ঢাকার উপর ড্রাগনের নিশ্বাস ফেলতে দেখা সুবীর ভৌমিক!


ঢাকার উপর ড্রাগনের নিশ্বাস ফেলতে দেখা সুবীর ভৌমিক!
গৌতম দাস
০৮ আগষ্ট ২০২৩
https://wp.me/p1sCvy-4MN

 

 

 

      Chinese special envoy Deng Xijun 

 

বাংলাদেশে চীনের এক বিশেষ দুত আসা-যাওয়া করছেন। আর তা নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের হয়ে সুবীর ভৌমিক এক “ষড়যন্ত্র তত্ব” এর গল্প ফেদে এক রচনা লিখেছেন গত ৫ আগষ্ট। আর তা ভারতে ছাপা হয়েছে এখানে। এর শিরোনাম বাংলা করে লিখলে , ড্রাগন ঢাকার উপর নিঃশ্বাস ফেলছে? বাংলাদেশের সাথে চীনের বেড়ে চলা অভিসারে ভারত উদ্বিগ্ন [Dragon’s breath on Dhaka? Bangladesh’s growing Chinese rendezvous worries India]। ড্রাগন বলতে প্রতীকীভাবে চীনকে বুঝিয়ে থাকে, যেটা ভারতীয় মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়।

এখন কাহিনীর পটভুমি আগে কিছু কথা একেবারে সরাসরি বলে নেওয়া যাক। চীনের এক বিশেষ দুত দেং শিজুন [Deng Xijun] বাংলাদেশ সফরে এসেছেন গত তিনমাসের ব্যবধানের আগে-পরে মিলিয়ে মোট দুবার। তিনি নীরবে মানে হৈ চৈ না করে এসেছেন কথা ঠিক, কিন্তু মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয়েছেন আর যেখানে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য কমবেশি পরিস্কারই লেখা হয়েছে।  যেমন এবারের সফর নিয়ে প্রথম আলোর রিপোর্ট চীনের বিশেষ দূত আবারও নীরবে ঢাকায়আর এই সফরের উদ্দেশ্য হল, তিনি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছেন। সেকথাআও প্রকাশ্যেই জানা যাচ্ছে।
কিন্তু এব্যাপারে চীনা অবস্থানটাই খুব কার্যকর বা এফেকটিভ কিছু  নয় বা কাজেরই না; মানে ফল আনে না। এর পিছনের মূল কারণ, চীন যেন বুঝেও স্বীকার করতে বা থামতে চাচ্ছে না যে বার্মার জেনারেলদেরকে তেল মেরে বা পিঠে হাত বুলিয়ে রোহিঙ্গাদের সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে জেনারেলদেরকে বাধ্য করা যাবে না। এটা চীনের কম্ম নয়! কিন্তু এই অকার্যকারিতার কথা জেনেও চীনা সরকারের তবু এতেই লেগে থাকার চেষ্টা,  এটাই খুবই বিরক্তিকর এক ঘটনা! কাজেই চীনের বিশেষ দুত প্রকাশ্যে না গোপনে এলো এটার কোন গুরুত্ব বা তাতপর্য নাই।

আরো কঠিন সত্যিটাঃ
আসলে আরও কঠিন আরেক সত্যি হল, আমেরিকা এই রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়ার ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বার্মার জেনারেলদের উতখাত করতে চায়। যেটাকে অনেকে বার্মায় রেজিম চেঞ্জের ঘটনা আসন্ন হতে পারে বলে মনে করছে। আর তা হলে সেটা স্বভাবতই কোন প্রো-আমেরিকান বার্মিজ জেনারেলকে বসিয়ে আমেরিকার পক্ষের এক ক্ষমতাদখল হবে বলে অনুমিত হয়।

বার্মা বা মায়ানমার নিয়ে একালে এমন সব ঘটনার রূট হল ২০০৭ সালে বার্মার জেনারেলদেরকে  পশ্চিমের সহযোগিতা এনে দেয়া ভারতীয় পরিকল্পনা ও এরই কিছু প্ররোচনা।  এটা ছিল আমেরিকা-সহ পশ্চিমকে কথিত এক নয়া রাস্তা দেখানো যাতে চীনের পাশাপাশি আমেরিকাও বার্মায় ব্যবসা-বাণিজ্যে লুটেরা হতে পারে। সাথে ভারতের জন্যও কিছু দুয়ার খুলে। আমেরিকা সহ পশ্চিমকে বার্মার রাস্তা দেখাতে সেটা ছিল ভারতীয় পরিকল্পনা।

