চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

গৌতম দাস

০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2sw

 

রাষ্ট্রসংঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায় – ছবি : সংগৃহীত বাংলানিউজ থেকে

বাংলাদেশ জুলাই মাসটা শুরু করেছে গ্লোবাল মিডিয়ায় ব্যানার হেডলাইন হয়ে, কারণ রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলসহ পাঁচ সংগঠনের প্রধান একসাথে একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তেনিও গুতেরেস (Antonio Guterres), বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম (Jim Yong Kim) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মরা (Peter Maurer) এবং সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৃহত্তর অধীনেই কাজ করা আরো দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি (Filippo Grandi ) ও মিয়ানমারের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ের ইয়াংহি লি বাংলাদেশে গত ৩০ জুন তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে পৌঁছে গেছিলেন। বলাবাহুল্য হবে না যে রোহিঙ্গা  ইস্যুতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হল, মূলত তিন বিষয়ে। এক : রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে সাময়িক অবস্থানের সময়ে দেখভালের ন্যূনতম ব্যবস্থার সব বিষয় নিশ্চিত করতে কাজ করা। দুই : রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর একটা ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। আর তিন : যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা। সারকথায় এ সফরে তাই মূল উদ্দেশ্য বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের এবং আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা। এছাড়া আশ্রয় দেয়ার অর্থনৈতিক দায় গ্লোবালি শেয়ার করা, তাই বিশ্বব্যাংক নিজেই ৪৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানাল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাই বলছেন ইতোমধ্যেই “উদার জনগোষ্ঠি বাংলাদেশিরা” রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে “বিপুল বোঝা নিজের কাধে” নিয়েছে। “তাদেরকে আর শাস্তি না দিয়ে তাদের বোঝা আমাদের শেয়ার করা উচিত”। ইংরাজি দৈনিক ডেইলি স্টার লিখেছে, “Generous humane country like Bangladesh shouldn’t be punished: WB”।

দুনিয়ায় মানুষ, সাধারণভাবে সব মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন “বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন” (Multi-lateral) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত চলে আসা দুনিয়াতে মানুষের অর্জন কম নয়। এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই আজকাল পাওয়া যাবে যারা সাফল্যের সাথে দুনিয়ার মানুষের সম্ভাবনা, মানুষের সাফল্যের ও অর্জনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বহুরাষ্ট্রীয় শব্দটাকে ইংরাজিতে মাল্টি-ল্যাটারেল (Multi-lateral) বলা হয়। কারণ তা, এ কথা মনে রেখে যে, আধুনিক যেকোনো ছোট বা বড় রাষ্ট্র মাত্রই সার্বভৌম রাষ্ট্র; যার সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের উপরে ক্ষমতাশালী অন্য কেউ থাকতে পারে না, পারবে না। ফলে ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের অন্য কোনো সংগঠনও এর উপরে থাকতে পারে না, কর্তৃত্বাধীন করতে পারে না। তাই ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের সংগঠন যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, রেডক্রস ইত্যাদির মতো সংগঠনগুলোর জন্ম হয়েছে এমনভাবে, যেন এসব সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুপ্রীম, তা অলঙ্ঘনীয় এ মূলনীতিকে মাথায় রেখে। তাই ল্যাটারাল ধারণাটা পাশাপাশির, কেউ কারো ওপরে নয়; না কোনো সদস্য আর এক সদস্য রাষ্ট্র, না কোনো অ্যাসোসিয়েশন সংগঠন নিজে সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে কর্তৃত্ববান। এই কারণেই ল্যাটারাল শব্দটা যার আক্ষরিক বাংলাটা হল “বহু বাহু” বিশিষ্ট।

তবু বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ার বেলায় সার্বভৌমত্বও এখানে ঠিক মূল বিষয় নয়। বরং মূল বিষয় মূল্যবোধ (values)। ঠিক কিসের বা কী সংক্রান্ত মূল্যবোধ? এককথায় বললে মানুষ সংক্রান্ত। মানুষ কে, কারা, কী এসব বিষয়ে মৌলিক ধারণা সংক্রান্ত মূল্যবোধ।

লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় হল, মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে “রাষ্ট্রসংঘ”, যুদ্ধে দুতয়ালি, ত্রাণ আশ্রয় সুরক্ষা চিকিৎসা সেবা দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ক এবং যুদ্ধকেই কিছু নীতি কনভেনশনের অধীনে আনার সংগঠন “রেডক্রস” ইত্যাদির জন্ম বেশি দিন আগের নয়। মাত্র গত শতাব্দীতে, তাও বিশেষত ১৯০০-১৯৫০ এই প্রথম অর্ধের মধ্যে। এর মূল কারণ একটি অভিন্ন মূল্যবোধের উপরে দুনিয়ার সবাইকে নিয়ে একমতে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। কেন? কারণ, দুনিয়ার নিয়ম যখন থাকে অপর রাষ্ট্রকে সরাসরি জবর দখল ও কলোনি করে রাখা, সেখানে মানুষের আর মূল্য কী? মূল্যবোধই বা কী? তবু গত ১৯১৯ সালে রেডক্রসের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল।

তবে বুঝার সুবিধার জন্য একটা কথা আগে বলে রাখা ভাল। বুঝার সূত্র। কলোনি দখল যুগের শুরু হয়েছিল মোটামুটি ১৭০০ সালের পর থেকে ফলে সেটা ঐ কলোনি দখলের যুগের কারণেই সম্ভবত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সেকালে নেই। কিন্তু মজার কথা এর প্রথম দুই শ’ বছর যুদ্ধবিগ্রহ চলেছিল কলোনি দখল মাস্টারদের মধ্যে তবে সেটা তাদের নিজ  ইউরোপীয় দেশে নয়। বরং যে দেশ-রাষ্ট্র দখল করা হবে এশিয়া, আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার সেসব প্রান্তীয় অঞ্চলে সেখানে, কলোনি দখলকারদের মধ্যে। ফলে এসব গরীব দেশের লোক মরলে তা দেখে দুঃখ মনোকষ্ট পাওয়ার কেউ ছিল না। কিন্তু দিন একভাবে যায়নি। হঠাৎ ১৯০০ সালের পরে এসে দেখা গেল যুদ্ধ এবার হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে, খোদ ইউরোপের কলোনি দখলের মাস্টারদের নিজ দেশে, দেশগুলোর মধ্যে। তাই এবার এটাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ১৯১৪-১৮ সাল। ইউরোপের সেই যুদ্ধ যার মূল বিষয় ছিল আসলে কলোনি দখলদার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কামড়াকামড়ি, তবে মরণ কামড়াকামড়ি। কিন্তু যেহেতু ঘটনায় এবারের ভিকটিম খোদ মালিক মহাজনের ঘর ফলে এবার এখান থেকে সুফল এসেছিল। কলোনি মাস্টার ভিকটিম ফলে এলিট, তাই অমানবিক, মানবেতর, নৃশংস, ঘৃণিত ইত্যাদি এসব মূল্যবোধযুক্ত শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে আর একটা বিষয় অবশ্যই বিরাট প্রভাব রেখেছিল বলা যায়। তাহলো ইতোমধ্যে সারা ইউরোপে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মানব-অধিকারের ধারণা ও মূল্যবোধের ব্যবহার ও চর্চা অন্তত নিজ ঘর থেকে শুরু হয়ে গেছিল। ফলে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, জীবিকা নির্বাহ, ইনসাফ পাওয়া ইত্যাদির অধিকার এবং সাধারণভাবে মানুষের অধিকার ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক এবং মানুষ নিজেই, অন্য কেউ না, একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসন করার হকদার এসব মূূূল্যবোধগুলো গেড়ে বসা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘটনাবলির শেষে রাষ্ট্রসংঘ, এসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর রাষ্ট্রসংঘ জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৪ সালে।

একটি ডিসক্লেমার জানিয়ে রাখার সময় বোধহয় পেরিয়ে যাচ্ছি। তাহলো, এখানে সাধারণভাবে সব পরিচয় ভিন্নতার ঊর্ধ্বে যেকোনো মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ে তোলা প্রসঙ্গে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। এর মানে এই নয় যে এসব সংগঠনগুলো সব আদর্শ ও ধোয়া তুলসীপাতা ও চরম সব অর্জনের সংগঠন এরা। না এমন আগাম অনুমান ধরে নেয়া ভুল ও তা ভিত্তিহীন। তবে, জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান “এটা এক চরম অর্জনের” – এ কথা মারাত্মক ভুল। আবার এর কোনো অর্জনই নেই এটাও মারাত্মক ভুল। বাস্তবতা হল, তাদের অনেক অর্জন থাকলেও এর বিরাট বিরাট ঘাটতি ও খামতি আছে সেগুলো পূরণের জন্য কাজ করতে হবে, লড়তে হবে এখনো অনেক, এটাই হল সঠিক মূল্যায়ন। এখানে জাতিসংঘ বলতে মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ সহ যত আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নিয়ম রেওয়াজ ইত্যাদি মানব-অধিকার ও মূল্যবোধ যা এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সেসব ধরে নিয়ে কথা বলেছি।

সেকালে এসব যা কিছু অর্জন এর পেছনে এক শীর্ষ ভূমিকা ছিল আমেরিকার। যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়া এটা আমেরিকারই এক দ্বিতীয় উদ্যোগ প্রচেষ্টা ছিল, আর তা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের। আর রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়ার প্রথম তবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া প্রচেষ্টাটা ছিল যার নাম হল “লিগ অব নেশন”, (রাষ্ট্রসঙ্ঘের আগের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানের নাম )। সেকালে এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের সময়কালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। এছাড়া, মনে রাখতে হবে কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে একমাত্র শাসন করবে অর্থাৎ কলোনি শাসকের শাসন নয়, এই ভিত্তিতেই সদস্য রাষ্ট্রদের নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো গড়তে আমেরিকা নিজের অবদান ও ভূমিকা যা রাখা সঠিক ও সম্ভব মনে করেছিল অথবা যা পারেনি করেছে, আর এভাবে আমেরিকা দুনিয়া শাসন ও নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পেরেছিল গত প্রায় ৭০ বছর। কিন্তু সময় এখন পালাবদলের। অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এবার এখন নতুন নেতা চীনা।

কিন্তু সেই সাথে আমরা কী দেখছি?
একটা উদ্যোগ যদি হয় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সফর। তাহলে অপর দিকে এক উদ্যোগ, প্রায় সমান্তরাল আর এক তৎপরতা আছে চীনের নেতৃত্বে। স্পষ্ট করে বললে, বার্মা, বাংলাদেশ ও চীনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়ের চীনে বৈঠক হয়েছে। এ তৎপরতাটা বিপরীত উদ্যোগ হিসেবে হাজির আছে।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবসময় প্রধান বাধা এসে যা হাজির হয় তাহল, সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থ অথবা  ঐ রাষ্ট্র পরিচালক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। বাংলাদেশের ভূমিকা কী তাই হতে যাচ্ছে?
এ ছাড়া স্বভাবতই মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বিপক্ষীয় ক্যাম্পে দেখতে পছন্দ করব না হয়ত। কিন্তু আমরা অপছন্দ করলেও চীন আমাদের হতাশ করার দিকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ চীন মনে করছে এ ব্যাপারে সে আমেরিকার আমলের স্টান্ডার্ডও ধরে রাখার চেষ্টা করবে বা, নিচে পড়ে থাকবে। অথচ দুনিয়ার নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের ষোলোআনা। এটা স্ববিরোধী। এ বিষয়ে, এককথায় এখনই বলা যায় –  গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ত হতে পারবে কিন্তু  দুনিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বে চীনের আসা অসম্ভব। এমনিতেই কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ার কারণে চীনের পক্ষে ‘পলিটিকস’ ও ‘রাইট’ শব্দগুলো অর্থ তাৎপর্য বুঝার ক্ষেত্রে তা এক বিরাট প্রতিবন্ধক। কারণ এখানে কমিউনিস্ট চিন্তার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর প্রচুর। ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ কথার অর্থ তাৎপর্য বুঝতে কার্ল মার্কসের ঘাটতি আছে কি না সে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় ৭০ বছরের পরিচিত চর্চার “মার্কসবাদ”, সেই মার্কসবাদ এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে অক্ষম। সে এখনো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এগুলোর বাইরে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে অক্ষম। অথচ ঐ শব্দগুলো সবই বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সুবিধা সংক্রান্ত। রাজনৈতিক ক্যাটাগরির শব্দ বা ধারণাই নয় ওগুলো। যেমন মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অধিকার নয় বরং এগুলোর বাইরে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে, বঞ্চিত করেছে।

এছাড়াও, কথা পরিস্কার রাখতে হবে; রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের এক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে তা হল, রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বার্মার রাখাইনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। একবার ও শেষবারের মতো। আর সেক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সরকার নিজের কোনো এক সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এর বিরুদ্ধে গেলে বা এই স্বার্থকে রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আজ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রশংশিত হচ্ছে। আমরা ভুলতে পারি না আর ঠিক সেই কারণেই এর আগের বছর কোন রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে কথা ভুলে যেতে পারি না। পরের বছরও শুরুতে ভারতের প্ররোচনায় সীমান্ত সিল করে দিবার নীতি নীতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীন নিজ জনগণের সহানুভুতি ও আশ্রয় না দিবার ক্ষোভ আঁচ করে পরে সীমান্ত খুলে দেয়াওয়া হয়।

এমনিতেই, বল গড়ানো শুরু করেছে দুইটা জায়গা থেকে। এক সাংগ্রিলা বৈঠক। সাংগ্রিলা মূলত এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক এক রাষ্ট্রজোট। সিঙ্গাপুরের  “সাংগ্রিলা নামের এক হোটেলে” তা প্রতিবছর আয়োজিত হয়ে থাকে। যেখানে সদস্য হিসেবে আমেরিকাও আছে, চীনও আছে। ইউরোপের মাতব্বর রাষ্ট্রেরা আছে, আছে মিয়ানমারও। গত জুন ২ তারিখের এবারের সিঙ্গাপুরের বার্ষিক বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন (National Security Adviser Thaung Tun)। মায়ানমার বা বার্মার গলার স্বর নামা শুরু হয় সেখান থেকে। তিনি সাত লাখ রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নিতে নিজে প্রস্তাব দেন ও সম্মতি জানান। তিনি আবেদনের স্বরে সেখানে প্রশ্ন রেখেছেন, “স্বেচ্ছায় যদি ৭ লাখকে ফেরত পাঠানো যায় তাহলে আমরা মায়ানমার তাদের গ্রহণে আগ্রহী। এরপরেও এটাকে কি জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলা যায়”?

“Myanmar is willing to take back all 700,000 Rohingya Muslim refugees who have fled to Bangladesh if they volunteer to return, the country’s National Security Adviser Thaung Tun said on Saturday”.

এবিষয়ে রয়টার্সের  এক ডিটেলড রিপোর্ট দেখা যেতে পারে এখানে। দেখা যাচ্ছে, তিনি এ প্রস্তাব দেন কারণ ওই সাংগ্রিলা সম্মেলনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি কি মিয়ানমারকে জাতিসঙ্ঘের আরটুপি (রেসপন্সিভিলিটি টু প্রটেক্ট) ফ্রেমওয়ার্ক চালুর দিকে নিয়ে যাবে? কথিত এই আরটুপি ফ্রেমওয়ার্কটি ২০০৫ সালে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়। [Shangri-La Dialogue, a regional security conference in Singapore, where he was asked if the situation in Myanmar’s Rakhine state, where most Rohingya live, could trigger use of the Responsibility to Protect framework of the United Nations.]

এর মধ্য দিয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিজ দেশের জনগণকে রক্ষা এবং এই প্রতিশ্রুতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতা করবে। [The so-called R2P framework was adopted at the 2005 U.N. World Summit in which nations agreed to protect their own populations from genocide, war crimes, ethnic cleansing and crimes against humanity and accepted a collective responsibility to encourage and help each other uphold this commitment.]

