রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

গৌতম দাস

১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2Ae

 

চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

“কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে” এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

“বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

গৌতম দাস

৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yW

BRI-2, First China freight train arrives in London 2017
BELT-ROAD SUMMIT-2,  আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – ছবি : সংগ্রহ

গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বদলে চীন মূল ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে চীন এগিয়েই চলেছে এবং এই পরিবর্তনে চীনের জিডিপি সব সময় ইতিবাচক থেকেছে, যদিও সময়ে তা কম-বেশি হয়েছে। অগ্রগতির সে বিচারে গত কয়েক মাস ছিল চীনের দিক থেকে খুবই নির্ধারক কিছু ঘটনার যা, চীন ইতিবাচক সাফল্যের সাথে পার হয়েছে। আর এমন সাফল্যের ওপর চড়ে চলতি এপ্রিল মাসে চীন আরেক সাফল্য লাভ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ইতিহাসে চীনা উত্থানের দ্বিতীয় পর্যায় বলেই চিহ্নিত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?

চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) বা [Belt and Road Initiative (BRI) ] সম্পর্কে এতদিনে আমরা সবাই কমবেশি জেনে গেছি যে, এটা ৬৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে একসাথে ভৌত অবকাঠামোগতভাবে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে কানেক্ট করার এক মহাপ্রকল্প। কাঠামোগতভাবে এটা  মহাদেশীয় পর্যায়ের সংযোগ প্রকল্প; যা মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপ এদুই মহাদেশকে সংযুক্ত করে ফেলার প্রকল্প এবং আরও। তাই এর সাথে এ’দুই মহাদেশের মাঝখানে সেন্ট্রাল এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের সবাই যুক্ত হবে। আর ওদিকে এই কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আরেক প্রান্ত কেনিয়া ও ইথিওপিয়া দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সাথেও সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া পুরো প্রকল্পই স্থানে স্থানে ছয়টিরও বেশি গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের পণ্য পরিবহণের সাথেও যুক্ত থাকবে। আইডিয়া হিসেবে বিআরআই উদ্যোগের মূল ধারণা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাজির করেছিলেন তাঁর কাজাখাস্তান সফরের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। তখন এর নাম বেল্টরোড, সিল্করোধ, সিল্করুট ইত্যাদি নানান নামে হাজির করা হয়েছিল। সে ঘটনাক্রম সম্পর্কে এখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।  তবে গত ২০১৭ সালের মে মাসে এর প্রথম সামিট (বা সদস্য রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের নিয়ে সভা, বেল্ট রোড সামিট) এর সময় তা “বেল্ট রোড উদ্যোগ” (BRI) নামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মূল ফোকাস ছিল – কোন কোন রাষ্ট্র এই বড় প্রকল্পের অংশ হতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। আজ এই ২০১৯ সালের চলতি এপ্রিল মাসের শেষে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এবারের নাম Belt and Road Forum বলতে দেখা যাচ্ছে। এর জন্য নতুন খোলা পোর্টাল এখানে।]  এই সামিট টু কেন গুরুত্বপূর্ণ বা এর মূল তাৎপর্য কী হতে যাচ্ছে?

বেল্ট রোড অবকাঠামো প্রকল্পের মূল কাঠামো হল মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপকে সব উপায়ে সংযুক্ত করে ফেলা। অর্থাৎ এশিয়ার অপরপ্রান্ত হবে ইউরোপ, এত দিন যা খুবই সীমিত সুযোগে কানেক্টেড ছিল। আর এখানে ইউরোপ মানে সারা ইউরোপ; অর্থাৎ ২৫ সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও সংখ্যায় ২৫ অনেক বেশি, কিন্তু আসলে ইউরোপের প্রভাবশালী মাতবর রাষ্ট্র – চার থেকে আট রাষ্ট্র, যারা যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক। এই প্রথম চার রাষ্ট্রের মধ্যে মূল দুই রাষ্ট্র আবার হলো ফ্রান্স ও জার্মানি। এর সাথে বাকি দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন আর ইতালি। এমনিতে আমেরিকান মাতবরিতে চলা গত ৭০ বছরের দুনিয়া বিচারে, আমেরিকা একা একা চলে নাই; সাগরেদ রাষ্ট্রসহ দলেবলে চলেছে। এভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রজোট হল ‘গ্রুপ সেভেন’ বা জি-৭। একটু বিস্তারিত জানতে এই ফাইনান্সিয়াল বিনিয়োগ-পিডিয়া সাইট, ইনভেস্টোপিডিয়া – এটা দেখা যেতে পারে।  ইউরোপের সেই চার রাষ্ট্র – ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি – এই চার রাষ্ট্রই হল ‘গ্রুপ সেভেন’-এর চার ইউরোপীয় সদস্য; আর বাকি কানাডা, আমেরিকা ও জাপান মিলে পূর্ণ হয় ‘গ্রুপ সেভেন’।

বেল্ট-রোড উদ্যোগের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে এই কাঠামোতে এখানে এশিয়ার অপর প্রান্ত ইউরোপ। অথচ ২০১৭ সালে প্রথম বেল্ট রোড সামিট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এর অগ্রগতি ও অর্জন মেপে দেখলে সেখানে বড় খামতির দিক ছিল যে, সেকালে পর্যন্ত ইউরোপের কে কে বা বিশেষ করে প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রের কাউকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহী করাতে পারেনি বা কমপক্ষে কাউকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়াদা চীন আদায় করতে পারেনি। সেই খামতিই এবার পূরণ হতে চলেছে।
তবে এত দিন চীন কেন তা পারেনি তা বুঝতে প্রথমত চীনের কাছে জি-৭ কী, এটা বুঝলে অনেকটাই স্পষ্ট হবে সমস্যার জটিলতা কোথায়? গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত চীন ও আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকার জায়গা নিতে চায় চীন। তাহলে ইউরোপ? এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপ কেউ নয়। কারণ ইউরোপ বিগত-যুবা। ফলে সে ঐ দু’য়ের লড়াইয়ে কারও জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। তবে আমরা ইতিহাস হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, যদিও ইউরোপও একসময় দুনিয়ার নেতা এবং তাঁর সেখানে রুস্তমি ছিল; তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এবং সেটা ছিল কলোনি রুস্তমি।  আর ঐ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ হয়েছিল আমেরিকার এক নম্বর সাগরেদ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় (১৯৪২) থেকেই গ্লোবাল নেতৃত্ব আমেরিকা নিজের হাতে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে যায়; আর সারা ইউরোপ ছোট-বড় সবাই হয়ে যায় আমেরিকার অনুগ্রহ প্রার্থী। এমনকি মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করা হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালি অথবা এশিয়ার জাপান বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার পর আরও বেশি করে আমেরিকার অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়। ওদিকে ঐ বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের প্রায় সবাইকে যুদ্ধে সবরকম সাহায্য করা, প্রধান খরচগুলো নিজে বহন করা, অনুদান দেয়া তো বটেই এমনকি যুদ্ধ সমাপ্তিতে ইউরোপের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্বাসনের যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সেটাও একা আমেরিকা জুগিয়েছিল। তাই আমেরিকা ও ইউরোপের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় যেন, আমেরিকা একাই ত্রাতা ও দাতা আর  ইউরোপ ওরই পাণিপ্রার্থী। সে সম্পর্কই সেই থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসছে জি-সেভেন ধরনের গ্রুপেও, এক উঁচু-নিচু সম্পর্কে। আমেরিকা কী বলে বা সে কী চায়, তা আমল করে শুনতে ইউরোপ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যদিও ১৯৪৪ সাল থেকে গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম, যা বহুরাষ্ট্রীয় নানান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, তা গড়তে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ও নেতারা আমেরিকার সাগরেদ হয়ে পাশে থেকে নিজেদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ করে নিয়েছিল। এভাবে ইউরোপের প্রভাবশালী চার-ছয় রাষ্ট্র আমেরিকার পাশে ছোট-তরফ বা সাগরেদ হয়ে উঠতে জায়গা পেয়েছিল।

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, একালে আমেরিকাকে সরিয়ে গ্লোবাল নেতৃত্বের সে জায়গা চীন নিতে চাইলে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকেও চীনমুখী করে নিতে হবে আগে। “আমেরিকা-ইউরোপের” সম্পর্কের বদলে একে ছাপিয়ে “চীন-ইউরোপের” মধ্যে সম্পর্ককে খাঁড়া হতে হবে আরও প্রবল প্রভাবশালী সম্পর্ক হিসাবে। আর এটাই হবে বাস্তবত আমেরিকাকে দুনিয়ায় কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া। অতএব, বিশাল হইচই ফেলে দেয়া ঘটনা হল – ইতালির বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা। এবছরের মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি-এর সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফর ছিল। আর সেখানেই স্বাক্ষরিত ১৭টি চুক্তির মধ্যে একটি হলো চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রাথমিক বোঝাবুঝিগুলো’ (এমওইউ বা MOU ) দলিল করে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর চলতি মাসের বেল্ট রোড সামিট টু-তে অংশ নেয়ার সময় তা পূর্ণতা পাবে।

ইটালির এই যোগদান-সম্মতির চীনা উত্থানের জন্য এক মাইলস্টোন তাতপর্যের। কারণ ইতালিই হল প্রথম জি-৭ গ্রুপের সদস্য যে খোলাখুলি আমেরিকান মেরু ত্যাগ করল। শুধু তাই নয় ইতালিই প্রথম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যে (আমেরিকার হাত ছেড়ে) চীনের সাথে “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” – সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। [The communique said the two sides have agreed to advance China-Italy comprehensive strategic partnership…… ] অর্থাৎ চীন-ইতালি সম্পর্কটা কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নয়। [এপ্রসঙ্গ আরও একটু বিস্তারিত পরের প্যারায়।] বৃটেনসহ অন্যান্যরাও ইতোমধ্যে অনেক দূর গিয়েছে কিন্তু সেগুলো ছাড়াছাড়া। যেমন এলেখার শিরোনামের ছবিটা; এছবি বেল্ট-রোড ব্যবহার করেই প্রথম ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, চীন থেকে লন্ডন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন ব্যবহারের। যেটা অনেকটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসায় একটা সংযোগ নেওয়ার মত। কিন্তু সেটা ঐ বিদ্যুৎ কোম্পানির সাথে মালিকানা-বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

কিন্তু ইতালি ইউরোপের বাকি সবার আগে এত গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রধান বস্তুগত স্বার্থের দিক হল – পুরো বেল্ট রোড প্রকল্পে ইউরোপীয় আর এক প্রভাবশালী প্রান্ত বা শেষ মাথা হবে ইতালি। তাতে ইউরোপের যে গভীর সমুদ্রবন্দর বেল্ট রোডের সড়ক ও রেলকে সংযুক্ত করাবে, সেই বন্দর গড়ে উঠবে ইতালিতে। যার মানে হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতা মুসোলিনি, তিনি হিটলারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে – সেই থেকে পিছিয়ে পড়া আর ধুঁকে চলা অর্থনীতির ইতালি এবার সামনের সারিতে চলে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ডাচ রটারডামকে ছাড়িয়ে ইতালি হয়ে উঠবে ইউরোপের হাব [hub] – সড়ক, রেলের সাথে সমুদ্রপথ যুক্ত হওয়ার বড় সংযোগস্থল। সব দিকের সাথে কানেক্টিভিটির এই বিশেষ সুবিধার জন্য ইতালি হয়ে উঠবে বুড়ো শরীরে আবার যৌবনের জোয়ার – ইতালি হবে এখন ইপিজেড-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের হাবও। তাই নিজ বিপুল সম্ভাবনার সামনে এখন থেকে আমেরিকার হাত হালকা করে ধরা আর ইউরোপের অন্যরা – ফ্রান্স, জর্মানি বা ব্রিটেন- এদের সবাইকে টপকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চীনের হাত শক্ত করে জাপটে ধরা হবে ইতালির কাছে খুবই জায়েজ।

কিন্তু তাই বলে জার্মান, ফ্রান্স বা ব্রিটেনকেও চীন বিমুখ করেছে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়। বিস্তারে তা বুঝতে আরেকটা ধারণার সাথে পরিচয় করাতে হবে। “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” [Comprehensive Strategic Partner]’ হলো সেই নতুন শব্দগুচ্ছ – যা চীন একালে ব্যাপক ব্যবহার করছে। বাংলায় “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” – চীন দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে এমন “কৌশলগত মিত্র” হিসেবে পেতে চায়। এটা একটা (বেল্ট রোড) প্রকল্পেই কেবল চীন সবাইকে পেতে চায় তা নয়, বরং আরও এবং সামগ্রিক। আসলে খোদ বেল্ট রোড প্রকল্পটি চীনের একটি কৌশলগত প্রকল্প। কেবল বাণিজ্যিক নয়।

স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বলতে এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অর্থ হল, যা কেবল অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটাই নয়, আরও অনেক কিছু। কী সেটা? অন্তত আপাতত অর্থ হল, আমেরিকাকে বাইরে রেখে বাকিদের নেয়া হয়েছে এমন এক পক্ষজোট- যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি সব (এই অর্থে তা সামগ্রিক) স্বার্থেই এখানে চীনের নেতৃত্বে সকলে আছে। এই অর্থে এটা আমেরিকাকে বাইরে রেখে এক রাষ্ট্রস্বার্থ জোট। আবার এই জোটের কাম্য সদস্যরা মানেই এরা সবাই বড় ক্ষমতার রাষ্ট্র, ঠিক তা নয়। যেমন হাসিনার বাংলাদেশ (অন্তত ঘোষণা মোতাবেক), আমরাও চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ব্যাপারটা আর একটু বিস্তার করতে আরেক দিকে আলো ফেলব।

ক্রাইস্টচার্চ ম্যাসাকার সামলানোর জন্য সদ্য সুখ্যাতি অর্জন করা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা, এ মাসের ১ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে চীনের “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” হয়ে এসেছেন। এমন মিত্র হওয়াতে এর অর্থ বুঝতে হবে এভাবে; নিউজিল্যান্ড বেল্ট রোড প্রকল্পের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হয়েছে ও নিয়েছে। অর্থাৎ চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার না হয়েও কেউ বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও জেসিন্ডা স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হওয়া বেশি লাভজনক মেনেছেন। আর বিপরীতে কেবল বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হলে স্বভাবতই সে ক্ষেত্রে সেটা কেবল “বাণিজ্যিক স্বার্থ” ধরনের সম্পর্ক হত। ফলে চীনের দেয়া অন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সে পেত না। যেমন- কোন রাষ্ট্র যদি কোন কারণে ঋণের কিস্তি শোধ দিতে পারছে না অবস্থায় পড়ে। এমন ক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্র আবার চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হলে চীন ব্যাপারটাকে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখে থেমে থাকবে না। চীন তাকে বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে, বিপদ থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেওয়াসহ সব সাহায্য করবে। চীনের এখনকার সাধারণ নীতি-কৌশল হল সব রাষ্ট্র বা প্রকল্পের সম্পর্ককে সব সময় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা। যদি পার্টনার রাজি থাকে কেবল তখন সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়, কিন্তু চীনের দিক থেকে আগ্রহ জারি থাকে সব ক্ষেত্রে ও সময়ে।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ কেন আনলাম? কারণ, ঠিক এর বিপরীত ঘটনা বা রাষ্ট্র হলো অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রায় সময় একসাথে উচ্চারিত শব্দ। মূল কারণ তারা একইভাবে, একই ভাগ্যে রকই সময়ে ব্রিটেনের কলোনি হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থ ও নীতিগত মিল এক হতে বেশির ভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায়। যদিও চীন না আমেরিকা কোন ক্যাম্পে থাকবে প্রশ্নে তাদের ভিন্নতা দেখা দিল। আর জেসিন্ডা প্রমাণ করলেন অষ্ট্রেলিয়া ভুল করেছে।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই অন্তত ওবামা আমল থেকে,  তবে চাদরের নিচে থেকে আস্তে আস্তে প্রকট হয়ে ভেসে উঠছিল। যা কেবল এ’কালে ট্রাম্পের আমলে এসেই চাদর উঠে গেছে। আর সবচেয়ে বড়ভাবে আরেকবার চাদর উঠেছিল ২০১৫ সালে, চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক – এআইআইবি [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ] গড়ার সময়ে। ওবামা লজ্জার মাথা খেয়ে খোলাখুলি সেই সময়ে এই নতুন ব্যাংক প্রকল্পে যেন এশিয়ার জাপান, কোরিয়া তাইওয়ান বা অস্ট্রেলিয়া (যারা আমেরিকার বহু পুরনো বন্ধু মনে করা হয়) এরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও কেউ যেন যোগ না দেয় এর লক্ষ্যে, কান-পড়া দিয়ে কার বিয়ে ভেঙে দেয়ার মত, করে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও আপত্তিতে ছেয়ে ফেলেছিল। যদিও ফলাফলে আমেরিকার হার হয়েছিল; শেষে প্রায় সব রাষ্ট্রই ওই ব্যাংক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু চীনের নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট আর আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট সেই থেকে প্রায় প্রকাশ্যেই তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এআইআইবি ব্যাংকে সদস্য হয়েও আমেরিকার জোটেই যোগ দিয়েছিল। এছাড়া আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোটে আর সদস্য হয়েছিল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মত রাষ্ট্রগুলো এবং স্বভাবতই আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেয়া ভারত তো ছিল।

এমনকি অস্ট্রেলিয়া আরও একধাপ এগিয়ে নিজের উপকূলে এক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন (২০১৬ সালে চালু হয়) করতে দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় সবাই ধরা খেয়ে যায় ট্রাম্পের আমলে এসে, তাঁর জাতীবাদি ট্রাম্প হয়ে উঠার কারণে। কারণ ট্রাম্পের সারকথা, বিড়াল যেন বলছে আর মাছ খাবো না। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের অর্থনীতিতে রূপান্তর মানে দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক পণ্য বিনিময়ের গ্লোবাল সমাজের দুনিয়া গড়তে নেতৃত্ব দেয়া সেই আমেরিকা, ট্রাম্পের হাতে পড়ে হয়ে গেল অ্যান্টি-গ্লোবাল। এক জাতিবাদি আমেরিকা; আমেরিকা ফাস্টের নীতি চর্চা শুরু করল। ফলে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক জোট মুখ থুবড়ে পড়লেও বিপরীতে চীনেরটা সদর্পে আরও এগিয়ে যেতে সুযোগ পেয়ে যায়। সেটারই স্পষ্ট সফলতা এই প্রথম এখন প্রমাণ হল গত মাসের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর ইউরোপ সফরে। মুখ পোড়ানো অস্ট্রেলিয়ার অতি উৎসাহ যে ভুল ছিল তা যেন আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়ার অকেজো স্ট্র্যাটেজিক জোটের পাল্টা চীনা স্ট্র্যাটেজিক জোটে যোগ দিল।

এদিকে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকেই ইউরোপের জার্মানি – যে ট্রাম্পের “অ্যান্টি-গ্লোবাল” অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পাল্টা সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিল এবং ভোকাল ছিল, সেই জার্মানির সাথেই চীনের সম্পর্ক গভীর হয়ে যায়। চীনা শিল্প-উদ্যোগের যুগ এখন দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যার সারকথা প্রত্যেক ট্রেডকেই হাইটেকে বা উচ্চ প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়া। যেখানে প্রথম পর্যায়টা ছিল বাল্ক উতপাদন করে উতপাদন খরচ নামিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করে ফেলা। তাই এবার হাইটেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে – এখানেই জার্মানির সাথে চীন গভীর পার্টনারশিপ হয়। ব্যাপারটা জার্মানির দিক থেকে দেখলে, চীনের মতো বড় আর ব্যাপক এবং হাইটেকের চাহিদার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাওয়া জার্মানির জন্য তা বিরাট কিছু। সাধারণভাবে হাইটেকে আর বিশেষত গাড়ি তৈরির অটো শিল্পে চীনের মূল পার্টনার এখন জার্মানি।  জার্মানরা বিনিয়োগ নয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। চীনে গত তিন বছরে লাগাতার  জার্মান সংশ্লিষ্টতা ও বিনিয়োগ বেড়ে চলা চলছেই, গ্রোথ রেট ১৪০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্স সফরে এক মূল সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রেসিডেন্ট শিং-এর জর্মান চ্যান্সেলার মার্কেলের সাথে বৈঠকের মিডিয়া রিপোর্ট বলছে [China was Germany’s largest trading partner for a third consecutive year in 2018, with a nearly 140 percent increase in German companies’ actual investment in China, he said.]। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে এই বৈঠক থেকে চীনের সাথে জর্মানির ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে কোন সুর ভেসে আসে নাই। কিন্তু তা সত্বেও চ্যান্সেলার মার্কেল জানাচ্ছেন তিনি ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ফোরামে জার্মানি যোগ দিচ্ছে। [Germany would like to deepen its economic and trade relations with China in the digital age, and is willing to actively participate in the second Belt and Road Forum for International Cooperation, Merkel said.]।

ওদিকে ফ্রান্সের সাথে চীনের সম্পর্ক আর এক মাত্রায় হাজির। এবার প্রেসিডেন্ট শি-এর সফরে ইতালির বাইরে আরেক গুরুত্বের সফরের জায়গা ছিল ফ্রান্স। এই সফরে যত না চীনের খুশির, এর চেয়ে বড় খুশি প্যারিসের, সে গদগদ। মূল কারণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ফরাসি পণ্য-ক্রয়ের চুক্তি।  চীন, আমেরিকার বোয়িংয়ের চলতি খারাপ সময়ে ইউরোপের ফ্রান্সের বড় শেয়ারের (চীনে অবস্থিত ফ্যাক্টরি থেকে) এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, জার্মান ও ফ্রান্স চীনের পক্ষে কৌশলগত জোটের প্রত্যক্ষ পার্টনার না হলেও তারা ঘনিষ্ঠ; অন্তত তারা আমেরিকার জোটের নয়।

