হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

গৌতম দাস

২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wW

 

আবার হেডলাইনে আসাম। তবে এবার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নতুন “নাগরিকত্ব বিল”। যদিও সম্প্রতিকালে আসাম বলতে বাংলাদেশের মানুষ চিনে এনআরসি-এর আসাম। NRC বা এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস; অর্থাৎ আসামে এখন বসবাসকারী সবাইকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে এক নাগরিকত্বের তালিকায় নাম তুলতে হচ্ছে। যার মূল কথা – ‘পড়শি’ দেশ থেকে যারা আসামে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর পরে আসামে এসেছে তাদের চিহ্নিত করা, যারা আসামের নাগরিক গণ্য হবেন না। তাদের অনুমান ছিল যে ইতোমধ্যে এক ব্যাপক সংখ্যক লোক আসামে এসে ঢুকেছে। যদিও নানা কারণে অনেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ দিতে পারেনি; যেমন সন্তান পেরেছি কিন্তু পিতা কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেন নাই এমনও হয়েছে। তবু এসব অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া কিন্তু চিহ্নিত নাগরিকদের নিয়ে এরপর তাদের নিয়ে ঠিক কি করা হবে তা “আনুষ্ঠানিক” ভাবে কেউ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত ভারতের সরকারি অবস্থান হল যে এটা ভারতের “অভ্যন্তরীণ বিষয়”  – এই বলে চালাতে চাইছে। ঠিক যেমন ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু করলেও তা আর কখনই বন্ধ করা হয় নাই। এদিকে এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল। এই তালিকা তৈরির নির্দেশ কিন্তু ভারতের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে এসেছে। তা সত্ত্বেও সেই কোর্টও স্পষ্ট করে বলছে না যে, ‘নাগরিক প্রমাণ দিতে না পারলে’ সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে কী করা হবে। কারণ, কারও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত না হওয়া মাত্রই এটা আপনাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে না যে, সে বাংলাদেশের নাগরিক। আর মূল কথা সে ক্ষেত্রে ঐ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ইস্যু নিয়ে কোন ততপরতার শুরুর আগে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিকভাবে ফরমাল কথা বলতে হবে। বাংলাদেশকে রাজি করাতে হবে। বাংলাদেশ যদি রাজি হয় তবেই এরপরেই কেবল আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারবে।

তবে সে কথা এখন থাক। কারণ, ইস্যু এখন তার চেয়ে আলাদা এবং ভয়াবহ। হিন্দুত্বের মোদী এবার আবার আর এক নতুন দানবীয় ইস্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাকে আসামে নতুন করে আগুন লাগানোর লক্ষ্যে মোদীর ‘নাগরিকত্ব বিল’ বলা যায়। যার আঁচ বাংলাদেশেও টের পাওয়া যাবে এমনই ভয়ঙ্কর। এই বিলের আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হল – সিটিজেনশিপ (সংশোধনী) বিল ২০১৬ (Citizenship (Amendment) Bill, 2016)। এই বিলটা বিজেপি ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় পেশ করেছিল ১৯ জুলাই ২০১৬ সালে। তাই বিলের নামের সাথে ২০১৬ শব্দটা লেগে আছে। এতদিন সেটা এক যাচাই কমিটিতে ইচ্ছা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। আসলে মোদী এটা সময়-সুবিধামত বের করবেন তাই গত দু-আড়াই বছর এটা আটকা ছিল। এখন গত সপ্তাহে ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঐ শিরোনামের আইনটা ভারতের লোকসভায় শেষ অধিবেশনে পাস হয়েছে।

সার করে বললে, মূলত এটা এর আগে ভারতের “নাগরিকত্ব বিল ১৯৫৫” (Citizenship Act, 1955) এর কিছু ধারায় আনা সংশোধনের পরের নতুন রূপ। সংশোধিত হবার পর ঐ বিলের সারকথাটা হল – বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশ থেকে (মুসলমান বাদে) হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান এই ছয় ধর্মের লোক ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হলে – আর ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে তাদের ছয় বছর বসবাস পূর্ণ হলে পরে এবার তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া যাবে। এই লক্ষ্যে এমন কেউ ভারতে প্রবেশ করলে যা আগের (১৯৫৫) সংজ্ঞা অনুসারে ‘অবৈধ ইমিগ্রান্ট’ (illegal immigrant) বলে বিবেচিত হতেন, এখন এই বিল পাশের পরে তারা “আশ্রয়প্রার্থী নাগরিক” বলে বিবেচিত হবেন। ফলে তারা ভারত থেকে বহিস্কৃত (deported) হবেন না, বা অবৈধ প্রবেশের দায়ে আদালতে পঁচে মরবেন না। বরং ভারতে থাকার পারমিট পাবেন। আর এভাবে টানা সাত বছর (আগের আইনে এটা ১২ বছর ছিল) থাকার পরে আবেদন করলে, ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন।

যদিও (মুসলমান বাদে) শব্দগুলো সেখানে লেখা নেই, কিন্তু অর্থ তাই। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শব্দগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে, আর ছয় ধর্মের নামও পরিস্কার উল্লেখ করা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়া বারবার ছয় ধর্মের উল্লেখ করার ঝামেলা এড়াতে েদের বদলে একটা শব্দ লেখা শুরু করেছে – ‘অ-মুসলমান”। যেমন ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনাম হল, (Lok Sabha passes Citizenship Bill amid protests, seeks to give citizenship to non-Muslims from 3 countries)। অর্থাৎ মোদী সরকার আসলে যা বুঝাতে চেয়েছে, মিডিয়াগুলো তাই লেখা শুরু করেছে।

কেন এই আইন আদালতে অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত
যে লিগাল ত্রুটির কারণে এই বিল অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত মূল সে যুক্তিটা হলঃ এটা বৈষম্যমূলক। অর্থাৎ এটা কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক “সাম্য নীতি” ভঙ্গ করেছে। ঐ বিলে বলা হয়েছে – ঐ তিন দেশে ‘ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে থাকারা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী যারা, তারা এ সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু তা সাধারণভাবে সব ধর্মের লোক না বরং ‘মুসলমান বাদে’ ভারতের ছয় ধর্মের কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে, যাদের বেলায়ই কেবল এটা প্রযোজ্য হবে। এটা স্পষ্টত এক বৈষম্যমূলক আইন। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা থাকা ও বাস্তবায়ন – এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের এক মৌলিক ভিত্তি।  এখানে সাম্য কথাটা ইতিবাচকভাবে বলা হয়। যেখানে মূল ভাবটা হল, বৈষম্য – নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, কোন আইন করা যাবে না যার মাধ্যমে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মানে রাষ্ট্রকে এক “নাগরিক বৈষম্যহীনতার” নীতি অনুসরণ করতেই হবে। বৈষম্যহীনতা মানেই ত সাম্য – তাই শব্দটাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে “সাম্যের” নীতি বলা হয়ে থাকে। এই কারণে, কোনও রিপাবলিক রাষ্ট্র কেউ মুসলমান বলে বা হিন্দু বলে যেকোন নাগরিক এমন কারও প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পারে না। এটাই নাগরিক সাম্য বা Equility এর মৌলিক নীতি, অথবা রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন থাকার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। এই যুক্তিতে কোন সুপ্রীম কোর্ট এই বিলকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।

এছাড়া, আর একটা কথা হল কখন কোন জিনিষ আইন বলে গণ্য হবে – এই প্রসঙ্গে আইনের ভিতমূলক প্রস্তাব বলে থাকে যে কোন বিষয় আইন বলে তখনই মানা হবে যদি তা নাগরিক-নির্বিশেষে সবার উপর প্রযোজ্য করা হয় তবেই। নইলে তা কোন আইনই নয়। সোজা কথা যা সবার উপর প্রযোজ্য করা যায় না তা কোন আইনই নয়। মোদীর নাগরিক বিল এই যুক্তিতে কোন আইনই নয়। ফলে ভারতের আদালতে রিট হলে আর  সৎ ও দুরদৃষ্টির যেকোন পেশাদার বিচারক এই আইনকে অবৈধ ও রদ (null & Void) করা হল – বলে রায় দিবেন।

ওদিকে বিল পাশের আগের সপ্তাহে ০৪ জানুয়ারি আসামের শিলচর গিয়ে মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছিলেন। সেখানে আবেগী বক্তৃতায়  দিয়ে মোদী বলছেন, ভারত মাতার সন্তানদের প্রতি ভারতের দায় আছে (আগ্রহীরা ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন। 15:58 মিনিটের এই ক্লিপে 05:30 মিনেটের পর থেকে মোদীর “ভারতমাতার” সে কাহিনী শুনা যেতে পারে।)। সেই দায় থেকে ঐ তিন দেশের ঐ ছয় ধর্মের যারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদেরকে আশ্রয় দেয়া মোদীর দায়িত্ব – এটাই মোদীর সারকথা। কিন্তু এখন মোদীর এই যুক্তি অনুসারেই মুসলমানদের বাদ পড়ার কোন কারণ নাই। এটা এমনই উদাম এক মুসলমান-বিদ্বেষী আইন।  যেখানে এমনকি পারসি, খ্রীশ্চান ধর্মও মোদীর ধর্ম-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  যেমন, আরএসএস-বিজেপি তাদের উদাম বিদ্বেষ ঢাকতে প্রায়ই বলে থাকে, “ইসলাম বা মুসলমানেরা ভারতে বহিরাগত”। এখন এসব বিদ্বেষী-ভাষ্য যদি এটা মেনেও নেই তাহলে খোদ আর্যরা কী বহিরাগত নয়? তারা কোন ভারতের ঘরের লোক? এছাড়া প্রাক-ইসলামি যুগের পারস্য বা ইরানের পারসিক অথবা ইউরোপীয় খ্রীশ্চান এরা কীভাবে ভারতের ঘরের? আরএসএস-বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষ কত তীব্র তার প্রমাণ এগুলো। না তবে সাবধান। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে বলবার জন্য একথাগুলো বলা হচ্ছে অজান্তেও তা মনে করা যাবে না। সেটা আর এক বিরাট বে-ইনসাফি হবে। যেমন মোদী যদি বলতে পারতেন “যে কোন ধর্মের” আর “যে কোন দেশের” নাগরিক যারা ধর্মের কারণ নির্যাতিত তাদের জন্য এই আইন – তবে সেটাই হত সবচেয়ে মানবিক আর সবার জন্য কাম্য ও আদরের এক নাগরিকত্ব আইন।

এখন তাই মোদির নাগরিক বিল পাস হওয়ার দিন, ৮ জানুয়ারি এক উল্লেখযোগ্য নতুন বৈষম্যের দিন হয়ে থাকল। কারণ, একে তো এমনিতেই আসামে আগের নাগরিক তালিকা তৈরির – এনআরসি তাতে, ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে আসামের অপ্রমাণিত নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে আবার ১৮ লাখই হিন্দু। অর্থাৎ এনআরসি তৈরির উদ্যেশ্য বা পেছনের অনুমান ছিল যে প্রমাণ করতে না পারা অর্থে অবৈধ নাগরিকের বেশির ভাগ হবে মুসলমান। আর মুসলমান মানেই ধরে নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অনুমানই ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে যায় যখন হাজির হয় যে এর মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাদের নিয়ে কী করা হবে সেই টেনশন বাড়ছিল। এর ভেতর নতুন করে আর এক দিকে উত্তেজনা ঘুরিয়ে বিজেপির দলীয়করণ করে নেয়া হল।

১৯৮৫ সালের চুক্তি বনাম মোদীর বিল
অহমিয়াদের সাথে রাজীব গান্ধী সরকারের ১৯৮৫ সালের চুক্তিতে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন ভাগ ছিল না। বলা ছিল, যারাই ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের পরে আসামে প্রবেশ করেছে বলে জানা যাবে তাদেরকে আসামের নাগরিক মানা হবে না – এই ছিল চুক্তি মূল কথা।  এই কারণে, NRC এর ভিত্তিও একই। কিন্তু বিজেপি এই ৪০ লাখ  হিন্দু-মুসলমান, এমন অপ্রমাণিত-নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবার বাস্তবতায় হিন্দুদেরকে সুবিধা আর মুসলমানদেরকে বঞ্চনা দিয়ে এক বৈষম্য করে এতে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের খাড়া করতে চাইছে।  এমনিতে বিজেপির সবখানের কমন রাজনৈতিক কৌশল হল – সাধারণভাবে “নাগরিক অধিকার” রক্ষা নয়, বরং একে পাশ কাটিয়ে হিন্দুত্বের আওয়াজ তুলে এর ভিত্তিতে সমাজে ভোটের মেরুকরণ তৈরি করা। আর এই সুযোগে হিন্দুত্বের নামে নিজদলের ভোটের বাক্স ভারি করা। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে সেই কাজটাই করা হল; তাতে সমাজে খামোখা বিভক্তি রেষারেষি বৈষম্য বাড়ল কীনা, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল কিনা – এসব কিছু ফেলে এখন পাঁচ বছরের মোদীর শাসনের শেষে উল্লেখযোগ্য সবই হারানো বিজেপি এখন বেপরোয়া।

এই বিলের প্রভাব ও পরিণতি
প্রথমত, আমাদের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, মোদির এই বিল আসামের এনআরসি বিতর্কের কোনো সুস্থ সুরাহা করার দিকে তাকিয়ে করা হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্য এ বিতর্ককে ব্যবহার করে বিজেপির নিজের বিভাজনের রাজনীতিকে বিস্তার ঘটান। তাই বেপরোয়া হয়ে অর্ধজ্ঞানের গোয়াঁর বিজেপি নেতারা [আসামের মন্ত্রী ও সারা নর্থ-ইস্টে বিজেপির মুল সংগঠক Himanta Biswa Sarma, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Sarbananda Sonowal ] মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন করে তারা দাবি করছে এটা নাকি তাদের তথাকথিত “সভ্যতার লড়াই”। বলছে – ……They want us to be slaves of a particular civilisation. However in this civilisational fight we must win. যদিও নেপথ্যে তারা বলছেও তারা নিরুপায়। অন্য সব ইস্যু বা অর্জন হারানো বিজেপি এখন তাই আসন্ন নির্বাচনে মূল ফোকাস শ্লোগান করবে তথাকথিত হিন্দুস্বার্থ, হিন্দুত্ব বা কথিত সভ্যতার লড়াই……।

এভাবে বিভাজন ঘটিয়ে তাদের শেষ আশা যে এভাবেই তারা আসন্ন নির্বাচন পার হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে,  সাধারণভাবে ভারতীয় “নাগরিক” এমন পরিচয়ের রাজনীতি বিজেপি করে না বরং এক বিভক্ত পরিচয় হিন্দুত্ব – এমন হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিই বিজেপি করে। এই হিন্দুত্ব পরিচয়ে ভোটারদের জন্য সে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে কেবল তথাকথিত হিন্দু স্বার্থের আওয়াজ তুলে মেরুকরণ করা ও ভোট বাক্সে তা পৌঁছান- এই হলো বিজেপির রাজনীতির কৌশল। তাই মোদির নাগরিকত্ব বিল সাধারণভাবে ভারতের সব রাজ্যের দিকে তাকিয়ে করা বলে মনে হলেও তা আসলে আড়াল সৃষ্টি করা। আর এই আড়ালে তাঁর বিশেষ টার্গেট রাজ্য হল – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। যেমন এ বিলের মাধ্যমে আসলে বলা হয়ে গেছে যে, আসামের তাদের এনআরসি-ইস্যুতে অপ্রমাণিত নাগরিকদের মধ্যেকার ১৮ লাখ হিন্দুকে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিজেপি নিয়ে নিল। আর এভাবেই আসামকে এখন হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করল বিজেপি।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এতদিন বিজেপি অভিযোগ করত,  পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া হিন্দু বাঙালি [পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভাষায় যারা ‘বাঙাল’], কংগ্রেস আর সিপিএম, কেবল এদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে গেছে। ‘বাঙালদের’ রেশনকার্ড আর ভোটার বানিয়ে দিয়ে নিজের দল-ভারী করার সহজ রাজনীতি করে গেছে। এমন ধরণের পাল্টাপাল্টি বয়ান অনেক আছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল এমন অভিযোগ – কংগ্রেস, সিপিএম অথবা বিজেপি – এরা কেউই মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কখনো করে না। তাহলে কী উল্টা? মানে, মমতা “বাঙালদের” বিরুদ্ধের রাজনীতিটা করে? না, সেটাও না। এমন অভিযোগও দেখা যায়নি। তবে মজার ব্যাপারটা হল এখন এ বিলের মাধ্যমে এবার বিজেপি নিজেই “বাঙাল” মনোরঞ্জনে সবার ওপরে এগিয়ে থাকার রাজনীতিতে নামল। যে অভিযোগ সে এতদিন অন্যদের বিরুদ্ধে করত।

সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া ধর্ম-নির্বিশেষে যে কেউই হোক, তাকে ভারতে নাগরিক হিসাবে “ন্যাচারালাইজ” করে নেয়া – এটা কোনোই খারাপ বা অন্যায় কাজ নয়। আপত্তি করারও কিছু এখানে নাই। যদিও আগে আইন বানিয়ে আইনসম্মত ভাবে তা করলে সেটা তো আরও ভাল। কিন্তু ঘোরতর বে-ইনসাফি অন্যায় ও খারাপ কাজ হবে যদি বৈষম্য করা হয় যে, “কেবল অমুক ধর্ম” হলেই তাকে স্বাগত। মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে যখন “মুসলমান বাদে” বলে নীতি-পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিজেপি সেই ভয়ঙ্কর বীজ বপনের কাজ শুরু করল। আসামের ঐ ১৮ লাখ হিন্দুর কথা তুলে বিজেপি আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনি ফোকাসের বক্তব্য করতে চায়। যাতে সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর বিশেষ করে “বাঙাল” হিন্দুরা সহানুভূতিশীল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটের বাক্সে আসে, প্রতিফলিত হয়। তাই মোদীর এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করা করা হয়েছে – অহমীয়াদের স্বার্থদের বিরুদ্ধে। এই হল নাগরিকত্ব বিল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি টার্গেট। মোদী তান্ডব আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই বিলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মমতাই এখন প্রধান প্রতিরোধকারি ও ভরসা।

