শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা


শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

গৌতম দাস

১৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৫ শুক্রবার

https://wp.me/p1sCvy-49S

 

Ignoring BRICS is ignoring turn of history

 

শশী থারুর [SHASHI THAROOR] একজন ভারতীয়, কংগ্রেস দলীয় রাজনীতিবিদ। মূলত, তিনি রাজনীতিকের চেয়ে বরং একজন কেরিয়ারিস্ট; তিনি প্রফেশনাল কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি এবং গ্রাজুয়েশন করেছেন আমেরিকার স্বনামধন্য ফ্লেশ্চার স্কুল [The Fletcher School of Law and Diplomacy] থেকে। এই অর্থে তাঁর এক নামী একাডেমিক ইনস্টিটিউশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদিও তিনি ততটুকুই রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন বা চেয়েছেন যতটুকু  কেরিয়ার বাড়াতে তাঁর দরকার মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এতে তিনি যতটা যোগ্য হয়েছেন তার চেয়ে বেশি  নিজ একাডেমিক (ফ্লেশ্চার) বড়াই বা গর্ব করে থাকেন এবং তা বাড়াবাড়ি রকম। তার সমসাময়িক বা এল্যুমনিদের [alumni] মধ্যে যারা এমনকি বাংলাদেশী (ফ্লেশ্চার) তাদেরকেও এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।

মোদির ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার আগের টানা দুই টার্ম (২০০৪-১৪) কংগ্রেসের মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় ছিল; সেই সময়কালে থারুরের কেরিয়ার ও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল। সে সময়টা ছিল কংগ্রেস সরকারের – তাই তিনি কংগ্রেস দলের (কেরালা থেকে) এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন। মানে সে সময় অন্য দলের সরকার হলে তিনি সেই দল করতেন হয়ত, এ রকম কেরিয়ারিস্ট তিনি। কেন এমন বলছি?

বলছি, সেকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই যেমন এতদিন তিনি ছিলেন এক মোদিবিরোধী কংগ্রেসী। কিন্তু গত ৭ জুলাই ২০২২ তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate] এক আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে – অবস্থান বদলে নিতে চাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি  বাইডেনের মহাউদ্যোগে নবগঠিত বা চলতি যে ‘পশ্চিমা জোট’ শক্তি তৈরি হচ্ছে (সাম্প্রতিকালে জি-৭ আর মাদ্রিদে ন্যাটোর সম্মেলন ডেকে বাইডেন হইচই ফেলতে চেয়েছেন, ইউরোপের সাথে আমেরিকার জোটকে তিনি  ‘পশ্চিমা ব্লক জোট’  [Western bloc’s] বলে পরিচয় করিয়েছেন সেখানেই) শশী থারুর বাইডেনের এই উন্মাদনা দেখে  আর বসে থাকতে পারেননি। একেবারে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকালতি শুরু করেছেন। যেখানে এতদিন তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকার ভারত পলিসির ক্রিটিক।

শশী থারুর নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।  সেখানে তার ব্যক্তি অবস্থান হিসেবে যে লাইন তিনি পারসু করতেন বা পক্ষে কথা বলে থাকেন তা হল যেমন – কেন আমেরিকা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেনমেন্টের [China Containment] এ’কাজের ঠিকা দিয়েছে; এর সমালোচক ছিলেন তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই চীন ঠেকানোর পুরস্কার বা মজুরি হিসেবেই ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল।

এই ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ প্রশ্নেই থারুর  মোদির প্রো-আমেরিকান হয়ে লেপ্টে থাকার নীতির সমালোচক ছিলেন। ফলে যেন কংগ্রেসি হিসেবেই মোদির সমালোচক তিনি, এ’পরিচয় লটকে চলতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি পাশ ফিরছেন; মোদির সমালোচক হয়ে বাইডেনকে অতি আপন করে নিতে চাইছেন। যেটা অনেকে পাল্টিমারাও বলতে পারেন। কিন্তু কী প্রসঙ্গে ছিল থারুরের সেই লেখা?

আলোচ্য সেই লেখার শিরোনাম হল  – ‘ব্রিকস থেকে ভারত কি বেরিয়ে যাবে?’ এটা বাংলাদেশে অনেকে এভাবে বাংলা করে ছেপেছে – যেটা ভালো বাংলা হয়নি। কারণ, মূল ইংরাজি ভাষ্যটা ছিল Are the BRICS Breaking Up?  বা – ‘ব্রিকস কী ভেঙে পড়বে’-এরকম।

