কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

গৌতম দাস

১৭ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Bb

 

 

ARTICLE 356, The Colonial Legacy & the deep Love to Colonial Power of NEHRU &…

রিভিউ বা ফিরে দেখা মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। জওহরলাল নেহেরু কেবল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ১৯৪৭ সালের আগষ্টে স্বাধীন দুই রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তানের জন্মের সময়ের রাজনীতির এক মুখ্য চরিত্র। ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক থেকে বহু ঘটনার নির্ধারক নির্ণায়ক ছিলেন তিনি। আমাদের রাজনীতির বহুকিছুর হাল ‘এমন বা ওমন’ কেন এর জবাব পেতে আমাদেরকে বারবার সেসব পুরান দিনের ঘটনা রিভিউ বা ফিরে দেখায় যেতে হয়। সেকাজে বলাই বাহুল্য নেহেরু এক বড় চরিত্র হয়ে হাজির থাকে।

সেখানে বহুবার আমরা দেখেছি, নেহেরুর চিন্তায় “গণপ্রজাতন্ত্রী” রাষ্ট্র ও ক্ষমতা  এই ধারণাটা যতটা না ‘মর্ডান রিপাবলিক’ প্রসুত তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেকে কলোনিয়াল মাস্টার মনে করা প্রসুত।  বারবার তিনি উপনিবেশ বা কলোনিয়াল সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ধারণা দিয়ে আপ্লুত হয়ে থেকেছেন, তা দেখতে পাই। যেমন নেপাল বা ভুটানের সাথে, ১৯৪৭ সালের পরবর্তি স্বাধীন ভারতের তথাকথিত ‘শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তির’ ধারাগুলোতে আমরা তা দেখতে পাই। অথচ ভারত তখন ইতোমধ্যেই এক স্বাধীন রিপাবলিক হওয়া সত্বেও নেপাল বা ভুটানের ভারতের সাথে চুক্তিতে নেহেরু একাজ পুরাটাই করেছেন আগের কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার সাথে নেপাল বা ভুটানের যে চুক্তি ছিল ওর ধারাগুলোই কপি করে; যেন স্বাধীন ভারত পুরান বৃটিশের জায়গায় এক নতুন “কলোনিয়াল পাওয়ার” হয়ে হাজির। অর্থাৎ কলোনি-শাসনমুক্ত হয়ে যাবার পরেও স্বাধীন “গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তখনও নিজেকে বৃটিশ জুতা পায়ে গলানো এক “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবছেন।  একালের ভারত বিশেষ করে চলতি মোদীকে ব্যাখ্যা করতে পারতে হলে, নেহেরুকেও বুঝতে হবে। আর তাতে সক্ষম হতে গেলে নেহেরুর এই বিশেষ বৈশিষ্ট পাঠ করতে পারতে হবে। আগা-পাছ-তলা এই নেহেরু আসলে কলোনিয়াল ধরণের সম্পর্ক ও ক্ষমতা প্রতি  প্রবল লোভ এবং চিন্তার ঝোঁকের এক নেহেরু; তাতে তিনি এটা “গণপ্রজাতন্ত্রী” ভারত গড়তেছেন বলে যত চিল্লাই দিয়ে থাকেন না কেন!

ভারত রাষ্ট্রগঠন বা ওর কনষ্টিটিউশন রচনাকালে, ওর বিভিন্ন আর্টিকেল বা ধারায় – নেহেরু এবং তাঁর চিন্তার বন্ধুদের নিজেদেরকে এমন “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবনা-চিন্তার ছাপ অনেক স্তরেই পাওয়া যাবে। তেমনই গভীর ছাপ ফেলা এক  বিতর্কিত আর্টিকেল হল ৩৫৬; যা কোন নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ভেঙ্গে দিয়ে ঐ রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ক্ষমতা সংক্রান্ত।

গত মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। প্রথম কথা হল, হ্যাঁ বিপদে তো তিনি আছেনই; তার কপালে শনি লেগেছে – লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ যেদিন হয়েছে সে দিন থেকেই। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৫৬ হল অদ্ভুত এক আর্টিকেল,  এটাই আপাতত মমতার সেই “শনির বিপদের” নাম। এটা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়ে মোদির কেন্দ্রীয় সরকার ছলে-বলে-কৌশলে চাইলে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। কনস্টিটিউশন অনুসারে এটাই “রাষ্ট্রপতির শাসন”।

ভারতে রাজ্য মানে, সেখানেও নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ ও সরকার আছে। যারা স্বতন্ত্র টাক্স আরোপ করতে পারে  এবং কনষ্টিটিউশনে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া যেসব বিষয় আছে ওর তদারকি করা ও যেসব সার্ভিস জনগণকে দেয়ার আছে , আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ইতাদি এসবই তার কাজের এক্তিয়ার। এছাড়া শহুরে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা মিউনিসিপাল্টি ব্যবস্থাও আছে। এখন প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের কোন অভিযোগ থাকলে এর প্রতিকার পেতে প্রত্যেক রাজ্যেই সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে হাইকোর্ট – সেখানে কেউ নালিশ দিতে পারে। এছাড়া মিছিল মিটিং প্রতিবাদ দিয়ে প্রতিকার দাবি সে তো আছেই। আরও সর্বোচ্চ তবে পরোক্ষ এক পদক্ষেপ হল, নিয়মিত বিরতিতে পরের নির্বাচনে প্রার্থী বা তার দলকে ভোট না দিয়ে শাস্তি দেয়া – সে সুযোগ তো আছে।

কিন্তু এসব সত্বেও আর্টিকেল ৩৫৬ তে রাষ্ট্রপতিকে রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েমের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।এখানে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির এই ভুমিকা কার্যত ব্যবহার ও প্রয়োগ হবে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার মাধ্যমে। যদিও রাষ্ট্রপতির নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ হবে তার প্রতিনিধি রাজ্যপালের মাধ্যমে কিন্তু তা আবার কাজ করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে। তাই সোজা সাপ্টা বললে, এটা রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে এর উপর কেন্দ্রীয় সরকারের দখল নেয়া।

তবে এই আর্টিকেলে এখন কিছু সংশোধনী আনার পর, ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় সংসদে অনুমোদন করিয়ে আনতে হয়। অর্থাৎ এই আর্টিকেল অনুসারে মোদীর সরকার মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দিতে পারে।  আর এখন কেন্দ্রীয় সংসদে মোদীর নিজ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এই চর্চা ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের, নেহরুর আমল থেকেই এভাবে চলে আসছে। দেখা গিয়েছে যখনই মোদী-মমতার মত রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার একই দলের থাকে না, তখনই এই অসুস্থ চর্চা শুরু হতে দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে ভারতে কনষ্টিটিউশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত মোট ১১৫ বার এভাবে এই আইন প্রয়োগ করে নানান রাজ্যে সরকার ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ১৯৭৫-৭৯ সালের মধ্যে ২১ বার, আর ১৯৮০-৮৭ সালের মধ্যে ১৮ বার। এর বেশির ভাগটাই নেহেরু বা কংগ্রেস ব্যবহার করেছে। যেটা এখন করছে বিজেপির মোদী।

একবার ক্ষমতা নিলে পরে এটা ছয়মাস করে করে বাড়িয়ে তিন বছর পর্যন্ত রাখা যায়। যদিও পাঞ্জাবে এরচেয়েও বেশি বছর প্রয়োগের “বিশেষ” উদাহরণ আছে। এতে কেন্দ্রের সরকারি দলের আসল সুবিধাটা হল, একবার বিরোধী রাজ্য সরকার ও প্রাদেশিক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল রাজ্যে নিজস্ব এক অনির্বাচিত সরকার কায়েম করে নিতে পারে। আর পরবর্তিতে ঐ তিনবছর সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে্র রাজনৈতিক দল  নিজ ‘সুবিধাজনক’ সময়ে – মানে রাজ্যে যখন নির্বাচন দিলে নিজে জিতে আসবে বলে আস্থা পায় – তখন নির্বাচন করিয়ে নিজ দলের রাজ্যসরকার কায়েমের সবচেয়ে সহজ উপায় হয় এটা। তাই, সদ্য লোকসভা নির্বাচন শেষে ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০ মে সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অজুহাত তৈরি করছে বিজেপি!”।

কিন্তু ভারতের কনস্টিটিউশনে কেন এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, এর পক্ষে যুক্তি কী? যেখানে আমেরিকায় এর কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট  ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কোন একটায় ক্ষমতা দখল করেছেন, এটা কেউ কল্পনাও করে না। কিন্তু ভারতে ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ জারি খুব কমন অভ্যাস বা চর্চা। এককথায় বললে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ একটা ব্যাপক ‘অপব্যবহারযোগ্য’ এক দাগী-ক্ষমতা।

প্রথমত এই আর্টিকেল-৩৫৬ ভারতের কনস্টিটিউশনে এল কীভাবে? গত ২০০১ সালে আর্টিকেল-৩৫৬ নিয়ে – বিচারক ও একাদেমিকদের  সমন্বয়ে এক ‘রিভিউ কমিশন’ বসেছিল। ঐ স্টাডির শেষে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আদৌও আর্টিকেল-৩৫৬ একটা মর্ডান রিপাবলিকের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ পুর্ণ কী না, ফলে ভারতের কনষ্টিটিউশনে এই আর্টিকেল থাকতে পারে না – অতএব বাতিলের সুপারিশ – এসব প্রশ্নের দিকে তারা যান নাই। [আইন পেশায় একাদেমিক আগ্রহ যাদের তারা এই রিভিউ রিপোর্ট এখানে পেতে পারেন।]  তবে ঐ রিভিউ রিপোর্টে এক জব্বর স্বীকারোক্তি আছে – এই আর্টিকেল-৩৫৬ কেন, কীভাবে এসেছিল সেই জন্ম ইতিহাস প্রসঙ্গে।

সোজা কথাটা হল বৃটিশ-ভারতে বৃটিশেরা ভারতের ঠিক নাগরিক নয় বরং ছিল এক “কলোনি দখলদার শক্তি”। আর কিভাবে বৃটিশ-ভারতকে তারা শাসন করা হবে এনিয়ে ই্ংল্যান্ডের বৃটিশ সরকার অধ্যদেশ জারি করত – সাধারণভাবে এটা “ভারত শাসন আইন [Govt of India Act] নামে পরিচিত, যা বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এটার প্রথম ভাষ্য শুরু হয়েছিল “Govt of India Act 1858” দিয়ে। আর অনেকবার সংশোধিত হবার পর শেষেরটা সম্ভবত “Govt of India Act 1935″। এই শেষের (১৯৩৫ সালের) সংশোধনীতেই তারা প্রথম ভারতীয় নেটিভ নিজেরা বড়জোর নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার গড়তে পারবে, এই অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তব কথাটা হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন ভারত-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এর পটভুমিতে দাঁড়িয়ে দেখলে Govt of India Act মূলত এক দাগী কালো আইন। কারণ এই আইন দিয়ে বৃটিশেরা বৃটিশ-ইন্ডিয়া চালালেও, এই শাসকেরা আসলে তো “কলোনি দখলদার শক্তি”। ফলে অবৈধ। ভারতের নাগরিকেরা তাদেরকে শাসন ক্ষমতার কোন অনুমতি দেয় নাই। ক্ষমতা বৃটিশেরা জবরদস্তিতে নিয়েছে। তাই এই ক্ষমতা অবৈধ।

এখন, এই অবৈধ ক্ষমতা জানত যে সে অবৈধ, বাপ-মায়ের ঠিকানা নাই, ভারতীয় নাগরিকেরা কখনও তাকে শাসন ক্ষমতা দেয় নাই। তাই ১৯৩৫ সালের সংশোধনিতে কেবল তিন প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগগুলোতে, তাই সেই সুত্রে  প্রথম বাংলা প্রেসিডেন্সিতে, ভোটে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাদেশিক পর্যায়ে এভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে দিয়ে বৃটিশ শাসকেরা না কোন বিপদে পড়ে এই ভয়ও তাদের মনে উদয় হয়েছিল। কারণ, এই সরকার প্রাদেশিক হলেও কখনও যদি কলোনি দখলদার শক্তি খোদ বৃটিশ কর্তৃত্বকে মানতে অস্বীকার করে বসে – তাহলে কী হবে? অতএব সম্ভাব্য সেটা ঠেকাতে, নিজেরা আশঙ্কা মুক্ত হতে বৃটিশ ভাইসরয়-এর হাতে এক নতুন আইনি ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার নির্বাচিত হলেও তিনি যেকোন সময় নির্বাচিত ঐ সরকার ভেঙ্গে দিতে পারবেন। Govt of India Act 1935 এর আইনে এটাই ৯৩ ধারা।

শুরুতে বলেছি নেহেরু আর তার বন্ধুরা  কলোনিয়াল “দাগী ক্ষমতা” খুবই পছন্দ করত, বৃটিশেরা কলোনি ত্যাগ করে চলে গেলেও এরা নিজেদের  “ভাইসরয়” ভাবতে চাইত। তাই তাঁরা Govt of India Act 1935 এই আইনের ৯৩ ধারাটাকে ভারতের নতুন কনষ্টিটিউশনে কপি করে তুলে এনে ঢুকিয়ে ফেলেছিল। এটাই নতুন নামে, আর্টিকেল ৩৫৬। আমাদেরকে পরিস্কার থাকতে হবে আগের ৯৩ ধারা ছিল কলোনি দখলদার শক্তির পক্ষে শাসিত নেটিভেরা যেন স্বাধীন হয়ে যায় তা ঠেকানোর জন্য তাদের উপর বৃটিশদের অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন। অথচ ১৯৪৯ সালের ভারত সে তো তখন স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্র। তাই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক কোন কলোনি দখলদার শক্তির, ক্ষমতা-সম্পর্ক আর নয়। কিন্তু তবু আমাদের নেহেরু ও অম্বেদকারের মত তাঁর বন্ধুদের কলোনিক্ষমতার প্রতি প্রীতিভালবাদা ও লোভ এতই তীব্র যে পুরানা অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন স্বাধীন ভারত রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে ঢুকিয়ে রেখেছেন অবলীলায়। ঐ রিভিউ রিপোর্টে তাই সোজা স্বীকার ও ছোটখাট কিছু বর্ণনা দিয়ে লিখেছে, “Article 356 is inspired by sections 93 of the Government of India Act, 1935অর্থাত এর সোজাসাপ্টা মানে দাঁড়াল, নেহেরু ও অম্বেদকারেরা কলোনি শাসন ক্ষমতার অনুরাগী ছিলেন। ভারতীয় নাগরিকদের সাথে তাঁরা নিজেদের সম্পর্ককে তারা তাহলে নিজেরা “কলোনি দখলদার শক্তি” ভেবে নিয়েছিলেন। তাই একটা “কলোনি শাসিত রাষ্ট্র” আর একটা “স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র” এদুইয়ের কোন ফারাক তারা দেখতে পান নাই, ফারাক করেন নাই। স্বাধীন রিপাবলিক ভারতে অবলীলায় আর্টিকেল ৩৫৬ ঢুকিয়ে রেখেছেন। যে আর্টিকেল কেন্দ্রীয় সরকার যেকোন রাজ্য সরকারকে উলটে দিতে পারে এই “উপনিবেশী ক্ষমতা” জারি রেখেছে।

এখানে মজার দিক হল, রাষ্ট্রপতি কী অজুহাতে রাজ্য সরকার ভাঙতে পারবেন – সেই ভাষাটাই দখলদারের ভাষা। এর সাধারণ লক্ষণ হল, এই ক্ষমতা প্রয়োগের অজুহাতের কথাগুলো দেখা যাবে অস্পষ্ট, আবছা রেখে দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন আর্টিকেল-৩৫৬ তে বলা হয়েছে, রাজ্যে “সরকার চালাতে পারেনি” বা “সরকার কনষ্টিটিউশন অনুসারে পরিচালিত হয়নি” বলে রাষ্ট্রপতির মনে হলেই হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কী দেখতে পেলে রাষ্ট্রপতি এমন মনে করবেন তা উহ্য রেখে দেখা হয়েছে। এভাবে ‘আবছা’ রেখে দেয়াতেই ইচ্ছামতো রাষ্ট্রপতির (কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের) পদক্ষেপকে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়া থাকছে। বলা হয়ে থাকে নেহরু রাজ্য সরকারগুলোকে নিজের, মানে কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতেই’ এভাবে বৃটিশ শাসকের মত ক্ষমতা পেতে আর্টিকেল-৩৫৬ লিখিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই ভারতে ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে, এর এক অন্যতম উৎস হয়ে আছে আর্টিকেল-৩৫৬।

নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা বা ডিফাইন্ড (defined) পাওয়ার
রিপাবলিক মানে, রাজতন্ত্র অথবা কলোনি দখলি শাসনের বিপরীতে এক উপযুক্ত বিকল্প ধারণা। কলোনি দখলদারি ক্ষমতার বিপরীতে এক ‘গণসম্মতির’ ক্ষমতা। রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের সময়  অভিজ্ঞতালব্ধ একটা গভীর মৌলিক ধারণা মেনে চলা হয়ে থাকে। তা হল – যে কোন ক্ষমতাকে অবশ্যই “ডিফাইন” করে রাখা ক্ষমতা হতে হবে। তা না হলে এটা দাগী ডাকাতের মত “দাগী ক্ষমতা” বা ‘ডেসপটিক পাওয়ার’ [Despotic Power] তৈরি করবে বা হাজির হবে। তাই ডিফাইন করা বলতে এখানে বুঝতে হবে – কোন ক্ষমতার উৎস কী, ক্ষমতা কে তাকে দিল  মানে কোথা থেকে পেয়েছে [how the power is drawn], অথবা কিভাবে এই ক্ষমতা হাজির হয়েছে – তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথেষ্ট বর্ণনায় পরিস্কার করে রাখা হতে হবে। নাগরিকদের যে সম্মিলিত ক্ষমতা আছে তা থেকে উৎসারিত এক গণসম্মতি প্রকাশিত হলে; এভাবে তৈরি হওয়া ক্ষমতা কাউকে অনুমোদন দিলে, সেটাই “গণসম্মতির ক্ষমতা”। এটা ডিফাইনড ক্ষমতা। নিজ ক্ষমতার উৎস নিজেই স্পষ্ট বয়ান করতে পারে এমন ক্ষমতা। এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্র ক্ষমতা।

আর্টিকেল-৩৫৪-এর অস্পষ্টতার দিক হল – কী হলে বা কী দেখলে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন, ওই রাজ্য সেখানকার “সরকার চালাতে পারেনি”? বলা হয়েছে, [……government of the State cannot be carried on in accordance with he provisions of this Constitution]। কিন্তু মানা যে হয়নি তা কী দেখে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন তা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নাই। এ পর্যন্ত এই আর্টিকেল ব্যবহার করে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন অজুহাত দেখা গেছে – “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি”। কিন্তু কী দেখিয়ে বুঝা বা বুঝানো হয়েছে যে, কোনো “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” ঘটেছে? সাধারণত এর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, শহরে কোনো দাঙ্গা হয়েছে কি না অথবা তাতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই ফিগার। এই সেই কমন অজুহাত। এটা আবছা রাখা হয়েছিল কারণ বৃটিশ কলোনি শাসকদের তো এমনটাই দরকার যাতে যেকোন অজুহাত তুলে নিজেদের অবৈধ ক্ষ্মতার নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা যায়।

এজন্য এই আর্টিকেলের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, যদি কোনো রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ বলে দাবি ওঠে তবে তা যাচাইয়ের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো লিগ্যাল বডি বা কনস্টিটিউশনাল আদালতকে দিয়ে তা যাচাই, এমন কোন সুযোগ ৩৫৪ আর্টিকেলে রাখা নাই। অর্থাৎ জুডিশিয়াল যাচাই না, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কেবল নিজে “মনে করলেই” হবে, ফলে দেখাই যাচ্ছে এটা অবাধ এক খেয়ালি – আন-ডিফাইনড [un-defined] ক্ষমতা। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, যা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা – এই দলীয় ক্ষমতার (মোদী) তার বিরোধী (মমতা) রাজনীতিকে দমনের এমন সুযোগ ছেড়ে দেয়ার কারণই নেই। তাই স্বাধীন ভারতের জন্মের পর থেকে এটা অপব্যবহার করে গেছে কংগ্রেস আর এখন তা মোদীর হাতে এসেছে।

এদিকে ভারতীয় মনও এই অপব্যবহার দেখতে এতই অভ্যস্ত যে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছিল, কবে পশ্চিমবঙ্গে কোথায় দাঙ্গা লাগানো হছে বা হয় কি না। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের পরে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসনের এক কমন প্রয়াস দেখা যায়, নির্বাচনকালে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও জন-বিভক্তিগুলোকে এবার বিদায় দেয়া। কিন্তু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এটা ছিল অনুপস্থিত। মূল কারণ, মোদী-অমিত অস্থির হয়ে মুখিয়ে আছেন মমতাকে এখনই সরিয়ে কীভাবে রাজ্য সরকার দখল করা যায়; অথচ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে।

‘সন্দেশখালি’ ইস্যু
রাজ্যে “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” হয়ে গেছে অথবা সরকার “রাজ্য চালাতে পারছে না” – এই অজুহাত তুলে “রাষ্ট্রপতির তা মনে হওয়ানোর” রাজনীতি চলছে এখন পশ্চিমবঙ্গে। লোকসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এভাবে অজুহাত তুলার যে মঞ্চ প্রথম তৈরি করা হয়েছিল এমন মোক্ষম কেস হল – “সন্দেশখালি” ইস্যু। উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার এক এলাকার নাম সন্দেশখালি। সেখানে তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলাজনিত সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য, ঘটনার পরস্পরবিরোধী বয়ান আমরা এখানে পাবো। এছাড়া এখানে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, এই ফিগার যেহেতু রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের সাফাইয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর – তাই ওই দাবি বেড়ে পরে হয়েছে আটজন। এর ওপর আবার বিজেপির নিখোঁজ বলে  দাবি ১৮ জন পর্যন্ত উঠেছে।

হামলার ঘটনার সেই সন্ধ্যাতেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কাছে কলকাতার বিজেপি নেতারা সরাসরি রিপোর্ট করেছেন, সেকথা টুইটও করেছেন। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতিরা যেভাবে অপেক্ষা করেছেন, সেভাবেই এবারের অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতিও কলকাতার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে রিপোর্ট চাইলে তিনি দিল্লি গিয়ে রিপোর্ট পেশ করেন এবং মোদী-অমিতের সাথে দেখা করেছেন।

মৃত্যুর ফিগার যথেষ্ট বড় নয়
তবে খুব সম্ভবত ঘটনা শুনেবুঝে বিজেপির মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য মৃত্যুর এই ফিগার যথেষ্ট নয়। এছাড়া শুরু থেকেই সমস্যা হল, বিজেপির এখনকার ম্যাজিক্যাল নেতা মুকুল রায়, হামলার সন্ধ্যাতেই নিজ টুইটে সংখ্যা বলে ফেলেছিলেন মাত্র তিনজন, [3 BJP workers shot dead……]। এ ছাড়া তৃণমূলের ক’জন মারা গেছে সেই সংখ্যা তিনি উল্লেখ করতে পারছেন না। ওদিকে রাজ্যপাল দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর মিডিয়ায় “রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে দিল্লির আপাত নেতি” অবস্থানের ধারণা দিয়েছিলেন। ১১ জুন আনন্দবাজার লিখেছে, প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল কেশরী বলেছিলেন, “এটি (৩৫৬ ধারা জারি) আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না”। কিন্তু পরে একটি বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “(৩৫৬ ধারা জারি) হতেও পারে। যখন দাবি উঠবে, তখন কেন্দ্র তা ভেবে দেখবে”।

ওদিকে মৃত্যুর ফিগার নিয়ে ঝগড়াটা ‘ন্যাংটা’ হতে চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেন, তিনি “নির্বাচনোত্তর হিংসায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে অমিত শাহকে জানিয়েছেন। অথচ মমতার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোকসভা ভোটের পর দিনহাটা, নিমতা, সন্দেশখালি, হাবড়া ও আরামবাগে পাঁচজন তৃণমূল কর্মী এবং সন্দেশখালিতে দু’জন বিজেপি কর্মী মারা গেছেন। তাই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, “নিয়মমাফিক রাজ্যসরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই রাজ্যপালের রিপোর্ট পাঠানোর কথা। কিন্তু এখানে বিজেপির দেয়া সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে”। তাই ঘটনার সারাংশ হল, সন্দেশখালি যথেষ্ট নয়, আরো ইস্যু লাগবে। ফলে  দ্বিতীয় ইস্যুতে চেষ্টা, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাফাইটা এবার শক্তভাবে পাওয়া যায়।

হাসপাতাল ইস্যু
দ্বিতীয় ইস্যুকে আমরা “হাসপাতাল ইস্যু” বলতে পারি। এটা আপাতত অনেক ছোট ইস্যু, কিন্তু বিরাট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনা আমাদেরও খুবই পরিচিত। কলকাতার (রাজ্য পরিচালিত) প্রাচীন সরকারি হাসপাতাল – নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানে “ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্য” হয়েছে – এজাতীয় উত্তেজনায় ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়া, তা থেকে ডাক্তারদের ধর্মঘট – এই হল মোটাদাগে বলা কাহিনীটা। ঘটনা ছিল আসলে আরো ছোট। এক রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের পরামর্শে রোগীর আত্মীয় কোন সিনিয়র ডাক্তার খুঁজে আনতে বের হন। কিন্তু কয়েকজনকে অনুরোধ করে, অপমানিত হয়েও  আনতে না পেরে শেষে একজন সিনিয়রকে একটু জোরাজুরি করে কব্জিতে ধরে তাকে আনেন। এই হলো “মূল অপরাধ”। ইতোমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে লাশ আনতে গেলে এবার ডাক্তারেরা “ক্ষমা না চাইলে লাশ দেয়া হবে না” বলে জানিয়ে দেন।

এটা আনন্দবাজারের রিপোর্ট। উত্তেজনা-মারামারি যা কিছু তা কিন্তু কেবল এরপর থেকে শুরু হয়েছিল। রোগীর বাড়ি হাসপাতাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। তাই ট্রাকে করে লোক জড়ো করে তাঁরা এবার ফিরে আসে। এসে সামনে পড়া দুই জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে আত্মীয়েরা মৃতরোগীর লাশ নিয়ে ফেরত যায়। আর ঐ হামলায় ডাক্তারদের একজনের আঘাত একটু গুরুতর ছিল, তবে এখন তিনি বিপদমুক্ত, তাই হাসপাতালের সাধারণ বেডে আছেন। আর ঞ্ছোট বড় ডাক্তাররা সবাই ধর্মঘটে। কিন্তু সময়টা ‘রাষ্ট্রপতির শাসন জারি’ করার ইস্যু খোঁজার অনুকূল; তাই এখন ‘বিরাট’ ঘটনা বানাতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ধর্মঘট ডেকে দেওয়া পর্যন্ত বিজেপি ঘটনা গড়িয়ে নিতে পেরেছে।

এসব ক্ষেত্রে  ডাক্তারেরা বা আমাদের পাবলিক মাইন্ডসহ সবাই – ঘটনাকে দেখে থাকে সাধারণত এভাবে যে, ঘটনার জন্য ‘সরকার দায়ী ’ – ঠিক তা নয়, তবে কেন সরকার মধ্যস্থতা করে বা পদক্ষেপ নিয়ে ইস্যুটা তাড়াতাড়ি মেটাচ্ছে না?  কিন্তু “হাসপাতাল ইস্যুতে” ঘটনা এখানে উল্টা। ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দায়ী করছেন। তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের  শিরোনাম “মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলুন, এই ঘটনা আর ঘটবে না, দাবি চিকিৎসক মহলের”। আসলে এই দাবি দেখে বুঝা যাচ্ছে ডাক্তারেরা কত গভীরে বিজেপির কব্জায় চলে গেছে। বিজেপির টার্গেট মমতার বেইজ্জতি, ইমেজ নষ্ট। আর সম্ভব হলে ঘটনাকে পাকিয়ে উঠাতে পারলে, এটাকেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ইস্যু করা।  কিন্তু ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী বা অপমান করতে হবে –  বিজেপির এমন ইচ্ছা, এদিকে যেতে পারল কেন? আর সবাই জানে বাস্তবত “এমন ঘটনা আর ঘটতেই পারবে না” এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারবে না। তবে যাতে না ঘটে এই লক্ষ্যে সিরিয়াস হয়ে কাজ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী – এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তেজনা মিটানোর দিকে ঘটনা গেল না কেন?

মৃত রোগী ছিলেন মুসলমান, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আর যারা এসে মাথা ফাটিয়ে লাশ মুক্ত করে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, এদের এই একশনকে নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে একটা বিরূপ কানে-কানে বলাবলি করে এক প্রচার [whispering campaign] হয়েছিল যে, “দেখেছিস, মুসলমানদের কত্ত বড় সাহস!”। “এদের খুব বাড় বেড়েছে” – এধরণের। তবে এঘটনার বহু আগে থেকেই সাধারণভাবে “মুসলমানদের আশকারা” দেয়ার জন্য গত কয়েক বছর ধরে মমতাকে দায়ী করে থাকেন তার সব বিরোধী। কলকাতা বিজেপির ফেসবুক পেজগুলো এই ভাষ্যে ভর্তি থাকতে দেখা যায়। কলকাতাজুড়ে এর মূল প্রকাশ্য ক্যাম্পেইন করে থাকে বিজেপি। আর তৃণমূলবিরোধী সিপিএমসহ বাকি অন্যান্য বেশির ভাগ সব ব্যক্তি ও দল এর প্রতি প্রকাশ্য বা মৌন সমর্থন দিয়ে থাকে। ঠিক একারণের ডাক্তারেরা দাবি করছেন মমতাকেই [মূলত মুসলমানদের সাহস বা বাড় বাড়ানোর পক্ষে তিনি নেপথ্য ব্যক্তিত্ব বলে] মাফ চাইতে হবে। যেমন এই কথাটাই আর একটু নেপথ্যে রেখে হাসপাতালের পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় [মুসলমান শব্দ উচ্চারণ না করে]  বলছেন, “জুলুমবাজদের ক্ষেপিয়ে তোলা” এবং “লেলিয়ে দেওয়া” বন্ধ হবে কবে? কিন্তু তিনি কে কাকে লেলিয়ে দিবার কথা বলছেন? বলতে চাইছেন, মমতা মুসলমানদেরকে লেলিয়ে দিয়েছেন।

মমতা মুসলমানদের “সাহস” “বাড় বাড়ানো” আশকারা দেয়া ইত্যাদি করেছেন কী না – এসব খুবই ঘৃণাবিদ্বেষী ও অরাজনৈতিক বক্তব্য। মমতা কী মুসলমানেরা মুসলমান হন আর যাই হন তিনি কী কিছু নাগরিককে যারা মারজিনাল কোনায় হয়ে পড়েছিল তাদের অধিকার ফিরে পেতে সাহায্য করেছেন? আর সেটা কী কোন নতুন বৈষম্য করে, অন্যদের অধিকার কেড়ে নিয়ে? বা, বেআইনিভাবে? এগুলোই একমাত্র হতে পারে মমতার পদক্ষেপগুলোকে বিচার করার নির্ণায়ক? কিন্তু বিজেপি তা করছে না। তাদের অভিযোগ হল মুসলমানেরা সমাজে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? কেউ কম বা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এটা অরাজনৈতিক বক্তব্য। বিজেপিকে বলতে পারতে হবে এটা মমতার পদক্ষেপ কেন বেআইনি? তা কি কোন অধিকার বৈষম্যের? কিভাবে? সবচেয়ে অধপতিত বিষয় হল, সিপিএম বা কংগ্রেসও বিজেপির উস্কানিতে মৌন বা প্রকাশ্য সমর্থন দিচ্ছে। একই অরাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। মমতার কোন পদক্ষেপ – মুসলমানদের কোনায় ফেলে রাখা থেকে বের করে আনা কী অন্য কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া? হলে কিভাবে? যদি তাই হয়ও তা নিয়ে হাইকোর্টেও তো যাওয়া যেতে পারে। তা না। সবাই বিজেপির হিন্দুত্ব আর ধর্মীয় মেরুকরণের উস্কানিতে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই মরিয়া।

কিন্তু ঘটনাবলীর পিছনে বিজেপির সমর্থন ও ততপরতা কত তীব্র তা বুঝবার এক ব্যবস্থা  করেছে আনন্দবাজার। অবস্থা দেখে তারা মন্তব্য করেছে, “এবারই প্রথম হাসপাতালের মূলগেটে তালা দিয়ে ধর্মঘট চলছে। মূলগেটে তালা দেয়া আগে কখনও হয় নাই”। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরিচালক অথবা প্রশাসনিক স্টাফ নিজে ডাক্তার হলেও তারা কখনই ধর্মঘটে যোগ দেন না। কারণ তারা দায়িত্ববান কর্মকর্তা ফলে বিরোধ মিটাতে দুতয়ালির ভুমিকা তাদের নিতে হয় বলে।  কিন্তু কলকাতায় এসব স্টাফেরাই মূল নেতা, সক্রিয়। অর্থাৎ স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাহস যোগান তখন আর কে কাকে পরোয়া করবে!

