ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

গৌতম দাস

২২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2zq

 

নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী ও সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তি – ছবি : TOI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, যা ভারতের ভাষায় “লোকসভার নির্বাচন” [General Election To Lok Sabha, 2019], তা অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় পর্ব গত ১৮ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। এভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ ভারতের ভোটপ্রদান  এবারও মোট সাত পর্বে এক মাসেরও বেশি দিন ধরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা করে পর্বের নির্বাচনের সমাপ্ত হবে। এভাবে নির্বাচন শেষ হবে সপ্তম পর্বটা আগামী মাসে, ১৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে। এরপর বাক্সবন্দী করে সব যার যার কেন্দ্রেই রাখা ভোট, ২৩ মে সকাল থেকে একসাথে গণনা শুরু হবে। এতে আশা করা যায়, ঐদিন বেলা ১১টার পর থেকে কে কোন আসনে এগিয়ে আছে, সেই অভিমুখ স্পষ্ট হতে শুরু করবে, আর সেখান থেকে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, সেই অভিমুখ বা ইঙ্গিতও জানা শুরু হয়ে যাবে। এভাবে দিন শেষে সন্ধ্যার পরে সব ফলাফল না এলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসছে।

এটা ভারতজুড়ে ৫৪৩ আসনের লোকসভা নির্বাচন; অর্থাৎ ভারতে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় যেতে হলে কোন দল বা জোটকে মোট ২৭২ ছাড়িয়ে (২৭২+) এরও বেশি আসন পেতে হয়। কারণ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত আরো দু’টি আসনও আছে তা যোগ হলে মোট আসন ৫৪৫ হবে।

ভারতের টিভি মিডিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন ড. প্রণয় রায়। তাঁর মিডিয়া প্রফেশনাল স্ত্রী রাধিকা রায় এনডিটিভি গ্রুপ কোম্পানি খোলার প্রথম উদ্যোক্তা। এর একমাস পরে প্রণয় রায় তাতে সহ-উদ্যোক্তা হিসাবে যোগ দেন। এভাবে দুজনে মিলে ১৯৮৮ সালে ‘এনডিটিভি’ মিডিয়া গ্রুপ চালু করেছিলেন। দু’জনে মিলে তাঁরা এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের শেয়ার মালিক। এই প্রণয় রায় ব্যতিক্রম অনেক অর্থে। তিনি অন্য মিডিয়া মালিক বা সম্পাদনার নির্বাহীদের সবার থেকে আলাদা এ জন্য যে, তিনি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, অর্থনীতির ডক্টরেট সেই সাথে ব্রিটেনে পড়ালেখা করা পেশাদার চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট।

এ ছাড়া যখন টিভি বলতে একমাত্র সরকারি টিভি বুঝত মানুষ, সেই যুগে তিনি ভারতীয় “দূরদর্শনে” অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করতেন। আরও সেই সাথে ভারতের নির্বাচনের সময় প্রাপ্ত নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য এবং অভিমুখ বিশ্লেষণ – এটা তখ থেকেই তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।ইংরাজিতে psephologist (উচ্চারণ “সিফোলজিস্ট”) বলে একটা শব্দ আছে। যার অর্থ নির্বাচনতাত্বিক; অর্থাৎ যিনি দক্ষতার সাথে  নির্বাচনে ভোটারেরা কোনদিকে ও কেন ভোট দিল সে তাতপর্য ও প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ভারতের মিডিয়া একমাত্র তাকেই নামের আগে ‘সিফোলজিস্ট’ বিশেষণ লাগিয়ে বলে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখা যায়।  যেমন  তামিলনারু ভিত্তিক দক্ষিণী ১৪০ বছরের প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক “দ্যা হিন্দু” লিখেছে, প্রণয় রায় সম্পর্কে –  “১৯৮০ সাল থেকে প্রণয় আর ভারতের নির্বাচন প্রায় সমার্থক কথা হয়ে গেছে। তাকে দিয়েই ভারতে “নির্বাচনতাত্বিক” শব্দটার ব্যবহার শুরু”। [“Prannoy Roy has been synonymous with elections since 1980. He pioneered opinion polls in India and introduced psephology to the country.”]।

পরবর্তীকালে ১৯৮৮ সালে নিজের “এনডিটিভি” চালু হলে ‘নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য ও অভিমুখ বিশ্লেষণ” করার ভারতের বাজারে তিনি আরও বিস্তারে পাইওনিয়ার বা অগ্রগামী বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। ইনি চলতি নির্বাচনের আগে এপ্রসঙ্গ নিয়ে তার বই [দ্যা ভারডিক্ট : ডিকোডিং ইন্ডিয়ান ইলেকশন… (The Verdict: Decoding India’s Elections. প্রকাশ করেছেন। বইটি হল, ভারতের নির্বাচনে ভোট প্রদানের অর্থ-তাতপর্য কী করে বের করতে হয়, তা নিয়ে। এরই এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

প্রণয়ের সেই বিচারে ১৯৫২ সাল  ভারতের লোকসভা নির্বাচনে শুরু হওয়ার পর থেকে, ভারতের ভোটারদের ভোট দেয়ার প্যাটার্নকে তিন আলাদা যুগে (একেকটা প্রায় ২৫ বছরে) তিনি ভাগ করতে চান। প্রথম ২৫ বছর ধরে (১৯৫২-১৯৭৭) ভোটারেরা একনাগাড়ে, স্বাধীন ভারত পাওয়ার আবেগ ও জোশে কংগ্রেসকেই মানে সরকারের পারফরম্যান্স যেমন হোক তাদেরকেই আবার জেতাতে হবে- এই ছিল তখনকার আবেগ বা ফর্মুলা। তাই ৮০% ক্ষেত্রে আগের সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছিল। এটার নাম তিনি দিয়েছেন পুরান “ক্ষমতাসীন-মুখি ভোট”। একবার জিতে যাবার পর সারা পাঁচবছর এলাকায় চেহারা না দেখালেও পরের বার আবার তিনি নির্বাচিত হতে পারতেন। কারণ সেটা ছিল বিশ্বস্ত ভোটারদের যুগ। ভোটারদের নেতাদের উপর অগাধ বিশ্বাস কাজ করত। প্রণয় বলছেন, এটাকে আপনারা “বোকা ভোটার” বা “গভীর আশাবাদী” ভোটারও বলতে পারেন।

প্রণয় বলছেন এরপর ১৯৭৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব – যার নাম তিনি দিয়েছেন – “ক্রুদ্ধ ভোটারদের [angry voter] যুগ”, ১৯৭৭-২০০২ সাল পর্যন্ত। এটা শুরু হয়েছিল  ১৯৭৭ সালের মার্চের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচন থেকে। এই নির্বাচন ছিল আগের ২১ মাসের (১৯৭৫-৭৭) ধরে ইন্দিরার “জরুরি আইন জারি” করে বিরোধী দমন নির্যাতন চালানোর সমাপ্তিতে। তাই সেটাই ছিল প্রথম  কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে পুনরায় বিজয়ী না করে শুরু হয় দ্বিতীয় যুগ পর্ব। অর্থাৎ এই ক্রদ্ধ ভোটার যুগের বৈশিষ্ঠ ছিল, যার পারফরম্যান্স খারাপ তাকে পরের নির্বাচনে নির্বিচারে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়া। প্রণয় বলছেন এই দ্বিতীয় যুগে যেকোন ক্ষমতাসীন সরকার [incumbency] পরের বার নির্বাচনে ৭০% ক্ষেত্রে উতখাত হয়ে গেছে। প্রণয়ের ব্যাখ্যা হল পাবলিক এতই ক্রুদ্ধ থাকত যে একট ভাল অথবা একটু খারাপ বলেও কাউকে মাফ করে নাই, নির্বিচারে পুরান হলেই তাকে বাদ – এই ছিল ফর্মুলা বা নীতি।

আর সর্বশেষ এখনকার যুগপর্ব, নতুন শতকের শুরুতে ২০০২ সাল থেকে যার উত্থান। তখন থেকে শুরু হয় আর একেবারে নির্বিচার নয়, এবার বিচার করে দেখেশুনে পুরান কোনো সরকারকে রেখে দেয়াও শুরু হয়েছে, যদিও কাউকে কাউকে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়াও, সে তো আছেই। প্রণয়ের রায়ের ভাষায়, এরা অনেক “বিবেচক ভোটার”। এখানে এপর্যন্ত ৫০% ক্ষেত্রে দেখা গেছে  ভোটাররা নেতাকে পুণর্নিবাচিত আর ৫০% ক্ষেত্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।   অর্থাৎ একথার সুত্র ধরে বললে, প্রণয় রায় মোদীর আবার বিজয় সম্ভাবনাকে তিনি একেবারে অসম্ভব বলে ঠিক ফেলে দেননি। ভারতের মিডিয়া জগতে প্রণয় ও তার টিভির চলতি বা সাবেক কলিগরা সবাই যারা এখন ভারতের মিডিয়া জগতের প্রভাবশালী ও মাথা পরিচালক। আর সম্ভবত একজন বাদে (অর্ণব গোস্বামি যে প্রকাশ্যেই বিজেপির পক্ষে) বাকিরা সবাই মোদি-বিরোধী বা কঠোর সমালোচক বলে মনে করা হয়।
তবে তিনি এই তৃতীয় পর্বে আর এক নতুন উপাদানের কথা বলেছেন; জানাচ্ছেন, এই পর্বে বিপুলভাবে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ঘটেছে। তাই তাদের সংখ্যার কারণে তারা এখন ভোটের ফলাফলে অন্তত এটাও আর একটা নির্ধারক উপাদান।

প্রণয় রায়ের বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হল, ভারতে সরকার গঠন এখন সরাসরি ঠিক ভোটারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সেটা ভোটারের ভোটের চেয়েও “জোট” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কেমন করে আপনি জোট করছেন, কাকে জোটসঙ্গি বেছে নিচ্ছেন, কেন, কী বুঝে – এভাবে জোটবন্ধু বেছে নেয়া – এটাই এখন মুখ্য নির্ধারক যে, শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে।

উল্টা করে বললে প্রণয় আসলে বলতে চাইছেন, ভারতে কোনো একক দলের একা নিজের সামর্থ্যে সরকার গঠনের দিন শেষ। সারা ভারতের ভোটারদের আস্থা আছে এমন কোন দল বলতে আর কেউ বাকি নাই। আর একটু এগিয়ে বললে তাহলে এখন কিসের দিন? অর্থাৎ কিসের ভিত্তিত্ব সরকার গঠন হয় বা হবে? এর জবাব হবে, এখনকার ভোট দেয়া ও সরকার গঠনে সমর্থ হওয়ার অভিমুখ হল সঠিক “জোট” টা গড়া। কিন্তু কার সাথে কার জোট? ভারতে সর্বভারতীয় বা ভারত-জুড়ে আছে এমন দল আছে মাত্র দুটা, আর তারা পরস্পর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি – বিজেপি ও কংগ্রেস। কাজেই এদের দুইয়ের মধ্যে জোট হবার প্রশ্নই আসে না, তা বলা হচ্ছে না। তাহলে জোট কাদের সাথে?

ভারতে আঞ্চলিক বা রিজিওনাল দল কথাটার মানে হল ঠিক কোন অঞ্চল নয় আসলে সেগুলো একেকটা রাজ্যভিত্তিক (প্রাদেশিক) দল। যেমন মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এর ততপরতা নাই বললেই চলে, অন্তত প্রার্থী দিবার মত অবস্থা নাই। এভাবে  ২৯ রাজ্যের ভারতে, প্রায় প্রত্যেক রাজ্যেই অন্তত দুই বা এর বেশি সংখ্যক আঞ্চলিক দল আছে। এরা মূলত প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনেও এরা দাঁড়িয়ে গিয়ে বিপর্যয় তৈরি করে ফেলতে পারে, ফেলে থাকে। বিশেষত এমন আঞ্চলিক দলগুলো যারা রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় থাকে। তাই তাদের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে বড় আসন পেয়ে যাবার সম্ভাবনাও তৈরি থাকে। যেমন তৃণমুল গত ২০১৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ মোট ৪২ আসনের মধ্যে ৩৪টাই পেয়েছিল। এ’কারণে আঞ্চলিক দলগুলোকে -কংগ্রেস না বিজেপি- কে আগে নিজের জোটে জুড়ে নিবে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কংগ্রেসের এমন জোটের নাম ইউপিএ [United Progressive Alliance, UPA] আর বিজেপির এমন জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance, NDA]। ভারতের নির্বাচনি রাজনীতির এই ঝোঁক একেই প্রণয় রায় বলছেন ভোটের চেয়েও সঠিক “জোট” গড়তে পারা – এটা বেশি নির্ধারক। ভারতে রাজনীতির এই নতুন ঝোঁক তৈরি ও তা স্থায়ী হয়ে গেছে সেই ১৯৮৫ সাল থেকে।

এজন্য বলা হচ্ছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকেই ভারতজুড়ে দল বলতে কংগ্রেস বা বিজেপির একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আসার দিন শেষ হয়েছে। আর শুরু হয়েছে, তাই “জোটের” সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসার দিন।  কিন্তু এই নতুন ধারাবাহিকতাতেও গতবার  মানে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস আর এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। ভোট পরিসংখ্যান বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি একা তো নয়ই, জোট হিসাবে ক্ষমতায় যেতে চাইলেও নিজ দলকে নুন্যতম কিছু আসন পেতেই হয়। এপর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে সেই সংখ্যাটা হল ১১৫। আর এই বিচারে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস নিজে পেয়েছিল মাত্র ৩৮ আসন আর, জোট হিসেবে সর্বনিম্ন, মাত্র ৬০ আসন। অর্থাৎ কংগ্রেসের ঝোঁক এবার আরও পতনের দিকে। আর ওদিকে এবারের চলতি নির্বাচন থেকে একইভাবে বিজেপিরও পতন শুরু হয়ে যেতে পারে।

তাই যদি এবারও কংগ্রেসের এই ট্রেন্ড অব্যাহত থাকে, তবে সেটা হবে জোট হিসাবেও কংগ্রেস আর লায়েক থাকবে না, এমন স্থায়ী পতন। অর্থাৎ আঞ্চলিক দলগুলোও আর কংগ্রেসের সাথে কোন জোট করতে চাইবে না। নতুন সেই অভিমুখের অর্থ হবে আঞ্চলিক দল বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দল – এমন ছোট দলগুলোই এবার উল্টা বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে না নিয়ে নিজেরা নিজেরাই জোট সরকার গঠন করার শুরুর দিন। কলকাতার মমতার ভাষায় এটাই, “ফেডারেল ফ্রন্ট” এর সরকার গড়া। এই রচনার শুরুতে যে ছবি ব্যবহৃত হয়েছে তাতে, তৃতীয় ফ্রন্ট বা থার্ড ফ্রন্ট বলতে এর কথাই বুঝানো হয়েছে। এদিকটাই আরেক ভাষায় আমলে নিয়ে প্রণব রায় বলছেন ভারতের এবার “এটা কোন জাতীয় নির্বাচন নয়”। বরং এটা হল রাজ্যগুলোর এক ফেডারেশনের নির্বাচন। [“2019 is not a national election at all, it’s a federation of states election,”]। মমতার “ফেডারল” শব্দের সাথে মিলের দিকটা লক্ষ্যণীয়।

বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রণয় রায়ের তৃতীয় মন্তব্য ছিল সরাসরি কংগ্রেস সম্পর্কে; এবং বলা বাহুল্য তা খুবই করুণ! তিনি বলছেন, ‘কংগ্রেস সম্ভবত ২০৫০ সালের নির্বাচনের কথা চিন্তা করে এবারের নির্বাচন লড়ছে”। এ কথার সোজা মানে হল, কংগ্রেস দিশা হারিয়েছে। তাই কারো সাথে জোট করতে চাচ্ছে না, বুঝছে না অথবা পারছে না। এমনকি সম্ভবত অন্যরাও কংগ্রেসকে তাদের জোটে নিলে কোনো লাভ হবে না, কংগ্রেসকে এমন অযোগ্য দল মনে করছে। তবে প্রণয় সব কারণের জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করছেন। বলতে চাইছেন কংগ্রেসের নিজের ওজন সম্পর্কেই নিজেরই কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা ধারণা নেই। যেন রাহুল দলের সভাপতি হয়ে যাওয়ার পরে তার মনে একটা ভাব এসেছে যে, এবার বাপ-দাদার কংগ্রেসের যুগ ফিরে এসেছে বা আসবেই। অথচ নিজের পায়ের নিচে মাটিই নেই, বেখবর!

ভারতের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে একা উত্তর প্রদেশ এই রাজ্যে সর্বোচ্চ আসন, একমাত্র রাজ্য যেখানে আসন সংখ্যা ৮০টি। এর পরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন অনেক নিচে; তা হলো মহারাষ্ট্র ৪৮, আর এর পরে তৃতীয় সর্বোচ্চ পশ্চিমবঙ্গ ৪২, এভাবে। অর্থাৎ উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে খুবই নির্ধারক, গত নির্বাচনে একা বিজেপিই এখানে পেয়েছিল ৭২টি। অর্থাৎ একা এখানে বেশি আসন পাওয়ার সাথে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারা সম্পর্কিত ফেনোমেনা। সেই উত্তর প্রদেশে এবার দুই প্রধান আঞ্চলিক দল [এসপি (সমাজবাদী পার্টি) আর বিএসপি (বহুজন সমাজবাদী পার্টি)] যারা মূলত গরিব, অন্তজ, দলিত ও মুসলমানদেরকে প্রতিনিধিত্ব করে, – ঠাকুরদের বিরুদ্ধে যাদব-  এমন দল। এরা সবার আগে এবার নিজেরাই বিজেপিকে ঠেকাতে প্রথম কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে জোট বাঁধে। প্রত্যেকে সমান ৩৮ আসন নিয়ে দুদলে মোট ৭৬। আর বাকি চারের কংগ্রেস নিতে চাইলে দু’টি গান্ধী পরিবারের মা-ছেলের জন্য। আর অন্য দু’টি আর এক ছোট আঞ্চলিক দলের (রাষ্ট্রীয় লোকদল) জন্য। এই জোট গড়তে সবচেয়ে নমনীয় হল সমাজবাদী পার্টি। তাই নিজের ভাগের ৩৮ সিট থেকে সে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার আগ্রহ যে দেখাতে পারছে।

কিন্তু মূল কথা যেটা, বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়ে সব রাজ্যেই এক “জোট” গড়তে না পারার জন্য আঞ্চলিক দলগুলো মূলত দায়ী করছে কংগ্রেসকে। কারও পাটাতনে না দাঁড়িয়ে উপর থেকে দেখলে, খুব সম্ভবত আসল জটিলতাটা হল – কংগ্রেসের স্বার্থের সাথে প্রতিটি আঞ্চলিক দলের স্বার্থই সঙ্ঘাতমূলক। অন্তত কংগ্রেস সেখান থেকেই দেখছে। এ ছাড়া সাথে আরও আছে কংগ্রেসের নিজের সম্পর্কে অতি-মূল্যায়ন। ফলে এ জন্য কোনো আঞ্চলিক দলের সাথেই এবার কংগ্রেসের কোনো রাজ্যে কোনো আসন সমঝোতা করতে সক্ষম হয়নি। যেমন এখন রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন দিল্লিতে এমন আঞ্চলিক দল হল আম আদমি পার্টি, ওদিকে কলকাতা, কেরালা বা ত্রিপুরায়  এমন দল হল সিপিএম, পাঞ্জাবেও প্রভাব আছে এমন দল আম আদমি, এছাড়া আর উত্তর প্রদেশের অবস্থা তো জানলাম উপরে ইত্যাদি; এভাবে আঞ্চলিক দলগুলো সকলে কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ। কারণ কোথাও কংগ্রেসের সাথে কারো শেষ পর্যন্ত কোনো জোট, বা আসন ভাগাভাগি হয়নি। এমনকি উত্তর প্রদেশে এসপি আর বিএসপির জোট ঘোষিত হওয়ার পরে সেটাকেও উপেক্ষায় এরপরেও আবার কংগ্রেস ঘোষণা করেছিল যে, রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা এবার প্রথম নির্বাচন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল, তাতে কংগ্রেস সবখানেই এবার একা নির্বাচন করছে। আবার প্রিয়াঙ্কার নিজে নির্বাচন করাও অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে যার সোজা মানে হল, কংগ্রেসের একা চলার এমন ততপরতার কারণে  এবার সবখানেই বিজেপি-বিরোধী ভোটগুলো কংগ্রেসের কারণেই সবচেয়ে বেশি ভাগ হবে। যার পুরা সুফলটা ভোগ করবে বিজেপি। এজন্য অনেকে টিটকিরি দিয়ে বলছে প্রিয়াংকার আগমনটা মূলত মোদীকে সহায়তা করতে।

অর্থাৎ কংগ্রেস যত আঞ্চলিক দলগুলোর ভোট কাটবে ঠিক তত ভোটই বিজেপির এগিয়ে যাবে। আর ততটাই বিজেপির জন্য তা সুবিধা বয়ে আনবে। এমনকি কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও মারাত্মক। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তর প্রদেশের ৩০টি আসনে কংগ্রেস একক ও শক্ত প্রার্থী দিবে, তাদের নাকি বিপুল সম্ভাবনা। মানে ওই ৩০ আসনে সে ‘শক্ত’ করে ভোট নষ্ট করবে আর বাকি ৫০টি আসনে ‘দুর্বল’ভাবে নষ্ট করবে। এ কারণে কংগ্রেসের এবারের ভোট কৌশলের কোনো তাল নেই বেতাল দশা; উদ্দেশ্যবিহীনের মতো আচরণ করছে কংগ্রেস। এ দিকটা খেয়াল করে প্রণয় রায় বলছেন সঠিকভাবে “জোট” করা যেখানে জেতার জন্য নির্ধারক বিষয়, কংগ্রেস সেখানে ততটাই যেন বেখবর, ভবঘুরে। তাই কংগ্রেসের লক্ষ্য চলতি ২০১৯ সাল না যেন সুদুর ২০৫০ সালের নির্বাচনের লক্ষ্যে এক অস্পষ্ট সময়ের দিকে তাকিয়ে কংগ্রেসের সব সিদ্ধান্ত।

প্রণয় রায়ের তিন মন্তব্য নিয়ে কথা শেষ, এখন অন্যান্য প্রসঙ্গ। ভারতের নির্বাচন তাই স্বভাবতই আমরা অনেকেই আগ্রহ নিয়ে সময় দিব, জানতে চাইব। বিশেষ করে নানান কারণ যারা আবার নিয়মিত ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিক-অভিমুখ জানতে ততটা সময় দিতে পারিনি, তারাও এখন জানতে চাইব। সব নির্বাচনেই মূল দু’টি দল থাকে, অনেকটা আমাদের লীগ-বিএনপির মত। আর ভারতের এমন দুই দল হল বিজেপি ও কংগ্রেস। এটাই আমাদের বহু পুরনো সময় থেকে চেনা ধারণা। কিন্তু সরি! এবার এই অনুমান নিয়ে ভারতের নির্বাচন বুঝতে গেলে সব হিসাবে ভুল হবে। কেন?

