ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

ট্রাম্পের প্রথম আপোষ

ট্রাম্পের প্রথম আ্পোষ

গৌতম দাস

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cS

 

 

 

হাওয়া কি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক আলাপে আমরা কাউকে যেমন পাগলা বলি, ঠিক তেমন আমেরিকান নতুন প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে নিজের নামের আগে আমাদের দেশী ভাষায় এই ‘পাগলা’ বিশেষণ লাগিয়ে ফেলার মত কাজ করেছেন – পাগলা ট্রাম্প। তো সেই ব্যক্তি কি এত তাড়াতাড়ি চীনের ইস্যুতেই ঠাণ্ডা আর থিতু হয়ে গেলেন? কিভাবে? হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, ৯ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেছিলেন এবং তার সাথে কথা বলেছেন। যে সে কথা নয়; ঐ বিবৃতির ভাষা অনুযায়ী,  “এক ‘দীর্ঘ ফোনালাপ’ [“a lengthy telephone conversation”] করেছেন। বিস্ময়কর তথ্য আরো আছে।

একই বিবৃতির আরো ভাষ্য বা বক্তব্য হল, “The two leaders discussed numerous topics and President Trump agreed, at the request of President Xi, to honor our “one China” policy.  Representatives of the United States and China will engage in discussions and negotiations on various issues of mutual interest”.
বাংলায় অনুবাদ করে বললে, “চীনা প্রেসিডেন্ট শি’র অনুরোধে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘একচীন নীতি’কে সম্মান জানাতে একমত হয়েছেন। … চীন ও আমেরিকা উভয় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা এখন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষিতে বসবেন”। এ থেকে বোঝা গেল, অন্তত এই একটা ইস্যুতে ট্রাম্পের অপরিপক্ক হম্বিতম্বি এমনভাবে শেষ হল যে,  ট্রাম্পের আমেরিকাকে মেনে নিতে হল যে গত সত্তরের দশক থেকে তাদের পুর্বপুরুষ নেতৃত্ব যে ‘একচীন নীতি’ স্বাক্ষর করেছিলেন, মেনে চলেছিলেন নিজ নিজ প্রশাসনের আমলে তারা গবেট ছিলেন না। আর এটাই ট্রাম্পের প্রথম পিছু হটা এবং আপসরফা। এমন নাকে-খতের পথ তাকে আরও নিতে হবে।

একচীন নীতি মানে হলো, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। এই পূর্বশর্ত পূরণ করার পরই এর ভিত্তিতে চীন যেকোনো রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করে থাকে। আমেরিকার সাথে মাওয়ের চীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল গোপনে অন্তত ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে। পরের বছর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেকালের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর দিয়ে সেটা প্রকাশ্যে ঘটেছিল। আর এসব ঘটনার পরম্পরায় শেষে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত এক পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সম্পর্ক শুরু করেছিল চীন-আমেরিকা। বলা বাহুল্য, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই শর্ত মেনেই আমেরিকা তাতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ ফক্স নিউজ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন বয়ান দেয়া শুরু করেছিলেন যে, আমেরিকা কেন সেই ‘পুরনো কমিটমেন্টে আটকে’ থাকবে। প্রশ্নের ভঙ্গিতে তিনি কথাটা তুলেছিলেন। এর আগে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানানোর উছিলায় ফোনকল করেছেন বলে তাতে ট্রাম্প সাড়া দিয়ে কথা বলেছিলেন। এ রকম অন্তত আরো তিনটি ঘটনা আছে যেখানে ‘একচীন নীতি’ ট্রাম্প মানতে চান না অথবা মানবেন না কিংবা দরকার হলে চীনের সাথে ট্রাম্প সংঘাতে যেতে চাইতে পারেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেকস টিলারসন তার প্রার্থিতা সিনেটে অনুমোদনের শুনানিতে জবাবে, সাউথ চায়না সি থেকে চীনাদের তাড়ানোর জন্য সামরিক বলপ্রয়োগের কথা বলেছিলেন। জন বোল্টন জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মে (২০০১-২০০৫) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাইওয়ানের পক্ষে লবি করার এক বড় প্রবক্তা মনে করা হয় তাকে। কূটনীতিতে বলপ্রয়োগ বা চাপে ফেলে আমেরিকান নীতির পক্ষে অন্য রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে সিদ্ধহস্ত এই কূটনীতিক। ট্রাম্পের বিজয়ের পর তিনি সরব হয়ে উঠেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা সেক্রেটারি অব স্টেট) হতে যাচ্ছেন হয়ত। কারণ ট্রাম্পের বিজয়ের পরে তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎও করেছিলেন। এছাড়া, স্টেফান ইয়েটস, বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তিনিও ট্রাম্পের পরোক্ষ দূত হিসেবে আন-অফিসিয়ালি তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনিই প্রথম তর্ক উঠান যে, ‘একচীন নীতি’তে দেয়া প্রতিশ্রুতিতে আমেরিকাকে আটকে থাকতে হবে কেন?
এই তিন ঘটনা ছাড়াও, চীনের অর্থনীতির উত্থানের কারণে আমেরিকানদের কাজ ও চাকরি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। পুরা নির্বাচনী প্রচারণা জুড়ে এটাই ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল। ফলে ট্রাম্প আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশের উপর  ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে তা ঠেকাবেন- এজাতীয় সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান ছিল নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভরতে ট্রাম্পের পপুলার দাবি। এসব মিলিয়ে সত্তরের দশক থেকে ক্রমশ দাঁড়ানো চীন-আমেরিকার গভীর সম্পর্ক ট্রাম্পের আমলে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে মনে করে দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট সবাই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। টলারশন সামরিক হুমকি দিয়েছেন আর ট্রাম্প চীনের সাথে সংঘাতে যেতে চান এমন ধারণাগুলো প্রচার করা সত্ত্বেও আমেরিকার কোনো ব্যবসায়ী, ওয়াল স্ট্রিট অথবা কোনো করপোরেট গ্রুপ – কেউই ট্রাম্পের সামরিক পথে অবস্থানের ইচ্ছা বা সঙ্ঘাতমূলক পন্থা গ্রহণকে সমর্থন করতে পারেনি, তাতে চীন-আমেরিকান কোন সম্ভাব্য সংঘাতে তাদের অবস্থানের যে দিকেই থাকুক। কিন্তু কেউই নিশ্চিত থাকতে পারছিলেন না যে, এই পাগলা প্রেসিডেন্ট শেষে হঠাৎ না কী করে বসেন। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে  ট্রাম্প আর শি জিনপিংয়ের ফোনালাপ তাই সবাইকে একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

ব্যাপারটাকে চীনের দিক থেকে দেখলে, এ প্রসঙ্গে চীনা অবস্থান শুরু থেকেই ছিল খুবই পরিপক্ব ও মাপা। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের তারিখ ছিল ২০ জানুয়ারি। ফলে ওই তারিখের আগে মিডিয়ায় যতই নতুন নতুন উসকানিমূলক খবর নিয়মিত প্রকাশ পাক না কেন, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সব সময় এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল। কেবল বলেছিল,  ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগে সব মিডিয়া রিপোর্টই জল্পনাকল্পনামূলক, আনুষ্ঠানিক কিছু নয়। তাই অনুমাননির্ভর বিষয়ে চীন কথা বলবে না। তবে, কেবল ৮ নভেম্বর ২০১৬  ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছিল। তাই এই ফল প্রকাশের পর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের মূলনীতি বিষয়ক একটা কথা চীন বলে এসেছে যে, গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে চীন-আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভাগ্য এক সুতায় বাঁধা পড়েছে। ফলে একমাত্র পরস্পর ডায়লগ করেই এক সাথে হাঁটতে হবে। চীন এ কথা ক্রমাগত প্রচার করে গেছে। ওদিকে আবার নির্বাচনে বিজয়ের পর ট্রাম্পের একচীন নীতি নিয়েও আবার দরকষাকষি করতে চাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করার পর প্রতিক্রিয়ায় চীন পরিষ্কার করে বলেছে, ‘চীনের একচীন নীতি কোনো দরকষাকষির বিষয়ই নয়’।

তবে ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে দুটো কারণে চীন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছিল।  সাধারণভাবে বললে তখন থেকে, চীন গাজর-লাঠি (হয় গাজর খাও, না হলে লাঠির বাড়ি) নীতিতে চলে যায়। তা হল, আমেরিকান লোকদের কাজ বা চাকরির সমস্যা নিয়ে চীনের সাথে বসে আলোচনায় সমাধান সম্ভব। চীন সেখানে ছাড় দিতেও রাজি। ওবামা আমলে ২০১১ সালে এমন এক আপসরফা হয়েছিল। কিন্তু চাকরির সমস্যাকে উছিলা করে সঙ্ঘাতের রাস্তায় সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার পথ ধরলে মুখোমুখি মোকাবেলার পথে যাওয়া হবে – এই ছিল চীনের ম্যাসেজ। এটা হলো অনেকটা এক জামাইয়ের বড়লোক শ্বশুরের মেয়ে বিয়ে করার অবস্থা। বিয়ের পর বউ-সন্তান নিয়ে জামাইয়ের দিন-খারাপ কাটছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে জামাইয়ের মনে হল, বিয়ের আগের তুলনায় এখন তাঁর সংসার খরচ বেড়ে গেছে। তাই সে বউ তালাক দিতে চায়। এ কথা শুনে শ্বশুর প্রথমে জামাইকে তোষামোদ করে আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষে না পেরে একপর্যায়ে শ্বশুর বললেন, হয় তুমি আলাপ আলোচনায় আস, তাতে সংসার চালানোর অর্থে টান পড়লে ভর্তুকিও দেয়া হতে পারে। কিন্তু তুমি যদি না মানো, তবে তোমাকে লাঠিপেটা করা হবে।’ এই গাজর-লাঠির নীতিতে কাজ হয়েছিল। জামাই আলোচনার টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান করেছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে,  ট্রাম্প বিরতিহীন গরম কথা বলতে বলতে তাথেকে এই প্রথম অন্তত একটা ইস্যুতে তাঁকে  পিছু হটতেই হল। কারণ ট্রাম্পের এখন সেই জামাইয়ের দশা। ইতোমধ্যে চীন দক্ষিণ চীন সাগর রক্ষা নিয়ে সামরিক মহড়াসহ পালটা প্রস্তুতি হিসাবে অনেক কিছুই তাকে আমরা করতে দেখেছি। তবে সেটা যা-ই করুক আর না করুক, চীনের মূল উদ্বিগ্নতা ছিল আরো ব্যবহারিক। কী সেটা?
কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের ফোনালাপ মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়। নির্ধারিত সময় অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প ফোন রেখে দিয়েছিলেন এবং ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় হঠাৎ থেমে যাওয়া সেই ফোনালাপের ঘটনা কী পরিস্থিতিতে থেমে যায় তা ফাঁস হয়ে যায়। এই ঘটনার কথা চিন্তা করে চীনা সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। ‘পাগলা’ ট্রাম্পের সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট কিভাবে কথা বলবেন – ট্রাম্প যদি সেখানেও অর্ধেক কথা বলেই ফোন রেখে দেন? এরপর যদি একইভাবে সবকিছু মিডিয়ায়  ফাঁস হয়ে যায় তবে তো তিনিও বিব্রত হবেন, এই ভয় পেয়ে বসেছিল শিং জিনপিংকে। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীন-আমেরিকার পররাষ্ট্র বিভাগ বসে আগেই সব কিছু ঠিক করে নেন। প্রেসিডেন্ট-দ্বয় কে কিভাবে কথা বলবেন, কতটুকু কোথায় রাজি হবেন ইত্যাদি নিয়ে আগেই কথা বলে নিয়েছিলে উভয় পক্ষ। অর্থাৎ আগে স্ক্রিপ্ট আর পরে সেই স্ক্রিপ্ট মোতাবেক শুটিং। এই ফরম্যাট মোতাবেক আগের দিন মানে বুধবার ট্রাম্পের অফিস সংবাদমাধ্যমকে জানায় যে, পরের দিন তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে কথা বলবেন। এরপর তাদের ফোনালাপ শেষে দুই পররাষ্ট্র অফিস থেকে দুটো আলাদা পূর্বনির্ধারিত বিবৃতি যায়। সব কিছু আগেই আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। সবই পাগলা ট্রাম্পের মহা কৃতিত্ব।

একটা বাড়তি পাওয়া প্রসঙ্গ আছে – তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখছে,
“Taiwan’s presidential office spokesman Alex Huang said in a statement that the island’s government and the United States “both maintain close contact and communication so as to keep a ‘zero accident’ approach” to their relationship”.
“হাতছুট কোন দুর্ঘটনা শুণ্যে নামিয়ে রাখা – এই এপ্রোচ নিয়ে  দ্বীপ (তাইওয়ান) সরকার ও আমেরিকা দুই পক্ষ ঘনিষ্ট সংযোগ ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে”। কারণ চীন-আমেরিকার কোন উত্তেজনায় প্রথম বোমাটা তাইওয়ানেরই খাবার সম্ভাবনা।

এখন পুরা ঘটনা থেকে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হল যে, এখনো ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু লোক আছেন যারা ট্রাম্পকে পরামর্শ শুনতে বাধ্য করতে পারেন। ট্রাম্প কি এখন থেকে থিতু হয়ে কথা বলবেন? যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে করে কথা বলবেন?

