মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

ভারতের ভাঙ্গন শুরু করতে পারে কাশ্মীর

গৌতম দাস

১২ আগষ্ট ২০১৯, ০০;০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Fc

[সার সংক্ষেপঃ অবিভক্ত ভারতে যাদের জন্ম বা উত্তরসুরি আমাদের সকলের এক “আদি-পাপ” হল, সেই রামমোহন রায়ের তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁ থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র-ধারণাটা ওর মূল ফিচার অথবা কী পয়েন্ট ও বৈশিস্টগুলো কী থাকতেই হয় তা আমরা রপ্ত করতে পারি নাই। অথচ ভারতে আধুনিকতা এসে গেছে, প্রগতিশীলতাও বলে গর্ব ফুটিয়ে বেড়াই। আসলে তো মনে মনে হিন্দুত্বের বাসনা আর বর্ণহিন্দুর জাতবিচারে শ্রেষ্ঠত্ব ভাবনা সব জায়গায় ঘুরে ফিরে আগের মতই আধিপত্যের আসনে বসে আছে। কিছু বদলাতে দেয় নাই। যে দেশে সমাজের সবখানে  বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথা সক্রিয় ও সবলভাবে টিকে আছে সেদেশে রিপাবলিক রাষ্ট্র কার্যকর আছে , নাগরিক-নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য নাই এমন দাবির রাষ্ট্র আছে – এর চেয়ে ঠাট্টা আর কী হতে পারে?  এছাড়া, এই যেমন ধরেন কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তান কোনদিকে যোগ দিবে?  না, এটা কোন এক হরি সিং রাজার খায়েস কোনদিকে এর দ্বারা নির্ধারিত হবে না, সে মামলা এটা একেবারেই নয়। তাহলে সমস্যাটা কী? গোড়ার সমস্যা হল আপনি হিন্দুত্ব-ছাড়া অন্য কোনভাবে রাষ্ট্র বুঝতে বা গড়তেই রাজি না। এটাই সমস্যার গোড়া। এখন ভেবে দেখেন হিন্দুত্ব-ছাড়া রাষ্ট্র বুঝতে না পারা বা চাওয়ার কারণে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী এক হিন্দুত্বই নির্ধারণ করে দিয়েছে – বলতে পারেন বাধ্য করে বলছে যে মুসলমান তুমি মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র কর। এভাবে একেবারে জবরদস্তিতে এদিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।  অথচ আবার এর জন্য দায়ী করা হয়েছে উলটে মুসলমানদেরকেই।

অথচ সহজ সমাধান ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কোন নাগরিকের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না, কাউকে করতেও দিবে না, হতে দিবে না।  যেকোন ধর্ম, কিংবা পাহাড়ি-সমতলি, সাদা-কাল, বাংলা বা হিন্দিভাষী ইত্যাদি নির্বিশেষে সকলেই রাষ্ট্রের চোখে সমান নাগরিক হবে – এমন রাষ্ট্র গড়তে হত। এক সমান নাগরিক পরিচয় ছাড়া আর কোন পরিচয়ে রাষ্ট্র কাউকে চিনে না। এই ছিল বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র, যেটাকে ইতিবাচকভাবে অনেকে সাম্যের (equality) রাষ্ট্র বলে বুঝে। কিন্তু হিন্দুত্বের নেহেরু ভাবলেন কেউ বুঝে ফেলার আগের সেরে ফেলবেন ব্যাপারটা; তাই তিনি কাশ্মীর যেন হরি সিং-এর ব্যক্তি সম্পত্তি ও সে অনুসারে সিদ্ধান্তের বিষয় বলে চালিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু কথায় আছে, পাপ তো কারও  বাপকেও ছাড়ে না।  তাই আমরা সকলেই আবার ব্যাক-টু-প্যাভেলিয়ান। কাশ্মীর ইস্যু আমাদের সকলকেই আবার ১৯৪৭ এর পুরানা অমীমাংসিত প্রশ্নে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তফাত এটাই যে এখন হিন্দুত্ব দগদগে সর্বাঙ্গে ঘাঁ-এর বিভৎস শরীর নিয়ে সে হাজির। তাই সকলেই চিনে ফেলতে পারছে। হিন্দুত্বকে আজ তাই সহজে সকলেই চিনতে পারে। সবকিছু ভেঙ্গে পড়ছে। আরও ভাঙ্গবে। কিন্তু শুধু চিনতে পারা নয় দরকার এক্ট করা, দৃঢ় পদক্ষেপের একশন।]

 


কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এটা নেহেরু-গান্ধীসহ ততকালীন কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারাও জানতেন ও মানতেন। কেন? কিন্তু এই “অংশই” বা করে নিবার সঠিক বা জনসমর্থিত পথ ও পদ্ধতি হত কোনটা? এটা সেই ১৮১৫ সালের রামমোহনের রেনেসাঁ থেকে একাল পর্যন্ত ভারতের নেতাদের কারই জানা হয় নাই। বরং কমবেশি সকলেরই বেকুবি ধারণাটা হল, ব্যাপারটা বোধ হয় বলপ্রয়োগ করেই করার বিষয়।

বৃটিশ-ইন্ডিয়ার প্রশাসন মানে কীঃ
আমাদের অনেকের ধারণা, অবিভক্ত ভারত মানে একটা একক প্রশাসনিক এলাকা; যা ব্রিটিশেরা ১৯৪৭ সালে চলে যাওয়ার সময় যেন একটা অংশ নেহরু-গান্ধীদের  দিয়ে যায় যা থেকে ভারত আর অপর অংশ মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র বানাতে দিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই ধারণা ভিত্তিহীন। ব্রিটিশ আমলের ইন্ডিয়া ছিল প্রধানত তিন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিভক্ত ভারত – বড় তিন প্রেসিডেন্সি (বাংলা,বোম্বাই ও মাদ্রাজ), প্রায় ১৭টা প্রদেশ আর ৫৫০-এরও বেশি প্রিন্সলি স্টেট (Princely State বা করদরাজ্য)। আর এদের প্রত্যেকেই ছিল কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (সংক্ষেপে এখন থেকে “কোম্পানি” লিখব) হেডকোয়ার্টারের অধীনে সরাসরি শাসনে; কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ আর প্রিন্সলি স্টেটগুলো এভাবে এরা সবাই একেকটা আলাদা সত্তা। প্রিন্সলি স্টেটগুলো আবার আরো জটিল এ কারণে যে, সেগুলোর অভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন প্রশাসন কোম্পানির অধীনে নয়, তৈরিও নয়। বরং কেবল বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ- এ বিষয়গুলোই এককভাবে কোম্পানির এক্তিয়ার, দখলে ও অধীনে। এসব ইস্যুতে কোম্পানি যা সিদ্ধান্ত নিবে তাই ফাইনাল। আসলে এর মূল কারণ ছিল বৃটিশ কলোনির প্রতিদ্বন্দ্বি অন্যরা যেমন ফরাসি, ডাচ  এমন অন্য কলোনি মালিকেরা যেন বৃটিশের অধীনের রাজাদের সাথে যোগাযোগ করে বেশি সুবিধা দিবার লোভ দেখায় বৃটিশদের থেকে রাজাদেরকে ভাগায় নিয়ে যেতে না পারে, তাই “নো ফরেন কমিউনিকেশন” নীতি পালন করত তারা।

তবে করদ রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, প্রশাসন ও রাজস্ব আদায় একচেটিয়াভাবে রাজাদের হাতেই থাকত, যদিও রাজারা আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট শেয়ার ব্রিটিশদেরকে দিতে বাধ্য থাকত। এ বিষয়ে প্রত্যেক রাজার সাথেই কোম্পানির আলাদা আলাদা চুক্তি ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম এক শ’ বছর, অর্থাৎ ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে ছিলাম। আর ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটলে, একে দমনের পর থেকে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি কোম্পানির সব কর্তৃত্ব নিজে অধিগ্রহণ করেছিল, আর শাসন করেছিল ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত।

তাই দেশ ভাগের সময় প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগুলো সহজে ও সরাসরি স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে গেলেও প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বলেই ব্রিটিশ সরকার বিদায় নিয়েছিল। কারণ কোম্পানি বা বৃটিশদের সাথে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিতে এমন কিছু লেখা নাই – এই যুক্তিতে তারা ইস্যুটা ফেলে পালিয়েছিল। আবার প্রিন্সলি স্টেট মানে আসলে, কোম্পানির ভারতে জেঁকে বসার আগে থেকেই এরা অসংখ্য ছোট-বড় রাজার রাজ্য ছিল। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে অনেকগুলোকে কোম্পানি পরাস্ত করে নিজ প্রশাসনিক দখলে নেয়নি, কিন্তু কোম্পানির অধীনে করদরাজ্য করে রেখে দিয়েছিল। তাই প্রশাসন রাজার হাতেই থেকে গিয়েছিল।

       প্রিয়জীত দেবসরকার: ‘ত্রিদিব রায় ছিলেন এমন একজন রাজা যিনি ব্যক্তি স্বার্থ-র জন্য তাঁর রাজত্ব হারিয়েছেন’ – বিবিসি বাংলা

কাশ্মীর আর আমাদের পাহাড়ি ইস্যুর মিল কেবল করদ রাজ্য হিসাবেঃ
ভারতের ভাগে পড়া প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে নেহরু নিজের জন্য যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তা হল, সব প্রিন্সলি স্টেটকে নবজাত ভারতে অন্তর্ভুক্ত অংশ করে নেয়া হবে। রাজাদেরকে স্বেচ্ছায় সারেন্ডার করতে হবে নইলে বলপ্রয়োগ করে রাজ্য দখল করে নেয়া হবে। এবং বিনা ক্ষতিপুরণে। অর্থাৎ রাজপরিবারকে কোনো খোরপোশ বা ভাতাও দেয়া হবে না। তবে বসতভিটা বা হাভেলির নামে যা নিতে পারে, নিবে। এই কাজটা নেহেরু বাস্তবায়ন করেছিলেন প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেলকে দিয়ে। বিপরীতে পাকিস্তান প্রিন্সলি স্টেট নিয়ে এত সিরিয়াস ছিল না। একারণেই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাজারা পাকিস্তান “মুসলমানদের” এটা জানা সত্বেও তাদের সাথেই যুক্ত হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এনিয়ে সম্প্রতি একটা পিএইচডি গবেষণা হয়েছে, যাতে এই কারণটাই উঠে এসেছে। এনিয়ে রিপোর্ট বিবিসি বাংলাতে প্রকাশিত হয়েছিল ডিসেম্বর ২০১৫ সালে। বিবিসির মতে, “সেই কাজটি করেছেন লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার, যার বই ‘দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান’ ঐ রিপোর্টের আগের সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছিল”। উপরের ছবিতে সেই বইটাই হাতে তুলে ধরে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কাজেই এরপর আমরা আশা করব পাহাড়ি ইস্যুতে বাংলাদেশকে দোষারোপ অভিযুক্ত করার আগে প্রগতিশীলেরা একটু পড়াশুনা করে নিবে। ইসলামবিদ্বেষী হয়ে বাংলাদেশের যারা কথিত প্রগতিশীলতা বা ভিকটিমহুডের ইমেজ তৈরি করে কাশ্মিরের সাথে পাহাড়ি ইস্যু মিলিয়ে তুলনা করছেন, সেটা ভিত্তিহীন। এই খবর যেন তাদের থাকে। আসলে পাহাড়ি রাজারা, পাকিস্তানে রাজা হিসেবে যোগ দিলেও মডার্ন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভেতরে ‘রাজাগিরি’ অকেজোই থেকে যায়, এই “আধুনিক” বাস্তবতাতে তা নিজেই শুকিয়ে গেছিল। কেবল পাহাড়িদের পুরানা ‘১৯০০ সালের ম্যানুয়াল’ বলে অকেজো কিছু একটা আছে। আর জমির অনেক অংশই এখন বাঙালিদের দ্বারা বেদখল হয়ে আছে, এও আরেক সত্য। কিন্তু সাবধান, এগুলো কেবল ১৯৭৫ সালের পরের, পাহাড়িরা অস্ত্র হাতে তুলে নিবার পরের নতুন ঘটনা। ভারতের প্ররোচনায় পাহাড়িরা আগে-পিছে চিন্তা না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে তাতে ফেল করার ভুল রাজনীতির পরিণতিতে এটি হয়েছে। পাহাড়িদের, যারা যে জমিতে আগে ছিল তাকে সেখানেই অবশ্যই পুনর্বাসন করা সম্ভব, যদি তারা ইতিবাচক রাজনীতির পথে ফিরে, সঠিক বন্ধু বাঙালি রাজনীতিকদের খুঁজে বের করে নেয়ার যোগ্য হয়।

কাশ্মীরের বেলায় নেহেরুর নিজের নীতি ভেঙ্গেছিলেনঃ
যা হোক, নেহরু নিজ নীতি ভেঙে ‘ব্যতিক্রম’ করেছিলেন কাশ্মিরের বেলায়। কাশ্মিরের দুর্ভাগ্য যে, এটা এক প্রিন্সলি স্টেট। এটা না হয়ে যদি কাশ্মির সরাসরি কোম্পানির অধীনস্থ কোনো প্রদেশ হত? তাহলে এর সোজা মানে হত কাশ্মীর মুসলিমপ্রধান অঞ্চল বলে এই কাশ্মীর সরাসরি পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত। কারণ, ১৯৪৭ সালের ডেমোগ্রাফিতে দেখা যায়, পুরো জম্মু-কাশ্মিরের কাশ্মির বা উপত্যকা অংশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নেই বললেই চলে। আর জম্মু অংশেও ৩০ শতাংশের বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠী নাই।  আর এটা বাদে বাকি সারা অবিভক্ত কাশ্মিরে ৯৫-৯৯ শতাংশই মুসলমান। তাই পাকিস্তানে সপক্ষে যোগ দিবার ক্ষেত্রে এটাই হ্ত কাশ্মীরিদের   প্রধান যুক্তি।

কিন্তু কাশ্মীরের পাঞ্জাবি (হিন্দু) রাজা হরি সিং ভারতের সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন এবং ভারতে যোগ দিতে চাওয়ার খায়েশ প্রকাশ করাতে নেহরু প্রলুব্ধ হয়ে উল্টো পথে হাঁটেন। নেহরু প্রিন্সলি স্টেট হায়দরাবাদের নিজাম (রাজা) [একমাত্র মুসলমান রাজা যিনি জমির উদ্বৃত্ব থেকে রাজস্ব আয়ে আয়েসি জীবন কাটিয়ে কিংবা বাঈজি নাচিয়ে জীবনযাপন না করে বরং জমির উদ্বৃত্ব সঞ্চয় জড়ো করে  ইন্ডাস্ট্রি গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে এর পণ্য বেচা এক ব্যতিক্রমি রাজা তিনি], তাকেও নেহরু আর্মি পাঠিয়ে উৎখাত করেছিলেন। সেই নেহরু হরি সিংয়ের কথায় প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। কাশ্মীরের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, একটি মূল ভারতের ভুখন্ডের ভিতরের কোন প্রিন্সলি স্টেট নয়। বরং এর অবস্থান সীমান্তে, ভারতের উত্তর পাশে সীমান্তে তো বটেই, আবার এর বড় এক অন্য ভুখন্ড অংশ পাকিস্তানেরও উত্তর সীমান্তে। তাই কাশ্মীর ভারত না পাকিস্তানে যুক্ত হবে – এমন দুই রাস্ট্রের যেকোনটাই যোগ দিবার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

বৃটিশেরা ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগের পরে প্রিন্সলি স্টেটগুলো ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার যে প্রচলিত চুক্তির রূপ – একেই বলা হয় কাশ্মীরেr “ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন” [instrument of accession] বা “সংযুক্ত হওয়ার (আইনগত) উপায়”।  তবে হরি সিংয়ের সাথে নেহরু যে একসেশন চুক্তি করেন তা ব্যতিক্রম ফলে শর্তযুক্ত। তা আসলে ব্রিটিশের সাথে কলোনি আমলে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিরই অনুরূপ, মডেলের। এটা মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় ভারতের হাতে দিয়ে দেয়া সাপেক্ষে বাকি ইস্যুতে নিজে করদ-রাজা হয়ে থাকার খায়েসি চুক্তি। অনস্বীকার্য বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল, নেহেরু সংখ্যালঘুর সমর্থনপুষ্ট রাজা হরি সিংয়ের সাথেই “শর্তযুক্ত” একসেশন চুক্তি করেছিলেন। কেন? খুব সম্ভবত, মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মির তো নেহরুর ভারতে যুক্ত হওয়ার কথাই নয়। কাজেই “পড়ে পাওয়া চারআনার” ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শর্তযুক্ত চুক্তি করলেই বা কী? এমন ভাবনার কারণে।

নেহেরু ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ চুক্তি করলেও রাজাগিরি রাখেন নাইঃ
কিন্তু নেহরু এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেন নাই। অর্থাৎ চুক্তি করলেও কাশ্মীর নেহরুর ভারতের নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে দাঁড়ায়নি। নেহরুর হাতে এ কাজে হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন কাশ্মিরের ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের নেতা শেখ আবদুল্লাহ। কাশ্মির ছিল প্রিন্সলি স্টেট মানে, রাজার রাজ্য ছিল বলে সেখানে ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজনৈতিক দল জমেনি। কারণ আমরা বুঝব, কোন রাজার রাজ্যে রাজনীতি থাকতে নাই। বুদ্ধিমান রাজারা তা থাকতে দেয় না। কারণ, রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল  থাকলেই তা রাজতন্ত্রের রাজ্যকে প্রজাতন্ত্র হওয়ার দিকে নিতে রওনা দিবে, যা রাজতন্ত্রের জন্য যম বা মরণকাঠি। তাই রাজার দেশে রাজা কোন পাল্টা ক্ষমতা জন্ম নিবার বীজ ও চিন্তাভাবনা হিসেবে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, জমায়েত এগুলো থাকতে দেয় না। তাই শেখ আব্দুল্লাহর পিঠে হাত রেখে নেহরু ঐ শেখেরই ন্যাশনাল কনফারেন্সকে কাশ্মীরে নেহেরু কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে উঠে আসতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। তাই চুক্তি করলেও কাশ্মীর নয়া দিল্লির নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, রাজার বিকল্প হিসেবে নেহরু শেখ আব্দুল্লাহকেই কাশ্মীরের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে ফেলেন। তবে এটা প্রথম পর্যায়। আর রাজা মনের দুঃখে বনবাসে যাওয়ার অবস্থায়। কালক্রমে রাজা কাশ্মীর থেকে দূরে পুরানা বোম্বাইয়ে বসবাস করতে থাকেন, সেখানেই ১৯৫১ সালে মারা যান। যদিও নেহরুর আসল দুঃখ তাতে ঘোচেনি।

সারা ভারতের যে কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, কাশ্মীর ভারতের অংশ হল কী করে? সবাই একবাক্যে বলবেন হরি সিং লিখে দিয়েছেন। এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ একসেশন চুক্তি অনুযায়ী হরি সিং কিন্তু ভারতকে কেবল মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো হস্তান্তর করেছেন, পুরা কাশ্মীর বা এর কোন ভুখন্ড না। এর অর্থ কাশ্মীর ভারত রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নয় বা ভারতের আইন ও কনস্টিটিউশনের অধীন নয়। তাই হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিতে থাকা কথাগুলোই এবার আবার লিখে ভারতের কনস্টিটিউশনে যে অনুচ্ছেদে সাজিয়ে আনা হয়, সেটাই ৩৭০ ধারা।
কিন্তু এরও আগে নেহরু পরিষ্কার জানতেন, কাশ্মির ভারতের অংশ নয়। বরং এটাই ভারত বা নেহেরুর দুর্বলতা। কিন্তু এই দুর্বলতা কাটাতে গিয়ে তিনি আরেক ভুল করে বসেন। তিনিই প্রথমে নিজে কাশ্মীর ইস্যুকে জাতিসঙ্ঘে তোলেন। যদিও এমনিতেও জাতিসঙ্ঘ এই বিবাদের ভেতরে ঢুকেই ছিল।

কাশ্মীরে এক দিকে ভারত অন্য দিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসঙ্ঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন, এটাই ভারত-পাকিস্তান অবজারভার মিশন [United Nations India-Pakistan Observation Mission (UNIPOM)]। জন্মলগ্নের সেকালে জাতিসঙ্ঘ মধ্যস্থতা করার জন্যই একপায়ে খাড়া থাকত। কেন?

হরি সিং কাশ্মীর কাউকে দিয়ে দেওয়ার কেউই ননঃ
প্রথমত একটা ফ্যাক্টস মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালিত ও শেষ করা হবে কীভাবে কী বৈশিষ্ট চেহারা নিয়ে – এসবের প্রধান নির্দেশক ও স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন সেকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। জাতিসংঘ তাঁরই ইমাজিনেশনের বাস্তব রূপ। যার সারকথাটা হল, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্ব স্ব রাষ্ট্রস্বার্থ নিয়ে যত বিবাদ এর অনেকগুলোই জাতিসংঘের নীতি কনভেনশন মেনে এর মধ্যস্ততায় বিনা যুদ্ধে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। সেকাজেই জাতিসংঘ গড়া। তাই কাশ্মীরে যতই আপাত থিতু এসেছিল ততই একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসংঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন– এভাবে বসে যায়।

হরি সিং একসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭। আর নেহরু কাশ্মীর ইস্যু জাতিসঙ্ঘে তোলেন ১ জানুয়ারি ১৯৪৮। প্রথমত, নেহরুর জাতিসঙ্ঘে যাওয়াটাই প্রমাণ করে যে, কাশ্মীর ভারতের নয় – এটা নেহেরুও মানছেন। এ ছাড়া হরি সিংয়ের সাথে চুক্তিটা দুর্বল, নেহরুর তা না বুঝবার কথা নয়। সেই দুর্বলা পূরণ করতে, সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন জাতিসঙ্ঘ তাকে ফেভার করতে পারে। কিন্তু তার অনুমানটা ভুল ও ভিত্তিহীন। কাশ্মীর ভারতের, এমন রায় নেহরু জাতিসঙ্ঘ থেকে আনতে পারেননি। এক কথায় তিনি ব্যর্থ। কেন?

নেহরু কত দূর রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারী ছিলেন? তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্ব এনজয় করতেন কী চোখে? নীতি করণীয় ঠিক করতেন কোন মানদণ্ডে? এসব বিচারে এক কথায় তিনি ছিলেন, আসলে একজন কলোনাইজার । শাসক হওয়া বলতে তিনি কলোনি শাসক হওয়া বুঝতেন, আকাঙ্খী ছিলেন। তিনি নিজেকে একজন কলোনি শাসকের বেশি ভাবেননি। তাই ভারত কলোনিমুক্ত হয়ে গেলেও, রাষ্ট্র বলতে তাঁর ইমাজিনেশন বা বুঝ হল – এক কলোনি শাসক তিনি। তিনি মডার্ন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধারণায় জন্ম নেয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এর মর্ম তিনি যাই বুঝে থাকুন না কেন, সেটা তার ব্যবহারিক রাষ্ট্রে ও প্রধানমন্ত্রিত্বে প্রতিফলিত করতে পারেননি – রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে তাঁর কলোনি শাসক বুঝের কারণে। এটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছিল জাতিসঙ্ঘের কাছে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর আশা-কামনার মধ্যে। তিনি সম্ভবত খেয়ালই করেননি কোন বয়ানের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনাকারী ও বিজয়ীরা তা শেষ করেছিল। আর যুদ্ধ শেষে দুনিয়া নতুন করে সাজানো হচ্ছিল কোন মৌলিক ভিত্তিমূলক নতুন ভাবনার ভিত্তিতে।

“কোন  জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রকে কে শাসন করবে, কিভাবে তা শাসিত হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার কেবল ঐ জনগোষ্ঠীর”। রুজভেল্টের [Franklin Delano Roosevelt] এই প্রস্তাব প্রথম চোখবন্ধ মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল (আগষ্ট ১৪, ১৯৪১)  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। পরে রাশিয়াসহ সারা ইউরোপ এটাকে ভিত্তি হিসেবে মানতে রাজি হওয়াতেই রুজভেল্ট হিটলার ঠেকাতে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। রুজভেল্ট রাশিয়াসহ ইউরোপের সবাইকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে যুদ্ধে জিতিয়েছিলেন। আর যুদ্ধ শেষের  দুনিয়াটাকে একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ে সেটাসহ সাজানো হয়েছিল ঐ একই শাসন-নীতির ভিত্তিতে। যে নীতিটা বলে দিয়েছিল বা ওর সারকথাটা ছিল – কলোনি শাসন অবৈধ। এবং রাজাও।

কোন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কে নেবে, তা নির্ধারিত করবে কেবল নিজ নিজ জনগোষ্ঠী – এই নীতিতে যদি কাশ্মীর ইস্যুর ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দেখি, হরি সিং আসলে কাশ্মীরের কেউ নন। বরং কাশ্মিরের জনগণই ঠিক করবে কাশ্মিরের ভাগ্য কী হবে। তাই হরি সিং কোথায় কী চুক্তি অথবা সই করেছেন তা মূল্যহীন। নেহেরু-হরি সিং একসেশন চুক্তি তাই বিশ্বযুদ্ধের পরে সাজানো জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে যে World order, সেই নতুন দুনিয়ার চোখে অকেজো, মুল্যহীন এক কাগজ মাত্র।

নেহেরুর কাছে  রিপাবলিক ধারণা আকর্ষণীয় না, তাই নতুনওয়ার্ল্ড বুঝেন নাই, মনেপ্রাণে কলোনি-ক্ষমতার ভক্তঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মূল মর্ম নেহরু যদি বুঝতেন তিনি কখনই কলোনি শাসকের নকল করতে যেতেন না। ফলে তখন তিনি হরি সিং  একসেশন চুক্তিকে বাইবেল জ্ঞান করতেন না। তিনি জাতিসঙ্ঘেও যেতেন না। কারণ জাতিসঙ্ঘের জন্মই হয়েছে রুজভেল্টের ওই “নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর” শাসননীতিতে। তাই জাতিসঙ্ঘে গেলে, সে প্রতিষ্ঠান হরি সিংয়ের চুক্তিকে ন্যাকড়া মনে করে ফেলে দেয়ারই কথা। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের রায় – রাজা নয়, একমাত্র “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই”  সিদ্ধান্ত নিতে হবেই – এমনই হবে, এটা তো জানা কথাই ছিল। “জনগোষ্ঠীর গণভোটেই” সব কিছু নির্ধারণের ভিত্তি, একেই মানতে বলবে। এটা নেহরুর জানা থাকা উচিত ছিল। তাই নেহেরুর জাতিসংঘে যাওয়া প্রমাণ করে যে নতুন ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ না অসচেতন ছিলেন।

নেহরু তাই জাতিসঙ্ঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করে এরপর সে খামতি নিজেই পূরণ করতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহকে আরো বেশি করে হরি সিংয়ের উপরে তুললেন। আর এখান থেকে জন্ম নিল, আর্টিকেল ৩৭০। এর সারকথা হল, একসেশন চুক্তি যেন ভারতের কনস্টিটিউশনের বিরোধী না হয়ে, সামঞ্জস্যপুর্ণ করে নেয়া যায়। আমাদের দেশী ভাষায় বললে, হালাল করে নেয়া হয়। কারণ একসেশন চুক্তি আসলেই তো ভারতীয় কনস্টিটিউশন-বিরোধী। কারণ, চুক্তিতে কাশ্মীরের জনগোষ্ঠিকে বুঝাতে কাশ্মীরের জনগণ নিজেরা নয়, কোথাকার এক ‘রাজা’কে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি বলে স্বীকার করা ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো রিপাবলিকের চোখে কোনো রাজা এমন গুরুত্ব পেতেই পারেন না। কোনো রাজা বা রাজতন্ত্রের চিন্তাকে কোন প্রজাতন্ত্র স্বীকার করতেই পারে না। তবু নেহরু অ্যাকসেশন চুক্তিকে হালাল করে নিতে কনস্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা যোগ করে। ভারতের কনস্টিটিউশন যারা ড্রাফট করেছেন, এর মূল ভূমিকায় ছিলেন প্রথম আইনমন্ত্রী ড. অম্বেদকার। নেহরু তাকে অনুরোধ করেন, হবু ৩৭০ ধারা ড্রাফট করতে। অম্বেদকার তা করতে অস্বীকার করেন।
ব্রিটিশ আমলে শাসক হিসেবে হরি সিং কাশ্মীরে এক বড় রাজত্বই চালাতেন। ফলে তার আমলাদের যথেষ্ট দক্ষ হতে হয়েছিল। এছাড়া পাশে ব্রিটিশরা থাকাতে তাদের থেকে এরা ট্রেনিং পেতেন সহজেই। এমনকি স্বয়ং হরি সিং স্বল্প বয়সে বাবার পরে কাকাও মারা যাওয়াতে রাজা হন। পরে তাঁর তাবৎ একাডেমিক শিক্ষা ও সামরিক ট্রেনিংও ব্রিটিশদের হাতে হয়েছিল। তাই কাশ্মীরের রাজার মুখ্য আমলা যাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত, তিনি হলেন ব্রিটিশ ট্রেইনড এক তামিল ব্যক্তিত্ব গোপালস্বামী আয়াঙ্গার। এই আয়াঙ্গার আর শেখ আবদুল্লাহ মিলে ৩৭০ ধারা ড্রাফট করেছিলেন।

৩৭০ ধারা আসলে কী?
এই ৩৭০ ধারা কী? ধরেন, আপনার লাখ টাকা আগেই আমি আমার বলে নিয়ে নিলাম। এরপর এই টাকা ফেরত দেয়ার সময় একটা দলিল করলাম। দলিলে লিখলাম, ১. আমিই আপনাকে লাখ টাকা দিলাম। ২. আপনি এই টাকা এখন আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দু’টাই মিলে গেলে, সে মোতাবেক খরচ করবেন। ৩. আপনার বাসায় কাউকে বসবাস করতে দিবেন না; আমার বাসা থেকে কেউ গেলেও না। তবে কাকে দেবেন না দেবেন, সেটি আপনাকে ঠিক করার অনুমতিটা আমিই আপনাকে দিয়ে দিলাম।
এতিনটা ধারার প্রথম দু’টি মিলে হল ৩৭০ ধারা, পাস হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। আর তৃতীয় ধারাটি হলো ৩৫এ, যা প্রেসিডেন্টের আদেশ হিসেবে ১৯৫৪ সালে চালু করা হয়েছিল।

তাহলে এবার মোদী-অমিত ঠিক কী করলেনঃ
আসলে এবার মোদী-অমিত মিলে যা করলেন তা হল – তারা বললেন এখন আর আপনার টাকাই আপনাকে দেয়ার দলিল না। দলিল থাকবে বাদ বা রদ। আর খোদ আপনি পুরাটাই এখন থেকে আমার।
এটাই ‘দ্যা কনস্টিটিউশন (অ্যাপ্লিকেশন টু জম্মু ও কাশ্মির) অর্ডার ২০১৯’  [The Constitution (Application to JAMMU & KASHMIR) Order 2019 ] এই নামে গত ৫ আগস্ট এক প্রেসিডেন্ট আদেশরূপে জারি করা হয়। আর এতে বলা হয়, এটাই “আগের “আর্টিকেল ৩৫এ” কে সুপারসিড’ করল। [It shall came into force at once and shall thereupon supersede the constitution (Application to Jammu & Kashmir) order, 1954……] মানে আগে যা-ই থাক, এখন থেকে এটাই 35A এর জায়গা নিল। এর সোজা মানে – এখন যা হল, একেবারে গায়ের জোরে পুরা কাশ্মীরকে (পাকিস্তান এবং চীনের কাশ্মীর অংশসহ) ভারতের ভুখন্ড বলে দাবি করে নিয়ে নেয়া হল।

এখন তাহলে আগে দলিলে যে লেখা ছিল ‘আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দুটাই মিলে গেলে’ [এই কথাটা বুঝাতে সব সময় সব জায়গায় concurrence শব্দটা ব্যবহার করা আছে।  বাংলায় যার মানে “সমঘটিত”। ] এটাই ভারতের পার্লামেন্টে পাশের পর যেকোন আইন আবার কাশ্মীরের পার্লামেন্টেও পাশ হলে বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটার কী হল? এছাড়া, এটাই ৩৭০ ধারা তে বাতিলের আগে কাশ্মীরিদের মত নেওয়ার পদ্ধতি বলে বুঝানো হয়েছে, তা হল কিভাবে?
এর জবাবে অমিত শাহ বলবেন, কাশ্মীরিদের মতামত মানে তো স্থানীয় প্রাদেশিক পার্লামেন্ন্টটে অনুমোদন, তাই তো? ঘটনা হল, এখন কাশ্মীরে  পার্লামেন্ট নেই, প্রেসিডেন্ট শাসনে আছে রাজ্যটাতে। তাই প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা – এর মানেই তো কাশ্মীরিদের মতামত বুঝতে হবে।

অর্থাৎ, অমিতের  ব্যাখ্যা অনুসারে, কাশ্মীরিদের মতামত=ভারতের প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা।  তাই ৫ আগষ্টের ঐ প্রেসিডেন্টের আদেশে শুরুর বাক্যটা হল এভাবে – আমি আমার সাথে একমত হয়ে… এই আদেশ জারি করলাম।

কিছু বাড়তি প্রসঙ্গঃ
আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো পরের লেখায় আনা যাবে হয়ত। সেখান থেকে কেবল দুটা সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ দিয়ে এখন শেষ করব।
সোশাল মিডিয়ায় দেখলাম সবাই আশা করছে এখন কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান বলতে বন্ধু রাষ্ট্র, দেশ, গ্রুপ বা ব্যক্তির সামরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো – এভাবে বুঝে। মানে মিলিটারি পদক্ষেপ বা যুদ্ধই এর একমাত্র সমাধান। এই অনুমান ভিত্তিহীন। এছাড়া যুদ্ধে যেতে চাইলেও অন্তত ভারত-পাকিস্তান কারই যুদ্ধে যাবার অর্থনৈতিক সামর্থ নাই।
আসলে ইস্যুটার ফোকাস মূলত লিগাল। তাই সেটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠবে। ভারতের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্যের একজনকে যদি পেতে হয়, তবে সম্ভাব্য সেটা হতে পারে আমেরিকা। কিন্তু সেটা ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে পাকিস্তানের গলা চড়ানো পদক্ষেপে।  ভারতের হাত আমেরিকা যতটুকু আড়ালে ধরেছিল, সেটি ছেড়ে এখন আমেরিকা তা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে [No policy change on Kashmir, says U.S.]। আমেরিকার স্টেটস ডিপার্টমেন্টের বা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত Ms. Ortagus এর প্রেস ব্রিফিং থেকে এটা পরিস্কার। অর্থাৎ, পাকিস্তানের কূটনীতির একটা বিরাট ভূমিকা এখানে আছে এবং আগামিতে থাকবে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান যতটুকু করেছে, তাতেই ভারত ইতোমধ্যে ব্যাকফুটে। ভারতের বিবৃতিগুলোতে তা পরিষ্কার।

পাকিস্তানের ডিপ্লোমেটিক প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পাঁচ পদক্ষেপঃ
1. Downgrading of diplomatic relations with India. 2. Suspension of bilateral trade with India.
3. Review of bilateral arrangements. 4. Pakistan to go to UN, including the Security Council.
5. August 14 (Pakistan’s Independence Day) to be observed in “solidarity with brave Kashmiris”. India’s Independence Day will be marked as “Black Day”.
পাকিস্তানের একক সিদ্ধান্ত – ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিচা স্কেলে নামিয়ে আনা – এটাকরে ফেলে নিজ রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার করা ও ভারতকে তারটা ফেরত নিতে বলা – এটা পশ্চিমাদেশের জন্য শক্ত ও সিরিয়াস ম্যাসেজ হিসাবে হাজির হয়েছে। এতে ভারতের প্রতিক্রিয়ার তাদের ভাষায় সেটা বুঝা গেছে। ভারতের the wire পত্রিকার ভাষ্যও তাই। পাকিস্তানের পদক্ষেপের পর ভারতের বিবৃতি বলছে, পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছে [India urged Islamabad to review these measures…।।] দেখে এই পত্রিকা বলছে। পত্রিকাটার ধারণা ইউরোপ, আমেরিকা পাকিস্তানের বিবৃতির পক্ষে চলে যেতে পারে এই ভয়ে ভারত এমন বিবৃতি দিয়েছে।  এছাড়া পত্রিকাটা মন্তব্য করছে, ভারতের বিবৃতিটা কম কড়া বা কম কর্কশ ভাষার [The Indian response seemed comparatively less strident, ]।
ওই দিকে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ভারতের বিরুদ্ধে চলে যাবে ধীরে ধীরে, যেটা উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে দেখা গিয়েছে। ওআইসি ধরনের আন্তর্জাতিক বডিগুলোতে ব্যাপক লবি লাগবে, কারণ আমির ও বাদশাহরা ‘পিছলে ভারতের পক্ষে  চলে যেতে পারে’। যেটা ঠেকাতে পাকিস্তানের কূটনীতির বিরাট ভুমিকা আছে। এসব ব্যাপারে আমাদের উলটা নাদান চিন্তাও প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। পাকিস্তানের জামায়েত বা কিছু ইসলামপন্থি দলগুলোর জোটের প্রতিক্রিয়া হল ইমরান খান কাশ্মীর ইস্যু আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা আসলে পাকিস্তানে কোনঠাসা হয়ে পড়া বিরোধি দলের ইমরানকে আক্রমণের আভ্যন্তরীণ ইস্যু। এতে তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে কোন কিছু প্রমাণ দেয়াটা গুরুত্বপুর্ণ নয় – তাই তারা দেনও নাই। বরং এই আক্রমণটায় মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে কিনা সেটাই বিবেচ্য। তাই অভিযোগটা কাশ্মীরের পক্ষে বা বিপক্ষে গেল কিনা সেটা একেবারেই বিবেচনার বিষয় নয়। বরং আভ্যন্তরীণভাবে পাকিস্তানের বিরোধীদেরকে মাইলেজ দিয়েছে কি না সেটাই বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশ বসে আমাদের পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে কারও মুখপাত্র হওয়ার কোন মানে হয় না। আমাদের কাছে মুখ্য হওয়া উচিত কাশ্মীরের স্বার্থ, পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কে আগিয়ে থাকল সেটা একেবারেই নয়।