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এমনকি এর সাথে পশ্চিমবঙ্গেও আর এক  বিজেপি প্রপাগান্ডাও চলবে যে, আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা “নাগরিক তালিকা” তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার শুরু করা হবে যে, তারা তুচ্ছ তেলাপোকা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাচনী অপপ্রচার এবং এই চরম ঘৃণা ছড়ান উন্মাদনা, এটাও বিজেপি পাশাপাশি চালাবেই। এটাই হবে, হিন্দুমনে জাগানো ঘৃণা-বিদ্বেষ কাজের মূল ফোকাস বয়ান। তার নির্বাচনি মুখ্য বয়ান।

যদিও এখানে খেয়াল রাখতে হবে আসামের মূল এনআরসির দাবি বা চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে আইনত তারা ঠিক কেবল মুসলমান বুঝায় নাই। এটা তেমন ভিত্তির ওপর দাঁড়ান নয়। ফলে তারা কেবল মুসলমানদের বের করে দিতে এ কাজ করছে তা নয়, বরং স্পষ্ট করে বলছে – ২৪ মার্চের পরে ধর্ম-নির্বিশেষে যারাই আসামে এসেছে তাদের বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে হবে। কিন্তু বিজেপি বা মোদি এই সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাদের সোজা ভাষ্য ও অর্থ হল – এনআরসির কর্মকান্ড বলতে কেবল ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ বুঝতে হবে।

আসামে এই বিলের প্রতিক্রিয়া
কেবল আসাম নয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আসাম ছাড়াও যেমন মনিপুরে, এমনকি ত্রিপুরায়ও। অনুমান করা যায় – তাদের মূল উদ্বেগের কারণ হল, এই সাত রাজ্যের মধ্যে যাদের সীমান্তের অপর পাড় বাংলাদেশ, তারা তো বটেই, এমনকি যারা নয়, তাদের এলাকাতেও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা এবার নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়েই এসে গেড়ে বসে যাবে – এই হল তাদের মুল উদ্বেগ। সাধারণভাবে এখানে আগে থেকেই থাকা সবচেয়ে বড় টেনশনের ইস্যু হয়ে ছিল, সমতলি-পাহাড়ি। আসামেরও মূল দ্বন্দ্ব, টেনশনও এটা। [আমাদের দেশে যেটা পাহাড়ি সেটা নর্থ-ইস্টের ভাষায় জনজাতি বা ট্রাইব।]  কারণ এই অঞ্চলের বড় বৈশিষ্ট হল পাহাড়ি বাসিন্দা অথবা ‘জনজাতি’ বাসিন্দা। ফলে এই অঞ্চলের সমতলি-পাহাড়ির মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন আর তা থেকে উদ্ভুত উচ্চ বা নিম্নস্বরে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা সেখানে সবসময় কাজ করে থাকে। এরই মধ্যে আবার “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করে তৈরি করা নাগরিকত্ব বিল এটাকে তারা দেখছে যে এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের (তারা বলতে চাচ্ছে এতে সমতলিদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে) নতুন করে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে আর স্বভাবতি তা ঘটলে তাতে আগের টেনশন আরও বড় নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে সুনির্দিষ্ট করে আসামের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক, তা অনুমান করা যায়। যেমন এমনিতেই আসামের এনআরসিতে যে ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকেছিল, তাদের মধ্যকার ১৮ লাখ হিন্দু নিজেদের ভাগ্য মোদী ফিরাবে একটা গতি হবে এই ভরসায় ইতোমধ্যেই তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের ও মোদীর ভক্ত হয়েছিলেন। সেটা কেবল ওই ১৮ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা আসামের বাঙালি হিন্দুমাত্রই তাঁরা ক্রমেই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছিলেন। এককথায় বললে, মোদীর হিন্দুত্বের ভিত্তিতে পাবলিক মেরুকরণ এর রাজনীতি এখানই বিভক্তির প্রভাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর তাই এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি”।

কেন? এখন এই ১৮ লাখ হিন্দুই হবেন আসামের পাহাড়ি বা যারা নিজেদের অহমিয়া পরিচয় দাবি করেন তাদের হাতে আক্রান্ত হবার প্রধান টার্গেট। আসামের পাহাড়ি বা অহমিয়া পরিচয়ধারীদেরই মূল রাজনৈতিক দল হল – অহম গণ পরিষদ ও বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। যারা বিজেপির সাথে মিলে বিজয়ে গত ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচন থেকে আসামের প্রাদেশিক জোট সরকারে ছিল। মোদীর নাগরিকত্ব বিল পাসের প্রতিবাদে এরাই এখন জোট-সরকার থেকে বের হয়ে গেছে। বিজেপির জোট শরিক অহম গণপরিষদের তিন মন্ত্রী রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে নয় জানুয়ারি সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরাই ১৯৮৫ সালের চুক্তির মুল দাবিদার পক্ষ যে চুক্তির মূলকথা হল, অ-অহমিয়দের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এরা এর প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক। এর আগে বাঙালি-নিধনের বহু রেকর্ড এদের আছে, এবং সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়া জেলায় পাঁচ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা ওই ১৮ লাখ হিন্দু বাঙালির ভাগ্যে এখন কী হবে এর ইঙ্গিত বলেছেন অনেকেই।

এ দিকে, আর এক অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যাচ্ছে। তা হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ মোদীর এই বিল পাসে খুশি হয়নি মনে হচ্ছে, অন্তত ভাল কাজ মনে করছে না। যদিও পেশাদার হিসেবে তাঁরা তাঁদের আপত্তি মনে মনে রেখেছে। তবে সেই সাথে আর একটা কাজ করেছে। তা হল, তাদের সাথে সম্পর্কিত বা এসাইনড লোকেদের হাতে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকে তাদের আপত্তি বা যুক্তিগুলো জানা গেছে। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিল পাসের ফলে এতে গত ছয় বছরে উলফার (ULFA, আসামে এটা উচ্চারিত হয় আলফা বলে) কমে আসা তৎপরতা যা এখন পরেশ বরুয়া অংশের নামে আছে কিন্তু স্তিমিত তাদের পুরনো সেসব তৎপরতা আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে তাঁরা। এমনিতেই জটিল পরিস্থিতি ও সমীকরণের আসামে আবার নতুন উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতের ফলে তাদের এতদিনের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যা কিছু অর্জন এত দিনে হয়েছিল তার উপর পানি ঢেলে দেয়া হবে বলে তারা মনে করে। তাই অশান্তি আর তাদের কাজ বাড়বে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া
এবারের ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি ও মোদীর রাজনীতি হবে বাংলাদেশের জন্যও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই বাংলাদেশের স্থানীয় হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই এখন আরএসএসের মুঠোয়। এই বিল “বাঙালি-হিন্দুমুখি” বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের “বাঙালদের” মনোরঞ্জন-মুখি এই অভিযোগ অনেকের।  ফলে মোদীর নাগরিকত্ব বিলের রাজনীতি হাজির করে বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই আরএসএসের মুঠোয় ভরতে তাদের সাহায্য করেছে। যদিও নিকট আগামিতেই বাংলাদেশের হিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে আত্মঘাতি বলে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য যে ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে তা হল, এই বিল এক বিশাল মরিচিকা।

ওদিকে অর্থনীতিক ‘উন্নয়ন ও বিকাশে’ রাজনীতিতে মোদী ইতোমধ্যেই ফেল মেরেছে। আসলে সেকারণেই মোদীর এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতি এত সিরিয়াস-নেস। আর একেই বিকল্প ইস্যু ভাব ধরে হাজির করার উদ্যোগ। মানে তার এখন একমাত্র সম্ভাব্য ইস্যু হবে হিন্দুত্ব, যার বিশেষ ফোকাস হবে ‘নাগরিকত্ব বিল’। আমরা ইতোমধ্যে – মুসলমানেরা তুচ্ছ তেলাপোকা, পিসে মেরে ফেলা হবে, বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে উপড়ে ফেলা হবে, ইত্যাদি এসব বলে গত নভেম্বর পাঁচ রাজ্য নির্বাচন লড়েছে বিজেপি দেখেছি।

সেই মহড়ার পর এবার আবার মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় নামতে হবে মোদীকে। আমাদের সরকার গতবার কেবল তথ্যমন্ত্রী ইনুকে দিয়ে এই ইস্যুতে ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নাগরিকত্বের বিল পাস করার পরে মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডা আরও তীব্র হবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ এবার এটা আরও বড় স্টেক; মোদী নির্বাচনে জেতার মামলা যেখানে আবার নাগরিকত্ব বিল মুল ইস্যু।

এছাড়া ওদিকে আবার বিশেষ করে আসামে যেখানে অহমিয়া-বাঙালি সঙ্ঘাত উসকে গেল সে পরিপ্রেক্ষিতঅও তৈরি হচ্ছে। হাসিনা সরকার তার প্রথম পাঁচ বছরেই উলফা দমনে যে ভূমিকা ও সহায়তা দিয়েছিল এর প্রশংসায় ভারতের গোয়েন্দা-আমলা থেকে রাজনীতিক সবাই পঞ্চমুখ। যদি তাই হয় তবে একদিকে এখন সেই অর্জন ভেঙে ফেলতে পরোয়া করছে না মোদীর নির্বাচনে জিতবার স্বার্থ। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের তেলাপোকা বলে ঘৃণা আর গালির জোয়ার তুলছে। এটা কতটুকু ফেয়ার? মোদীকেই জিতাবার স্বার্থে আমাদের সরকার কী মোদীর অত্যাচার, অনাচার জুলুমের দায়ীত্ব নিজের কাধে নিবে? আমাদের সরকারের নিজেকে আরও ভারতমুখি পরিচয়ে আর নিজেকে গণবিরোধী করার রিস্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে? মনে হয় না।

ভারতের হবু নির্বাচনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দুই দিকে দুই রাজ্যে থেকেই মোদীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় (যা ইতোমধ্যে আমরা রাজস্থান, ছত্তিসগড় নির্বাচনে দেখেছি) দেখতে হবে আমাদেরকে। বলা বাহুল্য এতে বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে পাল্টা সরব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর সম্ভাব্য সে পরিস্থিতির কথা আঁচ করে আগে থেকেই ভারতকে সাবধান করে নিজেদের স্বার্থ-প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে না ধরা হবে আমাদের সরকারের আর এক বড় ভুল।

গুরুতর প্রশ্ন, এ নাগরিকত্ব বিল পাসের পরে আসাম্র ‘নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকে যাওয়া’ প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের কী হবে? রোহিঙ্গাদের মত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে? অথবা মোদীর উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের কারণে জীবনের ভয়ে তারা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামাবে, নাকি তাদের বাধ্য করা হবে?

আমাদের উচিত হবে এমন যেকোনো কিছুর আগে এনিয়ে মোদীর সাথে ‘ডায়লগ ওপেন’ করা। মোদীকে আগে থেকেই সংযত করা, আমাদের উদ্বেগের কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি আদায় করা হবে আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অন্যথায় আমাদের সরকারকে অজনপ্রিয় হওয়ার অপ্রয়োজনীয় ভারতমুখি পরিচয়ের রিস্ক নিতে হবে।

শেষ কথাঃ
শেষ কথাটা হল এই বিল পুরাপুরি আইনসিদ্ধ হবার প্রক্রিয়া এখনও বাকী। কারণ লোকসভায় পাশের পর এবার ভারতের উচ্চ-কক্ষ, রাজসভাতেও তা পাশ হতে হবে। তবেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা পরিপুর্ণ আইন হবে। রাজ্যসভা বসবে আগামি ৩১ জানুয়ারি। সবচেয়ে বড় কথা কিন্তু এখানে বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই। এর অর্থ এই বিল এখানে পাশ হবার কোন সম্ভাবনা নাই। ২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর জোট এখনো ৮৮ জন সদস্য। বিপরীতে বিজেপি বিরোধী শিবিরের এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যা ১৫৬। তাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
তাহলে এটা জানার পরেও মোদী এত উদ্যোগী কেন? কারণ, আপাতত তাঁর “বাঙালি-হিন্দুমুখি” প্রেমের প্রকাশ – আর কিছু পারুক না পারুক  মোদীর মূল উদ্যোগ হল – এটা দেখিয়েই সে কাজ সারতে চায়। এটাই তাঁর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম-ত্রিপুরাসহ পুরা নর্থ-ইস্টে (মোট ৬৬ আসনে) নির্বাচনে লড়বার লক্ষ্যে মেরুকরণে হিন্দুত্ব রাজনীতির একমাত্র কৌশল।  আর এই মেরুকরণে এই অঞ্চলের প্রাণ-বেড়িয়ে যাবার অবস্থা তৈরি হলেও সংকীর্ণ স্বার্থপর বিজেপি ও মোদী নির্বিকার; যেভাবেই হোক তাঁকে ক্ষমতা পেতে হবে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) মোদির নতুন বিল: আসাম ও বাংলাদেশ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

“ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

গৌতম দাস

১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wO

 

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে; অফিসিয়াল ফলাফল প্রকাশ, শপথ নেয়াসহ মন্ত্রিসভা গঠন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। সরকারের দেশি-বিদেশি সুবিধাভোগীরা এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি’ [Land Slide Victory], বা বাংলায় “ভূমিধস বিজয়” শব্দ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যা করছে। কারণ, দাবি অনুযায়ী এই ফলাফলে  ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আওয়ামী জোটের ব্যাগে এসেছে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ আসন পেয়েছে সরকার। তাই অফিসিয়ালি ফলাফলে ৯৭ শতাংশের বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভূমিধস ধরনের শব্দ খুঁজে এনেই সম্ভবত একমাত্র এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যায়।

কিন্তু ভারতের মিডিয়ায় বিস্ময়কর এক “কিন্তু” আমরা লক্ষ করছি। নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হওয়ার অন্তত এক দিন পর থেকেই ভারতের মিডিয়ায় এই ফলাফল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই তারা বিভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাদের অস্বস্তিকর মন্তব্যগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছে। আর এতে প্রায় প্রত্যেকের রিপোর্টের শিরোনামে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ধরনের শব্দ দেখা যাচ্ছে। যে বক্তব্যগুলোর সারকথা হল, তাদের অনুমান এই নির্বাচনী ফলাফল ভারতের স্বার্থের জন্য অন্তত লং টার্মে বা শেষ বিচারে শুভ ইঙ্গিত নয়। খারাপ কিছুর কু-ইঙ্গিত। তাই এখান থেকেই ফলাফল গ্রহণে অস্বস্তির শুরু। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে কয়েকটা এখানে তুলে এনে আলোচনা করা হল।

একঃ কাঞ্চন গুপ্ত
যেমন ভারতের এমন ‘কিন্তু’ দৃষ্টিভঙ্গির মন্তব্যের এক লেখক হলেন কাঞ্চন গুপ্ত। তিনি সবার চেয়ে আগে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর, নির্বাচনের পরের দিনই কাঞ্চন গুপ্তের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আর তার লেখা ছেপেছে আবার ভারতের প্রভাবশালী বেসরকারী থিঙ্কট্যাঙ্ক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন”। যদিও কাঞ্চন গুপ্ত তাদের নিজেদের স্টাফ নন, তাই বাইরের লেখকের লেখা হিসেবে তারা ছেপেছে। কাঞ্চন গুপ্তের পরিচয় খুবই কম করে বললেও তা হল, তিনি একসসময়ের বাংলাদেশ (পুরানা পুর্ববঙ্গের) এক ব্রাক্ষ্মসমাজ পরিবারের সদস্য, এখন দিল্লি-নিবাসী এক প্রবীণ সাংবাদিক; যার আবার চলতি শতকের শুরুতে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বা মন্ত্রী আদভানির টেকনিক্যাল এইড বা মিডিয়াসংক্রান্ত সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারই লেখার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে এখন একদলীয় গণতন্ত্র’[Bangladesh now one-party democracy] । একদিক থেকে দেখলে এটা কোন খাতির বাছবিচার ছাড়া খুবই খাড়াভাবে তাঁর বক্তব্য হাজির করা হয়েছে। এছাড়া ঐ লেখার ভেতরের বিশেষ জোর দেয়া কিছু বুলেট বক্তব্য আছে। সেখান থেকে তুলে আনা এমন চারটা বক্তব্য হলঃ
যেমন- ১. “সব ব্যবহারিক অর্থে বাংলাদেশ এখন একটা একদলীয় রাষ্ট্র, যদিও ঐ দেশে এখনও “কিছু আসে-যায় না” ধরণের কয়েকটি দল রয়ে গেছে – যেন এটি প্রমাণ করার জন্য যে কনস্টিটিউশনাল বর্ণনায় বাংলাদেশ বহুদলীয় রাষ্ট্র”। [For all practical purposes Bangladesh is now a single-party state with inconsequential parties keeping alive the country’s constitutional description as a multiparty democracy.]
২. ” অভিযোগ হল, আওয়ামি লীগ ভিন্নমতকে নিশ্চুপ করে এক নির্বাচন আয়োজন করেছে যেটা না প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীন না ন্যয়নীতিতে পরিচালিত – এখন সেই অভিযোগকারিদেরকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা হয়েছে”। [Equally irrelevant are those who accuse the Awami League of silencing dissent and organising an election that was neither free nor fair.]

