ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

গৌতম দাস

২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

http://wp.me/p1sCvy-2hc

 

সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

[জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

গৌতম দাস
১৪ নভেম্বর ২০১৬,সোমবার,

http://wp.me/p1sCvy-21x

গত সেপ্টেম্বর মাসে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক দিনব্যাপী এক আলোচনার আয়োজন করেছিল যার আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন সুহাসিনী হায়দার। তিনি দক্ষিণী ভারতের প্রাচীন এক ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর বা পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক। দেশে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেটা গত ১৪ অক্টোবর “দি হিন্দু” পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
সেই সাক্ষাৎকারটা নেওয়া হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন এ’বছরের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাংলাদেশসহ কিছু দেশের বয়কট এবং বাতিল ঘোষণা হয়েছিল, এর পরপরই। প্রফেশনাল সাংবাদিক সুহাসিনীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হল, তিনি আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্রডকাস্টিং জার্নালিজম বিষয়ে এমএ করেছেন। এরপর প্রায় ২০ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায়। এর আগে তিনি ভারতীয় সিএনএন-আইবিএন টিভির এঙ্কর ও পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ফলে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড আর কেরিয়ার দেখে এটা বলার সুযোগ নেই যে তিনি অভিজ্ঞ নন। তাই, প্রধানমন্ত্রীকে করা তার প্রশ্ন কোনো নাদানের প্রশ্ন তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু লক্ষণীয় দিকটি হল, তার করা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাও বিরক্ত হয়েছেন। আমার ধারণা, যারা এই সরকারের বিরোধী, বাংলাদেশের এমন যে কেউও সুহাসিনীর প্রশ্নে বিরক্ত হবেন এবং অপছন্দ করবেন।
কিন্তু কী ছিল সে সাক্ষাতকারে? বাংলাদেশে গত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪ জানুয়ারি) আগে-পরের সময় থেকে হাসিনা সরকারের নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে। ঐ নির্বাচনের আগের মাসে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে স্পষ্ট প্রকাশ করে দিয়ে যান যে, এক “অনির্বাচিত নির্বাচনই” তাদের পছন্দ ও সমর্থনের। এভাবেই তারা আওয়ামী লীগ সরকারকেই “নির্বাচিত” দেখতে চান। আর সেই থেকে বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অগ্রহণযোগ্য হয়ে আছে; যদিও বাংলাদেশ সরকারের সাথে ব্যবহারিক কাজের সম্পর্ক তারা রেখেছেন। তবে নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে, সেটা জানাতেও ভোলেন না। এরপর থেকে “ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থে” বাংলাদেশ চলে, এমন বয়ান অনেকেই রাখেন। বাংলাদেশ একটা Vassal State বলে জাপানভিত্তিক ‘ডিপ্লোম্যাট’ পত্রিকা এক আর্টিকেল ছেপেছিল। সারকথায়, এটা ভারতের দয়ায় চলা ভারতের দিকে ঝুঁকে থাকা সরকার, এমন অভিযোগ মাথায় নিয়েই এই সরকার চলছে। অনেক সময় মন্ত্রী ও নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে এমন অভিযোগের অনুকূলে কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। এই হলো পটভূমিগত পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতির কথা সুহাসিনী হায়দারের অজানা থাকার কোনো কারণ নেই। এসব বিষয়ে তার নিজেরই অনেক রিপোর্ট আমরা দেখেছি। অথচ ঐ সাক্ষাতকারে ঠিক এর বিপরীত – সুহাসিনীর প্রায় সব প্রশ্নের পেছন এক ধরে নেয়া অনুমান থেকেছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কেন যথেষ্টভাবে ভারতের তল্পিবাহক হচ্ছেন না অথবা তার আরো হওয়া উচিত, এ ধরনের। এ ছাড়া তার প্রায় সব প্রশ্নই ভিতরেই একধরনের বোকামি বা নাদানিতে ভরপুর উপাদান রয়েছে। যেমন সব রাষ্ট্রেরই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন  ইস্যুতে তার নিজস্ব কিছু বয়ান-অবস্থান থাকে, যা একান্তই তার বয়ান। আর সেটা অন্য রাষ্ট্র বা ভিন নাগরিককেও মানতে হবে, এটা সে আশা করে না বা সেদিকে তাকিয়ে ঐ বয়ান অবস্থান নেয় না। কিন্তু এর পরও সে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন মাত্রায় সম্পর্কে জড়ায়। অর্থাৎ নিজের অবস্থানের সাথে অপর রাষ্ট্র একমত না হয়েও সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আগায়। সেখানে  অপর রাষ্ট্রকে নিজ রাষ্ট্রের সাথে একমত হতে হবে এমন কোন পূর্বশর্ত থাকে না বা সেটা জরুরিও নয়। এসব বিষয়গুলো ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর হিসেবে সুহাসিনীর জানা না থাকার কিছু নেই। কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নে সুহাসিনী বলতে চেয়েছেন, হাসিনা কেন বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের বয়ান-অবস্থানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না? কখনও কখনও এটা এমন জায়গায় গেছে যে মনে হয়েছে  হাসিনা কেন ভারতীয় অবস্থান নিচ্ছেন না সে প্রশ্ন তুলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করতে বা জবাবদিহিতা চাইতেই যেন এই সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং বাংলাদেশে এসেছেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার সাংবাদিক কম বরং জাতীয়তাবাদী সৈনিক বেশি হয়ে উঠা বেশি – হয়ে পড়েছিলেন।
তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, এবারের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাতিল হওয়া এবং বাংলাদেশের তাতে না যাওয়া প্রসঙ্গে। তিনি প্রশ্ন করছেন- এর ফলে সার্ক কি শেষ হয়ে গেল?
এখানে আগে এই প্রশ্নের পিছনের কিছু তথ্য বলে নেয়া ভাল। ভারতের উরি সামরিক ঘাঁটিতে কথিত হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য মোদি সরকার জনমতকে ক্ষিপ্ত করে তুলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষে যুদ্ধে না গিয়ে ‘বিদেশের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করব’ এটাই মোদির চরম অ্যাকশন হবে বলে তিনি কথা শেষ করেছিলেন। আর পরদিন থেকে ভারতের সব মিডিয়া ‘জাতীয়তাবাদী জোশে’ বাস্তবতা ভুলে মোদির কথা সফল করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। ফলে সুহাসিনীর প্রশ্নের ভেতর সেই সস্তা জোশই আমরা দেখেছিলাম। যেন সাংবাদিকতায় অবজেক্টিভ থাকার বিষয়টা তিনি  ‘জাতীয়তাবাদী’ থাকা দিয়ে বদলে নেয়েছেন। অথচ সস্তা জাতীয়তাবাদ কোনো পেশাদার সাংবাদিকের সাথে কোনোভাবেই মানানসই নয়। আসলে ভারতের মিডিয়ার এক রেওয়াজ হল, পাকিস্তানের সাথে যে কোন যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে (সত্য-মিথ্যা অথবা সরকারের সংকীর্ণ নিজ দলের পক্ষে ভোট পাবার স্বার্থের কারনে যুদ্ধের হুঙ্কার বা পরিস্থতি তৈরি করলেও) বিচার-বিবেচনা শুণ্য উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে সরকারের পক্ষে দল বেধে দাঁড়িয়ে যাওয়াটাই সাংবাদিকতা হয়ে যায় তখন। সেই রেওয়াজে এবারও ভারতের প্রায় সব মিডিয়া চিন্তাশূন্য হয়ে বেকুবের মতো বিশ্বাস করে নিয়েছিল, মোদির হুঙ্কার সত্যি জেনুইন। অথচ জোশ কিছু ঢিলা হবার পরে এই মিডিয়াই লিখেছিল যে আসন্ন ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভাল রেটিং পাবার সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে মোদী সরকার পাকিস্থানের সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ পেশাদারিত্ব ভুলে  ভারতের মিডিয়া এভাবেই বাস্তবতার বিচার-বিবেচনা শুণ্য হয়ে যাওয়া কোন ব্যাপারই না। যেমন মোদীর যুদ্ধের দামামা বা পাশা উল্টে যাবার পরে, (সুহাসিনীর ঐ প্রশ্ন প্রকাশের ছয় দিন পরে) ২০ অক্টোবর আনন্দবাজার লিখেছিল, “পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী হিসেবে তুলে ধরতে মোদির আহ্বানে সাড়া দেয়নি বেইজিং। …ব্রিকসে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু আগবাড়িয়ে খেলার সেই রণকৌশল নিয়ে আখেরে যে কোনো লাভ হয়নি, বারবার তা সামনে চলে আসছে। চীন, আমেরিকার পরে ব্রিটেনও জানিয়ে দিলো, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী আখ্যা দিয়ে মোদির সুরে সুর মেলাতে রাজি নয় তারা। এমনকি বেইজিংয়ের সুরেই লন্ডনের ব্যাখ্যা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ত্যাগ স্বীকার করেছে ইসলামাবাদ”। অর্থাৎ এবার খোদ আনন্দবাজারই নিজ দেশের সরকারের সমালোচনা করা ছাড়া উপায় দেখে নাই।

ওদিকে  পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করবেনই – মোদীর এমন প্রতিজ্ঞার প্রকাশের পর এটা নিয়েও ভারতের মিডিয়া – ‘রাজা যত বলেন পারিষদ বলে তার ততগুণ’ – অবস্থা করে ছেড়েছিল। যেন মোদী তা করেই ফেলেছেন। ব্রিকস – রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোটের এবারের সামিট সম্মেলন ডাকা হয়ে ছিল ভারতের গোয়ায়। সাথে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল যে ব্রিকসের শেষদিনে আর এক দক্ষিণ এশিয়া জোট (BIMSTEC) (The Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর সাথে মিলে যৌথ বৈঠক হবে। বিমসটেক ((BIMSTEC)) আসলে সার্কের পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বার্মা ও থাইল্যান্ডকে সাথে নিয়ে তৈরি। আর ওদিকে ভারতের কূটনৈতিক খায়েশ ছিল (খায়েশ বলতে হচ্ছে কারণ এটা ভারতের এক এবসার্ড মুরোদধীন কল্পনা। নিজের বাস্তব মুরোদে না, অন্যের ঘাড়ে চড়ে স্বপ্ন-জাল বুনা) যে বিমসটেককে এমনভাবে সামনে আনা যাতে সার্কের প্রয়োজন বা অস্তিত্বের কথা আর মনে না পড়ে। তা সার্কের বিকল্প হয়ে উঠে। ফলে পাকিস্তান বাদ পড়ে। বাস্তবে থাকুক আর নাই, কথার ফুলঝুড়ি তুলতে ওস্তাদ কলকাতার আনন্দবাজার, ০৪ অক্টোবর এক রিপোর্ট লিখেছিল যার শিরোনাম হল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লি” । আর তাতে প্রথম বাক্য লিখেছিল, “পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক সম্মেলন!”। আসলে স্বপ্ন দেখাটা সমস্যা নয়। সমস্যা হল কেন সেই স্বপ্ন বাস্তব হবে না তা ভেবে দেখা ত্যাগ করাটাই সমস্যা।  আর সাথে তো আছেই  ‘মুই কী হনু রে’ ভাব নেয়া। ব্যাপারটা যেন সবচেয়ে বেশি লেপ্টে গেছে বাংলাদেশে ভারতের এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত (২০০৭-০৮ সালে) পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে ঘিরে। তিনি বর্তমানে আমেরিকান সাপোর্টে চলা একটি ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফের (Observer Research Foundation (ORF)) ফেলো। তার ঢাকায় পোস্টেড থাকার সময়ও তিনি ‘মুই কী হনু রে’ ভাব রেখে গেছেন।  প্রায় একই ঐসময়ে বাংলাদেশের কিছু বিশেষ সাংবাদিক ভারতে গিয়েছিলেন। গত ৪ অক্টোবর যুগান্তর সেকথা ছেপেছিল এক রিপোর্ট। পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর জবানে যুগান্তর লিখছিল, তিনি বলেন, “এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই”। কথাগুলো পিনাক বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বলেছেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে  পিনাক চক্রবর্তীও মোদির কথা সত্যি হয়ে গেছে বা আছে বলে বিশ্বাস করেছিলেন।