সুপ্রীম কোর্ট কী প্রতিকার দিবে, ভরসা করা যায়?
ভারতের সুপ্রীম কোর্ট জনমত শক্ত হয়ে না উঠলে মামলাটাই নেবে না, পিছলাবে মনে হচ্ছে। এটা কিছুটা পরিস্কার হয়েছে এক মামলায় রায়ে [৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে]। আসলে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরার বিরুদ্ধে  নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আদালতের সাজার রায় হলে তিনি পালটা জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। ক্ষমতা ছাড়েন নাই, জেলেও যান নাই। সেই থেকে ভারতের আদালত ও একাদেমিকদের বুঝাবুঝি হল –  নির্বাহী ক্ষমতা বা প্রধানমন্ত্রী আগ্রাসি হয়ে গেলে আদালত মানতে না চাইলে – তাতে সেক্ষেত্রে ওর সামনে না গিয়ে ততটাই পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই সঠিক – এই অবস্থানে যেতে হবে। যদিও এমন সিদ্ধান্তে দুনিয়ার কোথাও রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া ঠেকানো যায় নাই। পারার কথাও নয়। তবু এসব আকাম্মা মধ্যবিত্তসুলভ গা-বাঁচানো চিন্তা এখনও ভারতে ভেসে বেড়াচ্ছে। গত নির্বাচনেও আমরা তাই দেখেছি। মোদীকে নির্বাচন কমিশন কোন নুন্যতম দন্ড দিতেই পারে নাই, কমিশন নিজেই গা-বাঁচিয়ে পালিয়েছে। ফলে আগ্রাসি মোদীর সামনে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া – আদালতের এই অবস্থান হওয়াটা অসম্ভব নয়।  যদিও ২০১৮ সালের অক্টোবরে এক মামলায়, আদালতের রায় দিয়েছিল যে, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।

ভারত ভেঙ্গে পড়ার প্রাথমিক আলামতঃ
ওদিকে রাজ্যগুলোও খুবই ভয় পেয়েছে। কারণ ভারত রাষ্ট্র মানে কথিত এক ভুতুড়ে ক্ষমতা, “কেন্দ্র” নামে যে জারি আছে। কে তাকে কী ক্ষমতা দিয়েছে, এই ক্ষমতার উৎস কী, কেউ জানে না। কিন্তু এই ক্ষমতা চাইলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কাল থেকে বিধানসভা বলে কোনো প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি নাই – এমন ঘোষণা দিতে পারে। ব্যাপারটা এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে। এই ভুতুড়ে কেন্দ্র এখন, পশ্চিমবঙ্গকেও একটা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। এবং তা কেন্দ্রিয় পার্লামেন্ট অথবারাজ্য বিধান সভাতেও কোন আলোচনা পরামর্শ ছাড়াই।  কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল ইস্যুতে রাজ্যগুলো এটাই দেখল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে আগে শঙ্কিত হয়েছে নাগাল্যান্ড ধরনের ট্রাইবাল ছোট রাজ্যগুলো। এব্যাপারে ভারতেরই এক মিডিয়া পর্যালোচনায় ভীতি ও আশঙ্কা এখানে পড়ে দেখা যেতে পারে [No debate, no discussion, no dissent, and the Constitution is changed]।

মোদীর রাজ্যসভার ভোট ম্যানেজ – ভারতের “দুদুকের” ভয়ে বাঘ বিড়াল যেনঃ
শুধু তাই না। ভারতের কনষ্টিটিউশন অনুসারে কোন বিষয় আইন হতে হলে তা লোকসভা ও রাজ্যসভা এই দুই পার্লামেন্টেই পাশ হতে হবে।  গত পাঁচ বছর মোদী্র লোকসভায় পাশ করা কোন আইনকে পরিপুর্ণতা দিতে রাজ্যসভা থেকে একক বিজেপি-জোটের ভোটে পাশ করাতে পারে নাই। বরং যা কিছু আইন পাশ হয়েছে এর সবই বিরোধী দলেরও ভোট-সমর্থন পাওয়া সাপেক্ষে। মোদীর দ্বিতীয় সরকারের বেলাতেও তাই, এবারও রাজ্য সভায় বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। কিন্তু তিনি কাশ্মীর ইস্যুসহ পরপর দুইটা আইন পাশ করিয়ে নিলেন। কীভাবে?

সোজা বুদ্ধি – যারই বা ঘনিষ্ট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে মামলা আছে – সিবিআই-ইডি [CBI-ED] (আমাদের দুদুক যেমন) এর হয়রানি বা মামলা খাবার ভয় আছে এমন সব দলের সদস্যদেরকে মোদীর পক্ষে ভোট দিবার বিনিময়ে সওদা করা হয়েছে। তাতে রাজ্যসভায় মোদীর দল ও জোটের এখন ১০৬ ভোট আর বিরোধীরা ১০০ ভোট হয়ে গেছে। AGP, YSR, BSP, NCP, TDP অথবা kejrilal  এদের এসব আঞ্চলিক দলের এরা কেউ  গত নিবাচনেও মোদীর দলে বা জোটের পক্ষের কেউ ছিল না। বরং বিপক্ষ জোটে ছিল। কিন্তু তারা সকলে কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর পক্ষে ভোট দিয়েছে।

,এখন, সব মিলিয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, ব্যাপারটা ভুতুড়ে ক্ষমতার কারণে ভারত রাষ্ট্রের ভেঙে টুকরা হয়ে যাওয়ার দিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছে তাই নির্দেশ করে। আর ইতিবাচকভাবে দেখলে, মাথা নাগরিকদের মুরোদ থাকলে এই ভাঙাটাই পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ কোন কিছু না ভাঙলে তা ফিরে গড়বেন কী করে? তবে পুনর্গঠনের মুরোদ যদি থাকে – এই হল মুখ্য প্রশ্ন। যদি তা না থাকে, তখনই এর অর্থ ভারতের ৩৬ টুকরা হয়ে যাওয়া। আর মুরোদ দেখাতে পারলে, পুনরায় আমেরিকার মত এক ফেডারেল ভারত হিসাবে নিজেকে পুনর্গঠিত ভারত হিসেবে আবির্ভূত করে ফেলা। বলাই বাহুল্য, সেক্ষেত্রে সবার আগের করণীয় বা লক্ষ্মণ হল,  “হিন্দুত্ব” কে চিরতরে সামাজিক চিন্তা থেকে ঝেটিয়ে বিদায়, একে  নির্বাসন করতে হবে। কেবলমাত্র এরপরেই ফেডারেল রাষ্ট্রবিষয়ক পাঠ পড়াশুনাগুলা সম্পন্ন করতে হবে বা যেতে পারে। কাশ্মীর তাই আসলে বিরাট ধবংস ও পতনের বীজ এক আইসবার্গ [iceberg], বিরাট বরফের চাঙ্গর, হিমশৈল। বাইরে থেকে এর কেবল উপরে ভেসে থাকা ছোট্ট মাথাটা  দেখা যাচ্ছে। অথচ সে বিরাট জাহাজ ঢুবিয়ে দিয়ে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন! না ভারতের কেউ এটা দেখতে পাচ্ছে, তা মনে হচ্ছে না। কারণ চারিদিকে প্রবল এক হিন্দুত্ব-জ্বর ছেয়ে গেছে, সবাই ভুগছে! এক অধপতিত নস্টা  চিন্তা – কাশ্মীরি নারীর নিয়ে ইতরোচিত অবদমিত ফ্যান্টাসি, হিন্দুত্ব-চিন্তাকে পুষ্ট করে আগাচ্ছে! এক গভীর অসুখে ভুগছে ভারত!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে ভাঙ্গন শুরু হতে পারে কাশ্মীর থেকে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  একই শিরোনামে  বিডিভিউজ  অন লাইনেও ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

গৌতম দাস

০৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2EJ

 

[সার সংক্ষেপঃ ভারতে আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯,  ভয়েজ অব আমেরিকার সাথে সাক্ষাতকারে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার বক্তব্যঃ
“ভারতে কোন অবৈধ বাংলাদেশি থাকার খবর ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধরনের খবর উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের পলিটিক্স।’
স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশি সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?’
বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই।”

তাহলে আগামি ০৭ আগষ্ট ২০১৯, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে তাঁর সাথে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বৈঠকে, আসামের এনআরসি ইস্যুর কোন কিছুই এজেন্ডাতেই আসতে পারে না। অথচ ভারতীয় মিডিয়ার দাবি এটাই এজেন্ডায় আছে।]

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে,
আসামের এনআরসি আলোচনার কোন এজেন্ডাই হতে পারে নাঃ
ভারতের এনআরসি [National Register of Citizens (NRC)]  মানে আসামের তথাকথিত বৈধ ভারতীয় নাগরিক বাছাই। শেষে এটা দাড়িয়েছে এমন যেন – কারা ভারতীয় নয়, তা খুঁজে বের করার নামে এক মুসলমানবিদ্বেষী প্রক্রিয়া। যার পেছনের বিদ্বেষী ভাবনাটা হল যে, আসামের কোথাও কোন মুসলমানকে পাওয়া গেলেই তা আগাম নিশ্চিত ধরে নেয়া যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু। এটা আরও বেশি হয়েছে, ২০১৬ সালে আসাম রাজ্য সরকারে বিজেপির কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নিবার পর থেকে। আর এর আগে মানে  ২০১৬ সালের আগের এব্যাপারে ভার্সানটা ছিল এমন যে কোন মুসলমান বা বাঙালি পেলেই বাছবিচার  ছাড়া আগাম ধরে হত যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু।  এমনই পরিস্থিতিতে গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, তার নিজের তত্ত্বাবধানে এনআরসি বা নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা শুরুর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে এই নাগরিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ করে এক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে – এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

ইতোমধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ডেডলাইন অনেকবারই বদলানো হয়েছে। এমন চারবার বদলানোর পরে এক খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর ৩১ জুলাই ২০১৮। ভারতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী (২০১৬), আসামের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৩৯ লাখ। এখন সাড়ে তিনকোটির কিছু বেশি হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ হিন্দু ও মুসলমান নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি বলে দাবি তালিকা প্রণয়নকারীদের। যদিও এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রায় প্রতিদিনই খবর আসছে। যেমন বাবা-মা নাগরিক অথচ সন্তান নয় এমন কেস সামনে আসছে।  আবার কাছাকাছি নাম, বা নামের মিলের জন্য অন্যজনকে ধরে আনার ঘটনা আছে। এমন বহু আজিব কাহিনীও আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা এই প্রজন্মের ধারণা নাই, রেশন মানে কী? কেরোসিন, চিনি, লুঙ্গি, সাবান এসবের জন্য সারাদিন ধরে লাইন ধরে পড়ে থাকা – এই অভিজ্ঞতা যার নাই সে বুঝবে না এটা কী।  এককথায় বললে মানুষের নুন্যতম মর্যাদাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয় এতে – পুরা ডি-হিউম্যানাইজ। পুরা আসামের সবাইকে বিশেষত মুসলমানদেরকে নাগরিক্ত্বের প্রমাণ করার নামে মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়েছে। কারণ কাজের পুরা পদ্ধতিটাই সেই সত্তর দশকের চিন্তায়, রেশনের লাইনে পাবলিককে সারাদিন খাড়া করায় রাখার মত। যখন এডুকেটেড মানুষও জানত কী “ম্যানেজমেন্ট” মানে কী?

এখন পর্যন্ত এই ৪০ লাখসহ পরে ঘোষিত আরো প্রায় এক লাখ বাদে বাকি জনসংখ্যা নাগরিক তালিকায় বৈধ নাগরিক বলে ভুক্তি ঘটেছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে ওই খসড়া তালিকায়। আর গতমাসে ৩১ জুলাই ২০১৯ এই খসড়ারই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালতের নির্ধারিত সেই ডেডলাইন এ পর্যন্ত মোট ছয়বার বদলানোর পরে গত মাসের (জুলাই ২০১৯) শুনানিতে আর একবার মাত্র এক মাস বাড়িয়ে চূড়ান্ত তারিখ (সম্ভবত এবারই শেষ) আদালত দিয়েছে ৩১ আগস্ট ২০১৯।

কিন্তু এবার তামাশার দিকটা হল – এতে কেউ, ভারতের কোনো পক্ষই সন্তুষ্ট নয়। না অসমিয়া বাসিন্দা, না কেন্দ্র বা রাজ্য বিজেপি, না আসাম কংগ্রেস না আসামের পাহাড়ি উপজাতিসহ আর কোনো রাজনৈতিক দল।  আসাম কংগ্রেসের নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গোগোই এর দাবি আসাম এক নির্ভুল নাগরিক তালিকার বদলে আসাম একটা কাগজের তেনা পাইতে যাইতেছে [Assam won’t get an error free NRC on August 31: Tarun Gogoi ]। আর প্রতীক হাজেলা নামের মুখ্য আমলা – যাকে এই প্রকল্পের মুখ্য সমন্বয়-কর্তা হিসেবে আদালত সরাসরি নিজের অধীনে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই প্রতীক হাজেলাকে দায়ী করে সবপক্ষই এখন যার যার নিজেদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।  গত মাসের শুনানিতে আদালতে খোদ আসাম রাজ্য সরকারও অন্যদের সাথে জানিয়েছিলেন তৈরি খসড়া তালিকাও “ভুলমুক্ত” নয়। তাই একে শুদ্ধ করে তুলতে সময় অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে হবে, যাতে তা একটা ভুলমুক্ত তালিকা হয়ে উঠতে পারে – এই বলে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত সে আবেদনে সাড়া দেননি। কেবল ৩১ জুলাইয়ের ফাইনাল ডেডলাইনটা মাত্র এক মাস পিছিয়ে ৩১ আগস্ট করেছেন।

ওই আবেদন করেছিল মূলত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার আলাদা দরখাস্তে, কিন্তু একই ভাষায়, [In identical but separate applications, they urged the Supreme Court ] অর্থাৎ মূলত বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ, যিনি এখন নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার কথাতেই এই আবেদন। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার বলতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই ছিল ঐ আবেদনকারী। আর এখন জানা যাচ্ছে, কেন অমিত শাহ আবার সময় চাচ্ছিলেন। আদালতে পেশ করা ওই আবেদনে লেখা ছিল, খসড়া তালিকাটা ‘নির্ভুল’ নয়।

কেন্দ্রিয় সরকারের এটর্নি তুষার মেহতা আদালতে পাবলিকের  অনুমানের [perception] দোহাই দিয়ে  দাবি করেছিলেন,
“There is a growing perception. They must have done excellent work, but mistakes have crept in. The quantum of people included in certain areas is more… Wrongful inclusions are manifold in the bordering districts, lakhs of illegal immigrants have been included in the draft NRC list.”। অর্থত পাবলিক পারসেপশন হল তালিকা নির্ভুল না।
তাই ঐ দাবির আবেদনে বলা হয়েছিল, অতএব এক নির্ভুল নাগরিক তালিকা করতে বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর আসামের জেলাগুলো থেকে খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ২০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায় এরা। এ ছাড়া এরা বাকি পুরো আসামের খসড়া নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ১০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায়। আদালত যদিও এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন, কিন্তু অমিত শাহদের এতে উদ্দেশ্য কী ছিল?

কথা সত্য, যে আসামে কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা তৈরি করা গেছে বলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। কেন? পাবলিক পারসেপশন [Public perception] কথাটার মানে হল – জনমনে যে অনুভব বা ধারণা তৈরি হয়ে আছে। এই অনুভব কিন্তু বাস্তবে সত্যি হতে পারে আবার মিথ্যাও।
কিন্তু আসামে কয়েক যুগ ধরে চলা উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলন – এমন একটা জনমনের অনুভব বা শক্ত পারসেপশন তৈরি করেছে যে  – “বিদেশি” বা “বাংলাদেশি বাঙালি”, “অনুপ্রবেশকারি”, “মুসলমান” ইত্যাদি শব্দগুলো – এগুলাই তাদের সব দুঃখের কারণ। এক শব্দে বললে “বিদেশিরাই” [xenophobia] এমন এক “বিদেশি-আতঙ্ক”  সব দুঃখের কারণ মনে গেথে দেওয়া হয়েছে।  কাজেই সত্যিকার নাগরিক তালিকা তৈরি মানে কিন্তু আসলে জনমনের এই অনুভব বা পারসেপশন সত্যি কিনা এর যাচাইমনে গেথে বসা ধারণাটার পক্ষে বিনা বিচারে কোন সাফাই তৈরি করার প্রকল্প নয় এটা।   কিন্তু পুরা আসাম NRC তৈরির কাজটাকে দেখেছে এভাবে যে এই প্রক্রিয়াটা হল তাদের “জনমনের অনুভব” এর পক্ষে সাফাই তৈরির কাজ এর প্রক্রিয়া হিসাবে।
অথচ সত্যতা যাচাই মানে তো সাফাই তৈরির কাজ না। তাই এই কারণের আসাম কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা পাবে না। 

ইতোমধ্যে আসামের রাজ্য (প্রাদেশিক) পার্লামেন্টে পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী রাজ্যভিত্তিক এনআরসির খসড়া ডাটা প্রকাশ করে দিয়েছেন। গত ০১ আগষ্ট ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা [With district-wise data, Assam govt. pushes for NRC ] এবিষয়ে জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশের সীমান্ত আসামের জেলাগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমান নাগরিক তারা সবাই খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আসামের মুসলমান অধ্যুষিত ধুবরি, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও সাউথ সালমারা জেলায় যথাক্রমে ৯১.৭৮ শতাংশ, ৯২.৩৩ শতাংশ, ৯১.৯৬ শতাংশ ও ৯২.৭৮ শতাংশ মানুষ খসড়া বৈধ নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এটাই বিজেপির বিরাট মাথাব্যথার মূল কারণ। আসামের পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী এই তথ্য তুলে ধরে এখন হায় হায় করছেন। কারণ, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এই ডাটা,  এটা অসমিয়া ও বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী যে প্রপাগান্ডা আছে যে, “মুসলমান মাত্রই এরা সবাই বাংলাদেশী” একে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে। সারকথা হল, আসামের অমুসলমান সবগুলো স্থানীয় পক্ষ এবং সাথে বিজেপি- এদের সবারই মুসলমানবিরোধী যে বয়ান তা হল, সীমান্ত এলাকা বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানে সব ভরে গেছে। অর্থাৎ মুসলমানবিরোধী সবগুলো পক্ষের অনুমানের বয়ান আর বাস্তবতা এ দুটোর বিরাট অমিল – এই খসড়া নাগরিক তালিকায় দেখা দিয়েছে। তাই তাদের আহাজারি উঠেছে।

তাই অমিত শাহ-দের ইচ্ছা ছিল যদি ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেক করার সুযোগ – এই অজুহাত তারা পেত, তবে “কিছু একটা” তারা করার চেষ্টা করত, যাতে ১৯৮৫ সালের চুক্তির বয়ান আর একালে বিজেপির মুসলমানবিরোধী বয়ানকে সত্য বলে হাজির করা যেত যে, এরা বেশির ভাগই বাংলাদেশী।

কিন্তু আদালত তাদের আবেদন পুরাই নাকচ করে সব মাটি করে দিয়েছে। যদিও আদালতের যুক্তি ছিল ভিন্ন। আদালত বলেছিল, আগেরবার তারিখ বাড়িয়ে নেয়ার আবেদন নিয়ে শুনানিতে প্রতীক হাজেলা আদালতে পেশ করা রিপোর্টে নিজেই স্বীকার করে জানিয়েছিলেন, প্রায় ২৭ শতাংশ ডাটা ইতোমধ্যে দু’বার চেক করা হয়ে গেছে। তাই এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আদালত বলেছিল যে তাহলে এখন আবার ২০ শতাংশের দাবি কেন? বরং আরো বেশি ২৭ শতাংশ ডাটা দু’বার চেক যেহেতু হয়েই গেছে, সেই যুক্তিতে আবার সময় দেয়া আর ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেকিংয়ের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য।  গত মাসে ২৩ জুলাই ২০১৯, শুনানি শেষে আদালত পুরো সে আবেদনই নাকচ করে দিয়েছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে বাঙালিবিরোধী অহমিয়া (অসমিয়া) ও মুসলমানবিরোধী বিজেপি সবারই রাজনৈতিক বয়ান ও দাবির পক্ষে সাফাই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দেখে এই অসন্তুষ্টিতে তারা সবাই এখন সব দোষারোপ ঢেলে দিচ্ছেন প্রতীক হাজেলার ওপর। অনেক স্থানীয় পত্রিকা প্রতীক হাজেলাকে “বিশ্বাসঘাতক’ বলতে দ্বিধা করেছেন না। নর্থ ইস্টের এমন এক পত্রিকা লিখছে- “আসাম-বিজেপির এক সভা থেকে প্রতীক হাজেলার ‘অবস্থানকে সন্দেহজনক’ বলে এক প্রস্তাব প্রকাশিত” হয়েছে [প্রান্তজ্যোতি প্রতিবেদন, গুয়াহাটি ২৬ জুলাই ২০১৯]। এছাড়া ‘নয়া ঠাহর’ নামে এ রকম আর এক পত্রিকার ভাষায় ২৫ জুলাই,   [পত্রিকাটার অসমিয়া স্টাইলের বাংলা হুবহু রেখে দেয়া হয়েছে এখানে] “আসামের জনসাধারণ,কেন্দ্র, রাজ্য সরকারকে অন্ধকারে রেখে একটি ত্রুটিপূর্ণ বিদেশী নাম যুক্ত এনআরসি প্রকাশের জন্য প্রতীক হাজেলা এক বিশেষ শক্তির নির্দেশে কাজ করছে বলে মনে হয়েছে । প্রতিক হাজেলার এমন পরিস্থিতি অসমীয়া জাতির জন্য এক অশুভ ইঙ্গিত বহন করে করছে বলে আসাম বিজেপি এক বিবৃতি যোগে প্রকাশ করেছে”।
পত্রিকাটি আরো লিখেছে, “উল্লেখ্য, প্রতীক হাজেলার উচ্চতম ন্যায়ালয়ের কোনো নির্দেশ না হওয়ার আগেই খসড়াতে সন্নিবিষ্ট লোকের ২৭ শতাংশ পুনরায় পরীক্ষণ করা হয়েছে বলে উচ্চতম ন্যায়ালয়ে দাখিল করা বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আসামের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের প্রতি লক্ষ রেখে রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসিতে নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নাগরিকের ২০ শতাংশ নাগরিকের নাম পুনরায় পরীক্ষার জন্য উচ্চতম ন্যায়ালয়কে আবেদন জানিয়েছিল। এই আবেদন সম্পর্কে ন্যায়ালয়ের নির্দেশ না হওয়ার আগেই ২৭ শতাংশ নাগরিকের পুনরায় পরীক্ষণ হাওয়ার কথা বলে প্রতীক হাজেলা যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় বলেই বিজেপি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে”।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরঃ
মনে হচ্ছে, এই অবস্থায় ইতোমধ্যে অমিত শাহরা আরেক বড় পরিকল্পনা এঁটেছে। আগেই বলেছি, অমিত শাহ এবারের দ্বিতীয় মোদী সরকারে নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। খবর বেরিয়েছে, তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে আগামী ৭ আগস্ট দিল্লিতে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। কোন বৈঠকের অনেক আগেই বৈঠকের অ্যাজেন্ডা কী হবে তা যেকোনো পক্ষই প্রস্তাব করতে পারে। এরপর দু’পক্ষই একমত হলে তবেই তা আলোচ্যসূচি বা এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশের মিডিয়ায় এই বৈঠকের এজেন্ডা কী তা নিয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে তা হল – ‘সীমান্তে পাচার, ভারতীয় ভুয়া মুদ্রা, ভারতীয় বিদ্রোহী গ্রুপ, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও জনগণ সম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যু।’ কিন্তু এসবের বাইরে আরেক বিশেষ এজেন্ডার কথা প্রকাশিত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের ‘ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকায়, ৩০ জুলাই। লেখা হয়েছে, ‘অমিত শাহ অবৈধ মাইগ্রেন্ট ইস্যু নিয়ে কথা তুলবেন” [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart]। আরো বলা হয়েছে, India is keen to ink a deportation deal…। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের সাথে একটা একেবারে “বিতাড়িত করার চুক্তি” করতে ভারত খুবই আগ্রহী। কী নিয়ে? না, আসামের নাগরিক তালিকাতে যে ৪০ লাখ লোক বাদ পড়েছে তাদের নিয়ে। কী আজব কথা!

এটি আসলে বিনা মেঘে বজ্রপাতের থেকেও বড় কোন ঘটনা।
প্রথমত এটা কোনোভাবেই দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের এজেন্ডাতেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। বাংলাদেশ রাজি হতে পারেনা। কারণ, এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের ঘোষিত অবস্থানের বিরোধী এটা। যেমনঃ প্রথম পয়েন্ট – গত ২০১৮ সালের আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে [শিরোনাম ছিল, NRC is India’s ‘local internal matter’ with ‘ethnic undertones’: Bangladesh] আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “প্রথমত আমরা এটিকে ভারতের আসাম রাজ্যের এক অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় রাজনৈতিক ইস্যু মনে করি”[“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। এ ছাড়া কেন আমরা এটা মনে করি তা নিয়ে এক শক্ত যুক্তি দেখিয়ে পরের বাক্যে তিনি বলেছিলেন, “যেহেতু এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, বন্ধু পড়শি রাষ্ট্রের ব্যাপার, তাই এ নিয়ে ভারতের সাথে কথা তোলার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। এছাড়া গত ৪৮ বছরে ভারত সরকার কখনোই এমন ইস্যু নিয়ে আমাদের কাছে কোনো কথা তোলেনি” [“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbour.”]।
এবার দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, গত বছর ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯, স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার। আমাদের ইত্তেফাক ঐ সাক্ষাৎকার থেকে নেয়া এক টেক্সট রিপোর্ট ছেপেছিল পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সেখানে লেখা দেখা যাচ্ছে- ‘শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশী সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?”  বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সাথে তার কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই”। অর্থাৎ শেষ বাক্যটাই সব জল্পনা-কল্পনার সব কিছুর ওপর পানি ঢেলে দেয়। সার কথাটা হল, আসামের এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান কী, আমাদের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী পাবলিককে তা জানিয়েছেন এবং তা খুবই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

তাহলে আসন্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে, আসামের এনআরসি অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে – তা আলোচনার এজেন্ডায় উঠে আসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

অথচ উদ্বেগের ব্যাপার হল, ভারতের ইকোনমিক টাইমস ৩০ জুলাই এমন রিপোর্ট করার পরে এর উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন আর যমুনা টিভির নিউজ ওয়েবসাইটে রিপোর্টটি একই দিনে বাংলায় ছাপা হলেও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের বা বাংলাদেশের ছাপা রিপোর্ট নিয়ে আমাদের আম-পাবলিককে কিছুই জানায়নি। কোন সাড়াশব্দও নাই। বাংলাদেশের প্রকাশ্যে গৃহীত অবস্থান ছাপিয়ে ভারতের সাথে একটা আলোচনার একে এক অ্যাজেন্ডা বলে হাজির করানোর দাবি করা হয়েছে, অথচ এর বিরুদ্ধে আমাদের সরকার পুরো নিশ্চুপ।

ওই দিকে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন চলতি বছরের শুরুতে প্রথম ভারত সফরে বলে বসেছিলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নাকি স্বামী-স্ত্রীর। এমন লুজটক করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার কেউ কখনো দেখেছে জানা যায় না। তিনি গত মাসে আর এক লুজটক করে ভারতের স্ক্রোল পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নিয়ে অনেক বিপদে আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। এই গ্রহে বাংলাদেশই সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ” [We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”। অর্থাৎ তিনিও খেয়াল রাখেননি, খোঁজ নেননি আসামের এনআরসি ইস্যুতে ইতোমধ্যে আমাদের গৃহীত অবস্থান কী? আমাদের তো এনআরসি ইস্যুতে ভারতের সাথে কথা বলাই উচিত না। বললে বরং সেটা আমাদেরই স্ববিরোধী অবস্থান হবে। এছাড়া, রাষ্ট্রের বিদেশনীতির প্রথম কথাই হচ্ছে নীতিগত অবস্থানের রেকর্ড স্ট্রেট রাখা, পরিষ্কার করে রাখা আর তা মেনে চলার ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখা। এর বাইরে কোনো লুজটক না করা।

তাহলে এর মানে কী, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এই ভারত সফরে, আসামের এনআরসি নিয়ে অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে কি কোনো চুক্তি করতে যাচ্ছেন? অথবা তাহলে হচ্ছেটা কী? পাবলিক তা কার কাছ থেকে জানবে?

অথচ হওয়া উচিত ছিল উলটা। ঐ অমিত শাহ এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। এর আগে যখন কোন মন্ত্রী বা সরকারের কেউ ছিলেন না তখন তিনি বাংলাদেশিদেরকে তেলাপোকা, উইপোকা, পিষে মেরে ফেলবেন, ছুড়ে ফেলে দিবেন ইত্যাদি বলে পাবলিক বক্তৃতা করতেন। এখন গত মাসে  ১৭ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় তিনি আবার বলেছেন, “দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি থেকে অবৈধ ভাবে বসবাসকারী অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বার করবে সরকার। এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদের ফেরত পাঠাবে”। ইউটিউবে দেখুন, [“Illegal Immigrants Living On Every Inch Will Be Deported”: Amit Shah] একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এধরণের কথার কোন জবাবদিহিতার ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আদায়ের আগে এই লোকের সাথে তো আমাদের কোন বৈঠকই করা উচিত না!

এদিকে, আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা ঘোষণার দিন চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট ২০১৯, টিকটিক করে এগিয়ে আসছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসামের এনআরসি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর কি সম্পর্কিত?” এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

প্রিয়া সাহা ইস্যুঃ জনগণের মন পড়তে ভুল করেন না

প্রিয়া সাহা ইস্যুঃ জনগণের মন পড়তে ভুল করেন না

গৌতম দাস

২৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০৫ বৃহস্পতিবার

https://wp.me/p1sCvy-2Dg

প্রিয়া সাহা অন্তত একটা ভাল কাজ করেছেন যে, বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আধাপ্রমাণিত-অপ্রমাণিত যেসব উদ্ভট তথ্যের ওপর এত দিন দাঁড়ানো ছিল, যা তাদের নিজেকে ভিকটিম হিসেবে দাঁড় করিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ করত – এমন যেসব বয়ান দীর্ঘ যুগ ধরে চালু আছে, তা এবার সরাসরি পাবলিক ডোমেনে সবার নজরে চলে এসেছে। আর তাতে সেসব বয়ান এক বিরাট সামাজিক আতসী-কাঁচের নিচে এসে পড়েছে। ফলে এবার আম-পাবলিকের সামনে আসল যাচাই-বাছাইয়ে তাকে নিজেকে প্রমাণ করতে পারতেই হবে, না হলে চিরতরে এসব বয়ানসহ বিদায় হওয়ার অবস্থা এসে গেছে।

প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে যা বলেছিলেন তা তিনি এর আরও অন্তত ৭২ ঘণ্টা পরে ঠাণ্ডা মাথায় আবার চিন্তা করে তা বলবার বা হাজির করার সুযোগ পেয়েছেন ও নিয়েছেন। বিডিনিউজ২৪ সেই ভিডিও বয়ান সংগ্রহ করে ট্রান্সস্ক্রিপ্ট ছাপিয়েছে, “নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন প্রিয়া সাহা” এই শিরোনামে,  আমি সেই ছাপানো রিপোর্ট ধরে কথা বলছি। বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, “প্রিয়া সাহা বলেন, সরকারের আদমশুমারি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী- দেশভাগের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৯.৭ শতাংশ ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক। ওই হার এখন নেমে এসেছে ৯.৭ শতাংশে”। এ ছাড়া আরও বলেন, ‘এখন দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ মিলিয়ন। সংখ্যালঘু জনসংখ্যা যদি একই হারে বৃদ্ধি পেত, তাহলে অবশ্যই যে জনসংখ্যা আছে, এবং যে জনসংখ্যার কথা আমি বলেছি ‘ক্রমাগত হারিয়ে গেছে’, সেই তথ্যটা মিলে যায়”।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “দেশভাগের সময়” আর “যদি” একই হারে বৃদ্ধি পেত। এককথায় বললে, প্রিয়া সাহা আসলে একটা “যদি” এর উপরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। মানে বাস্তবের জনসংখ্যা না, হাইপথিটিক্যাল ধরে নেয়া। অনেকটা দেশের কোন এক একর জমিতে যদি গুণে ১০টা গরু  পাওয়া যায় তাহলে দেশের মোট ১৪৭ হাজার বর্গকিমি ভূমিতে, ঐকিক নিয়মে ফেলে, গরুর সংখ্যা বের করে ফেলার মত।

এখন জানা যাচ্ছে, যে বই থেকে প্রিয়া এই তথ্য নিয়েছেন সে বইয়ের লেখক ডঃ আবুল বারাকাত। কিন্তু দেশে এখন প্রিয়ার দায় নিবার অথবা প্রিয়ার সাথে – আমি সম্পর্কিত বলে স্বীকার করার- লোকের সংখ্যা খুবই কম। কারণ দল নির্বিশেষে প্রায় সকলে প্রিয়ার বক্তব্যের বিরুদ্ধে যে নিন্দার ঝড় উঠেছে এরা সকলেই সেই ঝড়, বা সেই স্রোতের বাইরে থাকার বোকামি করতে একেবারেই নারাজ।  তাই বরং সম্পর্ক ত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে। সেটা মূল নেতা এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এর বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রিয়াকে বহিস্কার করে হাত ধুয়ে ফেলা থেকে শুরু করে, প্রিয়া সাহার নিজ এনজিও “শারি” এর কর্মীরা,    প্রিয়ার বক্তব্যের দায় না নিতে বইয়ের লেখক ডঃ আবুল বারাকাত বিবৃতি – এভাবে সকলে সামিল আছেন। বারাকাত এখন বলেছেন, প্রিয়া তাঁর “তথ্য-উপাত্ত বিকৃতভাবে উপস্থাপন” করেছেন। তাঁর দাবি,  “প্রিয়া সাহার বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক ও নীতি গর্হিত: বারকাত“।

হ্যাঁ, কেবল তথ্যের দিক বিবেচনায় বারাকাত তা বলতেই পারেন। যেমন- প্রিয়া দাবি করেছেন, ওই ২৯.৭ শতাংশ নাকি দেশভাগের সময়ের হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত। কিন্তু বারাকাত বলছিলেন, তার বইয়ে যা বলা আছে তাতে আসলে  ঐ অনুপাতটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ের নয়, বরং ১৯৬৪ সালের, প্রায় ১৭ বছর পরের। এটা বিরাট ভুল রেফারেন্স অবশ্যই। কিন্তু বারাকাত যে পদ্ধতিতে তাঁর হিসাব কষেছেন, যা এক – “যদি” এর উপর – দাঁড়ানো ঐকিক নিয়ম, প্রিয়া কিন্তু আসলে সে পদ্ধতিটাই অনুসরণ করেছেন। এব্যাপারে বারাকাত নিশ্চুপ।

এক স্বামী বাজারের ভেতর দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বড় বড় কৈ মাছ দেখে এসেছেন। বাড়ি ফিরে তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আদুরে গলায় গল্প আলাপ শুরু হয়েছিল, এক ‘যদি’র ওপরে। ‘যদি’ স্বামী বড় কৈ মাছ বাসায় আনতেন, সেখান থেকে স্ত্রী কত পদে কিভাবে তা রান্না করতেন সে আলাপ করতে যেয়ে স্ত্রীর আরও আহ্লাদ করতে ইচ্ছা করাতে তিনি বলে বসেন, ‘আমি ওই মাছ খেতাম না’। এতে স্বামী অগ্নিমূর্তি হয়ে বউ পেটানো শুরু করেছিলেন। তো মাছ বাজার থেকে বাসায় ঢোকার ব্যাপারটাই হাইপথিটিক্যাল থেকে গেলেও বাসায় বউ পিটানি ছিল কিন্তু জেনুইন। প্রিয়া-বারাকাতদের কাণ্ডটা প্রায় সেরকম।

এই তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক দিক হল, সরকারের পরিসংখ্যান দেখিয়েছে – হিন্দু জনসংখ্যাও নয়, বরং হিন্দু জনসংখ্যার (অন্যান্য ধর্মীয়-গোষ্ঠির তুলনায়) অনুপাত কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে ড. আবুল বারাকাত কেবল এতটুকুই জানছেন যে, অনুপাতে “কমেছে”, এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু এ থেকে তিনি সিদ্ধান্ত টানতে গিয়ে আর “কমেছে” লিখছেন না। বরং তা না লিখে এর বদলে লিখছেন, এরা “নিরুদ্দিষ্ট”। বাক্যে লিখছেন এভাবে – যদি একই অনুপাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ধরা হয়, তাহলে ‘আনুমানিক ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নিরুদিষ্ট হয়েছেন“। এভাবে – কমেছে মানেই নিরুদ্দিষ্ট – এমন অর্থ তৈরি করছেন।

এটা কোন একাডেমিকের কাজ হতে পারে না। কোন একাদেমিক এভাবে ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত বা  উটকো অর্থ তৈরি করেন না। এটা আসলে নিজের একাদেমিক যোগ্যতাকে নিচা করে ফেলা কাজ। এছাড়া, যেহেতু বারাকাতের বাক্যটা ‘যদি’র ওপর দাঁড়ানো, তাই তাকে লিখতে হতো – নিরুদিষ্ট “হয়ে গেছে” না, নিরুদিষ্ট ‘হত’। পরিসংখ্যানে জনসংখ্যা কম দেখতে পাওয়া মানেই কি তাদের ‘নিরুদ্দিষ্ট’ হওয়া বলে চালিয়ে দেয়া যায়? কিসের ভিত্তিতে বারাকাত এই দাবি করছেন?