ইউরোপের চার কুতুবকে নিয়ে কথা বলতে এবার বাকি থাকল বৃটেন। ব্রিটেন এত বাছবিচার না রেখে খোলাখুলি বেল্ট রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে লম্বা পরিকল্পনা নিয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় হংকং ব্যাংকের এক সাবেক চেয়ারম্যান ডগলাস ফ্লিন্টকে বিশেষ দুত ও প্রধান করে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে এ লক্ষ্যে কাজ ও পরিকল্পনা শুরু করতে।[Sir Douglas Flint, who was appointed as the Special Envoy to BRI of the British Treasury in December 2017]। ফ্লিন্ট জানাচ্ছেন, The Belt and Road Initiative (BRI) “is a real opportunity” to strengthen UK-China cooperation। বেল্ট রোড সামিট টু ব্রিটেনের জন্য এক বিরাট সুযোগ বলে ডগলাস ফ্লিন্ট প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন।

তাই এককথায় বললে, চলতি এপ্রিলের ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ থেকে এর ওলটপালট ঝড় আসন্ন হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনের আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তা আর এক ধাপ উঠে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ?
বেল্ট-রোড প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান সরাসরি বিরোধিতার। গত ২০১৭ সালের সামিটের দাওয়াত তাই সরাসরি প্রত্যাখান করেছিল। আর বাংলাদেশ গত ২০১৭ সালে বেল্ট রোড সামিট-ওয়ানের সময় ভারতের মন রক্ষা করতে বাংলাদেশ লো-প্রোফাইলে থেকেছিল।  তবে বেল্ট রোড প্রকল্পে চীনের সাথে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত লুকাতেও চায়নি বা পারেনি। বরং অক্টোবর ২০১৭ সালে ভারতকে বুঝিয়ে রাজি করার এক  উদ্যোগ নিয়েছিল যে ভারত যেন আমাদেরকে এই সম্পর্কে যেতে আপত্তি না করে বা ভালভাবে নেয় – তা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। বরং আমাদের পররাষ্ট্র সচিবকে একাজে ভারতে পাঠানোয় উলটা ভারতের সাথে আমাদের অবস্থান-ভিন্নতা আরো প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। আজ দুবছর পরে এই ইস্যুটা এখন যে  অবস্থায় চলে গেছে তাতে এখন  ভারতের মুখ চেয়ে স্থবির হয়ে থাকা যাবে সে জায়গাতেও আর নেই। মূল কারণ বটম লাইনটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বেল্ট-রোড প্রকল্পে হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে

মূল প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীনের (কুনমিং প্রদেশে) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে কী না? যেখানে কলকাতাও বাংলাদেশ হয়ে যুক্ত থাকবে। এটাই বিসিআইএম (BCIM যা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর) প্রকল্প। তবে এই প্রকল্পের আর এক অনুষঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। আসলে উলটা – মূলত এই গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করেই এই চার দেশের ঐ অঞ্চলটার মূলত ল্যান্ড লকড দশায়; তাই সে অবস্থা ছুটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ল্যান্ড লক কথাটা আমাদের বন্দর আছে কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর নাই – এই অর্থে বুঝতে হবে। বাস্তবে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজের বন্দর, যার কানেকটিং গভীর সমুদ্র বন্দরটা সিঙ্গাপুরে। তাই চার দেশের এই বদ্ধ অঞ্চল – এটাকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে উন্মুক্ত করাটাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে সোনাদিয়া ছাড়াই কেবল রেল ও সড়কের BCIM প্রকল্পের আওয়াজ উঠতে উঠতে এখন সেই প্রকল্পের সব কিছুই মুখ থুবড়ে গায়েব। কেন?

ভারতের যুক্তি চীন BCIM প্রকল্পকে এখন বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত করতে চায়। অবশ্যই চায়। বাংলাদেশও চায়। আর প্রশ্নটায় এখন তখনের কিছু নাই। বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য এটা খুবই জরুরি যে আমরা আন্তঃমহাদেশীয় প্রকল্প বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত থাকি। তাই BCIM প্রকল্প যুক্ত থাকুক – এটাই তো আমাদের স্বার্থ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হাতে গুনে মনে রাখতে হবে – হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে বেল্ট-রোডে জড়িয়ে না থাকে বা থাকতে না পারে তবে আমাদেরকে আজন্ম এর কাফফারা দিতে থাকতে হবে। আর ভারতের এখন-তখনের যুক্তির পালটা কথাটা হল, BCIM প্রকল্পের মূল আইডিয়ায় সোনাদিয়া বন্দর ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সেটাই বা বাদ দেয়া হয়েছিল কেন? কেন হাসিনার ২০১৪ সালের চীন সফরের কালে সোনাদিয়া বন্দর চুক্তিতে বাধা দেয়া হয়েছিল?

ভারত যদি মনে করে আর চায় তাহলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত না হয়ে এই প্রকল্প হবে না। নো প্রবলেম। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে ঢাকা-বার্মা-কুনমিং হবে অর্থাৎ BCM প্রকল্প হবে অসুবিধা কী! আর এই প্রকল্পের কেন্দ্র সোনাদিয়া বন্দরও একই সাথে।  সেইসাথে বেল্ট-রোড প্রকল্পেও BCM -এটাও অবশ্যই যুক্ত থাকবে। কিন্তু   ভারতের এতে আপত্তি বা  একমত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ভারতের অবস্থানটা হল  – সে  নিজে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে বেল্ট-রোডসহ কোন প্রকল্পই সে হতে দিবে না।

কেন? কারণ চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্প  সম্পন্ন হতে দিলে আর তাতে ভারত জড়িয়ে থাকলে  তাতে চীন বহু আগিয়ে যাবে আর ভারত চীনের অধীনস্ত হয়ে যাবে। তা হতেও পারে, অসম্ভব না। কারণ ব্যাপারটা মুরোদের – সক্ষমতা ও যোগ্যতার। ভারতের মুরোদ না থাকলে তার বা কারও কী আর করার আছে? কিন্তু তাই বলে, কান-পড়া দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার মত  ভারত কূট-ষড়যন্ত্রের পথ ধরবে? যেটা কোন কাজের কথা নয়।  নাকি গঠনমূলকভাবে, ভারত চীনের এখনকার সহযোগিতাগুলো কাজে লাগানো আর নিজের মুরোদ অর্জন করা্র দিকে যাবে? যাতে কোন একদিন চীনকেও ভারত ছাড়িয়ে যেতে পারে! আজকের চীনের অবস্থাই কী এর প্রমাণ নয়। এককালে আমেরিকার সাহায্য নিয়েই কী আজ চীন এজায়গায় নয়? তাতে সে কী এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে না!

এভাবে  ভারতের মুরোদ অর্জন বিকল্প কূট-ষড়যন্ত্রের পথ – এটা কখনই নয় হতে পারে না। এমনকি ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা তো নয়ই! পাকিস্তান কাশ্মীরের উপর দিয়ে বেল্ট-রোডের মূল বা পাকিস্তান করিডোর গিয়েছে – ভারতের এটা ফর্মাল আপত্তির যুক্তি। সেটাও আসলে খাটে না। কারণ পাকিস্তান অংশসহ পুরা কাশ্মীর ভারতের কী না এটা তো কোন বিতর্কই নয়। কারণ, বিতর্ক হল সারা কাশ্মীরিরা কীভাবে কার হাতে শাসিত হতে তারা সম্মত হবে? ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে শাসিত হবে নাকি নিজেরাই আলাদা হবে?  এরপরেই কেবল, পুরা কাশ্মীর ভারতের হবে কীংবা হবে না তা তখন মীমাংসিত হতে পারে। এর আগে কোন কাশ্মীরই ভারতের নয়, কেউ না।

অতএব ঈর্ষা বা প্রতিহিংসাবশত  বেল্ট-রোডে যোগ না দেওয়ার ভারতের কোন বিদেশনীতি যদি হাজির থাকে তবে তা ভারতেরই থাক। তা আমাদের তো নয়ই, আমাদের দায়ও নয়। তাই আমরা কী করব তা ভারতকে জিজ্ঞাসারও কিছু নাই। আমাদের স্বার্থ, আমাদের ভাল-মন্দ ক্ষতি সব আমাদেরই বইতে হবে। যদিও এব্যাপারে বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বশেষ কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে আমাদের নির্বাচন পরবর্তি সময়কালে।

এ বছর আমাদের নির্বাচনের পরে আমরা দেখেছিলাম, কারও পরোয়াহীন এক  চীনা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন। আর বিশেষ করে সিএনএন-নিউজ১৮ (CNN-NEWS18) নামে ভারতীয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই বোল্ড ছিল। এবং তা এক স্থির সিদ্ধান্তের প্রকাশ দেখিয়ে ফেলেছিল যে, সোনাদিয়া বন্দরসহ বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে হাসিনা সরকার আর থামবে না। এমনকি ওই সাক্ষাৎকার আসলে খোদ ভারতকেই চীনের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে আহ্বান রাখা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের আলো অনুসরণে চিন্তা করলে মনে হয়, এবারের এপ্রিলে বেল্ট রোড সামিট টু-তে চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা দেখব।

কিন্তু এর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, ভারতে এখন রুটিন সরকার; মানে মোদীসহ রাজনৈতিক নেতাদের সময় নেই এনিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার। এর চেয়ে নিজ নিজ এলাকায় মাঠের নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করা তাদের এখন প্রায়োরিটি, একমাত্র কাজ। আগামী মাসে ২৩ মের আগে ভারতে সরকারে কে আসবে, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তা জানার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় এক কথায় বললে, ভারতের নিজের বেল্ট রোড সামিট টু-এর পক্ষে কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশকে এবারো কি তারা ঠেকাতে পারবে?

ঠেকাতে ২০১৭ সালে আগেরবারই পারেনি। ফলে এবারো পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে, সাক্ষাৎকার দিয়ে বলা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দিক থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা। যদি তা আমরা না দেখতে পাই, তবে বুঝতে হবে সরকার আবার আপস করল। সেটা হবে বাংলাদেশের প্রবল সব সম্ভাবনাগুলোর মাথা মুড়িয়ে ফেলে রাখা আর পিটিয়ে কাউকে খাটো বামন বানিয়ে রাখার মতই একটা কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৬ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

গৌতম দাস

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2xv

সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তারা ভারতের পক্ষ হয়ে হাসিনাকে তোয়াজ করতে, মন গলাতে এক আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনাম হল, “বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”

তাতে মনে হয়েছে বিবিসি যেন শেখ হাসিনা সরকারের এক কড়া সমালোচক – এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, যেন এমন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা বিবিসির এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমরা দেখে চলেছি যখন আমাদের প্রায় সব মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে হঠাৎ করে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে এবার তারা উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার বাড়তি আর একটা দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মূলত ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব বিবিসি নিয়েছে। তাই কয়েকদিন আগে ২৯ জানুয়ারি ঐ রিপোর্ট তারা ছেপেছে।

দেখা গেছে, মূলত ভারত “বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে” এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

এটা যেন এক অর্ডার দেয়া রিপোর্ট, এমন মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হল, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের “শক্ত রিজার্ভেশন” বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে ভারতের থেকে যেন খেপ নিয়েছে বিবিসি। বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগেই ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এর ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হল যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।

কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন? এটাই সেই তাতপর্যপুর্ণ প্রশ্ন।

আমরা ইতোমধ্যে সবাই কমবেশি জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম কিছু বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ভারতও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। আর  ৯৭% আসন নিয়ে বিজয়ী হাসিনার ভয়ে ভারত এখন সেটাই প্রবল অস্বীকার করতেই বিবিসি দিয়ে করিয়েছে এই রিপোর্ট। যদিও বিএনপির দিক থেকে বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা পাঠানো প্রতিনিধিদের নাদান পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন তারা। অথবা সময়ে কখনও তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে আগোনোতে বা কথা বলাতে সেটা ভুল হয়েছে বা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে – এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। অনেক সময় ক্রিটিক্যাল প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

যদিও খেয়াল রাখতে হয় যে আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ আগেই টেনে নিয়ে একাজে নামতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ পেশাদার লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এমন সব ক্ষেত্রেই বিএনপির মারাত্মক কিছু ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া ভারতের সাথে এই আলাপে বিএনপির দিক থেকে মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের কাছে স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছিল বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। ব্যাপারটা যেন হাতি হয়ে আয়েশে বসে নত বিএনপির সালাম নেয়ার সময় তাদের। যেন তারা বুঝাতে চাইছে, বাংলাদেশে ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ ভারতের জন্য সঠিক প্রতিক্রিয়া বলে তারা মনে করেছে। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, “বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!”। অথচ তখন নিজেই বুঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনায় আমরা পরে আবার আসব। তবে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, “শো আপ” অংশ এটা।

আসলে ভেতরে রূপটা ছিল খুবই উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, কোনদিকে যায় কী ফল আনে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হল – তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট। এসংক্রান্ত বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল,”এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না”, “আওয়ামী লীগ খারাপভাবে হারবে”। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এককথায় তারা দেখছিল হাসিনার “পাবলিক রেটিং” খুবই শোচনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা যে তারা কী এজন্য নতুন করণীয় পদক্ষেপ ঠিক ভাবে নয়েছে? নাকি তা করতে পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ রেটিং” খুবই শোচনীয় হলে তো হাত ছেড়ে দিতে হবে; নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে……ইত্যাদি। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছিলাম – বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে। আর এগুলো তারা করেছিল আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন এই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে হাত সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে বিএনপির সাথে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন যাতে, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়। যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে তখন শুরু না করতে হয়। অথবা, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য “জয়ী নায়ক বিএনপির” ভারতের কাছে একেবারেই অপরিচিত বলে না হাজির হয়, বা ভারতকে “সেই” বিএনপির পেছনে ঘুরতে না হয়।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে তাদেরকে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়, আরও কিছু দিক আছে। যেমন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি,  ভারতকে হাসিনার “দেয়ার ভাণ্ডার সব খুলে ধরা” সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে হাসিনার পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং উলটা; অর্থাৎ মোদীর ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল; যার সোজা মানে হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত তখন স্বীকার করেছিল।

কিন্তু পরবর্তিতে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক নেয়া। ভারত সেই রিস্কটাই নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত নিতে ভারত উদ্বিপ্ত হয়েছিল কারণ রেটিং সম্পর্কে ভারতের নিজেদের গোয়েন্ডা অনুসন্ধান রিপোর্ট। অথচ নির্বাচনের পরে ফলাফল পেয়ে ভারত দেখেছিল আসলে বাস্তবেই বিরাট রিস্ক নেওয়াই হয়েছে। কোন অনুমান ফলে নাই।

আবার, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার “সুজাতা স্টান্ডার্ড” তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন হাসিনার সেই তাতপর্যপুর্ণ  মন্তব্য “আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি দেশটিকে তা সারা জীবন মনে রাখতে হবে” আমরা স্মরণে রাখতে পারি। হাসিনা কথাটা বলেছিলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলকে (বর্তমানে ২১শে টিভির সিইও) দিয়ে করানো এক প্রশ্নের জবাবে।

মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার নিজ গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। কিন্তু তাহলে ভারত কোথায় পরাজিত হয়েছিল? যেসব অনুমানের উপর ভারতের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণ দাড়িয়েছিল এর একটা না ঘটলে কী হবে অথবা তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে – এটা হতেই পারে না ধরে নেয়া হয়েছিল। আর তাই হয়েছিল। মানুষ তো ভোট দিবেই। তাই “যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- ভারতেই সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে। সেটা ধরে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, ধরে নেয়া যায় এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই ভারতের কোন অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, গোয়েন্দারা এমন তথ্য জেনে পাথর (stunned by the outcome) হয়ে গেছিলেন। আর খুব সম্ভবত তা, ভোটের মাত্র চারদিন আগে।

মানে তাদের কোন অনুমানও ছিল না যে,  মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা অনুমান-বিশ্লেষণ মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হল, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা গভীর নির্ভরতা / নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল – ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে সহজেই অনুমান করা যায়। পিনাক রঞ্জন সেখানে লিখেছিলেন, “… ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে”। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোন আশা-ভরসা দেখেন নাই না রাখেন নাই।

তাই ভারত হাসিনার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে পিনাক রঞ্জন লিখেছেন। সেই কারণে আরও সাহস দেখিয়ে আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” অভিযোগ, “হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের” [সবচেয়ে মজার অভিযোগ ছিল এটা] অভিযোগের মত মারাত্মক বিষয়গুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হল, পিনাক অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা  “গুলি করে হত্যার” নীতি নিয়েছেন। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন, বলেছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর লেখার শেষের বাক্য আরও মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, “শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তাঁর প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’। অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং অংশটা হল, সবশেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের একটা হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন পিনাক রঞ্জন। তিনি হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। তিনিই ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে একসেস রাখেন এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ [ORF] এর ফেলো।

আগেই বলেছি, ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট তাদেরকে এভাবে পরিচালিত করেছে। আর রিপোর্ট হয়ত ভুল ছিল না। কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’ এই তথ্য বা অনুমান তাদের ছিলই নয়া। এজন্যই তারা পরাজিত হন। এছাড়া আর এক বিষয় তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

বিএনপিকে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠনঃ এর গঠনের সাথে সাথে এর খুবই দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, “নির্বাচনের আগে থেকে ক্ষমতাসীন হাসিনার পতন আসন্ন” ধরনের একচোখের অনুমান ভারতকে শেষে করে দেয়। এতে বড় বিভ্রান্তিতে পড়ে এবার ভারত সব হারানোর দিকে আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

তাই বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের “দিন খারাপ যাওয়া” শুরু হয়েছে, বলা যায়। “চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়”। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের আগের দিন -এর  মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- এটা ছিল “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব” তৈরির শুরু। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছি।

আরও লক্ষণীয় হল, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক (যারা ভারতের সরকারি অবস্থান অনুসরণ করে চলেন) জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও আমারই এক আগের লেখায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সকলেই বাংলাদেশে চীনের ততপরতা ও ঘনিষ্ঠতা বাকাচোখে দেখত। চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়াকে, ভীষণ নেতিবাচক উপস্থাপন করে এই বিষয়গুলোকে দেখতেন। তাদের সকলেরই কল্পিত এক ভারতের “এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্স” বলে এক এলাকা ছিল। আর বাংলাদেশ হল সেই এরিয়ার অন্তর্গত সুতরাং বাংলাদেশে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন উদ্ভট তালুকদারি-দাবি তাদের থাকত। তাঁরা বোঝাতে চাইতেন এখানে ভারত ছাড়া অন্য কারও ঢুকা – এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী – এ্মন “গাঁয়ে মানে না” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা লিখে চলতেন। অথচ এখন তারা ভোল বদলিয়ে ফেলেছেন।  শ্রীরাধা [VIF] এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন – “চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না… তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়”।  [Interestingly, both India and China have viewed Bangladesh not only through the prism of bilateralism but also amidst the landscape of the growing regional framework] অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তাঁরা এখন কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন “তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে”। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?

বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মত নয় বড়জোর সাথে ভারতও আছে হয়ত কিন্তু তা আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার এক দুরবস্থা শুরু হয়ে গেছে যার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির এই রিপোর্ট।

এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখটা এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিকটা দেখবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে চীন সফরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন নাই। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখের দিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ৬৫ এর বেশি রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এই গ্রান্ড প্রকল্পে বাংলাদেশেরও অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে সেসময় অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্বাচনে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ডে” ভারতের সমর্থনের মাশুল ভারত সেবার উসুল করেছিল এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি না হতে হাসিনাকে রাজি করিয়ে। এছাড়া পরে ভারত আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু এবারের ২০১৮ নির্বাচনে? এই লেখায় আগেই বলেছি “ছয় দিনের” কথা। আমাদের নির্বাচনের পরবর্তীতে হাসিনার একদম খাড়া পদক্ষেপ হল , গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে [CNN-NEWS18] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

[CNN-NEWS18] এটা আমেরিকার CNN এর সাথে ভারতের Network 18 এর জয়েন্ট ভেঞ্চার, ভারতের এক টিভি মিডিয়া।

আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে হাসিনা ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে আর আগান নাই, এখন সেখান থেকেই আবার উদ্যোগ নিয়া তিনি সেই “খাতিরদারির” সমাপ্তি টানছেন। এই খাতিরদারি তার নড়বড়ে অ-অভিষিক্ত ক্ষমতার খামতি পূরণের দিক থেকে এসেনশিয়াল – এমন এক ধারণা তাঁর ভিতরে কাজ করে বলে মনে হয়। যেটা খুব সম্ভবত সমাপ্ত এখন। হাসিনার ঐ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপিয়েছে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া । দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়ে লেখা সে রিপোর্ট। যার ভাষ্য হল, “ভারতকে হাসিনা তাঁর “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন”। অর্থাৎ এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে হাসিনা এতদিন নিজ দেশের স্বার্থ বলি দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এখন হাসিনা নিজ দেশের স্বার্থকে আর পিছনে ফেলতে রাজি না – এটা বুঝাতে চেয়ে বিবিসি লিখেছে – “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই ……। কথা ঠিক; এবার দরকার হলে ভারতের বিরুদ্ধে তিনি যাবেন, রাজি আছেন। কারণ এবার “বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তির”  ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন, “বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে”। আসলে এই প্রস্তাবটা মূলত চীনের।  গত ২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মত  BRI (“Belt and Road Initiative”) সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করতে ভারতকে চীনের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই প্রথম ভারত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান আপত্তি তুলে ধরেছিল। আর তখন থেকেই চীনের প্রস্তাব হল, আসেন “কথা বলে” নিগোশিয়েট করি। চীনের সেই কথা বলার প্রস্তাবই এবার সাহসের সাথে হাসিনা ভারতের মুখের উপর ছুড়ে দিল। বা বলতে পারি, হাসিনা বুঝিয়ে দিল যে তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। এবার আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থনের মত ভারতের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত নিবার কোন দায় হাসিনার নাই। তি এবার সমর্থন পান নাও অথবা নেন নাই – তাই। তাই মন শক্ত বেঁধে তিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ঢুকে পড়বেন। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক [Bangla-China Relation] নতুন মাত্রায় উত্থিত হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে  বেল্ট-রোড প্রকল্প বলতে বুঝতে হবে – সোনাদিয়া বন্দর সহ, সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীন যাওয়ার অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্প এমনকি এর বাইরেরও চীনের সাথে বাংলাদেশের সব প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ পরোনা করে উপেক্ষায় হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাবে এখন। [ সাক্ষাতকারের YOUTUBE LINK এখানে]  ঐ সাক্ষাতকারে হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ – ইঙ্গিত দিয়েছে হাসিনা এবার জানেন তিনি পিছনে ফিরবেন না। খুব সম্ভবত – ভারতের মুখ চেয়ে চলার দিন ঘুরে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে – এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তিনি পথ চলতে শুরু করেছেন। মুখ চেয়ে চলায় তিনি কত ডেস্পারেট ছিলেন তা বুঝতে আমরা মনে রাখতে পারি – তিতাস নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ভরাট করে তিনি ত্রিপুরায় লং-হুইল ট্রাকে মালামাল কনটেইনার চলাচলের রাস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীটা এখন মরেই গেছে, ধান চাষাবাদ হয়েছে এবার।    

এখন এই “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ” হাসিনাকে নিয়ে ভারত কী করবে? কোথায় রাখবে? প্রথমত, কোন বিশেষ গায়েবি চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে বেল্ট-রোড বা এর সংশ্লিষ্ট কোন কিছু মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। বরং চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কান্থা [Ashok K Kantha] (যিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভোকাল) এখন অবসরে ভারতে বসেই “চীনা স্টাডিজ” থিঙ্কট্যাঙ্ক খুলেছেন। তিনি আগে আমাদের যা জানিয়েছিলেন ওর সারকথাটা ছিল – “বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার চীনে দাওয়াত এটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সম্ভব না কারণ, তাতে ভারত চিরদিনের মত চীনের পিছনে পড়ে যাবে”। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের কী চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, উপরে থাকা সম্ভব – সে মুরোদ কী আছে? না কী এটা অসক্ষমতার কোন “ফ্যান্টাসি আকাঙ্খা” – এনিয়ে কোন কথা জানা যায় নাই। তবে  নিশ্চয় এখন বেল্ট-রোড প্রকল্প বিরোধী আরও শক্ত যুক্তি আছে তাঁদের কাছে।  অতএব এর সোজা মানে হল, ভারতের পক্ষে আগের মত হাসিনার ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে ট্রিটেড বা আলগা খাতিরের লোক হতে চাইলে হাসিনার পরামর্শ মেনে ভারতকেই এখন বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর তা নইলে, ভারতকে কেবল চীন নয়, ঢাকার হাসিনা সরকারেরও বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান ও পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মাঠে হাজির হতে হবে! যেভাবে নির্বাচনের পরে মাত্র ২২ দিনের মাথায় আমরা হাসিনাকে CNN-NEWS18 সাক্ষাতকার দেখেছি তাতে – অচিরেই ভারতকে কী এমন নতুন অবস্থানে দেখব আমরা?

তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য আর আরামের “শান্তি নাই”; বরং এক ব্যাপক উদ্বিগ্নতা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, যেটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সময়গুলোতে কোন দেশের বেলার মত বাংলাদেশ সরকারপ্রধানেরও স্বাভাবিক ঝোঁক হয় – এখন ক্রমেই তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বা বলা যায়,মূল কারণ পরিস্থিতি এখন তার অনুকূলে।  ওদিকে ভারতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে খুবই করুণ। যেন সেই করুণ দশা বলেই সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য ভারতের মোদীর নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির বিরুদ্ধে কিছুটা বিষোদগার করে হাসিনার মন গলাতে চাইছেন । তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। ভারত এখন বিএনপিকে মুখরোচক তবে অর্থহীন ইস্যু ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা  – হঠাত করে শর্ত হিসেবে খাড়া করছেন। অথচ ভারতের এটা করার বেস্ট সময় ছিল নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ভারত সফরে-লবিতে ছিল তখন তুলে ধরা। অথচ এখন ভারত বলছে বিএনপি  ‘জামায়াত ছাড়া’ না হলে এখন বলছে, না হলে সম্পর্ক হবে না – এমন ভাব ধরছেন।  যার সোজা মানে ভারত পথ হারিয়েছে। এটা তার মুখরক্ষা ততপরতা; সে সিরিয়াস নয়। অথচ বিপরীতে ইতোমধ্যে বিএনপিই ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে  এখন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করতে ফিরে যাবে বিএনপি। এটাই কী স্বাভাবিক নয়!

আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফা ইস্যু ইত্যাদিতে বাংলাদেশের হাসিনার সহায়তার যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু না, সেসব আর এখন মুখ্য নয়, হিসেবে থাকছে না। বরং চীনের সাথে  হাসিনা সরকারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলেও সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে এখন বড় ইস্যু। ভারতের জন্য কঠিনতম বিপদ এখানেই।

বিশেষত, গভীর সমস্যার দিকটা হল, ভারতের জন্য সময় এখন উলটা হাসিনাকে তুষ্ট করার, মন পাবার। কিন্তু ঘটনা হল, হাসিনাকে তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসির এসব তুচ্ছ রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে হাসিনা-বিরোধীতার রাজনীতি ও অবস্থানে  উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

গৌতম দাস

২৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১৩

https://wp.me/p1sCvy-2vc

Paro locals question project DANTAK welcome sign, kuenselonline

ভুটানের পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে, দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি বা DNT) – এই দল বিজয়ী হয়েছে। এই দলের নেতা মেডিক্যাল ডাক্তার লোটে শেরিং প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
গত ১৮ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হওয়া এটা ছিল ভুটানের দ্বিতীয় ও শেষ রাউন্ডের নির্বাচন। ভুটানের কনষ্টিটিউশন অনুসারে এর নির্বাচন পদ্ধতি দুই স্তরে সম্পন্ন হতে হয়। প্রথম পর্বের সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় দলকে নিয়ে আবার নির্বাচনে নির্ধারিত হয় কে বিজয়ী বা কোন দল ক্ষমতাসীন হবে। এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে আমরা জেনেছিলাম ক্ষমতাসীন পিডিপি শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছে। ‘শোচনীয়’ বলা হচ্ছে এ জন্য যে, প্রথম পর্বের ফলাফলেই পিডিপি তৃতীয় অবস্থানে চলে যায়। প্রথম রাউন্ডেই তৃতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া দলের আর দ্বিতীয় রাউন্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।
ভুটানের মোট জনসংখ্যা প্রায় আট লাখ, যার মধ্যে এবারের ভোটদানে যোগ্য ভোটার ছিল প্রায় তিন লাখ। প্রথম রাউন্ডে এমন মোট ভোটগুলা প্রধান তিন দলের মধ্যে ভাগ হয়েছিল এভাবে – দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি) ৯২ হাজার ৭২২ ভোট, দ্রুক ফুয়েনসাম শোগপা (ডিপিটি) ৯০ হাজার ২০ ভোট আর পিউপুলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) ৭৯ হাজার ৮৮৩ ভোট। তৃতীয় হওয়ায় ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যায়। আর প্রথম রাউন্ডে প্রথম হয়েছিল ডিএনটি; সেই দলটি এবার শেষ রাউন্ডের নির্বাচনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। ভুটানের পার্লামেন্টে মোট আসন ৪৭। এর মধ্যেই ডা: লোটে শেরিংয়ের বিজয়ী দল ডিএনটি, এরা পায় ৩০টি আসন, আর বিরোধী ডিপিটি পায় ১৭টি। ইতোমধ্যে এটাও নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশ থেকে পাস করে যাওয়া ডাক্তার শেরিং-ই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।

কিন্তু ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে গেছে  এই কথার লেজ ধরে  নতুন ইঙ্গিত কী এই যে, তাহলে এখন এর বদলে হবু ক্ষমতার দল যেটা আসছে সে চীনমুখী? না, তা নয়। মজার কথা হল, তা কেউ বলছে না। এমনকি আগ্রাসী আচরণের কোনো ভারতীয় ব্যক্তি বা মিডিয়াও এ কথা বলছেন না। যেমন ভারতের সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক, [বিদেশি পয়সার এনজিও নয়, নিজ ব্যবসায়ীদের পয়সায় চলা দাতব্য প্রতিষ্টান (ORF), Observer Research Foundation] ওআরএফ। এর এক ফেলো মনোজ যোশির এই প্রসঙ্গে তাঁর লেখার শিরোনাম লিখেছেন, “ভুটানের হবু সরকারের ভারতের প্রতি মনোভাব অস্পষ্ট। এটা ভারতের উদ্বেগের কারণ হতে পারে”। [New Bhutan government’s attitude towards India is not clear, this should worry India]।

একথা আবার তিনি লিখেছেন আগ্রাসী নয় বরং দুঃখ করার মুডে। তার এই পুরা লেখাটাই এক হারুপার্টি বা পরাজিতের ভঙ্গিতে লেখা, আর একটা ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিতে তো বটেই। প্রথমেই নিজেদেরকে আত্মদোষী করে বলছেন, ‘ভুটানের নির্বাচন ভারতের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অথচ ভারতের মিডিয়া সেটা আমল করতে পারেনি। এ থেকে, পড়শির প্রতি আমরা কেমন গুরুত্ব দেই আমাদের সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন এটা”।

হারুপার্টি বা পরাজিত কথাটা এখানে আক্ষরিক অর্থেই বলা হয়েছে। কারণ ঘটনা হল, গত ২০১৩ সালের ভুটানের নির্বাচনের আগের দিন ততকালীন মনমোহন সরকার ভুটানে ভারতের সরবরাহ করা তেল গ্যাস জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সেবার এতে ভারতমুখি দল পিডিপির জয়লাভ আর প্রতিদ্বন্দ্বি ডিপিটি দলের হারের কারণ মনে করা হয়। আর ডিপিটি দলের উপর ভারতের এমন বিরাগ ও সাজা দিবার কারণ তার নেতা ২০১২ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাত করেছিল। তাই ভর্তুকি প্রত্যাহার করে যেন এটা বুঝাতে যে ভারতের কত ক্ষমতা বা ভারতের ইচ্ছার দাম কত, তাই তা ভুটানিজদের কতটা গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে হবে। এদিকে প্রায় এমন একই ঘটনা, তবে আরো ভয়াবহভাবে ঘটেছিল নেপালে; ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোদী সরকারের সিদ্ধান্তে। ভারতের অপছন্দকে আমলে না নিয়ে নেপাল তার নতুন কনষ্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ায়, ভারত জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ সব পণ্যের ভারতের উপর দিয়ে নেপালে আমদানির সব সড়ক ভারত অবরোধ করে রেখেছিল দীর্ঘ ছয়মাস ধরে। নেপাল ও ভুটানকে মূলত ভারতের ওপর দিয়ে বাইরে বের হতে হয়, এমন ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। আর এর সুযোগ নিয়ে নেহরু ১৯৪৯-৫০ সালে এ দুই রাষ্ট্রকে আলাদা দুই কলোনি সম্পর্কের চুক্তিতে বেঁধে ফেলে। যার সার কথা হল, নেপাল বা ভুটান দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সব সুযোগ এককভাবে ভারতকে দিতে হবে।
যেমন – নেপাল বা ভুটান তাদের উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারত ছাড়া তৃতীয় আর কোনো বিদেশী রাষ্ট্রে বিক্রি করা যাবে না; অথবা ভারতীয় কোম্পানির মাধ্যমে তৃতীয় রাষ্ট্রে বিক্রি করতে হবে, নিজে পারবে না। ভৌগলিকভাবে উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত বলে ঐ উচ্চতার পাহাড়ি নদী বা পানি ঢলকে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে খুব সহজেই পানি-বিদ্যুৎ উতপাদন করা যায়। আর পানিবিদ্যুত বলে এর উতপাদন খরচ সবচেয়ে কম, ২৫-৫০ পয়সা প্রতি ইউনিট। তাই বিদেশি মুদ্রা আয়ের এই বড় উৎস পানিবিদ্যুত হলেও ভারতের একচেটিয়া আর অযাচিত আধিপত্যের কারণে এর সুফল নেপাল বা ভুটানের ঘরে ঠিকমত উঠে না। আর আসলে এই লুটে নেয়া সুবিধার কিঞ্চিত ফেরৎ হিসাবে (তথাকথিত রেসিপ্রোকাল, reciprocal) ভূটানে জ্বালানি তেল ও সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ ভারতের অভ্যন্তরীণ দরে ভর্তুকিতে ভারত দিয়ে আসছিল। ভারত এটা দেয়, যাতে ভুটানে ঋণ ও বিনিয়োগ নিয়ে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে হাজির হতে না দেয়া যায়। ব্যবসা কেবল নিজের হাতে আর প্রভাবে বজায় থাকে। এই ঘটনাটার সবচেয়ে বেশি প্রতিফলন দেখতে পাব আমরা যে, ভুটানের ঋণগ্রস্ততা এখন বিশাল আর এর পরিমাণ ভুটানের জিডিপির ১১৮%। আর এই মোট ঋণের ৬৪% এর দাতা, ঋণ-মহাজন হল ভারত। ভুটানের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস পানিবিদ্যুৎ। তাই ভুটানের অর্থনৈতিক নুয়ে পড়া দশার বড় উৎস এখানেই।  ভারতের কাছে নেয়া ও পরিশোধ না হওয়া বৈদেশিক (মূলত পানিবিদ্যুতের জন্য) ঋণ ব্যাপারটা এত ভয়াবহ যায়গায় পৌচেছে যে ভারতের প্রাচীন পত্রিকার  দ্যা হিন্দু  বৈদেশিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার লিখছেন, ভারত যদি কিছু না করে তবে খোদ ভারতই এবার ভুটানকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলার পরিকল্পনা আটছে বলা হবে; যে অভিযোগের প্রপাগান্ডা ভারত এতদিন চীনের বিরুদ্ধে করে আসছে।   [……And unless India finds ways to help, it will be accused of the same sort of “debt-trapping” that China is accused of today.]

কিন্তু পালটা সুযোগ ভুটানের দোরগোড়ায় সম্ভবত টোকা দিচ্ছে। ভারতের দিক থেকে ভুটানকে এভাবে বেঁধে রাখা, এটাই একালে ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। এর প্রধান অবজেকটিভ কারণ মানে ভারত চাইলেও ঠেকিয়ে রাখতে পারে না এমন কারণ হল, চীনের কাছ থেকে আমাদের মত দেশের ঋণ বা বিনিয়োগপ্রাপ্তি সহজলভ্য হয়ে গেছে একালে; তাই “আমার বাড়ির পিছন বাগানে (মানে পড়শি দেশে) অন্যকে ঢুকতে দেবো না” বলে অক্ষম ভারতের প্রবল নাকিকান্না দেখছি আমরা।

কিন্তু এবিষয়টা ভারতের বদলে চীন মানে চীন “ভাল” আর ভারত ‘খারাপ’ – অতএব এখন আমাদের সবাইকে চীন-ভক্ত হয়ে যেতে হবে, এখন চীনের পক্ষে ঢোল পিটাতে হবে – এমন ভাড়ামো বা দালালির বিষয় নয় একেবারেই। বরং একচেটিয়া ভারত ভুটানে ব্যবসা ও বিনিয়োগের একমাত্র উৎস হয়ে থাকার বদলে পাশে চীনও আরেক উৎস হয়ে থাকলে, ভারতের একচেটিয়াত্ব ভাঙবে। ভুটান তুলনা করে দেখতে সুযোগ পাবে। এখান থেকে দেখতে হবে। মূলকথা, ভুটানকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া যে সে কোনটা নেবে, কাকে কোন ব্যবসা দিবে কিংবা আদৌও দিবে না – এগুলো বেছে নেয়ার সুযোগ পেতে হবে তাকে। এটা ভুটানের অধিকার।
এ ছাড়া ভারতের পাশাপাশি চীনও যদি ভুটানকে ট্রানজিট দেয়, (নেপাল যেমন সম্প্রতি পেয়ে নিয়েছে) আর সেই ট্রানজিট ব্যবহার করতে ভুটানে নতুন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও তা গড়ে দেয় সেটা হবে ভুটানবাসীর ভাগ্য খুলে যাওয়া। সবচেয়ে বড় পাওনা হবে ভারতের একচেটিয়া নাগপাশ থেকে  ভুটান অন্তত একটু মুক্ত, সেই বাধন ঢিলা হবে এতে।

একালে ভুটানের জনগণ বিশেষ করে কাজ-চাকরিপ্রার্থী তরুণেরা, এদের কাছে বিষয়গুলো তাদের না বুঝার বা আমল না করার কিছু নেই। সহজেই তারা বুঝতে পারে। এছাড়া পেটের তাগিদ বাড়ছে। এক হিশাবে বলা হচ্ছে তরুণ জনসংখ্যার প্রায় ১০% বেকার। এছাড়া বিশেষ করে নেপাল তাদের সামনে এক মুক্তির মডেল হয়ে যেখানে হাঁটছে। আমরা মনে রাখতে পারি যে ‘ভারত-নেপাল’ আর ‘ভারত-ভুটান’ এই দুই কলোনি-দাসত্ব চুক্তি একই ছাঁচ বা ড্রাফটের উপর করা হয়েছে। আসলে ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি তুলে নেয়ার পর থেকে ভুটানের জনমনে প্রথমে ভীতি জন্মায়। পরে তা থেকে ক্ষোভ আর শেষে এক তোলপাড়-বুঝাবুঝি-সচেতনতা ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়ে যায়। ভুটানের সরব তরুণদের টগবগে ফেসবুক পেজ বা গ্রুপ দেখলে তা বুঝা যায়।

এককথায় ভুটান বদলে যাচ্ছে। স্থবির ভুটান যেন সামনে আলো দেখছে। একটা ছোট ঘটনার বর্ণনা দেই। ভুটানের আকাশ থেকে নামলেই আপনি বিমান বন্দরে একটা স্বাগতম বোর্ড দেখতে পেতেন। এই লেখায় শুরুতে যে ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা খেয়াল করতে পারেন। এটা গতবছর ২০১৭ এপ্রিল ১১ এর আগের ছবি। এই সাইনবোর্ড নিয়ে আপত্তি-বিতর্কের ফলাফলে সেটার বদলে এখন নতুন সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে। নতুন সাইনবোর্ডের লিঙ্ক এখানে। এটা স্রেফ একটা সাইনবোর্ড বদল নয়, প্রতীকীভাবে এটা ভারতের হাত থেকে ভুটানের হারানো সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার লড়াই। ভুটানের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ মূলত ভারত নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। ঠিক যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ রেখে দিয়েছে। এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ভারত যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করে থাকে সেই ১৯৬১ সাল থেকে সেটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধীনস্ত এক প্রতিষ্ঠান যার নাম Border Roads Organisation। এক ভারতীয় ব্রিগেডিয়ারকে চীফ ইঞ্জিনিয়ার করে এর অধীনেই নেয়া কনষ্ট্রাকশন প্রজেক্টের নাম Dantak। ফলে সংক্ষেপে একে  DANTAK-BRO অথবা Dantak (ড্যানটক) বলা হয়ে থাকে। শুরুতে দেয়া ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভুটানের প্রধান এয়ারপোর্ট, “পারো এয়ারপোর্টে” ভিজিটরদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে ড্যানটক। এটা নিয়ে স্থানীয় পাবলিক জনমনে ঘোরতর অস্বস্তি আপত্তি তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে মিডিয়ায় যারা কথা বলেছেন তাদের মধ্যে আছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ট্যুর গাইড, প্রাক্তন আমলা  ইত্যাদি। তাদের বক্তব্য হল ড্যানটক ভারতীয় আর্মির সংগঠন ফলে তারা ভুটানের ভিজিটরদের স্বাগত জানানোর কেউ না; আর রাস্তার সাইনবোর্ড টাঙ্গানোর  অথরিটিও তারা নয়। বরং রাস্তায় “পথচারি সাইন” টাঙ্গানোর ভূটানিজ স্থানীয় যে আইন তা ভঙ্গ করে ভারত একাজ করেছে। মূলকথা হল, ভুটানে কেউ আসলে সেই ভিজিটরদের ভারতীয় কেউ স্বাগত জানাবে এটা ভুটানিজরা পছন্দ করছে না। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা বছর খানেক আগে ভুটানের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ক্স মন্ত্রণালয় এই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলতে চিঠি দিলেও ড্যানটক তা উপেক্ষা করে চলেছে তো বটেই এমনকি স্থানীয় এক ইংরাজি পত্রিকাকে সাক্ষাতকার দিয়ে ঐ ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার যিনি ড্যানটকের চীফ ইঞ্জিনিয়ার, খোলাখুলি বলছেন যে এনিয়ে বিরূপ পাবলিক সেন্টিমেন্ট তিনি “অগুরুত্বপুর্ণ” মনে করে উপেক্ষা করেছেন।  এছাড়া তিনি উদ্ধতের সঙ্গে বলছেন “ড্যানটক-কে অন্যান্য বিদেশি দাতা সংস্থার সঙ্গে তুলনা করাতে উলটা তিনিই ক্ষুব্ধ। কারণ ড্যানটক অবিচ্ছেদ্য অংশ [DANTAK has been an integral part of the infra-structure development ……]”। যেন ভুটান ভারতেরই অংশ। গতবছরের এপ্রিলে সেবার অসন্তোষের প্রকাশটা এই সাক্ষাতকারের কারণে  তুঙ্গে উঠেছিল। আর তা থেকে এবার ছয়দিনের মাথায় এপ্রিলে ভুটানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবার নিজেই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলে নিজেদের সাইনবোর্ড স্থাপন করেছিল। সারা পারো শহরে এধরণের বিলবোর্ড বহু জায়গায় ছড়িয়ে ছিল, আর রাস্তার পেভমেন্টেও ভারতীয় পতাকার তে-রং দিয়ে রাঙিয়ে রাখা হয়েছিল।

