর টার্গেট হবে [উত্তর প্রদেশের মত এটা আশিটা না হলেও] এই ৬৫ আসন এটার গুরুত্ব কম হবে না – এগুলো বিজেপির পক্ষে হাসিল করা। এক এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসন গুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদীর আশু লক্ষ্য।

মতুয়াঃ
বাংলাদেশে ট্রাইবাল বলতে পাহাড়ি বা সাঁওতালদের মত বিক্ষিপ্ত নানান পকেট আছে এগুলাই। এছাড়া সমতলিদের মধ্যে কোন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠি  এখনও টিকে বা বজায় থাকার কথা এখন আর জানা যায় না। বুঝা যায় তারা বিভিন্ন মানুষ মিলেমিশে এখন একই সমা্জে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা গড়ে পুরান ট্রাইবাল পরিচয়্টা ঘুটা দিয়ে গুলিয়ে দিয়েছে। তবু আমাদের গোপালগঞ্জের জেলার “মতুয়া” বলে এক হিন্দু জনগোষ্ঠির কথা জানা যায়। বাংলাপিডিয়া “মতুয়া”দের কথা বলছে। বলেছে, “গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারা” বলে এদের চিনিয়েছে। বলেছে ,“গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত”। এই জনগোষ্ঠিরই প্রধান বা বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বণগাঁও মহুকমাতে সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে।

গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠি বর্তমানে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘদিনের এমপি ছিল মমতা ঠাকুর। সে তৃণমুল দলের এমপি ছিল, কিন্তু সে এবার হেরে গেছে। আর সে জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন [তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাল মতুয়া, বনগাঁয় জয়ী শান্তনু]। এই দুই প্রার্থীই যদিও মুল গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। কিন্তু কেন মুখ ফেরাল? আনন্দবাজার লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে এখানে সভা করে গেছেন। “মোদীজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে”। আর সেই থেকে এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাতাল শুরু হয়েছে। পুরা ব্যাপারটাই ইঙ্গিত দেয় যে মোদী এনআরসি আন্দোলন নিয়ে কিভাবে আগাতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও একারণেই এবার দুহাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মতুয়াদের নড়াচড়াটা হিন্দুদের অবস্থা বুঝার জন্য প্রতীকী।

আসামের এনআরসি ততপরতা শুরু করার সময় মোদী সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা “ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” হয়ে থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষ্য দিয়ে সেকথার অনুরণন করে বিবিসিকে বলছেন, “নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন মি: মোমেন”। কিন্তু তাঁর পরচুলার মতই একথাও আসলে নকল, কোন ভরসা নাই। অন্তত নির্বাচন পরবর্তি নড়াচড়াগুলা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর হল তার কথায়, “বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোন কারণ নেই” । আচ্ছা মোদীর মুখপাত্র হয়ে তাঁর এই সাফাই দেয়াটা কেন প্রয়োজনীয়? কিছু না বলে “দেখছি” বলে থাকা যেত না?  সত্যি অদ্ভুত!

কিন্তু আর একটা দিক যখন আগে ভারত “আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” বলেছিল তখন “বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে” এমন কোন আইন বা ইস্যু ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা এই আইন এখন আছে। যা এখন নড়াচড়া করে উঠবে, সচল হবে অনুমান করা যায়। এটা নিয়ে বাংলাদেশেও একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। তবে দুই তরফে। এক, একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ততপরতা শুরু হলে সেখানে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার এই ততপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোন খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হলে এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, তা বলাই বাহুল্য। তারা খুবই ক্ষুব্ধ হবে অনুমান করতে পারি। তাই পুরা বিষয়টা নিয়ে মোদী সরকার ঠিক কী কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে এর একটা এসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কোথায় এবং কী কী তা নিয়ে কথা বলা, সম্ভাব্য স্বার্থবিঘ্ন কী হতে পারে তা নিয়ে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও ততপর হওয়া জরুরি। আমাদের সকলেরই সুস্থ শরীর ব্যস্ত হয়ে উঠার, অস্থির হয়ে উঠার দিন কী সামনে! সত্যি কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য কে জানে! আমরা সবাই কী বলি হয়ে যাব এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৫ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি! এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]