৩. “নিজস্ব কায়দায় চালানো শেখ হাসিনার এক ওয়ার অন টেররের তৎপরতা আছে। এই ততপরতায় টার্গেট করে হত্যা করা বা গুম করে দেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে অনেক কথা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রমেই ভায়োলেন্ট রেডিক্যালিজমের দিকে গড়িয়ে পড়া থেমেছে – এ কথার পক্ষে যায় এমন কোনো প্রমাণ নেই বললেই চলে”। [Much has been said and written of Sheikh Hasina’s own war on terror through targeted killings and alleged disappearances. There is little evidence to suggest that has halted Bangladesh’s slide towards violent radicalism.]
কাঞ্চন গুপ্তের এই বাক্যটা সম্পর্কে একটা মন্তব্য করা জরুরি যে, তাঁর একথাগুলো রাখঢাক না করে আবেগহীন ভাবে বলা সত্য, যা ভারতের স্বার্থের পক্ষে গেল কী না এই বিবেচনা না রেখেই তিনি বলেছেন।

তবে সব ছাড়িয়ে কাঞ্চন গুপ্তের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্তব্য আছে যা এখানে এখন আনা হবে। এর প্রথমটা হল তাঁর লেখার প্রথম বাক্য। খুবই চাচাছোলাভাবে তিনি আমাদের বলছেন, “প্রথম ভোটটা বাক্সে পড়া বা বাক্স গণনা শেষ হওয়ার আগে জানাই ছিল ফলাফল কী আসবে। কেবল বাকি ছিল এ কথা জানা যে, তিনি কত আসন সাথে নিয়ে আসবেন – যা প্রমাণ করবে হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে যোগ্য কেউ নাই”। [The results of the 11th parliamentary election in Bangladesh were known even before the first vote was cast last Sunday or the first ballot was counted in the evening on the same day. It was only a question of how many seats would Sheikh Hasina Wajed’s Awami League tote up to prove its point that it faces no opposition worth its name.]

এ ছাড়া কাঞ্চন গুপ্তের প্রথম মন্তব্য শুনে যাতে পাঠক আবার আশাবাদী না হয়ে যান সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হলঃ “বিরোধী দল এখন যতই ফ্রেশ নির্বাচনের দাবি জানাক সেটা ঘটবে না; তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকা এর পক্ষে কোনো আগ্রহ নিয়ে হাজির হবে বলে মনে হয় না”।’ [The opposition can keep demanding fresh elections but that will never happen. It is unlikely that either the US or the EU will strike a particularly harsh posture on the quality of Sunday’s election …… ]

এই হলেন কাঞ্চন গুপ্ত ও ভারতের মিডিয়ায় তাঁর আবেগহীন পর্যবেক্ষণ, যেটা এক অস্বস্তিকর প্রকাশও বটে।আর তার নিচের বাক্যটা হল চীনভীতি হতাশার। বলছেন, হাসিনা যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ কথাটি অনুসরণ করে সবার চেয়ে বেশি খুশি হবে আসলে চীন। [……would bear testimony to her claim that Bangladeshis have voted for development and progress. China would be more than willing to oblige.] তিনি বলতে চাইছেন এই বাক্য ত চীনের পক্ষে গেল!

দুইঃ ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণ
এবার দ্বিতীয় মিডিয়া মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া হল, ৩ জানুয়ারিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণের লেখা। তার লেখার শিরোনাম, “গণতন্ত্রের জন্য বা ভারতের স্বার্থের জন্য এটা কোনো অর্জনই নয়”।[No gain for democracy, or for India’s interests]। এছাড়া পরে বিস্তারে ভেঙে বলছেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল ঐ দেশের গণতন্ত্র অথবা দক্ষিণ এশিয়া বা বাইরে ভারতের লংটার্ম স্বার্থের জন্য কোন অগ্রগতি বয়ে আনবে না”। [The Bangladesh election results are neither going to further democracy in that country nor India’s long-term interests in South Asia, and beyond.]
তবে একটা মিলের দিক হল, ভরত ভূষণও উপরের কাঞ্চন গুপ্তের মত মনে করেন, “বিরোধীদের পুনর্নির্বাচনের দাবি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যাকে বিরোধীরা সরকারি দলবাজ বলছেন, সেও আমল করবে না”। কিন্তু ভরত ভূষণের অভিযোগ আরও খাড়া এই অর্থে যে তিনি খোদ হাসিনা সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তিনি মনে করেন, “সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটার বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন তাদের ইমেজ হারিয়েছে। মিডিয়াও সরকারি খবরদারির বয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। সরকার ও সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের মানে, এমন কর্তাব্যক্তিদের রেকর্ড আছে যে তারা বিরোধীদের ওপর হামলা করেছেন। এ অবস্থার মুখে গণস্বার্থ নিয়ে কথা বলা বুদ্ধিবৃত্তির লোকেরা ও স্বাধীন ব্লগাররাও জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছে”।’ [Due to political manipulation by the State, the judiciary and the Election Commission have also lost their sheen in the country. The media has fallen in line with state diktats. Given a history of attacks by both state and non-state actors, public intellectuals and independent bloggers fear for their lives.]

তবে ভরত ভূষণের মূল উদ্বেগের পয়েন্ট হলঃ তিনি লিখছেন, “ভিন্নমত প্রকাশ হতে দেয়ার সুযোগ না রাখায় দমবন্ধ পরিবেশে আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নমতের লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাতে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলা হচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যেই ইসলামী রেডিক্যালদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি আছে। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না রাখার ব্যর্থতা – এটাই যেকোনো ধরনের রেডিক্যাল রাজনীতির জন্ম ও বিস্তারের জন্য তা খুবই উর্বর ভূমি হিসেবে হাজির হয়। এধরনের অবস্থা-পরিস্থিতিগুলোই মানুষকে ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মিসর বা আলজেরিয়ায় ঘটেছিল। [The absence of democratic safety valves and with institutions of the state “weaponsied” against dissent, is a particularly dangerous situation for countries which have a significant presence of Islamic radicals. The failure of political processes creates a fertile ground for the expansion of radical politics. The people can then easily turn to Islamic radicalism, as happened in Egypt and Algeria.]।

তিনি সঠিকভাবেই মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে বলছেন, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপগুলোকে অকেজো করে ফেলা হচ্ছে তড়িত নগদ কিছু ফল পাবার আশায় অথচ ক্ষমতাসীনেরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায় ইয়াদের হাতেই এটা হচ্ছে”। [The democratic institutions of Bangladesh have been eroded for short-term gains by those in power for a long time.]

শেষ কথা হিশাবে তিনি বলছেন, “এ ছাড়া এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে আসন্ন স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব যা নিয়ে আসবে তা শেষ বিচারে এর ফসল চীনের পক্ষেই যাবে আর তাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ শুকিয়ে চিপার মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই দেখার বিষয় হবে। [China wants a strategic foothold in Bangladesh to counter the United States, and secondarily, India…….As this great game unfolds, it remains to be seen whether or not Indian intersts will get squeezed out of Bangladesh.]

তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত তার মারাত্মক ক্রিটিকাল পয়েন্ট হল, তিনি এমন একতরফা নির্বাচনের নিন্দা বা অসম্মতি প্রকাশ করতে বলছেন, “ভারতের জন্য নিরন্তর যেটা ভয়ের বিষয় বাংলাদেশে কোন ইসলামি রেডিকেলের উত্থান আর সীমান্ত পেরিয়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা – এমন একপক্ষীয় নির্বাচন সেই আশঙ্কাকেই আয়ু দিবে। ভারতের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের দিক থেকে দেখলে পকেটে গানপাউডার নিয়ে ঘুরা এক বাংলাদেশের চেয়ে সুস্থির নিয়মতান্ত্রিক বাংলাদেশই ভারতের জন্য কাম্য”। [As for India’s primary bugbear, the rise of Islamic radicals in Bangladesh and its consequences across the border, a one-sided election may have given it a new  breath of life. In the long run, it might be easier to deal with a stable and democratic Bangladesh than one that may become a powder keg.]

তিনঃ একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলী
আমাদের তৃতীয় উদাহরণ হল, একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলির লেখা এক রচনা। সুমিতের পরিচয় হল, তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রফেসর। এ ছাড়া, তিনি আমেরিকান ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় কালচার ও সভ্যতা বিষয়ের রবীন্দ্র চেয়ারের অধ্যাপক। আর তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’(Foreign Policy)  পত্রিকায় ৭ জানুয়ারিতে।

তার লেখার শিরোনাম হল, ‘বিশ্বের বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যর্থতার দিকে নজর করা উচিত”। [The World Should Be Watching Bangladesh’s Election Debacle]। আর এই লেখার দ্বিতীয় শিরোনাম হল, “ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটা তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে, ইসলামী চরমপন্থার অসুস্থ ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করেছে আর দেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে”। [The ruling party is making a mockery of the electoral process, pandering to Islamic extremists, and turning the country into an authoritarian state]। তাঁর অস্বীকৃতি প্রকাশের লক্ষ্যে খুবই কড়া কড়া শব্দ প্রয়োগ সন্দেহ নাই। যদিও এই লেখকের দেখার অবস্থান একজন ইসলাম-বিদ্বেষী আন-ক্রিটিক্যাল সেকুলারের। কিন্তু সেদিকটাকে পাশে ফেলে রেখে আমরা তাঁর কথা আমল করব এখানে।

প্রথমত, তিনি একে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের (questionable results)’ নির্বাচন মনে করেন। তাঁর লেখা শুরুর দ্বিতীয় বাক্য হল এরকম  The questionable results ended in a sweeping victory …।] এবার তাঁর লেখা থেকে তিনটি বুলেট বাক্য উঠিয়ে আনব এখানে।

তিনি মনে করেন- ১. ‘সস্তা রাজনৈতিক লাভালাভের স্বার্থে এই দল (মানে আওয়ামী লীগ) ধর্মীয় সহিংস দলের উত্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভোটারদের [হেফাজতের সাথে আপোষ সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন] সাথে আপস করেছে। [For reasons of political expediency the party has failed to fashion a concerted strategy to curb the rise of such religious militancy; it prefers to court religious voters.]
২. আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী বিজয় বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর, যেখানে গণতন্ত্রের আলখাল্লায় ঢেকে এটা এক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি পয়দা ও সংহত হতে সাহায্য করবে। [The Awami League’s questionable electoral victory is bad news for Bangladesh, where it will aid the consolidation of an authoritarian political order with a democratic facade.]
৩. এই দানব ক্ষমতার বিরোধীদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমল না করার একমাত্র চিহ্ন নয়। [The regime’s hostility toward the opposition was not the only marker of its disregard for democratic procedures.]

উপরের বাক্যগুলো নিজেই নিজের ব্যাখ্যা, তাই বিস্তারে যাওয়া হল না। তবে এছাড়া, সবশেষে সুমিত গাঙ্গুলিও মনে করেন, “ট্রাম্প বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না। এর বদলে আফগানিস্তানে আমেরিকার ভবিষ্যত নিয়েই সে বেশি চিন্তিত। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা বাংলাদেশের সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিক করা বা ঘাটতি পুরণের জন্য শক্তি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না”। [Finally, the Trump administration, to the extent it has devoted any attention to South Asia, has mostly been preoccupied with the future of the U.S. involvement in Afghanistan. It has paid little attention to political developments in Bangladesh or elsewhere in the region. Consequently, it seems highly unlikely that Washington will expend much energy, let alone political capital, to address the shortfalls of this election.

চারঃ প্রাক্তন সচিব অভিজিত চক্রবর্তী
চতুর্থ ও শেষ উদাহরণ টানব অভিজিত চক্রবর্তীর লেখা। অভিজিত ভারত সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সাবেক বিশেষ সচিব ছিলেন বলে লিখেছেন। অনুমান করা হয়, এ ধরনের বিশেষ সচিবের মানে এরা আসলে গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা হয়ে থাকেন। সে যাই হোক, তার লেখা ছাপা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে, (Economic Times), ৭ জানুয়ারি।

তার লেখার শিরোনাম, “বাংলাদেশের রাজনৈতিকতা রেডিক্যাল হয়ে যাচ্ছে ভারতের শঙ্কিত হওয়া উচিত”। [India should be wary of radicalisation of Bangladesh’s polity]। রেডিক্যাল বলতে আমরা সাধারণভাবে সব ধরনের “সশস্ত্র রাজনীতি” বলে  বুঝতে পারি। যদিও তিনি এখানে সুনির্দিষ্ট করে ইসলামি রেডিক্যাল বুঝাতে চেয়েছেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি এক মারাত্মক হাতেগণা অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। বলছেন, “আওয়ামী লীগের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয় এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের সংখ্যার ব্যবধানে বিজয় দেখানো, এই নির্বাচন পরিচালনাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে; বিশেষত যদি, আমরা বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত সমর্থক ভো্টার ভিত্তির কথা মনে রাখি”। [The win in over 90% of the seats contested by the Awami League and some with astounding victory margins have contributed to the questionable conduct of the elections, given the committed vote base of the BNP and JeI. অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই ৯০% এর বিজয় যদি মানি তাহলে একা বিএনপির প্রায় স্থায়ী ভোটার বেজ ৩০-৩৫% যা বলা হয় সেটাকে ব্যাখ্যা করব কী করে? এছাড়া জামাতের ভোট ত আছেই!

এছাড়া তিনি আরও বলছেন, ‘এই নির্বাচন শুধু বিরোধীরা নয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ; তারা এর তদন্ত দাবি করেছেন”। [The latest election falls short of widespread acceptability as not only the opposition parties, but also the EU and US have questioned the process and demanded investigation into the reports of harassment, intimidation and violence.]

এরপর তিনি সবশেষে একটা মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন, “এসব ফ্যাক্টর একটা দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যে দেশ অতীতে ধারাবাহিকভাবে বিরতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখে এসেছে”। [All these factors may pose a challenge to the establishment of a stable democracy in a country that has seen periodic military interventions in the past.]।
স্যরি, অভিজিত চক্রবর্তীকে বলতেই হচ্ছে, এই শেষ বাক্য তিনি না জুড়ে দিলেই ভালো হত। সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে এই মন্তব্য খুবই হাল্কা ও উস্কানিমূলক হয়েছে। এতে তিনি নিজের বিদ্যাবুদ্ধি, পেশা, তথ্য যোগাড় ও দক্ষতার মান নিচে নামিয়ে দিলেন।

সে যাই হোক তিনি হেফাজতের সাথে আওয়ামি লীগের আপসে চরম ক্ষুব্ধ। তিনি বলছেন, “গত দশ বছর তিনি শাসন ক্ষমতায় একনাগাড়ে থাকলেও ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এতে সমাজে দেশের ইসলামী পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির সামাজিক সুবাতাস পেয়েছে”। [The wooing of radical elements by all the political parties is an indication that despite 10 years of the Awami League government, the societal winds continue to favour a strong Islamist identity in the country. ] এটা বেশ ইন্টারেস্টং যে তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে “ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে” প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
তবে তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন, “এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বাংলাদেশকে রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়া হল”। এ ছাড়া সেকুলারিজমের মৌলিক বীজ ও চিহ্নগুলোকে ক্ষয়ে ফেলা হয়েছে। [The erosion of secular ethos will not only affect minorities, ………. ] ফলে তিনি এবার এক সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। বলছেন, সব মিলিয়ে “এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত”।  [These developments could pose security challenges for India, especially in the northeast.] অর্থাৎ তার কথা সঠিক বলে মানলে হাসিনার এ নির্বাচনী ফলাফল ও পরিচালনা ভারতের জন্য নিরাপত্তার ক্ষতি বয়ে এনেছে বা আনবে।
এসব কথার সূত্র ধরে তিনি এবার নতুন হাসিনা সরকারে চীনের প্রভাব বেড়ে যাবে বলে দেখছেন। তাই তার শেষ কথা “ভারত এসব দেখে শঙ্কিত না হয়ে” ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
তার পু্রা কথার মধ্যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলছেন আর এতে তিনি ভারতের জন্য বিপদ দেখছেন।

সবশেষেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
আনন্দবাজার পত্রিকার উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। এটা ১ জানুয়ারির রিপোর্ট, শিরোনাম হল– ‘ভোটে জিততে মুখ চাই, কংগ্রেসের হারের সাথে বিএনপির মহাবিপর্যয়ের তুলনা টানলেন হাসিনা।’ আনন্দবাজারের শিরোনাম এমন পেঁচানো হয় যে, খবরটা আগে পড়া শেষ না করলে শিরোনামের অর্থ জানা যায় না। এই রিপোর্টেরও সারকথা – আনন্দবাজারেরও একই উদ্বেগ, জয়লাভের পারসেন্টেজ বেশি হয়ে গেছে- বিরোধী দল থাকল না।

লিখেছে, “ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে, জাতীয় পার্টি এবং আরও ৬টি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনার মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি”।  অর্থাৎ সরকারি জোট একাই ৯৭% আসন পেয়ে গেছে। “সেই অর্থে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আর তেমন কোনো অস্তিত্বই থাকল না”। এই হল আনন্দবাজারের উদ্বেগ। এখন এখানে এক তামশা দেখলাম আমরা। আনন্দবাজারের এই উদ্বেগ তাড়াতে একপর্যায়ে উপায় না পেয়ে হাসিনাকেই বলতে হল, “আগামীতে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসে যেতে পারে”। এর উদাহরণ হিসেবে বললেন, “আজকের বিজেপিও তো একসময় ভারতের সংসদে মাত্র দু’টি আসন পেয়েছিল”। এ ছাড়া, হাসিনাকে বিএনপির হারের ব্যাখ্যাও নিজেই কান্ধে নিয়ে দিতে হয়েছিল। হাসিনা ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিএনপি জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি না বলাতেই নাকি তারা মূলত হেরেছে।
যা হোক সারকথাটা হল, ৯৭ শতাংশের মত আসন পেয়ে আওয়ামি লীগের শান্তি ছুটে গিয়েছে। উল্টো আওয়ামী লীগকেই বিএনপির আগামী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আপাতত নিজের জিতবার সাফাই দিতে হয়েছিল।