এছাড়া আমাদের সরকারি পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করে সম্প্রতি বিবিসি বাংলায় ছাপা রিপোর্টে দেখেছি, ব্রিটিশ আমলেও হিন্দু জন্মহারের অনুপাত কখনো কখনো কমে গিয়েছিল। বিবিসি লিখেছে, বরং ব্রিটিশ আমলেও এই অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক হার কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়”। এর মানে “হিন্দুরা ভিকটিম” বলে দেখিয়ে সমাজের সহানুভুতি টানা আর যা প্রকারন্তরে সহ-জনগোষ্ঠি মুসলমানদের মনে অপরাধীর অনুভুতি তৈরি করা টাই বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতি। দেখা যাচ্ছে এর ফাউন্ডেশন নড়বড়ে।  আর এই নড়বড়ে ফাউন্ডেশনকে তবু খাড়া করে ধরে রাখতে আমরা এখন দেখছি আসলে, ড. আবুল বারাকাতের এই ‘নিরুদ্দিষ্ট’ শব্দ ব্যবহার খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

আরও আছে। এরপর বারাকাতের ‘নিরুদ্দিষ্ট’ শব্দটাকে আরও এককাঠি চড়িয়ে প্রিয়া এর ইংরেজি করেছেন ‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ [Disappear], মানে যাকে আমরা ‘গুম হওয়া’ বলি।  কিন্তু লিগাল টার্ম হিসাবে গুম [disappeared] শব্দটি হিউম্যান রাইটস্-এ খুব সিরিয়াস শব্দ, যেখানে রাষ্ট্র বিরাট অপরাধী গণ্য হয়ে যায়। তাই, নিজেকে মানবাধিকার কর্মী দাবি করা প্রিয়া সাহার এই ‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ শব্দ ব্যবহার করা, একটা ক্রিমিনাল কাজ হয়েছে। মানে তিনি বলতে চাইছেন, হাসিনা সরকারসহ বাংলাদেশের সরকারগুলো ৩.৭ কোটি হিন্দু লোককে গুম করে ফেলেছে!  অথচ কথাটা সিম্পলি তিনি বলতে পারতেন, তারা দেশ ছেড়ে গেছে, ‘ভারতে’ যদি নাও বলতে চান!

কিন্তু প্রিয়ার মত ড. আবুল বারাকাতও এই অভিযোগের বাইরে নন। তাতে যতই তিনি এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চান না কেন! তিনি সরকারি পরিসংখ্যান বইয়ে জনসংখ্যা কম দেখতে পেয়েছেন, এর মানে কি তিনি একে ‘নিরুদ্দিষ্ট’ হওয়া বলে দাবি করতে পারেন? ফলে শব্দের আসল “উসকানি” তো প্রথম তিনিই দিয়েছেন। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আধাপ্রমাণিত-অপ্রমাণিত যেসব তথ্যের বয়ান আছে, এই বয়ানদাতারা যেন তার কথাটা লুফে নেন, সে কাজই তিনি করেছেন। হাতে হাতে ফলও পেয়েছেন। নিশ্চয়ই বিজেপি-আরএসএস বারাকাতের এমন বই ও তথ্য হাজার হাজার কপি বিলির জন্য ছেপে নিবেন। তাই ড. আবুল বারাকাত খুবই সফল বিরাট “অর্থনীতিবিদ” বলতেই হয়!

তাহলে একা বাংলাদেশ না, ভারত ও পাকিস্তানও গুম-কা্রবারিঃ
আজকের বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান তিন দেশের জন্যই ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সবাইকে এক উথালপাথাল সময়ের ভেতরে যেতে হয়েছিল। কেন?
কারণ, ব্যাপক মাইগ্রেশন [Migration] বা পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশান্তর ঘটেছিল এ তিন দেশেই,  যা থেকে আজকের এই তিন রাষ্ট্রের কেউ বাদ নয়। যদিও এগুলো কারও জন্যই কোনো সুখকর স্মৃতি নয়। তবে মুলকথা, এটা কেবল যে বাংলাদেশ থেকেই হিন্দুরা দেশত্যাগ করে ভারতে গেছে তা একেবারেই নয়; বরং তিনটি দেশ থেকেই কোথাওই তা একমুখী নয়, প্রতি দুই দেশের মধ্যে উভয়মুখী দেশান্তর ঘটেছিল। আর কেবল বাংলাদেশের কথাই যদি তুলি, তবে বলা যায় – হিন্দুদের দেশান্তর হয়ে ভারতে যাওয়ার পাশাপাশি সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠী নিরাপদ জীবনযাপনের আশায় বাংলাদেশে চলে এসেছিল।

সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) সমগ্র সীমান্ত এলাকাজুড়েই এটা ঘটেছিল। বিশেষ করে এখনকার সাতক্ষীরা, বাগেরহাট আর রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাগুলোতে অনেক বেশি করে। অথবা পশ্চিমবঙ্গের জল্পাইগুড়ি, কোচবিহার থেকে দিনাজপুর বা রংপুরে বাঙালি মুসলমানদের আসা। [দিনহাটা থেকে আসা এরশাদের পরিবারের কথা মনে করতে পারেন] এছাড়া আরো আছে। বিহার থেকে আমাদের দিনাজপুর কাছে বলে ব্যাপকসংখ্যক বিহারি-মুসলমান এসেছিল, যাদেরকে পুনর্বাসিত করতেই আমাদের সৈয়দপুরের জন্ম। দিনাজপুর-রংপুরের পঞ্চাশ মাইল দুরত্বের ঠিক মাঝখানে ২৫ মাইলে জায়গা বেছে নেয়া হয়েছিল। সেকালের মিল কারখানা প্রায় নাই পরিবেশে সৈয়দপুরের কয়েক কিলোর মধ্যে পার্বতিপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপকে মনে করা হয়েছিল পুণর্বাসনের এক বড় উপায়, তাই। তবে যেসব বিহারি অনেক আগেই বিহার ছেড়ে ততকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতায় কোন হাতের কাজ করত, ১৯৪৭ সালে এদের অনেকে আবার সেখান থেকে সরাসরি ঢাকায় চলে এসেছিল। ঢাকায় হাতের কাজ জানা কারিগরেরা গাড়িসহ যেকোন মেরামতি কাজ, ধুপবাতি তৈরি, নানান ডিজাইনের চটের হাতব্যাগ তৈরি, সেলুনের কারিগর ইত্যাদিতে – সর্বপ্রথম এভেলেবল কারিগর এরাই।  যেমন ঢাকার সেলুনগুলো চালানোর আদি কারিগর হল এরা।

সারকথায় বাংলাদেশের হিন্দুরাই একমাত্র [ভারতে] দেশান্তরি জনগোষ্ঠি নয়। দেশান্তরটা ঘটেছিল ক্রসবর্ডার মানে দুদিক থেকেই। কাজেই বাংলাদেশ কেবল হিন্দু জনগোষ্ঠিই ভিকটিম আর মুসলমানেরা সব এরজন্য দায়ী অপরাধী – এই বয়ান একচোখা। এই একই যুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে [পালিয়ে] আসা মুসলমানেদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদেরকেও কেউ দায়ী করতেই পারে। কিন্তু আমরা তা দেখি না। মানে এরা অভিযোগের বয়ান তৈরিতে দুর্বল, বুঝা যাচ্ছে। আবার তামসাও আছে। যেমন ধরেন, ডঃ আনিসুজ্জমান। কলকাতা থেকে প্রথম দেশান্তরি হন তার দুই সিনিয়র দুলাভাই [বাবার প্রথম পক্ষের দুই মেয়ের জামাই] সরকারি কর্মচারি, বাগেরহাটে। আনিসুজ্জামানের হোমিওপ্যাথি চিকিতসক বাবা এদেরকেই অনুসরণ করেন। একথাগুলো তাঁর আত্মজীবনী ধরণে লেখা বইতে পাওয়া যাবে। হাতের সামনে বইটা এখন নাই, আগে পড়ার স্মৃতি থেকে লিখলাম। কীন্তু তামসাটা হল তিনি এখন ঢাকার হিন্দু রাজনীতির বয়ান তৈরিকারিদের অংশ।

এখন তাহলে, প্রিয়া-বারাকাতদের তত্ব ও ফর্মুলা অনুসারে, ভারতের যে মুসলমান জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে চলে আসলো এতে ভারতের পরিসংখ্যান দেখে ভারতের কোন ডঃ ভট্টাচার্য অথবা কোন প্রিয়া রহমান কী এদেরকে  “নিরুদ্দিষ্ট” বা “ডিজঅ্যাপিয়ার্ড” বলে দাবি করছে? না, এটা বলবে? ভারতের কেউ কি তাদেরকে ভারত সরকারের হাতে “ডিজঅ্যাপিয়ার্ড” বলে দাবি করবে? আর কোনো এক প্রিয়া রহমান কী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গিয়ে আরো ৩.৭ কোটি মুসলমান ভারতের হাতে ডিজঅ্যাপিয়ার্ড বলে নালিশ দিবে? আর এতে নিশ্চয়ই প্রিয়া, বারাকাত এমনকি খোদ মোদী বা আরএসএস খুবই খুশি হবে! আদর করবে!

লুজ-টক, ‘দেশভাগ’ নাকি ভুলঃ
অনেকে প্রায়ই লুজ-টকের মতো করে বলে থাকেন, ১৯৪৭ সালের ‘দেশভাগ ভুল’। বিশেষত এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে করা হয়েছে, তাই। আসলে মূলকথাটা হল, এগুলো জমিদারদের স্বার্থের উপর দাঁড়িয়ে জেনে না জেনে বলা কথা। সেই বয়ান আপন করে নিয়ে বলা কথা। সেকালের জমিদার মানে হল, ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশরা যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তাদের কথা। অবিভক্ত সেই বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলতে ‘জমিদারি ভুমিমালিকানা ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাকেই বুঝাত, যা আবার ছিল কলোনি শাসকের স্বার্থের অধীনে। এই জমিদারদের সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিল বর্ণহিন্দু জমিদার।  ‘বর্ণ’ মানে জাতিভেদ প্রথা [Cast System]। এটা ব্রাক্ষ্মণদের সমাজে শীর্ষে রেখে বাকি মানুষদেরকে তাদের অধস্তন বিভিন্ন জাতের ক্যাটাগরিতে ফেলে একটা ‘কাস্ট সিস্টেম’ বা জাতপ্রথায় সাজিয়ে সমাজ পরিচালনা করা। প্রাচীন ভারত বলতে এই জাতপ্রথা ব্যবস্থার ব্রাক্ষ্মণ্যবাদের ভারতই বুঝাত।  ভারতে আজও যাই নতুন কিছু করতে চাওয়া হয়েছে তা শেষমেশে বর্ণহিন্দুদের শীর্ষে রেখে তাদের আধিপত্য বা হেজিমনিতে তৈরি এক ব্যবস্থা হয়েই দাড়িয়েছে। বৃটিশদের জমিদারি ব্যবস্থাও তাই বর্ণহিন্দুর জমিদারি ব্যবস্থা হয়ে দাড়িয়েছিল।
এতে অবিভক্ত সারা বাংলা মানে হয়ে যায় একচেটিয়াভাবে এই জমিদার শ্রেণীর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব – এক হেজিমনি। আবার অবিভক্ত বাংলা সেই প্রথম শহুরে-আরবান হতে শুরু করেছিল। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল ঐ জমিদারি ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই। ওরই ঔরসে। ‘শহর’ কথাটা আলাদা বিশেষ মনোযোগে বুঝতে হবে। অবিভক্ত বাংলার প্রথম “শহর” হওয়া খুব গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। তাও আবার বৃটিশ কলোনির সারা ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা ফলে সেই মাত্রার পুঁজি পুঞ্জীভবনের রাজধানী শহর কলকাতা –   বাংলার শহর হওয়ার শুরু সেই সারা ভারতের রাজধানী কলকাতা হবার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে। কিন্তু হলে কী হবে এই কলকাতা গড়ে উঠতেছিল এক বর্ণহিন্দু জমিদারের কর্তৃত্বেই।
একারণেই বাংলা ভাষা, বাঙালি বলে ‘জাতি’ ও সংস্কৃতিগত ধারণা, বাঙালির শহর, বাঙালির আধুনিকতা ইত্যাদি যাকিছু ঐ প্রথম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তা সব ঐ সময়েই এবং তা বর্ণহিন্দু জমিদার শ্রেণীর ঔরসে, পৃষ্ঠপোষকতায় ও স্বার্থে। বলা বাহুল্য, বাঙালি বিষয়ক এসব ধারণা তৈরি হয়েছিল ও আকার পেয়েছিল এই অনুমানে যে, বাংলার মুসলমানেরা বাঙালিই নয়, সুতরাং ‘এক্সক্লুডেড’। তাই জমিদারদের ‘বাঙালি’ ধারণায় কোথাও মুসলমানদের গোনায় ধরার দরকারই মনে করা হয়নি। এরই এক প্রবল প্রমাণ – উপন্যাসিক শরতচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখা। তিনি অবলীলায় তাই “বাঙালি বনাম মুসলমানের” ফুটবল খেলার গল্প বলেছেন। কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরী মরার আগে পর্যন্ত (একালে এরশাদের আমলেও) নিজের লেখায় স্বীকার করেন নি যে মুসলমানেরা বাঙালি।

এসব চিন্তা-ততপরতারই সার ফলাফল আমরা দেখেছিলাম সেকালে, সারা বাংলাতেই সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ইত্যাদি সব কিছুতে ছিল জমিদার হিন্দুর আধিপত্য। এতে সমাজে যে মুসলমান, তাকে মার্জিনাল করে কোণায় ফেলে রাখাই রেওয়াজ হয়ে যায়। আবার একই হিন্দু জমিদারের মুসলমান প্রজার জায়গায় হিন্দু প্রজার বেলায় দেখা যেত সামাজিক সাংস্কৃতিক ট্রিটমেন্ট আলাদা অর্থাৎ তুলনায় ভাল। যেমন জমিদারের বাড়িতে বসবার জায়গা থাকত আলাদা। বসার জায়গায় পাটি পাতা থাকত তাদের জন্য। অর্থাৎ মুসলমানদের মত খোলা মাটিতে তাদের বসতে হতো না। ভাল হুকোতে তামাক টানার ব্যবস্থা থাকত তাদের জন্য। আর এর ফলে হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজার চেয়ে  সামাজিকভাবে একটু উন্নত, উপরে এই ভাবটা সহজেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এই স্ট্যাটাসের কারণ তারা অন্তত সাংস্কৃতিকভাবে বর্ণহিন্দু জমিদারদের সাথে এক ছাঁচে লীন হয়ে যাওয়া, গণ্য হওয়া অনুভব করত। আবার যেমন, এমনকি বিশ শতকে এসেও ‘শেখ মুজিবের আত্মজীবনী’ বইতে যে সামাজিক বৈষম্য দেখি, সেটা তখনো খুবই প্রখর, মার্জিনালাইজড মুসলমানের এক মফস্বল শহরের। তবে একটা কাউন্টার ফ্যাক্ট ছিল সব সময় যে, পূর্ববঙ্গে মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।

একারণে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের দৃষ্টিতে দেখলে, তাই ১৯০৫ কিংবা ১৯৪৭ সালে তাদের কাছে বাংলার বিভক্তিজাত আলাদা প্রদেশ, কিংবা আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান – দুবারই তা খুবই কাম্য ছিল। আর এর ঠিক উল্টোটা হল, বৃটিশদের প্রশাসনিক পদক্ষেপে ১৯০৫ সালের বাংলার বিভক্তি থেকেই জমিদার হিন্দুদের চরম নাখোশ হওয়া। এর মূল কারণ পূর্ববঙ্গের ওপর তাদের কর্তৃত্ব হাতছাড়া হওয়ার ভয়। ব্রিটিশরা বড় হয়ে যাওয়া নিজেদের প্রশাসনিক ম্যানেজমেন্ট সহজ করার জন্য আর মুসলমানদের একটু স্বস্তি দেয়ার জন্য পূর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েছিল। কিন্তু জমিদারের কায়েমি স্বার্থের কাছে এটা অসহ্য লেগেছিল। কারণ, এতে মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে তারা হাতছুট হয়ে যায় কি না।

এদেরই লেখা ইতিহাসের আর এক বেছে নেয়া চালু শব্দ “ডিভাইড এন্ড রুল”।  মানে জমিদারী স্বার্থের দিক থেকে দেখে অভিযোগের সারকথাটা হচ্ছে, “বৃটিশ শাসক তুমি আমার পাশের মার্জিনাল মুসলমানদের উপরে উঠে যেতে সাহায্য করতে যাচ্ছ – এটাকে আমার বিরুদ্ধের কাজ, ওদের সুযোগ করে দেয়া বলে আমি দেখছি”। এই ডিভাইড করা তাই খারাপ কাজ।  কিন্তু যদি জমিদারকে জিজ্ঞাসা করা যেত তুমি কাকে ডিভাইড করে ফেলার কথা বলছ? মুসলমানদের তো তুমি ইতোমধ্যেই মার্জিনালাইড বলে আলাদা ডিভাইড করে রাখছ!  আসলে তামসাটা হল ডিভাইড বলার সময় সে মুসলমান প্রজাদের নিজের সাথে বলে ধরে নিয়েছে! আবার এখান থেকেই তাদের তথাকথিত স্বদেশী এবং বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের শুরু। কেন? না বৃটিশেরা মুসলমানদের একটু স্বস্তি দিবার জন্য পুর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ করতে গিয়েছে।

আসলে ১৯০৫ সালের পুর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হবার বিরুদ্ধে তথাকথিত বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন – খারা করে ফেলতে পারে, এটাই প্রমাণ করে জমিদারদের স্বার্থকেই হিন্দু প্রজারাও তাদের স্বার্থ গণ্য করেছিল। হিন্দুস্বার্থ বলে এক মিথ – এর ঘোল খেয়ে। এটাই বলে যে সে সমাজটা ছিল আসলে হিন্দুস্বার্থ বলে এক মিথ এর উপর দাঁড়ানো। মুসলমানেরা ঐ সমাজের কোন শক্তিই নয়।

তার মানে এটা কোন উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ছিল না। ছিল পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে  মুসলমানদের সম্ভাব্য প্রভাব বেড়ে যেতে পারে – এটা ঠেকানোর আন্দোলন। “অনুশীলন” বা “যুগান্তর” গোষ্ঠির মা-কালীর পুজা করে স্বদেশী আন্দোলন করতে বেরিয়ে পড়া এখান থেকে। উপন্যাসিকদের গল্প লিখে একে উতসাহ দেয়াও এখান থেকে। এটা মূলত জমিদার কায়েমি স্বার্থের বাইরে মুসলমানদের একটু হাতছুট হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন। অথচ  তারা ইতিহাস লিখেছে, এটাই নাকি ‘স্বদেশী আন্দোলন’। কার স্বদেশ? এই কারণে, বাংলাদেশের আম মুসলমানদের কাছে এখনো এর কোনো আবেদন নেই। অবশ্য এডুকেটেড মুসলমান ‘প্রগতিবাদী বুঝ’ থেকে অনেক সময়ে একে খুব বিরাট ঘটনা মনে করতে চায়। তাই আজ পুনোর্মুল্যায়ন করে দেখা দরকার এই আন্দোলনের কনটেন্ট, এর সারকথা কী? এটা কতটা আদৌও উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন নাকি বর্ণহিন্দুর জমিদারী ক্ষমতাকে যারা চ্যালেঞ্জ করছে তাদের দমানো মোকাবিলার আন্দোলন। পুর্ববঙ্গকে আলাদা প্রদেশ করানোর বৃটিশ এক প্রশাসনিক ঘোষণা – এর বিরোধিতা করার আন্দোলনকে কী কারণে “উপনিবেশবিরোধী” আন্দোলন মনে করতে হবে?

কিন্তু বাস্তবতা হল, পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজাদের কাছে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ ছিল সেই টুলস, যা দিয়ে সে জমিদারি উচ্ছেদ করে জমি পাওয়ার আন্দোলন বাস্তব করতে পারে। এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের গূঢ়ার্থ। বাইরে থেকে এটাকে ইসলাম কায়েম, মুসলমানরা দেশ পেয়েছে, ‘এটা মুসলিম জাতীয়তাবাদ কিংবা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়ে ফলে এটা নষ্ট, ইত্যাদি যাই বলা হোক না কেন, সারকথা ছিল জমিদারি উচ্ছেদ করে দেয়ার বাস্তব ক্ষমতা তারা হাতে পেয়ে যায়। তাই, ‘এস্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনেন্সি অ্যাক্ট ১৯৫০’ [The state acquisition and tenancy act, 1950 (East Bengal act no. Xxviii of 1951)]- যেটা পাস হয়েছিল ১৬ মে ১৯৫১ তারিখে, এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান ফলাফল হিসাবে সবচেয়ে সেই ‘বিপ্লবী ঘটনা’।

এই আইনের বলে জমিদারি পূর্ববঙ্গ থেকে উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। এতে অ্যাকুইজিশন মানে হল, বাংলাদেশ রাষ্ট্র দেশের সব জমিমালিকানা নিজের করে নিয়েছিল। এই আইনের ঘোষণাই সেটা। তাই এটাই জমিদারি উচ্ছেদ। এরপর যে যে জমি আগে চাষাবাদ করত এখন সরকারকে নির্ধারিত খাজনা দেয়া সাপেক্ষে সে সেই জমির মালিক। এটাই ছিল বাংলাদেশের (পুর্ব পাকিস্তান) অর্থনীতিতে “ক্যাপিটাল ফর্মেশনের’ দিক থেকে প্রথম সুদূরপ্রসারী কালজয়ী পদক্ষেপের ঘটনা। নিপীড়ন নিষ্পেষণের মধ্যে যুগ যুগ নিরন্তর ফেলে রাখা চাষা-প্রজার আত্মমুক্তির প্রথম পদক্ষেপ। বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন, আমাদের অর্থনীতির প্রথম ভিত্তি গেড়ে দেওয়ার এক আইন। সেটা হয়েছিল বলেই আজ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের এক্সপোর্ট গ্লোবাল বিজনেস, এক জটিল ব্যবস্থাপনার ব্যবসা সে  সামলাতে পারে মাথা তুলে, সেকালের সেই চাষার সন্তানরাই।

কোথাও বিপ্লব ঘটেছে বলে এমন কোনো কিছুকে চিনবার নির্ণায়ক যদি হয় নতুন রাষ্ট্র, মালিকানার ধরনে বদল, ক্ষমতায় বদল ইত্যাদি, তাহলে অন্তত এ তিন কারণে “পাকিস্তান আন্দোলন” ছিল একটা বিপ্লব। অনেকে বলবেন এর ধর্মীয় পরিচয়ের দিকটার কথা [এই আপত্তির অসারতার দিক নিয়ে আরেক সময় বলা যাবে]। কিন্তু এই জমিদারি উচ্ছেদের কাজটা খারাপ হয়েছে – এ কথা কেউ বলুক দেখি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে দুনিয়ার কলোনি শাসকের “শর্ত অনুযায়ী” কলোনি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এতে কলোনি শাসকেরা যত দেশ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, সব দেশেই এর সাধারণ ধারা ছিল, সবসম্পত্তি রেখে যাওয়া। যেমন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান রেলওয়ে, আমরা কেউ ব্রিটিশেরা চলে গেলেও তাদেরকে এর কোন মালিকানা শেয়ারও দেইনি। মিসরের নাসের সুয়েজ খালের মালিকানা নিয়ে কলোনি শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন ও জিতে এসেছিলেন। একাত্তর সালের পরে আমরাও পাকিস্তানি সম্পত্তি বায়োজাপ্ত করেছি ফেরত দেইনি। পাকিস্তানের ভুট্টো ১৯৭২ সালে পুরনো ব্যাংক বীমা কোম্পানির পুরানা আয়ুব আমলে প্রতিষ্ঠিত মালিকদের সম্পত্তি জাতীয়করণ করেছিলেন। তবে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, এথেকে পাওয়া মালিকানা সরকারের হাতে রাখতেই হবে, ব্যক্তির নয়।

তবে কলোনির ক্ষেত্রে সম্পত্তি বায়োজাপ্ত না করার একটাই উদাহরণ আছে, ওবামার প্রিয়জন  নেলসন ম্যান্ডেলার সাউথ আফ্রিকা। ১৯৯৪ সালে তিনি শ্বেতাঙ্গদের সম্পত্তি যেমন ছিল তাতে তিনি হাত দিতে দেননি। অথচ স্বাধীন হয়েছেন বলে ভান করেছেন, পশ্চিমারাও পিঠ চাপড়ে দিয়েছে। আর এরই ফলাফল হল, এখন সে দেশে খনি শ্রমিকের বেতন ১৬০০ ডলার, কিন্তু তারা বস্তির জীবনযাপন করে। কারণ, জীবনযাপন লন্ডনের মতো খুবই ব্যয়বহুল। আর ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষমতা আগের মতোই সাদাদের আধিপত্যে। কাজেই কাকে কী ফেরত দেয়া যাবে, এর নির্ণায়ক এগুলো। এক্ষেত্রে সম্পত্তি ও নাগরিকত্ব সাদাদের দিয়ে দেয়া মনে তাদেরকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাই দিয়ে দেওয়া। ক্ষমতার সাথে সম্পত্তির সম্পর্কটা এখানে এতই সিরিয়াস।

অতএব ধরা যাক, জমিদার রবীন্দ্রনাথ কবির চাদর গায়ে ফেরত এসেছেন বলে কিংবা গদ্য সাহিত্যের প্রমথ চৌধুরী যশোরের জমিদারি ফেরত চান বা লেখক সাহিত্যিক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী কিশোরগঞ্জ ফেরত চান বললেই আমরা ফেরত দিতে পারব না, দেওয়া যায় না, তাই না! আমাদের সাথে জমিদার-প্রজার সম্পর্কটা আমল না আড়ালে বাদ রেখে দেয়া যাবে না, মুল্যায়নে যাওয়া যাবে না। আমাদেরকে বুঝতে হবে কী দেয়া যায়, কী যায় না।

আমাদের এক মুরব্বি বদরুদ্দিন উমর, সেই ১৯৭০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে কোথায় রাখব, এর একটা নির্ণায়কের কথা তুলেছিলেন। তিনি “…… আন্দোলনের এক প্রান্তে থাকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতিকে অবতার হিসেবে খাড়া করার স্থূল ও হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা” – এর নিন্দা করেছেন। আসলে এরাই হল তথাকথিত “বেঙ্গল রেনেসাঁবাদী”। এরাই একদিকে রেনেসাঁ বলতে ধর্ম বা পশ্চাদপদতা কোপানোর কথার আড়ালে ইসলামবিদ্বেষী হয়ে ইসলামকে কোপ দিয়ে গেছে। অন্যদিকে এদেরই মূল স্বার্থ বর্ণহিন্দুর জমিদারি কায়েমি স্বার্থকে রক্ষা করা। তাই তারা জমিদারী শাসনের বিরুদ্ধে কখনও কোন কথা বলে নাই। যেন এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যবস্থা – এটা ধরে নিয়েছে। আবার জমিদারি কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে আঁচও যেন না লাগে সে চেষ্টা করে গেছে। বরং আঁচ লাগা থেকেই তাদের তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলনের শুরু। এজন্য পুর্ববঙ্গের মানুষের প্রজা মুসলমানেরা “বেঙ্গল রেনেসাঁগিরি” কথিত এক আধুনিকতার নামে কায়েমি স্বার্থকে আমল করে নাই। নিজের মনে করে নাই। তাই আমাদের মূল্যায়নে মূল নির্ণায়ক হল,  উনিশ শতক (১৮০০-১৮৯৯) থেকে একালেও কোন ব্যক্তিত্বের  সেকালের জমিদারি শাসনের প্রতি মনোভাব কী ছিল? এর উচ্ছিষ্টভোগী থেকে চুপ ছিলেন কী না এগুলো। আসলে এসব দেখেই বাংলাদেশের স্বতন্ত্র মূল্যায়নের ধারাটাই প্রধান হয়ে উঠবে।

প্রিয়া সাহা কোন প্লাটফর্ম থেকে কথা তুললেন?
একালে এ’ঘটনার শুরু ২০০১ সালে আমেরিকায় ৯/১১, মানে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে। এর এক মাসেরও কম সময় পর ৭ অক্টোবরে তখনকার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সাথে মূল সাগরেদ তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে নিয়ে আফগানিস্তানের ওপর যুদ্ধবিমান হামলা শুরু করেছিলেন। আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি কমন প্র্যাকটিস হল, এসব ক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরু বা বিমান হামলার সাথে সাথেই আর একটা কাজ তারা শুরু করে। তা হল, দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই পররাষ্ট্-দূত পাঠানো। এর উদ্দেশ্য আমেরিকান ওই হামলার সিদ্ধান্তের পক্ষে বিশ্বজনমতকে নিজের পক্ষে জড়ো করা। কারণ, যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে চলে না, যদি না সাথে এর পক্ষে বয়ান ও জনমত তৈরি করে নেয়া যায়। অবশ্য এর আগে এই যুদ্ধ ও হামলার এক খুবসুরত ছোট নাম প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ দিয়ে নিয়েছিলেন – ‘ওয়্যার অন টেরর’। ফলে তৈরি হয় ‘ওয়্যার অন টেরর’-এর বয়ান। গ্লোবাল নেতা হিসেবে আমেরিকা দুনিয়ার ছোট-বড় বিভিন্ন রাষ্ট্রের ওপর যতটুকু প্রভাব অথবা চাপ তৈরিতে সক্ষমতা, তা দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্রের ওপর এর সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রয়োগ করে আমেরিকান কূটনীতিক পাঠিয়ে বুশ এই পুরো কাজটা সম্পন্ন করেছিলেন।

তবে এর অন্য একটা দিক আছে। আমেরিকান কূটনীতিকদের এই সফরের মধ্য দিয়ে আসলে যা ঘটে তা হল, স্থানীয় নানান দ্বন্দ্বগুলোর সাথে গ্লোবাল এ রকম ইস্যুর এলায়েন্স। মানে এতে নতুন করে এক পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ শুরু হয়ে যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেমন কাশ্মির, পাকিস্তান বা একটু দূরে হলেও বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ আছে। একে ভারতের চোখ দিয়ে দেখে তাতে সমর্থন দিয়ে আমেরিকা তা আমলে নিলে, এবার ভারত ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নৌকায় উঠতে রাজি বলে জানায়। তাই রফাটা মোটামুটি এখানেই হয়েছিল এভাবে যে আসলে আমেরিকাই হিন্দুত্বের স্বার্থকে ‘ওয়্যার অন টেরর’-এর সাগরেদ বানিয়ে নিয়েছিল। আর সেখান থেকেই  আমেরিকায় “হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন” এর জন্ম ২০০৩ সালে।

তারা মূলত পারিবারিকভাবে হিন্দু হলেও আমেরিকায় জন্ম নেয়া হিন্দু প্রজন্ম, নিজেদের পরিচয়ে এটাই তারা ফোকাস করে থাকেন। এদের বোর্ড অব ডিরেক্টরদের তালিকায় এদের পরিচয় ও বয়েস দেখলে বুঝা যাবে। চলতি ইস্যুতে এদের মধ্য সবচেয়ে প্রভাবশালী জয় কানসারা [Jay Kansara]।

এছাড়া আছেন, হাওয়াই এর প্রতিনিধি পরিষদ নেতা বা কংগ্রেসম্যান (আমাদের ভাষায় এমপি)  তুলশি গাব্বার্ড  [Tulsi Gabbard] যাকে প্রথম হিন্দু (প্রাকটিসিং হিন্দু) কংগ্রেসম্যান বলে দেখানো হয় [ first Hindu member of the United States Congress]। ডেমোক্রেট দলীয় এই এমপি ভাগবদ গীতার উপর হাত রেখে কংগ্রেসম্যান হতে হাউজে শপথ নিয়েছিলেন। বাবা হাওয়াই সিনেট সদস্য।

আমেরিকার ইসকনসহ যত হিন্দু প্রতিষ্ঠান আছে ইত্যাদি সব মিলিয়ে ওরা এক প্রেসার ও লবি গ্রুপ, যারা হাউজে বা সিনেট লবিতে তৎপর থাকে কথিত হিন্দুস্বার্থের পক্ষে। শেষ বিচারে এর ‘মাখন’টা যায় ভারতের বিদেশনীতির পক্ষেই। তাই এই গ্রুপ বা ব্যক্তিগুলোর সমন্বয় করে থাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা। আর হোয়াইট হাউজ পর্যন্ত তা হাজির করে আমেরিকার ‘ফ্রিডম হাউজ’-এর মত পুরোপুরি সরকারি ফান্ডে চলা এনজিও।

এসব তথ্যগুলোকে স্রেফ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসাবে পড়লে অতি-সরলিকরণ দোষে পড়তে হবে। এরচেয়ে বরং এসব লবিগ্রুপ তৈরি হচ্ছে কিভাবে সে প্রক্রিয়া, এদের খেলাস্র নিয়ম ইত্যাদি খুবই মনোযোগে স্টাডি করার বিষয়। চাইলে এখেলায় আপনিও নামতে পারেন। কিন্তু কী করে এগুলো কাজ করে, এই খেলার নিয়ম কী সব বুঝতে হবে আগে। নিজের স্বার্থ গ্রুপ খারা করতে পারেন। আমেরিকন আইনে আইন মেনে লবি বা প্রেসার গ্রুপ বানানো বৈধ। আপনাকে নিজের গ্রুপ বানাতেই হবে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। কিন্তু আপনাকে এদের সম্পর্কে কতদুর কী করতে পারে জানা থাকতে হবে। আবার শত্রুর শত্রু তত্ব অনুসারে যেহেতু এরা হিন্দুস্বার্থের পক্ষে গ্রুপ, মানে এরা ‘ওয়্যার অন টেররে’ মুসলমান স্বার্থের বিপক্ষে; অতএব মাছি আসবেই। ইসরায়েলি সাফাদি-কেও এখানে পাবেন।

