কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

গৌতম দাস

১৭ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Bb

 

 

ARTICLE 356, The Colonial Legacy & the deep Love to Colonial Power of NEHRU &…

রিভিউ বা ফিরে দেখা মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। জওহরলাল নেহেরু কেবল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ১৯৪৭ সালের আগষ্টে স্বাধীন দুই রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তানের জন্মের সময়ের রাজনীতির এক মুখ্য চরিত্র। ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক থেকে বহু ঘটনার নির্ধারক নির্ণায়ক ছিলেন তিনি। আমাদের রাজনীতির বহুকিছুর হাল ‘এমন বা ওমন’ কেন এর জবাব পেতে আমাদেরকে বারবার সেসব পুরান দিনের ঘটনা রিভিউ বা ফিরে দেখায় যেতে হয়। সেকাজে বলাই বাহুল্য নেহেরু এক বড় চরিত্র হয়ে হাজির থাকে।

সেখানে বহুবার আমরা দেখেছি, নেহেরুর চিন্তায় “গণপ্রজাতন্ত্রী” রাষ্ট্র ও ক্ষমতা  এই ধারণাটা যতটা না ‘মর্ডান রিপাবলিক’ প্রসুত তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেকে কলোনিয়াল মাস্টার মনে করা প্রসুত।  বারবার তিনি উপনিবেশ বা কলোনিয়াল সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ধারণা দিয়ে আপ্লুত হয়ে থেকেছেন, তা দেখতে পাই। যেমন নেপাল বা ভুটানের সাথে, ১৯৪৭ সালের পরবর্তি স্বাধীন ভারতের তথাকথিত ‘শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তির’ ধারাগুলোতে আমরা তা দেখতে পাই। অথচ ভারত তখন ইতোমধ্যেই এক স্বাধীন রিপাবলিক হওয়া সত্বেও নেপাল বা ভুটানের ভারতের সাথে চুক্তিতে নেহেরু একাজ পুরাটাই করেছেন আগের কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার সাথে নেপাল বা ভুটানের যে চুক্তি ছিল ওর ধারাগুলোই কপি করে; যেন স্বাধীন ভারত পুরান বৃটিশের জায়গায় এক নতুন “কলোনিয়াল পাওয়ার” হয়ে হাজির। অর্থাৎ কলোনি-শাসনমুক্ত হয়ে যাবার পরেও স্বাধীন “গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তখনও নিজেকে বৃটিশ জুতা পায়ে গলানো এক “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবছেন।  একালের ভারত বিশেষ করে চলতি মোদীকে ব্যাখ্যা করতে পারতে হলে, নেহেরুকেও বুঝতে হবে। আর তাতে সক্ষম হতে গেলে নেহেরুর এই বিশেষ বৈশিষ্ট পাঠ করতে পারতে হবে। আগা-পাছ-তলা এই নেহেরু আসলে কলোনিয়াল ধরণের সম্পর্ক ও ক্ষমতা প্রতি  প্রবল লোভ এবং চিন্তার ঝোঁকের এক নেহেরু; তাতে তিনি এটা “গণপ্রজাতন্ত্রী” ভারত গড়তেছেন বলে যত চিল্লাই দিয়ে থাকেন না কেন!

ভারত রাষ্ট্রগঠন বা ওর কনষ্টিটিউশন রচনাকালে, ওর বিভিন্ন আর্টিকেল বা ধারায় – নেহেরু এবং তাঁর চিন্তার বন্ধুদের নিজেদেরকে এমন “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবনা-চিন্তার ছাপ অনেক স্তরেই পাওয়া যাবে। তেমনই গভীর ছাপ ফেলা এক  বিতর্কিত আর্টিকেল হল ৩৫৬; যা কোন নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ভেঙ্গে দিয়ে ঐ রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ক্ষমতা সংক্রান্ত।

গত মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। প্রথম কথা হল, হ্যাঁ বিপদে তো তিনি আছেনই; তার কপালে শনি লেগেছে – লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ যেদিন হয়েছে সে দিন থেকেই। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৫৬ হল অদ্ভুত এক আর্টিকেল,  এটাই আপাতত মমতার সেই “শনির বিপদের” নাম। এটা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়ে মোদির কেন্দ্রীয় সরকার ছলে-বলে-কৌশলে চাইলে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। কনস্টিটিউশন অনুসারে এটাই “রাষ্ট্রপতির শাসন”।

ভারতে রাজ্য মানে, সেখানেও নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ ও সরকার আছে। যারা স্বতন্ত্র টাক্স আরোপ করতে পারে  এবং কনষ্টিটিউশনে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া যেসব বিষয় আছে ওর তদারকি করা ও যেসব সার্ভিস জনগণকে দেয়ার আছে , আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ইতাদি এসবই তার কাজের এক্তিয়ার। এছাড়া শহুরে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা মিউনিসিপাল্টি ব্যবস্থাও আছে। এখন প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের কোন অভিযোগ থাকলে এর প্রতিকার পেতে প্রত্যেক রাজ্যেই সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে হাইকোর্ট – সেখানে কেউ নালিশ দিতে পারে। এছাড়া মিছিল মিটিং প্রতিবাদ দিয়ে প্রতিকার দাবি সে তো আছেই। আরও সর্বোচ্চ তবে পরোক্ষ এক পদক্ষেপ হল, নিয়মিত বিরতিতে পরের নির্বাচনে প্রার্থী বা তার দলকে ভোট না দিয়ে শাস্তি দেয়া – সে সুযোগ তো আছে।

কিন্তু এসব সত্বেও আর্টিকেল ৩৫৬ তে রাষ্ট্রপতিকে রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েমের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।এখানে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির এই ভুমিকা কার্যত ব্যবহার ও প্রয়োগ হবে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার মাধ্যমে। যদিও রাষ্ট্রপতির নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ হবে তার প্রতিনিধি রাজ্যপালের মাধ্যমে কিন্তু তা আবার কাজ করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে। তাই সোজা সাপ্টা বললে, এটা রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে এর উপর কেন্দ্রীয় সরকারের দখল নেয়া।

তবে এই আর্টিকেলে এখন কিছু সংশোধনী আনার পর, ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় সংসদে অনুমোদন করিয়ে আনতে হয়। অর্থাৎ এই আর্টিকেল অনুসারে মোদীর সরকার মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দিতে পারে।  আর এখন কেন্দ্রীয় সংসদে মোদীর নিজ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এই চর্চা ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের, নেহরুর আমল থেকেই এভাবে চলে আসছে। দেখা গিয়েছে যখনই মোদী-মমতার মত রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার একই দলের থাকে না, তখনই এই অসুস্থ চর্চা শুরু হতে দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে ভারতে কনষ্টিটিউশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত মোট ১১৫ বার এভাবে এই আইন প্রয়োগ করে নানান রাজ্যে সরকার ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ১৯৭৫-৭৯ সালের মধ্যে ২১ বার, আর ১৯৮০-৮৭ সালের মধ্যে ১৮ বার। এর বেশির ভাগটাই নেহেরু বা কংগ্রেস ব্যবহার করেছে। যেটা এখন করছে বিজেপির মোদী।

একবার ক্ষমতা নিলে পরে এটা ছয়মাস করে করে বাড়িয়ে তিন বছর পর্যন্ত রাখা যায়। যদিও পাঞ্জাবে এরচেয়েও বেশি বছর প্রয়োগের “বিশেষ” উদাহরণ আছে। এতে কেন্দ্রের সরকারি দলের আসল সুবিধাটা হল, একবার বিরোধী রাজ্য সরকার ও প্রাদেশিক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল রাজ্যে নিজস্ব এক অনির্বাচিত সরকার কায়েম করে নিতে পারে। আর পরবর্তিতে ঐ তিনবছর সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে্র রাজনৈতিক দল  নিজ ‘সুবিধাজনক’ সময়ে – মানে রাজ্যে যখন নির্বাচন দিলে নিজে জিতে আসবে বলে আস্থা পায় – তখন নির্বাচন করিয়ে নিজ দলের রাজ্যসরকার কায়েমের সবচেয়ে সহজ উপায় হয় এটা। তাই, সদ্য লোকসভা নির্বাচন শেষে ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০ মে সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অজুহাত তৈরি করছে বিজেপি!”।

কিন্তু ভারতের কনস্টিটিউশনে কেন এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, এর পক্ষে যুক্তি কী? যেখানে আমেরিকায় এর কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট  ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কোন একটায় ক্ষমতা দখল করেছেন, এটা কেউ কল্পনাও করে না। কিন্তু ভারতে ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ জারি খুব কমন অভ্যাস বা চর্চা। এককথায় বললে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ একটা ব্যাপক ‘অপব্যবহারযোগ্য’ এক দাগী-ক্ষমতা।

প্রথমত এই আর্টিকেল-৩৫৬ ভারতের কনস্টিটিউশনে এল কীভাবে? গত ২০০১ সালে আর্টিকেল-৩৫৬ নিয়ে – বিচারক ও একাদেমিকদের  সমন্বয়ে এক ‘রিভিউ কমিশন’ বসেছিল। ঐ স্টাডির শেষে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আদৌও আর্টিকেল-৩৫৬ একটা মর্ডান রিপাবলিকের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ পুর্ণ কী না, ফলে ভারতের কনষ্টিটিউশনে এই আর্টিকেল থাকতে পারে না – অতএব বাতিলের সুপারিশ – এসব প্রশ্নের দিকে তারা যান নাই। [আইন পেশায় একাদেমিক আগ্রহ যাদের তারা এই রিভিউ রিপোর্ট এখানে পেতে পারেন।]  তবে ঐ রিভিউ রিপোর্টে এক জব্বর স্বীকারোক্তি আছে – এই আর্টিকেল-৩৫৬ কেন, কীভাবে এসেছিল সেই জন্ম ইতিহাস প্রসঙ্গে।

সোজা কথাটা হল বৃটিশ-ভারতে বৃটিশেরা ভারতের ঠিক নাগরিক নয় বরং ছিল এক “কলোনি দখলদার শক্তি”। আর কিভাবে বৃটিশ-ভারতকে তারা শাসন করা হবে এনিয়ে ই্ংল্যান্ডের বৃটিশ সরকার অধ্যদেশ জারি করত – সাধারণভাবে এটা “ভারত শাসন আইন [Govt of India Act] নামে পরিচিত, যা বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এটার প্রথম ভাষ্য শুরু হয়েছিল “Govt of India Act 1858” দিয়ে। আর অনেকবার সংশোধিত হবার পর শেষেরটা সম্ভবত “Govt of India Act 1935″। এই শেষের (১৯৩৫ সালের) সংশোধনীতেই তারা প্রথম ভারতীয় নেটিভ নিজেরা বড়জোর নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার গড়তে পারবে, এই অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তব কথাটা হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন ভারত-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এর পটভুমিতে দাঁড়িয়ে দেখলে Govt of India Act মূলত এক দাগী কালো আইন। কারণ এই আইন দিয়ে বৃটিশেরা বৃটিশ-ইন্ডিয়া চালালেও, এই শাসকেরা আসলে তো “কলোনি দখলদার শক্তি”। ফলে অবৈধ। ভারতের নাগরিকেরা তাদেরকে শাসন ক্ষমতার কোন অনুমতি দেয় নাই। ক্ষমতা বৃটিশেরা জবরদস্তিতে নিয়েছে। তাই এই ক্ষমতা অবৈধ।

এখন, এই অবৈধ ক্ষমতা জানত যে সে অবৈধ, বাপ-মায়ের ঠিকানা নাই, ভারতীয় নাগরিকেরা কখনও তাকে শাসন ক্ষমতা দেয় নাই। তাই ১৯৩৫ সালের সংশোধনিতে কেবল তিন প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগগুলোতে, তাই সেই সুত্রে  প্রথম বাংলা প্রেসিডেন্সিতে, ভোটে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাদেশিক পর্যায়ে এভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে দিয়ে বৃটিশ শাসকেরা না কোন বিপদে পড়ে এই ভয়ও তাদের মনে উদয় হয়েছিল। কারণ, এই সরকার প্রাদেশিক হলেও কখনও যদি কলোনি দখলদার শক্তি খোদ বৃটিশ কর্তৃত্বকে মানতে অস্বীকার করে বসে – তাহলে কী হবে? অতএব সম্ভাব্য সেটা ঠেকাতে, নিজেরা আশঙ্কা মুক্ত হতে বৃটিশ ভাইসরয়-এর হাতে এক নতুন আইনি ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার নির্বাচিত হলেও তিনি যেকোন সময় নির্বাচিত ঐ সরকার ভেঙ্গে দিতে পারবেন। Govt of India Act 1935 এর আইনে এটাই ৯৩ ধারা।

শুরুতে বলেছি নেহেরু আর তার বন্ধুরা  কলোনিয়াল “দাগী ক্ষমতা” খুবই পছন্দ করত, বৃটিশেরা কলোনি ত্যাগ করে চলে গেলেও এরা নিজেদের  “ভাইসরয়” ভাবতে চাইত। তাই তাঁরা Govt of India Act 1935 এই আইনের ৯৩ ধারাটাকে ভারতের নতুন কনষ্টিটিউশনে কপি করে তুলে এনে ঢুকিয়ে ফেলেছিল। এটাই নতুন নামে, আর্টিকেল ৩৫৬। আমাদেরকে পরিস্কার থাকতে হবে আগের ৯৩ ধারা ছিল কলোনি দখলদার শক্তির পক্ষে শাসিত নেটিভেরা যেন স্বাধীন হয়ে যায় তা ঠেকানোর জন্য তাদের উপর বৃটিশদের অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন। অথচ ১৯৪৯ সালের ভারত সে তো তখন স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্র। তাই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক কোন কলোনি দখলদার শক্তির, ক্ষমতা-সম্পর্ক আর নয়। কিন্তু তবু আমাদের নেহেরু ও অম্বেদকারের মত তাঁর বন্ধুদের কলোনিক্ষমতার প্রতি প্রীতিভালবাদা ও লোভ এতই তীব্র যে পুরানা অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন স্বাধীন ভারত রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে ঢুকিয়ে রেখেছেন অবলীলায়। ঐ রিভিউ রিপোর্টে তাই সোজা স্বীকার ও ছোটখাট কিছু বর্ণনা দিয়ে লিখেছে, “Article 356 is inspired by sections 93 of the Government of India Act, 1935অর্থাত এর সোজাসাপ্টা মানে দাঁড়াল, নেহেরু ও অম্বেদকারেরা কলোনি শাসন ক্ষমতার অনুরাগী ছিলেন। ভারতীয় নাগরিকদের সাথে তাঁরা নিজেদের সম্পর্ককে তারা তাহলে নিজেরা “কলোনি দখলদার শক্তি” ভেবে নিয়েছিলেন। তাই একটা “কলোনি শাসিত রাষ্ট্র” আর একটা “স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র” এদুইয়ের কোন ফারাক তারা দেখতে পান নাই, ফারাক করেন নাই। স্বাধীন রিপাবলিক ভারতে অবলীলায় আর্টিকেল ৩৫৬ ঢুকিয়ে রেখেছেন। যে আর্টিকেল কেন্দ্রীয় সরকার যেকোন রাজ্য সরকারকে উলটে দিতে পারে এই “উপনিবেশী ক্ষমতা” জারি রেখেছে।

এখানে মজার দিক হল, রাষ্ট্রপতি কী অজুহাতে রাজ্য সরকার ভাঙতে পারবেন – সেই ভাষাটাই দখলদারের ভাষা। এর সাধারণ লক্ষণ হল, এই ক্ষমতা প্রয়োগের অজুহাতের কথাগুলো দেখা যাবে অস্পষ্ট, আবছা রেখে দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন আর্টিকেল-৩৫৬ তে বলা হয়েছে, রাজ্যে “সরকার চালাতে পারেনি” বা “সরকার কনষ্টিটিউশন অনুসারে পরিচালিত হয়নি” বলে রাষ্ট্রপতির মনে হলেই হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কী দেখতে পেলে রাষ্ট্রপতি এমন মনে করবেন তা উহ্য রেখে দেখা হয়েছে। এভাবে ‘আবছা’ রেখে দেয়াতেই ইচ্ছামতো রাষ্ট্রপতির (কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের) পদক্ষেপকে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়া থাকছে। বলা হয়ে থাকে নেহরু রাজ্য সরকারগুলোকে নিজের, মানে কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতেই’ এভাবে বৃটিশ শাসকের মত ক্ষমতা পেতে আর্টিকেল-৩৫৬ লিখিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই ভারতে ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে, এর এক অন্যতম উৎস হয়ে আছে আর্টিকেল-৩৫৬।

নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা বা ডিফাইন্ড (defined) পাওয়ার
রিপাবলিক মানে, রাজতন্ত্র অথবা কলোনি দখলি শাসনের বিপরীতে এক উপযুক্ত বিকল্প ধারণা। কলোনি দখলদারি ক্ষমতার বিপরীতে এক ‘গণসম্মতির’ ক্ষমতা। রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের সময়  অভিজ্ঞতালব্ধ একটা গভীর মৌলিক ধারণা মেনে চলা হয়ে থাকে। তা হল – যে কোন ক্ষমতাকে অবশ্যই “ডিফাইন” করে রাখা ক্ষমতা হতে হবে। তা না হলে এটা দাগী ডাকাতের মত “দাগী ক্ষমতা” বা ‘ডেসপটিক পাওয়ার’ [Despotic Power] তৈরি করবে বা হাজির হবে। তাই ডিফাইন করা বলতে এখানে বুঝতে হবে – কোন ক্ষমতার উৎস কী, ক্ষমতা কে তাকে দিল  মানে কোথা থেকে পেয়েছে [how the power is drawn], অথবা কিভাবে এই ক্ষমতা হাজির হয়েছে – তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথেষ্ট বর্ণনায় পরিস্কার করে রাখা হতে হবে। নাগরিকদের যে সম্মিলিত ক্ষমতা আছে তা থেকে উৎসারিত এক গণসম্মতি প্রকাশিত হলে; এভাবে তৈরি হওয়া ক্ষমতা কাউকে অনুমোদন দিলে, সেটাই “গণসম্মতির ক্ষমতা”। এটা ডিফাইনড ক্ষমতা। নিজ ক্ষমতার উৎস নিজেই স্পষ্ট বয়ান করতে পারে এমন ক্ষমতা। এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্র ক্ষমতা।

আর্টিকেল-৩৫৪-এর অস্পষ্টতার দিক হল – কী হলে বা কী দেখলে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন, ওই রাজ্য সেখানকার “সরকার চালাতে পারেনি”? বলা হয়েছে, [……government of the State cannot be carried on in accordance with he provisions of this Constitution]। কিন্তু মানা যে হয়নি তা কী দেখে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন তা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নাই। এ পর্যন্ত এই আর্টিকেল ব্যবহার করে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন অজুহাত দেখা গেছে – “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি”। কিন্তু কী দেখিয়ে বুঝা বা বুঝানো হয়েছে যে, কোনো “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” ঘটেছে? সাধারণত এর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, শহরে কোনো দাঙ্গা হয়েছে কি না অথবা তাতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই ফিগার। এই সেই কমন অজুহাত। এটা আবছা রাখা হয়েছিল কারণ বৃটিশ কলোনি শাসকদের তো এমনটাই দরকার যাতে যেকোন অজুহাত তুলে নিজেদের অবৈধ ক্ষ্মতার নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা যায়।

এজন্য এই আর্টিকেলের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, যদি কোনো রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ বলে দাবি ওঠে তবে তা যাচাইয়ের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো লিগ্যাল বডি বা কনস্টিটিউশনাল আদালতকে দিয়ে তা যাচাই, এমন কোন সুযোগ ৩৫৪ আর্টিকেলে রাখা নাই। অর্থাৎ জুডিশিয়াল যাচাই না, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কেবল নিজে “মনে করলেই” হবে, ফলে দেখাই যাচ্ছে এটা অবাধ এক খেয়ালি – আন-ডিফাইনড [un-defined] ক্ষমতা। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, যা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা – এই দলীয় ক্ষমতার (মোদী) তার বিরোধী (মমতা) রাজনীতিকে দমনের এমন সুযোগ ছেড়ে দেয়ার কারণই নেই। তাই স্বাধীন ভারতের জন্মের পর থেকে এটা অপব্যবহার করে গেছে কংগ্রেস আর এখন তা মোদীর হাতে এসেছে।

এদিকে ভারতীয় মনও এই অপব্যবহার দেখতে এতই অভ্যস্ত যে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছিল, কবে পশ্চিমবঙ্গে কোথায় দাঙ্গা লাগানো হছে বা হয় কি না। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের পরে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসনের এক কমন প্রয়াস দেখা যায়, নির্বাচনকালে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও জন-বিভক্তিগুলোকে এবার বিদায় দেয়া। কিন্তু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এটা ছিল অনুপস্থিত। মূল কারণ, মোদী-অমিত অস্থির হয়ে মুখিয়ে আছেন মমতাকে এখনই সরিয়ে কীভাবে রাজ্য সরকার দখল করা যায়; অথচ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে।

‘সন্দেশখালি’ ইস্যু
রাজ্যে “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” হয়ে গেছে অথবা সরকার “রাজ্য চালাতে পারছে না” – এই অজুহাত তুলে “রাষ্ট্রপতির তা মনে হওয়ানোর” রাজনীতি চলছে এখন পশ্চিমবঙ্গে। লোকসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এভাবে অজুহাত তুলার যে মঞ্চ প্রথম তৈরি করা হয়েছিল এমন মোক্ষম কেস হল – “সন্দেশখালি” ইস্যু। উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার এক এলাকার নাম সন্দেশখালি। সেখানে তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলাজনিত সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য, ঘটনার পরস্পরবিরোধী বয়ান আমরা এখানে পাবো। এছাড়া এখানে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, এই ফিগার যেহেতু রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের সাফাইয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর – তাই ওই দাবি বেড়ে পরে হয়েছে আটজন। এর ওপর আবার বিজেপির নিখোঁজ বলে  দাবি ১৮ জন পর্যন্ত উঠেছে।

হামলার ঘটনার সেই সন্ধ্যাতেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কাছে কলকাতার বিজেপি নেতারা সরাসরি রিপোর্ট করেছেন, সেকথা টুইটও করেছেন। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতিরা যেভাবে অপেক্ষা করেছেন, সেভাবেই এবারের অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতিও কলকাতার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে রিপোর্ট চাইলে তিনি দিল্লি গিয়ে রিপোর্ট পেশ করেন এবং মোদী-অমিতের সাথে দেখা করেছেন।

মৃত্যুর ফিগার যথেষ্ট বড় নয়
তবে খুব সম্ভবত ঘটনা শুনেবুঝে বিজেপির মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য মৃত্যুর এই ফিগার যথেষ্ট নয়। এছাড়া শুরু থেকেই সমস্যা হল, বিজেপির এখনকার ম্যাজিক্যাল নেতা মুকুল রায়, হামলার সন্ধ্যাতেই নিজ টুইটে সংখ্যা বলে ফেলেছিলেন মাত্র তিনজন, [3 BJP workers shot dead……]। এ ছাড়া তৃণমূলের ক’জন মারা গেছে সেই সংখ্যা তিনি উল্লেখ করতে পারছেন না। ওদিকে রাজ্যপাল দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর মিডিয়ায় “রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে দিল্লির আপাত নেতি” অবস্থানের ধারণা দিয়েছিলেন। ১১ জুন আনন্দবাজার লিখেছে, প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল কেশরী বলেছিলেন, “এটি (৩৫৬ ধারা জারি) আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না”। কিন্তু পরে একটি বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “(৩৫৬ ধারা জারি) হতেও পারে। যখন দাবি উঠবে, তখন কেন্দ্র তা ভেবে দেখবে”।

ওদিকে মৃত্যুর ফিগার নিয়ে ঝগড়াটা ‘ন্যাংটা’ হতে চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেন, তিনি “নির্বাচনোত্তর হিংসায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে অমিত শাহকে জানিয়েছেন। অথচ মমতার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোকসভা ভোটের পর দিনহাটা, নিমতা, সন্দেশখালি, হাবড়া ও আরামবাগে পাঁচজন তৃণমূল কর্মী এবং সন্দেশখালিতে দু’জন বিজেপি কর্মী মারা গেছেন। তাই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, “নিয়মমাফিক রাজ্যসরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই রাজ্যপালের রিপোর্ট পাঠানোর কথা। কিন্তু এখানে বিজেপির দেয়া সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে”। তাই ঘটনার সারাংশ হল, সন্দেশখালি যথেষ্ট নয়, আরো ইস্যু লাগবে। ফলে  দ্বিতীয় ইস্যুতে চেষ্টা, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাফাইটা এবার শক্তভাবে পাওয়া যায়।

হাসপাতাল ইস্যু
দ্বিতীয় ইস্যুকে আমরা “হাসপাতাল ইস্যু” বলতে পারি। এটা আপাতত অনেক ছোট ইস্যু, কিন্তু বিরাট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনা আমাদেরও খুবই পরিচিত। কলকাতার (রাজ্য পরিচালিত) প্রাচীন সরকারি হাসপাতাল – নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানে “ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্য” হয়েছে – এজাতীয় উত্তেজনায় ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়া, তা থেকে ডাক্তারদের ধর্মঘট – এই হল মোটাদাগে বলা কাহিনীটা। ঘটনা ছিল আসলে আরো ছোট। এক রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের পরামর্শে রোগীর আত্মীয় কোন সিনিয়র ডাক্তার খুঁজে আনতে বের হন। কিন্তু কয়েকজনকে অনুরোধ করে, অপমানিত হয়েও  আনতে না পেরে শেষে একজন সিনিয়রকে একটু জোরাজুরি করে কব্জিতে ধরে তাকে আনেন। এই হলো “মূল অপরাধ”। ইতোমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে লাশ আনতে গেলে এবার ডাক্তারেরা “ক্ষমা না চাইলে লাশ দেয়া হবে না” বলে জানিয়ে দেন।

এটা আনন্দবাজারের রিপোর্ট। উত্তেজনা-মারামারি যা কিছু তা কিন্তু কেবল এরপর থেকে শুরু হয়েছিল। রোগীর বাড়ি হাসপাতাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। তাই ট্রাকে করে লোক জড়ো করে তাঁরা এবার ফিরে আসে। এসে সামনে পড়া দুই জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে আত্মীয়েরা মৃতরোগীর লাশ নিয়ে ফেরত যায়। আর ঐ হামলায় ডাক্তারদের একজনের আঘাত একটু গুরুতর ছিল, তবে এখন তিনি বিপদমুক্ত, তাই হাসপাতালের সাধারণ বেডে আছেন। আর ঞ্ছোট বড় ডাক্তাররা সবাই ধর্মঘটে। কিন্তু সময়টা ‘রাষ্ট্রপতির শাসন জারি’ করার ইস্যু খোঁজার অনুকূল; তাই এখন ‘বিরাট’ ঘটনা বানাতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ধর্মঘট ডেকে দেওয়া পর্যন্ত বিজেপি ঘটনা গড়িয়ে নিতে পেরেছে।

এসব ক্ষেত্রে  ডাক্তারেরা বা আমাদের পাবলিক মাইন্ডসহ সবাই – ঘটনাকে দেখে থাকে সাধারণত এভাবে যে, ঘটনার জন্য ‘সরকার দায়ী ’ – ঠিক তা নয়, তবে কেন সরকার মধ্যস্থতা করে বা পদক্ষেপ নিয়ে ইস্যুটা তাড়াতাড়ি মেটাচ্ছে না?  কিন্তু “হাসপাতাল ইস্যুতে” ঘটনা এখানে উল্টা। ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দায়ী করছেন। তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের  শিরোনাম “মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলুন, এই ঘটনা আর ঘটবে না, দাবি চিকিৎসক মহলের”। আসলে এই দাবি দেখে বুঝা যাচ্ছে ডাক্তারেরা কত গভীরে বিজেপির কব্জায় চলে গেছে। বিজেপির টার্গেট মমতার বেইজ্জতি, ইমেজ নষ্ট। আর সম্ভব হলে ঘটনাকে পাকিয়ে উঠাতে পারলে, এটাকেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ইস্যু করা।  কিন্তু ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী বা অপমান করতে হবে –  বিজেপির এমন ইচ্ছা, এদিকে যেতে পারল কেন? আর সবাই জানে বাস্তবত “এমন ঘটনা আর ঘটতেই পারবে না” এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারবে না। তবে যাতে না ঘটে এই লক্ষ্যে সিরিয়াস হয়ে কাজ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী – এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তেজনা মিটানোর দিকে ঘটনা গেল না কেন?

