বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

“বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

গৌতম দাস

৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yW

BRI-2, First China freight train arrives in London 2017
BELT-ROAD SUMMIT-2,  আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – ছবি : সংগ্রহ

গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বদলে চীন মূল ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে চীন এগিয়েই চলেছে এবং এই পরিবর্তনে চীনের জিডিপি সব সময় ইতিবাচক থেকেছে, যদিও সময়ে তা কম-বেশি হয়েছে। অগ্রগতির সে বিচারে গত কয়েক মাস ছিল চীনের দিক থেকে খুবই নির্ধারক কিছু ঘটনার যা, চীন ইতিবাচক সাফল্যের সাথে পার হয়েছে। আর এমন সাফল্যের ওপর চড়ে চলতি এপ্রিল মাসে চীন আরেক সাফল্য লাভ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ইতিহাসে চীনা উত্থানের দ্বিতীয় পর্যায় বলেই চিহ্নিত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?

চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) বা [Belt and Road Initiative (BRI) ] সম্পর্কে এতদিনে আমরা সবাই কমবেশি জেনে গেছি যে, এটা ৬৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে একসাথে ভৌত অবকাঠামোগতভাবে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে কানেক্ট করার এক মহাপ্রকল্প। কাঠামোগতভাবে এটা  মহাদেশীয় পর্যায়ের সংযোগ প্রকল্প; যা মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপ এদুই মহাদেশকে সংযুক্ত করে ফেলার প্রকল্প এবং আরও। তাই এর সাথে এ’দুই মহাদেশের মাঝখানে সেন্ট্রাল এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের সবাই যুক্ত হবে। আর ওদিকে এই কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আরেক প্রান্ত কেনিয়া ও ইথিওপিয়া দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সাথেও সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া পুরো প্রকল্পই স্থানে স্থানে ছয়টিরও বেশি গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের পণ্য পরিবহণের সাথেও যুক্ত থাকবে। আইডিয়া হিসেবে বিআরআই উদ্যোগের মূল ধারণা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাজির করেছিলেন তাঁর কাজাখাস্তান সফরের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। তখন এর নাম বেল্টরোড, সিল্করোধ, সিল্করুট ইত্যাদি নানান নামে হাজির করা হয়েছিল। সে ঘটনাক্রম সম্পর্কে এখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।  তবে গত ২০১৭ সালের মে মাসে এর প্রথম সামিট (বা সদস্য রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের নিয়ে সভা, বেল্ট রোড সামিট) এর সময় তা “বেল্ট রোড উদ্যোগ” (BRI) নামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মূল ফোকাস ছিল – কোন কোন রাষ্ট্র এই বড় প্রকল্পের অংশ হতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। আজ এই ২০১৯ সালের চলতি এপ্রিল মাসের শেষে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এবারের নাম Belt and Road Forum বলতে দেখা যাচ্ছে। এর জন্য নতুন খোলা পোর্টাল এখানে।]  এই সামিট টু কেন গুরুত্বপূর্ণ বা এর মূল তাৎপর্য কী হতে যাচ্ছে?

বেল্ট রোড অবকাঠামো প্রকল্পের মূল কাঠামো হল মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপকে সব উপায়ে সংযুক্ত করে ফেলা। অর্থাৎ এশিয়ার অপরপ্রান্ত হবে ইউরোপ, এত দিন যা খুবই সীমিত সুযোগে কানেক্টেড ছিল। আর এখানে ইউরোপ মানে সারা ইউরোপ; অর্থাৎ ২৫ সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও সংখ্যায় ২৫ অনেক বেশি, কিন্তু আসলে ইউরোপের প্রভাবশালী মাতবর রাষ্ট্র – চার থেকে আট রাষ্ট্র, যারা যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক। এই প্রথম চার রাষ্ট্রের মধ্যে মূল দুই রাষ্ট্র আবার হলো ফ্রান্স ও জার্মানি। এর সাথে বাকি দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন আর ইতালি। এমনিতে আমেরিকান মাতবরিতে চলা গত ৭০ বছরের দুনিয়া বিচারে, আমেরিকা একা একা চলে নাই; সাগরেদ রাষ্ট্রসহ দলেবলে চলেছে। এভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রজোট হল ‘গ্রুপ সেভেন’ বা জি-৭। একটু বিস্তারিত জানতে এই ফাইনান্সিয়াল বিনিয়োগ-পিডিয়া সাইট, ইনভেস্টোপিডিয়া – এটা দেখা যেতে পারে।  ইউরোপের সেই চার রাষ্ট্র – ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি – এই চার রাষ্ট্রই হল ‘গ্রুপ সেভেন’-এর চার ইউরোপীয় সদস্য; আর বাকি কানাডা, আমেরিকা ও জাপান মিলে পূর্ণ হয় ‘গ্রুপ সেভেন’।

বেল্ট-রোড উদ্যোগের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে এই কাঠামোতে এখানে এশিয়ার অপর প্রান্ত ইউরোপ। অথচ ২০১৭ সালে প্রথম বেল্ট রোড সামিট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এর অগ্রগতি ও অর্জন মেপে দেখলে সেখানে বড় খামতির দিক ছিল যে, সেকালে পর্যন্ত ইউরোপের কে কে বা বিশেষ করে প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রের কাউকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহী করাতে পারেনি বা কমপক্ষে কাউকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়াদা চীন আদায় করতে পারেনি। সেই খামতিই এবার পূরণ হতে চলেছে।
তবে এত দিন চীন কেন তা পারেনি তা বুঝতে প্রথমত চীনের কাছে জি-৭ কী, এটা বুঝলে অনেকটাই স্পষ্ট হবে সমস্যার জটিলতা কোথায়? গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত চীন ও আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকার জায়গা নিতে চায় চীন। তাহলে ইউরোপ? এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপ কেউ নয়। কারণ ইউরোপ বিগত-যুবা। ফলে সে ঐ দু’য়ের লড়াইয়ে কারও জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। তবে আমরা ইতিহাস হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, যদিও ইউরোপও একসময় দুনিয়ার নেতা এবং তাঁর সেখানে রুস্তমি ছিল; তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এবং সেটা ছিল কলোনি রুস্তমি।  আর ঐ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ হয়েছিল আমেরিকার এক নম্বর সাগরেদ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় (১৯৪২) থেকেই গ্লোবাল নেতৃত্ব আমেরিকা নিজের হাতে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে যায়; আর সারা ইউরোপ ছোট-বড় সবাই হয়ে যায় আমেরিকার অনুগ্রহ প্রার্থী। এমনকি মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করা হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালি অথবা এশিয়ার জাপান বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার পর আরও বেশি করে আমেরিকার অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়। ওদিকে ঐ বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের প্রায় সবাইকে যুদ্ধে সবরকম সাহায্য করা, প্রধান খরচগুলো নিজে বহন করা, অনুদান দেয়া তো বটেই এমনকি যুদ্ধ সমাপ্তিতে ইউরোপের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্বাসনের যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সেটাও একা আমেরিকা জুগিয়েছিল। তাই আমেরিকা ও ইউরোপের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় যেন, আমেরিকা একাই ত্রাতা ও দাতা আর  ইউরোপ ওরই পাণিপ্রার্থী। সে সম্পর্কই সেই থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসছে জি-সেভেন ধরনের গ্রুপেও, এক উঁচু-নিচু সম্পর্কে। আমেরিকা কী বলে বা সে কী চায়, তা আমল করে শুনতে ইউরোপ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যদিও ১৯৪৪ সাল থেকে গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম, যা বহুরাষ্ট্রীয় নানান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, তা গড়তে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ও নেতারা আমেরিকার সাগরেদ হয়ে পাশে থেকে নিজেদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ করে নিয়েছিল। এভাবে ইউরোপের প্রভাবশালী চার-ছয় রাষ্ট্র আমেরিকার পাশে ছোট-তরফ বা সাগরেদ হয়ে উঠতে জায়গা পেয়েছিল।

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, একালে আমেরিকাকে সরিয়ে গ্লোবাল নেতৃত্বের সে জায়গা চীন নিতে চাইলে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকেও চীনমুখী করে নিতে হবে আগে। “আমেরিকা-ইউরোপের” সম্পর্কের বদলে একে ছাপিয়ে “চীন-ইউরোপের” মধ্যে সম্পর্ককে খাঁড়া হতে হবে আরও প্রবল প্রভাবশালী সম্পর্ক হিসাবে। আর এটাই হবে বাস্তবত আমেরিকাকে দুনিয়ায় কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া। অতএব, বিশাল হইচই ফেলে দেয়া ঘটনা হল – ইতালির বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা। এবছরের মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি-এর সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফর ছিল। আর সেখানেই স্বাক্ষরিত ১৭টি চুক্তির মধ্যে একটি হলো চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রাথমিক বোঝাবুঝিগুলো’ (এমওইউ বা MOU ) দলিল করে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর চলতি মাসের বেল্ট রোড সামিট টু-তে অংশ নেয়ার সময় তা পূর্ণতা পাবে।

ইটালির এই যোগদান-সম্মতির চীনা উত্থানের জন্য এক মাইলস্টোন তাতপর্যের। কারণ ইতালিই হল প্রথম জি-৭ গ্রুপের সদস্য যে খোলাখুলি আমেরিকান মেরু ত্যাগ করল। শুধু তাই নয় ইতালিই প্রথম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যে (আমেরিকার হাত ছেড়ে) চীনের সাথে “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” – সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। [The communique said the two sides have agreed to advance China-Italy comprehensive strategic partnership…… ] অর্থাৎ চীন-ইতালি সম্পর্কটা কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নয়। [এপ্রসঙ্গ আরও একটু বিস্তারিত পরের প্যারায়।] বৃটেনসহ অন্যান্যরাও ইতোমধ্যে অনেক দূর গিয়েছে কিন্তু সেগুলো ছাড়াছাড়া। যেমন এলেখার শিরোনামের ছবিটা; এছবি বেল্ট-রোড ব্যবহার করেই প্রথম ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, চীন থেকে লন্ডন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন ব্যবহারের। যেটা অনেকটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসায় একটা সংযোগ নেওয়ার মত। কিন্তু সেটা ঐ বিদ্যুৎ কোম্পানির সাথে মালিকানা-বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

কিন্তু ইতালি ইউরোপের বাকি সবার আগে এত গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রধান বস্তুগত স্বার্থের দিক হল – পুরো বেল্ট রোড প্রকল্পে ইউরোপীয় আর এক প্রভাবশালী প্রান্ত বা শেষ মাথা হবে ইতালি। তাতে ইউরোপের যে গভীর সমুদ্রবন্দর বেল্ট রোডের সড়ক ও রেলকে সংযুক্ত করাবে, সেই বন্দর গড়ে উঠবে ইতালিতে। যার মানে হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতা মুসোলিনি, তিনি হিটলারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে – সেই থেকে পিছিয়ে পড়া আর ধুঁকে চলা অর্থনীতির ইতালি এবার সামনের সারিতে চলে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ডাচ রটারডামকে ছাড়িয়ে ইতালি হয়ে উঠবে ইউরোপের হাব [hub] – সড়ক, রেলের সাথে সমুদ্রপথ যুক্ত হওয়ার বড় সংযোগস্থল। সব দিকের সাথে কানেক্টিভিটির এই বিশেষ সুবিধার জন্য ইতালি হয়ে উঠবে বুড়ো শরীরে আবার যৌবনের জোয়ার – ইতালি হবে এখন ইপিজেড-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের হাবও। তাই নিজ বিপুল সম্ভাবনার সামনে এখন থেকে আমেরিকার হাত হালকা করে ধরা আর ইউরোপের অন্যরা – ফ্রান্স, জর্মানি বা ব্রিটেন- এদের সবাইকে টপকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চীনের হাত শক্ত করে জাপটে ধরা হবে ইতালির কাছে খুবই জায়েজ।

কিন্তু তাই বলে জার্মান, ফ্রান্স বা ব্রিটেনকেও চীন বিমুখ করেছে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়। বিস্তারে তা বুঝতে আরেকটা ধারণার সাথে পরিচয় করাতে হবে। “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” [Comprehensive Strategic Partner]’ হলো সেই নতুন শব্দগুচ্ছ – যা চীন একালে ব্যাপক ব্যবহার করছে। বাংলায় “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” – চীন দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে এমন “কৌশলগত মিত্র” হিসেবে পেতে চায়। এটা একটা (বেল্ট রোড) প্রকল্পেই কেবল চীন সবাইকে পেতে চায় তা নয়, বরং আরও এবং সামগ্রিক। আসলে খোদ বেল্ট রোড প্রকল্পটি চীনের একটি কৌশলগত প্রকল্প। কেবল বাণিজ্যিক নয়।

স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বলতে এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অর্থ হল, যা কেবল অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটাই নয়, আরও অনেক কিছু। কী সেটা? অন্তত আপাতত অর্থ হল, আমেরিকাকে বাইরে রেখে বাকিদের নেয়া হয়েছে এমন এক পক্ষজোট- যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি সব (এই অর্থে তা সামগ্রিক) স্বার্থেই এখানে চীনের নেতৃত্বে সকলে আছে। এই অর্থে এটা আমেরিকাকে বাইরে রেখে এক রাষ্ট্রস্বার্থ জোট। আবার এই জোটের কাম্য সদস্যরা মানেই এরা সবাই বড় ক্ষমতার রাষ্ট্র, ঠিক তা নয়। যেমন হাসিনার বাংলাদেশ (অন্তত ঘোষণা মোতাবেক), আমরাও চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ব্যাপারটা আর একটু বিস্তার করতে আরেক দিকে আলো ফেলব।

ক্রাইস্টচার্চ ম্যাসাকার সামলানোর জন্য সদ্য সুখ্যাতি অর্জন করা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা, এ মাসের ১ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে চীনের “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” হয়ে এসেছেন। এমন মিত্র হওয়াতে এর অর্থ বুঝতে হবে এভাবে; নিউজিল্যান্ড বেল্ট রোড প্রকল্পের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হয়েছে ও নিয়েছে। অর্থাৎ চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার না হয়েও কেউ বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও জেসিন্ডা স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হওয়া বেশি লাভজনক মেনেছেন। আর বিপরীতে কেবল বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হলে স্বভাবতই সে ক্ষেত্রে সেটা কেবল “বাণিজ্যিক স্বার্থ” ধরনের সম্পর্ক হত। ফলে চীনের দেয়া অন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সে পেত না। যেমন- কোন রাষ্ট্র যদি কোন কারণে ঋণের কিস্তি শোধ দিতে পারছে না অবস্থায় পড়ে। এমন ক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্র আবার চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হলে চীন ব্যাপারটাকে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখে থেমে থাকবে না। চীন তাকে বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে, বিপদ থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেওয়াসহ সব সাহায্য করবে। চীনের এখনকার সাধারণ নীতি-কৌশল হল সব রাষ্ট্র বা প্রকল্পের সম্পর্ককে সব সময় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা। যদি পার্টনার রাজি থাকে কেবল তখন সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়, কিন্তু চীনের দিক থেকে আগ্রহ জারি থাকে সব ক্ষেত্রে ও সময়ে।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ কেন আনলাম? কারণ, ঠিক এর বিপরীত ঘটনা বা রাষ্ট্র হলো অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রায় সময় একসাথে উচ্চারিত শব্দ। মূল কারণ তারা একইভাবে, একই ভাগ্যে রকই সময়ে ব্রিটেনের কলোনি হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থ ও নীতিগত মিল এক হতে বেশির ভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায়। যদিও চীন না আমেরিকা কোন ক্যাম্পে থাকবে প্রশ্নে তাদের ভিন্নতা দেখা দিল। আর জেসিন্ডা প্রমাণ করলেন অষ্ট্রেলিয়া ভুল করেছে।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই অন্তত ওবামা আমল থেকে,  তবে চাদরের নিচে থেকে আস্তে আস্তে প্রকট হয়ে ভেসে উঠছিল। যা কেবল এ’কালে ট্রাম্পের আমলে এসেই চাদর উঠে গেছে। আর সবচেয়ে বড়ভাবে আরেকবার চাদর উঠেছিল ২০১৫ সালে, চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক – এআইআইবি [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ] গড়ার সময়ে। ওবামা লজ্জার মাথা খেয়ে খোলাখুলি সেই সময়ে এই নতুন ব্যাংক প্রকল্পে যেন এশিয়ার জাপান, কোরিয়া তাইওয়ান বা অস্ট্রেলিয়া (যারা আমেরিকার বহু পুরনো বন্ধু মনে করা হয়) এরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও কেউ যেন যোগ না দেয় এর লক্ষ্যে, কান-পড়া দিয়ে কার বিয়ে ভেঙে দেয়ার মত, করে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও আপত্তিতে ছেয়ে ফেলেছিল। যদিও ফলাফলে আমেরিকার হার হয়েছিল; শেষে প্রায় সব রাষ্ট্রই ওই ব্যাংক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু চীনের নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট আর আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট সেই থেকে প্রায় প্রকাশ্যেই তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এআইআইবি ব্যাংকে সদস্য হয়েও আমেরিকার জোটেই যোগ দিয়েছিল। এছাড়া আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোটে আর সদস্য হয়েছিল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মত রাষ্ট্রগুলো এবং স্বভাবতই আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেয়া ভারত তো ছিল।