ব্যাপারটা কীভাবে শেষ হল?  আমাদের প্রথম আলো পত্রিকায় গত ২৬ অক্টোবর এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “সার্কের বিকল্প হচ্ছে না বিমসটেক”। আসলে কোন কিছু বিশ্বাস করার ভিত্তি কী এরা কী করে তা চিন্তা করে আল্লায় জানে। যেন “ভারত চাইছে” – এটুকুই যথেষ্ট সেকথা বিশ্বাস করা জন্য। আসলে গ্লোবাল অর্থনীতির বিকাশ ও এর সাথে ছড়িয়ে পড়া জটিল সম্পর্কের কারণে চীন ও আমেরিকার (আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমাস্বার্থের ওয়ার অন টেররের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় স্প্রিংবোর্ড রাষ্ট্র হল পাকিস্তান) পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের গভীরতা ও নির্ভরশীলতা ভারত পড়তে অক্ষম – এটা তাই প্রমাণ করে। যেন ভারত এমনই এক আদুরে সন্তান যার খেয়ালকে চীনসহ পশ্চিমারাষ্ট্রগুলোকে নিজ স্বার্থ ভুলে গুরুত্ব দিতেই হবে। এবং এটা সম্ভব। এসবের নিট ফয়াফল হল এমন এবসার্ড স্বপ্ন-জাল বুনা। আর এদের চক্কড়ে পড়েছে চিন্তাভাবনা ত্যাগ করা বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়া ও সাংবাদিক। প্রথম আলোর রিপোর্টার রাহীদ এজাজ লিখেছেন, ‘গত মাসে নাটকীয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। এরপর থেকেই গোয়ায় ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোটের নতুন মেরুকরণ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। পাকিস্তানকে ছাড়া সার্ক, এমন একটি ভাবনা সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত সেটি ফলপ্রসূ হয়নি। বিশেষ করে সার্কের বিকল্প জোট হিসেবে বিমসটেক যে যথেষ্ট কার্যকর হবে না, সেটি স্পষ্ট হয়েছে গোয়ায় ১৬ অক্টোবর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর”। এখন কথা হল যে ভারতের মিডিয়া এসব গ্লপগাথা বিশ্বাস করছে করুক কিন্তু প্রথম আলো বা রাহিদ এজাজ এরাও এটা বিশ্বাস করেছিল। কেন? কোন টানে বা সুত্রে?
মূলত এমন ঘটনাগুলো ঘটবার পিছনের আর কিছু সমস্যা হল, এটা ঠিক যে  চীন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে আমেরিকা ভারতকে পাশে চায়। আর তাতে ভারতকে হিতাহিত জ্ঞান ও বাস্তবতা ভুলে অসম্ভব বায়না ধরা বালকের মতো আচরণ করতে হবে কেন? বাস্তবতার মধ্যে বিচরণ করলে তো কোন সমস্যা নাই। তাও হয়তো এটা তেমন সমস্যা মনে হতো না। কারণ আমেরিকার দুর্দশা থেকে ভারত ফায়দা লুটতে চাইলে বলার কী আছে? আর ভারতের তা না নিবার কিছু নাই। কিন্তু বড়ভাই পিঠে হাত রেখেছে বলে, ভারত নিজেই আপনা আপনি এক অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হয়ে গেছে, এই ‘মুই কী হনু রে’-এমন ভাবনাই ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়ার আসল সমস্যা। পিনাকি বা সুহাসিনী এর নমুনা। অথচ মূল সূত্র হল, সবার আগে রাষ্ট্রকে নিজ মুরোদে অর্থনৈতিক অর্থে পরাশক্তি হয়ে উঠতে হয়। সেটাও কেউ বিপদে পড়ে ঘুষ দিয়েছে বা পিঠে হাত রেখেছে- এভাবে অর্জনের জিনিস নয়। দুনিয়ার প্রথম সারির উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ হতে হয় আগে। এটা অর্জনের বিষয়। কারও দান অনুগ্রহে বা বিপদে পড়ে দেয়া ফেবার থেকে এটা অর্জন করা যায় না।

আর এক মজার দিক হল, সার্কের ম্যান্ডেট যেভাবে লেখা আছে সেই ম্যান্ডেট হিসেবে সার্ক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে কথা ওঠার কথাই নয়। ফলে সার্ক বৈঠকে বসতেতে না চাওয়ার পক্ষে কোন শক্ত যুক্তি নাই। তবুও এটাই সত্য যে ভারতের কূটনৈতিক লবির ‘সাফল্য হিসেবে’ বাংলাদেশ ও ভারত এবং আরো দুই রাষ্ট্র সার্ক বর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই বর্জনের আসল কারণ প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে, ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। কিন্তু সুহাসিনী জিদ ধরেছেন, হাসিনাকে প্রশ্নের চাপে ফেলে এটা স্বীকার করাবেনই। তাই তাঁর প্রশ্ন, “পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো দেশ। এটা কি আপনার সার্ক বর্জনের প্রধান কারণ নয়? সার্ক পরিত্যাগ কি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়?”। মহা সমস্যা, এই সুহাসিনীকে কে বুঝাবে যে এই ব্যাখ্যা বয়ান একান্তই ভারতের। এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ কনজাম্পশনের জন্য। ভারতের পক্ষে কাজ করতে চাইলেও হাসিনা এই বয়ান তারও বয়ান-অবস্থান বলে স্বীকার করে নেয়া জরুরি না।  কিন্তু সুহাসিনীরা মনে করেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভারতের পক্ষে সার্ভিস ও কূটনৈতিক সাড়া’ সুহাসিনী যেভাবে দেখতে চাইছেন ঠিক সেভাবে দিতেই হবে। অন্য  কোনভাবে হলে এতেও তার মন ভরবে না। তবুও শেখ হাসিনা ধৈর্য ধরে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিয়ে বলেছেন, “পাকিস্তানের ভেতরের কিছু কারণে (অর্থাৎ পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের জন্য বা ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বে ভারতের পক্ষে থাকার জন্য নয়) আমরা সার্কে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ভারত-পাকিস্তানেরও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ আছে। কিন্তু আমি এটা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। ভারত উরির জন্য সার্কে যায়নি, আর বাংলাদেশের কারণ এ থেকে ভিন্ন”। অর্থাৎ “মন্তব্য করতে না চাওয়ার কথা” বলে হাসিনা ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাকে চাপাচাপি করা সুহাসিনীর ঠিক হচ্ছে না। তবু এমন জবাব পেয়েও সুহাসিনী সন্তুষ্ট নন। তিনি আবার প্রশ্ন করছেন, “আপনি কি কাশ্মিরের সীমান্তরেখা এলওসি পার হয়ে পাকিস্তানে ঢুকে সন্ত্রাসী মারতে ভারতের যাওয়া সমর্থন করেন না?”। হাসিনা আবারো মাথা ঠাণ্ডা রেখে জবাব দিচ্ছেন, “আমার মনে হয়, এলওসি বরাবর উভয় পক্ষের নীরবতা বজায় রাখা উচিত, যাতে তা শান্তি আনে”। কিন্তু সুহাসিনী হাসিনার মুখ দিয়ে যেন ভারতের বয়ান-অবস্থানের ভাষায় কথা বলাবেনই বলে জিদ ধরেছেন। তাই তিনি আবার প্রশ্ন করেছেন, “আপনি কি এর নীতিগতভাবে সমর্থক নন? গত বছর সরকার ঘোষণা করেছিল, তারা সীমানা পেরিয়ে মিয়ানমারে সন্ত্রাসবাদীর সন্ধানে যাবে। আপনি কি বাংলাদেশের এমন অ্যাকশন করা সমর্থন করবেন?”।
এবার হাসিনার পক্ষে আর ধৈর্য রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “শোনেন, এই প্রশ্ন আপনি আপনার সরকার আর প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে করুন। আমি মনে করি, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তরেখা, এই এলওসি মান্য করতে হবে”।

এতে সুহাসিনীর কী শিক্ষা হয়েছিল, তিনি কী বুঝেছিলেন আমরা বলতে পারব না। তবে তার দ্বিতীয় ধারার প্রশ্ন এবারঃ “আপনি কিছু দিন আগে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বলেছিলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তৎপর হতে এত সময় লাগল কেন, বিশেষত যেখানে অনেক মৌলবাদী গ্রুপ এর আগে অনেক হিন্দু আর ব্লগারকে মেরে ফেলেছে?”।
জবাবে অনুমান করি প্রধানমন্ত্রী আবার ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “কথা সত্য নয়। বাংলাদেশই প্রথম সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে গেছে। তদন্ত করতে সময় লাগে, শুধু আমার দেশে নয়, সব দেশেই। তাই বলে এটা বলা ঠিক নয় যে, আমরা তৎপর হচ্ছি ধীরগতিতে”।
এবার সুহাসিনীর রাস্তা ভিন্ন, যা দিয়ে প্রশ্ন করলে শেখ হাসিনা ‘জব্দ’ হবেন আর সুহাসিনীর ক্রেডিট বাড়বে, এমন লাইনের প্রশ্ন।
“মানবাধিকার গ্রুপগুলো অভিযোগ করছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতে থাকা আসামিকে হত্যা, গুম অথবা হাঁটুতে গুলি করছে…”। সুনির্দিষ্ট করে হাটুতে গুলির কথা এসেছে এজন্য যে এর আগের সপ্তাহে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘হাঁটুতে গুলি’ করা নিয়ে এক লম্বা রিপোর্ট করেছিল, সেই বরাতের প্রশ্ন। ফলে এইবার শেখ হাসিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে জবাব দিয়েছেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যের যে, মানবাধিকার গ্রুপগুলো আজকাল ভিক্টিমের মানবাধিকারের বদলে ক্রিমিনালের মানবাধিকার নিয়ে বেশি সোচ্চার। আমেরিকায় কী হচ্ছে? তাদের স্কুলে বা কোথাও যখন টেরর আক্রমণ হয়, তখন তাদের বাহিনীগুলো কী করে? তারা কি আক্রমণকারীদের মেরে মানুষকে উদ্ধার করে না? আমাদের বাহিনী কি সন্ত্রাসীদের মারবে? না, যারা আক্রমণ করেছে, তাদের মারবে?’। মনে হচ্ছে এতে সুহাসিনী কিছু ঠান্ডা হয়েছেন।
এরপর সুহাসিনীর সেই পুরান প্রশ্ন, আইএস আছে, আইএস নেই। “আইএস নিজেই বলছে, প্রধান সন্দেহভাজনদের তারাই ট্রেনিং দিয়েছে। আপনি অস্বীকার করছেন- এই অভিযোগ করলে আপনার জবাব কী?”।
হাসিনা এখানে এসে আগের এতদিনের অস্বীকারের জায়গা থেকে একটু হেলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হতে পারে আইএস ওদের কাউকে কাউকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আমাদের এখানে আইএসের ঘাঁটি নেই। কেউ যদি দাবি করে, তাহলে আগে প্রমাণ দিক। আমরা আক্রমণকারীদের চিহ্নিত করেছি। আমরা জানি, তারা কোথা থেকে এসেছে এবং এরা সবাই স্থানীয়”।
সুহাসিনী বলছেন, “আপনি বলছেন যুদ্ধাপরাধের বিচার জনগণের দাবি। কিন্তু নির্বাচিত জামায়াত নেতারা ফাঁসিতে ঝুলছেন, না হলে জেলে। অনেক বিএনপি নেতা গ্রেফতার না হলেও বিদেশে পালিয়েছেন। আপনি কি আপনার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনকে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন না?”।
“না, এটা আমার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিষয় নয়। আপনি যদি একটা স্বাধীন দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি স্বাধীনতাবিরোধীদের কিভাবে সমর্থন করেন? বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিএনপি নেতাদের নিয়ে মামলার বিষয়গুলো আলাদা, এগুলো হয় দুর্নীতি, না হয় অপরাধের মামলা। যদি এসব নেতা মনে করেন তারা নির্দোষ, তারা বিচারপ্রক্রিয়া মোকাবেলা করুন। আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তারা আমার বিরুদ্ধেও ডজন ডজন মামলা দিয়েছিল”। (এই শেষের বাক্যটি বলে হাসিনা কিন্তু অজান্তে প্রকারান্তরে অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন।)

প্রসঙ্গ আপাতত এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। এই সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা স্বস্তিকর নয়। আমরা জানি না, পরে আর কখনো এই মহিলাকে সাক্ষাৎ দেয়া যাবে না, এমন সিদ্ধান্ত সেখানে হয়েছে কি না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর

চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর
গৌতম দাস

১৪ মার্চ ২০১৬, সোমবার
http://wp.me/p1sCvy-RW

শিরোনাম দেখে ভুল পড়ছি মনে হতে পারে কিন্তু আসলে ঠিকই পড়েছেন। ভারত ও চীনের সম্পর্ক কেমন, এ প্রসঙ্গে কোনো এভারেজ বা আম ভারতীয়কে বলতে বললে তার মুখ থেকে খুবই তিক্ত বক্তব্য শুনতে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বক্তব্য এমন তিক্ত-বিষাক্ত হওয়ার পেছনে দায়ী ভারতের উপস্থিত মিডিয়ার ব্রিফিং। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ আর তা এমন শক্তই। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স এর ব্যাপারে ভারতের মিডিয়া খুবই অনুগত, যেটাকে একেবারেই বাছবিচারহীন আনক্রিটিক্যাল বলে অনেকের ধারণা। এটা ঠিক-বেঠিকের প্রশ্ন নয়, ফ্যাক্টস। এই সূত্রে অনুমান করা যায়, ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের কৌশলগত অবস্থান সম্মত মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ। ফলে আমরা সর্বক্ষণ শুনতে পাই ভারতের প্রায় সব মিডিয়াই প্রপাগান্ডা করে বলছে- “চীন তাদের চার দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে”। কিন্তু বাস্তব অবস্থা কি একেবারে ঠিক এ রকমই? সেটা এবার পরীক্ষা করে দেখব।
কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এর অবস্থা ভয় পাওয়া পথিকের মত; যে চলতি পথে  নিজেকেই সাহস যোগানোর জন্য উঁচুস্বরে গান ধরে থাকে। কারণ এভাবে গান ধরলে নিজেকেই দুজন মনে হয়।  “চীন আমাদের ভারতকে এভাবে অথবা সেভাবে ঘিরে ফেলছে” এই নিয়মিত প্রচারের সাথে এই পত্রিকা সম্প্রতি এবার আরো খবর ছড়াচ্ছে- ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন বা মিয়ানমার- এই রাষ্ট্রগুলো ভারতের সাথে নৌ-সামরিক নানান তৎপরতা বা চুক্তিতে যুক্ত হচ্ছে ইত্যাদি। খবরগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে আস্থার প্রপাগান্ডায় নেয়ার মতো করে সাজানো, সন্দেহ নেই। তবে উপরে যে দেশগুলোর নাম নিলাম, এদের মধ্যে কমন দিকটি হল, এরা বেশির ভাগই চীনের পড়শি রাষ্ট্র। সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশের এবং চীন থেকে সমুদ্রপথে বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চীনের একমাত্র প্রবেশদ্বার দক্ষিণ চীন সাগর। প্রবেশমুখের চারপাশের প্রায় সব পড়শি-রাষ্ট্রের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্ক বিরোধ শুরু হয়ে আছে, চলছে দু-তিন বছর ধরে। এর ফলে চীনের পড়শি-রাষ্ট্রগুলোর ক্ষোভ-অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নেতা হয়ে সার্ভিস দিতে চায়, এমন ধারণা হাজির করলে অর্থনীতিতে উঠতি চীনের বিপরীতে পড়তি আমেরিকার এ অঞ্চলে কৌশলগত দাম-গুরুত্ব বাড়বে বলে মনে করে সে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরে এটা একটা টেনশন জাগানোর কারণ। এছাড়াও এমন টেনশন জেগে ওঠার পেছনের আরও কারণ এই সাগরে এমন সাতটি দ্বীপ আছে, যেগুলো জেগে ওঠার পথে বা উঠেই গেছে; চীন যার সবগুলোই নিজের বলে দাবি করে আসছে এবং ইতোমধ্যেই সব দ্বীপে কম-বেশি স্থাপনা গেড়েছে। এ ছাড়াও এই সাগরের নিচে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রচুর। অপর দিকে আবার জ্বালানি তেলের উৎস মধ্যপ্রাচ্য এলাকা আরব সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত চীনে প্রবেশের এই অঞ্চল প্রসঙ্গে পরিসংখ্যান বলছে, এখানে বছরে সব মিলিয়ে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য বা পণ্য জাহাজের চলাচল হয়ে থাকে। তাই চীন চায় এই এলাকাকে নিজের মুক্তাঞ্চল হিসেবে দেখতে। চীনের চোখে ভারত বা আমেরিকা- এদের নিজ রাষ্ট্রীয় সীমানার আশপাশের অঞ্চল এটা নয়। ফলে এই অঞ্চল এ দুই রাষ্ট্রের সরাসরি নিজেদের প্রত্যক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট, এমন নয়। তবুও আমেরিকা ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ নামের এক তত্ত্ব আউড়িয়ে এ এলাকার সবখানেই নিজের অবাধ চলাচলের অধিকার ফলাতে চায়। এর বিপরীতে চীনের স্পষ্ট আপত্তি ও অবস্থান হল, নিজ সমুদ্রসীমানার ১২ মাইলের মধ্যে কেউ প্রবেশ করলে বা উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করলে তাকে চীন সামরিকভাবে প্রতিরোধ করবেই। কারণ চীনের যুক্তি, এই ১২ মাইল নিজের ‘একান্ত অঞ্চল’ বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এ ছাড়া চীনের ব্যাখ্যায় এটা খুবই সেনসেটিভ এলাকা এ জন্য যে, নিজ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এখানে ফ্রিডম অব নেভিগেশন যুক্তিতে প্রবেশ করে আমেরিকার ফ্রিডম টেস্ট করতে চাওয়া খুবই বিপজ্জনক। কারণ, আমেরিকা ভুলচুকে ও অনিচ্ছায় ১২ মাইলের ভেতরে প্রবেশ করে ফেললে প্রতিক্রিয়ায় চীনের আমেরিকাকে আক্রমণ করে বসতে হতে পারে। কারণ, এখানে স্থাপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনেক ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন আর তুলনায় দূরত্ব মাত্র ১২ মাইল।
ওইদিকে আমেরিকা শুধু চীনের পড়শিদের নেতা হতে চায় তাই নয়, সে চায় ভারতও এ কাজে একইভাবে আমেরিকার পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিক।
কথা শুরু করেছিলাম দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে ভারত-চীন সম্পর্কের চেয়েও পেছনের আরো বড় ক্যানভাস ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যকার সামরিক টেনশন কেমন, তা নিয়ে। এ কথা দুনিয়ার কেউ অস্বীকার করবেন না যে, এমন সামরিক টেনশনের কোনোই বাস্তবতা নেই, তা নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে যদি কখনো কোনো অছিলায় সামরিক সঙ্ঘাত লেগেই যায়, তবে সম্ভাব্য সেই বাস্তবতা হবে ভারত-চীনের সীমান্তে অচিহ্নিত থেকে যাওয়া বেশ কিছু অংশের কারণে। যদিও ভারত-চীন দু’পক্ষই বিষয়টি নিয়ে কোনো টেনশন যেন না বাড়ে, সে লক্ষ্যে যৌথ মাপামাপি আর ডায়লগের ভেতর দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলতে চায়। এমন যৌথ ইচ্ছা প্রকাশ করে বিগত কংগ্রেস সরকারের আমলে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইতোমধ্যেই একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দু’পক্ষের নির্বাহী প্রধানের ঘোষিত স্থায়ী প্রতিনিধি পর্যায়ে সরাসরি এ নিয়ে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের কাজ চলছে। এ ছাড়াও কখনো আকস্মিক কোনো ঘটনায় এবং অনিচ্ছায়ও কোনো সামরিক টেনশন যেন ছড়িয়ে না পড়ে সে লক্ষে মাঠপর্যায়ে হটলাইন টেলিফোন যোগাযোগ সুবিধা চালু করা হয়েছে ওই চুক্তির ফলে। স্বভাবতই এসবের অর্থ উভয় পক্ষ এ ধরনের এক সীমান্ত সমঝোতা চুক্তি করতে আগ্রহবোধ করেছিল আগে থেকেই। এই আগ্রহবোধের তাগিদ অনুভবকে কেবল একটা দিক থেকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব; সেটা হল উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিরাট সম্ভাবনা আছে, যেটা দু’পক্ষই স্বীকার করে ও কাজে লাগাতে চায়। বিগত ১২ বছরে বিশাল পণ্য লেনদেন বিনিময়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে, যার মোট পরিমাণ এখন ৭০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