তবে এর বাইরেও অনেক রিপোর্ট, মন্তব্য, কলাম আছে পাওয়া যাবে; যা এখানে আনা হয়নি। যেমন সরাসরি ট্রাম্পকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছে এমন রচনাও আছে। তবে ভারতের এসব মুল্যায়ন প্রকাশের সাধারণ সুরটা হল, এই নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ভারত আগামী দিনে নিজ দেশের জন্য লুকানো বিপদ বলে মূল্যায়ন করছে। সে কারণেই এত অস্বস্তি।
আর একটা সোজা ফ্যাক্ট হল, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এতে যে ঐ খালি জায়গার দখল পাচ্ছে সেই লাভের ফসল যাচ্ছে মূলত চীনের ঘরে। কারণ, রাজনৈতিক অধিকারের (Political Right) বদলে “উন্নয়নের রাজনীতির” – হাসিনার এই রাজনীতিতে বিজয়ের সোজা অর্থ -ক্রমশ  হাসিনার কাছে আপন হয়ে উঠবে চীন যেখানে ভারত হবে তুচ্ছ, পরাজিত পার্টি! যার অন্তত কিছু কারণ ভারতের কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই। আর আমেরিকার হবু কোন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রায় নাই বলে এর বিরুদ্ধে  ভারতের সুপারিশ আর জরুরি না।  যার ফলাফল, চীনের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ এক বাংলাদেশ। আর তাতে ততই শিরশিরে ঠাণ্ডা চিলিং অনুভুতির এক ভারত – হতে দেখছি আমরা।
এ ছাড়া মানুষের রাজনৈতিক অধিকার  দাবড়ে রেখে হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো, “উন্নয়নের রাজনীতির” আওয়াজে সব আড়াল করা এসব কিছুর ফলে  সত্যি সত্যিই  রেডিক্যাল – শুধু ইসলামের নয় যেকোন – রাজনীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, সেটা তো আছেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘ভূমিধস’ বিজয়ে ভারতের মিডিয়ার শঙ্কা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

গৌতম দাস

০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2wC

 

 

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যেভাবেই হোক, শেষ হয়েছে। সেই সাথে শেষ হয়েছে এ নিয়ে ইতি বা নেতিবাচক বিভিন্ন উচ্ছ্বাসও। এই নির্বাচনে বিদেশী মিডিয়ার নজর পড়া যথেষ্টই ছিল বলা যায়। নির্বাচনি খবর সংগ্রহ করতে এসে তাদের তৎপরতা দেখা গিয়েছিল নির্বাচনের আগে-পরে মিলিয়ে মোট প্রায় দশ দিনের মত, যা এখন আস্তে আস্তে কমে আসছে বা নেই।

নির্বাচনের আগে বা ফল প্রকাশের পরে বিদেশী মিডিয়া বিশেষ করে যারা অর্থনীতি-ফোকাসের মিডিয়া যেমন, লন্ডন ইকোনমিস্ট বা আমেরিকার ব্লমবার্গ– এদের রিপোর্ট হল মুখ্যত জিডিপি-দেখা কেন্দ্রিক। আর এদের সাফাইয়ের সরল বয়ান কাঠামোটা হল – ‘বাংলাদেশের জিডিপি ভাল মানে, বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে, অতএব হাসিনা আবার জিতবে’, অথবা ‘জিতেছে’। এ ছাড়া  আরও যারা বাংলাদেশে নির্বাচনি ইস্যুতে এসেছিলেন এমন অন্যদের মধ্যে ছিল যেমন, লন্ডনের গার্ডিয়ান, আমেরিকার ভোয়া, গ্লোবাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স, দক্ষিণ ভারতের দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয় অথবা নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম ইত্যাদি- এরা সবাই অন্য যে বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে তা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের নাগরিক অধিকারহীনতার দুর্দশা। অর্থাৎ নাগরিক অধিকারের খবর নাই, জিনিষটাই অনুপস্থিত বা গায়েব। ফলে এর অনুষঙ্গ – গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা তথা বিরোধী দল বা সরকার-বিরোধীদের গায়েবি মামলা থেকে পালিয়ে বেড়ানো বা গ্রেফতার; অথবা কোনমতে নির্বাচনে থাকলেও  সমান সুযোগ না পাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ এরাই মূলত রাজনৈতিক দিক মুখ্য করে লেখা রিপোর্ট বা আসল রিপোর্ট করেছে।  যদিও এই দ্বিতীয় তালিকার মিডিয়াগুলোও তাদের দ্বিতীয় পয়েন্ট হিসাবে “ভাল জিডিপি” বিষয়টাকে সরকারের পুনর্বার জিতবার ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হিসাবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ কমবেশি সব বিদেশী মিডিয়া যে তর্কের চক্কর তৈরি করে রিপোর্ট লিখেছে তা পশ্চিমের ভাষায় বললে – ‘ডেমোক্রেসি বনাম ডেভেলপমেন্ট’- এর নির্বাচন। অর্থাৎ রাষ্ট্রে ‘নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার’ [Political Right] থাকাটা জরুরি নাকি ‘উন্নয়ন’ হলেই চলে – এভাবে তর্কটাকে হাজির করে এবার দাবি করা যে ‘উন্নয়নের’ কারণে হাসিনার জেতা উচিত বা জিতবে। এই হলো বয়ান।

খুবই চাতুরি তর্ক সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেক রূপে এই তর্কের হাজিরা অনেক পুরনো, সেই পাকিস্তান আমলের। আইয়ুব খানের শাসনের দশককে (১৯৫৮-৬৮) প্রশংসা আর সাফাই যোগান দিতে তখন যা বলা হত ওর সার কথা ছিল – পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে ঠিকমত কখনই ওর একটা কনস্টিটিউশন রচনা করতে ক্ষমতাসীনরা সক্ষমতা দেখাতে না পারলেও সেকালের শাসক আইয়ুব খান প্রচুর ‘উন্নয়ন’ করেছিলেন। সুতরাং আইয়ুবের শাসন জায়েজ। আর তাই ঢং করে বলা হত “আয়ুবি ডেভেলবমেন্ট ডিকেড”। পুরনো সেই তর্কটাই এবার আবার বাংলাদেশে ভেসে উঠেছে। কিন্তু কবে থেকে? অনেকে আবার সেটা খেয়াল করেনিই হয়ত।

ব্যাপারটা ঘটেছিল গত ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকার গড়ার পরে। আসলে সে সময় হাসিনার ওই “বিশেষ নির্বাচন ও সরকারের” পক্ষে একটা সাফাই যোগাড় ও খাড়া করে দেয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা দেয়ালে চিকা মারা দেখেছিলাম যে “হাসিনা হলেন বাংলাদেশের মাহাথির”। মাহাথির-এর নাম নেয়া এজন্য যে,যারা উন্নয়নের আড়ালে সব রাজনৈতিক দুর্বলতা ও খামতি ঢেকে ফেলতে দক্ষ তাঁরা বলেন মালয়েশিয়ার “উন্নয়নের” প্রতীক মাহাথির, তবে তাঁরা সাবধান থাকেন যাতে তা নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের নেতা বলে কেউ ভুলে না বুঝে। তবে বাংলাদেশে এবারের নির্বাচন শুরুর এক বছর আগে থেকেই উন্নয়নের স্লোগান দিয়েই হাসিনা আসন্ন ভোট বা পাবলিক মোকাবেলা বা তাঁর সমালোচনা মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।

সব জিনিসের বিকল্প হয় না, আমরা করি না। একটার বদলে অন্য একটা হলেও চলে এই অর্থে বিকল্প খুঁজি না বা সন্তুষ্ট হই না। মানুষের জীবন চাহিদায় এমন বহু কিছু বিষয় আছে। এ রকম বিষয়টা বুঝাতে ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে ‘নন-নিগোশিয়েবল’(non-negotiable)। মানুষের জীবনের যেসব বিষয়ের বিকল্প হয় না বলে মনে করা হয়, আমরা বিকল্প খুঁজিই না, সেগুলোই আসলে নন-নিগোশিয়েবল । যেমন ‘মায়ের ইজ্জত’ নিয়ে নিগোশিয়েশন চলে না, তাই এটা নন- নিগোশিয়েবল। ঠিক তেমন কোন রাষ্ট্রে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার বা মৌলিক মানবিক অধিকার একেবারেই  নন-নেগোশিয়েবল। কথাটার বইয়ের ভাষা থুয়ে, ব্যাপারটা আর ভেঙে বলা যাক। যেমন বলা হল – রাষ্ট্র আপনাকে পেট পুরে খেতে দেবে, চাকরি, আরামসহ আরো বহু কিছু দেবে এবং একদম নিশ্চয়তার সাথে। কিন্তু আপনি বেমালুম গুম, খুন হয়ে যেতে পারেন সে সম্ভাবনাও সাথে আছে; রাষ্ট্রের দিক থেকে এসব থেকে কোন সুরক্ষার নিশ্চয়তা নেই, প্রতিশ্রুতি নেই। এখন আপনি কি রাজি আছেন? এটাই উন্নয়ন দিয়ে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করা বা ভাবার প্রশ্ন। আসলে রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করে ফেলা যায় মনে করা আর এর বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নতিকে মুখ্য ও বিকল্প কাম্য মনে করা – এটাই ‘উন্নয়নের রাজনীতির’ ভাবনা। দুনিয়ার সব স্বৈর শাসকের কমন লক্ষণ এটা।

বস্তুত নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার নন-নেগোশিয়েবল। আমরা উন্নয়ন খেয়ে এর বিনিময়ে গুম-খুন হয়ে যেতে রাজি হতেই পারি না।  তাই এটা নেগোশিয়েবল বলে মনে করার সোজা মানে হল, আসলে আপনার রাষ্ট্রটাই নাই। কারণ রাষ্ট্র- এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য ও কাজ হল নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়া, বাস্তবে এই সুরক্ষা দেয়া, প্রতিরক্ষা বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র যদি তা না করতে পারে, না দেয় তাহলে সে রাষ্ট্র অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এর বদলে রাষ্ট্র হয়ে যায় তখন বড়জোর একটা পৌরসভা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনই পৌরসভা নয়। রাষ্ট্রের কাজ ও ভুমিকা – পানি বিদ্যুত ড্রেনেজ রাস্তা ইত্যাদির মত উন্নয়ন দেয়া নয়। সেকাজের জন্য একটা পৌরসভা বা মিউনিসিপাল্টিই যথেষ্ট। রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা, ইনসাফ দেয়া, সিরক্ষা এগুলোর নিশ্চিতের জন্যই মূলত আমাদের রাষ্ট্রগঠন নির্মাণ দরকার। তাই উন্নয়ন এর কথা বলা মানেই রাষ্ট্রকে পৌরসভায় নামিয়ে আনা। অথচ রাষ্ট্র [State] কোনভাবেই পৌরসভা নয়।

কাজেই কোনো দেশের নির্বাচনের আসরে এসে বিদেশী বা দেশী মিডিয়ায় সরকারের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার রেকর্ডের আলোচনাকে পেছনে ফেলা বা আড়াল করে ফেলাটা খুবই খারাপ ধরণের চাতু্রি। জেনে বা না জেনে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল বিষয় করে ফেলা – বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন বা জিডিপির ফিরিস্তি তোলার মিডিয়া রিপোর্ট – এটা সেই বিরাট চাতুরী। তারা অর্থনীতির মিডিয়ার লোক তাই রাজনীতি বোঝে না – এমন বুঝে নাই ভাব ধরে এরা পিঠে ছুরি মারে।
অথবা এই চাতুরী যেন উট আর বিড়ালের গল্প। যেমন একবার এক হাটে এক উট বিক্রেতা উটের দাম চাচ্ছে মাত্র এক টাকা। কিন্তু শর্ত হল ওই উটের সাথে একটা বিড়াল নিতেই হবে; যে বিড়ালের দাম পাঁচ লাখ টাকা।

এই ব্যাপারগুলো বিদেশী প্রভাবশালী মিডিয়াতেই বেশি হচ্ছে ও হয়ে থাকে। এর পেছনের মূল কারণ, এই মিডিয়াগুলো মূলত আমাদের মত দেশে দেখতে আসে বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের চোখ – এমন মিডিয়া হিসাবে। বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের পয়সাতেই তাদের আয় ও জীবিকা। তাই উন্নয়ন ও জিডিপি দিয়ে তাদের একটা নির্বাচন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার ঝোঁক দেখা যায়।
বাংলাদেশে নির্বাচন উপলক্ষে প্রকাশিত যাদের রিপোর্ট আমাদের নজরে এসেছে এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে অনেকে ব্লমবার্গকে (Bloomberg) মনে করেন। কারণ এই মিডিয়াটা “ওয়াল স্ট্রিট” ধরণের বিনিয়োগ কোম্পানীর সরাসরি মালিকানা বা বিনিয়োগ আছে। এবারের বাংলাদেশ নির্বাচনের আগে, তাদের রিপোর্টের সার কথাকে শুরুতে দেয়া দুই বুলেট বাক্য হল – ১. দ্রুত বেড়ে চলা অর্থনীতি হাসিনাকে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আনতে পারে। ২. বিরোধী নেতা জেলে বলে ভায়োলেন্স নতুন করে বাড়তে পারার শঙ্কা।

  • Fast-growing economy may propel Hasina to third term in power
  • Fears of fresh violence grow as opposition leaders jailed

অর্থাৎ এখানে সরাসরিই বলা হচ্ছে, রাজনীতিক অধিকারের দশা পরিস্থিতি নয়, জিডিপিই নির্বাচনে বিজয়ের একমাত্র নির্ণায়ক – এই আগাম অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে আবার বলে রাখা ভালো যে, ব্লমবার্গ- এই মিডিয়া গ্রুপ না হলেও অন্য অনেকে আবার অনেক সময় ‘পেজ-বিক্রি’ করার কারণেও এমন রিপোর্ট করে থাকে।

কিন্তু তবুও জিডিপিভিত্তিক আগাম অনুমানের এমন রিপোর্ট – যেটা দাবি করছে যে বাংলাদেশের জিডিপি ভাল এর মানে এটা হাসিনা মেলা উন্নয়ন করেছে তার প্রমাণ – একথা কী গ্রহণযোগ্য? সম্ভবত না।  এটাও যথেষ্ট সাফাই নয় বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ জিডিপি বাড়লেই তা সরকারের সাফল্য কি না, এর সপক্ষে ঐ রিপোর্টে সরাসরি কোনো সাফাই নাই। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতি    খুবই ব্যতিক্রমী ধরণের। তাই জিডিপি বাড়া মানেই তা সরকারের প্রত্যক্ষ সাফল্য এটা নাও হতে পারে। বাংলাদেশ  বিশেষ বৈশিষ্ট্যের তাই গতানুগতিক চোখে কেবল জিডিপির বাড়া-কমা দিয়ে সাফল্য মাপতে যাওয়া, হদিস করা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন, দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ১৭০ দিন হরতাল থাকলেও জিডিপিতে এর প্রভাব নেই। জিডিপি একই রকম থেকেছে।

যদিও এর সম্ভাব্য কারণ কী, এ নিয়ে কোনো ফরমাল স্টাডি নাই। তবুও এর সম্ভাব্য কারণ বলে যা অনুমান করা হয় সেই ফ্যাক্টরটা হল – রেমিট্যান্স। খুব কম দেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স এমন ফ্যাক্টর হয়ে থাকে। তাই এটা আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ বৈশিষ্ট বা ব্যতিক্রম। বিদেশে গরিব শ্রমিকের শ্রম বেচা অর্থ – বিদেশী মুদ্রা নিয়মিত আসে। এটা বলাই বাহুল্য, যে দেশের হরতালের সাথে এই আয়ের কম-বেশি হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই। এ ছাড়া আরেক গুরুত্বপর্ণ দিক হল, ৯০ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার আয় আসে গার্মেন্টস থেকে। এখন এর থেকে কাঁচামাল, মেশিনারিসহ ইত্যাদি্র বৈদেশিক মূল্য পরিশোধে বাদ দেয়ার পর যা নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় থাকে; দেখা যায় প্রতি বছর এর পরিমাণ যদি ১৪ বিলিয়ন ডলার হয়, তবে মোট রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও দেখা যায় আরও ১৪ বিলিয়ন ডলার, মানে প্রায় এর সমান। অর্থাৎ রেমিটেন্স আর রপ্তানি আয় প্রায় কাছাকাছি।

এখন যদি রপ্তানি আয়ের জন্য সরকারকে ক্রেডিট দেই তাহলে ঠিক আরও সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আয়ের অবদানের জন্য তো কাউকে ক্রেডিট দিতে হয়! অথচ ফ্যাক্টস হল,  রেমিট্যান্স আয় লাভের সাথে সরকারের পারফরমেন্স খুব কিছু সম্পর্ক নাই। মূলত এ কারণেই আমাদের অর্থনীতিকে বলা হয় রুটিন অর্থনীতি, মানে বিশেষ সরকারের খুবই বিশেষ ভূমিকা এখানে থাকে না। বিদেশি সাংবাদিকেরা এসব দিক আমল না করে যেকোনো দেশের মত শুধু জিডিপি দেখে ধারণা বা অর্থনীতি বুঝতে চাওয়া তাৎপর্যহীন। তবে কোন মিডিয়া রিপোর্ট যদি জিডিপি ফিগারকে দেখিয়ে তা সরকারের প্রত্যক্ষ পারফরমেন্স বলে দাবি করতেই চায়, সে ক্ষেত্রে তাকে সবার আগে – সম্পর্ক বা প্রমাণ দেখাতে হবে যে সরকারের অমুক বিশেষ নীতি-পলিসি-পদক্ষেপের কারণে জিডিপি বেড়েছে। এমন দেখানোর আগে কোন দাবি হবে অমূলক ভিত্তিহীন। আমরা কোথাও এমন প্রমাণ এখনও দেখি নাই। তাই জিডিপি বৃদ্ধিকে সরকারের পারফরমেন্স এর সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করা ভিত্তিহীন।

তাই সার কথাটা দাড়াচ্ছে, জিডিপি বা উন্নয়নের সাফাই দিয়ে বিদেশি মিডিয়ার নির্বাচনী রিপোর্ট- এগুলো সারবত্তাহীন প্রপাগান্ডা; কোন ভিত্তি প্রতিষ্ঠা আগে না করে করা উড়া দাবি মাত্র।

সবশেষঃ
এক বিরাট স্ববিরোধী বিষয় আমরা দেখেছি লন্ডন ইকোনমিস্ট গ্রুপের ইকোনমিস্ট ইকোনমিক গ্রুপের ফলাফল প্রেডিকশন। বোঝাই যাচ্ছিল এটা পেজ বিক্রি ধরণের কান্ড। তবে নির্বাচনের পরে সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার রিপোর্টই এর সাক্ষ্য বা প্রমাণ। এই রিপোর্টে কি ধরণের নির্বাচন হয়েছে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সারকথায়, ইকোনমিস্ট গ্রুপের এক মিডিয়া অপর মিডিয়ার বক্তব্যকে নাকচ করেছে, স্ববিরোধী ফাইন্ডিং হাজির করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৫ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিদেশী মিডিয়ার নির্বাচনী কাভারেজ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন

গৌতম দাস

১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৭

https://wp.me/p1sCvy-2wt

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে; যার শিরোনাম হল, “সংসদ নির্বাচন: গত দশ বছরের যে পাঁচটি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে”। সেখানে গত ২০০৮ সালের সাথে এখনকার বাংলাদেশের একটা তুলনা টানা হয়েছে- পাঁচটা ইস্যুতে। দাবি করা হয়েছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। বিবিসির চোখে ১০ বছর পরে বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হল – ১. কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২. সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, ৩. বিকাশমান অর্থনীতি, ৪. নয়া প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার বিস্তার, ৫. বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার। তাদের অনুমান হল আমাদের আসন্ন নির্বাচনে এই পরিবর্তগুলো গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চোখে পড়ার মত ঘটনা হল, এক ফাইন মর্নিং বা সুবহে সাদেকে যেন বিবিসি চোখ কচলে ‘আবিষ্কার’ করেছে, বাংলাদেশে নাকি ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। আর এরপর রিপোর্টের বাকি অংশ হল, এই ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ নিয়েই কচকচানি। এসব তৎপরতা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে “কর্তৃত্ববাদী শাসন” চলছে বলে একটা স্বীকারোক্তিকে প্রাধান্যে আনা হয়েছে যেন এতে সংশ্লিষ্টরা এখন এতে নিজেদের দায় ধুয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি ১০ বছর ধরে এই শাসন আনা ও চলার ক্ষেত্রে যেন বিবিসিরও কোনো দায় নেই!এমনকি বিবিসি যার রেফারেন্সে বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে চলে গেলে সেটা হল এক জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক সংগঠন বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন [[Bertelsmann Stiftung]; কিন্তু তাদের রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল গত মার্চ ২০১৮ সালে। এরা গ্লোবে সব রাষ্ট্রের শাসন কেমন সে বিষয়ে স্টাডি করে সুচক তৈরি করে প্রকাশ করে থাকে। তাদের করা স্টাডিও ২০১৫-১৭ সালের। এই দুই বছর ধরে মাঠে সংগ্রহ করে এরপর তা থেকে স্টাডি করে তৈরি রিপোর্ট। দুনিয়ার ১২৯ রাষ্ট্রের উপর করা স্টাডিতে বাংলাদেশের শাসন অবস্থান ছিল ৮০ তম খারাপ অর্থাৎ ৮০ টা রাষ্ট্রের নিচে।

এখানে যদিও বলা হচ্ছে এই পরিবর্তনের সময়কাল “দশ বছর”; অর্থাৎ হাসিনার শাসন কাল। কিন্তু যেকেউ নির্মোহ মুল্যায়ন করতে চাইলে মানবেন যে সত্যিকার ভাবে সাথে জড়িয়ে আছে আর দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ফলে এটা মোট ১২ বছরের। কারণ আসলে পরের ১০ বছর বা হাসিনার কালে যা কিছু হয়েছে, এর সব কিছুর ভিত গাঁথা, অভিমুখ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল ওই দুই বছরের আমলে। কেউ অস্বীকার করবে না যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর ওই দুই বছর আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও যেকোন গভীরে সীমাহীন। তাই সুবিবেচনা করতে চাইলে, লজ্জা বা দ্বিধা ভুলে মোট ১২ বছরের হিসাবই করতে হবে।

ঐ রিপোর্টের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তারা (মানে বিবিসি ও রিপোর্টে ইনপুট দাতারা) কেবল তত্ত্বাবধায়ক শাসনের দুই বছরসহ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের দায় বহন করেন। মানে, ওই সাত বছর যেন তাদের খানিকটা দায় সংশ্লিষ্টতা আছে – সেটা ভাবভঙ্গিতে ও প্রচ্ছন্নে হলেও সেটি কবুল করে কথা বলেছেন। তবে সেটা বুঝা গেলেও বুঝবার কোনো উপায় রাখেননি যে, ঠিক প্রথম কবে থেকে তারা ঠাহর করলেন যে, বাংলাদেশে এক ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। সেটা একেবারে যত্ন করে উহ্য রেখে দিয়েছেন। তবে মূল কথা – বিবিসির এই রিপোর্ট পড়ে আমরা নিশ্চিত যে, তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরের ‘মজা’ ও দায় তারা অন্তত অস্বীকার করছেন না। তবে আসলে মুল কথা যে প্রশ্নের জবাব দূরে থাক প্রশ্নটাই তারা পুরাই লুকিয়ে ফেলেছে তা হল, এই কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম নিল – কারা কারা দায়ী? তত্ববধায়কের গাঁথা ভিত ও ঠিক করা অভিমুখ থেকে কেন “কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম” হল – এই প্রশ্নটাই তারা গায়েব করে দিয়েছে।

বিবিসির চোখে ঐ পাঁচ পরিবর্তনের যা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, তা হল – বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটে যাওয়া। আসলে প্রথম পরিবর্তন ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনের’ সাথে দ্বিতীয়টি সহ-সম্পর্কিত বা কো-রিলেশনাল। এখানে বিবিসি এবং যাদের সাথে আলাপ করে বা ইনপুট নিয়ে তারা রিপোর্টটা তৈরি করেছেন, উভয়ের চোখে ‘ইসলামীকরণ’ – একটা নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ করে বা হয়ে গিয়ে খুব খারাপ হয়েছে – এই আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সবাই কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন এই ইস্যুতে পাল্টা কথা বলব, তখন শব্দটি ব্যবহার করলেও তা নেতি ধরে নেওয়া জরুরি নয়, বরং বর্ণনামূলক অর্থে এর ব্যবহার করব।

আর শব্দটাকে কখনও লিখব ‘ইসলামিস্ট’। যেমন – “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বেড়েছে” – সেটা এই অর্থে যে “রাজনীতিতে ইসলাম” দেখতে চাওয়া সব ধারার সকলে মিলে যারা এরা এখন সবচেয়ে এক বড় গোষ্ঠী; আর এরই বর্ণনামূলক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে বলা যায়, বাংলাদেশে এমন ‘ইসলামিস্টদের’ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। একথাতার সম-উদাহরণ হতে পারে যেমন, সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে নানা ফ্যাঁকড়ার ‘কমিউনিস্ট’, তারা সেযুগে সংখ্যায় ছিল সবচেয়ে বেশি – ঠিক তেমনি একালে ইসলামিস্ট। আবার কমিউনিস্টদের মতই ইসলামিস্টরাও তারা আসলে কী চান, এ ব্যাপারে সবাই একই কথা বলবেন, ব্যাপারটা তা না হলেও – বাংলাদেশের রাজনীতি ইসলাম ছুঁয়ে থাকলে, কি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তা দরকার – এ রকম একটা কথার পক্ষে এরা সবাই একমত হবেন – এমন অনুমান করা যায়। যাই হোক, আমাদের বর্ণনাত্মক ও অ-নেতিবাচক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ বুঝ নিয়েই আমরা নেতিবাচক ‘ইসলামীকরণ’ ধারণা নিয়ে কথা বলব।

আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ১/১১-এর ক্ষমতা দখল পছন্দ বা সমর্থন করেছিলেন কেন? কী সে কারণ ছিল? নীতি নির্ধারকদের পলিসি-চিন্তাকে নিয়ে এই প্রশ্ন করা বা বুঝবুঝির জগতে আলোচনা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান কী ছিল – এর ফরমাল অথবা ইনফরমাল ভাষ্য অথবা উইকিলিকস থেকে জানা ভাষ্য ইত্যাদি নানা কিছু থাকলেও বাস্তবে আমরা যা দেখেছি, সেখান থেকে তেমন এক অভিন্ন ভাষ্য মোটামুটি যা দাঁড়াতে পারে, তাই এখানে বলা হবে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে সে অনুমিত ভাষ্যটা হবে এরকমঃ বাংলাদেশ তার নিজ ভূখণ্ডে গ্লোবাল টেররিজমের প্রভাব প্রতিরোধে, বিএনপি তার শাসন আমলে অনেক করলেও যথেষ্ট করেনি বা সিরিয়াস ছিল নয়। আমেরিকার মত করে সিরিয়াসলি দেখে নাই। এছাড়া, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশকেও প্রতিরোধের রাষ্ট্র হিশাবে সেভাবে গুছিয়ে তৈরি করে নেয়নি। ‘সীমাহীন’ দুর্নীতিও ছিল। তাই দুর্নীতি তাড়ানোর অজুহাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দিতে বাংলাদেশে ঐ সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেছিল, যা আমেরিকার পছন্দ ও সমর্থিত। আলোচনার করার সুবিধার্থে এই ভাষ্যটা ধরে নিয়েই কথা আগাবো।

মানে, খোলাখুলি বলার সুযোগ থাকলে বা আইনি বিপদ ও সমস্যা না থাকলে, ১/১১-এর পক্ষে আমেরিকার অবস্থানের সাফাই মোটামুটি এমনই হত। [এটা আমেরিকার সাফাই ফলে বিএনপিকে এর সাথে একমত হতেই হবে তা নয়।] তার মানে দাঁড়াল, বিবিসির এই রিপোর্টে বাংলাদেশের ১০ বছরকে মূল্যায়ন করে পাঁচ ফ্যাক্টর বা বিপদ নিয়ে কথা বলতে বসেছে, সেই ১০ বছর হল আসলে এরও আগের দুবছরে আমেরিকার ‘তৈরি করে দেয়া’, রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দেয়ার পরের বাংলাদেশ। আর সেই সাথে ওই সাজানো রাষ্ট্র কে চালাবে, তেমন একজন শাসকও আমেরিকা পছন্দ করে তার পিঠে হাত রেখেছিল। ওই শাসক বা পরিচালক ছিল দল হিসেবে হাসিনার [RATS নয়] আওয়ামী লীগ। তবে এটা হতে পারে যে, আমেরিকা শেখ হাসিনার শাসনের ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় পাঁচ বছরের দায় নিয়ে আপত্তি করলেও প্রথম পাঁচ বছরের দায় আমেরিকার; সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।

এবার আমরা দেখব, তাহলে বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুট দেয়া আলোচকদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ”, এর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এর সোজা মানে হল, আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে সাজানো রাষ্ট্র আর শাসক ঠিক করে দিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের ১০ বছরের শাসনে হাসিনা সরকারের ‘টেররিজম মোকাবেলা’ করায় তা খামোশ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে ফলাফলে উল্টো ব্যাপক “ইসলামীকরণ” হয়েছে- এটাই বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুটদাতাদের পর্যবেক্ষণ – তাই নয় কি? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” হয়ে যাওয়া, এই ফেনোমেনা তাদের অপছন্দের; কিন্তু অপছন্দ করলেও এটাই আমেরিকার বেধে নেওয়া নীতি-পলিসি আর বেছে দেয়া শাসক – এসব মিলিয়ে তাদের ঐ শাসনের প্রডাক্ট বা ফলাফল। লক্ষ করতে হবে, ইসলামীকরণ তাদের অপছন্দের ফেনোমেনা কি না সেটার চেয়েও বড় বাস্তবতা হল, এই ‘ইসলামীকরণ’ আমেরিকার নীতি আর মনোনীত শাসকের শাসনেরই (অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের) প্রডাক্ট। কিন্তু কেন এমন প্রডাক্ট বা ফলাফল প্রসব করল আমেরিকার নীতি-পলিসি? সেই প্রশ্ন আর পাল্টা মূল্যায়নে যাওয়া উচিত নয় কী বিবিসি ও তার ইনপুটদাতা আলোচকদের? কিন্তু তারা এদিকে একেবারেই আগ্রহী নয়।

DEEP STATE

What does Deep State mean?

The Deep State is believed to be a clandestine network entrenched inside the government, bureaucracy, intelligence agencies, and other governmental entities. The Deep State supposedly controls state policy behind the scenes, while the democratically-elected process and elected officials are merely figureheads.

এছাড়া, বিবিসি জানিয়েছে আলী রিয়াজের ভাষ্যে বললে ‘ডীপ স্টেট’ হল, “যে কোন পরিস্থিতিতে যখনই রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়, তখন শক্তিপ্রয়োগের ধারা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। তখন যাদেরকে ‘ডীপ স্টেট’ বলে চিহ্ণিত করা হয়, তাদের ভূমিকা বাড়াটা স্বাভাবিক”। পাঠকের সুবিধার জন্য সেটাও এখানে দেয়া হল।

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেটে’ চলে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাকে ওয়েলকাম! কিন্তু এই উপলব্ধি কবে থেকে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। অথচ শুরু থেকেই হাসিনার ক্ষমতার ট্রেন্ড ছিল “ডিপ স্টেটে” বা দানব হওয়ার পথে রওনা দেওয়ার, এটা তো দেখাই যাচ্ছিল। তাই এই যাওয়া আমাদের অনুমান শুরু থেকেই, এটাই তো “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার” নামে ফ্যাসিজম। “মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা-শ্রেণীর’ একনায়কতন্ত্র”। এই জয়ধ্বনিতে, ক্ষমতার বিরোধী বাকি “সকল শ্রেণীকে” গুম-খুন-পঙ্গুতে পিষে দাবড়ে রাখা।

গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনের একটা মূল বৈশিষ্ট্য – তা হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, যেন যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন তিনি এই আড়ালে থেকে এইবার – ইসলামের নামে প্রকাশিত বাংলাদেশের – সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং ততপরতাকে “নির্মুল” করতে গেছে এরা। এই ছিল মুল রাজনৈতিক লাইন। সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক যেকোন ইসলামের নামে প্রকাশিত যেকোন ততপরতাকে “নির্মুল” করতে হবে – এই ছিল লাইন। এটাকেই “যুদ্ধাপরাধের বিচার” করা হচ্ছে এই আড়ালে সম্পন্ন করতে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে এই আড়ালে বসে – ইসলামের নামে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং তৎপরতাকে ‘নির্মূল’ করতে চেয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, এটাই তো বুশ প্রশাসনের (২০০১-৯) ‘টেররিজম’ মোকাবেলা যে, ইসলামের নামে প্রকাশিত ও তৎপর যেকোন ফেনোমেনাকে দমন-নির্মূল করো। আর পরবর্তিতে ২০০৭ সালে এসে কী লাভালাভ হল এই মুল্যায়নে নীতি-নির্ধারকেরা দেখল সব-ভুল। তেমন কিছু অর্জিত হয় নাই। শত্রু কিছুই মরে নাই। উলটা রাষ্ট্র অন্তহীন যুদ্ধে ঢুকে গেছে, মানে যুদ্ধের খরচ বইবার দাইয়ে আটকে গেছে। আর বাড়তি উপহার গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা। তাই বুশ প্রশাসনের টেররিজম নীতি ছিল পরাজয়ের ও অকেজো – সকলে একমত হয়। এরপর থিংকট্যাংক র‌্যান্ডের [RAND] গবেষণা প্রস্তাব [ইতোমধ্যে ২০০৭ সালের শুরুতেই হাতে আসা] অনুসরণ করে বুশ প্রশাসনের শেষ আমলে পুরানা নীতির পথ থেকে সরে ২০০৮ সাল থেকেই বুশ প্রশাসন নতুন ‘টেররিজম’ মোকাবিলার নীতি চালু হয়। পরে ২০০৯ সাল থেকে আরও ভালোভাবে ওবামা প্রশাসন টেররিজম প্রসঙ্গে তাদের নীতি-পলিসিতে বড় সংশোধন আনে। যদিও ইসলামের ‘সশস্ত্র’ ধারাগুলোর বেলায় নীতি মোটা দাগে আগেরটাই থাকে। তবে অন্যান্য ধারা, নিরস্ত্র বা আইনি রাজনৈতিক ধারা – এদের প্রতি সহনশীল এবং একসাথে কাজ করতে হবে। মিসরে হোসনি মোবারককে সরিয়ে নির্বাচনে শাসক ও শাসন বদলানো এবং তাদের সাথে আমেরিকার কাজ করা, এটাই নতুন নীতির (র‍্যান্ড প্রস্তাবের) বৈশিষ্ট্য। টেররিজম নিয়ে আমেরিকার বদলে যাওয়া এই নীতি, এটাই ‘আরব স্প্রিং’ পলিসি বলে পপুলারলি পরিচিত। এসবের বিপরীতে বুশ প্রশাসনের টেররিজমের ‘বাংলাদেশ ভার্সন’ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে থেকে ইসলামের নামে প্রকাশিত সকল সক্রিয় ফেনোমেনাকে নির্মুল ও দমন। আর সুকৌশলে যেকোনো বিরোধী রাজনীতি যেটা ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তাকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দমন-নির্মূল করা। মানে দাঁড়ালো জর্জ বুশের আমেরিকা যে নীতিকে ভুল মেনে সংশোধন করে সরে গেছে বাংলাদেশে সরকার সেই নীতিতে চলেছে। আর ২০০৯ সালের পর থেকে আমেরিকা সেটি উপেক্ষা করে গেছে, দেখেও না দেখে।

আমেরিকার এই অভিজ্ঞতাগুলো তো সকলেরই জানা ছিল। তার মানে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে গত ২০০৯ সালের শুরু থেকেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকারে এই পথই যে নিবে তা আমেরিকার অজানা ছিল না। আর তা মনে করার কোনো কারণও নাই। অথচ তামাশার দিকটি হল – বুশ প্রশাসনের পুরান নীতিটা অনুসরণেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকার পথ নিয়েছিল ।