মৃত রোগী ছিলেন মুসলমান, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আর যারা এসে মাথা ফাটিয়ে লাশ মুক্ত করে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, এদের এই একশনকে নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে একটা বিরূপ কানে-কানে বলাবলি করে এক প্রচার [whispering campaign] হয়েছিল যে, “দেখেছিস, মুসলমানদের কত্ত বড় সাহস!”। “এদের খুব বাড় বেড়েছে” – এধরণের। তবে এঘটনার বহু আগে থেকেই সাধারণভাবে “মুসলমানদের আশকারা” দেয়ার জন্য গত কয়েক বছর ধরে মমতাকে দায়ী করে থাকেন তার সব বিরোধী। কলকাতা বিজেপির ফেসবুক পেজগুলো এই ভাষ্যে ভর্তি থাকতে দেখা যায়। কলকাতাজুড়ে এর মূল প্রকাশ্য ক্যাম্পেইন করে থাকে বিজেপি। আর তৃণমূলবিরোধী সিপিএমসহ বাকি অন্যান্য বেশির ভাগ সব ব্যক্তি ও দল এর প্রতি প্রকাশ্য বা মৌন সমর্থন দিয়ে থাকে। ঠিক একারণের ডাক্তারেরা দাবি করছেন মমতাকেই [মূলত মুসলমানদের সাহস বা বাড় বাড়ানোর পক্ষে তিনি নেপথ্য ব্যক্তিত্ব বলে] মাফ চাইতে হবে। যেমন এই কথাটাই আর একটু নেপথ্যে রেখে হাসপাতালের পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় [মুসলমান শব্দ উচ্চারণ না করে]  বলছেন, “জুলুমবাজদের ক্ষেপিয়ে তোলা” এবং “লেলিয়ে দেওয়া” বন্ধ হবে কবে? কিন্তু তিনি কে কাকে লেলিয়ে দিবার কথা বলছেন? বলতে চাইছেন, মমতা মুসলমানদেরকে লেলিয়ে দিয়েছেন।

মমতা মুসলমানদের “সাহস” “বাড় বাড়ানো” আশকারা দেয়া ইত্যাদি করেছেন কী না – এসব খুবই ঘৃণাবিদ্বেষী ও অরাজনৈতিক বক্তব্য। মমতা কী মুসলমানেরা মুসলমান হন আর যাই হন তিনি কী কিছু নাগরিককে যারা মারজিনাল কোনায় হয়ে পড়েছিল তাদের অধিকার ফিরে পেতে সাহায্য করেছেন? আর সেটা কী কোন নতুন বৈষম্য করে, অন্যদের অধিকার কেড়ে নিয়ে? বা, বেআইনিভাবে? এগুলোই একমাত্র হতে পারে মমতার পদক্ষেপগুলোকে বিচার করার নির্ণায়ক? কিন্তু বিজেপি তা করছে না। তাদের অভিযোগ হল মুসলমানেরা সমাজে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? কেউ কম বা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এটা অরাজনৈতিক বক্তব্য। বিজেপিকে বলতে পারতে হবে এটা মমতার পদক্ষেপ কেন বেআইনি? তা কি কোন অধিকার বৈষম্যের? কিভাবে? সবচেয়ে অধপতিত বিষয় হল, সিপিএম বা কংগ্রেসও বিজেপির উস্কানিতে মৌন বা প্রকাশ্য সমর্থন দিচ্ছে। একই অরাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। মমতার কোন পদক্ষেপ – মুসলমানদের কোনায় ফেলে রাখা থেকে বের করে আনা কী অন্য কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া? হলে কিভাবে? যদি তাই হয়ও তা নিয়ে হাইকোর্টেও তো যাওয়া যেতে পারে। তা না। সবাই বিজেপির হিন্দুত্ব আর ধর্মীয় মেরুকরণের উস্কানিতে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই মরিয়া।

কিন্তু ঘটনাবলীর পিছনে বিজেপির সমর্থন ও ততপরতা কত তীব্র তা বুঝবার এক ব্যবস্থা  করেছে আনন্দবাজার। অবস্থা দেখে তারা মন্তব্য করেছে, “এবারই প্রথম হাসপাতালের মূলগেটে তালা দিয়ে ধর্মঘট চলছে। মূলগেটে তালা দেয়া আগে কখনও হয় নাই”। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরিচালক অথবা প্রশাসনিক স্টাফ নিজে ডাক্তার হলেও তারা কখনই ধর্মঘটে যোগ দেন না। কারণ তারা দায়িত্ববান কর্মকর্তা ফলে বিরোধ মিটাতে দুতয়ালির ভুমিকা তাদের নিতে হয় বলে।  কিন্তু কলকাতায় এসব স্টাফেরাই মূল নেতা, সক্রিয়। অর্থাৎ স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাহস যোগান তখন আর কে কাকে পরোয়া করবে!

ওদিকে ক্ষমতা হারিয়ে ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া সিপিএমের এ্মন মরিয়া দশা দেখা গেছিল সেই ২০১৪ সালের শেষে, যখন অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। বর্ধমানে বোমায় কথিত  জেএমবি, জামাত, বাংলাদেশ, জঙ্গি ইত্যাদি মিলিয়ে যে প্রপাগান্ডা-গল্প যে সব কিছুর সাথে মমতা আছেন – এই প্রপাগান্ডার ঝাঁপি নিয়ে এসেছিলেন অমিত শাহ। সেকালে সিপিএম কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে যে জনসভা ডেকেছিল, তাতে অমিতের দেয়া ঐ একই বয়ানে তারা মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। পরে অবশ্য মোদি-অমিত কৌশল বদলান, এই গল্প নিয়ে আর আগাতে চান নাই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস থেকে এক বিবৃতি সংসদে দিয়ে বলা হয়েছিল, অমিতের দাবি আর সরকারের অবস্থান এক নয়।

আমাদের প্রথম আলোতেও এমন এক কলকাতার কমিউনিস্টের (শান্তনু দে) লেখা ছাপা হয়েছে, শিরোনাম, “বাঁকের মুখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি”। তিনি সিপিএম কত ভাল ছিল এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু কলকাতায় ধর্মীয় মেরুকরণ হয়ে যাবার জন্য শেষে বিজেপি না মমতাকেই দায়ী করেছেন। লিখছেন, …… দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি”।কিন্তু বিজেপির ঘোষিত নীতিই যেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ সেখানে মমতা কিভাবে দোষী? কারণ সিপিএমও “মুসলমানদের সাহস” বা “বাড় বাড়ানোর” জন্য  মমতাকে দায়ী করার জন্য তৈরি, তাই বুঝা যাচ্ছে এখানে।

যা হোক, “রোগী মুসলমান” বা “মুসলমানদের সাহস!” -এভাবে তোলা ডাক্তারদের সেন্টিমেন্টের পক্ষে প্রথম ইঙ্গিত তুলে হাজির হতে ক্ষেপিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছিলেন, এর ‘পেছনে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত’ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সরাসরি ঘটনা ক্যাশ করার লোভ না সামলে বলে বসেন, “হামলাকারীরা সেই সম্প্রদায়ভুক্ত, রাজ্যে যাদের ২৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। হাসপাতালসহ রাজ্যে যেকোনো গোলমালের নেপথ্যেই ওই সম্প্রদায় রয়েছে”। মমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, “তৃণমূল সরকার ওদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অনুরোধ, তৃণমূলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না”।

তবে ডাক্তাররা বিজেপির চেয়ে বুদ্ধিমান থাকতে চেয়েছেন। তাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বিজেপির অবস্থানকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে তারা বলেন, “যারা আক্রমণ করে তারা সমাজের দুষ্কৃত। এখানে কোনো জাতি-ধর্মের বিচার নয়”। ওদিকে কংগ্রেস-সিপিএমও এই দায় না নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কলকাতার হাসপাতালে রোগী-ডাক্তার এই সঙ্ঘাত প্রায় আমাদের দেশের মতই। অথচ এর সবচেয়ে সহজ ও আসল সমাধান হতে পারত – সবপক্ষকেই যার যার আচরণ এক জবাবদিহিতার মধ্যে আনা। প্রথম কাজ, রোগী বা তার আত্মীয়দের মনে সত্য বা মিথ্যা যত ক্ষোভই থাক তাকে বের হতে ‘জানালা খুলে দেয়া” [ventilation]। এ জন্য হাসপাতালের পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে “তদারকি ও সান্ত্বনাদান” জাতীয় উইং খোলা যেতে পারে। এর মূল কাজ হবে রোগীর আত্মীয়দের ক্ষোভ মনোযোগ দিয়ে শোনা। হাসপাতালের কারও গাফিলতি থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া। এ ছাড়া সময় নিয়ে আর মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সাথে নিয়ে  (সর্ট ও লং) দুই ধরনের তদন্তের ব্যবস্থা রাখা। তবে অবশ্যই কেস কিছু থাকবে, যা মূলত হাসপাতালের রিসোর্সের সীমাবদ্ধতার কারণ ঘটেছে, সে অপারগতাগুলো রোগীকে বুঝিয়ে বলার মতো প্রফেশনালদেরকে রাখতে হবে। ফলে মমতাকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে যারা চাচ্ছেন, এরা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট বোঝেন না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা প্রফেশনাল ডাক্তার। বরং উলটা বিজেপির মমতাকে বেইজ্জতি করার প্রোগ্রামে তারা মিশে গেছেন বুঝে না বুঝে।আর মূলত তা ঘটেছে [whispering campaign] এর কারণে।

ডাক্তারের মাথা ফাটানো নিশ্চয়ই কোনো সমাধান নয়। কিন্তু সাবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ – “ক্ষমা না চাইলে মরদেহ দেয়া হবে না”, এটা বলার তাঁরা কে? এটাই তো মূল ক্রাইম। অথচ সরকারি/বেসরকারি কোন ডাক্তার রোগীর আত্মীয়দের এ কথা বলার অধিকার বা এখতিয়ার নেই। আর এ কথা বলে ডাক্তারেরা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া আর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে ।

আর পুরা ঘটনায় ডাক্তারদের মধ্যে, তারা নিজেরা একটা উচ্চ এলিট শ্রেণীর (ধর্মীয় পরিচয় আর গরীব-বড়লোক শ্রেণী পরিচয় এই দুই অর্থেই)- এমন ধারণা কাজ করছে।  বিজেপির প্ররোচনায় ডাক্তারেরা এলিট ভুমিকায় অন্যদের সাথে এই বৈষম্য করে গেছে অবলীলায়। আবার বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে এমনই ঘটনায় এক আইন প্রচলন করা হয়েছিল যে, “হাসপাতালে এমন হাঙ্গামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে”। তাই ডাক্তারদের সঠিক পদক্ষেপ হত বড়জোর পুলিশের কাছে যাওয়া মামলা করা, আইনের আশ্রয় নেয়া। বাস্তবে কিন্তু  রোগীর সেই হামিলাকারি আত্মীয়ের নামে মামলা হয়েছে, এখন সে জেলে আটক আছে। এছাড়া আর এক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য যে, রোগীর আত্মীয়রা স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশকে দিয়ে লাশ ছেড়ে দিতে ডাক্তারদের অনুরোধ করিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা তবু লাশ আটকে রেখেছিলেন। [এন্টালি থানার পুলিশ গিয়ে চিকিৎসকেদের বোঝান। তাতেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। ] তাদের এই উদ্ধত্ব দেখে বুঝা যায় বিজেপি কী পরিমাণ ডাক্তারদের বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি পিছনে থাকলে – যারা নিজেরাও একটা রাষ্ট্রপতির শাসন জারির জন্য বেপরোয়া – এসব মিলিয়ে সবকিছুই বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন না হলে সেটাই অস্বাভাবিক হত।

অর্থাৎ বিজেপি ডাক্তারদের এতই প্রটেকশন দিয়ে বেপরোয়া হতে উসকানি দিয়েছিল যে, তারা তাদের আইনি সীমা ও দায় সব ভুলে গেছিলেন। ওই দিকে কলকাতার কমিউনিস্ট ভাইয়েরা, তারাও ডাক্তারের পক্ষে, মানে নির্বাচনকালের মতই বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছেন, হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার ইমেজ ভাঙলে তাদের দিন ফিরবে।

না ফিরবে না। এবারের নির্বাচন তাদের কেটেছে নিজের দলীয় পরিচয়ে, কিন্তু বিজেপির ক্যাম্পে বসে। এই সহযোগিতায় বিজেপি এবার একলাফে ১৮ আসন পেয়েছে। আর কমিউনিস্টদের ভোট গিয়ে ঠেকেছে ৭%। এটাই তাদের শেষ কমিউনিস্ট পরিচয়। কারণ, ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে এই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবেন সরাসরি বিজেপি নাম নিয়ে, এটা দেখতে পাবার সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ বাস্তবতা হল, কমিউনিস্ট পরিচয়ে আর না আছে আইডিয়ার ধার বা ভার, না আছে পকেটে টাকা। বরং পকেট ভরা টাকা আছে বা দিবে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিতে যোগ দেয়া খারাপ, এটা বলার মত নৈতিক সাহসও কমিউনিস্ট নেতাদের আর নেই। কাজেই…।

বিজেপি কতদুর বেপরোয়া হয়ে গেছে এর এক উদাহরণ হল, মমতাকে নিয়ে বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের মন্তব্য। তিনি নিজের আঞ্চলিক দল জেডিইউ এর সভাপতি। তার দল গত রাজ্য নির্বাচনে (২০১৬ সালে) বিজেপিবিরোধীদের সাথে নির্বাচনি জোট করে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তিতে তিনি মেরু বদল করে বিজেপির জোট যোগ দিয়েছেন। আর এখন বিজেপির কোলে উঠে একেবারে সরাসরি বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষী রাজনীতি করছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ “মিনি পাকিস্তানে”(mini Pakistan) পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে  “বিহার থেকে “রোহিঙ্গারা” বিহারিদের তাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য” করল তার বিহারে এনডিএ-সরকারের মূল দল জেডিইউ (JDU)। মোদীর মন পেতে ইসলামবিদ্বেষের যেকোন পর্যায়ে নামতে তিনি রাজি। ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে এরই এক প্রতীকী প্রকাশ এটা।

মমতারও দোষ, ভুল বা গোঁয়ার্তুমিও যে নাই তা নয়। ডাক্তারদের পিছনে বিজেপি-সিপিএমের সমর্থন আছে কিন্তু এদেরকে বহিরাগত বলে ঘটনা তার দিকে ফিরে নাই। আবার চার ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারদের কাজে যোগ দিতে বলাও তার বিরুদ্ধে গিয়েছে। প্রশাসক আর রাজনৈতিক নেতার ভুমিকা মাখায় ফেলেছেন তিনি। উচিত ছিল কেবল মুখ্যমন্ত্রীর ভুমিকায় থাকা, তাহলে ফল পেতেন। এছাড়া গত পঞ্চায়েত ভোটে ৩৪ শতাংশ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা’র কাফফারাও আছে। তবে হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার আপোসী ধারার আর একটা সফট লাইন কার্যকর আছে বলেই মনে হচ্ছে – মেয়র ফিরহাদ, তার ডাক্তার মেয়ে, আর মমতার আরেক ডাক্তার ভাইপো প্রমুখের মাধ্যমে। সম্ভবত হাসপাতাল ইস্যু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আগেই তিনি আপসে এসব মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এতে বিজেপি্র হাতে তাঁকে কোণঠাসা করার সব চেষ্টা মাঠে মারা যেতেও পারে। দেখা যাক, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনতে ‘হাসপাতাল ইস্যু’ ব্যবহার হয় কি না। নাকি নতুন অন্য ইস্যুর খোজ পড়ে!

সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এর পক্ষে তখন বিপক্ষে লোক দেখতে পাওয়া ত আসলেই কঠিনই হবে! ধর্মীয় মেরুকরণ তাতিয়ে ক্ষমতাদখলের প্রচেষ্টা – এটা সবপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে, এক মারাত্মক আত্মঘাতি পরিস্থিতি আনবে, যা এখন বিজেপি ও গংয়ে্রা আমল করার অবস্থায় নাই। পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ সেই ভয়ংকর দিকে আগাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসনআনার জন্য এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেম, ইরানকে বলি

ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেমে, ইরানকে বলি

গৌতম দাস

১০ জুন ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2AX

 

Strait of Hormuz

ইরানের উপর আমেরিকান অবরোধ [Iran Sanctions] আরোপ করে রাখায় মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উপসাগরগুলোতে বিশেষ করে চিকন হয়ে আসা ইরানের সমুদ্রসীমায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলায় ‘খুঁচিয়ে ঘা করার’ একটা প্রবাদ আছে। এর সফল উদাহরণ হল সম্ভবত, ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা-ইরানের সম্পর্কের হাল অবস্থা। এমনিতেই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে জন্ম নেয়া নতুন ইরান, জন্ম থেকেই কঠোরভাবে আমেরিকাবিরোধী। এটা ফ্যাশন বা গতানুগতিক ঘটনা নয়, বরং অনিবার্য।  আমেরিকার স্ব-স্বীকারোক্তির ঘটনা হল সিআইএ এর হস্তক্ষেপে ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার  ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। আর সেসময় থেকে ইরান আমেরিকানদের দখল কব্জায়, পাপেট শাসনে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের আগে পর্যন্ত। তাই ১৯৭৯ সালে আমেরিকাবিরোধীতা ছিল অনিবার্য। আর সেখানে  এসে এটাই প্রমাণ যে, ইরান তখন সত্যি প্রথম ‘স্বাধীন’ হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব প্রমাণ করেছিল ইরানিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, একমাত্র তারাই নিজেকে শাসন করার বৈধ অধিকারী। বলা যায়, ১৯৫৩ সালের আমেরিকা সিআইএ পাঠিয়ে ইরানে হস্তক্ষেপের পরে এর সফল জবাব ছিল ১৯৭৯ সালের আয়াতুল্লাহ খোমেনির ‘ইসলামি বিপ্লব’।

নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা ও দখল করে। এতে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুতুল সরকার বসানোর পরও ইরানের সাথে মার্কিন সম্পর্কে এতে বড় রকমের কোন হেরফের হয়নি। ইতোমধ্যে ২০০৯ সালে ওবামা আমেরিকায় ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালের মধ্যে ইরাক থেকে সম্পূর্ণ আর আফগানিস্তান থেকে ১০ হাজার রেখে বাকি সব আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনেন। সেটা আমেরিকার ‘টেররিজমের’ যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন হয়েছে সেজন্য নয়, বরং যুদ্ধ শেষের কোনো লক্ষণ নেই। এর চেয়ে বড় কথা, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত অর্থনৈতিক সামর্থ্য আমেরিকা-রাষ্ট্রের আর নেই। পরে আবার আইএস এর সিরিয়ায় ততপরতা তুঙ্গে উঠার আমলে ওরা  সেখান থেকে আবার ফিরে ইরাকে শক্ত অবস্থান নিলে ওবামা সেই বিপদে পড়ে যে করণীয় ঠিক করেছিলেন, সেটাই প্রথম আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শুরু বলা যায়। ব্যাপারটা ছিল এই যে ইরাকে আইএসের উপস্থিতি ঠেকাতে হলে ওবামাকে আবার ইরাকে আমেরিকান সৈন্য পাঠাতে হত, অথচ ওবামার রাষ্ট্র সেই খরচ যোগাতে পারার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামর্থ্য ছিল না। তাই এর বিকল্প হিসেবে আমেরিকান যুদ্ধবিমানের সহায়তা ও সমর্থন নিয়ে নিচে মাঠে আইএস উৎখাতের সে কাজ ইরান করে দিতে পারে। এই শর্তে এবং ইরানের ‘পারমাণবিক বোমা’ বিষয়ক তৎপরতা জাতিসঙ্ঘের নজরদারিতে স্থগিত রাখা হবে, এই শর্তে সে সময় আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ও ইউরোপীয় নেতা দেশগুলো মিলে (পি৫+১) সবার স্বাক্ষরে তা সম্পন্ন হয়েছিল।

তাতে অবরোধ উঠে যাওয়াতে এই প্রথম ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ধারায় বিনা বাধায় তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি হয়েছিল ইসরাইল। ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার পরও ইসরাইলের এই অখুশির মূল কারণ, তেল বিক্রিসহ ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনের মূল ধারায় ফিরে আসা। আর তাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলা। তাই ওবামার আমলে প্রথম গড়ে ওঠা, আমেরিকা-ইরানের গঠনমূলক সম্পর্ককে মূলত জায়নিস্ট ইসরাইলের স্বার্থে ও আগ্রহে এবং সুনির্দিষ্ট কোন আমেরিকান স্বার্থ ছাড়াই ট্রাম্প তা ভেঙে দেন। এটাই ট্রাম্পের সেই ‘খুঁচিয়ে ঘা করা’। একটা সুস্থ শরীর, ক্ষতশুণ্য। কিন্তু তাকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত ক্ষত তৈরি করে এরপর সেই ক্ষতকে পঁচানোর মত ঘটনা ঘটানো, এটাই ট্রাম্পের কাজ। ভিন্নরাষ্ট্র ইসরাইলের স্বার্থে নিজ রাষ্ট্র আমেরিকাকে বিপদে ফেলা এবং এক আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের উদাহরণ হিসেবে এটা থেকে যাবে।