ওদিকে ক্ষমতা হারিয়ে ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া সিপিএমের এ্মন মরিয়া দশা দেখা গেছিল সেই ২০১৪ সালের শেষে, যখন অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। বর্ধমানে বোমায় কথিত  জেএমবি, জামাত, বাংলাদেশ, জঙ্গি ইত্যাদি মিলিয়ে যে প্রপাগান্ডা-গল্প যে সব কিছুর সাথে মমতা আছেন – এই প্রপাগান্ডার ঝাঁপি নিয়ে এসেছিলেন অমিত শাহ। সেকালে সিপিএম কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে যে জনসভা ডেকেছিল, তাতে অমিতের দেয়া ঐ একই বয়ানে তারা মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। পরে অবশ্য মোদি-অমিত কৌশল বদলান, এই গল্প নিয়ে আর আগাতে চান নাই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস থেকে এক বিবৃতি সংসদে দিয়ে বলা হয়েছিল, অমিতের দাবি আর সরকারের অবস্থান এক নয়।

আমাদের প্রথম আলোতেও এমন এক কলকাতার কমিউনিস্টের (শান্তনু দে) লেখা ছাপা হয়েছে, শিরোনাম, “বাঁকের মুখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি”। তিনি সিপিএম কত ভাল ছিল এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু কলকাতায় ধর্মীয় মেরুকরণ হয়ে যাবার জন্য শেষে বিজেপি না মমতাকেই দায়ী করেছেন। লিখছেন, …… দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি”।কিন্তু বিজেপির ঘোষিত নীতিই যেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ সেখানে মমতা কিভাবে দোষী? কারণ সিপিএমও “মুসলমানদের সাহস” বা “বাড় বাড়ানোর” জন্য  মমতাকে দায়ী করার জন্য তৈরি, তাই বুঝা যাচ্ছে এখানে।

যা হোক, “রোগী মুসলমান” বা “মুসলমানদের সাহস!” -এভাবে তোলা ডাক্তারদের সেন্টিমেন্টের পক্ষে প্রথম ইঙ্গিত তুলে হাজির হতে ক্ষেপিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছিলেন, এর ‘পেছনে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত’ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সরাসরি ঘটনা ক্যাশ করার লোভ না সামলে বলে বসেন, “হামলাকারীরা সেই সম্প্রদায়ভুক্ত, রাজ্যে যাদের ২৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। হাসপাতালসহ রাজ্যে যেকোনো গোলমালের নেপথ্যেই ওই সম্প্রদায় রয়েছে”। মমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, “তৃণমূল সরকার ওদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অনুরোধ, তৃণমূলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না”।

তবে ডাক্তাররা বিজেপির চেয়ে বুদ্ধিমান থাকতে চেয়েছেন। তাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বিজেপির অবস্থানকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে তারা বলেন, “যারা আক্রমণ করে তারা সমাজের দুষ্কৃত। এখানে কোনো জাতি-ধর্মের বিচার নয়”। ওদিকে কংগ্রেস-সিপিএমও এই দায় না নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কলকাতার হাসপাতালে রোগী-ডাক্তার এই সঙ্ঘাত প্রায় আমাদের দেশের মতই। অথচ এর সবচেয়ে সহজ ও আসল সমাধান হতে পারত – সবপক্ষকেই যার যার আচরণ এক জবাবদিহিতার মধ্যে আনা। প্রথম কাজ, রোগী বা তার আত্মীয়দের মনে সত্য বা মিথ্যা যত ক্ষোভই থাক তাকে বের হতে ‘জানালা খুলে দেয়া” [ventilation]। এ জন্য হাসপাতালের পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে “তদারকি ও সান্ত্বনাদান” জাতীয় উইং খোলা যেতে পারে। এর মূল কাজ হবে রোগীর আত্মীয়দের ক্ষোভ মনোযোগ দিয়ে শোনা। হাসপাতালের কারও গাফিলতি থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া। এ ছাড়া সময় নিয়ে আর মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সাথে নিয়ে  (সর্ট ও লং) দুই ধরনের তদন্তের ব্যবস্থা রাখা। তবে অবশ্যই কেস কিছু থাকবে, যা মূলত হাসপাতালের রিসোর্সের সীমাবদ্ধতার কারণ ঘটেছে, সে অপারগতাগুলো রোগীকে বুঝিয়ে বলার মতো প্রফেশনালদেরকে রাখতে হবে। ফলে মমতাকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে যারা চাচ্ছেন, এরা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট বোঝেন না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা প্রফেশনাল ডাক্তার। বরং উলটা বিজেপির মমতাকে বেইজ্জতি করার প্রোগ্রামে তারা মিশে গেছেন বুঝে না বুঝে।আর মূলত তা ঘটেছে [whispering campaign] এর কারণে।

ডাক্তারের মাথা ফাটানো নিশ্চয়ই কোনো সমাধান নয়। কিন্তু সাবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ – “ক্ষমা না চাইলে মরদেহ দেয়া হবে না”, এটা বলার তাঁরা কে? এটাই তো মূল ক্রাইম। অথচ সরকারি/বেসরকারি কোন ডাক্তার রোগীর আত্মীয়দের এ কথা বলার অধিকার বা এখতিয়ার নেই। আর এ কথা বলে ডাক্তারেরা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া আর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে ।

আর পুরা ঘটনায় ডাক্তারদের মধ্যে, তারা নিজেরা একটা উচ্চ এলিট শ্রেণীর (ধর্মীয় পরিচয় আর গরীব-বড়লোক শ্রেণী পরিচয় এই দুই অর্থেই)- এমন ধারণা কাজ করছে।  বিজেপির প্ররোচনায় ডাক্তারেরা এলিট ভুমিকায় অন্যদের সাথে এই বৈষম্য করে গেছে অবলীলায়। আবার বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে এমনই ঘটনায় এক আইন প্রচলন করা হয়েছিল যে, “হাসপাতালে এমন হাঙ্গামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে”। তাই ডাক্তারদের সঠিক পদক্ষেপ হত বড়জোর পুলিশের কাছে যাওয়া মামলা করা, আইনের আশ্রয় নেয়া। বাস্তবে কিন্তু  রোগীর সেই হামিলাকারি আত্মীয়ের নামে মামলা হয়েছে, এখন সে জেলে আটক আছে। এছাড়া আর এক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য যে, রোগীর আত্মীয়রা স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশকে দিয়ে লাশ ছেড়ে দিতে ডাক্তারদের অনুরোধ করিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা তবু লাশ আটকে রেখেছিলেন। [এন্টালি থানার পুলিশ গিয়ে চিকিৎসকেদের বোঝান। তাতেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। ] তাদের এই উদ্ধত্ব দেখে বুঝা যায় বিজেপি কী পরিমাণ ডাক্তারদের বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি পিছনে থাকলে – যারা নিজেরাও একটা রাষ্ট্রপতির শাসন জারির জন্য বেপরোয়া – এসব মিলিয়ে সবকিছুই বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন না হলে সেটাই অস্বাভাবিক হত।

অর্থাৎ বিজেপি ডাক্তারদের এতই প্রটেকশন দিয়ে বেপরোয়া হতে উসকানি দিয়েছিল যে, তারা তাদের আইনি সীমা ও দায় সব ভুলে গেছিলেন। ওই দিকে কলকাতার কমিউনিস্ট ভাইয়েরা, তারাও ডাক্তারের পক্ষে, মানে নির্বাচনকালের মতই বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছেন, হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার ইমেজ ভাঙলে তাদের দিন ফিরবে।

না ফিরবে না। এবারের নির্বাচন তাদের কেটেছে নিজের দলীয় পরিচয়ে, কিন্তু বিজেপির ক্যাম্পে বসে। এই সহযোগিতায় বিজেপি এবার একলাফে ১৮ আসন পেয়েছে। আর কমিউনিস্টদের ভোট গিয়ে ঠেকেছে ৭%। এটাই তাদের শেষ কমিউনিস্ট পরিচয়। কারণ, ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে এই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবেন সরাসরি বিজেপি নাম নিয়ে, এটা দেখতে পাবার সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ বাস্তবতা হল, কমিউনিস্ট পরিচয়ে আর না আছে আইডিয়ার ধার বা ভার, না আছে পকেটে টাকা। বরং পকেট ভরা টাকা আছে বা দিবে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিতে যোগ দেয়া খারাপ, এটা বলার মত নৈতিক সাহসও কমিউনিস্ট নেতাদের আর নেই। কাজেই…।

বিজেপি কতদুর বেপরোয়া হয়ে গেছে এর এক উদাহরণ হল, মমতাকে নিয়ে বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের মন্তব্য। তিনি নিজের আঞ্চলিক দল জেডিইউ এর সভাপতি। তার দল গত রাজ্য নির্বাচনে (২০১৬ সালে) বিজেপিবিরোধীদের সাথে নির্বাচনি জোট করে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তিতে তিনি মেরু বদল করে বিজেপির জোট যোগ দিয়েছেন। আর এখন বিজেপির কোলে উঠে একেবারে সরাসরি বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষী রাজনীতি করছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ “মিনি পাকিস্তানে”(mini Pakistan) পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে  “বিহার থেকে “রোহিঙ্গারা” বিহারিদের তাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য” করল তার বিহারে এনডিএ-সরকারের মূল দল জেডিইউ (JDU)। মোদীর মন পেতে ইসলামবিদ্বেষের যেকোন পর্যায়ে নামতে তিনি রাজি। ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে এরই এক প্রতীকী প্রকাশ এটা।

মমতারও দোষ, ভুল বা গোঁয়ার্তুমিও যে নাই তা নয়। ডাক্তারদের পিছনে বিজেপি-সিপিএমের সমর্থন আছে কিন্তু এদেরকে বহিরাগত বলে ঘটনা তার দিকে ফিরে নাই। আবার চার ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারদের কাজে যোগ দিতে বলাও তার বিরুদ্ধে গিয়েছে। প্রশাসক আর রাজনৈতিক নেতার ভুমিকা মাখায় ফেলেছেন তিনি। উচিত ছিল কেবল মুখ্যমন্ত্রীর ভুমিকায় থাকা, তাহলে ফল পেতেন। এছাড়া গত পঞ্চায়েত ভোটে ৩৪ শতাংশ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা’র কাফফারাও আছে। তবে হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার আপোসী ধারার আর একটা সফট লাইন কার্যকর আছে বলেই মনে হচ্ছে – মেয়র ফিরহাদ, তার ডাক্তার মেয়ে, আর মমতার আরেক ডাক্তার ভাইপো প্রমুখের মাধ্যমে। সম্ভবত হাসপাতাল ইস্যু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আগেই তিনি আপসে এসব মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এতে বিজেপি্র হাতে তাঁকে কোণঠাসা করার সব চেষ্টা মাঠে মারা যেতেও পারে। দেখা যাক, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনতে ‘হাসপাতাল ইস্যু’ ব্যবহার হয় কি না। নাকি নতুন অন্য ইস্যুর খোজ পড়ে!

সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এর পক্ষে তখন বিপক্ষে লোক দেখতে পাওয়া ত আসলেই কঠিনই হবে! ধর্মীয় মেরুকরণ তাতিয়ে ক্ষমতাদখলের প্রচেষ্টা – এটা সবপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে, এক মারাত্মক আত্মঘাতি পরিস্থিতি আনবে, যা এখন বিজেপি ও গংয়ে্রা আমল করার অবস্থায় নাই। পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ সেই ভয়ংকর দিকে আগাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসনআনার জন্য এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেম, ইরানকে বলি

ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেমে, ইরানকে বলি

গৌতম দাস

১০ জুন ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2AX

 

Strait of Hormuz

ইরানের উপর আমেরিকান অবরোধ [Iran Sanctions] আরোপ করে রাখায় মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উপসাগরগুলোতে বিশেষ করে চিকন হয়ে আসা ইরানের সমুদ্রসীমায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলায় ‘খুঁচিয়ে ঘা করার’ একটা প্রবাদ আছে। এর সফল উদাহরণ হল সম্ভবত, ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা-ইরানের সম্পর্কের হাল অবস্থা। এমনিতেই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে জন্ম নেয়া নতুন ইরান, জন্ম থেকেই কঠোরভাবে আমেরিকাবিরোধী। এটা ফ্যাশন বা গতানুগতিক ঘটনা নয়, বরং অনিবার্য।  আমেরিকার স্ব-স্বীকারোক্তির ঘটনা হল সিআইএ এর হস্তক্ষেপে ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার  ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। আর সেসময় থেকে ইরান আমেরিকানদের দখল কব্জায়, পাপেট শাসনে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের আগে পর্যন্ত। তাই ১৯৭৯ সালে আমেরিকাবিরোধীতা ছিল অনিবার্য। আর সেখানে  এসে এটাই প্রমাণ যে, ইরান তখন সত্যি প্রথম ‘স্বাধীন’ হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব প্রমাণ করেছিল ইরানিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, একমাত্র তারাই নিজেকে শাসন করার বৈধ অধিকারী। বলা যায়, ১৯৫৩ সালের আমেরিকা সিআইএ পাঠিয়ে ইরানে হস্তক্ষেপের পরে এর সফল জবাব ছিল ১৯৭৯ সালের আয়াতুল্লাহ খোমেনির ‘ইসলামি বিপ্লব’।

নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা ও দখল করে। এতে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুতুল সরকার বসানোর পরও ইরানের সাথে মার্কিন সম্পর্কে এতে বড় রকমের কোন হেরফের হয়নি। ইতোমধ্যে ২০০৯ সালে ওবামা আমেরিকায় ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালের মধ্যে ইরাক থেকে সম্পূর্ণ আর আফগানিস্তান থেকে ১০ হাজার রেখে বাকি সব আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনেন। সেটা আমেরিকার ‘টেররিজমের’ যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন হয়েছে সেজন্য নয়, বরং যুদ্ধ শেষের কোনো লক্ষণ নেই। এর চেয়ে বড় কথা, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত অর্থনৈতিক সামর্থ্য আমেরিকা-রাষ্ট্রের আর নেই। পরে আবার আইএস এর সিরিয়ায় ততপরতা তুঙ্গে উঠার আমলে ওরা  সেখান থেকে আবার ফিরে ইরাকে শক্ত অবস্থান নিলে ওবামা সেই বিপদে পড়ে যে করণীয় ঠিক করেছিলেন, সেটাই প্রথম আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শুরু বলা যায়। ব্যাপারটা ছিল এই যে ইরাকে আইএসের উপস্থিতি ঠেকাতে হলে ওবামাকে আবার ইরাকে আমেরিকান সৈন্য পাঠাতে হত, অথচ ওবামার রাষ্ট্র সেই খরচ যোগাতে পারার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামর্থ্য ছিল না। তাই এর বিকল্প হিসেবে আমেরিকান যুদ্ধবিমানের সহায়তা ও সমর্থন নিয়ে নিচে মাঠে আইএস উৎখাতের সে কাজ ইরান করে দিতে পারে। এই শর্তে এবং ইরানের ‘পারমাণবিক বোমা’ বিষয়ক তৎপরতা জাতিসঙ্ঘের নজরদারিতে স্থগিত রাখা হবে, এই শর্তে সে সময় আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ও ইউরোপীয় নেতা দেশগুলো মিলে (পি৫+১) সবার স্বাক্ষরে তা সম্পন্ন হয়েছিল।

তাতে অবরোধ উঠে যাওয়াতে এই প্রথম ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ধারায় বিনা বাধায় তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি হয়েছিল ইসরাইল। ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার পরও ইসরাইলের এই অখুশির মূল কারণ, তেল বিক্রিসহ ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনের মূল ধারায় ফিরে আসা। আর তাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলা। তাই ওবামার আমলে প্রথম গড়ে ওঠা, আমেরিকা-ইরানের গঠনমূলক সম্পর্ককে মূলত জায়নিস্ট ইসরাইলের স্বার্থে ও আগ্রহে এবং সুনির্দিষ্ট কোন আমেরিকান স্বার্থ ছাড়াই ট্রাম্প তা ভেঙে দেন। এটাই ট্রাম্পের সেই ‘খুঁচিয়ে ঘা করা’। একটা সুস্থ শরীর, ক্ষতশুণ্য। কিন্তু তাকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত ক্ষত তৈরি করে এরপর সেই ক্ষতকে পঁচানোর মত ঘটনা ঘটানো, এটাই ট্রাম্পের কাজ। ভিন্নরাষ্ট্র ইসরাইলের স্বার্থে নিজ রাষ্ট্র আমেরিকাকে বিপদে ফেলা এবং এক আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের উদাহরণ হিসেবে এটা থেকে যাবে।

গত ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল শেষ যুদ্ধের পর আরবেরা ‘তেল অবরোধ’ [OIL Embargo 1973] করেছিল।  এমনিতেই যুদ্ধে হেরেছিল, ফলে সে যুদ্ধের খরচের ভার তো আছেই। আবার আরবদের প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্রই যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা বলতে তেল বিক্রি বুঝে, এমন অর্থনীতির দেশ। তাই ‘তেল অবরোধ’ মানে, পশ্চিমাদের কাছে তেল বেচব না বললে তা সবার আগে নিজেদেরই সমস্যায় ফেলা হয়ে যায়। পশ্চিমা সভ্যতার অর্থনীতি মাটির নিচে পাওয়া ফসিল জ্বালানির ওপরে দাঁড়ানো, এর চাকা ঘুরছে ঐ জ্বালানি ব্যবহার করে। ঐ তেল অবরোধে পরে তা এই প্রথম প্রবল জোরে এক ঝাঁকুনিসহ ধাক্কা খেয়েছিল।তিন ডলার ব্যরেলের তেল পাঁচ মাসের মধ্যে চারগুণ হয়ে গেছিল। তবুও ওই অবরোধের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরো মারাত্মক, যেটা “কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি ১৯৭৩” বলে খ্যাত। এর মূল দিকটি হল, সৌদিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বানানো। স্বীয় সংকীর্ণ স্বার্থ রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে আমেরিকান প্রটেকশন পাওয়ার বিনিময়ে তারা আমেরিকানদের তেল পাওয়া নিশ্চিত করবে। ফলে ঐক্যবদ্ধ আরব হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হল। এরকমই আরেক তৎপরতার নাম হল, ইসরাইলকে আরবের বিরুদ্ধে সক্রিয়তায় খাঁড়া করে ও তৎপর রেখে আরবদের শায়েস্তা করা। এরই আর এক অংশ হল ক্যাম্পডেভিড চুক্তি, যাতে মিসরকে ইসরাইলের সীমান্ত প্রহরীর ভূমিকায় বসানো হয়েছে।

কিন্তু অবস্থা এখন আর সে একই জায়গায় নাই, একালে যখন আমেরিকা নিজেই এখন তেল রফতানিকারক দেশ হয়েছে। মার্কিন [Fracking] অয়েল আর সৌদি ফসিল ফুয়েল তেলবাজারে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মার্কিন ফ্রেকিং অয়েলের অসুবিধা হল এর উৎপাদন (কোমল শিলা [Shale] থেকে পিষে তেল বের করার) খরচ বেশি। ফলে তেলের দাম ৫০ ডলারের নিচে চলে গেলে এটা লস প্রজেক্ট। তাই দাম কমিয়ে দিয়ে সৌদিরা ফ্রেকিং পদ্ধতিতে পাওয়া অয়েলকে চাপে ফেলে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। অতএব, এই যুগে আমেরিকা-সৌদি বন্ধন আর পুরনো ‘কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি’ দিয়ে আটকানো নয়; বরং সৌদিরাই নিজ স্বার্থে আমেরিকানির্ভর। কাজেই ওবামার তৈরি করা ইরান-আমেরিকা পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি থেকে আমেরিকাকে ট্রাম্পের এককভাবে বের করে আনার পক্ষে একালে আমেরিকার সুনির্দিষ্ট কোনো স্বার্থ নেই, ইসরাইলের স্বার্থ ছাড়া।

আবার ইসরাইল অথবা ইরান একে অপরকে এখনই একেবারে ধ্বংস করে ফেলতে চলেছে এবং ব্যাপারটা একেবারে আসন্ন বাস্তবে এমন কিছুই হাজির নাই। বাস্তবতা এমন না ফলে ইসরায়েলের এমন কোনো স্বার্থ নেই। হ্যাঁ, পারস্পরিক বৈরিতা অবশ্যই আছে, তবে তা রুটিন ধরনের। ফলে শেষ বিচারে ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষে ট্রাম্প অথবা তার ইহুদি জামাইয়ের ব্যক্তিগত লাভালাভ ছাড়া আমেরিকার সিদ্ধান্তের পক্ষে আর কোনো যুক্তি নেই।

মজার কথা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সদস্য কেউ অথবা জাতিসঙ্ঘের কাছেও – যারা ওই পারমাণবিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী একপক্ষ – তাদের কারও কাছেই ট্রাম্প নিজের ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষের সাফাই প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

এছাড়া, ট্রাম্প এবার শুধু আমেরিকাকে চুক্তি থেকে সরিয়ে এনেছেন তাই নয়, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করেছেন। ট্রাম্পের এই আমলে অবরোধ আরোপ করা হচ্ছে যথেচ্ছাচারে। কাউকে অপছন্দ হলেই অবরোধ। এই অবরোধ কথার ব্যবহারিক অর্থ হল, অবরোধ আরোপ করা হয় যে রাষ্ট্রের উপর, সে রাষ্ট্র আর আমদানি-রপ্তানিতে আমেরিকান ডলারে কোন পণ্য কাউকে বিক্রি বা কারও থেকে কেনা – কোনটাই করতে পারবে না। কেন আমেরিকার পক্ষে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? কারণ, ইনভয়েসে ডলারে পণ্যমূল্য লেখা থাকলে সেই মূল্য নগদায়ন করতে কোনো-না-কোনো পর্যায়ে যেকোনো এলসি খোলা ব্যাংকের একটা আমেরিকান ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কোনো আমেরিকান ব্যাংক এখন আর নিজে সে সার্ভিস দিতে চায় না। কারণ, অবরোধ আরোপের পরে কোনো আমেরিকান ব্যাংক তা উপেক্ষা করলে, সেই ব্যাংককে নিকট অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করে তা আদায় করেছে।

আমেরিকান ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেন বিনিময়ের একমাত্র মুদ্রা হিসেবে অনুমোদন দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা, মানে ১৯৪৪ সালের [Bretton Woods System] আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা শুরু করা হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল, সেকালে আর কোনো দেশের মুদ্রা বিকল্প হিসেবে পাওয়া যায় নাই। সবারই মুদ্রামান ছিল ত্রুটিপুর্ণ, ফুলিয়ে ফাপানো মানে অবমুল্যায়িত।  অথবা ওই মুদ্রার রাষ্ট্রের নিজস্ব আয়-ব্যয়ে উদ্বৃত্ত নেই, ঘাটতির; ফলে ভরসা করার মতো মুদ্রা তা আর ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা বলে গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে কেউই সেকালে চিন্তাও করেনি যে, আমেরিকা পড়তি অর্থনীতির রাষ্ট্র হিসাবে এককালে নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে অন্য কোন রাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলতে ডলার-অবরোধ আরোপ করে অন্যায় সুবিধা নেবে।

আসলে দুনিয়ার সব বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ এখনো ডলারে সম্পন্ন হচ্ছে বলে সেটাই আমেরিকার জন্য অবরোধ আরোপের বাস্তব সুবিধা হয়ে হাজির হয়েছে। তুলনায় চীনের ইউয়ান ধেয়ে আসতে থাকলেও এর উঠে আসতে এখনও সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমেরিকা অশুভ অর্থনৈতিক মোড়লিপনার শেষ সুবিধা যা পায় ইচ্ছামত তা  খায়ে নিচ্ছে বলা যায়। তবে এবার অন্য কোনো মুদ্রা গৃহীত হলে তাতে সুনির্দিষ্ট করে শর্ত আরোপ করা থাকতে হবে যে, কোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গৃহীত হতে হলে সংশ্লিষ্ট সেই রাষ্ট্র নিজ একক স্বার্থে কারও বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করতে পারবে না।

অন্যদিকে, ইরানের উপর এবারের অবরোধে আরেক বিশেষ ব্যতিক্রম হল, অন্যান্য বার অবরোধে চীন ও ভারত রাইজিং অর্থনীতি ও ব্যাপক জনসংখার দেশ বলে ইরানের তেল কিনতে গিয়ে আমেরিকার বিশেষ ছাড় পেয়ে এসেছে। ভারতের তিনটা তেল শোধনাগার ইরানি অশোধিততেল নির্ভর হয়ে  জ্বালানি তেল উতপাদনে আছে। কিন্তু এবার আমেরিকার ট্রম্প প্রশাসন কঠোরভাবে বলে দিয়েছে ১ মে ২০১৯ এরপর থেকে অবরোধ কার্যকর হবে সব রাষ্ট্রের উপর [US Secretary of State Mike Pompeo’s announcement that Washington would no longer issue exemptions from sanctions ………“We are going to zero,” Pompeo said of the waivers, ]। অর্থাৎ ভারতের বেলায়ও ইরানি তেল কেনায় আর কোন ছাড় কার্যকর নয়। অথবা কথাটা এভাবে বলা যায় যে, আমেরিকা থেকে ছাড় আদায় করে নেয়ার জন্য ভারত দরকষাকষিতে নেই অথবা করতে চায়নি। বরং বিনিময়ে আমেরিকা থেকে ভিন্ন কোন সুবিধা পাওয়ার আশা করছে সম্ভবত। অবশ্য চীন ইরানের তেল কেনার চুক্তি অব্যাহত রেখেছে। যদিও এখানেও কোন কেনাবেচায় কোন অবরোধ-ছাড় কার্যকর নয়। তবে চীন-ইরান তেলক্রয় চুক্তিতে  কেবল নতুন একটা শর্তের ধারা যুক্ত হয়েছে তাতে যে, ইরান নিজস্ব বাহনে [National Iranian Tanker Co (NITC) ] করে চীনে তেল পৌঁছে দেবে। বাস্তবত তা অবরোধ না মানার শামিল। এছাড়া গত ২২ এপ্রিলে প্রতিদিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে চিনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে,আমেরিকার একপক্ষীয় অবরোধ আরোপের চীন বিরোধী, ইরানের সাথে সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক (তেল-পণ্য কেনাবেচাসহ) আইনি ভিত্তির উপর দাঁড়ানো  [ Geng Shuang, a Chinese Foreign Ministry spokesman, said at a daily news briefing in Beijing on Monday that it opposed unilateral US sanctions against Iran and that China’s bilateral cooperation with Iran was in accordance with the law.]

তবে ভারতের এই সিদ্ধান্ত বহু কিছুর ইঙ্গিত এবং প্রকাশ্য রূপও বলা যায়। পুরানা ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) বা এর জেরে পুরা ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক মানে ছিল, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ নীতি পালন করে এর বিনিময়ে ভারত আমেরিকা থেকে পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যে বা অস্ত্র ক্রয় বিষয়ে নানা সুবিধা আদায়। কিন্তু ট্রাম্প আসার পর থেকে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে শুকিয়ে গেছে তো বটেই, ২০১৮ সাল থেকে অবস্থা এমন যে, সব সুবিধাপ্রাপ্তিই বন্ধ। আর উল্টো ভারতীয় পণ্যেও ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ-শুল্ক আরোপ করেছিল। এমনকি এবারের নির্বাচনে মোদী আবার জয়লাভের পরও আমেরিকার খাতায় ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ক্যাটাগরি থেকেও ভারতের নাম কেটে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতের মনোভাব এখনো একই রকম – “যদি ট্রাম্প সাহেবের মন আবার বদলায়” – মন পাবার সে আশায় তাকিয়ে থাকা। কিন্তু পরিস্কারভাবে ট্রাম্প যেভাবে একপক্ষীয়ভাবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন, এতে বোঝা যাচ্ছে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত  পুরো আমলেও ট্রাম্পের অনুসৃত নীতিতে কোনো ছেদ পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবুও ভারতের একপক্ষীয় প্রেমের সমাপ্তি নেই। এমনকি এদিকে, সাউথ চায়না সি নিয়ে প্রায় সব পড়শিদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্কে আমেরিকা এখন অনেকটা গায়ে পড়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। নানান মহড়ায় আয়োজন ও তাতে অংশ নিচ্ছে। এই সমুদ্রসীমা বিতর্কে ভারত সেখানে কোন পক্ষ নয়। মানে ভারতের তেমন কোন স্বার্থ না থাকলেও ভারত যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে।

ভারতের আচরণে, এসব দেখেশুনে এবার ইরানেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এপর্যন্ত অবরোধকালে ইরানি তেল কেনার বিনিময়ে ভারত সব সময় মূল্য ছাড় পেয়ে এসেছে। ইরানও ধৈর্যের সাথে তা দিয়ে এসেছে। কিন্তু এবার [১মে ২০১৯ এর পরে] অবস্থা সম্ভবত ভিন্ন, অব্রোধের উছিলায় ভারত তেল কিনতে চাচ্ছে না। তাই, এ নিয়ে মুখোমুখি হতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে এসেছিলেন গত মাসে ১৩ মে ২০১৯। ভারতের মিডিয়ায় লিখেছে সে খবর নিয়ে যে তাদের সম্পর্ক [India-IRAN Relation] এখন কোথায়। সেখানে আমরা জানছি, ভারত আর কী কী সুবিধা নিয়েছে ইরানের কাছ থেকে!
ইরানের চাবাহার সমুদ্র উপকূলে অগভীর বন্দর হলেও এই পোর্টে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক সুবিধার দিকটি হল, একে ব্যবহার করে ভারত পাকিস্তানের ভূমি বা বন্দর ব্যবহার না করেই আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ার দেশে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারে। এ কারণে এই বন্দরে অংশত বিনিয়োগ ভারতেরও আছে। তবে ‘প্রচারে ওস্তাদ’ ভারত এটাকে গোয়াদর গভীর বন্দরের সমতুল্য বলে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে।

ভারতের এক মিডিয়া লিখেছে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবারের সফরে চাবাহার পোর্ট নিয়ে ভারতকে পাল্টা চাপ দিয়েছে। an issue that is likely to dominate the bilateral discussion is Iran’s Chabahar port, ……………Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran turns that assurance somewhat blurry. বিবিসি বাংলা লিখেছে, “এদিন সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবধারিতভাবে চাবাহার তাস ব্যবহার করেছেন”।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর এবার শুধু ভারতেই থেমে নাই। মাত্র দশ দিনের মাথায় ২৩ মে ২০১৯, তিনি পাকিস্তান সফরে যান।

ইরান চাবাহার বন্দরকে গোয়াদর বন্দরের সহযোগী করে গড়তে চীন ও পাকিস্তানের সাথে আলাপ শুরু করেছে। এ ছাড়া, পাকিস্তানের কলামিস্টদের লেখায় উঠে এসেছে, এত দিন এটা ইরান চিন্তাও করেনি ভারতের স্বার্থে। ইরানের সরকারি প্রেস এজেন্সি এক খবরে বলছে ইরানি পররাস্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানকে  “গোয়াদর আর চাবাহার পোর্টকে যুক্ত করে দিতে প্রস্তাব দিয়েছেন” [“We can connect the two seaports and then connect Gwadar to our entire railroad system and from Iran to the North Corridor through Turkmenistan, Kazakhstan and also Azerbaijan, Russia and also to Turkey,” ]। এর সোজা মানে হল, চাবাহার পোর্টকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের গভীর পোর্ট গোয়াদরের বিকল্প হিসাবে প্রচার করত তা আর থাকল না। শুধু তাই না চাবাহার পোর্টও  চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিবার প্রস্তাব এটা – যেখানে এখনও পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্প ভারতের চোখে হারাম।

যেখানে ভারতেরই মিডিয়াই মন্তব্য লিখছে যে, টিটকারি দিয়ে বলছে বারবার মত বদলে ঘুরে যাওয়া ট্রাম্প নির্ভরযোগ্য নয়, সে যুদ্ধবাজ [Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran ………] অন্যদিকে তবু ভারতের আমেরিকা বা ট্রাম্পবিষয়ক ‘একপক্ষীয়’ প্রেম সম্ভবত আরো বেশ কিছুদিন থাকবে বুঝা যাচ্ছে। সেটা এতই যে ভারতের শখ ও সুখস্বপ্নের চাবাহার পোর্টকে ট্রাম্পের প্রেমে বলি দিতে ভারতের দ্বিধা নাই।

এসসিও বা সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন মূলত চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়া- মিলিয়ে একটি সামরিক ও বাণিজ্যিক জোট। গত বছর এতে সদস্য করে নেয়া হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানকেও। এ বছরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়েছে গত মাসের শেষে। আর রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে চলতি মাসের মাঝামাঝি, ১৩-১৪ জুন। ভারতের মিডিয়ায় খবর, ইমরানের সাথে একই সভায় মোদির সাক্ষাৎ হলেও সাইড লবিতে তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে না। এবারো নির্বাচনে জিতে আসার পেছনে ‘পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর’ মোদি এই প্রপাগান্ডা বিরাট কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। ক্রমশ সামনে দানব হয়ে উঠা মোদীর এমন অনেক কাজ বাকি। তাই স্বভাবতই ‘বীরের’ ইমেজ মোদী সহসাই হারাতে চাইবেন না। তাই অন্তত প্রকাশ্য নীতিতে মোদী সহসাই কোনো বদল আনছেন না। আমাদের আরও ভুগতে হবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)ইরান,ভারত ও আমেরিকা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

গৌতম দাস

২৭ মে ২০১৯, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AB

 

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। তাতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং গত ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনের চেয়েও এবার আরও বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance (NDA)]। গত এমন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা মোট ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ২৮২ ও ৩৩৬।

এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’ [Hindutto]- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচনটা হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হল ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচনে সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এক প্রধান প্রশ্ন ছিল যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? অর্থাৎ বৃটিশ-ভারত নামেই বাইরে থেকে একে এককাট্টা ভারত মনে হয়। কিন্তু আসলে তা অসংখ্য রেসিয়াল বৈশিষ্ঠের জনগোষ্ঠির ভারত। এছাড়া বৃটিশ্বরা এই ভারতকে শাসন করে গেছে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে। ফলে ভারত বলতে বিভিন্ন ধরণের জনগোষ্ঠির ভিন্নতাগুলো আবার যেমন তেমন না। যেমন ভারতে এখনও ২৯টা রাজ্য। মানে অন্তত ২৯ রকমের বড় বড় বিভক্তি এখানে আছে। এরকম আর কত কত ধরণের আইডেনটিটিতে এখনও বিভক্ত হয়ে আছে ভারতের নাগরিকেরা।  এই ভিন্নতাগুলো সত্বেও তাদের একটা রাষ্ট্রে ধরে রাখার উপায় কী? এই ছিল নেহেরুর কাছে মুখ্য প্রশ্ন। সে  কোন বন্ধন, যা দিয়ে তাদের আটকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায়?

