ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

গৌতম দাস

১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2CP

একালে আপনি কার দিকে? চীন, আমেরিকা নাকি ভারতের? সাথে রাশিয়ার নামটা নিলাম না, সেটা একটু পেছনে পড়েছে বলে। তো চীন, আমেরিকা নাকি ভারত – এই প্রশ্নের জবাব হল – একটাও না। আর সরাসরি বললে, জবাবে এখানে বিকল্প শব্দটা হল “ভারসাম্য”। কারও দিকে ঝুঁকে পড়া না, কান্নি মারাও না – বরং একটা ভারসাম্য। নিজের স্বার্থের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা ভারসাম্য। এই অর্থে এটা ভারসাম্যের যুগ।  চীন, আমেরিকা নাকি ভারত কারো সাথে নয়, এক ভারসাম্য অবস্থান বা ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট- এমন পজিশন নেয়া।

এককালে আপনি কোন দিকে? অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে – আমেরিকা না সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) কোন দিকে অবস্থান নিয়েছে? এটা খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন ছিল। এভাবে ‘আপনি কোন দিকে’ বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বা কলোনি-উত্তরকালে ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়ায় চলতে শুরু করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা আমেরিকার নেতৃত্বে সেকালের নতুন দুনিয়া। তখনো পরাশক্তি বা দুই মেরুতে বিভাজন শুরু হয়নি। সেটা হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। শুরু হয়েছিল গ্লোব-জুড়েই এক ব্লক রাজনীতিঃ সোভিয়েত ব্লক না আমেরিকান ব্লক। এভাবে সেই থেকে ৭০ বছর আমরা পার করে দিয়েছি। ফলে আমাদের মতো দেশের ভাগ্য সেকালে লুকিয়ে ছিল ‘কোন দিকে’ বলে যার যার মতে, এক ভাল ব্লক খুঁজে নেয়ার ভিতরে। আর এই ছিল আমাদের “কোন দিকের” ধারণার জন্ম কাহিনী। এভাবেই চলছিল একনাগাড়ে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর লোকে বলতে শুরু করেছিল যে, দুনিয়া এবার এক মেরু, আমেরিকান মেরুর দুনিয়া হয়ে গেল। কথা হয়তো আপতিকভাবে সত্য, অন্তত সাদা চোখে সবার তো তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলেই তাই কী?

ওদিকে চীনের উত্থানঃ  শুরু হিসাবে ধরলে চীনের উত্থানে আজকের চীন হয়ে উঠার শুরুটা বলা যায় সেই ১৯৬৮ সাল থেকে, যদি না ১৯৫৮ সালের তথাকথিত “সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে” এর শুরু বলে কেউ কেউ না-ই ধরতে চান। না, তথাকথিত লিখেছি, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভুয়া ছিল বা মনে করি কিনা সেজন্য না। লিখেছি কারণ, আসলে সেটা ছিল দলের চিন্তার মূল খোলনলচা বদলে দেয়া এক বদল।  কিন্তু সেটা করা হয়েছিল “সাংস্কৃতিক বিপ্লবের” নামের আড়ালে। ফলে এটা দলের পলিটবুরোর নেতাদের সাথে তৃণমুল কর্মীদের সাংস্কৃতিক ফারাক দূর করার আন্দোলন একেবারেই নয়। বরং সেটা ছিল, পলিটবুরোর নেতাদের সাথে নেতাদের লড়াই। দলের পুরানা অবস্থানের সাথে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের লড়াই। আজকের চীন বলে যেটা দেখছি আমরা এটাই ছিল সেই নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। এমনকি মাওও ছিলেন এটারই পক্ষে।
যাহোক, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভাল না মন্দ সে তর্ক এখানের নয় বলে সেটা এখন এড়াতেই মূলত ১৯৬৮ বলেছি। যেখানে ১৯৬৮ সাল হল যখন আসলে “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” শেষে তা বিজয়ী ও মোটামুটি থিতু হবার কাল। তবুও দুনিয়া জুড়ে চীন আজকের এজায়গায় যেতে রওয়ানার এটা কোন ইঙ্গিত কিনা এমন আলোচনা কোথাও ছিল না। এর চেয়েও তখন মুল আলোচ্য ছিল কথিত “চীনা সমাজতন্ত্র” কোথায় যাচ্ছে।
এমনকি ১৯৬৮ সালই বা কেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৮ সালেও খুবই কম একেবারেই হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া কেউ বুঝেনি যে, সেটাই আজকের চীন হওয়ার শুরু। অথচ চীনের কাছে ১৯৭১ সাল মানে আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি অনুসারে, ওর সাহায্যে চীন মানে মাও সে তুংয়ের চীন, সেই প্রথম জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর এটা ছিল ভেটো দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটা সদস্যপদ। অনেকের কাছে তথ্যটা আজব লাগতে পারে কিন্তু এই তথ্য শতভাগ সত্য। কারণ, জাতিসংঘে এই সদস্যপদ এত দিন (চীন বলতে) তাইওয়ানকে দিয়ে রাখা ছিল। আর সেটাই ১৯৭১ সালে সেবার তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মাওয়ের চীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল, আমেরিকার সাথে চীনের গোপন আলাপের ফলাফল অনুসারে। গোপন বলছি এজন্য যে ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জার [Henry Kissinger] গোপনে প্রথম “মাওয়ের  চীন” সফর করেছিলেন, আর সেখানেই ভেটোওয়ালা সদস্যপদ ফেরত পাবার বুঝাবুঝিটা তৈরি হয়েছিল।

আরও ওদিকে ১৯৭৮ সালঃ এটা উল্লেখযোগ্য এ জন্য যে, মোটাদাগের সব দেনা-পাওনা [চীন আমেরিকান পুঁজি, বিনিয়োগ ও পণ্য ইত্যাদি নিজ বাজারে প্রবেশ করতে দিবে। এতে বিনিময়ে কী কী নিবে এরই দেনা-পাওনা] ডিল সম্পন্ন করে চীন-আমেরিকা উভয় রাষ্ট্র পরস্পর পরস্পরকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে উভয়ে একে অন্যের দেশে অফিস খুলে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ সাল থেকে। এভাবে পরবর্তিতে ১৯৯০ পর্যন্ত চীন ছিল আসলে আমেরিকান পুঁজি ও টেকনোলজি কিভাবে ব্যবহার করবে এর, আর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি ও গ্লোবাল বাজারে প্রবেশ করে চীনের নিজেকে অভ্যস্ত, সাজানো ও খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রস্তুতিকাল। আর এরও পরের প্রায় ২০ বছর ধরে চলে চীনের অর্থনৈতিক ডাবল ডিজিট (বা সময়ে এর চেয়েও বেশি) উত্থানের পর্ব। তবে ২০০৭ সালে গ্লোবাল রিসেশন শুরু হলে তা কমতে থাকে। তত দিনে আমেরিকা বুঝে গেছিল যে, চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার দিকে, তাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
তাই ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমেরিকা আগে তা জানত না বা অনুমান করেনি। আসলে বিষয়টা ছিল জেনেও কিছুই করার নেই ধরণের পরিস্থিতি। গ্লোবাল পুঁজির এক আপন স্ববিরোধী স্বভাব এটা। চীনের জনসংখ্যার শত কোটির ওপরে (২০১৮ সালের হিসাবে ১৪২ কোটি)। এমন দেশে সত্তরের দশকেও সে ভার্জিন এই অর্থে যে তখনও সেখানে কোন বিদেশি বিনিয়োগ যায় নাই। তাই এর বাজার খুলে দিলে এর বিদেশি পুঁজি পাবার আকাশচুম্বি চাহিদা পুরণ করতে বাইরের সকলে ঝাপিয়ে পড়বে। মানে উলটা করে বললে ওয়ালস্ট্রিটের চোখে এত বড় ক্রেতা সে জীবনেও কল্পনা করে নাই। তাই চীনে বিদেশি বিনিয়োগে বাজার চাহিদা ধরতে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট একে উপেক্ষা করা কথা চিন্তাও করতে পারে না।  তাই আমেরিকান পুঁজিতে চীন ফুলে-ফেঁপে উঠতে থেকেছিল ১৯৯০ সালের আগেও,  তবে ১৯৯০ সালের পরে আরও প্রবলভাবে। এটা জানা সত্বেও যে এই পুঁজি চীনে ব্যবহৃত হবার পরে যে নতুন উদ্বৃত সঞ্চয় ও সম্পদ তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য আমেরিকাকে পিছনে ফেলে দিবে এবং চ্যালেঞ্জ করবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে চীনে প্রবেশের সুযোগ আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট উপেক্ষাও করতে পারে নাই কারণ উপেক্ষা করলে তাতে তার নিজের মরণ। মূল কথা, সব সময় নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগের ভিতরই কেবল আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট এর জীবন। তাই নতুন শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা জেনে যায় চীন উঠে আসতেছে। এটা দেখেই বুশের আমলে, ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এবার চীন ঠেকানোর [China Containment] কৌশলের তোড়জোড়। প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর (২০০৬ মার্চ) থেকে ভারত আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর কাজ হাতে নেওয়ার ব্যাপারটা আর একধাপ আগিয়েছিল। আর তখন থেকেই ধীরে ধীরে আপনি কোন দিকে অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে, সেটা বুঝতে পারা ও জবাব দেয়া আর আগের মত সহজ থাকেনি। কেন?

আপনি কোন দিকে, এর জবাব দেয়া শুরুর সেকালে সহজ ছিল। কারণ, আমেরিকা নাহলে সোভিয়েত – এদুটোর কোন একটা মেরু বা পরাশক্তি আপনি বেছে নিলেই হত। কিন্তু একালে ব্যাপারটা আর মেরু বা পরাশক্তি-কেন্দ্রিক বিষয় নয়। যেমন – আপনি কোন দিকে চীন, আমেরিকা নাকি ভারত? এই প্রশ্নের মধ্যে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কাউকে পরাশক্তি গণ্য করা নাই বা হয়নি। একালে কেউ পরাশক্তি কি না তা এখানে মুখ্য বিষয়ই নয়। মুখ্য বিষয় গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা বা নেতৃত্ব কার, সেখানে। ফলে তা আসলে এখন মূলত পুরনো নেতা আমেরিকার জায়গায় নতুন হবু নেতা চীনের যোগ্য হয়ে দখল নেয়ার ইস্যু।

এই হিসাবে এখানে নেতা বা কেন্দ্র দুইটা – চীন ও আমেরিকা। তাহলে, সাথে ভারতের নামও আসছে কেন? কারণ, ভারত আমেরিকার হয়ে সে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটত। প্রতিদান হিসেবে পেয়ে গেছিল বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান ছড়ি ঘুরিয়ে মাতবরি। এছাড়াও আর একটা দিক হল, চীনের প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যার দেশ হল ভারত। ফলে এখনই না হলেও ভারত পটেনশিয়াল বা আগামীর সম্ভাবনা ভাল, এমন অর্থনৈতিক হবু শক্তি; এতটুকুই। তাতে সব মিলিয়ে ভারত ভেবেছিল এভাবেই দিন যাবে “চীন ঠেকানোর” বোলচালের মধ্যে থাকবে আবার চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ খুললে তাতে চীনের পরই বড় মালিকানা শেয়ারটা চীন ভারতকেই দিবে। ব্যাপারটা সেই কবিতার মতো যেন বলছে – “এভাবে কি দিন যাবে তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে অথচ তোমার কথা না ভেবে!’ ভারত আগামি গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা চীনের কোলে শুয়ে অথচ আমেরিকার কথা ভেবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারবে – তাই ভেবেছিল।
কিন্তু না একালে দিন তেমনভাবে যায়নি। যাওয়ার কথাও ছিল না। এখন ফলাফল হল বাংলাদেশ আমেরিকার হাতছাড়া, উল্টা বাংলাদেশ এখন ভারতের কোলে, সেটা সত্য। কিন্তু ওদিকে আবার ট্রাম্পের আমলে এসে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটাতে ট্রাম্পের আমেরিকাই আর আগ্রহী নয়। উল্টো চীনের মত ভারতের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প বাড়তি শুল্ক আরোপের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। যেখান থেকে ভারত আবার মোচড় দিয়ে নিজের আত্মগরিমা আর ট্রমা-ভীতি পেছনে ফেলে চীনের কোলে য়ুহান সামিটে হাজির। বলা হচ্ছে, ওই য়ুহান সম্মেলন সেখানে এমন কিছু মৌলিক বোঝাবুঝির ভিত্তি নাকি তৈরি হয়ে গেছে, যা আরো বিকশিত বা বাড়তে না পারলেও নাকি পিছাবে না। আমেরিকার সাথে ভারতের পরস্পরের পণ্য অন্যের যার যার বাজারে ঢুকার বিরুদ্ধে উভয়েরই বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ফলে – এটা দুদেশেরই রপ্তানি প্রায় স্থবির করে ফেলেছে। গতমাসে জাপানে জি২০ এর বৈঠকের ফাঁকে সাইডলাইনে ট্রাম্পের চাপ বা হুমকি – মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্কারোপ গ্রহণযোগ্য নয় – এসবই একালের পরিণতি।

কিন্তু ট্রমা- ভারতের ট্রমা [Trauma] সে ব্যাপারটা কী? বিষয়টা হল, ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের হার, এটাই তাকে বারবার বেচাইন অস্থির করে যে যদি একালে আবার সেটা হয়, এটি ভীতিই ভারতকে বারবার আমেরিকার দিকে টেনে নিয়ে যায়। চীন আগামির ফ্রেশ গ্লোবাল নেতা, তুলনায় আমেরিকা ক্রমশ ডুবে যাওয়া নেতা – এটা ভারতের অজানা নয়। তাই আমেরিকার চেয়ে আগামি নেতা চীনের সাথে আগেই গাটছাড়া বাধলে গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রভাব প্রতিপত্যি আগেই বাড়বে শুধু তাই না, আগামি দুনিয়ার যা কিছু নতুন রুল তৈরি হবে তা তৈরিতে নিজের ভুমিকা মতামত আগেই চীনের পাশাপাশি জোরদার করে রাখতে সুবিধা পাবে।  কিন্তু ট্রমার জন্য ভারত আমেরিকার দিকেই বারবার ফিরে আসে, কান্নি মেরে পরে থাকে। অর্থাৎ বলা যায়, ভারত আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ককে ভারসাম্যের জায়গা থেকে দেখে না, দেখতে পারে না। বরং আমেরিকাকে পুরনো পরাশক্তির আলোকে দেখতে চায়। কিন্তু চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব তো পরাশক্তিগত নয়। তবু ভারত আমেরিকার দিকেই কেবল ছুটে যায়। এছাড়া সবখানেই ভারতের গাছের খাওয়া আবার তলারও খেতে চাওয়ার নীতি তো আছেই। আবার তাতে সময়ে ধরাও খায়। যেমন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ট্রাম্প নিজের আফগান পলিসি প্রকাশ করেছিলেন। এতে পাকিস্তানকে সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেবার অভিযোগ দিয়ে সাজানোতে ভারত আবার তাতে ছুটে গিয়েছিল মোহে। কিন্তু না! ছয় মাস যেতেই জানা গেল ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে শেষ হাজার দশেক আমেরিকান সৈন্য, তাও এবার ফেরত আনতে চান। অথচ আফগান নীতিতে এর কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। যা হোক, সৈন্য ফেরতের চিন্তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেখল, পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া তা অসম্ভব। ফলে যে পাকিস্তানকে আমেরিকা চীনের কোলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, তাকেই আবার কুড়িয়ে নেয়া শুরু করেছিল।

আমেরিকার আফগানিস্তান-বিষয়ক বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ [U.S. envoy Zalmay Khalilzad ] এই সেই বিশেষে দুত যিনি ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রকাশের সময় পাকিস্তানের কঠোর সমালোচক, উঠতে বসতে সন্ত্রাস লালনকারী বলেছিল। সেই তিনি এবার সৈন্য ফেরানোর উপায় হিসেবে তালেবানদের সাথে কথা বলা আর রফাচুক্তি করার চেষ্টায় পাকিস্তানের সহায়তা কামনায়  এসে এবার পাকিস্তানকেই প্রায় বাপ ডাকা বাকি রেখেছে।  এরই সর্বশেষ হল আজ ১৫ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে “আফগান শান্তি আলোচনা থেকে ভারতকে কুনুই মেরে বের করে দেয়া হয়েছে” [India elbowed out of Afghanistan peace talks]।

আবার, সাম্প্রতিককালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান “ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স” [Financial Action Task Force (FATF)] প্রবল সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এই সংগঠন মূলত মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার যার একটা বড় অংশ জঙ্গিসংগঠনের অর্থ যোগানদাতা বলে অনুমানে এরই কাউন্টার করতে নানান পদক্ষেপ নিয়ে থাকে ও তা মনিটর করে। এতে আমেরিকার উদ্যোগে পাকিস্তানকে চেপে ধরাতে [পাকিস্তানের অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুতিমত তা নেয় নাই। তারিখ মিস করেছে।] ভারত খুবই খুশি ছিল। নিজ মনকে আশ্বস্ত করেছিল ভারত যে, হ্যাঁ অন্তত এই টেররিজম ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার এই অ্যালায়েন্স, এটাই তো ভারত চায়। এটা খুব দরকারি আর কাজেরও। এবং তারা দুই-রাষ্ট্র কত ভাল এবং তার টেররিজম ইস্যুতে একটা ন্যায্য লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। তাই তারা পাকিস্তানের মত নয়। অনেক ভাল। কিন্তু ঘটনার বাস্তবতা হল, এমন টেররিজম ইস্যু বলে আসলে বাস্তব দুনিয়াতে সত্যিকারের কিছুই নেই। টেররিজম কী, কোনটাকে বলবে, কী হলে বলবে এর এমন সংজ্ঞাই নাই – না আমেরিকার নিজের কাছে, না জাতিসংঘের। কেবল এক তালিকা আছে, কাদেরকে বা কোন সংগঠনকে তারা টেররিস্ট মনে করে। আর সেই থেকে বরং টেররিজম বলতে ভারত-আমেরিকা নিজেরা কী বুঝবে ও বুঝাবে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে “গভীর বোঝাবুঝি” আছে অবশ্যই। কাকে টেররিজম বলে চালিয়ে দিবে – সেটাই আসল সেখানে। যেমন- ২০০৭ সালে যা বলা হয়েছিল ওর সারকথা ছিল যে, বাংলাদেশকে টেররিজম মোকাবেলার যোগ্য করে সাজাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। অথচ এই “টেররিজম” কথাটি ছিল এক সাইনবোর্ড মাত্র। ভারতের মূল স্বার্থ ছিল আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাতে, তা ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা আর কলকাতা থেকে নর্থ-ইস্ট সরাসরি যোগাযোগের নানান করিডোর হাসিল করা।  সেকাজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর এককভাবে হাসিল করেছে ভারত। এখানে এককভাবে কথাটার মানে হল, করিডোর কেবল ভারতই ব্যবহার করবে, চীন পারবে না। এছাড়া সেই সাথে ভারত পুরা বাংলাদেশের বাজার দখল পেয়ে নিবে।  সার কথা ভারত কেবল “কানেকটিভিটি” “কানেকটিভিটি” বলে চিৎকার করবে, মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। কিন্তু এর মানে হবে বাংলাদেশের উপর দিয়ে কেবল ভারতই যাবে। কিন্তু ভারতের উপর দিয়ে কেউ যদি বাংলাদেশে আসতে চায়, আমরা যেতে চাই – না সেটা সে পারবে না। সেটা নেপাল, ভুটান কিংবা চীন এমন পড়শি কেউ যেই হোক তারা বাংলাদেশে আসতে পারবে না বা আমরাও যেতে পারব না। আর ভারত সব পাবার বিনিময়ে  আমেরিকার স্বার্থে ভারত এবার  “চীন ঠেকানোর” কাজে অবস্থান নিয়ে ভাড়া খাটবে। তাহলে দাঁড়াল যে এই হল ভারত-আমেরিকার টেররিজমের সংজ্ঞা ও বিশেষ বুঝাবুঝি। আর সেই সাথে সীমান্তে বাংলাদেশি মেরে শেষ করে চলবে। কিন্তু? হা আরও বিরাট “কিন্তু” তৈরি হয়েছে এখন।

ভারত-আমেরিকার এই “বিশেষ টেররিজম-বুঝের” সাইনবোর্ড তাদেরকে অনেক কিছু এনে দিয়েছিল, বিশেষ করে তাতে ভারতের  আস্থা ছিল দৃঢ় ও গভীর। কিন্তু টেররিজম-বুঝের সাইনবোর্ড এখন তা করলার চেয়েও তিতা। কেন? বালুচিস্তান!

বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা পাকিস্তান থেকে আলাদা স্বাধীন হতে চাওয়ার আন্দোলন অনেক পুরনো। কিন্তু এতে পাকিস্তান সরকারের সাথে কোনো নেগোসিয়েশন বা রফা-পরিণতিতে না যেতে পারার পেছনে একটা বড় কারণ হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এই আন্দোলনের দলকে [(বিএলএ), Baluchistan Liberation Army (BLA)) প্রায় খোলাখুলি সহায়তা ও সমর্থন। কিন্তু এবার এক বিরাট কিন্তু হল,  গত ২ জুলাই আমেরিকা পররাষ্ট্র দফতর বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট [Specially Designated Global Terrorists (SDGTs)] বলে ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের এক নির্বাহী নির্দেশে এটা জারি করা হয়েছে গত সপ্তাহে, ০২ জুলাই।

পাকিস্তানে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে (বিএলএ) বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ২০০৬ সালে এই সশস্ত্র গ্রুপটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। বলাই বাহুল্য, এবারের ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে চীন ও পাকিস্তান উভয়ে স্বাগত জানিয়েছে। অথচ চিপায় আটকা পড়ে ‘কোথাও নেই’ হয়ে গেছে ভারত। বিএলএ-কে টেররিস্ট বলায় এতে চীনেরও স্বার্থ ছিল সরাসরি। কারণ, পাকিস্তানের পেট চিরে পাকিস্তানের সব প্রদেশ ছুয়ে তাদের উপর দিয়ে টানা “চীন-পাকিস্তান করিডোর” [CPEC] স্থাপনার কাজে চীনা ঠিকাদারের কর্মীরা বারবার বিএলএ’র হাতে অপহরণের বা চাঁদা দানের শিকার হয়েছে বহুবার, চলতি শতকের শুরু থেকেই। সেসময় মনে করা হত, চীন-পাকিস্তানের এমন সহায়তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ভারত  (বিএলএ)কে সহায়তা দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই নির্বাহী নির্দেশের পরে? আরও আছে!

ট্রাম্পের বিএলএ-কে শুধু টেরর ঘোষণা করা নয়, আগামী ২২ জুলাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-ইমরানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার এক ঘোষণাও দিয়েছে হোয়াইট হাউজ, গত ১১ জুলাই। মানে ব্যাপারটা এক কথায় বললে আমেরিকার নিজের কৌশলগত অন্য কোনো স্বার্থে – এককালে আচারের আঁটির মতো চুষে রস খেয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া পাকিস্তানকে আবার এবার সমাদরে কোলে তুলতে চাইছে আমেরিকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এখানেও (বিএলএ)কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়া আসলে কোন টেররিজম ইস্যু নয়, সাইনবোর্ড মাত্র; আমেরিকার কৌশল্গত স্বার্থ মাত্র, যা আগে বাংলাদেশের মতোই। তাহলে ভারতের এখন এতে বাকশূন্য বোকা হয়ে যাওয়া কেন? যাকে কেউ কেউ বলছে তিতা ওষুধ খাওয়া। কারণ হল, ভারতের কাশ্মিরে সরকারি টেররিজমের নিপীড়ন ও হত্যার পক্ষে এতদিন ভারতের পক্ষে একটা ন্যায্যতা বা সাফাই জোগাড় করে দেয়া হয়ে যেত এই বলে যে, টেররিজমের একক হোতা হল পাকিস্তান বা মুসলমানরা। কিন্তু আমেরিকার বিএলএ-কে টেররিস্ট ঘোষণা করাতে এবং  ঘোষিত সেই দলকে খোদ ভারতই সমর্থন করত বলে ভারত হয়ে গেল এখন টেররিস্ট-সমর্থক রাষ্ট্র ; আমেরিকা পরোক্ষে এবার তাই বলে বসল।

তাহলে এখান থেকে কী শিক্ষা? শিক্ষাটা হল, চলতি এযুগ গ্লোবাল নেতৃত্বের বিশেষত, অর্থনৈতিক নেতৃত্বের নেতা বদলের যুগ এটা। আবার খেয়াল রাখতে হবে, এটা সোভিয়েত-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়। ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা কথাটা বুঝতে হবে। সেকালে এর মানে ছিল এক ব্লকের কোনো রাষ্ট্রেরই অপর ব্লকের কারো সাথে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক রাখত না, হারাম মনে করত, তাই সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না।

অথচ এ কালে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যতই ঝগড়া বা রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধই থাক না কেন- সেখানে একই সাথে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে সব বিনিময় লেনদেন-বাণিজ্যও সমানে চলে থাকে। অতএব, এ কালের ফর্মুলা হল সবার সাথেই নিজস্বার্থ মুখ্য করে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে লেপটে থাকা। তাই চীন, না আমেরিকা, নাকি ভারত এভাবে কারও দিকেই এককভাবে কান্নি মেরে থাকা যাবে না। এটা আবার শর্টকাট কোনো ন্যাশনালিজমের মত তা ভেবে বসাও ভুল হবে।

কাজেই আপনি ভারতের দালাল – নিজভূমিতে অন্যকে করিডোর দিয়েছেন, বাজারসহ সব খুলে দিয়েছেন এমন ভারতের দালাল, নাকি আপনি চীনের বিনিয়োগ এনে সয়লাব করেছেন সেই চীনা দালাল- এ দুটোই ভুল পথ। এমনকি এ দুইয়ের ভয়ে আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছেন, এটাও ভুল। বরং তিনের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে হবে কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণভাবে। এককভাবে কারো সাথে সম্পর্ক [এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ সম্পর্ক, বন্ধুরাষ্ট্র ইত্যাদি সব] একালে হারাম, বরং কার সাথে কতটুকু যাবেন তা আগেই নিজ বোঝাবুঝি ঠিক করে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তা বলা যেতে পারে, কখনো বলা যাবে না, কাজে দেখাতে হবে। কিন্তু নিজে কী করবেন সেই নিজ হোমওয়ার্ক অবশ্যই আগে করে রাখতে হবে।

সোনাদিয়ায় বন্দরসহ বিসিআইএম করিডোর নির্মাণ আমাদের কৌশলগত মৌলিক স্বার্থ। অথচ ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্যে রাখতে এটা কমপক্ষে ১০ বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রাখা হয়েছিল। আমাদের ‘নিশীথ ভোটের’ পরবর্তীকালে এ থেকে পরে পাওয়া দিকটা হল, এটা উন্মোচিত হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় আসার জন্য কারোই আর ভারতের সমর্থন জরুরি বা এসেনশিয়াল নয়। আবার আমেরিকাও এখন বিষহীন ঢোঁড়া সাপে পরিণত। আর বিরোধী দলসহ সারা দেশের মানুষ আজ ভারতকে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা দানব মনে করছে। ফলে তারা ভারতবিরোধী। লক্ষ্যনীয় যে এবারই প্রথম এই ভারতবিরোধিতা পুরাপুরি রাজনৈতিক, এ টু জেড রেখা টানতে পারবেন। তাই এটাই তো হাসিনার জন্য ছিল সব উপেক্ষা করে নিজস্বার্থে চীন সফরের সবচেয়ে ভালো সময়। শেখ হাসিনা যা বুঝেই নিয়ে থাকেন না কেন, এক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ওদিকে এতে চীনা প্রতিক্রিয়া বা সাড়া ব্যাপক। তারা আশাতীত খুশি যে, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। চীনা গ্লোবাল টাইমস তিনটারও বেশি আর্টিকেল ছেপে উচ্ছসিত। হাসিনাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, বাংলাদেশ বেল্ট-রোড আর বিসিআইএম [BCIM-EC] করিডোরে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, Hasina in balancing act between China, India। [এই রিপোর্টের শেষেই সবগুলো খবরের লিঙ্ক পেতে পারেন]।

