বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

“বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

গৌতম দাস

৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yW

BRI-2, First China freight train arrives in London 2017
BELT-ROAD SUMMIT-2,  আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – ছবি : সংগ্রহ

গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বদলে চীন মূল ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে চীন এগিয়েই চলেছে এবং এই পরিবর্তনে চীনের জিডিপি সব সময় ইতিবাচক থেকেছে, যদিও সময়ে তা কম-বেশি হয়েছে। অগ্রগতির সে বিচারে গত কয়েক মাস ছিল চীনের দিক থেকে খুবই নির্ধারক কিছু ঘটনার যা, চীন ইতিবাচক সাফল্যের সাথে পার হয়েছে। আর এমন সাফল্যের ওপর চড়ে চলতি এপ্রিল মাসে চীন আরেক সাফল্য লাভ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ইতিহাসে চীনা উত্থানের দ্বিতীয় পর্যায় বলেই চিহ্নিত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?

চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) বা [Belt and Road Initiative (BRI) ] সম্পর্কে এতদিনে আমরা সবাই কমবেশি জেনে গেছি যে, এটা ৬৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে একসাথে ভৌত অবকাঠামোগতভাবে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে কানেক্ট করার এক মহাপ্রকল্প। কাঠামোগতভাবে এটা  মহাদেশীয় পর্যায়ের সংযোগ প্রকল্প; যা মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপ এদুই মহাদেশকে সংযুক্ত করে ফেলার প্রকল্প এবং আরও। তাই এর সাথে এ’দুই মহাদেশের মাঝখানে সেন্ট্রাল এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের সবাই যুক্ত হবে। আর ওদিকে এই কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আরেক প্রান্ত কেনিয়া ও ইথিওপিয়া দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সাথেও সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া পুরো প্রকল্পই স্থানে স্থানে ছয়টিরও বেশি গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের পণ্য পরিবহণের সাথেও যুক্ত থাকবে। আইডিয়া হিসেবে বিআরআই উদ্যোগের মূল ধারণা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাজির করেছিলেন তাঁর কাজাখাস্তান সফরের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। তখন এর নাম বেল্টরোড, সিল্করোধ, সিল্করুট ইত্যাদি নানান নামে হাজির করা হয়েছিল। সে ঘটনাক্রম সম্পর্কে এখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।  তবে গত ২০১৭ সালের মে মাসে এর প্রথম সামিট (বা সদস্য রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের নিয়ে সভা, বেল্ট রোড সামিট) এর সময় তা “বেল্ট রোড উদ্যোগ” (BRI) নামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মূল ফোকাস ছিল – কোন কোন রাষ্ট্র এই বড় প্রকল্পের অংশ হতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। আজ এই ২০১৯ সালের চলতি এপ্রিল মাসের শেষে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এবারের নাম Belt and Road Forum বলতে দেখা যাচ্ছে। এর জন্য নতুন খোলা পোর্টাল এখানে।]  এই সামিট টু কেন গুরুত্বপূর্ণ বা এর মূল তাৎপর্য কী হতে যাচ্ছে?

বেল্ট রোড অবকাঠামো প্রকল্পের মূল কাঠামো হল মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপকে সব উপায়ে সংযুক্ত করে ফেলা। অর্থাৎ এশিয়ার অপরপ্রান্ত হবে ইউরোপ, এত দিন যা খুবই সীমিত সুযোগে কানেক্টেড ছিল। আর এখানে ইউরোপ মানে সারা ইউরোপ; অর্থাৎ ২৫ সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও সংখ্যায় ২৫ অনেক বেশি, কিন্তু আসলে ইউরোপের প্রভাবশালী মাতবর রাষ্ট্র – চার থেকে আট রাষ্ট্র, যারা যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক। এই প্রথম চার রাষ্ট্রের মধ্যে মূল দুই রাষ্ট্র আবার হলো ফ্রান্স ও জার্মানি। এর সাথে বাকি দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন আর ইতালি। এমনিতে আমেরিকান মাতবরিতে চলা গত ৭০ বছরের দুনিয়া বিচারে, আমেরিকা একা একা চলে নাই; সাগরেদ রাষ্ট্রসহ দলেবলে চলেছে। এভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রজোট হল ‘গ্রুপ সেভেন’ বা জি-৭। একটু বিস্তারিত জানতে এই ফাইনান্সিয়াল বিনিয়োগ-পিডিয়া সাইট, ইনভেস্টোপিডিয়া – এটা দেখা যেতে পারে।  ইউরোপের সেই চার রাষ্ট্র – ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি – এই চার রাষ্ট্রই হল ‘গ্রুপ সেভেন’-এর চার ইউরোপীয় সদস্য; আর বাকি কানাডা, আমেরিকা ও জাপান মিলে পূর্ণ হয় ‘গ্রুপ সেভেন’।

বেল্ট-রোড উদ্যোগের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে এই কাঠামোতে এখানে এশিয়ার অপর প্রান্ত ইউরোপ। অথচ ২০১৭ সালে প্রথম বেল্ট রোড সামিট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এর অগ্রগতি ও অর্জন মেপে দেখলে সেখানে বড় খামতির দিক ছিল যে, সেকালে পর্যন্ত ইউরোপের কে কে বা বিশেষ করে প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রের কাউকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহী করাতে পারেনি বা কমপক্ষে কাউকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়াদা চীন আদায় করতে পারেনি। সেই খামতিই এবার পূরণ হতে চলেছে।
তবে এত দিন চীন কেন তা পারেনি তা বুঝতে প্রথমত চীনের কাছে জি-৭ কী, এটা বুঝলে অনেকটাই স্পষ্ট হবে সমস্যার জটিলতা কোথায়? গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত চীন ও আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকার জায়গা নিতে চায় চীন। তাহলে ইউরোপ? এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপ কেউ নয়। কারণ ইউরোপ বিগত-যুবা। ফলে সে ঐ দু’য়ের লড়াইয়ে কারও জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। তবে আমরা ইতিহাস হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, যদিও ইউরোপও একসময় দুনিয়ার নেতা এবং তাঁর সেখানে রুস্তমি ছিল; তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এবং সেটা ছিল কলোনি রুস্তমি।  আর ঐ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ হয়েছিল আমেরিকার এক নম্বর সাগরেদ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় (১৯৪২) থেকেই গ্লোবাল নেতৃত্ব আমেরিকা নিজের হাতে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে যায়; আর সারা ইউরোপ ছোট-বড় সবাই হয়ে যায় আমেরিকার অনুগ্রহ প্রার্থী। এমনকি মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করা হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালি অথবা এশিয়ার জাপান বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার পর আরও বেশি করে আমেরিকার অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়। ওদিকে ঐ বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের প্রায় সবাইকে যুদ্ধে সবরকম সাহায্য করা, প্রধান খরচগুলো নিজে বহন করা, অনুদান দেয়া তো বটেই এমনকি যুদ্ধ সমাপ্তিতে ইউরোপের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্বাসনের যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সেটাও একা আমেরিকা জুগিয়েছিল। তাই আমেরিকা ও ইউরোপের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় যেন, আমেরিকা একাই ত্রাতা ও দাতা আর  ইউরোপ ওরই পাণিপ্রার্থী। সে সম্পর্কই সেই থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসছে জি-সেভেন ধরনের গ্রুপেও, এক উঁচু-নিচু সম্পর্কে। আমেরিকা কী বলে বা সে কী চায়, তা আমল করে শুনতে ইউরোপ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যদিও ১৯৪৪ সাল থেকে গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম, যা বহুরাষ্ট্রীয় নানান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, তা গড়তে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ও নেতারা আমেরিকার সাগরেদ হয়ে পাশে থেকে নিজেদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ করে নিয়েছিল। এভাবে ইউরোপের প্রভাবশালী চার-ছয় রাষ্ট্র আমেরিকার পাশে ছোট-তরফ বা সাগরেদ হয়ে উঠতে জায়গা পেয়েছিল।

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, একালে আমেরিকাকে সরিয়ে গ্লোবাল নেতৃত্বের সে জায়গা চীন নিতে চাইলে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকেও চীনমুখী করে নিতে হবে আগে। “আমেরিকা-ইউরোপের” সম্পর্কের বদলে একে ছাপিয়ে “চীন-ইউরোপের” মধ্যে সম্পর্ককে খাঁড়া হতে হবে আরও প্রবল প্রভাবশালী সম্পর্ক হিসাবে। আর এটাই হবে বাস্তবত আমেরিকাকে দুনিয়ায় কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া। অতএব, বিশাল হইচই ফেলে দেয়া ঘটনা হল – ইতালির বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা। এবছরের মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি-এর সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফর ছিল। আর সেখানেই স্বাক্ষরিত ১৭টি চুক্তির মধ্যে একটি হলো চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রাথমিক বোঝাবুঝিগুলো’ (এমওইউ বা MOU ) দলিল করে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর চলতি মাসের বেল্ট রোড সামিট টু-তে অংশ নেয়ার সময় তা পূর্ণতা পাবে।

ইটালির এই যোগদান-সম্মতির চীনা উত্থানের জন্য এক মাইলস্টোন তাতপর্যের। কারণ ইতালিই হল প্রথম জি-৭ গ্রুপের সদস্য যে খোলাখুলি আমেরিকান মেরু ত্যাগ করল। শুধু তাই নয় ইতালিই প্রথম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যে (আমেরিকার হাত ছেড়ে) চীনের সাথে “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” – সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। [The communique said the two sides have agreed to advance China-Italy comprehensive strategic partnership…… ] অর্থাৎ চীন-ইতালি সম্পর্কটা কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নয়। [এপ্রসঙ্গ আরও একটু বিস্তারিত পরের প্যারায়।] বৃটেনসহ অন্যান্যরাও ইতোমধ্যে অনেক দূর গিয়েছে কিন্তু সেগুলো ছাড়াছাড়া। যেমন এলেখার শিরোনামের ছবিটা; এছবি বেল্ট-রোড ব্যবহার করেই প্রথম ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, চীন থেকে লন্ডন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন ব্যবহারের। যেটা অনেকটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসায় একটা সংযোগ নেওয়ার মত। কিন্তু সেটা ঐ বিদ্যুৎ কোম্পানির সাথে মালিকানা-বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

কিন্তু ইতালি ইউরোপের বাকি সবার আগে এত গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রধান বস্তুগত স্বার্থের দিক হল – পুরো বেল্ট রোড প্রকল্পে ইউরোপীয় আর এক প্রভাবশালী প্রান্ত বা শেষ মাথা হবে ইতালি। তাতে ইউরোপের যে গভীর সমুদ্রবন্দর বেল্ট রোডের সড়ক ও রেলকে সংযুক্ত করাবে, সেই বন্দর গড়ে উঠবে ইতালিতে। যার মানে হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতা মুসোলিনি, তিনি হিটলারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে – সেই থেকে পিছিয়ে পড়া আর ধুঁকে চলা অর্থনীতির ইতালি এবার সামনের সারিতে চলে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ডাচ রটারডামকে ছাড়িয়ে ইতালি হয়ে উঠবে ইউরোপের হাব [hub] – সড়ক, রেলের সাথে সমুদ্রপথ যুক্ত হওয়ার বড় সংযোগস্থল। সব দিকের সাথে কানেক্টিভিটির এই বিশেষ সুবিধার জন্য ইতালি হয়ে উঠবে বুড়ো শরীরে আবার যৌবনের জোয়ার – ইতালি হবে এখন ইপিজেড-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের হাবও। তাই নিজ বিপুল সম্ভাবনার সামনে এখন থেকে আমেরিকার হাত হালকা করে ধরা আর ইউরোপের অন্যরা – ফ্রান্স, জর্মানি বা ব্রিটেন- এদের সবাইকে টপকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চীনের হাত শক্ত করে জাপটে ধরা হবে ইতালির কাছে খুবই জায়েজ।

কিন্তু তাই বলে জার্মান, ফ্রান্স বা ব্রিটেনকেও চীন বিমুখ করেছে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়। বিস্তারে তা বুঝতে আরেকটা ধারণার সাথে পরিচয় করাতে হবে। “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” [Comprehensive Strategic Partner]’ হলো সেই নতুন শব্দগুচ্ছ – যা চীন একালে ব্যাপক ব্যবহার করছে। বাংলায় “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” – চীন দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে এমন “কৌশলগত মিত্র” হিসেবে পেতে চায়। এটা একটা (বেল্ট রোড) প্রকল্পেই কেবল চীন সবাইকে পেতে চায় তা নয়, বরং আরও এবং সামগ্রিক। আসলে খোদ বেল্ট রোড প্রকল্পটি চীনের একটি কৌশলগত প্রকল্প। কেবল বাণিজ্যিক নয়।

স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বলতে এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অর্থ হল, যা কেবল অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটাই নয়, আরও অনেক কিছু। কী সেটা? অন্তত আপাতত অর্থ হল, আমেরিকাকে বাইরে রেখে বাকিদের নেয়া হয়েছে এমন এক পক্ষজোট- যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি সব (এই অর্থে তা সামগ্রিক) স্বার্থেই এখানে চীনের নেতৃত্বে সকলে আছে। এই অর্থে এটা আমেরিকাকে বাইরে রেখে এক রাষ্ট্রস্বার্থ জোট। আবার এই জোটের কাম্য সদস্যরা মানেই এরা সবাই বড় ক্ষমতার রাষ্ট্র, ঠিক তা নয়। যেমন হাসিনার বাংলাদেশ (অন্তত ঘোষণা মোতাবেক), আমরাও চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ব্যাপারটা আর একটু বিস্তার করতে আরেক দিকে আলো ফেলব।

ক্রাইস্টচার্চ ম্যাসাকার সামলানোর জন্য সদ্য সুখ্যাতি অর্জন করা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা, এ মাসের ১ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে চীনের “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” হয়ে এসেছেন। এমন মিত্র হওয়াতে এর অর্থ বুঝতে হবে এভাবে; নিউজিল্যান্ড বেল্ট রোড প্রকল্পের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হয়েছে ও নিয়েছে। অর্থাৎ চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার না হয়েও কেউ বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও জেসিন্ডা স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হওয়া বেশি লাভজনক মেনেছেন। আর বিপরীতে কেবল বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হলে স্বভাবতই সে ক্ষেত্রে সেটা কেবল “বাণিজ্যিক স্বার্থ” ধরনের সম্পর্ক হত। ফলে চীনের দেয়া অন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সে পেত না। যেমন- কোন রাষ্ট্র যদি কোন কারণে ঋণের কিস্তি শোধ দিতে পারছে না অবস্থায় পড়ে। এমন ক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্র আবার চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হলে চীন ব্যাপারটাকে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখে থেমে থাকবে না। চীন তাকে বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে, বিপদ থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেওয়াসহ সব সাহায্য করবে। চীনের এখনকার সাধারণ নীতি-কৌশল হল সব রাষ্ট্র বা প্রকল্পের সম্পর্ককে সব সময় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা। যদি পার্টনার রাজি থাকে কেবল তখন সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়, কিন্তু চীনের দিক থেকে আগ্রহ জারি থাকে সব ক্ষেত্রে ও সময়ে।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ কেন আনলাম? কারণ, ঠিক এর বিপরীত ঘটনা বা রাষ্ট্র হলো অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রায় সময় একসাথে উচ্চারিত শব্দ। মূল কারণ তারা একইভাবে, একই ভাগ্যে রকই সময়ে ব্রিটেনের কলোনি হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থ ও নীতিগত মিল এক হতে বেশির ভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায়। যদিও চীন না আমেরিকা কোন ক্যাম্পে থাকবে প্রশ্নে তাদের ভিন্নতা দেখা দিল। আর জেসিন্ডা প্রমাণ করলেন অষ্ট্রেলিয়া ভুল করেছে।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই অন্তত ওবামা আমল থেকে,  তবে চাদরের নিচে থেকে আস্তে আস্তে প্রকট হয়ে ভেসে উঠছিল। যা কেবল এ’কালে ট্রাম্পের আমলে এসেই চাদর উঠে গেছে। আর সবচেয়ে বড়ভাবে আরেকবার চাদর উঠেছিল ২০১৫ সালে, চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক – এআইআইবি [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ] গড়ার সময়ে। ওবামা লজ্জার মাথা খেয়ে খোলাখুলি সেই সময়ে এই নতুন ব্যাংক প্রকল্পে যেন এশিয়ার জাপান, কোরিয়া তাইওয়ান বা অস্ট্রেলিয়া (যারা আমেরিকার বহু পুরনো বন্ধু মনে করা হয়) এরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও কেউ যেন যোগ না দেয় এর লক্ষ্যে, কান-পড়া দিয়ে কার বিয়ে ভেঙে দেয়ার মত, করে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও আপত্তিতে ছেয়ে ফেলেছিল। যদিও ফলাফলে আমেরিকার হার হয়েছিল; শেষে প্রায় সব রাষ্ট্রই ওই ব্যাংক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু চীনের নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট আর আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট সেই থেকে প্রায় প্রকাশ্যেই তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এআইআইবি ব্যাংকে সদস্য হয়েও আমেরিকার জোটেই যোগ দিয়েছিল। এছাড়া আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোটে আর সদস্য হয়েছিল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মত রাষ্ট্রগুলো এবং স্বভাবতই আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেয়া ভারত তো ছিল।

এমনকি অস্ট্রেলিয়া আরও একধাপ এগিয়ে নিজের উপকূলে এক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন (২০১৬ সালে চালু হয়) করতে দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় সবাই ধরা খেয়ে যায় ট্রাম্পের আমলে এসে, তাঁর জাতীবাদি ট্রাম্প হয়ে উঠার কারণে। কারণ ট্রাম্পের সারকথা, বিড়াল যেন বলছে আর মাছ খাবো না। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের অর্থনীতিতে রূপান্তর মানে দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক পণ্য বিনিময়ের গ্লোবাল সমাজের দুনিয়া গড়তে নেতৃত্ব দেয়া সেই আমেরিকা, ট্রাম্পের হাতে পড়ে হয়ে গেল অ্যান্টি-গ্লোবাল। এক জাতিবাদি আমেরিকা; আমেরিকা ফাস্টের নীতি চর্চা শুরু করল। ফলে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক জোট মুখ থুবড়ে পড়লেও বিপরীতে চীনেরটা সদর্পে আরও এগিয়ে যেতে সুযোগ পেয়ে যায়। সেটারই স্পষ্ট সফলতা এই প্রথম এখন প্রমাণ হল গত মাসের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর ইউরোপ সফরে। মুখ পোড়ানো অস্ট্রেলিয়ার অতি উৎসাহ যে ভুল ছিল তা যেন আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়ার অকেজো স্ট্র্যাটেজিক জোটের পাল্টা চীনা স্ট্র্যাটেজিক জোটে যোগ দিল।

