“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

গৌতম দাস

০৩ এপ্রিল ২০১৮,  মঙ্গলবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2r9

কথা সত্য। চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যা অবস্থায় ছিল এর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে, ভারতের ভাষায় এটা রি-সেট (“reset”) হয়ে গেছে। মানে ‘ফির সে শুরু’ হয়ে গেছে। এটা হতে ১৬ বছর লাগল। তাই আজ কথা শেষের দিক থেকে শুরু করে বলব। প্রায় ষোলো বছর পর ভারত মেনে নিল যে এই অঞ্চলে চীনের ক্ষমতা ও প্রভাব ঠেকানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। সে হার স্বীকার করে নিচ্ছে। তাই সে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছে না, বরং মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে। ভারত মালদ্বীপ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে চীন যেন ভারতের দিকটাও একটু খেয়াল রাখে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ভারত স্বীকার করে নিল যে, আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’ অথবা চীন ঠেকানো বৈদেশিক নীতির যে ঠিকা আমেরিকার কাছ থেকে ভারত এত দিন নিয়ে খেদমত দিয়ে গেছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত এখন তা পরিত্যাগ করছে, ক্ষেমা দিচ্ছে। ফলে চীন যেন ভারতকে এর প্রতিদান দেয় (“it is clear that Delhi expects Beijing to reciprocate”)।

‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।

“India cannot claim sole proprietorship of the region. We can’t stop what the Chinese are doing, whether in the Maldives or in Nepal, but we can tell them about our sensitivities, our lines of legitimacy. If they cross it, the violation of this strategic trust will be upon Beijing,” the official said.

এখানে শেষের রঙিন বাক্যে রঙ দিয়েছি আমি। এই বক্তব্যের অর্থ ও ইঙ্গিতে খুবই করুণ ও অসহায়। ভারত যেন বলতে চাইছে, “এই দুনিয়ার লড়াইয়ে শক্তি আর মুরোদে আমরা হেরে গেছি, তবে পরকালে যেন বিচার হয় তেমন একটা বিচার দিছি”।’ এ ছাড়া দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ ভারতের কোটেড প্যারাগ্রাফের বক্তব্য হল এ রকমঃ – “যেদিন ভারত দেখেছে সে আর দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করে রাখতে ও চীনের মতো শক্তিকে  এখানে ক্ষমতার বিস্তার দেখাতে আসা বন্ধ করতে পারছে না সেদিন সে বুঝে গেছে এসব কিছু নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে চলে গেছে”।

“The days when India believed that South Asia was its primary sphere of influence and that it could prevent other powers, such as China, from expanding its own clout are long gone,” a senior government official told The Indian Express. 

খুবই পরিস্কার ভাষায় বলা অক্ষম অসহায়ত্বের বক্তব্য। যদিও এতদিন এসব প্রসঙ্গে ভারত চাপাবাজি করে বলে রেড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাবাধীন এলাকা, এখানে চীন আসতে পারে না।

এ ছাড়া মালদ্বীপ নিয়ে খুবই পরিস্কার ভাষায় ভারতের আর এক তৃতীয় বক্তব্য আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্টার দাবি করছেন, ওই সিনিয়র অফিসার তাকে বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের গত ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরের সময় তিনি চীনকে জানিয়ে দিয়েছেন, “ভারত মালদ্বীপ থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে মালদ্বীপে ভারতের  হস্তক্ষেপের কোনো সম্ভাবনা নেই”। আর এই বাক্যটাকেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে। On the Maldives, for example, the unusual overture to China was made by none other than Foreign Secretary Vijay Gokhale during his trip to Beijing in February,

অনুমান করা যায়, এখানে ভারতীয় এই স্বীকারোক্তির অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে এভাবে যে, সবার আগে এটা ‘সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল’-এভাবে পরিচয় লুকানো এক বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরটা ছাপবে। এরপর বাকি প্রায় সব লিডিং দৈনিকগুলো সবাই এবার তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ছাপবে। তাই-ই হয়েছে। তবে এভাবে এখানে ছাপা হওয়ার মধ্যে লক্ষণীয় দুটো দিক হল, কোনো মিডিয়াই কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট বা এর রেফারেন্সকে অস্বীকার অথবা অবিশ্বাস করেনি। এমনকি তারা এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বা কোন মুখপা্ত্রকে জিজ্ঞাসা করতে যায়নি। এটাই খুবই  ইন্টারেস্টিং। এর অর্থ  হল বাকি সব পত্রিকা বরং নিজেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে এই খবর ছেপে বলতে চাইছে যে, তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে এই খবর সত্য, তারাও ব্যাপারটা জানে। এ ছাড়া অন্যদিকে ভারত সরকারও মিডিয়াগুলোতে এই রিপোর্ট ছাপা হয়ে গেছে অথচ এই খবরকে অস্বীকার করে কোনো বিবৃতিও দেয়নি। এর অর্থ তারাও পরোক্ষে স্বীকার করছে যে হা এটাই তাদের বক্তব্য।

এদিকে আরেক ইংরেজি দৈনিক – ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, সবার মতো সেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতের রিপোর্ট  ছেপেছিল । তবে সেটা ছাড়াও রয়টার্সের বরাতে সে পরের দিন আরেকটা রিপোর্ট করেছে। শিরোনাম ‘Dalai Lama faces cold shoulder as India looks to improve China ties”। এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে দালাইলামাকে ‘শীতল কাঁধ দেখানোর’ কারণ ভারত বুঝিয়ে বলাতে তিনি ব্যাপারটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, মনে কোনো ক্ষোভ বা আকাঙ্খা নিয়ে দেখেননি। আসলে ঘটনা হল, বেচারা দালাইলামা তার সব কর্মসূচিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বাতিল করে দিয়েছে। আসলে এটা ছিল দালাইলামাদের চীনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের ৬০তম বার্ষিকী পালনের দিন। কিন্তু দিল্লীতে যত অনুষ্ঠান নেয়া হয়েছিল মোদী সব কিছুর পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এমনকি ভারত তাদের থাকতে দিয়েছে এজন্য দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য  সরকারকে “ধন্যবাদ জানাবার কর্মসূচিও” বাতিল করে তা তিব্বতের ধর্মশালায় সরিয়ে নিতে দালাইলামাকে বাধ্য করা হয়েছে। আর সাথে মোদীর সরকারের সার্কুলার জারি করা হয়েছে যে কোনো মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী যেন এদের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে। কারণ চীন মনে করে, দালাইলামা চীনের জন্য খুবই বিপজ্জনক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী। এককথায় বললে চীনকে খুশি করতে, রাখতে ভারত চরমতম মরিয়া অবস্থান নিয়েছে। গত ছাপান্ন বছরে এমন “চীন তোষামোদী” ভারত কেউ আগে দেখেনি। দালাইলামা সম্পর্কে  চীনের মূল্যায়ন ও মনোভাবকে পবিত্র আমানত জ্ঞান ও আমল করে আগলে রাখতে ভারত এখন ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই রিপোর্টের সাথেও নাম প্রকাশ না করে আরও এক সোর্সের বরাতে টাইমস অব ইন্ডিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাপিয়েছে। প্রথমত সেখানে বলা হয়েছে, নাম গোপন রাখা এই সোর্স তিনি নাকি ভারতের চীননীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন উচু ব্যক্তি। তিনি জানাচ্ছেন, “চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে নিয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের আইডিয়া হল, ২০১৭ সাল পর্যন্ত যা যা ঘটে গেছে তা ভুলে গিয়ে পেছনে ফেলে রাখতে চাই আমরা”। “We are moving forward with this relationship, the idea is to put the events of 2017 behind us,” a government source involved in China policy said. অর্থাৎ আর পরিস্কার নিশ্চিত করা বক্তব্য আমরা এখানে পাচ্ছি।

তবে রিপোর্টে প্রত্যক্ষ সরকারি স্বীকৃতি এখনো না দিলেও ভারতের অপর পক্ষ চীন, মানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের রেগুলার ব্রিফিং থেকেও এ বিষয়ে অনেক কিছুর স্বীকৃতি মিলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মুখপাত্রকে (Foreign Ministry Spokesman Lu Kang) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁঁর সেই বয়ানে। “চীন কি সাম্প্রতিক ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের (দালাই লামার সাথে দূরত্ব তৈরিসহ) প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়?” – এই ছিল সেই প্রশ্ন, মুখপাত্র এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেলেন। মুখপাত্র  দালাই লামা শব্দটা এড়িয়ে উচ্চারণ না করে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে জবাবে দেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, তিনি বলেছেন, “সাম্প্রতিক কালে তাদের উভয় পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, চীন-ভারত সম্পর্ক বাধাহীন গতিতে (‘সাউন্ড মোমেন্টাম’ বা ‘sound momentum’) বিকশিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি”।

আসলে আগামী জুন মাস পর্যন্ত চীন-ভারত তাদের বিভিন্ন মন্ত্রিপর্যায়ে (গড়ে সম্ভবত প্রতি মাসে প্রায় দু’টি করে) মিটিং আছে। আর সর্বশেষ জুন মাসে সাংহাই করপোরেশন সংস্থার (SCO, http://eng.sectsco.org/about_sco/) চীনে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সভার সাইড লাইনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাক্ষাৎ হবে।  আর আগামী মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চীন সফর দিয়ে বৈঠকগুলো শুরু হবে। এরপর আছে, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, বাণিজ্য ইত্যাদি।

আগামী জুন মাস পর্যন্ত তৎপরতায় ভারতের লক্ষ্য কী এ দিকে তাকিয়ে বললে এর এক কথায় জবাব হল, মুখ্যত চীনে ভারতের রফতানির বাজার লাভ করতে চায়। ভারত এত দিন চীনের সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে রেখেছিল, আমেরিকার চীন ঠেকানোর নীতি নিজের কাঁধে নিয়েছিল বলে। আর তা নিজের কাঁধে নিয়েছিল বিনিময়ে আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাজার পেয়েছিল বলে। কথাটা ভেঙ্গে সার কথাটা বললে, ভারতীয় পণ্য মূলত রফতানিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে একে আমেরিকার পণ্যের চেয়ে সস্তা ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে নেয়া ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আগের দুই প্রেসিডেন্টের দুই দুই করে টার্মে (মোট ষোলো বছরে) সবসময় আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে (চায়না কনটেইনমেন্ট) প্রাধান্য দিয়ে বিদেশনীতি সাজানো ছিল। তাই তখন ভারতকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা করে ভারতের ভর্তুকির রফতানিকেও অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল যে ভারতের গড় মাথাপিছু আয় কেবল এক হাজার ডলার না হওয়া পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধা বজায় থাকবে। কিন্তু গত ২০১৫ সালে এই শর্ত পূরণ হয়ে গেলেও রফতানি সুবিধা ভারত পেয়ে চলছিল। মোটা দাগে বললে, ট্রাম্পের সাথে আগের দুই আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ভারত-বিষয়ক নীতির ভিন্নতা কী – এভাবে কথাটা তুললে তার জবাব হবে – ট্রাম্প আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে আর কোনো প্রাধান্য না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি উল্টো ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার ওপরে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে’ এই নীতিতে চলতে চাইছেন (যদিও কতটা পারবেন পারছেন সেটা অন্য কথা)। ঠিক এ কারণেই ভারতের “ট্রাম্প রিডিং” হল, ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের আর বাণিজ্য সুবিধা কিছুই পাওয়ার নেই। তাই ভারতের উল্টো দ্রুত চীনের দিকে ও কাছে যেতে পথ বদল ঘটেছে। আর বাণিজ্য সুবিধা এবার চীনের কাছ থেকে পাওয়ার আশায়, ভারত চীনের মন জোগাতে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেয়ার নীতি নিয়ে আগাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি  ৫০ বিলিয়ন ডলারের, (এখন চীনের ভারতে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলার, ভারতের চীনে ১০ বিলিয়ন)। ভারতের লক্ষ্য চীন থেকে কমপক্ষে ৩০ বিলিয়নের রফতানি বাজার লাভ করা। মূলত কৃষিজাত পণ্য রফতানি ভারতের লক্ষ্য।

আমার লেখায় সবসময় বলে আসছি, চলতি আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়া ক্রমেই চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে বদলে যাওয়ার অভিমুখী হয়ে আগাচ্ছে। এই বিচারে চীন হল ‘রাইজিং অর্থনীতি’ এই নতুন অভিমুখের নেতা, বিপরীতে আমেরিকার অর্থনীতি পড়তি দশার। আর এই পরিস্থিতিতে ভারতের ন্যাচারাল অবস্থান ও অভিমুখ হল – চীনের সাথে ও পক্ষে, আমেরিকার বিপক্ষে। আমেরিকা হল অতীত যেখানে চীন হল আগামি – এই সুত্রের মধ্যে ভারতের ভবিষ্যত হল চীনের সাথে মিলে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক অর্ডার শৃঙ্খলা তৈরি।  কিন্তু এতদিন সে কাজ না করে ভারত রিভার্স খেলে বাড়তি নগদ সুবিধা যা পায় তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল। যেন কোন বালক তার নির্ধারিত খেলাধুলার বাল্য বয়েস এক্সটেন্ডেড করে নিয়ে হাসিখেলা আর মজা করে কাটাচ্ছিল। সেটারই এবার পরিসমাপ্তি ঘটল, এভাবে বলা যায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন সিস্টেম নতুন ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে ট্রাম্পের হাতে ও উদ্যোগে ভারত-আমেরিকার আর একসাথে কাজ করার দিন সম্ভবত এখান থেকে পরিসমাপ্তি লাভ করবে। বাস্তব শর্তগুলো (যেমন ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা) ট্রাম্পের হাতে চির নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার পথ নেবে। ওদিকে ভারতের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা যে ভারতের আমেরিকায় হারানো রফতানি টার্গেট বা বাজার ঘাটতি যা হয়েছে তা চীন পূরণ করে দিক, চীনে রফতানির বাজার দিক। মূলত এজন্যই ভারতের চীনের সামনে মরিয়া ও হাটুগাড়া অবস্থায় নিজেকে উপস্থাপন।   চীনও খুব সম্ভবত কিছু বাজার দেবে, বিশেষত ভারতকে আমেরিকা থেকে আলাদা করার তাগিদ চীনেরও আছে। আর ভারত এতই মরিয়া যে, চীনের সামনে ‘নীলডাউন’ অবস্থা। তবে আপাতত সফররত চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী কোনো চুক্তি ছাড়া গতকাল ভারত সফর শেষ করে চীনে ফিরে গেছেন। তবে ভারতকে রফতানি বাজার দেয়ার ‘প্রমিজ’ করেছেন, ভারতের মিডিয়া বলছে। চীনের প্রমিজ বা ওয়াদা সত্যিকারের ওয়াদা, ভারত আস্থা রাখতে পারে, রাখবে। কিন্তু ভারতের কাল থেকেই যেন এটা পেতে চায়।