এই নয়া রাস্তাটা কী ও কেন? গত ২০০৭ সালের আগের বিশবছরের  বার্মা ছিল জাতিসংঘ-সহ পশ্চিমাদেশের একেবারে কঠোর বাণিজ্য স্যাংশন খাওয়া এক দেশ। তাই বহিঃর্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বলতে এক লাগোয়া চীনা সীমান্ত দিয়ে পরোক্ষে বার্মা যতটুকু যা বের হতে পারে, তাও আন-অফিসিয়ালি। সেটাই একমাত্র ছিল তার বহিঃর্বিশ্ব! এই ছিল খুবই সীমিত কেবল চীনের সাথে আন-অফিসিয়াল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রায় একঘরে হয়ে থাকা বার্মা। সেটা ছিল আবার প্রায় ১৭০ ডলা্রে এক ব্যারেল জ্বালানি তেলের জমানা।  মানে, ২০০৮ সালের গ্লোবাল মহামন্দা তখনও আসে নাই, এর আগের ঘটনা।  তাই রাইজিং ইকোনমির চীন বা ভারতের মত দেশগুলোর জ্বালানি কিনে নিবার প্রতিযোগিতা চলত সেকালে যে, কে কোনদেশের মাটির নিচের  জ্বালানি আগাম কিনবার জন্য আগে বুকিং দিয়েছে বা চুক্তিই করে ফেলেছে। এমনই দিনকালের সেসময়ে এক বার্মিজ গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস ভারতের কিনবার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের উপর দিয়ে তা ভারতে নিবার কথাবার্তা ও তা নিয়ে কোন চুক্তিতে পৌছাবার আগেই  চীন বার্মার সেই গ্যাসক্ষেত্র কিনে নিয়েছিল। যা পরে পাইপলাইন বসিয়ে  এখন সরাসরি চীনের কুনমিং-এ যাওয়া চালু হয়েছে।

এই পটভুমিতেই ভারত পশ্চিমকে বার্মায় ডেকে নিয়ে আসে এই ধারণায় যে এতে বার্মা অনেক বেশি সাথে ভারতের দিকেও ঝুকবে, চীনের শাস্তি বা কোনঠাসা হবে ইত্যাদি। তাই, ভারতীয় মধ্যস্থতায় ঐ প্রস্তাব ছিল আসলে বার্মায়  এক নাম-কাওয়াস্তে সংস্কার, নয়া কনষ্টিটিউশন (২০০৮) চালু , সু চি কে ছেড়ে দিয়ে জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে সু চিকে সংসদে বসানো ইত্যাদি ধারাবাহিকভাবে ঘটেছিল।  আর এটাকেই বার্মার জেনারেলেরা ভাল হয়ে গেছে বলে সার্টিফিকেট দিয়ে সব পশ্চিমা স্যাংশন তুলে নেয়া হয়েছিল।   এরপর আমেরিকা-ইউরোপ ঝাঁপিয়ে পড়ে বিনিয়োগ নিয়ে বার্মায় ঢুকে পরে লুট শুরু করেছিল। সেটা বার্মার জঙ্গলের দামি কাঠ থেকে শুরু করে মাটির নিচের যা আছে প্রায় সব। আর বলাবাহুল্য যেমন সেই প্রথম মোবাইলের মত পশ্চিমের নানান টেকনোলজির বার্মার বাজারে প্রবেশ করে সব বাজার ছেয়ে ফেলাও…।