গত ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল শেষ যুদ্ধের পর আরবেরা ‘তেল অবরোধ’ [OIL Embargo 1973] করেছিল।  এমনিতেই যুদ্ধে হেরেছিল, ফলে সে যুদ্ধের খরচের ভার তো আছেই। আবার আরবদের প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্রই যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা বলতে তেল বিক্রি বুঝে, এমন অর্থনীতির দেশ। তাই ‘তেল অবরোধ’ মানে, পশ্চিমাদের কাছে তেল বেচব না বললে তা সবার আগে নিজেদেরই সমস্যায় ফেলা হয়ে যায়। পশ্চিমা সভ্যতার অর্থনীতি মাটির নিচে পাওয়া ফসিল জ্বালানির ওপরে দাঁড়ানো, এর চাকা ঘুরছে ঐ জ্বালানি ব্যবহার করে। ঐ তেল অবরোধে পরে তা এই প্রথম প্রবল জোরে এক ঝাঁকুনিসহ ধাক্কা খেয়েছিল।তিন ডলার ব্যরেলের তেল পাঁচ মাসের মধ্যে চারগুণ হয়ে গেছিল। তবুও ওই অবরোধের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরো মারাত্মক, যেটা “কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি ১৯৭৩” বলে খ্যাত। এর মূল দিকটি হল, সৌদিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বানানো। স্বীয় সংকীর্ণ স্বার্থ রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে আমেরিকান প্রটেকশন পাওয়ার বিনিময়ে তারা আমেরিকানদের তেল পাওয়া নিশ্চিত করবে। ফলে ঐক্যবদ্ধ আরব হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হল। এরকমই আরেক তৎপরতার নাম হল, ইসরাইলকে আরবের বিরুদ্ধে সক্রিয়তায় খাঁড়া করে ও তৎপর রেখে আরবদের শায়েস্তা করা। এরই আর এক অংশ হল ক্যাম্পডেভিড চুক্তি, যাতে মিসরকে ইসরাইলের সীমান্ত প্রহরীর ভূমিকায় বসানো হয়েছে।

কিন্তু অবস্থা এখন আর সে একই জায়গায় নাই, একালে যখন আমেরিকা নিজেই এখন তেল রফতানিকারক দেশ হয়েছে। মার্কিন [Fracking] অয়েল আর সৌদি ফসিল ফুয়েল তেলবাজারে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মার্কিন ফ্রেকিং অয়েলের অসুবিধা হল এর উৎপাদন (কোমল শিলা [Shale] থেকে পিষে তেল বের করার) খরচ বেশি। ফলে তেলের দাম ৫০ ডলারের নিচে চলে গেলে এটা লস প্রজেক্ট। তাই দাম কমিয়ে দিয়ে সৌদিরা ফ্রেকিং পদ্ধতিতে পাওয়া অয়েলকে চাপে ফেলে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। অতএব, এই যুগে আমেরিকা-সৌদি বন্ধন আর পুরনো ‘কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি’ দিয়ে আটকানো নয়; বরং সৌদিরাই নিজ স্বার্থে আমেরিকানির্ভর। কাজেই ওবামার তৈরি করা ইরান-আমেরিকা পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি থেকে আমেরিকাকে ট্রাম্পের এককভাবে বের করে আনার পক্ষে একালে আমেরিকার সুনির্দিষ্ট কোনো স্বার্থ নেই, ইসরাইলের স্বার্থ ছাড়া।

আবার ইসরাইল অথবা ইরান একে অপরকে এখনই একেবারে ধ্বংস করে ফেলতে চলেছে এবং ব্যাপারটা একেবারে আসন্ন বাস্তবে এমন কিছুই হাজির নাই। বাস্তবতা এমন না ফলে ইসরায়েলের এমন কোনো স্বার্থ নেই। হ্যাঁ, পারস্পরিক বৈরিতা অবশ্যই আছে, তবে তা রুটিন ধরনের। ফলে শেষ বিচারে ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষে ট্রাম্প অথবা তার ইহুদি জামাইয়ের ব্যক্তিগত লাভালাভ ছাড়া আমেরিকার সিদ্ধান্তের পক্ষে আর কোনো যুক্তি নেই।

মজার কথা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সদস্য কেউ অথবা জাতিসঙ্ঘের কাছেও – যারা ওই পারমাণবিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী একপক্ষ – তাদের কারও কাছেই ট্রাম্প নিজের ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষের সাফাই প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

এছাড়া, ট্রাম্প এবার শুধু আমেরিকাকে চুক্তি থেকে সরিয়ে এনেছেন তাই নয়, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করেছেন। ট্রাম্পের এই আমলে অবরোধ আরোপ করা হচ্ছে যথেচ্ছাচারে। কাউকে অপছন্দ হলেই অবরোধ। এই অবরোধ কথার ব্যবহারিক অর্থ হল, অবরোধ আরোপ করা হয় যে রাষ্ট্রের উপর, সে রাষ্ট্র আর আমদানি-রপ্তানিতে আমেরিকান ডলারে কোন পণ্য কাউকে বিক্রি বা কারও থেকে কেনা – কোনটাই করতে পারবে না। কেন আমেরিকার পক্ষে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? কারণ, ইনভয়েসে ডলারে পণ্যমূল্য লেখা থাকলে সেই মূল্য নগদায়ন করতে কোনো-না-কোনো পর্যায়ে যেকোনো এলসি খোলা ব্যাংকের একটা আমেরিকান ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কোনো আমেরিকান ব্যাংক এখন আর নিজে সে সার্ভিস দিতে চায় না। কারণ, অবরোধ আরোপের পরে কোনো আমেরিকান ব্যাংক তা উপেক্ষা করলে, সেই ব্যাংককে নিকট অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করে তা আদায় করেছে।

আমেরিকান ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেন বিনিময়ের একমাত্র মুদ্রা হিসেবে অনুমোদন দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা, মানে ১৯৪৪ সালের [Bretton Woods System] আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা শুরু করা হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল, সেকালে আর কোনো দেশের মুদ্রা বিকল্প হিসেবে পাওয়া যায় নাই। সবারই মুদ্রামান ছিল ত্রুটিপুর্ণ, ফুলিয়ে ফাপানো মানে অবমুল্যায়িত।  অথবা ওই মুদ্রার রাষ্ট্রের নিজস্ব আয়-ব্যয়ে উদ্বৃত্ত নেই, ঘাটতির; ফলে ভরসা করার মতো মুদ্রা তা আর ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা বলে গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে কেউই সেকালে চিন্তাও করেনি যে, আমেরিকা পড়তি অর্থনীতির রাষ্ট্র হিসাবে এককালে নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে অন্য কোন রাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলতে ডলার-অবরোধ আরোপ করে অন্যায় সুবিধা নেবে।

আসলে দুনিয়ার সব বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ এখনো ডলারে সম্পন্ন হচ্ছে বলে সেটাই আমেরিকার জন্য অবরোধ আরোপের বাস্তব সুবিধা হয়ে হাজির হয়েছে। তুলনায় চীনের ইউয়ান ধেয়ে আসতে থাকলেও এর উঠে আসতে এখনও সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমেরিকা অশুভ অর্থনৈতিক মোড়লিপনার শেষ সুবিধা যা পায় ইচ্ছামত তা  খায়ে নিচ্ছে বলা যায়। তবে এবার অন্য কোনো মুদ্রা গৃহীত হলে তাতে সুনির্দিষ্ট করে শর্ত আরোপ করা থাকতে হবে যে, কোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গৃহীত হতে হলে সংশ্লিষ্ট সেই রাষ্ট্র নিজ একক স্বার্থে কারও বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করতে পারবে না।

অন্যদিকে, ইরানের উপর এবারের অবরোধে আরেক বিশেষ ব্যতিক্রম হল, অন্যান্য বার অবরোধে চীন ও ভারত রাইজিং অর্থনীতি ও ব্যাপক জনসংখার দেশ বলে ইরানের তেল কিনতে গিয়ে আমেরিকার বিশেষ ছাড় পেয়ে এসেছে। ভারতের তিনটা তেল শোধনাগার ইরানি অশোধিততেল নির্ভর হয়ে  জ্বালানি তেল উতপাদনে আছে। কিন্তু এবার আমেরিকার ট্রম্প প্রশাসন কঠোরভাবে বলে দিয়েছে ১ মে ২০১৯ এরপর থেকে অবরোধ কার্যকর হবে সব রাষ্ট্রের উপর [US Secretary of State Mike Pompeo’s announcement that Washington would no longer issue exemptions from sanctions ………“We are going to zero,” Pompeo said of the waivers, ]। অর্থাৎ ভারতের বেলায়ও ইরানি তেল কেনায় আর কোন ছাড় কার্যকর নয়। অথবা কথাটা এভাবে বলা যায় যে, আমেরিকা থেকে ছাড় আদায় করে নেয়ার জন্য ভারত দরকষাকষিতে নেই অথবা করতে চায়নি। বরং বিনিময়ে আমেরিকা থেকে ভিন্ন কোন সুবিধা পাওয়ার আশা করছে সম্ভবত। অবশ্য চীন ইরানের তেল কেনার চুক্তি অব্যাহত রেখেছে। যদিও এখানেও কোন কেনাবেচায় কোন অবরোধ-ছাড় কার্যকর নয়। তবে চীন-ইরান তেলক্রয় চুক্তিতে  কেবল নতুন একটা শর্তের ধারা যুক্ত হয়েছে তাতে যে, ইরান নিজস্ব বাহনে [National Iranian Tanker Co (NITC) ] করে চীনে তেল পৌঁছে দেবে। বাস্তবত তা অবরোধ না মানার শামিল। এছাড়া গত ২২ এপ্রিলে প্রতিদিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে চিনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে,আমেরিকার একপক্ষীয় অবরোধ আরোপের চীন বিরোধী, ইরানের সাথে সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক (তেল-পণ্য কেনাবেচাসহ) আইনি ভিত্তির উপর দাঁড়ানো  [ Geng Shuang, a Chinese Foreign Ministry spokesman, said at a daily news briefing in Beijing on Monday that it opposed unilateral US sanctions against Iran and that China’s bilateral cooperation with Iran was in accordance with the law.]

তবে ভারতের এই সিদ্ধান্ত বহু কিছুর ইঙ্গিত এবং প্রকাশ্য রূপও বলা যায়। পুরানা ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) বা এর জেরে পুরা ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক মানে ছিল, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ নীতি পালন করে এর বিনিময়ে ভারত আমেরিকা থেকে পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যে বা অস্ত্র ক্রয় বিষয়ে নানা সুবিধা আদায়। কিন্তু ট্রাম্প আসার পর থেকে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে শুকিয়ে গেছে তো বটেই, ২০১৮ সাল থেকে অবস্থা এমন যে, সব সুবিধাপ্রাপ্তিই বন্ধ। আর উল্টো ভারতীয় পণ্যেও ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ-শুল্ক আরোপ করেছিল। এমনকি এবারের নির্বাচনে মোদী আবার জয়লাভের পরও আমেরিকার খাতায় ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ক্যাটাগরি থেকেও ভারতের নাম কেটে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতের মনোভাব এখনো একই রকম – “যদি ট্রাম্প সাহেবের মন আবার বদলায়” – মন পাবার সে আশায় তাকিয়ে থাকা। কিন্তু পরিস্কারভাবে ট্রাম্প যেভাবে একপক্ষীয়ভাবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন, এতে বোঝা যাচ্ছে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত  পুরো আমলেও ট্রাম্পের অনুসৃত নীতিতে কোনো ছেদ পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবুও ভারতের একপক্ষীয় প্রেমের সমাপ্তি নেই। এমনকি এদিকে, সাউথ চায়না সি নিয়ে প্রায় সব পড়শিদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্কে আমেরিকা এখন অনেকটা গায়ে পড়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। নানান মহড়ায় আয়োজন ও তাতে অংশ নিচ্ছে। এই সমুদ্রসীমা বিতর্কে ভারত সেখানে কোন পক্ষ নয়। মানে ভারতের তেমন কোন স্বার্থ না থাকলেও ভারত যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে।

ভারতের আচরণে, এসব দেখেশুনে এবার ইরানেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এপর্যন্ত অবরোধকালে ইরানি তেল কেনার বিনিময়ে ভারত সব সময় মূল্য ছাড় পেয়ে এসেছে। ইরানও ধৈর্যের সাথে তা দিয়ে এসেছে। কিন্তু এবার [১মে ২০১৯ এর পরে] অবস্থা সম্ভবত ভিন্ন, অব্রোধের উছিলায় ভারত তেল কিনতে চাচ্ছে না। তাই, এ নিয়ে মুখোমুখি হতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে এসেছিলেন গত মাসে ১৩ মে ২০১৯। ভারতের মিডিয়ায় লিখেছে সে খবর নিয়ে যে তাদের সম্পর্ক [India-IRAN Relation] এখন কোথায়। সেখানে আমরা জানছি, ভারত আর কী কী সুবিধা নিয়েছে ইরানের কাছ থেকে!
ইরানের চাবাহার সমুদ্র উপকূলে অগভীর বন্দর হলেও এই পোর্টে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক সুবিধার দিকটি হল, একে ব্যবহার করে ভারত পাকিস্তানের ভূমি বা বন্দর ব্যবহার না করেই আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ার দেশে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারে। এ কারণে এই বন্দরে অংশত বিনিয়োগ ভারতেরও আছে। তবে ‘প্রচারে ওস্তাদ’ ভারত এটাকে গোয়াদর গভীর বন্দরের সমতুল্য বলে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে।

ভারতের এক মিডিয়া লিখেছে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবারের সফরে চাবাহার পোর্ট নিয়ে ভারতকে পাল্টা চাপ দিয়েছে। an issue that is likely to dominate the bilateral discussion is Iran’s Chabahar port, ……………Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran turns that assurance somewhat blurry. বিবিসি বাংলা লিখেছে, “এদিন সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবধারিতভাবে চাবাহার তাস ব্যবহার করেছেন”।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর এবার শুধু ভারতেই থেমে নাই। মাত্র দশ দিনের মাথায় ২৩ মে ২০১৯, তিনি পাকিস্তান সফরে যান।

ইরান চাবাহার বন্দরকে গোয়াদর বন্দরের সহযোগী করে গড়তে চীন ও পাকিস্তানের সাথে আলাপ শুরু করেছে। এ ছাড়া, পাকিস্তানের কলামিস্টদের লেখায় উঠে এসেছে, এত দিন এটা ইরান চিন্তাও করেনি ভারতের স্বার্থে। ইরানের সরকারি প্রেস এজেন্সি এক খবরে বলছে ইরানি পররাস্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানকে  “গোয়াদর আর চাবাহার পোর্টকে যুক্ত করে দিতে প্রস্তাব দিয়েছেন” [“We can connect the two seaports and then connect Gwadar to our entire railroad system and from Iran to the North Corridor through Turkmenistan, Kazakhstan and also Azerbaijan, Russia and also to Turkey,” ]। এর সোজা মানে হল, চাবাহার পোর্টকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের গভীর পোর্ট গোয়াদরের বিকল্প হিসাবে প্রচার করত তা আর থাকল না। শুধু তাই না চাবাহার পোর্টও  চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিবার প্রস্তাব এটা – যেখানে এখনও পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্প ভারতের চোখে হারাম।

যেখানে ভারতেরই মিডিয়াই মন্তব্য লিখছে যে, টিটকারি দিয়ে বলছে বারবার মত বদলে ঘুরে যাওয়া ট্রাম্প নির্ভরযোগ্য নয়, সে যুদ্ধবাজ [Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran ………] অন্যদিকে তবু ভারতের আমেরিকা বা ট্রাম্পবিষয়ক ‘একপক্ষীয়’ প্রেম সম্ভবত আরো বেশ কিছুদিন থাকবে বুঝা যাচ্ছে। সেটা এতই যে ভারতের শখ ও সুখস্বপ্নের চাবাহার পোর্টকে ট্রাম্পের প্রেমে বলি দিতে ভারতের দ্বিধা নাই।

এসসিও বা সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন মূলত চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়া- মিলিয়ে একটি সামরিক ও বাণিজ্যিক জোট। গত বছর এতে সদস্য করে নেয়া হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানকেও। এ বছরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়েছে গত মাসের শেষে। আর রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে চলতি মাসের মাঝামাঝি, ১৩-১৪ জুন। ভারতের মিডিয়ায় খবর, ইমরানের সাথে একই সভায় মোদির সাক্ষাৎ হলেও সাইড লবিতে তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে না। এবারো নির্বাচনে জিতে আসার পেছনে ‘পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর’ মোদি এই প্রপাগান্ডা বিরাট কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। ক্রমশ সামনে দানব হয়ে উঠা মোদীর এমন অনেক কাজ বাকি। তাই স্বভাবতই ‘বীরের’ ইমেজ মোদী সহসাই হারাতে চাইবেন না। তাই অন্তত প্রকাশ্য নীতিতে মোদী সহসাই কোনো বদল আনছেন না। আমাদের আরও ভুগতে হবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)ইরান,ভারত ও আমেরিকা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

গৌতম দাস

০৩ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AL

 

বাংলাদেশের “পররাষ্ট্রনীতি” বলতে যা কিছু আছে তা হঠাৎ করে আমেরিকানদের নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। যদিও এরা কোন আমেরিকান, কারা এরা, তা নিয়েও কথা আছে অবশ্য। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই নড়াচড়া বা নজর ফেলা এককথায়, পন্ডশ্রম। বিষয়টা ‘প্রথম আলো’র ভাষাতেই বললে, গত ১৭ মে তাদের একজন লিখেছে, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞেস নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই, BEI) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই, IRI )“।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান দু’টি আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। তারা ঐ থিঙ্কট্যাঙ্কেরই বাংলাদেশ শাখা নাকি কেবল ফান্ডদাতা-এনজিও সম্পর্ক, কোনটা- সেটা তাদের মুখ থেকেই আমাদের জানার বাকি আছে। যা হোক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যা কিছু নিজের কাজের ইস্যু হিসেবে তুলে আনে, অনুমান করা অবাস্তব হবে না যে, তা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ বলে তারা মনে করে।

কথা হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন আছে, এর ঘাটতি, খামতি কী – সে প্রশ্ন এখন কেন? বিশেষ করে আজকের খোদ বাংলাদেশই যে দশায় আছে, একে এই অবস্থায় আনা ও ফেলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় আমেরিকান বন্ধুদেরও অবদান আছে। গত ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকা বুশ এবং ওবামা- এই দুই প্রশাসনের তো বটেই অন্তত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরও [AEI] বিশেষ ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কী করা হবে এনিয়ে অন্তত  ভারত-আমেরিকার আলোচনাগুলোতে, গোলটেবিল বা ইনফরমাল বৈঠকে ইনপুট দিয়ে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ধরনের পরিণতি, এই অর্থে ‘উত্তরসূরি’ বলা যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে এক ধরনের সামরিক ক্ষমতা দখল হয়েছিল তাকে আমরা অনেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলি, যা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। কেন এই ঘটনা ঘটেছিল, এর ‘আনুষ্ঠানিক’ কারণ কখনও জানা যাবে না। কিন্তু আসল কারণ যা দখলকারীদের সাফাই-বক্তব্য থেকে জানা যায়, মোটাদাগে সে ভাষ্যটা হল – আগের সরকার  “ওয়ার অন টেরর” -কে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে “জঙ্গি মোকাবেলার উপযোগী” করে ঢেলে সাজানো ও সংস্কার করা হয়নি। সে কাজগুলো সম্পন্ন করতেই ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই বক্তব্যটা ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পরে বদলে যায়।

মূল কারণ, আমেরিকান অগ্রাধিকার মানে কোনটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ ও আগে দরকার সেই বোধ বদলে গিয়ে এক নতুন আকার নিয়েছিল। আমেরিকা ওয়ার অন টেরর বা জঙ্গি ঠেকানোর চেয়ে তখন থেকেই “চীন ঠেকানো’-কে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করেছিল।  না সাব্যস্ত করা ছিল আগেই তবে বাস্তবায়ক রেডি ছিল না তখন। আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’[China containment], মানে ‘চীন ঠেকানো’ নামের কর্মসূচি আছে। এর অর্থ হল, ২০০৫ সালের পর থেকে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হিসেবে চীনা উত্থান আর আমেরিকার পতন যখন আমেরিকার নিজের করা সার্ভে ও পরে তা নিয়ে প্রকাশিত (২০০৮) রিপোর্টও স্বীকার করে, তখন এশিয়ার দুই ‘রাইজিং অর্থনীতি’ চীন ও ভারত – এদের একটাকে (ভারতকে) কাছে টেনে একে অপরটির (চীনের) বিরুদ্ধে লাগানোর নীতিই আমেরিকার “চায়না কনটেইনমেন্ট”। আমেরিকার এই “চায়না ঠেকানোর” নীতিতে ভারত নিজেকে পরিচালিত হতে দিতে রাজি হয়ে যায় এসময়েই। বাংলাদেশে আমেরিকান প্রায়োরিটি বদলের রহস্য এখানেই।  সেজন্যই হঠাত করে এই রদবদল ঘটেছিল।

আর এর বিনিময়ে ভারত পায় – এক. একদিকে আমেরিকায় পণ্যের রফতানি বাজারে বিনা বা কম শুল্কে আমেরিকায় প্রবেশ সুবিধা, ভারতের আমেরিকান হাইটেক অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি। আর দুই. এছাড়াও অন্য দিকে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে “দেখভালের দায়িত্ব” তুলে দেয় যাতে জঙ্গী ঠেকানো কথার আড়ালে ভারত বিনা পয়সার করিডোর, আসামের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারসহ এ দেশকে সরাসরি অন্যান্য নানান ব্যবহার করে সব সুবিধাই নিতে পারে ভারত।  প্রায় নিয়ন্ত্রক বনে ভারতের হাতে চলে যায় বহু কিছু। যেমন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ও প্রয়োজনে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনের সাহায্য নিবে কিনা তা নির্ভর করবে ভারতের স্বার্থ এই অগ্রাধিকার যদি তা এলাও করে একমাত্র তবেই। এর সোজা অর্থ, ভারত বন্দর চায় না তাই বাংলাদেশ এটা করতে পারবে না।

ফলে এভাবেই এরপর থেকে চলে আসছে আজ পর্যন্ত, আমাদের এই দুর্দশার শুরু এখান থেকে। কিন্তু সেই আমেরিকা এখন আবার আরও কী চায়? একই লোকদের আমরা আবার তৎপর হতে দেখছি কেন?

গত ২০১৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা দেখেছিলাম যে, সেবার বাংলাদেশের বিনা ভোটের নির্বাচনকে ভারত প্রকাশ্যে সদর্পে সমর্থন দিয়েছিল আর তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এত ঘনিষ্ঠতায় মিলে গেছিল যে, তারা কেউই আর যেন আমেরিকাকে চেনেই না। বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ডন মোজিনা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্রিফিং না পেয়ে বা না নিয়ে ভারতে গেছিলেন – এই ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী নিঃসন্দেহে!

বাস্তবতা হল, আমেরিকা এখন নিজের সব মুরোদই হারিয়েছে। চীন ঠেকানোর যে কাজ ভারতকে দিয়ে করানোর বিনিময় হিসেবে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে দেখার দায় তুলে দিয়েছিল, তাতে কি চীনের উত্থান ঠেকানো গেছে? প্রশ্নই উঠে না কারণ এভাবে তা হয় না।  তাই আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। কোন দাগও ফেলতে পারেনি, আমাদেরকে কষ্ট-দুর্দশায় ফেলা ছাড়া। বরং নিজেরই বেগতিক অবস্থায় আর দুর্দিনে আমেরিকা এক “পাগলা প্রেসিডেন্ট” পেয়েছে, যিনি নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি নাকি ন্যাশনালিস্ট আমেরিকান! কী তামাশা! গ্লোবালাইজেশনের নেতা আমেরিকা, যে দুনিয়াটাকে অন্তত ৩০ বছর ধরে একটা গ্লোবালাইজড শ্রমবিভাজিত এক গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিয়ে গিয়েছে, সেই আমেরিকার পাগলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, উনি এখন নাকি ‘ন্যাশনালিস্ট’, সবকিছু “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে ফরে সাজিয়ে ফেলবেন বা হয়ে যাবেন। যেন বুড়া বয়সে বিড়াল বলছে সে আর মাছ খাবে না।

কিন্তু ঘটনার কঠিন সত্য দিকটা হল, আমরা কেউই মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারি না, পারব না।  এটা সম্ভব নয়। তাই এর চিন্তাই করি না। কিন্তু এই গোয়াড় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন এটাও নাকি করা সম্ভব। ব্যাপারটা এমনই নাকি সহজ। আসলে পাগলামি আর দেশ চালানো তো এক জিনিস নয়। তাতে আমাদের অসুবিধা নেই; কিন্তু যারা বাংলাদেশে আমেরিকান স্বার্থের দেখভাল করে সেই “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা” তাদেরকে আবার তৎপর হতে আর বড়ই পেরেশান দেখাচ্ছে। সমস্যাটা মূলত তাদের। মনে হচ্ছে তাঁরা এটা বুঝতে বা এই বাস্তবতা মানতে চাচ্ছেন না।

অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ন্যায় কিনা কথা সেটা না। সে প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে আগালে এসব ব্যাপারে প্রথম দেখা প্রয়োজন হয় মুরোদ আছে কী না। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা মুরোদহীন। অর্থাৎ তিনি আমেরিকাকে মুরোদহীন করে ফেলেছেন অথবা আমেরিকা যে মুরোদহীন এটা মেনে নিয়েছেন। এখন ‘মুরোদহীন’ হলে আর সে তো মরদ থাকে না। তাই আমেরিকার মরদগিরি শেষ। ভারতকে বাংলাদেশ দিয়ে দেয়ার পর থেকে ঘটনাচক্রে আমেরিকাও এই মুরোদহীন হয়ে যায়, ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। তাই, ইতিহাসে ২০০৭ সালই সম্ভবত বাংলাদেশে ‘সর্বশেষ আমেরিকান হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ থাকবে। অন্তত ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, মানে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমেরিকা এমন থাকবে – অভিমুখ, ঝোঁক তাই বলছে। ২০২১ সালে (মানে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে) কে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জিতে বসবে – ডেমোক্রাট না রিপাবলিকান, এছাড়া আবার সে কেমন প্রেসিডেন্ট হবে – এগুলো হাজারটা শর্তের “যদি-না-কিন্তু” এর প্রশ্ন। এককথায় বিষয়টা এখন পুরাটাই অনিশ্চিত। আর ততদিনে আমেরিকার আগের মতন বাস্তব হস্তক্ষেপের মুরোদই থাকবে না, তা না হলেও তা আরও কমে যাবে। বাস্তবতাই থাকবে না হয়ত। অতএব, বাংলাদেশের “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকান” – আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। পারছেন না। আমরা জানি নভেম্বর ২০১৮ জেমস মাতিসের [Mattis] পদত্যাগ আপনাদের সব আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে, আপনারা অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল আসলে সেটাই শেষ।  মনে রাখতে পারেন – ট্রাম্প যতদিন অফিসে আছে তিনি সবকিছু ফ্রিজ করে দিবেন। এই সময়ের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন ইত্যাদি যেখানেই যা কিছু নড়াচড়া শুরু হোক না কেন, সেসব হোয়াইট হাউজে যাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকান স্বার্থের’ সবচেয়ে ‘ভালো ভালো উদ্যোগ ও প্রস্তাব’ তা যত ভালই হোক না কেন – এসবই ডিপ ফ্রিজে চলে যাবে। কারণ, পুরনো অভ্যাসে “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকার”  এসব তৎপরতার প্রতি ট্রাম্প ন্যূনতম আগ্রহী নন। এখান থেকেই এটাকে ‘মুরোদহীনতা’র শুরুও বলতে পারেন। কাজেই দিন শেষ!