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” এর ভিতর বাংলাদেশী টুপি

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর ভিতরে বাংলাদেশী টুপি

গৌতম দাস

২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cx

 

 

 

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ম মোতাবেক গত ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। শপথ নেয়ার দিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে দাঙ্গাহাঙ্গামা প্রতিবাদ বিক্ষোভ যেমন হয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের শপথের সব আনুষ্ঠানিকতাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্বভার বুঝে নেয়ার জন্য গঠিত ট্রাম্পের দলবল গত দুই মাসে তাদের সব কাজের মধ্যে একধরনের প্রতিহিংসা মাখানো পদক্ষেপের চিহ্ন রেখেছে। সেই সাথে প্রবল চাপাবাজি, আর প্রপাগান্ডায় সব কাজে “আমরাই শ্রেষ্ট, আমরাই একমাত্র” ধরনের লোক-দেখানো কর্মতৎপরতায় ভরপুর। সেসব আচরণ শপথ নেয়ার সময় পর্যন্ত বজায় ছিল। এমনকি ট্রাম্পের প্রশাসনের হবু উপদেষ্টারা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) যাদেরকে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন কিন্তু সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন, তারাও সিনেটের শুনানিতে প্রশ্নের জবাবের সময়ও একই প্রপাগান্ডা, চাপাবাজি আর জনপ্রিয়তাবাদি ভাষায় কথা বলা চালিয়ে গেছেন। যেমন ট্রাম্পের হবু পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হলেন শীর্ষ তেল কোম্পানী Exxon Mobil Corp এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী রেক্স টিলারসন। তিনি সিনেটের শুনানি চাপাবাজি হুঙ্কার দিয়ে বলছেন সাগরপথে  চীনের প্রবেশপথ “দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না”। কিন্তু কিভাবে তিনি এই আওয়াজ বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে তিনি বা ট্রাম্পের মুখপাত্ররা কেউ আর মুখ খুলতে নারাজ। ওদিকে এসব ছাড়া ট্রাম্পসহ সবাই এমন একটা ভাব বজায় রেখে কথা বলে গেছেন, যেন ট্রাম্পের আগে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট নির্বিশেষে ওবামাসহ যত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ছিলেন এরা স্কলে ছিলেন এক একজন বিদেশি শোষক, বিদেশীদের স্বার্থের প্রতীক। বিশেষ করে ওবামা হল ট্রাম্পের বিশেষ টার্গেট। তাই শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতার শুরুতেই ট্রাম্প বলছেন, “আজকের এই ক্ষমতা হস্তান্তর বিশেষ অর্থপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের এক ক্ষুদ্র অংশ রাজধানীতে বসে সব মাখন খেয়েছে। ওয়াশিংটন ঝলমল করে উঠেছে কিন্তু জনগণের সাথে তারা সম্পদ শেয়ার করেনি। রাজনীতিবিদরা উন্নতি করেছেন আর ওদিকে চাকরি হারিয়ে গেছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা একদল আর একদলকে অথবা এক সরকার আর এক সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিন নয়। আজ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার দিন”। যেন ট্রাম্প হয়ে গেছেন শ্রমিকের দুঃখ বেচে সহানুভুতি জড়ো করা ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্ট নেতা। আর টাম্পের সবকথার শেষ কথা হল, “এখন ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে এসে গেছেন, ফলে সব ঠিক হয়ে যাবে”। এ কারণেই যেন তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও কর্মচারীরা যেন খুবই দ্রুত বিদায় নেন, পারলে ওবামা চলে যাওয়ার পরপরই আর তাদের কাউকে দেখা না যায়। তিনি ইঙ্গিত দিতে চান যেন, এরা সবাই গণস্বার্থবিরোধী তৎপরতার প্রতীক । । ট্রাম্পের এই বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে ব্রিটিশ কলোনি আমলে নেটিভ কোনো নেতা বক্তৃতা দিচ্ছে যেখানে ওবামা যেন লর্ড ক্লাইভ। আর ট্রাম্প হলেন জনদরদি একমাত্র দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী।

এগুলো নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি রকমের লোকরঞ্জন ততপরতা। ট্রাম্প আর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওবামা আমলের যত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিশেষ করে যারা পেশাদার কূটনীতিক নন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল যেন তারা ২০ জানুয়ারির আগেই বিদেশে চাকরির দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এই নির্দেশনা প্রতিহিংসার উদাহরণ। এই রাষ্ট্রদূতেরা এক-দুই মাস অথবা অন্তত দুই সপ্তাহ স্বপদে বেশি থেকে গেলে তাতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকার প্রশাসনিক রেওয়াজও এটাই। অর্থাৎ রেওয়াজ ভাঙার অপ্রয়োজনীয় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইঙ্গিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যে- ওবামাসহ পুরনো রাজনীতিবিদেরা সব বিদেশী চর। তাই তাদের ছায়া যেন ট্রাম্পের ওপর না পড়ে। এ নিয়ে অনেক কার্টুন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প একটা বড় খেলনা রঙের পিচকারি বন্দুক নিয়ে ওবামার অফিসে ঢুকে ওবামাসহ সবাইকে তাড়া করছেন, রঙ ছিটাচ্ছেন আর বলছেন অফিস থেকে বের হয়ে যেতে।
এখানে ট্রাম্পের বক্তৃতা থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক অংশ হুবহু অনুবাদ হাজির করব যেখানে ট্রাম্পের সস্তা জাতিবাদী বুঝ এবং সুড়সুড়ি কত ভয়ানক হতে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে, এ’থেকে। ট্রাম্প বলছেন, “বহু যুগ ধরে আমরা আমেরিকান শিল্পের ঘাড়ে চড়ে বিদেশী শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি। অন্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়ে পালছি আর আমাদের বাহিনী শুকিয়ে মেরেছি। বিদেশী অবকাঠামোর পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছি আর আমেরিকার বেলায় সেগুলো রিপেয়ার না করায় ক্ষয়ে গেছে। আমরা অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করেছি অথচ তা করতে গিয়ে নিজেদের সম্পদ, সামর্থ্য, আস্থা সব লোপাট করেছি। একটা একটা করে আমাদের ফ্যাক্টরি ভেঙে পড়ছে, আমাদের উপকূল ছেড়ে গেছে আর আমাদের লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার ফেলে রেখে গেছে। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘর থেকে তাদের সব সম্পদ টেনে বের করে সাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দিন শেষ। এগুলো এখন অতীত। আমরা এখন শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকাব। আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি এবং এক ডিক্রি জারি করছি, যা দুনিয়ার সব রাজধানীতে প্রতিটা ক্ষমতার কেন্দ্রে শোনা যাবে। আজ থেকে এক নতুন স্বপ্ন আমাদের ভূমিকে শাসন করবে। এখন এই মুহূর্ত থেকে সবসময় “সবার আগে আমেরিকা, আমেরিকার স্বার্থ”। বাণিজ্য, ট্যাক্স, ইমিগ্রেশন, বিদেশনীতি ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তা আমেরিকার শ্রমিক ও আমেরিকান পরিবারের বেনিফিটের দিকে তাকিয়ে নেয়া হবে”।

এখানে তামাশার দিকটা হল, কমবেশি এই বক্তৃতাটাই এত দিন আমাদের মতো কম আয়ের বিভিন্ন রাষ্ট্রে জাতিবাদী বা কমিউনিস্টরা “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে দিয়ে এসেছে। আজ ট্রাম্প তা নিজ দেশের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে উগড়িয়েছেন।

আসলে ট্রাম্প নির্বাচনে দাঁড়ানোর শুরু থেকে পুরো ব্যাপারটাই এমন। যেমন, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল স্লোগান – “Making America Great Again” বা অনুবাদ করে বললে, “আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান বানাব”- এটাই সবচেয়ে বড় চাপাবাজি; অর্থহীন কথাবার্তা। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্পের শ্লোগান – এখানে যে গ্রেট বলা হয়েছে, এই গ্রেট মানে কী? কী হলে তা গ্রেট হবে, এর সংজ্ঞাই বা কী? যদি এ শব্দ দিয়ে সম্পদ বা সম্পদের দিক থেকে গ্রেট বোঝানো হয়ে থাকে তবে তিনি এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন, ‘১৯৮০ থেকে ২০১৪, মাত্র এই ৩৪ বছরেই আমেরিকার সম্পদ বেড়েছে ২১ গুণ। এর অর্থ আবার আমেরিকান ধনী মাত্র এক শতাংশ, এদের সম্পদের ১৯৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া। তার অর্থ আমেরিকা গ্রেট ছিল না, এ কথা তো সত্যি নয়। কিন্তু সে আর কত গ্রেট হবে! তাই ধরে নেয়া যায়, সম্পদের চেয়েও ভিন্ন, সম্পদ ছাড়িয়ে আরো বড় কিছুর দিক থেকে গ্রেট হওয়ার কথা ট্রাম্প বলছেন। তা হল, সম্পদের সঞ্চয় নয়, সম্পদের বিতরণ। ওই প্রফেসর বলছেন, এ কথা দিয়ে আসলে ব্যাখ্যা করা যায় ট্রাম্প কাদের পটিয়ে ভোট নিয়েছেন; কলেজ-না-পৌঁছানো যে শ্রমগোষ্ঠী আছে প্রকারান্তরে তাদের কথা বলছেন। যাদের কথা বলছেন তাদের বেলায় হয়ত  কথা ঠিক কিন্তু তাদের জন্য তিনি তা আনতে পারবেন না। কারণ বিষয়টা এত সহজ-সরল নয়।’
কোল্ড ওয়্যার যুগের সস্তা জাতিবাদী বুঝি। সব ধরনের আমদানি করা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করলেই সব কিছু আমেরিকায় উৎপাদন করা আবার শুরু হয়ে যাবে এটা বোকার মতো কথাবার্তা। যদি তা-ই হতো তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সত্তর দশকের মধ্যে, এর আগে সুন্দর দিন কাটানোর আমেরিকা ভেঙে গ্লোবালাইজেশনে যাওয়া হয়েছিল কেন? খামোখা? নিজের পায়ে কুড়াল মারার জন্য? আমেরিকা নিশ্চয় বাংলাদেশ নয়। ফলে কে এবং কী তাকে বাধ্য করেছিল? নাকি আসলে প্রলুব্ধ করেছিল?
আঙুর ফল মিঠা হলেও সময়ে তা হয় উল্টা, আঙুর ফল খাট্টা বলার সময় হয়ে যায় একটা সময়। আপনি অন্যকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেয়া মানে, সেও তার বাজারে অন্য পণ্যে আপনাকে প্রবেশে বাধা দেবে। আবার খুব সাবধান, এখানে বাজার বলতে শুধু ‘তৈরী ভোগ্যপণ্যের বাজার’ বুঝানো হয় নয়। ‘বাজার’ মানে আসলে বিনিয়োগপুঁজি, কাঁচামাল, টেকনোলজি, মেশিনারি, শ্রম ইত্যাদি সব কিছুরই বাজার। ‘বাজার’ মানে শুধু প্রান্তিক ভোগ্যপণ্য যা কনটেইনার জাহাজে ভরে আনা-নেয়া করে শুধু তা-ই নয়  – বরং সব কিছুই। এমনকি পুঁজি এবং শ্রমও। ফলে আমেরিকা শুধু সে তার নিজ দেশে বিদেশী পণ্য রফতানি হতে দেবে না, তা বাস্তবে করা সম্ভব নয়। কারণ যে দেশ পণ্য রফতানি করবে সে পুঁজিবিনিয়োগও করবে। এটা ঠেকানো যাবে না সবকিছুই করবে – এর ব্যতয় ঘটানো এক কথায় অসম্ভব। যেমন আমেরিকা সরকারের আয়-ব্যয়ের এক বড় উৎস সরকারি বন্ড। দেশি বা বিদেশিরা এই বন্ড কিনে। আজ যেখানে চীন ও জাপান প্রত্যেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি (চীনেরটা আরো বেশি) করে বন্ড কিনে রেখেছে, সেখানে পণ্য প্রবেশ বন্ধ করার যুদ্ধ কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?