এমনকি অস্ট্রেলিয়া আরও একধাপ এগিয়ে নিজের উপকূলে এক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন (২০১৬ সালে চালু হয়) করতে দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় সবাই ধরা খেয়ে যায় ট্রাম্পের আমলে এসে, তাঁর জাতীবাদি ট্রাম্প হয়ে উঠার কারণে। কারণ ট্রাম্পের সারকথা, বিড়াল যেন বলছে আর মাছ খাবো না। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের অর্থনীতিতে রূপান্তর মানে দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক পণ্য বিনিময়ের গ্লোবাল সমাজের দুনিয়া গড়তে নেতৃত্ব দেয়া সেই আমেরিকা, ট্রাম্পের হাতে পড়ে হয়ে গেল অ্যান্টি-গ্লোবাল। এক জাতিবাদি আমেরিকা; আমেরিকা ফাস্টের নীতি চর্চা শুরু করল। ফলে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক জোট মুখ থুবড়ে পড়লেও বিপরীতে চীনেরটা সদর্পে আরও এগিয়ে যেতে সুযোগ পেয়ে যায়। সেটারই স্পষ্ট সফলতা এই প্রথম এখন প্রমাণ হল গত মাসের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর ইউরোপ সফরে। মুখ পোড়ানো অস্ট্রেলিয়ার অতি উৎসাহ যে ভুল ছিল তা যেন আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়ার অকেজো স্ট্র্যাটেজিক জোটের পাল্টা চীনা স্ট্র্যাটেজিক জোটে যোগ দিল।

এদিকে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকেই ইউরোপের জার্মানি – যে ট্রাম্পের “অ্যান্টি-গ্লোবাল” অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পাল্টা সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিল এবং ভোকাল ছিল, সেই জার্মানির সাথেই চীনের সম্পর্ক গভীর হয়ে যায়। চীনা শিল্প-উদ্যোগের যুগ এখন দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যার সারকথা প্রত্যেক ট্রেডকেই হাইটেকে বা উচ্চ প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়া। যেখানে প্রথম পর্যায়টা ছিল বাল্ক উতপাদন করে উতপাদন খরচ নামিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করে ফেলা। তাই এবার হাইটেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে – এখানেই জার্মানির সাথে চীন গভীর পার্টনারশিপ হয়। ব্যাপারটা জার্মানির দিক থেকে দেখলে, চীনের মতো বড় আর ব্যাপক এবং হাইটেকের চাহিদার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাওয়া জার্মানির জন্য তা বিরাট কিছু। সাধারণভাবে হাইটেকে আর বিশেষত গাড়ি তৈরির অটো শিল্পে চীনের মূল পার্টনার এখন জার্মানি।  জার্মানরা বিনিয়োগ নয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। চীনে গত তিন বছরে লাগাতার  জার্মান সংশ্লিষ্টতা ও বিনিয়োগ বেড়ে চলা চলছেই, গ্রোথ রেট ১৪০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্স সফরে এক মূল সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রেসিডেন্ট শিং-এর জর্মান চ্যান্সেলার মার্কেলের সাথে বৈঠকের মিডিয়া রিপোর্ট বলছে [China was Germany’s largest trading partner for a third consecutive year in 2018, with a nearly 140 percent increase in German companies’ actual investment in China, he said.]। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে এই বৈঠক থেকে চীনের সাথে জর্মানির ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে কোন সুর ভেসে আসে নাই। কিন্তু তা সত্বেও চ্যান্সেলার মার্কেল জানাচ্ছেন তিনি ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ফোরামে জার্মানি যোগ দিচ্ছে। [Germany would like to deepen its economic and trade relations with China in the digital age, and is willing to actively participate in the second Belt and Road Forum for International Cooperation, Merkel said.]।

ওদিকে ফ্রান্সের সাথে চীনের সম্পর্ক আর এক মাত্রায় হাজির। এবার প্রেসিডেন্ট শি-এর সফরে ইতালির বাইরে আরেক গুরুত্বের সফরের জায়গা ছিল ফ্রান্স। এই সফরে যত না চীনের খুশির, এর চেয়ে বড় খুশি প্যারিসের, সে গদগদ। মূল কারণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ফরাসি পণ্য-ক্রয়ের চুক্তি।  চীন, আমেরিকার বোয়িংয়ের চলতি খারাপ সময়ে ইউরোপের ফ্রান্সের বড় শেয়ারের (চীনে অবস্থিত ফ্যাক্টরি থেকে) এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, জার্মান ও ফ্রান্স চীনের পক্ষে কৌশলগত জোটের প্রত্যক্ষ পার্টনার না হলেও তারা ঘনিষ্ঠ; অন্তত তারা আমেরিকার জোটের নয়।

ইউরোপের চার কুতুবকে নিয়ে কথা বলতে এবার বাকি থাকল বৃটেন। ব্রিটেন এত বাছবিচার না রেখে খোলাখুলি বেল্ট রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে লম্বা পরিকল্পনা নিয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় হংকং ব্যাংকের এক সাবেক চেয়ারম্যান ডগলাস ফ্লিন্টকে বিশেষ দুত ও প্রধান করে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে এ লক্ষ্যে কাজ ও পরিকল্পনা শুরু করতে।[Sir Douglas Flint, who was appointed as the Special Envoy to BRI of the British Treasury in December 2017]। ফ্লিন্ট জানাচ্ছেন, The Belt and Road Initiative (BRI) “is a real opportunity” to strengthen UK-China cooperation। বেল্ট রোড সামিট টু ব্রিটেনের জন্য এক বিরাট সুযোগ বলে ডগলাস ফ্লিন্ট প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন।

তাই এককথায় বললে, চলতি এপ্রিলের ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ থেকে এর ওলটপালট ঝড় আসন্ন হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনের আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তা আর এক ধাপ উঠে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ?
বেল্ট-রোড প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান সরাসরি বিরোধিতার। গত ২০১৭ সালের সামিটের দাওয়াত তাই সরাসরি প্রত্যাখান করেছিল। আর বাংলাদেশ গত ২০১৭ সালে বেল্ট রোড সামিট-ওয়ানের সময় ভারতের মন রক্ষা করতে বাংলাদেশ লো-প্রোফাইলে থেকেছিল।  তবে বেল্ট রোড প্রকল্পে চীনের সাথে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত লুকাতেও চায়নি বা পারেনি। বরং অক্টোবর ২০১৭ সালে ভারতকে বুঝিয়ে রাজি করার এক  উদ্যোগ নিয়েছিল যে ভারত যেন আমাদেরকে এই সম্পর্কে যেতে আপত্তি না করে বা ভালভাবে নেয় – তা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। বরং আমাদের পররাষ্ট্র সচিবকে একাজে ভারতে পাঠানোয় উলটা ভারতের সাথে আমাদের অবস্থান-ভিন্নতা আরো প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। আজ দুবছর পরে এই ইস্যুটা এখন যে  অবস্থায় চলে গেছে তাতে এখন  ভারতের মুখ চেয়ে স্থবির হয়ে থাকা যাবে সে জায়গাতেও আর নেই। মূল কারণ বটম লাইনটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বেল্ট-রোড প্রকল্পে হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে

মূল প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীনের (কুনমিং প্রদেশে) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে কী না? যেখানে কলকাতাও বাংলাদেশ হয়ে যুক্ত থাকবে। এটাই বিসিআইএম (BCIM যা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর) প্রকল্প। তবে এই প্রকল্পের আর এক অনুষঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। আসলে উলটা – মূলত এই গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করেই এই চার দেশের ঐ অঞ্চলটার মূলত ল্যান্ড লকড দশায়; তাই সে অবস্থা ছুটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ল্যান্ড লক কথাটা আমাদের বন্দর আছে কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর নাই – এই অর্থে বুঝতে হবে। বাস্তবে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজের বন্দর, যার কানেকটিং গভীর সমুদ্র বন্দরটা সিঙ্গাপুরে। তাই চার দেশের এই বদ্ধ অঞ্চল – এটাকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে উন্মুক্ত করাটাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে সোনাদিয়া ছাড়াই কেবল রেল ও সড়কের BCIM প্রকল্পের আওয়াজ উঠতে উঠতে এখন সেই প্রকল্পের সব কিছুই মুখ থুবড়ে গায়েব। কেন?

ভারতের যুক্তি চীন BCIM প্রকল্পকে এখন বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত করতে চায়। অবশ্যই চায়। বাংলাদেশও চায়। আর প্রশ্নটায় এখন তখনের কিছু নাই। বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য এটা খুবই জরুরি যে আমরা আন্তঃমহাদেশীয় প্রকল্প বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত থাকি। তাই BCIM প্রকল্প যুক্ত থাকুক – এটাই তো আমাদের স্বার্থ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হাতে গুনে মনে রাখতে হবে – হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে বেল্ট-রোডে জড়িয়ে না থাকে বা থাকতে না পারে তবে আমাদেরকে আজন্ম এর কাফফারা দিতে থাকতে হবে। আর ভারতের এখন-তখনের যুক্তির পালটা কথাটা হল, BCIM প্রকল্পের মূল আইডিয়ায় সোনাদিয়া বন্দর ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সেটাই বা বাদ দেয়া হয়েছিল কেন? কেন হাসিনার ২০১৪ সালের চীন সফরের কালে সোনাদিয়া বন্দর চুক্তিতে বাধা দেয়া হয়েছিল?

ভারত যদি মনে করে আর চায় তাহলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত না হয়ে এই প্রকল্প হবে না। নো প্রবলেম। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে ঢাকা-বার্মা-কুনমিং হবে অর্থাৎ BCM প্রকল্প হবে অসুবিধা কী! আর এই প্রকল্পের কেন্দ্র সোনাদিয়া বন্দরও একই সাথে।  সেইসাথে বেল্ট-রোড প্রকল্পেও BCM -এটাও অবশ্যই যুক্ত থাকবে। কিন্তু   ভারতের এতে আপত্তি বা  একমত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ভারতের অবস্থানটা হল  – সে  নিজে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে বেল্ট-রোডসহ কোন প্রকল্পই সে হতে দিবে না।

কেন? কারণ চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্প  সম্পন্ন হতে দিলে আর তাতে ভারত জড়িয়ে থাকলে  তাতে চীন বহু আগিয়ে যাবে আর ভারত চীনের অধীনস্ত হয়ে যাবে। তা হতেও পারে, অসম্ভব না। কারণ ব্যাপারটা মুরোদের – সক্ষমতা ও যোগ্যতার। ভারতের মুরোদ না থাকলে তার বা কারও কী আর করার আছে? কিন্তু তাই বলে, কান-পড়া দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার মত  ভারত কূট-ষড়যন্ত্রের পথ ধরবে? যেটা কোন কাজের কথা নয়।  নাকি গঠনমূলকভাবে, ভারত চীনের এখনকার সহযোগিতাগুলো কাজে লাগানো আর নিজের মুরোদ অর্জন করা্র দিকে যাবে? যাতে কোন একদিন চীনকেও ভারত ছাড়িয়ে যেতে পারে! আজকের চীনের অবস্থাই কী এর প্রমাণ নয়। এককালে আমেরিকার সাহায্য নিয়েই কী আজ চীন এজায়গায় নয়? তাতে সে কী এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে না!

এভাবে  ভারতের মুরোদ অর্জন বিকল্প কূট-ষড়যন্ত্রের পথ – এটা কখনই নয় হতে পারে না। এমনকি ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা তো নয়ই! পাকিস্তান কাশ্মীরের উপর দিয়ে বেল্ট-রোডের মূল বা পাকিস্তান করিডোর গিয়েছে – ভারতের এটা ফর্মাল আপত্তির যুক্তি। সেটাও আসলে খাটে না। কারণ পাকিস্তান অংশসহ পুরা কাশ্মীর ভারতের কী না এটা তো কোন বিতর্কই নয়। কারণ, বিতর্ক হল সারা কাশ্মীরিরা কীভাবে কার হাতে শাসিত হতে তারা সম্মত হবে? ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে শাসিত হবে নাকি নিজেরাই আলাদা হবে?  এরপরেই কেবল, পুরা কাশ্মীর ভারতের হবে কীংবা হবে না তা তখন মীমাংসিত হতে পারে। এর আগে কোন কাশ্মীরই ভারতের নয়, কেউ না।

অতএব ঈর্ষা বা প্রতিহিংসাবশত  বেল্ট-রোডে যোগ না দেওয়ার ভারতের কোন বিদেশনীতি যদি হাজির থাকে তবে তা ভারতেরই থাক। তা আমাদের তো নয়ই, আমাদের দায়ও নয়। তাই আমরা কী করব তা ভারতকে জিজ্ঞাসারও কিছু নাই। আমাদের স্বার্থ, আমাদের ভাল-মন্দ ক্ষতি সব আমাদেরই বইতে হবে। যদিও এব্যাপারে বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বশেষ কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে আমাদের নির্বাচন পরবর্তি সময়কালে।

এ বছর আমাদের নির্বাচনের পরে আমরা দেখেছিলাম, কারও পরোয়াহীন এক  চীনা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন। আর বিশেষ করে সিএনএন-নিউজ১৮ (CNN-NEWS18) নামে ভারতীয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই বোল্ড ছিল। এবং তা এক স্থির সিদ্ধান্তের প্রকাশ দেখিয়ে ফেলেছিল যে, সোনাদিয়া বন্দরসহ বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে হাসিনা সরকার আর থামবে না। এমনকি ওই সাক্ষাৎকার আসলে খোদ ভারতকেই চীনের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে আহ্বান রাখা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের আলো অনুসরণে চিন্তা করলে মনে হয়, এবারের এপ্রিলে বেল্ট রোড সামিট টু-তে চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা দেখব।

কিন্তু এর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, ভারতে এখন রুটিন সরকার; মানে মোদীসহ রাজনৈতিক নেতাদের সময় নেই এনিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার। এর চেয়ে নিজ নিজ এলাকায় মাঠের নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করা তাদের এখন প্রায়োরিটি, একমাত্র কাজ। আগামী মাসে ২৩ মের আগে ভারতে সরকারে কে আসবে, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তা জানার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় এক কথায় বললে, ভারতের নিজের বেল্ট রোড সামিট টু-এর পক্ষে কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশকে এবারো কি তারা ঠেকাতে পারবে?

