অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

গৌতম দাস

অপহরণ, গুম ও খুনের ভিতর ভাসছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে এটা এক চরম অবস্থানে এসে ঠেকেছে। হয়ত আরও কোন চরমে তা পৌছাবে। আতংক সমাজের প্রায় সব অংশকেই তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে এর আগে অপহরণ গুম ও খুন ঘটেনি, কিম্বা এখনকার মতো চরম আকার ধারণ করে নি । গত এক দেড় বছরে তো বটেই এমনকি গত ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের পর অপহরণ, গুম ও খুনের সংখ্যা ভীতিকর জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিল। অথচ এখনকার তুলনায় অপহরণ গুম ও খুন তখন গণমাধ্যমে আসে নি। যারা এর শিকার হয়েছিল তাদের প্রতি গণমাধ্যম সদয় ছিল না। এখনও সাতক্ষীরায় যে অপহরণ, গুম বা খুনের ঘটনা চলছে তা নারায়নগঞ্জের মত একইভাবে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে না। বিচারবহির্ভূতভাবে এদের ‘নির্মূল’ করবার ইচ্ছাটাও সমাজের একাংশের মধ্যে প্রবল হয়ে আছে। ফলে সেই সময়ের অপহরণ, গুম ও খুনের মিডিয়া রিপোর্টিং না হবার কারণে বিষয়টাকে সরকার আড়ালে রাখতে পেরেছিল এখনও “বিশেষ বিশেষ” অপহরণ, গুম বা খুনের বেলায় পারছে। যারা অপহরণ গুম ও খুন হচ্ছে তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” ফলে রাষ্ট্রের দিক থেকে এদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ড চালিয়ে যাওয়া জায়েজ -গণমাধ্যম খুব সফলভাবেই এই বিকৃত মানসিকতার চর্চা জারি রাখতে পেরেছিল ও পারছে। যে র্যা ব-১১ এর কমান্ডারের নামে এত অভিযোগ, শীর্ষে তিনি, নারায়নগঞ্জে বদলি হয়ে আসার আগে তিনি লক্ষীপুর জেলায় ছিলেন। সেখানকার বিএনপি ও জামাত নেতা কর্মীদের হত্যার অভিযোগ নিয়মিত আমরা দেখেছি। একবার তো ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে জনরোষ থেকে স্থানীয় র্যা ব বাহিনীকে উদ্ধার করতে হয়েছিল। কিন্তু লক্ষীপুরের সেসব ঘটনায় আজকের মত আমরা সামাজিক-রাজনৈতিক কোন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। অর্থাৎ বিচার ও আইনবহির্ভুতভাবে অপহরণ, গুম বা খুনের এক রাজনৈতিক-সামাজিক স্বীকৃতি আমরা দিয়েছি। অথচ সেই মিডিয়া ও সেই রাজনীতি আজকে অপহরণ, গুম বা খুনের বিরুদ্ধে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলতে চাইছে। বড়ই তাতপর্যপুর্ণ।
রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী ভূমিকা ও আইন শৃংখলা বাহিনীর আইন বহির্ভূতভাবে হত্যার পক্ষে দাড়ানো লোকের অভাব হয়নি, আর তাদের যুক্তির অভাব ঘটে নি। যেমন, এমন যুক্তিও আমরা শুনেছি যে, সর্বসাধারণের জান ও মাল রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; অতএব রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নাগরিকদের পঙ্গু কিম্বা হত্যা করতেই পারে। খুবই মজার যুক্তি এটা। কিন্তু সমাজের ভেতর থেকেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, কিন্তু গড়ে ওঠে সমাজেরই উর্ধে সমাজের ওপর চেপে বসে থাকা ‘দানব’ হিসাবে – এটা অতি পরিচিত পুরানকাল থেকেই চলে আসা বামপন্থি এক সবল চিন্তা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রকে দেখবার এই পুরানা বামপন্থি চিন্তার জায়গাটা বামপন্থিদের মধ্যেও খুব একটা অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ।
সেটা দূরে থাকুক, এখন ‘রাষ্ট্র’ নামক এই দানবকেই এক স্বাভাবিক সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য করবার মতাদর্শই বাংলাদেশে প্রবল। রাষ্ট্র হাজির আছে বলেই এই প্রতিষ্ঠানটি ন্যায্য, তার গঠনের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস ও চরিত্রের হদিস নেবার দরকার নাই, এই চিন্তা থেকে মুক্তি সহজ নয়। রাষ্ট্র আছে বলেই তার আর ন্যায্যতা প্রমাণের দরকার নাই, অতএব কোন নাগরিকের অধিকারের বালাই রাষ্ট্রের না করলেও চলে, এই চিন্তার প্রাবল্যের কারণেই ভিন্ন মতাদর্শের নাগরিকদের রাষ্ট্র যখন নিপীড়ন ও হত্যা করে তখন সমাজে কোন বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয় না। এমনকি তথাকথিত সুশীল বা লিবারেল কিম্বা প্রগতিশীলরাও নিশ্চুপ থাকা শ্রেয় মনে করে, সমর্থন যোগায়।
এমনকি যারা মুখে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের কথা বলেন, তাদেরও সে ক্ষেত্রে বলতে শুনি যে মৌলিক অধিকার বা অন্য সবকিছু দেখবার আগে দেখতে হবে রাষ্ট্রের দ্বারা নিপীড়িত বা আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে খুন হওয়া নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কি? যদি উনি ইসলামি রাজনীতির হন, কি ইসলামি চিন্তার উপর ঠেস দিয়ে আছেন বলে মনে হয়, তবে তিনি মৌলবাদি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। তখন রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও হত্যার সমালোচনা দূরে থাকুক, বরং প্রয়োজনে ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ বলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হত্যার পাশাপাশি তাদের নির্মূল করতে নেমে পড়তে হবে। এই হল তাদের দশা। এরা মনে করে “ইসলামপন্থি মৌলবাদি বা সন্ত্রাসীরা” রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মাকান্ডে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে গেলে দানব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার কিছু নাই। কারণ তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” এর মত রাজনৈতিক আদর্শের নাগরিক। এরা বলতে চান, এই নাগরিকদের নাগরিক অধিকার জান মাল মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়লেও অথবা রাষ্ট্র তার উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের মতো অপরাধ করলেও আগে বিবেচনায় নিতে হবে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। ক্ষমতাসীন সরকারের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে কোন নাগরিক ব্যক্তির নাগরিক অধিকার নাই – এই হোল তাদের সারকথা।
বাংলাদেশে এই ধরণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার বিরোধীদের সম্পর্কে একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। গত জানুয়ারির শেষে অপহরণ গুম ও খুনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রচারণার অংশ হিসাবে এক মানবাধিকার সংগঠনের সভার কাজে এক জেলা শহরে যেতে হয়েছিল। মূল প্রবন্ধ পড়ার পর সেখানে প্রথম বক্তা ছিলেন জেলা শহরেরই কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সভাপতি; জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতিও তিনি। তিনি কথা শুরু করলেন এভাবে, মানবাধিকারের কথা বইপুস্তকে অনেক ভাবে থাকে। সেটা সেখানে থাক। খোদ ওবামাও সেগুলো মানতে পারেন না। ফলে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধেও যে অপহরণ গুম ও খুনের অভিযোগ হচ্ছে সেগুলো নিয়ে বিচারে সবার আগে দেখতে হবে যারা অপহরণ গুম ও খুনের ভিকটিম তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। এটাই মুখ্য বিবেচনা। ইস্যুটাকে সেভাবেই দেখতে হবে।

“রাজনৈতিক আদর্শের” ভিত্তিতে রাষ্ট্র নাগরিককে তার নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণ করবে কথার অর্থ কি
কথাটার সার কথা কি? আমার পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাঁর নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো বা ক্ষুন্ন হবার বিপক্ষে সোচ্চার হওয়া যাবে না। বলা বাহুল্য, আমার খুবই বেগ পেতে হয়েছিল ঐ প্রকাশ্য সামাজিক সভায় সেই বক্তার মারাত্মক বিপদজনক ও আত্মঘাতি বক্তব্যের পরিণতি কি হতে পারে তা উপস্থিত সকলকে বুঝিয়ে বলতে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল। আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাটা ঘটনাচক্রে কমিউনিষ্ট পার্টি বা সিপিবি কেন্দ্রিক। কিন্তু এর অর্থ এমন নয় যে এই বিশেষ চরিত্রের “নাগরিক অধিকার” ধারণাটা কেবল সিপিবির পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটা ক্যাটাগরি করে বলা যেতে পারে যে, যারা নিজেদের “প্রগতিশীল” বা “চেতনার সৈনিক” মনে করেন নিজেকে মোটামুটি তাদের প্রায় সবারই অবস্থান এটা। তাই আমরা এখন দেখছি। একই বাহিনী কমান্ডারের ততপরতা লক্ষীপুরে ঘটলে কোন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। কিন্তু এবার নারায়নগঞ্জে ঘটলে প্রতিক্রিয়া হয়।
কোন “যদি” বা “কিন্তুর” আড়ালে বা কোন যুক্তিতেই রাষ্ট্র নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি করবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। এতে সমাজ বা রাষ্ট্র কোনটাই টেঁকে না। নতুন কোন রাষ্ট্রও এমন ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে না। সমাজের রক্তাক্ত বিভক্তি কিম্বা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে চাইলে এই অতি গোড়ার নীতি আমাদের আত্মস্থ করতে হবে। একে উপেক্ষা বা গাফিলতি মেনে নেওয়ার কোন সুযোগ নাই। অথচ এই ন্যূনতম নীতির অভাব তাদের মধ্যেই প্রবল যাদের কাছে আমরা এই নৈতিক প্রশ্নে দৃঢ়তা আশা করি। অথচ এরাই একই নিশ্বাসে নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন।
আদর্শ যাই হোক কোন রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিতে গিয়ে কোন নাগরিক যদি কোন ক্রিমিনাল অপরাধ করে বসেন তবে অবশ্যই তার অপরাধ আমলে নিতে হবে এবং বিচার করতে হবে। আদালতে অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে তিনি কেবল ঐ ক্রি্মিনাল অপরাধের জন্যই শাস্তি ভোগ করবেন। কোন ক্রমেই তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা তৎপরতার জন্য নয়। এটাই মূল কথা। এছাড়া আমরা ভুলে যাই রাষ্ট্রের নির্বাহি বিভাগ বিচার বিভাগ নয়। যার সোজা মানে নাগরিকের কোন কথিত অপরাধের বিচার সরকার করতে পারে না। সরকার বিচারক নয়, বড়জোর আদালতে অভিযোগ আনয়নকারী হতে পারে। অথচ সে জায়গায় আমরা রাষ্ট্রের নির্বাহী সরকারকেই অপরাধের বিচারক বানিয়ে ফেলছি। শুধু তাই নয় সরকারকেও কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ তাঁর পছন্দসই কিনা সেই বিচারের ভার দিয়েছি। অথচ কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কেমন তা কোন আদালতের বিচারকের পছন্দসই কিনা তা বিচারের এক্তিয়ার বিচার আদালতেরও নাই। আসলে, কোন রাজনীতি ভাল না মন্দ তা একমাত্র রাজনৈতিক পাড়ায় বিচার হয় অথবা জনগণ বিচার করে। আদালত পাড়ায় কোন রাজনীতির বিচার করা যায় না, চলে না; বিচারকের সেই এক্তিয়ার কনষ্টিটিউশন দেয় না। তবে কোন রাজনীতি কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করলে অথবা বিরোধী হলে সেটা অন্য কথা। যেটা কোনভাবেই রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোন দলের রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দ করা না করার বিষয় নয়। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শ বা গঠনতন্ত্র রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনের সাথে সংঘাতপুর্ণ বা বিরোধ তৈরি করে এমন প্রমাণিত না হলেই হল। এরপর ঐ রাজনীতি আর রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোনভাবেই পছন্দ অপছন্দের বিষয় নয়, এক্তিয়ার নাই। তবে যে কোন নাগরিক ঐ রাজনীতিকে (আদালতে আইনীভাবে নয় কেবল রাজনৈতিক পাড়ায়) পছন্দ করতে পারেন, বিরোধীতাও করতে পারেন। অথচ আমরা খোদ রাষ্ট্রকেই রাজনৈতিক আদর্শ বিবেচনার ভয়ংকর ও অদ্ভুত কথা বলে অবলীলায় সরকারকেই অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা ঘটাতে দিচ্ছি শুধু না, এর পক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছি।

দুই

নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনায় সমাজের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ঘটছে। এটা তাৎপর্যপুর্ণ। আমার অভিজ্ঞতার জেলা আইনজীবী সমিতির ঐ সভাপতির মত আমরা অনেকেই এই সরকারের শুধু শেষের গত তিন বছরে অপহরণ গুম ও খুন করতে দিয়ে একটু একটু করে এমন দানব বানিয়েছি। যুক্তি তুলতে দেখেছি, যে পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাকে তো সরকারের হাতে অপহরণ গুম ও খুনই হতে হবে। এই বেহুঁশ ও আত্মঘাতি চিন্তা নিয়েই আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম। আমাদের অনেকের কাছে তা খুবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু নারায়নগঞ্জের ঘটনা কি আমাদের হুঁশ ফিরিয়েছে, ফেরাতে সক্ষম হবে? এটা নির্ণয় করবার সময় এখনও আসে নি। যদিও রাজনৈতিক আদর্শ নির্বিশেষ সবারই অন্তত এটুকু হুঁশ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে যে, খারাপ কিছু একটা ঘটে গিয়েছে, যার ফল আমরা ভোগ করছি। কেউ বলছেন রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ছে, রাষ্ট্রের একটা মারাত্মক ব্যাত্যয় ঘটে গেছে কোথাও ইত্যাদি।
রাষ্ট্র কোন না কোন আদর্শের ওপর দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকাও সেই আদর্শের ওপর নির্ভর করে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলা হয় রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে মূল বিষয় নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ওপরই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ নাগরিকেরা সবাই একই রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী এমন কখনই থাকেন না। থাকার কথাও না। এমনকি মোটা দাগে অনেককে একই রাজনৈতিক আদর্শের কোন দলে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্বও থাকে। কিভাবে একটি রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র তাদের মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের মীমাংসা করে তার ওপর নির্ভর করে সেই দল কিম্বা রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকা।
যে কোন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠি বা প্রবণতার অধিকার আছে তাদের মতাদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়বার। কিন্তু সেকাজে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই একমাত্র সেটা করা যেতে পারে। ক্ষুন্ন করে নয়। মোটা দাগে গণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলো অগণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলোর বিরুদ্ধে লড়েই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কারো নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করে গণতন্ত্র কায়েম করে না, বরং সকল নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অগণতান্ত্রিক শ্রেণির তৎপরতা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বিচার বিভাগ এই ক্ষেত্রে একটা মুখ্য ভূমিকায় থাকে। এটাই গণতন্ত্র নিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী করবার পথ। এর কোন শর্টকা্ট রাস্তা নাই। প্রতিপক্ষকে ‘নির্মূল’ করাই যদি নীতি হয়, তাহলে প্রতিপক্ষও পালটা নির্মূলের নীতিই গ্রহণ করবে। এটা মনে রাখতে হবে। এটা দেশকে টুকরা টুকরা করবার নীতি, গড়বার বা গঠন করবার নীতি হতে পারে না।
আবার যার যার প্রত্যেকের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম দেখতে চাইলে বাস্তবে সেটা অসংখ্য রাষ্ট্রে টুকরা হয়ে যাবে। উদার গণতন্ত্র ভাল কি মন্দ সেই তর্কে না গিয়ে বলা যায়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি চর্চার অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণ্ণ করে না। মূলত নাগরিকের জানমাল সুরক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র; আবার রাষ্ট্র নাগরিকের সুরক্ষা করতে ব্যর্থ হবে না, কিম্বা নিরাপত্তা ভঙ্গের কারণ হবে না -রাষ্ট্রের এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বিনিময়েই নাগরিকরা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মানে বা মানাটা তার স্বার্থের অনুকুল বলে মনে করে। নাগরিকরা ভিন্ন ভিন্ন বা নানান রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করতে পারবে এটা সেখানে স্বীকৃত থাকে। ফলে সরকার বা ক্ষমতাসীন কোন গোষ্ঠির পছন্দসই রাজনৈতিক মতাদর্শ না হলে রাষ্ট্র তাকে অপহরণ গুম ও খুন করতে পারবে এই বিকৃত চিন্তা কোন সমাজে বা রাষ্ট্রে এসে গেলে সেটা ভয়াবহ নৈরাজ্যরই ইঙ্গিত বহন করে। একালে যে রাষ্ট্র নাগরিক ও মানবিক অধিকার স্বীকার করে না তার পরিণতি কী দাঁড়ায়? এককথায় এর জবাব হল আজ হোক কাল হোক রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাবে। বাংলাদেশে যেটা এখন ক্রমশ ঘটছে। অর্থাৎ যারা এতদিন সরকারী দলের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধীদের অপহরণ গুম ও খুনের পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন তারাই জেনে না জেনে নিজদের আত্মঘাতি চিন্তার কারণে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার মারাত্মক বিপদ দাওয়াত দিয়ে ঘরে তুলেছেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। যে বিপদ ডেকে এনেছেন তাকে বিদায়ও দিতে পারছেন না। পারবেনও না।
অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্র মানেই সম্পত্তি বা সম্পত্তি-সম্পর্ক রক্ষার জন্য কাঙ্খিত কার্যকর ও সুপ্রিম প্রতিষ্ঠান। এখানে নাগরিক মানেই সম্পত্তির মালিক, সম্পত্তি আগলে বসে থাকা নাগরিক। এটা শুধু যে প্রচুর সম্পত্তির মালিক কেবল তার বেলায় নয়, যার এক কানি জমি বা ভিটেমাটি আছে এটা তার বেলায়ও সত্য। এমনকি যার কিছুই নাই, সেও সম্পত্তির মালিক। সেই শ্রম হচ্ছে তার শ্রম শক্তি। সেই শক্তি বাজারে বেচাকেনার অধিকার তার নিজের। তাকে দাসের মতো জোর করে কোথাও খাটানো যায় না। অর্থাৎ সেও কোন না কোন সম্পত্তি আগলে থাকা নাগরিক। আমরা বলি, রাষ্ট্রের দায়িত্ত্ব নাগরিকদের “জান ও মাল অথবা জানমাল” রক্ষা। অর্থাৎ কেবল জান বা জীবন সুরক্ষাই নিরাপত্তা নয়, একই সঙ্গে মাল বা সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথাও শুনি আমরা।
তাহলে রাষ্ট্র যদি কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী হয়ে বাকি সব ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিক অপহরণ গুম ও খুন জারি রাখে তাহলে সেই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র ও সরকার কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের “জান ও মাল” সুরক্ষা করবে, অন্যদের নয়, এটা হতে পারে না। অথচ এই নীতির ভিত্তিতেই হাসিনা সরকারের বিগত ছয় বছর বিশেষ করে শেষ তিন বছর চলছে। “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” অপহরণ গুম ও খুন চলছে নিরন্তর। যাদের কাছে মনে হয়েছে “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” এর রাজনীতি ও আদর্শ তার পছন্দসই নয় তারা এতে চুপ থেকেছে, খুশি হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে সমর্থন ও যুক্তি তুলেছে যে হাসিনার সরকারের কাজ হচ্ছে ভিন্ন মতাদর্শীদের নির্মূল করা। নাগরিকদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার নয় বরং রাজনৈতিক আদর্শ সবার আগে বিবেচনায় রেখে অপহরণ গুম ও খুন চালিয়ে যাওয়া। হাসিনা সরকারের সবল ও এখনও টিকে যাবার পিছনে এটাই প্রধান মতাদর্শগত ভিত্তি।