এই কঠিন জটিলতার সবচেয়ে সহজ জবাব নেহেরু খুজে নিয়েছিলেন যেটা তা হল “হিন্দুত্ব”। মানে হিন্দুত্ব হল সেই আঠা বা গ্লু [glue] যার ভিত্তিতে নাগরিকেরা জোটে বেধে একতায় তাদের এক থাকার উপায়। সেই থেকে নব গঠিত ভারত হিন্দুত্ব হল নাগরিক ঐক্যে এভাবে গড়ে উঠেছে।বলাই বাহুল্য এটাই ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে একক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, the biggest disasterous decision.

প্রশ্নটা আসলে অরিজিনালি ছিল মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বুঝাবুঝির বা বলা যায় বুঝাবুঝিতে ঘাটতি থাকলে সেই অভাব থেকে উত্থিত এবং বিপথগামী প্রশ্ন। যেমন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে বা করার কালে আদৌ এমন ভিত্তি খুজে ফেরা  জরুরি কিনা? সরাসরি উত্তর হল যে – একেবারেই না। কিন্তু তবু নেহেরুর এই বিপথগামী পথই ধরেছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে এটা ১৯৪৭ সালের আগষ্টের পরে উদয় হওয়া প্রশ্ন নয়। এটা এর আগের পুরা উনিশ শতক (১৮১৫-১৮৯৯) এই সারাটা সময় চিন্তার বিপথগামী গমণ বজায় ছিল।  সেদিকে একটু পরে আবার আসছি।

নেহেরুর কাছে ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না – এটাই ছিল তাঁর চোখে সদুত্তর। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অ-হিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে, মারজিনাল করে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানের দিকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। তা হল, হিন্দুত্ব একটা কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়। এরই প্রতিভূ বা সব বৈশিষ্ট-চিহ্ন নিজেই হাজির হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’।

কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যেই সরাসরি হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে আরএসএসের নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে। দক্ষিণ ভারতের কমল হাসানকে অনেকে চিনে থাকতে পারেন যারা ভারতীয় সিনেমার খবর রাখেন। তিনি সিনেমার খ্যত নায়ক। তিনি সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু নাথুরাম সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি মামলা খেয়েছেন। পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জামিন চেয়ে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন,  “Godse himself, in his book Why I killed Gandhi, had categorically stated that Mahatma Gandhi had acted against the interest of Hindus, and had blamed him for partition, Mr. Haasan said.”। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস-বিজপি দুপক্ষই ইস্যুটা কার্পেটের নিচে ফেলে চেপে যেতে চান। আরএসএস তাদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্ট বা কর্মিসভায় নাথুরামকে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাদের হিরো বলে তুলে ধরে। যদিও বাইরে খুব বেশি এই ভাবনা প্রচারে আনতে চায় না। আর যে মোদী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নাথুরাম তর্কে ঢুকতেই চান না।

যে যাই হোক, ১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ গড়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা একালের নেতা এলকে আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে [… providing a fresh ideological narrative to the people,” ] বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদী নির্বাচনে নেমেছিলেন?  ছোট্ট করে এনিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যাক। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে আমরা তুলনা করলে বুঝব, ২০১৪ সালে মোদীর মুখ্য (catchy) ইস্যু ছিল মূলত “অর্থনৈতিক”। অথচ এবার অর্থনৈতিক শব্দটাই তিনি কোথাও উচ্চারণই করেন নাই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চলতি শতকের প্রথম দশক (২০০১-০৯) থেকে। যেখান থেকে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংকের ধারণা উঠে এসেছে। তো “রাইজিং অর্থনীতির” ইন্ডিয়া এর একটা। মোদীর আগের কংগ্রেস (২০০৪-১৪) সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে এর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশাআকাঙ্খাও চরমভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। সেদিকটা খেয়াল করে মোদী ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ঐ অর্থনৈতিক ইস্যু সেটাকেই আবার উস্কে চাঙ্গা করে তুলে ধরে দাবি করেছিলেন তিনি এটা আবার তুলে সচল করতে পারবেন, কারণ গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখমন্ত্রী তিনি। তিনি তখনও থার্ড টার্মের মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই খাতিরে যেন তাঁকে ২০১৪ নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল কিন্তু তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তাঁর নাই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি [demonitization & GST]  ইস্যুতে তার কপাল খুলে নাই, তা যতই ভাল প্রোগ্রাম হোক বা না হোক। ডিমনিটাইজেশন মানে নোট বাতিল আর জিএসটি মানে ভারতের এক রাজ্যের পণ্য আর রাজ্যে ঢুকলে টাক্স আরোপ করা হয়, এসব পাল্টাপাল্টি ট্যাক্সকে উঠিয়ে নেয়া, সরল নিয়ম করা আর আদায়কৃত ট্যাক্স শেয়ার করার ফর্মুলা চালু – এককথায় বিশেষ করে পরেরটা খুবই ভাল কাজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন, প্রথম তিন বছরের সাফারিং এর কারণে নগদ অর্থনীতিক পারফরমেন্সের বিচারে তিনি ফেল করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি একেবারেই ফেল করেছেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, মোদীই ভারতের এক ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে তিনি নিজের দল এবং বিশেষ করে নিজ সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যেটা যে, দলীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে একটা দল -অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বা প্রশাসন বিষয়ক একাদেমিক যারা দলের খাতায় নাম লেখানো – এমন  এদেরকে নিয়ে গঠিত কোন টিমের পরামর্শের দিয়ে সরকার চলছে। না মোদী এসব এমেচার করতে রাজী না।  বরং তিনি তা করে থাকেন ও ভরসা করেন তা হল প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানী নিয়োগ দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদী-অমিতের বিশেষ “রাজনৈতিক ব্রান্ড” এটাই। এজন্য তারা বিজেপির মত দল করলেও খুবই স্মার্ট। এমনকি নির্বাচনও তিনি করেন এমন কোম্পানীকে পরামর্শক রেখে। এই জায়গায় মোদীর বিজেপিকে ধর্মতাত্বিক নেতা বা মফস্বলী কোন নেতা জ্ঞান করা খুবই ভুল হবে ও খাটো করে দেখা হবে।

আর সেই কন্সাল্টেন্টদের পরামর্শেই এবার তিনি একক – কেবল “হিন্দুত্ব” ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। তবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ যেটা উপরে বলেছি যে, এটা সম্ভব হল কারণ ভিত্তি হিসাবে ভারত-রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠিত। কিন্তু যে উত্তর এখনও অমীমাংসিত তা হল – বিভিন্ন আত্ম-পরিচয় বা বৈশিষ্টের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কেন কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে – আটকে ধরে রাখার কোন আঠা বা গ্লু যেমন একটা হিন্দুত্ব – এর প্রয়োজন আদৌও কী অনিবার্য, এসেনসিয়াল? না কী অপ্রয়োজনীয় এবং বিকল্প আছে?  এছাড়া কবে থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টাকে “এসেনশিয়াল” মানে হিন্দুত্বকে এসেনশিয়াল বলে বুঝে এসেছেন, সেটাও খুজে দেখা ও লক্ষ্য করা খুবই জরুরি।

এই প্রশ্নটা ভারতে তো বটেই,উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, তাই স্পষ্ট উত্তর নাই। এবং এক ভারতের কারণেই উপমহাদেশের সবখানেই এটা অমীমাংসিত ও সব অসন্তোষের উতস এটা।

আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক রূপ বৈশিষ্ট হল “রেনেসাঁ” [Renaissance] চিন্তা। ইউরোপের এই রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বৃটিশ-ভারতের রাজধানী, বাংলায় নিয়ে এসেছিল বৃটিশ-শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে থাকেন সকল রেনেসাঁবাদীরা। তার সক্রিয়তার প্রধান সময়কালটা হল (১৮১৫-৩৩)। তিনিই প্রথম এবং তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পিছনে পুরা ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, একটা “হিন্দুত্ব” থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাক্ষ্ম ধর্ম-এর প্রবর্তক যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই – এক হিন্দু নাশনালিজম। তবে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়গুলোতে এটার কার্যকারিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে পরবর্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দের ইত্যাদি্র মত কিছু ব্যক্তিত্বের হাত ঘুরে আরও রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের জন্মের সময় (১৮৮৫) থেকেই এর  হাতে পৌছাতে শুরু করেছিল। আরও পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদ করা ও পরবর্তিতে তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলন – এসবের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। আর সবশেষে দেশভাগের পরে নেহেরুর হাতে সেই একই “হিন্দুত্ব” কিন্তু এবার নতুন প্রয়োজনে – এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। আর  সেই থেকে আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই পুরা সময়ে  হিন্দুত্ব চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সমস্ত বিভক্তির উতস এখানেই। এটাকে একটা অন্ধের হাতড়ানোও বলতে পারি! কারণ লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ভারত যদি একটা মর্ডান রিপাবলিকই হতে চেয়েছিল বা চেয়ে থেকে থাকে তবে তার আবার “হিন্দুত্ব” এর, হিন্দু নাশনালিজমের দরকার কেন? কিভাবে তা হয়? এর জবাব কংগ্রেস বা আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি কখনো দেয় নাই, দিবে না – খুঁজবে না। অথচ অনিবার্য এসেনশিয়াল মনে করে রাখবে।  এতেই তারা এর সাহায্যে অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠির উপরে আধিপত্য কায়েম করতে পারার সুবিধার দিকটা মুখ্য – এই সুবিধার দিকটাই তাদের জন্য সব চেয়ে লোভণীয় ছিল বলে। যদিও মর্ডান রিপাবলিক বলতে একে ধর্মীয় নাশনালিজম বলে মানে করা – এই সুবিধাবাদি ভুল বুঝার ঝোঁক ইউরোপেও ছিল।

সবচেয়ে বড় তামাশার দিকটা হল, হবু  “মর্ডান রিপাবলিক” ভারত বলতে একে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম বলে বুঝা ও মানে দেওয়া কিন্তু একে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ” বা “স্বদেশি আন্দোলন” বলে নাম দেয়া আর ওদিকে এভাবে এর আসল পরিচয় হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম লুকিয়ে রাখা ফেলা হয়েছে। শুধু তাই না। এর প্রভাব এখানেই শেষ না। এভাবে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম এর রাজনীতি করা এটাই মুসলমানদের জবরদস্তি ঠেলে দেয়া হয়েছে যেন তাঁরাও ইসলামি নাশনালিজমই করে – মুসলিম লীগ করে আবির্ভুত হয়। আর এইবার সেই কঠিন তামাশাটা! এই মুসলমান আর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ লটকে দেয় যে এরা ধর্মীয় রাজনীতি করে, এরা সাম্প্রদায়িক, এরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চায় ইত্যাদি। ফ্যাক্টস হল, হিন্দুরা যদি হিন্দু নাশনালিজমের রাস্তা ধরে  তাহলে এরপর মুসলমানেরা যাই করবে তা এক ইসলামি নাশনালিজমই তো হবেই!

অতএব সেই হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম – এটাই একালে মোদীর হাতে স্বরূপে হাজির হতে চাইছে।
এমন কী মোদীর গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে সামাজিক বিভাজন তো বটেই যেভাবে সংগঠিতভাবে  সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল,  “মুসলমানকে ধরে জয় শ্রীরাম বলাতে হবে” এর নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে, [এই মাত্র দ্য হিন্দু পত্রিকার খবর এটা এবারও শুরু হয়র গেছে – মুসলমান তরুণ দর্জি বাসায় ফিরছিল, তাঁকে ঘিরে ধরে বলা হয়েছে, মাথার টুপি খুলে ফেলতে, এরপর জবরদস্তিতে জয় শ্রীরাম বলতে বলে পিটানো হয়েছে।] গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে তারা নাজেহাল “সামাজিক ন্যুইসেন্স” তৈরি করতে নেমে পড়েছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে একইভাবে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা ঐ মুসলমান গৃহস্থকে খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ এরপরেও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে? কেঁউ মাথা ঘামায় নাই। কংগ্রেসের নেতাকর্মি অথবা কোন কমিউনিস্ট এনিয়ে প্রশ্ন করার মুরোদ আছে দেখি নাই আমরা।  মর্ডান রিপাবলিকের অর্থ তাতপর্য তারা নুন্যতম কিছু বুঝে অথবা চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ হচ্ছে এটা – এই বুঝ থেকে তারা কখনও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারে নাই। এটাই একটা বিরাট প্রমাণ যে ভারত আসলেই এবং বরাবরই একটা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র। এর বাইরে রাষ্ট্র কী, অন্য কোন রাষ্ট্রের রূপ কী – এনিয়ে ভারতের কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা কোন প্রগতিবাদীদের কোন বুঝ, কোন স্টাডি কোন বুঝাপড়া কিচ্চু নাই।

এই কথার আরও প্রমাণ পেতে চাইলে  আরও লক্ষ্যণীয় হল, যেমন এখনকার কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী – এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত। মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও কংগ্রেস নুন্যতম অন্তত প্রতীকী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। কংগ্রেসে তা না হয়ে, আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই তথাকথিত সেকুলারিজমের জামাখুলে প্রকাশ্যেই নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে এটা নাকি মোদীর মত হার্ড হিন্দুত্ববাদ না,”সফট হিন্দুত্ববাদ”। এই দাড়িয়েছে এখন কংগ্রেসের ‘সেকুলারিজম’। অর্থাৎ  তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস এখন আর হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদীর হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। ওদিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে তারাও সব আসন হারিয়েছে শুধু তাই না, নিজেদের ভাগের ২২% ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদের নির্বাচনে, মোদীর দলকে। তাতে ব্যাপারটা এখন দাড়িয়েছে এই যে, হিন্দুত্ববাদ ঠেকানোর বোলচালের দলগুলাকে মোদী এবার তাদেরকে আসল চেহারায় এনে ছেড়েছে, এটাই আসলের মোদীর ক্ষমতার আসল সাফল্য!

আবার লক্ষ্য করা যাক, এই নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হয়ে হলে, পরদিন (২০ মে) মোদী হিন্দু তীর্থস্থান উত্তরপ্রদেশের পাহাড়ে প্রাচীন কেদারনাথের মন্দির গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে বসে গেলে তা দেখে কংগ্রেসীদের জবাব হল আমাদের রাহুল তো সেখানে কেদারনাথের মন্দিরে পায়ে হেঁটে গেছিলেন আর মোদী গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে, কাজেই আমরা শ্রেষ্ট।  আসলে এইখানেই মোদীর হিন্দুত্ব অনেক আগেই বিজয় লাভ করে গেছে। তাই ভোটের ফলাফলে না, মোদী আসলে এখানেই বহু আগেই কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন।

হিন্দুত্ব কত ভারী এর লক্ষ্যণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন। মোদীর হিন্দুত্ব কত পাওয়ারফুল,বাকি সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে, পিছনে ফেলে নিজে সবার উপরে উঠে যেতে পারে এরই প্রাণ এগুলো।

যেমন, সবপর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদী-অমিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তাদের জোট ৩০০ এর আশেপাশের আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তব ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও ভালমত ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ শুরু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেছে তা নয়, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করে নাই, এটা এমনই ফলাফল।

আবার, সাধারণত রাজ্য সরকারে (যেমন রাজস্থানে কংগ্রেস ) কোন দল সরকারে আছে এটা লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল  সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথায় এমন ফ্যক্টর এবার কাজ করে নাই। এমনকি যেখানে গত মাত্র পাঁচ মাসে আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা কোন বিজেপি বিরোধী দল জিতেছে সেখানেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই এবার বিজেপি আবার ফিরে ঐ রাজ্যের প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এই অবস্থা দেখা গিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় বা কর্ণাটক এমন রাজ্যে। এসব রাজ্যের ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। খুব ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এমন দেখা যায় না। অথচ বিজেপি এবার এমন হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই জিতেছে।

আবার,নর্থ-ইষ্ট মানে আসাম-ত্রিপুরাসহ ছোট ছোট ট্রাইবাল সাত রাজ্য। আসামে এনআরসি [National Register of Citizens (NRC) ] অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর সর্বশেষ চল্লিশ লাখ হিন্দু-মুসলমান লোক নানান কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ জোগাড় করতে ফেল করেছে। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। গতবছর জুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। কারণ নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছিল। মিজোরামে “বাই বাই ইন্ডিয়া” বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর চলতি হিন্দুত্বের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এজাতীয় সব “কথিত নাগরিক আপত্তি” হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি সাত রাজ্যেই বেশিরভাগ আসন নিয়েছে, কোন রাজ্যে সবগুলোই।

আবার, কলকাতার মানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রচন্ড রকমভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তাঁর তৃণমুল দলের লোকসভার ৩৪ আসন এবার নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি দুইটা থেকে এক লাফে ১৮ আসন  পেয়ে গেছে। তৃণমুল বা মমতা রাজনীতি ও তাঁর সরকারের অনেক দোষ বা অভিযোগ থাকতে পারে, অনেকের অপছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রধান বাধা এখনো এই মমতাই। বিশেষ করে বিজেপির এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে আরও সফল হতে গেলে মোদীর প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানোর ব্যবস্থা করা – তা বলাই বাহুল্য।

ফলাফল প্রকাশের দিন, নিজের বিজয় নিশ্চিতের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছেন। এখনও করছেন। কিন্তু এসব জায়গায় সেখানে তিনি আগে নির্বাচনি প্রচারের সময়ে কত কী বলেছেন ঘৃণা ছড়িয়েছেন সব ভুলে এমনকি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে নির্বাচনের পরে এখন “তিনি সবার নেতা” বলে দাবি করেছেন। তিনি নিজেই  গত ২০১৪ নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – সেই শ্লোগান ওদিন তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হবার পরে প্রথম এবার উচ্চারণ করলেন। এবার নির্বাচনের পর ভোল পাল্টায়ে তিনি নিজেই “সংখ্যালঘুদের” সহানুভুতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, বলছেন”He said if his first term was about “Sabka sath, sabka vikas (Alongside all, development for all)”, his second would stand for “Sabka sath, sabka vikas, sabka vishwas (Alongside all, development for all, trust of all)”।  এই নির্বাচনি বিজয়ে পুরা সময় তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলার সাফল্য গাথা দিয়ে। “পাকিস্তান” = “মুসলমানের” বিরুদ্ধে তিনিই একমাত্র “ভারত-রক্ষক” – এই ছিল তার বয়ানের পাঞ্চ লাইন। আর দ্যা হিন্দু পত্রিকা তাদের নির্বাচন উত্তর গবেষণার ভিত্তিতে বলছে এই বক্তব্যের প্রভাব এমন ছিল যে এক্সিট পোলে অংশ নেয়া মানুষ  বলেছে অর্থনীতি মোদীর ঘাটতি আছে, সাফল্য নাই কিন্তু তবুও তারা মনে করে বালাকোট ইস্যুটাও গুরুত্বপুর্ণ – তাই মোদীকে ভোট দিয়েছেন। দা হিন্দু Balakot plank বলে উপশিরোনামে বলছে, বালাকোটকে ইস্যু করে মোদী রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ আর উত্তরাখন্ডের সব আসনের দখল পেয়েছে [all seats in Rajasthan, Gujarat, Madhya Pradesh, Haryana, Himachal Pradesh and Uttarakhand.]

আমাদের মনে রাখতে হবে, একথাটাও সঠিক যে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির মুখ্য টার্গেট – প্রধান উদ্দেশ্য পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে শেয়ার না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে এখন সুশীল হয়ে বলছে  নির্বাচনের সময় “মোদী একটু হিন্দুত্বের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু এখন সে এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল হয়ে যাবে” ভাবতে পারেন, একথা বলেছেনও। ইতোমধ্যে অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। যেমন কলকাতার টেলিগ্রাফ লিখছে Narendra Modi tried to shake off his divisive image and reach out to the minorities on Saturday। এছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি, একথাও ঠিক। কিন্তু একটা জিনিষ এখনই সবাই নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারে। তা হল – হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদীর পক্ষে আর সামনে আগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজনীতিতে – এটা আর সম্ভব নয়।

অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির “আগানোর” প্রধান কর্মসুচী হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মত “নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি” করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এনিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কিন্তু তাতে কী হতে পারে?

কলকাতায় যদি আসামের মত এনআরসি-ততপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোন হিন্দু নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে মোদী সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দিবার ব্যবস্থা নিবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহালে শেষ করা হবে। মুসলমানদের বেলায় কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয় অন্তত ক্যাম্পে নিয়ে ফেলে রাখবে। কপাল ভাল থাকলে তাকে আগের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন কোন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে! এতদিন এককথায় গরীবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল সেসব ছিনে এখন  সকলের জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করবে।

ওদিকে লক্ষ্যণীয় আর এক বিষয় হল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের বাংলায় নতুন করে এনআরসি-ততপরতা বা বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে ডেকে আনার রাজনীতিটা ঠিক পছন্দ করছে, তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হতে পারে এটা কাজ বেড়ে যাবে অনেক, অথবা অজানা বহু অভিমুখ গতিমুখ তৈরি হয়ে যাবে তা কোথায় গিয়ে না ঠেকে সে আশঙ্কায়, হতে পারে। অথবা হতে পারে ভান করা। যাতে এর প্রতিক্রিয়া কোথায় কোন পর্যায়ে হচ্ছে আগামিও হতে পারে তা জেনেবুঝে নেওয়ার সুযোগ নেয়ার কারণ। সারকথা তারা স্বস্তিদায়ক ঘটনা হিসাবে দেখছে না।

(ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫ টা। এখানে মোদীর টার্গেট হবে [উত্তর প্রদেশের মত এটা আশিটা না হলেও] এই ৬৫ আসন এটার গুরুত্ব কম হবে না – এগুলো বিজেপির পক্ষে হাসিল করা। এক এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসন গুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদীর আশু লক্ষ্য।

মতুয়াঃ
বাংলাদেশে ট্রাইবাল বলতে পাহাড়ি বা সাঁওতালদের মত বিক্ষিপ্ত নানান পকেট আছে এগুলাই। এছাড়া সমতলিদের মধ্যে কোন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠি  এখনও টিকে বা বজায় থাকার কথা এখন আর জানা যায় না। বুঝা যায় তারা বিভিন্ন মানুষ মিলেমিশে এখন একই সমা্জে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা গড়ে পুরান ট্রাইবাল পরিচয়্টা ঘুটা দিয়ে গুলিয়ে দিয়েছে। তবু আমাদের গোপালগঞ্জের জেলার “মতুয়া” বলে এক হিন্দু জনগোষ্ঠির কথা জানা যায়। বাংলাপিডিয়া “মতুয়া”দের কথা বলছে। বলেছে, “গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারা” বলে এদের চিনিয়েছে। বলেছে ,“গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত”। এই জনগোষ্ঠিরই প্রধান বা বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বণগাঁও মহুকমাতে সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে।

গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠি বর্তমানে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘদিনের এমপি ছিল মমতা ঠাকুর। সে তৃণমুল দলের এমপি ছিল, কিন্তু সে এবার হেরে গেছে। আর সে জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন [তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাল মতুয়া, বনগাঁয় জয়ী শান্তনু]। এই দুই প্রার্থীই যদিও মুল গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। কিন্তু কেন মুখ ফেরাল? আনন্দবাজার লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে এখানে সভা করে গেছেন। “মোদীজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে”। আর সেই থেকে এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাতাল শুরু হয়েছে। পুরা ব্যাপারটাই ইঙ্গিত দেয় যে মোদী এনআরসি আন্দোলন নিয়ে কিভাবে আগাতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও একারণেই এবার দুহাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মতুয়াদের নড়াচড়াটা হিন্দুদের অবস্থা বুঝার জন্য প্রতীকী।

আসামের এনআরসি ততপরতা শুরু করার সময় মোদী সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা “ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” হয়ে থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষ্য দিয়ে সেকথার অনুরণন করে বিবিসিকে বলছেন, “নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন মি: মোমেন”। কিন্তু তাঁর পরচুলার মতই একথাও আসলে নকল, কোন ভরসা নাই। অন্তত নির্বাচন পরবর্তি নড়াচড়াগুলা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর হল তার কথায়, “বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোন কারণ নেই” । আচ্ছা মোদীর মুখপাত্র হয়ে তাঁর এই সাফাই দেয়াটা কেন প্রয়োজনীয়? কিছু না বলে “দেখছি” বলে থাকা যেত না?  সত্যি অদ্ভুত!