ঠেকাতে ২০১৭ সালে আগেরবারই পারেনি। ফলে এবারো পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে, সাক্ষাৎকার দিয়ে বলা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দিক থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা। যদি তা আমরা না দেখতে পাই, তবে বুঝতে হবে সরকার আবার আপস করল। সেটা হবে বাংলাদেশের প্রবল সব সম্ভাবনাগুলোর মাথা মুড়িয়ে ফেলে রাখা আর পিটিয়ে কাউকে খাটো বামন বানিয়ে রাখার মতই একটা কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৬ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

গৌতম দাস

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2xv

সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তারা ভারতের পক্ষ হয়ে হাসিনাকে তোয়াজ করতে, মন গলাতে এক আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনাম হল, “বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”

তাতে মনে হয়েছে বিবিসি যেন শেখ হাসিনা সরকারের এক কড়া সমালোচক – এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, যেন এমন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা বিবিসির এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমরা দেখে চলেছি যখন আমাদের প্রায় সব মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে হঠাৎ করে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে এবার তারা উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার বাড়তি আর একটা দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মূলত ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব বিবিসি নিয়েছে। তাই কয়েকদিন আগে ২৯ জানুয়ারি ঐ রিপোর্ট তারা ছেপেছে।

দেখা গেছে, মূলত ভারত “বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে” এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

এটা যেন এক অর্ডার দেয়া রিপোর্ট, এমন মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হল, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের “শক্ত রিজার্ভেশন” বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে ভারতের থেকে যেন খেপ নিয়েছে বিবিসি। বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগেই ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এর ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হল যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।

কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন? এটাই সেই তাতপর্যপুর্ণ প্রশ্ন।

আমরা ইতোমধ্যে সবাই কমবেশি জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম কিছু বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ভারতও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। আর  ৯৭% আসন নিয়ে বিজয়ী হাসিনার ভয়ে ভারত এখন সেটাই প্রবল অস্বীকার করতেই বিবিসি দিয়ে করিয়েছে এই রিপোর্ট। যদিও বিএনপির দিক থেকে বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা পাঠানো প্রতিনিধিদের নাদান পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন তারা। অথবা সময়ে কখনও তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে আগোনোতে বা কথা বলাতে সেটা ভুল হয়েছে বা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে – এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। অনেক সময় ক্রিটিক্যাল প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

যদিও খেয়াল রাখতে হয় যে আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ আগেই টেনে নিয়ে একাজে নামতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ পেশাদার লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এমন সব ক্ষেত্রেই বিএনপির মারাত্মক কিছু ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া ভারতের সাথে এই আলাপে বিএনপির দিক থেকে মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের কাছে স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছিল বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। ব্যাপারটা যেন হাতি হয়ে আয়েশে বসে নত বিএনপির সালাম নেয়ার সময় তাদের। যেন তারা বুঝাতে চাইছে, বাংলাদেশে ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ ভারতের জন্য সঠিক প্রতিক্রিয়া বলে তারা মনে করেছে। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, “বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!”। অথচ তখন নিজেই বুঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনায় আমরা পরে আবার আসব। তবে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, “শো আপ” অংশ এটা।

আসলে ভেতরে রূপটা ছিল খুবই উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, কোনদিকে যায় কী ফল আনে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হল – তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট। এসংক্রান্ত বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল,”এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না”, “আওয়ামী লীগ খারাপভাবে হারবে”। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এককথায় তারা দেখছিল হাসিনার “পাবলিক রেটিং” খুবই শোচনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা যে তারা কী এজন্য নতুন করণীয় পদক্ষেপ ঠিক ভাবে নয়েছে? নাকি তা করতে পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ রেটিং” খুবই শোচনীয় হলে তো হাত ছেড়ে দিতে হবে; নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে……ইত্যাদি। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছিলাম – বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে। আর এগুলো তারা করেছিল আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন এই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে হাত সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে বিএনপির সাথে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন যাতে, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়। যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে তখন শুরু না করতে হয়। অথবা, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য “জয়ী নায়ক বিএনপির” ভারতের কাছে একেবারেই অপরিচিত বলে না হাজির হয়, বা ভারতকে “সেই” বিএনপির পেছনে ঘুরতে না হয়।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে তাদেরকে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়, আরও কিছু দিক আছে। যেমন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি,  ভারতকে হাসিনার “দেয়ার ভাণ্ডার সব খুলে ধরা” সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে হাসিনার পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং উলটা; অর্থাৎ মোদীর ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল; যার সোজা মানে হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত তখন স্বীকার করেছিল।

কিন্তু পরবর্তিতে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক নেয়া। ভারত সেই রিস্কটাই নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত নিতে ভারত উদ্বিপ্ত হয়েছিল কারণ রেটিং সম্পর্কে ভারতের নিজেদের গোয়েন্ডা অনুসন্ধান রিপোর্ট। অথচ নির্বাচনের পরে ফলাফল পেয়ে ভারত দেখেছিল আসলে বাস্তবেই বিরাট রিস্ক নেওয়াই হয়েছে। কোন অনুমান ফলে নাই।

আবার, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার “সুজাতা স্টান্ডার্ড” তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন হাসিনার সেই তাতপর্যপুর্ণ  মন্তব্য “আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি দেশটিকে তা সারা জীবন মনে রাখতে হবে” আমরা স্মরণে রাখতে পারি। হাসিনা কথাটা বলেছিলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলকে (বর্তমানে ২১শে টিভির সিইও) দিয়ে করানো এক প্রশ্নের জবাবে।

মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার নিজ গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। কিন্তু তাহলে ভারত কোথায় পরাজিত হয়েছিল? যেসব অনুমানের উপর ভারতের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণ দাড়িয়েছিল এর একটা না ঘটলে কী হবে অথবা তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে – এটা হতেই পারে না ধরে নেয়া হয়েছিল। আর তাই হয়েছিল। মানুষ তো ভোট দিবেই। তাই “যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- ভারতেই সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে। সেটা ধরে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, ধরে নেয়া যায় এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই ভারতের কোন অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, গোয়েন্দারা এমন তথ্য জেনে পাথর (stunned by the outcome) হয়ে গেছিলেন। আর খুব সম্ভবত তা, ভোটের মাত্র চারদিন আগে।

মানে তাদের কোন অনুমানও ছিল না যে,  মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা অনুমান-বিশ্লেষণ মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হল, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা গভীর নির্ভরতা / নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল – ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে সহজেই অনুমান করা যায়। পিনাক রঞ্জন সেখানে লিখেছিলেন, “… ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে”। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোন আশা-ভরসা দেখেন নাই না রাখেন নাই।

তাই ভারত হাসিনার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে পিনাক রঞ্জন লিখেছেন। সেই কারণে আরও সাহস দেখিয়ে আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” অভিযোগ, “হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের” [সবচেয়ে মজার অভিযোগ ছিল এটা] অভিযোগের মত মারাত্মক বিষয়গুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হল, পিনাক অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা  “গুলি করে হত্যার” নীতি নিয়েছেন। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন, বলেছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর লেখার শেষের বাক্য আরও মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, “শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তাঁর প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’। অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং অংশটা হল, সবশেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের একটা হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন পিনাক রঞ্জন। তিনি হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। তিনিই ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে একসেস রাখেন এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ [ORF] এর ফেলো।

আগেই বলেছি, ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট তাদেরকে এভাবে পরিচালিত করেছে। আর রিপোর্ট হয়ত ভুল ছিল না। কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’ এই তথ্য বা অনুমান তাদের ছিলই নয়া। এজন্যই তারা পরাজিত হন। এছাড়া আর এক বিষয় তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

বিএনপিকে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠনঃ এর গঠনের সাথে সাথে এর খুবই দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, “নির্বাচনের আগে থেকে ক্ষমতাসীন হাসিনার পতন আসন্ন” ধরনের একচোখের অনুমান ভারতকে শেষে করে দেয়। এতে বড় বিভ্রান্তিতে পড়ে এবার ভারত সব হারানোর দিকে আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

তাই বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের “দিন খারাপ যাওয়া” শুরু হয়েছে, বলা যায়। “চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়”। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের আগের দিন -এর  মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- এটা ছিল “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব” তৈরির শুরু। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছি।

আরও লক্ষণীয় হল, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক (যারা ভারতের সরকারি অবস্থান অনুসরণ করে চলেন) জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও আমারই এক আগের লেখায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সকলেই বাংলাদেশে চীনের ততপরতা ও ঘনিষ্ঠতা বাকাচোখে দেখত। চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়াকে, ভীষণ নেতিবাচক উপস্থাপন করে এই বিষয়গুলোকে দেখতেন। তাদের সকলেরই কল্পিত এক ভারতের “এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্স” বলে এক এলাকা ছিল। আর বাংলাদেশ হল সেই এরিয়ার অন্তর্গত সুতরাং বাংলাদেশে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন উদ্ভট তালুকদারি-দাবি তাদের থাকত। তাঁরা বোঝাতে চাইতেন এখানে ভারত ছাড়া অন্য কারও ঢুকা – এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী – এ্মন “গাঁয়ে মানে না” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা লিখে চলতেন। অথচ এখন তারা ভোল বদলিয়ে ফেলেছেন।  শ্রীরাধা [VIF] এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন – “চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না… তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়”।  [Interestingly, both India and China have viewed Bangladesh not only through the prism of bilateralism but also amidst the landscape of the growing regional framework] অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তাঁরা এখন কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন “তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে”। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?

বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মত নয় বড়জোর সাথে ভারতও আছে হয়ত কিন্তু তা আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার এক দুরবস্থা শুরু হয়ে গেছে যার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির এই রিপোর্ট।

এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখটা এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিকটা দেখবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে চীন সফরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন নাই। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখের দিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ৬৫ এর বেশি রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এই গ্রান্ড প্রকল্পে বাংলাদেশেরও অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে সেসময় অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্বাচনে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ডে” ভারতের সমর্থনের মাশুল ভারত সেবার উসুল করেছিল এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি না হতে হাসিনাকে রাজি করিয়ে। এছাড়া পরে ভারত আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু এবারের ২০১৮ নির্বাচনে? এই লেখায় আগেই বলেছি “ছয় দিনের” কথা। আমাদের নির্বাচনের পরবর্তীতে হাসিনার একদম খাড়া পদক্ষেপ হল , গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে [CNN-NEWS18] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

[CNN-NEWS18] এটা আমেরিকার CNN এর সাথে ভারতের Network 18 এর জয়েন্ট ভেঞ্চার, ভারতের এক টিভি মিডিয়া।

আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে হাসিনা ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে আর আগান নাই, এখন সেখান থেকেই আবার উদ্যোগ নিয়া তিনি সেই “খাতিরদারির” সমাপ্তি টানছেন। এই খাতিরদারি তার নড়বড়ে অ-অভিষিক্ত ক্ষমতার খামতি পূরণের দিক থেকে এসেনশিয়াল – এমন এক ধারণা তাঁর ভিতরে কাজ করে বলে মনে হয়। যেটা খুব সম্ভবত সমাপ্ত এখন। হাসিনার ঐ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপিয়েছে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া । দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়ে লেখা সে রিপোর্ট। যার ভাষ্য হল, “ভারতকে হাসিনা তাঁর “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন”। অর্থাৎ এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে হাসিনা এতদিন নিজ দেশের স্বার্থ বলি দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এখন হাসিনা নিজ দেশের স্বার্থকে আর পিছনে ফেলতে রাজি না – এটা বুঝাতে চেয়ে বিবিসি লিখেছে – “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই ……। কথা ঠিক; এবার দরকার হলে ভারতের বিরুদ্ধে তিনি যাবেন, রাজি আছেন। কারণ এবার “বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তির”  ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন, “বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে”। আসলে এই প্রস্তাবটা মূলত চীনের।  গত ২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মত  BRI (“Belt and Road Initiative”) সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করতে ভারতকে চীনের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই প্রথম ভারত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান আপত্তি তুলে ধরেছিল। আর তখন থেকেই চীনের প্রস্তাব হল, আসেন “কথা বলে” নিগোশিয়েট করি। চীনের সেই কথা বলার প্রস্তাবই এবার সাহসের সাথে হাসিনা ভারতের মুখের উপর ছুড়ে দিল। বা বলতে পারি, হাসিনা বুঝিয়ে দিল যে তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। এবার আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থনের মত ভারতের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত নিবার কোন দায় হাসিনার নাই। তি এবার সমর্থন পান নাও অথবা নেন নাই – তাই। তাই মন শক্ত বেঁধে তিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ঢুকে পড়বেন। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক [Bangla-China Relation] নতুন মাত্রায় উত্থিত হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে  বেল্ট-রোড প্রকল্প বলতে বুঝতে হবে – সোনাদিয়া বন্দর সহ, সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীন যাওয়ার অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্প এমনকি এর বাইরেরও চীনের সাথে বাংলাদেশের সব প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ পরোনা করে উপেক্ষায় হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাবে এখন। [ সাক্ষাতকারের YOUTUBE LINK এখানে]  ঐ সাক্ষাতকারে হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ – ইঙ্গিত দিয়েছে হাসিনা এবার জানেন তিনি পিছনে ফিরবেন না। খুব সম্ভবত – ভারতের মুখ চেয়ে চলার দিন ঘুরে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে – এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তিনি পথ চলতে শুরু করেছেন। মুখ চেয়ে চলায় তিনি কত ডেস্পারেট ছিলেন তা বুঝতে আমরা মনে রাখতে পারি – তিতাস নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ভরাট করে তিনি ত্রিপুরায় লং-হুইল ট্রাকে মালামাল কনটেইনার চলাচলের রাস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীটা এখন মরেই গেছে, ধান চাষাবাদ হয়েছে এবার।    

এখন এই “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ” হাসিনাকে নিয়ে ভারত কী করবে? কোথায় রাখবে? প্রথমত, কোন বিশেষ গায়েবি চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে বেল্ট-রোড বা এর সংশ্লিষ্ট কোন কিছু মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। বরং চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কান্থা [Ashok K Kantha] (যিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভোকাল) এখন অবসরে ভারতে বসেই “চীনা স্টাডিজ” থিঙ্কট্যাঙ্ক খুলেছেন। তিনি আগে আমাদের যা জানিয়েছিলেন ওর সারকথাটা ছিল – “বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার চীনে দাওয়াত এটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সম্ভব না কারণ, তাতে ভারত চিরদিনের মত চীনের পিছনে পড়ে যাবে”। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের কী চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, উপরে থাকা সম্ভব – সে মুরোদ কী আছে? না কী এটা অসক্ষমতার কোন “ফ্যান্টাসি আকাঙ্খা” – এনিয়ে কোন কথা জানা যায় নাই। তবে  নিশ্চয় এখন বেল্ট-রোড প্রকল্প বিরোধী আরও শক্ত যুক্তি আছে তাঁদের কাছে।  অতএব এর সোজা মানে হল, ভারতের পক্ষে আগের মত হাসিনার ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে ট্রিটেড বা আলগা খাতিরের লোক হতে চাইলে হাসিনার পরামর্শ মেনে ভারতকেই এখন বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর তা নইলে, ভারতকে কেবল চীন নয়, ঢাকার হাসিনা সরকারেরও বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান ও পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মাঠে হাজির হতে হবে! যেভাবে নির্বাচনের পরে মাত্র ২২ দিনের মাথায় আমরা হাসিনাকে CNN-NEWS18 সাক্ষাতকার দেখেছি তাতে – অচিরেই ভারতকে কী এমন নতুন অবস্থানে দেখব আমরা?

তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য আর আরামের “শান্তি নাই”; বরং এক ব্যাপক উদ্বিগ্নতা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, যেটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সময়গুলোতে কোন দেশের বেলার মত বাংলাদেশ সরকারপ্রধানেরও স্বাভাবিক ঝোঁক হয় – এখন ক্রমেই তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বা বলা যায়,মূল কারণ পরিস্থিতি এখন তার অনুকূলে।  ওদিকে ভারতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে খুবই করুণ। যেন সেই করুণ দশা বলেই সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য ভারতের মোদীর নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির বিরুদ্ধে কিছুটা বিষোদগার করে হাসিনার মন গলাতে চাইছেন । তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। ভারত এখন বিএনপিকে মুখরোচক তবে অর্থহীন ইস্যু ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা  – হঠাত করে শর্ত হিসেবে খাড়া করছেন। অথচ ভারতের এটা করার বেস্ট সময় ছিল নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ভারত সফরে-লবিতে ছিল তখন তুলে ধরা। অথচ এখন ভারত বলছে বিএনপি  ‘জামায়াত ছাড়া’ না হলে এখন বলছে, না হলে সম্পর্ক হবে না – এমন ভাব ধরছেন।  যার সোজা মানে ভারত পথ হারিয়েছে। এটা তার মুখরক্ষা ততপরতা; সে সিরিয়াস নয়। অথচ বিপরীতে ইতোমধ্যে বিএনপিই ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে  এখন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করতে ফিরে যাবে বিএনপি। এটাই কী স্বাভাবিক নয়!

আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফা ইস্যু ইত্যাদিতে বাংলাদেশের হাসিনার সহায়তার যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু না, সেসব আর এখন মুখ্য নয়, হিসেবে থাকছে না। বরং চীনের সাথে  হাসিনা সরকারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলেও সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে এখন বড় ইস্যু। ভারতের জন্য কঠিনতম বিপদ এখানেই।

বিশেষত, গভীর সমস্যার দিকটা হল, ভারতের জন্য সময় এখন উলটা হাসিনাকে তুষ্ট করার, মন পাবার। কিন্তু ঘটনা হল, হাসিনাকে তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসির এসব তুচ্ছ রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে হাসিনা-বিরোধীতার রাজনীতি ও অবস্থানে  উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

গৌতম দাস

২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2w6

 

নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং – ফাইল ছবি

আমরা এমন এক দুনিয়ায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলে। শুনতে স্ববিরোধী মনে হলেও কথাটা সত্য। আর তা বোঝার জন্য কথা আরো ভেঙে বলা যেতে পারে। এখন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একই সাথে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলে, এজন্য যে এখন কূটনীতি চলে ইস্যুভিত্তিক। ইস্যুটা কী – আলাদা করে শুধু সেই ইস্যুর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের অবস্থান বা নীতি-পলিসি নিতে হয়। তাই অপর রাষ্ট্রের সাথে একটা ইস্যুতে মিত্রতা বা আপসের একই অবস্থান আছে, অথচ দেখা যাবে হয়ত অন্য ইস্যুতে অপর ঐ রাষ্ট্রের সাথেই শত্রুতা, মানে প্রবল ঝগড়া-দ্বন্দ্বের অবস্থান দাঁড়াতে পারে, দাঁড়াতে হয়। এর অনেক উদাহরণই আছে, তবে এব্যাপারে সম্ভবত সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, চীন-ভারত সম্পর্ক।

ভারত-চীন দুই রাষ্ট্রের নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত বর্তমানে অন্তত চলতি বছরের প্রথম কোয়ার্টার থেকে খুবই নরম ও ঐক্যকামী। কিন্তু এশিয়ার তৃতীয় যে কোনো রাষ্ট্রে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়া দেখা গেলে ভারত এর বিরুদ্ধে চরমতম বিরোধীতায় ততপর। সম্পর্ক-অবস্থান ইস্যুভিত্তিক বলে, ভারত-চীনের এমন খারাপ-ভাল অথবা উত্থান-পতনের সম্পর্কের মাঝেও তাদের এক বড় সফলতা হল য়ুহান সম্মেলন (Wuhan, April 2018)। এটা ছিল যারা ভারত-চীনের ঘনিষ্ঠতায় নিজের স্বার্থহানি দেখেন এমন প্রো-আমেরিকানদের মুখে ছাই দিয়ে, চীন-ভারতের প্রথম কাছাকাছি আসার ভিত্তি তৈরির উদ্যোগে, চীনের য়ুহান শহরে শীর্ষ সম্মেলন।   প্রধান সব রাষ্ট্রের আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির উপর ট্রাম্পের  বাড়তি ট্যারিফ শুল্ক আরোপের যুদ্ধে ভারতকেও তালিকায় যুক্ত করাতে ভারত আমেরিকায় রফতানি বাজার হারানোর পর থেকে এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু। এতে চীন-ভারতের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধে তা পুরা মিটিয়ে না হলেও কমিয়ে আরও কাছাকাছি আসার বিরাট উদ্যোগ ছিল এটা। মোদী চীনের য়ুহান প্রদেশ সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক বিশেষ ধরনের বৈঠকে বসেছিলেন। এই সম্মেলন আর এর প্রবল প্রভাবের কাল ছিল এ বছরেরই গত এপ্রিল-মে মাসজুড়ে।

এটা বিশেষ ধরনের বৈঠক মানে এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে এখানে বলা হয়েছে, এটা ছিল এক “ইনফরমাল সামিট”; মানে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন। অর্থাৎ যে বৈঠকের কথা বিস্তারিত প্রকাশ করতে হবে না। আবার কোনো ইস্যুতে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটি যেহেতু অনানুষ্ঠানিক, তাই এমন বা অমন কথা হয়েছে সে রকম কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড [রেকর্ড অবশ্যই থাকবে কিন্তু তা কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে রেফার/স্বীকার করা হবে না। ] রাখার দায়ও কোনো পক্ষের নেই। এ এক বিরাট সুবিধা। বিশেষ করে ভারতের। কারণ, ভারতে রাজনীতি চর্চার স্টাইল ভোটের সস্তা পপুলিস্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অন্য বিরোধীরা বিদেশে আপোষ করে এসেছে বলে প্রপাগান্ডার নানা অভিযোগ তুলে বসে। আর এই ভয় থাকার কারণে কিছু বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অনেক বিরোধ আর কাটে না।

এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল, পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতের যেকোনো সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ। এই বিচারে য়ুহান সম্মেলনে আলোচনার কাঠামোই এমন ছিল যে, এখানে সেসব সমস্যা নেই। ফলে এই সম্মেলনে চীন-ভারতের বহু বা প্রায় সব ইস্যুতে দুই শীর্ষ নেতা মন খুলে কথা বলেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণ রাখার ভয় ভুলে, না রেখে বা ফরমাল নোট না রেখে। দোভাষী ছাড়া অন্য কোনো সহায়ক ব্যক্তিকেও কোনো পক্ষ সাথে সেখানে রাখেন নাই।

অথচ এখানেই উভয়পক্ষ বহু বিষয়ে বিরোধ মীমাংসার মৌলিক নীতিগত দিক সেটেল করেছেন। যাতে এই মৌলিক নীতিগত দিকের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বহু অমীমাংসিত ইস্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান টানা হতে পারবে। এটি ছিল এই সম্মেলনের বড় সুবিধা।

তবে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি নিয়ে চলার দুনিয়ায় আমরা এসে পৌঁছানোতে কি ব্যাপারটা খারাপ হয়েছে?  না, অবশ্যই নয়। তাহলে খারাপের ধারণা কেন আসছে?  আসলে ‘খারাপ’ হতে পারে এই ধারণাটাই হল – কোল্ড ওয়ার আমলের (১৯৫০-৯১) চিন্তার অভ্যাসে বলা কথা। কারণ, কোল্ড ওয়ার মানেই দুনিয়াকে পরস্পর দুই শত্রুর দু’টি রাষ্ট্রের গ্রুপে – সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা এভাবে দুটো ব্লকে দুনিয়াকে ভাগ করে ফেলা। এটা এমনই ব্লক যে, এখানে শত্রুতা ছাড়া অন্য কিছুর জায়গাই নেই। একেবারে হিন্দু জাতপ্রথার ছোঁয়াছুঁয়ির মত দুই রাষ্ট্রজোটের পরস্পরের সাথে সম্পর্কহীন থাকা আর শত্রুতাই এর একমাত্র বাস্তবতা। তবে আলোচ্য এখানকার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল, কেন এমন সম্পর্কহীনতার দুই ব্লক সেকালে চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল? এর জবাব হল, মুল কারণ যেহেতু দুই ব্লকের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, তাই এটা টিকে ছিল। অর্থনৈতিক বা বিনিময় সম্পর্ক মানে হল – কোনো পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগ এর বিনিময় সম্পর্ক। ফলে এমনকি কোনো ভাব বিনিময় সম্পর্কও সেখানে ছিল না। তাই সম্পর্কহীনতার দুই রাষ্ট্রজোট বা ব্লক চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল।

বিপরীতভাবে বললে, এ কালে সম্পর্কহীনতার এমন কোনো দুই ব্লক থাকা সম্ভব নয়। অথবা ইতিবাচকভাবে বললে, একালেই ‘য়ুহান ইনফরমাল সামিট’ সম্ভব। কেন? এর মূল কারণ দুনিয়ায় এখন আগের সোভিয়েত ব্লকের সকলেসহ সব রাষ্ট্র একই “গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার” – এর নিয়মশৃঙ্খলার অংশ। তাই সবধরণের পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগসহ সব ধরণের বিনিময় সম্পর্ক ওতপ্রতভাবে জড়িত। ভাব-ভাষাও।

পুঁজির জন্ম-স্বভাব হচ্ছে গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবাল থাকা; তাই সে দুনিয়াজুড়েই বিস্তৃত হবে। লোকাল পুঁজি বা কেবল কোন এক ছোট ভুগোলের পুঁজি বলে কিছুই থাকবে না। তাই, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের প্রতিটি কোনায় বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া পুঁজিতান্ত্রিক তৎপরতাগুলো ক্রমেই অপরাপর কোণের ততপরতাগুলো এরা পরস্পরের হাত ধরে ফেলবে, আর ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতরভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাবে। আর এই সম্পর্ক মানে? মনে রাখতে হবে, এটা হল পরস্পরের ওপর পরস্পরের গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক সম্পর্ক। এক গ্লোবাল সমাজ হয়ে উঠা। আবার একই ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার’ – এই সিস্টেম শৃঙ্খলার অংশ বলেই এটা সহজ এবং তা হতে বাধ্য। এই ইতিবাচক দিকটিই চীন-ভারতের চরম স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাতের মধ্যেও “য়ুহান ইনফরমাল সামিট” ঘটিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছিল।

চলতি ২৩-২৪ নভেম্বর ২০১৮, চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার ২১তম বৈঠক শুরু হয়েছে। ২১তম মানে এ ধরনের বৈঠকের শুরু অনেক পুরানা দিনে, সেই ২০০৩ সালে বাজপেয়ির চীন সফর থেকে। চুক্তি বা বুঝাবুঝি অনুসারে এর বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দুই রাষ্ট্রপক্ষের পূর্বঘোষিত স্থায়ী দুই ‘স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ থাকবে। আর তাদের উদ্যোগে ডায়ালগের মাধ্যমেই চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধের সমাধান তারা খুঁজবে। ভারত-চীনের সীমান্তের অনেক জায়গায় উভয়পক্ষের একমতে টানা সীমান্ত বা ‘ডিমারকেটেড’ বা চিহ্নিত নাই। এই অচিহ্নিত সীমান্ত সমস্যা সেই কলোনি আমল থেকে, এটা অমীমাংসিত হয়ে থেকে যাওয়া সমস্যা। সেটাই মিটানোর চেষ্টাই এর উদ্দেশ্য। সে হিসেবে এই বৈঠক এখন রুটিনের মতো হয়ে গেলেও য়ুহান ‘ইনফরমাল সামিট’-এর পরে এর গুরুত্ব এবার অনেক বেশি। কেন?

কোনটা, কত দূর কার সীমানা – সে ব্যাপারে উভয়ের একমত হয়ে এভাবে পুরো চীন-ভারত সীমান্তকে ‘চিহ্নিত সীমানা’ হিসেবে এঁকে ফেলা অবস্থায় পৌঁছানোই ‘এমন বিশেষ বৈঠক’ উদ্যোগে এবারের লক্ষ্য।  এখানে LAC বা ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ বলে উভয় পক্ষের একমতে একটা ধারণা আছে। সেটা হল, এক মতে “সীমানা চিহ্নিত” করে ফেলার আগে এখন সীমান্ত-ভূমি যেখানে যার দখলে যা আছে ও স্থিতাবস্থায় আছে, সেটাকেই উভয়ে “লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি” বলে মানে। যেটাকে আসলে “অস্থায়ী কিন্তু বাস্তব সীমানা’ বলা যায়। এবারের ২১তম আলোচনায় উভয়পক্ষ এখানেই এক নীতিগত জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। তা হল, সীমানা বিরোধ মিটানোর কাজে অগ্রগতি আর কিছু হোক আর না-ই হোক, বর্তমান এলওসি বা “অস্থায়ী বাস্তব সীমানা”- এটাকেই উভয়পক্ষ ‘বেস্ট অপশন’ বা সবচেয়ে ভাল সমাধান বলে মেনে নিবে। [“best option is “as it is; where it is”.] এ বিষয়ে উভয়ের ঘোষিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। এরপর আরও আলোচনা চলবে উভয়ের একমতে এরচেয়েও ভাল সমাধান খুঁজে পেতে।

সুতরাং চীন-ভারতের সীমান্ত আলোচনায় “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” কথাটার বিশেষ মানে আছে। এখানে ভারত-চীন কাকে নিজ নিজ পক্ষের “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” বলে ঘোষণা করে রাখবে – সেটা এপর্যন্ত দেখা অভিজ্ঞতা বলছে এটা চলতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নিরাপত্তা  উপদেষ্টা অথবা চীনের ক্ষেত্রে পলিটব্যুরোর বিশেষ সদস্যকেও হতে দেখা গেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এবার থাকবেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। আর চীনের দিক থেকে ছিলেন  পলিটব্যুরোর এক বিশেষ প্রভাবশালী সদস্য। এবার সভা থেকে তাঁর বদলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই দায়িত্বে পাবেন। আসলে “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” এরা মূলত সীমান্ত ইস্যুতে কথা বলার জন্য হলেও এর একটা স্থায়ী দায়ীত্বের পোস্ট বলে এদের কিছু আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ উভয়পক্ষ বাড়তি ইনফরমালি অনেক মনের কথা বলার সুযোগ ও দায়িত্ব এরা পালন করে থাকে। যেমন এরা এবার চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ”(BRI) [ এতে যোগ দেওয়ার অফার এপর্যন্ত ভারত ফিরিয়ে দিয়ে আসছে ] নিয়েও কিছু কথা বলবেন।  ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে,  “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” অজিত দোভাল এলএসি, বিআরআই এবং অন্যান্য ইস্যুর সাথে নিরাপত্তা নিয়েই কথা বলবেন। [Ajit Doval will discuss security along the Line of Actual Control (LAC), belt and road initiative (BRI) and other issues]।

ভারতের এক প্রাক্তন কূটনীতিক এমকে ভদ্রকুমার। ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান; মানে প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নিতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি হাতেগোনা দু-তিন কূটনীতিকের মধ্যে একজন, যিনি তা নন। উজবেকিস্তান ও তুরস্কে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভদ্রকুমার, যিনি ভারতের ভবিষ্যৎ আমেরিকার মধ্যে দেখেন না। সেই ভদ্রকুমার দেখছেন, চীনের সাথে ভারত তার নানান বিরোধের ইস্যুগুলো মিটাতে এখন প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠতে; একালের চলতি সময়ে মোদির ভারতকে।

অবশ্য শুধু সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার বৈঠক দেখে তিনি এ কথা বলেননি। তিনি আরো এক ইস্যু দেখেছেন। এই ১৩-১৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটা আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ মোট ১৮ রাষ্ট্রের এক সম্মেলন; যার শুরু হয়েছিল আসিয়ান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সাথে অন্যান্য ইস্ট এশিয়ান রাষ্ট্রকে নিয়ে। অর্থাৎ এখন এতে বাড়তি অনেককেই সদস্য করে নিয়েছে।

এবারের এই বৈঠক থেকে চীনের অর্জন অনেক। এখানে চীন-সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপগ্রেড ভাষ্য) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভদ্রকুমার বলছেন,  এতে এই প্রথম “বেল্টরোড উদ্যোগ”ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। [One highlight is the signing on Monday of an upgraded Free Trade Agreement between China and Singapore to include Belt and Road Initiative for the first time.] বলাই বাহুল্য, যারা চীনের ‘বেল্টরোড উদ্যোগে’ অন্তর্ভুক্ত হতে আপত্তি বা দ্বিধা করে থাকে, তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম ছিল। বিশেষ করে যেখানে আবার পশ্চিমের কাছে সিঙ্গাপুর এক বিশেষ অর্থ ও গুরুত্ব বহন করে। যেখানে তারা সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলেছিল ফ্রি-পোর্টসহ পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের এশিয়ান স্টোর/গোডাউন হিসেবে; আর একই সাথে ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ পুঁজির স্থানীয় বা বর্ধিত অফিস হিসেবে। এই হল ফ্রি-পোর্ট সিটির সিঙ্গাপুর; মানে বিনা মাশুলে পুনঃরফতানিযোগ্য করে নিয়ম বানানোর সিঙ্গাপুর। পশ্চিমের সেই সিঙ্গাপুরে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগকে একালে জায়গা করে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, আজকাল খোদ সেই সিঙ্গাপুরও চীনের ওপর কত বিরাট নির্ভরশীল। সেটা কী রকম?