তারা আসলে আরও খুশি এ জন্য যে, বিসিআইএম প্রকল্প জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এতে বা বেল্ট রোডে ভারত যোগ দেবে হয়তো কোনো এক কালে, আমেরিকার হাতে কোনো পরিস্থিতিতে চরম নাকানি-চুবানি খাওয়ায় বিধ্বস্ত হওয়ার পরে। কিন্তু কথাটা তারা ইতিবাচকভাবে লিখেছে।  সেকথা আমাদের ইউএনবি বার্তা সংস্থার বরাতে ভারতের দ্যা হিন্দু পত্রিকা বিরাট করে লিখেছে [“the initiative would have to be revived working together with India,” the United News of Bangladesh (UNB) reported on its website.]।

প্রথম আলোতে চীন সফরঃ
তবে হাসিনার চীন সফর প্রসঙ্গে প্রথম আলোর ভুমিকা খুবই নেতিবাচক। প্রায় সময় সে আমেরিকান অবস্থান নিয়ে খবর হাজির করে থাকে। এবার আমেরিকার হাসান ফেরদৌস যে লেখাটা লিখেছে সেটা অর্ধ সত্য বা পুরাই অসত্য। আর তা আমেরিকার তো বটেই, ভারতের অবস্থানে দাঁড়িয়ে লেখা। মূলত তিনি কোন যুক্তি বলা ছাড়াই চীনবিরোধী। এই খামতি তিনি পুরণ করতে, আশির দশেরর চিন্তায় ও তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আবার ভারতীয় প্রপাগান্ডা খেয়ে লিখছেন, ভারত নাকি আমাদের চীনের মতই ঋণ দিয়ে অবকাঠামো গড়ে দেওয়ার সঙ্গী। যেমন লিখছেন, “চীন ও ভারত দুই দেশই আমাদের অবকাঠামো খাতে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে”। কিন্তু ভারত কোন অবকাঠামো আমাদের গড়ে দিয়েছে? নিজস্বার্থে করিডোরের কিছু অবকাঠামো গড়ে নেয়া ছাড়া? তা আমাদের জানা নাই। যেমন ভারতের বহরমপুর জেলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে আসাম – এই তেল পাইপ লাইন স্থাপন কী বাংলাদেশের স্বার্থে্র অবকাঠামো? এছাড়া ভারত কী কাউকে অবকাঠামো ঋণ দিতে সক্ষম এমন অর্থনীতির রাষ্ট্র? নাকি ভারত এখনো নেওয়ার রাষ্ট্র? এসব তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? এতো ভারতের প্রপাগান্ডায় দালালী! আজীব! এছাড়া লেখার শিরোনামসহ তিনি হাসিনা সম্পর্কে আনন্দবাজারি স্টাইলে লিখছেন তিনি নাকি “চীনা তাস” খেলতে গেছেন। যেন বিনোদন দিতেই লিখতে বসেছেন। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সম্পর্কে লিখছেন, “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” সেজন্য নাকি এই বন্দর নির্মাণ হয় নাই। আবার নিজেই বলছেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সে (সোনাদিয়া) উদ্যোগ ভেস্তে যায়”। এই তথ্যও ভিত্তিহীন যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প কিছু দেওয়াতে তার কোন আপত্তি ছিল না। আপত্তি একমাত্র ভারতের।  আবার “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” – এই কথা সত্যি হলে হাসিনা চীন সফরে কী বিনোদনের জন্য গেছিল? আর [BCIM-EC] আবার শুরু করতে আলাপ তুলল কেন? আর [BCIM-EC] তে যদি বন্দরসহ প্রকল্প এটা নাই হয় তবে এটাকে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের এক “করিডোর” ভাববার কোন সুযোগই নাই। এমন ভাবনা তো আসলে ভারতের অবস্থান। তাও পুরানা অবস্থান। ভারত সেখান থেকে নড়াচড়ার আলামত দেখাচ্ছে। আসলে হাসিনার চীন সফর নিয়ে কিছু বলার জন্য নুন্যতম তথ্য পড়াশুনা নাড়াচাড়ার দরকার তা তার কাছে নাই, হোমওয়ার্ক নাই। আরও আজিব কান্ড পায়রা বন্দরকে সোনাদিয়ার বিকল্প বলে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পায়রা চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে একটু বড়। এছাড়া ড্রাফট বা গভীরতার লিমিটেশন আছে তাই একে গভীর সমুদ্র বন্দর বলতে অনেকের দ্বিধা আছে। এছাড়া সারা বছর বন্দরে প্রবেশ অংশকে নাব্য রাখতে হলে সারা বছরই একে ড্রেজিং করে যেতে হবে। তাই আমেরিকার চোখেই বাংলাদেশের দুটা বিস্ময়কর বিনিয়োগ হল, পায়রা আর রূপপুর। এককথায় বললে, চীন ঠেকানী মুডের ভারতের মান-মন রাখতে এটা এক অর্থহীন, টাকা পানিতে ফেলা প্রকল্প। তাঁর আজগুবি তথ্য আরও আছে। তিনি বলেছেন, এবার এপ্রিলে চীনে “বেল্ট-রোড সামিটে নাকি প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম নেতৃত্ব দিতে” গিয়েছিলেন। এটা ভুল তথ্য। বরং প্রতিনিধি নেতা হিসাবে গেছিলেন আসলে বাণিজ্যমন্ত্রী মজিদ হুমায়ন। যেটা গওহর রিজভিও নিশ্চিত করেছেন পাবলিকলি। আর হংকংয়ের পত্রিকায় সাক্ষাতকার শাহরিয়ার আলম দিয়েছিলেন কথা সত্য কিন্তু কোথায় বসে তা অস্পষ্ট। ঢাকায় বসেই খুব সম্ভবত, এবং তা ভারতের আয়োজনে। খুব সম্ভবত ঠিক সেসময়ের দ্বিধাগ্রস্থ হাসিনাকে কাজে লাগিয়ে। যেটার পুরা পরিস্থিতি বদলে যায় চীনা রাষ্ট্রদুতের উদ্যোগে ফলে, বিশেষ করে বিএনপিকে -সহ  স্থানীয়ভাবে সরকার, রাজনীতিক, সাংবাদিক ইত্যাদি নানান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে “বাংলাদেশ-চীন সিল্ক রোড ফোরাম” গঠন করে ফেলার পরে; হাসিনা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
এখন কথা হল, প্রথম আলো এমন অর্ধসিদ্ধ লেখা ছাপাচ্ছে কেন? লেখকের পরিচয় হিসাবে নিচে লেখা থাকে, ” হাসান ফেরদৌস, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি”। অর্থাৎ এটা অপিনিয়ন বা কোন গেস্ট লেখকের কলামও নয়, প্রথম আলোর নিজের। তাহলে প্রথম আলো, সে কার পক্ষে থাকতে চায়? ভারত বা আমেরিকার সমর্থনে ভারতের পক্ষে? ওর ম্যানেজমেন্ট কী এগুলো দেখে নাই, জানে না? অদ্ভুত ব্যাপার! তবে একটা জিনিষ আমরা পরিস্কার থাকতে পারি। এটা চলতে থাকলে বড় কাফফারা দিতে হবে।

কিন্তু কথা হল, তাতে চীন ভারতকে যতই সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ডালি চীন বা বাংলাদেশ যতই সাজিয়ে রাখুক না কেন অথবা বিসিআইএম প্রকল্পে ভারতের যোগদানের দরজা খুলে রাখুক না কেন – এতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি খুব সহজ নয়। আবার তা অসম্ভবও নয় নিশ্চয়। আবার এটা হতেও পারে যে, দেখা গেল ট্রাম্পের বাকি আমলের (জানুয়ারি ২০২১) মধ্যেও মোদী সিদ্ধান্ত নিতেই পারলেন না। [একটু আগের খবর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ভারত সফরের (এটা গত বছর চীনে মোদীর “য়ুহান সামিটের” পাল্টা সমতুল্য সফর)] তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও তা সেই অক্টোবর ১২ তারিখে। অর্থাৎ বুঝা গেল মোদীর তেমন তাড়া নাই।  যদিও অনেকে অবশ্য বলছেন, গত জুন মাসে কাজাখস্তানে সাংহাই করপোরেশনের [SCO] শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানে ঐ সম্মেলনের এক যৌথ ঘোষণা থেকে বেল্ট রোড প্রকল্পের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়। আগে এমন হলে, তাতে ভারতের আপত্তি আছে বা অংশগ্রহণে ভিন্নমত আছে বলে তা সাথে উল্লেখ থাকত। এবার তেমন কিছুই দেখা যায়নি। অনেকে এর অর্থ করছে যে, ভারত সম্ভবত এখন থেকে এতটুকু সরেছে যে সে বেল্ট-রোডের প্রসঙ্গটা গ্রহণও করেনি আবার বিরোধিতাও করেনি, এমন অবস্থায় এসেছে – আগের আপত্তির জায়গা থেকে সরে এসে।

তবুও এতে তেমন আশাবাদী না হওয়ার অন্য কারণ হল, যে হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা তুলে মোদি আবার ক্ষমতায় এসেছেন তা হলো চরম মুসলমান বিরোধিতা, যেটা পারলে ভারত থেকে প্রায় মুসলমান জনগোষ্ঠিকে মুছে নির্মুল করে ফেলার এক আকাঙ্খা যেন, যার মানে মুসলমানের কারণে পাকিস্তান বিরোধিতাও। কিন্তু এই ডিভিডেন্ড বা বাড়তি লাভ মোদী সহসাই লঘু করতে চাইছেন না। আগামী পাঁচ বছরজুড়েই ভারতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ রাজ্য করে নির্বাচন হবে। তাই এই একই মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুত্ব মোদীকে ব্যবহার করে যেতে হবে। এ ছাড়া বাবরি মসজিদ মন্দির বানানো, আসামসহ সারা দেশে নাগরিকত্ব পরীক্ষার নামে মুসলমান খেদানো, পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে সেসব রাজ্যসরকার দখল, কাশ্মিরে চরম বলপ্রয়োগে একে  কনষ্টিটিউশনালি ভারতের অঙ্গ করে নেয়া; এমন অনেক কিছু মোদির কর্মপরিকল্পনার তালিকায় আছে।

এদিকে যদিও ঐ সাংহাই করপোরেশন মানে হল, যেখানে চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া আর, ভারত-পাকিস্তানও এর সদস্য। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ‘টোন-ডাউন’ করা মোদীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর হলেন মোদী – এই বোলচাল মিথ্যা হলেও নিজের এই নির্বাচনী ইমেজে তিনি জিতেছেন তাই এটা তিনি আবছা হতে দেবেন না। যদিও ওদিকে আবার মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে এবার আমেরিকা ভারতের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নাই এটা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে মুখোমুখি।

অতএব, ভারতকে বাদ রেখে বন্দরসহ বিসিআইএম প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। ভারতের জন্য অপশন খোলা থাকবে, যার ফাইন্যান্সিয়াল দায়ভারসহ যুক্ত হতে চাইলে ভারত সে সুযোগ নিতে পারবে। কারণ, ভারত সহসাই প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে, এমন আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিন।

শ্রীলঙ্কা ড্রামাঃ
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা এক নতুন ড্রামার মঞ্চস্থল হয়ে উঠেছে। এম ভদ্রকুমার হলেন ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত। তিনি তার কলামে হাসিনার চীন সফর সফল ও বিরাট অর্জন বলে প্রভুত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আবার  লিখেছেন, ” শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালেই, অ্যাঙলো-আমেরিকান ‘রেজিম বদল’ প্রকল্পে সঙ্গ দিয়ে ভারতের কূটনীতি ইতোমধ্যেই হাতে রক্ত লাগিয়ে ফেলেছে [“In Sri Lanka (2015), Indian diplomacy tasted blood by collaborating with the Anglo-American project at ‘regime change.”] …… আর এখন যা হচ্ছে তাতে ভারতকে পাপোষের মতো ব্যবহার করে আমেরিকা শ্রীলঙ্কায় ঢুকে পড়েছে। শ্রীলঙ্কাকে সামরিক চুক্তিতে জড়িয়ে নিচ্ছে, অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ধন্য আমেরিকান হস্তক্ষেপ নীতি। [Meanwhile, the US used India as a door mat to make inroads into Sri Lanka. And the result is Sri Lanka has been seriously destabilized, thanks to intrusive US policies]। আসলে ওখানে রাষ্ট্রপতি সিরিসেনা আমেরিকাকে ডেকে আনার নায়ক। তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রয়োগ করে এক উগ্র বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা [নাম Galagoda Aththe Gnanasara],  তাকে জেল থেকে ছুটিয়ে এনেছেন। তার এক ধর্মীয় সংগঠন আছে নাম Bodu Bala Sena (BBS) or “Buddhist Power Force”। মানে কথিত অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের এই নেতা নিজ সংগঠনের নাম রেখেছে “পাওয়ার ফোর্স”। এরপর তাঁর সম্পর্কে আর কিইবা বলার বাকি আছে। তিনি সম্প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উগড়ানো এক পাবলিক মিটিং করেছেন। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের এই ধারাই মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন রোহিঙ্গাবিদ্বেষী একই বৌদ্ধ ধারা। অর্থাৎ ফলাফল হল,শ্রীলঙ্কায় চীনের প্রভাব দমাতে গিয়ে ভারত ব্যাপক রক্তপাত ঘটানোর পর এখন এর মাখন উঠিয়ে দিচ্ছে বা তা নিয়ে যেতে এসেছে আমেরিকা।

তা হলে এশিয়ায় মূল বিষয়টি হচ্ছে, না চীনের কোলে না ভারতের – এটাই বাঁচার উপায়। ভারসাম্যের নীতিতে, কারো দিকে কান্নি না মেরে থাকা। আর কেবল নিজের স্বার্থের দিকে ফোকাসের নীতি – এভাবে হোমওয়ার্ক করে আগানো, এই নীতিই একমাত্র বাঁচোয়া। কিন্তু ভারত ভারসাম্যের নীতি না মেনে চলার দেশ। তাই বরং উলটা, আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকার নীতি ভারতের। যে আমেরিকা আবার চলে নিজের একক স্বার্থে। আমেরিকার বেলায়, বালুচদের টেররিস্ট ঘোষণা করে দেয়া অথবা শ্রীলঙ্কায় সামরিক চুক্তি করে ঢুকে পড়া, এগুলো এর উদাহরণ হলেও এসব বিষয় ভারতকে হুঁশে আনবে, এমন ভরসা করা কঠিন।

তবে যারাই চীনের বদলে ভারত অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য খুনখারাবি পর্যন্ত যাবে, সম্পর্কের ব্যাপারটা যারা এভাবে দেখবে বা এই ভুল করে বসবে – এরাই সবশেষে সব খুইয়ে নিজের সব অর্জন আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে থাকে। হাসিনার জন্য এটাও এক বিরাট শিক্ষা হতে পারে যে, যদিনা সেও আবার শেষে আমেরিকাকে ডেকে নিয়ে না আসে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) এটা ভারসাম্যের যুগ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

 

Advertisements

চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদুল ফিতর ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯

প্রথম অনলাইন প্রকাশঃ ০৪ জুলাই, ২০১৯

https://wp.me/p1sCvy-2C8

 

[এই লেখাটা গত ঈদে মানে, গত মে মাসে ঈদুল ফিতরের ঈদ সংখ্যা নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে ছাপা হয়েছিল। সে হিসাবে এর প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯। কিন্তু এর কোন অন লাইন ভার্সান তারা করে নাই। সেকারণে  ঐ ছাপা ভার্সানেরই হুবহু সফট কপি, (নতুন কোন এডিট করা ছাড়াই) এখানে নতুন করে আনা হল। সাথে ছাপা ভার্সানের প্রথম পৃষ্ঠার একটা স্কান কপি ছবি আকারে উপরে সাটানো হল। লেখাটা যখন শেষ করে জমা দিয়েছিলাম, সেটা ছিল ১ মে ২০১৯।
ফলে মে মাসের পর থেকে ফোনের ৫জি টেকনোলজি ইস্যুতে চীন ও আমেরিকার গভীর স্বার্থ সংঘাত আর বিপরীতে চীন ও ইউরোপের পারস্পরিক স্বার্থ খাপ খাইয়ে নেয়ার সম্পর্ক সংক্রান্ত যা কিছু ডেভেলবমেন্ট ঘটেছে তা এখানে আপডেট করা নাই। সেসব নিয়ে আলাদা আবার লিখতে হবে। তবে ৫জি নিয়ে চীন-আমেরিকার সংঘাত এখনও চলছে।হুয়াওয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা সাবরিনা মেঙ’ কে আমেরিকার অনুরোধে কানাডা গ্রেফতার করেছিল, সাত মাস আগে। কানাডা-আমেরিকার মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি আছে। তাই আমেরিকায় দায়ের করা এক মামলার অভিযোগ সাবরিনার কানাডা সফরের সময় যেন তাঁকে গ্রেফতার করে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়া হয় – সেই আবেদন আগেই কানাডাকে জানিয়ে রেখেছিল আমেরিকা। তাই  ঐ কর্মকর্তা সাবরিনার কানাডা ট্রানজিট সফরে থাকার সময়ে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল কানাডা; যাতে কানাডারই আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে  কানাডা সরকার তাঁকে আমেরিকার হাতে তুলে দিতে পারে। বর্তমানে সাবরিনা জামিনে তবে কানাডা ত্যাগ করতে পারবে না, এই শর্তে যে মামলা না মিটে যাওয়া অব্দি। আর স্থানীয় থানায় রিপোর্ট, সাথে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে ও মামলা মোকাবিলা করে যেতে হবে। ইতোমধ্যে চীনা ৫জি টেকনোলজি দুনিয়া কাঁপিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।]

চীনা ইন্ডাস্টিইয়াল টেকনোলজি কোন পর্যায়ে আছেঃ
চীনা শিল্প-পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত টেকনোলজি কেমন পর্যায়ের, কেমন মানসম্পন্ন অথবা কোন স্তরে আছে চীনা টেক-শিল্প? এই প্রসঙ্গে চীনা টেকের মান যেন খুবই নিচে এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে চীনকে ব্যঙ্গ করা, নিচা দেখানো বা খোঁটা দিয়ে কথা বলা এমন লোকের কোনো অভাব নেই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে মানে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্ব এখন বাঁক পরিবর্তনের পর্যায়ে আছে, চলছে। এমনই আমাদের চলতি দুনিয়ায় চীনা উত্থানকে, সঠিক অথবা বেঠিকভাবে, যারা নিজ নিজ রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের পরাজয় হিসেবে দেখে থাকে ( ফলে অনেক সময় এতে তাদের অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা চেপে রাখতে পারে না, প্রকাশ হয়ে পড়ে) এমন রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষে আছে ভারত। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, তবু চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন যথেষ্ট গভীর।

ভারতীয় অর্থনীতিতে বিদেশী বিনিয়োগ তা, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অথবা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ (মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট, FDI)  এই দুই অর্থেই ভারতের অর্থনীতিতে চীনা বিনিয়োগ এখন এক বিরাট ভূমিকা ও অবদান নিয়ে হাজির আছে। যেমন ব্রিকস (BRICS) উদ্যোগ হল,  বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের এক বিকল্প গড়তে চীনের সাথে মোট পাঁচ রাষ্ট্রের এক উদ্যোগের নাম, চীন যেখানে মূল উদ্যোক্তা। ভারতও অবশ্যই এই উদ্যোগের সাথে আছে, শুধু তাই না। এই ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) নামে আর এক বিকল্প-বিশ্বব্যাংকও চালু আছে। কাজ ও তৎপরতার ধরনের দিক থেকে এটাও এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের নেতৃত্বে যে মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক আছে (যেখানে চীনের ৩০% মালিকানার পরই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মালিকানা ১০%) এরও বাইরের প্রতিষ্ঠান NDB, আর তা আর এক চীনা বিকল্প-বিশ্বব্যাংক অবশ্যই। যদিও মনে রাখতে হবে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) -এটা এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক থেকে একেবারেই আলাদা এক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তুলনায় খুবই ছোট। তবে এই দুই বিকল্প-ব্যাংকের মধ্যে মূল ফারাক বুঝতে গেলে এটা মনে রাখলেই চলে যে, আসলে ব্রিকস উদ্যোগের নামে চলা যেকোনো তৎপরতা তা কেবল চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তাতে সে তৎপরতা এই (NDB) ব্যাংকের সুবিধাদির গ্রহীতা বা দাতার যে ভূমিকারই হোক না কেন। মানে পাঁচের বাইরের আর কেউ এর সদস্য না, ফলে ব্যাংকের সুবিধাদি তাদের বাইরের কেউ পাবেও না। আবার নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ দেয়া হয়েছে ভারতকে আর সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতা এই ব্যাংকের একমাত্র বিনিয়োগ ‘খাতক’ হল ভারত।  নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কেবল পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের বিপরীতে তাহলে এআইআইবি ব্যাংকের সাথে এর মূল ফারাকটা হল, সর্বশেষ লেবাননকে সাথে ধরলে এআইআইবি ব্যাংকের মোট সদস্য ৮৭ রাষ্ট্র, যারা সবাই এআইআইবি-এর সুবিধাদি পাওয়ার যোগ্য। সার কথায় বোঝা গেল চীনের সাথে ভারতের গাঁটছড়া ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অনেক গভীরের, উপরে উপরে তা যতই রেষারেষির বলে দেখাক না কেন।

কিন্তু তবু ভারতের কূটনীতিতে বাস্তব কৌশলগত তৎপরতাগুলোর সবটাই চীনবিরোধী করে সাজানো। এমনকি সম্প্রতি অভ্যন্তরীণভাবে বিজেপির উদ্যোগের চীনা-পণ্যবিরোধী এক প্রপাগান্ডাও চালু হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া আরো আছে। যেমন ভারতের বাংলার বাইরে, উত্তরে হিন্দি-বলয়ে বা দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য রাজ্যগুলোতে মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হিসেবে দেওয়ালি পালিত হতে দেখা যায়। বাংলায় যেটাকে আমরা কালীপূজা নামকরণ হয়ে পালিত হতে দেখি, এটাই সেই দেওয়ালি। যদিও বাংলার মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হয়ে আছে আবার দুর্গাপূজা। আর কালীপূজা বাংলাতেও আছে, তবে সেটা সেকেন্ডারি উৎসব। এখন এই দেওয়ালিকে বাণিজ্য ও বাজারের দিক থেকে দেখলে, ভারতে এই প্রধান উৎসবে বাজি বা পটকার বাজারটা বিশাল, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মত। এ ছাড়া এই উৎসবের সাজসজ্জার আলোকবাতি, খেলনা বা আনুষঙ্গিক আইটেমসহ ধরলে এমন মোট আমদানি বাজার বছরে ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের। ওদিকে চীন থেকে ভারতের বাজারে বছরে আমদানির মোট পরিমাণ ৭০ বিলিয়নের ওপরে। আর এই আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে বিশেষত বাজি-পটকা এতদিন যা ভারতে স্থানীয়ভাবে তৈরি হত, বিশেষ করে তামিলনাড়ু–র শিবাকাসি শহরে (ভারতের ৯৫ ভাগ পটকা এখানে তৈরি হয়, আর ১০ লাখের মতো লোক কাজ করে) তৈরি পটকার দখলে ছিল এই বাজার। কিন্তু এক্ষেত্রে চীনা পণ্য হল এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিশেষ করে দামের কারণে। সস্তা চীনা পণ্যের ঠেলায় স্বভাবতই ভারতীয় উৎপাদকরা অস্থির ও নাখোশ। তাই গত ২০১৬ সাল থেকে অভ্যন্তরীণভাবে এই চীনা-পণ্যবিরোধী একটা ন্যাশনালিজমের বয়ান তৈরি হতে দেখা গেছিল, যাতে প্রধান তাল দেয়া অবস্থানটা বিজেপির।

মূল বিষয়টা হল, আমাদের মতো দেশে ছোটখাটো সমস্ত পণ্য, যা আগে নিজ নিজ দেশে তৈরি করতে সক্ষমতা ছিল ফলে বাজারও নিজ দখলে ছিল সেই সব বাজারে এখন চীনা সস্তা পণ্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়ে গিয়েছে। এর পেছনের প্রধান কারণ “বাল্ক (bulk) প্রডাকশন লাইন”। কোনো পণ্য উৎপাদনের সময় একেকটা ব্যাচে তা তৈরি হয়। আমাদের মতো দেশের কারখানায় ট্রাডিশনাল উৎপাদনের চেয়ে চীনা উৎপাদনের আলাদা বৈশিষ্ট্য হল সেখানে একেকটা উৎপাদন ব্যাচ আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ লম্বা শুধু তাই না, এক সাথে বসা ব্যাচের সংখ্যাও কয়েকগুণ বেশি। এতে উৎপাদকের সুবিধা হল কাঁচামাল কেনার সময় বিপুল ক্রয়ের সুবিধায় দামে কম পাওয়াসহ পণ্য তৈরির ব্যাচ সাইজের কারণে বহু পর্যায়েই উৎপাদনের ওভারহেড খরচ কমিয়ে ফেলতে পারে। আর এটা এক বাল্ক বা বিপুল সাইজের উৎপাদনের কারণে তাতে চীনা পণ্যমূল্য আমাদের মত দেশের চেয়ে অনেক সস্তা, বিশেষ করে যেমন প্লাস্টিক পণ্যে যা কখনো একেবারে অর্ধেক হয়ে যায়। প্লাস্টিকের সামান্য টুথব্রাশ উৎপাদনের বেলায় চীনা সস্তা দামের ঠেলায় আমাদের উতপাদন সক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে।

এরই প্রতিক্রিয়ায় ভারত বা আমাদের মতো দেশের ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী ‘ন্যাশনালিস্ট’ হওয়ার চেষ্টা করে, ন্যাশনালিজমের ‘বয়ান’ এর গাঁথুনি খাড়া করার চেষ্টা করে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের আবার মোকাবিলার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হল, এসব নাকে-কাঁদুনি “ন্যাশনালিস্ট” হয়ে থাকা বেকার; এরচেয়ে বরং কাজের কিছু পদক্ষেপ তারা নিতে পারে। যেমন প্রাণ গ্রুপ; যেসব প্লাস্টিক পণ্যে, অন্তত মূল্যের দিক থেকে চীনাদের সাথে পারা যাবে না অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেসব পণ্য ‘প্রাণ’ নিজেই চীন থেকে আমদানিকারক হয়ে এনে বিক্রি করতে শুরু করেছে। আর নিজ প্রডাকশন লাইন বদলে অন্য প্রডাকশনে নিয়ে গিয়েছে, অনুমান করা যায়।

যদিও ন্যাশনালিজমের বুঝ থেকে  “দেশে ব্যবহার্য সব জিনিস নিজেদেরই বানাতে পারতে হবে” এটা কতটা সঠিক বুঝ, কাজ হয় কি না ও বাস্তবোচিত কি না অথবা তা আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা এমন  “অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম” এর পালটা-চিন্তা হাজির আছে। অথচ পরীক্ষা করা হয়নি যে এটা আদৌ অর্থপূর্ণ পথ কি না? ভায়াবাল কি না? নাকি এটা জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও শ্রমঘণ্টার অপচয় বা টেকনোলজি ইত্যাদিতে পিছিয়ে পড়ে থাকা হবে? যদিও আবেগের ন্যাশনালিজম বহু আগেই প্রশ্নবিদ্ধ। এখন এই কঠিন বাস্তব প্রশ্নগুলো একালে আরো সামনে এসে গেছে, স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তবুও বারবার সহজেই সস্তা সুড়সুড়ি তৈরি করা যায় বলে দেখা যাচ্ছে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ থেকেই যাচ্ছে, জাগিয়ে উঠানো হচ্ছে।

ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতি উগ্র ন্যাশনালিস্ট, এটাই তার মূল ধারা। ওদিকে আবার চীন-ভারতের অমীমাংসিত সীমান্ত আর তা থেকে সামরিক সঙ্ঘাতের পুরানা (১৯৬২) স্মৃতি বা নতুন করে কিছু ঘটার একটা বাস্তবতা আছে বলে মূলত এসবকে পুঁজি করে ভারতে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ এর উসকানি ধারা খুবই প্রবল। বিশেষ করে ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী বয়ান সহজেই খাড়া করতে পারে। এবং করে লড়তে থাকে। সেখান থেকেই বয়ানের ডালপালা গজায় যে চীনা পণ্যের মান, এর টেকের মান খুবই খারাপ, ঠুনকো ইত্যাদি ইত্যাদি!