আসলেই কি হাসিনা “চেতনার” আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার বিলি করেছেন
নারায়ণগঞ্জের নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা নতুন এক উপাদান যুক্ত করেছে। “রাজনৈতিক আদর্শ” দিয়ে বিচার করলে নজরুল ইসলাম, তার সাথে খুন হওয়া আইনজীবি চন্দন সরকারসহ বাকি ছয় জন, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত অপর কাউন্সিলর নূর হোসেন, শামীম ওসমান এবং খোদ হাসিনা এদের সকলের একই “রাজনৈতিক আদর্শ” – সকলেই আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত। এমনকি র্যাদবের কমান্ডারসহ নারায়নগঞ্জ প্রশাসন সবাই একই “রাজনৈতিক আদর্শ” ধারণ করে কিম্বা তার পরোক্ষ সমর্থক। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এই নীতির ভিত্তিতেই তারা প্রশাসন পরিচালনা করেছে। এভাবেই এরা হাসিনার অপহরণ গুম ও খুনের রাজনীতিতে পরিচালিত হতে স্বচ্ছন্দবোধ করে গেছে।
তবে নারায়নগঞ্জের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে ঘটনা ভিন্ন ভাবে ঘটেছে। খুনাখুনি হয়েছে শেখ হাসিনার মতাদর্শের ব্যক্তিদের মধ্যে। এটা সুস্পষ্ট ভাবেই রাষ্ট্রের ভাঙ্গন ও সরকার পতনের লক্ষণ। কারন যে নীতির ভিত্তিতে প্রশাসন এতোদিন চলছিল, সেই নীতি প্রশাসনকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে, যা সরকারকেই এখন গ্রাস করতে উদ্যত। যারা ভেবেছিলেন জামাত-বিএনপি-হেফাজত এর রাজনৈতিক আদর্শ না করে আওয়ামি লীগের রাজনৈতিক আদর্শ করলেই জানমাল সুরক্ষিত ও নিশ্চিত থাকবে, হাসিনার সরকার তা নিশ্চিত করবে সেটা এখানে একেবারেই ঘটে নাই। যারা মারা গিয়েছেন তারা আওয়ামি লীগে নাম লিখিয়েও নিজের জানমাল রক্ষা করতে পারেনি। ওদিকে যারা হাসিনার এই দানব রাষ্ট্রের তান্ডব আচরণকে সরাসরি বা প্রচ্ছন্নে সমর্থন করে গেছেন, হয়ত ভেবেছেন তিনি রাজনৈতিক আদর্শ হিসাবে জামাত-বিএনপি-হেফাজত ধারণ করেন না ফলে তিনি সুরক্ষিত ও নিরাপদ তাদের এখন হঠাৎ মানবাধিকারের কথা মনে পড়েছে। তারা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করছেন। এরা শঙ্কিত যে নজরুল ইসলাম সহ সাতজন ‘অপর’ কেউ নয় আসলে ওটা তারা প্রত্যেকে, খোদ নিজেই। নজরুলের ভাগ্য সবারই আগামি ভাগ্য, অপেক্ষমান পরিণতি। ওটা নজরুল নয় নিজেরই খুড়ে রাখা আপন কবর। এই কবর তো দীর্ঘদিন ধরেই খুঁড়ছিলেন, তখন তাদের হুঁশ ছিলনা।
একই রাজনৈতিক আদর্শ আওয়ামি লীগে অন্তর্ভুক্ত থাকি আর নাই থাকি,- সম্পত্তি বা বিভিন্ন ধরণের স্বার্থ নিয়ে নিজের আপন ভাই, আত্মীয়, আপন বা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায় পার্টনার ইত্যাদিদের সাথে নানান স্বার্থ বিরোধ নিয়েই আমরা সমাজে থাকি। সমাজের মুখ্য প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অধীনে থাকি। কিন্তু এর মানে এই না যে স্বার্থ বিরোধের ফয়সালা আমরা নিজে অপরের উপর রুস্তমিতে করি বা কেউ আমার উপর করুক। রাষ্ট্র একছত্র রুস্তম হয়ে থাকবে, আর অভ্যন্তরে একে অন্যের উপর রুস্তমি করতে দিবে না এই শর্তে নাগরিক রাষ্ট্রের রুস্তমি মেনে নেয়। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ঘটনা প্রমাণ করেছে হাসিনার রাষ্ট্র এই শর্ত ভেঙ্গেছে। সে নূর হোসেনকে রুস্তমি করতে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, প্রশ্রয় দিয়েছে। প্রতিটা নাগরিক চায় রুস্তমি বলপ্রয়োগে খুনোখুনি প্রতিপক্ষকে নির্মুলের পথে না, স্বার্থবিরোধ ‘বিচার’ বা আইন কানুনের নিয়মে ফয়সালা হো্ক। নারায়নগঞ্জের ঘটনায় রাষ্ট্র শর্ত ভঙ্গ করায় সকলের মনে আশঙ্কা জাগিয়েছে যে হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আপন ভাই বা আপন দলের বিরোধী স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের হাতে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে যাওয়াটাও খুবই স্বাভাবিক। এককথায় রাষ্ট্র নাগরিক নির্বিশেষে জানমালের রক্ষক আর নয়। যে কোন সময় সরকার যে কোন গ্রুপকে সমর্থন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের জানমাল বিপন্ন করে ফেলতে পারে। এবং কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা সরকার আর্শিবাদ জানাবে তারও কোন দিশা নাই। এক্ষেত্রে নির্ণায়ক হচ্ছে কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপুর্ণ মনে করে। অর্থাৎ একমাত্র বিবেচনা হাসিনার নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে আমার সেই জেলার আইনজীবি বন্ধু যেভাবে বলছিলেন, কারও রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দসই লাগে কি না এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার জানমালের নিরাপত্তা দিবে এই ভিত্তিতেও হাসিনা তার দানব রাষ্ট্র সাজায় নি। হাসিনার কাছেও রাজনৈতিক আদর্শ গুরুত্বপুর্ণ কিছু নয়। আসলে তাঁর একমাত্র বিবেচনা নিজে দানব ক্ষমতায় টিকে থাকা।
নারায়নগঞ্জের ঘটনা কেন্দ্রিক গণক্ষোভকে আমি এভাবে ব্যাখ্যা করছি ঠিকই। কিন্তু গণমন নিয়ে আমার এই অনুমান কতটা সঠিক সত্য নাকি একেবারেই সাময়িক ও বিচ্ছিন্ন তা জানা যাবে এই ঘটনার শেষ হয় কি করে তা দেখতে পাবার পর। এটা হতেও পারে আশঙ্কিত নাগরিকেরা তাদের ক্ষোভ বিক্ষোভকে কোন পরিণতির দিকে নিতে অবিচল থাকলেন না; আর ব্যাপারটা একটা সাময়িক ক্ষোভ হিসাবে থেকেই চাপা পড়ে গেল। সেটা যাই হোক, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সেই কমিউনিষ্ট নেতা যেভাবে রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার জানমালের রক্ষার পক্ষে যুক্তি তুলে হাসিনার রাষ্টকে দানব হতে পুষ্ট করছিলেন তার সেই আকাঙ্খার অন্তত একটা পরিণতি হল এই সাত অপহরণ গুম ও খুন।
উপরের কথাগুলো বর্তমানের হাসিনার সরকারকে সামনে রেখে বলছি মানে এই নয় এটা কেবল আওয়ামি লীগ বা হাসিনার জন্য সত্য। অপহরণ গুম ও খুন কমবেশি স্বাধীনতার পর থেকেই সবসময়ই বজায় ছিল। কিন্তু এর মাত্রার ভিন্নতার দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। আজকে এই কথাগুলো আগামি যে কোন সরকার, বিএনপি অথবা জামাতের অথবা অন্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য এবং সত্য। এব্যাপারে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ সন্দেহ নাই। তথাকথিত রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণের রাষ্ট্র এটা যে কোন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বেলায়ই সমান বিপদজনক। আমাদের কি এই শিক্ষা যথেষ্ট হয়েছে? আগামির ভরসায়!

Advertisements

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২), দ্বিতীয় কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২)

ভারতের নির্বাচন ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বদলের সম্ভাবনা

গৌতম দাস

ভারতে নতুন নির্বাচন আসন্ন। দুমাস ধরে নয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে তা ফলাফল ঘোষণাসহ শেষ হবে মে মাসের ১৬ তারিখে। এপর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে একের পর এক প্রকাশিত একজিট পোলগুলো বলছে, ৫৪৩ আসনের আইনসভায় (লোকসভা) সরকার গড়তে দরকার ২৭২ আসন। কিন্তু কংগ্রেস ও তার জোট ইউপিএ মিলিয়ে তার ভাগ্যে জুটার সম্ভাবনা মাত্র ৯৮-১০২ আসন, অর্থাৎ ১০০ আশেপাশে, এর বেশি নয়। ফলে ইউপিএ এর সরকার যে হচ্ছে না এখন পর্যন্ত সবগুলো এক্সিট পোলই সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সোজা মানে আমেরিকার সাথে (কংগ্রেস দলসহ) ভারত সরকারের গত সাত বছরের যে সখ্যতা ও সর্বশেষ বিরোধের সম্পর্ক – তা কোনভাবেই আর আগের জায়গায় থাকছে না, এতে পালাবদল আসন্ন। বাংলাদেশে একমাত্র ভারতের সমর্থনের হাসিনার সরকার, এর প্রধান খুটি যা, বাইরের সমর্থনের দিক থেকে তা এই প্রথম ভীষণ নড়বড়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে শুরু করেছে। তাহলে কি বিজেপির নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসছে? না তাও একেবারে নিশ্চিত করতে পারেনি কোন একজিট পোল। সবগুলো একজিট পোলের ফলাফলে দেখা গিয়েছে বিজেপি জোটে ২৩৩ আসনের নিচে থেকেছে এই পর্যন্ত। [এখানে দেখুন,] আবার ১৬ তারিখের পর আসল ফলাফলে কোন কারণে এটাও যদি না হয় তবে ১৯৯৬ সালের দেবগৌড়ের সরকারের মত আঞ্চলিক দলগুলোর জোট ক্ষমতায় আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারতে এক দুর্বল সরকার মানে দুর্বল রাজনৈতিক কর্তৃত্ত্বের সরকার গঠিত হবে সন্দেহ নাই। এসব দিকে নজর রেখে আমেরিকার সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের অঞ্চলের ডেস্কের নিশা দেশাই সপ্তাহ তিনেক আগে বিজেপির মোদির সাথে বিস্তারিত আলাপ করতে এসেছিলেন। (যদিও সফরের প্রকাশ্য মূল এজেন্ডা ছিল ভারতের ট্রেড বিষয়ক বিরোধগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে কথা বলা।) ঘটনা শেষ পর্যন্ত যাই দাঁড়াক, এবার আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যে ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর সুবিধা পাবে, পশ্চিমা স্বার্থের সাথে সমন্বয় করে হাজির হতে সুযোগ পাবে তা বলাই বাহুল্য। অন্ততপক্ষে আমেরিকা ও ভারত উভয়ের বাংলাদেশ নীতি নতুন ভারসাম্য পরিস্থিতি নতুন করে রচিত করার সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। কংগ্রেস সরকারের সাথে মুখোমুখি বিরোধে জড়িয়ে তা যতটা সংঘাতপুর্ণ বা অকেজো হয়ে আছে তা নতুন রাস্তা নিবে। কারণ ভারতের এই নির্বাচনের ফলাফলে যে কোন অ-কংগ্রেসী সরকার গঠিত হলে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে গত তিন-চার বছরে যুক্ত হওয়া নতুন বাস্তবতা, নতুন করে হাজির হওয়া উপাদানগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভারসাম্যে রচিত হবে সন্দেহ নাই। উভয় রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতির কমন ভিত্তি খুজে বের করা ও রচনা হবে। অন্তত কংগ্রেস সরকারের মত “যেকোনভাবেই হোক আমার হাসিনা সরকারকেই চাই” এই জবরদস্তিমূলক অবস্থানে আর থাকছে না। এটা অবস্থাদৃষ্টে পরিস্থিতি যেদিকে বিকশিত ও মোচড় নিচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে এক অনুমান মাত্র। তবে একেবারেই হাওয়াই অনুমান নয়। এই অনুমানের পিছনের একটা বড় কারণ, মোদি এবং এবারের মোদির বিজেপির নীতি (তুলনায় ওল্ড হাগার্ড আদবানির বিজেপি নয়)।

মোদির বিজেপি কেমন নীতি ক্ষমতা নিয়ে হাজির হতে পারে
বিজেপি “সেকুলার” নয় অথবা মুসলমান-বিদ্বেষী এই অভিযোগ মোদি এই নির্বাচনে সিরিয়াস আমলে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। মোদি ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন “বল্লভ ভাই প্যাটেলের মত তিনিও সেকুলার”। [দেখুন,] প্যাটেল কে ছিলেন? স্বাধীন ভারতে ১৯৪৭ এর আগষ্টের পর নেহেরুর প্রথম সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন প্যাটেল। এই “প্যাটেলের সেকুলার” কথার অর্থ তাতপর্য কি তা নিয়ে আলাদা কোথাও বিস্তারে আলোচনা করতে হবে। আপাতত সংক্ষেপে – কংগ্রেস ও বিজেপি এবারের নির্বাচনে কমন যে ইস্যুতে বিতর্কে লিপ্ত তা হল, ভারতের অখন্ডতা। সব জনগোষ্ঠীকে এক ভারতে ধরে রাখা এই সুত্রে অখন্ডতা আলাপ। আর এক ‘সেকুলার ভারত” এটা ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য নাকি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। এই হলো অখন্ডতার আলাপের মধ্যে সেকুলার শব্দটা ঢুকে পড়ার সম্পর্ক সুত্র। বুঝাই যাচ্ছে এসব কথাবার্তাগুলো আসলে সমস্যার মুল এড়িয়ে শব্দের ফুলঝরি বা রেঠরিক। যেভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন করে আরও ভাগ টুকরা করে নতুন নতুন রাজ্য গঠনের দাবী বেড়েই চলেছে (এক পশ্চিমবঙ্গকেই আরও দুই তরফে আরও নতুন দুই ভাগে ভাগ করার দাবী আছে) এই ফেনোমেনার মুল তাতপর্য হল, ক্ষুদ্র (উত্তরপুর্ব ভারত) অথবা বড় (দক্ষিণ ভারত) ধরনের জনগোষ্ঠিগুলোকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা। এককথায় বললে এগুলো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপ্রতিনিধিত্ত্ব করে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। প্রায়ই “বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন” নাম দিয়ে এগুলোকেই নেতিবাচক লক্ষণ বা ফেনোমেনা বলে এমন বয়ানে চিনানোর চেষ্টা হতে দেখি আমরা। এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথাও তৈরি আছে যার হদিস নাগাল করার জন্য পাবার জন্য এগুলো মূলত ক্ষমতায় উপযুক্ত অংশীদারিত্ত্ব না পাওয়া অথবা শ্রুত হবার জন্য বঞ্চিত জনগোষ্ঠির আর্তনাদ। নিজের উপর এই ফেটিস বা ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দানবীয় শাসন এরা টের পায় কিন্তু সেক্ষমতাকে ধরতে পারে না, ভাগ পায় না। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় সে অপ্রতিনিধিত্বশীল থেকে যায়। কিন্তু কথার মারপ্যাচে ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্বশীলতার সব সমস্যাগুলোর সমাধান যেনবা সেকুলারিজম – এমন এক ইঙ্গিত দিয়ে সমস্যাকে ঝুলিয়ে বা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায়। ফলে “সেকুলারিজম” বলে বয়ানের আড়ালে বাকচাতুরি রেঠরিকে কংগ্রেস-বিজেপির মিছা লড়াই চলতে থাকে। বিগত ত্রিশ বছরে ধরে একনাগাড়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়ে আসছে কেবল আঞ্চলিক দলের সমর্থনে, কোয়ালিশনে। সাধারণভাবে কোয়ালিশন সরকার মানেই তা খারাপ লক্ষণ তা বলা হচ্ছে না। খেয়াল করতে হবে এটা বিজেপি বা কংগ্রেসের মত তথাকথিত সর্বভারতীয় দলগুলোর পরস্পরের কোয়ালিশন নয়। বরং বিজেপি বা কংগ্রেসের সাথে “আঞ্চলিক দলের” কোয়ালিশন। এটাই ভারতের অখন্ডতা সমস্যার মূল দিক, মৌলিক বিপদ। কংগ্রেস বা বিজেপি নিজেদের সর্বভারতীয় দল দাবী করে আসলেও তাই এর অন্তর্সারশুণ্যতা এখানেই। পুরা দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক দলের প্রভাব একচেটিয়া, একনাগাড়ে এবং বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরের। “আঞ্চলিক দল” এই ফেনোমেনোটার অর্থ তাতপর্য কি? এককথায় বললে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীভুত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। নেহেরুর ভারত রাষ্ট্র গঠনতান্ত্রিকভাবে ১৯৪৮ সালের শুরু থেকেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত ও কুক্ষিগত করে রাখতে হবে, একমাত্র তাহলেই অখন্ড ভারত রাখা যাবে, বিশাল ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে – এই নীতিতে রাষ্ট্র গঠন করে রাখা হয়েছে। অথচ নানান আঞ্চলিক দলের উত্থান ফেনোমেনো চোখে আঙুল দিয়ে বারবার বলছে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার রাষ্ট্র নয় ফেডারল ধরনের রাষ্ট্রক্ষমতাই এর একমাত্র সমাধান। এই প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নিতে হবে কখনও। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ যেটা – বাইরের পড়শি রাষ্ট্র, “সীমাপাড়-কী আতঙ্কবাদ” এগুলোই নাকি ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যা তৈরি করছে, এগুলো নাকি বাইরের তৈরি, মুসলমানদের তৈরি ফলে ‘সেকুলারিজম’ এর সমাধান এমন মুলা ঝুলিয়ে মূল সমস্যা ‘ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীলতা” এদিকটাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা তৈরির পথ চালু রাখা হয়েছে। আর এব্যাপারে কংগ্রেস ও বিজেপির মৌলিক মিল আছে, যদিও সমাধান প্রশ্নে অবস্থান ভিন্নতা আছে। যেমন, বিজেপি এপর্যন্ত ব্যাখ্যা করে এসেছে এর সমাধান “হিন্দু জাতিয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্য” আর কংগ্রেস দাবী করেছে সেকুলারিজমের ঐক্য এই বয়ানের আড়ালে আর এক ব্রান্ডের হিন্দু জাতিয়তাবাদ। উভয় দলের মিলটা হল কেউই রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতা গঠনের ভিতরেই যে সমস্যা সেদিকটা নিয়ে সরাসরি আলাপ তুলতে সাহস রাখে না। সমস্যাটা নাকি রাষ্ট্রের বাইরে থেকে আসছে এই দাবির ব্যাপারে উভয়ে একমত। এরা অস্বীকার করতে চায় সমস্যা রাষ্ট্রের বাইরে থেকে তৈরি করা, উস্কানি দিবার চেষ্টা থাকতেই পারে থাকবে কিন্তু এটা তখনই ইস্যু হবে, খচখচে কাঁটা হয়ে উঠবে যদি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা গঠনে সমস্যা থাকে, ক্ষমতা অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকে। পঞ্চাশ রাজ্যের ফেডারল রাষ্ট্র আমেরিকার অখন্ডতাকে কি বাইরের শত্রু রাষ্ট্রের উস্কানি দিয়ে ভেঙ্গে দিবার মত শত্রু রাষ্ট্রের অভাব আছে, না কি কোন কালে ছিল? কিন্তু কখনই আমেরিকা তা অনুভব করে নাই কেন?
বড় ভুগোল, বড় জনসংখ্যা, ভিতরে অনেক ধরনের আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত বিভক্তি-চিহ্ন এবং বড় অর্থনীতি ইত্যাদি পরিস্থিতিতে ঐ দেশের জন্য একে এক রাষ্ট্রে সংগঠিত করতে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রক্ষমতা গাঠনিক দিক থেকে দেখলে এপর্যন্ত সারা দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভাল রাষ্ট্র অভিজ্ঞতা হলো আমেরিকান রাষ্ট্র, ফেডারল ভিত্তির রাষ্ট্র। ফেডারল ধরণের রাষ্ট্র কথাটা বিস্তার করতে পারলে ভাল হত। প্রসঙ্গ অন্যদিকে চলে যাওয়া এড়াতে সংক্ষেপে কেবল বলব, একে বুঝবার জন্য আইন পরিষদ ( আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদ বা আমাদের সংসদ) থাকার পরও কোন আইন সংসদে পাশ হবার পর তা আবার সিনেটেও পাশ হতে হবে, কারা এই সিনেট গঠন করেছে এদিকটাসহ ফেডারল রাষ্ট্রে ক্ষমতা গঠন নীতির দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। অনেকে তর্ক তুলতে পারেন ভারতে সিনেট নামে না থাকলেও রাজ্যসভা নামে তো কিছু আছে। এর জবাব হল, ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র ভুমিকা ২৭২ জন লোকসভার (সংসদ) সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু ফেডারল আমেরিকা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল আইনসভা (প্রতিনিধি পরিষদ) কেন্দ্রিক কোন একটা ক্ষমতা-কেন্দ্র নাই, ফলে সেখানে কেন্দ্রীভুতও নয়। তাই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতাগঠন প্রক্রিয়া ও কাঠামো এক ভুতুড়ে অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাই তৈরি করবে সবসময়, এপর্যন্ত করে এসেছে। ফলে একই মাত্রায় তা বিরোধ সংঘাতে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে পড়ার বিপদ মাথায় নিয়ে ঘুরবে। এর আদি পাপ ১৯৪৭ সালে অখন্ড ভারত গঠন কাঠামোর মধ্যে যেখানে মুল যে বিষয়ে জোর দেয়া হয়ে হয়েছিল তা হলো নির্ভেজাল একছত্র “বলপ্রয়োগ”। আমাদের অনুমান থাকতে পারে যে বৃটিশ ভারত বোধহয় অখন্ড কিছু একটা ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন বৃটিশরা ছেড়ে যায় তখনও ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ৫০০ রাজার রাজ্যকে ইন্টিগ্রেট করে অখন্ড ভারত খাড়া করার বিপদ নেহেরুকে মোকাবিলা করতে হয়। এর মুল নীতি ছিল বলপ্রয়োগ; স্ব-ইচ্ছার ইউনিয়নও নয়, ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বশীলতার প্রশ্ন সেখানে নির্ধারক নয়। নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্ত্বে গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেল ছিলেন ওই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থাৎ বলপ্রয়োগ ঘটাবার কাজটা তাকেই করতে হয়েছিল। একটা উদাহরণ দেই। যেমন, এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ যা হায়দ্রাবাদকে রাজধানী করে পুনগঠিত হয় ১৯৪৭ সালের পরে। কিন্তু কেবল ঐ হায়দ্রাবাদ আসলে ছিল এক রাজার রাজ্য। এই রাজ্যের নিজাম (রাজা) বৃটিশ করদ দেয়া শর্তে স্বাধীন রাজার রাজ্য ছিল। হায়দ্রাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে অখন্ড ভারত বানাতে গিয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে যেতে হয়েছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলকে। বলপ্রয়োগ আর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এই ছিল তর্কের বিষয় – এনিয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এতকিছু শব্দ থাকতে ‘কমিউনিষ্ট’ কেন? নেহেরুকে যেখানে ‘প্রগতিশীলেরা’ কমিউনিষ্ট না হলেও সমাজতন্ত্রী বলেই চিত্রিত করতে পছন্দ করে দেখা যায়!