তাহলে এবার একটু সার করি। ‘ওয়্যার অন টেরর’ থেকে জন্ম নেয়া এই হিন্দুস্বার্থ গ্রুপ (শব্দগুলো ওদের, লিখেছেন হিন্দুইজম প্রমোট করেন তারা, HAF’s work impacts a range of issues — from the portrayal of Hinduism to…….) এদের বেশকিছু ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পেছনে। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতি এখন যা মূলত বিজেপির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে; মূলত গত নির্বাচনের সময় থেকে। এরাও এরই অংশ, যোগাযোগ সম্পর্ক আছে, রাখে। ক্ষমতায় আসার সময় এদের সমর্থন আওয়ামি লীগের ভাল লেগেছিল। কিন্তু খবর নেয় নাই এরা কারা কার সাথে কে কীভাবে কাজ করে। এ’দিকটা সম্ভবত সরকার যথাযথ আমল না করায় এখন ‘সেম সাইডে গোল’ খেতে হলো।

ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিবার পর থেকে গত দুবছর ধরে আমেরিকার ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার আছে কিনা এনিয়ে আওয়াজ তোলা প্রেসার গ্রুপ প্রায় চুপসে গেছিল। কারণ ট্রাম্প আমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা ফেলে আমেরিকা ফাস্টের ন্যাসনালিজম করতে গেছিল। তাই গত দুবছর নামকাওয়াস্তে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার আছে কিনা – এসবের বার্ষিক রিপোর্ট হয়েছিল। এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে এতে ট্রাম্প বাবাজীবন হাজির। হতে পারে আগামি বছর নির্বাচন, তিনি আবার দাড়াতে চান, সেটা এর কারণ। ট্রাম্পের ন্যাশনালিজমের খোলস থেকে মাথা বের করা। তবে যে কারণেই হোক মনে হচ্ছে ভারত পুরানা মেকানিজমটাকে ততপর করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বিপদজনক হচ্ছে হাসিনা নিজেকে রক্ষা করতে বিব্রত না হতে চারদিকে খোঁজ রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ঠিক ঠিক কাজের লোক তার নাই না ছিল না। দৃশ্যত হাসিনাকে এখানে পরাজিত করে ফেলা হয়েছে, আশপাশের অকাজের লোকের জন্য। দু-একটা শাহরিয়ার কবির বা প্রিয়া সাহা পাওয়া কোন ব্যাপার না। এগুলা ঘটনার পেটি-দিক।
এরপর অন্যদিকে যাবার আগে বলে রাখি। আবার বিএনপিরও বিরাট ওস্তাদ ভাবার কোন কারণ নাই। এরাও প্রায় সমান বেকুব। গত নির্বাচনে আরএসএস আমাদের দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। দু দলই বোকার মত মোদীর সমর্থন পাবার সাথে ব্যাপারটাকে সম্পর্কিত করে  দুই দলের ভিতরেই কিছু লোক এই হিন্দুস্বার্থকে পঞ্চাশ আসন দেয়ার জন্য লবি ও রাজী করিয়েছিল। অথচ আরএসএস মোকাবিলার জন্য পাবলিকই যথেষ্ট ছিল। অথচ কেউ ব্যবহার চিন্তা করে নাই। হাস্না পীয্যুষকে লাগিয়েছিল, অযথা দাগ লাগানোর জন্য। আর বিএনপির ভিতরে যারা বিরাট বুদ্ধিমান কিন্তু আসলে কথিত হিন্দুস্বার্থের জন্য লবী করেছিল, এরাও কোণঠাসা হওয়া আর শক্ত ওয়ার্নিং পাওয়ার যোগ্য।

তবে আমরা পাবলিককে যে নীতির পক্ষে সবার হাত ধরে দাড়াতে হবে তা হল, নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি। নাগরিক যেই হোক যে ধর্মের যে পরিচয়েরই হোক তার সাথে কোনই নাগরিক অধিকার বৈষম্য করা যাবে না। কাউকে বাড়ি সুযোগ, ক্ষমতাও দেয়া যাবে না। আইনের চোখে সবাই সমান হতে হবে। আমাদের সমস্যা এটা আসলে সেকুলারিজমের কোন ইস্যুই না। নাগরিক বৈষম্যহীনতা নীতি অনুসরণ করলে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে ছলাকলা প্রয়োজনীয় হয়ে যাবে।  আবার আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়া ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।  হাসিনার উচিত হবে ইমিডিয়েট এসব নীতি অনুসরণ করে সব সমস্যাকে দেখা। আর সর্বোপরি জনগণের শক্তির উপর ভরসা করে খাড়ায় যাওয়া।
এসব অনুসরণ করলে কোন ট্রাম্প বা প্রিয়া, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বা বাংলাদেশকে কখনও ভয় দেখাতে, বিব্রত করতে পারবে না।  এক পেটি স্বার্থে, এক হিন্দুর বাড়ি জমি এনক্রোচমেন্ট করতে পড়শি আরেক হিন্দু বা মুসলমানকে দেয়া হয়েছে। এতে বদনাম ছাড়া, কোন দলের কার কী লাভ হয়েছে? এগুলোই এখন প্রধান অভিযোগ। আর তা এমনভাবে প্রিয়াদের হাতে উপস্থাপিত যেন বিশেষ করে ইসলামী দলসহ আমাদের সব রাজনৈতিক দলগুলোর  প্রধান কর্মসুচি যেন পড়শি এনক্রোচমেন্ট যেন হিন্দুর সম্পত্তি দখল। অথচ ১২% বিশেষ জনগণকে ২৫% চাকরি দেয়া যে কোন কাজে আসে না, এটাই আজ দেখা যাচ্ছে। এটা কোন পথই না।
অথচ দরকার ছিল নুন্যতম আইনের শাসন। তা দিয়েই এগুলো সমাধান করা যায়। আমাদের সরকার চালানো এমনই কেলাস, পেটিস্বার্থে ভরপুর। যার মুল কারণ শাসন-হীনতা। খোদ প্রভাবশালী হিন্দুরই দেবোত্তর পুজামন্ডপের সম্পত্তি গ্রাস করা থেকে যা বুঝা যায়। আসলে সরকারের জমিজমা সম্পত্তিই যখন দলের লোকেদের দখলে চলে যাওয়া র‍্যানডাম হয়ে যায়, তখন দুর্বল হিন্দুরটা এর বাইরে থাকবে কেন?

তবু প্রিয়া সাহার ঘটনা প্রমাণ করল, এ সরকারের জন্য বাংলাদেশের হিন্দুত্বের রাজনীতি আর নির্ভরযোগ্য নয়। ‘ফলে রি-অ্যাসেসমেন্ট’ দরকার বলে মনে করা যায়। আমরা সবার সাথে ভারসাম্য সম্পর্ক রাখব – এগুলো তো আসলে মুখে বলে কিছু হবে না। প্রিয়ার ঘটনা যে গওহর রিজভীও আগাম অনুমান বা বুঝেন নাই তা বলাই বাহুল্য। বরং আমরা দেখছি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ঐ “ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সম্মেলনে” যোগ দিতে পাঠানো হয়েছে। কেন? কী বুঝে?

এখন আবার কী হাসিনার ক্ষমতার লোভে ভুল জায়গায় পা দেয়া হবে? প্রিয়া ইস্যুটা ভারতের মধ্যস্থতায় আপোষ করে নিবে? হতে পারে এটাই সম্ভবত ভারতের আকাঙ্খা। অথচ নিজেদের শক্তি সামর্থের খবর না নিয়ে কেন রাজনীতি করতে যাওয়া! বাংলাদেশের পাবলিক মাইন্ড কানখাড়া করে একটা ডাকের অপেক্ষা করছে। ওদিকে একটা ইতি আলামত বলছে – ভারত এখন আমেরিকাকে হাসিনার বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারছে না। সুযোগ যেকারণেই হোক, নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু হাসিনা কী সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারবে?

একই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের লেখায় যেতে হলে এখানে ক্লিক করেন

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সরকারের বিরাট পরীক্ষা প্রিয়া সাহা ইস্যু এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2D0

 

ভারতের এনআরসি মানে ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স’ (National Register of Citizens (NRC))। কিন্তু এটা কেবল আসামের এক ইস্যু। ভারতের নর্থ-ইস্টে সাত রাজ্যের বড়টা হল আসাম। আসলে উল্টাটা। বড় আসামকে ভেঙ্গেই পরে সাত রাজ্য (ত্রিপুরাকেও সাথে ধরে) বানানো। নানান জনগোষ্ঠীর ট্রাইবাল পরিচয়ের ভিত্তিতে আগের আসাম রাজ্যকে বিভক্ত করার কাজটা হয়েছিল মূলত ১৯৭২ সালে, ভাগ করে মোট সাতটি আলাদা রাজ্য করা হয়েছিল। এরপরের যে আলাদা নতুন আসাম কেবল তারই এনআরসির সোজা মানে হল, কেবল আসামের নাগরিকদের জাতীয় তালিকার রেজিস্টার। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটা দিয়ে সারা ভারতের নাগরিক তালিকা বুঝানো হয়নি, কেবল ‘আসামের নাগরিকদের তালিকা’ বুঝতে হবে। কিন্তু কেবল আসামে কেন?

এনআরসির তৈরির কাজ শুরুর পর থেকে এর ফাইনাল তালিকা করা কবে শেষ হবে ও প্রকাশিত হবে এনিয়ে বহু মোচড়ামুচড়ির পরে ঘোষণা করার সর্বশেষ তারিখ ছিল, চলতি মাসের শেষে, ৩১ জুলাই। কিন্তু আবার গড়িমসি করা শুরু হয়ে গেছে। আবার আদালতে তারিখ পেছানোর দরখাস্ত পেশ করা হয়েছে। আর খুব সম্ভবত এবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে “মুসলমানেরা দায়ী”, “মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা দায়ী”- এ কথাগুলো প্রবল করার বিজেপি-আরএসএসের জল্পনা-পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।  তাই একটা চাপ তৈরি করার চেষতা হচ্ছে। এদিকে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপেশাদার আচরণও ইস্যুটাকে আরও বিপজ্জনক  করে তুলছে। এমনিতেই ভারতের কিছু মিডিয়া বলা শুরু করেছে যে, এনআরসির তালিকা তৈরি করার কাজটা শেষে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থেকে অম্পুর্ণ ও ব্যর্থ হবে। শেষ করতে পারবে না ইত্যাদি। কেউ কেউ চার-পাঁচ সম্ভাব্য কারণও ছাপিয়ে ফেলেছে [5 reasons why NRC implementation is bound to fail] । অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের লেখা, “এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর ভারত কি সত্যিই কাউকে ফেরত পাঠাতে পারে”। আর ভারতের এমন মিডিয়ার তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার নাম। এদের সর্বশেষ রিপোর্টের শিরোনাম ‘এনআরসি বিপর্যয় : প্রক্রিয়ার ত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্র ও আসাম” [NRC Disaster: Center and Assam virtually admit flaws in the process – এটা প্রকাশিত হয়েছে দুদিন আগে ১৭ জুলাই।

কেবল আসামে কেন- সেই প্রশ্ন থেকে শুরু করতে প্রথমে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা অবশ্যই প্রশাসনিক, মানে নির্বাহী সরকার করবে। কিন্তু আসামের ক্ষেত্রে এই এনআরসি তৈরির কাজটা চলছে মোদী অথবা তার আগের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা বা আদেশে নয়। তাহলে কী এটা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকারের আদেশে বা ইচ্ছায় হচ্ছে? না, তা-ও নয়। এটা আসলে চলছে বিচার বিভাগের নির্দেশে। না, এনআরসি তৈরিতে কাজে নেমে পড়ার আদেশ বলতে, একটা আদালতের রায় যেমন হয়, এটা ততটুকুই নয়। রায় তো দিয়েছেনই, সেই সাথে খোদ আদালতই এনআরসি কাজের তদারককারী, তত্ত্বাবধায়ক। তা-ও আবার “আদালত” বলতে আসাম রাজ্যের হাইকোর্ট নয়, একেবারে দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে। তবে ‘সমন্বয়কারী’ নামে পদে এক হেড বুরোক্র্যাট (প্রতীক হাজেলা, [Prateek Hajela]) আছেন বটে, কিন্তু তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে জবাবদিহির অধীনে। অর্থাৎ তিনি কেন্দ্রের মোদীর (বা আসাম রাজ্যের) নির্বাহী সরকারের হুকুমের অধীনস্থ কেউ নন। সোজা কথায় বিচার বিভাগ, এব্যাপারে নির্বাহী বিভাগের কাজকাম নিজের দখলে নিয়েছে। যেমন ধরেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল আইডি তৈরির কাজ আমাদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন শেষ বিচারে নির্বাহী বিভাগের অন্তর্গত। কারণ এটি কনস্টিটিউশনে উল্লেখ থাকা প্রতিষ্ঠান বলে রাষ্ট্রপতির অধীনে, আর সেই সূত্রে সে রাষ্ট্রপতির অফিস ঘুরে সেই নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই। এখন বাংলাদেশে এটা যদি সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তদারকিতে সম্পন্ন হলে যা হত, তাই হচ্ছে আসামের এনআরসিতে।

এতে একটা অসুবিধা বললাম যে, সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্বাহী আর বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা থাকে, সে নিয়ম এখানে ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে, নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন নির্বাহী ক্ষমতা মানে তো সরকার, মানে রাজনীতিবিদদের কাজ বা দায়িত্বের এরিয়া। কিন্তু সেই এরিয়ায় বিচারপতিরা কেন ঢুকবেন? বা ঢুকলে কী বিপদ হবে? সমাজের রাজনৈতিক তর্ক-ঝগড়া রাজনীতির মাঠে সমাধান হতে হয় – সঙ্ঘাত, আপস ইত্যাদির মাধ্যমে। অথবা অমীমাংসিত থাকলে সেটাও রাজনীতির মাঠে-পরিসরেই পরে থাকবে; উঠবে পরবে – এভাবেই চলবে। মানে সবকিছু সেখানেই। কারণ যা রাজনীতিক স্বার্থের প্রশ্ন তা তো রাজনৈতিকভাবেই ফয়সালা হতে হবে – সংঘাতে না হয় আপোষে। রাজনৈতিক সমস্যার আইনি সমাধানই হয় না। ওর কাজ না সেটা। এ জন্য রাজনীতিকদের এরিয়ায় বিচার বিভাগ কখনো আসবে না, তার কজ এটা না তাই। আদালত তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখবে যেন  সমাজ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো ফয়সালা করতে দিবার জন্য এবং একে নিজের ভুমিকা ও ফাংশনগুলোকে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু এনআরসি করাটাই আসাম সমাজের রাজনৈতিক সমাধান কি না- এ নিয়ে রায় দিয়ে দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এটাই সবেচেয়ে বড় ব্লান্ডার। এরপর আবার তা বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হয়ে গেছেন আদালত নিজেই, যা আরেক ব্লান্ডার। এটা বিশাল অকাজ, অনধিকার চর্চা। নিজের সীমা, কাজের ধরণ না বুঝে কাজ করা হয়েছে। ধরেই নেয়া হয়েছে আদালত রাজনৈতিক বিতর্ক, স্বার্থ-দ্বন্দ্ব সমাধান দিতে পারে। বা এটা তার কাজ। এখন যদি মিডিয়ার আশঙ্কা অনুসারে এনআরসি প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় [যেমন চলতি মাসে আসাম রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথভাবে (যার দুটোই বিজেপির দলের সরকার) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, যাতে ফাইনাল তালিকা প্রকাশ করার শেষ তারিখ ৩১ জুলাই থেকে পিছিয়ে তা অনির্দিষ্টকাল করা হয়।] যার অর্থ এটা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কোর্টের। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেন একটা রাজনৈতিক পক্ষ হয়ে উঠবে, যার বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক পক্ষ বা স্বার্থগুলো সোচ্চার হবে। অথচ এটা অকল্পনীয় যে, আদালত বা বিচারকেরা নিজেই এক রাজনৈতিক পক্ষ হবেন! এ কারণেই দুনিয়ার আদালতগুলো সব সময় বুদ্ধিমানের মত [Jurisprudence বা জুরিসপ্রুডেন্সের] প্রুডেন্ট হয়ে, দূরদর্শিতা দেখিয়ে আগাম কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা বিপক্ষ হওয়া থেকে দূরে থাকে। তাই আদালতের কাছে কেউ মামলা নিয়ে গেলেই আদালতের তাতে আমল করে রায় দিতে ঝাপায় পড়া – এটা দুরদর্শী আদালত কখনও করে না। ওর প্রথম বিবেচনা ইস্যুটা রাজনৈতিক কিনা। যদি দেখে হা তবে একে আমল না করে  ততক্ষণাত সমাজের রাজনৈতিক পরিসরে, মাঠে ফেরত নিয়ে যেতে অনুরোধ করে। মামলা ফিরিয়ে দেয় এই যুক্তিতে। কোন সমাজের সব সমস্যা আইনি না। সমাজের নানান সমস্যার  সবকিছুর সমাধান দেওয়ার আদালতই একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। আদালত সবকিছুতে নাক গলানোর মানে সবকিছুকে আইনি সমস্যার হিসাবে ও চোখে দেখে নামিয়ে এনে সেই খাপে ভরে দেয়া। আর এতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুমিকা রাখা ফাংশনাল হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়া হবে। তাই আদালতকে এসব দিক বিবেচনা করে দেখার মত যোগ্য আর বুদ্ধিমান হতে হয়। আইডিয়ালি এটাই হওয়ার কথা।

এনআরসি করার দাবিকে কেন আসাম সমাজের ‘রাজনৈতিক সমস্যা ও দ্বন্দ্ব’ বলেছি?
ভৌগোলিকভাবে এই নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারতের মাঝখানে আছে বাংলাদেশ। যদিও একেবারেই এক প্রান্তের শিলিগুড়ি করিডোরের এক “চিকন গলা” দিয়ে নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারত সংযুক্ত অবশ্যই।  এখন যদি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সরাসরি যাওয়া হয় (যদি বাংলাদেশ যেতে দেয়) তবে কলকাতা থেকে আসামের সবচেয়ে কাছের জেলার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশ অনুমতি না দিলে ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ হয়ে ঘুরে কলকাতা আসতে সেই দূরত্ব বেড়ে হয়ে যায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তান (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে  ১৭০০ কিলোমিটার দুরত্বের ফ্যারে পরে যায় আসাম। এটাই আসামের দুঃখের মূল উৎস। আসামের সাথে বাকি ভারতের সহজ যোগাযোগ ‘নাই’ হয়ে যায়। যোগাযোগ খারাপ তো লেনদেন বিনিময় ব্যবসা খারাপ। মানে ‘মানি সার্কুলেশন’ নাই, অর্থনীতি নাই, অবকাঠামো নাই, এভাবে সব কিছু নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। তবু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের নেহরু সরকার এভাবে আসামকে স্থবির ফেলেই রেখে দিয়েছিল। কেন?

কারণ তার ভয় আসাম নেহেরুর ভারতকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। আসামের আরও উত্তরের সীমান্ত হল – চীন সীমান্ত। আসামের স্বার্থে ভারত বাংলাদেশের সাথে কোনো ‘ফেয়ার ডিল’, এক “উপযুক্ত পালটা সুবিধার বিনিময়” করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম-কলকাতা যোগাযোগ সহজ করে নিতে পারে অবশ্যই।  কিন্তু জন্ম থেকেই ভারতের কেন্দ্র বা নেহেরু সরকার এতে আগ্রহ দেখায় নাই। কারণ, তাদের ভয় হল, আসামের জন্য বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া করিডোর পাওয়া গেলে এতে একই সাথে এবার বৃহত্তর আসাম সীমান্তের লাগোয়া অপর পাড়ের চীনের প্রদেশগুলোও আসামের ওপর দিয়ে, বাংলাদেশ হয়ে কোনো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ বা চীন তখন আসামের উপর দিয়ে চীনের জন্য করিডোর পাওয়া – এই প্রবেশাধিকার, ভারতকে দেয়া বাংলাদেশের সুবিধার বিনিময়ে শর্ত হিসেবে হাজির করে ফেলতে পারে? এটা ভারত একেবারেই চায় না। এব্যাপারে আনন্দবাজার ঠিক এই প্রসঙ্গে না বিসিআইএম [BCIM] প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লিখেছে ,“বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ (এই প্রকল্প নিয়ে)ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ‘ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল [মানে আসাম] চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে।’ ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”।

সারকথায় চীনকে এসব আলোচনার ভিতরে ঢুকতে দিতে চায় না ভারত, কারণ আলোচনায় একবার ঢুকে পড়লে শেষে চীন আসামের ওপর দিয়ে করিডোর না পেয়ে যায়। সম্ভবত ভারতের মনে ভয়, নর্থ-ইস্ট কখনো যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যেতে চায়, একই ভারত রাষ্ট্রে যদি না থাকতে চায়, তাহলে কী হবে? যদি স্বাধীন হতে চায় বা চীনের সাথে যুক্ত হতে চায় তাহলে কী হবে? সারকথা বিষয়টা হল, ভারত থেকে আসামের বেরিয়ে যাওয়ার ভয়। ভারতের শাসকেরা এপর্যন্ত তাদের মনের এই ভয়কেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে সব সময়। আর তাতে ব্যাপারটা হয়ে গেছে অনেকটা,  নিজের সন্তানকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে রাখার মত, যাতে সে পালিয়ে না যায়, তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো যায়। আর সে জন্য পুরো নর্থ-ইস্টকে জন্মের পর থেকেই ভারত যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক দিয়ে প্রায় অচল করে রেখেছে।

তাই কেবল গত দশ বছরের ঘটনা হল, এবার ভারত একা সব সুবিধা হাসিল করেছে। এই সুযোগ সুবিধা মানে বিনা পয়সার বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোরের একক সুবিধা ভারত এখন নিয়েছে। কারণ এটা আমেরিকার “চীন ঠেকানো” স্বার্থে ভারতের ভাড়া খাটার বিনিময়ে পাওয়া  বাংলাদেশ এখন মোস্ট ভারত-ফেভারেবল বাংলাদেশ পেয়েছে।  এখানে বাংলাদেশে করিডোরের বিনিময় চাওয়ারই কেউ নাই। এটা একপক্ষীয় করিডোরসহ সব সুবিধা। এমনকি মেজর অবকাঠামো তৈরির দায়ও বাংলাদেশের। আনন্দবাজার লিখছে, আসামে উপর দিয়ে চীন বাংলাদেশে আসুক সেটা চায় না। মানে, ভারত একপক্ষীয় করিডোর চায়।

কিন্তু এতদিন আসামের মানুষের একারনে জীবনযাপনে যে গরিবি হাল হয়ে আছে এর কারণ কাকে দেখানো হবে? এটাকে আড়াল বা দায়ী করার জন্য বয়ান তৈরি করা হয়েছে যে, আসামে বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) অনুপ্রবেশকারী, এদের ( বিদেশীরা) ঢুকে পড়া সবকিছু জন্য দায়ী। কথাটা আসলে উল্টোভাবে সত্য। কারণ ব্রিটিশ আমলে ধান ফলাতে বৃহত্তর রংপুর বা টাঙ্গাইল থেকে দক্ষ বাঙালি গৃহস্থকে আসামে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা, যাতে সেখানে ধানের উৎপাদন বাড়ে। বিশেষত চল্লিশের মহাযুদ্ধের সময়ে সেনাদের জন্য খাদ্যশস্যের খুবই বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ সেই মাইগ্রেশনটা অভাবে পড়ে মাইগ্রেশনও ছিল না এই অর্থে যে, এটা একই ব্রিটিশ কলোনির মধ্যেই এক প্রদেশ থেকে অন্য আর এক প্রদেশে মাইগ্রেশন ছিল। এছাড়া বৃটিশ শাসকেরা নিজে কর্মসূচি নিয়ে এটা ঘটিয়েছিল।

কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এ ব্যাপারটাকে দেখানো হল, আসামের ‘সব দুঃখের মূল কারণ’ হিসেবে – এই বলে যে বাঙালি বা মুসলমানেরাই দায়ী। আসামের মূল জনগোষ্ঠী হলো অসম (বা অহমীয়), বাঙালি (মুসলমানসহ) আর ট্রাইবাল বোড়ো। এ ছাড়া সাথে ছোট ছোট অনেক ট্রাইব বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও আছে। ‘বিদেশী’ বা কথিত পূর্ব বাংলার লোক, এদেরকে বের করে দিতে হবে- এই অছিলায় সেকালে কংগ্রেস আন্দোলন করেছিল। কথা বিদেশি বলে ঘুরিয়ে দিতে সেই প্রথম ১৯৫১ সালে নাগরিক তালিকা [NRC 1951] বা প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা ফাইনালি হয়েছিল আসলে আসামে বসবাসকারী সব বাসিন্দার আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি। অর্থাৎ এ থেকে কাউকে কী পদ্ধতিতে বের করে দেয়া হবে, কী করে বুঝবে সে বিদেশি ইত্যাদি সেই পর্যন্ত আর আগানো হয়নি। আর এই ক্ষোভ জমতে জমতে তা থেকেই পরে ১৯৭৯ সালে মূলত মাঠের ছাত্র আন্দোলন হিসাবে অতি উগ্র “অসমীয় জাতীয়তাবাদীরা” সাথে বোড়োদের সমর্থনে মূলত বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙালি খেদাও’ বলে আন্দোলন শুরু করেছিল। এটাই একপর্যায়ে চরমে উঠে, আসামেরই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করলে তা ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর সরকার দ্রুত আপসে ১৯৮৫ সালে ‘আসাম অ্যাকর্ড’ [Assam accord, 1985] নামে ছাত্রদের সাথে এক আপোষচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। সেখানেই বলা ছিল, ১৯৫১ সালের এনআরসিকে বিদেশী চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে আপডেট করা হবে। তাতে কে বিদেশী তা চিহ্নিত করে ওদের বের করে দেয়া হবে। এর পর থেকে ওই ছাত্ররাই এবার রাজনৈতিক দল খুলে বসে ‘অহম গণপরিষদ’ [AGP] নামে বা ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট’ নামে।

ওদিকে ১৯৮৫ সালের ‘আসাম অ্যাকর্ড’ চুক্তি হলেও এর বাস্তবায়ন ২০০৯ সাল পর্যন্ত কিছু না হওয়াতে একটি স্থানীয় দাতব্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান  – নাম ‘আসাম পাবলিক ওয়ার্কস’ – এই ইস্যুটাকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যায়, তারা রিট পিটিশন করে। ব্যাপারটা যেন খুবই গর্বের, দেশের কাজ আর বিরাট দেশপ্রেমের কাজ হয়েছে এই ভাব ধরে গত বছর কলকাতার ইংরাজি টেলিগ্রাফ এই রিপোর্ট ছাপছিল [Couple who set NRC ball rolling]।  আর ঐ রীট মামলার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শেষে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই হয়ে গেছিল আসাম সমাজের রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কের নিষ্পত্তির নির্বাহী বাস্তবায়ক।  এনআরসি তৈরির কাজের নিয়মকানুন কী হবে সেটাও আদালত ঠিক করে দেয়। বিচারকদের পা-পিছলানির ঐতিহাসিক ঘটনা এটা। কিন্তু এটা কেন “রাজনৈতিক ইস্যু”, যাতে বিচারকেরা পা পিছলে ঢুকে পড়েছিল – একথা বলছি?

মাইগ্রেশন মানে কাজ বা পেশায় সুবিধা পেতে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস; এর মূল কারণ বা চালিকাশক্তি হল অর্থনীতি। কেউ চাইলে এটাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্থানীয় লোকাল ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল হয়ে ওঠা, এমন “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ফেনোমেনা” বলতে পারেন। একটা দেশে যেকোনো কারণে ব্যাপক উদ্বৃত্ত বাড়তি সঞ্চয় ঘটে গেলে আর সেই সঞ্চয় অর্থনীতিতে আবার বিনিয়োজিত হতে চাইলে তাতে এবার ওই দেশে প্রাপ্ত জনসংখ্যার (লেবার) চেয়ে লেবারের চাহিদা বেশি হয়ে গেলে কী হবে? ঐ দেশে তখন অন্য দেশ থেকে মাইগ্রেশন হবেই। আর সেই দেশের আইনকানুন ও সীমান্তও চাইবে বিদেশী লেবার মানে শ্রমিক আসুক, তারা খুবই স্বাগত। কিন্তু  পরবর্তিকালে কখনও কোন কারণে যদি ঐ অর্থনীতি ভালো না? ভুবতে থাকে, মন্দা দেখা দেয়? তাহলে এবার, সেখানে বিদেশীবিরোধী আন্দোলন শুরু হবে, মাইগ্রেশনবিরোধী দল ক্ষমতায় আসবে ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিদেশীরা কত খারাপ, কত বেশি বেশি পয়দা করে বা মাইগ্রেটেড এরা তো স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, ওরা বেশি পয়দা করে, ওরা অসভ্য, ওদের ধর্ম নৃশংসতায় ভর্তি ইত্যাদি কত কিছু খুত আবিস্কার করে এসব বয়ান বলে এদের কুপিয়ে কেটে গণহত্যা করে ভাগাও- এসবই হবে ওদের সমাজের পপুলার রাজনীতির বয়ান। সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ডের শুটিং গণহত্যা বা ফ্রান্সের উগ্রপন্থী লি-পেনের দলের কাণ্ডকারখানা অথবা আমেরিকায় ট্রাম্পের ইমিগ্রেশনবিরোধীতা ( বিদেশীবিরোধী) ও মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলার বয়ান  – সবকিছু এই একই কারণে।

এগুলোই আসলে বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধিতার আড়ালে চরম নোংরা বর্ণবাদ। ওমুকেরা জাতে খারাপ, এমন বয়ান। ১৯৭৯ সালের পর থেকে আসামের পুরো সমাজ এমন বাঙালি বা বিশেষত মুসলমান বিরোধি ঘৃণাতেই ভেসে চলছিল।

আবার মনে করিয়ে দেই, আসামের মূল সমস্যা বা শুরুটা কিন্তু ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে আসামের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা এবং যা থেকে তৈরি খুবই খারাপ ও অবকাঠামোহীন, বিনিয়োগহীন এক স্থবির জনজীবন। এখন ধরা যাক, আসামে যাদের কথিত বাংলাদেশী বলা হচ্ছে যদি এদের সংখ্যা একই রকম থাকে, আর কালকেই যদি কোনো জাদুতে আসামের যোগাযোগ অবকাঠামো সহজ, বিনিয়োগের অভাব নেই, অর্থনীতি প্রবল চাঙ্গা ইত্যাদি – এমন এক অবস্থা হয় যাতে প্রাপ্ত লেবার যা আছে তা-ও কম পড়েছে দেখা যায়, তবে ঐ ঘাটতি পুরণে সেই আসামই আবার আরও নতুন মুসলমান ‘বিদেশীদের’কেও দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনবে। তাই বলছি, আসামের মূল সমস্যা আসলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক। অথচ সবাই ভাবছে, বিশ্বাস করে বসে আছে আসামের প্রধান ইস্যু এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা কবে ঘোষণা হবে; যেন এটা হয়ে গেলেই অসমিয়াদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অথচ এটা এমনি হিংসা ঘৃণায় ঢুবে থাকা জনজীবন যে ঐ সমাজে কারও বাস্তবতায় চোখ মেলার মুরোদ নাই, কারণ এটা তো আসলে এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। এরা অভিবাসী বা মাইগ্রেশন জিনিষটা নিয়ে কখনও বুঝে দেখেনি।  এরা আসলে চিন্তা করে দেখেনি যে, আসামের অর্থনীতি আরো খারাপ হলে তারা নিজেরাও অভিবাসী হতে ঘর ছাড়বে। যেমন ইতোমধ্যেই গুজরাত বা মুম্বাইয়ের মত শিল্প-শহরগুলোর অর্থনীতি আসামের চেয়ে প্রবল সচল। তাই ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষিত আধা শিক্ষিত অসমিয়া ওসব রাজ্যে ছুটছে, এই হার বেড়ে গেছে।

এ অবস্থায়, ৩১ জুলাই ফাইনাল তালিকা ঘোষণা হওয়ার আগে বিজেপি সভাপতি ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কী চাচ্ছেন? তিনি চাচ্ছেন মূলত অনির্দিষ্টকালের জন্য ফাইনাল তালিকা ঘোষণা পিছিয়ে দিতে। এই আবেদন আদালতে করা হয়েছে যৌথভাবে, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে। ইতোমধ্যে মিডিয়ায় লোকজন নামানো হয়েছে যেন এই লাইনের পক্ষে কথা বলে [OPINION | Why the Deadline For Final NRC Draft Should be Extended Beyond July 31]। যার সার আর্গুমেন্ট হল, যে তারা খুবই খাটিবাদী। কোনকিছু খাটি না হলে তাদের চলেই না। তাই তারা খুবই সঠিক নির্ভুল একটা তালিকা চান।

তাই, অমিতের কথিত যুক্তি হল, ২০ শতাংশ রি-ভেরিফিকেশন। মানে তালিকায় যাদের উঠানো হয়েছে অথবা বাইরে ফেলা হয়েছে এমন সব ডাটারই ২০% আবার খুলে চেক করা। এই কাজের জন্য তিনি কেন্দ্র্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে (এজি) দিয়ে তিনি যুক্তি দেয়াচ্ছেন যে, এনআরসি তৈরি “আগে কল্পনা করা যায় নাই এমন জটিল কাজ” [“unprecedented large scale of complexities” involved in the NRC process]। তাই এইটা আসামের পাবলিকের ধারণা, এই তালিকা সঠিক নয়। গত বছর প্রকাশিত প্রথম ড্রাফট তালিকাতে আসামের প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। তাই এক শুদ্ধ তালিকা পেতে.২০% ডাটা আবার খুলে চেক করতে সময় বাড়াতে হবে।

এদিকে অনেক রাজনীতিবিদ দাবি করছেন, এই ৪০ লাখের মধ্যে ২৫ লাখই হিন্দু। হতে পারে অমিত শাহের তারিখ পিছাতে চাওয়ার পিছনে এটা একটা উদ্বেগের কারণ। তবে সরকারি হিসাবে ৈ ৪০ লাখের মধ্যে ধর্মীয় ভাগের অনুপাত নিয়ে কিছুই জানানো হয়নি। এই সুযোগে অমিত শাহ এজিকে দিয়ে বলাচ্ছেন যে, ২০ পার্সেন্ট ডাটা আবার চেক করে দেখতে হবে। আর তা বিশেষ করে ঘটাতে হবে সীমান্ত জেলাগুলোতে। মানে বাংলাদেশের সীমান্তে। কারণ সেখানে নাকি (মুসলমান) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কোন তাল-ঠিকানা নেই। এভাবে যেভাবেই হোক বিচারকদের কিছু একটা বুঝ দিয়ে হলেও তারিখ পেছাতে এজি একেবারেই মরিয়া। কিন্তু আদালত এখনো রাজি না হয়ে ২৩ জুলাই তারিখ পর্যন্ত আরও শুনানি – এটা মুলতবি রেখেছে।

ওই দিকে আরেক কাণ্ড ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের স্ক্রোল [SCROLL] পত্রিকা বলছে, তিনি নাকি কোনো স্থানীয় টিভিতে বলেছেন, “যদিও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়, তবু পত্রিকার রিপোর্ট দেখে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে”। এভাবে আমাদের উদ্বিগ্নতা আছে, আবার নাই – এমন মাজা শক্ত না করা হা-না করে কথা বলছি কেন আমরা? এ ছাড়া গত বছর আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইনুর এক বিবৃতির রেফারেন্স দিচ্ছে ভারতের স্ক্রোল অন লাইন মিডিয়া। ইনু বলেছিলেন, “প্রথমত এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আসামের স্থানীয় সমস্যা” [“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। আরো বলেছিলেন, “এ নিয়ে তাই বাংলাদেশের কিছু করার নেই। ভারত সরকার আমাদের সাথে কখনো এ নিয়ে কথা বলেনি। তাই আমাদের কোনো অভিপ্রায় নেই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে তাদের সাথে কথা তোলার”[“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbor”.] আসলে এই কথাগুলো ইনু বলেছিলেন ১ আগষ্ট ২০১৮তে মূলত কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায়। সেটাই রেফারেন্স করা হয়েছে। ঐ বক্তব্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা বাক্যটা হল, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হবার ৪৮ বছর হয়ে গেল কিন্তু ভারত কখনও এনিয়ে প্রশ্ন তুলে নাই, আমাদের সাথে কথা বলে নাই। যার সোজা পরের অর্থ হল,  তাহলে এনিয়ে এখন আসছে কেন?  এর আমরা কিছুই জানি না, সংশ্লিষ্টই নই। কাজেই এখনও যদি কখনও তুলে তাতেও আমরা এটা আমল করব না।

তাহলে ইনুর ইনুর এই কথার পর এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের “আমাদের কিছু উদ্বিগ্নতা রয়েছে” বলার দরকার পড়ল কেন? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।  মোমেন বলছেন, “যারা দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে ওখানে আছে তারা ওদের নাগরিক, আমাদের নয়”। এই কথা থেকে পরিষ্কার, এ কথার চেয়ে আগে ইনুর- ‘এটা আমাদের ইস্যু নয়, কোনো দায়দায়িত্ব নেই’- বলা অনেক ভালো ছিল। সে তুলনায় এখন এক দুর্বল অবস্থান নেয়া হল। কারণ, ভারতে কেউ ৭৫ বা ১০০ বছর ধরে আছে কি না তাতে আমাদের কী? আর তারা কোথাকার নাগরিক তা নিয়ে আমাদের বলারও কিছু নেই। এর চেয়ে বরং “ভারতের কোনো সরকার এ নিয়ে আমাদের সাথে কখনো কথা তোলেনি’- এটাই সবচেয়ে ভালো ডিফেন্স, ভাল যুক্তি ছিল। এক কথায় বললে মোমেনের কথা ইনুর কথা থেকে সরে গেছে। এ ছাড়া বোকা কিসিমের আরেক কথা বলেছেন মোমেন। তিনি বলেছেন, “আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ঝামেলায় আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। বাংলাদেশ দুনিয়াতে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, “We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”]।

এত কেলাস কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত এর আগে দুনিয়া দেখে নাই। আমরা আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিছি তাই আর নিতে পারব না- এটা কি কোনো ডিপ্লোমেটিক কথা হল? এটা কী আরও নিব কিনা সেই কথা উঠে গেছে? প্রথমত, তিনি যেচে শরণার্থী নেয়া-না নেয়ার কথা কেন তুলছেন? ভারত কি এ প্রসঙ্গ তুলেছে আমাদের সাথে? তোলেনি।  ডিপলোমেসি খাউজানি আলাপ না, যে একটু অকারণে চুলকায় নিলাম। এখানে প্রতিটা শব্দ গুরুত্বপুর্ণ ও মাপা ও প্রয়োজনীয় হতেই হয়। আর এরচেয়ে ার এক গুরুত্বের বিষয় “ডকুমেন্ট” বা রেফারেন্স’। আগে কী বলেছি এর বাইরে যাওয়া যাবে না। যখন যেমন এটা তো চলবেই না। তাই এখানে আগে কী আছে এর রেফারেন্স খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এছাড়া মোমেনের কথায় মানে হয়েছে যেন, আমরা যদি কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী না নিয়ে থাকতাম তাহলে কি এখন আসামের শরণার্থী নিতাম- ব্যাপারটা কি এটাই? আবার, দুনিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ না হলে আমরা আসামের শরণার্থী নিতাম, তাই কি? সবচেয়ে বড় কথা, এ পর্যন্ত আমাদের সাথে কখনো ভারতের এ নিয়ে কথা হয়নি- এটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। অথচ প্রশ্ন এবং প্রসঙ্গ না বুঝেই অতিরিক্ত কথা বলা ও অকূটনীতিসুলভ কথা বলা নির্বুদ্ধিতা বটে। তাঁর প্রফেশনাল যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। সম্ভবত তিনি আমাদের আরো বড় বিপদে ফেলে দিবেন!

