চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

 

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

গৌতম দাস

১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uW

ইমরান খান ও শি জিনপিং – ছবি : সংগ্রহ

পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কেমন? মানে সম্পর্ক বলতে ভেঙ্গে বললে, স্ট্রাটেজিক, ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল সম্পর্ক কেমন, এই হল প্রশ্নটা। কোন দুই রাষ্ট্র তা ঘোষণা দিয়ে বললে  স্বভাবতই তা বুঝতে সহজ হয়। তবে না বললেও আন্দাজ অনুমান করে অনেক কিছুই প্রায় সঠিক জানা যায়। আসলে আমেরিকা এবং বিশেষ করে ভারতের সবচেয়ে গভীর আগ্রহ হল, স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী – তা জেনে ফেলার। ভারতের এই আগ্রহের তীব্রতা টের পাওয়া যায়, তাদের সব মিডিয়ায় ব্যবহৃত একটা শব্দ থেকে। সেটা হল, “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” (all weather friend); যেমন তারা খোঁচা দেওয়া মন্তব্য হিসাবে প্রায়ই লিখে থাকে যে – চীনের “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” পাকিস্তান ওমুকটা করতে যাচ্ছে……। তবে “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” লেখাটা যতটা না খোঁচা দিয়ে বলা এর চেয়ে বেশি এটা আসলে এক ঈর্ষামূলক আক্ষেপ। “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” মানে যারা খারাপ বা ভাল যে কোন পরিস্থিতিতেই বন্ধুই থেকে যায়। এছাড়াও আর একটা বিষয় হল, সাধারণভাবে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী তা জানাবুঝা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট করে “চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের” [CPEC projects] পিছনে স্ট্রাটেজিক বিষয়াদি কী লুকানো আছেও তা জানতে ভারত ও আমেরিকা বিশেষভাবে আগ্রহী।

পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকার এ’এক নতুন ধরনের ক্ষমতা। আমাদের আগের দেখা বা পুরনো অভিজ্ঞতায় যেসব ধারণা আছে তা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন। আমাদের মত রাষ্ট্র মাত্রই, আমরা সাধারণত দেখি এক বিশেষ কোটারি অথবা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ও দুর্নীতি সেখানে ঘটবেই। এটা গেল এক দিক আর অন্য দিকে থাকবে ঐ গোষ্ঠী নিজেদের কোটারি কোনো লাভালাভের লোভে বিদেশী কোনো স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মুখস্তের মত আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ইমরানের আগমন অন্তত এই অর্থে নতুন যে, এই ক্ষমতা আমাদের দেখা বা জানা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে অনেক কিছুই আমরা ভিন্ন দেখব, তা অনেকেই আশা করে।

কিন্তু কতটুকু নতুন বা ভিন্ন? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ ফিরানো দরকার। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য কাজ বা পদক্ষেপ নিতে পারে না। অন্তত পারেনি। পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করে এসেছে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যে ধরনের যুদ্ধকে আমরা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলি। মানে অন্যের স্বার্থে তার যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সেই যুদ্ধ করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। যেখানে সাধারণভাবে  প্রক্সি মানে হল, স্কুলের ক্লাসরুমে নাম ডাকার সময় অনুপস্থিত বন্ধুর হয়ে “উপস্থিত” বলার মত। আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ খেটে দেওয়া – এবিষয়ে আদি গ্লোবাল ঐতিহাসিক ঘটনা বা শুরুর ঘটনাটা হল, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়া, আর তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্ত মধ্য এশিয়ায় এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয় পেয়ে  সোভিয়েত ইউনিয়নের (বাফার গড়তে) আফগানিস্তান দখল করা; আর এবার তা ঠেকাতে বা উল্টে দিতে আমেরিকা, পাকিস্তানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে নিজের প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা – মানে মোজাহিদিন লড়াই শুরু করা – এটা ছিল প্রথম পর্ব। আর এরই লেজ ধরে দ্বিতীয় পর্বে, আলকায়েদা-তালেবান বনাম আমেরিকার ওয়ার-অন টেরর যুদ্ধে এরই ময়দান হিসেবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত হওয়া, যুদ্ধে ঝাপায় পড়ার পাটাতন হিসাবে আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভুমি ব্যবহার করতে দিয়ে নিজে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।

ফলে এই দুই ইস্যুতে গত ৩৮ বছর ধরে পাকিস্তান অন্যের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। না এটা অবশ্যই পাকিস্তানের স্বেচ্ছায় করা কাজ নয়। এছাড়া এর মধ্যে তা যতটা না নিজ স্বার্থে এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আমেরিকান স্বার্থে আর আমেরিকার চাপের বাধ্যবাধকতায় পাকিস্তান করেছে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে যে পাকিস্তান আর আমাদের মত এক আম- রাষ্ট্রের মতো থাকেনি। এ এক বিরাট ব্যতিক্রমী, বিশেষ রাষ্ট্র হয়ে গেছে। যে নিজের স্বার্থ না থাকলেও আমেরকান স্বার্থে নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েই শেষ হয় নাই। এরপর আবার আমেরিকাই অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই বিচারে পাকিস্তান আমাদের মত একই পাল্লায় তুলনাযোগ্য রাষ্ট্র কি না সেই প্রশ্ন অনেকে তুলতে পারেন। তবে এই আলোকেই সার কথাটা হল, গত ৩৮ বছরে পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য, নিজের জন্য রাষ্ট্র থাকেনি, কাজ করেনি।

কিন্তু ওদিকে আরেক সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা হল, পাকিস্তান নিয়ে যেকোনো আলোচনার সময় বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেকোন সিদ্ধান্ত যে পাকিস্তানের নয় – এই প্রক্সি-খেটে বেড়ানো, বিশেষ করে আমেরিকান স্বার্থের দায়ের বাধ্যবাধকতায় চলে বেড়ানো, সে কথা মনে রাখে না। মনে রেখে কথা বলে না। পাকিস্তান যেন স্বাধীন – এই অনুমান ধরে নিয়ে এরপর পাকিস্তানের সমালোচনা ও মূল্যায়ন শুরু করেন। সবচেয়ে তামাশার কথা হল, বুশের আমল থেকে পরের সব আমেরিকান প্রশাসন পাকিস্তানের যেকোনো সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ যে আমেরিকারই স্বার্থে প্রক্সি পদক্ষেপ সে কথা স্বীকার না করে, দায় না নিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকেন।

তবু এগুলোও মূল বিষয় নয়, আরো দিক আছে। তা হল, প্রক্সি যুদ্ধের এই কালের  পাকিস্তানের অপর দুটা রাজনৈতিক দল,  নওয়াজ শরীফের পিএমএল (PML-N) আর ভুট্টো পরিবারের পিপিপির (PPP) ভূমিকা। তারা এই প্রক্সি যুদ্ধের পাকিস্তান পরিস্থিতিতে নিজেরা যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছে তা হল – যেহেতু আমেরিকান ইচ্ছা, চাহিদা বা সিদ্ধা্নতের পক্ষে থাকা তাদের আমলের সরকারের পক্ষে এড়ানো বা ভিন্ন কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থেকে চুরি আর লুটপাটের বন্যা বইয়ে দেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ – কারণ আমেরিকানদের খেদমতে খেটে যাবার করার কারণে ক্ষমতা তো নিশ্চিত! আর তাতে দায় দোষারোপ সব আমেরিকার ওপর দেয়া যাবে। এই দুই দল এখান থেকে পাকিস্তানকে দেখেছে – আর এটাই পাকিস্তানের দুরবস্থায় সবকিছুর উপরে দুর্ভাগ্যের দিক। এ কারণে আজ পাকিস্তানের ক্ষমতার করিডোরের আলাপে এক চালু হিসাব হল, নওয়াজ অর্থ লোপাট করে বিদেশে রেখেছে দুই বিলিয়ন ডলার, আর ভুট্টো পরিবার রেখেছে এক বিলিয়ন ডলার।

এভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থায়। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান এবার ক্ষমতায় এসেছেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট স্বাক্ষ্য দিয়ে, ডাটা ও গ্রাফ এঁকে দিয়ে বুঝিয়ে, বলছে পাকিস্তানের চরম খারাপ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য ইমরান দায়ী নয়। আগের সরকার নওয়াজ শরীফ দায়ী। [The economy’s troubles are not Mr Khan’s fault.]   তবে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের দেউলিয়া এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে এখন ১৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পাকিস্তান রুপির ডলার বিনিময় মূল্যমান গত এক বছরে ৯১ থেকে নেমে এখন ১৩৪ রুপিতে ঠেকেছে। কথাগুলো বলা হচ্ছে এ জন্য যে, ইমরানের ক্ষমতার শপথের পরের প্রথম মাস তার কেটেছে সৌদি, চীন নাকি আইএমএফ  – কার কাছ থেকে নুন্যতম ঋণ-মুক্তির অর্থ বা “বেল আউট”-এর অর্থ পেতে পারে সেই খোঁজাখুঁজিতে। সৌদিদের উপর প্রবল ভরসা করে ইমরান নিজেই প্রথম সফর হিসাবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঋণ দেওয়ার বদলে, CPEC projects এ বিনিয়োগের শেয়ার নিতে স্বেচ্ছায় এক পালটা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমরানের বিবেচনায় সঠিকভাবেই এই প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে চীনের সাথে পাকিস্তানের  সম্পর্কে খামোখা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ সৌদি প্রস্তাবে একমত হতে চীনকেও বুঝাতে হবে, রাজি করাতে হবে ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। তাই সৌদি প্রস্তাব ফেলে রাখা ছাড়া ইমরান উপায় দেখেন নাই।  

ইতোমধ্যে সর্বশেষ খবর হল, শেষমেশে, ইমরানের সিদ্ধান্ত – পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেল আউট ঋণ চেয়ে আবেদন পেশ করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাষায়, এটা পাকিস্তানের “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি” মিটানোর ঋণ। 

গ্লোবাল অর্থনীতির (Global Economic Order) দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের যুগ চলছে; অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পালাবদলে এটা আমেরিকার জায়গায় চীনের আগমন ও সেই স্থান দখলের কাল। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদুর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এ দিকে এই মূল লড়াইয়ে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, একাজে বাড়তি সুবিধা পেতে  ভারতকে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে দেখা যায়। যদিও সবসময় আবার তা নিজ অন্য স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে না, সেকথাও সত্য।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (China–Pakistan Economic Corridor বা CPEC projects) – মোট ৬২ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প যা উত্তর দক্ষিণ বরাবর পাকিস্তানের বুক চিড়ে করাচির গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে একেবারে চীনের জিনঝিয়াং (Xinjiang Uyghur Autonomous Region) উইঘুর প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত এক হাইওয়ে তৈরি হচ্ছে। তাই এই প্রকল্পটা আসলে চীনকেই পাকিস্তানের করিডোর দেয়া। অর্থাৎ পুরোটাই কেবল পাকিস্তানের স্বার্থে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়। চীনের উইঘুর প্রদেশ ল্যান্ডলকড অঞ্চল; ফলে এর বধ্যদশা ঘুচাতে, অঞ্চলটাকে সমুদ্রপথেও যোগাযোগ করিয়ে দিতে, রাজনৈতিকভাবে উইঘুর মুসলমানদের মন-জয় করতে, তাদের পিছিয়ে থাকা দশা থেকে মুক্ত করতে  – চীন এটা নিজের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মনে করে।

কিন্তু আমেরিকা (সাথে ভারতও) নিজেদের সন্দেহ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে চীন-পাকিস্তানের এই বাস্তব বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চরমতম বিরোধিতা করে থাকে। পাকিস্তান আমেরিকার প্রভাবের হাত থেকে ছুটকারা পেয়ে যাচ্ছে এই প্রকল্পের মত তৎপরতার কারণে। ফলে এই প্রকল্প পুরোটাই আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে এরা দেখে। কিন্তু ওদিকে আমেরিকা ও ভারতের জন্য আর এক চরম অস্বস্তিকর একটা ফ্যাক্টস হল, করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের মূল চার প্রদেশকে এক সাথে এক জায়গায় এনেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর দিয়ে গেছে, তাই এটা কেবল কেন্দ্রের নয় পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক সরকারও স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের দিক থেকে এই প্রকল্পকে  অনুমোদন করে স্ব স্ব প্রাদেশিক পার্লামেন্টেও সিদ্ধান্ত পাশ করেছে। এমনকি বেলুচিস্তান যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে তাদেরও কোনো পক্ষই এই প্রকল্পের ঠিক বিরোধী নয়।

এসব কিছুর মূল কারণ সব প্রদেশের জনগণও এই প্রকল্পকে দেখে থাকে এক হাইওয়ে ধরে রপ্তানিতে গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ, এতে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্রিয় হতে নিজ নিজ প্রাদেশিক স্বার্থেও বিকশিত হওয়ার জন্য এই প্রকল্পকে বিরাট নিয়ামতের মত মনে করে। ফলে চার প্রদেশ অন্তত একটা ইস্যুতে পুরো পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার চীনেরও স্বার্থে এই অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবহৃত হবে বলে এর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করার দায়ভার এবং এর ঋণ পরিশোধের দায়ভার পাকিস্তানের সাথে চীনেরও। কিন্তু এসব বিষয়গুলো কিভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে লেখা আছে – সেটা বিলিয়ন ডলারের এক কৌতূহল আমেরিকার (সাথে ভারতেরও) কাছে। তাদের গভীর অনুমান যে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে।

আসলে অর্থনৈতিক স্বার্থ মানেই সাথে জড়ানো থাকে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থঃ
এই প্রকল্পের শিরোনামেই বলা আছে এটা “অর্থনৈতিক” প্রকল্প। অর্থাৎ এটা কোন সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থে নেয়া যুদ্ধ করার প্রকল্প নয়। তবুও তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ শতভাগ যেকোন অর্থনৈতিক প্রকল্পেও ওর নিরাপত্তার দিক থাকবেই; ফলে সেই সুত্রে ওর সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকও থাকেই, তা আলাদা করা যায় না। এই ব্যাপারটা আমেরিকা বা ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। যখন চীন অর্থনৈতিক ভাবে কেবল জাগতে শুরু করছে কেবল, সেই ২০০৮ সালের একটা ঘটনা হল – মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন এফেয়ার হাউজ কমিটির সামনে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হায়ার করে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের আলোচনায় চীন উত্থানের প্রভাব কী এনিয়ে মুল্যায়ন রিপোর্ট করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রফেসরকে কংগ্রেস কমিটিতে শপথ করিয়ে যেমন জেরার শুনানি চলে তা চলেছিল। যেখানে প্রফেসর স্বাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল চীনের অর্থনীতিতে বাধা সৃষ্টি করে একে ডুবিয়ে দিবার উপায় কী। চীনে জ্বালানি তেল আনা আর রপ্তানি পণ্য পাঠানোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে, চোকিং পয়েন্ট মানে ঠুটিই চিপে শ্বাস রুদ্ধ করে ধরা সম্ভব এমন এক চিকন হয়ে পড়া নৌচলাচল পথের অংশ আছে, (Strait of Malacca বা বাংলায় মালাক্কা প্রণালী নামে) মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মাঝে। যা চিপে ধরলে মানে এই ৯০০ কিমি চিকন হয়ে থাকা নৌপথে – ইচ্ছা করে কোন জাহাজ ডুবিয়ে নৌচলাচল ব্লক করে দিলেই চীনের অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে আমেরিকাকে আর যুদ্ধ করতে লাগবে না। এই ছিল ঐ প্রফেসরের যুক্তি ও পরামর্শ। এখন আমেরিকান সিনেট যদি চীনের ক্ষতি  করতে এই আলাপ করতে পারে তাহলে চীন পালটা তার দুর্বল জায়গা – ঐ মালাক্কা প্রণালীর অনেক অনেক বিকল্প তৈরি করে রাখবে না কেন?  আর চীন তা করলেই, “চীন অর্থনীতির সাথে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ” মিলিয়ে ফেলছে –  আমেরিকা ও ভারতের এই ভুয়া চিৎকার অর্থহীন।  ফলে পাকিস্তানের গোয়াদর অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতায় [এমন কি হবু বাংলাদেশের সোনাদিয়ায়ও আর একটা ] গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে তা ব্যবহার করে – চীন মালাক্কা প্রনালীর বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের উপায় করে নিবে – এটাই কী সবচেয়ে স্বাভাবিক নয়? এই অবস্থায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে কেবল “ভারতকে মুক্তা মালার মত ঘিরে ফেলতেছে”, তাই ভারতের হাসিনাকে চাপ দিয়ে  বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় আর একটা বন্দর করা ঠেকিয়ে রাখতে হবে – এসব বক্তব্য কোন এক পেত্নির নাকি-কান্না ছাড়া আর কী? তাহলে সারকথা, কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প যত বড় হবে তাতে উল্লেখ করা থাক আর না থাক, ওর সাথে সাথে এক সামরিক -স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ততই বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোন (৫ থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলারের) বড় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রকল্প কোন রাষ্ট্র কেন নিবে? বরং নিতেই পারে না।

কিন্তু প্রশ্ন এত দূরে কেন উঠছে? কারণ, পাকিস্তান ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরে এখন আইএমএফ টিমের চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তান সফর এবং মূল্যায়নে বসা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে খবর হল, পাকিস্তান সফর করছে এমন আইএমএফের টিম বলেছে, তাদেরকে CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে যে পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া আইএমএফের জন্য কতটা রিস্ক বা দায় নেয়া হয়ে উঠতে পারে। যদিও পাকিস্তান এই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু ভারতের মিডিয়া প্রবল আগ্রহ তৈরি করেছে যে এইবার “আঙ্কেল স্যাম” তাদেরকে CPEC করিডোর চুক্তির হদিশ পাইয়ে দিবেই।

এখানেই হল আসল ইস্যু। আগেই বলেছি, আমেরিকার (সাথে ভারতও) কাছে তাদের অনুমান হল, চীন-পাকিস্তানের ওই প্রকল্পের চুক্তিতে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি কী আছে তা এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে। তাই তাদের প্রবল কৌতূহল ওই চুক্তিতে কী আছে তা জানার।

এখন আইএমএফকে দিয়ে চুক্তির “স্টাটেজিক তথ্যের দিক হাতিয়ে”  আমেরিকা কি তার সেই প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল মিটিয়ে নিতে পারবে?
আমরা স্মরণ করতে পারি, ইমরান খান সরকারের শপথ নেয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানের লোন প্রসঙ্গ উঠতেই আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে চীনের ঋণের দায় শোধ করা যাবে না”। [Pompeo warns against IMF bailout that pays off Chinese lenders]। এটা অবশ্যই আমেরিকার কোন বুদ্ধিমান মন্তব্য ছিল না। ছিল, ডুবে যাচ্ছে এমন মরিয়া এক আমেরিকান আস্ফালন।

তাই মনে করার কারণ আছে যে, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট লাগার্দের (Christine Lagarde) কথিত এখনকার মন্তব্য যে আমাদেরকে “CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে” [যদিও কোন মিডিয়াই লাগার্ডে বা আইএমএফের কোন কর্ককর্তার সরাসরি বরাতে একথা বলতে পারে নাই। সবাই “সোর্স বলেছে” বলে লিখেছে। ] এটা আগের পম্পেই হুঙ্কারেরই নরম ও কারেক্ট ভার্সন। এখন দেখার বিষয় চীন-পাকিস্তান করিডোর চুক্তি পুরোটাই বা অংশ ওপেন না করেও পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ হাসিল করতে পারে কি না!

তবে ভারত ও আমেরিকার দুটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এখানে আলাদা করা দরকার। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ কী, চীনা CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ? এপর্যন্ত কোন দেশি বা বিদেশি মিডিয়া রিপোর্ট এই দাবি করেছে এমন দেখা যায় নাই। কিন্তু সকলেই এমন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত করার চেষ্টা করে থাকে। ইমরানের পাকিস্তান সরকার এবিষয়ে নিজেই কিছু ফ্যাক্টস প্রকাশ করে এমন ইঙ্গিত ও প্রপাগান্ডাকে নস্যাতে উড়িয়ে দিয়েছে।  ইমরানের সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় – তারা বলেছে, “The CPEC deals are open and transparent,” said Noor Ahmad, a spokesman for the Ministry of Finance.

এছাড়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের এপর্যন্ত প্রাপ্ত মোট বিদেশি ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৬ বিলিয়ন বা ৬.৩% হল CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ। [Pakistan has already brushed aside criticism on growing indebtedness of the country due to CPEC, saying the share of the CPEC loans was only $6 billion or 6.3% in total outstanding external debt of $95 billion as of end June this year.]  আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল, আইএমএফ এবারই প্নরথম নয় আগেও (২০১৪) করিডর প্রকল্পের এক মুল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিল। করিডোর প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর এটা জানিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসা্রে, আইএমএফ লিখেছিল,  [The IMF report has then stated that the CPEC infrastructure and transport projects are financed by long-term concessional government borrowing from China.]  অর্থাৎ  এই প্রকল্প চীনের স্বল্প সুদে (concessional) দেয়া ঋণ” বলে মনে করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় “কনসেশনাল” ঋণ মানে হল  –  (১% এর কম,) ০.৭৫% বাৎসরিক সুদ, চল্লিশ বছরে শোধ করতে হবে তবে প্রথম দশ বছর কোন কিস্তি দিতে হবে না, মাফ পাবে। এখানে “কনসেশনাল” ঋণ মানে সুনির্দিষ্ট করে কী বুঝানো হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। এছাড়া ঐ রিপোর্টে আর একটা মন্তব্য আছে, CPEC-related outflows would peak at about $3.5 billion to $4.5 billion per annum by fiscal year 2024-25. – মানে ঋণ শোধের দায় সবচেয়ে চড়া হয়ে উঠবে ২০২৪-২৫ সালে, যখন বছরে প্রায় চার বিলিয়ন করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ তখন এটা পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে পারে। এই বিষয়গুলো পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্ট। কাজেই আমেরিকা ও ভারতের ভুয়া ক্যাম্পেইনের পাল্লায় পড়া থেকে এবার সকলে সাবধান। 

দুনিয়ার জন্য বর্তমানে এক ইউনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যখন চীনের উত্থান ঘটেইনি সেই পরিস্থিতি মানে, যখন দুনিয়াতে আমাদের মতো রাষ্ট্রের কোনো ঋণ পাওয়ার একমাত্র উৎস ছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সেসব দিন পেরিয়ে, এখন চীন উত্থিত ও বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের একালে দুনিয়াকে নতুনভাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককেও  আমল করতে হচ্ছে। কারণ এখন আর সে একক ঋণদাতা নয়। শুধু তাই নয়, আইএমএফ যদি প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানের মত না হয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির ভাঁড় হয়ে থাকতে চায়, ঐ বিদেশনীতি সরাসরি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকতে চায় তবে এই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানও একদিন আমেরিকার সাথে শুকিয়ে ছোট হয়ে যাবে – সেটাও আশা করি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আমল করে চলে, আমরা দেখতে পাব!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস জানা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

গৌতম দাস

০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১২

https://wp.me/p1sCvy-2uC

 

নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকারের পাঁচ বছর শেষ হতে আর ছয় মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। ফলে কেন্দ্রিয় নির্বাচন ২০১৯ সালের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের আইনি ভাষায় এটা “লোকসভা” নির্বাচন। আরও ফরমাল ভাষায় বললে, এটা (ফেডারেল) ইউনিয়ন ভারত-রাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন। ভারতের রাজনীতিতে এখন থেকে সরকার ও বিরোধী দলের যত ততপরতা এবং সাথে যত বিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হচ্ছে – বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সংগঠন, গ্রুপ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সবাই যে যা কিছু গত ছয় মাস ধরে করে চলেছেন এবং আগামী ছয় মাসেও করবেন – ইত্যাদি সব কিছুই আসন্ন এই নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই ঘটছে। এসব ততপরতায় সবার লক্ষ্য এমন কিছু করা যেটা এই নির্বাচনের ফলাফলকে কিভাবে যার যার পছন্দের রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারে – সে কথা মনে রেখেই তাঁরা করে যাচ্ছেন। সেটা অমর্ত সেন বা অরুন্ধতি রায়সহ আরও যারা – জাতপাতের বিরুদ্ধের নিজ অধিকারের লড়াই বা দলিত আন্দোলনে – জড়িয়ে আছেন, তাদের ততপরতাও একইভাবে সংশ্লিষ্ট। এমনকি কোন কোন রাজ্যের বিভিন্ন পকেটে যেসব মাওবাদী ততপরতা চলছে সেগুলোও এখন বেশি ততপর একই কারণে। পুরা ব্যাপারটাই রাজনীতিতে ক্ষমতায় যারা ছিল আর যারা যেতে চায় সবারই একটা স্টক টেকিং বা হিসাব নেয়া ও মিলানোও বটে। ফলাফলে নতুন করে আবার জোট গঠনে কেউ বের হয়ে যাওয়া অথবা কারও প্রবেশের সময় এটা।  তাই এদিক থেকে বিচার করে কেউ হয়তো বলবেন, ভারতের রাজনীতি কেবল “কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনকেন্দ্রিক”।

এমনকি বলতে পারেন, তা পঞ্চম বছর-কেন্দ্রিক, যার প্রথম চার বছর তারা তুলনায় বেখবর থাকেন। কথাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো না হলেও এমন হওয়ার প্রধান কারণ হল – আবার যারা সম্ভাব্য নতুন ক্ষমতার প্রার্থী, ক্ষমতায় যেতে প্রবল আগ্রহী, তারা পঞ্চম বছরেই কেবল ভারতের ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার মুখোমুখি হতে চান বা পারেন। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বিরাট সমাজের বিভিন্ন গ্রুপ, গোষ্ঠী অথবা সামাজিক বা রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের মধ্যে যত বেশি সংখ্যককে তারা তাদের নিজেদের ‘নৌকায় উঠাতে’ সচেষ্ট হন। অন্য সময়ে, মানে আগের চার বছরে এই আমল করার মানে নৌকায় যদিওবা উঠানো যায় কিন্তু চার বছর তাদের ধরে রাখা খুবই কঠিন তাই, কোনো কারণ তারা দেখেন না, হাজিরও থাকেন না। তবে এমন হবার পিছনে এতে বিশাল ভারতে সকলকে এড্রেস করতে গেলে এর একটা বিরাট খরচের দিকও আছে। তাই সব মিলিয়ে এই হল “ভারত” মানে,  প্রতি পঞ্চম বছরের রাজনীতির এক ‘ভারতীয় সমাজ’, এসব সীমাবদ্ধতার ভিতরে থেকেই যার জন্ম ও ততপরতা।

এই পঞ্চম বছরেই দলগুলোর মূল টার্গেট হল, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সমাজের নানা দল ও জোট গড়ে এক ইতিবাচক ঘোঁট পাকিয়ে অর্থপূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে দু’টি বৃহত্তর জোটের পক্ষ হিসেবে নিজেদের হাজির হন বা বলা যায় এভাবেই তাদের হাজির হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সব শেষে দু’টি রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে পুরো ভারতকে মেরুকরণ করে নিতে পছন্দ করা, রাজনীতির এক স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেমন মোটা দাগে গত ৩০ বছরের এমন ‘ফেনোমেনা’ হল – হয় কংগ্রেসকে কেন্দ্রে রেখে ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) আর নয়ত বিজেপিকে কেন্দ্রে রেখে এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স) – এভাবে দু’টি জোট আমরা দেখে আসছি। যদিও এবার সম্ভবত তিনটা জোট অথবা দুটাই জোট তবে ভিন্ন নামে, হতে আমরা দেখব। অর্থাৎ বিজেপির জোট এনডিএ ঠিক থাকছে যদিও জোটের দলের কেউ বের হয়ে অন্য জোটে যাবেন অথবা নতুন কোনো দল এই জোটে ঢুকবে – এমন হবে। কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট ইউপিএ এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও কিছুটা অনিশ্চিত।

যদিও কোন সন্দেহ নাই যে বিজেপির বিরুদ্ধে সব বিরোধীদলের একটা বড় অংশের বড় জোট অবশ্যই হচ্ছে; সে লক্ষ্যে এর তৎপরতা ও উদ্দীপনা বরং অন্যবারের চেয়ে এবার বরং প্রবল। এনিয়ে প্রকাশ্যে প্রাথমিক আলোচনাও হয়ে গেছে, বলা যায় সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে গেছে। তবে এর মধ্যে এখনও অমীমাংসিত কিছু বিষয় আছে। তা হল, বিজেপিবিরোধী এই সম্ভাব্য জোট – এটা ঠিক কংগ্রেসের নেতৃত্বেই হবে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক বেশ গভীরে। অর্থাৎ শুরুতেই ধরে নেয়া যে জোট হবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে, যার মানে হল হবু প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের থেকে বা তিনি রাহুল গান্ধী – তা অনেকে এবার আগেই মেনে নিয়ে শুরু করতে চাচ্ছেন না। এই হল মূল বিতর্কের বিষয়, তাই জোট গঠন শুরু হতে একটু সময় নিচ্ছে। যদিও কংগ্রেস ইতোমধ্যে জোটের নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেও একটা পালটা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে যে  – জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হতে পারেন সেটা কেন্দ্রিয় নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে আলোচনা হবে – সে পর্যন্ত এটা মুলতবি করে রাখা যেতে পারে। কিন্তু জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে সেটাও তো একটা ইস্যু, তাই পুরা ব্যাপারটা আপাতত স্থবির হয়ে আছে।

