পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

গৌতম দাস

১১ নভেম্বর ২০১৯, ০১:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2MQ

 

পাকিস্তানের রাজনীতিতে যেন ‘বিনা মেঘে বৃষ্টি’ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে সম্ভবত সেখানে এসে যাচ্ছে একেবারে ঘূর্ণিঝড়, যাতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে। ফলে অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। যেমন অসময়ে কিলিয়েও কাঁঠাল পাকানো যায় না, এমনকি ফল পাকানোর ওষুধ দিয়েও না, সেই অবস্থা এটা। আসলে সব কাজে টাইমিং বা সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর!
সীমাহীন অব্যবস্থাপনা আর গরীবদেশের নিত্যসঙ্গী দুর্নীতিতে ডুবে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থাকে টেনে তুলতে আশার আলো দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিলেন। ওদিকে এরই মধ্যে কাশ্মীরে নরেন্দ্র মোদীর ভারত “দখলদার বাহিনী” হিসেবে হাজির হওয়ায় এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স্তরে কাশ্মীরিদের পক্ষে লড়ার জন্য দৃশ্যত এই প্রথম পাকিস্তান এমন এক নেতা পেয়েছে যিনি সৎ হিসেবে পরিচিত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলি যার চেনাজানা এবং নয়া দৃষ্টিতে ও নয়া উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানকে সাজাতে যার আগ্রহ এক নেতা হয়ে হাজির ইমরান খান। এবারের ইমরানের জাতিসংঘ-বক্তৃতার প্রশংসা করেনি বা এটা তাঁকে স্পর্শ করেনি, এমন সংবেদনশীল মানুষ কমই পাওয়া যাবে। আমরা ‘মুখের উপর কঠিন সত্য ছুড়ে দেয়া’ বলি যেটাকে, ঐ বক্তৃতা তেমন। তাই প্রতিপক্ষ ভারত এই বক্তৃতার বিরোধিতায় না গিয়ে পাশ কাটিয়ে ‘মোকাবেলা’ করার পথ ধরেছিল।
এক দিকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া আর কোনো নেতা ইমরানের পর্যায়ে পপুলার নন বলে তাঁর ভক্তদের দাবি। অথচ আমেরিকার স্বার্থে ওয়ার অন টেররে ব্যবহৃত হতে হতে পাকিস্তান বলতে গেলে, নিজস্বার্থের পাকিস্তান-রাষ্ট্র হওয়ার কথা যেন সে ভুলেই গিয়েছে। এই দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় পুরানা রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিল এই সুযোগে লুটপাট ছাড়া তাঁরা আর কী করার থাকতে পারে! আমেরিকার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে তারা ভেবেছেন, দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। এ ছাড়া তাদের যেন কোনো কাজ-ভূমিকা নেই। আর তাতে স্বভাবতই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে ছারখার। এই চরম হতাশার মাঝে গত বছরের নির্বাচনে ‘আশা-ভরসার একক নেতা’ ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরানের উত্থান ঘটতে দেখেছিল পাকিস্তান। বলাই বাহুল্য, এই পাবলিক তারা কেউই আশা করে না যে, ইমরানের হাতে কোনো চেরাগ আছে যেটা ঘষা দিলে অথবা ভেঙে পড়া অর্থনীতির উপর ইমরান স্রেফ হাত বুলিয়ে দিয়েই সব কিছু আবার ঠিক করে ফেলবেন তিনি।
তারা এতটুকু অন্তত বুঝতে পারা ‘পাবলিক’। তাই আশা ছিল একজন ন্যূনতম সৎ লোক, যার বিদেশে চুরির অর্থ রাখার অ্যাকাউন্ট নাই, যিনি সৎভাবে ও ঈমানের সাথে নতুন নতুন উদ্যোগে আন্তরিক চেষ্টা করবেন অর্থনীতিকে পতিত অবস্থা থেকে উঠিয়ে আনার জন্য। এমনই  ছোট আশার আলো দেখিয়েই উঠে এসেছিলেন ইমরান। পাকিস্তানের অর্থনীতি যত নিচে ডুবে ছিল এখনো তার রেশ কাটেনি। তাতে ইমরানের সরকার অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ফেললেও তার সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
পাকিস্তান আসলে বিদেশী স্বার্থে ও তাদের দায় মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে চলেছিল। আর এই সুযোগে দেশী শাসক-চোরদের হাতে লুটের শিকার হয়ে পাকিস্তান ফোকলা হয়ে গিয়েছিল। সরকার চালানোর মতো যে নগদ কিছু বৈদেশিক মুদ্রা লাগে, সে খরচের মাত্র তিন মাস ভার বইবার বা সরকার চালানোর মত সক্ষমতাও সে দেশের ছিল না- এমন অবস্থায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল।
আর তাতেই ইমরান খান নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। অবশ্য এই অভিযোগও ছিল এবং এখনো আছে যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা পেতে অন্যায় প্রভাব খাটিয়েছে। আবার এর পাল্টা সাফাইও অনেকে দেয় যে, সেনাবাহিনী ঠিকই বুঝেছিল এই ফোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনীতি ও জনজীবনকে টেনে তুলতে হলে নতুন মুখ ও নতুন উদ্যোগ লাগবে- এই বিবেচনায় তারা ইমরানকে অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোক হিসেবে দেখেছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ‘হাত ঢুকিয়ে থাকা’- এটা বহু পুরনো সত্য হলেও একমাত্র সত্য নয়। অন্তত আরো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হল – এক. কোল্ড ওয়ারের জমানায় (১৯৫৩-৯১) আমেরিকা নিজ ব্লকের খুব কম রাষ্ট্রকেই সেনাসরকার বসানো ছাড়া চালাতে পেরেছিল।
দুই. কাশ্মীর ইস্যুর কারণে জন্ম থেকেই ছোট অর্থনীতির দেশ হলেও দক্ষ সেনা আর ব্যাপক খরচের সংস্থান করতে হয়, এমন দেশ হতে হয়েছে পাকিস্তানকে। তাতে বাহিনীর পেছনে সরকারি সমর্থন যে মাত্রায় দরকার, সেই প্রয়োজন নিজেরাই সরকারে্র ক্ষমতায় থাকলে পাওয়া যাবে বলে সেনারা সঠিক অথবা ভুলভাবে মনে করত। তবে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা যাই হোক না, তাদের ক্ষমতায় ব্যাপক অপব্যবহারের বড় বড় নেতিবাচক ভূমিকাই অনেক বেশি।
আর তিনঃ বাস্তবতা হল, ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লব আর এর প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল- আর তা থেকে শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোর মার্কিন বিদেশনীতিতে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থপূরণের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান আমেরিকান স্বার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিল। আর এথেকে পাকিস্তান ততটা নিজের থাকতে পারে নাই, যদিও সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানো সেটা পাকিস্তানের নিজের স্বার্থও ছিল বটে। কিন্তু বড় কথা যেটা যে তালেবান আমলে এসে যতদিন গিয়েছে পাকিস্তান আর তখন নিজের জন্য পাকিস্তান থাকতে পারে নাই। বাধ্য করা হয়ঞ্ছিল তাকে [প্রেসিডেন্ট মোশাররফের লেখা “লাইন অন ফায়ার” বইটা এর বড় স্বাক্ষী। ], আমেরিকার স্বার্থ বাস্তবায়নের এক হাতিয়ার রাষ্ট্র হয়ে গেছিল পাকিস্তান। যেন আমেরিকান যুদ্ধের জাম্পিং প্যাড বা লঞ্চিং প্যাড [ launching pad]।

তাই সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বড় বড় ব্যর্থতা আর চরম হতাশার মধ্যেও এখন ইমরানই এক আশার আলো, আশা-ভরসার প্রতীক। মনে হয়, ২০ বছর পরে পাকিস্তান এই প্রথম নিজের জন্য নিজে কিছু করার চেষ্টা করছে, পাকিস্তানের পাবলিক পারসেপশন এখন এটাই। পাকিস্তানের কলামিস্ট ইকরাম সেহগাল লিখছেন, “নতুন সরকার আগের সরকারগুলোর হাতে বিধ্বস্ত একটি অর্থনীতির উত্তরসূরি হয়েছিল। মাওলানার দুর্ভাগ্যময় মার্চ তখনই হচ্ছে, যখন এই অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার প্রথম লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছে”। কোন মাওলানার কথা বলছেন তিনি?

এরই মধ্যে এখন এক বৈপরীত্য – একটা নাম চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছে – “মাওলানা ফজলুর রহমান”। এই মাওলানার কথাই বলছিলেন সেহগাল।  দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাকে এখন “ডিজেল মওলানা” বলে কুৎসা করার চেষ্টা হয়েছে, দেখা গেছে। এটা তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের ভাল পথ বা সঠিক উপায় না। অতীতে পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতিকে কিছু কমন ইস্যুতে (জিয়াউল হকের আমল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে) একটা জোটে সবাইকে আনার ক্ষেত্রে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল, এ কথা অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু তাতে আসলেই “ইসলামী রাজনীতি” বলে কিছু এগিয়েছিল কি না অথবা ইসলামী নাম দিয়ে বসলেই তা ভালো কিছু হওয়ার গ্যারান্টি কিনা – এসব প্রশ্ন, এমন বুঝাবুঝির ক্ষেত্রে বহু কিছু এখনও বাকি থেকে যায় – এ বিষয়গুলো পুনর্মূল্যায়ন করা বা ফিরে দেখা দিন চলে যাচ্ছে!

পাকিস্তানে এখন যেসব রাজনীতিবিদ দুর্নীতির দায়ে জেলে অথবা দুর্নীতি করার অভিযোগে “দুর্নীতিবিরোধী ইসলামী আইনে” ব্যাপক সংখ্যায় যারা গত নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে, আদালতের রায়ে আনফিট বা অযোগ্য হয়ে গেছিলেন – এসব ক্ষেত্রে তারা নিজেদেরই তৈরি ‘ইসলামী আইনে’ তারা নিজেরাই ফেঁসে গেছিলেন। কারণ কিছু নুন্যতম পড়াশুনা করতে হয় আর বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি লাগে।  আধুনিক রাষ্ট্র ও এর আইনের বৈশিষ্ঠ সম্পর্কে নুন্যতম শিক্ষা ধারণা ও জানাশুনা না রেখে এক জেনারেল তাঁর নিজস্বার্থে কিছু সুবিধা পেয়েছে বলেই একটা ইসলামি রাজনীতি বলে কোন কিছুকে চালু করা যায় না। সেটা ইসলামিওও হয়ে যাবার গারান্টি নাই। সবকিছুর সামনে “ইসলাম” শব্দ বসায় দিয়েই পার পাওয়া যায় না।   আইন প্রণয়নের সময় ইসলামের নামে অর্থহীন অস্পষ্ট শব্দ রেখে দিলে তাতে ভবিষ্যতে  নিজেই তাতে বলি-শিকার হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাদেরই বিরুদ্ধে ঐ আইন ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে ফজলুর রহমানসহ পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতির নেতারা ভূমিকা রেখেছিলেন। জেলারেল মোশাররফের শাসন সমাপ্তিতে নওয়াজ শরিফ বা ভুট্টোর দল পরবর্তীতে এসব আইন সংশোধনের (সংসদীয় একটা কনস্টিটিউশনাল রিভিউ কমিশন গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে ১৮তম সংশোধনী আনতে) সুযোগ পেয়েও তাঁরা নেয়নি; বরং নওয়াজের দল বাধা দিয়েছিল। অথচ পরবর্তী সময়ে এর প্রথম শিকার হয়েছিলেন নওয়াজ শরীফ নিজেই। তিনি এই ইসলামি আইনেই ডিস-কোয়ালিফাইয়েড মাই অযোগ্য বিবেচিত ও পদচ্যুত।

আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন এখানে ২০১৭ সালের এক রিপোর্ট, জিয়াউল হকের আমলের পাকিস্তান কনষ্টিটিউশনের সম্পর্কিত ৬২ ও ৬৩ ধারা, যা দাবি করে – জনপ্রতিনিধিকে ‘সাদিক’ বা সত্যবাদী ও ‘আমিন’ বা বিশ্বস্ত হতে হবে। [Under Article 62(1)(f) of the Constitution, a person cannot be qualified as member of the national or provincial legislatures, if he is not ‘Sadiq and Ameen’ – truthful and trustworthy.] অন্যথায় হাইকোর্টের বিচারক তাকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। নওয়াজ এই আইনেই অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের এক বিচারপতি, বিচারপতি খোসা; তার মন্তব্য থেকে অনেক কিছু পরিস্কার জানা যায়ঃ
[Two years ago, Justice Khosa in Ishaq Khan Khakwani case had described the words ‘Sadiq’ and ‘Ameen’ as obscure and impracticable and had also talked about ‘nightmares of interpretation and application that they involved’.
Justice Khosa had said that some provisions of Article 62 of the Constitution certainly contained strong moral overtones but those provisions introduced into the Constitution by General Ziaul Haq had not been undone by the popularly elected parliaments in the last many decades.]

আর পরে গত নির্বাচনে পরোক্ষে সেনাবাহিনী এই আইন ব্যবহার করেই মুসলিম লীগ ও পিপলস পার্টির বহু (কমপক্ষে ৭০ জন) সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেয়নি, অর্থাৎ দৃশ্যত অযোগ্য করে দিয়েছিল। কাজেই কোনটা “ইসলামি আইন” আর সেটা কার জন্য তৈরি করা হয়েছিল অথবা কার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল এর এক ব্যাপক ও প্রকৃত মূল্যায়ন কি তারা মাওলানা ও তার ইসলামি বন্ধু রাজনীতিকরা এখন করবেন? করতে সক্ষম হবেন? এমন কোনো ইচ্ছার কথা আমরা শুনিনি।

তাহলে এখন মাওলানা ‘ফজলুর রহমানের আন্দোলন’ হচ্ছে কেন? এর অর্থ ও তাৎপর্য কী?
একটা অনুমান হল, পাকিস্তান তার অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার সঙ্কট থেকে বের হওয়ার একটা পথ বের করতে পেরেছে; যদিও সঙ্কট থেকে এখনও বের হয়ে যায়নি, এটা হতে সময় লাগবে। এই অর্থে ইমরানের সরকার কিছুটা থিতু হয়ে বসতে শুরু করেছে। কিন্তু মাওলানা ফজলুর রহমানসহ রাজনীতিক যারা বিরোধী দলে আছেন, বিশেষত যারা জেলে আছেন অথবা গত নির্বাচনে যারা অযোগ্য বিবেচিত হওয়াতে দাঁড়াতেই পারেননি বা পরাজিত হয়েছেন- তারা এখন খুবই খারাপ অবস্থায় আছেন। তারা নিজেদের জন্যও কিছু সুবিধার অর্থে কিছু আনুকূল্য ভাগ চাইছেন সরকারের কাছে। কিন্তু মাওলানার পক্ষের মিডিয়া ক্যাম্পেইন বা গুজব ছড়ানোর অনেক ক্ষমতা আছে বুঝা যাচ্ছে। যেমন আমাদের ইনকিলাব এসব নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে যার শিরোনামে লেখা হয়েছে এভাবেঃ “ইসলামাবাদে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা; দুশ্চিন্তায় ইমরান খান”। এটাকে “টু মাচ” ছাড়া আর কীবা বলার আছে! এখন সবকিছুই আর সবার কাছেই নিশ্চয় সবাই তা বাস্তবে বুঝতে পারছেন।  যুগান্তরের আর এক এমন ম্যানুফ্যাকচারড রিপোর্ট কোথা থেকে নিয়েছে তা বলে নাই।

যেকথায় ছিলাম আমরা যে,  বিরোধীরা এখন যে খারাপ অবস্থায় আছেন, সেটা অবশ্য ইমরানের কৃতিত্ব নয়; বিরোধীদের নিজেদের ব্যর্থতাই এর কারণ যে তারা আদালত মোকাবিলায় ব্যর্থ। তবু এরা সবাই পুনরায় অন্তত বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় তৎপর হতে চাইছেন। কিন্তু সমস্যা হল এরা নিজ মুরোদে তা নিশ্চিত করতে পারছেন না। কিন্তু তারা একটা ‘তৃতীয় পক্ষ’ – মধ্যপ্রাচ্যকে কামনা করেছেন আর তা পেয়ে গেছেন এবং নিয়েছেন; যা তাদেরকে সরকারের সাথে দর কষাকষিতে সহায়তা করতে পারে।

লক্ষণীয়, মাওলানা ফজলুর রহমানকে সামনে রেখে পিছনে নওয়াজ (PML-N) ও ভুট্টোর(PPP) দল দুটো এরা তিন দলীয় ভাবে নয় বরং মাওলানার আন্দোলনকে বাইরে থেকেই সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ এটা মূলত একা এই মাওলানার আন্দোলন। কোনো “ইসলামী” রাজনীতির যে দায়দায়িত্ব, তাতে নওয়াজ-ভুট্টোরা নিজেকে জড়াচ্ছেন না। আর মূলত ফজলুর রহমানের প্রতিই সৌদি সরকারের সমর্থন। কিন্তু যুবরাজরা কেন তাকে সমর্থন করতে আগ্রহী?

এখনকার সৌদি আরবঃ
এখনকার সৌদি আরবের বিরাট সঙ্কট কেবল রাজতন্ত্র টিকানো নয় অথবা ইরানি হুমকি থেকেই কেবল নিজের রাজত্ব বাঁচানো নয়। সঙ্কট অন্যত্র এবং তা বাস্তব ও অবজেকটিভ। মানে, যা কোন ব্যক্তি বা দেশ দায়ী নয়। যেমন বলা হচ্ছে, আগামী ২০ বছরের মধ্যে চলতি দুনিয়ায় আর ফসিল ফুয়েল [fossil fuel] বা মাটির নিচের তেল ব্যবহার করে চলতে চাইবে না বা পারবে না। বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গ্লোবাল অভিমুখ চলে যাবে যা ইতোমধ্যেই যাচ্ছে ধীরে ধীরে হলেও। সৌরবিদ্যুৎ বা ব্যাটারিচালিত যানবাহন বা ইঞ্জিন আবিষ্কার বা তা চালুর পক্ষে ব্যাপক বিনিয়োগ ঢেলে দেওয়ার ব্যাপারটা নজর করলে, এ ব্যাপারে কিছুটা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। তাই সৌদি আরব দুনিয়ায় এই মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যাবার আগেই নিজের ব্যবসা-বিনিয়োগ সব কিছুকে আর তেল বিক্রিনির্ভর নয়, অন্যান্য ব্যবসা-বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল করে স্থানান্তত করে নিতে চায়। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে পৌঁছাতে চায় বলে দেশটা বিরাট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যদিও  এটা খুবই ঝুঁকিবহুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা। বহু ইফ, নট আর বাট [if, not, but] এসবে ঢাকা প্রতি পদক্ষেপ।

প্রথম কারণ, অনেক দেরিতে এটা ‘বুড়ো বয়সে’ এসে সৌদি আরবে শুরু করা হয়েছে। যেমন সৌদিদের চেয়ে দশ ভাগের এক ভাগেরও কম পুঁজি নিয়ে, আমিরাতের দুবাই একা অন্যান্য ব্যবসায় ঢুকে গেছে গত শতক থেকেই। গত ২০০০ সাল থেকেই দুবাই এক নম্বর এয়ারলাইন্স কোম্পানি (এমিরেটস) আর বিরাট এয়ারপোর্ট (দুবাই) প্যাসেঞ্জার হাব চালু করে ফেলেছে। শেখেরা চাইলে যে তাঁরা কেবল আয়েশি জীবন কাটানোর মানুষ নয়; বড় বিনিয়োগ-ম্যানেজমেন্ট নাড়াচাড়া ও সামলানোর মালিক হতে পারে এটা তার বড় প্রমাণ। অথচ দুবাইয়ের সাথে তুলনায়, তেলভিত্তিক নয় এমন বড় প্রকল্পের কথা সৌদিরা জীবনেও ভাবে নাই। তেলবিক্রির মুনাফা তারা ব্যাঙ্কে জমা রেখে খেয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং বিনিয়োগের আগ্রহ নেয় নাই। এখন সৌদিরা একালে এসে তাদের অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ নিয়ে যেতে চাইছে। সৌদিরা এ বছর পাকিস্তানে ২০ বিলিয়ন আর ভারত প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে গেছে, যার বড় অংশ তেল শোধনাগারে।

সমস্যা আরও আছে, বাড়বাড়ন্ত। আমেরিকা এখন আর সৌদি বা পুরা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ১৯৭৩ এর হাত ধরে তেল অবরোধের পালটা পদক্ষেপ হিসাবে তৈরি কিসিঞ্জারের হাতের “আমেরিকার মিডিল-ইস্ট পলিসির” জন্ম হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যা বিখ্যাত আর আরবদের কাছে যা কুখ্যাত। ইসরায়েলকে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে শায়েস্তা করা বা চাপে রাখার কৌশল তখন থেকেই চালু হয়েছিল। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিও যার গুরুত্বপুর্ণ অংশ। আমেরিকার এগুলো সব ব্যবহার বা প্রয়োগ করার সুযোগ এখনও আগের মতই আছে। কিন্তু আমেরিকা আর সৌদি বা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। কারণ আমেরিকা এখন তেল রপ্তানিকারক দেশ, যেটা মূলত ফ্রেকিং অয়েল ( শুকনা কাদামাটির শ্লেট চাপে-তাপে পিষে ভেঙ্গে বের করা তেল)। যার একটাই ডি-মেরিট যে এর উতপাদন খরচ ৫০ ডলারের বেশি। তা সত্বেও এটাই এখন বাজারে সৌদি তেলের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বি। তবুও নিজের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে আমেরিকা এখনো কোন পরিবর্তন আনে নাই। ফলে সৌদি আরব উলটা আরও বেশি একপক্ষীয়ভাবে আমেরিকা-নির্ভরশীল হয়ে গেছে।

আসলে এটা এখন প্রমাণিত যে সৌদি আরব ইতোমধ্যে তার রাষ্ট্রের বইবার সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শত্রু  সৃষ্টি ও তাদের মোকাবিলা-নির্ভর করে নিজ নীতি সাজিয়ে চলে এসেছে। সর্বশেষ ২০১৯ সেপ্টেম্বর মাসে ইরানি ড্রোন-হামলা খেয়ে উলটা সৌদিদের দুঃস্থ অবস্থা  আরও প্রকাশ হয়ে পড়েছিল, তারা হামলা খেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া স্পষ্ট করে ফেলেছিল। সৌদি আরব নিজেকে প্রটেক্ট করতে কতটা অসহায়, আর ওদিকে তার এপর্যন্ত নেওয়া অনুসরণ করা বিদেশনীতি কতই অকেজো – এটা স্পষ্ট সবাই জেনে যায়। অস্ত্র কেনাসহ নানা উছিলায় আমেরিকাকে অর্থদান-সহ ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের দায়দেনা দেউলিয়াত্বের পিছনে অর্থব্যায় করা – সৌদি বাদশারা এতদিন কী না করেছে। অথচ কাজের সময় এগুলোর কিছুই তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ট্রান্সশ্লেটেড হয় নাই।  কাজে আসে নাই।

এছাড়াও আর একটা বড় সমস্যা হলঃ তাদের ‘রাজাগিরি’ স্বভাব। মানে,  ফিউডাল বা সামন্ততান্ত্রিক ও বোকা রাজার স্বভাব; তাই সব কিছুকে তাঁরা ভুয়া রাজকীয় ভ্যানিটিতে আঘাত পেয়েছে বলে খাশোগির মত সবকিছুই টুকরা করে কেটে ফেলার মতো সহজ মনে করে – আর এর সম্ভাবনা কিন্তু সব সময়। কাজেই তাদের রাজত্ব টিকানোর ভয়ও সব সময়। একালে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থ খরচ করে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বাড়ানোর জন্য যাতে অন্তত ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা হয়। কিন্তু সৌদিরা অর্থ খরচ করে নিজের েসব আজীব স্বভাব আর রাজত্ব রাজাগিরি টিকানোর জন্য।

তুলনায় আর এক রাজতন্ত্রী কিন্তু একেবারেই ভিন্ন ও স্মার্ট’ ব্যবসায়ী এবং উতপাদক হল কাতার রাজ পরিবার। সে ট্যাংকার-জাহাজে ভরে (গ্লোবাল সেকেন্ড হায়েস্ট রিজার্ভ আছে কাতারে) গ্যাস রফতানিতে বিরাট বিনিয়োগকারি ও হাইটেক এক উতপাদক ও ব্যবস্থাপনা তাকে সামলাতে হয়। এছাড়াও আছে অ্যালুমিনিয়াম, নিজের খনি থেকে তুলে তা থেকে অন্তত ছয় ধরনের ফিনিশড প্রোডাক্ট উৎপাদন করে রফতানি করে এমন হাইটেক বিজনেস করে চলেছে।  এসব কাজ বসে বসে তেল বেচা অর্থ ভোগ-খরচের রোয়াবি না,  রাজতান্ত্রিক মধ্যপ্রাচ্যের  রূপান্তরে – আর কী  ম্যানুফ্যাকচারিং মডেল হতে পারে – এর আরেক উদাহরণ এখন কাতার। কিন্তু সৌদি আরব যার নিজ নিরাপত্তার ঠিক নাই সে কাতারকে বোকার মত সামরিক হুমকি দিয়ে বসেছিল। মূল অভিযোগ ব্রাদারহুডকে সাহায্য ও আশ্রয়দান। আর তাতে কাতার দ্রুত তুরস্কের সাথে সামরিক চুক্তি করে তুর্কি সেনাবাহিনীর স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলেছে খোদ রাজধানী দোহা-তে। এতে কী লাভ হল সৌদিদের? এটা কেন তারা আগে বুঝে নাই? এরই নিট ফলাফল হল, শুধু ইরানই নয়; তুরস্কও সৌদি আরবের আর এক বড় সামরিক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়ে উঠল। সৌদিরা এক ইরানের ঠেলায় বাঁচে না তাতে আবার তুরস্ক!

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অর্থ না থাকুক; তবু অনেক দেশের চেয়ে পাকিস্তান অনেক বিকশিত ও উন্নত। বড় কারণ, দেশটা একটা মডার্ন রিপাবলিক। ন্যাটো সদস্য তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের এখন প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত অস্ত্র বা উপকরণ বিনিময় বেচাবিক্রিতে সম্পর্ক গভীর। এদিকে ইমরানের উদ্যোগের কারণে ইরান-পাকিস্তান অস্পষ্ট সম্পর্ককে এখন ধোয়ামোছা করার ফলে তারা খুবই ঘনিষ্ঠ। এর আগের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা ভাবতেন সৌদি রাজতান্ত্রিক দেশের ওপর নির্ভর হয়ে থাকা , মাঝে মধ্যে অনুদান নেওয়া আর প্রতিদানে ইরানকে খামাখা উপেক্ষায় ফেলে রাখা, এটাই পাকিস্তানের একমাত্র ও বেস্ট কূটনীতি। বিপরীতে ইমরান প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, তিনি ২০ বিলিয়ন সৌদি বিনিয়োগও আনতে পারেন, সাথে সৌদি অনুদানের কিছু মিলিয়ন ডলারও আনতে পারেন আবার যুবরাজ এমবিএস এর বিশেষ বন্ধু হতে পারেন। তদুপরি, ইরানের সাথে সম্পর্কের জট খুলে তাদেরও ঘনিষ্ঠ হতে পারেন। শুধু তাই নয়, এমনকি ইরান-সৌদি বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার চেষ্টাও করতে পারেন। তাহলে  পাকিস্তানের পটেনশিয়াল কী ছিল তা কি এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নওয়াজ শরিফ কিংবা অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট বেনজিরের উত্তরসূরিরা দেখতে পাচ্ছেন?
মনে হচ্ছে না! বরং তামসা হইতেছে আমাদের মাওলানা ফজলুর রহমান পোক্ত যুক্তি আর যথেষ্ট খোজ খবর ছাড়াই তার আন্দোলন থেকে  দাবি করেছেন ইমরানের আমলে নাকি পাকিস্তান বন্ধুহারা হয়ে গেছে!

একালের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরন আলাদা। এটা আর কোল্ড ওয়ারের (১৯৫৩-১৯৯১) যুগ নয়। এ কালে চীন-ভারত প্রচণ্ড বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিযোগিতা করবে আবার একই সময়ে ভিন্ন ইস্যুতে প্রচণ্ড সহযোগিতা করবে, স্থায়ী কিছু বোঝাবুঝির ভিত্তিও তৈরি করবে। সবই চলবে ইস্যুভিত্তিক, একেকটা ইস্যুতে একেক রকম কৌশল ও অবস্থান; কখনো মিত্র তো কোনটায় চরম বিরোধীতা শত্রুতা। দু’টি দেশের মধ্যে কোনো ইস্যুতে মারামারি লেগে যায় অবস্থা, আবার কোনো ইস্যুতে সহযোগিতা।

এই পটভুমিতে খুব সম্ভবত সৌদি যুবরাজের ধারণা, পাকিস্তানের ইমরানের তুরস্ক ঘনিষ্ঠতাকে একটা ছেঁটে দেয়া বা সাইজ করার জন্য একটু চেষ্টা করা যাক। কোনো চাপ সৃষ্টির সুযোগ পাওয়া যায় কি না, চেষ্টা করে দেখা যাক। মাওলানা ফজলুর রহমানকে ‘ব্যাক’ করার ফলাফল এমনটাই হয়ে যেতে পারে। এই হল সেই অনুমান। এতে যুবরাজকে ইমরানের পাল্টা যুক্তি হবে, আপনি তো আমার পাশাপাশি ভারতেও বিনিয়োগ দিয়েছেন। আবার দুবাইকে দিয়ে মোদীর ‘কাশ্মির দখল’কে সমর্থন দেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।

কাজেই এখন  যুবরাজ বা মাওলানার চাপ উপেক্ষা করে ইমরান মাথা উচা রেখেই উঠে দাঁড়াতে পারেন কিনা অথবা কতটা পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। যদিও মাওলানা ফজলুর রহমানদের খারাপভাবে  ‘হেরে যাওয়ার’ অনেক দ্রুতই সম্ভাবনা বাড়ছে।

কারণ, টাইমিং জ্ঞান। প্রথমত ইমরানের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠানোর জন্য এটা উপযুক্ত বা পরিপক্ক সময় একেবারেই নয়। না পাকিস্তান দেশের ভেতরে না আন্তর্জাতিক জগত-পরিসরে। প্রায় এবছর জুড়ে এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমেরিকার তেমন কোনো অভিযোগ-অনুযোগই নেই। আবার জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা দিয়ে এখন ইমরান যেন ‘হিরো’। মুসলমানেরা ও যারা সাধারণভাবে ন্যায়বিচারের দুনিয়ার পক্ষে, তারা সবাই ইমরান তাদের মনের কথাই বলেছেন বলে মনে করছে। এই ইমেজ কী দিয়ে মাওলানা ভাঙ্গবেন! নিজেকে ইসলামের খেদমতের লোক বলে হাজির করবেন? সেই ইসলামি রাজনীতিরইবা কোন ভাল ইমেজ কই? ইমরানের ইমেজের কাছে এখন এর রেটিং সর্বনিম্ন! এছাড়া, দেশের ভেতরে ইমরান আশা-ভরসা ও ভালো দিনের প্রতীক। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলা আর তা প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন। কিলিয়ে কাঠাল পাকানোও বোধহয় সম্ভবত তুলনায় সহজ ও সম্ভব। বিশেষ করে যখন কোনটা ‘ইসলামী’ রাজনীতি বা ইসলামি স্বার্থ তা পুরাই অস্পষ্ট। পাকিস্তানের “ইসলামিজম” পুরাই ব্যর্থ এখানে আপাতত।

সম্ভবত প্রকৃতিও বিরুদ্ধে। সমুদ্রে নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই রাস্তায় যেখানে আন্দোলনকারীরা এক তারিখ থেকে বসে আছেন, তা বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে, কতটা হানে দেখতে হবে। কর্মসূচি শেষ ঘোষণা করার আগেই এগিয়ে আসছে প্রকৃতির আক্রোশরূপী ‘বুলবুল’! কোন কিছুই মাওলানা ফেবারে নাই, মনে হচ্ছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত  ০৯ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ধাঁধাএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

গৌতম দাস

০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৪৬ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2My

 

গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় একটা ছোট নিউজ ছাপা হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল, “চীন আপাতত বাংলাদেশে কোনো নতুন প্রকল্পে আর অর্থ জোগাবে না’ [China won’t bankroll new projects for now]। কেন?