Source: Election Commission data | Shivam Vij/ThePrint

গত প্রায় ৩০ বছরের (১৯৮৪-২০১৪) একটা ভোটের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ বলছে, যে আসন কখনো কংগ্রেস হারাচ্ছে তা বিজেপি বা আঞ্চলিক দল পাচ্ছে; বেশি সময়ে বিজেপি পাচ্ছে। কিন্তু বিজেপি যে সিট হারাচ্ছে তা কংগ্রেস ফিরে পাচ্ছেই না। বেশির ভাগই আঞ্চলিক দল পাচ্ছে। তাই আগ্রহিরা এই খবর অনুসরণ করতে পারেন যে বলছে – ২০১৯ সালের নির্বাচন থেকে “কংগ্রেসমুক্ত ভারত” – বিজেপির এই শ্লোগান বাস্তবে ত্বরান্বিত হয়ে উঠতে পারে।

এর সোজা মানে হল, বিজেপির বিকল্প দল বলতে সেটা আর কংগ্রেস নয়, আঞ্চলিক দল। এক কথায় আঞ্চলিক দলের প্রভাব ক্রমশ বড় করে বেড়ে চলা – এটাই ভারতের রাজনীতির মূল অভিমুখ। আর এটাই কংগ্রেসের কথিত অনুমিত স্বার্থের সাথে প্রত্যেক আঞ্চলিক দলের অনুভূত স্বার্থবিরোধ অথবা বিজেপি-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কারো সাথেই কংগ্রেসের জোট না হওয়া। তাই এবার বিজেপি ফল খারাপ করলে এর অর্থ কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে তা নয়। এবারো তা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর মমতা ঠিক এই কারণের বেশির ভাগ আঞ্চলিক দলের কংগ্রেসবিরোধিতার ভোকাল মুখপাত্র। ভোট চাইতে গিয়ে তিনি পাবলিক মঞ্চে উঠে সরাসরি বলছেন, কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। প্রবল উত্তেজিত মমতার আরো একধাপ এগিয়ে দাবি এবার বিজেপি ১০০ আসনও পাবে না: মমতা।

জনমত সমীক্ষা
ভারতের নির্বাচনের ফল সম্পর্কে জনমতের সমীক্ষা (বা বুথ ফেরত ভোটার সমীক্ষা) চালিয়ে আগাম অনুমান করা সব সময় খুবই কঠিন একটা কাজ। এর মূল কারণ বিপুলসংখ্যক ভোটার (প্রায় ১০০ কোটি) যার তুলনায় স্যাম্পল সাইজ যত বড় আর ছড়ানো হওয়া উচিত তা না হওয়া বা নেয়া। তবুও এই নির্বাচনের ভারতের অন্তত পাঁচটা সমীক্ষা গ্রুপের কথা জানা যায়, যারা গত বছর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে (মোদির পক্ষে) সে অনুমান দিয়ে যাচ্ছে। আগে যাই থাক, গত ১৯ মার্চ এমনই এক অনুমিত গণনা রিপোর্ট বলে চলছিল বিজেপির-বন্ধু জোট আবার সরকার গঠন করে ফেলবে ২৮৩ আসন পেয়ে।

এই জনমত সমীক্ষা চালিয়েছিল “টাইমস নাউ ও ভিএমআর”। যারা অবশ্য প্রো-বিজেপি সমীক্ষা গ্রুপ বলে প্রচার আছে। আমরা লক্ষ্য করছি এদের প্রচারটাই আমাদের প্রথম আলোতে বেশি আসছে। কিন্তু ১১ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে সবার হাতে আর অনুমিত ডাটা নয়, অন্তত মোট ভোট প্রদানের শতকরা হার কত সে ফ্যাক্টস এখন প্রকাশিত। এর ফলে দেখা গেছে অন্তত দু’টি সমীক্ষা গ্রুপ এখন পিছু হটছে। এমনই একটা গ্রুপ ‘সিএসডিএস’ তাদের প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হল, ‘প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি কী অসুবিধায় পড়ছে?’ [Is it disadvantage BJP post first phase polling?] তারা এবার বিশ্লেষণে বলছে, প্রথম পর্যায়ে উত্তর প্রদেশের আট আসনে নির্বাচন হয়েছে। যার দু’টি বাদে বাকি ছয়টাতে বিজেপির অবস্থা খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা, যেখানে গত ২০১৪-তে এই আট আসনই বিজেপির ছিল। এখানে এবার ভোট প্রদানের হার কম আর ওই ছয়টা আসনেই মুসলমান ভোটার সংখ্যায় আধিক্য বলে এই যুক্তি তুলে এরা এখন সরে এসে বলছে- এই আট আসনের ছয়টাতেই বিজেপি খারাপ করবে।……the BJP would be down six in UP in the first round.

একইভাবে আরেক সমীক্ষা গ্রুপ ‘সি-ভোটার’- যারা মোদির ‘পাবলিক রেটিং’ কেমন যাচ্ছে তা নিয়ে কথা বলে এসেছে। আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি এরা দাবি করেছিল পাকিস্তানে কথিত ‘বিমান হামলা’ করে আসাতে মোদির রেটিং বেড়ে ৬২ শতাংশ হয়েছিল। এরপর এক মাসে তা অল্প করে কমলেও তা হয়েছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর এবার তারা বলছে, সেটা আরো কমে এবার ৪৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মোদির গ্রহণযোগ্যতা এখন ১৯ শতাংশই কমে গেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটপ্রদান অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত ১৮ এপ্রিল। তাতেও দেখা গেছে ভোট প্রদানের হার ২০১৪ সালের চেয়ে বাড়েনি, তবে অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। [On 7 March, the Modi government’s approval rating was at 62.06 percent. Despite a minor decrease it remained in the 50s till 22 March. But on 12 April, a day after the first phase of polling, the Modi government’s approval rating had fallen to 43.25 percent, a fall of almost 19 percent in about five weeks.] মোটকথা সমীক্ষা গ্রুপগুলোই আর জোর দিয়ে মোদির সম্ভাব্য ভালো ফল করার কথা বলতে চাচ্ছে না। তাতে আসল ফলাফল আগামী মাসে যাই আসুক না কেন।

এই নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য তার আশা কী? তার আশা হবে এই লেখার শুরুতে যে ছবি তৃতীয় শক্তি বা ফেডারল ফ্রন্টের কথা বলা হয়েছে এর সাফল্য ও বিজয়। এতে  নাগরিকদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ভারত রাষ্ট্র কোন কোটারি নয়, কোন ভুতুড়ে ক্ষমতার “কেন্দ্র” এর রাষ্ট্র নয় – এই বিচারে এখানকার চেয়ে তুলনায় ভাল গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র হবে। দানব ভারত, হিন্দুত্বের ভারতের বদলে এর তুলনামূলক গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে।  তার তাতেই বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২০ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের নির্বাচনে কী হচ্ছে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

গৌতম দাস

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xP

 

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

গৌতম দাস

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন হওয়ার সময় আরও কাছে ঘনিয়ে এসেছে। গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে বলা যায়, পুরো এপ্রিল-মে মাসজুড়ে এবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা হবে কয়েকটা পর্বে, যেমন গতবার হয়েছিল নিরাপত্তার স্বার্থে পাঁচ পর্বে দুই মাস ধরে বিভিন্ন দিনে। আর সবশেষে মে মাসের মাঝামাঝি একসাথে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি নতুন সরকারও গঠিত হয়ে শপথ নিয়েছিল মে মাসের মধ্যেই। অর্থাৎ সেই হিসাবে কথা বললে আর এক মাস পর থেকেই ভারতে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের আওতায় চলে যাবে প্রশাসনিক কাঠামো।

আর সেই সাথে সরকার চালানো আর রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর কমিশনের বিভিন্ন বাধানিষেধ বা গাইডিং নানা নিয়ম আরোপিত হতে শুরু করবে – মানে এবিষয়গুলোও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। মোদির সরকারের ‘ফ্রি হ্যান্ড’ মাতবরিতে  বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্র-প্রশাসনকে অপব্যবহারে প্রয়োগের সুযোগ ইদানীং প্রবল হয়েছে; যেমন- অপছন্দের বিরোধী দলকে বেকায়দায় ফেলতে বা বিজেপির কাছে নত হতে বা কোণঠাসা করতে বাধ্য করছে। সেসবের সুযোগ আর থাকবে না। দুর্নীতি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের নামে ভারতের কথিত সিবিআই (Central Bureau of Investigation – CBI) বা ইডি (Enforcement Directorate, ED) -কে ব্যবহার করে মমতার মত মোদীবিরোধীদের হয়রানি করার অভিযোগ যা ইদানিং প্রবল, মোদীর সেসব কাজ করার সুযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

ফলে ওদিকে ইতোমধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে কী কী ইস্যু প্রধান হয়ে উঠবে, তাও পরিষ্কার হয়ে গেছে। যে কথা বলছিলাম, সিবিআই-ইডির কথা। ‘মোটা দাগে’ বললে, এর গঠন আমাদের দুদকের মত না হলেও এটা বরং ভারতের কেন্দ্রীয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তবে পুলিশ প্রশাসনের ( Delhi Special Police Establishment Act, 1946.) এক আইনী ক্ষমতায় পরিচালিত বিশেষত দুর্নীতিবিরোধী এক বিশেষ তদন্ত-অনুসন্ধানের সংস্থা। আর ইডি হল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অর্থনীতিবিষয়ক আইন প্রয়োগ ও সম্পর্কিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়বার সংগঠন।  এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাইরের যেকোনো হস্তক্ষেপ বা প্রভাবমুক্ত থেকে আদালতের নির্দেশ-সিদ্ধান্তে এর হাতে দেয়া কোনো ঘটনা-মামলার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত-অনুসন্ধান রিপোর্ট পাওয়া এবং তা আইনের আওতায় আনা। বাংলাদেশের দুদকের মত প্রতিষ্ঠান কাজের নামের মিল ছাড়া আর কোনদিক থেকেই সিবিআই তুলনীয় নয়। আর সিবিআই অনেক বেশি সফল, শক্তিশালী ও পেশাদার ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের দুদক দেখে মনে হয় কেবল সরকার বিরোধীদের সাইজ করার ওর কাজ। আর ওদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তবুও সিবিআইয়ের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে চলছে; তাই অপব্যবহারমুক্ত প্রতিষ্ঠান বলা যাচ্ছে না।

এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ ছিল গত ০৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতার রাজ্য পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই লেলিয়ে দেয়া – যা আসলে আক্ষরিক অর্থেই রাজ্য পুলিশ বনাম কেন্দ্রের সিবিআই অফিসের লড়াইয়ের ঘটনা। এতে মাঠের চেহারা দাঁড়ায় এমন যে, কলকাতায় এসে রাজ্য পুলিশ কমিশনারকে গ্রেফতার বা জিজ্জাসাবাদ করতে তার বাসায় কেন্দ্রের সিবিআই দল পৌছালে তাদেরকেই রাজ্য পুলিশের বাধা দেয়া শুধু নয়, উল্টো সিবিআই অফিসারদের গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে কাছের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

মোটামুটি ঘটনা-সংক্ষেপটা হল, আমাদের ডেসটিনির মত মানুষের টাকা নিয়ে সুদসহ ডাবল ফেরত দেয়া বা এমএলএম করবে বলে শেষে পুরা টাকাই মেরে দেয়ার ঘটনা। ঘটনাকাল মমতার জমানার আগে এবং ধরা পড়া মমতা-কালীন। তবে এখানে মমতার দলের কিছু নেতা সহ অনেক কয়টা রাজনৈতিক দলের (কংগ্রেস, সিপিএম অথবা আগে তৃণমুলের নেতা এখন বিজেপি করা এমন সকলে অভিযুক্ত) নেতাকেই মাসোহারা বা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে সম্পর্কিত করে নেয়া ছিল। মমতার আমলে এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়লে তিনি রাজ্য-পর্যায়ে যে তদন্ত কমিটি করেছিলেন ও রিপোর্ট দিয়েছিলেন তা হয়েছিল এই আলোচ্য পুলিশ কমিশনার রাজীবের নেতৃত্বে। এদিকে কেন্দ্র সরকারও সিবিআইকে দিয়ে ঘটনা তদন্ত, মামলা ও চার্জশীট দেওয়ায়। তাহলে এখন ইস্যু কী? সেটা হল সিবিআইয়ের দাবি তারা পরে জেনেছে রাজীব তদন্তের সময় কথিত এই ডাইরি পেয়েছিলেন যা তিনি সিবিআইকে দেন নাই বা জানান নাই। যদিও আসামিরা বলছে এমন ডাইরির কথাটাই ভুয়া। কিন্তু এখানেই নির্বাচনের আগে মোদীর ইচ্ছা তিনি এই কথিত (দুর্নীতি) অনিয়মের কথা তুলে মমতাকে একটু বেকায়দা ফেলে ভোটারের স্মৃতিতে বছর দশের আগের ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয়া এই অনুমানে যে তাহলে আসন্ন নির্বাচনে্র ভোটে কিছু মাইলেজ বা বাড়তি সুবিধা তিনি পেয়েও যেতে পারেন। মামলা ইতোমধ্যেই রাজ্য হাইকোর্ট ছেড়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে বিচারাধীন। বাকি বিষয়টা কী হল তা সংক্ষেপ করার জন্য এনিয়ে দুপক্ষই এবার আদালতে গেলে প্রধান বিচারপতি কী নির্দেশ দিলেন তা দেখব। বিচারকের সারকথাটা ছিল, রাজীবকে সিবিআইয়ের গ্রেফতার করতে পারবে না, এটা অপ্রয়োজনীয়। তবে   সিবিআইয়ের রাজীবকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে সে অবশ্যই সহযোগিতা করে মুখোমুখি বসবে, তবে তৃতীয় নিরপেক্ষ জায়গায়। ইতোমধ্যে শিলং শহরে সিবিআই আর রাজীব মুখোমুখি সাক্ষাতও ঘটে গেছে, শান্তিপুর্ণভাবে। রাজীব এখন নিজের কাজে। এর মানে, প্রধান বিচারপতির এই রায় বা নির্দেশই প্রমাণ করে যে মোদী সিবিআই লেলিয়ে রাজীবকে গ্রেফতারে উঠায় নিয়ে যেতে আর তাতে নির্বাচনের আগে মমতাকে এনিয়ে অস্বস্তিতে ফেলতে চেয়েছিল। যেমন এক প্রাক্তন সিবিআই প্রধান মন্তব্য করছেন, রাজীব সিবিআইয়ের সাথে সহযোগিতা না করলে তাকে তো সহজেই আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা যেত। সিবিআই সে পথে না গিয়ে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু তৈরির পথে গেল কেন? খুব জেনুইন প্রশ্ন। যার সহজ জবাব মোদী তো আসলে এক হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যুই চেয়েছে। আর এটাই তো অপব্যবহার। তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা হল, মমতাও কম যান না। রাজীবের বাসায় যে সন্ধায় সিবিআই যায় সেই তখন থেকে এর প্রতিবাদে রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করতে বসে যান, আর তা চলে লাগাতর তিনদিন যতক্ষণ না আদালতে প্রধান বিচারপতি নির্দেশ জারি করেন। আর এই তিন দিনে সব বিরোধীদলের নেতাই  বিবৃতি দিয়ে ও ব্যক্তি প্রতিনিধি পাঠিয়ে মমতার ঐ অবস্থান ধর্মঘটে স্ব স্ব দলের সমর্থন ও সহ-অবস্থান জানান দিলেন। তাতে সবার কমন এক স্বরে অভিযোগ ছিল যে মোদী নিজ দলের সংকীর্ণ স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেলিয়ে অপব্যবহার করছেন। সারকথায় সব মিলিয়ে এতে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু অবশ্যই একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা মমতার পক্ষে গিয়েছে।

কিন্তু ঘটনার অন্য এক মাত্রার দিক আছে। সাদা চোখে দেখলে ব্যাপারটাকে  মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই-ঘটিত নেহায়েতই এক অপব্যবহার মনে হলেও এর ভেতরে জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্র-এর এক গাঠনিক দুর্বলতা [ফেডারল রাষ্ট্রক্ষমতা না হয়ে ভুতুড়ে কেন্দ্রের কুক্ষিগত ক্ষমতা] আর তাতে ভুতুড়ে ক্ষমতার শিকার হওয়া ইস্যু আরো উদোম হয়ে সামনে আসাও নজরে আসবে। এটাই মূলত ভারত রাষ্ট্রক্ষমতার ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্যের লড়াই’ – মমতা যে লড়াইয়ের সোচ্চার অগ্রসেনানি। ভারত রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সময়ের মৌলিক ও গভীর দুর্বলতা এটাই।

ভারত এখন মোট ২৯টি রাজ্যের দেশ। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা মূলত কোন রাজ্যের হাতে? সে রকম কোনো একটা রাজ্য অন্যান্য রাজ্যের ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নকে ভারতের জন্মের সময় থেকেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এভাবেই বাস্তবতা হল। কথিত এই “কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটাই” এক ভুতুড়ে [না বলা কওয়া, অ-সংজ্ঞায়িত (un-defined power) লুকানো ক্ষমতা ] ক্ষমতা হিসেবে থেকে গেছে। এই ক্ষমতা কার হাতে এবং কেন এর জবাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘হিন্দি-বলয়’ বা ‘হিন্দিতে কথা বলা’ রাজ্য নামে একটি পরিভাষা দিয়ে বলা হয়েছে, এদের হাতেই ভারতের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এ পর্যন্ত বিরাজ করে এসেছে। আর অন্য সব রাজ্যের ঘাড়ের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের আদায়কৃত রাজস্ব কাকে কতটা দেবে কেন্দ্রীয় এই ক্ষমতা তা নিয়ন্ত্রণ করে, বরাদ্দ দেয়। আর এই বরাদ্দ নিয়ে বিরোধী দলের রাজ্য সরকার (যেমন মমতা) নিয়মিত হৈ চৈ করে তুলছেন। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের নামে এই ভুতুড়ে ক্ষমতা রাজ্যগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার ভাষায়- ক্ষমতার কেন্দ্র বনাম রাজ্যের বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তার মূল লড়াই, এটাই তার রাজনীতি। এরই একটা প্রকাশ হল সিবিআই প্রতিষ্ঠানকে রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অপব্যবহার করা।