প্রতি বছর ব্রিকস জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার গতমাসে ২৩-২৪ জুন তা হয়েছিল চীনে। একইসাথে তা বিশেষ গুরুত্বে ‘বেইজিং ঘোষণা’ [XIV BRICS Summit Beijing Declaration] বলে এক ঐক্যমতের দলিলে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। আর এবার ব্রিকস সম্মেলন হয়েছে এমন পটভূমিতে যখন বাইডেনের ‘পশ্চিমা-শক্তি’ আগেই ঘোষণা দিয়ে যা যা বলেছে এর অর্থ হয় যে, মূলত চীন ও সাথে রাশিয়া এবং এদের সহযোগী সব রাষ্ট্রকে তারা একঘরে করবে, কোনো অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কও রাখবে না; ভিন্ন করে দিবে; যেন অ-জাত বা নিচা-জাত তারা। সেটা অনেকটা ১৯৯২ সালের আগে সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই-ব্লকে দুনিয়া ভাগ হয়ে থাকার সময়কালে দুনিয়া যেমন ছিল তেমনি।
সেখানে আবার দুনিয়াটাকে ফিরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাইডেনের এটা এক অবাস্তব খায়েস-কল্পনা মাত্র। যেটাকে ‘কোল্ড ওয়্যার’ [cold war]-এর সেকাল বলে অনেকে চিনে থাকে যার মূল অমন বৈশিষ্ঠ যে ব্লকে ভাগ হতে পেরেছিল যে, তাতে সোভিয়েত-আমেরিকা বলে এ দুই ব্লকের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্য-পুঁজিবিনিয়োগ বিষয়ক (ফলে  জ্ঞান বা স্বাভাবিক বাতচিত-সহ সবকিছুও) মানে ভাব বা ব্যবসা কোনোকিছুরই বিনিময় সম্পর্ক ছিল না।

ঐ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ, খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের কোনো দেশ কেউই – ১৯৪৪ সালে আইএমএফ প্রথম  জন্ম ও গঠন হওয়ার পর থেকেই – এরা কেউ  সদস্যপদ নেয়নি। আর যে সুযোগে পরে আমেরিকাও সদস্যপদ না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাইডেনের নয়া-কল্পনার খায়েস অনেকটা সেকালের মতই যা একালে আবার সেখানে পৌঁছানো যায় কি না; এই তাঁর আকাঙ্খা বা মনোবাঞ্ছা। যদিও একালে সে বাস্তবতাটাই নাই ভেঙে গেছে, মানে বাস্তবে তা আর উপস্থিতিও নেই। তবু এ জায়গায় বাইডেন নির্বিকার। কিন্তু জিদ ধরেছেন সেকালেই ফিরতে চান! বাইডেনের ভাষায় বললে, তার নেতৃত্ব গড়ে তোলা ‘পশ্চিমা শক্তির’ সাথে চীন ও এর বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নাকি ‘মূল্যবোধে’ [Beijing…. challenges the Western bloc’s ‘interests, security and values’] এক বিশাল ফারাক আছে; তাই তিনি যেন অবাস্তব জেনেও এমন জিদ ধরেছেন।

এ ছাড়া এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেক তাৎপর্য ছিল, এতদিন এতে পাঁচসদস্য রাষ্ট্র শুধু অংশ নিয়েএসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম অতিথি হিসেবে আরো ১৩টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। যে দেশগুলো হল – আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, সেনেগাল, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আমরা বলতে পারি, এর মানে, এদের কাছে বাইডেনের উদ্যোগে নবগঠিত যে ‘পশ্চিমা ব্লক’ করেছে, চীনকে একঘরে করবে বলে হুমকি দিয়েছে- সেসব দিকগুলো এসব দেশের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। কেন এভাবে বলছি?

গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস (BRICS) আসলে কীঃ
এক কথায় বললে, এখনো আমেরিকা গ্লোবাল ইকোনমির নেতা হয়ে থাকলেও এর অবস্থা পড়তি শেষ পর্যায়ে। বিপরীতে চীনের নেতৃত্ব উত্থিত হয়ে তা সেই জায়গা নিতে চাইছে। আ্মাদের অর্থ-বাণিজ্যের দুনিয়া এখন এরই জংশনে আছি। আর এতে গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; যেটা নিজে আছে আবার আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণে।
কারণ, নিয়ন্ত্রক আইএমএফ এর বড় শেয়ার মালিকানা একা আমেরিকার নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। এমনকি চীন উঠে এলেও তার সাথে শেয়ার শেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। আর তা থেকেই ওয়াল স্টিটের পরামর্শে ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম! তাহলে ব্রিকস হল সেই আগামী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান; যখন গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল ঘটবে তখন যা কার্যকরি হবে। কিন্তু তা সক্রিয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে যখন চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে তখন। কেন? এখন নয় কেন?

ইকোনমিক-টেকনিক্যাল কারণে একই দুনিয়াতে দুইটা ‘আইএমএফ’ ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে একটা দেশে একই সাথে দুটা সরকার থাকতে পারে না। তাই ২০০৯ সাল থেকে ব্রিকসের জন্ম হলেও এখনই তা দুনিয়াজুড়ে ‘আইএমএফ’-এর সমান্তরালে সক্রিয় হয়নি, ইচ্ছা করেই।
চীন, ভারত, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল – এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস গঠিত। যদি অনুমান করে নেই আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে কেবল এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে সমান্তরাল আরেকটা দুনিয়া যেন আছে; তবে এখন অস্থায়ীভাবে এই পাঁচ রাষ্ট্রের জন্যই শুধু ব্রিকস যেন, আর সেই দুনিয়ায় আরেক আইএমএফ হিসেবে তা আপাতত হাজির আছে।
এভাবে মনে করা যেতে পারে। যেদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে চীন আসীন হবে সেদিন ব্রিকস আর আইএমএফ মিলিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। তবে তা আজকের আমেরিকান প্রভাবের (মানে লায়ন শেয়ার) আইএমএফ যেমন, সেই রকম তখন সেটা চীনের প্রভাবের একটা নয়া আইএমএফ প্রতিষ্ঠান হবে, তাতে নতুন নাম কিছু একটা হবে হয়ত বা পুরনোটাই থাকবে। কিন্তু নয়া মালিকানা শেয়ারে বড় ভাগটা চীনের পক্ষে পুনর্গঠিত হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। কাজেই চীনকে উপেক্ষা করে নয়া দুনিয়া সাজানো বাইডেনের আমেরিকার এক মরণ খায়েশ মাত্র। অথচ বাইডেনের এ’অবস্থানের পরোয়া না করে ১৩ রাষ্ট্রের এবার ব্রিকসের অতিথি হয়েছে – নিজেদের স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটা ঘটিয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাইডেন যেখানে চীনকে গ্লোবাল বাণিজ্য থেকে বের করে একঘরে করার জিদ ধরেছেন; সেখানে এই ১৩ রাষ্ট্র উল্টা বাইছে – এমন পদক্ষেপ নজর-আমল করার মতই বলতে হবে!