বাংলাদেশকে নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা না বলে, ভুল লাইনের রেষারেষি চলে, এটা বলাই ভাল। ব্যাপারটাকে সারকথায় বললে, “বাংলাদেশে যে সরকার আছে সেটা তো ভারতেরই” – এমন দম্ভ ভারতের মিডিয়ায় প্রায়ই প্রকাশ হতে দেখা যায়। ভারতের সরকারি পাতিনেতা বা মন্ত্রীরাও অনেক সময় এমন মন্তব্য করে থাকেন। তারা বলতে চায়, বাংলাদেশের সরকার তাদেরই বসানো। ফলে চীন কেন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ হতে চাইবে বা ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করবে – তাদের বক্তব্যের সারকথাটা আকার ইঙ্গিতে ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে এরকমই থাকে।

কিন্তু বাংলাদেশে কে ভাল বিনিয়োগের সক্ষমতা দেখিয়েছে – চীন না ভারত, কার অবকাঠামো বিনিয়োগ বেশি – এই প্রসঙ্গ এলে এবার অবশ্য আবার তারা নিজেরাই কুঁকড়ে গিয়ে বলে ভারতের তো বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তাই বাংলাদেশে আমরা চীনের কাছে হেরে যাই। তবু এমন ভারতের ন্যূনতম মুরোদ না থাকলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত চীনের সাথে সে টক্কর দিয়ে চলছে এই ভাব তাকে দেখাতেই হবে, এমনই জেদ ও গোঁয়ার্তুমি ঘটতে আমরা সবসময় দেখে থাকি। শুধু তাই নয়, ভারত চীন নিয়ে অজস্র ভুয়া বা নেতি-মিথ ছড়িয়ে রেখেছে, যার প্রবক্তা ও শিকার আমাদের ও ভারতে মিডিয়াও।

যেমন আবার ভারতকে পিছনে ফেলে চীন বাংলাদেশকে দখল করে ছেয়ে ফেলছে বা নিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে? না, চীন বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক উপস্থিত হয়ে আছে বা বিনিয়োগ করে আছে। কিন্তু ফ্যাক্টস অর্থে বাস্তবতা হল এটা একেবারেই কেবল সেদিনের ফেনোমেনা; যে চীন বাংলাদেশে ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। গত ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে আসার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের কোন উল্লেখ করার মত বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রায় ছিলই না। তাই এ কথাগুলোও পুরোপুরি ভিত্তিহীন। তবে ২০১৬ সালের আগের সেই সময়কালে বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটা কন্ট্রাক্টর বা বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে, বিনিয়োগকারি হিসাবে না। এছাড়া বাংলাদেশে চীনের অনেকগুলো প্রকল্প যেমন কয়েকটা বুড়িগঙ্গা মৈত্রী সেতু অথবা মৈত্রী অডিটোরিয়াম ধরনের ছোটখাটো বিনিয়োগ প্রকল্প এসব অনেক পুরনো। এগুলো টেনে আনলে এমন ছোট ছোট চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই আছে। কিন্তু কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বিনিয়োগকারী হিসেবে চীন ছিল না। বরং চীনা প্রেসিডেন্টের ২০১৬ সালের অক্টোবরে ঐ বাংলাদেশ সফর থেকেই ব্যাপক বিনিয়োগ আসা শুরু হয়, সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলেন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের। এ নিয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে সে সময় ভারতের এনডিটিভি-তে লাইভ-ইনহাউজ, চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে একটা টকশো ধরনের আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের ক্ষমতাসীনেরা পাতিনেতাসহ যেমন বলে থাকেন, বাংলাদেশ তো তাদেরই, এটাই মিডিয়াও শুনে আসছে। তাই যদি হয় তবে চীনা প্রেসিডেন্ট এত ঘটা করে বাংলাদেশে আসছেন এটা তারা দেখতে পাচ্ছে কেন? তাদের এই চোখ আর কানের বিবাদ মেটানো, এই বিষয়টা পরিষ্কার করা ছিল এনডিটিভির উদ্দেশ্য।

তাদের ঐ আলোচনা থেকে তাদেরই করা হতাশ উপসংহার ছিল “দিল্লি আসলে অনেক দূরে”। মানে কী? মানে, চীনের সক্ষমতার তুলনায় ভারত কোনও বিনিয়োগকারীই নয় এখনও। খোদ ভারতই যেখানে বিনিয়োগ-গ্রহীতা। কাজেই বিনিয়োগের, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের দিক থেকে বাংলাদেশে ভারত কেউ না। তাই এনিয়ে চীনের সাথে ভারত কোন তুলনার যোগ্য না। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশে সরকারকে ভোটবিহীন অর্থে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতায় থাকতে হলে ভারতের সমর্থন পাওয়া আমাদের সরকারের জন্য জরুরি এমন বুঝের ক্ষেত্রে একটা ফ্যাক্টর অবশ্যই, বলে মনে করা হয়। যদিও এটা একটা পারসেপশনই কেবল। কারণ কখনই এটা পরীক্ষা করে দেখা হয় নাই বা এই ধারণাটা চ্যালেঞ্জ করে কেউ দেখে নাই কখনও যে আদৌও ভারতের সমর্থন অনিবার্য কিনা বা কেন? তবে সেটা যাই হোক তবু ভোটারবিহীন ক্ষমতা কায়েম থাকার ইস্যুতে আবার চীন ভারতের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। অথবা চীন আগ্রহী হতে চায় এমন কখনও দেখা যায় নাই তা  বলাই বাহুল্য। অতএব ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর – সেটাই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে মিডিয়ায় ব্যাপক হইচই পড়বে হয়ত সেটা স্বাভাবিক। এ ছাড়া ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে আসা সেটাও তো কোন হাতের মোয়া নয়। চীন নিজেই সেই সফরকে “মাইলস্টোন” বলেছিল, আর তাতে বাংলাদেশে প্রো-ইন্ডিয়ান বিডিনিউজ২৪সহ আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াগুলোও সবাই অনুরণিত করেছিল যে, এটা চীনা প্রেসিডেন্টের “মাইলস্টোন” সফর। এমনটা না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। যেমন সফর শেষে ফাইনালি দেখা গেল, মোট ২৭টা প্রকল্পের জন্য প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারে চুক্তি বা এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছিল তখন।

এছাড়া আরও ঘটনা হল, সেটা আবার এখন ২০১৯ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই ফিগারটাও ছাড়িয়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে। আর তাহলে এরপর এখন?

খুব সম্ভবত, “কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে” চীন একটু দম নিতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, দম নেয়াই বলছি; অর্থাৎ সাময়িক বিরতি। মানে এটা ঠিক মুখ ফিরিয়ে নেয়া নয়। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের চীনা দূতাবাসের বাংলাদেশকে ফিরতি জবাব লেখা চিঠির বরাতে লিখেছে, “চলতি ২৫ বিলিয়ন ডলারের ২৭ প্রজেক্টের বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কিছুতে চীন এখন মন দেবে না। [It has also requested Bangladesh to concentrate more on the timely execution of existing 27 projects for which it pledged more than $25 billion.]

এছাড়া ঐ জবাবি চিঠিতে আরও জানিয়েছে, “বিগত নেয়া প্রকল্প কাজগুলোর একটা মূল্যায়ন করতে সে লম্বা সময় নেবে’। [China will take a long time to evaluate and implement the listed projects involving large amounts, said a letter sent to the external relations division of finance ministry recently] তাই বাংলাদেশ সরকার যেন আপাতত নতুন আরও কোনো প্রকল্প নিতে নতুন প্রস্তাব না পাঠায়।

আসলে ঘটনাটা শুরু হয়েছিল একটা নতুন প্রকল্পের অনুরোধ নিয়ে। আমাদের দেশের সরকার জি-টু-জি সহযোগিতার অধীনে চীনের কাছে বরিশাল-পটুয়াখালি-কুয়াকাটা চার লেনের সড়ক প্রকল্প নেয়া যায় কিনা সেই অনুরোধ করে এক প্রস্তাব পাঠালে এর জবাবে এসব চীনা প্রতিক্রিয়া বাইরে এসেছিল।

এই খবর থেকে বাংলাদেশ জুড়ে একটা কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে যে, তাহলে চীনও কী হাত গুটিয়ে নিচ্ছে? তারা কী সরকারের ওপর নাখোশ? সরকারকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে? সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে? বাংলাদেশ কী আর কোনো চীনা বিনিয়োগ কোনোদিন পাবে না? ইত্যাদি নানান অনুমানের কানাঘুষা গুজব শুরু হতে দেখা গেছে। এর সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে সেটাই এখানে আলোচনার মূল প্রসঙ্গ।

সার কথায় বললে, খুব সম্ভবত এটা নতুনভাবে নতুন নিয়ম-কানুনে চীনের আবার বিনিয়োগে বাংলাদেশে ফিরে আসার পূর্বপ্রস্তুতি নেয়ার কালপর্ব। এ কারণে এটা সাময়িক বিরতি। যে ধরনের সম্পর্ক কাঠামো বা চুক্তি-কাঠামোর মধ্যে চীন এতদিন অবকাঠামো বিনিয়োগ করে এসেছে, তাকে আরো স্বচ্ছ করে নিতেই সম্ভবত চলতি বিরতি এটা। আর এই ঢেলে সাজানোটা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, এটা যেকোনো দেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগের বেলায় নেয়া এমন পরিবর্তন হাওয়া বইবার কথা।
আমাদের এই সম্ভাব্য অনুমান যদি সঠিক হয় তবে আমাদের কথা শুরু হতে হবে ‘জিটুজি’ থেকে। জিটুজি মানে ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ বা সরকারের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি। কী নিয়ে বুঝাবুঝি?

জিটুজি ও কনসালটেন্টঃ
চীনের সাথে নেয়া বাংলাদেশের বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্প এগুলো আসলে জিটুজির অধীনে নেয়া। যার সোজা অর্থ হল, কোন প্রকল্প নির্মাণে কত মূল্য বা খরচ পড়বে তা নির্ধারণ নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডার এখানে হবে না, তাই সবার জন্য কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ডাকা আর সেখান থেকে সে মূল্য যাচাই করে নেয়া হবে না। কিন্তু এমন টেন্ডারবিহীনতাকে আইনে বাঁচাতে এখানে ‘সরকারের সাথে সরকারের চুক্তি’ হয়েছে বলে এই উসিলায় ‘খরচের কাহিনী’ আন্ডারস্টান্ডিং করে নির্ধারিত হয়েছে বলা হবে। এটা চীনা বিনিয়োগের অস্বচ্ছ দিক নিঃসন্দেহে; এক কথায় উন্মুক্ত টেন্ডার না হওয়া যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই একটা কালো দিক, তা বলাই বাহুল্য।
এছাড়া আর একটা দিক। যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ওর টেকনিক্যাল দিক থেকে ঐ প্রকল্প ব্লু-প্রিন্ট মোতাবেক ঠিক ঠিক নির্মিত হয়েছে কি না, তা নির্মাণ কোম্পানি সম্পন্ন করেছে কি না তা প্রকল্প-গ্রহীতা মানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে এক আলাদা কনসালটেন্ট কোম্পানি। মানে সরকার একাজে আলাদা একটা ইঞ্জিয়ারিং কনসালটেন্ট কোম্পানিকে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এটা প্রকল্পে স্বচ্ছতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকল্প-গ্রহীতা রাষ্ট্র নিজস্বার্থে প্রকল্প বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে সাধারণত এক বিদেশী কনসালটেন্ট কোম্পানিকে দিয়ে। যেমন বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প যমুনা সেতুর বেলায় তাই দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু এর আবার এক খারাপ দিক আছে। এই কনসালটেন্ট কোম্পানিই হয়ে দাঁড়ায় ঘুষের অর্থ সরানোর উপায় কোম্পানি। নির্মাণ কন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে ঘুষের অর্থ নিয়ে সরকার বা সরকারের লোকের কাছে পৌঁছে দেয়ার কোম্পানি। কারণ কাজের বিল ছাড় করতে অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে ঐ কনসালট্যান্ট কোম্পানির হাতে।
কিন্তু চীনা জিটুজির বেলায় চীন কোন কনসালট্যান্ট রাখা পছন্দ করে না। তবে, প্রকল্পের খরচে না হলেও গ্রহীতা-রাষ্ট্র চাইলে নিজ আলাদা খরচ করে  সমান্তরালভাবে কোনো কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে প্রকল্পে নিয়োগ দিতে পারে। এটা সে অনুমোদন করে। তাহলে কী চীন বিশ্বব্যাংকের নিয়মের চেয়ে স্বচ্ছ দাতা? যেহেতু এখানে কনসালটেন্ট কোন কোম্পানিই রাখে না?

না, সেটা একেবারেই নয়। কারণ বিশ্বব্যাংকের বেলায় প্রথমত তো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া কাজ দেয়ার নিয়মই নেই। আর টেন্ডারে কাজ দেবার পর সেখানে এক বিদেশি কনসালটেন্ট কোম্পানিও বিশ্বব্যাংকের নিয়মে নিয়োগ পায়! যদিও ঘুষের সুযোগ থাকে সেখানে। কানাডার লাভালিন তেমনই এক কোম্পানি ছিল।  তাহলে?
আসলে চীন বলতে চায় যেহেতু এটা জিটুজি, ফলে সরকারই অন্য সরকারকে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারে। তাহলে কনসালটেন্টের আর প্রয়োজন কী? কিন্তু তাহলে এক্ষেত্রে কী ঘুষের ব্যাপার নাই? বা থাকলে ঘুষের অর্থ স্থানান্তরের প্রতিষ্ঠান কে হয়? সহজ উত্তর, চীনা নির্মাণ কোম্পানির এক স্থানীয় বাংলাদেশী এজেন্ট কোম্পানি থাকতে দেখা যায়। সাধারণত এটাই সেই অর্থ স্থানান্তরের কোম্পানি হয়ে থাকে।
অন্যদিকে আবার কনসালট্যান্ট কোম্পানি রেখেই বা লাভ কী হয়? সে প্রশ্নও ভ্যালিড। কারণ, যমুনা সেতু নির্মাণের ১০ বছরের মাথায় কিছু ফাটল বা নিচের বেয়ারিং বদলের প্রয়োজন দেখা গিয়েছিল। এর দায় কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে নিতে দেখা যায়নি। এ কথাটাও তো সত্যই। তাই সার কথাটা হল, কনসালটেন্ট সম্পর্কিত একটা অস্বচ্ছতা থেকেই যায় সবখানে। এছাড়া টেন্ডার না হওয়াতেও প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল্য ইচ্ছামত সাজিয়ে নিবার অভিযোগ সামলানোর কোন উপায় এখানে থাকে না। তাই জিটুজি তুলনামুলক একটা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থা।

ঋণের ফাঁদঃ
এদিকে ইতোমধ্যে গত দুই বছর ধরে চীনবিরোধী বিশেষ করে গত বছর আমেরিকান সরকারি উদ্যোগে কিছু একাডেমিককে দিয়ে একটা প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল, যার সার বক্তব্য হল যে, বিভিন্ন দেশে চীনের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ-ঋণ দেওয়ার নামে চীন “ঋণের ফাঁদ’ তৈরি করছে ও ঋণগ্রহীতা দেশকে এতে ফেলছে। এ নিয়ে চীনবিরোধী ব্যাপক ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছিল।

পশ্চিমা ঋণ মানে মূলত সিংহভাগ যার আমেরিকান অবকাঠামো-ঋণ, তা রাষ্ট্র নিজে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করে, দুনিয়াজুড়ে এটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠেছিল। কম কথায় বললে, আগে কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো বিশ্বযুদ্ধের শেষে মুক্ত-স্বাধীন দেশ হতে হয়েছে; এরপরই বিশ্বযুদ্ধের শেষেই কেবল খোদ বিশ্বব্যাংকেরই জন্ম হতে হয়েছে। আর এরও পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো তারা বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে শেষে লোন নেয়া শুরু করেছিল। এ কারণে সবটাই বিশ্বযুদ্ধের পরের ফেনোমেনা। তাও আবার আরো কাহিনী আছে। জাপান বাদে যে এশিয়া, এর বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল অন্তত আরও ২০ বছর পরে। এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক – সেটা ষাটের দশকের আগে একেবারেই আসে নাই। অর্থাৎ ১৯৪৫ সাল থেকে পুরো ষাটের দশক পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপ ও এদিকে একমাত্র জাপানকে পুনর্গঠনে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ দিয়ে সাহায্য করেছিল। যার চিহ্ন হিসেবে সেই থেকে “রি-কনস্ট্রাকশন” শব্দটা বিশ্বব্যাংকের নামের সাথে জড়িয়ে যায়; এভাবে “ব্যাংক অব রি-কন্সট্রাকশন এন্ড ডেভেলবমেন্ট”। আর সেই বিনিয়োগ যা সেকালে আমেরিকান ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত ছিল, তা ইউরোপে  বিনিয়োগ ঢেলে স্যাচুরেটেড কানায় কানায় ভর্তি হয়ে উপচিয়ে না পড়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক ইউরোপ আর জাপান থেকে সরেনি, এশিয়াতেও আসেনি। বরং এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক পুরোদমে ঋণ দিতে শুরু করেছিল ১৯৭৩ সালের পর থেকে। ততদিনে আবার বিশ্বব্যাংক প্রথম ম্যান্ডেট (যেটা হল, সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে তবেই সমতুল্য মুদ্রা ছাপানো শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা) অকার্যকর হয়ে গেছিল ও এই পরাজয় সামলাতে পরে ১৯৭৩ সালে নতুন ম্যান্ডেটে বিশ্বব্যাংকের পুনর্জন্ম হয়েছিল। আর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রথম তৎপরতায় এসেছিল ১৯৭৫ সালের শেষভাগে। তবুও সেই থেকে বাংলাদেশে গত ৪৫ বছরে বিশ্বব্যাংক যে মোট ঋণ দিয়েছে তা গত তিন বছরে চীন একা যে অবকাঠামো ঋণ দিয়েছে তার চেয়েও কম। মূল কথা, বিশ্বব্যাংকের মোট সামর্থ্যরে চেয়ে চীনা সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু এতদিনে বিশ্বব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পেশাদারিতে ও ইন্ট্রিগিটিতে নিজেকে যতটা তুলনামূলক বেশকিছুটা স্বচ্ছ করতে সক্ষম হয়েছে, আর এই বিচারে আবার চীন অনেক পেছনে আছে, একথা মানতে হবে।

যদিও এ ব্যাপারে অবশ্য চীনের কিছু পাল্টা যুক্তি ও শেল্টার আছে।
কোনো দেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা ও সেই নির্মাণকাজ ধরা প্রসঙ্গে চীনের যুক্তিটা অনেকটা এরকম যে গ্রহীতা রাষ্ট্র-সরকার চোর হলে আমরা ওর সহযোগী হয়ে যাই ও বেশ করে ঘুষের ব্যবস্থা করে দেই। আবার তারা যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার সরকার হয় সে ক্ষেত্রেও আমরা তার সহযোগীই হয়ে যাই। যার বাংলা মানে হল, আমরা ঘুষ না দেয়ার কারণে কাজ হারাতে চাই না।

এছাড়াও চীন বলতে চায় (বুর্জোয়া) আমেরিকার চেয়ে তবু আমরা ভাল। কারণ ঐ ঋণগ্রহীতা দেশে ক্ষমতায় কে আসবে বসবে তা নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। দেখাই না। কিন্তু আমেরিকার ষোল আনা আছে। আমরা বরং এসবক্ষেত্রে আমেরিকার কাছে নিশ্চয়তা নিয়ে নেই যে, তার পছন্দে নির্ধারিত হবু যেকোনো সরকার যেন আমার অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে দেয়। তাহলে আমেরিকা সরকার বানাতে সেদেশ কী করছে এটা নিয়ে আমরা আর মাথাব্যাথা দেখাই না। চীন আসলে বলতে চায়, চীনের অর্থনীতির উত্থান ও বিকাশের এই পর্যায়ে তৃতীয় দেশে সরকারকে প্রভাবিত করতে আপাতত আমেরিকার সাথে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না জড়ানোর নীতিতে চলে চীন। এটাই চীনের আপাতত অবস্থান ও কৌশল।

কিন্তু উত্থিত অর্থনীতির চীনের বিরুদ্ধে বাস্তব এমন পরিস্থিতিতে, শুরু থেকেই বিশেষত একালে “চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প” নিয়ে হাজির হওয়ার পর  তবুও আমেরিকার পক্ষে আর বসে থাকা সম্ভব হয়নি। আমেরিকা চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে, নিজের গ্লোবাল নেতৃত্বকে চীনের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিরোধ দেখিয়েছিল চীনের বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ [AIIB] ব্যাংকের জন্মের সময় থেকে। এক কথায় দিন কে দিন আমেরিকা স্পষ্ট জানছিল যে, সত্তর বছর ধরে তার পকেটে থাকা গ্লোবাল নেতৃত্ব এটা চীন কেড়ে নিতে চ্যালেঞ্জ করতে উঠে আসছে। আর তাতে আমেরিকা ২০০৯ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, চীনের এই উত্থানকে আমেরিকা নিজের পাশাপাশি সমান্তরালে উঠতে বা চলতে দিতে চায় না। বরং যতদূর ও যতদিন পারে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে – এই নীতি নিয়েছিল। এই নীতিরই এক সর্বশেষ অংশ হল চীন ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলতে চাচ্ছে, এই ক্যাম্পেইন শুরু করা।

এই ক্যাম্পেইনে আমেরিকা যা প্রচার করতে চায় তা হল, প্রথমত, চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলা যে, চীন দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে আসেনি। বরং ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলে চাপ দিয়ে লুটপাট, মুনাফা লাভালাভ এই বাড়তি সুবিধা নেয়া আর অর্থ কামানো, যেন এটাই চীনের ব্যবসা। এমন একটা প্রচারণার আবহ তৈরি করেছে আমেরিকা যেটা ডাহা ভিত্তিহীন ক্যাম্পেইন। এমনকি সত্তর-আশির দশকের বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেও যেসব অভিযোগ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা করত এটা তাঁর তুল্য নয়। যেমন অভিযোগ করত যে, ঋণের অর্থ বিশ্বব্যাংক অপচয় বা নিজের কর্মীদের সে অর্থ পকেটে ভরা অথবা কনসালট্যান্টের নামেই ঋণের অর্ধেক টাকা মেরে দেয়া বা ফিরিয়ে নেয়ার অভিযোগ ইত্যাদি। অবশ্য যারা এই অভিযোগ তুলত এদের জানাই নেই যে, কনসালটেন্সিতে দাবি করা অর্থ মোট প্রকল্পের পাঁচ শতাংশের বেশি দেখানোও প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব। তবু এসব অভিযোগ চালু ছিল, আর তাতে যতটুকু বাস্তবতা ছিল, একালে চীনবিরোধী এই ক্যাম্পেইনে তাও নেই। তবে আবার চীনের বিরুদ্ধে কোনই অভিযোগই নেই, সে কথাও মিথ্যা। ঠিক যেমন বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এ কথাও ডাহা মিথ্যা।

প্রথমত কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়াই তথাকথিত জিটুজিতে প্রকল্প নেয়া, এটাই তো চীনা প্রকল্পের সবচেয়ে কালো আর বড় অগ্রহণযোগ্য দিক। যা চূড়ান্তভাবে অস্বচ্ছ। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক অন্তত নব্বুইয়ের দশকের শেষ থেকে সতর্ক ও সংশোধিত হয়েছে। কঠোর ইন্ট্রিগিটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও তা দিয়ে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া এখন নিয়ম হল যে, অবকাঠামো ঋণের দাতা যে দেশই হোক না কেন, তাতে ওই প্রকল্পের কাজ সেকারণে দাতাদেশকেই টেন্ডারে পাইয়ে দিতে এমন কোন সম্ভাবনা নাই। বরং বিশ্বাসযোগ্য খোলা টেন্ডার হতে হবে – বিশ্বব্যাংক যেখানে ইতোমধ্যেই এই নীতিতে পরিচালিত [যমুনা সেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা ছিল জাপান। কিন্তু জাপান এই সেতু প্রকল্পে কোন নির্মাণ কাজ পায় পাই।] , চীনা ঋণ নীতি এখনো এই মান অর্জন করতে পারেনি। কাজেই  টেন্ডার-ছাড়া কাজ পাওয়া এই চীনা অবস্থান গ্রহণযোগ্য হতেই পারে না।
তবে চীনের ক্ষেত্রে আবার এ কথাও সত্য যে, ঋণগ্রহীতা দেশ ঋণ-পরিশোধের সমস্যায় পড়ে যায় এমন বেশি ঋণ যদি হয়েও যায়, তবে চীন তা গ্রহীতা দেশের ঘটিবাটি সম্পত্তি বেঁধে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়, তা-ও কখনোই ঘটেনি। বরং পুরা বিষয়টাই পুনর্মূল্যায়ন করে – সুদ কমিয়ে দেয়া বা পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেয়া থেকে শুরু করে এক কথায় যেকোনো রি-নিগোশিয়েশনের সুযোগ এ পর্যন্ত সব দেশের ক্ষেত্রেই চীন দিয়েছে। যেমন মালয়েশিয়া বা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আমরা তাই দেখেছি। আর শ্রীলঙ্কার বন্দর নির্মাণের ঋণ পরিশোধের জটিলতার যেটা নিয়ে চীনা “ঋণের ফাঁদ” হিসাবে একে সবচেয়ে বড় উদাহরণ বলে ক্যাম্পেইন করা হয় তা মূলত শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির খেয়াখেয়ি থেকে উঠে এসেছে। নিজের মাজায় জোর নেই এমন শ্রীলঙ্কার একটা রাজনৈতিক দলকে বাগে এনে ভারত তাকে কাছে টেনে উসকানি দেয়া থেকে এটা তৈরি হয়েছে। যার কারণে অনেক বাড়তি সমস্যা উঠে এসেছিল। বন্দর তৈরি হয়ে যাওয়ার পরও তা চালু করা যায়নি। পরের পাঁচ বছর এটা অকেজো ফেলে রাখা হয়েছিল ও এতে আয়হীন ঋণের দায় আরো বাড়ছিল। তাই বলে আবার চীন ওই বন্দর নির্মাণ ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছিল এমন কোনো ব্যাপার সেখানে ছিলই না। কিন্তু  তারা নিজেরাই দুই দলের টানাটানি সামলাতে না পেরে নির্মিত এই বন্দরের মালিকানা শ্রীলঙ্কা নিতে অপারগ বলে চীনকে  জানালে চীন এক প্রস্তাব দেয়। যে ঐ বন্দর নিজে অপারেট করে চালিয়ে আয় তুলে আনার কোম্পানি হিসেবে চীন বাধ্য হয়ে অন্য এক চীনা কোম্পানি সামনে এনেছিল।  ঐ কোম্পানি পুরাটাই দায় নিতে চেয়েছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকার বন্দরের ৭০% মালিকানা কিনে নিতে দিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার সরকারের ঋণের দায় মুক্তি ঘটেছিল।  ব্যাপারটা আসলে ফয়সালা হয়েছিল এভাবে যে বন্দর নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার কোন ঋণ নাই। কারণ বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। আর শ্রীলঙ্কায় চীনা ঐ কোম্পানীর একটা সম্পত্তি আছে – সেটা হল ঐ বন্দর। আর এর পরিচালনা ও নিরাপত্তার ভার কেবল শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীই নিবে [চীনা নৌবাহিনী নিবে বলে প্রপাগান্ডা করা হয়েছিল], এটাই বাস্তবায়ন হয়েছিল।

ঋণের ফাঁদ – এই বিতর্কে আবার আর এক গুরুত্বপুর্ণ দিক হলঃ  প্রথমত, কোনো রাষ্ট্রে ‘অতিরিক্ত ঋণ” নিয়েছে – এটা বুঝাবুঝি ভিত্তি বা ক্রাইটিরিয়া কী?  এই তর্কের ভিত্তি কী তা কোনো দিনই সাব্যস্ত করা যায়নি যা, দিয়ে বুঝা যাবে অতিরিক্ত ঋণ নেয়া বা গছানো হয়েছে?  যে সব যুক্তি আমেরিকান প্রপাগান্ডার একাদেমিকেরা তুলেছেন তা হল ঋণ জিডিপির অনুপাত।  কিন্তু  নেয়া-ঋণ, জিডিপির কত পার্সেন্ট হয়ে গেলে সেটা অতিরিক্ত ঋণ বলে গণ্য হবে এর সর্ব-গ্রহণযোগ্য নির্ণায়ক কোথায়? তা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে কিস্তি না দিলে টুঁটি চেপে ধরতে হবে, চীনের এমন কোনো নীতিই নেই। কোন উদাহরণ নাই। আবার এই নীতি মানলে ভুটানে ভারতের বিনিয়োগও একই দোষে দুষ্ট। মানে ভুটানে ভারতও ঋণের “ফাঁদ পেতেছে” – এই একই যুক্তিতে অভিযোগ উঠানো যাবে, এর কী হবে?