কিন্তু জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এবারের নির্বাচনের আগেই বিতর্ক উঠল কেন? উঠার মূল কারণ হিসাবে দুটা ইস্যুকে বলা যায়। প্রথমতঃ  গত ২০১৪ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস খুবই খারাপ ফল করেছিল। কংগ্রেসের জন্মের পর থেকে এর আগে সে সরকারে বা বিরোধী দলে যেখানেই থাক, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জোট গঠন করে থেকেছে। কিন্তু কখনই ঐসব জোটে কংগ্রেস দলের আসন সংখ্যা সেখানে ১১৪-এর নিচে (লোকসভার মোট আসন ৫৪৫) যায়নি। অথচ গত (২০১৪) নির্বাচনে তা নেমে আসে ৪৮ আসনে, যা মোট আসনের ১০ শতাংশেরও কম। ফলে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস এবারই প্রথম অন্যান্য আঞ্চলিক দলের আসন সংখ্যার কাতারে নেমে যায়। যেমন, মমতার তৃণমূল দলের (২০১৪ সালে নির্বাচনে) লোকসভায় আসন সংখ্যা ৪২। এছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে এটা সর্বোচ্চ। মানে লোকসভায় আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আসন সংখ্যার দিক দিয়ে একক দল হিসেবে মমতার দলের আসন সংখ্যা ৪২, এটাই সবচেয়ে বড়। ফলে এককালের একক কংগ্রেস দল একালে এসে যেন মমতার আঞ্চলিক দলের কাতারে নেমে গেছে। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে কংগ্রেস আর আগের মত ইজ্জত-সম্মান বা গুরুত্ব আশা করতে পারে না, যেন এটাই আঞ্চলিক দলগুলো বলতে চাইছে।

ইতোমধ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর সম্ভাব্য কোন জোট হলে তাতে কংগ্রেসকে তারা কোথায়, কীভাবে রাখবে – এই অনুমানের একটা মহড়াও হয়ে গেছে ২০১৬ সালে, বিহার রাজ্যের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট ছিল না। বরং বাক্যটা লিখতে হবে এভাবে যে, ঐ নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট হয়েছিল, কংগ্রেস যেখানে নেতা নয়, তবে ঐ জোটের এক অংশীদার হিসাবে ছিল। বিজেপি-বিরোধী “কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট” না কী “আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট” – এদুইয়ের মধ্যে এক বিশাল ফারাক আছে। আর বিহারে গঠিত ঐ আঞ্চলিক জোট বিজেপিকে পরাজিত করেছিল এবং করার পর কংগ্রেস দল থেকে নয়, এক আঞ্চলিক দলের নেতা নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল। ফলে ঐ মহড়াটা যেন কংগ্রেওকে জানিয়ে দিয়েছিল আঞ্চলিক দলগুলো একালে কংগ্রেসকে কীভাবে মাপে, মুল্যায়ন করে কোথায় রাখে।

ভারত ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি প্রদেশে (রাজ্যে) বিভক্ত, যেখানে প্রদেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাজ্য’ বলে পরিচিত। আর কোন রাজ্যের স্থানীয় কোন দলকেই এখানে ‘আঞ্চলিক দল’ বলা হচ্ছে। ‘আঞ্চলিক দল’ শব্দটার বিপরীত শব্দ হল ‘সর্বভারতীয় দল’ (বৃটিশ আমলে এই ধারণাটাকেই “অল ইন্ডিয়া” বা বাংলায় “নিখিল ভারত” বলে শব্দ দলের নামের শুরুতে যুক্ত থাকত। যেমন “নিখিল ভারত মুসলিম লীগ” – বলা হত)। মানে সারা ভারতের সবপ্রদেশের যার শাখা ও সবল ততপরতা আছে এমন দলের ধারণা। আর এর বিপরীতে আঞ্চলিক দল মানে যা মূলত একটা রাজ্য কেন্দ্রিক দল, আর বাকি ভারতজুড়ে মূলত এদের কোনো শাখা বা কর্মতৎপরতা প্রায় থাকেই না। প্রত্যেকটা প্রদেশে সাধারণত কমপক্ষে একটা আঞ্চলিক দল পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসন পায়, ফলে কেন্দ্রে জোট সরকার গড়ার ক্ষেত্রে এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এভাবে সর্বভারতীয় দলের বিপরীতে, ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দল এক নতুন উঠে আসা ফেনোমেনা এবং যা ক্রমশ প্রভাবশালী প্রধান ভূমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত আসন্ন এই নির্বাচন থেকেই বিজেপির বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস দলের ভুমিকা লোপ পেতে থাকবে। না ব্যাপারটা কেবল কংগ্রেসের বেলায় ঘটবে তাই শুধু না সেক্ষেত্রে বিজেপিও বাদ থাকবে না। খুব সম্ভবত “আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট” হবে ভারতীয় আগামি রাজনীতির মূল এবং নতুন ফেনোমেনা। তবে সেই সাথে হয়ত ‘আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট’ হবে দুটা – একের বিরোধী অন্যটা। আর কংগ্রেস ও বিজেপি তাদের পছন্দ অনুসারে এবার একেকটা জোটে যোগ দিবে – এই হবে সম্ভবত নতুন দৃশ্যপট।

জোটের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের দ্বিতীয় কারণঃ কংগ্রেসের প্রভাব “শুকিয়ে আসা” এবং এর বিপরীত ঘটনা হিসাবে আঞ্চলিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা (আর বিজেপি তখন বেখবরিয়া দল ছিল) – গত ৩০ বছর ধরে এটাই ভারতের নির্বাচনী চালচিত্র। ফলে আসন্ন এই সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোটের আঞ্চলিক নেতারা যেমন, তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা উত্তরপ্রদেশের নিম্নবর্গের দল, বহুজন সমাজবাদী পার্টি দলের নেতা মায়াবতী প্রভুদাস – তারা এবার মনে করছেন, তারাও কেন রাহুল গান্ধীর মত “প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার” হবেন না? তারা অযোগ্য কিসে? এ কারণে আঞ্চলিক দলগুলো এবার জোট গঠনের শুরুতেই কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে আগের মত ইউপিএ জোট বাঁধতে দ্বিধা করছে। আর পুরান ধরণে ইউপিএ-জোটের বিপরীতে প্রথম থেকেই এবার সরব হয়েছেন মমতা। তিনি আরো এগিয়ে বলেছেন, তার আলাদা জোটের দাবির অর্থ হল, এবার ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ গড়তে হবে। মানে কংগ্রেসকে ছাড়াই আগে আঞ্চলিক দলগুলোর একটি জোট হবে। এরপর কংগ্রেসকে সাথে নেয়া বা না নেয়ার প্রশ্ন। সার কথায়, বিজেপির এনডিএ নামে জোট থাকলেও এর প্রতিদ্বন্দ্বী জোট কোনটা হবে ইউপিএ নাকি প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’- এটাই নির্ধারিত হতে একটু সময় নিচ্ছে, তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা হয়ে যাবে। ডিসেম্বর এজন্য যে ঐ মাসে পাঁচ রাজ্যের (রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম ) প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল এর নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। ঐ রাজ্য-নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে ওসব রাজ্যের আঞ্চলিক দল ও জোটে আসন ভাগাভাগির বুঝাবুঝি কেমন কী দাড়ায় – এর উপর সব কিছু নির্ভর করছে। সেটা দেখতেই সবার অপেক্ষা।

বিপরীত প্রসঙ্গ হিসাবে বিজেপিঃ
ইতোমধ্যেই এটা স্পষ্ট যে, এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর অবস্থা খুব শোচনীয় হতে পারে। কেন? কারণ মোদীর “ইকোনমিক পারফরম্যান্স” (Economic Performance), অর্থাৎ গত প্রায় পাঁচ বছরে মোদী অর্থনীতিতে কেমন করলেন! কেন্দ্রিয় সরকার অর্থনীতিতে ভালো বা মন্দ করছে কি না এনিয়ে ভারতের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচনে এটা কোন ইস্যু হতে দেখা যায় না বা এর তেমন প্রভাব পড়তে দেখা যায় না বললেই চলে। এটা চলতি মোদী সরকারের আমলনামার ভিত্তিতে বলা খবর। গত সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের বেলায় এটাই দেখা গেছে যে, মোদীর খারাপ “ইকোনমিক পারফরম্যান্স’ (বা অর্থনৈতিক সাফল্য) সেখানে কোথাও কোন ইস্যু হতে পারে নাই। কিন্তু গত দুইবারের (২০০৯ ও ২০১৪) কেন্দ্রের নির্বাচনে দেখা গেছে – আগের (কংগ্রেস ২০০৪-০৯) সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণে পরের বারও কংগ্রেস বিপুল ভোট পেয়ে আবার ক্ষমতায় এসেছিল। আবার ইউপিএ-টু (২০০৯-১৪) সরকারের ব্যর্থতাকে প্রবলভাবে তুলে ধরে দেখিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী (বিজেপি) দল ভোটে নিজে সেই জায়গা নিবে, অর্থনীতিতে ভাল করবে – এই কথায় প্রলুব্ধ করার মত করে ভোটারদের আস্থায় নিজেকে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন মোদী, এই সম্ভাবনা জাগাতে পেরেছিল বলেই মূলত একারণেই মোদী জিতেছিলেন।

এ দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর ছিল “অর্থনৈতিক সাফল্য” – এই ইস্যু। আবার এই সাফল্য প্রদর্শন মানে কেবল জিডিপি অনেক ভাল হলে হবে, তা নয়। সাথে দেখাতে হবে একদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক ‘কাজ সৃষ্টির’ বিষয় সে পেরেছে বা পারবে; অন্য দিকের গুরুত্বপূর্ণ হল, ব্যবসায়ীদের (ম্যানুফ্যাকচারার, বাণিজ্য আর শেয়ার মার্কেটসহ) মধ্যে আস্থার জোশ তুলতে পেরেছে কি না। কংগ্রেস ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে; আবার ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে কংগ্রেসের হাল ছেড়ে দেয়ার মুখে সেটা আবার ঘটাতে মোদির দল ও সরকার পারবে, এই আশা জাগাতে পেরেছিলেন তিনি তাই। এভাবে দুই ক্ষেত্রেই প্রধান ফ্যাক্টর ছিল অর্থনীতিতে পারফরমেন্স। আসলে নিরন্তর গরিব হালে ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধুঁকে মরা দশায় তাদের ফেলে রাখা হয়েছে। তাই, ভারতের নির্বাচনে, “অর্থনীতিতে পারফরমেন্স” মুখ্য ভুমিকায় হাজির হবে – এটাই তো স্বাভাবিক!

তাহলে কেবল এই বিচারে ২০১৯ সালের নির্বাচনে, বিজেপির মোদীর আবার জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, বলতে হয়। কারণ প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সাফল্যের বিচারে মোদী ইতোমধ্যে ব্যর্থ। শুধু তাই না, অর্থনীতিতে সাফল্যের বিচারে – একটু পুরান এবং নতুন (চলতি) – দু ধরণের ইস্যুই আছে; আবার একটু পুরান ইস্যুটা বিরাট বড় ইস্যু। এছাড়া একালের নতুন দগদগে ইস্যুও আছে যা সামনের কয়েক মাসে ‘আরো দগদগে ঘা’ হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা।

একটু পুরনো ইস্যুটা হল, গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে, মোদীর ‘নোট বাতিলের’ (DeMonetization) সিদ্ধান্ত। আগামি দিনের ইতিহাসে এবং আসন্ন নির্বাচনেও মোদী সরকারের বিরাট ব্যর্থতা বলতে অবশ্যই ‘নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত, সামনে আসবে। মানুষের মনে ভেসে উঠবে। নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত কথাটার মানে হল, ভারতের মুদ্রায় সবচেয়ে বড় নোট ছিল ৫০০ ও ১০০০ রুপির। ঐ দিনের শেষে রাত্রে হঠাৎ – এই দুই ধরনের সব নোটই বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন মোদী। যদিও পুরান নোট ব্যাংকে জমা দিলে সেটার বদলে নতুন নোট দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু নাম ঠিকানাসহ কে জমা দিচ্ছেন, তা বলতে হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর হল – মানুষের ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস অথবা দিনমজুরি সব ধরনের কাজ ফেলে ব্যাংকে লাইন দেয়া। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতায় একেবারে এলোমেলো শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়া তো আছেই, সেই সাথে বহু কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়েছিল। আর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব অর্থনৈতিক তৎপরতা ও লেনদেন-বিনিময়ে ভারতের অর্থনীতিতে সচলতার ব্যস্ততা যে পর্যায়ে আগে ছিল অর্থনীতির সেই সাজানো বাগান এবার অর্ধেক হয়ে, বড় স্থবিরতার দিকে গড়াতে থাকে।

দুটা উদাহরণ দিলে এর মারাত্মক প্রভাব বুঝা যাবে। ভারতের অর্থনীতির হাব বলে বুঝানো বা মনে করা হয় মুম্বাইকে আর একালে সাথে পড়শি গুজরাতকেও। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এদুই রাজ্যের অর্থনৈতিক ততপরতা অগ্রসর ও গতি বেশি। ব্যাপারটা কলকাতার স্বর্ণকারদের মাঝে কীভাবে আমল হয়েছিল এর একটা প্রমাণ হল, তারা দল বেধে গুজরাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত এলাকায় দোকান খুলে বসেছিল; একেক জন মুল ওস্তাদ আর সাথে পাঁচ-ছয় জন সাগরেদ এভাবে। তারা সেখানে ভাল আয় করতে পারত ফলে নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গের পরিবারের চলতে তাদের কাছে টাকা পাঠাতেও পারছিল। অর্থনীতিক স্টাডির মুল্যায়নে এগুলো অবশ্যই ‘মূল’ কাজ সৃষ্টি নয়, ইনফরমাল সেক্টর বলা হবে। মানে হল, সরকারের নীতির কারণে যারা কাজ পেয়েছে বা আয় বেড়েছে – এই মূল সুবিধাভোগীদের স্বচ্ছলতার কারণে সৃষ্ট এরা। মুল ফরমাল সেক্টরের কাজ পাওয়া সদস্য তারা নয়। তবে ফরমালদের আয় বাড়াতে ইনফরমালের কিছু লোক তাতে নিজেদের সম্ভাবনা দেখেছিল। তারা নিজেরাই যা পারে তেমন কিছু সার্ভিস নিয়ে ঐ সুবিধাভোগীদের কাছে হাজির হবার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া – এজন্য এটা ইনফরমাল, আর সুবিধাভোগীরা হল ফরমাল সেক্টর। সরকারের খুবই সফল নীতি পলিসি হলে তাতে,  ফরমাল সেক্টরের নিয়োগের চাহিদাই যত বেশি হবে ততই ইনফরমাল সেক্টর ত্যাগ করে মানুষ ফরমাল সেক্টরে চলে যাবে। ফলে তা ঠিক করে দেয় যে একজন চাকরি প্রার্থী বা লেবারকে কতদিন ইনফরমাল সেক্টরে থাকতে হবে। সারকথায় মোদীর অর্থনীতি স্বর্ণকারদের ভাল-সুবিধায়-ভরপুর কাজ দিতে পারে নাই সত্য কিন্তু এর ভিতরেই কলকাতার স্বর্ণকারেরা প্রতি ওস্তাদ পিছু পাচ-ছয় সাগরেদ মিলে ভিন রাজ্যে বেঁচে থাকার অবস্থার (ইনফরমাল) কাজ খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু মোদীর নোট বাতিলের প্রভাবে শ্লথ অর্থনীতির কারণে এদের এটুক স্বপ্নও ভঙ্গ হয়ে যায়। গুজরাতে কাজের অভাবে এরা সবাই সব গুটিয়ে দেশে ফিরে চলে যায়।  তাদের পরিবারসহ তারা এখন সেই আগের দুঃসহ গরীরি হালে ফিরে এসেছে।

আমাদের কাওরান বাজারের মত দিল্লীর পাইকারি বাজারের দিনমজুরঃ পাইকাররা মালামাল কিনলে তা পৌছে দেয়া বা গাড়িতে তুলে দেয়া এই কাজ করে তাদের দৈনন্দিন পাঁচশ রুপির মত আয় করতে পারত। কিন্তু নোট বাতিলের কারণে একই পরিণতি। ঢলে পড়া অর্থনীতির প্রভাব এই পাইকারি বাজারের এতই নিচে পড়েছে যে ঐ মজুরেরা দুই-তিনশ টাকা দৈনিক আয় করতে হিমশিম খেয়েছে। কয়েকদিন তারা উপায়ন্ত না দেখে “বাতিল নোটে মজুরি” নিবে পরে নিজে সময় দিয়ে ব্যাঙ্কে তা বদলে নিবে – এই শর্তে কাজ করেছে। একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে এর প্রভাব কত স্তরে পরে তা বুঝার জন্য এই উদাহরণ দুইটার খুটিনাটি লক্ষ্য করলে অনেক কিছু টের পাওয়া যায়। এছাড়া আসলে এটাই তো স্বাভাবিক, একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে বা যেকোন বিপর্যয় দেখা দিলে সবার চেয়ে বেশি এর চাপ গিয়ে পড়ে স্বল্প আয়ের নিচের মানুষের উপর। মোদী নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এদিকটা আমলই করেন নাই যে তাঁর  টার্গেট লক্ষ্যচ্যুত হলে, তিনি ব্যর্থ হলে পরে এর প্রভাব কত স্তরে কত মারাত্মক হতে পারে।

বরং মোদি আশ্বাসের উপরে চলছিলেন যে, রুপি বদলে নিতে ব্যাঙ্কে আসলে – এতদিন যারা নগদ রুপিতে সম্পদ রাখা কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির সবাই এবার ধরা পড়বেন। অর্থাৎ ধরা পড়ার ও পরে শাস্তির ভয়ে এরা আর ব্যাঙ্কেই আসবে না। সেক্ষেত্রে সরকারের অনুমান ছিল, ৮৫ শতাংশের হয়ত বৈধ আয় বলে রুপি বদলে নিতে আসবে। বাকি ১৫% নোটের মালিক এরা কালোটাকার মালিক বলে ধরা পড়ার ভয়ে তাঁরা আর রুপি বদলে নিতে আসবে না, ফলে প্রায় ২৪০ হাজার কোটি রুপি রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে না, তাই বিপুল লাভ হবে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দেখা গেল, ৯৯ শতাংশ ছাপানো মুদ্রাই ফেরত এসেছে। অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আসেনি। এর মানে, সারা ভারতের জনগোষ্ঠীকে কষ্ট দিয়ে, বিশেষ করে গরিব মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েও কোনো সুফল মেলেনি।

বরং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ রুপি ফেরত আসেনি বলে, ভারতের মিডিয়া লিখছে, ‘‘এ থেকে যা ‘লাভ’ তা মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা। নতুন নোট ছাপা ও বণ্টন এবং অর্থনীতির সামগ্রিক ক্ষতি বিবেচনা করলে অবশ্য সেই লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যাবে!” অথচ সবচেয়ে কষ্টকর অবস্থা স্বল্প আয়, ‘দিনে আনে দিনে খায়’ লোকদের। এ ছাড়া, মূল ক্ষতিটা হয়েছে তাদের কাজ হারানো।

মোদির দ্বিতীয় ব্যর্থতার ইস্যুঃ মোদি গত নির্বাচনে আশ্বস্ত করেছিলেন – নির্বাচিত হলে কংগ্রেসের প্রথম জমানার (২০০৪-০৯) মত ভাল অর্থনীতি তিনি গড়বেন। এ ছাড়া আর আরো বেশি কাজ সৃষ্টি করবেন। তার দেয়া নতুন টার্গেট ছিল, বছরে দুই কোটি লোকের কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু এখন সমালোচকরা বলছেন, বাস্তব পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, উলটো গত চার বছর ধরে গড়ে ৭০ লাখ করে কর্মসংস্থান কমেছে। এটা কাজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গত আট বছরে সর্বনিম্ন। সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন তরুণেরা এখনও বছরে ২ কোটি কাজ সৃষ্টি দেখার অপেক্ষায় আছে। [……said young Indians were waiting for the 20 million jobs promised by the Bharatiya Janata Party (BJP).]

একইভাবে রয়টার্সের এই রিপোর্ট বলছে, যার শিরোনামটাই সাংঘাতিকঃ [No jobs, no vote: Indian town warns Modi ahead of 2019 polls]। ঐ রিপোর্টই আরও বলছে,  কাজ সৃষ্টি দূরে থাক,  ভারতে বেকারত্ব এখন সর্বোচ্চ। [……hit its highest level in 16 months in March at 6.23 percent, according to the Centre for Monitoring Indian Economy (CMIE), an independent think-tank.]

চলতি সময়ে মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ইস্যু – তেলের দামঃ
ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের বিপুল ঘাটতি শুরু হয়েছে, এই ঘাটতিই  সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধির কারণ। ২০১৬ সালে দাম সর্বোচ্চ নেমে যাওয়ার সময়, ৩০ ডলারে নেমে যাওয়া জ্বালানি তেল কিনেছিল ভারত। আর এখন তা (অক্টোবর ২০১৮) ৮৪ ডলার এবং এ দাম ক্রমবর্ধমান। তেলের দাম কমাতে সেই সময় রাজস্ব বিভাগ ১৪০ বিলিয়ন ডলার বাড়তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল। কিন্তু সেই অর্থ থেকে কোন আপতকালীন রিজার্ভ রাখা হয় নাই, বরং পুরা অর্থ অন্য প্রকল্পে লাগিয়ে ফেলায় এখন মোদীর পক্ষে কোন ভর্তুকি আয়োজনের সুযোগ নাই।  তাই ভারতের শহরগুলোতে তেলের পাম্প-স্টেশনে তেলের দাম এখন ওঠানামা করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাথে সম্পর্কিত হয়ে, কোনো সরকারি ভর্তুকি এখানে নেই।
তবুও আগের অবরোধের সময় ভারতের আরও একটা বিশেষ সুবিধা ছিল,  কমমুল্যের ইরানি তেল সরবরাহ কিনতে পারত ভারত (আমেরিকান অবরোধ ভারতের উপর শিথিল থাকত, আর ইরানও কিছুটা সস্তায় তেন বিক্রি করত)  – যেটা খুব সম্ভবত মোদী এবার হাতছাড়া করে ফেলেছেন। ইরান ছিল ভারতে তেল সরবরাহকারি হিসাবে তৃতীয়। এর আগের যেকোন তেল অবরোধের ক্ষেত্রেও আমেরিকার থেকে বিশেষ ছাড় পাবার কারণে ঐ বিশেষ সুবিধার দামে ইরানি তেন কিনতে পেরেছিল ভারত সেটা এবার ব্যতিক্রম কারণ এবার  – রাশিয়ান অস্ত্র আর ইরানি তেল ক্রয় – দুটার ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন জোর আপত্তি জারি করেছিল। খুব সম্ভবত রাশিয়ান অস্ত্র ক্রয়ে ছাড় পেতে আর ট্রাম্পকে খুশি করতে এবারই প্রথম ভারত আমেরিকাকে জানিয়েছে যে, অবরোধ মেনে ইরানি তেল এবার ভারত ক্রয় করবে না। ব্রাকেটে বলে রাখা যায়, চীন এখনও ইরানি তেল কিনছে, তবে ইরানি ট্যাংকার পৌছে দিবে এই শর্তে।

আর মোদীর ক্ষেত্রে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনীতিক গতি বা উন্নতির এক প্রধান নিয়ামক হল জ্বালানি তেলের মুল্য এবং মুল্যের স্থিরতা। ফলে তেলের দাম এবার ভারতের অর্থনীতিকে শ্লথ করার ক্ষেত্রে প্রধান ভুমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে।

ওদিকে আবার তেলের দামের প্রভাবে ভারতে উঠে এসেছে মুদ্রাস্ফীতিও, যেটা তেলের দাম বৃদ্ধির আগে থেকেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী।  এছাড়াও আছে খারাপ ঋণ (নন-পারফরমিং লোন) বিতরণ গত পাঁচ বছরে ৪৫০ গুণ বেড়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্ট করেছে; পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তর থেকে জানা যাচ্ছে তা ১৪৮ বিলিয়ন ডলারের মত।

শেষ বড় আঘাতঃ রুপির দর পতন
সব কিছু মিলিয়ে আবার বাজারের বিরাট অস্থিরতায় রুপি-ডলার বিনিময় হারে রুপির মান কমেই চলেছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা নেয়ার সময় ডলার ছিল ৬০ রুপি, সেটা এখন ৭৪ রুপি। ভারতের ইকনমিক টাইমসের প্রাক্তন সম্পাদকের দাবি রুপির এই মুল্য পতনের পরিমাণ ১২.৫%। [Rupee is Asia’s worst performing currency ..]

তাহলে সার কথাটা হল ‘অর্থনৈতিক সাফল্যের’ ইস্যুতে মোদীর প্রায় সব প্রতিশ্রুতি গত চার বছরে উলটো দিকে হাঁটছে। তাই আর সাফল্য নিয়ে যেন কেউ আর কথা না বলে, এটাই এখন মোদীর কাম্য। তাহলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভারতে যে জাতীয় নির্বাচন আসন্ন – বিজেপি ও মোদিকে যার মুখোমুখি হতে হবে – সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদী বা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ কী করবেন?

অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যু চাপা দেয়া বা পেছনে ফেলে দেয়ার উপায় নিশ্চয় মোদী-অমিত খুঁজবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে এদের একমাত্র ইস্যু এখন হিন্দুত্ব; মুসলমানবিদ্বেষের দামামা সর্বোচ্চ শব্দে বাজানো। এই আলোকেই অমিত শাহের মুসলমান নিধন, বাংলাদেশীদের ‘উইপোকা-তেলাপোকা’ বলে তুচ্ছ করে সম্বোধন এবং মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গালাগালি, তাদের হত্যা করার হুঙ্কার – এসব কিছুকে আমাদের দেখতে ও বিচার করতে হবে। সেই সাথে আসামের নাগরিকত্ব বিল নিয়ে আরো নোংরা হুঙ্কার। আসামের মতো নাগরিকত্ব বাছাইয়ের কর্মসূচি পশ্চিমবাংলা ও ছত্তিশগড় এবং অন্যান্য রাজ্যে চালু করা হবে বলে স্থানীয় বিজেপি হুমকি দিচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই- এ কথা বলে মুসলমানবিদ্বেষী একটা আবহ সৃষ্টি করা। ওদিকে ত্রিপুরায় গিয়ে বিজেপিরই আরেক অসভ্য এমপি সুব্রমানিয়াম স্বামী বাংলাদেশ দখলের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি নাকি হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট, এর নমুনা এটা?