তবে ওদিকে একই দুনিয়াতে বিশ্বব্যাংক টাইপের প্রতিষ্ঠান একাধিক হতে পারে। টেকনিক্যাল অসুবিধা নাই। যেমন ইতোমধ্যেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এডিবি ADB) অথবা ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি IDB) আসলে এরা বিশ্ব ব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছে। এছাড়া চীনা প্রভাবাধীন নয়া এআইআইবি [AIIB] অথবা ব্রিকসের ভেতরেই আরেকটা ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক [NDB]’ নামে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে আছে।

সার কথায় এতক্ষণের কথাগুলো সারকরে বললে, ব্যাপারটি হল, শশী থারুরকে এতদিন ব্রিকস নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। বরং ভারত-আমেরিকার চীন ঠেকানো নিয়ে কথা বলতেন। সেই তিনি এখন “ব্রিকস ভেঙে যাবে কি না” তা নিয়ে কথা বলছেন!
আসলে আগেও অনেকবার বলেছিলাম যে গ্লোবাল ইকোনমি বা আইএমএফ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় কূটনীতিকদের সাবধান হওয়াই ভাল; এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির ইস্যু বলে ঠাওরে নিয়ে কথা বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের বিদ্যের দৌড় প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে – তাই অসাবধানে এ ইস্যুর সাথে আচরণ না করা ভুল। আর ঠিক সেই ভুল ও ফাঁদে আটকে গেছেন শশী থারুর!
আগে বলে নেয়া যাক – কেন এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ‘বেইজিং ঘোষণা’ জিনিসটা কী যার ওপরই মূলত শশী থারুর এত ক্ষোভ বা আপত্তি!

পাকিস্তানি আবদুল রহমান মক্কিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা নিয়ে তিন পর্যায় :
প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগের সপ্তাহে ১৭ জুন, একজন পাকিস্তানি কিন্তু আইএস সদস্য আবদুল রহমান মক্কির নাম জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকায় তোলা হবে কি না এ নিয়ে ভারত-আমেরিকার এক যৌথ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন এটা আরো ছয় মাস দেরি করার পক্ষে নিজ ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, পরের সপ্তাহে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের ভারতের মোদি নিজ বক্তৃতায় সরাসরি এ প্রসঙ্গটা উচ্চারণ না করে তবে প্রসঙ্গটা মাথায় রেখে বলেন, ‘আমাদের (ব্রিকসের সদস্যরা) একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝা উচিত, সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা দেয়া উচিত; যাতে এমন ইস্যুর রাজনীতিকরণ না হয়ে যায়।’

Modi has said that the BRICS member nations should understand each other’s security concerns and provide mutual support in the designation of terrorists, asserting that this sensitive issue should not be “politicised”.

আর এতে তৃতীয় ঘটনাটা হল, ব্রিকস সম্মেলন শেষে ‘বেইজিং ঘোষণা’ নামে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আর এই প্রস্তাবের  বিষয়টা সারকথায় বললে – আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যুতে ব্রিকস সদস্যরা  যখনই একসাথে জাতিসঙ্ঘে অবস্থান  নিতে পেরেছে তাতে কত ভাল কিছু ফলাফল এসেছে -সেসবের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখন থেকে আবার পরস্পরের সহযোগী হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