আসলে কোন নেয়া-ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি, কিন্তু সাথে পরিশোধের সক্ষমতাও যদি বেশি হয় – অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি ভাল থাকে তাহলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও হারও কোনই সমস্যা নয়। আসলে কোন বড় প্রকল্প নেয়ার পরেই ওর ইকোনমিক ভায়াবিলিটি বা ফিজিবিলিটি টেস্ট করে নেয়া মানে সুনির্দিষ্ট ঐ দেশের ঐ সময়ের অর্থনীতি ঋণ পরিশোধের জন্য যোগ্য কিনা – এনিয়ে একটা স্টাডি করে নিলেই সব বিতর্কের মীমাংসা হয়ে যায়। যমুনা সেতুর বেলায় এই টেস্ট করা হয়েছিল আর তাতে পাস করেছিলাম আমরা। আবার বাস্তবে যমুনা সেতুর ঋণ পরিশোধের হার (যেহেতু এই সেতুর ব্যবহার অনুমিতের চেয়ে বেশি মানে ট্রাফিক বেশি, তাই টোল আদায় বেশি) অনুমিত হারের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই ঋণ যদি অনেক বেশিও হয় তাহলেই চীন “ঋণের ফাঁদ” পেতেছে এটা যেমন মিথ্যা, তেমনি আবার চীনের অবকাঠামো ঋণ নীতি সব স্বচ্ছ; তাও একেবারেই সত্যি নয়। এমনকি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীন আপটুডেট এখনকার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে, তাও সত্যি নয়।

সার কথায়, আমেরিকার এসব তৎপরতা নেতিবাচক ও চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা। আর ভারতও সুযোগ বুঝে এতে সামিল হয়েছে আর নিজের মিডিয়ায় এসবের প্রগান্ডায় ভরিয়ে ফেলেছে। এমনকি আমাদের প্রথম আলোও নিজস্ব কোন বাছবিচার বা ক্রিটিক্যাল অবস্থান না নেয়া ছাড়াই ভারতের মিডিয়ার খবর অনুবাদ করে ছাপাচ্ছে। ইদানীং অবশ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, হঠাৎ এমন প্রপাগান্ডায় ভাটা পড়েছে। হতে পারে প্রপাগান্ডাকারীদের সাথে আমেরিকার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে!

ইইউ চীনের বেস্ট বন্ধুঃ প্রপাগান্ডা করে খাওয়ার দিন যে শেষ করে দিবে
সেটা যাই হোক, আমরা আরও ইতিবাচক জায়গায় ইতোমধ্যে পৌছে গেছি। আসলে নতুন অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। ব্যাপ্যারটা হল, এই বিতর্ক বা প্রপাগান্ডাকে মেরে ফেলতে সক্ষম এমন নতুন এক স্টেজ তৈরি হয়ে গেছে। সেই আসরের প্রধান ইতিবাচক নেতা ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর এর সূত্রপাত, চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে চীন সারা ইউরোপকে সাথী হিসেবে পেতে যাচ্ছে – নতুন এই বাস্তবতা এখান থেকে। অথবা কথাটা উল্টা করে বলা যায়, চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পের ইউরোপে বিস্তৃতিকে ইইউ নিজের জন্য বিরাট সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছে ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর ঠিক এ কারণে আমেরিকার যেমন অবস্থান হলো চীনকে কোনো সহযোগী স্থান না দেয়া, চীনের সাথে কোন সহযোগিতা নয়। চীনের সাথে মিলে কোন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা নয় বরং চীনের স্ট্যান্ডার্ড নাই বলে অভিযোগ তুলে নাকচ করে চীনকে কোণঠাসা করা। ঠিক এরই বিপরীতে ইইউয়ের অবস্থান হলঃ চীনকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে উঠে আসতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সেই স্ট্যান্ডার্ড যৌথভাবে আরো উঁচুতে উপরে উঠাতে ভূমিকা নিতে হবে। আর এই শর্তেই কেবল বেল্ট-রোডসহ চীনকে আপন করে নিতে হবে।

এ ব্যাপারে গত ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল  চীন-ইইউ যৌথ সম্মেলনসহ ঘটনা অনেক দূর এগিয়ে কাজে নেমে গেছে। আর ঐ দিনই একমতের করণীয় নিয়ে এক যৌথ ঘোষণাও ফুল টেক্সট এখানে প্রকাশিত হয়ে গেছে। যদিও অবকাঠামো ঋণদানসহ অর্থনৈতিক তৎপরতায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি কথাটা শুনতে যত সহজ মনে হয়, ব্যাপারটা ততই সহজ-সরল নয়।
মূল কারণ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কথাটা বলা মানেই আপনা থেকেই উঠে আসবে জাতিসংঘের কথা। জাতিসংঘের ঘোষণা, জাতিসংঘের চার্টার, নানান আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন  – এককথায় অধিকারবিষয়ক সবকিছুই। মূল কারণ জাতিসংঘ দাঁড়িয়ে আছে ‘অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ – এরই একটা সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে।

কিন্তু তাতে সমস্যা কী?
সমস্যা বিরাট। মৌলিক সমস্যাটা হল কমিউনিস্ট রাজনীতি অধিকারভিত্তিক রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা নয়। যদিও জাতিসঙ্ঘের পাঁচ ভেটোওয়ালা রাষ্ট্রের দুটাই কমিউনিস্ট। অন্তত চীন ও রাশিয়া কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের রাষ্ট্র। যার সোজা অর্থ হল ‘অধিকারের রাষ্ট্র’ কথাটায় কমিউনিস্টদের ‘ঈমান’ কম। অধিকারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি এটা কমিউনিস্টদের রাজনীতি নয়, কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক এজেন্ডাও নয়। অথচ কমিউনিস্টরাও বহাল তবিয়তেই জাতিসঙ্ঘে সক্রিয় আছে। কিন্তু জাতিসংঘের যেসব জায়গায় অধিকারবিষয়ক নীতি বা কথাবার্তায় প্রাবল্য আছে, সেসব সেকশন বা বিভাগ অথবা ইউএন- হিউম্যান রাইট ধরণের উপ-সংগঠনে কমিউনিস্টরা তেমন অংশ নেয় না বা পাশ কাটিয়ে চলে। কখনও আড়ালে টিটকারীও দেয়। এগুলো এতদিনের রেওয়াজের কথা বলছি।
কিন্তু আমরা যদি এ নিয়ে চীন-ইইউয়ের যৌথ ঘোষণা পাঠ করি, তাহলে বুঝব ঘটনা আর সে জায়গায় নেই। পানি অনেকদূর গড়িয়েছে। উল্টা এই প্রথম যৌথ ঘোষণায় জাতিসঙ্ঘের অধিকারবিষয়ক ভিত্তিগুলোর রেফারেন্স উল্লেখ করে বলা হয়েছে চীন ও ইইউ এগুলোকে মেনে চলে ও ভিত্তি মনে করে – একমতের সাথে। এমনকি বলা হয়েছে, এখন থেকে প্রতি বছর চীন ও ইইউ জাতিসংঘের মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝি বাড়াতে ও একমত হতে আলাদা করে নিজেদের যৌথ সেশনের আয়োজন করবে।

আরও অগ্রগতিঃ
এমনকি চীন-ইইউ ঐ সম্মেলনের পরে এ বছরের চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনেও [২৭ এপ্রিল ২০১৯] যে যৌথ ঘোষণা গ্রহীত হয়েছে সেই যৌথ ঘোষণাও আসলে চীনা-ইইউয়ের আগের যৌথ ঘোষণার ছাপে তৈরি করা।

এই সবগুলো অভিমুখ বিচারে, বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগে বিরতি এবং চীনা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের কথা যেগুলো শোনা যাচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হল চীন অভ্যন্তরীণভাবে অবকাঠামোতে ঋণদান বা বিনিয়োগ নীতি বদলাচ্ছে। এরই ছাপ এখানে পড়ছে বলে অনুমান করা আশা করি ভুল হবে না। লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট! চীন আবার আরও স্বচ্ছ নীতিতে অবকাঠামো ঋণ দিতে এগিয়ে আসবেই। এসব তারই পুর্বপ্রস্তুতি!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত  – এর ১৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে পদার্পন উপলক্ষে গত  ২৭ অক্টোবর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে বাংলাদেশে কেন স্থগিত হলো চীনা ঋণ!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ ফেলে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারী ইসকন

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

Last updated: OCT 28, 2019 @ 23:01:35

https://wp.me/p1sCvy-2LG

 

 

ঢাকায় ইসকনের একটি মিছিল

Ratha Yatra In Dhaka City By Shamibag Iskcon Temple 2017

ইসকন এখন বাংলাদেশে নানান জল্পনা-কল্পনায় প্রবল আলোচ্য বিষয়। এরই মাঝে বাংলাদেশের ২৪ অক্টোবর সকালটা শুরু হয়েছে আনন্দবাজারে প্রকাশিত ইসকন নিয়ে গুজবের গল্প পাঠ করে। গুজব বলছি কারণ যে খবরের সোর্স বা উৎসের ঠিকঠিকানা নাই, এই অর্থে। মানে, আবার সেই কোনো মিডিয়ার পেজ-বিক্রি, যেখানে এবারের মিডিয়া হল কলকাতার আনন্দবাজার, আর পত্রিকার পাতার ক্রেতা হল ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ। কথিত বেনামি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতের নামে বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন গল্প ছড়ানো হয়েছে সেখান থেকে।

এবারের গল্পটা দেখে  বিগত ২০১৪ সালের শেষভাগে কথিত “বর্ধমান জেএমবি বোমার গল্পটার” কথা মনে পড়ে যেতে পারে অনেকের। তখন মোদী কেবল প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছেন (মে ২০১৪), এর প্রায় ছয় মাসের মধ্যকার গল্প। অভিযোগের ফোকাস ছিল, কথিত মমতা-সারদা-জামায়াত-জেএমবি চক্র। আর ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্ট বর্ধমান জেলা। অমিত শাহ খুঁটি গেড়ে কলকাতায় বসে গিয়েছেন। সারদা মানে হল, প্রায় আমাদের দেশের মতই “ডেসটিনি” নামের প্রতিষ্ঠানের পাবলিকের টাকা মেরে ফেরার হয়ে যাওয়ার মত এক ঘটনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম।  তবে বাড়তি হল, এখানে অভিযোগ সাজানো হয়েছিল যে কথিত সারদার টাকা এসেছিল ঐ বোমা হামলার জন্য” বলে অমিত শাহ অভিযোগ তুলেছিলেন। আর পুরা ঘটনায় অমিত শাহের টার্গেট ২০১৬ কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে মমতার তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে পরাজয় ঘটানো, নির্মুল করা। তাই জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলা।  কলকাতার মুসলমানদের এক নেতাকে রাজ্যসভায় মমতার দলের নমিনেশন দেয়া থেকে জ্বলে উঠে এই প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল। কলকাতার মুসলমানেরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে, মমতা তাদের তোষামোদ করছেন ইত্যাদি এই সার অভিযোগ তুলে পরের ২০১৬ সালের রাজ্য সরকার ভোটের কথা মনে রেখে কলকাতার হিন্দু ভোটারদের মনে উস্কানি তৈরি করা। এই ছিল মূল ঘটনা। এমনকি একপর্যায়ে কলকাতার সিপিএম দলও এই একই অভিযোগের বয়ানের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশ-জামায়াত-মুসলমান ও জঙ্গিবাদের অভিযোগ তুলে মমতাকে দায়ী করে  কলকাতার ব্রিগেডের মাঠে জনসভায় বক্তৃতা করেছিল।

অভিযোগের প্রপাগান্ডা ডালি সাজিয়ে ভারতে বলা হয়েছিল, এটা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের খবর। আবার পরে একই গুজব বাংলাদেশে প্রচার করা হয়েছিল এটা ভারতের গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া খবর বলে। আর বাংলাদেশে তাতে শামিল হয়েছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির খালেদ মহিউদ্দিন [যিনি এখন জার্মানিতে বসে উলটা সরকারের বিরুদ্ধে ভোকাল হওয়ার চেষ্টা করছেন], চ্যানেল আই এমনকি প্রথম আলো ইত্যাদি অনেক মিডিয়া। সেকালের মোদীর ভারতের নতুন সংসদে এ নিয়ে ঝড় তোলা হয়েছিল। আর, গায়ক নতুন প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের অভিযোগের ডালি সাজিয়ে বসা আর সর্বশেষ কলকাতায় অমিত শাহের জনসভায় (০১ ডিসেম্বর ২০১৪) মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর আক্রমণের ডালি তুলে ধরা, সবই ঘটেছিল। কিন্তু এরপর হঠাৎ সব ফুস, বেলুন চুপসে যায়।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটা পারসোনাল বিভাগ বা বাংলায় আমরা বলি সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিসের “আপন বিভাগ” আছে। আমাদের বেলায় এই বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্বাবধানে আর ভারতের বেলায় এর মাঝে আছেন এক প্রতিমন্ত্রী। ঘটনাওগুলোর অনেক কিছু স্মৃতি থেকে লিখা হল। তবে এখন হাতের কাছে একটা ভিডিও রিপোর্ট পাওয়া গেল। এনডিটিভির। তাতে দেখা যাচ্ছে মোদীর অফিসের ঐ প্রতিমন্ত্রীর নাম ছিল জিতেন্দ্র সিং। তাকে দিয়ে হঠাৎ এক বিবৃতির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যার সারকথা ছিল যে আপাতত ওই বর্ধমান মামলা স্থগিত রাখা হচ্ছে, আরো তদন্তের পরে ভবিষ্যতে এটা আবার দেখা যাবে। [Three days after Amit Shah, the president of the BJP, alleged in Bengal that funds involved in the Saradha scam were used for terror, the government appears to have contradicted him] ইতোমধ্যে অমিত শাহ কলকাতা ত্যাগ করেন কারণ জীতেন্দ্র সিং-ই অমিত শাহের দাবির বিরোধিতা করে সংসদে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তবে বাবুল সুপ্রিয়ই সবচেয়ে বেকুব হয়েছিলেন। ধরা খেয়ে বেকুব হয়ে তিনি কী বলেছিলেন সেটাও এনডিটিভিও ভিডিও ক্লিপে পাওয়া যাবে।  কারণ, তার ভুয়া অভিযোগ-আক্রমণই ছিল সবার শেষে মানে প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্রের ঘোষণা ঠিক আগে। কিন্তু কেন হঠাৎ পশ্চাৎপসারণ? খুব সম্ভবত কোনও কারণে বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে লড়বার নির্বাচনী কৌশল বদল করেছিল তাই। তবে এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, পরবর্তীকালে ঐ ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে মমতা আগেরবারের চেয়ে বেশি, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় দ্বিতীয়বার ফিরে এসেছিলেন। সেই ২০১৪ সাল থেকে আজও আর কখনো সেই জঙ্গিবাদের গল্প আর ঝাঁপি খোলেনি।

অতএব সাধু সাবধান। এসব পেজ বিক্রির আনন্দবাজারি গল্প আমাদের কাছে আবার আনা কি ঠিক হলো? যদিও এবারের ঘটনা মোদীর গুরু প্রতিষ্ঠান আরএসএসের ষ্ট্রাটেজিক ও ধর্মীয় সংগঠন “ইসকন”-কে নিয়ে। অনুমান করি, বাংলাদেশে লিগ্যাল স্ট্যাটাসের দিক থেকে ইসকন এক বিদেশী এনজিও হিসেবে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড ও তৎপর। আর বাংলাদেশের এখনকার মাঠের বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে ইসকন সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে, আধা সত্য-আধা গুজবে মাখামাখিতে ইসকন এক খুবই খারাপ ইমেজ নিয়ে হাজির; যা বাংলাদেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর এই ধারণায় ভরপুর হয়ে উঠছে ক্রমাগত ও দ্রুতগতিতে। সবচেয়ে বড় কথা ইসকনের এই ষড়যন্ত্রকারি ইমেজ এটা খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে, যা যেকোন সময় সামাজিক দাঙ্গা লাগিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে হাজির হওয়ার জন্য খুবই পটেনশিয়াল।

এই পটেনশিয়াল দিকটার কথা যদি মনে রাখি, তবে ভারতের বা কলকাতার এই গুজবের গল্প ছড়ানো খুবই অবিবেচক কাজ হয়েছে। অবশ্য যদি না ডেলিবারেট কোনো দাঙ্গা বাধানোর মধ্যে ভারতের সরকার ও গোয়েন্দাদের কোনো খায়েশ থেকে থাকে যা আমরা জানি না, তাহলে অবশ্য ব্যাপারটা আলাদা।

ইসকন [ISKCON]
ইসকন নিজেদের “ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘ- এভাবে একটি হিন্দু বৈষ্ণবধর্মীয় প্রতিষ্ঠান” বলে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত আমেরিকা ব্যক্তিবাদের ধারণাকে [individualism] চরমতম অর্থের দিক থেকে নেয়াতে আর সেটাই পপুলার ধারণা বলে পরিণতিতে সেখানে ব্যক্তিমাত্রই খুবই একা ও বিচ্ছিন্ন, এক সম্পর্কহীনতার অবস্থার দিকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হয়ে রয়ে যায় সবাই। কিন্তু স্বভাব হিসেবে মানুষমাত্রই রিলেটেড-সম্পর্কিত মানুষ তো বটেই, অন্ততপক্ষে এক জীবনসঙ্গীর “আকাঙ্খাসম্পন্ন” মানুষ। ফলে মানুষ একা তো নয়ই, অন্তত দোকা তো বটেই এবং মানুষের অস্তিত্বই  গভীরভাবে সামাজিকও। এর বাইরের দিকে তাকিয়ে সেটা অমান্য করতে চাইলেও ভিতরে এটা তাই-ই থাকে।  তাই তার গভীর স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদাও আছে। স্পিরিচুয়ালিটিই আসলে মানুষের নানান সম্পর্ক ও এথেকে জাত কামনার অর্থ তাৎপর্য ব্যাখ্যাও তুলে ধরে। এটা মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তি ও স্বভাবে আছে, কিন্তু পশ্চিমা চরমব্যক্তিবাদের সমাজ সেই স্বভাব ও আকাঙ্খাকে চাপা দিয়ে রেখেছে। এই স্পিরিচুয়ালিটি বলতে তা সে দার্শনিক অর্থে স্পিরিট [spirit] বা প্রজ্ঞা হোক অথবা থিওলজির অর্থে বা ভাষ্যে আত্মা-রুহু – সেটা যে যাই করুক বা বুঝুক না কেন – শেষ বিচারে এটা মানুষের অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক করা, সম্পর্কিত থাকা ও সম্পর্কিত অনুভবের আকাঙ্খা-চাহিদার সপক্ষেই দাঁড়িয়ে কথা বলে। এরই বৃহত্তর অর্থ হল মানুষের পরমসত্তা অনুভবের দিক। থিওলজিক্যাল অর্থে ও ব্যাখ্যায় এটাই মানুষের যার যার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভবের অথবা আল্লাহর মাধ্যমে মধ্যস্ততায় জগতের সকল অপর মানুষ ও সত্বার সাথে নিজেকে যুক্ত ও লিপ্ত অনুভব করার দিক। থিওলজি বলবে মানুষ তাই রূহুর চাহিদায় সাড়া না দিয়ে পারে না।

এটাই, ঠিক এটাই পশ্চিমের এক স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা-চাহিদার ক্ষেত্রে এক বড় ভ্যাকুয়াম হয়ে আছে দেখা যায়। তুলনায় এটাই এশিয়ান যেকোনো থিওলজির প্রভাব যথেষ্ট স্যাচুরেটেড বা পুষ্ট হয়ে আছে। অন্তত কোনো ভ্যাকুয়াম-শূন্যতা নেই। এখন এশিয়ান এই থিওলজিক্যাল পূর্ণতাকে এবার পশ্চিমের চাহিদার কথা খেয়াল করে এর উপস্থাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের হিসাবে, এক কৃষ্ণপ্রেম বিলিয়ে বেড়ানোর দিক থেকে ইসকন ভালো প্রভাব ছড়িয়ে আমেরিকায় নিজের যাত্রা শুরু বা ভিত গাড়তে পেরেছিল। আবার মানুষের সম্পর্ককে একটু ভিন্ন [সেক্সচুয়ালিটি] উপস্থাপনের দিক থেকে আর এক গুরু রজনীশও ভালই আমেরিকান চাহিদা ধরতে পেরে পসার জমাতে পেরেছিল। ভারতের গুরুরা এসব সহজেই তুলে ধরতে পারে বলে [এমনকি যোগ ব্যায়ামেরও স্পিরিচুয়াল দিক আছে তা ব্যাখ্যা করে থাকে অনেকে] এদের গড়ে তোলা নানান আশ্রম ও ব্যাপক ভক্তকুল আমরা আমেরিকাতে দেখতে পাই। এভাবে এমনই এক উদ্যোগ হল ইসকন – নানান উঠতি পড়তির মধ্যদিয়ে ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইসকন আমেরিকাতে খারাপ চলে নাই। তবে এসব ততপরতাগুলো সেকালে কোনোটাই ভারত-রাষ্ট্রের স্বার্থের কোনো রাজনৈতিক উপস্থাপন ছিল না। কিন্তু এই পরিস্থিতিটাই বদলে যায় ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার পর থেকে। বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে। বুশের আমেরিকা তার ওয়ার অন টেররের পক্ষে এশিয়ার এক কুতুব হিসাবে ভারতের সমর্থন পেতে, ভারতের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমর্থনের এক অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছিল, সেখান থেকে ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে।

কাশ্মীর সংকট ও এর “সীমা পার কী আতঙ্কবাদ” হয়ে উঠা
বলা হয়ে থাকে, ১৯৮৭ সালের জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাদেশিক নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ঘটানো হয়েছিল। পরিণতিতে এটা সেই থেকে  নির্বাচনী ধারার কাশ্মীরের রাজনীতি এর নিজ সমাজেই আস্থা হারিয়ে একে এক সশস্ত্র রাজনৈতিক ধারার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৪৯ সাল থেকে কাশ্মীর ইস্যু বিভক্ত ও অমীমাংসিত এমনই থেকে যাওয়া সত্ত্বেও এর রাজনীতি একটা নির্বাচনী ধারাতেই প্রবাহিত হয়েছিল, যেটা ১৯৮৭ সালের পরে কাশ্মীরে আর তেমন থাকেনি। এনিয়ে প্রচুর একাদেমিক গবেষণা স্টাডি হয়েছে। [যার রিপোর্ট ও ফাইন্ডিংস-গুলো (1987 March kashmir elections rigging লিখে) নেটে সার্চ দিলেই যেকেউ দেখতে পাবে।] আর সশস্ত্রতার রসদ তারা সংগ্রহ করেছিল সেকালে আফগানিস্তানের সোভিয়েতবিরোধী আমেরিকা সমর্থিত লড়াকু মুজাহিদীনদের কাছ থেকে, পাকিস্তান হয়ে।

আর এথেকে কাশ্মীরের রাজনীতি পারস্পরিক খুনোখুনি রক্তারক্তির এক বাস্তবতায় ঢুকে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা হল, বড় সংখ্যায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যা করা আর পরিণতিতে তাদের কাশ্মীরে নিজ ভিটা-সম্পত্তি ত্যাগ করতে হয়েছিল। এতে কে কাকে কী বলে দায়ী করবে সে এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কারণ, সবাই জানত কাশ্মীরের সমস্যার কোন জবরদস্তি বা সামরিক সমাধান নাই, তবু পক্ষগুলো পরস্পরকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। [যেটা আজ আবার সেই একই বেকুবি পথে মোদী-আরএসএস ঠেলতে শুরু করেছে।]  তবু সেকালে পরবর্তী সময়ে নব্বই দশকের অস্থির সময়ে বিজেপি নেতা বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকে এরই পাল্টা সংগঠিত এক প্রপাগান্ডা শুরু হয় – “সীমা পাড় কা আতঙ্কবাদ” বলে। অর্থাৎ কাশ্মীরের সমস্যার মূলে আছে আফগান বা পাকিস্তান থেকে আসা  সশস্ত্রতা (কথিত টেররিজম)। মানে ভারতের রাষ্ট্র বা সরকারের কোন দায় নাই, ভুল বা অন্যায় শুরু করা নাই; সব দায় হল বাইরে থেকে আসা সশস্ত্রতার। কাশ্মীর রাজনীতিতে  নির্বাচনী কারচুপি করা যে বিরাট আত্মঘাতী পদক্ষেপ ছিল, কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতিতে কারচুপি আমদানি করলে যে হতাশগ্রস্থতা শুরু হয় তা থেকে যেকেউ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে নিয়ে চলে যেতে পারে – এটাই সেই আত্মঘাতী পথ। তাই এটা সেই মেসেজ দিয়েছিল যে কাশ্মীরে নির্বাচনী রাজনীতির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ফলে সশস্ত্রতাই একমাত্র বিকল্প- এই ভাবনাই যে পরবর্তীকালে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল, তা কমবেশি সব পক্ষের কাছেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই মনমরা হিন্দুমনে ধীরে ধীরে পাল্টা নতুন মরাল জাগানোর কাজটাই করেছিলেন বাজপেয়ি; এই বলে যে, সব দোষের গোড়া হল, বাইরে মানে পাকিস্তান থেকে আসা সশস্ত্রতা।

তবু এ কথা বলাতেই শুরুতে তখনও তা তেমন পাত্তা পায়নি। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর (১৯৮৯ সাল থেকে ধরলে ) ভারতকে সাফার করতে হয়েছিল, কোনো গ্লোবাল বন্ধু-সাথী রাষ্ট্রকে ভারত পাশে পায়নি। যার মূল কারণ সেকালে কাশ্মীরে পাওয়া সহজ হয়ে যাওয়া অস্ত্রের মূল উৎস তো আসলে আমেরিকা, আর সাথে এছাড়া স্বল্প কিছু ফেলে যাওয়া বা দখলি সোভিয়েত অস্ত্র। তাই এক লম্বা পথ বা ঘটনাক্রম  – সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার, পরে আমেরিকার আফগানিস্তানকে বিশৃঙ্খলতায় ফেলে চলে যাওয়া, শেষে একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে আফগানিস্তানে তালিবানদের আবির্ভাব, আর এতে তালিবানদেরক এক তুলনামূলক স্থিতিশীলতা আনার শক্তি হিসাবে দেখে আমেরিকা তাদের সমর্থন করলেও শেষে ক্রাইসিস মেটেনি। কারণ, পরে তালেবানি শাসকেরা আলকায়েদার প্রভাবে চলে যায়। আর তা থেকে আমেরিকায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলা – এই পুরা চক্র সমাপ্তি শেষ হতে দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। পরে বুশের ওয়ার অন টেরর প্রোগ্রামকে ভারত সমর্থন করেছিল, কাশ্মীরের সশস্ত্রতা পরিস্থিতিতে ভারতের সামরিক অবস্থান এবং ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিকে নষ্ট করা নয়, বরং “সীমা পারকে আতঙ্কবাদ” সবকিছুর জন্য দায়ী এই বয়ানের প্রতি আমেরিকার সমর্থন আদায়ের বিনিময়ে।

আর এথেকে আরও ডালপালা গজিয়ে তখন থেকেই শুরু হয় আমেরিকার সাথে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে ভারতের লম্বা খাতির সম্পর্কের যুগ। আর তা শুধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অফিস স্তরেই নয়, আমেরিকান এমপি (প্রতিনিধি পরিষদ) ও সিনেটেও ভারতের পক্ষে নিরন্তর লবি করার জন্য আমেরিকাতেই বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়দেরকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগানোর বেশকিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এরই সমন্বয়কের ভুমিকা নিয়েছিল আমেরিকায় ভারতীয় এমবেসি (গোয়েন্দা বিভাগ)। এই লক্ষ্যে ২০০৩ সালে জন্ম হয় ” হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন”। যারা আমেরিকায় জন্ম নেয়া ভারতীয়-অরিজিন বাবা-মার পরের প্রজন্ম, যদিও তারা আমেরিকান নাগরিক, এরাই এর সদস্য। তারা গর্ব করে বলে আমরা ভারতীয় নই, আমেরিকান হিন্দু। কিন্তু বাস্তবে এরা ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার সংগঠন, ভারতীয় বিদেশনীতির বাস্তবায়ক। তাদের মুরুব্বিরাও তাদের পিছনে, অফ-সিনে। ১২০ মিলিয়ন ভারতের বাজারে ব্যবসা দেয়ার বিনিময়ে আমেরিকান ব্যক্তি ব্যবসায়ী আর এর সাথে এমপি ও সিনেটর মিলিয়ে এক চক্র যা লবি ও প্রেসার গ্রুপ, কোটারি গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল। লবি ও প্রেসার গ্রুপ তৈরি আমেরিকায় বৈধ। তাই আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনকে কেন্দ্রে রেখে এরা আরো সংগঠিত করেছিল এক এমপি তুলসি গাব্বার্ড, ভারতীয় নানান সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন [ইসকন যার মধ্যে একটা বিশেষ] বা প্রবাসী ভারতীয়-অরিজিন আমেরিকান ব্যক্তিত্বকে।

ইসকন আর কৃষ্ণপ্রেম বিলায় না, ভারতরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার, হিন্দুত্ববাদ বিলি করে
এতে স্বভাবতই আগের শতকের আমেরিকান ইসকন, আগের কৃষ্ণপ্রেম বিলানো ইসকন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের খাঁচায় বিরহ একাকিত্বে আটকে থাকা সাদা আমেরিকানদের মুক্ত করতে আসা ইসকন, এমনকি তাই এর আগের নেতৃত্ব কোন কিছুই এক থাকেনি। সেই ইসকনের মৃত্যু হয়। ফোকাস বদলে যায়। নতুন ইসকন জন্ম নেয় যার কাজ ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক হাতিয়ার হওয়া। [Strategic বা স্ট্রাটেজিক মানে এখানে, রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নেয়া কৌশল ও পরিকল্পনা ]  কংগ্রেস আমলে যেটা ছিল সফট [soft] হিন্দুত্ব তাই এখন হয়ে উঠেছে আরও এগ্রেসিভ, আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদ। প্রথমত এর তৎপরতার ক্ষেত্রে তখন থেকে আর পশ্চিমাদেশ থাকেনি, বাংলাদেশও হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা ভৌগোলিক পকেটের হিন্দুজনগোষ্ঠির উপস্থিতি থাকলেই (যেমন আফ্রিকান অনেক দেশেই ইসকন সংগঠন পাওয়া যাবে) সেখানে ভারত রাষ্ট্র-সরকারের নীতি ও স্বার্থ স্ট্রাটেজির পক্ষে সকলকে জড়ো করা, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের বোধ জাগিয়ে তোলা, কমপক্ষে সহানুভূতিশীল করে তোলা – এসবই ইসকনের মুখ্য কাজ হয়ে ওঠে। এতে ভারত রাষ্ট্রই যে প্রকাশ্যে হিন্দু-রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে – ভারতীয় নাগরিককে সে “হিন্দু হিসাবেই” (এটা ভারত-রাষ্ট্রের কাজ ছিল না) সংগঠিত করছে, সাথে পাশে কোন অন্যদেশের হিন্দু থাকলে তাকেও হিন্দু হিসাবে ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে অবলীলায় শামিল করেছে।