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে, লো-টেকনোলজি লাগে এমন পণ্যে – চীনারা পণ্য মান খারাপ করে সস্তা দামে বাজার দখল করে এগোতে হবে – এটাই তাদের সবকালের এগোনোর পথ ও পরিকল্পনা – এমন বুঝের কোনো অনুমান করা ভুল হবে। তাহলে কিভাবে দেখতে হবে? আসলে তাদের মূল বিষয় ছিল আশির দশকে চীনা ক্যাপিটালিজম উত্থানের শুরুর দিকের নিজ সস্তা শ্রমের সুবিধাকে কাজে লাগানো আর “বাল্ক প্রডাকশন লাইনে” উৎপাদন করে বাজারে নেতা হওয়া। যেমন আরেক উদাহরণ, আমাদের মত দেশে কম্পিউটার পণ্য সস্তায় পাওয়ার পেছনে চীনের দুই উতপাদন সূত্র – সস্তা শ্রম ও বাল্ক প্রডাকশন – হল মূল কারণ। আবার যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে মান একটু গুরুত্বপূর্ণ সেই বাজারটা চীনারা তাইওয়ান, ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরের (একালে ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের) হাতে ছেড়ে দিয়েছে বা বাধ্য হয়েছেও বলতে পারি।

ইদানীং চীনা উৎপাদকদের মধ্যে আর এক আওয়াজ জোরদার হচ্ছে যে, চীনা শ্রম আর সস্তা নয়, মানে ন্যূনতম মজুরি চোখে পড়ার মত অনেক বেড়ে গেছে। ফলে আগের সেই বাল্ক প্রডাকশন কোম্পানি এখন চীন ছেড়ে সস্তা শ্রমের কোন ভিন দেশে কারখানা স্থানান্তর করতে চায়, এটা বড় ইস্যু এখন চীনে।

আবার এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চীন নিজের এমন পরিচয় চায় না যে দেশ-বিদেশে মানুষ চীনকে ‘লো-টেকনোলজি’ পণ্যের দেশ হিসেবে চিনুক অথবা এটাই তার ভবিষ্যৎ পরিচিতি হয়ে দাঁড়াক। ফলে যেসব হাই-টেকনোলজি চীনের করায়ত্বে নাই তা আনতে পশ্চিম থেকে কোম্পানিগুলোকে জয়েন্ট ভেঞ্চারের কোম্পানি হিসেবে চীনে আনার তৎপরতাও প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে যেমন গাড়ি তৈরির শিল্পে। পশ্চিমের কোম্পানিগুলোও আসতে খুবই আগ্রহী কারণ পশ্চিমের দিনকে দিন বাজার সঙ্কোচনের বিপরীতে চীনে বাজার উদ্যমী ও সচল (vibrent) বলে।

এভাবে লো আর হাইটেকের ছাড়াও আর এক দিকের চীনা কৌশল হল কোন একটা উতপাদন খাতে লেটেস্ট টেকের শীর্ষ নেতা হওয়া। তেমন সেই খাত হল মোবাইল টেলিফোন। তারবিহীন স্মার্ট টেকনোলজি। চীনা এমন দুই পাইওনিয়ার কোম্পানি হল, বেসরকারি হুয়াওয়ে (HUAWEI) ও সরকারি জেডটিই (ZTE)।

মোবাইল টেকনোলজির ব্যবসা ফলে এর উৎপাদনের পুরাটা বলতে গেলে তা মূল তিন ধরণের উতপাদক কোম্পানিতে বিভক্ত। এক হল, আমরা ব্যবহারকারী পর্যায়ের উতপাদক মানে, ফোন সেটের (mobile phone set) উৎপাদন ও বাজারজাত করা। দুই হল, আমাদের গ্রামীণ বা বাংলালিঙ্কের মত কোম্পানিগুলো; যাদের ভূমিকা হল ব্যবহারকারিদের ফোনের সেটে – নেটওয়ার্ক কানেকশনসহ ফোনের সার্ভিস জোগান দেয়া। এদেরকে ক্যারিয়ার (carrier) কোম্পানিও বলে থাকে অনেকে। আর তৃতীয় ধরণটা হল, আর এক টেক উৎপাদক যারা গ্রামীণদের মত কোম্পানির জন্য বেজ যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে তা সরবরাহ করে থাকে। স্বভাবতই এসব বিপুল যন্ত্রপাতি সাধারণ মানুষ পর্যায়ে সরাসরি ব্যবহার করার জন্য না। তবে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই ক্যারিয়ার কোম্পানিগুলো পাবলিককে সার্ভিস জুুগিয়ে থাকে, তাই পাবলিক এই টেকনোলজির পরোক্ষ ব্যবহারকারী। এ কারণে এমন যন্ত্রপাতিকে ‘ব্যাকঅ্যান্ড’ (back-end) টেক বা পেছন-ঘরে লাগে এমন যন্ত্রপাতি বলে। অর্থাৎ গ্রামীণের মত কোম্পানিগুলোই ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতির মূল ক্রেতা বা গ্রাহক। আর এটা ব্যবহার করেই সাধারণ মানুষকে তারা নানান ফোন সার্ভিস যুগিয়ে থাকে।

এই মোবাইল টেকনোলজিতে চীন শীর্ষপর্যায়ের টেক-উৎপাদন ও সরবরাহকারী পরিচয় হাসিল করে ফেলেছে। টেকনোলজিতে উঁচুমান – এই পরিচয় চীনা পণ্যে লাগানোর ক্ষেত্রে – ফোন কোম্পানির নাম এখন হুয়াওয়ে (HUAWEI)। তবে এই কোম্পানি ফোনসেট এবং ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি  – দুটোই উৎপাদন করে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের কাছেও ‘হুয়াওয়ে’ নামটা পৌঁছে গেছে ও পরিচিত। হুয়াওয়ে ব্যক্তি-মালিকানাধীন কোম্পানি, তা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট কায়দায় এর কর্মচারীরাও প্রত্যেকে স্বল্প হলেও সবাই শেয়ারহোল্ডার মালিক। এ ছাড়া মালিকেরা বা পরিচালক বোর্ডের মেম্বারেরা রোটেশনালি মানে ঘুরে ঘুরে সবাই নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকেন। এমন অনেক কিছুই এর নতুন বা ভিন্ন। এ ছাড়া এই কোম্পানি চীনা সরকাররেও আদরের চোখের মনির মত। কারণ এটা  সামগ্রিকভাবে চীনা টেকনোলজিক্যাল উচ্চতা কত, তা কতটা ওপরে উঠেছে এর চিহ্ন সেট করেছে।

আর ঠিক ততটাই যেন এটা আমেরিকার চক্ষুশূল। অনেকগুলো কারণে। প্রথমত কী দিয়ে বুঝা যাবে হুয়াওয়ে উঁচুমানের টেকনোলজির? মোবাইলে টেকনোলজিতে ওয়ান-জি, টু-জি করে লেটেস্ট হলো ফাইভ-জি। মোবাইলে টেক্সট (লেখা), ভয়েজ (শব্দ) আর ভিডিও (ছবি) পাঠানো – এই তিনটাই আদান-প্রদান করা যায় কি না; আর তা কত দ্রুত যায় এরই প্রকাশ হল – এই ওয়ান থেকে ফাইভ জি (ইংরেজি জি মানে এখানে জেনারেশন বা প্রজন্ম) পাঁচ প্রজন্মের টেকনোলজি।

৫জি এর স্পিড

যার মূল জিনিসটা হল, ফোন নেটওয়ার্কে চলাচলকারী ডাটার গতি। যেমন একটা ধারণা দেয়া যাক, ১৯৯১ সালে চালু ২জি টেকনোলজি দিয়ে একটা পাঁচ গেগাবাইটের পূর্ণ সিনেমার ডাটা নামিয়ে আনতে সময় লাগত এক মাসেরও বেশি। তাই তা করতে যায়নি কেউ। কিন্তু গত ২০১০ সাল থেকে চালু হয়ে থাকা চলতি ৪জি টেকনোলজিতে (যা আমরা বাংলাদেশে দেখি নাই, গল্প আর “কে দিয়েছের” চাপাবাজি শুনেছি। অভিজ্ঞতা পাইনি বলাই ভাল) লাগে ৭ মিনিট। সেই পাঁচ গেগার সিনেমা আসন্ন নতুন ৫জি টেকনোলজিতে লাগবে মাত্র ৪০ সেকেন্ড। [৫জি সাপোর্ট করে এমন ফোনসেট এখনো বাজারে আসনি, তবে এ বছরই আসবে।]

এই ৫জি টেকনোলজি এখন একটা রাষ্ট্রের টেক-উচ্চতা কতটা তা মাপার বিষয় (স্টান্ডার্ড) হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন আমেরিকার কোন কোম্পানি এই টেকনোলজি নিয়ে কখনও কাজই করেনি। বিপরীতে এই টেকনোলজি নিয়ে নিজের ল্যাবে গবেষণা ও উন্নয়ন শেষ করে, এরপর বাণিজ্যিক উৎপাদনে এবং বিক্রিতে চলে গেছে চীনা হুয়াওয়ে। শুধু তাই না, ২০১৮ সালের মোট বিক্রিতে ইতোমধ্যে কিছু ৫জি টেকসহ বিক্রি করেছে ১০৮ বিলিয়ন ডলারের। এই বিক্রি, তাও আবার সরাসরি ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা হুমকির মধ্যে যে চীনা ৫জি টেকনোলজি [বেসরকারি হুয়াওয়ে ও সরকারি জেডটিই ] বাজারে আনা হয়েছে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের গোয়েন্দাগিরির জন্য। অন্যের রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ ও তা নিজ দেশে পাচারের জন্য – এই হল সেই ভীতিকর মিথ্যা প্রপাগান্ডা। শুধু তাই না, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ নির্দেশ জারি করেছে যে কোনো আমেরিকান সরকারি অফিস এ দুই কোম্পানির কোনো কিছু কিনতে ও ব্যবহার করতে পারবে না [President Donald Trump in August, which bars federal agencies and their contractors from procuring its equipment and services]। এই আইনের বিরুদ্ধে খোদ হুয়াওয়ে নিজে আমেরিকার টেক্সাসের আদালতে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নতুন দুনিয়ায় মাতব্বরিতে নেতা আমেরিকার সাথে সবসময় ছোট-তরফ বা প্রধান সাগরেদ হয়ে থেকেছে ইউরোপ। সম্ভবত এবারই প্রথম আমেরিকান নেতাগিরির শেয়ার-ভাগ সাগরেদ নিতে চাইছে না। ইউরোপ আমেরিকার হাত ছেড়ে ভেগে আগে বাড়তে যাচ্ছে।

এ বছর ‘মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস” [Mobile World Congress] যেটা সাধারণভাবে বললে ‘মোবাইল টেকনোলজির গ্লোবাল বাণিজ্যমেলা, তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৫-২৮ ফেব্রুয়ারি, স্পেনের বার্সিলোনায়। কিন্তু ট্রাম্পের প্রপাগান্ডাীখানে এসে ফেল করে যায়। মানে চীনা হুয়াওয়ে সম্পর্কে আমেরিকার প্রপাগান্ডা ও ভীতি ছড়ানো আর তা ইউরোপে কাজ করাতে ব্যর্থ হয় আমেরিকা এই সম্মেলন থেকেই। এটা ফোন ব্যবহারকারি সাধারণ মানুষের মেলা নয়, ফলে সাধারণ ক্রেতাদের বাদে বা তাদের বাইরে, মোবাইল নিয়ে গবেষণা, উৎপাদন থেকে বাণিজ্য বিতরণ পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা টেলিকম এক্সিকিউটিভদের মেলা ছিল এটা। ইউরোপের পলিটিকো ম্যাগাজিনের হিসাব মতে প্রায় এক লাখ [where some 100,000 telecoms executives had gathered] এমন টেলিকম নির্বাহীর সমাগম হয়েছিল এখানে। এমনিতেই এই মেলার বড় খরচের  দায়ভার নিয়েছিল হুয়াওয়ে। সে সাথে নিজের ৫জি টেকনোলজিসহ সব পণ্যের ব্যাপক প্রদর্শনীও করেছিল। এই মেলা থেকেই মোবাইল উতপাদন ব্যবসার দুনিয়ার বড় বড় কুতুবেরা বিশেষ করে যারা ইউরোপীয় যেমন, নরওয়ের নোকিয়া, ব্রিটিশ ভোডাফোন, সুইডিশ এরিকশন ইত্যাদির, আমেরিকান প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এদের আপত্তিগুলো সামনে প্রবলে আসতে থাকে।

তাদের বক্তব্যের সারকথা হল, তারা আমেরিকার কাছে খাস প্রমাণ চাচ্ছে, নইলে তারা হুয়াওয়ের টেকনোলজি কিনতে ও ব্যবহার- সম্পর্ক করতে থামবে না। অর্থাৎ চীন বা হুয়াওয়েকে রাজনৈতিক কারণে কোণঠাসা করার কাজে যুক্ত হতে তারা অস্বীকার করে বসলেন। রয়টার্স বলছে, ওই মোবাইল মেলাতে ভোডাফোনের প্রধান নির্বাহী মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে, আমরা “ফ্যাক্টস ভিত্তিক মূল্যায়ন দেখতে চাই” [“We need to have a fact-based risk-assessed review,” – Nick Read, chief executive of Vodafone]। আর হুয়াওয়ের টেক ব্যবহার করব না বলার খারাপ পরিণতিও আছে। আমরা যদি অস্পষ্ট তর্কে সিদ্ধান্তহীন থাকি তবে ইউরোপ আপডেট টেকনোলজিতে দুই বছর পিছিয়ে যাবে। আর ইতোমধ্যে আমরা যারা হুয়াওয়ের ৪জি টেক ব্যবহার করছি সেগুলোর কী হবে?” [ Read said it was not a simple case of barring Huawei from future 5G networks as the company’s equipment was already in use in 4G networks in Europe that would be the foundation of the new technology……“It will delay 5G in Europe by probably two years,” he said.] ।

ওদিকে ওই মেলা থেকে এক টেকনিক্যাল আলোচনায় হুয়াওয়ের চেয়ারম্যান সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বললেন আমেরিকার হাতে কোন প্রমাণ নাই [The U.S. security accusation on our 5G has no evidence, nothing,”] অথচ প্রপাগান্ডা করছে।  তিনি খোঁচা দিয়ে বলেন, “হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করার মিথ্যা অভিযোগ আনার আগে আমেরিকা স্নোডেনকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারে [those concerned about government spying “can go ask Edward Snowden” ]। (আমেরিকান টেক কন্ট্রাকটারের এক স্টাফ অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেন প্রমাণসহ দেখিয়ে দেন যে আমেরিকান সরকার কিভাবে গ্লোবালি মোবাইল ডাটা হ্যাক করে থাকে। এই তথ্য ফাঁস করা, সেই থেকে তিনি আমেরিকা থেকে পালিয়ে রাশিয়াতে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে বাস করছেন।)

তবে অনেক তর্ক-বিতর্কে উঠার পরে ঐ বার্সেলোনা মেলা থেকেই হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগ হাল্কা হয়ে যেতে থাকে। ইউরোপীয় পলিটিকো বা আমেরিকান ব্লুমবার্গ মিডিয়া বলছে, মূলত ট্রাম্পের একটা মন্তব্য থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি। ব্যাপারটা হল, বর্তমানে চীন ও আমেরিকা এক বাণিজ্য যুদ্ধে পরস্পরের ওপর বাড়তি আমদানি শুল্ক আরোপের ঝগড়ায় আটকে আছে। যার সর্বশেষ অবস্থা হল তারা এখন আলাপ আলোচনার মধ্যে আছে যাতে মনে হচ্ছে তারা একটা আপসের পথ খুঁজে পেতে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই এখনও ফাইনাল নয়। সেই আলোচনার সময়ে এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলে বসেন যে হুয়াওয়ে কেসটা আমাদের আলোচনায় দরকষাকষিতে হাতিয়ার হতে পারে [“President Trump has made a big mistake by allowing the Chinese to draw the conclusion that the two are related”]। এ কথা জেনে যাওয়ার পর থেকে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ফলে তা থেকে টেক কোম্পানিগুলোও হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগগুলো আর গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এরপর থেকে আমেরিকা ইউরোপকে আর নিজের নৌকায় তুলে নিতে পারেনি।

এদিকে বিতর্কেরও কোনো শেষ হয়নি। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এ নিয়ে খুবই ভোকাল। তিনি এক পাবলিক আলোচনাতে বলছেন, তিনি দুটো বিষয়ে নীতিগতভাবে বিশ্বাস করেন না। এক, আমেরিকার এমন সেনসেটিভ নিরাপত্তা-বিষয়ক অভিযোগ পাবলিকলি তুলল কেন? আর দুই-একটা কোম্পানিকে একঘরে করতে হবে কারণ সে একটা বিশেষ দেশের [“First, to discuss these very sensitive security questions publicly, and second, to exclude a company simply because it’s from a certain country.’] – একটা বিশেষ দেশ বলতে বলা বাহুল্য তিনি বুঝিয়েছেন চীনের হুয়াওয়ে] কোম্পানি। এরপর তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে শক্ত এথিক্যাল প্রশ্ন তুলে বলছেন, “চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বলে তার সাথে এভাবে লড়ব। বরং আমাদেরকে অবশ্যই ন্যায্য আইনকানুন ও পারস্পরিক স্ট্যান্ডার্ডের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আর আমরা ‘বহুরাষ্ট্রীয় দুনিয়া ব্যবস্থা’ মাল্টিলেটারিজম ত্যাগ করতে পারব না, [Of course we’re in a systemic competition with China,’’ Merkel said in a separate speech at the same event. “But the answer can’t be that we fight those who are economically strong, we must stand up for fair, reciprocal rules and not give up on multilateralism.’’]।

এ কথাগুলো তিনি বলেছেন কারণ ইতোমধ্যে এ নিয়ে ন্যাটোর মিটিংয়ে চরম তর্কাতর্কি ও আর আমেরিকান হুমকি প্রদর্শন ঘটে গেছে। আমেরিকা হুমকি দেয় যে চীনা ফোন টেকনোলজি ৫জি ব্যবহার জার্মান বন্ধ না করলে তারা আর আগের মত জার্মানির সাথে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করবে না। ন্যাটোর জেনারেল স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, “ন্যাটো ফোর্স জার্মানির সাথে ‘বার্তা যোগাযোগ ছিন্ন” করবে যদি তারা হুয়াওয়ের সাথে সম্পর্ক রেখে কাজ করে’ [The threat escalated when Nato’s Supreme Allied Commander in Europe, US General Curtis Scaparrotti, warned Germany that Nato forces would cut communications if Berlin were to work with Huawei.]। কিন্তু মার্কেলের অবস্থান আসলে খুবই পরিষ্কার। তিনি বলতে চাইছেন, আমরা নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড উন্নত করতে পারি, আলোচনায় চীনকে তা মানতে বাধ্য করতে পারি। কিন্তু চীনা কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না এ কথা বলতে পারি না।

ওদিকে ইটালিকে নিয়েও প্রায় একই রকম বিতর্কে [Italian daily La Stampa ] এক ভুয়া নিউজ ছাপা হয়েছিল। ওর পেছনে আর এক কারণ হল, সেই একই সময়ে ইতালি চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিয়েছে, এমন এক মেমোরেন্ডাম বা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ইতালির মন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যেহেতু এখনও ৫জি ইস্যুতে  নিরাপত্তার জন্য হুমকিমূলক কোনও কিছুই পায়নি। তাই কোনও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে আগ্রহী নয়। ইতালির “টেলিকম ইতালিয়া” কোম্পানি হুয়াওয়ের গ্রাহক। তারাও বলছে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা না পেলে তারা কিছুই বন্ধ করবে না [Italian phone incumbent Telecom Italia has previously said it will keep working with Huawei until told otherwise by the government.]।

মোটা দাগে বললে, হুয়াওয়ে বা চীনা টেকনোলজি ঠেকিয়ে দেয়ার ইস্যুতে আমেরিকা ইউরোপকে নিজের নেয়া ‘নিষেধাজ্ঞার পথে’ আকৃষ্ট বা রাজি করাতে পারেনি। এর মূল কারণ চীন বা হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার আনা গোয়েন্দাগিরি অভিযোগের কোনও প্রমাণ দিতে না পারা। অর্থাৎ আমেরিকান অভিযোগ এখনো ভিত্তিহীন বলে এমন অসৎ পথে আমেরিকার সঙ্গী হতে চায়নি ইউরোপ। ইতোমধ্যে প্রায়ই ট্রাম্পের মুখে শোনা যায় যে চীন আমাদের টেকনোলজি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি হুয়াওয়ের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে আমেরিকান টি-মোবাইল কোম্পানির পক্ষে [T-Mobile, an American wireless carrier] টেকনোলজি চুরির মামলা করা হয়েছিল। লন্ডন ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, সে মামলাতে আদালতের মূল্যায়ন হল, এখানে টি-মোবাইলের কোনো ‘ক্ষতি করা, কারও অন্যায় লাভবান হওয়া এমন কিছু ঘটেনি। এমনকি এটা হুয়াওয়ের দিক থেকে ইচ্ছা করে কিছু ঘটানো এমন কাজ নয়, খারাপ উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজও নয়” [The court found, however, “neither damage, unjust enrichment nor wilful and malicious conduct by Huawei”.।

তবু আমেরিকার দিক থেকে ইউরোপকে নিয়মিতভাবে চীনা ৫জি টেকনোলজি ব্যবহার না করার আবেদন করে চলছিল। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশন আমেরিকার চীনাবিরোধি যা অভিযোগ তা আনুষ্ঠানিক আমল করেনি বলে জানা যাচ্ছে। কিভাবে? কারণ সে তার নিজস্ব কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সেগুলো আসলে উপরে অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের বয়ানে যেটা আমরা দেখেছি সেই অবস্থানই। তা হল, কমিশনের সিদ্ধান্ত হল যে আরো ‘শক্ত নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড’ তৈরি করতে হবে, কিন্তু কোনো দেশকে ঠেকাতে হবে এটা তাদের কোনো পথ নয় [commission officials signalled they prefer to secure Europe’s critical digital infrastructure with a more nuanced approach, rather than bowing to US pressure for blanket bans.]। । আসলে মূলত এ কারণেই ইউরোপের মোবাইল জয়েন্টগুলো হুয়াওয়ের টেকনোলজি কেনার ও সাথে সম্পর্কে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল।

হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইন্যান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা গ্রেফতারঃ
তবু আমেরিকা চীন ও হুয়াওয়েকে বিনা যুক্তিতে স্রেফ নিজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মাতব্বরির স্বার্থে কোন যুক্তি ছাড়া “তাদের ঠেকাতে” একের পর এক বাধা তৈরি করে যাচ্ছে। এমনই আর এক বাধার দেওয়াল হল, হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইনান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা মেঙ ওয়ানঝুয়ের [Huawei CFO Subrina Meng Wanzhou ] কানাডায় গ্রেফতার। যিনি আসলে হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক রন ঝেংফাই এর নিজের মেয়ে। সেই সাবরিনা মেঙ কোম্পানির কাজে হংকং থেকে মেক্সিকো যাচ্ছিলেন, পথে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ছিল তার বিমান বদলের জন্য যাত্রা বিরতি। আর এই ভ্যাঙ্কুভার বিমানবন্দর থেকে কানাডিয়ান পুলিশ তাকে গত ১ ডিসেম্বর ২০১৮, গ্রেফতার করেছে। কিন্তু এর সাথে আমেরিকার কী সম্পর্ক?

কানাডা-আমেরিকার মধ্যে পরস্পরের “বন্দী হস্তান্তর চুক্তির” সম্পর্ক আছে। তাই আমেরিকার অনুরোধে কানাডা সরকার এই গ্রেফতার করেছে। কিন্তু আমেরিকার অভিযোগ কী?
আমেরিকার দিন ফুরিয়ে আসছে এর অনেকগুলো চিহ্ন ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এর একটা হল, যাকে খুশি তাকে যেকোন অপছন্দের রাষ্ট্রকে নিজের একক সিদ্ধান্তে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করে দেয়া। নেতানিয়াহুর জিগরি দোস্ত ট্রাম্প ইরানের ওপর খুবই বেজার। ট্রাম্প ইরানের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছেন। যার সোজা অর্থ হল ইরান কোন ভিন্ন-রাষ্ট্রের সাথে পণ্য কেনা বা বেচাবিক্রির ক্ষেত্রে আমেরিকান ডলারে সেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন না। করলে কী হবে? করলে এর মানে হবে ওই পণ্যের চালানে ডলারে পেমেন্টের কথা উল্লেখ থাকবে আর সেই ডলার দেয়া-নেয়া করতে গেলে তা একমাত্র একটা পর্যায়ে কোন না কোন এক আমেরিকান ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবেই। আর ইরান যেহেতু অবরোধ ঘোষিত তালিকায় আছে তাই আমেরিকান কোনো ব্যাংকের জন্য ওই অবরোধের অর্থ হল, এই লেনদেন ঘটিয়ে দেয়া নিষিদ্ধ। কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি এমন নিষিদ্ধ লেনদেনে সহায়তা করে আর আমেরিকান সরকার যদি এ জন্য তাকে অভিযুক্ত করে তবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ফাইন দিয়ে তাকে রেহাই পেতে হয়। তাহলে ইরান অবরোধের সাথে হুয়াওয়েকে কিভাবে সম্পর্কিত করছে আমেরিকা?

অভিযোগ হল, হুয়াওয়ে তার মোবাইল টেক বিক্রি করেছে ইরানকে। আমেরিকার অভিযোগ এই বিক্রি ঘটেছে হুয়াওয়ে মূল কোম্পানির নাম বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নয়, বেনামে। ‘স্কাইকম’ নামে এক কোম্পানির মাধ্যমে হুয়াওয়ে ইরানের সাথে কেনাবেচা ব্যবসা করেছে। কিন্তু আইনত স্কাইকম হুয়াওয়ের কোনো অধীনস্ত বা সাবসিডিয়ারি কোম্পানি নয় বলে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে সাবরিনা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই মামলাটা হয়েছে এই লেনদেনে মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে। ভয় পাওয়ার মতো তথ্য হল, প্রমাণিত হলে আমেরিকায় এর সাজা কমপক্ষে ৩০ বছর। তবে কানাডার আদালতে এখনকার মামলা হল সাবরিনা মেঙকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তরের অনুমতি পাওয়ার। কানাডার আদালত অনুমতি না দিলে কানাডা সরকার সাবরিনাকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না। তাই সাবরিনা এখন বিশেষ অনেক শর্তের জামিনে আছে, যার একটা হলো তাকে কানাডায় থাকতে হবে, রায় না হওয়া পর্যন্ত।

ঘটনার এখানে শেষ নয়, উপরে বলেছিলাম যে চীন-আমেরিকা যে বাণিজ্য যুদ্ধের সমাপ্তির আলোচনা চলছে ট্রাম্প সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি সাবরিনাকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটাকে তিনি ঐ আলোচনায় বিশেষ সুবিধা আদায়ের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চান।
কিন্তু ব্যাপারটাতে আমেরিকা একাই চালাক তা তো নয়। চীনও অন্তত দুজন কানাডার নাগরিককে পাল্টা ডিটেনশন দিয়ে আটকে রেখেছে [After Meng’s Vancouver arrest, Chinese police also detained two Canadian citizens]। যাদের একজন আমেরিকার প্রাক্তন কূটনৈতিক, এখন “ক্রাইসিস গ্রুপ” নামের থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে কাজ করছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ‘উঠায়ে নেওয়া’, ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা এসবই চালু করার জায়গায় পৌঁছেছে আমেরিকা।

কিন্তু আমেরিকা এক হুয়াওয়েকে নিয়ে এত মরিয়া কেন?
এখানে দুটা প্রসঙ্গ, তবে কমকথায় বলতে হবে। একালে মোবাইল টেকনোলজিতে আমেরিকা আর কুতুব কেউ নয়। বরং সব  টেক কোম্পানিই বেচে-কিনে সারা। আমেরিকান ভ্যানিটি ছিল প্রখ্যাত গ্রাহাম বেলের এটিঅ্যান্ডটি [AT&T]। কিন্তু এত বিখ্যাত এটাই তার নেতি দিক। কোম্পানিটা একচেটিয়া করছে – এই অভিযোগে আমেরিকান এন্টি-ট্রাস্ট আইনের মামলা খেয়েছিল এই কোম্পানি। ফলাফলে দুটা ঘটনা ঘটে। এটিওঅ্যান্ডটি নিজেই নিজের কোম্পানিকে ভেঙ্গে দুইটা করে। মানে লুসেন্ট (Lucent) নামে যন্ত্রপাতি উৎপাদন ইউনিটকে আলাদা কোম্পানি [Lucent Technologies, Inc.] হিসেবে সাজিয়ে নেয়। এতে সেকালে (১৯৯৬) বাজারে প্রবল সাড়া জাগানোতে ইনিশিয়াল ইস্যু করা শেয়ার বেচে তারা তিন বিলিয়ন ডলার জোগাড় করেছিল।

আমাদের অধুনা বিলুপ্ত মোবাইল কোম্পানি সিটিসেলের কল্যাণে “সিডিএমএ” [CDMA] নামে টেকনোলজির কথা কেউ কেউ জানি। বাংলাদেশের মোবাইলে ওই একটাই সিডিএমএ নামে টেকনোলজি ছিল। এ ছাড়া বাকি সবগুলো এখন জিএসএম [GSM]। এই দুটা ছাড়া কাছাকাছি সুবিধা-অসুবিধার অন্যান্য অনেক টেকনোলজি ছিল। আমেরিকান সরকার ১৯৯৬ সালে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে দেশে টেকনোলজির স্টান্ডার্ড বলে কিছু সবাইকে আর মানতে হবে না। “সিডিএমএ” বা “জিএসএম” বা যেকোন স্টান্ডার্ডের মোবাইল সার্ভিস চালু করা যাবে।  সরকার তখন মনে করেছিল এতে একচেটিয়াত্ব বন্ধ হবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে যায়। কারণ, মোবাইল টেকনোলজি ব্যবসার রিস্কি দিকটা হল, এখানে ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কোম্পানিগুলোকে নিরন্তর গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করে যেতে হয়। তাই আমেরিকায় একটা স্ট্যান্ডার্ড না থাকার কারণে সব টেকনোলজির ফোন সার্ভিস বেচে তুলে আনা রাজস্ব সবগুলো টেকনোলজিতেই গবেষণা করতে গিয়ে ভাগ হয়ে যায়। ফলে প্রত্যেকটা টেকনোলজির গবেষণা খরচ জোগানো কঠিন হয়ে যায়। ফলে ২০০১ সালের মধ্যে লিসেন্টের পতন শুরু হতে থাকে। এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মটোরোলা [Motorola] তারও অবস্থা খারাপ। মোটের ওপর আজকের শেষ পরিণতি অবস্থাটা হল – নরওয়ের নোকিয়ার কাছে আমেরিকার লুসেন্ট বা মটোরোলা দুটাই বিক্রি হয়ে গেছে। ওদিকে ফ্রান্সের আর এক কোম্পানি “এলকাটেল” [Alcatel] – সেও এখন নোকিয়ার পেটে, চলে গেছে। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে আমেরিকার নিজের এখন মূল ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতি বানানোর কোন কোম্পানি নেই। সব ইউরোপের হাতে। বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত এর মূল কারণ ইউরোপ শুরু থেকেই কেবল ‘জিএসএম’ [GSM] একেই একমাত্র মোবাইল টেক স্ট্যান্ডার্ড বলে নির্দিষ্ট করে দেয়। ফলে এখানে কোম্পানিগুলোর গবেষণার খরচ জোগান তুলনামূলক সহজ ছিল।
তাহলে সার কথা দাঁড়াল আমেরিকার হাতে কোনো ৫জি টেকনোলজিই নেই। কিন্তু না থাকলে কী? ইউরোপ থেকে কিনে নেবে!
ব্যাপারটা অত সহজ নয়। কেন?