কেন এসব বলেও বারবার চীন-ভারত একসাথে থাকতে পারেনি :
এর মুলকথা হিসাবে বলা যায়, গ্লোবাল নেতৃত্বের পরিবর্তনের একালে গত ২০ বছর ধরে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে তাতে মৌলিক বোঝাবুঝিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেছে বা রাখা হয়েছে বলে এর উল্টো ফলই ভারত বারবার পেয়েছে। যেমন- ভারত মনে করে এসেছে, এযুগে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভারত এদের দুজনের মাথার উপরে উঠে যেতে পারবে। নিজ ভাগ্য গুছিয়ে নিতে পারবে, কারণ ভারতের কূটনীতি খুবই চতুর!!  কিন্তু এটা এতটাই উচ্চাশা যে, এ নিয়ে কথা বলাই সময় নষ্ট। কারণ, এখানে মূল বিষয়টা – কূটনীতিক দক্ষতা দেখানোর নয়- বরং ‘নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ও তা দেখানোর’। নিজেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করে দেখানোর
এতে মোদি ভাল নেতা কি না, বা দেশপ্রেমিক জাতিবাদী কি না কেবল তা দিয়ে বা এই কর্তাসত্তা দেখিয়ে দাবি করা অর্থহীন যে- ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’ অর্জন হয়ে গেছে। ফলে এখন চীন-আমেরিকাকে কূটনীতিক চাতুরি দিয়ে টেক্কা মেরে দিলেই সব অর্জন হয়ে যাবে?  না, তা হওয়ার কারণ নাই। বরং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে দেখাতে হয়। তার আগেই নিজেকে পরাশক্তি দাবি করা অর্থহীন। বাগাড়ম্বর! আর কিছু হওয়ার আগেই আমি বিরাট কিছু এই বাগড়ম্বরতাই ভারতের কিছু না হতে পারার কারণ। সর্বোপরি আছে হিন্দুত্ববাদ, এই ভুল শুধু না বিরাট ক্ষতিকর রাজনীতি।
যেমন ধরেন, সম্প্রতি ভারতের জনসংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়েছে। বিবিসি বাংলা খবরটা ছেপেছে যেন এটা নিজেই এক অর্জনের ঘটনা।   গ্লোবাল অর্থনীতির প্রধান কেউ হতে হলে বড় জনসংখ্যা এর অর্জনের জন্য অবশ্য একটা ইতিবাচক উপায় (ফ্যাক্টর) ও সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বড় জনসংখ্যার কোনো দেশ হয়ে যাওয়া মানেই সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কারণ, ওই বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতিতে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বানাতে রূপান্তর করতে সক্ষম হতে হবে আগে – তবেই বড় জনসংখ্যা ইতিবাচক; না হলে ওই বিপুল জনসংখ্যাই হবে তখন বড় বোঝা বা ভার।

আর এই ভারতীয় ভুল মনোভাবকেই ফুসলিয়ে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে দিল্লিকে নিয়ে গেছে, ঠিকা দিয়েছে; মানে উল্টা ভারতকে ব্যবহার করেছে। চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়েছে। অথচ আমেরিকা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘পতিত শক্তি’। অর্থাৎ ভারতসহ উদীয়মান যেকোন অর্থনীতির জন্য বিপরীত শক্তি। কাজেই আমেরিকা ভারতের দোস্ত বা এলাই হতে পারে না!!

এবার সুনির্দিষ্ট করে জঙ্গি ইস্যু :
চীনের উইঘুর ইস্যু। আপনি উইঘুর বাসিন্দাদের পক্ষে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন এবং যাওয়া উচিতও। কিন্তু এক শর্তে! তা হল – উইঘুররা আবার আফগানিস্তানে আইএসের সহযোগী হয়ে সশস্ত্র তৎপরতা করে বেড়াতে পারবে না। আসলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানেরাও উইঘুর [ETIM]  এদের এমন তৎপরতা করতে আপত্তি ও বাধা জানিয়েছে। এইখানে দেখেন এনিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট।
কিন্তু তারা তবু ভারত ও আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কাজে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচরাও থাকছে।

পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা ইনস্টিটিউটে হামলা বা পাকিস্তানে গোয়াদর ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী মারতে বেলুচদের সাথে মিলে উইঘুরের বাসিন্দারা যদি তৎপরতা চালায় তবে এরপর আপনি আর একই সাথে তাদের প্রতি চীনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরেক বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, গত ২০০১ সাল থেকে উইঘুররা আমেরিকা সরকারের “সন্ত্রাসী দলের তালিকায়” অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগ-দিয়ে  ট্রাম্প প্রশাসন এই [ETIM] গ্রুপকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে মুক্ত করে দেয়। আর পরে বাইডেন উইঘুর বাসিন্দাদের উপর চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেইজিংয়ের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। রফতানিতে চীনা তুলা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে বাইডেন আসলে কী চায়?

সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবান গ্রুপ টিটিপির [Tehrik-i-Taliban Pakistan] সাথে এদের মিলিত তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্রয় অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তাদের তৎপরতা স্তিমিত করেছে। আসলে বটমলাইন হল – আপনি আরেক দেশে সন্ত্রাস উসকে দিয়ে নিজ দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারবেন না। আমেরিকার সাথে মিলে ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস উসকে তোলার নীতিতে চলে তারা স্ব স্ব নিজ দেশ সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে পারবে না। ভারত-আমেরিকা মিলে পাকিস্তানে [চীনা স্থাপনা বা প্রকল্পে] সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দিয়ে নিজেরা ভাল থাকতে পারবে না। সন্ত্রাস প্রসঙ্গে সবখানেই সব ফোরামেই একই নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। এটাই একমাত্র এথেকে মুক্তির উপায়। পিস-মিল করে একেক সন্ত্রাসের ঘটনায় একেক অবস্থান নিবেন কোনটা কাছে টেনে কোল দিবেন আবার কোনটাকে জাতিসংঘের তালিকায় তুলবেন – এগুলো কোনটাই কাজ করবে না। শেষ বিচারে এসব কোন কাজের অবস্থান হবে না।  কেবল নুইসেন্স সৃষ্টি করা যাবে।