স্বাভাবিকভাবেই এখন ভারতকে মুখোমুখি হতে হবে চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ” (http://english.gov.cn/beltAndRoad/) – এই ইস্যুতে। সত্যি কথাটা হল, এবার সত্যিকার অবস্থানটা ভারতকে বলতে হবে। সম্ভবত আর ভ্যানিটি  বা মিছা লোক দেখানো অবস্থান আর নয় যে ভারত একনম্বর অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এরকম নয়, বাস্তব সত্য অবস্থান অর্থাৎ তা প্রকাশ করার বিনিময়েই খুব সম্ভবত চীনের কাছ থেকে ভারতকে রফতানি বাজার সুবিধা পেতে হবে। কারণ ভারত নিজেই নিজের মিথ্যা ভ্যানিটি- ‘আমেরিকা আমার পিঠে হাত রেখেছে’, ‘মুই কী হনুরে’- এগুলো তার ভুয়া পরিচয়, ভারত নিজেই তা ভেঙে ফেলে এখন চীনের সামনে নীলডাউন। কাজেই ভুয়া মিথ্যা চাপাবাজির দিন শেষ। সত্যি কথাটা হল আজ শেখ হাসিনা ভোটের কথা চিন্যেতা করে যে উন্নয়ন বা “মধ্য আয়ের দেশের”  তর্ক  তুলেছেন ভারত সেই “লোয়ার মধ্য আয়ের দেশের” (“lower-middle-income” economy ) হয়েছে মাত্র ২০১৬ সালের জুনে। ভারতেরই এক মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, The World Bank has dropped the use of developing nation tag for India in its specialized reports and instead classifies it as a “lower-middle-income” economy in South Asia, a top official has said. ফলে সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি এই হল বলে, অথবা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগে যোগ দিলে সে “চীনের সাবরডিনেট বা অধস্থন অবস্থায় চলে যাবে” এসব কল্পিত গল্পের জগত ফেলে ভারতকে বাস্তবে নেমে আসতে হবে। কারণ বেসিক কথাটা হল, কোন  রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জিনিষটা অবজেকটিভ। একে কেউ চাইলেই সাবজেকটিভলি দাবায় বা অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই স্বপ্নে পোলাও খাওয়া অথবা গল্প প্রচার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।

তবে মিথ্যা ভ্যানিটি বা গর্বের কী দশা হয় এর এক আদর্শ ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। আমেরিকা বা চীনের মত থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খুলে ভারতের স্বার্থ কী হতে পারে তার ষ্ট্রাট্রজিক বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শ তৈরি করার শখ ভারতেরও। কিন্তু এর খরচ?  ২০০৫ সালে বুশের প্রস্তাবে এর খরচের দায় আমেরিকা নিয়েছে। ভারতের ধারণা সে আমেরিকাকে মহাঠকিয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ আমেরিকার উপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছে। আপনার স্ত্রী-সন্তান মানে সংসার প্রতিপালনের খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করতে পারেন আপনি। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন ঐ সংসার আর অচিরেই আপনার থাকবে না। ফলে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো গজিয়েছে হয় ভারতে এনজিও রূপে যার ফান্ড করছে আমেরিকান কোন ফাউন্ডেশন অথবা আমেরিকান কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক এক্সটেন্ডেড হয়ে ভারতে শাখা খুলেছে। আর এতে সবচেয়ে খুশি হয়েছে তরুণ একাদেমিক কেরিয়ারিস্ট্রা যারা ভারতের স্বার্থের চেয়ে নিজের কেরিয়ারে আগ্রহ রাখে বেশি। আর এতে ভারেতের প্রায় সব থিঙ্কট্যাঙ্কঅগুলো আসলে আমেরিকান বিদেশনীতিই ভারতে প্রচার করার কাজএ লিপ্ত হয়েছে। আমেরিকান অর্থ উসুল হয়েছে এভাবে।  মুক্তমালার মত চীনের ভারতকে ঘিরে ফেলার তত্ব তারাই খাইয়েছে ভারতকে, সয়লাব করে ফেলেছে। এমনকি যে দুএকটা ভারতের ডিফেন্সের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও আমেরিকান বিদেশনীতির প্রভাব ঢুকাতে পেরেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে IDSA নামে এমন এক প্রতিষ্ঠানের “চীন-ভারতঃ নতুন ভারসাম্য” শিরোনামের থিম নিয়ে বার্ষিক কনফারেন্স করতে অনাপত্তি-পত্র দেয় নাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়।  অনুমান করা যায় আমেরিকার চোখে দেখা চীনা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিত সেখানে ছিল বা থাকতে পারে – তা চীনের মন জয়ে ভারতের  জন্য বাধা হিতে পারে আশঙ্কায়, চীন অখুশি হতে পারে  – তাই এই অনুমতি প্রদান না দেওয়া্র ঘটনা ঘটেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে,  Meanwhile, the MEA has refused clearance to an annual conference by the ministry of defence-sponsored think tank, Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) whose theme was “India-China: a new equilibrium”. The conference slated for this week has been “deferred” said people familiar with developments. এথেকে বুঝা যায় ভারতকে এখন কত গভীর পর্যায়ে চীন-বিরোধীতার খোলনলচে বদলাতে হবে।

ওদিকে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার উপরে প্রায়োরিটি’ এই নীতি তিনি যদি ধরে রেখে এগিয়ে যান (যেটা এখনও পর্যন্ত এর ভিন্ন কিছু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ) কারণ ট্রাম্প মনে করেন তার ‘বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি’ এই নীতির প্রশ্নে তিনি – এতটাই সিরিয়াস যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে  এই প্রথম ইউরোপের সাথেও আমেরিকার ভিন্ন অবস্থান হতে বা তা নিয়ে লড়তে তিনি পিছপা নন। এমনকি আমেরিকা দুনিয়ার এক ‘এম্পায়ার’ অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘ আমেরিকার প্রভাবে চলে  – এসব কথাগুলোও বাদ দিতে বা বদলাতে হলেও ট্রাম্পের আমেরিকা এসব ভ্যানিটি ছাড়তে রাজি। তবু ‘বাণিজ্য প্রায়োরিটি’ নীতির জায়গা থেকে তিনি সরবেন না বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক কোথায় দাঁড়ায়।

এবার এই সূত্রে বলা যায়, আমেরিকার ভারতের কাছে ‘বাংলাদেশকে বন্ধক দেয়া’- সে বাস্তবতারও একই সাথে অবসান হতে চলেছে বা ঘটবেই। যদিও সেটা বাস্তবায়িত হতে, কার্যকর হতে – বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে। তবে পরিবর্তনের আগমনী ‘ঘণ্টা বাজিয়ে’ দেয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও এখন থেকে ভারতের নতুন নীতি, নতুন বন্ধু, মিত্র এগুলো থিতু হয়ে বসতে, সমন্বিত হয়ে বসতে কিছু সময় লাগবে। আবার ওদিকে আমেরিকা দিক থেকে বললে, তার “ভারত-বিবেচনার দায়” ছুটে যাচ্ছে অর্থাৎ ভারত আর আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর খেদমত করবে কিনা তা নিয়ে আর কোন ভরসা ট্রাম্পের আছে বলে মনে হয় না। এই কারণে অবশ্যই আমেরিকা নিজেই “ইন্ডিপেন্ডেন্টলি” বাংলাদেশ নিয়ে কিছু সরাসরি ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এর শর্ত তৈরি হয়ে গেছে, সে কথাও সত্যি। ফলে ভারতের পরামর্শ, মতামত সমন্বয় এগুলো আমেরিকার কাছে আর আগের মতো নেই, থাকবে না। বলাই বাহুল্য। তবে এমন পরিবর্তন যদিও শুরু হয়েছে মাত্র। ফলে ফল দেখতে পেতে ধীর লয়ের কারণে দেরি হতে পারে বা দ্রুতও হতে পারে।  কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সারকথা “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” সেই বিউগল বেজে গেছে। এতে কে কার কাছে আসবে, কোলে উঠবে নাকি চিরতরে সুদূরে চলে যাবে এমন ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীনকে কোথায় বসতে দেয় সেই অস্থিরতায় ভারত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

গৌতম দাস

২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

http://wp.me/p1sCvy-2hc

 

সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

[জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারত ডোকলামে মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

চীন-ভারত ডোকলাম মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

গৌতম দাস

০১ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gF

 

ডোকলাম ভুটানের এক উপত্যকা। উপরে ছবিতে দেখুন নেপাল ও ভুটানের মাঝে কা্লো অংশ, যেটা আসলে সিকিম, যা এখন ভারতের অংশ। এই অর্থে নেপাল-ভুটানের মাঝে ভারত আছে। কিন্তু পুরাটাই ভারত নয়। এর কিছু অংশ আবার চীনের ভুখন্ড। চীনের ঐ ভুখন্ডের লাগোয়া এক অংশ হল ভুটানের ডোকলাম উপত্যকা। অর্থাৎ সারকথায় ডোকলাম ভুখন্ডের বিতর্ক মূলত ভুটান-চীনের মধ্যে সীমান্তের বিতর্ক। ভারতের কোন ভুখন্ড এটা নয়। এটা তাই কোনো মতেই চীন-ভারতের কোনো সীমান্ত-ভুখন্ডই নয়। চীন সেই সীমান্ত বরাবর থাকা কাঁচা রাস্তাকে ৪০ টন ভারবহনে সক্ষম এমন পাকা রাস্তায় উন্নীত করার কাজ শুরু করতে গেলে বিতর্ক শুরু হয়।

ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে গত ১৬ জুন ২০১৭ ডোকলামের ডোকলা থেকে সীমান্তবর্তি যে রাস্তা যোমপেলরিতে ভুটানিজ আর্মি ক্যাম্পের দিকে গেছে, সীমান্তবর্তি সে রাস্তার পাশেই কাজ করতেই চীনারা এসেছিল। চীনা ভাষ্যও প্রায় এরকমই যে, সীমান্ত বরাবর ওই রাস্তাতেই চীনের পরবর্তী সীমান্ত ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সামনে কাজে বাধা সৃষ্টি করে বসে যায়।

তবে ভারতীয় সেনা কেন? সীমান্ত বিতর্ক তো ভুটান-চীনের মধ্যে। এ ব্যাপারে ভারতের যুক্তি হল, ভুটান স্বাধীন রাজার রাষ্ট্র (যা এখন কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র) বটে। কিন্তু ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে ভূমিবেষ্টিত ভুটানের বিদেশনীতির বিষয়াদি দেখার জন্য ভারত-ভুটান এক চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের দাসখত চুক্তিগুলোর গালভরাভাবে নাম রাখা হয় ‘শান্তিচুক্তি’ বা ‘বন্ধুত্বচুক্তি’; এখানেও তাই হয়েছিল। এটা হল অন্যের ভূমিবেষ্টিত অবস্থার প্যাঁচে পড়াকে কেন্দ্র করে তার দুরবস্থার সুযোগ নেয়া। নেহেরুর ভারত ল্যান্ডলকড ভুটানের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ঐ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল।  ১৯৪৯ সালের ওই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ভুটানের বিদেশনীতি ভারতের পরামর্শে গাইডেড হতে হবে। [“……Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.”]

যদিও ১৯৭৯ সালে ভুটানের রাজার এক সাক্ষাৎকারের রেফারেন্সে অনেকে দাবি করেন যে, ভুটানের রাজা মনে করেন ওই অনুচ্ছেদে বলা ভারতের পরামর্শ ভুটানের জন্য ‘অবশ্য পালনীয়’ এমন কথা লেখা নেই। [“India’s advice in the conduct of foreign affairs was welcome but “not binding” on Bhutan, he said.] তবে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতীয়রা ওই চুক্তির অজুহাতে “ভুটানের অনুরোধে” সেখানে সেনা হাজির করেছে বলে জানায়। ফলে স্বভাবতই চীনারাও পরে সেখানে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায়। দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।   আর সেই থেকে ব্যাপারটা চীন-ভারত সম্ভাব্য সীমান্তযুদ্ধের টেনশন হয়ে হাজির হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই চীনের দিক থেকে জানানো হয় তারা নিজ ভূখণ্ডেই তৎপরতা করছে; ফলে নিঃশর্তভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার দাবি করে চীনারা।

অবস্থা এখন এমনই যে ভারতেরই এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কূটনীতিক পি স্তবগান (P stobdan) লিখছেন, ভারতের ভুটান নীতি একটা কলোনিয়াল চিন্তা ভাবনা। ভারতের আসল সমস্যা তার ভুটান নীতি, ভুটানের সীমান্ত নয়।  নী  শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় লিখে বলছেন,  ভারতের ভুটান নীতি কলোনিয়াল কাঠামো চিন্তা। এটা কাজ করবে না, টিকবে না, এটা বুদ্ধিমান বিদেশনীতির চিহ্ন নয়। (This approach was not sustainable; nor was it a sign of prudent foreign policy.) সে তুলনায় গত কয়েক বছরে চীন অনেক বেশি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে ফেলেছে।

তবে এই প্রথম চীনের দিক থেকে এক তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিও দেয়া হয়। বলা হয়, চীন-ভুটান সীমানা বিতর্কে যদি ‘শান্তিচুক্তির’ অজুহাতে ভারত নাকগলায় তবে কাশ্মির ইস্যুতেও পাকিস্তানের পক্ষে তৃতীয় রাষ্ট্র (মানে ইঙ্গিতে চীনের কথা বলা হলো) নিজের সেনা নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। চীনের এই যুক্তিতে দম আছে বলতেই হয়। এই বয়ানে মধ্যে ভারতের জন্য বিপদের কথা বুঝে ভারত অন্য এক যুক্তির দিকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারত এবার যুক্তি তুলে যে শিলিগুড়ির নিজের ‘চিকেন-নেক’ এলাকার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ঐ  রাস্তা পাকা করার কাজ করতে চীনকে বাধা দিয়েছে।

চিকেন-নেক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেয়া দরকারঃ ব্যাপারটা হল, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ধরা যাক কলকাতা থেকে কোনো ভারতীয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পুর্ব অঞ্চলের রাজ্যে যেতে চাইলে তার আর (ভিন্ন রাষ্ট্র বলে) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকল না। তাদের যেতে হবে পুরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটা চক্কর ঘুরে। যেন বেনাপোল থেকে যে কুমিল্লা যেতে চায় তাকে বেনাপোল থেকে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া, রংপুর, সিলেট হয়ে এরপরে কুমিল্লা- এভাবে। সরাসরি বেনাপোল থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে যেতে হবে ভারতীয় ভূখণ্ড ধরে যা পাহাড়ি দুর্গম শুধু নয় এরচেয়ে এক বড় বিপদ আছে।  কলকাতা থেকে সাত রাজ্যে যেতে যাত্রাপথে শিলিগুড়িতে সবচেয়ে চিকন (চওড়া মাত্র ১৮-২০ কিলোমিটার, যার একদিকে নেপাল অন্যদিকে বাংলাদেশ) এক অংশ পাড় হতে হয়। ওই অংশকেই চিকেন-নেক বলা হচ্ছে। কারণ কম চওড়া বলে ওই চিকন অংশ রুদ্ধ করে দেয়া গেলে (কয়েকটা নষ্ট গাড়ি বা ভারী কিছু ফেলে রাস্তাগুলো ব্লক করে দিলেই হল) ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাত রাজ্য যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যাবে। উপরে ছবিতে চিকেন নেককে  ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন  এই ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এর অজুহাত তুলে ডোকলাম ইস্যুতে ভারত বলতে চাচ্ছে, ডোকলাম ভারতের ভূখণ্ড না হলেও সে চীনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দিয়েছে নিজের ঐ ‘চিকেন-নেকের’ নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটাও খুবই দুর্বল যুক্তি, প্রায় যুক্তিহীন ভাসাভাসা কথার মত। শিলিগুড়ির চিকেন-নেক ভারতের জন্য ষ্ট্রাটেজিক অর্থে দুর্বল জায়গা সে কথা বুঝা যায়। কিন্তু ওই রাস্তা তা ভুটানের বা চীনের যারই অংশ হোক না কেন, আর তা পাকা বা কাঁচা রাস্তা যাই থাকুক, ‘চিকেন-নেক’ অংশ ভারতের সবসময় জন্য দুর্বলতা। রাস্তাটা পাকা হয়ে যাওয়াতে এরপর ওটা ভারতের জন্য দুর্বলতা হয়ে দাড়ায় তা তো নয়।

আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন : ভারত কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমেরিকার সাথে গলাগলি করে চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের পথের ‘চিকেন-নেক’ সিঙ্গাপুরের ‘মালাক্কা প্রণালি’ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করেনি? এটা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথ তুলনামূলক চিকন হয়ে আসা একটা অংশ। এই ইস্যুতে আমেরিকান সিনেটের শুনানিতে প্রফেসরদের সাক্ষ্য দিয়ে বলা পিডিএফ নোট এখনো নেটে যে কেউ পেতে পারে।  [ US CONGRESS HEARING ON INDIA-US RELATIONSHIP  – চোদ্দ পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে ষষ্ঠ পৃষ্টায় ‘চিকেন-নেক’ ‘মালাক্কা প্রণালির’ ছবি দিয়ে চিনানো আছে।  এখানে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দিলেও এই সমুদ্রপথ (চীনে প্রবেশপথ) ব্লক হয়ে যেতে পারে। প্রণালি বা ইংরেজিতে strait মাত্রই সমুদ্রপথে এটা চিকন গলার সমস্যা। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি ভারতের ত্রিসীমানার কোনো স্থান নয়। তবু আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত কী আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনায় শামিল হয়নি? গত ২০০৫ সাল থেকে ভারত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ কাজে শামিল হয়েছে। তখন থেকেই কে কার চিকন গলা ধরতে পারে বা এর মজা কি সে কথা আমরা শুনে আসছি। কাজেই ‘কারো চিকন গলা চেপে ধরা কোন খারাপ কাজ না’- এমন নৈতিকতা বা আইন তো ভারতই মানে নাই। এমন পদক্ষেপ সে চীনের আগেই চীনের বিরুদ্ধে অভ্যাস নিয়ে ফেলেছে।  কাজেই চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরে চিকন গলা চেপে ধরে আসে সেটাকে অন্যায় বলার নৈতিকতা ভারতের নাই।  তবুও আমরা মনে করি এসব কাজ সবার ছেড়ে দেয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পণ্য চলাচলে অন্য রাষ্ট্রের বাধা তৈরি করা অন্যায়, নীতিগতভাবে সবার এই অবস্থান বাস্তবায়নে আসা উচিত।

ইতোমধ্যে এখানে আর এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছে। ডোকলাম বিরোধ ঘটনার তিন সপ্তাহের মধ্যে খোদ ভারতেই মোদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে একঘরে হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্ট। এমন একটা রিপোর্ট হল, ১৫ জুলাইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকা; যার শিরোনাম ‘ভুটানের আর্জিতে দুশ্চিন্তা, দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’। ওর সারকথা ছিল, ডোকলামে সৈন্য সমাবেশের দায়, সামরিক উত্তেজনা তৈরির দায় একা মোদি ও তার সরকারের বলে সব বিরোধী দল আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এক বড় অংশ সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছিল। মোদি সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন পরামর্শ নেয়ার জন্য সেখানকার ঘটনা এটা। অথবা বলা যায়, সম্মানজনক পশ্চাত-অপসারণের উপায় খুঁজতে সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন মোদি। ওই সভার সিদ্ধান্ত, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে একটাই কথা, সৈন্য প্রত্যাহার করে কূটনীতির পথ হাতড়ানোতেই সমাধান।

কিন্তু সবাই বলতে চেয়েছে বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল  ও তৃণমুলের মমতা যে, মোদি উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করেছেন তিনি। কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ও বাক্য নেয়া যাক ঐ রিপোর্ট থেকে। খোদ আনন্দবাজারই মোদির নীতিকে “দাদাগিরি” বলেছে। লিখেছে, “হিমালয়ের কোলের এই একমুঠো রাষ্ট্রকে তার তাঁবে থাকা দেশ বলেই মনে করে দিল্লি”। এতদিন এসব কথা আমরাই সবসময় আমাদের মূল্যায়নে বলে এসেছি, এখন আনন্দবাজারও বলছে বাধ্য হয়ে; এটা আমাদের মুল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়। আসলে, নেহরুর হাতে আকার পাওয়া, ভারতের আমলা-গোয়েন্দাদের চিন্তা কাঠামো মূলত কলোনিয়াল। ফলে ভিন্ন দুই জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের মধ্যে কলোনি ধরনের অধীনতার বাইরে আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা এরা চিন্তা করতে পারে না। এজন্য যেকোন বিদেশনীতি বিষয়ক চিন্তায় এটা প্রতিফলিত, প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

নেহরু নিজেকে একটা স্বাধীন রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী এটা অনুভবের চেয়ে নিজেকে যেন কোন ব্রিটিশ ভাইসরয় ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ নেপাল বা ভুটানের সাথে ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তিগুলো’। এরই আলোকে একালে ভারত তার প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়ে এসেছে, এখনো করে যাচ্ছে। যার ফলাফলে ভারতের সব প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ক অন্তত আনন্দবাজার ভাষায় বললে, ‘দাদাগিরির’। আমাদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হলো খোদ আনন্দবাজারেরই শিরোনাম- ‘দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’।

ওই একই রিপোর্টের ভেতরে আনন্দবাজার আরও লিখছে, ‘১৯৪৯ সালে ভুটানের সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন জওয়াহের লাল নেহরু। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ভারতের পরামর্শ মতোই চলবে। ২০০৭ সালে ভুটান যখন পুরোদস্তুর রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, তখন চুক্তিপত্র থেকে এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়। যদিও কার্যক্ষেত্রে থিম্পুর ওপর দিল্লির প্রভাব খুব একটা খর্ব হয়নি। ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান। তার পরেও তার এই বেসুর সাউথ ব্লকের কানে বাজছে।’

এখানে দেয়া দুটো তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটান এখন এক কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সেখানে আইন প্রণয়নের এখন জননির্বাচিত সংসদ আছে। কিন্তু আনন্দবাজারই সাক্ষ্য দিয়ে বলছে, ভুটান সংসদীয় সরকার হওয়ার পর ২০০৭-এর সংশোধিত চুক্তিপত্রে আগের মতো ভারতের ‘দাদাগিরির অনুচ্ছেদটা’ নেই। অথচ দাদাগিরি চলছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ‘ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান’। এখানে একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। ডিমার্শে হল কূটনৈতিক ইংরেজি শব্দ démarche; যার বাংলা অর্থ হল, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোন আপত্তি অভিযোগ বা মনোভাব জানানো। ভুটান ডোকলাম ইস্যুতে চীনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ‘ভারতের চাপে পড়ে’, নিজে থেকে নয়। এটাই আনন্দবাজারের দাবি। তাই এখন খোদ ভুটান ভারতকেই সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলাতে ভারত প্রমাদ গুনছে। এটাই আনন্দবাজারের রিপোর্ট। ওদিকে, ভারত সবার আগে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে; তাই চীন, সবার আগে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের শর্ত রেখেছে। আর এ অবস্থায় ভারতের সব বিরোধী দল মোদির সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে। মোদিকে উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করা লোক বলেছে। সুযোগ বুঝে কংগ্রেস নেতা রাহুল প্রশ্ন তুলেছে,  ভারতের বন্ধু অনেক রাষ্ট্র ছিল (সম্ভবত রাশিয়ার কথা বলতে চাইছেন) তারা কেন এখন দূরে- এই প্রশ্ন তুলেছে। তবে শেষে ‘সৈন্য প্রত্যাহার আর কূটনীতিক আলাপ’ এই সীমায় মোদি্র ফিরে আসার শর্তে সমর্থন জানিয়েছে। আর, সব মিডিয়া ‘কূটনীতি চাই’ বলে সম্পাদকীয় লিখেছে। যেমন আনন্দবাজারের ১৯ জুলাইয়ের রিপোর্টের শিরোনাম, ‘যুদ্ধ নয়, চাই কূটনীতি’। বেচারা!

মোদির অবস্থা একঘরে শুধু নয়, একেবারে বেইজ্জতি হওয়ার দশা। কারণ চীনের কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করেছে আগে এককভাবে ভারতের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আর মোদির সরকার উঠেপড়ে লেগেছে যে, একসাথে প্রত্যাহার টাইপের একটা কথা যদি চীনের কাছ থেকে বের করা যায়। গত ২৭-২৮ জুলাই ছিল চীনে ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক। ভারত চেষ্টা করছিল ওই সভার সাইড লাইনে চীনের প্রতিনিধি স্টেট কাউন্সিলরের (Chinese state councillor Yang Jiechi) সাথে যদি একটা বৈঠকের সুযোগ করে নিতে পারেন। মাত্র গত ২৯ জুলাই দুপুরে ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া খবর দিচ্ছে যে, ওই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও ছাপা হয়নি।

ইতোমধ্যে রাশিয়ান ডিপ্লোম্যাট সূত্রে অনেক খবর আসছে, যেগুলোর ফরমাল ভার্সান এখনো রিলিজ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে- ১. অন্তত দু’সপ্তাহ আগে চীন ভারতকে জানিয়েছিল যে তারা নতুন রাস্তা বানাতে নয়, রাস্তা আগে থেকেই যেটা ছিল সেটা চওড়া করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত সে নোটিফিকেশন উপেক্ষা করেছে। ২. চীনারা যেখানে অবস্থান ও কাজ করছিল সেটা ইতোমধ্যে ভুটানের সাথে আলোচনায় বিবাদ নিরসিত হিসেবে চিহ্নিত চীনের অংশ। ৩. তাই চীন এখনো প্রমাণ চাচ্ছে ও দাবি করছে যে ভুটান কখনোই ভারতকে কোনো সামরিক অ্যাকশন নিতে অনুরোধ জানায়নি।

ভারতের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাই প্রস্তাব রেখেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচিত এখনই, আসলে কী ঘটেছে তার ঘটনাক্রম কী সে বিষয়ে ভারতে অবস্থিত সব কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিং দিয়ে ভারত অবস্থান পরিষ্কার করুক। এমন একজন হলেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাঈদ নকভি। তিনি দাবি করছেন, তার জানা মতে ভারতীয় সরকার এক আমেরিকান কূটনীতিক ছাড়া আর কাউকেই এখন পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছে তা জানিয়ে কোনো ব্রিফিং কাউকেই দেননি।

চীন-ভারত সংঘাতে  সময়ে সময়ে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে তা হাজির হতে দেখি। তা সত্ত্বেও যদি বলা হয় এগুলোর মধ্যে খটর মটর লাগার সবচেয়ে অমসৃণ বিষয়টা কী? সে প্রসঙ্গে সংক্শেষেপে কিছু বলে শেষ করব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেটেল হওয়া চলতি গ্লোবাল অর্ডার আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে চালু হয়েছিল। সেটা তার আয়ুর শেষ করতে যাচ্ছে। আর একই সাথে ধীরে ধীরে চীন উঠে আসছে সে জায়গা নিতে। গ্লোবাল পরিবর্তনের এই অভিমুখকে স্বীকার করে নিয়েও মানতে ইচ্ছা করে না দশা আমেরিকার। ফলে কম করে হলেও যতটা সম্ভব সে আসন্ন পরিবর্তনকে দেরি করিয়ে দেয়ার নীতি নিয়েছে আমেরিকা। তবে কম-বেশির ফারাক আছে। ওবামা  প্রশাসন যতটা এব্যাপারে এগ্রেসিভ হয়ে ততপর ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ততটা চেয়ে বলা ভাল একই কৌশলে ততপর নয়। যদিও ঘটনা শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল  সেকেন্ড টার্মের (2005-9) বুশ প্রশাসন। মূল ব্যাপারটা হল আমেরিকা ভারতকে প্রলুব্ধ করে, লোভে ফেলে নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থার নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন AIIB, BRICS, SCO ইত্যাদি) গড়ে উঠতে দেরি করিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কারণ নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থাগুলো তৈরিতে চীন ভারতকে সাথে নিতে চায়, আর একাজে চীনের প্রধান সহযোগী পুতিনের রাশিয়া। কিন্তু ভারত গাছেরও খেতে চায় আবার তলার গুলোও কুড়িতে নিতে চায় – নীতি নিয়েছে। সে চীন, রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন ব্যবস্থা গড়তে ভাল অবস্থানগুলো নিতে চায় আবার আমেরিকার দেয়া লোভের অফারগুলোও পেতে চায়। ভারতের এই দ্বৈততা, দ্বিমুখি ঝোঁক – এটাই সব সমস্যা সংকটের উতস এখানে।

এর ফলে ভারত তার যেসব বিরোধে কোন সংঘাত  তৈরি না করে সমাধান করার কথা তা মুখ্য সংঘাত বানিয়ে ফেলছে। আর যেখানে বড় সংঘাতই হবার কথা তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করছে না।  আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে সস্তা জাতীয়তাবাদের চিন্তা। অথচ কমিউনিস্ট বা জাতীয়তাবাদীরা যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনে করে আসছিল সেটা আসলে কোল্ড ওয়ার কালে বুঝের জাতীয়তাবাদ, যা একালে অচল। যেমন দেশের ব্যবহার্য সব পণ্য দেশেই বানাতে হবে এমন গোঁ ধরা জাতীয়তাবাদ কীনা নিজ জনগোষ্ঠির তাতে আসলে একালেও লাভ হয় কীনা ভেবে দেখতে হবে। নিজ মুদ্রার অবমুল্যায়ন একালে সময়ে ইতিবাচক হতে পারে। নাহলে আমেরিকার বিষয়টাকে  অভিযোগ আকারে আনত না যে চীন নিজের মুদ্রা অবমুল্যায়িত রেখেছে। ইত্যাদি।

আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভারতের বর্তমান স্বার্থ হলে চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতের ভবিষ্যত। ফলে ভারতের  বুদ্ধিমান অবস্থান হল, এদুইয়ের মধ্যে এক সুক্ষ হিসাব করা ভারসাম্য রচনা করে পা ফেলা। কিন্তু কথাটা ভারত প্রায়ই ইচ্ছা করে ভুলে যায়। অনেক বাচ্চা নিজ অভিভাবককে ব্লাকমেল করে পকেটমানি বাড়িয়ে নেয় – বাচ্চারা এভাবে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন  আচরণ করে সাময়িক সুবিধার মজা উপভোগ করতে চায়। ভারতের অবস্থা এরকম। কিন্তু বাস্তবে ভারত কোন বাচ্চাসন্তান নয়, আবার চীন বা রাশিয়া (নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্যোক্তা কারিগরেরা) এরাও ভারতের অভিভাবক কেউ নয়। ফলে ভারতেরও উদ্যোক্তাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া উচিত না যে উদ্যোক্তারা ভারতের আশা ছেঁড়ে ভিন্ন পরিকল্পনা করে বসে। ভারতের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়।