আর সব রাজ্যই অনুভব করে ‘কেন্দ্র’ নামে এক ভুতুড়ে ক্ষমতা তার ঘাড়ে চেপে আছে। কিন্তু কী করে এর বিরুদ্ধে লড়বে, তাদের কাছে তা এখনো অস্পষ্ট। মমতাই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে, কী করলে এর সমাধান আসবে তা তিনিও সুনির্দিষ্ট করে বলার ক্ষেত্রে তিনিসহ পুরা ভারতের রাজনীতিবিদ, একাডেমিকসহ সমাজের সবাই অস্পষ্ট। বলা যায়, একাডেমিক স্তরেও ইস্যুটি নিয়ে আলোচনাই শুরু হয়নি। সকলেই ভীত যে এতে না ভারত বিভিন্ন রাজ্যে টুকরা হয়ে যায় শেষে। যদিও মমতা বৈষম্যের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আসল কথা, সমাধান কী? এর এক কথার জবাব হলো কথিত, ভারত রাষ্ট্রের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে দিয়ে এক ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থায় চলে যাওয়া। এমন রাষ্ট্র হিসাবে যার আদর্শ উদাহরণ আমেরিকা, তার ফেডারেল স্টেট কাঠামো। এ কারণে ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কখনও এমন অভিযোগ নাই যে কোন এক-দুইটা রাজ্য বাকি সব রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে মাখন তুলে নিয়ে খাচ্ছে, বা মাতবরি করছে। এমন অভিযোগ আজ আমেরিকার জন্মের আড়াই শ’ বছর পরও উঠেনি। একারণেই বলা যায় আমেরিকা রাজ্যগুলোর সত্যিও এক স্বাধীন ইউনিয়ন। কেউ বা অন্য রাজ্য তাদের বাধ্য করে নাই। নিজের স্বার্থে বুঝে বুঝে নিয়ে তেমন নিয়ম আইন করেই একই ফেডারল রাষ্ট্রে সকলে সামিল হয়েছে।  কথিত ইউনিয়ন-ভারত আসলে নেহেরুর বলপ্রয়োগে বাধ্য করা এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারত; যেখানে বহু ক্ষমতার উৎসের হদিস নাই, কেন এই ক্ষমতা তার – এর কোন ব্যাখ্যা নাই,  এমন ক্ষমতা। বরং ইতোমধ্যেই সমালোচক ও বিরোধীদের দাবি, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা খাতেও “রাজনৈতিক দলাদলি ঢোকাচ্ছে মোদির সরকার“।

তবে এখনকার সারকথা হল, কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্য, এ বিষয়টিকে মমতা নির্বাচনে ইস্যু হিসেবে হাজির করতে সফল হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের দায়ে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি বাকি সব বিরোধী দলকেও একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটাই আসন্ন নির্বাচনে একটা মুখ্য ইস্যু হিসেবে রূপ পেয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু,
এই নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু হল, চাকরি বা কাজ সৃষ্টি। গত ২০০৪ সাল থেকে পরের ১৫ বছরে ভারতের তিন সরকারের আমলে প্রথম প্রধান ইস্যু ছিল এটা। অন্য ভাষায়, ইস্যুটার নাম সরকার “অর্থনীতিতে ভাল” করেছে বা সাফল্যের সাথে তা চালাতে পেরেছে কি না। এর জবাব বা আসন্ন নির্বাচনের আগের মূল্যায়নে বলা যায়, এই ইস্যুতে মোদী ইতোমধ্যেই প্রকাশিত যে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। আর এর সর্বশেষ প্রমাণ হল, এক পরিসংখ্যান রিপোর্ট। মোদির সরকার নির্বাচনের আগে এর স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটতে দিতে বাধা দিয়েছে – এই অভিযোগে জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানসহ দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। [কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এই রিপোর্ট চেপে রাখার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশন-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান পি সি মোহনন।সে রিপোর্ট বলেছে, কাজ সৃষ্টি বা চাকরির সংস্থান এই সরকারের আমলে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তা ভারত রাষ্ট্রের জন্য আরেক কারণে খুব খারাপ ইঙ্গিত। ১৯৮৫ সালের পর থেকে ভারতের ‘কেন্দ্রীয় সরকার’ (যেটা ভুতুড়ে বা অস্পষ্ট সাফাইয়ের ক্ষমতা বা হিন্দি বলয়ের কোটারি ক্ষমতা) ধারণাটাই দুর্বল হতে শুরু করেছিল। কেন? কারণ, কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোনো সর্বভারতীয় দলের আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয় লাভ করে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা  আসীন হতে আর সক্ষমতা পারে নাই। মানে এ’দুই দল ভুতুড়ে ক্ষমতাতেও আসতে সক্ষমতা ছিল না- এ দৃশ্যই প্রধান ফেনোমেনা হিসেবে সামনে আসতে শুরু হয়েছিল। এর বদলে আমরা দেখছিলাম, সর্বভারতীয় দল দু’টি আর এককভাবে নয়, বরং আঞ্চলিক দলের সাথে জোট করে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা – এই নতুন ফেনোমেনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ বা বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট  – এভাবে কোয়ালিশন গড়া – এভাবে সরকার গঠনঅই প্রধান ধারা বলে হাজির হয়েছিল। তবে আবার গত ৩০ বছরের এই ফেনোমেনার বিরুদ্ধে ব্যতিক্রম হল, ২০১৪ সালের বিজয়ী চলতি মোদী সরকার। যদিও এটাও একটা এনডিএ কোয়ালিশন সরকার, সে কথা সত্য। কিন্তু এই এনডিএ জোট গঠন ছাড়াই মোদীর বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও আছে। মোদীর বিজেপি সেবার এই ব্যতিক্রম ঘটাতে পেরেছিলেন কেন? কারণ, মূলত কাজ সৃষ্টির ইস্যু। ২০১৪ সালের মোদি প্রবল প্রচারণা চালিয়ে হতাশ [এর আগে কংগ্রেসের দ্বিতীয় ইউপিএ জোটের সরকারের অর্থনীতিক ব্যর্থতায় ] ভোটারদেরকে ফিরে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি সেবার কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে পারলে (অর্থনীতিতে ভালো করে) ব্যাপক কাজ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু পাঁচ বছর শেষে এবার ২০১৯ সালে হতাশ ভোটাররা দেখছেন, সেই আস্থা এখন আবার ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। অর্থাৎ মোদীর চাকরি সৃষ্টিতে ব্যর্থতা-হতাশার মানে হল, এবারে ভারতের নির্বাচনে আবার সর্বভারতীয় দল দু’টির ওপর প্রবল অনাস্থা (কেন্দ্রীয় ভুতুড়ে ক্ষমতার ওপর অনাস্থা) – এটাই স্থায়ী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থাৎ বিজেপি বা কংগ্রেস বাদে কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর কোন এক কোয়ালিশন সরকার – এটাই মুখ্য ফেনোমেনো বলে এখন থেকে হাজির হয়ে যেতে পারে।

এর সোজা অর্থ আরো ব্যাপকভাবে, এবার বিজেপি অথবা কংগ্রেসের নেতৃত্বের আঞ্চলিক দলগুলোকে সাথে নিয়ে কোনো কোয়ালিশন সরকার আর নয়, বরং (১৯৯৬ সালের দেবগৌড়া সরকারের মত) কেবল আঞ্চলিক দলগুলোরই কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মোদির ‘কাজ সৃষ্টিতে’ চরম ব্যর্থতার প্রভাবে এমন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের তৃতীয় ইস্যু,
গরু, গো-মাতা বা গো-রক্ষক মোদি ইস্যু! হিন্দুত্বের হুজুগ বা জোয়ার তুলে সমাজে মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোটের বাক্স ভরতে হবে- এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতির সারকথা। এই উদ্দেশ্যে গরুকে হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক বানিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে  কথিত মুসলমানেরা মাংস বহন করেছে বা ফ্রিজে রেখেছে অথবা গরু কেটেছে ইত্যাদি হুজুগ তুলে পাবলিক লিঞ্চিংয়ের ব্যাপকতা দেখা গেছে। এমন সামাজিক তাণ্ডবে মোদী নিজেকে গরু-পূজারী, গো-মাতা বা গো-রক্ষক হয়ে হাজির করে গেছেন। কিন্তু মোদী এই ‘গরুর রাজনীতি’তেও পরাজিত। মোদী ভেবেছিলাম গরুর রাজনীতির জজবা দিয়ে বাক্স ভরবেন। কিন্তু সেটা আগেই ব্যাকফায়ার করে গেছে। কীভাবে?

যেকোনো দলীয় কর্মসূচি তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও টেকসই বা বাস্তবায়িত (viability) করা সম্ভব কি না তা আগাম যাচাই করে নিতে হয়। মানে, সেদিক থেকেও টিকে থাকার সক্ষমতা থাকতে হয়। মোদির গরুর রাজনীতির অর্থনৈতিক দিকও টেকসই কি না তা আগেই পরীক্ষা করে নেয়া হয় নাই এবং তা টেকসই নয়। তা না করাতে, এর ব্যর্থতা থেকেই মোদী এখানে হেরে গিয়েছেন। যে সমাজে গরু কৃষির উপকরণ সে সমাজে মাংস হিসেবেও গরুর ব্যবহার থাকতে হবে বা থাকবেই। এর বিরুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা অবাস্তব। এমনকি ধর্মীয় বা কোনো কারণে, মাংস নিজেরা না খেলেও, অন্তত মাংস রফতানি করতেই হবে। এই সত্য মোদি মানতে চাননি, বোঝেননি- তাই তিনি ব্যর্থ।

মূল ব্যাপারটি হল, একটা বয়সের পরে গৃহপালিত গরুকে আর কৃষিতে বা মাল টানার কাজে ব্যবহার করা যায় না। তখন থেকে গরুকে আর বসিয়ে খাওয়ানো মালিকের পক্ষে অসহনীয় দায় হয়ে যাবেই। এটাই হিন্দুত্বের রাজনীতি বুঝতে অক্ষম। অথচ এর সামাজিক সমাধান ছিল, গরুকে বিক্রি করতে দেয়া। যার সোজা অর্থ হল, গরু নিজে না কাটলেও, অন্যকে মাংসের উৎস হিসেবে  গরুকে ব্যবহার করতে দিয়ে দেয়া, যার মাধ্যমে গরুর জীবনচক্রের একটা পরিসমাপ্তি টানা। কিন্তু মোদীর রাজনীতি হিন্দুত্বের জোশে –  মাংসের জন্য গরুকে বিক্রি করতে দেয়া যাবে না বলে অবিবেচক বাধা তৈরি করেছিল। কিন্তু গরুকে সেই পর্বে খাওয়াবে কে, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করলেন না। নামকাওয়াস্তে কিছু গো-শালা বানালেও তা রক্ষণাবেক্ষণ আর গরু্কে খাওয়ানোর অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করলেন না।

আসলে বাস্তবে কতগুলোই বা গো-শালা বানাবেন? বাড়ি থেকে গো-শালা বেশি দূরত্বের হলে গাড়ি ভাড়া করে কেউ গরু গোশালায় দিতে যেতে চাইবে না। এতে যেহেতু গরুকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে  কৃষক/ গরুমালিক অপারগ, তাই সে – এবার গরুর দড়ি খুলে ছেড়ে দেয়াকেই একমাত্র ও সহজ উপায় মনে করল। কিন্তু তাতেও ‘গরু খাবে কী’ ব্যাপারটা শেষ হলো না। গরু তাই এবার ব্যাপক হারে কৃষকের ফসলি জমিতে গিয়ে হামলে পড়ল। ফলে রাত-দিন জমি পাহারা দিয়ে ফসল বাঁচানো এক বিরাট মাথাব্যথা আর খরচের নতুন খাত হিসেবে হাজির হল। ব্যাপারটা এতই মারাত্মক হয়ে গেছে যে, গত ডিসেম্বরে রাজস্থানের রাজ্য নির্বাচনে ‘ছাড়া গরু’ মোকাবেলা করা নির্বাচনী ইস্যু হয়ে হাজির হয়েছিল। অর্থাৎ ছাড়া গরু ইস্যু উল্টো মোদির ভোটকেটে দিয়ে রাজস্থানে বিজেপি পরাজিত করেছিল। তাই এখন চাকরি সৃষ্টি না করতে পারার ব্যর্থতা, না ছাড়া গরুর সমস্যা- কোনটা মোদির প্রধান ব্যর্থতা বলে হাজির হবে, তা নিয়ে এখন জল্পনা-কল্পনা। এমনই এক আর্টিকেল আছে এখানেলোকসভা নির্বাচনে মোদির বিজেপি’র জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে কোনটি – গরু না বেকারত্ব?

আসন্ন নির্বাচনের চতুর্থ ইস্যুঃ
চতুর্থত, হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিল। নতুন এই আইন লোকসভায় বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে বিজেপির আনা বিল হলেও এটা মোদী এনেছিলেন মূলত সারা ভারতে এটা প্রযোজ্য হবে- তেমন ভেবে নয়। বরং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্ট – এদুই পকেটের রাজ্যগুলোর জন্য। তারা আবার মোট আট রাজ্যের (নর্থইস্ট সাত রাজ্য আর পশ্চিমবঙ্গ) হলেও এখানে লোকসভার মোট আসন হলো ৬৬টা। ভারতের লোকসভার মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে সরকার গড়ার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন পেতে হয় ২৭২টা। আর, এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্টের মোট ৬৬ আসনের কথা মাথায় রেখেই মোদী নাগরিকত্বের বিলটা এনেছিলেন। কিন্তু তার কপাল এখন একেবারেই ফাটা, যেখানে হাত দেন সব ব্যর্থ।

তার অনুমান ছিল এই বিল তাকে নির্বাচনের ৬৬ আসনে বিজেপির পক্ষ জিততে বাড়তি সুবিধা বা মাইলেজ দেবে। অথচ এটা ছিল তার সবচেয়ে ভুল অনুমান। ফলাফলে ইতোমধ্যেই তিনি ব্যর্থ। কারণ, নর্থইস্ট সাত রাজ্যের বেলায় তা ‘ব্যাকফায়ার’ করেছে। এই বিল আনার কারণে মোদীর ভোট পাওয়া দূরে থাক, ওই সাত রাজ্যে তারা এখন ইউনিয়ন ভারতের সাথে থাকবে কী না সেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। প্রতিদিন এখন এনিয়ে ভারত ছেড়ে, ‘ভেগে যাওয়া’র আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। আর এদিকে আসামে? সেখানে এখন রাজ্য সরকারে আছে বিজেপি। কিন্তু আসামের মূল নাগরিকদের সব দল ও পক্ষই এখন সেই বিজেপির প্রবল বিরুদ্ধে। জনসম্মতির রেটিংয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় বিজেপি। এই বিল আনার কারণে বিজেপিকে ১৯৮৫ সালের চুক্তির সাথে প্রতারণার কৃতিদার হিসাবে বিট্রেয়ার মনে করছে। বাকি থাকল পশ্চিম বাংলা। সেখানেও মোদীর বিরুদ্ধে মমতার সংগ্রাম ও বিরোধিতা প্রবল আর সফলই বলা যায়। বরং উলটা, মমতা তার নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলগুলোকে বিজেপির এবং মোদীর বিরুদ্ধে একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন, আর স্বভাবতই এতে মোদীর বিরুদ্ধে “বাংলার স্বার্থের আসল ধারক” হলেন মমতা – এ কথা বলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ভোটারের সহানুভূতি মমতা নিজের ব্যাগে তুলে ফেলেছেন।

তাহলে কী দাঁড়াল? কারা এই বিলের পক্ষে? বাংলাদেশের মতো পড়শি দেশের যেসব হিন্দু আছেন, এদের অনেকে মোদীর চরম ভক্ত। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির প্রধান ধারা এখন আরএসএস-মুখি অথবা ডমিনেটেড। কিন্তু তাতে মোদীর কোনো লাভ নেই এ জন্য যে, তারা খুব কম জনই মোদীর ভোটার। কাজেই পড়শি দেশের হিন্দুদের স্বার্থে পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা কতটা মোদীর ভোটের বাক্সে ভোট দিতে য়াগিয়ে আসবেন তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, মমতার কারণে কেন্দ্র ও রাজ্য ক্ষমতার লড়াই ব্যাপারটাকে মুখ্য করে তোলাতে এখন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারেরা স্থানীয় স্বার্থে তারা এখন হিন্দিবলয় বিরোধী; মমতা সেখানে মোদীকে “ভিলেন” হিসেবে দেখাতে পেরেছেন।

মোদীর আরও বিপদ আছে। কারণ  মোদী সরকারের দায় খোদ আরএসএস আর নিতে চাচ্ছে না। বরং তাঁরা এখন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের পক্ষে সহানুভূতি দেখিয়ে নিজের ইমেজ বাঁচাতে ব্যস্ত। আনন্দবাজারের শিরোনাম- “বেকারত্ব বাড়ছে, বিরোধীদের সুরে সঙ্ঘ প্রধান, অস্বস্তিতে মোদি’। ওদিকে বিজেপি দলের ভেতরেই মোদী-অমিত গ্রুপের বিরোধিতাকারীরা- যেমন- মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী মোদীর থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করতে চাইছেন। এদিকে শত্রুঘ্ন সিনহা বা যশবন্ত সিনহা ও অরুণ সুরি- এরা প্রকাশ্যেই বিরোধিতায় নেমেছেন।  এমনকি মোদীবিরোধী মমতার সমাবেশ র‌্যালিতেও অংশ নিচ্ছেন।

তাই সব মিলিয়ে আমরা লক্ষ করছি- আসন্ন নির্বাচনী ফলাফলের সম্ভাব্য ঝোঁকটা হল, মোদির বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে কমছেই আর কমছেই। কিন্তু এর মানে কী? তা সত্ত্বেও আবার বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে কোনো কোয়ালিশন ক্ষমতার দাবিদার তারাও নয়। বরং কেবল আঞ্চলিক দলগুলো – এদেরই কোনো কোয়ালিশন সরকারের সম্ভাবনা ক্রমেই জেঁকে বসা, এটাই প্রবল হচ্ছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু?” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

গৌতম দাস

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2xv

সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তারা ভারতের পক্ষ হয়ে হাসিনাকে তোয়াজ করতে, মন গলাতে এক আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনাম হল, “বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”

তাতে মনে হয়েছে বিবিসি যেন শেখ হাসিনা সরকারের এক কড়া সমালোচক – এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, যেন এমন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা বিবিসির এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমরা দেখে চলেছি যখন আমাদের প্রায় সব মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে হঠাৎ করে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে এবার তারা উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার বাড়তি আর একটা দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মূলত ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব বিবিসি নিয়েছে। তাই কয়েকদিন আগে ২৯ জানুয়ারি ঐ রিপোর্ট তারা ছেপেছে।

দেখা গেছে, মূলত ভারত “বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে” এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

এটা যেন এক অর্ডার দেয়া রিপোর্ট, এমন মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হল, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের “শক্ত রিজার্ভেশন” বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে ভারতের থেকে যেন খেপ নিয়েছে বিবিসি। বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগেই ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এর ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হল যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।

কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন? এটাই সেই তাতপর্যপুর্ণ প্রশ্ন।

আমরা ইতোমধ্যে সবাই কমবেশি জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম কিছু বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ভারতও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। আর  ৯৭% আসন নিয়ে বিজয়ী হাসিনার ভয়ে ভারত এখন সেটাই প্রবল অস্বীকার করতেই বিবিসি দিয়ে করিয়েছে এই রিপোর্ট। যদিও বিএনপির দিক থেকে বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা পাঠানো প্রতিনিধিদের নাদান পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন তারা। অথবা সময়ে কখনও তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে আগোনোতে বা কথা বলাতে সেটা ভুল হয়েছে বা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে – এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। অনেক সময় ক্রিটিক্যাল প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

যদিও খেয়াল রাখতে হয় যে আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ আগেই টেনে নিয়ে একাজে নামতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ পেশাদার লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এমন সব ক্ষেত্রেই বিএনপির মারাত্মক কিছু ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া ভারতের সাথে এই আলাপে বিএনপির দিক থেকে মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের কাছে স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছিল বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। ব্যাপারটা যেন হাতি হয়ে আয়েশে বসে নত বিএনপির সালাম নেয়ার সময় তাদের। যেন তারা বুঝাতে চাইছে, বাংলাদেশে ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ ভারতের জন্য সঠিক প্রতিক্রিয়া বলে তারা মনে করেছে। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, “বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!”। অথচ তখন নিজেই বুঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনায় আমরা পরে আবার আসব। তবে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, “শো আপ” অংশ এটা।

আসলে ভেতরে রূপটা ছিল খুবই উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, কোনদিকে যায় কী ফল আনে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হল – তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট। এসংক্রান্ত বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল,”এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না”, “আওয়ামী লীগ খারাপভাবে হারবে”। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এককথায় তারা দেখছিল হাসিনার “পাবলিক রেটিং” খুবই শোচনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা যে তারা কী এজন্য নতুন করণীয় পদক্ষেপ ঠিক ভাবে নয়েছে? নাকি তা করতে পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ রেটিং” খুবই শোচনীয় হলে তো হাত ছেড়ে দিতে হবে; নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে……ইত্যাদি। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছিলাম – বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে। আর এগুলো তারা করেছিল আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন এই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে হাত সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে বিএনপির সাথে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন যাতে, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়। যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে তখন শুরু না করতে হয়। অথবা, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য “জয়ী নায়ক বিএনপির” ভারতের কাছে একেবারেই অপরিচিত বলে না হাজির হয়, বা ভারতকে “সেই” বিএনপির পেছনে ঘুরতে না হয়।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে তাদেরকে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়, আরও কিছু দিক আছে। যেমন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি,  ভারতকে হাসিনার “দেয়ার ভাণ্ডার সব খুলে ধরা” সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে হাসিনার পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং উলটা; অর্থাৎ মোদীর ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল; যার সোজা মানে হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত তখন স্বীকার করেছিল।