আসলে ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ যারা তাঁরা সম্ভবত আসলে খেয়ালই করেননি যে ২০০৭ সালেই তাদেরকে অসত্য বলা হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে তা সামনে রেখে এর আড়ালে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর প্রায়রিটি’তে মেতে উঠেছিল। ভারতের হাতে সব তুলে দিয়েছে অথচ বাংলাদেশের বন্ধুদেরই তা বলেনি। আর বাংলাদেশের বন্ধুরা যদি জানতেনই তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতি। তবে তাদের শান্ত্বনা এই যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে আমেরিকার পক্ষে আর সত্য লুকায়ে রাখা সম্ভব হয় নাই।  ‘ওয়ার অন টেরর’ যে আর আমেরিকার প্রায়রিটি নয়, সে তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস এই সময়ে এসে আর না লুকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন [Mattis: US national security focus no longer terrorism]। এটা ২০১৮ সালের শুরুতে ১৯ জানুয়ারি বিবিসির সংবাদ শিরোনাম। মাতিস বলছেন, “টেররিজম নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আমেরিকার জন্য প্রধান হুমকি”। অথচ এই কথাটাই ২০০৭ সাল থেকেই তাদের মনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় থেকেই সব স্তরে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুল কারণ দুনিয়াতে চীনা উত্থান অনিবার্যভাবে আসন্ন – সেকথা তারা তখনই গবেষণা সার্ভে ও স্টাডির রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক-কাল অবস্থা থেকেই তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। আনুষ্ঠানিক এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।

এই বিকল্প ডেভেলবমেন্টগুলো ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ এরা আমল করেছিলেন বা করতে সক্ষম ছিলেন তা তাদের কারবার ততপরতা দেখে কখনও মনে হয় নাই। কিন্তু এতে আসলে যা মূল জিনিষটা বদলে গেছে, বিশেষ করে খোদ ‘ফ্রেন্ডস’ শব্দটিরই সংজ্ঞা বদল হয়ে গেছে ট্রাম্পের হাতে, সেটাই কেউ আমল করেছে মনে হয় নাই। ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান – তাঁর পরিচলন নীতিটাই আসলে বলে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে – আদৌ আমেরিকার কোনো ফ্রেন্ড দরকার আছে কি না? ট্রাম্প নিজেই জবাব দিয়েছেন, যে দরকার নাই। আর যদি থাকেও, তারা ভিন্ন কেউ; অথবা বাংলাদেশে তার এমন ফ্রেন্ড আর লাগবে না। ট্রাম্প নিশ্চয় সরাসরি এ কথা বলেননি, তবে তাঁর অনুসৃত নীতি (ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্প বা ট্রাম্পের নাশনালিজম) এই মেসেজটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে আমেরিকান বন্ধুদের (Friends of America, in Bangladesh) বাংলাদেশকেই সবকিছুর জন্য দোষী ঠাউরানো – অস্বাভাবিক বা নতুন না। এটাই তারা সবসময় করে এসেছেন। যেমন এভাবে অনেকে এখনও বলছেন যে, ভাল ভাল “গণতান্ত্রিক দেশে”  তাদের পররাষ্ট্রনীতি নাকি “জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে” সমর্থিত ও সমৃদ্ধ থাকে বলে, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ তারা সহজেই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা; সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রথম আলো পত্রিকা যে রিপোর্ট করছে তাতেও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্যারায় তারাও লিখেছে এভাবে – “আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা বদলে যায় বলে জনমনে ধারণা আছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সুশাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আলোচক”। অর্থাৎ সার কথা আমেরিকার কোন দোষ নাই। সব আমাদের দুই দলের রেষারেষির কারণে, তাই সবদোষ আমাদেরই।

বিইআই ও আইআরআই-এর আলোচনা সভায় আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর সব দায় চাপিয়ে এমন মন্তব্য খুবই অনুচিত ও অবিচার তা বলাই বাহুল্য। কারণ, ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপার কমবেশি সবই আপনারা তো জানেন। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিবাদ আছে কথা সত্য, ফলে তা অনেক কারণের একটা । কিন্তু তা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কারণ তো – আমেরিকার হস্তক্ষেপ।

ঠিক আছে তাহলে আসেন, আপনাদের বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়া ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, আপনাদের বক্তব্যের দুদিন পরেই। ভেঙ্গে বললে, একটা বড় ঘটনাই ঘটেছে। সম্ভবত বলা যায় যে চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এটাই এই প্রথম আমরা প্রধান দলগুলো একটা সফল এককাট্টা অবস্থান প্রকাশ করেছে।

তাহলে ঠিক এখনই আপনাদের নড়াচড়া কেন?
সম্প্রতি চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এই প্রথম প্রধান দলগুলো একটা সফল অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। আর এটা তারা করেছে ভারতের এব্যাপারে অবস্থান যাই হোক না কেন – এই প্রথম এটা ধরে নিয়ে। “গত ১৯ মে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশ চীন সিল্ক রোড ফোরাম’ গঠন করেছেন”। বেশির ভাগ পত্রিকার হেডিং এটাই। এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব হয়ত বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের – তা যারই হোক, এ ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভি, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ো -এদের উপস্থিতিতে সহায়ক সে কমিটি করা হয়েছে সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ অনেকে এর সদস্য হয়েছেন। মঈন খান বক্তৃতায় করেছেন। ওদিকে ড. গওহর রিজভী [Gowher Rizvi] ঐ সভায় দাবি করেছেন যে, “ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে”।

এই কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই আছে। তবু বাস্তবতা যতটুকুই থাক একেবারে মাঠের ফ্যাক্টস হল, এই গতকাল ১ জুন ২০১৯ ব্লুমবার্গ রিপোর্ট লিখেছে যে ট্রাম্প চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিসহ  ভারতের সাথে কোন খাতিরের সম্পর্কই করতে চান না। সবকিছুর মাথা মুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাগজ কলমে ভারত সুবিধাদিগুলো উপভোগ করত কারণ, ভারত আমেরিকার বিবেচনায় একটা উন্নয়নশীল দেশ [Developing Nation] ঘোষণা করা ছিল বলে। এখন ট্রাম্প সেটার মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, বলছে Trump Ends India’s Trade Designation as a Developing Nation.। এমনিতেই আগের ভারতকে দেয়া সবসুবিধা ( যা চীন ঠেকানোর বুটি হিসাবে ওবামা দিয়েছিল) ট্রাম্পের আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছিল গত বছর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শুধু তাই না উলটা ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক ট্যারিফ বসিয়ে দিয়েছিল যাতে রপ্তানিই অকার্যকর হয়ে যায়।

কাজেই ভারত এখনও আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর খেপ মারতে” পুরানো শর্ত রাজি থাকলেও খোদ ট্রাম্প বাবাজিরই “মন” নাই। নট ইন্টারেস্টেড। এই ফ্যাক্টসটা আমল করলে বাংলাদেশের ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ এদের সব ততপরতাই পন্ডশ্রম। ওদিকে খেয়াল করলেই আমরা নিজেরাও বুঝব যে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলতে চীন গত বছর থেকেই পুরাপুরি তৈরি – এবং তা বাস্তবায়িতই হয়ে গেছে। এর প্রমাণ সফল  য়ুহান সম্মেলন (Wuhan Summit)। এমনকি এবছরও সম্ভবত পরের মাসে দ্বিতীয় য়ুহান সম্মেলন হতে চলেছে। এসব ততপরতার সার কথাটা হল এবার হয় ভারত চীনা শুধু বেল্ট ও রোড প্রকল্পেই না খোদ চীনা নৌকাতেই উঠবে। যদি কোন কারণে না উঠতে পারে, বনাবনি না হয় তবে পরস্পর কঠিন শত্রুতার দিন শুরু হবে। সুতরাং  নিঃসন্দেহে ভারত অনেক দাম চাইবে। যা তার দাম নয় এর চেয়েও বেশি হবে হয়ত সেই প্রাথমিক “asking price” । কিন্তু চীনা স্বার্থের চেয়েও বেশি এমন অসম্ভব অবাস্তব কিছু না চাইলে এই ডিল হবার সমূহ সম্ভাবনা। বিশেষ করে দুটা ফ্যাক্টস এর পটভুমিতে একথা বিবেচনা করা যায়। এক. চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ মিটিয়ে নিবার ডিল ব্যর্থ হয়ে গেছে যা, এখন পরবর্তি ঝড়ের অপেক্ষায় যা এখন আসন্ন। আর দুই. ভারত শত চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের কোন ডিল, কোন “খেপ” পাবার কিছুই নাই, কোন অফারও নাই। বরং পুরা উপেক্ষা আছে। ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠে বসলেও যেন ট্রাম্পের তা নিয়ে কোন পরোয়া নাই। ভারতকে এমনই তাচ্ছিল্যের মুডে আছেন ট্রাম্প। যার মূল কারণ হল, ট্রাম্প তার এখন প্রধান লক্ষ্য হল দ্বিতীয় বার নির্বাচনে দাঁড়ানো – এই মুডেই তিনি আছেন। আর তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এখন নিচ্ছেন তা সে উদ্দেশ্যেই প্রভাবিত। চীনের সাথে বিরোধ মিটিয়ে কোন বাণিজ্য ডিল না করা অথবা ভারতকে কোন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া ইত্যাদি এমন সবই একারণে তুচ্ছ ট্রাম্পের কাছে। বরং তিনি বীর, তিনি আমেরিকান ন্যাশনালিস্ট – এই পরিচয় গড়তে তিনি একমাত্র ব্যস্ত যা দিয়ে তিনি নির্বাচন লড়বেন। যদি না আবার ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন!

কাজেই ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ, আপনাদের উচিত হবে বাস্তববাদী হওয়ার, সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পন্ডশ্রম অর্থহীন। বরং ফ্রেন্ডশীপ রিনিউ বা চেক করে দেখতে পারেন – তা এখনও বহাল আছে কী না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutam.das@gmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০১ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার বন্ধুদের নজরে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

গৌতম দাস

২৭ মে ২০১৯, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AB

 

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। তাতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং গত ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনের চেয়েও এবার আরও বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance (NDA)]। গত এমন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা মোট ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ২৮২ ও ৩৩৬।

এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’ [Hindutto]- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচনটা হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হল ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচনে সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এক প্রধান প্রশ্ন ছিল যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? অর্থাৎ বৃটিশ-ভারত নামেই বাইরে থেকে একে এককাট্টা ভারত মনে হয়। কিন্তু আসলে তা অসংখ্য রেসিয়াল বৈশিষ্ঠের জনগোষ্ঠির ভারত। এছাড়া বৃটিশ্বরা এই ভারতকে শাসন করে গেছে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে। ফলে ভারত বলতে বিভিন্ন ধরণের জনগোষ্ঠির ভিন্নতাগুলো আবার যেমন তেমন না। যেমন ভারতে এখনও ২৯টা রাজ্য। মানে অন্তত ২৯ রকমের বড় বড় বিভক্তি এখানে আছে। এরকম আর কত কত ধরণের আইডেনটিটিতে এখনও বিভক্ত হয়ে আছে ভারতের নাগরিকেরা।  এই ভিন্নতাগুলো সত্বেও তাদের একটা রাষ্ট্রে ধরে রাখার উপায় কী? এই ছিল নেহেরুর কাছে মুখ্য প্রশ্ন। সে  কোন বন্ধন, যা দিয়ে তাদের আটকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায়?

এই কঠিন জটিলতার সবচেয়ে সহজ জবাব নেহেরু খুজে নিয়েছিলেন যেটা তা হল “হিন্দুত্ব”। মানে হিন্দুত্ব হল সেই আঠা বা গ্লু [glue] যার ভিত্তিতে নাগরিকেরা জোটে বেধে একতায় তাদের এক থাকার উপায়। সেই থেকে নব গঠিত ভারত হিন্দুত্ব হল নাগরিক ঐক্যে এভাবে গড়ে উঠেছে।বলাই বাহুল্য এটাই ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে একক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, the biggest disasterous decision.

প্রশ্নটা আসলে অরিজিনালি ছিল মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বুঝাবুঝির বা বলা যায় বুঝাবুঝিতে ঘাটতি থাকলে সেই অভাব থেকে উত্থিত এবং বিপথগামী প্রশ্ন। যেমন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে বা করার কালে আদৌ এমন ভিত্তি খুজে ফেরা  জরুরি কিনা? সরাসরি উত্তর হল যে – একেবারেই না। কিন্তু তবু নেহেরুর এই বিপথগামী পথই ধরেছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে এটা ১৯৪৭ সালের আগষ্টের পরে উদয় হওয়া প্রশ্ন নয়। এটা এর আগের পুরা উনিশ শতক (১৮১৫-১৮৯৯) এই সারাটা সময় চিন্তার বিপথগামী গমণ বজায় ছিল।  সেদিকে একটু পরে আবার আসছি।

নেহেরুর কাছে ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না – এটাই ছিল তাঁর চোখে সদুত্তর। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অ-হিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে, মারজিনাল করে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানের দিকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। তা হল, হিন্দুত্ব একটা কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়। এরই প্রতিভূ বা সব বৈশিষ্ট-চিহ্ন নিজেই হাজির হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’।

কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যেই সরাসরি হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে আরএসএসের নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে। দক্ষিণ ভারতের কমল হাসানকে অনেকে চিনে থাকতে পারেন যারা ভারতীয় সিনেমার খবর রাখেন। তিনি সিনেমার খ্যত নায়ক। তিনি সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু নাথুরাম সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি মামলা খেয়েছেন। পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জামিন চেয়ে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন,  “Godse himself, in his book Why I killed Gandhi, had categorically stated that Mahatma Gandhi had acted against the interest of Hindus, and had blamed him for partition, Mr. Haasan said.”। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস-বিজপি দুপক্ষই ইস্যুটা কার্পেটের নিচে ফেলে চেপে যেতে চান। আরএসএস তাদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্ট বা কর্মিসভায় নাথুরামকে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাদের হিরো বলে তুলে ধরে। যদিও বাইরে খুব বেশি এই ভাবনা প্রচারে আনতে চায় না। আর যে মোদী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নাথুরাম তর্কে ঢুকতেই চান না।

যে যাই হোক, ১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ গড়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা একালের নেতা এলকে আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে [… providing a fresh ideological narrative to the people,” ] বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদী নির্বাচনে নেমেছিলেন?  ছোট্ট করে এনিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যাক। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে আমরা তুলনা করলে বুঝব, ২০১৪ সালে মোদীর মুখ্য (catchy) ইস্যু ছিল মূলত “অর্থনৈতিক”। অথচ এবার অর্থনৈতিক শব্দটাই তিনি কোথাও উচ্চারণই করেন নাই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চলতি শতকের প্রথম দশক (২০০১-০৯) থেকে। যেখান থেকে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংকের ধারণা উঠে এসেছে। তো “রাইজিং অর্থনীতির” ইন্ডিয়া এর একটা। মোদীর আগের কংগ্রেস (২০০৪-১৪) সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে এর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশাআকাঙ্খাও চরমভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। সেদিকটা খেয়াল করে মোদী ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ঐ অর্থনৈতিক ইস্যু সেটাকেই আবার উস্কে চাঙ্গা করে তুলে ধরে দাবি করেছিলেন তিনি এটা আবার তুলে সচল করতে পারবেন, কারণ গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখমন্ত্রী তিনি। তিনি তখনও থার্ড টার্মের মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই খাতিরে যেন তাঁকে ২০১৪ নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল কিন্তু তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তাঁর নাই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি [demonitization & GST]  ইস্যুতে তার কপাল খুলে নাই, তা যতই ভাল প্রোগ্রাম হোক বা না হোক। ডিমনিটাইজেশন মানে নোট বাতিল আর জিএসটি মানে ভারতের এক রাজ্যের পণ্য আর রাজ্যে ঢুকলে টাক্স আরোপ করা হয়, এসব পাল্টাপাল্টি ট্যাক্সকে উঠিয়ে নেয়া, সরল নিয়ম করা আর আদায়কৃত ট্যাক্স শেয়ার করার ফর্মুলা চালু – এককথায় বিশেষ করে পরেরটা খুবই ভাল কাজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন, প্রথম তিন বছরের সাফারিং এর কারণে নগদ অর্থনীতিক পারফরমেন্সের বিচারে তিনি ফেল করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি একেবারেই ফেল করেছেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, মোদীই ভারতের এক ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে তিনি নিজের দল এবং বিশেষ করে নিজ সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যেটা যে, দলীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে একটা দল -অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বা প্রশাসন বিষয়ক একাদেমিক যারা দলের খাতায় নাম লেখানো – এমন  এদেরকে নিয়ে গঠিত কোন টিমের পরামর্শের দিয়ে সরকার চলছে। না মোদী এসব এমেচার করতে রাজী না।  বরং তিনি তা করে থাকেন ও ভরসা করেন তা হল প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানী নিয়োগ দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদী-অমিতের বিশেষ “রাজনৈতিক ব্রান্ড” এটাই। এজন্য তারা বিজেপির মত দল করলেও খুবই স্মার্ট। এমনকি নির্বাচনও তিনি করেন এমন কোম্পানীকে পরামর্শক রেখে। এই জায়গায় মোদীর বিজেপিকে ধর্মতাত্বিক নেতা বা মফস্বলী কোন নেতা জ্ঞান করা খুবই ভুল হবে ও খাটো করে দেখা হবে।

আর সেই কন্সাল্টেন্টদের পরামর্শেই এবার তিনি একক – কেবল “হিন্দুত্ব” ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। তবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ যেটা উপরে বলেছি যে, এটা সম্ভব হল কারণ ভিত্তি হিসাবে ভারত-রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠিত। কিন্তু যে উত্তর এখনও অমীমাংসিত তা হল – বিভিন্ন আত্ম-পরিচয় বা বৈশিষ্টের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কেন কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে – আটকে ধরে রাখার কোন আঠা বা গ্লু যেমন একটা হিন্দুত্ব – এর প্রয়োজন আদৌও কী অনিবার্য, এসেনসিয়াল? না কী অপ্রয়োজনীয় এবং বিকল্প আছে?  এছাড়া কবে থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টাকে “এসেনশিয়াল” মানে হিন্দুত্বকে এসেনশিয়াল বলে বুঝে এসেছেন, সেটাও খুজে দেখা ও লক্ষ্য করা খুবই জরুরি।

এই প্রশ্নটা ভারতে তো বটেই,উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, তাই স্পষ্ট উত্তর নাই। এবং এক ভারতের কারণেই উপমহাদেশের সবখানেই এটা অমীমাংসিত ও সব অসন্তোষের উতস এটা।

আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক রূপ বৈশিষ্ট হল “রেনেসাঁ” [Renaissance] চিন্তা। ইউরোপের এই রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বৃটিশ-ভারতের রাজধানী, বাংলায় নিয়ে এসেছিল বৃটিশ-শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে থাকেন সকল রেনেসাঁবাদীরা। তার সক্রিয়তার প্রধান সময়কালটা হল (১৮১৫-৩৩)। তিনিই প্রথম এবং তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পিছনে পুরা ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, একটা “হিন্দুত্ব” থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাক্ষ্ম ধর্ম-এর প্রবর্তক যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই – এক হিন্দু নাশনালিজম। তবে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়গুলোতে এটার কার্যকারিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে পরবর্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দের ইত্যাদি্র মত কিছু ব্যক্তিত্বের হাত ঘুরে আরও রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের জন্মের সময় (১৮৮৫) থেকেই এর  হাতে পৌছাতে শুরু করেছিল। আরও পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদ করা ও পরবর্তিতে তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলন – এসবের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। আর সবশেষে দেশভাগের পরে নেহেরুর হাতে সেই একই “হিন্দুত্ব” কিন্তু এবার নতুন প্রয়োজনে – এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। আর  সেই থেকে আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই পুরা সময়ে  হিন্দুত্ব চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সমস্ত বিভক্তির উতস এখানেই। এটাকে একটা অন্ধের হাতড়ানোও বলতে পারি! কারণ লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ভারত যদি একটা মর্ডান রিপাবলিকই হতে চেয়েছিল বা চেয়ে থেকে থাকে তবে তার আবার “হিন্দুত্ব” এর, হিন্দু নাশনালিজমের দরকার কেন? কিভাবে তা হয়? এর জবাব কংগ্রেস বা আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি কখনো দেয় নাই, দিবে না – খুঁজবে না। অথচ অনিবার্য এসেনশিয়াল মনে করে রাখবে।  এতেই তারা এর সাহায্যে অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠির উপরে আধিপত্য কায়েম করতে পারার সুবিধার দিকটা মুখ্য – এই সুবিধার দিকটাই তাদের জন্য সব চেয়ে লোভণীয় ছিল বলে। যদিও মর্ডান রিপাবলিক বলতে একে ধর্মীয় নাশনালিজম বলে মানে করা – এই সুবিধাবাদি ভুল বুঝার ঝোঁক ইউরোপেও ছিল।

সবচেয়ে বড় তামাশার দিকটা হল, হবু  “মর্ডান রিপাবলিক” ভারত বলতে একে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম বলে বুঝা ও মানে দেওয়া কিন্তু একে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ” বা “স্বদেশি আন্দোলন” বলে নাম দেয়া আর ওদিকে এভাবে এর আসল পরিচয় হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম লুকিয়ে রাখা ফেলা হয়েছে। শুধু তাই না। এর প্রভাব এখানেই শেষ না। এভাবে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম এর রাজনীতি করা এটাই মুসলমানদের জবরদস্তি ঠেলে দেয়া হয়েছে যেন তাঁরাও ইসলামি নাশনালিজমই করে – মুসলিম লীগ করে আবির্ভুত হয়। আর এইবার সেই কঠিন তামাশাটা! এই মুসলমান আর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ লটকে দেয় যে এরা ধর্মীয় রাজনীতি করে, এরা সাম্প্রদায়িক, এরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চায় ইত্যাদি। ফ্যাক্টস হল, হিন্দুরা যদি হিন্দু নাশনালিজমের রাস্তা ধরে  তাহলে এরপর মুসলমানেরা যাই করবে তা এক ইসলামি নাশনালিজমই তো হবেই!