আগ্রহবোধ বিষয়টিকে আরেকটু বিস্তার করে বলা যায়। যেমন প্রথমত, দু’টি রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে সামরিক-অসামরিক কোনো টেনশন থাকলেই তা আমাদের মনে পুরনো ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় ছেয়ে থাকা আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ঠাণ্ডাযুদ্ধ’ বা ‘কোল্ডওয়ার’ দিয়ে তা বুঝতে হবে এই অভ্যাস একেবারে বাদ দিতে হবে। বরং পরামর্শ থাকবে, ঠাণ্ডাযুদ্ধ দিয়ে কোন কিছুকে বুঝার মানসিকতা আমরা জীবনেও চিরতরে যেন ত্যাগ করি, এদিয়ে আর যেন কোনো কিছুকে বুঝার চেষ্টা না করি। কারণ, ইতোমধ্যেই এমন এক বড় ফারাক এখানে ঘটে গেছে, যাতে কোল্ডওয়ার ধরনের শর্ত-পরিস্থিতি দুনিয়ায় আর কখনো কোথাও ফিরে আসবে না। বরং আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করতে পারি যে, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো একই কমন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের মধ্যকার সম্পর্কিত দুই অর্থনীতি ছিল না। আরো সোজা ভাষায় বললে সে সময়ে এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পারস্পরিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কই ছিল না, বরং প্যারালাল এমন দুটো জোটের অর্থনীতি হয়ে তারা তখন চালু ছিল, যাদের মধ্যে আবার কোনো বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন নাই। ফলে পরস্পরের মধ্যে সহজেই এমন শত্রুতা কল্পনা করা খুবই সম্ভব ছিল যে, পরস্পর পরস্পরকে অবলীলায় দুনিয়া থেকে নির্মূল করার কথা ভাবতে পারে এবং তাতে একজন অপরজনকে নাই করে দিলেও পারস্পরিক কোনো পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্ক নেই বলে এতে বেঁচে থাকা অপর রাষ্ট্রপক্ষের অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধে বিরোধীকে নির্মূল করার মতো যেকোনো চরম পর্যায়ে নেয়ার বাস্তবতা ও সুযোগ তখনো ছিল। কিছু আজ সারা দুনিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের সাথে যতই স্বার্থবিরোধ থাক, তারা আবার সবাই একই গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হয়ে পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত সম্পর্কিত হয়ে আছে। এটাই সবচেয়ে প্রভাবশালী বাস্তবতা। ফলে এখানে রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধ প্রবল আছে এবং তা থাকলেও কিন্তু সে বিরোধকে কোনো চরম দিকে নেয়ার সুযোগ নেই। ফলে বিরোধকে বরং নির্মূল বা চরমে না নিয়ে, এই পথ ছাড়া অন্য আর যেকোনো পথ অবলম্বন করে বিরোধ লড়াইয়ের মীমাংসা খুঁজে নেয়াই মঙ্গল। কারণ, এখন অন্যের নির্মূল মানে নিজেরও বিরাট ক্ষতি। অতএব, একদম সারকথায় ভারতের মিডিয়া যতই তারস্বরে চিৎকার করুক যে ‘চীন ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলল’ তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের মধ্যে এমন সীমান্ত সমঝোতা চুক্তির পক্ষে উভয় রাষ্ট্র আগ্রহ দেখাতে পারা সম্ভব। এবং সেটাই হয়েছে।
কিন্তু ২০১৩ সালের শেষে ওই চুক্তির পরও এখন “চীন ভারতকে মুক্তামালার মত চার দিক থেকে ঘিরে ফেলছে” ভারতের এই প্রপাগান্ডায় কোনো ভাটা পড়েনি। এটাকে ভারতের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মিডিয়া প্রসঙ্গে কৌশলগত অবস্থান বলে মনে করা যেতে পারে। এছাড়াও এর পেছনে আর দু’টি কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে: এক. সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে তুলনায় চীনের থেকে ভারত পিছিয়ে আছে। অস্ত্রের ও বাহিনীর সক্ষমতা বিষয়টি যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতির সক্ষমতার বা মুরোদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, সামরিক ব্যয় জোগানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলে তবেই তা ওই রাষ্ট্রের অস্ত্র ও বাহিনী মজুদের সক্ষমতা হিসেবে হাজির হতে পারে। এই বিচারে ভারত চীনের চেয়ে পিছিয়ে আছে; ভারত তুলনায় ছোট অর্থনীতির বলে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও যেটুকু ব্যয় জোগানোর সামর্থ্য ভারতের হাতে আছে, তার সমতুল্য অস্ত্রশস্ত্র কেনা বা উৎপাদন করতে পারার সক্ষমতার দেখানোর ক্ষেত্রে ‘ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক’ বেশ কিছু ঘাটতি ভারতের আছে। এসব সমস্যা ঢেলে সাজানোর জন্য সময়ে ভারতের মিডিয়ায় তা খোলাখুলি আলোচনাও হতে দেখা গেছে। এসব সমস্যা ভারত দ্রুত আপ্রাণ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে এই অবস্থায় প্রপাগান্ডা দিয়ে অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে ধরে রাখার উদ্যোগ এটা হতে পারে। আর পয়েন্ট দুই. ১৯৬২ সালে নেহরু আমলে চীন-ভারত এক প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হয়েছিল, যে যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় হার ভারতের কাছে ট্রমার মতো এখনো মানসিক বিষয় হয়ে আছে বলে মনে করা হয়। যেটা একালে সামরিক সক্ষমতা এখন অর্জনে থাকলে বা তৈরি হলেও নিজের ওপর আস্থা বিষয়ক এক খচখচি থেকেই যায় ধরনের। এ ছাড়া সবার উপরে, মিডিয়ার সব কিছুকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে দেখার এক প্রপাগান্ডা তো আছেই। যার পরিণতিতে সব আলোচনায় হয়ে যায় যেন দুই ছাপোষা কেরানির রাস্তার ধারে বসে টংয়ের চা দোকানের আলাপ; যারা জাহাজের খবরাখবর নিয়েও আলাপ করছে, রাজা-উজির মারছে এসব। আনন্দবাজার পত্রিকার খবর উপস্থাপনে এই ভাষা ও ইঙ্গিত দিয়ে লেখা হয়। সম্ভবত তারা মনে করে, এটাই সাধারণ মানুষকে বোঝানোর ভাষা, তরল করে লেখার ভাষা। নিজের পক্ষে ন্যায্যতা টানার উপায় হিসেবে তারা হয়তো এমন বলবে, কিন্তু তবু এটা অন্যায্য যুক্তি তাই তা অপ্রতিষ্ঠিতই থেকে যাবে।
আমেরিকা চায় ভারতও আমেরিকার মতো ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ এর অধিকার টেস্ট করতে আমেরিকার সাথে যৌথভাবে এ অঞ্চলে টহল দিতে এগিয়ে আসুক। এ কাজে আমেরিকা ভারতকে উসকানিমূলক প্রস্তাব দিয়েছিল। সম্প্রতি গত ১০ ফেব্রুয়ারি বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে এ কথাই ছেপেছে। রয়টার্স বলছে, ‘আমেরিকা চায় তার আঞ্চলিক বন্ধুরা সবাই চীনের বিরুদ্ধে এমন জোট অবস্থান নিক। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।’ ভারতীয় নেভাল মুখপাত্র রয়টার্সকে এ প্রসঙ্গে জানিয়েছে, ‘ভারতের নীতি হলো অন্য রাষ্ট্রের সাথে একই ফ্ল্যাগ-কমান্ডের অধীনে কোনো যৌথ টহলে ভারতের অংশ না নেয়া। ভারত এখন পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘ ছাড়া অন্য কোথাও কোনো ভিনরাষ্ট্রের সাথে যৌথ টহলে অংশ নেয়নি; না নেয়ার ভারতের এই নীতিতেই সে এখনো অটল আছে।’ এখানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার মনের গোপন খায়েশ প্রকাশিত হয়েছে- এটাই চীনের বক্তব্য। এ নিয়ে চীনের সরকারি নীতিনির্ধারণী বিষয়ক পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ বেশ কয়েকটা লেখা ছেপেছে। ভারত-আমেরিকা-চীন এই ট্রয়কার পারস্পরিক সম্পর্কের দিক নিয়ে আরো কিছু বক্তব্যও সেখানে হাজির করেছে। চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে নামাতে রাজি করানোর আমেরিকান খায়েশ মার খাওয়াতেই চীনের মুখে এই বোল ফুটেছে এমন মনে করা অসঙ্গত হবে না। গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘নিজের অর্থনীতিক বিকাশ-উন্নতির স্বার্থ এবং চীনের সাথে মিলে ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগে ভারতের স্বার্থের দিক থেকে ভাবলে ভারতের কাছে চীন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলের আমেরিকান প্রস্তাবের পাল্লায় পড়ার বিলাসিতা করতে গিয়ে ভারত চীনা সহযোগিতা হারাতে পারে না।’ কথা সত্যি। ভারতের দিক থেকে কথাটির মূল বিষয়- ভারতের কাছে প্রায়রিটি কোনটি। ভারত সঠিকভাবেই ধরেছে, সময়টা এখন পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ভেঙে আমেরিকার বদলে চীনা নেতৃত্বের সাথে মিলে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার সাজিয়ে তোলা। দুনিয়াকে নতুন করে নেতৃত্ব দেয়া। সাজিয়ে ওঠার এই কাজে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ স্পষ্টতই নতুন অর্ডার, নতুন নেতৃত্বের সাথেই। ফলে পুরনো অর্ডারে নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ চীনের সাথে নতুন অর্থনৈতিক অর্ডার গড়ার কাজেই। এ প্রসঙ্গে আমার আগের লেখায় অনেক সময় এই অবস্থানই ব্যক্ত করেছি বটে বিষয়টি নিয়ে এর আগে কখনোই ভারত, আমেরিকা বা চীন কেউ কখনো স্পষ্ট করে মুখফুটে কিছু বলেনি। ভারতও স্পষ্ট না করে বরং আমেরিকাকে এক মিথ্যা ভানের মধ্যে রেখে ফায়দা নেবার চেষ্টা করে গেছে। যেমন আমেরিকান নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্টের ব্যাংক গড়তে গিয়ে এর গঠনকাঠামো রচনা করার সময় চীনের পরে দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার ভারতের হওয়ার ক্ষেত্রে চীনের সম্মতি পেতে ভারতের কোনো অসুবিধাই হয়নি। এবং সম্ভবত সেজন্য এই প্রথম চীনের দিক থেকে গ্লোবাল টাইমস ব্যাপারটিকে পরিষ্কার বাক্য লিখে বলেছে, ‘… ভারত চীনের সহযোগিতা-সম্পর্ক, সমর্থন হারানোর কথা ভাবতেই পারে না।’ বিষয়টির গুরুত্ব লক্ষ করে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাও ১ মার্চ সংখ্যায় চীনের গ্লোবাল টাইমসকে উদ্ধৃত করে এক রিপোর্ট ছেপেছে। এর প্রথম বাক্য হলো, ‘বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলে অংশ নিয়ে চীনের সমর্থন হারানো ভারতের পোষাবে না।’

[লেখাটা এর আগে ৭ মার্চ ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে এখন আপডেট করে ছাপান হল। ]
goutamdas1958@hotmail.com

ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে

ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে
গৌতম দাস
১০ নভেম্বর, ২০১৫

http://wp.me/p1sCvy-cG

নেপালে গত সাত বছরের মধ্যে দুই বারের কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি বা সংবিধান সভার নির্বাচন ও সভা পরিচালনা শেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নতুন কনষ্টিটিউশন গৃহীত ও প্রণয়নের কাজ সমাপ্তির ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়। এর মধ্য দিয়ে নেপাল এক রিপাবলিক জনরাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু ভারত প্রকাশ্যেই এর বিরুদ্ধে নিজের আপত্তি অসন্তুষ্টি জানায়। কোন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন সমাপ্তি ও গৃহীত হবার ঘোষণা বিষয়গুলো একান্তই সে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিজস্ব ব্যাপার। এটা ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়ই নয়।  ফলে এনিয়ে ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির এক উদাহরণ দেখলাম আমরা।

“নিজে গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ভারত নিঃসন্দেহে সীমা ছাড়িয়ে পা ফেলেছে, শুধু তাই নয় পড়শি ছোট দেশের উপর নিজের খায়েস চাপানোর চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারত বারবার যে কোন রাষ্ট্রের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তুলে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত এই নীতি ভারত নেপালের বেলায় প্রয়োগে ইচ্ছুক নয়” – ডিপ্লোম্যাট ৭ অক্টোবর ২০১৫।  ডিপ্লোম্যাট এশিয়া প্যাসিফিক জোনে ফোকাস করে  জাপান থেকে প্রকাশিত ওয়েব ম্যাগাজিন। এশিয়ায় আমেরিকা-জাপান মিলিত উদ্যোগে কমন ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থে পরিচালিত এক থিঙ্কট্যাংকের মন্তব্য, বিশ্লেষণ প্রকাশ করে থাকে। এতে ভারতকেও সামিল করে নেয়া হয়। নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে মূলত চীনের বিকাশ, উত্থানকে ষ্টাডি করা  এর মূল ফোকাস। এর এডিটরিয়াল ষ্টাফদের বেশির ভাগই ভারতীয়।

তো এই ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার পক্ষেও ভারতের নেপাল নীতি ও পদক্ষেপকে কঠিন সমালোচনা না করে থাকা সম্ভব হয় নাই। নিরবে কিন্তু কঠিন শব্দের এই মন্তব্যে ভারতের মৌলিক নীতিগত বিচ্যুতি দিক ভুলে আঙুল তুলে এটাকে “ওভারষ্টেপিং” বলা হয়েছে। ডিপ্লোম্যাটের অবস্থান ও বিশ্লেষণ খুব ইন্টারেষ্টিং। ভারতের ইন্ডায়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা দাবি করেছে, নেপালের কনষ্টিটুশন সংবিধান সভায় অনুমোদিত হয়েছে এই ঘোষণা আসার পরও ভারত সাতটা অনুচ্ছেদে পুনরায় সংশোধন আনার জন্য অফিসিয়ালি এক তালিকা হস্তান্তর করে দাবি জানিয়েছে। ভারত এতই মরিয়াভাবে  হস্তক্ষেপ করেছে। ভারত এই রিপোর্ট অস্বীকার করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থেকে অস্বীকার করলেও বিবৃতি দিলেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নিজের দাবি থেকে এক চুলও পিছু হটে নাই।

নতুন নেপাল রাষ্ট্র বৈশিষ্ঠের দিক থেকে সাত প্রদেশে বিভক্ত এক ফেডারল কাঠামোর রাষ্ট্র। যদিও প্রদেশগুলোর সীমানা বিষয়ক বিতর্ক এখন জারি আছে, তা টানার কাজ এখনও চূড়ান্ত করা হয় নাই, হবে। কিন্তু এটা নিয়ে নেপাল-ভারত সীমান্তের মাধোসি (Madhesi) ও তরাই সমতলি অঞ্চলের বাসিন্দাদের অসন্তোষকে উস্কে দিয়ে যেন কনষ্টিটিউশন প্রনয়নের কাজ সমাপ্ত হয় নাই – এবং হয় নাই বলার ভিতর দিয়ে নেপালের রাষ্ট্রগঠন ও ক্ষমতা তৈরিতে ভারতের এক ভাগীদার বা স্টেক আছে তাই সে প্রমাণ রাখতে চেয়েছে। নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের (মিলিত আসন সংখ্যা ৮৪%) এদের অভিযোগ ভারত মাধোসি ও তরাইদের মধ্যে অসন্তোষ ও উস্কানি ছড়াচ্ছে। পরিশেষে ভারত নেপালের বিরুদ্ধে অঘোষিত ভাবে বাস্তবে কার্যকর এক অবরোধ আরোপ করেছে। ল্যান্ড-লকড নেপাল, পণ্য চলাচলের দিক থেকে যা সম্পুর্ণত ভারতের উপর নির্ভরশীল, বিশেষত তেল-গ্যাস জ্বালানীর সরবরাহের দিক থেকে ১০০ ভাগ নির্ভরশীল নেপালের উপর এই অবরোধ আরোপ করে ভারতের নেপাল উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কত গভীর তা জাহির করতে গিয়েছিল। একথা ঠিক যে অবরোধের প্রথম ৪২ দিন ধরে নেপালের প্রতিটা নাগরিক তা হারে হারে নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছিল যে ভারতের কত শক্তি । তবে ভারতের এই শক্তির ব্যবহার নেপালীদের কাছে অত্যাচারীর নির্যাতনকারির হিসাবেই হাজির হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ার এতে ভারতের প্রাপ্তি পুরা জনগোষ্ঠির বদ-দোয়া। নেপালের জনগণ আশা করে না যে ভারত তাদের বসিয়ে খাওয়াবে। আবার এটাও আশা করে না যে ভারত তাদের স্বাভাবিক জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে।