তত্ত্ব দিয়ে এই প্রসঙ্গে আলোচনা অনেক করা যায়। দেখানো যায়, এটা কেন অসম্ভব। তবে এর চেয়ে বরং ট্রাম্পের শপথের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ট্রাম্পের সমর্থক তরুণ যারা নানান রাজ্য পেরিয়ে ট্রাম্পের ‘ভোট দেয়ার বিপ্লবে’ যোগ দিতে ওয়াশিংটনে এসেছিলেন তাদের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যাক। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ ট্রাম্পের নির্বাচনে নানা ইস্যুতে শুরু থেকেই সমালোচক। বিশেষ করে, ট্রাম্পের ভোটে জয়লাভের পর থেকে যেসব ক্যারিকেচারও স্ববিরোধিতা ফুটে বের হচ্ছে সেগুলো তুলে আনার ক্ষেত্রে। শপথ নেয়ার দিনে রয়টার্সের এমন এক নিউজ হল, ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ প্রচার অভিযান নিয়ে। ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ বা লাল টুপির ঘটনা হল, উগ্র জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণীর বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হয়েছে লাল টুপি পরে। রয়টার্স ওই তরুণদের টুপি খুলিয়ে দেখাচ্ছে যে, তাদের সব টুপিই বিদেশে তৈরি, হয় বাংলাদেশের, না হয় ভিয়েতনামের, না হয় চীনের। কেন? কারণ ট্রাম্পের টুপি প্রচারাভিযানের মূল প্রপাগান্ডা অফিসে যেসব টুপি বিক্রির জন্য রাখা ছিল ওগুলো খোদ আমেরিকায় তৈরি ফলে এর দাম বেশী, কমপক্ষে ত্রিশ ডলার বা তারও বেশি। কত বেশি? বিদেশী (বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা চীনের) টুপির  তুলনায় বেশি, বিদেশী ওই তিন দেশের টুপির দাম বিশ ডলার বা এর নিচে। ফলে স্বভাবতই ঐ প্রচারাভিযানে সবাই সস্তা নামে পাওয়া টুপি পড়েই এসেছে – বাজারের স্বভাব অনুসারে। অর্থাৎ আমেরিকার তৈরি টুপি নিজ সমর্থকেরাই কম পরেছে। এই হলো ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর তামাশা এবং পরিণতি।

মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের এই আমেরিকাই গত সত্তরের দশক থেকে দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশন যেতে বাধ্য করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক-আইএমএফ আমাদেরকে নিজ বাজারের রক্ষণশীলতা ছেড়ে গ্লোবালাইজেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাপাচাপির মাধ্যমে বাধ্য করে এসেছিল। আজ ট্রাম্প নিজেই গ্লোবালাইজেশন ছেড়ে উলটা সংরক্ষণবাদিতা বা প্রোটেকশনিজমে যাওয়ার কথা বলছেন।

আজ সোজা কথাটা হল, গ্লোবাল বাণিজ্য বেচাকেনা বিনিময়ের মাধ্যমে একটা পরস্পর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে গেছে এবং তা যে স্তরে যে জায়গায় চলে গেছে, এ থেকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কঠিন। চাল-ডাল মিশে গেলে যেমন এগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। ট্রাম্পের জয়লাভের পর গত দুমাসে গ্লোবাল অর্থনীতির সমন্বয় আর গ্লোবাল বাণিজ্যবিষয়ক দু’টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রথমটা ল্যাটিন আমেরিকার পেরুর লিমা শহরে ‘এপেক’ (বাণিজ্য) সম্মেলন। আর দ্বিতীয়টা সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন, যেটার অংশগ্রহণকারি গ্লোবাল। তবে দুটোতেই সুর পরিষ্কার, আমেরিকা সংরক্ষণবাদী হতে চাইলে তাকে পেছনে ফেলে বা উপায়ান্তে তার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও চীনের নেতৃত্বেই দুনিয়া গ্লোবালাইজেশনে এগিয়ে যাবে। যেতে হবে। জাপান ট্রাম্পের ওপর হতাশ হয়ে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক উষ্ণ হতে যাচ্ছে। দুনিয়া সাজানোর সব হিসাব নতুন করে সাজতে বাধ্য। আসলে বিষয়টা হল- গ্লোবাল বাজার নিজের শেয়ার বাড়ানোর, নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২২ জানুয়ারী ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে যেকোন যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

গৌতম দাস
০৪ নভেম্বর ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Zw

দ্বিতীয় ও শেষ পর্বঃ
গত পর্বে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তের প্রসঙ্গে বলেছিলাম, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে “বেশ্যার ছেলে” ( ‘son of a whore’) বলে প্রকাশ্যে গালি দিয়ে ছিলেন। এমন শব্দের ব্যবহার খুব ভালো কথা নয় নিশ্চয়ই। ফলে তা প্রশংসার বিষয় নয়। কিন্তু এসবের পেছনে অর্থাৎ আমেরিকার বিরুদ্ধে দুতের্তের ক্ষোভের কারণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার দরকার আছে। সাধারণভাবে বললে, গালি দেয়ার কারণ – প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজ দেশে অবৈধ ড্রাগের বাড়াবাড়ি বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে ড্রাগ ডিলার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচারবহির্ভূতভাবে শুধু গুলি করেই মারছে না। দুতের্তে প্রকাশ্যেই দাবি করে বলছেন, “ড্রাগ ডিলাররা তার বৈধ টার্গেট। এরা আরো মরবে”। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় চার্চ, মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সবশেষে ওবামা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আপত্তি তোলায় সবাইকে অশ্লীল ভাষায়, প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষায় তিনি পাল্টা গালাগালি করেছেন। দুতের্তে বলতে চান, বিচারবহির্র্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দিক থেকে দেখে অথবা দেখার সুযোগ নিয়ে অন্য কারো আপত্তি বা সমালোচনা তিনি শুনতে চান না। “তিনি বা তার দেশ যেহেতু এখনো স্বাধীন সার্বভৌম এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের উপনিবেশ নয়, তাই তাদের ডিকটেশন বা সমালোচনা তিনি শুনবেন না”। এ কথা ঠিক যে, যে কোন রাষ্ট্রের যে কোন উছিলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ নাই, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনাকে ইস্যু করে আমেরিকার কাছে এমন মানবাধিকার ইস্যু ভিনদেশে হস্তক্ষেপ করার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করা হয় সময়ে – এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। ফিলিপাইনে ড্রাগের সমস্যা সঙ্কট মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে, তা সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, সে কথাও ঠিক। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে, তাঁর যে কোন সমালোচককে অভদ্র ভাষায় বাপ-মা তুলে গালি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবার মূল কথা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে, অন্তত ভদ্রতার খাতিরে ভদ্র ভাষা ব্যবহার করেও তো দুতের্তে তার পয়েন্ট, তার সমস্যা ও বক্তব্য  তুলে ধরতে পারতেন। এমন না করার দোষে তিনি দুষ্ট।
যা হোক, গালাগালি করার এমন পরিস্থিতির ফলে স্বভাবতই ওবামা এরপরে দুতের্তের সাথে তাদের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দেন। যদিও এর পরের দিন দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’বলে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু তা কোন কিছুকেই আগের মত স্বাভাবিক করেনি; বরং তা ন্যূনতম একটি কাজ চালানোর মতো কার্যকর সম্পর্কের স্তরেও আর ফিরে আসেনি। এটা সেই থেকে আমেরিকা-ফিলিপাইন সম্পর্ককে পুরান গভীর ঘনিষ্টতার বিপরীতে বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

ওবামা-দুতের্তে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, আঞ্চলিক জোট ‘আসিয়ান’-এর সভা, যা এবার আয়োজিত হয়েছিল লাওসে, সেখানেই সাইড লাইনে। মানে মূল অনুষ্ঠান সূচির ফাঁকে। ফলে দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা বাতিল হলেও পরোক্ষে তাদের দেখা হয়েছিল ওই আসিয়ান সম্মেলনে, সভার সদস্য হিসেবে। কিন্তু সরি বলার পরও কেন সম্পুরক-পরিস্থতিতে কোন উন্নতি হয় নাই এ বিষয়ে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ম্যাগাজিন এক এক্সক্লুসিভ বিশেষ রিপোর্ট ছেপেছিল। কিছু ব্যক্তিগত রেফারেন্স থেকে পাওয়া এটা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ঐ রিপোর্ট বলছে, দুতের্তে  সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’ বলার পর দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা আবার আয়োজনের চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু সম্মেলনেই এক ডিনারের টেবিলে এক ফাঁকে দুতের্তে ওবামার সাথে কথা বলতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করেছিলান। কিন্তু ওবামা দুতের্তের সাথে ঠিকমত কোনো মুখের কথাও বলেনি শুধু তাই নয় ওবামা উল্টো নিজের জুনিয়র স্তরের আমলা প্রতিনিধির সাথে দুতের্তেকে বৈঠকে বসতে প্রস্তাব করেছিলেন। (Mr. Obama said a follow-up would come from White House staff, not himself) এতেই দুতের্তে প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করেন এবং আমেরিকা-ফিলিপাইন গভীর সম্পর্ক এরপর একেবারে আরো খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়।

বলা হইয়ে থাকে, আমেরিকা-ফিলিপাইন এদুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিগত প্রায় সত্তর বছরের পুরনো এবং সেকালের আসন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লব ঠেকাতে গিয়ে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা, আর সেই থেকে আমেরিকান সেনাঘাঁটি স্থাপন হয়ে আছে ফিলিপাইনে। সেই সম্পর্ককে একেবারেই ছিন্ন করে উল্টো পথে হাঁটতে চাইছেন দুতের্তে। অন্তত রাগের মাথায় তাই বলছেন তিনি। সে দিকে বিস্তারে যাওয়ার আগে কোন পশ্চাৎ পটভূমিতে এসব ঘটনাবলি ঘটছে, সেগুলোর একটু স্মরণ ও ঝালাই করে নেব।

একালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের অর্থনৈতিক আসন্ন ও চলতি  উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন বিগত ২০১১ সালে এক ‘এশিয়া নীতি’ ঘোষণা করেছিল। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকাও, এই লক্ষ্যে সাজানো ওই নীতিতে আমেরিকা নিজের ভূমিকাকে কেন্দ্রীয় ত্রাতার (পিভোটাল রোল) জায়গায় দেখিয়ে প্রকাশ করেছিল। ভৌগোলিক দিক থেকে আমেরিকার এই এশিয়া নীতির কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ সমুদ্রপথে চীনা ভূখণ্ডে প্রবেশদ্বার- চীন সাগর; বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরের কথা মনে রেখে।।
চীনা মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রে অথবা সমুদ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের প্রবেশদ্বার একটাই- চীনের পূর্ব দিকে। এই সাগর আসলে একই চীন সাগরের দুই দিক, দুই নামে তা দক্ষিণ চীন সাগর আর পূর্ব চীন সাগর নামে পরিচিত। এর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরাঞ্চল আরো এগিয়ে তা মহাসাগরে মিশে যাওয়ার আগে চীনের প্রবেশদ্বারের চার দিকে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ান- এসব দেশের সমুদ্রসীমান্ত। ফলে এসব দেশের সবার সাথে সমুদ্রসীমান্ত বিষয়ে চীনের অমীমাংসিত বিরোধ বিতর্ক আছে। বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরের পানির নিচ, সেটা পুরোটাই তেলসহ নানান সমুদ্র সম্পদে সমৃদ্ধ। সে জন্যই এই বিরোধে সবাই সিরিয়াস। কিন্তু এসব সম্পদের হিসাবের কথাগুলো সত্যি না হলেও চীনের কাছে এর গুরুত্ব আলাদা ও বিশেষ ভাবে থাকে, আছে। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগর চীনের কাছে নিজের একমাত্র সমুদ্রপথে চলাচল অবাধ রাখা, এবং তা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা – খুবই জরুরি ও নির্ধারক। কারণ নিজের মরা-বাঁচার মত ইস্যু এটা। এদিক তাক করেই আমেরিকা চীনকে বিরক্ত করার এশিয়া নীতি সাজিয়েছে। যার মধ্যে আমেরিকার ভান করার দিক হল, চীনের পড়শিদের স্বার্থ রক্ষা করতেই যেন আমেরিকার এই সুদূর এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতিতে আসার উদ্দেশ্য। নিজেকে পিভোটাল (pivotal বা ক্ষমতা কেন্দ্র) ত্রাতার ভূমিকায় দেখিয়ে হাজির করা। আমেরিকার তৎপরতার ভেতর এসব দিকের কথা চীনের পড়শি সব রাষ্ট্র জানতে পেরেছে সেই ২০১১ সাল থেকে। কিন্তু তারা কেউ সেসময়ই আমেরিকার কথায় মাতেনি। কেন? সারকথায় বললে, তারা আমেরিকার পক্ষে চীন-বিরোধী কোনো যুদ্ধপক্ষের জোট বা ঘোটের মধ্যে ঢুকে নিজেদের জড়াতে বা দেখতে চান না। যুদ্ধ রিস্কি জিনিষ -পুঁজিপাট্টা গায়েব হয়ে যায়। তবে নিজ নিজ ভুখন্ড সীমান্ত-সার্বভৌমত্ব রক্ষার করতে কোন আপোষ করতে তারা যায় না। তাই আশা করে কোনো নীতির ভিত্তিতে সব বিতর্ক সমাধান হয়ে যাক, এটা তারা চায়। এব্যাপারে শুরুতে সবচেয়ে ভোকাল ছিল ফিলিপাইন, যদিও ইতোমধ্যে আমেরিকার প্ররোচনায় সেই ফিলিপাইনই একমাত্র রাষ্ট্র, যে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার জাতিসঙ্ঘের ট্রাইব্যুনাল ‘আনক্লস’ ( UNCLOS, United Nations Convention on the Law of the Sea)-এ মামলা করেছিল। এই মামলায় আমেরিকার প্রভাবে ফিলিপাইন সম্প্রতি চীনের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষে একটা রায় পেয়েছে। যদিও ওই আদালত গঠন নিয়ে আগেই চীনের আপত্তি ছিল আর তা উপেক্ষা করার কারণে চীন মামলা চলার সময়ে সক্রিয়ভাবে কনটেস্ট করেনি। তাই রায় প্রকাশের পরে চীন এই রায় গ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে। তবে রায় প্রকাশের পরে কোনো পক্ষ থেকেই তা সামরিক পদক্ষেপের দিকে যায়নি। তবে রায় প্রকাশের অনেক আগে থেকেই (২০১২ সালে) বাস্তব মাঠে, মাছ ধরার দিক থেকে ফিলিপাইনকে মাছ ধরা থেকে বিরত রেখে আসছিল চীন, সেটাও এখনও তেমনই আছে। এক কথায় বললে, রায় প্রকাশের পর ফিলিপাইনের দিক থেকে তারাও কোনো সামরিক দখল উদ্যোগের দিকে যায়নি বা যাওয়ার কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। ইতোমধ্যে ২০১৬ সালের ৩০ জুন দুতের্তে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের শপথ নেন। এরপর থেকে সমুদ্রসীমা বিতর্কে ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে নিজ অবস্থানের কথা তিনি জানান। কিন্তু এ নিয়ে কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা তিনি নাকচ করে দেন। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে খোলা ভাষায় পরিষ্কার করে বলছিলেন, চীনের সাথে কোনো যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী নন; বরং দুতের্তে ক্ষমতা নেয়ার পর মাছ ধরার ইস্যু নিয়ে চীনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। এগুলো সবই ‘ওবামাসহ সবাইকে গালাগালির প্রসঙ্গ’ হাজির হওয়ার আগেকার ঘটনা। তাই গালাগালির প্রসঙ্গ এবার চীন-ফিলিপাইন সম্পর্ক, আমেরিকার এশিয়া নীতি, আমেরিকা-ফিলিপাইন সামরিক সম্পর্ক ইত্যাদি সব কিছুকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আসিয়ানের লাওস সম্মেলন ছিল গত ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ওখান থেকে দেশে ফিরে দুতের্তে খুব দ্রুত আমেরিকার সাথে পুরনো সম্পর্ক প্রায় ছিঁড়ে ফেলা আর বিপরীতে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার উদ্যোগ নিতে থাকেন।