চীনের গ্লোবাল টাইমস যেখানে চীনের সরকারি অবস্থান কড়া ভাষায় কিন্তু ইনফরমালি চীন প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়, সেখানে ডোকলাম ইস্যুটাকে শিরোনাম লিখা হয়েছে, ভারতের সাংহাই কর্পরেশন সংস্থার (SCO) সদস্যপদ পেয়ে পশ্চিম চীনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে চাইছে। (India’s SCO membership threatens West China security)। চীন শান্তিপুর্ণ অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করতে  শিকাগোর এক আমেরিকান প্রফেসরের তত্ত্ব যে, চীন নাকি ভারতকে মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলেছে, চীন ভারতের জন্য হুমকি  এইসব  তত্ত্ব আঊরায়।   আসলে মোটাদাগে বললে ভারতের চীন বিরোধী সংঘাত এটা আসলে আমেরিকার চীনা নীতির আলোকে সাজানো। ইন্ডিয়া শুধু আমেরিকার সাথে সামরিক অস্ত্রের চুক্তি করেছে তাই নয়, বরং চীন-ভারত সীমান্ত বরাবর সামরিক ঘাটি বানিয়েছে। (In fact, India’s confrontation with China is, by and large, backed by America’s China policy. India has not only sealed arms deals with the US, but also established strategic military bases along the China-India border. ) সে নিজ জনগণকে চীন বিরোধী প্রপাগান্ডায় সামিল করেছে।

এটাকে আমরা বলতে পারি চীনের  দুঃখ করে বলা (আবার হুমকিরও)  কথা যা খুব সম্ভবত রাশিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিবার উছিলায় সবাইকে জানানো। কারণ রাশিয়ার উতসাহেই চীন ভারতকে এই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক জোটে (পাকিস্তানসহ) ভারতকেও সদস্যপদ দিতে রাজি হয়েছে কয়েকমাস আগে।

ভারতের অজিত ডোভাল চীন থেকে ফিরেছেন, কিন্তু ভারতের মিডিয়ার গান সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল কিছু শিরোনাম আনছি যার ভিতরে অনেক ইঙ্গিত আছে। চীনে ভারত কী শিক্ষা পেয়েছে  সম্ভবত এর ইঙ্গিত আছে এখানে। আনন্দবাজার পত্রিকা ২৯ জুলাই,  “বেজিংকে না চটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৯ জুলাই,  “Doklam is not about a road”।  অর্থাৎ ভারতের মিডিয়ার আর ডোকলাম অচলাবস্থার কারণ ডোকলামে না, বাইরে খুজতে শুরু করেছে। একটু দেরি হয়ে গেছে অবশ্য।  মনে হচ্ছে মোদি ভুলে মাটি খেয়ে ফেলেছেন বা মুখে মাটি গেছে। খুব সম্ভবত গাছের খাওয়া আর তলেরও কুড়ানোর দিন ভারতের জন্য শেষ হয়ে আসছে। কোন একটা বেছে নিতে হবে। এশিয়ায় পড়শিদের উপর ভারতের প্রভাব দাবরানি আর কূটচাল দিয়ে, কলোনি চিন্তা কাঠামো দিয়ে, বৃটিশ বাপ-দাদাদের ছিল ফলে একই স্টাইলে তা আমারও শাসনে থাকবে এই যুক্তিতে এখন টিকানো অসম্ভব, তাই সেগুলো সবই শেষ হয়ে আসছে, যাবে। সে জায়গায় চীনের যে প্রভাব বাড়ছে তা চীনা অর্থনীতির সক্ষমতার কারণে, এই অর্থে এটা অবজেকটিভ। চীনের সাবজেকটিভ ইচ্ছার কারণে এটা হয় নাই, হচ্ছে না এবং  হয় না। এই অর্থে আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ভারতের বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এর মাসুলও দিতে হবে চড়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ৩১ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

গৌতম দাস

০৭ জুন ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2fX

 

চীন ২০১৪ সাল থেকে এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছিল। এআইআইবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য, তবে চীনা নেতৃত্বের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক। গত ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়ে এটা কর্মতৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। এর সেই প্রস্তুতিকালে আমেরিকা তার প্রভাবাধীন এশিয়ার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যেন এই ব্যাংকে যোগ না দেয় তা নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে যে আপত্তি সে তুলেছিল, তা মনে রাখার মতো। বলেছিল, আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়তে গিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে যে স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা সংগঠনে জন্ম দিয়েছে, তার সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চীন ব্যর্থ হবে বলেই আমেরিকা উদ্বিগ্ন। আর এই ‘কথা’ আমেরিকা তার এশিয়ান পার্টনার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জানিয়েছিল- যেটাকে আমেরিকার নেতিবাচক প্রচারণা বলা হয়েছিল সে সময়। চীনের এআইআইবি ব্যাংকের উত্থান এই প্রচারণা দিয়ে আটকে দেয়া যায়নি। বরং শুরু থেকেই এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টাকে তারা ইতিবাচকভাবে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। আজ ৭৭ রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দান হাসিল করে এআইআইবি নিজ মহিমায় নিজের তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এখানকার মূল প্রসঙ্গ হল – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি।
গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানেও একই কথা উঠেছিল। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের, যেখানে ৬৮ রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হবে। ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের যৌথ ঘোষণার এক অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউরোপের নেতা রাষ্ট্রগুলো যেমন জর্মান, ফরাসি এরা। তাদের সার কথা হল, অর্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কালে ওর মান, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি কী হবে? শেষ মুহূর্তে আমেরিকা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ- এদের প্রধান নির্বাহী এবং প্রায় ৩০টি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এতে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।
এখানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার স্ট্যান্ডার্ড কথাটা ভেঙে বললে দাঁড়ায়, বড় অর্থ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে যে কথা বলছি আমরা, এর মালিক কিন্তু হবে আলাদা আলাদা এক একটা খোদ রাষ্ট্র মানে সে দেশের জনগণ। পাবলিক মানি, পাবলিক এসেট বা সম্পদ। ফলে প্রকল্পের মোট খরচ কত, তা ন্যায্য কিনা, প্রকল্পের খরচ অনুমোদনের পর তা কৌশলে দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ করে নেয়া হয়েছে কিনা, কাজের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আদৌ ছিল কিনা, প্রকল্পে দুর্নীতিরোধের কোনো ‘সেলফ চেক’ ব্যবস্থা ছিল কিনা- এ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ামাত্র তো বটেই, না চাইলেও জনগণের দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, ‘পরিবেশ ধ্বংস করা কোনো উপাদান এই প্রকল্পে নাই’, এমন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশী পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল কিনা, কাজ প্রদানে সবস্তরে স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি পাবলিক মানি নাড়াচাড়া সংক্রান্ত  গুরুত্বপুর্ণ  সব কিছুকে বুঝানো হয়েছে।

দুইঃ
বিগত প্রায় পাঁচ শ’ বছরের বিশ্ব বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থাকে মোটা দাগে তিনটি স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে একটা ল্যান্ড মার্ক ধরে বলা যায়, এর আগের যুগ ছিল প্রথম পর্যায় – কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম। মানে আমাদের মতো দেশগুলোকে উপনিবেশীপন্থায় দখল করে কলোনি মালিক সাম্রাজ্যগুলা এক  গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছিল যাকে এখানে আমরা ‘কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম’ বলে নামকরণ করছি । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে যায়, আর কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম, সেটাতে কোন কেন্দ্র বা কোন গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা ছিল না। অর্থাৎ সেটা কোনো গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। যে অর্থে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন ব্যবস্থাটা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীন করে সাজানো।
আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই; টানা ২২ দিন ধরে আমেরিকার হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে ৭৩০ ডেলিগেটের সভা ও তর্ক-বিতর্ক নিগোশিয়েশনের ভেতর দিয়ে । তাই এদের ব্রেটনউড প্রতিষ্ঠানও বলে অনেকে। এখানে প্রথম পর্যায়ের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের পরের দ্বিতীয় পর্যায়কে ব্রেটনউড সিস্টেমের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বলে চেনাব, সংক্ষেপে ব্রেটনউড সিস্টেম বলব।

তাই বলা যায়, কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এ ধরনের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমনকি ‘কলোনি মাস্টার’ যেমন খোদ ব্রিটিশ রাষ্ট্রও খুব নিয়ন্ত্রণ করত না। বরং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ট্রেডিং বা মেরিটাইম কোম্পানি, এদের নেতৃত্বে কর্তৃত্ব প্রভাবে  ম্যানুফ্যাকচারিং-সহ বাকি সব কোম্পানির এক সমাহার ছিল; রাষ্ট্র সেখানে ঠিক নিয়ন্ত্রক নয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো বোঝা যাবে, যদি মনে রাখি একালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) ধারণাটা। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ব্রেটনউড সিস্টেমের সাথে আনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাটা।  ব্রেটনউড সিস্টেমের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। মানে রাষ্ট্র মোটা দাগে আগাম কিছু ষ্টাটুটারি আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়ে থাকে, আর সেগুলোর অধীনে ও সীমার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বশাসিত। সেই আইনি সীমার মধ্যে এই ব্যাংক স্বশাসিতই শুধু নয়, রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপর অন্য সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মতৎপরতার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সে। ব্যাংক ব্যবসা করার নীতি ঘোষণা করা, মনিটরিং এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশ দেয়ার প্রতিষ্ঠান এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে সরকারের মুদ্রানীতি, ফিসক্যাল (অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা) নীতি হাজির করা ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিষ্ঠানও এটা। মুদ্রা ছাপানোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে এত কিছুর পরও এগুলো সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা। এসবের বাইরে আইএমএফের নির্দেশ পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বলা হয় আইএমএফের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়ে থাকে যেন আইএমএফের ডানা বা এক্সটেন্ডেড উইং। ফলে পুরা দুনিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে আইএমএফ।  কোনো রাষ্ট্রের আইএমএফের সদস্যপদ পাওয়ার পূর্বশর্ত হল, ওই রাষ্ট্রের এর আগে একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে হবে। তাই বেশির ভাগ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্ম ১৯৪০ এর দশকে। ব্যতিক্রম কোথাও যদি থাকে তবে তা ভিন্ন কারণে। যেমন আমেরিকার ফেড বা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আমেরিকার উদীয়মান ও বিকাশমান সব রাজ্যে আগে আলাদা স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্যের ব্যাংক ভিন রাজ্যে ব্যবসা ততপরতা করতে পারত না। আবার একই রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন ছাপা নোট ছিল। পরে (মানে অনুমান করি প্রতিটা রাজ্য নিজের পুঁজির স্ফীতিতে উপচে পড়লে বা স্যাচুরেটেড হয়ে গেলে অথবা বড় বড় প্রকল্পে এক সাথে বিনিয়োগের প্রয়োজনে) সব রাজ্য ব্যবস্থাগুলোর সমন্বয়ে এক অভিন্ন, ফেডারেল ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য (যেমন কমন কারেন্সি চালুর জন্য) ১৯১৩ সালে ফেডের জন্ম হয়েছিল। ওদিকে বৃটেনে তাকাই, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সাল থেকেই ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন ব্যাংক। কিন্তু এই ব্যাংকই ব্রিটিশ সরকারের আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট ধারণকারী ব্যাংক। একটা বড় করপোরেশনের মতোই ব্রিটিশ সরকার তার একটা ক্লায়েন্ট। আবার সরকারের অনুমতিধারী একমাত্র মুদ্রা ছাপানোর ব্যাংক এটাই। এভাবেই প্রাইভেট ব্যাংক হিসেবে চলার প্রায় তিনশ বছর পর ১৯৪৬ সালে এই ব্যাংকের জাতীয়করণ হয়, আর ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ সম্পর্কে এত বিস্তারে বলছি আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এই ব্যাংক ছিল না, ফলে তুলনামূলক বিচার করে বুঝবার জন্য। এখন কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ ছিল না, একথার আর এক অর্থ  হল, মানে রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। এই অর্থে বলা যায়, ওই ক্যাপিটালিজম ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের হাতে নিয়ন্ত্রিত হত। এ ছাড়া অনেকেই জানেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার – এটাও প্রাইভেট ব্যাংক বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিদিন ঠিক করে দিত। এ কাজের একচেটিয়া কারবারি, ‘রথশিল্ড ব্যাংকিং পরিবারের’ কথা অনেকেই জানেন। আমাদের অনেকের ধারণা, স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সরকার ছাড়া হয় না, হবে না। এই ধারণাটা বাস্তব নয়। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগে স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল বেসরকারিভাবে, ব্যবসায়ীদের সমিতি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে এবং একটা স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতার মান নিশ্চিত করে। তবে সেকালে এক বিরাট বাড়তি সুবিধা ছিল। তা হল কোন কাগুজে মুদ্রা মানেই তা ছিল ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’। মানে ঐ কাগুজে মুদ্রার সমমানের সোনা ব্যাঙ্কে আগে গচ্ছিত (রিজার্ভ) রেখে তবেই মুদ্রা ছাপানো হয়েছে। ফলে কাগুজে নোট যার হাতে আছে সে ব্যাংকে গিয়ে “চাহিবা মাত্র” ঐ সমতুল্য রক্ষিত সোনা ব্যাংক নোট হোল্ডারকে পরিশোধ করে দিত। এর কারণে প্রতিদিন আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ সহজ ছিল। পরে ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মুদ্রাই আর  ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’ নয়।
কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগ শেষে তা ভেঙে কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা- এই প্রথম এমন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা যেখানে তা এক গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতার (আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের) অধীনে গড়া ও নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থা। আগেই বলেছি এটা পরিচালিত হয় সব সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – আইএমএফের এই ‘ডানা’গুলোর মাধ্যমে। এই অর্থে ‘পড়ে পাওয়া’ সুবিধা হল রাষ্ট্র এরপর থেকে ব্যাংক ব্যবসার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের যুগের সূচনা করেছিল।