৫জি এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন
মূল কারণ ৫জি কোনো সাধারণ টেকনোলজি নয়। যেমন ২জি থেকে ৩জি অথবা ৩জি থেকে ৪জি এসেছিল – তেমন সাধারণ নয়। কথাটা ভেঙে বলতে হবে।

প্রথমতঃ আগের যেকোনো টেকনোলজি থেকে ৫জি তে আসা – এটা এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন। মানে কী? এত সাংঘাতিক করে ব্যাপারটা হাজির করছি কেন?
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial intelligence, AI) এর কথা একালে আমরা অনেকে শুনেছি। যন্ত্র বা রোবটকে মানুষের বুদ্ধিতে চলার মত করে তৈরি করা। মানুষের শ্রম কম লাগবে। আর এর বিকল্প হিসেবে রোবট সে কাজ করবে। যেমন “রোবট রেস্টুরেন্ট” – মানে এখানে কাস্টমারকে রোবট ঘুরে ঘুরে খাওয়া সার্ভ করছে, অর্ডার নিচ্ছে – এটা আমরা অনেকেই দেখেছি।

এ ছাড়া ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির কথা শুনেছেন অনেকে। এসব আগামীতে আমরা কেমন থাকব, চলব, কেমম কাজ পাবো, করব অথবা আমাদের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুকে বদলে দেবে, প্রভাবিত করবে।

এসবের প্রধান আর কমন বিষয়টা হল, এগুলো গায়েবি নিশ্চয় নয়, বরং মানুষই অনেক দূরে বসে এসব কিছুকে পরিচালিত করবে। যেহেতু অনেক দূর থেকে, একটা বৃত্তের মধ্যে নানান জায়গায় বসে বসবাস করে তাই খুবই দ্রুত আর বাল্ক নির্দেশ পৌঁছানোর উপযুক্ত তারবিহীন টেকনোলজি বা নির্দেশ বহনকারী ওয়ারলেস টেকনোলজি লাগবে। এসব কিছু ঠিকঠাক চলার ব্যাকবোন বা শিরদাড়ার মত কাজ করতে হবে ৫জি ওয়ারলেস টেকনোলজিকে। এর মাধ্যমেই সবাই সব নির্দেশ পাঠাবে, নেবে।

আরো দিক আছে কারখানা পর্যায়েও প্রডাকশন লাইনে নির্দেশ পাঠাতে ব্যবহৃত হবে ৫জি টেকনোলজি। এ জন্য বলা হচ্ছে এই ৫জি মোবাইল বা ওয়ারলেস টেকনোলজিকে আসলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

এই বিপুল পরিবর্তন যা মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটাবে এর ব্যাকবোন  হতে যাচ্ছে ৫জি টেকনোলজি। অথচ আমেরিকার হাতে এটাই নাই, থাকবে না। এখনও যদি শুরু করে তবুও তিন থেকে পাঁচ বছরের পেছনে থাকবে আমেরিকা। এছাড়া অর্থনৈতিক লাভজনকভাবে একে প্রতিস্থাপন সে ত আমেরিকার জন্য আর এক অলীক স্বপ্ন! আর ওদিকে চীন! এখনই সে শীর্ষে। অতএব, বলাই বাহুল্য আমেরিকা কেন এমন হাত-পা ছোড়া ছোট ছেলের মতো অস্থির আচরণ করছে। আমেরিকার জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ও পরিণতি অপেক্ষা করছে বলাই বাহুল্য!

[এই ব্যাপক পরিবর্তনের টেকনিক্যাল দিকটা  থেকে আগ্রহী পাঠকেরা এই আর্টিকেল ও সংশ্লিষ্ট অন্যগুলো পড়ে দেখতে পারেন।]

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

চীন সফর ইতিবাচক

চীন সফর ইতিবাচক

গৌতম দাস

০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2BN

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই মাসের শুরুতে ১-৬ জুলাই চীন সফরে যাচ্ছেন। এটা তার চলতি গত ১০ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে প্রথম ২০১০ সালের মার্চেরটা সফরটা সহ ধরলে এটা তৃতীয় চীন সফর হবে। তবে আগের ২০১৪ সালের জুনের  সফরটা ছিল ২০১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে। এবারো প্রায় তাই, ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরের ছয় মাস শেষে। গতবারের সফরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর পরিকল্পিত থাকা সত্ত্বেও চীন সফরে গিয়ে তিনি মত বদলিয়ে তাতে স্বাক্ষর করেননি। মনে করা হয়, ভারতের আপত্তিকে গুরুত্ব দিতে তিনি বিরত থেকেছিলেন। যদিও তখন চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প কেবল শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এই মহাপ্রকল্পের কোনো ছাপ বা প্রভাব সেবারের কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই ছিল না। কিন্তু আসল ঘটনা ছিল ভারতের ভাষায় “আমার প্রভাব বলয়ের” বাংলাদেশ কেন চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতায় যাবে, এই মনোভাব। না, এটা কোন জল্পনা-কল্পনা ছিল না। ভারত মনে করত যে, এশিয়ার পড়শি দেশগুলো হল ভারতের খাস তালুক যেন নিজ বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ির উ্ঠান। আর সে জন্য এটা তার “প্রভাববলয়ের” এলাকা। তবে অবশ্য ভারত নিজেই পরে এ থেকে পিছু হটে।

নীচের প্যারা দুটা গত ২০১৮ সালের পুরানা লেখা থেকেঃ

[‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।]

এটা ঘটেছিল ট্রাম্পের আমেরিকার হাতে পড়ে এর আগে আমেরিকা থেকে ভারত যা যা পেত – প্রাপ্ত প্রায় সে সব সুবিধা গুটিয়ে যাওয়া অথবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই যখন ভারত নিজ-কল্পিত দেবতা ট্রাম্পের উপর পুরা হতাশ হয়ে চীনমুখী পথ ধরেছিল; এর শুরুতেই তখন ভারত নিজ মিডিয়াতেই যেচে স্বীকার করে বলেছিল যে, তার এমন মুরোদ নেই। “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক”।

যা হোক, ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে। বাংলাদেশে আমরা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছি বলে বেড়িয়েছি, আবার সময়ে পিছিয়েও গিয়েছি। এ কথাও বলেছি, “আমরা যা দিয়েছি ভারতকে মনে রাখতে হবে”। এমনকি উল্টো ভারতকেই বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে সাহসের সাথে আহবান রেখেছি। আবার পরক্ষণে চাপের মুখে বলেছি, বাংলাদেশের জন্য আমরা “চীন না অন্য বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজছি”। আবার চীনা রাষ্ট্রদূতের সাহসের বলে বাইরে বের হয়ে বলেছি বেল্ট-রোড প্রকল্পে আমরা জিন্দা আছি। আমরা বিএনপিসহ সর্বদলীয় “বাংলাদেশ-চায়না সিল্ক রোড ফোরাম নামে অধিকাংশ দলের এক সমিতি গঠন করে ফেলেছি।

এমনই এক পটভূমি পরিস্থিতিতে আর বিশেষ করে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার চীন সফরে যাচ্ছেন। এখন এবারও কী প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগের সফরের বকেয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তা তুলে ধরে এগিয়ে যেতে পারবে? সার কথায়, যেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ, এর পক্ষে সবলে দাঁড়িয়ে চীনের সাথে গভীর সম্পর্কে গড়তে এগিয়ে যেতে সাহস করবে? এতে কে কী মনে করবে তা পেছনে ফেলে সফলভাবে নিজ লক্ষ্য অর্জনে লিপ্ত হতে পারবে? এগুলো সবই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, সন্দেহ নেই।

তবে প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে এই চীন সফর আয়োজন করে ফেলা – এটাই ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ও সঠিক পদক্ষেপ। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক আপত্তি বা সমালোচনা যা আছে সব সহই এ ঘটনাকে আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারি; অন্তত এ কারণে যে এই সফরটাই ভারতের স্বার্থের অধীন থেকে বা এর কবল থেকে বাইরে বেরিয়ে বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে নেয়া এক ইতিবাচক পদক্ষেপ।

যদিও এখানে একটা লুকোছাপা আছে। ভারতের একটা নিমরাজি সম্মতি আছে এই সফরে। ভারতের নিজ মুখরক্ষার একটা বয়ানও আছে। সেটা হল এমন, যেন নিজে নিজেদেরই সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা আছে। এই সমস্যার হাল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব-শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক ও কিছু মাত্রায় ঘনিষ্ঠতায় যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই। তাই ভারত এটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হতে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব-বলয় আগের মতোই আছে বা থাকছে- এই অনুমান। যেমন আনন্দবাজার এমনই সাফাই দিয়ে লিখেছে,

“এক দিকে ওবর (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) মহাপ্রকল্পে বাংলাদেশকে কাছে টানা, অন্য দিকে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চিন, ভারত, মায়ানমার) অর্থনৈতিক করিডরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। চিনের এই যৌথ কৌশল ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল বলে মনে করছে বিদেশ মন্ত্রক। দেশে নতুন সরকার আসার পরে এই করিডরটি নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করবে চিন, এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এ বার বাংলাদেশের স্বার্থকে করিডরের সঙ্গে আরও বেশি করে তারা যুক্ত রাখবে, যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না”।

রোহিঙ্গা ইস্যুঃ
রোহিঙ্গা ইস্যুকে আমাদের সরকার সামনে নিয়ে এসেছে এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। তবে এ প্রসঙ্গে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসাই মূলত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কথাও খুবই সত্যি যে, এটা ষাটের দশক নয় যখন  কোন জনগোষ্ঠীকে দিনের পর দিন উদ্বাস্তু করে অনিশ্চিত ফেলে রাখা হবে আর তারা চুপচাপ নিরীহ বসে থাকবে। আগে যাই ঘটে থাকুক, এই শতক শুরুই হয়েছে সশস্ত্রতায় – হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া দিয়ে। ফলে গ্লোবাল পরিস্থিতি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার পক্ষে অথবা বলা যায় অভ্যস্ত। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগাতে তৎপর পরস্পরবিরোধী ছোট-বড় স্বার্থ এত বেশি যে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ধরে রাখাই এক কঠিন কাজ। হোস্ট বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে একাজে।

তবে মনে রাখতে হবে চীনকে কোন কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীনা কূটনীতির শক্তি এখানে অর্থনীতিক, ঠিক রাজনৈতিক নয়। চীন রোহিঙ্গা সমস্যাকে দেখে থাকে, রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ বা অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব এটাই মূল কারণ। ফলে চীনের দেখা এর সমাধানও এখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করার মধ্যে – এভাবে। রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ সমস্যা আছে  একথা হয়ত সত্য হলেও কিন্তু সেটাই রোহিঙ্গাদের চরম নিপীড়িত ও উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণ নয়। মূল সমস্যা রোহিঙ্গারা মুসলমান এই রেসিয়াল ঘৃণা তো বটেই; এ ছাড়া বরং নিজ বার্মিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে সবাইকেই এই বার্মিজ জেনারেলরা প্রচন্ড বর্ণবাদী ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। আর একারনেই রোহিঙ্গাসহ জেনারেলদের অপছন্দ এমন সব জনগোষ্ঠীকেই একমাত্র স্মূলে নির্মূল করার মধ্যেই তাঁরা সমাধান দেখে থাকে। এমন বার্মিজ শাসকদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে কাজ আদায়ের কৌশল কতটা কাজ করবে তাতে আস্থা রাখা কঠিন। সারকথায় চীনা এই পদ্ধতিতে কাজ আদায় বা চাপ দেয়া – টুলস হিসেবে খুবই দুর্বল। আসলে বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে নয় “রাজনৈতিক চাপ” সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুরই কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

চাপ হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন তোলা ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশনের জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইট বা বিচারের আইসিসির তৎপরতা ঘটানো – এটাই একমাত্র “রাজনৈতিক চাপ” এর উপায় নয় নিশ্চয় তা হলেও সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু যেকোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের মত চীন এই পথে খুবই দুর্বল। হিউম্যান রাইট কমিউনিস্টদের হাতিয়ার নয়। যদিও অন্য কোন কিছুও হাতিয়ার হতে পারে। যেমন কমিউনিস্ট পটভূমির রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও পশ্চিমের আমেরিকাসহ যারা হিউম্যান রাইট ইস্যুতে চাইলে গ্লোবাল ক্ষমতার করিডোরে খুবই সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে, মিয়ানমারের জেনারেলদের নাস্তানাবুদ করতে পারে – আমেরিকা বা ইউরোপের হিউম্যান রাইট বিষয়ক ততপরতার দিক থেকে এই চাপ এখনও খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে, এই সুযোগ এখনো হারিয়ে যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কেবল চীনামুখী বা চীনা নির্ভরতা হয়ে পড়া হবে মারাত্মক ভুল। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায় আমরা এককভাবে নিয়ে যে ইউরোপসহ পশ্চিমা শক্তিকে রক্ষা করেছি সে কথা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি। আর সেই সাথে  দায়-কর্তব্যের তাদের পার্ট মনে করাতে এক ক্যাম্পেন করতে পারি। এর পরিপূরক হিসেবে অন্তত অর্থনৈতিক দায় বইতে তাদেরও আমাদের সহায়তা দেয়া ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে তাদেরকেও চাপ দেয়া ও বাধ্য করতে পারি।

সারকথায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমাশক্তি আর অন্যদিকে চীন এভাবে সবার চাপ সৃষ্টির শক্তিকে একসাথে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। এটা না করতে পারলে বরং মিয়ানমারের জেনারেলেরা চীনকেই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে ফেলবে, যা করে এত দিন সে টিকে আছে।

এ দিকগুলো বিবেচনা করে কথা বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামার দাভোস সম্মেলনঃ
তবে এই চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও আরেকটা টুপি বা আড়াল আছে তা হল – ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (এখন থেকে সংক্ষেপে কেবল ‘ফোরাম’ লিখব)। অফিশিয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন যাচ্ছেন কারণ ফোরাম-এর “সামার দাভোস সম্মেলন” [Summer Davos“. Organised by the World Economic Forum] চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই আড়ালটা হল, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ১-৩ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সেই- ‘সামার দাভোস সম্মেলনে’ যোগ দিতে যাচ্ছেন। ফোরামের খুব সংক্ষেপে পরিচয় দিলে, এই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জন্ম ১৯৭১ সালে, যা মূলত রাজনীতি ও ব্যবসায়ের নেতা এবং গ্লোবাল সমাজের অন্যান্য নেতাদেরকে একসাথে বসিয়ে গ্লোবাল, রিজিওনাল বা শিল্প-কলকারখানা-বিনিয়োগের নানা ইস্যুতে কথা বলানো, যাতে তা পরিণতিতে এটা দুনিয়াকে নতুন ইতিবাচক আকার দিতে সহায়ক হয় – এমন কথা বলানোরই প্লাটফর্ম হল এই ফোরাম।

একেবারে স্বল্প কথায়, এটা হলো ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বসিয়ে কথা বলানো – কথা বলানোর এক ফোরাম। এতে এর বার্ষিক সম্মেলন একই সময় একাধিক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হবে এভাবে আগাম ঠিক করা ইস্যুতে রাষ্ট্রপ্রধানসহ যে কাউকে বক্তা ও শ্রোতা বানিয়েীটা আয়োজন করা হয়। আয়োজক এই ফোরাম নন-প্রফিট দাতব্য ধরনের সংগঠন, যা নিজেরা নিজেদের ‘প্রাইভেট-পাবলিক’ সংগঠনের মিলনমেলা বলতে পছন্দ করে। বরাবর প্রতি বছর জানুয়ারিতে এই ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ২০০৭ সাল থেকে এর বার্ষিক সম্মেলন দুইবার করে হচ্ছে। প্রতি জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস জেলা শহরের মুল সম্মেলনটা ছাড়াও ২০০৭ সাল থেকে সব সময় চীনে আরেকটা সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের দালিয়ান ও তিয়ানজিং এ দুই শহরের একেকবার একেকটায়, প্রতি জুলাইয়ে তা ঐ একই ফোরামের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এটাকেই ‘সামার দাভোস’ নামে ডাকা হচ্ছে। তবে এখানে প্রাধান্য পায় উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো। একারণে সামার দাভোসের আর এক নাম হল Annual Meeting of the New Champions। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এখানেই যোগ দিতে যাচ্ছেন। আর যেহেতু চীনে যাচ্ছেনই, তাই যেন তিনি চীনের সাথে এই ফাঁকে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৈঠকগুলোো করে নেবেন ৩-৬ জুলাই, ব্যাপারটা হাজির করা হয়েছে অনেকটা এ রকমভাবে।

এই সফরে কী কী চুক্তি স্বাক্ষর হবে সে বিষয়ে মিডিয়ায় যা প্রকাশ হয়েছে তা হল মোট আটটা চুক্তি (বা কোনটা সমঝোতা স্মারক)। যার প্রথম চারটিই হল, পটুয়াখালির পায়রায় যে তেরো শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণ হচ্ছে তা উৎপাদনে গেলে পরে এই বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিতে হলে নতুন কিছু “বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামো” নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ গ্রিড নির্মাণ, লাইন টেনে পরিচালন ও তা বিতরণ ইত্যাদি- এই কাঠামো তৈরিতে যে বিনিয়োগ লাগবে এমন বিষয়ক চুক্তি। এমন প্রথম চার চুক্তির কেবল অর্থমূল্য হিসেবে তা সম্ভবত মোট মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাকি পরের দুই চুক্তি হল, চীনের সাথে যেসব বিনিয়োগ আগামীতে হবে এর টেকনিক্যাল দিক – মানে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতার চুক্তি। এ ছাড়াও অন্য একটা চুক্তি হল, ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎস চীনে, সে অংশ ও আমাদের অংশের প্রবাহবিষয়ক তথ্যবিনিময় ও তা ব্যবহারে সহযোগিতাবিষয়ক। আর শেষের চুক্তিটা হল, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে। এই হল মোট আট চুক্তি।

BCIM প্রকল্পঃ
অতএব, ঠিক বড় বিনিয়োগ আনতে বা এখনই বড় কোনো প্রকল্প চুক্তি হতে যাচ্ছে এই সফর ঠিক তেমন নয়। তা হলে? চোরের মন পুলিশ পুলিশ। ভারতের প্রবল অনুমান যে এই সফরে মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে BCIM প্রকল্প। BCIM নামটা চার রাষ্ট্রের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি। এপ্রসঙ্গে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক খবর ভারতের অনেক মিডিয়াই ছেপেছে। পিটিআই বলছে,  [BCIM] ‘বিসিআইএম(কলকাতা থেকে ঢাকা কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং- এই সড়ক ও রেল সংযোগ) প্রকল্পকে চীনারা সাম্প্রতিককালে আবার জাগিয়েছে” [China lately is making efforts to revive the BCIM.]। আসলে এই প্রকল্প কখনোই বাতিল করা না হলেও ভারত একে মৃত বলতে, এমন রটনা করতে পছন্দ করে থাকে। কারণ ভারত চায় না এই বিসিআইএম প্রকল্পে সে নিজে জড়িয়ে থাকে অথবা তাকে বাদ দিয়ে এটা সফল হয়ে যাক তা-ও চায় না। এখনকার এর কারণ, চীনের নতুন প্রস্তাব হল BCIM প্রকল্প বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হোক,  এতে বাংলাদেশ খুবই আগ্রহী; কিন্তু ভারত একেবারেই নয়। তবে এই প্রস্তাবের আগেও ভারতের অবস্থান ছিল নেহায়তই না বলতে না পেরে যুক্ত থাকা। কারণ আবার ভারত চায়, বিসিআইএম প্রকল্প বলতে এর মানে হোক শুধুই সড়ক ও রেল সংযোগ। কোন গভীর সমুদ্র বন্দর নয়।

অথচ এর বড় এক মূল অনুষঙ্গ ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দর ছাড়া এই “সংযোগ” অবকাঠামো গড়া অর্থহীন। এমনকি তা অর্থনৈতিকভাবে বিচারে এতে বিনিয়োগ করলে তা ভায়াবল হবে কি না বা খরচ উঠবে কি না সন্দেহ। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলেও, ভারত শুরু থেকেই বন্দর নির্মাণকে বিসিআইএম প্রকল্পের অংশ নয় মনে করতে চায়। অতএব চীন-বাংলাদেশের বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা মানেই তা সোনাদিয়া বন্দরসহই। আর এটাই ভারতের জন্য অস্বস্তির।

তবে ভারতের আপত্তির যুক্তি বড়ই অদ্ভুত আর তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বলছে সে চাচ্ছে না ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্টের ভেতর দিয়ে এসে চীন বাংলাদেশের কোনো বন্দর ব্যবহার করুক। আনন্দবাজারের ভাষায় বললে, “বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে। ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”। কিন্তু ঘটনা হল। বিসিআইএমের রুট হল, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে মান্দালয় হয়ে কুনমিং। এটা ভারতের সব মিডিয়া নিজেই লিখছে এই রুট মোট দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটারের। যেমন এভাবে, [The 2800-km BCIM corridor proposes to link Kunming in China’s Yunnan province with Kolkata, passing though nodes such as Mandalay in Myanmar and Dhaka in Bangladesh before heading to Kolkata.]।

অথচ ওদিকে ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্ট হল,  বাংলাদেশের দিনাজপুর-সিলেট এই পুরা উত্তর ভূখণ্ডেরও আরো উত্তরে, যা বিসিআইএম’র রুটেই নয়। বিসিআইএম’র রুট হল বলতে গেলে, কলকাতা-যশোর-ঢাকা হয়ে এবার পুরা দক্ষিণে বা দক্ষিণ-পুবে, আর নর্থ ইস্ট হল এর পুরো উত্তরে। তাহলে?

আসলে BCIM প্রকল্পে চীন বলতে সকলে কুনমিং বুঝলে ও বুঝালেও (কুনমিং আমাদের কক্সবাজার থেকে বার্মার মান্দালয় পার হলে তবেই পৌছানো যাবে) এমন হলেও ভারত জবরদস্তিতে মানে করতে চাচ্ছে – এটা ভারতের নর্থ-ইস্টের অংশ অরুনাচল প্রদেশে চীন-ভারত সীমান্তের ওপারের চীন। হতে পারে ভারতের ভয় এখন চীন বলতে কুনমিং বুঝলেও ভবিষ্যতে প্রকল্প গড়া শেষ হলে চীন তখন আসাম-অরুনাচল সীমান্তের অপর পারের দিক থেকে চীন হিসাবেও আসাম-বাংলাদেশ হয়ে সোনাদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

আর সম্ভাব্য এখানেই চীনকে আসাম করিডোর ব্যবহার করতে দিতে ভারতের ভীতি ও আপত্তি আছে, ধরা যাক ভারত এটাই বলতে চাইছে। ভারতের এই কথার মানে হল, তাহলে কাউকে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ জায়েজ। অতএব, বাংলাদেশ কেন নিজ ভুখন্ড পেরিয়ে ভারতকে নর্থ-ইস্টে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ করবে না।

আবার মজার কথা হল, আসামসহ নর্থ-ইস্টকে চীন করিডোর হিসেবে যাতে ব্যবহার না করতে পারে বা করে ফেলবে এই ভয়ে ভারত নর্থ-ইস্টকে চরম পিছিয়ে পড়া, অবকাঠামোহীন এক অঞ্চল করে গত সত্তর বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রেখেছে। এটাই আসাম সংকটের মূল কারণ; ওখানকার বাসিন্দাদের স্থবির হয়ে থাকা ও রাখা অর্থনৈতিক জীবনের। অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে যে মুসলমানেরা এর কারণ। বাসিন্দাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে ঘৃণা জাগাতে। আর মুসলমান মানেই যেন এরা নিশ্চয় বাংলাদেশের – এই অদ্ভুত প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আর এখান থেকেই এনআরসি (NRC), মুসলমান খেদানো, ৪০ লাখ মানুষকে রিফুউজি ক্যাম্পে মানবেতরে জীবনে ফেলে রাখা ইত্যাদি কী নয়! অর্থাৎ এ যেন, নিজ সন্তান হত্যা করে হলেও প্রতিবেশীর ক্ষতি করতে হবে – এই মনোভাব। সত্যি অদ্ভুত এই হিন্দুত্বের রাজনীতি!

অদ্ভুত এক বাস্তবতা হল, হাসিনার এই আসন্ন সফর নিয়ে ভারতের এই “হিন্দুত্বের রাজনীতি” চরম অস্থির ও খামোখা উদ্বিগ্ন। পিটিআই’র [PTI] ওই রিপোর্ট আরও লিখেছে, ‘সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদি সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের সামিট মিটিংয়ের (১৩-১৪ জুন) সাইডলাইনে কথা বলেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি দীর্ঘ সময়ের পরে বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে কথা তোলেন”। [After a long gap, Xi raised the BCIM project during his meeting with Prime Minister Narendra Modi at Bishkek on the sidelines of the Shanghai Cooperation Organisation summit early this month.]।

লক্ষণীয়, এখানে বিসিআইএম প্রকল্প চীন আগে বাতিল করেছিল তা বলা হয়নি, বলা হয়েছে আফটার লং গ্যাপ- অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পরে প্রেসিডেন্ট শি ইস্যুটা নিয়ে কথা বলেছেন। পিটিআই’র এমন লেখার পেছনের কারণ পাওয়া যায় এখানে, গত ১০ জুন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট [China denies abandoning BCIM corridor। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত প্রতিদিন এক সাংবাদিক প্রেস ব্রিফিং করে থাকে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের কথা ভেবে ভারতীয় সাংবাদিক সেখানে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসে যে, চীন বিসিআইএম প্রকল্প বাতিল করেছে কিনা। স্বভাবতই ব্রিফিং কর্মকর্তা তা নাকচ করেন ও বলেন যে, না তা চালু আছে [“the BCIM has not been abandoned. It is very much on board.”]। আর তা থেকেই হিন্দুত্বের রাজনীতি অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে যে হাসিনার চীন সফরে গুরুত্বপুর্ণ আলোচনার বিষয় বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে কথা হবে। বাংলাদেশ নিজ একান্ত স্বার্থে তার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী স্বাধীনভাবে শেষ পর্যন্ত এবিষয়ে আলোচনা আগিয়ে নিয়ে সক্ষম হবে! আমরা বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছি!