পশ্চিম চীনের সাথে বহু সম্পর্কই করে থাকে সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, সিঙ্গাপুরে অফিস খুলে। যেমন একটা উদাহরণ দেই। আজকাল চীনে উঠতি সম্পদের মালিক যারা, এমন যাদের এক মিলিয়ন ডলার বা এর বেশি অর্থ বাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আছে – এমন এদেরকে বাজারে নিয়ে আসা সহজ করতে সাহায্য করতে, এমন ব্যক্তি ক্লায়েন্টদের ধরতে আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে অফিস খুলেছে। আর সেখান থেকে তাদের রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা চীনে সরাসরি ক্লায়েন্টদের বাসা সফর করছে। ফলে সার কথায় সিঙ্গাপুর আর কেবল পশ্চিমের এক্সটেনডেড দোকান থাকেনি, চীনেরও হয়ে উঠছে। তাহলে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগে নতুন অন্তর্ভুক্তি, সেটা শুধু কি সিঙ্গাপুরই?

না আরো আছে, আরও বড় সে নাম হল খোদ জাপান। কারণ কী? ব্যাপারটা হল, চীনের নতুন এক সিদ্ধান্ত। এমনিতেই চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগ এক বহুরাষ্ট্রীয় (৬৫ রাষ্ট্রেরও বেশি) অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প। ফলে ভুগোলের বিচারে এতে বিনিয়োগ সুযোগের বড় অংশই চীনের বাইরে। চীন ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগের’ অংশ হিসেবে তৃতীয় রাষ্ট্রে চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগে সিঙ্গাপুর বা জাপানকে সংশ্লিষ্ট হতে চীন অফার (Investment in Third Country) দিয়েছে। এতে সিঙ্গাপুরের মত জাপানও প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

ওদিকে সবকিছুর পালটা কিছু থাকে। তাই, এশিয়ায় চীনের ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’-এর পাল্টা আমেরিকান নেতৃত্বের যে উদ্যোগ আছে, সেটি মূলত “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি” নামে হাজির আছে। আর এর সহযোগী উদ্যোগ হল “কোয়াড”(QUAD) , মানে চীনবিরোধী ‘আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া’ এই চারদেশীয় জোট। কিন্তু কখনই এই চার দেশ একসাথে একমতে খাড়া হতে পারেনি। কমন ভাষায় একটা বিবৃতি দিতে পারে নাই। এর মূল কারণ, এরা সবাই চীনের সাথে নানান ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িয়ে আছে আবার একই সাথে অন্যন্য স্বার্থবিরোধে জড়িয়ে থাকার কারণে আমেরিকার সাথে এক কমন প্লাটফর্মে আসতে চেয়েছে কিন্তু বড় কিছু করে দেখাতে অসফল। ফলে সব সময়ই দেখা গেছে এই চারের কেউ একজন চীনের সাথে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাবল্য অনুভব করে বাকিদের সাথে থাকেনি।

‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’ চীনের সাথে তৃতীয় রাষ্ট্রে যৌথ বিনিয়োগের অফার পাওয়া জাপান, তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝাতে ভদ্রকুমার কিছু ঘটনা টেনেছেন। তাঁকে এক জাপানি কূটনীতিক বলছেন, “আমাদের কিছু আসিয়ান সদস্য বেল্ট-রোড উদ্যোগের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে তুলনা করতে পছন্দ করছে না”। [“Some ASEAN members didn’t like the idea of having to make a choice between an Indo-Pacific strategy and the Belt and Road Initiative]।  ফলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে এরপর “ইন্দো-প্যাসিফিক” শব্দটি বলা বন্ধ করেছেন। তা না বলে এর বদলে বলছেন “ভিশন”। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাপানি কর্মকর্তা বলছেন, আসলে “স্ট্র্যাটেজি শব্দটির মধ্যে অন্য রাষ্ট্রকে পরাজিত করানোর একটা অর্থ লেপটে আছে, সে কারণেই এই পরিবর্তন”। অর্থাৎ জাপানও কোয়াড থেকে নিজেকে দূরে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ছাড়া ছাড়াভাবে চলা কোয়াডের যুগ্মসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকে ভারত যোগ দিচ্ছে। সেই রেফারেন্স তুলে ভদ্রকুমার বলছেন, জাপান ভারতকে পেছনে ফেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেল। এভাবে এশিয়া-প্যাসিফিকের ভূকৌশলগত অবস্থা পরিস্থিতিই বদলে যাচ্ছে। আর মোদির ভারত এতে বিরাট কিছু সুবিধা হারাচ্ছে, অথচ নিজ অবকাঠামোগত সুবিধা পাওয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

শেষ কথাঃ
শেষ বিচারে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক গন্তব্য-অভিমুখ হল তাদেরকে পরস্পর ঘনিষ্ট হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে হাত ধরে উঠে দাঁড়ানো। আমেরিকা দুনিয়ার অতীত, যেখানে চীন আগামি। ভারতকেও আগামির অংশ হওয়ার খাতিরে খাবলা-সুবিধা নেয়া ত্যাগ করে স্থির-পক্ষ নিতে হবে। কিন্তু মায়ের দুষ্ট ছেলের মত প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে ভারত প্রায়ই টেবিল ছেড়ে চলে যায়; যার অনিরাপদবোধও আছে। এসবের মানে আবার এই না যে চীনের সিদ্ধান্ত বা অবস্থান সবসময় ফেয়ার বা বেস্ট হয় বা থাকে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন-ভারতের শত্রুতা ও মিত্রতা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

গৌতম দাস

১৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sE

File photo of 1st China-South Asia Cooperation Forum ((CSACF), Fuxian Lake Initiative – ORF

ভারতের অন্যতম বেসরকারি দাতব্য থিংকট্যাংক বা বেসরকারি পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা সংক্ষেপে ওআরএফ (Observer Research Foundation, ORF)। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনেকেই থাকেন রিসার্চ ফেলো হিসেবে, যারা সাধারণত হন দীর্ঘ পেশাদার জীবন কাটানো কোনো কূটনীতিক, জার্নালিস্ট বা একাডেমিক ইত্যাদি পেশাজীবী। কিন্তু ওআরএফ রিসার্চ ফেলোদের নিয়ে এক আজব ঝোঁক দেখা যাচ্ছে যে, তারা তাদের সহকর্মী একই বিষয়ের কী নিয়ে কাজ করছে, কোথায় কী বলছে, সেসবের খবর রাখে না। তাই একই প্রতিষ্ঠান ওআরএফের এক সহকর্মী যা বলছেন, অপর সহকর্মী ঠিক এর উল্টো বলছেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য খারাপ নাম কামিয়ে বাংলাদেশের চোখে পড়ে যাওয়া ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। পরবর্তী সময়ে কূটনীতিক চাকরির জীবন শেষ করে তিনি ২০১৬ সালে ভারতের ওআরএফ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো হয়েছিলেন। এমনিতেই ভারতের থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ ঝোঁক হলো প্রো-আমেরিকান পলিসি অনুসরণ করা অথবা তাদের জন্মই হয় আমেরিকান অর্থে আমেরিকান নীতি-পলিসি প্রচারের জন্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, বিপুল উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির পক্ষে প্রচারণা চালাতে ভারতের প্রায় সব থিংকট্যাংকই ভাড়া খাটে। এর মূল কারণ, এদের বেশির ভাগেরই জন্ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডিং এ কারণে। তেমনই, প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খাটা, আর আমেরিকান বলে বলীয়ান এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর হলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। যদিও কপাল খারাপ, এখন ট্রাম্পের জমানা, আর তাতে এসব ভাড়াটেদের অবশ্য অবস্থা খুবই শোচনীয়। ট্রাম্পের চলতি “বাণিজ্য যুদ্ধের” নীতির ঠেলায় আমেরিকান পলিসির পক্ষে দাঁড়ানো ও ওকালতি তারা করুক এব্যাপারে ট্রাম্পই তেমন আগ্রহী না, গুরুত্ব দেয় না। সময়ে বেইজ্জতি করে দেয়। আর ভারতের বিরুদ্ধেও যে আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছে সেই প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খেটে ইজ্জত রক্ষা করা অসম্ভব। অর্থহীন এক দালালিতে পরিণত হয়েছে একাজ।  কিন্তু তা হলেও সেই ২০১৬ সালেও পিনাক রঞ্জনদের ডাটফাট ছিল আলাদা, খুবই আক্রমণাত্মকভাবে আমেরিকান ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে তারা চোটপাট করে যেতেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র-জোট সার্কের (SAARC) ২০১৬ সালে অক্টোবরের সম্মেলন ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম হয় ভারত। সেবারের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে। ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশও পাকিস্তানে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার পক্ষে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিল। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ রিপোর্ট ছিল, সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যাচ্ছে না বাংলাদেশসহ চার দেশ । সার্ক ভন্ডুল করার ক্ষেত্রে ভারতের সফলতা হিসাবে প্রথম আলো লিখেছিল, সার্কের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে।

ভারতের কূটনৈতিক লবিতে অবজারভার সদস্য আফগানিস্তানসহ চার রাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান) পাকিস্তানের সার্কের সম্মেলনে যেতে অপারগতা জানায়। আনন্দবাজার লিখেছিল ভারতের মনের গোপন কথাটা। অক্টোবর ২০১৬ তে লিখেছিল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লিভারতের অমিত বসু কালের কন্ঠে কলাম লিখে ছিলেন, “ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক সুতোয় ঝুলছে। ছিঁড়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়। দুই দেশের মৈত্রী উধাও”। শুধু তাই নয়, আবার কবে সার্ক সচল হবে, সেটাও অনিশ্চিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- তার জন্মজন্মান্তরের শত্রু পাকিস্তানকে একঘরে করা।

ইতোমধ্যে ১৯৯৭ সালে এক ‘বে অব বেঙ্গল উদ্যোগ’ হিসেবে এবং ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) নামে আর এক রাষ্ট্র জোট গঠন হয়েছিল। যেখানে পাকিস্তান ছাড়া সার্কের বাকি পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বাড়তি নতুন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এ দুই রাষ্ট্র, এভাবে মোট সাত রাষ্ট্র নিয়ে এটা গঠিত ছিল।

ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সার্কের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশনীতির পক্ষে ২০১৬ সালে প্রচারণার কাজ হাতে নেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল এ রকম- ‘সার্কের দিন শেষ’। ফলে পাকিস্তানও একঘরে হয়ে শেষ। এখন থেকে এর বদলে, এর জায়গায় এখন সবাইকে ‘বিমসটেক’ নিয়ে ভাবতে হবে। গত ৪ অক্টোবর ২০১৬ যুগান্তর লিখেছিল,  এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই।’

আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল এমন যে, এ ঘটনার প্রায় একই কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশের কিছু প্রো-গভর্নমেন্ট সাংবাদিক ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সফরসূচির অংশ হিসেবে তারা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জনের সাথে দেখা করেছিলেন। দেশে ফিরে ওসব সাংবাদিকরা পিনাক রঞ্জনের বরাতে বিরাট নিউজ করেছিলেন, ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন’। উপরে যুগান্তরের রিপোর্টের ঐ সাংবাদিকও ছিলেন ঐ সফরে। এছাড়া, ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে অনলাইন বিডিনিউজ২৪-এর রিপোর্টের শিরোনাম দেখতে পারেন। বিডিনিউজের রিপোর্টারও ছিলেন ঐ ভারত সফরে। আর তাতে মূল খবরটি ছিল এভাবে- ‘সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক।’

তাহলে এতক্ষণের সার কথা হল, গত ২০১৬ সালেই সার্কের “কবর দিতে” বা “ভুলিতে দিতে” ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। এবং এর পালটা হিসাবে ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) কে হাজির করার সিদ্ধান্ত সকলকে প্রকাশ্যেই ভারত জানিয়েছিল।

কিন্তু, আসলে সবই ভাগ্যের পরিহাস। নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটাই প্রমাণিত হলো। সার্ক প্রসঙ্গে ভারতের ঘৃণা ও প্রচারণায় এই ফেলা থুথু এখন সেই ভারতকেই এখন ফিরে চাটতে হইতেছে।

কারণ, বেশি দিন লাগেনি, প্রায় দেড় বছর না যেতেই গত ১০ জুলাই ২০১৮ ওই একই ওআরএফের সাইটে এবার আরেক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, ‘সার্ক কোমায়, চীন আর এক নতুন আঞ্চলিক জোট হাজির করেছে।’ [SAARC in coma, China throws another challenging regional initiative]। তার মানে এই রিপোর্ট এখানে সেই সার্কের প্রতি ভারত এখন কত সহানুভুতিশীল তাই দেখাতে চাইছে। একেবারে পুরা উল্টা-রথ।

যদিও এবারের রিপোর্টটা আর পিনাক রঞ্জনের করা নয়, করেছেন আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি’। আর এখানে এবার বিশেষ করে লক্ষণীয় হল, দেড় বছর আগে যে ওআরএফ একই ‘সার্ক’ এবং সাথে পাকিস্তানের ‘ডুবে যাক’ চাচ্ছিল, সবারই ‘ভুলে যাওয়া’ চাচ্ছিল; এবার সেই একই সার্কের পক্ষে ওআরএফের দরদ ও প্রীতি ঝরে পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ ভারতের এখন বিপরীত মুডে, সার্কের পক্ষে ভারতের প্রীতি এখন উপচানো। সত্যি এ’এক বড়ই আজব ঘটনা! ভারতের এই উল্টো যাত্রা কেন? ঘটনা কী?

ঘটনা হল, গত মাসে চীনের গুয়াংজুতে চীনা উদ্যোগে এক আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। জোটের নাম চীন-দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা ফোরাম, [China-South Asia Cooperation Forum] (CSACF)। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আগের সার্ক আর সাথে উদ্যোক্তা চীন। দক্ষিণ এশিয়া রাষ্ট্র জোটের সাথে চীনের সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম এটা। অর্থাৎ এটা মূলত (সেই ভারত-পাকিস্তানসহ) সার্ক প্লাস চীনের জোট।

এখন তাহলে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা সংক্ষেপে ওআরএফের আগে কি আগে স্বীকার ও ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল না যে, ২০১৬ সালে ‘সার্ককে ডুবিয়ে দেয়ার পক্ষে’ ভারতের যে বিদেশনীতি ছিল আর যেটা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন প্রশংসা ও সমর্থন করেছিলেন, সেটা থেকে এখনকার ওআরএফ সরে এসেছে? এবং কেন এই সরে আসা, সে ব্যাখ্যাই বা কী? নাকি ওআরএফ এর আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি এখনো জানেনই না যে, পিনাক রঞ্জন এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালে এমন একটি অবস্থান ছিল?