সেই থেকে ক্ষমতাসীনেরা নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে – উদ্দেশ্য ও কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘ডিপ স্টেটে’ নিয়ে গেছেন। আজ আলী রিয়াজ অভিযোগ করে লিখছেন, “ডিপ স্টেটে” চলে যাবার কথা। বলছেন, বাংলাদেশে “গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা’র ব্যাপক বিস্তার এক ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে”। অথচ সরকার কি এটা ২০০৯ সাল থেকেই শুরু করেনি? শুরুতে এটা কেবল জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনকে প্রবোধ দিয়ে আমেরিকান নীতিনির্ধারক বা থিংকট্যাংকগুলো অন্য দিকে তাকিয়ে এ বিষয়কে উপেক্ষা করে গেছে। কিন্তু এটা কার অজানা যে, হিটলারও শুরুতে তার নাজিজমে নির্মূল তৎপরতা কেবল ইহুদিদের ওপর চালিয়েছিলেন। আর যারা ইহুদি নির্মূল করাকে দেখেও উপেক্ষা করেছিলেন, পরবর্তিতে তারাসহ যাকে হিটলারের শত্রু মনে হত সকলে একইভাবে সকলকে, তাদের সবাইকে নির্মূল করা হয়েছিল। শাসন ‘ডিপ স্টেটে’ চলে গেলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই হয়ে থাকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই আমেরিকার অজানা ছিল না, বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পলিসি কী, সে কোথায় যাবে ও যাচ্ছে। আসল কথাটা হল, ১/১১ ঘটানোর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশকে কোন গন্তব্যে, কোন অভিমুখে যাবে – অর্থাৎ বাংলাদেশের টেররিজম পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকা আর সিরিয়াস থাকে নাই। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমেরিকার কাছে তা অ-গুরুত্বপূর্ণ বা কিছু আসে-যায় না, এমন হয়ে গেছিল। কিন্তু কেন? কারণ, আমেরিকার তার স্বার্থের দিক থেকে আরও গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ দেখতে পেয়েছিল।

বাংলাদেশের টেররিজম ইস্যুর চেয়েও আমেরিকার গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ হাজির হয়েছিল। আমেরিকার যেটাকে দুনিয়াব্যাপী “ওয়ার অন টেরর” বা “টেররিজম ঠেকানো” বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর লক্ষ্যে কাজ করার চেয়েও আমেরিকার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরেক ইস্যু। সেটা হল, ‘চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো’ এই মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতকে কাজ করতে রাজি করানো। বাংলাদেশের টেররিজম নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এর প্রতি ভারতের সমর্থন চাইতে গিয়ে আমেরিকার জন্য নতুন দুয়ার খুলে যায়। ‘চীন ঠেকানো’ হয়ে যায় মুল আলাপের ইস্যু। আর ভারতকে তাতে রাজি করাতে বিনিময় আমেরিকা সওদা করেছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে। এর সাথে অবশ্য ভারত আরও কিছু আদায় করে নিয়েছিল। আমেরিকায় বাজারে নিজের রফতানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে আমেরিকার ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়েছিল। অবশ্য এই সুবিধা ২০১৭ সালের শুরুতে ট্যারিফ আরোপ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রত্যাহার করে নিয়েছে; চুক্তিতেও তাই ছিল।

বাংলাদেশ-ভারত-আমেরিকা কী গত দশ বছর সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম ইস্যুতে একসাথে কাজ করেছে? না সরি; এটা ধরে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, তাহলে এই টেররিজম ইস্যুর সাথে ভারতকে বাংলাদেশের ‘বিনা পয়সা’য় ট্রানজিট দেয়ার কী সম্পর্ক? তা বলতে বা দেখাতে পারতে হবে আগে। কেন ভারত যা চায় তা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের এই নীতি কেন? এটা বাংলাদেশের কোন টেররিজমের, কার টেররিজমের পক্ষে থাকা? কোন বলিদান?
টেররিজমের ইস্যুর আড়ালে আমেরিকা নিজের চীন ঠেকানো ইস্যুতে ভারতকে পাওয়া হাসিল করেছিল। আর আমরা এই সওদার বুটি হয়েছি, আর ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভারতকে সব ধরণের ট্রানজিট দেয়া আর ভারতের দিকে ঝুকে থাকা সরকার কায়েম ইত্যাদি……

আমেরিকা গত ১০ বছর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে একরকম অন্ধ ও উদাসিন হয়ে থেকেছে। আর আমাদের সরকার ‘চেতনার’ শাসনের আড়ালে ইসলাম জঙ্গি দমনের নামে তার ক্ষমতার বিরোধীদের নির্মুল করে চলেছে। রাষ্ট্র তার ফাংশনাল সব প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যাঙ্ক প্রশাসন আদালত সব। তাই এখন বিবিসি ও এর আলোচকেরা গত ১০ বছরে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” বলে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ তুলছেন তা যদি কিছু হয়ে থাকে বা যা যা কিছু হয়েছে – প্রথমত এটা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ আমেরিকা ত টেররিজম মোকাবিলাযোগ্য করে রাষ্ট্র তৈরি করে দিয়েছিল সাথে শাসকও ঠিক করে দিয়েছিল। তাহলে দশ বছর পরে ইসলামিকরণ প্রডাক্ট আসবে না। আর যদি আসে এর জন্য দায়ী কে? এটা কী আমেরিকার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়েই ঘটেছে তা বলা যাবে না! অথচ এরা কেউ বাংলাদেশ সরকার বা আমেরিকার নীতিকে দায়ী করছেন না। আজ হঠাৎ বাংলাদেশ ডিপ স্টেটে চলে গেছে বলে আঙুল তুললেও যেন এর দায় অন্য কারও বলে ব্যাখ্যা দেয়া্র চেষ্টা করছেন। কেন? এটা কি সঠিক? নাকি আমেরিকান পলিসিকে প্রশ্ন করতে হবে, মুরোদ থাকলে পলিসি নির্মাতাদের দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ, সত্যিকার পুনঃমূল্যায়নে যেতে হবে।

মূলকথাটা হল, ভারতের আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’র ঠিকাদারি নেয়াতেই বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে গেল না কোথায় গেল তা নিয়ে আমেরিকার অনাগ্রহের শুরু। আর এসবের ফলাফলেই কালক্রমে আজ আমেরিকাকে পাত্তা না দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ভারত-হাসিনার, দুজনে দুজনার, এমন শাসন হয়ে যাওয়ার গ্রাউন্ড হয়ে দাড়িয়েছিল।

অথচ এক শুভ সকালে বসে আলী রিয়াজ ডিপ স্টেটে চলে যাওয়া বা ইসলামিকরণ – এসব লক্ষ করেছেন করছেন কিন্তু আমেরিকান নীতি ও পদক্ষেপের সাথের এর সম্পর্কের দিকে দেখতে পাচ্ছেন না। যতক্ষণ বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কী এবং কেন – তা না বলতে পারবেন ততদিন এসব আবিস্কার অর্থহীন। যদিও তাতে ইসলামিস্টরা কত খারাপ তা প্রমাণে একে ব্যবহার করা যাবে অবশ্যই।

ওদিকে আর এক বড় কথা, বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করতে চাইছেন। কিন্তু কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করবেন? শুরু থেকেই হাসিনা লাগাতর এক অপ্রয়োজনীয় ইসলামবিদ্বেষী নীতি চালিয়ে গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। অথচ ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ দু’টির মধ্যে ১৯৭১ সালেও কোনো বিরোধ ছিল না। কেউ বিচার এড়ানো যুদ্ধাপরাধী হলে তাকেও সুস্থ পক্ষপাতহীন বিচারপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে কাঠগড়ায় নেয়া যেত। কিন্তু তা বলে যুদ্ধাপরাধীর সাথে ইসলামের কী সম্পর্ক? জামাতের কোন অপরাধ দোষত্রুটি মানে সেটাকে ইসলামের ত্রুটি হিসাবে দেখানো্র ইঙ্গিত করা – এটা তো চরম অসততা। এভাবে কী ইসলামের গায়ে কালি লাগিয়ে দেওয়া যাবে? এটা কী কোন পথ হতে পারে? এর সাথে ইসলামপন্থী রাজনীতি মোকাবিলার পথ ও উপায় হিসাবে একে ব্যবহার করা – এটাই তো চরম ইসলামবিদ্বেষী কাজ। এরচেয়ে আত্মঘাতি কাজ আর কী হতে পারে? এই রাজনীতি তো আজ অথবা কাল নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ ও পরাজিত হবেই।

আর এসব অবিবেচক তৎপরতারই সামাজিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। মানুষ এটাকে সরকারের জুলুম আর চরম বে-ইনসাফি হিশাবে দেখেছে। উলটা ইসলামের প্রতি আরও আগ্রহি ও সহানুভুতিশীল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা যেন রোমের মত। ঠিক এইভাবেই রোম সাম্রাজ্যে ক্রিশ্চানিটির প্রভাব উতখাতে লড়তে গিয়ে শেষে তা সামলাতে না পেরে সম্রাট কনস্টানটিনসহ নাগরিকেরা ক্রিশ্চান হয়ে গিয়ে রোমকে সেই প্রথম ৩৩২ খ্রীষ্টাব্দে ‘ক্রিশ্চান রোমে’ পরিণত করেছিল। আর এখানে গত দশ বছরের হাসিনার শাসনে কার্যত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা আগের চেয়েও আরো বেশি থাকার পক্ষে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এটাকেই বিবিসি ও তার বন্ধুরা বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে আক্ষেপ করছে।

বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে গেছে বলে কারো দিকে আঙুল তোলার আগে তাদের উচিত হবে, আমেরিকার বিদেশ নীতি আর সেই সূত্রে ভারতের নীতির পুনঃমূল্যায়ন থেকে দেখা শুরু করতে হবে। আর সম্ভবত তাতে দেখা যাবে যে, কথিত ‘ইসলামীকরণ’ আসলে আর কিছু নয়, আমেরিকান ফরেন পলিসি, তা থেকে ভারতের পলিসির অপর পীঠ। তাদের পলিসির কারণে ঢাকার সরকার কী করছে তা সকলেই উপেক্ষা করে গিয়েছে। আর ঢাকার সরকারের সবার ওপরে ডিপ স্টেট কায়েম আর চরম ইসলামবিদ্বেষী পলিসির চর্চা যা কিছু করেছে এসবের ফলাফলের অপর পিঠ হচ্ছে কথিত “ইসলামিকরণ”। আর আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এখনকার বাংলাদেশের এই অবস্থাটা শেষ বিচারে আমেরিকার বা ভারতের কোন স্বার্থের পক্ষে যায় নাই। বরং তাদেরকে এর কাফফারা চুকাইতে এখন রেডি থাকতে হবে!

এই পরিস্থিতিতে যারা বাংলাদেশ এক্সপার্ট হয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের কাজে নিজের নাম কামাতে চায় তাদের প্রথম কাজ হবে “ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে অস্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান ত্যাগ করা। বরং আমেরিকার নীতির কোন ভুলে এটা ঘটল তা পুনঃমূল্যায়িত করা এবং সেই পুনঃমূল্যায়িত নীতি, সংশোধিত নীতি নিয়ে এখনও ইতিবাচকভাবে আগালে, পুরান নীতিতে জমে যাওয়া আবর্জনা সাফসুতারা করতে বাংলাদেশের মানুষ এখনও তার পক্ষে সাড়া দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার কি নিজের পলিসি পুনঃমূল্যায়নের সাহস আছে? এই ট্রাম্প আমলে এসে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। আমাদের আস্থায় কমে গেছে।

বিবিসির আলোচ্য রিপোর্টে নির্বাচনে প্রভাব রাখার মতো পাঁচটা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আসল এক ফ্যাক্টরের কথাটাই তারা বলতে পারেননি। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারবে কী বা সুস্থ নির্বাচন কে নিশ্চিত করবে? এটাই তো সবচেয়ে বড় আর নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর সবচেয়ে বড় এই ফ্যাক্টরের ব্যাপারে বিবিসির রিপোর্ট বেখবর।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

গৌতম দাস

১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wo

 

[সার-কথাঃ বুদ্ধিজীবিতা করতে গেলে চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। এটা প্রি-রিকুইজিট বা আগাম শর্ত। পেটের স্বার্থ তীব্র হয়ে গেলে অথবা আপনি নিজেই পেটসর্বস্ব চিন্তাবিদ হয়ে গেলে বুদ্ধিজীবিতা আর আপনার জন্য নয়। কারণ আপনার চিন্তার আর স্বাধীন হবার সুযোগ নাই। পেটের-স্বার্থ চিন্তার উপর আধিপত্য নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে ভারতের সরকার অথবা প্রাক্তন কূটনীতিক বা বুদ্ধিবৃত্তি জগতের কেউ কোনদিন কোন মুল্যবোধ নীতি-নৈতিকতার উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে নাই। নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বা জাতিসংঘের গৃহীত মুল্যবোধের উপরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারলে ভারতের সেসব কথা আন্ডার-স্টেটমেন্ট বা নিম্নতলের খাটো-কথা হয়েই থেকে যাবে; পেটসর্বস্ব কথা যাকে বলে।]

এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় (MEA) কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ঐ অনুষ্ঠান ছিল নিয়মিত ব্রিফিং, বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ কোনো কিছু নয়। বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোয় ৬ ডিসেম্বর তাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি প্রেরিত এমন রিপোর্টে এটা  ছাপা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “এর আগে নানা সময় বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের ভোট নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগ্রহ দেখিয়েছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র রবীশ কুমার এড়িয়ে যান”।

তার মানে, ভারত অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করে না এমন নয়; করেই থাকে এবং সেটা এখানেও তারা অস্বীকার করে নাই। তার পরও কোনো মন্তব্য করেননি মুখপাত্র। কিন্তু তবুও যে কথার অর্থ হয় না, কথার কথা – এমন কথা হিসেবে বলেছেন, “বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না, প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”।

গত ১৭ নভেম্বর প্রথম আলোতে এমনই আর এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা ছিল মূলত একই প্রতিনিধিরই নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে নেয়া কিছু মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াসংবলিত একটি রিপোর্ট। আর সেই মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াদাতা ছিলেন ভারতের কিছু সাবেক এবং বর্তমান রাষ্ট্রদূতও। এ ছাড়া, আরো ছিলেন এক থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব।

১৭ নভেম্বরের রিপোর্ট লিখার আগে বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সাথে সরাসরি সে প্রতিনিধির কথা হয়নি। তবে অন্য কোথাও তিনি যেসব কথা বলেছেন, এমন রেফারেন্সে কিছু কথা সেখানে আছে। যেমন – বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এটা দেখে নাকি ভারত “উৎফুল্ল”। এছাড়া, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও তারা মনে করেন, “সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে ঠিক সময়েই ভোট হবে এবং সেই ভোট হবে “অংশগ্রহণমূলক”; বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকবে” ইত্যাদি।

কিন্তু ঘটনা হল, আমাদের নির্বাচন নিয়ে ভারতের এ’ধরনের প্রতিক্রিয়া পড়তে গিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হল, আমাদের কোনো ইস্যুতে ভারতের “সরকারি অবস্থান” অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট (Intellect) বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কখনোই কোনো “নীতিগত অবস্থানে” অথবা কোনো “মরালের” ওপর দাঁড়িয়ে তারা বলছেন – তা আমরা সাধারণত দেখিনা।

তাদের মন্তব্যগুলো অনেকটা – “মেরা ভারত মহান হ্যায়” ধরনের “জাতিবাদী দেশপ্রেমিকে” (State Interest) বক্তব্যের মত। যেকোন জাতিবাদী শ্লোগান কখনই কোন নৈতিকতা বা নীতির উপর দাঁড়াতেই পারে না যেটা অন্য রাষ্ট্রস্বার্থের ক্ষেত্রেও কাজ করবে, মানে কমন। এজন্য বলা হয় জাতিবাদী শ্লোগান মাত্রই এমন যে, তা সব সময় কোন কমন মরালিটি-ভিত্তিক হয় না। ফলে তা ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম’ সর্বস্ব বক্তব্য। আর যা ভারতের ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিকতা’ সর্বস্ব, তাতে ভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশের কী স্বার্থ? তাই এর সোজা মানে, এগুলা ভারতের সরাসরি একান্ত স্বার্থের দিক থেকে বলা কথা। অর্থাৎ কমন ইন্টেলেক্ট ভ্যালুজ বা “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” – এর ওপর দাঁড়িয়ে বলা কোনো কথা নয়। ভারতের সরকারী অবস্থান বা কোন  ইন্টেলেক্ট বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কোন “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” দাঁড়াতে এখনও কোনদিন পারে নাই। শিখেনি বা পারেনি।

আসলে নীতিগত অবস্থানের উপরে দাঁড়ানো মানে কী? এর মানে হল, এমন এক অবস্থান যার পেছনে কিছু ভ্যালুজ বা মূল্যবোধ বা মরাল কাজ করে আছে। আর “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধ” বলতে যেমন – যেকোন রাষ্ট্রের নাগরিক মৌলিক স্বার্থ (Human values) বা আন্তর্জাতিক মানবিক নাগরিক অধিকার (Civil & political Right)। সব রাষ্ট্রেরই করণীয় ‘নাগরিক অধিকার রক্ষার’ ন্যূনতম কর্তব্য আছে। সেকারণে চাইলে সহজেই, চেষ্টা করলে যেকোনো দু’টি রাষ্ট্রের “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধের” কিছু ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু  উলটা দিকে – এর অনুপস্থিতি মানে, কমন কোন ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে বলা কথা যদি না-ই থাকে, তবে ভারতের সরকারি অবস্থান অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট বা সাবেক কূটনীতিকসহ যে কারো মন্তব্যের কোনো অর্থ-তাৎপর্য বা ভিত্তি থাকে না। যেমন – বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘নাগরিকদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার অধিকার’ থাকতে হবে। এটা মানার মত কী ভারতের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সত্যিই কী আছেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না!