অতএব সেই হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম – এটাই একালে মোদীর হাতে স্বরূপে হাজির হতে চাইছে।
এমন কী মোদীর গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে সামাজিক বিভাজন তো বটেই যেভাবে সংগঠিতভাবে  সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল,  “মুসলমানকে ধরে জয় শ্রীরাম বলাতে হবে” এর নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে, [এই মাত্র দ্য হিন্দু পত্রিকার খবর এটা এবারও শুরু হয়র গেছে – মুসলমান তরুণ দর্জি বাসায় ফিরছিল, তাঁকে ঘিরে ধরে বলা হয়েছে, মাথার টুপি খুলে ফেলতে, এরপর জবরদস্তিতে জয় শ্রীরাম বলতে বলে পিটানো হয়েছে।] গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে তারা নাজেহাল “সামাজিক ন্যুইসেন্স” তৈরি করতে নেমে পড়েছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে একইভাবে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা ঐ মুসলমান গৃহস্থকে খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ এরপরেও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে? কেঁউ মাথা ঘামায় নাই। কংগ্রেসের নেতাকর্মি অথবা কোন কমিউনিস্ট এনিয়ে প্রশ্ন করার মুরোদ আছে দেখি নাই আমরা।  মর্ডান রিপাবলিকের অর্থ তাতপর্য তারা নুন্যতম কিছু বুঝে অথবা চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ হচ্ছে এটা – এই বুঝ থেকে তারা কখনও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারে নাই। এটাই একটা বিরাট প্রমাণ যে ভারত আসলেই এবং বরাবরই একটা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র। এর বাইরে রাষ্ট্র কী, অন্য কোন রাষ্ট্রের রূপ কী – এনিয়ে ভারতের কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা কোন প্রগতিবাদীদের কোন বুঝ, কোন স্টাডি কোন বুঝাপড়া কিচ্চু নাই।

এই কথার আরও প্রমাণ পেতে চাইলে  আরও লক্ষ্যণীয় হল, যেমন এখনকার কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী – এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত। মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও কংগ্রেস নুন্যতম অন্তত প্রতীকী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। কংগ্রেসে তা না হয়ে, আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই তথাকথিত সেকুলারিজমের জামাখুলে প্রকাশ্যেই নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে এটা নাকি মোদীর মত হার্ড হিন্দুত্ববাদ না,”সফট হিন্দুত্ববাদ”। এই দাড়িয়েছে এখন কংগ্রেসের ‘সেকুলারিজম’। অর্থাৎ  তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস এখন আর হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদীর হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। ওদিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে তারাও সব আসন হারিয়েছে শুধু তাই না, নিজেদের ভাগের ২২% ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদের নির্বাচনে, মোদীর দলকে। তাতে ব্যাপারটা এখন দাড়িয়েছে এই যে, হিন্দুত্ববাদ ঠেকানোর বোলচালের দলগুলাকে মোদী এবার তাদেরকে আসল চেহারায় এনে ছেড়েছে, এটাই আসলের মোদীর ক্ষমতার আসল সাফল্য!

আবার লক্ষ্য করা যাক, এই নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হয়ে হলে, পরদিন (২০ মে) মোদী হিন্দু তীর্থস্থান উত্তরপ্রদেশের পাহাড়ে প্রাচীন কেদারনাথের মন্দির গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে বসে গেলে তা দেখে কংগ্রেসীদের জবাব হল আমাদের রাহুল তো সেখানে কেদারনাথের মন্দিরে পায়ে হেঁটে গেছিলেন আর মোদী গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে, কাজেই আমরা শ্রেষ্ট।  আসলে এইখানেই মোদীর হিন্দুত্ব অনেক আগেই বিজয় লাভ করে গেছে। তাই ভোটের ফলাফলে না, মোদী আসলে এখানেই বহু আগেই কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন।

হিন্দুত্ব কত ভারী এর লক্ষ্যণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন। মোদীর হিন্দুত্ব কত পাওয়ারফুল,বাকি সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে, পিছনে ফেলে নিজে সবার উপরে উঠে যেতে পারে এরই প্রাণ এগুলো।

যেমন, সবপর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদী-অমিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তাদের জোট ৩০০ এর আশেপাশের আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তব ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও ভালমত ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ শুরু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেছে তা নয়, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করে নাই, এটা এমনই ফলাফল।

আবার, সাধারণত রাজ্য সরকারে (যেমন রাজস্থানে কংগ্রেস ) কোন দল সরকারে আছে এটা লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল  সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথায় এমন ফ্যক্টর এবার কাজ করে নাই। এমনকি যেখানে গত মাত্র পাঁচ মাসে আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা কোন বিজেপি বিরোধী দল জিতেছে সেখানেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই এবার বিজেপি আবার ফিরে ঐ রাজ্যের প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এই অবস্থা দেখা গিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় বা কর্ণাটক এমন রাজ্যে। এসব রাজ্যের ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। খুব ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এমন দেখা যায় না। অথচ বিজেপি এবার এমন হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই জিতেছে।

আবার,নর্থ-ইষ্ট মানে আসাম-ত্রিপুরাসহ ছোট ছোট ট্রাইবাল সাত রাজ্য। আসামে এনআরসি [National Register of Citizens (NRC) ] অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর সর্বশেষ চল্লিশ লাখ হিন্দু-মুসলমান লোক নানান কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ জোগাড় করতে ফেল করেছে। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। গতবছর জুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। কারণ নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছিল। মিজোরামে “বাই বাই ইন্ডিয়া” বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর চলতি হিন্দুত্বের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এজাতীয় সব “কথিত নাগরিক আপত্তি” হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি সাত রাজ্যেই বেশিরভাগ আসন নিয়েছে, কোন রাজ্যে সবগুলোই।

আবার, কলকাতার মানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রচন্ড রকমভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তাঁর তৃণমুল দলের লোকসভার ৩৪ আসন এবার নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি দুইটা থেকে এক লাফে ১৮ আসন  পেয়ে গেছে। তৃণমুল বা মমতা রাজনীতি ও তাঁর সরকারের অনেক দোষ বা অভিযোগ থাকতে পারে, অনেকের অপছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রধান বাধা এখনো এই মমতাই। বিশেষ করে বিজেপির এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে আরও সফল হতে গেলে মোদীর প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানোর ব্যবস্থা করা – তা বলাই বাহুল্য।

ফলাফল প্রকাশের দিন, নিজের বিজয় নিশ্চিতের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছেন। এখনও করছেন। কিন্তু এসব জায়গায় সেখানে তিনি আগে নির্বাচনি প্রচারের সময়ে কত কী বলেছেন ঘৃণা ছড়িয়েছেন সব ভুলে এমনকি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে নির্বাচনের পরে এখন “তিনি সবার নেতা” বলে দাবি করেছেন। তিনি নিজেই  গত ২০১৪ নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – সেই শ্লোগান ওদিন তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হবার পরে প্রথম এবার উচ্চারণ করলেন। এবার নির্বাচনের পর ভোল পাল্টায়ে তিনি নিজেই “সংখ্যালঘুদের” সহানুভুতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, বলছেন”He said if his first term was about “Sabka sath, sabka vikas (Alongside all, development for all)”, his second would stand for “Sabka sath, sabka vikas, sabka vishwas (Alongside all, development for all, trust of all)”।  এই নির্বাচনি বিজয়ে পুরা সময় তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলার সাফল্য গাথা দিয়ে। “পাকিস্তান” = “মুসলমানের” বিরুদ্ধে তিনিই একমাত্র “ভারত-রক্ষক” – এই ছিল তার বয়ানের পাঞ্চ লাইন। আর দ্যা হিন্দু পত্রিকা তাদের নির্বাচন উত্তর গবেষণার ভিত্তিতে বলছে এই বক্তব্যের প্রভাব এমন ছিল যে এক্সিট পোলে অংশ নেয়া মানুষ  বলেছে অর্থনীতি মোদীর ঘাটতি আছে, সাফল্য নাই কিন্তু তবুও তারা মনে করে বালাকোট ইস্যুটাও গুরুত্বপুর্ণ – তাই মোদীকে ভোট দিয়েছেন। দা হিন্দু Balakot plank বলে উপশিরোনামে বলছে, বালাকোটকে ইস্যু করে মোদী রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ আর উত্তরাখন্ডের সব আসনের দখল পেয়েছে [all seats in Rajasthan, Gujarat, Madhya Pradesh, Haryana, Himachal Pradesh and Uttarakhand.]

আমাদের মনে রাখতে হবে, একথাটাও সঠিক যে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির মুখ্য টার্গেট – প্রধান উদ্দেশ্য পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে শেয়ার না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে এখন সুশীল হয়ে বলছে  নির্বাচনের সময় “মোদী একটু হিন্দুত্বের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু এখন সে এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল হয়ে যাবে” ভাবতে পারেন, একথা বলেছেনও। ইতোমধ্যে অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। যেমন কলকাতার টেলিগ্রাফ লিখছে Narendra Modi tried to shake off his divisive image and reach out to the minorities on Saturday। এছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি, একথাও ঠিক। কিন্তু একটা জিনিষ এখনই সবাই নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারে। তা হল – হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদীর পক্ষে আর সামনে আগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজনীতিতে – এটা আর সম্ভব নয়।

অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির “আগানোর” প্রধান কর্মসুচী হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মত “নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি” করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এনিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কিন্তু তাতে কী হতে পারে?

কলকাতায় যদি আসামের মত এনআরসি-ততপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোন হিন্দু নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে মোদী সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দিবার ব্যবস্থা নিবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহালে শেষ করা হবে। মুসলমানদের বেলায় কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয় অন্তত ক্যাম্পে নিয়ে ফেলে রাখবে। কপাল ভাল থাকলে তাকে আগের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন কোন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে! এতদিন এককথায় গরীবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল সেসব ছিনে এখন  সকলের জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করবে।

ওদিকে লক্ষ্যণীয় আর এক বিষয় হল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের বাংলায় নতুন করে এনআরসি-ততপরতা বা বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে ডেকে আনার রাজনীতিটা ঠিক পছন্দ করছে, তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হতে পারে এটা কাজ বেড়ে যাবে অনেক, অথবা অজানা বহু অভিমুখ গতিমুখ তৈরি হয়ে যাবে তা কোথায় গিয়ে না ঠেকে সে আশঙ্কায়, হতে পারে। অথবা হতে পারে ভান করা। যাতে এর প্রতিক্রিয়া কোথায় কোন পর্যায়ে হচ্ছে আগামিও হতে পারে তা জেনেবুঝে নেওয়ার সুযোগ নেয়ার কারণ। সারকথা তারা স্বস্তিদায়ক ঘটনা হিসাবে দেখছে না।

(ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫ টা। এখানে মোদীর টার্গেট হবে [উত্তর প্রদেশের মত এটা আশিটা না হলেও] এই ৬৫ আসন এটার গুরুত্ব কম হবে না – এগুলো বিজেপির পক্ষে হাসিল করা। এক এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসন গুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদীর আশু লক্ষ্য।

মতুয়াঃ
বাংলাদেশে ট্রাইবাল বলতে পাহাড়ি বা সাঁওতালদের মত বিক্ষিপ্ত নানান পকেট আছে এগুলাই। এছাড়া সমতলিদের মধ্যে কোন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠি  এখনও টিকে বা বজায় থাকার কথা এখন আর জানা যায় না। বুঝা যায় তারা বিভিন্ন মানুষ মিলেমিশে এখন একই সমা্জে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা গড়ে পুরান ট্রাইবাল পরিচয়্টা ঘুটা দিয়ে গুলিয়ে দিয়েছে। তবু আমাদের গোপালগঞ্জের জেলার “মতুয়া” বলে এক হিন্দু জনগোষ্ঠির কথা জানা যায়। বাংলাপিডিয়া “মতুয়া”দের কথা বলছে। বলেছে, “গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারা” বলে এদের চিনিয়েছে। বলেছে ,“গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত”। এই জনগোষ্ঠিরই প্রধান বা বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বণগাঁও মহুকমাতে সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে।

গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠি বর্তমানে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘদিনের এমপি ছিল মমতা ঠাকুর। সে তৃণমুল দলের এমপি ছিল, কিন্তু সে এবার হেরে গেছে। আর সে জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন [তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাল মতুয়া, বনগাঁয় জয়ী শান্তনু]। এই দুই প্রার্থীই যদিও মুল গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। কিন্তু কেন মুখ ফেরাল? আনন্দবাজার লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে এখানে সভা করে গেছেন। “মোদীজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে”। আর সেই থেকে এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাতাল শুরু হয়েছে। পুরা ব্যাপারটাই ইঙ্গিত দেয় যে মোদী এনআরসি আন্দোলন নিয়ে কিভাবে আগাতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও একারণেই এবার দুহাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মতুয়াদের নড়াচড়াটা হিন্দুদের অবস্থা বুঝার জন্য প্রতীকী।

আসামের এনআরসি ততপরতা শুরু করার সময় মোদী সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা “ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” হয়ে থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষ্য দিয়ে সেকথার অনুরণন করে বিবিসিকে বলছেন, “নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন মি: মোমেন”। কিন্তু তাঁর পরচুলার মতই একথাও আসলে নকল, কোন ভরসা নাই। অন্তত নির্বাচন পরবর্তি নড়াচড়াগুলা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর হল তার কথায়, “বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোন কারণ নেই” । আচ্ছা মোদীর মুখপাত্র হয়ে তাঁর এই সাফাই দেয়াটা কেন প্রয়োজনীয়? কিছু না বলে “দেখছি” বলে থাকা যেত না?  সত্যি অদ্ভুত!

কিন্তু আর একটা দিক যখন আগে ভারত “আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” বলেছিল তখন “বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে” এমন কোন আইন বা ইস্যু ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা এই আইন এখন আছে। যা এখন নড়াচড়া করে উঠবে, সচল হবে অনুমান করা যায়। এটা নিয়ে বাংলাদেশেও একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। তবে দুই তরফে। এক, একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ততপরতা শুরু হলে সেখানে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার এই ততপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোন খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হলে এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, তা বলাই বাহুল্য। তারা খুবই ক্ষুব্ধ হবে অনুমান করতে পারি। তাই পুরা বিষয়টা নিয়ে মোদী সরকার ঠিক কী কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে এর একটা এসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কোথায় এবং কী কী তা নিয়ে কথা বলা, সম্ভাব্য স্বার্থবিঘ্ন কী হতে পারে তা নিয়ে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও ততপর হওয়া জরুরি। আমাদের সকলেরই সুস্থ শরীর ব্যস্ত হয়ে উঠার, অস্থির হয়ে উঠার দিন কী সামনে! সত্যি কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য কে জানে! আমরা সবাই কী বলি হয়ে যাব এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৫ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি! এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

গৌতম দাস

২০ মে ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ap

 

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচন প্রায় শেষ। এটা ভারতের ১৭তম লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন।  নির্বাচনের ছয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছিল আগেই। আজ ১৯ মে রোববার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এরপর ২৩ মে সকাল থেকে একযোগে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। ঐদিনই দুপুর ১২টা নাগাদ কোন প্রার্থী কে কোথায় এগিয়ে থাকছেন তা আঁচ পাওয়া শুরু হয়ে যাবে। কোন দল সরকার গড়তে যাচ্ছে এর অভিমুখ আন্দাজ করাও ঐদিনই সন্ধ্যার পর থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কে কোন আসনে জিততে যাচ্ছে; কোন দলের প্রাপ্ত মোট আসন সংখ্যা কেমন হবে ইত্যাদিও। আর প্রাপ্ত সে ফলাফলের ভিত্তিতে পরেরদিন ২৪ মে থেকে প্রত্যেক দলের জোট গড়ার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যাবে। ফলাফল কী হতে পারে এপ্রসঙ্গে প্রায় সবারই অনুমান ভারতে একটা কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

আসলে ভারতে কোয়ালিশন সরকার এবারই নতুন না। বরং গত ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সব সরকারই ছিল আসলে কোয়ালিশন সরকার। এমনকি মোদীর চলতি সরকারে বিজেপির মারজিনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এটাও ছিল এক কোয়ালিশন সরকার। তবে এ পর্যন্ত এসব কোয়ালিশন সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল হয় কংগ্রেস না হয় বিজেপির নেতৃত্বে। সেকালে এ’দুই পার্টির কোন একটা কোয়ালিশনের নেতা না থাকলে সরকার টিকে নাই। যেমন, ১৯৯৬ সালে দেবগৌড়া-জ্যোতি বসুর কোয়ালিশন ছিল এমন এক ব্যতিক্রম যা ১৮ মাসের বেশি টিকে নাই। তবে এবারই কংগ্রেস অথবা বিজেপিকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও এরকম আরও কয়েকজন যেমন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা মায়াবতী বা অন্ধ্রপ্রদেশের সিটিং মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুও আছেন যারা এমন সরকারের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। আর মমতাই এমন ভিন্ন ধরণের কোয়ালিশন সরকারের বিশেষত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে একে আলাদা নাম, ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর সরকার বলে ডাকছেন।

দুনিয়াতে  রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিপরীত ধারণা হিসেবে ইতিহাসের একপর্যায়ে উঠে আসে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা। যার মূল বৈশিষ্টগত ফারাক ও নতুনদিকটা হল,  রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার বলতে এটা পাবলিকের গণসম্মতির রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রে এর ক্ষমতার উতস – নাগরিক লোকক্ষমতা।  এছাড়াও এমন রাষ্ট্রের আবার আরও একটা রূপ আছে। বিশেষত কাঠামোর দিক থেকে বিচারে দুনিয়ায় সেই রাষ্ট্র-রূপটার নাম – ফেডারেল রিপাবলিক রাষ্ট্র। একে ফেডারেল বলার কারণ হল, এখানে রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রদেশ নিয়ে গঠিত বা বলা যায় রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রাদেশিক ইউনিট বা রাজ্যে বিভক্ত থাকে। তবে ফেডারল রাষ্ট্রের  বৈশিষ্টের মূল জায়গাটা হল, এখানে রাষ্ট্রের  কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও সম্পদ ইত্যাদি কী ভিত্তিতে রাজ্যগুলোও এসব উতস ব্যবহারের সমান সুযোগ [access] পাবে তা আগেই বিস্তারিত এর লিখিত নিয়ম বলা থাকে, একটা ন্যায্যতার ভিত্তিও যেন সেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাজ্য বা রাজ্য-সরকারকে দেয়া বরাদ্দ যেন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানের পছন্দের বা অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে, এভাবে এখানে রাজস্বসহ সব বরাদ্দ হতে হয়। রাজস্ব, সম্পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদিতে কোনো কোনো রাজ্য যেন কোন বৈষম্যের শিকার না হয়- এমন কাঠামোগত প্রটেকশন ব্যবস্থা থাকাই ফেডারেল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। ভারত আমেরিকার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় দলগুলোর সমন্বয়ে একটা কেন্দ্রীয় সরকার গড়া অর্থে মমতা এটাকে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ [Fedaral Front]- এর সরকার বলছেন।

গত ১৭ মে ছিল শেষপর্বের এবং পুরা নির্বাচনের প্রচারণার সর্বশেষ দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী ততপরতা ও কার্যক্রমের সমাপ্তি হিসেবে দলের প্রধান অমিত শাহকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। অমিত শাহ মুখস্থ কথার মত সেখানে বিজেপির জোট তিন শতাধিক আসন পাবে বলে দাবি করে আসছিলেন। মজার কথা হল, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক পাশে বসা মোদীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বলছিল না। ঐ সাংবাদিক সম্মেলনের পুরা সভা পরিচালনা ও শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সবই অমিত একাই করছিলেন, মাঝে মোদী কেবল একবার তার প্রশাসনের পাঁচ বছর সমাপ্ত হল বলে নিজের কিছু অনুভূতি প্রকাশ ও শেয়ার করেছিলেন। তবে কোনো কারণে তিনি এদিন সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি, সব অমিত একাই সামলেছেন। দ্যা হিন্দু পত্রিকা বলছে, এটা গত পাঁচ বছরের শেষে এক বড় ব্যতিক্রম [At his first press conference in 5 years, Modi says Amit Shah will take questions]। তবে মোদীর বক্তব্যের শরীরী-ভাষ্য ছিল ভিন্নররকম। যেন তিনি বলতে চাইছিলেন, গত পাঁচ বছরের শাসন আর এই নির্বাচনী প্রচারণা মিলিয়ে যা কিছু পেরেছি সব করলাম। যেন তিনি এখন ভগবান ভরসায় আছেন যদি তিনি আবার তাঁকে ক্ষমতায় আনেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় তিনি আবার ফিরে আসছেনই এমন কনফিডেন্স, গত ২০১৪ সালের মত, মোদির নিজের ওপর আস্থা বা মোদি-জ্বর ইত্যাদি কোনটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিবিসি (১৮ মে দিবাগত) রাত দশটায় এক খবর ছেপেছে যেখানে বলা হয়েছে মোদী উত্তরপ্রদেশেরও আরও উত্তরে প্রাচীন কেদারনাথ মন্দিরে ধ্যানে বসেছেন। বিবিসি শিরোনামে বলেছে এটা মোদীর “স্পিরিচুয়াল ব্রেক” [spiritual break]। ঘটনা হল তিনি নিজেই বা তাঁর দল টুইটারে ছবিসহ এই খবর দিয়েছে। একই ছবি দিয়ে তবে বিবিসির একটু আগে মধ্যপ্রাচ্যের এক ইংরাজি দৈনিক গালফ টুডে রিপোর্ট করেছে যে এই  ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। টুইটারেও অনেকে  মন্তব্য লিখেছে। একজন বলছে তিনি গতদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের সময় থেকেই তিনি ধ্যানে [@Bhai_saheb: Yesterday modiji was meditating in press conference and today at kedarnath]। সে যাই হোক মোদীর “মন অশান্ত” এটা স্বপ্রকাশিতভাবে বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ আগেরদিনের সাংবাদিক সভায় মোদীর শরীরী ভাষায় যে তিনি নিজেকে “হবু বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী” হিসাবে কনফিডেন্ট মনে করতে পারছিলেন মনের সেই অস্থিরতার কথাই আজকের টুইটারের ম্যাসেজ থেকেও প্রতিষ্ঠিত হল। এমনিতেই মোদী চরম মিথ্যাবাদী বলে মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করেছিল দুদিন আগে যে – ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট তিনি অনেক আগেই ব্যবহার জানতেন বলে এমন আগের সময়ে তিনি দাবি করেছেন সেটা ভারতে বাণিজ্যিকভাবে  ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট চালু হবার বছর পাঁচেক আগের ঘটনা হয়ে যায়।

   ______________________

সর্বশেষঃ  আজ ১৯ মে সন্ধ্যা থেকে এই প্রথম এক্সিট পোলের মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য আসতে শুরু করেছিল। এক্সিট পোল মানে ভোটের বুথ ফেরত কিছু সংখ্যক লোকের সাথে কথা বলা – এমন নমুনার ভিত্তিতে সংগৃহিত তথ্যের বিশ্লেষণ মন্তব্য। এমন আটটা  কোম্পানি থেকে প্রকাশিত আট এক্সিট পোলের ফলাফল  মানে অনুমান-মন্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ছয়টাই বলেছে মোদীর জোট  আবার ক্ষমতায় ফিরবে। মানে ২৭২ এর বেশি আসন পাবেন। কেবল দুটা এক্সিট পোলের ফলাফল-অনুমান-মন্তব্যে একটা বলছে ২৪২, অন্যটা বলছে ২৬৭ আসন পাবে। বলাই বাহুল্য এগুলো খাটি অনুমান মাত্র, সত্যি ফলাফল নয়। আর ভারতের নির্বাচনে এর আগে এক্সিট পোলের অনুমানের পুরা উলটা ফলাফল বাস্তবে হয়েছে এমন রেকর্ডও আছে। তাই  আসল ফলাফল পেতে ২৩ মে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আমরা সতর্কতা হিসাবে ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি
(প্রাক্তন বিজেপি নেতা) ভেঙ্কায় নাইডু বলছেন, “Exit polls do not mean exact polls...Since 1999, most of the exit polls have gone wrong”- উনার এই কথাটা মনে রাখতে পারি।______________________

ওদিকে  কেবল নন-কনফিডেন্ট মোদী কেবল চেহারাতেই নয়, মোদী সম্ভবত যে ফিরে ক্ষমতায় আসতে পারছেন না সে ব্যাপারটা চার দিকে সেভাবেই খবর ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অন্তত নির্বাচন শুরুর পর থেকে। প্রায় পাঁচ জোড়া নির্বাচনী-বিশ্লেষক গ্রুপ কেউই নির্বাচন শুরুর (১১ এপ্রিলের) পর থেকে আর ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে, মোদী আবার ক্ষমতায় আসছেন। শুধু তাই না, এবার মিডিয়াগুলোও তাদের মূল্যায়নে বলা শুরু করেছে, মোদির বিজেপি ও তাঁর জোট এনডিএ-কে সাথে নিলেও সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসন ) বিজেপি পাচ্ছে না। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোকে ভাগিয়ে নিজ নিজ জোটে ঢুকিয়ে নিতে ফলাফল ঘোষণা হবার পরে হর্সেস ট্রেডিং বা  এমপি কেনা-বেচার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠল। আর কংগ্রেসের বেলায় বলা হচ্ছে, ফলাফলে যদি তার মোট প্রাপ্ত আসন এক শ’র নিচে হয়, তবে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি ছেড়ে দেবেন আগেই; আর সেই সাথে জোটের অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবেন [কুর্সিতে অনড় নয় কংগ্রেস,বার্তা আঞ্চলিক দলগুলিকে]। আর যদি দেড় শ’র বেশি আসন পান, সে ক্ষেত্রেই কেবল জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল দরকষাকষিতে নামবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস যদি এক শ’র নিচে আসন পায় তবে আর কংগ্রেসের পক্ষের জোট ইউপিএ-এর পক্ষের কাউকে ভাগিয়ে মোদী তার এনডিএ জোটকে মোট ২৭২ এর উপরে নিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরাই ফেডারেল ফ্রন্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন করার সম্ভাবনা হাজির হয়ে যাবে।