কিন্তু আর একটা দিক যখন আগে ভারত “আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” বলেছিল তখন “বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে” এমন কোন আইন বা ইস্যু ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা এই আইন এখন আছে। যা এখন নড়াচড়া করে উঠবে, সচল হবে অনুমান করা যায়। এটা নিয়ে বাংলাদেশেও একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। তবে দুই তরফে। এক, একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ততপরতা শুরু হলে সেখানে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার এই ততপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোন খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হলে এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, তা বলাই বাহুল্য। তারা খুবই ক্ষুব্ধ হবে অনুমান করতে পারি। তাই পুরা বিষয়টা নিয়ে মোদী সরকার ঠিক কী কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে এর একটা এসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কোথায় এবং কী কী তা নিয়ে কথা বলা, সম্ভাব্য স্বার্থবিঘ্ন কী হতে পারে তা নিয়ে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও ততপর হওয়া জরুরি। আমাদের সকলেরই সুস্থ শরীর ব্যস্ত হয়ে উঠার, অস্থির হয়ে উঠার দিন কী সামনে! সত্যি কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য কে জানে! আমরা সবাই কী বলি হয়ে যাব এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৫ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি! এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

গৌতম দাস

২০ মে ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Ap

 

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচন প্রায় শেষ। এটা ভারতের ১৭তম লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন।  নির্বাচনের ছয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছিল আগেই। আজ ১৯ মে রোববার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এরপর ২৩ মে সকাল থেকে একযোগে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। ঐদিনই দুপুর ১২টা নাগাদ কোন প্রার্থী কে কোথায় এগিয়ে থাকছেন তা আঁচ পাওয়া শুরু হয়ে যাবে। কোন দল সরকার গড়তে যাচ্ছে এর অভিমুখ আন্দাজ করাও ঐদিনই সন্ধ্যার পর থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কে কোন আসনে জিততে যাচ্ছে; কোন দলের প্রাপ্ত মোট আসন সংখ্যা কেমন হবে ইত্যাদিও। আর প্রাপ্ত সে ফলাফলের ভিত্তিতে পরেরদিন ২৪ মে থেকে প্রত্যেক দলের জোট গড়ার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যাবে। ফলাফল কী হতে পারে এপ্রসঙ্গে প্রায় সবারই অনুমান ভারতে একটা কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

আসলে ভারতে কোয়ালিশন সরকার এবারই নতুন না। বরং গত ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সব সরকারই ছিল আসলে কোয়ালিশন সরকার। এমনকি মোদীর চলতি সরকারে বিজেপির মারজিনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এটাও ছিল এক কোয়ালিশন সরকার। তবে এ পর্যন্ত এসব কোয়ালিশন সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল হয় কংগ্রেস না হয় বিজেপির নেতৃত্বে। সেকালে এ’দুই পার্টির কোন একটা কোয়ালিশনের নেতা না থাকলে সরকার টিকে নাই। যেমন, ১৯৯৬ সালে দেবগৌড়া-জ্যোতি বসুর কোয়ালিশন ছিল এমন এক ব্যতিক্রম যা ১৮ মাসের বেশি টিকে নাই। তবে এবারই কংগ্রেস অথবা বিজেপিকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও এরকম আরও কয়েকজন যেমন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা মায়াবতী বা অন্ধ্রপ্রদেশের সিটিং মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুও আছেন যারা এমন সরকারের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। আর মমতাই এমন ভিন্ন ধরণের কোয়ালিশন সরকারের বিশেষত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে একে আলাদা নাম, ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর সরকার বলে ডাকছেন।

দুনিয়াতে  রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিপরীত ধারণা হিসেবে ইতিহাসের একপর্যায়ে উঠে আসে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা। যার মূল বৈশিষ্টগত ফারাক ও নতুনদিকটা হল,  রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার বলতে এটা পাবলিকের গণসম্মতির রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রে এর ক্ষমতার উতস – নাগরিক লোকক্ষমতা।  এছাড়াও এমন রাষ্ট্রের আবার আরও একটা রূপ আছে। বিশেষত কাঠামোর দিক থেকে বিচারে দুনিয়ায় সেই রাষ্ট্র-রূপটার নাম – ফেডারেল রিপাবলিক রাষ্ট্র। একে ফেডারেল বলার কারণ হল, এখানে রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রদেশ নিয়ে গঠিত বা বলা যায় রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রাদেশিক ইউনিট বা রাজ্যে বিভক্ত থাকে। তবে ফেডারল রাষ্ট্রের  বৈশিষ্টের মূল জায়গাটা হল, এখানে রাষ্ট্রের  কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও সম্পদ ইত্যাদি কী ভিত্তিতে রাজ্যগুলোও এসব উতস ব্যবহারের সমান সুযোগ [access] পাবে তা আগেই বিস্তারিত এর লিখিত নিয়ম বলা থাকে, একটা ন্যায্যতার ভিত্তিও যেন সেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাজ্য বা রাজ্য-সরকারকে দেয়া বরাদ্দ যেন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানের পছন্দের বা অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে, এভাবে এখানে রাজস্বসহ সব বরাদ্দ হতে হয়। রাজস্ব, সম্পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদিতে কোনো কোনো রাজ্য যেন কোন বৈষম্যের শিকার না হয়- এমন কাঠামোগত প্রটেকশন ব্যবস্থা থাকাই ফেডারেল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। ভারত আমেরিকার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় দলগুলোর সমন্বয়ে একটা কেন্দ্রীয় সরকার গড়া অর্থে মমতা এটাকে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ [Fedaral Front]- এর সরকার বলছেন।

গত ১৭ মে ছিল শেষপর্বের এবং পুরা নির্বাচনের প্রচারণার সর্বশেষ দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী ততপরতা ও কার্যক্রমের সমাপ্তি হিসেবে দলের প্রধান অমিত শাহকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। অমিত শাহ মুখস্থ কথার মত সেখানে বিজেপির জোট তিন শতাধিক আসন পাবে বলে দাবি করে আসছিলেন। মজার কথা হল, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক পাশে বসা মোদীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বলছিল না। ঐ সাংবাদিক সম্মেলনের পুরা সভা পরিচালনা ও শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সবই অমিত একাই করছিলেন, মাঝে মোদী কেবল একবার তার প্রশাসনের পাঁচ বছর সমাপ্ত হল বলে নিজের কিছু অনুভূতি প্রকাশ ও শেয়ার করেছিলেন। তবে কোনো কারণে তিনি এদিন সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি, সব অমিত একাই সামলেছেন। দ্যা হিন্দু পত্রিকা বলছে, এটা গত পাঁচ বছরের শেষে এক বড় ব্যতিক্রম [At his first press conference in 5 years, Modi says Amit Shah will take questions]। তবে মোদীর বক্তব্যের শরীরী-ভাষ্য ছিল ভিন্নররকম। যেন তিনি বলতে চাইছিলেন, গত পাঁচ বছরের শাসন আর এই নির্বাচনী প্রচারণা মিলিয়ে যা কিছু পেরেছি সব করলাম। যেন তিনি এখন ভগবান ভরসায় আছেন যদি তিনি আবার তাঁকে ক্ষমতায় আনেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় তিনি আবার ফিরে আসছেনই এমন কনফিডেন্স, গত ২০১৪ সালের মত, মোদির নিজের ওপর আস্থা বা মোদি-জ্বর ইত্যাদি কোনটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিবিসি (১৮ মে দিবাগত) রাত দশটায় এক খবর ছেপেছে যেখানে বলা হয়েছে মোদী উত্তরপ্রদেশেরও আরও উত্তরে প্রাচীন কেদারনাথ মন্দিরে ধ্যানে বসেছেন। বিবিসি শিরোনামে বলেছে এটা মোদীর “স্পিরিচুয়াল ব্রেক” [spiritual break]। ঘটনা হল তিনি নিজেই বা তাঁর দল টুইটারে ছবিসহ এই খবর দিয়েছে। একই ছবি দিয়ে তবে বিবিসির একটু আগে মধ্যপ্রাচ্যের এক ইংরাজি দৈনিক গালফ টুডে রিপোর্ট করেছে যে এই  ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। টুইটারেও অনেকে  মন্তব্য লিখেছে। একজন বলছে তিনি গতদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের সময় থেকেই তিনি ধ্যানে [@Bhai_saheb: Yesterday modiji was meditating in press conference and today at kedarnath]। সে যাই হোক মোদীর “মন অশান্ত” এটা স্বপ্রকাশিতভাবে বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ আগেরদিনের সাংবাদিক সভায় মোদীর শরীরী ভাষায় যে তিনি নিজেকে “হবু বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী” হিসাবে কনফিডেন্ট মনে করতে পারছিলেন মনের সেই অস্থিরতার কথাই আজকের টুইটারের ম্যাসেজ থেকেও প্রতিষ্ঠিত হল। এমনিতেই মোদী চরম মিথ্যাবাদী বলে মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করেছিল দুদিন আগে যে – ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট তিনি অনেক আগেই ব্যবহার জানতেন বলে এমন আগের সময়ে তিনি দাবি করেছেন সেটা ভারতে বাণিজ্যিকভাবে  ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট চালু হবার বছর পাঁচেক আগের ঘটনা হয়ে যায়।

   ______________________

সর্বশেষঃ  আজ ১৯ মে সন্ধ্যা থেকে এই প্রথম এক্সিট পোলের মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য আসতে শুরু করেছিল। এক্সিট পোল মানে ভোটের বুথ ফেরত কিছু সংখ্যক লোকের সাথে কথা বলা – এমন নমুনার ভিত্তিতে সংগৃহিত তথ্যের বিশ্লেষণ মন্তব্য। এমন আটটা  কোম্পানি থেকে প্রকাশিত আট এক্সিট পোলের ফলাফল  মানে অনুমান-মন্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ছয়টাই বলেছে মোদীর জোট  আবার ক্ষমতায় ফিরবে। মানে ২৭২ এর বেশি আসন পাবেন। কেবল দুটা এক্সিট পোলের ফলাফল-অনুমান-মন্তব্যে একটা বলছে ২৪২, অন্যটা বলছে ২৬৭ আসন পাবে। বলাই বাহুল্য এগুলো খাটি অনুমান মাত্র, সত্যি ফলাফল নয়। আর ভারতের নির্বাচনে এর আগে এক্সিট পোলের অনুমানের পুরা উলটা ফলাফল বাস্তবে হয়েছে এমন রেকর্ডও আছে। তাই  আসল ফলাফল পেতে ২৩ মে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আমরা সতর্কতা হিসাবে ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি
(প্রাক্তন বিজেপি নেতা) ভেঙ্কায় নাইডু বলছেন, “Exit polls do not mean exact polls...Since 1999, most of the exit polls have gone wrong”- উনার এই কথাটা মনে রাখতে পারি।______________________

ওদিকে  কেবল নন-কনফিডেন্ট মোদী কেবল চেহারাতেই নয়, মোদী সম্ভবত যে ফিরে ক্ষমতায় আসতে পারছেন না সে ব্যাপারটা চার দিকে সেভাবেই খবর ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অন্তত নির্বাচন শুরুর পর থেকে। প্রায় পাঁচ জোড়া নির্বাচনী-বিশ্লেষক গ্রুপ কেউই নির্বাচন শুরুর (১১ এপ্রিলের) পর থেকে আর ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে, মোদী আবার ক্ষমতায় আসছেন। শুধু তাই না, এবার মিডিয়াগুলোও তাদের মূল্যায়নে বলা শুরু করেছে, মোদির বিজেপি ও তাঁর জোট এনডিএ-কে সাথে নিলেও সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসন ) বিজেপি পাচ্ছে না। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোকে ভাগিয়ে নিজ নিজ জোটে ঢুকিয়ে নিতে ফলাফল ঘোষণা হবার পরে হর্সেস ট্রেডিং বা  এমপি কেনা-বেচার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠল। আর কংগ্রেসের বেলায় বলা হচ্ছে, ফলাফলে যদি তার মোট প্রাপ্ত আসন এক শ’র নিচে হয়, তবে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি ছেড়ে দেবেন আগেই; আর সেই সাথে জোটের অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবেন [কুর্সিতে অনড় নয় কংগ্রেস,বার্তা আঞ্চলিক দলগুলিকে]। আর যদি দেড় শ’র বেশি আসন পান, সে ক্ষেত্রেই কেবল জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল দরকষাকষিতে নামবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস যদি এক শ’র নিচে আসন পায় তবে আর কংগ্রেসের পক্ষের জোট ইউপিএ-এর পক্ষের কাউকে ভাগিয়ে মোদী তার এনডিএ জোটকে মোট ২৭২ এর উপরে নিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরাই ফেডারেল ফ্রন্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন করার সম্ভাবনা হাজির হয়ে যাবে।

নির্বাচন কেমন হলো?
এবারের নির্বাচন কেমন হলো? এক কথায় জবাব, খুবই খারাপ। ভারত-রাষ্ট্র আরেকবার আরেক ধাপ দুর্বল হয়ে গেল। এটা বলাই বাহুল্য যে কোন নির্বাচন কমিশন যখন নিরপেক্ষতা সততা স্বচ্ছতায় একটা সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাতে সবচেয়ে সবল হয়ে উঠে খোদ রাষ্ট্রটাই। ওর প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যত দৃঢ় হয়।  কিন্তু এবারের ভারতের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই এসব ক্ষেত্রেই অসফল; ফলে এই কমিশনই  ভারত-রাষ্ট্রকে পরাজিত করে দিল। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেল।

কিন্তু “আরেকবার” কেন? আর দুর্বল হওয়া মানেইবা কী?
সাধারণভাবে বললে, ভারত-রাষ্ট্র মূলত চালায়, চালিয়ে আসছে এর ব্যুরোক্র্যাটেরা। সেটাই হবার কথা এবং একমাত্র বিকল্প। কারণ ১৪০ কোটির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এক রাষ্ট্র, একে দক্ষ ব্যুরোক্র্যাটরাই একমাত্র চালাতে পারবে – এটাই স্বাভাবিক। অনেকে ভাবতে পারেন যে, কেন এভাবে বলা হচ্ছে যেখানে বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা তো সমাজে নেতিবাচক ধারণার বলে মনে করা হয়। হা তা থাকলেও মনে রাখতে হবে  বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা আসলে ইতিবাচক পজিটিভ এবং প্রয়োজনীয় শব্দ। প্রথমে এর সেই ইতিবাচক অর্থ বুঝতে হবে বুর‍্যোক্রাসির আসল মানে কী? আমাদের পরিবারগুলোর প্রধান ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা আমাদের মায়েরা। মা সন্তান, স্বামীসহ সব মেম্বারদের নিয়ে সবাইকে ভাত বেরে খাওয়ায় এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু ধরা যাক পরিবার বড় হয়ে যাবার কোন কারণে মা সন্তানদের মাথার কাছে নিয়ে হাত বুলিয়ে ভাল বেড়ে আর ভাত খাওয়াতে পারছেন না। তাই ম্যানেজ করার সুবিধার্থে মা নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছেন। এতে খাবার সবার পাতে পাতে আর তুলে না দিয়ে বাটিতে বাটিতে তরকারি বেড়ে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যেখানে কোনটা কার বাটি তা বুঝতে বাটির নিচে চিরকুটে নাম লিখে রাখা হয়ছে। এতে মার পক্ষে বড় সংসারটা ম্যানেজ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে, স্বাশ ফেলার সময় পাচ্ছেন। আর এখানেও মায়ের স্নেহ-মমতা প্রকাশ আছে অবশ্যই, তা টের পাওয়া যায় কিন্তু একটু পরোক্ষে। এটাই বুর‍্যোক্রেসি, এক বুর‍্যোক্রেটিক ম্যানেজমেন্ট।  বড় হয়ে যাওয়া যে কোন কাজ একমাত্র এভাবেই ম্যানেজ করা সম্ভব। এক লিখিত নির্দেশিকা বইয়ের মাধ্যমে বড় কাজ পরিচালনা।
এখন মা যাকে ম্যানেজার বা কেয়ারটেকার রেখে এই নতুন ব্যবস্থাপনা চালু রেখেছেন সেই ম্যানেজার এবার নিজের অসৎ কোন স্বার্থে মায়ের নির্দেশের উলটা মানে করল বা প্রয়োগ করল, আর মাও আবার তদারকি মনিটরিং করা ঢিলা দিল বা ভুলে গেল। অথবা মায়ের এক দুষ্ট সন্তান যে জানে, ডাক্তারের নির্দেশে তার এক বোনের বিশেষ যত্ন নিতে সেই  ভাগের বাটিতে বেশি মাংস থাকছে আজকাল  তাই  সেই দুষ্টু সন্তান এবার ম্যানেজারের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বাটি অদলবদল করে নিয়েছে ইত্যাদি  – এই যে পরিস্থিতি এখানে এসে এবার বুর‍্যোক্রাসির অর্থ হয়ে দাড়াবে নেগেটিভ। বুর‍্যোক্রাসির মানে হয়ে যাবে এবার অবহেলা, হ্যারাসমেন্ট দুর্নীতি ইত্যাদির এক ব্যবস্থা। তাহলে সারকথায় কোন কাজ ততপরতা যখ্ন বড় হয়ে যায় তা ম্যানেজ করতে বুর‍্যোক্রাসির বিকল্প কোন উপায় নাই। তাই আবার তদারকি মনিটারিং এর ভাল ব্যবস্থাপনা দিয়েই একে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বুর‍্যোক্রাসির অর্থ ইতিবাচক করাই একমাত্র পথ।

কাজেই যেখান থেকে কথা উঠেছিল,.১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতকে পরিচালনা করতে পারে কেবলমাত্র এক দক্ষ ও করিৎকর্মা এক বুর‍্যোক্রাসিই।  তবে এদের উপরে বসে রাজনৈতিক নির্দেশ দিতে, ভালো রাজনীতি ও রাজনীতিবিদও অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র চালানো শুধু ব্যুরোক্র্যাটদের কাজ নয়। এ ছাড়া শক্ত এক বিচার বিভাগও আরেকটা খুবই প্রয়োজনীয় অঙ্গ। ওদিকে নির্বাচন কমিশনও আছে – এরাও মূলত ব্যুরোক্র্যাটেরই অংশ। তাই তাদেরও শক্ত ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বলা হয়ে থাকে, সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (১৯৯০-৯৬) টিএন সেশন – তিনি তার আমলে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ও কঠোর সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে, আর সেটাই নির্বাচন কমিশনের আজকের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রধান উৎস। কিন্তু তবু এবারের নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশন ‘পরাজিত’।  অনুমান করা হচ্ছে রাজনীতিবিদের কারণে প্রভাবিত হয়ে দ্বিতীয়বার ভারত-রাষ্ট্রের পরাজয় ও দুর্বল হওয়ার ঘটনা ঘটল। চলতি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনাস্থা জমেছে পাহাড় প্রমাণ।

এবারের নির্বাচন ছিল পরিচালনের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এক নির্বাচন। যার মূল কারণ হল, মোদীর অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। আর তা থেকে পালাতে আড়ালে যেতে তিনি নির্বাচনকে সাজিয়েছেন “হিন্দুত্বকে” মুখ্য বা কেন্দ্র করে। হিন্দুত্বই শ্রেষ্ট এবং সবকিছু – এই বক্তব্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান হিসাবে মোদী তাঁর সব সংজ্ঞায়িত বা অসংজ্ঞায়িত ক্ষমতাকে অপব্যাবহারে কাজে লাগাতে নেমে গেছেন যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ভোটের স্বার্থে মুচড়ে ব্যবহার করা যায়। এতে তাঁর সৃষ্ট এই অযাচিত চাপ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা দ্বিধাগ্রস্থতা থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই বিশেষত মোদীর বিরুদ্ধে একশন নেবার ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে গেছে।  দ্বিতীয় সদস্য তাঁকে কোনঠাসা ও উপেক্ষা করে রেখেছে প্রধানসহ অন্য জন – মিডিয়াতেই এই অভিযোগ এসে গেছে।
এককথায় বললে, রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান যখন আইন মানতে চান না বা তাঁর বিরুদ্ধে যখন আইন প্রয়োগ করা যায় না বা প্রয়োগ কর্তা ভীত হয়ে এড়িয়ে চলতে চায় – এটা হল সেই অবস্থা। মূলত এটা রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া, অকেজো নন-ফাইশনাল হয়ে পড়ার পুর্বলক্ষণ। এমন অসহায় অবস্থার প্রকৃত  মানে বা ইঙ্গিতটা হল, রাষ্ট্রকে আবার ঢেলে সাজানো, নতুন করে প্রজাতন্ত্র গড়বার মুরোদ দেখানোর জন্য রাষ্ট্র আহবান জানাচ্ছে।

এমনই, প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি আসন থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘কারচুপি করে’ জিতেছিলেন – এই অভিযোগে ১৯৭১ সালেই মামলা হয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টে। এরই রায় এসেছিল ১২ জুন ১৯৭৫ সালে। সেবার আদালত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে সশরীরে এসে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিলেন, এমনকি আদালত পুলিশের নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর আদালতে প্রবেশ অনুমোদন করে নাই। বরং আইন সংশ্লিষ্ট সব পেশার লোক যারা আদালতে আসেন তাদের নিয়ে গড়া এক হিউম্যান চেইন – এর ভিতরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে রেখে আদালতের এমন নিজস্ব নিরাপত্তায় ইন্দিরা গান্ধী এজলাসে উঠে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু  রায় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে যায়, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাতে ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আপিল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত করেছিল আর কয়েকমাস পরে, ৭ নভেম্বর বিস্তারিত শুনানিতে সব শাস্তি রদ করে দেন। কিন্তু এর অনেক আগেই ঘটনা অন্য দিকে গড়ায় ও গতিমুখ বদলে যায় ।

হাইকোর্ট তার মূল রায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনে জিতবার দায়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওই কারচুপির নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে দেন। এছাড়া ইন্দিরার প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এর আগেই অন্য কাউকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়ার সংসদীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী ২০ দিন সময় দিয়ে ঐ নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু এখানেই নির্বাহীপ্রধান ইন্দিরা আইনের উর্ধে উঠে যেতে চাইলেন।

ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে যেন ক্ষমতা ছাড়তে বা সাজা খাটতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে পরবর্তি ২০ দিন শেষ হওয়ার আগেই ২৫ জুন ১৯৭৫ সারা দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে বসেন। এতে তিনি নাগরিক মৌলিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার, মিডিয়ায় সেন্সরশিপ আরোপ ইত্যাদি প্রায় সবকিছু করার সুযোগ নেন, সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। কনস্টিটিউশনাল জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে তিনি পাল্টা দাবি করেছিলেন যে, ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং তা ঠেকাতে’ এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। এভাবে স্রেফ নিজেকে বাঁচাতে তিনি রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশনকে অকার্যকর ও দুর্বল করে ফেলেন, খরচের খাতায় ঠেলে  দেন।
প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতাকে বা ক্ষমতাকেন্দ্র একক রাখতে হয় বিভাজ্য করা যায় না। একে বিভক্ত বা কোনো শরিকানা করার ভুল করা যায় না। একথা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে এই ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্যও কিছু পদক্ষেপ থাকতে হয়। যেমন কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও নির্বাহী প্রধানের বৃহত্তর অধীনেই রেখে; তবে ব্যক্তি না বরং নন-পারসনাল, অবজেকটিভভাবে ওর ক্ষমতা স্ট্যাটুটরি বিধানে বর্ণিত করে রেখে দেয়া হয়। যেমন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিষ্ঠান, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কম্প্রোটোলার জেনারেল নিয়োগ ইত্যাদির বেলায়। অথবা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে (তুলনামূলক অর্থে) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে স্বাধীন করে রেখে দেয়া খুবই দরকার হয়; যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া বা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় এবং যাবেই। কারণ শত আইন করে, লিখে রেখে এমন বিপর্যয়গুলোকে বন্ধ করা যাবে না। কারণ নির্বাহীপ্রধানই যদি আইনের উর্ধে উঠে যেতে চান তখন কী হবে! এর জবাবে বলা হয়, যাদের দিয়ে ক্ষমতার এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হবে, ক্ষমতার চর্চা হবে তারা নিজেরা প্রজ্ঞাবান হবেন – এটাই এর একমাত্র প্রতিকার। বিশেষ করে নির্বাহী প্রধানের হাতে এবং যার যার এখতিয়ার পেরিয়ে অন্যের সীমানায় ঢুকে পড়া, কোনো সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। আর সর্বোপরি, কেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে এমন করে রাখা হয়েছে, এর সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

কিন্তু না হলে?  অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন (যেটা সাধারণত নির্বাহী প্রধানের হাতে ঘটে থাকে, সেই ইংল্যান্ডের রাজার আমল থেকেই) ঘটলে তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা ও ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার কারণে রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়বে। তাই ঘটেছিল।

ভারতের জরুরি আইন জারির প্রায় দুবছর পরে ইন্দিরা গান্ধী (২১ মাসের) জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে, ১৯৭৭ সালে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিলেন এবং গোহারা হেরেছিলেন। তিনি নিজে এবং বড় সন্তান সঞ্জয় গান্ধী এতে পরাজিত হন অর্থাৎ পরোক্ষে শাস্তি পেয়েছিলেন বলা হয়। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতার দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এরই একটা দাগ হল এবারের নির্বাচনে এই দুরবস্থা।

কারণ ইন্দিরার ঐ ঘটনা এরপর থেকে ভারতের বিচার বিভাগ বা প্রশাসনে জড়িয়ে থাকা পেশাদার ব্যক্তিরা একটা শিক্ষা নিয়ে থাকবেন সম্ভবত – সেটা হলঃ  তারা কোনো দুর্দমনীয় নির্বাহী প্রধান মানে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে যাবেন না। বরং পরোক্ষে (কমন বন্ধুকে পাঠিয়ে) তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকবেন; আর বাস্তবে মুখোমুখি কোনো সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টা করবেন। খুব সম্ভবত ইন্দিরার ঐ ঘটনা সম্পর্কে তাদের মুল্যায়ন হল আদালতের ঐ একশন শেষ বিচারে কাউন্টার প্রডাকটিভ। তাই মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে মুখ বাঁচাতে হবে, সেটাই বেটার।  যেমন ওই মামলাতেই লক্ষণীয় হল, সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই সাজার রায় উল্টে দিয়েছিলেন। যদিও জরুরি আইন জারি থাকায় সে আমলে এটা করা তত জরুরি ছিল না। কিন্তু আসলেই কী এটা “বেটার”!

নরেন্দ্র মোদীর এই পাঁচ বছরে নির্বাহী ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অনেকবার তিনি ঘটিয়েছেন।  রিজার্ভ ব্যাংকের গর্ভনরের উপর চাপ সৃষ্টি অথবা নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা সিবিআই এর প্রধানকে অপসারণ করা নিয়ে বেপরোয়া হয়ে অনেক জল ঘোলা করেছেন। সেসব রেখে কেবল এবারের নির্বাচনের কথায় আসি। অন্যান্য বারের মত এবারের নির্বাচনের আগেও ভারতের নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ এক আচরণবিধি জারি করেছিল। সেখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে কোনো নির্বাচনী বক্তব্য দেয়া যাবে না, কাশ্মিরে পুলওয়ামায় প্যারামিলিটারি গাড়িবহরে হামলা বা এরপরে পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত ভারতের বিমান হামলা – এগুলোকে নির্বাচনী বক্তব্য বা পোস্টারে আনা যাবে না। বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু মোদী নিজেই  এসবগুলো আচরণবিধির সবই ভঙ্গ করেছেন। যেমন তিনি “তাঁর সেনাবাহিনীর” সাফল্য, যারা বালাকোটে সন্ত্রাসীদের বোমা মেরে ধ্বংস করে এসেছে “তাদের সম্মানে দেশপ্রেমে” এবারই প্রথম ভোটার’ যারা সে তরুণেরা যেন মোদীকে ভোট দেয়- এরকম প্রচারণার সব অভিযোগ মোদীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল।

কমপক্ষে পাঁচটা এমন সিরিয়াস আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এসেছিল মোদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক গড়িমসির পরে সব অভিযোগ থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীকে খালাস দিয়ে দেয় [EC’s clean chit to PM came amid dissent]। এটা দ্যা হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ঐ খালাস দেয়াটাই শেষ কথা নয়। কোনায় একতা শব্দ আছে “amid dissent”। যার মানে হল, Ashok Lavasa নামে এক নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে।

এছাড়া প্রথম দু-তিনটা অভিযোগ বা মামলার ক্ষেত্রে সে অভিযোগ প্রায় মাসখানেক ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রায় কাছাকাছি অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ৪৮ ঘণ্টা, আর এক বিরোধী নেতা মায়াবতীকে ৩৬ ঘন্টা নির্বাচনি প্রচার ততপরতা চালানো থেকে বিরত থাকার শাস্তি দেয়া হয়েছিল। যোগী আদিত্যনাথও ঐ একই “মোদি কা আর্মি” বলে সম্বোধন করে মোদীর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। এছাড়া আবার অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ যেখানে রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন কমিশন শাস্তি দিয়েছিল, সেখানে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে কমিশনের কেন্দ্র দিল্লির অফিসে।

ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল তাদের পদক্ষেপ-হীন অভিযোগ ফেলে রাখার  নানান উদাহরণ দিয়ে। কিন্তু তবু আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক রায় শুনাতে যায় নাই। এর স্বপক্ষে অবশ্য আদালতের শক্ত যুক্তি আছে যা ভ্যালিড। তাই আদালত রায়ে বলেছে,  ‘কমিশন স্বাধীনভাবে এসব ব্যাপার নিজেই বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি দিতে পারে’  – এভাবে বলে এক উৎসাহিত করার রায় দিয়েছে। এর পেছনের সুপ্রিম কোর্টের শক্ত অবস্থান আছে বলে  আমরা নিজেরাই অনুমান করতে পারি। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের মতোই নির্বাচন কমিশনের নিজেরও বিচারিক ক্ষমতা আছে। ফলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হল, আগেই নিজে হস্তক্ষেপ না করা, বরং কমিশনের নিজের বিচারিক ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালনের জন্য যে ক্ষমতা আছে, তা ব্যবহার প্রয়োগ করতে পর্যাপ্ত সময় সুযোগ করে দেয়া, যাতে কমিশন তা ব্যবহার করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট আগেই হস্তক্ষেপ করতে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠত। ফলে এটা এড়ানো সুপ্রীম কোর্টের সঠিক পদক্ষেপ।

কিন্তু আমরা দেখছি, নির্বাচন কমিশন মোদীর নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাত করতে চায় নাই, এড়িয়ে যাবার পথ ধরেছে গেছে। এটা এখন দগদগেভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা মিডিয়াও প্রসঙ্গটা তুলেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে  যথেষ্ট সক্ষম ও দক্ষ এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। যদিও বাংলাদেশের গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি দল হয়ে এসে কী ভূমিকা নিয়েছিল আমরা জানতেই পারি নাই। বলাই বাহুল্য তাদের সফর কূটনীতির বুদ্ধিতেই পরিচালিত হয়েছিল, কমিশন পর্যায়ের বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ হয়নি।

সাম্প্রতিককালে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অপব্যবহার করে কিছু স্টাটুটারি প্রতিষ্ঠান যেমন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা তদন্ত প্রতিষ্ঠান সিবিআইর প্রধানসহ অনেকের সাথে, তাদের তুলনামূলক স্বাধীন থাকার ক্ষমতা ক্ষুন্ন করতে গিয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছিলেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হয়তো বিজেপি দলের; কিন্তু স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও ক্ষতযুক্ত করে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী দাগ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় এর ‘কাফফারা’ দিতে হতে পারে।

খুব সম্ভবত মোদীর আগের এসব তৎপরতা দেখেই এর প্রতিক্রিয়ায় এবার নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে। কিন্তু তাতে কী? ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল করে ফেলার দুর্ঘটনা কী এড়াতে পেরেছে – সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে! এটা ভারত-রাষ্ট্রকে অনবরত তাড়া করতেই থাকবে; সম্ভবত কখন কোন কাফফারা আদায় করে নিবে, কে জানে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৮ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)মোদির শরীরী ভাষা তা নয় এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

গৌতম দাস

২২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2zq

 

নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী ও সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তি – ছবি : TOI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, যা ভারতের ভাষায় “লোকসভার নির্বাচন” [General Election To Lok Sabha, 2019], তা অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় পর্ব গত ১৮ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। এভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ ভারতের ভোটপ্রদান  এবারও মোট সাত পর্বে এক মাসেরও বেশি দিন ধরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা করে পর্বের নির্বাচনের সমাপ্ত হবে। এভাবে নির্বাচন শেষ হবে সপ্তম পর্বটা আগামী মাসে, ১৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে। এরপর বাক্সবন্দী করে সব যার যার কেন্দ্রেই রাখা ভোট, ২৩ মে সকাল থেকে একসাথে গণনা শুরু হবে। এতে আশা করা যায়, ঐদিন বেলা ১১টার পর থেকে কে কোন আসনে এগিয়ে আছে, সেই অভিমুখ স্পষ্ট হতে শুরু করবে, আর সেখান থেকে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, সেই অভিমুখ বা ইঙ্গিতও জানা শুরু হয়ে যাবে। এভাবে দিন শেষে সন্ধ্যার পরে সব ফলাফল না এলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসছে।

এটা ভারতজুড়ে ৫৪৩ আসনের লোকসভা নির্বাচন; অর্থাৎ ভারতে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় যেতে হলে কোন দল বা জোটকে মোট ২৭২ ছাড়িয়ে (২৭২+) এরও বেশি আসন পেতে হয়। কারণ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত আরো দু’টি আসনও আছে তা যোগ হলে মোট আসন ৫৪৫ হবে।

ভারতের টিভি মিডিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন ড. প্রণয় রায়। তাঁর মিডিয়া প্রফেশনাল স্ত্রী রাধিকা রায় এনডিটিভি গ্রুপ কোম্পানি খোলার প্রথম উদ্যোক্তা। এর একমাস পরে প্রণয় রায় তাতে সহ-উদ্যোক্তা হিসাবে যোগ দেন। এভাবে দুজনে মিলে ১৯৮৮ সালে ‘এনডিটিভি’ মিডিয়া গ্রুপ চালু করেছিলেন। দু’জনে মিলে তাঁরা এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের শেয়ার মালিক। এই প্রণয় রায় ব্যতিক্রম অনেক অর্থে। তিনি অন্য মিডিয়া মালিক বা সম্পাদনার নির্বাহীদের সবার থেকে আলাদা এ জন্য যে, তিনি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, অর্থনীতির ডক্টরেট সেই সাথে ব্রিটেনে পড়ালেখা করা পেশাদার চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট।

এ ছাড়া যখন টিভি বলতে একমাত্র সরকারি টিভি বুঝত মানুষ, সেই যুগে তিনি ভারতীয় “দূরদর্শনে” অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করতেন। আরও সেই সাথে ভারতের নির্বাচনের সময় প্রাপ্ত নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য এবং অভিমুখ বিশ্লেষণ – এটা তখ থেকেই তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।ইংরাজিতে psephologist (উচ্চারণ “সিফোলজিস্ট”) বলে একটা শব্দ আছে। যার অর্থ নির্বাচনতাত্বিক; অর্থাৎ যিনি দক্ষতার সাথে  নির্বাচনে ভোটারেরা কোনদিকে ও কেন ভোট দিল সে তাতপর্য ও প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ভারতের মিডিয়া একমাত্র তাকেই নামের আগে ‘সিফোলজিস্ট’ বিশেষণ লাগিয়ে বলে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখা যায়।  যেমন  তামিলনারু ভিত্তিক দক্ষিণী ১৪০ বছরের প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক “দ্যা হিন্দু” লিখেছে, প্রণয় রায় সম্পর্কে –  “১৯৮০ সাল থেকে প্রণয় আর ভারতের নির্বাচন প্রায় সমার্থক কথা হয়ে গেছে। তাকে দিয়েই ভারতে “নির্বাচনতাত্বিক” শব্দটার ব্যবহার শুরু”। [“Prannoy Roy has been synonymous with elections since 1980. He pioneered opinion polls in India and introduced psephology to the country.”]।