সব রাষ্ট্রেরই কৌশলগত নানা স্বার্থ থাকে, যার ফলে সব সময় সত্যি কথাটা সরাসরি বলতে পারে না। তবে মিথ্যা না বলে, মানে সত্য-মিথ্যার মাঝখানে নিজ অবস্থান অস্পষ্ট, রেখে কথা বলার ধরণ, এটাই যেন কূটনৈতিক ভাষার এক বড় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ তো গেল রাষ্ট্রীয় অবস্থান; তাহলে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তি যিনি সরকারি পদে নেই, তার কোন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারার কোন কারণ নাই। আর এই না পারাটা অগ্রহণযোগ্য। বরং এতে তিনি আসলে একরকম করুণার পাত্র হয়ে যান। আর সোজা ভাষায় বললে তা হয়ে দাঁড়ায় – পেটসর্বস্ব এক লোকের অযাচিত বা গায়ে পড়া কিছু কথা। এর চেয়ে বড় কথা, এতে তাঁর ধান্ধাবাজি ও পেটিস্বার্থের দিকটিও উদোম হয়ে যায়। তবে আমাদের অবজারভেশন বলে, ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান অথবা সরকারি শুভ-দৃষ্টিপ্রাপ্ত থিঙ্কট্যাঙ্কে নিয়োজিত হয়েছেন। খুব সম্ভবত চাকরি শেষের এই নিয়োগের স্বার্থেই তাদের কোন স্বাধীন অবস্থান আমরা দেখি নাই। সারা জীবন দল নির্বিশেষে ‘সরকারি অবস্থানের’ তাবেদারি করতে থাকেন। অতএব এটা পেট সর্বস্ব অবস্থান বলতে পারি, তাই কোন নীতিগত অবস্থানের কোন সুযোগ নাই।

একথা সত্য, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ (State Interest) জিনিসটার গুঢ় দিকটা অনেক সময় মরালিটি দিয়ে গঠিত ও উদ্ভূত হয় না। তাই অনেকের কাছে তা রক্ষা করা কঠিন। এর পরও রাষ্ট্র-সরকারের নীতি-পলিসিগত কিছু ন্যূনতম দিক সেখানে থাকে। চাইলে তা রাখাও সম্ভব; আর তা বজায় রাখতেও হবে যদি নুন্যতম কিছু মৌলিক নীতি নৈতিকতা মেনে চলতে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন। কিন্তু এই মাপকাঠিতে ব্যক্তির, বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়িতদের বেলায় এমন ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে না। সে সুযোগও থাকার কথা নয়।

আবার ‘রাষ্ট্রস্বার্থ’ বলেই তার ক্ষেত্রে সব ছাড়, ব্যাপারটা তেমনও নয়। বাংলাদেশে দিল্লির স্বার্থ আছে, থাকবে। কিন্তু অবশ্যই সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিষয়ক ন্যূনতম কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এরপর সেই স্বার্থ প্রকাশিত হতে  হবে। জাতিসঙ্ঘের বা আন্তর্জাতিক নীতি কনভেনশনের কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার হতে হবে এসবের ভিত্তি। আসলে এমন ভিত্তির ওপর যদি দাঁড়াতে পারি, তবে সেই কারণে আপনাতেই সেখান থেকে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে মন্তব্য করার ভিত্তি ও সাফাই তৈরি হতে পারে। কারণ, উভয় রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের পক্ষের কিছু নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অভিন্নতা, এটাই সেই ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে।

যেমন – “জনগণের ভোট দেয়ার সুযোগ অবাধ হতে হবে”। আর সেই অবাধে দেয়া ভোট থেকেই “একমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতার ম্যান্ডেট প্রাপ্ত” বলে কোন দল বিবেচিত হতে পারে – এটা একটা কমন মুল্যবোধের ভিত্তি হতে পারে। কারণ এই কথাটা কেবল বাংলাদেশের বেলায় নয়, ভারত ত বটেই যেকোন রাষ্ট্রের বেলায়ও সমান ভাবে সত্য। আর এটা যেকোন মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। অতএব এটা হতে পারে  অভিন্ন নৈতিকতা বা মূল্যবোধ। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থ এমনই “দুস্থঃ আর হাভাতে” অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের “ভোট দেয়ার অধিকার”- ন্যূনতম এ দিকটি উপেক্ষা করে হলেও যেকোন উপায়ে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধার করতে হয়! ভারত এমনই দুস্থঃ! এমন জায়গায় পৌঁছে গেছেন ভারতের নীতিনির্ধারক মহল।

গত সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশে আসা আর তাঁর খোলাখুলি হস্তক্ষেপ, এখনও এক রেকর্ড হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, “সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দল নিয়ে” মানে, বিএনপির জোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া এরশাদের সাথে মিটিংয়ে সুজাতা এরশাদকে নির্বাচনে  যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা এরশাদ গণমাধ্যমে প্রকাশও করে দিয়েছিলেন। এরশাদ বলেছিলেন, তাকে ‘পাতানো’ বিরোধী দল হয়ে যেতে বলা হচ্ছে, তা না হলে নাকি ‘বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায়’ এসে যাবে।

আমরা সবাই বিস্ময়ে লক্ষ করেছি সুজাতার সে হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের কোনো বুদ্ধিজীবী, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কেউ কখনো নিন্দা বা সমালোচনা করেননি। নিজেরা লজ্জিত ও বিব্রতও হননি। অন্তত ভারত-সরকারের এই ভূমিকার প্রশ্নে তাদের কোনো ভিন্ন মত আছে, এমনটি দেখা যায়নি। এই হল ভারতের বুদ্ধিজীবীতা!

বাংলাদেশে আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসেছে। আর তাঁরা এই নির্বাচন নিয়ে আবার মন্তব্য করতে এসেছেন। রাষ্ট্র, নির্বাচন, সরকার ইত্যাদি বিষয়ে তারা কী বলবেন? কাকে ভালো, কাকে মন্দ বলবেন? কিসের ভিত্তিতে বলবেন? ভারতের ইন্টেলেক্ট, সাবেক ডিপ্লোম্যাট বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কখনোই যে ভিত্তি তৈরি করা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেননি! এটা তো তাই একধরনের পেটসর্বস্ব বা স্বার্থসর্বস্ব হয়েই আছে সব কিছুতে। এ অবস্থায় এবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”- তখন এই অট্টহাসি দেয়া ছাড়া আর কী করা যায়!  স্বভাবতই এগুলো হাস্যকর ‘অনর্থক কথা’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং হতে থাকবে।

কিন্তু তবু ঘটনার আর এক ভিন্ন সুক্ষ্ম কোণও সম্ভবত আছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমারের এবারের মন্তব্য করতে না চাওয়া – এরও অর্থ আছে অবশ্যই; তাহলে সেটাই বা কী? যে অর্থ না লিখলেও প্রকাশিত হয়ে যায়, সেই অর্থটা কী? এর সোজা অর্থ হল, বাংলাদেশে যা হচ্ছে, এ পর্যন্ত সেটাই ঠিকঠাক; অর্থাৎ যা যা হবে বলে তারা জেনেছে সেটিই ভারতের স্বার্থ ও অবস্থান এর পক্ষেই আছে। দ্বিতীয়ত, এর আর এক অর্থ হল – খুব সম্ভবত ভারত মনে করে এবারের নির্বাচন নিয়ে যদি ভারত প্রকাশ্যে তার “অনুমোদনের কথা” ২০১৪ সালের নির্বাচনের মত প্রকাশ করে ফেলে, তবে সমস্যা হবে। অবশ্যই মূল কারণ এবার বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। যেকোন ভাবে আওয়ামী লীগ আবার জিতেছে এটা দেখতে চাওয়া – এটা তাদের প্রথম চয়েজ বা কাম্য হলেও যদি কোন কারণে প্রধান বিরোধী “জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট” কোনো ‘বিপর্যয়’ ঘটিয়ে ফেলে, তখন কী হবে? এই দুশ্চিন্তা থেকেই সম্ভবত, মূলত তাদের এইসব “অনর্থক কথা” বলে রাখা। এমন অর্থই রবীশ কুমারের ‘না বলা কথা’ প্রকাশ করেছে।

বোঝা যাচ্ছে, ভারত সরকারের মুখপাত্র অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবাই এখনও এমনই কঠিনভাবেই দুস্থ-হাভাতে অবস্থায় আছেন যে, তাদের পক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক ভোটের অধিকার প্রসঙ্গে কোনো নৈতিক অবস্থান নেয়া অসম্ভব। এ কারণেই ভারতের সরকার বা কোনো ইন্টেলেক্টের বিবৃতি-মন্তব্যের কোনো গুরুত্ব তাদের কাছেও নেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “পেটসর্বস্ব বুদ্ধিজীবিতা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

গৌতম দাস

০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2we

 

 

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

শেষ কথাঃ
কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

গৌতম দাস

২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2w6

 

নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং – ফাইল ছবি

আমরা এমন এক দুনিয়ায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলে। শুনতে স্ববিরোধী মনে হলেও কথাটা সত্য। আর তা বোঝার জন্য কথা আরো ভেঙে বলা যেতে পারে। এখন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একই সাথে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলে, এজন্য যে এখন কূটনীতি চলে ইস্যুভিত্তিক। ইস্যুটা কী – আলাদা করে শুধু সেই ইস্যুর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের অবস্থান বা নীতি-পলিসি নিতে হয়। তাই অপর রাষ্ট্রের সাথে একটা ইস্যুতে মিত্রতা বা আপসের একই অবস্থান আছে, অথচ দেখা যাবে হয়ত অন্য ইস্যুতে অপর ঐ রাষ্ট্রের সাথেই শত্রুতা, মানে প্রবল ঝগড়া-দ্বন্দ্বের অবস্থান দাঁড়াতে পারে, দাঁড়াতে হয়। এর অনেক উদাহরণই আছে, তবে এব্যাপারে সম্ভবত সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, চীন-ভারত সম্পর্ক।

ভারত-চীন দুই রাষ্ট্রের নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত বর্তমানে অন্তত চলতি বছরের প্রথম কোয়ার্টার থেকে খুবই নরম ও ঐক্যকামী। কিন্তু এশিয়ার তৃতীয় যে কোনো রাষ্ট্রে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়া দেখা গেলে ভারত এর বিরুদ্ধে চরমতম বিরোধীতায় ততপর। সম্পর্ক-অবস্থান ইস্যুভিত্তিক বলে, ভারত-চীনের এমন খারাপ-ভাল অথবা উত্থান-পতনের সম্পর্কের মাঝেও তাদের এক বড় সফলতা হল য়ুহান সম্মেলন (Wuhan, April 2018)। এটা ছিল যারা ভারত-চীনের ঘনিষ্ঠতায় নিজের স্বার্থহানি দেখেন এমন প্রো-আমেরিকানদের মুখে ছাই দিয়ে, চীন-ভারতের প্রথম কাছাকাছি আসার ভিত্তি তৈরির উদ্যোগে, চীনের য়ুহান শহরে শীর্ষ সম্মেলন।   প্রধান সব রাষ্ট্রের আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির উপর ট্রাম্পের  বাড়তি ট্যারিফ শুল্ক আরোপের যুদ্ধে ভারতকেও তালিকায় যুক্ত করাতে ভারত আমেরিকায় রফতানি বাজার হারানোর পর থেকে এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু। এতে চীন-ভারতের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধে তা পুরা মিটিয়ে না হলেও কমিয়ে আরও কাছাকাছি আসার বিরাট উদ্যোগ ছিল এটা। মোদী চীনের য়ুহান প্রদেশ সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক বিশেষ ধরনের বৈঠকে বসেছিলেন। এই সম্মেলন আর এর প্রবল প্রভাবের কাল ছিল এ বছরেরই গত এপ্রিল-মে মাসজুড়ে।

এটা বিশেষ ধরনের বৈঠক মানে এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে এখানে বলা হয়েছে, এটা ছিল এক “ইনফরমাল সামিট”; মানে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন। অর্থাৎ যে বৈঠকের কথা বিস্তারিত প্রকাশ করতে হবে না। আবার কোনো ইস্যুতে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটি যেহেতু অনানুষ্ঠানিক, তাই এমন বা অমন কথা হয়েছে সে রকম কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড [রেকর্ড অবশ্যই থাকবে কিন্তু তা কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে রেফার/স্বীকার করা হবে না। ] রাখার দায়ও কোনো পক্ষের নেই। এ এক বিরাট সুবিধা। বিশেষ করে ভারতের। কারণ, ভারতে রাজনীতি চর্চার স্টাইল ভোটের সস্তা পপুলিস্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অন্য বিরোধীরা বিদেশে আপোষ করে এসেছে বলে প্রপাগান্ডার নানা অভিযোগ তুলে বসে। আর এই ভয় থাকার কারণে কিছু বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অনেক বিরোধ আর কাটে না।

এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল, পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতের যেকোনো সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ। এই বিচারে য়ুহান সম্মেলনে আলোচনার কাঠামোই এমন ছিল যে, এখানে সেসব সমস্যা নেই। ফলে এই সম্মেলনে চীন-ভারতের বহু বা প্রায় সব ইস্যুতে দুই শীর্ষ নেতা মন খুলে কথা বলেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণ রাখার ভয় ভুলে, না রেখে বা ফরমাল নোট না রেখে। দোভাষী ছাড়া অন্য কোনো সহায়ক ব্যক্তিকেও কোনো পক্ষ সাথে সেখানে রাখেন নাই।

অথচ এখানেই উভয়পক্ষ বহু বিষয়ে বিরোধ মীমাংসার মৌলিক নীতিগত দিক সেটেল করেছেন। যাতে এই মৌলিক নীতিগত দিকের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বহু অমীমাংসিত ইস্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান টানা হতে পারবে। এটি ছিল এই সম্মেলনের বড় সুবিধা।

তবে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি নিয়ে চলার দুনিয়ায় আমরা এসে পৌঁছানোতে কি ব্যাপারটা খারাপ হয়েছে?  না, অবশ্যই নয়। তাহলে খারাপের ধারণা কেন আসছে?  আসলে ‘খারাপ’ হতে পারে এই ধারণাটাই হল – কোল্ড ওয়ার আমলের (১৯৫০-৯১) চিন্তার অভ্যাসে বলা কথা। কারণ, কোল্ড ওয়ার মানেই দুনিয়াকে পরস্পর দুই শত্রুর দু’টি রাষ্ট্রের গ্রুপে – সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা এভাবে দুটো ব্লকে দুনিয়াকে ভাগ করে ফেলা। এটা এমনই ব্লক যে, এখানে শত্রুতা ছাড়া অন্য কিছুর জায়গাই নেই। একেবারে হিন্দু জাতপ্রথার ছোঁয়াছুঁয়ির মত দুই রাষ্ট্রজোটের পরস্পরের সাথে সম্পর্কহীন থাকা আর শত্রুতাই এর একমাত্র বাস্তবতা। তবে আলোচ্য এখানকার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল, কেন এমন সম্পর্কহীনতার দুই ব্লক সেকালে চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল? এর জবাব হল, মুল কারণ যেহেতু দুই ব্লকের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, তাই এটা টিকে ছিল। অর্থনৈতিক বা বিনিময় সম্পর্ক মানে হল – কোনো পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগ এর বিনিময় সম্পর্ক। ফলে এমনকি কোনো ভাব বিনিময় সম্পর্কও সেখানে ছিল না। তাই সম্পর্কহীনতার দুই রাষ্ট্রজোট বা ব্লক চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল।

বিপরীতভাবে বললে, এ কালে সম্পর্কহীনতার এমন কোনো দুই ব্লক থাকা সম্ভব নয়। অথবা ইতিবাচকভাবে বললে, একালেই ‘য়ুহান ইনফরমাল সামিট’ সম্ভব। কেন? এর মূল কারণ দুনিয়ায় এখন আগের সোভিয়েত ব্লকের সকলেসহ সব রাষ্ট্র একই “গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার” – এর নিয়মশৃঙ্খলার অংশ। তাই সবধরণের পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগসহ সব ধরণের বিনিময় সম্পর্ক ওতপ্রতভাবে জড়িত। ভাব-ভাষাও।

পুঁজির জন্ম-স্বভাব হচ্ছে গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবাল থাকা; তাই সে দুনিয়াজুড়েই বিস্তৃত হবে। লোকাল পুঁজি বা কেবল কোন এক ছোট ভুগোলের পুঁজি বলে কিছুই থাকবে না। তাই, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের প্রতিটি কোনায় বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া পুঁজিতান্ত্রিক তৎপরতাগুলো ক্রমেই অপরাপর কোণের ততপরতাগুলো এরা পরস্পরের হাত ধরে ফেলবে, আর ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতরভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাবে। আর এই সম্পর্ক মানে? মনে রাখতে হবে, এটা হল পরস্পরের ওপর পরস্পরের গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক সম্পর্ক। এক গ্লোবাল সমাজ হয়ে উঠা। আবার একই ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার’ – এই সিস্টেম শৃঙ্খলার অংশ বলেই এটা সহজ এবং তা হতে বাধ্য। এই ইতিবাচক দিকটিই চীন-ভারতের চরম স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাতের মধ্যেও “য়ুহান ইনফরমাল সামিট” ঘটিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছিল।

চলতি ২৩-২৪ নভেম্বর ২০১৮, চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার ২১তম বৈঠক শুরু হয়েছে। ২১তম মানে এ ধরনের বৈঠকের শুরু অনেক পুরানা দিনে, সেই ২০০৩ সালে বাজপেয়ির চীন সফর থেকে। চুক্তি বা বুঝাবুঝি অনুসারে এর বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দুই রাষ্ট্রপক্ষের পূর্বঘোষিত স্থায়ী দুই ‘স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ থাকবে। আর তাদের উদ্যোগে ডায়ালগের মাধ্যমেই চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধের সমাধান তারা খুঁজবে। ভারত-চীনের সীমান্তের অনেক জায়গায় উভয়পক্ষের একমতে টানা সীমান্ত বা ‘ডিমারকেটেড’ বা চিহ্নিত নাই। এই অচিহ্নিত সীমান্ত সমস্যা সেই কলোনি আমল থেকে, এটা অমীমাংসিত হয়ে থেকে যাওয়া সমস্যা। সেটাই মিটানোর চেষ্টাই এর উদ্দেশ্য। সে হিসেবে এই বৈঠক এখন রুটিনের মতো হয়ে গেলেও য়ুহান ‘ইনফরমাল সামিট’-এর পরে এর গুরুত্ব এবার অনেক বেশি। কেন?