একটা জিনিষ পরিস্কার থাকতে হবে, কোন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক-স্বার্থ বিষয়ক নানান সিদ্ধান্ত সে রাষ্ট্র অবশ্যই নিবে। আমাদের তাতে না করার কিছু নাই। আর বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। ব্যতিক্রম স্বল্প কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বাদে তা কখনও অন্য-রাষ্ট্রেরও পক্ষেও যাবে না। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল অন্য রাষ্ট্রের যে সিদ্ধান্ত যা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক তা প্রত্যাখান ও প্রতিরোধে করতে সক্ষম হতেই হবে। এটা ন্যায়-অন্যায়ে বিষয়ক ইস্যু যত না এর চেয়ে বেশি নিজ স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ও সক্ষম হওয়া, আপোষ করে বিক্রি না হয়ে যাওয়ার বিষয়। ইসকনের ততপরতা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনের তদারকি ও লাইসেন্সিং প্রতিষ্ঠান “এনজিও ব্যুরোর” মাধ্যমে আর “ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন এক্ট ১৯৭৮” (যেটা সর্বশেষ ২০১৬ তে সংশোধিত হয়েছে) – এই আইন দিয়েই প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর আমাদের এটা করতে পারতেই হবে। আর সার কথাটা মনে রাখতে হবে ভিন্ন রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক প্রতিষ্ঠানকে আমরা আমাদের দেশে ততপরতা চালাতে দিতে পারি না। বিদেশি এনজিও হিসাবে তো আরও নয়, তাও আবার ধর্ম-প্রচারের উসিলায়।

আসলে ইসকনের বাংলাদেশে উপস্থিতিটাই এর কথাকাজের বেমিলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, আমেরিকায় গিয়ে ইসকনের জন্ম হতে পেরেছিল মূলত একাকিত্বের আমেরিকান সমাজের শূন্যতার হাহাকার পূরণে। তাহলে ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ তার কাম্যভূমি হতেই পারে না, ম্যান্ডেটে কাভার করে না। কারণ বাংলাদেশ পশ্চিমাদেশ নয়, অন্তত স্পিরিচুয়ালিটির ভ্যাকুয়াম এখানে নাই। বাংলাদেশে হিন্দুদের ধর্মীয় সংগঠন – মন্ত্র জানা, শাস্ত্র জানা, বামুন পুরুত বা মন্দিরের কমতি এখানে ঘটে নাই – কখনও ছিল না। তাহলে আমেরিকায় যে কারণে ইসকনের জন্ম, ঠিক সে কারণেই বাংলাদেশে ইসকনকে হিন্দুদের দরকারই নেই।  তাই ইসকন ভারত-রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠিত হওয়া থেকে বাংলাদেশে  ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের জন্যই এর জন্ম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

আর তাই অন্তত এই একটা কারণে, বাংলাদেশের সরকার ইসকনকে বিদেশি এনজিও হিসাবে এনজিও ব্যুরো থেকে রেজিষ্ট্রেশন দিতে পারে না।  ইসকন আসলে ধর্মীয় নয় ভারত রাষ্ট্রের হাতিয়ার রাজনৈতিক সংগঠন। আবার কোন ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠনকে এনজিও ব্যুরোর রেজিষ্ট্রেশন দেয়া হারাম – আপন রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধী বলে নিষিদ্ধ। কেবল রিলিফ বিতরণের কাজ, দাতব্য কাজ করতে পারে – সেজন্য অনুমতি পেতে পারে।

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব, ভারত সরকারের আমাদের সরকারের ওপর সবখানে প্রভাব বিস্তারের বিরোধী  – এমন মনোভাব প্রচন্ড বাড়ছে, এ নিয়ে আমাদের সমাজের কোনো কোণে বা কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বিমত পাওয়া যাবে না। তবে আবার দ্বিমত হবে এর মাত্রা নিয়ে। সরকারি পক্ষের হলে কেউ বলবেন ভারতের প্রভাব অনেক কম বা স্বাভাবিক। বিপরীতে অন্যরা বলবেন ভারতের প্রভাব চরম, সীমাহীন অসহ্য বা অনাকাঙ্খিত ইত্যাদি। আর এরই মধ্যে ইসকনের নাম ও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিরূপ মনোভাব ক্ষোভ ক্রমেই চড়ছে। এরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধাতে চাইছে – এমন এগ্রেসিভ।  ইসকন সাধারণ্যে চোখে পড়া শুরু করে ২০১৬ সালে সিলেটের সঙ্ঘাত থেকে আর এ কালে চট্টগ্রাম শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে ‘প্রসাদ খাইয়ে’ কৃষ্ণনাম গাওয়ার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ হয়ে পড়া থেকে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে সনদ প্রদান বা তারা ইসকনের সদস্য বলে প্রচার চলা থেকে। এগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই হয়ত অনুমান করে বলা, আধা সত্য অথবা প্রপাগান্ডা বা একেবারেই গুজব হয়ত।

গুজবের আসল অর্থ হল ফ্যাক্টসের সাপ্লাই না থাকা। সাধারণত  সরকারের বুঝে না বুঝে বোকা হয়ে খাড়িয়ে থাকা উদাসীন্যতা থেকে এর জন্ম হয়। এছাড়া, যারা বুঝতেই পারে না সঠিক বিশ্বাসযোগ্য ও স্পষ্ট তথ্য সমাজে সহজেই পাওয়া না যাওয়া অবস্থায় রাখা কত আত্মঘাতী। এটা আসলে চাইলেই পাওয়া যায় এমন করে রাখা হয়নি, এই পরিস্থিতি। তাই গুজব মোকাবেলার উপযুক্ত উপায় হচ্ছে, তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয় এভাবে হাজির রাখা। সমাজের বিভ্রান্তি সম্পর্কে খবর রাখা আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে আগে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য হাজির রাখা। নিশ্চুপ থাকলে বা গুজবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা গুজবের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বাড়তে পারে। কখনো তা ফেটে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে।

ইসকন ও এনজিও ব্যুরো
বাংলাদেশে আইনে ইসকনের ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে ততপরতা করতে অনুমোদন, বিদেশী অর্থ নিয়ে আসা ও বিতরণের অনুমোদন জোগাড় করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্ট ২০১৬, এই আইন পেরিয়ে বিদেশী স্বার্থ প্রতিফলিত হয় এমন তৎপরতার ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকে সেজন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইন বিদেশী ধর্মীয় এনজিও প্রতিষ্ঠানের দেশে সহজে কোনো তৎপরতা চালানোর বিরুদ্ধে এভাবেই সাজানো। কারণ, তারা যেন কোনো ধর্মান্তকরণ বা ধর্মে প্রভাবিত করার কাজ না করতে পারে।

বাস্তবত ইসকন এখন কৃষ্ণপ্রেম বিলানোর চেয়ে ভারত রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বাস্তবায়নের পার্টনার। ওদিকে সাধারণভাবে বললে কোন বিদেশী রাষ্ট্রের কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান অন্য দেশে  নিজ দেশের নীতি বা স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য অনুমতি পেতে বা চাইতেই পারে না। বিশেষত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাজের সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেয়া ছাড়াও বিদেশী অর্থ আনার অনুমোদনই পেতে পারে না। বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থ বলে কিছু নিয়ে তৎপরতা চালানো অথবা [এমনিতেই ইসকন আমেরিকান অরিজিনের] ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুনীতি নিয়ে তৎপরতা- এর কোনোটাই ইসকন বা  কোনো এনজিওকে বাংলাদেশে করতেই দিতে পারে না।  এটা আমাদের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী হবে, তাই।
অথচ আনন্দবাজারের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে যে, কথিত জঙ্গি হামলা হতে পারে এই অজুহাত তুলে যেন বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থে  “জঙ্গী” মারার অজুহাতে কাজ করতে তৎপর হয়। এতে বাংলাদেশের সরকারের কী হাল হবে? তার নিজের স্বার্থ কোথায় এতে?

আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম কাজটি হল, এব্যাপারে নিজের হাত পরিষ্কার রাখা। সরকারকে নিজ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করা, না হতে দেয়া, যেসব গুজব ইতোমধ্যেই উঠেছে তা বিনাশ করা। গুজবের বিনাশ করতে যেটা করতে পারে যে ইসকন কী হিসেবে রেজিস্টার্ড তা পরিষ্কার ও সরাসরি পাবলিককে জানানো। যেমন এটা কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, না রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান? এ কাজটা সরকার নিজে অথবা কোনো বিশাসযোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্বের অধীনে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করতে পারে।

যেমন ইসকন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমতিপ্রাপ্ত হলেও ‘প্রসাদ’ বিতরণ সে করতে পারে না, সেটা পুরোপুরি বেআইনি। ‘প্রসাদ’ বিলানো মানে যেটা ধর্মীয় এনজিও হিসেবে রেজিস্টার্ড (যে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার কথা নয়) কেবল সেই করতে পারে। এছাড়া ‘প্রসাদ’ বিলানো আর কাউকে দুপুরের খাওয়ার প্যাকেট বিতরণ এক কাজ নয়। আবার যেমন রিলিফ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়ে এবং অর্থ ছাড় করে সেই টাকায় ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা বেআইনি হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে পাবলিকের কাছে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ নিয়ে সরকারের কোন দায় নেয়ার অথবা কোন আড়াল টেনে দেওয়া  প্রয়োজন নেই। আমাদের আইন পারমিট না করলে সরকারের কিছুই করার নেই। আবার আমাদেরও ইসকন সম্পর্কে কিছু বুঝে না বুঝে জেনে ইসকন তাবলীগের মত এক সংগঠন ধরনের কোন সাফাই দেওয়ারও কিছু নাই। আর এতে “অসাম্প্রদায়িক” এই সার্টিফিকেট পাইবেনই অথবা এই সার্টিফিকেটের কোন মূল্য থাকবে এসবেরও কোন নিশ্চয়তা নাই। আমাদের দরকার আসলে ফ্যাক্টস – কোন গুজবও না, কোন সাফাইও না।

আবার এক শিক্ষকের ভাই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারের পর দেখা যাচ্ছে সে ইসকনের সদস্য অথবা সরকারি কর্মচারী ইসকনের পদক মেডেল বা সংবর্ধনা নিয়েছে বা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এখন এই ইসকনের সদস্য হওয়া কী জিনিস? কোনো বিদেশী এনজিও এখানে কাউকে ধর্মীয় দল গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য বানানোর কার্যক্রম নিতে পারে না। এনজিও বলতে মূলত বস্তুগত জিনিসের দাতব্য হতে হবে। এটাই কাম্য।

এনজিও করতে আসা চ্যারিটির কথা বলে কোনও “ভাব” (ধর্মীয় বা রাজনীতির) প্রচার করতে অনুমতি দেয়া হয় না, যায় না। তবে বড়জোর সেটা (ধর্মীয় নয়) সামাজিক সচেতনতা ধরনের কাজ যেমন অধিকারবিষয়ক, দক্ষতা শেখানো, স্বাস্থ্য বা পরিবেশবিষয়ক ইত্যাদি এ রকম হতে পারে। সরাসরি রাজনীতি অথবা ধর্ম প্রচার- এটা আমাদের এনজিও আইনে একেবারেই নিষিদ্ধ। আসলে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরে কী কার্যক্রম নেবে এর বিস্তারিত বর্ণনা, কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করবে ইত্যাদির হবু কার্যক্রমের বিস্তারিত সব কিছু কর্মসুচি আগেই এনজিও ব্যুরোতে জমা দিতে হয়। দেওয়ার কথা। আর আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ তা সরেজমিন যাচাই করে ইতি রিপোর্ট দিলে তবেই সে বিদেশী এনজিও অর্থ ছাড়ের অনুমতি পায়। আর এর ব্যতিক্রম করলে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ আইনে জেল-জরিমানার কথা লেখা থাকলে সেটাও প্রয়োগ হতে পারে।

বাংলাদেশের ইসকনের ততপরতা সম্পর্কে সরকারের ভাষ্য দেয়ার পিক আওয়ার চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইসকন নিয়ে এক সরজমিনে রিপোর্ট, যা খুবই ভয়াবহ অবস্থা নির্দেশ করেছে, তা প্রকাশিত হয়েছে। ওর শিরোনামই বাংলাদেশে বেপরোয়া ইসকন,‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’য় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা।

একটা রাষ্ট্র-সরকার চালাতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে নরমে-গরমে অথবা বিশেষ খাতিরের অনেক রূপের সম্পর্ক রাখার দরকার হতে পারে। কিন্তু এসব ডিলিং বা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের যা প্রচলিত আইন তা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা বা আইন বাঁকা করে ফেলার তো দরকার নেই বা তা কাম্যও নয়। নিশ্চয়ই প্রতিবেশীসহ যে কোন রাষ্ট্র যার যারটা-সহ সব দেশের আইনি সীমার কথা বুঝবে ও মান্য করবে, এটাই কাম্য। এনজিও প্রসঙ্গে আমাদের প্রচলিত আইন যথেষ্ট স্বচ্ছ। কাজেই রেকর্ড স্পষ্ট রাখা আর সেসব রেকর্ড পাবলিকের জন্য খুলে রাখা হল সব কিছু জটিলতা থেকে পরিত্রাণ ও দূরে থাকার সবচেয়ে সহজ উপায়। বাংলাদেশের মানুষকে জানাতেই হবে বাংলাদেশে ইসকন ঠিক কী কী করার অনুমতি পেয়েছে? কোন আইনে? আর ইসকনের ততপরতা দেশের আইনসম্মত আছে কী না?
তথ্য স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য রাখার পরও কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উত্তেজনা বা বিভেদ তৈরি করার কেউ চেষ্টা করলে সরকারের তা মোকাবেলা সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়। এছাড়া এমন সমাজে গুজব বিভ্রান্তি বা প্রপাগান্ডাও আসলে শুরু করাই কঠিন থাকে। কাজেই স্বচ্ছতা সরকারের সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র। আমরা কী তা বুঝব!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ২৬ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ইসকন কি এখনো কৃষ্ণপ্রেম বিতরণেই আছেএই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

গৌতম দাস

 ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Lb

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ভারত সফর ছিল চলতি অক্টোবর মাসের ৩ থেকে ৬ তারিখ। প্রধানমন্ত্রী তিন তারিখ সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলেন। সেই দিনই মানে ভোরে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র নেতা শাহরিয়ার কবিরের একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। ওর শিরোনাম ছিল “Hasina ascent marked Hindu turnaround: Kabir”। মানে “হাসিনার ক্ষমতারোহণ হিন্দুদের ঘুরে দাঁড়ানোর চিহ্ন হয়ে উঠেছেঃ কবির”।

ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ কলকাতার আনন্দবাজার গ্রুপের পত্রিকা। তবে এর টার্গেট পাঠক আনন্দবাজারের মত ঠিক ‘অস্বস্তিকর দেশপ্রেমী’ বা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা নন। টেলিগ্রাফ রিপোর্টিংয়ের চেয়ে কলাম দিয়ে পাঠক আকর্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে চলে। সম্ভবত এই পত্রিকা এমন কলামের পাঠকের ওপর ভর করে টিকে যেতে পারে বলে তাদের অনুমান। এই সুবাদে একালের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কিছু কলামিস্টদের ভালো কিছু লেখা আমাদের পড়ার সুযোগ ঘটে যায় অবশ্য। এই বিচারে টেলিগ্রাফ একেবারেই মান খারাপ কোন পত্রিকা না হলেও শাহরিয়ার কবিরের কথিত এই সাক্ষাতকারটা বেশ বেমানান তো বটেই। তবে বুঝাই যায় এটা অর্ডারি বা খেপ মারা মাল। ভদ্র ভাষায় যাকে অনেকে পেজ-বিক্রি করা পাওয়া বা ছাপা লেখা বলে থাকে। মানে, এধরণের পাতায় কী ছাপা হয়েছে এর দায়দায়িত্ব সম্পাদকের নাই বলে মনে করা হয়।

একেবারেই সাজানো আর কথিত এক অধ্যাপককে দিয়ে করানো এই সাক্ষাতকারে যেখানে শেষে শাহরিয়ারের নিজ বীরত্বের প্রশংসাটা বাদ দিলে পাঁচটার মত প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু উনি কোথাকার অধ্যাপক, কী বিষয়ের বা আদৌও কোন অধ্যাপক কিনা এমন কোন পরিচয়-ধারণা দেওয়া নাই সেখানে। তাঁর প্রশ্ন শুনে এক গদ্গদ ঘন আবেগী ধরণের কলকাতার এক আম হিন্দু নাগরিক – এর চেয়ে বেশি, যিনি স্থিরভাবে কিছু চিন্তাও করতে পারেন, এমন মনে হয় নাই। বলা বাহুল্য ওখানে প্রশ্নগুলো ফরমায়েশি। যার উদ্দেশ্য হল একটা প্রচারণা চালানো – এই বলে যে বর্তমান আমলে হিন্দুরা বাংলাদেশে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে – এই কথার পক্ষে ঢাক পিটানো। ভারতের কাছে এই ঢাক পিটিয়ে বাংলাদেশের কোন শাসককে সার্টিফিকেট নিতে হবে কেন, এর কোন সদুত্তর এখানে নাই। তবুও এর উদ্দেশ্যটা আরও বুঝতে হলে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছে তোলা তার অভিযোগগুলোর নাটকটা মনে করে দেখতে পারি। সেখানে হাজির করা প্রিয়া সাহার বক্তব্যেরই পালটা কিছু ঠিক কাটান কথা নয় শ্রেফ দাবিই শাহরিয়ার এখানে জানিয়েছেন।

যেমন, সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার দাবি করেছেন, ২০০৯ সালের পর (সুনির্দিষ্ট করেন নাই) তিন লাখ হিন্দু নাগরিক নাকি বাংলাদেশ থেকে ভারতে দেশান্তরী হয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসন এত ভালো ছিল যে, ওর মধ্যে আড়াই লাখ হিন্দুই আবার ভারত থেকে ফিরে বাংলাদেশে চলে এসেছেন”। [……out of 3 lakh Hindus who had crossed the boundary, two-and-a-half lakh returned to Bangladesh] . মানে হাসিনার আমলেও হিন্দু দেশান্তর আগের মতই ঘটে – তিনি স্বীকার করছেন। তবু হাসিনা বীর এজন্য যে তাঁর আমলে এই তিন লাখের আড়াই লাখই আবার ফিরে আসে, তাই। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দাবি তা অবশ্য জানা যায় না। সেখানে কোনো রেফারেন্স দেয়া নাই। আবার ধরে নেয়া হয়েছে যে তিন না হলেও আড়াই লাখ লোকের এমন যাওয়া আসা কোন ব্যাপারনা। শুধু তাই না। তাদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘর সম্পত্তি তারা আবার ঠিকটাক ফিরেও পেয়েছে। দাবির এই অংশটাই বেশ ইন্টারেস্টিং।  এ ছাড়া আরো দাবি করা হয়েছে, হিন্দুদের জন্য এখন জব মার্কেট খুলে রাখা আছে […job market was thrown open for the Hindus,]। এটা পড়ে কারও মনে সন্দেহ হলেও কিছুই করার নাই যে আগে কি তাহলে এই ‘জব মার্কেট’ বন্ধ ছিল! এছাড়া আরও দাবি আছে। বলছেন, গত নির্বাচনে (২০১৮) ‘তারা’ ব্যবস্থা করাতে, ব্যবস্থা নেয়াতে ও পাহারা দেয়াতে মোট ৬১ কনস্টিটুয়েন্সিতে হিন্দুরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছিলেন। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করাই বোধহয় সঠিক। কারণ এবার কেউ ভোট দিতে পেরেছিল কি না সে অভিজ্ঞতা, সেটা সবারই জানা আছে। সারকথায় শাহরিয়ার তার কোন বক্তব্যের স্বপক্ষেই কোন পয়েন্টে কোনও প্রমাণ সাথে দাখিল করেননি। বলা যায় কেবল কিছু স্টেটমেন্ট রেখেছেন।

বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতিতে’ বড় বাঁক বদল
বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতি’ বিশেষত গত তিন বছর ধরে চলা রাজনীতি খুবই বিপজ্জনক স্কেলে ও ডিরেকশনে আগাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এটা ভারতে মোদীর উত্থান এবং তাতে আরএসএসের ততপরতা ও সুবিধা বিতরণ ও উস্কানির মিলিত প্রভাব বা আফটার এফেক্ট। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির শুরু হিন্দু কমিউনিস্ট নেতাদের হাতে, সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্মের পরে। এটা কোন রাস্তায় যাবে, কিভাবে ফুলে-ফলে বাড়বে সেটিও তাদের হাতেই সূচিত। এভাবে এর কৌশল ও বয়ানগুলোও নির্ধারিত হয়েছিল। এই বাস্তবতা মানলে বলা যায় বাংলাদেশের সেই হিন্দু রাজনীতি একালে এসে এখন আরএসএসের দিকে মোড় নিয়েছে – এটা অকল্পনীয় এবং এটা আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরএসএস যারা এখন সমর্থন করে এদের কাছে অতীত হিন্দু-বুঝের সেকুলারিজম এখন কেমন লাগে? তারা কি এখন আরএসএস করেও সেকুলারিজম অপ্রয়োজনীয় বলে বুঝে তাই বাদ দিয়েছেন? এটা পরিষ্কার করে জানা যায় না। এ ব্যাপারে হ্যাঁ ও না, দু’টি জবাবই পাওয়া যায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদ কিভাবে গ্রহণীয় হয়ে যেতে পারে, প্রগতিবাদী থেকে হিন্দুত্ববাদে ঝাপিয়ে পড়া এই জার্নি – সেটা দেখতে পাওয়াই আসলে এক বিরাট বিস্ময়। যার অপর বা ৯০ শতাংশ পড়শি নাগরিক হল মুসলমান সে কী ভবিষ্যত বুঝে এই রাজনীতি বেছে নেয় সেটা এক বিষ্ময় বললেও কমই বলা হয়, সেটা বুঝা সত্যিই মুশকিল! এঁদের স্বপ্ন কী এক হিন্দুত্বের বাংলাদেশ? এ’ কেমন স্বপ্ন!  এছাড়া ওদিকে বাংলাদেশের হিন্দুদের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বেছে নেওয়া মানে আসলে নিজের জন্য রাজনীতি না করে বরং ভারতের জন্য রাজনীতি করা। বাংলাদেশে যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনায় তারা ছিল সেখান থেকে নগদ কিছু লাভের আশায় ভাড়া খাটাই, তবে আরও বড় গহবরে ঢুকে যাওয়া।  অবশ্য সেকালে মস্কোর বৃষ্টির ছাতা বাংলাদেশে তুলে ধরা গেলে এরা আর এখন দোষ করেছে কী? সে সাফাইওও দেয়া যায়। মানুষ তো এমন করেই থাকে, নানান কারণে। যাই হোক, এসব প্রশ্ন আগামীতে নিজেই নিজের জবাব হয়ে উঠে আসবে হয়ত। তবে মনে রাখতে হবে খোদ ভারতেরই ভবিষ্যৎ হিন্দুত্ববাদের ভেতরে নিহিত হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখনো পুরাটাই অমীমাংসিত।

আবার এই প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে, ইউরোপে হিটলারিজম ফিরে আসতে পারে কী, এমন ধরনের। ইউরোপে হিটলারের নাম না নিয়ে হলেও “হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট” বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী নামের ধারার সমর্থক বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একথা সত্য। তবে এখনো তা বিচ্ছিন্নভাবে ও বিভিন্ন পকেটে। আর ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পই সম্ভবত আমেরিকার শেষ ও ছোট হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে থেকে যাবেন। তাতে ওদিকে স্টিভ বেননেরা [STEVE BANON] আবার সুপ্রিমিস্ট চিন্তাকে জাগাতে মটিভেশনাল ক্লাস নেয়া শুরু করেছেন ইতালিতে। সেটাও সত্য।

এদিকে বাংলাদেশে, যারা নিজেদের সুর্যসেন, প্রীতিলতাদের উত্তরসূরি বলে দাবি করেন, দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকে আজকাল মোদী-আরএসএসের দিকে ছুটছেন। এখানে স্পষ্ট কথাটা হল, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়া, এই প্রশ্নে প্রথমবার ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতে যাওয়া আর তা করতে গিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া পর্যন্ত যারা গিয়েছিলেন – তাদের এটা ছিল এক হিন্দুইজমের রাজনীতিতে ঝাপায় পড়া। এক হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি, যা বাস্তবত জমিদার স্বার্থের রাজনীতি। পূর্ববঙ্গের কৃষি উদ্বৃত্ত যা ততদিনে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে, যা কলকাতায় জমা হচ্ছিল – এর বদলে সেসময় বাংলা ভাগ হয়ে পুর্ববঙ্গ আলাদা হওয়াতে এবার কৃষি উদ্বৃত্ত ঢাকায় জমা হবে – এটা জমিদার স্বার্থের প্রাণকেন্দ্র ‘কলকাতা’ মেনে নিতে চায়নি। এটাই স্বার্থবিরোধের মূল। অথচ এটা তো সাধারণভাবে জমিদারি উচ্ছেদের মত কোন কিছু ছিল না, তাই তাদের গায়ে কোনো আঁচড় লাগার কথাও নয়। তবু এটুকু পরিবর্তনও তারা সহ্য করতে পারেননি। কারণ পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে তাতে পুর্ববঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না বলে তারা কর্তৃত্ব হারাতে হত, একথা ঠিক। এই স্বার্থ হারানো এটা তারা মেনে নিতে চায়নি মূল কারণ এটা আর তা থেকে জমিদারদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান।

কাজেই অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর ওপর অহেতুক বিপ্লবীপনা আরোপ করে কমিউনিস্টদের এদেরকে মহান করে দেখানোর কিছু নাই।  এটা বাংলার বা অন্ততপক্ষে পুর্ববঙ্গের সবার স্বার্থের রাজনীতি ছিল না তা তারা করেও নাই। তাদের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা মানে, জমিদারের স্বার্থে পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধিতা। এটাই তারা করেছিলেন। এটাকে স্বদেশী আন্দোলন বলে াপনি এতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন কি না, সেটা নির্ভর করে আপনার রাজনীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্ভর কি না। এই হল প্রীতিলতা-প্রীতি যাদের আছে তাদের রাজনীতি। কাজেই প্রীতিলতাদের উত্তরসুরিদের এখন মোদী-আরএসএস এর দিকে যাওয়া এটা তো তাদের ন্যাচারাল  গন্তব্য, নয় কী? কাজেই সুর্যসেনদের অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর রাজনীতি একটা হিন্দুইজমের রাজনীতি, সেকালের জমিদারদের স্বার্থের রাজনীতি। এর মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজা রঙের আড়াল চড়িয়ে দেয়া অথবা একে কোন অর্থেই প্রগতিশীল বলে দাবি করার কোন সুযোগ নাই।

এবার একালে আসি। আওয়ামি লীগের বোকা হয়ে যাওয়া, মানে না-বুঝে ভুল রাজনীতি করে ফেলার সময়টা হল যখন আওয়ামী লীগে নিজেই আরএসএসের রাজনীতির শাখা হিসাবে বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট’ দল খুলতে দিয়েছিল অথবা নিজেই খুলে বসেছিল। আমরা আরএসএসের আইকন বিনায়ক দামোদর সাভারকারের “কালো টুপিটা” দেখেও চিনতে পারিনি, কারা আরএসএস আর কারা নয়। অথচ মাথায় এই টুপিটা রাখা, এটা আরএসএস প্রধান মোহন ভগত থেকে শুরু করে হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক, এভাবে আরএসএসের সবার চিহ্ন। এই দল ব্যানারে নিজেদের নাম হিন্দিতে কেন লেখে, সে প্রশ্নও আমরা করিনি।  ব্যাপারটা হল, বাঙালি হিন্দু যদি আবার হিন্দির প্রয়োজন বা প্রীতি বোধ করে তা-ও আবার বাংলাদেশে বসে, বুঝতে হবে এটাই রাজনৈতিক ‘হিন্দুত্ব’- হিটলারি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা- এখানে তা ছেয়ে বসেছে। আমরা আসলে সম্ভবত অবুঝ গর্দভ হয়েছি, অথচ ভাব ধরেছি যে এটা উদারতা উদার। আমাদের উদারতার ঠেলায় আমাদেরই কাপড় খুলে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের হুশ নাই। অন্ততপক্ষে হাত ছেড়ে দিতে ত পারতাম!

বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কবে খোলা হয়েছিল এ নিয়ে অনেক মত আছে। কেউ কেউ ২০১৩ সালও বলে থাকে। তবে আওয়ামী লীগ এদের বিরুদ্ধে কিছু ছোট অ্যাকশনে গিয়েছিল সম্ভবত ২০১৬ সালে। কিন্তু যে বুঝ বা অজুহাতে তা করেছিল তাতেই বোঝা যায় এটাই লীগের ভুল রাজনীতি। লীগ ভেবেছিল এমন ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কায়েম হলে সেটা নাকি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক কাটবে। কেবল এতটুকুই নাকি আওয়ামী লীগ ক্ষতি, দেশের ক্ষতি! চিন্তার ক্ষেত্রে এমনই দীনতায় আক্রান্ত আওয়ামী লীগ! মানে, দলটি চিনতেই পারেনি বাংলাদেশের আরএসএস তার সামনে হাজির। তাই শুধু ভোটের চিন্তাতেই নিজেকে অস্থির রেখেছিল। আবার অন্যদিকটা যদি  দেখি? আচ্ছা ব্যাপারটা যেন এমন বাংলাদেশে কী ভোট হয় এখন? যেন, বাংলাদেশের মানুষের ভোটই আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় আনছে! তাই কি?  নিজের সাথে এ’কেমন প্রতারণা!