প্রকৃতির নিয়ম কোন জায়গা খালি থাকে না। ফলে ভারত নেপালকে জ্বালানি সরবরাহ না দিয়ে মারবে এই সিদ্ধান্ত খোদ ভারতের জন্যই বিশাল বিপদ হয়ে হাজির হতে বেশি সময় লাগে নাই। জ্বালানি সরবরাহ-হীন পরিস্থিতি নেপালকে মরিয়া হয়ে বিকল্পের সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছিল। গত সপ্তাহ ০২ নভেম্বর থেকে ভারতের মিডিয়ার মনে পড়েছিল যে ট্রাডিশনালি ভারত নেপালের একমাত্র জ্বালানীদাতা, যা এখন আর নয়। সে জায়গা পুরণে এখন চীন হাজির হয়ে গেছে। ভারতের মিডিয়া শিরোণাম এখন এই হারানোর ব্যাথা প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছে। ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া শিরোনাম করে লিখেছিল, “চীন নেপালে তেল সরবরাহ পাঠানো শুরু করে দিয়েছে, ভারতের একচেটিয়া সরবরাহকারির ভুমিকা হারাল”।

নেপাল ভুখন্ড পুব-পশ্চিম দিক করে বিস্তৃত যার পুরা দক্ষিণ সীমান্ত জুড়ে আছে ভারত। আর ঠিক একইভাবে উত্তর সীমান্ত জুড়ে আছে চীন। নেপালের উত্তর দিক  দক্ষিণ দিকের চেয়ে আরও বেশি উচু পাহাড়ি, সমুদ্রের খবর দক্ষিণ দিকের চেয়ে উত্তর সীমান্ত দিকে আরও বেশি দূরে। এছাড়া ট্রাডিশনালি ভারতের সাথে ও দিক থেকে নেপালের বহিঃবাণিজ্যের আনা-নেওয়া চালু বেশি। এবারের ভারতের নেপাল অবরোধ বিপরীত ফল বয়ে আনতে শুরু করেছিল, ভারতের একচেটিয়ার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে তা। নেপাল-চীনের সীমান্তে চলাচলের রাস্তা ও সড়ক কাস্টম দুয়ার চার স্থানে। এর মধ্যে সবচেয়ে চালু ও যোগাযোগ সুবিধাজনক “তাতোপানি” এবং “কেরুঙ” স্থল সীমান্ত। গত ভুমিকম্পে দুটা সীমান্তেই পাহাড়ের পাথর ধ্বস নেমে পুরা রাস্তা ব্লক হয়ে গিয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে তা পরিস্কার করে রাস্তা উন্মুক্ত করা হয়েছে এখন। জ্বালানী তেল সরবরাহের চুক্তি নিয়ে কথা চলছে, চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দর আর বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে শুভেচ্ছা স্বরূপ অনুদান হিসাবে ১০০০ টন জ্বালানীর চালান আসা শুরু হয়ে গেছে গত ১ নভেম্বর থেকে। নেপালের মোট চাহিদার কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নেপাল চীন থেকে আমদানির স্থায়ী চুক্তি করতে চায়। এই অবস্থা দেখে ভারতের মিডিয়ার সুর নরম ও হতাশার। নেপালকে চাপ দিয়ে ধরার অস্ত্র ভোতা অকেজো হয়েছে দেখে এখন উলটা তা ভারতের উপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে বলে। ভারতের ভুল নেপাল নীতি এখন সকলের কাছে পরিস্কার হতে শুরু করেছে। ফলে নেপালকে চীনের দিকে নিজেরাই ঠেলে দিয়েছে বলে ভারতীয় মিডিয়ায় এখন আত্মসমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় প্রতিযোগিতা অনুভব করে, দোষ কিছু কাটাতে ভারত কিছু কিছু সীমান্ত অবরোধ শিথিল করে তেল ট্যাঙ্কার নেপাল প্রবেশ করতে দেয়া শুরু হয়েছে।
সার করে বললে, ভারতের চাপের কৌশল ভাঙতে, অকেজো করতে নেপাল সরকার সফল হয়েছে। স্বভাবতই এখন ক্রমশ তা বাকি পণ্যে অবরোধ দুর্বল হতে থাকবে।
এই প্রেক্ষিতে ভারতের নেপাল নীতিতে যে সুরে পরিচালিত এর প্রাপ্তি কী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । ফলাফল ও ভবিষ্যত নিয়েও মুল্যায়ন শুরু হয়েছে।

ভারতের দিক থেকে ভারত-নেপালের সম্পর্ককে শুরু থেকেই এপর্যন্ত কলোনি অধস্তন সম্পর্ক হিসাবে দেখা হয়েছিল। ভারত সেখানে দাতা বড় ভাই। শুরু থেকে মানে ১৯৫০ সালের ৩১ জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ভারত-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে। ভারতের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ করে কথা শুরু করতে হল কারণ এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল পুরানা আগের চুক্তির ধারাবাহিকতায়। আগের কলোনি মাস্টার বৃটিশ-ইন্ডিয়া ও নেপাল সরকারের মধ্যকার চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রয়োজনে। কলোনী মাস্টারের সাথে নেপালের রাজার সর্বশেষ চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়েছিল ১৯২৩ সালে, যেখানে ঐ চুক্তির কার্যকারিতা সমাপ্তির তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। সেকারণেই স্বাধীন ভারতের নেহেরু ও নেপালের রানা রাজবংশে রাজার মধ্যে ঐ ৩১ জুলাই ১৯৫০ তারিখেই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে ভারতের সাথে নেপালকে চুক্তি করতে হবেই কেন? বাধ্যবাধকতাটা কোথায়? আর এটা আসলে কীসের বা কী বিষয়ক চুক্তি? সংক্ষেপে এর জবাব হল, পুরান কাল থেকেই নেপাল এক ল্যান্ড-লক ভুখন্ড; অর্থাৎ এভুখন্ড সমুদ্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নেপালকে অন্য রাষ্ট্রের ভুমি মাড়িয়ে তবে সমুদ্রের নাগাল পেতে হয়। একমাত্র এভাবেই দুনিয়ার তৃতীয় যে কোন দেশের সাথে নেপালের বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্ভব হয়। ফলে বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকেই ভারতের ভুমি ব্যবহার করে নেপালকে বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় চালু রাখতে হয়েছে। আর তাই এই প্রয়োজনে সবসময়ই নেপালকে ভারতের সাথে ভুমি ব্যবহারের চুক্তির উপর নির্ভর করে, হাত জোর করে থাকতে হয়েছে। নির্ভর মানে আক্ষরিক অর্থেই বিষয়টা শুরু থেকেই সবসময় ভারতের ইচ্ছাধীন থেকেছে। প্রত্যেকবার চুক্তির ভারসাম্য ভারতের পক্ষে থেকেছে, এমন শর্ত লিখে চুক্তি করতে হয়েছে যেন নেপাল সমুদ্র বদরে প্রবেশ পেতে বিনিময়ে পুরা দেশ দাসখত হিসাবে লিখে দিয়েছে। বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে প্রথম চুক্তি হয়েছিল ১৮১৬ সালে (Treaty of Sugauli 1816)। সে সময় এই চুক্তি করা হয়েছিল নেপালের এক তৃতীয়াংশ ভূমি বৃটিশ-ভারত কলোনী মাস্টারকে দিয়ে দেয়ার বিনিময়ে। বৃটিশ রাজ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সদয় সন্তুষ্ট হয়েই তুলনামূলক ছাড় দেয়া এক নতুন চুক্তি করেছিল ১৯২৩ সালে। সে চুক্তির পঞ্চম দফাতেও লেখা ছিল নেপাল সরকার অস্ত্র-শস্ত্রসহ সবকিছুই আমদানী করতে পারবে (“British Government is satisfied that the intentions of the Nepal Government are friendly”) যতক্ষণ বৃটিশ সরকার সন্দেহাতীতভাবে সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু কী হলে বা বৃটিশ সরকার কীসে সন্তুষ্ট হবে এর কোন তালিকা বা তাল ঠিকানা দেয়া হয় নাই। অথবা সুনির্দিষ্ট করে কোন তালিকা করে কখনও বলা হয় নাই যে কী কী জিনিষ নেপাল আমদানী করতে পারবে। অর্থাৎ কিছুই স্পষ্ট করে উল্লেখ না করে পুরা ব্যাপারটা বৃটিশ সরকারের খেয়ালী ইচ্ছাধীন করে রাখা হয়েছিল।