আমেরিকাও কান পাতাঃ
হাসিনার আসন্ন চীন সফর নিয়ে আরেক লক্ষণীয় দিক হল – কেবল ভারত নয়, আমেরিকাও কান পেতে এ সফরকে জানা ও শুনার জন্য গভীর আগ্রহী। এর আগে এসব ক্ষেত্রে দেখা যেত এনিয়ে একটা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার রিপোর্টই তাদের যথেষ্ট ছিল। ইদানীং দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কিছু মিডিয়া হাসিনার চীন সফর নিয়ে ভারতের মতোই আগ্রহী রিপোর্ট ছেপেছে। ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’ বা এর এফিলিয়েটেড ‘বেনার নিউজ’ এমন আমেরিকান সরকারের বিদেশনীতির আলোকে রিপোর্ট লিখেছে। এরা পরস্পর একই রিপোর্ট শেয়ার করে থাকে।  Radio Free Asia, এই নাম বা শব্দের মধ্যে “FREE” শব্দটা ইন্টারেস্টিং। কোল্ড ওয়ারের যুগে সোভিয়েত বিরোধী প্রপাগান্ডা লড়তে আমেরিকার প্রিয় শব্দ ছিল ফ্রি। মানে বদ্ধ সোভিয়েত দুনিয়া থেকে মুক্ত দুনিয়ায় আহবান। ব্যাপারটা এখানেও প্রায় তেমনই। বলা হয়েছে এশিয়ার যেসব দেশের জনগণকে তাদের সরকার সত্যিকথা শুনতে জানতে দেয় না, এই রেডিও তাদের জন্য। অর্থাৎ এটা এখন একালে চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডার কাজে লিপ্ত। যা হোক এটা কেবল রেডিও হলেও এদেরি সহযোগী এফিলিয়েটেড আর প্রতিষ্ঠান হল, BenarNews. এরা ইংরাজি ছাড়া আরও বাংলাসহ চার ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন নিউজ।

বাংলাদেশ কতটা চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চলে গেল এ নিয়ে ভারতের মতই আমেরিকার উদ্বিগ্নতা – এটাই তাদের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কলাপাড়া, পটুয়াখালীতে দুর্ঘটনায় এক স্থানীয় শ্রমিকের মৃত্যু হলে শ্রমিকদের সাথে চীনা ঠিকাদারের ম্যানেজমেন্টের বিরোধে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একজন বাংলাদেশী শ্রমিক ও একজন চীনা টেকনিশিয়ান নিহত হয়েছেন। মূলত নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকের “লাশ গুম হওয়ার গুজব ছড়িয়ে” পড়লে মূলত তা থেকেই সংঘর্ষের শুরু।

এই পরিস্থিতির উত্তেজনা সামলাতে ও ঠান্ডা করতে আপাতত সবাইকে দু’সপ্তাহ ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। বেনার নিউজ লিখছে, It was not immediately clear whether Hasina and the Chinese leaders will discuss the recent fight between Chinese and Bangladeshi workers at a site of a partly built China-funded power plant.]। সারকথাটা বাংলা করে বললে তারা ‘পরিষ্কার নয় যে, এটা ইস্যু হিসেবে চীন-বাংলাদেশ সামিটে আলোচনা হবে কি না’!

আসলেই, এটা Benar এবং RFA এর গভীর উদ্বেগপ্রসূত “আশা”! কিন্তু সমস্যা হল, শকুনের বদ দোয়াতে গরু কখনও মরে না। তবে আমরা পরিস্কার থাকতে পারি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টও লিখে এমন “শকুনি আশা” জানাবে না। ঘটনা হল, এই প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ আবার বাংলাদেশী শ্রমিকের অধিকার রক্ষাও বাংলাদেশের স্বার্থ – দুটোই আমাদের স্বার্থ। দুটোই আমাদের সবল রক্ষা করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এটা নিয়ে “সামিট লেবেল” কথা বলতে হবে? এটা কী চীন-বাংলাদেশ কোন বিরোধ? ঐ রিপোর্ট কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন?  এটা তো রিপোর্টিং নয়, বেয়াদবি খোঁচাখুচি!  ভাষা লক্ষ্য করার মত লিখেছে এটা নাকি “চীনা ও বাংলাদেশি শ্রমিকের ফাইট” [fight between Chinese and Bangladeshi workers] এর ইস্যু। ব্যাপারটা বড়জোর বাংলাদেশী প্রকল্প পরিচালক আর ওই চীনা ঠিকাদার কোম্পানির মিলিতভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক সৎ উদ্যোগ এ সমস্যা মিটিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। অথচ …। বাংলাদেশ-চীনের প্রকল্প ভালো না চললে বা তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেই যেন রিপোর্টারের লাভ, তাই তিলকে তাল। বদ দোয়াই ভরসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন সফর ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

গৌতম দাস

০৩ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AL

 

বাংলাদেশের “পররাষ্ট্রনীতি” বলতে যা কিছু আছে তা হঠাৎ করে আমেরিকানদের নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। যদিও এরা কোন আমেরিকান, কারা এরা, তা নিয়েও কথা আছে অবশ্য। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই নড়াচড়া বা নজর ফেলা এককথায়, পন্ডশ্রম। বিষয়টা ‘প্রথম আলো’র ভাষাতেই বললে, গত ১৭ মে তাদের একজন লিখেছে, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞেস নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই, BEI) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই, IRI )“।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান দু’টি আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। তারা ঐ থিঙ্কট্যাঙ্কেরই বাংলাদেশ শাখা নাকি কেবল ফান্ডদাতা-এনজিও সম্পর্ক, কোনটা- সেটা তাদের মুখ থেকেই আমাদের জানার বাকি আছে। যা হোক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যা কিছু নিজের কাজের ইস্যু হিসেবে তুলে আনে, অনুমান করা অবাস্তব হবে না যে, তা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ বলে তারা মনে করে।

কথা হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন আছে, এর ঘাটতি, খামতি কী – সে প্রশ্ন এখন কেন? বিশেষ করে আজকের খোদ বাংলাদেশই যে দশায় আছে, একে এই অবস্থায় আনা ও ফেলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় আমেরিকান বন্ধুদেরও অবদান আছে। গত ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকা বুশ এবং ওবামা- এই দুই প্রশাসনের তো বটেই অন্তত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরও [AEI] বিশেষ ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কী করা হবে এনিয়ে অন্তত  ভারত-আমেরিকার আলোচনাগুলোতে, গোলটেবিল বা ইনফরমাল বৈঠকে ইনপুট দিয়ে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ধরনের পরিণতি, এই অর্থে ‘উত্তরসূরি’ বলা যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে এক ধরনের সামরিক ক্ষমতা দখল হয়েছিল তাকে আমরা অনেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলি, যা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। কেন এই ঘটনা ঘটেছিল, এর ‘আনুষ্ঠানিক’ কারণ কখনও জানা যাবে না। কিন্তু আসল কারণ যা দখলকারীদের সাফাই-বক্তব্য থেকে জানা যায়, মোটাদাগে সে ভাষ্যটা হল – আগের সরকার  “ওয়ার অন টেরর” -কে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে “জঙ্গি মোকাবেলার উপযোগী” করে ঢেলে সাজানো ও সংস্কার করা হয়নি। সে কাজগুলো সম্পন্ন করতেই ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই বক্তব্যটা ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পরে বদলে যায়।

মূল কারণ, আমেরিকান অগ্রাধিকার মানে কোনটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ ও আগে দরকার সেই বোধ বদলে গিয়ে এক নতুন আকার নিয়েছিল। আমেরিকা ওয়ার অন টেরর বা জঙ্গি ঠেকানোর চেয়ে তখন থেকেই “চীন ঠেকানো’-কে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করেছিল।  না সাব্যস্ত করা ছিল আগেই তবে বাস্তবায়ক রেডি ছিল না তখন। আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’[China containment], মানে ‘চীন ঠেকানো’ নামের কর্মসূচি আছে। এর অর্থ হল, ২০০৫ সালের পর থেকে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হিসেবে চীনা উত্থান আর আমেরিকার পতন যখন আমেরিকার নিজের করা সার্ভে ও পরে তা নিয়ে প্রকাশিত (২০০৮) রিপোর্টও স্বীকার করে, তখন এশিয়ার দুই ‘রাইজিং অর্থনীতি’ চীন ও ভারত – এদের একটাকে (ভারতকে) কাছে টেনে একে অপরটির (চীনের) বিরুদ্ধে লাগানোর নীতিই আমেরিকার “চায়না কনটেইনমেন্ট”। আমেরিকার এই “চায়না ঠেকানোর” নীতিতে ভারত নিজেকে পরিচালিত হতে দিতে রাজি হয়ে যায় এসময়েই। বাংলাদেশে আমেরিকান প্রায়োরিটি বদলের রহস্য এখানেই।  সেজন্যই হঠাত করে এই রদবদল ঘটেছিল।

আর এর বিনিময়ে ভারত পায় – এক. একদিকে আমেরিকায় পণ্যের রফতানি বাজারে বিনা বা কম শুল্কে আমেরিকায় প্রবেশ সুবিধা, ভারতের আমেরিকান হাইটেক অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি। আর দুই. এছাড়াও অন্য দিকে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে “দেখভালের দায়িত্ব” তুলে দেয় যাতে জঙ্গী ঠেকানো কথার আড়ালে ভারত বিনা পয়সার করিডোর, আসামের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারসহ এ দেশকে সরাসরি অন্যান্য নানান ব্যবহার করে সব সুবিধাই নিতে পারে ভারত।  প্রায় নিয়ন্ত্রক বনে ভারতের হাতে চলে যায় বহু কিছু। যেমন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ও প্রয়োজনে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনের সাহায্য নিবে কিনা তা নির্ভর করবে ভারতের স্বার্থ এই অগ্রাধিকার যদি তা এলাও করে একমাত্র তবেই। এর সোজা অর্থ, ভারত বন্দর চায় না তাই বাংলাদেশ এটা করতে পারবে না।

ফলে এভাবেই এরপর থেকে চলে আসছে আজ পর্যন্ত, আমাদের এই দুর্দশার শুরু এখান থেকে। কিন্তু সেই আমেরিকা এখন আবার আরও কী চায়? একই লোকদের আমরা আবার তৎপর হতে দেখছি কেন?

গত ২০১৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা দেখেছিলাম যে, সেবার বাংলাদেশের বিনা ভোটের নির্বাচনকে ভারত প্রকাশ্যে সদর্পে সমর্থন দিয়েছিল আর তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এত ঘনিষ্ঠতায় মিলে গেছিল যে, তারা কেউই আর যেন আমেরিকাকে চেনেই না। বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ডন মোজিনা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্রিফিং না পেয়ে বা না নিয়ে ভারতে গেছিলেন – এই ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী নিঃসন্দেহে!

বাস্তবতা হল, আমেরিকা এখন নিজের সব মুরোদই হারিয়েছে। চীন ঠেকানোর যে কাজ ভারতকে দিয়ে করানোর বিনিময় হিসেবে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে দেখার দায় তুলে দিয়েছিল, তাতে কি চীনের উত্থান ঠেকানো গেছে? প্রশ্নই উঠে না কারণ এভাবে তা হয় না।  তাই আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। কোন দাগও ফেলতে পারেনি, আমাদেরকে কষ্ট-দুর্দশায় ফেলা ছাড়া। বরং নিজেরই বেগতিক অবস্থায় আর দুর্দিনে আমেরিকা এক “পাগলা প্রেসিডেন্ট” পেয়েছে, যিনি নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি নাকি ন্যাশনালিস্ট আমেরিকান! কী তামাশা! গ্লোবালাইজেশনের নেতা আমেরিকা, যে দুনিয়াটাকে অন্তত ৩০ বছর ধরে একটা গ্লোবালাইজড শ্রমবিভাজিত এক গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিয়ে গিয়েছে, সেই আমেরিকার পাগলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, উনি এখন নাকি ‘ন্যাশনালিস্ট’, সবকিছু “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে ফরে সাজিয়ে ফেলবেন বা হয়ে যাবেন। যেন বুড়া বয়সে বিড়াল বলছে সে আর মাছ খাবে না।

কিন্তু ঘটনার কঠিন সত্য দিকটা হল, আমরা কেউই মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারি না, পারব না।  এটা সম্ভব নয়। তাই এর চিন্তাই করি না। কিন্তু এই গোয়াড় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন এটাও নাকি করা সম্ভব। ব্যাপারটা এমনই নাকি সহজ। আসলে পাগলামি আর দেশ চালানো তো এক জিনিস নয়। তাতে আমাদের অসুবিধা নেই; কিন্তু যারা বাংলাদেশে আমেরিকান স্বার্থের দেখভাল করে সেই “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা” তাদেরকে আবার তৎপর হতে আর বড়ই পেরেশান দেখাচ্ছে। সমস্যাটা মূলত তাদের। মনে হচ্ছে তাঁরা এটা বুঝতে বা এই বাস্তবতা মানতে চাচ্ছেন না।

অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ন্যায় কিনা কথা সেটা না। সে প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে আগালে এসব ব্যাপারে প্রথম দেখা প্রয়োজন হয় মুরোদ আছে কী না। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা মুরোদহীন। অর্থাৎ তিনি আমেরিকাকে মুরোদহীন করে ফেলেছেন অথবা আমেরিকা যে মুরোদহীন এটা মেনে নিয়েছেন। এখন ‘মুরোদহীন’ হলে আর সে তো মরদ থাকে না। তাই আমেরিকার মরদগিরি শেষ। ভারতকে বাংলাদেশ দিয়ে দেয়ার পর থেকে ঘটনাচক্রে আমেরিকাও এই মুরোদহীন হয়ে যায়, ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। তাই, ইতিহাসে ২০০৭ সালই সম্ভবত বাংলাদেশে ‘সর্বশেষ আমেরিকান হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ থাকবে। অন্তত ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, মানে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমেরিকা এমন থাকবে – অভিমুখ, ঝোঁক তাই বলছে। ২০২১ সালে (মানে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে) কে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জিতে বসবে – ডেমোক্রাট না রিপাবলিকান, এছাড়া আবার সে কেমন প্রেসিডেন্ট হবে – এগুলো হাজারটা শর্তের “যদি-না-কিন্তু” এর প্রশ্ন। এককথায় বিষয়টা এখন পুরাটাই অনিশ্চিত। আর ততদিনে আমেরিকার আগের মতন বাস্তব হস্তক্ষেপের মুরোদই থাকবে না, তা না হলেও তা আরও কমে যাবে। বাস্তবতাই থাকবে না হয়ত। অতএব, বাংলাদেশের “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকান” – আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। পারছেন না। আমরা জানি নভেম্বর ২০১৮ জেমস মাতিসের [Mattis] পদত্যাগ আপনাদের সব আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে, আপনারা অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল আসলে সেটাই শেষ।  মনে রাখতে পারেন – ট্রাম্প যতদিন অফিসে আছে তিনি সবকিছু ফ্রিজ করে দিবেন। এই সময়ের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন ইত্যাদি যেখানেই যা কিছু নড়াচড়া শুরু হোক না কেন, সেসব হোয়াইট হাউজে যাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকান স্বার্থের’ সবচেয়ে ‘ভালো ভালো উদ্যোগ ও প্রস্তাব’ তা যত ভালই হোক না কেন – এসবই ডিপ ফ্রিজে চলে যাবে। কারণ, পুরনো অভ্যাসে “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকার”  এসব তৎপরতার প্রতি ট্রাম্প ন্যূনতম আগ্রহী নন। এখান থেকেই এটাকে ‘মুরোদহীনতা’র শুরুও বলতে পারেন। কাজেই দিন শেষ!

আসলে ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ যারা তাঁরা সম্ভবত আসলে খেয়ালই করেননি যে ২০০৭ সালেই তাদেরকে অসত্য বলা হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে তা সামনে রেখে এর আড়ালে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর প্রায়রিটি’তে মেতে উঠেছিল। ভারতের হাতে সব তুলে দিয়েছে অথচ বাংলাদেশের বন্ধুদেরই তা বলেনি। আর বাংলাদেশের বন্ধুরা যদি জানতেনই তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতি। তবে তাদের শান্ত্বনা এই যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে আমেরিকার পক্ষে আর সত্য লুকায়ে রাখা সম্ভব হয় নাই।  ‘ওয়ার অন টেরর’ যে আর আমেরিকার প্রায়রিটি নয়, সে তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস এই সময়ে এসে আর না লুকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন [Mattis: US national security focus no longer terrorism]। এটা ২০১৮ সালের শুরুতে ১৯ জানুয়ারি বিবিসির সংবাদ শিরোনাম। মাতিস বলছেন, “টেররিজম নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আমেরিকার জন্য প্রধান হুমকি”। অথচ এই কথাটাই ২০০৭ সাল থেকেই তাদের মনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় থেকেই সব স্তরে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুল কারণ দুনিয়াতে চীনা উত্থান অনিবার্যভাবে আসন্ন – সেকথা তারা তখনই গবেষণা সার্ভে ও স্টাডির রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক-কাল অবস্থা থেকেই তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। আনুষ্ঠানিক এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।

এই বিকল্প ডেভেলবমেন্টগুলো ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ এরা আমল করেছিলেন বা করতে সক্ষম ছিলেন তা তাদের কারবার ততপরতা দেখে কখনও মনে হয় নাই। কিন্তু এতে আসলে যা মূল জিনিষটা বদলে গেছে, বিশেষ করে খোদ ‘ফ্রেন্ডস’ শব্দটিরই সংজ্ঞা বদল হয়ে গেছে ট্রাম্পের হাতে, সেটাই কেউ আমল করেছে মনে হয় নাই। ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান – তাঁর পরিচলন নীতিটাই আসলে বলে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে – আদৌ আমেরিকার কোনো ফ্রেন্ড দরকার আছে কি না? ট্রাম্প নিজেই জবাব দিয়েছেন, যে দরকার নাই। আর যদি থাকেও, তারা ভিন্ন কেউ; অথবা বাংলাদেশে তার এমন ফ্রেন্ড আর লাগবে না। ট্রাম্প নিশ্চয় সরাসরি এ কথা বলেননি, তবে তাঁর অনুসৃত নীতি (ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্প বা ট্রাম্পের নাশনালিজম) এই মেসেজটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে আমেরিকান বন্ধুদের (Friends of America, in Bangladesh) বাংলাদেশকেই সবকিছুর জন্য দোষী ঠাউরানো – অস্বাভাবিক বা নতুন না। এটাই তারা সবসময় করে এসেছেন। যেমন এভাবে অনেকে এখনও বলছেন যে, ভাল ভাল “গণতান্ত্রিক দেশে”  তাদের পররাষ্ট্রনীতি নাকি “জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে” সমর্থিত ও সমৃদ্ধ থাকে বলে, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ তারা সহজেই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা; সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রথম আলো পত্রিকা যে রিপোর্ট করছে তাতেও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্যারায় তারাও লিখেছে এভাবে – “আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা বদলে যায় বলে জনমনে ধারণা আছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সুশাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আলোচক”। অর্থাৎ সার কথা আমেরিকার কোন দোষ নাই। সব আমাদের দুই দলের রেষারেষির কারণে, তাই সবদোষ আমাদেরই।

বিইআই ও আইআরআই-এর আলোচনা সভায় আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর সব দায় চাপিয়ে এমন মন্তব্য খুবই অনুচিত ও অবিচার তা বলাই বাহুল্য। কারণ, ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপার কমবেশি সবই আপনারা তো জানেন। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিবাদ আছে কথা সত্য, ফলে তা অনেক কারণের একটা । কিন্তু তা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কারণ তো – আমেরিকার হস্তক্ষেপ।

ঠিক আছে তাহলে আসেন, আপনাদের বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়া ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, আপনাদের বক্তব্যের দুদিন পরেই। ভেঙ্গে বললে, একটা বড় ঘটনাই ঘটেছে। সম্ভবত বলা যায় যে চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এটাই এই প্রথম আমরা প্রধান দলগুলো একটা সফল এককাট্টা অবস্থান প্রকাশ করেছে।

তাহলে ঠিক এখনই আপনাদের নড়াচড়া কেন?
সম্প্রতি চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এই প্রথম প্রধান দলগুলো একটা সফল অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। আর এটা তারা করেছে ভারতের এব্যাপারে অবস্থান যাই হোক না কেন – এই প্রথম এটা ধরে নিয়ে। “গত ১৯ মে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশ চীন সিল্ক রোড ফোরাম’ গঠন করেছেন”। বেশির ভাগ পত্রিকার হেডিং এটাই। এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব হয়ত বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের – তা যারই হোক, এ ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভি, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ো -এদের উপস্থিতিতে সহায়ক সে কমিটি করা হয়েছে সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ অনেকে এর সদস্য হয়েছেন। মঈন খান বক্তৃতায় করেছেন। ওদিকে ড. গওহর রিজভী [Gowher Rizvi] ঐ সভায় দাবি করেছেন যে, “ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে”।

এই কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই আছে। তবু বাস্তবতা যতটুকুই থাক একেবারে মাঠের ফ্যাক্টস হল, এই গতকাল ১ জুন ২০১৯ ব্লুমবার্গ রিপোর্ট লিখেছে যে ট্রাম্প চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিসহ  ভারতের সাথে কোন খাতিরের সম্পর্কই করতে চান না। সবকিছুর মাথা মুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাগজ কলমে ভারত সুবিধাদিগুলো উপভোগ করত কারণ, ভারত আমেরিকার বিবেচনায় একটা উন্নয়নশীল দেশ [Developing Nation] ঘোষণা করা ছিল বলে। এখন ট্রাম্প সেটার মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, বলছে Trump Ends India’s Trade Designation as a Developing Nation.। এমনিতেই আগের ভারতকে দেয়া সবসুবিধা ( যা চীন ঠেকানোর বুটি হিসাবে ওবামা দিয়েছিল) ট্রাম্পের আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছিল গত বছর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শুধু তাই না উলটা ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক ট্যারিফ বসিয়ে দিয়েছিল যাতে রপ্তানিই অকার্যকর হয়ে যায়।

কাজেই ভারত এখনও আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর খেপ মারতে” পুরানো শর্ত রাজি থাকলেও খোদ ট্রাম্প বাবাজিরই “মন” নাই। নট ইন্টারেস্টেড। এই ফ্যাক্টসটা আমল করলে বাংলাদেশের ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ এদের সব ততপরতাই পন্ডশ্রম। ওদিকে খেয়াল করলেই আমরা নিজেরাও বুঝব যে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলতে চীন গত বছর থেকেই পুরাপুরি তৈরি – এবং তা বাস্তবায়িতই হয়ে গেছে। এর প্রমাণ সফল  য়ুহান সম্মেলন (Wuhan Summit)। এমনকি এবছরও সম্ভবত পরের মাসে দ্বিতীয় য়ুহান সম্মেলন হতে চলেছে। এসব ততপরতার সার কথাটা হল এবার হয় ভারত চীনা শুধু বেল্ট ও রোড প্রকল্পেই না খোদ চীনা নৌকাতেই উঠবে। যদি কোন কারণে না উঠতে পারে, বনাবনি না হয় তবে পরস্পর কঠিন শত্রুতার দিন শুরু হবে। সুতরাং  নিঃসন্দেহে ভারত অনেক দাম চাইবে। যা তার দাম নয় এর চেয়েও বেশি হবে হয়ত সেই প্রাথমিক “asking price” । কিন্তু চীনা স্বার্থের চেয়েও বেশি এমন অসম্ভব অবাস্তব কিছু না চাইলে এই ডিল হবার সমূহ সম্ভাবনা। বিশেষ করে দুটা ফ্যাক্টস এর পটভুমিতে একথা বিবেচনা করা যায়। এক. চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ মিটিয়ে নিবার ডিল ব্যর্থ হয়ে গেছে যা, এখন পরবর্তি ঝড়ের অপেক্ষায় যা এখন আসন্ন। আর দুই. ভারত শত চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের কোন ডিল, কোন “খেপ” পাবার কিছুই নাই, কোন অফারও নাই। বরং পুরা উপেক্ষা আছে। ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠে বসলেও যেন ট্রাম্পের তা নিয়ে কোন পরোয়া নাই। ভারতকে এমনই তাচ্ছিল্যের মুডে আছেন ট্রাম্প। যার মূল কারণ হল, ট্রাম্প তার এখন প্রধান লক্ষ্য হল দ্বিতীয় বার নির্বাচনে দাঁড়ানো – এই মুডেই তিনি আছেন। আর তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এখন নিচ্ছেন তা সে উদ্দেশ্যেই প্রভাবিত। চীনের সাথে বিরোধ মিটিয়ে কোন বাণিজ্য ডিল না করা অথবা ভারতকে কোন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া ইত্যাদি এমন সবই একারণে তুচ্ছ ট্রাম্পের কাছে। বরং তিনি বীর, তিনি আমেরিকান ন্যাশনালিস্ট – এই পরিচয় গড়তে তিনি একমাত্র ব্যস্ত যা দিয়ে তিনি নির্বাচন লড়বেন। যদি না আবার ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন!