কিন্তু ভারতের জাত-স্বভাব হল, মুসলমান কোপানো – একটা জিঘাংসা, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোতেই যেন সে আনন্দ খুঁজে পায়; সবকিছুর সাথে এটাও তার চাই-ই!  অথচ এটা সত্যিই আনন্দের কিনা, হিন্দুত্ববাদ করে এতে ভারতীয় রাজনীতির কী লাভ হয়েছে না উলটা স্থায়ী ক্ষতি – এসব ফিরে দেখে চেক করার থেকে সে ক্রমশ চরম দূরে সরে গেছে। অথচ এতেই সে মেতে থেকেছে। তাই রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর কুবুদ্ধি উস্কানিটা এবার তারাই জেনারেলদেরকে দিয়েছিল। যেকাজ জেনারেলেরা আগেও প্রতি দশবছর পরপর একবার করে তারা করে  আসছিল। বুদ্ধিটা ছিল যে এবার যেহেতু সারা পশ্চিমাদেশ আর সাথে চীন ও ভারত মানে সবাইকেই বার্মার জেনারেলেরা ব্যবসা দিয়েছে – সবার গলায় ব্যবসার স্বার্থ আটকে আছে ফলে,  এটাই এবার রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর সবচেয়ে ভাল সময়। কোন মানবাধিকার কোন আপত্তি এখন কাজ করবে না, এই ছিল পিছনের অনুমান। হয়েছিলোও তাই, এমনকি আমেরিকাসহ কেউই জেনারেলদের রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর বিরুদ্ধে যায় নাই। কোন আপত্তিও দেয় নাই।  উলটে বরং ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর কাজটা জায়েজ করে দিয়েছিল,  আরসা [ARSA] নামে কথিত বাহিনীর বার্মা সেনাব্যারাক আক্রমণের গল্প দিয়ে যেটার পক্ষে  সেসময় বার্মায় বিদেশিস্বার্থের সকলেই সাফাই দিয়েছিল। বলেছিল জেনারেলদের রোহিঙ্গা খেদানী-নির্যাতনটা জায়েজ!

কিন্তু একালে সব বদলে গিয়েছে। যদিও এর শুরু হয়েছিল ওবামা সেকেন্ড টার্ম (২০১৩) থেকে। ক্রমশ এটা এখন আমেরিকার “বার্মা এক্ট ২০২১” হয়ে পরিণতিতে হাজির হয়েছে।  বার্মার  জেনারেলদের বিরুদ্ধে আমেরিকা ক্রমশ সাঁড়াশির চাপ বাড়াচ্ছে আর সাথে দখল, সরকার বদল ইত্যাদি প্রায় সবকিছুই এজেন্ডায় আছে জানা যাচ্ছে। যেটা বাস্তবায়ন করতে পারলে একালে বার্মাই হয়ে উঠতে পারে আমেরিকার বহুদিনের খায়েস – এশিয়ায় অ্যামেরিকান পা-রাখার প্রধান দেশ-ভুখন্ড। আর স্বভাবতই এরই ঠিক বিপরীতে চীনের ততপরতাও উঠে এসেছে –  থাকবে ও আছেও যাতে অ্যামেরিকান পরিকল্পনাটা না ঘটে।  চীনের সে পালটা ততপরতার এক বড় অংশ হল চুইয়ে পড়া পানির মত ক্ষীণকায় ধারা হলেও পঞ্চাশ-একশজন করে রোহিঙ্গা ফেরত নেয়া যে শুরু হয়েছে এমন এই মিথ্যা ভাবটা তৈরি করা।
কিন্তু চীনের এই অর্থহীন কূটনীতি মানে  নীতিহীনতার দুর্দশা এমনই তলানিতে ঠেকেছে যে এই লোকদেখানি কাজ সেটাতেও বার্মিজ জেনারেলদের রাজি করাতে চীন একেবারেই প্রায় অক্ষম হয়ে থাকছে। তোষামোদ করে চলার চীনা নীতিক্র জেনারেলেরা কেন পাত্তা দিবে?  অর্থাত একাজটায় চীনেরও মুরোদ নাই। সম্ভবত চীন বেশি চাপাচাপি করলে সেক্ষেত্রে হয়ত চীনের পাইপলাইন, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিপুলভাবে  বার্মায় চীনের নানান বিনিয়োগ ইত্যাদিতে জড়ানো চীন-বার্মা  সম্পর্ক তাতে উলটে যেতে পারে।  সারকথায় চীন বিনিয়োগ-বৈষয়িকতা লোভে বা স্বার্থের জালে আটকে গেছে। আর যেটাকে চীনের সুবিধা মনে হয় – সে দেখাতে চায় যে তা অন্যদেশের রাজনীতিতে নাকি হস্তক্ষেপ করে না। কারণ এই ইমেজের আড়ালে বৈষয়িকতা লোভে বা স্বার্থের জালে নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখা বেশি সহজ। অথচ চীনের এই বৈষয়িকতা লোভে বা স্বার্থের জালে এটার কারণের কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ধুঁকে মরলে চীনের কী কিছু আসলে এসে যায়???  কমিউনিস্ট চীনের বিনিয়োগ ব্যবসার স্বার্থই প্রধান, যেটাকে  “সে রাজনীতিতে নাকি হস্তক্ষেপ করে না” বলে চালিয়ে যেতে চায়!
যদিও আসলেই কী  এটাই চীন বা যেকোন দেশের স্বার্থ হতে পারে??? মানুষ বাদ দিয়ে  কেবল ব্যবসা লাভালাভের বৈষয়িক স্বার্থ এগুলোই কেবল চীনের স্বার্থ???? সম্ভবত এনিয়ে সামনে চীনকে এক বিরাট ধাক্কা খেতে হতে পারে, তাতে কিছু আক্কেল হতে পারে!