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএসের নেতা, হিন্দু মহাজোটেরও নেতা এখন গোবিন্দ প্রামাণিক। তার সাথে চট্টগ্রামের অ্যাডভোকেট আরেক হিন্দু নেতা রানা দাসগুপ্তের ব্যক্তিবিরোধের কথা জানা যায়। তাই তারা একই দল হিন্দু মহাজোট করতে পারেন না বলে শুনা যায়। তবু দেখা যায় প্রিয়া সাহা এদের দু’জনেরই লোক, প্রিয়া এদের দুজনের সাথেই সংশ্লিষ্ট।  সেকারণের রানা দাসগুপ্তও দেখিয়েছে যে মোদী পর্যন্ত একসেস তাঁরও আছে আর তা কম না, তবে প্রামাণিকের হাত ধরে তিনি সেখানে যান না।

এই বিচারে শাহরিয়ারের বক্তব্য এই প্রথম প্রিয়া সাহা, প্রামাণিক অথবা সংশ্লিষ্ট হিন্দু নেতা এমন যেকারও অবস্থানের বিরোধিতা করে হাজির করা বক্তব্য ও অবস্থান। তাহলে, শাহরিয়ার কি বুঝাতে চাচ্ছেন এটাই সরকারের নতুন অবস্থান ও লাইন? আওয়ামি লীগ তোবা করতেছে? এমনটা কেউ মনে করতে পারে অথবা করুক – এটাই সম্ভবত শাহরিয়ারের বক্তব্যের উদ্দেশ্য। তবে সেক্ষেত্রে এটা বিয়ের আসর ভেঙ্গে যাওয়ার পর বাজনাদারের বাজাতে আসার মত। প্রামাণিকের মত এসব করিতকর্মা ব্যক্তিত্বরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আরএসএসের রাজনীতি এনে দল খুলে বসেছে শুধু তাই না। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাতের পুতুল হয়েছে। উঠতে বসতে আসামের পত্রিকায় বিবৃতির হুঙ্কার দিচ্ছে। বারবার বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিবৃতি ঠুকতেছে, আমরা দেখছি।  আসামের এনআরসিতে বাদ পড়া উনিশ লাখ  লোক নাকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বলে ফতোয়া দিচ্ছে। আর জোর দাবি জানাচ্ছে বাংলাদেশকে এদের ফেরত ও দায়িত্ব নিতে হবে। এই দাবি এখন পর্যন্ত অমিত শাহ অথবা প্রামাণিকের বড় হুজুর, নেতা খোদ মোহন ভগতও বলতে পারেন নাই। মোদীর সরকারও যেখানে নিজের সরকারি ভাষ্য ও অবস্থান হিসাবে এখনও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছেন যে এনআরসি ভারতের নিজের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ইস্যু। সেখানে গোবিন্দ প্রামাণিক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কোলে বসে তাদের পুতুল হয়েছে আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন, হুঙ্কার দিচ্ছেন। তিনি কোনদিকে এখান থেকেই পরিস্কার।

একটা কথা আছে, মুখে মাটি যাওয়া বা মাটি খেয়ে ফেলা। আওয়ামী লীগের অবস্থাটা হয়েছে তেমন। এটা লীগকে আরো বড় নির্বুদ্ধিতায় ফেলেছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনের বছরের শুরুতে। ভারতের আরএসএস বাংলাদেশে নির্বাচনে পঞ্চাশটা আসন হিন্দু প্রার্থীদের পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি খেলেছিল। আর এই ফাঁদে পড়েছিল লীগ-বিএনপি দু’দলই। এদের চিন্তাশক্তি ও খুবই উর্বর চিন্তা করার ক্ষমতা, যার প্রশংসা না করে আমাদের উপায় নাই। বিগত নির্বাচনে আরএসএস ভারতের সমর্থন এনে দিবে – এই মুলা ঝুলিয়ে দু’দলকেই বিভ্রান্ত করেছিল আরএসএস। আর অবাক বিষ্ময়ে আমরা দেখেছিলাম দু-দলই বিভ্রান্ত হয়েছিল! বলা হয়ে থাকে, এ কাজে আওয়ামী লীগের সমর্থনে পীষুষ বন্দোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ নামে সংগঠন খুলে দেয়া হয়েছিল। ভারতীয় সাংবাদিক চন্দন নন্দীর ভাষ্যমতে, বিএনপির ভিতরের ভারত লবির একটি গ্রুপও আরএসএস সমর্থিত দল বা প্রার্থীকে বিএনপির মনোনয়ন দানের কথা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আরএসএসকে ঘোরতরভাবে এখানকার রাজনীতিতে ডেকে আনা তখন থেকে। অথচ ক্ষমতাসীনদের উচিত ছিল আরএসএসের সাথে কোনো রফায় বা কোনো সুযোগ করে দিতে না যাওয়া। তাতে বিএনপি পালটা যদি হিন্দু মনোনয়ন দিয়ে আরএসএসের কোলে গিয়ে উঠত, সেটা মোকাবেলার অনেক অনেক বিকল্প ও সহজ রাস্তা ছিল। সোজা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারলে তারাই শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসেও নড়ে’। তাই কিছু দিনের মধ্যে প্রিয়া সাহারা উন্মোচিত হয়ে যায়, ট্রাম্পের কাছে নালিশকাণ্ড থেকেই তাদের রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বাস্তবতা হল, শাহরিয়ার কথিত ওমন ৬১ টা কনষ্টিটুয়েন্সি যেখানে মেজর কনসেন্ট্রেশন ভোটার হিন্দুরা – এটা বাংলাদেশে বাস্তবত কোথাও নাই। আমাদের কোন কনষ্টিটুয়েন্সি আপনা থেকেই ওমন কোন ধর্মীয় ভাগে বিভক্ত নয়, বরং ভৌগলিকভাবে মানে ইউনিয়ন বা উপজেলা হিসাবে একেকটা  কনষ্টিটুয়েন্সিতে পড়েছে, এভাবে বিভক্ত। আল্লাহ বাঁচাইছে, চাইলেও আমাদের কোন ধর্মীয় ভাগের কনষ্টিটুয়েন্সি নাই। কিন্তু এই সুযোগে আমরা দেখে ফেলেছি, আমাদের দলগুলোই মোদীর সরকারও না খোদ হিন্দুত্ববাদের কেন্দ্র আরএসএসকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোই বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা বানিয়ে দিতে, মেনে নিতে কীভাবে একপায়ে রাজি এবং বেপরোয়া!

এই অবস্থায় এই কথিত সাক্ষাৎকারের শাহরিয়ার এক সবচেয়ে বড় ভান করেছেন। ওখানে এক প্রশ্ন করানো হয়েছিল, সেটা মূল ইংরাজিটা ছিল এরকম……
Q. The journal South Asia has said that the RSS is working actively in Bangladesh. It has targeted the Hindu minority and is trying to forge a strong Hindu power bloc and a Hindu political party which could act as a power-broker.
প্রশ্নের মূল ভাবটা বাংলায় লিখলে তা হবে এমন যে, – বাংলাদেশে আরএসএস সক্রিয়ভাবে বাড়ছে। তারা স্থানীয় হিন্দুদের সাথে মিলে একটা শক্তিশালী “হিন্দু পাওয়ার ব্লক” নাকি বানিয়েছে?
জবাবে শাহরিয়ার কবির খুব শান্তভাবে বলেন যে, “তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য নেই”। তবে বাংলাদেশে আরএসএস এর রাজনৈতিক উপস্থিতি বা হিন্দু মহাজোট দল বা এদের সহযোগী দল গঠন ইত্যাদিকে সাহায্য করে এবার এসব কিছুকে অস্বীকার করলে আওয়ামি লীগ নিজের বোকামি ঢেকে রাখতে পারবে না। তবে এরপর শাহরিয়ার বাংলাদেশের হিন্দুদের “হিন্দু মৌলবাদী’ দল” না করতে পরামর্শ প্রদান করেছেন। বলেছেন, ” I would strongly advise the Hindu community not to form any fundamentalist outfit”।

তাহলে এবার তামাশাটা দেখেন, শাহরিয়ার আরএসএসকে সেকুলারিজমের মহিমা বুঝাইতে চেয়ে যেন বলছেন, I would like to state candidly that … we speak of a secular, welfare state………। অথবা আবার আরএসএসকে আশ্বস্ত করতে বুঝাইতেছেন যে শাহরিয়াররা বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের আকড় কনষ্টিটিউশনে, সেকুলার কনষ্টিটিউশনে [we are determined to go back to the 1972 Constitution ] নিয়ে যাবেনই। অর্থাৎ তামশাটা লক্ষ্য করেন, শাহরিয়ার এতই বুদ্ধিমান যে আরএসএসের কাছে সেকুলারিজম উপহার নিয়ে গেছেন!

একদিকে তিনারা আরএসএসে কাছে পঞ্চাশ হিন্দু প্রার্থী্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভেবেছিলেন সেই আশীর্বাদে বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকবেন। আবার এখন তারাই আবার আরএসএসের কাছে “সেকুলারিজম” উপহার নিয়ে যাচ্ছেন!

ব্যাপারটা হল, সারা ভারত যেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদের জ্বরে ছেয়ে গেছে, জয় শ্রীরাম না বলাতে মুসলমান পিটিয়ে মেরে ফেলছে। আবার, মোদীর সরকারী অবস্থান হল ভারতে কোথাও কোন পাবলিক লিঞ্চিং (পিটিয়ে মেরে ফেলা) নাই, ঘটে নাই তবে কিছু গুজব আছে। আরএসএস প্রধান মোহন ভগত দাবি করেছেন, লিঞ্চিং শব্দটা যেন ব্যবহার না করা হয়। কারণ লিঞ্চিং নাকি একটা “বিদেশি” ও “খ্রীশ্চান” শব্দ আর এসবের আলোকের বাংলাদেশে আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হিন্দুরাও এতে তাদের আকাঙ্খা ও দাবি সাজিয়েছেন। সেইখানে শাহরিয়ারেরা এই আকাঙ্খাকে সেকুলারিজম দিয়ে ঠান্ডা করতে বা আটকানোতে সক্ষম হবেন, এর কোন কারণ নাই। বাংলাদেশে আরএসএসের প্ররোচনায় বাংলাদেশের নেতা হিন্দুদের সেই আকাঙ্খা এখন এক কল্পিত “হিন্দুত্ববাদের বাংলাদেশে” পৌছে গেছে। শাহরিয়ার ও তার বন্ধুরা একদিকে বাংলাদেশে আরএসএস ও তাদের হিন্দুত্ববাদকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা করবেন আবার তাদের সেকুলারিজম উপহার দিবেন? এটা কোন তামশা? তারা যে তামাশা করতেছেন সেইটা বুঝবার হুশও তারা হারায় ফেলছেন।
আবার দেশে আর একদল লোক ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যারা আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা, হিন্দু মহাজোট দল খুলে দেওয়া গোবিন্দ প্রমাণিক বা দাসগুপ্ত অথবা ইসকনের ততপরতা ও প্রসাদ খাওয়ানো নিয়ে কথা বললে এরা অভিযোগ করছেন যে এই কথা তোলা নাকি “সাম্প্রদায়িকতা” করা হচ্ছে। সমাজ দুনিয়াদারির খবর না রাখা এরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের সাম্প্রদায়িকতার “মহিমা” যে কত অফুরান তাই দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে?

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে? অথচ এককথায় বললে, এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনীতি হতে পারে না, এটা তাদের স্বার্থে যাবে না। কারণ, অন্যদেশের স্বার্থে বাংলাদেশে তৎপর এক কোটারি হিন্দুগোষ্ঠীর ততপরতা এটা।

সুতরাং, ঐ সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের জন্য কাউন্টার প্রডাকটিভ হবে, হতে বাধ্য। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএসের প্রভাব বাড়াতেই, ওর কবলে চলে যেতেই এটা ব্যবহৃত হবে। কেন?
বাংলাদেশের কোন ধর্মীয় বা সামাজিক গ্রুপের বিশেষ অভিযোগের প্রেক্ষিত  বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহির সম্পর্ক পাতাতে পারে না। তাতে সেটা স্বেচ্ছায় অথবা ক্ষমতায় থাকার ভারতের সমর্থনের লোভ যা কিছুই হোক।
বাংলাদেশের সরকারের এক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতাসীনদের আশ্বস্ত করার কিছুই নেই। এটা তেমন বিষয় হতেই পারে না।

জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের সভায়ও আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই জবাবদিহিতা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন নয়। কারণ আমরাই স্বেচ্ছায় জাতিসংঘ ও ঐ কাউন্সিলের সদস্য হয়েছি। ওর নিয়মকানুনে আমরা নিজেই সম্মতি দিয়েছি। নিজের সংসদে তা রেটিফিকেশন করেছি। ঐ মানবাধিকার আমরা নিজ নাগরিকের বেলায় রক্ষা করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এথেকেই এটা আমাদের উপর প্রযোজ্য হতে পেরেছে।
কাজেই অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে আমাদের জবাবহিহিতার কোন সম্পর্ক হতে পারে না। ঠিক যেমন, ভারতে কোন মুসলমান নিপীড়ন হলে কী ভারত আমাদের কাছে জবাবদিহিতা করবে? সেটা কী আমাদের আশা করার ইস্যু হতে পারে?  আমরা কী ভারতের মুসলমান রক্ষাকর্তা সাজতে পারি?

খাড়া কথাটা হল,  বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকের অভিযোগে বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহিতা করতে যেতে পারে না। অথচ শাহরিয়ার কবির হাসিনা সরকারের হয়ে এমন তোষামোদি ও জবাবদিহিতার সম্পর্কই স্থাপনই যেন করতে গিয়েছেন। এটা আত্মঘাতি। এটা তিনি করতে পারেন না। ভারতের ক্ষমতাসীনদেরকে এখানে শাহরিয়ারের আশ্বস্ত করার কিছুই নাই। এটা শাহরিয়ারের বোকামি ও অনধিকার।

প্রিয়া সাহারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের “দুঃখ বেচে খাওয়ার লোক” হিসেবে তাদের চেয়ে শাহরিয়ারেরা কত নাদান ও অযোগ্য। কারণ তারা ভারতের আরএসএস এর ক্ষমতা ও এর শ্রীবৃদ্ধির স্বার্থে ততপর হয়ে চলতে জানে।  বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো যদি নাদান হতে চায়, যদি বাংলাদেশের দলগুলোকে ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে আরএসএস-কে যদি তারা ক্ষমতার উতস বা দাতা মনে করে এর অর্থ তাদেরকে আরএসএসের অধীনস্ত হয়েই রাজনীতিই করতে হবে। আরএসএসের রঙের রাজনীতিই করতে হবে।  এর বাইরে অন্য কিছু ঘটবে না। আর এরপর সেটা আর বাংলাদেশ থাকে, থাকবে না! এটা তাদের বুঝতে হবে। এমনকি সেটা আর বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশও থাকবে না!

যেমন বাংলাদেশের কোন হিন্দু নাগরিকের নালিশ করার জায়গা ভারত হতে পারে না, তেমনি তারা বাংলাদেশে আরএসএস বা হিন্দু মহাজোটকে ডেকে আনতে পারে না। তারা অথবা আমাদের কোন সরকার আরএসএস ও হিন্দু মহাজোটকে দোকান খুলতে দিতে পারে না। আবার আমরাও ভারতের কাছে জবাবদিহি করতে যেতে পারি না। তাহলে?

ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

এখন খাড়া কথাটা শুনেন ও মনে রাখেন।  ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৯ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আরএসএসের মন জয়ের চেষ্টা!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ছাত্রলীগের সমান্তরাল ক্ষমতার বুয়েট

ছাত্রলীগের সমান্তরাল ক্ষমতার বুয়েট

গৌতম দাস

 ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ks

আবরার হত্যা ও তাঁর বাবার মুখ

[সার সংক্ষেপঃ  আমাদের যতই রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থ থাক, কী অনুভূত হোক, আমরা কী একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিচালনা করতে সেই প্রশাসনের উপরে একটা সরকারী ছাত্র সংগঠনকে বসিয়ে দিতে পারি? রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থের দিক থেকে এটাকে খুবই সুবিধার ও মোক্ষম কার্যকর মনে হলেও এটা চালু করলে কী হয় এরই ক্লাসিক কেস হল চলতি বুয়েট। আবার, সবকিছুরই তো একটা শেষ আছে, এর দায় আছে!  সে দায় কে নিবে? সরকার ইতোমধ্যে হাত ধুয়ে ফেলেছে। বুয়েটের ভিসি সাইফুল ইসলাম ও তাঁর প্রশাসন সঙ্গীরা এখন সারা দেশের করুণার পাত্র। সবচেয়ে তাজ্জব কথা তিনি যে এমন দশায় পড়েছেন তাঁর আচরণ অথবা মুখের দিকে তাকালে মনে হয় না তিনি এটা বুঝেছেন।

বুয়েট একটা বিশেষ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রেক্ষিতে দেখলে তবেই এর গুরুত্ব কিছু বুঝা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীও চাইলে সেটা বুঝতে পারেন। অন্তত তিনি যদি তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থ বুয়েটের সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। বাংলাদেশ অনেক বড়, তুলনায় একটা বুয়েটকে এর বাইরে বিবেচনা করে রাখলে, রাজনৈতিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পড়বে না। এখনও সব শেষ হয়ে যায় নাই। শেষ সুযোগ কী আমরা নিতে পারব? আমাদের নানান স্বার্থ আছে, থাকবে। কিন্তু  প্রফেশনালিজমকে সবার উপরে জায়গা দিতে পারলে আমরা অনেক কিছুই পারব। আমাদের সিনিয়রেরা কী “প্রফেশনাল” হতে পারবেন না!  একটা প্রতিষ্ঠানের মর্ম বুঝতে যোগ্য হব না! নিজের সার্টিফিকেটের মর্ম কী বুঝব না? অপমানিত, ধুলায় লুটাতে দিব? একটা প্রতিষ্ঠান গড়া ও তা ধরে রাখার পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের মর্ম আমরা যদি না বুঝতে পারি তাহলে আর কী! বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যত নাই বুঝতে হবে। ]

সব না হলেও অনেক কিছুই যেন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ভিত-কাঠামোসহ সবকিছু ভেঙ্গে পড়ার ইঙ্গিত আছে তাতে। বাইরে থেকে দেখলে ঘটনা হল, সম্ভাবনাময় এক ছাত্র বুয়েটের আবরার ফাহাদকে নির্মম নির্যাতন করে ছাত্রলীগ নেতার মেরে ফেলেছে। কিন্তু এটা এক হিমশৈল [Iceberg] এর প্রকাশিত উপরের সামান্য চুঁড়া মাত্র। যার নিচে বিরাট বরফের চাঁইয়ের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা। তাই দেখলে চাইলে সব ফকফকা স্বচ্ছ দেখা যাচ্ছে যে সবকিছু ভেঙ্গে পড়ার অপেক্ষায়। একারণেই বলতে হচ্ছে, আবরারের হত্যা, এই বলিদান কী যথেষ্ট? খুব সম্ভবত না! আমাদের হুঁশে আসতে আমাদের আরও অনেক প্রিয় মানুষকে বলি দিতে হবে, ত্যাগ করতে হবে। তাদের লাশ লাগবে! তবেই যদি কিছু পরিবর্তন হয়!

এদিকে বিশৃঙ্খলা আর নির্বিকার কেলাসনেসের [callousness] প্রতীক হয়ে উঠেছেন এখন বুয়েটের ভিসি।
বুয়েটে (BUET) তাঁর বাসস্থান থেকে ঠাণ্ডা শরীর নিয়ে মৃত পড়ে থাকা আবরারের দূরত্ব ছিল মাত্র তিন-চার মিনিটের হাঁটা পথ। এই কয়েক মিনিট তিনি তাঁর নিজের এই জীবনে আর পার হতে বা ছুঁতেই পারলেন না। অবশেষে কোনও মুরুব্বির বকা খেয়ে যখন দৌড় লাগালেন, ইতোমধ্যে ছত্রিশ ঘণ্টা গত হয়ে গেছে। এখন তিনি বলছেন, তাকে কেউ জানায়নি। অথচ তিনিই তো  বুয়েটের প্রশাসনিক প্রধান। তাকে বাইরের কেউ জানাবে কেন, যদি না উনি ভেতরের কাউকে জানানোর দায়িত্ব দিয়ে রাখেন? তিনি তো সেটাও পারেন নাই!
আসলে না কোনো প্রশাসনিক দক্ষতার গুণবিচারে; না মানবিক গুণবিচারে, দু’দিক দিয়েই বুয়েট ভিসি নিজেকে চরমভাবে অযোগ্য ও ব্যর্থ প্রমাণ করেছেন। বকা খেয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী তিনি দৌড়ালেন, শেষে পৌঁছে ছিলেনও বটে; কিন্তু ততক্ষণে আবরার  সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে। আবরারের ক্ষমা তিনি পেলেন না।
তিনি তো ভিসি, ফলে বুয়েটের যেকোন ঘটানায় তাঁকে সামনে দেখতে পাবার কথা! কিন্তু সেই যে ছত্রিশ ঘন্টা পিছিয়ে পড়া, সেই থেকে তিনি এখনও সবসময় ঘটনার পিছনেই দৌড়াচ্ছেন।

আবরার মারা গেছেন ৬ অক্টোবর সারা দিন টর্চার খেয়ে সেদিন পেরিয়ে রাত প্রায় ২টার সময়। আর জানাজানি না হয়ে উপায় ছিল না ভোর ৪টার পর থেকে। তবু ৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত নানান চেষ্টা চালানো হয়েছে ঘটনা লুকানোর জন্য। যুগান্তর অনলাইন সকাল পৌনে ১০টায় লিখেছে, “হল প্রভোস্ট মো: জাফর ইকবাল খান বলেন, রাত পৌনে ৩টার দিকে খবর পাই, এক শিক্ষার্থী হলের সামনে পড়ে আছে। কেন সে বাইরে গিয়েছিল, কী হয়েছিল, তা এখনো জানা যায়নি”। পরে প্রকাশিত ফুটেজে দেখা যাচ্ছে- ছাত্র কল্যাণ পরিচালকসহ প্রভোস্ট ওই ৭ অক্টোবর ভোরে এর আগেই জেনে গেছেন কারা আবরারকে কিভাবে মেরেছে। বুয়েটের ডাক্তারও আবরারের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া আবরার হলের সামনে নয়, ভেতরেই সিঁড়ির মধ্যে পড়ে ছিলেন।

আবার সকাল সাড়ে ১০টায় দৈনিক দেশ রূপান্তর, তখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে সব আড়ালে ঢাকা দেবার। তাই লিখছে,  “বিতর্কিত’ পেজে লাইক, শিবির সম্পৃক্ততা ছিল নিহত বুয়েট ছাত্রের : ছাত্রলীগ নেতা”- এই শিরোনামে রিপোর্ট ছেপেছে। অর্থাৎ তখনও ছাত্রলীগের দিক থেকে খুনের সাফাই জোগাড়ের চেষ্টা চলছে। সহায়তা করছে এই পত্রিকা। আর এরপর থেকেই সব ভেঙ্গে পড়া শুরু হয়ে যায়। কারণ ইতোমধ্যে দুই পুলিশ কমিশনারেরা স্বীকার করে নিয়েছেন, এটা ছাত্রলীগের ছেলেদের কাজ। এ ছাড়া ততক্ষণে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতারও হয়ে গেছিল। বেলা পৌনে ৩টায় বিডিনিউজ২৪ জানাচ্ছে–   সেতুমন্ত্রী বলেছেন, “ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই : কাদের”।

সাবাস সেতু মন্ত্রী!  বিরাট সাহসী বীর আপনি মানতেই হয়! শত কথার এককথা হল – সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই”। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তার একথা বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কত দেরি? না হলেও একেবারে প্রায় এগারো বছর।

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই”। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তার একথা বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কত দেরি? না হলেও একেবারে প্রায় এগারো বছর।

এই সরকার ক্ষমতা নিয়েছিল ২০০৯ সালের শুরুতে। এরপর বিশেষত শাহবাগ আন্দোলন থেকেই যে কাউকে ‘জামাত-শিবির’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারলেই এবার তাকে মেরে ফেলা, নির্যাতন করা বৈধ করে নেয়া শুরু হয়েছিল। এই সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে পাঁচ শতাধিকের বেশি গুম-খুনের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে তোলা অভিযোগ তো আছেই। এসব নিয়ে প্রকাশিত দেশী মিডিয়া রিপোর্টে সরকারকেই ‘জামাত-শিবির’ করার সাফাই বেশি দিতে দেখা গেছে। তাহলে? এগুলোর কী হবে?
ইতোমধ্যে বুয়েটের টর্চার সেলে যারা নিপীড়িত হয়েছেন তাদের বয়ানগুলো ফেসবুকে ভেসে ওঠা শুরু হয়েছে।

বুয়েটে সাধারণ ছাত্রদের প্রতিরোধ দানা বাঁধতে সময় লেগেছিল। পুলিশ কমিশনার আর প্রভোস্ট এসেছিলেন সকালে ফুটেজ নিয়ে চলে যেতে। তাতে বাধা দিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ রক্ষার সময় থেকে শুরু করে বিকেলের মধ্যে নির্যাতিত ভুক্তভোগীরা (অসংখ্য চড়-থাপ্পড়, কান ফাটিয়ে ফেলা, পঙ্গু করে ফেলা ইত্যাদি যাদের সহ্য করতে হয়েছিল) তাদের সহপাঠীদের সমর্থনসহ সংগঠিত হয়ে যায়। ঢাকনা খুলে যায়। গত এগারো বছরের পাথর সরে যায় এই প্রথম। বুয়েটের ঘটনাবলীতে যারা ইতোমধ্যে বুয়েটের ভেতরের বিভিন্ন ফুটেজ দেখতে মনোযোগ দিয়েছেন, তারা হয়তো খেয়াল করেছেন – হলের ভিতরে কোণায় কোণায় ‘র‌্যাগ-নিষিদ্ধ’ বলে হল কর্তৃপক্ষ পোস্টার সাটিয়েছে।

বুয়েটে কোন র‍্যাগ নাই। টর্চার সেলের কাহিনীগুলোকে
‘র‌্যাগ’ বলে আড়ালের ও চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

আর টর্চার সেলের কাহিনীগুলোকে ‘র‌্যাগ’ বলে চালানোর চেষ্টা দেখেই বোঝা যায়, ভিসি থেকে শুরু করে পুরো হল প্রশাসন কেমন দায়িত্বশীল ছিল! বুয়েটের একজন শিক্ষকের আয় কি এতই কম যে, তাদের কোন বাড়তি আয় সুবিধা পাওয়ার লোভে কারও অপরাধকে সহায়তা দিতে হবে!

শাহবাগের সময় থেকেই আস্তে আস্তে কথিত “সিনিয়র-জুনিয়র” কালচারটা পরিকল্পিতভাবে চালু করা হয়েছিল। এটা এর আগে কোনো দিন বুয়েটে ছিল না। এটা আসলে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ বলে কোনো কিছু নয়। এটা হল, হলের সব ছাত্রছাত্রী ও ভিসিসহ প্রশাসন পর্যন্ত সবার ওপর ছাত্রলীগের বলপ্রয়োগপূর্বক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাদের কাজ মূলত দুটা; এক. ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রলীগ নেতারা যেন হলে সর্ব-কর্তৃত্বময় নির্দেশদাতা হয়। এর নিচে ব্যাচের স্তর অনুসারে একটা প্যারালাল কর্তৃত্ব কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে বুয়েট শাসন করা। আর এ কাজের সাফাই হিসেবে, বিএনপি-জামাত-শিবির ট্যাগ লাগিয়ে এই ক্ষমতা কাঠামোর সহায়তায় বিরোধীদের নির্মূল করা। দেখা যাচ্ছে, অনেক চিন্তাভাবনা করেই কাঠামোটা সৃষ্টি করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কাজটা হল, ফার্স্ট ইয়ার থেকেই ছাত্রলীগের নেতাদের প্যারালাল ক্ষমতা কাঠামোটা চালানোর উপযোগী করে গড়া বা ট্রেনিং দেয়া। এটাকেই প্রশ্রয়ের ভাষায় ভিসির প্রশাসন নাম দিয়েছে ‘র‌্যাগিং’। এর ট্রেনিংয়ের ম্যানুয়াল পুলিশের ট্রেনিং স্কুলের মত।

পুলিশ মানে ওভার-পাওয়ারিং। কথিত আসামীর চেয়ে পুলিশের ক্ষমতাবেশি বা উপরে এই ভাব-আবহাওয়া তৈরি করা বিশেষত তা পুলিশটাকে বিশ্বাস করানো – এর লক্ষ্য। আপনি-আমি যেকোন মানুষকে হঠাত একটা সপাটে চড় মারতে পারব না। সামাজিক-মানসিক স্তুরভেদ আর মুরুব্বিসহ মানুষের সাথে সম্মান আদব-লেহাজ কী করতে হবে তা আমাদের ধর্ম ও সামাজিক এথিক্স আচার আমাদেরকে গড়ে তুলে থাকে। সেসব মুল্যবোধ আমাদের পিছনে টেনে রাখবে, তাই। অতএব আমাদেরকে তৈরি করা এই সমাজ থেকেই একজনকে তুলে নিয়ে পুলিশ বানাতে গেলে সবার আগে  আদব-লেহাজ সংক্রান্ত যেসব ভ্যালুজ সামাজিক মানসিকতা ওর তৈরি হয়ে আছে তা আগে ভেঙ্গে দিতে হবে। আর এর বদলে পুলিশের ক্ষমতা কাঠামো অনুসরণে ও পুলিশ প্রশাসনিক কালচারে ওকে রপ্ত করাতে হবে।  আসলে যেকোন বলপ্রয়োগ বাহিনী গড়তে গেলে এমন বাহিনীমাত্রই এমন সবচেয়ে নুন্যতম ট্রেনিং তাদের দিতেই হবে।  কিন্তু সরকারি বিভিন্ন বাহিনী তৈরির ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক হলেও একটা সরকারি ছাত্রলীগ এই ফর্মুলা অনুসারে তৈরি করা এটা ভয়ঙ্কর ও অকল্পনীয় বললে কম বলা হল। এটাই আসলে সমাজের নানান স্তর নিয়ন্ত্রণের হিটলারের ফর্মুলা।

বিশেষত বুয়েটের ছাত্রলীগ এভাবেই ট্রেনিংপ্রাপ্ত। প্রথম বা দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র যখন সহপাঠী বা কাউকে ধরে এনে টর্চার করতে সক্ষম হয় এবং এর পরেও কোনো শাস্তি ছাড়া সদর্পে বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাইরের সমাজে ঘুরতে পারে; এর অর্থ হল, কার্যত সংশ্লিষ্ট ঐ ছাত্রনেতা বা তাঁর ছাত্রলীগের অধীনে চলে যায় ভিসির প্রশাসন আর বাইরেরও পুলিশ প্রশাসনেরও কিছু অংশ। এই হল প্যারালাল ক্ষমতা। জামাত-শিবির দমন ও নির্মূল- এই সাফাই বয়ানের কাভারে। বিরোধী যেকোন পক্ষের উপর ওভার-পাওয়ারিংয়ের ক্ষমতা। অথচ ভিসির ভাষ্যমতে এগুলা নাকি র‍্যাগিং। আর ভিসি ও প্রশাসন  কথিত র‍্যাগবিরোধী কয়েকটা পোস্টার সাটিয়ে মনে করেছেন তাদের দায় শেষ।  আবার শিক্ষামন্ত্রী দীপুমনির র‍্যাগিংয়ের পক্ষে সাফাই দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, যা খুবই আপত্তিকর। প্রশ্রয়মূলক সাফাইয়ে তিনি বলেছেন, “সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কমবেশি র‍্যাগিং আছে: শিক্ষামন্ত্রী”। এটা টু মাচ! মন্ত্রী অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় দায় নিচ্ছেন, প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এটা তাঁর কাজ না। ছাত্রলীগকে দায়মুক্ত রাখার প্রচেষ্টার এই বক্তব্য আত্মঘাতী। এক সময় এটা তাদের সবারই বিরুদ্ধে যাবে। প্রথমত এটা র‍্যাগ নয়, পুলিশি ম্যানুয়ালে ছাত্রলীগের ট্রেনিং। এক প্যারালাল প্রশাসন, এটা মনে রাখতে হবে।