ব্যাপারটা ভারতের আর এক সিনিয়র সম্পাদক,  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গ্রুপের শেখর গুপ্তা, তাঁরও নজরে পরেছে। তিনি নিজেই দ্যা প্রিন্ট এরও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি লিখেছেন, BJP has decided to use Assam as its key to 2019। আবার  রাহুল গান্ধীও হিন্দুত্বের রাজনীতির অনুসারি হয়ে উঠতে চাইছেন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই শেখর লিখছেন, রাহুলেরটা সফট হিন্দুত্ব

সারকথায় এভাবে নাহলে ওভাবে এসব মুসলিমবিদ্বেষী দামামা, ঘৃণা উগরানো আসন্ন হয়ে উঠছে।  এসবেরই উদ্দেশ্য একটাই – মোদীর ডুবে যাওয়া অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের সমস্যাকে আড়াল করে বিজেপি দলকে ভোট চাইবার ‘উপযুক্ত’ করে তোলা। সে কারণে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ভারতের সমাজকে বিভক্ত ও মেরুকরণের ফলে যাতে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে ‘হিন্দুত্ব’। অর্থাৎ আগামী ছয় মাস, অন্তত ভারতের নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মুসলিমবিদ্বেষের বিষ, ঘৃণা উগলানো দেখতেই থাকব, সেই আশঙ্কা হচ্ছে।

শেষ কথাঃ
ভারতের এই ভোটযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক বিচারে আমাদের জন্য “ফেবারিট” বা কাম্য হল, ‘ফেডারল ফ্রন্ট’ গড় উঠে এরা জয় লাভ করুক। এটা মনে রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের নির্বাচন ২০১৯; কী হতে যাচ্ছে?”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শিক্ষা

গৌতম দাস

০১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ur

 

মূলকথাঃ ব্যাপারটা মোটেও প্রো-ইন্ডিয়ান থেকে প্রো-চাইনিজ হওয়া নয়।
১। গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলের কাল এটা। একালে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কোন একটার দিকে কান্নি মেরে বাংলাদেশের স্বার্থকে একদড়িতে বাধবার বা একলাইন নেওয়ার চেষ্টায় প্রো-ইন্ডিয়ান, বা প্রো-চাইনিজ হওয়া হবে আত্মঘাতি।
২। ক্ষমতায় থাকার লোভে কারো-মুখি হওয়া, এতে শুধু নিজের দলের বা সরকারের না; পুরা দেশকেই ভালনারেবল বা দুস্থ করে ফেলা হবে। অন্যের হাতের পিংপং বল হওয়া এটা। সোজা রাস্তটা হল, সব সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখা ও প্রাধান্যে রাখা শুরু করতে হবে। এতে আপনা আপনিই ঐ তিন রাষ্ট্রের থেকে প্রয়োজনীয় আমাদের জন্য আলাদা একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যাবে। অর্থাৎ ঐ তিন রাষ্ট্রের সাথেই নানান সম্পর্কে জড়ানো যাবে কিন্তু সেটা বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখে এবং অবশ্যই ক্ষমতার থাকার লোভে নয়।
৩। তবে গুরুত্বপুর্ণ, একাজে তখনই সফলতা আসবে যখন নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীন ও সচল রাখা যাবে। আর তা করতে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সংসদসহ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযাচিত নির্বাহি হস্তক্ষেপ ছাড়াই কার্যকর হতে দিতে হবে। কার্যকর এসব প্রতিষ্ঠানগুলোই জনগণকে ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট করে রাখতে সহায়তা দিবে, তবেই একমাত্র বিদেশি আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব।

 

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ছিল মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ছোট দেশ, মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে চার লাখের (৪৪৪,২৫৯) মত, যার মধ্যে এবারের রেজিস্টার্ড ভোটার প্রায় আড়াই লাখ (২৬২,১৩৫)। এই নির্বাচনে মাত্র দু’জন প্রার্থী ছিলেন, চলতি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন [Abdulla Yameen] ও বিরোধী দলের জোট থেকে প্রার্থী [যিনি এখন বিজয়ী নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত] ইব্রাহিম মোহম্মদ সলিহ [Ibrahim Mohamed Solih]। সলিহ ছিলেন চারদলীয় এক জোটের প্রার্থী, ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি জিতেছেন। যদিও ভোটদানের সুযোগ ছিল ভোটের দিন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। তবু আড়াই লাখ ভোট গুনতে বেশি সময় লাগার কথা নয়, তাই নির্বাচনের দিন না হোক পরের দিন মালদ্বীপের রাজধানী মালের একেবারে সকাল (২৪ সেপ্টেম্বর) থেকেই দেশী-বিদেশী সবাই জেনে যায় ভোটের ফলাফল। যদিও তখনও সেটা আনুষ্ঠানিক ফলাফল নয়, মানে মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে এমন ফলাফল নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের প্রকাশ্য অস্থিরতা ও নড়াচড়া ছিল খুবই অকূটনীতিসুলভ। কূটনৈতিক আচার-আচরণ ভেঙে আনুষ্ঠানিক ফলাফল আসার আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে সলিহকে শুধু অভিনন্দন জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন কি না, মনগড়া সে আশঙ্কা ভারত সৃষ্টি করে আর তা প্রপাগান্ডায় ছড়িয়ে দেয়। ভারতের বিবৃতিটা লেখা হয়েছে এভাবে যে, “আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন এখন এই ফলাফল নিশ্চিত করে তাড়াতাড়ি অফিসিয়াল ঘোষণা দেবে। এই নির্বাচন কেবল মালদ্বীপের গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয়ের চিহ্ন নয় বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রতি কমিটমেন্টের প্রকাশ”। [We heartily congratulate Ibrahim Mohamed Solih on his victory and hope that the Election Commission will officially confirm the result at the earliest. This election marks not only the triumph of democratic forces in the Maldives, but also reflects the firm commitment to the values of democracy and the rule of law.] টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া

এই বিবৃতিটা স্পষ্টতই ভারতের এক চরম হস্তক্ষেপমূলক কাজ। ব্যাপারটা শুধু আমরা পাঠকেরাই নই, টাইমস অব ইন্ডিয়াও আমল না করে পারেনি। তাঁরা নিজ মন্তব্যে লিখেছে, ফলাফলের “অফিসিয়াল ঘোষণা দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে” [not waiting for official announcement] ভারত বিবৃতি দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশন সলিহ-এর নির্বাচনে বিজয়ের ফলাফল ঘোষণা নাও করতে পারে – এই বিবৃতিতে ভারত আগাম এ ধরনের এক সন্দেহ ও ইঙ্গিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে স্বভাবতই এই বিবৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, পরিস্থিতিকে খামোখা উত্তেজিত করার চেষ্টার এক সীমা ছাড়ানি হস্তক্ষেপ।

বিবৃতির ভাষাও লক্ষণীয় যে, বিবৃতিতে ভারত সাজেশনে বলতে চাচ্ছে নির্বাচনী “ফলাফল” তো এসেই গেছে, এখন কমিশনের কাজ হল কেবল ঘোষক-এর ভুমিকা পালন করার; তাই তাড়াতাড়ি ওই ফলাফল ঘোষণা করে দিক। ভারতের এমন বক্তব্য, এটা আসলে অপর রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশনের কাজ ও এখতিয়ারের মধ্যে ঢুকে পড়া। আর এর চেয়ে বড় কথা, এতে কমিশনকে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরিচালক নয় যেন কেবল ফলাফল ঘোষক – এরকম এক আপত্তিকর সাজেশন ও অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা হয়েছে। ভারতের বিবৃতিতে দাবি করছে নির্বাচনের ফলাফলে সলিহ জিতে গেছে – অথচ এটা ভারতের দাবি করার সে কেউ নয়, ফলে অনধিকার চর্চা। এটা ভিন্ন রাষ্ট্রের ইস্যু বা বিষয়। অতএব এই দাবি করাটাই অবৈধ হস্তক্ষেপ। কারণ নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণার (গেজেট নয়) আগে কোনো ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষিত হয়ে গেছে বলে বিবেচিত হতে পারে না। ফলে কমিশনের ঘোষণার আগেই কোন বিদেশী রাষ্ট্র, ফলাফল সে জানে এই দাবি করে বিবৃতি দেয়া এক বিরাট অনধিকার চর্চা। কিন্তু ভারত সেটাই করেছে।

চলতি বছরের শুরুর আগে পর্যন্ত বিগত দশ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি” নিয়ে কাজ করে গেছে। কিন্তু এবছর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের আমেরিকায় রফতানির ওপর শুল্ক আরোপ করার কারণে বস্তুত সেসব আন্ডারহ্যান্ড  সম্পর্ক অকার্যকর হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এতে আগের সব বোঝাপড়া যে, ভারত কী সার্ভিস দিলে বিনিময়ে কী পাবে, তা অকেজো হয়ে যায়। তবুও ভারত চীন বিরোধী কোনো স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান নিলে আমেরিকা তাতে চোখ বন্ধ করে সমর্থন দেবে – এমন একটা কাঠামো এখনও থেকে গেছে দেখা যাচ্ছে। তাই মালদ্বীপ প্রসঙ্গে ভারতের বিবৃতির পর, ভারতের আবদারে আমেরিকাকেও একই লাইনে একটা বিবৃতি দিতে দেখা যায়। মালদ্বীপের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে এটাও আমেরিকার হস্তক্ষেপমূলক এক বিবৃতি। যদিও ভারতের বিবৃতির সাথে এর তফাত এতটুকু যে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র হিদার নওরট [Heather Nauert]  সবকিছুর আগে নিজেই বলে নিয়েছেন, “অফিসিয়াল ফলাফল এখনো ঘোষিত হয় নাই”’ তবে “স্থানীয় মিডিয়া ও এনজিও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি” করে তিনি কথা বলছেন।  [“Although the Election Commission has not yet announced the final tally, we note Maldives’ media and NGO reports ………] এটাও টাইমস অব ইন্ডিয়ার আর এক রিপোর্ট।

অর্থাৎ আমেরিকা তাদের একটু হলেও আক্কেল আছে যে, কোনো রাষ্ট্রের নির্বাচনে কে জিতেছে এই ফলাফলের নির্ধারণের একমাত্র অথরিটি ঐ রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন। ভিন রাষ্ট্র এর বাইরে যেতে পারে না। যদি যায় অর্থাৎ তারা যদি ধরে নিয়ে বিবৃতি দেয়া শুরু করে যে, “অমুকে জিতেছে” তাতে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের বড় নজির হবে সেটা, আমেরিকা তা আমল করেছে।

কিন্তু তবু আর একটা বাক্যে আমেরিকাও ভারতের প্ররোচনায় অযাচিত নোংরা হাত ঢুকিয়েছে এবং বেকুবও হয়েছে। সেই বাক্যটা হল, “We urge calm and respect for the will of the people as the election process concludes,” Nauert said. অর্থাৎ “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে তাই আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো ও শান্ত থাকার আহবান জানাই” – নওরট বলেন।

এখানে ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার “নির্বাচন প্রক্রিয়া যেহেতু শেষ হয়েছে”, অথবা “ফলাফল হয়ে গেছে” – এভাবে বাক্য লেখার মূল কারণ হল, মূলত ভারতের ধারণা, “এটা দাবি করা যে সলিহ জিতে গেছে” – এটা ব্যাপক প্রচার করে দাবি না করলে যদি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রভাবে কমিশন ফল প্রকাশ না করে! তাই  (এবং প্রভাবিত করে আমেরিকাকেও) নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণার আগে থেকেই ভারতকে দাবি করতে থাকতে হবে যে “সলিহ জিতে গেছে”। কিন্তু গুরুতর সমস্যা হল, বাইরের রাষ্ট্র এটা করলে তা অনধিকার হয়, অকুটনীতিক আচরণ হয়। কিন্তু ভারত একেবারে ইজ্জত-জ্ঞান শুন্য বেপরোয়া হয়ে তাই করেছে।

আবার লক্ষ্যণীয় আসলে ব্যাপারটা এমনও ছিল না যে, কমিশনের কাজে কোনো গড়িমসি দেখা গেছে। কারণ নির্বাচনের পরের দিন অর্থাৎ ঐ ২৪ তারিখেই বেলা বাড়তেই নির্বাচন কমিশন নিয়ম মাফিক সলিহকে নির্বাচিত বলে ফলাফল ঘোষণা করেছিল। আর এর দু-এক ঘণ্টা পরেই প্রেসিডেন্ট  ইয়ামিন নিজ অফিসে নির্বাচিত প্রার্থী সলিহকে আমন্ত্রিত করে ডেকে নিয়ে বিজয়ের অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর এর পরেই প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন  নিজে মিডিয়ার সামনে ঘোষণা  দিয়ে বলেন, “মালদ্বীপের জনগণ তারা যা চায় সেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আমি গতকালের সেই ফল মেনে নিয়েছি। ইতোমধ্যে আমি সলিহর সাথে দেখা করেছি, যাকে ভোটাররা পরবর্তি প্রেসিডেন্ট হিসাবে বেছে নিয়েছে। আমি তাকে অভিনন্দনও জানিয়েছি”। [“Maldivian people have decided what they want. I have accepted the results from yesterday. Earlier today, I met with Ibrahim Mohamed Solih, who the Maldivian electorate has chosen to be their next president. I have congratulated him,” Yameen said in a televised press conference.]। এটা রয়টারের রিপোর্ট, থেকে নেওয়া। অর্থাৎ কোন নির্বাচনে একজন প্রেসিডেন্টের পরাজিত হওয়ার পর এর চেয়ে স্পষ্ট ও সবল স্বাভাবিক ঘোষণা আর কী হতে পারে!

অথচ ভারত নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর বহু আগে থেকেই নিয়মিতভাবে ইয়ামিনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে গিয়েছে যে, “নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি সবকিছু। আর অনুসারী হয়ে আমেরিকাও ভারতকে সমর্থ করে নিজের খারাপ কূটনৈতিক ইমেজ আর বেকুবির নজির সৃষ্টি করেছে। অথচ  নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া দেখার জন্য অন্তত ২৪ সেপ্টেম্বর দিনটা পার হওয়া পর্যন্ত ভারত ও আমেরিকা অপেক্ষা করতে পারত। আর সেটাই সবাই আশা করে আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই অতি উৎসাহ দেখিয়ে দুই রাষ্ট্র নিজেরাই এক হস্তক্ষেপের নজির সৃষ্টি করে রেখেছে, আর নিজের মুখে কালি লাগিয়েছে। কারণ, এপর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত কোথাও কোন ধরণের গোলযোগ ছাড়াই মালদ্বীপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি ভারতীয় প্রপাগান্ডার ফাঁদে পড়ে, গোলযোগের আশঙ্কা করে নির্বাচনের তিনদিন আগে ২০ সেপ্টেম্বর আলজাজিরা-এর মত মিডিয়া এক পক্ষপাতিত্বের রিপোর্ট ছেপেছিল।  অথচ ফলাফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত ভারত, আমেরিকা বা কোন মিডিয়া তাদের কারচুপি বা গোলযোগের মনগড়া প্রপাগান্ডার কোন সত্যতা তারা দেখাতে পারে নাই।

বরং প্রতিক্ষেত্রে  ভারত ও আমেরিকার প্রপাগান্ডার উল্টা – নির্বাচন এতই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মমাফিক হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা আমলা ঘনিষ্ট এক কলামিস্ট নিজেই ২৪ তারিখ সকালেও নিজের “ফলাফল ঘোষণা ও ক্ষমতা হস্তান্তর” নাও হতে পারে – এ ধরনের মনগড়া আশঙ্কা যাচাই করতে মালদ্বীপে দু’জন গুরুত্বপূর্ণ এমপির সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন। ওই এমপি দু’জন এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিলে এবার তিনি আশ্বস্ত হন বলে তাও লিখেছেন।
সবশেষ নিজেই লিখছেন, “সলিহ যেহেতু জিতেছে অতএব মালদ্বীপের নির্বাচনে কারচুপি হয়নি”। এই হল মালদ্বীপের নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় প্রপাগান্ডার মুখ থুবড়ে পড়া পরিণতি!

মালদ্বীপের ফলাফল দেখে ফেসবুকে একটা ছোট মন্তব্যে লিখেছিলাম, ‘এটা বিপর্যয়’। কিন্তু কীসের? মালদ্বীপের থেকে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কী শেখার আছে, তা বোঝার উদ্দেশ্যে সেখানকার রাজনৈতিক ঘটনাবলির এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে আনব।

মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি স্পষ্ট পরস্পরবিদ্বেষী দুই ভাগে বিভক্ত। এটা আর বিরোধী নয় বিদ্বেষী জায়গায় চলে গেছে। তবু ঘটনাবলির একটা বর্ণনা মানে বর্ণনার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই করতে হবে। আর তাতে কোন পক্ষ সঠিক ছিল অথবা এর কোনো একটা পক্ষের প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলাটা এখানে এর একেবারেই উদ্দেশ্য নয়। তাই এই রচনায় কোনো পক্ষকে “ভাল” বললাম কি না, তা খোঁজা অথবা সেদিক থেকে বুঝতে যাওয়া খুবই ভুল হবে। আর এতে লেখাটার সুবিচার বঞ্চিত হবে।

প্রথমত, মালদ্বীপের রাজনৈতিক অসন্তোষ, অস্থিরতা অনেক পুরনো, গত শতক থেকে। এর একটা বড় উৎস হল, ক্ষমতাসীন পরিবারের প্রভাবশালী দুই সৎ ভাইয়ের রেষারেষি আর স্বার্থ ঝগড়াকে কেন্দ্রে রেখে এবার এর সাথে সমাজের অন্যান্য নানান স্বার্থগুলো একেক ভাইয়ের পক্ষ বেছে নেওয়াতে এটাকেই মালদ্বীপের রাজনৈতিক পোলারাইজেশন হিসেবে মনে করা হচ্ছে – এ ধরনের। অর্থাৎ রাজনীতি কম আর স্বার্থবিরোধ ভার বেশি। দ্বিতীয়ত, ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপে ভারত “অপারেশন ক্যাকটাস” নামে নিজ সামরিক বাহিনী নামিয়ে পছন্দের সরকার বসিয়ে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছিল; এই বিরাট খারাপ নজির সেই থেকে জ্বলজ্বল করছে। তৃতীয়ত, ২০১২ সালের পর থেকে চলতি প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সাথে অপর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের রাজনৈতিক বিবাদ তৈরি হওয়া, এক পর্যায়ে ‘টেরোরিজমের অভিযোগে’ নাশিদকে আদালতে নিয়ে শাস্তি দেয়া, এরপরে পার্লামেন্টকে কার্যকরভাবে কাজ করতে না দেয়া, বিচারককে গ্রেফতার, দুবার অপ্রতিষ্ঠিত-সাফাই দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি ইত্যাদি ঘটনা ঘটেছে যা মালদ্বীপের রাজনৈতিক তৎপরতা ও চর্চা হিসেবে খুবই খারাপ সব উদাহরণ।

কিন্তু এসবের বিপরীতে আদালতের ঘটনার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের (Mohamed Nasheed, যিনি প্যারোলে চিকিতসার জন্য বাইরে লন্ডনে গিয়ে সেখান থেকে দেশে না ফিরে এখন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসাবে শ্রীলঙ্কায় বসবাস করেন) খোলাখুলি ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপে ক্ষমতা দখলের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা আরো খারাপ এক উদাহরণ। সৌভাগ্যবশত এটা গত শতক নয়। অল্প কথায় বললে, জাপানি টাইমস আর রয়টা্র্সের খবর অনুযায়ী , নাশিদের খোলাখুলি ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের প্রতিক্রিয়ায় পরে,  চীন ১১ জাহাজের এক বহর নিয়ে ভারত মহাসাগরে হাজির হয়েছিল। এতে চীনের সাথে কোন মুখোমুখি সঙ্ঘাত পরিস্থিতি এড়াতে ভারত মালদ্বীপে হস্তক্ষেপে নাশিদের আহবান উপেক্ষা করে, আর বিষয়টা এবার চিন্তা থেকে বাদ দেয়। ফলে আরো খারাপ কিছুর হাত থেকে নাশিদ এবং মালদ্বীপও বেঁচে যায়। তবে ভারতের কোন কোন মিডিয়া অহেতুক “ভারতের মুখরক্ষা করার তাগিদ” থেকে একটা স্টোরি প্রচার করতে থাকে যে নাশিদ তো এখন বিরোধী দলে – ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নয় (১৯৮৮ সালের মালদ্বীপ প্রেসিডেণ্ট গাইয়ুমের ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবানের সাথে মনে মনে তুলনা করে এরা কথা বলছে) তাই ভারত এবারের আহবান উপেক্ষা করেছে। যদিও আমরা ভারত মহাসাগরে চীনা মেরিন ও ভারতীয় নৌবাহিনীর তাদের পরস্পরের জাহাজ কত দূরে এনিয়ে বিবৃতি দেখেছি। ভারত বলেছিল আমার হাজার খানেক মাইলেরও দূরে। আর চীনা এক নৌ ওয়েবসাইট বলেছিল, না আমরা বেশ কাছাকাছিই। এরপর এতটুকুতেই ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল, কারণ ……।

নাশিদের ভারতকে আহবান এর ঘটনা এই বছর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে। আর চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারীর। আর ওদিকে আর এক বিশাল বেড়ে চলা নয়া স্টোরি হল, ভারতের চলতি বিদেশ সচিব বিজয় কেশব গোখলে ঐ ৩০ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে তাঁর প্রথম বিদেশ ঘটান চীনে, ২৪ ফেব্রুয়ারি। ফলে যে যাই গালগপ্প দেক এবার সব টেনশন ফুস! আর এর পরেই আমরা পেয়েছিলাম ২৮ মার্চ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সিনিয়র সরকারি কর্তার  স্বীকারোক্তি – “দক্ষিণ এশিয়া কি আর ভারতের সেই বাগানবাড়ি আছে, চীন এসে গেছে না! আমরা এখন বড় জোর আমাদের মনোবাঞ্ছা চীনকে বলতে পারি। চীনের উচিত হবে আমাদের সাথে স্ট্রাটেজিক ট্রাস্ট তৈরি করা। ………আমরা চীনকে জানিয়েছি যে মালদ্বীপে আমরা হস্তক্ষেপ করব না”। এটা ছিল ঐ পত্রিকা রিপোর্টের সাব-হেডিং। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার বরাতে এটা ছাপা হয়েছিল। সারকথায় নাশিদের আহবান সত্ত্বেও বরং ভারত খোলাখুলি সংযত হয়েছিল।

কিন্তু মালদ্বীপের ঘটনাবলিকে মালদ্বীপ-রাষ্ট্রের নিজ স্বার্থের দিক থেকে যদি বিচার করা হয় তাহলে, ইয়ামিনের ক্ষেত্রে অপরাধ হলঃ যেসব প্রতিষ্ঠানের কারণে রাষ্ট্র কার্যকর ও প্রাণবন্ত থাকে – কিন্তু কেউ ক্ষমতায় আছে বলে সেগুলো প্রত্যেকটার (যেমন আইনশৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ইত্যাদি) স্বাধীন বা কনষ্টিটিউশন নির্ধারিত এখতিয়ার ও আইনসম্মত কাজে নির্বাহী প্রধানের অযাচিত ও বেআইনি হস্তক্ষেপ ঘটানো – এটা এক চরম আত্মঘাতী কাজ। ইয়ামিন বেপরোয়াভাবে সেই বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর কাজগুলোই করে গেছেন। আর বিপরীতে নাশিদের ক্ষেত্রে, নিজ তথাকথিত রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহবান রেখে পুরো মালদ্বীপ রাষ্ট্রকেই অস্তিত্বহীন দুস্থ করে ফেলার আরও এক অপরাধ করেছেন নাশিদ।

সব দেশেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থের নানা লড়াই, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সকলের জন্য পালনীয় এর কিছু ‘নো গো এরিয়া’ থাকে, যা থেকে দলগুলো সকলকে দূরে থাকতে হয়।

মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বা এর শৃঙ্খলায় ব্যাপক উলটপালট পরিবর্তন আসন্ন। আমার প্রায় সব লেখাই যেখানে দাঁড়িয়ে দেখে লেখা। গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও এর শৃঙ্খলা এবারের অভিমুখ চীনের নেতৃত্বে পরিবর্তন হতেই থাকবে। আর নতুন করে সাজানো হতে থাকবে। দুনিয়ায় আমেরিকান নেতৃত্ব ও প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে; একেবারে নাই না হলেও। আর তাতে পশ্চিম বা ইউরোপ নয়, দুনিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নাট্যশালা হয়ে উঠছে এশিয়া। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এশিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই কাঁধ-বদল বা শিফটিং – এর ভাল এবং মন্দ দুটো দিকই আছে। একদিকে ভাল কিছু সুযোগ পাওয়ার আছে আবার ঠিকমত ব্যবহার না করলে জানলে একইসাথে নিজে তছনছ হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনাও আছে – দুটোই।

সবচেয়ে মন্দের দিকটা হল, অস্থির ও চলতি এই শিফটিংয়ের প্রাথম দিককার সময়কালটা। দুনিয়া নতুন করে সাজানো আর সম্পর্কগুলো ঢেলে সাজিয়ে গড়ার এই কালেঃ
১. চীন, আমেরিকা আর ভারত এই তিন পক্ষের রেষারেষি থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে দূরে থাকতে পারতে হবে। কোন পক্ষকে নিজের পক্ষ ভাবা যাবে না, এলাইন হয়ে যাওয়া যাবে না। ঐ তিন পক্ষের কারও স্বার্থে নিজেরা বিভক্ত হলে ঐ বিভক্ত হওয়া থেকে ক্ষতি শুরু হবে।
২. দেশের দলগুলোর মধ্যে আভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও স্বার্থবিরোধে ওই তিন রাষ্ট্রকে ডেকে আনা যাবে না, সংশ্লিষ্ট করে ফেলা যাবে না।
৩. অথবা উল্টা করে বললে, ওই তিন রাষ্ট্র স্বার্থের কোনো একটার পক্ষ নিয়ে আমাদের কোনো রাজনৈতিক দল দেশের ভেতর কাজ করতে পারবে না। ‘প্রো-ইন্ডিয়ান বা প্রো-চাইনিজ দল ক্ষমতায়’- এ ধরনের পরিচিতি আমাদের পতনের ইঙ্গিত।
৪. একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই প্রধান, এটাকে সব সময় প্রাধান্যে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেই হবে।
৫. যে দলই ক্ষমতায় থাকুক – তার ভারত, আমেরিকা অথবা চীনকে কোনো সুবিধা দেয়া বা ঋণ নেয়া তা করতে হবে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে রেখে; অবিতর্কিত এবং স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়ায় যাতে অহেতুক তর্ক-বিতর্কের সুযোগ কেউ না নিতে পারে ইত্যাদি।

কিন্তু এসবই বজায় রাখা যাবে যদি নিয়মিত ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ও ক্ষমতাহস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে এক স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ দেয়া যায়। এ ছাড়া ক্ষমতাসীনের চোখে যে সরকার বিরোধী তারও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করতে ক্ষমতাসীনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।

এক কথায় বললে, মালদ্বীপের রাজনীতি ও দল এসব মৌলিক করণীয়গুলো করতে সবাই ব্যর্থ হয়েছে। ইয়ামিনের দিক থেকেও এই রাজনৈতিক ফলাফল বিপর্যয়কর এজন্য যে, হয়ত সে বলবে বিদেশীকে হস্তক্ষেপ ডেকে আনা নাশিদের উদ্যোগকে ঠেকাতে পেরেছে। কিন্তু ইয়ামিন তা এমন প্রক্রিয়ায় করেছে তাতে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন আদালত ও পার্লামেন্টকে) অকেজো করে ফেলেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা জনগণই এই কাজ পছন্দ করেনি। অনুমোদন করেনি। উল্টা করে বললে ইয়ামিন তার কাজকে জনগণ সাথে নিয়ে করতে পারেনি। এরই ফলাফল হল নির্বাচনে সব পাবলিক সহানুভূতি বিরোধী দলের দিকে চলে গেছে, যার প্রকাশ নাশিদের প্রার্থী বেশি ভোট পাওয়া বা ইয়ামিনের পরাজয়। তবে অবশ্যই আবার ইয়ামিন প্রশংসার দাবি রাখে যে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত ও তার বন্ধুদের নিয়মিত শত প্রপাগান্ডা [যে নির্বাচন হয় কি না, অথবা নির্বাচনে কারচুপি হবে, অথবা নির্বাচনে বিরাট গোলযোগ হবে, বিরোধী প্রার্থী সলিহ জিতলেও ফল ঘোষণা করা হবে না ইত্যাদি] এসব সত্ত্বেও এগুলোর প্রতিটা যে ডাহা মিথ্যা তা ইয়ামিন প্রমাণ করে দিয়েছেন – একটা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্পন্ন করে দিয়ে। যা ভারত ও আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত। ওদিকে ভারতকে আহবান জানিয়ে নাশিদ যা করেছে তাতে তাঁর এখন রাজনীতি ত্যাগ করে অবসরে যাওয়া উচিত।

এখন নিয়ম অনুযায়ি আগামী ১৭ নভেম্বর হল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন। এরপরে এবার পালটা সলিহ ও নাশিদের দল বা জোট কী প্রতপক্ষের উপর পালটা প্রতিশোধ নেয়া শুরু করবে আর একইভাবে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকেজো করে রাখবে? জবাব সম্ভবত হ্যাঁ, সেই সম্ভাবনাই বেশি। এক ভারতীয় ‘বিদ্বজ্জন’ অধীর আগ্রহে কি লিখেছেন লক্ষ করা যাক। তিনি বলছেন, “নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মালদ্বীপ এবার ভারতের দিকে ফিরতে পারে এবং অবশ্যই ফিরবে”। [For new development projects, Maldives can turn to India and will.] তিনি এয়ারপোর্ট পুননির্মান প্রকল্প আবার ভারতের ফিরে পেয়ে যাবার স্বপ্ন দেখছেন।  অর্থাৎ সে সম্ভাবনা বাস্তব হলে তা হবে, নাশিদ ও তার দলবলের মালদ্বীপকে চীন-ভারতের হাতে পিংপং বল করে ফেলা- যা এক বিরাট অযোগ্যতা আর তা, আনফিট রাজনীতিক হওয়া হবে।

শেষ বিচারে আবার মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের এখনই উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই। একটা কারণ, মালদ্বীপে পার্লামেন্টারি নির্বাচন হবে ২০১৯ সালের মে মাসে। অতীতের রেকর্ড বলে, সে নির্বাচনে ইয়ামিনের দল আবার পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ে ফিরে এসে যেতে পারে। এ ছাড়া নাশিদের জন্য আরো বড় বিপদ হল, তারা জিতেছে একটা জোট হিসেবে। কিন্তু একদিকে জোটের মেনিফেস্টো অসম্পূর্ণ, আবার তাতে বলা আছে জোটের এগ্রিমেন্ট পার্লামেন্ট বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনু-স্বাক্ষরিত হতে হবে।
আরও আছে। এছাড়া নাশিদের দল চায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা উঠিয়ে দিয়ে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকারে চলে যায়। কিন্তু জোট শরিকেরা এতে একমত নয়। ফলে বহু – যদি, কিন্তু ও অনিশ্চয়তা – অপেক্ষা করছে।

তবে আমাদের জন্য সারকথাটা হল, আমাদের দলগুলো একেকটা চীন অথবা ভারতের এজেন্সি নিয়ে বিভক্ত হয়ে যেতে পারবে না। চীন, ভারত অথবা আমেরিকার আগে সবসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রস্বার্থ প্রাধান্যে ও স্বচ্ছতায় নিয়ে হাজির হতে হবে। নইলে নিজেরাই তছনছ হয়ে যাওয়ার শুরু হবে সেখান থেকেই।

একটা তামাসার বাক্য দিয়ে শেষ করা যাক। ভারত মালদ্বীপ ইস্যুতে ইয়ামিনকে “একনায়ক” আর তাঁর বিরুদ্ধে  নাশিদ-সলিহদেরকে “গণতন্ত্রপন্থিদের” বিজয় হিসাবে এক “মরাল” দাড় করাবার কোশিশ করে গেছে। আচ্ছা বাংলাদেশের বেলায় কী করবে? কাকে একনায়ক আর কাকে “গণতন্ত্রী” হিসাবে রঙ লাগাবে! ভারতকে মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য যারা আহবান করে সে অবশ্যই “বিরাট গণতন্ত্রী” দেখা যাচ্ছে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপের নির্বাচন ও আমাদের জন্য শিক্ষা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

গৌতম দাস

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uc

ভুটানের সদ্য শেষ হওয়া সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের অপেক্ষা

ভারতের জন্য সম্ভবত “আরেকটা উইকেটের পতন” হতে যাচ্ছে। না, দুবাইয়ের এশিয়া কাপ ক্রিকেট খেলা নয়, ভুটানের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। ভুটানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। প্রো-ইন্ডিয়ান যে দল এতদিন ক্ষমতায় ছিল যার নাম পিডিপি [Peoples’ Democratic Party’s (PDP)], এবারের নির্বাচনে এর শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দলটি নেমে গেছে প্রথম থেকে তৃতীয় অবস্থানে। এটা অবশ্য প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন। সেকেন্ড বা ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে আগামি মাসে ১৮ অক্টোবর। ২১ সেপ্টেম্বর ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার শেষ দিন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে ভারত “নিজের বাড়ির পিছনের বাগানবাড়ি” মনে করতে ভালোবাসে। শুধু তাই নয়, নিজের কোনো মুরোদ থাকুক আর নাই থাকুক, চীন কেন সেখানে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে হাজির হবে এবং এতে সেখানে চীনের প্রভাব কেন বাড়াবে তা নিয়ে ভারতের নাই-মুরোদের অস্বস্তি ও আপত্তি কেউ শুনুক আর না শুনুক, ভারত নিয়মিত এনিয়ে উষ্মা-অভিযোগ করে যেতে খুবই ভালোবাসে।

ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের(?) চুক্তি ১৯৪৯
ভুটান এক দিকে ভারত ও অন্য দিকে চীন দিয়ে ঘেরা। আর এক পড়শি নেপাল রাষ্ট্রের মতই ভুটানও চারদিকে অন্যের ভুমি দিয়ে ভূমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। বাইরে বের হতে চাইলে ভুটানকে ভারত অথবা চীনের ভুমি পেরিয়ে তবেই তাদেরই কোন সমুদ্র বন্দরের নাগাল পেতে পারে। বাণিজ্য ও পণ্য আনা নেওয়া সচল করতে পারে। সাম্প্রতিককালে ভারতের নাগপাশ ছিঁড়ে নেপালের সার্বভৌমত্বের চর্চা, সাহস এবং তার নেয়া পদক্ষেপগুলো দেখে সম্ভবত ভুটানের মনেও অনেক সাহস জমা হয়ে থাকবে। ভুটানের প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে অন্তত এর একটা প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করার কারণ আছে; তাই এতে ভুটানও হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য সম্ভবত আরেক উইকেটের পতনের ইঙ্গিত!