সর্বশেষঃ
চলতি জুলাই মাসের শুরুতে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের (UN-OHCHR) স্বাধীন এক্সপার্টেরা ভারতের আসামে এনআরসির ততপরতা নিয়ে বিরাট উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে [UN experts: Risk of statelessness for millions and instability in Assam, India]। এনআরসি নিয়ে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আপত্তির পয়েন্ট হল, আসামে নাগরিকত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি ঠিক নয়। কারণ কেউ নাগরিক নয় সেটা প্রমাণের দায় সবখানে হয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু আসামে এটা চাপানো হয়েছে নাগরিকের উপর, [“In nationality determination processes, the burden of proof should lie with the State and not with the individual,” said the experts, noting the discriminative and arbitrary nature of the current legal system.]। তাই এটা বৈষম্যমূলক ও খামখেয়ালিমূলক আইনি ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছে।

লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এটাকে সরাসরি মুসলমানদের টার্গেট করা এক প্রক্রিয়া বলে চিহ্নিত করেছে [India’s hunt for “illegal immigrants” is aimed at Muslims]।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাংলাদেশ কি এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছে? এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

গৌতম দাস

১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার,

আপডেটেড ১৭ জুলাই, ২০১৯ ১৭:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2CP

একালে আপনি কার দিকে? চীন, আমেরিকা নাকি ভারতের? সাথে রাশিয়ার নামটা নিলাম না, সেটা একটু পেছনে পড়েছে বলে। তো চীন, আমেরিকা নাকি ভারত – এই প্রশ্নের জবাব হল – একটাও না। আর সরাসরি বললে, জবাবে এখানে বিকল্প শব্দটা হল “ভারসাম্য”। কারও দিকে ঝুঁকে পড়া না, কান্নি মারাও না – বরং একটা ভারসাম্য। নিজের স্বার্থের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা ভারসাম্য। এই অর্থে এটা ভারসাম্যের যুগ।  চীন, আমেরিকা নাকি ভারত কারো সাথে নয়, এক ভারসাম্য অবস্থান বা ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট- এমন পজিশন নেয়া।

এককালে আপনি কোন দিকে? অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে – আমেরিকা না সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) কোন দিকে অবস্থান নিয়েছে? এটা খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন ছিল। এভাবে ‘আপনি কোন দিকে’ বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বা কলোনি-উত্তরকালে ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়ায় চলতে শুরু করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা আমেরিকার নেতৃত্বে সেকালের নতুন দুনিয়া। তখনো পরাশক্তি বা দুই মেরুতে বিভাজন শুরু হয়নি। সেটা হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। শুরু হয়েছিল গ্লোব-জুড়েই এক ব্লক রাজনীতিঃ সোভিয়েত ব্লক না আমেরিকান ব্লক। এভাবে সেই থেকে ৭০ বছর আমরা পার করে দিয়েছি। ফলে আমাদের মতো দেশের ভাগ্য সেকালে লুকিয়ে ছিল ‘কোন দিকে’ বলে যার যার মতে, এক ভাল ব্লক খুঁজে নেয়ার ভিতরে। আর এই ছিল আমাদের “কোন দিকের” ধারণার জন্ম কাহিনী। এভাবেই চলছিল একনাগাড়ে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর লোকে বলতে শুরু করেছিল যে, দুনিয়া এবার এক মেরু, আমেরিকান মেরুর দুনিয়া হয়ে গেল। কথা হয়তো আপতিকভাবে সত্য, অন্তত সাদা চোখে সবার তো তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলেই তাই কী?

ওদিকে চীনের উত্থানঃ  শুরু হিসাবে ধরলে চীনের উত্থানে আজকের চীন হয়ে উঠার শুরুটা বলা যায় সেই ১৯৬৮ সাল থেকে, যদি না ১৯৫৮ সালের তথাকথিত “সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে” এর শুরু বলে কেউ কেউ না-ই ধরতে চান। না, তথাকথিত লিখেছি, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভুয়া ছিল বা মনে করি কিনা সেজন্য না। লিখেছি কারণ, আসলে সেটা ছিল দলের চিন্তার মূল খোলনলচা বদলে দেয়া এক বদল।  কিন্তু সেটা করা হয়েছিল “সাংস্কৃতিক বিপ্লবের” নামের আড়ালে। ফলে এটা দলের পলিটবুরোর নেতাদের সাথে তৃণমুল কর্মীদের সাংস্কৃতিক ফারাক দূর করার আন্দোলন একেবারেই নয়। বরং সেটা ছিল, পলিটবুরোর নেতাদের সাথে নেতাদের লড়াই। দলের পুরানা অবস্থানের সাথে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের লড়াই। আজকের চীন বলে যেটা দেখছি আমরা এটাই ছিল সেই নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। এমনকি মাওও ছিলেন এটারই পক্ষে।
যাহোক, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভাল না মন্দ সে তর্ক এখানের নয় বলে সেটা এখন এড়াতেই মূলত ১৯৬৮ বলেছি। যেখানে ১৯৬৮ সাল হল যখন আসলে “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” শেষে তা বিজয়ী ও মোটামুটি থিতু হবার কাল। তবুও দুনিয়া জুড়ে চীন আজকের এজায়গায় যেতে রওয়ানার এটা কোন ইঙ্গিত কিনা এমন আলোচনা কোথাও ছিল না। এর চেয়েও তখন মুল আলোচ্য ছিল কথিত “চীনা সমাজতন্ত্র” কোথায় যাচ্ছে।
এমনকি ১৯৬৮ সালই বা কেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৮ সালেও খুবই কম একেবারেই হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া কেউ বুঝেনি যে, সেটাই আজকের চীন হওয়ার শুরু। অথচ চীনের কাছে ১৯৭১ সাল মানে আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি অনুসারে, ওর সাহায্যে চীন মানে মাও সে তুংয়ের চীন, সেই প্রথম জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর এটা ছিল ভেটো দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটা সদস্যপদ। অনেকের কাছে তথ্যটা আজব লাগতে পারে কিন্তু এই তথ্য শতভাগ সত্য। কারণ, জাতিসংঘে এই সদস্যপদ এত দিন (চীন বলতে) তাইওয়ানকে দিয়ে রাখা ছিল। আর সেটাই ১৯৭১ সালে সেবার তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মাওয়ের চীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল, আমেরিকার সাথে চীনের গোপন আলাপের ফলাফল অনুসারে। গোপন বলছি এজন্য যে ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জার [Henry Kissinger] গোপনে প্রথম “মাওয়ের  চীন” সফর করেছিলেন, আর সেখানেই ভেটোওয়ালা সদস্যপদ ফেরত পাবার বুঝাবুঝিটা তৈরি হয়েছিল।

আরও ওদিকে ১৯৭৮ সালঃ এটা উল্লেখযোগ্য এ জন্য যে, মোটাদাগের সব দেনা-পাওনা [চীন আমেরিকান পুঁজি, বিনিয়োগ ও পণ্য ইত্যাদি নিজ বাজারে প্রবেশ করতে দিবে। এতে বিনিময়ে কী কী নিবে এরই দেনা-পাওনা] ডিল সম্পন্ন করে চীন-আমেরিকা উভয় রাষ্ট্র পরস্পর পরস্পরকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে উভয়ে একে অন্যের দেশে অফিস খুলে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ সাল থেকে। এভাবে পরবর্তিতে ১৯৯০ পর্যন্ত চীন ছিল আসলে আমেরিকান পুঁজি ও টেকনোলজি কিভাবে ব্যবহার করবে এর, আর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি ও গ্লোবাল বাজারে প্রবেশ করে চীনের নিজেকে অভ্যস্ত, সাজানো ও খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রস্তুতিকাল। আর এরও পরের প্রায় ২০ বছর ধরে চলে চীনের অর্থনৈতিক ডাবল ডিজিট (বা সময়ে এর চেয়েও বেশি) উত্থানের পর্ব। তবে ২০০৭ সালে গ্লোবাল রিসেশন শুরু হলে তা কমতে থাকে। তত দিনে আমেরিকা বুঝে গেছিল যে, চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার দিকে, তাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
তাই ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমেরিকা আগে তা জানত না বা অনুমান করেনি। আসলে বিষয়টা ছিল জেনেও কিছুই করার নেই ধরণের পরিস্থিতি। গ্লোবাল পুঁজির এক আপন স্ববিরোধী স্বভাব এটা। চীনের জনসংখ্যার শত কোটির ওপরে (২০১৮ সালের হিসাবে ১৪২ কোটি)। এমন দেশে সত্তরের দশকেও সে ভার্জিন এই অর্থে যে তখনও সেখানে কোন বিদেশি বিনিয়োগ যায় নাই। তাই এর বাজার খুলে দিলে এর বিদেশি পুঁজি পাবার আকাশচুম্বি চাহিদা পুরণ করতে বাইরের সকলে ঝাপিয়ে পড়বে। মানে উলটা করে বললে ওয়ালস্ট্রিটের চোখে এত বড় ক্রেতা সে জীবনেও কল্পনা করে নাই। তাই চীনে বিদেশি বিনিয়োগে বাজার চাহিদা ধরতে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট একে উপেক্ষা করা কথা চিন্তাও করতে পারে না।  তাই আমেরিকান পুঁজিতে চীন ফুলে-ফেঁপে উঠতে থেকেছিল ১৯৯০ সালের আগেও,  তবে ১৯৯০ সালের পরে আরও প্রবলভাবে। এটা জানা সত্বেও যে এই পুঁজি চীনে ব্যবহৃত হবার পরে যে নতুন উদ্বৃত সঞ্চয় ও সম্পদ তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য আমেরিকাকে পিছনে ফেলে দিবে এবং চ্যালেঞ্জ করবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে চীনে প্রবেশের সুযোগ আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট উপেক্ষাও করতে পারে নাই কারণ উপেক্ষা করলে তাতে তার নিজের মরণ। মূল কথা, সব সময় নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগের ভিতরই কেবল আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট এর জীবন। তাই নতুন শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা জেনে যায় চীন উঠে আসতেছে। এটা দেখেই বুশের আমলে, ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এবার চীন ঠেকানোর [China Containment] কৌশলের তোড়জোড়। প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর (২০০৬ মার্চ) থেকে ভারত আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর কাজ হাতে নেওয়ার ব্যাপারটা আর একধাপ আগিয়েছিল। আর তখন থেকেই ধীরে ধীরে আপনি কোন দিকে অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে, সেটা বুঝতে পারা ও জবাব দেয়া আর আগের মত সহজ থাকেনি। কেন?

আপনি কোন দিকে, এর জবাব দেয়া শুরুর সেকালে সহজ ছিল। কারণ, আমেরিকা নাহলে সোভিয়েত – এদুটোর কোন একটা মেরু বা পরাশক্তি আপনি বেছে নিলেই হত। কিন্তু একালে ব্যাপারটা আর মেরু বা পরাশক্তি-কেন্দ্রিক বিষয় নয়। যেমন – আপনি কোন দিকে চীন, আমেরিকা নাকি ভারত? এই প্রশ্নের মধ্যে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কাউকে পরাশক্তি গণ্য করা নাই বা হয়নি। একালে কেউ পরাশক্তি কি না তা এখানে মুখ্য বিষয়ই নয়। মুখ্য বিষয় গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা বা নেতৃত্ব কার, সেখানে। ফলে তা আসলে এখন মূলত পুরনো নেতা আমেরিকার জায়গায় নতুন হবু নেতা চীনের যোগ্য হয়ে দখল নেয়ার ইস্যু।

এই হিসাবে এখানে নেতা বা কেন্দ্র দুইটা – চীন ও আমেরিকা। তাহলে, সাথে ভারতের নামও আসছে কেন? কারণ, ভারত আমেরিকার হয়ে সে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটত। প্রতিদান হিসেবে পেয়ে গেছিল বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান ছড়ি ঘুরিয়ে মাতবরি। এছাড়াও আর একটা দিক হল, চীনের প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যার দেশ হল ভারত। ফলে এখনই না হলেও ভারত পটেনশিয়াল বা আগামীর সম্ভাবনা ভাল, এমন অর্থনৈতিক হবু শক্তি; এতটুকুই। তাতে সব মিলিয়ে ভারত ভেবেছিল এভাবেই দিন যাবে “চীন ঠেকানোর” বোলচালের মধ্যে থাকবে আবার চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ খুললে তাতে চীনের পরই বড় মালিকানা শেয়ারটা চীন ভারতকেই দিবে। ব্যাপারটা সেই কবিতার মতো যেন বলছে – “এভাবে কি দিন যাবে তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে অথচ তোমার কথা না ভেবে!’ ভারত আগামি গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা চীনের কোলে শুয়ে অথচ আমেরিকার কথা ভেবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারবে – তাই ভেবেছিল।
কিন্তু না একালে দিন তেমনভাবে যায়নি। যাওয়ার কথাও ছিল না। এখন ফলাফল হল বাংলাদেশ আমেরিকার হাতছাড়া, উল্টা বাংলাদেশ এখন ভারতের কোলে, সেটা সত্য। কিন্তু ওদিকে আবার ট্রাম্পের আমলে এসে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটাতে ট্রাম্পের আমেরিকাই আর আগ্রহী নয়। উল্টো চীনের মত ভারতের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প বাড়তি শুল্ক আরোপের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। যেখান থেকে ভারত আবার মোচড় দিয়ে নিজের আত্মগরিমা আর ট্রমা-ভীতি পেছনে ফেলে চীনের কোলে য়ুহান সামিটে হাজির। বলা হচ্ছে, ওই য়ুহান সম্মেলন সেখানে এমন কিছু মৌলিক বোঝাবুঝির ভিত্তি নাকি তৈরি হয়ে গেছে, যা আরো বিকশিত বা বাড়তে না পারলেও নাকি পিছাবে না। আমেরিকার সাথে ভারতের পরস্পরের পণ্য অন্যের যার যার বাজারে ঢুকার বিরুদ্ধে উভয়েরই বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ফলে – এটা দুদেশেরই রপ্তানি প্রায় স্থবির করে ফেলেছে। গতমাসে জাপানে জি২০ এর বৈঠকের ফাঁকে সাইডলাইনে ট্রাম্পের চাপ বা হুমকি – মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্কারোপ গ্রহণযোগ্য নয় – এসবই একালের পরিণতি।

কিন্তু ট্রমা- ভারতের ট্রমা [Trauma] সে ব্যাপারটা কী? বিষয়টা হল, ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের হার, এটাই তাকে বারবার বেচাইন অস্থির করে যে যদি একালে আবার সেটা হয়, এটি ভীতিই ভারতকে বারবার আমেরিকার দিকে টেনে নিয়ে যায়। চীন আগামির ফ্রেশ গ্লোবাল নেতা, তুলনায় আমেরিকা ক্রমশ ডুবে যাওয়া নেতা – এটা ভারতের অজানা নয়। তাই আমেরিকার চেয়ে আগামি নেতা চীনের সাথে আগেই গাটছাড়া বাধলে গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রভাব প্রতিপত্যি আগেই বাড়বে শুধু তাই না, আগামি দুনিয়ার যা কিছু নতুন রুল তৈরি হবে তা তৈরিতে নিজের ভুমিকা মতামত আগেই চীনের পাশাপাশি জোরদার করে রাখতে সুবিধা পাবে।  কিন্তু ট্রমার জন্য ভারত আমেরিকার দিকেই বারবার ফিরে আসে, কান্নি মেরে পরে থাকে। অর্থাৎ বলা যায়, ভারত আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ককে ভারসাম্যের জায়গা থেকে দেখে না, দেখতে পারে না। বরং আমেরিকাকে পুরনো পরাশক্তির আলোকে দেখতে চায়। কিন্তু চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব তো পরাশক্তিগত নয়। তবু ভারত আমেরিকার দিকেই কেবল ছুটে যায়। এছাড়া সবখানেই ভারতের গাছের খাওয়া আবার তলারও খেতে চাওয়ার নীতি তো আছেই। আবার তাতে সময়ে ধরাও খায়। যেমন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ট্রাম্প নিজের আফগান পলিসি প্রকাশ করেছিলেন। এতে পাকিস্তানকে সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেবার অভিযোগ দিয়ে সাজানোতে ভারত আবার তাতে ছুটে গিয়েছিল মোহে। কিন্তু না! ছয় মাস যেতেই জানা গেল ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে শেষ হাজার দশেক আমেরিকান সৈন্য, তাও এবার ফেরত আনতে চান। অথচ আফগান নীতিতে এর কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। যা হোক, সৈন্য ফেরতের চিন্তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেখল, পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া তা অসম্ভব। ফলে যে পাকিস্তানকে আমেরিকা চীনের কোলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, তাকেই আবার কুড়িয়ে নেয়া শুরু করেছিল।

আমেরিকার আফগানিস্তান-বিষয়ক বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ [U.S. envoy Zalmay Khalilzad ] এই সেই বিশেষে দুত যিনি ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রকাশের সময় পাকিস্তানের কঠোর সমালোচক, উঠতে বসতে সন্ত্রাস লালনকারী বলেছিল। সেই তিনি এবার সৈন্য ফেরানোর উপায় হিসেবে তালেবানদের সাথে কথা বলা আর রফাচুক্তি করার চেষ্টায় পাকিস্তানের সহায়তা কামনায়  এসে এবার পাকিস্তানকেই প্রায় বাপ ডাকা বাকি রেখেছে।  এরই সর্বশেষ হল আজ ১৫ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে “আফগান শান্তি আলোচনা থেকে ভারতকে কুনুই মেরে বের করে দেয়া হয়েছে” [India elbowed out of Afghanistan peace talks]।

আবার, সাম্প্রতিককালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান “ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স” [Financial Action Task Force (FATF)] প্রবল সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এই সংগঠন মূলত মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার যার একটা বড় অংশ জঙ্গিসংগঠনের অর্থ যোগানদাতা বলে অনুমানে এরই কাউন্টার করতে নানান পদক্ষেপ নিয়ে থাকে ও তা মনিটর করে। এতে আমেরিকার উদ্যোগে পাকিস্তানকে চেপে ধরাতে [পাকিস্তানের অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুতিমত তা নেয় নাই। তারিখ মিস করেছে।] ভারত খুবই খুশি ছিল। নিজ মনকে আশ্বস্ত করেছিল ভারত যে, হ্যাঁ অন্তত এই টেররিজম ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার এই অ্যালায়েন্স, এটাই তো ভারত চায়। এটা খুব দরকারি আর কাজেরও। এবং তারা দুই-রাষ্ট্র কত ভাল এবং তার টেররিজম ইস্যুতে একটা ন্যায্য লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। তাই তারা পাকিস্তানের মত নয়। অনেক ভাল। কিন্তু ঘটনার বাস্তবতা হল, এমন টেররিজম ইস্যু বলে আসলে বাস্তব দুনিয়াতে সত্যিকারের কিছুই নেই। টেররিজম কী, কোনটাকে বলবে, কী হলে বলবে এর এমন সংজ্ঞাই নাই – না আমেরিকার নিজের কাছে, না জাতিসংঘের। কেবল এক তালিকা আছে, কাদেরকে বা কোন সংগঠনকে তারা টেররিস্ট মনে করে। আর সেই থেকে বরং টেররিজম বলতে ভারত-আমেরিকা নিজেরা কী বুঝবে ও বুঝাবে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে “গভীর বোঝাবুঝি” আছে অবশ্যই। কাকে টেররিজম বলে চালিয়ে দিবে – সেটাই আসল সেখানে। যেমন- ২০০৭ সালে যা বলা হয়েছিল ওর সারকথা ছিল যে, বাংলাদেশকে টেররিজম মোকাবেলার যোগ্য করে সাজাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। অথচ এই “টেররিজম” কথাটি ছিল এক সাইনবোর্ড মাত্র। ভারতের মূল স্বার্থ ছিল আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাতে, তা ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা আর কলকাতা থেকে নর্থ-ইস্ট সরাসরি যোগাযোগের নানান করিডোর হাসিল করা।  সেকাজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর এককভাবে হাসিল করেছে ভারত। এখানে এককভাবে কথাটার মানে হল, করিডোর কেবল ভারতই ব্যবহার করবে, চীন পারবে না। এছাড়া সেই সাথে ভারত পুরা বাংলাদেশের বাজার দখল পেয়ে নিবে।  সার কথা ভারত কেবল “কানেকটিভিটি” “কানেকটিভিটি” বলে চিৎকার করবে, মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। কিন্তু এর মানে হবে বাংলাদেশের উপর দিয়ে কেবল ভারতই যাবে। কিন্তু ভারতের উপর দিয়ে কেউ যদি বাংলাদেশে আসতে চায়, আমরা যেতে চাই – না সেটা সে পারবে না। সেটা নেপাল, ভুটান কিংবা চীন এমন পড়শি কেউ যেই হোক তারা বাংলাদেশে আসতে পারবে না বা আমরাও যেতে পারব না। আর ভারত সব পাবার বিনিময়ে  আমেরিকার স্বার্থে ভারত এবার  “চীন ঠেকানোর” কাজে অবস্থান নিয়ে ভাড়া খাটবে। তাহলে দাঁড়াল যে এই হল ভারত-আমেরিকার টেররিজমের সংজ্ঞা ও বিশেষ বুঝাবুঝি। আর সেই সাথে সীমান্তে বাংলাদেশি মেরে শেষ করে চলবে। কিন্তু? হা আরও বিরাট “কিন্তু” তৈরি হয়েছে এখন।

ভারত-আমেরিকার এই “বিশেষ টেররিজম-বুঝের” সাইনবোর্ড তাদেরকে অনেক কিছু এনে দিয়েছিল, বিশেষ করে তাতে ভারতের  আস্থা ছিল দৃঢ় ও গভীর। কিন্তু টেররিজম-বুঝের সাইনবোর্ড এখন তা করলার চেয়েও তিতা। কেন? বালুচিস্তান!

বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা পাকিস্তান থেকে আলাদা স্বাধীন হতে চাওয়ার আন্দোলন অনেক পুরনো। কিন্তু এতে পাকিস্তান সরকারের সাথে কোনো নেগোসিয়েশন বা রফা-পরিণতিতে না যেতে পারার পেছনে একটা বড় কারণ হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এই আন্দোলনের দলকে [(বিএলএ), Baluchistan Liberation Army (BLA)) প্রায় খোলাখুলি সহায়তা ও সমর্থন। কিন্তু এবার এক বিরাট কিন্তু হল,  গত ২ জুলাই আমেরিকা পররাষ্ট্র দফতর বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট [Specially Designated Global Terrorists (SDGTs)] বলে ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের এক নির্বাহী নির্দেশে এটা জারি করা হয়েছে গত সপ্তাহে, ০২ জুলাই।

পাকিস্তানে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে (বিএলএ) বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ২০০৬ সালে এই সশস্ত্র গ্রুপটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। বলাই বাহুল্য, এবারের ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে চীন ও পাকিস্তান উভয়ে স্বাগত জানিয়েছে। অথচ চিপায় আটকা পড়ে ‘কোথাও নেই’ হয়ে গেছে ভারত। বিএলএ-কে টেররিস্ট বলায় এতে চীনেরও স্বার্থ ছিল সরাসরি। কারণ, পাকিস্তানের পেট চিরে পাকিস্তানের সব প্রদেশ ছুয়ে তাদের উপর দিয়ে টানা “চীন-পাকিস্তান করিডোর” [CPEC] স্থাপনার কাজে চীনা ঠিকাদারের কর্মীরা বারবার বিএলএ’র হাতে অপহরণের বা চাঁদা দানের শিকার হয়েছে বহুবার, চলতি শতকের শুরু থেকেই। সেসময় মনে করা হত, চীন-পাকিস্তানের এমন সহায়তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ভারত  (বিএলএ)কে সহায়তা দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই নির্বাহী নির্দেশের পরে? আরও আছে!

ট্রাম্পের বিএলএ-কে শুধু টেরর ঘোষণা করা নয়, আগামী ২২ জুলাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-ইমরানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার এক ঘোষণাও দিয়েছে হোয়াইট হাউজ, গত ১১ জুলাই। মানে ব্যাপারটা এক কথায় বললে আমেরিকার নিজের কৌশলগত অন্য কোনো স্বার্থে – এককালে আচারের আঁটির মতো চুষে রস খেয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া পাকিস্তানকে আবার এবার সমাদরে কোলে তুলতে চাইছে আমেরিকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এখানেও (বিএলএ)কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়া আসলে কোন টেররিজম ইস্যু নয়, সাইনবোর্ড মাত্র; আমেরিকার কৌশল্গত স্বার্থ মাত্র, যা আগে বাংলাদেশের মতোই। তাহলে ভারতের এখন এতে বাকশূন্য বোকা হয়ে যাওয়া কেন? যাকে কেউ কেউ বলছে তিতা ওষুধ খাওয়া। কারণ হল, ভারতের কাশ্মিরে সরকারি টেররিজমের নিপীড়ন ও হত্যার পক্ষে এতদিন ভারতের পক্ষে একটা ন্যায্যতা বা সাফাই জোগাড় করে দেয়া হয়ে যেত এই বলে যে, টেররিজমের একক হোতা হল পাকিস্তান বা মুসলমানরা। কিন্তু আমেরিকার বিএলএ-কে টেররিস্ট ঘোষণা করাতে এবং  ঘোষিত সেই দলকে খোদ ভারতই সমর্থন করত বলে ভারত হয়ে গেল এখন টেররিস্ট-সমর্থক রাষ্ট্র ; আমেরিকা পরোক্ষে এবার তাই বলে বসল।

তাহলে এখান থেকে কী শিক্ষা? শিক্ষাটা হল, চলতি এযুগ গ্লোবাল নেতৃত্বের বিশেষত, অর্থনৈতিক নেতৃত্বের নেতা বদলের যুগ এটা। আবার খেয়াল রাখতে হবে, এটা সোভিয়েত-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়। ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা কথাটা বুঝতে হবে। সেকালে এর মানে ছিল এক ব্লকের কোনো রাষ্ট্রেরই অপর ব্লকের কারো সাথে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক রাখত না, হারাম মনে করত, তাই সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না।

অথচ এ কালে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যতই ঝগড়া বা রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধই থাক না কেন- সেখানে একই সাথে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে সব বিনিময় লেনদেন-বাণিজ্যও সমানে চলে থাকে। অতএব, এ কালের ফর্মুলা হল সবার সাথেই নিজস্বার্থ মুখ্য করে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে লেপটে থাকা। তাই চীন, না আমেরিকা, নাকি ভারত এভাবে কারও দিকেই এককভাবে কান্নি মেরে থাকা যাবে না। এটা আবার শর্টকাট কোনো ন্যাশনালিজমের মত তা ভেবে বসাও ভুল হবে।

কাজেই আপনি ভারতের দালাল – নিজভূমিতে অন্যকে করিডোর দিয়েছেন, বাজারসহ সব খুলে দিয়েছেন এমন ভারতের দালাল, নাকি আপনি চীনের বিনিয়োগ এনে সয়লাব করেছেন সেই চীনা দালাল- এ দুটোই ভুল পথ। এমনকি এ দুইয়ের ভয়ে আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছেন, এটাও ভুল। বরং তিনের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে হবে কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণভাবে। এককভাবে কারো সাথে সম্পর্ক [এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ সম্পর্ক, বন্ধুরাষ্ট্র ইত্যাদি সব] একালে হারাম, বরং কার সাথে কতটুকু যাবেন তা আগেই নিজ বোঝাবুঝি ঠিক করে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তা বলা যেতে পারে, কখনো বলা যাবে না, কাজে দেখাতে হবে। কিন্তু নিজে কী করবেন সেই নিজ হোমওয়ার্ক অবশ্যই আগে করে রাখতে হবে।

সোনাদিয়ায় বন্দরসহ বিসিআইএম করিডোর নির্মাণ আমাদের কৌশলগত মৌলিক স্বার্থ। অথচ ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্যে রাখতে এটা কমপক্ষে ১০ বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রাখা হয়েছিল। আমাদের ‘নিশীথ ভোটের’ পরবর্তীকালে এ থেকে পরে পাওয়া দিকটা হল, এটা উন্মোচিত হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় আসার জন্য কারোই আর ভারতের সমর্থন জরুরি বা এসেনশিয়াল নয়। আবার আমেরিকাও এখন বিষহীন ঢোঁড়া সাপে পরিণত। আর বিরোধী দলসহ সারা দেশের মানুষ আজ ভারতকে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা দানব মনে করছে। ফলে তারা ভারতবিরোধী। লক্ষ্যনীয় যে এবারই প্রথম এই ভারতবিরোধিতা পুরাপুরি রাজনৈতিক, এ টু জেড রেখা টানতে পারবেন। তাই এটাই তো হাসিনার জন্য ছিল সব উপেক্ষা করে নিজস্বার্থে চীন সফরের সবচেয়ে ভালো সময়। শেখ হাসিনা যা বুঝেই নিয়ে থাকেন না কেন, এক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ওদিকে এতে চীনা প্রতিক্রিয়া বা সাড়া ব্যাপক। তারা আশাতীত খুশি যে, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। চীনা গ্লোবাল টাইমস তিনটারও বেশি আর্টিকেল ছেপে উচ্ছসিত। হাসিনাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, বাংলাদেশ বেল্ট-রোড আর বিসিআইএম [BCIM-EC] করিডোরে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, Hasina in balancing act between China, India। [এই রিপোর্টের শেষেই সবগুলো খবরের লিঙ্ক পেতে পারেন]।

তারা আসলে আরও খুশি এ জন্য যে, বিসিআইএম প্রকল্প জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এতে বা বেল্ট রোডে ভারত যোগ দেবে হয়তো কোনো এক কালে, আমেরিকার হাতে কোনো পরিস্থিতিতে চরম নাকানি-চুবানি খাওয়ায় বিধ্বস্ত হওয়ার পরে। কিন্তু কথাটা তারা ইতিবাচকভাবে লিখেছে।  সেকথা আমাদের ইউএনবি বার্তা সংস্থার বরাতে ভারতের দ্যা হিন্দু পত্রিকা বিরাট করে লিখেছে [“the initiative would have to be revived working together with India,” the United News of Bangladesh (UNB) reported on its website.]।

প্রথম আলোতে চীন সফরঃ
তবে হাসিনার চীন সফর প্রসঙ্গে প্রথম আলোর ভুমিকা খুবই নেতিবাচক। প্রায় সময় সে আমেরিকান অবস্থান নিয়ে খবর হাজির করে থাকে। এবার আমেরিকার হাসান ফেরদৌস যে লেখাটা লিখেছে সেটা অর্ধ সত্য বা পুরাই অসত্য। আর তা আমেরিকার তো বটেই, ভারতেরও কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে লেখা। মূলত তিনি কোন যুক্তি বলা ছাড়াই, চীনবিরোধী। এই খামতি তিনি পুরণ করতে, আশির দশকের চিন্তায় ও তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আবার ভারতীয় প্রপাগান্ডা খেয়ে লিখছেন, ভারত নাকি আমাদের চীনের মতই ঋণ দিয়ে অবকাঠামো গড়ে দেওয়ার সঙ্গী। যেমন লিখছেন, “চীন ও ভারত দুই দেশই আমাদের অবকাঠামো খাতে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে”। কিন্তু ভারত কোন অবকাঠামো আমাদের গড়ে দিয়েছে? নিজস্বার্থে করিডোরের কিছু অবকাঠামো গড়ে নেয়া ছাড়া? তা আমাদের জানা নাই। যেমন ভারতের বহরমপুর জেলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে আসাম – এই তেল পাইপ লাইন স্থাপন কী বাংলাদেশের স্বার্থে্র অবকাঠামো? ভারতের টাটা আর লিলেন্ড গাড়ি, আমাদের বিআরটিসি- এর ঘাড়ে ডাম্প করতে কোন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এটা করা হচ্ছে। আর এতে দেখানো হয় যে ভারত আমাদের ঋণ দিয়েছে এই গাড়ি কিনতে। অথচ ব্যাপারটা উলটা, ভারতের রুগ্ন ইস্পাত শিল্পকে বাঁচাতে ভারত সরকার ওসব গাড়ির দাম আগেই শোধ করে কোম্পানিগুলোকে বাঁচায়। এরপর কেনা সেই গাড়ি ভারত সরকার আমাদেরকে ঋণে বিক্রি করেছে বলে কাগজপত্রে দেখায়। এই হল “অবকাঠামো ঋণ”!
এছাড়া ভারত কী কাউকে অবকাঠামো ঋণ দিতে সক্ষম এমন অর্থনীতির রাষ্ট্র? নাকি ভারত এখনো মূলত ঋণ নেওয়ার রাষ্ট্র? কাজেই ভারত আমাদের অবকাঠামো গড়ে দেয়, এসব আজগুবি তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? এগুলো তো ভারতের প্রপাগান্ডা দালালি! আজীব! এছাড়া লেখার শিরোনামসহ তিনি হাসিনা সম্পর্কে আনন্দবাজারি স্টাইলে লিখছেন, হাসিনা নাকি “চীনা তাস” খেলতে গেছেন। যেন এক বিনোদন রিপোর্ট লিখতে বসেছেন।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সম্পর্কে লিখছেন, “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” সেজন্যই নাকি এই বন্দর নির্মাণ হয় নাই। আবার নিজেই বলছেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সে (সোনাদিয়া) উদ্যোগ ভেস্তে যায়”। এই তথ্যও ভিত্তিহীন কারণ, যুক্তরাষ্ট্রকে হাসিনার “বিকল্প কিছু” দেওয়াতে সোনাদিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এতে কোন আপত্তি নাই। আপত্তি একমাত্র ভারতের।  আবার “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” – এই কথা সত্যি হলে তাহলে আর হাসিনা চীন সফরে গেলেন কেন? কী বিনোদন কাটাতে গেছিলেন? তাহলে চীনে গিয়ে আবার [BCIM-EC] প্রকল্প শুরু করতে আলাপ তুললেন কেন? সে ব্যাখ্যা কই?
আর [BCIM-EC] প্রকল্পতে যদি বন্দরসহ প্রকল্প এটা নাই হয় তবে এটাকে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পে যুক্ত হবার এক “করিডোর” ভাববার তো কোন সুযোগই নাই। কাজেই বন্দর-ছাড়াই BCIM-EC প্রকল্প, এমন ভাবনা তো আসলে ভারতের অবস্থান। তাও পুরানা অবস্থান। সম্প্রতিকালে সেঅবস্থান থেকে ভারতের নড়াচড়ার আলামত দেখাচ্ছে। আসলে হাসিনার চীন সফর নিয়ে কিছু বলার জন্য নুন্যতম তথ্য নিয়ে পড়াশুনা বা নাড়াচাড়ার দরকার তা ফেরদৌসের কাছে নাই, ফাঁকিবাজ ছাত্রের মত যার হোমওয়ার্ক নাই।