নির্বাচন কেমন হলো?
এবারের নির্বাচন কেমন হলো? এক কথায় জবাব, খুবই খারাপ। ভারত-রাষ্ট্র আরেকবার আরেক ধাপ দুর্বল হয়ে গেল। এটা বলাই বাহুল্য যে কোন নির্বাচন কমিশন যখন নিরপেক্ষতা সততা স্বচ্ছতায় একটা সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাতে সবচেয়ে সবল হয়ে উঠে খোদ রাষ্ট্রটাই। ওর প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যত দৃঢ় হয়।  কিন্তু এবারের ভারতের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই এসব ক্ষেত্রেই অসফল; ফলে এই কমিশনই  ভারত-রাষ্ট্রকে পরাজিত করে দিল। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেল।

কিন্তু “আরেকবার” কেন? আর দুর্বল হওয়া মানেইবা কী?
সাধারণভাবে বললে, ভারত-রাষ্ট্র মূলত চালায়, চালিয়ে আসছে এর ব্যুরোক্র্যাটেরা। সেটাই হবার কথা এবং একমাত্র বিকল্প। কারণ ১৪০ কোটির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এক রাষ্ট্র, একে দক্ষ ব্যুরোক্র্যাটরাই একমাত্র চালাতে পারবে – এটাই স্বাভাবিক। অনেকে ভাবতে পারেন যে, কেন এভাবে বলা হচ্ছে যেখানে বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা তো সমাজে নেতিবাচক ধারণার বলে মনে করা হয়। হা তা থাকলেও মনে রাখতে হবে  বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা আসলে ইতিবাচক পজিটিভ এবং প্রয়োজনীয় শব্দ। প্রথমে এর সেই ইতিবাচক অর্থ বুঝতে হবে বুর‍্যোক্রাসির আসল মানে কী? আমাদের পরিবারগুলোর প্রধান ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা আমাদের মায়েরা। মা সন্তান, স্বামীসহ সব মেম্বারদের নিয়ে সবাইকে ভাত বেরে খাওয়ায় এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু ধরা যাক পরিবার বড় হয়ে যাবার কোন কারণে মা সন্তানদের মাথার কাছে নিয়ে হাত বুলিয়ে ভাল বেড়ে আর ভাত খাওয়াতে পারছেন না। তাই ম্যানেজ করার সুবিধার্থে মা নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছেন। এতে খাবার সবার পাতে পাতে আর তুলে না দিয়ে বাটিতে বাটিতে তরকারি বেড়ে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যেখানে কোনটা কার বাটি তা বুঝতে বাটির নিচে চিরকুটে নাম লিখে রাখা হয়ছে। এতে মার পক্ষে বড় সংসারটা ম্যানেজ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে, স্বাশ ফেলার সময় পাচ্ছেন। আর এখানেও মায়ের স্নেহ-মমতা প্রকাশ আছে অবশ্যই, তা টের পাওয়া যায় কিন্তু একটু পরোক্ষে। এটাই বুর‍্যোক্রেসি, এক বুর‍্যোক্রেটিক ম্যানেজমেন্ট।  বড় হয়ে যাওয়া যে কোন কাজ একমাত্র এভাবেই ম্যানেজ করা সম্ভব। এক লিখিত নির্দেশিকা বইয়ের মাধ্যমে বড় কাজ পরিচালনা।
এখন মা যাকে ম্যানেজার বা কেয়ারটেকার রেখে এই নতুন ব্যবস্থাপনা চালু রেখেছেন সেই ম্যানেজার এবার নিজের অসৎ কোন স্বার্থে মায়ের নির্দেশের উলটা মানে করল বা প্রয়োগ করল, আর মাও আবার তদারকি মনিটরিং করা ঢিলা দিল বা ভুলে গেল। অথবা মায়ের এক দুষ্ট সন্তান যে জানে, ডাক্তারের নির্দেশে তার এক বোনের বিশেষ যত্ন নিতে সেই  ভাগের বাটিতে বেশি মাংস থাকছে আজকাল  তাই  সেই দুষ্টু সন্তান এবার ম্যানেজারের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বাটি অদলবদল করে নিয়েছে ইত্যাদি  – এই যে পরিস্থিতি এখানে এসে এবার বুর‍্যোক্রাসির অর্থ হয়ে দাড়াবে নেগেটিভ। বুর‍্যোক্রাসির মানে হয়ে যাবে এবার অবহেলা, হ্যারাসমেন্ট দুর্নীতি ইত্যাদির এক ব্যবস্থা। তাহলে সারকথায় কোন কাজ ততপরতা যখ্ন বড় হয়ে যায় তা ম্যানেজ করতে বুর‍্যোক্রাসির বিকল্প কোন উপায় নাই। তাই আবার তদারকি মনিটারিং এর ভাল ব্যবস্থাপনা দিয়েই একে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বুর‍্যোক্রাসির অর্থ ইতিবাচক করাই একমাত্র পথ।

কাজেই যেখান থেকে কথা উঠেছিল,.১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতকে পরিচালনা করতে পারে কেবলমাত্র এক দক্ষ ও করিৎকর্মা এক বুর‍্যোক্রাসিই।  তবে এদের উপরে বসে রাজনৈতিক নির্দেশ দিতে, ভালো রাজনীতি ও রাজনীতিবিদও অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র চালানো শুধু ব্যুরোক্র্যাটদের কাজ নয়। এ ছাড়া শক্ত এক বিচার বিভাগও আরেকটা খুবই প্রয়োজনীয় অঙ্গ। ওদিকে নির্বাচন কমিশনও আছে – এরাও মূলত ব্যুরোক্র্যাটেরই অংশ। তাই তাদেরও শক্ত ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বলা হয়ে থাকে, সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (১৯৯০-৯৬) টিএন সেশন – তিনি তার আমলে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ও কঠোর সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে, আর সেটাই নির্বাচন কমিশনের আজকের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রধান উৎস। কিন্তু তবু এবারের নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশন ‘পরাজিত’।  অনুমান করা হচ্ছে রাজনীতিবিদের কারণে প্রভাবিত হয়ে দ্বিতীয়বার ভারত-রাষ্ট্রের পরাজয় ও দুর্বল হওয়ার ঘটনা ঘটল। চলতি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনাস্থা জমেছে পাহাড় প্রমাণ।

এবারের নির্বাচন ছিল পরিচালনের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এক নির্বাচন। যার মূল কারণ হল, মোদীর অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। আর তা থেকে পালাতে আড়ালে যেতে তিনি নির্বাচনকে সাজিয়েছেন “হিন্দুত্বকে” মুখ্য বা কেন্দ্র করে। হিন্দুত্বই শ্রেষ্ট এবং সবকিছু – এই বক্তব্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান হিসাবে মোদী তাঁর সব সংজ্ঞায়িত বা অসংজ্ঞায়িত ক্ষমতাকে অপব্যাবহারে কাজে লাগাতে নেমে গেছেন যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ভোটের স্বার্থে মুচড়ে ব্যবহার করা যায়। এতে তাঁর সৃষ্ট এই অযাচিত চাপ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা দ্বিধাগ্রস্থতা থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই বিশেষত মোদীর বিরুদ্ধে একশন নেবার ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে গেছে।  দ্বিতীয় সদস্য তাঁকে কোনঠাসা ও উপেক্ষা করে রেখেছে প্রধানসহ অন্য জন – মিডিয়াতেই এই অভিযোগ এসে গেছে।
এককথায় বললে, রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান যখন আইন মানতে চান না বা তাঁর বিরুদ্ধে যখন আইন প্রয়োগ করা যায় না বা প্রয়োগ কর্তা ভীত হয়ে এড়িয়ে চলতে চায় – এটা হল সেই অবস্থা। মূলত এটা রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া, অকেজো নন-ফাইশনাল হয়ে পড়ার পুর্বলক্ষণ। এমন অসহায় অবস্থার প্রকৃত  মানে বা ইঙ্গিতটা হল, রাষ্ট্রকে আবার ঢেলে সাজানো, নতুন করে প্রজাতন্ত্র গড়বার মুরোদ দেখানোর জন্য রাষ্ট্র আহবান জানাচ্ছে।

এমনই, প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি আসন থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘কারচুপি করে’ জিতেছিলেন – এই অভিযোগে ১৯৭১ সালেই মামলা হয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টে। এরই রায় এসেছিল ১২ জুন ১৯৭৫ সালে। সেবার আদালত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে সশরীরে এসে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিলেন, এমনকি আদালত পুলিশের নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর আদালতে প্রবেশ অনুমোদন করে নাই। বরং আইন সংশ্লিষ্ট সব পেশার লোক যারা আদালতে আসেন তাদের নিয়ে গড়া এক হিউম্যান চেইন – এর ভিতরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে রেখে আদালতের এমন নিজস্ব নিরাপত্তায় ইন্দিরা গান্ধী এজলাসে উঠে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু  রায় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে যায়, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাতে ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আপিল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত করেছিল আর কয়েকমাস পরে, ৭ নভেম্বর বিস্তারিত শুনানিতে সব শাস্তি রদ করে দেন। কিন্তু এর অনেক আগেই ঘটনা অন্য দিকে গড়ায় ও গতিমুখ বদলে যায় ।

হাইকোর্ট তার মূল রায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনে জিতবার দায়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওই কারচুপির নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে দেন। এছাড়া ইন্দিরার প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এর আগেই অন্য কাউকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়ার সংসদীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী ২০ দিন সময় দিয়ে ঐ নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু এখানেই নির্বাহীপ্রধান ইন্দিরা আইনের উর্ধে উঠে যেতে চাইলেন।

ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে যেন ক্ষমতা ছাড়তে বা সাজা খাটতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে পরবর্তি ২০ দিন শেষ হওয়ার আগেই ২৫ জুন ১৯৭৫ সারা দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে বসেন। এতে তিনি নাগরিক মৌলিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার, মিডিয়ায় সেন্সরশিপ আরোপ ইত্যাদি প্রায় সবকিছু করার সুযোগ নেন, সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। কনস্টিটিউশনাল জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে তিনি পাল্টা দাবি করেছিলেন যে, ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং তা ঠেকাতে’ এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। এভাবে স্রেফ নিজেকে বাঁচাতে তিনি রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশনকে অকার্যকর ও দুর্বল করে ফেলেন, খরচের খাতায় ঠেলে  দেন।
প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতাকে বা ক্ষমতাকেন্দ্র একক রাখতে হয় বিভাজ্য করা যায় না। একে বিভক্ত বা কোনো শরিকানা করার ভুল করা যায় না। একথা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে এই ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্যও কিছু পদক্ষেপ থাকতে হয়। যেমন কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও নির্বাহী প্রধানের বৃহত্তর অধীনেই রেখে; তবে ব্যক্তি না বরং নন-পারসনাল, অবজেকটিভভাবে ওর ক্ষমতা স্ট্যাটুটরি বিধানে বর্ণিত করে রেখে দেয়া হয়। যেমন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিষ্ঠান, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কম্প্রোটোলার জেনারেল নিয়োগ ইত্যাদির বেলায়। অথবা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে (তুলনামূলক অর্থে) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে স্বাধীন করে রেখে দেয়া খুবই দরকার হয়; যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া বা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় এবং যাবেই। কারণ শত আইন করে, লিখে রেখে এমন বিপর্যয়গুলোকে বন্ধ করা যাবে না। কারণ নির্বাহীপ্রধানই যদি আইনের উর্ধে উঠে যেতে চান তখন কী হবে! এর জবাবে বলা হয়, যাদের দিয়ে ক্ষমতার এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হবে, ক্ষমতার চর্চা হবে তারা নিজেরা প্রজ্ঞাবান হবেন – এটাই এর একমাত্র প্রতিকার। বিশেষ করে নির্বাহী প্রধানের হাতে এবং যার যার এখতিয়ার পেরিয়ে অন্যের সীমানায় ঢুকে পড়া, কোনো সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। আর সর্বোপরি, কেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে এমন করে রাখা হয়েছে, এর সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

কিন্তু না হলে?  অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন (যেটা সাধারণত নির্বাহী প্রধানের হাতে ঘটে থাকে, সেই ইংল্যান্ডের রাজার আমল থেকেই) ঘটলে তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা ও ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার কারণে রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়বে। তাই ঘটেছিল।

ভারতের জরুরি আইন জারির প্রায় দুবছর পরে ইন্দিরা গান্ধী (২১ মাসের) জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে, ১৯৭৭ সালে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিলেন এবং গোহারা হেরেছিলেন। তিনি নিজে এবং বড় সন্তান সঞ্জয় গান্ধী এতে পরাজিত হন অর্থাৎ পরোক্ষে শাস্তি পেয়েছিলেন বলা হয়। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতার দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এরই একটা দাগ হল এবারের নির্বাচনে এই দুরবস্থা।

কারণ ইন্দিরার ঐ ঘটনা এরপর থেকে ভারতের বিচার বিভাগ বা প্রশাসনে জড়িয়ে থাকা পেশাদার ব্যক্তিরা একটা শিক্ষা নিয়ে থাকবেন সম্ভবত – সেটা হলঃ  তারা কোনো দুর্দমনীয় নির্বাহী প্রধান মানে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে যাবেন না। বরং পরোক্ষে (কমন বন্ধুকে পাঠিয়ে) তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকবেন; আর বাস্তবে মুখোমুখি কোনো সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টা করবেন। খুব সম্ভবত ইন্দিরার ঐ ঘটনা সম্পর্কে তাদের মুল্যায়ন হল আদালতের ঐ একশন শেষ বিচারে কাউন্টার প্রডাকটিভ। তাই মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে মুখ বাঁচাতে হবে, সেটাই বেটার।  যেমন ওই মামলাতেই লক্ষণীয় হল, সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই সাজার রায় উল্টে দিয়েছিলেন। যদিও জরুরি আইন জারি থাকায় সে আমলে এটা করা তত জরুরি ছিল না। কিন্তু আসলেই কী এটা “বেটার”!

নরেন্দ্র মোদীর এই পাঁচ বছরে নির্বাহী ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অনেকবার তিনি ঘটিয়েছেন।  রিজার্ভ ব্যাংকের গর্ভনরের উপর চাপ সৃষ্টি অথবা নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা সিবিআই এর প্রধানকে অপসারণ করা নিয়ে বেপরোয়া হয়ে অনেক জল ঘোলা করেছেন। সেসব রেখে কেবল এবারের নির্বাচনের কথায় আসি। অন্যান্য বারের মত এবারের নির্বাচনের আগেও ভারতের নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ এক আচরণবিধি জারি করেছিল। সেখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে কোনো নির্বাচনী বক্তব্য দেয়া যাবে না, কাশ্মিরে পুলওয়ামায় প্যারামিলিটারি গাড়িবহরে হামলা বা এরপরে পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত ভারতের বিমান হামলা – এগুলোকে নির্বাচনী বক্তব্য বা পোস্টারে আনা যাবে না। বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু মোদী নিজেই  এসবগুলো আচরণবিধির সবই ভঙ্গ করেছেন। যেমন তিনি “তাঁর সেনাবাহিনীর” সাফল্য, যারা বালাকোটে সন্ত্রাসীদের বোমা মেরে ধ্বংস করে এসেছে “তাদের সম্মানে দেশপ্রেমে” এবারই প্রথম ভোটার’ যারা সে তরুণেরা যেন মোদীকে ভোট দেয়- এরকম প্রচারণার সব অভিযোগ মোদীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল।

কমপক্ষে পাঁচটা এমন সিরিয়াস আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এসেছিল মোদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক গড়িমসির পরে সব অভিযোগ থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীকে খালাস দিয়ে দেয় [EC’s clean chit to PM came amid dissent]। এটা দ্যা হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ঐ খালাস দেয়াটাই শেষ কথা নয়। কোনায় একতা শব্দ আছে “amid dissent”। যার মানে হল, Ashok Lavasa নামে এক নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে।

এছাড়া প্রথম দু-তিনটা অভিযোগ বা মামলার ক্ষেত্রে সে অভিযোগ প্রায় মাসখানেক ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রায় কাছাকাছি অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ৪৮ ঘণ্টা, আর এক বিরোধী নেতা মায়াবতীকে ৩৬ ঘন্টা নির্বাচনি প্রচার ততপরতা চালানো থেকে বিরত থাকার শাস্তি দেয়া হয়েছিল। যোগী আদিত্যনাথও ঐ একই “মোদি কা আর্মি” বলে সম্বোধন করে মোদীর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। এছাড়া আবার অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ যেখানে রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন কমিশন শাস্তি দিয়েছিল, সেখানে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে কমিশনের কেন্দ্র দিল্লির অফিসে।

ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল তাদের পদক্ষেপ-হীন অভিযোগ ফেলে রাখার  নানান উদাহরণ দিয়ে। কিন্তু তবু আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক রায় শুনাতে যায় নাই। এর স্বপক্ষে অবশ্য আদালতের শক্ত যুক্তি আছে যা ভ্যালিড। তাই আদালত রায়ে বলেছে,  ‘কমিশন স্বাধীনভাবে এসব ব্যাপার নিজেই বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি দিতে পারে’  – এভাবে বলে এক উৎসাহিত করার রায় দিয়েছে। এর পেছনের সুপ্রিম কোর্টের শক্ত অবস্থান আছে বলে  আমরা নিজেরাই অনুমান করতে পারি। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের মতোই নির্বাচন কমিশনের নিজেরও বিচারিক ক্ষমতা আছে। ফলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হল, আগেই নিজে হস্তক্ষেপ না করা, বরং কমিশনের নিজের বিচারিক ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালনের জন্য যে ক্ষমতা আছে, তা ব্যবহার প্রয়োগ করতে পর্যাপ্ত সময় সুযোগ করে দেয়া, যাতে কমিশন তা ব্যবহার করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট আগেই হস্তক্ষেপ করতে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠত। ফলে এটা এড়ানো সুপ্রীম কোর্টের সঠিক পদক্ষেপ।

কিন্তু আমরা দেখছি, নির্বাচন কমিশন মোদীর নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাত করতে চায় নাই, এড়িয়ে যাবার পথ ধরেছে গেছে। এটা এখন দগদগেভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা মিডিয়াও প্রসঙ্গটা তুলেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে  যথেষ্ট সক্ষম ও দক্ষ এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। যদিও বাংলাদেশের গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি দল হয়ে এসে কী ভূমিকা নিয়েছিল আমরা জানতেই পারি নাই। বলাই বাহুল্য তাদের সফর কূটনীতির বুদ্ধিতেই পরিচালিত হয়েছিল, কমিশন পর্যায়ের বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ হয়নি।

সাম্প্রতিককালে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অপব্যবহার করে কিছু স্টাটুটারি প্রতিষ্ঠান যেমন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা তদন্ত প্রতিষ্ঠান সিবিআইর প্রধানসহ অনেকের সাথে, তাদের তুলনামূলক স্বাধীন থাকার ক্ষমতা ক্ষুন্ন করতে গিয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছিলেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হয়তো বিজেপি দলের; কিন্তু স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও ক্ষতযুক্ত করে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী দাগ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় এর ‘কাফফারা’ দিতে হতে পারে।

খুব সম্ভবত মোদীর আগের এসব তৎপরতা দেখেই এর প্রতিক্রিয়ায় এবার নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে। কিন্তু তাতে কী? ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল করে ফেলার দুর্ঘটনা কী এড়াতে পেরেছে – সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে! এটা ভারত-রাষ্ট্রকে অনবরত তাড়া করতেই থাকবে; সম্ভবত কখন কোন কাফফারা আদায় করে নিবে, কে জানে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৮ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)মোদির শরীরী ভাষা তা নয় এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

গৌতম দাস

১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2Ae

 

চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

“কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে” এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মাহাথির কায়দায় ‘ঋণফাঁদে’র গল্প মোকাবেলা

মাহাথির কায়দায় ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলা

গৌতম দাস

২৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2zH

 

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ, বাংলাদেশে তাকে চেনেন না এমন লোক খুব কমই আছে। অবশ্য নিজ স্বার্থে কেউ কেউ নিজের আকামের পক্ষের সাফাই হিসাবে তাঁর নাম মুখে নিয়ে থাকেন  ঢাল হিসেবে মাহাথিরকে ব্যবহার করে থাকে। মালয়েশিয়ার টানা পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী আর ১৯৮১-২০০৩ সাল, এই ২২ বছরের সক্রিয় রাজনীতিবিদ তিনি। প্রাকটিসিং সরকারি ডাক্তারির চাকরি রেখে ১৯৬৪ সাথে প্রথম পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল। তার শাসনকালের প্রধান সাফল্য মনে করা হয়, মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে তিনি বিপুল উঁচু স্তরে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ার শিল্পায়িত ভবিষ্যত তাঁর হাতেই আলো দেখেছিল। আবার তিনিই এমন রাজনীতিবিদ ষাটের দশকের শেষভাগে যেটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথমপর্যায় ছিল, তখন  তারই লেখা একটা বই – তারই দলের সরকার এর প্রকাশনা ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরিণতিতে যা তাঁকে রাজনীতি ও দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কারণ প্রকাশিত “মালয় ডিলেমা” নামে ঐ বইয়ে তিনি স্থানীয় মালয়বাসীর পক্ষে, তাদের জীবনে অসাম্য দূর করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। মালয়েশিয়া মূল চারটা নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠির [race or ethnic groups] দেশ মনে করা হয়। [এই কথাগুলো মালয়েশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান বিভাগের এই রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে।] সেখানে ২০১০ সালের জনসংখ্যা রিপোর্টের উপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলা হয়েছে। ঐ চার এথনিক গোষ্ঠি মধ্যে ভুমিপুত্র [Bumiputera (inclusive of Malay and Indigenous)]  মিলিয়ে এরা ৬০ ভাগ বলা হয়েছে [Bumiputera, the main ethnic constituted 60.3 per cent]। আর চীনা-অরিজিন মালয়েশিনেরা ২২.৯% [Chinese and Indians at 22.9 and 6.8 per cent] বলা হয়েছে।  ভুমিপুত্ররা সংখ্যায় বেশি কিন্তু চীনা-অরিজিন মালয়েশিয়ানদের চেয়ে বেশি গরীব বলে মাহাথির ঐ বইয়ে দাবি করেছিলেন ভুমিপুত্রদের সামাজিক-অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধায় কিছুদিন বেশি দেয়া হোক। (আমাদের পাহাড়ি কোটার মত যেটাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘এফারমেটিভ একশন'[affermative action] বলা হয়ে থাকে।) কিন্তু ততকালীন প্রধানমন্ত্রী আব্দুল রহমান [Prime Minister Abdul Rahman] এসব কথা তোলাতে এথনিক বিবাদ লড়াই না উস্কে উঠে এই ভয়ে তা চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এথেকেই সেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এগুলো সবই ১৯৭২ সালের আগের ঘটনা। তবে ১৯৭২ সালে ঐ প্রধানমন্ত্রীর টার্ম শেষ হয়ে তিনি অবসরে গেলে, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে, মাহাথির আবার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যান। এর পর থেকে তার রাজনৈতিক জীবনের কালো দিন কেটে যায়, তাকে আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি। ১৯৭৪ সালে তিনি মন্ত্রীসভায় স্থান পান, আর ১৯৮১ সালের পর থেকে টানা পাঁচ টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্বের দিন শুরু হয়ে যায়। তবে তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁর গৃহিত অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য দিয়েই তিনি বিভক্ত এথনিক জনগোষ্ঠিগত অসাম্য দূর করেছিলেন। [Mahathir sought to bridge Malaysia’s ethnic divisions by increasing general prosperity. ]

এ সময়কালে এক দিকে তার পরিচালিত সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য যেমন সত্য, তেমনি অন্য দিকে তিনিই ১৯৮৭ সালে ‘ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ [Internal Security Act] নামে কালো আইন পাস ও তা আরোপ করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। এভাবে ২০০৩ সালে তিনি তাঁর পাঁচ টার্ম প্রধানমন্ত্রীত্ব শেষ করে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের দিনে (২০১৮ সালের নির্বাচন থেকে) তিনি আবার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জোটসঙ্গী করে নির্বাচনে জিতে এখন ক্ষমতায়। যদিও সেকালে ঐ ১৯৮৭ সালের কালো আইন দিয়েই মাহাথির, আনোয়ার ইব্রাহিমসহ বহু বিরোধী নেতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টকে বন্দী করে রেখেছিলেন। এতে সেসময় মোট চারটি দৈনিক পত্রিকা বন্ধ এবং মোট প্রায় ১০৬ জন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাকে গ্রেফতার করেছিলেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ক্ষমতা খর্ব এবং কাউকে কাউকে পদত্যাগ করতে বাধ্যও তিনিই করেছিলেন। এভাবে বেপরোয়া মানবাধিকার কেড়ে নেয়াতে আমেরিকাসহ দেশী-বিদেশী অনেকের ভাষায় ও চোখে তিনি ‘স্বৈরশাসক ও নিপীড়ক’ হয়ে উঠেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই বৈপরীত্যের কারণে আমাদের কালের অনেক “স্বৈরশাসক” নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে মাহাথির মোহাম্মদের নামের আড়ালে নিজেদের অপকর্ম লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকেন।