আমেরিকাসহ ইউরোপ আজ স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা তুলছে। তা ব্রেটনউড সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানে আসতে সময় লেগেছিল ৫৬ বছর, ২০০১ সালে। অর্থাৎ মাত্র চলতি শতকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে (স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তদারকি নিশ্চিত করতে) শক্তিশালী ও স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ  চালু করা হয়েছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আলাদা এই বিভাগ সরাসরি কেবল বোর্ডের কাছে রিপোর্ট ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কোনো কান্ট্রি অফিসকে কিছু না জানিয়েই সে তার কাজ করতে পারে। তবে এসব কথা শুনে এই বিভাগ বা বিশ্বব্যাংককে ‘সততার দেবতা’ মনে করার কোনো কারণ নেই, তা ভুল হবে। রক্ত মাংসের ও স্বার্থের এই দুনিয়ায় মানুষ যে মানের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেখাতে পেরেছে এর এক নমুনা বলা যায় এই বিভাগকে। তবে এরও আগে আর একটা কথা বলা দরকার। বিশ্বব্যাংকের কাজ দেয়ার টেন্ডার পদ্ধতি খারাপ নয়, এটা বলতেই হবে। এই অর্থে যে, কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে ফান্ডদাতা হয় যে দেশের সরকার; ধরা যাক, একটা প্রকল্পে এর অর্ধেকের বেশি ফান্ড জাপান সরকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রকল্প নির্মাণের কাজ জাপানের কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পায়নি। মানে কেউ ফান্ডদাতা হলে কাজ তাকেই দিতে হবে, এমন কোন কথা নেই। টেন্ডার আলাদা স্বাধীন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা আছে। টেন্ডারে ঠিক হবে কে কাজ পাবে। যেমন যমুনা সেতুতে নদীশাসন কাজ পেয়েছিল নেদারল্যান্ড, দুই কানেকটিং রোড আর মূল ব্রিজ নির্মাণকাজ পেয়েছিল দুই কোরিয়ান কোম্পানি, আর কন্সালটেন্সি পেয়েছিল এক ব্রিটিশ কোম্পানি। তবে আবার বলে রাখি, টেন্ডার ব্যবস্থা চালু করতে পারার জন্য অথবা বিশ্বব্যাংকের ভেতরের প্রসেসিংয়ের তুলনামূলক স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য তারা একেবারে ‘আদর্শের অবতার’, এমন বলা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার যমুনা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতিই ছিল না, এমন অ্যাবসলিউট কোনো কথা বলা হচ্ছে না। তবে অন্তত তুলনামূলক অর্থে ফান্ডদাতা আর কাজ পাওয়াকে আলাদা করে ফেলতে পারা কম অগ্রগতি নয়। আর বিশ্বব্যাংক এটা ২০০১ সালে ইন্টিগ্রিটি বিভাগ খোলার আগেই চালু করতে পেরেছিল। আবার বিশ্বব্যাংকের বদনামের শেষ নাই। ফলে এটাও বলে রাখা ভাল, অর্থের অপচয় আর দুর্নীতির (মানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব) দিক থেকে সত্তরের দশকের বিশ্বব্যাংক ছিল সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেটনউডস সিস্টেম এতটুকু পেরেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হিসাবে খারাপ নয়।

পাঁচ শ’ বছরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়কে  মোটা দাগে চিহ্নিত করে তা চলতি শতক থেকে শুরু তা বলা যায়। আমেরিকার জায়গায় চীনের নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা আজ আর কোন অনুমান করে যা মনে চায় বলা এমন বিষয় নয়। খোদ আমেরিকার সরকারি স্টাডি ও নানা গবেষণাতেও এর স্বীকৃতি আছে। ব্রেটনউডস সিস্টেম বা দ্বিতীয় পর্যায়টা কায়েম হতে, একটা ওলটপালটের ভিতর দিয়ে তা আসতে একটা বিশ্বযুদ্ধের দরকার হয়েছিল। তাই তৃতীয় পর্যায়ে যেতেও একটা বিশ্বযুদ্ধ দরকার, অনেকে অনুমানে এমন কথা বলে থাকেন। কিন্তু এখনো তা স্পষ্ট হয়ে যায়নি। সর্বশেষ আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান; আর হম্বিতম্বিকে চীনের দিক থেকে একে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা এবং আমেরিকার জন্য জায়গা (বাজার, কাজে ছাড় দেয়া) করে দেয়া কোন টেনশন বা যুদ্ধের শঙ্কাকে আপাতত নাকচ করেছে।

কিন্তু এই লেখার মূল প্রশ্ন, একালে তৃতীয় পর্যায়ে, চীনের তৈরি গ্লোবাল প্রভাব নিয়ে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- এআইআইবি, ব্রিক ব্যাংক, আরআইবি ইত্যাদির স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান কী হবে? এক কথায় বললে গ্লোবাল ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়ের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হতে গেলে এগুলোকে অবশ্যই ব্রেটন উডস সিস্টেমের চেয়েও ভাল, মানে যেমন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও আরও ভাল মান দেখাতেই হবে। তবে এ কথা ঠিক, চীনের উত্থানে রেষারেষি প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের স্বার্থটাকে মাখিয়ে তারা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার কথাটা উপস্থাপন করেছে। তাই আমেরিকা বা ইউরোপের স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গ তুলে চীনকে যে অর্থে খোটা দিচ্ছে, নিজের প্রভাবকে বাড়িয়ে নিবার চেষ্টা করছ এর মধ্যে আমাদের মতো দেশের লাভ নেই। আমাদের স্বার্থ আমাদেরকে ভাবতে হবে। যেমন বাংলাদেশের সাথে চীনের রেল-রোড উদ্যোগসহ সব অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের স্বার্থে তা খুবই দরকারি ও নির্ধারক। কিন্তু লক্ষণীয় যে, আমরা এখন টেন্ডার আহ্বানবিহীন সরকার, আর যেকোনো প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে ছয় গুণ ব্যয় বাড়ানোর সরকারে পরিণত হয়েছি। এই বিষয়টা  বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বাদ রেখে বললেও এটা চীনের জন্য বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান- এই বিচারে খুবই খারাপ উদাহরণ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার দিক থেকে এই ব্যবস্থা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এদিকটায় চীনেরও অবশ্যই  মনোযোগ দিতেই হবে। যদিও চীনের হয়ত পাল্টা বলার বিষয় হবে যে, বাংলাদেশের জনগণ যদি একটি অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালো না হওয়া পর্যন্ত চীন হাতগুটিয়ে বসে থাকলে এর সুবিধা চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীরাই নেবে। তবুও এটা ভালো যুক্তি নয়। কারণ এর চেয়েও দুর্নীতিবাজ সরকারের সাথে গত চল্লিশ বছর ধরে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে কাজ করতে হয়েছে। তার পরও তাদের অর্জন খারাপ নয়। আমাদের মতো দেশে সরকারের কার্যকারিতা যতটুকু, এর দক্ষতা যতটুকু, তা তো আপন কোনো রাজনৈতিক সরকারের কারণে হয়নি, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শর্ত দিয়ে তাদের বাধ্য করেছে বলা হয়েছে। যদিও শর্তের খারাপ দিক আছে, তা মেনেও এ কথা বলা যায়। যেমন শেখ মুজিবের আমলের রেশনব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে আগের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ঠিক রেশন নয়, তবে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে কার্যকর আনা আছে। চালের সরকারি মওজুদ আর আগের দরে বাজারে চাল ছেড়ে দিয়ে মুল্য নামানো – এটা খুবই কার্যকর ব্যবস্থা।
মোট কথা, আমরা ব্রেটনউডস সিস্টেমের যুগ পার হয়ে এসেছি- এ কথা চীনকে মনে রেখে আগাতে হবে। আমাদের নতুন আকাঙ্খা পূরণ না করে, আমাদের হতাশ করে চীনের তৃতীয় পর্যায় গড়ে তোলা বা এর নেতা হওয়া অসম্ভব। চীনই ফান্ডদাতা, আবার কোনো টেন্ডার সিস্টেম নেই, কাজ পাবে কেবল চীন– এই ‘জি টু জি’, লোকাল এজেন্টের নামে ঘুষের ব্যবস্থা, প্রকল্পের অর্থ ছয় গুণ বাড়িয়ে নেয়া- এসব অগ্রহণযোগ্য। খুবই খারাপ উদাহরণ। এটাই ‘অপারগ’ চীনের আপাতত স্বার্থ মনে করে চীন নিজ মনকে প্রবোধ দিতে পারে। কিন্তু সাবধান এর মূল্য একদিন চীনকে শোধ করতে হবে। এই একই ফর্মুলায় আমরা বেল্ট-রোড উদ্যোগে যুক্ত হতে না চাইলে না পারলে তা আত্মঘাতী – চীন ও বাংলাদেশের জন্যই।
গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে চীনকে অবশ্যই স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দিক থেকে উন্নত মানের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হাজির করতে পারতে হবে। এমন কাজের নীতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। কোন অজুহাত এখানে অচল এবং আত্মধবংশী।

ভারত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন যোগ দেয় নাই। সেই সিদ্ধান্ত ভারতের স্বার্থে ন্যায্য হয়েছে সেই সাফাই যোগাড়ে মোদি সরকার কাহিল। কারণ এটা ফাঁপা আত্মম্ভরি সিদ্ধান্ত ফলে আত্মঘাতি তা স্পষ্ট। চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে কেউ অভিমানে মাটিতে ভাত রেখে খায় না।  তাই ভারতও এই সুযোগে যেন  ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাবের কারণে যোগ দেয় নাই, এমন ইঙ্গিত দিয়ে নিজের লাজ ঢাকতে চাইছে। তা সে চাইতেই পারে কারণ কেই বা  বেকুবির লজ্জায় নিজেকে রাঙা দেখাতে চায়। তবে এটা ফ্যাক্টস যে সম্মেলনের আগে ভারতের দেখানো যোগ না দেবার কারণগুলোর মধ্যে ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাব বলে কোন কারণ তালিকায় ছিল না।  কাজেই ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’  কথা তুলে সে আড়ালে সুযোগ সন্ধানীও কম নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

গৌতম দাস

০২ মার্চ ২০১৭, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2db

Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star
Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star

গত বছর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক” বিষয়ে ঢাকায় এক ‘সংলাপ’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার এবং আইপিএজি (ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড গভর্নেন্স) নামে এক সংগঠনের যৌথ নামে  ও উদ্যোগে তা করা হয়েছিল। দিনব্যাপী ভারত ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, কূটনীতিক, সরকারি প্রতিনিধি ও একাডেমিকরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি গত ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই ভারতকে করিডোর দেয়ার পক্ষে কখনো ট্রানজিটের কথা তুলে, কখনো কানেকটিভিটির কথা তুলে সবার আগে থেকে যুক্তির হাল ধরার কাজ করে এসেছেন।
গ্লোবাল অর্থনীতিতে সত্তরের দশক থেকেই গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ঝাণ্ডা উড়তে শুরু করেছিল।  আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ব্যাপক তাগিদ তৈরিতে নেমে পড়েছিল। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানে। ইতিবাচকভাবে বললে, এরই প্রকাশ্য দিক হল – আমাদের মনে আছে নিশ্চয়, “রফতানিমুখী অর্থনীতির” শ্লোগান। মানে, কেবল জাতিবাদী অভ্যন্তরীণ বাজারমুখিতা আর নয়; এর বদলে রফতানিমুখী করে নিজ অর্থনীতি সাজানো। এর এক মৌলিক স্বীকৃত দিক হল, নিজের বাজারে অন্যকে ঢুুকতে দেয়া এবং অন্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ নেয়া। তবে বাস্তবে এই দেয়া-নেয়ার কোনো কিছুই একেবারে অবাধ নয়। মূল কথাটা  বললে, গ্লোবাল অর্থনীতি কেবল কিছু পরাশক্তিগত বিশেষ ক্ষমতার অধীনেই কার্যকর, ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময় এক বাস্তবতা। সুতরাই এখানে এ ক্ষেত্র ‘অবাধ’ বলে কিছু নেই। দুনিয়ায় উপস্থিত সেসব ক্ষমতাবান রাষ্ট্র ও তাদের অর্থনীতির আধিপত্যের অধীনে এবং তাদের মাতব্বরি মেনে নিয়েই এটা কেবল ঘটতে পারে। এই “রফতানিমুখী অর্থনীতির” ফাংশনাল দিকটাই এমন। যেমন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ঢুকতে গেলে  সেটা অবাধে নয়; বরং কোটা, মাল্টি ফাইবার এগ্রিমেন্ট বা তেমন অনুমতি থাকলেই কেবল ঢুকতে পারে। নইলে রক্ষণশীল প্রটেকটিভ বিশাল অঙ্কের শুল্ক দিয়ে “অবাধে” ঢুকতে হবে। বিপরীতে বাংলাদেশে আমেরিকার পণ্যের বেলায় সেটা অবাধ। এই সমস্যা ছিল এখনও আছে। ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময়ে আছে। এমন অসাম্যের পরও বাজার যতটুকু আমাদের দখলে থেকে যায়, সে ফ্যাক্টর হল নিজ শ্রম-দক্ষতা আর কোয়ালিটি পণ্য বা সস্তা প্রতিযোগী পণ্য দিয়ে নিজের জন্য তুলনামূলক বাড়তি সুবিধা যেখানে যার বেশি, সে ভিত্তিতে ও কারণে। এসব সীমিত অর্থে এই গ্লোবালাইজেশন – তবু এটা রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ধারণা ও অবস্থানের বিপরীত একটা অবস্থান অবশ্যই। এটাকে অনেকে পশ্চিমের “মার্কেট লিবারালাইজেশন” বলেও চেনাতে চান। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই গ্লোবালাইজেশনের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান হল, দুনিয়াজোড়া সবার মধ্যে এক এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা- এক গ্লোবাল পণ্যবাণিজ্য, পণ্যবিনিময় ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলছে এটা। আর ইতোমধ্যেই এটা যে জায়গায় বিকশিত হয়ে বা পৌছে  গেছে তাতে এটা আর আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব।
গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে তত্ত্বগত ও প্রচারের দিকগুলো যখন প্রথম আনা হয়েছিল, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, তখন এখানে ১৯৮২ সালের সামরিক ক্ষমতা দখল ও সংস্কার কর্মসূচি চালু করার সময় ছিল। রফতানিমুখী অর্থনীতির নেতিবাচক দিকগুলো বাদ রেখে কেবল  ইতিবাচক দিকগুলো আদর্শিকভাবে হাজির করলে যা হবার কথা, সে প্রসঙ্গে সে সময় একাডেমিক জগতে এক বয়ান চালু ছিল। যেমন, বলা হত – কল্পনা করুন, প্রত্যেক রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠী একটা বা কয়েকটা করে পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে দক্ষ হয়ে উঠলে, সারা দুনিয়ার বাজারের জন্য তৈরি করে এরপর সেসব পণ্য প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজেদের পরস্পরের মধ্যে বাধাহীন বিনিময় ঘটাতে পারলে এই বেনিফিট সব জনগোষ্ঠীই পেতে পারে। সবাই কোনো-না-কোনো পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করবে এবং দক্ষ শ্রমের অধিকারী হয়ে উঠবে। এতে একটা গ্লোবাল বাজার ও বিনিময়ের মধ্য দিয়ে এবং এর মাধ্যমে এক গ্লোবাল বাণিজ্য গড়ে ওঠার কারণে গ্লোবালাইজেশন ঘটানো সম্ভব। সবাই যার সুফল ভোগ করবে। জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীল ক্যাপিটালিজমের বিপরীতে এটাই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার (বাস্তবায়ন করতে হবে এমন) মডেল ধারণা।