পরবর্তীকালে ১৯৮৮ সালে নিজের “এনডিটিভি” চালু হলে ‘নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য ও অভিমুখ বিশ্লেষণ” করার ভারতের বাজারে তিনি আরও বিস্তারে পাইওনিয়ার বা অগ্রগামী বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। ইনি চলতি নির্বাচনের আগে এপ্রসঙ্গ নিয়ে তার বই [দ্যা ভারডিক্ট : ডিকোডিং ইন্ডিয়ান ইলেকশন… (The Verdict: Decoding India’s Elections. প্রকাশ করেছেন। বইটি হল, ভারতের নির্বাচনে ভোট প্রদানের অর্থ-তাতপর্য কী করে বের করতে হয়, তা নিয়ে। এরই এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

প্রণয়ের সেই বিচারে ১৯৫২ সাল  ভারতের লোকসভা নির্বাচনে শুরু হওয়ার পর থেকে, ভারতের ভোটারদের ভোট দেয়ার প্যাটার্নকে তিন আলাদা যুগে (একেকটা প্রায় ২৫ বছরে) তিনি ভাগ করতে চান। প্রথম ২৫ বছর ধরে (১৯৫২-১৯৭৭) ভোটারেরা একনাগাড়ে, স্বাধীন ভারত পাওয়ার আবেগ ও জোশে কংগ্রেসকেই মানে সরকারের পারফরম্যান্স যেমন হোক তাদেরকেই আবার জেতাতে হবে- এই ছিল তখনকার আবেগ বা ফর্মুলা। তাই ৮০% ক্ষেত্রে আগের সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছিল। এটার নাম তিনি দিয়েছেন পুরান “ক্ষমতাসীন-মুখি ভোট”। একবার জিতে যাবার পর সারা পাঁচবছর এলাকায় চেহারা না দেখালেও পরের বার আবার তিনি নির্বাচিত হতে পারতেন। কারণ সেটা ছিল বিশ্বস্ত ভোটারদের যুগ। ভোটারদের নেতাদের উপর অগাধ বিশ্বাস কাজ করত। প্রণয় বলছেন, এটাকে আপনারা “বোকা ভোটার” বা “গভীর আশাবাদী” ভোটারও বলতে পারেন।

প্রণয় বলছেন এরপর ১৯৭৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব – যার নাম তিনি দিয়েছেন – “ক্রুদ্ধ ভোটারদের [angry voter] যুগ”, ১৯৭৭-২০০২ সাল পর্যন্ত। এটা শুরু হয়েছিল  ১৯৭৭ সালের মার্চের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচন থেকে। এই নির্বাচন ছিল আগের ২১ মাসের (১৯৭৫-৭৭) ধরে ইন্দিরার “জরুরি আইন জারি” করে বিরোধী দমন নির্যাতন চালানোর সমাপ্তিতে। তাই সেটাই ছিল প্রথম  কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে পুনরায় বিজয়ী না করে শুরু হয় দ্বিতীয় যুগ পর্ব। অর্থাৎ এই ক্রদ্ধ ভোটার যুগের বৈশিষ্ঠ ছিল, যার পারফরম্যান্স খারাপ তাকে পরের নির্বাচনে নির্বিচারে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়া। প্রণয় বলছেন এই দ্বিতীয় যুগে যেকোন ক্ষমতাসীন সরকার [incumbency] পরের বার নির্বাচনে ৭০% ক্ষেত্রে উতখাত হয়ে গেছে। প্রণয়ের ব্যাখ্যা হল পাবলিক এতই ক্রুদ্ধ থাকত যে একট ভাল অথবা একটু খারাপ বলেও কাউকে মাফ করে নাই, নির্বিচারে পুরান হলেই তাকে বাদ – এই ছিল ফর্মুলা বা নীতি।

আর সর্বশেষ এখনকার যুগপর্ব, নতুন শতকের শুরুতে ২০০২ সাল থেকে যার উত্থান। তখন থেকে শুরু হয় আর একেবারে নির্বিচার নয়, এবার বিচার করে দেখেশুনে পুরান কোনো সরকারকে রেখে দেয়াও শুরু হয়েছে, যদিও কাউকে কাউকে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়াও, সে তো আছেই। প্রণয়ের রায়ের ভাষায়, এরা অনেক “বিবেচক ভোটার”। এখানে এপর্যন্ত ৫০% ক্ষেত্রে দেখা গেছে  ভোটাররা নেতাকে পুণর্নিবাচিত আর ৫০% ক্ষেত্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।   অর্থাৎ একথার সুত্র ধরে বললে, প্রণয় রায় মোদীর আবার বিজয় সম্ভাবনাকে তিনি একেবারে অসম্ভব বলে ঠিক ফেলে দেননি। ভারতের মিডিয়া জগতে প্রণয় ও তার টিভির চলতি বা সাবেক কলিগরা সবাই যারা এখন ভারতের মিডিয়া জগতের প্রভাবশালী ও মাথা পরিচালক। আর সম্ভবত একজন বাদে (অর্ণব গোস্বামি যে প্রকাশ্যেই বিজেপির পক্ষে) বাকিরা সবাই মোদি-বিরোধী বা কঠোর সমালোচক বলে মনে করা হয়।
তবে তিনি এই তৃতীয় পর্বে আর এক নতুন উপাদানের কথা বলেছেন; জানাচ্ছেন, এই পর্বে বিপুলভাবে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ঘটেছে। তাই তাদের সংখ্যার কারণে তারা এখন ভোটের ফলাফলে অন্তত এটাও আর একটা নির্ধারক উপাদান।

প্রণয় রায়ের বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হল, ভারতে সরকার গঠন এখন সরাসরি ঠিক ভোটারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সেটা ভোটারের ভোটের চেয়েও “জোট” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কেমন করে আপনি জোট করছেন, কাকে জোটসঙ্গি বেছে নিচ্ছেন, কেন, কী বুঝে – এভাবে জোটবন্ধু বেছে নেয়া – এটাই এখন মুখ্য নির্ধারক যে, শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে।

উল্টা করে বললে প্রণয় আসলে বলতে চাইছেন, ভারতে কোনো একক দলের একা নিজের সামর্থ্যে সরকার গঠনের দিন শেষ। সারা ভারতের ভোটারদের আস্থা আছে এমন কোন দল বলতে আর কেউ বাকি নাই। আর একটু এগিয়ে বললে তাহলে এখন কিসের দিন? অর্থাৎ কিসের ভিত্তিত্ব সরকার গঠন হয় বা হবে? এর জবাব হবে, এখনকার ভোট দেয়া ও সরকার গঠনে সমর্থ হওয়ার অভিমুখ হল সঠিক “জোট” টা গড়া। কিন্তু কার সাথে কার জোট? ভারতে সর্বভারতীয় বা ভারত-জুড়ে আছে এমন দল আছে মাত্র দুটা, আর তারা পরস্পর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি – বিজেপি ও কংগ্রেস। কাজেই এদের দুইয়ের মধ্যে জোট হবার প্রশ্নই আসে না, তা বলা হচ্ছে না। তাহলে জোট কাদের সাথে?

ভারতে আঞ্চলিক বা রিজিওনাল দল কথাটার মানে হল ঠিক কোন অঞ্চল নয় আসলে সেগুলো একেকটা রাজ্যভিত্তিক (প্রাদেশিক) দল। যেমন মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এর ততপরতা নাই বললেই চলে, অন্তত প্রার্থী দিবার মত অবস্থা নাই। এভাবে  ২৯ রাজ্যের ভারতে, প্রায় প্রত্যেক রাজ্যেই অন্তত দুই বা এর বেশি সংখ্যক আঞ্চলিক দল আছে। এরা মূলত প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনেও এরা দাঁড়িয়ে গিয়ে বিপর্যয় তৈরি করে ফেলতে পারে, ফেলে থাকে। বিশেষত এমন আঞ্চলিক দলগুলো যারা রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় থাকে। তাই তাদের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে বড় আসন পেয়ে যাবার সম্ভাবনাও তৈরি থাকে। যেমন তৃণমুল গত ২০১৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ মোট ৪২ আসনের মধ্যে ৩৪টাই পেয়েছিল। এ’কারণে আঞ্চলিক দলগুলোকে -কংগ্রেস না বিজেপি- কে আগে নিজের জোটে জুড়ে নিবে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কংগ্রেসের এমন জোটের নাম ইউপিএ [United Progressive Alliance, UPA] আর বিজেপির এমন জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance, NDA]। ভারতের নির্বাচনি রাজনীতির এই ঝোঁক একেই প্রণয় রায় বলছেন ভোটের চেয়েও সঠিক “জোট” গড়তে পারা – এটা বেশি নির্ধারক। ভারতে রাজনীতির এই নতুন ঝোঁক তৈরি ও তা স্থায়ী হয়ে গেছে সেই ১৯৮৫ সাল থেকে।

এজন্য বলা হচ্ছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকেই ভারতজুড়ে দল বলতে কংগ্রেস বা বিজেপির একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আসার দিন শেষ হয়েছে। আর শুরু হয়েছে, তাই “জোটের” সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসার দিন।  কিন্তু এই নতুন ধারাবাহিকতাতেও গতবার  মানে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস আর এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। ভোট পরিসংখ্যান বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি একা তো নয়ই, জোট হিসাবে ক্ষমতায় যেতে চাইলেও নিজ দলকে নুন্যতম কিছু আসন পেতেই হয়। এপর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে সেই সংখ্যাটা হল ১১৫। আর এই বিচারে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস নিজে পেয়েছিল মাত্র ৩৮ আসন আর, জোট হিসেবে সর্বনিম্ন, মাত্র ৬০ আসন। অর্থাৎ কংগ্রেসের ঝোঁক এবার আরও পতনের দিকে। আর ওদিকে এবারের চলতি নির্বাচন থেকে একইভাবে বিজেপিরও পতন শুরু হয়ে যেতে পারে।

তাই যদি এবারও কংগ্রেসের এই ট্রেন্ড অব্যাহত থাকে, তবে সেটা হবে জোট হিসাবেও কংগ্রেস আর লায়েক থাকবে না, এমন স্থায়ী পতন। অর্থাৎ আঞ্চলিক দলগুলোও আর কংগ্রেসের সাথে কোন জোট করতে চাইবে না। নতুন সেই অভিমুখের অর্থ হবে আঞ্চলিক দল বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দল – এমন ছোট দলগুলোই এবার উল্টা বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে না নিয়ে নিজেরা নিজেরাই জোট সরকার গঠন করার শুরুর দিন। কলকাতার মমতার ভাষায় এটাই, “ফেডারেল ফ্রন্ট” এর সরকার গড়া। এই রচনার শুরুতে যে ছবি ব্যবহৃত হয়েছে তাতে, তৃতীয় ফ্রন্ট বা থার্ড ফ্রন্ট বলতে এর কথাই বুঝানো হয়েছে। এদিকটাই আরেক ভাষায় আমলে নিয়ে প্রণব রায় বলছেন ভারতের এবার “এটা কোন জাতীয় নির্বাচন নয়”। বরং এটা হল রাজ্যগুলোর এক ফেডারেশনের নির্বাচন। [“2019 is not a national election at all, it’s a federation of states election,”]। মমতার “ফেডারল” শব্দের সাথে মিলের দিকটা লক্ষ্যণীয়।

বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রণয় রায়ের তৃতীয় মন্তব্য ছিল সরাসরি কংগ্রেস সম্পর্কে; এবং বলা বাহুল্য তা খুবই করুণ! তিনি বলছেন, ‘কংগ্রেস সম্ভবত ২০৫০ সালের নির্বাচনের কথা চিন্তা করে এবারের নির্বাচন লড়ছে”। এ কথার সোজা মানে হল, কংগ্রেস দিশা হারিয়েছে। তাই কারো সাথে জোট করতে চাচ্ছে না, বুঝছে না অথবা পারছে না। এমনকি সম্ভবত অন্যরাও কংগ্রেসকে তাদের জোটে নিলে কোনো লাভ হবে না, কংগ্রেসকে এমন অযোগ্য দল মনে করছে। তবে প্রণয় সব কারণের জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করছেন। বলতে চাইছেন কংগ্রেসের নিজের ওজন সম্পর্কেই নিজেরই কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা ধারণা নেই। যেন রাহুল দলের সভাপতি হয়ে যাওয়ার পরে তার মনে একটা ভাব এসেছে যে, এবার বাপ-দাদার কংগ্রেসের যুগ ফিরে এসেছে বা আসবেই। অথচ নিজের পায়ের নিচে মাটিই নেই, বেখবর!

ভারতের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে একা উত্তর প্রদেশ এই রাজ্যে সর্বোচ্চ আসন, একমাত্র রাজ্য যেখানে আসন সংখ্যা ৮০টি। এর পরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন অনেক নিচে; তা হলো মহারাষ্ট্র ৪৮, আর এর পরে তৃতীয় সর্বোচ্চ পশ্চিমবঙ্গ ৪২, এভাবে। অর্থাৎ উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে খুবই নির্ধারক, গত নির্বাচনে একা বিজেপিই এখানে পেয়েছিল ৭২টি। অর্থাৎ একা এখানে বেশি আসন পাওয়ার সাথে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারা সম্পর্কিত ফেনোমেনা। সেই উত্তর প্রদেশে এবার দুই প্রধান আঞ্চলিক দল [এসপি (সমাজবাদী পার্টি) আর বিএসপি (বহুজন সমাজবাদী পার্টি)] যারা মূলত গরিব, অন্তজ, দলিত ও মুসলমানদেরকে প্রতিনিধিত্ব করে, – ঠাকুরদের বিরুদ্ধে যাদব-  এমন দল। এরা সবার আগে এবার নিজেরাই বিজেপিকে ঠেকাতে প্রথম কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে জোট বাঁধে। প্রত্যেকে সমান ৩৮ আসন নিয়ে দুদলে মোট ৭৬। আর বাকি চারের কংগ্রেস নিতে চাইলে দু’টি গান্ধী পরিবারের মা-ছেলের জন্য। আর অন্য দু’টি আর এক ছোট আঞ্চলিক দলের (রাষ্ট্রীয় লোকদল) জন্য। এই জোট গড়তে সবচেয়ে নমনীয় হল সমাজবাদী পার্টি। তাই নিজের ভাগের ৩৮ সিট থেকে সে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার আগ্রহ যে দেখাতে পারছে।

কিন্তু মূল কথা যেটা, বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়ে সব রাজ্যেই এক “জোট” গড়তে না পারার জন্য আঞ্চলিক দলগুলো মূলত দায়ী করছে কংগ্রেসকে। কারও পাটাতনে না দাঁড়িয়ে উপর থেকে দেখলে, খুব সম্ভবত আসল জটিলতাটা হল – কংগ্রেসের স্বার্থের সাথে প্রতিটি আঞ্চলিক দলের স্বার্থই সঙ্ঘাতমূলক। অন্তত কংগ্রেস সেখান থেকেই দেখছে। এ ছাড়া সাথে আরও আছে কংগ্রেসের নিজের সম্পর্কে অতি-মূল্যায়ন। ফলে এ জন্য কোনো আঞ্চলিক দলের সাথেই এবার কংগ্রেসের কোনো রাজ্যে কোনো আসন সমঝোতা করতে সক্ষম হয়নি। যেমন এখন রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন দিল্লিতে এমন আঞ্চলিক দল হল আম আদমি পার্টি, ওদিকে কলকাতা, কেরালা বা ত্রিপুরায়  এমন দল হল সিপিএম, পাঞ্জাবেও প্রভাব আছে এমন দল আম আদমি, এছাড়া আর উত্তর প্রদেশের অবস্থা তো জানলাম উপরে ইত্যাদি; এভাবে আঞ্চলিক দলগুলো সকলে কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ। কারণ কোথাও কংগ্রেসের সাথে কারো শেষ পর্যন্ত কোনো জোট, বা আসন ভাগাভাগি হয়নি। এমনকি উত্তর প্রদেশে এসপি আর বিএসপির জোট ঘোষিত হওয়ার পরে সেটাকেও উপেক্ষায় এরপরেও আবার কংগ্রেস ঘোষণা করেছিল যে, রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা এবার প্রথম নির্বাচন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল, তাতে কংগ্রেস সবখানেই এবার একা নির্বাচন করছে। আবার প্রিয়াঙ্কার নিজে নির্বাচন করাও অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে যার সোজা মানে হল, কংগ্রেসের একা চলার এমন ততপরতার কারণে  এবার সবখানেই বিজেপি-বিরোধী ভোটগুলো কংগ্রেসের কারণেই সবচেয়ে বেশি ভাগ হবে। যার পুরা সুফলটা ভোগ করবে বিজেপি। এজন্য অনেকে টিটকিরি দিয়ে বলছে প্রিয়াংকার আগমনটা মূলত মোদীকে সহায়তা করতে।

অর্থাৎ কংগ্রেস যত আঞ্চলিক দলগুলোর ভোট কাটবে ঠিক তত ভোটই বিজেপির এগিয়ে যাবে। আর ততটাই বিজেপির জন্য তা সুবিধা বয়ে আনবে। এমনকি কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও মারাত্মক। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তর প্রদেশের ৩০টি আসনে কংগ্রেস একক ও শক্ত প্রার্থী দিবে, তাদের নাকি বিপুল সম্ভাবনা। মানে ওই ৩০ আসনে সে ‘শক্ত’ করে ভোট নষ্ট করবে আর বাকি ৫০টি আসনে ‘দুর্বল’ভাবে নষ্ট করবে। এ কারণে কংগ্রেসের এবারের ভোট কৌশলের কোনো তাল নেই বেতাল দশা; উদ্দেশ্যবিহীনের মতো আচরণ করছে কংগ্রেস। এ দিকটা খেয়াল করে প্রণয় রায় বলছেন সঠিকভাবে “জোট” করা যেখানে জেতার জন্য নির্ধারক বিষয়, কংগ্রেস সেখানে ততটাই যেন বেখবর, ভবঘুরে। তাই কংগ্রেসের লক্ষ্য চলতি ২০১৯ সাল না যেন সুদুর ২০৫০ সালের নির্বাচনের লক্ষ্যে এক অস্পষ্ট সময়ের দিকে তাকিয়ে কংগ্রেসের সব সিদ্ধান্ত।

প্রণয় রায়ের তিন মন্তব্য নিয়ে কথা শেষ, এখন অন্যান্য প্রসঙ্গ। ভারতের নির্বাচন তাই স্বভাবতই আমরা অনেকেই আগ্রহ নিয়ে সময় দিব, জানতে চাইব। বিশেষ করে নানান কারণ যারা আবার নিয়মিত ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিক-অভিমুখ জানতে ততটা সময় দিতে পারিনি, তারাও এখন জানতে চাইব। সব নির্বাচনেই মূল দু’টি দল থাকে, অনেকটা আমাদের লীগ-বিএনপির মত। আর ভারতের এমন দুই দল হল বিজেপি ও কংগ্রেস। এটাই আমাদের বহু পুরনো সময় থেকে চেনা ধারণা। কিন্তু সরি! এবার এই অনুমান নিয়ে ভারতের নির্বাচন বুঝতে গেলে সব হিসাবে ভুল হবে। কেন?

Source: Election Commission data | Shivam Vij/ThePrint

গত প্রায় ৩০ বছরের (১৯৮৪-২০১৪) একটা ভোটের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ বলছে, যে আসন কখনো কংগ্রেস হারাচ্ছে তা বিজেপি বা আঞ্চলিক দল পাচ্ছে; বেশি সময়ে বিজেপি পাচ্ছে। কিন্তু বিজেপি যে সিট হারাচ্ছে তা কংগ্রেস ফিরে পাচ্ছেই না। বেশির ভাগই আঞ্চলিক দল পাচ্ছে। তাই আগ্রহিরা এই খবর অনুসরণ করতে পারেন যে বলছে – ২০১৯ সালের নির্বাচন থেকে “কংগ্রেসমুক্ত ভারত” – বিজেপির এই শ্লোগান বাস্তবে ত্বরান্বিত হয়ে উঠতে পারে।

এর সোজা মানে হল, বিজেপির বিকল্প দল বলতে সেটা আর কংগ্রেস নয়, আঞ্চলিক দল। এক কথায় আঞ্চলিক দলের প্রভাব ক্রমশ বড় করে বেড়ে চলা – এটাই ভারতের রাজনীতির মূল অভিমুখ। আর এটাই কংগ্রেসের কথিত অনুমিত স্বার্থের সাথে প্রত্যেক আঞ্চলিক দলের অনুভূত স্বার্থবিরোধ অথবা বিজেপি-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কারো সাথেই কংগ্রেসের জোট না হওয়া। তাই এবার বিজেপি ফল খারাপ করলে এর অর্থ কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে তা নয়। এবারো তা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর মমতা ঠিক এই কারণের বেশির ভাগ আঞ্চলিক দলের কংগ্রেসবিরোধিতার ভোকাল মুখপাত্র। ভোট চাইতে গিয়ে তিনি পাবলিক মঞ্চে উঠে সরাসরি বলছেন, কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। প্রবল উত্তেজিত মমতার আরো একধাপ এগিয়ে দাবি এবার বিজেপি ১০০ আসনও পাবে না: মমতা।

জনমত সমীক্ষা
ভারতের নির্বাচনের ফল সম্পর্কে জনমতের সমীক্ষা (বা বুথ ফেরত ভোটার সমীক্ষা) চালিয়ে আগাম অনুমান করা সব সময় খুবই কঠিন একটা কাজ। এর মূল কারণ বিপুলসংখ্যক ভোটার (প্রায় ১০০ কোটি) যার তুলনায় স্যাম্পল সাইজ যত বড় আর ছড়ানো হওয়া উচিত তা না হওয়া বা নেয়া। তবুও এই নির্বাচনের ভারতের অন্তত পাঁচটা সমীক্ষা গ্রুপের কথা জানা যায়, যারা গত বছর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে (মোদির পক্ষে) সে অনুমান দিয়ে যাচ্ছে। আগে যাই থাক, গত ১৯ মার্চ এমনই এক অনুমিত গণনা রিপোর্ট বলে চলছিল বিজেপির-বন্ধু জোট আবার সরকার গঠন করে ফেলবে ২৮৩ আসন পেয়ে।

এই জনমত সমীক্ষা চালিয়েছিল “টাইমস নাউ ও ভিএমআর”। যারা অবশ্য প্রো-বিজেপি সমীক্ষা গ্রুপ বলে প্রচার আছে। আমরা লক্ষ্য করছি এদের প্রচারটাই আমাদের প্রথম আলোতে বেশি আসছে। কিন্তু ১১ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে সবার হাতে আর অনুমিত ডাটা নয়, অন্তত মোট ভোট প্রদানের শতকরা হার কত সে ফ্যাক্টস এখন প্রকাশিত। এর ফলে দেখা গেছে অন্তত দু’টি সমীক্ষা গ্রুপ এখন পিছু হটছে। এমনই একটা গ্রুপ ‘সিএসডিএস’ তাদের প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হল, ‘প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি কী অসুবিধায় পড়ছে?’ [Is it disadvantage BJP post first phase polling?] তারা এবার বিশ্লেষণে বলছে, প্রথম পর্যায়ে উত্তর প্রদেশের আট আসনে নির্বাচন হয়েছে। যার দু’টি বাদে বাকি ছয়টাতে বিজেপির অবস্থা খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা, যেখানে গত ২০১৪-তে এই আট আসনই বিজেপির ছিল। এখানে এবার ভোট প্রদানের হার কম আর ওই ছয়টা আসনেই মুসলমান ভোটার সংখ্যায় আধিক্য বলে এই যুক্তি তুলে এরা এখন সরে এসে বলছে- এই আট আসনের ছয়টাতেই বিজেপি খারাপ করবে।……the BJP would be down six in UP in the first round.

একইভাবে আরেক সমীক্ষা গ্রুপ ‘সি-ভোটার’- যারা মোদির ‘পাবলিক রেটিং’ কেমন যাচ্ছে তা নিয়ে কথা বলে এসেছে। আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি এরা দাবি করেছিল পাকিস্তানে কথিত ‘বিমান হামলা’ করে আসাতে মোদির রেটিং বেড়ে ৬২ শতাংশ হয়েছিল। এরপর এক মাসে তা অল্প করে কমলেও তা হয়েছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর এবার তারা বলছে, সেটা আরো কমে এবার ৪৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মোদির গ্রহণযোগ্যতা এখন ১৯ শতাংশই কমে গেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটপ্রদান অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত ১৮ এপ্রিল। তাতেও দেখা গেছে ভোট প্রদানের হার ২০১৪ সালের চেয়ে বাড়েনি, তবে অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। [On 7 March, the Modi government’s approval rating was at 62.06 percent. Despite a minor decrease it remained in the 50s till 22 March. But on 12 April, a day after the first phase of polling, the Modi government’s approval rating had fallen to 43.25 percent, a fall of almost 19 percent in about five weeks.] মোটকথা সমীক্ষা গ্রুপগুলোই আর জোর দিয়ে মোদির সম্ভাব্য ভালো ফল করার কথা বলতে চাচ্ছে না। তাতে আসল ফলাফল আগামী মাসে যাই আসুক না কেন।

এই নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য তার আশা কী? তার আশা হবে এই লেখার শুরুতে যে ছবি তৃতীয় শক্তি বা ফেডারল ফ্রন্টের কথা বলা হয়েছে এর সাফল্য ও বিজয়। এতে  নাগরিকদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ভারত রাষ্ট্র কোন কোটারি নয়, কোন ভুতুড়ে ক্ষমতার “কেন্দ্র” এর রাষ্ট্র নয় – এই বিচারে এখানকার চেয়ে তুলনায় ভাল গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র হবে। দানব ভারত, হিন্দুত্বের ভারতের বদলে এর তুলনামূলক গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে।  তার তাতেই বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২০ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের নির্বাচনে কী হচ্ছে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

গৌতম দাস

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xP

 

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

গৌতম দাস

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xI

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন হওয়ার সময় আরও কাছে ঘনিয়ে এসেছে। গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে বলা যায়, পুরো এপ্রিল-মে মাসজুড়ে এবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা হবে কয়েকটা পর্বে, যেমন গতবার হয়েছিল নিরাপত্তার স্বার্থে পাঁচ পর্বে দুই মাস ধরে বিভিন্ন দিনে। আর সবশেষে মে মাসের মাঝামাঝি একসাথে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি নতুন সরকারও গঠিত হয়ে শপথ নিয়েছিল মে মাসের মধ্যেই। অর্থাৎ সেই হিসাবে কথা বললে আর এক মাস পর থেকেই ভারতে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের আওতায় চলে যাবে প্রশাসনিক কাঠামো।

আর সেই সাথে সরকার চালানো আর রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর কমিশনের বিভিন্ন বাধানিষেধ বা গাইডিং নানা নিয়ম আরোপিত হতে শুরু করবে – মানে এবিষয়গুলোও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। মোদির সরকারের ‘ফ্রি হ্যান্ড’ মাতবরিতে  বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্র-প্রশাসনকে অপব্যবহারে প্রয়োগের সুযোগ ইদানীং প্রবল হয়েছে; যেমন- অপছন্দের বিরোধী দলকে বেকায়দায় ফেলতে বা বিজেপির কাছে নত হতে বা কোণঠাসা করতে বাধ্য করছে। সেসবের সুযোগ আর থাকবে না। দুর্নীতি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের নামে ভারতের কথিত সিবিআই (Central Bureau of Investigation – CBI) বা ইডি (Enforcement Directorate, ED) -কে ব্যবহার করে মমতার মত মোদীবিরোধীদের হয়রানি করার অভিযোগ যা ইদানিং প্রবল, মোদীর সেসব কাজ করার সুযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

ফলে ওদিকে ইতোমধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে কী কী ইস্যু প্রধান হয়ে উঠবে, তাও পরিষ্কার হয়ে গেছে। যে কথা বলছিলাম, সিবিআই-ইডির কথা। ‘মোটা দাগে’ বললে, এর গঠন আমাদের দুদকের মত না হলেও এটা বরং ভারতের কেন্দ্রীয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তবে পুলিশ প্রশাসনের ( Delhi Special Police Establishment Act, 1946.) এক আইনী ক্ষমতায় পরিচালিত বিশেষত দুর্নীতিবিরোধী এক বিশেষ তদন্ত-অনুসন্ধানের সংস্থা। আর ইডি হল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অর্থনীতিবিষয়ক আইন প্রয়োগ ও সম্পর্কিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়বার সংগঠন।  এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাইরের যেকোনো হস্তক্ষেপ বা প্রভাবমুক্ত থেকে আদালতের নির্দেশ-সিদ্ধান্তে এর হাতে দেয়া কোনো ঘটনা-মামলার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত-অনুসন্ধান রিপোর্ট পাওয়া এবং তা আইনের আওতায় আনা। বাংলাদেশের দুদকের মত প্রতিষ্ঠান কাজের নামের মিল ছাড়া আর কোনদিক থেকেই সিবিআই তুলনীয় নয়। আর সিবিআই অনেক বেশি সফল, শক্তিশালী ও পেশাদার ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের দুদক দেখে মনে হয় কেবল সরকার বিরোধীদের সাইজ করার ওর কাজ। আর ওদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তবুও সিবিআইয়ের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে চলছে; তাই অপব্যবহারমুক্ত প্রতিষ্ঠান বলা যাচ্ছে না।

এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ ছিল গত ০৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতার রাজ্য পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই লেলিয়ে দেয়া – যা আসলে আক্ষরিক অর্থেই রাজ্য পুলিশ বনাম কেন্দ্রের সিবিআই অফিসের লড়াইয়ের ঘটনা। এতে মাঠের চেহারা দাঁড়ায় এমন যে, কলকাতায় এসে রাজ্য পুলিশ কমিশনারকে গ্রেফতার বা জিজ্জাসাবাদ করতে তার বাসায় কেন্দ্রের সিবিআই দল পৌছালে তাদেরকেই রাজ্য পুলিশের বাধা দেয়া শুধু নয়, উল্টো সিবিআই অফিসারদের গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে কাছের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