বার্মাকে ঘিরে আমেরিকা ও চীনের স্বার্থ ও ততপরতাগুলো দেখা যায়; কিন্তু ভারতঃ
তবু যাক সেকথা; এখানকার মুলকথায় আসি। উপরে বার্মাকে ঘিরে আমেরিকা ও চীনের স্বার্থ ও ততপরতাগুলোকে দেখলাম। কিন্তু ভারত? যে ভারত ২০০৭ সাল থেকে বার্মার জেনারেলদেরকে পশ্চিমের স্যাংশন উঠিয়ে এনে পশ্চিমের সাথে বার্মার  সম্পর্ক করে দিল! সেই ভারতের এখন খবর নাই। কারণ বার্মা এখন মূলত আমেরিকা ও চীনের দ্বন্দ্বের ইস্যু!  ভারত সেখানে কেউ না।  তবে এখন এই পরিস্থিতিতে অনেকে মনে করতে চান যে  একমাত্র একটু পথ ভারতের জন্য  যা খুলা আছে তা হল আমেরিকা অথবা চীন “সাগরেদ” হয়ে যাওয়া!  এদুই দেশের কোন একটার অধীনস্ত  “ছুট-ভাই’ হতে হবে – আর তাতে যতটুকু উচ্ছিষ্ট ভাগ ভারতের পক্ষে আসে! এটুকুই!
তাহলে এই উচ্ছিষ্ট খাওয়ার জন্যই কী ভারত এতদিন খেদমত করে গেছিল?  এই প্রশ্নের জবাব  সেকালের ভারতের কংগ্রেস বা একালের  মোদির বিজেপি – এদের কারো কাছে নাই। আগে-পিছে চিন্তা না করে কাজ করা কথিত নীতি-নির্ধারক এরা কখনই পুরানা কাজ-ততপরতার আত্ম-মুল্যায়ন করে না, করবে না।  মোদি সরকার ভারতের যে বাকি ছয়-আট মাস ক্ষমতায় আছে এইসময়ে সে না আমেরিকার পক্ষে না চীনের পক্ষে কোনদিকেই যেতে পারবে না। আর যদি আগামিতে মোদিবিরোধিরা ক্ষমতায় আসে তবে তারা আমেরিকার অধীনস্ত এক ভারত খাড়া করবে আবার যেটা ততটা চীনবিরোধীও হবে না। যদি আদৌও ঘটনা সেসব দিকে গড়ায়!

তাহলে সুবীর ভৌমিক ঢাকার উপর ড্রাগন মানে চীনের নিঃশ্বাস ফেলা দেখছে কেনঃ
এটার একটাই জবাব ভারতীয়  ঈর্যাকাতরতা! এছাড়া আর কোন অর্থ নাই।  অথচ এটা আসলে তাদের কর্মফল!
যেমন প্রথম কথা, চীনের কূটনীতি হল যে লোকদেখানো হলেও রোহিঙ্গা ফেরত নেয়া শুরু হয়েছে – এটা প্রতিষ্ঠা করা যাতে অ্যামেরিকান কোন ভবিষ্যত আক্রমণ বার্মার উপর ঘটলেও রোহিঙ্গা ফেরত না নেয়াকে যেন আমেরিকা তাদের  বার্মা আক্রমণের সাফাই হিশাবে হাজির না করতে পারে। এছাড়া চীন চাচ্ছে আমেরিকার বিরুদ্ধে এখানেই হাসিনা সরকারের স্বার্থ আছে এটা প্রতিষ্ঠা করা, দেখানো!   কিন্তু আসলেই কী তাই?