গত বছর ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ বিষয়ে ঐ সংলাপে রেহমান সোবহান এই গ্লোবালাইজেশনেরই আরোও এক কোয়ালিফায়েড বৈশিষ্ট্য আরোপ করে কথাটা পেড়েছিলেন। সে কথাটা হল – ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ (value addition chain) তৈরির দিক থেকে প্রসঙ্গটাকে বিচার করা। ভ্যালু এড মানে কোন কাঁচামালে অথবা আধা-সম্পুর্ণ পণ্যে আবার শ্রমের প্রবেশ ঘটিয়ে তাকে আরও-সম্পুর্ণ পণ্য বা একেবারে সম্পন্ন পণ্যে রূপান্তর করা। একই দেশে কাঁচামাল থেকে সম্পুর্ণ পণ্যে রূপান্তর না ঘটিয়ে নানান দেশে তা সম্পন্ন করা এটাকে ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ পণ্য উতপাদন বলা হয়।   গ্লোবালাইজেশনের মধ্যে এটা আর এক জটিল ধাপ উপরে উঠে এটা এক ধরণের পণ্য উতপাদন ও  বিনিময়। রেহমান সোবহান বলছিলেন  ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর দিক থেকে দেখে তুলনা করে বলছিলেন সিনসিয়ার মনোযোগী হওয়ার কারণে চীন কেন সফল আর ভারত কেন বিফল, সে আলোচনা তুলেছিলেন। চীনের ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ মানে হল, একটা প্রডাক্টের কয়েকটা অংশ কয়েকটা চীনের পড়শি দেশ থেকে তৈরি হয়ে আসার পর অর্থাৎ ভ্যালু যোগ হয়ে আসার পর সেগুলো চীনে জড়ো হবে, এরপর সেগুলো সব চীনে অ্যাসেম্বল বা সংযুক্ত হয়ে একটা ফাইনাল প্রডাক্ট হিসাবে বের হবে। অর্থাৎ চীন পড়শি কয়েকটা দেশকে সাথে নিয়ে একটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর মাধ্যমে তৈরী প্রডাক্ট এবার রফতানি করবে। এতে সংশ্লিষ্ট সব অর্থনীতিই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে একসাথে বেড়ে উঠবে, সবাই লাভবান হবে। এ ছাড়া, পুরাটাই চীনে করতে হবে এমন জাতীয়তাবাদী ধারণা নয় এটা। ফলে এটা শুধু সবার ফিনিসড পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ক্রবে তা নয়। পণ্য উতপাদনেই শেয়ার করা এক পণ্য উতপাদন। তিনি চীনের প্রশংসা করছিলেন চীনের পড়শিদের সাথে এমন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ প্রডাক্ট তৈরির সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে সে জন্য। প্রফেসর রেহমান সোবহানের বক্তব্যসহ পুরা অনুষ্ঠানের প্রায় এক ঘন্টার ভিডিও ক্লিপ ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
চীনের পথ ধরে বাংলাদেশের সাথে ভারত ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর সম্পর্ক গড়তে পারেনি বলে তিনি ভারতের সমালোচনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ৩৯০ বিলিয়ন ডলারের ভারতের আমদানি ব্যবসার ০.২ শতাংশও বাংলাদেশ পায়নি। এই তথ্য হাজির করে তিনি সমালোচনা করছিলেন। বলছিলেন, “অথচ বাংলাদেশ নাকি ভারতে বিনা কোটায় ও বিনাশুল্কে পণ্য রফতানির সুবিধাপ্রাপ্ত” “বন্ধুরাষ্ট্র”। এই হল ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বন্ধুরাষ্ট্রের”  দশা। আসল বাংলাদেশের দশা বুঝানোর জন্য তিনি আরো শক্ত উদাহরণ তুলেছিলেন। তিনি তুলনা দিয়ে বলেছিলেন, ভারত নানা পণ্য রফতানিকারী যেসব দেশ ভারতে বাংলাদেশের মত কথিত কোনই ফ্রি ট্রেড সুবিধাপ্রাপ্ত নয়, যেমন- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, এমনকি মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার মতো এসব রাষ্ট্রও ভারতে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রফতানি করে থাকে।
অর্থাৎ, রেহমান সোবহান এখন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর জায়গায় দাঁড়িয়ে ভারতের সমালোচক হতে চাইছেন। সেটা প্রশংসনীয় সন্দেহ নাই। তবে ২০০৭ সাল থেকেই আমরা তাঁর মুখ থেকে  ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটির কথা শুনে আসছি, কিন্তু কখনো ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমন শোনা যায়নি। এখন সমালোচক হওয়াতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান দশার দায় তার ওপর কি কমে আসবে? তা দেখতে হবে।

তবে রেহমান সোবহান এখন কড়া সমালোচক হলেও পুরনো স্টাইলে ভারতের প্রশংসা করা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে পঞ্চমুখ হওয়ার লোক অনেকে এখনো বোধ হয় আগের মতোই আছেন। এদের একজন হলেন সাবেক কূটনীতিক ফারুক সোবহান। তিনি আমেরিকাকেন্দ্রিক থিংকট্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী। তিনি গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যেখানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চারটি উন্নতি তিনি দেখেছেন বলেন। জানিয়েছেন, উন্নতির ক্ষেত্র এর চেয়ে বেশি থাকলেও তিনি সদয় হয়ে বেছে কেবল চারটি উল্লেখ করেছেন; যার প্রথম আর সবচেয়ে বড় সফলতার ক্ষেত্রটা নাকি “বিদ্যুৎ সহযোগিতা”। অথচ সোজা কথায় বললে, আসলে ভারতকে “বিদ্যুৎ ট্রানজিট” দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ভারতের এপার ওপার যোগ করে নেয়া হয়েছে। অথচ তিনি বলছেন, এই অবকাঠামো নাকি আমাদেরকে ভারতীয় বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য সদয় হয়ে করা হয়েছে। ফলে এটাই নাকি আমাদের স্বার্থে উন্নয়ন। আর ভবিষ্যতে নেপাল ও ভুটানে আকাশকুসুমে কল্পিত বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে কল্পিত সেই বিদ্যুৎ আমাদের কেনার পথ সুগম হয়েছে এতে। এটাই ‘সফলতা’। অথচ এখনই নেপালে যেসব বিদ্যুৎ কোম্পানী ভারতীয় মালিকানায় নয় তাদের বিদ্যুৎ বিক্রিতে জটিলতা শুরু হয়েছে।  তাঁর দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ভারতের বাজারে বাংলাদেশ নাকি  কোনো শুল্ক অথবা কোটা ছাড়াই অবাধ রফতানি সুবিধা ভোগ করছে। এমনকি নন-ট্যারিফ যেসব বাধা ছিল সেগুলোও নাকি অপসারণ হয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি যে পুরা উল্টা, সেটা আমরা ওপরে খোদ রেহমান সোবহানের বরাতে জেনেছি। তিনি পরিসংখ্যান হাজির করে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের তৃতীয় ও চতুর্থ অর্জন হিসেবে ফারুক সোবহান এনেছেন বাংলাদেশ ভারতকে নিজের দু’টি পোর্ট ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছে। আর চতুর্থ হল ভারতের নর্থ-ইস্ট নাকি এখন আমাদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। অথচ হয়েছে ঠিক উল্টা। ট্রানজিট দেয়াতে বাংলাদেশী পণ্যের চেয়ে ভারতের অপর অংশের পণ্য তার নর্থ-ইস্টে আমাদের বেশি প্রতিযোগী হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের দু’টি পোর্টই বিনা শুল্কে ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়ায় তাতে আমাদের কিভাবে উন্নতি হয়েছে তা তিনি ব্যাখ্যা করে কিছুই বলেননি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[লেখাটা এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” এর ভিতর বাংলাদেশী টুপি

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর ভিতরে বাংলাদেশী টুপি

গৌতম দাস

২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cx

 

 

 

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ম মোতাবেক গত ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। শপথ নেয়ার দিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে দাঙ্গাহাঙ্গামা প্রতিবাদ বিক্ষোভ যেমন হয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের শপথের সব আনুষ্ঠানিকতাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্বভার বুঝে নেয়ার জন্য গঠিত ট্রাম্পের দলবল গত দুই মাসে তাদের সব কাজের মধ্যে একধরনের প্রতিহিংসা মাখানো পদক্ষেপের চিহ্ন রেখেছে। সেই সাথে প্রবল চাপাবাজি, আর প্রপাগান্ডায় সব কাজে “আমরাই শ্রেষ্ট, আমরাই একমাত্র” ধরনের লোক-দেখানো কর্মতৎপরতায় ভরপুর। সেসব আচরণ শপথ নেয়ার সময় পর্যন্ত বজায় ছিল। এমনকি ট্রাম্পের প্রশাসনের হবু উপদেষ্টারা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) যাদেরকে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন কিন্তু সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন, তারাও সিনেটের শুনানিতে প্রশ্নের জবাবের সময়ও একই প্রপাগান্ডা, চাপাবাজি আর জনপ্রিয়তাবাদি ভাষায় কথা বলা চালিয়ে গেছেন। যেমন ট্রাম্পের হবু পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হলেন শীর্ষ তেল কোম্পানী Exxon Mobil Corp এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী রেক্স টিলারসন। তিনি সিনেটের শুনানি চাপাবাজি হুঙ্কার দিয়ে বলছেন সাগরপথে  চীনের প্রবেশপথ “দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না”। কিন্তু কিভাবে তিনি এই আওয়াজ বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে তিনি বা ট্রাম্পের মুখপাত্ররা কেউ আর মুখ খুলতে নারাজ। ওদিকে এসব ছাড়া ট্রাম্পসহ সবাই এমন একটা ভাব বজায় রেখে কথা বলে গেছেন, যেন ট্রাম্পের আগে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট নির্বিশেষে ওবামাসহ যত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ছিলেন এরা স্কলে ছিলেন এক একজন বিদেশি শোষক, বিদেশীদের স্বার্থের প্রতীক। বিশেষ করে ওবামা হল ট্রাম্পের বিশেষ টার্গেট। তাই শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতার শুরুতেই ট্রাম্প বলছেন, “আজকের এই ক্ষমতা হস্তান্তর বিশেষ অর্থপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের এক ক্ষুদ্র অংশ রাজধানীতে বসে সব মাখন খেয়েছে। ওয়াশিংটন ঝলমল করে উঠেছে কিন্তু জনগণের সাথে তারা সম্পদ শেয়ার করেনি। রাজনীতিবিদরা উন্নতি করেছেন আর ওদিকে চাকরি হারিয়ে গেছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা একদল আর একদলকে অথবা এক সরকার আর এক সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিন নয়। আজ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার দিন”। যেন ট্রাম্প হয়ে গেছেন শ্রমিকের দুঃখ বেচে সহানুভুতি জড়ো করা ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্ট নেতা। আর টাম্পের সবকথার শেষ কথা হল, “এখন ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে এসে গেছেন, ফলে সব ঠিক হয়ে যাবে”। এ কারণেই যেন তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও কর্মচারীরা যেন খুবই দ্রুত বিদায় নেন, পারলে ওবামা চলে যাওয়ার পরপরই আর তাদের কাউকে দেখা না যায়। তিনি ইঙ্গিত দিতে চান যেন, এরা সবাই গণস্বার্থবিরোধী তৎপরতার প্রতীক । । ট্রাম্পের এই বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে ব্রিটিশ কলোনি আমলে নেটিভ কোনো নেতা বক্তৃতা দিচ্ছে যেখানে ওবামা যেন লর্ড ক্লাইভ। আর ট্রাম্প হলেন জনদরদি একমাত্র দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী।

এগুলো নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি রকমের লোকরঞ্জন ততপরতা। ট্রাম্প আর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওবামা আমলের যত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিশেষ করে যারা পেশাদার কূটনীতিক নন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল যেন তারা ২০ জানুয়ারির আগেই বিদেশে চাকরির দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এই নির্দেশনা প্রতিহিংসার উদাহরণ। এই রাষ্ট্রদূতেরা এক-দুই মাস অথবা অন্তত দুই সপ্তাহ স্বপদে বেশি থেকে গেলে তাতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকার প্রশাসনিক রেওয়াজও এটাই। অর্থাৎ রেওয়াজ ভাঙার অপ্রয়োজনীয় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইঙ্গিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যে- ওবামাসহ পুরনো রাজনীতিবিদেরা সব বিদেশী চর। তাই তাদের ছায়া যেন ট্রাম্পের ওপর না পড়ে। এ নিয়ে অনেক কার্টুন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প একটা বড় খেলনা রঙের পিচকারি বন্দুক নিয়ে ওবামার অফিসে ঢুকে ওবামাসহ সবাইকে তাড়া করছেন, রঙ ছিটাচ্ছেন আর বলছেন অফিস থেকে বের হয়ে যেতে।
এখানে ট্রাম্পের বক্তৃতা থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক অংশ হুবহু অনুবাদ হাজির করব যেখানে ট্রাম্পের সস্তা জাতিবাদী বুঝ এবং সুড়সুড়ি কত ভয়ানক হতে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে, এ’থেকে। ট্রাম্প বলছেন, “বহু যুগ ধরে আমরা আমেরিকান শিল্পের ঘাড়ে চড়ে বিদেশী শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি। অন্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়ে পালছি আর আমাদের বাহিনী শুকিয়ে মেরেছি। বিদেশী অবকাঠামোর পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছি আর আমেরিকার বেলায় সেগুলো রিপেয়ার না করায় ক্ষয়ে গেছে। আমরা অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করেছি অথচ তা করতে গিয়ে নিজেদের সম্পদ, সামর্থ্য, আস্থা সব লোপাট করেছি। একটা একটা করে আমাদের ফ্যাক্টরি ভেঙে পড়ছে, আমাদের উপকূল ছেড়ে গেছে আর আমাদের লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার ফেলে রেখে গেছে। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘর থেকে তাদের সব সম্পদ টেনে বের করে সাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দিন শেষ। এগুলো এখন অতীত। আমরা এখন শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকাব। আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি এবং এক ডিক্রি জারি করছি, যা দুনিয়ার সব রাজধানীতে প্রতিটা ক্ষমতার কেন্দ্রে শোনা যাবে। আজ থেকে এক নতুন স্বপ্ন আমাদের ভূমিকে শাসন করবে। এখন এই মুহূর্ত থেকে সবসময় “সবার আগে আমেরিকা, আমেরিকার স্বার্থ”। বাণিজ্য, ট্যাক্স, ইমিগ্রেশন, বিদেশনীতি ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তা আমেরিকার শ্রমিক ও আমেরিকান পরিবারের বেনিফিটের দিকে তাকিয়ে নেয়া হবে”।

এখানে তামাশার দিকটা হল, কমবেশি এই বক্তৃতাটাই এত দিন আমাদের মতো কম আয়ের বিভিন্ন রাষ্ট্রে জাতিবাদী বা কমিউনিস্টরা “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে দিয়ে এসেছে। আজ ট্রাম্প তা নিজ দেশের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে উগড়িয়েছেন।