এর সংক্ষিপ্ত জবাব ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লবের পর রাষ্ট্র গঠনে লেনিনকে নানান জাতিগোষ্ঠিকে (যেগুলো আসলে ছিল রাশিয়া ও এর পড়শি জার সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা নানাঞ্জনগোষ্ঠি) ঐ রাষ্ট্রে ইন্ট্রিগ্রেশেন যা মুলত ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা তা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। নেহেরুর মন্ত্রী প্যাটেলের মতই লেনিনের মন্ত্রী (রুশ ভাষায় commiserate বা মন্ত্রণালয়ের কমিসার বলা হত) ছিলেন জর্জিয়ান জোসেফ ষ্টালিন। ষ্টালিনীয় নির্মম বলপ্রয়োগ তা ঘটানো হয়েছিল। [যদিও লেনিনের নীতিগত অবস্থান ছিল, জনগোষ্টিগত উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিরোধ সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সমর্থন করতে হবে। কিন্তু এটা নীতিগত। ষ্টালিনের হাতে বাস্তবে প্রয়োগে এটা যা দাড়িয়েছিল এর সাথে লেনিনের নীতির আর কোন সামঞ্জস্য খুজে পাওয়া যায় নাই। বিপ্লব ঘটেছিল কেবল রাশিয়ায়। কিন্তু একছত্র ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে দানবীয় করতে রাশিয়ার তথাকথিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পড়শি পর পড়শি রাষ্ট্র বা অঞ্চল জোড়া দিতে দিতে সীমান্ত বাড়িয়ে সেই রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন নাম ধারণ করে। এই পড়শি জোড়া দেয়া ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল, একই সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে তবে সাইজ সীমান্ত বাড়িয়ে, থামে নাই। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে ছত্রাখান হয়ে পড়ার পর এবার এতদিন জোর করে দাবিয়ে রাখা জাতিগত প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা ফেটে প্রকাশিত হয়তে শুরু করে। উলটা পথ, আবার ম্যাপ সীমান্ত আঁকা। ষ্টালিনের শখের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার তা ছোট্ট রাশিয়া হয়ে যায়। আলাদা দুই রাষ্ট্র হয়ে ষ্টালিনের জর্জিয়া লেনিনের রাশিয়ার সাথে এখন সীমান্ত যুদ্ধে লিপ্ত। কসোভো, বসনিয়া এবং এমনকি হাল আমলের ইউক্রেন বা ক্রিমিয়া এভাবে প্রতিটা সমস্যার আদি গোড়া একটাই -ভুতুড়ে রাষ্ট্রে “বলপ্রয়োগে ইন্ট্রিগেশন” -জবরদস্তি। আমেরিকা ফেডারেল রাষ্ট্রের জন্ম ১৭৭৬ সালে। কিন্তু কেউই রাষ্ট্রগঠন ইতিহাসের এই গুরুত্বপুর্ণ অভিজ্ঞতাকে আমল করে নাই; না সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভারত।] সেই সুত্রে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের সেকুলারিজমের বিপরীতে বিজেপির মোদির নির্বাচনী কালার ‘প্যাটেলের সেকুলারিজম’ কথার অর্থ তাতপর্য এখন থেকে পাওয়া যেতে পারে। আকার ইঙ্গিত রেঠরিক বাকচাতুরি যে যতই করুক মুল কথা ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডিয়া বা অখন্ড ভারত ধরে রাখা। কিন্তু কি ভিত্তিতে সেটাই মূল প্রশ্ন। অথচ এটাই ভারত রাষ্ট্রের মাথার উপর সবসময় টিকটিক করা বিখন্ড হয়ে পড়ার বিপদ – এটাই নানান ইঙ্গিতে নানান ছলে ইস্যু হিসাবে এই নির্বাচনে হাজির – বিজেপি ও কংগ্রেস রেঠরিক নানা কথার টোপড়ের আড়ালে এর স্বীকৃতি দিচ্ছে।

কিন্তু এবারের নির্বাচনের আর একটা দিক, ভারতের মুসলমান ভোটাররা আর একটা ফ্যাক্টর হয়ে হাজির, এই অর্থে যে মুসলমানেরা আর ‘সেকুলার ভারত’ এমন কথার লোভে কংগ্রেস বা কমিউনিষ্টদের কনষ্টিটুয়েন্সি হয়ে থাকতে চাইছে না; এটা পরিস্কার। মোদি ও তার দল ইতোমধ্যে পাবলিক মিটিংয়ে মুসলমানদের কাছে শুধু মাফ চান নাই, শুধু একবারের মত সুযোগ যেন তারা দেয় এই আকুতি জানিয়েছেন। [“apologize to you by bowing our heads” দেখুন,]। পশ্চিমবঙ্গের মমতার মুসলিম কনষ্টিটুয়েন্সী হাসিল করার প্রচেষ্টাও প্রায় একই রকম।

মোদির নীতি ক্ষমতার সম্ভাব্য ফোকাস
মোদি বা বিজেপি প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে দিকটা নিয়ে কথা বলব সেটা আলোচনার সুত্রে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, একনাগাড়ে পরপর তিন টার্মের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। সারা ভারতে মূলত ব্যবসায়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি হিসাবে গুজরাতিদের একটা একক পরিচয় আছে। মোদি টাইটেলটাও এর সূচক। যদিও গত কয়েক বছরে তার পরিচয় ছাপিয়ে উঠেছে দাঙ্গায় মুসলমান হত্যার নেতা-লোক হিসাবে। কিন্তু একইসাথে তার গুজরাট মানে রাইজিং ইকোনমির গুজরাট। আর একাজে সে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে জাপান থেকে। তাঁর খাতির, সম্পর্ক বেশির ভাগটাই জাপানের পলিটিক্যাল ও বিজনেস এলিটদের সাথে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সে সরাসরি দাওয়াত দিয়ে গুজরাটে এনে সম্বর্ধনা দিয়েছে। এদিক থেকে যদি দেখি তবে গ্লোবাল পরিসরে তার রাজনীতিবোধটাকে বলা যায়, মুলত বিজনেস ওরিয়েন্টেড পলিটিক্স। শুধু জাপান নয়, একই সাথে চিন, জার্মান, ফ্রান্স, আমেরিকার সাথে মোদির গভীর সম্পর্কের দিকটা বুঝার জন্য এই আর্টিকেলটা মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। আবার, আসামের নির্বাচনী বক্তৃতায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আর চীন সীমান্তে অরুণাচলের নির্বাচনী বক্তৃতায় চীন প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন যা যুদ্ধবাজ বাজপাখী অথবা সাম্প্রদায়িক মনে হলেও তা রেঠরিক হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কারণ তিনি কিছুই না বললে সমালোচকরা সেটা নিয়েই কথা যাতে না তুলতে পারে তারই ব্যবস্থা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। [দেখুন,]
আবার আমেরিকার বিদেশনীতি বিষয়ক গুরুত্বপুর্ণ জার্ণাল foreignpolicy তে এক বিশেষ নিবন্ধে [দেখুন Decoding Modi’s Foreign Policy] দেখা যাচ্ছে মোদির নীতির ফোকাসের ব্যাপারটা তাদেরও নজরে এসেছে। বলছে, Despite his roots in a nationalistic, right wing BJP, the highlight of Modi’s foreign policy will likely be economics, and not security. While taking a rhetorical hard line on India’s national interests suits his political ideology, Modi appears to understand that as prime minister he will need to prioritize boosting trade and fixing India’s economy. নিজের দায়িত্বে বাংলায় বললেঃ “এক ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভিতর মোদির শিকড় পোতা থাকলেও তাঁর বিদেশনীতির বৈশিষ্ট হবে খুব সম্ভবত নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি। ভারতের জাতীয় স্বার্থ বিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে খাপখায় এমন হার্ডলাইনের রেঠরিক ঠাটবাট বাকচাতুরি তার আছে। কিন্তু মোদি বুঝে একজন প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে তাকে তাঁর কোন চাহিদাটা প্রধান করতে হবে আর সে প্রাধান্যের বিষয়টা হল, বাণিজ্যকে চাঙ্গা করা, ভারতের অর্থনীতিতে বাধা ও সমস্যাগুলোকে সমাধান করা”।
এখানেই বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির থেকে বিজেপির মোদির বড় নীতিগত পার্থক্য। যদিও মোদির সম্ভাব্য ভারতের জন্য কঠিন কাজটা রয়ে গেছে। সেটা হল, ভারতের সাথে আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ককে নিজের স্বার্থের দিক আমলে রেখে একটা ফাইন ব্যালেন্সের উপর দাঁড় করানো। এটা ঠিক আমেরিকা ও চীন এদের একের বিরুদ্ধে অন্যটাকে ব্যবহারও নয়, আবার কোনটাকে বাদ দিয়ে নয়। কংগ্রেসের ভারত যেটা করতে শোচণীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। [অবশ্য আমেরিকার উস্কানি লোভ দেখানিও ছিল।] এটাই এই অঞ্চলের আমাদের সবার জন্য সঠিক এক পদক্ষেপ হবে।
সংক্ষেপে একটা কথা বলে রাখি। বিজেপির পুরানা রাজনৈতিক লাইন – মুসলমান বিদ্বেষ কেন্দ্রিক হিন্দু জাতিয়তাবাদ – এর প্রতীকী নেতা হয়ে থেকে আছেন আদবানি, সাথে আছেন সুষমা স্বরাজ প্রমুখ। নরেন্দ্র মোদির ব্যবসা বা অর্থনীতি ফোকাসের লাইন এটাই আন্ত-পার্টি সংগ্রাম হিসাবে আদবানিকে পরাজিত করে ‘বিজেপি জিতলে মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন’ হিসাবে হাজির হয়েছে। এটা কেবল ফোকাস বা প্রাইয়োরিটি সরিয়ে আনা। এতটুকুওই বদল। তবু এই বদলটাই তাতপর্যপুর্ণ। বিশেষত বাংলাদেশের দিক থেকে। কারণ এটা কংগ্রেসের মত তথাকথিত নিরাপত্তা বিষয়ক যুদ্ধবাজ লাইনে ফোকাস নয়। তবে কোন কারণে মোদি সরকার গঠন পর্যন্ত পৌছাতে না পারলে বর্তমানে কোনঠাসা আদবানিরা পুরানা ফোকাসের বিজেপি আবার জেগে উঠবে বলে মনে হয়।


সবমিলিয়ে শেষ কথাটা হলো, ব্যবসায়ী মোদির সরকার যদি গঠন হতে সুযোগ পায় তবে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। বর্তমান কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতির ফোকাসটা হলো, সিকুইরিটি মানে তথাকথিত নিরাপত্তা। এককথায় বললে, এটা আসলে “মুই কি হনু রে” ধরনের পথে আশেপাশের সবাইকে দাবড়ে বেরিয়ে নিজের প্রিভিলেজ সুবিধাটা নিশ্চিত ও হাসিল করতে চাওয়া। বিপরীতে তুলনা করে বললে, মোদির লক্ষ্য ব্যবসা ও অর্থনীতিতে এক রাইজিং ইন্ডিয়া হাজির করা আর সেকাজে দলের পুরান ইমেজ পরিচয় মুসলমান বিদ্বেষী এক বিজেপি এই পরিচয়কে ফিকে করে ফেলা। একমাত্র একাজ করেই সে ভোটারদের মনে এই নতুন বিজেপির পরিচয়কে স্থায়ীত্ব দিতে চায়। পুরানো পরিচয়গুলোকে যেন ছাপিয়ে উঠে রাইজিং ইন্ডিয়ার মোদি ও বিজেপি। এমন এক ইঙ্গিত মোদি হাজির রেখে চলেছেন। সেটা শেষ পর্যন্ত কোথায় কি হয় সেটা অবশ্যই হতে দেখবার বিষয়, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদি তাঁর ইঙ্গিত সত্যি ও অর্থপুর্ণ হয়, সে প্রেক্ষিত মাথায় রেখেই বলেছি সেক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। তবে আমাদের জন্য মূল কথা হল, ঘটনা যেদিকেই যাক, বটম লাইন হল, সরকার বদলের সাথে বর্তমান ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে বদল আসছেই। তাতে অন্তত বাংলাদেশে ফ্যাসিজমের ভিত আলগা হচ্ছে। বাইরের গুরুত্বপুর্ণ সমর্থন নাই হয়ে যাচ্ছে, এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। “আমার হাসিনা সরকারই চাই” আগামি ভারত সরকারের এমন অবস্থান আর থাকছে না।

পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি
তৃতীয় কিস্তি

মার্কিন বিবৃতি: বাংলাদেশের প্রতি ভারত ও মার্কিন অবস্থানের ভিন্নতা

মার্কিন বিবৃতি: বাংলাদেশের প্রতি ভারত ও মার্কিন অবস্থানের ভিন্নতা

গৌতম দাস

প্রসঙ্গ একঃ আমেরিকা ভারতের কথা শুনল না

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে স্থানীয় মিডিয়ার জন্য একটা প্রেস রিলিজ পাঠানো হয়েছে ০৯ নভেম্বর সন্ধ্যায়। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে ইংরাজীর সাথে বাংলাতেও বিবৃতিটি দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টালে খবরটি ছাপা হয়েছে, প্রিন্ট পত্রিকাতেও এসেছে। প্রথম আলোর ১০ নভেম্বর প্রিন্ট কিম্বা অনলাইন সংস্করণেও তাদের নিজেদের করা বাংলা অনুবাদ দেয়া আছে।আমি সেটাই এখানে ব্যবহার করব।ওর কিছু অংশ এরকমঃ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা দুই দলকে সহিংসতা এড়িয়ে চলতে বলছি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সহিংসতার স্থান নেই এবং তা গ্রহণযোগ্যও নয়।’  বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অবশ্যই এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ থাকতে হবে যেখানে সব দল অবাধে ও শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করতে পারে। সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নির্বাচনের দিনক্ষণ খুব দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। তাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সমাধানের পথ খুঁজে নিতে প্রধান দলগুলোকে অবশ্যই ইতিবাচক আলোচনায় যুক্ত হওয়া উচিত

সাদা চোখে  এই বিবৃতি তাৎপর্যহীন রুটিন কূটনৈতিক বক্তব্য মনে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের ঘটমান রাজনীতির দিক থেকে এর তাৎপর্য বেশ গভীর। শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য হিসাবে নয়, এটা প্রকাশ্য বা পাবলিক স্টেটমেন্ট হবার কারণে। এই বিবৃতি কেন্দ্র করে আমাদের কিছু নিরীক্ষণ এখানে পেশ করছি।

গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশ বিষয়ে আমেরিকা ও ভারতের মতভিন্নতা বিভিন্ন খবর ও বিশ্লেষণে চারদিকে ছেয়ে আছে। এটা মনে করার কারণ নাই যে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিমুখ একমাত্র দিল্লী কিম্বা ওয়াশিংটন ঠিক করবে। পরাশক্তি যতই চেষ্টা করুক তারা কখনই সব কিছুর নির্ধারক নয়। এটা অসম্ভব। আমাদের ভাগ্য বিদেশীরা ঠিক করে দেয় এই প্রপাগাণ্ডা তারাই করে যারা চায় না অথবা আগেই হাল ছেড়ে দিতে চায় কিছু না করে যে, জনগণ তাদের নিজেদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গা থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় হোক। এই ধরণের প্রপাগাণ্ডা রাজনীতিতে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জায়গা থেকে সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকাকে ম্লান করে দেওয়া বা নিরুৎসাহিত করবারই প্রচেষ্টা। রাজনীতির বর্তমান অভিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনও বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারক হবে। তবে জনগণকে সঠিক তথ্য ও সম্ভাব্য বিশ্লেষণ ধরিয়ে দেওয়া এখনকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার কুটনৈতিক সম্পাদক  ইন্দ্রাণী বাগচীর ৩০ অক্টোবরের রিপোর্ট, আর পরবর্তিতে তা নিয়ে একই পত্রিকায় সুবীর ভৌমিকের ১ নভেম্বরের কলামের কথা মার্কিন বিবৃতিটি বিশ্লেষণের আগে স্মরণ করা যেতে পারে। ইন্দ্রাণী বাগচী তাঁর লেখার শিরোনামেই বাংলাদেশ সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণের প্রশ্নে মার্কিন ও ভারতের মতভিন্নতার কথা বলেছেন। (India, US at odd over Bangladesh policy – ইন্ডিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নীতিতে দুই মেরুতে)। সুবীর ভৌমিক বলছেন, বাংলাদেশ এক সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে আছে, ভারতকে তাদের বন্ধুপ্রতিম সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য যা কিছু করার দরকার সব করতে হবে (Bangladesh is in a violent phase and India must do all it can to see a friendly regime return to power)এরপর রয়েছে বীণা সিক্রির বিবিসিতে সাক্ষাৎকারআর এছাড়া গত পুরা সপ্তাহ ধরে রয়েছে প্রথম আলোর এই বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনের রিপোর্ট আর মিজানুর রহমান খানের নিয়মিত কলাম এভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ নীতির প্রশ্নে দিল্লী ওয়াশিংটনের টানাপড়েনের খবর। খবরটা মিডিয়াতে তাতিয়ে ওঠা ও দীর্ঘায়িত হবার মুল কারণ হাসিনাকে ক্ষমতার রাখবার জন্য ভারতীয় খায়েস ও প্রচেষ্টা – তা নয়। বরং দিল্লীর আশংকা যে, মতভিন্নতার ফলে ভারতের খায়েসকে (ভারতের তিন চাহিদাপত্র বলে আগের লেখা দেখুন) উপেক্ষা করে আমেরিকা বাংলাদেশে নিজেদের স্বাধীন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের মধ্যে ভারতপন্থীদের দাপট অজানা কিছু নয়। তারা এর বিপদ ভালই বুঝে। তারা এতদিন মার্কিন ছাতার তলে আড়ালে দিল্লীর স্বার্থ রক্ষা করে চলত। সেই ছাতা সরে গেলে ইচ্ছামত দিল্লীর স্বার্থ ও এজেন্সি রক্ষা করে চলা বাংলাদেশে তাদের জন্য কঠিনই হবে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের আওয়ামি সংশ্লিষ্টতাকেও তারা অসাম্প্রদায়িক”, “লিবারেলরাজনীতির দোহাই দিয়ে ঢেকে ঢুকে রাখতে পারত, সেটাও কঠিন হয়ে যেতে পারে ভেবে ব্যাপারটাকে একয়দিন মোটামুটি তাতিয়েই রেখেছে।

আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক মতভিন্নতা চলছে কূটনৈতিক ভাষায়।আমেরিকান অবস্থানের প্রকাশিত ভাষার সুরটা হচ্ছে, সবাইকে নিয়ে (ইনক্লুসিভ)মুক্ত, সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। বিপরীতে ভারতীয় অবস্থানের ভাষা হলো, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হতে হবে। উভয়ের মতভিন্নতা এই দুই ধরণের কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহারের লড়াই হিসাবেও পর্যালোচনা করা যায়।

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে দেওয়া তাদের বিবৃতিটির দিকে তাকালে আমরা দেখব, তারা কুটনৈতিক ভাষা বদল করে নাই,  “সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনলেখে নাই। বরং সংবিধানশব্দটাই নাই। ফলে দিল্লীর সঙ্গে অন্তত মতভিন্নতার মূল পয়েন্টই তারা বজায় রেখেছে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা বলতে পারি গতমাসের ২৩ অক্টোবর তারিখে মজিনার ভারত সফরের পর থেকে শুরু করে এই বিবৃতি দেবার সময় অবধি অর্থাৎ ১৮ দিন পরেও আমেরিকা তার অবস্থান বদলায় নি। কূটনৈতিক ভাষার মধ্যে বাহ্যিক কিছু আমরা দেখছিনা যাতে তাদের অবস্থান বদল হয়েছে বলে শনাক্ত করা যায়। প্রকারান্তরে এই বিবৃতির এই মানেই আমরা করতে পারি যে ভারতের অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও নাকচ করে চলেছে।

এই নাকচ করার অর্থ অবশ্য আবার দুটো অবস্থানের একটি হতে পারে।এক, হয়তো এটা শুধু আমেরিকার বক্তব্য নয়, ভারতের ইচ্ছাও এর মধ্যে ইনক্লুডেড বা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ হতে পারে যে এটাই বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই দেশেরই কমন অবস্থান। যদি তাই হয় ভারত কি তার শক্ত অবস্থান ছেড়ে দিচ্ছে? হাসিনার আচরণ দেখে তা মনে হয় না। দুই, এটা আমেরিকার নিজের শক্ত অবস্থান, যেখানে ভারতের অবস্থান সম্পুর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নীতির প্রশ্নে দিল্লীর ওপর ঠিক আগের মতো নির্ভরশীল হতে চায় না। দিল্লীর বাইরে নিজের স্বাধীন নীতি অনুসরণ করতে চায়। শুধু তাই নয়। এই মতভিন্নতা পাবলিকলি স্পষ্টও করতে চায়।

প্রসঙ্গ দুইঃ কর্তৃত্ত্ব নিজের হাতে নেবার উদ্যোগ আমেরিকার

ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের দেওয়া বিবৃতি যদি ওয়াশিংটনের নতুন নীতির প্রতিফলন হয় তাহলে এর আরও অর্থ হলো, হাসিনার পঞ্চদশ সংশোধনীর কন্সটিটিউশন অনুযায়ী নির্বাচনের পক্ষে আমেরিকা নাই। অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করার বিষয়টার সুরাহা হবার আগে, নির্বাচন আপাতত স্থগিত বা বাতিলের পক্ষে আমেরিকা। নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত করা এবং পরবর্তিতে নির্বাচন কোন মেকানিজমে হবে তার কোন ইশারা বিবৃতিতে নাই। তবে এর ইঙ্গিতপুর্ণ জবাব পাওয়া যেতে পারে ০৯নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটার একুশে টিভিতে, এরশাদের এক বিরল সাক্ষাৎকারে। ওখানে এরশাদ বলেছেন একটা আর্মিব্যাকড সিভিল সরকার নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীসরকার পরিচালনা করতে পারে। অর্থাৎ তিনি এক এগারোর সেনা সমর্থিত ধরণের সুশীল-সামরিক সরকারের কথাই বলছেন। সেই সাথে তিনি এও বলেছেন যে যদি করতে হয় তবে সেই সিদ্ধান্তও কনস্টিটিউশনে অনুমোদিত করিয়ে নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে ঠিক হুবহু তিনি কী বলেছেন, সেটা আশা করি ক্লিপ দেখে নিলে জানা যাবে। তবে সার কথা এটাই। ওদিকে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের শেষপ্যারাটাও এরকমই ইঙ্গিতপুর্ণ – ‘Sheikh Hasina has no interest in alienating it’সেনা সমর্থিত সুশীল সরকার আসবার সম্ভাবনা থাকলেও তাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে দূরে সরিয়ে দেবার কোন আগ্রহ শেখ হাসিনার নাই।

“If a boycott takes place, then elections could be delayed and street violence is likely in the next few months. If so, the army, which also has the job of providing security at polling stations, would play a decisive political role. Sheikh Hasina has no interest in alienating it.”

আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে মার্কিন এই বিবৃতি বিএনপির পক্ষে থাকা মার্কিনিদের কুটিল চেষ্টা। যেন, মজিনার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকে কূটনৈতিক ভাষায় নাকচ করে দিয়ে ইনক্লসিভনির্বাচনের পরামর্শ সেই চেষ্টারই প্রতিফলন। সন্দেহ নাই, এমন ভাবা একটা ভুল পাঠ হবে। সুবীর ভৌমিক সেই ভুল পাঠ করে এর বিপদ দেখেছেন। এরই প্রতিক্রিয়ায় এক অনামী ভারতীয় কুটনীতিকের বরাতে সুবীর ভৌমিক মজিনা যেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য”  বলে তাকে তুচ্ছ করার দিকে মেতে উঠেছেন। অথচ এতে তিনি বুঝে উঠতেই পারলেন না যে তিনিই, দিল্লীর বাংলাদেশ নীতি প্রণেতাদের মতই আঞ্চলিক মুদি দোকানদারির চরিত্র নিয়ে নিয়ে হাজির হয়েছেন। বাংলাদেশকে ভারতের বাজার ভাবা অথবা নিজেরই আর একটা রাজ্য ভাবা ছাড়া আর অধিক কিছু ভাববার সামর্থ দিল্লীর যেমন নাই, সুবীর ভৌমিকের মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধির লোকদেরও নাই। যদি থাকত তার লেখা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট কিভাবে উসকে দিতে পারে সেই হুঁশ তাঁর থাকত। যেমন তাঁর শিরোনামই ছিল মারাত্মক উস্কানিমূলক। এভাবে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে মর্যাদা না দিয়ে দিল্লী নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনছে। বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচিত করবে কি না করবে সেটা দিল্লীর মাথাব্যথার কারণ হওয়া উচিত ছিল না। গত পাঁচ বছরে শেখ হাসিনার নীতি ভারতীয় রুস্তমি দেখানোর জায়গা আর তার ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিমাণ বাড়িয়েছে বটে, কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে যে অবনতি ঘটিয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে না। দিল্লীর উচিত ছিল প্রতিবেশীর আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নীতিগ্রহণ। কিন্তু দিল্লী বাংলাদেশকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রেখে স্রেফ লুটতরাজ করতে চায়। গায়ের জোর ও দম্ভের রুস্তমি দেখাতে চায়, শেখ হাসিনার সরকার সে জন্যই তাদের দরকার। দিল্লীর এই লুন্ঠন নীতি একটি বৃহৎ দেশ হিসাবে উপমহাদেশে উলটা তাদের রাজনৈতিক আধিপত্যকেই খর্ব করবে, সন্দেহ নাই। অথচ দিল্লীতে দুরদর্শী কোন নেতৃত্ব থাকলে ক্ষুদে দোকানদারী মানসিকতা নয়, নিদেনপক্ষে আমদানি-রফতানির ব্যবসায়ীর মতো হলেও আরও একটু বড় চোখে আদান-প্রদানের মানসিকতা দেখা যেতো। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক করতে হবে একতরফা লুন্ঠন নয়, দেওয়া নেওয়ার। আর দিল্লী যদি মাড়োয়ারি মানসিকতা বাদ দিয়ে উপমহাদেশের সাধারণ স্বার্থ তার নিজের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য জরুরী মনে করত তাহলেএকসাথে বেড়ে উঠারনীতিই অনুসরণ করত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য রোধ করা, কিম্বা চিনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সংকট কাটিয়ে তোলা সহজ হোত। বহু কিছু করার সুযোগ ছিল আমাদের। কিন্তু যতটুকু খোঁজখবর রাখি ভারতের এমন নেতৃত্ব ও নীতি আগামি বছরগুলোতে দেখার কোন সম্ভাবনা দেখি নাই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত ৫ মের ঘটনার পর ঘটনার মধ্যে সবার আগে মার্কিন  দূতাবাস তাদের বিপদটা টের পেয়েছে। ঢাকার কূটনৈতিক মহলের কাছে ক্রমে তা পরিষ্কার হয়েছে। বিপদটা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের ভাষায় রেডিক্যাল এলিমেন্টহাজির হবার সম্ভাবনা। শাহবাগকে চ্যালেঞ্জ করে শাপলা চত্বরের আবির্ভাব বাংলাদেশে শ্রেণী ও শক্তির ভারসাম্য যে বদল ঘটিয়ে দিয়েছে, তা আর পাঁচই মের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপযোগী শ্রেণি ও শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার দিকেই মার্কিন নীতি ঝুঁকবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নাই। সেই উদ্বেগ নিরসন ও ভারসাম্য বজায় রাখার দিক থেকে আওয়ামি লীগের চেয়ে বিএনপিই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছের মিত্র হতে পারে। সেক্ষেত্রে  ‘রেডিক্যাল এলিমেন্টগুলোকেআঠারো দলীয় জোটের মধ্যে ধারণ বা আটক রেখে, জোটকে সামনে রেখে দেশে একটা নির্বাচনী লিবারেল রাজনীতি টিকিয়ে রাখা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ রেডিক্যাল এলিমেন্টসামলানোর এটা খুবই উপাদেয় ও কার্যকরী উপায় হতে পারে।

ভারতের এই অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্যের মতো সহিংস পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার স্বার্থের জন্য অনুকুল মনে করে না। আফগানিস্থান থেকেও আগামি বছর শেষে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হবে। বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সঠিক অবস্থানই নিতে হবে। মার্কিন দূতাবাসের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে এই রেডিকাল সম্ভাবনাকে মোকাবিলা করা। আর দিল্লির এখনকার ভূমিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে উলটা উস্কানি দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে আরও অস্থির ও সহিংসতার দিকে নিয়ে যাওয়া্। যেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মার্কিন নীতিকে জোর করে আরও উগ্র ও আগ্রাসী জায়গায় নিয়ে গিয়ে ইসলামী জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা যায়। এ কারণেই দিল্লী বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে দিয়ে লিবারেল নির্বাচনী রাজনীতির পরিমণ্ডল পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে, বাংলাদেশকে সহিংস ও বিপর্যয়গ্রস্ত করে তুলেছে। দিল্লী ও ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র নীতির মধ্যে এই টানাপড়েন অনিবার্য ভাবেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও সহিংসতা দেখব।

মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতার কারণে ওয়াশিংটন সম্ভবত এই পরিস্থিতি এড়াতে চায়। বিএনপিকে সামনে রেখে সম্ভাব্য রেডিক্যাল ইসলামী শক্তিগুলোকে লিবারেল রাজনীতির মধ্যে আটকে রেখেই সেটা সম্ভব। এতে রেডিক্যাল ঝোঁক সামলানো সহজ। এছাড়া এডেড ফ্যাক্টর, পপুলার পারসেপশন বা ভোটের জনমতও এখন বিএনপিরই দিকে। ফলে পরিকল্পনাটা সফল হবার ভাল সম্ভাবনা আছে। তাহলে মজিনার কাছে মুল উৎকন্ঠা সম্ভাব্য রেডিক্যাল রাজনীতি সামলানোর উপায় খুজে পাওয়া। সেই ইচ্ছাপুরণের ক্ষেত্রে বিএনপির জায়গায় আওয়ামি লীগকে রাখলে যদি তা সম্ভব হোত সম্ভবত তিনি সেটাই করতেন। আমেরিকান উদ্বেগটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের স্বার্থের দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদের সাধারণ রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে পুরাপুরি সম্পৃক্ত করার প্রক্রিয়া যেন ব্যাহত না হয় বাংলাদেশে মার্কিন নীতির ভরকেন্দ্র সেই দিকেই। এই অঞ্চলকে সেই আলোকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিচার করে। এই ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও অবশ্যই নিহিত রয়েছে। ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কথা তো আমরা জানি। কিন্তু বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি গতিশীল পুঁজিতান্ত্রিক বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকুল। অন্যদিকে এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী ও একইসঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষী শক্তিশালী শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও তাদের মতাদর্শের নিরন্তর পয়দাই ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মার্কিন রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

বিপরীতে দিল্লীর উদ্বেগ, আগেই বলেছি, নিতান্তই ভারতের ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণস্বার্থ। বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ভাবে শুধু নয়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ভাবে উঠতে না দেওয়া। বাংলাদেশ ভারতের বাজার হোক, ভারতের আত্মঘাতি ইসলাম বিদ্বেষীও অকার্যকর নিরাপত্তা নীতির স্বার্থে নিজেকে বলি দিয়ে দেক দিল্লী শুধু তাই চায় না। অর্থনৈতিক ভাবে ভারতের প্রতিযোগী না হয়ে উঠুক দিল্লী তাও চায়। একেই বলছি গোঁয়ার ক্ষুদে দোকানদারীর মানসিকতা, একটি আঞ্চলিক শক্তির দূরদর্শিতা এখানে শোচনীয় ভাবে অনুপস্থিত। এই ক্ষুদে দোকানদারী মানসিকতা গায়ের জোরে সবকিছু মোকাবিলা করা সম্ভব মনে করে। যদি গায়ের জোরে আর রুস্তমিতে সবকিছু হত তবে বুশের ওয়ার অন টেরর পলিসি ব্যর্থ হত না, ওবামাকে বুশের নীতি থেকে সরে আসার চেষ্টা করার প্রয়োজন পড়ত না। গ্লোবাল ইকোনমিকে ২০০৭-৮ সালের রিসেশন দেখতে হত না। কোন ফল হাতে না নিয়েই ২০১৪ সালে খালি হাতে আফগানিস্তান থেকে উলটা দেনা নিয়ে ফিরার পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পড়তে হোত না।

এতদিন সাম্রাজ্যবাদীর বলয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশের মত দেশে সরকারে কে থাকবে তা একচেটিয়া নির্ধারণ করাবার যাঁতাকাঠিটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। সেটা এক হিসাবে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের উপর ব্যবহার করতে আমেরিকা ধার দিয়েছিল ভারতকে। ব্যাপারটা ক্ষুদে দোকানদারের পিঠে বড় ভাইয়ের হাত রাখার মত। যাঁতাকাঠির কথাটা কোন গল্প বা অনুমান নয়। একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষকের।

ডঃ ওয়াল্টার এন্ডারসন, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এসোসিয়েট ডিরেক্টর। তাঁর এক গবেষণার বিষয় ছিল চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ভারতের নতুন সম্পর্ক এলায়েন্স গড়ার ভালমন্দের দিক খুজে দেখা। [আগ্রহিরা দেখুন, CONGRESSIONAL TESTIMONY:  India and the United States – A Different Kind of Relationship।] এরপর ২০০৮ সালে সেই কাজের ভিত্তিতে তৈরি রিপোর্ট তিনি আমেরিকান সিনেটের হাউস কমিটিতে পেশ করেছিলেন এবং কমিটির সদস্যদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে সাক্ষ্যে (testimony) তিনি যা বলেছিলেন তা ঐ রিপোর্টে আছে। ঐ রিপোর্টে ব্যবহৃত একটা শব্দ ছিললিভারেজ। আমি সেটাকে এখানে বাংলায় যাঁতাকাঠি বলছি। এই যাঁতাকাঠির চাপে গত পাঁচ বছর আমরা সীমাহীন কষ্ট পাচ্ছি। মজিনা দুসপ্তাহের জন্য ওয়াশিংটনে গিয়েছেন ভারত সফরের পরেই। অনুমান করি এন্ডারসন সাহেব এখন নিজের যাঁতাকাঠি তত্ত্বের জন্য হাত কামড়াচ্ছেন, তওবা পড়ছেন। আমরা সবাই যাঁতাকাঠি তত্ত্বে ক্ষুদে দোকানদারের শিকার হয়ে আছি। একথাগুলো বললাম আমেরিকার দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া নীতির কাফফারার দিকটা বুঝানোর জন্য। আমেরিকান স্বার্থ আমেরিকাকেই দেখতে হবে, ভুগতেও হবে। তা তারা ভুগুক অথবা লাভ খুঁজে পাক। কিন্তু আমাদেরটা আমাদেরকেই দেখতে হবে। ফলে আমেরিকা ও ভারতের মতভিন্নতাকে আমরা যেন এমন আনাড়ি ব্যাখ্যা না করি যে হাসিনার পক্ষে ভারত, সেজন্যই খালেদার পক্ষে আমেরিকা। সাম্রাজ্যবাদে অর্থনৈতিক দিক থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, আবার রাজনৈতিক দিক থেকে বিশ্বব্যাপী পুঁজির সাধারণ স্বার্থ রক্ষাও তার কাজ। মার্কিন নীতি সেই সাধারণ স্বার্থ দেখভাল করতে গিয়ে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করেছে তা নয়, দিল্লীর সঙ্গে তার ভিন্নতার কারণ এই দুই স্তরেই নিহিত রয়েছে।

প্রসঙ্গ তিনঃ ভারত কি এখনও হাসিনার পক্ষে থাকবে?

এর উত্তর নির্ভর করছে মার্কিন বিবৃতি আমরা কিভাবে পাঠ করি। যদি মনে করি মার্কিন বিবৃতি একই সঙ্গে বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উভয়েরই এখনকার কমন অবস্থান তাহলে উভয়েই শেখ হাসিনাকে একটা বার্তা দিচ্ছে, পরিষ্কার ভাবেই। আমেরিকার বিবৃতিতে কি ভারত ইনক্লুডেড নাকি নয় সেটাই হচ্ছে মূল বিষয়। যা আমরা আজ না হলেও দ্রুতই বুঝব। যদি ইনক্লুডেড না হয় তাহলে ভারতের কাছে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য। সেই ক্ষেত্রে হাসিনাকে ভারত শক্ত ভাবেই সমর্থন দেবেবা দিতে হবে যাতে গোঁয়ারের মতো একা নির্বাচনের পথে শক্ত ভাবে ক্ষমতাসীনরা এগিয়ে যেতে পারে। দিল্লী ও ঢাকাকে তখন মুখোমুখি সংঘাতের জন্য তৈরি হতে হবে। অন্যভাবে বলতে পারি, মাঠে চরম সংঘাতের পথে জিতে ফয়সালার রিস্ক নিতে হবে। অথবা হার। দিল্লী হাসিনাকে নিয়ে এতো বড় ঝুঁকি নেবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

সংঘাত আসলে আবার একদিক থেকে আমেরিকার কাম্য। তবে সেটা অবশ্যই সীমিত আকারে যদি ঘটে। যেমন সংঘাত যেন আনুমানিক দুদিনের বেশি না গড়ায়, মোটকথা তা যেন নিয়ন্ত্রণে ও সীমিত থাকে। তবে অবশ্যই ঐ দুদিনে ভাল রক্তারক্তি প্রচুর হতে হবে। নইলে ব্যারাক ছেড়ে সেনাবাহিনী বাইরে বের করে আনার যুক্তিকে ন্যায্য প্রমাণ করা যাবে না। ওদিকে আবার যদি একে নিয়ন্ত্রণে ও সীমিত পর্যায়ে রাখা না যায় তবে আন্দোলন রেডিকেল মুড নিবে; গণভ্যুত্থানের দিকে মোড় নিয়ে নিতে পারে। আর গনঅভ্যুত্থানের দিকে মোড় নেয়া মানে এখন যেমন ১৮ দলকে মজিনার সাথে সম্পর্ক রেখে মুখ চেয়ে থাকতে হচ্ছে তখন হবে উলটা। মজিনাকেই বিজয়ী গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের দিকে চেয়ে থাকতে হবে।

প্রসঙ্গ চারঃ কেন মজিনার আর্মি ব্যাকিং দরকার?

একথা ভাবা ভুল হবে যে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে কুটনৈতিক বিরোধ আমেরিকা চরমে নিবে। বিরোধ আছে এটা সত্যি হওয়া সত্ত্বেও। আবার পরিস্কার মনে রাখতে হবে, মাইনাস হাসিনা আমেরিকান প্রভাবে একটা আর্মিব্যকড সরকার এমন সিনারিওতে অতি অবশ্যই সবচেয়ে বড় হারু পার্টি হবে ভারত। কারণ হাসিনা ক্ষমতায় নাই মানে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ বিষয়ে গলার আওয়াজ তুলে কথাবলার কার্ড ভারতের হাতে নাই। যেমন খালেদার প্রস্তাবের পরদিন সেটা উড়িয়ে দেবার জন্য সৈয়দ আশরাফের ডাকা প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতে একা মজিনার অনুরোধ হাসিনা শুনতে রাজি হয়নি। ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণের শরণাপন্ন হয়ে মজিনাকে তা বন্ধ করতে হয়েছিল। মজিনার এই দুর্দিনের কথা তাঁর ভুলে যাবার নয়।আবার একদিনের মধ্যে ভারত-আমেরিকার একটা কমন বাংলাদেশ নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে বের করতে মজিনা পারবে না। সময় লাগবে, কমপক্ষে ৬ মাস-একবছর। হয়ত আরও বেশি। অর্থাৎ বিরোধ চরমে নেয়া আমেরিকার লক্ষ্য বা স্বার্থ নয়। কারণ এই অঞ্চলে সম্ভাব্য চীন-ভারত টেনশন বিরোধের ফয়দা হিসাবে আমেরিকা ওদের মাঝখানে বসে থাকতে চায়। এর জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা বাংলাদেশ। আবার চীন-আমেরিকা বাণিজ্য-নৌপথ দখলের লড়াইয়ে আমেরিকা ভারতকে পাশে পেতে চায়। (এটাও ঐ এন্ডারসন সাহেবের রিপোর্টে পরামর্শ ছিল।) যদিও ভারত আমেরিকার মতিগতিতে চীনের চেয়ে আমেরিকাকে কম ভয় পায় বা কম সন্দেহ করে তাও নয়। বরং ভারতও মনে করে এই রিজিয়নের কোন সংঘাতে আমেরিকাকে পাশে না পেলে তার পক্ষে একা নিজের স্বার্থ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হবে না। ফলে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার কমন নীতি বের করাই এর সমাধান। যদিও কাজটা সহজ নয়। এবং বলা বাহুল্য এই কমন নীতি আমাদেরকে ভারতের নাগপাশ থেকে বের হতে দিবে না। বরং ভারতের অন্যায় আবদার মেনে নেবার জন্য আমেরিকা আমাদের উপর চাপ অব্যাহতই রাখবে। ফলে এক কথায় বললে তাদের কোন কমন বাংলাদেশ নীতি সবসময় বাংলাদেশের বিপক্ষে যাবেই। ফলে বাংলাদেশের স্বার্থ, মুক্তি লুকিয়ে আছে পরিস্থিতিকে গণভ্যুত্থান ঘটানোর পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে শক্তিশালী গণসমর্থনের ওপর দাঁড়ানো একটি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা কায়েম।

: SolaimanLipi;”>প্রাসঙ্গিক নয় বলে চীনের বিষয় প্রসঙ্গ হিসাবে আনিনি। প্রয়োজনে সে আলোচনা আলাদা ভাবে করা যাবে।

ত্রয়োদশ সংশোধনী পুর্ণাঙ্গ রায়ের ক্রিটিক

দারুণ রায়! দারুণ বৈচারিক প্রতিভা!
ফরহাদ মজহার
Friday 28 September 2012
লেখাটা নিচের লিঙ্ক থেকে নেয়া।
http://www.chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/168/bangla

“আমি হচ্ছি ভাঙা কুলা। পঞ্চম সংশোধনী থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ সংশোধনী পর্যন্ত সবগুলো রায়ই আমাকে দিতে হয়েছে” – সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, মানবজমিন, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১২

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বিচার করে বিদ্যমান গণবিরোধী অগণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীতে জনগণের রাজনৈতিক শক্তি বিকাশের রাজনীতি কী হতে পারে তার নীতি ও কৌশল নির্ধারণই এখন বাংলাদেশের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সেই দিকে নজর রেখে কয়েক কিস্তিতে লেখা শুরু করেছিলাম, প্রথম লেখা ছিল ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আঞ্চলিক উত্তাপ’  (নয়া দিগন্ত ২/৯/২০১২ এখানে দেখুন) । তবে অনিবার্য কারনে লেখার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। পাঠকের কাছে মাফ চেয়ে আবার শুরু করছি।

আভ্যন্তরীণ বাস্তবতা যতোটা নয়, তার চেয়ে আগামি দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক বেশি নির্ধারক ভূমিকা রাখবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। এই প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম। কথা বাকি থাকলেও ইতোমধ্যে দেশের ভেতরে বেশ কিছু নতুন বিষয় সামনে চলে এসেছে। যেমন, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়। এই রায় আগামি নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি প্রাসঙ্গিক। গত বছর ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ের প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই রায় দিয়েছিল। সংক্ষিপ্ত রায় একই সঙ্গে ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণ করে পরবর্তী দুটি নির্বাচন হতে পারে বলেও অভিমত দেয়। – অর্থাৎ আদালত বলেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দশম ও একাদশ সংসদের নির্বাচন হতে পারে।

সংক্ষিপ্ত আদেশে বিচারপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন, ১৯৯৬ (আইন-১: ১৯৯৬) ভবিষ্যতের জন্য ‘বাতিল’ (void) করা হয় এবং এই সংশোধনী ‘সাংবিধানিক কর্তৃত্ব বহির্ভূত’ (ultra vires) হয়েছিল বলে ঘোষণা করা হয়। ultra vires একটি ল্যাটিন পদ, যার অর্থ দাঁড়ায় যারা সংবিধান সংশোধন করেছেন তাদের এটা করবার কোন আইনী বা সাংবিধানিক কর্তৃত্ব ছিল না। ইংরাজিতে দেওয়া রায়ের ভাষা ছিল এরকমঃ The Constitution (Thirteenth amendement) Act, 1996 (Act 1 of 1996) is prospectively declared void and ultra vires the Constitution। সংবিধান সংশোধন করেছে জাতীয় সংসদ। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ জাতীয় সংসদকে যে ক্ষমতা দিয়েছে সেই ক্ষমতা শুধু আইন প্রণয়ণের ক্ষমতা নয় (legislative power), একই সঙ্গে সংবিধান বদলে দেবার বা সংবিধান প্রণয়ণী ক্ষমতা (constitutive power)। আদালত এই ধরনের ক্ষমতা আদৌ জাতীয় সংসদের থাকা উচিত কিনা সেই বিষয়ে প্রশ্ন করে নি, বা গণতন্ত্রের এই গোড়ার প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে বিরত থেকেছে, কিন্তু এই সংশোধনী রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো বা মৌলিক বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ করেছে বলে বাতিল করেছে।

গণ মাধ্যমগুলো ultra vires –এর অনুবাদ করে থাকে ‘সংবিধান লংঘন’ বা ‘অসাংবিধানিক’। এতে অসুবিধা নাই তবে এই অনুবাদে আইনী বা সাংবিধানিক কর্তৃত্ব সংক্রান্ত গুরুত্ব পূর্ণ ধারণা আড়াল হয়ে যাবার আশংকা তৈরী হয়। যেমন, আদালত যে কর্তৃত্বের বলে এই সংশোধনী বাতিল করলেন সেই কর্তৃত্ব বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী আদৌ আদালতের আছে কিনা গোড়ার সেই প্রশ্নটা এতে অস্পষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া আরেকটি প্রশ্নও আড়াল হয়ে যায়ঃ রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা আদালতের করা উচিত কিনা। শেষের প্রশ্নটি নিছকই আইনী প্রশ্ন নয়, রাজনীতিরও প্রশ্ন। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায় আদালত এই কুকর্ম করলে নিজের ঘাড়েই বিপদ ডেকে আনে এবং কার্যত আদালত নিজেই নিজেকে রাজনীতির ময়দানে পরিণত করে।

রায় লেখার পর বিচারপতি খায়রুল হক গত ২৮ মার্চ তা সুপ্রিম কোর্টে জমা দেন। এর ওপর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দেন অপর বিচারপতিরা। মতামতসহ রায়টি গত ১১ সেপ্টেম্বর ইতোমধ্যে অবসর নেওয়া বিচারপতি খায়রুল হকের কাছে পাঠানো হয়। পত্রিকার খবর অনুযায়ী তিনি নীল কাগজে প্রিন্ট নেওয়া ৩৪২ পৃষ্ঠার রায়ে সই করেন (প্রথম আলো, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১২) ।

ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত পূর্ণ রায় এখন প্রকাশিত হয়েছে। ঢাউস জিনিস। বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এ নিয়ে এমন এক ভাব করছে যে এই রায়ই আগামি দিনের রাজনীতি নির্ধারণ করে দেবে। এই ফালতু ধারণাকে নাকচ করা দরকার। রাজনীতি আদালত বা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে ক্ষমতাসীন দল আদালত ও বিচারকদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে রায়ের ভাষা ও তার অন্তর্নিহিত তত্ত্বের কী দশা ঘটে সেটা বোঝার জন্য রায়টি ভাল নজির। তবে কোন ধরণের অ্যাকাডেমিক আলোচনা এখন সময়ের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।

বাংলাদেশে এখন জনগণের প্রধান কর্তব্য বিদ্যমান রাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটিয়ে গণতন্ত্র কায়েম। নতুন রাষ্ট্র গঠন ও কায়েম করা। গণতন্ত্র রাষ্ট্রের একটি ধরণ। নির্বাচন বা ভোটাভুটির মাধ্যমে সরকার গঠনকে রাষ্ট্র গঠন বলে না। রাষ্ট্র গঠন সম্পূর্ণ আলাদা একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় যারা ক্ষমতাবান তারা এই রূপান্তর চায় না, চাইতে পারে না। ক্ষমতাবানদের বিভিন্ন পক্ষের কাছে বিদ্যমান রাষ্ট্র বহাল রেখে নিজেদের মধ্যে কে আগামি পাঁচ বছর জনগণকে শাসন ও শোষণ করবে তা নির্ধারণ করাই একমাত্র ‘রাজনৈতিক’(?) বিতর্ক। এই তর্ক থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের দিক থেকে বিতর্কের গোড়ার বিষয়গুলো ধরতে পারা জরুরি কাজ। যেমন, কিভাবে বিদ্যমান রাষ্ট্র জনগণের মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করছে এবং কেন গণতন্ত্রের অর্থ হয়ে আছে এমন একটি রাষ্ট্রের ধরণ যেখানে জনগণের মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করবার ক্ষমতা রাষ্ট্রের কুক্ষিগত। অথচ গণতন্ত্রে মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করবার ক্ষমতা জনগণ রাষ্ট্রকে দেয় না। দিতে পারে না। বাংলাদেশে জনগণের রাজনৈতিক শক্তি বিকাশের কর্তব্য মনে রাখলে এই গোড়ার বিষয় ধরতে পারার সামর্থ্য অর্জন প্রাথমিক, কিন্তু অতিশয় জরুরি একটি কাজ। সেই কথা মনে রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত আদালতের রায় নিয়ে যে বিতর্ক চলছে সেই কথা মনে রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত আদালতের যে তায় চলছে তা নিয়ে দুই একটি বিষয় নিয়ে আজ আলোচনা করব।

রায়কে কেন্দ্র করে তর্কের ধরন
তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত বিতর্ক যেভাবে চলছে তাতে এর রাজনৈতিক মর্ম যদি কিছু থাকে তাহলে সেটা হোল নির্বাচনে নিজ নিজ দলের পক্ষে সুবিধা আদায়ের সংগ্রাম। এর অধিক কিছু নয়। সেই দিক থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত বিতর্ক নিছকই ‘দলীয়’ বিতর্ক, বিতর্কের ধরণও দলবাজিতার বা দলসর্বস্বতার বাইরে যেতে পারে নি। ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত পূর্ণ রায় প্রকাশিত হবার পর যেসব তর্কবিতর্ক দেখছি সেই সবও দলীয় পরিমণ্ডলের সীমার মধ্যেই খাবি খাচ্ছে। রাজনৈতিক,আইনি বা তাত্ত্বিক কোন দিক থেকেই এই তর্কগুলো আমাদের নতুন ভাবে ভাবতে সহায়তা করে না।

ছোট বা সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছে আগামি দুই দফা অনির্বাচিতদের দিয়ে পুরানা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে, কিন্তু পূর্ণ রায়ে আবার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করবার কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রি হাসিনার সর্বশেষ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলে কিন্তু কোন মন্ত্রি বা সংসদ সদস্য আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকেন না। তাহলে পূর্ণ রায় অনুসারে একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গড়তে গেলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কোথায় পাওয়া যাবে? তর্কটা দাঁড়াচ্ছে শেখ হাসিনার কথা মতো অনির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত ছোট মন্ত্রিসভার অধীনে নির্বাচন হবে, নাকি হবে পুরানা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে? বুঝি, সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের রায়ই বাংলাদেশে কিভাবে আগামি দিনে নির্বাচন হবে তা ঠিক করে দেবে! রায়কে কেন্দ্র করে তর্কগুলো কিভাবে নির্বাচন হবে শুধু সেই জায়গাতেই এই ভাবে খাবি খাচ্ছে।

নিজ দলের স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়া অবশ্য এই সব আইনি তামাশাকে ধমক দিতে দেরি করেন নি। অনেকের অভিযোগ সাবেক বিচারপতি শেখ হাসিনাকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত রায় আর পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যে সঙ্গতি রাখবার ন্যূনতম বিবেচনাও হারিয়ে ফেলেছেন। হতে পারে। তবে আইনি দিক থেকে এই দৃশ্যমান অসঙ্গতিকে ভিন্ন ভাবে দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। সেটা হোল, এ বি এম খায়রুল হক কি একই মামলার দুইটা রায় দিয়েছেন? একটি তিনি অবসরে যাবার আগে, পরেরটি অবসরে গিয়ে? নাকি দুটো মিলেই একটা রায়। যদি দুটো মিলে একটি রায়ই হয় তাহলে রায়ে অসঙ্গতি সমস্যার কথা আর কি বলব! কিছুই না! রায় অনুযায়ী পুরানা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে, আবার দুই দল থেকে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠন করা ছোট মন্ত্রী সভা দিয়েও নির্বাচন করা সম্ভব। দুটোই সম্ভব। রায়ে দুই পরামর্শই আছে। আসলেই।

দারুণ রায়! দারুণ বৈচারিক প্রতিভা!

রাজনৈতিক বিষয়কে আইনী তর্কে পর্যবসিত করা হোল
এই ধরণের অসঙ্গতি বিচারপতি ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের আস্থা বাড়াবে না, বরং কমাবে। কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হকের অবস্থানকে অধিক গুরুত্ব দেবার জন্য এই তর্কটা গণমাধ্যমে প্রধান করে আনা হচ্ছে। অথচ আগে দেওয়া ছোট রায়ই বেঞ্চের সমস্ত বিচারপতিদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। পূর্ণ রায়ে আমরা বিভিন্ন বিচারপতির ব্যক্তিগত অবস্থান দেখি। সম্মিলিত রায়ই আদালতের রায় আর পূর্ণ রায়ে বিচারপতিদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে আমরা বিষয়টিকে বিভিন্ন দিক থেকে পর্যালোচনা করতে পারি মাত্র। কিন্তু এটা বলতে পারি না যে শেখ হাসিনার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য ছোট মন্ত্রী সভার অধীনে নির্বাচনের পরামর্শই আদালতের সম্মিলিত পরামর্শ। সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সম্পর্কে নতুন করে বলবার কিছু নাই, কিন্তু পূর্ণ রায় দেখে বোঝা যায় সব বিচারক রাজনৈতিক দলের হুকুমদারিতে চলেন না।

আসলে পূর্ণ রায় সংক্ষিপ্ত রায়ের তুলনায় আইনী দিক থেকে দিক থেকে নতুন কোন বিতর্ক তৈরি করে নি। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হলেও আগামি দুইটা সংসদীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। এটাই সম্মিলিত রায়। রায়ে বিচারপতিদের ভিন্ন ভিন্ন মতকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে গুরুত্ব দিয়ে তর্ক তোলা নিরর্থকই বটে।

তবে জনগণের দিক থেকে ইন্টারেস্টিং দিক হোল কিভাবে ক্ষমতাসীনরা আদালতের সহযোগিতায় এই তর্ককে একটি ‘আইনি’ তর্কে পর্যবসিত করল। তাদের দাবি, যেহেতু আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে অতএব তাদের কিছুই করার নাই। ক্ষমতাসীনরা তাহলে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রাখতে চায় কেন? তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সরাসরি আইন পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিলেই ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু করলেন না কেন তারা? বোঝা মুশকিল। তবে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাব হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার মূলত আওয়ামী লীগেরই আন্দোলনের ফল। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেছিল তারা, আন্দোলন-সংগ্রাম করে এই দাবি তারা আদায় করে ছেড়েছিল।

কিন্তু এখন ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে। শেখ হাসিনা এখন ক্ষমতায়, ক্ষমতায় এসেই তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা জরুরি মনে করেছেন। তাঁর সাধ ক্ষমতায় থেকেই তিনি আগামি নির্বাচন করবেন। কিন্তু এখন কোন মুখে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করবে? অতএব নিজেরা তত্ত্বাবধায়কের বিরোধিতা না করে আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে গুলি ছোঁড়া হোল। সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সানন্দে কাঁধ দিলেন। আওয়ামী লীগ এখন বলতে পারছে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একসময় চেয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখন আদালত তা অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিয়েছে। আদালত মান্য। এ ক্ষেত্র আওয়ামী লীগের কোন হাত নাই।

পাল্টা বিরোধী পক্ষ বলছে আদালত কী রায় দিল তাতে কিছু আসে যায় না, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না। বেগম জিয়া ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে দিনাজপুরের সভায় বলেছেন, গত নির্বাচনের সময় ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন জুটেছিল। এখন আরেক সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে দিয়ে আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত রায়ের ষোল মাস পর একটা মন মতো রায় লিখিয়ে নিয়েছে। আরো বলেছেন, “আওয়ামী লীগের সভানেত্রী যে ভাষায় কথা বলেন, সে ভাষায় রায় লিখে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে ছোট মন্ত্রিসভা করে নির্বাচন করার জন্য বলেছেন তিনি”। এই রায় অতএব মানবার প্রশ্নই ওঠে না।

ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত রায় যে আসলেই দলীয় রায় বেগম খালেদা জিয়ার এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করা কঠিন। কঠোর আন্দোলন আসছে বলেও খালেদা জিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এটা মনে করিয়ে দেবার দরকার নাই যে শুরুতে যখন প্রস্তাব আসে বিএনপি এই ধরণের সরকার ব্যবস্থার বিরোধিতাই করেছে। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে বিএনপি নির্বাচন করতে চায় না, কারণ আশংকা এতে তার জিতবার সম্ভাবনা কম। অতএব তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না, এটাই বিএনপির দাবি। এই হোল অবস্থা।

এটা পরিষ্কার যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মোটেও একটি আইনি তর্ক নয়, কখনোই ছিল না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই এই ব্যবস্থা বিবদমান দলগুলো নিজেদের মধ্যে একটা মীমাংসা হিশাবে মেনে নিয়েছিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে এই ব্যবস্থা সঙ্গতিপূর্ণ কি না সেটাও আইনি তর্কের বিষয় নয়, রাজনৈতিক বিষয়। মনে রাখতে হবে ১৯৯১ সালে প্রথমবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জনগণ যতটা নিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করেছিল রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই। আর আমরা আগেই বলেছি, এই দলগুলো গণতান্ত্রিক নয়। এ কথাটা বলছি রাজনৈতিক বিচারে, আইনি তর্কের জন্য না। এই ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না তার রাজনৈতিক বিচার দলগুলো তখন করে নি। বিচার করবার দরকারও তারা মনে করে নি। কিন্তু স্মরণ করিয়ে দেই, এরশাদ ক্ষমতাসীন থাকার সময় তার বিরুদ্ধে যেসব দল একাট্টা হয়েছিল, তারা এরশাদকে সরিয়ে দিয়ে কিভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রশ্ন নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করবে তারই একটি ফর্মুলা হিশাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় সকলে একমত হয়েছিল।

রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানগত সমীকরণ এখন বদলে গিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে তাদের বিরোধও প্রকট হয়েছে। কেউ আন্দোলন করে তা বহাল রাখতে চাইছে, আর কেউ আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তা বাতিল করে ভাবছে, এতে প্রতিপক্ষকে দুর্বল অবস্থানে ভালোভাবেই ঠেলে দেওয়া গেল। মনে রাখতে হবে ২০০৬ সালে মওদুদ আহমেদও বিচারকের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে বিএনপির পক্ষে এমনই একটা সুবিধা বের করে নিতে চেয়েছিলেন। এবার আওয়ামী লীগ সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে বলির পাঁঠার মতো সামনে এগিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে নিতে পারবে ভাবছে। সাবেক বিচারপতি তাঁর এই ভূমিকা সানন্দে মেনেও নিলেন। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে তিনি বিখ্যাত হয়ে থাকবেন, সন্দেহ নাই। বিচার বিভাগকে অতিশয় নগ্ন ভাবে ক্ষমতাসীন দলের অতি সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করবার যে নজির তিনি সৃষ্টি করলেন তার তুলনা হয় না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, কিন্তু জনগণের সমর্থন থাকুক বা না থাকুক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারনেই রাজনৈতিক দলগুলো এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে এবং জাতীয় সংসদে সংশোধনী এনে তা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার ন্যায্যতা সরাসরি সংবিধান সংশোধন বা আইনের দ্বারা কায়েম করা হয় নি, বরং রাজনীতির দ্বারা আগেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে এই ন্যায্যতা তৈরি, সন্দেহ নাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ন্যায্য নাকি অন্যায্য, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নাকি নয় ইত্যাদিকে আদালতের বিষয়ে পরিণত করলে, আদালতকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে টেনে আনা হয়। কিছু কিছু বিচারপতি সোৎসাহে এই কাজ করে চলেছেন। দ্বিতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক-সংক্রান্ত রাজনৈতিক ধারণা জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়ে সাংবিধানিক ন্যায্যতা লাভ করেছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী এই আইনকে বাতিল করবার এখতিয়ার আদৌ আদালতের আছে কিনা, কিম্বা থাকলেও এই এখতিয়ার আদালতের থাকা বাঞ্ছনীয় কিনা সেটাই হচ্ছে তর্কের বিষয়।

সংশোধনীসহ সংবিধান রক্ষা করবার শপথ নিয়ে সংবিধান বাতিল !
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা যদি নিছকই অগণতান্ত্রিক ক্ষমতাবান শক্তি ও শ্রেণির নিজেদের মধ্যে ‘রাজনৈতিক’ মীমাংসা হয়ে থাকে, তাহলে কি তার কোন সাংবিধানিক বা আইনি মর্ম নাই? অবশ্যই আছে। আমরা জানি, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংসদে সংবিধানের সংশোধনী হিশাবে গৃহীত হয়েছে। অতএব তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানের অংশ। এ বি এম খায়রুল হক যখন বিচারপতি হিশাবে শপথ নিয়েছিলেন, তখন তিনি এই সংবিধান রক্ষা করবেন বলেই শপথ নিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতি হিশাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি শপথ নিয়েছিলেন, “আমি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব” (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় তফসিল দেখুন)। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে সংবিধান রক্ষা করবেন বলে শপথ নিয়ে যিনি বিচারপতি হয়েছেন তিনি সেই সংবিধানের কোন সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করতে পারেন কি না? ‘সংবিধান ও আইনের রক্ষা, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান’ করবার কর্তব্যের সঙ্গে এটা সাংঘর্ষিক কি না। এই প্রশ্নটির গুরুত্ব অসামান্য। কারণ এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্য দিয়ে বিচারপতিরা সংবিধানের অধীন, নাকি অধীন নন সেই প্রশ্ন তুলবার ও মীমাংসার পথ খোলাসা হতে পারে। কিন্তু সংবিধান ও আইনের অতি গোড়ার এই প্রশ্নটিকেই সংবিধান সংশোধনী-সংক্রান্ত বিতর্কগুলোতে বিস্ময়কর ভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত বিতর্কের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় নি।

বিচারপতিরা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নী সংস্থা বা জাতীয় সংসদের সদস্যদের মত নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। অতএব সংবিধানের কোন ধারা, অনুচ্ছেদ বা সংশোধনী বাতিলের কোন ক্ষমতা তাদের থাকতে পারে না। যারা ভিন্ন রকম ভাবেন তাদের সঙ্গে তর্ক করবার জন্য আমরা প্রস্তুত রইলাম। তর্কটা হবে এই ধরণের ক্ষমতা বিচারপতিদের দিলে সেটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় কি না! আর, আমরা তো এখন চলমান আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে থেকে গণতন্ত্র ব্যাপারটা আসলে কী সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি।

কিন্তু সংবিধানের কোন ধারা , অনুচ্ছেদ বা সংশোধনী বাতিলের কোন ক্ষমতা বা এখতিয়ার সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ না থাকলেও বিচারপতিরা নিজেদের জন্য সংবিধানের সংশোধনী ও আইন বাতিল করবার জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তারা তাদের বৈচারিক ক্ষমতা বা এখতিয়ার প্রয়োগ করছেন সেই জায়গা হচ্ছে সংবিধানের তথাকথিত ‘মৌলিক কাঠামো’ (Basic Structure) বা ‘মৌলিক বৈশিষ্ট্য’ (Basic Feature) রক্ষা করবার জায়গা। সংবিধানে আদৌ উল্লেখ না থাকলেও দাবি করা হয়, সংবিধানের কিছু ‘মৌলিক কাঠামো’ বা ‘মৌলিক বৈশিষ্ট্য’ আছে যা জাতীয় সংসদ লংঘন করতে পারে না। বিচারপতিদের এক দল মনে করে জাতীয় সংসদ যদি এই মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ করে সংবিধানে কোন সংশোধনী আনে তাহলে আদালত তা বাতিল ঘোষনা করবার ক্ষমতা রাখে। গণতন্ত্রে জনগণের মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার ছাড়া জাতীয় সংসদের যেকোন আইন প্রণয়ন করবার এখতিয়ার থাকে। থাকাটাই গণতন্ত্র। সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা কাঠামোর ধারণা মূলত জাতীয় সংসদের ক্ষমতাকে খর্ব করে। কারণ এই অজুহাতে বিচার বিভাগ জাতীয় সংসদে গৃহীত সংবিধানের সংশোধনী বা আইন বাতিল করতে পারে বলে দাবি করে। আর জাতীয় সংসদ যেহেতু জনগণ দ্বারা নির্বাচিত, সেই কারণে জাতীয় সংসদের ক্ষমতা খর্ব করা মানে জনগণের ক্ষমতাকেও খর্ব করা। কার্যত এর দ্বারা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকেই নাকচ করা হয়। অন্য দিক থেকে আবার আগেই বলেছি, জনগণের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার লংঘনের এখতিয়ার বা ক্ষমতা জাতীয় সংসদেরও থাকে না। থাকতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই অধিকার জাতীয় সংসদের ঠিকই আছে ।যদি কোন সংবিধানে সেটা থাকে তবে সেটা গণবিরোধী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সে ক্ষেত্রে জনগণের গণতান্ত্রিক কর্তব্য হচ্ছে সেই রাষ্ট্র উৎখাত করা ও গণতন্ত্র কায়েম করা।

সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও কাঠামো গণতন্ত্রের দিক থেকে একটি বিপজ্জনক ধারণা
কেন গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদকে জনগণের মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করবার ক্ষমতা দেওয়া হয় না – সেই দিকটা আইনের দিক থেকে বোঝা খুবই সহজ। জাতীয় সংসদকে জনগণই নির্বাচিত করেছে। অতএব যারা তাদের নির্বাচিত করেছে তাদের অধিকার ও ক্ষমতা জাতীয় সংসদ কোন অবস্থাতেই খর্ব করতে পারে না। নাগরিকদের যে মৌলিক বা গাঠনিক ক্ষমতার (constitutive power) ওপর রাষ্ট্র গঠিত হয় এবং একই সঙ্গে যে ক্ষমতা জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়নী ক্ষমতার (legislative power) ভিত্তি — জনগণের সেই ক্ষমতা খর্ব করার মানে যে ডালে কেউ বসা সেই ডাল কেটে দেওয়ার মতো ব্যাপার। এই সহজ ব্যাপার বোঝার জন্য পণ্ডিত হবার দরকার নাই।

অন্যদিকে, সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও কাঠামো গণতন্ত্রের দিক থেকে একটি বিপজ্জনক ধারণা। এই ধারণার শক্তিতে বলিয়ান হয়ে বিচার বিভাগ জাতীয় সংসদের বিপরীতে একটি আলাদা ক্ষমতা-বলয় তৈরি করে। যার সঙ্গে জনগণের কোন সম্পর্ক নাই। এই ধরণের ধারণার পক্ষের বিচারপতিরা দাবি করেন জাতীয় সংসদে কোন সংশোধনী পাস হলেও সেই সংশোধনী যদি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তারা আদালতে রায় দিয়ে তা বাতিল করতে পারবেন।
কী সেই মৌলিক কাঠামো বা মৌলিক বৈশিষ্ট্য? কে তা নির্ধারণ করবে? বিচারপতিদের দাবি, এই ‘মৌলিক কাঠামো’ বা ‘মৌলিক বৈশিষ্ট্য’ নামক মিস্টিরিয়াস জিনিসটা আসলে কী, সেটাও ঠিক করবেন বিচারপতিরাই। এই কাঠামো বা বৈশিষ্ট্যটা কী তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একেক জন বিচারক একেক রকম তালিকা দিয়ে থাকেন। বলা বাহুল্য বিচারপতিদের মধ্যে অবশ্যই ব্যতিক্রম আছেন। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্য-সংক্রান্ত ধারণা বিচারপতিদের কাছেও বিতর্কিত বিষয়। অনেকেই এই ধারণার বিরোধী। এই ধারণার সঙ্গে গণতন্ত্রের মৌলিক বিরোধ রয়েছে, সে বিষয়ে অনেকেই সজ্ঞান।

সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংসদের যা খুশি আইন পাশ করার ক্ষমতা!
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ কার্যত যা খুশি তাই আইন করতে পারে। এই ক্ষমতা নিছকই আইন প্রণয়নী (legislative) ক্ষমতা নয়, একই সঙ্গে সাংবিধানিক (constitutive) ক্ষমতা। সংসদ নির্বাচনের অর্থ গৃহীত সংবিধানের অধীনে থেকে আইন প্রণয়নী ক্ষমতা কার থাকবে এমন সদস্যদের নির্বাচন। এটা কোনভাবেই খোদ সংবিধান রচনার ক্ষমতা থাকে এমন প্রতিনিধি সদস্য নির্বাচন নয়। এই দুই ক্ষমতা ধারণা হিসাবে সম্পুর্ণ আলাদা। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে ১৪২ ধারার কারনে এই দুই ধরণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদকে দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ বলছে, ‘সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও (ক) সংসদের আইন দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে”। কি করে সেটা করা হবে সে সম্পর্কে কিছু পদ্ধতিগত শর্ত রয়েছে। তবে এই অনুচ্ছেদের গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী দিক হচ্ছে সংসদ দুই তৃতীয়াংশ ভোটে মৌলিক নাগরিক ও মানবিক বিরোধী আইন পাশ করতে পারবে। অসম্পূর্, সীমিত শর্তযুক্ত হলেও এই অধিকার সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ শি্রোনামে সন্নিবেশিত রয়েছে। বলা হয়েহে ১৪২(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত কোন সংশধনের ক্ষেত্রে ২৬ অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না’। অথচ সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদ জাতীয় সংসদের হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষা করবার একমাত্র কবচ বা প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা। সেখানে বলা হয়ে মৌলিক অধিকারের সঙ্গে “অসমঞ্জস সকল প্রচলি আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে”।

এই ধরনের অনুচ্ছেদ আদৌ নাগরিকদের অধিকার ও গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না সেই তর্কে না গিয়ে বিচারপতিরা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের বিপরীতে নিজেদের জন্য ক্ষমতার একটি পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে চান। সে জন্যই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা মৌলিক বৈশিষ্ট্য নামক ধারণার উৎপত্তি বা আমদানি ঘটেছে। আসলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্য নামক ধারণা ভারতের আদালতের দেখাদেখি বাংলাদেশের বিচারপতিদের একটি আবিষ্কার যা নিয়ে আলাদা ভাবে আলোচনা করা দরকার। তবে আমাদের এখনকার আলোচনার জন্য এই মুহূর্তে সেই কাজ বিশেষ জরুরি নয়। বরং এই ধরণের ধারণার মধ্য দিয়ে বিচারপতিদের অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী ধ্যানধারণা কিভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেটাই বেশি বোঝা দরকার।

কিভাবে সেটা আমরা বুঝব? বিচারপতিরা যেখানে সংবিধানের এইসব গুপ্ত কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার ও রক্ষা করতে ব্যস্ত সেখানে জনগণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তারা সমান অমনোযোগী ও উদাসীন। অথচ এটাই বিচার বিভাগের — বিশেষত উচ্চ আদালতের প্রধান কাজ। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের অন্যায় ক্ষমতা প্রয়োগ বা জাতীয় সংসদের হাতে নাগরিক ও মানবাধিকার বিরোধী আইন প্রণয়নের বিপদ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা বিচার বিভাগের প্রধান দায়িত্ব। অথচ নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের কোন উদ্বিগ্নতা নাই বললেই চলে। এই উদাসীনতা এখন চরম ও প্রকট আকার ধারণ করেছে। শুধু তা-ই নয়, শেখ হাসিনার এই আমলে আমরা দেখেছি বিচারপতিরা নাগরিকদের জামিন পাওয়া ন্যায়সঙ্গত হলেও জামিন দেন না। নির্বাহী বিভাগের ইঙ্গিতের দিকে চেয়ে থাকেন বলে যে কারনে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোন অভিযুক্ত নাগরিককে রিমান্ডে নিতে চাইলে বিচারপতিরা তাদের নির্যাতন করা হবে জেনেও রিমান্ড দিয়ে থাকেন। এমনকি রিমান্ডে নির্যাতিত হয়ে তার দাগ বা চিহ্ন নিয়ে আদালতে ফিরে আসলেও বিচারক তা দেখেন না। এভাবে বিচার ব্যবস্থা চলত পারে না। এমনকি অভিযুক্ত আদালতের কাছে প্রমাণ দেখিয়ে অভিযোগ করলেও বিচারক নির্বাক থাকেন, আমলে নেন না। এছাড়া রিমান্ডে নির্যাতন করে অভিযুক্তের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় মানবাধিকার বিরোধী ও বেআইনি হলেও বিচারপতিরা রিমান্ড দিয়ে যাচ্ছেন। ওদিকে আদালত অবমাননার দোহাই দিয়ে তারা নাগরিকদের কারাগারে নিক্ষেপ করতেও দ্বিধা করছেন না। অথচ, অন্য দিকে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্য ক্ষুন্ন হওয়ার অজুহাতে জাতীয় সংসদে গৃহীত বিভিন্ন সংশোধনী বাতিল করে দিচ্ছেন। এ এক পরাবাস্তব পরিস্থিতি!

সংবিধানে ‘মৌলিক কাঠামো’ বা ‘মৌলিক বৈশিষ্ট্য’ নামক কোন অনুচ্ছেদ নাই, কিন্তু সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ শিরোনামে একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট বিভাগ রয়েছে। না থাকলেও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্যের পক্ষে বিচার বিভাগের দিক থেকে একটা ইতিবাচক তর্ক থাকতেই পারে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়ে তর্কের ক্ষেত্রে অনেকে সেটা দাবি করেছেন। বাংলাদেশের বিতর্কেও শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। কিন্তু বাংলাদেশে মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত তর্ক শেষাবধি বিচারপতিদের স্বার্থ ও জাতীয় সংসদের বিপরীতে বিচার বিভাগের ক্ষমতার অধিক কিছু হয়ে ওঠে নি। তা ছাড়া যেখানে মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষাই বিচার বিভাগের মুখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য, সেই অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট না হয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্য রক্ষার চিন্তা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেবার মতো ব্যাপার। একে সাংবিধানিক বিতর্কের প্রধান বিষয়ে পরিণত করার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক ধ্যানধারণাকে অপরিচ্ছন্ন করে তোলা হয়েছে।

রাজনীতি ও আইনের সম্পর্ক
আমাদের সমাজ রাজনীতি ও আইনের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এখনও খুবই অপরিণত। দুইয়ের সম্পর্ক এখনও আমাদের কাছে অস্পষ্ট। গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের জন্য অপরিণত ও অপরিচ্ছন্ন চিন্তা বড় একটি বাধা। অধিকাংশেরই ধারণা আইন মাত্রই অতি পবিত্র জিনিস, একে যে কোন অবস্থাতেই মানতে হবে এবং বিচারপতি মাত্রই ফেরেশতার সমতুল্য। কিন্তু আইন তো কালো আইনও হতে পারে আর বিচারপতিও বদ হতে পারেন। বিচারপতি কেউই ফেরেশতা নন, তারা আমাদের মতোই ভালমন্দে মানুষ। বিচারপতিদের ওপর নির্বিচার আস্থার কারনে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বিচারপতিদেরই সবার আগে প্রধান উপদেষ্টা বানাবার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেন অন্য কোন পেশার মানুষ এই ভূমিকা পালন করবার যোগ্য নয়। উল্টা দিকে দেখি রাজনীতি মাত্রই নোংরা ব্যাপার গণ্য করার প্রবল মানসিকতা। যেন, রাজনীতিবিদরা শয়তানের খালাতো ভাই। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ সন্দেহ নাই, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনীতি, রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামই প্রধান ভূমিক পালন করেছে, আর সেই ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের ভূমিকাই মুখ্য ছিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে রাজনীতিই মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

জাতীয় সংসদের সদস্যদের জনগণ সরাসরিই নির্বাচিত করে, যাদের প্রধান দায়িত্ব সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়ণ করা। সেই দিক থেকে জনগণের সঙ্গে আইন তৈরির সম্পর্ক সরাসরি। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে আমরা নেহায়েতই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া হিশাবে দেখি, জনগণের পক্ষে আইন প্রণয়ণের ক্ষমতা চর্চা আকারে দেখি না। আমাদের আলোচনার জন্য যে দিকট গুরুত্বপূর্ণ সেটা হোল বিচার বিভাগ জনগণের পক্ষে এই আইন প্রণয়নী ক্ষমতার অধীন বা সোজা কথায় আইন প্রণয়নের ক্ষমতার দিক থেকে বিচার বিভাগ জাতীয় সংসদের অধীন। বিচার বিভাগের নিজের কোন আইন প্রণয়ণের ক্ষমতা নাই, যদিও আইন ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা রয়েছে । অন্যদিকে জনগণ ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মধ্যে যে-রাজনৈতিক সম্পর্ক জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়নী ক্ষমতা তৈরী করে ভাবে বিচার বিভাগ সেই রাজনৈতিক সম্পর্কেরও অধীন। রাজনীতি ও আইন তৈরির এই সম্পর্কের জায়গা অনুধাবনের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে।

বিচার বিভাগের তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’-র ধারণাও চরম বিভ্রান্তি তৈরি করে। দেখা যায় গণমাধ্যমে এই ধরণের ধারণা নির্বিচারে প্রচার করে। অনেকের ধারণা বিচার বিভাগকে স্বাধীন করে দিলেই বুঝি সমাজ ও রাজনীতির সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। বিচার বিভাগ সংবিধান ও আইনের অধীন, এই দিকটা আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু যে দিকটা আমরা আলোচনা করছি সেই দিকটি সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা নাই বললেই চলে।
এটা ঠিক যে বৈচারিক দায়িত্ব নির্বাহ করবার দিক থেকে বিচার বিভাগকে সরকার ও জাতীয় সংসদ থেকে আলাদা বা ‘পৃথক’ ভাবে দায়িত্ব পালন করা দরকার। অতএব তাদের আলাদা ভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালনের সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরী। কিন্তু সেটা বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা’ নয়। বিচার বিভাগ শুধু সংবিধানের অধীন তাই নয়, এমনকি একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত করবার প্রত্যক্ষ সম্পর্কের কারনে চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারও অধীনস্থ। ‘স্বাধীন’ বিচারবিভাগের ধারণা গণতন্ত্রের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। ইংরাজিতে Independent Judiciary-র অনুবাদ ‘স্বাধীন’ বিচার বিভাগ নয়। এর উপযুক্ত মানে হছে রাষ্ট্রের অন্য কোন অঙ্গের ওপর বিচার বিভাগ dependent বা নির্ভরশীল থাকবে না। এই কথাগুলো বলতে বাধ্য হচ্ছি এ কারনে যে আমার আশংকা আমাদের সমাজে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ নামক অগণতান্ত্রিক ধারণার আধিপত্যের কারনে অনেকে ভাবেন বিচার বিভাগ বুঝি যা খুশি রায় দিতে পারে। আর তা মানতে নাগরিকরা বাধ্য। আবার অনেকে মনে করতে পারেন বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন হয়, তাহলে বিচারপতিরাও বুঝি স্বাধীন। বিচারপতির ব্যক্তিগত ‘মত’ সেই কারনে আইন হিশাবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। একই কারনে গণমাধ্যমে দেখছি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান ত্রয়োদশ সংশোধনীর পূর্ণ রায়ের মধ্যে অনুসন্ধানের নিস্ফল প্রয়াস চলছে। অন্যদিকে খালেদা জিয়া রাজনৈতিক দিক থেকে এই রায় নাকচ করে দেবার কারনে একটা হাস্যকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে।

মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকারের অলংঘনীয়তা
রাজনীতি ও আইনের সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে রাজনৈতিক দলগুলো যা খুশি আইন তৈরি করতে পারে। যদিও বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিশাবে অগণতান্ত্রিক বলে ১৪২ অনুচ্ছেদে কার্যত এই ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাব গঠিত হলে এই ধরনের অনুচ্ছেদ আপনাতেই বাতিল হয়ে যাবে। গণতন্ত্রের মূল জায়গা হচ্ছে মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার। এই অধিকার লংঘন করবার ক্ষমতা গণতন্ত্রে জনগণ কাউকেই দেয় না। দিতে পারে না। রাজনৈতিক দলকেও নয়। গণতন্ত্র এই ক্ষমতা কারুরই থাকতে পারে না। যে কারনে একজন নাগরিকের এই অধিকারের সীমা ততোটুকুই যতোটুকু অন্যের অধিলার লংঘিত না হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে গিয়েই আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ‘গঠিত’ হয়ে ওঠে। এছাড়া অন্য যেকোন বিষয়ে জনগণের ইচ্ছা আকাংখা রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত হয়ে উঠলে, অর্থাৎ একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ মত গড়ে উঠলে জাতীয় সংসদে তার প্রভাব পড়তেই পারে। তার ভিত্তিতে একটা লিখিত রূপ জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত হতে পারে ও গৃহীত হলে সেটা আইনের শক্তি লাভ করে বা আইন হয়ে ওঠে। রাজনীতি সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মত তৈরি করে। আর সেটা করবার মধ্য দিয়েই আইনের ন্যায্যতা ও কার্যকারিতা কায়েম হয়। মূল কথা হোল আইন অনুসরণ করে রাজনৈতিক কনসেনসাস বা সম্মতির জন্ম হয় না। রাজনৈতিক সত্যই আইনী রূপ পরিগ্রহণ করে।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মানুষ স্বাধীন ও সার্বভৌম, ব্যক্তির মর্যাদা অলংঘনীয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সম্মতি ছাড়া কেউ শাসক হবে না –এইসকল ধারণা গণতন্ত্রের মূল কথা। দর্শন অবশ্য এই সকল ধারণার সমালোচনা করে, একে শ্বাশ্বত সত্য হিশাবে মানে না। কিন্তু সমাজ বিকাশের একটি স্তরে মানুষ নিজেকে এই ভাবেই ভাবতে শেখে। সমাজের চিন্তা চেতনের স্তরে এই চিন্তা অলংঘনীয় গণ্য হলে এই ধারণাই রাজনৈতিক সত্যের ভুমিকা পালন করে। এই রাজনৈতিক সত্যই তখন দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়ে উঠতে সক্ষম হয়। রাজনীতি ও আইনের এই সম্পর্কের দিকটি এভাবে অনুধাবন করলে আমার কথা বুঝতে সুবিধা হবে। একই সঙ্গে দর্শনের সঙ্গে রাজনীতির পার্থক্যও আমরা বুঝতে শিখব। বুঝতে পারব গণতন্ত্র কায়েম একটি সমাজের জন্য বিশেষ অবস্থায় বা স্তরে দরকারি হতে পারে কিন্তু চরম লক্ষ্য হতে পারে না । রাজনৈতিক গণতন্ত্রই রাষ্ট্রের চরম আদর্শ নয়।

আদালত জগতে একটা গুরুত্বপূর্ণ শব্দ প্রুডেন্স বা কাণ্ডজ্ঞান। এই দিক থেকে ব্যক্তি হিশাবে বিচারকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বিচারককে যাচাই করতে হয় তার সামনে বিচারের জন্য হাজির করা কো্ন্‌ বিতর্ক রাজনৈতিক আর কোনটি সাংবিধানিক বা আইনী। আদালতের এখতিয়ার আর রাজনীতির পরিমণ্ডলের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন না হলে একজন বিচারক একটি দেশে ভয়াবহ বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারেন। রাজনৈতিক-সামাজিক বিতর্ক বা লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক বিতর্ক নিরসিত হয়। আদালতের রায় দিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সমাধান করা যায় না।

বিচারকের কাণ্ডজ্ঞান ধরা পড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আদালতের রায় দিয়ে সমাধানের চেষ্টা না করার মধ্যে। সামাজিক-রাজনৈতিক কিম্বা কোন ঐতিহাসিক বিতর্ক বিচারকের আমলে নেবার অযোগ্য ঘোষণা করা এবং তাকে সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ফেরত পাঠানোর মধ্যেই বিচারকের প্রজ্ঞা ধরা পড়ে। বিচারকের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা একটি সমাজের জন্য অভিশাপ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

জাতীয় সংসদে গৃহীত সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল করবার এখতিয়ার বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আদালতের আছে কিনা এই তর্ক এড়াবার যে আর কোন সুযোগ নাই এই কথাটি প্রতিষ্ঠা করবার জন্য এত কথা বলতে বাধ্য হয়েছি। শুধু যে বাংলাদেশের সংবিধানের চরিত্র বোঝার জন্য এই তর্কের মীমাংসা কাজে লাগে তা নয়, আগামি দিনে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে যে সকল বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে তার উপাদানও আমরা ওপরের পর্যালোচনা থেকে শনাক্ত করতে পারি। বাংলাদেশের আদালত সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও বৈশিষ্ট্যের অজুহাত তুলে দাবি করছে জাতীয় সংসদে গৃহীত সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল করবার এখতিয়ার তাদের আছে। আমরা তা মনে করি না। সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাবে এই ধরণের কোন মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা কাঠামোর কথা নাই।

গণতন্ত্রের দিকে থেকে মূল বিষয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বৈশিষ্ট্য নয়, বরং মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার। সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাবে ‘মৌলিক অধিকার’ শিরোনামে তা উল্লেখ করা থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানেও আছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান গণতান্ত্রিক না হবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে এই অধিকার হরণের এখতিয়ার সংবিধানের ১৪২ অনুছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদকে দেওয়া রয়েছে। অথচ গণতন্ত্রে মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার অলংঘনীয়, এই অধিকার হরণ করবার কোন এখতিয়ার যেমন জাতীয় সংসদের নাই, নির্বাহি বিভাগেরও নাই। তেমনি আদালতেরও নাই। এই অলংঘনীয় অধিকার রক্ষা করার মধ্য দিয়েই আদালত সংবিধান রক্ষা করে। এই অধিকার লংঘিত হলে বিচারক তার শপথ ভঙ্গ করেন। তাই আদালতের মুখ্য কাজ হচ্ছে নাগরিকদের এই অধিকার লংঘিত হলে তা রক্ষা করা। অর্থাৎ সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করলে আদালত অবশ্যই তা বাতিল করতে পারে। এটাও আমাদের বুঝতে হবে যে গণতন্ত্র কায়েম করা ও কায়েম থাকার মানে হচ্ছে আদালতের এই ক্ষমতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠা এবং আদালতের এই ক্ষমতা আছে তা সবসময় দৃশ্যমান থাকা। মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার লংঘনের অধিকার রাজনৈতিক দলেরও নাই বা থাকে না। তারা রাজনীতির মাঠে থাকুক, কিম্বা সংসদে। আদালতই জনগণের এই অধিকার রক্ষার দায়িত্বে বিশেষ ভাবে নিযুক্ত থাকে। আর ঠিক এই ক্ষমতার মধ্য দিয়েই নির্বাচিত না হয়েও জনগণের সঙ্গে আদালত সরাসরি ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কায়েম রাখে। নির্বাচিত না হয়ে গণশক্তির বাহন হয়ে ওঠে। উঠতে পারে। আদালতের শক্তির জায়গাও নাগরিকদের অধিকার রক্ষার মাত্রা দিয়ে নির্ধারিত হয়। এই দিক থেকে গণতন্ত্রে আদালত জাতীয় সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের চেয়েও শক্তিশালী।

অনেকে দাবি করেন সংবিধানকে ব্যাখ্যা করা এবং ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে নতুন আইন তৈরি বা নতুন আইন জন্ম দেবার এখতিয়ার আদালতের আছে। এই দাবি মেনে নিলেও পরিষ্কার যে আদালতের এই ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ও সুনির্দিষ্ট। আদালতকে তখন প্রমাণ করতে হয় যে-ব্যাখ্যা আদালত দিচ্ছে সেই ব্যাখ্যা সংবিধান বা আইন প্রণেতা যে উদ্দেশ্যে সংবিধান বা আইন প্রণয়ন করেছেন সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু সংবিধানে যার উল্লেখ নাই তা রক্ষা করবার অজুহাত তুলে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের বাইরে আদালতের বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা স্বীকার করার অর্থ হচ্ছে অনির্বাচিত ব্যাক্তির হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তুলে দেওয়া, যারা জনগণের প্রতিনিধি নয়।

আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে কি থাকবে না সেটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক ভাবেই তার মীমাংসা হতে হবে। সেই মীমাংসা সম্পন্ন হলে জাতীয় সংসদ আজ যা বাতিল করেছে কাল তা আবার অনায়াসেই ফিরিয়ে আনতে পারে। জাতীয় সংসদ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করতে পারে, তাহলে তা আবার ফিরিয়েও আনতে পারে। কিম্বা বিবদমান দুই পক্ষ অন্য কোনো সমঝোতা করতে পারে। আর, ক্ষমতাবান শ্রেণী ও শক্তি যদি নির্বাচন চায় তাহলে এই তর্কের মীমাংসা তারা অনায়াসেই নিজেরা করতে পারে। আদালতের দরকার পড়ে না।। কিন্তু রাজনীতিতে আদালতকে টেনে আনার অর্থ হছে বিচার বিভাগকে ধ্বংস করা। শেখ হাসিনা এই কাজটিই খুব ভাল ভাবে করেছেন। রাজনীতিতে আদালতের কোন ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। আইন ও রাজনীতির পারস্পরিক সীমা সম্পর্কে হুঁশ না থাকলে রাজনীতি ও আদালত উভয়েরই ক্ষতি।

অতএব সাবেক বিচারপতি খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় বাংলায় লিখেছেন নাকি ইংরাজিতে লিখেছেন, তিন পাতা লিখেছেন নাকি ৩৪২ পাতা লিখেছেন সেই সব তর্ক অর্থহীন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে কী সব যুক্তি প্রমাণ হাজির করেছেন, সেই সব যুক্তি শক্তিশালী, অর্বাচীন ও নাকি স্ববিরোধী তাতেও কিছু আসে যায় না। বরং জনগণের কর্তব্য হচ্ছে আদালতকে রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসার জন্য দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করবার এই নজির সৃষ্টির নিন্দা করা।

বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে কি থাকবে না তার সিদ্ধান্ত বিচারপতিরা এর আগে দেন নি, এখনো তাদের দেবার এখতিয়ার নাই। ক্ষমতাবানদের সকল পক্ষকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করাতে হলে শেখ হাসিনাকে অচিরেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে বিশাল ও ঢাউস ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ের কোন ভূমিকা থাকবে কি না সন্দেহ।