আরও আজিব কান্ড তিনি পায়রা বন্দরকে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের বিকল্প বলে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পায়রা চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে একটু বড় মাত্র। এছাড়া ড্রাফট বা গভীরতার লিমিটেশন, মানে বড় জাহাজ ঢুকানোর লিমিটেশন আছে, তাই একে গভীর সমুদ্র বন্দর বলতে অনেকের দ্বিধা আছে। আরও পরিকল্পনাগত বিরাট ত্রুটি হল,  সারা বছর এই বন্দরের প্রবেশ অংশকে নাব্য রাখতে হলে সারা বছরই একে ড্রেজিং করে যেতে হবে। সোনাদিয়া লোকেশনে ড্রাফট যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই ১৮ মিটার। তাই আমেরিকার চোখেই বাংলাদেশের দুটা বিস্ময়কর অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প হল, পায়রা আর রূপপুর। এককথায় বললে, চীন ঠেকানী মুডের ভারতের মান-মন রাখতে ‘পায়রা’ আসলে এক অর্থহীন, টাকা পানিতে ফেলা প্রকল্প।

হাসান ফেরদৌসের আজগুবি তথ্য আরও আছে। তিনি বলেছেন, এবার এপ্রিলে চীনে “বেল্ট-রোড সামিটে নাকি প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম নেতৃত্ব দিতে” গিয়েছিলেন। এটা ভুল তথ্য। বরং প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে গেছিলেন কোন প্রতিমন্ত্রী না বরং ফুল মন্ত্রী। আর সেই মন্ত্রী হলেন, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন । যেটা গওহর রিজভিও নিশ্চিত করেছেন পাবলিকলি। আর হংকংয়ের পত্রিকায় সাক্ষাতকার শাহরিয়ার আলম দিয়েছিলেন কথা সত্য কিন্তু, কোথায় বসে তা অস্পষ্ট। ঢাকায় বসেই খুব সম্ভবত, এবং তা ভারতের আয়োজনে। খুব সম্ভবত ঠিক সেসময়ের দ্বিধাগ্রস্থ হাসিনাকে চাপ দিয়ে কাজে লাগিয়ে। যেটার পুরা পরিস্থিতি বদলে যায় চীনা রাষ্ট্রদুতের উদ্যোগে ফলে, বিশেষ করে বিএনপিকে -সহ  স্থানীয়ভাবে সরকার, রাজনীতিক, সাংবাদিক ইত্যাদি নানান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে “বাংলাদেশ-চীন সিল্ক রোড ফোরাম” গঠন করে ফেলার পরে; হাসিনা তখন থেকেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
এখন কথা হল, প্রথম আলো এমন আধা-সিদ্ধ লেখা ছাপাচ্ছে কেন? লেখকের পরিচয় হিসাবে তাঁর লেখার নিচে লেখা থাকে, ” হাসান ফেরদৌস, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি”। অর্থাৎ এটা অপিনিয়ন বা কোন গেস্ট লেখকের কলামও নয়, প্রথম আলোর নিজের স্টাফ রিপোর্ট। তাহলে প্রথম আলো, সে কার পক্ষে থাকতে চায়? ভারত বা আমেরিকার সমর্থনে ভারতের পক্ষে? প্রথম আলোর ম্যানেজমেন্ট কী এগুলো দেখে নাই, জানে না? অদ্ভুত ব্যাপার! তবে একটা জিনিষ আমরা পরিস্কার থাকতে পারি। এমনটা চলতে থাকলে আগামিতে বড় কাফফারা দিতে হবে।

কিন্তু কথা হল, তাতে চীন ভারতকে যতই সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ডালি চীন বা বাংলাদেশ যতই সাজিয়ে রাখুক না কেন অথবা বিসিআইএম প্রকল্পে ভারতের যোগদানের দরজা খুলে রাখুক না কেন – এতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি খুব সহজ নয়। আবার তা অসম্ভবও নয় নিশ্চয়। আবার এটা হতেও পারে যে, দেখা গেল ট্রাম্পের বাকি আমলের (জানুয়ারি ২০২১) মধ্যেও মোদী সিদ্ধান্ত নিতেই পারলেন না। [একটু আগের খবর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ভারত সফরের (এটা গত বছর চীনে মোদীর “য়ুহান সামিটের” পাল্টা সমতুল্য সফর)] তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও তা সেই অক্টোবর ১২ তারিখে। অর্থাৎ বুঝা গেল মোদীর তেমন তাড়া নাই।  যদিও অনেকে অবশ্য বলছেন, গত জুন মাসে কাজাখস্তানে সাংহাই করপোরেশনের [SCO] শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানে ঐ সম্মেলনের এক যৌথ ঘোষণা থেকে বেল্ট রোড প্রকল্পের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়। আগে এমন হলে, তাতে ভারতের আপত্তি আছে বা অংশগ্রহণে ভিন্নমত আছে বলে তা সাথে উল্লেখ থাকত। এবার তেমন কিছুই দেখা যায়নি। অনেকে এর অর্থ করছে যে, ভারত সম্ভবত এখন থেকে এতটুকু সরেছে যে সে বেল্ট-রোডের প্রসঙ্গটা গ্রহণও করেনি আবার বিরোধিতাও করেনি, এমন অবস্থায় এসেছে – আগের আপত্তির জায়গা থেকে সরে এসে।

তবুও এতে তেমন আশাবাদী না হওয়ার অন্য কারণ হল, যে হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা তুলে মোদি আবার ক্ষমতায় এসেছেন তা হলো চরম মুসলমান বিরোধিতা, যেটা পারলে ভারত থেকে প্রায় মুসলমান জনগোষ্ঠিকে মুছে নির্মুল করে ফেলার এক আকাঙ্খা যেন, যার মানে মুসলমানের কারণে পাকিস্তান বিরোধিতাও। কিন্তু এই ডিভিডেন্ড বা বাড়তি লাভ মোদী সহসাই লঘু করতে চাইছেন না। আগামী পাঁচ বছরজুড়েই ভারতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ রাজ্য করে নির্বাচন হবে। তাই এই একই মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুত্ব মোদীকে ব্যবহার করে যেতে হবে। এ ছাড়া বাবরি মসজিদ মন্দির বানানো, আসামসহ সারা দেশে নাগরিকত্ব পরীক্ষার নামে মুসলমান খেদানো, পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে সেসব রাজ্যসরকার দখল, কাশ্মিরে চরম বলপ্রয়োগে একে  কনষ্টিটিউশনালি ভারতের অঙ্গ করে নেয়া; এমন অনেক কিছু মোদির কর্মপরিকল্পনার তালিকায় আছে।

এদিকে যদিও ঐ সাংহাই করপোরেশন মানে হল, যেখানে চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া আর, ভারত-পাকিস্তানও এর সদস্য। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ‘টোন-ডাউন’ করা মোদীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর হলেন মোদী – এই বোলচাল মিথ্যা হলেও নিজের এই নির্বাচনী ইমেজে তিনি জিতেছেন তাই এটা তিনি আবছা হতে দেবেন না। যদিও ওদিকে আবার মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে এবার আমেরিকা ভারতের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নাই এটা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে মুখোমুখি।

অতএব, ভারতকে বাদ রেখে বন্দরসহ বিসিআইএম প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। ভারতের জন্য অপশন খোলা থাকবে, যার ফাইন্যান্সিয়াল দায়ভারসহ যুক্ত হতে চাইলে ভারত সে সুযোগ নিতে পারবে। কারণ, ভারত সহসাই প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে, এমন আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিন।

শ্রীলঙ্কা ড্রামাঃ
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা এক নতুন ড্রামার মঞ্চস্থল হয়ে উঠেছে। এম ভদ্রকুমার হলেন ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত। তিনি তার কলামে হাসিনার চীন সফর সফল ও বিরাট অর্জন বলে প্রভুত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আবার  লিখেছেন, ” শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালেই, অ্যাঙলো-আমেরিকান ‘রেজিম বদল’ প্রকল্পে সঙ্গ দিয়ে ভারতের কূটনীতি ইতোমধ্যেই হাতে রক্ত লাগিয়ে ফেলেছে [“In Sri Lanka (2015), Indian diplomacy tasted blood by collaborating with the Anglo-American project at ‘regime change.”] …… আর এখন যা হচ্ছে তাতে ভারতকে পাপোষের মতো ব্যবহার করে আমেরিকা শ্রীলঙ্কায় ঢুকে পড়েছে। শ্রীলঙ্কাকে সামরিক চুক্তিতে জড়িয়ে নিচ্ছে, অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ধন্য আমেরিকান হস্তক্ষেপ নীতি। [Meanwhile, the US used India as a door mat to make inroads into Sri Lanka. And the result is Sri Lanka has been seriously destabilized, thanks to intrusive US policies]। আসলে ওখানে রাষ্ট্রপতি সিরিসেনা আমেরিকাকে ডেকে আনার নায়ক। তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রয়োগ করে এক উগ্র বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা [নাম Galagoda Aththe Gnanasara], নানাসারা বলে পরিচিত এই নেতাকে অপহরণের অভিযোগে ছয় বছরের ও আদালত অবমাননার সাজার জেল থেকে ছুটিয়ে এনেছেন। রাজনৈতিক দলের মত তাঁর এক ধর্মীয় সংগঠন আছে – নাম Bodu Bala Sena (BBS) or “Buddhist Power Force”। মানে কথিত অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের এই নেতা নিজ সংগঠনের নাম রেখেছে “পাওয়ার ফোর্স”। বুঝা যাচ্ছে তিনি শিকারির “খুবই অহিংস”। এরপর তাঁর সম্পর্কে আর কিইবা বলার বাকি আছে। তিনি সম্প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উগড়ানো এক পাবলিক মিটিং করেছেন। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের এই ধারাই মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন রোহিঙ্গাবিদ্বেষী একই বৌদ্ধ ধারা। অর্থাৎ তাহলে ফলাফল হল, শ্রীলঙ্কায় চীনের প্রভাব দমাতে গিয়ে ভারত ব্যাপক রক্তপাত ঘটানোর পর এখন এর মাখন উঠিয়ে দিচ্ছে বা তা নিয়ে যেতে এসেছে আমেরিকা।

তা হলে এশিয়ায় মূল বিষয়টি হচ্ছে, না চীনের কোলে না ভারতের – এটাই বাঁচার উপায়। ভারসাম্যের নীতিতে, কারো দিকে কান্নি না মেরে থাকা। আর কেবল নিজের স্বার্থের দিকে ফোকাসের নীতি – এভাবে হোমওয়ার্ক করে আগানো, এই নীতিই একমাত্র বাঁচোয়া। কিন্তু ভারত ভারসাম্যের নীতি না মেনে চলার দেশ। বরং উলটা, আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকার নীতি ভারতের। যে আমেরিকা আবার চলে নিজের একক স্বার্থে। আমেরিকার বেলায়, বালুচদের টেররিস্ট ঘোষণা করে দেয়া অথবা শ্রীলঙ্কায় (SOFA সহ) সামরিক চুক্তি করে ঢুকে পড়া, এগুলো এর উদাহরণ হলেও এসব বিষয় ভারতকে হুঁশে আনবে, এমন ভরসা করা কঠিন।

তবে যারাই চীনের বদলে ভারত অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য খুনখারাবি পর্যন্ত যাবে, সম্পর্কের ব্যাপারটা যারা এভাবে দেখবে বা এই ভুল করে বসবে – এরাই সবশেষে সব খুইয়ে নিজের সব অর্জন আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে থাকে। হাসিনার জন্য এটাও এক বিরাট শিক্ষা হতে পারে যে, যদি না তিনিও আবার শেষে সব হারিয়ে, আমেরিকাকে ডেকে নিয়ে না আসেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) এটা ভারসাম্যের যুগ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

গৌতম দাস

০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Co

 

Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদুল ফিতর ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯

প্রথম অনলাইন প্রকাশঃ ০৪ জুলাই, ২০১৯

https://wp.me/p1sCvy-2C8

 

[এই লেখাটা গত ঈদে মানে, গত মে মাসে ঈদুল ফিতরের ঈদ সংখ্যা নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে ছাপা হয়েছিল। সে হিসাবে এর প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯। কিন্তু এর কোন অন লাইন ভার্সান তারা করে নাই। সেকারণে  ঐ ছাপা ভার্সানেরই হুবহু সফট কপি, (নতুন কোন এডিট করা ছাড়াই) এখানে নতুন করে আনা হল। সাথে ছাপা ভার্সানের প্রথম পৃষ্ঠার একটা স্কান কপি ছবি আকারে উপরে সাটানো হল। লেখাটা যখন শেষ করে জমা দিয়েছিলাম, সেটা ছিল ১ মে ২০১৯।
ফলে মে মাসের পর থেকে ফোনের ৫জি টেকনোলজি ইস্যুতে চীন ও আমেরিকার গভীর স্বার্থ সংঘাত আর বিপরীতে চীন ও ইউরোপের পারস্পরিক স্বার্থ খাপ খাইয়ে নেয়ার সম্পর্ক সংক্রান্ত যা কিছু ডেভেলবমেন্ট ঘটেছে তা এখানে আপডেট করা নাই। সেসব নিয়ে আলাদা আবার লিখতে হবে। তবে ৫জি নিয়ে চীন-আমেরিকার সংঘাত এখনও চলছে।হুয়াওয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা সাবরিনা মেঙ’ কে আমেরিকার অনুরোধে কানাডা গ্রেফতার করেছিল, সাত মাস আগে। কানাডা-আমেরিকার মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি আছে। তাই আমেরিকায় দায়ের করা এক মামলার অভিযোগ সাবরিনার কানাডা সফরের সময় যেন তাঁকে গ্রেফতার করে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়া হয় – সেই আবেদন আগেই কানাডাকে জানিয়ে রেখেছিল আমেরিকা। তাই  ঐ কর্মকর্তা সাবরিনার কানাডা ট্রানজিট সফরে থাকার সময়ে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল কানাডা; যাতে কানাডারই আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে  কানাডা সরকার তাঁকে আমেরিকার হাতে তুলে দিতে পারে। বর্তমানে সাবরিনা জামিনে তবে কানাডা ত্যাগ করতে পারবে না, এই শর্তে যে মামলা না মিটে যাওয়া অব্দি। আর স্থানীয় থানায় রিপোর্ট, সাথে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে ও মামলা মোকাবিলা করে যেতে হবে। ইতোমধ্যে চীনা ৫জি টেকনোলজি দুনিয়া কাঁপিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।]

চীনা ইন্ডাস্টিইয়াল টেকনোলজি কোন পর্যায়ে আছেঃ
চীনা শিল্প-পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত টেকনোলজি কেমন পর্যায়ের, কেমন মানসম্পন্ন অথবা কোন স্তরে আছে চীনা টেক-শিল্প? এই প্রসঙ্গে চীনা টেকের মান যেন খুবই নিচে এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে চীনকে ব্যঙ্গ করা, নিচা দেখানো বা খোঁটা দিয়ে কথা বলা এমন লোকের কোনো অভাব নেই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে মানে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্ব এখন বাঁক পরিবর্তনের পর্যায়ে আছে, চলছে। এমনই আমাদের চলতি দুনিয়ায় চীনা উত্থানকে, সঠিক অথবা বেঠিকভাবে, যারা নিজ নিজ রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের পরাজয় হিসেবে দেখে থাকে ( ফলে অনেক সময় এতে তাদের অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা চেপে রাখতে পারে না, প্রকাশ হয়ে পড়ে) এমন রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষে আছে ভারত। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, তবু চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন যথেষ্ট গভীর।

ভারতীয় অর্থনীতিতে বিদেশী বিনিয়োগ তা, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অথবা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ (মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট, FDI)  এই দুই অর্থেই ভারতের অর্থনীতিতে চীনা বিনিয়োগ এখন এক বিরাট ভূমিকা ও অবদান নিয়ে হাজির আছে। যেমন ব্রিকস (BRICS) উদ্যোগ হল,  বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের এক বিকল্প গড়তে চীনের সাথে মোট পাঁচ রাষ্ট্রের এক উদ্যোগের নাম, চীন যেখানে মূল উদ্যোক্তা। ভারতও অবশ্যই এই উদ্যোগের সাথে আছে, শুধু তাই না। এই ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) নামে আর এক বিকল্প-বিশ্বব্যাংকও চালু আছে। কাজ ও তৎপরতার ধরনের দিক থেকে এটাও এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের নেতৃত্বে যে মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক আছে (যেখানে চীনের ৩০% মালিকানার পরই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মালিকানা ১০%) এরও বাইরের প্রতিষ্ঠান NDB, আর তা আর এক চীনা বিকল্প-বিশ্বব্যাংক অবশ্যই। যদিও মনে রাখতে হবে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) -এটা এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক থেকে একেবারেই আলাদা এক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তুলনায় খুবই ছোট। তবে এই দুই বিকল্প-ব্যাংকের মধ্যে মূল ফারাক বুঝতে গেলে এটা মনে রাখলেই চলে যে, আসলে ব্রিকস উদ্যোগের নামে চলা যেকোনো তৎপরতা তা কেবল চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তাতে সে তৎপরতা এই (NDB) ব্যাংকের সুবিধাদির গ্রহীতা বা দাতার যে ভূমিকারই হোক না কেন। মানে পাঁচের বাইরের আর কেউ এর সদস্য না, ফলে ব্যাংকের সুবিধাদি তাদের বাইরের কেউ পাবেও না। আবার নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ দেয়া হয়েছে ভারতকে আর সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতা এই ব্যাংকের একমাত্র বিনিয়োগ ‘খাতক’ হল ভারত।  নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কেবল পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের বিপরীতে তাহলে এআইআইবি ব্যাংকের সাথে এর মূল ফারাকটা হল, সর্বশেষ লেবাননকে সাথে ধরলে এআইআইবি ব্যাংকের মোট সদস্য ৮৭ রাষ্ট্র, যারা সবাই এআইআইবি-এর সুবিধাদি পাওয়ার যোগ্য। সার কথায় বোঝা গেল চীনের সাথে ভারতের গাঁটছড়া ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অনেক গভীরের, উপরে উপরে তা যতই রেষারেষির বলে দেখাক না কেন।

কিন্তু তবু ভারতের কূটনীতিতে বাস্তব কৌশলগত তৎপরতাগুলোর সবটাই চীনবিরোধী করে সাজানো। এমনকি সম্প্রতি অভ্যন্তরীণভাবে বিজেপির উদ্যোগের চীনা-পণ্যবিরোধী এক প্রপাগান্ডাও চালু হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া আরো আছে। যেমন ভারতের বাংলার বাইরে, উত্তরে হিন্দি-বলয়ে বা দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য রাজ্যগুলোতে মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হিসেবে দেওয়ালি পালিত হতে দেখা যায়। বাংলায় যেটাকে আমরা কালীপূজা নামকরণ হয়ে পালিত হতে দেখি, এটাই সেই দেওয়ালি। যদিও বাংলার মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হয়ে আছে আবার দুর্গাপূজা। আর কালীপূজা বাংলাতেও আছে, তবে সেটা সেকেন্ডারি উৎসব। এখন এই দেওয়ালিকে বাণিজ্য ও বাজারের দিক থেকে দেখলে, ভারতে এই প্রধান উৎসবে বাজি বা পটকার বাজারটা বিশাল, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মত। এ ছাড়া এই উৎসবের সাজসজ্জার আলোকবাতি, খেলনা বা আনুষঙ্গিক আইটেমসহ ধরলে এমন মোট আমদানি বাজার বছরে ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের। ওদিকে চীন থেকে ভারতের বাজারে বছরে আমদানির মোট পরিমাণ ৭০ বিলিয়নের ওপরে। আর এই আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে বিশেষত বাজি-পটকা এতদিন যা ভারতে স্থানীয়ভাবে তৈরি হত, বিশেষ করে তামিলনাড়ু–র শিবাকাসি শহরে (ভারতের ৯৫ ভাগ পটকা এখানে তৈরি হয়, আর ১০ লাখের মতো লোক কাজ করে) তৈরি পটকার দখলে ছিল এই বাজার। কিন্তু এক্ষেত্রে চীনা পণ্য হল এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিশেষ করে দামের কারণে। সস্তা চীনা পণ্যের ঠেলায় স্বভাবতই ভারতীয় উৎপাদকরা অস্থির ও নাখোশ। তাই গত ২০১৬ সাল থেকে অভ্যন্তরীণভাবে এই চীনা-পণ্যবিরোধী একটা ন্যাশনালিজমের বয়ান তৈরি হতে দেখা গেছিল, যাতে প্রধান তাল দেয়া অবস্থানটা বিজেপির।

মূল বিষয়টা হল, আমাদের মতো দেশে ছোটখাটো সমস্ত পণ্য, যা আগে নিজ নিজ দেশে তৈরি করতে সক্ষমতা ছিল ফলে বাজারও নিজ দখলে ছিল সেই সব বাজারে এখন চীনা সস্তা পণ্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়ে গিয়েছে। এর পেছনের প্রধান কারণ “বাল্ক (bulk) প্রডাকশন লাইন”। কোনো পণ্য উৎপাদনের সময় একেকটা ব্যাচে তা তৈরি হয়। আমাদের মতো দেশের কারখানায় ট্রাডিশনাল উৎপাদনের চেয়ে চীনা উৎপাদনের আলাদা বৈশিষ্ট্য হল সেখানে একেকটা উৎপাদন ব্যাচ আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ লম্বা শুধু তাই না, এক সাথে বসা ব্যাচের সংখ্যাও কয়েকগুণ বেশি। এতে উৎপাদকের সুবিধা হল কাঁচামাল কেনার সময় বিপুল ক্রয়ের সুবিধায় দামে কম পাওয়াসহ পণ্য তৈরির ব্যাচ সাইজের কারণে বহু পর্যায়েই উৎপাদনের ওভারহেড খরচ কমিয়ে ফেলতে পারে। আর এটা এক বাল্ক বা বিপুল সাইজের উৎপাদনের কারণে তাতে চীনা পণ্যমূল্য আমাদের মত দেশের চেয়ে অনেক সস্তা, বিশেষ করে যেমন প্লাস্টিক পণ্যে যা কখনো একেবারে অর্ধেক হয়ে যায়। প্লাস্টিকের সামান্য টুথব্রাশ উৎপাদনের বেলায় চীনা সস্তা দামের ঠেলায় আমাদের উতপাদন সক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে।

এরই প্রতিক্রিয়ায় ভারত বা আমাদের মতো দেশের ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী ‘ন্যাশনালিস্ট’ হওয়ার চেষ্টা করে, ন্যাশনালিজমের ‘বয়ান’ এর গাঁথুনি খাড়া করার চেষ্টা করে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের আবার মোকাবিলার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হল, এসব নাকে-কাঁদুনি “ন্যাশনালিস্ট” হয়ে থাকা বেকার; এরচেয়ে বরং কাজের কিছু পদক্ষেপ তারা নিতে পারে। যেমন প্রাণ গ্রুপ; যেসব প্লাস্টিক পণ্যে, অন্তত মূল্যের দিক থেকে চীনাদের সাথে পারা যাবে না অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেসব পণ্য ‘প্রাণ’ নিজেই চীন থেকে আমদানিকারক হয়ে এনে বিক্রি করতে শুরু করেছে। আর নিজ প্রডাকশন লাইন বদলে অন্য প্রডাকশনে নিয়ে গিয়েছে, অনুমান করা যায়।

যদিও ন্যাশনালিজমের বুঝ থেকে  “দেশে ব্যবহার্য সব জিনিস নিজেদেরই বানাতে পারতে হবে” এটা কতটা সঠিক বুঝ, কাজ হয় কি না ও বাস্তবোচিত কি না অথবা তা আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা এমন  “অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম” এর পালটা-চিন্তা হাজির আছে। অথচ পরীক্ষা করা হয়নি যে এটা আদৌ অর্থপূর্ণ পথ কি না? ভায়াবাল কি না? নাকি এটা জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও শ্রমঘণ্টার অপচয় বা টেকনোলজি ইত্যাদিতে পিছিয়ে পড়ে থাকা হবে? যদিও আবেগের ন্যাশনালিজম বহু আগেই প্রশ্নবিদ্ধ। এখন এই কঠিন বাস্তব প্রশ্নগুলো একালে আরো সামনে এসে গেছে, স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তবুও বারবার সহজেই সস্তা সুড়সুড়ি তৈরি করা যায় বলে দেখা যাচ্ছে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ থেকেই যাচ্ছে, জাগিয়ে উঠানো হচ্ছে।

ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতি উগ্র ন্যাশনালিস্ট, এটাই তার মূল ধারা। ওদিকে আবার চীন-ভারতের অমীমাংসিত সীমান্ত আর তা থেকে সামরিক সঙ্ঘাতের পুরানা (১৯৬২) স্মৃতি বা নতুন করে কিছু ঘটার একটা বাস্তবতা আছে বলে মূলত এসবকে পুঁজি করে ভারতে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ এর উসকানি ধারা খুবই প্রবল। বিশেষ করে ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী বয়ান সহজেই খাড়া করতে পারে। এবং করে লড়তে থাকে। সেখান থেকেই বয়ানের ডালপালা গজায় যে চীনা পণ্যের মান, এর টেকের মান খুবই খারাপ, ঠুনকো ইত্যাদি ইত্যাদি!

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে, লো-টেকনোলজি লাগে এমন পণ্যে – চীনারা পণ্য মান খারাপ করে সস্তা দামে বাজার দখল করে এগোতে হবে – এটাই তাদের সবকালের এগোনোর পথ ও পরিকল্পনা – এমন বুঝের কোনো অনুমান করা ভুল হবে। তাহলে কিভাবে দেখতে হবে? আসলে তাদের মূল বিষয় ছিল আশির দশকে চীনা ক্যাপিটালিজম উত্থানের শুরুর দিকের নিজ সস্তা শ্রমের সুবিধাকে কাজে লাগানো আর “বাল্ক প্রডাকশন লাইনে” উৎপাদন করে বাজারে নেতা হওয়া। যেমন আরেক উদাহরণ, আমাদের মত দেশে কম্পিউটার পণ্য সস্তায় পাওয়ার পেছনে চীনের দুই উতপাদন সূত্র – সস্তা শ্রম ও বাল্ক প্রডাকশন – হল মূল কারণ। আবার যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে মান একটু গুরুত্বপূর্ণ সেই বাজারটা চীনারা তাইওয়ান, ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরের (একালে ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের) হাতে ছেড়ে দিয়েছে বা বাধ্য হয়েছেও বলতে পারি।

ইদানীং চীনা উৎপাদকদের মধ্যে আর এক আওয়াজ জোরদার হচ্ছে যে, চীনা শ্রম আর সস্তা নয়, মানে ন্যূনতম মজুরি চোখে পড়ার মত অনেক বেড়ে গেছে। ফলে আগের সেই বাল্ক প্রডাকশন কোম্পানি এখন চীন ছেড়ে সস্তা শ্রমের কোন ভিন দেশে কারখানা স্থানান্তর করতে চায়, এটা বড় ইস্যু এখন চীনে।

আবার এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চীন নিজের এমন পরিচয় চায় না যে দেশ-বিদেশে মানুষ চীনকে ‘লো-টেকনোলজি’ পণ্যের দেশ হিসেবে চিনুক অথবা এটাই তার ভবিষ্যৎ পরিচিতি হয়ে দাঁড়াক। ফলে যেসব হাই-টেকনোলজি চীনের করায়ত্বে নাই তা আনতে পশ্চিম থেকে কোম্পানিগুলোকে জয়েন্ট ভেঞ্চারের কোম্পানি হিসেবে চীনে আনার তৎপরতাও প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে যেমন গাড়ি তৈরির শিল্পে। পশ্চিমের কোম্পানিগুলোও আসতে খুবই আগ্রহী কারণ পশ্চিমের দিনকে দিন বাজার সঙ্কোচনের বিপরীতে চীনে বাজার উদ্যমী ও সচল (vibrent) বলে।

এভাবে লো আর হাইটেকের ছাড়াও আর এক দিকের চীনা কৌশল হল কোন একটা উতপাদন খাতে লেটেস্ট টেকের শীর্ষ নেতা হওয়া। তেমন সেই খাত হল মোবাইল টেলিফোন। তারবিহীন স্মার্ট টেকনোলজি। চীনা এমন দুই পাইওনিয়ার কোম্পানি হল, বেসরকারি হুয়াওয়ে (HUAWEI) ও সরকারি জেডটিই (ZTE)।

মোবাইল টেকনোলজির ব্যবসা ফলে এর উৎপাদনের পুরাটা বলতে গেলে তা মূল তিন ধরণের উতপাদক কোম্পানিতে বিভক্ত। এক হল, আমরা ব্যবহারকারী পর্যায়ের উতপাদক মানে, ফোন সেটের (mobile phone set) উৎপাদন ও বাজারজাত করা। দুই হল, আমাদের গ্রামীণ বা বাংলালিঙ্কের মত কোম্পানিগুলো; যাদের ভূমিকা হল ব্যবহারকারিদের ফোনের সেটে – নেটওয়ার্ক কানেকশনসহ ফোনের সার্ভিস জোগান দেয়া। এদেরকে ক্যারিয়ার (carrier) কোম্পানিও বলে থাকে অনেকে। আর তৃতীয় ধরণটা হল, আর এক টেক উৎপাদক যারা গ্রামীণদের মত কোম্পানির জন্য বেজ যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে তা সরবরাহ করে থাকে। স্বভাবতই এসব বিপুল যন্ত্রপাতি সাধারণ মানুষ পর্যায়ে সরাসরি ব্যবহার করার জন্য না। তবে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই ক্যারিয়ার কোম্পানিগুলো পাবলিককে সার্ভিস জুুগিয়ে থাকে, তাই পাবলিক এই টেকনোলজির পরোক্ষ ব্যবহারকারী। এ কারণে এমন যন্ত্রপাতিকে ‘ব্যাকঅ্যান্ড’ (back-end) টেক বা পেছন-ঘরে লাগে এমন যন্ত্রপাতি বলে। অর্থাৎ গ্রামীণের মত কোম্পানিগুলোই ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতির মূল ক্রেতা বা গ্রাহক। আর এটা ব্যবহার করেই সাধারণ মানুষকে তারা নানান ফোন সার্ভিস যুগিয়ে থাকে।

এই মোবাইল টেকনোলজিতে চীন শীর্ষপর্যায়ের টেক-উৎপাদন ও সরবরাহকারী পরিচয় হাসিল করে ফেলেছে। টেকনোলজিতে উঁচুমান – এই পরিচয় চীনা পণ্যে লাগানোর ক্ষেত্রে – ফোন কোম্পানির নাম এখন হুয়াওয়ে (HUAWEI)। তবে এই কোম্পানি ফোনসেট এবং ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি  – দুটোই উৎপাদন করে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের কাছেও ‘হুয়াওয়ে’ নামটা পৌঁছে গেছে ও পরিচিত। হুয়াওয়ে ব্যক্তি-মালিকানাধীন কোম্পানি, তা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট কায়দায় এর কর্মচারীরাও প্রত্যেকে স্বল্প হলেও সবাই শেয়ারহোল্ডার মালিক। এ ছাড়া মালিকেরা বা পরিচালক বোর্ডের মেম্বারেরা রোটেশনালি মানে ঘুরে ঘুরে সবাই নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকেন। এমন অনেক কিছুই এর নতুন বা ভিন্ন। এ ছাড়া এই কোম্পানি চীনা সরকাররেও আদরের চোখের মনির মত। কারণ এটা  সামগ্রিকভাবে চীনা টেকনোলজিক্যাল উচ্চতা কত, তা কতটা ওপরে উঠেছে এর চিহ্ন সেট করেছে।

আর ঠিক ততটাই যেন এটা আমেরিকার চক্ষুশূল। অনেকগুলো কারণে। প্রথমত কী দিয়ে বুঝা যাবে হুয়াওয়ে উঁচুমানের টেকনোলজির? মোবাইলে টেকনোলজিতে ওয়ান-জি, টু-জি করে লেটেস্ট হলো ফাইভ-জি। মোবাইলে টেক্সট (লেখা), ভয়েজ (শব্দ) আর ভিডিও (ছবি) পাঠানো – এই তিনটাই আদান-প্রদান করা যায় কি না; আর তা কত দ্রুত যায় এরই প্রকাশ হল – এই ওয়ান থেকে ফাইভ জি (ইংরেজি জি মানে এখানে জেনারেশন বা প্রজন্ম) পাঁচ প্রজন্মের টেকনোলজি।

৫জি এর স্পিড

যার মূল জিনিসটা হল, ফোন নেটওয়ার্কে চলাচলকারী ডাটার গতি। যেমন একটা ধারণা দেয়া যাক, ১৯৯১ সালে চালু ২জি টেকনোলজি দিয়ে একটা পাঁচ গেগাবাইটের পূর্ণ সিনেমার ডাটা নামিয়ে আনতে সময় লাগত এক মাসেরও বেশি। তাই তা করতে যায়নি কেউ। কিন্তু গত ২০১০ সাল থেকে চালু হয়ে থাকা চলতি ৪জি টেকনোলজিতে (যা আমরা বাংলাদেশে দেখি নাই, গল্প আর “কে দিয়েছের” চাপাবাজি শুনেছি। অভিজ্ঞতা পাইনি বলাই ভাল) লাগে ৭ মিনিট। সেই পাঁচ গেগার সিনেমা আসন্ন নতুন ৫জি টেকনোলজিতে লাগবে মাত্র ৪০ সেকেন্ড। [৫জি সাপোর্ট করে এমন ফোনসেট এখনো বাজারে আসনি, তবে এ বছরই আসবে।]

এই ৫জি টেকনোলজি এখন একটা রাষ্ট্রের টেক-উচ্চতা কতটা তা মাপার বিষয় (স্টান্ডার্ড) হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন আমেরিকার কোন কোম্পানি এই টেকনোলজি নিয়ে কখনও কাজই করেনি। বিপরীতে এই টেকনোলজি নিয়ে নিজের ল্যাবে গবেষণা ও উন্নয়ন শেষ করে, এরপর বাণিজ্যিক উৎপাদনে এবং বিক্রিতে চলে গেছে চীনা হুয়াওয়ে। শুধু তাই না, ২০১৮ সালের মোট বিক্রিতে ইতোমধ্যে কিছু ৫জি টেকসহ বিক্রি করেছে ১০৮ বিলিয়ন ডলারের। এই বিক্রি, তাও আবার সরাসরি ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা হুমকির মধ্যে যে চীনা ৫জি টেকনোলজি [বেসরকারি হুয়াওয়ে ও সরকারি জেডটিই ] বাজারে আনা হয়েছে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের গোয়েন্দাগিরির জন্য। অন্যের রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ ও তা নিজ দেশে পাচারের জন্য – এই হল সেই ভীতিকর মিথ্যা প্রপাগান্ডা। শুধু তাই না, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ নির্দেশ জারি করেছে যে কোনো আমেরিকান সরকারি অফিস এ দুই কোম্পানির কোনো কিছু কিনতে ও ব্যবহার করতে পারবে না [President Donald Trump in August, which bars federal agencies and their contractors from procuring its equipment and services]। এই আইনের বিরুদ্ধে খোদ হুয়াওয়ে নিজে আমেরিকার টেক্সাসের আদালতে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নতুন দুনিয়ায় মাতব্বরিতে নেতা আমেরিকার সাথে সবসময় ছোট-তরফ বা প্রধান সাগরেদ হয়ে থেকেছে ইউরোপ। সম্ভবত এবারই প্রথম আমেরিকান নেতাগিরির শেয়ার-ভাগ সাগরেদ নিতে চাইছে না। ইউরোপ আমেরিকার হাত ছেড়ে ভেগে আগে বাড়তে যাচ্ছে।