লোকদেখানো ভাবে রোহিঙ্গা ফেরত এর  চীনা কূটনীতি তো নিস্ফল; কোন নুন্যতম সাফল্য বা এর কার্যকারিতা এতে আসে নাই!  ফলে হাসিনা সরকারের চীনের (কোন নীতি-পলিসির) কোলে উঠার সুযোগটা কোথায়?   আর তাহলে সোজা প্রশ্ন, সুবীর ভৌমিকের এখানে ঢার উপর চীন বা ড্রাগনের নিঃশ্বাস ফেলা দেখছে কোথায়?

মানুষ কখনও কখনও যখন টের পায় যে ভুল করেছে, ভুল পথে চলছে কিংবা আরো বড় ঘটনা যখন যে বুঝে যায় সে চরম বোকার মত সমুলে হেরে যাচ্ছে – পতন আসন্ন; এমন পরিস্থতিতে, এটাই সেই খড়কুটো আকড়ে ধরার দশা-বাস্তবতা!  সুবীর ভৌমিকের আচরণ অবস্থান তেমনই। উলটাপালটা কথা বলছেন যেটা তার নিজেরই অজানা নয় যে “তার কথা হচ্ছে” না।  কাউকে যদি বলি আপনার কথা হয় না এটা কিন্তু আসলে সবচেয়ে অসম্মাঞ্জনক । এর মানে হল, তার নিজের কথা যে অর্থপুর্ণ হচ্ছে না (মানে অর্থহীন) সেটা উনি নিজেই নিজের বুঝবার  মত দশা-অবস্থাও হারিয়েছেন!  এককথায় চিন্তা করতে অযোগ্য অক্ষম এমন এক মানুষ তিনি, তাই বলা হচ্ছে। সুবীরের অবস্থা এলেখায় হয়েছে তাই।