আসলে ট্রাম্প নির্বাচনে দাঁড়ানোর শুরু থেকে পুরো ব্যাপারটাই এমন। যেমন, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল স্লোগান – “Making America Great Again” বা অনুবাদ করে বললে, “আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান বানাব”- এটাই সবচেয়ে বড় চাপাবাজি; অর্থহীন কথাবার্তা। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্পের শ্লোগান – এখানে যে গ্রেট বলা হয়েছে, এই গ্রেট মানে কী? কী হলে তা গ্রেট হবে, এর সংজ্ঞাই বা কী? যদি এ শব্দ দিয়ে সম্পদ বা সম্পদের দিক থেকে গ্রেট বোঝানো হয়ে থাকে তবে তিনি এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন, ‘১৯৮০ থেকে ২০১৪, মাত্র এই ৩৪ বছরেই আমেরিকার সম্পদ বেড়েছে ২১ গুণ। এর অর্থ আবার আমেরিকান ধনী মাত্র এক শতাংশ, এদের সম্পদের ১৯৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া। তার অর্থ আমেরিকা গ্রেট ছিল না, এ কথা তো সত্যি নয়। কিন্তু সে আর কত গ্রেট হবে! তাই ধরে নেয়া যায়, সম্পদের চেয়েও ভিন্ন, সম্পদ ছাড়িয়ে আরো বড় কিছুর দিক থেকে গ্রেট হওয়ার কথা ট্রাম্প বলছেন। তা হল, সম্পদের সঞ্চয় নয়, সম্পদের বিতরণ। ওই প্রফেসর বলছেন, এ কথা দিয়ে আসলে ব্যাখ্যা করা যায় ট্রাম্প কাদের পটিয়ে ভোট নিয়েছেন; কলেজ-না-পৌঁছানো যে শ্রমগোষ্ঠী আছে প্রকারান্তরে তাদের কথা বলছেন। যাদের কথা বলছেন তাদের বেলায় হয়ত  কথা ঠিক কিন্তু তাদের জন্য তিনি তা আনতে পারবেন না। কারণ বিষয়টা এত সহজ-সরল নয়।’
কোল্ড ওয়্যার যুগের সস্তা জাতিবাদী বুঝি। সব ধরনের আমদানি করা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করলেই সব কিছু আমেরিকায় উৎপাদন করা আবার শুরু হয়ে যাবে এটা বোকার মতো কথাবার্তা। যদি তা-ই হতো তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সত্তর দশকের মধ্যে, এর আগে সুন্দর দিন কাটানোর আমেরিকা ভেঙে গ্লোবালাইজেশনে যাওয়া হয়েছিল কেন? খামোখা? নিজের পায়ে কুড়াল মারার জন্য? আমেরিকা নিশ্চয় বাংলাদেশ নয়। ফলে কে এবং কী তাকে বাধ্য করেছিল? নাকি আসলে প্রলুব্ধ করেছিল?
আঙুর ফল মিঠা হলেও সময়ে তা হয় উল্টা, আঙুর ফল খাট্টা বলার সময় হয়ে যায় একটা সময়। আপনি অন্যকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেয়া মানে, সেও তার বাজারে অন্য পণ্যে আপনাকে প্রবেশে বাধা দেবে। আবার খুব সাবধান, এখানে বাজার বলতে শুধু ‘তৈরী ভোগ্যপণ্যের বাজার’ বুঝানো হয় নয়। ‘বাজার’ মানে আসলে বিনিয়োগপুঁজি, কাঁচামাল, টেকনোলজি, মেশিনারি, শ্রম ইত্যাদি সব কিছুরই বাজার। ‘বাজার’ মানে শুধু প্রান্তিক ভোগ্যপণ্য যা কনটেইনার জাহাজে ভরে আনা-নেয়া করে শুধু তা-ই নয়  – বরং সব কিছুই। এমনকি পুঁজি এবং শ্রমও। ফলে আমেরিকা শুধু সে তার নিজ দেশে বিদেশী পণ্য রফতানি হতে দেবে না, তা বাস্তবে করা সম্ভব নয়। কারণ যে দেশ পণ্য রফতানি করবে সে পুঁজিবিনিয়োগও করবে। এটা ঠেকানো যাবে না সবকিছুই করবে – এর ব্যতয় ঘটানো এক কথায় অসম্ভব। যেমন আমেরিকা সরকারের আয়-ব্যয়ের এক বড় উৎস সরকারি বন্ড। দেশি বা বিদেশিরা এই বন্ড কিনে। আজ যেখানে চীন ও জাপান প্রত্যেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি (চীনেরটা আরো বেশি) করে বন্ড কিনে রেখেছে, সেখানে পণ্য প্রবেশ বন্ধ করার যুদ্ধ কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?

তত্ত্ব দিয়ে এই প্রসঙ্গে আলোচনা অনেক করা যায়। দেখানো যায়, এটা কেন অসম্ভব। তবে এর চেয়ে বরং ট্রাম্পের শপথের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ট্রাম্পের সমর্থক তরুণ যারা নানান রাজ্য পেরিয়ে ট্রাম্পের ‘ভোট দেয়ার বিপ্লবে’ যোগ দিতে ওয়াশিংটনে এসেছিলেন তাদের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যাক। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ ট্রাম্পের নির্বাচনে নানা ইস্যুতে শুরু থেকেই সমালোচক। বিশেষ করে, ট্রাম্পের ভোটে জয়লাভের পর থেকে যেসব ক্যারিকেচারও স্ববিরোধিতা ফুটে বের হচ্ছে সেগুলো তুলে আনার ক্ষেত্রে। শপথ নেয়ার দিনে রয়টার্সের এমন এক নিউজ হল, ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ প্রচার অভিযান নিয়ে। ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ বা লাল টুপির ঘটনা হল, উগ্র জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণীর বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হয়েছে লাল টুপি পরে। রয়টার্স ওই তরুণদের টুপি খুলিয়ে দেখাচ্ছে যে, তাদের সব টুপিই বিদেশে তৈরি, হয় বাংলাদেশের, না হয় ভিয়েতনামের, না হয় চীনের। কেন? কারণ ট্রাম্পের টুপি প্রচারাভিযানের মূল প্রপাগান্ডা অফিসে যেসব টুপি বিক্রির জন্য রাখা ছিল ওগুলো খোদ আমেরিকায় তৈরি ফলে এর দাম বেশী, কমপক্ষে ত্রিশ ডলার বা তারও বেশি। কত বেশি? বিদেশী (বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা চীনের) টুপির  তুলনায় বেশি, বিদেশী ওই তিন দেশের টুপির দাম বিশ ডলার বা এর নিচে। ফলে স্বভাবতই ঐ প্রচারাভিযানে সবাই সস্তা নামে পাওয়া টুপি পড়েই এসেছে – বাজারের স্বভাব অনুসারে। অর্থাৎ আমেরিকার তৈরি টুপি নিজ সমর্থকেরাই কম পরেছে। এই হলো ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর তামাশা এবং পরিণতি।

মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের এই আমেরিকাই গত সত্তরের দশক থেকে দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশন যেতে বাধ্য করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক-আইএমএফ আমাদেরকে নিজ বাজারের রক্ষণশীলতা ছেড়ে গ্লোবালাইজেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাপাচাপির মাধ্যমে বাধ্য করে এসেছিল। আজ ট্রাম্প নিজেই গ্লোবালাইজেশন ছেড়ে উলটা সংরক্ষণবাদিতা বা প্রোটেকশনিজমে যাওয়ার কথা বলছেন।

আজ সোজা কথাটা হল, গ্লোবাল বাণিজ্য বেচাকেনা বিনিময়ের মাধ্যমে একটা পরস্পর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে গেছে এবং তা যে স্তরে যে জায়গায় চলে গেছে, এ থেকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কঠিন। চাল-ডাল মিশে গেলে যেমন এগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। ট্রাম্পের জয়লাভের পর গত দুমাসে গ্লোবাল অর্থনীতির সমন্বয় আর গ্লোবাল বাণিজ্যবিষয়ক দু’টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রথমটা ল্যাটিন আমেরিকার পেরুর লিমা শহরে ‘এপেক’ (বাণিজ্য) সম্মেলন। আর দ্বিতীয়টা সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন, যেটার অংশগ্রহণকারি গ্লোবাল। তবে দুটোতেই সুর পরিষ্কার, আমেরিকা সংরক্ষণবাদী হতে চাইলে তাকে পেছনে ফেলে বা উপায়ান্তে তার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও চীনের নেতৃত্বেই দুনিয়া গ্লোবালাইজেশনে এগিয়ে যাবে। যেতে হবে। জাপান ট্রাম্পের ওপর হতাশ হয়ে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক উষ্ণ হতে যাচ্ছে। দুনিয়া সাজানোর সব হিসাব নতুন করে সাজতে বাধ্য। আসলে বিষয়টা হল- গ্লোবাল বাজার নিজের শেয়ার বাড়ানোর, নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২২ জানুয়ারী ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে যেকোন যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

গৌতম দাস

২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-29P

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

দুইঃ
হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা
গৌতম দাস
২৬ নভেম্বর ২০১৬, শনিবার
http://wp.me/p1sCvy-26p

বড় এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অস্থিরতা আবার এই প্রথম। সাম্প্রতিক নির্বাচনে অনেক উত্তেজনা ছড়ানোর পর আমেরিকা এক নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেয়েছে, এ জন্যই কি অস্থিরতা? কিন্তু প্রেসিডেন্ট তো পেয়েই গেছে, তাহলে আর অস্থিরতা কেন? আসলে আমেরিকার নির্বাচনকে মাধ্যম করে অস্থিরতা এর ভেতর দিয়ে বাইরে প্রকাশ্যে এসেছে। তাহলে ভেতরের দিক, মানে অস্থিরতা উৎস কোথায় ও কেন? তাই এখন বোঝা দরকার।
যে প্রসঙ্গ ধরে এর জবাব খুঁজব তা হল, গ্লোবাল নেতৃত্ব। গ্লোবাল নেতৃত্বে এখন আছে কে, কবে থেকে? এবং কোন প্রক্রিয়ায় সে সমাসীন হয়েছিল এই দিকগুলো খুজে দেখে আগাব। আমাদের অনেকের হয়ত পছন্দ হবে না। বিশেষ করে যারা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের বয়ানের বাইরে আর কোন বয়ান এবং বিশেষত, ঐ বয়ানের সাথে মিলে না এমন কোন ফ্যাক্টস বা ইনফরমেশন থাকতেই পারে না বলে মনে করেন, তাদের কথা বলছি। তাদের পছন্দ না হলেও কথা সত্য যে , আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নেতৃত্ব নিয়েছে ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে। তাতে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী আমরা এ’ঘটনাকে ভাল অথবা মন্দ বলে যে যাই বিবেচনা করি না কেন, এটাই কঠিন সত্যি। আর মোটা দাগে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪১ সালের আগস্টে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষ পক্ষ নেয়ার, অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ততকালের পরপর চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (Franklin Delano Roosevelt, known as FDR)। আর বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উইলস্টন চার্চিল (Sir Winston Leonard Spencer-Churchill)। রুজভেল্ট-চার্চিল ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট স্বাক্ষরিত বিখ্যাত চুক্তির নাম আটল্যান্টিক চার্টার (Atlantic Charter 1941)। এই আটল্যান্টিক চুক্তিকে বলা যায় সেরা কলোনি মাস্টার ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে লিখে দেওয়া দাসখত স্বাক্ষর। আর আর এক দিক থেকে বলা যায় ঐ চুক্তি হাতে পেয়ে রুজভেল্ট নিশ্চিত হন যে দুনিয়ায় তখন থেকে আমেরিকান নেতৃত্বে আসা নিশ্চিত হয়েছে। কেন এমন বলছি? ঐ চুক্তিকে দাসখত বলছি এজন্য যে ঐ চুক্তিতে আটটা পয়েন্ট আছে যার তৃতীয় পয়েন্টে হল যে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই নাগরিক অধিকার ঐ দুই নেতা স্বীকার করেছিলেন ও সম্মান দেখাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা হয়ত এখনও বুঝি নাই তাতে কী? তাতে বিরাট কিছু। কারণ আমরা তখনও ছিলাম বৃটিশ কলোনি – কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বাসিন্দা। তার মানে ঐ চুক্তিতে চার্চিল স্বীকার করে নিয়েছেন যে বৃটিশ-ইন্ডিয়ার নাগরিক আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই দুই নাগরিক অধিকার আছে। আর এই অধিকার থাকার অর্থ বৃটিশ সরকারের ইন্ডিয়াকে কলোনি করে রাখা অবৈধ। আর এটাই খোদ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আটলান্টিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে স্বীকার করে নিয়েছেন।  কে স্বীকার করছেন? করছেন বৃটিশ মাস্টার। যে বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্য দম্ভ আর গর্ব  করে বলত, “বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কোনদিন অস্ত যাবে না”।আর এটাই ছিল রুজভেল্টের চার্চিলের বৃটেনকে যুদ্ধে সামরিক সাহায্য সহযোগিতা ও হিটলারের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ নেবার শর্ত। এজন্যই যুদ্ধের পর দুনিয়া জুড়ে  কলোনি-মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে দেখেছিলাম। এর সাথে অবশ্য বৃটিশ বিরোধী বা কলোনি বিরোধী স্থানীয় জনগণের যেসব আন্দোলন ছিল এসবের ভুমিকাও ফেলনা নয়। অর্থাৎ কোনটাই অগুরুত্বপুর্ণ না, সংযুক্ত উপাদান।

তবে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কেন রুজভেল্টের শর্তে আটল্যান্টিক চুক্তি করেছিলেন? আর তাতে কলোনি শব্দটা উচ্চারণ না করেও তবে ভিন্ন ভাষায় কোন রাষ্ট্রকে “কলোনি করে রাখা অবৈধ” – তা স্বীকার করেছিলেন কেন? এর প্রধান কারণ, হিটলারের জর্মানির হাতে ততদিনে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে গিয়েছে। মানে ফ্রান্স ১৯৪০ সালের জুন থেকে জর্মানির দখলে চলে গেছে। আর ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের মাঝে হল ইংলিশ চ্যানেল। অর্থাৎ বৃটেনের দিক থেকে দেখলে চার্চিল, বৃটেন থেকে ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ফ্রান্সকে দেখছিলেন যে হিটলারের হাতে ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। যার মানে শত্রু ইংলিশ চ্যানেলের অপর পাড় পর্যন্ত এসে গিয়েছে। ওদিকে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই বৃটেনের গোলাবারুদসহ যুদ্ধের উপকরণের অভাব চলছিল। একমাত্র সাপ্লায়ার আমেরিকার নিজের “ক্যাশ এন্ড ক্যারি আইন ১৯৩৭”, আর “নিউট্রালিটি এক্ট ১৯৪০” (যে সে যুদ্ধে কোন পক্ষে জড়াবে না) – এই দুই আইনের কারণে কেবল নগদ সোনায় মুল্য পরিশোধের শর্তে তাও সীমিত পর্যায়ে সাপ্লাই বজায় রেখেছিল। বৃটেনের নগদ সোনার সামর্থও ১৯৪০ সালের শেষ নাগাদ ফুরিয়ে আসে। এই মরিয়া অবস্থাকে বাঁচার জন্য চার্চিলের একমাত্র পথ খোলা ছিল রুজভেল্টের শর্তে আটলান্টিক চার্টার স্বাক্ষরে রাজি হওয়া।