তবে এটা হওয়াও অসম্ভব নয়, এখন নতুন চীনা উদ্যোগে আগের ‘সার্ক +’ জোট একটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দেখে রাতারাতি ভোল বদলে ওআরএফ এখন সার্কের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অবস্থান নিচ্ছে? অর্থাৎ এই সহানুভূতিও ফাঁপা, ওআরএফের দরকার চীনের বিরুদ্ধে খোঁড়া হলেও একটি যুক্তি (নিজের স্ববিরোধিতা প্রকাশ হয়ে গেলেও তা) হাজির করা। কিন্তু তাতেও, প্রশ্ন আরো আছে।

কারণ, ওআরএফ এবার নিজেই জানাচ্ছে, চীনে এই সম্মেলনের খবর ভারতে খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। (এমনকি বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় এসেছে চোখে পড়েনি, অথচ বাংলাদেশের প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিল।) কিন্তু ভারতে প্রচার হয়নি কেন?

এছাড়া, আরো বেশ কিছু সিরিয়াস ‘কেন’ প্রশ্ন আছে?
কারণ, ওআরএফ ছদ্ম সার্ক-দরদি সেজে এক খোঁচামারা মন্তব্য করে বলেছে, “চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরাম কি আসলে চীনের বেল্ট রোডেরই এক সহযোগী উদ্যোগ, যার ভেতর দিয়ে সার্কের মৃত্যুঘণ্টা বাজবে?” [The parallel, yet unasked question, either at or outside the CSACF venue, was if the new Chinese initiative, alongside the more-visible Belt and Road Initiative (BRI) could ring the death-knell for the South Asian Association for Regional Cooperation (SAARC), where it had failed to go beyond the ‘Observer’ status, to obtain full membership.]

ওআরএফের এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেন সার্কের মৃত্যু হলে ভারতের জান চলে যাবে। এতই পতিপ্রাণা, অথচ কারপেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা কথাটা হল,  ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়ে ভারত আগেই সার্কের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। আর এখন দরদি সাজছে। কুমিরের চোখে যেন জল।

এ ছাড়া, আরেকটা খোঁচা দিয়ে ওআরএফ বলছে যে, সার্ক থেকে চীনকে কখনোই অবজারভারের বেশি মর্যাদা ভারত দিয়ে দেয়নি। আর যেন তা ভারতের বিরাট সাফল্য ছিল? এতে পরিষ্কার যে, ভারত কখন কী চেয়ে কী করে আর তাতে লক্ষ্যই বা কী- এসবের পেছনে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করার কোনো পরিকল্পনাই থাকে না।

এবারের চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরামের সভায় খুব ভালোভাবেই ভারতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। প্রতিনিধিত্ব করেছেন গুয়াংজুতে ভারতের কনসাল জেনারেল সাইলাস থাংগেল (Sailas Thangal)। ভারতের প্রতিনিধি ওই সভায় এই জোট উদ্যোগকে বহুল প্রশংসা করেছেন, বলেছেন এই উদ্যোগ এ অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে হাজির করবে। [Praising Beijing’s initiative, Indian Consul General in Guangzhou, Sailas Thangal said the CSACF boasts of the world’s biggest market. But the region also boasts of being home to millions of poor people.] শ্রীলঙ্কার এক অনলাইন পত্রিকা দ্য আইল্যান্ড এই খবর দিয়েছে। এ ছাড়া, চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক ডিরেক্টর জেনারেল লি জিমিংয়ের বরাতে আইল্যান্ড লিখেছে, ‘CSACF’ ফোরাম আসলে বেল্ট রোড উদ্যোগেরই অংশ, যেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে চীনের ভৌগোলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গাঢ় করবে।’ [He declared that the CSACF was a part of the BRI, “which is expected to bring together South Asian countries that share a geographical vicinity and cultural affinity with China” ]

মজার কথা হলো এসব খবর ওআরএফ নিজেই নিজের রিপোর্টে লিখে জানাচ্ছে। তাহলে এর মানে কি এই এক ফাইন মর্নিংয়ে আমরা উল্টো প্রশ্নের সম্মুখীন হব যে, ভারত তখন উল্টো আমাদের জিজ্ঞেস করবে, ভারত কবে চীনা বেল্ট রোড উদ্যোগের বিরোধী ছিল?

এসব কারবার দেখে মনে হয় থিংকট্যাংক, রিসার্চ, পলিসি ইত্যাদি এসব শব্দ এসব ব্যক্তি এখনো গুরুত্বের সাথে নেয়নি। যথার্থ ওজন বুঝে ব্যবহার করে না। আসলে নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটা তাদের বোঝানোর কেউ নেই।

তবে তামাশার কথাটা হল, ভারত চীনা উদ্যোগের এর CSACF সভায় ঠিকই পাকিস্তানের সাথে ও পাশে বসতে পেরেছে। বস্তুত CSACF  ফোরামটা হল আগেরই সার্ক + চীন। তাহলে, সার্ককে চলতেই না দিলেও এবার চীনা দাবড়ে এই ফোরামে ঠিকই পাকিস্তানের পাশে অবলীলায় বসতে পারছে ভারত! আসলে ভারত হল শক্তের ভক্ত, তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৪ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সার্ক দরদের স্বরূপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sr

 

থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!

কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।

যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে  থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.

এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে  আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।

আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।

এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল।  “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে”  দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।

সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল,  ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও  বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে।  তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন  হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে  নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে  ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ  এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।

চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।

মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন,  ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।

মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের  নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট।  তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”।  এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।

তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো  মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা।  সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে।  আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]।  ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।

এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।

আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।

ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।

সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই  ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে?  তিনি লিখেছেন,

Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

গৌতম দাস

২ জুন ২০১৮, ০০:০৩, শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rS

 

 


Illustration: Ajit Ninan, Times of India – মোদীও সওয়ার হওয়ার কথা ভাবছেন!

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের পয়লা টার্গেট ছিল চীন, তবে সেই সাথে দ্বিতীয় বা সহ-টার্গেট ছিল ভারতও। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমেরিকা হয়ে পড়ে একা। অন্যদিকে, এই নতুন পরিস্থিতি চীন-ভারতকে কাছাকাছি এনে ফেলেছে। উল্টো করে বলা যায়, আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির খেদমতে ও সমর্থনে ভারতেরও আর আমেরিকান ঐ নীতি পো-ধরে আগিয়ে চলার  বাস্তবতা লোপ পায়। ফলে মোদী ও ভারতের চীন নীতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। আগে যতই উসকানিমূলক অবস্থান থাকুক না কেন, ভারত এবার থুক্কু বলে সব ভুলে চীনের সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবেই ২৭ এপ্রিল মোদির চীন যাত্রা ঘটেছিল। চীনে মাওয়ের অবসর যাপনের শহর য়ুহানে (Wuhan), চীন-ভারত “ইনফরমাল শীর্ষ সামিট” বা মোদী-জিনপিং এই দুই শীর্ষ রাষ্ট্র নির্বাহীর অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু হয় সেখান থেকে।

ট্রাম্পের আমেরিকা হল এখন এক ‘একাকী আমেরিকা’ হতে রওনা দিয়েছে। এই অবস্থায় মানে “এন্টি গ্লোবাইজেশন” আর “সবার আগে আমেরিকা” এ দুই নীতিতে চলে যাওয়ার পর চাইলেও আর ভারতের পক্ষে আমেরিকার কোলে বসে আর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উদীয়মান ভারতের অর্থনীতির প্রবল ও বিপুল বিনিয়োগ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও দেখা গেল, আমেরিকা এক্ষেত্রে ভারতের জন্য দরকারি কেউই না। অথচ চীন-ভারত সম্পর্ককে মোদী সংঘাতময় করে ফেলে রাখা সত্ত্বেও চীনই ছিল ভারতের জন্য একমাত্র উপযুক্ত বিনিয়োগদাতা। ফলে য়ুহান সম্মেলনে অন্তত ভারতের বিনিয়োগ সম্পর্কের দিক বা বিনিয়োগ প্রয়োজনের গুরুত্ব মোদি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।

গত ২৭ এপ্রিল ভারত ত্যাগের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই সম্মেলন থেকে ‘চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করা’ তার বিশেষ লক্ষ্য। [“Modi stresses on strengthening economic ties]

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা ক্ষমতার নির্বাচন। ফলে ক্ষমতার আকাঙ্খী বিরোধী অপর দল কংগ্রেসে এবার মা সোনিয়া গান্ধী ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলের নতুন নেতা করে নামিয়েছেন। রাহুলও তৎপর হয়ে প্রায় প্রত্যেক ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আক্রমণ ও সমালোচনা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন। ফলে মোদীর য়ুহান যাত্রার আগেও ব্যতিক্রম করেননি। কিন্তু হায়! গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিমুখ সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর মত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভবত যথেষ্ট সচেতন হন নাই, হোমওয়ার্ক করেন না – এমন আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করলেন রাহুল এক টুইট বার্তা দিয়ে। য়ুহান যাত্রার প্রাক্কালে তিনি মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখলেন – তিনি যেন “ডোকলাম ইস্যু” ও “চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তির” কথা তুলে ধরতে ভুলে না যান।

এর সোজা অর্থ মোদি-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পিছনের কথা বা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ভারতের অর্থনীতির জন্য তা কেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে আসবে সেসব সম্পর্কে একেবারেই বেখবর রাহুল। প্রথমত, মোদির কাছে বা ভারতের দিক থেকে এই সফর হল বিগত দুই বছরে চীন-ভারতের সম্পর্ক যে সঙ্ঘাত ও বৈরিতার পথে চলে গিয়েছিল, তা ছেড়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে উঠে আসার জন্য ভারতের সুযোগ নেয়ার সফর। ফলে এই সফর থেকে ভুটানের ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তুলে আনা কোনোভাবেই মোদির বা ভারতের লক্ষ্য নয়। বরং ডোকলামের সঙ্ঘাত যা মূলত ডেড ইস্যু যা মোদী শেষে সফলভাবে চাপা দিতে পেরেছিল; চীনের সাথে কোনো বড় সঙ্ঘাতের দিকে তা চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল, এটাই মোদীর বিরাট অর্জন ছিল। ফলে ডোকলাম ভারতের কাছে, অন্তত মোদীর জন্য কোন অমীমাংসিত ইস্যু নয়, ভালভাবে ও কমপক্ষে আপাত হলেও মীমাংসিত ইস্যু। অথচ রাহুল মোদীকে ডোকলাম ইস্যুতে চীনের সাথে আলাপ তুলে পুরান ঘা খোঁচাখুচি করতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

[Congress president Rahul Gandhi said the PM looked tense in the live TV feed of the China visit. “Saw the live TV feed of your “No Agenda” China visit. You look tense! A quick reminder: 1. Doklam. 2. China Pakistan Economic Corridor passes through PoK. That’s Indian territory. India wants to hear you talk about these crucial issues. You have our support,” Rahul Gandhi said on Twitter.]

রাহুল দ্বিতীয় প্রসঙ্গ তুলছেন, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তি নিয়ে। এই দাবিও অপ্রাসঙ্গিক। মোদী য়ুহান সামিটে যাচ্ছেন মূলত চীন-ভারত সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক ও বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে এর ভিত্তিমূলক আলাপ করতে। বোঝা যাচ্ছে, এর খবর রাহুলের কাছে নেই। মোদীর এই উদ্যোগ সরকার বিরোধী নেতা বলে রাহুলের তো তা ভন্ডুল করে দেয়া বা বেখবর থাকা কোন দায়ীত্ববান লোকের কাজ না।  অথচ তিনি ভেবেছেন যেন মোদী চীন যাচ্ছেন চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কে কোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে। দেখা যাচ্ছে রাহুল তো ইস্যুই বুঝেন নাই!

আসলে চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এক বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা মূলত চীনের নিজের স্বার্থের অবকাঠামো প্রকল্প। পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন যেটা পাহাড় পর্বতমালায় পুরোপুরি ল্যান্ডলক্ড অবস্থায়; সেই অঞ্চলকে  গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশসহ সব আবদ্ধতা ভেঙে ফেলে উন্মুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্প। এটা পাকিস্তানের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পুরা পাকিস্তানের বুকচিরে চলা এক হাইওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা, যার একদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়াদর আর অন্য প্রান্তে শেষে এটা চীনের অবরুদ্ধ পশ্চিম চীনের ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ ছাড়া এটাই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিআরআই (BRI) এর অংশ; যা দুনিয়ার ৬৫টি রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে এমন অবকাঠামো প্রকল্প।

ভারত এই প্রকল্পে অংশ নিতে চায় না – একথা বলে ভারত এখন নিজের দাম বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টার মোডে আছে; এই স্তরে আছে। এরই অজুহাত হিসেবে ভারত এখন এক নন-সিরিয়াস অভিযোগ তুলে রেখেছে যে এই করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে গেছে। আর ভারতের চোখে কাশ্মীর এক বিতর্কিত ভূমি এবং দাবি যে কাশ্মীর পুরোটাই ভারতের। ফলে এই সুত্র এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের রক্ষার প্রশ্ন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপত্তি তুলে রেখেছে সত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মনের আসল ইচ্ছা হল, ভারতকে বিআরআই (BRI) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চীন ভারতকে আরো কী কী ছাড় ও সুবিধা দেয় তার দরকষাকষি করা। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন অশোক কান্থা; তিনি অবসরে যাওয়ার পরে গণমাধ্যমে নিজেই এক বয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতাবান ‘ক্রমবর্ধমান ধেয়ে আসা চীনের প্রভাব’ মোকাবেলা করাই হলো ‘ভারতের কূটনীতির জন্য আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। আর এই কাজে চীনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিতেই ভারত বিআরআই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [……”how to deal with an increasingly assertive China… in an uncertain, fluid international environment, this is going to be possibly the biggest challenge in India’s foreign policy in years to come,” ]

তিনি মূলত বলেছিলেন BRI/OBOR প্রকল্পে যোগ দিলে ভারত চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবে। তাই ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নাই। [……joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,”]

এই কথাগুলো কান্থাসহ প্রো-আমেরিকান ধারার আমলারা যখন বলছিলেন, ভারত আমেরিকায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজ ভর্তুকির পণ্য রফতানির সুযোগ তখনও বজায় ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি নিজেরও নীতি, ভারতকে এটা আমল করে নিজ মুকুটে পালক হিসেবে লাগিয়ে রাখতে হয়েছিল। অশোক কান্থাসহ আমলাদের এই আমেরিকান ধারা এখন পরাজিত বলেই গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চীন-ভারত য়ুহান সম্মেলন হতে পেরেছিল। বোঝা যাচ্ছে কংগ্রেসের রাহুল একেবারেই এতই নাদান যে বাস্তবের এসব ঘটনার কোনো ন্যূনতম তথ্যও তার কাছে নেই। তাই তিনি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের সার্বভৌমত্বের আপত্তি নিয়ে কথা বলতে মোদীকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। যেন মোদী চীন সফরে যাচ্ছিলেন, পাকিস্তান অংশের কাশ্মীরে ভারতের নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে।

ভারতের আরেক রাজনীতিক কাপিল সিবাল। তারও দল হল, সোনিয়া-রাহুলের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মূলত তিনি দিল্লির চাঁদনী চক নির্বাচনী এলাকা থেকে সাধারণত নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু গত ২০১৪ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দাড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ভারতীয় সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ, রাজ্যসভার সদস্য। পেশাগতভাবে তার মূল পরিচয় মূলত তিনি হলেন দিল্লি সুপ্রিম কোর্টের উকিল, যিনি দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের তিনবারের সভাপতি। বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই টার্মের তিনি অনেক মন্ত্রণালয়ের যেমন আইনমন্ত্রী, টেলিকমমন্ত্রী, মানবসম্পদমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের একজন মানা হয়।
কাপিল গত ২১ মে টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের এক মতামত ছেপেছেন। এটা ছিল টাইমস অব ইন্ডিয়ার ব্লগে কাপিল সিবালের লেখা। এই লেখাটাকে পড়া যেত হয়ত রাহুল গান্ধীর তথ্য ও চিন্তার খামতি পূরণের একটা উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু তা যায়নি এ জন্য যে, এটা কাপিল সিবালের ব্যক্তিগত মতামত বলে উল্লেখ করেই ছাপা হয়েছে।

কাপিলের এই লেখা বরং মোদিকে সার্টিফিকেট দেয়া বা এগিয়ে যেতে বাহবা দেয়া বলে মনে করা যায়। যেমন শিরোনামটাই তেমন বিনয়ের যদিও তা খোঁচা দেয়ারও। [Modi gets real on China: Wuhan summit demonstrated that a weak economy gives India few cards to deal]

এতদিন আমেরিকার কথায় নেচে ফাঁপা হামবড়া দেখানো যে ভুল ছিল কাপিল তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকার করেও এর দায় কেবল মোদীর ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। বাংলায় কাপিলের লেখার শিরোনামটা হল, “আসল চীনের সামনে মোদী এখন বুঝছেঃ য়ুহান সম্মেলন দেখাল নিজের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করতে যাওয়া ভারতের হাতে কার্ড খুব কমই আছে”। মোদী এখন বুঝুক – টাইপের কাপিলের এই বয়ান পুরাপুরি অন্যায্য। যেন মোদী একাই আমেরিকার প্ররোচনায় চীনের সাথে মিথ্যা হামবড়া করে বা এমন হামবড়া দেখিয়ে চলেছিল। অথচ সোনিয়া-প্রণবের কংগ্রেসের আমলেও (২০০৪-১৪) চীন মোকাবেলার ক্ষেত্রে তারাও কি আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর উসকানিতে’ তাল দিয়ে একই মিথ্যা হামবড়া করে চলেনি? আর কাপিল কি সেই দুই টার্মের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না? তাহলে একা মোদীকে দায় দেয়া কেন?