এদিকে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকেই ইউরোপের জার্মানি – যে ট্রাম্পের “অ্যান্টি-গ্লোবাল” অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পাল্টা সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিল এবং ভোকাল ছিল, সেই জার্মানির সাথেই চীনের সম্পর্ক গভীর হয়ে যায়। চীনা শিল্প-উদ্যোগের যুগ এখন দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যার সারকথা প্রত্যেক ট্রেডকেই হাইটেকে বা উচ্চ প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়া। যেখানে প্রথম পর্যায়টা ছিল বাল্ক উতপাদন করে উতপাদন খরচ নামিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করে ফেলা। তাই এবার হাইটেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে – এখানেই জার্মানির সাথে চীন গভীর পার্টনারশিপ হয়। ব্যাপারটা জার্মানির দিক থেকে দেখলে, চীনের মতো বড় আর ব্যাপক এবং হাইটেকের চাহিদার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাওয়া জার্মানির জন্য তা বিরাট কিছু। সাধারণভাবে হাইটেকে আর বিশেষত গাড়ি তৈরির অটো শিল্পে চীনের মূল পার্টনার এখন জার্মানি।  জার্মানরা বিনিয়োগ নয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। চীনে গত তিন বছরে লাগাতার  জার্মান সংশ্লিষ্টতা ও বিনিয়োগ বেড়ে চলা চলছেই, গ্রোথ রেট ১৪০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্স সফরে এক মূল সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রেসিডেন্ট শিং-এর জর্মান চ্যান্সেলার মার্কেলের সাথে বৈঠকের মিডিয়া রিপোর্ট বলছে [China was Germany’s largest trading partner for a third consecutive year in 2018, with a nearly 140 percent increase in German companies’ actual investment in China, he said.]। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে এই বৈঠক থেকে চীনের সাথে জর্মানির ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে কোন সুর ভেসে আসে নাই। কিন্তু তা সত্বেও চ্যান্সেলার মার্কেল জানাচ্ছেন তিনি ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ফোরামে জার্মানি যোগ দিচ্ছে। [Germany would like to deepen its economic and trade relations with China in the digital age, and is willing to actively participate in the second Belt and Road Forum for International Cooperation, Merkel said.]।

ওদিকে ফ্রান্সের সাথে চীনের সম্পর্ক আর এক মাত্রায় হাজির। এবার প্রেসিডেন্ট শি-এর সফরে ইতালির বাইরে আরেক গুরুত্বের সফরের জায়গা ছিল ফ্রান্স। এই সফরে যত না চীনের খুশির, এর চেয়ে বড় খুশি প্যারিসের, সে গদগদ। মূল কারণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ফরাসি পণ্য-ক্রয়ের চুক্তি।  চীন, আমেরিকার বোয়িংয়ের চলতি খারাপ সময়ে ইউরোপের ফ্রান্সের বড় শেয়ারের (চীনে অবস্থিত ফ্যাক্টরি থেকে) এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, জার্মান ও ফ্রান্স চীনের পক্ষে কৌশলগত জোটের প্রত্যক্ষ পার্টনার না হলেও তারা ঘনিষ্ঠ; অন্তত তারা আমেরিকার জোটের নয়।

ইউরোপের চার কুতুবকে নিয়ে কথা বলতে এবার বাকি থাকল বৃটেন। ব্রিটেন এত বাছবিচার না রেখে খোলাখুলি বেল্ট রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে লম্বা পরিকল্পনা নিয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় হংকং ব্যাংকের এক সাবেক চেয়ারম্যান ডগলাস ফ্লিন্টকে বিশেষ দুত ও প্রধান করে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে এ লক্ষ্যে কাজ ও পরিকল্পনা শুরু করতে।[Sir Douglas Flint, who was appointed as the Special Envoy to BRI of the British Treasury in December 2017]। ফ্লিন্ট জানাচ্ছেন, The Belt and Road Initiative (BRI) “is a real opportunity” to strengthen UK-China cooperation। বেল্ট রোড সামিট টু ব্রিটেনের জন্য এক বিরাট সুযোগ বলে ডগলাস ফ্লিন্ট প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন।

তাই এককথায় বললে, চলতি এপ্রিলের ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ থেকে এর ওলটপালট ঝড় আসন্ন হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনের আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তা আর এক ধাপ উঠে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ?
বেল্ট-রোড প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান সরাসরি বিরোধিতার। গত ২০১৭ সালের সামিটের দাওয়াত তাই সরাসরি প্রত্যাখান করেছিল। আর বাংলাদেশ গত ২০১৭ সালে বেল্ট রোড সামিট-ওয়ানের সময় ভারতের মন রক্ষা করতে বাংলাদেশ লো-প্রোফাইলে থেকেছিল।  তবে বেল্ট রোড প্রকল্পে চীনের সাথে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত লুকাতেও চায়নি বা পারেনি। বরং অক্টোবর ২০১৭ সালে ভারতকে বুঝিয়ে রাজি করার এক  উদ্যোগ নিয়েছিল যে ভারত যেন আমাদেরকে এই সম্পর্কে যেতে আপত্তি না করে বা ভালভাবে নেয় – তা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। বরং আমাদের পররাষ্ট্র সচিবকে একাজে ভারতে পাঠানোয় উলটা ভারতের সাথে আমাদের অবস্থান-ভিন্নতা আরো প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। আজ দুবছর পরে এই ইস্যুটা এখন যে  অবস্থায় চলে গেছে তাতে এখন  ভারতের মুখ চেয়ে স্থবির হয়ে থাকা যাবে সে জায়গাতেও আর নেই। মূল কারণ বটম লাইনটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বেল্ট-রোড প্রকল্পে হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে

মূল প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীনের (কুনমিং প্রদেশে) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে কী না? যেখানে কলকাতাও বাংলাদেশ হয়ে যুক্ত থাকবে। এটাই বিসিআইএম (BCIM যা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর) প্রকল্প। তবে এই প্রকল্পের আর এক অনুষঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। আসলে উলটা – মূলত এই গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করেই এই চার দেশের ঐ অঞ্চলটার মূলত ল্যান্ড লকড দশায়; তাই সে অবস্থা ছুটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ল্যান্ড লক কথাটা আমাদের বন্দর আছে কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর নাই – এই অর্থে বুঝতে হবে। বাস্তবে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজের বন্দর, যার কানেকটিং গভীর সমুদ্র বন্দরটা সিঙ্গাপুরে। তাই চার দেশের এই বদ্ধ অঞ্চল – এটাকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে উন্মুক্ত করাটাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে সোনাদিয়া ছাড়াই কেবল রেল ও সড়কের BCIM প্রকল্পের আওয়াজ উঠতে উঠতে এখন সেই প্রকল্পের সব কিছুই মুখ থুবড়ে গায়েব। কেন?

ভারতের যুক্তি চীন BCIM প্রকল্পকে এখন বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত করতে চায়। অবশ্যই চায়। বাংলাদেশও চায়। আর প্রশ্নটায় এখন তখনের কিছু নাই। বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য এটা খুবই জরুরি যে আমরা আন্তঃমহাদেশীয় প্রকল্প বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত থাকি। তাই BCIM প্রকল্প যুক্ত থাকুক – এটাই তো আমাদের স্বার্থ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হাতে গুনে মনে রাখতে হবে – হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে বেল্ট-রোডে জড়িয়ে না থাকে বা থাকতে না পারে তবে আমাদেরকে আজন্ম এর কাফফারা দিতে থাকতে হবে। আর ভারতের এখন-তখনের যুক্তির পালটা কথাটা হল, BCIM প্রকল্পের মূল আইডিয়ায় সোনাদিয়া বন্দর ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সেটাই বা বাদ দেয়া হয়েছিল কেন? কেন হাসিনার ২০১৪ সালের চীন সফরের কালে সোনাদিয়া বন্দর চুক্তিতে বাধা দেয়া হয়েছিল?

ভারত যদি মনে করে আর চায় তাহলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত না হয়ে এই প্রকল্প হবে না। নো প্রবলেম। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে ঢাকা-বার্মা-কুনমিং হবে অর্থাৎ BCM প্রকল্প হবে অসুবিধা কী! আর এই প্রকল্পের কেন্দ্র সোনাদিয়া বন্দরও একই সাথে।  সেইসাথে বেল্ট-রোড প্রকল্পেও BCM -এটাও অবশ্যই যুক্ত থাকবে। কিন্তু   ভারতের এতে আপত্তি বা  একমত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ভারতের অবস্থানটা হল  – সে  নিজে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে বেল্ট-রোডসহ কোন প্রকল্পই সে হতে দিবে না।

কেন? কারণ চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্প  সম্পন্ন হতে দিলে আর তাতে ভারত জড়িয়ে থাকলে  তাতে চীন বহু আগিয়ে যাবে আর ভারত চীনের অধীনস্ত হয়ে যাবে। তা হতেও পারে, অসম্ভব না। কারণ ব্যাপারটা মুরোদের – সক্ষমতা ও যোগ্যতার। ভারতের মুরোদ না থাকলে তার বা কারও কী আর করার আছে? কিন্তু তাই বলে, কান-পড়া দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার মত  ভারত কূট-ষড়যন্ত্রের পথ ধরবে? যেটা কোন কাজের কথা নয়।  নাকি গঠনমূলকভাবে, ভারত চীনের এখনকার সহযোগিতাগুলো কাজে লাগানো আর নিজের মুরোদ অর্জন করা্র দিকে যাবে? যাতে কোন একদিন চীনকেও ভারত ছাড়িয়ে যেতে পারে! আজকের চীনের অবস্থাই কী এর প্রমাণ নয়। এককালে আমেরিকার সাহায্য নিয়েই কী আজ চীন এজায়গায় নয়? তাতে সে কী এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে না!

এভাবে  ভারতের মুরোদ অর্জন বিকল্প কূট-ষড়যন্ত্রের পথ – এটা কখনই নয় হতে পারে না। এমনকি ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা তো নয়ই! পাকিস্তান কাশ্মীরের উপর দিয়ে বেল্ট-রোডের মূল বা পাকিস্তান করিডোর গিয়েছে – ভারতের এটা ফর্মাল আপত্তির যুক্তি। সেটাও আসলে খাটে না। কারণ পাকিস্তান অংশসহ পুরা কাশ্মীর ভারতের কী না এটা তো কোন বিতর্কই নয়। কারণ, বিতর্ক হল সারা কাশ্মীরিরা কীভাবে কার হাতে শাসিত হতে তারা সম্মত হবে? ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে শাসিত হবে নাকি নিজেরাই আলাদা হবে?  এরপরেই কেবল, পুরা কাশ্মীর ভারতের হবে কীংবা হবে না তা তখন মীমাংসিত হতে পারে। এর আগে কোন কাশ্মীরই ভারতের নয়, কেউ না।

অতএব ঈর্ষা বা প্রতিহিংসাবশত  বেল্ট-রোডে যোগ না দেওয়ার ভারতের কোন বিদেশনীতি যদি হাজির থাকে তবে তা ভারতেরই থাক। তা আমাদের তো নয়ই, আমাদের দায়ও নয়। তাই আমরা কী করব তা ভারতকে জিজ্ঞাসারও কিছু নাই। আমাদের স্বার্থ, আমাদের ভাল-মন্দ ক্ষতি সব আমাদেরই বইতে হবে। যদিও এব্যাপারে বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বশেষ কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে আমাদের নির্বাচন পরবর্তি সময়কালে।

এ বছর আমাদের নির্বাচনের পরে আমরা দেখেছিলাম, কারও পরোয়াহীন এক  চীনা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন। আর বিশেষ করে সিএনএন-নিউজ১৮ (CNN-NEWS18) নামে ভারতীয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই বোল্ড ছিল। এবং তা এক স্থির সিদ্ধান্তের প্রকাশ দেখিয়ে ফেলেছিল যে, সোনাদিয়া বন্দরসহ বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে হাসিনা সরকার আর থামবে না। এমনকি ওই সাক্ষাৎকার আসলে খোদ ভারতকেই চীনের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে আহ্বান রাখা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের আলো অনুসরণে চিন্তা করলে মনে হয়, এবারের এপ্রিলে বেল্ট রোড সামিট টু-তে চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা দেখব।

কিন্তু এর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, ভারতে এখন রুটিন সরকার; মানে মোদীসহ রাজনৈতিক নেতাদের সময় নেই এনিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার। এর চেয়ে নিজ নিজ এলাকায় মাঠের নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করা তাদের এখন প্রায়োরিটি, একমাত্র কাজ। আগামী মাসে ২৩ মের আগে ভারতে সরকারে কে আসবে, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তা জানার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় এক কথায় বললে, ভারতের নিজের বেল্ট রোড সামিট টু-এর পক্ষে কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশকে এবারো কি তারা ঠেকাতে পারবে?

ঠেকাতে ২০১৭ সালে আগেরবারই পারেনি। ফলে এবারো পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে, সাক্ষাৎকার দিয়ে বলা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দিক থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা। যদি তা আমরা না দেখতে পাই, তবে বুঝতে হবে সরকার আবার আপস করল। সেটা হবে বাংলাদেশের প্রবল সব সম্ভাবনাগুলোর মাথা মুড়িয়ে ফেলে রাখা আর পিটিয়ে কাউকে খাটো বামন বানিয়ে রাখার মতই একটা কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৬ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

 

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

গৌতম দাস

১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uW

ইমরান খান ও শি জিনপিং – ছবি : সংগ্রহ

পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কেমন? মানে সম্পর্ক বলতে ভেঙ্গে বললে, স্ট্রাটেজিক, ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল সম্পর্ক কেমন, এই হল প্রশ্নটা। কোন দুই রাষ্ট্র তা ঘোষণা দিয়ে বললে  স্বভাবতই তা বুঝতে সহজ হয়। তবে না বললেও আন্দাজ অনুমান করে অনেক কিছুই প্রায় সঠিক জানা যায়। আসলে আমেরিকা এবং বিশেষ করে ভারতের সবচেয়ে গভীর আগ্রহ হল, স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী – তা জেনে ফেলার। ভারতের এই আগ্রহের তীব্রতা টের পাওয়া যায়, তাদের সব মিডিয়ায় ব্যবহৃত একটা শব্দ থেকে। সেটা হল, “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” (all weather friend); যেমন তারা খোঁচা দেওয়া মন্তব্য হিসাবে প্রায়ই লিখে থাকে যে – চীনের “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” পাকিস্তান ওমুকটা করতে যাচ্ছে……। তবে “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” লেখাটা যতটা না খোঁচা দিয়ে বলা এর চেয়ে বেশি এটা আসলে এক ঈর্ষামূলক আক্ষেপ। “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” মানে যারা খারাপ বা ভাল যে কোন পরিস্থিতিতেই বন্ধুই থেকে যায়। এছাড়াও আর একটা বিষয় হল, সাধারণভাবে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী তা জানাবুঝা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট করে “চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের” [CPEC projects] পিছনে স্ট্রাটেজিক বিষয়াদি কী লুকানো আছেও তা জানতে ভারত ও আমেরিকা বিশেষভাবে আগ্রহী।

পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকার এ’এক নতুন ধরনের ক্ষমতা। আমাদের আগের দেখা বা পুরনো অভিজ্ঞতায় যেসব ধারণা আছে তা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন। আমাদের মত রাষ্ট্র মাত্রই, আমরা সাধারণত দেখি এক বিশেষ কোটারি অথবা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ও দুর্নীতি সেখানে ঘটবেই। এটা গেল এক দিক আর অন্য দিকে থাকবে ঐ গোষ্ঠী নিজেদের কোটারি কোনো লাভালাভের লোভে বিদেশী কোনো স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মুখস্তের মত আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ইমরানের আগমন অন্তত এই অর্থে নতুন যে, এই ক্ষমতা আমাদের দেখা বা জানা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে অনেক কিছুই আমরা ভিন্ন দেখব, তা অনেকেই আশা করে।

কিন্তু কতটুকু নতুন বা ভিন্ন? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ ফিরানো দরকার। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য কাজ বা পদক্ষেপ নিতে পারে না। অন্তত পারেনি। পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করে এসেছে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যে ধরনের যুদ্ধকে আমরা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলি। মানে অন্যের স্বার্থে তার যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সেই যুদ্ধ করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। যেখানে সাধারণভাবে  প্রক্সি মানে হল, স্কুলের ক্লাসরুমে নাম ডাকার সময় অনুপস্থিত বন্ধুর হয়ে “উপস্থিত” বলার মত। আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ খেটে দেওয়া – এবিষয়ে আদি গ্লোবাল ঐতিহাসিক ঘটনা বা শুরুর ঘটনাটা হল, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়া, আর তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্ত মধ্য এশিয়ায় এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয় পেয়ে  সোভিয়েত ইউনিয়নের (বাফার গড়তে) আফগানিস্তান দখল করা; আর এবার তা ঠেকাতে বা উল্টে দিতে আমেরিকা, পাকিস্তানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে নিজের প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা – মানে মোজাহিদিন লড়াই শুরু করা – এটা ছিল প্রথম পর্ব। আর এরই লেজ ধরে দ্বিতীয় পর্বে, আলকায়েদা-তালেবান বনাম আমেরিকার ওয়ার-অন টেরর যুদ্ধে এরই ময়দান হিসেবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত হওয়া, যুদ্ধে ঝাপায় পড়ার পাটাতন হিসাবে আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভুমি ব্যবহার করতে দিয়ে নিজে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।

ফলে এই দুই ইস্যুতে গত ৩৮ বছর ধরে পাকিস্তান অন্যের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। না এটা অবশ্যই পাকিস্তানের স্বেচ্ছায় করা কাজ নয়। এছাড়া এর মধ্যে তা যতটা না নিজ স্বার্থে এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আমেরিকান স্বার্থে আর আমেরিকার চাপের বাধ্যবাধকতায় পাকিস্তান করেছে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে যে পাকিস্তান আর আমাদের মত এক আম- রাষ্ট্রের মতো থাকেনি। এ এক বিরাট ব্যতিক্রমী, বিশেষ রাষ্ট্র হয়ে গেছে। যে নিজের স্বার্থ না থাকলেও আমেরকান স্বার্থে নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েই শেষ হয় নাই। এরপর আবার আমেরিকাই অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই বিচারে পাকিস্তান আমাদের মত একই পাল্লায় তুলনাযোগ্য রাষ্ট্র কি না সেই প্রশ্ন অনেকে তুলতে পারেন। তবে এই আলোকেই সার কথাটা হল, গত ৩৮ বছরে পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য, নিজের জন্য রাষ্ট্র থাকেনি, কাজ করেনি।