অতএব তখন থেকেই যুদ্ধের পরিণতি, যুদ্ধের বিজয়, বিজয়-পরবর্তী নতুন করে দুনিয়া সাজানো ইত্যাদি সব কিছুতে নির্ধারক ভূমিকা নিয়ে আমেরিকা নেতৃত্বে চলে আসার সুযোগ তৈরি হয়ে এসেছিল। কিন্তু রুজভেল্টের দিক থেকে কলোনি অবৈধ বা কলোনি মুক্তি শর্ত হল কেন?  আর তাতে আমেরিকার কী লাভ? প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী একটা যুদ্ধ ছিল ঠিকই, তবে সেদিকের চেয়ে এর প্রধান গুরুত্ব হল- এই যুদ্ধের হাত ধরে তদানীন্তন দুনিয়ার এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটেছিল। কী সে নতুন সম্পর্ক? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। ফলে ১৯৪৫ সালকে বেঞ্চমার্ক ধরলে তার আগের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটা কলোনি শাসন সম্পর্কের দুনিয়া। ইউরোপের ব্রিটিশ ও ফরাসিরাসহ মোট পাঁচ-ছয়টি সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র সমগ্র দুনিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের কারো না কারো ভাগের দখলি কলোনি করে নিয়ে রেখেছিল। এশিয়া ও আফ্রিকা দুটা পুরা মহাদেশকে উপনিবেশ বা কলোনি বানিয়ে রাখা কলোনিকর্তা ছিল ইউরোপ। কেবল আমেরিকা এসবের ভেতরে ছিল না, আলাদা অবস্থান ছিল তার। এই ছিল সেই কলোনি-সম্পর্কের দুনিয়ার শাসন চিত্র। আর এর বিপরীতে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হল – কলোনি শাসন-সম্পর্কের অবসান। দুনিয়া কলোনিমুক্ত হওয়ার যুগ। ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তারা এরপর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র; অন্তত প্রত্যক্ষ বিদেশী শাসনের অধীনে আর তারা রইল না। তবে এক নতুন সম্পর্ক – আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সম্পর্কের ভেতরে তাদের প্রবেশ ঘটে। বলা বাহুল্য, আগের কলোনি শাসন সম্পর্কের বদলে এটা তুলনামূলক অর্থে, অবশ্যই ভাল। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র তারা বটে, তবে নিজের দুর্বল অর্থনীতি, অগ্রসর অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে অসম সম্পর্ক, দুর্বল চুক্তি করার ক্ষমতা, দুর্বল বিনিয়োগ সক্ষমতা ইত্যাদি এগুলো বৈশিষ্ট্য তাদের। এক ভিয়েতনাম (১৯৭৫) বাদ দিলে এশিয়ার কলোনিমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে পুরো পঞ্চাশের দশক পার হয়ে যায়। আর আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে (১৯৯৪) বাদ দিলে কলোনি শেষ হতে সেখানে সত্তরের দশক পর্যন্ত লেগে যায়। এভাবে বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটাই সেই আমেরিকার নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজমের এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি-ক্যাপিটালিজমের সাথে তুলনায় বিপরীতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজমের এক নয়া দুনিয়া। ততকালে উঠে আসা ব্যাপক পুজি বিনিয়োগ সক্ষমতার গ্লোবাল পুজি বাজারের আড়ত – ওয়াল স্ট্রিট – এর স্বার্থ ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজম।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকার পক্ষে এই নেতৃত্ব নেয়া বা দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়া কেন সম্ভব হয়েছিল, এ দিক থেকে ঘটনা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এর মৌলিক কারণ আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। বলা হয় ১৮৮০ সাল থেকেই অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও পুঞ্জীভবনের দিক থেকে আমেরিকা সেকালের সবচেয়ে বড় কলোনিমাস্টার, এম্পেরিয়াল ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসিবিরোধী অ্যালায়েড ফোর্স – এই জোটের সব রাষ্ট্রকেই আমেরিকা এককভাবে সাহায্য করতে সক্ষম ছিল এবং তা করেছিল। অর্থাৎ মোট যুদ্ধখরচের এক প্রধান অংশ আমেরিকা একাই বহন করতে সক্ষম ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ নাৎসি ব্লক-বিরোধী সবাইকে আমেরিকা অর্থ (তৈরী পণ্য পাঠিয়ে যেমন- যুদ্ধজাহাজ, প্লেন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের খাদ্যদ্রব্য বা সেনা-ইউনিফর্মসহ সবকিছু) ধার দিয়েছিল। ধার লিখলাম বটে; কিন্তু কবে কিভাবে এটা পরিশোধ হবে, তা উহ্য রেখে এই সাহায্য দেয়া হয়েছিল। আমেরিকার ‘লেন্ড অ্যান্ড লিজ অ্যাক্ট’ নামে এক আইনের অধীনে এটা দেয়া হয়েছিল। এই আইনের অনেকগুলো ভার্সন আছে। আইনটি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সাল থেকে cash & Carry act এবং  Neutrality act নামে বিভিন্ন সংশোধিত ভার্সান থেকে। এরপর Lend-Lease Act”  ১৯৩৯ আর শেষে ১৯৪১ সালের সংশোধিত ভার্সনই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কংগ্রেস ও সিনেটে পাস হওয়া এই আইনের মূল কথা- আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে প্রেসিডেন্টকে এক অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়। যেমন- প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন অমুক রাষ্ট্রকে একটা নতুন যুদ্ধজাহাজ দেয়া কিংবা ১০০ টন চিনি পাঠিয়ে দেয়া আমেরিকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি, তবে প্রেসিডেন্ট ওই রাষ্ট্রকে এই আইনে তা দিতে পারেন। অর্থাৎ মূল শর্ত হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ‘মনে করলেই’ (deem) যথেষ্ট। এখানে লক্ষণীয় হল, এটা অনুদান বলা হয় নাই। বরং সুনির্দিষ্ট করে আমেরিকা সরকারের দেয়া ধার অথবা লিজ। ফলে তা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু কবে কিভাবে, তা নিয়ে কোনো শর্ত নেই। উল্লেখও নাই। ইচ্ছা করে এ দিকটি উহ্য রাখার নিয়ম করা  হয়েছিল, যাতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেটা পরে কোনো এক সময় উভয় রাষ্ট্রের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে তা ঠিক করতে পারেন। চাই কী মাফ করে দিতে পারেন। যুদ্ধ শেষে এক হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকা এই আইনে ধার অথবা লিজ দেয়া মোট সম্পদ হস্তান্তর করে ফেলেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের। (এখনকার ২০১০ সালের সমতুল্য মুল্যে এটা ৭৫০ বিলিয়ন ডলার)। ওর মধ্য কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেয়া হয়েছিল ১১ বিলিয়ন ডলারের (মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের ২২% ) সাহায্য-পণ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকার লেন্ড এন্ড লিজ আইনে করা সাহায্য চুক্তির প্রটোকল এখানে দেখা যেতে পারে। যুদ্ধ শেষে এই খরচের বেশির ভাগই মওকুফ করে দেয়া হয়। কোনো জাহাজ বা প্লেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হলে তা নিজেদের এলায়েড যুদ্ধজোটের  পক্ষ থেকে হয়েছে বলে তার কোনো দাম ধরা হয়নি। আর বাকিটা দীর্ঘ ৬০ বছরের কিস্তিতে ২ শতাংশ সুদে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিশোধের চেয়েও তখন বড় প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল, সারা ইউরোপে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বিনিয়োগ কে কোথা থেকে জোগাড় করবে? কে দেবে? সে সময় সক্ষম একমাত্র রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ইতালিতে দুর্ভিক্ষাবস্থা সামলাতে অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটসহ সারা ইউরোপে ভেঙে পড়া অবকাঠামো আবার নির্মাণ, কারখানা পুনর্নির্মাণ এবং তা চালু করার পুঁজি, এভাবে সব কিছুতেই বিনিয়োগ ঢেলে দেয় একা আমেরিকাই। বলা হয়, যুদ্ধের খরচের প্রায় সমপরিমাণ বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই ব্যয় করতে হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গঠন করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই প্রথম সচল হতে শুরু করেছিল। অপর দিকে, ইউরোপের জার্মানি আর এশিয়ায় জাপানের যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনের জন্য আমেরিকা বিশেষ বিনিয়োগ প্রোগ্রামে ‘মার্শাল প্লান’ নিয়েছিল। এভাবেই আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল। সেই থেকে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, জাতিসঙ্ঘ এবং ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ইত্যাদির মাধ্যমে গ্লোবাল নিয়মশৃঙ্খলার এক অর্ডার কায়েম করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব। আর স্বভাবতই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে একক দুনিয়া চালিয়ে আসছিল দেশটি।
ইউরোপের কলোনি ক্যাপিটালের ভেতরেই যেমন আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছিল ১৮৮০ সালের দিকে, ঠিক তেমনি ১৯৭২ সাল থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ফাইনালি চলতি একুশ শতক থেকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন হাজির হয়েছে। আর ততটাই চীন আমেরিকান সক্ষমতার বিপরীতে চ্যালেঞ্জ আকারে হাজির হচ্ছে। আমেরিকার ক্রমেই সক্ষমতার দিক থেকে ঢলে পড়ছে। আর এই পথে সে যেতে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাকে(২০০৩) হামলা। এক দিকে সমাপ্তিহীন এ যুদ্ধ, আবার যুদ্ধের ফলাফল নিজের পক্ষে তেমন না আসা, আর সব কিছুর ওপর যুদ্ধের সীমাহীন ব্যয়- এসব কারণে আমেরিকার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায় সে এখান থেকে। এছাড়াও আবার এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসে ২০০৭ সালের শেষে। এভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রকে পুরাপুরি বিপদে ফেলার কাজটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ তার দুই টার্মে (২০০১-০৮)। এরপর বারাক ওবামা। প্রথম টার্মে তিনি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন জানুয়ারি ২০০৯ সালে। আর দ্বিতীয় টার্মে ২০১৩ সালে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম ২০১১ সালে, আমেরিকার পুরাতন নীতি-পলিসিগুলো নতুন করে সাজানোর প্রথম সুযোগ পান ওবামা। ইতোমধ্যে তিনি যুদ্ধ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা সাব্যস্ত করেছিলেন ২০১৪ সাল। কিন্তু দেশের অর্থনীতির শুকিয়ে যাওয়া দেখে তো বটেই, সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেখে (আমেরিকান অহঙ্কারে ঘা লেগেছে) এগুলো যে আমেরিকার নেতৃত্ব ও সক্ষমতা ঢলে পড়ার ইঙ্গিত- এ নিয়ে দেশের ভেতরে আলোচনা প্রবল হতে থাকে। ওদিকে ২০১১ সালেই ওবামা প্রথম অনেকটা সরাসরি চীন ঠেকানোর “এশিয়া নীতি” (PIVOT to Asia Policy) ঘোষণা করেছিলেন। আর ঐ বছরেরই মে মাসে ওবামা একসাথে ইউরোপের ছয় রাষ্ট্র সফরে বের হয়েছিলেন।
প্রথমেই আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেন সফরের সময় থেকেই তিনি মনোবল বাড়ানো বা ফেরানোর জন্য বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। ‘আমরাই এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবো’, ‘পাশ্চাত্য এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবে’, এই ছিল তার নতুন বয়ান। বৃটিশ পার্লামেন্টে বক্তৃতায় ওবামা যা বলেছেন তা নিয়ে ২৫ মে ২০১১ বিবিসির ভাষ্য ছিল এরকম,

“……But he rejected arguments that the rise of superpowers like China and India meant the end for American and European influence in the world.
“Perhaps, the argument goes, these nations represent the future, and the time for our leadership has passed. That argument is wrong. The time for our leadership is now,” he said.
“It was the United States, the United Kingdom, and our democratic allies that shaped a world in which new nations could emerge and individuals could thrive.”

এটা তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। আমেরিকার ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমির গ্র্যাজুয়েশনে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘উদাহরণ হয়ে আমেরিকাকে দুনিয়াতে নেতৃত্ব দিতে হবে।’ পরের সপ্তাহেই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্যাপারটা নিয়ে ঠাট্টা করেন।  সে যাই হোক, কিন্তু আসল কথা তত দিনে সবাই বুঝে গেছে, আর কিছুই ফিরবে না। আমেরিকার অ্যাকাডেমিক, থিঙ্কট্যাঙ্ক ইত্যাদি সব জায়গায় একই বিতর্ক বিষয়, আমেরিকান নেতৃত্ব, সক্ষমতার ঢলে পড়া। ইতোমধ্যে ২০১১ সালে আমেরিকার ভেতরের চাকরি বা কাজের সুযোগ, উৎপাদন ও পড়ে যাওয়া বাজার ঠিক করতে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে পুনঃদরকষাকষিতে নিয়ে কিছু চাকরি এবং সুবিধা ফিরিয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু খুব বেশি কিছু হয়নি বা আগায় নাই তাতে। আমেরিকান প্রডাক্ট অথবা লেবার, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে, এটা এখন প্রতিষ্ঠিত। এসব কিছুর প্রভাবে এক ব্যাপক সামাজিক হতাশা চার দিকে ছেয়ে বসেছে।

এইবারের (২০১৬) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূল ইস্যু ছিল আসলে এটাই। এ কাজে ‘রেগুলার পলিটিক্যাল অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যারা গিয়েছেন সেই লিবারেলদের পক্ষে কোনো আবেদন ছিল না। তাই যার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কখনো কোনো স্তরে জনপ্রতিনিধি ছিলেন না যিনি, এমন এক ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রধান ভরসা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। নির্বাচনে জেতার পর আমেরিকার এখন দরকার এক কল্পিত শত্রু – যার বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে অভ্যন্তরীণ গণসংহতি তৈরি করতে হবে। স্বভাবতই চাকরির দিক থেকে অবৈধ অভিবাসী, বিদেশী এবং ‘মুসলমান’ এদের বিরুদ্ধে লোক ক্ষেপানো তুলনামূলকভাবে সহজ ও ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। অভ্যন্তরীণভাবে এই কৌশলকে যারা সঠিক ও উপযুক্ত মনে করেন, তাদের নতুন নামকরণ হয়েছে উগ্র ডানপন্থী অথবা বিকল্প ডানপন্থী বলে। এরা মনে করেন, এই পথ এখন সবচেয়ে কার্যকর। যেমন ট্রাম্প জিতে গেছেন এখন কে কে ট্রাম্পের সাথে প্রশাসনে বসবেন – তাদেরকে বেছে নিবার লড়াই চলছে। সে লড়াইয়ে এখনও কারা “মুসলমানদের আলাদা রেজিস্ট্রিতে নাম লেখাতে হবে” এর পক্ষে থাকতে চান এটা সেখানে ইস্যু। বিকল্প ডানপন্থীরা মনে করছে, এমন অবস্থান না নিলে নির্বাচিত হিসেবে ক্ষমতার জনভিত্তি দেয়া যাবে না। আবার উল্টো দিকে বিকল্প ডানপন্থীদেরই কারবার দেখে প্রচলিত রিপাবলিকান যারা আছেন, তারা রেসিজম বা ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ বিরোধীরা আনবেন এই ভয়ে বা লিবারেলদের প্রচারণার ভয়ে ভীত। তারা চাচ্ছেন, বিকল্প ডানপন্থীরা যেন ট্রাম্পের আশপাশে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়ে না আসেন। এই লড়াইটাই এখন এ দু’পক্ষের।
অপর দিকে, ট্রাম্পের মাধ্যমে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার চাপের মুখোমুখি চীন হতে যাচ্ছে, তা তারা বুঝে গেছে। তাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্বিগ্ন হয়ে আগেই বলে বেড়াচ্ছেন, (ট্রাম্পকে) মাথা ঠাণ্ডা করে মুখোমুখি বসতে হবে। ডায়ালগ ছাড়া আমাদের উভয়ের বিকল্প নেই। অর্থাৎ শঙ্কা, ট্রাম্পের কোনো গোঁয়ার্তুমিতে গ্লোবাল মন্দায় পড়ে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না। চার দিকে এক বিশাল অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, সামনের পথ আরো অস্থিরতার, কোনো সহজ পথের আলো কোথাও নেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইন ২২ নভেম্বর সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) কিছুটা ছোট করে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার অনেক সংযোজন ও এডিট করে নতুন এডিশন হিসাবে আবার ছাপা হল।]