আর ওদিকে দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, এই মুহূর্তে জোকের মুখে নুনের মতো এক উদ্যোগ। সেটা হল, আইসিসির  ( International Criminal Court, ICC) প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোহ বেনসুদার উদ্যোগ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের কারণে তিনি যে অভিযোগের তদন্ত করতে চাইছেন তা হচ্ছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়-‘জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন বা জোর করে অন্যত্র ঠেলে সরিয়ে দেয়া’ (অনুচ্ছেদ ৭ [১] [ডি])। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি অভিযোগ দায়ের করতে চান। আপাতদৃষ্টে অভিযোগটি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে না হলেও এর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব কম নয়, কেননা এই অভিযোগের শাস্তি ওইসব অভিযোগের চেয়ে কম নয়, প্রায় একই।

অর্থাৎ মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইসিসির আদালতে তুলতে সক্ষম হতে পারার ইঙ্গিত। এই উদ্যোগের বিশেষ দিকটা হল, এতদিন  চীন বা রাশিয়ার দেয়া সবকিছুতে ভেটো মেরে মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার সব কিছুকে আটকে ফেলা যত সহজ মনে হচ্ছিল এই প্রথম বার দেখা যাচ্ছে সেটা সম্ভবত এবার অকেজো হবে।

এমনিতেই শুরু থেকেই (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প বার্মার জেনারেলেরা সবাই কে খাইয়েছিল। আর তা ভারত, চীন এবং আমেরিকাসহ সবাই আনন্দের সাথে খেয়েছিল। কারো অরুচি লাগেনি।  বার্মার দেয়া বৈষয়িক সুবিধা বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের লোভে সবার কাপড় উদোম হয়ে গেছিল। সবাই জেনারেলদের ভক্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের বানানো (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প কার আগে কে বেশি বিশ্বাস করবে সে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছিল।  সবাই গল্প সহজেই মেনে নিয়েছিল যে আরসা সন্ত্রাসীদের হামলাই সব কিছুর জন্য দায়ী। কিন্তু  কেউ নিজেকে প্রশ্ন করে নাই যে তাহলে হত্যা ও ধর্ষণের ভিতর দিয়ে  সাত লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়া হতে হল কেন? বার্মার সেনাবাহিনীকেই বা কেন রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়ন করতে হবে – এই প্রশ্ন চীন বা আমেরিকাসহ কেউই তখন তুলতে চায়নি। কিন্তু আগে যেমন অসহায়ভাব দেখা যাচ্ছিল, যে কেউ একটা জঙ্গি হামলার গল্প রান্না করলেই দুনিয়ার মা-বাপ যারা তারা সবাই তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়, কোনো প্রশ্ন করে না। এখন দেখা যাচ্ছে সেসব গল্প সবার এবার বদহজম হয়ে গেছে।

চীনের গ্লোবাল টাইমসে দাবি করা হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে, ‘চীনের নীতি ধারাবাহিকতায় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ’। [On the issue of the Rakhine State, China’s position is consistent]। আসলে এটা একটা মুখরক্ষার কথা, কিন্তু অসত্য কথা। তাই যদি হয় তবে চীন তখন (২০১৭ সালে) কথিত আরসা জঙ্গি হামলাকে দায়ী করে জেনারেলদের গণহত্যা ও ধর্ষণ ও বিতারণ কাজের পক্ষে সাফাই দিয়েছিল কেন? আর এখন সে সাফাই কোথায়? এখন জেনারেলেরা আপস করতেই বা রাজি কেন? কেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে, এই ইস্যুতে চীন নিঃশ্চুপ?

[We believe that the issue should be solved through dialogue and consultations between Myanmar and Bangladesh, and the international community should act according to the two countries’ wishes,]

এ ছাড়া এখন রোহিঙ্গাদের তাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। এ ছাড়া যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা চীন কী এ দুই কাজ ও তৎপরতার বিরোধী? তাহলে কেন মায়ানমার আর বাংলাদেশের ডায়লগে সব সমাধা করতে চায় চীন?

গত চল্থ্বালিশ বছরে বার্মার সামরিক শাসকদের এই একই নিরবিচ্ছিন্ন নীতি চলে আসছে তাদের সাথে নতুন করে ডায়লগের ভিত্তি ও ভরসা কী?

বার্মার চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘনকে আড়াল করতে চীন জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠলেই বার্মায় বাইরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মনে করছে কেন? চীন অপরাধীদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে চায় না, না করলে কেন তা স্পষ্ট ভাষায় চীনের বলা উচিত।

চীন কী মনে করে বার্মায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটা কী সেখানে চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের নিচে, কম গুরুত্বপুর্ণ? দেখা যাচ্ছে প্রশ্নটাকে চীন বরং দানব শাসকের ব্যক্তি ইচ্ছায় পর্যবসিত করে রাখবে, আর ওই ব্যক্তিশাসকের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের (বার্মা বা বাংলাদেশ) সার্বভৌমত্ব বলে চালিয়ে দেবে তবে, এ চীন অচিরেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে অপসৃত হবে তা আগাম বলা যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
৫ জুলাই ২০১৮
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জাতিসঙ্ঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

গৌতম দাস
০৪ জানুয়ারি ২০১৮, বৃহষ্পতিবার, ০০:১৮

চীন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু দিনকে দিন মুখোমুখি হয়ে ওঠা বাড়ছে। তবে চীনের ভেতরে মানবাধিকার আছে কি না তা নিয়ে চীনকে পশ্চিমের খোঁচা দেয়া কিংবা বিব্রত করার যে নিয়মিত প্রচেষ্টা আছে, আমরা সেটার কথা বলছি না। যদিও দুটার মধ্যে কোথাও একটা সম্পর্ক আছে, তবুও এখানে প্রসঙ্গ সেটা নয়। প্রসঙ্গ খোদ চীনের অভ্যন্তরীণ নয়, বাইরের। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে যেগুলো বাইরের দেশ যেমন, আমাদের মতো রাষ্ট্র বা মিয়ানমার –  সেখানে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের পরিস্থিতি। চীনের আভ্যন্তরীণ নয় বাইরের ভিন্ন রাষ্ট্রে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ঘটনায় চীনের দায় কী?কী অর্থে? যেমন আমাদের মতো দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা, নির্বাচিত সরকার থাকা কী রাষ্ট্রের জন্য জরুরি? আবার কিংবা ধরুন বিরোধী দল মানে সরকারে থাকা দলটা ছাড়াও এর বাইরের কোনো দল দেশে থাকা জরুরি কি না? অথবা সরকারের কোনো সমালোচক থাকা কতটা দরকার? অথবা ধরেন, কোন বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ও সাফাই মানে না, ভিন্ন চোখে দেখতে চায় – এমন লোক কি দেশে থাকতে পারবে না গুম হয়ে যাবে, ইত্যাদি। অথবা কথাটা আরেকভাবে তোলা যায়। গণতন্ত্র না উন্নয়ন, কোনটা চান? মানে, যেন মানবাধিকার ও উন্নয়ন- এ দুটোর কোনো একটা বেছে নিতে হবে। এর একটা যেন অপরটার বিকল্প! যেন পথ দু’টি কিন্তু একই ফল পাওয়া যায় এমন। এমন কথা বলা কী ঠিক? এগুলো তো দানব সরকারের কাজ!  এছাড়া এখানে আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল যে দানব সরকার এমন দানবীয় সাফাই দিচ্ছে তাই না। বরং খোদ চীন সরকার এব্যাপারে এখন সাফাই দিয়ে এগিয়ে এসে যাচ্ছে।

এটাই হল এসবের সাথে চীনের সম্পর্ক। বিতর্ক অন্য রাষ্ট্রের ভেতরের হলেও গুরুত্বপূর্ণ হল, চীন বিষয়গুলোতে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নিজেই একটা সাফাইদাতা হয়ে উঠছে। লজ্জ্বার মাথা খেয়ে এভাবে চীন সেই সব স্বৈরশাসক রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশ্য মঞ্চে সাফাই বা জাস্টিফিকেশন দিতে শুরু করেছে। বলছে, এটা হচ্ছে নাকি যার যার রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ বা ‘নিজস্ব গণতন্ত্রবোধ’। এখানে অন্যের কিছু বলার নাই। সবাইকে একই বুঝ ও বোধের হিউম্যান রাইটে চলতে হবে এমন কোনো মানে নাকি নেই! চীনের ধারণা, হিউম্যান রাইটের বোধ যেহেতু একেকটা রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, ফলে ‘গণতন্ত্র’বোধ একেকজনের একেক রকম হতে পারে। আর সেই সূত্রে কোনো রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট রক্ষা মুখ্য কাজ হিসাবে নিতে পারে। আবার কেউ নাকি উন্নয়নের পথ বেছে নিতে পারে। এমনকি “উন্নয়নের স্বার্থে” কোনো রাষ্ট্রের কাউকে গুম, খুন করতে হতে পারে! দুর্নীতিও পুষতে হতে পারে! এটাও কোনো এক ‘বুঝের বা বোধের গণতন্ত্র’। এটাই যেন বা ‘কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব উন্নয়নের পথ’। এটা নিয়ে অন্যের কথা বলার কিছু নেই। যেমন চীনের অন্য রাষ্ট্রে মাথা গলানোর কিছু নেই বলে চীন বড় গলায় দাবি করে।

চীন বলছে এই যে, প্রত্যেক রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ এটাতে চীন কোনো মাথা গলাতে চায় না। এর কারণ চীনের সাধারণ নীতি হচ্ছে অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যাপারে, মানে তার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ব্যাপারে চীন মাথা ঘামায় না। সাধারণভাবে বললে, ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের’ ধারণার দিক থেকে দেখলে এটা অনেক পুরনো কথা, ফলে চীন নতুন কিছু বলেনি। কিন্তু চীন এ কথা বলে আসলে যেসব রাষ্ট্রের স্বৈরাচার শাসক নিজের আকামগুলাকে ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নিয়েছে বলে চালিয়ে দিবার চেষ্টা করছে – চীন এসব রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজকে সাফাই সরবরাহকারি ও স্বৈরশাসকের ‘রক্ষক’ হয়ে উঠতে চাইছে। এক কথায়, অন্যের রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করি না – এ কথা বলে চীন আসলে স্বৈরশাসকদের বন্ধু আর এমন শাসকদের ক্লাবের নেতা ও সংরক্ষক হতে চাইছে।

কিন্তু চীনের এটা হওয়ার দরকার কী? দরকার হচ্ছে কেন? দরকার হচ্ছে এ জন্য যে, ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন, আর সেকথার পক্ষে এক গ্লোবাল স্বীকৃতিও আছে। চীন দুনিয়ার নেতা হয়ে উঠতে চাওয়া এমন হবু গ্লোবাল নেতা। কিন্তু তাঁর এমন আকাঙ্ক্ষার আগে থেকেই ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন হয়ে আছে। আর এই গ্লোবাল স্বীকৃতি পেয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে নতুন দুনিয়া গড়ার কাল থেকে। জাতিসঙ্ঘ বলে প্রতিষ্ঠান ১৯৪৫ সালে গড়ে ওঠে আর ১৯৪৮ সালে ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস চার্টার’ ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার ভিতর দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার বিষয়টা সার্বজনীন স্বীকৃত। এটা ছিল প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই নাগরিকদের জন্য অধিকারের সনদ। আর চীনকে আজ একথা মানতে হবে যে, ১৯৪৮ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রে মনে করা হয়নি বা কেউ এমন কথা তোলেনি যে, ওই চার্টারের কারণে ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে বা এতে কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ ঘটছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ‘রাইট’ বা ‘অধিকার’ কথাটা কেবল বিশেষ একটি রাষ্ট্রের জন্য পালনীয় ধারণা নয়, বরং এটা বিশ্বজনীন ধারণা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, এটা রাষ্ট্রসংঘের সদস্য ও অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সব রাষ্ট্রেরই পালনের এক ধরনের বাধ্যবাধকতাও আছে। যেমন রাষ্ট্রসংঘের আর এক কনভেনশন হল, International Covenant On Civil And Political Rights 1966 । সদস্য ইচ্ছুক রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষর শেষে এটা কার্যকর হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। স্বাক্ষরের পরে নিজ নিজ সংসদে এতে অনুস্বাক্ষরের প্রস্তাব পাশ করে ফেলার পরে ঐ রাষ্ট্র ঐ কনভেনশনে বর্ণিত ভাবে নিজ নাগরিকের সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইট রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যান। মজার কথা হচ্ছে, চীন এতে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। আর আগামী বছর এতে চীনের স্বাক্ষরের ২০ বছর পূর্তি পালন করতে হবে।  তাই চীনেরও বাধ্যবাধকতা আছে। অতএব আমরা ধরে নিতে পারি, চীনের এই স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে চীনের ওপর বাইরের বা রাষ্ট্রসংঘের কারও কোন হস্তক্ষেপ ঘটে নাই বলেই চীন বিশ্বাস করে।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? হিউম্যান রাইট বা মানবাধিকার বিষয়টা এমন না যে যার যার মত করে এর একটা সংজ্ঞা দেয়া যায়। নিয়মিত হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন করে এরপরে আবার সেটাকে যার যার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ঘটনা বলে চালানোর সুযোগ নাই। আমার হিউম্যান রাইট বুঝের সংজ্ঞা আলাদা তাই আমার ইচ্ছামতো স্বৈরশাসক হওয়ার সুযোগ আছে। এই ব্যাপারে, চীন যা বলছে তা সত্য নয়। স্বৈরশাসকদের ক্লাব বানানো ও চীনের এদেরকে আগলে রেখে পেলে পুষে এদের নেতা হওয়ার সুযোগ আসলেই নেই। যেমন মিয়ানমারের সু চি এবং ওর জেনারেলদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন ততপরতা অথবা কম্বোডিয়ার স্বৈরশাসক হুন সেন – এদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের কাজকে চীন ওদের  ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেওয়া বলে সাফাই দিয়েছে। অথচ এই সাফাইয়ের কোন সুযোগ নাই। আর এই উসিলায় এদেরকে নিয়ে চীনের আলাদা স্বৈরশাসক ক্লাব বানানো অথবা তাতে বাংলাদেশকে যোগ করানোর চেষ্টা করা – এগুলোর কোনো সুযোগ আসলে নেই। তবু এই প্রবণতা দিন দিন বাড়তে দেখছি আমরা।

কিন্তু কেন বাড়ছে, গোড়াটা কোথায়? ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের এই চার্টার গঠন ও অনুমোদনের সময়কালে বা পরে কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র এই চার্টার মানি না অথবা এর অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হবো না – এমন কথা বলেনি। যদিও কোনো কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট কথাটার একটা ভিন্ন সংজ্ঞা, একটা ‘কমিউনিস্ট ব্যাখ্যা’ আগলে নিয়ে সময় সময়ে তা আউরেছে। সেই কমিউনিস্ট ব্যাখ্যাটাই সব ত্রুটি আর বিভ্রান্তির উৎস। স্বৈরশাসকের পক্ষে সাফাই ওখান থেকে আসছে।

কমিউনিস্টদের এক বিশাল আত্মতুষ্টি যে, তারা মনে করেন- রিপাবলিক রাষ্ট্র বিষয়ে ‘পশ্চিমের রাজনৈতিক সাম্য ও নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার ধারণা’- এগুলো খামাখা এবং ভিত্তিহীন। তারা মনে করেন, ‘অধিকার’ ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখা ও বোঝাটাই এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’। কেন? কারণ, কমিউনিস্টদের চোখে বরং অধিকারের আসল অর্থ হল ‘বৈষয়িক অধিকার’। এই বিচারে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান – এই বৈষয়িক অধিকারগুলোই আসলে কমিউনিস্ট বুঝ, বিকল্প বুঝের ‘অধিকার’-এর অর্থ। পশ্চিমের ধারণার বিরুদ্ধে ‘অধিকার’ শব্দের কমিউনিস্ট অর্থ ও সংজ্ঞা এটাই। বলা বাহুল্য এটা খুবই অধপতিত ধারণা।