নেপালের মত ভুটানও “ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের চুক্তি ১৯৪৯” নামে ভারতের কাছে দাসখতের খোটায় বাধা পরে আছে। এগুলো একালে ১৯৪৭ সালের পরে ভারতের রিনিউ বা নতুন করে করা চুক্তি হলেও, সবই কলোনি আমলে বৃটিশ এম্পায়ারের সাথে ভুটানের (নেপালেরও) যে দাসত্ব চুক্তি ছিল, মুলত সেটারই কপি। কেবল “বৃটিশ সরকারের” জায়গায় “ভারত সরকার” বসিয়ে নিয়েছেন ভারতের নেহেরু সাহেব।  সে আমলে কলোনি মালিক বলতে বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, স্পেনিস, পর্তুগীজ মূলত এরাই ছিল, আর ছিল এদের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কার কলোনি কে যেকোন উপায়ে টান দিয়ে নিয়ে যায় এনিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। একারণে পুরানা রাজার রাজ্য কলোনি করে নিতে পারলে এরপর অনেক সময় সেটাকে “করদ রাজ্য” বলে ছাড় দিয়ে রাখত। আর করদ রাজ্য অন্যতম বৈশিষ্ট হত এক চুক্তিপত্র যেখানে লেখা থাকত যে ঐ রাজ্য আর বৈদেশিক বিষয়ে নিজে নিজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না, সেটা করবে বৃটেন। […the Kingdom of Bhutan is guaranteed its independence, but agrees to be represented by Great Britain in its foreign affairs.] এটা (১৯১০ সালে) বৃটেন ও ভুটানের মধ্যেকার চুক্তিপত্র  থেকে তুলে আনলাম। চুক্তিতে এমন লেখা থাকার মূল কারণ যাতে নেপাল বা ভুটান অন্যকোন কলোনি শক্তির সাথে নতুন চুক্তি করে চলতি চুক্তি ভেঙ্গে না দিতে পারে। পুরান চুক্তির কলোনি প্রভুদের কথাগুলোই কপি করার মধ্য দিয়ে “কথিত প্রগতিবাদী” প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নিজেই কলোনি-প্রভু হবার খায়েস এবং কলোনি-শাসক-প্রিয়তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সেই থেকে ভারতের সিভিল-মিলিটারি আমলা প্রশাসনের ওরিয়েন্টেশনে ও মন-মানসিকতায় অন্য রাষ্ট্রকে কলোনি-সম্পর্কে আবদ্ধ করার আগ্রহ অভ্যাস হিসাবে রপ্ত হয়ে যায়।
অনেকে মনে করতে পারেন কলোনি আমলে কলোনি বানানো জায়েজ হলে একালে নয় কেন, নেহেরুর তাহলে দোষ কী? অবশ্যই দোষের এবং ঘোরতর দোষের। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়া শুরু হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত অবস্থান ও কনভেনশনে যে, কলোনি শাসন অন্যায়, অবৈধ। ভিন্ন ভাষায়, “প্রত্যেক জনগোষ্ঠি কিভাবে শাসিত হবে তা তাঁরা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। আর এই নির্ধারণ তাদের অধিকার”। তাই ১৯৪১ সালের পরে জন্ম নেয়া জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। সেকারণে কফি আনান বলতে পেরেছিলেন, সাদ্দাম-উতখাতের পরের ইরাকে আমেরিকার বুশ প্রশাসনের উপস্থিতি – জাতিসংঘের চোখে এখানে “আমেরিকা এক দখলদার শক্তি”।

আর এটারই নেহেরু আমলে ১৯৪৯ সালের করা চুক্তির ভাষ্যে, তৃতীয় দফা আছে এভাবে, “……বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে ভারত সরকার  ভুটান সরকারকে যা বলবে ভুটান সেই পরামর্শ অনুসরণ করবে বলে রাজি হচ্ছে”। [On its part the Government of Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.] অর্থাৎ কেবল ভাষার রকম ফের করে একই জিনিষ রেখে দেয়া হয়েছে। মজার কথা হল, এই চুক্তিতে ভুটান সরকারকে বৃটিশ সরকারের একটা ক্ষতিপুরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল। যার ১৯১০ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী ছিল সেকালের মুদ্রায় ১০ লাখ ভারতীয় রুপী। আর ১৯৪৯ সালে এসে দেখা যায়, নেহেরু সাব একালের মুদ্রামানে বাড়ানো দূরে থাক বরং কমিয়ে করেছিলেন মাত্র ৫ লাখ রুপী। তবে এসব প্রসঙ্গগুলো ২০০৭ সালে চুক্তি আপডেট [update the 1949 Treaty] এর সময় বাদ দেয়া হয়েছে । আর সেই সাথে ২০০৭ সালের এই আপডেট চুক্তিতে কী শর্তে ভারতের ভুমি ব্যবহার করে মালামাল আমদানি করতে পারবে এই ইস্যু ঢুকানো হয়েছে। তবে বলা হয়েছে ভুটান সব কিছুই আমদানি করতে পারবে “ভারত যতক্ষণ সন্তুষ্ট” [as long as the Government of India is satisfied] থাকবে। এটা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষ্যটাই এটাই। এবার সেটার আলোকে ২০০৭ সালে ভারত-ভুটান আপডেট চুক্তি করে নেয়া হয়েছে। এর সোজা অর্থ হল এই চুক্তি অর্থহীন। কারণ ভারত যে কোন সময় কোন কারণ না দেখিয়ে যেকোন আমদানিকে “বন্ধ” বলতে পারবে – কেবল সে “অসন্তুষ্ট” একথা উল্লেখ করার যথেষ্ট হবে।

এখান থেকে এটা পরিস্কার কেন ভুটান চীনের সাথে সম্পর্ক পাতাতে আগ্রহী। নেপাল বা ভুটান উভয়েই ভারতের শর্তের বেড়াজাল ভাঙতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি নেপাল কোন কিছু আমদানি করতে গেলে এতদিনের ভারতের উপর তার শতভাগ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার পথ পেয়ে গেছে। নেপালকে ট্রানজিট দানের ক্ষেত্রে ভারতের একচেটিয়ার দিন শেষ হয়েছে।  ভারতের বিকল্প হিসাবে চীনের ভুমি ব্যবহার করে চীনের চারটা সমুদ্র পোর্টসহ ও স্থলবন্দর মিলিয়ে মোট সাতটা পয়েন্ট দিয়ে আমদানি করতে পারার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের সাথে এই চুক্তির ফলে বাস্তবত এটা নেপাল-ভারত মৈত্রী চুক্তির নামে দাসত্ব চুক্তি নেপালের কাছে “অপ্রয়োজনীয়” হয়ে গেছে। চীন-নেপাল সম্পর্কের এই নতুন বিকাশ ও অভিমুখ ভুটানের অজানা থাকার কারণ নাই। নেপালকে অনুসরণ এখন ভুটানের জন্য কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

২০১৩ ও ২০১৮ এর নির্বাচন কিছু তুলনামূলক আলাপ
গত ২০০৭ সালে আগের পুরা রাজতন্ত্র থেকে কনষ্টিটিউশনাল শাসনে আসার পর থেকে এটা ভুটানের তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। তবে ভুটানে নির্বাচনব্যবস্থা দুই স্তরে সম্পন্ন হয়। তাই এবারের নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ করতে, দ্বিতীয় ও শেষ স্তরের নির্বাচন হবে ১৮ অক্টোবর। যেখানে এবার প্রার্থী হতে পারবেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয়, কেবল সেই দুই দলের প্রত্যেকের (ভুটানের পার্লামেন্টে মোট সংসদীয় আসন ৪৭ মাত্র) ৪৭ জন করে প্রার্থী।

২০১৩ সালের নির্বাচনের ফলাফলের সাথে এবারের একটা তুলনার মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের মধ্যে তুলনা করে বলা চলে যে, গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে যে (পিডিপি) [[Peoples’ Democratic Party’s (PDP)],] দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল সেই দল এবার ২০১৮ সালের প্রথম রাউন্ডে হয়ে গেছে তৃতীয়। আর ২০১৩ সালে যে দল দ্বিতীয় হয়েছিল (ডিপিটি) [Druk Phuensum Tshogpa (Bhutan Peace and Prosperity Party) (DPT)]; সে এবারো দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। কিন্তু তৃতীয় দল (ডিএনটি) [Druk Nyamrup Tshogpa (DNT) দলের মূলনেতা ডাক্তার লোটে শেরিং] এবার চমক দিয়ে উঠে এসে একেবারে প্রথম হয়ে গেছে। আর প্রথম হওয়া দলটা গঠিত হয়েছিল মাত্র গত ২০১৩ নির্বাচনের আগদিয়ে।

খুব ছোট দেশ ভুটানের লোকসংখ্যা মাত্র প্রায় আট লাখ [আমাদের মধ্যম মানের দুটা উপজেলার মোট জনসংখ্যা এরকমই; যার মধ্যে আবার এবারের মোট ভোটার প্রায় তিন লাখ (২৯১,০৯৮)। এবার ভোটদানের হারও বেশি; ভোট পড়েছে মোট ভোটারের ৬৬%, গতবার যা ছিল ৫৫.৩%। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ভুটানি মিডিয়া বলছে, পোস্টাল ভোট এবার অনেক বেশি পড়েছে। এর বেশির ভাগ পেয়েছে প্রথম হওয়া দল। সরকারি কর্মচারী আর প্রবাসী ভুটানি (যারা আগে থেকে রেজিস্টার্ড)- এরাই মূলত পোস্টাল ভোটার। ওই দিকে বাংলাদেশের কোনো কোনো পত্রিকায় খবর বের হয়েছে [ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ছাত্র লোটে শেরিং] – প্রথম হওয়া ডিএনটি দলের প্রধান একজন এমবিবিএস ডাক্তার, তিনি আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। যা হোক, তার দলের বিরাট জনপ্রিয়তা ও প্রথম হওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে যে, তার প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তিনি বিজয়ী হলে গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছে দেবেন, বিশেষ করে মা ও মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। মনে হচ্ছে এই প্রতিশ্রুতি তাদের মনে ধরেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো অবকাঠামো যেখানে খুবই অপ্রতুল যেমন – মোট মাত্র ১৮ হাজার বর্গমাইলের ভুটানের (তুলনায় ৫৭ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ) পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে যেতে আজও এক সপ্তাহ সময় লাগে।

সাহস করে ভুটানের চীনের প্রতি আগ্রহের হাত বাড়ানো
তবে আরেক ফ্যাক্টস হল, এবারের দ্বিতীয় হওয়া দল ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘ডিপিটি’ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন  করে ক্ষমতায় (২০০৮-১৩) ছিল। কিন্তু ভারতের চোখে এই দলের “অপরাধ” হল, ২০১২ সালে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাওয়ের সাথে ব্রাজিলে দলের নেতা ও তৎকালীন ভুটানি প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করেছিলেন। এতে ভারত খুবই নাখোশ হয়। এই প্রসঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়ার কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রাণী বাগচী লিখছেন, India has had a rocky relationship with DPT which was in government between 2008 and 2013, largely because of the then PM Jigme Thinley’s interest in building ties with China.অর্থাৎ ডিপিটির প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। আর এখান থেকেই পড়শি সব দেশে ভারতের যা করা স্বভাব যে, কোনো একটি দলকে প্রভাবিত করে সেটাকে ভারতের অন্ধ দালাল বানিয়ে ঐ দেশের রাজনীতি কলুষিত করে ফেলা, তা শুরু হয়। ফলে ভুটানের সেসময়ের ক্ষমতাসীন দল ‘ডিপিটি এর প্রতিদ্বন্দ্বি দল – পিডিপি ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে পরের নির্বাচনে হাজির হয়ে যায় ও জয়লাভ করে।

সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘স্ট্রেইট টাইমস’।  ইন্ডিয়া থেকে এর ব্যুরো চিফ হলেন নির্মলা গণপতি। তিনি তাঁর রিপোর্টে ভুটানিরা ভারত ও চীন ইস্যুকে কিভাবে দেখে তা বোঝাতে একটা সাবহেডিং বাক্য লিখেছেন এমন – “ভুটানিরা দিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু তাঁরা একই সাথে বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়”। [While Bhutanese value close ties with Delhi, they also feel need for relations with Beijing…]
যদিও ব্যাপারটা হল- ‘মূল্য দেয়’ অবশ্যই অগত্যা। কারণ, না দিলে আরো বিপদ। কিন্তু বেইজিংকেও খুঁজতে হয়। কারণ একতরফা ভারতের কর্তৃত্ব থেকে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতেই হবে।

চীনের সাথে এখনও ভুটানের রাষ্ট্রদূত বিনিময় হয়নি। সেটা এখন প্রক্রিয়াধীন। তবে ইতোমধ্যেই ভারতে পরস্পরের অফিস বা অন্য কোন দেশের কোথাও গিয়ে তারা দেখা করে কথা বলে। কিন্তু তাতেও ঘোরতর অস্বস্তি আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি যে ভারতের পার্লামেন্ট -লোকসভার সংসদীয় প্রশ্নোত্তরে এটাকে প্রসঙ্গ করা হয়েছিল। ব্যাপারটা এমনভাবে হাজির করা হয়েছে, যেন বৌমা কেন কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছে আর শাশুড়ির তা নিয়ে কথা তোলার সুযোগ পেয়েছে। এনিয়ে সংসদীয় রিপোর্ট এখানে দেখা যাবে, [Q NO. 1470 BHUTAN-CHINA GETTING CLOSER]।

এ দিকে, ২০০৭ সালের পর থেকে ভুটান আর রাজার খেয়ালি শাসনের দেশ নয়, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রাষ্ট্র। এবার নিয়ে সেখানে তৃতীয়বার পার্লামেন্ট নির্বাচন হল। আর এর আগে প্রায় শত বছরের পুরনো (১৯১০) স্বাধীন রাজতন্ত্র হলেও, ১৯৪৭ সালে নেহরুর আমল থেকে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতনির্ভর।

যেহেতু ভারতের ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া ভুটানের ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্তি নেই- এটাকেই ভারত একরকম মুক্তিপণ বানিয়ে নিয়েছে; আর ভারতনির্ভর হতে বাধ্য করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু কত দিন ভারত সেসুযোগ পাবে? ভুটানের নতুন প্রজন্ম এথেকে মুক্তি পেতে যেন মরিয়া। যা সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই সতর্কভাবে ভুটানিজদের অন্তরে ভারত-বিরোধিতা আর চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার হাতছানি – দুটোই বাড়ছে। নেপাল ভারতের বিকল্প এবং ভারতের চেয়ে প্রাপ্ত সুবিধাদির দিক থেকেও অগ্রসর চীনা ট্রানজিট (রেল যোগাযোগ) জোগাড় করতে পারলে, তাহলে ভুটানেরও সেটা না পারার কোনো কারণ নেই। কেবল তা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এটা অতীতে ১৯৪৭ সাল থেকেই নেহরুর ‘ভাইসরয়’ ভাব ধরে থাকার যে খায়েশ দেখিয়ে গেছে, ভারতের সিভিল ও গোয়েন্দা আমলা প্রশাসন এখনও যেই নীতির অনুসারি এর তো ক্ষতিপূরণ ভারতকে এখন দিতেই হবে। নেহরুর সেই আত্মঘাতী চিন্তার মূল্য ভারতকে চুকাতেই হবে।

খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেই ২০০৭ সালের পর থেকে রাজার আর খামখেয়ালি তো শাসন নয়। ভারতের হাত থেকে ভুটানকে বাঁচাতে তিনি তা একা পারবেন না, তাই জনগণকে শাসন-ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বেচ্ছায় রাজা জননির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের সরকার আর কনস্টিটিউশনের অধীনে (রাজার খেয়াল নয়) পরিচালিত সরকার – এমন কনষ্টিটিউশনাল রাজতন্ত্র চালু করে দেন; আর সেই সাথে রাজনৈতিক দল ও তৎপরতা চালু হওয়ায় সরকার গঠনে জনসম্পৃক্ততাও আসে। এখান থেকেই ভুটান সরকারের নিজেরা নিজের সার্বভৌমত্ব চর্চা ও নিজ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে তদানীন্তন চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ ছিল এর অংশ। কিন্তু ভারত এতে অসন্তুষ্ট হয়েছিল ও নিজের কোটারি স্বার্থের বিপদ দেখেছিল। ভুটানের জ্বালানি তেলের সরবরাহকারী ভারত, আর এতে ভারত কিছু ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তাই ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগের দিন ওই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে, নিজের পক্ষে ভুটানিদের ওপর চাপ দিতে – ভারত ওই ভর্তুকি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছিল। হঠাৎ এই চাপের মুখে, জনমনে কিছুটা ভয়ে – সব মিলিয়ে এর প্রভাবেই ঐ নির্বাচনে ভারতপন্থী দল পিডিপি ক্ষমতায় জয়লাভ করেছিল বলে মনে করা হয় এখনও। এমনকি ভারতীয় মিডিয়াতেও  কেউ কেউ এটাকে ভারতীয় সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া বলে দোষারোপ করে থাকে।

চীনের ঝাড়ি মারা
কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রো-ইন্ডিয়ান দলের এক নম্বর অবস্থান থেকে তিনে চলে যাওয়াতে ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচুর হইচই পড়ে যায়। এমনকি কোথাও ভারত সরকারকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান ও পরামর্শও আসতে থাকে। তেমনি এক রিপোর্ট হল – টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। এতে কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রানী বাগচী লিখছেন, “ভুটানে ভারতকে উদ্যোগ ও তৎপরতা দ্বিগুণ করতে হবে”। [India will have to work doubly hard to help its closest neighbour achieve its aspirations while securing its interest…]
কিন্তু ভুটানে ভারতকে  “কোন উদ্যোগ” (হস্তক্ষেপের?) নিতে তিনি তাগিদ দিচ্ছেন সেটা ইন্দ্রাণী উহ্য রাখছেন। ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি আগের মত কোন ভারতীয় হস্তক্ষেপের কথা বলছেন। লিখছেন, ‘পড়শিকে তার স্বার্থরক্ষার আকাঙ্খা অর্জন করতে ভারত যেন ভুটানে নিজ প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করে”। এটা কি সাংবাদিকতা না উগ্র জাতীয়তাবাদী মনের আধিপত্য কামনা? আবার ভাব ধরছেন বিরাট কূটনীতিকের। কসরত করেছেন কোন এক কায়দা ব্যবহার করে “ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে” আহ্বান করবেন যা কূটনৈতিক বা সাংবাদিকতার নর্মস অথবা আইনের বরখেলাপ মনে না হয়।
এটা আসলে পড়শির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া না, পড়শির মাথায় চায়ের কাপ রেখে আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে চা খাওয়ার বেকুবি চেষ্টা। সেই নেহরুর আমল থেকে এটাই ভারতের নিয়মনীতি বা পড়শি পলিসি হয়ে আছে। এভাবেই বিশেষ করে ল্যান্ডলকড পড়শিদের নানা চুক্তিতে বাধ্য করে সুবিধা আদায় করে এসেছে ভারত। ব্রিটিশ কলোনি মাস্টার ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেপাল বা ভুটানের মতো পড়শি দেশের বেলায় নেহরুকে যেন বৃটিশ “ভাইসরয়” হিসেবে ভূমিকা পালন করতে দিয়ে গেছে। মোটকথা, পড়শিদের ভারতকে ‘ট্যাক্স’ দিয়ে চলতে হবে, যাতে নিধিরাম সর্দার ভারত দাবি করতে পারে যে – “এই চীন, এদিকে এসো না, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না; এটা আমার এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট!”

কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারতের অর্থনীতিতে যেমন অবকাঠামো ঋণের চাহিদা ও অভাব প্রবল – আর তা মেটাতে সে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে; তেমনি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মতো পড়শিরাও একই কারণে সেটাই করছে। কারণ কলোনি আমল থেকে ভারতসহ আমাদের সবার অর্থনীতিতে স্থানীয় মানুষের হাড় ভেঙে খেটে যা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়, যা আমাদের হক এবং হবু বিনিয়োগ পুঁজি, তা লোপাট ও নিজ দেশে পাচার করেছে ব্রিটিশরা। সে অভাব, সেই থেকে বিনিয়োগ চাহিদা আর প্রাপ্তির যে বিরাট গ্যাপ সেটা এখন একটু মনোযোগ পাচ্ছে – কারণ চীনের হাতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়েছে, যা অবকাঠামো ঋণ হিসেবে দিতে চীনও আগ্রহী।

তাই ভারতসহ সবাই আমরা বুভুক্ষের মতো চীনা অবকাঠামো ঋণ ও প্রকল্প নেবো কারো বাধা না মেনে। তবে যাদের সরকার, রাজনীতি বা রাষ্ট্র ইতোমধ্যে যথেষ্ট শক্তপোক্ত হয়ে গেছে, ব্যাপস্থাপনায় দক্ষ; তারা প্রকল্প ও শর্তগুলো ভালো বাছবিচার করতে পারবে। না হলে কোন কোন দেশ কিছু আরও কষ্ট স্বীকার করবে, কোন কোন প্রকল্প লাটে উঠবে, চুরি দুর্নীতিতে ভরে যাবে।

সব ঘটনার মূল কারণ তাহলে, আমাদের সীমাহীন অবকাঠামো ঋণ চাহিদা এবং বিনিয়োগ না হওয়া। এই চাহিদা প্রসঙ্গে এডিবির এক স্টাডি বলছে – এশিয়াতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি আর এআইআইবি (AIIB, চীনের বিশ্বব্যাংক) সবাই মিলে তাদের সব সামর্থ্য ঢেলে অবকাঠামো বিনিয়োগ করলেও তাতে এশিয়ার এখন অবকাঠামো বিনিয়োগ চাহিদা যত তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ঘাটতি থেকেই যাবে। অবকাঠামো ঋণ পেতে এ ব্যাপারে ভারতসহ আমরা সবাই “একই নৌকায়”। ভারতের যেমন, আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের পড়শি সব রাষ্ট্রেরও একই অবস্থা। ভারতসহ সবাই এক কাতারে যে, চীন আমাদের সবার অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণকারী এবং দীর্ঘ দিনের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ না হওয়া খরা-দশায় মূল ঋণদাতা। ফলে ‘আমার বাগানবাড়িতে চীন ঢুকে গেল’ এসব অর্থহীন কথা আর ভুয়া অহঙ্কার ভারতের বন্ধ করা উচিত। এগুলো আমাদের না কারও আর না বুঝার কিছু নাই।

আসলে ভারতের উচিত সবার আগে নিজে “চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগ” না নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক । চীন খোদ ভারতের অর্থনীতিতেই ঋণদাতা হয়ে ঢুকে বসে আছে, ভারত চীনের এআইআইবির (চীনের বিশ্বব্যাংক) সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। মানে চীন ভারতের বাগানবাড়ি না খোদ মূল বাড়িতে ঢুকে বসে আছে। এটা সবাই জানে।

ভারতীয় মিডিয়া হৈ চৈ প্রসঙ্গটা, ব্যাপারটা চীনের সরকারি ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকারও নজর এড়ায়নি।  তাই গ্লোবাল টাইমসের এক রিপোর্ট প্রশ্ন তুলেছে ভুটানের নির্বাচনী ইস্যুতে ইন্দ্রাণী বাগচীর লেখাসহ ভারতীয় মিডিয়ার হইচই নিয়ে। আর বলেছে, ‘ভারত যেটাকেই উন্নয়নের আদর্শ মডেল মনে করুক, তা যেন সব জায়গায়ই একই থাকে, আর ভারত যেন সেই একই মডেলের পক্ষে থাকে।’ উদাহরণ হিসেবে বলছে, ভুটান পূর্ব-পশ্চিমব্যাপী হাইওয়ে তৈরিতে এডিবির থেকে একটা ঋণ পেতে যাচ্ছিল কিন্তু ভারতীয় প্ররোচনায় সেটা বাতিল হলো কেন? ভারত একচেটিয়াভাবে ভুটানের সস্তা জলবিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে; অথচ তৃতীয় দেশে এর বিক্রি বাণিজ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। কিন্তু কেন?

আইএমএফের রেফারেন্স দিয়ে পত্রিকাটি প্রশ্ন করছে, ‘ভুটান কেন ঋণগ্রস্ত, এত আকণ্ঠে নিমজ্জিত? ভুটানের মোট ঋণ তার জিডিপি-এর চেয়েও বেশি হয়ে গেছে কেন? তাহলে ভুটান নিয়ে চাপাবাজি করছে কে? [Who is bullying Bhutan, China or India?] আর সেটা হয়েছে গত মাত্র ছয় বছরে – ভুটানের ঋণ জিডিপির ৬৭ শতাংশ থেকে ১১৮ শতাংশে উঠে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ভুটানের মোট ঋণের ৬৪ শতাংশ ঋণই হল ভারতের প্রদত্ত?