কিন্তু পরবর্তিতে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক নেয়া। ভারত সেই রিস্কটাই নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত নিতে ভারত উদ্বিপ্ত হয়েছিল কারণ রেটিং সম্পর্কে ভারতের নিজেদের গোয়েন্ডা অনুসন্ধান রিপোর্ট। অথচ নির্বাচনের পরে ফলাফল পেয়ে ভারত দেখেছিল আসলে বাস্তবেই বিরাট রিস্ক নেওয়াই হয়েছে। কোন অনুমান ফলে নাই।

আবার, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার “সুজাতা স্টান্ডার্ড” তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন হাসিনার সেই তাতপর্যপুর্ণ  মন্তব্য “আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি দেশটিকে তা সারা জীবন মনে রাখতে হবে” আমরা স্মরণে রাখতে পারি। হাসিনা কথাটা বলেছিলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলকে (বর্তমানে ২১শে টিভির সিইও) দিয়ে করানো এক প্রশ্নের জবাবে।

মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার নিজ গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। কিন্তু তাহলে ভারত কোথায় পরাজিত হয়েছিল? যেসব অনুমানের উপর ভারতের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণ দাড়িয়েছিল এর একটা না ঘটলে কী হবে অথবা তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে – এটা হতেই পারে না ধরে নেয়া হয়েছিল। আর তাই হয়েছিল। মানুষ তো ভোট দিবেই। তাই “যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- ভারতেই সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে। সেটা ধরে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, ধরে নেয়া যায় এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই ভারতের কোন অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, গোয়েন্দারা এমন তথ্য জেনে পাথর (stunned by the outcome) হয়ে গেছিলেন। আর খুব সম্ভবত তা, ভোটের মাত্র চারদিন আগে।

মানে তাদের কোন অনুমানও ছিল না যে,  মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা অনুমান-বিশ্লেষণ মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হল, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা গভীর নির্ভরতা / নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল – ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে সহজেই অনুমান করা যায়। পিনাক রঞ্জন সেখানে লিখেছিলেন, “… ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে”। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোন আশা-ভরসা দেখেন নাই না রাখেন নাই।

তাই ভারত হাসিনার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে পিনাক রঞ্জন লিখেছেন। সেই কারণে আরও সাহস দেখিয়ে আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” অভিযোগ, “হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের” [সবচেয়ে মজার অভিযোগ ছিল এটা] অভিযোগের মত মারাত্মক বিষয়গুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হল, পিনাক অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা  “গুলি করে হত্যার” নীতি নিয়েছেন। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন, বলেছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর লেখার শেষের বাক্য আরও মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, “শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তাঁর প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’। অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং অংশটা হল, সবশেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের একটা হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন পিনাক রঞ্জন। তিনি হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। তিনিই ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে একসেস রাখেন এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ [ORF] এর ফেলো।

আগেই বলেছি, ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট তাদেরকে এভাবে পরিচালিত করেছে। আর রিপোর্ট হয়ত ভুল ছিল না। কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’ এই তথ্য বা অনুমান তাদের ছিলই নয়া। এজন্যই তারা পরাজিত হন। এছাড়া আর এক বিষয় তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

বিএনপিকে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠনঃ এর গঠনের সাথে সাথে এর খুবই দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, “নির্বাচনের আগে থেকে ক্ষমতাসীন হাসিনার পতন আসন্ন” ধরনের একচোখের অনুমান ভারতকে শেষে করে দেয়। এতে বড় বিভ্রান্তিতে পড়ে এবার ভারত সব হারানোর দিকে আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

তাই বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের “দিন খারাপ যাওয়া” শুরু হয়েছে, বলা যায়। “চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়”। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের আগের দিন -এর  মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- এটা ছিল “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব” তৈরির শুরু। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছি।

আরও লক্ষণীয় হল, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক (যারা ভারতের সরকারি অবস্থান অনুসরণ করে চলেন) জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও আমারই এক আগের লেখায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সকলেই বাংলাদেশে চীনের ততপরতা ও ঘনিষ্ঠতা বাকাচোখে দেখত। চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়াকে, ভীষণ নেতিবাচক উপস্থাপন করে এই বিষয়গুলোকে দেখতেন। তাদের সকলেরই কল্পিত এক ভারতের “এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্স” বলে এক এলাকা ছিল। আর বাংলাদেশ হল সেই এরিয়ার অন্তর্গত সুতরাং বাংলাদেশে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন উদ্ভট তালুকদারি-দাবি তাদের থাকত। তাঁরা বোঝাতে চাইতেন এখানে ভারত ছাড়া অন্য কারও ঢুকা – এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী – এ্মন “গাঁয়ে মানে না” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা লিখে চলতেন। অথচ এখন তারা ভোল বদলিয়ে ফেলেছেন।  শ্রীরাধা [VIF] এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন – “চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না… তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়”।  [Interestingly, both India and China have viewed Bangladesh not only through the prism of bilateralism but also amidst the landscape of the growing regional framework] অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তাঁরা এখন কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন “তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে”। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?

বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মত নয় বড়জোর সাথে ভারতও আছে হয়ত কিন্তু তা আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার এক দুরবস্থা শুরু হয়ে গেছে যার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির এই রিপোর্ট।

এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখটা এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিকটা দেখবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে চীন সফরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন নাই। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখের দিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ৬৫ এর বেশি রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এই গ্রান্ড প্রকল্পে বাংলাদেশেরও অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে সেসময় অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্বাচনে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ডে” ভারতের সমর্থনের মাশুল ভারত সেবার উসুল করেছিল এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি না হতে হাসিনাকে রাজি করিয়ে। এছাড়া পরে ভারত আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু এবারের ২০১৮ নির্বাচনে? এই লেখায় আগেই বলেছি “ছয় দিনের” কথা। আমাদের নির্বাচনের পরবর্তীতে হাসিনার একদম খাড়া পদক্ষেপ হল , গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে [CNN-NEWS18] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

[CNN-NEWS18] এটা আমেরিকার CNN এর সাথে ভারতের Network 18 এর জয়েন্ট ভেঞ্চার, ভারতের এক টিভি মিডিয়া।

আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে হাসিনা ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে আর আগান নাই, এখন সেখান থেকেই আবার উদ্যোগ নিয়া তিনি সেই “খাতিরদারির” সমাপ্তি টানছেন। এই খাতিরদারি তার নড়বড়ে অ-অভিষিক্ত ক্ষমতার খামতি পূরণের দিক থেকে এসেনশিয়াল – এমন এক ধারণা তাঁর ভিতরে কাজ করে বলে মনে হয়। যেটা খুব সম্ভবত সমাপ্ত এখন। হাসিনার ঐ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপিয়েছে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া । দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়ে লেখা সে রিপোর্ট। যার ভাষ্য হল, “ভারতকে হাসিনা তাঁর “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন”। অর্থাৎ এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে হাসিনা এতদিন নিজ দেশের স্বার্থ বলি দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এখন হাসিনা নিজ দেশের স্বার্থকে আর পিছনে ফেলতে রাজি না – এটা বুঝাতে চেয়ে বিবিসি লিখেছে – “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই ……। কথা ঠিক; এবার দরকার হলে ভারতের বিরুদ্ধে তিনি যাবেন, রাজি আছেন। কারণ এবার “বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তির”  ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন, “বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে”। আসলে এই প্রস্তাবটা মূলত চীনের।  গত ২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মত  BRI (“Belt and Road Initiative”) সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করতে ভারতকে চীনের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই প্রথম ভারত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান আপত্তি তুলে ধরেছিল। আর তখন থেকেই চীনের প্রস্তাব হল, আসেন “কথা বলে” নিগোশিয়েট করি। চীনের সেই কথা বলার প্রস্তাবই এবার সাহসের সাথে হাসিনা ভারতের মুখের উপর ছুড়ে দিল। বা বলতে পারি, হাসিনা বুঝিয়ে দিল যে তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। এবার আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থনের মত ভারতের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত নিবার কোন দায় হাসিনার নাই। তি এবার সমর্থন পান নাও অথবা নেন নাই – তাই। তাই মন শক্ত বেঁধে তিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ঢুকে পড়বেন। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক [Bangla-China Relation] নতুন মাত্রায় উত্থিত হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে  বেল্ট-রোড প্রকল্প বলতে বুঝতে হবে – সোনাদিয়া বন্দর সহ, সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীন যাওয়ার অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্প এমনকি এর বাইরেরও চীনের সাথে বাংলাদেশের সব প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ পরোনা করে উপেক্ষায় হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাবে এখন। [ সাক্ষাতকারের YOUTUBE LINK এখানে]  ঐ সাক্ষাতকারে হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ – ইঙ্গিত দিয়েছে হাসিনা এবার জানেন তিনি পিছনে ফিরবেন না। খুব সম্ভবত – ভারতের মুখ চেয়ে চলার দিন ঘুরে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে – এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তিনি পথ চলতে শুরু করেছেন। মুখ চেয়ে চলায় তিনি কত ডেস্পারেট ছিলেন তা বুঝতে আমরা মনে রাখতে পারি – তিতাস নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ভরাট করে তিনি ত্রিপুরায় লং-হুইল ট্রাকে মালামাল কনটেইনার চলাচলের রাস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীটা এখন মরেই গেছে, ধান চাষাবাদ হয়েছে এবার।    

এখন এই “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ” হাসিনাকে নিয়ে ভারত কী করবে? কোথায় রাখবে? প্রথমত, কোন বিশেষ গায়েবি চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে বেল্ট-রোড বা এর সংশ্লিষ্ট কোন কিছু মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। বরং চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কান্থা [Ashok K Kantha] (যিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভোকাল) এখন অবসরে ভারতে বসেই “চীনা স্টাডিজ” থিঙ্কট্যাঙ্ক খুলেছেন। তিনি আগে আমাদের যা জানিয়েছিলেন ওর সারকথাটা ছিল – “বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার চীনে দাওয়াত এটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সম্ভব না কারণ, তাতে ভারত চিরদিনের মত চীনের পিছনে পড়ে যাবে”। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের কী চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, উপরে থাকা সম্ভব – সে মুরোদ কী আছে? না কী এটা অসক্ষমতার কোন “ফ্যান্টাসি আকাঙ্খা” – এনিয়ে কোন কথা জানা যায় নাই। তবে  নিশ্চয় এখন বেল্ট-রোড প্রকল্প বিরোধী আরও শক্ত যুক্তি আছে তাঁদের কাছে।  অতএব এর সোজা মানে হল, ভারতের পক্ষে আগের মত হাসিনার ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে ট্রিটেড বা আলগা খাতিরের লোক হতে চাইলে হাসিনার পরামর্শ মেনে ভারতকেই এখন বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর তা নইলে, ভারতকে কেবল চীন নয়, ঢাকার হাসিনা সরকারেরও বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান ও পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মাঠে হাজির হতে হবে! যেভাবে নির্বাচনের পরে মাত্র ২২ দিনের মাথায় আমরা হাসিনাকে CNN-NEWS18 সাক্ষাতকার দেখেছি তাতে – অচিরেই ভারতকে কী এমন নতুন অবস্থানে দেখব আমরা?

তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য আর আরামের “শান্তি নাই”; বরং এক ব্যাপক উদ্বিগ্নতা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, যেটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সময়গুলোতে কোন দেশের বেলার মত বাংলাদেশ সরকারপ্রধানেরও স্বাভাবিক ঝোঁক হয় – এখন ক্রমেই তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বা বলা যায়,মূল কারণ পরিস্থিতি এখন তার অনুকূলে।  ওদিকে ভারতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে খুবই করুণ। যেন সেই করুণ দশা বলেই সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য ভারতের মোদীর নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির বিরুদ্ধে কিছুটা বিষোদগার করে হাসিনার মন গলাতে চাইছেন । তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। ভারত এখন বিএনপিকে মুখরোচক তবে অর্থহীন ইস্যু ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা  – হঠাত করে শর্ত হিসেবে খাড়া করছেন। অথচ ভারতের এটা করার বেস্ট সময় ছিল নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ভারত সফরে-লবিতে ছিল তখন তুলে ধরা। অথচ এখন ভারত বলছে বিএনপি  ‘জামায়াত ছাড়া’ না হলে এখন বলছে, না হলে সম্পর্ক হবে না – এমন ভাব ধরছেন।  যার সোজা মানে ভারত পথ হারিয়েছে। এটা তার মুখরক্ষা ততপরতা; সে সিরিয়াস নয়। অথচ বিপরীতে ইতোমধ্যে বিএনপিই ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে  এখন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করতে ফিরে যাবে বিএনপি। এটাই কী স্বাভাবিক নয়!

আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফা ইস্যু ইত্যাদিতে বাংলাদেশের হাসিনার সহায়তার যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু না, সেসব আর এখন মুখ্য নয়, হিসেবে থাকছে না। বরং চীনের সাথে  হাসিনা সরকারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলেও সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে এখন বড় ইস্যু। ভারতের জন্য কঠিনতম বিপদ এখানেই।

বিশেষত, গভীর সমস্যার দিকটা হল, ভারতের জন্য সময় এখন উলটা হাসিনাকে তুষ্ট করার, মন পাবার। কিন্তু ঘটনা হল, হাসিনাকে তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসির এসব তুচ্ছ রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে হাসিনা-বিরোধীতার রাজনীতি ও অবস্থানে  উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

গৌতম দাস

২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wW

 

আবার হেডলাইনে আসাম। তবে এবার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নতুন “নাগরিকত্ব বিল”। যদিও সম্প্রতিকালে আসাম বলতে বাংলাদেশের মানুষ চিনে এনআরসি-এর আসাম। NRC বা এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস; অর্থাৎ আসামে এখন বসবাসকারী সবাইকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে এক নাগরিকত্বের তালিকায় নাম তুলতে হচ্ছে। যার মূল কথা – ‘পড়শি’ দেশ থেকে যারা আসামে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর পরে আসামে এসেছে তাদের চিহ্নিত করা, যারা আসামের নাগরিক গণ্য হবেন না। তাদের অনুমান ছিল যে ইতোমধ্যে এক ব্যাপক সংখ্যক লোক আসামে এসে ঢুকেছে। যদিও নানা কারণে অনেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ দিতে পারেনি; যেমন সন্তান পেরেছি কিন্তু পিতা কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেন নাই এমনও হয়েছে। তবু এসব অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া কিন্তু চিহ্নিত নাগরিকদের নিয়ে এরপর তাদের নিয়ে ঠিক কি করা হবে তা “আনুষ্ঠানিক” ভাবে কেউ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত ভারতের সরকারি অবস্থান হল যে এটা ভারতের “অভ্যন্তরীণ বিষয়”  – এই বলে চালাতে চাইছে। ঠিক যেমন ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু করলেও তা আর কখনই বন্ধ করা হয় নাই। এদিকে এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল। এই তালিকা তৈরির নির্দেশ কিন্তু ভারতের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে এসেছে। তা সত্ত্বেও সেই কোর্টও স্পষ্ট করে বলছে না যে, ‘নাগরিক প্রমাণ দিতে না পারলে’ সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে কী করা হবে। কারণ, কারও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত না হওয়া মাত্রই এটা আপনাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে না যে, সে বাংলাদেশের নাগরিক। আর মূল কথা সে ক্ষেত্রে ঐ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ইস্যু নিয়ে কোন ততপরতার শুরুর আগে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিকভাবে ফরমাল কথা বলতে হবে। বাংলাদেশকে রাজি করাতে হবে। বাংলাদেশ যদি রাজি হয় তবেই এরপরেই কেবল আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারবে।

তবে সে কথা এখন থাক। কারণ, ইস্যু এখন তার চেয়ে আলাদা এবং ভয়াবহ। হিন্দুত্বের মোদী এবার আবার আর এক নতুন দানবীয় ইস্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাকে আসামে নতুন করে আগুন লাগানোর লক্ষ্যে মোদীর ‘নাগরিকত্ব বিল’ বলা যায়। যার আঁচ বাংলাদেশেও টের পাওয়া যাবে এমনই ভয়ঙ্কর। এই বিলের আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হল – সিটিজেনশিপ (সংশোধনী) বিল ২০১৬ (Citizenship (Amendment) Bill, 2016)। এই বিলটা বিজেপি ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় পেশ করেছিল ১৯ জুলাই ২০১৬ সালে। তাই বিলের নামের সাথে ২০১৬ শব্দটা লেগে আছে। এতদিন সেটা এক যাচাই কমিটিতে ইচ্ছা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। আসলে মোদী এটা সময়-সুবিধামত বের করবেন তাই গত দু-আড়াই বছর এটা আটকা ছিল। এখন গত সপ্তাহে ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঐ শিরোনামের আইনটা ভারতের লোকসভায় শেষ অধিবেশনে পাস হয়েছে।

সার করে বললে, মূলত এটা এর আগে ভারতের “নাগরিকত্ব বিল ১৯৫৫” (Citizenship Act, 1955) এর কিছু ধারায় আনা সংশোধনের পরের নতুন রূপ। সংশোধিত হবার পর ঐ বিলের সারকথাটা হল – বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশ থেকে (মুসলমান বাদে) হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান এই ছয় ধর্মের লোক ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হলে – আর ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে তাদের ছয় বছর বসবাস পূর্ণ হলে পরে এবার তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া যাবে। এই লক্ষ্যে এমন কেউ ভারতে প্রবেশ করলে যা আগের (১৯৫৫) সংজ্ঞা অনুসারে ‘অবৈধ ইমিগ্রান্ট’ (illegal immigrant) বলে বিবেচিত হতেন, এখন এই বিল পাশের পরে তারা “আশ্রয়প্রার্থী নাগরিক” বলে বিবেচিত হবেন। ফলে তারা ভারত থেকে বহিস্কৃত (deported) হবেন না, বা অবৈধ প্রবেশের দায়ে আদালতে পঁচে মরবেন না। বরং ভারতে থাকার পারমিট পাবেন। আর এভাবে টানা সাত বছর (আগের আইনে এটা ১২ বছর ছিল) থাকার পরে আবেদন করলে, ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন।

যদিও (মুসলমান বাদে) শব্দগুলো সেখানে লেখা নেই, কিন্তু অর্থ তাই। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শব্দগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে, আর ছয় ধর্মের নামও পরিস্কার উল্লেখ করা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়া বারবার ছয় ধর্মের উল্লেখ করার ঝামেলা এড়াতে েদের বদলে একটা শব্দ লেখা শুরু করেছে – ‘অ-মুসলমান”। যেমন ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনাম হল, (Lok Sabha passes Citizenship Bill amid protests, seeks to give citizenship to non-Muslims from 3 countries)। অর্থাৎ মোদী সরকার আসলে যা বুঝাতে চেয়েছে, মিডিয়াগুলো তাই লেখা শুরু করেছে।

কেন এই আইন আদালতে অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত
যে লিগাল ত্রুটির কারণে এই বিল অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত মূল সে যুক্তিটা হলঃ এটা বৈষম্যমূলক। অর্থাৎ এটা কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক “সাম্য নীতি” ভঙ্গ করেছে। ঐ বিলে বলা হয়েছে – ঐ তিন দেশে ‘ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে থাকারা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী যারা, তারা এ সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু তা সাধারণভাবে সব ধর্মের লোক না বরং ‘মুসলমান বাদে’ ভারতের ছয় ধর্মের কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে, যাদের বেলায়ই কেবল এটা প্রযোজ্য হবে। এটা স্পষ্টত এক বৈষম্যমূলক আইন। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা থাকা ও বাস্তবায়ন – এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের এক মৌলিক ভিত্তি।  এখানে সাম্য কথাটা ইতিবাচকভাবে বলা হয়। যেখানে মূল ভাবটা হল, বৈষম্য – নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, কোন আইন করা যাবে না যার মাধ্যমে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মানে রাষ্ট্রকে এক “নাগরিক বৈষম্যহীনতার” নীতি অনুসরণ করতেই হবে। বৈষম্যহীনতা মানেই ত সাম্য – তাই শব্দটাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে “সাম্যের” নীতি বলা হয়ে থাকে। এই কারণে, কোনও রিপাবলিক রাষ্ট্র কেউ মুসলমান বলে বা হিন্দু বলে যেকোন নাগরিক এমন কারও প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পারে না। এটাই নাগরিক সাম্য বা Equility এর মৌলিক নীতি, অথবা রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন থাকার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। এই যুক্তিতে কোন সুপ্রীম কোর্ট এই বিলকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।