মূল কথাটা হল এখানে প্রদর্শিত এটিচ্যুড, আর কূটনৈতিক মনোভাব বা শিষ্টাচারের অভাব অথবা ভুটানের সার্বভৌমত্বকে  সম্মান  না জানানো – এগুলোর কোনকিছুই এখানে কাজ করে নাই। যেন ড্যানটক নিজেই অবকাঠামো গড়ার কাজ করতে ভুটানে এসেছে, ভুটানের সরকারের কেউ তাকে “ওয়ার্ক-অর্ডার” দেয় নাই। এর পিছনের ভারতের ধরে নেয়া ভয়ঙ্কর অনুমানটা হল, খোদ ভুটান তো ভারতেরই। ভারতের এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান বাকা-করে বলা কথা নয়।

যেমন প্রথমত, গত বছর ২০১৭ সালের চীন-ভারতের কথিত “ডোকলাম সঙ্কট”। ডোকলাম ভুটানের ভুমি, এটা ভারতও অস্বীকার করে না। ভুটানের সঙ্গে চীনের অচিহ্নিত সীমানা বিতর্ক দীর্ঘদিনের, সেই কলোনি আমলের। একালে তা আপোষে মীমাংসার জন্য উভয় রাষ্ট্রই তাদের বিভিন্ন স্থানের “ভুখন্ড বিনিময়” করে এই বিতর্ক মিটানোর চেষ্টা করছে। এখন এর ২৫তম রাউন্ডের আলোচনা বৈঠক চলছে। এরই অংশ হিশাবে ডোকলামের কিছু অংশ চীনের সাথে বিনিময়ে দিয়ে দেওয়াতে এরপর, চীনে সেখানে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে  ভারত সামরিকভাবেই তাতে বাধা দেয়। পরবর্তিতে হুমকি-আলোচনা শেষে, ৭৩ দিন পরে ভারত সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়াতে ঐ সঙ্কট দৃশ্যত মিটে যায়। তাহলে ব্যাপার হল, ভুটানের ভুমিকে ভারত নিজের মনে করে, চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। এছাড়া দ্বিতীয়ত, ভূটান এখন মোট ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ে কূটনৈতিক সম্পর্কে স্বীকৃতিতে আবদ্ধ। ভুটানের মাত্র দুই পড়শি – ভারত ও চীন। ভৌগলিকভাবে ভারতেরই সমানতুল্য আর এক প্রতিবেশি চীন হলেও ভুটানের সাথে চীনের কুটনৈতিক স্বীকৃতি নাই। গুরুত্বপুর্ণ হল এই কুটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করতে, এখানে দেশি-বিদেশি আইনি কোন বাধা নাই। কারণ সার্বভৌম ভুটান কোন রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করবে এটা ভারতের নাকগলানোর বিষয় নয়। কিন্তু বাধা হল বড়ভাই, বড়ভাই মাইন্ড করবে। ভারত অসন্তুষ্ট হবে এটাই আকারে-প্রকারে বুঝিয়ে ঠেকায়, চাপ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

আসলে ভারত ভূটানের ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ের বেলায় আপত্তি না করলেও চীনের ব্যাপারে ছুপা আপত্তি কেন? এককথায় বললে, অন্যান্য রাষ্ট্র কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করার পরে, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ যে সম্পর্কই করুক তা ভারতের ভুমি দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে তা বাধাগ্রস্থ করা না করা ভারতের ইচ্ছাধীনে থাকে। মানে ভারতের অনুমতি সাপেক্ষেই কেবল কোন কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু চীন –  সে ভুটানের  অপর পড়শি বলে ভারতের কোন বাধাই পরোয়া না করে সরাসরি চীন থেকে ভুটানে সব ধরণের যোগাযোগ  স্থাপন করতে পারে। অর্থাৎ ভুটানকে চুক্তিতে আটকিয়ে কলোনি করে রাখার ভারতের কূট-বুদ্ধি এখানে অচল। একারণেই, সারকথায় ভুটানকে ভারতের নিজেরই ভুখন্ড মনে করে চলা – এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান চীনের কারণ বাস্তবতা হারাবে, এটা ভারত ভালই বুঝে। এই কারণে, চীন-ভূটান কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময়ে ভারতের ছুপা আপত্তি।

এসব কিছু মিলিয়ে ভুটানের জনমনে বিশেষ করে তরুণদের মনে যে ক্ষোভ তা এখন প্রবল এবং সংগঠিত হয়ে উঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তাদের ক্ষোভের একটা বড় পয়েন্ট হল, ভুটান কেন নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে চীনের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক করবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সম্প্রতি ভুটানিজ স্থানীয় বিশেষ করে তরুণদের প্রতিরোধী মনোভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি একটা রিপোর্ট করেছে যেটা হংকং থেকে প্রকাশিত  সাউথ চায়না মর্ণিং পোষ্টে ছাপা হয়েছে। সেখান থেকে টুকছিঃ  “থ্রিম্পুতে ২১ বছর বয়স্ক কলেজ ছাত্র বিমলা প্রধান বলেন, ভারত ও ভুটান যদি ভালো বন্ধু হয়, তবে আমাদের বন্ধুত্ব অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের কারণে প্রভাবিত হবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, সবকিছুর জন্যই ভারতের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় ভুটানকে। ভারত সবসময়ই অন্যদের আগে আসবে। কিন্তু ভারতের উচিত হবে না ঈর্ষান্বিত বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করা”। ঠিক এমনই আর অনেক কথোপকথন আছে সেখানে। [এর এক বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে এখানে] এএফপি আরও লিখছে, ” ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংজাং দর্জি ভুটানের কূটনীতি সম্পর্কে মাথা ঘামাতে চান না। তবে তিনি বিদেশী বিনিয়োগের মূল্য বোঝেন। তিনি বলেন, ভুটানের উচিত হবে অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। তিনি বলেন, অনেক চীনা পর্যটক এখানে আসতে শুরু করেছে। তারা অনেক টাকা নিয়ে আসে”।

এই ব্যাপারটা ইদানিং এতই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তা টের পায় মানে স্বীকার করে ভারতের কিছু মিডিয়া। গত মাসে প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে ভারত-মুখি পিডিপির শোচনীয় হার দেখার পরে,  টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টার সরাসরি ভারত সরকারকে  ভুটানে জ্বালানিতে ভর্তুকি তুলে নেয়ার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দায়ে অভিযুক্ত করেছিল।
উপরে থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো মনোজ যোশির ‘পরাজিত মনোভঙ্গির’ কথা বলছিলাম। অনুমান করা যায়, তাঁরও এদিকগুলো আমল না করতে পারার কথা নয়। এর পরও তিনি আক্ষেপ করছেন যে এই নির্বাচনের ইস্যু হিশাবে ভারত বা ভুটান-ভারত সম্পর্ক কোন প্রকাশ্য বিষয় ছিল না। তিনি লিখে চলেছেন, “এর আগের ভারতমুখী পিডিপির সরকার থাকাতে ও সে সহযোগিতা করাতে ভারত তখন চীনের সাথে ‘ডোকলাম সঙ্কট’ আরামে মেটাতে পেরেছিল”। [The defeat of the incumbent government headed by Tshering Tobgay could not have been comfortable for New Delhi. This is especially because along with the Bhutanese government, New Delhi had managed the crisis over Doklam successfully last year.] এটা আসলেই যোশির কল্পনা আর আক্ষেপের কথা; বাস্তবতা নয়। এই অর্থে এটা একটা চাপাবাজি, ভিত্তিহীন কথা।

কারণ, প্রথম কথা ভারতীয় সৈন্য প্রায় স্থায়ীভাবে ভুটানে এখনো আছে। আর ভুটানের অপর পাড়ে চীনের সীমান্ত শুরু হবার আগে  পর্যন্ত সেটা ভুটানের আর ভুটানের যেহেতু অতএব তা, যেন ভারতেরই ভূমি ও সীমান্ত – এমন চিন্তার অভ্যাস ও বিশ্বাস জন্মে গেছে ভারতের। ঘটনা হল – সীমান্ত নিয়ে বিতর্ক কলোনির সেকাল থেকে যখন কলোনি শাসক ব্রিটিশ, চীনের সেকালের রাজারা আর নেপাল-ভুটানের করদ রাজা – এদেরই রাজ্য-সাম্রাজ্যের অমীমাসিত সীমানা। এদের পারস্পরিক সীমান্তের বহু অংশ সেকাল থেকেই বিতর্কিত ছিল, যা ভিন্ন ভিন্ন দাবির সীমানা হয়েই তখন থেকে এখনো রয়ে গেছে। চীন-ভারত সীমান্তের বিতর্ক এমনই উদাহরণ। তেমনিভাবে, চীন-ভুটানের এমন বিতর্কিত সীমান্ত একালে চীন ও ভুটান পরস্পর এক অংশের দাবি ত্যাগ করে অপর অংশ পেয়ে নিয়ে তারা আপস মিটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আয়তনের দিক থেকে সেখানে চীন ভুটানকে বেশি এলাকা দিয়ে দিতে চায়। কারণ ভুটান থেকে পাওয়া ভূমির কৌশলগত মূল্য চীনের কাছে বেশি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চীন-ভুটানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো নাই; বড়ভাই ভারত আইনি বাধা না দিতে পারলেও সে অখুশি হবে, তার অস্বস্তি হবে এগুলো চিন্তা করে ভুটান এই সম্পর্ক করতে আগাতে পারে নাই।
তাসত্বেও চীনের ভাইস পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত জুলাইয়ে ভুটান সফর করে গেছেন। এছাড়া তৃতীয় দেশে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস তারা ভিজিট করে থাকে। এমনকি ভারতে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস নিয়মিত ভিজিট করে থাকেন। বিশেষ কারণ, দিল্লিতে চীনের এমবেসি ভুটানেরও প্রক্সি এমবেসি বা কুটনৈতিক অফিস হিশাবে কাজ করে থাকে। এই বিষয়গুলো চীন-ভূটান যোগাযোগ ও নানান স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট বাধা। এসব কারণ সবাই শেরিংয়ের হবু সরকারের আমলে এ বাধা অপসারণ হবে এটা সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান এজেন্ডা ও প্রবল কামনা। মনোজ যোশি লিখছেন, “ডোকলাম যেটা চীনের দাবি করা, কিন্তু দৃশ্যত ভুটানের জায়গা”। [Doklam, which was ostensibly about Bhutanese territory claimed by China, did not figure in the elections.] কিন্তু ডোকলামকে ভুটান কেন নির্বাচনে ইস্যু করেনি এই তাঁর আপত্তি বা অবজারভেশন। যোশি এখানে প্রকারন্তরে স্বীকার করছেন ডোকলাম ভারতের নয়। ফলে তা চীনের হোক কিংবা ভুটানের তাতে ভারতের কী? এর কোন জবাব যোশি কথায় পাওয়া যায় না। অথচ “ডোকলাম ভুটানের” ভারতের এই ভুয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে সৈন্য হাঁকিয়েছিল ভারতই। আর তাতে তো ভারত নিজের জন্য তা সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। পরে ডোকলাম ভুটান-চীনের ইস্যু – এটা স্বীকার করে সৈন্য প্রত্যাহারের ফলেই ভারতের ইজ্জত বেচেছিল। তাই এখন সেসময়ে “ভুটানে পিডিপির দলের সরকার ছিল বলে” ভারত ডোকলাম সমস্যা সহজে মিটাতে পেরেছিল, এ কথা ভিত্তিহীন, মুখরক্ষার কথা। বরং সেসময়ে ভুটান ভারতের ওপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে একেবারেই নিশ্চুপ নির্বাক ছিল। অনাহূত ভারত সেসময়ে “ভুটানের ডোকলাম রক্ষার নামে”  চীনকে বাধা দিতে গেছে, এটা ভুটান একেবারেই পছন্দ করেনি।
আসলে তখন থেকেই ভারত বুঝেছিল দিন বদলে যাচ্ছে। এটা আর আগের ভুটান নয়। ‘বৌদ্ধ নিশ্চুপতা’ এক বিরাট শক্তি। দুর্বলের “নির্বাক থাকা” সময়ে এক বিশাল শক্তি হয়ে উঠে। এটা ভারত দ্রুত বুঝলেই তার জন্য ভাল। কেন?

কারণ, “ভুটান ভারতের যেন কলোনি। যেন ভুটানের মালিক অথবা মা-বাবা সে।” এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের ছড়ি ঘুরানো আর কত? জনসচেতনতা, ক্ষোভের কারণে তা এখন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। এটাই মূল ইস্যু হলেও ভারত খোড়া যুক্তিতে হয়ত বলতে চাইবে, আমার ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ কোনো যুদ্ধাবস্থার সময় চীন দখল নিতে পারে। হা, হয়তো পারে। কিন্তু সে কারণে ভুটানকে ভারতের কলোনি (১৯৪৯ সালের চুক্তি) হয়ে থাকতে হবে, কেন? এটাই কি ভারত বলতে চাইছে? চাইলে খুলে বলুক! এ কারণেই কি ভুটান-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে পারবে না? আসলে ডোকলাম ভূটানের নির্বাচনি ইস্যু কেন হতে হবে? ভারত চাইলে সে নিজেই এটাকে ভারতের নির্বাচনী ইস্যু বানাক!

আবার বলা হচ্ছে, হবু-ক্ষমতাসীন বিজয়ী ডিএনটি দল খুবই বোকা। যোশি বলতে চাইছেন। কারণ, “তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে কোনো ফরেন পলিসির চ্যাপ্টার ছিল না”। [The DNT had no section on external affairs in its manifesto.] ফলে “চীন-ভারত বা ডোকলাম ইস্যুতে দলগুলার কোনো বক্তব্য রাখার সুযোগ ছিল না। অবশ্যই তা সত্যি। কিন্তু এনিয়ে, অন্ধের হস্তি দেখার মত কেউ বলছেন, DNT এই দলটা আসলে নাকি রাজার অনুগত দল। তাই তাদের বিদেশনীতি নেই। ওরা নাকি অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে, অর্থনীতির উন্নতি নিয়ে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছড়িয়ে দিতে চায় ইত্যাদি নিয়েই কেবল নির্বাচনে ব্যস্ত ছিল। ভারতের ইমেরিটাস প্রফেসর এস ডি মুনি তারও [হংকংয়ের scmp পত্রিকায়] এক আর্টিকেলে এমনটা দাবি করা হয়েছে। বলছেন, Foreign and security policy issues were left out। তিনি বলছেন, “ধনী-গরীবের সম্পদের গ্যাপ কমাতে হবে” এমন অর্থনৈতিক শ্লোগান দিয়ে ডিএনটি দলের শেরিং নির্বাচন করেছেন। হা অবশ্যই, দৃশ্যত একথা সত্য। কিন্তু তবু তারা সবটা দেখতে পায়নি অথবা দেখেও ভিন্ন কথা বলছেন।কেন? একথার মানে কী?

ব্যাপার হল, সামরিক ক্ষমতাই একমাত্র ক্ষমতা নয়। যারা সামরিক অথবা লোকবলের দিক থেকে দুর্বল তাদেরকে অন্য যেকোন কিছু যেমন “চার চোখের ক্ষমতা” বা “বুদ্ধি খাটিতে” চলতে হয়। ২০০৭ সালে ভুটানের পশ্চিমা শিক্ষিত রাজা বুঝে গিয়েছিলেন ভুটানকে ভারতের হাত থেকে টিকানো ও বাঁচানো জন্য অন্য রাস্তা ধরতে হবে। “রাজকীয়” রাষ্ট্র কাঠামো দিয়ে আট লাখ জনগণের রাষ্ট্র ভারতের হাত থেকে বাচানো কঠিন। তাই তিনি  যেচে রাজার শাসন বা মনার্কিজম ছেড়ে নিজেই সোজা ভুটানকে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন। এক কথায় বললে, ক্ষমতায় জনগণকে সংশ্লিষ্ট করা, জনগণের ভেতর দিয়ে এক গণক্ষমতা তৈরি করা। এগুলোই একটি রাষ্ট্রকে টিকাতে পারে। ভারতের কলোনি চক্ষুকে উপেক্ষা করতে পারে। জনগণ নিজের রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষক নিজেই হতে পারে।  ছোট আট লাখ জনসংখ্যার রাষ্ট্রে এটা এক উপযুক্ত ও বিরাট অগ্র-পদক্ষেপ ছিল।

খেয়াল করলে আমরাও সকলেই জানব যে, ভারতের কৌশল হল পড়শি দেশে এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলকে নিজের ভাঁড় বানানো। ক্ষমতায় রাখার নামে ঐ দল বা ব্যক্তিকে ভারতের দালাল বানানো, পুতুল বানানো। গত ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি উঠানো থেকে ভুটান এ বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছে। ভুটানে রাজার প্রভাব এখনো অনেক। রাজা এখন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনাল প্রধানও বটে।  তিনি ভারতের কৌশল অকেজো করে দিয়েছেন। সে কারণে এই নির্বাচনে কোনো বিদেশনীতি বিশেষত ভারত অথবা চীন সম্পর্কিত ইস্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক তোলা যাবে না – এই নীতিতে সকল দলকে আসতে রাজি করিয়েছেন। এটাই এখন নির্বাচনী আইন এবং এটা কেউ ভঙ্গ করলে নির্বাচন কমিশন জরিমানা করতে পারবে, এই নিয়ম জারি করেছে। [গত নির্বাচনে দুটা দলকে ২০০ ডলার করে ফাইন-ও করেছিল কমিশন।]  আর আসলে ওদিকে রাজার মধ্যস্থতা বা সভাপতিত্বে চীন-ভারত বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মিলে একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করবে, যেটা ক্ষমতাসীন দল সে অনুযায়ী চলবে, এই হলো সেই কৌশল। অর্থাৎ চীন-ভারত ইস্যুতে পপুলার প্রপাগান্ডা চলবে না। কেবল সুনির্দিষ্ট ফোরামে বসে সিরিয়াস তর্কবিতর্ক করতে হবে। আর এতে এক বড় লক্ষ্য হল ভারত যেন কোনো একটা দলকে তার দালাল বা পুতুল বানাতে যাতে না পারে। ফলে এই অর্থে এখন সব দলই দৃশ্যত “রাজার অনুগত”।  নতুন হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং বলছেন, বিদেশ নীতি প্রসঙ্গ নিয়ে তারা না, রাজা বলবেন। অতএব অচিরেই, হবু ক্ষমতাসীন ডিএনটি দলই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনসহ ভারতের কলোনি নিগড় ছিন্ন করে ভুটান বিদেশনীতি সাজাচ্ছে – খুব সম্ভবত এটাই দেখব আমরা।

এছাড়া ওদিকে লক্ষ্য করলে দেখব, আসলেই কী হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং কেবল অর্থনৈতিক ইস্যুতে নির্বাচন করলেন? শেরিংয়ের দল  ডিএনটি বলছে, ভুটানের অর্থনীতি অতিমাত্রায় পানিবিদ্যুৎ উতপাদন ও বেচাকেন্দ্রিক। বৈদেশিক ঋণের ৮০% এর কারণ এই অব্যবস্থাপনার পানিবিদ্যুত। ভূটানে এটা বদলাতে হবে। নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বের করতে হবে। এর অর্থ – ভারতের নিয়ন্ত্রিত এই পানিবিদ্যুৎ আর সীমিত বিনিয়োগের ও বৈচিত্রহীন বিনিয়োগের ভারতীয় খাঁচা থেকে ভুটানকে বের হতে হবে। তাহলে এখন এটা কি আর অভ্যন্তরীণ নীতির নির্বাচন থাকল?