কাজেই ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ, আপনাদের উচিত হবে বাস্তববাদী হওয়ার, সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পন্ডশ্রম অর্থহীন। বরং ফ্রেন্ডশীপ রিনিউ বা চেক করে দেখতে পারেন – তা এখনও বহাল আছে কী না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutam.das@gmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০১ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার বন্ধুদের নজরে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

গৌতম দাস

১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2Ae

 

চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

“কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে” এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মাহাথির কায়দায় ‘ঋণফাঁদে’র গল্প মোকাবেলা

মাহাথির কায়দায় ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলা

গৌতম দাস

২৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2zH

 

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ, বাংলাদেশে তাকে চেনেন না এমন লোক খুব কমই আছে। অবশ্য নিজ স্বার্থে কেউ কেউ নিজের আকামের পক্ষের সাফাই হিসাবে তাঁর নাম মুখে নিয়ে থাকেন  ঢাল হিসেবে মাহাথিরকে ব্যবহার করে থাকে। মালয়েশিয়ার টানা পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী আর ১৯৮১-২০০৩ সাল, এই ২২ বছরের সক্রিয় রাজনীতিবিদ তিনি। প্রাকটিসিং সরকারি ডাক্তারির চাকরি রেখে ১৯৬৪ সাথে প্রথম পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল। তার শাসনকালের প্রধান সাফল্য মনে করা হয়, মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে তিনি বিপুল উঁচু স্তরে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ার শিল্পায়িত ভবিষ্যত তাঁর হাতেই আলো দেখেছিল। আবার তিনিই এমন রাজনীতিবিদ ষাটের দশকের শেষভাগে যেটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথমপর্যায় ছিল, তখন  তারই লেখা একটা বই – তারই দলের সরকার এর প্রকাশনা ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরিণতিতে যা তাঁকে রাজনীতি ও দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কারণ প্রকাশিত “মালয় ডিলেমা” নামে ঐ বইয়ে তিনি স্থানীয় মালয়বাসীর পক্ষে, তাদের জীবনে অসাম্য দূর করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। মালয়েশিয়া মূল চারটা নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠির [race or ethnic groups] দেশ মনে করা হয়। [এই কথাগুলো মালয়েশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান বিভাগের এই রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে।] সেখানে ২০১০ সালের জনসংখ্যা রিপোর্টের উপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলা হয়েছে। ঐ চার এথনিক গোষ্ঠি মধ্যে ভুমিপুত্র [Bumiputera (inclusive of Malay and Indigenous)]  মিলিয়ে এরা ৬০ ভাগ বলা হয়েছে [Bumiputera, the main ethnic constituted 60.3 per cent]। আর চীনা-অরিজিন মালয়েশিনেরা ২২.৯% [Chinese and Indians at 22.9 and 6.8 per cent] বলা হয়েছে।  ভুমিপুত্ররা সংখ্যায় বেশি কিন্তু চীনা-অরিজিন মালয়েশিয়ানদের চেয়ে বেশি গরীব বলে মাহাথির ঐ বইয়ে দাবি করেছিলেন ভুমিপুত্রদের সামাজিক-অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধায় কিছুদিন বেশি দেয়া হোক। (আমাদের পাহাড়ি কোটার মত যেটাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘এফারমেটিভ একশন'[affermative action] বলা হয়ে থাকে।) কিন্তু ততকালীন প্রধানমন্ত্রী আব্দুল রহমান [Prime Minister Abdul Rahman] এসব কথা তোলাতে এথনিক বিবাদ লড়াই না উস্কে উঠে এই ভয়ে তা চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এথেকেই সেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এগুলো সবই ১৯৭২ সালের আগের ঘটনা। তবে ১৯৭২ সালে ঐ প্রধানমন্ত্রীর টার্ম শেষ হয়ে তিনি অবসরে গেলে, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে, মাহাথির আবার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যান। এর পর থেকে তার রাজনৈতিক জীবনের কালো দিন কেটে যায়, তাকে আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি। ১৯৭৪ সালে তিনি মন্ত্রীসভায় স্থান পান, আর ১৯৮১ সালের পর থেকে টানা পাঁচ টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্বের দিন শুরু হয়ে যায়। তবে তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁর গৃহিত অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য দিয়েই তিনি বিভক্ত এথনিক জনগোষ্ঠিগত অসাম্য দূর করেছিলেন। [Mahathir sought to bridge Malaysia’s ethnic divisions by increasing general prosperity. ]

এ সময়কালে এক দিকে তার পরিচালিত সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য যেমন সত্য, তেমনি অন্য দিকে তিনিই ১৯৮৭ সালে ‘ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ [Internal Security Act] নামে কালো আইন পাস ও তা আরোপ করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। এভাবে ২০০৩ সালে তিনি তাঁর পাঁচ টার্ম প্রধানমন্ত্রীত্ব শেষ করে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের দিনে (২০১৮ সালের নির্বাচন থেকে) তিনি আবার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জোটসঙ্গী করে নির্বাচনে জিতে এখন ক্ষমতায়। যদিও সেকালে ঐ ১৯৮৭ সালের কালো আইন দিয়েই মাহাথির, আনোয়ার ইব্রাহিমসহ বহু বিরোধী নেতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টকে বন্দী করে রেখেছিলেন। এতে সেসময় মোট চারটি দৈনিক পত্রিকা বন্ধ এবং মোট প্রায় ১০৬ জন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাকে গ্রেফতার করেছিলেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ক্ষমতা খর্ব এবং কাউকে কাউকে পদত্যাগ করতে বাধ্যও তিনিই করেছিলেন। এভাবে বেপরোয়া মানবাধিকার কেড়ে নেয়াতে আমেরিকাসহ দেশী-বিদেশী অনেকের ভাষায় ও চোখে তিনি ‘স্বৈরশাসক ও নিপীড়ক’ হয়ে উঠেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই বৈপরীত্যের কারণে আমাদের কালের অনেক “স্বৈরশাসক” নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে মাহাথির মোহাম্মদের নামের আড়ালে নিজেদের অপকর্ম লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকেন।

২০০৩ সালে মাহাথির রাজনীতি থেকে অবসরে চলে গেলেও তিনি মালয়েশিয়ার নির্বাচনে (গত ২০১৮ সালের মে মাসে) কোয়ালিশন জোটে বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছেন এবং ৯৩ বছর বয়সে এখন আবার প্রধানমন্ত্রী। একালের মাহাথিরসহ তাঁর জোটসঙ্গীদের দাবি, এই জোট গড়ার মূল কারণ নাজিব রাজাকের অপশাসন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাকের আমলের কুশাসন ও ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতি থেকে মালয়েশিয়াকে বাঁচাতে জেলে বন্দী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথেই জোটবদ্ধ হয়ে মাহাথির আবার নির্বাচনে নামেন এবং বিজয়ী হয়ে জোটের বোঝাপড়া অনুসারে, এখন প্রথম দুই-তিন বছরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আছেন।

আমাদের আজকের আলোচনার বাকি অর্ধেক অংশের প্রসঙ্গ চীন। এটাকে বলা যেতে পারে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের চীন অথবা নতুন করে চলতি চীন-মালয়েশিয়া গভীর সম্পর্ক স্থাপন কেন সম্ভব হল, সেটাই প্রসঙ্গ।

আগের প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের শাসনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল, ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট। আর এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ঘটনা হল 1MDB প্রকল্প। 1MDB মানে ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলবমেন্ট লিমিটেড” (মালয় ভাষায় বেরহাড) নামে এক কোম্পানি। এটা মালয়েশিয়ান অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজ মালিকানাধীনে  “উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার চিন্তায়” নেয়া এক কোম্পানির নাম। আগ্রহিরা প্রভাবশালি মিডিয়া ব্লুমবার্গের এই রিপোর্ট-টা পড়ে নিতে পারেন।  কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা কখনো নিজ-সক্ষমতার [insolvent] কোম্পানি হয়ে উঠতে পারে নাই। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে অচচ্ছভাবে  লেনদেন, মানি লন্ডারিং, অর্থ নয়ছয় ও চুরির অভিযোগে নজরদারিতে পরে যায়। ব্লুমবার্গ এনিয়ে রিপোর্টের শিরোনাম থেকেই একে মহা অর্থ-কেলেঙ্কারি Scandal বলে চিহ্নিত করেছে।

বলা হয়েছিল, এটা আসলে মালয়েশিয়া সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন প্রকল্প, লক্ষ্য ফান্ড সংগ্রহ; কিন্তু বাস্তবে এটা আমেরিকা-সুইজারল্যান্ডসহ সাত দেশের বিভিন্ন বিনিয়োগ ফান্ড কোম্পানির সাথে মিলে দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ নিয়ে যাওয়াসহ বহু অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির এক প্রকল্প হিসেবে হাজির হয়। মোট প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার এখানে ‘নয়ছয়’ হয়েছে। এ ছাড়া, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের গত কয়েক বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ষ বিনিয়োগ কোম্পানি “গোল্ডম্যান স্যাস” [Goldman Sachs ] এতে জড়িত বলে আমেরিকার আইন বিভাগ সে অভিযোগ তদন্তে নেমেছে, মামলা করেছে। স্যাক্সের অন্তত তিনজন ব্যাঙ্কার এই মামলায় আসামি।  ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাক ও তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে এই প্রকল্প থেকে প্রায় বিলিয়ন ডলার অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কীভাবে এত অর্থ রাজাকের একাউন্টে এল, গত নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাজাক এর কোন সদুত্তর দিতে পারেন নাই। এভাবে এক মহা-কেলেঙ্কারির দুর্নীতি মামলায় রাজাক ও তার স্ত্রী এখন জেলে।

East Coast Rail Link (ECRL) from railprofessional.com

ওদিকে এই 1MDB প্রকল্প ছাড়াও আরও এর বাইরে চীনের সাথে নেয়া বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্পে মালয়েশিয়াকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে মাহাথির জোটের অভিযোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হল, চীনের সাথে নেয়া “ইস্ট কোস্ট রেল লিঙ্ক প্রকল্প” (East Coast Rail Link, ECRL)। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এটা এক বড় প্রকল্প এবং  নির্মিত হয়ে গেলে এটা চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত ও অংশ হয়ে যাবে। মালয়েশিয়ার পূর্ব-পশ্চিম দু’দিকেই সমুদ্রসীমানা। এই প্রকল্প পূর্বের কেলানতান বন্দর থেকে উপকূল বরাবর নেমে পশ্চিমে গিয়ে সেখানকার ক্লাঙ্গ বন্দরের সাথে যুক্ত হবে – এমন রেল যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রকল্প এটা। বলা হয়, নাজিব সরকার বিপুল ব্যয় করে এই প্রকল্প নিয়েছিল ‘ভালো কমিশন’ পাওয়ার স্বার্থে। তাই এত বড় বিনিয়োগের ভার তাদের অর্থনীতি বইতে পারবে কি না সে দিক উপেক্ষা করেছিল।

মাহাথির এবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ২০১৮ সালের মে মাসের নির্বাচনে। এর তিন মাসের মধ্যে আগষ্ট ২০১৮ তিনি চীন সফরে চলে যান যার মূল ইস্যু এই ECRL প্রকল্প। সেকালে এই প্রকল্প নিয়ে মাহাথিরের জনসমক্ষে বলা প্রধান যুক্তি ছিল, “আমার দেশ এত বড় বিনিয়োগের ভার সইতে পারবে না, অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে”।  তিনি চীনাদেরকে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পরে যেতে পারা – এই দুর্দশার দিকটা আমল করতে বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ভুল বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প – এমন বলছেন না। এদিকে চীনা ঠিকাদার কোম্পানির হাতে প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে, মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হয়েই চীনের সাথে কথা বলে প্রকল্পের কাজ স্থগিত করিয়ে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন।

একালে এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ব্যাপক হারে অবকাঠামো খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেখা যায়। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই আবার চীনা ‘বেল্ট-রোড’ মহাপ্রকল্পে যুক্ত হওয়ার কথা। তাই  চীন-ঠেকানোর বুদ্ধিতে স্বভাবতই এসব প্রকল্পের চরম বিরোধী অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্পের আমেরিকা। সাথে কিছু থিংক-ট্যাংক প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এমনই এক প্রপাগান্ডা শব্দ-চিহ্ন হল – “ঋণের ফাঁদ” [Debt Trap]।

এই প্রপাগান্ডার সারকথা বা দাবি হল, চীন বিভিন্ন দেশকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে নিজের কব্জায় নিয়ে ফেলছে। এমন অভিযোগ সত্তর দশকে এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রথম আগমনের সময় থেকে বিশ্বব্যাংকের, মানে আমেরিকার বিরুদ্ধেও ঊঠেছিল বা দেয়া হত। মজার বিষয় হল, আমেরিকা এখন সেই ভাষাতেই  চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা-অভিযোগ আনছে। এটা চীনবিরোধী মোক্ষম প্রপাগান্ডা বলে তা ভারতের (বিশেষ করে তার মিডিয়ার) কাছেও খুবই লোভনীয়। নিয়মিতভাবেই ভারতের মিডিয়া এই ফাঁদের প্রপাগান্ডায় মেতে আছে।  একারণে “ঋণের ফাঁদ” বিষয়ক ভারতীয় উৎসের যেকোন রিপোর্ট পাঠ বা রেফার করার সময় সতর্কতা থাকা জরুরি যাতে ভারতীয় মিডিয়া-প্রপাগান্ডার শিকার না হতে হয়। ভারতের কৌশলগত কূটনৈতিক অবস্থান হল চীন-ঠেকানোর এই প্রপাগান্ডায় অংশ নেয়া। কিন্তু ঘটনা হল, এমনকি জেনে অথবা না জেনে আমাদের প্রথম আলোতেও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

চীনা “ঋণের ফাঁদ” বা বেল্ট-রোড বিরোধী প্রপাগান্ডার এপর্যন্ত সবচেয়ে মোক্ষম রিপোর্ট হল, থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভলবমেন্টের রিপোর্ট। আবার এর যুক্তিগুলোকে কেটে পালটা বক্তব্যের অবস্থানও আছে এখানে এক ডাচ কনসালটেন্টের বক্তব্যে।

কিন্তু ভারতের চীনের বিরুদ্ধে আপত্তির বিপরীতে একটা মজার দিক আছে। সেটা হল, খোদ ভারতেও চীনা বিনিয়োগের অর্থে নেয়া এমন অবকাঠামো প্রকল্প কম নয়। এমনকি চীনা ‘ব্রিকস’ উদ্যোগে নেয়া ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (যা বিশ্বব্যাংকের মত প্রায় একই কাঠামোতে চলে) নামে একটা অবকাঠামো ব্যাংক আছে – যার বিনিয়োগ প্রকল্পের একমাত্র খাতক হল ভারত; কিন্তু এসব চীনা প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের জন্য তা ‘ঋণের ফাঁদ’ এমন কোনো অভিযোগ নেই ভারতের। এর মানে, অন্তত বোঝা গেল যে, চীনা ‘ঋণফাঁদের’ খারাপ স্বভাব চরিত্র ভারতে এলে ভাল হয়ে যায়। যেন খারাপ “চীনা খাসিলত” আর কাজ করে না।

তবে লক্ষণীয় হল, এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান বা মালয়েশিয়ায়- যেখানে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয়েছে- সরকার বদলের সাথে সাথে সব দেশেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব আপত্তি নিয়ে নতুন সরকারগুলো চীনা সরকারের সাথে কোনো সঙ্ঘাতের সম্পর্কে যাওয়া ছাড়াই বরং আপস আলাপ আলোচনা সব ক্ষেত্রই আপত্তি মীমাংসা করতে পেরেছে। অর্থাৎ সে সুযোগ ছিল এবং তা নেয়া হয়েছে বোঝা গেছে। আর এই আলোচনা শেষ হয়েছে পুনরায় নেগোসিয়েশন ও আগের চুক্তিটা সংশোধিত ও নবায়ন করার ভেতর দিয়ে। সারকথায় কোথাও কোনো প্রকল্প অমীমাংসিত বিতর্কে আটকে যায়নি। বড় জোর এক বছরের মধ্যে নিরসন করা হয়েছে মানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যায়নি এবং এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই হয়েছে। চীন কোন আদালত ‘আইন’ দেখায় নাই;  বাড়তি ক্ষতিপূরণ দাবি, জোরাজুরি বা চাপ দিচ্ছে এমন অভিযোগ কোথাও – এমনকি আমেরিকান প্রপাগান্ডার ভেতরেও নেই।

যদিও একথা সত্যি যে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চীনা প্রকল্প নেয়ার সময় এশিয়ার সরকারগুলোকে প্রকল্প থেকে বেনামে কমিশন দেয়া হয়েছে। আর একালের বিশ্বব্যাংকের নেয়া প্রকল্পের সাথে তুলনা করলে বলা যায়, এ ব্যাপারে চীনা প্রকল্প কম স্বচ্ছ এবং এ’পর্যন্ত দাঁড়ানো বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা যেন ওর লক্ষ্যই নয়।

যা হোক, মাহাথিরের ক্ষেত্রেও এবার তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তিন মাসের মধ্যে (আগস্ট ২০১৮) চীন সফরে প্রকল্প নিয়ে তার আপত্তি একইভাবে চীন আমলে নিয়েছিল। সফর থেকে ফিরে তিনি বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্পের খরচ বেশি, যা আমাদের বইবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই, তাই এখনকার মতো এটা বাতিল করতে হচ্ছে।’  [‘We just can’t pay’: Mahathir ] তবে ‘চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক অটুট থাকবে, কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলা ছাড়াই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’ [Malaysia has seen a change of government, its foreign policy concerning China remains the same.”]।

পরে এ বছর জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা এই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে মালয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বরাতে রয়টার্স জানাচ্ছে, অর্থমন্ত্রীও একই কারণ জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রকল্প বাতিলের জন্য ক্ষতিপূরণ কত দিতে হবে এ নিয়েও ঠিকাদারের সাথে কথা চলছে বলে জানিয়েছিলেন।

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল ভারতসহ আমেরিকান প্রপাগান্ডিস্টরা। চীনা প্রকল্প নিয়ে কতগুলো দেশ পরে সরকার বদলের সাথে প্রকল্প বাতিল বা সংশোধিত চুক্তি করেছে, এই উদাহরণের তালিকায় মালয়েশিয়াকে যুক্ত করে আরেকটা দেশ হিসেবে দেখিয়ে কথিত চীনা ‘ঋণের ফাঁদের’ কথিত ভয়াবহতা তুলে ধরতে শুরু করেছিল তারা। এর পর থেকে প্রপাগান্ডা জোরে শোরে চলছিল চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এক আমেরিকার ভদ্রলোক লিখেছিলেন, “the debt-trap argument gained further credence after Malaysian Prime Minister Mahathir Mohamed cancelled $23 billion in BRI projects and warned China against falling prey to ‘a new version of colonialism,’” according to Haenle.

কিন্তু গত ১২ এপ্রিল এই প্রসঙ্গে হংকংয়ের এক মিডিয়া  “সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট” সব উলটে যাবার খবর দিয়ে লিখছে , ১২ এপ্রিল মালয়েশিয়া জানিয়েছে যে, বাতিল হয়ে যাওয়া রেল প্রজেক্ট নিয়ে তারা আবার এক নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরো লিখছে, গত কয়েক মাসে কিছু ভুল কথা আর মাহাথিরের দুই ধরনের বক্তব্যের পরে এই চুক্তি আবার স্বাক্ষর হলো” [after months of false starts and contradictory statements from Prime Minister Mahathir Mohamad’s government on the future of the multibillion-dollar project”.।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে এবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হলো প্রপাগান্ডিস্টদের। কিন্তু কেন এমন ঘটল? কেন বাতিল চীনা রেল প্রকল্প মালয়েশিয়ায় আবার ‘জিন্দা’ হলো?

গরিবের অনাদরে পড়ে থাকা খাদ্য পামবীজ বা তা থেকে পিষে তৈরি করা পামঅয়েলকে মাহাথিরের মালয়েশিয়া দুনিয়াজুড়ে ভোজ্যতেলের প্রধান উৎস হিসেবে হাজির করেছিল। গুরুত্বপুর্ণ হল, তা আমেরিকান সয়াবিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এর ছাঁকনি টেকনোলজিসহ তেল বের করার পুরা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক টেকনিক্যাল অগ্রগতি হলে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসহ ওই অঞ্চলই ভোজ্যতেলের প্রধান সরবরাহকারী এলাকা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও সয়াবিন নামে যা বিক্রি হয় এর বেশির ভাগই আসলে রিফাইনড পামঅয়েল। এগুলো আমরা কমবেশি সবাই জানি। আমেরিকার সয়াবিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব সময় আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিত থাকতে হয় মালয়েশিয়াসহ উৎপাদক দেশগুলোকে। এভাবে ইউরোপের বাজারেও একটা বড় মার্কেটশেয়ার তৈরি করে ফেলেছিল মালয়েশিয়া; কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চলা কানাঘুষা এবার বোঝা গেল সত্যি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ‘পামঅয়েল চাষাবাদের কারণে ব্যাপকভাবে বনজঙ্গল ধ্বংস ঠেকাতে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পামঅয়েল ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেবে”[This month, the European Commission concluded that palm oil cultivation results in excessive deforestation and its use in transport fuel should be phased out by 2030.]।

খবরটা শুনে মাহাথির স্বভাবতই খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি এটাকে ইইউ’র বিবাদ-সঙ্ঘাত লাগিয়ে চলার মনোভাব হিসেবে দেখে বলেন, আমরা পামঅয়েল বিপ্লব ঘটানোতে যেখানে ‘এটা এখন চকোলেট থেকে লিপস্টিকসহ প্রসাধনী ও সাবানের প্রধান কাঁচামাল হয়ে গেছে- তখন ইইউ নিজের পণ্য, রাইসরিষার তেলের বাজার সংরক্ষণের জন্য এই দুশমনি’ শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ এমন ভালো জিনিস নয় যে, আমরা তা প্রমোট করতে চাই। কিন্তু তা বলে বড়লোকের দেশের গরিব দেশের মানুষকে আরো গরিবি হালে ফেলার চেষ্টা- এটা মারাত্মক অবিচার” [Mahathir, 93, said the EU’s increasingly hostile attitude towards palm oil, a commodity used in everything from chocolate spread to lipstick, was an attempt to protect alternatives that Europe produced itself, like rape seed oil.]।
এই মারাত্মক অবিচারের প্রশ্ন তুলতে পারা- এটাই মাহাথির যে আসল নেতা- এর পরিচয়। তিনি ইইউ’র বাজার দখল করার দিকটাকে সামনে আনলেন।

গত জানুয়ারি মাসে রেল লিঙ্ক প্রকল্প বাতিল করার পর থেকে নানা প্রসঙ্গে মাহাথির চীনের নেতৃত্ব নিয়ে নিজে অনেক ক্রিটিকাল হয়ে ভালমন্দের বিচার করেছেন। তবে ইতিবাচকভাবে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে আমেরিকার নেতৃত্বে কথিত “ঋণের ফাঁদের” কথা তোলা অথবা চীন নিজের হুয়াওয়ে ফাইভ-জি মোবাইল টেকনোলজি দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে ইত্যাদি প্রপাগান্ডা প্রসঙ্গে একপর্যায়ে তিনি পাশ্চাত্যবিরোধী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি সরাসরি স্পষ্ট করে বলে বসেন, ‘ধূর্ত আমেরিকানদের মোকাবেলা করতে ধনী চীনাদের পক্ষ নেবো” [I’d side with rich China over fickle US: Malaysia’s Mahathir Mohamad”]। শুধু তাই নয়, চীন প্রসঙ্গে তার অবস্থান আরো স্পষ্ট করতে তিনি বলেছেন, ‘উদীয়মান শক্তি চীন থেকে ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়ার চেয়ে ওদের সাথে কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলার একটা ভালো উপায় বের করতে হবে আমাকে” […to find ways of working with the rising power rather than to let fears…]। আবার বলছেন, ‘আমরা যখন থেকে চীনের সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছিলাম সে সময়ের গরিব চীনের দিকে আমরা ভীত চোখে তাকাতাম। আজ চীন বড়লোক, এখনো আমরা ভীত। এটা চলবে না। আমার মনে হয়, চীনের সাথে সম্পর্ক পাতানোর একটা ভালো উপায় আমাদের বের করতে হবে” [I think we have to find some way to deal with China.]।

মাহাথিরের সে উপায় হল, চীনের সাথে বাজার শরিক করার সম্পর্ক ও বুঝাবুঝি তৈরি করা। এই ফর্মুলায় সহজেই তিনি বিভিন্ন চুক্তিতে উপনীত হয়ে গেলেন। তাতে এখন থেকে আমেরিকান সয়াবিন নয়, বরং চীন হবে মালয়েশিয়ান পামঅয়েলের একচেটিয়া ভোক্তা। সেই খুশিতে মাহাথির এবার সেই পরিত্যক্ত চীনা রেল লিঙ্ক প্রকল্প- এতে বিভিন্ন জায়গায় সংশোধনী এনে হলেও আবার চীনের সাথেই এ নিয়ে চুক্তি করে ফেলেছেন। [Malaysia to ‘take advantage’ of ECRL deal to sell China more palm oil: Mahathir Mohamad]। তিনি চীনাদেরকে ভাল ব্যবসায়ী বলে প্রশংসা করে এক লম্বা ইন্টারভিউ দিয়েছেন এখানে, Chinese by nature are very good businesspeople’: Malaysian Prime Minister ।

শুধু তাই নয়, গত ২৫ এপ্রিল চীনে দ্বিতীয় বেল্ট-রোড সামিট মানে, বেল্ট-রোড ফোরামের সম্মেলন শুরু হয়েছে। আড়ম্বরের সাথে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তিন-চারজন অতিথি-বক্তার একজনও তিনি।

হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা “ঋণফাঁদের” অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মাহাথিরের পক্ষ পত্রিকা খোদ এডিটোরিয়াল লিখেছে। Editorial by SCMP Editorial।

কারও প্রপাগান্ডায় ভয় পাওয়া কোনো কাজের কথা নয়; বরং নিজ বুদ্ধিতে চীনের সাথে চলার উপায় বের করে আগানো শিখতে চাইলে মাহাথির আমাদের সামনে শিক্ষণীয় হয়ে থাকলেন। আমরা কী এই শিক্ষা চর্চার জন্য যোগ্য হতে পারব না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৭ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ঋণফাঁদের গল্প মোকাবেলার মাহাথির-পথ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

“বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

গৌতম দাস

৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yW

BRI-2, First China freight train arrives in London 2017
BELT-ROAD SUMMIT-2,  আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – ছবি : সংগ্রহ

গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বদলে চীন মূল ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে চীন এগিয়েই চলেছে এবং এই পরিবর্তনে চীনের জিডিপি সব সময় ইতিবাচক থেকেছে, যদিও সময়ে তা কম-বেশি হয়েছে। অগ্রগতির সে বিচারে গত কয়েক মাস ছিল চীনের দিক থেকে খুবই নির্ধারক কিছু ঘটনার যা, চীন ইতিবাচক সাফল্যের সাথে পার হয়েছে। আর এমন সাফল্যের ওপর চড়ে চলতি এপ্রিল মাসে চীন আরেক সাফল্য লাভ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ইতিহাসে চীনা উত্থানের দ্বিতীয় পর্যায় বলেই চিহ্নিত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?

চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) বা [Belt and Road Initiative (BRI) ] সম্পর্কে এতদিনে আমরা সবাই কমবেশি জেনে গেছি যে, এটা ৬৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে একসাথে ভৌত অবকাঠামোগতভাবে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে কানেক্ট করার এক মহাপ্রকল্প। কাঠামোগতভাবে এটা  মহাদেশীয় পর্যায়ের সংযোগ প্রকল্প; যা মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপ এদুই মহাদেশকে সংযুক্ত করে ফেলার প্রকল্প এবং আরও। তাই এর সাথে এ’দুই মহাদেশের মাঝখানে সেন্ট্রাল এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের সবাই যুক্ত হবে। আর ওদিকে এই কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আরেক প্রান্ত কেনিয়া ও ইথিওপিয়া দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সাথেও সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া পুরো প্রকল্পই স্থানে স্থানে ছয়টিরও বেশি গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের পণ্য পরিবহণের সাথেও যুক্ত থাকবে। আইডিয়া হিসেবে বিআরআই উদ্যোগের মূল ধারণা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাজির করেছিলেন তাঁর কাজাখাস্তান সফরের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। তখন এর নাম বেল্টরোড, সিল্করোধ, সিল্করুট ইত্যাদি নানান নামে হাজির করা হয়েছিল। সে ঘটনাক্রম সম্পর্কে এখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।  তবে গত ২০১৭ সালের মে মাসে এর প্রথম সামিট (বা সদস্য রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের নিয়ে সভা, বেল্ট রোড সামিট) এর সময় তা “বেল্ট রোড উদ্যোগ” (BRI) নামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মূল ফোকাস ছিল – কোন কোন রাষ্ট্র এই বড় প্রকল্পের অংশ হতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। আজ এই ২০১৯ সালের চলতি এপ্রিল মাসের শেষে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এবারের নাম Belt and Road Forum বলতে দেখা যাচ্ছে। এর জন্য নতুন খোলা পোর্টাল এখানে।]  এই সামিট টু কেন গুরুত্বপূর্ণ বা এর মূল তাৎপর্য কী হতে যাচ্ছে?