মোটামুটি ঘটনা-সংক্ষেপটা হল, আমাদের ডেসটিনির মত মানুষের টাকা নিয়ে সুদসহ ডাবল ফেরত দেয়া বা এমএলএম করবে বলে শেষে পুরা টাকাই মেরে দেয়ার ঘটনা। ঘটনাকাল মমতার জমানার আগে এবং ধরা পড়া মমতা-কালীন। তবে এখানে মমতার দলের কিছু নেতা সহ অনেক কয়টা রাজনৈতিক দলের (কংগ্রেস, সিপিএম অথবা আগে তৃণমুলের নেতা এখন বিজেপি করা এমন সকলে অভিযুক্ত) নেতাকেই মাসোহারা বা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে সম্পর্কিত করে নেয়া ছিল। মমতার আমলে এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়লে তিনি রাজ্য-পর্যায়ে যে তদন্ত কমিটি করেছিলেন ও রিপোর্ট দিয়েছিলেন তা হয়েছিল এই আলোচ্য পুলিশ কমিশনার রাজীবের নেতৃত্বে। এদিকে কেন্দ্র সরকারও সিবিআইকে দিয়ে ঘটনা তদন্ত, মামলা ও চার্জশীট দেওয়ায়। তাহলে এখন ইস্যু কী? সেটা হল সিবিআইয়ের দাবি তারা পরে জেনেছে রাজীব তদন্তের সময় কথিত এই ডাইরি পেয়েছিলেন যা তিনি সিবিআইকে দেন নাই বা জানান নাই। যদিও আসামিরা বলছে এমন ডাইরির কথাটাই ভুয়া। কিন্তু এখানেই নির্বাচনের আগে মোদীর ইচ্ছা তিনি এই কথিত (দুর্নীতি) অনিয়মের কথা তুলে মমতাকে একটু বেকায়দা ফেলে ভোটারের স্মৃতিতে বছর দশের আগের ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয়া এই অনুমানে যে তাহলে আসন্ন নির্বাচনে্র ভোটে কিছু মাইলেজ বা বাড়তি সুবিধা তিনি পেয়েও যেতে পারেন। মামলা ইতোমধ্যেই রাজ্য হাইকোর্ট ছেড়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে বিচারাধীন। বাকি বিষয়টা কী হল তা সংক্ষেপ করার জন্য এনিয়ে দুপক্ষই এবার আদালতে গেলে প্রধান বিচারপতি কী নির্দেশ দিলেন তা দেখব। বিচারকের সারকথাটা ছিল, রাজীবকে সিবিআইয়ের গ্রেফতার করতে পারবে না, এটা অপ্রয়োজনীয়। তবে   সিবিআইয়ের রাজীবকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে সে অবশ্যই সহযোগিতা করে মুখোমুখি বসবে, তবে তৃতীয় নিরপেক্ষ জায়গায়। ইতোমধ্যে শিলং শহরে সিবিআই আর রাজীব মুখোমুখি সাক্ষাতও ঘটে গেছে, শান্তিপুর্ণভাবে। রাজীব এখন নিজের কাজে। এর মানে, প্রধান বিচারপতির এই রায় বা নির্দেশই প্রমাণ করে যে মোদী সিবিআই লেলিয়ে রাজীবকে গ্রেফতারে উঠায় নিয়ে যেতে আর তাতে নির্বাচনের আগে মমতাকে এনিয়ে অস্বস্তিতে ফেলতে চেয়েছিল। যেমন এক প্রাক্তন সিবিআই প্রধান মন্তব্য করছেন, রাজীব সিবিআইয়ের সাথে সহযোগিতা না করলে তাকে তো সহজেই আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা যেত। সিবিআই সে পথে না গিয়ে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু তৈরির পথে গেল কেন? খুব জেনুইন প্রশ্ন। যার সহজ জবাব মোদী তো আসলে এক হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যুই চেয়েছে। আর এটাই তো অপব্যবহার। তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা হল, মমতাও কম যান না। রাজীবের বাসায় যে সন্ধায় সিবিআই যায় সেই তখন থেকে এর প্রতিবাদে রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করতে বসে যান, আর তা চলে লাগাতর তিনদিন যতক্ষণ না আদালতে প্রধান বিচারপতি নির্দেশ জারি করেন। আর এই তিন দিনে সব বিরোধীদলের নেতাই  বিবৃতি দিয়ে ও ব্যক্তি প্রতিনিধি পাঠিয়ে মমতার ঐ অবস্থান ধর্মঘটে স্ব স্ব দলের সমর্থন ও সহ-অবস্থান জানান দিলেন। তাতে সবার কমন এক স্বরে অভিযোগ ছিল যে মোদী নিজ দলের সংকীর্ণ স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেলিয়ে অপব্যবহার করছেন। সারকথায় সব মিলিয়ে এতে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু অবশ্যই একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা মমতার পক্ষে গিয়েছে।

কিন্তু ঘটনার অন্য এক মাত্রার দিক আছে। সাদা চোখে দেখলে ব্যাপারটাকে  মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই-ঘটিত নেহায়েতই এক অপব্যবহার মনে হলেও এর ভেতরে জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্র-এর এক গাঠনিক দুর্বলতা [ফেডারল রাষ্ট্রক্ষমতা না হয়ে ভুতুড়ে কেন্দ্রের কুক্ষিগত ক্ষমতা] আর তাতে ভুতুড়ে ক্ষমতার শিকার হওয়া ইস্যু আরো উদোম হয়ে সামনে আসাও নজরে আসবে। এটাই মূলত ভারত রাষ্ট্রক্ষমতার ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্যের লড়াই’ – মমতা যে লড়াইয়ের সোচ্চার অগ্রসেনানি। ভারত রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সময়ের মৌলিক ও গভীর দুর্বলতা এটাই।

ভারত এখন মোট ২৯টি রাজ্যের দেশ। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা মূলত কোন রাজ্যের হাতে? সে রকম কোনো একটা রাজ্য অন্যান্য রাজ্যের ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নকে ভারতের জন্মের সময় থেকেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এভাবেই বাস্তবতা হল। কথিত এই “কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটাই” এক ভুতুড়ে [না বলা কওয়া, অ-সংজ্ঞায়িত (un-defined power) লুকানো ক্ষমতা ] ক্ষমতা হিসেবে থেকে গেছে। এই ক্ষমতা কার হাতে এবং কেন এর জবাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘হিন্দি-বলয়’ বা ‘হিন্দিতে কথা বলা’ রাজ্য নামে একটি পরিভাষা দিয়ে বলা হয়েছে, এদের হাতেই ভারতের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এ পর্যন্ত বিরাজ করে এসেছে। আর অন্য সব রাজ্যের ঘাড়ের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের আদায়কৃত রাজস্ব কাকে কতটা দেবে কেন্দ্রীয় এই ক্ষমতা তা নিয়ন্ত্রণ করে, বরাদ্দ দেয়। আর এই বরাদ্দ নিয়ে বিরোধী দলের রাজ্য সরকার (যেমন মমতা) নিয়মিত হৈ চৈ করে তুলছেন। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের নামে এই ভুতুড়ে ক্ষমতা রাজ্যগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার ভাষায়- ক্ষমতার কেন্দ্র বনাম রাজ্যের বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তার মূল লড়াই, এটাই তার রাজনীতি। এরই একটা প্রকাশ হল সিবিআই প্রতিষ্ঠানকে রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অপব্যবহার করা।

আর সব রাজ্যই অনুভব করে ‘কেন্দ্র’ নামে এক ভুতুড়ে ক্ষমতা তার ঘাড়ে চেপে আছে। কিন্তু কী করে এর বিরুদ্ধে লড়বে, তাদের কাছে তা এখনো অস্পষ্ট। মমতাই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে, কী করলে এর সমাধান আসবে তা তিনিও সুনির্দিষ্ট করে বলার ক্ষেত্রে তিনিসহ পুরা ভারতের রাজনীতিবিদ, একাডেমিকসহ সমাজের সবাই অস্পষ্ট। বলা যায়, একাডেমিক স্তরেও ইস্যুটি নিয়ে আলোচনাই শুরু হয়নি। সকলেই ভীত যে এতে না ভারত বিভিন্ন রাজ্যে টুকরা হয়ে যায় শেষে। যদিও মমতা বৈষম্যের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আসল কথা, সমাধান কী? এর এক কথার জবাব হলো কথিত, ভারত রাষ্ট্রের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে দিয়ে এক ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থায় চলে যাওয়া। এমন রাষ্ট্র হিসাবে যার আদর্শ উদাহরণ আমেরিকা, তার ফেডারেল স্টেট কাঠামো। এ কারণে ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কখনও এমন অভিযোগ নাই যে কোন এক-দুইটা রাজ্য বাকি সব রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে মাখন তুলে নিয়ে খাচ্ছে, বা মাতবরি করছে। এমন অভিযোগ আজ আমেরিকার জন্মের আড়াই শ’ বছর পরও উঠেনি। একারণেই বলা যায় আমেরিকা রাজ্যগুলোর সত্যিও এক স্বাধীন ইউনিয়ন। কেউ বা অন্য রাজ্য তাদের বাধ্য করে নাই। নিজের স্বার্থে বুঝে বুঝে নিয়ে তেমন নিয়ম আইন করেই একই ফেডারল রাষ্ট্রে সকলে সামিল হয়েছে।  কথিত ইউনিয়ন-ভারত আসলে নেহেরুর বলপ্রয়োগে বাধ্য করা এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারত; যেখানে বহু ক্ষমতার উৎসের হদিস নাই, কেন এই ক্ষমতা তার – এর কোন ব্যাখ্যা নাই,  এমন ক্ষমতা। বরং ইতোমধ্যেই সমালোচক ও বিরোধীদের দাবি, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা খাতেও “রাজনৈতিক দলাদলি ঢোকাচ্ছে মোদির সরকার“।

তবে এখনকার সারকথা হল, কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্য, এ বিষয়টিকে মমতা নির্বাচনে ইস্যু হিসেবে হাজির করতে সফল হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের দায়ে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি বাকি সব বিরোধী দলকেও একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটাই আসন্ন নির্বাচনে একটা মুখ্য ইস্যু হিসেবে রূপ পেয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু,
এই নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু হল, চাকরি বা কাজ সৃষ্টি। গত ২০০৪ সাল থেকে পরের ১৫ বছরে ভারতের তিন সরকারের আমলে প্রথম প্রধান ইস্যু ছিল এটা। অন্য ভাষায়, ইস্যুটার নাম সরকার “অর্থনীতিতে ভাল” করেছে বা সাফল্যের সাথে তা চালাতে পেরেছে কি না। এর জবাব বা আসন্ন নির্বাচনের আগের মূল্যায়নে বলা যায়, এই ইস্যুতে মোদী ইতোমধ্যেই প্রকাশিত যে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। আর এর সর্বশেষ প্রমাণ হল, এক পরিসংখ্যান রিপোর্ট। মোদির সরকার নির্বাচনের আগে এর স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটতে দিতে বাধা দিয়েছে – এই অভিযোগে জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানসহ দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। [কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এই রিপোর্ট চেপে রাখার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশন-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান পি সি মোহনন।সে রিপোর্ট বলেছে, কাজ সৃষ্টি বা চাকরির সংস্থান এই সরকারের আমলে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তা ভারত রাষ্ট্রের জন্য আরেক কারণে খুব খারাপ ইঙ্গিত। ১৯৮৫ সালের পর থেকে ভারতের ‘কেন্দ্রীয় সরকার’ (যেটা ভুতুড়ে বা অস্পষ্ট সাফাইয়ের ক্ষমতা বা হিন্দি বলয়ের কোটারি ক্ষমতা) ধারণাটাই দুর্বল হতে শুরু করেছিল। কেন? কারণ, কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোনো সর্বভারতীয় দলের আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয় লাভ করে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা  আসীন হতে আর সক্ষমতা পারে নাই। মানে এ’দুই দল ভুতুড়ে ক্ষমতাতেও আসতে সক্ষমতা ছিল না- এ দৃশ্যই প্রধান ফেনোমেনা হিসেবে সামনে আসতে শুরু হয়েছিল। এর বদলে আমরা দেখছিলাম, সর্বভারতীয় দল দু’টি আর এককভাবে নয়, বরং আঞ্চলিক দলের সাথে জোট করে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা – এই নতুন ফেনোমেনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ বা বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট  – এভাবে কোয়ালিশন গড়া – এভাবে সরকার গঠনঅই প্রধান ধারা বলে হাজির হয়েছিল। তবে আবার গত ৩০ বছরের এই ফেনোমেনার বিরুদ্ধে ব্যতিক্রম হল, ২০১৪ সালের বিজয়ী চলতি মোদী সরকার। যদিও এটাও একটা এনডিএ কোয়ালিশন সরকার, সে কথা সত্য। কিন্তু এই এনডিএ জোট গঠন ছাড়াই মোদীর বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও আছে। মোদীর বিজেপি সেবার এই ব্যতিক্রম ঘটাতে পেরেছিলেন কেন? কারণ, মূলত কাজ সৃষ্টির ইস্যু। ২০১৪ সালের মোদি প্রবল প্রচারণা চালিয়ে হতাশ [এর আগে কংগ্রেসের দ্বিতীয় ইউপিএ জোটের সরকারের অর্থনীতিক ব্যর্থতায় ] ভোটারদেরকে ফিরে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি সেবার কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে পারলে (অর্থনীতিতে ভালো করে) ব্যাপক কাজ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু পাঁচ বছর শেষে এবার ২০১৯ সালে হতাশ ভোটাররা দেখছেন, সেই আস্থা এখন আবার ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। অর্থাৎ মোদীর চাকরি সৃষ্টিতে ব্যর্থতা-হতাশার মানে হল, এবারে ভারতের নির্বাচনে আবার সর্বভারতীয় দল দু’টির ওপর প্রবল অনাস্থা (কেন্দ্রীয় ভুতুড়ে ক্ষমতার ওপর অনাস্থা) – এটাই স্থায়ী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থাৎ বিজেপি বা কংগ্রেস বাদে কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর কোন এক কোয়ালিশন সরকার – এটাই মুখ্য ফেনোমেনো বলে এখন থেকে হাজির হয়ে যেতে পারে।

এর সোজা অর্থ আরো ব্যাপকভাবে, এবার বিজেপি অথবা কংগ্রেসের নেতৃত্বের আঞ্চলিক দলগুলোকে সাথে নিয়ে কোনো কোয়ালিশন সরকার আর নয়, বরং (১৯৯৬ সালের দেবগৌড়া সরকারের মত) কেবল আঞ্চলিক দলগুলোরই কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মোদির ‘কাজ সৃষ্টিতে’ চরম ব্যর্থতার প্রভাবে এমন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে।

আসন্ন নির্বাচনের তৃতীয় ইস্যু,
গরু, গো-মাতা বা গো-রক্ষক মোদি ইস্যু! হিন্দুত্বের হুজুগ বা জোয়ার তুলে সমাজে মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোটের বাক্স ভরতে হবে- এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতির সারকথা। এই উদ্দেশ্যে গরুকে হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক বানিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে  কথিত মুসলমানেরা মাংস বহন করেছে বা ফ্রিজে রেখেছে অথবা গরু কেটেছে ইত্যাদি হুজুগ তুলে পাবলিক লিঞ্চিংয়ের ব্যাপকতা দেখা গেছে। এমন সামাজিক তাণ্ডবে মোদী নিজেকে গরু-পূজারী, গো-মাতা বা গো-রক্ষক হয়ে হাজির করে গেছেন। কিন্তু মোদী এই ‘গরুর রাজনীতি’তেও পরাজিত। মোদী ভেবেছিলাম গরুর রাজনীতির জজবা দিয়ে বাক্স ভরবেন। কিন্তু সেটা আগেই ব্যাকফায়ার করে গেছে। কীভাবে?

যেকোনো দলীয় কর্মসূচি তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও টেকসই বা বাস্তবায়িত (viability) করা সম্ভব কি না তা আগাম যাচাই করে নিতে হয়। মানে, সেদিক থেকেও টিকে থাকার সক্ষমতা থাকতে হয়। মোদির গরুর রাজনীতির অর্থনৈতিক দিকও টেকসই কি না তা আগেই পরীক্ষা করে নেয়া হয় নাই এবং তা টেকসই নয়। তা না করাতে, এর ব্যর্থতা থেকেই মোদী এখানে হেরে গিয়েছেন। যে সমাজে গরু কৃষির উপকরণ সে সমাজে মাংস হিসেবেও গরুর ব্যবহার থাকতে হবে বা থাকবেই। এর বিরুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা অবাস্তব। এমনকি ধর্মীয় বা কোনো কারণে, মাংস নিজেরা না খেলেও, অন্তত মাংস রফতানি করতেই হবে। এই সত্য মোদি মানতে চাননি, বোঝেননি- তাই তিনি ব্যর্থ।

মূল ব্যাপারটি হল, একটা বয়সের পরে গৃহপালিত গরুকে আর কৃষিতে বা মাল টানার কাজে ব্যবহার করা যায় না। তখন থেকে গরুকে আর বসিয়ে খাওয়ানো মালিকের পক্ষে অসহনীয় দায় হয়ে যাবেই। এটাই হিন্দুত্বের রাজনীতি বুঝতে অক্ষম। অথচ এর সামাজিক সমাধান ছিল, গরুকে বিক্রি করতে দেয়া। যার সোজা অর্থ হল, গরু নিজে না কাটলেও, অন্যকে মাংসের উৎস হিসেবে  গরুকে ব্যবহার করতে দিয়ে দেয়া, যার মাধ্যমে গরুর জীবনচক্রের একটা পরিসমাপ্তি টানা। কিন্তু মোদীর রাজনীতি হিন্দুত্বের জোশে –  মাংসের জন্য গরুকে বিক্রি করতে দেয়া যাবে না বলে অবিবেচক বাধা তৈরি করেছিল। কিন্তু গরুকে সেই পর্বে খাওয়াবে কে, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করলেন না। নামকাওয়াস্তে কিছু গো-শালা বানালেও তা রক্ষণাবেক্ষণ আর গরু্কে খাওয়ানোর অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করলেন না।

আসলে বাস্তবে কতগুলোই বা গো-শালা বানাবেন? বাড়ি থেকে গো-শালা বেশি দূরত্বের হলে গাড়ি ভাড়া করে কেউ গরু গোশালায় দিতে যেতে চাইবে না। এতে যেহেতু গরুকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে  কৃষক/ গরুমালিক অপারগ, তাই সে – এবার গরুর দড়ি খুলে ছেড়ে দেয়াকেই একমাত্র ও সহজ উপায় মনে করল। কিন্তু তাতেও ‘গরু খাবে কী’ ব্যাপারটা শেষ হলো না। গরু তাই এবার ব্যাপক হারে কৃষকের ফসলি জমিতে গিয়ে হামলে পড়ল। ফলে রাত-দিন জমি পাহারা দিয়ে ফসল বাঁচানো এক বিরাট মাথাব্যথা আর খরচের নতুন খাত হিসেবে হাজির হল। ব্যাপারটা এতই মারাত্মক হয়ে গেছে যে, গত ডিসেম্বরে রাজস্থানের রাজ্য নির্বাচনে ‘ছাড়া গরু’ মোকাবেলা করা নির্বাচনী ইস্যু হয়ে হাজির হয়েছিল। অর্থাৎ ছাড়া গরু ইস্যু উল্টো মোদির ভোটকেটে দিয়ে রাজস্থানে বিজেপি পরাজিত করেছিল। তাই এখন চাকরি সৃষ্টি না করতে পারার ব্যর্থতা, না ছাড়া গরুর সমস্যা- কোনটা মোদির প্রধান ব্যর্থতা বলে হাজির হবে, তা নিয়ে এখন জল্পনা-কল্পনা। এমনই এক আর্টিকেল আছে এখানেলোকসভা নির্বাচনে মোদির বিজেপি’র জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে কোনটি – গরু না বেকারত্ব?

আসন্ন নির্বাচনের চতুর্থ ইস্যুঃ
চতুর্থত, হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিল। নতুন এই আইন লোকসভায় বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে বিজেপির আনা বিল হলেও এটা মোদী এনেছিলেন মূলত সারা ভারতে এটা প্রযোজ্য হবে- তেমন ভেবে নয়। বরং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্ট – এদুই পকেটের রাজ্যগুলোর জন্য। তারা আবার মোট আট রাজ্যের (নর্থইস্ট সাত রাজ্য আর পশ্চিমবঙ্গ) হলেও এখানে লোকসভার মোট আসন হলো ৬৬টা। ভারতের লোকসভার মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে সরকার গড়ার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন পেতে হয় ২৭২টা। আর, এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্টের মোট ৬৬ আসনের কথা মাথায় রেখেই মোদী নাগরিকত্বের বিলটা এনেছিলেন। কিন্তু তার কপাল এখন একেবারেই ফাটা, যেখানে হাত দেন সব ব্যর্থ।

তার অনুমান ছিল এই বিল তাকে নির্বাচনের ৬৬ আসনে বিজেপির পক্ষ জিততে বাড়তি সুবিধা বা মাইলেজ দেবে। অথচ এটা ছিল তার সবচেয়ে ভুল অনুমান। ফলাফলে ইতোমধ্যেই তিনি ব্যর্থ। কারণ, নর্থইস্ট সাত রাজ্যের বেলায় তা ‘ব্যাকফায়ার’ করেছে। এই বিল আনার কারণে মোদীর ভোট পাওয়া দূরে থাক, ওই সাত রাজ্যে তারা এখন ইউনিয়ন ভারতের সাথে থাকবে কী না সেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। প্রতিদিন এখন এনিয়ে ভারত ছেড়ে, ‘ভেগে যাওয়া’র আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। আর এদিকে আসামে? সেখানে এখন রাজ্য সরকারে আছে বিজেপি। কিন্তু আসামের মূল নাগরিকদের সব দল ও পক্ষই এখন সেই বিজেপির প্রবল বিরুদ্ধে। জনসম্মতির রেটিংয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় বিজেপি। এই বিল আনার কারণে বিজেপিকে ১৯৮৫ সালের চুক্তির সাথে প্রতারণার কৃতিদার হিসাবে বিট্রেয়ার মনে করছে। বাকি থাকল পশ্চিম বাংলা। সেখানেও মোদীর বিরুদ্ধে মমতার সংগ্রাম ও বিরোধিতা প্রবল আর সফলই বলা যায়। বরং উলটা, মমতা তার নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলগুলোকে বিজেপির এবং মোদীর বিরুদ্ধে একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন, আর স্বভাবতই এতে মোদীর বিরুদ্ধে “বাংলার স্বার্থের আসল ধারক” হলেন মমতা – এ কথা বলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ভোটারের সহানুভূতি মমতা নিজের ব্যাগে তুলে ফেলেছেন।

তাহলে কী দাঁড়াল? কারা এই বিলের পক্ষে? বাংলাদেশের মতো পড়শি দেশের যেসব হিন্দু আছেন, এদের অনেকে মোদীর চরম ভক্ত। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির প্রধান ধারা এখন আরএসএস-মুখি অথবা ডমিনেটেড। কিন্তু তাতে মোদীর কোনো লাভ নেই এ জন্য যে, তারা খুব কম জনই মোদীর ভোটার। কাজেই পড়শি দেশের হিন্দুদের স্বার্থে পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা কতটা মোদীর ভোটের বাক্সে ভোট দিতে য়াগিয়ে আসবেন তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, মমতার কারণে কেন্দ্র ও রাজ্য ক্ষমতার লড়াই ব্যাপারটাকে মুখ্য করে তোলাতে এখন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারেরা স্থানীয় স্বার্থে তারা এখন হিন্দিবলয় বিরোধী; মমতা সেখানে মোদীকে “ভিলেন” হিসেবে দেখাতে পেরেছেন।

মোদীর আরও বিপদ আছে। কারণ  মোদী সরকারের দায় খোদ আরএসএস আর নিতে চাচ্ছে না। বরং তাঁরা এখন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের পক্ষে সহানুভূতি দেখিয়ে নিজের ইমেজ বাঁচাতে ব্যস্ত। আনন্দবাজারের শিরোনাম- “বেকারত্ব বাড়ছে, বিরোধীদের সুরে সঙ্ঘ প্রধান, অস্বস্তিতে মোদি’। ওদিকে বিজেপি দলের ভেতরেই মোদী-অমিত গ্রুপের বিরোধিতাকারীরা- যেমন- মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী মোদীর থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করতে চাইছেন। এদিকে শত্রুঘ্ন সিনহা বা যশবন্ত সিনহা ও অরুণ সুরি- এরা প্রকাশ্যেই বিরোধিতায় নেমেছেন।  এমনকি মোদীবিরোধী মমতার সমাবেশ র‌্যালিতেও অংশ নিচ্ছেন।

তাই সব মিলিয়ে আমরা লক্ষ করছি- আসন্ন নির্বাচনী ফলাফলের সম্ভাব্য ঝোঁকটা হল, মোদির বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে কমছেই আর কমছেই। কিন্তু এর মানে কী? তা সত্ত্বেও আবার বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে কোনো কোয়ালিশন ক্ষমতার দাবিদার তারাও নয়। বরং কেবল আঞ্চলিক দলগুলো – এদেরই কোনো কোয়ালিশন সরকারের সম্ভাবনা ক্রমেই জেঁকে বসা, এটাই প্রবল হচ্ছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু?” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

গৌতম দাস

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2xv

সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তারা ভারতের পক্ষ হয়ে হাসিনাকে তোয়াজ করতে, মন গলাতে এক আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনাম হল, “বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”

তাতে মনে হয়েছে বিবিসি যেন শেখ হাসিনা সরকারের এক কড়া সমালোচক – এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, যেন এমন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা বিবিসির এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমরা দেখে চলেছি যখন আমাদের প্রায় সব মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে হঠাৎ করে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে এবার তারা উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার বাড়তি আর একটা দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মূলত ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব বিবিসি নিয়েছে। তাই কয়েকদিন আগে ২৯ জানুয়ারি ঐ রিপোর্ট তারা ছেপেছে।

দেখা গেছে, মূলত ভারত “বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে” এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

এটা যেন এক অর্ডার দেয়া রিপোর্ট, এমন মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হল, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের “শক্ত রিজার্ভেশন” বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে ভারতের থেকে যেন খেপ নিয়েছে বিবিসি। বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগেই ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এর ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হল যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।

কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন? এটাই সেই তাতপর্যপুর্ণ প্রশ্ন।

আমরা ইতোমধ্যে সবাই কমবেশি জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম কিছু বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ভারতও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। আর  ৯৭% আসন নিয়ে বিজয়ী হাসিনার ভয়ে ভারত এখন সেটাই প্রবল অস্বীকার করতেই বিবিসি দিয়ে করিয়েছে এই রিপোর্ট। যদিও বিএনপির দিক থেকে বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা পাঠানো প্রতিনিধিদের নাদান পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন তারা। অথবা সময়ে কখনও তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে আগোনোতে বা কথা বলাতে সেটা ভুল হয়েছে বা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে – এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। অনেক সময় ক্রিটিক্যাল প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

যদিও খেয়াল রাখতে হয় যে আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ আগেই টেনে নিয়ে একাজে নামতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ পেশাদার লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এমন সব ক্ষেত্রেই বিএনপির মারাত্মক কিছু ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া ভারতের সাথে এই আলাপে বিএনপির দিক থেকে মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের কাছে স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছিল বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। ব্যাপারটা যেন হাতি হয়ে আয়েশে বসে নত বিএনপির সালাম নেয়ার সময় তাদের। যেন তারা বুঝাতে চাইছে, বাংলাদেশে ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ ভারতের জন্য সঠিক প্রতিক্রিয়া বলে তারা মনে করেছে। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, “বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!”। অথচ তখন নিজেই বুঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনায় আমরা পরে আবার আসব। তবে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, “শো আপ” অংশ এটা।

আসলে ভেতরে রূপটা ছিল খুবই উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, কোনদিকে যায় কী ফল আনে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হল – তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট। এসংক্রান্ত বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল,”এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না”, “আওয়ামী লীগ খারাপভাবে হারবে”। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এককথায় তারা দেখছিল হাসিনার “পাবলিক রেটিং” খুবই শোচনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা যে তারা কী এজন্য নতুন করণীয় পদক্ষেপ ঠিক ভাবে নয়েছে? নাকি তা করতে পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ রেটিং” খুবই শোচনীয় হলে তো হাত ছেড়ে দিতে হবে; নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে……ইত্যাদি। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছিলাম – বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে। আর এগুলো তারা করেছিল আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন এই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে হাত সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে বিএনপির সাথে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন যাতে, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়। যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে তখন শুরু না করতে হয়। অথবা, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য “জয়ী নায়ক বিএনপির” ভারতের কাছে একেবারেই অপরিচিত বলে না হাজির হয়, বা ভারতকে “সেই” বিএনপির পেছনে ঘুরতে না হয়।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে তাদেরকে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়, আরও কিছু দিক আছে। যেমন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি,  ভারতকে হাসিনার “দেয়ার ভাণ্ডার সব খুলে ধরা” সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে হাসিনার পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং উলটা; অর্থাৎ মোদীর ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল; যার সোজা মানে হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত তখন স্বীকার করেছিল।

কিন্তু পরবর্তিতে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক নেয়া। ভারত সেই রিস্কটাই নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত নিতে ভারত উদ্বিপ্ত হয়েছিল কারণ রেটিং সম্পর্কে ভারতের নিজেদের গোয়েন্ডা অনুসন্ধান রিপোর্ট। অথচ নির্বাচনের পরে ফলাফল পেয়ে ভারত দেখেছিল আসলে বাস্তবেই বিরাট রিস্ক নেওয়াই হয়েছে। কোন অনুমান ফলে নাই।

আবার, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার “সুজাতা স্টান্ডার্ড” তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন হাসিনার সেই তাতপর্যপুর্ণ  মন্তব্য “আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি দেশটিকে তা সারা জীবন মনে রাখতে হবে” আমরা স্মরণে রাখতে পারি। হাসিনা কথাটা বলেছিলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলকে (বর্তমানে ২১শে টিভির সিইও) দিয়ে করানো এক প্রশ্নের জবাবে।

মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার নিজ গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। কিন্তু তাহলে ভারত কোথায় পরাজিত হয়েছিল? যেসব অনুমানের উপর ভারতের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণ দাড়িয়েছিল এর একটা না ঘটলে কী হবে অথবা তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে – এটা হতেই পারে না ধরে নেয়া হয়েছিল। আর তাই হয়েছিল। মানুষ তো ভোট দিবেই। তাই “যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- ভারতেই সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে। সেটা ধরে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, ধরে নেয়া যায় এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই ভারতের কোন অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, গোয়েন্দারা এমন তথ্য জেনে পাথর (stunned by the outcome) হয়ে গেছিলেন। আর খুব সম্ভবত তা, ভোটের মাত্র চারদিন আগে।

মানে তাদের কোন অনুমানও ছিল না যে,  মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা অনুমান-বিশ্লেষণ মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হল, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা গভীর নির্ভরতা / নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল – ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে সহজেই অনুমান করা যায়। পিনাক রঞ্জন সেখানে লিখেছিলেন, “… ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে”। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোন আশা-ভরসা দেখেন নাই না রাখেন নাই।

তাই ভারত হাসিনার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে পিনাক রঞ্জন লিখেছেন। সেই কারণে আরও সাহস দেখিয়ে আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” অভিযোগ, “হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের” [সবচেয়ে মজার অভিযোগ ছিল এটা] অভিযোগের মত মারাত্মক বিষয়গুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হল, পিনাক অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা  “গুলি করে হত্যার” নীতি নিয়েছেন। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন, বলেছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর লেখার শেষের বাক্য আরও মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, “শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তাঁর প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’। অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং অংশটা হল, সবশেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের একটা হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন পিনাক রঞ্জন। তিনি হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। তিনিই ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে একসেস রাখেন এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ [ORF] এর ফেলো।

আগেই বলেছি, ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট তাদেরকে এভাবে পরিচালিত করেছে। আর রিপোর্ট হয়ত ভুল ছিল না। কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’ এই তথ্য বা অনুমান তাদের ছিলই নয়া। এজন্যই তারা পরাজিত হন। এছাড়া আর এক বিষয় তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

বিএনপিকে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠনঃ এর গঠনের সাথে সাথে এর খুবই দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, “নির্বাচনের আগে থেকে ক্ষমতাসীন হাসিনার পতন আসন্ন” ধরনের একচোখের অনুমান ভারতকে শেষে করে দেয়। এতে বড় বিভ্রান্তিতে পড়ে এবার ভারত সব হারানোর দিকে আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

তাই বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের “দিন খারাপ যাওয়া” শুরু হয়েছে, বলা যায়। “চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়”। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের আগের দিন -এর  মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- এটা ছিল “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব” তৈরির শুরু। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছি।

আরও লক্ষণীয় হল, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক (যারা ভারতের সরকারি অবস্থান অনুসরণ করে চলেন) জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও আমারই এক আগের লেখায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সকলেই বাংলাদেশে চীনের ততপরতা ও ঘনিষ্ঠতা বাকাচোখে দেখত। চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়াকে, ভীষণ নেতিবাচক উপস্থাপন করে এই বিষয়গুলোকে দেখতেন। তাদের সকলেরই কল্পিত এক ভারতের “এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্স” বলে এক এলাকা ছিল। আর বাংলাদেশ হল সেই এরিয়ার অন্তর্গত সুতরাং বাংলাদেশে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন উদ্ভট তালুকদারি-দাবি তাদের থাকত। তাঁরা বোঝাতে চাইতেন এখানে ভারত ছাড়া অন্য কারও ঢুকা – এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী – এ্মন “গাঁয়ে মানে না” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা লিখে চলতেন। অথচ এখন তারা ভোল বদলিয়ে ফেলেছেন।  শ্রীরাধা [VIF] এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন – “চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না… তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়”।  [Interestingly, both India and China have viewed Bangladesh not only through the prism of bilateralism but also amidst the landscape of the growing regional framework] অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তাঁরা এখন কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন “তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে”। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?

বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মত নয় বড়জোর সাথে ভারতও আছে হয়ত কিন্তু তা আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার এক দুরবস্থা শুরু হয়ে গেছে যার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির এই রিপোর্ট।

এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখটা এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিকটা দেখবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে চীন সফরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন নাই। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখের দিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ৬৫ এর বেশি রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এই গ্রান্ড প্রকল্পে বাংলাদেশেরও অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে সেসময় অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্বাচনে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ডে” ভারতের সমর্থনের মাশুল ভারত সেবার উসুল করেছিল এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি না হতে হাসিনাকে রাজি করিয়ে। এছাড়া পরে ভারত আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু এবারের ২০১৮ নির্বাচনে? এই লেখায় আগেই বলেছি “ছয় দিনের” কথা। আমাদের নির্বাচনের পরবর্তীতে হাসিনার একদম খাড়া পদক্ষেপ হল , গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে [CNN-NEWS18] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

[CNN-NEWS18] এটা আমেরিকার CNN এর সাথে ভারতের Network 18 এর জয়েন্ট ভেঞ্চার, ভারতের এক টিভি মিডিয়া।

আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে হাসিনা ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে আর আগান নাই, এখন সেখান থেকেই আবার উদ্যোগ নিয়া তিনি সেই “খাতিরদারির” সমাপ্তি টানছেন। এই খাতিরদারি তার নড়বড়ে অ-অভিষিক্ত ক্ষমতার খামতি পূরণের দিক থেকে এসেনশিয়াল – এমন এক ধারণা তাঁর ভিতরে কাজ করে বলে মনে হয়। যেটা খুব সম্ভবত সমাপ্ত এখন। হাসিনার ঐ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপিয়েছে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া । দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়ে লেখা সে রিপোর্ট। যার ভাষ্য হল, “ভারতকে হাসিনা তাঁর “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন”। অর্থাৎ এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে হাসিনা এতদিন নিজ দেশের স্বার্থ বলি দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এখন হাসিনা নিজ দেশের স্বার্থকে আর পিছনে ফেলতে রাজি না – এটা বুঝাতে চেয়ে বিবিসি লিখেছে – “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই ……। কথা ঠিক; এবার দরকার হলে ভারতের বিরুদ্ধে তিনি যাবেন, রাজি আছেন। কারণ এবার “বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তির”  ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন, “বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে”। আসলে এই প্রস্তাবটা মূলত চীনের।  গত ২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মত  BRI (“Belt and Road Initiative”) সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করতে ভারতকে চীনের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই প্রথম ভারত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান আপত্তি তুলে ধরেছিল। আর তখন থেকেই চীনের প্রস্তাব হল, আসেন “কথা বলে” নিগোশিয়েট করি। চীনের সেই কথা বলার প্রস্তাবই এবার সাহসের সাথে হাসিনা ভারতের মুখের উপর ছুড়ে দিল। বা বলতে পারি, হাসিনা বুঝিয়ে দিল যে তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। এবার আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থনের মত ভারতের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত নিবার কোন দায় হাসিনার নাই। তি এবার সমর্থন পান নাও অথবা নেন নাই – তাই। তাই মন শক্ত বেঁধে তিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ঢুকে পড়বেন। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক [Bangla-China Relation] নতুন মাত্রায় উত্থিত হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে  বেল্ট-রোড প্রকল্প বলতে বুঝতে হবে – সোনাদিয়া বন্দর সহ, সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীন যাওয়ার অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্প এমনকি এর বাইরেরও চীনের সাথে বাংলাদেশের সব প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ পরোনা করে উপেক্ষায় হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাবে এখন। [ সাক্ষাতকারের YOUTUBE LINK এখানে]  ঐ সাক্ষাতকারে হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ – ইঙ্গিত দিয়েছে হাসিনা এবার জানেন তিনি পিছনে ফিরবেন না। খুব সম্ভবত – ভারতের মুখ চেয়ে চলার দিন ঘুরে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে – এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তিনি পথ চলতে শুরু করেছেন। মুখ চেয়ে চলায় তিনি কত ডেস্পারেট ছিলেন তা বুঝতে আমরা মনে রাখতে পারি – তিতাস নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ভরাট করে তিনি ত্রিপুরায় লং-হুইল ট্রাকে মালামাল কনটেইনার চলাচলের রাস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীটা এখন মরেই গেছে, ধান চাষাবাদ হয়েছে এবার।    

এখন এই “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ” হাসিনাকে নিয়ে ভারত কী করবে? কোথায় রাখবে? প্রথমত, কোন বিশেষ গায়েবি চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে বেল্ট-রোড বা এর সংশ্লিষ্ট কোন কিছু মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। বরং চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কান্থা [Ashok K Kantha] (যিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভোকাল) এখন অবসরে ভারতে বসেই “চীনা স্টাডিজ” থিঙ্কট্যাঙ্ক খুলেছেন। তিনি আগে আমাদের যা জানিয়েছিলেন ওর সারকথাটা ছিল – “বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার চীনে দাওয়াত এটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সম্ভব না কারণ, তাতে ভারত চিরদিনের মত চীনের পিছনে পড়ে যাবে”। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের কী চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, উপরে থাকা সম্ভব – সে মুরোদ কী আছে? না কী এটা অসক্ষমতার কোন “ফ্যান্টাসি আকাঙ্খা” – এনিয়ে কোন কথা জানা যায় নাই। তবে  নিশ্চয় এখন বেল্ট-রোড প্রকল্প বিরোধী আরও শক্ত যুক্তি আছে তাঁদের কাছে।  অতএব এর সোজা মানে হল, ভারতের পক্ষে আগের মত হাসিনার ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে ট্রিটেড বা আলগা খাতিরের লোক হতে চাইলে হাসিনার পরামর্শ মেনে ভারতকেই এখন বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর তা নইলে, ভারতকে কেবল চীন নয়, ঢাকার হাসিনা সরকারেরও বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান ও পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মাঠে হাজির হতে হবে! যেভাবে নির্বাচনের পরে মাত্র ২২ দিনের মাথায় আমরা হাসিনাকে CNN-NEWS18 সাক্ষাতকার দেখেছি তাতে – অচিরেই ভারতকে কী এমন নতুন অবস্থানে দেখব আমরা?

তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য আর আরামের “শান্তি নাই”; বরং এক ব্যাপক উদ্বিগ্নতা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, যেটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সময়গুলোতে কোন দেশের বেলার মত বাংলাদেশ সরকারপ্রধানেরও স্বাভাবিক ঝোঁক হয় – এখন ক্রমেই তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বা বলা যায়,মূল কারণ পরিস্থিতি এখন তার অনুকূলে।  ওদিকে ভারতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে খুবই করুণ। যেন সেই করুণ দশা বলেই সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য ভারতের মোদীর নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির বিরুদ্ধে কিছুটা বিষোদগার করে হাসিনার মন গলাতে চাইছেন । তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। ভারত এখন বিএনপিকে মুখরোচক তবে অর্থহীন ইস্যু ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা  – হঠাত করে শর্ত হিসেবে খাড়া করছেন। অথচ ভারতের এটা করার বেস্ট সময় ছিল নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ভারত সফরে-লবিতে ছিল তখন তুলে ধরা। অথচ এখন ভারত বলছে বিএনপি  ‘জামায়াত ছাড়া’ না হলে এখন বলছে, না হলে সম্পর্ক হবে না – এমন ভাব ধরছেন।  যার সোজা মানে ভারত পথ হারিয়েছে। এটা তার মুখরক্ষা ততপরতা; সে সিরিয়াস নয়। অথচ বিপরীতে ইতোমধ্যে বিএনপিই ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে  এখন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করতে ফিরে যাবে বিএনপি। এটাই কী স্বাভাবিক নয়!

আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফা ইস্যু ইত্যাদিতে বাংলাদেশের হাসিনার সহায়তার যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু না, সেসব আর এখন মুখ্য নয়, হিসেবে থাকছে না। বরং চীনের সাথে  হাসিনা সরকারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলেও সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে এখন বড় ইস্যু। ভারতের জন্য কঠিনতম বিপদ এখানেই।

বিশেষত, গভীর সমস্যার দিকটা হল, ভারতের জন্য সময় এখন উলটা হাসিনাকে তুষ্ট করার, মন পাবার। কিন্তু ঘটনা হল, হাসিনাকে তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসির এসব তুচ্ছ রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে হাসিনা-বিরোধীতার রাজনীতি ও অবস্থানে  উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

গৌতম দাস

২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wW

 

আবার হেডলাইনে আসাম। তবে এবার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নতুন “নাগরিকত্ব বিল”। যদিও সম্প্রতিকালে আসাম বলতে বাংলাদেশের মানুষ চিনে এনআরসি-এর আসাম। NRC বা এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস; অর্থাৎ আসামে এখন বসবাসকারী সবাইকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে এক নাগরিকত্বের তালিকায় নাম তুলতে হচ্ছে। যার মূল কথা – ‘পড়শি’ দেশ থেকে যারা আসামে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর পরে আসামে এসেছে তাদের চিহ্নিত করা, যারা আসামের নাগরিক গণ্য হবেন না। তাদের অনুমান ছিল যে ইতোমধ্যে এক ব্যাপক সংখ্যক লোক আসামে এসে ঢুকেছে। যদিও নানা কারণে অনেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ দিতে পারেনি; যেমন সন্তান পেরেছি কিন্তু পিতা কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেন নাই এমনও হয়েছে। তবু এসব অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া কিন্তু চিহ্নিত নাগরিকদের নিয়ে এরপর তাদের নিয়ে ঠিক কি করা হবে তা “আনুষ্ঠানিক” ভাবে কেউ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত ভারতের সরকারি অবস্থান হল যে এটা ভারতের “অভ্যন্তরীণ বিষয়”  – এই বলে চালাতে চাইছে। ঠিক যেমন ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু করলেও তা আর কখনই বন্ধ করা হয় নাই। এদিকে এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল। এই তালিকা তৈরির নির্দেশ কিন্তু ভারতের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে এসেছে। তা সত্ত্বেও সেই কোর্টও স্পষ্ট করে বলছে না যে, ‘নাগরিক প্রমাণ দিতে না পারলে’ সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে কী করা হবে। কারণ, কারও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত না হওয়া মাত্রই এটা আপনাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে না যে, সে বাংলাদেশের নাগরিক। আর মূল কথা সে ক্ষেত্রে ঐ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ইস্যু নিয়ে কোন ততপরতার শুরুর আগে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিকভাবে ফরমাল কথা বলতে হবে। বাংলাদেশকে রাজি করাতে হবে। বাংলাদেশ যদি রাজি হয় তবেই এরপরেই কেবল আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারবে।

তবে সে কথা এখন থাক। কারণ, ইস্যু এখন তার চেয়ে আলাদা এবং ভয়াবহ। হিন্দুত্বের মোদী এবার আবার আর এক নতুন দানবীয় ইস্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাকে আসামে নতুন করে আগুন লাগানোর লক্ষ্যে মোদীর ‘নাগরিকত্ব বিল’ বলা যায়। যার আঁচ বাংলাদেশেও টের পাওয়া যাবে এমনই ভয়ঙ্কর। এই বিলের আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হল – সিটিজেনশিপ (সংশোধনী) বিল ২০১৬ (Citizenship (Amendment) Bill, 2016)। এই বিলটা বিজেপি ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় পেশ করেছিল ১৯ জুলাই ২০১৬ সালে। তাই বিলের নামের সাথে ২০১৬ শব্দটা লেগে আছে। এতদিন সেটা এক যাচাই কমিটিতে ইচ্ছা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। আসলে মোদী এটা সময়-সুবিধামত বের করবেন তাই গত দু-আড়াই বছর এটা আটকা ছিল। এখন গত সপ্তাহে ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঐ শিরোনামের আইনটা ভারতের লোকসভায় শেষ অধিবেশনে পাস হয়েছে।

সার করে বললে, মূলত এটা এর আগে ভারতের “নাগরিকত্ব বিল ১৯৫৫” (Citizenship Act, 1955) এর কিছু ধারায় আনা সংশোধনের পরের নতুন রূপ। সংশোধিত হবার পর ঐ বিলের সারকথাটা হল – বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশ থেকে (মুসলমান বাদে) হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান এই ছয় ধর্মের লোক ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হলে – আর ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে তাদের ছয় বছর বসবাস পূর্ণ হলে পরে এবার তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া যাবে। এই লক্ষ্যে এমন কেউ ভারতে প্রবেশ করলে যা আগের (১৯৫৫) সংজ্ঞা অনুসারে ‘অবৈধ ইমিগ্রান্ট’ (illegal immigrant) বলে বিবেচিত হতেন, এখন এই বিল পাশের পরে তারা “আশ্রয়প্রার্থী নাগরিক” বলে বিবেচিত হবেন। ফলে তারা ভারত থেকে বহিস্কৃত (deported) হবেন না, বা অবৈধ প্রবেশের দায়ে আদালতে পঁচে মরবেন না। বরং ভারতে থাকার পারমিট পাবেন। আর এভাবে টানা সাত বছর (আগের আইনে এটা ১২ বছর ছিল) থাকার পরে আবেদন করলে, ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন।

যদিও (মুসলমান বাদে) শব্দগুলো সেখানে লেখা নেই, কিন্তু অর্থ তাই। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শব্দগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে, আর ছয় ধর্মের নামও পরিস্কার উল্লেখ করা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়া বারবার ছয় ধর্মের উল্লেখ করার ঝামেলা এড়াতে েদের বদলে একটা শব্দ লেখা শুরু করেছে – ‘অ-মুসলমান”। যেমন ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনাম হল, (Lok Sabha passes Citizenship Bill amid protests, seeks to give citizenship to non-Muslims from 3 countries)। অর্থাৎ মোদী সরকার আসলে যা বুঝাতে চেয়েছে, মিডিয়াগুলো তাই লেখা শুরু করেছে।

কেন এই আইন আদালতে অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত
যে লিগাল ত্রুটির কারণে এই বিল অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত মূল সে যুক্তিটা হলঃ এটা বৈষম্যমূলক। অর্থাৎ এটা কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক “সাম্য নীতি” ভঙ্গ করেছে। ঐ বিলে বলা হয়েছে – ঐ তিন দেশে ‘ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে থাকারা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী যারা, তারা এ সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু তা সাধারণভাবে সব ধর্মের লোক না বরং ‘মুসলমান বাদে’ ভারতের ছয় ধর্মের কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে, যাদের বেলায়ই কেবল এটা প্রযোজ্য হবে। এটা স্পষ্টত এক বৈষম্যমূলক আইন। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা থাকা ও বাস্তবায়ন – এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের এক মৌলিক ভিত্তি।  এখানে সাম্য কথাটা ইতিবাচকভাবে বলা হয়। যেখানে মূল ভাবটা হল, বৈষম্য – নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, কোন আইন করা যাবে না যার মাধ্যমে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মানে রাষ্ট্রকে এক “নাগরিক বৈষম্যহীনতার” নীতি অনুসরণ করতেই হবে। বৈষম্যহীনতা মানেই ত সাম্য – তাই শব্দটাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে “সাম্যের” নীতি বলা হয়ে থাকে। এই কারণে, কোনও রিপাবলিক রাষ্ট্র কেউ মুসলমান বলে বা হিন্দু বলে যেকোন নাগরিক এমন কারও প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পারে না। এটাই নাগরিক সাম্য বা Equility এর মৌলিক নীতি, অথবা রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন থাকার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। এই যুক্তিতে কোন সুপ্রীম কোর্ট এই বিলকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।

এছাড়া, আর একটা কথা হল কখন কোন জিনিষ আইন বলে গণ্য হবে – এই প্রসঙ্গে আইনের ভিতমূলক প্রস্তাব বলে থাকে যে কোন বিষয় আইন বলে তখনই মানা হবে যদি তা নাগরিক-নির্বিশেষে সবার উপর প্রযোজ্য করা হয় তবেই। নইলে তা কোন আইনই নয়। সোজা কথা যা সবার উপর প্রযোজ্য করা যায় না তা কোন আইনই নয়। মোদীর নাগরিক বিল এই যুক্তিতে কোন আইনই নয়। ফলে ভারতের আদালতে রিট হলে আর  সৎ ও দুরদৃষ্টির যেকোন পেশাদার বিচারক এই আইনকে অবৈধ ও রদ (null & Void) করা হল – বলে রায় দিবেন।

ওদিকে বিল পাশের আগের সপ্তাহে ০৪ জানুয়ারি আসামের শিলচর গিয়ে মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছিলেন। সেখানে আবেগী বক্তৃতায়  দিয়ে মোদী বলছেন, ভারত মাতার সন্তানদের প্রতি ভারতের দায় আছে (আগ্রহীরা ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন। 15:58 মিনিটের এই ক্লিপে 05:30 মিনেটের পর থেকে মোদীর “ভারতমাতার” সে কাহিনী শুনা যেতে পারে।)। সেই দায় থেকে ঐ তিন দেশের ঐ ছয় ধর্মের যারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদেরকে আশ্রয় দেয়া মোদীর দায়িত্ব – এটাই মোদীর সারকথা। কিন্তু এখন মোদীর এই যুক্তি অনুসারেই মুসলমানদের বাদ পড়ার কোন কারণ নাই। এটা এমনই উদাম এক মুসলমান-বিদ্বেষী আইন।  যেখানে এমনকি পারসি, খ্রীশ্চান ধর্মও মোদীর ধর্ম-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  যেমন, আরএসএস-বিজেপি তাদের উদাম বিদ্বেষ ঢাকতে প্রায়ই বলে থাকে, “ইসলাম বা মুসলমানেরা ভারতে বহিরাগত”। এখন এসব বিদ্বেষী-ভাষ্য যদি এটা মেনেও নেই তাহলে খোদ আর্যরা কী বহিরাগত নয়? তারা কোন ভারতের ঘরের লোক? এছাড়া প্রাক-ইসলামি যুগের পারস্য বা ইরানের পারসিক অথবা ইউরোপীয় খ্রীশ্চান এরা কীভাবে ভারতের ঘরের? আরএসএস-বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষ কত তীব্র তার প্রমাণ এগুলো। না তবে সাবধান। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে বলবার জন্য একথাগুলো বলা হচ্ছে অজান্তেও তা মনে করা যাবে না। সেটা আর এক বিরাট বে-ইনসাফি হবে। যেমন মোদী যদি বলতে পারতেন “যে কোন ধর্মের” আর “যে কোন দেশের” নাগরিক যারা ধর্মের কারণ নির্যাতিত তাদের জন্য এই আইন – তবে সেটাই হত সবচেয়ে মানবিক আর সবার জন্য কাম্য ও আদরের এক নাগরিকত্ব আইন।

এখন তাই মোদির নাগরিক বিল পাস হওয়ার দিন, ৮ জানুয়ারি এক উল্লেখযোগ্য নতুন বৈষম্যের দিন হয়ে থাকল। কারণ, একে তো এমনিতেই আসামে আগের নাগরিক তালিকা তৈরির – এনআরসি তাতে, ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে আসামের অপ্রমাণিত নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে আবার ১৮ লাখই হিন্দু। অর্থাৎ এনআরসি তৈরির উদ্যেশ্য বা পেছনের অনুমান ছিল যে প্রমাণ করতে না পারা অর্থে অবৈধ নাগরিকের বেশির ভাগ হবে মুসলমান। আর মুসলমান মানেই ধরে নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অনুমানই ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে যায় যখন হাজির হয় যে এর মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাদের নিয়ে কী করা হবে সেই টেনশন বাড়ছিল। এর ভেতর নতুন করে আর এক দিকে উত্তেজনা ঘুরিয়ে বিজেপির দলীয়করণ করে নেয়া হল।

১৯৮৫ সালের চুক্তি বনাম মোদীর বিল
অহমিয়াদের সাথে রাজীব গান্ধী সরকারের ১৯৮৫ সালের চুক্তিতে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন ভাগ ছিল না। বলা ছিল, যারাই ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের পরে আসামে প্রবেশ করেছে বলে জানা যাবে তাদেরকে আসামের নাগরিক মানা হবে না – এই ছিল চুক্তি মূল কথা।  এই কারণে, NRC এর ভিত্তিও একই। কিন্তু বিজেপি এই ৪০ লাখ  হিন্দু-মুসলমান, এমন অপ্রমাণিত-নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবার বাস্তবতায় হিন্দুদেরকে সুবিধা আর মুসলমানদেরকে বঞ্চনা দিয়ে এক বৈষম্য করে এতে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের খাড়া করতে চাইছে।  এমনিতে বিজেপির সবখানের কমন রাজনৈতিক কৌশল হল – সাধারণভাবে “নাগরিক অধিকার” রক্ষা নয়, বরং একে পাশ কাটিয়ে হিন্দুত্বের আওয়াজ তুলে এর ভিত্তিতে সমাজে ভোটের মেরুকরণ তৈরি করা। আর এই সুযোগে হিন্দুত্বের নামে নিজদলের ভোটের বাক্স ভারি করা। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে সেই কাজটাই করা হল; তাতে সমাজে খামোখা বিভক্তি রেষারেষি বৈষম্য বাড়ল কীনা, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল কিনা – এসব কিছু ফেলে এখন পাঁচ বছরের মোদীর শাসনের শেষে উল্লেখযোগ্য সবই হারানো বিজেপি এখন বেপরোয়া।

এই বিলের প্রভাব ও পরিণতি
প্রথমত, আমাদের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, মোদির এই বিল আসামের এনআরসি বিতর্কের কোনো সুস্থ সুরাহা করার দিকে তাকিয়ে করা হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্য এ বিতর্ককে ব্যবহার করে বিজেপির নিজের বিভাজনের রাজনীতিকে বিস্তার ঘটান। তাই বেপরোয়া হয়ে অর্ধজ্ঞানের গোয়াঁর বিজেপি নেতারা [আসামের মন্ত্রী ও সারা নর্থ-ইস্টে বিজেপির মুল সংগঠক Himanta Biswa Sarma, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Sarbananda Sonowal ] মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন করে তারা দাবি করছে এটা নাকি তাদের তথাকথিত “সভ্যতার লড়াই”। বলছে – ……They want us to be slaves of a particular civilisation. However in this civilisational fight we must win. যদিও নেপথ্যে তারা বলছেও তারা নিরুপায়। অন্য সব ইস্যু বা অর্জন হারানো বিজেপি এখন তাই আসন্ন নির্বাচনে মূল ফোকাস শ্লোগান করবে তথাকথিত হিন্দুস্বার্থ, হিন্দুত্ব বা কথিত সভ্যতার লড়াই……।

এভাবে বিভাজন ঘটিয়ে তাদের শেষ আশা যে এভাবেই তারা আসন্ন নির্বাচন পার হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে,  সাধারণভাবে ভারতীয় “নাগরিক” এমন পরিচয়ের রাজনীতি বিজেপি করে না বরং এক বিভক্ত পরিচয় হিন্দুত্ব – এমন হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিই বিজেপি করে। এই হিন্দুত্ব পরিচয়ে ভোটারদের জন্য সে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে কেবল তথাকথিত হিন্দু স্বার্থের আওয়াজ তুলে মেরুকরণ করা ও ভোট বাক্সে তা পৌঁছান- এই হলো বিজেপির রাজনীতির কৌশল। তাই মোদির নাগরিকত্ব বিল সাধারণভাবে ভারতের সব রাজ্যের দিকে তাকিয়ে করা বলে মনে হলেও তা আসলে আড়াল সৃষ্টি করা। আর এই আড়ালে তাঁর বিশেষ টার্গেট রাজ্য হল – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। যেমন এ বিলের মাধ্যমে আসলে বলা হয়ে গেছে যে, আসামের তাদের এনআরসি-ইস্যুতে অপ্রমাণিত নাগরিকদের মধ্যেকার ১৮ লাখ হিন্দুকে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিজেপি নিয়ে নিল। আর এভাবেই আসামকে এখন হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করল বিজেপি।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এতদিন বিজেপি অভিযোগ করত,  পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া হিন্দু বাঙালি [পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভাষায় যারা ‘বাঙাল’], কংগ্রেস আর সিপিএম, কেবল এদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে গেছে। ‘বাঙালদের’ রেশনকার্ড আর ভোটার বানিয়ে দিয়ে নিজের দল-ভারী করার সহজ রাজনীতি করে গেছে। এমন ধরণের পাল্টাপাল্টি বয়ান অনেক আছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল এমন অভিযোগ – কংগ্রেস, সিপিএম অথবা বিজেপি – এরা কেউই মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কখনো করে না। তাহলে কী উল্টা? মানে, মমতা “বাঙালদের” বিরুদ্ধের রাজনীতিটা করে? না, সেটাও না। এমন অভিযোগও দেখা যায়নি। তবে মজার ব্যাপারটা হল এখন এ বিলের মাধ্যমে এবার বিজেপি নিজেই “বাঙাল” মনোরঞ্জনে সবার ওপরে এগিয়ে থাকার রাজনীতিতে নামল। যে অভিযোগ সে এতদিন অন্যদের বিরুদ্ধে করত।

সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া ধর্ম-নির্বিশেষে যে কেউই হোক, তাকে ভারতে নাগরিক হিসাবে “ন্যাচারালাইজ” করে নেয়া – এটা কোনোই খারাপ বা অন্যায় কাজ নয়। আপত্তি করারও কিছু এখানে নাই। যদিও আগে আইন বানিয়ে আইনসম্মত ভাবে তা করলে সেটা তো আরও ভাল। কিন্তু ঘোরতর বে-ইনসাফি অন্যায় ও খারাপ কাজ হবে যদি বৈষম্য করা হয় যে, “কেবল অমুক ধর্ম” হলেই তাকে স্বাগত। মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে যখন “মুসলমান বাদে” বলে নীতি-পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিজেপি সেই ভয়ঙ্কর বীজ বপনের কাজ শুরু করল। আসামের ঐ ১৮ লাখ হিন্দুর কথা তুলে বিজেপি আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনি ফোকাসের বক্তব্য করতে চায়। যাতে সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর বিশেষ করে “বাঙাল” হিন্দুরা সহানুভূতিশীল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটের বাক্সে আসে, প্রতিফলিত হয়। তাই মোদীর এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করা করা হয়েছে – অহমীয়াদের স্বার্থদের বিরুদ্ধে। এই হল নাগরিকত্ব বিল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি টার্গেট। মোদী তান্ডব আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই বিলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মমতাই এখন প্রধান প্রতিরোধকারি ও ভরসা।

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এমনকি এর সাথে পশ্চিমবঙ্গেও আর এক  বিজেপি প্রপাগান্ডাও চলবে যে, আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা “নাগরিক তালিকা” তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার শুরু করা হবে যে, তারা তুচ্ছ তেলাপোকা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাচনী অপপ্রচার এবং এই চরম ঘৃণা ছড়ান উন্মাদনা, এটাও বিজেপি পাশাপাশি চালাবেই। এটাই হবে, হিন্দুমনে জাগানো ঘৃণা-বিদ্বেষ কাজের মূল ফোকাস বয়ান। তার নির্বাচনি মুখ্য বয়ান।

যদিও এখানে খেয়াল রাখতে হবে আসামের মূল এনআরসির দাবি বা চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে আইনত তারা ঠিক কেবল মুসলমান বুঝায় নাই। এটা তেমন ভিত্তির ওপর দাঁড়ান নয়। ফলে তারা কেবল মুসলমানদের বের করে দিতে এ কাজ করছে তা নয়, বরং স্পষ্ট করে বলছে – ২৪ মার্চের পরে ধর্ম-নির্বিশেষে যারাই আসামে এসেছে তাদের বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে হবে। কিন্তু বিজেপি বা মোদি এই সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাদের সোজা ভাষ্য ও অর্থ হল – এনআরসির কর্মকান্ড বলতে কেবল ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ বুঝতে হবে।

আসামে এই বিলের প্রতিক্রিয়া
কেবল আসাম নয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আসাম ছাড়াও যেমন মনিপুরে, এমনকি ত্রিপুরায়ও। অনুমান করা যায় – তাদের মূল উদ্বেগের কারণ হল, এই সাত রাজ্যের মধ্যে যাদের সীমান্তের অপর পাড় বাংলাদেশ, তারা তো বটেই, এমনকি যারা নয়, তাদের এলাকাতেও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা এবার নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়েই এসে গেড়ে বসে যাবে – এই হল তাদের মুল উদ্বেগ। সাধারণভাবে এখানে আগে থেকেই থাকা সবচেয়ে বড় টেনশনের ইস্যু হয়ে ছিল, সমতলি-পাহাড়ি। আসামেরও মূল দ্বন্দ্ব, টেনশনও এটা। [আমাদের দেশে যেটা পাহাড়ি সেটা নর্থ-ইস্টের ভাষায় জনজাতি বা ট্রাইব।]  কারণ এই অঞ্চলের বড় বৈশিষ্ট হল পাহাড়ি বাসিন্দা অথবা ‘জনজাতি’ বাসিন্দা। ফলে এই অঞ্চলের সমতলি-পাহাড়ির মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন আর তা থেকে উদ্ভুত উচ্চ বা নিম্নস্বরে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা সেখানে সবসময় কাজ করে থাকে। এরই মধ্যে আবার “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করে তৈরি করা নাগরিকত্ব বিল এটাকে তারা দেখছে যে এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের (তারা বলতে চাচ্ছে এতে সমতলিদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে) নতুন করে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে আর স্বভাবতি তা ঘটলে তাতে আগের টেনশন আরও বড় নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে সুনির্দিষ্ট করে আসামের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক, তা অনুমান করা যায়। যেমন এমনিতেই আসামের এনআরসিতে যে ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকেছিল, তাদের মধ্যকার ১৮ লাখ হিন্দু নিজেদের ভাগ্য মোদী ফিরাবে একটা গতি হবে এই ভরসায় ইতোমধ্যেই তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের ও মোদীর ভক্ত হয়েছিলেন। সেটা কেবল ওই ১৮ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা আসামের বাঙালি হিন্দুমাত্রই তাঁরা ক্রমেই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছিলেন। এককথায় বললে, মোদীর হিন্দুত্বের ভিত্তিতে পাবলিক মেরুকরণ এর রাজনীতি এখানই বিভক্তির প্রভাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর তাই এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি”।

কেন? এখন এই ১৮ লাখ হিন্দুই হবেন আসামের পাহাড়ি বা যারা নিজেদের অহমিয়া পরিচয় দাবি করেন তাদের হাতে আক্রান্ত হবার প্রধান টার্গেট। আসামের পাহাড়ি বা অহমিয়া পরিচয়ধারীদেরই মূল রাজনৈতিক দল হল – অহম গণ পরিষদ ও বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। যারা বিজেপির সাথে মিলে বিজয়ে গত ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচন থেকে আসামের প্রাদেশিক জোট সরকারে ছিল। মোদীর নাগরিকত্ব বিল পাসের প্রতিবাদে এরাই এখন জোট-সরকার থেকে বের হয়ে গেছে। বিজেপির জোট শরিক অহম গণপরিষদের তিন মন্ত্রী রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে নয় জানুয়ারি সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরাই ১৯৮৫ সালের চুক্তির মুল দাবিদার পক্ষ যে চুক্তির মূলকথা হল, অ-অহমিয়দের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এরা এর প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক। এর আগে বাঙালি-নিধনের বহু রেকর্ড এদের আছে, এবং সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়া জেলায় পাঁচ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা ওই ১৮ লাখ হিন্দু বাঙালির ভাগ্যে এখন কী হবে এর ইঙ্গিত বলেছেন অনেকেই।