এসবের কিছু খবর অন্তত ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পেয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ভারত সরকারকে কড়া সাবধান করে তার এক সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে,  আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। ওর শিরোনাম হল – “ভারতকে ভুটানের আকাঙ্খার সাথে নিজের কৌশলগত স্বার্থ ভারসাম্যপূর্ণ করে গড়তে হবে”। এসব ব্যাপার, এগুলো কিসের লক্ষণ? এরা বলতে চাচ্ছেন, ভুটান-চীনের কূটনৈতিকসহ সব সম্পর্ক হওয়া একেবারে নেপালের মত ভারতের বিকল্প চীনের ভিতর দিয়ে ট্রানজিট পাওয়া পর্যন্ত আরও কিছু হওয়া ঠেকানো আর অসম্ভব। আর একভাবে বললে, এএফপির ভুটানিজ তরুণদের মনোভাব নিয়ে রিপোর্ট যেটা হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এটারই স্বপক্ষে ভারতের অধ্যাপক এস ডি মুনি র লেখা সেটাও হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপানো ছিল পালটা, তবে ইতিবাচক জবাব। প্রফেসর মুনি লিখছেন, “এটা বিশ্বাস না করার কারণ নাই যে আগামিতে চীন-ভূটানের কূটনৈতিক সম্পর্ক হওয়া ভারত কাছে অগ্রহণীয় হবে, যদি নিরাপত্তা, শান্তি ও ইতিবাচক ব্যবসার পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে ভারতের কোর স্বার্থকে তা ক্ষতিগ্রস্থ না করে”। [There is no reason to believe India would not accept Bhutan’s establishment of diplomatic relations with China in future if its core interests of preserving security, peace and a positive business climate are not disturbed.] অর্থাৎ শর্ত সাপেক্ষে [খুব সম্ভবত শিলিগুড়ি করিডোর মাথায় রেখে] তিনি রাজি হচ্ছেন। তবে একটা মজার দিক হল দুটো রিপোর্টেরই শিরোনামে বলতে চাইছে ভারতের কপাল পুরেছে, ভারতকে আগের অবস্থানে ছাড় দিতে হবে। যেমন এএফপি লিখছে “at the expense of rival India”। আর কমিউনিস্ট প্রফেসর মুনি অহেতুক ন্যাশনালিস্ট হয়ে লিখছেন, “with India’s blessing”। মানে বলতে চাচ্ছেন যে, “মহান দাতা ভারতের আশীর্বাদ” পেলে পরে, চীন-ভুটান মিলতে পারবে।  মানে একজন খই খাচ্ছিল, তার কিছু খই বাতাসে উড়ে গেলে সেটা ঠাকুর গোবিন্দের নামে দান করে দেয়া হল বলে চালিয়ে দেয়া।

একটা তথ্য দিয়ে শেষ করা যাক। সার্ক (BBIN) Motor Vehicles Agreement চুক্তি বলে একটা বিষয় ছিল যেটার সারকথা হল, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একই মটরযান নিয়ে ভ্রমণের চুক্তি। সেই সময়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভুটানের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে নিজেকে তারা ঐ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কারণ বলা হয়েছিল, প্রচুর যানবাহনের হাঙ্গামায় শান্ত বৌদ্ধ ভুটানিজ ধ্যানে বাধাগ্রস্থ হতে পারে একারণে আর তাদের অত যানবাহন সামলানোর মত অবকাঠামো নাই বলে। খেয়াল করতে হবে সেটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু পার্লামেন্টের। মানে বিরোধীদের বাধা, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ছিল তাই সরকার পিছু হটে ছিল। কিন্তু এর পিছনের আসল কারণ এখন বলা হচ্ছে।  বিরোধীরা তারাই আসলে ঐ সময় থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল এবং এরই প্রথম বিজয়ী পদক্ষেপ ছিল সেটা। সব ব্যাপারে “ভারতের অনুমতি নিতে হয়”  – এই অনুমতিদানের ভারত একে প্রতিহত করে স্বাধীন ইচ্ছার সিদ্ধান্তের ভুটান, এর কায়েমই ছিল তাদের কমন লক্ষ্য।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভুটানে সব ভারতের হাতছূটে চলে যাচ্ছে, এটা আমল হওয়া শুরু হয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সুজন হয়, একমাত্র তবেই এর বিপদ বুঝবে।

এদিকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার ভুটান যদি নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করতে পারে, আমাদের মধ্যে কী কেউ কেউ নিশ্চয় বুদ্ধিমান হবেন, এমন পাওয়া যাবে না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভুটানের বুদ্ধিমান রাজা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

 

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

গৌতম দাস

১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uW

ইমরান খান ও শি জিনপিং – ছবি : সংগ্রহ

পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কেমন? মানে সম্পর্ক বলতে ভেঙ্গে বললে, স্ট্রাটেজিক, ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল সম্পর্ক কেমন, এই হল প্রশ্নটা। কোন দুই রাষ্ট্র তা ঘোষণা দিয়ে বললে  স্বভাবতই তা বুঝতে সহজ হয়। তবে না বললেও আন্দাজ অনুমান করে অনেক কিছুই প্রায় সঠিক জানা যায়। আসলে আমেরিকা এবং বিশেষ করে ভারতের সবচেয়ে গভীর আগ্রহ হল, স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী – তা জেনে ফেলার। ভারতের এই আগ্রহের তীব্রতা টের পাওয়া যায়, তাদের সব মিডিয়ায় ব্যবহৃত একটা শব্দ থেকে। সেটা হল, “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” (all weather friend); যেমন তারা খোঁচা দেওয়া মন্তব্য হিসাবে প্রায়ই লিখে থাকে যে – চীনের “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” পাকিস্তান ওমুকটা করতে যাচ্ছে……। তবে “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” লেখাটা যতটা না খোঁচা দিয়ে বলা এর চেয়ে বেশি এটা আসলে এক ঈর্ষামূলক আক্ষেপ। “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” মানে যারা খারাপ বা ভাল যে কোন পরিস্থিতিতেই বন্ধুই থেকে যায়। এছাড়াও আর একটা বিষয় হল, সাধারণভাবে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী তা জানাবুঝা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট করে “চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের” [CPEC projects] পিছনে স্ট্রাটেজিক বিষয়াদি কী লুকানো আছেও তা জানতে ভারত ও আমেরিকা বিশেষভাবে আগ্রহী।

পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকার এ’এক নতুন ধরনের ক্ষমতা। আমাদের আগের দেখা বা পুরনো অভিজ্ঞতায় যেসব ধারণা আছে তা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন। আমাদের মত রাষ্ট্র মাত্রই, আমরা সাধারণত দেখি এক বিশেষ কোটারি অথবা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ও দুর্নীতি সেখানে ঘটবেই। এটা গেল এক দিক আর অন্য দিকে থাকবে ঐ গোষ্ঠী নিজেদের কোটারি কোনো লাভালাভের লোভে বিদেশী কোনো স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মুখস্তের মত আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ইমরানের আগমন অন্তত এই অর্থে নতুন যে, এই ক্ষমতা আমাদের দেখা বা জানা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে অনেক কিছুই আমরা ভিন্ন দেখব, তা অনেকেই আশা করে।

কিন্তু কতটুকু নতুন বা ভিন্ন? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ ফিরানো দরকার। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য কাজ বা পদক্ষেপ নিতে পারে না। অন্তত পারেনি। পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করে এসেছে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যে ধরনের যুদ্ধকে আমরা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলি। মানে অন্যের স্বার্থে তার যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সেই যুদ্ধ করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। যেখানে সাধারণভাবে  প্রক্সি মানে হল, স্কুলের ক্লাসরুমে নাম ডাকার সময় অনুপস্থিত বন্ধুর হয়ে “উপস্থিত” বলার মত। আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ খেটে দেওয়া – এবিষয়ে আদি গ্লোবাল ঐতিহাসিক ঘটনা বা শুরুর ঘটনাটা হল, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়া, আর তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্ত মধ্য এশিয়ায় এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয় পেয়ে  সোভিয়েত ইউনিয়নের (বাফার গড়তে) আফগানিস্তান দখল করা; আর এবার তা ঠেকাতে বা উল্টে দিতে আমেরিকা, পাকিস্তানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে নিজের প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা – মানে মোজাহিদিন লড়াই শুরু করা – এটা ছিল প্রথম পর্ব। আর এরই লেজ ধরে দ্বিতীয় পর্বে, আলকায়েদা-তালেবান বনাম আমেরিকার ওয়ার-অন টেরর যুদ্ধে এরই ময়দান হিসেবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত হওয়া, যুদ্ধে ঝাপায় পড়ার পাটাতন হিসাবে আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভুমি ব্যবহার করতে দিয়ে নিজে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।

ফলে এই দুই ইস্যুতে গত ৩৮ বছর ধরে পাকিস্তান অন্যের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। না এটা অবশ্যই পাকিস্তানের স্বেচ্ছায় করা কাজ নয়। এছাড়া এর মধ্যে তা যতটা না নিজ স্বার্থে এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আমেরিকান স্বার্থে আর আমেরিকার চাপের বাধ্যবাধকতায় পাকিস্তান করেছে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে যে পাকিস্তান আর আমাদের মত এক আম- রাষ্ট্রের মতো থাকেনি। এ এক বিরাট ব্যতিক্রমী, বিশেষ রাষ্ট্র হয়ে গেছে। যে নিজের স্বার্থ না থাকলেও আমেরকান স্বার্থে নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েই শেষ হয় নাই। এরপর আবার আমেরিকাই অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই বিচারে পাকিস্তান আমাদের মত একই পাল্লায় তুলনাযোগ্য রাষ্ট্র কি না সেই প্রশ্ন অনেকে তুলতে পারেন। তবে এই আলোকেই সার কথাটা হল, গত ৩৮ বছরে পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য, নিজের জন্য রাষ্ট্র থাকেনি, কাজ করেনি।

কিন্তু ওদিকে আরেক সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা হল, পাকিস্তান নিয়ে যেকোনো আলোচনার সময় বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেকোন সিদ্ধান্ত যে পাকিস্তানের নয় – এই প্রক্সি-খেটে বেড়ানো, বিশেষ করে আমেরিকান স্বার্থের দায়ের বাধ্যবাধকতায় চলে বেড়ানো, সে কথা মনে রাখে না। মনে রেখে কথা বলে না। পাকিস্তান যেন স্বাধীন – এই অনুমান ধরে নিয়ে এরপর পাকিস্তানের সমালোচনা ও মূল্যায়ন শুরু করেন। সবচেয়ে তামাশার কথা হল, বুশের আমল থেকে পরের সব আমেরিকান প্রশাসন পাকিস্তানের যেকোনো সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ যে আমেরিকারই স্বার্থে প্রক্সি পদক্ষেপ সে কথা স্বীকার না করে, দায় না নিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকেন।

তবু এগুলোও মূল বিষয় নয়, আরো দিক আছে। তা হল, প্রক্সি যুদ্ধের এই কালের  পাকিস্তানের অপর দুটা রাজনৈতিক দল,  নওয়াজ শরীফের পিএমএল (PML-N) আর ভুট্টো পরিবারের পিপিপির (PPP) ভূমিকা। তারা এই প্রক্সি যুদ্ধের পাকিস্তান পরিস্থিতিতে নিজেরা যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছে তা হল – যেহেতু আমেরিকান ইচ্ছা, চাহিদা বা সিদ্ধা্নতের পক্ষে থাকা তাদের আমলের সরকারের পক্ষে এড়ানো বা ভিন্ন কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থেকে চুরি আর লুটপাটের বন্যা বইয়ে দেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ – কারণ আমেরিকানদের খেদমতে খেটে যাবার করার কারণে ক্ষমতা তো নিশ্চিত! আর তাতে দায় দোষারোপ সব আমেরিকার ওপর দেয়া যাবে। এই দুই দল এখান থেকে পাকিস্তানকে দেখেছে – আর এটাই পাকিস্তানের দুরবস্থায় সবকিছুর উপরে দুর্ভাগ্যের দিক। এ কারণে আজ পাকিস্তানের ক্ষমতার করিডোরের আলাপে এক চালু হিসাব হল, নওয়াজ অর্থ লোপাট করে বিদেশে রেখেছে দুই বিলিয়ন ডলার, আর ভুট্টো পরিবার রেখেছে এক বিলিয়ন ডলার।

এভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থায়। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান এবার ক্ষমতায় এসেছেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট স্বাক্ষ্য দিয়ে, ডাটা ও গ্রাফ এঁকে দিয়ে বুঝিয়ে, বলছে পাকিস্তানের চরম খারাপ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য ইমরান দায়ী নয়। আগের সরকার নওয়াজ শরীফ দায়ী। [The economy’s troubles are not Mr Khan’s fault.]   তবে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের দেউলিয়া এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে এখন ১৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পাকিস্তান রুপির ডলার বিনিময় মূল্যমান গত এক বছরে ৯১ থেকে নেমে এখন ১৩৪ রুপিতে ঠেকেছে। কথাগুলো বলা হচ্ছে এ জন্য যে, ইমরানের ক্ষমতার শপথের পরের প্রথম মাস তার কেটেছে সৌদি, চীন নাকি আইএমএফ  – কার কাছ থেকে নুন্যতম ঋণ-মুক্তির অর্থ বা “বেল আউট”-এর অর্থ পেতে পারে সেই খোঁজাখুঁজিতে। সৌদিদের উপর প্রবল ভরসা করে ইমরান নিজেই প্রথম সফর হিসাবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঋণ দেওয়ার বদলে, CPEC projects এ বিনিয়োগের শেয়ার নিতে স্বেচ্ছায় এক পালটা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমরানের বিবেচনায় সঠিকভাবেই এই প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে চীনের সাথে পাকিস্তানের  সম্পর্কে খামোখা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ সৌদি প্রস্তাবে একমত হতে চীনকেও বুঝাতে হবে, রাজি করাতে হবে ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। তাই সৌদি প্রস্তাব ফেলে রাখা ছাড়া ইমরান উপায় দেখেন নাই।  

ইতোমধ্যে সর্বশেষ খবর হল, শেষমেশে, ইমরানের সিদ্ধান্ত – পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেল আউট ঋণ চেয়ে আবেদন পেশ করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাষায়, এটা পাকিস্তানের “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি” মিটানোর ঋণ। 

গ্লোবাল অর্থনীতির (Global Economic Order) দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের যুগ চলছে; অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পালাবদলে এটা আমেরিকার জায়গায় চীনের আগমন ও সেই স্থান দখলের কাল। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদুর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এ দিকে এই মূল লড়াইয়ে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, একাজে বাড়তি সুবিধা পেতে  ভারতকে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে দেখা যায়। যদিও সবসময় আবার তা নিজ অন্য স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে না, সেকথাও সত্য।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (China–Pakistan Economic Corridor বা CPEC projects) – মোট ৬২ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প যা উত্তর দক্ষিণ বরাবর পাকিস্তানের বুক চিড়ে করাচির গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে একেবারে চীনের জিনঝিয়াং (Xinjiang Uyghur Autonomous Region) উইঘুর প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত এক হাইওয়ে তৈরি হচ্ছে। তাই এই প্রকল্পটা আসলে চীনকেই পাকিস্তানের করিডোর দেয়া। অর্থাৎ পুরোটাই কেবল পাকিস্তানের স্বার্থে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়। চীনের উইঘুর প্রদেশ ল্যান্ডলকড অঞ্চল; ফলে এর বধ্যদশা ঘুচাতে, অঞ্চলটাকে সমুদ্রপথেও যোগাযোগ করিয়ে দিতে, রাজনৈতিকভাবে উইঘুর মুসলমানদের মন-জয় করতে, তাদের পিছিয়ে থাকা দশা থেকে মুক্ত করতে  – চীন এটা নিজের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মনে করে।

কিন্তু আমেরিকা (সাথে ভারতও) নিজেদের সন্দেহ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে চীন-পাকিস্তানের এই বাস্তব বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চরমতম বিরোধিতা করে থাকে। পাকিস্তান আমেরিকার প্রভাবের হাত থেকে ছুটকারা পেয়ে যাচ্ছে এই প্রকল্পের মত তৎপরতার কারণে। ফলে এই প্রকল্প পুরোটাই আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে এরা দেখে। কিন্তু ওদিকে আমেরিকা ও ভারতের জন্য আর এক চরম অস্বস্তিকর একটা ফ্যাক্টস হল, করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের মূল চার প্রদেশকে এক সাথে এক জায়গায় এনেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর দিয়ে গেছে, তাই এটা কেবল কেন্দ্রের নয় পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক সরকারও স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের দিক থেকে এই প্রকল্পকে  অনুমোদন করে স্ব স্ব প্রাদেশিক পার্লামেন্টেও সিদ্ধান্ত পাশ করেছে। এমনকি বেলুচিস্তান যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে তাদেরও কোনো পক্ষই এই প্রকল্পের ঠিক বিরোধী নয়।

এসব কিছুর মূল কারণ সব প্রদেশের জনগণও এই প্রকল্পকে দেখে থাকে এক হাইওয়ে ধরে রপ্তানিতে গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ, এতে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্রিয় হতে নিজ নিজ প্রাদেশিক স্বার্থেও বিকশিত হওয়ার জন্য এই প্রকল্পকে বিরাট নিয়ামতের মত মনে করে। ফলে চার প্রদেশ অন্তত একটা ইস্যুতে পুরো পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার চীনেরও স্বার্থে এই অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবহৃত হবে বলে এর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করার দায়ভার এবং এর ঋণ পরিশোধের দায়ভার পাকিস্তানের সাথে চীনেরও। কিন্তু এসব বিষয়গুলো কিভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে লেখা আছে – সেটা বিলিয়ন ডলারের এক কৌতূহল আমেরিকার (সাথে ভারতেরও) কাছে। তাদের গভীর অনুমান যে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে।

আসলে অর্থনৈতিক স্বার্থ মানেই সাথে জড়ানো থাকে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থঃ
এই প্রকল্পের শিরোনামেই বলা আছে এটা “অর্থনৈতিক” প্রকল্প। অর্থাৎ এটা কোন সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থে নেয়া যুদ্ধ করার প্রকল্প নয়। তবুও তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ শতভাগ যেকোন অর্থনৈতিক প্রকল্পেও ওর নিরাপত্তার দিক থাকবেই; ফলে সেই সুত্রে ওর সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকও থাকেই, তা আলাদা করা যায় না। এই ব্যাপারটা আমেরিকা বা ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। যখন চীন অর্থনৈতিক ভাবে কেবল জাগতে শুরু করছে কেবল, সেই ২০০৮ সালের একটা ঘটনা হল – মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন এফেয়ার হাউজ কমিটির সামনে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হায়ার করে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের আলোচনায় চীন উত্থানের প্রভাব কী এনিয়ে মুল্যায়ন রিপোর্ট করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রফেসরকে কংগ্রেস কমিটিতে শপথ করিয়ে যেমন জেরার শুনানি চলে তা চলেছিল। যেখানে প্রফেসর স্বাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল চীনের অর্থনীতিতে বাধা সৃষ্টি করে একে ডুবিয়ে দিবার উপায় কী। চীনে জ্বালানি তেল আনা আর রপ্তানি পণ্য পাঠানোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে, চোকিং পয়েন্ট মানে ঠুটিই চিপে শ্বাস রুদ্ধ করে ধরা সম্ভব এমন এক চিকন হয়ে পড়া নৌচলাচল পথের অংশ আছে, (Strait of Malacca বা বাংলায় মালাক্কা প্রণালী নামে) মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মাঝে। যা চিপে ধরলে মানে এই ৯০০ কিমি চিকন হয়ে থাকা নৌপথে – ইচ্ছা করে কোন জাহাজ ডুবিয়ে নৌচলাচল ব্লক করে দিলেই চীনের অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে আমেরিকাকে আর যুদ্ধ করতে লাগবে না। এই ছিল ঐ প্রফেসরের যুক্তি ও পরামর্শ। এখন আমেরিকান সিনেট যদি চীনের ক্ষতি  করতে এই আলাপ করতে পারে তাহলে চীন পালটা তার দুর্বল জায়গা – ঐ মালাক্কা প্রণালীর অনেক অনেক বিকল্প তৈরি করে রাখবে না কেন?  আর চীন তা করলেই, “চীন অর্থনীতির সাথে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ” মিলিয়ে ফেলছে –  আমেরিকা ও ভারতের এই ভুয়া চিৎকার অর্থহীন।  ফলে পাকিস্তানের গোয়াদর অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতায় [এমন কি হবু বাংলাদেশের সোনাদিয়ায়ও আর একটা ] গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে তা ব্যবহার করে – চীন মালাক্কা প্রনালীর বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের উপায় করে নিবে – এটাই কী সবচেয়ে স্বাভাবিক নয়? এই অবস্থায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে কেবল “ভারতকে মুক্তা মালার মত ঘিরে ফেলতেছে”, তাই ভারতের হাসিনাকে চাপ দিয়ে  বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় আর একটা বন্দর করা ঠেকিয়ে রাখতে হবে – এসব বক্তব্য কোন এক পেত্নির নাকি-কান্না ছাড়া আর কী? তাহলে সারকথা, কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প যত বড় হবে তাতে উল্লেখ করা থাক আর না থাক, ওর সাথে সাথে এক সামরিক -স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ততই বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোন (৫ থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলারের) বড় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রকল্প কোন রাষ্ট্র কেন নিবে? বরং নিতেই পারে না।

কিন্তু প্রশ্ন এত দূরে কেন উঠছে? কারণ, পাকিস্তান ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরে এখন আইএমএফ টিমের চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তান সফর এবং মূল্যায়নে বসা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে খবর হল, পাকিস্তান সফর করছে এমন আইএমএফের টিম বলেছে, তাদেরকে CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে যে পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া আইএমএফের জন্য কতটা রিস্ক বা দায় নেয়া হয়ে উঠতে পারে। যদিও পাকিস্তান এই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু ভারতের মিডিয়া প্রবল আগ্রহ তৈরি করেছে যে এইবার “আঙ্কেল স্যাম” তাদেরকে CPEC করিডোর চুক্তির হদিশ পাইয়ে দিবেই।

এখানেই হল আসল ইস্যু। আগেই বলেছি, আমেরিকার (সাথে ভারতও) কাছে তাদের অনুমান হল, চীন-পাকিস্তানের ওই প্রকল্পের চুক্তিতে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি কী আছে তা এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে। তাই তাদের প্রবল কৌতূহল ওই চুক্তিতে কী আছে তা জানার।

এখন আইএমএফকে দিয়ে চুক্তির “স্টাটেজিক তথ্যের দিক হাতিয়ে”  আমেরিকা কি তার সেই প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল মিটিয়ে নিতে পারবে?
আমরা স্মরণ করতে পারি, ইমরান খান সরকারের শপথ নেয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানের লোন প্রসঙ্গ উঠতেই আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে চীনের ঋণের দায় শোধ করা যাবে না”। [Pompeo warns against IMF bailout that pays off Chinese lenders]। এটা অবশ্যই আমেরিকার কোন বুদ্ধিমান মন্তব্য ছিল না। ছিল, ডুবে যাচ্ছে এমন মরিয়া এক আমেরিকান আস্ফালন।

তাই মনে করার কারণ আছে যে, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট লাগার্দের (Christine Lagarde) কথিত এখনকার মন্তব্য যে আমাদেরকে “CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে” [যদিও কোন মিডিয়াই লাগার্ডে বা আইএমএফের কোন কর্ককর্তার সরাসরি বরাতে একথা বলতে পারে নাই। সবাই “সোর্স বলেছে” বলে লিখেছে। ] এটা আগের পম্পেই হুঙ্কারেরই নরম ও কারেক্ট ভার্সন। এখন দেখার বিষয় চীন-পাকিস্তান করিডোর চুক্তি পুরোটাই বা অংশ ওপেন না করেও পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ হাসিল করতে পারে কি না!