আমেরিকা বা ওবামার সাথে শুধু সম্পর্ক ছিন্ন নয়, বরং আমেরিকার সাথে নতুন বিরোধে জড়াতে গত ১৯ অক্টোবর ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজেই চীন সফরে যান। শুধু তাই নয়, ২০ অক্টোবর রয়টার্স জানাচ্ছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে আমরা ‘দুই ভাই’ বলে বরণ করে নিয়েছেন। রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনামই হল, ‘Brothers’ Xi and Duterte cement new-found friendship।  দুতের্তে সেখানে ঘোষণা করেছেন, পুরনো বন্ধু আমেরিকা বাই বাই, দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহল বাতিল, আর এখন থেকে রাশিয়া ও চীন থেকে অস্ত্র কিনবেন তিনি ইত্যাদি। তিনি আরো পরিষ্কার করে বলেছেন, ফিলিপাইন নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে। ফলে এখন ফিলিপাইন, চীন আর রাশিয়া এই হলো তাদের নতুন কৌশলগত অ্যালাইনমেন্ট ইত্যাদি। অর্থাৎ পুরো উল্টো দিকে বেয়ে চলছেন তিনি। তবে এটা সত্যি যে, দুতের্তের ভাষ্যে অনেক রেঠরিক বা বাকচাতুরির প্রপাগান্ডা শব্দ মেশানো আছে। তাই আমরা দুতের্তের নীতিকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝতে তার বদলে তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মন্তব্য শুনব। চীন সফর শুরু হওয়ার পর তিনি এক বিবৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘এশিয়ান অর্থনৈতিক সমন্বয়ের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ছিল, আপডেট করা হয়নি আমরা সেগুলোতে মনোযোগ দিয়েছি; এর মানে আমরা পশ্চিম থেকে পিঠ ফিরিয়ে নিচ্ছে ঠিক তা নয়।’ …(his top economic policymakers released a statement saying that, while Asian economic integration was “long overdue”, that did not mean the Philippines was turning its back on the West.)

অপর দিকে ফিলিপিনো অর্থসচিব কার্লোস ডোমিঙ্গোজ এবং অর্থপরিকল্পনা সচিব আর্নেস্তো পারনিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রাখব। কিন্তু আমরা প্রতিবেশীর সাথে গভীর সম্পর্কের সমন্বয় কামনা করছি। আমরা আমাদের অঞ্চলের প্রতিবেশীদের সাথে একই কালচার শেয়ার করি আর তাদের ভালো বুঝতে পারি।’ (“We will maintain relations with the West but we desire stronger integration with our neighbors,” said Finance Secretary Carlos Dominguez and Economic Planning Secretary Ernesto Pernia in a joint statement. “We share the culture and a better understanding with our region.”)

উপরে তিন সচিবের দুই বিবৃতি প্রথমত, এটা প্রেসিডেন্ট দুতের্তের গরম ভাষ্যগুলোর থিতু ভার্সন। তবে এটা আমেরিকার সাথে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন নয় অবশ্যই। কিন্তু এটা ফিলিপাইনের সত্যি সত্যিই, আমেরিকার কৌশলগত বলয় থেকে দূরে চলে যাওয়া নির্দেশ করে। ওদিকে এ বিষয়ে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য ছিল, ফিলিপাইন আমাদের এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে আগামী সপ্তাহে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে আমেরিকার সেক্রেটারি ডেনিয়েল রাসেল ফিলিপাইন সফর করে নতুন ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যা চাইবেন।

এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমেরিকা-ফিলিপাইনের সম্পর্কের শুরু সেই ষাটের দশকে সশস্ত্র কমিউনিস্ট গেরিলা বিপ্লব ঠেকাতে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি দিয়ে সহযোগিতা করা থেকে এখনো ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি আছে। সামরিক বাজেট খরচের অনেক কিছুই এখনো আমেরিকা শেয়ার করে। ফলে আমেরিকাকে ছাড়তে গেলে বহু কিছু এখন ঢেলে সাজাতে হবে। যদিও দুতের্তে প্রকাশ্য ঘোষণায় বলা শুরু করেছেন, তিনি দীর্ঘ সময় প্রেসিডেন্ট থাকলে ফিলিপাইনের সাথে আমেরিকার সামরিক ‘ডিফেন্স ডিল’-এর কথা আমেরিকাকে ভুলে যেতে হবে।

তাহলে মূল বিষয় চীন-ফিলিপাইন সমুদ্রসীমা বিতর্ক বা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক- নতুন পরিস্থিতিতে এখন কী হবে? দুতের্তে জানাচ্ছেন, সমুদ্রসীমা বিতর্ককে আপাতত তিনি পেছনের বেঞ্চে ফেলে রাখতে চান। বিশেষত যত দিন চীনের সাথে বর্তমানে শুরু করা আলোচনা একটা নির্দিষ্ট আকার না নেয়। অথবা এরপর চীনারা নিজে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না হওয়া পর্যন্ত। (Duterte on Wednesday said the South China Sea arbitration case would “take the back seat” during talks, and that he would wait for the Chinese to bring up the issue rather than doing so himself.)

আর চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর বরাতে তারা বলেছেন, যেসব বিতর্ক তাৎক্ষণিক সমাধান করা যাচ্ছে না, সেগুলো আপাতত সরিয়ে রাখা হবে। দুতের্তে জানাচ্ছেন এসবের অর্থ, তিনি “জাতিসঙ্ঘের হেগ ট্রাইব্যুনালে ফিলিপাইনের পক্ষে পাওয়া রায়কে ত্যাগ করছেন বা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন না, অথবা ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব কোথাও চীনের কাছে বন্ধকও রাখছেন না।’ আর চীন এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলছে, ‘তারা দুতের্তের এই সেন্টিমেন্টকে সমর্থন করেন”। (China has welcomed the Philippines approaches, even as Duterte has vowed not to surrender any sovereignty to Beijing, which views the South China Sea Hague ruling as null and void.)
তাহলে মাছ ধরার ব্যাপারটা কী হবে? গত ২০১২ সালে ‘স্কারবোর্গ শোল’ নামে দ্বীপ থেকে ফিলিপিনো জেলেদেরকে চীন বের করে দিয়ে দখল নিয়েছিল। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি এই শোল দ্বীপের বিষয়ে বা জেলেদের মাছ ধরার অধিকার বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- আমরা উভয় দেশ কোস্টগার্ড ও জেলেদের বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে একমত হয়েছি। আর আমেরিকান সিএনএন দাবি করছে দুতের্তে বলেছেন, ‘মাছ ধরার বিষয়টি আমি চীনাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

হেগ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আমার আলাদা বিস্তারে লেখার পরিকল্পনা আছে। তবে আপাতত একটা সারসংক্ষেপ করে বলা যায়, দক্ষিণ চীন সাগর সীমানা বিতর্ককে উসকে দিয়ে আমেরিকা তার এশিয়া পলিসি সাজিয়েছিল, যেখানে আমেরিকা নিজের ভূমিকা কেন্দ্রীয় বা পিভটাল বলে মনে করে। কিন্তু এটা এখন পরিষ্কার যে, আমেরিকার এশিয়া নীতি এই প্রথম মারাত্মক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল। ফিলিপাইনের আমেরিকাকে ত্যাগ করা এটা আমেরিকার জন্য মারাত্মক থাপ্পড় খাওয়া। বিশেষ করে ফিলিপাইনের পথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি সব রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে – সেদিক থেকে দেখলে। কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতি ঘোষণা করার আগে এদের সবার অবস্থান ছিল তারা কেউ কোনো সামরিক বিবাদে জড়াতে চায় না; বরং সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে চীনের সাথে যুক্ত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনে উন্নতি করতে চায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই দ্বিতীয় পর্ব আগে দৈনিক নয়াদিগন্তে ৩০ অক্টোবর ২০১৬ (প্রিন্টের পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। আজ এখন সেটা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। ]

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

গৌতম দাস
০২ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-1Vh

কোল্ড ওয়ারের শুরুর দিকের পটভুমিতে একাত্তর বছর আগে জন্ম নেয়া এক সম্পর্ক হল ফিলিপাইন-আমেরিকার সম্পর্ক। সম্পর্কের এমন ঘনিষ্ঠতার পিছনে একটা বড় কারণ ছিল সেকালের ফিলিপাইনে সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মোকাবিলা। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সেই থেকে ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়। সেই থেকে একাল পর্যন্ত আমেরিকা ফিলিপাইনের এক নম্বর বন্ধু হিসাবেই ছিল। ছিল বলছি এজন্য যে এই সম্পর্কে ভাল রকমের চির ধরেছে। ফিলিপিনো সদ্য নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন রডরিগো দুতের্তে। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর ২০১৬, তিনি চীন সফরে গিয়ে আমেরিকাকে প্রকাশ্যে “বাই বাই” বলেছেন। না এটা ভাবা ভুল হবে যে তিনি নিজ ভাষায় না ইংরাজিতে বলেছেন ফলে কোন ভাষান্তর সমস্যা হয়েছে কিনা। কারণ তিনি জানিয়েছেন তিনি নিজ মাতৃভাষার চেয়ে ইংরাজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সেকথার সাথে নিচের ইংরাজি উদ্ধৃতি দেখুন।

Duterte did not hesitate to say that America, which is part of the New World Order, “has lost now. I’ve realigned myself in your ideological flow [China], and maybe I will also go to Russia to talk to Putin and tell him that there are three of us against the world—China, the Philippines, and Russia. It’s the only way.”

Keep in mind that Duterte is not against the West’s achievement in science, medicine, and even in language. Duterte admitted to a reporter that “I am more articulate in English than in my own dialect.”