এ দিকে, আর এক অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যাচ্ছে। তা হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ মোদীর এই বিল পাসে খুশি হয়নি মনে হচ্ছে, অন্তত ভাল কাজ মনে করছে না। যদিও পেশাদার হিসেবে তাঁরা তাঁদের আপত্তি মনে মনে রেখেছে। তবে সেই সাথে আর একটা কাজ করেছে। তা হল, তাদের সাথে সম্পর্কিত বা এসাইনড লোকেদের হাতে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকে তাদের আপত্তি বা যুক্তিগুলো জানা গেছে। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিল পাসের ফলে এতে গত ছয় বছরে উলফার (ULFA, আসামে এটা উচ্চারিত হয় আলফা বলে) কমে আসা তৎপরতা যা এখন পরেশ বরুয়া অংশের নামে আছে কিন্তু স্তিমিত তাদের পুরনো সেসব তৎপরতা আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে তাঁরা। এমনিতেই জটিল পরিস্থিতি ও সমীকরণের আসামে আবার নতুন উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতের ফলে তাদের এতদিনের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যা কিছু অর্জন এত দিনে হয়েছিল তার উপর পানি ঢেলে দেয়া হবে বলে তারা মনে করে। তাই অশান্তি আর তাদের কাজ বাড়বে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া
এবারের ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি ও মোদীর রাজনীতি হবে বাংলাদেশের জন্যও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই বাংলাদেশের স্থানীয় হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই এখন আরএসএসের মুঠোয়। এই বিল “বাঙালি-হিন্দুমুখি” বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের “বাঙালদের” মনোরঞ্জন-মুখি এই অভিযোগ অনেকের।  ফলে মোদীর নাগরিকত্ব বিলের রাজনীতি হাজির করে বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই আরএসএসের মুঠোয় ভরতে তাদের সাহায্য করেছে। যদিও নিকট আগামিতেই বাংলাদেশের হিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে আত্মঘাতি বলে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য যে ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে তা হল, এই বিল এক বিশাল মরিচিকা।

ওদিকে অর্থনীতিক ‘উন্নয়ন ও বিকাশে’ রাজনীতিতে মোদী ইতোমধ্যেই ফেল মেরেছে। আসলে সেকারণেই মোদীর এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতি এত সিরিয়াস-নেস। আর একেই বিকল্প ইস্যু ভাব ধরে হাজির করার উদ্যোগ। মানে তার এখন একমাত্র সম্ভাব্য ইস্যু হবে হিন্দুত্ব, যার বিশেষ ফোকাস হবে ‘নাগরিকত্ব বিল’। আমরা ইতোমধ্যে – মুসলমানেরা তুচ্ছ তেলাপোকা, পিসে মেরে ফেলা হবে, বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে উপড়ে ফেলা হবে, ইত্যাদি এসব বলে গত নভেম্বর পাঁচ রাজ্য নির্বাচন লড়েছে বিজেপি দেখেছি।

সেই মহড়ার পর এবার আবার মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় নামতে হবে মোদীকে। আমাদের সরকার গতবার কেবল তথ্যমন্ত্রী ইনুকে দিয়ে এই ইস্যুতে ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নাগরিকত্বের বিল পাস করার পরে মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডা আরও তীব্র হবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ এবার এটা আরও বড় স্টেক; মোদী নির্বাচনে জেতার মামলা যেখানে আবার নাগরিকত্ব বিল মুল ইস্যু।

এছাড়া ওদিকে আবার বিশেষ করে আসামে যেখানে অহমিয়া-বাঙালি সঙ্ঘাত উসকে গেল সে পরিপ্রেক্ষিতঅও তৈরি হচ্ছে। হাসিনা সরকার তার প্রথম পাঁচ বছরেই উলফা দমনে যে ভূমিকা ও সহায়তা দিয়েছিল এর প্রশংসায় ভারতের গোয়েন্দা-আমলা থেকে রাজনীতিক সবাই পঞ্চমুখ। যদি তাই হয় তবে একদিকে এখন সেই অর্জন ভেঙে ফেলতে পরোয়া করছে না মোদীর নির্বাচনে জিতবার স্বার্থ। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের তেলাপোকা বলে ঘৃণা আর গালির জোয়ার তুলছে। এটা কতটুকু ফেয়ার? মোদীকেই জিতাবার স্বার্থে আমাদের সরকার কী মোদীর অত্যাচার, অনাচার জুলুমের দায়ীত্ব নিজের কাধে নিবে? আমাদের সরকারের নিজেকে আরও ভারতমুখি পরিচয়ে আর নিজেকে গণবিরোধী করার রিস্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে? মনে হয় না।

ভারতের হবু নির্বাচনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দুই দিকে দুই রাজ্যে থেকেই মোদীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় (যা ইতোমধ্যে আমরা রাজস্থান, ছত্তিসগড় নির্বাচনে দেখেছি) দেখতে হবে আমাদেরকে। বলা বাহুল্য এতে বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে পাল্টা সরব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর সম্ভাব্য সে পরিস্থিতির কথা আঁচ করে আগে থেকেই ভারতকে সাবধান করে নিজেদের স্বার্থ-প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে না ধরা হবে আমাদের সরকারের আর এক বড় ভুল।

গুরুতর প্রশ্ন, এ নাগরিকত্ব বিল পাসের পরে আসাম্র ‘নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকে যাওয়া’ প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের কী হবে? রোহিঙ্গাদের মত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে? অথবা মোদীর উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের কারণে জীবনের ভয়ে তারা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামাবে, নাকি তাদের বাধ্য করা হবে?

আমাদের উচিত হবে এমন যেকোনো কিছুর আগে এনিয়ে মোদীর সাথে ‘ডায়লগ ওপেন’ করা। মোদীকে আগে থেকেই সংযত করা, আমাদের উদ্বেগের কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি আদায় করা হবে আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অন্যথায় আমাদের সরকারকে অজনপ্রিয় হওয়ার অপ্রয়োজনীয় ভারতমুখি পরিচয়ের রিস্ক নিতে হবে।

শেষ কথাঃ
শেষ কথাটা হল এই বিল পুরাপুরি আইনসিদ্ধ হবার প্রক্রিয়া এখনও বাকী। কারণ লোকসভায় পাশের পর এবার ভারতের উচ্চ-কক্ষ, রাজসভাতেও তা পাশ হতে হবে। তবেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা পরিপুর্ণ আইন হবে। রাজ্যসভা বসবে আগামি ৩১ জানুয়ারি। সবচেয়ে বড় কথা কিন্তু এখানে বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই। এর অর্থ এই বিল এখানে পাশ হবার কোন সম্ভাবনা নাই। ২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর জোট এখনো ৮৮ জন সদস্য। বিপরীতে বিজেপি বিরোধী শিবিরের এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যা ১৫৬। তাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
তাহলে এটা জানার পরেও মোদী এত উদ্যোগী কেন? কারণ, আপাতত তাঁর “বাঙালি-হিন্দুমুখি” প্রেমের প্রকাশ – আর কিছু পারুক না পারুক  মোদীর মূল উদ্যোগ হল – এটা দেখিয়েই সে কাজ সারতে চায়। এটাই তাঁর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম-ত্রিপুরাসহ পুরা নর্থ-ইস্টে (মোট ৬৬ আসনে) নির্বাচনে লড়বার লক্ষ্যে মেরুকরণে হিন্দুত্ব রাজনীতির একমাত্র কৌশল।  আর এই মেরুকরণে এই অঞ্চলের প্রাণ-বেড়িয়ে যাবার অবস্থা তৈরি হলেও সংকীর্ণ স্বার্থপর বিজেপি ও মোদী নির্বিকার; যেভাবেই হোক তাঁকে ক্ষমতা পেতে হবে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) মোদির নতুন বিল: আসাম ও বাংলাদেশ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

গৌতম দাস

১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wO

 

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে; অফিসিয়াল ফলাফল প্রকাশ, শপথ নেয়াসহ মন্ত্রিসভা গঠন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। সরকারের দেশি-বিদেশি সুবিধাভোগীরা এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি’ [Land Slide Victory], বা বাংলায় “ভূমিধস বিজয়” শব্দ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যা করছে। কারণ, দাবি অনুযায়ী এই ফলাফলে  ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আওয়ামী জোটের ব্যাগে এসেছে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ আসন পেয়েছে সরকার। তাই অফিসিয়ালি ফলাফলে ৯৭ শতাংশের বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভূমিধস ধরনের শব্দ খুঁজে এনেই সম্ভবত একমাত্র এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যায়।

কিন্তু ভারতের মিডিয়ায় বিস্ময়কর এক “কিন্তু” আমরা লক্ষ করছি। নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হওয়ার অন্তত এক দিন পর থেকেই ভারতের মিডিয়ায় এই ফলাফল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই তারা বিভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাদের অস্বস্তিকর মন্তব্যগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছে। আর এতে প্রায় প্রত্যেকের রিপোর্টের শিরোনামে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ধরনের শব্দ দেখা যাচ্ছে। যে বক্তব্যগুলোর সারকথা হল, তাদের অনুমান এই নির্বাচনী ফলাফল ভারতের স্বার্থের জন্য অন্তত লং টার্মে বা শেষ বিচারে শুভ ইঙ্গিত নয়। খারাপ কিছুর কু-ইঙ্গিত। তাই এখান থেকেই ফলাফল গ্রহণে অস্বস্তির শুরু। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে কয়েকটা এখানে তুলে এনে আলোচনা করা হল।

একঃ কাঞ্চন গুপ্ত
যেমন ভারতের এমন ‘কিন্তু’ দৃষ্টিভঙ্গির মন্তব্যের এক লেখক হলেন কাঞ্চন গুপ্ত। তিনি সবার চেয়ে আগে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর, নির্বাচনের পরের দিনই কাঞ্চন গুপ্তের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আর তার লেখা ছেপেছে আবার ভারতের প্রভাবশালী বেসরকারী থিঙ্কট্যাঙ্ক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন”। যদিও কাঞ্চন গুপ্ত তাদের নিজেদের স্টাফ নন, তাই বাইরের লেখকের লেখা হিসেবে তারা ছেপেছে। কাঞ্চন গুপ্তের পরিচয় খুবই কম করে বললেও তা হল, তিনি একসসময়ের বাংলাদেশ (পুরানা পুর্ববঙ্গের) এক ব্রাক্ষ্মসমাজ পরিবারের সদস্য, এখন দিল্লি-নিবাসী এক প্রবীণ সাংবাদিক; যার আবার চলতি শতকের শুরুতে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বা মন্ত্রী আদভানির টেকনিক্যাল এইড বা মিডিয়াসংক্রান্ত সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারই লেখার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে এখন একদলীয় গণতন্ত্র’[Bangladesh now one-party democracy] । একদিক থেকে দেখলে এটা কোন খাতির বাছবিচার ছাড়া খুবই খাড়াভাবে তাঁর বক্তব্য হাজির করা হয়েছে। এছাড়া ঐ লেখার ভেতরের বিশেষ জোর দেয়া কিছু বুলেট বক্তব্য আছে। সেখান থেকে তুলে আনা এমন চারটা বক্তব্য হলঃ
যেমন- ১. “সব ব্যবহারিক অর্থে বাংলাদেশ এখন একটা একদলীয় রাষ্ট্র, যদিও ঐ দেশে এখনও “কিছু আসে-যায় না” ধরণের কয়েকটি দল রয়ে গেছে – যেন এটি প্রমাণ করার জন্য যে কনস্টিটিউশনাল বর্ণনায় বাংলাদেশ বহুদলীয় রাষ্ট্র”। [For all practical purposes Bangladesh is now a single-party state with inconsequential parties keeping alive the country’s constitutional description as a multiparty democracy.]
২. ” অভিযোগ হল, আওয়ামি লীগ ভিন্নমতকে নিশ্চুপ করে এক নির্বাচন আয়োজন করেছে যেটা না প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীন না ন্যয়নীতিতে পরিচালিত – এখন সেই অভিযোগকারিদেরকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা হয়েছে”। [Equally irrelevant are those who accuse the Awami League of silencing dissent and organising an election that was neither free nor fair.]

৩. “নিজস্ব কায়দায় চালানো শেখ হাসিনার এক ওয়ার অন টেররের তৎপরতা আছে। এই ততপরতায় টার্গেট করে হত্যা করা বা গুম করে দেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে অনেক কথা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রমেই ভায়োলেন্ট রেডিক্যালিজমের দিকে গড়িয়ে পড়া থেমেছে – এ কথার পক্ষে যায় এমন কোনো প্রমাণ নেই বললেই চলে”। [Much has been said and written of Sheikh Hasina’s own war on terror through targeted killings and alleged disappearances. There is little evidence to suggest that has halted Bangladesh’s slide towards violent radicalism.]
কাঞ্চন গুপ্তের এই বাক্যটা সম্পর্কে একটা মন্তব্য করা জরুরি যে, তাঁর একথাগুলো রাখঢাক না করে আবেগহীন ভাবে বলা সত্য, যা ভারতের স্বার্থের পক্ষে গেল কী না এই বিবেচনা না রেখেই তিনি বলেছেন।

তবে সব ছাড়িয়ে কাঞ্চন গুপ্তের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্তব্য আছে যা এখানে এখন আনা হবে। এর প্রথমটা হল তাঁর লেখার প্রথম বাক্য। খুবই চাচাছোলাভাবে তিনি আমাদের বলছেন, “প্রথম ভোটটা বাক্সে পড়া বা বাক্স গণনা শেষ হওয়ার আগে জানাই ছিল ফলাফল কী আসবে। কেবল বাকি ছিল এ কথা জানা যে, তিনি কত আসন সাথে নিয়ে আসবেন – যা প্রমাণ করবে হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে যোগ্য কেউ নাই”। [The results of the 11th parliamentary election in Bangladesh were known even before the first vote was cast last Sunday or the first ballot was counted in the evening on the same day. It was only a question of how many seats would Sheikh Hasina Wajed’s Awami League tote up to prove its point that it faces no opposition worth its name.]

এ ছাড়া কাঞ্চন গুপ্তের প্রথম মন্তব্য শুনে যাতে পাঠক আবার আশাবাদী না হয়ে যান সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হলঃ “বিরোধী দল এখন যতই ফ্রেশ নির্বাচনের দাবি জানাক সেটা ঘটবে না; তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকা এর পক্ষে কোনো আগ্রহ নিয়ে হাজির হবে বলে মনে হয় না”।’ [The opposition can keep demanding fresh elections but that will never happen. It is unlikely that either the US or the EU will strike a particularly harsh posture on the quality of Sunday’s election …… ]

এই হলেন কাঞ্চন গুপ্ত ও ভারতের মিডিয়ায় তাঁর আবেগহীন পর্যবেক্ষণ, যেটা এক অস্বস্তিকর প্রকাশও বটে।আর তার নিচের বাক্যটা হল চীনভীতি হতাশার। বলছেন, হাসিনা যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ কথাটি অনুসরণ করে সবার চেয়ে বেশি খুশি হবে আসলে চীন। [……would bear testimony to her claim that Bangladeshis have voted for development and progress. China would be more than willing to oblige.] তিনি বলতে চাইছেন এই বাক্য ত চীনের পক্ষে গেল!

দুইঃ ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণ
এবার দ্বিতীয় মিডিয়া মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া হল, ৩ জানুয়ারিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণের লেখা। তার লেখার শিরোনাম, “গণতন্ত্রের জন্য বা ভারতের স্বার্থের জন্য এটা কোনো অর্জনই নয়”।[No gain for democracy, or for India’s interests]। এছাড়া পরে বিস্তারে ভেঙে বলছেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল ঐ দেশের গণতন্ত্র অথবা দক্ষিণ এশিয়া বা বাইরে ভারতের লংটার্ম স্বার্থের জন্য কোন অগ্রগতি বয়ে আনবে না”। [The Bangladesh election results are neither going to further democracy in that country nor India’s long-term interests in South Asia, and beyond.]
তবে একটা মিলের দিক হল, ভরত ভূষণও উপরের কাঞ্চন গুপ্তের মত মনে করেন, “বিরোধীদের পুনর্নির্বাচনের দাবি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যাকে বিরোধীরা সরকারি দলবাজ বলছেন, সেও আমল করবে না”। কিন্তু ভরত ভূষণের অভিযোগ আরও খাড়া এই অর্থে যে তিনি খোদ হাসিনা সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তিনি মনে করেন, “সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটার বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন তাদের ইমেজ হারিয়েছে। মিডিয়াও সরকারি খবরদারির বয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। সরকার ও সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের মানে, এমন কর্তাব্যক্তিদের রেকর্ড আছে যে তারা বিরোধীদের ওপর হামলা করেছেন। এ অবস্থার মুখে গণস্বার্থ নিয়ে কথা বলা বুদ্ধিবৃত্তির লোকেরা ও স্বাধীন ব্লগাররাও জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছে”।’ [Due to political manipulation by the State, the judiciary and the Election Commission have also lost their sheen in the country. The media has fallen in line with state diktats. Given a history of attacks by both state and non-state actors, public intellectuals and independent bloggers fear for their lives.]

তবে ভরত ভূষণের মূল উদ্বেগের পয়েন্ট হলঃ তিনি লিখছেন, “ভিন্নমত প্রকাশ হতে দেয়ার সুযোগ না রাখায় দমবন্ধ পরিবেশে আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নমতের লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাতে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলা হচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যেই ইসলামী রেডিক্যালদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি আছে। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না রাখার ব্যর্থতা – এটাই যেকোনো ধরনের রেডিক্যাল রাজনীতির জন্ম ও বিস্তারের জন্য তা খুবই উর্বর ভূমি হিসেবে হাজির হয়। এধরনের অবস্থা-পরিস্থিতিগুলোই মানুষকে ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মিসর বা আলজেরিয়ায় ঘটেছিল। [The absence of democratic safety valves and with institutions of the state “weaponsied” against dissent, is a particularly dangerous situation for countries which have a significant presence of Islamic radicals. The failure of political processes creates a fertile ground for the expansion of radical politics. The people can then easily turn to Islamic radicalism, as happened in Egypt and Algeria.]।

তিনি সঠিকভাবেই মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে বলছেন, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপগুলোকে অকেজো করে ফেলা হচ্ছে তড়িত নগদ কিছু ফল পাবার আশায় অথচ ক্ষমতাসীনেরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায় ইয়াদের হাতেই এটা হচ্ছে”। [The democratic institutions of Bangladesh have been eroded for short-term gains by those in power for a long time.]

শেষ কথা হিশাবে তিনি বলছেন, “এ ছাড়া এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে আসন্ন স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব যা নিয়ে আসবে তা শেষ বিচারে এর ফসল চীনের পক্ষেই যাবে আর তাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ শুকিয়ে চিপার মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই দেখার বিষয় হবে। [China wants a strategic foothold in Bangladesh to counter the United States, and secondarily, India…….As this great game unfolds, it remains to be seen whether or not Indian intersts will get squeezed out of Bangladesh.]

তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত তার মারাত্মক ক্রিটিকাল পয়েন্ট হল, তিনি এমন একতরফা নির্বাচনের নিন্দা বা অসম্মতি প্রকাশ করতে বলছেন, “ভারতের জন্য নিরন্তর যেটা ভয়ের বিষয় বাংলাদেশে কোন ইসলামি রেডিকেলের উত্থান আর সীমান্ত পেরিয়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা – এমন একপক্ষীয় নির্বাচন সেই আশঙ্কাকেই আয়ু দিবে। ভারতের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের দিক থেকে দেখলে পকেটে গানপাউডার নিয়ে ঘুরা এক বাংলাদেশের চেয়ে সুস্থির নিয়মতান্ত্রিক বাংলাদেশই ভারতের জন্য কাম্য”। [As for India’s primary bugbear, the rise of Islamic radicals in Bangladesh and its consequences across the border, a one-sided election may have given it a new  breath of life. In the long run, it might be easier to deal with a stable and democratic Bangladesh than one that may become a powder keg.]

তিনঃ একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলী
আমাদের তৃতীয় উদাহরণ হল, একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলির লেখা এক রচনা। সুমিতের পরিচয় হল, তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রফেসর। এ ছাড়া, তিনি আমেরিকান ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় কালচার ও সভ্যতা বিষয়ের রবীন্দ্র চেয়ারের অধ্যাপক। আর তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’(Foreign Policy)  পত্রিকায় ৭ জানুয়ারিতে।

তার লেখার শিরোনাম হল, ‘বিশ্বের বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যর্থতার দিকে নজর করা উচিত”। [The World Should Be Watching Bangladesh’s Election Debacle]। আর এই লেখার দ্বিতীয় শিরোনাম হল, “ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটা তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে, ইসলামী চরমপন্থার অসুস্থ ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করেছে আর দেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে”। [The ruling party is making a mockery of the electoral process, pandering to Islamic extremists, and turning the country into an authoritarian state]। তাঁর অস্বীকৃতি প্রকাশের লক্ষ্যে খুবই কড়া কড়া শব্দ প্রয়োগ সন্দেহ নাই। যদিও এই লেখকের দেখার অবস্থান একজন ইসলাম-বিদ্বেষী আন-ক্রিটিক্যাল সেকুলারের। কিন্তু সেদিকটাকে পাশে ফেলে রেখে আমরা তাঁর কথা আমল করব এখানে।

প্রথমত, তিনি একে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের (questionable results)’ নির্বাচন মনে করেন। তাঁর লেখা শুরুর দ্বিতীয় বাক্য হল এরকম  The questionable results ended in a sweeping victory …।] এবার তাঁর লেখা থেকে তিনটি বুলেট বাক্য উঠিয়ে আনব এখানে।

তিনি মনে করেন- ১. ‘সস্তা রাজনৈতিক লাভালাভের স্বার্থে এই দল (মানে আওয়ামী লীগ) ধর্মীয় সহিংস দলের উত্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভোটারদের [হেফাজতের সাথে আপোষ সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন] সাথে আপস করেছে। [For reasons of political expediency the party has failed to fashion a concerted strategy to curb the rise of such religious militancy; it prefers to court religious voters.]
২. আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী বিজয় বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর, যেখানে গণতন্ত্রের আলখাল্লায় ঢেকে এটা এক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি পয়দা ও সংহত হতে সাহায্য করবে। [The Awami League’s questionable electoral victory is bad news for Bangladesh, where it will aid the consolidation of an authoritarian political order with a democratic facade.]
৩. এই দানব ক্ষমতার বিরোধীদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমল না করার একমাত্র চিহ্ন নয়। [The regime’s hostility toward the opposition was not the only marker of its disregard for democratic procedures.]

উপরের বাক্যগুলো নিজেই নিজের ব্যাখ্যা, তাই বিস্তারে যাওয়া হল না। তবে এছাড়া, সবশেষে সুমিত গাঙ্গুলিও মনে করেন, “ট্রাম্প বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না। এর বদলে আফগানিস্তানে আমেরিকার ভবিষ্যত নিয়েই সে বেশি চিন্তিত। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা বাংলাদেশের সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিক করা বা ঘাটতি পুরণের জন্য শক্তি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না”। [Finally, the Trump administration, to the extent it has devoted any attention to South Asia, has mostly been preoccupied with the future of the U.S. involvement in Afghanistan. It has paid little attention to political developments in Bangladesh or elsewhere in the region. Consequently, it seems highly unlikely that Washington will expend much energy, let alone political capital, to address the shortfalls of this election.

চারঃ প্রাক্তন সচিব অভিজিত চক্রবর্তী
চতুর্থ ও শেষ উদাহরণ টানব অভিজিত চক্রবর্তীর লেখা। অভিজিত ভারত সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সাবেক বিশেষ সচিব ছিলেন বলে লিখেছেন। অনুমান করা হয়, এ ধরনের বিশেষ সচিবের মানে এরা আসলে গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা হয়ে থাকেন। সে যাই হোক, তার লেখা ছাপা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে, (Economic Times), ৭ জানুয়ারি।

তার লেখার শিরোনাম, “বাংলাদেশের রাজনৈতিকতা রেডিক্যাল হয়ে যাচ্ছে ভারতের শঙ্কিত হওয়া উচিত”। [India should be wary of radicalisation of Bangladesh’s polity]। রেডিক্যাল বলতে আমরা সাধারণভাবে সব ধরনের “সশস্ত্র রাজনীতি” বলে  বুঝতে পারি। যদিও তিনি এখানে সুনির্দিষ্ট করে ইসলামি রেডিক্যাল বুঝাতে চেয়েছেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি এক মারাত্মক হাতেগণা অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। বলছেন, “আওয়ামী লীগের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয় এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের সংখ্যার ব্যবধানে বিজয় দেখানো, এই নির্বাচন পরিচালনাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে; বিশেষত যদি, আমরা বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত সমর্থক ভো্টার ভিত্তির কথা মনে রাখি”। [The win in over 90% of the seats contested by the Awami League and some with astounding victory margins have contributed to the questionable conduct of the elections, given the committed vote base of the BNP and JeI. অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই ৯০% এর বিজয় যদি মানি তাহলে একা বিএনপির প্রায় স্থায়ী ভোটার বেজ ৩০-৩৫% যা বলা হয় সেটাকে ব্যাখ্যা করব কী করে? এছাড়া জামাতের ভোট ত আছেই!

এছাড়া তিনি আরও বলছেন, ‘এই নির্বাচন শুধু বিরোধীরা নয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ; তারা এর তদন্ত দাবি করেছেন”। [The latest election falls short of widespread acceptability as not only the opposition parties, but also the EU and US have questioned the process and demanded investigation into the reports of harassment, intimidation and violence.]

এরপর তিনি সবশেষে একটা মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন, “এসব ফ্যাক্টর একটা দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যে দেশ অতীতে ধারাবাহিকভাবে বিরতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখে এসেছে”। [All these factors may pose a challenge to the establishment of a stable democracy in a country that has seen periodic military interventions in the past.]।
স্যরি, অভিজিত চক্রবর্তীকে বলতেই হচ্ছে, এই শেষ বাক্য তিনি না জুড়ে দিলেই ভালো হত। সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে এই মন্তব্য খুবই হাল্কা ও উস্কানিমূলক হয়েছে। এতে তিনি নিজের বিদ্যাবুদ্ধি, পেশা, তথ্য যোগাড় ও দক্ষতার মান নিচে নামিয়ে দিলেন।

সে যাই হোক তিনি হেফাজতের সাথে আওয়ামি লীগের আপসে চরম ক্ষুব্ধ। তিনি বলছেন, “গত দশ বছর তিনি শাসন ক্ষমতায় একনাগাড়ে থাকলেও ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এতে সমাজে দেশের ইসলামী পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির সামাজিক সুবাতাস পেয়েছে”। [The wooing of radical elements by all the political parties is an indication that despite 10 years of the Awami League government, the societal winds continue to favour a strong Islamist identity in the country. ] এটা বেশ ইন্টারেস্টং যে তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে “ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে” প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
তবে তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন, “এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বাংলাদেশকে রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়া হল”। এ ছাড়া সেকুলারিজমের মৌলিক বীজ ও চিহ্নগুলোকে ক্ষয়ে ফেলা হয়েছে। [The erosion of secular ethos will not only affect minorities, ………. ] ফলে তিনি এবার এক সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। বলছেন, সব মিলিয়ে “এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত”।  [These developments could pose security challenges for India, especially in the northeast.] অর্থাৎ তার কথা সঠিক বলে মানলে হাসিনার এ নির্বাচনী ফলাফল ও পরিচালনা ভারতের জন্য নিরাপত্তার ক্ষতি বয়ে এনেছে বা আনবে।
এসব কথার সূত্র ধরে তিনি এবার নতুন হাসিনা সরকারে চীনের প্রভাব বেড়ে যাবে বলে দেখছেন। তাই তার শেষ কথা “ভারত এসব দেখে শঙ্কিত না হয়ে” ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
তার পু্রা কথার মধ্যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলছেন আর এতে তিনি ভারতের জন্য বিপদ দেখছেন।

সবশেষেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
আনন্দবাজার পত্রিকার উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। এটা ১ জানুয়ারির রিপোর্ট, শিরোনাম হল– ‘ভোটে জিততে মুখ চাই, কংগ্রেসের হারের সাথে বিএনপির মহাবিপর্যয়ের তুলনা টানলেন হাসিনা।’ আনন্দবাজারের শিরোনাম এমন পেঁচানো হয় যে, খবরটা আগে পড়া শেষ না করলে শিরোনামের অর্থ জানা যায় না। এই রিপোর্টেরও সারকথা – আনন্দবাজারেরও একই উদ্বেগ, জয়লাভের পারসেন্টেজ বেশি হয়ে গেছে- বিরোধী দল থাকল না।

লিখেছে, “ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে, জাতীয় পার্টি এবং আরও ৬টি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনার মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি”।  অর্থাৎ সরকারি জোট একাই ৯৭% আসন পেয়ে গেছে। “সেই অর্থে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আর তেমন কোনো অস্তিত্বই থাকল না”। এই হল আনন্দবাজারের উদ্বেগ। এখন এখানে এক তামশা দেখলাম আমরা। আনন্দবাজারের এই উদ্বেগ তাড়াতে একপর্যায়ে উপায় না পেয়ে হাসিনাকেই বলতে হল, “আগামীতে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসে যেতে পারে”। এর উদাহরণ হিসেবে বললেন, “আজকের বিজেপিও তো একসময় ভারতের সংসদে মাত্র দু’টি আসন পেয়েছিল”। এ ছাড়া, হাসিনাকে বিএনপির হারের ব্যাখ্যাও নিজেই কান্ধে নিয়ে দিতে হয়েছিল। হাসিনা ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিএনপি জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি না বলাতেই নাকি তারা মূলত হেরেছে।
যা হোক সারকথাটা হল, ৯৭ শতাংশের মত আসন পেয়ে আওয়ামি লীগের শান্তি ছুটে গিয়েছে। উল্টো আওয়ামী লীগকেই বিএনপির আগামী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আপাতত নিজের জিতবার সাফাই দিতে হয়েছিল।

তবে এর বাইরেও অনেক রিপোর্ট, মন্তব্য, কলাম আছে পাওয়া যাবে; যা এখানে আনা হয়নি। যেমন সরাসরি ট্রাম্পকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছে এমন রচনাও আছে। তবে ভারতের এসব মুল্যায়ন প্রকাশের সাধারণ সুরটা হল, এই নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ভারত আগামী দিনে নিজ দেশের জন্য লুকানো বিপদ বলে মূল্যায়ন করছে। সে কারণেই এত অস্বস্তি।
আর একটা সোজা ফ্যাক্ট হল, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এতে যে ঐ খালি জায়গার দখল পাচ্ছে সেই লাভের ফসল যাচ্ছে মূলত চীনের ঘরে। কারণ, রাজনৈতিক অধিকারের (Political Right) বদলে “উন্নয়নের রাজনীতির” – হাসিনার এই রাজনীতিতে বিজয়ের সোজা অর্থ -ক্রমশ  হাসিনার কাছে আপন হয়ে উঠবে চীন যেখানে ভারত হবে তুচ্ছ, পরাজিত পার্টি! যার অন্তত কিছু কারণ ভারতের কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই। আর আমেরিকার হবু কোন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রায় নাই বলে এর বিরুদ্ধে  ভারতের সুপারিশ আর জরুরি না।  যার ফলাফল, চীনের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ এক বাংলাদেশ। আর তাতে ততই শিরশিরে ঠাণ্ডা চিলিং অনুভুতির এক ভারত – হতে দেখছি আমরা।
এ ছাড়া মানুষের রাজনৈতিক অধিকার  দাবড়ে রেখে হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো, “উন্নয়নের রাজনীতির” আওয়াজে সব আড়াল করা এসব কিছুর ফলে  সত্যি সত্যিই  রেডিক্যাল – শুধু ইসলামের নয় যেকোন – রাজনীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, সেটা তো আছেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘ভূমিধস’ বিজয়ে ভারতের মিডিয়ার শঙ্কা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]