তবে ভারত ও আমেরিকার দুটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এখানে আলাদা করা দরকার। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ কী, চীনা CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ? এপর্যন্ত কোন দেশি বা বিদেশি মিডিয়া রিপোর্ট এই দাবি করেছে এমন দেখা যায় নাই। কিন্তু সকলেই এমন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত করার চেষ্টা করে থাকে। ইমরানের পাকিস্তান সরকার এবিষয়ে নিজেই কিছু ফ্যাক্টস প্রকাশ করে এমন ইঙ্গিত ও প্রপাগান্ডাকে নস্যাতে উড়িয়ে দিয়েছে।  ইমরানের সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় – তারা বলেছে, “The CPEC deals are open and transparent,” said Noor Ahmad, a spokesman for the Ministry of Finance.

এছাড়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের এপর্যন্ত প্রাপ্ত মোট বিদেশি ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৬ বিলিয়ন বা ৬.৩% হল CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ। [Pakistan has already brushed aside criticism on growing indebtedness of the country due to CPEC, saying the share of the CPEC loans was only $6 billion or 6.3% in total outstanding external debt of $95 billion as of end June this year.]  আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল, আইএমএফ এবারই প্নরথম নয় আগেও (২০১৪) করিডর প্রকল্পের এক মুল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিল। করিডোর প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর এটা জানিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসা্রে, আইএমএফ লিখেছিল,  [The IMF report has then stated that the CPEC infrastructure and transport projects are financed by long-term concessional government borrowing from China.]  অর্থাৎ  এই প্রকল্প চীনের স্বল্প সুদে (concessional) দেয়া ঋণ” বলে মনে করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় “কনসেশনাল” ঋণ মানে হল  –  (১% এর কম,) ০.৭৫% বাৎসরিক সুদ, চল্লিশ বছরে শোধ করতে হবে তবে প্রথম দশ বছর কোন কিস্তি দিতে হবে না, মাফ পাবে। এখানে “কনসেশনাল” ঋণ মানে সুনির্দিষ্ট করে কী বুঝানো হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। এছাড়া ঐ রিপোর্টে আর একটা মন্তব্য আছে, CPEC-related outflows would peak at about $3.5 billion to $4.5 billion per annum by fiscal year 2024-25. – মানে ঋণ শোধের দায় সবচেয়ে চড়া হয়ে উঠবে ২০২৪-২৫ সালে, যখন বছরে প্রায় চার বিলিয়ন করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ তখন এটা পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে পারে। এই বিষয়গুলো পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্ট। কাজেই আমেরিকা ও ভারতের ভুয়া ক্যাম্পেইনের পাল্লায় পড়া থেকে এবার সকলে সাবধান। 

দুনিয়ার জন্য বর্তমানে এক ইউনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যখন চীনের উত্থান ঘটেইনি সেই পরিস্থিতি মানে, যখন দুনিয়াতে আমাদের মতো রাষ্ট্রের কোনো ঋণ পাওয়ার একমাত্র উৎস ছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সেসব দিন পেরিয়ে, এখন চীন উত্থিত ও বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের একালে দুনিয়াকে নতুনভাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককেও  আমল করতে হচ্ছে। কারণ এখন আর সে একক ঋণদাতা নয়। শুধু তাই নয়, আইএমএফ যদি প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানের মত না হয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির ভাঁড় হয়ে থাকতে চায়, ঐ বিদেশনীতি সরাসরি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকতে চায় তবে এই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানও একদিন আমেরিকার সাথে শুকিয়ে ছোট হয়ে যাবে – সেটাও আশা করি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আমল করে চলে, আমরা দেখতে পাব!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস জানা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

গৌতম দাস

০১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ur

 

মূলকথাঃ ব্যাপারটা মোটেও প্রো-ইন্ডিয়ান থেকে প্রো-চাইনিজ হওয়া নয়।
১। গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলের কাল এটা। একালে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কোন একটার দিকে কান্নি মেরে বাংলাদেশের স্বার্থকে একদড়িতে বাধবার বা একলাইন নেওয়ার চেষ্টায় প্রো-ইন্ডিয়ান, বা প্রো-চাইনিজ হওয়া হবে আত্মঘাতি।
২। ক্ষমতায় থাকার লোভে কারো-মুখি হওয়া, এতে শুধু নিজের দলের বা সরকারের না; পুরা দেশকেই ভালনারেবল বা দুস্থ করে ফেলা হবে। অন্যের হাতের পিংপং বল হওয়া এটা। সোজা রাস্তটা হল, সব সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখা ও প্রাধান্যে রাখা শুরু করতে হবে। এতে আপনা আপনিই ঐ তিন রাষ্ট্রের থেকে প্রয়োজনীয় আমাদের জন্য আলাদা একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যাবে। অর্থাৎ ঐ তিন রাষ্ট্রের সাথেই নানান সম্পর্কে জড়ানো যাবে কিন্তু সেটা বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখে এবং অবশ্যই ক্ষমতার থাকার লোভে নয়।
৩। তবে গুরুত্বপুর্ণ, একাজে তখনই সফলতা আসবে যখন নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীন ও সচল রাখা যাবে। আর তা করতে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সংসদসহ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযাচিত নির্বাহি হস্তক্ষেপ ছাড়াই কার্যকর হতে দিতে হবে। কার্যকর এসব প্রতিষ্ঠানগুলোই জনগণকে ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট করে রাখতে সহায়তা দিবে, তবেই একমাত্র বিদেশি আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব।

 

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ছিল মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ছোট দেশ, মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে চার লাখের (৪৪৪,২৫৯) মত, যার মধ্যে এবারের রেজিস্টার্ড ভোটার প্রায় আড়াই লাখ (২৬২,১৩৫)। এই নির্বাচনে মাত্র দু’জন প্রার্থী ছিলেন, চলতি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন [Abdulla Yameen] ও বিরোধী দলের জোট থেকে প্রার্থী [যিনি এখন বিজয়ী নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত] ইব্রাহিম মোহম্মদ সলিহ [Ibrahim Mohamed Solih]। সলিহ ছিলেন চারদলীয় এক জোটের প্রার্থী, ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি জিতেছেন। যদিও ভোটদানের সুযোগ ছিল ভোটের দিন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। তবু আড়াই লাখ ভোট গুনতে বেশি সময় লাগার কথা নয়, তাই নির্বাচনের দিন না হোক পরের দিন মালদ্বীপের রাজধানী মালের একেবারে সকাল (২৪ সেপ্টেম্বর) থেকেই দেশী-বিদেশী সবাই জেনে যায় ভোটের ফলাফল। যদিও তখনও সেটা আনুষ্ঠানিক ফলাফল নয়, মানে মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে এমন ফলাফল নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের প্রকাশ্য অস্থিরতা ও নড়াচড়া ছিল খুবই অকূটনীতিসুলভ। কূটনৈতিক আচার-আচরণ ভেঙে আনুষ্ঠানিক ফলাফল আসার আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে সলিহকে শুধু অভিনন্দন জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন কি না, মনগড়া সে আশঙ্কা ভারত সৃষ্টি করে আর তা প্রপাগান্ডায় ছড়িয়ে দেয়। ভারতের বিবৃতিটা লেখা হয়েছে এভাবে যে, “আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন এখন এই ফলাফল নিশ্চিত করে তাড়াতাড়ি অফিসিয়াল ঘোষণা দেবে। এই নির্বাচন কেবল মালদ্বীপের গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয়ের চিহ্ন নয় বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রতি কমিটমেন্টের প্রকাশ”। [We heartily congratulate Ibrahim Mohamed Solih on his victory and hope that the Election Commission will officially confirm the result at the earliest. This election marks not only the triumph of democratic forces in the Maldives, but also reflects the firm commitment to the values of democracy and the rule of law.] টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া

এই বিবৃতিটা স্পষ্টতই ভারতের এক চরম হস্তক্ষেপমূলক কাজ। ব্যাপারটা শুধু আমরা পাঠকেরাই নই, টাইমস অব ইন্ডিয়াও আমল না করে পারেনি। তাঁরা নিজ মন্তব্যে লিখেছে, ফলাফলের “অফিসিয়াল ঘোষণা দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে” [not waiting for official announcement] ভারত বিবৃতি দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন সলিহ-এর নির্বাচনে বিজয়ের ফলাফল ঘোষণা নাও করতে পারে – এই বিবৃতিতে ভারত আগাম এ ধরনের এক সন্দেহ ও ইঙ্গিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে স্বভাবতই এই বিবৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, পরিস্থিতিকে খামোখা উত্তেজিত করার চেষ্টার এক সীমা ছাড়ানি হস্তক্ষেপ।

বিবৃতির ভাষাও লক্ষণীয় যে, বিবৃতিতে ভারত সাজেশনে বলতে চাচ্ছে নির্বাচনী “ফলাফল” তো এসেই গেছে, এখন কমিশনের কাজ হল কেবল ঘোষক-এর ভুমিকা পালন করার; তাই তাড়াতাড়ি ওই ফলাফল ঘোষণা করে দিক। ভারতের এমন বক্তব্য, এটা আসলে অপর রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশনের কাজ ও এখতিয়ারের মধ্যে ঢুকে পড়া। আর এর চেয়ে বড় কথা, এতে কমিশনকে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরিচালক নয় যেন কেবল ফলাফল ঘোষক – এরকম এক আপত্তিকর সাজেশন ও অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা হয়েছে। ভারতের বিবৃতিতে দাবি করছে নির্বাচনের ফলাফলে সলিহ জিতে গেছে – অথচ এটা ভারতের দাবি করার সে কেউ নয়, ফলে অনধিকার চর্চা। এটা ভিন্ন রাষ্ট্রের ইস্যু বা বিষয়। অতএব এই দাবি করাটাই অবৈধ হস্তক্ষেপ। কারণ নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণার (গেজেট নয়) আগে কোনো ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষিত হয়ে গেছে বলে বিবেচিত হতে পারে না। ফলে কমিশনের ঘোষণার আগেই কোন বিদেশী রাষ্ট্র, ফলাফল সে জানে এই দাবি করে বিবৃতি দেয়া এক বিরাট অনধিকার চর্চা। কিন্তু ভারত সেটাই করেছে।

চলতি বছরের শুরুর আগে পর্যন্ত বিগত দশ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি” নিয়ে কাজ করে গেছে। কিন্তু এবছর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের আমেরিকায় রফতানির ওপর শুল্ক আরোপ করার কারণে বস্তুত সেসব আন্ডারহ্যান্ড  সম্পর্ক অকার্যকর হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এতে আগের সব বোঝাপড়া যে, ভারত কী সার্ভিস দিলে বিনিময়ে কী পাবে, তা অকেজো হয়ে যায়। তবুও ভারত চীন বিরোধী কোনো স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান নিলে আমেরিকা তাতে চোখ বন্ধ করে সমর্থন দেবে – এমন একটা কাঠামো এখনও থেকে গেছে দেখা যাচ্ছে। তাই মালদ্বীপ প্রসঙ্গে ভারতের বিবৃতির পর, ভারতের আবদারে আমেরিকাকেও একই লাইনে একটা বিবৃতি দিতে দেখা যায়। মালদ্বীপের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে এটাও আমেরিকার হস্তক্ষেপমূলক এক বিবৃতি। যদিও ভারতের বিবৃতির সাথে এর তফাত এতটুকু যে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র হিদার নওরট [Heather Nauert]  সবকিছুর আগে নিজেই বলে নিয়েছেন, “অফিসিয়াল ফলাফল এখনো ঘোষিত হয় নাই”’ তবে “স্থানীয় মিডিয়া ও এনজিও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি” করে তিনি কথা বলছেন।  [“Although the Election Commission has not yet announced the final tally, we note Maldives’ media and NGO reports ………] এটাও টাইমস অব ইন্ডিয়ার আর এক রিপোর্ট।

অর্থাৎ আমেরিকা তাদের একটু হলেও আক্কেল আছে যে, কোনো রাষ্ট্রের নির্বাচনে কে জিতেছে এই ফলাফলের নির্ধারণের একমাত্র অথরিটি ঐ রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন। ভিন রাষ্ট্র এর বাইরে যেতে পারে না। যদি যায় অর্থাৎ তারা যদি ধরে নিয়ে বিবৃতি দেয়া শুরু করে যে, “অমুকে জিতেছে” তাতে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের বড় নজির হবে সেটা, আমেরিকা তা আমল করেছে।

কিন্তু তবু আর একটা বাক্যে আমেরিকাও ভারতের প্ররোচনায় অযাচিত নোংরা হাত ঢুকিয়েছে এবং বেকুবও হয়েছে। সেই বাক্যটা হল, “We urge calm and respect for the will of the people as the election process concludes,” Nauert said. অর্থাৎ “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে তাই আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো ও শান্ত থাকার আহবান জানাই” – নওরট বলেন।

এখানে ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে”, অথবা “ফলাফল হয়ে গেছে” – এভাবে বাক্য লেখার মূল কারণ হল, মূলত ভারতের ধারণা, “এটা দাবি করা যে সলিহ জিতে গেছে” – এটা ব্যাপক প্রচার করে দাবি না করলে যদি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রভাবে কমিশন ফল প্রকাশ না করে! তাই  (এবং প্রভাবিত করে আমেরিকাকেও) নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণার আগে থেকেই ভারতকে দাবি করতে থাকতে হবে যে “সলিহ জিতে গেছে”। কিন্তু গুরুতর সমস্যা হল, বাইরের রাষ্ট্র এটা করলে তা অনধিকার হয়, অকুটনীতিক আচরণ হয়। কিন্তু ভারত একেবারে ইজ্জত-জ্ঞান শুন্য বেপরোয়া হয়ে তাই করেছে।

আবার লক্ষ্যণীয় আসলে ব্যাপারটা এমনও ছিল না যে, কমিশনের কাজে কোনো গড়িমসি দেখা গেছে। কারণ নির্বাচনের পরের দিন অর্থাৎ ঐ ২৪ তারিখেই বেলা বাড়তেই নির্বাচন কমিশন নিয়ম মাফিক সলিহকে নির্বাচিত বলে ফলাফল ঘোষণা করেছিল। আর এর দু-এক ঘণ্টা পরেই প্রেসিডেন্ট  ইয়ামিন নিজ অফিসে নির্বাচিত প্রার্থী সলিহকে আমন্ত্রিত করে ডেকে নিয়ে বিজয়ের অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর এর পরেই প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন  নিজে মিডিয়ার সামনে ঘোষণা  দিয়ে বলেন, “মালদ্বীপের জনগণ তারা যা চায় সেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আমি গতকালের সেই ফল মেনে নিয়েছি। ইতোমধ্যে আমি সলিহর সাথে দেখা করেছি, যাকে ভোটাররা পরবর্তি প্রেসিডেন্ট হিসাবে বেছে নিয়েছে। আমি তাকে অভিনন্দনও জানিয়েছি”। [“Maldivian people have decided what they want. I have accepted the results from yesterday. Earlier today, I met with Ibrahim Mohamed Solih, who the Maldivian electorate has chosen to be their next president. I have congratulated him,” Yameen said in a televised press conference.]। এটা রয়টারের রিপোর্ট, থেকে নেওয়া। অর্থাৎ কোন নির্বাচনে একজন প্রেসিডেন্টের পরাজিত হওয়ার পর এর চেয়ে স্পষ্ট ও সবল স্বাভাবিক ঘোষণা আর কী হতে পারে!

অথচ ভারত নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর বহু আগে থেকেই নিয়মিতভাবে ইয়ামিনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে গিয়েছে যে, “নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি সবকিছু। আর অনুসারী হয়ে আমেরিকাও ভারতকে সমর্থ করে নিজের খারাপ কূটনৈতিক ইমেজ আর বেকুবির নজির সৃষ্টি করেছে। অথচ  নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া দেখার জন্য অন্তত ২৪ সেপ্টেম্বর দিনটা পার হওয়া পর্যন্ত ভারত ও আমেরিকা অপেক্ষা করতে পারত। আর সেটাই সবাই আশা করে আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই অতি উৎসাহ দেখিয়ে দুই রাষ্ট্র নিজেরাই এক হস্তক্ষেপের নজির সৃষ্টি করে রেখেছে, আর নিজের মুখে কালি লাগিয়েছে। কারণ, এপর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত কোথাও কোন ধরণের গোলযোগ ছাড়াই মালদ্বীপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি ভারতীয় প্রপাগান্ডার ফাঁদে পড়ে, গোলযোগের আশঙ্কা করে নির্বাচনের তিনদিন আগে ২০ সেপ্টেম্বর আলজাজিরা-এর মত মিডিয়া এক পক্ষপাতিত্বের রিপোর্ট ছেপেছিল।  অথচ ফলাফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত ভারত, আমেরিকা বা কোন মিডিয়া তাদের কারচুপি বা গোলযোগের মনগড়া প্রপাগান্ডার কোন সত্যতা তারা দেখাতে পারে নাই।

বরং প্রতিক্ষেত্রে  ভারত ও আমেরিকার প্রপাগান্ডার উল্টা – নির্বাচন এতই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মমাফিক হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা আমলা ঘনিষ্ট এক কলামিস্ট নিজেই ২৪ তারিখ সকালেও নিজের “ফলাফল ঘোষণা ও ক্ষমতা হস্তান্তর” নাও হতে পারে – এ ধরনের মনগড়া আশঙ্কা যাচাই করতে মালদ্বীপে দু’জন গুরুত্বপূর্ণ এমপির সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন। ওই এমপি দু’জন এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিলে এবার তিনি আশ্বস্ত হন বলে তাও লিখেছেন।
সবশেষ নিজেই লিখছেন, “সলিহ যেহেতু জিতেছে অতএব মালদ্বীপের নির্বাচনে কারচুপি হয়নি”। এই হল মালদ্বীপের নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় প্রপাগান্ডার মুখ থুবড়ে পড়া পরিণতি!