যেমন যদি প্রশ্ন করি, ভারত মুক্কি ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে আমেরিকার সাথে মিলে ভারত জাতিসঙ্ঘে যৌথ প্রস্তাব উত্থাপনে গেল কেন? একই সাথে এ ইস্যুতে চীনের সাথে কথা বলা ও একই নীতি তৈরি করে উভয়েই তাতে চলতে চাইল না কেন? সমস্যা তো এখানেই! ভারত তো আসলে মুক্কি ইস্যুতে মানে সন্ত্রাস ইস্যুতে চীনের সাথেও এক অবস্থানে যেতে চায় না। চাইলে এই পথ ধরত। ভারত চেয়েছিল আমেরিকার সাথে গলা মিলিয়ে চীনকে জাতিসঙ্ঘের আসরে বিব্রত করতে। ভারত সমাধান চাইলে আগেই চীনের সাথেও একই অবস্থান নিয়ে কথা বলত। যেটা মোদি ব্রিকসের সভায় নিজ বক্তৃতায় বলেছেন যে, “ব্রিকসের পাঁচ সদস্যের সবাই অন্যের সন্ত্রাস নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আমল করা উচিত”। কিন্তু ভারত নিজেই তো তা অনুসরণ না করার নীতিতে চলেছে। না হলে পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে মিলে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, উইঘুর বা আইএস সশস্ত্র তৎপরতাকে ক্রমাগত সাহায্য সমর্থন না করে তা থেকে দূরে সরে আসত! কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়ে কোন সশস্ত্র হামলা হয় নাই। কিন্তু সেজন্য ইমরানের সাথে মোদি সরকারের কোন ঘনিষ্ঠতা, কাজের আলাপ বা সম্পর্কের উন্নতিতে কোন পরিবর্তন আসে নাই। বরং পাকিস্তান-মুসলমান বলে বিদ্বেষ-ঘৃণা আরো বেড়েছে। মুসলমান কোপানো এখন আরো প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটা ভারতীয় নির্বাচনি প্রধান ইস্যু। এরই শেষপ্রান্তে আমরা নুপুর শর্মা-কে দেখতে পাচ্ছি!!!

আগেই বলেছি, মূল কথা্টা হল – ভারত মনে করে চীন-মার্কিন বিরোধে ভারতকে আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকতে হবে, আর এরপর এ থেকে ফয়দা তোলার কূটনীতিতে চলতে হবে। চীন-আমেরিকার বিরোধ কাজে লাগিয়ে এভাবেই নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। যেন ভারতের কূটনীতিই খুবই বুদ্ধিমান তাই এটাই জিততে থাকবে সবস্ময়!!!  কিন্তু বাস্তবতা কী?? সময়ে তা ধরা যাক কিছুটা আদায় হলেও হতে পারে হয়ত, কিন্তু এথেকে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কীভাবে? অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সাথে কূটনীতিতে ওস্তাদ হওয়া বা না থাকার কী সম্পর্ক? চালাকি কূটনীতি আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী এক জিনিস? না কি এটা উলটা ক্ষতি করবে? করছে!! এখানে কবি নীরব! অথচ এসব নিয়ে  নুপুর শর্মা ইস্যুতে ডুবে যাওয়া দিনে শশী থারুর এ নিয়েই আমেরিকার পক্ষে তৎপর হতে উঠে দাঁড়ানোর সঠিক সময় ভাবলেন।

ভারত কিসে ডুবে যাচ্ছে?
মূলত মুসলমান নির্যাতন ও কোপানো। অথচ একমাত্র  মুসলমান নিধন করেই মোদি নির্বাচনে বাক্স ভরার নীতিতে তাকে চলতে হবে বলে মনে করেন। কারণ অর্থনীতির পারফরম্যান্স আগামিতে আর ভাল করার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সর্বশেষ ফরেন কারেন্সী্তে বিপর্যয়ের ধাক্কা আরো বিশাল। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাহার করে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার-  সবদেশের উপর প্রয়োগ করা ছাড়া তার অস্ত্র ভোঁতা – তাই বাইডেনের পক্ষে ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাওয়া আবার দিল্লির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রয়োগ না করা স্ববিরোধী।

অথচ থারুর ভাবছেন মোদি তার মত বুদ্ধিমান নন। সেজন্যই নাকি সমস্যা!! তাই তিনি ভেবেছেন বাইডেনের এ নয়া উদ্যমে চীনের বিরোধিতা করার সময়গুলোতে একে ভারতের নিজের কাজে লাগাতে বাইডেনের বন্ধু হতে হবে ও আমেরিকার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ ভাব দেখাতে হবে। অথচ এসব অবস্থান মোদি-জয়শঙ্কর সব উল্টে-পাল্টে যতদুর ব্যবহার করা যায় করেছেন । এরপরেই সব অকেজো অবস্থায় তারা। ভারতের উপত লাগাতর তিনবছর ধরে  মুসলমানদের উপর আক্রমণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শুণ্যের কোঠায় আনার জন্য অবরোধ আরোপের সুপারিশ ঝুলছে। অথচ সেদিকে শশী থারুর খবর নাই। কেবল নিজেকে মোদির চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবা ছাড়া……!!!

ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা- একথা দিয়ে শিরোনাম লেখা কেনঃ
শশী থারুর তার লেখার শিরোনাম করেছেন ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে। কেন?
এনিয়ে লেখায় একটাই কারণ জানা যায় যে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ঐক্যমত না দেখাতে পারা। প্রশ্ন হল, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে তা তো না। এনিয়ে ভিন্নতা ব্রিকসের জন্মের আগে ছিল। মাঝে ছিল এখনও আছে। তাহলে এখন সেকথা তুলে এই প্রশ্ন কেন? এটাই সন্দেহজনক। এমনকি মোদি  নিজে বা  সরকারের কেউ এমন “ভেঙ্গে যাওয়া” ধরণের মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন দেখা যায় নাই।  তাহলে “ভেঙ্গে যাওয়া” নিয়ে যেন আলোচনা উঠে এর কৃতিত্ব একা থারুরের। কেন? তিনি এই ইঙ্গিত তুলে মোদির আগে বা উপরে আমেরিকার প্রিয় হতে চান? আমেরিকার নয়া এজেন্সি নিতে মোদির সাথে টক্কর দিয়ে আগায় থাকতে চান? যদিও কংগ্রেস এখনও কোথাও চীন ফেলে প্রো- আমেরিকান অবস্থান নিবে এমন ইঙ্গিত এখনও কোথাও কোন ইস্যুতে দেখায় নাই। বরং একাদেমিক বা সোশাল পর্যায়ের ঘরোয়া আলোচনায়, মোদি জমানা শেষ হলে চীন-ভারত সম্পর্ক ভাল হবে এমন ইঙ্গিত নন-পার্টিজানদের দিয়ে অনেক সময় দেয়া হয়েছে।
তো সেটা হতেই পারে। শশী থারুর তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি অবস্থান নেন, বদলান।
কিন্তু ২০১৬ অক্টোবরের এক সংবাদ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শশী থারুর  ব্রিকস সম্পর্কে বলছেন, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ নেয়া উচিত, তাই ব্রিকস কে উপেক্ষা করলে এমন মোড় পরিবর্তন থেকে নিজেকে উপেক্ষিত করা হয়ে যেতে পারে [Ignoring BRICS is ignoring turn of history: Shashi Tharoor]। তাহলে, মিস্টার থারুর, কী দাড়ালো ব্যাপারটা?
মনে হচ্ছে খোদ শশী থারুরেরই মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যাহোক, সেটা হতেও পারে। কিন্তু এনিয়ে তার একটা ব্যাখ্যা পেলে আমাদের জন্য সব বুঝাবুঝি সহজ হতে পারত।  তা শশী থারুর কী এখন অবলীলায় “ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকেও উপেক্ষার” পক্ষপাতি হতে বলছেন!!!! কোথায় গেল তার সে ইতিহাসবোধ!!  কেন?

শশী থারুর গ্লোবাল অর্থনীতির ব্যবস্থাটাই বুঝেন না তা উদামঃ
তাই শেষ কথাটা হল – শশী থারুর যে গ্লোবাল অর্থনীতি বুঝেন না সেটাই এতে উদাম হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন ব্রিকসকে আরও চীনকেন্দ্রিক করা হোক, সেটা ভারত চায় না।’। আসলে এই হল হাজার কথার এক কথা। গোপেন এবার ধরা পড়েছে!!!! শশী থারুর যে ব্রিকস কী ধরনের প্রতিষ্ঠান এটাই বুঝেন না, তার এক শক্ত প্রমাণ এটা।

প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে আইএমএফ কী এবং – এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ও গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ছাড়া দুনিয়াতে কোন দেশ আরেক দেশের সাথে পণ্য-বিনিময়, পুঁজিবিনিয়োগ বিনিময় ইত্যাদি চলতেই পারত না কেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা ও যুদ্ধের খরচ একক বহণকর্তা হিসাবে আমেরিকার উঠে আসা ও পরবর্তিতে আবার অর্থনীতির পুণর্বাসনে রিপেয়ারে অর্থ ঢেলেছে ঐ আমেরিকাই। এরসাথে সেই উদ্যোগ নিয়ে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  ব্যবস্থা জন্ম দিয়ে গিয়েছে বলে আজও দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা বলে একটা কিছু চলছে। তবে এটা মন্দের ভাল। আর এই ব্যবস্থা আমেরিকার দিকে কান্নিমারা ভাবেই তৈরি হয়েছে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে এই শতকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আর চীনের হাতে নয়া ও বিপুল সঞ্চিত সম্পদের কারণে একা চীনের হাতেই সবার চেয়ে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা পুঞ্জিভুত হচ্ছে। এটাই চীনের সব ধরণের ক্ষমতা বা সক্ষমতার উতস।  এই কারণেই মূলত চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সবখানে বেশি উঠছে। কিন্তু ঐ ১৯৪৫ সালের দিকে যদি আওয়াজ তোলা হত যে  (ঐকালের ব্রিকস মানে) আইএমএফ এই প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না, তাহলে কেমন হত?  এককথায় এর উত্তর হত তাহলে আজও দুনিয়ায় কোন বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুই হত না।