বেল্ট রোড অবকাঠামো প্রকল্পের মূল কাঠামো হল মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপকে সব উপায়ে সংযুক্ত করে ফেলা। অর্থাৎ এশিয়ার অপরপ্রান্ত হবে ইউরোপ, এত দিন যা খুবই সীমিত সুযোগে কানেক্টেড ছিল। আর এখানে ইউরোপ মানে সারা ইউরোপ; অর্থাৎ ২৫ সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও সংখ্যায় ২৫ অনেক বেশি, কিন্তু আসলে ইউরোপের প্রভাবশালী মাতবর রাষ্ট্র – চার থেকে আট রাষ্ট্র, যারা যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক। এই প্রথম চার রাষ্ট্রের মধ্যে মূল দুই রাষ্ট্র আবার হলো ফ্রান্স ও জার্মানি। এর সাথে বাকি দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন আর ইতালি। এমনিতে আমেরিকান মাতবরিতে চলা গত ৭০ বছরের দুনিয়া বিচারে, আমেরিকা একা একা চলে নাই; সাগরেদ রাষ্ট্রসহ দলেবলে চলেছে। এভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রজোট হল ‘গ্রুপ সেভেন’ বা জি-৭। একটু বিস্তারিত জানতে এই ফাইনান্সিয়াল বিনিয়োগ-পিডিয়া সাইট, ইনভেস্টোপিডিয়া – এটা দেখা যেতে পারে।  ইউরোপের সেই চার রাষ্ট্র – ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি – এই চার রাষ্ট্রই হল ‘গ্রুপ সেভেন’-এর চার ইউরোপীয় সদস্য; আর বাকি কানাডা, আমেরিকা ও জাপান মিলে পূর্ণ হয় ‘গ্রুপ সেভেন’।

বেল্ট-রোড উদ্যোগের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে এই কাঠামোতে এখানে এশিয়ার অপর প্রান্ত ইউরোপ। অথচ ২০১৭ সালে প্রথম বেল্ট রোড সামিট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এর অগ্রগতি ও অর্জন মেপে দেখলে সেখানে বড় খামতির দিক ছিল যে, সেকালে পর্যন্ত ইউরোপের কে কে বা বিশেষ করে প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রের কাউকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহী করাতে পারেনি বা কমপক্ষে কাউকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়াদা চীন আদায় করতে পারেনি। সেই খামতিই এবার পূরণ হতে চলেছে।
তবে এত দিন চীন কেন তা পারেনি তা বুঝতে প্রথমত চীনের কাছে জি-৭ কী, এটা বুঝলে অনেকটাই স্পষ্ট হবে সমস্যার জটিলতা কোথায়? গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত চীন ও আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকার জায়গা নিতে চায় চীন। তাহলে ইউরোপ? এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপ কেউ নয়। কারণ ইউরোপ বিগত-যুবা। ফলে সে ঐ দু’য়ের লড়াইয়ে কারও জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। তবে আমরা ইতিহাস হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, যদিও ইউরোপও একসময় দুনিয়ার নেতা এবং তাঁর সেখানে রুস্তমি ছিল; তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এবং সেটা ছিল কলোনি রুস্তমি।  আর ঐ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ হয়েছিল আমেরিকার এক নম্বর সাগরেদ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় (১৯৪২) থেকেই গ্লোবাল নেতৃত্ব আমেরিকা নিজের হাতে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে যায়; আর সারা ইউরোপ ছোট-বড় সবাই হয়ে যায় আমেরিকার অনুগ্রহ প্রার্থী। এমনকি মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করা হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালি অথবা এশিয়ার জাপান বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার পর আরও বেশি করে আমেরিকার অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়। ওদিকে ঐ বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের প্রায় সবাইকে যুদ্ধে সবরকম সাহায্য করা, প্রধান খরচগুলো নিজে বহন করা, অনুদান দেয়া তো বটেই এমনকি যুদ্ধ সমাপ্তিতে ইউরোপের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্বাসনের যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সেটাও একা আমেরিকা জুগিয়েছিল। তাই আমেরিকা ও ইউরোপের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় যেন, আমেরিকা একাই ত্রাতা ও দাতা আর  ইউরোপ ওরই পাণিপ্রার্থী। সে সম্পর্কই সেই থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসছে জি-সেভেন ধরনের গ্রুপেও, এক উঁচু-নিচু সম্পর্কে। আমেরিকা কী বলে বা সে কী চায়, তা আমল করে শুনতে ইউরোপ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যদিও ১৯৪৪ সাল থেকে গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম, যা বহুরাষ্ট্রীয় নানান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, তা গড়তে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ও নেতারা আমেরিকার সাগরেদ হয়ে পাশে থেকে নিজেদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ করে নিয়েছিল। এভাবে ইউরোপের প্রভাবশালী চার-ছয় রাষ্ট্র আমেরিকার পাশে ছোট-তরফ বা সাগরেদ হয়ে উঠতে জায়গা পেয়েছিল।

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, একালে আমেরিকাকে সরিয়ে গ্লোবাল নেতৃত্বের সে জায়গা চীন নিতে চাইলে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকেও চীনমুখী করে নিতে হবে আগে। “আমেরিকা-ইউরোপের” সম্পর্কের বদলে একে ছাপিয়ে “চীন-ইউরোপের” মধ্যে সম্পর্ককে খাঁড়া হতে হবে আরও প্রবল প্রভাবশালী সম্পর্ক হিসাবে। আর এটাই হবে বাস্তবত আমেরিকাকে দুনিয়ায় কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া। অতএব, বিশাল হইচই ফেলে দেয়া ঘটনা হল – ইতালির বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা। এবছরের মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি-এর সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফর ছিল। আর সেখানেই স্বাক্ষরিত ১৭টি চুক্তির মধ্যে একটি হলো চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রাথমিক বোঝাবুঝিগুলো’ (এমওইউ বা MOU ) দলিল করে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর চলতি মাসের বেল্ট রোড সামিট টু-তে অংশ নেয়ার সময় তা পূর্ণতা পাবে।

ইটালির এই যোগদান-সম্মতির চীনা উত্থানের জন্য এক মাইলস্টোন তাতপর্যের। কারণ ইতালিই হল প্রথম জি-৭ গ্রুপের সদস্য যে খোলাখুলি আমেরিকান মেরু ত্যাগ করল। শুধু তাই নয় ইতালিই প্রথম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যে (আমেরিকার হাত ছেড়ে) চীনের সাথে “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” – সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। [The communique said the two sides have agreed to advance China-Italy comprehensive strategic partnership…… ] অর্থাৎ চীন-ইতালি সম্পর্কটা কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নয়। [এপ্রসঙ্গ আরও একটু বিস্তারিত পরের প্যারায়।] বৃটেনসহ অন্যান্যরাও ইতোমধ্যে অনেক দূর গিয়েছে কিন্তু সেগুলো ছাড়াছাড়া। যেমন এলেখার শিরোনামের ছবিটা; এছবি বেল্ট-রোড ব্যবহার করেই প্রথম ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, চীন থেকে লন্ডন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন ব্যবহারের। যেটা অনেকটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসায় একটা সংযোগ নেওয়ার মত। কিন্তু সেটা ঐ বিদ্যুৎ কোম্পানির সাথে মালিকানা-বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

কিন্তু ইতালি ইউরোপের বাকি সবার আগে এত গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রধান বস্তুগত স্বার্থের দিক হল – পুরো বেল্ট রোড প্রকল্পে ইউরোপীয় আর এক প্রভাবশালী প্রান্ত বা শেষ মাথা হবে ইতালি। তাতে ইউরোপের যে গভীর সমুদ্রবন্দর বেল্ট রোডের সড়ক ও রেলকে সংযুক্ত করাবে, সেই বন্দর গড়ে উঠবে ইতালিতে। যার মানে হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতা মুসোলিনি, তিনি হিটলারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে – সেই থেকে পিছিয়ে পড়া আর ধুঁকে চলা অর্থনীতির ইতালি এবার সামনের সারিতে চলে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ডাচ রটারডামকে ছাড়িয়ে ইতালি হয়ে উঠবে ইউরোপের হাব [hub] – সড়ক, রেলের সাথে সমুদ্রপথ যুক্ত হওয়ার বড় সংযোগস্থল। সব দিকের সাথে কানেক্টিভিটির এই বিশেষ সুবিধার জন্য ইতালি হয়ে উঠবে বুড়ো শরীরে আবার যৌবনের জোয়ার – ইতালি হবে এখন ইপিজেড-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের হাবও। তাই নিজ বিপুল সম্ভাবনার সামনে এখন থেকে আমেরিকার হাত হালকা করে ধরা আর ইউরোপের অন্যরা – ফ্রান্স, জর্মানি বা ব্রিটেন- এদের সবাইকে টপকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চীনের হাত শক্ত করে জাপটে ধরা হবে ইতালির কাছে খুবই জায়েজ।

কিন্তু তাই বলে জার্মান, ফ্রান্স বা ব্রিটেনকেও চীন বিমুখ করেছে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়। বিস্তারে তা বুঝতে আরেকটা ধারণার সাথে পরিচয় করাতে হবে। “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” [Comprehensive Strategic Partner]’ হলো সেই নতুন শব্দগুচ্ছ – যা চীন একালে ব্যাপক ব্যবহার করছে। বাংলায় “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” – চীন দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে এমন “কৌশলগত মিত্র” হিসেবে পেতে চায়। এটা একটা (বেল্ট রোড) প্রকল্পেই কেবল চীন সবাইকে পেতে চায় তা নয়, বরং আরও এবং সামগ্রিক। আসলে খোদ বেল্ট রোড প্রকল্পটি চীনের একটি কৌশলগত প্রকল্প। কেবল বাণিজ্যিক নয়।

স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বলতে এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অর্থ হল, যা কেবল অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটাই নয়, আরও অনেক কিছু। কী সেটা? অন্তত আপাতত অর্থ হল, আমেরিকাকে বাইরে রেখে বাকিদের নেয়া হয়েছে এমন এক পক্ষজোট- যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি সব (এই অর্থে তা সামগ্রিক) স্বার্থেই এখানে চীনের নেতৃত্বে সকলে আছে। এই অর্থে এটা আমেরিকাকে বাইরে রেখে এক রাষ্ট্রস্বার্থ জোট। আবার এই জোটের কাম্য সদস্যরা মানেই এরা সবাই বড় ক্ষমতার রাষ্ট্র, ঠিক তা নয়। যেমন হাসিনার বাংলাদেশ (অন্তত ঘোষণা মোতাবেক), আমরাও চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ব্যাপারটা আর একটু বিস্তার করতে আরেক দিকে আলো ফেলব।

ক্রাইস্টচার্চ ম্যাসাকার সামলানোর জন্য সদ্য সুখ্যাতি অর্জন করা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা, এ মাসের ১ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে চীনের “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” হয়ে এসেছেন। এমন মিত্র হওয়াতে এর অর্থ বুঝতে হবে এভাবে; নিউজিল্যান্ড বেল্ট রোড প্রকল্পের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হয়েছে ও নিয়েছে। অর্থাৎ চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার না হয়েও কেউ বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও জেসিন্ডা স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হওয়া বেশি লাভজনক মেনেছেন। আর বিপরীতে কেবল বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হলে স্বভাবতই সে ক্ষেত্রে সেটা কেবল “বাণিজ্যিক স্বার্থ” ধরনের সম্পর্ক হত। ফলে চীনের দেয়া অন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সে পেত না। যেমন- কোন রাষ্ট্র যদি কোন কারণে ঋণের কিস্তি শোধ দিতে পারছে না অবস্থায় পড়ে। এমন ক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্র আবার চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হলে চীন ব্যাপারটাকে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখে থেমে থাকবে না। চীন তাকে বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে, বিপদ থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেওয়াসহ সব সাহায্য করবে। চীনের এখনকার সাধারণ নীতি-কৌশল হল সব রাষ্ট্র বা প্রকল্পের সম্পর্ককে সব সময় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা। যদি পার্টনার রাজি থাকে কেবল তখন সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়, কিন্তু চীনের দিক থেকে আগ্রহ জারি থাকে সব ক্ষেত্রে ও সময়ে।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ কেন আনলাম? কারণ, ঠিক এর বিপরীত ঘটনা বা রাষ্ট্র হলো অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রায় সময় একসাথে উচ্চারিত শব্দ। মূল কারণ তারা একইভাবে, একই ভাগ্যে রকই সময়ে ব্রিটেনের কলোনি হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থ ও নীতিগত মিল এক হতে বেশির ভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায়। যদিও চীন না আমেরিকা কোন ক্যাম্পে থাকবে প্রশ্নে তাদের ভিন্নতা দেখা দিল। আর জেসিন্ডা প্রমাণ করলেন অষ্ট্রেলিয়া ভুল করেছে।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই অন্তত ওবামা আমল থেকে,  তবে চাদরের নিচে থেকে আস্তে আস্তে প্রকট হয়ে ভেসে উঠছিল। যা কেবল এ’কালে ট্রাম্পের আমলে এসেই চাদর উঠে গেছে। আর সবচেয়ে বড়ভাবে আরেকবার চাদর উঠেছিল ২০১৫ সালে, চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক – এআইআইবি [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ] গড়ার সময়ে। ওবামা লজ্জার মাথা খেয়ে খোলাখুলি সেই সময়ে এই নতুন ব্যাংক প্রকল্পে যেন এশিয়ার জাপান, কোরিয়া তাইওয়ান বা অস্ট্রেলিয়া (যারা আমেরিকার বহু পুরনো বন্ধু মনে করা হয়) এরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও কেউ যেন যোগ না দেয় এর লক্ষ্যে, কান-পড়া দিয়ে কার বিয়ে ভেঙে দেয়ার মত, করে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও আপত্তিতে ছেয়ে ফেলেছিল। যদিও ফলাফলে আমেরিকার হার হয়েছিল; শেষে প্রায় সব রাষ্ট্রই ওই ব্যাংক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু চীনের নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট আর আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট সেই থেকে প্রায় প্রকাশ্যেই তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এআইআইবি ব্যাংকে সদস্য হয়েও আমেরিকার জোটেই যোগ দিয়েছিল। এছাড়া আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোটে আর সদস্য হয়েছিল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মত রাষ্ট্রগুলো এবং স্বভাবতই আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেয়া ভারত তো ছিল।

এমনকি অস্ট্রেলিয়া আরও একধাপ এগিয়ে নিজের উপকূলে এক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন (২০১৬ সালে চালু হয়) করতে দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় সবাই ধরা খেয়ে যায় ট্রাম্পের আমলে এসে, তাঁর জাতীবাদি ট্রাম্প হয়ে উঠার কারণে। কারণ ট্রাম্পের সারকথা, বিড়াল যেন বলছে আর মাছ খাবো না। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের অর্থনীতিতে রূপান্তর মানে দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক পণ্য বিনিময়ের গ্লোবাল সমাজের দুনিয়া গড়তে নেতৃত্ব দেয়া সেই আমেরিকা, ট্রাম্পের হাতে পড়ে হয়ে গেল অ্যান্টি-গ্লোবাল। এক জাতিবাদি আমেরিকা; আমেরিকা ফাস্টের নীতি চর্চা শুরু করল। ফলে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক জোট মুখ থুবড়ে পড়লেও বিপরীতে চীনেরটা সদর্পে আরও এগিয়ে যেতে সুযোগ পেয়ে যায়। সেটারই স্পষ্ট সফলতা এই প্রথম এখন প্রমাণ হল গত মাসের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর ইউরোপ সফরে। মুখ পোড়ানো অস্ট্রেলিয়ার অতি উৎসাহ যে ভুল ছিল তা যেন আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়ার অকেজো স্ট্র্যাটেজিক জোটের পাল্টা চীনা স্ট্র্যাটেজিক জোটে যোগ দিল।

এদিকে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকেই ইউরোপের জার্মানি – যে ট্রাম্পের “অ্যান্টি-গ্লোবাল” অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পাল্টা সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিল এবং ভোকাল ছিল, সেই জার্মানির সাথেই চীনের সম্পর্ক গভীর হয়ে যায়। চীনা শিল্প-উদ্যোগের যুগ এখন দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যার সারকথা প্রত্যেক ট্রেডকেই হাইটেকে বা উচ্চ প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়া। যেখানে প্রথম পর্যায়টা ছিল বাল্ক উতপাদন করে উতপাদন খরচ নামিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করে ফেলা। তাই এবার হাইটেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে – এখানেই জার্মানির সাথে চীন গভীর পার্টনারশিপ হয়। ব্যাপারটা জার্মানির দিক থেকে দেখলে, চীনের মতো বড় আর ব্যাপক এবং হাইটেকের চাহিদার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাওয়া জার্মানির জন্য তা বিরাট কিছু। সাধারণভাবে হাইটেকে আর বিশেষত গাড়ি তৈরির অটো শিল্পে চীনের মূল পার্টনার এখন জার্মানি।  জার্মানরা বিনিয়োগ নয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। চীনে গত তিন বছরে লাগাতার  জার্মান সংশ্লিষ্টতা ও বিনিয়োগ বেড়ে চলা চলছেই, গ্রোথ রেট ১৪০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্স সফরে এক মূল সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রেসিডেন্ট শিং-এর জর্মান চ্যান্সেলার মার্কেলের সাথে বৈঠকের মিডিয়া রিপোর্ট বলছে [China was Germany’s largest trading partner for a third consecutive year in 2018, with a nearly 140 percent increase in German companies’ actual investment in China, he said.]। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে এই বৈঠক থেকে চীনের সাথে জর্মানির ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে কোন সুর ভেসে আসে নাই। কিন্তু তা সত্বেও চ্যান্সেলার মার্কেল জানাচ্ছেন তিনি ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ফোরামে জার্মানি যোগ দিচ্ছে। [Germany would like to deepen its economic and trade relations with China in the digital age, and is willing to actively participate in the second Belt and Road Forum for International Cooperation, Merkel said.]।

ওদিকে ফ্রান্সের সাথে চীনের সম্পর্ক আর এক মাত্রায় হাজির। এবার প্রেসিডেন্ট শি-এর সফরে ইতালির বাইরে আরেক গুরুত্বের সফরের জায়গা ছিল ফ্রান্স। এই সফরে যত না চীনের খুশির, এর চেয়ে বড় খুশি প্যারিসের, সে গদগদ। মূল কারণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ফরাসি পণ্য-ক্রয়ের চুক্তি।  চীন, আমেরিকার বোয়িংয়ের চলতি খারাপ সময়ে ইউরোপের ফ্রান্সের বড় শেয়ারের (চীনে অবস্থিত ফ্যাক্টরি থেকে) এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, জার্মান ও ফ্রান্স চীনের পক্ষে কৌশলগত জোটের প্রত্যক্ষ পার্টনার না হলেও তারা ঘনিষ্ঠ; অন্তত তারা আমেরিকার জোটের নয়।

ইউরোপের চার কুতুবকে নিয়ে কথা বলতে এবার বাকি থাকল বৃটেন। ব্রিটেন এত বাছবিচার না রেখে খোলাখুলি বেল্ট রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে লম্বা পরিকল্পনা নিয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় হংকং ব্যাংকের এক সাবেক চেয়ারম্যান ডগলাস ফ্লিন্টকে বিশেষ দুত ও প্রধান করে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে এ লক্ষ্যে কাজ ও পরিকল্পনা শুরু করতে।[Sir Douglas Flint, who was appointed as the Special Envoy to BRI of the British Treasury in December 2017]। ফ্লিন্ট জানাচ্ছেন, The Belt and Road Initiative (BRI) “is a real opportunity” to strengthen UK-China cooperation। বেল্ট রোড সামিট টু ব্রিটেনের জন্য এক বিরাট সুযোগ বলে ডগলাস ফ্লিন্ট প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন।

তাই এককথায় বললে, চলতি এপ্রিলের ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ থেকে এর ওলটপালট ঝড় আসন্ন হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনের আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তা আর এক ধাপ উঠে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ?
বেল্ট-রোড প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান সরাসরি বিরোধিতার। গত ২০১৭ সালের সামিটের দাওয়াত তাই সরাসরি প্রত্যাখান করেছিল। আর বাংলাদেশ গত ২০১৭ সালে বেল্ট রোড সামিট-ওয়ানের সময় ভারতের মন রক্ষা করতে বাংলাদেশ লো-প্রোফাইলে থেকেছিল।  তবে বেল্ট রোড প্রকল্পে চীনের সাথে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত লুকাতেও চায়নি বা পারেনি। বরং অক্টোবর ২০১৭ সালে ভারতকে বুঝিয়ে রাজি করার এক  উদ্যোগ নিয়েছিল যে ভারত যেন আমাদেরকে এই সম্পর্কে যেতে আপত্তি না করে বা ভালভাবে নেয় – তা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। বরং আমাদের পররাষ্ট্র সচিবকে একাজে ভারতে পাঠানোয় উলটা ভারতের সাথে আমাদের অবস্থান-ভিন্নতা আরো প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। আজ দুবছর পরে এই ইস্যুটা এখন যে  অবস্থায় চলে গেছে তাতে এখন  ভারতের মুখ চেয়ে স্থবির হয়ে থাকা যাবে সে জায়গাতেও আর নেই। মূল কারণ বটম লাইনটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বেল্ট-রোড প্রকল্পে হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে

মূল প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীনের (কুনমিং প্রদেশে) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে কী না? যেখানে কলকাতাও বাংলাদেশ হয়ে যুক্ত থাকবে। এটাই বিসিআইএম (BCIM যা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর) প্রকল্প। তবে এই প্রকল্পের আর এক অনুষঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। আসলে উলটা – মূলত এই গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করেই এই চার দেশের ঐ অঞ্চলটার মূলত ল্যান্ড লকড দশায়; তাই সে অবস্থা ছুটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ল্যান্ড লক কথাটা আমাদের বন্দর আছে কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর নাই – এই অর্থে বুঝতে হবে। বাস্তবে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজের বন্দর, যার কানেকটিং গভীর সমুদ্র বন্দরটা সিঙ্গাপুরে। তাই চার দেশের এই বদ্ধ অঞ্চল – এটাকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে উন্মুক্ত করাটাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে সোনাদিয়া ছাড়াই কেবল রেল ও সড়কের BCIM প্রকল্পের আওয়াজ উঠতে উঠতে এখন সেই প্রকল্পের সব কিছুই মুখ থুবড়ে গায়েব। কেন?

ভারতের যুক্তি চীন BCIM প্রকল্পকে এখন বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত করতে চায়। অবশ্যই চায়। বাংলাদেশও চায়। আর প্রশ্নটায় এখন তখনের কিছু নাই। বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য এটা খুবই জরুরি যে আমরা আন্তঃমহাদেশীয় প্রকল্প বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত থাকি। তাই BCIM প্রকল্প যুক্ত থাকুক – এটাই তো আমাদের স্বার্থ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হাতে গুনে মনে রাখতে হবে – হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে বেল্ট-রোডে জড়িয়ে না থাকে বা থাকতে না পারে তবে আমাদেরকে আজন্ম এর কাফফারা দিতে থাকতে হবে। আর ভারতের এখন-তখনের যুক্তির পালটা কথাটা হল, BCIM প্রকল্পের মূল আইডিয়ায় সোনাদিয়া বন্দর ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সেটাই বা বাদ দেয়া হয়েছিল কেন? কেন হাসিনার ২০১৪ সালের চীন সফরের কালে সোনাদিয়া বন্দর চুক্তিতে বাধা দেয়া হয়েছিল?

ভারত যদি মনে করে আর চায় তাহলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত না হয়ে এই প্রকল্প হবে না। নো প্রবলেম। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে ঢাকা-বার্মা-কুনমিং হবে অর্থাৎ BCM প্রকল্প হবে অসুবিধা কী! আর এই প্রকল্পের কেন্দ্র সোনাদিয়া বন্দরও একই সাথে।  সেইসাথে বেল্ট-রোড প্রকল্পেও BCM -এটাও অবশ্যই যুক্ত থাকবে। কিন্তু   ভারতের এতে আপত্তি বা  একমত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ভারতের অবস্থানটা হল  – সে  নিজে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে বেল্ট-রোডসহ কোন প্রকল্পই সে হতে দিবে না।

কেন? কারণ চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্প  সম্পন্ন হতে দিলে আর তাতে ভারত জড়িয়ে থাকলে  তাতে চীন বহু আগিয়ে যাবে আর ভারত চীনের অধীনস্ত হয়ে যাবে। তা হতেও পারে, অসম্ভব না। কারণ ব্যাপারটা মুরোদের – সক্ষমতা ও যোগ্যতার। ভারতের মুরোদ না থাকলে তার বা কারও কী আর করার আছে? কিন্তু তাই বলে, কান-পড়া দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার মত  ভারত কূট-ষড়যন্ত্রের পথ ধরবে? যেটা কোন কাজের কথা নয়।  নাকি গঠনমূলকভাবে, ভারত চীনের এখনকার সহযোগিতাগুলো কাজে লাগানো আর নিজের মুরোদ অর্জন করা্র দিকে যাবে? যাতে কোন একদিন চীনকেও ভারত ছাড়িয়ে যেতে পারে! আজকের চীনের অবস্থাই কী এর প্রমাণ নয়। এককালে আমেরিকার সাহায্য নিয়েই কী আজ চীন এজায়গায় নয়? তাতে সে কী এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে না!

এভাবে  ভারতের মুরোদ অর্জন বিকল্প কূট-ষড়যন্ত্রের পথ – এটা কখনই নয় হতে পারে না। এমনকি ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা তো নয়ই! পাকিস্তান কাশ্মীরের উপর দিয়ে বেল্ট-রোডের মূল বা পাকিস্তান করিডোর গিয়েছে – ভারতের এটা ফর্মাল আপত্তির যুক্তি। সেটাও আসলে খাটে না। কারণ পাকিস্তান অংশসহ পুরা কাশ্মীর ভারতের কী না এটা তো কোন বিতর্কই নয়। কারণ, বিতর্ক হল সারা কাশ্মীরিরা কীভাবে কার হাতে শাসিত হতে তারা সম্মত হবে? ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে শাসিত হবে নাকি নিজেরাই আলাদা হবে?  এরপরেই কেবল, পুরা কাশ্মীর ভারতের হবে কীংবা হবে না তা তখন মীমাংসিত হতে পারে। এর আগে কোন কাশ্মীরই ভারতের নয়, কেউ না।

অতএব ঈর্ষা বা প্রতিহিংসাবশত  বেল্ট-রোডে যোগ না দেওয়ার ভারতের কোন বিদেশনীতি যদি হাজির থাকে তবে তা ভারতেরই থাক। তা আমাদের তো নয়ই, আমাদের দায়ও নয়। তাই আমরা কী করব তা ভারতকে জিজ্ঞাসারও কিছু নাই। আমাদের স্বার্থ, আমাদের ভাল-মন্দ ক্ষতি সব আমাদেরই বইতে হবে। যদিও এব্যাপারে বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বশেষ কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে আমাদের নির্বাচন পরবর্তি সময়কালে।

এ বছর আমাদের নির্বাচনের পরে আমরা দেখেছিলাম, কারও পরোয়াহীন এক  চীনা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন। আর বিশেষ করে সিএনএন-নিউজ১৮ (CNN-NEWS18) নামে ভারতীয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই বোল্ড ছিল। এবং তা এক স্থির সিদ্ধান্তের প্রকাশ দেখিয়ে ফেলেছিল যে, সোনাদিয়া বন্দরসহ বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে হাসিনা সরকার আর থামবে না। এমনকি ওই সাক্ষাৎকার আসলে খোদ ভারতকেই চীনের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে আহ্বান রাখা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের আলো অনুসরণে চিন্তা করলে মনে হয়, এবারের এপ্রিলে বেল্ট রোড সামিট টু-তে চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা দেখব।

কিন্তু এর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, ভারতে এখন রুটিন সরকার; মানে মোদীসহ রাজনৈতিক নেতাদের সময় নেই এনিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার। এর চেয়ে নিজ নিজ এলাকায় মাঠের নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করা তাদের এখন প্রায়োরিটি, একমাত্র কাজ। আগামী মাসে ২৩ মের আগে ভারতে সরকারে কে আসবে, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তা জানার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় এক কথায় বললে, ভারতের নিজের বেল্ট রোড সামিট টু-এর পক্ষে কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশকে এবারো কি তারা ঠেকাতে পারবে?

ঠেকাতে ২০১৭ সালে আগেরবারই পারেনি। ফলে এবারো পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে, সাক্ষাৎকার দিয়ে বলা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দিক থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা। যদি তা আমরা না দেখতে পাই, তবে বুঝতে হবে সরকার আবার আপস করল। সেটা হবে বাংলাদেশের প্রবল সব সম্ভাবনাগুলোর মাথা মুড়িয়ে ফেলে রাখা আর পিটিয়ে কাউকে খাটো বামন বানিয়ে রাখার মতই একটা কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৬ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

গৌতম দাস

০১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yM

প্রেসিডেন্ট দাবিদার হুয়ান গুয়াইদো ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো – ফাইল ছবি

ল্যাটিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। এই ভেনিজুয়েলারই নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ [Hugo Chávez] কমিউনিস্টদের নয়নমণি, তাদের সাফল্যের প্রতীক ছিলেন। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অসুস্থতায় তিনি মারা যান। যদিও সেনাবাহিনীর এই সাবেক লে. কর্নেল ক্ষমতায় তার উত্থান এই সেদিন, মানে ১৯৯৮-৯৯ সালের এবং তা স্বল্পকালীনও – মাত্র ১৪ বছরের শাসন। ভেনিজুয়েলায় যা তার উল্লেখযোগ্য অবদান বলে কমিউনিস্টেরা মনে করে তা হল একধরনের “সমাজতন্ত্র কায়েম” করেন তিনি, বিশেষত ২০০৭ সালের পর থেকে। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। খুবই মার্জিনাল (৫০.৬২%) ভোটে তিনি সেবার জিতেছিলেন।

আর এর পরের টার্মের নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। কিন্তু এখানে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিরোধীরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবুও মাদুরো নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শপথ নেন। ওদিকে গত ২০১৫ সালে ভেনিজুয়েলার পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল, যার ফলাফল ছিল বিরোধী দলের বিজয়-প্রাধান্যে। তাই মাদুরোর শপথের প্রতিক্রিয়ায় পার্লামেন্ট হয়ে উঠে বিরোধীদের বিকল্প ক্ষমতা প্রদর্শনের কেন্দ্র। মাদুরোর এই দ্বিতীয় শপথের পর থেকে পার্লামেন্টে থেকে তারা মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট না মানার তৎপরতাও শুরু করেছিল। তারা পাল্টা প্রস্তাব পাস করে, মাদুরো সঠিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নন, তাই পার্লামেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংসদের বিরোধী দলের নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে [Juan Guaidó] মনোনীত করছে [declared himself interim president on 23 January ]। এতে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকার উপস্থিতি ও স্বার্থ খুবই খোলাখুলি হয়ে যায়। আর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, এক রাষ্ট্রে দুই প্রেসিডেন্টের দাবিদার – বলাই বাহুল্য, এটা ঐ রাষ্ট্রের ইমেজের জন্য খুবই খারাপ।

দেশে-বিদেশে এর বিভক্ত প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। তবুও এক সোজা লাইন টেনে বলা যায়, দেশের ভেতরে তবে পার্লামেন্টের বাইরে আর কেউই এটা মানেনি বা প্রভাব নেই। অর্থাৎ নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মাদুরোর নিয়ন্ত্রণে স্বভাবতই সব সরকারি অফিস প্রশাসন তো আছেই; সেই সাথে বিচার বিভাগও তার পক্ষে। ফলে দাঁড়ায়, পার্লামেন্ট ছাড়া রাষ্ট্রের অবশিষ্ট দুই মূল প্রতিষ্ঠান মাদুরোর পক্ষে। তবে সেই সাথে নির্ধারক সেনাবাহিনীর জেনারেলরাও মাদুরোর পক্ষে। মাদুরো জেনারেলদের সাথে ক্ষমতা ও বৈষয়িক সুবিধা শেয়ার করেন বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু দেশের বাইরে?