এছাড়া, আর একটা কথা হল কখন কোন জিনিষ আইন বলে গণ্য হবে – এই প্রসঙ্গে আইনের ভিতমূলক প্রস্তাব বলে থাকে যে কোন বিষয় আইন বলে তখনই মানা হবে যদি তা নাগরিক-নির্বিশেষে সবার উপর প্রযোজ্য করা হয় তবেই। নইলে তা কোন আইনই নয়। সোজা কথা যা সবার উপর প্রযোজ্য করা যায় না তা কোন আইনই নয়। মোদীর নাগরিক বিল এই যুক্তিতে কোন আইনই নয়। ফলে ভারতের আদালতে রিট হলে আর  সৎ ও দুরদৃষ্টির যেকোন পেশাদার বিচারক এই আইনকে অবৈধ ও রদ (null & Void) করা হল – বলে রায় দিবেন।

ওদিকে বিল পাশের আগের সপ্তাহে ০৪ জানুয়ারি আসামের শিলচর গিয়ে মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছিলেন। সেখানে আবেগী বক্তৃতায়  দিয়ে মোদী বলছেন, ভারত মাতার সন্তানদের প্রতি ভারতের দায় আছে (আগ্রহীরা ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন। 15:58 মিনিটের এই ক্লিপে 05:30 মিনেটের পর থেকে মোদীর “ভারতমাতার” সে কাহিনী শুনা যেতে পারে।)। সেই দায় থেকে ঐ তিন দেশের ঐ ছয় ধর্মের যারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদেরকে আশ্রয় দেয়া মোদীর দায়িত্ব – এটাই মোদীর সারকথা। কিন্তু এখন মোদীর এই যুক্তি অনুসারেই মুসলমানদের বাদ পড়ার কোন কারণ নাই। এটা এমনই উদাম এক মুসলমান-বিদ্বেষী আইন।  যেখানে এমনকি পারসি, খ্রীশ্চান ধর্মও মোদীর ধর্ম-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  যেমন, আরএসএস-বিজেপি তাদের উদাম বিদ্বেষ ঢাকতে প্রায়ই বলে থাকে, “ইসলাম বা মুসলমানেরা ভারতে বহিরাগত”। এখন এসব বিদ্বেষী-ভাষ্য যদি এটা মেনেও নেই তাহলে খোদ আর্যরা কী বহিরাগত নয়? তারা কোন ভারতের ঘরের লোক? এছাড়া প্রাক-ইসলামি যুগের পারস্য বা ইরানের পারসিক অথবা ইউরোপীয় খ্রীশ্চান এরা কীভাবে ভারতের ঘরের? আরএসএস-বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষ কত তীব্র তার প্রমাণ এগুলো। না তবে সাবধান। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে বলবার জন্য একথাগুলো বলা হচ্ছে অজান্তেও তা মনে করা যাবে না। সেটা আর এক বিরাট বে-ইনসাফি হবে। যেমন মোদী যদি বলতে পারতেন “যে কোন ধর্মের” আর “যে কোন দেশের” নাগরিক যারা ধর্মের কারণ নির্যাতিত তাদের জন্য এই আইন – তবে সেটাই হত সবচেয়ে মানবিক আর সবার জন্য কাম্য ও আদরের এক নাগরিকত্ব আইন।

এখন তাই মোদির নাগরিক বিল পাস হওয়ার দিন, ৮ জানুয়ারি এক উল্লেখযোগ্য নতুন বৈষম্যের দিন হয়ে থাকল। কারণ, একে তো এমনিতেই আসামে আগের নাগরিক তালিকা তৈরির – এনআরসি তাতে, ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে আসামের অপ্রমাণিত নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে আবার ১৮ লাখই হিন্দু। অর্থাৎ এনআরসি তৈরির উদ্যেশ্য বা পেছনের অনুমান ছিল যে প্রমাণ করতে না পারা অর্থে অবৈধ নাগরিকের বেশির ভাগ হবে মুসলমান। আর মুসলমান মানেই ধরে নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অনুমানই ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে যায় যখন হাজির হয় যে এর মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাদের নিয়ে কী করা হবে সেই টেনশন বাড়ছিল। এর ভেতর নতুন করে আর এক দিকে উত্তেজনা ঘুরিয়ে বিজেপির দলীয়করণ করে নেয়া হল।

১৯৮৫ সালের চুক্তি বনাম মোদীর বিল
অহমিয়াদের সাথে রাজীব গান্ধী সরকারের ১৯৮৫ সালের চুক্তিতে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন ভাগ ছিল না। বলা ছিল, যারাই ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের পরে আসামে প্রবেশ করেছে বলে জানা যাবে তাদেরকে আসামের নাগরিক মানা হবে না – এই ছিল চুক্তি মূল কথা।  এই কারণে, NRC এর ভিত্তিও একই। কিন্তু বিজেপি এই ৪০ লাখ  হিন্দু-মুসলমান, এমন অপ্রমাণিত-নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবার বাস্তবতায় হিন্দুদেরকে সুবিধা আর মুসলমানদেরকে বঞ্চনা দিয়ে এক বৈষম্য করে এতে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের খাড়া করতে চাইছে।  এমনিতে বিজেপির সবখানের কমন রাজনৈতিক কৌশল হল – সাধারণভাবে “নাগরিক অধিকার” রক্ষা নয়, বরং একে পাশ কাটিয়ে হিন্দুত্বের আওয়াজ তুলে এর ভিত্তিতে সমাজে ভোটের মেরুকরণ তৈরি করা। আর এই সুযোগে হিন্দুত্বের নামে নিজদলের ভোটের বাক্স ভারি করা। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে সেই কাজটাই করা হল; তাতে সমাজে খামোখা বিভক্তি রেষারেষি বৈষম্য বাড়ল কীনা, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল কিনা – এসব কিছু ফেলে এখন পাঁচ বছরের মোদীর শাসনের শেষে উল্লেখযোগ্য সবই হারানো বিজেপি এখন বেপরোয়া।

এই বিলের প্রভাব ও পরিণতি
প্রথমত, আমাদের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, মোদির এই বিল আসামের এনআরসি বিতর্কের কোনো সুস্থ সুরাহা করার দিকে তাকিয়ে করা হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্য এ বিতর্ককে ব্যবহার করে বিজেপির নিজের বিভাজনের রাজনীতিকে বিস্তার ঘটান। তাই বেপরোয়া হয়ে অর্ধজ্ঞানের গোয়াঁর বিজেপি নেতারা [আসামের মন্ত্রী ও সারা নর্থ-ইস্টে বিজেপির মুল সংগঠক Himanta Biswa Sarma, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Sarbananda Sonowal ] মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন করে তারা দাবি করছে এটা নাকি তাদের তথাকথিত “সভ্যতার লড়াই”। বলছে – ……They want us to be slaves of a particular civilisation. However in this civilisational fight we must win. যদিও নেপথ্যে তারা বলছেও তারা নিরুপায়। অন্য সব ইস্যু বা অর্জন হারানো বিজেপি এখন তাই আসন্ন নির্বাচনে মূল ফোকাস শ্লোগান করবে তথাকথিত হিন্দুস্বার্থ, হিন্দুত্ব বা কথিত সভ্যতার লড়াই……।

এভাবে বিভাজন ঘটিয়ে তাদের শেষ আশা যে এভাবেই তারা আসন্ন নির্বাচন পার হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে,  সাধারণভাবে ভারতীয় “নাগরিক” এমন পরিচয়ের রাজনীতি বিজেপি করে না বরং এক বিভক্ত পরিচয় হিন্দুত্ব – এমন হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিই বিজেপি করে। এই হিন্দুত্ব পরিচয়ে ভোটারদের জন্য সে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে কেবল তথাকথিত হিন্দু স্বার্থের আওয়াজ তুলে মেরুকরণ করা ও ভোট বাক্সে তা পৌঁছান- এই হলো বিজেপির রাজনীতির কৌশল। তাই মোদির নাগরিকত্ব বিল সাধারণভাবে ভারতের সব রাজ্যের দিকে তাকিয়ে করা বলে মনে হলেও তা আসলে আড়াল সৃষ্টি করা। আর এই আড়ালে তাঁর বিশেষ টার্গেট রাজ্য হল – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। যেমন এ বিলের মাধ্যমে আসলে বলা হয়ে গেছে যে, আসামের তাদের এনআরসি-ইস্যুতে অপ্রমাণিত নাগরিকদের মধ্যেকার ১৮ লাখ হিন্দুকে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিজেপি নিয়ে নিল। আর এভাবেই আসামকে এখন হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করল বিজেপি।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এতদিন বিজেপি অভিযোগ করত,  পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া হিন্দু বাঙালি [পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভাষায় যারা ‘বাঙাল’], কংগ্রেস আর সিপিএম, কেবল এদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে গেছে। ‘বাঙালদের’ রেশনকার্ড আর ভোটার বানিয়ে দিয়ে নিজের দল-ভারী করার সহজ রাজনীতি করে গেছে। এমন ধরণের পাল্টাপাল্টি বয়ান অনেক আছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল এমন অভিযোগ – কংগ্রেস, সিপিএম অথবা বিজেপি – এরা কেউই মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কখনো করে না। তাহলে কী উল্টা? মানে, মমতা “বাঙালদের” বিরুদ্ধের রাজনীতিটা করে? না, সেটাও না। এমন অভিযোগও দেখা যায়নি। তবে মজার ব্যাপারটা হল এখন এ বিলের মাধ্যমে এবার বিজেপি নিজেই “বাঙাল” মনোরঞ্জনে সবার ওপরে এগিয়ে থাকার রাজনীতিতে নামল। যে অভিযোগ সে এতদিন অন্যদের বিরুদ্ধে করত।

সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া ধর্ম-নির্বিশেষে যে কেউই হোক, তাকে ভারতে নাগরিক হিসাবে “ন্যাচারালাইজ” করে নেয়া – এটা কোনোই খারাপ বা অন্যায় কাজ নয়। আপত্তি করারও কিছু এখানে নাই। যদিও আগে আইন বানিয়ে আইনসম্মত ভাবে তা করলে সেটা তো আরও ভাল। কিন্তু ঘোরতর বে-ইনসাফি অন্যায় ও খারাপ কাজ হবে যদি বৈষম্য করা হয় যে, “কেবল অমুক ধর্ম” হলেই তাকে স্বাগত। মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে যখন “মুসলমান বাদে” বলে নীতি-পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিজেপি সেই ভয়ঙ্কর বীজ বপনের কাজ শুরু করল। আসামের ঐ ১৮ লাখ হিন্দুর কথা তুলে বিজেপি আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনি ফোকাসের বক্তব্য করতে চায়। যাতে সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর বিশেষ করে “বাঙাল” হিন্দুরা সহানুভূতিশীল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটের বাক্সে আসে, প্রতিফলিত হয়। তাই মোদীর এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করা করা হয়েছে – অহমীয়াদের স্বার্থদের বিরুদ্ধে। এই হল নাগরিকত্ব বিল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি টার্গেট। মোদী তান্ডব আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই বিলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মমতাই এখন প্রধান প্রতিরোধকারি ও ভরসা।

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এমনকি এর সাথে পশ্চিমবঙ্গেও আর এক  বিজেপি প্রপাগান্ডাও চলবে যে, আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা “নাগরিক তালিকা” তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার শুরু করা হবে যে, তারা তুচ্ছ তেলাপোকা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাচনী অপপ্রচার এবং এই চরম ঘৃণা ছড়ান উন্মাদনা, এটাও বিজেপি পাশাপাশি চালাবেই। এটাই হবে, হিন্দুমনে জাগানো ঘৃণা-বিদ্বেষ কাজের মূল ফোকাস বয়ান। তার নির্বাচনি মুখ্য বয়ান।

যদিও এখানে খেয়াল রাখতে হবে আসামের মূল এনআরসির দাবি বা চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে আইনত তারা ঠিক কেবল মুসলমান বুঝায় নাই। এটা তেমন ভিত্তির ওপর দাঁড়ান নয়। ফলে তারা কেবল মুসলমানদের বের করে দিতে এ কাজ করছে তা নয়, বরং স্পষ্ট করে বলছে – ২৪ মার্চের পরে ধর্ম-নির্বিশেষে যারাই আসামে এসেছে তাদের বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে হবে। কিন্তু বিজেপি বা মোদি এই সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাদের সোজা ভাষ্য ও অর্থ হল – এনআরসির কর্মকান্ড বলতে কেবল ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ বুঝতে হবে।

আসামে এই বিলের প্রতিক্রিয়া
কেবল আসাম নয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আসাম ছাড়াও যেমন মনিপুরে, এমনকি ত্রিপুরায়ও। অনুমান করা যায় – তাদের মূল উদ্বেগের কারণ হল, এই সাত রাজ্যের মধ্যে যাদের সীমান্তের অপর পাড় বাংলাদেশ, তারা তো বটেই, এমনকি যারা নয়, তাদের এলাকাতেও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা এবার নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়েই এসে গেড়ে বসে যাবে – এই হল তাদের মুল উদ্বেগ। সাধারণভাবে এখানে আগে থেকেই থাকা সবচেয়ে বড় টেনশনের ইস্যু হয়ে ছিল, সমতলি-পাহাড়ি। আসামেরও মূল দ্বন্দ্ব, টেনশনও এটা। [আমাদের দেশে যেটা পাহাড়ি সেটা নর্থ-ইস্টের ভাষায় জনজাতি বা ট্রাইব।]  কারণ এই অঞ্চলের বড় বৈশিষ্ট হল পাহাড়ি বাসিন্দা অথবা ‘জনজাতি’ বাসিন্দা। ফলে এই অঞ্চলের সমতলি-পাহাড়ির মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন আর তা থেকে উদ্ভুত উচ্চ বা নিম্নস্বরে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা সেখানে সবসময় কাজ করে থাকে। এরই মধ্যে আবার “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করে তৈরি করা নাগরিকত্ব বিল এটাকে তারা দেখছে যে এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের (তারা বলতে চাচ্ছে এতে সমতলিদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে) নতুন করে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে আর স্বভাবতি তা ঘটলে তাতে আগের টেনশন আরও বড় নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে সুনির্দিষ্ট করে আসামের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক, তা অনুমান করা যায়। যেমন এমনিতেই আসামের এনআরসিতে যে ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকেছিল, তাদের মধ্যকার ১৮ লাখ হিন্দু নিজেদের ভাগ্য মোদী ফিরাবে একটা গতি হবে এই ভরসায় ইতোমধ্যেই তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের ও মোদীর ভক্ত হয়েছিলেন। সেটা কেবল ওই ১৮ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা আসামের বাঙালি হিন্দুমাত্রই তাঁরা ক্রমেই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছিলেন। এককথায় বললে, মোদীর হিন্দুত্বের ভিত্তিতে পাবলিক মেরুকরণ এর রাজনীতি এখানই বিভক্তির প্রভাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর তাই এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি”।

কেন? এখন এই ১৮ লাখ হিন্দুই হবেন আসামের পাহাড়ি বা যারা নিজেদের অহমিয়া পরিচয় দাবি করেন তাদের হাতে আক্রান্ত হবার প্রধান টার্গেট। আসামের পাহাড়ি বা অহমিয়া পরিচয়ধারীদেরই মূল রাজনৈতিক দল হল – অহম গণ পরিষদ ও বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। যারা বিজেপির সাথে মিলে বিজয়ে গত ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচন থেকে আসামের প্রাদেশিক জোট সরকারে ছিল। মোদীর নাগরিকত্ব বিল পাসের প্রতিবাদে এরাই এখন জোট-সরকার থেকে বের হয়ে গেছে। বিজেপির জোট শরিক অহম গণপরিষদের তিন মন্ত্রী রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে নয় জানুয়ারি সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরাই ১৯৮৫ সালের চুক্তির মুল দাবিদার পক্ষ যে চুক্তির মূলকথা হল, অ-অহমিয়দের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এরা এর প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক। এর আগে বাঙালি-নিধনের বহু রেকর্ড এদের আছে, এবং সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়া জেলায় পাঁচ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা ওই ১৮ লাখ হিন্দু বাঙালির ভাগ্যে এখন কী হবে এর ইঙ্গিত বলেছেন অনেকেই।

এ দিকে, আর এক অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যাচ্ছে। তা হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ মোদীর এই বিল পাসে খুশি হয়নি মনে হচ্ছে, অন্তত ভাল কাজ মনে করছে না। যদিও পেশাদার হিসেবে তাঁরা তাঁদের আপত্তি মনে মনে রেখেছে। তবে সেই সাথে আর একটা কাজ করেছে। তা হল, তাদের সাথে সম্পর্কিত বা এসাইনড লোকেদের হাতে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকে তাদের আপত্তি বা যুক্তিগুলো জানা গেছে। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিল পাসের ফলে এতে গত ছয় বছরে উলফার (ULFA, আসামে এটা উচ্চারিত হয় আলফা বলে) কমে আসা তৎপরতা যা এখন পরেশ বরুয়া অংশের নামে আছে কিন্তু স্তিমিত তাদের পুরনো সেসব তৎপরতা আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে তাঁরা। এমনিতেই জটিল পরিস্থিতি ও সমীকরণের আসামে আবার নতুন উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতের ফলে তাদের এতদিনের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যা কিছু অর্জন এত দিনে হয়েছিল তার উপর পানি ঢেলে দেয়া হবে বলে তারা মনে করে। তাই অশান্তি আর তাদের কাজ বাড়বে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া
এবারের ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি ও মোদীর রাজনীতি হবে বাংলাদেশের জন্যও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই বাংলাদেশের স্থানীয় হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই এখন আরএসএসের মুঠোয়। এই বিল “বাঙালি-হিন্দুমুখি” বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের “বাঙালদের” মনোরঞ্জন-মুখি এই অভিযোগ অনেকের।  ফলে মোদীর নাগরিকত্ব বিলের রাজনীতি হাজির করে বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই আরএসএসের মুঠোয় ভরতে তাদের সাহায্য করেছে। যদিও নিকট আগামিতেই বাংলাদেশের হিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে আত্মঘাতি বলে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য যে ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে তা হল, এই বিল এক বিশাল মরিচিকা।

ওদিকে অর্থনীতিক ‘উন্নয়ন ও বিকাশে’ রাজনীতিতে মোদী ইতোমধ্যেই ফেল মেরেছে। আসলে সেকারণেই মোদীর এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতি এত সিরিয়াস-নেস। আর একেই বিকল্প ইস্যু ভাব ধরে হাজির করার উদ্যোগ। মানে তার এখন একমাত্র সম্ভাব্য ইস্যু হবে হিন্দুত্ব, যার বিশেষ ফোকাস হবে ‘নাগরিকত্ব বিল’। আমরা ইতোমধ্যে – মুসলমানেরা তুচ্ছ তেলাপোকা, পিসে মেরে ফেলা হবে, বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে উপড়ে ফেলা হবে, ইত্যাদি এসব বলে গত নভেম্বর পাঁচ রাজ্য নির্বাচন লড়েছে বিজেপি দেখেছি।

সেই মহড়ার পর এবার আবার মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় নামতে হবে মোদীকে। আমাদের সরকার গতবার কেবল তথ্যমন্ত্রী ইনুকে দিয়ে এই ইস্যুতে ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নাগরিকত্বের বিল পাস করার পরে মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডা আরও তীব্র হবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ এবার এটা আরও বড় স্টেক; মোদী নির্বাচনে জেতার মামলা যেখানে আবার নাগরিকত্ব বিল মুল ইস্যু।

এছাড়া ওদিকে আবার বিশেষ করে আসামে যেখানে অহমিয়া-বাঙালি সঙ্ঘাত উসকে গেল সে পরিপ্রেক্ষিতঅও তৈরি হচ্ছে। হাসিনা সরকার তার প্রথম পাঁচ বছরেই উলফা দমনে যে ভূমিকা ও সহায়তা দিয়েছিল এর প্রশংসায় ভারতের গোয়েন্দা-আমলা থেকে রাজনীতিক সবাই পঞ্চমুখ। যদি তাই হয় তবে একদিকে এখন সেই অর্জন ভেঙে ফেলতে পরোয়া করছে না মোদীর নির্বাচনে জিতবার স্বার্থ। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের তেলাপোকা বলে ঘৃণা আর গালির জোয়ার তুলছে। এটা কতটুকু ফেয়ার? মোদীকেই জিতাবার স্বার্থে আমাদের সরকার কী মোদীর অত্যাচার, অনাচার জুলুমের দায়ীত্ব নিজের কাধে নিবে? আমাদের সরকারের নিজেকে আরও ভারতমুখি পরিচয়ে আর নিজেকে গণবিরোধী করার রিস্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে? মনে হয় না।

ভারতের হবু নির্বাচনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দুই দিকে দুই রাজ্যে থেকেই মোদীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় (যা ইতোমধ্যে আমরা রাজস্থান, ছত্তিসগড় নির্বাচনে দেখেছি) দেখতে হবে আমাদেরকে। বলা বাহুল্য এতে বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে পাল্টা সরব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর সম্ভাব্য সে পরিস্থিতির কথা আঁচ করে আগে থেকেই ভারতকে সাবধান করে নিজেদের স্বার্থ-প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে না ধরা হবে আমাদের সরকারের আর এক বড় ভুল।

গুরুতর প্রশ্ন, এ নাগরিকত্ব বিল পাসের পরে আসাম্র ‘নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকে যাওয়া’ প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের কী হবে? রোহিঙ্গাদের মত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে? অথবা মোদীর উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের কারণে জীবনের ভয়ে তারা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামাবে, নাকি তাদের বাধ্য করা হবে?