এ বছর ‘মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস” [Mobile World Congress] যেটা সাধারণভাবে বললে ‘মোবাইল টেকনোলজির গ্লোবাল বাণিজ্যমেলা, তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৫-২৮ ফেব্রুয়ারি, স্পেনের বার্সিলোনায়। কিন্তু ট্রাম্পের প্রপাগান্ডাীখানে এসে ফেল করে যায়। মানে চীনা হুয়াওয়ে সম্পর্কে আমেরিকার প্রপাগান্ডা ও ভীতি ছড়ানো আর তা ইউরোপে কাজ করাতে ব্যর্থ হয় আমেরিকা এই সম্মেলন থেকেই। এটা ফোন ব্যবহারকারি সাধারণ মানুষের মেলা নয়, ফলে সাধারণ ক্রেতাদের বাদে বা তাদের বাইরে, মোবাইল নিয়ে গবেষণা, উৎপাদন থেকে বাণিজ্য বিতরণ পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা টেলিকম এক্সিকিউটিভদের মেলা ছিল এটা। ইউরোপের পলিটিকো ম্যাগাজিনের হিসাব মতে প্রায় এক লাখ [where some 100,000 telecoms executives had gathered] এমন টেলিকম নির্বাহীর সমাগম হয়েছিল এখানে। এমনিতেই এই মেলার বড় খরচের  দায়ভার নিয়েছিল হুয়াওয়ে। সে সাথে নিজের ৫জি টেকনোলজিসহ সব পণ্যের ব্যাপক প্রদর্শনীও করেছিল। এই মেলা থেকেই মোবাইল উতপাদন ব্যবসার দুনিয়ার বড় বড় কুতুবেরা বিশেষ করে যারা ইউরোপীয় যেমন, নরওয়ের নোকিয়া, ব্রিটিশ ভোডাফোন, সুইডিশ এরিকশন ইত্যাদির, আমেরিকান প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এদের আপত্তিগুলো সামনে প্রবলে আসতে থাকে।

তাদের বক্তব্যের সারকথা হল, তারা আমেরিকার কাছে খাস প্রমাণ চাচ্ছে, নইলে তারা হুয়াওয়ের টেকনোলজি কিনতে ও ব্যবহার- সম্পর্ক করতে থামবে না। অর্থাৎ চীন বা হুয়াওয়েকে রাজনৈতিক কারণে কোণঠাসা করার কাজে যুক্ত হতে তারা অস্বীকার করে বসলেন। রয়টার্স বলছে, ওই মোবাইল মেলাতে ভোডাফোনের প্রধান নির্বাহী মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে, আমরা “ফ্যাক্টস ভিত্তিক মূল্যায়ন দেখতে চাই” [“We need to have a fact-based risk-assessed review,” – Nick Read, chief executive of Vodafone]। আর হুয়াওয়ের টেক ব্যবহার করব না বলার খারাপ পরিণতিও আছে। আমরা যদি অস্পষ্ট তর্কে সিদ্ধান্তহীন থাকি তবে ইউরোপ আপডেট টেকনোলজিতে দুই বছর পিছিয়ে যাবে। আর ইতোমধ্যে আমরা যারা হুয়াওয়ের ৪জি টেক ব্যবহার করছি সেগুলোর কী হবে?” [ Read said it was not a simple case of barring Huawei from future 5G networks as the company’s equipment was already in use in 4G networks in Europe that would be the foundation of the new technology……“It will delay 5G in Europe by probably two years,” he said.] ।

ওদিকে ওই মেলা থেকে এক টেকনিক্যাল আলোচনায় হুয়াওয়ের চেয়ারম্যান সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বললেন আমেরিকার হাতে কোন প্রমাণ নাই [The U.S. security accusation on our 5G has no evidence, nothing,”] অথচ প্রপাগান্ডা করছে।  তিনি খোঁচা দিয়ে বলেন, “হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করার মিথ্যা অভিযোগ আনার আগে আমেরিকা স্নোডেনকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারে [those concerned about government spying “can go ask Edward Snowden” ]। (আমেরিকান টেক কন্ট্রাকটারের এক স্টাফ অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেন প্রমাণসহ দেখিয়ে দেন যে আমেরিকান সরকার কিভাবে গ্লোবালি মোবাইল ডাটা হ্যাক করে থাকে। এই তথ্য ফাঁস করা, সেই থেকে তিনি আমেরিকা থেকে পালিয়ে রাশিয়াতে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে বাস করছেন।)

তবে অনেক তর্ক-বিতর্কে উঠার পরে ঐ বার্সেলোনা মেলা থেকেই হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগ হাল্কা হয়ে যেতে থাকে। ইউরোপীয় পলিটিকো বা আমেরিকান ব্লুমবার্গ মিডিয়া বলছে, মূলত ট্রাম্পের একটা মন্তব্য থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি। ব্যাপারটা হল, বর্তমানে চীন ও আমেরিকা এক বাণিজ্য যুদ্ধে পরস্পরের ওপর বাড়তি আমদানি শুল্ক আরোপের ঝগড়ায় আটকে আছে। যার সর্বশেষ অবস্থা হল তারা এখন আলাপ আলোচনার মধ্যে আছে যাতে মনে হচ্ছে তারা একটা আপসের পথ খুঁজে পেতে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই এখনও ফাইনাল নয়। সেই আলোচনার সময়ে এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলে বসেন যে হুয়াওয়ে কেসটা আমাদের আলোচনায় দরকষাকষিতে হাতিয়ার হতে পারে [“President Trump has made a big mistake by allowing the Chinese to draw the conclusion that the two are related”]। এ কথা জেনে যাওয়ার পর থেকে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ফলে তা থেকে টেক কোম্পানিগুলোও হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগগুলো আর গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এরপর থেকে আমেরিকা ইউরোপকে আর নিজের নৌকায় তুলে নিতে পারেনি।

এদিকে বিতর্কেরও কোনো শেষ হয়নি। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এ নিয়ে খুবই ভোকাল। তিনি এক পাবলিক আলোচনাতে বলছেন, তিনি দুটো বিষয়ে নীতিগতভাবে বিশ্বাস করেন না। এক, আমেরিকার এমন সেনসেটিভ নিরাপত্তা-বিষয়ক অভিযোগ পাবলিকলি তুলল কেন? আর দুই-একটা কোম্পানিকে একঘরে করতে হবে কারণ সে একটা বিশেষ দেশের [“First, to discuss these very sensitive security questions publicly, and second, to exclude a company simply because it’s from a certain country.’] – একটা বিশেষ দেশ বলতে বলা বাহুল্য তিনি বুঝিয়েছেন চীনের হুয়াওয়ে] কোম্পানি। এরপর তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে শক্ত এথিক্যাল প্রশ্ন তুলে বলছেন, “চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বলে তার সাথে এভাবে লড়ব। বরং আমাদেরকে অবশ্যই ন্যায্য আইনকানুন ও পারস্পরিক স্ট্যান্ডার্ডের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আর আমরা ‘বহুরাষ্ট্রীয় দুনিয়া ব্যবস্থা’ মাল্টিলেটারিজম ত্যাগ করতে পারব না, [Of course we’re in a systemic competition with China,’’ Merkel said in a separate speech at the same event. “But the answer can’t be that we fight those who are economically strong, we must stand up for fair, reciprocal rules and not give up on multilateralism.’’]।

এ কথাগুলো তিনি বলেছেন কারণ ইতোমধ্যে এ নিয়ে ন্যাটোর মিটিংয়ে চরম তর্কাতর্কি ও আর আমেরিকান হুমকি প্রদর্শন ঘটে গেছে। আমেরিকা হুমকি দেয় যে চীনা ফোন টেকনোলজি ৫জি ব্যবহার জার্মান বন্ধ না করলে তারা আর আগের মত জার্মানির সাথে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করবে না। ন্যাটোর জেনারেল স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, “ন্যাটো ফোর্স জার্মানির সাথে ‘বার্তা যোগাযোগ ছিন্ন” করবে যদি তারা হুয়াওয়ের সাথে সম্পর্ক রেখে কাজ করে’ [The threat escalated when Nato’s Supreme Allied Commander in Europe, US General Curtis Scaparrotti, warned Germany that Nato forces would cut communications if Berlin were to work with Huawei.]। কিন্তু মার্কেলের অবস্থান আসলে খুবই পরিষ্কার। তিনি বলতে চাইছেন, আমরা নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড উন্নত করতে পারি, আলোচনায় চীনকে তা মানতে বাধ্য করতে পারি। কিন্তু চীনা কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না এ কথা বলতে পারি না।

ওদিকে ইটালিকে নিয়েও প্রায় একই রকম বিতর্কে [Italian daily La Stampa ] এক ভুয়া নিউজ ছাপা হয়েছিল। ওর পেছনে আর এক কারণ হল, সেই একই সময়ে ইতালি চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিয়েছে, এমন এক মেমোরেন্ডাম বা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ইতালির মন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যেহেতু এখনও ৫জি ইস্যুতে  নিরাপত্তার জন্য হুমকিমূলক কোনও কিছুই পায়নি। তাই কোনও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে আগ্রহী নয়। ইতালির “টেলিকম ইতালিয়া” কোম্পানি হুয়াওয়ের গ্রাহক। তারাও বলছে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা না পেলে তারা কিছুই বন্ধ করবে না [Italian phone incumbent Telecom Italia has previously said it will keep working with Huawei until told otherwise by the government.]।

মোটা দাগে বললে, হুয়াওয়ে বা চীনা টেকনোলজি ঠেকিয়ে দেয়ার ইস্যুতে আমেরিকা ইউরোপকে নিজের নেয়া ‘নিষেধাজ্ঞার পথে’ আকৃষ্ট বা রাজি করাতে পারেনি। এর মূল কারণ চীন বা হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার আনা গোয়েন্দাগিরি অভিযোগের কোনও প্রমাণ দিতে না পারা। অর্থাৎ আমেরিকান অভিযোগ এখনো ভিত্তিহীন বলে এমন অসৎ পথে আমেরিকার সঙ্গী হতে চায়নি ইউরোপ। ইতোমধ্যে প্রায়ই ট্রাম্পের মুখে শোনা যায় যে চীন আমাদের টেকনোলজি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি হুয়াওয়ের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে আমেরিকান টি-মোবাইল কোম্পানির পক্ষে [T-Mobile, an American wireless carrier] টেকনোলজি চুরির মামলা করা হয়েছিল। লন্ডন ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, সে মামলাতে আদালতের মূল্যায়ন হল, এখানে টি-মোবাইলের কোনো ‘ক্ষতি করা, কারও অন্যায় লাভবান হওয়া এমন কিছু ঘটেনি। এমনকি এটা হুয়াওয়ের দিক থেকে ইচ্ছা করে কিছু ঘটানো এমন কাজ নয়, খারাপ উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজও নয়” [The court found, however, “neither damage, unjust enrichment nor wilful and malicious conduct by Huawei”.।

তবু আমেরিকার দিক থেকে ইউরোপকে নিয়মিতভাবে চীনা ৫জি টেকনোলজি ব্যবহার না করার আবেদন করে চলছিল। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশন আমেরিকার চীনাবিরোধি যা অভিযোগ তা আনুষ্ঠানিক আমল করেনি বলে জানা যাচ্ছে। কিভাবে? কারণ সে তার নিজস্ব কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সেগুলো আসলে উপরে অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের বয়ানে যেটা আমরা দেখেছি সেই অবস্থানই। তা হল, কমিশনের সিদ্ধান্ত হল যে আরো ‘শক্ত নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড’ তৈরি করতে হবে, কিন্তু কোনো দেশকে ঠেকাতে হবে এটা তাদের কোনো পথ নয় [commission officials signalled they prefer to secure Europe’s critical digital infrastructure with a more nuanced approach, rather than bowing to US pressure for blanket bans.]। । আসলে মূলত এ কারণেই ইউরোপের মোবাইল জয়েন্টগুলো হুয়াওয়ের টেকনোলজি কেনার ও সাথে সম্পর্কে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল।

হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইন্যান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা গ্রেফতারঃ
তবু আমেরিকা চীন ও হুয়াওয়েকে বিনা যুক্তিতে স্রেফ নিজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মাতব্বরির স্বার্থে কোন যুক্তি ছাড়া “তাদের ঠেকাতে” একের পর এক বাধা তৈরি করে যাচ্ছে। এমনই আর এক বাধার দেওয়াল হল, হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইনান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা মেঙ ওয়ানঝুয়ের [Huawei CFO Subrina Meng Wanzhou ] কানাডায় গ্রেফতার। যিনি আসলে হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক রন ঝেংফাই এর নিজের মেয়ে। সেই সাবরিনা মেঙ কোম্পানির কাজে হংকং থেকে মেক্সিকো যাচ্ছিলেন, পথে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ছিল তার বিমান বদলের জন্য যাত্রা বিরতি। আর এই ভ্যাঙ্কুভার বিমানবন্দর থেকে কানাডিয়ান পুলিশ তাকে গত ১ ডিসেম্বর ২০১৮, গ্রেফতার করেছে। কিন্তু এর সাথে আমেরিকার কী সম্পর্ক?

কানাডা-আমেরিকার মধ্যে পরস্পরের “বন্দী হস্তান্তর চুক্তির” সম্পর্ক আছে। তাই আমেরিকার অনুরোধে কানাডা সরকার এই গ্রেফতার করেছে। কিন্তু আমেরিকার অভিযোগ কী?
আমেরিকার দিন ফুরিয়ে আসছে এর অনেকগুলো চিহ্ন ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এর একটা হল, যাকে খুশি তাকে যেকোন অপছন্দের রাষ্ট্রকে নিজের একক সিদ্ধান্তে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করে দেয়া। নেতানিয়াহুর জিগরি দোস্ত ট্রাম্প ইরানের ওপর খুবই বেজার। ট্রাম্প ইরানের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছেন। যার সোজা অর্থ হল ইরান কোন ভিন্ন-রাষ্ট্রের সাথে পণ্য কেনা বা বেচাবিক্রির ক্ষেত্রে আমেরিকান ডলারে সেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন না। করলে কী হবে? করলে এর মানে হবে ওই পণ্যের চালানে ডলারে পেমেন্টের কথা উল্লেখ থাকবে আর সেই ডলার দেয়া-নেয়া করতে গেলে তা একমাত্র একটা পর্যায়ে কোন না কোন এক আমেরিকান ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবেই। আর ইরান যেহেতু অবরোধ ঘোষিত তালিকায় আছে তাই আমেরিকান কোনো ব্যাংকের জন্য ওই অবরোধের অর্থ হল, এই লেনদেন ঘটিয়ে দেয়া নিষিদ্ধ। কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি এমন নিষিদ্ধ লেনদেনে সহায়তা করে আর আমেরিকান সরকার যদি এ জন্য তাকে অভিযুক্ত করে তবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ফাইন দিয়ে তাকে রেহাই পেতে হয়। তাহলে ইরান অবরোধের সাথে হুয়াওয়েকে কিভাবে সম্পর্কিত করছে আমেরিকা?

অভিযোগ হল, হুয়াওয়ে তার মোবাইল টেক বিক্রি করেছে ইরানকে। আমেরিকার অভিযোগ এই বিক্রি ঘটেছে হুয়াওয়ে মূল কোম্পানির নাম বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নয়, বেনামে। ‘স্কাইকম’ নামে এক কোম্পানির মাধ্যমে হুয়াওয়ে ইরানের সাথে কেনাবেচা ব্যবসা করেছে। কিন্তু আইনত স্কাইকম হুয়াওয়ের কোনো অধীনস্ত বা সাবসিডিয়ারি কোম্পানি নয় বলে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে সাবরিনা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই মামলাটা হয়েছে এই লেনদেনে মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে। ভয় পাওয়ার মতো তথ্য হল, প্রমাণিত হলে আমেরিকায় এর সাজা কমপক্ষে ৩০ বছর। তবে কানাডার আদালতে এখনকার মামলা হল সাবরিনা মেঙকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তরের অনুমতি পাওয়ার। কানাডার আদালত অনুমতি না দিলে কানাডা সরকার সাবরিনাকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না। তাই সাবরিনা এখন বিশেষ অনেক শর্তের জামিনে আছে, যার একটা হলো তাকে কানাডায় থাকতে হবে, রায় না হওয়া পর্যন্ত।

ঘটনার এখানে শেষ নয়, উপরে বলেছিলাম যে চীন-আমেরিকা যে বাণিজ্য যুদ্ধের সমাপ্তির আলোচনা চলছে ট্রাম্প সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি সাবরিনাকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটাকে তিনি ঐ আলোচনায় বিশেষ সুবিধা আদায়ের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চান।
কিন্তু ব্যাপারটাতে আমেরিকা একাই চালাক তা তো নয়। চীনও অন্তত দুজন কানাডার নাগরিককে পাল্টা ডিটেনশন দিয়ে আটকে রেখেছে [After Meng’s Vancouver arrest, Chinese police also detained two Canadian citizens]। যাদের একজন আমেরিকার প্রাক্তন কূটনৈতিক, এখন “ক্রাইসিস গ্রুপ” নামের থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে কাজ করছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ‘উঠায়ে নেওয়া’, ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা এসবই চালু করার জায়গায় পৌঁছেছে আমেরিকা।

কিন্তু আমেরিকা এক হুয়াওয়েকে নিয়ে এত মরিয়া কেন?
এখানে দুটা প্রসঙ্গ, তবে কমকথায় বলতে হবে। একালে মোবাইল টেকনোলজিতে আমেরিকা আর কুতুব কেউ নয়। বরং সব  টেক কোম্পানিই বেচে-কিনে সারা। আমেরিকান ভ্যানিটি ছিল প্রখ্যাত গ্রাহাম বেলের এটিঅ্যান্ডটি [AT&T]। কিন্তু এত বিখ্যাত এটাই তার নেতি দিক। কোম্পানিটা একচেটিয়া করছে – এই অভিযোগে আমেরিকান এন্টি-ট্রাস্ট আইনের মামলা খেয়েছিল এই কোম্পানি। ফলাফলে দুটা ঘটনা ঘটে। এটিওঅ্যান্ডটি নিজেই নিজের কোম্পানিকে ভেঙ্গে দুইটা করে। মানে লুসেন্ট (Lucent) নামে যন্ত্রপাতি উৎপাদন ইউনিটকে আলাদা কোম্পানি [Lucent Technologies, Inc.] হিসেবে সাজিয়ে নেয়। এতে সেকালে (১৯৯৬) বাজারে প্রবল সাড়া জাগানোতে ইনিশিয়াল ইস্যু করা শেয়ার বেচে তারা তিন বিলিয়ন ডলার জোগাড় করেছিল।

আমাদের অধুনা বিলুপ্ত মোবাইল কোম্পানি সিটিসেলের কল্যাণে “সিডিএমএ” [CDMA] নামে টেকনোলজির কথা কেউ কেউ জানি। বাংলাদেশের মোবাইলে ওই একটাই সিডিএমএ নামে টেকনোলজি ছিল। এ ছাড়া বাকি সবগুলো এখন জিএসএম [GSM]। এই দুটা ছাড়া কাছাকাছি সুবিধা-অসুবিধার অন্যান্য অনেক টেকনোলজি ছিল। আমেরিকান সরকার ১৯৯৬ সালে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে দেশে টেকনোলজির স্টান্ডার্ড বলে কিছু সবাইকে আর মানতে হবে না। “সিডিএমএ” বা “জিএসএম” বা যেকোন স্টান্ডার্ডের মোবাইল সার্ভিস চালু করা যাবে।  সরকার তখন মনে করেছিল এতে একচেটিয়াত্ব বন্ধ হবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে যায়। কারণ, মোবাইল টেকনোলজি ব্যবসার রিস্কি দিকটা হল, এখানে ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কোম্পানিগুলোকে নিরন্তর গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করে যেতে হয়। তাই আমেরিকায় একটা স্ট্যান্ডার্ড না থাকার কারণে সব টেকনোলজির ফোন সার্ভিস বেচে তুলে আনা রাজস্ব সবগুলো টেকনোলজিতেই গবেষণা করতে গিয়ে ভাগ হয়ে যায়। ফলে প্রত্যেকটা টেকনোলজির গবেষণা খরচ জোগানো কঠিন হয়ে যায়। ফলে ২০০১ সালের মধ্যে লিসেন্টের পতন শুরু হতে থাকে। এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মটোরোলা [Motorola] তারও অবস্থা খারাপ। মোটের ওপর আজকের শেষ পরিণতি অবস্থাটা হল – নরওয়ের নোকিয়ার কাছে আমেরিকার লুসেন্ট বা মটোরোলা দুটাই বিক্রি হয়ে গেছে। ওদিকে ফ্রান্সের আর এক কোম্পানি “এলকাটেল” [Alcatel] – সেও এখন নোকিয়ার পেটে, চলে গেছে। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে আমেরিকার নিজের এখন মূল ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতি বানানোর কোন কোম্পানি নেই। সব ইউরোপের হাতে। বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত এর মূল কারণ ইউরোপ শুরু থেকেই কেবল ‘জিএসএম’ [GSM] একেই একমাত্র মোবাইল টেক স্ট্যান্ডার্ড বলে নির্দিষ্ট করে দেয়। ফলে এখানে কোম্পানিগুলোর গবেষণার খরচ জোগান তুলনামূলক সহজ ছিল।
তাহলে সার কথা দাঁড়াল আমেরিকার হাতে কোনো ৫জি টেকনোলজিই নেই। কিন্তু না থাকলে কী? ইউরোপ থেকে কিনে নেবে!
ব্যাপারটা অত সহজ নয়। কেন?

৫জি এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন
মূল কারণ ৫জি কোনো সাধারণ টেকনোলজি নয়। যেমন ২জি থেকে ৩জি অথবা ৩জি থেকে ৪জি এসেছিল – তেমন সাধারণ নয়। কথাটা ভেঙে বলতে হবে।

প্রথমতঃ আগের যেকোনো টেকনোলজি থেকে ৫জি তে আসা – এটা এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন। মানে কী? এত সাংঘাতিক করে ব্যাপারটা হাজির করছি কেন?
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial intelligence, AI) এর কথা একালে আমরা অনেকে শুনেছি। যন্ত্র বা রোবটকে মানুষের বুদ্ধিতে চলার মত করে তৈরি করা। মানুষের শ্রম কম লাগবে। আর এর বিকল্প হিসেবে রোবট সে কাজ করবে। যেমন “রোবট রেস্টুরেন্ট” – মানে এখানে কাস্টমারকে রোবট ঘুরে ঘুরে খাওয়া সার্ভ করছে, অর্ডার নিচ্ছে – এটা আমরা অনেকেই দেখেছি।

এ ছাড়া ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির কথা শুনেছেন অনেকে। এসব আগামীতে আমরা কেমন থাকব, চলব, কেমম কাজ পাবো, করব অথবা আমাদের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুকে বদলে দেবে, প্রভাবিত করবে।

এসবের প্রধান আর কমন বিষয়টা হল, এগুলো গায়েবি নিশ্চয় নয়, বরং মানুষই অনেক দূরে বসে এসব কিছুকে পরিচালিত করবে। যেহেতু অনেক দূর থেকে, একটা বৃত্তের মধ্যে নানান জায়গায় বসে বসবাস করে তাই খুবই দ্রুত আর বাল্ক নির্দেশ পৌঁছানোর উপযুক্ত তারবিহীন টেকনোলজি বা নির্দেশ বহনকারী ওয়ারলেস টেকনোলজি লাগবে। এসব কিছু ঠিকঠাক চলার ব্যাকবোন বা শিরদাড়ার মত কাজ করতে হবে ৫জি ওয়ারলেস টেকনোলজিকে। এর মাধ্যমেই সবাই সব নির্দেশ পাঠাবে, নেবে।

আরো দিক আছে কারখানা পর্যায়েও প্রডাকশন লাইনে নির্দেশ পাঠাতে ব্যবহৃত হবে ৫জি টেকনোলজি। এ জন্য বলা হচ্ছে এই ৫জি মোবাইল বা ওয়ারলেস টেকনোলজিকে আসলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

এই বিপুল পরিবর্তন যা মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটাবে এর ব্যাকবোন  হতে যাচ্ছে ৫জি টেকনোলজি। অথচ আমেরিকার হাতে এটাই নাই, থাকবে না। এখনও যদি শুরু করে তবুও তিন থেকে পাঁচ বছরের পেছনে থাকবে আমেরিকা। এছাড়া অর্থনৈতিক লাভজনকভাবে একে প্রতিস্থাপন সে ত আমেরিকার জন্য আর এক অলীক স্বপ্ন! আর ওদিকে চীন! এখনই সে শীর্ষে। অতএব, বলাই বাহুল্য আমেরিকা কেন এমন হাত-পা ছোড়া ছোট ছেলের মতো অস্থির আচরণ করছে। আমেরিকার জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ও পরিণতি অপেক্ষা করছে বলাই বাহুল্য!

[এই ব্যাপক পরিবর্তনের টেকনিক্যাল দিকটা  থেকে আগ্রহী পাঠকেরা এই আর্টিকেল ও সংশ্লিষ্ট অন্যগুলো পড়ে দেখতে পারেন।]

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

চীন সফর ইতিবাচক

চীন সফর ইতিবাচক

গৌতম দাস

০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2BN

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই মাসের শুরুতে ১-৬ জুলাই চীন সফরে যাচ্ছেন। এটা তার চলতি গত ১০ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে প্রথম ২০১০ সালের মার্চেরটা সফরটা সহ ধরলে এটা তৃতীয় চীন সফর হবে। তবে আগের ২০১৪ সালের জুনের  সফরটা ছিল ২০১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে। এবারো প্রায় তাই, ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরের ছয় মাস শেষে। গতবারের সফরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর পরিকল্পিত থাকা সত্ত্বেও চীন সফরে গিয়ে তিনি মত বদলিয়ে তাতে স্বাক্ষর করেননি। মনে করা হয়, ভারতের আপত্তিকে গুরুত্ব দিতে তিনি বিরত থেকেছিলেন। যদিও তখন চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প কেবল শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এই মহাপ্রকল্পের কোনো ছাপ বা প্রভাব সেবারের কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই ছিল না। কিন্তু আসল ঘটনা ছিল ভারতের ভাষায় “আমার প্রভাব বলয়ের” বাংলাদেশ কেন চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতায় যাবে, এই মনোভাব। না, এটা কোন জল্পনা-কল্পনা ছিল না। ভারত মনে করত যে, এশিয়ার পড়শি দেশগুলো হল ভারতের খাস তালুক যেন নিজ বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ির উ্ঠান। আর সে জন্য এটা তার “প্রভাববলয়ের” এলাকা। তবে অবশ্য ভারত নিজেই পরে এ থেকে পিছু হটে।

নীচের প্যারা দুটা গত ২০১৮ সালের পুরানা লেখা থেকেঃ

[‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।]

এটা ঘটেছিল ট্রাম্পের আমেরিকার হাতে পড়ে এর আগে আমেরিকা থেকে ভারত যা যা পেত – প্রাপ্ত প্রায় সে সব সুবিধা গুটিয়ে যাওয়া অথবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই যখন ভারত নিজ-কল্পিত দেবতা ট্রাম্পের উপর পুরা হতাশ হয়ে চীনমুখী পথ ধরেছিল; এর শুরুতেই তখন ভারত নিজ মিডিয়াতেই যেচে স্বীকার করে বলেছিল যে, তার এমন মুরোদ নেই। “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক”।

যা হোক, ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে। বাংলাদেশে আমরা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছি বলে বেড়িয়েছি, আবার সময়ে পিছিয়েও গিয়েছি। এ কথাও বলেছি, “আমরা যা দিয়েছি ভারতকে মনে রাখতে হবে”। এমনকি উল্টো ভারতকেই বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে সাহসের সাথে আহবান রেখেছি। আবার পরক্ষণে চাপের মুখে বলেছি, বাংলাদেশের জন্য আমরা “চীন না অন্য বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজছি”। আবার চীনা রাষ্ট্রদূতের সাহসের বলে বাইরে বের হয়ে বলেছি বেল্ট-রোড প্রকল্পে আমরা জিন্দা আছি। আমরা বিএনপিসহ সর্বদলীয় “বাংলাদেশ-চায়না সিল্ক রোড ফোরাম নামে অধিকাংশ দলের এক সমিতি গঠন করে ফেলেছি।

এমনই এক পটভূমি পরিস্থিতিতে আর বিশেষ করে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার চীন সফরে যাচ্ছেন। এখন এবারও কী প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগের সফরের বকেয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তা তুলে ধরে এগিয়ে যেতে পারবে? সার কথায়, যেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ, এর পক্ষে সবলে দাঁড়িয়ে চীনের সাথে গভীর সম্পর্কে গড়তে এগিয়ে যেতে সাহস করবে? এতে কে কী মনে করবে তা পেছনে ফেলে সফলভাবে নিজ লক্ষ্য অর্জনে লিপ্ত হতে পারবে? এগুলো সবই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, সন্দেহ নেই।

তবে প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে এই চীন সফর আয়োজন করে ফেলা – এটাই ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ও সঠিক পদক্ষেপ। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক আপত্তি বা সমালোচনা যা আছে সব সহই এ ঘটনাকে আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারি; অন্তত এ কারণে যে এই সফরটাই ভারতের স্বার্থের অধীন থেকে বা এর কবল থেকে বাইরে বেরিয়ে বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে নেয়া এক ইতিবাচক পদক্ষেপ।

যদিও এখানে একটা লুকোছাপা আছে। ভারতের একটা নিমরাজি সম্মতি আছে এই সফরে। ভারতের নিজ মুখরক্ষার একটা বয়ানও আছে। সেটা হল এমন, যেন নিজে নিজেদেরই সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা আছে। এই সমস্যার হাল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব-শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক ও কিছু মাত্রায় ঘনিষ্ঠতায় যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই। তাই ভারত এটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হতে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব-বলয় আগের মতোই আছে বা থাকছে- এই অনুমান। যেমন আনন্দবাজার এমনই সাফাই দিয়ে লিখেছে,

“এক দিকে ওবর (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) মহাপ্রকল্পে বাংলাদেশকে কাছে টানা, অন্য দিকে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চিন, ভারত, মায়ানমার) অর্থনৈতিক করিডরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। চিনের এই যৌথ কৌশল ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল বলে মনে করছে বিদেশ মন্ত্রক। দেশে নতুন সরকার আসার পরে এই করিডরটি নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করবে চিন, এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এ বার বাংলাদেশের স্বার্থকে করিডরের সঙ্গে আরও বেশি করে তারা যুক্ত রাখবে, যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না”।

রোহিঙ্গা ইস্যুঃ
রোহিঙ্গা ইস্যুকে আমাদের সরকার সামনে নিয়ে এসেছে এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। তবে এ প্রসঙ্গে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসাই মূলত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কথাও খুবই সত্যি যে, এটা ষাটের দশক নয় যখন  কোন জনগোষ্ঠীকে দিনের পর দিন উদ্বাস্তু করে অনিশ্চিত ফেলে রাখা হবে আর তারা চুপচাপ নিরীহ বসে থাকবে। আগে যাই ঘটে থাকুক, এই শতক শুরুই হয়েছে সশস্ত্রতায় – হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া দিয়ে। ফলে গ্লোবাল পরিস্থিতি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার পক্ষে অথবা বলা যায় অভ্যস্ত। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগাতে তৎপর পরস্পরবিরোধী ছোট-বড় স্বার্থ এত বেশি যে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ধরে রাখাই এক কঠিন কাজ। হোস্ট বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে একাজে।

তবে মনে রাখতে হবে চীনকে কোন কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীনা কূটনীতির শক্তি এখানে অর্থনীতিক, ঠিক রাজনৈতিক নয়। চীন রোহিঙ্গা সমস্যাকে দেখে থাকে, রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ বা অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব এটাই মূল কারণ। ফলে চীনের দেখা এর সমাধানও এখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করার মধ্যে – এভাবে। রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ সমস্যা আছে  একথা হয়ত সত্য হলেও কিন্তু সেটাই রোহিঙ্গাদের চরম নিপীড়িত ও উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণ নয়। মূল সমস্যা রোহিঙ্গারা মুসলমান এই রেসিয়াল ঘৃণা তো বটেই; এ ছাড়া বরং নিজ বার্মিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে সবাইকেই এই বার্মিজ জেনারেলরা প্রচন্ড বর্ণবাদী ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। আর একারনেই রোহিঙ্গাসহ জেনারেলদের অপছন্দ এমন সব জনগোষ্ঠীকেই একমাত্র স্মূলে নির্মূল করার মধ্যেই তাঁরা সমাধান দেখে থাকে। এমন বার্মিজ শাসকদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে কাজ আদায়ের কৌশল কতটা কাজ করবে তাতে আস্থা রাখা কঠিন। সারকথায় চীনা এই পদ্ধতিতে কাজ আদায় বা চাপ দেয়া – টুলস হিসেবে খুবই দুর্বল। আসলে বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে নয় “রাজনৈতিক চাপ” সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুরই কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

চাপ হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন তোলা ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশনের জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইট বা বিচারের আইসিসির তৎপরতা ঘটানো – এটাই একমাত্র “রাজনৈতিক চাপ” এর উপায় নয় নিশ্চয় তা হলেও সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু যেকোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের মত চীন এই পথে খুবই দুর্বল। হিউম্যান রাইট কমিউনিস্টদের হাতিয়ার নয়। যদিও অন্য কোন কিছুও হাতিয়ার হতে পারে। যেমন কমিউনিস্ট পটভূমির রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও পশ্চিমের আমেরিকাসহ যারা হিউম্যান রাইট ইস্যুতে চাইলে গ্লোবাল ক্ষমতার করিডোরে খুবই সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে, মিয়ানমারের জেনারেলদের নাস্তানাবুদ করতে পারে – আমেরিকা বা ইউরোপের হিউম্যান রাইট বিষয়ক ততপরতার দিক থেকে এই চাপ এখনও খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে, এই সুযোগ এখনো হারিয়ে যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কেবল চীনামুখী বা চীনা নির্ভরতা হয়ে পড়া হবে মারাত্মক ভুল। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায় আমরা এককভাবে নিয়ে যে ইউরোপসহ পশ্চিমা শক্তিকে রক্ষা করেছি সে কথা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি। আর সেই সাথে  দায়-কর্তব্যের তাদের পার্ট মনে করাতে এক ক্যাম্পেন করতে পারি। এর পরিপূরক হিসেবে অন্তত অর্থনৈতিক দায় বইতে তাদেরও আমাদের সহায়তা দেয়া ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে তাদেরকেও চাপ দেয়া ও বাধ্য করতে পারি।

সারকথায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমাশক্তি আর অন্যদিকে চীন এভাবে সবার চাপ সৃষ্টির শক্তিকে একসাথে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। এটা না করতে পারলে বরং মিয়ানমারের জেনারেলেরা চীনকেই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে ফেলবে, যা করে এত দিন সে টিকে আছে।

এ দিকগুলো বিবেচনা করে কথা বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামার দাভোস সম্মেলনঃ
তবে এই চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও আরেকটা টুপি বা আড়াল আছে তা হল – ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (এখন থেকে সংক্ষেপে কেবল ‘ফোরাম’ লিখব)। অফিশিয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন যাচ্ছেন কারণ ফোরাম-এর “সামার দাভোস সম্মেলন” [Summer Davos“. Organised by the World Economic Forum] চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই আড়ালটা হল, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ১-৩ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সেই- ‘সামার দাভোস সম্মেলনে’ যোগ দিতে যাচ্ছেন। ফোরামের খুব সংক্ষেপে পরিচয় দিলে, এই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জন্ম ১৯৭১ সালে, যা মূলত রাজনীতি ও ব্যবসায়ের নেতা এবং গ্লোবাল সমাজের অন্যান্য নেতাদেরকে একসাথে বসিয়ে গ্লোবাল, রিজিওনাল বা শিল্প-কলকারখানা-বিনিয়োগের নানা ইস্যুতে কথা বলানো, যাতে তা পরিণতিতে এটা দুনিয়াকে নতুন ইতিবাচক আকার দিতে সহায়ক হয় – এমন কথা বলানোরই প্লাটফর্ম হল এই ফোরাম।