মালদ্বীপের ফলাফল দেখে ফেসবুকে একটা ছোট মন্তব্যে লিখেছিলাম, ‘এটা বিপর্যয়’। কিন্তু কীসের? মালদ্বীপের থেকে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কী শেখার আছে, তা বোঝার উদ্দেশ্যে সেখানকার রাজনৈতিক ঘটনাবলির এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে আনব।

মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি স্পষ্ট পরস্পরবিদ্বেষী দুই ভাগে বিভক্ত। এটা আর বিরোধী নয় বিদ্বেষী জায়গায় চলে গেছে। তবু ঘটনাবলির একটা বর্ণনা মানে বর্ণনার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই করতে হবে। আর তাতে কোন পক্ষ সঠিক ছিল অথবা এর কোনো একটা পক্ষের প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলাটা এখানে এর একেবারেই উদ্দেশ্য নয়। তাই এই রচনায় কোনো পক্ষকে “ভাল” বললাম কি না, তা খোঁজা অথবা সেদিক থেকে বুঝতে যাওয়া খুবই ভুল হবে। আর এতে লেখাটার সুবিচার বঞ্চিত হবে।

প্রথমত, মালদ্বীপের রাজনৈতিক অসন্তোষ, অস্থিরতা অনেক পুরনো, গত শতক থেকে। এর একটা বড় উৎস হল, ক্ষমতাসীন পরিবারের প্রভাবশালী দুই সৎ ভাইয়ের রেষারেষি আর স্বার্থ ঝগড়াকে কেন্দ্রে রেখে এবার এর সাথে সমাজের অন্যান্য নানান স্বার্থগুলো একেক ভাইয়ের পক্ষ বেছে নেওয়াতে এটাকেই মালদ্বীপের রাজনৈতিক পোলারাইজেশন হিসেবে মনে করা হচ্ছে – এ ধরনের। অর্থাৎ রাজনীতি কম আর স্বার্থবিরোধ ভার বেশি। দ্বিতীয়ত, ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপে ভারত “অপারেশন ক্যাকটাস” নামে নিজ সামরিক বাহিনী নামিয়ে পছন্দের সরকার বসিয়ে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছিল; এই বিরাট খারাপ নজির সেই থেকে জ্বলজ্বল করছে। তৃতীয়ত, ২০১২ সালের পর থেকে চলতি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সাথে অপর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের রাজনৈতিক বিবাদ তৈরি হওয়া, এক পর্যায়ে ‘টেরোরিজমের অভিযোগে’ নাশিদকে আদালতে নিয়ে শাস্তি দেয়া, এরপরে পার্লামেন্টকে কার্যকরভাবে কাজ করতে না দেয়া, বিচারককে গ্রেফতার, দুবার অপ্রতিষ্ঠিত-সাফাই দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি ইত্যাদি ঘটনা ঘটেছে যা মালদ্বীপের রাজনৈতিক তৎপরতা ও চর্চা হিসেবে খুবই খারাপ সব উদাহরণ।

কিন্তু এসবের বিপরীতে আদালতের ঘটনার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের (Mohamed Nasheed, যিনি প্যারোলে চিকিতসার জন্য বাইরে লন্ডনে গিয়ে সেখান থেকে দেশে না ফিরে এখন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসাবে শ্রীলঙ্কায় বসবাস করেন) খোলাখুলি ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপে ক্ষমতা দখলের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা আরো খারাপ এক উদাহরণ। সৌভাগ্যবশত এটা গত শতক নয়। অল্প কথায় বললে, জাপানি টাইমস আর রয়টা্র্সের খবর অনুযায়ী , নাশিদের খোলাখুলি ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের প্রতিক্রিয়ায় পরে,  চীন ১১ জাহাজের এক বহর নিয়ে ভারত মহাসাগরে হাজির হয়েছিল। এতে চীনের সাথে কোন মুখোমুখি সঙ্ঘাত পরিস্থিতি এড়াতে ভারত মালদ্বীপে হস্তক্ষেপে নাশিদের আহবান উপেক্ষা করে, আর বিষয়টা এবার চিন্তা থেকে বাদ দেয়। ফলে আরো খারাপ কিছুর হাত থেকে নাশিদ এবং মালদ্বীপও বেঁচে যায়। তবে ভারতের কোন কোন মিডিয়া অহেতুক “ভারতের মুখরক্ষা করার তাগিদ” থেকে একটা স্টোরি প্রচার করতে থাকে যে নাশিদ তো এখন বিরোধী দলে – ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নয় (১৯৮৮ সালের মালদ্বীপ প্রেসিডেণ্ট গাইয়ুমের ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের সাথে মনে মনে তুলনা করে এরা কথা বলছে) তাই ভারত এবারের আহবান উপেক্ষা করেছে। যদিও আমরা ভারত মহাসাগরে চীনা মেরিন ও ভারতীয় নৌবাহিনীর তাদের পরস্পরের জাহাজ কত দূরে এনিয়ে বিবৃতি দেখেছি। ভারত বলেছিল আমার হাজার খানেক মাইলেরও দূরে। আর চীনা এক নৌ ওয়েবসাইট বলেছিল, না আমরা বেশ কাছাকাছিই। এরপর এতটুকুতেই ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, কারণ ……।

নাশিদের ভারতকে আহবান এর ঘটনা এই বছর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে। আর চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারীর। আর ওদিকে আর এক বিশাল বেড়ে চলা নয়া স্টোরি হল, ভারতের চলতি বিদেশ সচিব বিজয় কেশব গোখলে ঐ ৩০ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে তাঁর প্রথম বিদেশ ঘটান চীনে, ২৪ ফেব্রুয়ারি। ফলে যে যাই গালগপ্প দেক এবার সব টেনশন ফুস! আর এর পরেই আমরা পেয়েছিলাম ২৮ মার্চ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সিনিয়র সরকারি কর্তার  স্বীকারোক্তি – “দক্ষিণ এশিয়া কি আর ভারতের সেই বাগানবাড়ি আছে, চীন এসে গেছে না! আমরা এখন বড় জোর আমাদের মনোবাঞ্ছা চীনকে বলতে পারি। চীনের উচিত হবে আমাদের সাথে স্ট্রাটেজিক ট্রাস্ট তৈরি করা। ………আমরা চীনকে জানিয়েছি যে মালদ্বীপে আমরা হস্তক্ষেপ করব না”। এটা ছিল ঐ পত্রিকা রিপোর্টের সাব-হেডিং। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার বরাতে এটা ছাপা হয়েছিল। সারকথায় নাশিদের আহবান সত্ত্বেও বরং ভারত খোলাখুলি সংযত হয়েছিল।

কিন্তু মালদ্বীপের ঘটনাবলিকে মালদ্বীপ-রাষ্ট্রের নিজ স্বার্থের দিক থেকে যদি বিচার করা হয় তাহলে, ইয়ামিনের ক্ষেত্রে অপরাধ হলঃ যেসব প্রতিষ্ঠানের কারণে রাষ্ট্র কার্যকর ও প্রাণবন্ত থাকে – কিন্তু কেউ ক্ষমতায় আছে বলে সেগুলো প্রত্যেকটার (যেমন আইনশৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ইত্যাদি) স্বাধীন বা কনষ্টিটিউশন নির্ধারিত এখতিয়ার ও আইনসম্মত কাজে নির্বাহী প্রধানের অযাচিত ও বেআইনি হস্তক্ষেপ ঘটানো – এটা এক চরম আত্মঘাতী কাজ। ইয়ামিন বেপরোয়াভাবে সেই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর কাজগুলোই করে গেছেন। আর বিপরীতে নাশিদের ক্ষেত্রে, নিজ তথাকথিত রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবান রেখে পুরো মালদ্বীপ রাষ্ট্রকেই অস্তিত্বহীন দুস্থ করে ফেলার আরও এক অপরাধ করেছেন নাশিদ।

সব দেশেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থের নানা লড়াই, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সকলের জন্য পালনীয় এর কিছু ‘নো গো এরিয়া’ থাকে, যা থেকে দলগুলো সকলকে দূরে থাকতে হয়।

মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বা এর শৃঙ্খলায় ব্যাপক উলটপালট পরিবর্তন আসন্ন। আমার প্রায় সব লেখাই যেখানে দাঁড়িয়ে দেখে লেখা। গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও এর শৃঙ্খলা এবারের অভিমুখ চীনের নেতৃত্বে পরিবর্তন হতেই থাকবে। আর নতুন করে সাজানো হতে থাকবে। দুনিয়ায় আমেরিকান নেতৃত্ব ও প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে; একেবারে নাই না হলেও। আর তাতে পশ্চিম বা ইউরোপ নয়, দুনিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নাট্যশালা হয়ে উঠছে এশিয়া। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এশিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই কাঁধ-বদল বা শিফটিং – এর ভাল এবং মন্দ দুটো দিকই আছে। একদিকে ভাল কিছু সুযোগ পাওয়ার আছে আবার ঠিকমত ব্যবহার না করলে জানলে একইসাথে নিজে তছনছ হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনাও আছে – দুটোই।

সবচেয়ে মন্দের দিকটা হল, অস্থির ও চলতি এই শিফটিংয়ের প্রাথম দিককার সময়কালটা। দুনিয়া নতুন করে সাজানো আর সম্পর্কগুলো ঢেলে সাজিয়ে গড়ার এই কালেঃ
১. চীন, আমেরিকা আর ভারত এই তিন পক্ষের রেষারেষি থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে দূরে থাকতে পারতে হবে। কোন পক্ষকে নিজের পক্ষ ভাবা যাবে না, এলাইন হয়ে যাওয়া যাবে না। ঐ তিন পক্ষের কারও স্বার্থে নিজেরা বিভক্ত হলে ঐ বিভক্ত হওয়া থেকে ক্ষতি শুরু হবে।
২. দেশের দলগুলোর মধ্যে আভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও স্বার্থবিরোধে ওই তিন রাষ্ট্রকে ডেকে আনা যাবে না, সংশ্লিষ্ট করে ফেলা যাবে না।
৩. অথবা উল্টা করে বললে, ওই তিন রাষ্ট্র স্বার্থের কোনো একটার পক্ষ নিয়ে আমাদের কোনো রাজনৈতিক দল দেশের ভেতর কাজ করতে পারবে না। ‘প্রো-ইন্ডিয়ান বা প্রো-চাইনিজ দল ক্ষমতায়’- এ ধরনের পরিচিতি আমাদের পতনের ইঙ্গিত।
৪. একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই প্রধান, এটাকে সব সময় প্রাধান্যে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেই হবে।
৫. যে দলই ক্ষমতায় থাকুক – তার ভারত, আমেরিকা অথবা চীনকে কোনো সুবিধা দেয়া বা ঋণ নেয়া তা করতে হবে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে রেখে; অবিতর্কিত এবং স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়ায় যাতে অহেতুক তর্ক-বিতর্কের সুযোগ কেউ না নিতে পারে ইত্যাদি।

কিন্তু এসবই বজায় রাখা যাবে যদি নিয়মিত ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ও ক্ষমতাহস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে এক স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ দেয়া যায়। এ ছাড়া ক্ষমতাসীনের চোখে যে সরকার বিরোধী তারও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করতে ক্ষমতাসীনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।

এক কথায় বললে, মালদ্বীপের রাজনীতি ও দল এসব মৌলিক করণীয়গুলো করতে সবাই ব্যর্থ হয়েছে। ইয়ামিনের দিক থেকেও এই রাজনৈতিক ফলাফল বিপর্যয়কর এজন্য যে, হয়ত সে বলবে বিদেশীকে হস্তক্ষেপ ডেকে আনা নাশিদের উদ্যোগকে ঠেকাতে পেরেছে। কিন্তু ইয়ামিন তা এমন প্রক্রিয়ায় করেছে তাতে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন আদালত ও পার্লামেন্টকে) অকেজো করে ফেলেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা জনগণই এই কাজ পছন্দ করেনি। অনুমোদন করেনি। উল্টা করে বললে ইয়ামিন তার কাজকে জনগণ সাথে নিয়ে করতে পারেনি। এরই ফলাফল হল নির্বাচনে সব পাবলিক সহানুভূতি বিরোধী দলের দিকে চলে গেছে, যার প্রকাশ নাশিদের প্রার্থী বেশি ভোট পাওয়া বা ইয়ামিনের পরাজয়। তবে অবশ্যই আবার ইয়ামিন প্রশংসার দাবি রাখে যে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত ও তার বন্ধুদের নিয়মিত শত প্রপাগান্ডা [যে নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি] এসব সত্ত্বেও এগুলোর প্রতিটা যে ডাহা মিথ্যা তা ইয়ামিন প্রমাণ করে দিয়েছেন – একটা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্পন্ন করে দিয়ে। যা ভারত ও আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত। ওদিকে ভারতকে আহবান জানিয়ে নাশিদ যা করেছে তাতে তাঁর এখন রাজনীতি ত্যাগ করে অবসরে যাওয়া উচিত।

এখন নিয়ম অনুযায়ি আগামী ১৭ নভেম্বর হল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন। এরপরে এবার পালটা সলিহ ও নাশিদের দল বা জোট কী প্রতপক্ষের উপর পালটা প্রতিশোধ নেয়া শুরু করবে আর একইভাবে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকেজো করে রাখবে? জবাব সম্ভবত হ্যাঁ, সেই সম্ভাবনাই বেশি। এক ভারতীয় ‘বিদ্বজ্জন’ অধীর আগ্রহে কি লিখেছেন লক্ষ করা যাক। তিনি বলছেন, “নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মালদ্বীপ এবার ভারতের দিকে ফিরতে পারে এবং অবশ্যই ফিরবে”। [For new development projects, Maldives can turn to India and will.] তিনি এয়ারপোর্ট পুননির্মান প্রকল্প আবার ভারতের ফিরে পেয়ে যাবার স্বপ্ন দেখছেন।  অর্থাৎ সে সম্ভাবনা বাস্তব হলে তা হবে, নাশিদ ও তার দলবলের মালদ্বীপকে চীন-ভারতের হাতে পিংপং বল করে ফেলা- যা এক বিরাট অযোগ্যতা আর তা, আনফিট রাজনীতিক হওয়া হবে।

শেষ বিচারে আবার মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের এখনই উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই। একটা কারণ, মালদ্বীপে পার্লামেন্টারি নির্বাচন হবে ২০১৯ সালের মে মাসে। অতীতের রেকর্ড বলে, সে নির্বাচনে ইয়ামিনের দল আবার পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ে ফিরে এসে যেতে পারে। এ ছাড়া নাশিদের জন্য আরো বড় বিপদ হল, তারা জিতেছে একটা জোট হিসেবে। কিন্তু একদিকে জোটের মেনিফেস্টো অসম্পূর্ণ, আবার তাতে বলা আছে জোটের এগ্রিমেন্ট পার্লামেন্ট বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনু-স্বাক্ষরিত হতে হবে।
আরও আছে। এছাড়া নাশিদের দল চায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা উঠিয়ে দিয়ে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকারে চলে যায়। কিন্তু জোট শরিকেরা এতে একমত নয়। ফলে বহু – যদি, কিন্তু ও অনিশ্চয়তা – অপেক্ষা করছে।

তবে আমাদের জন্য সারকথাটা হল, আমাদের দলগুলো একেকটা চীন অথবা ভারতের এজেন্সি নিয়ে বিভক্ত হয়ে যেতে পারবে না। চীন, ভারত অথবা আমেরিকার আগে সবসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে ও স্বচ্ছতায় নিয়ে হাজির হতে হবে। নইলে নিজেরাই তছনছ হয়ে যাওয়ার শুরু হবে সেখান থেকেই।

একটা তামাসার বাক্য দিয়ে শেষ করা যাক। ভারত মালদ্বীপ ইস্যুতে ইয়ামিনকে “একনায়ক” আর তাঁর বিরুদ্ধে  নাশিদ-সলিহদেরকে “গণতন্ত্রপন্থিদের” বিজয় হিসাবে এক “মরাল” দাড় করাবার কোশিশ করে গেছে। আচ্ছা বাংলাদেশের বেলায় কী করবে? কাকে একনায়ক আর কাকে “গণতন্ত্রী” হিসাবে রঙ লাগাবে! ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য যারা আহবান করে সে অবশ্যই “বিরাট গণতন্ত্রী” দেখা যাচ্ছে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপের নির্বাচন ও আমাদের জন্য শিক্ষা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

গৌতম দাস

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uc

ভুটানের সদ্য শেষ হওয়া সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের অপেক্ষা

ভারতের জন্য সম্ভবত “আরেকটা উইকেটের পতন” হতে যাচ্ছে। না, দুবাইয়ের এশিয়া কাপ ক্রিকেট খেলা নয়, ভুটানের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। ভুটানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। প্রো-ইন্ডিয়ান যে দল এতদিন ক্ষমতায় ছিল যার নাম পিডিপি [Peoples’ Democratic Party’s (PDP)], এবারের নির্বাচনে এর শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দলটি নেমে গেছে প্রথম থেকে তৃতীয় অবস্থানে। এটা অবশ্য প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন। সেকেন্ড বা ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে আগামি মাসে ১৮ অক্টোবর। ২১ সেপ্টেম্বর ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার শেষ দিন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে ভারত “নিজের বাড়ির পিছনের বাগানবাড়ি” মনে করতে ভালোবাসে। শুধু তাই নয়, নিজের কোনো মুরোদ থাকুক আর নাই থাকুক, চীন কেন সেখানে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে হাজির হবে এবং এতে সেখানে চীনের প্রভাব কেন বাড়াবে তা নিয়ে ভারতের নাই-মুরোদের অস্বস্তি ও আপত্তি কেউ শুনুক আর না শুনুক, ভারত নিয়মিত এনিয়ে উষ্মা-অভিযোগ করে যেতে খুবই ভালোবাসে।

ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের(?) চুক্তি ১৯৪৯
ভুটান এক দিকে ভারত ও অন্য দিকে চীন দিয়ে ঘেরা। আর এক পড়শি নেপাল রাষ্ট্রের মতই ভুটানও চারদিকে অন্যের ভুমি দিয়ে ভূমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। বাইরে বের হতে চাইলে ভুটানকে ভারত অথবা চীনের ভুমি পেরিয়ে তবেই তাদেরই কোন সমুদ্র বন্দরের নাগাল পেতে পারে। বাণিজ্য ও পণ্য আনা নেওয়া সচল করতে পারে। সাম্প্রতিককালে ভারতের নাগপাশ ছিঁড়ে নেপালের সার্বভৌমত্বের চর্চা, সাহস এবং তার নেয়া পদক্ষেপগুলো দেখে সম্ভবত ভুটানের মনেও অনেক সাহস জমা হয়ে থাকবে। ভুটানের প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে অন্তত এর একটা প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করার কারণ আছে; তাই এতে ভুটানও হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য সম্ভবত আরেক উইকেটের পতনের ইঙ্গিত!

নেপালের মত ভুটানও “ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের চুক্তি ১৯৪৯” নামে ভারতের কাছে দাসখতের খোটায় বাধা পরে আছে। এগুলো একালে ১৯৪৭ সালের পরে ভারতের রিনিউ বা নতুন করে করা চুক্তি হলেও, সবই কলোনি আমলে বৃটিশ এম্পায়ারের সাথে ভুটানের (নেপালেরও) যে দাসত্ব চুক্তি ছিল, মুলত সেটারই কপি। কেবল “বৃটিশ সরকারের” জায়গায় “ভারত সরকার” বসিয়ে নিয়েছেন ভারতের নেহেরু সাহেব।  সে আমলে কলোনি মালিক বলতে বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, স্পেনিস, পর্তুগীজ মূলত এরাই ছিল, আর ছিল এদের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কার কলোনি কে যেকোন উপায়ে টান দিয়ে নিয়ে যায় এনিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। একারণে পুরানা রাজার রাজ্য কলোনি করে নিতে পারলে এরপর অনেক সময় সেটাকে “করদ রাজ্য” বলে ছাড় দিয়ে রাখত। আর করদ রাজ্য অন্যতম বৈশিষ্ট হত এক চুক্তিপত্র যেখানে লেখা থাকত যে ঐ রাজ্য আর বৈদেশিক বিষয়ে নিজে নিজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না, সেটা করবে বৃটেন। […the Kingdom of Bhutan is guaranteed its independence, but agrees to be represented by Great Britain in its foreign affairs.] এটা (১৯১০ সালে) বৃটেন ও ভুটানের মধ্যেকার চুক্তিপত্র  থেকে তুলে আনলাম। চুক্তিতে এমন লেখা থাকার মূল কারণ যাতে নেপাল বা ভুটান অন্যকোন কলোনি শক্তির সাথে নতুন চুক্তি করে চলতি চুক্তি ভেঙ্গে না দিতে পারে। পুরান চুক্তির কলোনি প্রভুদের কথাগুলোই কপি করার মধ্য দিয়ে “কথিত প্রগতিবাদী” প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নিজেই কলোনি-প্রভু হবার খায়েস এবং কলোনি-শাসক-প্রিয়তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সেই থেকে ভারতের সিভিল-মিলিটারি আমলা প্রশাসনের ওরিয়েন্টেশনে ও মন-মানসিকতায় অন্য রাষ্ট্রকে কলোনি-সম্পর্কে আবদ্ধ করার আগ্রহ অভ্যাস হিসাবে রপ্ত হয়ে যায়।
অনেকে মনে করতে পারেন কলোনি আমলে কলোনি বানানো জায়েজ হলে একালে নয় কেন, নেহেরুর তাহলে দোষ কী? অবশ্যই দোষের এবং ঘোরতর দোষের। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়া শুরু হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত অবস্থান ও কনভেনশনে যে, কলোনি শাসন অন্যায়, অবৈধ। ভিন্ন ভাষায়, “প্রত্যেক জনগোষ্ঠি কিভাবে শাসিত হবে তা তাঁরা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। আর এই নির্ধারণ তাদের অধিকার”। তাই ১৯৪১ সালের পরে জন্ম নেয়া জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। সেকারণে কফি আনান বলতে পেরেছিলেন, সাদ্দাম-উতখাতের পরের ইরাকে আমেরিকার বুশ প্রশাসনের উপস্থিতি – জাতিসংঘের চোখে এখানে “আমেরিকা এক দখলদার শক্তি”।

আর এটারই নেহেরু আমলে ১৯৪৯ সালের করা চুক্তির ভাষ্যে, তৃতীয় দফা আছে এভাবে, “……বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে ভারত সরকার  ভুটান সরকারকে যা বলবে ভুটান সেই পরামর্শ অনুসরণ করবে বলে রাজি হচ্ছে”। [On its part the Government of Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.] অর্থাৎ কেবল ভাষার রকম ফের করে একই জিনিষ রেখে দেয়া হয়েছে। মজার কথা হল, এই চুক্তিতে ভুটান সরকারকে বৃটিশ সরকারের একটা ক্ষতিপুরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল। যার ১৯১০ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী ছিল সেকালের মুদ্রায় ১০ লাখ ভারতীয় রুপী। আর ১৯৪৯ সালে এসে দেখা যায়, নেহেরু সাব একালের মুদ্রামানে বাড়ানো দূরে থাক বরং কমিয়ে করেছিলেন মাত্র ৫ লাখ রুপী। তবে এসব প্রসঙ্গগুলো ২০০৭ সালে চুক্তি আপডেট [update the 1949 Treaty] এর সময় বাদ দেয়া হয়েছে । আর সেই সাথে ২০০৭ সালের এই আপডেট চুক্তিতে কী শর্তে ভারতের ভুমি ব্যবহার করে মালামাল আমদানি করতে পারবে এই ইস্যু ঢুকানো হয়েছে। তবে বলা হয়েছে ভুটান সব কিছুই আমদানি করতে পারবে “ভারত যতক্ষণ সন্তুষ্ট” [as long as the Government of India is satisfied] থাকবে। এটা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষ্যটাই এটাই। এবার সেটার আলোকে ২০০৭ সালে ভারত-ভুটান আপডেট চুক্তি করে নেয়া হয়েছে। এর সোজা অর্থ হল এই চুক্তি অর্থহীন। কারণ ভারত যে কোন সময় কোন কারণ না দেখিয়ে যেকোন আমদানিকে “বন্ধ” বলতে পারবে – কেবল সে “অসন্তুষ্ট” একথা উল্লেখ করার যথেষ্ট হবে।