আমাদের উচিত হবে এমন যেকোনো কিছুর আগে এনিয়ে মোদীর সাথে ‘ডায়লগ ওপেন’ করা। মোদীকে আগে থেকেই সংযত করা, আমাদের উদ্বেগের কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি আদায় করা হবে আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অন্যথায় আমাদের সরকারকে অজনপ্রিয় হওয়ার অপ্রয়োজনীয় ভারতমুখি পরিচয়ের রিস্ক নিতে হবে।

শেষ কথাঃ
শেষ কথাটা হল এই বিল পুরাপুরি আইনসিদ্ধ হবার প্রক্রিয়া এখনও বাকী। কারণ লোকসভায় পাশের পর এবার ভারতের উচ্চ-কক্ষ, রাজসভাতেও তা পাশ হতে হবে। তবেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা পরিপুর্ণ আইন হবে। রাজ্যসভা বসবে আগামি ৩১ জানুয়ারি। সবচেয়ে বড় কথা কিন্তু এখানে বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই। এর অর্থ এই বিল এখানে পাশ হবার কোন সম্ভাবনা নাই। ২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর জোট এখনো ৮৮ জন সদস্য। বিপরীতে বিজেপি বিরোধী শিবিরের এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যা ১৫৬। তাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
তাহলে এটা জানার পরেও মোদী এত উদ্যোগী কেন? কারণ, আপাতত তাঁর “বাঙালি-হিন্দুমুখি” প্রেমের প্রকাশ – আর কিছু পারুক না পারুক  মোদীর মূল উদ্যোগ হল – এটা দেখিয়েই সে কাজ সারতে চায়। এটাই তাঁর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম-ত্রিপুরাসহ পুরা নর্থ-ইস্টে (মোট ৬৬ আসনে) নির্বাচনে লড়বার লক্ষ্যে মেরুকরণে হিন্দুত্ব রাজনীতির একমাত্র কৌশল।  আর এই মেরুকরণে এই অঞ্চলের প্রাণ-বেড়িয়ে যাবার অবস্থা তৈরি হলেও সংকীর্ণ স্বার্থপর বিজেপি ও মোদী নির্বিকার; যেভাবেই হোক তাঁকে ক্ষমতা পেতে হবে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) মোদির নতুন বিল: আসাম ও বাংলাদেশ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

গৌতম দাস

১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wO

 

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে; অফিসিয়াল ফলাফল প্রকাশ, শপথ নেয়াসহ মন্ত্রিসভা গঠন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। সরকারের দেশি-বিদেশি সুবিধাভোগীরা এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি’ [Land Slide Victory], বা বাংলায় “ভূমিধস বিজয়” শব্দ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যা করছে। কারণ, দাবি অনুযায়ী এই ফলাফলে  ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আওয়ামী জোটের ব্যাগে এসেছে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ আসন পেয়েছে সরকার। তাই অফিসিয়ালি ফলাফলে ৯৭ শতাংশের বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভূমিধস ধরনের শব্দ খুঁজে এনেই সম্ভবত একমাত্র এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যায়।

কিন্তু ভারতের মিডিয়ায় বিস্ময়কর এক “কিন্তু” আমরা লক্ষ করছি। নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হওয়ার অন্তত এক দিন পর থেকেই ভারতের মিডিয়ায় এই ফলাফল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই তারা বিভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাদের অস্বস্তিকর মন্তব্যগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছে। আর এতে প্রায় প্রত্যেকের রিপোর্টের শিরোনামে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ধরনের শব্দ দেখা যাচ্ছে। যে বক্তব্যগুলোর সারকথা হল, তাদের অনুমান এই নির্বাচনী ফলাফল ভারতের স্বার্থের জন্য অন্তত লং টার্মে বা শেষ বিচারে শুভ ইঙ্গিত নয়। খারাপ কিছুর কু-ইঙ্গিত। তাই এখান থেকেই ফলাফল গ্রহণে অস্বস্তির শুরু। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে কয়েকটা এখানে তুলে এনে আলোচনা করা হল।

একঃ কাঞ্চন গুপ্ত
যেমন ভারতের এমন ‘কিন্তু’ দৃষ্টিভঙ্গির মন্তব্যের এক লেখক হলেন কাঞ্চন গুপ্ত। তিনি সবার চেয়ে আগে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর, নির্বাচনের পরের দিনই কাঞ্চন গুপ্তের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আর তার লেখা ছেপেছে আবার ভারতের প্রভাবশালী বেসরকারী থিঙ্কট্যাঙ্ক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন”। যদিও কাঞ্চন গুপ্ত তাদের নিজেদের স্টাফ নন, তাই বাইরের লেখকের লেখা হিসেবে তারা ছেপেছে। কাঞ্চন গুপ্তের পরিচয় খুবই কম করে বললেও তা হল, তিনি একসসময়ের বাংলাদেশ (পুরানা পুর্ববঙ্গের) এক ব্রাক্ষ্মসমাজ পরিবারের সদস্য, এখন দিল্লি-নিবাসী এক প্রবীণ সাংবাদিক; যার আবার চলতি শতকের শুরুতে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বা মন্ত্রী আদভানির টেকনিক্যাল এইড বা মিডিয়াসংক্রান্ত সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারই লেখার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে এখন একদলীয় গণতন্ত্র’[Bangladesh now one-party democracy] । একদিক থেকে দেখলে এটা কোন খাতির বাছবিচার ছাড়া খুবই খাড়াভাবে তাঁর বক্তব্য হাজির করা হয়েছে। এছাড়া ঐ লেখার ভেতরের বিশেষ জোর দেয়া কিছু বুলেট বক্তব্য আছে। সেখান থেকে তুলে আনা এমন চারটা বক্তব্য হলঃ
যেমন- ১. “সব ব্যবহারিক অর্থে বাংলাদেশ এখন একটা একদলীয় রাষ্ট্র, যদিও ঐ দেশে এখনও “কিছু আসে-যায় না” ধরণের কয়েকটি দল রয়ে গেছে – যেন এটি প্রমাণ করার জন্য যে কনস্টিটিউশনাল বর্ণনায় বাংলাদেশ বহুদলীয় রাষ্ট্র”। [For all practical purposes Bangladesh is now a single-party state with inconsequential parties keeping alive the country’s constitutional description as a multiparty democracy.]
২. ” অভিযোগ হল, আওয়ামি লীগ ভিন্নমতকে নিশ্চুপ করে এক নির্বাচন আয়োজন করেছে যেটা না প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীন না ন্যয়নীতিতে পরিচালিত – এখন সেই অভিযোগকারিদেরকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা হয়েছে”। [Equally irrelevant are those who accuse the Awami League of silencing dissent and organising an election that was neither free nor fair.]

৩. “নিজস্ব কায়দায় চালানো শেখ হাসিনার এক ওয়ার অন টেররের তৎপরতা আছে। এই ততপরতায় টার্গেট করে হত্যা করা বা গুম করে দেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে অনেক কথা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রমেই ভায়োলেন্ট রেডিক্যালিজমের দিকে গড়িয়ে পড়া থেমেছে – এ কথার পক্ষে যায় এমন কোনো প্রমাণ নেই বললেই চলে”। [Much has been said and written of Sheikh Hasina’s own war on terror through targeted killings and alleged disappearances. There is little evidence to suggest that has halted Bangladesh’s slide towards violent radicalism.]
কাঞ্চন গুপ্তের এই বাক্যটা সম্পর্কে একটা মন্তব্য করা জরুরি যে, তাঁর একথাগুলো রাখঢাক না করে আবেগহীন ভাবে বলা সত্য, যা ভারতের স্বার্থের পক্ষে গেল কী না এই বিবেচনা না রেখেই তিনি বলেছেন।

তবে সব ছাড়িয়ে কাঞ্চন গুপ্তের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্তব্য আছে যা এখানে এখন আনা হবে। এর প্রথমটা হল তাঁর লেখার প্রথম বাক্য। খুবই চাচাছোলাভাবে তিনি আমাদের বলছেন, “প্রথম ভোটটা বাক্সে পড়া বা বাক্স গণনা শেষ হওয়ার আগে জানাই ছিল ফলাফল কী আসবে। কেবল বাকি ছিল এ কথা জানা যে, তিনি কত আসন সাথে নিয়ে আসবেন – যা প্রমাণ করবে হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে যোগ্য কেউ নাই”। [The results of the 11th parliamentary election in Bangladesh were known even before the first vote was cast last Sunday or the first ballot was counted in the evening on the same day. It was only a question of how many seats would Sheikh Hasina Wajed’s Awami League tote up to prove its point that it faces no opposition worth its name.]

এ ছাড়া কাঞ্চন গুপ্তের প্রথম মন্তব্য শুনে যাতে পাঠক আবার আশাবাদী না হয়ে যান সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হলঃ “বিরোধী দল এখন যতই ফ্রেশ নির্বাচনের দাবি জানাক সেটা ঘটবে না; তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকা এর পক্ষে কোনো আগ্রহ নিয়ে হাজির হবে বলে মনে হয় না”।’ [The opposition can keep demanding fresh elections but that will never happen. It is unlikely that either the US or the EU will strike a particularly harsh posture on the quality of Sunday’s election …… ]

এই হলেন কাঞ্চন গুপ্ত ও ভারতের মিডিয়ায় তাঁর আবেগহীন পর্যবেক্ষণ, যেটা এক অস্বস্তিকর প্রকাশও বটে।আর তার নিচের বাক্যটা হল চীনভীতি হতাশার। বলছেন, হাসিনা যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ কথাটি অনুসরণ করে সবার চেয়ে বেশি খুশি হবে আসলে চীন। [……would bear testimony to her claim that Bangladeshis have voted for development and progress. China would be more than willing to oblige.] তিনি বলতে চাইছেন এই বাক্য ত চীনের পক্ষে গেল!

দুইঃ ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণ
এবার দ্বিতীয় মিডিয়া মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া হল, ৩ জানুয়ারিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণের লেখা। তার লেখার শিরোনাম, “গণতন্ত্রের জন্য বা ভারতের স্বার্থের জন্য এটা কোনো অর্জনই নয়”।[No gain for democracy, or for India’s interests]। এছাড়া পরে বিস্তারে ভেঙে বলছেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল ঐ দেশের গণতন্ত্র অথবা দক্ষিণ এশিয়া বা বাইরে ভারতের লংটার্ম স্বার্থের জন্য কোন অগ্রগতি বয়ে আনবে না”। [The Bangladesh election results are neither going to further democracy in that country nor India’s long-term interests in South Asia, and beyond.]
তবে একটা মিলের দিক হল, ভরত ভূষণও উপরের কাঞ্চন গুপ্তের মত মনে করেন, “বিরোধীদের পুনর্নির্বাচনের দাবি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যাকে বিরোধীরা সরকারি দলবাজ বলছেন, সেও আমল করবে না”। কিন্তু ভরত ভূষণের অভিযোগ আরও খাড়া এই অর্থে যে তিনি খোদ হাসিনা সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তিনি মনে করেন, “সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটার বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন তাদের ইমেজ হারিয়েছে। মিডিয়াও সরকারি খবরদারির বয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। সরকার ও সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের মানে, এমন কর্তাব্যক্তিদের রেকর্ড আছে যে তারা বিরোধীদের ওপর হামলা করেছেন। এ অবস্থার মুখে গণস্বার্থ নিয়ে কথা বলা বুদ্ধিবৃত্তির লোকেরা ও স্বাধীন ব্লগাররাও জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছে”।’ [Due to political manipulation by the State, the judiciary and the Election Commission have also lost their sheen in the country. The media has fallen in line with state diktats. Given a history of attacks by both state and non-state actors, public intellectuals and independent bloggers fear for their lives.]

তবে ভরত ভূষণের মূল উদ্বেগের পয়েন্ট হলঃ তিনি লিখছেন, “ভিন্নমত প্রকাশ হতে দেয়ার সুযোগ না রাখায় দমবন্ধ পরিবেশে আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নমতের লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাতে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলা হচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যেই ইসলামী রেডিক্যালদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি আছে। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না রাখার ব্যর্থতা – এটাই যেকোনো ধরনের রেডিক্যাল রাজনীতির জন্ম ও বিস্তারের জন্য তা খুবই উর্বর ভূমি হিসেবে হাজির হয়। এধরনের অবস্থা-পরিস্থিতিগুলোই মানুষকে ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মিসর বা আলজেরিয়ায় ঘটেছিল। [The absence of democratic safety valves and with institutions of the state “weaponsied” against dissent, is a particularly dangerous situation for countries which have a significant presence of Islamic radicals. The failure of political processes creates a fertile ground for the expansion of radical politics. The people can then easily turn to Islamic radicalism, as happened in Egypt and Algeria.]।

তিনি সঠিকভাবেই মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে বলছেন, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপগুলোকে অকেজো করে ফেলা হচ্ছে তড়িত নগদ কিছু ফল পাবার আশায় অথচ ক্ষমতাসীনেরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায় ইয়াদের হাতেই এটা হচ্ছে”। [The democratic institutions of Bangladesh have been eroded for short-term gains by those in power for a long time.]

শেষ কথা হিশাবে তিনি বলছেন, “এ ছাড়া এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে আসন্ন স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব যা নিয়ে আসবে তা শেষ বিচারে এর ফসল চীনের পক্ষেই যাবে আর তাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ শুকিয়ে চিপার মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই দেখার বিষয় হবে। [China wants a strategic foothold in Bangladesh to counter the United States, and secondarily, India…….As this great game unfolds, it remains to be seen whether or not Indian intersts will get squeezed out of Bangladesh.]

তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত তার মারাত্মক ক্রিটিকাল পয়েন্ট হল, তিনি এমন একতরফা নির্বাচনের নিন্দা বা অসম্মতি প্রকাশ করতে বলছেন, “ভারতের জন্য নিরন্তর যেটা ভয়ের বিষয় বাংলাদেশে কোন ইসলামি রেডিকেলের উত্থান আর সীমান্ত পেরিয়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা – এমন একপক্ষীয় নির্বাচন সেই আশঙ্কাকেই আয়ু দিবে। ভারতের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের দিক থেকে দেখলে পকেটে গানপাউডার নিয়ে ঘুরা এক বাংলাদেশের চেয়ে সুস্থির নিয়মতান্ত্রিক বাংলাদেশই ভারতের জন্য কাম্য”। [As for India’s primary bugbear, the rise of Islamic radicals in Bangladesh and its consequences across the border, a one-sided election may have given it a new  breath of life. In the long run, it might be easier to deal with a stable and democratic Bangladesh than one that may become a powder keg.]

তিনঃ একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলী
আমাদের তৃতীয় উদাহরণ হল, একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলির লেখা এক রচনা। সুমিতের পরিচয় হল, তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রফেসর। এ ছাড়া, তিনি আমেরিকান ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় কালচার ও সভ্যতা বিষয়ের রবীন্দ্র চেয়ারের অধ্যাপক। আর তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’(Foreign Policy)  পত্রিকায় ৭ জানুয়ারিতে।

তার লেখার শিরোনাম হল, ‘বিশ্বের বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যর্থতার দিকে নজর করা উচিত”। [The World Should Be Watching Bangladesh’s Election Debacle]। আর এই লেখার দ্বিতীয় শিরোনাম হল, “ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটা তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে, ইসলামী চরমপন্থার অসুস্থ ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করেছে আর দেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে”। [The ruling party is making a mockery of the electoral process, pandering to Islamic extremists, and turning the country into an authoritarian state]। তাঁর অস্বীকৃতি প্রকাশের লক্ষ্যে খুবই কড়া কড়া শব্দ প্রয়োগ সন্দেহ নাই। যদিও এই লেখকের দেখার অবস্থান একজন ইসলাম-বিদ্বেষী আন-ক্রিটিক্যাল সেকুলারের। কিন্তু সেদিকটাকে পাশে ফেলে রেখে আমরা তাঁর কথা আমল করব এখানে।

প্রথমত, তিনি একে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের (questionable results)’ নির্বাচন মনে করেন। তাঁর লেখা শুরুর দ্বিতীয় বাক্য হল এরকম  The questionable results ended in a sweeping victory …।] এবার তাঁর লেখা থেকে তিনটি বুলেট বাক্য উঠিয়ে আনব এখানে।

তিনি মনে করেন- ১. ‘সস্তা রাজনৈতিক লাভালাভের স্বার্থে এই দল (মানে আওয়ামী লীগ) ধর্মীয় সহিংস দলের উত্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভোটারদের [হেফাজতের সাথে আপোষ সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন] সাথে আপস করেছে। [For reasons of political expediency the party has failed to fashion a concerted strategy to curb the rise of such religious militancy; it prefers to court religious voters.]
২. আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী বিজয় বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর, যেখানে গণতন্ত্রের আলখাল্লায় ঢেকে এটা এক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি পয়দা ও সংহত হতে সাহায্য করবে। [The Awami League’s questionable electoral victory is bad news for Bangladesh, where it will aid the consolidation of an authoritarian political order with a democratic facade.]
৩. এই দানব ক্ষমতার বিরোধীদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমল না করার একমাত্র চিহ্ন নয়। [The regime’s hostility toward the opposition was not the only marker of its disregard for democratic procedures.]

উপরের বাক্যগুলো নিজেই নিজের ব্যাখ্যা, তাই বিস্তারে যাওয়া হল না। তবে এছাড়া, সবশেষে সুমিত গাঙ্গুলিও মনে করেন, “ট্রাম্প বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না। এর বদলে আফগানিস্তানে আমেরিকার ভবিষ্যত নিয়েই সে বেশি চিন্তিত। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা বাংলাদেশের সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিক করা বা ঘাটতি পুরণের জন্য শক্তি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না”। [Finally, the Trump administration, to the extent it has devoted any attention to South Asia, has mostly been preoccupied with the future of the U.S. involvement in Afghanistan. It has paid little attention to political developments in Bangladesh or elsewhere in the region. Consequently, it seems highly unlikely that Washington will expend much energy, let alone political capital, to address the shortfalls of this election.

চারঃ প্রাক্তন সচিব অভিজিত চক্রবর্তী
চতুর্থ ও শেষ উদাহরণ টানব অভিজিত চক্রবর্তীর লেখা। অভিজিত ভারত সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সাবেক বিশেষ সচিব ছিলেন বলে লিখেছেন। অনুমান করা হয়, এ ধরনের বিশেষ সচিবের মানে এরা আসলে গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা হয়ে থাকেন। সে যাই হোক, তার লেখা ছাপা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে, (Economic Times), ৭ জানুয়ারি।

তার লেখার শিরোনাম, “বাংলাদেশের রাজনৈতিকতা রেডিক্যাল হয়ে যাচ্ছে ভারতের শঙ্কিত হওয়া উচিত”। [India should be wary of radicalisation of Bangladesh’s polity]। রেডিক্যাল বলতে আমরা সাধারণভাবে সব ধরনের “সশস্ত্র রাজনীতি” বলে  বুঝতে পারি। যদিও তিনি এখানে সুনির্দিষ্ট করে ইসলামি রেডিক্যাল বুঝাতে চেয়েছেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি এক মারাত্মক হাতেগণা অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। বলছেন, “আওয়ামী লীগের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয় এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের সংখ্যার ব্যবধানে বিজয় দেখানো, এই নির্বাচন পরিচালনাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে; বিশেষত যদি, আমরা বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত সমর্থক ভো্টার ভিত্তির কথা মনে রাখি”। [The win in over 90% of the seats contested by the Awami League and some with astounding victory margins have contributed to the questionable conduct of the elections, given the committed vote base of the BNP and JeI. অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই ৯০% এর বিজয় যদি মানি তাহলে একা বিএনপির প্রায় স্থায়ী ভোটার বেজ ৩০-৩৫% যা বলা হয় সেটাকে ব্যাখ্যা করব কী করে? এছাড়া জামাতের ভোট ত আছেই!

এছাড়া তিনি আরও বলছেন, ‘এই নির্বাচন শুধু বিরোধীরা নয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ; তারা এর তদন্ত দাবি করেছেন”। [The latest election falls short of widespread acceptability as not only the opposition parties, but also the EU and US have questioned the process and demanded investigation into the reports of harassment, intimidation and violence.]