যা হোক কাপিল তার লেখায় এবার সোজা দেনা পাওনার আলাপে চলে এসেছেন। বলছেন, “বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, বার্মা, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা – এসব দেশে চীন প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতেও প্রধান সেক্টরগুলোতে চীন আমাদের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করবে। আমাদের ১৮টা বড় শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সব বিনিয়োগ চীনাদের”। ইত্যাদি সব কথাই আছে সেখানে।
কিন্তু এবার তিনি এক মজার আলাপ তুলেছেন।  চীনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সরকার যেসব অভিযোগ করত বা এখনো যেসব অভিযোগ, তিনি তার সব ফিরিয়ে নিচ্ছেন আর মোদীকেও তা ফিরিয়ে নিতে সুপারিশ করছেন। এটাই খুবই ইন্টারেস্টিং, স্রোত বদলের সরাসরি ইঙ্গিত।  “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে” – এই শিরোনাম দিয়ে তিনি এক তালিকা দিয়েছেন।

বলছেন, “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে”।
“চীন কখনো পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব ছাড়বে না। জাতিসঙ্ঘের উচ্চ আসনে চীনারা আমাদের প্রার্থিতা সমর্থন করবে না। [এই কাগুজে প্রার্থিতা  চীনের সমর্থন করার কোন কথা কোথায় হয় নাই। বুশ_ ওবামা দুজনের আশ্বাস দিয়েছিল। ] আবার নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্য হিসেবে ঐ সংগঠনে আমাদের অন্তর্ভুক্তি চীনারা মেনে নেবে না। আমাদের বাজারে চীনের প্রবেশাধিকার থাকলেও প্রতিদানে আইটি সেক্টরসহ তাদের বাজারে আমাদের তারা প্রতিদান দেবে না। যদিও চীনারা সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমাদের তৈরী ওষুধ চীনা বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরকম অনেক তালিকা আছে। কিন্তু এখানে মূল কথাটা হলো, নিজে মেনে নেয়া এবং সবাইকে মেনে নিতে সুপারিশ করা”।

আসলে ব্যাপার হল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে ঠিক ভারতের তোলা অভিযোগ নয়। বরং ভারতকে আমেরিকার দেয়া মিথ্যা আশ্বাসের তালিকা। যেমন জাতিসঙ্ঘ বা সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দেবে, এই আলাপ ছিল ভারতকে দেয়া আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাস।  আসলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল এতটাই নাদান যে, তারা এটা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল আ-মে-রি-কা; এই আমেরিকা চাইলে সবই যেন সে কাউকে দিতে পারে। তবে মূল কথা কাপিলের এসব বক্তব্য তাদের দলের নাদান সভাপতি রাহুলের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বাস্তবে পা দিয়ে চলা – এমন কথা। অন্তত বক্তব্যের পটভূমি বুঝে তিনি কথা বলেছেন।

তবে এই প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে আমাদের কাকাবাবু প্রণব মুখার্জির গ্লোবাল ইতিহাসবোধের উদাহরণ না তুলে ধরে পারছি না। বুশ এবং ওবামার আমলেও  (বিশেষ করে ২০০৯ সালে ওবামা ক্ষমতায় আসার পর) ভারতকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার সদস্যপদ ভারতকে এনে দেয়া হবে। আর প্রণব মুখার্জির মত নীতি নির্ধারকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। এমনকী ভেটো ক্ষমতা পেলে সবার আগে পাবার সম্ভাবনা একালে মার্কেলের জার্মানী। সেই জর্মানি রাষ্ট্রও কেমন (P5+1) হয়ে ঝুলে আছে সেটাও লক্ষ্য করতে ভারত ভুলে গেছে। আর এর চেয়েও বড় কথা হল কেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব করে, এর জন্ম দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস জানলে যে কেউ বুঝবে কেন এখন পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্য একালে বাড়াতে যাবার সোজা মানে হল রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্ষমতাধর আমেরিকা এখন একালে আর  সেই ক্ষমতাধর নয় অথবা কখনই ফিরে আসবে না। ফলে রাষ্ট্রসংঘ পুনর্গঠনের মুরোদ আর আমেরিকার নাই। আগামিতে ঠিক কার বা কার কার এই মুরোদ হতে পারে সবটাই আবছা। এছাড়া “রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন” এর জন্য কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবার প্রয়োজনীয় পুর্বশর্তের মত এবারও একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে, তাই কী! বিশেষত যখন আমেরিকার এক নম্বর ক্ষমতাধর জায়গা থেকে বিদায়ের আলামত চারিদিকে ফুটে উঠেছে। অথচ সেই ঢলে যাওয়া লোলচর্ম  আমেরিকার পকেটেই যেন গ্লোবাল ক্ষমতা ধরা আছে এই হল কাকাবাবুদের গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিডিং।

তবে আসল তামাশার কথা বলাটা এখনও বাকি। গত ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন। সেখানে হাসিনাকে দিয়ে পঞ্চাশেরও বেশি পয়েন্টে হাসিনাকে দিয়ে স্বাক্ষরিত এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল এরকমঃ

Responding to the Prime Minister of India, the Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council as and when the reform of the UN Security Council is achieved. Bangladesh conveyed its support to the Indian Candidature for a non-permanent seat in the UNSC for the term 2011-2012. India also conveyed its support to the Bangladesh’s candidature for a non-permanent seat in UNSC for the term 2016-2017.

অর্থাৎ ঐ ঘোষণার ৪৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল এরকম, “বাংলাদেশ ভারতের ভেটো সদস্যপদের দাবি সমর্থন করছে”। মানে বাংলাদেশকে দিয়ে যা মনে চায় তাই স্বাক্ষর করে নেয়া যায় বলে কাকাবাবু এটাও ছাড়তে রাজি হয় নাই। তার কোন মুল্য থাক আর নাই থাক। যদি লাইগা যায়! আসল কথাটা হল রাষ্ট্রসংঘের ভেটো সদস্যপদ ভারত আমেরিকার কাছে আবদার করেছিল। অথচ এটা আমেরিকার কাছে আবদার করে পাবার জিনিষ নয়, আমেরিকাও তা একক ইচ্ছায় কাউকে দান করার কখনই কেউ নয়, কেউ ছিলও না। এটাই কাকাবাবুরা বুঝেন না!

এবার সবশেষে সুবীর ভৌমিকের দেয়া এক তথ্য। বিসিআইএম (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর কথাটা গণমাধ্যমে অনেক দিন উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ভারতের আপত্তি, অনাগ্রহের কারণে। বিসিআইএম হল, বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার এই চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে লেখা নাম। এই নাম দেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে এরপর বার্মার গুমদুম হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এক অর্থনৈতিক করিডোর অবকাঠামো প্রকল্প, যার নাম বিসিআইএম (BCIM)। সুবীর বলছেন, “য়ুহানে মোদি-শি জিংপিংয়ের বৈঠকের একটা ইতিবাচক ফল মনে হচ্ছে আসন্ন হয়ে উঠেছে”। কলকাতায় চীনা দূতাবাসের এক কনসাল জেনারেল লেবেলের অফিস আছে। সেই কনসাল জেনারেল  (Ma Jhanwu ) মা ঝানয়ু-এর বরাত দিয়ে সুবীর জানাচ্ছেন, তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, বিসিআইএম প্রকল্প এখন শুরু হবে কারণ এ দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’ [……”BCIM would take off now because the two leaders had agreed to take the process forward”. ]

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও খুবই কম তথ্য এটা সন্দেহ নেই। বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থা চালু হয়ত হয়ে যাবে কখনও। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটা ছিল বিসিআইএম প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত, এক গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো। এ ছাড়া আরেকটা দিক আছে। বন্দর সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিসিআইএম প্রকল্পও চীনা ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ একটা অংশ হওয়ার কথা। ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সুবিধা থাকার কথা, বিসিআইএম প্রকল্প তার একটি। তাহলে ভারত কি আস্তে ধীরে বেল্ট-রোড উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার পথে?

না এটা এখনই অতিরিক্ত আশা। যদিও তা কোনো দিন হবে হয়ত, এমন অনুমান করা অবাস্তব হবে না। তবে খুব সম্ভবত আমরা অনেক আগেই এবং বেশি দ্রুত তা অনুমান করছি। যদিও একটা বিষয় এখনই পরিষ্কার করে রাখা যায়।

য়ুহান সম্মেলনের কোনো ফলাফল যদি আসতে শুরু করে, তবে তা হবে সবার আগে শুরু হবে, ভারতের একান্ত নিজের জন্য নেয়া চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে। চীন-ভারত সম্পর্ক সবার আগে এদিক দিয়ে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশেরও চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বর্তমান যে আপত্তিগুলো আছে তা আপনাতেই সরে যাওয়া নয়। ভারতীয় কূটনীতিতে এ দুটো আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের আপত্তি এখনও সক্রিয় আছে বলেই সম্ভবত এবার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরের সময়, কথিত ভারতের কাছ থেকে “প্রতিদান” পাওয়ার আলাপ উঠতে আমরা দেখেছি। সেই সাথে আমরা দেখেছি, কথিত “প্রতিদান” পাওয়ার জন্য সরকারের বেপরোয়া কাছাখোলা ও মরিয়া অবস্থা। যদিও এ ব্যাপারে আবার সরকারের সর্বশেষ অবস্থান হল, নিজের মরিয়া দুর্দশা সে আর বাইরে দেখাতে চাচ্ছে না। গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে তাই বোধহয় একটু ইউ-টার্ণ। যদিও আগের দিন ২৮ মে সরকারি প্যানেল সাংবাদিক নেতাদের আলোচনা সভা ছিল অভুতপুর্ব, দেখার মত।  খুব সম্ভবত, প্রতিদান পাবার বেপরোয়া দেখালেও কোনো ফল আসবে না বা আসছে না, এমন হয়ত তাদের অনুমান।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩১ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিচ্ছে ভারত!”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

গৌতম দাস

১২ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rG

 

 

 

ভারতীয় থিংকট্যাংক (Think Tank or Policy Institute) প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা হালহকিকত নিয়ে প্রায় সময়ই আমার লেখায় নানা মন্তব্য থাকে। সেখানে আমি সবসময় প্রশ্ন তুলেছি যে, কোন আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা (আমেরিকান ফান্ড চলা) ভারত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষ থেকে পলিসি নিয়ে কাজ করা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ফলে শেষ বিচারে এগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের এক পলিসি প্রতিষ্ঠানই হবে। কারণ এটা  থিংকট্যাংক অর্থাৎ চিন্তা, আইডিয়া ও মতাদর্শ তৈরি করা বা করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রস্বার্থ জিনিষটা কোকিলের ঘরে কাকের বাসার গড়ার মত কাজ কারবারের না; সেটা এখানে চলতে পারে না। ফলে শুধু আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা নয়, এমনকি আমেরিকান (এনজিও) ফান্ডে চলে এমন স্থানীয় ভারতীয় থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই কারণে সেগুলোও ভারতের মাটিতে “আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পলিসি প্রতিষ্ঠানই” হবে।

বুশের আমল থেকে এভাবেই আমেরিকা ভারতের ঘাড়ে চড়ে আমেরিকার নিজের “চীন ঠেকাও নীতি” বাস্তবায়ন চালিয়ে গিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এখানে কথাগুলোর মূল বিষয় সাধারণভাবে বিদেশি এনজিও প্রসঙ্গে নয়। ফলে সাধারণভাবে এনজিও এর মাধ্যমে আমেরিকান ফান্ড বিতরণ এর বিরুদ্ধে কথা বলা বলে বুঝলে ভুল হবে। যারা বস্তুগত, বা বিষয়আশয় বিতরণের দাতব্য বিদেশি এনজিও – তাদের ক্ষেত্রে এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু চিন্তা, মতামত ও পলিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফান্ডে হলে এখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের সাথে স্বার্থ সংঘাত, সমস্যা হবেই। এটাই মূল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত চরম ন্যাশনালিজমের ভারতের রাজনীতি, অথচ থিংকট্যাংক প্রশ্নে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংককে অবলীলায় ততপর করে রেখেছে।  আসলে আমেরিকায় ভারতের ভর্তুকির রপ্তানি পণ্য বিক্রি করতে দেওয়াতে রপ্তানি বাজারের এই লোভে সম্ভবত ভারতরাষ্ট্র নিজ দেশে আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রভাব প্রতিপত্তি চালু রাখতে দিয়েছে। এই অনুমান যদি সঠিক হয় তবে বুঝতে হবে এবার  ভারতে ততপর আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা অথবা অথবা আমেরিকান ফান্ডে চলা লোকাল থিংকট্যাংক এদের সবার ততপরতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে এবার ঢিলা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। হাত গুটাতে হবে তাদের। এক ব্যাপক বদল আসন্ন হয়ে উঠছে। মূল কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতিতে “চীন ঠেকানো” প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে ছিল বিগত প্রায় ষোল বছর – প্রেসিডেন্ট বুশের আট বছর আর পরে ওবামার আরও আট বছরে। এর ফলে এটা শুধু স্থায়ী নীতি হয়ে যাওয়া না, বরং “চীন ঠেকানো” ছিল আগের বুশ ও ওবামা প্রশাসনের পলিসিগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার। কিন্তু এই প্রথম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। অন্তত প্রায়রিটি উলটে দিয়েছেন তিনি। আগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র স্বার্থের টপ প্রায়রিটি। আর এর বদলে ট্রাম্পের প্রায়রিটি হল বাণিজ্যস্বার্থ এখন টপ প্রায়রিটি। অর্থাৎ চীন ঠেকানো ট্রাম্পের কাছে প্রায়রিটি নয়। চীনের কাছে হারিয়ে ফেলা বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার ট্রাম্পের টপ প্রায়রিটি। এসবের ফলাফলে  ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক ততপরতাগুলোর শুকিয়ে যাবার কথা। দেখা যাক কী হয়। বাস্তবে কী ঘটে তা দেখার জন্য আমাদেরকে কমপক্ষে এবছরটা অপেক্ষা করতে হবে।