সুবীরের শেষ ভরসা সুখরঞ্জন দাসগুপ্তঃ
সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত হলেন চল্লিশ বছরের আনন্দবাজারের সংবাদদাতা। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে টানা প্রায় সাড়ে তিনবছর বাংলাদেশে থেকে আনন্দবাজারের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু শেখ মুজিব হত্যার সময় ছিলেন না। আবার ২০০৩ সালে আনন্দবাজার-ই ছেড়ে দেন। হয়ে যান কলামিস্ট কিন্তু বাংলাদেশের পত্রিকায়!  ঘটনা কী? ঘপ্টনা খুবই সিম্পল। মিডিয়া কর্মীর পরিচয় দেখিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা নতুন কিছু নয়। দাসগুপ্ত সেটাই করে গেছেন। আর ২০০৩ সাল থেকে তিনি গোয়েন্দা কাজে ফুলটাইমার হয়ে যান।  তিনি সময়ে বিডিনিউজ২৪-এ কলাম লিখে থাকেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় ডি-মেরিট বা অযোগ্যতা হল তার বয়স! বয়স মানে ঠিক বয়েস নয়। হিন্দুত্ববাদী মন ও চোখ আর গোয়েন্দা-গিরি সার্পনেস এদুটো একেবারেই এককথা নয়। বরং এক মনে করাটাই বিরাট অযোগ্যতা।  তার বয়েসী মানুষের হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বকে দেখার স্টাইল সেটা কংগ্রেস-নেহেরু আমলের তা একালে কার্যকর গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্সের জন্য একেবারেই অচল। এর উপর তিনি নাকি বরিশাল ঝালকাঠির লোক, পঞ্চাশের দশকে দেশ ছেড়েছিলেন। এতে তার মনে যে ক্ষত এটাই তো ডি-মেরিট। এই আবেগ বা ঘৃণা যা কিছু আছে তা তার এসাইনমেন্টের জন্য নেগেটিভ।   এটা ভারতের ‘র’-সহ যেকোন ইন্টেলিজেন্সে কাজের জন্য একেবারেই অচল মাল। এটা হিন্দুত্ববাদ চর্চা-প্রচারের জন্য কাজের হতেও পারে! কিন্তু সেটা তো  ইন্টেলিজেন্স কাজ নয়। অন্তত ঘটনাবলী ঠিকমত ব্যাখ্যা করতে  সক্ষমতার দিক থেকে অক্ষম ও অযোগ্য। এছাড়া এই ব্যর্থতা ঢাকতে ষড়যন্ত্র তত্ব আমদানি করে গল্প ছড়ানো – সেটা আরও অযোগ্যতার প্রকাশ।
সুখরঞ্জন এক কলাম লিখেছিলেন গত বছর (২৪ জুলাই ২০২২) যার শিরোনাম বাংলা করে লিখলে বিএনপির নির্বাচনে অনিচ্ছার অন্তরালে [Behind the BNP’s poll reluctance]এককথায় এটা সুখরঞ্জনের এক গারবেজ লেখা। পাঁড় হিন্দুত্ববাদি চোখে আওয়ামী লীগকেই  ব্যাখ্যা করার  বেকুবি চেষ্টা; যা লীগের পক্ষেও গ্রহণ করা সম্ভব হয় নাই।  যদিও আওয়ামি লীগ পরম যত্নে এলেখাকে তাদের দলীয় ওয়েব সাইটের মুখে টাঙিয়ে রেখেছে। লীগের এই অতি আগ্রহের কারণ খুব সম্ভবত এটাই যে, ঐ লেখাতেই দাসগুপ্ত উল্লেখ করেছেন, বিএনপিকে নাকি কানাডার কোন আদালত জঙ্গী বলেছে তিনি লিখেছিলেন  “Even a Canadian court verdict in 2017 put a “terrorist tag” on the BNP for its violent activities.” – এই লেখার পরিণতি বা বাস্তবতা কী তা এখন আমরা আমরা সবাই জানি।  এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  জার্নালিজমের এক সিনিয়র শিক্ষক মন্তব্যে বলেছেন, “এরা তো কোর্টের রায়ের ইংরাজিও বুঝে না”।
সুখরঞ্জনের লেখা – “বিএনপির নির্বাচনে অনিচ্ছার অন্তরালে” কী আছে?   সেই লেখায় তিনি বলতে চেয়েছেন যে বিএনপি-জামাত আন্দোলন করে হাসিনা সরকারের অপসারণ চায়। আর তাই – মানে বিএনপি এক জঙ্গী দল বলেই বিএনপি নাকি  নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না [……the BNP, reluctant to fight the parliament elections? Why is it that the BNP leaders are threatening to launch an agitation to oust the Hasina government?]। এখানে,  agitation to oust- এই ইংরাজি কথাটার আক্ষরিক অর্থ হল আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে উতখাত – করতে চাওয়া। এরপরেও এটা আইনি ভাষার মধ্যেই এক গ্রহণযোগ্য বক্তব্য। যেমন বললাম আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করব – এটা বললে যে অর্থ হয়। আর কারচুপি বা রাতের ভোটের প্রেক্ষিতে  হাসিনার পরিচালিত নির্বাচনে অংশ নিতে না চাওয়া – এটাও খুবই ন্যায্য ও আইনি ফ্রেমের মধ্যে থাকা বক্তব্য। এটা কোন আদালতও অন্যায় বলতে পারে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি বড় লীগার হয়ে এটাতেই সুখরঞ্জন বিএনপিকে (জামাতের সাথে ট্যাগ করে যেখানে ২০২২ সালের আগেই বিএনপি আগের ২০ দল ভেঙ্গে দিয়েছে) জঙ্গীত্ববাদ অভিযুক্ত করতে চেয়েছে।
দ্বিতীয়ত আরো বড় পয়েন্ট হল, আমেরিকা এই নির্বাচনে হাসিনা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। আর একারণে স্বভাবতই বিএনপি তার আন্দোলনে কোন সহিংসতা করলেই আমেরিকা বা স্থানিয় এমবেসি,  বিএনপির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিবে। অন্তত সমালোচনা ও অভিযুক্তও করতে পারে; আর সেটা বিএনপি জানে। কাজেই কোন যুক্তিতেই বিএনপিকে সহিংসতার পথে যাবে না। তাই এমন অভিযোগ তোলা – এটা তো আওয়ামি লীগও করছে না। অথচ সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান জ্ঞান করে আওয়ামি লীগকে রাস্তা দেখানোর নামে এলেখা লিখেছে। অথচ এটা দাসগুপ্তের  সবচেয়ে স্টুপিড লেখা ও আর্গুমেন্ট। এটা এতই স্টুপিড যে আওয়ামি লীগও দাসগুপ্তের স্টাইলে বিএনপিকে অভিযোগ করছে না। বরং এই প্রথম (লীগ নিজেই দিয়েছে বলে অভিযোগ) গাড়িতে আগুন দেয়া ফলে জঙ্গীবাদের অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধে খাড়া করা যায় কিনা সেটা বাজায় দেখতে চাইছে। যদিও তা জমে নাই।  মানে লীগ বুঝায়ে দিয়েছে লীগকে রতাজনীতি শিখানো ; এটা সুখরঞ্জনের কাজ না। আসলে এজন্যই বলেছি, সুখরঞ্জন এর কথা হয় না।!
তাহলে, এখন সুবীর কোথায় এসে ঠেকেছে? এই সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত যিনি নাকি “কোর্টের রায় বুঝেন না” তিনিই এখন সুবীরের শেষ ভরসা।  সুবীর এই সর্বশেষ লেখাটা তিনি  এই দাসগুপ্ত এর কাঁধে সওয়ার হয়েই লিখে দিয়েছেন। মানে ইন্টেলিজেন্ট এজেন্সির এই  এজেন্টের রেফারেন্সে লিখে দিয়েছেন। এটাই সুবীরের খড়কুটো আকড়ে ধরার দশা বটে!