কিন্তু ওদিকে আরেক সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা হল, পাকিস্তান নিয়ে যেকোনো আলোচনার সময় বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেকোন সিদ্ধান্ত যে পাকিস্তানের নয় – এই প্রক্সি-খেটে বেড়ানো, বিশেষ করে আমেরিকান স্বার্থের দায়ের বাধ্যবাধকতায় চলে বেড়ানো, সে কথা মনে রাখে না। মনে রেখে কথা বলে না। পাকিস্তান যেন স্বাধীন – এই অনুমান ধরে নিয়ে এরপর পাকিস্তানের সমালোচনা ও মূল্যায়ন শুরু করেন। সবচেয়ে তামাশার কথা হল, বুশের আমল থেকে পরের সব আমেরিকান প্রশাসন পাকিস্তানের যেকোনো সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ যে আমেরিকারই স্বার্থে প্রক্সি পদক্ষেপ সে কথা স্বীকার না করে, দায় না নিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকেন।

তবু এগুলোও মূল বিষয় নয়, আরো দিক আছে। তা হল, প্রক্সি যুদ্ধের এই কালের  পাকিস্তানের অপর দুটা রাজনৈতিক দল,  নওয়াজ শরীফের পিএমএল (PML-N) আর ভুট্টো পরিবারের পিপিপির (PPP) ভূমিকা। তারা এই প্রক্সি যুদ্ধের পাকিস্তান পরিস্থিতিতে নিজেরা যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছে তা হল – যেহেতু আমেরিকান ইচ্ছা, চাহিদা বা সিদ্ধা্নতের পক্ষে থাকা তাদের আমলের সরকারের পক্ষে এড়ানো বা ভিন্ন কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থেকে চুরি আর লুটপাটের বন্যা বইয়ে দেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ – কারণ আমেরিকানদের খেদমতে খেটে যাবার করার কারণে ক্ষমতা তো নিশ্চিত! আর তাতে দায় দোষারোপ সব আমেরিকার ওপর দেয়া যাবে। এই দুই দল এখান থেকে পাকিস্তানকে দেখেছে – আর এটাই পাকিস্তানের দুরবস্থায় সবকিছুর উপরে দুর্ভাগ্যের দিক। এ কারণে আজ পাকিস্তানের ক্ষমতার করিডোরের আলাপে এক চালু হিসাব হল, নওয়াজ অর্থ লোপাট করে বিদেশে রেখেছে দুই বিলিয়ন ডলার, আর ভুট্টো পরিবার রেখেছে এক বিলিয়ন ডলার।

এভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থায়। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান এবার ক্ষমতায় এসেছেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট স্বাক্ষ্য দিয়ে, ডাটা ও গ্রাফ এঁকে দিয়ে বুঝিয়ে, বলছে পাকিস্তানের চরম খারাপ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য ইমরান দায়ী নয়। আগের সরকার নওয়াজ শরীফ দায়ী। [The economy’s troubles are not Mr Khan’s fault.]   তবে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের দেউলিয়া এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে এখন ১৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পাকিস্তান রুপির ডলার বিনিময় মূল্যমান গত এক বছরে ৯১ থেকে নেমে এখন ১৩৪ রুপিতে ঠেকেছে। কথাগুলো বলা হচ্ছে এ জন্য যে, ইমরানের ক্ষমতার শপথের পরের প্রথম মাস তার কেটেছে সৌদি, চীন নাকি আইএমএফ  – কার কাছ থেকে নুন্যতম ঋণ-মুক্তির অর্থ বা “বেল আউট”-এর অর্থ পেতে পারে সেই খোঁজাখুঁজিতে। সৌদিদের উপর প্রবল ভরসা করে ইমরান নিজেই প্রথম সফর হিসাবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঋণ দেওয়ার বদলে, CPEC projects এ বিনিয়োগের শেয়ার নিতে স্বেচ্ছায় এক পালটা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমরানের বিবেচনায় সঠিকভাবেই এই প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে চীনের সাথে পাকিস্তানের  সম্পর্কে খামোখা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ সৌদি প্রস্তাবে একমত হতে চীনকেও বুঝাতে হবে, রাজি করাতে হবে ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। তাই সৌদি প্রস্তাব ফেলে রাখা ছাড়া ইমরান উপায় দেখেন নাই।  

ইতোমধ্যে সর্বশেষ খবর হল, শেষমেশে, ইমরানের সিদ্ধান্ত – পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেল আউট ঋণ চেয়ে আবেদন পেশ করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাষায়, এটা পাকিস্তানের “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি” মিটানোর ঋণ। 

গ্লোবাল অর্থনীতির (Global Economic Order) দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের যুগ চলছে; অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পালাবদলে এটা আমেরিকার জায়গায় চীনের আগমন ও সেই স্থান দখলের কাল। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদুর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এ দিকে এই মূল লড়াইয়ে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, একাজে বাড়তি সুবিধা পেতে  ভারতকে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে দেখা যায়। যদিও সবসময় আবার তা নিজ অন্য স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে না, সেকথাও সত্য।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (China–Pakistan Economic Corridor বা CPEC projects) – মোট ৬২ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প যা উত্তর দক্ষিণ বরাবর পাকিস্তানের বুক চিড়ে করাচির গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে একেবারে চীনের জিনঝিয়াং (Xinjiang Uyghur Autonomous Region) উইঘুর প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত এক হাইওয়ে তৈরি হচ্ছে। তাই এই প্রকল্পটা আসলে চীনকেই পাকিস্তানের করিডোর দেয়া। অর্থাৎ পুরোটাই কেবল পাকিস্তানের স্বার্থে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়। চীনের উইঘুর প্রদেশ ল্যান্ডলকড অঞ্চল; ফলে এর বধ্যদশা ঘুচাতে, অঞ্চলটাকে সমুদ্রপথেও যোগাযোগ করিয়ে দিতে, রাজনৈতিকভাবে উইঘুর মুসলমানদের মন-জয় করতে, তাদের পিছিয়ে থাকা দশা থেকে মুক্ত করতে  – চীন এটা নিজের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মনে করে।

কিন্তু আমেরিকা (সাথে ভারতও) নিজেদের সন্দেহ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে চীন-পাকিস্তানের এই বাস্তব বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চরমতম বিরোধিতা করে থাকে। পাকিস্তান আমেরিকার প্রভাবের হাত থেকে ছুটকারা পেয়ে যাচ্ছে এই প্রকল্পের মত তৎপরতার কারণে। ফলে এই প্রকল্প পুরোটাই আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে এরা দেখে। কিন্তু ওদিকে আমেরিকা ও ভারতের জন্য আর এক চরম অস্বস্তিকর একটা ফ্যাক্টস হল, করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের মূল চার প্রদেশকে এক সাথে এক জায়গায় এনেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর দিয়ে গেছে, তাই এটা কেবল কেন্দ্রের নয় পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক সরকারও স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের দিক থেকে এই প্রকল্পকে  অনুমোদন করে স্ব স্ব প্রাদেশিক পার্লামেন্টেও সিদ্ধান্ত পাশ করেছে। এমনকি বেলুচিস্তান যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে তাদেরও কোনো পক্ষই এই প্রকল্পের ঠিক বিরোধী নয়।

এসব কিছুর মূল কারণ সব প্রদেশের জনগণও এই প্রকল্পকে দেখে থাকে এক হাইওয়ে ধরে রপ্তানিতে গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ, এতে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্রিয় হতে নিজ নিজ প্রাদেশিক স্বার্থেও বিকশিত হওয়ার জন্য এই প্রকল্পকে বিরাট নিয়ামতের মত মনে করে। ফলে চার প্রদেশ অন্তত একটা ইস্যুতে পুরো পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার চীনেরও স্বার্থে এই অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবহৃত হবে বলে এর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করার দায়ভার এবং এর ঋণ পরিশোধের দায়ভার পাকিস্তানের সাথে চীনেরও। কিন্তু এসব বিষয়গুলো কিভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে লেখা আছে – সেটা বিলিয়ন ডলারের এক কৌতূহল আমেরিকার (সাথে ভারতেরও) কাছে। তাদের গভীর অনুমান যে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে।

আসলে অর্থনৈতিক স্বার্থ মানেই সাথে জড়ানো থাকে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থঃ
এই প্রকল্পের শিরোনামেই বলা আছে এটা “অর্থনৈতিক” প্রকল্প। অর্থাৎ এটা কোন সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থে নেয়া যুদ্ধ করার প্রকল্প নয়। তবুও তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ শতভাগ যেকোন অর্থনৈতিক প্রকল্পেও ওর নিরাপত্তার দিক থাকবেই; ফলে সেই সুত্রে ওর সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকও থাকেই, তা আলাদা করা যায় না। এই ব্যাপারটা আমেরিকা বা ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। যখন চীন অর্থনৈতিক ভাবে কেবল জাগতে শুরু করছে কেবল, সেই ২০০৮ সালের একটা ঘটনা হল – মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন এফেয়ার হাউজ কমিটির সামনে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হায়ার করে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের আলোচনায় চীন উত্থানের প্রভাব কী এনিয়ে মুল্যায়ন রিপোর্ট করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রফেসরকে কংগ্রেস কমিটিতে শপথ করিয়ে যেমন জেরার শুনানি চলে তা চলেছিল। যেখানে প্রফেসর স্বাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল চীনের অর্থনীতিতে বাধা সৃষ্টি করে একে ডুবিয়ে দিবার উপায় কী। চীনে জ্বালানি তেল আনা আর রপ্তানি পণ্য পাঠানোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে, চোকিং পয়েন্ট মানে ঠুটিই চিপে শ্বাস রুদ্ধ করে ধরা সম্ভব এমন এক চিকন হয়ে পড়া নৌচলাচল পথের অংশ আছে, (Strait of Malacca বা বাংলায় মালাক্কা প্রণালী নামে) মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মাঝে। যা চিপে ধরলে মানে এই ৯০০ কিমি চিকন হয়ে থাকা নৌপথে – ইচ্ছা করে কোন জাহাজ ডুবিয়ে নৌচলাচল ব্লক করে দিলেই চীনের অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে আমেরিকাকে আর যুদ্ধ করতে লাগবে না। এই ছিল ঐ প্রফেসরের যুক্তি ও পরামর্শ। এখন আমেরিকান সিনেট যদি চীনের ক্ষতি  করতে এই আলাপ করতে পারে তাহলে চীন পালটা তার দুর্বল জায়গা – ঐ মালাক্কা প্রণালীর অনেক অনেক বিকল্প তৈরি করে রাখবে না কেন?  আর চীন তা করলেই, “চীন অর্থনীতির সাথে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ” মিলিয়ে ফেলছে –  আমেরিকা ও ভারতের এই ভুয়া চিৎকার অর্থহীন।  ফলে পাকিস্তানের গোয়াদর অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতায় [এমন কি হবু বাংলাদেশের সোনাদিয়ায়ও আর একটা ] গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে তা ব্যবহার করে – চীন মালাক্কা প্রনালীর বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের উপায় করে নিবে – এটাই কী সবচেয়ে স্বাভাবিক নয়? এই অবস্থায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে কেবল “ভারতকে মুক্তা মালার মত ঘিরে ফেলতেছে”, তাই ভারতের হাসিনাকে চাপ দিয়ে  বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় আর একটা বন্দর করা ঠেকিয়ে রাখতে হবে – এসব বক্তব্য কোন এক পেত্নির নাকি-কান্না ছাড়া আর কী? তাহলে সারকথা, কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প যত বড় হবে তাতে উল্লেখ করা থাক আর না থাক, ওর সাথে সাথে এক সামরিক -স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ততই বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোন (৫ থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলারের) বড় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রকল্প কোন রাষ্ট্র কেন নিবে? বরং নিতেই পারে না।

কিন্তু প্রশ্ন এত দূরে কেন উঠছে? কারণ, পাকিস্তান ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরে এখন আইএমএফ টিমের চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তান সফর এবং মূল্যায়নে বসা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে খবর হল, পাকিস্তান সফর করছে এমন আইএমএফের টিম বলেছে, তাদেরকে CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে যে পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া আইএমএফের জন্য কতটা রিস্ক বা দায় নেয়া হয়ে উঠতে পারে। যদিও পাকিস্তান এই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু ভারতের মিডিয়া প্রবল আগ্রহ তৈরি করেছে যে এইবার “আঙ্কেল স্যাম” তাদেরকে CPEC করিডোর চুক্তির হদিশ পাইয়ে দিবেই।

এখানেই হল আসল ইস্যু। আগেই বলেছি, আমেরিকার (সাথে ভারতও) কাছে তাদের অনুমান হল, চীন-পাকিস্তানের ওই প্রকল্পের চুক্তিতে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি কী আছে তা এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে। তাই তাদের প্রবল কৌতূহল ওই চুক্তিতে কী আছে তা জানার।

এখন আইএমএফকে দিয়ে চুক্তির “স্টাটেজিক তথ্যের দিক হাতিয়ে”  আমেরিকা কি তার সেই প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল মিটিয়ে নিতে পারবে?
আমরা স্মরণ করতে পারি, ইমরান খান সরকারের শপথ নেয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানের লোন প্রসঙ্গ উঠতেই আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে চীনের ঋণের দায় শোধ করা যাবে না”। [Pompeo warns against IMF bailout that pays off Chinese lenders]। এটা অবশ্যই আমেরিকার কোন বুদ্ধিমান মন্তব্য ছিল না। ছিল, ডুবে যাচ্ছে এমন মরিয়া এক আমেরিকান আস্ফালন।

তাই মনে করার কারণ আছে যে, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট লাগার্দের (Christine Lagarde) কথিত এখনকার মন্তব্য যে আমাদেরকে “CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে” [যদিও কোন মিডিয়াই লাগার্ডে বা আইএমএফের কোন কর্ককর্তার সরাসরি বরাতে একথা বলতে পারে নাই। সবাই “সোর্স বলেছে” বলে লিখেছে। ] এটা আগের পম্পেই হুঙ্কারেরই নরম ও কারেক্ট ভার্সন। এখন দেখার বিষয় চীন-পাকিস্তান করিডোর চুক্তি পুরোটাই বা অংশ ওপেন না করেও পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ হাসিল করতে পারে কি না!

তবে ভারত ও আমেরিকার দুটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এখানে আলাদা করা দরকার। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ কী, চীনা CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ? এপর্যন্ত কোন দেশি বা বিদেশি মিডিয়া রিপোর্ট এই দাবি করেছে এমন দেখা যায় নাই। কিন্তু সকলেই এমন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত করার চেষ্টা করে থাকে। ইমরানের পাকিস্তান সরকার এবিষয়ে নিজেই কিছু ফ্যাক্টস প্রকাশ করে এমন ইঙ্গিত ও প্রপাগান্ডাকে নস্যাতে উড়িয়ে দিয়েছে।  ইমরানের সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় – তারা বলেছে, “The CPEC deals are open and transparent,” said Noor Ahmad, a spokesman for the Ministry of Finance.

এছাড়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের এপর্যন্ত প্রাপ্ত মোট বিদেশি ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৬ বিলিয়ন বা ৬.৩% হল CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ। [Pakistan has already brushed aside criticism on growing indebtedness of the country due to CPEC, saying the share of the CPEC loans was only $6 billion or 6.3% in total outstanding external debt of $95 billion as of end June this year.]  আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল, আইএমএফ এবারই প্নরথম নয় আগেও (২০১৪) করিডর প্রকল্পের এক মুল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিল। করিডোর প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর এটা জানিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসা্রে, আইএমএফ লিখেছিল,  [The IMF report has then stated that the CPEC infrastructure and transport projects are financed by long-term concessional government borrowing from China.]  অর্থাৎ  এই প্রকল্প চীনের স্বল্প সুদে (concessional) দেয়া ঋণ” বলে মনে করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় “কনসেশনাল” ঋণ মানে হল  –  (১% এর কম,) ০.৭৫% বাৎসরিক সুদ, চল্লিশ বছরে শোধ করতে হবে তবে প্রথম দশ বছর কোন কিস্তি দিতে হবে না, মাফ পাবে। এখানে “কনসেশনাল” ঋণ মানে সুনির্দিষ্ট করে কী বুঝানো হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। এছাড়া ঐ রিপোর্টে আর একটা মন্তব্য আছে, CPEC-related outflows would peak at about $3.5 billion to $4.5 billion per annum by fiscal year 2024-25. – মানে ঋণ শোধের দায় সবচেয়ে চড়া হয়ে উঠবে ২০২৪-২৫ সালে, যখন বছরে প্রায় চার বিলিয়ন করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ তখন এটা পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে পারে। এই বিষয়গুলো পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্ট। কাজেই আমেরিকা ও ভারতের ভুয়া ক্যাম্পেইনের পাল্লায় পড়া থেকে এবার সকলে সাবধান। 

দুনিয়ার জন্য বর্তমানে এক ইউনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যখন চীনের উত্থান ঘটেইনি সেই পরিস্থিতি মানে, যখন দুনিয়াতে আমাদের মতো রাষ্ট্রের কোনো ঋণ পাওয়ার একমাত্র উৎস ছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সেসব দিন পেরিয়ে, এখন চীন উত্থিত ও বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের একালে দুনিয়াকে নতুনভাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককেও  আমল করতে হচ্ছে। কারণ এখন আর সে একক ঋণদাতা নয়। শুধু তাই নয়, আইএমএফ যদি প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানের মত না হয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির ভাঁড় হয়ে থাকতে চায়, ঐ বিদেশনীতি সরাসরি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকতে চায় তবে এই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানও একদিন আমেরিকার সাথে শুকিয়ে ছোট হয়ে যাবে – সেটাও আশা করি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আমল করে চলে, আমরা দেখতে পাব!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস জানা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

গৌতম দাস

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tY

 

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে

প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party'”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sc

 

 

আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়

লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

গৌতম দাস

১২ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rG

 

 

 