এরপর তিনি সবশেষে একটা মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন, “এসব ফ্যাক্টর একটা দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যে দেশ অতীতে ধারাবাহিকভাবে বিরতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখে এসেছে”। [All these factors may pose a challenge to the establishment of a stable democracy in a country that has seen periodic military interventions in the past.]।
স্যরি, অভিজিত চক্রবর্তীকে বলতেই হচ্ছে, এই শেষ বাক্য তিনি না জুড়ে দিলেই ভালো হত। সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে এই মন্তব্য খুবই হাল্কা ও উস্কানিমূলক হয়েছে। এতে তিনি নিজের বিদ্যাবুদ্ধি, পেশা, তথ্য যোগাড় ও দক্ষতার মান নিচে নামিয়ে দিলেন।

সে যাই হোক তিনি হেফাজতের সাথে আওয়ামি লীগের আপসে চরম ক্ষুব্ধ। তিনি বলছেন, “গত দশ বছর তিনি শাসন ক্ষমতায় একনাগাড়ে থাকলেও ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এতে সমাজে দেশের ইসলামী পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির সামাজিক সুবাতাস পেয়েছে”। [The wooing of radical elements by all the political parties is an indication that despite 10 years of the Awami League government, the societal winds continue to favour a strong Islamist identity in the country. ] এটা বেশ ইন্টারেস্টং যে তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে “ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে” প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
তবে তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন, “এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বাংলাদেশকে রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়া হল”। এ ছাড়া সেকুলারিজমের মৌলিক বীজ ও চিহ্নগুলোকে ক্ষয়ে ফেলা হয়েছে। [The erosion of secular ethos will not only affect minorities, ………. ] ফলে তিনি এবার এক সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। বলছেন, সব মিলিয়ে “এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত”।  [These developments could pose security challenges for India, especially in the northeast.] অর্থাৎ তার কথা সঠিক বলে মানলে হাসিনার এ নির্বাচনী ফলাফল ও পরিচালনা ভারতের জন্য নিরাপত্তার ক্ষতি বয়ে এনেছে বা আনবে।
এসব কথার সূত্র ধরে তিনি এবার নতুন হাসিনা সরকারে চীনের প্রভাব বেড়ে যাবে বলে দেখছেন। তাই তার শেষ কথা “ভারত এসব দেখে শঙ্কিত না হয়ে” ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
তার পু্রা কথার মধ্যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলছেন আর এতে তিনি ভারতের জন্য বিপদ দেখছেন।

সবশেষেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
আনন্দবাজার পত্রিকার উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। এটা ১ জানুয়ারির রিপোর্ট, শিরোনাম হল– ‘ভোটে জিততে মুখ চাই, কংগ্রেসের হারের সাথে বিএনপির মহাবিপর্যয়ের তুলনা টানলেন হাসিনা।’ আনন্দবাজারের শিরোনাম এমন পেঁচানো হয় যে, খবরটা আগে পড়া শেষ না করলে শিরোনামের অর্থ জানা যায় না। এই রিপোর্টেরও সারকথা – আনন্দবাজারেরও একই উদ্বেগ, জয়লাভের পারসেন্টেজ বেশি হয়ে গেছে- বিরোধী দল থাকল না।

লিখেছে, “ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে, জাতীয় পার্টি এবং আরও ৬টি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনার মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি”।  অর্থাৎ সরকারি জোট একাই ৯৭% আসন পেয়ে গেছে। “সেই অর্থে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আর তেমন কোনো অস্তিত্বই থাকল না”। এই হল আনন্দবাজারের উদ্বেগ। এখন এখানে এক তামশা দেখলাম আমরা। আনন্দবাজারের এই উদ্বেগ তাড়াতে একপর্যায়ে উপায় না পেয়ে হাসিনাকেই বলতে হল, “আগামীতে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসে যেতে পারে”। এর উদাহরণ হিসেবে বললেন, “আজকের বিজেপিও তো একসময় ভারতের সংসদে মাত্র দু’টি আসন পেয়েছিল”। এ ছাড়া, হাসিনাকে বিএনপির হারের ব্যাখ্যাও নিজেই কান্ধে নিয়ে দিতে হয়েছিল। হাসিনা ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিএনপি জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি না বলাতেই নাকি তারা মূলত হেরেছে।
যা হোক সারকথাটা হল, ৯৭ শতাংশের মত আসন পেয়ে আওয়ামি লীগের শান্তি ছুটে গিয়েছে। উল্টো আওয়ামী লীগকেই বিএনপির আগামী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আপাতত নিজের জিতবার সাফাই দিতে হয়েছিল।

তবে এর বাইরেও অনেক রিপোর্ট, মন্তব্য, কলাম আছে পাওয়া যাবে; যা এখানে আনা হয়নি। যেমন সরাসরি ট্রাম্পকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছে এমন রচনাও আছে। তবে ভারতের এসব মুল্যায়ন প্রকাশের সাধারণ সুরটা হল, এই নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ভারত আগামী দিনে নিজ দেশের জন্য লুকানো বিপদ বলে মূল্যায়ন করছে। সে কারণেই এত অস্বস্তি।
আর একটা সোজা ফ্যাক্ট হল, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এতে যে ঐ খালি জায়গার দখল পাচ্ছে সেই লাভের ফসল যাচ্ছে মূলত চীনের ঘরে। কারণ, রাজনৈতিক অধিকারের (Political Right) বদলে “উন্নয়নের রাজনীতির” – হাসিনার এই রাজনীতিতে বিজয়ের সোজা অর্থ -ক্রমশ  হাসিনার কাছে আপন হয়ে উঠবে চীন যেখানে ভারত হবে তুচ্ছ, পরাজিত পার্টি! যার অন্তত কিছু কারণ ভারতের কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই। আর আমেরিকার হবু কোন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রায় নাই বলে এর বিরুদ্ধে  ভারতের সুপারিশ আর জরুরি না।  যার ফলাফল, চীনের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ এক বাংলাদেশ। আর তাতে ততই শিরশিরে ঠাণ্ডা চিলিং অনুভুতির এক ভারত – হতে দেখছি আমরা।
এ ছাড়া মানুষের রাজনৈতিক অধিকার  দাবড়ে রেখে হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো, “উন্নয়নের রাজনীতির” আওয়াজে সব আড়াল করা এসব কিছুর ফলে  সত্যি সত্যিই  রেডিক্যাল – শুধু ইসলামের নয় যেকোন – রাজনীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, সেটা তো আছেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘ভূমিধস’ বিজয়ে ভারতের মিডিয়ার শঙ্কা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

গৌতম দাস

১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wo

 

[সার-কথাঃ বুদ্ধিজীবিতা করতে গেলে চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। এটা প্রি-রিকুইজিট বা আগাম শর্ত। পেটের স্বার্থ তীব্র হয়ে গেলে অথবা আপনি নিজেই পেটসর্বস্ব চিন্তাবিদ হয়ে গেলে বুদ্ধিজীবিতা আর আপনার জন্য নয়। কারণ আপনার চিন্তার আর স্বাধীন হবার সুযোগ নাই। পেটের-স্বার্থ চিন্তার উপর আধিপত্য নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে ভারতের সরকার অথবা প্রাক্তন কূটনীতিক বা বুদ্ধিবৃত্তি জগতের কেউ কোনদিন কোন মুল্যবোধ নীতি-নৈতিকতার উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে নাই। নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বা জাতিসংঘের গৃহীত মুল্যবোধের উপরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারলে ভারতের সেসব কথা আন্ডার-স্টেটমেন্ট বা নিম্নতলের খাটো-কথা হয়েই থেকে যাবে; পেটসর্বস্ব কথা যাকে বলে।]

এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় (MEA) কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ঐ অনুষ্ঠান ছিল নিয়মিত ব্রিফিং, বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ কোনো কিছু নয়। বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোয় ৬ ডিসেম্বর তাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি প্রেরিত এমন রিপোর্টে এটা  ছাপা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “এর আগে নানা সময় বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের ভোট নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগ্রহ দেখিয়েছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র রবীশ কুমার এড়িয়ে যান”।

তার মানে, ভারত অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করে না এমন নয়; করেই থাকে এবং সেটা এখানেও তারা অস্বীকার করে নাই। তার পরও কোনো মন্তব্য করেননি মুখপাত্র। কিন্তু তবুও যে কথার অর্থ হয় না, কথার কথা – এমন কথা হিসেবে বলেছেন, “বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না, প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”।

গত ১৭ নভেম্বর প্রথম আলোতে এমনই আর এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা ছিল মূলত একই প্রতিনিধিরই নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে নেয়া কিছু মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াসংবলিত একটি রিপোর্ট। আর সেই মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াদাতা ছিলেন ভারতের কিছু সাবেক এবং বর্তমান রাষ্ট্রদূতও। এ ছাড়া, আরো ছিলেন এক থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব।

১৭ নভেম্বরের রিপোর্ট লিখার আগে বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সাথে সরাসরি সে প্রতিনিধির কথা হয়নি। তবে অন্য কোথাও তিনি যেসব কথা বলেছেন, এমন রেফারেন্সে কিছু কথা সেখানে আছে। যেমন – বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এটা দেখে নাকি ভারত “উৎফুল্ল”। এছাড়া, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও তারা মনে করেন, “সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে ঠিক সময়েই ভোট হবে এবং সেই ভোট হবে “অংশগ্রহণমূলক”; বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকবে” ইত্যাদি।

কিন্তু ঘটনা হল, আমাদের নির্বাচন নিয়ে ভারতের এ’ধরনের প্রতিক্রিয়া পড়তে গিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হল, আমাদের কোনো ইস্যুতে ভারতের “সরকারি অবস্থান” অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট (Intellect) বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কখনোই কোনো “নীতিগত অবস্থানে” অথবা কোনো “মরালের” ওপর দাঁড়িয়ে তারা বলছেন – তা আমরা সাধারণত দেখিনা।

তাদের মন্তব্যগুলো অনেকটা – “মেরা ভারত মহান হ্যায়” ধরনের “জাতিবাদী দেশপ্রেমিকে” (State Interest) বক্তব্যের মত। যেকোন জাতিবাদী শ্লোগান কখনই কোন নৈতিকতা বা নীতির উপর দাঁড়াতেই পারে না যেটা অন্য রাষ্ট্রস্বার্থের ক্ষেত্রেও কাজ করবে, মানে কমন। এজন্য বলা হয় জাতিবাদী শ্লোগান মাত্রই এমন যে, তা সব সময় কোন কমন মরালিটি-ভিত্তিক হয় না। ফলে তা ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম’ সর্বস্ব বক্তব্য। আর যা ভারতের ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিকতা’ সর্বস্ব, তাতে ভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশের কী স্বার্থ? তাই এর সোজা মানে, এগুলা ভারতের সরাসরি একান্ত স্বার্থের দিক থেকে বলা কথা। অর্থাৎ কমন ইন্টেলেক্ট ভ্যালুজ বা “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” – এর ওপর দাঁড়িয়ে বলা কোনো কথা নয়। ভারতের সরকারী অবস্থান বা কোন  ইন্টেলেক্ট বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কোন “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” দাঁড়াতে এখনও কোনদিন পারে নাই। শিখেনি বা পারেনি।

আসলে নীতিগত অবস্থানের উপরে দাঁড়ানো মানে কী? এর মানে হল, এমন এক অবস্থান যার পেছনে কিছু ভ্যালুজ বা মূল্যবোধ বা মরাল কাজ করে আছে। আর “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধ” বলতে যেমন – যেকোন রাষ্ট্রের নাগরিক মৌলিক স্বার্থ (Human values) বা আন্তর্জাতিক মানবিক নাগরিক অধিকার (Civil & political Right)। সব রাষ্ট্রেরই করণীয় ‘নাগরিক অধিকার রক্ষার’ ন্যূনতম কর্তব্য আছে। সেকারণে চাইলে সহজেই, চেষ্টা করলে যেকোনো দু’টি রাষ্ট্রের “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধের” কিছু ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু  উলটা দিকে – এর অনুপস্থিতি মানে, কমন কোন ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে বলা কথা যদি না-ই থাকে, তবে ভারতের সরকারি অবস্থান অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট বা সাবেক কূটনীতিকসহ যে কারো মন্তব্যের কোনো অর্থ-তাৎপর্য বা ভিত্তি থাকে না। যেমন – বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘নাগরিকদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার অধিকার’ থাকতে হবে। এটা মানার মত কী ভারতের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সত্যিই কী আছেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না!

সব রাষ্ট্রেরই কৌশলগত নানা স্বার্থ থাকে, যার ফলে সব সময় সত্যি কথাটা সরাসরি বলতে পারে না। তবে মিথ্যা না বলে, মানে সত্য-মিথ্যার মাঝখানে নিজ অবস্থান অস্পষ্ট, রেখে কথা বলার ধরণ, এটাই যেন কূটনৈতিক ভাষার এক বড় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ তো গেল রাষ্ট্রীয় অবস্থান; তাহলে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তি যিনি সরকারি পদে নেই, তার কোন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারার কোন কারণ নাই। আর এই না পারাটা অগ্রহণযোগ্য। বরং এতে তিনি আসলে একরকম করুণার পাত্র হয়ে যান। আর সোজা ভাষায় বললে তা হয়ে দাঁড়ায় – পেটসর্বস্ব এক লোকের অযাচিত বা গায়ে পড়া কিছু কথা। এর চেয়ে বড় কথা, এতে তাঁর ধান্ধাবাজি ও পেটিস্বার্থের দিকটিও উদোম হয়ে যায়। তবে আমাদের অবজারভেশন বলে, ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান অথবা সরকারি শুভ-দৃষ্টিপ্রাপ্ত থিঙ্কট্যাঙ্কে নিয়োজিত হয়েছেন। খুব সম্ভবত চাকরি শেষের এই নিয়োগের স্বার্থেই তাদের কোন স্বাধীন অবস্থান আমরা দেখি নাই। সারা জীবন দল নির্বিশেষে ‘সরকারি অবস্থানের’ তাবেদারি করতে থাকেন। অতএব এটা পেট সর্বস্ব অবস্থান বলতে পারি, তাই কোন নীতিগত অবস্থানের কোন সুযোগ নাই।

একথা সত্য, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ (State Interest) জিনিসটার গুঢ় দিকটা অনেক সময় মরালিটি দিয়ে গঠিত ও উদ্ভূত হয় না। তাই অনেকের কাছে তা রক্ষা করা কঠিন। এর পরও রাষ্ট্র-সরকারের নীতি-পলিসিগত কিছু ন্যূনতম দিক সেখানে থাকে। চাইলে তা রাখাও সম্ভব; আর তা বজায় রাখতেও হবে যদি নুন্যতম কিছু মৌলিক নীতি নৈতিকতা মেনে চলতে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন। কিন্তু এই মাপকাঠিতে ব্যক্তির, বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়িতদের বেলায় এমন ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে না। সে সুযোগও থাকার কথা নয়।

আবার ‘রাষ্ট্রস্বার্থ’ বলেই তার ক্ষেত্রে সব ছাড়, ব্যাপারটা তেমনও নয়। বাংলাদেশে দিল্লির স্বার্থ আছে, থাকবে। কিন্তু অবশ্যই সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিষয়ক ন্যূনতম কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এরপর সেই স্বার্থ প্রকাশিত হতে  হবে। জাতিসঙ্ঘের বা আন্তর্জাতিক নীতি কনভেনশনের কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার হতে হবে এসবের ভিত্তি। আসলে এমন ভিত্তির ওপর যদি দাঁড়াতে পারি, তবে সেই কারণে আপনাতেই সেখান থেকে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে মন্তব্য করার ভিত্তি ও সাফাই তৈরি হতে পারে। কারণ, উভয় রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের পক্ষের কিছু নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অভিন্নতা, এটাই সেই ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে।

যেমন – “জনগণের ভোট দেয়ার সুযোগ অবাধ হতে হবে”। আর সেই অবাধে দেয়া ভোট থেকেই “একমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতার ম্যান্ডেট প্রাপ্ত” বলে কোন দল বিবেচিত হতে পারে – এটা একটা কমন মুল্যবোধের ভিত্তি হতে পারে। কারণ এই কথাটা কেবল বাংলাদেশের বেলায় নয়, ভারত ত বটেই যেকোন রাষ্ট্রের বেলায়ও সমান ভাবে সত্য। আর এটা যেকোন মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। অতএব এটা হতে পারে  অভিন্ন নৈতিকতা বা মূল্যবোধ। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থ এমনই “দুস্থঃ আর হাভাতে” অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের “ভোট দেয়ার অধিকার”- ন্যূনতম এ দিকটি উপেক্ষা করে হলেও যেকোন উপায়ে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধার করতে হয়! ভারত এমনই দুস্থঃ! এমন জায়গায় পৌঁছে গেছেন ভারতের নীতিনির্ধারক মহল।

গত সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশে আসা আর তাঁর খোলাখুলি হস্তক্ষেপ, এখনও এক রেকর্ড হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, “সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দল নিয়ে” মানে, বিএনপির জোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া এরশাদের সাথে মিটিংয়ে সুজাতা এরশাদকে নির্বাচনে  যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা এরশাদ গণমাধ্যমে প্রকাশও করে দিয়েছিলেন। এরশাদ বলেছিলেন, তাকে ‘পাতানো’ বিরোধী দল হয়ে যেতে বলা হচ্ছে, তা না হলে নাকি ‘বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায়’ এসে যাবে।

আমরা সবাই বিস্ময়ে লক্ষ করেছি সুজাতার সে হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের কোনো বুদ্ধিজীবী, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কেউ কখনো নিন্দা বা সমালোচনা করেননি। নিজেরা লজ্জিত ও বিব্রতও হননি। অন্তত ভারত-সরকারের এই ভূমিকার প্রশ্নে তাদের কোনো ভিন্ন মত আছে, এমনটি দেখা যায়নি। এই হল ভারতের বুদ্ধিজীবীতা!

বাংলাদেশে আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসেছে। আর তাঁরা এই নির্বাচন নিয়ে আবার মন্তব্য করতে এসেছেন। রাষ্ট্র, নির্বাচন, সরকার ইত্যাদি বিষয়ে তারা কী বলবেন? কাকে ভালো, কাকে মন্দ বলবেন? কিসের ভিত্তিতে বলবেন? ভারতের ইন্টেলেক্ট, সাবেক ডিপ্লোম্যাট বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কখনোই যে ভিত্তি তৈরি করা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেননি! এটা তো তাই একধরনের পেটসর্বস্ব বা স্বার্থসর্বস্ব হয়েই আছে সব কিছুতে। এ অবস্থায় এবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”- তখন এই অট্টহাসি দেয়া ছাড়া আর কী করা যায়!  স্বভাবতই এগুলো হাস্যকর ‘অনর্থক কথা’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং হতে থাকবে।

কিন্তু তবু ঘটনার আর এক ভিন্ন সুক্ষ্ম কোণও সম্ভবত আছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমারের এবারের মন্তব্য করতে না চাওয়া – এরও অর্থ আছে অবশ্যই; তাহলে সেটাই বা কী? যে অর্থ না লিখলেও প্রকাশিত হয়ে যায়, সেই অর্থটা কী? এর সোজা অর্থ হল, বাংলাদেশে যা হচ্ছে, এ পর্যন্ত সেটাই ঠিকঠাক; অর্থাৎ যা যা হবে বলে তারা জেনেছে সেটিই ভারতের স্বার্থ ও অবস্থান এর পক্ষেই আছে। দ্বিতীয়ত, এর আর এক অর্থ হল – খুব সম্ভবত ভারত মনে করে এবারের নির্বাচন নিয়ে যদি ভারত প্রকাশ্যে তার “অনুমোদনের কথা” ২০১৪ সালের নির্বাচনের মত প্রকাশ করে ফেলে, তবে সমস্যা হবে। অবশ্যই মূল কারণ এবার বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। যেকোন ভাবে আওয়ামী লীগ আবার জিতেছে এটা দেখতে চাওয়া – এটা তাদের প্রথম চয়েজ বা কাম্য হলেও যদি কোন কারণে প্রধান বিরোধী “জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট” কোনো ‘বিপর্যয়’ ঘটিয়ে ফেলে, তখন কী হবে? এই দুশ্চিন্তা থেকেই সম্ভবত, মূলত তাদের এইসব “অনর্থক কথা” বলে রাখা। এমন অর্থই রবীশ কুমারের ‘না বলা কথা’ প্রকাশ করেছে।

বোঝা যাচ্ছে, ভারত সরকারের মুখপাত্র অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবাই এখনও এমনই কঠিনভাবেই দুস্থ-হাভাতে অবস্থায় আছেন যে, তাদের পক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক ভোটের অধিকার প্রসঙ্গে কোনো নৈতিক অবস্থান নেয়া অসম্ভব। এ কারণেই ভারতের সরকার বা কোনো ইন্টেলেক্টের বিবৃতি-মন্তব্যের কোনো গুরুত্ব তাদের কাছেও নেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “পেটসর্বস্ব বুদ্ধিজীবিতা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

গৌতম দাস

০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2we

 

 