প্রতি বছর সারা দেশের উচ্চমাধ্যমিক পাস স্টুডেন্টদের থেকে বুয়েট নির্বাচনী পরীক্ষার মাধ্যমে ছেঁকে টপ সাড়ে পাঁচ শ’ (একালে সংখ্যাটা বোধহয় প্রায় ডাবলেরও বেশি ) স্টুডেন্টকে তুলে আনে বুয়েট। এই আইডিয়াটার জন্য বুয়েটের প্রথম ভিসি প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুর রশিদকে আমরা এই সুযোগে সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে নিতে পারি। তিনি বুঝতেন (১৯৫৮), নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রকে নিজের পায়ে দাড় করাতে গড়তে মেধাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার কেন পাইওনিয়ার। এবারের বুয়েটের ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে ভারতীয় মিডিয়া ভারতে তাদের নিজের পাঠকের জন্য  – বুয়েট কী, তা বুঝাতে একটা শব্দ ব্যবহার করছে “এলিট’ বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট”। বাংলাদেশের আমরা বুয়েটের ক্ষেত্রে “এলিট” শব্দ ব্যবহার করি না। “এলিট” [elite] শব্দটা মূলত সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে উপরের স্তরের মানুষ বুঝাতে ব্যবহার করা হয়। ছেঁকে টপ সাড়ে পাঁচ শ’ স্টুডেন্টকে বুয়েটে তুলে আনা হয় বলে এবং কেবল ‘মেধা’ অর্থে, বুয়েট অবশ্যই এলিট। কিন্তু সাবধান, একে টাকাপয়সাওয়ালা সামাজিক এলিট বলে বুঝা ভুল হবে। এমনকি আবরার হত্যা ঘটনায় যে উনিশ (বা কিছু বেশি) তরুণ ছাত্র-আসামি তাদের অন্তত একজন ভ্যানচালকের সন্তান। এটা বাংলাদেশে এখনো সম্ভব। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পয়সা লাগে না, মেধা হলেই চলে। তাই এটা সম্ভব। তবে আমাদের সমাজের চোখে বুয়েট এতটা চোখের মণি হয়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হল, তুলনামূলক অর্থে ইঞ্জিনিয়ারের চাকরির সুযোগ বেশি, চাকরিতে সুযোগ সুবিধাও বেশি, আপসে ও বিনা খরচে বিদেশে পড়া বা চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। পশ্চিমা গ্রহীতা দেশে তারাই আগে গ্রিন কার্ড পেয়ে যান ইত্যাদি।

এসব মিলিয়ে বলা যায়, পুরা সত্তর-আশির দশক তো বটেই, এমনকি নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত (তবে কিছুটা শিথিলভাবে) বুয়েট ও এর প্রশাসন তুলনামূলকভাবে মডেল বা আদর্শ ছিল। যেমন সবসময়ই কোনো ছাত্রের অসদাচরণের জন্য যদি প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি বসানো হত, সেটা ছিল যেকোনো ছাত্রের জন্য জীবনের সব স্বপ্ন বরবাদ হয়ে যাওয়ার সমান। কারণ, অল্প কিন্তু সিরিয়াস দোষে সে বহিষ্কৃত হয়ে যেতে পারে। এর মূল কারণ, প্রশাসনের স্বচ্ছনীতিতে চলা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। খুব সম্ভবত রশীদ স্যারের সেট করে দেয়া প্রশাসনিক নিয়ম ও আদর্শ তার উত্তরসূরিদের আকর্ষণ, উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য করতে পেরেছিল। সমাজে-রাষ্ট্রে একটা “প্রতিষ্ঠান” গড়ে তোলার অধ্যবসায় ও পরিশ্রম; আর এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার গুরুত্ব এসময়-গুলো সম্ভবত সবাই বুঝত, অন্তত দায় বোধ করত। এমন হওয়ার আরেক বড় কারণ হল, দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে বুয়েট প্রশাসনের একটা দূরত্ব রাখা। আসলে বুয়েটের ছাত্র বা শিক্ষকরা রাজনৈতিক প্রভাব জোগাড় করে তা খাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুবিধা পাওয়ার চেয়ে নিজ যোগ্যতায় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা সমাজে আরো ঢের বেশি থাকত বলে সে দিকে ছাত্র ও শিক্ষকেরা আগ্রহী হতো না। কিন্তু মোটা দাগে নব্বইয়ের দশক থেকে এর ঢলে পড়া শুরু। বুয়েটের মূল কালো জায়গা ভিসি নির্বাচন, আর সেখান থেকে দলবাজি, দলকানা হয়ে নিয়ম-আইন ও রেওয়াজ ভেঙে ফেলা। খামোখা বড় দুই দলেরই সমর্থক  সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মুখগুলো এসব আত্মঘাতী ও অবিবেচক সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী। আর ২০০৯ সালের পর থেকে এরই নতুন ডাইমেনশন হল – বুয়েটের এক ‘পুলিশ ম্যানুয়ালে’ চলে যাওয়া, যার অর্থ ভিসিসহ প্রশাসন ছাত্রলীগের অধীনে কার্যকর হওয়া।  প্যারালাল ক্ষমতার নির্যাতন কক্ষের বুয়েট – একারণেই আজকের বাস্তবতা।

এটা ভুলে যাওয়ার কিছু নেই যে, গত এগারো বছর ধরে বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ম নিয়ন্ত্রণ সব ভেঙে গেছে। বাইরের এসব প্রভাব ঠেকিয়ে একা বুয়েট কতটা ঠিক থাকবে? কিন্তু তাই বলে, ছাত্রলীগের অধীনে ভিসিসহ প্রশাসন চলে যেতে পারে না। পুলিশ কমিশনার এসে ভিসি-প্রভোস্টসহ প্রশাসনকে না ছাত্রলীগ সেক্রেটারিকে জিজ্ঞেস করবেন, ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকবে কি না!

তবে মূলত সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়ে পরার কারণে আপাতত পরিস্থিতি পালটে গেছে। তাই দৃশ্যত সময়টা এখন সরকারের দিক থেকে সমস্ত  দায় অস্বীকার করার। যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরম ভাষায় পুরা দায়ে দায়ী করেছেন ভিসিসহ বুয়েট প্রশাসনকে। বলেছেন, ‘বুয়েট প্রশাসনের আরেকটু সতর্ক থাকা দরকার ছিল’। কোথায় সতর্ক থাকা দরকার? তিনি উল্লেখ করে বলছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন না ডাক দিলে পুলিশ ভেতরে ঢোকে না জানিয়ে তিনি বলেন, এ জায়গাটিতে” সতর্ক থাকা দরকার। অর্থাৎ আবরারকে হত্যা করার দায় ছাত্রলীগেরও নয়। সরকারেরও না – এককভাবে ভিসিসহ বুয়েট প্রশাসনের!
তাহলে এবার বুঝেছেন ‘কার স্বার্থে’ বুয়েটের ভিসি সাইফুল ইসলাম আপনি, এতদিন ছাত্রলীগের অধীনে প্রশাসন চলতে দিলেন? কেউ দায় নিবে না। নেওয়ার কথা না। সত্যিকারভাবে বললে, ভিসি ও তার প্রশাসন প্রভোস্ট, সহ-প্রভোস্ট, ডিএসডাবলু আপনারা সকলে সীমা পার হয়ে [হত্যায় সহায়তা করা] একটা ক্রিমিনাল অপরাধের জোনে চলে গেছেন। ভেবেছেন সরকার চাইলে আপনাদের কোন দায় নাই। সরি। এটা একেবারেই ভিত্তিহীন ধারণা। আদালত ‘চাইলে’ আপনাদেরকেও অপরাধে সংশ্লিষ্ট করতে পারে। প্রশাসনের ক্ষমতা শেয়ার করার দায় আপনাদেরও।

আবার দেখেন, গত ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলন (‘যুগান্তর’ লিখেছে) প্রসঙ্গে শিরোনাম, “সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হল তল্লাশির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর”। মূলত হলে টর্চার সেল থাকা প্রসঙ্গে কথাটা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোসহ হল তল্লাশির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, হল দখল করে রেখে মাস্তানি করা চলবে না। সারা দেশে খোঁজ-খবর নেয়া হবে’। অর্থাৎ এর সোজা মানে প্রধানমন্ত্রী মানে তাঁর সরকার ও দল এই হত্যার কোন দায় নিচ্ছেন না।

এখন যদি তিনি সিরিয়াস হয়ে বলে থাকেন তাহলে বড়জোর আমরা জানতে চাইতে পারি, ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, আর কী অগ্রগতি হয়েছে তাতে। আর যদি কথার কথা এটা হয়ে থাকে তাহলে পাবলিকের আর কিছু বলার নাই। তবে এতটুকুই কেবল জানিয়ে রাখতে পারি যে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার পরিণতি দেখে পাবলিকের  “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের” উপর আস্থা কতটুকু সেটাও চাইলে তারা খোঁজ নিয়ে নিতে পারেন। এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, আবরার হত্যার এক আসামি ‘অমিত সাহা’, আবরারকে খুনের প্রসঙ্গে তাকে আদালতে তোলার এক ফাঁকে তিনি যুগান্তরকে বলেছেন, ‘বুয়েটের ট্র্যাডিশনই এটা যে, অর্ডার ওপরের (সিনিয়র) থেকে আসে। সিনিয়র ব্যাচ অর্ডার দিলে জুনিয়র ব্যাচ তা করতে বাধ্য। এটা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই”।
এই ‘উপরের’ বলতে কত উপরের? সেটা এক বিরাট প্রশ্ন! জবাব পাওয়া খুবই মুশকিল।  তবে বোকা হয়ে যাওয়া অমিত সাহা হয়ত ভাবছেন এটা বলে তিনি সরকারকে জড়ায় ফেলতে পারবেন!  আমরা খুবই দুঃখিত অমিত সাহা।  আপনি আটকে গেছেন। আপাতত মুক্তি নাই। কিন্তু ‘সিনিয়র ব্যাচ অর্ডার দিলে জুনিয়র ব্যাচ তা করতে বাধ্য’- বুয়েটে কখনও এমন ট্র্যাডিশনের কথা আমাদের জানা নেই। হতে পারে একালে ২০০৯ সালের পরের কথা। কিন্তু তবু নিশ্চিত থাকেন আপনার দায় এখন কেউ নিবে না।

ওদিকে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত প্রমুখ বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে ডঃ আইনুন নিশাতের একটা মন্তব্য দেখেছিলাম টিভি নিউজ ক্লিপে যার সারকথাটা হল – “বুয়েটের হল প্রশাসন আর প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্টের হাতে ছিল না”। যেখানে বুয়েট চলে ছাত্রলীগের পুলিশি ম্যানুয়ালে, সেখানে হল প্রশাসন তো এমনই হওয়ার কথা। প্রশ্ন হল, তাহলে হল প্রশাসনের প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্ট ‘কোন লোভে’ এই বাড়তি প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে আসতেন? ‘চেতনা’ বা লীগ ভালোবাসেন বলে ছাত্রলীগের অধীনে থেকে  প্রশাসন চালাতে তাদের ভালো লাগত? অথবা এটা বাড়তি কোনো সুযোগ সুবিধার অর্জনের খাতিরে!

জামিলুর রেজা চৌধুরীর উপস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপুমনি খুবই নাখোশ। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি, যেটা অবশ্য খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আবার বুয়েট ভিসি ভোয়া এবং যুগান্তরের কাছে বলেছেন যে, কেন জামিলুর রেজা চৌধুরী তার পদত্যাগ চাইলেন? ভিসি উল্টা দাবি করেছেন, তিনি কোনো দোষ করেননি। তাই পদত্যাগ করবেন কেন? তাহলে ভিসি সাধারণ ছাত্রদের সাথে আলোচনায় অন্তত দু’বার ক্ষমা চেয়েছেন। দেখুন ‘যুগান্তরে’, ‘ক্ষমা চাইলেন বুয়েট ভিসি’। এটা কি তাহলে, স্ববিরোধী নয়? আর তাঁর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হল – পুরা বুয়েট প্রশাসন ছাত্রলীগের পুলিশি ম্যানুয়ালে বা কাঠামোতে চলে যাওয়া। এটা তিনি যেতে দিবেন কেন? এটা তাঁকে দেয়া ক্ষমতা, এই ক্ষমতা তিনি কাউকে দিবেন কেন? গেল কী করে? ভিসি ছাত্রদের সাথে ওই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগের সব টর্চারের বিচার করবেন।
এতে আসল কথা হল দুইটা। এক, স্বীকার করলেন, আগে বুয়েটে নির্যাতন হয়েছে। তাহলে তখন কোন অ্যাকশন নিলেন না কেন? এটা কি আপনার গুরুতর ব্যর্থতা নয়? দ্বিতীয়ত, আপনি এখনই এবারে বিচার করতে সক্ষম হবেন কেন? আপনি সরকারের দলীয় হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পারবেন, এর নিশ্চয়তা কিভাবে দিবেন? গত কয়েক বছর ধরে আপনার ওপর ছাত্রলীগের কর্তৃত্ব করা ঠেকাতে পারেননি। ছাত্রলীগের অধীনে চলে গেছেন আপনি। এটাই আপনার চরম ও পরম অযোগ্যতা। আপনার কাছে এখনো দল অনেক বড়, আপনার ভিসি হিসেবে দায়িত্বের চেয়েও বড়। এর চেয়ে বড় অযোগ্যতা আর কী?

বুয়েট এখন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাথে শিক্ষক রাজনীতিও। অনেকেই দেখছি হতাশ; সম্ভবত রাজনীতি নিষিদ্ধ” এই বাক্য কয়টার কারণে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ কথাটার অর্থ বুঝতে হবে। বুঝতে হবে পাশে লেখা ‘শিক্ষক রাজনীতিও নিষিদ্ধ” – এইকথার ভিতর দিয়ে। আসলে সকলে চেয়েছে যেকোন উপায়ে ক্ষমতাসীন সরকারের হস্তক্ষেপের সুবিধা বন্ধ করতে। কিন্তু তা কার্যত সম্ভব নয়। অন্তত আজকের বাংলাদেশে। তাই  সরকারের হস্তক্ষেপ ঘটার যে মাধ্যম “শিক্ষকদের পেটি কামড়াকামড়ি” – এটাকে দূরে রাখতে যদি পারা যায় সেটা আপাতত মন্দের ভাল হতে পারে। আবার সিনিয়র ও শিক্ষকদের অবস্থা বুঝা যাবে চলতি ভিসির সাক্ষাতকার, জামিলুর রেজা চৌধুরীর সম্পর্কে মন্তব্যে, আর পরে ডঃ আইনুন নিশাতের দেয়া প্রথম আলোতে সাক্ষাতকারে। তবে মোটের উপর এটা কতটা কাজ করবে তা নির্ভর করছে সরকারের উপর। হাসিনা যদি এই বুয়েট প্রতিষ্ঠানের মর্ম বুঝে থাকেন, এই প্রতিষ্ঠানের সাথে রাষ্ট্র গঠনের সম্পর্ক উপলব্দি করে থাকেন, তাহলেও অনেক কিছু সম্ভব। হাসিনার নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ পাশে সরিয়ে রেখেও তা তিনি করতে পারেন। তবে শুরুতে এটা চলতি ভিসিকে রেখে এটা একেবারেই অসম্ভব, তা বলাই বাহুল্য।

কাজেই ভিসি নিয়োগের পদ্ধতি বদলানো থেকে শুরু করে সব স্বচ্ছ করা ছাড়া, সর্বোপরি রাজনীতিবিদদের দলীয় ভিসি পাওয়া দরকার-  এই চাহিদা বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত পাবলিকের মুক্তি নেই।

সবশেষে কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের স্ববিরোধী দোলাচাল বা শিফটিংঃ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ, কমিউনিস্ট দল সিপিবির সদস্য। এখানে তাকে কেন্দ্র করে কিছু কথা বলব তবে সেটা ব্যক্তি আকাশ নয়, তাই কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের একজন প্রতিনিধি হিসাবে তাকে বিবেচনা করে এটা পাঠ করলেই সুবিচার হবে।
গত ২০১৫ সালে ১৬ মার্চে সমকাল পত্রিকায় তারই লেখা একটা কলামে তিনি বলেছিলেন, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির এ ক্ষেত্রে যা করণীয় সেটা হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসী শক্তিকে যদি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও দুর্বল ও নিঃশেষিত করতে পারে, তাতে বাগড়া না দেওয়া”। এর সারকথাটা হল, “আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও” জামাত-শিবিরকে “নিঃশেষিত করতে পারে, তাতে বাগড়া না দেওয়া” -।  মানে জামাত-শিবিরের রাজনীতিকে “রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও” নির্মুলে তার আপত্তি নাই, উতসাহ আছে।
তাহলে এখন এবার আবরারের হত্যার পর এক সমাবেশে তিনি সরকারকে অভিযুক্ত করে সরকারের অবস্থান ও নীতিকে ব্যাখ্যা করে বলছেন, “…যে আমি ফ্যাসিবাদি কায়দায় , বক্তব্যের স্বাধীনতা দিবনা”।  অর্থাৎ আবরারের পক্ষে দাঁড়িয়ে এখন তিনি সরকারকে বক্তব্যের স্বাধীনতা না দেওয়ায়,  সরকারকে ফ্যাসিবাদী বলে অভিযোগ আনছেন।

এর অর্থ কী আকাশ কী এখন অবস্থান বদলেছেন? এছাড়া আরও বলছেন, “……কেউ শিবির করলে,যদি সেই শিবির করে,তাহলে তার সেই অধিকার আছে কিনা সেটার তো মীমাংসা করতে হবে”।
এটা একা আকাশের নয় কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের সাধারণ সমস্যা ও লক্ষণ। জামাত-শিবিরের মত বিরোধী মতকে একবার মনে করে এদের নির্মুল মানে জবেহ করা উচিত। আবার আর এক সময় মনে করেন বিরোধী মতকে জায়গা করে দিতে হবে। ছাত্রলীগকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার আইনে মামলা করার। মানে খুন না করে সাইবার আইনে মামলা করতে।
আবার সবশেষে বলছেন, শিবিরের অধিকার কী কী সেটার তো মীমাংসা করতে হবে!
এই সমস্যার সোজা জবাব হল কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীদের কাছে এর মীমাংসা নাই। বা বলা যায় তারা মীমাংসা করতে পারবে না। মূল কারণ, “অধিকার” অথবা “নাগরিক অধিকার”  কমিউনিস্টদের রাজনীতিই নয়। কাজেই ২০১৫ সালেরটা না এখনকারটা – এদুটোর কোন একটা তাদের কৌশলগত বক্তব্য।

এর সমাধান মীমাংসা পেতে চাইলে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীতার বাইরে দাঁড়াতে হবে।


গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১২ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে দেশে আসলে কী হচ্ছে?এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম’

 

গান্ধীর ‘হিন্দুইজম

গৌতম দাস

০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2JS

https://www.kolkata24x7.com থেকে নেওয়া

[সার সংক্ষেপেঃ ছুপা হিন্দু জাতীয়তাবাদী গান্ধী-নেহেরুসহ ভারতের ইমেজ হল গান্ধীরা খুবই ভাল মানুষ। আর জিন্নাহ বেটা খুব খারাপ তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানিয়েছে, এতই খারাপ এরা। কিন্তু কঠিন সত্যি হল কংগ্রেস গান্ধী-নেহেরুসহ এরাই নিজেদের হিন্দুইজমের বাইরে কখনই যায় নাই। একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারতই কায়েম করতে কাজ করে গেছে তারা। আর এর সবচেয়ে বড় তাত্বিক নেতা হল গান্ধী। ফলে এদের হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হতে চাওয়াটাই নিরুপায় মুসলমানদেরকে ঠেলে দিয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান কায়েম করতে। কাজেই নিরুপায় হয়ে জিন্নাহ সঠিকভাবেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কায়েম করেছিলেন। বলা যায় মুসলিম লীগ মুসলিম জাতীয়তাবাদের দিকে কেন গিয়েছিল তা গান্ধী-নেহেরুসহ কংগ্রেসের হাতে নির্ধারিত হয়েছিল।
মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করা বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ কথিত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা যারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার দায় জিন্নাহ’র উপর এককভাবে চাপিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চায় তাদেরকে চ্যালেঞ্জ। এরা মনগড়া কথা বলে এই গল্প তৈরি করেছে। নিজেদের দায় আকাম জিন্নাহর উপর চাপিয়েছে।
এই লেখার একটা সারকথা এটা। তবে গান্ধী বনাম আরএসএসের তর্ক লড়াটাই কী ছিল তা জানার মাধ্যমে মূলত আপনাদেরকে চিনতে হবে গান্ধীর হিন্দুইজম-কে।]

 

আসেন ছুপা হিন্দুবাদীগণকে চিনে নেইঃ
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যাকে আমরা গান্ধী নামে চিনি। অনেকে তাকে আদর করে বা তেল দিয়ে তোয়াজ করতে বাপু বা মহাত্মা নামেও ডাকে। গান্ধী, জিন্নাহ, প্যাটেল- এরা সবাই মোদীর মতই গুজরাতি। যদিও সেকালের গুজরাট বলতে এটা বোম্বাই মানে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল। মাত্র গত ১৯৬০ সালে গুজরাত প্রথম বোম্বাই (মহারাষ্ট্র) থেকে রাজ্য হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। গত দুই অক্টোবর ছিল সেই গুজরা্তি গান্ধীর জন্মবার্ষিকী; তাও আবার ১৫০তম। সম্ভবত সে কারণে তাকে নিয়ে স্তুতিমূলক-মূল্যায়নের ছড়াছড়ি একটু বেশি দেখা গিয়েছিল এবার, এটা বলতে পারলে সহজ হত হয়ত। কিন্তু সমস্যা জটিল করে তুলতে সক্ষম হয়েছে, বিজেপি এবং আরএসএস এ দুই প্রতিষ্ঠানই। তাই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ‘১৫০তম’ জন্মবার্ষিকীই এবারের হইচইয়ের আসল কারণ কি না।

এক কথায় বললে, ভারতের জন্মের সময় থেকে কংগ্রেসের তৈরি সব না হলেও অনেক আইকন অথবা বয়ান এত দিন ধরে আরএসএস-বিজেপি এই গোষ্ঠী, এরা ভাগ বসিয়ে হয় নিজেদের আইকন করে নিয়েছে অথবা একে ম্লান বা পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। বিজেপির তেমনই আর এক এবারের উদ্যোগ হল গান্ধীকে নিজেদের আইকন করে নেয়ার চেষ্টা। খোদ আরএসএস প্রধান মোহন ভগত এ দিন দাবি করেছেন, “গাঁধীর আদর্শেই এগোচ্ছি”
তবে বলাই বাহুল্য, আইকন দখলের সময় বিজেপি-আরএসএস এর আগের বয়ান-মূল্যায়নকে নিজেদের মত করে আকার দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে থাকে। যেমন নেহরুর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গান্ধীঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল- এই প্যাটেলকে ইদানীং বিজেপি-আরএসএস একেবারে নিজেদের নেতা আইকন করে নিয়েছে। গুজরাতে পৃথিবীর দীর্ঘতম স্ট্যাচু এখন প্যাটেলের, মোদীর উদ্যোগে এটা বানিয়ে নেয়া হয়েছে। মোদীর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে ২০১৩ সালে, পরিচালনা কমিটি তৈরি, অর্থ সংগ্রহসহ এর কাজ তিনি উদ্বোধন করেছিলেন। প্যাটেলকে তুলে ধরারও কারণ-সূত্র একটাই। ভারত স্বাধীনের বছরের আগস্টের পরবর্তীকালে ৫৫০-এরও বেশি ছোট-বড় করদরাজ্যের রাজাগুলোকে বলপ্রয়োগে পিটিয়ে নতুন ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এই বলপ্রয়োগের প্রশ্নে নেহরুর সাথে প্যাটেল একমতে থাকলেও, প্যাটেল নিজে ও তার মন্ত্রণালয় ও এর কাজকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক আগ্রাসী ও চরমপন্থা অবস্থানে। আর শুধু সে কারণেই এক আগ্রাসী হিন্দুজাতিবাদী হিসেবে প্যাটেলকে পরিচিতির আইকন লাগিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে মোদি-আরএসএস গোষ্ঠী। তাই এবার খোদ গান্ধীকে দখল নিতে এবারে বিজেপি এক কর্মসুচি শুরু করেছে যার নাম, “গাঁধী সঙ্কল্প যাত্রা”। ভেঙে বললে এটা হল, থেমে থেমে আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে গান্ধীর জন্মের ১৫০ বছর পালনে বিজেপির নেয়া ১৫০ কিলোমিটার পদযাত্রার এক কর্মসূচি।

স্বভাবতই কংগ্রেসের গান্ধী, তাদের এত বড় “জাতির পিতা’ আইকন বিজেপি-আরএসএসের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া- এটা কংগ্রেস এখন দুর্বল ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেও আপত্তি তো তাদের তুলতেই হয়। তারা তুলেছেও, আর সাথে কমিউনিস্টরাও বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সঙ্গ দিয়েছে। বিজেপি-আরএসএসের গান্ধী দখলে এবারের বার্ষিকীতে ঝাপিয়ে পড়া নিয়ে খোঁচা মারাও কম হয় নি। যেমন কংগ্রেস নেতা  মল্লিকার্জুন খড়্গে; তিনি বলেন,  ‘‘এত দিন যাঁরা শুধু গডসের নাম নিতেন, ভোট পেতে তাঁরা গাঁধীর নাম নেওয়া শুরু করেছেন”।  গডসে [Nathuram Vinayak Godse] হল গান্ধীকে গুলি করে [৩০ জানুয়ারী ১৯৪৮] হত্যাকারী সেই আততায়ীর নাম। দলের দায় এড়াতে যে হত্যা করার আগে দিয়ে আরএসএস থেকে নিজে পদত্যাগ করে নিয়েছিল। আর একালে এই সেদিনও প্রকাশ্যেই বিজেপি গডসে কে দলের হিরো মেনেছিল।

ঘটনার এ দিকটা নিয়ে আমাদের আর এতে খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু এই ১৫০তম উপলক্ষে আমরা অন্তত তিনজন একাদেমিকের লেখা বা মন্তব্য জানতে পেরেছি। এদের একজন প্রফেসর ও লেখক রামচন্দ্র গুহ [Ramachandra Guha], যাকে গবেষক বা ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করা সিরিয়াস লেখক বলা যায়। কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি বর্ষ-পুরানা চিবিয়ে রাখা জিনিষটাই আবার চিবাতে থাকেন, এমন ভারতীয় একাদেমিক না। তার চিন্তার ফ্রেম পুরানাদের চেয়ে আলাদা। কাজেই খুব বড় করে পরিচয় না বললেও আপাতত অন্তত এতটুকু বলতেই হবে। তিনি কলকাতার ইংরেজি দৈনিক “হিন্দুস্তান টাইমস” এবং “টেলিগ্রাফে” কলাম লিখে থাকেন। সেখানে যেমন লেখা এক কলামের তিনি শিরোনাম দিয়ে দিয়েছেন – “সোনিয়া গান্ধীর কেন ইবনে খালদুন পড়া উচিত”। অবলীলায় ইবনে খালেদুনের নাম নিয়ে কথা বলা একাদেমিক ভারতে খুব কমই আছেন!

তিনি “গান্ধী ও আরএসএস” [Gandhi and the RSS] – এই শিরোনামে এক কলাম লিখেছেন গান্ধীর ‘১৫০তম জন্মবার্ষিকী’র তিন দিন আগে। এটা ছিল গবেষণাধর্মী দেড় হাজারের বেশি অক্ষরের এক সিরিয়াস লেখা, সাথে সুনির্দিষ্ট বইপুস্তকের রেফারেন্স। যার মূল প্রসঙ্গ হল, ঘটনাকাল ১৯৪৭ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর, এই সময়কালে গান্ধীর সাথে আরএসএসের সম্পর্ক কেমন গিয়েছিল, তা রেফারেন্সসহ তুলে আনা। তাঁর লেখায় ঘটনার মূল পাত্রপাত্রী হল একদিকে গান্ধী আর অন্য দিকে আরএসএস প্রধান গোলওয়ালকার [Golwalker] ও তার দল।  সে সময়ে নানান শহরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ঘটছিল আর গান্ধী সেসব শহরে গিয়ে দাঙ্গা থামানোর উপায় হিসেবে অহিংস প্রতিবাদে দাঙ্গা না থামা পর্যন্ত অনশনে বসছিলেন। এছাড়া এর পাশাপাশি আরএসএসও সেসব শহরে গিয়ে মুসলমান ও গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, হুমকি দিয়ে কিভাবে লিপ্ত হত অথবা তাদের মুখপাত্র “অর্গানাইজার” পত্রিকায় উসকানি দিয়ে কী লিখত, এমনকি গান্ধীর সাথে চিঠি চালাচালি বা একবারের মুখোমুখি সাক্ষাতে কিভাবে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার অভিযোগ অস্বীকারের লুকোচুরি খেলে গান্ধীর প্রচেষ্টাগুলো ভণ্ডুল করে গেছিল – গান্ধী রচনাবলী ও আর্কাইভ ঘেঁটে তা তুলে আনা- সেসবের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এই লেখায় পাব। তিনি বলেছেন, আর দুদিন পরে (জন্মবার্ষিকীতে) মোদী ও আরএসএস গান্ধী সম্পর্কে নানান ভাল ভাল কথার ফুলঝুড়ি [nice things will be said] তুলবে। তাই এর আগেই তিনি সেকালে গান্ধী ও আরএসএসের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নিয়ে এই রেকর্ড হাজির করে রাখতে চান।
এই লেখকের লেখা অনুসারে, পলিটিক্যাল লাইনের দিক থেকে গান্ধীর অবস্থান হল, তিনি বহুধর্মীয় জাতীয়তাবাদের (religiously plural nationalism) ধরণের এক ভারত চাইছেন, সেজন্য লড়েছেন। গান্ধীর এই হিন্দুবাদে হিন্দুধর্ম বলতে এটা ‘এক্সক্লুসিভ রিলিজিয়ান’ নয়। মানে একা হিন্দুধর্ম না, অন্য (মুসলমান) ধর্মও সাথে আছে। [Hinduism was not an exclusive religion]। কিন্তু মূলকথা এই বিশেষ হিন্দুবাদের, একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভারত চাইছেন গান্ধী। বিপরীতে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার চাইছেন মুসলমানদের মেরে কেটে হলেও বাধ্য করে পাকিস্তানে পাঠানো। হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই মুসলমানদের হিন্দুস্তানে রাখে” [no power on Earth could keep them in Hindustan”]। তো এসব লেখা বা কথার সারাংশ হল, একজন মুসলমানদের কচুকাটা করে ভাগাতে চাইছেন তো অন্যজন হিন্দু-মুসলমানের কথিত ঐক্যের পুর্বশর্ত ও এর জোয়ার তুলতে চাইছেন। না হলে অনশনে, না খেয়ে রইছেন। আর একারণে কাজের কাজ কিছু হোক আর না হোক অন্তত সহানুভুতি তার পক্ষে যাচ্ছে। এতে গান্ধীর আপাত জিত ও জাতির পিতা হওয়া তো কার পক্ষে ঠেকানো যায় নাই।

কিন্তু আসল কথা হল, তাতে লাভ কী হয়েছে? ভারত কি হিন্দু-মুসলমানের ভারত হয়েছে? পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলেও ভারতে নিয়মিত দাঙ্গা হয়ে চলেছে। এমনকি চলতি শতকের শুরুতেও গুজরাটে বড় দাঙ্গা হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত নাগরিকের রাষ্ট্র হতে পারেনি। হিন্দুর রাষ্ট্র হয়ে থেকেছে। পারস্পরিক ধর্মীয় বিদ্বেষ কিছুই মেটেনি, দীর্ঘ সময় যাওয়াতে যা যতটুকু চাপা পড়েছিল তা প্রবল হচ্ছে আবার। সারকথা গান্ধীর নিজের আমল থেকেই দাঙ্গা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু কেন? এর জবাব গান্ধী কখনো দেননি। অর্থাৎ গান্ধীর হিন্দুইজমের ভারতরাষ্ট্র এটা কখনই সমাধান হতে পারে নাই। আসলে তা হওয়ার কথাও না।

তবে রামচন্দ্র গুহের এই পরিশ্রমী কাজটির পরও এই লেখা থেকে একালে, মোদি-আরএসএস খারাপ আর গান্ধী মহান- এর বেশি কিছুই প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। গান্ধীর হিন্দুইজমের বিপরীতে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ- এর ভারত আরও শক্ত হয়ে হাজির হয়েছে। এককথায় রামচন্দ্র গুহের পরিশ্রমটার মধ্যে কোন প্রতিকার নাই, ইঙ্গিত নাই। আছে খালি গান্ধী মহান! সে তো আমরা সকলেই জানতামই!