ভারতীয় থিংকট্যাংক (Think Tank or Policy Institute) প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা হালহকিকত নিয়ে প্রায় সময়ই আমার লেখায় নানা মন্তব্য থাকে। সেখানে আমি সবসময় প্রশ্ন তুলেছি যে, কোন আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা (আমেরিকান ফান্ড চলা) ভারত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষ থেকে পলিসি নিয়ে কাজ করা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ফলে শেষ বিচারে এগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের এক পলিসি প্রতিষ্ঠানই হবে। কারণ এটা  থিংকট্যাংক অর্থাৎ চিন্তা, আইডিয়া ও মতাদর্শ তৈরি করা বা করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রস্বার্থ জিনিষটা কোকিলের ঘরে কাকের বাসার গড়ার মত কাজ কারবারের না; সেটা এখানে চলতে পারে না। ফলে শুধু আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা নয়, এমনকি আমেরিকান (এনজিও) ফান্ডে চলে এমন স্থানীয় ভারতীয় থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই কারণে সেগুলোও ভারতের মাটিতে “আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পলিসি প্রতিষ্ঠানই” হবে।

বুশের আমল থেকে এভাবেই আমেরিকা ভারতের ঘাড়ে চড়ে আমেরিকার নিজের “চীন ঠেকাও নীতি” বাস্তবায়ন চালিয়ে গিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এখানে কথাগুলোর মূল বিষয় সাধারণভাবে বিদেশি এনজিও প্রসঙ্গে নয়। ফলে সাধারণভাবে এনজিও এর মাধ্যমে আমেরিকান ফান্ড বিতরণ এর বিরুদ্ধে কথা বলা বলে বুঝলে ভুল হবে। যারা বস্তুগত, বা বিষয়আশয় বিতরণের দাতব্য বিদেশি এনজিও – তাদের ক্ষেত্রে এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু চিন্তা, মতামত ও পলিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফান্ডে হলে এখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের সাথে স্বার্থ সংঘাত, সমস্যা হবেই। এটাই মূল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত চরম ন্যাশনালিজমের ভারতের রাজনীতি, অথচ থিংকট্যাংক প্রশ্নে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংককে অবলীলায় ততপর করে রেখেছে।  আসলে আমেরিকায় ভারতের ভর্তুকির রপ্তানি পণ্য বিক্রি করতে দেওয়াতে রপ্তানি বাজারের এই লোভে সম্ভবত ভারতরাষ্ট্র নিজ দেশে আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রভাব প্রতিপত্তি চালু রাখতে দিয়েছে। এই অনুমান যদি সঠিক হয় তবে বুঝতে হবে এবার  ভারতে ততপর আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা অথবা অথবা আমেরিকান ফান্ডে চলা লোকাল থিংকট্যাংক এদের সবার ততপরতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে এবার ঢিলা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। হাত গুটাতে হবে তাদের। এক ব্যাপক বদল আসন্ন হয়ে উঠছে। মূল কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতিতে “চীন ঠেকানো” প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে ছিল বিগত প্রায় ষোল বছর – প্রেসিডেন্ট বুশের আট বছর আর পরে ওবামার আরও আট বছরে। এর ফলে এটা শুধু স্থায়ী নীতি হয়ে যাওয়া না, বরং “চীন ঠেকানো” ছিল আগের বুশ ও ওবামা প্রশাসনের পলিসিগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার। কিন্তু এই প্রথম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। অন্তত প্রায়রিটি উলটে দিয়েছেন তিনি। আগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র স্বার্থের টপ প্রায়রিটি। আর এর বদলে ট্রাম্পের প্রায়রিটি হল বাণিজ্যস্বার্থ এখন টপ প্রায়রিটি। অর্থাৎ চীন ঠেকানো ট্রাম্পের কাছে প্রায়রিটি নয়। চীনের কাছে হারিয়ে ফেলা বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার ট্রাম্পের টপ প্রায়রিটি। এসবের ফলাফলে  ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক ততপরতাগুলোর শুকিয়ে যাবার কথা। দেখা যাক কী হয়। বাস্তবে কী ঘটে তা দেখার জন্য আমাদেরকে কমপক্ষে এবছরটা অপেক্ষা করতে হবে।

তবে ভবিষ্যত অবস্থা যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, ভারতের আমেরিকান থিংকট্যাংক ব্যাক্তিত্বরা এখনই হাল ছেড়ে দেন নাই।  তেমনই এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী থিংকট্যাংকার ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজা মোহন। বর্তমানে তিনি কার্ণিগি ইন্ডিয়ার (Carnegie India) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কার্ণিগি মানে হল, আমেরিকার ওয়াশিংটনভিত্তিক এক ফরেন পলিসি – বিষয়ক থিংকট্যাংক যার নাম – কার্ণিগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারনাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)। এই পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রূপের নাম হল, কার্নোগি। আর এর ভারতীয় শাখা হল, কার্নোগি ইন্ডিয়া। রাজামোহন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স পাস করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তবে পরে দিল্লির জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। এরপর অধ্যাপনা করেছেন অথবা নানান ধরণের একাডেমিক কাজে জড়িয়ে ছিলেন কখনও ভারতে, সিঙ্গাপুরে, অস্ট্রেলিয়ায় নয়তো আমেরিকায়। তবে তার মূল পরিচয় এখন “ফরেন পলিসি এনালিস্ট”, তার নিজের পরিচিতির ভাষায় তিনি “থিংকট্যাংকার”। আমেরিকায় থাকার সময় থেকে তিনি দক্ষিণ ভারতে তামিলনারুর প্রাচীন ইংরেজ জমানার ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকার ওয়াশিংটন করসপন্ডেন্স ছিলেন। পরে ডিপ্লোমেটিক এডিটর বা কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এই দ্য হিন্দু অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাতেও। বর্তমানে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখছেন। ভারত সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক অথবা থিংকট্যাংক সংশ্লিষ্ট যত প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারক বোর্ড আছে তিনি প্রতি বছরই একাধিক এমন সব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য থাকেন। তিনি এমনই প্রভাবশালী শিরোমণি। তার গুরুত্বপূর্ণ উত্থান ২০০৪ সালের আশেপাশের সময় থেকে। বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের আমলে, জুলাই ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম ভারত সফর কাল থেকে। আমেরিকার ভারতনীতি কী হবে – তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তখন থেকেই ‘আমেরিকার বন্ধু’ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব ও নীতির বিচারে তিনি প্রভাবশালী এক বিরাট ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশও সফর করেছেন কয়েক বছর আগে; অনুমান করি সেটা ভারতের বাংলাদেশ নীতি সমন্বয়ের কাজে। সে সময়ে চ্যানেল আই টিভিতে জিল্লুর রহমানের টকশো অনুষ্ঠানের শ্লটে। কিন্তু রাজামোহন সেখানে এসেছিলেন একক বক্তা, বলা যায় সেটা ছিল ডায়ালগের বদলে এক মনোলগ অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য, তিনি আমেরিকার এশিয়া নীতিতে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ (বা চীন ঠেকাও) – এর প্রবক্তা। যার বাংলা কথাটা হল, এশিয়ার সবাই আমেরিকার পাশে থেকে চীন কোপাক, চীন ঠেকানোর কাজে লাগুক। আমেরিকার এই স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেক। যেটাতে রাজামোহন যেন একজন ন্যাশনালিস্ট ভারতীয়ের বক্তব্য দিচ্ছেন এমন মনে করানোর চেষ্টা থাকে। যদিও আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজের কাঁধে তুলে নিলে অথবা না নিলে সেটা ভারতের স্বার্থের পক্ষে যাবেই ব্যাপারটা এমন নয়। তবু এতদিন প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সব মিডিয়া এই একই ধারায় প্রপাগাণ্ডা করে গেছে। উইকিপিডিয়া পরিচিতি হিসেবে রাজামোহনের সম্পর্কে লিখা হয়েছে, তাঁর বিদেশনীতি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মোটা দাগে লিবারেল ও বাস্তববাদী, তবে তিনি আমেরিকার মতো গ্লোবাল প্লেয়ারদের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার” পক্ষে কথা বলে থাকেন।

আগেই বলেছে ট্রাম্প আমলে এসে, ভারতের এহেন থিংকট্যাংকদের দিনকাল ইদানীং খুবই খারাপ যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার নীতি ভারতের থিংকট্যাংকারদের তাদের কাজ তৎপরতাসহ সব এলোমেলো করে ডুবিয়ে দিয়েছে। মূল কারণ তারা অবিরত ভারতে আমেরিকার হয়ে জনমত তৈরি ও প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করে ভারতের আমেরিকাতে রপ্তানি ততপরতায় হাহাকার তুলে ফেলেছে।  আমেরিকায় ভর্তুকির ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা বা বাড়তি ট্যারিফ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প এদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ফেরি করার দিন শেষ। এসবের আর মূল্য নেই। অথবা আমেরিকা প্রভাবিত থিংকট্যাংকগুলোর করা ভারতের মিডিয়া-প্রোপাগান্ডা সব মিথ্যা হয়ে যাওয়ার চেয়েও সেগুলো বাস্তবতা হারিয়ে অচল অসার বক্তব্য হয়ে গেছে। আর ওই দিকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মোদির সরকার লজ্জার মাথা খেয়ে যেসব তৎপরতায় নেমেছে সেটাকে যদি চীনকে খুশি করার উদ্যোগ বলা এড়াতেও চাই তো বলতে হবে ‘চীন অখুশি হবে’ এমন সব কাজ পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চোটটা গিয়ে পড়েছে তিব্বতের দালাইলামার ওপরে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ ঘটনা হল, মোদি ও শি জিনপিংয়ের দুই দিনের একান্ত ইনফরমাল সামিট। (বিস্তারিত এখানে)

রাজামোহন গত ১ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তার নিয়মিত কলামে মোদি ও শি জিনপিংয়ের একান্ত ইনফরমাল সামিটকে নিজের লেখার প্রসঙ্গ করেছেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংকারদের করুণ অবস্থা স্বীকার করতে এখনো রাজি হননি। বরং রাজামোহন লিখছেন, গত সপ্তাহে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চীনের য়ুহান (Wuhan) শহরে একান্ত ইনফরমাল সামিট হয়েছে, সেটা ভারতের চীনা নীতিকে রিসেট (reset) বা “ফিরসে শুরু” করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা আসলে বরং চীন, যে এশিয়ার তার ‘প্রতিবেশী নীতি’ বদলিয়েছে। আর দিল্লি তাতে কেবল চিন্তাই করা যায় না এমন পাওয়া সুবিধা পেতে সাড়া দিয়েছে মাত্র। ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, চীনই তার আঞ্চলিক নীতি ‘ফির সে শুরু’ করে সাজিয়েছে কারণ সে ট্রাম্পের উজানে বাওয়া দেখে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনকে এমনটা করতে হয়েছে। [Last week’s informal summit in Wuhan between Prime Minister Narendra Modi and President Xi Jinping was widely billed as India’s ‘reset’ of its China policy. A close look suggests it was Beijing that was really recasting its policy towards its Asian neighbours. Delhi was merely responding to an unexpected opportunity. A closer examination, however, suggests China’s reset of its regional policy was itself a response to the American upheaval under President Donald Trump.]

ইন্টেলকট বা একাদেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ যাদের করতে হয় তাদের বক্তব্যের ধার বা পয়েন্ট যখন এমন হাল্কা তর্কে নামা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝা যাচ্ছে, রাজামোহনের অবস্থা আসলে খুবই মরিয়া দশায়। পরের প্যারায় তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে আরও লিখছেন, “গ্লোবাল ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকা-চীন এই দুইয়ের মধ্যে চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে যে ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়ে গেছিল মাত্র ১৬ মাসে তা একা হাতে ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ করে উল্টে দিতে পেরেছে।’ ট্রাম্প কেবল তার নিজের বিশেষ আজব ঢংয়ে বলে দিতে পেরেছে, ‘না, এত তাড়াতাড়ি সেটা ঘটবে না”। [“In a short span of 16 months, Trump has single-handedly challenged widespread perception that the balance of power between America and China was tilting in favour of the latter. Trump, in his own peculiar way, has said, ‘not so fast’”.

এই লেখা আসলে ডেসপারেট এক ট্রাম্পভক্তের; রাজামোহন সম্পর্কে এ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। যেন এ’এক আমেরিকা প্রেমে মজে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যেন দুই শিশু তুমুল তর্ক করছে যে, “কার বাবা বেশি বড়লোক”। কম করে বললে এমন তর্ক অশোভন, অন্তত একাডেমিক পর্যায়ের লোকদের তর্ক এটা নয়।

এটা আমেরিকা অথবা চায়নাকে ভাল বলে তাদের কারও পক্ষে ওকালতির ইস্যু না। ট্রাম্পের আমেরিকা ভাল না চায়না ভাল – এই স্টাইলে তর্ক  বলাই বাহুল্য খুবই নিম্নমানের। বরং একাডেমিকদের তর্ক হতে পারে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের নীতি ছেড়ে চলে যেতে পরোয়া করছে না কেন?  দুনিয়ায় গত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো আমেরিকার যে গ্লোবাল ভূমিকা ও এক এম্পায়ার (empire) ভূমিকা এবং দুনিয়ার নেতার ভূমিকা – সেসব ঢিলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা আমরা মানলেও ট্রাম্পের আমেরিকা তা যেচে ত্যাগ করতে আর পরোয়া করছে না, কেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে আকার পেয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ – এখন সেই গর্বও ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। কেন? একই সময়ে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপের সাথে আমেরিকার প্রধান সহযোগী হিসাবে সম্পর্ক, সত্তর বছর পরে এসে আমেরিকা অবলীলায় এই প্রথম বেপরোয়াভাবে এই সম্পর্ককে ত্যাগ করছে। ন্যাটোসহ ইউরোপের সাথে মিলে যা কিছু যৌথ প্রতিষ্ঠান এতদিন  ধরে গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকা এখন সব ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। অথচ এগুলোই তো আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের মৌলিক ভূমিকা পালনের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমেরিকাকে সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এগুলোকেই ট্রাম্প স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চাইছে, ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাহলে “চীনের বদলে আমেরিকার হাতেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থাকছে, এত তাড়াতাড়ি তা যাচ্ছে না” – রাজামোহনের এই কথা বলে ট্রাম্পকে বিরাট ত্রাতা বলে তোষামোদীর কারণ কী?  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প নিজেই তার কোনো উপদেষ্টার কোনো কথা রাখছেন না বা অবস্থান কমিটমেন্ট যেখানে যা কিছু বলে আসছেন ট্রাম্প তা রক্ষা করছেন না, মানছেন না। তিনি মূলত পরিচালিত হয়ে চলছেন অসংখ্য লবিস্ট (ব্যবসায়ী) তাকে যখন যেভাবে বলাচ্ছেন বেশির ভাগ সময় তিনি তাদের খপ্পরে। ট্রাম্পের প্রশাসনের এসব অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ট্রাম্পের আমলেই রেকর্ড পরিমাণ কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা বা প্রশাসনিক কর্তার বরখাস্ত হওয়া বা পদত্যাগ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এথেকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়!

আর সবচেয়ে বড় কথা ট্রাম্পের প্রশংসা করে রাজামোহনের দাবি যদি সঠিকও হয় তাতে রাজামোহনের ভারতের কী লাভ এতে? মোদির সরকার প্রশাসন থেকে কী আমরা ইতোমধ্যেই জানি নাই যে, খোদ ট্রাম্প বা আমেরিকার কাছ থেকে বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের আর কিছুই পাওয়া নেই? এটা মোদির সরকার প্রশাসন প্রকাশ করেননি! ভারত আমেরিকায় তার রফতানি বাজারটাই হারিয়েছে, এটাই চরম বাস্তবতা। তাহলে রাজামোহন কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? কার খুশিতে খুশি হচ্ছেন? কোন আমেরিকা? এই আমেরিকা কী কেবল শুধু ভারতের নয়, দুনিয়ার কারো জন্যই কেউ নয়, তাই নয়? তাহলে রাজামোহন কার স্বার্থের প্রতিনিধি? বটম অব দা হার্ড ফ্যাক্টস হল, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থের উপরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে টপ প্রায়রিটিতে এনেছেন। আর আগের আমেরিকার “চীন ঠেকানো” – এটাকে রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে দেখে ও প্রাধান্যে রাখাতে ভারতের পণ্য তা প্রতিযোগিতায় না পারলেও ভর্তুকিতে রপ্তানিযোগ্য করে তা আমেরিকায় রপ্তানি করতে দিয়েছিল। এই সত্যকে আড়াল করে ট্রাম্পকে রাজামোহন হিরো বানায় কী করে, এটা সত্যিই বিস্ময়! ্ট্রাম্প কার চোখে হিরো? কার জন্য হিরো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরা পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল ও থেকেছিল। আর আমেরিকা ছিল তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাদাতা। ছিল বলছি কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণ  নীতির কারণে এর দিন শেষ। অথচ এসব ইঙ্গিত যেমন, চলতি দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মোচড় মনে হচ্ছে রাজামোহন দেখেও না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে মূল ইঙ্গিতটা হল, পুর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করছে আমেরিকাকে সবসময় নিজ ভাবনার সাথে মিলিয়ে এক গণ্ডিতে সাথে রেখে চিন্তাভাবনা করার দিন ফুরিয়েছে। ভারতের এ্ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (O.P. Jindal Global University, in Sonipat, India) দুই প্রফেসর জাপানের নতুন ভাবনার পক্ষে বিভিন্ন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। যেমন দেখুন, Trump Is Driving Xi Into Modi’s Arms

সেসব রচনার সার কথা হল, সাম্প্রতিককালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের পর থেকে বহু কিছু বদলে গেছে। জাপান এমনকি চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার সুযোগ কী তার জন্য আছে তা এক্সপ্লোর করতে শুরু করেছে। এমন একটা আর্টিকেলে লেখা হয়েছে, ভারতের জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার। [A lesson for India in Japan’s approach to China’s belt and road initiative] অপরদিকে দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ সামিট সম্প্রতি আমরা দেখেছি – যদিও এমন সামিট এর আগেও মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবার নেতাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বিশেষ ধরনের আলাদা। যেন দুই কোরিয়া একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তারা এবার খুজে পেয়ে গেছে। প্রথম যেদিনে সীমান্তে দুই প্রেসিডেন্টের পরস্পর দেখা হয়, তখন থেকে। বিশেষ করে উত্তরের প্রেসিডেন্টের আন্তরিকতা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছেও কাম্য অবশ্যই, তবে অদৃশ্যপূর্ব ঠেকেছে। এর পেছনের মূল কথাটা কী? সেটি হল, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে, পরস্পরের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি। তাই এটা এখনই বলে দেয়া যায় আগামী ইতিহাসে যখন খুঁজে দেখা হবে যে, কবে থেকে গ্লোবাল ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আমেরিকা থেকে চীনের হাতে চলে এসেছিল? এক বাক্যে সেই ইতিহাস বলবে চীনের মধ্যস্থতায় দুই কোরিয়ার পরস্পরকে বিশ্বাসের সাথে পরস্পরের কাছে আসার শুরু থেকে। আর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বন্ধু জাপান যখন আমেরিকা ছেড়ে চীনের ভেতরে বন্ধুত্ব খুঁজতে রওনা হয়েছিল আর চীন এর উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিল, তখন থেকে।