তো দীর্ঘ এত পুরানা বন্ধু হঠাত উলটা বইতেছেন কেন তা এখানে জানব। ফিলিপাইন সম্পর্কে বিশেষ করে ওর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের দেশে খুব বেশী জানাশুনা নাই। তাই প্রেসিডেন্ট দুতের্তের চিন্তা বা কর্মসুচীর মুল ফিচারগুলো কী তা বলবার উছিলায় আগে ফিলিপিনো রাজনীতি জনগণ সম্পর্কে পটভুমির দিক থেকে কিছু বলে নিব। তাই লেখাটার দুই অংশ। দ্বিতীয় অংশ আলাদা পোষ্ট হিসাবে আসবে। সেখানে আমেরিকার সঙ্গে ফিলিপাইনের সম্পর্কের অবনতির বিস্তারিত দিকটা জানা যাবে।

প্রথম ভাগঃ ক্রসফায়ার : বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে। নির্বাচনে জিতে চলতি বছর, ২০১৬ সালের জুন থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এর আগে ছিলেন দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সবচেয়ে অগ্রসর শহর ডাভাও এর মেয়র। দুতের্তের নিজ ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক ফ্যামিলির সন্তান। বাবা ভিনসেন্ট গনজালেস দুতের্তে ছিলেন ফিলিপাইনের ডাভাও প্রদেশের গভর্নর এবং সিনেটর।  নিজে আইনে গ্র্যাজুয়েট, আইনজীবী ও প্রাক্তন সরকারি প্রসিকিউটর। প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এক কঠিন কর্মসূচি নিয়েছেন। ফিলিপাইনে ড্রাগ ব্যবসার দাপট আর ড্রাগ এডিক্টেট মানুষ ও পরিবারের সংখ্যা দুইই  সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার এক বিরাট ইস্যু। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে বলছিলেন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে এমন ড্রাগগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এও সংখ্যা তার আমলসহ ধরে।  ড্রাগের সাথে সম্পর্কিত সমস্যা ও অপরাধের ব্যাপকতা বা সংখ্যা – এটাই দুতের্তের বিচার-বহির্ভুত হত্যা করে অপরাধীদের মেরে ফেলার পক্ষে একমাত্র যুক্তি। (যারা আরও ডিটেল চান তাদের জন্য। এমন পাঠকেরা এবিষয়ে তাঁর পয়েন্টগুলো ডিটেইল শুনতে আগ্রহী হলে গত ১৫ অক্টোবর আলজাজিরা টিভির নেয়া দুপর্বের সাক্ষাতকার ইউটিউবে দেখুন।) দুতের্তের আমলের মাত্র প্রায় তিন মাস – এর মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক বিচার বহির্ভুতভাবে নহত হয়েছেন।  তবে অন্য যে কোন কারও চেয়ে দুতের্তে স্পষ্ট করে বলেন, “আমি যদি এখন সবল হস্তক্ষেপ না করি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ভবিষ্যত শুন্য হয়ে যাবে। অতএব এই ক্রিমিনাল এরা আমার বৈধ টার্গেট  আমি তাদের হত্যা করব”।  বুঝা যাচ্ছে আইনী দিক থেকে ব্যাপারটা অ-অনুমোদনের সন্দেহ নাই। কিন্তু এধরণের মরিয়া কথা থেকে  ফিলিপিনো সমাজে ড্রাগের ভয়াবহতার রূপ প্রকাশ পায় হয়ত। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট দুতের্তের পক্ষে জনমতের সমর্থন নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে তাঁর রেটিং ৭৬ ভাগ। অর্থাৎ সেই পুরানা কথা যা পপুলার তা আইন সম্মত বা সমর্থিত নাও হতে পারে।

আমাদের দেশে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ওয়্যার অন টেরর কর্মসূচিতে প্রেসিডেন্ট বুশের আমেরিকার দেয়া ফর্দ ও টার্গেটের বাধ্যবাধকতা পূরণ ও পালন। যদিও স্থানীয়ভাবে সে কথা মানুষকে বলার নয় বলে সেকথা আড়ালেই থেকে গেছে। অপর দিকে ফেলে যাওয়া এর আগের মানে হাসিনার প্রথম আওয়ামী সরকারের (১৯৯৬) আমলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষজন অতিষ্ঠ ছিল। ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে র‌্যাবের হাতেই বিচার বহির্ভুত হত্যার সংস্কৃতি বা ‘ক্রসফায়ার’ ফেনোমেনা শুরু হয়েছিল। এতে র‌্যাব বিশাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেন ত্রাতা। যেন ক্রসফায়ার করার জন্যই র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল, এমন আড়ালও এসে যায় এতে। ক্ষমতায় আসার পর দুতের্তেও এমন জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি নেন, যে ড্রাগ ডিলার বা ব্যবসায়ী অথবা ড্রাগ সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত যে কেউ, এদের দেখামাত্র গ্রেফতার ও গুলি। যার আনুষ্ঠানিক আর আইনি আড়াল দেয়ার নাম ক্রসফায়ার, তা চালু করেন। তবে একটু সংশোধন দরকার। এর আগে থেকেই দুতের্তে আসলে বিখ্যাত হয়ে এসেছেন ড্রাগ অপরাধীদের ক্রসফায়ার করেই। ফলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নতুন না, বরং মেয়র থাকার সময় এটাই ছিল প্রথম  তাঁর মুখ্য কাজ ও পরিচিতি। দুতের্তে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এ বছর, ২০১৬ সালের ৩০ জুন। এরপর প্রথম দুই মাসেই এমন মৃত্যুর সংখ্যা হয় ২৪০০-এর বেশি, এটা সরকার-ঘোষিত সংখ্যা। অর্থাৎ গড়ে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন নিয়মিত ৪০ জন করে হত্যা করা হয়েছে। (উপরে বলা আলজাজিরাকে দেয়া ঐ সাক্ষাতকারে আপডেটেড সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার বলে প্রথম স্বীকৃত হয়)
ক্রসফায়ার, সোজা কথায় এটা হল খুন করে মেরে ফেলার পর যে শব্দ দিয়ে খুনটা আড়াল করা হয়। মানবাধিকার ও আইনের চোখে এ ধরনের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে। সমাজে কোনো অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র পুলিশকে দেয় না। অপরাধের বিচারের দায়দায়িত্ব বিচার বিভাগের, মানে একমাত্র আদালতের। আর সেখানে ঐ আদালতে পুলিশের কাজ হল যাকে পুলিশের অপরাধী মনে হবে, সন্দেহ হবে, তাকে আদালতের সামনে হাজির করে, অভিযোগ এনে তা প্রমাণের চেষ্টা করতে পারে তাঁরা। এতটুকুই। সে অপরাধী কি না সে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই। এই এখতিয়ার একমাত্র আদালতের এবং আদালতও সে রায় দিতে পারেন একমাত্র বিচার-আচার মূল্যায়ন পরীক্ষার সবশেষে। কিন্তু এসবের পাল্টা ক্রসফায়ারকারী পুলিশ বা সরকারের পাল্টা বক্তব্য হল – এমন বিচার-আচারের পথ, এটা অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার, আসামি জামিন নিয়ে বের হয়ে যায় ইত্যাদি। তবে একথাও তো সত্য যে আবার অনেক সময় জেনুইন অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, উপযুক্ত প্রমাণ ও আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের অভাবে। এ দিকে সমাজে অপরাধী বেড়েই চলে। অতএব আমরা নিজেরাই কাউকে অপরাধী বলে শনাক্ত করি ও সিদ্ধান্ত নেই। তাকে শাস্তি হিসেবে মেরে ফেলি। আর আইনের চোখে বিষয়টিকে ন্যায্যতা দিতে ক্রসফায়ারের গল্প বানিয়ে এভাবে বলি যে, আমার হেফাজতের আসামিই আমাকে আক্রমণ করাতে আত্মরক্ষার্থে তাকে গুলি করে মেরেছি।ীসব পালটা যুক্তির পরও দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন এমন হত্যার পক্ষে কোনভাবেই সমর্থন দেয় না।  আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ক্রসফায়ারের বিচারবহির্ভূত দিক ছাড়াও আরো বড় এক অপরাধ হল, সরকার যাকে তাকে এই পদ্ধতিতে মেরে ফেলতে পারে। তাকে ‘জঙ্গি’ বা ‘ড্রাগ ডিলার’ অথবা যেকোন কিছু বলে সাজিয়ে। সরকারের অপছন্দ, রাজনৈতিক বিরোধী, প্রতিদ্বন্দ্বী যে কাউকে মেরে সরিয়ে দেয়া সহজ হয়ে যায়। মূল ত্রুটি বা সমালোচনার কথা হল, নিহত ব্যক্তি  যে কথিত অপরাধেই অপরাধী ছিল তা তো কোন আদালতের মত প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাবে পরীক্ষা করা হয় নাই। এটাই সরকারের হাতে যাকে তাকে খুন করার লাইসেন্স হিসাবে হাজির হয়।

ফলে স্বভাবতই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধকে মানবাধিকার ও আইনের চোখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। অর্থাৎ পুলিশের দায়িত্ব হল যেখানে অপরাধীকে কেবল বিচারের আওতায় আনা, বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা, সেখানে পুলিশই তাকে কোন বিচার ছাড়াই মেরে ফেলেছে। ফলে এখানে বিচার বা শাস্তি প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হয়েছে বলে এটা বিচারবহির্ভূত এবং তা সাদা এক হত্যাকাণ্ড। যদিও সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশে যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, এর গল্প কিন্তু একই- ক্রসফায়ার। যেমন ভারতে একই অর্থে তবে অন্য প্রচলিত শব্দ হল – এনকাউন্টার। যা হোক শব্দে কিছু যায় আসে না, ঘটনাটা সারমর্মে একই।

বিগত অক্টোবর মাসের ১ তারিখে এক মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী (ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার শাখা) রবার্ট বারশিনস্কি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান ব্যক্ত করছিলেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্টো ফল দিতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্যের বিস্তার গত ০৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। আমি সেখান থেকে একটু লম্বা অংশ টুকে আনছি। রবার্ট বারশিনস্কি বলেন, “৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নানা বিতর্ক হয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ খুবই বিপজ্জনক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ নিহত হয়। কিন্তু তার পরও দোষী ব্যক্তির ক্ষতি করা বা তাকে আঘাত করার বিষয়টি কখনোই মেনে নেয়া হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই সম্ভব, তখনই দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়। কারণ, তাহলেই ওই নেটওয়ার্কের সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের অবস্থান হলো, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে”।
তিনি আরও বলেন, “ক্রসফায়ার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ কারণ হিসেবে প্রায়ই বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করা হয়। এতে সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না, আসামি জামিনে বের হয়ে যান বলে বিভিন্ন যুক্তি দেয়া হয়। এ সম্পর্কে রবার্ট বারশিনস্কির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এ দেশের সাক্ষ্য আইন ঔপনিবেশিক আমলের। শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ওপর নির্ভর করায় বিচারপ্রক্রিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে আসামির ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, আইনগুলোর আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে”। আশা করি পাঠক যা বোঝার বুঝেছেন। আমেরিকান মন্ত্রীর বক্তব্য মিথ্যা নয়। তবে তাঁর বক্তব্য তুলে আনায় তাঁকে ও আমেরিকাকে কোন ‘ন্যায়ের আদর্শ প্রতীক’ বলে ধারণা করা ভুল হবে। আর নেপথ্যে বলে রাখি, আমেরিকার এত সাধু সাজার সুযোগ নেই। কারণ র‌্যাব তাদের সরাসরি পরামর্শে আর তাদের আসামিকে বাংলাদেশে এনে টর্চার করে স্বীকারোক্তি বের করার জন্যই গঠন করা হয়েছিল। কারণ তাদের দেশে রেখে টর্চার করলে তা সংশ্লিষ্ট ওই অফিসারের জন্য বেআইনি ও ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে। আমেরিকান পরিভাষায় এটাকে রেনডিশন বলে। ওবামা রেনডিশন করার প্রশাসনিক অভ্যাস তুলে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু রাখতে পারেননি।
তবে আরেক বাস্তবতা হল, উপরে বাংলাদেশের ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে আমেরিকান বক্তব্য সঠিক। আবার সরকারের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের কথা তুলে এমন বক্তব্যের ভেতর দিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর একটা যেন অথরিটি হিসেবে হাজির হওয়ার সুযোগ নেয়। এটাও আরেক সত্যি। আর তা নেয়ার সুযোগ থাকে এ জন্য যে, জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস তদারকির প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
ফলে হিউম্যান রাইটস ইস্যুটি দু’ধারী তলোয়ারের মতো আমেরিকার হাতে অস্ত্র হিসেবে হাজিরও হয়। এক দিকে আমাদের সরকারগুলো ক্রসফায়ার করার দোষে দোষী। ফলে আমেরিকা সে অভিযোগ সঠিকভাবে তুলে আনে ঠিকই। আবার সেটা তুলে বাংলাদেশের ওপর নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে একে ব্যবহার করে এ কথাও সত্যি।