আসলে ইন্দ্রাণীর ভারত সরকারকে সরাসরি কিছু করার (হস্তক্ষেপের) আহ্বান, নিঃসন্দেহে এটা এক বেপরোয়া কাজ হয়েছে। ইন্দ্রাণী তার লেখার শুরুতে ‘হাইলাইট’ উপ-শিরোনামে তিনটি পয়েন্ট মানে তিনটি বাক্য লিখেছেন। এর প্রথম বাক্যটা হল এই বেপরোয়া আচরণ। আর পরের দুটা হল তার হতাশার কারণ বর্ণনা। যেমন, দ্বিতীয় বাক্যে তিনি আক্ষেপ করে লিখছেন, “২০১৩ সালের মত এবারের ২০১৮ সালে ভুটানের নির্বাচনে “ভারত কোনো ইস্যুই হতে পারেনি”। আর তৃতীয় বাক্য হল, “ভুটানে যে দুটো দল প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছে তারা ভারতের সাথে খাতিরের সম্পর্ক গড়ার কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়েই আমাদের খালি কিছু আশ্বাস শুনিয়েছে”।

আসলে ভুটানের এই নির্বাচনের বহু আগে থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে ভুটানিদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল এবং করণীয় নিয়ে খুবই সংগঠিতভাবে আলোচনা ও প্রচার তাঁরা চালিয়েছে। যেমন এনিয়ে “ভুটানিজ ফোরাম” নামে ফেসবুক গ্রুপ, সেছিল সবচেয়ে সরব। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় তারা একেবারে লো প্রোফাইল। কোনো দলের ক্ষোভ থাকুক আর ভালোবাসাই থাকুক নির্বাচনের মূল তিনটা দল ভুটানে “ভারতের তৎপরতার” বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ সম্পর্কে ছিল একেবারেই নিশ্চুপ। সম্ভবত তাদের ভয় ছিল, এতে ২০১৩ সালের মতো ভারতের কোনো পদক্ষেপ তাদের সাধারণ মানুষকে আরো কষ্টে ফেলে দিতে পারে। তাই তারা ভারতীয় মিডিয়ায় নয়, নিজ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছে, আর ভোটের বাক্সে ভোট দিয়ে আসল কাজটা করেছে; ভারতকে আসল জবাবটা দিয়েছে।

বহু পুরনো এক প্রবাদ হলো, কারো ক্ষতি করে সেটা থেকে তোমার লাভ আসবে – সেটা আশা করো না কখনও।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালের পর এবার ভুটান হাতছাড়া!  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

গৌতম দাস

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tY

 

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে

প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party'”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tL

 

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, ভারতের এক সাবেক কূটনীতিক, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, ২০০৭ সালে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। বর্তমানে তিনি ভারতের একটা বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো হিসেবে সক্রিয়। তাঁর বিশেষ গুরুত্বের দিকটা হল, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের নীতিনির্ধারক যারা – ভাবেন, অবস্থান নেন এমন সবার সাথে, অন্য সব কূটনীতিকের চেয়ে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থার সাথে সংযুক্ত এমন এক ব্যক্তিত্ব তিনি। তাঁর সার্ভিস পিরিয়ড, ২০০৭-০৯ সময়পরিধিতে তাঁর বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্বে থাকাকালীন কিছু কাজ এর পিছনের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করা হয়। না, এটা যথেষ্টভাবে বলা হলো না। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই রচনা কী নিয়ে সেদিক আলোকপাত করে কিছু কথা বলা দরকার।

আসলে, বাংলাদেশ যে পিনাক রঞ্জনকে চিনত সে নয়; তা থেকে একেবারে ভিন্ন, ‘আনলাইক’ এক পিনাক রঞ্জনের এক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ পত্রিকায়। সে প্রবন্ধের ভাষ্য এমন যে এটা শেখ হাসিনা সরকারের উপর থেকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত হিসেবে তা পাঠ করার সুযোগ রেখে লেখা হয়েছে। [এটা বাংলা ও ইংরাজী দুই ভাষাতেই একই লেখা প্রকাশিত হয় এমন এক ওয়েব পত্রিকা, ফলে বাংলায় অনুদিত ও প্রকাশিত ভাষ্য পাঠকেরা পড়তে পারেন। ]

এক-এগারোর সরকারের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এবং পরিণতিতে, আমেরিকা যদি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হাওলা বা হস্তান্তর করে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করে থাকে; তবে ভারতের দিক থেকে এতে এক নম্বর পরামর্শদাতা এবং বাস্তবে তা রূপদানকারী ব্যক্তি হলেন কাকাবাবু প্রণব মুখার্জি। আর সে কাজেরই মাঠের বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী।

প্রকাশিত উইকিলিকস ফাইল থেকে জানা যায়, এক-এগারোর টেকওভার বা ক্ষমতা দখল এবং এর লক্ষ্য অনুযায়ী সাধিত কাজ শেষে এরপর এর এক্সিট রুট কী হবে, মানে কাকে ক্ষমতা দিয়ে তাঁরা তখন কেটে পড়বে, এটা নিয়ে শত প্রশ্ন ও অনুরোধ সত্ত্বেও ক্ষমতা দখলকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর জানতে পারেনি। উপায়ন্তরহীন সেই পরিস্থিতিতে অবস্থা দেখে মনে হয়, এ ব্যাপারে ক্ষমতা দখলকারীরা একটা নিজস্ব আবছা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। তা হল, লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ হওয়া শেষে তারা নিজেরাই এরশাদের মতো কোনো দল গঠন করে রাজনীতিতে নেমে পড়বে। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০০৭ সালের জুনের পর থেকে অক্টোবরের মধ্যে এটা ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে যে, আমেরিকা এ অঞ্চলের তার -ওয়ার অন টেররে – “টেররিজমের বিরুদ্ধে পাহারাদারের” ঠিকা ভারতকে দিচ্ছে। আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেমিনারে সাব্যস্ত হয় যে,  “ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় তার নিরাপত্তা স্বার্থ” দেখবে ও বুঝে নেবে। এথেকে তাই মনে করা হয়, এরই নিট ফলাফলে বাংলাদেশ ভারতের ইচ্ছাধীনে চলে যায়। এর অন্য আরেকটি লুকানো দিক ছিল, আসলে এটা ছিল আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নামে পদক্ষেপের আড়ালে ভারতকে নিজের নৌকায় অন বোর্ড করে নেওয়া। যার মানে হল, এটাই আমেরিকান স্বার্থে ‘চীন ঠেকাও’ বা ‘China containment’ এর কাজটা ভারতকে দিয়ে করিয়ে নিতে আমেরিকা তাকে রাজি করিয়ে নেয়, আর দেনা-পাওনাও ঠিক করে নেয়। বিনিময়ে এরই রাজভেট হল, “বাংলাদেশকে বলি দেওয়া” – আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হস্তান্তর, ভারতের করিডোর লাভ থেকে শুরু করে লাভ আর লাভ ইত্যাদি।

কিন্তু বিউটেনিস নিজেদের এই নতুন সিদ্ধান্তের পক্ষে মইন-ফখরুদ্দীন ও তার সঙ্গীদেরকে রাজি করাতে পারছিল না। একারণে শেখ হাসিনার জামিন, দেশত্যাগ, স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে আলোচনা করতে দেয়া ও তাকে ক্ষমতায় আনা ইত্যাদিতে সহযোগিতা করতে তারা রাজি হচ্ছিল না। এ সময় পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী কিছু নির্ধারক কাজ করে, আর তাতে মইন ও তার সঙ্গীদেরকে বাধ্য হয়ে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আগমনের পরে ২০০৯ সালে পিনাক রঞ্জন তার ‘সফল’ অ্যাসাইনমেন্ট শেষে দেশে ফিরেছিলেন।

পিনাক রঞ্জনের বিশেষ প্রবন্ধ
পিনাক রঞ্জনের এই বিশেষ প্রবন্ধের শিরোনাম অবশ্যই সেটা পিনাক রঞ্জন-সুলভ ছিল না। যেমন লেখাটার বাংলা শিরোনাম হল- “বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ছায়া, হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, বিএনপিকে দমন”। আর ইংরাজিতে, “Shadow of India, Hasina government’s corruption, repression of BNP looms over Bangladesh polls.” অনুমান করা যায় লেখাটা ইংরাজীতে আর পরে তার অনুবাদ বাংলায় করা হয়েছে।

এখানে দেখা যাচ্ছে, এটা সত্যিই বেশ তামাশার যে “বিএনপির ওপর নিপীড়ন হচ্ছে” – এই কথা তুলে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত তাঁর লেখায় এটাকে শিরোনাম করেছে। তবে এর চেয়েও আরো বিস্ময়কর হল, শিরোনামের কিছু বিশেষ ‘শব্দ’ পছন্দ করে নেওয়া। যেমন, বাংলাদেশে দুর্নীতি হচ্ছে কি না, শেখ হাসিনা সরকার সেই দুর্নীতি করছে কি না – এটা গত দশ বছরে ভারত বা পিনাক রঞ্জনের ভাষায় তা কখনও উঠে আসেনি। ভারতের মিডিয়া বা ইন্টেলেক্টরাও কখনও এসবকে তাদের লেখার বিষয়বস্তু করেনি। বরং হাসিনার শাসনে ভারত কত কিছু – না চাইতেই সব উপুড় করে পাচ্ছে, তাদের পছন্দে ও ভাষ্যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দিচ্ছে – হাসিনা সরকারের এসব অবদান নিয়েই সবসময় তাঁরা বিগলিত থেকেছে। আসলে “দুর্নীতি” – এটি মূলত আমেরিকান ভাষা। ফলে অচানক এটা পিনাকের ভাষা হয়ে উঠা সত্যিই ‘তাতপর্যপুর্ণ’, তা বলতেই হয়।

এভাবে পিনাক রঞ্জনের পুরা লেখাতে যেসব বিস্ময়কর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তার একটি তালিকা এখানে আমরা দেখে নেই।

এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনঃ
অচিন্তনীয় ঘটনা হল, পিনাক রঞ্জন আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন। তিনি
লিখেছেন,

“আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পদক্ষেপকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং এর মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের নীলনকশা হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিক্ষোভ করেছিল। এর জের ধরে বিএনপি সরকার সংবিধানে বিধিটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার আয়োজিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বাতিল করে”।

দুই. কোটা আন্দোলন ও যানবাহন ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলন সামলাতে ব্যর্থতা ও হার্ডলাইনে যাওয়াঃ
এটাও সত্যিই বিস্ময়কর যে, পিনাক রঞ্জনের মত ভারতের কোন কূটনীতিক হাসিনাকে “হার্ডলাইনে দমন করা” [যে হার্ড লাইন ছাড়া আর কোন লাইনে তিনি কখনও দাঁড়াতেই পারেন নাই।] আর ‘কাজ’ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলে অভিযোগ আনছে।  কিছুটা আমেরিকান বা পশ্চিমা কূটনীতিকের আদলে মানবাধিকারের কথা ব্যাকগ্রাউন্ডে মনে রেখে তারা যেভাবে কথা বলেন, যা বলাই বাহুল্য “পিনাক-সুলভ নয়” আর তা না হয়েও তিনি লিখেছেন –
“সরকারি চাকরির কোটার মতো ঘরোয়া ইস্যু এবং ঢাকার অবাধ্য ও বিশৃঙ্খল যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা আন্দোলন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন ইস্যুতে হাসিনা সরকারের ছন্দপতন ঘটেছে, যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল, ঢাকার অবাধ্য যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। এসব চালক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ফলে দেশব্যাপী ছাত্রদের ক্রোধ উসকে দেয়া এবং এ ইস্যুতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নস্যাতের অভিযোগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার ছিল বেপরোয়া সিদ্ধান্ত। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে, কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করেননি”।

অর্থাৎ এমনকি “আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার” বলে শহিদুল আলমের কথাও তিনি উল্লেখ করে সে ড্রাম পিটানো ছদ্ম এক্টিভিস্ট সাজতে  তিনি এখানে দ্বিধা করছেন না, আর লিখেছেন – “এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে”।
মজার ব্যাপার হল, গত দশ বছরে ভারতের কোনো কূটনীতিক, কলামিস্ট, মিডিয়া রিপোর্ট কেউ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো গুম-খুন, পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া ইত্যাদি থেকে শুরু করে, ‘হার্ডলাইনে দমন করা’ আর কাজ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলছে আমরা এমন কখনও দেখিনি।

তিন. স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতিঃ
নিজ চোখে দেখলেও এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন “স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতির” অভিযোগ আনছেন। বিশেষত যখন, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় আনার কালে মাঠের এক কুশীলব ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি লিখেছেন –
“হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতি। নির্বাচনী প্রচারণায় এসব ইস্যু ও ভারত ফ্যাক্টর প্রাধান্য পাবে। রাজনৈতিক বিরোধীদের অব্যাহতভাবে হয়রানি করার ফলে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নীরব ক্ষোভ বেড়েই চলেছে এবং ব্যাপকভাবে এ ধারণার সৃষ্টি করেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে। ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। অনেক সমালোচক বিশ্বাস করেন, হাসিনা সরকার নির্বাচন ‘ম্যানেজ’ করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় একে বলা হয় ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’ “।

চার. মাদকবিরোধী অভিযান আসলে “গুলি করে হত্যার” নীতিঃ
কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন কি পরিচয় বদলে ‘মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট’ হয়ে যাচ্ছেন? সে এক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন! যেমন তিনি লিখেছেন –
“মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি ‘গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত হয় বলে মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন। এতে অনেক নিরপরাধ মারা যায়”।  আসলে বরং ফ্যাক্টস হল, গত দশ বছরে ভারতের ‘বাংলাদেশ নীতি’ কখনও হাসিনা সরকারের হিউম্যান রাইট মেনে চলার রিপোর্ট কার্ড রেকর্ড কেমন কখনও সেটাকে ইস্যু করে নাই, সবসময় এড়িয়ে চলেছে, মাতে নাই ফলে কোন অভিযোগও কখনও তুলে নাই। তাহলে পিনাক এখন এতবড় ব্যতিক্রম কেন?

পাঁচ. সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও আওয়ামী লীগের হিন্দু দলন ইস্যুঃ
ভারতের কোনো সাবেক হাইকমিশনার শেখ হাসিনা ও তার দলকে “হিন্দু সংখ্যালঘুদের দলন, হয়রানি ও বৈষম্য করছে” বলে অভিযোগ করছে – এটা এর আগে কখনও চিন্তাও করা যায়নি। তাহলে, এটাই কি হাত ছেড়ে দেয়ার চূড়ান্ত ইঙ্গিত? সবাইকে অবাক করে পিনাক রঞ্জন এই অভিযোগ তুলে বলেছেন,
“হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এক প্রধান বিচারপতি সরকারের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে ও বিদেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনসূচক থাকা হিন্দু সংখ্যালঘুরাও ক্ষুব্ধ। কারণ, আওয়ামী লীগ নেতারা দায়মুক্তির সাথে হিন্দু সম্পত্তি জবরদখল করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা ছাড়া ভারতের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্য করা হলেও কিছু বলবে না”।

ছয়. বিএনপির প্রতি সহানুভূতিঃ
পিনাক রঞ্জনের দু-দুটি প্যারাগ্রাফ ধরে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিমূলক ভাষায়, “তারা হাসিনা সরকারের হাতে নির্যাতিত” এই পটভূমি তৈরি করে লিখেছেন,
“তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে বিএনপি”। অর্থাৎ বিএনপির সম্ভাব্য আন্দোলনের প্রতিও তার সহানুভূতির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তিনি পরের প্যারাগ্রাফে আরো লিখেছেন, “কয়েক দিনের মধ্যেই আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতে পারে। তা ঘটলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়বে”। পিনাক রঞ্জন এখানে গণক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হয়ে উঠতে চাওয়া তাতপর্যপুর্ণ।
এখানে পাঠককে একটু সাবধান করার আছে যে, এখনই কোনো “সরল” সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঝাপিয়ে পড়ার কিছু নেই। ওয়েট অ্যান্ড সি। বরং অবজারভ করেন মন দিয়ে। পিনাক রঞ্জনের ভাষা ও বক্তব্যের মধ্যে সত্যিই কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না এই বিচার্য বিষয়ে, এতটুকুতেই আপাতত থাকাই ভাল।

সাত. আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির ভেতরে কথিত ভাঙনের গুজব ছড়ানোর দায় আনাঃ
পিনাক রঞ্জন “আগে দেখা যায় নাই” এমন বেশ খোলাখুলিই লিখেছেন,
“বিএনপির প্রবীণ নেতারা তারেককে অপছন্দ করেন। তারা নেতা হিসেবে খালেদাকেই অগ্রাধিকার দেবেন। বিএনপির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা রয়েছে, এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে ভাঙনের মাধ্যমে নতুন দলের আবির্ভাব ঘটতে পারে। সম্ভাব্য ভাঙনে আওয়ামী লীগের হাত আছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে”।
এই ভাষ্যে লক্ষণীয় বিষয়টা হল,  বিএনপি নিয়ে এত কথা পিনাক রঞ্জন লিখেছেন অথচ ২০০১-০৬ সালের বিএনপি সরকারের কোনো কাজ বা পদক্ষেপের কোনই সমালোচনা নেই। এমনকি, দশ ট্রাক অস্ত্র অথবা কথিত জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেয়ারও কোনো অভিযোগও তিনি তোলেননি। এটি কোন ভারতের কূটনীতিক ও সাবেক হাইকমিশনারের জন্য চরম সীমাহীন ব্যতিক্রম। বিশেষ করে ঠোঁট কাটা অ-কূটনীতিক-সুলভ মন্তব্যের জন্য যেই পিনাক রঞ্জন খারাপভাবে খ্যাত।

আট. নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার অভিযোগঃ
এই অভিযোগটা তুলেছিল মূলত বিএনপি। কিন্তু পিনাক রঞ্জন সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে তুলে এনেছেন। তবে অবশ্যই “নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার” এই অভিযোগ যে কোন নির্বাহী সরকারের বিরুদ্ধে খুবই মারাত্মক। তিনি লিখেছেন,
“‘বিএনপির নির্বাচনী প্ল্যাটফর্মের মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি। দলটি অভিযোগ করছে, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রেখেছে”।

পিনাক রঞ্জনের লেখায় মূল অভিযোগ মূলত এগুলোই। তবে কামাল হোসেনের যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে হাসিনার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মন্তব্যেরও পিনাক সমালোচনা করেছেন। এ ছাড়া ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে একটি শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। ব্যাপারটা হল, অনেকটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সব কিছুতেই ভারতের নিরন্তর দাদাগিরি ও হস্তক্ষেপ আর নিজের একক স্বার্থে মাখনটুকু নিয়ে যাওয়া ইত্যাদির গত দশ বছর ধরে এমন আচরণ – এসব কিছুকে ইঙ্গিত করে এটাকেই তিনি ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে বুঝাতে চেয়েছেন, আর তা করেছেন অনেকটা ক্ষমা চেয়ে নেয়ার ভঙ্গিতে। যেমন নিজে থেকেই প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন,
“বাংলাদেশ ও ভারতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বিএনপির হাসিনাকে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নতজানু দেখানোর সম্ভাবনা থাকায় ভারত ফ্যাক্টর হবে বিপুল। প্রধান সমালোচনা হবে, হাসিনা ভারতকে খুব বেশি ছাড় দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন অতি সামান্য”।

অর্থাৎ পিনাক রঞ্জন এখানে নিজে থেকেই হাসিনার ভারতের সাথে ঘষাঘষি (মুল ইংরাজীটা ছিল kowtowing); যেমন বলেছিলেন “pillory Hasina of kowtowing to India” –  মানে ভারতের সাথে ঢলাঢলিতে গায়ে পড়া হয়ে সব দিয়ে দেওয়া্র দায়ে হাসিনাকে কাঠগড়ায় তোলা – এর সুযোগ আছে বলে পিনাক রঞ্জন নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। তাই এই ভাষা বা অর্থ দিয়ে তা পিনাক রঞ্জন নিজে থেকে আঁকছেন।  খুব সম্ভবত এর কারণ সাধারণ মানুষের ক্ষভ প্রশমন ও তাদের সহানুভুতি সংগ্রহ। তাই পিনাকে এই অংশের “উপস্থাপন” সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ।

আবার ভারতের পানি না দেয়া ইস্যু নিজেই তুলে বলছেন, “নদীর পানিবণ্টন এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেলেও তা কাটিয়ে ওঠা যাবে না এমন নয়“।
এ ছাড়া, আসাম নাগরিকত্ব ইস্যুতে মিস্টি প্রস্তাবের সুরে বলেছেন, “…দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে উদ্বিগ্ন করবে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এনআরসি থেকে সৃষ্ট অনিবার্য প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে”।

সোজা কথায় রাখঢাক না করে বললে ব্যাপারটা হল, গত ১০ বছরে ভারতের যত রুস্তমি, প্রভাব বিস্তার বা বর্ডার কিলিং থেকে শুরু করে তার যা দরকার তা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, ভারতের স্বার্থ সবার উপরে এই নীতিতে এভাবে ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ যে চরমভাবে ক্ষুব্ধ, সে সম্পর্কে পিনাক রঞ্জন সচেতন – তাই জানা গেল। তবে এখানে তিনি ইঙ্গিতে যা বলতে চাইছেন, তা যদি আমরা বুঝে থাকি তা সম্ভবত এমন যে, তিনি বলতে চাইছেন, সম্ভাব্য নতুন সরকার এলে পুরানা সব ভুলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যাত্রা করা যেতে পারে।
বলা বাহুল্য, মি. পিনাক রঞ্জন আসলে এখানে অনেক ফাস্ট। ফলে অনেক দূর আগেই কল্পনা করে ফেলেছেন। তাই দ্রুত অনেক আগে চলে গেছেন আর খুবই “সরল” আর প্রায় ‘খ্রীষ্টীয় ইনোসেন্ট’ ধরণের সব নানান ভাষ্য হাজির করেছেন। বাংলাদেশে গুম হওয়া কোনো মানুষ ভারতের মাটিতে পাওয়া যাওয়া কি আসলেই এতই সরল আর ইনোসেন্ট? পিনাক রঞ্জন নিজেকেই এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন! ফলে পিনাক রঞ্জন খুব গভীর সচেতন তা বলতে পারছি না। তবে তাকে অনেক গভীরে চিন্তা করতে হবে আর স্বভাবতই তাতে অনেক কাঠ এবং খড়ও পুড়বে।

সবশেষে পিনাকের রচনার শেষ প্যারাগ্রাফের চারটি বাক্য সম্পর্কেঃ
প্রথম বাক্যঃ
বাংলাদেশে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করুক এর বিরুদ্ধে ভারতের আপত্তি ঈর্ষামূলক ও ক্ষতিকর তা কি ভারত এখন বুঝেছে? মনে হয় না কারণ, আমরা কোথাও এমন কিছু দেখিনি। ফলে তার শেষ প্যারাগ্রাফের প্রথম বাক্য –
“বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পূর্ণ বিকশিত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর আরো একীভূতকরণ, সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র আরো আধুনিকায়ন, মোটরযান চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ভবিষ্যতে আরো জোরালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে”   – এই আশার কোনো ভিত্তি নেই। খামাখা ইউজলেস। নন স্টার্টার!

দ্বিতীয় বাক্যঃ
“ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে”।
এই বাক্য থেকে আমরা হাসিনা সরকার যে দুর্বল দুস্ত অবস্থায় আছে, তাই সম্ভবত তিনি বুঝতে চাইছেন মনে করতে পারি। কিন্তু ২০১৩ সালে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফর, তাঁর মাতব্বরি ও নোংরা হাত ঢুকানোর সাথে এই বক্তব্যের কোন মিল খুঁজে পাই না। সুজাতা ফরমান জারির মত করে বলেছিলেন, “যারা নির্বাচনে আসবে তাদের নিয়েই নির্বাচন হবেই” আর এরশাদ যেন বিরোধী দলের জায়গা পূরণ করে। সেটা তাহলে কেন বলেছিলেন? কেন তখন বলতে পারেন নাই যে, ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে? বাস্তবতা হল, তিনি তা পারেন নাই। তাহলে এখানে প্রশ্ন উঠবেই যে এখন কেন পিনাক রঞ্জন একথা বলছেন? এটার অর্থ কী এই যে ভারতের “বাংলাদেশ নীতি” বদল হয়ে গেছে? কিংবা পুরান প্রেম ও পছন্দের সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে চাইছে – আর ভাল লাগছে না বলে, তাই কী? পিনাকের কথার অর্থ কোনটা করব? পিনাক নিজেকেই সবার আগে এসব বিভ্রান্তি খোলসা করতে হবে।

তৃতীয় বাক্যঃ
“তাই বলে কোনো হাসিনাবিরোধীকে ভারত বিকল্প মনে করছে, এমন কিছু ভাবা হবে কষ্টকর কল্পনা”। বোঝা গেল এটা পিনাকের ‘সংবিধি সতর্ককরণ’ বা একটা “ডিসক্লেমার” দিয়ে রাখা যে ভারত বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছে ব্যাপারটা এমন সরল না। নো প্রবলেম। আমাদেরও এমন তাড়া নাই!

চতুর্থ ও শেষ বাক্যঃ
“অবশ্য, হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তার প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়, ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে”।
সরি মি. পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী; এটা এভাবে বলতেই হচ্ছে যে “ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়” – আসলে এটাই হল আপনাদের ঘুরিয়ে বলা যে কাজ ফুরিয়েছে, শেখ হাসিনা ক্রমেই এখন লায়াবিলিটি বলে অনুভূত হচ্ছেন, আপনাদের কাছে। বলাই বাহুল্য, আসলে এমনটাই হয়ে থাকে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

গৌতম দাস || Wednesday 27 June 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tI

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা প্রথম পর্ব।]

ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন শেষ হবার পর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ২৫ জুন সন্ধ্যায় ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহম্মদ মোরসিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবু দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সব জায়গায় মূল আলোচনার বিষয় মোরসির ক্ষমতা কি কি, কত দিনের প্রেসিডেন্ট, কি তাঁর কাজ এবং কাজের সীমা ইত্যাদি। কোন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) বলতে প্রচলিত যে ধারণা দুনিয়ায় আছে সেই রকম একটা ভাবের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলতে দুনিয়াতে প্রচলিত ভাবটা কে কি বুঝে তা দিয়ে কোন কাজ চলতে পারে না, বরং ঐ সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট-এর মানে কি, কি তাঁর ক্ষমতা, কোনটা তার নয়, কতদিনের জন্য ক্ষমতা ইত্যাদি স্পষ্ট করে বলা থাকতে হয়। তা বলা থাকতে হয় কনষ্টিটিউশনে এবং নির্বাচনের আয়োজন শুরুরও আগেই । একটা কনষ্টিটিউশন কোন রাষ্ট্রের থাকার মানে হল ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক-জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত (কনষ্টিটিউটেড) হয়েছে; এভাবে হলে, হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে রাষ্ট্র বলা চলে। অন্যভাবে বললে জনগণ রাজনৈতিকভাবে কনষ্টিটিউটেড হওয়া আর রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যাওয়া একই কথা। আর সেই সাথে জনগণ কিসের ভিত্তিতে একত্র হলো, কনষ্টিটিউটেড হলো সেই ভিত্তি – জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার কোন ভিত্তি – সেকথার লিখিত দলিলটা হলো কনষ্টিটিউশন। ঐ কনষ্টিটিউশনে বলে দেয়া থাকে, রাষ্ট্র যে পরিচালনার করবে সেই নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাজ, ক্ষমতা কি, কতদিনের, রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা হবে ইত্যাদি। এরপর সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনস্ততা মেনে রাষ্ট্রের বাকি সমস্ত  প্রতিষ্ঠান এমনকি খোদ নির্বাহী প্রধান, পার্লামেন্ট অথবা বিচার বিভাগ সবাই আনুগত্য প্রকাশ করেই একমাত্র তারা যার যা ভুমিকা পালন করতে পারে। ফলে রাষ্ট্র দৃশ্যমান হয়। খেয়াল রাখতে হবে আমি রাষ্ট্রের কথা বলছি, দেশ না। দেশ বলতে ওর মাটি সীমানা মানুষ ইত্যাদি সবই থাকতে পারে – এতে দেশ হয়ে থাকলেও তা রাষ্ট্র নাও হতে পারে। সোমালিয়া একটা দেশ বটে কিন্তু রাষ্ট্র নয় সেটা। আবার কোন দেশ একই থাকে কিন্তু ওর রাষ্ট্র আবার কনষ্টিটিউট বা গঠন করে নেবার দরকার হতে পারে। দরকারের মূল কারণ, পুরানা রাষ্ট্র আর জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না তাই। রাজনৈতিক শব্দে একে কোন দেশের নতুন করে রিপাবলিক গড়া বলে। আবার অনেকের মনে হতে পারে এতক্ষণ রাষ্ট্র বা রিপাবলিক (গণ)রাষ্ট্র বলতে আমি বোধহয় আগাম ধরেই নিয়েছি যে আমি “গণতন্ত্র” ধরনের রাষ্ট্রের কথাই বলছি। না আমি তা বলছি না। আমি  রাষ্ট্রের কথা বলছি, রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। এই রাষ্ট্র ইসলামি, কমিউনিষ্ট, লিবারেল ইত্যাদি অথবা এসবেরও বাইরে নতুন কোন রাষ্ট্র হতে পারে। আর এসব রাষ্ট্র শব্দের আগে বিশেষণে রিপাবলিক কথাটা যোগ করেছি এজন্য যে এটা অন্তত রাজা, বাদশা সম্রাটের রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য নয়; এসবের বিপরীতে জনগণের কর্তৃত্বের রাষ্ট্র কেবল সেটা পরিস্কার রাখার জন্য।

  • ইজিপ্টের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রের কোন কনষ্টিটিউশন বর্তমানে নাই।  মোবারকের পুরানা কনষ্টিটিউশন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর, পার্লামেন্ট বসার আগে এবং SCAF (সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স)-এর ঘোষণায় নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতার জোরে ।
  • এর মানে ইজিপ্ট একটা অন্তর্বতীকালিন বা মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে, পুরানা রাষ্ট্র নাই আবার নতুন রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা হয়নি – এদুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা।
  • তাহলে নতুন কোন কনষ্টিটিউশনের আগেই একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইজিপ্টে ঘটেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ীর মত। আবার এর আগে একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত এপ্রিলে; ব্রাদারহুড যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়েছে। সাথে ইসলামি সালাফি রাজনীতির নূর পার্টি (২৫%) মিলিয়ে মোট ৫৪% আসন এই দুই ইসলামী ব্যকগ্রাউন্ডের রাজনীতিক দলের হাতে। সাধারণভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচন মানে আগাম একটা কনষ্টিটিউশন আছে; সে কনষ্টিটিউশনের অধীনে সীমায় থেকে প্রতিদিনের নানান প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ওর কাজ। কিন্তু ইজিপ্টের বিশেষ ক্ষেত্রে নামে বলা হচ্ছে এটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট কিন্তু এর কাজ হবে একটা কনষ্টিটিউশন খাড়া করা। কিন্তু তাও আবার সরাসরি নয়। পার্লামেন্টের দ্বারা একশ মনোনিত (নির্বাচিত নয়) সদস্যের এক কমিটি ইজিপ্ট রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন (খসড়া বা প্রস্তাবিত) খাড়া করবে। যেটা পরে হয়ত পার্লামেন্ট পাশ বা অনুমোদন করলেই হবে; অথবা আবার গণভোটে দেয়া হবে।(“হয়ত” বলে আমাকে বাক্য লিখতে হচ্ছে এজন্য যে এগুলোর কোনটাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে পরিস্কার করা হয় নাই।) কিন্তু তাই যদি হয় তবে পুরানা বা নতুন কোন কনষ্টিটিউশনই না থাকা অবস্থায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের কাজ, উদ্দেশ্য লক্ষ্য কী? কেনই বা কথাটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট বলা হচ্ছে; যেখানে হবার কথা একটা কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বী (কনষ্টিটিউশন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সভা) বা আমাদের বাংলায় সমতুল্য প্রতিশব্দ ‘গণ পরিষদ’; ফলে ঠিক পার্লামেন্ট মেম্বার বা নির্বাচন নয়, বরং গণ পরিষদের সদস্য কে হবেন তাঁর নির্বাচন – এটাই হবার কথা। এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনেরও আগের কাজ। প্রথম কাজ কনষ্টিটিউশন বা রাষ্ট্র গঠন – জনগণের কনষ্টিটিউটেড হওয়া – সেটা ঘটানো। এরপর ঐ কনষ্টিটিউশনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে বড় ধরনের এক গোজামিল এখানে চলছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উপরে বারবার দেখিয়েছি কোন কিছুই স্পষ্ট না করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আওয়াজে ঘটনা চলছে। এমনকি ঐ একশজন কারা কিভাবে মনোনিত হবেন তাও স্পষ্ট করে রাখা হয় নাই। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ঐ পার্লামেন্ট এনিয়ে বিরোধ মীমাংসা শেষ করতে না পেরে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। ব্রাদারহুড সালাফি বাদে সমাজের বাকি সবাই পার্লামেন্ট থুয়ে আবার তাহরির স্কয়ারমুখী জমায়েত হয়। এই অবস্থা অবশ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগেও হয়েছিল। নির্বাচন বর্জনের ডাক এসেছিল। কিন্তু এর ভিতরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘটেছিল। আর পরে দেখলাম পার্লামেন্টের বিরোধ মীমাংসা যখন হলো না তখন ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে যাওয়ায় সবাই তাতেই মত্ত হয়ে গেল এই ভেবে যে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা দিয়েই তারা সব বিরোধের মীমাংসা করে নিবেন।