একেবারে স্বল্প কথায়, এটা হলো ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বসিয়ে কথা বলানো – কথা বলানোর এক ফোরাম। এতে এর বার্ষিক সম্মেলন একই সময় একাধিক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হবে এভাবে আগাম ঠিক করা ইস্যুতে রাষ্ট্রপ্রধানসহ যে কাউকে বক্তা ও শ্রোতা বানিয়েীটা আয়োজন করা হয়। আয়োজক এই ফোরাম নন-প্রফিট দাতব্য ধরনের সংগঠন, যা নিজেরা নিজেদের ‘প্রাইভেট-পাবলিক’ সংগঠনের মিলনমেলা বলতে পছন্দ করে। বরাবর প্রতি বছর জানুয়ারিতে এই ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ২০০৭ সাল থেকে এর বার্ষিক সম্মেলন দুইবার করে হচ্ছে। প্রতি জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস জেলা শহরের মুল সম্মেলনটা ছাড়াও ২০০৭ সাল থেকে সব সময় চীনে আরেকটা সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের দালিয়ান ও তিয়ানজিং এ দুই শহরের একেকবার একেকটায়, প্রতি জুলাইয়ে তা ঐ একই ফোরামের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এটাকেই ‘সামার দাভোস’ নামে ডাকা হচ্ছে। তবে এখানে প্রাধান্য পায় উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো। একারণে সামার দাভোসের আর এক নাম হল Annual Meeting of the New Champions। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এখানেই যোগ দিতে যাচ্ছেন। আর যেহেতু চীনে যাচ্ছেনই, তাই যেন তিনি চীনের সাথে এই ফাঁকে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৈঠকগুলোো করে নেবেন ৩-৬ জুলাই, ব্যাপারটা হাজির করা হয়েছে অনেকটা এ রকমভাবে।

এই সফরে কী কী চুক্তি স্বাক্ষর হবে সে বিষয়ে মিডিয়ায় যা প্রকাশ হয়েছে তা হল মোট আটটা চুক্তি (বা কোনটা সমঝোতা স্মারক)। যার প্রথম চারটিই হল, পটুয়াখালির পায়রায় যে তেরো শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণ হচ্ছে তা উৎপাদনে গেলে পরে এই বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিতে হলে নতুন কিছু “বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামো” নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ গ্রিড নির্মাণ, লাইন টেনে পরিচালন ও তা বিতরণ ইত্যাদি- এই কাঠামো তৈরিতে যে বিনিয়োগ লাগবে এমন বিষয়ক চুক্তি। এমন প্রথম চার চুক্তির কেবল অর্থমূল্য হিসেবে তা সম্ভবত মোট মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাকি পরের দুই চুক্তি হল, চীনের সাথে যেসব বিনিয়োগ আগামীতে হবে এর টেকনিক্যাল দিক – মানে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতার চুক্তি। এ ছাড়াও অন্য একটা চুক্তি হল, ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎস চীনে, সে অংশ ও আমাদের অংশের প্রবাহবিষয়ক তথ্যবিনিময় ও তা ব্যবহারে সহযোগিতাবিষয়ক। আর শেষের চুক্তিটা হল, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে। এই হল মোট আট চুক্তি।

BCIM প্রকল্পঃ
অতএব, ঠিক বড় বিনিয়োগ আনতে বা এখনই বড় কোনো প্রকল্প চুক্তি হতে যাচ্ছে এই সফর ঠিক তেমন নয়। তা হলে? চোরের মন পুলিশ পুলিশ। ভারতের প্রবল অনুমান যে এই সফরে মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে BCIM প্রকল্প। BCIM নামটা চার রাষ্ট্রের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি। এপ্রসঙ্গে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক খবর ভারতের অনেক মিডিয়াই ছেপেছে। পিটিআই বলছে,  [BCIM] ‘বিসিআইএম(কলকাতা থেকে ঢাকা কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং- এই সড়ক ও রেল সংযোগ) প্রকল্পকে চীনারা সাম্প্রতিককালে আবার জাগিয়েছে” [China lately is making efforts to revive the BCIM.]। আসলে এই প্রকল্প কখনোই বাতিল করা না হলেও ভারত একে মৃত বলতে, এমন রটনা করতে পছন্দ করে থাকে। কারণ ভারত চায় না এই বিসিআইএম প্রকল্পে সে নিজে জড়িয়ে থাকে অথবা তাকে বাদ দিয়ে এটা সফল হয়ে যাক তা-ও চায় না। এখনকার এর কারণ, চীনের নতুন প্রস্তাব হল BCIM প্রকল্প বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হোক,  এতে বাংলাদেশ খুবই আগ্রহী; কিন্তু ভারত একেবারেই নয়। তবে এই প্রস্তাবের আগেও ভারতের অবস্থান ছিল নেহায়তই না বলতে না পেরে যুক্ত থাকা। কারণ আবার ভারত চায়, বিসিআইএম প্রকল্প বলতে এর মানে হোক শুধুই সড়ক ও রেল সংযোগ। কোন গভীর সমুদ্র বন্দর নয়।

অথচ এর বড় এক মূল অনুষঙ্গ ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দর ছাড়া এই “সংযোগ” অবকাঠামো গড়া অর্থহীন। এমনকি তা অর্থনৈতিকভাবে বিচারে এতে বিনিয়োগ করলে তা ভায়াবল হবে কি না বা খরচ উঠবে কি না সন্দেহ। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলেও, ভারত শুরু থেকেই বন্দর নির্মাণকে বিসিআইএম প্রকল্পের অংশ নয় মনে করতে চায়। অতএব চীন-বাংলাদেশের বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা মানেই তা সোনাদিয়া বন্দরসহই। আর এটাই ভারতের জন্য অস্বস্তির।

তবে ভারতের আপত্তির যুক্তি বড়ই অদ্ভুত আর তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বলছে সে চাচ্ছে না ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্টের ভেতর দিয়ে এসে চীন বাংলাদেশের কোনো বন্দর ব্যবহার করুক। আনন্দবাজারের ভাষায় বললে, “বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে। ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”। কিন্তু ঘটনা হল। বিসিআইএমের রুট হল, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে মান্দালয় হয়ে কুনমিং। এটা ভারতের সব মিডিয়া নিজেই লিখছে এই রুট মোট দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটারের। যেমন এভাবে, [The 2800-km BCIM corridor proposes to link Kunming in China’s Yunnan province with Kolkata, passing though nodes such as Mandalay in Myanmar and Dhaka in Bangladesh before heading to Kolkata.]।

অথচ ওদিকে ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্ট হল,  বাংলাদেশের দিনাজপুর-সিলেট এই পুরা উত্তর ভূখণ্ডেরও আরো উত্তরে, যা বিসিআইএম’র রুটেই নয়। বিসিআইএম’র রুট হল বলতে গেলে, কলকাতা-যশোর-ঢাকা হয়ে এবার পুরা দক্ষিণে বা দক্ষিণ-পুবে, আর নর্থ ইস্ট হল এর পুরো উত্তরে। তাহলে?

আসলে BCIM প্রকল্পে চীন বলতে সকলে কুনমিং বুঝলে ও বুঝালেও (কুনমিং আমাদের কক্সবাজার থেকে বার্মার মান্দালয় পার হলে তবেই পৌছানো যাবে) এমন হলেও ভারত জবরদস্তিতে মানে করতে চাচ্ছে – এটা ভারতের নর্থ-ইস্টের অংশ অরুনাচল প্রদেশে চীন-ভারত সীমান্তের ওপারের চীন। হতে পারে ভারতের ভয় এখন চীন বলতে কুনমিং বুঝলেও ভবিষ্যতে প্রকল্প গড়া শেষ হলে চীন তখন আসাম-অরুনাচল সীমান্তের অপর পারের দিক থেকে চীন হিসাবেও আসাম-বাংলাদেশ হয়ে সোনাদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

আর সম্ভাব্য এখানেই চীনকে আসাম করিডোর ব্যবহার করতে দিতে ভারতের ভীতি ও আপত্তি আছে, ধরা যাক ভারত এটাই বলতে চাইছে। ভারতের এই কথার মানে হল, তাহলে কাউকে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ জায়েজ। অতএব, বাংলাদেশ কেন নিজ ভুখন্ড পেরিয়ে ভারতকে নর্থ-ইস্টে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ করবে না।

আবার মজার কথা হল, আসামসহ নর্থ-ইস্টকে চীন করিডোর হিসেবে যাতে ব্যবহার না করতে পারে বা করে ফেলবে এই ভয়ে ভারত নর্থ-ইস্টকে চরম পিছিয়ে পড়া, অবকাঠামোহীন এক অঞ্চল করে গত সত্তর বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রেখেছে। এটাই আসাম সংকটের মূল কারণ; ওখানকার বাসিন্দাদের স্থবির হয়ে থাকা ও রাখা অর্থনৈতিক জীবনের। অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে যে মুসলমানেরা এর কারণ। বাসিন্দাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে ঘৃণা জাগাতে। আর মুসলমান মানেই যেন এরা নিশ্চয় বাংলাদেশের – এই অদ্ভুত প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আর এখান থেকেই এনআরসি (NRC), মুসলমান খেদানো, ৪০ লাখ মানুষকে রিফুউজি ক্যাম্পে মানবেতরে জীবনে ফেলে রাখা ইত্যাদি কী নয়! অর্থাৎ এ যেন, নিজ সন্তান হত্যা করে হলেও প্রতিবেশীর ক্ষতি করতে হবে – এই মনোভাব। সত্যি অদ্ভুত এই হিন্দুত্বের রাজনীতি!

অদ্ভুত এক বাস্তবতা হল, হাসিনার এই আসন্ন সফর নিয়ে ভারতের এই “হিন্দুত্বের রাজনীতি” চরম অস্থির ও খামোখা উদ্বিগ্ন। পিটিআই’র [PTI] ওই রিপোর্ট আরও লিখেছে, ‘সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদি সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের সামিট মিটিংয়ের (১৩-১৪ জুন) সাইডলাইনে কথা বলেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি দীর্ঘ সময়ের পরে বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে কথা তোলেন”। [After a long gap, Xi raised the BCIM project during his meeting with Prime Minister Narendra Modi at Bishkek on the sidelines of the Shanghai Cooperation Organisation summit early this month.]।

লক্ষণীয়, এখানে বিসিআইএম প্রকল্প চীন আগে বাতিল করেছিল তা বলা হয়নি, বলা হয়েছে আফটার লং গ্যাপ- অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পরে প্রেসিডেন্ট শি ইস্যুটা নিয়ে কথা বলেছেন। পিটিআই’র এমন লেখার পেছনের কারণ পাওয়া যায় এখানে, গত ১০ জুন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট [China denies abandoning BCIM corridor। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত প্রতিদিন এক সাংবাদিক প্রেস ব্রিফিং করে থাকে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের কথা ভেবে ভারতীয় সাংবাদিক সেখানে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসে যে, চীন বিসিআইএম প্রকল্প বাতিল করেছে কিনা। স্বভাবতই ব্রিফিং কর্মকর্তা তা নাকচ করেন ও বলেন যে, না তা চালু আছে [“the BCIM has not been abandoned. It is very much on board.”]। আর তা থেকেই হিন্দুত্বের রাজনীতি অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে যে হাসিনার চীন সফরে গুরুত্বপুর্ণ আলোচনার বিষয় বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে কথা হবে। বাংলাদেশ নিজ একান্ত স্বার্থে তার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী স্বাধীনভাবে শেষ পর্যন্ত এবিষয়ে আলোচনা আগিয়ে নিয়ে সক্ষম হবে! আমরা বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছি!

আমেরিকাও কান পাতাঃ
হাসিনার আসন্ন চীন সফর নিয়ে আরেক লক্ষণীয় দিক হল – কেবল ভারত নয়, আমেরিকাও কান পেতে এ সফরকে জানা ও শুনার জন্য গভীর আগ্রহী। এর আগে এসব ক্ষেত্রে দেখা যেত এনিয়ে একটা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার রিপোর্টই তাদের যথেষ্ট ছিল। ইদানীং দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কিছু মিডিয়া হাসিনার চীন সফর নিয়ে ভারতের মতোই আগ্রহী রিপোর্ট ছেপেছে। ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’ বা এর এফিলিয়েটেড ‘বেনার নিউজ’ এমন আমেরিকান সরকারের বিদেশনীতির আলোকে রিপোর্ট লিখেছে। এরা পরস্পর একই রিপোর্ট শেয়ার করে থাকে।  Radio Free Asia, এই নাম বা শব্দের মধ্যে “FREE” শব্দটা ইন্টারেস্টিং। কোল্ড ওয়ারের যুগে সোভিয়েত বিরোধী প্রপাগান্ডা লড়তে আমেরিকার প্রিয় শব্দ ছিল ফ্রি। মানে বদ্ধ সোভিয়েত দুনিয়া থেকে মুক্ত দুনিয়ায় আহবান। ব্যাপারটা এখানেও প্রায় তেমনই। বলা হয়েছে এশিয়ার যেসব দেশের জনগণকে তাদের সরকার সত্যিকথা শুনতে জানতে দেয় না, এই রেডিও তাদের জন্য। অর্থাৎ এটা এখন একালে চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডার কাজে লিপ্ত। যা হোক এটা কেবল রেডিও হলেও এদেরি সহযোগী এফিলিয়েটেড আর প্রতিষ্ঠান হল, BenarNews. এরা ইংরাজি ছাড়া আরও বাংলাসহ চার ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন নিউজ।

বাংলাদেশ কতটা চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চলে গেল এ নিয়ে ভারতের মতই আমেরিকার উদ্বিগ্নতা – এটাই তাদের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কলাপাড়া, পটুয়াখালীতে দুর্ঘটনায় এক স্থানীয় শ্রমিকের মৃত্যু হলে শ্রমিকদের সাথে চীনা ঠিকাদারের ম্যানেজমেন্টের বিরোধে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একজন বাংলাদেশী শ্রমিক ও একজন চীনা টেকনিশিয়ান নিহত হয়েছেন। মূলত নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকের “লাশ গুম হওয়ার গুজব ছড়িয়ে” পড়লে মূলত তা থেকেই সংঘর্ষের শুরু।

এই পরিস্থিতির উত্তেজনা সামলাতে ও ঠান্ডা করতে আপাতত সবাইকে দু’সপ্তাহ ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। বেনার নিউজ লিখছে, It was not immediately clear whether Hasina and the Chinese leaders will discuss the recent fight between Chinese and Bangladeshi workers at a site of a partly built China-funded power plant.]। সারকথাটা বাংলা করে বললে তারা ‘পরিষ্কার নয় যে, এটা ইস্যু হিসেবে চীন-বাংলাদেশ সামিটে আলোচনা হবে কি না’!

আসলেই, এটা Benar এবং RFA এর গভীর উদ্বেগপ্রসূত “আশা”! কিন্তু সমস্যা হল, শকুনের বদ দোয়াতে গরু কখনও মরে না। তবে আমরা পরিস্কার থাকতে পারি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টও লিখে এমন “শকুনি আশা” জানাবে না। ঘটনা হল, এই প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ আবার বাংলাদেশী শ্রমিকের অধিকার রক্ষাও বাংলাদেশের স্বার্থ – দুটোই আমাদের স্বার্থ। দুটোই আমাদের সবল রক্ষা করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এটা নিয়ে “সামিট লেবেল” কথা বলতে হবে? এটা কী চীন-বাংলাদেশ কোন বিরোধ? ঐ রিপোর্ট কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন?  এটা তো রিপোর্টিং নয়, বেয়াদবি খোঁচাখুচি!  ভাষা লক্ষ্য করার মত লিখেছে এটা নাকি “চীনা ও বাংলাদেশি শ্রমিকের ফাইট” [fight between Chinese and Bangladeshi workers] এর ইস্যু। ব্যাপারটা বড়জোর বাংলাদেশী প্রকল্প পরিচালক আর ওই চীনা ঠিকাদার কোম্পানির মিলিতভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক সৎ উদ্যোগ এ সমস্যা মিটিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। অথচ …। বাংলাদেশ-চীনের প্রকল্প ভালো না চললে বা তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেই যেন রিপোর্টারের লাভ, তাই তিলকে তাল। বদ দোয়াই ভরসা!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন সফর ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্পের পলায়ন

ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্পের পলায়ন

গৌতম দাস

২৪ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Bo

 

ড্রোন বিতর্ক, ইরানের হামলা খেয়ে হরমুজ প্রণালিতে কোথায় পড়েছিল
[ড্রোন বিতর্ক, ইরানের হামলা ভুপাতিত আমেরিকান ড্রোন হরমুজ প্রণালিতে কোথায়, সেই ছবি – নিউইয়র্ক টাইমসের সৌজন্য]
শুক্রবারের সকালটা শুরু হয়েছিল অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্যভাবে। প্রথমে হালকাভাবে শুরু হলেও দিন শেষে পরিণতি ছিল ‘পাক্কা’। আসলে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্টের বেইজ্জতি হওয়ার দিন যেন শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকার ‘প্লেবয়’ প্রেসিডেন্ট Trump এবার এক বোকা-ক্যাবলা হয়ে হাজির হয়েছেন। গতকাল প্রথম দেখা গেল – ঢলে পড়া হলেও এখনও গ্লোবাল নেতা আমেরিকা; অথচ এর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন বন্ধুহীন, ইউরোপও তাঁকে বিশ্বাস করে না, তাঁর সাত-পাঁচে নেই বা থাকে না। এমনকি আন্তর্জাতিক মিডিয়াও তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না, তাঁরা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বাইরে খবর খোঁজে। কেন?

বাংলাদেশের শুক্রবার সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে জানা গেল রয়টার্সের ব্রেকিং নিউজ জানাচ্ছে,[ United Airlines suspends Newark-Mumbai flights…] আমেরিকার ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের নিউ ইয়র্ক-মুম্বাই ফ্লাইটটা বাতিল করা হয়েছে।কারণ হিসেবে বলা হয়েছে আগের দিনের এক ঘটনা। আমেরিকান একটি ড্রোন (সামরিক কিন্তু মানুষবিহীন রোবট) বিমান ইরানের আকাশে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়েছিল, যেটা ইরান মিসাইল ছুড়ে ধ্বংস ও ভূপাতিত করে ফেলেছে, এরই প্রতিক্রিয়ায় ঐ ফ্লাইট বাতিল। এ খবর কিছুটা গরমিলের আবার কিছুটা টেনশনেরও মনে হয়েছিল। কারণ, আগের দিন ইরান আমেরিকান ড্রোন [RQ-4 Global Hawk, Drone] ফেলে দিয়েছে কথা সত্য এবং ইরান-আমেরিকা উভয় পক্ষই এটা মিডিয়ায় স্বীকার করেছে। তবে যেটা গুরুত্বপুর্ণ – এটা কোন খেলনা ড্রোন নয়, বরং খুবই উঁচুমানের বা হাইটেক সফিস্টিকেটেড। এর একেকটার মূল্য ১৩০ মিলিয়ন ডলার। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্যাসেঞ্জার বিমান চলাচল করে ৩০-৪২ হাজার ফুট উচ্চতায়। কিন্তু এই ড্রোন ৬০ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় চলাচল এবং নিখুঁত ছবি বা নানান তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তাই আমেরিকার কাছে এটা ছিল মহাবিস্ময় যে, এত উচ্চতার এই ড্রোনও নিখুঁতভাবে ভূপাতিত করার সক্ষমতা ইরানের আছে। এধরণের ড্রোন ভুপাতিত করার জন্য উপযুক্ত একমাত্র টেকনোলজি হল মিসাইল ছুড়ে একে নামানো। তা করতে হলে, ভূমি থেকে আকাশে ছুড়ে যুদ্ধবিমান নামানো যায় – এমন টেকনোলজির মিসাইল দিয়ে এটা করা সম্ভব। ইরান সম্ভবত রুশ ‘এস-৪০০’ [Russian S-400 missile] এখানে ব্যবহার করেছে, যা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।

খবরের গরমিলটা হল – সাধারণত কোনো রাষ্ট্রের আকাশসীমা নিরাপদ মনে না হলে তা এড়িয়ে ঘুরপথে অন্য দেশের ওপর দিয়ে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল করে থাকে। সে ক্ষেত্রে বড়জোর বাড়তি সময় লাগে এবং তেল বেশি খরচ হতে পারে মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে একেবারে ফ্লাইট বাতিল করা হলো কেন?

দিন গড়াতেই সেসব প্রকাশ পেয়ে গেল। বাংলাদেশের বেলা ১১টার মধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমসে পাওয়া গেল বিস্তারিত [Strikes on Iran Approved by Trump, Then Abruptly Pulled Back] আসল খবরটা হল, ড্রোন ভূপাতিত করার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের ওপর হামলা পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা গত শুক্রবার ভোরবেলায় (আমেরিকান সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে) ঘটার কথা ছিল। ওই নির্দেশ পাওয়ার পরে আমেরিকান যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুতিতে নেমেও পড়েছিল। কিন্তু হামলা শুরুর মাত্র ১০ মিনিট আগে হঠাৎ পাল্টা নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প ওই হামলার নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেন। ইরানের ওপর কোন বিদেশী হামলার বিরুদ্ধে তাদের নেয়া যেসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে যেমন- রাডার, মিসাইল ব্যাটারি ইত্যাদির এমন তিনটা টার্গেটে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

খবরটা তখনও আর কোন মিডিয়া বা কোন সরকারি ভাষ্য- কোথাও আসেনি।  এমন প্রাথমিক পর্যায় বলে সেজন্য নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, [Here’s what we know so far… Here’s what we don’t know…] কেন ট্রাম্প ওই হামলা স্থগিত বা বাতিল করলেন তা এখনো জানা যায়নি, এমনকি ওই হামলা আবার করা হবে কি না, তাও জানা যায়নি।

পরবর্তিতে আমেরিকান সময় সন্ধ্যা ৭টা, ২১ জুনে ট্রাম্প নিজে দুইখানা টুইট করেন। আর সেখানেই মুখরক্ষার সাফাই দেন তিনি, এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে হামলার নির্দেশ বাতিল করেছেন। 

তিনি টুইটে যা লেখেন এর সারকথা হল, ‘আমার জিজ্ঞাসায় যখন জেনারেলরা বললেন, এই হামলায় ১৫০ জনের মতো লোক মারা যাওয়ার সম্ভাবনা, তখন এটা অসামঞ্জস্য [disproportionate] হবে মনে করে বাতিল করে দিই। তবে এখানে তার “অসামঞ্জস্য” বলার যুক্তি সম্ভবত এই যে, মানুষবিহীন ড্রোন হারানোর বিরুদ্ধে দেড় শ’ মানুষ মারা – এভাবে তুলনা। কিন্তু এগুলো মুখরক্ষার মিছা কথা। কারণ এর মানে হল, ট্রাম্পের এমন উপদেষ্টা কেউ নেই যিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈঠকে মানুষ মারা যাওয়ার ব্যাপারটা আমলে নিতে পারেননি অথবা বলতে হয়, ইরানের কাছে আমেরিকার ড্রোন হারানোর পালটা উপযুক্ত ব্যবস্থা কী হতে পারে, এর পরামর্শও কেউ ঠিকমতো দিতে পারেনি। সবচেয়ে বড়কথা, ট্রাম্পের এই কথিত পাল্টা হামলার নির্দেশে যে যুদ্ধ শুর্টাহয়ে যাবে তা শুধু আমেরিকা-ইরান নয়, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে তো পড়বেই, এমনকি এখান থেকে নতুন বিশ্বযুদ্ধও শুরু হতে পারে – এটাও তারা কেউ ভাবতেই পারেনি – এমন বোকা-বোকা কথা – এটাই কি ট্রাম্প বলতে চাইছেন? সত্যিই অবিশ্বাস্য! তাহলে আমেরিকা শুধু নয়, সারা দুনিয়া কার নাদানিতে বা কাদের হাতে পড়েছে? আমেরিকান কোন প্রেসিডেন্ট এর আগে এমন আনস্মার্ট, বোকা কথা বলেন নাই; আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হওয়ার মানে কী, দায়দায়িত্ব কী, তাঁর যেকোন পদক্ষেপের দুনিয়াজুড়ে পড়া প্রভাব ও পরিণতি কী হয় সেটা তাঁর অজানা বেখবর এমন নাদানি আচরণ কোন প্রেসিডেন্ট কখনও করেন নাই। ট্রাম্পের বেইজ্জতির শুরু এখান থেকেই।

আসলে বাস্তবে খুব সম্ভব যে, সৌদি আরবের অনুরোধে ট্রাম্প এই ইরান হামলার নির্দেশ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ, ইরানে কোন হামলা হলে এর পাল্টা প্রথম ইরানি হামলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা সৌদি আরবের সবচেয়ে বেশি।

এরপর শুক্রবার বাকি সারা দিনের ঘটনা হল, সৌদি আরব ছাড়া আর কেউ ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ায়নি। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়া ও ভ্যাটিকানসহ সবাই ট্রাম্পকে সাবধান করে বিবৃতি দিয়েছে [‘Brink of war’: World leaders push for Iran-US restraint]। কিন্তু কোন দায় কেউ নেয়নি। বরং ট্রাম্পকে সংযত হতে ইরানের সাথে ডায়লগে যেতে পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া কেউই ইরানের নিন্দা করা দূরে থাক, ইরানের আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত করাতে কোন আপত্তিও জানায়নি। আমেরিকার নেতৃত্বের গত ৭০ বছরের দুনিয়ায় এটা এক বড় ব্যতিক্রম।

এমন হওয়ার পেছনে অন্তত দু’টি কারণ পাওয়া যায়। এক. এখন পর্যন্ত ২০১৫ সালে ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি বাতিল করে কেন ট্রাম্প বের হয়ে এলেন তা তিনি ইসরাইল ও সৌদি আরব ছাড়া আর কারো কাছে উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও সাফাই দিয়ে বলতে পারেননি। ট্রাম্পের একা হয়ে পড়ার শুরু এখান থেকেই। দুই. এ ছাড়াও সে চুক্তি বাতিলের পর ট্রাম্প আসলে ঠিক কী চাচ্ছেন, ইরানকে কোথায় নিতে চান? তা তিনি নিজ কথার মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে বলতে পারছেন না। যেমন এখন বলছেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র উঠতে দেবেন না। ভাল কথা। কিন্তু তাই যদি হবে, তবে আগের চুক্তি ভেঙে দিলেন কেন? কারণ, চুক্তিতে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ, তা কেবল জ্বালানিতে ব্যবহারযোগ্যতার মধ্যে রাখতে হবে এই বাধ্যবাধকতা ছিল; আর তা জাতিসঙ্ঘের নিরপেক্ষ এক্সপার্টের তদারকিতে ছিল।

আসল ব্যাপার হল, ইসরাইল আর সৌদি আরব চায় চুক্তি বাতিল করে আর ইরানকে অবরোধে ফেলে অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্বল করে রাখতে। তাদের এই বায়না – এটাকে ট্রাম্প আর কারও কাছেই ন্যায্য বলে হাজির করতে পারেননি। এমনকি এতে আমেরিকার নিজের কী স্বার্থ, তাও দেখাতে পারেননি। কেবল ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ জন বোল্টন অ্যান্ড গং – এসব উপদেষ্টা্রা আড়ালে [Bolton: ‘Our Goal Should Be Regime Change in Iran’] ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর কথা আওড়াতে দেখা যায়। অথচ চাইলেই কী আমেরিকা তা করতে পারবে? আমেরিকা এ ব্যাপারে দিনকে দিন মুরোদহীন হয়ে পড়ছে সে খবর নাই।

আবার এ কথাগুলো খোদ ট্রাম্পেরই মৌলিক নীতিবিরোধী। কারণ, তিনি ২০১৭ সালে ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে তার জাতিবাদী “আমেরিকা ফাস্ট” [AMERICA FAST] নীতিতে তিনি বলে আসছেন, গ্লোবাল নেতা হিসেবে তাঁর আমেরিকা আর কোনও যুদ্ধে তিনি আর নেই। যুদ্ধবিষয়ক যা কিছু স্থায়ী “কাঠামোগত স্থাপনা” আছে সেগুলোর সব কিছুতেই খরচ কমানো – এমনকি ন্যাটো বা জাতিসঙ্ঘ থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। অর্থাৎ কোন গ্লোবাল দায়দায়িত্ব বা কোন যুদ্ধে জড়ানো থেকে তিনি আমেরিকাকে বের করে আনার পক্ষে – এই নাকি তাঁর মৌলিক নীতি। তাই যদি হয়, তবে ইরানের সাথে চুক্তি ভেঙে দিলেন কেন? আরো এগিয়ে এখন তিনি ইরানে হামলা করে শুধু আমেরিকা নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র দুনিয়াকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে চাইছেন। কেন? এমনকি তিনি তো আসলেই “অন্ধ”, যিনি আমেরিকাকে রাস্তা দেখানো ও গাইড পরিচালনা করার দড়ি নেতানেহায়ুর ইসরাইলের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন! এটা তার কোন ধরনের নীতি?

আরও স্ববিরোধের দিক হল, ইরানের সাথে চুক্তি থেকে বের হওয়ার পর আবার এখন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে অবরোধ দিয়ে রাখার পথ ধরেছেন ট্রাম্প। কিন্তু কেন করছেন, এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? ট্রাম্প দাবি করছেন, তার লক্ষ্য নাকি ইরানকে টেবিলে বসানো। কিন্তু এটা ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে কখনো করা যায়নি, শতচাপের মুখেও তা কাজ করেনি। ফলে এখনো তা হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আবার ট্রাম্পের এই চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে টেবিলে বসানোর আশা করার কায়দাটা ছেলেভুলানো হাস্যকর খেলা বললেও কম বলা হয়। রয়টার্স বলছে [Exclusive: Trump warned Iran via Oman that U.S. attack was imminent, called for talks] ইরানে হামলার নির্দেশ যেটা পরে পিছু হটেছে এটার সাথে নাকি ওমানের মাধ্যমে ইরানকে একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল ট্রাম্প। আচ্ছা, এটা কী রাস্তায় ছিনতাই বা গুন্ডামি করার মত কাজ? যে বলবে যা আছে সব দিয়ে দেও নাইলে ছুরি মেরে দিব?  সেভাবে – ট্রাম্প বলে পাঠিয়েছে ইরান তুমি আলোচনায় বস, না হলে বোমা মারতে পাঠালাম!

স্বভাবতই এতে ইরান কেন, কোন রাষ্ট্রেরই রাজি হবার কোনই কারণ নাই। তাই উল্টো ইরান বলছে,যাকে আস্থা-ভরসা করা যায়, ট্রাম্প এমন লোক নন, তাই সে কথা বলবে না, ট্রাম্পের সাথে ডিল করবে না। অর্থাৎ অন্য গ্যারান্টার দরকার। এটা ট্রাম্পের বড় সমস্যা। আসলে ট্রাম্প যা বলেন তাতে কেউ ভরসা রাখে না, মিডিয়াও না। যার কথার দাম নাই তিনি এমন প্রেসিডেন্ট। যেমন- ট্রাম্প ইরানে হামলা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এতে দুনিয়া অখুশি। আবার হামলা না করে ফেরত এলেন, যেটা এই প্রথম আমেরিকা করল। কিন্তু এটাকে মানুষ আমেরিকার দুর্বলতা মনে করে, যদিও প্রকাশ্যে বলছে না কেউ।

আবার ওদিকে  ইরান-আমেরিকার মধ্যে বিতর্ক আছে যে স্থানে ইরান আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত করেছে, সেটা ইরানের ভূখণ্ডে নাকি বাইরে – মজার কথা হল এই তর্কে কোন রাষ্ট্র বা কোন মিডিয়া কেউ আমেরিকার পক্ষ নেয়নি, পরিস্কার দূরত্ব বজায় রেখেছে। এছাডা দেখা যাচ্ছে এ ব্যাপারে মিডিয়ায় আমেরিকার সরবরাহ করা তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা তুলনায় কম। ড্রোন ইরানি আকাশসীমায় ঢুকেছিল কি না এ ব্যাপারে আলজাজিরার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর জেমস বেসের মন্তব্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইরানের সরবরাহ করা জিপিএস থেকে নেয়া তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা আমেরিকার দেয়া তথ্যের চেয়ে বেশি। নিউ ইয়র্ক টাইমসই প্রথম ডিটেইল ম্যাপ জোগাড় করে ছেপেছিল। আর তাতে দেখিয়েছিল, ড্রোন যখন ইরানি হামলার শিকার হয় তখন আমেরিকা ও ইরানের দাবি করা স্থান দুটো কোথায়। এই দুই দেশের দাবির ফারাক কতটা। নিউ ইয়র্ক টাইমস তার সে রিপোর্ট আপডেট করেছে ইরানের পার্স টিভির দেয়া তথ্য থেকে।

ড্রোন হামলা বা পরে ট্রাম্পের পাল্টা হামলার সিদ্ধান্ত ও সেখান থেকে পিছিয়ে আসা- এই পুরো ব্যাপারটা জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলাই হয়নি। কোনো বৈঠকও ডাকা হয়নি। কারো যেন আগ্রহ নেই। আমেরিকার বন্ধুহীনতার বেলায় এটা বিরাট ব্যতিক্রম। সবশেষে জানা গেল, আমেরিকা নিজেই সোমবার মানে আরো ৭২ ঘণ্টা পরে এই বৈঠক চেয়েছে।

কিন্তু সেখানেও ট্রাম্পের জন্য আরো বিপদ। কারণ, এটা এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম যে, আমেরিকার নিজের ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পরে সে কূটনৈতিক পথে যায়নি, নিরাপত্তা পরিষদে আসেনি; বরং এককভাবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিল। তাহলে এখন আবার সেটা ত্যাগ করে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে এসেছে কেন? এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা কারো নেই। ফলে আমেরিকার অবস্থান আসলে ঠিক কোনটা- সামরিক না কূটনৈতিক, এ ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদের সবাই অনিশ্চিত ও অস্পষ্টতায়, অনাস্থায়। ব্যাপারটাকে তুলে ধরতে আমেরিকার প্রভাবশালী ব্লুমবার্গ মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে- ‘ট্রাম্প ইউটার্ন নিয়েছেন, ইরানে আকাশ হামলা বন্ধ করে রেখেছেন; কিন্তু তবু সাথী বন্ধুরা অস্বস্তিতে” [Trump Leaves Iran, Allies Uneasy Even After Stopping Airstrike]।’

সব দেখেশুনে আলজাজিরার এক কমেন্টেটর বলছেন, পুরো ঘটনা শেষে ইরান এখন ঘটনার ড্রাইভিং সিটে আছে। তা বিশেষত ইরানের দু’টি দাবির কারণে। ইরান বলছে, ওই ড্রোনটা চার ঘণ্টা ধরে আকাশে উড়ছিল। শেষের দিকে সেটাতে ইরান রেডিও মেসেজ পাঠায় যে, তুমি ইরান সীমায় ঢুকে যাচ্ছো, সামলাও নিজেকে। এই ড্রোনে মানুষ না থাকলেও ওর বেজ স্টেশনের সাথে সব সময় যুক্ত থেকেই ওটা পরিচালিত হয়। তাই সে বাইরের রেডিও মেসেজ পেলে সেটা বেজ স্টেশনের কাছে পাঠিয়ে করণীয় জানতে চেয়ে, জেনে সে মোতাবেক কাজ করতে পারে। কিন্তু ওই ড্রোন বা সংশ্লিষ্ট বেজ স্টেশন সব মেসেজ উপেক্ষা করে গেছে। সব আকাশযানের নিচে সাধারণত ওর পরিচিতিসূচক শব্দ লেখা বা চিহ্ন দেয়া থাকে, যা ভূমি বা নিচ থেকে পড়া যায়; যা থেকে বুঝা যায় ওটা কোন দেশের বা কী কাজের।

ইরান দাবি করছে, ওই ড্রোনের সেসব পরিচিতি সূচক লেখা বা চিহ্ন ঢেকে রাখা ছিল, যার মানে, সেটা গোয়েন্দাগিরি ইঙ্গিত। এ ছাড়া ইরান নিজের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দেখানোর জন্য আর একটা তথ্য দিয়েছে। ইরান বলছে, একই সময়ে আর একটা আমেরিকান (সম্ভবত) গোয়েন্দা বিমানও আকাশে ছিল। ইরানের দাবি, তা তেত্রিশ জন মানুষ বহনের যান ছিল, তাই ইরান তাতে হামলা করেনি। চাইলে করতে পারত। সেটা না করে তাদেরকেও সতর্ক রেডিও বার্তা পাঠালে তারা ইরানি আকাশসীমা ছেড়ে চলে যায়। শেষে ইরান মানুষবিহীন ওই ড্রোনকেই ভূপাতিত করেছে। এ কারণে মন্তব্যকারীরা বলছেন, ঘটনা শেষে ইরানই ‘ড্রাইভিং সিটে’। ট্রাম্প সম্ভবত এই প্রথম বুঝছেন যে, একজন ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ হওয়া বলতে ঠিক কী বুঝায়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২২ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)  “ট্রাম্প আমাদের যুদ্ধে নিচ্ছিলেন প্রায় এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]