আসলে এসবের মূল কথাটা হল, যে আমেরিকা কেবল নিজের জন্য আমেরিকা – এটা কোন এম্পায়ার আমেরিকা নয়। বরং নিজেই নিজেকে দুনিয়ার নেতা – এম্পায়ার – এই অবস্থান থেকে নিজেই নিজেকে খারিজ করে দেয়া। এভাবে কোনো রাষ্ট্র যখন চরম রক্ষণশীল অবস্থান নেয় তখন কেউই আর সেই আমেরিকার কেউ থাকে না। এ যুগে এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান বলে নিজের কোনো অবস্থানের বাস্তবতা সম্ভব বলে মনে করা হলে এর সোজা অর্থ হল – সেই রাষ্ট্র আর তখন ইউরোপ, জাপান বা কোরিয়ার জন্য কেউই নয় হয়ে যায়। কেবল তখনও ট্রাম্পের আমেরিকার একমাত্র ভক্ত-বন্ধু থাকে সি রাজামোহন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের থিংকট্যাংক এখনো ট্রাম্পভক্ত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

গৌতম দাস
০৫ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ry

 

 

চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ব্যাপারটাকে সম্ভবত এভাবে বলা যায় যে, চীন ও ভারতের সম্পর্ক যেটা এত দিন ভাসতে ভাসতে ক্রমেই বড় দূরত্বে এবং বিচ্ছিন্ন ও সঙ্ঘাতপূর্ণ পথ ধরছিল; তা হঠাৎ করেই এবার উল্টো এক পথ তালাশ করতে নেমেছে। সেটা হল, পরস্পর কাছে আসার উত্তম পথ কী হতে পারে তা দ্রুত খুঁজে বের করা। ব্যাপারটা যেন উভয়ে মিলে স্থায়ী ও শক্ত কোনো ভিতের ঠিকানা খুঁজে ফেরা। কারণ, তারা তাদের সম্পর্ককে এবার স্থায়ী ভিতের উপর ও ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড় করাতে অধীর হয়ে পড়েছে। গত মাসে ৩ এপ্রিল “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা- সেই বিউগল বেজে গেছে” শিরোনামে আমার লেখায় এই পরিবর্তন শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যে অবস্থায় ছিল, এর সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে; ভারতের ভাষায় এটা ‘রিসেট’ (reset) হয়ে গেছে। এটা হতে অবশ্য ১৬ বছর লাগল।

কিন্তু দূরত্ব ও সঙ্ঘাতের পথ হঠাৎ ত্যাগ করে চীন ও ভারতের সম্পর্ক উল্টো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ কেন, এর পেছনের কারণ কী? তা সবাই তা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলেও সে কারণটি হল – মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করা। আমেরিকার সেই মূল বাণিজ্য লড়াই চীনের সাথে হলেও, তা ভারতের বিরুদ্ধেও পরিচালিত। এত দিন আমেরিকার কাছ থেকে এক ‘বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা’ বা ‘চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার দেয়া ঘুষ’ প্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে ভারত নিজের সরকারি ভর্তুকি দেয়া পণ্য আমেরিকায় রফতানি করে চলেছিল। এ ‘বিশেষ’ সুযোগটাই ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের শুরুতে সবার আগে বাদ করে দিয়েছে। আর ঠিক ততোধিক বেগে ভারতের চীনমুখী রাস্তা খুঁজে বের করতে ঝাঁপিয়ে পড়া এখান থেকেই।

সম্ভাব্য এই ইউটার্ন বা উল্টো পথ যে ধরতে হতে পারে, তা ভারতের অজানা ছিল না, বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি; যেটা ট্রাম্প ২০১৭ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার সময় থেকেই বলতে শুরু করেছিলেন। কথাটির ব্যবহারিক অর্থ যদিও অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। গত আশির দশক থেকে, পণ্য বিনিময় (সেই সাথে পুঁজিও) দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে এক গ্লোবাল অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রবক্তা আমেরিকা নিজেই এখন রক্ষণশীল, সবার আগে নিজ পণ্যবাজার সংরক্ষণ করতে হবে – এই উল্টো লাইনে চলে যাওয়া। এটাই ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতির সারকথা।  ফলে ‘ফরেন পলিসি’ নামে আমেরিকার নামকরা এক ম্যাগাজিনের মতামত কলামে লেখা হয়েছে, ‘চীন-ভারতের কাছাকাছি আসতে চাইবার পেছনে একটা থার্ড পার্টি বা তৃতীয় পক্ষ আছে; যার নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। [But there’s an unacknowledged third party — U.S. President Donald Trump.] অর্থাৎ ট্রাম্পের নীতি এদের পরস্পরের কাছে আসতে বাধ্য করেছে।

তবে সম্ভাব্য এই পরিস্থিতির কিছু গ্রাউন্ডওয়ার্ক করে রেখেছিলেন এখনকার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে। এ বছর ৩০ জানুয়ারি তিনি নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। এর মাত্র তিন মাস আগে অক্টোবর ২০১৭ মাস পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রায় দুই বছর ধরে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত। মোদী ও তাঁর ‘খামাখা শক্ত লাইন’ পথের মুখ্য সঙ্গী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের অনুসৃত নীতির কারণে ভারত যখন ভুটানের ডোকলাম সঙ্কটে নাকানি-চুবানি খেয়ে আটকে যায়; তখন যারা যারা মোদিকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন; তাদের মূল লোক ধরা হয় সে সময়ের ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্করকে। আর ভারতের পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের মতে, [দেখুনঃ Who is Vijay Keshav Gokhale] জয়শঙ্করের সাথে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এই গোখলেও বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই সঙ্কটকালে সফট পাওয়ারের ব্যবহার করে সব কিছুকে স্বাভাবিক করতে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

জানুয়ারির শেষে পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে গোখলে চীন সফরে যান, যেখান থেকে বলা হয় চীন-ভারতের সম্পর্কের নতুন ধারার শুরু। আর এতে বিগত দুই মাসেই চীনের বাণিজ্যমন্ত্রীর ভারত সফর এবং ভারতের দিক থেকে তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর শেষ হয়েছে। এর শেষেই নেয়া হয়েছিল মোদির চীন সফরসূচি, ২৭-২৮ এপ্রিল। এই সফরের ফরম্যাট দেখলে আর কোথায় কোন পটভূমিতে মোদির এই সফর হয়েছে, তা বিচার করলে অনেক বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হবে।

মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে – মোদির এই ‘বিশেষ’ চীন সফর যেমন ভারতের দিক থেকে আশা করা হয়েছিল, সেভাবে শেষ হয়েছে। মে মাসের শুরুতে আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, মোদীর সফরে কী চীন-ভারত সম্পর্ক নতুন অগ্রগতি ও আকার পাবে? আমার জবাব ছিল, এটা আর পাবে কি না, সে পর্যায়ে নেই। বরং নতুন আকারে একটা বিরাট ‘ডিল’ হতে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। এখন কী কী বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়ে আর দেনা-পাওনার বিষয় সেটেল করে তা হবে, সেটাই নির্ধারণের কথাবার্তা চলছে। মোদীর চীন সফরের আগের সপ্তাহে ২২ এপ্রিল ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ চীনে গিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে মিটিংয়ে মোদীর সফরের বাকি খুঁটিনাটি সম্পন্ন করেন।

সেখান থেকে তারা দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য টেনে মোদী-শি’র সামিটকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু মোদী তার চীন সফরের শুরুতে একটা বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে মোদী বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি ও আমি এক গুচ্ছ দ্বিপক্ষীয় ও গ্লোবাল গুরুত্বের ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় করব। আমরা আমাদের প্রত্যেকের জাতীয় উন্নয়ন, বিশেষ করে চলতি ও আগামী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলব”। [“President Xi and I will exchange views on a range of issues of bilateral and global importance. We will discuss our respective visions and priorities for national development, particularly in the context of current and future international situation,” PM Modi said in a statement.]

এই দুই বাক্য অনেক ডিপ্লোমেটিক ভঙ্গি ও ভাষায় ভরপুর, সন্দেহ নেই। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘গ্লোবাল গুরুত্বের’ বিষয় তাদের আলোচনার ইস্যু – এই শব্দ দুটো। এ ছাড়া “চলতি ও আগামী বিশ্বপরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতের প্রসঙ্গ” টেনে কথা বলাও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব কথার অর্থ হল – মোদি বলতে চাইছেন,  ট্রাম্পের অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন ও নিজ বাজারে রক্ষণশীল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি চলতি গ্লোবালাইজড (দুনিয়াব্যাপী এক ব্যাপক পুঁজি ও পণ্যবিনিময় ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ায় সবার তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া) বিশ্ব- অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়াতে – এই অর্থে এই দুই রাষ্ট্রকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে ও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করেছে। কথা অবশ্যই সত্য, আর চীন ও ভারতের জনসংখ্যা মেলালে তা দুনিয়ার ৪০ শতাংশ, এ কথা স্মরণ করলে তা আরো ভালো বোঝা যায়। অনেক এক্সপার্ট মনে করেন, চীন-ভারতের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে যদি মোড় নেয়, তবে ৩০ বছর ধরে তা আগামী দুনিয়াকে আকার দেয়ার সামর্থ্য রাখে। [“The relationship between New Delhi and Beijing has the potential to shape the world for the next 30 years,” says political commentator Einar Tangen.]

আসলে এক কথায় বললে, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও (SCO) এর বৈঠকে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি চীন সফর করছেন, এ কথা কেবল এক উসিলা। প্রথমত, এটা ছিল এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক।  এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রধানদের কোন বৈঠক নয়। আর এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, আগামী ৯-১০ জুন চীনে এসসিও’র মূল বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, তারই প্রস্তুতি বৈঠক করা। তবে এবারের এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের এক বাড়তি অনুষঙ্গ ছিল। তা হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের আগে এসসিও সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের ২৩-২৪ এপ্রিল এক বৈঠকে বসা। আর এরপরেই এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের অফিসিয়াল সুচি ছিল ২৫-২৬ এপ্রিল। তাই, ভারতের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এর দিন কয়েক আগে ২২ এপ্রিল বেইজিংয়ে গিয়েই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঘোষণা করেন যে, চীনের য়ুহান শহরে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে ‘ঘরোয়া সামিট’ হবে। বিবিসি-বাংলার ভাষায় এই ঘোষণা ‘কূটনৈতিক মহলে ছিল রীতিমতো অভাবিত’। তাই ক্রিটিক্যালি দেখলে এসসিও’র কোনো বৈঠকের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রত্যক্ষ কোন লেনদেন ছিলই না। এমনকি মোদী এবং হোস্ট চীনের প্রেসিডেন্ট ছাড়া আর কোনো এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ঐ সময়কালে চীন সফরেই আসেন নাই।

দ্বিতীয়ত, য়ুহান (Wuhan) বাইরের মিডিয়ায় খুবই অপরিচিত এক শহর; যদিও চীনের ভেতরে এর আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ, য়ুহান হল,  মূলত মাও সে তুংয়ের ছুটি কাটানোর প্রিয় শহর। ফলে এটা এখন মাওয়ের স্মৃতিবাহী এক মিউজিয়ামের শহর। খরস্রোতা ইয়াংসি নদীর তীরে এই শহর, যে নদীতে অবসরে সাঁতার কাটতে ভালোবাসতেন মাও। আর সেখানে এক বিখ্যাত ‘ইস্ট লেক’ আছে, যার তীরে এক ভিলায় মোদি-শি’র থাকা ও বৈঠকের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই শীর্ষ সামিটের নাম দেখেছি আমরা “ঘরোয়া সামিট” বলে। ‘ঘরোয়া’ শব্দটি বিবিসি বাংলার করা বাংলা। মূল শব্দটি ইংরেজিতে ছিল ‘ইনফরমাল’। অর্থাৎ এখানে তারা যে যাই দু’জনে দু’জনকে বলবে তা আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান বলে বিবেচনা করা হবে না। ফলে এক ধরনের দায়শূন্যতার সুবিধা থাকবে এবং মনখুলে কথা বলা যাবে। শুধু তাই নয়, তারা দু’জন অনুবাদক ছাড়া কোনো সরকারি বা মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্ত্রী বা সহযোগীকে সাথে রাখার কথা ছিল না, নেনও নাই তাই সব অর্থেই এটা ‘ইনফরমাল’। কিন্তু ‘ইনফরমাল’ রাখা হল কেন?
কারণ, ইনফরমাল বলে ঘোষণা করে রাখলে আসল কথা সরাসরি তারা বলে নিতে পারেন – পারস্পরিক স্বার্থ, অসুবিধা, সুবিধা ইত্যাদি সব সেগুলো হয়ত ফরমাল সভায় কেউ কখনও বলবেন না, বলেন না। আর এখানকার কথা, মানে এর কোনো রেফারেন্স পরবর্তি কোনো আনুষ্ঠানিক সভায় উঠবেই না। তাহলে এখন আসি, সেখানে মোদি আসলে কী খুঁজতে গিয়েছেন?

মোদি বলতে চাইছেন, এখান থেকে তারা ‘চীন-ভারত সম্পর্কের এক পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন সম্ভাবনা বের করতে চাইছেন, যাতে তাদের নতুন স্ট্র্যাটেজিক নীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থ কী হতে পারে’ [Modi said he and Chinese President Xi Jinping will review the developments in Sino-Indian relations from a strategic and long-term perspective during a two-day informal summit at Wuhan in China from tomorrow.] সে সম্পর্কে উভয়েই পরিষ্কার হতে পারেন। এটা বিজনেস টুডে থেকে নেয়া।  এসব কারণে ভারতের ‘বিজনেস টুডে’ পত্রিকা এটাকে ‘হার্ট-টু-হার্ট সামিট’ নামে ডাকছে। এই বিজনেস টুডে ছাড়াম আমাদের প্রথম আলো বা বিবিসি বাংলা এবং ভারতের যতগুলো মিডিয়া এই সফরের রিপোর্ট কাভার করেছে, সবাই আসলে আন্দাজে হাতড়েছে যে, এই সামিটে আসলে কী হচ্ছে, কী হবে, কেন ইত্যাদি। এসব প্রসঙ্গে সবাই একেকটা মনগড়া ব্যাখ্যার কথা লিখেছেন। এমনকি ভারতের কথিত থিংকট্যাংকগুলো মিডিয়াকে আরও বিভ্রান্ত করেছে। যেমন, বিবিসি বাংলা কথিত এক চীন-বিশেষজ্ঞ অলকা আচারিয়ার বরাতে লিখেছে,  আচারিয়া বলেছেন, ” দুই দেশের সম্পর্ককে এখন যে আবার ‘রিসেট’ করার কথা বলা হচ্ছে, ডোকলাম সঙ্কটের তলানিই কিন্তু তাকে গতি দিয়েছে। আমার মতে, ডোকলাম দুই দেশের জন্যই ছিল একটা ওয়েকআপ কল। সম্পর্কটি যাতে আরো খারাপের দিকে না গড়ায়, দুই নেতাই সেই সুযোগ নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে”। এমন আন্দাজি কথা বলার মূল কারণ হল, ভারতের থিংকট্যাংক একাডেমিকরা আসলে একেকজন “আমেরিকান স্বার্থের চোখে”, মানে তাঁরা আমেরিকান স্বার্থের ‘চায়না কন্টেনমেন্টের ভেতরেই’ সব কিছুকে দেখতে অভ্যস্ত। তাই সত্যি কথাটা হল, ভারতের এসব ‘আমেরিকান চোখগুলো’রই সবার আগে ‘রিসেট’ দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একাডেমিক জগতের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল – এরা মারাত্মকভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল।

অপর দিকে মিডিয়া বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভবত আরো একটা কারণ আছে। তা রয়টারের এক ডিটেল রিপোর্ট। সেটা হলো, এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এক প্রস্তাব নেয়া হয়েছিল। তাতে ভারত ছাড়া এসসিও’র সব সদস্য রাষ্ট্রই চীনের OBOR প্রকল্পে নিজেদের অংশগ্রহণ ও সমর্থনের কথা জানিয়েছে। একারণে মোদি-শি’র বৈঠকের আগে রয়টারের ঐ রিপোর্টের শিরোনাম হলও, ‘OBOR প্রকল্পে চীন ভারতের সমর্থন জোগাড়ে ব্যর্থ হয়েছে।’ [China fails to get Indian support for Belt and Road ahead of summit] কিন্তু সেটাই তো হওয়ার কথা। SCO এর ঐ বৈঠক তো ভারতকে মানানোর কোন বৈঠক ছিল না। বরং SCO এর যেকোন বৈঠকের বাইরে মোদী-শি’র ওই শীর্ষ বৈঠকে, ভারতের সাথে চীনের সামগ্রিক সম্পর্কের বিষয়ই ছিল মোদি-শি’র ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। তাই কেউ যদি SCO এর কোন বৈঠকের ভিতর চীনের ‘আকাঙ্ক্ষা’ আগে থেকেই ছিল, এ কথা সামনে ঝুলিয়ে দেন  এর তো কোন মানে হয় না। একারনেই, এমন রিপোর্ট অর্থপূর্ণ। চীনের (এবং ভারতেরও) সব আকাঙ্খার মূল জায়গা এসসিও’র কোনো সভা নয়, বরং মোদি-শি’র শীর্ষ ঘরোয়া বৈঠক। তাই রয়টারের রিপোর্ট মোদি-শি’র শীর্ষ বৈঠককে প্রধান গুরুত্ব না দেয়ায় এই বিভ্রান্তি।

এখন তাহলে, শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে কী করা হবে, মানে, তা প্রকাশিত হবে কোথায়? কীভাবে? সেটাও নির্ধারিত। আগেই বলেছি, এসসিও’র সভা আসলে মোদি-শি’র শীর্ষ ইনফরমাল বৈঠক ঘটানোর ক্ষেত্রে এক উসিলা মাত্র। তাই সেই বৈঠকের ফলাফল প্রকাশের নির্ধারিত স্থান হল, পরবর্তিতে আগামি জুন মাসে আবার এসসিও’র শীর্ষ বৈঠক আছে চীনেই; সেই সময় তবে আলাদা করে সভা করে তা তুলে ধরা বা মূল্যায়নের সমাপ্তি টানা হবে। সম্ভবত এসসিও’র সম্মেলন শুরুর আগে বা পরের অবশ্যই কোনো আলাদা সময়ে মোদী-শি’র আবার কোন শীর্ষ বৈঠক থেকে তা প্রকাশ করা হবে। তত দিন আরো দৌড়ঝাঁপ আমাদের দেখতে হবে।