তাই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া – এই কথার আড়ালে স্বৈরশাসকদের কথার সারার্থ হল, তারা রাজনৈতিক অধিকার বা মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার কথা মানেন না। কারণ তারা কমিউনিস্ট হন বা না হন, তারা কমিউনিস্টদের ইচ্ছামত বানানো হিউম্যান রাইটের নতুন সংজ্ঞা গ্রহণ করতে চান। আড়ালে থাকতে চান। কারণ চীনের মত কমিউনিস্টরা রাজনৈতিক অধিকার মানেন না।  এটাকেই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া বলে চালাতে চান। আর এই নতুন বক্তব্যের ভিত্তিতে চীন স্বৈরশাসকদের ‘নতুন ক্লাব’ গড়ার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে দেখছি আমরা। এক কথায় বললে, এটা  কমিউনিস্টদের ‘অধিকার’-সম্পর্কিত ভিত্তিহীন ধারণা। কমিউনিস্টদের চোখে অধিকার মানে বৈষয়িক সুবিধাদি পাওয়ার অধিকার। ফলে যে স্বৈরশাসক দাবি করবেন- আমি ‘গণতন্ত্র না উন্নয়নের’ বিতর্কে ‘উন্নয়ন’ এর পক্ষে আছি- এর মানেই হলো সেই স্বৈরশাসক বলতে চাইছেন, অধিকার সম্পর্কিত পশ্চিমা ধারণার বিরুদ্ধে আমি। তাই আমাকে পশ্চিমের ধারণা দিয়ে মাপলে হবে না। আমি আমার ব্যাখ্যা সহি আছি।

তবে বাংলাদেশ কি চীনের এই ক্লাবে জয়েন করবে? কিছু তোড়জোড় দেখা গিয়েছিল। সিপিবিসহ চার দল নিয়ে চীনা মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিল, আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সম্ভবত বেশি সুবিধা হয়নি।

অনেকে ভাবতে পারেন, এগুলো তো ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগের কমিউনিস্টদের ধারণা। ফলে সেই পুরান দায় দিয়ে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করা কি ঠিক হবে? হ্যাঁ অবশ্যই সঠিক হবে। কেন? ওয়েন জিয়াবাও ২০০৩ সাল থেকে ১০ বছর ধরে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বাণী শুনুন। তিনি বলেছেন, “সবচেয়ে বড় হিউম্যান রাইট হল ১.৩ বিলিয়ন লোককে খাওয়ানো। ফলে সিভিল নাগরিকের ধারণা- পশ্চিমের এই ধারণা আসলে বাতিল বলে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে”। [……Jiabao, when premier, said the biggest human rights issue was feeding 1.3 billion people. Civil liberties were rejected as Western ideals…….]

চীনের আরেক আলোচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন। ২০০৬ সালে তার এক বিখ্যাত মন্তব্য, ‘পেট ভর্তি থাকছে কি না আর গরম কাপড় পরা আছে কি না – এসবের ভিত্তিতে চীনের হিউম্যান রাইটকে সংজ্ঞায়িত করে দেখতে হবে।’  [Former president Jiang Zemin famously said in 2006 that having a full stomach and warm clothes was how human rights should be defined in China.] এর সোজা অর্থ পুরান কমিউনিস্টদের হিউম্যান রাইটের ‘বিকল্প সংজ্ঞা’ চীন এখনো ত্যাগ করেনি, বরং আঁকড়ে ধরে আছে। আর একালে এসে স্বৈরশাসকদের ক্লাব গড়ে সেখান থেকে চীন নিজেই সাফাই সরবরাহকারী হতে চাচ্ছে। চীন যদি ভেবে থাকে এই নতুন সাফাইয়ের ভিত্তিতে  দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকদের নিয়ে চীন নিজের ‘স্বৈরশাসক ক্লাবের মেম্বার’ বানাবে, বুঝতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের কোন ধারণাই হয় নাই।

মানুষ কি কেবল  খাওয়া আর বাথরুম করার একটা মেশিন? কেবল এক বৈষয়িক ভোগের মেশিন মাত্র? নাকি তার এসবের বাইরেও বহু উন্মেষ আছে এবং তা দরকারও! মানুষ আসলে রক্তমাংসের জীবন্ত সত্তা, আবার এক স্পিরিচুয়াল সত্বা সে। দুনিয়ায় সে কেন এসেছে, কিভাবে দুনিয়ার আর সব কিছুর সাথে সে সম্পর্কিত, কী তার দায়-কর্তব্য- এসব বোঝাবুঝি এবং তদনুযায়ী অ্যাক্ট-রিঅ্যাক্ট করার নামই মানুষ। একথাগুলোকেই আরেক ভাষায় আমরা বলি মানুষের রাজনৈতিক সত্ত্বা আছে। এমনকি সে অবজেকটিভ সত্ত্বা না, কর্তা সত্ত্বা আছে। এজন্যই তাঁর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে এমন বৈশিষ্টের রাষ্ট্রও লাগে। কেবল খাওয়া-পরায় বাঁচায় রাখার রাষ্ট্র হলে চলে না, সন্তুষ্ট হয় না সে।

অপর দিকে, রাষ্ট্রসংঘের হিউম্যান রাইট চার্টারই শেষ কথা নয়। চার্টারেরও নানান ঘাটতি আছে ও ত্রুটি আছে। সবচেয়ে বড় ফাউন্ডেশনাল ত্রুটি হল, এটা ইনডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর দাঁড়িয়ে সাজানো। অথচ মানুষ মানেই সামাজিক মানুষ। কিন্তু সেদিকটা ফেলে, ভুলে মানুষের ব্যক্তিবোধের দিকটাই কেবল সত্য ধরে নিয়ে ‘চার্টার’ সাজানো হয়েছে।  ফলে এটাও ভেঙ্গে চুড়ে নতুন কিছু লাগবে, এরও আরও অনেক উন্মেষ লাগবে। কিন্তু সেই ‘আরো ভালো কিছু’ পাওয়ার আগে কিছু শুরু করার বিন্দু হিসেবে এখনো চার্টারের ভূমিকা আছে। ফলে একালে এসে, মানুষ রাজনৈতিক না বৈষয়িক- এই বিতর্কটা এমন নয় যে, মানুষ হয় কেবল রাজনৈতিক না হয় কেবল বৈষয়িক সত্ত্বা। কমিউনিস্টরা ‘অধিকার’ বলতে রাজনৈতিক অধিকারের বদলে বৈষয়িক অধিকার বলে বুঝাকেই সহি মানতে চেয়েছে। কিন্তু এটা ডাহা ভুল ও এবসার্ড।

একারণে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের আর এক দগদগে স্ববিরোধীতা আছে।   ইউরোপের মর্ডানিটির ফসল আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রকে কমিউনিস্ট চিন্তার বিচারে এটা এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’ বা ‘বুর্জোয়া কান্ডকারখানা’ বলে তুচ্ছ করা হয়।  রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা – এগুলোকে কোন অর্জন বলে মানা হয় না, গুরুত্ব দেয়া হয় না। খেয়াল করলে দেখা যাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে বা চীনে বিপ্লবের পরের নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা রেখে দেয়া হয়েছে। USSR অথবা PRC নাম দুটার মধ্যেই ‘R’ এর অর্থ রিপাবলিক। রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা যদি তুচ্ছ এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে থাকে তবে রাষ্ট্রের নামের মধ্যে রিপাবলিক শব্দ বয়ে বেড়ানোর ন্যায্যতা কী?

এখন রাষ্ট্রসংঘের ‘চার্টারে’  ‘অধিকার’ বলতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ হয়ে গেছে – এই ভয়ে ও অভিযোগে অধিকারের রাজনৈতিক অর্থের দিক – মৌলিক মানবিক অধিকারের দিকটা তুচ্ছজ্ঞান করা্র কোন সুযোগ নাই। এটা ভিত্তিহীন ও মারাত্মক অন্যায়। ফলে ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়’ সর্বস্ব অধিকারের বৈষয়িক ধারণাই মুখ্য – এমন মনে করাও বোকামি। মনে রাখতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের এই বৈষয়িকতাসর্বস্ব চিন্তার কারণেই – চীন বার্মায় ব্যবসা করতে গিয়েছে, অথচ পাশে একটা বিরাট (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠী নিধন হয়ে যাচ্ছে। তবু চীন বে-খবর। কারণ চীনের শাসকেরা মানুষ নয়, একটা বৈষয়িক বিষয়-আশয় বোধের ডিব্বা। তাই চীন নিজের ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়ের’অধিকার’ রাজনীতিতে বুঁদ হয়ে আছে। হয়ত বিশাল উন্নতি করছে চীন! কিন্তু এই বিশাল উন্নীত চীন ‘লইয়া দুনিয়া কী করিবে!’

গৌতম দাস
লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের পেট ভর্তিআর গরম কাপড়ের মানবাধিকার“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2oJ

ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

গৌতম দাস
২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
https://wp.me/p1sCvy-2lz

বার্মার রোহিঙ্গার পর এবার কম্বোডিয়া। তবে এবার গ্লোবাল রাজনীতির প্রসঙ্গে সেদিক থেকে কথা বলা হচ্ছে, গ্লোবাল অর্থনীতি নয়। সচরাচর চীন মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শীর্ষ উঠার কথা তুলে বলে থাকি। কিন্তু এবার নয়, সেটা যেন পাঠকের মনোযোগ ফস্কে না যায়, নজরে থাকে সেটা আশা করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা দুনিয়ায় গ্লোবাল রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ক্রমশ নিজ সক্ষমতা দেখিয়ে দুনিয়াকে নিজের একক নেতৃত্বে নিয়েছিল। সেটা এখনও আছে, যদিও সময়ে এখন একটা ভাটার টান অনুভুত হওয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমানভাবে ঢিলা হতে শুরু হয়েছে অনেক আগেই, তুলনায় যদিও গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন একেবারেই নয়। এই পরিস্থিতিতে পাঠকের নজর টানব সত্তরের দশকের  কমিউনিস্ট বিপ্লবের ছোট দেশ কম্বোডিয়ার দিকে।

রাষ্ট্রের নাম কম্বোডিয়া, রাজধানী যার নম পেন। থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামের পড়শি এই রাষ্ট্রের দেড় কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ সবাই খেমার (Khmer) নামে এক এথনিক জনগোষ্ঠীর, তাদের ভাষার নামও খেমার। দেশের সাইজ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বড়, এর জনগোষ্ঠি মূলত বৌদ্ধ-ধর্মীয়। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এক রাজতন্ত্রে শাসিত ছিল খেমাররা। কিন্তু এরপর নানা হাত ঘুরে কলোনি দখলের যুগে এসে শেষে, ফরাসি কলোনি রাজ্যে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৫৩ সালে, কিন্তু থিতু হতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৪৫-৭৫) সাথে ভাগ্য ক্রমশ বাধা পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলে, কম্বোডিয়ান চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি খেমাররুজ (ফরাসি ভাষায় রুজ মানে লাল। অর্থাৎ কমিউনিস্ট লাল খেমার বা Khmer Rouge) নেতা পলপট কম্বোডিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তার কুখ্যাত শাসনের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) এই দল শ্রেণী-শত্রু হত্যা নৃশংসতার উদাহরণ হয়ে যায়; বলা হয় ঐ সময়কালে গ্রামে মালিকানা উচ্ছেদের নামে এরা ২০ লাখ লোককে গণহত্যা করেছিল।

প্রতিক্রিয়ায় এরপর অনেক ক্যু, পালটা ক্যু শেষ করে সেসব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে সব বিবদমান পক্ষগুলোকে নিয়ে ‘প্যারিস শান্তিচুক্তিতে’ এক রাজনৈতিক আপোষনামা তৈরি হয়েছিল; এরও আরো পরে, কম্বোডিয়া থিতু হতে হতে ১৯৯৭ সাল লেগে যায়। আর সেসব প্রক্রিয়ারই আর এক অংশ, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘খেমাররুজের গণহত্যার’ বিচার এখনও চলছে। সেই থেকে সাজিয়ে রাখা মৃত মানুষের সাদা সাদা মাথায় খুলি হয়ে যায় কম্বোডিয়ার ব্যঙ্গপ্রতীক। তবে এই কম্বোডিয়া এখন এক কনষ্টিটিউশনাল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; অর্থাৎ এর নামকাওয়াস্তে রাজতন্ত্র বা এক রাজা আছে ঠিকই, তবে সব কিছুই জনগণ নির্বাচিত, এক কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক এটা। আর ১৯৮৫ সাল থেকে নানা কায়দা করে এর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন হুন সেন। একালে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়া ও এর শ্রম। চীনের বিপুল বিনিয়োগের এক গন্তব্য এখন কম্বোডিয়া। চলতি বছরেও টার্গেট দুই বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড এর পড়শি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-গঠনের দিক থেকে প্রায় একইরকম বলে ব্যাংককের মত ট্যুরিজমের আয় কম্বোডিয়ার এক বড় আয়ের খাত হয়ে উঠছে ক্রমেই। আর সমুদ্র সীমান্তে (অফসোরে) তেল গ্যাস পাওয়ায় তা অর্থনীতিতে এক বিশাল খাত হয়ে উঠছে। এই হল পুরনো দিক থেকে কম্বোডিয়ার বর্ণনা-পরিচিতি, এবার চলতি লেটেস্ট দিক থেকে আর এক পর্ব শুরু করা যাক।

আগামী বছর ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় আবার সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। আবার বলছি কারণ গত ২০১৩ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে তা শেষ হয়েছিল। স্বল্প ভোটে বিরোধী দল (কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি, CNRP) হেরেছিল এভাবে দেখিয়ে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। আর চলতি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দলকে (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, CPP) বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে ‘বিরোধীদের সংসদ বয়কট’ – আমাদের পরিচিত এই ফেনোমেনায় কম্বোডিয়ার বিরোধী দল বেশির ভাগ সময়টা সংসদের বাইরে কাটায়। ওদিকে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন, গুম, খুন করা, ইংরাজী দৈনিক পত্রিকা বন্ধ, রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এগুলো খুবই কমন। কিন্তু ওদিকে সরকারের সংসদে পাশ করা বড় অদ্ভুত কিছু আইন চালু আছে। যেমন একটা হল কুখ্যাত ‘কটূক্তি আইন’ (ডিফেমেশন ল), যা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদ ধারক কারও সমালোচনা করলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া সম্ভব। এরকম অদ্ভুত আরো কিছু আইন প্রচলিত আছে সেখানে। যেমন – সরকারের আইনি অধিকার আছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সামান্য অজুহাতে নিষিদ্ধ করে দেয়ার। এই আইনে বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান তিনি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন – এই অজুহাতে তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। এর পরে ফেব্রুয়ারি থেকে যিনি দলের নেতা হয়ে আসেন তিনিও গত কয়েক মাস থেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ জেলে আছেন। আর উচ্চ আদালত এর পুরো বিচার শেষ নাই বটে, কিন্তু তা না করেই গত ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর জামিনের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উলটা ডিটেনশন দিয়ে রেখেছে।