The “Dorbesh coterie”  বা সুখরঞ্জনের দরবেশ কোটারিঃ
সুখরঞ্জন এর যেকোন বয়ানই অচল হচ্ছে এবং হবেই – এর মূলকারণ তিনি সবকিছুকে হিন্দু বনাম মুসলমান বা হিন্দুরা ভাল মুসলমানে মানে খারাপ –  এই স্টাইলে যেটা ষাটের দশকের নেহেরুয়ান বয়ান বা জমিদার-হিন্দুর বয়ান – আর এর উপর দাঁড়িয়ে বলা কথা। এই স্টাইল ক্লিশে [Cliché] মানে অতিব্যবহারে জীর্ণ। তাই এই বয়ান আওয়ামি লীগের জন্যও বিপদজনক এবং বুমেরাং হবার সম্ভাবনা। তিনি বেক্সিমকোর সালমান রহমানের (যাকে সাধারণ্যে দরবেশ বলার রেওয়াজ আছে। কিন্তু সেটা কোন খারাপ অর্থে না। সম্ভবত তার কোন সন্তানের মৃত্যুর পরে তিনি এমন দাড়ি রাখা শুরু করেন তাই পাবলিক যেন বলতে চায় তিনি এত সৎ লোক নন)  উপর চড়াও হয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন। প্রথমত এটা লীগ বা সরকারের কাছে অগ্রহণযোগ্য। বিপরীতে সুখ্রঞ্জন দরবেশ বলতে তিনি পাকিস্তানি এই হুজুগ তুলতে চান। এটাই তো জমিদার হিন্দুর হিন্দুত্ববাদী ভাষ্য। এটা এমনই অগ্রহণযোগ্য যে লীগও এতা খায় নাই। আর কেন না জানে সালমানের পরিবারের অনেকের বিয়ে হয়েছে পাকিস্তানি ফেমেলির সাথে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। আর এটা কী অপরাধ??? এটা হিন্দুত্ববাদের চোখে অপরাধ হতে পারে যা একটা বড়সড় গাধামি!!!
তামসাটা হল সুবীরও এতই দেউলিয়া হয়েছে যে সেও হিন্দুত্ববাদি চোখে ও মনে  সুখরঞ্জনের দরবেশ কোটারি বক্তব্যকে আপন করেছে। গল্প-প্রপাগান্ডা করেছে হাসিনা নাকি এমন দরবেশ কোটারি মানে পাকিস্তানিদের পাল্লায় পড়েছে  আর এছাড়া এমন নাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনসহ নয়জন মন্ত্রী আছে।  এটা টু মাচ!!!
বটম লাইনটা হল ভারতের র এই সংস্থা হিন্দুত্ববাদি হতে পারে না। অর্থাৎ আমি বলতে চাই, বজরং দল বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এর কাজ আর র-এর কাজ এক হতে পারে না। একই ধরণের সংগঠন তারা নয়।  র এই সংস্থা হিন্দুত্ববাদ সময়ে কাজে লাগাতে পারে পরিমিত ভাবে কিন্তু এর জন্য সংগঠনের পেশাদারিত্ব ক্ষুন্ন হতে পারবে না। তা যদি বজায় না রাখতে পারে তবে এটা পরের রাষ্ট্রে অন্তর্ঘাত কাজ করার মত ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান হতে অযোগ্য হবে। অকেজো ও ধবংস হয়ে যাবেই! অথচ সুখরঞ্জন ও সুবীর মিলে  র এই সংস্থাকে যেন বজরং দল ঠাউরিয়েছে!!!
ওদিকে এক বিরাট তামাসার কথা হল সালমান রহমান কত কোটি ডলার মানি লন্ডারিং করেছে এর ফিরিস্তি নিয়ে হাজির হয়েছে। মানে ধরে নিয়েছে হাসিনা যেন ঘাসে মুখ দিয়ে চলে!! বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু নাই!!!  অথচ এতে এরা দুজনই যে চরম বেকুব দুই মহাজন সেটা তারা নিজেরাই বুঝতে পারছে না।
তাই, শুধু এই সুবীর ভৌমিক বা সুখ্রঞ্জন দাসগুপ্ত এরাই কোঙ্কিছু চিন্তা করতে বেকুব আর অযোগ্য হিশাবে নিজেকে তুলে ধরেছে তাই নয়,  সারা ভারতীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা-ই  বা এস্টটাবলিশমেন্টই এমন মফস্বলি এটাই উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।  – ভারত পরাশক্তি হওয়া দূরে থাক কোন শক্তিই নয় সেটাই ভৌমিক ও দাসগুপ্ত নিজেরাই হাজির করে দিয়েছেন।