প্রেসিডেন্ট দুতের্তের ক্ষেত্রে তার ড্রাগ-ডিলারের হত্যার বেলায় একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ প্রসঙ্গে তার সাথে দেখা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তার উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর আগে দীর্ঘ দিন ধরেই ম্যানিলার ক্যাথলিক চার্চ, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু সেগুলোকে দুতের্তে সবলে উড়িয়ে দিতে আর উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। দুতের্তের সাথে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাতের কথা ছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর, লাওসের ভিয়েনতিয়েনে আসিয়ান জোটের সভায় দুই প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সময়ে, সাইডলাইনে বসে। কিন্তু ওবামার সাথে কথিত সেই সাক্ষাতের আগেই দুতের্তে এক কাণ্ড করে বসেন। লাওস রওনা দেয়ার আগেই তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে সেই কান্ড করেন। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, “ওবামা কি তাঁকে বিচারবহির্ভূত ড্রাগ-ডিলার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবেন না”- এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। সম্ভবত দুতের্তে ওবামার সাথের ওই সাক্ষাৎ এড়াতে চেয়েছিলেন তাই ওই রকম জবাব। তিনি অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় ওবামার মাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে কথা বলেছিলেন; যেটা স্বভাবতই কোনো প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে মানানসই নয়। তবে কোন প্রেসিডেন্ট অবশ্যই ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এমনকি সে ক্ষেত্রে যদি “তিনি ক্ষুব্ধ” একথাটাই মুখে বা আচরণে এতটুকুই প্রকাশ করেন- এটাই তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু তিনি বলেন, “তার (ওবামার) সম্মান বজায় রেখে কথা বলা উচিত। আমার ওপর যেন যা মনে চায় প্রশ্ন আর স্টেটমেন্ট ছুড়ে না দেয়। এমন হলে, বেশ্যার ছেলে, ওই ফোরামে আমি তাকে ছিঁড়ে ফেলব। উনি যদি তা করেন তবে আমরা তাকে শুয়োরকে যেমন করে কাদায় পুঁতে তেমন করে পুঁতে ফেলব”।

আচ্ছা, দুতের্তে কি হঠাৎ এমন কথা বলছেন; নাকি তিনি এমনই? তা বুঝতে পেছনের কিছু তথ্য দেখা যাক। এর আগে তিনি ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের দাভাও শহরের মেয়র ছিলেন। ড্রাগের সমস্যা আর খুনোখুনি সেখানে লাগাতার ছিল। সেখানেও তিনি ড্রাগ ডিলারদের সম্পর্কে বলতেন তারা “আরো মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদকপাচারকারীকে বের করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাবো”। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সেকালের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি বলছিলেন, ‘যদি আমার সিটিতে আপনি অবৈধ কাজ করেন, যদি আপনি ক্রিমিনাল হন, কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হন, যারা শহরের নিরীহ লোকদের শিকার বানায়, তবে যতক্ষণ আমি মেয়র আছি ততক্ষণ আপনি আমার হত্যার বৈধ টার্গেট।’ এটা ২০০৯ সালে মেয়র হিসেবে তার বয়ান। শেষ বাক্যটি মারাত্মক আপত্তিকর। এখানে আইনি লুকোছাপা তিনি রাখেননি। একেবারে প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় সরাসরি হত্যা করার কথা বলছেন। এই বাক্যটাই তার অভিযুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ওদিকে প্রায় একই ভাষায়, একই কারণে ইইউকে এবং জাতিসঙ্ঘকেও তিনি গালাগালি করেন।
স্বভাবতই দুতের্তের খারাপ গালাগালির পরে ওবামা সেই সাক্ষাৎ বাতিল করেন। কিন্তু পরের দিন পরিস্থিতি রিভিউ করার পর (খুব সম্ভবত তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের কারণে) দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে স্যরি বলে ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের সাথে নিরবচ্ছিন্ন কৌশলগত মিত্র ছিল আমেরিকা। ফিলিপাইন-আমেরিকান সেই সম্পর্ক এখন খারাপ থেকে চরম খারাপ হয়ে এখন প্রায় পুরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা দুই আলাদা দিনে দুই অংশ ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় – ২৩ অক্টোবর ২০১৬ প্রথম বা চলতি পর্ব অনলাইনে (প্রিন্টে ২৪ অক্টোবর)। এখানে সেই লেখা পর পর দুই পোষ্ট আকারে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। এটা প্রথম পর্ব।] পরের পর্ব আগামিকাল পরশুর মধ্যে।

শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
গৌতম দাস
১৮  জুন ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1jc

 

‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর

চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর
গৌতম দাস

১৪ মার্চ ২০১৬, সোমবার
http://wp.me/p1sCvy-RW

শিরোনাম দেখে ভুল পড়ছি মনে হতে পারে কিন্তু আসলে ঠিকই পড়েছেন। ভারত ও চীনের সম্পর্ক কেমন, এ প্রসঙ্গে কোনো এভারেজ বা আম ভারতীয়কে বলতে বললে তার মুখ থেকে খুবই তিক্ত বক্তব্য শুনতে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বক্তব্য এমন তিক্ত-বিষাক্ত হওয়ার পেছনে দায়ী ভারতের উপস্থিত মিডিয়ার ব্রিফিং। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ আর তা এমন শক্তই। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স এর ব্যাপারে ভারতের মিডিয়া খুবই অনুগত, যেটাকে একেবারেই বাছবিচারহীন আনক্রিটিক্যাল বলে অনেকের ধারণা। এটা ঠিক-বেঠিকের প্রশ্ন নয়, ফ্যাক্টস। এই সূত্রে অনুমান করা যায়, ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের কৌশলগত অবস্থান সম্মত মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ। ফলে আমরা সর্বক্ষণ শুনতে পাই ভারতের প্রায় সব মিডিয়াই প্রপাগান্ডা করে বলছে- “চীন তাদের চার দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে”। কিন্তু বাস্তব অবস্থা কি একেবারে ঠিক এ রকমই? সেটা এবার পরীক্ষা করে দেখব।
কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এর অবস্থা ভয় পাওয়া পথিকের মত; যে চলতি পথে  নিজেকেই সাহস যোগানোর জন্য উঁচুস্বরে গান ধরে থাকে। কারণ এভাবে গান ধরলে নিজেকেই দুজন মনে হয়।  “চীন আমাদের ভারতকে এভাবে অথবা সেভাবে ঘিরে ফেলছে” এই নিয়মিত প্রচারের সাথে এই পত্রিকা সম্প্রতি এবার আরো খবর ছড়াচ্ছে- ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন বা মিয়ানমার- এই রাষ্ট্রগুলো ভারতের সাথে নৌ-সামরিক নানান তৎপরতা বা চুক্তিতে যুক্ত হচ্ছে ইত্যাদি। খবরগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে আস্থার প্রপাগান্ডায় নেয়ার মতো করে সাজানো, সন্দেহ নেই। তবে উপরে যে দেশগুলোর নাম নিলাম, এদের মধ্যে কমন দিকটি হল, এরা বেশির ভাগই চীনের পড়শি রাষ্ট্র। সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশের এবং চীন থেকে সমুদ্রপথে বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চীনের একমাত্র প্রবেশদ্বার দক্ষিণ চীন সাগর। প্রবেশমুখের চারপাশের প্রায় সব পড়শি-রাষ্ট্রের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্ক বিরোধ শুরু হয়ে আছে, চলছে দু-তিন বছর ধরে। এর ফলে চীনের পড়শি-রাষ্ট্রগুলোর ক্ষোভ-অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নেতা হয়ে সার্ভিস দিতে চায়, এমন ধারণা হাজির করলে অর্থনীতিতে উঠতি চীনের বিপরীতে পড়তি আমেরিকার এ অঞ্চলে কৌশলগত দাম-গুরুত্ব বাড়বে বলে মনে করে সে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরে এটা একটা টেনশন জাগানোর কারণ। এছাড়াও এমন টেনশন জেগে ওঠার পেছনের আরও কারণ এই সাগরে এমন সাতটি দ্বীপ আছে, যেগুলো জেগে ওঠার পথে বা উঠেই গেছে; চীন যার সবগুলোই নিজের বলে দাবি করে আসছে এবং ইতোমধ্যেই সব দ্বীপে কম-বেশি স্থাপনা গেড়েছে। এ ছাড়াও এই সাগরের নিচে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রচুর। অপর দিকে আবার জ্বালানি তেলের উৎস মধ্যপ্রাচ্য এলাকা আরব সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত চীনে প্রবেশের এই অঞ্চল প্রসঙ্গে পরিসংখ্যান বলছে, এখানে বছরে সব মিলিয়ে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য বা পণ্য জাহাজের চলাচল হয়ে থাকে। তাই চীন চায় এই এলাকাকে নিজের মুক্তাঞ্চল হিসেবে দেখতে। চীনের চোখে ভারত বা আমেরিকা- এদের নিজ রাষ্ট্রীয় সীমানার আশপাশের অঞ্চল এটা নয়। ফলে এই অঞ্চল এ দুই রাষ্ট্রের সরাসরি নিজেদের প্রত্যক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট, এমন নয়। তবুও আমেরিকা ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ নামের এক তত্ত্ব আউড়িয়ে এ এলাকার সবখানেই নিজের অবাধ চলাচলের অধিকার ফলাতে চায়। এর বিপরীতে চীনের স্পষ্ট আপত্তি ও অবস্থান হল, নিজ সমুদ্রসীমানার ১২ মাইলের মধ্যে কেউ প্রবেশ করলে বা উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করলে তাকে চীন সামরিকভাবে প্রতিরোধ করবেই। কারণ চীনের যুক্তি, এই ১২ মাইল নিজের ‘একান্ত অঞ্চল’ বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এ ছাড়া চীনের ব্যাখ্যায় এটা খুবই সেনসেটিভ এলাকা এ জন্য যে, নিজ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এখানে ফ্রিডম অব নেভিগেশন যুক্তিতে প্রবেশ করে আমেরিকার ফ্রিডম টেস্ট করতে চাওয়া খুবই বিপজ্জনক। কারণ, আমেরিকা ভুলচুকে ও অনিচ্ছায় ১২ মাইলের ভেতরে প্রবেশ করে ফেললে প্রতিক্রিয়ায় চীনের আমেরিকাকে আক্রমণ করে বসতে হতে পারে। কারণ, এখানে স্থাপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনেক ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন আর তুলনায় দূরত্ব মাত্র ১২ মাইল।
ওইদিকে আমেরিকা শুধু চীনের পড়শিদের নেতা হতে চায় তাই নয়, সে চায় ভারতও এ কাজে একইভাবে আমেরিকার পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিক।
কথা শুরু করেছিলাম দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে ভারত-চীন সম্পর্কের চেয়েও পেছনের আরো বড় ক্যানভাস ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যকার সামরিক টেনশন কেমন, তা নিয়ে। এ কথা দুনিয়ার কেউ অস্বীকার করবেন না যে, এমন সামরিক টেনশনের কোনোই বাস্তবতা নেই, তা নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে যদি কখনো কোনো অছিলায় সামরিক সঙ্ঘাত লেগেই যায়, তবে সম্ভাব্য সেই বাস্তবতা হবে ভারত-চীনের সীমান্তে অচিহ্নিত থেকে যাওয়া বেশ কিছু অংশের কারণে। যদিও ভারত-চীন দু’পক্ষই বিষয়টি নিয়ে কোনো টেনশন যেন না বাড়ে, সে লক্ষ্যে যৌথ মাপামাপি আর ডায়লগের ভেতর দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলতে চায়। এমন যৌথ ইচ্ছা প্রকাশ করে বিগত কংগ্রেস সরকারের আমলে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইতোমধ্যেই একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দু’পক্ষের নির্বাহী প্রধানের ঘোষিত স্থায়ী প্রতিনিধি পর্যায়ে সরাসরি এ নিয়ে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের কাজ চলছে। এ ছাড়াও কখনো আকস্মিক কোনো ঘটনায় এবং অনিচ্ছায়ও কোনো সামরিক টেনশন যেন ছড়িয়ে না পড়ে সে লক্ষে মাঠপর্যায়ে হটলাইন টেলিফোন যোগাযোগ সুবিধা চালু করা হয়েছে ওই চুক্তির ফলে। স্বভাবতই এসবের অর্থ উভয় পক্ষ এ ধরনের এক সীমান্ত সমঝোতা চুক্তি করতে আগ্রহবোধ করেছিল আগে থেকেই। এই আগ্রহবোধের তাগিদ অনুভবকে কেবল একটা দিক থেকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব; সেটা হল উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিরাট সম্ভাবনা আছে, যেটা দু’পক্ষই স্বীকার করে ও কাজে লাগাতে চায়। বিগত ১২ বছরে বিশাল পণ্য লেনদেন বিনিময়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে, যার মোট পরিমাণ এখন ৭০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