ঐ রায়ের বিচারক খিম পন তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় এই নেতা কেম সোখাকে ডিটেনশন দেয়া হল, নতুন ক্রাইম ঠেকাতে আর যাতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আদালত গ্যারান্টি দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে’ সেজন্য।  [The detention of Kem Sokha is to prevent new crimes and that the court can  guarantee public order, JUDGE KHIM PONN]  কম্বোডিয়ায় আরেকটা মজার আইন আছে। তা হল, রাজনৈতিক দলের প্রধানের নামে যদি আদালতে কোন ক্রিমিনাল অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয় ও তা বিচারের শেষে আদালতের রায়ে যদি সাজা হয়, তবে এরপর পুরা ঐ দলকেই সরকার ‘বিলুপ্ত’ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার প্রধান বিরোধী দলের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে।  প্রধান বিরোধী দল CNRP এর সর্বশেষ অবস্থা হল, এই দলের আগের প্রধান যে ছিলেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সাজা হয়ে গেছে, তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন। আর দলের চলতি প্রধান ডিটেনশনে আছেন। অভিযোগ হল সেই ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকান সরকারি লোকের সাথে  তিনি কথা বলছেন এমন এক ভিডিও দেখিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। আর গত ৬ অক্টোবর, তাই এইবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতে  বিরোধী দলকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করার আবেদন করেছিলেন। আর তাতে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রায় দেন। ঐ রায়ের ফলে সেই সাথে ওই দলের ১১৮ জন সিনিয়র সদস্য ও রাজনীতিক নিষিদ্ধ হবেন এবং গত চার বছরে  যে ৪৮৯টি কমিউন (স্থানীয়) নির্বাচনে CNRP দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাও সবাই পদ হারাবেন। ওদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের ৫৫টি আসনই হারাবেন।

এই অবস্থায় তাহলে আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে ছলেবলে কৌশলে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হল, এর অর্থ তাৎপর্য না বোঝার কিছু নেই। আমাদের দেশের বিনা নির্বাচনে বিজয়ের মতো কিছু একটা সেখানে এখন হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নাই। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে এই বিরোধীরা হুন সেনকে বহু পেরেসান করেছিল। এবার তাই তিনি কোনো রিস্ক রাখলেন না। আর ওই ৫৫টি আসন এখন (আমাদের এরশাদের মত) খুচরা বিরোধী দলগুলো যারা সবাই মিলে গত নির্বাচনে মোট ভোটের মাত্র ৭ শতাংশ পেয়েছিল এদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। এসব ছোট দলের সদস্যদের মধ্যে তাই হুটোপুটি শুরু হয়েছে পদ-পদবি ও সুবিধাদি নেবার জন্য। আরো আছে। একই অভিযোগ এনে এখন আরো সম্ভাব্য ১০০ জন্য বিরোধী প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করে রাখার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

সাবেক খেমাররুজ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে, একনাগাড়ে প্রায় ৩৩ বছর। সম্প্রতি তার দেশে এক বয়ান,  ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ এ কথা কয়টাক এক বিরাট ইস্যু বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এক পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ আরো এক যুগ তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।

তাহলে এখন থেকে যা বোঝার বুঝে নেন। কিন্তু কোথাকার এক কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ইতিহাস নিয়ে আমি কেন আপনাদের শুনাতে এলাম? বাংলাদেশের সরকার আর বিরোধী দল আর ওদিকে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বলার জন্য কী? না একেবারেই নয়। এই অনুমান ভুল। বরং আসল উদ্দেশ্য এতক্ষণ উপরে কোথাও লেখাই হয়নি। কী সেটা?
কম্বোডিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক দশা পরিস্থিতি নিয়ে ইষ্ট এশিয়ার মিডিয়াগুলোর অনেকেই নানা আর্টিকেল ছেপেছে। এমনি একটা হল, হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। ‘মর্নিং পোস্টে’ একটি কলাম ছাপা হয়েছে, লেখক এডোয়ার্ড মরটন।

তিনি বলছেন, “হুন সেন চীনের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে নেমেছেন। কিন্তু হুন সেনের এই হিসাব ‘যা নয় তাই বাড়িয়ে ধরা’ অনুমান বলে প্রমাণিত হবে।” কিছু বিশ্লেষক, কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জার্নালিস্টদের বক্তব্যের রেফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এসব মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হুন সেনের আরেক মন্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, ‘আগামী বছরের নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমাদের স্বীকৃতি জোগাড়ের প্রয়োজন হবে না।’ কিন্তু তবু এটাও আমার এই লেখার ফোকাস নয়। তবে এবার লিখছি ফোকাসটা কোথায় এবং তা কী? যা খুবই বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

আলজাজিরা টিভি গত ১৭ নভেম্বর কম্বোডিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের টকশোর মতো অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’ প্রচার করেছে। সেখানে তিন অতিথি ছিলেন ০১. মু সোচুয়া – তিনি সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিরোধী দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পলাতক হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ০২, ভিকটর গাও – চায়না ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক। তিনি আসলে আবার ‘চায়না এনার্জি সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের’ চেয়ারম্যান। তার আরেক পরিচয় হল, তিনি বিখ্যাত চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের অনুবাদক হিসাবে কাজ করেছেন। আর ০৩. হোসেক লি ম্যাকিয়ামা – তিনি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক। এই তিন প্যানেল বক্তার মধ্যে চীনা একাডেমিক মি: গাও – এর বক্তব্য আমার প্রসঙ্গ।

গাও তার পালা এলে তিনি স্পষ্ট করে হুন সেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। হুন সেনের সরকার, তার গৃহীত পদক্ষেপ সব সমর্থন করলেন। এটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জেনারেলদের পক্ষেও এত স্পষ্ট করে পাবলিক মিডিয়ায় চীন কথা বলেনি। ১৯৭০-এর দশকে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক পাকা হয়, আর সে সময়ে নিজেরা যার যার স্বার্থ বুঝাবুঝি, পারস্পরিক স্বীকৃতি বা দেনাপাওনাগুলো ঠিকঠাক হয়েছিল ১৯৭১-৭৮ সালের মধ্যে। আমেরিকান বিনিয়োগে চীনে এক ক্যাপিটালিজম জগত প্রবেশ করবে আর, এক নতুন অর্থনৈতিক পথে চীন যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকেই চীন নিজের জন্য আর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর ফলে ক্রমশ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সক্ষমতা ক্রমশ বেড়ে চললেও এর প্রভাবে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নাক গলানোর বা গ্লোবাল প্রভাবের ভাগিদারি ভাগ পাওয়ার সুযোগ হাতে পেলেও চীন তাতে জড়িত হবে না। না এটা চীনের কোনো ভালো মানুষি নয়। বরং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকান যে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়ে আছে এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ভাগিদারি এই খাতে চীন নিজেকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অথবা প্রভাবের শেয়ার নিতেও সে যাবে না। বরং চীন যদি এতে পুরো ছাড় আমেরিকাকে দিয়ে দিলে, দুনিয়ার সব কোনা থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বিষয়াদির ভাগিদারি কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিনা বাধায় পেতে সহজ হবে। ফলে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক অ-সাংঘর্ষিকভাবে বিকশিত হতে পারবে। চীন চেয়েছিল গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো ভাগ আমেরিকার কাছে সে চাচ্ছে না। অথবা চীন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই বার্তা আমেরিকাকে  জানানো। আর সে কারণে সবার আগে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের উত্থান পর্বকে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। যেটা  আসলে সহজে চীন বাস্তবে অর্জন করেছিল।

যেমন – ২০১৪ সালে আমাদের নির্বাচন ইস্যুতে দেখা গিয়েছিল কোন রাজনৈতিক স্টেক বা কেমনভাবে নির্বাচন হতে হবে তা নিয়ে কোনো বক্তব্য চীনের ছিল না। কিন্তু সরকারে যেই থাক বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় চীনের যা স্বার্থ যা সে চায় তা নিয়ে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সে পশ্চিমা অবস্থানের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে তা নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে ভাগিদার সাজতে না চাওয়া চীনের এই নীতি অবশ্যই বেশ লম্বা সময়ের জন্য, তবুও তা আবার এক অর্থে সাময়িক। যেমন, যত দিন চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হচ্ছে  ততদিন একই সাথে গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে হাত বাড়াতে চীন যাবে না। তবে এর পরে অবশ্যই যাবে। এরই সোজা অর্থ সম্ভবত এবার রাজনৈতিক ইস্যুতেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন দুনিয়ায় হাজির হতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হুন সেনের পক্ষ দাঁড়িয়েছে শুধু তাই নয়, হুন সেন একটি ন্যূনতম ভাবে ফেয়ার নির্বাচিত সরকার হয়ে থাক সেটার দরকার নেই – এ কথায় এতদূর গিয়ে প্রবক্তা হয়েছে। মি. গাও বলেছেন. কম্বোডিয়ায় একটা ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে যদি পুরনো অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে এসে পড়ে’ তাই এর দরকার নেই। আর এতে অর্থ সম্পদও নষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’ (তিনি তথাকথিত বা সোকল্ড শব্দটা ব্যবহার করেছেন) বাস্তবায়নকে দেখার অনেক ধরন আছে। অর্থাৎ হুন সেন বিরোধীদের মেরে ধরে গুম নির্যাতন করে, জবরদস্তি যদি নিজেকে ভুয়া নির্বাচিত হিসেবে দেখায় তবুও সেটা চীনের স্টাইলের নির্বাচন (গণতন্ত্রকে দেখার নানা পথ আছে) মনে করে এবং ‘স্থিতিশীলতার স্বার্থে’, ‘সম্পদ নষ্ট না করার স্বার্থে’ হুন সেনকেই নির্বাচিত মানতে হবে। চীনের নিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রে নাগরিকের কোনো রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার, মানবিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন- এগুলোকে সে নিজ করণীয় বলে মনে করে না। নিজে করেওনি। বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জন এগুলোই করণীয়। অর্থাৎ মানুষ বৈষয়িক বিষয়াদির ভোগকারি মাত্র। তার কোন স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, করণীয়, দায়দায়িত্ব এসব কিছু নাই- এই হলো চীনা কল্পনায় দেখা মানুষ। মানুষ সম্পর্কে এই অনুমানের উপরে দাঁড়ানো আছে চীনের নেতৃত্ব।

তাহলে কী দাঁড়াল? চীন কী এখন থেকে আমেরিকার সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রভাব এর ভাগিদার বা পুরা কতৃত্ব নেয়ার জন্য এখন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুরু করবে? যার বাইরের দিকটা দেখে লাগবে কম্বোডিয়ায় মতই, কোনো বিরোধী দল সেখানে নেই অথবা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা থাকার দরকার আছে কিনা এই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের লড়াই? নাকি কম্বোডিয়ার মত কিছু দেশের বেলায় (সব দেশের বেলায় নয়) চীন একক রাজনৈতিক প্রভাব হাসিলের জন্য এখন থেকে আমেরিকার সাথে লড়বে? এই দুইয়ের মধ্যে সেটা যেটাই হোক, চীন গোহারা হারবে সেটা আগেই বলে দেয়া যায়। কারণ মডার্নিটি পরবর্তী দুনিয়া ১৯৪৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইট চার্টার পর্যন্ত গিয়েছে। ওর অনেক খামতি আছে। কিন্তু তাই বলে সেটা ওর পেছনের সময়ে ফিরে যেতে পারে না। দুনিয়া এমনকি সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট বুঝে আবার ফিরে যেতে পারে না।

অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন যতই এগিয়ে যাক, চীনের রাজনৈতিক বুঝাবুঝিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। তবুও, আচ্ছা এটাই কী চীনের সদ্য সমাপ্ত দলীয় কংগ্রেসে উল্লেখিত ‘মডার্ন সমাজতন্ত্রের’ ব্যাখ্যা; আর এজন্য শি জিনপিংকে মাওয়ের সমতুল্য নেতা বলে দাঁড় করানো শুরু? সেটা যাই হোক, চীনের এই পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে যাওয়ার ইঙ্গিত!

সর্বশেষঃ
 রয়টার্স এজেন্সির খবর,  ১৭ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার বিফ্রিংয়ে প্রশ্নের উত্তরে জানায়, কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরোধী দল ও নেতাদের নির্মুল ও শুন্য করা প্রসঙ্গে চীন বলছে, এটা “কম্বোডিয়ার নিজস্ব কায়দার উন্নয়নের রাস্তা অনুসরণ” করা বলে চীন মনে করে। [Cambodia in pursuing its own development path……)
আর এর পাল্টা আমেরিকা বলছিল, আমেরিকা নির্বাচন সম্পর্কিত সব ফান্ড প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ [“concrete steps”] নিতে যাচ্ছে।  এর প্রতিক্রিয়ার হুন সেন গতকাল ১৯ নভেম্বর বলেছেন, তিনি  সমস্ত আমেরিকান এইড প্রত্যাহার করে নিতে স্বাগত জানায়। [“Hun Sen … welcomes and encourages the U.S. to cut all aid.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com   

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ধরতে পারবে

 

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ফিরে ধরতে পারবে
গৌতম দাস
০৭ নভেম্বর ২০১৭, রাত ০০ঃ৪৩
https://wp.me/p1sCvy-2kC

আমেরিকা কি ফেল করা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? কোন ট্রেন? বার্মা ট্রেন, নাকি মিয়ানমার ট্রেন? আসলে এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই; কথা হলো এটা রোহিঙ্গা-ট্রেন! অর্থাৎ আমেরিকা কি ফেল করা রোহিঙ্গা-ট্রেন আবার ফিরে ধরতে পারবে? আবার ধরার জন্য কতদুর সিরিয়াস যাবে? রোহিঙ্গা-ট্রেন  – একথারই বা মানে কী? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ, মাত্র চার পারসেন্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা-মানুষের মর্যাদা এতই পর্যুদস্ত, এতই নিচে অমানুষের বা ঊন-মানুষের স্তরে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ নিয়ে গেছে যে, দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে রোহিঙ্গা পারসিকিউশন বা অত্যাচার নিষ্পেষণ। সেই সাথে বার্মিজ জেনারেলদের নাম নৃশংসতার ওস্তাদ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়েছে। এরা নির্মূল ক্লিনজিংয়ে কত দক্ষ এর স্বাক্ষর-চিহ্ন ব্যাপক ছড়াছড়ির মুখে জাতিসঙ্ঘকে বলতেই হয়েছে যে, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে পারসিকিউটেড বা নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা’। অতেব আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন হল, আমেরিকা কি বর্মি জেনারেলদের একটা শিক্ষা দিতে পারবে? কতদুর পর্যন্ত সিরিয়াসলি যাবে?