কেন এরকম করে রাখা হয়েছিল, রাখতে পারে কী না – এমন প্রশ্ন করার সুযোগ ঐকালে ছিল না। অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে কলোনি দাস বানিয়ে রাখা অন্যায় – এমন কোন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন বলতে কোন কিছু ১৯৪৪-৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠিত হবার আগে দুনিয়াতে ছিল না। ফলে বরং কলোনি দখলের পক্ষে এক ধরণের জোর-যার এর সাফাই এর ইঙ্গিত তখন কাজ করত। কিন্তু জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল আটলান্টা চার্টার চুক্তির উপর ভর করে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালে ঐ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। “দুনিয়ায়ে আর কলোনী শাসন চলবে না” – ঠিক এমন ভাষায় না লিখে তবে কলোনী শব্দটা এড়িয়ে আটলান্টা চুক্তির সার কথাটাই ছিল। লিখা হয়েছিল “প্রত্যেক জনগোষ্ঠী নিজের ইচ্ছাধীনের সরকার গঠন, কার অধীনে থাকবে তা নির্ধারণের সার্বভৌমত্ত্ব অধিকার থাকবে”– এই ভাষায়। অর্থাৎ যুদ্ধশেষে জাতিসংঘ গঠন হয়ে যাবার পরে যে কলোনি দখল ও শাসন বেআইনি ও নিন্দনীয় হয়ে যাবে সেটা বুঝা যাচ্ছিল। হয়েছিলও তাই।
কিন্তু তা সত্ত্বেও নেহেরুর ভারত ১৯৫০ সালে আগের কলোনী বৃটিশের অধীনস্ততা চুক্তিটাকেই রাস্তা দেখিয়ে দেয়া মডেল মনে করে, ধরে নিয়ে নেপাল-ভারতের মধ্যে নতুন আর এক দাসখত চুক্তি করেছিল।
দাসখত বলছি এজন্য যে ১৯২৩ সালের চুক্তিতে  তাল ঠিকানাহীন বৃটিশ সরকারের “সন্তুষ্টির” উপর দাড় করানো হয়েছিল। আর ১৯৫০ সালের চুক্তিতে দশ দফা শর্তের পঞ্চম দফায় সন্তুষ্টি কথাটা সরিয়ে আরও অস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কী শর্তে নেপাল অস্ত্র-শস্ত্র আনতে পারবে তার প্রক্রিয়া কী হবে তা চুক্তির বাইরে কেস টু কেস ভিত্তিতে পরবর্তিতে দু সরকার বসে ঠিক করবে। এছাড়া ষষ্ঠ দফায় নেপালে ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে নেপালী নাগরিকের মতই সমান সুযোগ সুবিধা দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। আর সপ্তম দফায় ভারতে নেপালীরা বসবাস, সম্পত্তির মালিক হওয়া, ব্যবসা করা, চলাচল ইত্যাদির সুবিধা পাবে বলে এর “রেসিপ্রোকাল” বা পালটা নেপালে ভারতীয়দেরও একই সুবিধা দেয়ার শর্ত রাখা হয়। েটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুবিধা দেয়া আর তা নিতে পারা বা কাজে লাগানোর মধ্যে বিরাট ফারাক আছে। মূলত নেপালের অর্থনীতির ক্ষমতা ও সাইজ ভারতের তুলনায় নস্যি বলে শেষের ষষ্ঠ ও সপ্তম দফার মাধ্যমে রেসিপ্রোকাল সুবিধার কথা বললেও এর সুবিধা নিবার যোগ্যতার দিক থেকে ভারতীয়রাই এগিয়ে থাকবে, ভারতের ব্যবসায়ীরাই তা নিবার যোগ্য হবে। নেপালীরা পারবে না। ফলে কার্যত এটা বিরাট অসাম্য।  ফলে এই ছলে কৌশলে চুক্তিটাকে ভারতের পক্ষে কান্নি মারা ভাবে হাজির করা হয়েছে। এই কারণে ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতে নেহেরুর করা চুক্তিটাকেও নতুন ধরনের এক কলোনি চুক্তি বলা যায়।
নেপালের দিক থেকে আইডিয়াল চুক্তি হতে পারে, নেপালকে সবকিছুই বাধাহীন আমদানি করতে দিবার বিনিময়ে ভারত বিনিময়ে ঠিক কি চায়, কী শর্তপূরণে তা দিতে চায় এর মধ্যে কোন অস্পষ্টতা না রাখা, ভারতের খেয়ালের উপর ছেড়ে না দেওয়া, সন্তুষ্টি-জাতীয় আবছা নন-কমিটনেন্টের শব্দ এড়ানো সঠিক উপায় হতে পারে। এছাড়া ভারতের দেয়া বিনিময় শর্তের ইকোনমিক মূল্য কত তা যাচাই করা এবং শর্তের পক্ষে ভারতের ন্যায্যতা কী তা শুনতে চাইতে হবে। যেমন ভারতে ব্যবসা করার সুযোগ নেপালীদের দরকার নাই। নেপালের দরকার সমুদ্রে প্রবেশের অধিকার। অথচ এটাকে কি যুক্তি র‍্যাশনালিতে ষষ্ঠ ও সপ্তম দফা হাজির করা হয়েছে তা অস্পষ্ট।
ভারতের দিক থেকে বললে প্রথমত, বৃটিশ উপনিবেশিক বাস্তবতায় সেকালে নেপালের সঙ্গে চুক্তিতে কলোনী দাসখতের বিষয়াদি থাকবে হয়ত এটা স্বাভাবিক।  কিন্তু সে চুক্তি ভারতের সাথে সম্পন্ন হবার কালে তখন বাস্তবতা ভিন্ন। কলোনি শাসন ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ভারতের পুরান বৃটিশ চুক্তিটাকে অনুসরণ করার কোন কারণ নাই। এটা ভালোমানুষি প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রস্বার্থ ভালমানুষির কাজ বা বিষয় নয়। বিষয়টা হল, পুরাণ বৃটিশ-নেপাল চুক্তিটাকে অনুসরণ করা মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়াটা নতুন কী আকার নিল – এর সম্মক উপলব্দি করতে কোন বোধবুদ্ধি না থাকার প্রমাণ। দুনিয়ার এই পরিবর্তনের এর বৈশিষ্ঠসূচক দিক গুলো আঙ্গুলে গুণে নোট নিতে অক্ষমতার প্রমাণ রাখা। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে – ইমাজিন করে কল্পনায় একে দেখতে রুজভেল্ট চেয়েছিলেন যে, আগের কলোনি ধরণের দখল ও শাসনের কারণে বিশ্ববাণিজ্য বিনিময় খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেলে। কলোনি সম্পর্কের উচ্ছেদ ঘটিয়ে রুজভেল্ট ব্যাপকতর বিশ্ববাণিজ্য বিনিময়, পণ্য ও পুঁজি চলাচলের এক নতুন দুনিয়া দেখতে চেয়েছিলেন। মূল এই বিষয়টা অর্থনের লক্ষ্য তিনি মেপে প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে শুরুর ইমাজিনেশন সবসময় ও সবটা পরবর্তিতে বাস্তবে হাজির হয় না। কিন্তু কলোনি সম্পর্ক উচ্ছেদের বিষয়টার ক্ষেত্রে তা হয়েছিল। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানও অনেক সীমাবদ্ধতা, অকেজো, ঠুঠো হয়ে থাকা, কান্নি মেরে থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নর্মস হাজির করতে পেরেছে। শুধু তাই না ল্যান্ড লকড রাষ্ট্রগুলোর তৃতীয় রাষ্ট্র মাড়িয়ে সমুদ্রে প্রবেশ বিষয়টাকে কতগুলো বিশেষ আগাম শর্তে রাষ্ট্রগুলোর অধিকার হিসাবে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ডেকে স্বীকৃতি দিবার পক্ষে এখন কাজ চলছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের সদস্য এমন ৩১টা ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্র এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সমবেত হয়েছে। ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরকে যেন পড়শী রাষ্ট্রের কলোনি-খায়েশের খোরাক না হতে হয় এর জন্য আইন কনভেনশন আনা – এটার এর মূল উদ্দেশ্য। এসব থেকে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চিন্তা প্রকৃতির সাধারণ অভিমুখকে চিনিয়ে নেয়া সম্ভব। এবং বলা যায়, দুনিয়া অন্তত আর কলোনি দখল ও শাসনকে আইনি ন্যায্যতা দিবে না। এমনকি ল্যান্ড-লকড বলে পড়শীর কলোনি-খায়েশের শিকার না হতে হয়, সমুদ্র পর্যন্ত প্রবেশ যেন তারও অধিকার হিসাবে দেখা হয় সে চেষ্টা এখন চলছে।
কাজেই নেহেরু পুরান কলোনিচুক্তি সুত্রে নেপালের উপর আবার কলোনি চুক্তি চাপিয়ে দিবার সুযোগ পাওয়া গেছিল বলেই তা নিতে হবে, নিয়েছেন সেটা কোন দুরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের কথা নয়। এছাড়া, কলোনি সম্পর্কের বিরোধীতা প্রত্যেক জনগোষ্ঠির কাছে একটা নীতিগত ইস্যু। নিশ্চয় ভারতের বেলায় বৃটিশদের কলোনি খায়েশ খারাপ আর নেপালের বেলায় ভারতের কলোনি খায়েশ ভাল – এটা কোন নীতিগত অবস্থান হতে পারে না। তবে আবার একথাও ঠিক যে কোন রাষ্ট্রেরই পড়শী রাষ্ট্রের ভিতর নিজের স্বার্থ দেখতে পাওয়া দোষের নয়। কিন্তু তা পাবার চেষ্টা করতে হবে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন এসবের সীমা বজায় রেখে। আর সবচেয়ে ভাল হবে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের ততপরতায় বল প্রয়োগে পাবার পথে না হেঁটে এর বিপরীতে সদিচ্ছায় পড়শি নাগরিকের মন জয় ক্তে হবে দেয়া-নেয়ার বিনিময় ও বাণিজ্যের মাধ্যমে।

বিগত ষাট বছরে ভারতের কূটনীতি চেয়েছে পরিচালিত হয়েছে নেপালে একটা বশংবদ দল ও নেতা তৈরি করে পুরান বৃটিশ কলোনি পথে নেপালকে নিজের অধীনে রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করা। আজ নেপালে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দল্গুলো ভারতের হাত থেকে এক এক করে সবাই হাতছুটে চলে গেছে। সব হারিয়ে নেপালের একমাত্র মাধোশি-তরাই জনগোষ্ঠিই ভারতের ভরসা। ভারতের নীতির ভুলে অবস্থা এমন যায়গায় পৌচেছে যে নেপালী কংগ্রেসের পক্ষেও আজ নেপালে বসে ভারতের পক্ষে থাকা কথা বলার সুযোগ ভারতই রাখেনি। কারণ পুরা নেপাল আজ ভারত-বিরোধী হয়ে গেছে। অথচ বিগত ষাট বছরে রাজা ও নেপালী কংগ্রেসের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভারত খেদমত পেয়েছে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ে আইন কনভেনশনের রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক গ্লোবাল ট্রেন্ড বুঝবার ক্ষেত্রে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা যে নাদানিতে আছে এব্যাপারে নেপাল একটা ভাল উদাহরণ। রাষ্ট্র হিসাবে এদের কাছে এমন মডেল হল বৃটিশ কলোনি এমপায়ার। অথচ একালটা  আর এমপায়ার হওয়ার না। না হয়েও বহু কিছু ভোগ অর্জন করা সম্ভব। বল থাকলেই বড়ভাই সেজে, ক্ষমতা দেখিয়ে তা ব্যবহার করতে হবে এই পথে সব কিছু আদায় করতে হবে – এটা খুবই আনকুথ একটা কাজ। এভাবেই আদায় করতে হবে এটা খুব কাজের কথা নয়।
ইতিহাস স্বাক্ষী নেপালের বিরাট তাতপর্যপুর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ও একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষে নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সমবেত করে দেবার ক্ষেত্রে ভারতের ইতিবাচক ভুমিকা নির্ধারক ও অনুঘটকের এবং এক ইন্টারলকেটর হোস্ট এর। এমনকি আমেরিকার পক্ষেও ইতিবাচক ভুমিকা রাখা সম্ভব ও সহজ হত না ভারতের এমন ভুমিকা না নিলে। তাহলে এটা আজ জ্বলজ্বল করা প্রশ্ন সেই ভারতকে আজ নেপালের মূলধারার তিনসহ সব রাজনৈতিক দল বাদ একমাত্র ভরসা নাম ও যোগ্যতাহীন মাধোসী কেন? মাধোসি যারা নিজেদেরই এখনও কোন পরিপক্ক রাজনৈতিক শক্তি নয়, নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা গঠনে গোনায় ধরে এমন স্টেকহোল্ডার মাধোসিরা কেউ নয়, হয়ে উঠতে পারে নাই। তাহলে কী বুঝে ২০০৫ সালে ভারত নিজের কোন স্বার্থের কথা ভেবে নেপালের রাজনীতিতে ভুমিকা রাখতে গিয়েছিল? অথচ প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের ভারতের বড় প্রভাব রাখার সুযোগ কী সে সময়টাতেই ছিল না! নেপালে ভারতের যা জেনুইন স্বার্থ তা খোলাখুলি সৎ ভাবে এই দলগুলোর সাথে আলাপ করতে পারত। না কোন চুক্তির পুর্বশর্ত হাজির করার জন্য নয়। সে হিসাবে না। উদ্দেশ্য হত ভারতের জেনুইন স্বার্থ প্রসঙ্গে নেপালি রাজনীতিবিদদেরকে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে রাখা। আগানোর এপ্রোচের ধরণ দেখে মনে হয় না ভারত এমনভাবে ভেবেছে। বরং আমরা দেখি ভারত সব সময় বশংবদ নেপালি রাজনৈতিক দল পালা-পুষে আগানোর পথে হেটেছে। চিন্তার এই ধারাটাই উপনিবেশিক ও পশ্চাতপদ। ফলে অযোগ্যতা। এই প্রশ্ন উঠছে তাহলে ভারত নেপালি কংগ্রেস আর দুই কমিউনিষ্ট পার্টিকে – প্রধান এই তিন দলকে কেন সাহায্য করেছিল, কী বুঝে করেছিল?
এটাই কী ভারতের রাজনীতিক, আমলা-গোয়েন্দাদের যোগ্যতার সঙ্কটের ইঙ্গিত নয়! এটা অবিশ্বাস্য যে ভারত ২০০৫ সালে নেপালকে আজকের নেপাল হতে নির্ধারক ভুমিকা রেখেছিল সেই তারা আজ নেপালের ধুলায় গড়াগড়ি যাওয়া ভিলেন কেন হবে? চিন্তার অযোগ্যতার পরিণতি এমন করুণই হয়!