সবশেষে, ভারতের সম্পর্কের প্রভাব ও ভূমিকা বাংলাদেশে কী হতে পারে? প্রথমত, সহসাই এর কোনো প্রভাব আমরা কোথাও পড়তে দেখব না। এমনকি মোদী-শি’র শীর্ষ বৈঠকের ফলাফলে চীন-ভারত সবচেয়ে কাছাকাছি চলে এলেও এখন সহসাই কোন প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ চীনের প্রভাব বলয়ে যেন না যায়, সেটা তো বটেই, এমনকি বাংলাদেশে যেন চীনা বিনিয়োগ না ঢুকে – ভারতের এখনকার এই অবস্থানই বজায় থাকবে। তবে হয়ত অনেক দীর্ঘ সময় পরে কখনো তা বদলাতে পারে। এ ছাড়া, বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর তাৎক্ষণিক কারণ নেই। এছাড়াও, গত সপ্তাহে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণচুক্তি (প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটা মনে রাখা যেতে পারে।

আসলে এখনও মুখ্য বিষয় হল – ভারত চীনের কাছ থেকে কী পাবে, মূলত এই প্রসঙ্গকে ঘিরে। এসব দিকের সুরাহা হলে এরপরে এশিয়ায় অন্য দেশে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গে যেমন বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে ভারতের আপত্তি বন্ধ হবে কি না, নাকি একই রকম থাকবে; হলে কিভাবে, কী শর্তে, সেসব প্রসঙ্গ উঠতে পারে। এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর কোন কারণ দেখা যাচ্ছে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

গৌতম দাস

০৩ এপ্রিল ২০১৮,  মঙ্গলবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2r9

কথা সত্য। চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যা অবস্থায় ছিল এর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে, ভারতের ভাষায় এটা রি-সেট (“reset”) হয়ে গেছে। মানে ‘ফির সে শুরু’ হয়ে গেছে। এটা হতে ১৬ বছর লাগল। তাই আজ কথা শেষের দিক থেকে শুরু করে বলব। প্রায় ষোলো বছর পর ভারত মেনে নিল যে এই অঞ্চলে চীনের ক্ষমতা ও প্রভাব ঠেকানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। সে হার স্বীকার করে নিচ্ছে। তাই সে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছে না, বরং মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে। ভারত মালদ্বীপ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে চীন যেন ভারতের দিকটাও একটু খেয়াল রাখে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ভারত স্বীকার করে নিল যে, আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’ অথবা চীন ঠেকানো বৈদেশিক নীতির যে ঠিকা আমেরিকার কাছ থেকে ভারত এত দিন নিয়ে খেদমত দিয়ে গেছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত এখন তা পরিত্যাগ করছে, ক্ষেমা দিচ্ছে। ফলে চীন যেন ভারতকে এর প্রতিদান দেয় (“it is clear that Delhi expects Beijing to reciprocate”)।

‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।

“India cannot claim sole proprietorship of the region. We can’t stop what the Chinese are doing, whether in the Maldives or in Nepal, but we can tell them about our sensitivities, our lines of legitimacy. If they cross it, the violation of this strategic trust will be upon Beijing,” the official said.

এখানে শেষের রঙিন বাক্যে রঙ দিয়েছি আমি। এই বক্তব্যের অর্থ ও ইঙ্গিতে খুবই করুণ ও অসহায়। ভারত যেন বলতে চাইছে, “এই দুনিয়ার লড়াইয়ে শক্তি আর মুরোদে আমরা হেরে গেছি, তবে পরকালে যেন বিচার হয় তেমন একটা বিচার দিছি”।’ এ ছাড়া দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ ভারতের কোটেড প্যারাগ্রাফের বক্তব্য হল এ রকমঃ – “যেদিন ভারত দেখেছে সে আর দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করে রাখতে ও চীনের মতো শক্তিকে  এখানে ক্ষমতার বিস্তার দেখাতে আসা বন্ধ করতে পারছে না সেদিন সে বুঝে গেছে এসব কিছু নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে চলে গেছে”।

“The days when India believed that South Asia was its primary sphere of influence and that it could prevent other powers, such as China, from expanding its own clout are long gone,” a senior government official told The Indian Express. 

খুবই পরিস্কার ভাষায় বলা অক্ষম অসহায়ত্বের বক্তব্য। যদিও এতদিন এসব প্রসঙ্গে ভারত চাপাবাজি করে বলে রেড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাবাধীন এলাকা, এখানে চীন আসতে পারে না।

এ ছাড়া মালদ্বীপ নিয়ে খুবই পরিস্কার ভাষায় ভারতের আর এক তৃতীয় বক্তব্য আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্টার দাবি করছেন, ওই সিনিয়র অফিসার তাকে বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের গত ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরের সময় তিনি চীনকে জানিয়ে দিয়েছেন, “ভারত মালদ্বীপ থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে মালদ্বীপে ভারতের  হস্তক্ষেপের কোনো সম্ভাবনা নেই”। আর এই বাক্যটাকেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে। On the Maldives, for example, the unusual overture to China was made by none other than Foreign Secretary Vijay Gokhale during his trip to Beijing in February,

অনুমান করা যায়, এখানে ভারতীয় এই স্বীকারোক্তির অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে এভাবে যে, সবার আগে এটা ‘সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল’-এভাবে পরিচয় লুকানো এক বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরটা ছাপবে। এরপর বাকি প্রায় সব লিডিং দৈনিকগুলো সবাই এবার তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ছাপবে। তাই-ই হয়েছে। তবে এভাবে এখানে ছাপা হওয়ার মধ্যে লক্ষণীয় দুটো দিক হল, কোনো মিডিয়াই কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট বা এর রেফারেন্সকে অস্বীকার অথবা অবিশ্বাস করেনি। এমনকি তারা এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বা কোন মুখপা্ত্রকে জিজ্ঞাসা করতে যায়নি। এটাই খুবই  ইন্টারেস্টিং। এর অর্থ  হল বাকি সব পত্রিকা বরং নিজেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে এই খবর ছেপে বলতে চাইছে যে, তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে এই খবর সত্য, তারাও ব্যাপারটা জানে। এ ছাড়া অন্যদিকে ভারত সরকারও মিডিয়াগুলোতে এই রিপোর্ট ছাপা হয়ে গেছে অথচ এই খবরকে অস্বীকার করে কোনো বিবৃতিও দেয়নি। এর অর্থ তারাও পরোক্ষে স্বীকার করছে যে হা এটাই তাদের বক্তব্য।

এদিকে আরেক ইংরেজি দৈনিক – ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, সবার মতো সেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতের রিপোর্ট  ছেপেছিল । তবে সেটা ছাড়াও রয়টার্সের বরাতে সে পরের দিন আরেকটা রিপোর্ট করেছে। শিরোনাম ‘Dalai Lama faces cold shoulder as India looks to improve China ties”। এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে দালাইলামাকে ‘শীতল কাঁধ দেখানোর’ কারণ ভারত বুঝিয়ে বলাতে তিনি ব্যাপারটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, মনে কোনো ক্ষোভ বা আকাঙ্খা নিয়ে দেখেননি। আসলে ঘটনা হল, বেচারা দালাইলামা তার সব কর্মসূচিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বাতিল করে দিয়েছে। আসলে এটা ছিল দালাইলামাদের চীনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের ৬০তম বার্ষিকী পালনের দিন। কিন্তু দিল্লীতে যত অনুষ্ঠান নেয়া হয়েছিল মোদী সব কিছুর পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এমনকি ভারত তাদের থাকতে দিয়েছে এজন্য দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য  সরকারকে “ধন্যবাদ জানাবার কর্মসূচিও” বাতিল করে তা তিব্বতের ধর্মশালায় সরিয়ে নিতে দালাইলামাকে বাধ্য করা হয়েছে। আর সাথে মোদীর সরকারের সার্কুলার জারি করা হয়েছে যে কোনো মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী যেন এদের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে। কারণ চীন মনে করে, দালাইলামা চীনের জন্য খুবই বিপজ্জনক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী। এককথায় বললে চীনকে খুশি করতে, রাখতে ভারত চরমতম মরিয়া অবস্থান নিয়েছে। গত ছাপান্ন বছরে এমন “চীন তোষামোদী” ভারত কেউ আগে দেখেনি। দালাইলামা সম্পর্কে  চীনের মূল্যায়ন ও মনোভাবকে পবিত্র আমানত জ্ঞান ও আমল করে আগলে রাখতে ভারত এখন ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই রিপোর্টের সাথেও নাম প্রকাশ না করে আরও এক সোর্সের বরাতে টাইমস অব ইন্ডিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাপিয়েছে। প্রথমত সেখানে বলা হয়েছে, নাম গোপন রাখা এই সোর্স তিনি নাকি ভারতের চীননীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন উচু ব্যক্তি। তিনি জানাচ্ছেন, “চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে নিয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের আইডিয়া হল, ২০১৭ সাল পর্যন্ত যা যা ঘটে গেছে তা ভুলে গিয়ে পেছনে ফেলে রাখতে চাই আমরা”। “We are moving forward with this relationship, the idea is to put the events of 2017 behind us,” a government source involved in China policy said. অর্থাৎ আর পরিস্কার নিশ্চিত করা বক্তব্য আমরা এখানে পাচ্ছি।

তবে রিপোর্টে প্রত্যক্ষ সরকারি স্বীকৃতি এখনো না দিলেও ভারতের অপর পক্ষ চীন, মানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের রেগুলার ব্রিফিং থেকেও এ বিষয়ে অনেক কিছুর স্বীকৃতি মিলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মুখপাত্রকে (Foreign Ministry Spokesman Lu Kang) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁঁর সেই বয়ানে। “চীন কি সাম্প্রতিক ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের (দালাই লামার সাথে দূরত্ব তৈরিসহ) প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়?” – এই ছিল সেই প্রশ্ন, মুখপাত্র এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেলেন। মুখপাত্র  দালাই লামা শব্দটা এড়িয়ে উচ্চারণ না করে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে জবাবে দেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, তিনি বলেছেন, “সাম্প্রতিক কালে তাদের উভয় পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, চীন-ভারত সম্পর্ক বাধাহীন গতিতে (‘সাউন্ড মোমেন্টাম’ বা ‘sound momentum’) বিকশিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি”।

আসলে আগামী জুন মাস পর্যন্ত চীন-ভারত তাদের বিভিন্ন মন্ত্রিপর্যায়ে (গড়ে সম্ভবত প্রতি মাসে প্রায় দু’টি করে) মিটিং আছে। আর সর্বশেষ জুন মাসে সাংহাই করপোরেশন সংস্থার (SCO, http://eng.sectsco.org/about_sco/) চীনে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সভার সাইড লাইনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাক্ষাৎ হবে।  আর আগামী মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চীন সফর দিয়ে বৈঠকগুলো শুরু হবে। এরপর আছে, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, বাণিজ্য ইত্যাদি।

আগামী জুন মাস পর্যন্ত তৎপরতায় ভারতের লক্ষ্য কী এ দিকে তাকিয়ে বললে এর এক কথায় জবাব হল, মুখ্যত চীনে ভারতের রফতানির বাজার লাভ করতে চায়। ভারত এত দিন চীনের সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে রেখেছিল, আমেরিকার চীন ঠেকানোর নীতি নিজের কাঁধে নিয়েছিল বলে। আর তা নিজের কাঁধে নিয়েছিল বিনিময়ে আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাজার পেয়েছিল বলে। কথাটা ভেঙ্গে সার কথাটা বললে, ভারতীয় পণ্য মূলত রফতানিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে একে আমেরিকার পণ্যের চেয়ে সস্তা ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে নেয়া ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আগের দুই প্রেসিডেন্টের দুই দুই করে টার্মে (মোট ষোলো বছরে) সবসময় আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে (চায়না কনটেইনমেন্ট) প্রাধান্য দিয়ে বিদেশনীতি সাজানো ছিল। তাই তখন ভারতকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা করে ভারতের ভর্তুকির রফতানিকেও অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল যে ভারতের গড় মাথাপিছু আয় কেবল এক হাজার ডলার না হওয়া পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধা বজায় থাকবে। কিন্তু গত ২০১৫ সালে এই শর্ত পূরণ হয়ে গেলেও রফতানি সুবিধা ভারত পেয়ে চলছিল। মোটা দাগে বললে, ট্রাম্পের সাথে আগের দুই আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ভারত-বিষয়ক নীতির ভিন্নতা কী – এভাবে কথাটা তুললে তার জবাব হবে – ট্রাম্প আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে আর কোনো প্রাধান্য না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি উল্টো ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার ওপরে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে’ এই নীতিতে চলতে চাইছেন (যদিও কতটা পারবেন পারছেন সেটা অন্য কথা)। ঠিক এ কারণেই ভারতের “ট্রাম্প রিডিং” হল, ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের আর বাণিজ্য সুবিধা কিছুই পাওয়ার নেই। তাই ভারতের উল্টো দ্রুত চীনের দিকে ও কাছে যেতে পথ বদল ঘটেছে। আর বাণিজ্য সুবিধা এবার চীনের কাছ থেকে পাওয়ার আশায়, ভারত চীনের মন জোগাতে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেয়ার নীতি নিয়ে আগাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি  ৫০ বিলিয়ন ডলারের, (এখন চীনের ভারতে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলার, ভারতের চীনে ১০ বিলিয়ন)। ভারতের লক্ষ্য চীন থেকে কমপক্ষে ৩০ বিলিয়নের রফতানি বাজার লাভ করা। মূলত কৃষিজাত পণ্য রফতানি ভারতের লক্ষ্য।

আমার লেখায় সবসময় বলে আসছি, চলতি আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়া ক্রমেই চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে বদলে যাওয়ার অভিমুখী হয়ে আগাচ্ছে। এই বিচারে চীন হল ‘রাইজিং অর্থনীতি’ এই নতুন অভিমুখের নেতা, বিপরীতে আমেরিকার অর্থনীতি পড়তি দশার। আর এই পরিস্থিতিতে ভারতের ন্যাচারাল অবস্থান ও অভিমুখ হল – চীনের সাথে ও পক্ষে, আমেরিকার বিপক্ষে। আমেরিকা হল অতীত যেখানে চীন হল আগামি – এই সুত্রের মধ্যে ভারতের ভবিষ্যত হল চীনের সাথে মিলে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক অর্ডার শৃঙ্খলা তৈরি।  কিন্তু এতদিন সে কাজ না করে ভারত রিভার্স খেলে বাড়তি নগদ সুবিধা যা পায় তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল। যেন কোন বালক তার নির্ধারিত খেলাধুলার বাল্য বয়েস এক্সটেন্ডেড করে নিয়ে হাসিখেলা আর মজা করে কাটাচ্ছিল। সেটারই এবার পরিসমাপ্তি ঘটল, এভাবে বলা যায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন সিস্টেম নতুন ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে ট্রাম্পের হাতে ও উদ্যোগে ভারত-আমেরিকার আর একসাথে কাজ করার দিন সম্ভবত এখান থেকে পরিসমাপ্তি লাভ করবে। বাস্তব শর্তগুলো (যেমন ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা) ট্রাম্পের হাতে চির নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার পথ নেবে। ওদিকে ভারতের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা যে ভারতের আমেরিকায় হারানো রফতানি টার্গেট বা বাজার ঘাটতি যা হয়েছে তা চীন পূরণ করে দিক, চীনে রফতানির বাজার দিক। মূলত এজন্যই ভারতের চীনের সামনে মরিয়া ও হাটুগাড়া অবস্থায় নিজেকে উপস্থাপন।   চীনও খুব সম্ভবত কিছু বাজার দেবে, বিশেষত ভারতকে আমেরিকা থেকে আলাদা করার তাগিদ চীনেরও আছে। আর ভারত এতই মরিয়া যে, চীনের সামনে ‘নীলডাউন’ অবস্থা। তবে আপাতত সফররত চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী কোনো চুক্তি ছাড়া গতকাল ভারত সফর শেষ করে চীনে ফিরে গেছেন। তবে ভারতকে রফতানি বাজার দেয়ার ‘প্রমিজ’ করেছেন, ভারতের মিডিয়া বলছে। চীনের প্রমিজ বা ওয়াদা সত্যিকারের ওয়াদা, ভারত আস্থা রাখতে পারে, রাখবে। কিন্তু ভারতের কাল থেকেই যেন এটা পেতে চায়।

স্বাভাবিকভাবেই এখন ভারতকে মুখোমুখি হতে হবে চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ” (http://english.gov.cn/beltAndRoad/) – এই ইস্যুতে। সত্যি কথাটা হল, এবার সত্যিকার অবস্থানটা ভারতকে বলতে হবে। সম্ভবত আর ভ্যানিটি  বা মিছা লোক দেখানো অবস্থান আর নয় যে ভারত একনম্বর অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এরকম নয়, বাস্তব সত্য অবস্থান অর্থাৎ তা প্রকাশ করার বিনিময়েই খুব সম্ভবত চীনের কাছ থেকে ভারতকে রফতানি বাজার সুবিধা পেতে হবে। কারণ ভারত নিজেই নিজের মিথ্যা ভ্যানিটি- ‘আমেরিকা আমার পিঠে হাত রেখেছে’, ‘মুই কী হনুরে’- এগুলো তার ভুয়া পরিচয়, ভারত নিজেই তা ভেঙে ফেলে এখন চীনের সামনে নীলডাউন। কাজেই ভুয়া মিথ্যা চাপাবাজির দিন শেষ। সত্যি কথাটা হল আজ শেখ হাসিনা ভোটের কথা চিন্যেতা করে যে উন্নয়ন বা “মধ্য আয়ের দেশের”  তর্ক  তুলেছেন ভারত সেই “লোয়ার মধ্য আয়ের দেশের” (“lower-middle-income” economy ) হয়েছে মাত্র ২০১৬ সালের জুনে। ভারতেরই এক মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, The World Bank has dropped the use of developing nation tag for India in its specialized reports and instead classifies it as a “lower-middle-income” economy in South Asia, a top official has said. ফলে সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি এই হল বলে, অথবা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগে যোগ দিলে সে “চীনের সাবরডিনেট বা অধস্থন অবস্থায় চলে যাবে” এসব কল্পিত গল্পের জগত ফেলে ভারতকে বাস্তবে নেমে আসতে হবে। কারণ বেসিক কথাটা হল, কোন  রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জিনিষটা অবজেকটিভ। একে কেউ চাইলেই সাবজেকটিভলি দাবায় বা অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই স্বপ্নে পোলাও খাওয়া অথবা গল্প প্রচার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।