আগে আমরা দেখছি, আমেরিকা ভুলে গিয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে, জেনোসাইড বা ক্লিনজিংয়ের বিষয়ে দুনিয়ার কাছে তার কমিটমেন্ট কী? দুনিয়ার কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে গ্লোবাল লিডার হয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্লোবাল ইকনোমিক ব্যবস্থায় একটা অর্ডার বা নিয়ম শৃঙ্খলা কায়েম করেই আমেরিকা আজকের ওয়ার্ল্ড লিডার হয়েছিল। তবে  শুধু এতটুকু করেই হতে পারেনি। এটা সে হতে পেরেছিল কারণ সাথে কিছু পলিটিক্যাল কমিটমেন্টও তাকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি। যদিও তাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার  বিষয়টাকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে, নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ‘রেজিম চেঞ্জের’ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির স্থাপন করেছে। এখনো এই সমস্যা দুনিয়াতে আছে যে, সুদানের বশির একটা গণহত্যা চালালেও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি উদ্ধার হয় তবে বলা হবে গণহত্যা হয়নি, বরং ‘গণহত্যার কাছাকাছি’ কিছু একটা হয়েছে। কারণ চীনের এ কথা না মানলে চীন ভেটো দিয়ে দিবে; একই উদাহরণ আমেরিকারও আছে। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিচার বিবেচনা মুল্যায়নে একটা গণহত্যা ঘটেছে কি না তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুনিয়ায় এখনো বহু সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাই দরকার আবার এক রুজভেল্টের, আবার এক নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন করে জাতিসঙ্ঘ গড়া। অথচ আমেরিকা নিজেরই সেসব ইতিহাস ভুলে বসে আছে। আর বাস্তবে হারার আগেই মনে মনে হেরে গেছে।

এ কথা ঠিক যে, ২০০৭-০৮ সাল থেকেই এটা জানা গিয়েছিল যে, দুনিয়ার অন্তত অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও লিডার অর্থে চীনের কাছে আমেরিকার কাঁধবদলের সময় হয়ে গেছে। আমেরিকার জায়গায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হচ্ছে চীন। এ কথাও সত্যি যে, কারো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটা তখন থেকে কেবল সময়ের ব্যাপার যে, সেই রাষ্ট্র এখন ক্রমে ক্রমে সব অর্থেই গ্লোবাল পরাশক্তি হিসেবে হাজির হবে। কিন্তু তাই বলে একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকা কেবল অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তির জোরে গ্লোবাল পরাশক্তি বা গ্লোবাল লিডার হয়নি। সাথে রাজনৈতিক শক্তি হতে হয়েছে আগে, কিছু গ্লোবাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আগে;  তবেই আমেরিকার গ্লোবাল লিডার হওয়া গেছে। এমনি এমনি আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের এম্পায়ার বানাতে সক্ষম হয়নি। পলিটিক্যাল আইডিয়া, এর উপযোগী গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আর সর্বোপরি কমিটমেন্ট – এসব প্রতিটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণভাবে হাজির করাতে হয়েছিল আমেরিকাকে। আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি? সেটা বাইরে কাউকে না খোদ নিজের কাছে নিজেকে দিতে হয়েছিল যে – মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা কেবল আমেরিকাতে করলেই হবে না, সারা দুনিয়ার ব্যাপারেও অন্তত নীতি-অবস্থানগত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এতকিছু বলার পরেও এ কথাও সত্য যে, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস চার্টার যেটা রচিত হয়েছিল বটে কিন্তু ওখানের ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ ধারণায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে, তাই তা নিয়ে দুনিয়াকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। সারকথা কোনো ‘রাজনৈতিক’ নীতি-অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমেরিকা গ্লোবাল লিডার হয়নি, হতে পারেনি। আজকের জায়গায় আমেরিকা এমনি এমনি উঠে আসেনি। তাই আগেই বলে দেয়া যায় এই নুন্যতম শর্তপুরণ ছাড়া  আগামিতে অন্য কেউও হতে পারবে না।

অথচ এই শতকে এসে  আমেরিকা সত্যি সত্যি হেরে যাওয়ার আগেই ২০০৮ সালে সব ছেড়েছুড়ে আগেই হার স্বীকার করে নিয়েছিল। এর আগে নানা সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভঙ্গের কারণে ২০০৮ সালের আগের বার্মা ছিল আমেরিকান অবরোধে ডুবে থাকা, বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা এক বার্মা। অথচ চীনের দেখানো রাস্তায় সেই মতনই বার্মায় বিনিয়োগ ও ট্রেড আর ব্যবসার ভাগ পেতে মরিয়া লোভী হয়ে আমেরিকা চীনের পথ অনুসরণ করে বসেছিল। বর্মি জেনারেলদের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রেসিজমে নির্মূল ক্লিনজিং দেখেও না দেখার ভান করার দিন দুনিয়াতে যেন আবার ফিরে এসেছিল – চীনের দেখানো সর্টকাট রাস্তার লোভে পরে আমেরিকাও এই শর্টকাট পথ নেয়ার লোভে পড়েছিল। আমেরিকা মনে করে নিয়েছিল যেন দুনিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নীতি অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া দুনিয়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। আর আমেরিকা কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই বোধহয় সে এই দুনিয়ার নেতা হয়েছিল। ২০০৮ সালের বার্মার কনস্টিটিউশন চালুর পরেও সেই একই দানব ও কোটারি এক সামরিক রাষ্ট্রই ছিল বার্মা। অথচ বলা হচ্ছিল বার্মা নাকি ‘গণতন্ত্রের পথে’ যাত্রা শুরু করেছে, গণতন্ত্রের পথে নাকি ট্রানজিশনে বা অন্তর্বর্তি রাস্তায় আছে বার্মা। আর সু চি নাকি শান্তির নোবেল মানুষ ইত্যাদি। এসব ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণ করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম।  চলতি আগষ্টে বার্মায় ফিরে গণহত্যা শুরুর পরে সু চি তাঁর সাফাই ভাষণে গণহত্যার অভিযোগের জবাবে মিয়ানমারের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তা শুনে প্রখ্যাত মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন যথার্থই বলেছেন, “এটা গতানুগতিক অজুহাত। অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারীদের দিক থেকে এটা বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা বলে থাকেন, গণহত্যা বন্ধের দিকে নজর দেয়ার চেয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া বজায় রাখাটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চি তাই করেছেন”।

অথচ আমেরিকা ট্রেন মিস করেছিল। রাজনৈতিক কর্তব্য ভুলে সস্তা ব্যবসাব ও বৈষয়িকতার লোভের ফাঁদে বর্মি জেনারেলদের কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছিল। নিজেকে সস্তা করে তুলে, সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছিল। নিজের দাম নিজে বোঝেনি। যার দায় ওবামা প্রশাসনেরও কম নয়। চীনের কাছে দুনিয়ার নেতৃত্ব হারানোর আগেই আমেরিকা উলটো নিজেকে চীনের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিল।

আচ্ছা আমেরিকা কী কখনও খেয়ালই করেনি দুনিয়াতে কোথাও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক সিরিয়াস প্রতিশ্রুতিই নেই। এরা নিজ নিজ বিপ্লবের পরে রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বলে একটা শব্দ রেখেছে, ইংরেজির একটা ‘আর’ অক্ষর সেখানে আছে বা ছিল। লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত মানে ওর ‘ইউএসএসআর’ (USSR) নামে ‘আর’ অক্ষরটা ছিল। এখনও বর্তমান মাও এর চীনের নাম ‘পিআরসি’ (PRC) তেও ‘আর’ অক্ষরটা আছে। এই ‘আর’  এর অর্থ হল ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র উতখাত করে পিপলস রিপারলিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মর্ডান রিপাবলিকের আরও অর্থ হল রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কমিউনিস্টদের কাছে  এসব কথার সাথে কোনো ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্ট’ তৎপরতা তাদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের করণীয় নাই। সেখানে কনস্টিটিউশনের কোনো গুরুত্ব নেই, কী লেখা আছে সেখানে তাও তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সেটা তো কোনো সিরিয়াস কিছু নয়। কারণ এসব কথার কথার নাকি নেহাতই ভোটের হিসাব; যেমন কোনো করপোরেট চেয়ারম্যানেরও এক ভোট, এক ফকিরেরও এক ভোট। তাই মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির কথাবার্তার কোন মুল্য কমিউনিস্টদের কাছে নাই। মৌলিক মানবাধিকার ইস্যুটা নাকি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্র। যদিও একথা সত্য রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা নয়। ফলে এটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু তাই বলে এটা কোন অর্জনই নয়, এটা মারাত্মক ভুল ধারণা। ফলে মর্ডান রিপাবলিকে মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য  ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কমিউনিস্টদের কাজই নয়, এর কোন গুরুত্ব নাই, এটা কারও কাজে লাগে না, এগুলো মানুষের কোন অর্জন নয় – এটা মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা শুধু না। খুবই নিম্ন বোধের – মানুষ কেবল জীব, এই অনুমানে বলা বক্তব্য। মানুষকে রিডিউসড নীচা গণ্য করা বক্তব্য।

তাই চীনের বুঝ হল, তারা যে দানব বর্মি জেনারেলদের পা-চুমে বিনিয়োগ ব্যবসা খাচ্ছে – এর পাশেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঐ জেনারেলদের হাতেই কচুকাটা ক্লিন হয়ে গেলে তাতে চীনের কী দায়! তার কোনো দায় নেই। সেই, ১৯৭০-এর দশক থেকেই চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় সে যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনো গ্লোবাল ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হওয়া বা থাকা না থাকার দায়দায়িত্ব সে নেবে না। কেবল কোন ব্যবসাটা সে পাবে সেই ভাগ সে ঠিকই গ্লোবাল প্লেয়ারদের ভাগ থেকে নিজেরটা বুঝে নেবে। এই নীতিতেই চীনের বিদেশনীতির ডিপলোম্যাসি এত দিন চলে এসেছিল। আর প্রমাণ হয়েছে এটা অচল। রোহিঙ্গারা প্রমাণ করে দিয়েছে   এই চীন ব্যর্থ। এই চীন গড়ে তোলা অর্থহীন, খামোখা। মানুষ কেবল জীব নয়, সে কেবল একটা বৈষয়িক জীব-জীবন নয়। মানুষের জীবনের আরও অর্থ উদ্দেশ্য লক্ষ্য আছে; দায় কর্তব্য আছে। স্পিরিচুয়ালিটির দিক আছে। জীব জীবন ছাড়িয়ে মানুষের তাই আরও উন্মেষ দরকার হয়। সেকথাটাই আর ভাবে বললে হয়, মানুষের রাষ্ট্রের তাই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার থাকে। মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ইনসাফ, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার স্তরে তাই মানুষের নুন্যতম দায়। এসব পুরণের পথে নুন্যতম দায় কর্তব্যবোধ নাই চীনের। ফলে আগেই বলা যায় কোন গ্লোবাল নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের পূরণ হবার সুযোগই নাই। আসলে সে ধরা খেয়েছে। কিভাবে?

আগেই বলেছি আমেরিকা লোভে পড়ে হুঁশ হারিয়েছিল। নিজের গৌরব নিজের অবদান ভুলতে বসেছিল। এমনকি এবারের আগষ্টের পর থেকে নবউদ্যোগে নির্মূল অভিযান শুরুর পরে, ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে বক্তব্যে বিষয়ে আমেরিকার উপমন্ত্রী মার্ফি সাহেবের কথাবার্তা লক্ষ্য করা যাক। তিনি তখনও কেবল সতর্ক কী বলতে কী বলে ফেললে আবার বর্মি জেনারেলদের মন উঠে যায়, অখুশি হয়ে যায় – সেদিকে খুবই সতর্ক থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে কথা বলছেন। জেনারেলদের মন জোগাতে মার্ফি বলার চেষ্টা করছিলেন যে এটা নাকি রোহিঙ্গা বা মুসলমান নির্মূল ক্লিনজিংয়ের ইস্যু নয়, এটা নাকি রাখাইন স্টেটের দুই জাতিগোষ্ঠীর ঝগড়া, অর্থাৎ বার্মা রাষ্ট্র বা মিলিটারির কোন ভূমিকা নেই। তার এই অবস্থা দেখে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করায় জবাবে মার্ফি সাহেব আবার সে কথা কনফার্ম করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও সব চিতপট হয়ে যায়, সব কিছু ঘুরে যায়। গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারে অবস্থিত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসাথে রাখাইন প্রদেশ সরেজমিন সফর করে এসে এরপরে তা নিয়ে মিয়ানমারে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দেন তাতে পরিস্থিতি উলটে যায়। যার মূল কথা হল, বার্মার জেনারেলদেরকে অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর বারে বারে চাপ দিয়ে বলা যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, জাতিসঙ্ঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আসতে দেয়া ইত্যাদি। এসব নিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

অর্থাৎ তখন থেকে আমেরিকা সুর পালটিয়ে ফেলেছিল। নিজ শক্তি, তুচ্ছ করে ফেলে রাখা হারানো গৌরবের কথা মনে পড়ে গেছিল। ফলে এরপর থেকে আর এটাকে ‘রাখাইন প্রদেশের জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ঝগড়া’ বলে আড়াল করতে চাইছে না। এটাকে বলা যায় আমেরিকান বার্মা নীতিতে মেজর শিফট পটপরিবর্রতন।  এরপরে ২৩ অক্টোবর এসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি – এটা একেবারে কঠোর অ্যাকশনের দলিল নির্দেশনামা যেন। সাথে আগের মতো যে দায়ী ইনভেস্টিগেট করো, তাকে ধরে নিয়ে আসো সেসব কথা তো আছেই। তবে মূল কথা হল, ২০০৮ সালের আগে আরোপিত আমেরিকার দেয়া যেসব অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে দেওয়া। বিশেষত বর্তমান ও সাবেক সামরিক অফিসারদের ওপর ট্রাভেল ব্যান আবার বলবৎ করা, বার্মা থেকে রুবিসহ দামি পাথর আমেরিকায় পাঠানো ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরে আরোপ, আর সামরিক বাহিনীর জন্য নেয়া আমেরিকার স্পন্সরড যেকোনো কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়া। এক কথায় আমেরিকান রাষ্ট্রের সাথে বর্মি আর্মি সদস্যদের সব ধরনের যেকোনো সংশ্লিষ্টতা ও যৌথ তৎপরতা স্থগিত।
তবে এবারের সারকথায় গুরুত্বপুর্ণ দিক হল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতে দেখতে চায় আমেরিকা এই দাবিটা ছিল মুখ্য। আর, একথা শুনে জেনারেলদের কাপড় নষ্ট করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের মিডিয়া ভাষ্যকারদের মতে, ‘ভারত নাকি প্লট হারিয়ে চীনের কাছে হেরে হাত গুটিয়ে’ নিয়েছে। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলাপে বসতে আয়োজন করে দিয়েছে নাকি চীন। কিন্তু তাতে আমাদের মন্ত্রী দেশে ফিরতে-না-ফিরতেই যাকে বলে দু’জনে দুই মন্ত্রী দু’দিকে দুই ধরনের কথাতে হয়ে পড়েছেন একেবারে ‘ফল এপার্ট’। তাতে বোঝা গেল যে বর্মি জেনারেলদের শায়েস্তা করা চায়নিজ কূটনীতির কাজ নয়। এ ব্যাপারে চায়নিজরা চাইলে আমেরিকানদের কাছে মধ্যস্থতাকারীর কাজে কূটনৈতিক কিছু শিক্ষা নিতে পারে। আচ্ছা এটা কি জানা কথা না যে, পিছলা বার্মিজ জেনারেল ভাষ্য বদলে দেবে। অতএব আগে থেকেই চীনাদের ‘দুটা মানে হয়’ এমন সুযোগ যাতে না থাকে এমন শব্দ বা কথা না রাখা – সেই ফুটা বন্ধ করার ব্যাপারে চীনাদের সাবধান হওয়া দরকার ছিল!