এখান থেকে এটা পরিস্কার কেন ভুটান চীনের সাথে সম্পর্ক পাতাতে আগ্রহী। নেপাল বা ভুটান উভয়েই ভারতের শর্তের বেড়াজাল ভাঙতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি নেপাল কোন কিছু আমদানি করতে গেলে এতদিনের ভারতের উপর তার শতভাগ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার পথ পেয়ে গেছে। নেপালকে ট্রানজিট দানের ক্ষেত্রে ভারতের একচেটিয়ার দিন শেষ হয়েছে।  ভারতের বিকল্প হিসাবে চীনের ভুমি ব্যবহার করে চীনের চারটা সমুদ্র পোর্টসহ ও স্থলবন্দর মিলিয়ে মোট সাতটা পয়েন্ট দিয়ে আমদানি করতে পারার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের সাথে এই চুক্তির ফলে বাস্তবত এটা নেপাল-ভারত মৈত্রী চুক্তির নামে দাসত্ব চুক্তি নেপালের কাছে “অপ্রয়োজনীয়” হয়ে গেছে। চীন-নেপাল সম্পর্কের এই নতুন বিকাশ ও অভিমুখ ভুটানের অজানা থাকার কারণ নাই। নেপালকে অনুসরণ এখন ভুটানের জন্য কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

২০১৩ ও ২০১৮ এর নির্বাচন কিছু তুলনামূলক আলাপ
গত ২০০৭ সালে আগের পুরা রাজতন্ত্র থেকে কনষ্টিটিউশনাল শাসনে আসার পর থেকে এটা ভুটানের তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। তবে ভুটানে নির্বাচনব্যবস্থা দুই স্তরে সম্পন্ন হয়। তাই এবারের নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ করতে, দ্বিতীয় ও শেষ স্তরের নির্বাচন হবে ১৮ অক্টোবর। যেখানে এবার প্রার্থী হতে পারবেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয়, কেবল সেই দুই দলের প্রত্যেকের (ভুটানের পার্লামেন্টে মোট সংসদীয় আসন ৪৭ মাত্র) ৪৭ জন করে প্রার্থী।

২০১৩ সালের নির্বাচনের ফলাফলের সাথে এবারের একটা তুলনার মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের মধ্যে তুলনা করে বলা চলে যে, গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে যে (পিডিপি) [[Peoples’ Democratic Party’s (PDP)],] দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল সেই দল এবার ২০১৮ সালের প্রথম রাউন্ডে হয়ে গেছে তৃতীয়। আর ২০১৩ সালে যে দল দ্বিতীয় হয়েছিল (ডিপিটি) [Druk Phuensum Tshogpa (Bhutan Peace and Prosperity Party) (DPT)]; সে এবারো দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। কিন্তু তৃতীয় দল (ডিএনটি) [Druk Nyamrup Tshogpa (DNT) দলের মূলনেতা ডাক্তার লোটে শেরিং] এবার চমক দিয়ে উঠে এসে একেবারে প্রথম হয়ে গেছে। আর প্রথম হওয়া দলটা গঠিত হয়েছিল মাত্র গত ২০১৩ নির্বাচনের আগদিয়ে।

খুব ছোট দেশ ভুটানের লোকসংখ্যা মাত্র প্রায় আট লাখ [আমাদের মধ্যম মানের দুটা উপজেলার মোট জনসংখ্যা এরকমই; যার মধ্যে আবার এবারের মোট ভোটার প্রায় তিন লাখ (২৯১,০৯৮)। এবার ভোটদানের হারও বেশি; ভোট পড়েছে মোট ভোটারের ৬৬%, গতবার যা ছিল ৫৫.৩%। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ভুটানি মিডিয়া বলছে, পোস্টাল ভোট এবার অনেক বেশি পড়েছে। এর বেশির ভাগ পেয়েছে প্রথম হওয়া দল। সরকারি কর্মচারী আর প্রবাসী ভুটানি (যারা আগে থেকে রেজিস্টার্ড)- এরাই মূলত পোস্টাল ভোটার। ওই দিকে বাংলাদেশের কোনো কোনো পত্রিকায় খবর বের হয়েছে [ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ছাত্র লোটে শেরিং] – প্রথম হওয়া ডিএনটি দলের প্রধান একজন এমবিবিএস ডাক্তার, তিনি আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। যা হোক, তার দলের বিরাট জনপ্রিয়তা ও প্রথম হওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে যে, তার প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তিনি বিজয়ী হলে গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছে দেবেন, বিশেষ করে মা ও মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। মনে হচ্ছে এই প্রতিশ্রুতি তাদের মনে ধরেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো অবকাঠামো যেখানে খুবই অপ্রতুল যেমন – মোট মাত্র ১৮ হাজার বর্গমাইলের ভুটানের (তুলনায় ৫৭ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ) পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে যেতে আজও এক সপ্তাহ সময় লাগে।

সাহস করে ভুটানের চীনের প্রতি আগ্রহের হাত বাড়ানো
তবে আরেক ফ্যাক্টস হল, এবারের দ্বিতীয় হওয়া দল ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘ডিপিটি’ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন  করে ক্ষমতায় (২০০৮-১৩) ছিল। কিন্তু ভারতের চোখে এই দলের “অপরাধ” হল, ২০১২ সালে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাওয়ের সাথে ব্রাজিলে দলের নেতা ও তৎকালীন ভুটানি প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করেছিলেন। এতে ভারত খুবই নাখোশ হয়। এই প্রসঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়ার কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রাণী বাগচী লিখছেন, India has had a rocky relationship with DPT which was in government between 2008 and 2013, largely because of the then PM Jigme Thinley’s interest in building ties with China.অর্থাৎ ডিপিটির প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। আর এখান থেকেই পড়শি সব দেশে ভারতের যা করা স্বভাব যে, কোনো একটি দলকে প্রভাবিত করে সেটাকে ভারতের অন্ধ দালাল বানিয়ে ঐ দেশের রাজনীতি কলুষিত করে ফেলা, তা শুরু হয়। ফলে ভুটানের সেসময়ের ক্ষমতাসীন দল ‘ডিপিটি এর প্রতিদ্বন্দ্বি দল – পিডিপি ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে পরের নির্বাচনে হাজির হয়ে যায় ও জয়লাভ করে।

সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘স্ট্রেইট টাইমস’।  ইন্ডিয়া থেকে এর ব্যুরো চিফ হলেন নির্মলা গণপতি। তিনি তাঁর রিপোর্টে ভুটানিরা ভারত ও চীন ইস্যুকে কিভাবে দেখে তা বোঝাতে একটা সাবহেডিং বাক্য লিখেছেন এমন – “ভুটানিরা দিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু তাঁরা একই সাথে বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়”। [While Bhutanese value close ties with Delhi, they also feel need for relations with Beijing…]
যদিও ব্যাপারটা হল- ‘মূল্য দেয়’ অবশ্যই অগত্যা। কারণ, না দিলে আরো বিপদ। কিন্তু বেইজিংকেও খুঁজতে হয়। কারণ একতরফা ভারতের কর্তৃত্ব থেকে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতেই হবে।

চীনের সাথে এখনও ভুটানের রাষ্ট্রদূত বিনিময় হয়নি। সেটা এখন প্রক্রিয়াধীন। তবে ইতোমধ্যেই ভারতে পরস্পরের অফিস বা অন্য কোন দেশের কোথাও গিয়ে তারা দেখা করে কথা বলে। কিন্তু তাতেও ঘোরতর অস্বস্তি আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি যে ভারতের পার্লামেন্ট -লোকসভার সংসদীয় প্রশ্নোত্তরে এটাকে প্রসঙ্গ করা হয়েছিল। ব্যাপারটা এমনভাবে হাজির করা হয়েছে, যেন বৌমা কেন কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছে আর শাশুড়ির তা নিয়ে কথা তোলার সুযোগ পেয়েছে। এনিয়ে সংসদীয় রিপোর্ট এখানে দেখা যাবে, [Q NO. 1470 BHUTAN-CHINA GETTING CLOSER]।

এ দিকে, ২০০৭ সালের পর থেকে ভুটান আর রাজার খেয়ালি শাসনের দেশ নয়, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রাষ্ট্র। এবার নিয়ে সেখানে তৃতীয়বার পার্লামেন্ট নির্বাচন হল। আর এর আগে প্রায় শত বছরের পুরনো (১৯১০) স্বাধীন রাজতন্ত্র হলেও, ১৯৪৭ সালে নেহরুর আমল থেকে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতনির্ভর।

যেহেতু ভারতের ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া ভুটানের ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্তি নেই- এটাকেই ভারত একরকম মুক্তিপণ বানিয়ে নিয়েছে; আর ভারতনির্ভর হতে বাধ্য করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু কত দিন ভারত সেসুযোগ পাবে? ভুটানের নতুন প্রজন্ম এথেকে মুক্তি পেতে যেন মরিয়া। যা সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই সতর্কভাবে ভুটানিজদের অন্তরে ভারত-বিরোধিতা আর চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার হাতছানি – দুটোই বাড়ছে। নেপাল ভারতের বিকল্প এবং ভারতের চেয়ে প্রাপ্ত সুবিধাদির দিক থেকেও অগ্রসর চীনা ট্রানজিট (রেল যোগাযোগ) জোগাড় করতে পারলে, তাহলে ভুটানেরও সেটা না পারার কোনো কারণ নেই। কেবল তা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এটা অতীতে ১৯৪৭ সাল থেকেই নেহরুর ‘ভাইসরয়’ ভাব ধরে থাকার যে খায়েশ দেখিয়ে গেছে, ভারতের সিভিল ও গোয়েন্দা আমলা প্রশাসন এখনও যেই নীতির অনুসারি এর তো ক্ষতিপূরণ ভারতকে এখন দিতেই হবে। নেহরুর সেই আত্মঘাতী চিন্তার মূল্য ভারতকে চুকাতেই হবে।

খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেই ২০০৭ সালের পর থেকে রাজার আর খামখেয়ালি তো শাসন নয়। ভারতের হাত থেকে ভুটানকে বাঁচাতে তিনি তা একা পারবেন না, তাই জনগণকে শাসন-ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বেচ্ছায় রাজা জননির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের সরকার আর কনস্টিটিউশনের অধীনে (রাজার খেয়াল নয়) পরিচালিত সরকার – এমন কনষ্টিটিউশনাল রাজতন্ত্র চালু করে দেন; আর সেই সাথে রাজনৈতিক দল ও তৎপরতা চালু হওয়ায় সরকার গঠনে জনসম্পৃক্ততাও আসে। এখান থেকেই ভুটান সরকারের নিজেরা নিজের সার্বভৌমত্ব চর্চা ও নিজ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে তদানীন্তন চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ ছিল এর অংশ। কিন্তু ভারত এতে অসন্তুষ্ট হয়েছিল ও নিজের কোটারি স্বার্থের বিপদ দেখেছিল। ভুটানের জ্বালানি তেলের সরবরাহকারী ভারত, আর এতে ভারত কিছু ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তাই ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগের দিন ওই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে, নিজের পক্ষে ভুটানিদের ওপর চাপ দিতে – ভারত ওই ভর্তুকি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছিল। হঠাৎ এই চাপের মুখে, জনমনে কিছুটা ভয়ে – সব মিলিয়ে এর প্রভাবেই ঐ নির্বাচনে ভারতপন্থী দল পিডিপি ক্ষমতায় জয়লাভ করেছিল বলে মনে করা হয় এখনও। এমনকি ভারতীয় মিডিয়াতেও  কেউ কেউ এটাকে ভারতীয় সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া বলে দোষারোপ করে থাকে।

চীনের ঝাড়ি মারা
কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রো-ইন্ডিয়ান দলের এক নম্বর অবস্থান থেকে তিনে চলে যাওয়াতে ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচুর হইচই পড়ে যায়। এমনকি কোথাও ভারত সরকারকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান ও পরামর্শও আসতে থাকে। তেমনি এক রিপোর্ট হল – টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। এতে কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রানী বাগচী লিখছেন, “ভুটানে ভারতকে উদ্যোগ ও তৎপরতা দ্বিগুণ করতে হবে”। [India will have to work doubly hard to help its closest neighbour achieve its aspirations while securing its interest…]
কিন্তু ভুটানে ভারতকে  “কোন উদ্যোগ” (হস্তক্ষেপের?) নিতে তিনি তাগিদ দিচ্ছেন সেটা ইন্দ্রাণী উহ্য রাখছেন। ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি আগের মত কোন ভারতীয় হস্তক্ষেপের কথা বলছেন। লিখছেন, ‘পড়শিকে তার স্বার্থরক্ষার আকাঙ্খা অর্জন করতে ভারত যেন ভুটানে নিজ প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করে”। এটা কি সাংবাদিকতা না উগ্র জাতীয়তাবাদী মনের আধিপত্য কামনা? আবার ভাব ধরছেন বিরাট কূটনীতিকের। কসরত করেছেন কোন এক কায়দা ব্যবহার করে “ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে” আহ্বান করবেন যা কূটনৈতিক বা সাংবাদিকতার নর্মস অথবা আইনের বরখেলাপ মনে না হয়।
এটা আসলে পড়শির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া না, পড়শির মাথায় চায়ের কাপ রেখে আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে চা খাওয়ার বেকুবি চেষ্টা। সেই নেহরুর আমল থেকে এটাই ভারতের নিয়মনীতি বা পড়শি পলিসি হয়ে আছে। এভাবেই বিশেষ করে ল্যান্ডলকড পড়শিদের নানা চুক্তিতে বাধ্য করে সুবিধা আদায় করে এসেছে ভারত। ব্রিটিশ কলোনি মাস্টার ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেপাল বা ভুটানের মতো পড়শি দেশের বেলায় নেহরুকে যেন বৃটিশ “ভাইসরয়” হিসেবে ভূমিকা পালন করতে দিয়ে গেছে। মোটকথা, পড়শিদের ভারতকে ‘ট্যাক্স’ দিয়ে চলতে হবে, যাতে নিধিরাম সর্দার ভারত দাবি করতে পারে যে – “এই চীন, এদিকে এসো না, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না; এটা আমার এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট!”

কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারতের অর্থনীতিতে যেমন অবকাঠামো ঋণের চাহিদা ও অভাব প্রবল – আর তা মেটাতে সে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে; তেমনি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মতো পড়শিরাও একই কারণে সেটাই করছে। কারণ কলোনি আমল থেকে ভারতসহ আমাদের সবার অর্থনীতিতে স্থানীয় মানুষের হাড় ভেঙে খেটে যা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়, যা আমাদের হক এবং হবু বিনিয়োগ পুঁজি, তা লোপাট ও নিজ দেশে পাচার করেছে ব্রিটিশরা। সে অভাব, সেই থেকে বিনিয়োগ চাহিদা আর প্রাপ্তির যে বিরাট গ্যাপ সেটা এখন একটু মনোযোগ পাচ্ছে – কারণ চীনের হাতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়েছে, যা অবকাঠামো ঋণ হিসেবে দিতে চীনও আগ্রহী।

তাই ভারতসহ সবাই আমরা বুভুক্ষের মতো চীনা অবকাঠামো ঋণ ও প্রকল্প নেবো কারো বাধা না মেনে। তবে যাদের সরকার, রাজনীতি বা রাষ্ট্র ইতোমধ্যে যথেষ্ট শক্তপোক্ত হয়ে গেছে, ব্যাপস্থাপনায় দক্ষ; তারা প্রকল্প ও শর্তগুলো ভালো বাছবিচার করতে পারবে। না হলে কোন কোন দেশ কিছু আরও কষ্ট স্বীকার করবে, কোন কোন প্রকল্প লাটে উঠবে, চুরি দুর্নীতিতে ভরে যাবে।

সব ঘটনার মূল কারণ তাহলে, আমাদের সীমাহীন অবকাঠামো ঋণ চাহিদা এবং বিনিয়োগ না হওয়া। এই চাহিদা প্রসঙ্গে এডিবির এক স্টাডি বলছে – এশিয়াতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি আর এআইআইবি (AIIB, চীনের বিশ্বব্যাংক) সবাই মিলে তাদের সব সামর্থ্য ঢেলে অবকাঠামো বিনিয়োগ করলেও তাতে এশিয়ার এখন অবকাঠামো বিনিয়োগ চাহিদা যত তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ঘাটতি থেকেই যাবে। অবকাঠামো ঋণ পেতে এ ব্যাপারে ভারতসহ আমরা সবাই “একই নৌকায়”। ভারতের যেমন, আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের পড়শি সব রাষ্ট্রেরও একই অবস্থা। ভারতসহ সবাই এক কাতারে যে, চীন আমাদের সবার অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণকারী এবং দীর্ঘ দিনের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ না হওয়া খরা-দশায় মূল ঋণদাতা। ফলে ‘আমার বাগানবাড়িতে চীন ঢুকে গেল’ এসব অর্থহীন কথা আর ভুয়া অহঙ্কার ভারতের বন্ধ করা উচিত। এগুলো আমাদের না কারও আর না বুঝার কিছু নাই।

আসলে ভারতের উচিত সবার আগে নিজে “চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগ” না নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক । চীন খোদ ভারতের অর্থনীতিতেই ঋণদাতা হয়ে ঢুকে বসে আছে, ভারত চীনের এআইআইবির (চীনের বিশ্বব্যাংক) সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। মানে চীন ভারতের বাগানবাড়ি না খোদ মূল বাড়িতে ঢুকে বসে আছে। এটা সবাই জানে।

ভারতীয় মিডিয়া হৈ চৈ প্রসঙ্গটা, ব্যাপারটা চীনের সরকারি ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকারও নজর এড়ায়নি।  তাই গ্লোবাল টাইমসের এক রিপোর্ট প্রশ্ন তুলেছে ভুটানের নির্বাচনী ইস্যুতে ইন্দ্রাণী বাগচীর লেখাসহ ভারতীয় মিডিয়ার হইচই নিয়ে। আর বলেছে, ‘ভারত যেটাকেই উন্নয়নের আদর্শ মডেল মনে করুক, তা যেন সব জায়গায়ই একই থাকে, আর ভারত যেন সেই একই মডেলের পক্ষে থাকে।’ উদাহরণ হিসেবে বলছে, ভুটান পূর্ব-পশ্চিমব্যাপী হাইওয়ে তৈরিতে এডিবির থেকে একটা ঋণ পেতে যাচ্ছিল কিন্তু ভারতীয় প্ররোচনায় সেটা বাতিল হলো কেন? ভারত একচেটিয়াভাবে ভুটানের সস্তা জলবিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে; অথচ তৃতীয় দেশে এর বিক্রি বাণিজ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। কিন্তু কেন?

আইএমএফের রেফারেন্স দিয়ে পত্রিকাটি প্রশ্ন করছে, ‘ভুটান কেন ঋণগ্রস্ত, এত আকণ্ঠে নিমজ্জিত? ভুটানের মোট ঋণ তার জিডিপি-এর চেয়েও বেশি হয়ে গেছে কেন? তাহলে ভুটান নিয়ে চাপাবাজি করছে কে? [Who is bullying Bhutan, China or India?] আর সেটা হয়েছে গত মাত্র ছয় বছরে – ভুটানের ঋণ জিডিপির ৬৭ শতাংশ থেকে ১১৮ শতাংশে উঠে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ভুটানের মোট ঋণের ৬৪ শতাংশ ঋণই হল ভারতের প্রদত্ত?

আসলে ইন্দ্রাণীর ভারত সরকারকে সরাসরি কিছু করার (হস্তক্ষেপের) আহ্বান, নিঃসন্দেহে এটা এক বেপরোয়া কাজ হয়েছে। ইন্দ্রাণী তার লেখার শুরুতে ‘হাইলাইট’ উপ-শিরোনামে তিনটি পয়েন্ট মানে তিনটি বাক্য লিখেছেন। এর প্রথম বাক্যটা হল এই বেপরোয়া আচরণ। আর পরের দুটা হল তার হতাশার কারণ বর্ণনা। যেমন, দ্বিতীয় বাক্যে তিনি আক্ষেপ করে লিখছেন, “২০১৩ সালের মত এবারের ২০১৮ সালে ভুটানের নির্বাচনে “ভারত কোনো ইস্যুই হতে পারেনি”। আর তৃতীয় বাক্য হল, “ভুটানে যে দুটো দল প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছে তারা ভারতের সাথে খাতিরের সম্পর্ক গড়ার কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়েই আমাদের খালি কিছু আশ্বাস শুনিয়েছে”।

আসলে ভুটানের এই নির্বাচনের বহু আগে থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে ভুটানিদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল এবং করণীয় নিয়ে খুবই সংগঠিতভাবে আলোচনা ও প্রচার তাঁরা চালিয়েছে। যেমন এনিয়ে “ভুটানিজ ফোরাম” নামে ফেসবুক গ্রুপ, সেছিল সবচেয়ে সরব। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় তারা একেবারে লো প্রোফাইল। কোনো দলের ক্ষোভ থাকুক আর ভালোবাসাই থাকুক নির্বাচনের মূল তিনটা দল ভুটানে “ভারতের তৎপরতার” বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ সম্পর্কে ছিল একেবারেই নিশ্চুপ। সম্ভবত তাদের ভয় ছিল, এতে ২০১৩ সালের মতো ভারতের কোনো পদক্ষেপ তাদের সাধারণ মানুষকে আরো কষ্টে ফেলে দিতে পারে। তাই তারা ভারতীয় মিডিয়ায় নয়, নিজ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছে, আর ভোটের বাক্সে ভোট দিয়ে আসল কাজটা করেছে; ভারতকে আসল জবাবটা দিয়েছে।

বহু পুরনো এক প্রবাদ হলো, কারো ক্ষতি করে সেটা থেকে তোমার লাভ আসবে – সেটা আশা করো না কখনও।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালের পর এবার ভুটান হাতছাড়া!  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]