তবে ভবিষ্যত অবস্থা যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, ভারতের আমেরিকান থিংকট্যাংক ব্যাক্তিত্বরা এখনই হাল ছেড়ে দেন নাই।  তেমনই এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী থিংকট্যাংকার ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজা মোহন। বর্তমানে তিনি কার্ণিগি ইন্ডিয়ার (Carnegie India) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কার্ণিগি মানে হল, আমেরিকার ওয়াশিংটনভিত্তিক এক ফরেন পলিসি – বিষয়ক থিংকট্যাংক যার নাম – কার্ণিগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারনাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)। এই পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রূপের নাম হল, কার্নোগি। আর এর ভারতীয় শাখা হল, কার্নোগি ইন্ডিয়া। রাজামোহন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স পাস করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তবে পরে দিল্লির জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। এরপর অধ্যাপনা করেছেন অথবা নানান ধরণের একাডেমিক কাজে জড়িয়ে ছিলেন কখনও ভারতে, সিঙ্গাপুরে, অস্ট্রেলিয়ায় নয়তো আমেরিকায়। তবে তার মূল পরিচয় এখন “ফরেন পলিসি এনালিস্ট”, তার নিজের পরিচিতির ভাষায় তিনি “থিংকট্যাংকার”। আমেরিকায় থাকার সময় থেকে তিনি দক্ষিণ ভারতে তামিলনারুর প্রাচীন ইংরেজ জমানার ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকার ওয়াশিংটন করসপন্ডেন্স ছিলেন। পরে ডিপ্লোমেটিক এডিটর বা কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এই দ্য হিন্দু অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাতেও। বর্তমানে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখছেন। ভারত সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক অথবা থিংকট্যাংক সংশ্লিষ্ট যত প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারক বোর্ড আছে তিনি প্রতি বছরই একাধিক এমন সব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য থাকেন। তিনি এমনই প্রভাবশালী শিরোমণি। তার গুরুত্বপূর্ণ উত্থান ২০০৪ সালের আশেপাশের সময় থেকে। বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের আমলে, জুলাই ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম ভারত সফর কাল থেকে। আমেরিকার ভারতনীতি কী হবে – তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তখন থেকেই ‘আমেরিকার বন্ধু’ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব ও নীতির বিচারে তিনি প্রভাবশালী এক বিরাট ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশও সফর করেছেন কয়েক বছর আগে; অনুমান করি সেটা ভারতের বাংলাদেশ নীতি সমন্বয়ের কাজে। সে সময়ে চ্যানেল আই টিভিতে জিল্লুর রহমানের টকশো অনুষ্ঠানের শ্লটে। কিন্তু রাজামোহন সেখানে এসেছিলেন একক বক্তা, বলা যায় সেটা ছিল ডায়ালগের বদলে এক মনোলগ অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য, তিনি আমেরিকার এশিয়া নীতিতে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ (বা চীন ঠেকাও) – এর প্রবক্তা। যার বাংলা কথাটা হল, এশিয়ার সবাই আমেরিকার পাশে থেকে চীন কোপাক, চীন ঠেকানোর কাজে লাগুক। আমেরিকার এই স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেক। যেটাতে রাজামোহন যেন একজন ন্যাশনালিস্ট ভারতীয়ের বক্তব্য দিচ্ছেন এমন মনে করানোর চেষ্টা থাকে। যদিও আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজের কাঁধে তুলে নিলে অথবা না নিলে সেটা ভারতের স্বার্থের পক্ষে যাবেই ব্যাপারটা এমন নয়। তবু এতদিন প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সব মিডিয়া এই একই ধারায় প্রপাগাণ্ডা করে গেছে। উইকিপিডিয়া পরিচিতি হিসেবে রাজামোহনের সম্পর্কে লিখা হয়েছে, তাঁর বিদেশনীতি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মোটা দাগে লিবারেল ও বাস্তববাদী, তবে তিনি আমেরিকার মতো গ্লোবাল প্লেয়ারদের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার” পক্ষে কথা বলে থাকেন।

আগেই বলেছে ট্রাম্প আমলে এসে, ভারতের এহেন থিংকট্যাংকদের দিনকাল ইদানীং খুবই খারাপ যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার নীতি ভারতের থিংকট্যাংকারদের তাদের কাজ তৎপরতাসহ সব এলোমেলো করে ডুবিয়ে দিয়েছে। মূল কারণ তারা অবিরত ভারতে আমেরিকার হয়ে জনমত তৈরি ও প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করে ভারতের আমেরিকাতে রপ্তানি ততপরতায় হাহাকার তুলে ফেলেছে।  আমেরিকায় ভর্তুকির ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা বা বাড়তি ট্যারিফ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প এদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ফেরি করার দিন শেষ। এসবের আর মূল্য নেই। অথবা আমেরিকা প্রভাবিত থিংকট্যাংকগুলোর করা ভারতের মিডিয়া-প্রোপাগান্ডা সব মিথ্যা হয়ে যাওয়ার চেয়েও সেগুলো বাস্তবতা হারিয়ে অচল অসার বক্তব্য হয়ে গেছে। আর ওই দিকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মোদির সরকার লজ্জার মাথা খেয়ে যেসব তৎপরতায় নেমেছে সেটাকে যদি চীনকে খুশি করার উদ্যোগ বলা এড়াতেও চাই তো বলতে হবে ‘চীন অখুশি হবে’ এমন সব কাজ পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চোটটা গিয়ে পড়েছে তিব্বতের দালাইলামার ওপরে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ ঘটনা হল, মোদি ও শি জিনপিংয়ের দুই দিনের একান্ত ইনফরমাল সামিট। (বিস্তারিত এখানে)

রাজামোহন গত ১ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তার নিয়মিত কলামে মোদি ও শি জিনপিংয়ের একান্ত ইনফরমাল সামিটকে নিজের লেখার প্রসঙ্গ করেছেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংকারদের করুণ অবস্থা স্বীকার করতে এখনো রাজি হননি। বরং রাজামোহন লিখছেন, গত সপ্তাহে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চীনের য়ুহান (Wuhan) শহরে একান্ত ইনফরমাল সামিট হয়েছে, সেটা ভারতের চীনা নীতিকে রিসেট (reset) বা “ফিরসে শুরু” করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা আসলে বরং চীন, যে এশিয়ার তার ‘প্রতিবেশী নীতি’ বদলিয়েছে। আর দিল্লি তাতে কেবল চিন্তাই করা যায় না এমন পাওয়া সুবিধা পেতে সাড়া দিয়েছে মাত্র। ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, চীনই তার আঞ্চলিক নীতি ‘ফির সে শুরু’ করে সাজিয়েছে কারণ সে ট্রাম্পের উজানে বাওয়া দেখে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনকে এমনটা করতে হয়েছে। [Last week’s informal summit in Wuhan between Prime Minister Narendra Modi and President Xi Jinping was widely billed as India’s ‘reset’ of its China policy. A close look suggests it was Beijing that was really recasting its policy towards its Asian neighbours. Delhi was merely responding to an unexpected opportunity. A closer examination, however, suggests China’s reset of its regional policy was itself a response to the American upheaval under President Donald Trump.]

ইন্টেলকট বা একাদেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ যাদের করতে হয় তাদের বক্তব্যের ধার বা পয়েন্ট যখন এমন হাল্কা তর্কে নামা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝা যাচ্ছে, রাজামোহনের অবস্থা আসলে খুবই মরিয়া দশায়। পরের প্যারায় তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে আরও লিখছেন, “গ্লোবাল ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকা-চীন এই দুইয়ের মধ্যে চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে যে ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়ে গেছিল মাত্র ১৬ মাসে তা একা হাতে ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ করে উল্টে দিতে পেরেছে।’ ট্রাম্প কেবল তার নিজের বিশেষ আজব ঢংয়ে বলে দিতে পেরেছে, ‘না, এত তাড়াতাড়ি সেটা ঘটবে না”। [“In a short span of 16 months, Trump has single-handedly challenged widespread perception that the balance of power between America and China was tilting in favour of the latter. Trump, in his own peculiar way, has said, ‘not so fast’”.

এই লেখা আসলে ডেসপারেট এক ট্রাম্পভক্তের; রাজামোহন সম্পর্কে এ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। যেন এ’এক আমেরিকা প্রেমে মজে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যেন দুই শিশু তুমুল তর্ক করছে যে, “কার বাবা বেশি বড়লোক”। কম করে বললে এমন তর্ক অশোভন, অন্তত একাডেমিক পর্যায়ের লোকদের তর্ক এটা নয়।

এটা আমেরিকা অথবা চায়নাকে ভাল বলে তাদের কারও পক্ষে ওকালতির ইস্যু না। ট্রাম্পের আমেরিকা ভাল না চায়না ভাল – এই স্টাইলে তর্ক  বলাই বাহুল্য খুবই নিম্নমানের। বরং একাডেমিকদের তর্ক হতে পারে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের নীতি ছেড়ে চলে যেতে পরোয়া করছে না কেন?  দুনিয়ায় গত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো আমেরিকার যে গ্লোবাল ভূমিকা ও এক এম্পায়ার (empire) ভূমিকা এবং দুনিয়ার নেতার ভূমিকা – সেসব ঢিলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা আমরা মানলেও ট্রাম্পের আমেরিকা তা যেচে ত্যাগ করতে আর পরোয়া করছে না, কেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে আকার পেয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ – এখন সেই গর্বও ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। কেন? একই সময়ে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপের সাথে আমেরিকার প্রধান সহযোগী হিসাবে সম্পর্ক, সত্তর বছর পরে এসে আমেরিকা অবলীলায় এই প্রথম বেপরোয়াভাবে এই সম্পর্ককে ত্যাগ করছে। ন্যাটোসহ ইউরোপের সাথে মিলে যা কিছু যৌথ প্রতিষ্ঠান এতদিন  ধরে গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকা এখন সব ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। অথচ এগুলোই তো আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের মৌলিক ভূমিকা পালনের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমেরিকাকে সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এগুলোকেই ট্রাম্প স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চাইছে, ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাহলে “চীনের বদলে আমেরিকার হাতেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থাকছে, এত তাড়াতাড়ি তা যাচ্ছে না” – রাজামোহনের এই কথা বলে ট্রাম্পকে বিরাট ত্রাতা বলে তোষামোদীর কারণ কী?  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প নিজেই তার কোনো উপদেষ্টার কোনো কথা রাখছেন না বা অবস্থান কমিটমেন্ট যেখানে যা কিছু বলে আসছেন ট্রাম্প তা রক্ষা করছেন না, মানছেন না। তিনি মূলত পরিচালিত হয়ে চলছেন অসংখ্য লবিস্ট (ব্যবসায়ী) তাকে যখন যেভাবে বলাচ্ছেন বেশির ভাগ সময় তিনি তাদের খপ্পরে। ট্রাম্পের প্রশাসনের এসব অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ট্রাম্পের আমলেই রেকর্ড পরিমাণ কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা বা প্রশাসনিক কর্তার বরখাস্ত হওয়া বা পদত্যাগ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এথেকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়!

আর সবচেয়ে বড় কথা ট্রাম্পের প্রশংসা করে রাজামোহনের দাবি যদি সঠিকও হয় তাতে রাজামোহনের ভারতের কী লাভ এতে? মোদির সরকার প্রশাসন থেকে কী আমরা ইতোমধ্যেই জানি নাই যে, খোদ ট্রাম্প বা আমেরিকার কাছ থেকে বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের আর কিছুই পাওয়া নেই? এটা মোদির সরকার প্রশাসন প্রকাশ করেননি! ভারত আমেরিকায় তার রফতানি বাজারটাই হারিয়েছে, এটাই চরম বাস্তবতা। তাহলে রাজামোহন কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? কার খুশিতে খুশি হচ্ছেন? কোন আমেরিকা? এই আমেরিকা কী কেবল শুধু ভারতের নয়, দুনিয়ার কারো জন্যই কেউ নয়, তাই নয়? তাহলে রাজামোহন কার স্বার্থের প্রতিনিধি? বটম অব দা হার্ড ফ্যাক্টস হল, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থের উপরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে টপ প্রায়রিটিতে এনেছেন। আর আগের আমেরিকার “চীন ঠেকানো” – এটাকে রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে দেখে ও প্রাধান্যে রাখাতে ভারতের পণ্য তা প্রতিযোগিতায় না পারলেও ভর্তুকিতে রপ্তানিযোগ্য করে তা আমেরিকায় রপ্তানি করতে দিয়েছিল। এই সত্যকে আড়াল করে ট্রাম্পকে রাজামোহন হিরো বানায় কী করে, এটা সত্যিই বিস্ময়! ্ট্রাম্প কার চোখে হিরো? কার জন্য হিরো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরা পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল ও থেকেছিল। আর আমেরিকা ছিল তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাদাতা। ছিল বলছি কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণ  নীতির কারণে এর দিন শেষ। অথচ এসব ইঙ্গিত যেমন, চলতি দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মোচড় মনে হচ্ছে রাজামোহন দেখেও না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে মূল ইঙ্গিতটা হল, পুর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করছে আমেরিকাকে সবসময় নিজ ভাবনার সাথে মিলিয়ে এক গণ্ডিতে সাথে রেখে চিন্তাভাবনা করার দিন ফুরিয়েছে। ভারতের এ্ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (O.P. Jindal Global University, in Sonipat, India) দুই প্রফেসর জাপানের নতুন ভাবনার পক্ষে বিভিন্ন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। যেমন দেখুন, Trump Is Driving Xi Into Modi’s Arms

সেসব রচনার সার কথা হল, সাম্প্রতিককালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের পর থেকে বহু কিছু বদলে গেছে। জাপান এমনকি চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার সুযোগ কী তার জন্য আছে তা এক্সপ্লোর করতে শুরু করেছে। এমন একটা আর্টিকেলে লেখা হয়েছে, ভারতের জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার। [A lesson for India in Japan’s approach to China’s belt and road initiative] অপরদিকে দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ সামিট সম্প্রতি আমরা দেখেছি – যদিও এমন সামিট এর আগেও মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবার নেতাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বিশেষ ধরনের আলাদা। যেন দুই কোরিয়া একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তারা এবার খুজে পেয়ে গেছে। প্রথম যেদিনে সীমান্তে দুই প্রেসিডেন্টের পরস্পর দেখা হয়, তখন থেকে। বিশেষ করে উত্তরের প্রেসিডেন্টের আন্তরিকতা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছেও কাম্য অবশ্যই, তবে অদৃশ্যপূর্ব ঠেকেছে। এর পেছনের মূল কথাটা কী? সেটি হল, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে, পরস্পরের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি। তাই এটা এখনই বলে দেয়া যায় আগামী ইতিহাসে যখন খুঁজে দেখা হবে যে, কবে থেকে গ্লোবাল ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আমেরিকা থেকে চীনের হাতে চলে এসেছিল? এক বাক্যে সেই ইতিহাস বলবে চীনের মধ্যস্থতায় দুই কোরিয়ার পরস্পরকে বিশ্বাসের সাথে পরস্পরের কাছে আসার শুরু থেকে। আর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বন্ধু জাপান যখন আমেরিকা ছেড়ে চীনের ভেতরে বন্ধুত্ব খুঁজতে রওনা হয়েছিল আর চীন এর উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিল, তখন থেকে।

আসলে এসবের মূল কথাটা হল, যে আমেরিকা কেবল নিজের জন্য আমেরিকা – এটা কোন এম্পায়ার আমেরিকা নয়। বরং নিজেই নিজেকে দুনিয়ার নেতা – এম্পায়ার – এই অবস্থান থেকে নিজেই নিজেকে খারিজ করে দেয়া। এভাবে কোনো রাষ্ট্র যখন চরম রক্ষণশীল অবস্থান নেয় তখন কেউই আর সেই আমেরিকার কেউ থাকে না। এ যুগে এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান বলে নিজের কোনো অবস্থানের বাস্তবতা সম্ভব বলে মনে করা হলে এর সোজা অর্থ হল – সেই রাষ্ট্র আর তখন ইউরোপ, জাপান বা কোরিয়ার জন্য কেউই নয় হয়ে যায়। কেবল তখনও ট্রাম্পের আমেরিকার একমাত্র ভক্ত-বন্ধু থাকে সি রাজামোহন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের থিংকট্যাংক এখনো ট্রাম্পভক্ত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]