২০০৩ সালে মাহাথির রাজনীতি থেকে অবসরে চলে গেলেও তিনি মালয়েশিয়ার নির্বাচনে (গত ২০১৮ সালের মে মাসে) কোয়ালিশন জোটে বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছেন এবং ৯৩ বছর বয়সে এখন আবার প্রধানমন্ত্রী। একালের মাহাথিরসহ তাঁর জোটসঙ্গীদের দাবি, এই জোট গড়ার মূল কারণ নাজিব রাজাকের অপশাসন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাকের আমলের কুশাসন ও ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতি থেকে মালয়েশিয়াকে বাঁচাতে জেলে বন্দী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথেই জোটবদ্ধ হয়ে মাহাথির আবার নির্বাচনে নামেন এবং বিজয়ী হয়ে জোটের বোঝাপড়া অনুসারে, এখন প্রথম দুই-তিন বছরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আছেন।

আমাদের আজকের আলোচনার বাকি অর্ধেক অংশের প্রসঙ্গ চীন। এটাকে বলা যেতে পারে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের চীন অথবা নতুন করে চলতি চীন-মালয়েশিয়া গভীর সম্পর্ক স্থাপন কেন সম্ভব হল, সেটাই প্রসঙ্গ।

আগের প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের শাসনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল, ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট। আর এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ঘটনা হল 1MDB প্রকল্প। 1MDB মানে ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলবমেন্ট লিমিটেড” (মালয় ভাষায় বেরহাড) নামে এক কোম্পানি। এটা মালয়েশিয়ান অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজ মালিকানাধীনে  “উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার চিন্তায়” নেয়া এক কোম্পানির নাম। আগ্রহিরা প্রভাবশালি মিডিয়া ব্লুমবার্গের এই রিপোর্ট-টা পড়ে নিতে পারেন।  কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা কখনো নিজ-সক্ষমতার [insolvent] কোম্পানি হয়ে উঠতে পারে নাই। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে অচচ্ছভাবে  লেনদেন, মানি লন্ডারিং, অর্থ নয়ছয় ও চুরির অভিযোগে নজরদারিতে পরে যায়। ব্লুমবার্গ এনিয়ে রিপোর্টের শিরোনাম থেকেই একে মহা অর্থ-কেলেঙ্কারি Scandal বলে চিহ্নিত করেছে।

বলা হয়েছিল, এটা আসলে মালয়েশিয়া সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন প্রকল্প, লক্ষ্য ফান্ড সংগ্রহ; কিন্তু বাস্তবে এটা আমেরিকা-সুইজারল্যান্ডসহ সাত দেশের বিভিন্ন বিনিয়োগ ফান্ড কোম্পানির সাথে মিলে দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ নিয়ে যাওয়াসহ বহু অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির এক প্রকল্প হিসেবে হাজির হয়। মোট প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার এখানে ‘নয়ছয়’ হয়েছে। এ ছাড়া, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের গত কয়েক বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ষ বিনিয়োগ কোম্পানি “গোল্ডম্যান স্যাস” [Goldman Sachs ] এতে জড়িত বলে আমেরিকার আইন বিভাগ সে অভিযোগ তদন্তে নেমেছে, মামলা করেছে। স্যাক্সের অন্তত তিনজন ব্যাঙ্কার এই মামলায় আসামি।  ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাক ও তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে এই প্রকল্প থেকে প্রায় বিলিয়ন ডলার অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কীভাবে এত অর্থ রাজাকের একাউন্টে এল, গত নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাজাক এর কোন সদুত্তর দিতে পারেন নাই। এভাবে এক মহা-কেলেঙ্কারির দুর্নীতি মামলায় রাজাক ও তার স্ত্রী এখন জেলে।

East Coast Rail Link (ECRL) from railprofessional.com

ওদিকে এই 1MDB প্রকল্প ছাড়াও আরও এর বাইরে চীনের সাথে নেয়া বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্পে মালয়েশিয়াকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে মাহাথির জোটের অভিযোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হল, চীনের সাথে নেয়া “ইস্ট কোস্ট রেল লিঙ্ক প্রকল্প” (East Coast Rail Link, ECRL)। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এটা এক বড় প্রকল্প এবং  নির্মিত হয়ে গেলে এটা চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত ও অংশ হয়ে যাবে। মালয়েশিয়ার পূর্ব-পশ্চিম দু’দিকেই সমুদ্রসীমানা। এই প্রকল্প পূর্বের কেলানতান বন্দর থেকে উপকূল বরাবর নেমে পশ্চিমে গিয়ে সেখানকার ক্লাঙ্গ বন্দরের সাথে যুক্ত হবে – এমন রেল যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রকল্প এটা। বলা হয়, নাজিব সরকার বিপুল ব্যয় করে এই প্রকল্প নিয়েছিল ‘ভালো কমিশন’ পাওয়ার স্বার্থে। তাই এত বড় বিনিয়োগের ভার তাদের অর্থনীতি বইতে পারবে কি না সে দিক উপেক্ষা করেছিল।

মাহাথির এবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ২০১৮ সালের মে মাসের নির্বাচনে। এর তিন মাসের মধ্যে আগষ্ট ২০১৮ তিনি চীন সফরে চলে যান যার মূল ইস্যু এই ECRL প্রকল্প। সেকালে এই প্রকল্প নিয়ে মাহাথিরের জনসমক্ষে বলা প্রধান যুক্তি ছিল, “আমার দেশ এত বড় বিনিয়োগের ভার সইতে পারবে না, অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে”।  তিনি চীনাদেরকে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পরে যেতে পারা – এই দুর্দশার দিকটা আমল করতে বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ভুল বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প – এমন বলছেন না। এদিকে চীনা ঠিকাদার কোম্পানির হাতে প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে, মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হয়েই চীনের সাথে কথা বলে প্রকল্পের কাজ স্থগিত করিয়ে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন।

একালে এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ব্যাপক হারে অবকাঠামো খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেখা যায়। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই আবার চীনা ‘বেল্ট-রোড’ মহাপ্রকল্পে যুক্ত হওয়ার কথা। তাই  চীন-ঠেকানোর বুদ্ধিতে স্বভাবতই এসব প্রকল্পের চরম বিরোধী অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্পের আমেরিকা। সাথে কিছু থিংক-ট্যাংক প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এমনই এক প্রপাগান্ডা শব্দ-চিহ্ন হল – “ঋণের ফাঁদ” [Debt Trap]।

এই প্রপাগান্ডার সারকথা বা দাবি হল, চীন বিভিন্ন দেশকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে নিজের কব্জায় নিয়ে ফেলছে। এমন অভিযোগ সত্তর দশকে এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রথম আগমনের সময় থেকে বিশ্বব্যাংকের, মানে আমেরিকার বিরুদ্ধেও ঊঠেছিল বা দেয়া হত। মজার বিষয় হল, আমেরিকা এখন সেই ভাষাতেই  চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা-অভিযোগ আনছে। এটা চীনবিরোধী মোক্ষম প্রপাগান্ডা বলে তা ভারতের (বিশেষ করে তার মিডিয়ার) কাছেও খুবই লোভনীয়। নিয়মিতভাবেই ভারতের মিডিয়া এই ফাঁদের প্রপাগান্ডায় মেতে আছে।  একারণে “ঋণের ফাঁদ” বিষয়ক ভারতীয় উৎসের যেকোন রিপোর্ট পাঠ বা রেফার করার সময় সতর্কতা থাকা জরুরি যাতে ভারতীয় মিডিয়া-প্রপাগান্ডার শিকার না হতে হয়। ভারতের কৌশলগত কূটনৈতিক অবস্থান হল চীন-ঠেকানোর এই প্রপাগান্ডায় অংশ নেয়া। কিন্তু ঘটনা হল, এমনকি জেনে অথবা না জেনে আমাদের প্রথম আলোতেও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

চীনা “ঋণের ফাঁদ” বা বেল্ট-রোড বিরোধী প্রপাগান্ডার এপর্যন্ত সবচেয়ে মোক্ষম রিপোর্ট হল, থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভলবমেন্টের রিপোর্ট। আবার এর যুক্তিগুলোকে কেটে পালটা বক্তব্যের অবস্থানও আছে এখানে এক ডাচ কনসালটেন্টের বক্তব্যে।

কিন্তু ভারতের চীনের বিরুদ্ধে আপত্তির বিপরীতে একটা মজার দিক আছে। সেটা হল, খোদ ভারতেও চীনা বিনিয়োগের অর্থে নেয়া এমন অবকাঠামো প্রকল্প কম নয়। এমনকি চীনা ‘ব্রিকস’ উদ্যোগে নেয়া ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (যা বিশ্বব্যাংকের মত প্রায় একই কাঠামোতে চলে) নামে একটা অবকাঠামো ব্যাংক আছে – যার বিনিয়োগ প্রকল্পের একমাত্র খাতক হল ভারত; কিন্তু এসব চীনা প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের জন্য তা ‘ঋণের ফাঁদ’ এমন কোনো অভিযোগ নেই ভারতের। এর মানে, অন্তত বোঝা গেল যে, চীনা ‘ঋণফাঁদের’ খারাপ স্বভাব চরিত্র ভারতে এলে ভাল হয়ে যায়। যেন খারাপ “চীনা খাসিলত” আর কাজ করে না।

তবে লক্ষণীয় হল, এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান বা মালয়েশিয়ায়- যেখানে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয়েছে- সরকার বদলের সাথে সাথে সব দেশেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব আপত্তি নিয়ে নতুন সরকারগুলো চীনা সরকারের সাথে কোনো সঙ্ঘাতের সম্পর্কে যাওয়া ছাড়াই বরং আপস আলাপ আলোচনা সব ক্ষেত্রই আপত্তি মীমাংসা করতে পেরেছে। অর্থাৎ সে সুযোগ ছিল এবং তা নেয়া হয়েছে বোঝা গেছে। আর এই আলোচনা শেষ হয়েছে পুনরায় নেগোসিয়েশন ও আগের চুক্তিটা সংশোধিত ও নবায়ন করার ভেতর দিয়ে। সারকথায় কোথাও কোনো প্রকল্প অমীমাংসিত বিতর্কে আটকে যায়নি। বড় জোর এক বছরের মধ্যে নিরসন করা হয়েছে মানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যায়নি এবং এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই হয়েছে। চীন কোন আদালত ‘আইন’ দেখায় নাই;  বাড়তি ক্ষতিপূরণ দাবি, জোরাজুরি বা চাপ দিচ্ছে এমন অভিযোগ কোথাও – এমনকি আমেরিকান প্রপাগান্ডার ভেতরেও নেই।

যদিও একথা সত্যি যে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চীনা প্রকল্প নেয়ার সময় এশিয়ার সরকারগুলোকে প্রকল্প থেকে বেনামে কমিশন দেয়া হয়েছে। আর একালের বিশ্বব্যাংকের নেয়া প্রকল্পের সাথে তুলনা করলে বলা যায়, এ ব্যাপারে চীনা প্রকল্প কম স্বচ্ছ এবং এ’পর্যন্ত দাঁড়ানো বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা যেন ওর লক্ষ্যই নয়।

যা হোক, মাহাথিরের ক্ষেত্রেও এবার তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তিন মাসের মধ্যে (আগস্ট ২০১৮) চীন সফরে প্রকল্প নিয়ে তার আপত্তি একইভাবে চীন আমলে নিয়েছিল। সফর থেকে ফিরে তিনি বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্পের খরচ বেশি, যা আমাদের বইবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই, তাই এখনকার মতো এটা বাতিল করতে হচ্ছে।’  [‘We just can’t pay’: Mahathir ] তবে ‘চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক অটুট থাকবে, কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলা ছাড়াই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’ [Malaysia has seen a change of government, its foreign policy concerning China remains the same.”]।

পরে এ বছর জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা এই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে মালয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বরাতে রয়টার্স জানাচ্ছে, অর্থমন্ত্রীও একই কারণ জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রকল্প বাতিলের জন্য ক্ষতিপূরণ কত দিতে হবে এ নিয়েও ঠিকাদারের সাথে কথা চলছে বলে জানিয়েছিলেন।

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল ভারতসহ আমেরিকান প্রপাগান্ডিস্টরা। চীনা প্রকল্প নিয়ে কতগুলো দেশ পরে সরকার বদলের সাথে প্রকল্প বাতিল বা সংশোধিত চুক্তি করেছে, এই উদাহরণের তালিকায় মালয়েশিয়াকে যুক্ত করে আরেকটা দেশ হিসেবে দেখিয়ে কথিত চীনা ‘ঋণের ফাঁদের’ কথিত ভয়াবহতা তুলে ধরতে শুরু করেছিল তারা। এর পর থেকে প্রপাগান্ডা জোরে শোরে চলছিল চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এক আমেরিকার ভদ্রলোক লিখেছিলেন, “the debt-trap argument gained further credence after Malaysian Prime Minister Mahathir Mohamed cancelled $23 billion in BRI projects and warned China against falling prey to ‘a new version of colonialism,’” according to Haenle.

কিন্তু গত ১২ এপ্রিল এই প্রসঙ্গে হংকংয়ের এক মিডিয়া  “সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট” সব উলটে যাবার খবর দিয়ে লিখছে , ১২ এপ্রিল মালয়েশিয়া জানিয়েছে যে, বাতিল হয়ে যাওয়া রেল প্রজেক্ট নিয়ে তারা আবার এক নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরো লিখছে, গত কয়েক মাসে কিছু ভুল কথা আর মাহাথিরের দুই ধরনের বক্তব্যের পরে এই চুক্তি আবার স্বাক্ষর হলো” [after months of false starts and contradictory statements from Prime Minister Mahathir Mohamad’s government on the future of the multibillion-dollar project”.।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে এবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হলো প্রপাগান্ডিস্টদের। কিন্তু কেন এমন ঘটল? কেন বাতিল চীনা রেল প্রকল্প মালয়েশিয়ায় আবার ‘জিন্দা’ হলো?

গরিবের অনাদরে পড়ে থাকা খাদ্য পামবীজ বা তা থেকে পিষে তৈরি করা পামঅয়েলকে মাহাথিরের মালয়েশিয়া দুনিয়াজুড়ে ভোজ্যতেলের প্রধান উৎস হিসেবে হাজির করেছিল। গুরুত্বপুর্ণ হল, তা আমেরিকান সয়াবিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এর ছাঁকনি টেকনোলজিসহ তেল বের করার পুরা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক টেকনিক্যাল অগ্রগতি হলে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসহ ওই অঞ্চলই ভোজ্যতেলের প্রধান সরবরাহকারী এলাকা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও সয়াবিন নামে যা বিক্রি হয় এর বেশির ভাগই আসলে রিফাইনড পামঅয়েল। এগুলো আমরা কমবেশি সবাই জানি। আমেরিকার সয়াবিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব সময় আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিত থাকতে হয় মালয়েশিয়াসহ উৎপাদক দেশগুলোকে। এভাবে ইউরোপের বাজারেও একটা বড় মার্কেটশেয়ার তৈরি করে ফেলেছিল মালয়েশিয়া; কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চলা কানাঘুষা এবার বোঝা গেল সত্যি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ‘পামঅয়েল চাষাবাদের কারণে ব্যাপকভাবে বনজঙ্গল ধ্বংস ঠেকাতে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পামঅয়েল ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেবে”[This month, the European Commission concluded that palm oil cultivation results in excessive deforestation and its use in transport fuel should be phased out by 2030.]।

খবরটা শুনে মাহাথির স্বভাবতই খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি এটাকে ইইউ’র বিবাদ-সঙ্ঘাত লাগিয়ে চলার মনোভাব হিসেবে দেখে বলেন, আমরা পামঅয়েল বিপ্লব ঘটানোতে যেখানে ‘এটা এখন চকোলেট থেকে লিপস্টিকসহ প্রসাধনী ও সাবানের প্রধান কাঁচামাল হয়ে গেছে- তখন ইইউ নিজের পণ্য, রাইসরিষার তেলের বাজার সংরক্ষণের জন্য এই দুশমনি’ শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ এমন ভালো জিনিস নয় যে, আমরা তা প্রমোট করতে চাই। কিন্তু তা বলে বড়লোকের দেশের গরিব দেশের মানুষকে আরো গরিবি হালে ফেলার চেষ্টা- এটা মারাত্মক অবিচার” [Mahathir, 93, said the EU’s increasingly hostile attitude towards palm oil, a commodity used in everything from chocolate spread to lipstick, was an attempt to protect alternatives that Europe produced itself, like rape seed oil.]।
এই মারাত্মক অবিচারের প্রশ্ন তুলতে পারা- এটাই মাহাথির যে আসল নেতা- এর পরিচয়। তিনি ইইউ’র বাজার দখল করার দিকটাকে সামনে আনলেন।

গত জানুয়ারি মাসে রেল লিঙ্ক প্রকল্প বাতিল করার পর থেকে নানা প্রসঙ্গে মাহাথির চীনের নেতৃত্ব নিয়ে নিজে অনেক ক্রিটিকাল হয়ে ভালমন্দের বিচার করেছেন। তবে ইতিবাচকভাবে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে আমেরিকার নেতৃত্বে কথিত “ঋণের ফাঁদের” কথা তোলা অথবা চীন নিজের হুয়াওয়ে ফাইভ-জি মোবাইল টেকনোলজি দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে ইত্যাদি প্রপাগান্ডা প্রসঙ্গে একপর্যায়ে তিনি পাশ্চাত্যবিরোধী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি সরাসরি স্পষ্ট করে বলে বসেন, ‘ধূর্ত আমেরিকানদের মোকাবেলা করতে ধনী চীনাদের পক্ষ নেবো” [I’d side with rich China over fickle US: Malaysia’s Mahathir Mohamad”]। শুধু তাই নয়, চীন প্রসঙ্গে তার অবস্থান আরো স্পষ্ট করতে তিনি বলেছেন, ‘উদীয়মান শক্তি চীন থেকে ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়ার চেয়ে ওদের সাথে কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলার একটা ভালো উপায় বের করতে হবে আমাকে” […to find ways of working with the rising power rather than to let fears…]। আবার বলছেন, ‘আমরা যখন থেকে চীনের সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছিলাম সে সময়ের গরিব চীনের দিকে আমরা ভীত চোখে তাকাতাম। আজ চীন বড়লোক, এখনো আমরা ভীত। এটা চলবে না। আমার মনে হয়, চীনের সাথে সম্পর্ক পাতানোর একটা ভালো উপায় আমাদের বের করতে হবে” [I think we have to find some way to deal with China.]।

মাহাথিরের সে উপায় হল, চীনের সাথে বাজার শরিক করার সম্পর্ক ও বুঝাবুঝি তৈরি করা। এই ফর্মুলায় সহজেই তিনি বিভিন্ন চুক্তিতে উপনীত হয়ে গেলেন। তাতে এখন থেকে আমেরিকান সয়াবিন নয়, বরং চীন হবে মালয়েশিয়ান পামঅয়েলের একচেটিয়া ভোক্তা। সেই খুশিতে মাহাথির এবার সেই পরিত্যক্ত চীনা রেল লিঙ্ক প্রকল্প- এতে বিভিন্ন জায়গায় সংশোধনী এনে হলেও আবার চীনের সাথেই এ নিয়ে চুক্তি করে ফেলেছেন। [Malaysia to ‘take advantage’ of ECRL deal to sell China more palm oil: Mahathir Mohamad]। তিনি চীনাদেরকে ভাল ব্যবসায়ী বলে প্রশংসা করে এক লম্বা ইন্টারভিউ দিয়েছেন এখানে, Chinese by nature are very good businesspeople’: Malaysian Prime Minister ।

শুধু তাই নয়, গত ২৫ এপ্রিল চীনে দ্বিতীয় বেল্ট-রোড সামিট মানে, বেল্ট-রোড ফোরামের সম্মেলন শুরু হয়েছে। আড়ম্বরের সাথে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তিন-চারজন অতিথি-বক্তার একজনও তিনি।

হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা “ঋণফাঁদের” অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মাহাথিরের পক্ষ পত্রিকা খোদ এডিটোরিয়াল লিখেছে। Editorial by SCMP Editorial।

কারও প্রপাগান্ডায় ভয় পাওয়া কোনো কাজের কথা নয়; বরং নিজ বুদ্ধিতে চীনের সাথে চলার উপায় বের করে আগানো শিখতে চাইলে মাহাথির আমাদের সামনে শিক্ষণীয় হয়ে থাকলেন। আমরা কী এই শিক্ষা চর্চার জন্য যোগ্য হতে পারব না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৭ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলার মাহাথির-পথ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

গৌতম দাস

২২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2zq

 

নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী ও সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তি – ছবি : TOI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, যা ভারতের ভাষায় “লোকসভার নির্বাচন” [General Election To Lok Sabha, 2019], তা অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় পর্ব গত ১৮ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। এভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ ভারতের ভোটপ্রদান  এবারও মোট সাত পর্বে এক মাসেরও বেশি দিন ধরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা করে পর্বের নির্বাচনের সমাপ্ত হবে। এভাবে নির্বাচন শেষ হবে সপ্তম পর্বটা আগামী মাসে, ১৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে। এরপর বাক্সবন্দী করে সব যার যার কেন্দ্রেই রাখা ভোট, ২৩ মে সকাল থেকে একসাথে গণনা শুরু হবে। এতে আশা করা যায়, ঐদিন বেলা ১১টার পর থেকে কে কোন আসনে এগিয়ে আছে, সেই অভিমুখ স্পষ্ট হতে শুরু করবে, আর সেখান থেকে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, সেই অভিমুখ বা ইঙ্গিতও জানা শুরু হয়ে যাবে। এভাবে দিন শেষে সন্ধ্যার পরে সব ফলাফল না এলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসছে।

এটা ভারতজুড়ে ৫৪৩ আসনের লোকসভা নির্বাচন; অর্থাৎ ভারতে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় যেতে হলে কোন দল বা জোটকে মোট ২৭২ ছাড়িয়ে (২৭২+) এরও বেশি আসন পেতে হয়। কারণ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত আরো দু’টি আসনও আছে তা যোগ হলে মোট আসন ৫৪৫ হবে।

ভারতের টিভি মিডিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন ড. প্রণয় রায়। তাঁর মিডিয়া প্রফেশনাল স্ত্রী রাধিকা রায় এনডিটিভি গ্রুপ কোম্পানি খোলার প্রথম উদ্যোক্তা। এর একমাস পরে প্রণয় রায় তাতে সহ-উদ্যোক্তা হিসাবে যোগ দেন। এভাবে দুজনে মিলে ১৯৮৮ সালে ‘এনডিটিভি’ মিডিয়া গ্রুপ চালু করেছিলেন। দু’জনে মিলে তাঁরা এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের শেয়ার মালিক। এই প্রণয় রায় ব্যতিক্রম অনেক অর্থে। তিনি অন্য মিডিয়া মালিক বা সম্পাদনার নির্বাহীদের সবার থেকে আলাদা এ জন্য যে, তিনি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, অর্থনীতির ডক্টরেট সেই সাথে ব্রিটেনে পড়ালেখা করা পেশাদার চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট।

এ ছাড়া যখন টিভি বলতে একমাত্র সরকারি টিভি বুঝত মানুষ, সেই যুগে তিনি ভারতীয় “দূরদর্শনে” অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করতেন। আরও সেই সাথে ভারতের নির্বাচনের সময় প্রাপ্ত নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য এবং অভিমুখ বিশ্লেষণ – এটা তখ থেকেই তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।ইংরাজিতে psephologist (উচ্চারণ “সিফোলজিস্ট”) বলে একটা শব্দ আছে। যার অর্থ নির্বাচনতাত্বিক; অর্থাৎ যিনি দক্ষতার সাথে  নির্বাচনে ভোটারেরা কোনদিকে ও কেন ভোট দিল সে তাতপর্য ও প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ভারতের মিডিয়া একমাত্র তাকেই নামের আগে ‘সিফোলজিস্ট’ বিশেষণ লাগিয়ে বলে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখা যায়।  যেমন  তামিলনারু ভিত্তিক দক্ষিণী ১৪০ বছরের প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক “দ্যা হিন্দু” লিখেছে, প্রণয় রায় সম্পর্কে –  “১৯৮০ সাল থেকে প্রণয় আর ভারতের নির্বাচন প্রায় সমার্থক কথা হয়ে গেছে। তাকে দিয়েই ভারতে “নির্বাচনতাত্বিক” শব্দটার ব্যবহার শুরু”। [“Prannoy Roy has been synonymous with elections since 1980. He pioneered opinion polls in India and introduced psephology to the country.”]।

পরবর্তীকালে ১৯৮৮ সালে নিজের “এনডিটিভি” চালু হলে ‘নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য ও অভিমুখ বিশ্লেষণ” করার ভারতের বাজারে তিনি আরও বিস্তারে পাইওনিয়ার বা অগ্রগামী বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। ইনি চলতি নির্বাচনের আগে এপ্রসঙ্গ নিয়ে তার বই [দ্যা ভারডিক্ট : ডিকোডিং ইন্ডিয়ান ইলেকশন… (The Verdict: Decoding India’s Elections. প্রকাশ করেছেন। বইটি হল, ভারতের নির্বাচনে ভোট প্রদানের অর্থ-তাতপর্য কী করে বের করতে হয়, তা নিয়ে। এরই এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