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

শেষ কথাঃ
কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

গৌতম দাস

২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2w6

 

নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং – ফাইল ছবি

আমরা এমন এক দুনিয়ায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলে। শুনতে স্ববিরোধী মনে হলেও কথাটা সত্য। আর তা বোঝার জন্য কথা আরো ভেঙে বলা যেতে পারে। এখন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একই সাথে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলে, এজন্য যে এখন কূটনীতি চলে ইস্যুভিত্তিক। ইস্যুটা কী – আলাদা করে শুধু সেই ইস্যুর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের অবস্থান বা নীতি-পলিসি নিতে হয়। তাই অপর রাষ্ট্রের সাথে একটা ইস্যুতে মিত্রতা বা আপসের একই অবস্থান আছে, অথচ দেখা যাবে হয়ত অন্য ইস্যুতে অপর ঐ রাষ্ট্রের সাথেই শত্রুতা, মানে প্রবল ঝগড়া-দ্বন্দ্বের অবস্থান দাঁড়াতে পারে, দাঁড়াতে হয়। এর অনেক উদাহরণই আছে, তবে এব্যাপারে সম্ভবত সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, চীন-ভারত সম্পর্ক।

ভারত-চীন দুই রাষ্ট্রের নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত বর্তমানে অন্তত চলতি বছরের প্রথম কোয়ার্টার থেকে খুবই নরম ও ঐক্যকামী। কিন্তু এশিয়ার তৃতীয় যে কোনো রাষ্ট্রে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়া দেখা গেলে ভারত এর বিরুদ্ধে চরমতম বিরোধীতায় ততপর। সম্পর্ক-অবস্থান ইস্যুভিত্তিক বলে, ভারত-চীনের এমন খারাপ-ভাল অথবা উত্থান-পতনের সম্পর্কের মাঝেও তাদের এক বড় সফলতা হল য়ুহান সম্মেলন (Wuhan, April 2018)। এটা ছিল যারা ভারত-চীনের ঘনিষ্ঠতায় নিজের স্বার্থহানি দেখেন এমন প্রো-আমেরিকানদের মুখে ছাই দিয়ে, চীন-ভারতের প্রথম কাছাকাছি আসার ভিত্তি তৈরির উদ্যোগে, চীনের য়ুহান শহরে শীর্ষ সম্মেলন।   প্রধান সব রাষ্ট্রের আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির উপর ট্রাম্পের  বাড়তি ট্যারিফ শুল্ক আরোপের যুদ্ধে ভারতকেও তালিকায় যুক্ত করাতে ভারত আমেরিকায় রফতানি বাজার হারানোর পর থেকে এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু। এতে চীন-ভারতের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধে তা পুরা মিটিয়ে না হলেও কমিয়ে আরও কাছাকাছি আসার বিরাট উদ্যোগ ছিল এটা। মোদী চীনের য়ুহান প্রদেশ সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক বিশেষ ধরনের বৈঠকে বসেছিলেন। এই সম্মেলন আর এর প্রবল প্রভাবের কাল ছিল এ বছরেরই গত এপ্রিল-মে মাসজুড়ে।

এটা বিশেষ ধরনের বৈঠক মানে এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে এখানে বলা হয়েছে, এটা ছিল এক “ইনফরমাল সামিট”; মানে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন। অর্থাৎ যে বৈঠকের কথা বিস্তারিত প্রকাশ করতে হবে না। আবার কোনো ইস্যুতে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটি যেহেতু অনানুষ্ঠানিক, তাই এমন বা অমন কথা হয়েছে সে রকম কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড [রেকর্ড অবশ্যই থাকবে কিন্তু তা কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে রেফার/স্বীকার করা হবে না। ] রাখার দায়ও কোনো পক্ষের নেই। এ এক বিরাট সুবিধা। বিশেষ করে ভারতের। কারণ, ভারতে রাজনীতি চর্চার স্টাইল ভোটের সস্তা পপুলিস্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অন্য বিরোধীরা বিদেশে আপোষ করে এসেছে বলে প্রপাগান্ডার নানা অভিযোগ তুলে বসে। আর এই ভয় থাকার কারণে কিছু বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অনেক বিরোধ আর কাটে না।

এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল, পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতের যেকোনো সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ। এই বিচারে য়ুহান সম্মেলনে আলোচনার কাঠামোই এমন ছিল যে, এখানে সেসব সমস্যা নেই। ফলে এই সম্মেলনে চীন-ভারতের বহু বা প্রায় সব ইস্যুতে দুই শীর্ষ নেতা মন খুলে কথা বলেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণ রাখার ভয় ভুলে, না রেখে বা ফরমাল নোট না রেখে। দোভাষী ছাড়া অন্য কোনো সহায়ক ব্যক্তিকেও কোনো পক্ষ সাথে সেখানে রাখেন নাই।

অথচ এখানেই উভয়পক্ষ বহু বিষয়ে বিরোধ মীমাংসার মৌলিক নীতিগত দিক সেটেল করেছেন। যাতে এই মৌলিক নীতিগত দিকের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বহু অমীমাংসিত ইস্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান টানা হতে পারবে। এটি ছিল এই সম্মেলনের বড় সুবিধা।

তবে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি নিয়ে চলার দুনিয়ায় আমরা এসে পৌঁছানোতে কি ব্যাপারটা খারাপ হয়েছে?  না, অবশ্যই নয়। তাহলে খারাপের ধারণা কেন আসছে?  আসলে ‘খারাপ’ হতে পারে এই ধারণাটাই হল – কোল্ড ওয়ার আমলের (১৯৫০-৯১) চিন্তার অভ্যাসে বলা কথা। কারণ, কোল্ড ওয়ার মানেই দুনিয়াকে পরস্পর দুই শত্রুর দু’টি রাষ্ট্রের গ্রুপে – সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা এভাবে দুটো ব্লকে দুনিয়াকে ভাগ করে ফেলা। এটা এমনই ব্লক যে, এখানে শত্রুতা ছাড়া অন্য কিছুর জায়গাই নেই। একেবারে হিন্দু জাতপ্রথার ছোঁয়াছুঁয়ির মত দুই রাষ্ট্রজোটের পরস্পরের সাথে সম্পর্কহীন থাকা আর শত্রুতাই এর একমাত্র বাস্তবতা। তবে আলোচ্য এখানকার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল, কেন এমন সম্পর্কহীনতার দুই ব্লক সেকালে চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল? এর জবাব হল, মুল কারণ যেহেতু দুই ব্লকের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, তাই এটা টিকে ছিল। অর্থনৈতিক বা বিনিময় সম্পর্ক মানে হল – কোনো পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগ এর বিনিময় সম্পর্ক। ফলে এমনকি কোনো ভাব বিনিময় সম্পর্কও সেখানে ছিল না। তাই সম্পর্কহীনতার দুই রাষ্ট্রজোট বা ব্লক চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল।

বিপরীতভাবে বললে, এ কালে সম্পর্কহীনতার এমন কোনো দুই ব্লক থাকা সম্ভব নয়। অথবা ইতিবাচকভাবে বললে, একালেই ‘য়ুহান ইনফরমাল সামিট’ সম্ভব। কেন? এর মূল কারণ দুনিয়ায় এখন আগের সোভিয়েত ব্লকের সকলেসহ সব রাষ্ট্র একই “গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার” – এর নিয়মশৃঙ্খলার অংশ। তাই সবধরণের পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগসহ সব ধরণের বিনিময় সম্পর্ক ওতপ্রতভাবে জড়িত। ভাব-ভাষাও।

পুঁজির জন্ম-স্বভাব হচ্ছে গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবাল থাকা; তাই সে দুনিয়াজুড়েই বিস্তৃত হবে। লোকাল পুঁজি বা কেবল কোন এক ছোট ভুগোলের পুঁজি বলে কিছুই থাকবে না। তাই, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের প্রতিটি কোনায় বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া পুঁজিতান্ত্রিক তৎপরতাগুলো ক্রমেই অপরাপর কোণের ততপরতাগুলো এরা পরস্পরের হাত ধরে ফেলবে, আর ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতরভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাবে। আর এই সম্পর্ক মানে? মনে রাখতে হবে, এটা হল পরস্পরের ওপর পরস্পরের গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক সম্পর্ক। এক গ্লোবাল সমাজ হয়ে উঠা। আবার একই ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার’ – এই সিস্টেম শৃঙ্খলার অংশ বলেই এটা সহজ এবং তা হতে বাধ্য। এই ইতিবাচক দিকটিই চীন-ভারতের চরম স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাতের মধ্যেও “য়ুহান ইনফরমাল সামিট” ঘটিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছিল।

চলতি ২৩-২৪ নভেম্বর ২০১৮, চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার ২১তম বৈঠক শুরু হয়েছে। ২১তম মানে এ ধরনের বৈঠকের শুরু অনেক পুরানা দিনে, সেই ২০০৩ সালে বাজপেয়ির চীন সফর থেকে। চুক্তি বা বুঝাবুঝি অনুসারে এর বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দুই রাষ্ট্রপক্ষের পূর্বঘোষিত স্থায়ী দুই ‘স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ থাকবে। আর তাদের উদ্যোগে ডায়ালগের মাধ্যমেই চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধের সমাধান তারা খুঁজবে। ভারত-চীনের সীমান্তের অনেক জায়গায় উভয়পক্ষের একমতে টানা সীমান্ত বা ‘ডিমারকেটেড’ বা চিহ্নিত নাই। এই অচিহ্নিত সীমান্ত সমস্যা সেই কলোনি আমল থেকে, এটা অমীমাংসিত হয়ে থেকে যাওয়া সমস্যা। সেটাই মিটানোর চেষ্টাই এর উদ্দেশ্য। সে হিসেবে এই বৈঠক এখন রুটিনের মতো হয়ে গেলেও য়ুহান ‘ইনফরমাল সামিট’-এর পরে এর গুরুত্ব এবার অনেক বেশি। কেন?

কোনটা, কত দূর কার সীমানা – সে ব্যাপারে উভয়ের একমত হয়ে এভাবে পুরো চীন-ভারত সীমান্তকে ‘চিহ্নিত সীমানা’ হিসেবে এঁকে ফেলা অবস্থায় পৌঁছানোই ‘এমন বিশেষ বৈঠক’ উদ্যোগে এবারের লক্ষ্য।  এখানে LAC বা ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ বলে উভয় পক্ষের একমতে একটা ধারণা আছে। সেটা হল, এক মতে “সীমানা চিহ্নিত” করে ফেলার আগে এখন সীমান্ত-ভূমি যেখানে যার দখলে যা আছে ও স্থিতাবস্থায় আছে, সেটাকেই উভয়ে “লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি” বলে মানে। যেটাকে আসলে “অস্থায়ী কিন্তু বাস্তব সীমানা’ বলা যায়। এবারের ২১তম আলোচনায় উভয়পক্ষ এখানেই এক নীতিগত জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। তা হল, সীমানা বিরোধ মিটানোর কাজে অগ্রগতি আর কিছু হোক আর না-ই হোক, বর্তমান এলওসি বা “অস্থায়ী বাস্তব সীমানা”- এটাকেই উভয়পক্ষ ‘বেস্ট অপশন’ বা সবচেয়ে ভাল সমাধান বলে মেনে নিবে। [“best option is “as it is; where it is”.] এ বিষয়ে উভয়ের ঘোষিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। এরপর আরও আলোচনা চলবে উভয়ের একমতে এরচেয়েও ভাল সমাধান খুঁজে পেতে।

সুতরাং চীন-ভারতের সীমান্ত আলোচনায় “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” কথাটার বিশেষ মানে আছে। এখানে ভারত-চীন কাকে নিজ নিজ পক্ষের “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” বলে ঘোষণা করে রাখবে – সেটা এপর্যন্ত দেখা অভিজ্ঞতা বলছে এটা চলতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নিরাপত্তা  উপদেষ্টা অথবা চীনের ক্ষেত্রে পলিটব্যুরোর বিশেষ সদস্যকেও হতে দেখা গেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এবার থাকবেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। আর চীনের দিক থেকে ছিলেন  পলিটব্যুরোর এক বিশেষ প্রভাবশালী সদস্য। এবার সভা থেকে তাঁর বদলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই দায়িত্বে পাবেন। আসলে “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” এরা মূলত সীমান্ত ইস্যুতে কথা বলার জন্য হলেও এর একটা স্থায়ী দায়ীত্বের পোস্ট বলে এদের কিছু আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ উভয়পক্ষ বাড়তি ইনফরমালি অনেক মনের কথা বলার সুযোগ ও দায়িত্ব এরা পালন করে থাকে। যেমন এরা এবার চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ”(BRI) [ এতে যোগ দেওয়ার অফার এপর্যন্ত ভারত ফিরিয়ে দিয়ে আসছে ] নিয়েও কিছু কথা বলবেন।  ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে,  “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” অজিত দোভাল এলএসি, বিআরআই এবং অন্যান্য ইস্যুর সাথে নিরাপত্তা নিয়েই কথা বলবেন। [Ajit Doval will discuss security along the Line of Actual Control (LAC), belt and road initiative (BRI) and other issues]।

ভারতের এক প্রাক্তন কূটনীতিক এমকে ভদ্রকুমার। ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান; মানে প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নিতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি হাতেগোনা দু-তিন কূটনীতিকের মধ্যে একজন, যিনি তা নন। উজবেকিস্তান ও তুরস্কে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভদ্রকুমার, যিনি ভারতের ভবিষ্যৎ আমেরিকার মধ্যে দেখেন না। সেই ভদ্রকুমার দেখছেন, চীনের সাথে ভারত তার নানান বিরোধের ইস্যুগুলো মিটাতে এখন প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠতে; একালের চলতি সময়ে মোদির ভারতকে।

অবশ্য শুধু সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার বৈঠক দেখে তিনি এ কথা বলেননি। তিনি আরো এক ইস্যু দেখেছেন। এই ১৩-১৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটা আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ মোট ১৮ রাষ্ট্রের এক সম্মেলন; যার শুরু হয়েছিল আসিয়ান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সাথে অন্যান্য ইস্ট এশিয়ান রাষ্ট্রকে নিয়ে। অর্থাৎ এখন এতে বাড়তি অনেককেই সদস্য করে নিয়েছে।

এবারের এই বৈঠক থেকে চীনের অর্জন অনেক। এখানে চীন-সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপগ্রেড ভাষ্য) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভদ্রকুমার বলছেন,  এতে এই প্রথম “বেল্টরোড উদ্যোগ”ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। [One highlight is the signing on Monday of an upgraded Free Trade Agreement between China and Singapore to include Belt and Road Initiative for the first time.] বলাই বাহুল্য, যারা চীনের ‘বেল্টরোড উদ্যোগে’ অন্তর্ভুক্ত হতে আপত্তি বা দ্বিধা করে থাকে, তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম ছিল। বিশেষ করে যেখানে আবার পশ্চিমের কাছে সিঙ্গাপুর এক বিশেষ অর্থ ও গুরুত্ব বহন করে। যেখানে তারা সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলেছিল ফ্রি-পোর্টসহ পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের এশিয়ান স্টোর/গোডাউন হিসেবে; আর একই সাথে ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ পুঁজির স্থানীয় বা বর্ধিত অফিস হিসেবে। এই হল ফ্রি-পোর্ট সিটির সিঙ্গাপুর; মানে বিনা মাশুলে পুনঃরফতানিযোগ্য করে নিয়ম বানানোর সিঙ্গাপুর। পশ্চিমের সেই সিঙ্গাপুরে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগকে একালে জায়গা করে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, আজকাল খোদ সেই সিঙ্গাপুরও চীনের ওপর কত বিরাট নির্ভরশীল। সেটা কী রকম?

পশ্চিম চীনের সাথে বহু সম্পর্কই করে থাকে সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, সিঙ্গাপুরে অফিস খুলে। যেমন একটা উদাহরণ দেই। আজকাল চীনে উঠতি সম্পদের মালিক যারা, এমন যাদের এক মিলিয়ন ডলার বা এর বেশি অর্থ বাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আছে – এমন এদেরকে বাজারে নিয়ে আসা সহজ করতে সাহায্য করতে, এমন ব্যক্তি ক্লায়েন্টদের ধরতে আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে অফিস খুলেছে। আর সেখান থেকে তাদের রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা চীনে সরাসরি ক্লায়েন্টদের বাসা সফর করছে। ফলে সার কথায় সিঙ্গাপুর আর কেবল পশ্চিমের এক্সটেনডেড দোকান থাকেনি, চীনেরও হয়ে উঠছে। তাহলে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগে নতুন অন্তর্ভুক্তি, সেটা শুধু কি সিঙ্গাপুরই?

না আরো আছে, আরও বড় সে নাম হল খোদ জাপান। কারণ কী? ব্যাপারটা হল, চীনের নতুন এক সিদ্ধান্ত। এমনিতেই চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগ এক বহুরাষ্ট্রীয় (৬৫ রাষ্ট্রেরও বেশি) অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প। ফলে ভুগোলের বিচারে এতে বিনিয়োগ সুযোগের বড় অংশই চীনের বাইরে। চীন ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগের’ অংশ হিসেবে তৃতীয় রাষ্ট্রে চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগে সিঙ্গাপুর বা জাপানকে সংশ্লিষ্ট হতে চীন অফার (Investment in Third Country) দিয়েছে। এতে সিঙ্গাপুরের মত জাপানও প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

ওদিকে সবকিছুর পালটা কিছু থাকে। তাই, এশিয়ায় চীনের ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’-এর পাল্টা আমেরিকান নেতৃত্বের যে উদ্যোগ আছে, সেটি মূলত “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি” নামে হাজির আছে। আর এর সহযোগী উদ্যোগ হল “কোয়াড”(QUAD) , মানে চীনবিরোধী ‘আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া’ এই চারদেশীয় জোট। কিন্তু কখনই এই চার দেশ একসাথে একমতে খাড়া হতে পারেনি। কমন ভাষায় একটা বিবৃতি দিতে পারে নাই। এর মূল কারণ, এরা সবাই চীনের সাথে নানান ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িয়ে আছে আবার একই সাথে অন্যন্য স্বার্থবিরোধে জড়িয়ে থাকার কারণে আমেরিকার সাথে এক কমন প্লাটফর্মে আসতে চেয়েছে কিন্তু বড় কিছু করে দেখাতে অসফল। ফলে সব সময়ই দেখা গেছে এই চারের কেউ একজন চীনের সাথে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাবল্য অনুভব করে বাকিদের সাথে থাকেনি।

‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’ চীনের সাথে তৃতীয় রাষ্ট্রে যৌথ বিনিয়োগের অফার পাওয়া জাপান, তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝাতে ভদ্রকুমার কিছু ঘটনা টেনেছেন। তাঁকে এক জাপানি কূটনীতিক বলছেন, “আমাদের কিছু আসিয়ান সদস্য বেল্ট-রোড উদ্যোগের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে তুলনা করতে পছন্দ করছে না”। [“Some ASEAN members didn’t like the idea of having to make a choice between an Indo-Pacific strategy and the Belt and Road Initiative]।  ফলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে এরপর “ইন্দো-প্যাসিফিক” শব্দটি বলা বন্ধ করেছেন। তা না বলে এর বদলে বলছেন “ভিশন”। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাপানি কর্মকর্তা বলছেন, আসলে “স্ট্র্যাটেজি শব্দটির মধ্যে অন্য রাষ্ট্রকে পরাজিত করানোর একটা অর্থ লেপটে আছে, সে কারণেই এই পরিবর্তন”। অর্থাৎ জাপানও কোয়াড থেকে নিজেকে দূরে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ছাড়া ছাড়াভাবে চলা কোয়াডের যুগ্মসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকে ভারত যোগ দিচ্ছে। সেই রেফারেন্স তুলে ভদ্রকুমার বলছেন, জাপান ভারতকে পেছনে ফেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেল। এভাবে এশিয়া-প্যাসিফিকের ভূকৌশলগত অবস্থা পরিস্থিতিই বদলে যাচ্ছে। আর মোদির ভারত এতে বিরাট কিছু সুবিধা হারাচ্ছে, অথচ নিজ অবকাঠামোগত সুবিধা পাওয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

শেষ কথাঃ
শেষ বিচারে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক গন্তব্য-অভিমুখ হল তাদেরকে পরস্পর ঘনিষ্ট হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে হাত ধরে উঠে দাঁড়ানো। আমেরিকা দুনিয়ার অতীত, যেখানে চীন আগামি। ভারতকেও আগামির অংশ হওয়ার খাতিরে খাবলা-সুবিধা নেয়া ত্যাগ করে স্থির-পক্ষ নিতে হবে। কিন্তু মায়ের দুষ্ট ছেলের মত প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে ভারত প্রায়ই টেবিল ছেড়ে চলে যায়; যার অনিরাপদবোধও আছে। এসবের মানে আবার এই না যে চীনের সিদ্ধান্ত বা অবস্থান সবসময় ফেয়ার বা বেস্ট হয় বা থাকে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন-ভারতের শত্রুতা ও মিত্রতা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]