গণ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বা যেকোন বিপ্লব সফল করতে গেলে কনষ্টিটিউশন থাকা আর না থাকার মাঝের অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার হাতে থাকছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় সব কিছুর নির্ধারক এবং লক্ষণও বটে। র‍্যাডিকাল কোন পরিবর্তন বিপ্লবের ভাব তুলে এর বদলে তা উদারতাবাদী লোক দেখানো কোন ঘটনা হিসাবে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়ে যাবে কি না তা সহজে বুঝবার উপায় হলো অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতাটার দিকে লক্ষ্য রাখা। উপরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের নামে তামাশা আর পরে একইভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের নামে যে রহস্য ইজিপ্টের আমরা দেখছি – মোরসি নির্বাচিত এটা জানার পরও সাথে সাথে যে প্রশ্ন উঠছে যে তাঁর ক্ষমতা কি কি, আর সমানে পিছন থেকে SCAF সমানে প্রম্পট করছে, এক এক সময় এক এক ভাবে ফরমান জারি করে প্রেসিডেন্টকেই সাইজ করছে – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার এটা কত গুরুত্বপূর্ণ, সেন্ট্রাল পয়েন্ট। কিন্তু SCAF কিভাবে কেন অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা হয়ে গেল? এরমানে আরব জাগরণ আন্দোলন বা বিপ্লবের আওয়াজই কি  SCAF কে ক্ষমতায় আনে নাই? ঘটনা ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু এই সত্যি ঘটনা ঘটতে পারল কেন? কেন এমন হলো, এদিকটা এখন বুঝাবুঝির দিকে যাব।

ইজিপ্টের ঘটনায় মূল তিন প্লেয়ার – ১) SCAF, ২) স্থানীয় ব্রাদারহুড আর ৩)পশ্চিমের লিবারেল ইসলাম (RAND প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ধারা)। এর বাইরে সেকুলার, কমিউনিষ্ট বা লিবারেল ধারার ছোট টুকরা যারা আছে এরা ঠিক গোনায় ধরা প্লেয়ার হতে পারেনি তাই এদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা না করে তাহরিরের মাঠের সাধারণ গণ আন্দোলনের কর্মীদের ভিতরে ধরেছি, সবমিলিয়ে যারা চতুর্থ ধারা বলতে পারি।

[এই লেখাটা শুরু করেছিলাম ১৬-১৭ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে। লেখার প্রসঙ্গ ক্রমশ বিস্তার হতে থাকে কারণ, যেটাকে গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম বলছি – এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টরটা কোথাও আলোচনা হতে দেখিনি। “আরব স্প্রিং” বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম জিনিষটা কি কেন, এর প্রভাবে ইজিপ্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সম্পর্কটা কি এটা বাদ  রেখেই সব আলোচনা চলছে। মিডিয়াগুলোর ফোকাস হলো ব্রাদারহুড ইসলাম নিয়ে তেড়ে আসছে এবার কপটিক খ্রীশ্চানদের কি দশা ঘটে এটাই যেন মূল বিষয়। অথচ তুলনায় এটা সবচেয়ে তুচ্ছ দিক। ফলে কেন তুচ্ছ বলছি সেকথাগুলো ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে লেখা শেষ করতে পারিনি। এদিকে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। এই দেখে ঐ ২৫ তারিখেই ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে তাড়াহুড়া তবে আলাদা করে “কয়েক ঘন্টা পর ইজিপ্ট – কি ঘটতে পারে? কি হতে যাচ্ছে?” শিরোনামে লেখাটা দিয়ে দেই। এখন মুল লেখাটা আবার সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, কয়েক পর্বে। ]

 

বিপ্লবী রাজনীতি না উদারবাদী রাজনীতি

কোন গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে, বিপ্লব সফল করতে গেলে পুলিশ-মিলিটারীর মার নির্যাতন সহ্য করা, অঙ্গ হারানো, নিহত বা গুম হয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে দমনের সব পথ মোকাবিলায় পাড়ি দিয়েই একমাত্র সেটা ঘটতে পারে—এটা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু কোন প্রতিরোধ আন্দোলন সেটা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব হলো বা হবে কি না, পৌছাবে কি না তা – কতটা মাত্রার দমন নির্যাতন সহ্য করা হয়েছে তা মেপে ঠিক হয় না; বলা ভাল নির্যাতনের মাত্রা আর বিপ্লব – এদুটোর আসলে কোন সম্পর্কই নাই, সম্পর্ক আছে মনে করে কোন মনবুঝ দেয়াটাও বেকুবি, নিজেকে ধোকা দেয়া। বাংলাদেশেও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা ১৯৯০ সালে নিজেদের সাথে এমন ধোকাবাজি করেছিল, দাবি করেছিল প্রেসক্লাবের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে তারা নাকি এক গণঅভ্যুত্থান করে ফেলেছিল। ইজিপ্টের আরব জাগরণের বিপ্লবীরা একই সমস্যায় পড়েছে। গত আঠারো মাস ধরে আন্দোলনে তাদেরও ধারণা হয়েছিল তারা বিপ্লবের স্বাদ পেয়েছে, নিচ্ছে। আজ (১৬-১৭ জুন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড মানে রান-অফ চলছে। দুমাস আগের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (সামরিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত এক ধরণের কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট) “অবৈধ” ঘোষণায় ভেঙ্গে দিয়েছে ঠিক এর দুদিন আগে ১৪ জুন। দিন দশেক আগে ঐ একই আদালত (প্রায় একই বিচারকেরা তবে কোর্টের নাম আলাদা) হোসেনী মুবারক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ছয়জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ৮০০ এর মত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগ থেকে “প্রমাণাভাবে” তাদের খালাস বলে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ এই ৮০০ জনকে কারা মেরেছে, কাদের হুকুমে পুলিশ গুলি ছুড়েছে তা আইনের চোখে আন-আইডেনটিফায়েড”, তাই বেকসুর খালাস। কিন্তু সাথে এক তামাশা আছে এখানে। ঐ ৮০০ জনকে হত্যা রাষ্ট্র কেন প্রটেক্ট করতে পারেনি এই অভিযোগে কেবল প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। এর আগে এতদিন ইজিপ্টের বিপ্লবী তরুণেরা খুশিতেই ছিল বিপ্লবের কিছু একটা হচ্ছে মনে করে। বিপ্লব প্রায় শেষ মনে করে, বিপ্লবের গাথা লিখাতেও তারা উদ্যোগী হয়ে গিয়েছিল। গান ছড়া, কার্টুন ডকুমেন্টারীতে সমাজ সয়লাব হচ্ছিল, যেমন হয়। কিন্তু এই রায়ের পরেই কেবল তারা প্রথম টের পাওয়া শুরু করে যে তারা প্রতারিত, ঠকেছে তারা। সবকিছু হাতছাড়া তাদের, আঙ্গুলের ফাঁক গলে সব বেরিয়ে গেছে। কবে কিভাবে বের হয়ে গেছে টেরও পায়নি। এতদিন খুশিতে আশা ভরশায় বুঁদ হয়ে মগ্ন থাকছিল আর ভেবে ছিল মোবারক আর তার সঙ্গী সাগরেদদের বিচার হচ্ছে, হবে। আসলে তরুণ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদেরই ঠকিয়েছে; কারণ বিপ্লব কি, কি করে বুঝা যায় বিপ্লব হচ্ছে কি না, হবে কি না সে সম্পর্কে তাদের ভাবনা কত নাদান সে খবর রাখতে চায়নি। প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের নির্যাতন কম হয় নাই, ৮০০-৯০০ এর মত বিপ্লবী মারা গেছে এই ১৮ মাসে, ফলে অনুমান করে নেয়া যায় নিহতের সাথে আহত পঙ্গু হয়ে যাবার সংখ্যাটাও অনুপাতে কত হতে পারে এবং যারা নির্যাতনে ট্রমাটাইজ মানসিক বিকলাঙ্গ সদমা নিয়ে আছেন হয়েছেন এই সংখ্যাটাও। ফলে পুরা সমাজে উথাল পাথাল করা ১৮ মাসের এই আন্দোলন সংগ্রাম মানে সামাজিকভাবে গণ-মনকে ঝাকুনি দেয়ার ঘটনা এটা। এতেও ঝাকুনি খায়নি বাইরে রয়ে গেছে  এমন লোকজন সমাজে খুব কমই অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি নির্যাতন হত-নিহত হওয়া আর সবার উপরে সামাজিক ঝড়ের প্রভাব আন্দোলিত হয়ে যাওয়া এর সব শর্তই এখানে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এত কিছুর পরও সবাই টের পাচ্ছে এটা বিপ্লব হয় নাই; বিপ্লবের দেখা নাই। আর তরুণেরা সেটা টের পাচ্ছে এখন। এখানে তরুণ বলতে সবাই, এককথায় সামরিক কাউন্সিল SCAF বাদে রাজনৈতিক কমিউনিটি, সমাজের সব অংশে সব দল মতের সব জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বুঝিয়েছি। বিপ্লব যে ঘটেনি এটা আমি এখানে বলছি বলে না, ইজিপ্টের সবার মুখে আর মনের অনুভবের কথা, কারও বুঝতে বাকি নাই। সারা রাজনৈতিক কমিউনিটি হতাশ শুধু নয়,  নতুন করে সমাগত নির্যাতন নিপীড়নের দিন আবার ফিরে আসছে এটা ভেবে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেটা সবার আগে ঘটে রাজনৈতিক পাড়ায় পরস্পরকে ব্যর্থতায় দোষারোপ করা, বিভক্তি বড় হওয়া, যা আগেও ছিল এখন তা আরও বড় হতেও শুরু করেছে।

তাহলে মূল কথাটা, ব্যাপারটা কি এই যে, বুঝব কি করে ঘটনা বিপ্লবের দিকে হাটছে নাকি উদারবাদী রাজনীতির দিকে যাচ্ছে—এটা কেবল ঘটনা ঘটার শেষে  কি দাড়ালো সেটা দেখার পরে জানতে পারা ছাড়া আগাম বুঝবার কোন উপায়  নাই যে বিপ্লব হচ্ছে কি না? বিপ্লব কী আগে বুঝার কোন উপায় আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু কি সেটা? লেনিন সাহেব বলেছিলেন, বিপ্লব করা নাকি একটা আর্ট। এবং অভুত্থান নাকি উপযুক্ত দিন তারিখের আগেও করা যায় না পরেও না। আরও এগিয়ে বলা কথাও আছে। পুরান রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ভেঙ্গে না পরে তাহলে বুঝতে হবে বিপ্লব হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক অনেক কথাবার্তা। তবু আমি সেদিকে যাব না, কোন চর্বিত চর্বন বা আপ্তকথা আউড়াব না, সেসব আশ্রয় করে আমার কথা সাজাব না। কিছু খাস কথা খাসভাবে বলার চেষ্টা করব।

 

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

গৌতম দাস || Sunday 01 July 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tF

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা দ্বিতীয় পর্ব।]

 

আগের পর্বে বলেছিলাম, গণ-আন্দোলনের চাপে মোবারকের সরে যাওয়ার পর ট্রানজিশনাল বা অন্তর্বতীকালিন সরকার কে হচ্ছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বতীকালিন সরকার হিসাবে যা তৈরি হবে তা গঠন করার সময় ও পরে এর উপর রাস্তার আন্দোলনের যদি একক কোন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বই না থাকে তবে বুঝতে হবে গণ-আন্দোলন একটা গর্ভস্রাবে পরিণত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বতীকালিন সরকারে কে থাকবে, কারা সদস্য হবে তা নিয়ে গণ-আন্দোলনের কাউকেই প্রকাশ্যে বা ড্রয়িং রুমে ডেকেও মতামত চাওয়া হয় নাই। অন্তর্বতীকালিন সরকার কিভাবে হচ্ছে সেই পুরা ব্যাপারটাই ঘটেছে, বলা ভাল ঘটতে সক্ষম হয়েছে মোবারক ও সামরিক কাউন্সিলের কর্তৃত্বে, নিয়ন্ত্রণে। মাঠের আন্দোলনের নেতাদেরকে গোনায়ও ধরা হয় নাই। আর একভাবে বলা যায় তাদেরকে গণায় ধরতে বাধ্য করা যায় মাঠের আন্দোলন নিজেকে সে তীব্রতায় এবং উচ্চতায় নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে সামরিক কাউন্সিলের পক্ষে কেবল মোবারককে সরিয়ে দিয়ে পুরা ক্ষমতা ও ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলো (সামরিক কাউন্সিল SCAF আর এর দুই সহযোগী—আদালত কেন্দ্রিক সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আর এরই বর্ধিত রূপ সুপ্রীম ইলেকশান কাউন্সিল) ঠিক যেমন ছিল সেভাবে অটুট রেখে নতুন করে পুরানা ক্ষমতাটাই আবার সাজিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছিল। পুরান ক্ষমতা অথবা এর নব উত্থানকে দমন করে এর উপর গণ-আন্দোলন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিবে এমন কোন কাজ, ইচ্ছা, আলামত কিছুই ঘটতে দেখা যায় নাই। কেবল মোবারকের সরে যাওয়া—এই দাবি আদায়ের খুশিতে জনগণকে মাতোয়ারা রাখার কাজেই গণ-আন্দোলনের শক্তিকে সীমিত রাখা হয়েছিল। গণ-আন্দোলন কেবল একটাই প্রতীকী কাজ করেছিল—মোবারকের রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সদর দপ্তর জ্বালিয়ে দেয়া। জনগণের এই ক্ষোভের প্রতিকী অর্থ হলো, কেবল একটা শত্রুকে চিনানো তা হলো, মোবারকের ছেলে গামালকে কেন্দ্র করে মোবারকের বউয়ের যে খায়েস, যে ছোট ছেলেকে প্রেসিডেন্ট বানাবে, সেই ইচ্ছার সম্ভাবনা চিরতরে নাকচ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই ইচ্ছা কেবল গণ-আন্দোলনের নয় এটা সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ইচ্ছা ও স্বার্থ ছিল। ফলে সহজেই ঘটানো গিয়েছিল। ফলাফলে পুলিশ বাহিনী প্রত্যাহার করে ট্যাঙ্কে চড়ে সামরিক বাহিনী শহরের দখল নিয়েছিল। আর রাস্তার জনগণ তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। এর অর্থ হলো গণ-আন্দোলনের কাঁধে সওয়ার হয়ে সামরিক কাউন্সিল SCAF নিজের খায়েস পূরণ করে নেয়া । এই অর্থে তথাকথিত বিপ্লবে সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ভাগীদারী প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পেরেছিল

ক্ষমতা হস্তান্তরের আইনী বা লিগ্যাল দিক বিবেচনা করলে, মোবারকের কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের অপারগতায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা ভাইস-প্রেসিডেন্টের হাতে, তিনিই একটিং প্রেসিডেন্ট হবেন এবং মোবারকের মতই তার সব ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। কিন্তু মোবারক কোনভাবেই কোন সামরিক কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা দিয়ে যেতে পারেন না। কনষ্টিটিশন তাকে সে ক্ষমতা ও এক্তিয়ার দেয় নাই। এটা হলো পুরানা কনষ্টিটিউশনের দিক থেকে ক্ষমতাকে বুঝা ও বিচারের মানদণ্ড, বলবৎ আইনী সীমার মধ্যে থাকছে কিনা তা বুঝার কষ্টিপাথর। কিন্তু কোন গণ-আন্দোলনের বিপ্লব হিসাবে নতুন স্তরে (গণ-আন্দোলন উদারবাদী সীমায় থাকবে না বিপ্লবী র্যা ডিক্যাল হবে তাঁর প্রথম পরীক্ষা এটা ) আবির্ভাবের ন্যূনতম শর্ত হলো, নিজেই নিজেকে নতুন ক্ষমতা হিসাবে হাজির করা, কোন পুরান কনষ্টিটিউশন থেকে তাঁর ক্ষমতা উৎসারিত হচ্ছে এমন কোন ধারণা তৈরি হতে দেয়া বা ভুলে তা মেনে নেওয়া মানেই গণ-আন্দোলনের বিপ্লবী সম্ভাবনার ইতি টেনে দেয়া। ক্ষমতা থেকে বা আয়ত্বে থাকলে কনষ্টিটিশনের জন্ম দেয়া যায় কিন্তু কোন তৈরি কনষ্টিটিশন থেকে ক্ষমতা ডিরাইভ করা যায় না, উৎস মনে করে ভুল করা যায় না, পাওয়া যায় না। ক্ষমতা বিষয়ক এই মৌলিক ধারণা হাতের কড়ায় গুনে সবসময় নিজের কাছে পরিস্কার রাখতে হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি, মোবারক জেনারেল সোলায়মানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা দিলেন বটে কিন্তু সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স বা SCAF বলে কিছু একটা খাড়া হয়ে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের সব ক্ষমতা নিয়ে জেঁকে বসে গেল। গণ-আন্দোলন নিজেই নিজেকে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বলে দাবি করার বদলে হয়ে গেল SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিয়ে নেয়া; আবার এটা অবশ্যই এক নতুন ক্ষমতা কারণ কার্যত সে আর পুরানা কনষ্টিটিউশন মেনে নিজেকে তৈরি করে নাই, নিজেই নিজেকে ক্ষমতা বলে দাবি করেছে। এটাই হলো তামাশার দিক। গণ-আন্দোলনের সম্ভাব্য ক্ষমতাটা ছিনতাই হয়ে যাওয়া। SCAF যে ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা দখলে নিল এটা তাঁর নিজের তৈরি না, ছিনতাই করে নেয়া ক্ষমতা, এটা SCAF-এর অজানা নয়। এর প্রমাণ হলো, টিভিতে ক্যামেরার সামনে মানে দেশবাসীর সামনে জেনারেল সোলায়মান একেবারে সামরিক কায়দায় তাহরির স্কয়ারকে বিশাল এক স্যালুট ঠুকে বিপ্লব বিপ্লব বলে চিৎকার শুরু করে দিতে দেখলাম আমরা। কারণ তারা বুঝে তাহরির স্কয়ারের কারণেই SCAF নামে তারা ক্ষমতায়। তারাই তাহরির স্কয়ারের (চোরাই করে আনা) ক্ষমতা। এটা SCAF-এর পক্ষে ক্ষমতা ছিনতাই করে আনার এক বিপ্লবই বটে। SCAF-এর ক্ষমতার ভিত্তি কোন পুরানা কনষ্টিটিউশন না, চুরি করে আনা ক্ষমতাটাই তাঁর ভিত্তি। আর নতুন ক্ষমতা তো কনষ্টিটিউশন থেকে আসে না, আসার কথাও না।

আমার এই লেখা পড়ে যারা ব্রাদারহুডের রাজনীতি ভালবাসেন তারা ফ্যাকচুয়াল যুক্তি তুলতে পারেন যে ব্রাদারহুড তো আন্দোলনের শুরু থেকে শামিল ছিল না। তারা বড়জোর বাইরে থেকে ধাত্রির ভূমিকায় ছিল যেন গন-আন্দোলনটা (বিপ্লব?) প্রসব করে, তারা আন্দোলনের আহতদের মেডিক্যাল সেবা বা খাবারদাবার সরবরাহের ভূমিকা নিয়েছিল, মোবারকের এনডিপি সদর দপ্তরে আগুন দিয়ে এটাকে গণক্ষোভের প্রতীকে প্রতিষ্ঠার কাজটা করেছিল, ঘোড়া উটে বা উটের গাড়ি চড়ে এনডিপি-সামরিক মদদে গুন্ডারা তাহরির স্কয়ারের জমায়েতের উপর দিয়ে বিপ্লব মাড়িয়ে দাবড়ানোর যে গুন্ডামী করতে এসেছিল তা প্রতিরোধের সময় ব্রাদারহুড নির্ধারক ভূমিকায় প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করেছিল। এছাড়া আর একটা যুক্তি তাদের হতে পারে, যে মোবারকের পতনের পর নির্বাচন দেবার ব্যাপারে ব্রাদারহুডের বাইরে আন্দোলনে যে সব রাজনৈতিক ধারা আছে [সেকুলার কমিউনিষ্ট ও আমেরিকার ফ্রিডম হাউস জাতীয় এনজিও এর উৎসাহ প্রভাবের লিবার্টির শ্লোগান দেয়া তরুণেরা, যেমন সিক্সথ এপ্রিল গ্রুপ ইত্যাদি; এছাড়া সাধারণ জনগণ] তাদের চাপেই SCAF ট্রানজিশনাল ক্ষমতা তৈরি করে জেঁকে বসার পরপরই নির্বাচন দাবি করা যায় নাই। তাদের ধারণা ছিল যত দ্রুত নির্বাচন হবে ততই ব্রাদারহুডের (আগে থেকেই সংগঠিত সংগঠন হয়ে থেকেছে বলে) জিতে আসার সম্ভবনা।

এই যুক্তির অসার দিকটা হলো, এটা ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা কে কিভাবে তৈরি করছে এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা নজর করতে অক্ষম, এটা কোন বিষয়ই না এদের কাছে; বিষয় হলো মোবারকের সরে যাওয়া মানে একটা নির্বাচন আর নির্বাচন হলেই সেটা মোবারক বা SCAF-এর বিরুদ্ধে ও বাইরে একটা ক্ষমতা তৈরি করবে। এটাই ব্রাদারহুড এর দৃষ্টিতে ক্ষমতা পাবার ধারণা, ক্ষমতা ধারণা। ফলে ট্রানজিশনাল সময়ে ক্ষমতাটা কে নিচ্ছে কার হাতে যাচ্ছে তাতে কিছুই যায় আসে না। ক্ষমতা ধারণার কোন ন্যূনতম বুঝ না থাকার জন্য নির্বাচনে দেরি করিয়ে দেওয়াটাকে ক্ষমতা না পাওয়া, ক্ষমতা পেতে দেরি হওয়ার কারণ বলে মনে করছে।

উপরে আমি বারবার জোর দিয়েছি কেন ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, তার উপর। কারণ এই নতুন ক্ষমতাটাই ঘটনা পরবর্তী সমস্ত ঘটনার গতি, অভিমুখ ঠিক করে দিবে। এটা স্রেফ এক নতুন ক্ষমতা নয়, এটা আসলে সব ঘটনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ইজিপ্টে আজ পর্যন্ত এটা তাই ঘটিয়েছে। SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হওয়াটাই আজ পর্যন্ত সব ঘটনা আর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। এমনকি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কেউ হয়ে আসলেও সে ক্ষমতা নাও পেতে পারে, নির্বাচিত পার্লামেন্ট হলেও সে পার্লামেন্ট এক ঘোষণা দিয়ে তুড়ি মেরে অবৈধ বাতিল বলে দিতে পারে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কি হবে তা সে ঠিক করে দিতে পারে, প্রেসিডেন্ট নিজে সরকার গঠন—মন্ত্রীসভা গঠন করার আগেই SCAF নিজেকে নিজেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলে ঘোষণা দিতে পারে ইত্যাদি। এককথায় প্রেসিডেন্ট বা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতার যে প্রাতিষ্ঠানিকতা তৈরি হবে সেটা SCAF ক্ষমতার অধীনস্ততা মেনেই ডিকটেশনে কেবল একটা সীমিত ক্ষমতা চর্চা করতে পারবে।

কথাগুলো সোজা-সিদা করে বললে, ক্ষমতা কি জিনিষ, এর কোন ধারণার বালাই এদের নাই। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টাকেই বুঝতে পারেনি। আর তৃতীয়ত, ধরে নিয়েছে নির্বাচনের মাধম্যে ক্ষমতা পাওয়া যায়।

নির্বাচন ক্ষমতা তৈরি করে না। বরং নির্বাচনেরও আগে নির্বাচন আহবান করার মুরোদ—এটাই ক্ষমতা; [আলোচ্য ক্ষেত্রে SCAF যেটা আগেই হাসিল করে নিয়েছে।] গণ-অভ্যুত্থান বিপ্লবী এই ক্ষমতার উৎস, সেটাই ট্রানজিশনাল বা সাময়িক ক্ষমতা। সাময়িক কেন? এরপর নির্বাচন ইত্যাদিতে যেটা তৈরি হয় সেটা হলো এই ক্ষমতা কি করে বাস্তবে পরবর্তীকালে ব্যবহার করা হবে, বাইরের কেউ নয় বিপ্লবের ভিতরকার কেউঁ প্রতিনিধি হয়ে কেবল ঐ ক্ষমতা সবার পক্ষ থেকে প্রয়োগ করবে এরই নিয়ম, আইন কানুন ইত্যাদির জন্য প্রতিনিধি কে হবে তারই নির্বাচন। নির্বাচন নিজে ক্ষমতার উৎস নয়, ক্ষমতা সে জন্ম দিতে পারে না। ক্ষমতা থাকলে, অর্জিত হলে, নিয়ন্ত্রণে আসলে তবে নির্বাচন আয়োজন বা আহবান করা যায়। অর্জিত ক্ষমতা কি করে ব্যবহার প্রয়োগ করা হবে এরই নির্বাচন। ক্ষমতা এক্সারসাইজের পথে [প্রতিনিধি] নির্বাচন এক উপায় মাত্র, নির্বাচন নিজে ক্ষমতা নয়।

এই লেখা শুরু করেছিলাম এই প্রশ্ন রেখে যে কি করে বুঝা যাবে ঘটমান বিপ্লবের অভিমুখ ঠিক আছে কিনা? গণ-আন্দোলন যদি নিজেই ঐ দেশ বা রাষ্ট্রের প্রচলিত সব ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেকে একমাত্র প্রাধান্য বিস্তারি ক্ষমতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, পুরানা সব ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানকে সবাইকে অধীনস্ত হতে বাধ্য করতে পারে তবে বুঝতে হবে অন্তত অভিমুখ ঠিক আছে। কিন্তু আর এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আছে, কাঠামোর দিক থেকে পুরানা ক্ষমতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে কারণে দাড়িয়েছিল, ফাংশনাল থাকতে পেরেছিল [ সামরিক, আদালত, সংসদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে] সেগুলো ভেঙ্গে দিতে হবে। এই ভেঙ্গে দেয়া মানে ব্যক্তিগতভাবে তাদের হত্যা করা একেবারেই নয়। প্রথম কথা, আগের মত করে নির্বাহী রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে আর ফাংশনাল থাকা নয়, তাঁরা তখন থেকে নতুন মাঠের ক্ষমতা [তাহরির স্কয়ার] কাছে আনুগত্য প্রকাশ করবে এবং সীমিতভাবে সাময়িক কাজ চালিয়ে যাবার মত ফাংশনাল থাকবে কিন্তু মাঠের নতুন ক্ষমতার ইচ্ছা সাপেক্ষে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পুরান ক্ষমতার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান পুরানা কনষ্টিটিউশন ভেঙ্গে দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে দিতে হবে। এতে মাঠের নতুন ক্ষমতা যেটাকে বলছি এটাই ট্রানজিশনাল ক্ষমতা। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিজে ঘোষণায় কনষ্টিটিউশন সহ পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠাঙ্গুলোকে নিজের আনুগত্যে নিতে পারতে হবে। তবেই জেনারেল সোলায়মান বা SCAF এর স্যলুট ঠুকে দেওয়াটা মিনিংফুল হবে। কিন্তু ইজিপ্টের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে মাঠের ক্ষমতা হাইজাক করে SCAF নামে নিজেই নিজে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েম করে ফেলেছে। ফলে স্যালুট নিজেই নিজেকে করেছে, ওর সাথে জনগণের কোন সম্পর্কই আর নাই।

মোরসির প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবার সময়ে প্রধান বিচারপতি শপথ পড়ানোর আগের উদ্বোধনী বক্তৃতায় একটা মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, “এই অনুষ্ঠিতব্য শপথের পর থেকে ইজিপ্ট এক দ্বিতীয় রিপাবলিক হিসাবে জন্ম নিতে যাচ্ছে”। রাষ্ট্রতত্ত্বের দিক থেকে এটা একটা খুবই সঠিক উচ্চারণ। তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন একই ইজিপ্ট দেশ, নতুন করে এক রাষ্ট্রে [আগের একই দেশ কিন্তু একই রাষ্ট্র নয়] নিজেকে কনষ্টিটিউট করতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের রি-কনষ্টিটিউশন মানে জনগণের নিজের নতুন শপথ নতুন করে রি-কনষ্টিটিউশন পুনর্গঠন এবং নাগরিক-জনগণের এই পুনর্গঠিত হওয়া মানে রাষ্ট্রে পুনর্গঠিত হওয়া – একই কথা। এই হলো মোরসির শপথ কথার তাৎপর্য। কিন্তু এত তাত্ত্বিক তাৎপর্য থাকা এবং এর প্রকাশ্য উচ্চারণ সত্ত্বেও এটা একটা তামাশার বেশি কিছু নয়। কারণ, ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট যারা শপথ পড়াতে এসেছেন তারা কারা? মোরসি যদি নতুন রিপাবলিকের ক্ষমতা হয়ে থাকেন, নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হয়ে থাকেন, তাহরিরের মাঠের ক্ষমতার প্রতিনিধি হয়ে থাকেন তবে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের আনুগত্য সেই মাঠের ক্ষমতা, জনগণের ক্ষমতার কাছে নেই কেন? কেন তাঁর আনুগত্যের উৎস SCAF? SCAF-এর ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে তিনি তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টে হয়ে হাজির আছেন, শপথ পড়াতে এসেছেন। তাদের তাহরির মাঠের ক্ষমতার প্রতি কোন আনুগত্য নাই। ফলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথা উচ্চারণের আগে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট প্রধান বিচারকের নিজের আনুগত্য কোথায় সেই প্রশ্ন নিজেকে নিজে করতে হত। SCAF-এর আনুগত্য মেনে কোন বিচারক সেকেন্ড রিপাবলিক বলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথায় নিজের জনগণের সাথে ঐতিহাসিক গাদ্দারি ঢাকা দিতে পারবেন না। তাই এই তামাশার নাটক আমরা ওখানে মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। এই পর্যায়ে এসে মোরসি বেচারা আসলে, ঘ্যাতঘোত করতে পারেন কিন্তু এর বাইরে কিছুই করার আর অবশিষ্ট তিনি নিজেই রাখেননি। কারণ তিনি আগেই জনগণের ক্ষমতা, ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAF-এর হাতে তুলে দিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন। তিনি একমাত্র SCAF অনুগ্রহেই প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, এটা বহু আগেই মেনে নেয়া হয়ে আছে।