উদ্বৃত সম্পদ  বা সারপ্লাস কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকাই ছিল সেকালে (মোটামুটি  ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া শতক জুড়ে)  একমাত্র রাষ্ট্র যার হাতে বা যার অর্থনীতি হচ্ছিল উদ্বৃত সম্পদে ভরপুর। সেকালের কলোনি সাম্রাজ্যের নেতা বৃটিশ বা ফরাসীদেরকে ছাড়িয়ে।  ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতাই ছিল সেকালের একমাত্র ভরসা যে যুদ্ধের পরেও এই আমেরিকার ভরসাতেই, সেই প্রথম দুনিয়াতে একটা গ্লোবাল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন গড়ে উঠে। এবং তাই হয়েছিল। তাই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। তাই আমেরিকা ছাড়া বা আমেরিকা-কেন্দ্রিক নয় এমন এক আইএমএফ গড়ার কথা কেউ যদি বলে তাহলে বুঝতে হবে তিনি আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা কী ও কেন এর দরকার সেটাই আসলে বুঝেন নাই।
এখন সেকালে কী শশী থারুর মত টেরা কিন্তু বোকা চিন্তার কেউই ছিল না যে বলে নয়া আইএমএফ কে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না ???
হা অবশ্যই ছিল।  আর সেটা হল ফ্রান্স।  ফ্রান্স আপত্তি তুলেছিল যে একমাত্র আমেরিকান ডলার-কেন্দ্রিক  এক আইএমএফ বাণিজ্য-অর্থনৈতিক  এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। ফ্রান্সের যুক্তি ছিল অনেকটা কথিত ‘গণতন্ত্রি’ বা রাষ্ট্রের সাম্য ধারণার মত যে একা আমেরিকা কেন সব খাবে? সব কর্তৃত্ব নিবে!!
কিন্তু  বলাইবাহুল্য ফ্রান্সের আপত্তি সবাই নাদান বালকের আপত্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ সেকালে আমেরিকাই ছিল একমাত্র উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশ। আর উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশের মুদ্রা ছাড়া  (এটাই মূল টেকনিক্যাল যুক্তি বা কারণ) ঐ একই ন্যাশনাল মুদ্রাকে একই সাথে গ্লোবাল বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। তাই সদস্য সকল দেশই একমাত্র ডলারকেই পছন্দ না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।   

এখন একালে, চীনকে নিয়েও প্রায় একই আচরণ দেখাচ্ছে বাইডেনের আমেরিকা। নাদান আচরণ করছে।  আওয়াজ তুলছে বাইডেন। যেমন একটা তুলনা চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পকে নিয়ে। বাইডেন এই প্রথম এই চীনা প্রকল্পকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বলে আওয়াজ উঠিয়েছে। যদিও সবাই জানে ও বুঝছে এটা অবুঝ বাচ্চার আকাশের চাঁদ পাবার জিদের মত!
বাইডেন বহুকষ্ট পশ্চিমের সবদাতা মিলে কুথে-কাথে ছয়শ বিলিয়ন ডলার যোগাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেবল। যদিও এখনও সে অর্থ দিয়ে কাজে নামে নাই। এর ভিতর আমেরিকা দিয়েছে মাত্র দুইশ, সারা ইইউ মিলে দুইশ আর জাপান ও অন্যেরা মিলে বাকি দুইশ বিলিয়ন এভাবে। আর  এভাবে তারা সবাই মিলে বিনিয়োগ সক্ষমতা যোগাড় করেছে ছয়শ বিলিয়ন ডলার। ভাল, খুব ভাল!!

কিন্তু চীনের বেল্ট-রোডে বিনিয়োগ কত?  
চীন মনে করে, বেল্ট-রোড এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর স্বপ্ন। সে যা হয় হোক, এর যাত্রাশুরু মাত্র এই ২০১৩ সাল থেকে।   ইতোমধ্যেই এর বিনিয়োগ চার ট্রিলিয়ন (মানে চারহাজার বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে [China Belt And Road Projects Value Now Exceeds US$4 Trillion]।
ব্যাপারটা সোজা। আমেরিকাও ওর অর্থনৈতিক উত্থানে যখন ওর যৌবনকালে ছিল তখন বেশির ভাগ এমন বিনিয়োগ প্রকল্প একা আমেরিকাই চালিয়েছে। সেটাই এখন শিফট করে গেছে, চীনের উত্থান ঘটছে একালে।

 তাহলে, এটা চীনা উদ্বৃত সম্পদে উত্থানের যুগঃ
তাই সেকালে আমেরিকার নেতৃত্বে আইএমএফের বদলে একালে আমরা চীনের নেতৃত্বে হবু আইএমএফ এর ভ্রুণ হিসাবে যেন – ব্রিকসকে দেখছি। কাজেই একালে চীন ছাড়া তো ব্রিকস দাড়াবেই না। আর এতে বড় বিনিয়োগ-মালিকানাও চীনেরই হবে। যেমন এখনও আইএমএফের শেয়ার মালিকানা আমেরিকার সবার চেয়ে বেশি; তা আমেরিকা জবরদস্তিতে হলেও ধরে রেখেছে।

তাহলে, বটম লাইন ফ্যাক্টস হল – চীন নাই এবং প্রধান ভূমিকায় নেই এটা যদি কল্পনা করি, তবে ব্রিকস বলে কোনো প্রতিষ্ঠানই হবে না, দাঁড়াবেই না। দাঁড়ানোর দরকারও হবে না।

আসলে ব্রিকস প্রতিষ্ঠান দরকার কেন? এটা নিয়ে শশী থারুর নিজেই প্রশ্ন তুলে নিজেই যেসব জবাব দিয়েছেন তাতেই তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধির খামতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন- প্রথমত, ব্রিকস বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক নাকি ভূরাজনৈতিক জোট?