তবে মিথ্যা ভ্যানিটি বা গর্বের কী দশা হয় এর এক আদর্শ ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। আমেরিকা বা চীনের মত থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খুলে ভারতের স্বার্থ কী হতে পারে তার ষ্ট্রাট্রজিক বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শ তৈরি করার শখ ভারতেরও। কিন্তু এর খরচ?  ২০০৫ সালে বুশের প্রস্তাবে এর খরচের দায় আমেরিকা নিয়েছে। ভারতের ধারণা সে আমেরিকাকে মহাঠকিয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ আমেরিকার উপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছে। আপনার স্ত্রী-সন্তান মানে সংসার প্রতিপালনের খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করতে পারেন আপনি। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন ঐ সংসার আর অচিরেই আপনার থাকবে না। ফলে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো গজিয়েছে হয় ভারতে এনজিও রূপে যার ফান্ড করছে আমেরিকান কোন ফাউন্ডেশন অথবা আমেরিকান কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক এক্সটেন্ডেড হয়ে ভারতে শাখা খুলেছে। আর এতে সবচেয়ে খুশি হয়েছে তরুণ একাদেমিক কেরিয়ারিস্ট্রা যারা ভারতের স্বার্থের চেয়ে নিজের কেরিয়ারে আগ্রহ রাখে বেশি। আর এতে ভারেতের প্রায় সব থিঙ্কট্যাঙ্কঅগুলো আসলে আমেরিকান বিদেশনীতিই ভারতে প্রচার করার কাজএ লিপ্ত হয়েছে। আমেরিকান অর্থ উসুল হয়েছে এভাবে।  মুক্তমালার মত চীনের ভারতকে ঘিরে ফেলার তত্ব তারাই খাইয়েছে ভারতকে, সয়লাব করে ফেলেছে। এমনকি যে দুএকটা ভারতের ডিফেন্সের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও আমেরিকান বিদেশনীতির প্রভাব ঢুকাতে পেরেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে IDSA নামে এমন এক প্রতিষ্ঠানের “চীন-ভারতঃ নতুন ভারসাম্য” শিরোনামের থিম নিয়ে বার্ষিক কনফারেন্স করতে অনাপত্তি-পত্র দেয় নাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়।  অনুমান করা যায় আমেরিকার চোখে দেখা চীনা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিত সেখানে ছিল বা থাকতে পারে – তা চীনের মন জয়ে ভারতের  জন্য বাধা হিতে পারে আশঙ্কায়, চীন অখুশি হতে পারে  – তাই এই অনুমতি প্রদান না দেওয়া্র ঘটনা ঘটেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে,  Meanwhile, the MEA has refused clearance to an annual conference by the ministry of defence-sponsored think tank, Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) whose theme was “India-China: a new equilibrium”. The conference slated for this week has been “deferred” said people familiar with developments. এথেকে বুঝা যায় ভারতকে এখন কত গভীর পর্যায়ে চীন-বিরোধীতার খোলনলচে বদলাতে হবে।

ওদিকে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার উপরে প্রায়োরিটি’ এই নীতি তিনি যদি ধরে রেখে এগিয়ে যান (যেটা এখনও পর্যন্ত এর ভিন্ন কিছু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ) কারণ ট্রাম্প মনে করেন তার ‘বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি’ এই নীতির প্রশ্নে তিনি – এতটাই সিরিয়াস যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে  এই প্রথম ইউরোপের সাথেও আমেরিকার ভিন্ন অবস্থান হতে বা তা নিয়ে লড়তে তিনি পিছপা নন। এমনকি আমেরিকা দুনিয়ার এক ‘এম্পায়ার’ অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘ আমেরিকার প্রভাবে চলে  – এসব কথাগুলোও বাদ দিতে বা বদলাতে হলেও ট্রাম্পের আমেরিকা এসব ভ্যানিটি ছাড়তে রাজি। তবু ‘বাণিজ্য প্রায়োরিটি’ নীতির জায়গা থেকে তিনি সরবেন না বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক কোথায় দাঁড়ায়।

এবার এই সূত্রে বলা যায়, আমেরিকার ভারতের কাছে ‘বাংলাদেশকে বন্ধক দেয়া’- সে বাস্তবতারও একই সাথে অবসান হতে চলেছে বা ঘটবেই। যদিও সেটা বাস্তবায়িত হতে, কার্যকর হতে – বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে। তবে পরিবর্তনের আগমনী ‘ঘণ্টা বাজিয়ে’ দেয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও এখন থেকে ভারতের নতুন নীতি, নতুন বন্ধু, মিত্র এগুলো থিতু হয়ে বসতে, সমন্বিত হয়ে বসতে কিছু সময় লাগবে। আবার ওদিকে আমেরিকা দিক থেকে বললে, তার “ভারত-বিবেচনার দায়” ছুটে যাচ্ছে অর্থাৎ ভারত আর আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর খেদমত করবে কিনা তা নিয়ে আর কোন ভরসা ট্রাম্পের আছে বলে মনে হয় না। এই কারণে অবশ্যই আমেরিকা নিজেই “ইন্ডিপেন্ডেন্টলি” বাংলাদেশ নিয়ে কিছু সরাসরি ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এর শর্ত তৈরি হয়ে গেছে, সে কথাও সত্যি। ফলে ভারতের পরামর্শ, মতামত সমন্বয় এগুলো আমেরিকার কাছে আর আগের মতো নেই, থাকবে না। বলাই বাহুল্য। তবে এমন পরিবর্তন যদিও শুরু হয়েছে মাত্র। ফলে ফল দেখতে পেতে ধীর লয়ের কারণে দেরি হতে পারে বা দ্রুতও হতে পারে।  কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সারকথা “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” সেই বিউগল বেজে গেছে। এতে কে কার কাছে আসবে, কোলে উঠবে নাকি চিরতরে সুদূরে চলে যাবে এমন ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীনকে কোথায় বসতে দেয় সেই অস্থিরতায় ভারত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের ‘প্রিয়তম’ বদল

ভারতের ‘প্রিয়তম’ বদল

গৌতম দাস

২৯ মার্চ ২০১৮,  বৃহষ্পতিবার   ০০:০৩
updated 30 Mar 2018, 16:13

https://wp.me/p1sCvy-2qT

 

আশির দশকের শুরুতে গ্লোবালাইজেশনের মূল প্রবক্তা ও নেতা ছিল আমেরিকা। সে আমাদেরকে নিরন্তর চাপ দিত  আমাদের বাজারকে তাদের জন্য উদাম করে দেওয়ার জন্য। সেই আমেরিকা  নিজেই এখন উলটা অবস্থান নিয়েছে।  ট্রাম্পের আমেরিকা প্রটেকশনিস্ট (protectionist)। এখন কেবল নিজ বাজার রক্ষণশীলতা নিয়ে ব্যস্ত। শিল্পের দুই গুরুত্বপুর্ণ উপাদান স্টিল ও এল্যুমিনিয়াম। আমেরিকায় অন্য দেশের কোন  স্টিল ও এল্যুমিনিয়াম পণ্য প্রবেশ বা আমদানি করতে চাইলে এখন এর উপর অতিরিক্ত সোজা ২৫% শুল্ক দিতে হবে। ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের অনুমান ভিনদেশের এই দুই পণ্য আমেরিকান পণ্য বিক্রিতে বাধা দিচ্ছে বা আমেরিকান শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে।  এই ভিনদেশীয় পণ্যের ভিনদেশ বলতে মূলত চীনা পণ্য। এবং সেই সাথে অনেক ভারতীয় পণ্যও আছে। আমেরিকার নিজের বাণিজ্যস্বার্থ দেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সরকারি কর্তা হলেন U.S. Trade Representative (USTR)। তাঁর ভারতের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল,  আমেরিকায় রপ্তানিতে ভারত তার পণ্যমুল্যে ভর্তুকি দেয় আর এভাবে আমেরিকার চেয়ে ভারতের পণ্যমুল্য সস্তা পড়ে, এতে ভারতের পণ্যমূল্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিয়ে হাজির হয়, ভারতীয় পণ্যের বাজার বড় হয় আর আমেরিকান শ্রমিক কাজ হারায়। এই হল তার দাবি। তাই তিনি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় (WTO) অভিযোগ দায়ের করেছেন।

এই বিষয়টা নিয়ে এক রিপোর্ট লিখেছে ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা। ঐ রিপোর্টের শুরুর বাক্যটা এরকমঃ “The United States said Wednesday it was taking action at the World Trade Organization against Indian export subsidies as Washington’s intensifying trade offensive moved to encompass two of Asia’s largest economies. এতে শেষের শব্দ কয়টা বেশ তাতপর্যপুর্ণ। লিখেছে encompass two of Asia’s largest economies. মানে “এশিয়ার দুটা সবচেয়ে বড় অর্থনীতিকে ঘিরে এদের বিরুদ্ধে (আমেরিকান) পদক্ষেপ “।  অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্থ ভারত একা নিজের কথা বলছে না। চীনকে সাথে জড়িয়ে নিয়ে দল ভারি করে ‘এশিয়া সেন্টিমেন্ট’ তুলে কথাটা বলার চেষ্টা করছে। অথচ কমপক্ষে  গত তিন বছর ধরে লাগাতর ভারতের মিডিয়া চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে গিয়েছে। চীনের জন্মই যেন ভারতের ক্ষতি করার জন্য এমন আজন্ম শত্রুতার বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে সেই প্রচার চলেছে। আমেরিকার “চীন ঠেকানো” বিদেশনীতির এক নম্বর বাহকের ভুমিকা পালন করে গেছে ভারত। তাহলে হঠাত এই হার্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে কেন?

গত ২৩ মার্চ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক শিরোনামও এমন আরও এক কাঠি চড়া।  ওই দিনের পত্রিকা শিরোনাম করেছে, ‘চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ, কাঁপছে বিশ্ব অর্থনীতি’। লক্ষ্যণীয় এখানে শিরোনামের বাক্যে ‘ভারত’ শব্দটাই নাই। আছে মূলত তিনটি শব্দ – চীন, আমেরিকা আর বিশ্ব অর্থনীতি। অর্থাৎ প্রকারান্তরে আনন্দবাজার স্বীকার করছে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘কাঁপানোর’ ঘটনা ঘটতে গেলে চীন-আমেরিকাই যথেষ্ট, ভারত এখনো ঘটনা হয়ে উঠতে পারেনি। যদিও পটেনশিয়াল অর্থে ভারতের সম্ভাবনা আছে, জ্বলে উঠার মত বারুদ আছে; কিন্তু পরিপক্ক হয়ে উঠেনি। বরং উল্টো তা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে তাতে সব সম্ভাবনা নষ্টও হতে পারে। কিন্তু এখানে ঘটনাটা আসলে কী? বাণিজ্যযুদ্ধ নাকি সত্যিকার যুদ্ধ?

ঘটনার আসল নাম যদিও ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’; কিন্তু আনন্দবাজার বারবার একে এ’থেকে পরিস্থিতি আসল যুদ্ধে চলে যাবে কি-না, সে ইঙ্গিত করে কথা বলেছে। যেমন লিখেছে – “বিশ্ব অর্থনীতির দুই মহাশক্তির এই যুদ্ধে তাই কাঁপুনি বাজার ও করপোরেট দুনিয়ায়। হবে না-ইবা কেন? ২০৩৬ সাল পর্যন্ত সাত হাজার বোয়িং বিমানের বরাত দিয়েছে তো শুধু চীনা সংস্থাই। পুরোদস্তুর যুদ্ধ বাধলে, তাই প্রভাব সর্বগ্রাসী হওয়ারই সম্ভাবনা। …কিন্তু তাতে কি যুদ্ধ আটকাবে? উত্তর ট্রাম্প ছাড়া আর একজনই জানেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং”।

এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট, আনন্দবাজার চীন আর আমেরিকাকেই কেবল ‘মহাশক্তি’ বলছে, নিজ ভারতকে বলছে না। আর আনন্দবাজার সম্ভবত বলতে চাইছে, মোদি পোল বদলে আমেরিকাকে ছেড়ে চীনের পক্ষপুটে আগেই চলে গেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সত্যিকার যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় সেকথা ভেবে, এর আগেই!

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ দেখে এক কথায় বললে, ভারত আসলে ভীষণ ভয় পেয়েছে, পাওয়ার কথাই। কারণ মুই কী হনু রে ভারতের যা কিছু সম্ভাবনা তা ট্রাম্পের ঘোষণার এক ঝটকায় শুণ্যে ঝুলবার দশায় পৌছে গিয়েছে। চলতি শতকের শুরু থেকেই ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্টদের প্রশাসনগুলো “চীন ঠেকাও” নীতির কারণে ভারতকে কাছে টানতে, সব সময় তোয়াজ আর নানান বাড়তি সুবিধা দিয়ে গিয়েছিল। আর সেসব সুবিধা খেতে খেতে ভারত ধরে নিয়েছিল এভাবেই বুঝি আরামেই দিন কাটবে। যেন এই তোয়াজ আর ঘুষের সুবিধাদির বাইরে আর কোন বাস্তব দুনিয়া নাই। এই অর্থে ভারতের ঝটকা লেগেছে, ভয় পেয়েছে। সেই ঝটকাতে একেবারে বাস্তবতায় এসে গেছে।  আসলে ভর্তুকি দিয়ে রপ্তানিতে WTO নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও,  ভারতকে “বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র” হিসাবে ঘোষণা করে দিয়ে আমেরিকা ভারতকে নিজ দেশে (ভর্তুকির) রপ্তানি করতে দিত। যদিও ঐ শর্তে বলা ছিল ভারতের মাথা পিছু আয় এক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলে এই বিশেষ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। গত ২০১৫ সালে WTO জানিয়েছিল যে ভারত সে শর্ত পূরণ করে ফেলেছে। কিন্তু দেখেও না দেখায়, আদরের ভারতের জন্য আমেরিকায় রপ্তানি সুবিধা আগের মতই জারি ছিল। সেটাই এখন হঠাত একবারে অতিরিক্ত শুল্কারোপের মুখোমুখি হল। ফলে বাস্তবে এই রপ্তানি বন্ধ হতে হবে।

ভারত নিজেই পালটা WTO তে অভিযোগ করতে যাবে কেউ কেউ বলছে যদিও তারা সকলে পরিস্কার জানে এটা WTO তে বিচারে উঠামাত্র অভিযোগের রায় আমেরিকার পক্ষে  হয়ে যাবে। তবুও এবার তেলানোর ঢঙ একটা চালু আছে।  মিনমিনে গলায় বলা হচ্ছে আমাদের রপ্তানি তো খুবই কম, আমেরিকার মোট ইস্পাত ও এলুমিনিয়ামের মাত্র দু পার্সেন্ট। মানে তাদেরকে কোন এক অজুহাতে  যেন বিশেষ ছাড় আবার দেয়া হয়, সে চেষ্টাও আছে। যদিও সে সম্ভাবনা প্রায় নাই বললেই চলে।  ট্রাম্পের আগানোর নীতিটা হল, আগের আমেরিকান প্রশাসনগুলোর আমলে যেখানে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের উপরে রাজনৈতিক কারণে সুবিধা দেয়া জারি রাখা হয়েছিল। সেখানে  ট্রাম্প এবার বাণিজ্য স্বার্থকে ফিরে আবার সবার উপরে স্থানে এনে রেখেছে। ফলে ট্রাম্প এবার আর কোন নীতি পরিবর্তন না করলে ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থই সবখানে সবার উপরে স্থান নিয়ে থাকবে, এটা বলে দেয়া যায়। তবে এটা ঠিক যেমন ভারতের সাথে আমেরিকার যেসব বিশেষ খায়খাতির বাড়তি সুবিধা দেয়া ছিল আগের রেওয়াজ অনুসারে সেগুলো সব বাতিল হয়ে গেছে সে কথা কোথাও ঘোষণা দিয়ে বলা হবে না। কিন্তু বাণিজ্যস্বার্থ প্রায়রিটিতে সবার উপরে এক নম্বরে হাজির থাকবে – এই নীতিতে পরিচালিত হবে। তবে এর মানেই ভারত-আমেরিকা সব বিশেষ সম্পর্ক বাতিল নয়, তবে অকেজো হয়ে যাবে। ভারত এই গভীর দিকটা দেখতে পেয়ে গেছে।  একারণে এই ঝটকায় সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সটান চীনের দিকে  ঝুঁকে গেছে। যদিও মন থেকে দুরাশা ক্ষীণ আলো হয়ত সব চলে যায় নাই, এই আশার বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে।

যেমন ভারতের বাণিজ্য সচিব রীতা তিওতিয়া রিপোর্টারদের বলছেন, “আমেরিকা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এই বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। কিন্তু ভারত তো আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার ফলে আমরা নিশ্চয় আমেরিকার নিরাপত্তা হুমকি নই”।  [India’s commerce secretary Rita Teaotia told reporters last week: “The tariffs have been imposed on security grounds and some of the key trading partners have been excluded from that. “On the basis of India’s strategic partnership with the United States, we are certainly not a security threat to the United States, and an exemption for India on the same grounds should also be available.”]