আগ্রহবোধ বিষয়টিকে আরেকটু বিস্তার করে বলা যায়। যেমন প্রথমত, দু’টি রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে সামরিক-অসামরিক কোনো টেনশন থাকলেই তা আমাদের মনে পুরনো ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় ছেয়ে থাকা আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ঠাণ্ডাযুদ্ধ’ বা ‘কোল্ডওয়ার’ দিয়ে তা বুঝতে হবে এই অভ্যাস একেবারে বাদ দিতে হবে। বরং পরামর্শ থাকবে, ঠাণ্ডাযুদ্ধ দিয়ে কোন কিছুকে বুঝার মানসিকতা আমরা জীবনেও চিরতরে যেন ত্যাগ করি, এদিয়ে আর যেন কোনো কিছুকে বুঝার চেষ্টা না করি। কারণ, ইতোমধ্যেই এমন এক বড় ফারাক এখানে ঘটে গেছে, যাতে কোল্ডওয়ার ধরনের শর্ত-পরিস্থিতি দুনিয়ায় আর কখনো কোথাও ফিরে আসবে না। বরং আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করতে পারি যে, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো একই কমন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের মধ্যকার সম্পর্কিত দুই অর্থনীতি ছিল না। আরো সোজা ভাষায় বললে সে সময়ে এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পারস্পরিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কই ছিল না, বরং প্যারালাল এমন দুটো জোটের অর্থনীতি হয়ে তারা তখন চালু ছিল, যাদের মধ্যে আবার কোনো বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন নাই। ফলে পরস্পরের মধ্যে সহজেই এমন শত্রুতা কল্পনা করা খুবই সম্ভব ছিল যে, পরস্পর পরস্পরকে অবলীলায় দুনিয়া থেকে নির্মূল করার কথা ভাবতে পারে এবং তাতে একজন অপরজনকে নাই করে দিলেও পারস্পরিক কোনো পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্ক নেই বলে এতে বেঁচে থাকা অপর রাষ্ট্রপক্ষের অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধে বিরোধীকে নির্মূল করার মতো যেকোনো চরম পর্যায়ে নেয়ার বাস্তবতা ও সুযোগ তখনো ছিল। কিছু আজ সারা দুনিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের সাথে যতই স্বার্থবিরোধ থাক, তারা আবার সবাই একই গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হয়ে পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত সম্পর্কিত হয়ে আছে। এটাই সবচেয়ে প্রভাবশালী বাস্তবতা। ফলে এখানে রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধ প্রবল আছে এবং তা থাকলেও কিন্তু সে বিরোধকে কোনো চরম দিকে নেয়ার সুযোগ নেই। ফলে বিরোধকে বরং নির্মূল বা চরমে না নিয়ে, এই পথ ছাড়া অন্য আর যেকোনো পথ অবলম্বন করে বিরোধ লড়াইয়ের মীমাংসা খুঁজে নেয়াই মঙ্গল। কারণ, এখন অন্যের নির্মূল মানে নিজেরও বিরাট ক্ষতি। অতএব, একদম সারকথায় ভারতের মিডিয়া যতই তারস্বরে চিৎকার করুক যে ‘চীন ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলল’ তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের মধ্যে এমন সীমান্ত সমঝোতা চুক্তির পক্ষে উভয় রাষ্ট্র আগ্রহ দেখাতে পারা সম্ভব। এবং সেটাই হয়েছে।
কিন্তু ২০১৩ সালের শেষে ওই চুক্তির পরও এখন “চীন ভারতকে মুক্তামালার মত চার দিক থেকে ঘিরে ফেলছে” ভারতের এই প্রপাগান্ডায় কোনো ভাটা পড়েনি। এটাকে ভারতের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মিডিয়া প্রসঙ্গে কৌশলগত অবস্থান বলে মনে করা যেতে পারে। এছাড়াও এর পেছনে আর দু’টি কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে: এক. সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে তুলনায় চীনের থেকে ভারত পিছিয়ে আছে। অস্ত্রের ও বাহিনীর সক্ষমতা বিষয়টি যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতির সক্ষমতার বা মুরোদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, সামরিক ব্যয় জোগানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলে তবেই তা ওই রাষ্ট্রের অস্ত্র ও বাহিনী মজুদের সক্ষমতা হিসেবে হাজির হতে পারে। এই বিচারে ভারত চীনের চেয়ে পিছিয়ে আছে; ভারত তুলনায় ছোট অর্থনীতির বলে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও যেটুকু ব্যয় জোগানোর সামর্থ্য ভারতের হাতে আছে, তার সমতুল্য অস্ত্রশস্ত্র কেনা বা উৎপাদন করতে পারার সক্ষমতার দেখানোর ক্ষেত্রে ‘ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক’ বেশ কিছু ঘাটতি ভারতের আছে। এসব সমস্যা ঢেলে সাজানোর জন্য সময়ে ভারতের মিডিয়ায় তা খোলাখুলি আলোচনাও হতে দেখা গেছে। এসব সমস্যা ভারত দ্রুত আপ্রাণ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে এই অবস্থায় প্রপাগান্ডা দিয়ে অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে ধরে রাখার উদ্যোগ এটা হতে পারে। আর পয়েন্ট দুই. ১৯৬২ সালে নেহরু আমলে চীন-ভারত এক প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হয়েছিল, যে যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় হার ভারতের কাছে ট্রমার মতো এখনো মানসিক বিষয় হয়ে আছে বলে মনে করা হয়। যেটা একালে সামরিক সক্ষমতা এখন অর্জনে থাকলে বা তৈরি হলেও নিজের ওপর আস্থা বিষয়ক এক খচখচি থেকেই যায় ধরনের। এ ছাড়া সবার উপরে, মিডিয়ার সব কিছুকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে দেখার এক প্রপাগান্ডা তো আছেই। যার পরিণতিতে সব আলোচনায় হয়ে যায় যেন দুই ছাপোষা কেরানির রাস্তার ধারে বসে টংয়ের চা দোকানের আলাপ; যারা জাহাজের খবরাখবর নিয়েও আলাপ করছে, রাজা-উজির মারছে এসব। আনন্দবাজার পত্রিকার খবর উপস্থাপনে এই ভাষা ও ইঙ্গিত দিয়ে লেখা হয়। সম্ভবত তারা মনে করে, এটাই সাধারণ মানুষকে বোঝানোর ভাষা, তরল করে লেখার ভাষা। নিজের পক্ষে ন্যায্যতা টানার উপায় হিসেবে তারা হয়তো এমন বলবে, কিন্তু তবু এটা অন্যায্য যুক্তি তাই তা অপ্রতিষ্ঠিতই থেকে যাবে।
আমেরিকা চায় ভারতও আমেরিকার মতো ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ এর অধিকার টেস্ট করতে আমেরিকার সাথে যৌথভাবে এ অঞ্চলে টহল দিতে এগিয়ে আসুক। এ কাজে আমেরিকা ভারতকে উসকানিমূলক প্রস্তাব দিয়েছিল। সম্প্রতি গত ১০ ফেব্রুয়ারি বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে এ কথাই ছেপেছে। রয়টার্স বলছে, ‘আমেরিকা চায় তার আঞ্চলিক বন্ধুরা সবাই চীনের বিরুদ্ধে এমন জোট অবস্থান নিক। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।’ ভারতীয় নেভাল মুখপাত্র রয়টার্সকে এ প্রসঙ্গে জানিয়েছে, ‘ভারতের নীতি হলো অন্য রাষ্ট্রের সাথে একই ফ্ল্যাগ-কমান্ডের অধীনে কোনো যৌথ টহলে ভারতের অংশ না নেয়া। ভারত এখন পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘ ছাড়া অন্য কোথাও কোনো ভিনরাষ্ট্রের সাথে যৌথ টহলে অংশ নেয়নি; না নেয়ার ভারতের এই নীতিতেই সে এখনো অটল আছে।’ এখানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার মনের গোপন খায়েশ প্রকাশিত হয়েছে- এটাই চীনের বক্তব্য। এ নিয়ে চীনের সরকারি নীতিনির্ধারণী বিষয়ক পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ বেশ কয়েকটা লেখা ছেপেছে। ভারত-আমেরিকা-চীন এই ট্রয়কার পারস্পরিক সম্পর্কের দিক নিয়ে আরো কিছু বক্তব্যও সেখানে হাজির করেছে। চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে নামাতে রাজি করানোর আমেরিকান খায়েশ মার খাওয়াতেই চীনের মুখে এই বোল ফুটেছে এমন মনে করা অসঙ্গত হবে না। গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘নিজের অর্থনীতিক বিকাশ-উন্নতির স্বার্থ এবং চীনের সাথে মিলে ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগে ভারতের স্বার্থের দিক থেকে ভাবলে ভারতের কাছে চীন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলের আমেরিকান প্রস্তাবের পাল্লায় পড়ার বিলাসিতা করতে গিয়ে ভারত চীনা সহযোগিতা হারাতে পারে না।’ কথা সত্যি। ভারতের দিক থেকে কথাটির মূল বিষয়- ভারতের কাছে প্রায়রিটি কোনটি। ভারত সঠিকভাবেই ধরেছে, সময়টা এখন পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ভেঙে আমেরিকার বদলে চীনা নেতৃত্বের সাথে মিলে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার সাজিয়ে তোলা। দুনিয়াকে নতুন করে নেতৃত্ব দেয়া। সাজিয়ে ওঠার এই কাজে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ স্পষ্টতই নতুন অর্ডার, নতুন নেতৃত্বের সাথেই। ফলে পুরনো অর্ডারে নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ চীনের সাথে নতুন অর্থনৈতিক অর্ডার গড়ার কাজেই। এ প্রসঙ্গে আমার আগের লেখায় অনেক সময় এই অবস্থানই ব্যক্ত করেছি বটে বিষয়টি নিয়ে এর আগে কখনোই ভারত, আমেরিকা বা চীন কেউ কখনো স্পষ্ট করে মুখফুটে কিছু বলেনি। ভারতও স্পষ্ট না করে বরং আমেরিকাকে এক মিথ্যা ভানের মধ্যে রেখে ফায়দা নেবার চেষ্টা করে গেছে। যেমন আমেরিকান নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্টের ব্যাংক গড়তে গিয়ে এর গঠনকাঠামো রচনা করার সময় চীনের পরে দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার ভারতের হওয়ার ক্ষেত্রে চীনের সম্মতি পেতে ভারতের কোনো অসুবিধাই হয়নি। এবং সম্ভবত সেজন্য এই প্রথম চীনের দিক থেকে গ্লোবাল টাইমস ব্যাপারটিকে পরিষ্কার বাক্য লিখে বলেছে, ‘… ভারত চীনের সহযোগিতা-সম্পর্ক, সমর্থন হারানোর কথা ভাবতেই পারে না।’ বিষয়টির গুরুত্ব লক্ষ করে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাও ১ মার্চ সংখ্যায় চীনের গ্লোবাল টাইমসকে উদ্ধৃত করে এক রিপোর্ট ছেপেছে। এর প্রথম বাক্য হলো, ‘বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলে অংশ নিয়ে চীনের সমর্থন হারানো ভারতের পোষাবে না।’

[লেখাটা এর আগে ৭ মার্চ ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে এখন আপডেট করে ছাপান হল। ]
goutamdas1958@hotmail.com

চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী প্রভাবিত হবে

দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক
চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী এতে প্রভাবিত হবে

গৌতম দাস
১৭ জানুয়ারী, ২০১৬
http://wp.me/p1sCvy-zk

এআইআইবি-চীনের বিশ্ব ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত নাম। সংক্ষেপ ভাঙলে চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের পুরা নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি শুধু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য ব্যাংকই নয়, বলা হয়ে থাকে এআইআইবি জাপান-আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে উঠা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও প্রতিদ্বন্দ্বী। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর রয়টার্স চীনা অর্থমন্ত্রীর বরাতে চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছে, ২০১৬ সালের মধ্য জানুয়ারিতে নতুন ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। এছাড়া ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্স এক রিপোর্টে আরও কিছু অগ্রগতির খবর জানিয়েছে। যেমন- আগেই সাব্যস্ত ছিল এই ব্যাংক ১০০ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত ক্যাপিটাল নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। আর এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ওই ১০০ বিলিয়ন ডলারের ২০ শতাংশ পরিশোধ করবেন, যা পরিশোধিত হওয়ার পথে। এছাড়া ১৭ উদ্যোক্তা সদস্য রাষ্ট্র মোট শেয়ারের মূল্যের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করে ফেলায় এই ব্যাংক (এখানে এখন থেকে ব্যাংক বলতে এআইআইবি বুঝতে হবে) আর নেহাত এক আইডিয়া বা কল্পনা নয়, এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই আমেরিকা এই ব্যাংকের জন্ম নেয়ার বিরুদ্ধে যা যা বাধা দেয়া সম্ভব এর সবই করেছে। শুরুর দিকে তা কিছুটা কাজও করেছিল। এশিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অথবা আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের সম্পর্ক রেখে চলে এমন রাষ্ট্রগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ইত্যাদির ওপর আমেরিকার এ কূটনৈতিক চাপ ভালোই কাজ করেছিল। যদিও এসব রাষ্ট্র নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে বুঝেছিল আমেরিকার মুখ চেয়ে এই ব্যাংক উদ্যোগের বিরুদ্ধে নিরাসক্ত ভাব নেয়া, দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখানোটা নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে। তাই প্রথম বাঁধভাঙার ঘটনাটা ঘটে ইউরোপের নেতা রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি- এ তিনের তরফ থেকে; এরপর এশিয়া আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখেনি।নে নেতৃত্ব কথাটার অর্থ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার কোন রাষ্ট্র। স্বভাবতই এর ফলে গঠন ও পরিচালনে সে রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসে গেছে যে, এই ব্যাংকের অপারেশন বা কার্যকারিতা শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে এ মাসেই, ১৬-১৮ জানুয়ারি। এই উপলক্ষে আমাদের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত ইতোমধ্যেই চীন রওয়ানা দিয়েছেন।