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত ০৮ নভেম্বর ২০১৫ সংখ্যায়। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও সম্পাদনার পর ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

গৌতম দাস
২৩ আগস্ট ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-bb

ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক উদ্যোক্তাদের এবছরের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাস ২০১৫ জুলাইয়ের ৯ ও ১০ তারিখে রাশিয়ার উফা শহরে। আমেরিকার নেতৃত্বে চলতি গ্লোবাল অর্থনীতি বা বিশ্বব্যাপী সক্রিয় পুঁজিতান্ত্রিক গ্লোবাল ব্যবস্থার ওপর ব্রিকস সদস্য অর্থে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানোর ও পালটা নেতৃত্ব কায়েমের লক্ষ্যে পাঁচ ‘রাইজিং ইকোনমি’র উদ্যোগে গঠিত সংগঠনের নাম ব্রিকস। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা এভাবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর থেকে এ নামকরণ। কিন্তু এর লক্ষ্য অনুসারে এপর্যন্ত কাজে তেমন অগ্রগতি ঘটেনি; বরং প্রয়োজনীয় মাত্রার সক্রিয়তার অভাবে বিরাট গ্যাপ আছে সত্য; কিন্তু জন্মের (২০০৯) পর থেকে ব্রিকস প্রতি বছর নিয়মিত তাদের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন করে যাচ্ছে। ব্রিকস এবার সাত বছরে পড়ল। সে তুলনায় চীনের নেতৃত্বে পালটা বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) উদ্যোগ আইডিয়া হাজির করার পরে মাত্র ২ বছরেই প্রায় কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাজির হয়ে গেছে। আগামী বছর থেকে এ ব্যাংক পুরোদমে অপারেশনাল হয়ে যাবে। এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান।
বলা যায়, ৭ বছর ধরে ব্রিকস নিয়ে চীনের নানান চেষ্টা চরিত্রের পরও অগ্রগতি কাঙ্খিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর কারণে চীন হঠাৎ ব্রিকসের বাইরের বন্ধুদের সামনে আলাদা করে এআইআইবি ব্যাংক গড়ার প্রস্তাব হাজির করেছিল; এবং ২ বছর শেষ হওয়ার আগেই বাস্তবায়নের দিকে চলে যায়। ব্রিকস নিয়ে নানা বাধা তৈরি ও ওজর-আপত্তি তুলে ব্যাংকটিকে কার্যকর করার কাজ ধীরগতি করার পেছনে ভারতের অবদান বেশি। এর পিছনে ভারতের নীতি নির্ধারক দ্বিধা ও থিঙ্ক-ট্যাংক জাতীয় পরামর্শকদের ভুল পরামর্শ ও বিভ্রান্তি এবং সর্বপরি ভারতের নিজের সম্পর্কে অতি-মুল্যায়ন এবং আমেরিকান-পো ধরার চেষ্টা, আমেরিকান প্রভাব ইত্যাদি দায়ী। এ প্রসঙ্গে দুইটি প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা করব। এক. ভারতের ওজর-আপত্তির অজুহাতগুলো কী ধরনের এবং কেন? ভারত কেন ব্রিকসের প্রশ্নে ওজর-আপত্তির পথে হাঁটছে কিংবা ব্যাংকটিকে এখনও নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ও সঠিক মনে করছে না- এসব নিয়ে আলোচনা করা। কথাগুলো ব্রিকস বাস্তবায়নের পথের সমস্যা শিরোনাম দিয়েও আলোচনা করা। দুই. এআইআইবি ব্যাংক অপারেশনাল করার জন্য গঠন কাঠামো, আর্টিকেল অনুমোদন সম্পন্ন হয়ে গেছে; অর্থাৎ এআইআইবি ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার ব্যাংক হিসেবে চালু করার পর্যায়ে চলে যাওয়ার পরও এবারের ব্রিকস সম্মেলন আরেক অবকাঠামো ব্যাংক, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে এনডিবি (NDB) চালু করার সিদ্ধান্ত নিল কেন? অর্থাৎ একসাথে দুদুটো অবকাঠামো ব্যাংক উদ্যোগ কেন?

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থার ৭০ বছর
দুনিয়ায় পুঁজিতন্ত্রের বয়স প্রায় ৫০০ বছর। এ সময়ের মধ্যেই এর উত্থান, আন্তঃসম্পর্কিতভাবে দুনিয়াব্যাপী বিস্তার এবং পুঁজির অন্তর্নিহিত লজিক অনুযায়ী বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বর্তমানে এটা গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ৫০০ বছরের মধ্যে চলতি শেষ পর্যায়ের মাত্র ৭০ বছর বাদ দিলে বাকি আগের পুরো সময়টাতে (১৯৪৪ সালের আগের প্রায় ৪৩০ বছর কাল পর্যন্ত) ব্যাংক বা টাকার ব্যবসার উত্থান ও বিকাশ ঘটেছে তথাকথিত প্রাইভেট সেক্টরে, রাষ্ট্রের মালিকানার বাইরে। অর্থাৎ জন্মের শুরু থেকে ক্যাপিটালিজম কলোনি যুগের বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা সহায়তা ছাড়া চলতে সক্ষম হয়েছিল। ক্যাপিটালিজমের কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে প্রথম দুইটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বা মাল্টিল্যাটারাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। এটাই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রথম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বা বলা যায়, আমেরিকার নেতৃত্বে রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ। আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়া, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা। যদিও এর মূল উদ্দেশ্য বা তাগিদ ছিল দুনিয়াব্যাপী সবার জন্য এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কায়েম করা। যে কোনো বাণিজ্য বিনিময় ঘটার পূর্বশর্ত হলো সকল রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা চালু থাকা এবং ওই মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে ঐ আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা হাজির থাকা। ফলে আন্তর্জাতিক এক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম চাওয়া মানেই সেটা আসলে আগে এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা কায়েম করার কাজ হাতে নেয়া। তৎকালে বাণিজ্যের দিক থেকে একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে তার জাতীয় মুদ্রা ডলারকে একইসঙ্গে সব রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। দুনিয়ায় এ প্রথম সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম করে।

পুরানার বিশ্বব্যবস্থার গর্ভে নতুন ব্যবস্থার আগমন
মোটা দাগে বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্কের বিচারে তিনটি পর্যায় আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রথমত, মধ্যযুগ থেকে ১৯৪৪ সালের আগ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই আজকের তুলনায় হয়তো সীমিতভাবে বিকশিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এটাকে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের” হাতে বিকশিত বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থাও বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সাল থেকে চলতি সাল পর্যন্ত আমেরিকান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে কায়েম করে গড়ে তোলা (সেকালে) নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা- পণ্য গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলা যায়। আমেরিকান প্রভাবের এই ব্যবস্থাটা যেটা এখনও চলতি তবে পড়তি অবস্থা, তা এখন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। আর তৃতীয়ত, মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকে আমেরিকান নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জায়গায় চীনের নেতৃত্বে পুরনো ব্যবস্থাটার পুনর্গঠন করে নেয়ার উদ্যোগ – আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো নতুন ধরনের পালটা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব। চলতি সময়টায় একটা গেম চেঞ্জিংয়ের কাল পার হচ্ছি আমরা। একালে এতে ভারতের গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে, পুরনো নেতা আমেরিকা কিংবা হবু নেতা চীন- উভয়ের কাছেই। গুরুত্বটা হলো, ভারত আমেরিকার কোলে বসে পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন ঠেকিয়ে আরও কিছু দিন চলতি ব্যবস্থার আয়ু বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা হতে পারে, একে আরও যতদিন আয়ু দেয়া যায় আমেরিকার প্রভাব তত বেশি দিন বাড়ে। আর এর বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে সুবিধা শুষে নেয়ার কাজে লাগা। তবে মনে রাখতে হবে, এ কম্ম সাময়িক লাভালাভের জন্য এবং এটা নিজের আগামীর বিরুদ্ধে কুড়াল মারাও হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এর বিপরীত পথ হচ্ছে, চীনের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত নিজের জন্য নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়তে ত্বরান্বিত হয়ে কাজে লেগে পড়তে পারে। তবে উভয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারতের এমন গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ভারতের বিশাল জনসংখ্যা। অর্থনীতির দৃষ্টির ভাষায় বলতে হবে, যত জনসংখ্যা তত জোড়া মুখ এবং হাত; এবং ততই বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং শ্রম।
এটা এখন নির্ধারিত যে, চীন ও ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গন্তব্য এক সূত্রে বাঁধা হয়ে গেছে- এখানে তারা উভয়ে ন্যাচারাল অ্যালায়েন্সের অ্যালাই। পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা খাড়া করতে পারার মধ্যেই তাদের আগামী নির্ভরশীল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার ভেতরে চীন কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে জায়গা ছেড়ে দেবে তা সবটা ভারতের দাবি জানিয়ে আদায় করার বিষয় নয়। নতুন ব্যবস্থায় ভারত চীনের কাছে কী কী দাবি করবে সেসবের সঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও অর্জিত সক্ষমতার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে হবে।

ব্রিকসঃ একের ভিতর দুই কাজের ভুমিকায়
একই ব্রিকস উদ্যোগের মধ্যে আসলে দুইটা পালটা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ আছে – একটি আইএমএফের সমতুল্য পাল্টা প্রতিষ্ঠান, অন্যটি বিশ্বব্যাংকের। ভারতের মূল যে প্রস্তাবের কারণে ব্রিকস অগ্রগতি আটকে বাধাগ্রস্ত বা শ্লথ হয়ে আছে তা হল, এখানে পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের সকলের সমান পরিমাণ বিনিয়োগ নিয়েই শুধু প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অসম সক্ষমতার বাস্তবতায় থাকলেও কাউকে বেশি বিনিয়োগ করতে দিয়ে প্রতিষ্ঠান খাড়া করা যাবে না। ভারতের এ ওজর-আপত্তিতে পড়ে পরিশেষে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য অবকাঠামো ব্যাংক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে NDB (এনডিবি) কার্যকর হতে যাচ্ছে পাঁচ সদস্যের প্রত্যেকের সমান ১০ বিলিয়ন করে মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে। অনেকের মনে হতে পারে, সদস্যদের সমান বিনিয়োগ থাকাই সঠিক। কিন্তু আসলে এমন চিন্তা অহেতুক ও অর্থহীন। ঈর্ষাকাতর সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা বলা যেতে পারে। এগুলো দিয়ে কারও প্রভাবশালী উত্থান আসন্ন হলে তা ঠেকিয়ে রাখা যায় না। যেমন আজ চীনের উত্থান কি আমেরিকা ঠেকিয়ে রাখতে পারছে, না রাখা সম্ভব হয়েছে। ভারতের অর্থনীতি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ওই ১০ বিলিয়ন ডলার কাউকে না দিয়ে নিজ নিজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করলেই তো পারত। তা না করে NDB প্রতিষ্ঠানের নামে তা জড়ো করার কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার একটি কমন স্বার্থ ওই পাঁচ রাষ্ট্রের সবার আছে। সেটা হল, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরনো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে বা বাইরে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানো। এখন ‘বিনিয়োগে সবার সমান ভাগ থাকতে হবে’ এই নীতি মানতে গেলে নতুন অর্জিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র থেকে যাবেই। অবকাঠামো ব্যাংক হিসাবে এই পুঁজি খুবই অল্প। আর এমন থেকে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এর হওয়া সম্ভব নয়। অথচ সেটাই ছিল নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গড়ার প্রধান তাগিদ।
যেমন বিশ্বব্যাংকের বর্তমানে মোট বিনিয়োগ সক্ষমতা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, এডিবির ১৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর তুলনায় “সবার সমান বিনিয়োগ হতে হবে” এ জেদাজেদিতে সবার ১০ বিলিয়ন ডলার করে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ব্রিকসের এনডিবি ব্যাংক কতটা প্রভাবশালী হবে বলাই বাহুল্য এবং তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এছাড়া মূলকথা, ভারত অন্য রাষ্ট্রকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দাতা এখনও নয়, বরং নিজেই গ্রহীতার দেশ। ফলে এ পর্যায়ে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ তত্ত্ব ও অবস্থানের সারার্থ হচ্ছে, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে নামিয়ে সবার সমান বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান গড়া। মানে এনডিবি ব্যাংককে বামন করে রাখা। ফলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী কিছুই এটা হতে না দেয়া।

ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থানঃ এক ভুয়া ও অর্থহীন তত্ত্ব
ওদিকে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থান যে ভুয়া ও অর্থহীন এর আর এক বড় প্রমাণ হলো ব্রিকস উদ্যোগের অপর কম্পোনেন্ট, যেটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে তৎপরতা বলেছি সেদিকে তাকালে। [এখনও এটা পুরা আকার নেয় নাই ফলে নাম এখনও নাই। ব্রিকস উদ্যোগের ভিতরে আপাতত ভ্রুন প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গাঠনিক পর্যায়ে আছে বাড়ছে যার আপাত নাম “নয়া আইএমএফ” মনে করে নেয়া যেতে পারে।] ব্রিকসের ‘সমান বিনিয়োগের’ এনডিবি ব্যাংক ছাড়াও হবু “নয়া আইএমএফ” এর জন্য আর একটি ফান্ড তৈরি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্যে কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে তার নিজের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি পরিস্থিতিতে তা মেটাতে সহায়তা করা। এত দিন দুনিয়ায় এ ধরনের সহায়তা বিতরণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল আইএমএফ। ব্রিকস উদ্যোগে এমন ফান্ড মোট ১০০ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এক্ষেত্রে সদস্যরা চাঁদা দেবে অসমভাবে। চীন একাই ৪১ বিলিয়ন, সাউথ আফ্রিকা সবচেয়ে কম মাত্র ৫ বিলিয়ন আর ভারতসহ বাকি তিন সদস্য রাষ্ট্র প্রত্যেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার করে- এভাবে মোট ১০০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই ফান্ড সংগ্রহের বেলায় তা অসম রাখার ন্যায্যতা কী? কেন এখানেও ভারত চীনের সমান অবদান চাঁদা দিচ্ছে না? অর্থাৎ ভারত এখানে নিজেরই ‘সমান মালিকানা তত্ত্বের’ পক্ষে নিজেই দাঁড়াচ্ছে না কেন?
নীতি কথার মানে হল, যে অবস্থানটা সবখানে ইউনিফর্মভাবে প্রয়োগ করা হবে। দেখা যাচ্ছে ভারতের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি অবস্থান নাই, ফলে প্রয়োগে ইউনিফর্মিটি নাই। এই অবস্থা কে বলা যায় ভারতের সিরিয়াসনেসের ঘাটতি আছে, ঘাটতিজাত সমস্যা আছে। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা এটা বুদ্ধিমানের অবস্থান মনে করে। কারণ এটা অজান্তে দোদুল্যমানতা নয়। জেনেশুনে দোদুল্যমান থাকা। ব্রিকসের ভিতরেই থাকা ছেড়ে না যাওয়া। কারণ একমাত্র এভাবে সে ব্রিকস উদ্যোগকে আটকে শ্লথ করে রাখতে পারে। আর এই সার্ভিসটা আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে লাগে বলে আমেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিতর সেখান থেকে বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা আদায় করা। ভারতের এই দ্বৈত ঝোঁকের কারণেই চীন হঠাত করে নিজের ঝুলি থেকে আচমকা ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) এর প্রস্তাব হাজির করে ২০১৪ সালে আর আগামি বছর ২০১৬ থেকে কার্যকর করে ফেলতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা হয়েছে এমনভাবে যে চীন একাই প্রস্তাব করেছে আর ইউরোপসহ [এবং বলা বাহুল্য ভারতও] সকলে ঐ প্রস্তাবের পিছনে পিছনে ছুটেছে হা বলার জন্য। অর্থাৎ এটা প্রমানিত হয়েছে যে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা ও প্রস্তাব করার ব্যাপারে চীন যেভাবে আগাতে চায় তা ঠেকানোর ক্ষমতা ভারত কেন ইউরোপেরও নাই। নাই এজন্য যে বিষয়টা চীনা নেতৃত্বের কোন খামখেয়ালিপনার ইচ্ছা নয়, বিষয়টা হল এক অবজেকটিভ বাস্তবতা – চীনের অর্জিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

ভারতের সিদ্ধান্তের অর্থ তাতপর্য
আর ভারতের দিক থেকে দেখলে এটা তার শর্ট সাইটনেস, সংকীর্ণ দৃষ্টি অর্থাৎ আপাত নগদ লাভের দিকে প্রলুব্ধ হয়ে চলা, আর সেই সাথে নিজের আগামি লংটার্ম স্বার্থের পায়ে কুড়াল মারা। চীনের সাথে ইতিবাচক নয়, আগামির এলাই নয়, ঈর্ষাবাচক প্রতিযোগিতার চোখে পরিস্থিতিকে দেখা। অথচ বাস্তব ফ্যাকটস হলো, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা হল ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ওপর দাঁড়ানো এক অর্থনীতি। এটা এখন দুনিয়ার সর্বোচ্চ। সেজন্য চীন যে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে এর প্রতি ঈর্ষামূলক অবস্থান নেয়া অর্থহীন, কারণ বিষয়টা ঈর্ষা করা নয়। বরং প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেয়াটাই উপযুক্ত পথ, ঈর্ষা নয়। এছাড়া নিজের ওপর আস্থা রাখা উচিত যে, কালক্রমে ভারত রাষ্ট্রের যেটুক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হচ্ছে, হয়েছে; কিন্তু তা অর্জনের পরও আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো ফোরামে সমতুল্য গুরুত্ব ও জায়গা যদি অন্যরা তাকে না দেয় তবে পালটা আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান, ব্রিকস বা AIIB হাজির হবে- ভারত তৈরি করবেই। সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হলে অন্যেরা কেউ চাইলেই ভারতকে বঞ্চিত রাখতে পারবে না। কাজেই ঈর্ষা, সন্দেহ এগুলো কোনো পথ বা কাজের কথা নয়। তবে সংকীর্ণ দৃষ্টির ভারতের নীতিনির্ধারকদের ধারণা যেহেতু নিজের ন্যাচারাল ভবিষ্যতের পথে চীনের সঙ্গে নতুন উদ্যোগে শামিল হতে ঢিলেঢালা, গড়িমসি দেখালে আমেরিকার দিকে ঝুঁকার ভয় দেখিয়ে চীনকে চাপে রাখার সুযোগ আছে, তাই সেটা নেয়া উচিত। এর অর্থ নিজের যেটুকু গুরুত্ব মূল্য পাওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি যেন সে পেতে পারে এমন আবদারে তা পাওয়ার জন্য অযথা ঝুলাঝুলি করা। এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে তা ভারতের জন্য আত্মঘাতী ফল বয়ে আনতে পারে। ব্রিকস উদ্যোগ এত দিন কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি ভারতের এসব ওজর-আপত্তির কারণে।
ভারত-চীনের সামরিক স্বার্থ বিষয়ক টেনশন আছে এটা বাস্তবতা। এর বড় কারণ মার্ক করা বা চিহ্নিত করা হয় নাই এমন বিস্তৃর্ণ কমন রাষ্ট্র সীমান্ত তাদের আছে। বিগত ১৯৬২ সালে চীনের কাছে যুদ্ধে হেরে যাবার খারাপবোধ, ট্রমা আছে। এছাড়া চলতি সময়ে অসম সামরিক সক্ষমতার বাস্তবতা এখানে আছে। এরপরেও এগুলোই একমাত্র বাস্তবতা নয়। কারণ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে আবার উলটা চীনের থেকে সহযোগিতা পাবার (অবকাঠামো ঋণ, আমদানি ব্যবসার বাজার পণ্য ও কাঁচামাল) নেবার স্বার্থ ভারতের আছে। অথচ সবকিছু মিলিয়ে দেখলে অন্তত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অহেতুক চীনভীতি ছড়ানোর চেষ্টা ভারতের মানায় না, কারণ এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ। যেমন ব্রিকস উদ্যোগের NDB ব্যাংক গড়ার ক্ষেত্রে ভারত শর্ত দেয় প্রথম ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট ভারতের হতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এভাবে শর্ত রাখা হয়েছে যে, রোটেশনে চীনের সুযোগ আসবে সবার শেষে, মানে ২০ বছর পর। ফলে আগামী দুই দশক চীন এই এনডিবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই চীনভীতি অহেতুক। তবু চীন তাতেই রাজি হয়েছে। আর ভারতের প্রস্তাবিত ও মনোনীত ব্যক্তি কে ভি কামাথ এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সাথে চীনের আরও কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা-ও জানা যাচ্ছে।
ব্রিকস উদ্যোগের মূল আইডিয়ার মধ্যে চীন বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়াকে আপাতত ব্রিকসের ভেতরে সীমিতভাবে এবং ব্রিকসের বাইরেও পূর্ণভাবে- দুই জায়গাতেই বাস্তবায়ন করার পথে রওনা হয়েছে। দৃশ্যত তাই দেখা যাচ্ছে। ব্রিকসের ভেতরের অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এনডিবি ব্যাংক। আর এউদ্যোগের বাইরের আরও পূর্ণভাবে ব্যাপক পরিসরে অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক। ভারতের খায়েশ ও চীনের প্রতি অর্থহীন সন্দেহ অনুসরণ করে ব্রিকসকে সে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে বামন রাখতে চায়। অথচ ব্রিকস উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হল, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পালটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে গ্লোবাল অর্থনীতির ওপর আমেরিকার বদলে নিজেদের নতুন কর্তৃত্ব লাভ করা। অর্থাৎ এ দুই অবস্থান স্ববিরোধী। আর ভারত এই স্ববিরোধী অবস্থানের উদ্গাতা। এ স্ববিরোধিতা কাটতে পারে একমাত্র, ভারত যদি ব্রিকস উদ্যোগের সাফল্যের ভেতর নিজেকে গ্লোবাল নতুন কর্তৃত্বে চীনের সঙ্গে বড় অংশীদারিত্বে নিজেকে দেখতে চায় তবে, তা সম্ভব একমাত্র চীনের বড় ভূমিকা এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই।
এখান থেকে ভারতের জন্য শিক্ষা হল,
১। বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী একটা অবকাঠামো ব্যাংক গড়ার উদ্যোগ যেটা শেষে AIIB নামে বাস্তবায়িত হল – শেষ পর্যন্ত এমন ঘটনাগুলো ঠেকানোর ক্ষমতা ভারতের নাই, সম্ভব হয় নাই। কারণ এটা সম্ভব নয়। ঠেকানোর চেষ্টাটাও আসলে ভারতের স্বার্থে যায় নাই। ২। গত সাত বছর ধরে এটা ঠেকিয়ে রেখে কি ভারতের লাভ হয়েছিল না কি এখন AIIB হাজির হওয়াতে ভারতের স্বার্থ বেশি আছে তাতে? AIIB ব্যাংক আগে বাস্তবায়িত হলে কি ভারতের জন্য তা বেশি ভাল হত না! আবার চীনের সাথে পক্ষে সক্রিয় থাকলে ব্রিকস উদ্যোগের অধীনেই AIIB ব্যাংক হাজির হত। তাতে বর্তমানের চেয়েও AIIB এর উপর ভারত ব্রিকসের মাধ্যমে বেশি কর্তৃত্ব লাভ করতে পারত। সেটা সে এখন হারাল। তাহলে ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় এতদিন কার পক্ষে কাজ করল? কি লাভ করল? এসব নিয়ে তার অবিলম্বে মুল্যায়নে বসা উচিত।

বিরোধে না জড়ানো বুদ্ধিমান চীন
তবে মজার দিকটা হল, ভারতের এ স্ববিরোধিতার মুখেও চীন তাকে ত্যাগ করেনি। অথবা ব্রিকস উদ্যোগকে চীন স্থবির বা গুটিয়ে ফেলেনি। বুদ্ধিমান ও ইতিবাচকভাবে ভারতকে নাড়াচাড়া মোকাবিলা করেছে। তবে দেখিয়েছে, চীন একা নিজ উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী মূল অবকাঠামো ব্যাংক গড়তে সমর্থ। তাই মাত্র ২ বছরের মধ্যে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের স্ববিরোধী ও দোদুল্যমানতার কারণে চীন আর ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে রেখে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর করার পথে যায়নি আপাতত। এর অর্থ হলো, ভারতের নির্বুদ্ধিতার জন্য চীন এআইআইবি ব্যাংক আপাতত ব্রিকস উদ্যোগের বাইরে নিয়ে রাখল। স্বভাবতই এতে ভারতের ক্ষতি ছাড়া কোনোই লাভ হয়নি। বরং এভাবে হওয়াতে এআইআইবি ব্যাংকের বাস্তবায়নের উপর চীনের একার বক্তব্যের ওজন সবচেয়ে বেশি। এমনকি ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরের এনডিবি ব্যাংকের উপর নিজের প্রভাবের চেয়ে তা বেশি। ফলে সমান বিনিয়োগের গোঁ ধরে ভারতেরই ক্ষতি হল। যদিও এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট কামাথ বলছেন, এআইআইবি ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এনডিবি ব্যাংক রেখে কাজ করবে।

এনডিবি ব্যাংক চেয়ারম্যান আরও বলছেন, তারা শুরুতে শুধু পাঁচ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখবে। এটাও কথার কথা। কারণ ব্রিকসের ভিতরে বাস্তবে অবকাঠামো ঋণ পাওয়ার দরকার আছে, প্রথমত ভারত আর ব্রাজিলের। বাকিরা দাতা অথবা ঋণ কাজে লাগানোর উপযোগী অর্থনীতির রাষ্ট্র নয়। এর মানে দাঁড়াল, আপাতত যেন ভারত শুধু নিজের জন্য ব্যবহার করবে এনডিবি ব্যাংককে। অর্থাৎ ভারত কী চাচ্ছে আর তা পেয়ে ভারতের কী লাভ হচ্ছে – এসবের কোনো ঠায়ঠিকানা ভারত মিলাতে দেখাতে পারছে না। তবু নানান ওজর-আপত্তি তুলতে দেখছি আমরা ভারতকে।
আসলে মূল স্ববিরোধী কঠিন বাস্তবতা হল, ভারত মূলত ঋণগ্রহীতা; কিন্তু সে ঋণদাতার ভূমিকা ও গুরুত্ব পাওয়ার জন্য জিদ ধরেছে।

[এই লেখাটা এর আগে আগষ্ট ২, ২০১৫ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে ছাপা হয়েছিল। পরে সে লেখাটাই আরও বিস্তার করে এবং সম্পাদনা করে এখানে এখন ছাপা হল।]