ট্রাম্পের আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আঞ্চলিক দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র জোট  ওএএস [ Organization of American States, OAS] , এসব মিলিয়ে মোট প্রায় ষাটেরও বেশি বিভিন্ন রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর পাল্টা রাশিয়া এবং চীন থেকে ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক, এরা মাদুরোর পক্ষে। এক কথায় যেন নতুন করে এক ‘কোল্ড ওয়ার’-এর দুই পক্ষ দল। এ ঘটনায় সবচেয়ে বাজে দিক হল এটাই। যার কারণেই হোক, পরিস্থিতিকে ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকা’ এমন দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে কোল্ড ওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধেরীক লড়াই যেন ফিরে এসেছে – এমন ভাব তৈরি করা, এভাবে ফেলে দেয়া একেবারেই ঠিক হয়নি। কারণ, দুনিয়াকে আমরা চাইলেই আবার ‘দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়’ ফেলে দিতে পারব না। কারণ, দুনিয়ায় এমন কিছুই আর বাস্তবে নেই। এ জন্য এমন ভান ভনিতা ছায়ার সাথে লড়াই – এটা কারো পক্ষেই কোনো কাজের কাজ হয়নি। এটা দুই পক্ষের জন্যই এক অচলাবস্থা।

আরও কঠিন বাস্তবতার দিকটা হল, এখন কথিত সেই ‘সমাজতন্ত্র’ কোথাও আর টিকে থাকতে পারেনি, টিকে নেই কোথাও। কাজেই ভান করে যেন মাদুরোর পক্ষে এক “সমাজতান্ত্রিক জোট” উঠে দাড়িয়েছে, এই ভাব ধরার সুযোগ নেই। কারণ, রাষ্ট্রের সব কিছুই একমাত্র সরকারি মালিকানায় – এমন চিত্রের সেই সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্র বলতে একালে আর কেউ অবশিষ্ট নাই। ফলে যে চিত্রের রাষ্ট্রগুলো এখন আর নাই তাই এদেরই কোন “সোভিয়েত” ব্লক বা আলাদা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোন রাষ্ট্র-জোট আর নাই। গত ১৯৯১ সালের পর থেকে বলা যায়, সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার অন্তর্গত। এমনকি মিয়ানমার অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বলতে হয় উত্তর কোরিয়াও এখন মূলত চীনের মাধ্যমে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থায় যুক্ত। কাজেই এ কালে প্রতারণা করা ছাড়া, “কথিত সমাজতন্ত্রী” ভাব ধরার আর কিছুই নেই। ‘সমাজতন্ত্র’ কারও কাছে খুব ভালো জিনিস হয়ত। ছিল অথবা আছে এখনও। তবুও দুনিয়ায় এমন কিছু একটা এককালে চালু থাকলেও এখন সেটা “এক মৃত অভিজ্ঞতা” ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই এ কালের রাশিয়া অথবা প্রেসিডেন্ট পুতিন মানেই “সমাজতন্ত্রী” নয়। এমন আকার ইঙ্গিত করা,  ভং-চং ধরারও কিছু নাই। এমনকি তার সাগরেদ হিসেবে ইঙ্গিতে চীনকে সাথে দেখতে পেলেও কথা একই থাকে।

বরং, একালে বলা যায় চীন-রাশিয়া মিলে তারা হয়ত আমেরিকার বিরোধীও। তবুও তা যেকোনো দুই বিরোধী স্বার্থের রাষ্ট্রের মতই। এর বেশি গুরুত্ব বা  তাতপর্য এর নাই।  এটা “সাম্রাজ্যবাদ” হিসেবে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়া কোন অবস্থান এমন মানের ইঙ্গিত দিয়ে নৈতিকতার সুড়সুড়ি তুলতে হবে – এমন চেষ্টা ফাঁপা কাজ তো বটেই, তা অগ্রহণযোগ্য ও খারাপ কাজ। কাজেই ‘সমাজতন্ত্রের’ পক্ষ নেয়া হচ্ছে মনে করে এখনকার রাশিয়া বা চীনকে সমর্থন করা কিংবা সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে থাকা বুঝা; কিংবা আমেরিকার ও ইইউর বিরোধিতা করা কিংবা ভেনিজুয়েলার মাদুরোকে কোলে তুলে নেয়া – এসব প্রতিটি কাজই এখন নিজের সাথে প্রতারণা, মিথ্যা প্রবোধ দেয়া হয়ে দাঁড়াবে। এর চেয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া কাজের হতে পারে। ভেনিজুয়েলা সঙ্কটের গোড়া কোথায় তা নতুন করে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি।

কমিউনিস্টরা বলতে পছন্দ করবেন হয়ত যে শ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ জাতীয়করণ করেছেন, গরিবের জন্য তেল বিক্রির অর্থ পাকা বহুতল বাড়ি, শিক্ষা-চিকিৎসায় ব্যয় ইত্যাদির ‘সমাজতন্ত্র কায়েম’ করেছিলেন; সে জন্য “সাম্রাজ্যবাদীরা” ভেনিজুয়েলার জন্য বাধা ও নানান সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ভেনিজুয়েলার বর্তমান সঙ্কটে রাশিয়া ঠিক এ ব্যাখ্যাই দিচ্ছে।

আসলে তেল জাতীয়করণ আর গরিবের জন্য খরচ ব্যাপারটাকে সমাজতন্ত্র বলি আর না বলি, ভেনেজুয়েলার সঙ্কট সেজন্য হয়নি। আবার যদিও বেজ ফ্যাক্টস হল, ভেনিজুয়েলায় তেল জাতীয়করণ শ্যাভেজ করেননি, এটা ১৯৭৬ সাল থেকে আগেই করা ছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি (PDVSA) -এর জন্ম তখন থেকেই। শ্যাভেজ ২০০৭ সালে যেটা করেছেন, সেটা কী তাহলে? দুনিয়ায় যা তেল প্রতিদিন ভোগ-ব্যবহার হয়ে যায়, ভেনিজুয়েলা এর ১৩ শতাংশ একা উৎপাদন করে থাকে বা সক্ষম। কিন্তু তার এই সক্ষমতার প্রধান তেলক্ষেত্র এমন এলাকাকে বলে ‘অরিনোকো বেল্ট’। [ ভেনেজুয়েলায় একুশশত কিলোমিটার লম্বা বিস্তৃত অরিনোকো নদীর দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে দুনিয়ার বৃহত্তম এই তেল ক্ষেত্রে ]।  কিন্তু যেখানকার তেল তুলতে বড় বাধা ছিল যে, প্রথম দিকে এই তেল ক্ষেত্রে প্রস্তুত করতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল।

সে কারণে সরকারি মালিকানাধীন তেলক্ষেত্রের উপরই তা তেল তোলার অবস্থায় আনতে “তেল উত্তোলন বিনিয়োগ প্রকল্প” নেয়া হয়েছিল। আর বিদেশী কোম্পানিকেই বিনিয়োগ এনে এই প্রকল্প চালাতে দেয়া হয়েছিল।  আসলে মুল কারণ ছিল, দুনিয়াতে তেলের চাহিদা ক্রমে বাড়তে থাকায়  ১৯৯৭ সালের দিকে ভেনেজুয়েলার ‘অরিনোকো বেল্ট’ এর তেল উত্তোলনে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এভাবে কূপ তৈরি বহু আগেই শেষ করে কোম্পানিগুলো, যখন বহু আগেই উৎপাদনেও চলে গেছিল, এরই কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে ওই কোম্পানিগুলোকেই হুগো শ্যাভেজের সরকার চাপের মুখে দেশ থেকে বের করে দেয়। এ কাজকে ‘সমাজতন্ত্র’ বলে দাবি কমিউনিস্টরা করুক আর যা-ই করুক, আইনি দিক থেকে ব্যাপারটা হল একটা প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে যে পার্টনার, তাকেই কোম্পানি থেকে গায়ের জোরে বের করে দেয়ার মত। তাই এসব ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে যেমনটা হয়, তেমনই এখানেও ক্ষতিপূরণ মামলা হবেই, হয়েছিলও। আর তাতে কোন কোনটার মালিকানা বিতর্ক মামলায় ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে গেছে, আবার কোনটার মামলা এখনো পেন্ডিং। এখন একে ‘সমাজতন্ত্র’ নামে ডেকে কেউ সুখ পেতে চাইলে পেতে পারে, প্রপাগান্ডা করতে চাইলে করতে পারে।

তবে হুগো শ্যাভেজ এর চেয়েও আরো গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট তৈরি করেছিলেন অন্যখানে। আমরা সে দিকটা বুঝতে যাবো। মাটির নিচের তিন ডলারের তেল ১৭০ ডলারে বেচার চেয়ে আরামের কাজ আর কী হতে পারে! এর চেয়ে আরামের ‘সমাজতন্ত্র’ আর কী হতে পারে! শ্যাভেজ এ মজাই খেয়েছেন। দুনিয়ায় তেলের দাম কিন্তু সব সময়ই সাব্যস্ত হয়েছে কোন ‘সমাজতন্ত্র’ ব্যবস্থা নয় বরং, ‘বাজার’ মানে, একেবারে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারব্যবস্থা দিয়ে। ২০০৭ সালের দিকে তেলের বাজার তখনও তুঙ্গে ছিল, কারণ চীনের জিডিপি তখনো ডাবল ডিজিটে। তাই চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিতে তার জ্বালানি চাহিদা মানে চীনের সম্ভাব্য ব্যাপক তেলের চাহিদাও ছিল তুঙ্গে ফোরকাস্ট। এ দিকটায় নজর করে তেলের বাজারের ফোরকাস্ট খুবই তেজী ছিল।  যদিও ২০০৭ সালের শেষে (২০০৭-০৮) এসে, আমেরিকা টের পায় যে আফগান-ইরাক ওয়ার অন টেররের অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকান রাষ্ট্র নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়িয়ে খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু ওদিকে যুদ্ধ শেষেরও কোন নামগন্ধ নাই। সামগ্রিক পরিণতিতে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতিতে (দ্বিতীয়) মহামন্দা হাজির হয়েছিল।

এতে আমেরিকা-ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়লেও কিন্তু চীনের অর্থনীতির গতি কিছু কমে  সিঙ্গেল ডিজিটের জিডিপিতে এসে আটকে বহাল ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষে (এনার্জি স্টাটিস্টিক্সের প্রতিষ্ঠান, US Energy Information Administration (EIA); এটা আমেরিকান সরকারের হলেও তেলের বাজারে সবার কাছে বিশ্বস্ত) EIA -এর দেয়া চাহিদার ফোরকাস্ট (নিম্নহার) প্রকাশ পায়। এর ফলে তেলে বিনিয়োগকারীরা সদলে আগেই পুঁজি তুলে নেয়া শুরু করেছিল। এতে এরপর থেকে তেলের দাম প্রবলভাবে ক্রমেই কমতে কমতে একপর্যায়ে ৩০ ডলারেও গেছিল, যা এখন ৫৫-৬০ ডলার/ব্যারেলের মধ্যে। সেই থেকে এর ধাক্কা ভেনিজুয়েলার মতো রাষ্ট্র ও ‘সমাজতন্ত্রী’ সরকার আর সহ্য করতে পারেনি। তত দিনে অবশ্য শ্যাভেজ মারা (২০১৩) গেছেন, মাদুরো এসেছেন ক্ষমতায়।

তাহলে ভুলটা কোথায়? মফস্বলের এক দোকানদার বাবা তার দুই ছেলেকে নিয়ে ব্যবসা করেন। সারা দিন তার দোকান খোলা থাকে আর প্রতিদিন তার ক্যাশবাক্স ভর্তি হতে থাকে নগদ ও গোনা হয়নি এমন পরিমাণ টাকায়, তার ব্যবসা এমনই চালু। কিন্তু প্রতিদিন সেই বাবা সন্তানদের সাবধান করে একটা কথাই কেবল বলেন, বাবারা মনে রাখবা, বাক্সের সব টাকা আমার নয়। ব্যবসায় লভ্যাংশ যেটা, কেবল সেটা আমার, সেই টাকা থেকে সংসারে খরচ করতে পার। কেন? কারণ তিনি আসলে বলছিলেন ব্যবসার পুঁজিতে হাত না দিতে, পুঁজি না খেয়ে ফেলতে। ক্যাশবাক্সের কাঁড়ি কাঁড়ি মোট টাকা মানে তা হল ব্যবসায় বিনিয়োগ আর মুনাফার যোগফল। কাজেই, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দেখে ছেলেদের যেন মাথা খারাপ না হয়ে যায়।

সমাজতন্ত্রী শ্যাভেজ-মাদুরোরা বাজার খুবই অপছন্দ করেন, কিন্তু ফুলে-ফেঁপে ওঠা ১৭০ ডলারের তেলের বাজার কামনা করেন, ব্যাপারটা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৭০ ডলার এক ব্যারেল তেলের মধ্যে ১৭০ ডলার পরিমাণ ভ্যালু (value addition) ভেনিজুয়েলা যোগ করেনি। তবুও ওই দামেই তা বিক্রি হয়েছে, কারণ বাজারের প্রবল চাহিদা। আর সেটা আবার কোনো স্থানীয় বাজার না গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারে সেটি নির্ধারিত। ফলে এই বিপুল আয়ের ওপর চোখবুজে ভরসা করে খরচের ফর্দ আর দায় নিয়ে ফেলা অনুচিত হলেও শ্যাভেজরা তাই করেছিল। সরকার সমাজতন্ত্রের নামে ‘গরিবের জন্য অর্থ ব্যয়ের পপুলার কর্মসূচি’ খুলে বসেছিল। ফলে এটা স্থায়ী সরকারি ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছিল। বিপরীতে আয়ের সংস্থানের ব্যবস্থাটার কোন স্থায়ীত্ব না থাকলেও। তাই তেলের দাম পড়ে গেলে তখন এই ব্যয় নির্বাহে সরকার হিমশিম। ফলাফলে অতিরিক্ত টাকা ছাপানো, ফাইন্যান্সিয়াল মিসম্যানেজমেন্ট, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি।

তবে দ্বিতীয় আরো বড় ভুলটা হল, তেল বেচে পাওয়া অর্থ থেকে সরাসরি পপুলার সামাজিক কর্মসুচিতে খরচ না করে বরং একে আগে কোনো উৎপাদনে, কোনো কৃষি বা শিল্প কাজে বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। এরপর সেই উৎপাদনের লাভালাভ থেকে একটা অংশই কেবল ‘গরিবের জন্য অর্থব্যয়ের পপুলার কর্মসূচিতে ব্যয়’ বা ব্যবহার করা উচিত ছিল। এতে শুরুতে গরিবের জন্য কর্মসূচি চালু করতে কয়েক বছর একটু দেরি হত অবশ্যই। কিন্তু ক্রমেই একবার চালু করতে পারলে তা স্থির ও দৃঢ়ভাবে চলত। মাঝপথে তেলের দাম পড়ে গেলেও তা রাষ্ট্রের জন্য দায় হয়ে উঠত না। তেলের আয়ের সাথে গরিবের জন্য ব্যয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না করা ছিল এর সূত্র বা চাবিকাঠি।

ক্যাপিটালিজমের স্বভাব না বুঝে ক্যাপিটালিজমের বিরোধিতা, খামখা সব পদক্ষেপ আর উদ্ভট দাবি অনেক অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে পারে। সমাজতন্ত্রীরা আজীবন এগুলোই করে এসেছে। সমাজতন্ত্রী চিন্তার আরেক আজিব বৈশিষ্ট্য হল – নাগরিকের সব মৌলিক খরচের (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান) দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে – তা সবার আগেই দাবি করে অথবা ধরে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্র কোথা থেকে তা জোগাড় করবে, সামর্থ্য আছে কি না, হয়েছে কি না বা কতটা সেসব কোনো কিছু দেখা ছাড়াই এমন দাবি তারা করে থাকে। তারা ধরে নেয় রাষ্ট্রের এই সামর্থ্য আছে বা থাকবেই বা থাকে। অথচ প্রথম কাজ ছিল রাষ্ট্রের আয় ও খরচের সামর্থ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়া।  আর পরে বাড়া সামর্থের অনুপাতে খরচের পরিকল্পনা করা।

আফ্রিকার দেশগুলো কলোনিমুক্ত স্বাধীন হয়েছিল মোটামুটি ষাটের দশকের শুরু থেকে। তাদের কাছেও সমাজতন্ত্র-ভাবনা এমন এক কাঙ্খিত বটিকাও ছিল। আফ্রিকার  জাম্বিয়া ১৯৬২ সালে স্বাধীন হয়েছিল। এর এমন স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্টের নাম কেনেথ কাউন্ডা। এ কালে চাকরি সুত্রে জাম্বিয়ায় বসবাস কালে শুনেছি, তিনি নাকি সেকালে বাসায় তৈরি মদ খেয়ে জনগণের পেট খারাপের কষ্ট পাওয়া পছন্দ করতেন না। তাই কারখানায় তৈরি মদ ট্যাঙ্ক লরিতে নিয়ে বিতরণের ব্যবস্থা করতে গেছিলেন। সম্ভবত মদও যেহেতু এক প্রকার খাওয়া্‌ মানে অন্নের সংস্থান। ফলে সেটাও রাষ্ট্রের খাওয়ানোর দায় নিতে গেছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের পর এসে জাম্বিয়া রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে গেছিল, যা এখন একালে আবার অনেক কষ্টে ধীরেসুস্থে বিদেশী (চীনা ও বিশ্বব্যাংকের) বিনিয়োগ, দান-অনুদানে আবার জাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভেনিজুয়েলার সঙ্কট অবশ্য ওপরে যেগুলো বললাম, এগুলোই সব নয়। এর উপরে আরো নানান ডালপালাও আছে। যেমন ওই ২০০৭ সালের আরো ঘটনা হল, যখন সমগ্র দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র এক মৃত অভিজ্ঞতা মাত্র, (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ভেঙে গেছে) যা নিজ উদ্যোগে ভেঙে পড়েছে তা সবাই জানে। কিন্তু তবু শ্যাভেজ সেখান থেকে কোন শিক্ষা , সাবধানতা সতর্কতা ছারাই ভেনিজুয়েলার টেলিকম, বিদ্যুৎ, পানি, সিমেন্ট, স্টিল, ব্যাংক ইত্যাদি সব কিছু জাতীয়করণ করেন। পরবর্তীকালে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনের বিস্তারিত সব দিক প্রসঙ্গ যদি সরিয়েও রাখি, তবুও ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে এর প্রধান প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল এবং এখনও হয়ে আছে – এগুলোর অদক্ষভাবে প্রচুর খরচে পরিচালনা।

আর সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া দিক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া, সেটা তো আছেই। সরকারের হাতে মালিকানা রাখলে সে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট বা পরিচালনা যে এক অসহনীয় সমস্যা, এ কথা তো ২০০৭ সাল নাগাদ সমগ্র দুনিয়ার সমাজতন্ত্রীদের কানে ঢুকে যাওয়ার কথা। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেটা ঘটেনি। ভেনেজুয়েলার দুর্নীতি জনমনে কত মারাত্মক উদ্বেগের তা একটা চিহ্ন হল – এ বছর জানুয়ারিতে মাদুরো প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে তিনি তা উল্লেখ করে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ নেবেন। [He concluded by highlighting that the recovery of Venezuela’s economy and the fight against corruption and indolence are the government’s priorities for the near future,]। এমন সব কিছু অব্যবস্থার প্রভাব কত প্রবল তা বোঝার আরেক সহজ জায়গা হল মুদ্রাস্ফীতি। আপনার যদি ১০ হাজার টাকা থেকে থাকে, তবে এক বছর পর ওর মূল্য ভেনিজুয়েলায় এখন ৫৯ পয়সা। বলা হচ্ছে, ভেনিজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০৮৭.৫২ শতাংশ। [which means that bolívar savings worth $10,000 at the start of the year dwindle to 59 cents by the end. ]

অনেকে ইঙ্গিতে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, ভেনিজুয়েলা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সে জন্য নাকি পুতিনের রাশিয়ার সাথে খুব দহরম-মহরম। এমন ভিত্তিহীন অনুমান অনেকের মনে কাজ করে থাকে। কিন্তু পুতিনের সাথে সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক কী? পুতিন বা রাশিয়া কী এমন দাবি করেছে  যে রাশিয়া সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, আছে? তবু এমন “সমাজতন্ত্র- বিক্রেতা” এখনও আছে। এরা আসলে রাশিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থের তাঁবেদার ও ভাঁড়। বাস্তবে, ভেনিজুয়েলা এখন রাশিয়ার বিরাট বিনিয়োগের ক্ষেত্র, ২০০৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট বিনিয়োগ প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার [Since 2006 Russia has lent Venezuela at least $17bn. ]। ইকোনমিস্ট এক রিপোর্টের শিরোনাম বলছে, [Vladimir Putin fights for his own future ] অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে মাদুরোকে যদি শেষে বিদায়ই নিতে হয়, তবে নিজের বিনিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাশিয়া।

অর্থনীতি ভেঙে পড়া, দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া ও অব্যবস্থায় অচল ইত্যাদির সরকারের ক্ষেত্রে যা হয়, এখানে তা ঘটেছে। এর একপর্যায়ে সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের পক্ষে সরাসরি ক্যাডার গুণ্ডা বা মিলিশিয়া নামাতে হয়, বিরোধী জমায়েতে হামলা করতে হয় যারা আবার পুলিশবাহিনীর প্রটেকশন পেয়ে থাকে – এসবই ঘটে গেছে ভেনিজুয়েলায়। জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থাকার সব কর্মাদি এখানে সম্পন্ন করা হয়েছে। সবার ওপরে মাদুরোকে  আবার কেউ উলটে ফেলে দেয় তা থেকে রক্ষা করতে পুতিনের দেয়া প্রটেকশন, সেটা তো আছেই।

ইকোনমিস্টের আরেক অবজারভেশন হল – […hollowing out of institutions and the privatisation of state power is precisely what Russia and Venezuela have in common]। অর্থাৎ এখানে মাদুরো আর পুতিনের মধ্যে এক বড় মিল আছে। সেটা হল, উভয় ব্যক্তিরই দখলে থাকা বা পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যার যা ভূমিকা তা হল, প্রশাসন পাবলিকের পক্ষ থেকে গণস্বার্থ দেখা ও মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি সব দায়িত্ব বাদ দিয়ে এখন উলটা্ “প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ফোকলা” আর অকেজো করে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনিক বিজনেস রুলের রুল বই দিয়ে এগুলো আর পরিচালিত নয়। এগুলো পরিচালিত হয় ব্যক্তি-মুখের নির্দেশে। এটা যেন ‘রাষ্ট্রক্ষমতারই এক প্রাইভেটাইজেশন’ এমন ঘটে গেছে। আর কে না জানে, যখন রাষ্ট্রের নির্বাহীদের কেউ কব্জা করে নেয়, তখন তার রাষ্ট্রীয় সম্পদও তাদের দখলে চলে যায়, রাষ্ট্র এক পরিত্যক্ত এলাকা হয়ে যায়।

এসবের মিলিত এখন আর এক রূপ হল, ‘প্রাইভেট আর্মির’ সমাধান। ইকোনমিস্ট-সহ অনেকে জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে মাদুরোর কোনো সম্ভাব্য ক্ষমতাচ্যুতি ঠেকাতে রাশিয়া ইতোমধ্যে কয়েক শ’ রাশিয়ান ‘প্রাইভেট আর্মি’ বা ওয়াগনার (Wagner mercenaries) পাঠিয়েছে।

‘প্রাইভেট আর্মি’- এটা ইদানীংকালের আরেক নতুন ফেনোমেনা। তবে সাবধান, এটা পুতিনের রাশিয়াই প্রথম দেখিয়েছে তা মোটেও নয়। ইরাকে বা আফগানিস্তানে ব্লাক-ওয়াটার[Blackwater] বাহিনীর কথা আমরা শুনেছিলাম। এরাই ছিল সেখানে আমেরিকান ‘প্রাইভেট আর্মি’ সরবরাহের কোম্পানি। পরে অবশ্য এক স্থানিয় বাজারে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গুলি ছুড়ে মারার অভিযোগে কেলেঙ্কারিতে পড়ে এই বাহিনী আমেরিকায় ফিরে যায়। মজার ব্যাপার হল, মিয়ানমারের এক ইংরেজি দৈনিক খবরে দাবি করা হয়েছে যে, চীন সেই ব্লাক-ওয়াটার কোম্পানিকেই নতুন নামে মিয়ানমারে নিয়োগ করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার চুলায় যাক, আমেরিকা, রাশিয়া অথবা চীন প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে প্রাইভেট গুন্ডাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও তা করতে চায়। এব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন নীতিগত ফারাক নাই।

ভেনিজুয়েলাবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলার ক্ষেত্রে আরেক বিরাট অবদান ট্রাম্পের আমেরিকার। এ কালে আমেরিকা যার ওপরে ইচ্ছা “অবরোধ আরোপ” করে রাখছে। এই অবরোধের সোজা মানে, সেই রাষ্ট্রের পক্ষে ডলারে কোনো কিছু বেচা/কেনা করা বন্ধ করে দেয়া। ফলে ভেনিজুয়েলার এখন ডলারে তেল বিক্রি বন্ধ। এ ছাড়া ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয়গুলো পণ্যের আমদানিতেও এর বাধা তোইরি করে রাখা  তো আছেই। অথচ ১৯৪৪ সালে ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে গ্রহণ করার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল নিজে অন্য রাষ্ট্রকে ডলারে পণ্য কেনাবেচা করতে বাধা দিবার সুযোগ নিজের হাতে রাখবে এমন কোনো শর্ত ছিল না।

সামগ্রিক দিক থেকে দেখলে ভেনিজুয়েলার বিরাট আরেক ভুলটা হল বিপ্লবীপনার মোহে শেষে রাশিয়া ও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার ফাঁদে পড়া। অথচ সরাসরি কারো কব্জায় পড়া এড়িয়ে যাওয়া – এই নীতি অনুসরণ করে পথ চলা সঠিক ছিল। এ ছাড়া নিজ দেশের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ যতই বিরোধ থাক, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবিতর্কিত রাখা খুবই জরুরি। অন্যথায় আভ্যন্তরীণ বিরোধকে ছোট বা সীমিত  ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে যায়। কারণ, সমাজে নানা রকম স্বার্থদ্বন্দ্ব থাকবেই, যা এক চলমান ঘটনা। কিন্তু তা এক ‘পারমিশিবেল রেঞ্জের’ মধ্যে রাখতে পারতে হয়। আমরাই একমাত্র ভাল অথবা সমাজতন্ত্রী এসব প্রচার করে সমাজকে অন্তত গভীর দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেললে নিজের দেশ বাইরের দেশ ও লোকের স্বার্থের ঘুঁটি হয়েই ওঠে। ভেনিজুয়েলার অবস্থা হয়েছে এটাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভেনিজুয়েলা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]