কেন চীনের প্রতি ঈর্ষাকাতর বলেছিঃ
সুবীর অভিযোগ আকারে বলছেন, চীনা বিশেষ দুত নাকি হাসিনা সরকারকে আমেরিকা মোকাবিলার কিছু টিপস দিয়েছে। আর এটাতেও ভারত উদ্বিগ্ন!!  এটা আসলে একতা গাধা-গরুর আলাপ হয়েছে।
হাসিনা যেখানে আমেরিকার প্রবল চাপ আছে সেখানে চীন যদি এমন কিছু টিপস দিতে চায় বলাই বাহুল্য সরকার বা মোমেন তা শুনতে আগ্রহিওই তো হবেই। এটাই তো সেলফ-ইন্টারেস্ট বা নিজস্বার্থ। অথচ সুবীর আশা করছেন হাসিনা এখানেও ভারতের স্বার্থের চোখে তাকাবেন…। এটা এক গাধা-গরুর আলাপ ছাড়া কী?
দেখেন Tips to handle US? উপশিরোনামে সুবীর বা দাসগুপ্তকে রেফার করে লিখছেন, “we have good reasons to believe China was providing Bangladesh with a brief to handle the US,” । মানে চীনের এমন পরামর্শ কেন হাসিনা নিল? যেন এটা নেয়া হাসিনার অপরাধ হয়েছে???? 

দিন কে দিন দেখা যাচ্ছে সুবীর ভৌমিক বা দাসগুপ্ত – রা এমন গারবেজ লেখা প্রসব করা শুরু করেছেন…!

 

আপডেটেডঃ    ০৬ আগষ্ট ২০২৩; দুপুর ১১ঃ০২
আপডেটেডঃ     ২০২৩;

>>>
গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

Leave a comment