আসলে কে যে কখন “নিরাপত্তার হুমকির” অজুহাত তুলে কথা বলে কিন্তু ভিন্ন কী বুঝায়, তা বুঝা মুসকিল। সেটা অবশ্য ভারতের বাণিজ্য সচিবের না জানা থাকার কথা না। আমরা জেনে আসছি দেখছি, “ভারতের নিরাপত্তার জন্য” নিয়মিত আমাদের বর্ডারে বিএসএফের হ্যাপী কিলিং চলছে। যদিও কোন কথিত জঙ্গীও কোন দিন কোন সীমান্তে ধরা পড়ল না বা গুলি খেল না।  ফলে নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতই কী বলতে ঠিক কী বুঝায় “এটা বুঝা মুশকিল”। তবে রীতা কোন অজুহাতে আবার বিশেষ সুবিধা চাইছেন তাতে ভারতকে আমেরিকার ভুয়া টেররিজমের বরকন্দাজ হতে হলেও যে তার বিশেষ আপত্তি নাই – তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সমস্যা হল, ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছে টেররিজম আর আমেরিকার প্রধান হুমকি নয়। মানে আমেরিকা আর বরকন্দাজ কিনবে না।

‘বাণিজ্যযুদ্ধ’
শুরুতে যেকথা বলছিলাম একদা গ্লোবালাইজেশনের মূল প্রবক্তা ও নেতা আমেরিকা নিজেই এখন উলটা –  ট্রাম্পের আমেরিকা প্রটেকশনিস্ট। এই বাণিজ্যযুদ্ধ মানে কী, কেন? বাণিজ্যযুদ্ধ মানে হল কোনো দেশের নিজ বাজারে অন্যের পণ্য প্রবেশে বাধা দিতে অনেক সময় বিশাল অতিরিক্ত আমদানিশুল্ক আরোপ করে দেয়া হয়, যাতে ঐ পণ্যের আমদানিমূল্য স্থানীয় উৎপাদকদের মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এ থেকে দু’টি রাষ্ট্র একে অপরের পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত আমদানিশুল্ক আরোপের ক্ষতিকর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে যেতে পারে। তবে পাঠকের জন্য একটা সাবধানবাণী হল, দ্রুত জাতিবাদী হয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, ভুল হবে। কারণ বিষয়টা এমন সরল নয় যে, ‘জাতিবাদী বোধে নিজ বাজার সংরক্ষণ’ সবার কাম্য হওয়া উচিত, আর এতেই সব সমস্যার সমাধান হবে। ব্যাপারটা তা নয়।

যদিও আমাদের অনেকের ধারণা হতে পারে, ‘বাজার সংরক্ষণ’ করলেই সমাধান হয়। সবচেয়ে পুরনো বুদ্ধিটা হল, ‘বাজার সংরক্ষণ’। ‘বাজার সংরক্ষণ’ মানে হল দেশে নিজেরা যা কিছু ভোগ করব, তা সব নিজেরাই বানাব; অন্য দেশকে এখানে মাল বেচতে দেবো না। এই হল এর সারকথা। কথাটা শুনতে খুব ভালো লাগে, জাতিবাদী রক্ত শরীরের ভেতরে বয়ে যাচ্ছে বা দেশপ্রেমিক ভাবের গরম লাগছে টের পাওয়া যায়; কিন্তু এই ভাবনাটি একেবারেই অবাস্তব। কারণ আমাদের বটম লাইন মানে যার নিচে যেতে পারব না তা হল, অন্য দেশকে নিজ দেশে পণ্য রফতানি করতে না দেয়ার অর্থ বুঝতে হবে! এর সোজা মানে এতে নিজেও অন্য কোনো দেশে রফতানি করতে না পারা। কারণ, আমি কাউকে আমার দেশে আমদানি করতে না দিলে সেও তার দেশে আমাকে রফতানি করতে দেবে না। অর্থাৎ একারণে তাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা হল, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য-বিনিময়ের আমদানি-রফতানি চালিয়ে যাওয়া। আর এটি শখ নয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রই এটি করতে বাধ্য। কারণ, অন্তত আমাদের শিল্পের কাঁচামাল ও মেশিনপত্র ইত্যাদি তো আমদানি করতে হবেই। আর সেগুলোই অন্য রাষ্ট্রের রফতানি পণ্য। একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যায়- আসলে আমাদের জন্য ‘বাজার সংরক্ষণ’ বলতে এর অর্থ ও পরিণাম কী- এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হবে গার্মেন্ট রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়া। অনেকটা আশির দশকের আগের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফিরে যাওয়ার মত। আমরা নিজ বাজার সংরক্ষণ করে কাউকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি করতে না দিলে সেসব রাষ্ট্রও নিজ দেশে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি করতে দেবে না। সেটাই স্বাভাবিক।

তবে একালে  ‘গ্লোবালাইজেশন’ শব্দটার বিপরীত হিসাবে ‘বাজার সংরক্ষণের’ কথাটা এসেছে । গ্লোবালাইজেশনের মূলনেতা আমেরিকা নিজেই এখন ট্রাম্পের আমলে এসে ‘বাজার সংরক্ষণবাদী’ হতে চাচ্ছে। এই গ্লোবালাইজেশনের দুনিয়ার বয়স বেশি নয়, ত্রিশের বেশি বা চল্লিশের কম বছর। বইয়ের ভাষায় আইডিয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন মানে হল, কোনো পণ্য সবচেয়ে দক্ষ (কম শ্রমে) আর ভালো মানের যারা বানাতে পারবে (ফলে কম দামে) সেসব রাষ্ট্র হবে ঐসব পণ্যের রফতানিকারণ,  আর বাদ বাকি সব রাষ্ট্র এদের পণ্য কিনবে।

এতে সবাইকেই কোন না কোন পণ্য উৎপাদনে দক্ষ ওস্তাদ হতে হবে আর সেই ওস্তাদি দেখিয়ে  গ্লোবাল বাজার নিজ নিজ শেয়ার বাড়িয়ে দখলে নিতে হবে। এতে সবার সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে – অদক্ষতা, খারাপ মানের পণ্যের দায় থেকে সবাই মুক্তি পাবে। আর নিজেও কোনো না কোনো পণ্য উৎপাদনের উচু দক্ষতার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মানে পৌঁছাতে পারবে। সবাইকেই কোনো না কোনো কিছুর মাথা হতে পারতে হবে। হাতির মাথা হতে না পারলে অন্তত মুরগির মাথা হতে হবে। তেমন মাথা হতে পারতে হবে। তবে আগেই বলেছি, এটা আইডিয়াল কথা। কারণ, বাস্তব সব রাষ্ট্রের অন্যের উপর চাপ সৃষ্টি বা প্রভাব সৃষ্টির ক্ষমতা বা ক্ষমতা দেখানোর ক্ষমতা সমান নয়। বাস্তব দুনিয়াটা আইডিয়ালও নয়। জিএসপির নামে আমেরিকা আমাদেরকে তার বাজারে প্রবেশে আটকে রাখতে পারে, অথচ আমরা কোনো আমেরিকান পণ্যের আমাদের দেশে প্রবেশের বাধা দিতে পারি না। এটা বাস্তবতা। ফলে ঠিক বাজার নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা পরিস্থিতি বাজারকে নিজের নিজের পক্ষে নিয়ে যায়। এবার তত্ত্ব কথা শেষে বাস্তব অবস্থায় যাই।

ট্রাম্প গত ২২ মার্চ, ইস্পাত (২৫% হারে) ও অ্যালুমিনিয়াম (১০% হারে) এই দুই চীনা পণ্যের ওপর  মোট ষাট বিলিয়ন ডলার বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করার ঘোষণা দেন। তিনি ট্যারিফ ছাড়াও আর দু’টি, মোট তিনটি শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কথা বলেন। দ্বিতীয়টা হল আমেরিকায় ‘চীনা কোম্পানির ওপর বিনিয়োগসীমা’ আরোপ করা আর তৃতীয়টা হল, ডব্লিউটিওতে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার নালিশি মামলা করা। এর পাল্টা চীনা প্রতিক্রিয়ায় হয় অবশ্য খুবই কড়া ও খারাপ। আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন “কেউ কঠোর হলে আমরাও কঠোর হয়েই খেলব”।

তবে প্রথম কথা হল, ভাবা হয় বটে কিন্তু ‘বাড়তি ট্যারিফ আরোপ’ খুব সুবিধার জিনিস না। কারণ শেষ বিচারে এখন আমেরিকান ভোক্তাদেরকেই এই বাড়তি ট্যারিফের অর্থ অপ্রয়োজনে শোধ করতে হবে। ভোক্তাদেরকে ঐ দুই পণ্য ব্যবহার করতে অতিরিক্ত যাট বিলিয়ন ডলার গুনতে হবে। এতে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজার এলোমেলো ও ছোট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এ নিয়ে আমেরিকায় এ পর্যন্ত যতগুলো স্টাডি রিপোর্ট বের হয়েছে কোনোটাই ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলেনি। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট বলছে, সম্ভবত চীন আমেরিকান কৃষিপণ্যের ওপর বিশেষ করে আমেরিকান সয়াবিনের ওপর পাল্টা প্রতিশোধের ট্যারিফ আরোপ করবে। ফলে ইকোনমিস্ট মনে করে ‘চীনের পাল্টাব্যবস্থার কারণে বরং বাজার পরিস্থিতি আরো খারাপ জায়গায় চলে যেতে পারে। এভাবে ‘পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ এটাই বাণিজ্যযুদ্ধের ক্ষতিকারক লজিক’। [What would make matters much worse is Chinese retaliation. ] তবে ট্রাম্পের ঘোষণায়, বাজারে কাঁপাকাঁপি সত্যি সত্যি লেগেছে। দুনিয়াজুড়ে স্টক শেয়ারবাজার উথালপাতাল হয়ে গেছে। বাজার শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা দেখে কিছু নিশ্চয়তা না দেখলে যা থিতু হবে না।

কিন্তু মজার বিষয় নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইকোনমিস্টসহ থিংকট্যাংকগুলোর ভাষ্য যা প্রকাশিত হয়েছে তাতে কোথাও এই বাণিজ্যযুদ্ধ প্রকৃত যুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে এমন ইঙ্গিত এখনো দেয়া হয়নি কোথাও। তা সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়ার ভাষ্যগুলোতে তারা যেন এই লড়াই বহুদূর যাবে, চাই কী আমেরিকান গ্লোবাল আধিপত্য যেন এই যুদ্ধের মধ্যে শেষ হবে এই জায়গা থেকে পরিস্থিতিকে দেখতে চাইছে। অন্তত মোদী  সরকার ও ভারতীয় মিডিয়া যেন নিশ্চিত হয়ে গেছে ট্রাম্পের আমেরিকা থেকে তাদের কিছু আর পাওয়ার নেই। অথচ আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, এই ট্রাম্পের  নির্বাচনের জয়লাভের পর থেকে মোদী ও বিজেপির কর্মীরা আক্ষরিকভাবেই ট্রাম্পকে পূজা করেছে। কারণ, ট্রাম্প ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলমান ব্যাসিং দিয়ে তার প্রেসিডেন্টশিপ শুরু করেছিল। অথচ এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, অনানুষ্ঠানিকভাবে (মানে কোনো ঘোষণা না দিয়ে) এবং বাস্তবত ভারত -আমেরিকার সম্পর্ক আপাতত শেষ।
এক কথায় বললে ভারত মেরু বদল করে ফেলেছে। আমেরিকা-ভরসার ভারত এখন চীনা বন্ধুত্বপ্রেমী ভারত হয়ে উঠতে চাইছে।

মূল কারণ, ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা করেছে তেমনি তিনি দাবি করেছেন যে ভারত আমেরিকায় তার রফতানি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। যাতে সে আমেরিকার নিজের পণ্যের চেয়ে নিজ পণ্য সস্তা হয় বলে বাজার পায়। এই অভিযোগে ট্রাম্প ডব্লিউটিও তে ফরমাল নালিশ করেছেন। ইতোমধ্যে আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থ দেখার প্রতিনিধি (USTR), রবার্ট লাইটহাইজার কংগ্রেসের শুনানিতে বলেছেন, তিনি আশঙ্কা করেন যে ভারত সম্ভবত পাল্টা (ট্যারিফ বসানো ধরনের) প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।

তাই অনেক আগে থেকেওই মোদী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন।  গত মাসে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের নতুন পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে চীন সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই নতুন এই পরিবর্তনের সূত্রপাত। হিন্দুস্তান টাইমস শিরোনামে বলেছে, এটা এক “low-key visit”  বা চুপচাপ সফর। এই ‘চুপচাপের’ অর্থ বুঝা যাবে যদি আমরা মনে রাখি যে গত চার বছর ধরে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” খেদমতে লেগে থাকা ভারত চীনের বিরুদ্ধে সব সময় এই না সেই করে ফেলবে বলে এক উগ্র-জাতিবাদী মিডিয়া হম্বিতম্বি জারি রাখত। সেই হইচইয়ের বিপরীতে গোখলের এই সফর আসলেই ‘চুপচাপ’ সফর। আর ওই সফরের শেষে বহু কিছু পরিবর্তন হয়ে যায়। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষ এক সক্রিয় ‘ডায়লগ মেকানিজম’ খাড়া করার জন্য কাজ করবে। তারা উভয়পক্ষ তাদের যেসব অবস্থান ভিন্নতাগুলো আছে সেগুলোকে খুবই “সংবেদনশীলতার সাথে ও পারস্পরিক সম্মানের দিকে খেয়াল রেখে ঐকমত্যের অবস্থান গড়ে তোলার জন্য কাজ করবে”। এ ব্যাপারে হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্য হল, শেষের এই কথাগুলো বলা হয়েছে, মালদ্বীপ নিয়ে চীন-ভারতের অবস্থানের ভিন্নতার দিকে তাকিয়ে। লিখেছে [Wang told the Indian foreign secretary in an apparent reference to a host of sensitive issues between India and China, including the current political crisis in the Maldives.]

তার মানে, ভারতের সাথে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের মোকাবেলাটা ভারত ‘চীনের সাথে মিলে বা কাছে থেকে’ করতে চায়।  ভারত-চীন সম্পর্কের এমন নতুন সুবাতাস বইতেছে। এই মূল ম্যাসেজ ভারত আর লুকোছাপা না করে চার দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ ধরনের আরো অনেক যা অগ্রগতি হয়েছে সেগুলো নিয়েও কথা বলা যায়; কিন্তু সেগুলোর একটা বললেই এখানে বাকি সবকিছু বলা হয়ে যাবে। যেমন, লাগাতার গত তিন বছর ধরে মোদি ও তার উপদেষ্টা দোভাল মিলে আমেরিকাকে খুশি করতে চীনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে, নিজ জঙ্গণকে উগ্র জাতীবাদীতায় তাতিয়ে গিয়েছে। আর  সেকাজে চীনকে কঠিন-সময় উপহার দিতে সবচেয়ে ভাল হাতিয়ার হিসাবে  তিব্বতের দালাইলামাকে নিয়ে প্রতি বছরে কয়েকটা করে অনুষ্ঠান করে গিয়েছিল। আর ভারতের মন্ত্রী আমলারা সব সময় ঘনিষ্ঠভাবে তাতে সম্পৃক্ত থেকেছে। বলা ভালো, এমন কোনো অনুষ্ঠান করা বাদ রাখেনি যাতে চীন খুবই অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু তাতে এবার এক বিরাট ছেদ পড়েছে। মোদি সরকার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখছে, বিজয় গোখলের চীন সফরে যাওয়ার আগের দিন মোদীর ক্যাবিনেট সচিব পি এন সিনহাকে গোখলে এক নোট পাঠিয়েছিলেন। চার দিন পরে সেই নোটের ভিত্তিতে  সিনহা এক গোপন সার্কুলার ছাড়েন যাতে তিনি অ্যাড্রেস করেছিলেন – ‘সিনিয়র লিডারেরা’ ও ‘সরকারি ফাংশনারিজ’ বলে। সেখানে নির্দেশ দেয়া হয় আপনারা কেউ দালাইলামার কোন তৎপরতার সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক রাখবেন না, অংশ নিবেন না, এটা ‘কাম্য নয়’। এই পরামর্শ মেনে চলবেন।

অর্থাৎ মোদি সরকার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। বুঝা গেল ভারত আগের আমেরিকার মন জোগানোর মতো করে এখন চীনেরও মন জোগানোর চেষ্টায় রত হয়েছে। আসলে ভারত এখন জেনে গেছে চীন কী সে সেনসেটিভ! আর চীনের সেনসিটিভিটি নিয়ে ভারত আসলেই সিরিয়াস মনোযোগী!

ওদিকে সুবীর ভৌমিক ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দিয়ে খেতে চাইছেন। তিনি লিখছেন, “ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের প্রয়োজন ভারতের বিশাল বাজারের। তবে চীন যদি তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে চায়, তবে তা দিল্লিকে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা দেবে”।

সুবীর আরও জানাচ্ছেন, “বিরোধী কংগ্রেস দলীয় আইনপ্রণেতা ও ভারতীয় পার্লামেন্টারি স্থায়ী কমিটির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান শশী থারুর বলেছেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা উভয় দেশকেই ভারতের দিকে ধাবিত করবে”।  অর্থাৎ কংগ্রেসের শশীথারুরও অনুমান, চীন এখন নানান বাণিজ্য সুবিধার ডালি নিয়ে ভারতের দিকে আসবে। মোদি সম্ভাব্য সেসব সুবিধা খেতেই দালাইলামাকে বলিতে চড়িয়ে দিয়েছেন, মনে হচ্ছে!

সর্বশেষ আরও আছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রী এখন ভারত সফরে। ভারতে চীনের রপ্তানি ৬০ বিলিয়ন ডলারের আর ভারতের চীনে রপ্তানি মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। তাদের মূল আলোচ্য বিষয় বাণিজ্য ঘাটতি। চীনা বাণিজ্য মন্ত্রী Zhong Shan নিজেই বলছেন, এই বাণিজ্য ঘাটতি ফেলে রাখা যাবে না, এড্রেস করতে হবে। [Trade deficit with India unsustainable, needs to be addressed: China]। ফলে ভারত থেকে মূলত কৃষিপণ্য যেমন রাইসরিষা, তেলবীজ, বাসমতি বা নন-বাসমতি চাল ও চিনি রপ্তানি বিষয়ে কথা চলছে। ব্যাপারটা আমাদের মনযোগ দিয়ে বুঝবার দরকার আছে। ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতিও বিরাট। ফলে এই যুক্তিগুলো আমাদের কাজে লাগতে পারে।

তবে সারকথা হল, ভারতের প্রিয়তম কে হবে ! ভারত আপাতত সে জায়গা উঠিয়ে নিয়ে এসেছে চীনকে – তা পরিস্কার ভাবে বলে যায়। এর ছাপ প্রভাব বাংলাদেশে কী পড়বে তা বুঝবার আছে। কিন্তু আগে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাবের অর্থ ও দাবি যেটা ছিল যে,   বাংলাদেশ চীনা বিনিয়োগ নিতে পারবে না ও বেল্ট-রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে না  – এর হাল এখন কী হবে? এখনও পর্যন্ত এটা যা ছিল তাই, ভিন্নতার কোন তথ্য নাই। খুব সম্ভবত চীন-ভারত নতুন মাত্রার সম্পর্কের পরেও এটা “এর বাইরের ইস্যু” হিসাবেই  আগের মত অবস্থায় থেকে যাবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ মার্চ ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে পোল বদল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]