আবার আর দুই শিক্ষাবিদ- গৌতম ভদ্র ও দীপেশ চক্রবর্তী, এদের মন্তব্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করেছে আনন্দবাজার, এখানে “গাঁধীর স্বরাজ আর সঙ্ঘের রাষ্ট্র এক নয়” – এই শিরোনামে। এদুইজনের মিলের দিকটা হল তারা নিজেদের সাবঅল্ট্রান [subaltern] ধারার প্রবক্তা ভাবেন বা ভাবতেন, যদিও তারাই এখন বলে থাকেন, এই ধারা এখন সাংগঠনিকভাবে মৃত। এদের একটা বৈশিষ্ট্য বলা যায় যে, তারা হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোলে বসে সেই চোখে দেখার যে অভ্যস্ত যুগ ও ধারা ছিল এর বাইরের এরা। বরং সমাজের যাদের কথা বা স্বর শোনা হয় না, উপেক্ষিত, নিচু আয়ের, নিচু জাতের মনে করে চাপানো হয় ইত্যাদি তাদের উদ্বেগগুলো উঠিয়ে আনা বা তাদের জায়গায় বসে দেখার পক্ষের লোক। কিন্তু মডার্ন রিপাবলিক গড়তে একটা ‘জাতি’ ধারণা বা একটা না একটা “জাতীয়তাবাদ” অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে এরা মনে করেন কি না- এই প্রশ্নে, প্রশ্নটাই তাদের মাথায় এসেছে এমন প্রমাণ দেখা যায় না।
তবে দীপেশের এখনকার অবস্থানটা হল, ঠিক মোদী মানে উদ্র জাতীয়তাবাদীরা নয় তবে সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ যেহেতু ভারত মেনেই নিয়েছে তাহলে একইভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে জায়গা করে দিতে অসুবিধা কী। প্রথম আলো বা তাদেরই প্রতিচিন্তায় তাঁর কিছু লেখা দেখে এমন মনে হয়েছে। কিন্তু মূল কথা যেটা, কেন ধর্মীয়সহ যেকোন জাতীয়তাবাদ একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয় পুর্বশর্ত মনে করা হয়েছে? এটা ভিত্তিহীন নয় কেন, সে প্রশ্ন এদের অবস্থান দেখা যায় নাই।

এদিকে আনন্দবাজার দীপেশের একটা বড় উদ্ধৃতি এনেছে সেটা হল এরকম, “হেডগেওয়ার ১৯৩৪ সালেই বলে দিয়েছিলেন, রাজনীতি বিষয়ে সঙ্ঘ উদাসীন। অন্য দলের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সে খাদির সমর্থক এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের বিরোধী নয়। তখনকার কংগ্রেস আর সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেস যেমন এক নয়, হেডগেওয়ারের সঙ্ঘ আর আজকের সঙ্ঘও এক নয়”। এই কথাটাকে স্পষ্ট বুঝবার জন্য এখানে ফুটনোট দিয়ে রাখছি। তা হল, আরএসএস –এর পুরা নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংক্ষেপে একে সঙ্ঘ বলে ডাকে অনেকে। এই সঙ্ঘ ১৯২৫ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হেডগেওয়ার (কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার)। আর পরবর্তিতে ৪৭ সালের দিকে আরএসএস-এর প্রধান ছিলেন,  গোলওয়ালকার (মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার); যার নাম এই লেখার প্রথম দিকে নেয়া হয়েছে।

বিপরীতে গৌতম ভদ্র – তার বিজেপি-আরএসএস সমালোচনা অনেক সরাসরি। তার দুটি উদ্ধৃত বক্তব্য ঐ রিপোর্টে এসেছে। যেমন- ভদ্র আরএসএস প্রধানের সমালোচনা করে বলছেন – ‘ভারত আধ্যাত্মিক দেশ। আধ্যাত্মিক পথেই এর উত্থান হবে বলে চেয়েছিলেন গাঁধী” – মোহনের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। বরং আসল বক্তব্য ও ব্যাখ্যা হল, “গাঁধী কখনই আধ্যাত্মিক দেশ বলেননি। তিনি ধর্মের কথা বলেছেন, রামরাজ্যের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই রাম অযোধ্যায় থাকেন না, অস্তিত্বের ভেতরে তার স্বর অনুভব করা যায়। ইনার ভয়েস!”।
আর ভদ্রের দ্বিতীয় উদ্ধৃতি, গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে প্রবন্ধের অর্থ, এখনকার আরএসএস প্রধান মোহন ভগত যেভাবে করেছেন, এর সমালোচনা সংক্রান্ত। মোহন বলেছেন, “পরাধীনতার ফলে তৈরি গোলামি মানসিকতা যে কী ক্ষতি করতে পারে, গাঁধী বুঝতেন। স্বদেশী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তাই এক ছাত্রের চরিত্র এসেছিল। তৎকালীন রাজনীতিবিদেরা দেশের পূর্ব গৌরব ভুলে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ চালিয়ে যেতেন। তার প্রভাব আজও দেখা যাচ্ছে”। শেষে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন, ‘গাঁধীর পথ ধরেই ভারত আবার বিশ্বগুরু হয়ে উঠবে”।
আনন্দবাজার বলছে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে, দুই ইতিহাসবিদই আপত্তি করে তাদের মতে বলছেন, “হিন্দ স্বরাজ নিছক স্বদেশীর কথা বলে না। সে আধুনিকতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর নৈরাজ্যবাদের কথা বলে। সঙ্ঘের রাষ্ট্রবাদের সাথে তার সম্পর্ক নেই”। ‘আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের অসভ্য করে’- ঐ বইয়ে লিখেছিলেন গাঁধী। ‘হিন্দ স্বরাজ’ আর ‘হাউডি মোদি’ মেলে না কিছুতেই! তবে দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, গান্ধীর কাজকে তিনি বলছেন, একে “জেহাদি অহিংসা বলতে পারেন”। গৌতম ভদ্রও এতে একমত। মোটা দাগে তাঁদের সারকথা হল, মোদি ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি নয়। যদিও সেটা তো বলাই বাহুল্য।

আসলে এখান থেকে দু’টি প্রশ্ন উঠে, যা নিয়ে উপরের রামচন্দ্রসহ তিন শিক্ষাবিদের কেউই তোলেননি। তার প্রথমটি হল, যদি মোদী ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি না-ই হয়, তবু মোদী ও আরএসএস গান্ধীকে নিজেদের করে নেয়ার সুযোগ নিতে বা দাবি করতে পারছেন কেন? এই যে দুইটা পক্ষ এদের উভয়ের চিন্তার মিল বা মৌলিক দিকটি কী ছিল?
কংগ্রেস ও আরএসএস ভিন্ন রাজনৈতিক দল অবশ্যই। তবুও তাদের রাজনীতিতে মিলের দিকটি হল – হিন্দু জাতীয়তাবাদ। উভয়েই হিন্দু জাতীয়তাবাদী। আর ফারাক হল, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে দুই দল দু’ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। আরএসএস বলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ- এটাই হিন্দুত্ব। হিন্দু জাতি খাঁটি, পিওর; খাঁটি আর্য রক্তের ধারা হিন্দুরা। এটাই আবার হিটলারের ভাষায় জর্মানিরা পিওর আরিয়ান রেস (খাঁটি আর্য রক্তের)। অর্থাৎ এরা তাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে এই একই জায়গাকে কেন্দ্র করে। এ কারণে হিটলার ও আরএসএসের রেসিজম বা বর্ণবাদিতা, জাত-শ্রেষ্ঠত্ব একই ধরনের।
বিপরীতে গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় তাঁর দাবি হিন্দু বা হিন্দুইজম শব্দ – এটা কেবল একটা হিন্দুধর্ম নয়, অন্য (মুসলমান) ধর্মও। এ নিয়ে তার ব্যাখ্যার পক্ষে বিস্তর কোশেশ আছে। যেমন দাঙ্গার মুখে প্রতিকার হিসেবে তিনি হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলাতে চান আবার, মুসলমানকে জয় শ্রীরাম ধরনের কিছু। এ কারণে গান্ধীর হিন্দুইজমের পূর্বশর্ত হচ্ছে, কথিত এক ফ্যান্টাসির “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য”। এ প্রসঙ্গে গান্ধী নিজ দলীয় কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশ করে বলা ১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বরের এক ভাষণ থেকে রামচন্দ্র গুহের গবেষণায় উদ্ধৃতিটা দেয়া হল এখানেঃ “be true to the basic character of the Congress and make Hindus and Muslims one, for which ideal the Congress has worked for more than sixty years”.

কিন্তু বাস্তবতা হল, গান্ধীর নির্দেশ নিজের দল কতটা মেনেছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ তো বটেই। এ ছাড়া, এমনকি তা পুরোপুরি মেনে চললেও ফলাফল শূন্যই হয়েছিল। তখন ও এখনকার বাস্তবতাই এর প্রমাণ। তাহলে মূল সমস্যা কোথায়? গান্ধীর “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য” কথার আসল মানেই বা কী? এর সোজা অর্থ পরস্পরের ধর্মের পক্ষে জয়গানের স্লোগান দিতে হবে, এটাই বলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য।

কিন্তু তাতে এ থেকেই আবার, হিন্দুদেরকে কেন আল্লাহু আকবর বলতে বলছেন গান্ধী- এই অভিযোগ তুলে আরএসএস তাদের মুখপাত্র অর্গানাইজার পত্রিকায় গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করে তাদের ধুয়ে দিয়েছিল। আসলে এতে উল্টো আরএসএসের পক্ষে দাঙ্গা বাধানোই সহজ হয়ে গেছিল।

এখানে মূল কথা হল, গান্ধীর এই ঐক্যের প্রস্তাবই ছিল অলীক ও অবাস্তব, বাস্তবায়ন অযোগ্য। ধর্ম মানুষের যার যার কোর বিশ্বাসের প্রশ্ন। এখানে চাইলেই এক ধর্মের লোক আর এক ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বলে ধ্বনি দিতে পারে না। এমনকি কোনো মুসলমানের অন্য ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বা মূল শ্লোক বা কালাম উচ্চারণ করার পরে সে আর মুসলমান থাকে কি না সে প্রশ্ন তো উঠবেই! আবার এটা হিন্দুর দিক থেকেও একই ভাইসভারসা। অথচ গান্ধীর প্রস্তাব ও ব্যাখ্যা দাবি করছে একটা ভারত রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এসব অস্বস্তিকর নিজ নিজ ধর্মবিরোধী অবস্থানে নাকি যেতেই হবে। হিন্দু-মুসলমানের তথাকথিত ঐক্য- এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব নাকি এতই।

এক কথায় বললে গান্ধীর কথিত ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ প্রকল্প- এর ধারণাই বাস্তবায়ন অযোগ্য। ফলে তা অবাস্তব হয়ে থেকে গেছে। আর গান্ধী খুন হয়ে মরে যেন বেঁচে গেছেন।

কিন্তু কেন একটা ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ, বিশেষ করে তা কেন ‘হিন্দুইজমের’ হতেই হবে ? এ ছাড়া একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদই কেন দরকার? একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে চাইলে কেন এটা অনিবার্য?

লক্ষণীয় যে, ওপরের তিন ভারতীয়  একাডেমিকের কেউ এসব প্রশ্নগুলোর দিকে যাননি বা যেতে চাননি। কোনো রাষ্ট্র গড়তে চাইলে একটা জাতীয়তাবাদ, তাও আবার একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ- এটাকে কেন এসেনশিয়াল বা অনিবার্য প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। জাতীয়তাবাদ যার গোড়াটা আছে কথিত এক ‘জাতি’ ধারণায়। বাংলায় জাতি বললেও এটা দু’টি আলাদা ধারণা ইংরেজিতে রেস ও এথনিক- এ দুই শব্দের অর্থ বাংলায় একটাই- ‘জাতি’ করা হয়ে থাকে।

লক্ষণীয় যে, ইংরেজিতে এই দু’টি শব্দই অরাজনৈতিক পরিচয়-প্রকাশমূলক শব্দ। যেমন বাঙালি রেসের লোক আর আমার খাদ্যাভ্যাস বা ধর্ম-সংস্কৃতি কী হবে এই এথনিক পরিচয় আমার জন্মের আগে থেকেই নির্ধারিত। এই পরিচয়গুলো আমরা যে কেউ বেছে নিয়ে দুনিয়ায় আসি না বলেই, এগুলো অরাজনৈতিক। এর দায় আমার নয়। এর সাথে আমি কেমন রাষ্ট্র গড়বে এর সম্পর্ক কী? এমন কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই রাষ্ট্র গড়তে চাইলে নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে সংশয় তৈরি করার প্রয়োজন কী?

নিশ্চয় নেহরু-গান্ধীরা কোনো বোকা অবুঝ মানুষ নন! কিন্তু তবু সেই রামমোহনের আমল থেকেই আমরা যেন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ অনিবার্য প্রয়োজনীয়, এমন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তালাশে থাকতে দেখতে পাই আমরা। কেন?

মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের তাবৎ কামনা, বোঝাবুঝি আগ্রহ ইত্যাদি সব কিছুর উৎস হল ব্রিটিশ কলোনি মাস্টারের রাষ্ট্র। রামমোহন থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই বিশ্বাস করতেন [তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় থাকা একমাত্র রাষ্ট্র] যে ব্রিটিশ রাষ্ট্র তারা দেখছে এর নাগরিকদের এক থাকার পেছনে তাদের একই ধর্মীয় পরিচয় ( এংলিকান ক্যাথলিক, Anglican Catholic)- এটাই তাদের কথিত ঐক্য বা এক হয়ে থাকার ভিত্তি হয়ে আছে। কাজেই ভারতেরও একটা রাষ্ট্র হতে গেলে তাদেরও একটা ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে একটা একক ধর্ম থাকতেই হবে। এই ছিল তাদের প্রবল অনুমান। কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভুল ও ভিত্তিহীন। বৃটিশ রাষ্ট্রের ভিত্তি মানে তা এক হয়ে আছে কোন Anglican Catholicism র কারণে নয়।   যদিও আবার এরা সবাই দেখেছিল ভারতে সেটা বাস্তবতা নয়। কারণ অবিভক্ত ভারতে সবার ধর্ম এক হিন্দুত্ব মানে এক হিন্দুধর্ম তা ছিল না। তাই সেখান থেকে রামমোহন বলে গেছিলেন অবিভক্ত ভারতের সবার জন্য একটা ব্রাহ্ম ধর্ম তৈরি করতে, যদিও সেটাও  অলীক ও অপ্রয়োজনীয় বলে ব্যর্থ হয়েছিল। সম্ভবত সেকারণে গান্ধীর পথটা রামমোহন থেকে আলাদা হয়েছিল। যেটা আবার পরবর্তি উদ্যোগ হিসাবে বঙ্কিম চন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) -এর হিন্দুত্বের কাছাকাছিই, ইসলামবিদ্বেষী ছুপা অথবা উদাম।

এককথায়, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে ঐ সমাজে পিছনে একটা একক ধর্মের মিল বা ঐক্য থাকতেই হয়, এই অনুমান মিথ্যা, ভিত্তিহীন। সম্পুর্ণত এক ভুল ধারণা। বরং রাষ্ট্রে নাগরিক এক হয়ে থাকে – নাগরিক ঐক্য থাকে – মূলত বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার বা নাগরিক নির্বিশেষে “সাম্য” কায়েম রাখতে পারলে। এটাকেই অনেকে ক্লাসিক অর্থে সেকুলারিজম (ইসলামবিদ্বেষী সেকুলারিজম নয়) বলেও বুঝে থাকে।

পরবর্তীকালে সেই একই কারণে গান্ধী নতুন ব্যাখ্যা দিলেন যে ভারতের হিন্দুইজম মানে এটা একটা ধর্ম না, বহু। এক রিলিজিয়াস প্লুরালিটি। একে হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্ম বলে, বহু বলে বুঝতে হবে দাবি করতেন। গান্ধীর হিন্দুইজম বলতে তাই ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য’ কথাটা এভাবে বুঝতে হবে। গান্ধীর এই অবাস্তব সোনার পাথরের বাটি ধারণার উৎস এখানে। অথচ হিন্দু ও মুসলমান শুধু নয়, বরং যেকোনো দুই মানুষ এক বোধ, একটা ঐক্যবোধ করতে পারে খুবই সহজে এভাবে যে,  পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রে সব নাগরিক সমান, তাদের নাগরিক অধিকার সমান- এই ভিত্তিতে যদি একটা রাষ্ট্র গড়া যায়। মানুষের এথনিক, রেসিয়াল, নারী-পুরুষ, ভাষা বা ধর্মীয়সহ যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে এক অধিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কায়েম ছিল এর আসল সমাধান। অথচ খুব সম্ভবত হিন্দু বা হিন্দু সভ্যতা এসব কোনো ধারণার আড়ালে গান্ধীসহ সবার মনেই একটা হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব একটা হেজিমনি কায়েমের, এর ধারণা কাজ করত। তাই কোন হিন্দুইজম ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা তারা করতে চান নাই, বা পারেন নাই। অথচ এক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে হিন্দু-মুসলমানকে এক হয়ে যেতে হবে কেন? এছাড়া এই – হিন্দু-মুসলমান এক করে ফেলা – এই প্রকল্পটাই তো অলীক অবাস্তব; এক সোনার পাথরের বাটি!

ফলে বাস্তবত এক দিকে গান্ধীর দেয়া অলীক অবাস্তব প্রস্তাবের কারণে হিন্দু-মুসলমান এরা এক পরস্পর বিরোধাত্মক পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছিল এবং যেটা এখনো আছে। আবার তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য থাকতে হবে বলে পরস্পর একে অপরের ধর্মের পক্ষে চিল্লা দিতে হবে বলে দাবি করছেন, নইলে তিনি অনশনে যাবেন। আর অন্যদিকে আরএসএস গান্ধীর এই অবস্থানকেই যে [হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলতে হবে], গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে আরএসএসের পক্ষে আনার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার ও দাঙ্গায় প্ররোচিত করে গেছে।

সারকথায়, গান্ধী নিজেই দাঙ্গার কারণ, আবার দাঙ্গা উঠে এলে তিনি অনশনে বসে গেছেন! আর এই গান্ধীকেও মোদী ও আরএসএস এখন নিজেদের করে নিতে চাচ্ছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০৫ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে গান্ধীর স্ববিরোধী ‘হিন্দুইজম“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

ব্রাহ্মণ্যবাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব রিপাবলিক রাষ্ট্রে অগ্রহণযোগ্য

গৌতম দাস

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2IQ

 

Om Birla during Hindu Mahasabha event (Facebook/om birla) by NEWS18, India

ভারতের আরএসএস বা বিজেপির অঙ্গসংগঠন অনেক। এগুলোর একটা হল, “অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভা”। শুধু ব্রাহ্মণদের নিয়ে সংগঠন এমন আরো আছে – ‘অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ একতা পরিষদ, সর্বব্রাহ্মণ মহাসভা, পরশুরাম সর্বকল্যাণ, ব্রাহ্মণ মহাসভা’ ইত্যাদি। অবশ্য বুঝাই যায় হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিচরণ ধর্মকে পেশা হিসেবে নেয়া অসংখ্য ব্যক্তি বা তাদের দলের মধ্যেই হবে।

গত নির্বাচনের (মে ২০১৯) পরে, ভারতের লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছিল রাজস্থানের এক এমপি, ওম বিড়লাকে। তার পরিচিতি পড়ে তিনি কোনো বড় কেউকেটা কেউ নন মনে হচ্ছে। এমনকি তিনি আইনের ছাত্রও নন। সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পিকাররা আইন পেশার ব্যক্তিত্ব হন। বিড়লা আগে ছিলেন রাজস্থানের প্রাদেশিক সংসদের (ভারতের ভাষায় বিধান সভা বা Assembly) তিনবারের এমএলএ। এ ছাড়া তিনি ছিলেন বিজেপির যুব সংগঠন – ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার সাবেক রাজ্য সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্থান রাজ্যের কোটা শহরে অখিল ভারতীয় ব্রাহ্মণ মহাসভার এক সভায় যোগ দিয়েছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। কোটা স্পিকারের নিজের নির্বাচনী কনস্টিটুয়েন্সিও। তবে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের শুরু ওই সভায় তার বক্তৃতা থেকে।

তিনি সেখানে ঠিক কী বলেছেন এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বলাটা ঠিক হয়েছিল কিনা, এটাই বিতর্কের বিষয়। কারণ আসলে অনুষ্ঠানস্থল ছিল – রাজস্থান রাজ্যের রাজধানীও নয়, তৃতীয় বড় শহর এই কোটা, যেটা আসলে এক জেলা শহর মাত্র। তাই, ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে সেখানে ভারতের প্রধান পত্রিকাগুলোর সাংবাদিক অনুমান করা যায়, খুব কমই উপস্থিত ছিলেন। তবে সব পত্রিকাতেই ঘটনার নিউজ হয়েছে ছোট, কিন্তু অথেনটিক। কারণ স্পিকার নিজেই এক টুইট করেছেন বা ফেসবুকে ছবি দেয়েছেন ওই সভা প্রসঙ্গে। সেটাই সবার খবরের উৎস। তবে মাত্র তিনটা বাক্যের এক টুইট, তা আবার হিন্দিতে লেখা। অথেনটিক তিনটা বাক্যই সব বিতর্কের উৎস।

স্পিকার বিড়লা তার টুইটারে অনুষ্ঠানের কয়েকটা ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, “সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। যে স্থান তাদের ত্যাগ ও তপস্যার ফল। এ কারণেই সমাজে ব্রাহ্মণেরা সব সময় পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন”।

“Brahmins have always had a high status in society. This status is a result of their sacrifice and dedication. This is the reason that Brahmins have always been the guiding light for society,” – নিউজ১৮, এটা একটা টিভির ওয়েব পেজ, থেকে নেওয়া।

কলকাতার আনন্দবাজারের রিপোর্ট পড়লে মনে হয়, পত্রিকাটি যেন সবসময় ক্লাস টুয়ের বাচ্চাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ও শেখানোর লক্ষ্যে লিখছে। তবে বলাই বাহুল্য, তারা আবার ঝোপ বুঝে চলে। এবার মনে হচ্ছে কোপ দেয়ার সুযোগ দেখেছে, তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের প্রথম বাক্য, “ব্রাহ্মণেরা সমাজে শ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য করে বিতর্ক বাধালেন স্পিকার ওম বিড়লা”। আর ও প্রকাশের হিন্দি বক্তব্যের আনন্দবাজারের করা বাংলাটা হল, ‘‘ত্যাগ ও তপস্যার কারণে ব্রাহ্মণেরা বরাবরই সমাজে উচ্চ স্থানে আসীন। তাঁরা সমাজে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন।’’

কিন্তু কথা হচ্ছে এটাই কি ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ভারতীয় হিন্দু সমাজের প্রধান ও সত্য বয়ান নয়!  তাই এমন কথা কী ওম বিড়লাই  প্রথম! ব্রাহ্মণের জাতভেদের বয়ানের ওপর দাঁড়িয়েই কি তাদের সমাজ বিভক্ত নয়? এছাড়া  একালে বিজেপির উসকানি-প্রটেকশনে পুরানা দিন ফিরিয়ে এনে একে ব্রাহ্মণ্য বলশালী কর্তৃত্বের বয়ান হিসেবে সমাজে তা ফেরত আনার চেষ্টা কী চলছে না? দোষ একা যেন কেবল স্পিকারের – আনন্দবাজারের এমন ভান করার দরকার কী?

এই তো গত মার্চ মাসে (২০১৯) ভারতের প্রেসিডেন্ট সস্ত্রীক গিয়েছিলেন উড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির দর্শনে। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ, ব্রাহ্মণমতে একজন দলিত বা নীচু জাতের মানুষ। তাই তার মন্দিরে “প্রবেশ নিষেধ”। এই যুক্তিতে ঐ মন্দিরের ভক্ত ও সেবায়েত- তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের পথরোধ করে বাধা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, এটা “শকিং, চরম বিব্রতকর ও বেয়াদবি আচরণ”। [In a shocking and an extremely embarrassing incident …‘misbehaved with’ ]  আরো লিখেছিল, মন্দির পরিচালনা প্রশাসনের মিটিংয়ে আলাপ হয়েছে, এমন রেকর্ড মোতাবেক কথিত সেবায়েতরা প্রেসিডেন্ট পত্নিকে তাঁর চলার পথের সামনে বাধা দিয়ে তাকে ‘ধাক্কা মেরেছেন” [The group had also shoved the First Lady, as per the minutes of a meeting occurred……… ]। অথচ এনিয়ে কোনো আইনি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোথায় হয়নি। এটাই কি বাস্তবের ভারতীয় হিন্দু সমাজ নয়?

আসলে মন্দিরের দেবতা-রক্ষকদের দাবি মতে, ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে উল্টা, যেন দেবতা নন, দলিতেরা এতই ‘পাওয়ার ফুল’ যে তাঁরা কোনো মন্দির কেন, এমনকি খোদ দেবতাকে ছুঁয়ে দিলে অচ্ছুতেরাই সব কিছুকেই অপবিত্র করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতীয় হিন্দু সমাজের জাত-বিভক্তির উঁচা-নিচা সত্যি খুবই ‘আধুনিক’!