১৯ আশ্বিন ১৪১৯। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১২। শ্যামলী।

জাতীয়তাবাদী মনের অসুখঃ মেহেরজান সিনেমা

মেহেরজান সিনেমাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখ খোলাখুলি বাইরে এসে পড়েছে। মনের এই অসুখটা অনেক গভীরের, অনেক পুরানোও বটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী মন মেহেরজান নিয়ে তাদের আপত্তির ন্যায্যতা কতখানি তা তাদের চিন্তার মুরোদ দিয়ে গলা ও কলমের জোরে দেখিয়ে দিতে পারত। কিন্তু মোকাবিলার সে পথে তারা যায়নি। মাত্র আটদিন মেহেরজান-এর প্রদর্শনী সহ্য করার পর নিজের অসুখের উত্তাপে তারা প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার বীরত্ব দেখিয়েছে। সিনেমা হলে মেহেরজান দেখানোর শুরু থেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ছবিটা ‘নিষিদ্ধ করা হোক’। কেউ কেউ নাকি আতঙ্কিতও হয়ে পড়েছিলেন এরপর প্রশ্ন করেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকারের সেন্সর বোর্ড এ ছবি মুক্তি দিল কী করে”। অর্থাৎ নিজের চিন্তার মুরোদের উপর তাঁর ভরসা নাই, তাই শেষ অবলম্বন সেন্সর বোর্ড। যাত্রা নাটকের উপর সরকারের সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে এদেরকেই এককালে আমরা সোচ্চার হতে দেখেছি। অথচ আজ এরা নিজেরাই সরকারকে ছবি নিষিদ্ধ করতে দাওয়াত দিচ্ছে। বড়ই আজীব তাদের সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে লড়াই। অনেকে বলেছেন এ ছবি লাহোরের বদলে ভুল করে ঢাকায় রিলিজ করা হয়ে গেছে। এসব এলোপাথাড়ি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পর জানিয়েছেন তিনি ছবি নিষিদ্ধের পক্ষে নন, বরং গভীর আগ্রহে সিনেমা হলে দর্শকের প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখতে চান। কিন্তু সম্ভবত আট দিনে সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে “কাম্য প্রতিক্রিয়া” না দেখতে পেয়ে নিজেরাই সেন্সর বোর্ডের ভূমিকায় নেমে পড়েন। তবে পিছনের দরজা দিয়ে। প্রদর্শক বা ডিস্টিবিউটরকে চাপ দিয়ে সে কাজ করিয়েছেন। ডিষ্টিবিউটর হাবিব খান তাঁর সে লড়াই আর দুঃখের কথার গুমোর কিছুটা ফাঁস করে জানিয়েছেন বিডিনিউজ২৪ আয়োজিত এক আলোচনা সভায়। ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার পর স্বভাবতই “সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে” ঐসব লড়াকু সৈনিকদের কাউকেই বন্ধের বিপক্ষে দাঁড়াতে দেখা যায় নি। কেউ কেউ চিন্তার দৌড় অনুপাতে স্বভাবসুলভ “পাকিস্তানী লবির এজেন্ডা” আবিষ্কার করেছেন, এদের কেউ আবার নিজেকে আলাদা করে এসব “ষড়যন্ত্র তত্ত্বের” বাইরে থাকার কপট দাবি জানিয়ে শেষমেশ নিজেও সেই পাকিস্তানী এজেন্ডারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ স্রেফ ‘পাকিস্তানের’ ভয় দেখিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার ফ্রেমের মধ্যে সবাইকে বেধে রাখার সেই পুরানো অক্ষম প্রচেষ্টা। ঠিক যেভাবে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সব কিছুর ভিতরে ‘হিন্দুদের’ ষড়যন্ত্র দেখতে পেতেন।
সব কিছুকে পাকিস্তানী এজেন্ডা বা একটা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে দেখার খপ্পর থেকে বেরিয়ে আমরা যদি আমাদের সংকীর্ণ চোখকে মুক্ত করি, মনকে স্বাধীন চিন্তা করার সাহস যোগাই তবে আমাদের বহু চিন্তার জট খুলে যাবে, ব্যাখ্যা মিলবে, আমাদের সমস্যা আর সম্ভাবনা দুটোই দেখতে পাব। যদিও আপাতত সেটা একটা সম্ভাব্য পথ মাত্র। যদি তা মানি তবে বুঝব, প্রেম যদি সব দূরত্ব-বাধা ভেদী সর্বগামী এবং সার্বজনীন বলে মানি তবে পাকিস্তানী-বাঙালির মধ্যে প্রেম হতে না পারার কোন কারণ নাই। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রেও কী সম্ভব? সাথে ধর্ষণ যখন প্রকট সত্য হয়ে হাজির? সেটা নির্ভর করে কাহিনী কীভাবে উপস্থাপন করছি। চিত্রনাট্য, দৃশ্যকল্প, অভিনয় ইত্যাদি ও সর্বোপরি পরিচালকের মুন্সিয়ানায় যদি ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য,লজিক ও শক্ত জাষ্টিফিকেশন খাড়া করে উপস্থাপন করা যায়, ঘটনা ও চরিত্রের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি আকর্ষণ করাতে সমর্থ হয় – তবে সেখানেও প্রেম সম্ভব ও ন্যায্যও বটে। এইক্ষেত্রে মেহেরজান ছবির দুর্বলতা আছে। কিন্তু মেহেরজানকে যারা পাকিস্তানী-এজেন্ডা আখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করছেন এটা তাদের সংকীর্ণ চিন্তার সমস্যা। তাঁরা চিন্তার সংকীর্ণতা দেখিয়ে শেষ করেন নি, ছবি বন্ধের একশনে গিয়েছেন।
আশির দশক থেকে আক্ষেপ শুনে আসছি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন মহাকাব্য লেখা হলো না বলে। এতে বক্তা যে মহাকাব্য পড়েছেন তা জানা গেছিল বড় জোর। কিন্তু কোন জনগোষ্ঠিতে মহাকাব্য রচিত হতে গেলে সামাজিক মানস গঠনে কী প্রাকপ্রস্তুতি লাগে, সামাজিক না হোক অন্তত নিজের সে পরিপক্কতা এসেছে কীনা – সে খবর এদের জানা হয় নাই। সংকীর্ণ “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বা বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কর্ম এটা নয় তা বলা বাহুল্য। কারণ যে নাদান অপরিপক্ক চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে, এক্ষেত্রে সে নিজেই তো মস্ত এক বাধা। প্রাকপ্রস্তুতি সেরে পরিপক্ক হতে চাইলে সবার আগে আমাদের অন্তত নিজের জীবনকে নানাভাবে দেখতে জানতে হবে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কাছে জীবন মানে “বাঙালি” – যার আগে কিছু নাই, পরেও কিছু নাই। এই ‘বাঙালি’ বলতে সাংস্কৃতিক নাকি রাজনৈতিক – সে কী বুঝে সেসবের সতর্কতা তার নাই। সে নিজেকে ‘বাঙালি’ বলে চিনেছে এই সত্যের বাইরে আর কোন সত্য কি আছে? নাকি আর কোন সত্য হতেই পারে না? এঁদের জানা হয় নাই। যদি সে ‘বাঙালি’ এটাই একমাত্র সত্য হয় তাহলে সে কি আবার মানুষও? যদি মানুষ হয় তবে দুনিয়ার অপরাপর সব অপর মানুষের প্রেক্ষিতে সে কে? তাদের সাথে কোন সম্পর্ক, টান কি অনুভব করে? যদি না করে তাহলে তো বালাই নাই। যদি করে তাহলে অ-বাঙালি সব অপরের সাথে টান অনুভবের কারণ কী? কারণ যে নিজের বাঙালি পরিচয়কে একমাত্র সত্য জ্ঞান করে তাঁর তো অ-বাঙালি সব অপরের সাথে সম্পর্কিত–এ অনুভব থাকার কোন কারণ নাই। ফলে অপর সব মানুষ কী তাকে অর্থাৎ ‘বাঙালি’কে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, অথবা সে নিজে অপরকে? জর্জ হ্যারিসনের কথাই ধরা যাক, নিশ্চয় তিনি বাঙালি ছিলেন না। তাহলে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ কায়েম হলো কি হলো না তাতে তাঁর কিসের ঠেকা? আর আমরাই বা এই অ-বাঙালি অপর মানুষটাকে আমাদের বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে জায়গা দিব কোথায়, ধারণ করব কী করে!
এই পরিস্থিতিতে মেহেরজান সিনেমা প্রমাণ করল মহাকাব্য দূরে থাক ছকবাঁধা ফ্রেমে আটকা মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বাইরে অন্য কোনভাবে জীবনকে দেখতে, অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে দেখা বা দেখানোর চেষ্টার পরিণতি কী হতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণ মন এখনো এতই নাদান যে এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানানোর মত পরিপক্কতা সে লাভ করে নাই। এর মানে এমন নয় যে মেহেরজান একটা ‘উৎরে যাওয়া’ ছবি। ‘উৎরে যাওয়া’ মানে–কী বলতে চাই, কীভাবে বলতে চাই, সিনেমা বানানোর পর তা বলতে পারা গেছে কী না এসব। এই বিচারে মেহেরজান সফল হতে পারেনি। তবে বলা যেতে পারে, সে কাজের একটা ছোট পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেষ্টা এটা। আর এতটুকুতেই খড়্গ নেমে এসেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী মন একে তাড়া করে আঁতুড় ঘরেই মেরে ফেলতে চাইছে।

ইতিহাসে বিতর্ক তাই ইতিহাসেরই সমবয়সী
দুনিয়ার কোন দেশের যুদ্ধের ইতিহাস একাট্টা নয়, হওয়ার কোন কারণও নাই। অসংখ্য বয়ান থাকে, থাকবে ওখানে। এটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা, বিভিন্ন স্বার্থের দিক থেকে দেখা, বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে দেখার কারণে এসব ভিন্নতা দেখা যায়। ইতিহাসে বিতর্ক তাই ইতিহাসেরই সমবয়সী। আবার এসবের মধ্য থেকে সাধারণ একটা বয়ানও বের করা যায়, যাকে আমরা অবিতর্কিত মুলধারার বয়ান বলে মানি। কিন্তু ইতিহাসের বিতর্ক আর পলিটিসাইজড ইতিহাসের বিতর্ক (যেটা আসলে ইতিহাস নিয়ে দলবাজীর কুতর্ক) এক কথা নয়। যেমন, ধরা যাক স্বাধীনতার ঘোষণা, যুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, ধর্ষণ ঘটনার সংখ্যা ইত্যাদি নিয়ে যে তর্ক করা হয় তা ইতিহাসের বিতর্ক বলে মানা যায় না; এগুলো এমনভাবে করা হয় যেন এই তর্কের সমাধানের উপর নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধ আদৌ হয়েছে কি হয় নি, অথবা যেন ২৫শে মার্চের কালোরাত্রির নৃশংসতা ইত্যাদি সব মিথ্যা হয়ে যাবে। অথচ ঘটনা হলো, ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা বা শহীদের সংখ্যা বেশি কিংবা কম হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণসহ সব অপরাধ, নৃশংসতা জায়েজ হয়ে যাবে না। শেখ মুজিবের অবদান খাটো হয়ে যাবে না। কিন্তু এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়েছে যেন ধর্ষণের সংখ্যা বেশি হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রেডিট আর কম হলে ডিসক্রেডিট। অদ্ভুত এ’এক মনের খবর পাই এখানে।
আবার আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, এমন একটা লজিক তৈরি করা হয়েছে যেন, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবের ক্রেডিট কতখানি তা দিয়ে এখনকার আওয়ামী লীগের রাজনীতির ক্রেডিট রেটিং আমাদের করতে হবে এবং আওয়ামী লীগকেই ভোট দিতে হবে। একই লজিক বিএনপিরও। রেডিওতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কারণে এখনকার বিএনপির রাজনীতির ক্রেডিট রেটিং আমাদের করতে হবে এবং বিএনপিকেই ভোট দিতে হবে। আর এইসব হাস্যকর লজিককে আমরা ইতিহাস-বিতর্ক বলে দাবি করতে দেখছি। আবার এই খাঁটি দলবাজিগুলোই নাকি “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি”! জাতীয়তাবাদী মন ইতিহাসের নামে দলবাজির এই চক্করে আমাদের সবাইকে বেধে রাখতে চায়, তাদের চিন্তার ফ্রেমের বাইরে যে কোন চিন্তাকে শেকল পড়াতে চায়।
যুদ্ধ ব্যক্তি মানুষকে জনগোষ্ঠীগত মানুষের একজন, এক মানুষের মধ্যে হাজারও মানুষের অস্তিত্ব, মানুষের এক একক কমিউনিটিবোধ জাগাতে বাধ্য করে। এক মানুষ সারা পৃথিবীর মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে দায়, দায়িত্ত্ব বোধ করে। এতে চিন্তার অর্গল খুলে যায় বলে নানান দিক থেকে জীবন পরখ করা, ছুঁয়েছেনে দেখার সুযোগ মিলে। মনের শঠতা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, পলায়নপরতাগুলো কোন এক কোণে চাপা পড়ে যায়। এর মানে এই না যে রক্তমাংসের দোষত্রুটি-ওয়ালা মানুষের বদলে সবাই বইয়ের আদর্শ মানুষ বনে যায়। আদর্শ মানুষ তো আদর্শ-আইডিয়েল, বাস্তবের রক্তমাংসের রিয়েল মানুষ সে নয়। বইয়ের আদর্শ মানুষ বই থেকে বেরিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বাস্তব মানুষ কোনদিন হতে পারে না, আমরাও দেখব না। রক্তমাংসের দোষত্রুটি-ওয়ালা মানুষই একমাত্র বাস্তব মানুষ হতে পারে। তবে একথা সত্য ইতিহাস লেখার সময় মানুষের আদর্শগত দিকটা প্রধান হয়ে উঠে। তবে এক্ষেত্রে, মানুষের আদর্শগত দিকটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি রক্তমাংসের মানুষের দোষত্রুটি আছে থাকে এটাও সমান সত্যি হয়ে তখনও থেকে যায়।
তবে যারা শিল্পজগতের লোক, নতুন কিছু করতে চায়, শিল্প করতে চায়, তাদের পছন্দ রক্তমাংসের মানুষ। তারা রক্তমাংসের মানুষ আর আদর্শ মানুষ – এই একই মানুষের ভিতরের দুইদিকের দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করে শিল্প রচনার ভিত গড়ে।
সেসব দিক থেকে সুনির্দিষ্টভাবে মেহেরজানে কী আছে সে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতেই পারে। এখানে সেসবের আগে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখটা কী তা একটু বিশদ করে দেখব, সেখানে প্রবেশ করব।

সাংস্কৃতিক বাঙালি ও রাজনৈতিক বাঙালি
আমরা বাঙালী – দুটো অর্থে কথাটা বলা যায়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগেও আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম, পরেও ‘বাঙালি’। এই বাক্যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার বাঙালি আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট অর্থে। আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে জীবনযাপন, জীবন প্রকাশ করার ধরণ অর্থে। দুনিয়ায় বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও অনেকানেক নৃবৈশিষ্টের মানুষের পাশাপাশি আমরা আমাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। ভাষা, ধর্ম, সৃষ্টিশীলতা, জীবনকে দেখার ধরণ, পারস্পরিক সম্পর্কের রূপ, পরিবার, সমাজের ধরণ, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে প্রকাশিত আমাদের সুদীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ছাপ যার প্রতিটি পরতে পরতে লুকানো। তবে এটা আবার একাট্টা না, মোটাদাগের সাংস্কৃতিক ফ্রেমের মধ্যে আভ্যন্তরীণ লড়াই সংগ্রাম আছে, বাঁক ফেরা আছে; যদিও নদীর স্রোতের মত তা বহমান, যাতে পরিবর্তন আছে তবে সদা বিকশিত। এভাবেই আকার নিচ্ছে, ভাঙছে আবার আকার নিচ্ছে। সব মিলিয়ে এককথায় একে বাঙালি সাংস্কৃতিক রূপ, বৈশিষ্ট্য বলছি।
অন্যদিকে যদি বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম না, এরপর ‘বাঙালি’ পরিচয় নিয়েছি; আর এরপরে কী হব এখন জানি না। তবে ভবিষ্যতে অন্যকিছু পরিচয় নিতেও পারি। এবার এই কথার মধ্যে যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার করেছি তার অর্থ কিন্তু এখানে রাজনৈতিক; সাংস্কৃতিক পরিচয় সীমা ছাড়াও রাজনৈতিক অর্থে বাঙালি। এতে আমাদের সাংস্কৃতিক বাঙালীত্ব ঘুচে গেল না, তবে যোগ হলো রাজনৈতিক পরিচয়। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ কথা হলো, রাজনৈতিক পরিচয় বলতে এটা কোন চিরস্থায়ী ধরণের ব্যাপার নয়।
বাঙালি – এই শব্দ ব্যবহারের সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলে এই ভাগটা সতর্কভাবে মনে রাখা দরকার। আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? রাজনৈতিক পরিচয় হলো, অফুরন্ত সম্ভাবনাময় মানুষের চিন্তায় নিজেকে অনুভব, চিন্তার এক প্রডাক্ট বা ফসল। এটা আমরা জনগোষ্ঠী হিসাবে নিজেরা নির্মাণ করি। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগোষ্ঠীর নিজে নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবনে লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে। এটাই কোন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে বড় ফারাক।
রাজনৈতিক পরিচয়- এই কথাটায় এমন কী আছে যা সাংস্কৃতিক নয়? কেন মনে ভাগ বজায় রাখার কথা বলছি? এর জবাব অনেকভাবে দেয়া যেতে পারে। সেসবে এখানে বিস্তার না ঘটিয়ে সংক্ষেপে মূল কিছু দিক উল্লেখ করব। কোন জনগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বলে যা আকার নেয় এর মূলে আছে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট। যেমন, হিমালয় – সুউচ্চ পর্বত, এর পাদদেশের শেষ মাথায়, এর বরফগলা পানি, বিশেষ মিঠা পানি সমুদ্রে মিশে নিজ বৈশিষ্ট্য লোপ পাবার ঠিক আগে প্রায় সমতল এক ভূমিতে আমাদের জন্ম। পর্বতের বরফগলা বিশেষ মিঠা পানিতে কৃষি চাষাবাদ করে ও মাছ খেয়ে আকার পাওয়া কোন নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী দুনিয়াতে আর কোথাও আছে কিনা খোঁজ করে দেখা যেতে পারে। গরুর দুধকে নানানভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন নতুন নানান খাদ্য ও খাদ্যাভাসের কথা দুনিয়ার নানান জনগোষ্ঠির মধ্যে চল আছে আমরা দেখতে পাই, যেগুলো আবার প্রায় নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কমন। যেমন, মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি। কিন্তু ছানা? রসে সিদ্ধ করা সেই ছানার রসগোল্লা? এটা এতই আন-কমন খাদ্য বা খাদ্যাভ্যাস যে ‘ছানা’ শব্দের ভাষান্তর মেলে না। সাধারণভাবে বললে ছানা একধরণের প্রসেসড মিল্ক। একই দুধ কিন্তু আমাদের প্রক্রিয়াজাত করণের মধ্যে এমন এক বিশেষ ধরণ আছে যার কারণে এটা দুধের অন্য আর সব সাধারণ প্রক্রিয়াজাত ফল মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি থেকে একেবারে ভিন্ন। সব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এমন বিশেষ কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। একথাগুলো পড়তে পড়তে পাঠককে জাতগর্বে বা আবেগে আপ্লুত হতে বারণ করি। কারণ আসল কথাটা এখন বলতে হবে। লক্ষ্য করলে দেখব, আমরা যা বাঙালি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে চিনছি তা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামোর উপর। আর গুরুত্ত্বপূর্ণ হলো, এই মৌলিক কাঠামোটা প্রকৃতি-প্রদত্ত, আমাদের কোন কেরামতি নাই। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত বা গিভেন, অনেকে যা গড-গিভেন বলতে পছন্দ করেন। আগে থেকে নির্ধারিত ঐ পটভূমির উপর বেঁচে থাকা, জীবনধারণ, যাপন করতে গিয়ে আমাদের কেরামতিটা অতটুকুই যে, আমাদের জীবন সংগ্রাম লড়াই ও তার মধ্যে দিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর জীবন প্রকাশের বিশেষ ধরণ এটা—এককথায় যাকে আমরা সাংস্কৃতিক বাঙালি বলে জানছি। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে আকার দিচ্ছে আমাদের নৃবৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামো—এই পূর্বনির্ধারিত পটভূমি মেনে নিতে হচ্ছে কেন? কারণ, আমরা কেউই আল্লার সাথে চুক্তি করে বঙ্গদেশে জন্ম নেইনি; আমার নাক-বোচা, শ্যামলা, গড়ে সাড়ে পাঁচ ফুটের হব কিনা তা আমরা কেউই ঠিক করিনি; মাটিতে হিমালয় পর্বত থাকতে হবে যার পাদদেশে আবার বিস্তীর্ণ সমতলভূমি থাকতে হবে এমন নিশ্চয়তা জন্মের আগে আমাদের কেউ দেয়নি। এর মানে আকার পাওয়া সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মৌলিক দিকগুলো পূর্বনির্ধারিত, প্রকৃতি-প্রদত্ত; কোন জনগোষ্ঠীর ওতে কোন হাত নাই। ওকে খণ্ডান বা বদলে নেয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।
তাহলে এখানকার জন্য মুলকথা, আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত।
কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? এটা জনগোষ্ঠী নির্মাণের রাজনৈতিক ভাব, কাজ ও তৎপরতার মধ্যে মানুষ তৈরি করে। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। জনগোষ্ঠীর নিজের নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবন লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে।
রাজনৈতিক পরিচয় কথাটা একটু ভেঙ্গে বলি। রাজনৈতিক পরিচয় মানে রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়; একটা নতুন রাষ্ট্র গঠনে যা কালমিনেট অর্থে পরিণতি পায়। এখানে রাষ্ট্র বলতে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থাৎ রাজা সম্রাটের সাম্রাজ্য অর্থে রাষ্ট্র নয়। যেমন ১৯৭২ সালে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কালমিনেটেড, মোটাদাগে এর রাজনৈতিক পরিচয় বিনির্মাণ (রিকনষ্ট্রাকশন) শুরু ষাটের দশকে। আমরা এক নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, বাঙালি (সাংস্কৃতিক নয় রাজনৈতিক অর্থে) বা বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিচয় ধারণ করে জনগোষ্ঠীগত ভাবে নতুন আকার নিতে শুরু করেছিলাম। এটা সাংস্কৃতিক অর্থে খেয়ে পড়ে জীবনযাপন বেঁচে থাকা ও স্রেফ জীবন প্রকাশ নয়; নতুন রাষ্ট্র গঠন, রাষ্ট্রে পরিণতি পাওয়ার মামলা; তাই রাজনৈতিক। প্রকৃতি-প্রদত্ত বিষয়াবলীর উপর মানুষের নিজস্ব অর্জন, চিন্তার মুরোদ হাজির করা। পাঠক হয়ত লক্ষ্য করেছেন, আগের বাক্যে ‘রিকনষ্ট্রাকশন’, ‘নতুন’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছি। তার মানে রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে বা কনষ্ট্রাক্ট করে নেবার বিষয়; যা আগে থেকেই হয়ে বা গড়া থাকে না। এটা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মত প্রকৃতি-প্রদত্ত অর্থে গিভেন না। আবার ‘রি-কনষ্ট্রাকশন’ এর ‘রি’ অথবা ‘নতুন’ বলেছি—তার মানে এক্ষেত্রে আমাদের অন্য কোন রাজনৈতিক পরিচয় আগেও একবার নির্মিত হয়েছিল! হ্যাঁ, হয়েছিল। যেটা পাকিস্তান রাষ্ট্র। ভুল বা শুদ্ধের প্রশ্ন নয়; ফ্যাক্টস হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক পরিচয় ধারণের আগেও আমরা একবার মুসলমান ডাকনামের রাজনৈতিক পরিচয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের ফসল বা পরিণতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রে আকার পেয়েছিলাম। আর ওটা ছিল আমাদের প্রথম রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ। [এর আগে আমরা ছিলাম বৃটিশ-ইন্ডিয়া এই কলোনী রাষ্ট্রের প্রজা, আর এরও আগে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রজা; ফলে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণতি চাই এমন নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় এগুলোর কোনটাই নয়, ঘটনা নয়। তাই রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ওগুলোকে বলতে পারব না।]
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ গড়নের বিষয়টা আসলে কেবল একবারই নয়, বারবার তা নির্মাণ পুণর্গঠন হতে পারে; জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয়কে আবার নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই পূর্ববঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর আমাদের বিভিন্ন সব সম্ভাব্য পরিচয়ের মধ্য থেকে এক সময়, মূলত কলোনী ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটাতে মুসলমান পরিচয় মুখ্য গণ্য করে একবার পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং পরবর্তীতে সেই নিপীড়ক পাকিস্তান রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে নতুন আর এক রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমাদের উদ্ভব ঘটেছিল। এখান থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, একই বাঙালি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী আগামীতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবার নতুন রাষ্ট্রে পুণর্গঠিত হবার চেষ্টা করতে পারে।
পস্থিত কোন রাষ্ট্রের মধ্যে বসে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করে রাজনৈতিক সংগ্রামের কাজ একটা নিরন্তর ঘটনা। কিন্তু কাকে রাজনৈতিক পরিচয় মেনে ধরে নিয়ে তা বারবার আগাবে তা নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূর-মীমাংসীত্ব বিরোধ স্বার্থসংঘাত কী রূপ, চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছে। তবে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করা মানে রাষ্ট্রের সীমানা ভেঙ্গে নতুন সীমানা নিয়ে রাষ্ট্র হতেই হবে এমন কোন কথা নাই। একই বাংলাদেশ ভৌগলিক সীমার মধ্যে থেকেই রাষ্ট্র নতুন করে নতুন পরিচয়ে পরিগঠিত হতে পারে। বাংলাদেশের এখনকার রাষ্ট্র বদলে আগামীতে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে একই ভৌগলিক সীমায় যদি নতুন রাষ্ট্র, কনষ্টিটিউশনে পুণর্গঠিত হয় তবে একাদেমিক ভাষায় একে নতুন বাংলাদেশের সেকেন্ড রিপাবলিক বলা হবে।
এখনকার জন্য মূল কথা হলো, সাংস্কৃতিক অর্থে বাঙালি একই জনগোষ্ঠী বারবার রাজনৈতিক পরিচয় বদল করতে পারে, রাষ্ট্র বদলে পুণর্গঠিত হতে পারে। তবে এখনকার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ভবিষ্যতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করে বদলে গেলেও সাংস্কৃতিক অর্থে অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক, ভৌগলিক অর্থে সে একই বাঙালি জনগোষ্ঠীই থাকবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ – এই রাজনৈতিক পরিচয় তার শেষ কথা নয়; এর যেমন শুরু আছে তেমনি শেষও আছে। আর, এটা সাংস্কৃতিক অর্থে শেষ হওয়া নয়। আবার, সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি বলে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ওর একমাত্র ও থিতু-রূপ হবে এমন ধারণার কোন ভিত্তি নাই।
আবার সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি –এটাও শুকিয়ে মরা অর্থে শেষ হতেও পারে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের কথা ধরা যাক। ওর সাংস্কৃতিক পরিচয় এখনও বাঙালী হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে ওরা ৪৭ সাল থেকেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। এখন ওর রাজনৈতিক পরিচয় তো বিলীন হয়েছে দেখা যাচ্ছে, এই সাংস্কৃতিক পরিচয়টুকুও কী শেষ পর্যন্ত থাকবে? এটা নির্ভর করে সর্বভারতীয় যে আগামী রাষ্ট্র পরিচয় দাড়াবে তা সে বর্তমান ভারতীয় জাতীয়তাবাদ থাকুক আর যাই থাকুক—তাতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীর চিন্তার অবদান কতটুকু ও কী থাকবে এর দ্বারা। ঠিক একইভাবে দুনিয়াতে বাংলাদেশ বলে আগামীতে কিছু কি থাকবে? আলাদা করে চেনা যাবে? এটা নির্ভর করে গ্লোবাল চিন্তা জগতে আলাদা করে চেনা যায় এমন কোন অবদান যদি আমাদের থাকে, রাখার মুরোদ রাখি তবে। নইলে এমনও হতে পারে কারও কোন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে চাপে প্রভাবে আমরাও বিলীন হয়ে গেছি।

রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ও রেসিজমের বিপদ
এবার কথা আর একটু সরাসরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করব। রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ মানে একইসাথে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করে ফেলাও বটে। কলোনী ভূমিব্যবস্থা অর্থাৎ জমিদারী-প্রজা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ইস্যুতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পূর্ববঙ্গীয় প্রজাদের পক্ষে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারে নি। বরং দেশভাগ ঘটনার শেষের দিকে বিশেষত ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময় থেকে সংখ্যাগরিষ্ট পূর্ববঙ্গের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ বা হিন্দুদের রক্ষা করার নামে জমিদারদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এসব ঘটনায় পূর্ববঙ্গ পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে মিলে মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে দেশভাগের দাবির সাথে একাত্ম হয়ে যায়, আর এর নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সাথে বিপরীতে নতুন সম্ভাব্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় হয়ে যায় ‘হিন্দু’; এটা এড়ানোর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না। এখন মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে দেশভাগ ঘটে যারার পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ গরহাজির হয়ে যায়। অথচ ইতোমধ্যে ‘মুসলমান’ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করে ফেলার কারণে চাইলেই ঐ রাষ্ট্রের শত্রু যে আর বাস্তবে ‘হিন্দু’ নয় সেই বয়ান থেকে সরে আসা সম্ভব হয় না। কারণ আগেই ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যে নতুন প্রোথিত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি ‘মুসলমান’। এটাই যে কোন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ, গ্রহণের আজন্ম স্ববিরোধ।
অবিভক্ত বৃটিশ ভারতে পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা সংঘাত ছিল ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানো। কিন্তু বিশাল ভারতবর্ষের হাজারো বিরোধ সংঘাতের মধ্যে পূর্ববঙ্গ নিজের দাবিকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতার রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে হাজির করতে পারার মত রাজনৈতিক শক্তি তার ছিল না। একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৪৭ সালের আগের দেড়শ বছর ধরে চলা বৃটিশ ভূমি চিরস্থায়ী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রজা-কৃষক আন্দোলন। তিতুমীর, শরিয়তুল্লাহ বা ফরাজী আন্দোলনকে বাইরের আবরণ দেখে ভুলে এগুলোকে ধর্মীয় আন্দোলন বলে মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো মুলত বৃটিশ ভূমি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকের জমি পাওয়ার আন্দোলন সংগ্রাম। জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড় থেকে মুক্তির আন্দোলন। কিন্তু এগুলোর কোনটাই সফল হতে পারেনি। কারণ এগুলো সর্বভারতীয় বৃটিশ রাষ্ট্রক্ষমতার বিপরীতে কোন পালটা ক্ষমতা হতে পারেনি, বড়জোর স্থানীয় ঘটনা হিসাবে থেকে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯০০ সালের পরের ও ১৯৪৭ সালের আগে এই সময়কালে পূর্ববঙ্গের ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের বদলের আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতা হয়ে উঠতে এবার সে রাজনৈতিক মৈত্রী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এই রাজনৈতিক মৈত্রী গড়া ভাল না খারাপ অথবা ভুল না শুদ্ধ হয়েছিল সে বিচারে নয়, ফ্যাক্টস হিসাবে কী ঘটেছিল সেদিক থেকে বললে, পূর্ববঙ্গে প্রথম এলায়েন্সটা গড়ে উঠেছিল ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড়ে আটকে থাকা প্রজা-কৃষক আর মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে; এরা কলকাতাকেন্দ্রিক ততদিনে গড়ে উঠা শহুরে প্রথম প্রজন্মের মুসলমান মধ্যবিত্ত। পড়াশুনা, সরকারী চাকরি, ওকালতি ইত্যাদি নানান পেশা—সবমিলিয়ে এক শহুরে মুসলিম মধ্যবিত্ত, মোটাদাগে সোহরাওয়ার্দী এদের নেতা বা বলা যায় এটাই সোহরাওয়ার্দীর কনষ্টিটিউয়েন্সী। এরপর পূর্ববঙ্গে প্রথম এই এলায়েন্সটার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের এলায়েন্স— এটাই পালটা ক্ষমতা, বৃটিশ রাজ আর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সক্ষম এক সংহত ক্ষমতা হয়ে উঠতে পেরেছিল। পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা ভূমিবিরোধ একমাত্র এভাবেই অন্যেরা শুনতে বাধ্য করা যায় এমন শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছিল, পূর্ববঙ্গের একমাত্র গতি হয়ে উঠেছিল। মুসলীম লীগ নামের এই এলায়েন্সের ভিত্তি একটাই –তাদের সবার শত্রু কমন, অবশিষ্ট ভারতের রাজনৈতিক শক্তি; আর ঐ এলায়েন্সের দাবি হলো মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে তাদের আলাদা রাষ্ট্র হতে হবে। অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ নিজের মূল দাবি জমিদার-প্রজা বিরোধের সমাধান শেষে, মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের মধ্যে খুঁজে নেবার একটা রাস্তা পেল। কিন্তু এতে নতুন অনুসঙ্গ, সেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় ভিত্তি হয়ে উঠল ‘মুসলমান’।
ওদিকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ মানে আসলে কী? নতুন পরিচয়ের মানে খুঁজতে গিয়ে তা শেষে গিয়ে দাঁড়াল পাকিস্তান রাষ্ট্রকে “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র হতে হবে—এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এখন পুর্ববঙ্গের দিক থেকে দেখলে তার প্রধান বিরোধ যার সে সমাধান খুজছিল তা ছিল ভূমিব্যবস্থার সমাধান; কিন্তু কাম্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে তা শেষে হয়ে দাঁড়াল “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। বুঝাই যাচ্ছে মূল জায়গা থেকে সরে যাওয়া এ এক লম্বা জার্নি; ছিল ভূমিবিরোধ সমাধান দাবি, কিন্তু শেষে তা হয়ে দাঁড়ালো ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয়ে এক “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় দেয়া হয়ে গেছে হিন্দু। এটাই রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে যাওয়ার স্ববিরোধ ও বিপদ। কারণ দেশভাগ হয়ে যাবার পর, যখন বাস্তবে ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটে গিয়েছে এরপর হিন্দুরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রু একথা বলবার আর কোন মানে হয় না, ভিত্তি থাকে না।
শুধু তাই না, ভূমি বিরোধ অবসানের পর নতুন বিরোধ নতুন রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে তা মুখ্য হয়ে উঠেছিল। সেসবের খবর যারাই করতে গিয়েছিল এমন পূর্ববঙ্গের প্রতিটা প্রশ্নকে নতুন “পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সংহত” করার নামে তা “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা বিরোধী” বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হতে লাগল। আরও একটু আগ বাড়িয়ে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলা হতে লাগল।
‘মুসলমান’—এই রাজনৈতিক পরিচয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়েও আর এক বড় বিপদ ঢেকে আনে। বিপদটা হলো দেশভাগ ঘটে যারার পরেও শত্রুকে দেখানো, চেনানোর সমস্যা। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী প্রথা বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ হাজির নয়। ফলে এই নতুন বাস্তবতায় শত্রুকে আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে দেখানো চেনানো বাস্তবে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জমিদারী উচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল জমিদারকে কোন ক্ষতিপূরণ দেবার মত আপোষমূলক ছাড় না দিয়ে; ফলে ‘জমিদার-প্রজা’ ধরণের কোন পুরানো উৎপাদন সম্পর্কের জের ওখানে থাকেনি, সমুলে উৎখাত হয়ে গিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান বলে নির্মম নৃশংস দাঙ্গা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এর তলে তলে পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে গিয়েছিল অথচ মালিকানায় রদবদল অর্থে কোন ধরণের সামাজিক ঝাকুনি এতে তৈরি হয়নি। যেন কেউ টেরই পায়নি। এতে মজার এক ব্যাপার ঘটে। কোন সামাজিক ঝাকুনি তৈরি না করে, পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে যাবার ঘটনা ঘটেছিল অথচ সবার মনে ছাপ ফেলেছিল, ঝাকুনি দিয়েছিল হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আর ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটনার সুফল সবাই ভোগ করেছে। ওদিকে এই অবস্থায় নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র ততদিনে অদৃশ্য ‘হিন্দু’ শত্রুর ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্র সংহত করতে চাইছে, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে সেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুললে তাকে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলে টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছে। একইভাবে আমরা যদি পরবর্তীকালের ভাষাভিত্তিক বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, এই ‘পরিচয়ের রাজনীতি (politics of identity) বিচার করতে বসি তবে আগের ‘মুসলমান’ ‘পরিচয়ের রাজনীতি’র সাথে এর অবাক করা মিল খুঁজে পাব।
পাকিস্তান থেকে আমরা আলাদা নিজের রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছি ৪০ বছর হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন আমাদের উন্মেষ, বিকাশ, চিন্তাভাবনা চর্চার, সিদ্ধান্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা– একথা বলবার কোন মানে হয় না। কিন্তু ‘পাকিস্তান’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র করেছি। ঠিক যেমন ‘হিন্দু’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে পাকিস্তান নামে রাষ্ট্র হয়েছিল।
পাকিস্তানের প্রেক্ষিতে, পূর্ববঙ্গের দিক থেকে মূলত জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান চাইতে গিয়ে রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা, ঘটনাপ্রভাবে ‘হিন্দু’ শত্রুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হয়ত গ্রহণযোগ্য মনে করা যেতে পারে। কিন্তু এর মানে যদি হয় হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠা? ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা তাল সামলাতে না পেরে আগ বাড়িয়ে যদি হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে যায়? তবে এটাকে রেসিজম বলে। যে কোন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণের সাথে সহজাতভাবে তবে লুকিয়ে হাজির থাকে রেসিজম। এটাই ‘পরিচয়ের রাজনীতির (politics of identity)ভয়াবহ দিক। মুসলমান পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘হিন্দু’কে শত্রু ঠাউরে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে তার নিজের হিন্দুবিদ্বেষী বা হিন্দু-রেসিষ্ট (রেসিষ্ট হিন্দু নয়) হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া এড়ানো খুবই কঠিন। আর ঘটলে তা হবে ভয়াবহ। একইভাবে ‘পাকিস্তানী’কে শত্রু ঠাউরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে তার পাকিস্তানীবিদ্বেষী বা পাঞ্জাবীবিদ্বেষী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এর উপর কেউ যদি পাকিস্তান ও ইসলাম – শব্দ দুটোকে মনে মনে সমার্থক জ্ঞান করে তাহলে সে ইসলামবিদ্বেষী হবে সন্দেহ নাই।
রাজনৈতিক বা আকাদেমিক দুনিয়া রেসিজম (Racism) কথাটার সাথে আমাদের পরিচয়, সচেতনতার খুব বেশি দিন আগের নয়। সাউথ আফ্রিকার শাসকের সাদা-কালো বর্ণবাদের বিরোধিতা অথবা একালের পুর্ব-ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গোত্র বা নৃজাতি (Race)দের মধ্যে পরস্পরকে খতম বা নির্মূল অভিযানমুলক সংঘাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন ইত্যাদি এগুলোর চিহ্ন। কিন্তু আমাদের চিন্তার মধ্যে রেসিজমের ব্যাধি এমনই অদ্ভুত যে বহনকারী গর্বের সাথে সে কথা বলে এবং সে কোনদিন খেয়াল করেই দেখেনি যে ঐ বক্তব্য রেসিজমের ব্যাধিতে ভরপুর। মানুষকে যত ধরণের পরিচয়ে বিভক্ত করে হাজির করা সম্ভব বা বলা চলে মানুষে মানুষে যত ধরণের বিভক্তিমূলক চিহ্ন আবিস্কার করা সম্ভব যেমন, গায়ের রং, শরীরের গড়ন (বেটে-লম্বা, নাক খাড়া-বোচা ইত্যাদি), সমতল-পাহাড়ী বা কোস্টাল, ধর্ম, গোত্র, বংশ, প্রাচ্য-পশ্চিম, নারী-পুরুষ ইত্যাদি। এসব বিভক্তি চিহ্ন মানুষের মধ্যে হাজির আছে। এসব বিভক্তি টের পাওয়া সচেতন হওয়া কোন সমস্যা নয়। এবং সম্ভবত এই বিভক্তি চিহ্নকে ভিত্তি করেই রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণ ঘটে থাকে, আমরা এড়াতে পারি না। কিন্তু এই বিভক্তি চিহ্নের ভিত্তিতে একটাকে অন্যটার বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ গণ্য করা, হেয় গণ্য করা, খাটো বা নিচু করে দেখানো, উচু-নিচু ধারণা তৈরি করে বিদ্বেষী হয়ে যাওয়া রেসিজমের ব্যাধি, রেসিস্ট মন তৈরি করা।
জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকে তৈরি হয়, সেই দ্বন্দ্বে লড়াই সংগ্রাম চলে, চলতেই থাকে। সে লড়াইয়ে স্বার্থে শত্রু-মিত্র সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেজন্য রেসিজম তৈরি করা, ওর মর্ম অপর জাতবিদ্বেষী হয়ে পড়া জরুরী নয়।
কিন্তু জরুরী না হলেও রেসিজম, বিদ্বেষই ঘটতে দেখি আমরা। পাকিস্তান রাষ্ট্র হিন্দু রেসিজমে ভুগেছিল। ঠিক একইভাগে বাঙালি জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিজমে ভুগছে। পাকিস্তানের বেলায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পর সে হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল। কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা”, ‘“ইসলামী চেতনা’র” বিরোধী বলে ট্যাগ লাগিয়ে দমন নিপীড়ন, নিষিদ্ধ ঘোষণার পথে মোকাবিলা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের বেলায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের পাকিস্তানীবিদ্বেষী হতে বলছে। ‘পাকি’, ‘পাঞ্জাবী’, ‘সিন্ধী’ এসব শব্দে জাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে আমোদ জাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে দমনের পাকিস্তানের দেখানো রাস্তা বেছে নিচ্ছে।
“পাকি’’ বা ‘পাকিস্তানী’ বলে জাতবিদ্বেষ জাগিয়ে তোলার যারা চেষ্টা করেন তাদের পক্ষে যে যুক্তি তাকে পরীক্ষা করলে পাওয়া যায় তার সার বয়ানটা হলো, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী রাষ্ট্র-সেনাবাহিনী নৃশংস অত্যাচার ধর্ষণ চালিয়েছে তাই আমাদেরকে পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী রেসিষ্ট হতে হবে। কেউ কেউ আবার নিজের মনের রেসিজমকে ঢাকতে শর্ত দিয়ে বলে, পাকিস্তান এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায় নাই। কাজেই পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী জায়েজ। পাকিস্তান কিভাবে নিজের গায়ের রক্ত কৃতকর্ম, পরিচয় সাফসুতরা করবে, দুনিয়ায় নিজেকে হাজির করবে সেটা একজন পাকিস্তানী ও পাকিস্তানী রাষ্ট্রের নিজস্ব গভীর সমস্যা। এই ইমেজ পরিচয় সঙ্কট পাকিস্তান নিজে না কাটানো দায়িত্ত্ববোধ না করা পর্যন্ত তাদের প্রতি সারা দুনিয়ার সাথে আমাদেরও খারাপ ধারণা থাকবেই, করুণা ছাড়া আর কীইবা করতে পারি। কিন্তু ওদের ইমেজ পরিচয়ে দাগ নিজস্ব সমস্যা সঙ্কট আছে বলে সেটাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে আমাদের নিজেকে কলঙ্কিত করব? বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী জায়েজ করার এই যুক্তিটা এমনই আজীব।
এই বয়ানের ফাঁকির দিকটা হলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভূমিকা আমরা এখনো জ্বলজ্বলে স্মরণে রাখতে পারি, মাফ না করতে পারি কিন্তু এই সুযোগে আমাদের জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা ন্যায্য হয়ে যায় না। এমনকি পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে যুদ্ধের ভয়াবহতা, বিভৎসতা দেখে কেউ যদি ট্রমাটাইজড হয়ে যান তখন বা এখন তবে সেই ট্রমার সাইকোপ্যাথিক চিকিৎসা করতে পারি। কিন্তু সেই ট্রমাকে মহৎ জ্ঞান করে মুকুট বানিয়ে আমরা নিজেদের স্বভাবে তা অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারি না, জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে যেতে পারি না। বিভৎসতা দেখে আমাদের ঘৃণা জাগতে পারে, ট্রমাটাইজডও হয়ে যেতে পারি—এতদূর পর্যন্ত একটা স্তর। কিন্তু তা থেকে এবার জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা এটা দ্বিতীয় ধাপ—এর দায় যে হয়ে ওঠে তাঁর। প্রথম স্তরের দায় পাকিস্তানের আর দ্বিতীয়টা আমাদের।  ঘটনাচক্রে কোন ধর্ষণের ঘটনায় নারীর ট্রমাটাইজড হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে নারী এ থেকে পুরুষবিদ্বেষীও হয়ে যেতে পারেন। সমাজের দিক থেকে এ ঘটনায় মনোভাব হয় ঘৃণা, নিন্দা ও ধর্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির। ধর্ষণের ঘটনার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ কারণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হলো, আমরা কেউ এজন্য সব নারীকে পুরুষবিদ্বেষী হয়ে উঠার জন্য তাগিদ দেই না। আবদারও করি না। করতে পারি না।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ বিকৃত হয়ে ঐ রাষ্ট্রকে হিন্দুবিদ্বেষী রেসিস্ট এই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় “বাঙালি” বাংলাদেশের অনেককে পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিস্ট জায়গায় নিয়ে গেছে।

* লেখাটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বিডিনিউজ২৪ মতামত-বিশ্লেষণ বিভাগে ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১১ , সেই লিঙ্ক এখানে আবার কিছু এডিট করার করে এখানে ছাপানো হলো।