এর জবাব হল – ব্রিকস না অর্থনৈতিক না ‘ভূরাজনৈতিক’ জোট। না বুঝে প্রশ্ন তুলতে গেলে এভাবেই ধরা খেতে হবে!!!! যেমন যদি প্রশ্ন তোলা হয় – আচ্ছা আইএমএফ কী কোন জোট? অর্থনৈতিক না ভূরাজনৈতিক জোট? এটা তেমনই এক বোকা প্রশ্ন হয়েছে।  আইএমএফ মূলত এক “গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম’ খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে  আর এই সিস্টেমের মুল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ, সাথে সহযোগী বিশ্বব্যাংক।

আর নয়া ব্রিকস [BRICS],  এটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তবে পুর্ণ প্রস্ফুটিত নয় বা করা হয় নাই ইচ্ছা করেই। এক ঘরে দুই পীর থাকে না তাই।  এখন আইএমএফ কেমন প্রতিষ্ঠান এটা যখন শশী থারুর, আপনার ধারণায় নাই তখন ব্রিকসও আপনি বুঝবেন না। কেবল প্রশ্ন করবেন আর নিজের বোকামিটাই তুলে ধরবেন!

কাজেই মুখ খোলার আগে শশী থারুরের উচিত হবে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটি কী – এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ফ্লেশ্চার স্কুল কিন্তু আইন আর কূটনীতি বিষয়ে জোর দেয় সত্ত্বেও এটা মান্টিশেডের সাবজেক্ট এমন প্রতিষ্ঠান। একথা বারবার বলা হয়েছে। তবে এর বাকি শেডগুলো স্টুডেন্টদেরকে নিজ যোগ্যতায় পূরণ করে নিতে হবে। থারুর সেদিকে মনোযোগ দেন নাই দেখা যাচ্ছে। অতএব তার এখন এসব ব্যাপারে দ্রুত মুখ খুলা এড়ায় চলা উচিত! এটা অপ্রয়োজনীয়! এজন্যই বারবার বলেছি এই যুগের কূটনীতিতে মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা আইআর [আন্তর্জাতিক রিলেশন] এবিষয়ে পড়ুয়াদের ক্লাসের পাঠ্য না হলেও নিজ উদ্যোগে অর্থনীতি পড়ে নিতেই হবে।

একারণে শশী থারুর নিজে বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে, ভারত ব্রিকসের সদস্য ঠিকই হতে চান। কিন্তু তার দাবি, “চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না”। এর মানে কি?  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফে কী ভারতের জন্য কোন জায়গা আছে? আইএমএফে ভারতের উল্লেখ করার মত কোন মালিকানা নাই কেন? আর সেটা কী আমেরিকা একালে ভারতকে দেওয়ার জন্য বসে আছে? দিবে? আমেরিকার প্রিয়বান্দা হতে চাওয়া  শশী থারুর কাছে এর কী কোন জবাব আছে? অতএব তাঁর না বুঝে কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয় কী!!!

তাহলে নবগঠিত বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান AIIB, আসেন এখানে দেখিঃ
এটা চীনা উদ্যোগের একালের বিশ্বব্যাংক যেন। ব্রিকস (বা আইএমএফ) গড়তে গিয়ে আগেই নিজস্ব বিশ্বব্যাংকটা যেন গড়ে নিয়েছে।  ফলে চীনা প্রভাব ও সিদ্ধান্ত এখানে প্রধান ভুমিকায়। চীনের নিজের মালিকানা শেয়ার এখানে ৩০% এর মত। এটাই সবার চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হল, ভারত যার, শেয়ার মালিকানা ১০% এর মত। আমেরিকার নাই, ইউরোপের খুব কিছু উল্লেখ করার মত নয়। অর্থাৎ আর কাউকে তেমন নয়, তবে ভারতকে  চীন ঠিকই গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে পাশে রেখেছে। তাতে ভারতের সাথে চীনের যতই রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকুক।  এটা স্বাভাবিক!

তাহলে শশী থারুর কীবুঝে বলছেন – চীনকেন্দ্রিক  ব্রিকস তিনি চাননা?? 

ভারী কথাবার্তা থাক একটা গল্প বলে শেষ করব।
শশী থারুর ব্রিকস চান কিন্তু চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না। আর বাস্তবতা হল, চীন না থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে উদ্বৃত্ব সম্পদ – বিনিয়োগ দিবে কে? বুঝা যাচ্ছে এদিকটা নিয়ে তিনি ভাবেনই নাই। তাহলে আইএমএফ অথবা ব্রিকস বলতে তিনি কী বুঝছেন? কেমন প্রতিষ্ঠান এর কিছুই বুঝেন নাই। আবার  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফ নিয়েও তার আপত্তি দেখি না। তাই সবমিলিয়ে, তাঁর এই অবস্থানেরই প্রতীক যেন নিচের এই গল্প!
শ্রাদ্ধঃ  কোন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সৎকারের নানা অনুষ্ঠান হয়। এই  ক্রিয়াকর্মাদি যা কিছু করা হয় একে শ্রাদ্ধ বা শ্রাদ্ধাদির নানা অনুষ্ঠান বলে। আর কয়েকদিন ব্যাপী এমন অনুষ্ঠান শেষে সাধারণত একটা নিরামিষ ভোজ বা খাওয়াদাওয়া ভিতর দিয়ে এসবের সমাপ্তি ঘটে থাকে। এখন এক ব্যক্তি দাওয়াতে এমন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।  কিন্তু উপস্থিত হয়ে তিনি সৌজন্য আলাপ জমাতে গিয়ে  ঐ বাড়ির কর্তাগোছের এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আচ্ছা যার শ্রাদ্ধ খেতে এলাম তাঁকে দেখছিনা? তিনি কোথায়???” 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   শশী থারুরের ব্রিকস বুঝ!– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s