ভারতের স্পিকার ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে যতগুলো অভিযোগ উঠেছে, এসবের মূল কথাটা হল, এটা “জাতবাদ” বা “জাতের শ্রেষ্ঠত্ববাদ”; মানে এটা বর্ণবাদের [racism] মতই আর এক নস্টামি। যেমন, কংগ্রেসের এক প্রাক্তন এমপি, দিল্লির উচ্চ আদালতের নামকরা উকিল কপিল সিবাল বলেছেন, এটা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধযুক্ত মনের, এক মন্তব্য” [senior Congress leader Kapil Sibal said that his mindset reeks of casteism]। তিনি আরও বলেন, “It is this mindset that caters to a caste-ridden unequal India. We respect you Birlaji not because you are a Brahmin but because you are our Speaker in Lok Sabha,” tweeted Kapil Sibal.]। “বিড়লাজি, আমরা আপনাকে সম্মান করি কারণ আপনি স্পিকার, কিন্তু আপনি ব্রাহ্মণ বলে না”।

কথাটা সঠিক। কিন্তু সমস্যাটা হল, কেউ যখন কটু বা পঁচা গন্ধের কোন কিছু নিয়ে সারাক্ষণ সারাদিন নাড়াচাড়া করতে থাকে তাতে একসময় তার শরীর ওই খারাপ গন্ধ-প্রুফ হয়ে যায়। খারাপ গন্ধটা এতই গা-সওয়া হয়ে যায় যে, তার কাছে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি কেউ তাকে মনে করিয়ে দিলেও সে এটা বিশ্বাস করতে বা মানতে চায় না। বিজেপি-আরএসএসের অবস্থাটা হয়েছে তাই। তারা “জাতবাদিতার তীব্র কটু গন্ধপ্রুফ” বা গা-সওয়া হয়ে গেছেন।

হিন্দু-ধর্ম চর্চাকারী সমাজের প্রধান সামাজিক বৈশিষ্ট্য জাত-ভেদ [caste system]। সমাজের সব মানুষকেই উচা-নিঁচার বিভিন্ন স্তরে এখানে ভাগ করা হয়ে থাকে। তাই হিন্দু ধর্ম মানেই এই জাত-ভেদ প্রথা তার প্রধান অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য। যদিও মানুষের আধুনিক জীবন যাপনের বা শহরায়নের সাথে সাথে জাত-ভেদ ধারণা ও এর চর্চার প্রাবল্য কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই বিজেপির আমলে এটা এখন আবার উল্টামুখী। জাত-ভেদ ব্যবস্থাটাকে অনেক ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ [Brahminism] বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এই সিস্টেমে এর ভিত্তি বা চিন্তাটা হল, ব্রাহ্মণকে শীর্ষে রেখে এটা সমাজের বাকি সব মানুষকে অধস্তন বানায়। এভাবে একটা জাত-ভেদের ব্যবস্থামূলক ধর্ম হয়ে তা নিজেকে হাজির করে থাকে। এই “অধস্তনতার বয়ান” বাস্তবে সক্রিয় ও সত্যি হয়ে যায় এজন্য যে, ওখানে দাবি করা হয়, যাগ-যজ্ঞ-পূজার একমাত্র অধিকারি ব্রাহ্মণের। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ, সবার উপরে।

অনেক হিন্দু ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ শব্দ ও এর অর্থটা না বুঝে ভুল আচরণ, প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন। তাই না বুঝে মনে করে বসে যে কেউ ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’ লিখেছে সুতরাং এটা নিশ্চয় হিন্দুদেরকে গালি দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা একেবারেই এমন না। যেমন ইতিহাসবিদ বা প্রাক্তন সাব-অল্টার্ন গ্রুপের সদস্য গৌতম ভদ্র, তিনিও ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তিনি মনে করেন ও  লিখেছেন, বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক”। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ শব্দটা কোন গালি নয়, একটা বিশেষ ধরণের চিন্তা ও সেই আদর্শ ও বৈশিষ্ঠকে চিনানোর একটা শব্দ বা নাম এটা।

থিওলজিক্যাল স্কলারদের মধ্যেও, সেই প্রাচীন কালে এমন জাতভেদমূলক-ব্যবস্থা কেন করা হয়েছিল এর এক ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, সেকালের জনগোষ্ঠির পক্ষে সন্তান জন্মদান বা প্রজন্ম টিকানো কঠিন ছিল বলে এটা চালু হয়েছিল। কিন্তু তাতে এটা ন্যায্য-সাফাই হোক আর না হোক, একালে সমাজের হিসেবে এই জাত-ভেদ প্রথা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মূল কারণ এটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের আমল। এখানে নাগরিক অধিকারে অসাম্য, বা মানুষ সকল সমান না এমন বক্তব্যের পক্ষে সাড়া পাওয়া কঠিন। সেটা যাই হোক, এখনকার ভারতীয় সমাজের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, কালক্রমে সমাজের এই জাতিভেদ  ব্যবস্থাটাই হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে – একজনের ঘাড়ে চড়ে অন্যদের বা কথিত উঁচু জাতের দাবিদারদের আয়েশি জীবন যাপনের ব্যবস্থার উৎস।

আর যারা একবার জাতের স্তরভেদের সুবিধা লুটেছে তারা আর তা ছাড়তে চাইবে কেন! চাওয়ার কারণ নেই। শুধু তাই না, সমাজের কাছে জাতভেদ প্রথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওই উঁচু জাতের দাবিদারেরাই নিজের অন্যায় সুবিধা অপরিবর্তনীয়, এটা স্থায়ী এমন এক ধারণা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে এখনো। অর্থাৎ ধর্মের নামে জাত-ভেদের ওপর আস্থা বিশ্বাসটা একালে শিথিল বা বাস্তবে তত প্রবল নয় এমন হয়ে পড়লেও, বাড়তি সুবিধা ভোগের লোভে কথিত উচ্চবর্ণরা সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর স্তরে জাত-ভেদের বয়ান বারবার মনে করিয়ে দিয়ে তা আঁকড়ে সেখান থেকে দাপটের সাথে সব সুবিধা ভোগ করে চলেছেন। বরং এখানে তাদের মূল অজুহাত হল – তোমরা জাতভেদ মানো না, এর মানে তোমরা ধর্ম মান না। এই যুক্তি তুলে ভয় দেখিয়ে সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে স্তরে জাত-ভেদ কে ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

তবে, এখানে আমাদের একটু সাবধান হতে পরামর্শ রাখব। ব্যাপারটা হল,  সবার কাছেই সবার ধর্মই সবচেয়ে ভাল, এমন মনে করা এটাই স্বাভাবিক। আবার, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে তর্ক করা ঠিক না। তর্ক চলে না সেখানে। তাই এখানে সমাজের আমরা পরস্পরকে একটু স্পেস বা জায়গা করে দিতে হবে। যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অছিলায় কোনো ঘৃণা ছড়ানোর কাজে আমরা যেন নেমে না যাই সেদিকটা খেয়াল রাখাই কাম্য। আর “ব্রাহ্মণরা বদ লোক তাদের উদ্দেশ্য খারাপ” – পাঠককে এমন কোনো ধারণা দেয়া অনুচিত। ফলে সেটা বলা এখানে কোন উদ্দেশ্য নয়। এমন অনুমান সেটা ঠিক হবে না শুধু তাই নয়, বরং অতি সরলীকরণ দোষ হবে।

তাহলে মূল কথাটা কী? সেটা হল, আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে জাত-ভেদ প্রথার চিন্তাকে দুয়ারের বাইরে জুতার মত খুলে রেখে আসতে হবে। অথবা এটা রাষ্ট্রের সাথে সঙ্ঘাতের নয় এমন ব্যাখ্যা বয়ানে, এমন নন-কনফ্রন্টেশনাল ভাবে হাজির করতে হবে।

কারণ জাতভেদ প্রথার সারকথাটা হল, মানুষ সকলে এখানে সমান নয়, সমান হিসেবে গণ্য নয়, মানুষে-মানুষে জাত বলে ভেদাভেদ আছে। অথচ একটা মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ওর কনস্টিটিউশন, গঠন ও মৌলিক ভিত্তি ইত্যাদির বিচারে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রেই সবাই সমান। কোনো অসাম্য সেখানে নেই, রাষ্ট্র তা অনুমোদন করে না। সবাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান, বৈষম্যহীনভাবে আচরণ পাওয়ার যোগ্য, সব সুবিধা সমান পাওয়ার যোগ্য – তাতে নাগরিক মানুষের ধর্ম-বর্ণ-জাত ইত্যাদি যা হোক না কেন।  এবং রাষ্ট্র নাগরিককে বৈষম্য থেকে প্রটেক্ট করতে বাধ্য। কাজেই রাষ্ট্রের এখতিয়ার আছে, এমন সব বিষয়ে জাতভেদ প্রথার ধর্মীয়-সামাজিক বয়ান নন-কনফ্রন্টেশনাল হয়ে জায়গা ছেড়ে রাখবে।

কিন্তু বাস্তবে ভারত হল এমন – যেখানে পত্নীসহ খোদ প্রেসিডেন্টকেই চরম বৈষম্যের শিকার করা হয়েছে। এক এমএলএ আরেক সহ-এমএলএকে প্রকাশ্যেই ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। অথচ সমাজ নির্বিকার, কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কেউ কেউ এখন বলার চেষ্টা করছেন স্পিকার পদটা নিরপেক্ষ, তাই তার পদত্যাগ করা উচিত। আনন্দবাজার লিখেছে, “নিরপেক্ষতার শপথ নিয়ে যিনি সাংবিধানিক পদে বসেছেন, তিনি কিভাবে একটি বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে সওয়াল করতে পারেন,তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবিলম্বে ওমকে স্পিকারের পদ থেকে সরানোর দাবিও উঠেছে। তবে অনেকের আশঙ্কা- সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির সুরে কথা বললে এখন সাত খুন মাফ হয়ে যায়। ওমও ছাড় পেয়ে যেতে পারেন। কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের কাছে তাদের আদর্শই শেষ। সংবিধান মূল্যহীন”।

খেয়াল রাখতে হবে যে, ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব সঠিক কি না এটা নিয়ে রাষ্ট্রের বলবার কিছু নেই। কারণ কোন ধর্ম কেমন হবে বা হতে হবে তা নিয়ে কথা বলা রাষ্ট্রের কাজ নয়। এ ছাড়া কোন ধর্মের সংস্কার করা আদৌও দরকার তা, দেখাও রাষ্ট্রের কাজ না।  রাষ্ট্র কেবল বৈষম্যহীন এক নাগরিক সমাজ বজায় রাখা আর মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া ছাড়াই আপসহীন থাকবে। কারণ এটা মৌলিক বিষয়।

ওম বিড়লার মন্তব্য নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রায় সব মিডিয়া এখানেই শেষ হয়ে গেছে।  কিন্তু আরও এগিয়ে আনন্দবাজার কিছু একাদেমিকের মন্তব্য এখানে যোগ করেছে। আনন্দবাজার লিখেছে ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র বলেছেন, “বৌদ্ধ দার্শনিকদের মতে ব্রাহ্মণদের মতো অত্যাচারী আর কেউ নেই। ধর্মপদে বলা হয়েছে, মন্ত্র দিয়ে ব্রাহ্মণ হয় না। গুণ থাকতে হয়। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ জাতিভেদ প্রথাকে তুলে ধরে। বিজেপি ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক। ব্রাহ্মণের মূল ক্ষমতা ছিল যজ্ঞের অধিকার। তাই বুদ্ধদেব যজ্ঞের বিরোধী ছিলেন। যজ্ঞের বিরোধিতার মাধ্যমেই সমাজে ব্রাহ্মণদের কার্যত অর্থহীন করে দেয়া হয়েছিল”।  এছাড়া আরো এক সমাজতত্ত্ববিদ অভিজিৎ মিত্রের সাথে কথা বলেছে। মিত্র বলেছেন, “যে কেউ ব্রাহ্মণ হতে পারেন। যিনি গুণের অধিকারী এবং যে গুণ মঙ্গলময় তিনিই ব্রাহ্মণ। তিনি যে কোনও শ্রেণীর প্রতিনিধি হতে পারেন। জ্ঞানের দিক থেকে একটি উচ্চতায় পৌঁছলে সেই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ধরা হতো। সেটাই ছিল ধারণা”। আনন্দবাজার বলছে,  “অভিজিৎ বাবুর বক্তব্য, ‘বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ব্রাহ্মণেরা ব্যর্থ হয়েছেন”।
“ফারাক আছে ব্রাহ্মণে-ব্রাহ্মণেও। যিনি অপরের কাছ থেকে বেশি দান গ্রহণ করেন, তাদের ব্রাহ্মণেরাই নীচু চোখে দেখেন।’ ব্রাহ্মণ হওয়ার অধিকার একটি বর্ণের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করেন অভিজিৎ বাবু”।

কিন্তু আমাদের বক্তব্য এমন হওয়া ঠিক হবে না। কারণ, উপরের দুটা বক্তব্যই মূলত ধর্ম-সংস্কারমূলক। এগুলো একটাও রাজনীতি বা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা নয়। বক্তা একাদেমিক দুজনই ধর্ম সংস্কারের আলাপ করেছেন, তাঁরা আলাপ করেছেন ব্রাহ্মণের তাতপর্য, তাদের কী হওয়া উচিত, না উচিত ইত্যাদি এসব নিয়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-রাজনীতির আলাপ করেননি তারা। কিন্তু রাষ্ট্র তো সব ধর্মের নাগরিক সবার। তাই এর এখতিয়ার নেই যে, কোনো ধর্মের সংস্কার হওয়া উচিত কিনা, কেমন হওয়া উচিত এমন কোন আলাপে মগ্ন হয়ে ওঠা। বরং রাষ্ট্র বলবে, জাত-ভেদের আলাপ আপনার ধর্মে থাকুক আর না থাকুক, নাগরিক সবার স্বার্থে আপনাদেরকে আমার নীতিকে – নাগরিক সাম্যের নীতি ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার নীতি – একে সবার উপরে প্রাধ্যন্য দিয়ে মেনে চলতে হবে।

এদিকে, “সিভিল লিবার্টি” নিয়ে কাজ করে এমন এক সংগঠনও ভারতে আছে দেখা যাচ্ছে। আনন্দবাজার আরো জানাচ্ছে, “পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস (পিইউসিএল)- স্পিকারের ওই বক্তব্যের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এর রাজস্থান শাখার সভাপতি কবিতা শ্রীবাস্তব”। তাঁর দাবি, “স্পিকারকে ওই মন্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে”। কবিতা বলেন, “একটি বর্ণ বা জাতকে অন্যদের চেয়ে ভালো বলা বা একটি জাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এটা এক দিকে অন্য বর্ণকে খাটো করে দেখায়, তথা জাতিভেদ প্রথাকে আরো উৎসাহিত করে”।

বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, দল হিসাবে অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

কিন্তু কথা কনস্টিটিউশনে থাকা আর বাস্তবে চর্চা এক নয়। বাস্তবে যদি থাকতই তাহলে তো বিজেপি রাজনৈতিক দল হিসেবে অনুমোদনই পেত না। বিজেপি ভারতীয় কনস্টিটিউশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে, অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়। অথচ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাগরিকবোধের চেয়ে হিন্দুত্ববোধ যদি কারো চিন্তা ও বুদ্ধিতে ওপরে চড়ে থাকে তবে অবস্থা এরকমই হবে।

তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিন্দা করা মন্তব্য দিয়েছেন গুজরাট রাজ্য সংসদের এক এমএলএ ও এক্টিভিস্ট – জিগনেস মাভানি। তিনি তাঁর টুইটে লিখেছেন, “ভারতের জাত ব্যবস্থার পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা – এটা শুধু নিন্দাযোগ্যই না এটা  বিব্রতকরভাবে পিছন-দিকে-হাঁটা। এটা আমাদের জন্য এক তামাশা যে এমন জাত-বর্ণবাদী একজন লোক আমাদের লোকসভার স্পিকার। জনগণের কাছে তার আচরণের জন্য মাফ চাওয়া উচিত”।
এটা একটা ট্রাজেডি যে কনষ্টিটিউশন জাত ব্যবস্থার উচ্ছেদ চায় সেই কনষ্টিটিউশন রক্ষার শপথ নিয়েছেন এই ব্যক্তি।
[Gujarat MLA Jignesh Mevani sought Birla’s apology. “This celebration of Indian caste system is not only condemnable but also cringe-worthy,” he tweeted. “It’s a joke on us that a casteist like him is our Lok Sabha speaker. He should publicly apologise for this attitude.”
He added: “It’s a tragedy that such people take oath on our Constitution that wants to annihilate the caste system.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জাত ভেদের সমাজে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ“এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু মনে করতে পারি না, এটা অবৈধঃ

গৌতম দাস

২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৭ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2GL

 

20 Aug 2019, Dhaka, Press Conference.

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তাঁর দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য চলে আসছে, তা আমাদের কারও অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে সব ছেড়ে দিয়ে আরেকবার লুঠ হবার বা হেরে যারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন নির্বাচন করেই হোক, চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও চলতি বছরের মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে ইতোমধ্যে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। ওদিকে রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হল, আসামের এনআরসি [NRC] ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও উৎপাত তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ’ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি, এখন মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন – এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিয়ে চলছিলেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রায় দুসপ্তাহ আগে ভারতে গত ৭ আগস্ট দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক  আলোচনার এজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু তা সত্বেও ভারতের [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart] কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই আমরা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও আমাদের সরকারকে সতর্ক [আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না] করেছিলাম।  ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছিলাম দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় [‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মতান্তর, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি] কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠক নিয়ে আলাদা আলাদা যার যার দেশের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ’প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১৪ দিনের মাথায় এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ [Assam NRC is India’s internal matter: Jaishankar] বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এই এক ইস্যু আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট, আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু যতই উত্তেজনা আর উস্কানি তৈরির চেষ্টা হোক না কেন ভারতের সরকারী অবস্থান হল, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যার মানে হল আসামের এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণ প্রক্রিয়ায় কেউ নিজেকে নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলেও এজন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না, কারণ, বাংলাদেশ এব্যাপারে সংশ্লিষ্টই নয় বলে ভারত মনে করে। তাই এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করার চেষ্টা কমে আসবে হয়ত, এছাড়া কোন সরকার সংশ্লিষ্ট সদস্য এমন অভিযোগ তোলার কথাই না। তাও কেউ তুললে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি এই প্রথম আমাদের হাতে এল, যা আমাদের সরকার বা যে কেউ ব্যবহার করতে পারব। একটা উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া যাওয়াতে আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ নই।

NRC in Assam is India’s internal matter, says MEA S Jaishankar, S External Affairs Minister. File photo   –  The Hindu

দুঃখের কথা হল, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” [Mr. Jaishankar said, “It’s an internal matter.” – এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার প্রায় কেউই ধরতেই পারেন নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জয়শঙ্করের এই সফরে কোন কোন ইস্যুগুলো মুখ্য হয়ে উঠবে এসব আগেই জানা না থাকার কোন কারণ নাই। বুঝা যাচ্ছে এনিয়ে মিডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিটের কারও এব্যাপারে কোন হোমওয়ার্ক নাই।  জয়শঙ্করের এই সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে ভেসে উঠা বা উঠতে পারত এমন ইস্যুগুলো হল, ১। তিস্তা বা ৫৪ নদীর পানি,  ২। সীমান্ত হত্যা, ৩। অসম বাণিজ্য, ৪। আসাম এনআরসি ইস্যু, আর ভারতের দিক থেকে ৫। বাংলাদেশের পোর্টগুলো ব্যবহারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, ৬। ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ, ৭।  কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি অন্য কিছু। এসবের মধ্যে আসাম এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের মিডিয়ার চোখে হওয়া উচিত ছিল এক নম্বর ইস্যু। কারণ, ৩১ আগষ্ট তারিখে আসামে ফাইনাল নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশবিরোধী প্রচার আর অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে শ্লোগানে সব ছেয়ে ফেলার হতে পারে যে “অনুপ্রবেশকারিরা ফেরত যাও” । কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের মিডিয়াও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে এব্যাপারে ছিল পুরাই উদাসীন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, এমনকি জয়শঙ্করের সফরে সাংবাদিক সম্মেলন কাভার করে যে মিডিয়া রিপোর্ট পরদিন ছাপা হয়েছে সেখানেও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে প্রায় কিছুই নাই বললেই চলে। অথচ জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” সংলগ্ন যেকোন বক্তব্য হওয়ার কথা ছিল শিরোনাম। পারলে এই কয়েক শব্দে দেয়া জয়শঙ্করের বক্তব্যের ভিডিওসহ রিপোর্টিং হত সবচেয়ে উপযুক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন কোন জায়গায় আছে এর এক বিরাট মাপকাঠি হয়ে গেল – জয়শঙ্করের সফর বা “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” নিয়ে রিপোর্ট। কোনভাবেই এখানে হাসিনার ফ্যাসিজমের শাসন, মিডিয়ার উপর সরকারি চাপ ইত্যাদির অজুহাত তোলারও সুযোগ নাই। কারণ মিডিয়া মূলত ১. কোন ইস্যুটা এই সফরে এক নম্বরের সে ইস্যুটাই বুঝে নাই, এটা প্রমাণিত। ২. ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয় যে আমাদের মিডিয়ায় জয়শঙ্কর বলেছেন “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” এটাকে প্রধান শিরোনাম করলে বা ভিডিওওতে দেখালে সরকারের বা ভারতের দিক থেকে আপত্তির কিছু আছে। কাজেই এটা ছিল সরকারি কোন চাপ ছাড়া ইস্যু। ৩. এটা ছিল বাংলাদেশের বার্ণিং আর জেনুইন স্বার্থের ইস্যু। ৪। এমন রিপোর্ট হাসিনার পক্ষেই যায়। কাজেই হাসিনাকে দোষ দিয়ে মিডিয়ার নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার কোন সুযোগই নাই।
এছাড়া উলটা করেও দেখানো যায়  – আমাদের মিডিয়া বিকল্প কী বা কাকে তারা শিরোনাম করেছে? – এটা থেকেও প্রমাণ হয় যে মিডিয়া ইস্যুটা বুঝেই নাই। দেখা গিয়েছে বেশির ভাগের কাছে ইস্যু হয়েছে  – তিস্তা ইস্যু। যার সার কথা হল তিস্তা নিয়ে কিছু হল না এটা দেখিয়ে ভারতকে বেইজ্জতি করব, হাসিনা কত অযোগ্য তা দেখাব। এগুলো সম্ভবত বামপন্থি মধ্যবিত্তের চোখ ও সেই মাপের বুঝাবুঝি। যেমন দেখেন বাম গণতান্ত্রিক জোট – এদের কারবার [জয়শঙ্করের সফর : তিস্তা চুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস না থাকায় বাম জোটের ক্ষোভ]। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা নিজেদের সবার উপরের নিজেদের বুঝমান মনে করে। তাই তাদের বুঝে আসাম এনআরসিতে কি হচ্ছে সেটা না, তিস্তা এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ।  কেউ কেউ আরও বাম বুদ্ধিমান হতে চেয়ে  – “ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ” এটাকে মূল শিরোনাম করেছে। এমনকি যাকে প্রফেশনাল পত্রিকা বলে মানতে চায় অনেকে সেই প্রথম আলোও  দেখা গেছে ইস্যুটা বুঝেই নাই। তাদেরও আমলে আসে নাই। তাই  শিরোনাম, ২২ আগষ্টের –  “জয়শঙ্করের সফর: বাংলাদেশের বিষয়গুলো আসেনি, ভারত স্বস্তি পেয়েছে—বামজোট”। ২২ আগষ্টের  শিরোনাম,  “মোদির কিছু বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”

জয়শঙ্করের নিজে যেচে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে স্বীকার করে নিবার অর্থ হল, যে ভারত নীতিগতভাবে মানল যে ১। ভারতে কেউ নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণে করতে না পারলেও – এর পরের বাক্য হবে – সেটাও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।  ২। ভারত অফিসিয়ালি বলতে পারবে না যে ঐ লোক তাহলে বাংলাদেশের; অথবা বাংলাদেশের থেকে আসা গোপনে প্রবেশকারি বা অনুপ্রবেশকারি। ৩। বাংলাদেশকে বলতে পারবে না যে আসেন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি।

তাহলে দাড়াঁলো কী? যেটা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল যে, জয়শঙ্করের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরের দিনে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার লীড হেডলাইন হত – আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর। সেটা হয় নাই। এতে আমাদের মিডিয়া সেন্সের করুন হাল আমরা দেখলাম। এমনকি পুরা জয়শঙ্করের সফর কাভার ছাড়াও আলাদা করে আর একটা রিপোর্ট দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। আমার কথাটা বুঝা যাবে শুধু Jaishankar bangladesh NRC – এই তিনটা শব্দ লিখে গুগুলে সার্চ দেন দেখবেন সার্চের ফলাফলে প্রথম দুই পাতা জুড়ে ভারতীয় পত্রিকার নাম আসবে যাদের রিপোর্টের শিরোনাম হল, “NRC in Assam India’s internal matter: Jaishankar”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের মিডিয়া কিন্তু ঠিকই বুঝেছে তাদের রিপোর্টের শিরোনাম কী করতে হবে।  এমনকি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য আরও কী নতুন অর্থ-তাতপর্য তৈরি করছে সেটা নিয়ে দ্যা হিন্দু পত্রিকা লিখেছে,   His statement is significant as it indicates India’s official position just days before the final NRC list is to be published on August 31. In July, Mr. Momen had expressed concern about the possible fallout of the final list on Bangladesh.

তাহলে দাঁড়ালো যা তা হল, আমরা কমিউনিস্ট প্রগতিশীল ধরণের বুঝমান খেতাব পেতে যত আগ্রহী, সাধারণ কান্ডজ্ঞান দেখাতে ততটাই বেখবর। কি আর করা – কাজেই এখন আসেন আমরা আপাতত দোয়া-কামনা করি যাতে কান্ডজ্ঞান জাগে। আর এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। এখনও বিরাট এক কাজ রয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আসামের এনআরসি ইস্যুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন আগামী ৩১ আগস্ট। কাজেই ভারতের সরকারী অবস্থান বাংলাদেশকে জড়ানো বা দায়ী করার না হলেও বাংলাদেশবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী পিছন থেকে সংগঠিত তথাকথিত “অসমিয়া স্বার্থের” দাবি তোলা হতে পারে।  তাই আগে থেকেই এর পাল্টা আমাদের বয়ান অবস্থান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। এছাড়া জয়শঙ্করের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কেমন গুরুত্ব দিতে হবে সেখানে এব্যাপারটা বুঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এর আলোকে কোন মিডিয়া রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।
যেমন বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “আসামের নাগরিকত্ব ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। ভিতরে লিখেছিল – “সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি”।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে – ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান …’। এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বুঝানো হচ্ছে যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর কেন এত সহজে ‘এনআরসি অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানলেন?
জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হল, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হল, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে শহরের বাইরের ক্যাম্পে রাখবে তারা; এসব ক্যাম্প ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে; আর যদিও অনেক পরে এদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মত নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। আর সম্ভবত অ-মুসলমানদের বেলায় এটা ঘটবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ এমনভাবে  করতে চান।
দুই. সামনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কাজ, দম ফেলার সময় নাই। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে এবার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা নিজের অবস্থানের পক্ষে রাষ্ট্রগুলোকে আনার কাজে – মুখোমুখি হবার সময় তাদের। তাই  অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হল ভারতের কাছে এখনকার আসাম এনআরসির চেয়েও আরেক বড় ইস্যু হল কাশ্মীর, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে  এখন থেকেই আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,  ২৪-২৬ আগষ্টে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক চলছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, সে এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদী দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা নেতারা কথা বলতে চায়। মোদী সেখানে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, এখন অলরেডি তিনি প্যারিসে, যেখানে এবারের জি৭ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

India’s risky Kashmir power grab, VOX

এর এক সোজা অর্থ কাশ্মীর আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু একেবারেই নয়, তা প্রকারান্তরে এখানে মেনে নেয়া হয়েছে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথের এক দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আরও রাষ্ট্রকে পক্ষে আনতে ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভাগুলো শুরু হয়ে যাবে; যেখানে বলাই বাহুল্য কাশ্মীর সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু-সমর্থক জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে – ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। এছাড়া আর একটা দিক আছে। ভারতের হিন্দু-মনের চোখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আসলে পুরান একক পাকিস্তান – “মুসলমানের” পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু বলে মেনে নেওয়া – এর অর্থ বাংলাদেশ যতটা ভাল দেশ ইমরানের পাকিস্তান ততই খারাপ, সহি না – এমন ইঙ্গিত তৈরি হয় এখানে। এটাকে ভারত তার বড় পাওয়া মনে করে, আর যেখানে কাজে লাগবে সেখানে ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি।

কিন্তু কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, একেবারেই না। সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং যে কোন জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু আমরা মনে করতে পারি না, কারণ জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী এটা অবৈধঃ
কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। মুল কারণ, কাশ্মীর সমস্যা আসলে জাতিসংঘের চার্টারের [Charter of the United Nations] আলোকে মিটাতে আমরা বাধ্য। আর কাশ্মীর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হল, কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কোন রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরি দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে এটা মেনে নেওয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের কেউ নয়। বরং কাশ্মীরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক। কাজেই হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, কোন চুক্তি করে দিয়েছে – এই তুলে দেওয়া বা চুক্তি আইনত অকেজো, মুল্যহীন। কারণ জাতিসংঘের দৃষ্টিতে কোন রাজা অথবা উপনিবেশ মালিকপ্রভু কোন ভুখন্ডের মালিক হতে পারে না। ঐ ভুখন্ডের মালিক, শাসক কে তা নির্ধারণের একমাত্র হকদার ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়ার মত হয়ে যাবে। এর ফলশ্রুতিতে ঐ দখলকারি দেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যেতেও পারে। সাদ্দামের ইরাকের কুয়েত দখল করা যেভাবে অবৈধ গণ্য হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। নিজ ভুখন্ডের শাসক নাগরিক নিজে অথবা তার সম্মতি নেয়া এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকার। নিজ ভুখন্ডের শাসক হল নাগরিক নিজে বা তার সম্মতি নেয়া প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।  তাই কোন ভুখন্ডের উপরে ওর বাসিন্দাদের বাইরে অন্য কোন রাজতন্ত্রী (Monarchy) অথবা কলোনিয়াল (Colonial) মালিকানা শাসক দাবি করাকে জাতিসংঘ অবৈধ মনে করে। অবৈধ দখলদার মনে করে।

UN Declaration 1942

জাতিসংঘের জন্ম দলিল ও ভিত্তি

  • ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই নীতি মেনে ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
  • পরে ঐ বছর শেষে ১৯৪২ সালের ০১ জানুয়ারি এতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। অর্থাৎ ঐদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এবং আগের চার্চিল ও রুজভেল্ট এভাবে মোট চার রাষ্ট্র আর এক ছোট দলিলে লেখেন ও স্বাক্ষর করেন এই বলে যে তারা আগের  Atlantic Charter  এর যৌথ ঘোষণার সাথে একমত হয়ে এই স্বাক্ষর করছেন।
    পরবর্তিতে এই চার রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত দলিল এটাই জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা [1942: Declaration of The United Nations] মানা হয়।
  • পরের দিন ০২ জানুয়ারি ১৯৪২, আরও ২২ রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেছিল। জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করা হয় এভাবে।
  • পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালে পুর্ণ গঠন দলিল লেখা শেষ হলে যেটাকে জাতিসংঘের চার্টারের [UN Charter]  বলা হয়, ওর ১১০ নম্বর ধারা মতে ঐ গঠন দলিলে অন্যান্য রাষ্ট্গুলো স্বাক্ষর করাতে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছে

এই ভিত্তিতেই পরবর্তিতে অসংখ্য গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থগত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। একালে সেসব কনভেনশন, আইন ইত্যাদির হেফাজতকারি ও তদারককারি হল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিল (UNHRC)। কাজেই জাতিসংঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

এছাড়া আর সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীর প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ
১। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,  রাজা হরি সিং ভারতের নেহেরুর সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে  কাশ্মীরের বৈধ প্রতিনিধি না।
কাশ্মীরের জনগণের কোন রায় নিয়ে তিনি নেহেরুর কাছে যান নাই।
২। গিয়েছিলেন রাজা হিসাবে, একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন রাজা হিসাবে।
তাই জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,এই চুক্তি অবৈধ, অকেজো মুল্যহীন।
৩। যদি ধরেও নেই এই দলিল বৈধ তাতেও সমস্যা হল এটা ঠিক কোন একসেশন চুক্তি নয়। এটা আসলে করদ রাজ্য চুক্তি। ঠিক যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে হরি সিংয়ের প্রিন্সলি স্টেট চুক্তি ছিল – হরি সিং নেহেরুর সাথে তেমনই এক চুক্তি করেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘের চোখে করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি সেটা আরও অগ্রহণযোগ্য, তাই অবৈধ। কারণ এর ভিত্তি কলোনি বা কলোনিয়ালিজম। নেহেরুর রিপাবলিক ভারত কী করে কাশ্মীরের জনগণকে এক কলোনিয়ান করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি করতে পারেন?
৪। আটল্যান্টা চুক্তি বা জাতিসংঘ ঘোষণার সারকথা ও মূখ্য ভিত্তি হল “কলোনিয়ালিজম অবৈধ, তাই বাতিল”। ভুখন্ডের শাসক বা মালিক ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা। বিদেশি কলোনি মাস্টার ভুখন্ডের কেউ নয়।  মনে রাখতে হবে আটল্যান্টিক চার্টারের কথা। কলোনি মাস্টার চার্চিল সেখানে তৃতীয় ধারায় স্বীকার করে নিচ্ছেন যে – ” Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them; । অর্থাৎ কোন ভুখন্ডের মালিক সেই ভুখন্ডের বাসিন্দা এই নীতি মেনেই ঐ চার্টার চুক্তিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দাসখতের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে নিয়েছিলেন রুজভেল্ট। আর এই শর্তেই তিনি হিটলারের হাতে থেকে বৃটিশসহ ইউরোপকে বাচিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারাই ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদেরককে অর্থ ও অস্ত্রসহ সবরকম সহায়তা করেছিলেন।

অতএব ভারতের কনষ্টিটিউশনে বা ৩৭০ ধারাতে যাই লেখা থাক, অথবা এই মাসে এখন ৩৭০ ধারা রদ -বাতিল করে ভারতের রাষ্ট্রপতির যে ঘোষণাই দেয়া হোক কাশ্মীর নিয়ে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিসহ সবই অবৈধ। মূল কারণ, কোথাও কাশ্মীরের জনগণ – সেই মুল বাসিন্দাদের – কোন ম্যান্ডেট বা রায় নেয়া হয় নাই কোথাও।

তাই কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘ চার্টার, জাতিসংঘের নানান গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসংঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। অন্তত জাতিসংঘের সদস্যপদ বজায় রেখে। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগই নেই যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মিটাতে হবে।

সুতরাং জাতিসংঘ চার্টার অমান্য করে বাংলাদেশেরও – কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু মনে করা, ঘোষণা করা ভিত্তিহীন। শুধু তাই না এটা আত্মঘাতি। এটা যেকোন পর্যায়ে বাংলাদেশেরই সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]