প্রণয়ের সেই বিচারে ১৯৫২ সাল  ভারতের লোকসভা নির্বাচনে শুরু হওয়ার পর থেকে, ভারতের ভোটারদের ভোট দেয়ার প্যাটার্নকে তিন আলাদা যুগে (একেকটা প্রায় ২৫ বছরে) তিনি ভাগ করতে চান। প্রথম ২৫ বছর ধরে (১৯৫২-১৯৭৭) ভোটারেরা একনাগাড়ে, স্বাধীন ভারত পাওয়ার আবেগ ও জোশে কংগ্রেসকেই মানে সরকারের পারফরম্যান্স যেমন হোক তাদেরকেই আবার জেতাতে হবে- এই ছিল তখনকার আবেগ বা ফর্মুলা। তাই ৮০% ক্ষেত্রে আগের সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছিল। এটার নাম তিনি দিয়েছেন পুরান “ক্ষমতাসীন-মুখি ভোট”। একবার জিতে যাবার পর সারা পাঁচবছর এলাকায় চেহারা না দেখালেও পরের বার আবার তিনি নির্বাচিত হতে পারতেন। কারণ সেটা ছিল বিশ্বস্ত ভোটারদের যুগ। ভোটারদের নেতাদের উপর অগাধ বিশ্বাস কাজ করত। প্রণয় বলছেন, এটাকে আপনারা “বোকা ভোটার” বা “গভীর আশাবাদী” ভোটারও বলতে পারেন।

প্রণয় বলছেন এরপর ১৯৭৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব – যার নাম তিনি দিয়েছেন – “ক্রুদ্ধ ভোটারদের [angry voter] যুগ”, ১৯৭৭-২০০২ সাল পর্যন্ত। এটা শুরু হয়েছিল  ১৯৭৭ সালের মার্চের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচন থেকে। এই নির্বাচন ছিল আগের ২১ মাসের (১৯৭৫-৭৭) ধরে ইন্দিরার “জরুরি আইন জারি” করে বিরোধী দমন নির্যাতন চালানোর সমাপ্তিতে। তাই সেটাই ছিল প্রথম  কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে পুনরায় বিজয়ী না করে শুরু হয় দ্বিতীয় যুগ পর্ব। অর্থাৎ এই ক্রদ্ধ ভোটার যুগের বৈশিষ্ঠ ছিল, যার পারফরম্যান্স খারাপ তাকে পরের নির্বাচনে নির্বিচারে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়া। প্রণয় বলছেন এই দ্বিতীয় যুগে যেকোন ক্ষমতাসীন সরকার [incumbency] পরের বার নির্বাচনে ৭০% ক্ষেত্রে উতখাত হয়ে গেছে। প্রণয়ের ব্যাখ্যা হল পাবলিক এতই ক্রুদ্ধ থাকত যে একট ভাল অথবা একটু খারাপ বলেও কাউকে মাফ করে নাই, নির্বিচারে পুরান হলেই তাকে বাদ – এই ছিল ফর্মুলা বা নীতি।

আর সর্বশেষ এখনকার যুগপর্ব, নতুন শতকের শুরুতে ২০০২ সাল থেকে যার উত্থান। তখন থেকে শুরু হয় আর একেবারে নির্বিচার নয়, এবার বিচার করে দেখেশুনে পুরান কোনো সরকারকে রেখে দেয়াও শুরু হয়েছে, যদিও কাউকে কাউকে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়াও, সে তো আছেই। প্রণয়ের রায়ের ভাষায়, এরা অনেক “বিবেচক ভোটার”। এখানে এপর্যন্ত ৫০% ক্ষেত্রে দেখা গেছে  ভোটাররা নেতাকে পুণর্নিবাচিত আর ৫০% ক্ষেত্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।   অর্থাৎ একথার সুত্র ধরে বললে, প্রণয় রায় মোদীর আবার বিজয় সম্ভাবনাকে তিনি একেবারে অসম্ভব বলে ঠিক ফেলে দেননি। ভারতের মিডিয়া জগতে প্রণয় ও তার টিভির চলতি বা সাবেক কলিগরা সবাই যারা এখন ভারতের মিডিয়া জগতের প্রভাবশালী ও মাথা পরিচালক। আর সম্ভবত একজন বাদে (অর্ণব গোস্বামি যে প্রকাশ্যেই বিজেপির পক্ষে) বাকিরা সবাই মোদি-বিরোধী বা কঠোর সমালোচক বলে মনে করা হয়।
তবে তিনি এই তৃতীয় পর্বে আর এক নতুন উপাদানের কথা বলেছেন; জানাচ্ছেন, এই পর্বে বিপুলভাবে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ঘটেছে। তাই তাদের সংখ্যার কারণে তারা এখন ভোটের ফলাফলে অন্তত এটাও আর একটা নির্ধারক উপাদান।

প্রণয় রায়ের বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হল, ভারতে সরকার গঠন এখন সরাসরি ঠিক ভোটারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সেটা ভোটারের ভোটের চেয়েও “জোট” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কেমন করে আপনি জোট করছেন, কাকে জোটসঙ্গি বেছে নিচ্ছেন, কেন, কী বুঝে – এভাবে জোটবন্ধু বেছে নেয়া – এটাই এখন মুখ্য নির্ধারক যে, শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে।

উল্টা করে বললে প্রণয় আসলে বলতে চাইছেন, ভারতে কোনো একক দলের একা নিজের সামর্থ্যে সরকার গঠনের দিন শেষ। সারা ভারতের ভোটারদের আস্থা আছে এমন কোন দল বলতে আর কেউ বাকি নাই। আর একটু এগিয়ে বললে তাহলে এখন কিসের দিন? অর্থাৎ কিসের ভিত্তিত্ব সরকার গঠন হয় বা হবে? এর জবাব হবে, এখনকার ভোট দেয়া ও সরকার গঠনে সমর্থ হওয়ার অভিমুখ হল সঠিক “জোট” টা গড়া। কিন্তু কার সাথে কার জোট? ভারতে সর্বভারতীয় বা ভারত-জুড়ে আছে এমন দল আছে মাত্র দুটা, আর তারা পরস্পর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি – বিজেপি ও কংগ্রেস। কাজেই এদের দুইয়ের মধ্যে জোট হবার প্রশ্নই আসে না, তা বলা হচ্ছে না। তাহলে জোট কাদের সাথে?

ভারতে আঞ্চলিক বা রিজিওনাল দল কথাটার মানে হল ঠিক কোন অঞ্চল নয় আসলে সেগুলো একেকটা রাজ্যভিত্তিক (প্রাদেশিক) দল। যেমন মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এর ততপরতা নাই বললেই চলে, অন্তত প্রার্থী দিবার মত অবস্থা নাই। এভাবে  ২৯ রাজ্যের ভারতে, প্রায় প্রত্যেক রাজ্যেই অন্তত দুই বা এর বেশি সংখ্যক আঞ্চলিক দল আছে। এরা মূলত প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনেও এরা দাঁড়িয়ে গিয়ে বিপর্যয় তৈরি করে ফেলতে পারে, ফেলে থাকে। বিশেষত এমন আঞ্চলিক দলগুলো যারা রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় থাকে। তাই তাদের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে বড় আসন পেয়ে যাবার সম্ভাবনাও তৈরি থাকে। যেমন তৃণমুল গত ২০১৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ মোট ৪২ আসনের মধ্যে ৩৪টাই পেয়েছিল। এ’কারণে আঞ্চলিক দলগুলোকে -কংগ্রেস না বিজেপি- কে আগে নিজের জোটে জুড়ে নিবে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কংগ্রেসের এমন জোটের নাম ইউপিএ [United Progressive Alliance, UPA] আর বিজেপির এমন জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance, NDA]। ভারতের নির্বাচনি রাজনীতির এই ঝোঁক একেই প্রণয় রায় বলছেন ভোটের চেয়েও সঠিক “জোট” গড়তে পারা – এটা বেশি নির্ধারক। ভারতে রাজনীতির এই নতুন ঝোঁক তৈরি ও তা স্থায়ী হয়ে গেছে সেই ১৯৮৫ সাল থেকে।

এজন্য বলা হচ্ছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকেই ভারতজুড়ে দল বলতে কংগ্রেস বা বিজেপির একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আসার দিন শেষ হয়েছে। আর শুরু হয়েছে, তাই “জোটের” সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসার দিন।  কিন্তু এই নতুন ধারাবাহিকতাতেও গতবার  মানে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস আর এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। ভোট পরিসংখ্যান বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি একা তো নয়ই, জোট হিসাবে ক্ষমতায় যেতে চাইলেও নিজ দলকে নুন্যতম কিছু আসন পেতেই হয়। এপর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে সেই সংখ্যাটা হল ১১৫। আর এই বিচারে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস নিজে পেয়েছিল মাত্র ৩৮ আসন আর, জোট হিসেবে সর্বনিম্ন, মাত্র ৬০ আসন। অর্থাৎ কংগ্রেসের ঝোঁক এবার আরও পতনের দিকে। আর ওদিকে এবারের চলতি নির্বাচন থেকে একইভাবে বিজেপিরও পতন শুরু হয়ে যেতে পারে।

তাই যদি এবারও কংগ্রেসের এই ট্রেন্ড অব্যাহত থাকে, তবে সেটা হবে জোট হিসাবেও কংগ্রেস আর লায়েক থাকবে না, এমন স্থায়ী পতন। অর্থাৎ আঞ্চলিক দলগুলোও আর কংগ্রেসের সাথে কোন জোট করতে চাইবে না। নতুন সেই অভিমুখের অর্থ হবে আঞ্চলিক দল বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দল – এমন ছোট দলগুলোই এবার উল্টা বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে না নিয়ে নিজেরা নিজেরাই জোট সরকার গঠন করার শুরুর দিন। কলকাতার মমতার ভাষায় এটাই, “ফেডারেল ফ্রন্ট” এর সরকার গড়া। এই রচনার শুরুতে যে ছবি ব্যবহৃত হয়েছে তাতে, তৃতীয় ফ্রন্ট বা থার্ড ফ্রন্ট বলতে এর কথাই বুঝানো হয়েছে। এদিকটাই আরেক ভাষায় আমলে নিয়ে প্রণব রায় বলছেন ভারতের এবার “এটা কোন জাতীয় নির্বাচন নয়”। বরং এটা হল রাজ্যগুলোর এক ফেডারেশনের নির্বাচন। [“2019 is not a national election at all, it’s a federation of states election,”]। মমতার “ফেডারল” শব্দের সাথে মিলের দিকটা লক্ষ্যণীয়।

বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রণয় রায়ের তৃতীয় মন্তব্য ছিল সরাসরি কংগ্রেস সম্পর্কে; এবং বলা বাহুল্য তা খুবই করুণ! তিনি বলছেন, ‘কংগ্রেস সম্ভবত ২০৫০ সালের নির্বাচনের কথা চিন্তা করে এবারের নির্বাচন লড়ছে”। এ কথার সোজা মানে হল, কংগ্রেস দিশা হারিয়েছে। তাই কারো সাথে জোট করতে চাচ্ছে না, বুঝছে না অথবা পারছে না। এমনকি সম্ভবত অন্যরাও কংগ্রেসকে তাদের জোটে নিলে কোনো লাভ হবে না, কংগ্রেসকে এমন অযোগ্য দল মনে করছে। তবে প্রণয় সব কারণের জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করছেন। বলতে চাইছেন কংগ্রেসের নিজের ওজন সম্পর্কেই নিজেরই কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা ধারণা নেই। যেন রাহুল দলের সভাপতি হয়ে যাওয়ার পরে তার মনে একটা ভাব এসেছে যে, এবার বাপ-দাদার কংগ্রেসের যুগ ফিরে এসেছে বা আসবেই। অথচ নিজের পায়ের নিচে মাটিই নেই, বেখবর!

ভারতের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে একা উত্তর প্রদেশ এই রাজ্যে সর্বোচ্চ আসন, একমাত্র রাজ্য যেখানে আসন সংখ্যা ৮০টি। এর পরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন অনেক নিচে; তা হলো মহারাষ্ট্র ৪৮, আর এর পরে তৃতীয় সর্বোচ্চ পশ্চিমবঙ্গ ৪২, এভাবে। অর্থাৎ উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে খুবই নির্ধারক, গত নির্বাচনে একা বিজেপিই এখানে পেয়েছিল ৭২টি। অর্থাৎ একা এখানে বেশি আসন পাওয়ার সাথে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারা সম্পর্কিত ফেনোমেনা। সেই উত্তর প্রদেশে এবার দুই প্রধান আঞ্চলিক দল [এসপি (সমাজবাদী পার্টি) আর বিএসপি (বহুজন সমাজবাদী পার্টি)] যারা মূলত গরিব, অন্তজ, দলিত ও মুসলমানদেরকে প্রতিনিধিত্ব করে, – ঠাকুরদের বিরুদ্ধে যাদব-  এমন দল। এরা সবার আগে এবার নিজেরাই বিজেপিকে ঠেকাতে প্রথম কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে জোট বাঁধে। প্রত্যেকে সমান ৩৮ আসন নিয়ে দুদলে মোট ৭৬। আর বাকি চারের কংগ্রেস নিতে চাইলে দু’টি গান্ধী পরিবারের মা-ছেলের জন্য। আর অন্য দু’টি আর এক ছোট আঞ্চলিক দলের (রাষ্ট্রীয় লোকদল) জন্য। এই জোট গড়তে সবচেয়ে নমনীয় হল সমাজবাদী পার্টি। তাই নিজের ভাগের ৩৮ সিট থেকে সে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার আগ্রহ যে দেখাতে পারছে।

কিন্তু মূল কথা যেটা, বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়ে সব রাজ্যেই এক “জোট” গড়তে না পারার জন্য আঞ্চলিক দলগুলো মূলত দায়ী করছে কংগ্রেসকে। কারও পাটাতনে না দাঁড়িয়ে উপর থেকে দেখলে, খুব সম্ভবত আসল জটিলতাটা হল – কংগ্রেসের স্বার্থের সাথে প্রতিটি আঞ্চলিক দলের স্বার্থই সঙ্ঘাতমূলক। অন্তত কংগ্রেস সেখান থেকেই দেখছে। এ ছাড়া সাথে আরও আছে কংগ্রেসের নিজের সম্পর্কে অতি-মূল্যায়ন। ফলে এ জন্য কোনো আঞ্চলিক দলের সাথেই এবার কংগ্রেসের কোনো রাজ্যে কোনো আসন সমঝোতা করতে সক্ষম হয়নি। যেমন এখন রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন দিল্লিতে এমন আঞ্চলিক দল হল আম আদমি পার্টি, ওদিকে কলকাতা, কেরালা বা ত্রিপুরায়  এমন দল হল সিপিএম, পাঞ্জাবেও প্রভাব আছে এমন দল আম আদমি, এছাড়া আর উত্তর প্রদেশের অবস্থা তো জানলাম উপরে ইত্যাদি; এভাবে আঞ্চলিক দলগুলো সকলে কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ। কারণ কোথাও কংগ্রেসের সাথে কারো শেষ পর্যন্ত কোনো জোট, বা আসন ভাগাভাগি হয়নি। এমনকি উত্তর প্রদেশে এসপি আর বিএসপির জোট ঘোষিত হওয়ার পরে সেটাকেও উপেক্ষায় এরপরেও আবার কংগ্রেস ঘোষণা করেছিল যে, রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা এবার প্রথম নির্বাচন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল, তাতে কংগ্রেস সবখানেই এবার একা নির্বাচন করছে। আবার প্রিয়াঙ্কার নিজে নির্বাচন করাও অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে যার সোজা মানে হল, কংগ্রেসের একা চলার এমন ততপরতার কারণে  এবার সবখানেই বিজেপি-বিরোধী ভোটগুলো কংগ্রেসের কারণেই সবচেয়ে বেশি ভাগ হবে। যার পুরা সুফলটা ভোগ করবে বিজেপি। এজন্য অনেকে টিটকিরি দিয়ে বলছে প্রিয়াংকার আগমনটা মূলত মোদীকে সহায়তা করতে।

অর্থাৎ কংগ্রেস যত আঞ্চলিক দলগুলোর ভোট কাটবে ঠিক তত ভোটই বিজেপির এগিয়ে যাবে। আর ততটাই বিজেপির জন্য তা সুবিধা বয়ে আনবে। এমনকি কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও মারাত্মক। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তর প্রদেশের ৩০টি আসনে কংগ্রেস একক ও শক্ত প্রার্থী দিবে, তাদের নাকি বিপুল সম্ভাবনা। মানে ওই ৩০ আসনে সে ‘শক্ত’ করে ভোট নষ্ট করবে আর বাকি ৫০টি আসনে ‘দুর্বল’ভাবে নষ্ট করবে। এ কারণে কংগ্রেসের এবারের ভোট কৌশলের কোনো তাল নেই বেতাল দশা; উদ্দেশ্যবিহীনের মতো আচরণ করছে কংগ্রেস। এ দিকটা খেয়াল করে প্রণয় রায় বলছেন সঠিকভাবে “জোট” করা যেখানে জেতার জন্য নির্ধারক বিষয়, কংগ্রেস সেখানে ততটাই যেন বেখবর, ভবঘুরে। তাই কংগ্রেসের লক্ষ্য চলতি ২০১৯ সাল না যেন সুদুর ২০৫০ সালের নির্বাচনের লক্ষ্যে এক অস্পষ্ট সময়ের দিকে তাকিয়ে কংগ্রেসের সব সিদ্ধান্ত।

প্রণয় রায়ের তিন মন্তব্য নিয়ে কথা শেষ, এখন অন্যান্য প্রসঙ্গ। ভারতের নির্বাচন তাই স্বভাবতই আমরা অনেকেই আগ্রহ নিয়ে সময় দিব, জানতে চাইব। বিশেষ করে নানান কারণ যারা আবার নিয়মিত ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিক-অভিমুখ জানতে ততটা সময় দিতে পারিনি, তারাও এখন জানতে চাইব। সব নির্বাচনেই মূল দু’টি দল থাকে, অনেকটা আমাদের লীগ-বিএনপির মত। আর ভারতের এমন দুই দল হল বিজেপি ও কংগ্রেস। এটাই আমাদের বহু পুরনো সময় থেকে চেনা ধারণা। কিন্তু সরি! এবার এই অনুমান নিয়ে ভারতের নির্বাচন বুঝতে গেলে সব হিসাবে ভুল হবে। কেন?

Source: Election Commission data | Shivam Vij/ThePrint

গত প্রায় ৩০ বছরের (১৯৮৪-২০১৪) একটা ভোটের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ বলছে, যে আসন কখনো কংগ্রেস হারাচ্ছে তা বিজেপি বা আঞ্চলিক দল পাচ্ছে; বেশি সময়ে বিজেপি পাচ্ছে। কিন্তু বিজেপি যে সিট হারাচ্ছে তা কংগ্রেস ফিরে পাচ্ছেই না। বেশির ভাগই আঞ্চলিক দল পাচ্ছে। তাই আগ্রহিরা এই খবর অনুসরণ করতে পারেন যে বলছে – ২০১৯ সালের নির্বাচন থেকে “কংগ্রেসমুক্ত ভারত” – বিজেপির এই শ্লোগান বাস্তবে ত্বরান্বিত হয়ে উঠতে পারে।

এর সোজা মানে হল, বিজেপির বিকল্প দল বলতে সেটা আর কংগ্রেস নয়, আঞ্চলিক দল। এক কথায় আঞ্চলিক দলের প্রভাব ক্রমশ বড় করে বেড়ে চলা – এটাই ভারতের রাজনীতির মূল অভিমুখ। আর এটাই কংগ্রেসের কথিত অনুমিত স্বার্থের সাথে প্রত্যেক আঞ্চলিক দলের অনুভূত স্বার্থবিরোধ অথবা বিজেপি-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কারো সাথেই কংগ্রেসের জোট না হওয়া। তাই এবার বিজেপি ফল খারাপ করলে এর অর্থ কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে তা নয়। এবারো তা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর মমতা ঠিক এই কারণের বেশির ভাগ আঞ্চলিক দলের কংগ্রেসবিরোধিতার ভোকাল মুখপাত্র। ভোট চাইতে গিয়ে তিনি পাবলিক মঞ্চে উঠে সরাসরি বলছেন, কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। প্রবল উত্তেজিত মমতার আরো একধাপ এগিয়ে দাবি এবার বিজেপি ১০০ আসনও পাবে না: মমতা।

জনমত সমীক্ষা
ভারতের নির্বাচনের ফল সম্পর্কে জনমতের সমীক্ষা (বা বুথ ফেরত ভোটার সমীক্ষা) চালিয়ে আগাম অনুমান করা সব সময় খুবই কঠিন একটা কাজ। এর মূল কারণ বিপুলসংখ্যক ভোটার (প্রায় ১০০ কোটি) যার তুলনায় স্যাম্পল সাইজ যত বড় আর ছড়ানো হওয়া উচিত তা না হওয়া বা নেয়া। তবুও এই নির্বাচনের ভারতের অন্তত পাঁচটা সমীক্ষা গ্রুপের কথা জানা যায়, যারা গত বছর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে (মোদির পক্ষে) সে অনুমান দিয়ে যাচ্ছে। আগে যাই থাক, গত ১৯ মার্চ এমনই এক অনুমিত গণনা রিপোর্ট বলে চলছিল বিজেপির-বন্ধু জোট আবার সরকার গঠন করে ফেলবে ২৮৩ আসন পেয়ে।

এই জনমত সমীক্ষা চালিয়েছিল “টাইমস নাউ ও ভিএমআর”। যারা অবশ্য প্রো-বিজেপি সমীক্ষা গ্রুপ বলে প্রচার আছে। আমরা লক্ষ্য করছি এদের প্রচারটাই আমাদের প্রথম আলোতে বেশি আসছে। কিন্তু ১১ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে সবার হাতে আর অনুমিত ডাটা নয়, অন্তত মোট ভোট প্রদানের শতকরা হার কত সে ফ্যাক্টস এখন প্রকাশিত। এর ফলে দেখা গেছে অন্তত দু’টি সমীক্ষা গ্রুপ এখন পিছু হটছে। এমনই একটা গ্রুপ ‘সিএসডিএস’ তাদের প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হল, ‘প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি কী অসুবিধায় পড়ছে?’ [Is it disadvantage BJP post first phase polling?] তারা এবার বিশ্লেষণে বলছে, প্রথম পর্যায়ে উত্তর প্রদেশের আট আসনে নির্বাচন হয়েছে। যার দু’টি বাদে বাকি ছয়টাতে বিজেপির অবস্থা খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা, যেখানে গত ২০১৪-তে এই আট আসনই বিজেপির ছিল। এখানে এবার ভোট প্রদানের হার কম আর ওই ছয়টা আসনেই মুসলমান ভোটার সংখ্যায় আধিক্য বলে এই যুক্তি তুলে এরা এখন সরে এসে বলছে- এই আট আসনের ছয়টাতেই বিজেপি খারাপ করবে।……the BJP would be down six in UP in the first round.

একইভাবে আরেক সমীক্ষা গ্রুপ ‘সি-ভোটার’- যারা মোদির ‘পাবলিক রেটিং’ কেমন যাচ্ছে তা নিয়ে কথা বলে এসেছে। আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি এরা দাবি করেছিল পাকিস্তানে কথিত ‘বিমান হামলা’ করে আসাতে মোদির রেটিং বেড়ে ৬২ শতাংশ হয়েছিল। এরপর এক মাসে তা অল্প করে কমলেও তা হয়েছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর এবার তারা বলছে, সেটা আরো কমে এবার ৪৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মোদির গ্রহণযোগ্যতা এখন ১৯ শতাংশই কমে গেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটপ্রদান অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত ১৮ এপ্রিল। তাতেও দেখা গেছে ভোট প্রদানের হার ২০১৪ সালের চেয়ে বাড়েনি, তবে অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। [On 7 March, the Modi government’s approval rating was at 62.06 percent. Despite a minor decrease it remained in the 50s till 22 March. But on 12 April, a day after the first phase of polling, the Modi government’s approval rating had fallen to 43.25 percent, a fall of almost 19 percent in about five weeks.] মোটকথা সমীক্ষা গ্রুপগুলোই আর জোর দিয়ে মোদির সম্ভাব্য ভালো ফল করার কথা বলতে চাচ্ছে না। তাতে আসল ফলাফল আগামী মাসে যাই আসুক না কেন।

এই নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য তার আশা কী? তার আশা হবে এই লেখার শুরুতে যে ছবি তৃতীয় শক্তি বা ফেডারল ফ্রন্টের কথা বলা হয়েছে এর সাফল্য ও বিজয়। এতে  নাগরিকদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ভারত রাষ্ট্র কোন কোটারি নয়, কোন ভুতুড়ে ক্ষমতার “কেন্দ্র” এর রাষ্ট্র নয় – এই বিচারে এখানকার চেয়ে তুলনায় ভাল গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র হবে। দানব ভারত, হিন্দুত্বের ভারতের বদলে এর তুলনামূলক গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে।  তার তাতেই বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২০ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের নির্বাচনে কী হচ্ছে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]