ওদিকে নতুন এক ইস্যু “দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক” – কয়েক বছর ধরে আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করে সব প্রসঙ্গের মধ্যেই বিঁধতে দেখা যাচ্ছে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর-সমুদ্রপথে চীনে পৌছানোর একমাত্র প্রবেশদ্বার। আসলে এই সাগর কেবল চীনের দক্ষিণে নয় বরং পূর্ব অবধিও বিস্তৃত। পূর্বের অংশকে আলাদা করে পূর্ব চীন সাগর বলা হয় যদিও কিন্তু সাগরের দক্ষিণ অংশ আর পূর্ব অংশ এ দুইয়ের মাঝে কোনো দেয়াল বা বিচ্ছেদ নেই। আর চীনের প্রবেশদ্বারের একেবারে মুখ এলাকা হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর অংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশপাশে পড়শি রাষ্ট্রের ভিড়ভাট্টা দক্ষিণ দিকে বেশি। তাই দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কটা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক নামেই পরিচিত। এই দক্ষিণ-পূর্ব কোণটা ছাড়া চীনের সীমান্তের বাকি সব দিক দিয়েই স্থলাবদ্ধ,ল্যান্ড লকড।
কিন্তু নতুন এক ইস্যু আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করতে শুরু করে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর- সমুদ্রপথে চীনের একমাত্র প্রবেশ দ্বার। চীন বাকি তিনদিকেই স্থলাবদ্ধ, ল্যান্ড লকড।

আজ চীন যেমন অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার বিভিন্ন বিবেচনার দিক থেকে আমেরিকার তুলনায় ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি ১৮৮০ সালেই আমেরিকান অর্থনীতি সাইজের দিক থেকে তৎকালীন কলোনি মাস্টার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব বিবেচনাতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকা উঠে যায়। সেকালে উত্থানের যুগে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রের সমুদ্রপথের প্রবেশে আশপাশের সব সমুদ্র অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে এ ঘটনার সঙ্গে এর নিরাপত্তার প্রশ্নটাই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে বাধাহীন, ভয়হীন ‘বস্নুওয়াটার’ এলাকায় বয়ে যাওয়ার চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা রাষ্ট্র যে কোনোভাবে হোক নিশ্চিত করাকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে। আজ চীনের প্রবেশপথ দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের অবস্থানও সে রকম। সে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবাধ নৌবাণিজ্য জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে সেনসিটিভ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ দক্ষিণ চীন সাগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক দ্বীপের মালিকানা দখলে নিতে ও রাখতে মারমুখী হয়ে উঠেছে। আর তা থেকে সামরিক-কূটনৈতিক টেনশন মারাত্মক। জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ইত্যাদির সঙ্গে ছোট-বড় দ্বীপ মালিকানা বিরোধ সবার সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে আমেরিকা বিরোধে বিরোধী রাষ্ট্রকে তাল দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ শব্দটা হয়ে উঠেছে দ্বীপ মালিকানা বিরোধের প্রতীক। চীনা নেতৃত্বের এআইআইবি উদ্যোগে যোগ দিতে অন্তত অংশগ্রহণে দ্বিধা করার ক্ষেত্রে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ বিষয়টি অনেকের কাছেই তাই একটা ইস্যু।

US in 1880
আমেরিকান এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে অনুষঙ্গ হিসেবে ওই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সমুদ্র-চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া জাহাজের বাধাহীন, ভয়হীন ‘ব্লু-ওয়াটার’ নেভিগেশন এলাকা পাবার চাহিদা  ও নির্ভয়ে জাহাজ চলাচলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ কারণে  দুনিয়াতে অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া যেকোন রাষ্ট্র এ বিষয়টাকে যে কোনোভাবে হোক নিজের জন্য নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে।
আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ফিলিপাইন- দ্বীপ মালিকানা বিরোধে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ এ রাষ্ট্রের কাছে একটা ইস্যু। উদ্যোক্তা সদস্য হওয়ার স্বাক্ষর সে করেছে; কিন্তু বাকি আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করতে এ ব্যাংক উদ্যোগে সদস্য হিসেবে ভাগে পাওয়া শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতে এত দিন সে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। যে চীনের সঙ্গে দ্বীপ মালিকানা নিয়ে তার বিরোধ তুঙ্গে যাচ্ছে, সেই চীনের উদ্যোগেই এআইআইবি ব্যাংকে যোগদান শেয়ার মালিকানা ও সদস্য হওয়া কি ঠিক হচ্ছে- এ ছিল ফিলিপাইনের দ্বিধার সুনির্দিষ্ট বিষয়।
ফিলিপাইনের জন্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর শেষদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫। আমেরিকান অর্থনৈতিক বা গ্লোবাল পুঁজিবাজারবিষয়ক ম্যাগাজিন বস্নুমবার্গ ৩০ ডিসেম্বর জানিয়েছে, ফিলিপাইন সরকার পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিজের ভাগের ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কেনার অর্থ ৫ বছরে যা পরিশোধযোগ্য তার অর্থ জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৩০ ডিসেম্বর এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ফাইলে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ফিলিপাইনের জন্য সিদ্ধান্তটি কেন এবং কত কঠিন তা বোঝা যায় পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এর সপক্ষে যেসব বিবেচনা অর্থসচিব তুলে ধরেছেন তা থেকে। ফিলিপিনো অর্থসচিব বলছেন, ‘সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপস্থিত বহু রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্বব্যাংক, এডিবি) ভূমিকার দিক থেকে এআইআইবি এক সহায়ক ও পরিপূরক এবং এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্রতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে এ প্রতিষ্ঠান আস্থা রাখার মতো এবং আমাদের সে আস্থা আছে।’ বোঝা যাচ্ছে, ফিলিপাইনের ঋণ চাহিদা প্রবল আর তা পূরণে এক ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সে এআইআইবিকে দেখে থাকে।
একজন চীনা মুখপাত্রকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সদস্যদের সবার অংশগ্রহণে লেখা ওর গঠনপ্রণালিতে যেভাবে লেখা আছে এআইআইবি নিজের অপারেশনের সময় সেটা অনুসরণ করেই ফিলিপাইন লোন পাবে কিনা তা নির্ধারিত হবে, অন্য কিছু নয়।
মনে হচ্ছে, চীনের দিক থেকে এআইআইবির বিষয়াদিতে বাইরের কোনো বিবেচনা নয়, ব্যাংকের নিজস্ব গঠনপ্রণালি ও রুল অনুসরণ করে চলতে চায় চীন। এখন দেখা যাক, বাস্তবে চীন সেটা কতটা কীভাবে করে।

দুইঃ কাপলান ও দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক
দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে আগেই বলেছি, কোনো রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে থাকলে ওর সমুদ্রপথে প্রবেশদ্বার সেনসেটিভ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক ইস্যু হয়ে যায় সেটা। এর মূল কারণ, সমুদ্রপথে জ্বালানি তেলসহ কাঁচামালের আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি নিরাপদ ও অবাধ রাখতে হয়। বাণিজ্য-নিরাপত্তার স্বার্থ বলে এটা সামরিক স্বার্থও। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, এই সামরিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ অন্যের দান, দয়াদাক্ষিণ্য, আইনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে রাখতে কোনো রাষ্ট্রই পারে না।
মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেমন লজিক র‌্যাশনালিটি বা আইনের দ্বারা ন্যায্য বলে সাব্যস্ত  হওয়ার অপেক্ষায় ছেড়ে দিয়ে রাখা যায় না, কেউ রাখতে পারে না চীনের কাছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর একক রুস্তমি করতে চাওয়া ঠিক তেমনি। এই ব্যাপারটাকে প্রতীকীভাবে ধরে এক নতুন শব্দ চালু হয়েছে ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’।
সাধারণত সাগর-উপসাগর বলতে আমাদের কল্পনা হলো, যার অন্তত একটা দিক, সাধারণত তীর বা উপকূলের উল্টো দিক অসীম আর অবারিত। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকেই চীনের নানা পড়শি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড।
আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের অধীনে জন্ম নেওয়া সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের রেওয়াজ অনুসারে রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা টানা ও মানা হয়ে থাকে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকের প্রায় সব পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সমুদ্রসীমা বা জেগে ওঠা দ্বীপের মালিকানাগত বিরোধ হাজির হয়েছে ও চলছে কয়েক বছর ধরে। পূর্ব চীন সাগরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মালিকানা নিয়েও জাপানের সঙ্গে বিরোধ-বিতর্ক আছে; গত বছর যা তুঙ্গে উঠেছিল।
এখন সার করে বললে চীনের জন্য ইস্যুটা হলো, লজিক আইনের ঊর্ধ্বে, নৌ-বাণিজ্য জাহাজের অবাধ চলাচলের স্বার্থ। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, রেওয়াজ, সালিস ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিরোধ মীমাংসার পথও একটা বাস্তবতা। চীনের জন্য এই দুই সত্য সংঘাতময়, বিরোধাত্মক। ফলে চীনকে দেখাতে হচ্ছে কতটা সৃজনশীল হয়ে সে এই দুই সত্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত বিরোধ মীমাংসার ফর্মুলা হাজির করতে সক্ষম হয়। চীনের নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জটি এখানেই।
আমেরিকায় থিংক-ট্যাংক বা চিন্তার দোকানের শেষ নেই। আমেরিকা দুনিয়ায় রুস্তমি করে চলেছে মূলত এদেরই বদৌলতে। এই দুনিয়ার তেমনই এক শেঠ রবার্ট ডি কাপলান। নামের শেষ অংশ দিয়েই বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনে। ২০১৪ সালের মার্চে তার লেখা একটা বই প্রকাশিত হয়েছে : এশিয়ার ফুটন্ত কড়াই : দক্ষিণ চীন সাগর ও শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরের দিন শেষ।
ওই বইয়ে তিনি চীনের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে চীনের সপক্ষে এক শক্ত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যার শিরোনাম, “বেইজিংয়ের ক্যারেবিয়ান লজিক”।
কাপলান প্রথমত আমেরিকার উত্থান ইতিহাসে গিয়েছেন। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আজ চীন যেমন প্রায় সব বিবেচনায় আমেরিকাকে ক্রমে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে ১৮৮০ সালে আমেরিকান অর্থনীতি আকারের দিক থেকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ের মধ্যে সব বিবেচনায় ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার ওপরে আমেরিকা উঠে যায়। এই উত্থান পর্যায়ে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রে সমুদ্রপথের প্রবেশের ক্ষেত্রে লাগোয়া প্রতিটা সমুদ্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
সেকালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুরাষ্ট্র ছিল ইউরোপ; যাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমেরিকাকে পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসতে হয়েছে।
সমুদ্রপথে মেক্সিকো উপসাগরসহ বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে যেন ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রের অবাধ আনাগোনা না থাকে, ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে দূরে রেখে তা কেবল যেন আমেরিকার জন্য অবারিত থাকে- ১৮৮০ থেকে প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এই নীতি অনুসরণ করেছেন।
কাপলান আমেরিকান সেই নীতির রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, আমেরিকা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উত্থিত হওয়ার দিন ছিল সেগুলো- ফলে আমেরিকা বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান নৌ-অঞ্চলে নিজের জন্য ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’ নীতি অনুসরণ করেছিল। সেকালে তা ন্যায্যতা পেলে আজ দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যা করছে, তা কেন পাবে না?
কাপলানের এই লজিকের পক্ষে এক বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল গত বছর। দক্ষিণের মতোই পূর্ব-চীন সাগরের দ্বীপ মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ আছে। আমেরিকা গত বছর এই বিরোধকে ধারালো করতে জাপানকে তাতিয়ে তুলছিল। একপর্যায়ে এটা চরমে যায়।
এই দেখে ওয়াল স্ট্রিট কারবারিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, শঙ্কিত ও বিরক্ত হয়ে ওঠে। পরের সপ্তাহের লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার কাভার স্টোরিতে তা উঠে আসে। ওখানে দুটো পয়েন্ট ছিল : চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে, কেউ এমন পরাশক্তি হলে ব্লু-ওয়াটার ধরনের ইস্যুতে তার পেশি দেখানো স্বাভাবিক এবং এটা আমাদের নিচু গুরুত্বে দেখা উচিত। কারণ, আমরাও এমন করেছিলাম। এর চেয়েও বড় কথা, ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দুনিয়াব্যাপী মহামন্দার ভেতর আমরা এখনো আছি। এ সময়ে চীনের মতো রাইজিং ইকোনমি না থাকলে আমাদের অবস্থা আরও করুণ হতো। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিবাদের খাতা খোলার চেষ্টা অর্থহীন ও আত্মঘাতী। এরপর থেকে এই ইস্যুতে জাপান লো-প্রফাইলে চলে যায়। যদিও পুব চীন সাগরের অপর অংশ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুটা এখনো জীবন্ত, বিশেষ করে ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের দিক থেকে।

goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর ০৩ জানুয়ারী সংখ্যায়, দৈনিক নয়াদিগন্তের ০৪ জানুয়ারী সংখ্যায় এবং সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৯ জানুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সেগুলোকে আবার একসাথে এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]