সে কথা থেকে শুরু করেছিলাম, ব্রাদারহুডের যুক্তি যে SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পর বাম সেকুলারদের কারণে নির্বাচনটা তাড়াতাড়ি হতে পারে নাই, ফলে আজ মোরসির এই দুর্গতির কারণ সেটা। উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম সমস্যাটা নির্বাচন কত আগে ডাকা হবে তাতে কিছুই আসে যায় না, এমনকি SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পরেরদিন কোন নির্বাচন হলেও ওর পরিণতি আজকের মতই হত, বাস্তবতা থেকে আমাদের কারোই পালানোর কোন পথ নাই। মূল ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAFকে দিয়ে দেয়া বা মেনে নেবার পর পরবর্তী সব অভিমুখ গতিপথ নির্ধারিত হয়ে গেছে ওখানেই। সারকথায় নির্বাচন কবে এটা বিষয়ই নয়, বিষয় হলো ক্ষমতা, ক্ষমতা কি তা আঙুলে গুণে বুঝা, মনে রাখা—এই কাজে অযোগ্যতা ব্যর্থতা। যেটা ব্রাদারহুড শুধু নয় ওর বাইরের সব রাজনৈতিক শক্তিরও অযোগ্যতা, ব্যর্থতা।

আমি বহু লেখায় এই দিকটা নিয়ে কথা তুলেছি যে ইসলামি রাজনীতি যেটা জাগছে এদের রাষ্ট্র ধারণা ও ক্ষমতা ধারণা নিয়ে চিন্তা ভাবনা হোম-ওয়ার্ক একেবারেই অপরিণত। সবটাই ষ্টেজে দেখা যাবে, উপস্থিত সময় কিছু একটা করে ফেলা যাবে ধরনের। আবার অনেকের ধারণা রাষ্ট্র ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে। ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাধারণভাবে ইসলামি রাজনীতি বড় জোর একটা খেলাফত রাষ্ট্র করব [যেটা আসলে বৃটিশ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের মত কলোনী মাষ্টারীর সাথে বেশি খাপ খায় ধরনের অটোমান সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের এক ভাসাভাসা ধারণার বাইরে গিয়ে কিছু বুঝায় কিনা সেটা স্পষ্ট করতে পারে না] ধরনের এক স্বপ্ন কাজ করে। এমনকি ঐ যুগে সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র জন্ম ও টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত ছিল অন্য অনেক দেশকে ঐ সাম্রাজ্যের অধীনে কলোনী হয়ে থাকতে হবে। অর্থাৎ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র নিজেই নিজ ক্ষমতায়, নিজ জনগণের এবং নিজ রাষ্ট্র সীমানার কোন রাষ্ট্র না। অন্য দেশ দখল ও তাদেরকে কলোনী বানিয়ে রাখা সাপেক্ষে একটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র এ যুগে আবার বাস্তবে কায়েম সম্ভব। তাঁর মানে কি ইসলামের নামে মুসলমান জনগোষ্ঠির দেশগুলো ইসলামি রাজনীতিতে কোন একটা রাষ্ট্রের সবাই কলোনী হয়ে যাবে? খুব জোরালো না হলেও এক খলিফার নেতৃত্বে [ইসলামি রাজনীতিতে এটাকে গাইডেন্স বলা হয়] খেলাফত কায়েমের ভাসাভাসা স্বপ্নটা এরকম বলেই আমার ধারণা হয়েছে। এসব দেখে পঞ্চাশের দশকে কমিউনিজমের শ্লোগানের আড়ালে দলে দলে সদ্য কলোনীমুক্ত দেশগুলোর সোভিয়েত ব্লকের সদস্য হয়ে যাওয়া আমরা দেখেছি সেই মিলের দিকটা মনে পড়ে যায়। আজ ইসলামি রাজনীতিতে যে সঙ্কট, রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তায় সঙ্কট সেই একই ঘাটতি কাজ করেছিল সদ্য কলোনীমুক্ত কমিউনিষ্ট প্রীতির ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির দেশগুলোতে। রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তার হোম-ওয়ার্ক কেউ করতে চায়নি। প্রায় সবাই যেটা মনে করেছিল, রাষ্ট্রভাবনা? সেটা আবার কি? এসব বুর্জোয়াদের গরীবদের দমিয়ে রাখার চাতুরি ব্যাপার স্যাপার। [তুলনায় ইসলামি রাজনীতিতে একই কথা তবে ভিন্ন ভাষায়, “রাষ্ট্র বা ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে; ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়” ধরনের।] কমিউনিষ্টরা ভেবেছিল, “পুজিবাদ বা ধনিক শ্রেণী” কে মুছে ফেলতে পারলেই মোক্ষ লাভ হবে। আর এর পরিণতি হয়েছিল এক খোদ সোভিয়েত রাষ্ট্রকে সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা দিয়ে টিকিয়ে রাখার কাজে ওর নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ অনুযায়ী ব্লকের বাকি সব রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে, পিছনে ফেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসাবে নিজেকে নামিয়ে নেয়া। পরবর্তীতে ষাটের দশকে নয়া-চীন এটাতে বিদ্রোহ করে বসল, অভিযোগ তুলল এটা সোভিয়েত রাষ্ট্রের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” হয়ে যাওয়া। কিন্তু মজার কথা হলো, আবার সে নিজেই চীনা বলয়ের এক ব্লক তৈরি করে নিজের ব্রান্ডের কমিউনিজমের নামে একই চীনা রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষার ভূমিকায় নেমে পড়েছিল । এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ, ১৯৭১ এর বাংলাদেশের নিজ স্বার্থ এভাবেই স্থানীয় চীনা কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোর হাতে চীনা রাষ্ট্রের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে বলি হয়ে গিয়েছিল।

আমার সার কথা হলো, রাষ্ট্র ধারণা – কি রাষ্ট্র আমরা চাচ্ছি গ্লোবাল পরিস্থিতিতে সে ধারণার মানে কি দাঁড়ায় সেসব নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা হোমওয়ার্ক তত্ত্বীয় প্রস্তুতির কাজটা আমরা কেউ এড়াতে পারব না। এটা ষ্টেজে মেরে দেবার বিষয় না। ফলে ইসলামি রাজনীতিও কি একই “কমিউনিষ্ট” অভিজ্ঞতা ও পরিণতি নিতে যাচ্ছে? ইজিপ্টের পরিস্থিতি পরিণতি দেখে, ব্রাদারহুডের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বুঝবার অপরিণত রাজনীতি দেখে এই আশঙ্কা আমি দেখি। এমনিতেই ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে এক অমীমাংসিত বিতর্ক আছে যে, কোন মুসলমান রাষ্ট্রের [রুলার বা শাসক অর্থে] আনুগত্য করতে পারে কি না? সংক্ষেপে একে “আনুগত্য বিতর্ক” নামে ডাকতে পারি। এটুকু বুঝি, যুগের পর যুগ ব্যাপারটাকে অমীমাংসিত করে ফেলে রাখতে পারি না। এটা আত্মঘাতি। তাই তর্ক-বিতর্ক উস্কে দেবার জন্য আমি মোরসির একটা বক্তৃতা যেটা গত শুক্রবার তাঁর শপথ নেবার আগের দিন তাহরির স্কয়ারের জমায়েতে তিনি দিয়েছিলেন সেটা সামনে আনতে চাই। এই বক্তৃতার গুরুত্ব অনুভব করে ফেসবুকে আমি এর ভিডিও লিঙ্ক দিয়েছি। যাতে বডি ল্যাঙ্গুয়েজসহ তা বুঝা যায়। আগ্রহীরা তা দেখতে পারেন। ওর সারকথা হলো,

In the context before sworn in as Egypt’s president Mohamed Morsi : “I am here because of you. No institution, no Authority none can be above this will, the will of you, your will. You are the source of power. The nation is the source of power. The nation is the one to decide, the nation is the one to give unity, nation is the one to give appoint and hire and the nation is the one to fire…….” – Historical speach in Tahrir square.

এই বক্তৃতায় মোরসি প্রতীকীভাবে তাহিরর স্কয়ার ও ঐ মাঠের জনগণকে তাঁর ক্ষমতার উৎস বলে সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি জনগণের ক্ষমতার প্রেসিডেন্ট। জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক তিনি। ফলে যে রাষ্ট্রের তিনি প্রেসিডেন্ট সেই রাষ্ট্র জনগণের নিজেরই ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা। ফলে “রাষ্ট্র মানে আনুগত্য” এই আনুগত্য কথার এক বিশেষ অর্থ তিনি দাড় করিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই। ব্যাপারটা হয়ে গেছে নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপের প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ। যেটা মুসলমান পরিচয়ে বা ইসলামের চোখে অসঙ্গতির নয় এমন একটা মানে করা যায়। ফলে আনুগত্য বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান মোরসি নিজে এবং তাঁর মুসলমান জনগণের সম্পর্ক আর এর ভিতর দিয়ে নিজেকে, নিজের ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করার উপায় বের করতে হয়েছে তাঁকে; বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান, পথের ইঙ্গিত এখানে এসেছে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা কি মোরসির কৌশলী কথা, নাকি ক্ষমতা রাষ্ট্র আনুগত্য প্রসঙ্গে তাঁর নীতিগত অবস্থান? আবার এই অবস্থান কি কেবল তাঁর নিজের? ব্যক্তিগত ও প্রেসিডেন্ট হিসাবে, বিশেষ পরিস্থিতি SCAF-এর অধীনের প্রেসিডেন্ট তিনি তাই? এর সাথে পার্টি ব্রাদারহুড এই অবস্থান নিজেরও বলে স্বীকার করে কি না? এসব বহু প্রশ্নের জবাব কি তা আমরা এখনও জানি না।

রাষ্ট্র ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে ইসলামি রাজনীতির সঙ্কট নিয়ে মূল কথা আপাতত এতটুকুই। তবে একটা সহযোগী প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হলো, ব্রাদারহুডের SCAF-এর হাতে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া ও মেনে নেওয়া – এই ব্যাপারটা কি শ্রেফ রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা না বুঝা হোমওয়ার্ক না করার থেকে জন্ম নেয়া? আমার জবাব হবে, না; অন্য আরও বড় কারণ আছে। সেদিকটা এখানে এখনও আনিনি। সেটা গ্লোবাল দিক বা ফ্যাক্টর। সেটা আমরা খুজে পাব, আমেরিকান চলতি ষ্ট্রাটেজিক ও বৈদেশিক নীতি, ইসলাম ইস্যুটাকে নিজের নিরাপত্তার ইস্যু হিসাবে মনে করা (আগের বুশের আমল থেকে চলে আসা ওয়ার অন টেররের সেকুলারিজমের আড়ালে দুনিয়াকে নিজের পক্ষে নিয়ে নিজ রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় করে নেবার লাইন – যেটা ছিল এর বিপরীত লাইন) সেই সুত্রে RAND এর ইসলামি প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম প্রসঙ্গের ভিতরে। এনিয়ে আলাপ করতে করতে পরের পর্ব শুরু করার ইচ্ছা রাখি।

 

গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে আসে কবে থেকে

গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে আসে কবে থেকে

গৌতম দাস

  আগস্ট ৩১, ২০১৮, 00:0২

https://wp.me/p1sCvy-2tv

 

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মূল তাত্পর্য কী?  এই প্রশ্নের জবাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষজনের মধ্যে এক অদ্ভুত মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। এই যুদ্ধে হিটলার-মুসোলিনির ‘অ্যাক্সিস পাওয়ার’ বা ‘অক্ষশক্তির’ কথা সবাই ঠিক ঠিকই জানে। কিন্তু এই শক্তির বিপরীতে কথিত মিত্রবাহিনীতে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রধান ভূমিকায় কে ছিল— আমেরিকা না ব্রিটেন? এ প্রসঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশীয় ধারণা হলো, এটা ব্রিটেন। অথবা একই কথা আরেক প্রশ্ন করে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকা কী? মানে কেমন ছিল? সেটা কি গুরুত্বের দিক থেকে ব্রিটেনের ভূমিকার চেয়ে খাটো বা নিচে? এরও একই জবাব হবে — আমেরিকান ভুমিকা ছিল ব্রিটেনের চেয়ে নিচে। এছাড়া এ কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিলের নেতৃত্ব ও নানা গুণের কথা তুলে প্রশংসাও শুরু করবে।

কিন্তু এগুলো একেবারেই ডাহা অসত্য তথ্য। ফ্যাক্টস হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেউ যদি নিজেদের পরিকল্পনামাফিক গ্লোবাল মেরুকরণ (অক্ষশক্তি বনাম মিত্র) করে একে পরিণতি ও পরিসমাপ্তির দিকে নিয়ে গিয়ে সফল হয়ে থাকে, তবে সেটা আমেরিকা ও এর সে সময়ের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট করেছেন। এর সমস্ত ক্রেডিট তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের। আসলে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে কলোনি প্রভু ব্রিটিশদের বাইরে “পশ্চিম” বলতে আর কেউ আছে বলে আমরা সে সময়ে খুব কমই জানতাম। আর কাউকে আমরা চিনতামই না। বৃটেন মানে যদি বড়জোড় ইউরোপের ধরি তবে এর বাইরে আমেরিকা কী, কোথায়, কী তার বৈশিষ্ট, কেমন রাষ্ট্র সেটা ইত্যাদি এত সব নিয়ে আমাদের শিক্ষিতজনদেরও কোন আগ্রহ ছিল না।

শিরোনাম যেভাবে দেয়া হয়েছে, তাতে যা বলতে চেয়েছি, এক. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে “গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা” বলে কোন কিছুর অস্তিস্ত ছিল না বললেই চলে। অন্য ভাষায় গ্লোবাল অর্থনীতিতে “গ্লোবাল পণ্য  বিনিময় ব্যবস্থা” বলতে কিছু ছিল না বললেই চলে।  দুই. গ্লোবাল মুদ্রা ব্যবস্থা ছাড়া গ্লোবাল পণ্য বিনিময় অসম্ভব। সেকালে কোন গ্লোবাল বা বহুরাষ্ট্রীয় পরিচালিত আইএমএফ এর মত কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না, ফলে গ্লোবাল কোন মুদ্রা ব্যবস্থা ছিল না। ফলে স্বভাবতই বাস্তবে একটা “গ্লোবাল পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা” অসম্ভব ছিল। তিন. পণ্য বিনিময়ও ছিল খুবই সীমিত এবং তা কেবল কলোনি প্রভু (যেমন বৃটেন) দেশের সাথে তার কলোনি দেশের (বৃটিশ-ইণ্ডিয়া) মধ্যে। তাও সেটা মূলত একপক্ষীয় কেবল কলোনি দেশ থেকে প্রভুর দেশে লুটের আয় যাওয়া।   ফলে আইএমএফের মাধ্যমে (ভাল অথবা খারাপ তা যেটাই হোক) – প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে আসে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম হয় অর্থাৎ একট গ্লোবাল পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা বিকশিত ও তা বাস্তবায়িত হয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মানে কলোনি যুগে, ফাংশনাল যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল এর উপর কোন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই ছিল না। রাষ্ট্রীয় মালিকানার কোন ব্যংকের ধারণাই ছিল না। ফলে সেন্ট্রাল ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন) বলে কোন ধারণাও ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাত্পর্য এক: কলোনি যুগের অবসান
কলোনিয়ালিজম বা উপনিবেশবাদের ছুটির ঘণ্টা বাজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে। এই বিচারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত সময়কালকে কলোনি যুগ বলা যায়। আর ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি পর থেকে উপনিবেশ-উত্তর স্বাধীন রাষ্ট্রের যুগ শুরু হয়েছিল। ফ্যাক্টস দেখে অনেকে তর্ক তুলতে চেষ্টা করতে পারেন, এশিয়ায় কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদ্বয় – তা হতে শুরু হওয়া  মোটাদাগে পঞ্চাশের দশকে ঘটনা ফেনোমেনা। যদিও ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া সম্ভবত এমন অভ্যুদ্বয়ে সব শেষের দিকের ঘটনা। ওদিকে আফ্রিকায় একইভাবে বেশির ভাগ কলোনি-রাষ্ট্র স্বাধীন হয় ষাটের দশকের শেষের দিকে, অল্প কিছু সত্তরের দশকে আর সর্বশেষ সম্ভবত দক্ষিণ আফ্রিকা, ১৯৯৪ সালে। লাতিন আমেরিকা এরকমই ষাট-সত্তরের দশকের মধ্যে বেশির ভাগ স্বাধীন হয়েছিল। তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত উপনিবেশ যুগ আর পরে সমাপ্তিতে মুক্ত স্বাধীন যুগ— এমন এক ‘বিভক্তি লাইন’ টানা যায়। কিন্তু ঠিক কীসের ভিত্তিতে এই লাইন টানা হবে, সে ভিত্তি কী?

আসলে সুনির্দিষ্ট করে বললে বিভক্তি লাইন নয় বরং আরও স্পষ্ট করে বিভক্তির দিনক্ষণই বলে দেয়া যায়। মানে কলোনি শাসন সমাপ্তি টানার ঘণ্টা বাজার দিনটা হবে ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্ট। কেন?

কারণ ওইদিন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে “আটলান্টিক চার্টার” নামে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। আর আট দফা এ চুক্তিতে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, তারা উভয়ই মানুষের নিজ ভূমিতে বসবাস করা এবং সেই ভূমিতে কী ধরনের শাসনের অধীনে কারা তার শাসক হবে তা নিজেই বেছে নেবে— এ অধিকারকে সম্মান করে। এছাড়া তারা উভয়ে যেকোন ভুখন্ডের জনগোষ্ঠি মানুষের নিজ দেশে সার্বভৌমত্বের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রিত সরকার পুনরুদ্ধার করা গেছে এটাই দেখতে চায়, যা থেকে ওসব জনগোষ্ঠিকে বলপ্রয়োগে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে বলে তাঁরা উভয়ে মনে করে।

অর্থাৎ চার্চিল এই চুক্তিতে রুজভেল্টের চাপের মুখে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে অবিভক্ত ভারতবাসীকে নিজ ভূমির ওপর শাসনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তাহলে তো চার্চিলের আর নিজের উপনিবেশগিরি থাকে না। এটা জানা সত্ত্বেও কলোনি শাসন ত্যাগের এ নীতিগত অবস্থানপত্রের আট দফায় চার্চিল স্বাক্ষর করেছিলেন। মানে নীতিগতভাবে কলোনি শাসন আর বজায় রাখবেন না — এ প্রতিশ্রুতি তিনি অন্তত আমেরিকাকে দিয়েছিলেন ওই চুক্তিতে বাধ্য হয়ে। কেন? কারণ হিটলারের আক্রমণে  এরই মধ্যে ফ্রান্স হিটলারের দখলে চলে গেছে এবং এরপরে ব্রিটেনও দখল হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। তাই এই ভয়ে আমেরিকার সহায়তা পেতে চাইছেন তিনি। তাই “কলোনি শাসন ত্যাগের এ নীতিগত অবস্থানপত্রের” এই শর্তেই চার্চিল রুজভেল্টের মন পেয়েছিলেন। আর এথেকেই রুজভেল্ট চার্চিলের সঙ্গে মিলে হিটলারবিরোধী “মিত্রশক্তি” গড়তে রাজি হয়েছিলেন। ফলে বিশ্বযুদ্ধে হিটলার ও সহযোগীদের পতন নিশ্চিত করেছিল।

রুজভেল্ট ‘মিত্রশক্তির’ ইউরোপকে শুধু সামরিক সহায়তাই করেননি; যুদ্ধে প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয় বা পোশাক থেকে শুরু করে যুদ্ধজাহাজসহ যেকোন সামরিক সহায়তা ইত্যাদি না কোন জাহাজ রিপেয়ার, নতুন সরবরাহ অথবা নগদ সাহায্য করেছিলেন। আর তা করেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ মিত্রশক্তির সব রাষ্ট্রকে। যুদ্ধ শেষে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের এক হিসাবে দেখা যায় মিত্রশক্তির রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে দেয়া সাহায্য, এর মোট পরিমাণ ছিল ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এখনকার মুদ্রামানে যা হবে এর আরো ৩৫ গুণ। কারণ সেকালে স্বর্ণের আউন্স ছিল ৩৫ ডলার, যা আজকের সোনা ১ হাজার ২৩০ ডলারের আউন্স ধরলে সেটা এখন ৩৫ গুণ হয়। অর্থাৎ সেকালের ২৭০ বিলিয়ন ডলার হবে একালে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। এখানেই শেষ নয়।

ওদিকে আবার যুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপের (সঙ্গে পুরা জাপান ও চীনেও কিছু) অবকাঠামো পুনর্গঠনের “মার্শাল প্ল্যানে” আবার নতুন করে অবকাঠামো গড়ে দিতে নতুন বিনিয়োগ করতে হয়েছিল আমেরিকাকে। নতুন এ বিনিয়োগ প্রায় বিশ্বযুদ্ধের ব্যয়ের সমান।

সেই থেকে আমেরিকা হয়ে যায় দুনিয়ার নতুন নেতা। আমেরিকান নেতৃত্বের দুনিয়া অথবা আমেরিকান নেতৃত্বের এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল। আজ প্রায় সত্তর বছর পরে এবার আমেরিকাকে পেছনে ফেলে সে জায়গা নিতে যাচ্ছে গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা চীন। সেকালে আজকের রাইজিং অর্থনীতির চীনের মতোই উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ছিল আমেরিকার হাতে। বিশ্বযুদ্ধের আগের সেকালে দুনিয়াকে কলোনি করে রাখাই ছিল রীতি; আর এর ভেতর নতুন উত্থিত অর্থনৈতিক শক্তি হচ্ছিল আমেরিকা, ১৮৮০ সালের পর থেকেই। বলা যায়, এরই পূর্ণতা তারা পাওয়া শুরু করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) পর থেকে। চলতি নতুন শতকে এসে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতার ভুমিকায় উঠে আসছে।

তাত্পর্য দুই: অর্থনীতিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকতা, গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেক তাত্পর্য হলো, এ যুদ্ধ শেষের নতুন দুনিয়ায় এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়া শুরু হয়।

এর মানে কী? প্রথমত. এর আগে দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলত ঠিকই, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের একটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন — কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান সেখানে ছিল না। ফলে এ রকম কোনো নিয়ন্ত্রণও ছিল না। বিচ্ছিন্নভাবে নানা ধরনের ক্যাপিটাল মালিকদের প্রতিষ্ঠান, সেটা কোনো ব্যাংক বা কারখানা বা বাণিজ্যিক মালিকানা প্রতিষ্ঠান যা-ই হোক, তা নিজ নিজ মালিকানার পুঁজিকেই কেবল নিয়ন্ত্রণ করত, যেটা সব পুঁজি মালিকই নিজের স্বার্থে করে।

প্রথম কথা হলো, কলোনি যুগের অর্থনীতিতে কোনো ইনস্টিটিউশন— যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে মোটাদাগে নিয়ন্ত্রণ করে — এমন প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ছিল না; তেমন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান দূরে থাকে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান মানে যেকোনো রাষ্ট্রের অধীনে ও ভেতরে নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। আজ সব রাষ্ট্রেরই একটা ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক’ থাকে, যা দিয়ে সে নিজ অর্থনীতিকে মোটাদাগে নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক’ যেমন সময়ে সময়ে ফিসক্যাল ও মনিটারি পলিসি ঘোষণা করে। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে, বাজারে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এটা কত আগে থেকে, কবে থেকে শুরু হয়েছিল?

এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোনো ফেনোমেনা ছিল না। ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ ১৬৯৪ সালে জন্মের পর থেকে এটা প্রাইভেট ব্যাংক ছিল এবং ফাংশন করত। আর ১৯৪৬ সালে এসে এটা ন্যাশনালাইজড বা সরকারি মালিকানায় নেয়া হয়, সেই থেকে এটাই ইংল্যান্ডের “সেন্ট্রাল ব্যাংক” হিসাবে কাজ করছে। ১৯৪৬ সালের আগে আসলে ‘সরকারি ব্যাংক’ বলে কোনো ধারণাও ছিল না। রাষ্ট্র, সরকার, এমনকি রানীর অফিস — এসব প্রতিষ্ঠানের সব অ্যাকাউন্টের হিসাব-কিতাব ব্যাংক অব ইংল্যান্ডই দেখাশোনা করত। ব্যক্তি ক্লায়েন্টের মতোই। তবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড মুদ্রা ছাপানোর অনুমতি পেয়েছিল, সরকারের থেকে তা নিতে হতো সমতুল্য পরিমাণ স্বর্ণ জমা রেখে।

তবে এ প্রসঙ্গে একটু ব্যতিক্রম আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, যার জন্ম ১৯১৩ সালে। এটা আমেরিকার ৫০ স্টেটের মধ্যকার মুদ্রা ও অর্থনীতির সমন্বয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কারণ ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পর থেকে প্রতিটি স্টেট আলাদা আলাদা নোট ছাপত। শুধু তাই নয়, প্রত্যেক স্টেটের প্রত্যেক ব্যাংক আলাদা নোট ছাপত। এছাড়া এক স্টেট অন্য স্টেটে বিনিয়োগ করতে পারত না। পরবর্তীতে প্রত্যেক স্টেটের পুঁজি সঞ্চয় এর পরিমাণ বেড়ে গেলে এ বাধা উ্ঠিয়ে দেয়া হয়, আর পরস্পরের  পুঁজি ও সঞ্চয়  বিনিয়োগ ইত্যাদির সমন্বয়ের দরকার দেখা দেয়। সেখান থেকেই ১৯১৩ সালে ফেড রিজার্ভের জন্ম। আরো পরে এটা আর পাঁচটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো ভূমিকায়ও নামে।

কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের পরেই কেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারণার জন্ম? বিশ্বযুদ্ধের আগে নয় কেন?

এতক্ষণ সাধারণভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার কথা বলেছি, তবে তা রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতরেই কেবল এখতিয়ার— এমন প্রতিষ্ঠানের কথা।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেক তাত্পর্য হিসেবে যে প্রাতিষ্ঠানকতার কথা বলছি, তা আসলে গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা; রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরে সর্বত্র যার এখতিয়ার।

মূলত ১৯৪৪ সালে আইএমএফ (তবে সঙ্গে বিশ্বব্যাংক) গ্লোবাল অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করে। আর আইএমএফের গ্লোবাল তত্পরতা সক্রিয় করার জন্য এরই নানা ডানার মতো সদস্য দেশগুলোয় ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ গড়ে তোলা হয়। আইএমএফের সদস্য হতে হলে কোনো রাষ্ট্রে আগে না থেকে থাকলে এবার এক কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুলে নিতে হয়। আর কীভাবে কী কী অর্থনৈতিক তথ্য আইএমএফকে দিতে হবে সেই ফরম্যাট ও এর ট্রেনিং আইএমএফ দিয়ে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত কনস্টিটিউশনাল স্টাটুটরি প্রতিষ্ঠান হয়, তবে স্বায়ত্তশাসিত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আগের কলোনি ক্যাপিটালিজম যা নিয়ন্ত্রণবিহীন চলত তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণেই নয়, বরং ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি এবার সারা দুনিয়ার একক গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকল।

এই প্রথম দুনিয়া একটা নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলো— গ্লোবাল অর্থনীতি। তাহলে গ্লোবাল অর্থনীতি মানে কী দাঁড়াল, যুদ্ধের আগের কলোনি যুগে গ্লোবাল অর্থনীতি বলে কিছু ছিল না? হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। কিছু ছিল না। তাহলে কী ছিল?