কিন্তু এরও আগে যে কথা বলতে হবে, তা হলো- ১৯৭০-এর দশক থেকে নেয়া চীনাদের পলিটিক্যাল দায় বা সংশ্লিষ্টতা না নিয়ে গ্লোবাল পলিটিক্যাল-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্টতায় থেকে মাখন খেয়ে যাবো খালি, চীনাদের এই বুদ্ধি অচল-অকেজো এটাই প্রমাণ হয়েছে। কারণ আমরা দেখছি, আমেরিকানদের সামান্য একটু নাড়াচাড়াতেই ভয় পেয়ে বর্মি জেনারেলদের কী করে চীন রক্ষা করবে তা নিয়ে চীনকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। চীনাদের হাতে ভেটো ক্ষমতা থাক আর না থাক কিছু যায় আসে না তাতে। এথেকে চীন কী শিক্ষা নিয়েছে যে,  দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। অর্থনৈতিক শক্তি বা মুরোদ আপনার অঢেল থাকতে পারে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, নীতি-অবস্থান থাকতেই হবে, এসব দিক- তো আছেই। বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে একসাথে বসানোর কাজে চীনাদের নামা প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কী জিনিস। এটা রোহিঙ্গারা মরুক যা হোক, আর্মি জেনারেলদের কাছ থেকে বিনিয়োগ আর ব্যবসা বাগানোর কাজটা ভালো জানলেই চলবে – চীনের অনুমান যে মিথ্যা ছিল তা চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ধারণার যে ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা ও অচল তা বুঝিয়ে দিলেও কী চীন সে শিক্ষা নিয়েছে আমরা নিশ্চিত না। কারণ চীনকে ‘রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেগোসিয়েশন’ এর গুরুত্বের কথা মেনে নিতে হয়েছে। আর আসলে রোহিঙ্গারা সব অত্যাচার নিষ্পেশন সহ্য করতে হয়েছে কথা ঠিক কিন্তু তা করে  সারা দুনিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যু দেখিয়ে দিয়েছে যে দুনিয়া চলে দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট তাতে লাগবেই। আর তা নাই বলে, চীনাদের দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

উপরের এসব কথার উপর দাঁড়িয়ে আর একটা কথা বলে দেয়া যায়।  কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দুনিয়াকে অ্যাম্পায়ার হিসেবে নিজের নেতৃত্বে চালাতে কখনই পারবে না, কখনোই সম্ভব হবে না। এর মূল কারণ রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না দেখিয়ে, হিউম্যান রাইটসকে নিজের ইস্যু গণ্য না করে দুনিয়া চালানো অসম্ভব। রিপাবলিক রাষ্ট্র আর তাতে মানুষের  মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য ইনসাফ কায়েম ইত্যাদিতে মানবাধিকার সুরক্ষার ইস্যু আগামীতে আরো সিরিয়াস ইস্যু হয়ে উঠবে দুনিয়াতে। কমিউনিস্ট জগতে যার কোনো ন্যূনতম ধারণা বা আমলই নেই। কমিউনিস্টদের এখনো ধারণা, ‘তাদের বেইজ্জতি করতেই’ নাকি আমেরিকা এই ইস্যুটা হাজির রাখে। এর চেয়ে অজ্ঞতার আর কী হতে পারে! এর মানে কি কমিউনিস্ট বলতে চাইছে দুনিয়াতে গণহত্যা ক্লিনজিং রেসিজম – এগুলো চলবেই? তাই কি? তবে আমি শিউর মাফিয়া রাষ্ট্র রাশিয়ার পুতিন অথবা চীনে নতুন জেঁকে বসা শি জিনপিংয়ের ‘মডার্ন সমাজতন্ত্র’ নামে সোনার পাথরের বাটি ধারণার ভেতর এর কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আমেরিকানরা কত দূর যাবে? রোহিঙ্গারা কি ঘরে ফিরবে? আমেরিকানরা কতটা সিরিয়াস? অর্থাৎ উপরে আমেরিকার সৎ পথে রওনা হবার অনেক ইঙ্গিত দিবার পরেও আমি সন্দেহ রাখছি যে  আমেরিকা শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে কীনা? কতদুর যাবে?  বাংলাদেশের মানুষদের জন্য এসব মাপার দ্রুত একটা মাপকাঠি দেই।

‘এশিয়ায় আমেরিকান (নিরাপত্তা) স্বার্থ আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে’ এই নীতিতে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বুশ প্রশাসন চালু করে দিয়ে গেছে। এই কথার একটা ইম্পিকেশন অর্থে সারার্থ হল, সেই থেকে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়ে রেখে গেছিল। সেটা এখনও ওরকমই আছে। ট্রাম্প হয়ত ব্যাপারটা নিয়ে ভোকাল ততপর নয়। কিন্তু রুটিন প্রসাশনের গাইডিং প্রিন্সিপাল এখনও সেটাই। এখন এই সপ্তাহ ট্রাম্পসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী মুরুব্বিরা মানে রেক্স টিলারসন এবং আন্ডার সেক্রেটারিসহ এভাবে সবাই আমাদের দেশ বা পড়শি দেশে থাকবে। এগুলো যত যা-ই ঘটুক যতক্ষণ না আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের কাছে দিয়ে রাখা  বন্ধকদশা থেকে ছুটিয়ে আমাদের সাথে সরাসরি ডিল না করবে, এই ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিবে তত দিন অন্য যাই কিছু আমরা দেখি না কেন আমেরিকার ওপর আমাদের আস্থা রাখার কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি এটাই বুঝতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার

http://wp.me/p1sCvy-2kx

 

গত ২২-২৩ অক্টোবর ২০১৭ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এক দিক থেকে দেখলে, এটা একটা বকেয়া সফর এই অর্থে যে, গত আগস্ট মাস থেকেই হবু এই সফর নিয়ে কথা হচ্ছিল; কিন্তু নানান কারণে হতে পারছিল না। অবশেষে অক্টোবর মাসে এসে এটা হতে পেরেছে। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানের ভিন্নতা যখন প্রকটভাবে স্পষ্ট কিন্তু এক দেখানোর চেষ্টাও সমান ততপর চলছে, সে পটভূমিতে এ সফর হয়েছে। তাই বলা যায়, সুষমা স্বরাজের এবারের সফর হলো ভারত ও বাংলাদেশের মতভিন্নতা রেকর্ড করে রাখার সফর।

ভারতের অবস্থান বার্মার রোহিঙ্গা নির্মূলের নীতি ও বর্বরোচিত তৎপরতার পক্ষে  এবং এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। কিন্তু এর কারণ কী? এশিয়াতে ভারতের প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথেই চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। এই সম্পর্কগুলোকে ঠেকানো অসম্ভব। কারণ ভারতের পড়শি দেশগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ উপেক্ষিত হয়ে আছে। অবহেলায় এগুলোকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফেলে রাখায় এসব পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রে বিনিয়োগ পাওয়ার আকাঙ্খা উঠেছে চরমে। অন্য দিকে, একালের চীনের বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এসব দেশের দোরগড়ায় হাজির। তাই, এই দুইয়ের মিলন ঠেকানো অসম্ভব। কিন্তু ভারত চাচ্ছে এসব দেশ বিকশিত না হয়ে ভারতের ক্ষুদ্র সামর্থ্য মোতাবেক এর সাথে তাল মিলিয়ে বামন হয়ে থাকুক; যেটা ভারতের সীমিত মাত্রার অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তুল্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রই নিজ অর্থনীতিকে বামন করে রাখতে পারে না। ফলে ভারতের এহেন নীতির শেষ ফলাফল হচ্ছে – ওসব রাষ্ট্রে ভারতের ভাগে বড়জোর ছোট কোনো অবকাঠামো প্রকল্প ভাগে পাওয়া। বার্মাতে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার ফলও তাই হয়েছে। কিন্তু বার্মিজ সেনাবাহিনী খুবই সাফল্যের সাথে চীন ও ভারত – এই দুই রাষ্ট্রকে রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে সমর্থক হিসেবে হাজির হতে বাধ্য করেছে। চীন ও ভারত উভয়েই প্রতিযোগিতা করে বার্মা সরকারের রোহিঙ্গাদেরকে নির্মূল করে ধুয়েমুছে সাফ করার কাজের স্বপক্ষে  সমর্থন নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। ভারত ও চীন উভয়েরই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে দাঁড়ানোর পেছনে খোঁড়া যুক্তি একটাই, ২৫ আগস্ট আরসা গোষ্ঠী নাকি ‘সন্ত্রাসবাদী’ আক্রমণ চালিয়েছে। তাই ভারত ও চীনের সরকার বার্মিজ সরকারের বিরুদ্ধে কথিত  ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’কে সমর্থন করছে। এ থেকে স্পষ্ট, কথিত ‘আরসা আক্রমণ’ এই অজুহাত চীন, ভারত এবং বার্মার সরকার সবার জন্যই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয় এক সাফাই দাতা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কথিত আরসা (ARSA) আক্রমণ তাহলে আসলে কার পক্ষে সহায়তা করেছে, আরসা কী রোহিঙ্গাদের পক্ষের সংগঠন? নাকি এটা কাদের কাজে লাগছে? আরসা কাদের সংগঠন? নাকি আরসা বলে সক্ষম কোন সংগঠন কী আদৌও আছে?

এর আগে ২০১২ সালের রোহিঙ্গা নির্মূলের সময় ভারত বার্মিজ সরকারের কাছে ‘কৃতিত্ব’ জাহির করেছিল যে, ভারত বাংলাদেশের সরকারকে প্রভাবিত করেছে এমনভাবে যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সে দেশে আশ্রয় নিতে দেয়নি। বাংলাদেশ নিজ সীমান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য খুলে দেয় নাই। ফলে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পার হয়ে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং এ জন্য দুর্যোগের সেই পুরাটা সময় সীমান্ত বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে ২০১৭ সাল এবারও শুরুর দিকে একই কৃতিত্ব নিতে পেরেছিল ভারত। আমাদের সরকারও প্রথম সপ্তাহে সীমান্ত বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু এরপর আর পারেনাই। আভ্যন্তরীণ নিজ জনমতের চাপে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যে, সীমান্ত বন্ধ রাখার চাপ হয়ে গিয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গণবিস্ফোরণের চাপ। সীমান্ত না খুলে দিলে বাংলাদেশ সরকার যেন হয়ে দাঁড়াত রোহিঙ্গাদের ওপর সব নির্যাতনের মূল হোতা। এই বাস্তবতা ভারত বা বার্মিজ সরকারের ইচ্ছামতো বয়ান দেয়া অসম্ভব করে তোলে। অথচ ২০১২ সালে এরাই “রোহিঙ্গারা জঙ্গী” এই বয়ানের সাফাই তুলে সীমান্ত বন্ধ রাখা সম্ভব করেছিল। কিন্তু এবার নিজের বয়ান নিজে গিলে খেয়ে ভুলে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল শরণার্থীদের জন্য। উলটা “মানবাধিকার রক্ষাকর্তা মা” বলে ক্রেডিট দাবি করতে ছুটেছিল। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অবস্থানের মৌলিক ভিন্নতা সেই থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর বার্মা সফরে গিয়ে সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নির্মূলকে ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’র কাজ বলে বাহবা দিয়ে এসেছিলেন। বার্মার এই কথিত সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের কাজে মোদি গভীর উদ্বেগ দেখিয়ে এসেছিলেন। (Prime Minister Narendra Modi said on Wednesday that India shared Myanmar’s concern about “extremist violence” in its Rakhine state, …) এটাই হল রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের প্রকৃত অবস্থান।

অনেকে সুষমা স্বরাজের এবারের বাংলাদেশ সফর থেকে ‘আবিষ্কার’ করছেন, সুষমা তো এবার এই সফরে এসে ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ দাবি জানিয়েছেন। ফলে এটা ভারতের অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন। যেমন ফলাও করে বিবিসি লিখছে, “……বিবৃতিতে সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ না করেই বলেন, ‘আমরা কোফি আনান কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলোর বাস্তবায়নকেও সমর্থন করি’।” যেন এটা ভারতের এক বিরাট অগ্রগতির অবস্থান।

 

বাস্তবে মোটেও তা নয়। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ ইচ্ছা তো খোদ সু চিরও আছে বলে তিনি বহু আগেই জানাচ্ছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সু চির কথায় সাথে একটা ‘যদি বা কিন্তু’ আছে। তা হল, যারা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারবে তিনি কেবল তাদেরই ফেরত নেবেন বা কেবল তাদের বেলায় আনান কমিশনের রিপোর্ট ‘বাস্তবায়ন’ করবেন। সু চি ভাল করেই জানেন যে,  লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ নাগরিকত্বের প্রমাণ তো দিতে পারবেন না। ফলে সু চিকে ‘সাত মণ ঘিও ঢালার দরকার হবে না এবং রাধাও নাচবে না।’ অতএব ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ খায়েশ প্রচার করতে খোদ সু চি নিজের কোনই সমস্যা দেখেন নাই।

আর ঠিক একইভাবে সুষমা স্বরাজও বলেছেন, আমরাও ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন’ সমর্থন করি। এটা বলায় তারও কোনো সমস্যা নেই। কারণ তিনি জানেন, খোদ সু চি যে কথা বলেছেন, সে কথা বলতে সুষমার নিজের বলতেও কোনো অসুবিধা নেই। এ ব্যাপারে বরং ভারতের ‘নীতি’ খুবই সোজাসাপ্টা। খোদ বার্মা যে ভাষায় ও বয়ানে যা অবস্থান নেবে, ভারতও সেটা করবে। এটাই হলো ভারতের বাস্তব অবস্থান। বার্মা সরকার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করে না, কেউ করুক তাও চায় না। ফলে সুষমা স্বরাজের সফরে ভারতের লিখিত ভাষ্য হল, ‘রাখাইন প্রদেশের ডিসপ্লেসড বা বাস্তুচ্যুত’ জনগোষ্ঠীকে ফেরত নিতে হবে। এক কথায় বললে, বার্মার অবস্থানই ভারতের অবস্থান। এটা বোঝাতে অস্পষ্টতা রাখেনি ভারত।
ভারত তার অবস্থান যে একচুল বদলায়নি রোহিঙ্গা ইস্যুতে এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, সুষমা স্বরাজের সফর উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে সেখানে লেখা একটি পুরনো বাক্য হলো- ’I may add that India is deeply concerned at the spate of violence in Rakhine State of Myanmar. We have urged that the situation be handled with restraint, keeping in mind the welfare of the population’. এর প্রথম বাক্যটা পয়দা হয়েছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর মোদির বার্মা সফরকালে, আর দ্বিতীয় বাক্যটা যোগ করা হয়েছিল মোদি সফর শেষ করে ভারতে ফিরে আসার পরে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার পরে।

আমরা বরং সুষমা স্বরাজের সফরকালে বলা, নতুন আর এক বাক্যের কথা মনে রাখতে পারি। সুষমা বলেছেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো, রাখাইন প্রদেশের ব্যাপক আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা ওই প্রদেশে বসবাসকারী সব কমিউনিটির জনজীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে’। সুষমার এবারের সফরে নতুন যোগ হওয়া বাক্য এটা। কিন্তু ভারত যে রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান চায় না, বরং বার্মা সরকারের চোখেই দেখে সঙ্কটটিকে, এর প্রমাণ হচ্ছে এই বাক্যগুলো। রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের সমূলে নির্মূল করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার এ কারণে হচ্ছে না যে, কোনো অসম সুযোগ-সুবিধা তাদের দেয়া হয়েছে। তারা অন্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে কম অথবা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, সঙ্কট সে জন্য নয়। বরং আদৌ রোহিঙ্গারা বার্মার নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবে কি না, কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠী বৌদ্ধদের পাশাপাশি রাখাইন প্রদেশে বাস করতে পারবে কি না, এবং নাগরিক হয়ে থাকতে পারবে কি না, এটাই মূল ইস্যু।
লক্ষণীয় যেটা বিষয় নয়, ইস্যু নয় সেসব কথা সুকৌশলে তুলে আনছেন সুষমা স্বরাজ। আর এভাবেই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কে প্রশ্রয় দেয়া এবং এর বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশের দিক থেকে যেটা এখন অবশ্য করণীয় হয়ে গেছে তা হল, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট  অবস্থান স্থির করা এবং সে অনুযায়ে অবস্থান নেয়া। যাতে একেবারে নিজের জাতীয় স্বার্থে এই অবস্থানের পক্ষে বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এক সাথে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থ একমাত্র এভাবেই অটুট থাকতে পারে। এরপর দেশে-বিদেশে ও জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে এর পক্ষে তৎপরতা চালানো হতে পারে আমাদের সঠিক অবস্থান। একমাত্র সে ক্ষেত্রেই আমরা বার্মার সরকারের ওপর যে চাপ বাড়ছে এর সুবিধা নিতে পারব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের সাপ ও ওঝার কুটনীতি

ভারতের সাপ আর ওঝার কূটনীতি

গৌতম দাস

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১২ঃ৩৫

http://wp.me/p1sCvy-2i4

 

সাপ ও ওঝা কুটনীতি। .মানে সাপ হয়ে কাউকে কামড়ানোর পরে আবার ওঝা হয়ে সেই বিষ নামাতে আসার ভান করা। কিন্তু এটা কী কূটনীতি হতে পারে? কুটনীতির মধ্যে বুদ্ধি, শঠতা, দুরদর্শীতা, কাছে ও দুরের স্বার্থ ইত্যাদি সবই থাকে। কিন্তু অন্তত সকাল বিকাল মিছা বলে ধরা খাওয়া বেকুব কেউ হয় না।  অথচ ভারত তাই হয়েছে। এটা কে বলে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব। আর এর সাগরেদ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আমাদের সরকার বলেছিল, বার্মার সাথে যৌথ ট্হল দিতে চাই যাতে রোহিঙ্গার বাপও না আসতে পারে। আবার এখন বলছে, ১৬ কোটি লোক খাওয়াতে পারলে ওদের খাওয়াতে পারব না কেন।  এরা সকলে ধরে নিয়েছে যে মানুষ এতই বোকা যে তারা কিছুই দেখবে না, বুঝতেও পারবে না? অথচ এটা অসম্ভব! এটা হয় না, হতে পারে না। তবু লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে অসহায় ভারত এই কাজই করেছে, বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে ডুবেছে।  সব হারিয়ে দুস্থ ভারত এখন সাপ-ওঝার কূটনীতিতে নেমে গেছে।

মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর বার্মার সেনাবাহিনী ও সরকারের নির্মুল অভিযান বহু পুরানা কাল সেই ১৯৭৭ সাল থেকেই চলে আসছে। কেবল কিছুদিন পর পর এই এথনিক ক্লিনজিং বা নির্মুল অভিযানের জোয়ার উঠতে দেখা যায়। এবারের পর্বে মায়ানমারে রোহিঙ্গা মারা ও খেদানো শুরু হয়েছিল ২৫ আগষ্ট রাত থেকে। প্রত্যেক বারের মত এবারও বার্মা সেনাবাহিনীকে এক নতুন অজুহাত দিতে দেখি আমরা। এবারের অজুহাত হল, আরসা নামে রোহিঙ্গাদের এক সামরিক সংগঠন বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর নাকি কিছু আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু তাতে পরিণতি বা ফলাফল কী হয়েছে? এখন আমরা দেখছি তাতে ফলাফল হল, বর্মীজ সামরিক বাহিনী এপর্যন্ত চার লাখের মত রাখাইন রোহিঙ্গাদের উপর নির্মুল অত্যাচার নিপীড়ন করেছে আর হাজার চারেক হত্যা করেছে। তাহলে কে কার পক্ষে কাজ করল? মায়ানমার তাদের উদ্বাস্তু করল কেন? ইন্টার নাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ অবশ্য একটা সাফাই টেনে উল্লেখ করেছে, আরসা সংগঠনের হামলার প্রতিক্রিয়ায় নাকি সেনাবাহিনী একটা “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” চালিয়েছে। [In response, the military is conducting “clearance operations” across ……] । কিন্তু আরসা সংগঠন হামলা চালালেই বর্মী সেনাবাহিনী কোন “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” কী  চালাতে পারে এই প্রশ্ন কেউ তুলছে না। কে কাকে কী ক্লিয়ার করল? মানুষ ক্লিয়ার করল মানে কী? ক্রাইসিস গ্রুপ এই রিপোর্ট কী আসলে সেনাবাহিনীর স্বীকার করে নেওয়া যে তারা রোহিঙ্গা নির্মুল করেছে! ক্লিনজিং!

আবার ২৭ আগষ্টের রয়টার্স পরিবেশিত খবরে দেখা যাচ্ছে বার্মা সেনাবাহিনীর এক বিবৃতি পাঠিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে প্রায় “৮০০ বাঙালী টেররিস্ট” (রোহিঙ্গা উচ্চারণ না করে বর্মীজ সরকার তাদের বাঙালী বলে) কে তারা ‘মোকাবিলা’ করেছে। সেনাবাহিনীর ‘মোকাবিলা’ মানে বুঝতে হবে মেরে ধরে হত্যা নির্যাতন ধর্ষণ করে ঘরছাড়া উদ্বাস্তু করা। কিন্তু সেনাবাহিনী যে ৮০০ সংখ্যা উল্লেখ করে যতই আরসার (ARSA) কথিত হামলাকে অজুহাত হিসাবে দেখাক না কেন, বাস্তবে আমরা দেখছি, চার লাখের উপর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে উদ্বাস্তু করা আর প্রায় চার হাজারের মত হত্যা করা হয়েছে। ফলে ৮০০ সংখ্যার উল্লেখ এরপরেও এই অত্যাচারের ফিগারগুলোর পক্ষে ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে না। ফ্যাক্টস হল, বরং এতে এখানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ঘটেছে তা প্রমাণিত হয়। আসলে শাহবাগী একটা যুক্তি আছে এখানে। যুক্তিটা ামরা শাহবাগের রমরমা যুগেও দেখেছি যে বলা হত, কোথাও হয়ত পুলিশের উপরও কিছু পালটা  হামলা হয়েছে। এইবার সেটাকে অজুহাত হিসাবে নিয়ে এরা সাফাই গাইত যে এজন্যই পুলিশ এবার নির্বিচারে হত্যা, বলপ্রয়োগ নির্যাতন, পায়ে গুলি করা ইত্যাদি সবই করেছে এবং পুলিশ এমন সবকিছু করতে পারে এবং এটা জায়েজ। অথচ ফ্যাক্টস ও আইনের কথা হল, এটাকে পুলিশী ভাষাতেই বলে ‘একসেস বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ বলে। অর্থাৎ পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে যখন কোন সিভিল গ্রুপ মুখোমুখি হয় বা মারামারি হয় তখন সেটা জমি নিয়ে দুপক্ষের লড়াই বা পাড়ার দুই পক্ষের পোলাপানের মারামারির মত না; যেখানে উভয় পক্ষই যথেচ্ছাচার অপরপক্ষের উপর যেকোন মাত্রায় বলপ্রয়োগ করতে পারে। কারণ আলোচ্য ক্ষেত্রে এখানে একপক্ষ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তার কাজ কখনই অপরপক্ষকে নির্মুল বা ঘরছাড়া করা নয়; এবং এই লক্ষ্যে সে ইচ্ছামত মাত্রার বলপ্রয়োগ একেবারেই সে করতে পারে না। বরং যতটুকু বলপ্রয়োগ করলে সে অপরপক্ষকে কাবু করতে পারবে ঠিক ততটুকুই সে বলপ্রয়োগ বা  “ওভার-পাওয়ার” করবে। এর বেশি না। কোন প্রতিহিংসা তো নয়ই। আর এর বেশি হলে বরং ঐ নিরাপত্তা বাহিনী উলটা ফৌজদারি অপরাধ করেছে বলে গণ্য হবে। এটাকেই একসেস বা “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ” এর অপরাধ বলে। আর এটাই হল যে কোন ফোর্সের ‘ফোর্স এনগেজমেন্ট রুল’, ‘বলপ্রয়োগে সংশ্লিষ্ট’ হবার পক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর পালনীয় শর্ত। এতে পরিস্কার যে বর্মীজ বাহিনীর নিজেরই দেয়া তথ্য ও কথিত  যুক্তিকে সত্যি হিসাবে যদি ধরি তবুও নিরাপত্তা বাহিনী অবশ্যই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। ফলে এখানে স্পষ্টত সেনাবাহিনীই অপরাধ করেছে। মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন হয়েছে। ওদিকে গণতন্ত্রের নোবেল নেত্রী সু চি আবার দাবি করে বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইনে রোহিঙ্গা জঙ্গীরাই নাকি রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে”। এখন কার কথা আমরা বিশ্বাস করব এও আর এক মুসিবত!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বার্মা সফরে ছিলেন গত ৫-৭ সেপ্টেম্বর।  বিবিসি লিখেছিল, এই সফরে ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। আর “সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা” করা। অর্থাৎ নিজে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া অথবা কাউকে হারানোর জন্য কোন রাষ্ট্র কারও গণহত্যা ও নির্মূলকরণে সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল মোদির ভারত। সুচির সাথে মিডিয়ার সামনে সাক্ষাতে মোদি বলেছিলেন তিনি সুচির ‘পাশে আছেন’। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, তিনিও বর্মী সেনাবাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানান। আর সু চি সাথে তাল মিলিয়ে মনে করেন, এটা রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বা নির্মুল করে ফেলার ইস্যু না বরং এটা হল,একটা “ইসলামি টেররিজমের” ইস্যু। ফলে মোদি তা সঠিক মনে করেন ও সু চি কে সমর্থন জানান। সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা ছিল ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। অবশ্য মোদির এই সফর শুরুর আগের সপ্তাহে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হঠাত করে বলা শুরু করেছিলেন ভারতে নাকি ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছে (জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনারের মতে ১৬ হাজার), এবং তাদের বের করে দেয়া হবে বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। এটাও বার্মার সেনাবাহিনী ও সু চির মন পাবার জন্য ভারতের কাতর এক প্রচেষ্টা তা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু মোদির এই সফর শেষে তিনদিন পরে ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টে শুরুতেই লিখছে যে মোদি তার সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে দেখেছেন চরম সন্ত্রাসবাদের ঘটনা হিসাবে এবং তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ রোহিঙ্গাদের উপর পরিচালিত ক্লিনজিং – নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হবার দিকটা নিয়ে কিছুই বলেন নাই। অথচ ঐ সফর শেষে আচমকা ১০ সেপ্টেম্বর এই বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা আবেদন রাখব রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ‘সামালে আর পরিপক্কতার’ সাথে যেন নাড়াচাড়া করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ‘বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের’ দিকটাও যেন দেখা হয়”। বেশির ভাগ অন্যান্য পত্রিকা শুধু এতটুকুওই ছেপেছে, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এছাড়াও এক বাড়তি বাক্য ছেপেছে, ‘পিছনের কারণ’ বলে। তা হল, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তিনি নাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে দেখা করার পরেই ভারত এই মত বদলিয়ে ফেলে। আসলে এটা হল ভারতের নিজের ইউ-টার্ণের পক্ষে এক সাফাই নিজ উদ্যোগে বাজারে ছেড়ে রাখা। আর এই উলটা মোড় যে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব তা পরোক্ষে স্বীকার করে নেয়া। ব্যাপারটা হল, যদি বাংলাদেশের ঐ হাইকমিশনার এতই বুদ্ধিমান, কার্যকর ও করিতকর্মা হয়ে থাকেন আর ভারতের কূটনৈতিকদের কাজের ভুল সংশোধনের মূল ব্যক্তি হয়ে থাকেন তবে ভারতের উচিত তাকে স্থায়ীভাবে ভারতের কূটনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া, যাতে ভবিষ্যতে এমন বেকুবি আর দেউলিয়া সিদ্ধান্ত ভারত আর না নিয়ে বসতে হয়। তাই নয় কী!

ব্যাপারটা হল সকালে মোদি যাকে “রোহিঙ্গা টেরর” বলছেন বিকেলে তারই সুরক্ষার জন্য আবার সু চিকে “বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের দিকটা সামলাতে” বলছেন। নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনীতিতে একইসঙ্গে সাপ আর ওঝার ভুমিকা পালনের এক ক্লাসিক উদাহরণ।

কিন্তু আসলেই কী ভারতের কূটনীতিকেরা এতই বেকুব যে তাঁরা নিজেদের এই স্ববিরোধিতাটা দেখতেই পায় নাই? না, বরং এটা আসলে জেনেশুনে নিজেকে বেকুব বলে হাজির করা এবং মনে করা যে এতে বেশি লাভ হবে। অনেক পত্রিকাতেই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মন্তব্যে আরও একটা বাক্য আছে। তা হল, “এটা বুঝাই যাচ্ছে যে সহিংসতা শেষ হয়েছে, রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত ফিরে আসছে”।  অর্থাৎ ভারতের ফরেন অফিস বলতে চাইছে যে হা কথা সত্য, তাদের অফিস সকাল বিকেল  ভোল বদলিয়েছে। তবে বদলেছে কারণ রাখাইনে দাঙ্গা থেমে গেছে। কিন্তু এমন বাক্য ভারত লিখতে গেল কেন? সেপ্রসঙ্গের আগে বলতেই হয়, এটা খুবই অকূটনীতিক ভাষা। কারণ মায়ানমারে দাঙ্গা পরিস্থিতি ভাল বা উন্নতি হয়েছে কী না তা নিয়ে ভারত কথা বলার কে? এটা তার বলার কথা না, এক্তিয়ার নয়। এমনকি ভারত এটা জানলেও তা ওরবলা উচিত না বা বলার কথা না। কারণ তাতে ব্যাপারটা ভিন রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের মত হয়ে যায়। তাই একমাত্র মায়ানমার বলতে পারে, আর এরপরেই সে ভাষ্য ভারত ব্যবহার করতে পারে মাত্র, এর আগে না। তাহলে ভারত এই কুটনীতিক রীতিভঙ্গ করল কেন?

কারণ, এবারে বার্মা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোন এক উছিলায় বাধ্য করে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া, যাতে  প্রায় চার লাখের উপরে এরা এরপর থেকে শরনার্থী ষ্টাটাস পায়। তাতে বার্মার লাভ হল যে,  বার্মা দাবি করছিল এরা বার্মার নাগরিক নয়। কিন্তু ওরা দেশের ভিতরে বসবাস করছিল বলে সেই বার্মার সে দাবি হালে পানি পাচ্ছিল না। তাই এবার ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বার্মার অর্জন হল, মূল জনগোষ্ঠির রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়া সফল হয়ে গেছে। যদিও এতে কিছু পকেটে কিছু রোহিঙ্গা এরপরেও থেকে যেতে পারে কিন্তু মুল অংশ বের করে দেয়া গেছে। সুতরাং লক্ষ্য অর্জিত। তাই, এখন ভারত অবস্থান বদলালে তেমন অসুবিধা নাই। তাই ভারত নিজ উদ্যোগে দাবি করছে ‘দাঙ্গা থেমে গেছে’, ফলে তাদের অবস্থান বদল। তাহলে মূল কথা, সু চিকে ভারতীয় সার্ভিস পুরা মাত্রায় দেয়া হয়ে গেছে বলে ভারত অবস্থান বদলিয়ে নিয়েছে, তাতে যতই কূটনীতিক বেইজ্জতিই ভারতের হোক না কেন! অতএব এখন সময় হাসিনা-সুষমা গলা জড়াজড়ি করা। ত্রাণ পাঠানোর ছবি তোলা, আর মহড়া করার।

কেউ কম যায় নাই। চীনের গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, বার্মার নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়ছে আর তাতে নিজের  উদ্বেগের কথা চীন জানিয়েছে। [backs Myanmar’s efforts to “safeguard peace and stability,”]। অথচ রোহিঙ্গাদের নির্মুল নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হওয়াকে চীনের কাছে ইস্যু নয়। এর কোন উল্লেখ চীন করে নাই।  অর্থাৎ সবার রোগ একই। আর চীনের ঐ খবরের শিরোনাম হল, মায়ানমার নাকি “শান্তি আর স্থিতিশীলতা সুরক্ষা করছে” বলে চীন মনে করে। ফলে ভারতের মত চীনও পিছিয়ে না থেকে এখন ত্রাণ পাঠাতে ব্যস্ত।

আমেরিকাও তাই; সেও পিছিয়ে নাই। আমেরিকান উপ-সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফি গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনিও নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আর তিনি মনে করেন রাখাইনে রাজ্যে একা মুসলমানেরা নির্যাতিত নয়, মুসলমানদের হাতে অন্যেরাও নির্যাতিত। এটাই সু চির এর লাইন। সু চি চায় সবাই ‘এটা বিভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা’ এটা প্রচার করুক। আর সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা ক্লিনজিং বা সাফা করা আড়াল করুক।

 

গৌতম দাস

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

যখন সাফাই নিজের অবস্থান আরো দুর্বল করে

যখন সাফাই নিজের অবস্থান আরো দুর্বল করে
গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1Zu

চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা হাঙ্গেরি সফর করে দেশে ফিরেছেন। সেখান থেকে ফিরে আসার পর জনগণকে সেই সফর প্রসঙ্গে অবহিত করতে এক সংবাদ সম্মেলনে ডেকেছিলেন। সেখানে বাড়তি প্রসঙ্গ হিসেবে অনেক কিছুই হাজির হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন কিভাবে করা হবে সে প্রসঙ্গও ছিল। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন কিভাবে হবে তা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অফিসে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সাংবাদিকেরা মূলত সেই প্রস্তাবের বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া বা অবস্থান জানতে চাইছিলেন। কিন্তু এতে তিনি যেভাবে এবং যে জবাবে এই প্রশ্নকে মোকাবেলা করেছেন তা জোরালো তো ছিলই না এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সাফাই না হয়ে এটা তাঁর বিপক্ষে গেছে বলে মনে করা যেতে পারে। আর সবচেয়ে কম করে বললেও তা কোন প্রধানমন্ত্রীর জন্য মানানসই হয়নি। আর একভাবে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তার জবাব কনস্টিটিউশনাল আইনের চোখে সিদ্ধ হচ্ছে কি না সে দিকটা একেবারেই বিবেচনায় নেননি, বরং তা আইনসিদ্ধ হোক আর না হোক ডোন্ট কেয়ার হয়ে কেবল রাজনীতির বাকচাতুর্য দিয়ে কথা সাজিয়েছেন। এক ধরণের সাফাই খাঁড়া করতে গিয়েছেন। পার হয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই সাফাই যথেষ্ট হয় নাই ও উপযুক্ত না হওয়ার কারণে তার অবস্থানের বিরাট এই দুর্বল দিকটাই প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

এখানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বক্তব্যগুলো প্রথম আলোয় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছিলেন ৩ ডিসেম্বর। প্রথম আলো অনলাইনে ৩ ও ৪ ডিসেম্বর এ বিষয়ে পরপর দুই দিন দুটা রিপোর্ট ছেপেছিল। এর মধ্যে ৪ ডিসেম্বরের রিপোর্টটাই সবিস্তারে। এখানকার সব কোটেশন প্রথম আলো ৪ ডিসেম্বরের রিপোর্ট থেকে নেয়া।

১. নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলছেন, “ওনার (মানে খালেদা জিয়ার) প্রস্তাব উনি দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে বলুক। এটা রাষ্ট্রপতি ভালো বুঝবেন উনি কী পদক্ষেপ নেবেন। রাষ্ট্রপতি যে পদক্ষেপ নেবেন; সেটাই হবে। এখানে আমাদের বলার কিছু নেই”। প্রথমত মনে রাখা দরকার নির্বাচন কমিশন কনষ্টিটিউশনে একটা স্টাটুটারী (statutory) প্রতিষ্ঠান। ধারণা হিসাবে ষ্টাটুটারী প্রতিষ্ঠান মানে যার নিয়ন্ত্রণকারী এবং রিপোর্টিং (জবাবদিহি) অফিস রাষ্ট্রপতির অফিস, নির্বাহী সরকার নয়। ফলে আমাদের নির্বাচন কমিশনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগের মানে নির্বাহী সরকারের অধীনে নয়, বরং সরাসরি রাষ্ট্রপতির অফিসের অধীনে। অর্থাৎ সার কথা হল, নির্বাচন কমিশন অফিসের কমিশনারদের নিয়োগকর্তা হলেন রাষ্ট্রপতি এবং তাদের জবাবদিহি করার বা রিপোর্টিং অফিস হল রাষ্ট্রপতির অফিস। প্রধানমন্ত্রীর অফিস নয়। কিন্তু আমাদের কনস্টিটিউশনে আবার অন্য এক আর্টিকেল আছে যেখানে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগদান বাদে বাকি সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই পরিচালিত হবেন। এই বলে রাষ্ট্রপতির উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে রাখা আছে। এই কারণে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগদান বাদে  রাষ্ট্রপতির তৎপরতার সবকিছু বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নিজের বিবেচনা প্রয়োগ করে কিছুই নির্ধারণ করতে অপারগ। ফলে সবকিছুই সরকার বা সরকারপ্রধান দ্বারাই নির্ধারিত হয়ে থাকে। ব্যবহারিক দিক থেকে বললে, প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে পাঠানো পরামর্শ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি একমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। অতএব প্রধানমন্ত্রীর এই জবাবের কার্যত কোনো অর্থ নেই। ‘রাষ্ট্রপতি ভালো বুঝবেন, উনি কী পদক্ষেপ নেবেন’, এটা নিছক কথার কথা। কারণ এই ইস্যুতে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী যা পরামর্শ দেবেন রাষ্ট্রপতি সেই সিদ্ধান্তই নিতে কনষ্টিটিউশন আইনে বাধ্য। সোজা কথা আমাদের কনস্টিটিউশন অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনার বাইরে ভিন্নভাবে ভেবে দেখার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রপতির নেই।

২. নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে বিএনপির দেয়া প্রস্তাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিএনপি যে প্রস্তাব দিয়েছে আপনারা এর মাথা বা লেজের হদিস পেয়েছেন কি না, আমি জানি না। তিনি নির্বাচন করেননি, একটা দল হিসেবে বা দলের প্রধান হিসেবে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন থেকে বিরত থেকেছিলেন। এখন এত দিন পর ওনার টনক নড়ল। এরপর উনি মানুষ খুন করে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত করার আন্দোলন করলেন। যেকোনো প্রস্তাব দেয়ার আগে তার তো জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল”।
প্রথম আলো আরো লিখছে, ‘হত্যাকাণ্ড থেকে কোনো সম্প্রদায়ই রেহাই পাননি জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সাধারণ মানুষ, বাসের চালক, হেলপার, রেল, লঞ্চ, কোথায় না আঘাত করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়েছে, ইঞ্জিনিয়ারকে মেরেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ২০ জন সদস্যকে হত্যা করেছে। আগে সেই জবাবটা জাতির কাছে দিক। তারপর প্রস্তাব নিয়ে কথা হবে। তারপর তার প্রস্তাব নিয়ে কথা বলব।’

প্রথমত বিএনপি আগের নির্বাচন অংশ নেয় নাই। কিন্তু সেজন্য এবার নির্বাচন কমিশন গঠন কী করে হওয়া উচিত তা নিয়ে প্রস্তাব রাখতে পারবে না কিছু বলার সুযোগ, আইনী অধিকার নাই এমন ধারণার ভিত্তি নাই। একথা প্রধানমন্ত্রীর অজানা নয়। ফলে একথা তুলে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির উপর যে কালি লেপে দিতে চেষ্টা করেছেন সেটা ভুল। তাই তিনি তা করতে পারেন না। একইভাবে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের আইনগত ভুল বা সমস্যার দিক হল, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে বিএনপির সিদ্ধান্ত ভুল কি না আইনগত দিক থেকে নির্বাহী সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর সেটা বিবেচনায় নেয়ার কিছু নেই। এক্তিয়ার নাই। দ্বিতীয়ত, যদি এটা ভুল সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করা হয়ও, তবু সে কারণে নির্বাহী সরকারের এ নিয়ে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার আছে বলে জানা যায় না। এমনকি সে জন্য বিএনপির ‘জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত’ কি না তা নিয়ে আইনগত দিক থেকে সরকারের বলারও কিছু নেই। ফলে এটা প্রধানমন্ত্রীর প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু নয়। এ ছাড়া নির্বাচন বর্জন এবং তা করতে গিয়ে কোনো দল যদি কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স করে ফেলে, সে ক্ষেত্রে সরকার বড়জোর সুনির্দিষ্ট অপরাধকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে এবং আদালত (নির্বাহী সরকার নয়) এ ব্যাপারে আইনগত প্রক্রিয়ায় ওই অভিযোগের ইস্যু নিষ্পত্তি করবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গটা ব্যাখ্যা করছেন এভাবে বলে যে, আগে বিএনপি “জবাবটা জাতির কাছে দিক। তারপর তার প্রস্তাব নিয়ে কথা বলব”। প্রধানমন্ত্রী অন্য একটা দলের কাছে জবাব চাইবার কেউ নন। চাইতে পারেন না তিনি। কেউ তাকে জবাব চাইতে দায়িত্ব দেয় নাই। সেটা তিনি জানেন। তাই বলছেন, (তার কাছে না) তবে “জাতির কাছে জবাব দিক”।  প্রধানমন্ত্রী এভাবে বিষয়টা শর্তযুক্ত করলেন বটে- যে এটা দিলে সেটা দেয়া হবে- এ ধরনের করে; কিন্তু এমন করার এখতিয়ার তার আছে কি? আসলে কোনো নাগরিক কোনো ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে কি না সেটা বিচারের কোনো এখতিয়ার নির্বাহী সরকারের নেই। সরকার বড়জোর মামলা করতে পারে। আর আদালতে সে অভিযোগ পেশ করে সরকার প্রমাণের চেষ্টা করে যেতে পারে। কিন্তু সেটা কোনো অপরাধ হয়েছে কি না সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এক্তিয়ার একমাত্র আদালতের। এমনকি কোনো আদালতে যদি প্রমাণিত হয়ও যে, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করতে গিয়ে দলের কোন মেম্বার কেউ অপরাধ ঘটিয়েছে, কিন্তু তবুও সে জন্য দল হিসাবে বিএনপির নির্বাচন কমিশন সংস্কার করার বিষয়ে প্রস্তাব করার অধিকার খর্ব হয় না। অথবা জনগণের কাছে ‘ক্ষমা চাওয়া’র শর্ত পূরণ না হলে সরকার ওই প্রস্তাব বিবেচনা করবে না এটাই বলার এক্তিয়ার সরকারের নাই। আইনগত দিক থেকে এটা বলাও সরকারপ্রধানের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। বরং উল্টাটা, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে মাফ চাইলে তবেই সুষ্ঠু নির্বাচনের পদক্ষেপ নেয়া হবে- সরকারের অবস্থান যেন এমনটাই হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী যেন বলতে চাইছেন, বিএনপি জনগণের কাছে মাফ না চাইলে তিনি আগামি নির্বাচন সুষ্ঠ করার লক্ষে পদক্ষেপ নিবেন না – এমন হয়ে গেছে। আর তার চেয়েও বড় কথা এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যেন ইচ্ছাধারী এবং দাতা। যিনি শাস্তিও দিতে পারেন, আনুকুল্যের সুবিধাও দিতে পারেন। আর বিপরীতে বিরোধী সব দল তার দেয়া আনুকুল্য অথবা শাস্তি গ্রহীতা।
কথা হল, প্রধানমন্ত্রী এভাবে জবাব দিতে গেলেন কেন? এটা করা হল এ জন্য যে, এভাবে যুক্তি তুললে জনগণের চোখে বিএনপিকে ডিসক্রেডিট করা দেয়া যায়, হয়ত সেজন্য। সেটা ভেবে এমন বক্তব্য দেয়া হল। কিন্তু তাতে আসলে ঘটে গেছে ঠিক উল্টোটা। কারণ, আইনগত দিক থেকে প্রত্যেকটা কথা এখতিয়ারের বাইরে চলে গেছে। আর সরকারের দিক থেকে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হতে না দেয়ার পক্ষে তো মূলত কোনো যুক্তি চলে না। এরফলে ভাষ্যগুলো শুধু যে দুর্বল বলে হাজির হয়েছে তা-ই নয়; বরং উপযুক্ত সাফাই যে সরকারের হাতে নেই, এটাই প্রকট হয়ে গেছে।
এই বিষয়টা আরো এক নতুন সমস্যা সৃষ্টি করছে, তা হল – সরকারের স্ববিরোধিতা। যেমন সাধারণভাবে সরকার নিজেই নিজের ইমেজ বাড়ানোর লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ অন্তত লোক দেখানোর জন্য হলেও নিচ্ছে বলে দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। বিশেষত আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনের সময় থেকে এপর্যন্ত। যেমন আইনমন্ত্রী বলছেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, আইনবহির্ভূত হত্যা’। কিন্তু এটা নতুন স্ববিরোধিতা সৃষ্টি করছে। কারণ, এত দিন সরকার কোনো ‘আইনবহির্ভূত হত্যা’ দেশে ঘটছে না বা সরকার করছে না বলে পুরোপুরি অস্বীকারের মুডে ছিল। কিন্তু এখন ইমেজ বাড়বে মনে করে এই নতুন ভাষায় কথা বলাতে আসলে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়া হয়ে গেছে যে, “আইনবহির্ভূত হত্যা” হচ্ছে, ঘটছে। তাই এটা একটা বড় সমস্যা। ফলে, বিষয়টি যতটা স্বীকার করে নিচ্ছে ঠিক ততটাই সরকারের ইমেজ বাড়া দূরে থাক, উল্টো ইমেজ হারানো বা বদনাম হিসেবে হাজির হচ্ছে। অর্থাৎ স্বীকারোক্তিতে ইমেজ আরো কমছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু
সবশেষে এখন আরেকটি বিষয় আনব- রোহিঙ্গা ইস্যু। এটা অবশ্য ‘নির্বাচন কমিশন’ বা ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ ধরনের ইস্যু নয়। তবে এখানে মূলকথা হল, রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতন বিরাট মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। এটা বাংলাদেশের কমবেশি সব মানুষকে এক অসহায়বোধের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ফলে বার্মা বা মিয়ানমার সরকারের করা কাজের পক্ষে কোনো সাফাই আর কাজ করছে না। শুধু তা-ই নয়, আমাদের সরকারেরও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষের যুক্তিতে কোনো কাজ হচ্ছে না। ঐ একই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে একটা কথা বলে ফেলেছেন।
জানে মারা যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য, অন্তত একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য  রোহিঙ্গারা এখন পলায়নপর এবং মরিয়া হয়ে আশ্রয়প্রার্থী। এ অবস্থায় কোনো মানবিক আচরণ করা দূরে থাক, প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য মানবিক আচরণ না করার পক্ষে সাফাই দেয়া হয়ে গেছে। যেমন, প্রথম আলো লিখছে, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। সে দেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকেছে। বিজিবি সতর্ক আছে। কিছু মানুষ এলে মানবিক দিক বিবেচনা করে আশ্রয় না দিয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু যারা এর জন্য দায়ী, ৯ জনকে হত্যা করল, তারা কোথায় আছে? কী অবস্থায় আছে, ধরে দেয়া উচিত। তাদের জন্য হাজার হাজার মানুষ কষ্ট পাচ্ছে”। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, “তারা যদি আমাদের এদিকে এসে থাকে আমি ইন্টেলিজেন্সকে খবর দিয়েছি তাদের খুঁজে বের করার জন্য। কেউ যদি শেল্টার নিতে আসে দেবো না, তাদের মিয়ানমারের হাতে তুলে দেবো”।

অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়, তিনি বার্মা সরকারের সাফাই বয়ানটাই নিজের বয়ান মনে করছেন। যেমন, বার্মা সরকারের দাবি হল, বার্মা সরকারের হত্যা ও আক্রমণের মুখে মরিয়া হয়ে কথিত কিছু রোহিঙ্গা প্রতিরোধ করতে গিয়ে ৯ জন পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোককে হত্যা করে ফেলেছে। কাজেই বার্মা সরকারের এখন যে গণহারে রোহিঙ্গা গণহত্যা করছেন, এর জন্য বার্মা সরকার দায়ী নয়। বরং ওই প্রতিরোধকারীরাই দায়ী। সব দোষ তাদের। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে হবে। বার্মিজ সরকার গণহত্যা করছে কথাটা ঠিক। কিন্তু তারা সে জন্য দায়ী নয়। দায়ী ওই রোহিঙ্গা প্রতিরোধকারীরা, যারা ৯ জন পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোককে হত্যা করেছে। এই বক্তব্য বয়ান খুবই খুবই বিপদজনক। এর মানে হবে, পাকিস্তানের গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ করতে আমরা গিয়েছিলাম। ফলে এভাবেই কী আমরা আমাদের নিজেদের এক কোটি লোক উদ্বাস্তু হওয়ার, নিজেদের মানুষ রেপ আর আর হত্যা হওয়ার জন্য দায়ী? এই বয়ান কী আমরা গ্রহণ করতে রাজী হব!

আসলে এসব বক্তব্য আর অবস্থান নিতে গিয়ে সরকার নিজের কাজ ও আচরণের পক্ষে কোনো সাফাই সৃষ্টি করতে পারছে না, বরং যতই ভাল ইমেজ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছে ততই আর বেশি করে ইমেজ হারিয়ে ফেলছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ১২ ডিসেম্বর ২০১৬ (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে সে লেখা আরও ঘষামাজা আর এডিট করে আবার ছাপা হল।]