আসলে বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি শুরু হওয়া মানেই হলো তা গ্লোবাল অর্থনীতি। যেমন — একটা রাষ্ট্র সীমানার ভেতরে বাণিজ্যিক লেনদেন হলে তা একই নিজস্ব মুদ্রায় করা যায়। ওই মুদ্রার মান কত, মানে অন্য মুদ্রার সঙ্গে এর বিনিময় হার কত, তা সেখানে অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন। কিন্তু যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্য বিনিময় লেনদেনের বেলায় মুদ্রা বিনিময় হার কত তা নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিজ নিজ মুদ্রার মান মানে, বিনিময় হার সেখানে জানতেই হবে। কিন্তু তা নিশ্চিত জানার উপায় কী? কথাটা আরেকভাবেও বলা যায়। বাণিজ্যিক বিনিময় যদি রাষ্ট্রসীমার বাইরে হয়, মানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিনিময় লেনদেন হয়, সেই বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাও তো লাগবে। এই প্রয়োজন মেটাতে যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা, এরই প্রতিষ্ঠান হলো আইএমএফ। এক ম্যান্ডেট অনুযায়ী এর কাজ দুটো। এক. আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় হার ঠিক করা, যাতে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র তা থেকে নিজের মুদ্রার সরকারি হার জেনে বুঝে নিতে পারে। দুই. কোনো রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক লেনদেনের অ্যাকাউন্টে ব্যালান্সের ঘাটতি দেখা দিলে তা পূরণে লোন দেয় আইএমএফ। তবে ওই ঘাটতি আর যাতে দেখা না দেয়, সেজন্য যা কিছু পরামর্শ ও করণীয় আইএমএফ দেবে, তা পালন করতে রাজি থাকা সাপেক্ষে ঐ ঋণ অনুমোদিত হবে। তবে ্মনে রাখতে হবে আইএমএফ অন্য কোন ঋণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। সেকাজ সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংকের, যা মূলত অবকাঠামো ঋণ বিতরণ করে থাকে।

গ্লোবাল অর্থনীতি কথাটা সেই থেকে অর্থপূর্ণ হতে শুরু করেছিল। যদিও এর ভেতর আবার চড়াই-উতরাই ক্রাইসিস সবই ছিল এবং এখনো আছে। এটা আরো অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে আশির দশক থেকে অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশন শুরু হলে। আর সবচেয়ে ইতিবাচক অর্থে গ্লোবালাইজেশন মানে হল, প্রত্যেক রাষ্ট্র যেসব পণ্য উৎপাদনে সবার চেয়ে দক্ষ, কেবল সেগুলোই সেসহ যারা তার মতনই দক্ষ, তারা মিলে সেসব পণ্য দুনিয়ার সবার জন্য উৎপাদন ও রফতানি করবে। বিনিময়ে অন্যান্য পণ্যের বেলায় সেগুলোরও দক্ষ উৎপাদকের থেকে তা আমদানি করবে।

এক অব=জারভেশন হিসাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ এ পর্যন্ত সব গ্লোবাল পরিবর্তনে দেখা  গেছে, কেবল সেগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে যেগুলোয় ‘ওয়াল স্ট্রিট’ প্রতিষ্ঠানগুলোরও সম্মতি ছিল। যেমন— কলোনি যুগের সমাপ্তি টানতে হবে রুজভেল্টের এ সিদ্ধান্তের মূল প্রভাবক ওয়াল স্ট্রিট প্রতিষ্ঠানগুলো। ওয়াল স্ট্রিট প্রতিষ্ঠানগুলো মানে হলো, যেকোনো ব্যাংক বা করপোরেট মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি অথবা কোনো বড় ম্যানুফ্যাকচারার ইত্যাদিসহ যেখানেই বড় বিনিয়োগ লাগে সেখানে বাণিজ্যিক ঋণ দেয় এমন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ আমাদের মতিঝিলের শেয়ারবাজার পাড়ার মতো আমেরিকার নিউইয়র্কের ম্যানহাটন সিটিতে ওয়াল স্ট্রিট নামের পাড়ায় অবস্থিত বলে সেখান থেকে এমন নাম। সেখানকার সবচেয়ে এক বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হল, গোল্ডম্যান স্যাকস। এরই এক গবেষক হলেন জিম ও’নিল। তিনি সাবেক ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী ও পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাজকীয় চেথাম হাউজের চেয়ারম্যান। তার গবেষণার সবচেয়ে প্রভাব ফেলা কাজ হল, চীন যে ব্রিকস উদ্যোগ বা ব্যাংক বানিয়েছে, সেটা তিনি ও তাঁর দলের পরামর্শ থেকে।

সম্প্রতি তিনি খুবই ভোকাল হয়ে উঠেছেন। তার প্রসঙ্গ হলো গ্লোবাল অর্থনীতি, চাইলে যেটাকে আমরা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমও বলতে পারি। তার আর্গুমেন্ট হলো বিশ্বযুদ্ধের পর যে গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটা তৈরি হল, এর ওপরও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন, বিশেষ করে ক্রাইসিসের সময়গুলোয়। এ কাজে বড় অর্থনীতির সাত রাষ্ট্রের যে জি৭ গ্রুপ তৈরি হয়েছিল, সেটা গ্লোবাল ক্রাইসিসের সময় যথাযথ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, জি৭ এখন জিরো, মানে অথর্ব অকেজো। এছাড়া ট্রাম্পের আমেরিকার এখন যে অবস্থান, সেটা অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের। ফলে এখন আরও যারা রাইজিং অর্থনীতির সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র— এমন টপ ২০টিকে নিয়ে জি২০ গ্রুপ গড়তে হবে।

সারকথা, গ্লোবাল অর্থনীতি কথাটা এখনো কাজে পরিপূর্ণতা পায়নি। সে লক্ষ্যে অনেক কাজ বাকি, যেখানে আমাদের মনোযোগী হতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ আগস্ট ২০১৮ দৈনিক বণিকবার্তা পত্রিকায় বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কবে থেকে  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

গৌতম দাস

০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2ti

 

 

শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা – ছবি : ফেবু থেকে সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যে স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে, তা নিয়ে চার দিকে তুমুল অলোচনা চলছে। এ স্লোগানগুলোতে দেশের পরিস্থিতির নানা চিত্র উঠে এসেছে। গত চার দিনের চলমান রাস্তার আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের দেয়া স্লোগানের ভাষা কী অশ্লীল, প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এক কথায় বললে এর প্রথম জবাব হবে ‘কে আপনি’, প্রশ্নটি তুলতেছেন। আপনি যদি ক্ষমতাসীন দানব ক্ষমতার মানে দানব এস্টাবলিসমেন্টের পক্ষের লোক হন কিংবা জেনে – নাজেনে এই দানব ক্ষমতাকে সম্মতিদাতা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার অভিযোগ হবে শিক্ষার্থীদের ভাষা ‘অশ্লীল’। আপনি দানব ক্ষমতার সুবিধাভোগী হলেও বলবেন, এটা ‘অশ্লীল’ ভাষা। ক্ষমতাসীনদের সাগরেদ হলে ‘এথিক্যাল পুলিশের’ ভূমিকায় নামতে ইচ্ছে করবে আপনার কিংবা নেমেই যাবেন। কারণ আপনি হারতেছেন – লুজিং। চ্যালেঞ্জড হয়েছেন – এরই দিশাহারা প্রতিক্রিয়া এটা!

আসলে এটাকে শ্লীল-অশ্লীলের বিষয় না বলে মানে ‘নৈতিকতার পুলিশগিরি’ পজিশন না নিয়ে বরং এটা ফরমাল বনাম ইনফরমাল ভাষার তর্ক – এভাবে বর্ণনা অর্থে সেটি বলাই সম্ভবত সঠিক হবে। স্ল্যাং (slang) বা অশ্লীল ভাষা সব সমাজে থাকে, চর্চাও হয় সমানে। [স্ল্যাংয়ের ডিকশনারি অর্থও আরও সহজ – very casual speech or writing।] মানে স্যুট-কোর্ট থুয়ে হাফ প্যান্ট পড়ে কথা বলা। এমন সমাজ দুনিয়ায় পাওয়া যাবে না যেখানকার ভাষায় স্ল্যাং শব্দ নাই বা এই শব্দের চর্চা নাই। তবে স্বভাবতই এই চর্চা হয় মূলত সমাজের ইনফরমাল পকেটগুলোতে – চায়ের দোকানে, ক্লাব আড্ডায়, সমবয়সী ও বন্ধু মহলে। তবে ফরমাল জায়গাগুলোর ভাষা যেহেতু আলাদা হয়, তাই সেখানে এই ভাষা দেখা যায় না। কিন্তু একটা কথা মানতে হবে, ভাষার মুখ্য কাজটা হল মনের কথা ঠিক ঠিক-ঠিকভাবে বাইরে আনা, যেটাকে আমরা বলি এক্সপ্রেশন বা প্রকাশ ঘটানো। লক্ষ করবেন, ইনফরমাল শব্দ মানে যার ভিতর স্ল্যাং শব্দ অন্তর্ভুক্ত – এই শব্দ অন্য যেকোন কিছু চেয়ে খুবই সফল ও সাবলীলভাবে এক্সপ্রেশন ঘটায়, অন্তত ফরমাল ভাষার তুলনায় এবং ওর চেয়ে সহজে। তুলনায় এই চমৎকার প্রকাশগুণ, এটাই ইনফরমাল ভাষা কদর পাওয়ার একটি অন্যতম কারণ। আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই প্রকাশগুণসম্পন্ন হয়, তাই ইনফরমাল আবহের সুযোগ পেলেই তা নিয়ে আমরা এই ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ নিয়ে নেই। মূল কারণ, সহজে এখানে নিজের মনের ঠিক ঠিক ভাব তুলে ধরা বা বাইরে আনা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, মূলত যেমন ধরেন রেগে গেলে বা রাগে, ক্ষোভে অথবা দীর্ঘদিনের চাপা থাকা অবস্থার মন অসহ্য হয়ে পড়লে সাধারণত আমাদের প্রকাশভঙ্গির শব্দ ইনফরমাল হয়ে যায়। অর্থাৎ ফরমালিটির কন্ট্রোল তখন অকার্যকর হয়। মনে হতে থাকে, রুলিং পাওয়ার বা শাসকসমাজ আমাকে আমল করছে না, আমার ব্যথা বুঝছে না, বুঝতেই চাচ্ছে না; তাহলে আমি কেন একপক্ষীয় তাকে আমল করার দায় নেব! ফলে ইনফরমাল শব্দ ব্যবহারকারির মানসিক অবস্থা থাকে এরকম। আর আমরা সবাই জীবনের নানান চড়াই-উতরাইয়ের স্তরে পরে কখন না কখনও ইনফরমাল স্তরে যাবার সদুযোগ নিয়ে নিজেকে হাল্কা অনুভব করার সুযোগ নিয়েই থাকি।

তার মানে দাঁড়াল ফরমাল-ইনফরমাল ভাষা বলে সমাজে একটা ফারাক, সব দেশ-সমাজে আছে আর তা বজায় বা ধরে রাখা হয় বা থাকে। ফরমাল সমাজের আড়ালে থেকে থাকা ভাষা আসলে ‘দোস্ত-বন্ধু সার্কেলের ভাষা;’ যাকে ইনফরমাল ভাষা বলছি তা সফল আয়ু নিয়ে টিকে থাকে, ফরমাল ভাষার পাশাপাশি হেঁটে চলে।

তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু এর মানে কি এটা যে এখন থেকে দেশে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ, ভাষার ফারাক এগুলো কি এখন থেকে উঠে যাবে? এই আন্দোলনে যারা বেশির ভাগ বা সংখ্যায় ভারী এরা মূলত ১৬-১৭ বছরের কিশোর বা তরুণ। এই ১৬-১৭ বছরের তরুণ, এরা ইনফরমাল ভাষা অবলীলায় ব্যবহার করছে – এর মানে কী এখন থেকে বাসার ড্রয়িংরুমে, ডাইনিং টেবিলে কিংবা ক্লাসরুমে এরা নিয়মিত ইনফরমাল ভাষায়ই কথা বলা শুরু করবে? পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ভাষা কি সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? না, একেবারেই না। আসলে ঘটনা খুবই সিম্পল। আগে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ যতটা আপনা-আপনিই বজায় রাখা যেত বা থাকত, এখন সেখানে একটা ব্যত্যয় ঘটেছে। তা ঘটিয়েছে সোস্যাল মিডিয়া। সোস্যাল মিডিয়ার কারণে ইনফরমাল জগৎ ও এর ততপরতা ফরমাল দুনিয়ায় হাজির হয়ে গেছে। অর্থাৎ ইনফরমাল ভাষা তাদের বন্ধুমহল ছেড়ে মিডিয়ার কল্যাণে সবার সামনে চলে এসেছে। আর তাতেই এত তর্ক উঠেছে। খেয়াল করলে দেখব, ফেসবুকই এ ধরনের ইনফরমাল ভাষার প্ল্যাকার্ড বা এর ছবি সবার কাছে প্রকাশ করে দিচ্ছে, ফেসবুক এর প্রধান সোর্স। পাশাপাশি তুলনা করলে দেখব, আমাদের মেন স্ট্রিম বা প্রচলিত মিডিয়া এমনকি টিভি মিডিয়ারও যাদের কাছে এমন প্ল্যাকার্ড ও এর ছবির কথা অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু তাদের মিডিয়ায় ইনফরমাল ভাষার খবর, এটা অনুপস্থিত। তারা কিন্তু ফরমাল জগতে একে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

তাহলে এই ফরমাল-ইনফরমাল জগৎ ও ভাষার যে ভেদ এখন দেখা যাচ্ছে তাতে কিছু ছিদ্র দেখা গেছে, এই হল কথা। এখন এই ছিদ্র দেখা দেয়ায় আগামীতে এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, এই ভাষার ফরমাল-ইনফরমাল ভেদ কখনই উঠে যাবে না। যদিও ঠিক যেমন, অন্তত মা জানে তার সন্তান সিগারেট খায়, কিন্তু তা নিয়ে নাড়াচাড়া করার কায়দাও কেমন নরম-গরমে রাখতে হয় তা মায়েরা জানে। বাড়াবাড়ি করে না। এরকম হয়ে থেকে যাবে। ফলে হয়তো সেভাবে সোস্যাল মিডিয়ায় এটা জানাজানি ঘটা অবস্থাতেই তা থাকবে, কিন্তু আবার এই তথ্য ফরমাল সমাজ উপেক্ষা করতেও থাকবে, ফরমাল সমাজে তা আনবে না। আর সম্ভবত এটা নির্ধারিত হবে অভিভাবক মা-বাবারা সন্তানদের এই আন্দোলনের প্রতি কী মনোভাব পোষণ করছে ও করবে তা দিয়ে।

এখন পর্যন্ত যা প্রকাশিত তাতে মনে করার কারণ আছে যে, এটা কেবল ১৬-১৭ বছরের তরুণদের আন্দোলনই নয় এর পাশাপাশি এটা তাদের মা-বাবারও সম্মতির আন্দোলন। বিশেষ করে মায়েরাই মূলত সন্তানদের স্কুল-কলেজে পৌঁছে দিতে আসে সেই মায়েদেরও সম্মতিতে সন্তানদের আন্দোলন। এর একটা বড় কারণ সড়ক ও যানবাহনের অনিরাপত্তা। এমনিতেও তারা চিনায় দিচ্ছে যে নিরাপদ সড়ক – এটাই তাদের আন্দোলনের ইস্যু। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে এই মায়েদের পূর্ণ সম্মতি আছে পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রতি। অন্তত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, আশির দশকেও তখনকার আন্দোলনে এমনটা কোনো অভিভাবককে পাওয়া যেত না যে সন্তানের আন্দোলনে অংশ নেয়াকে সম্মতি দিত। কিন্তু এখনকার পড়ুয়াদের আন্দোলনে অভিভাবকদের পূর্ণ সম্মতি আছে, এর বড় প্রমাণ হল গত চার দিনে তরুণেরা তারা লাগাতার মাঠে উপস্থিত থাকছে; বাসায় বাধা তেমন পায়নি শুধু তাই না, মায়েরা নিজেই পরের দিনও ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনছে বা তাদের আসতে দিচ্ছে। সম্ভাব্য এর মূল কারণ হল, চরম অনিরাপদ বেপরোয়া যানবাহন আর এই নৈরাজ্যকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে এমন ‘পাবলিক জবাবদিহিতাহীন’ সরকার ও এর ক্ষমতা- এসবের  প্রতি মায়েদের গভীর অনাস্থা। বেপরোয়া এই ব্যবস্থা রাজীব ও মীমকে হত্যা আর সাথে আরো দশজনকে মারাত্মকভাবে পিষে মেরে ফেলার অবস্থায় আহত করেছে। কিন্তু এই বীভৎসতার অভিজ্ঞতা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, এটা কেবল রাজীব বা মিমেরও নয়, রাজীব অথবা মিমের ভেতর দিয়ে আসলে প্রতিটি শিক্ষার্থী ও  অনিরাপদ সড়ক তাদের নিরাপত্তা দিতে আসা মায়েরা প্রত্যেকে নিজেকেই দেখতে পেয়েছেন। ঘাতক বেপরোয়া পরিবহনের সরাসরি শিকার এখন মা এবং সন্তানেরা। তাদের সাথে রাজীব-মিমের ফারাক হল এই যে, এরা দু’জন পরিবহন নৈরাজ্যে হত্যার শিকার হয়েছে; আর এই মা-সন্তানেরা এক্সিডেন্টলি মারা যায়নি, তাই বেঁচে আছে। ফলে চরম নৈরাজ্যের বিপরীতে একটা সুস্থ সিস্টেমের এক নির্বাহী সরকার পরিচালনার অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে মা বা সন্তান কাউকেই দাওয়াত দিতে হয়নি। এটি ভুক্তভোগীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের প্রকাশ। এ কারণে সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা গেছে অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে নিজেই মাঠে আইডেন্টিফাই করে বাহবা দিতে। অর্থাৎ পড়ুয়া সন্তানের সাথে সমান সরাসরি ভুক্তভোগী বলেই অভিভাবকেরা এই আন্দোলনে সম্মতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে।

এই আন্দোলনকারী কারা? অনেকে এদেরকে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা ছেলে বলে সম্বোধন করছেন। এটা সম্ভবত অসতর্কতা অথবা আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি বোঝাতে ‘বাচ্চা ছেলে’ কথা যতটা না তাদের বয়স বোঝানোর শব্দ, এর চেয়ে বেশি তাদের প্রতি সহানুভূতিসূচক শব্দ। তবুও সেটি যাই হোক, বয়সের বিচারে এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৬-১৭ বছর। অর্থাৎ টিনএজের শেষার্ধে। এই বয়সের মূল বৈশিষ্ট্য হল, পরিবার ও সমাজকে তারা এটা জানান দিতে চায় যে, “আমি এখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারি, আমার চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয়েছে, মনে বুঝাবুঝির ফ্যাকাল্টি ডেভেলপ করে গিয়েছে  ও ন্যূনতম পরিপক্বতা এসেছে। ফলে প্রতিটি বিষয় আমি কিভাবে চাই অথবা দেখতে চাই তা আমাকে আমার মত করে দেখতে ও তাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে; আর সেই সাথে অন্যদের তা আমল করতে হবে। আপনার আইডিয়ার তলে আমাকে চেপে দেয়ার সুযোগ আর নাই”।

এরপর ১৮ বছর হয়ে গেলে এ ভাবটাকেই তো আইনসিদ্ধ মতামত জানানোর মত পোক্ত বলে মানা হয়, আমরা মেনে নেই যে তারা রাজনীতি ও নির্বাচনে ভোট বা মতামত দেয়ার যোগ্য বিবেচিত। এ জন্য উল্টো এক কমন ট্রেন্ড দেখা যায় এদের মধ্যে তা হল, তাদের মতামত প্রকাশ করতে না দিলে বা এদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অবস্থান নিলে এরা ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ করে, এদের প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায় জীবন দিয়ে দেওয়ার মত মরিয়া। এরা নিজেদের আমল করানো, তাদের কথা শোনানোর জন্য কোনো ২৫ বা ৩৫ বছর বয়সী মানুষের চেয়েও বহু দূর যেতে রাজি থাকে। তবে ঠাণ্ডামাথায় বুঝিয়ে বলেই একমাত্র যদি তাদের মানানো যায় বা যেতে পারে।

এসব কারণে তাদের দাবি খুবই চিন্তা করে বলা যার মূল সুর হল অনিরাপদ সড়কের তাদের আপত্তি ও অভিযোগ, সড়ক নিরাপত্তা তাদের মূল ইস্যু। দানব ক্ষমতার নৈরাজ্যের এক প্রকাশ পরিবহন নৈরাজ্য – এটা তাদের সব ক্ষোভের কেন্দ্র। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ সড়কে আহত নিজের কোনো বাসযাত্রীকে চিকিৎসা দেয়ার ঝামেলা এড়াতে নদীতে ছুড়ে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে – পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ এই ভয়ংকর অবিশ্বাস্য অমানুষের জায়গায় চলে গেছে। কেউ আর মানুষের গুণ স্বভাবে নেই। এমনকি এ ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সরকার-মালিক-শ্রমিক নেতা কারো দিক থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং নতুন করে আবার দায় এড়ানোর বুদ্ধি আঁটছে তারা।

এক কথায় বললে ১৯৮৩ সালে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BRTA) গঠনের সময় থেকেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা সোজাসাপ্টা চেয়েছে – তারা লাইসেন্স কিনে নিতে পারে এমন ব্যবস্থা চায়। কোন ট্রেনিং শেষে যোগ্যতা পরীক্ষার প্রমাণ দেয়া নয়, সরাসরি কাগজ কেনা এমন একটা লাইসেন্সিং-অনুমোদন ব্যবস্থা যেন কায়েম হয়। আর সেকাজে প্রগতি বা অ-প্রগতিবাদী পরিবহণ নেতারা সকলেই এই ব্যবস্থায় সায় দিয়েছে এই অজুহাতে যে ট্রেনিং-পরীক্ষার যে ব্যবস্থাকে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া বলে এটা নাকি ‘আমলাতান্ত্রিক’। কারণ আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গালি দিতে পারা চরম বিপ্লবীপনা মানা হয়। ফলে তারা এই আমলাতন্ত্রের অজুহাতের আড়ালে সকলেই চেয়েছে পয়সা দিয়ে কেনা যায় এমন এক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কায়েম হোক। আর আমলারাও এমন ব্যবস্থা হলে সহজেই পরিবহণের কাঁচা পয়সার ভাগ মিলবে বলে এতে সামিল হয়েছিল। এভাবে পয়সা দিয়ে কিনে নেয়ার এই ব্যবস্থায় তারা সরকারকেও শামিল করে নিয়েছিল। সেটাই এখন ভয়াবহ দানব মহীরুহ হয়েছে। তাই গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্স দিতে হবে- এটা মন্ত্রী এখন প্রকাশ্যেই দাবি করছেন। অথচ মূল ব্যাপারটা হল, লাইসেন্স বা অনুমোদন যদি কিনেই নেয়া যায়, এরপর তা কি আর ‘লাইসেন্স’ বলে বিবেচ্য হতে পারে? না সেটা লাইসেন্স থাকে? সেটা তো তখন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষালব্ধ দলিল অর্থে লাইসেন্স নয়, এক টুকরো কাগজ মাত্র। এটা চিন্তা করা অবস্থায় সরকার-মালিক-শ্রমিকেরা কেউ নেই। আসলে সরকার-মালিক-শ্রমিকের মিলিত এক সিন্ডিকেট বিআরটিএ’র মাধ্যমে মানুষ মারার ‘লাইসেন্স’ কেনাবেচা করছে মাত্র। আর অন্যদিকে পরিবহনের এই মন্ত্রী-মালিক-শ্রমিকদের গুণ্ডামির এরা এক কোটারি ক্ষমতা, এটাকে দানব সরকার নিজের ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে তাদের মধ্যে এই দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের সিন্ডিকেট, সে আরো চরম বেপরোয়া। অর্থাৎ সরকার মালিক-শ্রমিকদের এই সিন্ডিকেট প্রমাণ করেছে বিআরটিএ আসলে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এক সংগঠন। কার্যকর কোনো রাষ্ট্র-সরকার ও বিআরটিএ সব কিছু একেবারেই বাস্তবত অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এই জায়গা থেকে দেখলে বোঝা যায় টিনএজ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন আমাদের বলতে চাচ্ছে, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য আসলে নতুন রাষ্ট্র-সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন।

তাহলে ব্যাপারটা শুধু পরিবহন নৈরাজ্য নয়, খোদ রাষ্ট্র ও সরকারই এক নৈরাজ্যের দানব, প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এরই প্রধান প্রতিভূ যাকে মাঠের লড়াকু তরুণেরা সম্মুখ মোকাবেলা করছে, তারা হলো পুলিশ। পুলিশ হয়ে উঠেছে নৈরাজ্যের দানবীয় প্রতীক।

ফলে তরুণদের স্লোগানের টার্গেট মূলত পুলিশ ও ক্ষমতা। কিন্তু এই পুলিশ ও ক্ষমতা এটা নষ্টা, বিচ্যুত ও অধঃপতিত। “পুলিশ তুই কোন চ্যাট@র বা@…”। অর্থাৎ তুই আমার কাছে, আমার চোখে তুচ্ছ – এটাই আন্দোলনকারীদের বক্তব্য-বয়াত্নের সার কথাটা। সারকথায়, তাই একে তুচ্ছজ্ঞান করে দেয়া। কারণ, নষ্টা ক্ষমতা, despotic বা ‘দাগী’ ক্ষমতা সে তো পশমের মতোই তুচ্ছ। এই বয়ান হাজির করাই তরুণদের আন্দোলনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরম রাগ-ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ হয়ে কাউকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দেয়া- সে কিছুই না, তাকে সে মানে না পাত্তা দেয় না; এটা বোঝানোর ক্ষেত্রে ইনফরমাল ভাষা- এক্সপ্রেশন হিসেবে অতুলনীয়, আনপ্যারালাল। তাই পুলিশ সম্পর্কিত সব স্নোগানই তাদের তুচ্ছ জ্ঞান করার ভাষা। ইনফরমাল ভাষা যাকে বলি। এখন আপনি দানব ক্ষমতার বেনিফিসারি হলে ওর সাথে থাকলে, আত্মীয় হলে তো এই ভাষার বয়ান নিজের স্বার্থে আঘাত খেয়ে প্রতিক্রিয়ায় নিচা দেখাতে একে ‘অশ্লীল’ বলতে চাইবেনই। তাহলে দেখা যাচ্ছে শেষ বিচারে শ্লীল-অশ্লীল ব্যাপারটা পৌঁছাল যে, এটা আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন। আপনি দানব ক্ষমতার আত্মীয় হলে দানব ক্ষমতার চ্যালেঞ্জকারীকে অশ্লীলই বলবেন।

একটা ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়েও ওপর পুলিশ লাঠি তুলছে, পেটাচ্ছে বা ভয় দেখাচ্ছে – এমন অনেক ছবি মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু সব ছবিতেই দেখবেন তরুণদের ভিতর কোনো ভয় পাওয়ার চিহ্ন নেই, সটান দাঁড়িয়ে আছে, একটুও হেলেনি, মার থেকে বাঁচার চেষ্টা নেই। অথচ ঐ উদ্যত লাঠির বাড়ি পড়লে মাথা দুভাগ হবার সম্ভাবনা। তবু সে ভয়ডর কারও ভিতর কাজ করছে মনে হয় না। কেউ একজন ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়ে – এরই হুবহু প্রতীক হল এ ছবিগুলো। সে বলতে চায়, সে স্বাধীন চিন্তা করতে সক্ষম। ফলে তাকেও আমল দিতে হবে। তার কথা শুনতে হবে।

গ্রীক এক প্রবাদ আছে, যা আপনি কাউকে দিবার যোগ্যতা রাখেন না মুরোদ নাই তা কারও থেকে কেড়ে নিবারও আপনি কেউ না, আপনার সে অধিকার নাই। সুর্যের আলো আপনি কাউকে দিতে পারেন না, সে যোগ্য আমরা কেউ নই। তাহলে কারও সুর্যের আলো পাওয়ার পথে আপনি বাধা হতে পারেন না। সে অধিকারই নাই। মীমের বাবা-মার কথাই ধরা যাক। তারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, বড় জোর ২৫ হাজার টাকার মধ্যে নিরন্তর কষ্ট করে সংসারে মাসের সব খরচ চালাতে বাধ্য হন এমন পরিবার। আশা করার মত তাদের কিছু নাই। কিন্তু এধরণের জীবন নিয়ে মানুষ বেচে থাকে কেন? বাকি জীবনে এর পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নাই। তাহলে কী আছে যা তাদের বাঁচিয়ে রাখে? আত্মহত্যা করতে দেয় না, বাঁচতে আগ্রহ যোগায়? সেই উসিলাটা কী? ঘনিষ্ট হয়ে বসে এদের যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে শুনবেন “বাচ্চাদের মুখের দিকে চেয়ে বেচে আছি”। এক স্বপ্ন আছে যা তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, বেঁচে থাকতে প্রেরণা দেয়। অর্থাৎ মা-বাবারা বুঝে গেছে তাদের প্রজন্ম গেছে। কিন্তু পরের প্রজন্মের সময়ে জীবনমান অবস্থা বদলের স্বার্থে নিজের প্রজন্মকে বলি দিতে রাজি আছে।  যেমন আশা করে থাকে যে মীম পড়ালেখা করে বড় হলে একটা (সরকারি) চাকরি পেলে তাদের চির দুঃখের অবসানে তাদের জীবনযাত্রার মান এক নতুন স্তরে উতীর্ণ হতে পারে। কিন্তু মীমের মৃত্যু তাদের পাচজনের পরিবারের সবস্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার করে দিয়েছে। জীবন ও এতদিনের দাতচেপে ধরে করা কষ্ট সব এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। রাষ্ট্র তাদেরকে একটা নুন্যতম অভাবপুরণের জীবন দিতে পারে নাই। তাহলে রাষ্ট্র-সরকারের কী অধিকার আছে তাদের স্বপ্ন ছিনিয়ে নিবার? কিন্তু এর জবাব দিবার কেউ নাই। কারণ মীমের পরিবারের সংগ্রাম আর তাদের দিক থেকে জীবনকে একবার দেখারও কেউ নাই! আমরা এমন সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাস করছি।

তাহলে আগামীতে কী হবে? প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কী বুঝবেন বা বুঝেছেন- তারা কার মুখোমুখি হয়েছেন, কার সাথে ডিল করছেন? এর জবাব সম্ভবত হতাশাব্যঞ্জক হবে! তারা বুঝবেনই না; অথচ  কী শক্তি ছিল অদমনীয় ১৬-১৭ বছরের এই তরুণদের ভিতর। কাজেই মাননীয় ক্ষমতা- আপনি পরাজিতই হবেন। আপনারা নো বডি, তুচ্ছ! তাহলে আমরা কি একটা ম্যাসাকার দেখতে যাচ্ছি। এক কঠিন সময়ের প্রান্তে আমরা।

[এই রচনাটা লিখতে যাদের ফিল্ড রিপোর্ট আমাকে খুবই সাহায্য করেছে, বিশেষ করে আলনোলনরত মা-সন্তানদের তথ্য আর অথবা রাজীব ও মীমের পারিবারিক তথ্য – এসবগুলোকে আমার ইমাজিনেশনে নিতে পেরেছি, তা নিয়েছি দৈনিক প্রথম আলো থেকে। তাদের রিপোর্টিং সত্যিই ছিল প্রফেশনাল যা আমাকে খুবই সহায়তা করেছে। তারা জানে তারা কি করছে। আর আমার দিক থেকে, কারণ সমাজতত্বের আলাপ তুলতে গেলে যে ধরণের নুন্যতম তথ্য দরকার হয় তা একমাত্র প্রথম আলোতেই ছিল। তাদের সকলকে তাই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ আগস্ট ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]