কোনটা, কত দূর কার সীমানা – সে ব্যাপারে উভয়ের একমত হয়ে এভাবে পুরো চীন-ভারত সীমান্তকে ‘চিহ্নিত সীমানা’ হিসেবে এঁকে ফেলা অবস্থায় পৌঁছানোই ‘এমন বিশেষ বৈঠক’ উদ্যোগে এবারের লক্ষ্য।  এখানে LAC বা ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ বলে উভয় পক্ষের একমতে একটা ধারণা আছে। সেটা হল, এক মতে “সীমানা চিহ্নিত” করে ফেলার আগে এখন সীমান্ত-ভূমি যেখানে যার দখলে যা আছে ও স্থিতাবস্থায় আছে, সেটাকেই উভয়ে “লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি” বলে মানে। যেটাকে আসলে “অস্থায়ী কিন্তু বাস্তব সীমানা’ বলা যায়। এবারের ২১তম আলোচনায় উভয়পক্ষ এখানেই এক নীতিগত জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। তা হল, সীমানা বিরোধ মিটানোর কাজে অগ্রগতি আর কিছু হোক আর না-ই হোক, বর্তমান এলওসি বা “অস্থায়ী বাস্তব সীমানা”- এটাকেই উভয়পক্ষ ‘বেস্ট অপশন’ বা সবচেয়ে ভাল সমাধান বলে মেনে নিবে। [“best option is “as it is; where it is”.] এ বিষয়ে উভয়ের ঘোষিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। এরপর আরও আলোচনা চলবে উভয়ের একমতে এরচেয়েও ভাল সমাধান খুঁজে পেতে।

সুতরাং চীন-ভারতের সীমান্ত আলোচনায় “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” কথাটার বিশেষ মানে আছে। এখানে ভারত-চীন কাকে নিজ নিজ পক্ষের “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” বলে ঘোষণা করে রাখবে – সেটা এপর্যন্ত দেখা অভিজ্ঞতা বলছে এটা চলতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নিরাপত্তা  উপদেষ্টা অথবা চীনের ক্ষেত্রে পলিটব্যুরোর বিশেষ সদস্যকেও হতে দেখা গেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এবার থাকবেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। আর চীনের দিক থেকে ছিলেন  পলিটব্যুরোর এক বিশেষ প্রভাবশালী সদস্য। এবার সভা থেকে তাঁর বদলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই দায়িত্বে পাবেন। আসলে “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” এরা মূলত সীমান্ত ইস্যুতে কথা বলার জন্য হলেও এর একটা স্থায়ী দায়ীত্বের পোস্ট বলে এদের কিছু আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ উভয়পক্ষ বাড়তি ইনফরমালি অনেক মনের কথা বলার সুযোগ ও দায়িত্ব এরা পালন করে থাকে। যেমন এরা এবার চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ”(BRI) [ এতে যোগ দেওয়ার অফার এপর্যন্ত ভারত ফিরিয়ে দিয়ে আসছে ] নিয়েও কিছু কথা বলবেন।  ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে,  “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” অজিত দোভাল এলএসি, বিআরআই এবং অন্যান্য ইস্যুর সাথে নিরাপত্তা নিয়েই কথা বলবেন। [Ajit Doval will discuss security along the Line of Actual Control (LAC), belt and road initiative (BRI) and other issues]।

ভারতের এক প্রাক্তন কূটনীতিক এমকে ভদ্রকুমার। ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান; মানে প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নিতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি হাতেগোনা দু-তিন কূটনীতিকের মধ্যে একজন, যিনি তা নন। উজবেকিস্তান ও তুরস্কে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভদ্রকুমার, যিনি ভারতের ভবিষ্যৎ আমেরিকার মধ্যে দেখেন না। সেই ভদ্রকুমার দেখছেন, চীনের সাথে ভারত তার নানান বিরোধের ইস্যুগুলো মিটাতে এখন প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠতে; একালের চলতি সময়ে মোদির ভারতকে।

অবশ্য শুধু সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার বৈঠক দেখে তিনি এ কথা বলেননি। তিনি আরো এক ইস্যু দেখেছেন। এই ১৩-১৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটা আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ মোট ১৮ রাষ্ট্রের এক সম্মেলন; যার শুরু হয়েছিল আসিয়ান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সাথে অন্যান্য ইস্ট এশিয়ান রাষ্ট্রকে নিয়ে। অর্থাৎ এখন এতে বাড়তি অনেককেই সদস্য করে নিয়েছে।

এবারের এই বৈঠক থেকে চীনের অর্জন অনেক। এখানে চীন-সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপগ্রেড ভাষ্য) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভদ্রকুমার বলছেন,  এতে এই প্রথম “বেল্টরোড উদ্যোগ”ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। [One highlight is the signing on Monday of an upgraded Free Trade Agreement between China and Singapore to include Belt and Road Initiative for the first time.] বলাই বাহুল্য, যারা চীনের ‘বেল্টরোড উদ্যোগে’ অন্তর্ভুক্ত হতে আপত্তি বা দ্বিধা করে থাকে, তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম ছিল। বিশেষ করে যেখানে আবার পশ্চিমের কাছে সিঙ্গাপুর এক বিশেষ অর্থ ও গুরুত্ব বহন করে। যেখানে তারা সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলেছিল ফ্রি-পোর্টসহ পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের এশিয়ান স্টোর/গোডাউন হিসেবে; আর একই সাথে ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ পুঁজির স্থানীয় বা বর্ধিত অফিস হিসেবে। এই হল ফ্রি-পোর্ট সিটির সিঙ্গাপুর; মানে বিনা মাশুলে পুনঃরফতানিযোগ্য করে নিয়ম বানানোর সিঙ্গাপুর। পশ্চিমের সেই সিঙ্গাপুরে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগকে একালে জায়গা করে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, আজকাল খোদ সেই সিঙ্গাপুরও চীনের ওপর কত বিরাট নির্ভরশীল। সেটা কী রকম?

পশ্চিম চীনের সাথে বহু সম্পর্কই করে থাকে সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, সিঙ্গাপুরে অফিস খুলে। যেমন একটা উদাহরণ দেই। আজকাল চীনে উঠতি সম্পদের মালিক যারা, এমন যাদের এক মিলিয়ন ডলার বা এর বেশি অর্থ বাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আছে – এমন এদেরকে বাজারে নিয়ে আসা সহজ করতে সাহায্য করতে, এমন ব্যক্তি ক্লায়েন্টদের ধরতে আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে অফিস খুলেছে। আর সেখান থেকে তাদের রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা চীনে সরাসরি ক্লায়েন্টদের বাসা সফর করছে। ফলে সার কথায় সিঙ্গাপুর আর কেবল পশ্চিমের এক্সটেনডেড দোকান থাকেনি, চীনেরও হয়ে উঠছে। তাহলে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগে নতুন অন্তর্ভুক্তি, সেটা শুধু কি সিঙ্গাপুরই?

না আরো আছে, আরও বড় সে নাম হল খোদ জাপান। কারণ কী? ব্যাপারটা হল, চীনের নতুন এক সিদ্ধান্ত। এমনিতেই চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগ এক বহুরাষ্ট্রীয় (৬৫ রাষ্ট্রেরও বেশি) অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প। ফলে ভুগোলের বিচারে এতে বিনিয়োগ সুযোগের বড় অংশই চীনের বাইরে। চীন ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগের’ অংশ হিসেবে তৃতীয় রাষ্ট্রে চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগে সিঙ্গাপুর বা জাপানকে সংশ্লিষ্ট হতে চীন অফার (Investment in Third Country) দিয়েছে। এতে সিঙ্গাপুরের মত জাপানও প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

ওদিকে সবকিছুর পালটা কিছু থাকে। তাই, এশিয়ায় চীনের ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’-এর পাল্টা আমেরিকান নেতৃত্বের যে উদ্যোগ আছে, সেটি মূলত “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি” নামে হাজির আছে। আর এর সহযোগী উদ্যোগ হল “কোয়াড”(QUAD) , মানে চীনবিরোধী ‘আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া’ এই চারদেশীয় জোট। কিন্তু কখনই এই চার দেশ একসাথে একমতে খাড়া হতে পারেনি। কমন ভাষায় একটা বিবৃতি দিতে পারে নাই। এর মূল কারণ, এরা সবাই চীনের সাথে নানান ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িয়ে আছে আবার একই সাথে অন্যন্য স্বার্থবিরোধে জড়িয়ে থাকার কারণে আমেরিকার সাথে এক কমন প্লাটফর্মে আসতে চেয়েছে কিন্তু বড় কিছু করে দেখাতে অসফল। ফলে সব সময়ই দেখা গেছে এই চারের কেউ একজন চীনের সাথে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাবল্য অনুভব করে বাকিদের সাথে থাকেনি।

‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’ চীনের সাথে তৃতীয় রাষ্ট্রে যৌথ বিনিয়োগের অফার পাওয়া জাপান, তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝাতে ভদ্রকুমার কিছু ঘটনা টেনেছেন। তাঁকে এক জাপানি কূটনীতিক বলছেন, “আমাদের কিছু আসিয়ান সদস্য বেল্ট-রোড উদ্যোগের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে তুলনা করতে পছন্দ করছে না”। [“Some ASEAN members didn’t like the idea of having to make a choice between an Indo-Pacific strategy and the Belt and Road Initiative]।  ফলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে এরপর “ইন্দো-প্যাসিফিক” শব্দটি বলা বন্ধ করেছেন। তা না বলে এর বদলে বলছেন “ভিশন”। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাপানি কর্মকর্তা বলছেন, আসলে “স্ট্র্যাটেজি শব্দটির মধ্যে অন্য রাষ্ট্রকে পরাজিত করানোর একটা অর্থ লেপটে আছে, সে কারণেই এই পরিবর্তন”। অর্থাৎ জাপানও কোয়াড থেকে নিজেকে দূরে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ছাড়া ছাড়াভাবে চলা কোয়াডের যুগ্মসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকে ভারত যোগ দিচ্ছে। সেই রেফারেন্স তুলে ভদ্রকুমার বলছেন, জাপান ভারতকে পেছনে ফেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেল। এভাবে এশিয়া-প্যাসিফিকের ভূকৌশলগত অবস্থা পরিস্থিতিই বদলে যাচ্ছে। আর মোদির ভারত এতে বিরাট কিছু সুবিধা হারাচ্ছে, অথচ নিজ অবকাঠামোগত সুবিধা পাওয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

শেষ কথাঃ
শেষ বিচারে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক গন্তব্য-অভিমুখ হল তাদেরকে পরস্পর ঘনিষ্ট হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে হাত ধরে উঠে দাঁড়ানো। আমেরিকা দুনিয়ার অতীত, যেখানে চীন আগামি। ভারতকেও আগামির অংশ হওয়ার খাতিরে খাবলা-সুবিধা নেয়া ত্যাগ করে স্থির-পক্ষ নিতে হবে। কিন্তু মায়ের দুষ্ট ছেলের মত প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে ভারত প্রায়ই টেবিল ছেড়ে চলে যায়; যার অনিরাপদবোধও আছে। এসবের মানে আবার এই না যে চীনের সিদ্ধান্ত বা অবস্থান সবসময় ফেয়ার বা বেস্ট হয় বা থাকে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন-ভারতের শত্রুতা ও মিত্রতা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

গৌতম দাস

২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2vW

 

 

এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

গৌতম দাস

১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2vK

সৌদি নাগরিক, জার্নালিষ্ট জামাল খাশোগি এ সময়ের বিশ্বে এক আলোচিত নাম। আশির দশকে আর এক ‘খাশোগির’ নাম আমরা তখন শুনেছিলাম, আদনান খাশোগি। ড্রাগ বা অস্ত্রের মতো চরম নিষিদ্ধ বা বেআইনি পণ্যের পেমেন্ট লেনদেনে জড়িত ব্যাংক বিসিসিআইর ডিরেক্টর ছিলেন আদনান। তাই তিনি ‘কুখ্যাত’ আর বিপরীতে জামাল দুনিয়ার সহানুভূতি পাওয়া, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যক্তিত্ব। সেকালের পত্রিকায় লেখা হত, ‘সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি’। “খাশোগি” নামের সেই বাংলা বানানই বজায় রাখলাম এখানে। আর সেই আদনান খাশোগির ভাতিজা হলেন জামাল খাশোগি।

জামাল খাশোগির দাদা মোহাম্মদ খাশোগি ছিলেন মূলত তুরস্কের নাগরিক, এক ডাক্তার। তিনি সৌদি আরবে এসে সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর রাজ পরিবারের সাথে স্বভাবতই তাঁর  ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। পরে এক সৌদি নারীকে বিয়ে করে তিনি সৌদি নাগরিক হয়ে যান। তারই নাতি জামাল খাশোগির জন্ম ১৯৫৩ সালে সৌদি আরবে। জামাল রাজ পরিবারের সাথে রক্তের সম্পর্কের কেউ নন। কিন্তু তা না হলেও দাদার সূত্রে, রাজ পরিবারের অনেকের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়ে ওঠেন। তবে সেটা হওয়ার পেছনে আর একটা ফ্যাক্টরও গুরুত্ব ছিল – যখন জামাল পড়ালেখায় আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতায় ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

তবে জামালের এরপরের পরিচিতি অঙ্গনটা হয়ে যায় মূলত – মধ্যপ্রাচ্যের মূলত দেশিবিদেশী ইংরাজি মিডিয়ার জগত। চাকরি সূত্রে তিনি ‘সৌদি গেজেট, আরব নিউজ, আল ওয়াতন ইত্যাদির পত্রিকার সাথে জড়িয়ে পড়েন। প্রিন্ট মিডিয়ায় সাধারণ রিপোর্টার থেকে প্রধান সম্পাদক, আর টিভি মিডিয়াতে নিউজ এডিটর থেকে ডিরেক্টর – এভাবে পুরো নব্বইয়ের দশক হল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে জামাল খাশোগির উত্থান কালপর্ব। এ সময়েই এক ফাঁকে ফেলো সিটিজেন ওসামা বিন লাদেনের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন এবং  সোভিয়েতবিরোধী  মুজাহিদিনদের সেই প্রতিরোধে লড়াইয়ের সময়কাল থেকে কয়েকবার তিনি লাদেনের সাক্ষাৎকার ছেপেছেন। তবে অবশ্যই আমেরিকায় টুইন টাওয়ার হামলার পরে সেই বিন লাদেনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ভিন্ন বিষয়।

তবুও অনেকের সাথে সেসব পুরনো পরিচয় আর বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও তার গঠন সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা একদিকে; অন্য দিকে পশ্চিমের চিন্তার সাথেও তাঁর পরিচিতি আর পশ্চিমের ভাষায় তা উপস্থাপনের দক্ষতার জন্য জামাল গুরুত্বপূর্ণ ‘রিসোর্স পারসন’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে ওঠেন। পারিবারিক সূত্রের সুবিধায় রাজপরিবারের নানা প্রজন্মের অনেক সদস্যের সাথে তার স্বাভাবিক পরিচয়ও ছিল। তেমন একজন হলেন এক প্রিন্স, তুর্কি বিন ফয়সল বিন আব্দুল আজিজ। পুরো আফগান মুজাহিদিন লড়াইয়ের সময়কালে তুর্কি ছিলেন সৌদি গোয়েন্দাবাহিনীর প্রধান। তিনি আসলে মুজাহিদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে যারা সৌদি ফান্ডের সাথে সম্পর্কিত তাদের অর্থ বিতরণ আর নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও পরিচালনা করতেন। পরে ২০০১ সালের দিকে গোয়েন্দাপ্রধানের কাজ ছেড়ে কিছুদিন তিনি সৌদি আরবে ফিরে গিয়ে সেখানেই ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি লন্ডনে বা আমেরিকায় কাটিয়েছেন, বিশেষ করে পড়ালেখার সূত্রে। পরে ২০০৫ সালে তিনিই ব্রিটেনে সৌদি রাষ্ট্রদূত যুক্ত হন। আর সেই সময় তিনি জামাল খাশোগিকে তার মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করেন।  আর সর্বশেষ তিনি সৌদি ডিফ্যাক্টো রাজার ক্ষমতায় হাজির থাকা যুবরাজ, মোহাম্মদ বিন সালমন (MBS) এর প্রতিহিংসা স্বীকার হতে পারেন, এই ভয়ে আগেই  আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ  গিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় কলাম লিখতেন। কিন্তু যুবরাজের ব্যক্তি প্রতিহিংসা থেকে বাঁচতে পারলেন না।

এই জামাল খাশোগি গত ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে প্রবেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখান থেকে গুম বা খুন হয়ে যান। আমাদের মূল আলোচনার প্রসঙ্গ এখান থেকে। জামালের দুর্ভাগ্য যে তিনি এক মনার্কি (monarchy) বা রাজতন্ত্রের দেশের নাগরিক। বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা লাভের দিক থেকে তিনি পশ্চিমের আলোতে বড় হয়েছেন, ফলে যথেষ্ট আলোকিত বলা যায়। এরপরেও তার দুর্ভাগ্য, তিনি রাজতন্ত্রের জমিদারসুলভ  ফিউড্যাল অহঙ্কারের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছেন। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, বাদশার ছেলে নিজের ফিউড্যাল জেদ পূরণ করতে তাঁকে নৃশংসভাবে খুন করেছেন। এখানে ‘নাগরিক’ শব্দটা ব্যবহার করেছি বটে, কিন্তু শব্দটা রাজতান্ত্রিক শাসনের সাথে মানানসই শব্দ নয়। ধার করে আনা।

রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থাকে দুই ধরণে ভাগ করা যায় – অতীত ব্যবস্থা আর চলতি বা মডার্ন ব্যবস্থা। অতীত ব্যবস্থা বলতে আগেকার রাজতন্ত্র বা বাদশা-আমিরিতন্ত্রের ডাইনেস্টি বা বংশীয় শাসন ব্যবস্থা। এরা সবই এক ক্যাটাগরির। আর এদের সবার বিপরীতে ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র থেকে রিপাবলিক মানে সব সমাধান পেয়ে যাওয়া নয়। তবে এক মৌলিক বদল আর তা স্বাভাবিক বদল না একেবারে লাফানো বদলের উল্লফন। আবার না, অবশ্যই এটা প্রাচীন “রোমের রিপাবলিক” নয়; তাই ফারাক টানতে অনেক সময় একে ‘আধুনিক প্রজাতন্ত্র’ বা ‘মডার্ন রিপাবলিক’ বলেও উল্লেখ করা হয়। মূলত অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে (১৭৮৯) ও স্বাধীন আমেরিকায় (১৭৭৬) এর উত্থান ও সূচনা। এর প্রথম বাস্তব রূপ। তবু ‘মডার্ন’ শব্দটা শুনেই মনে এক অপছন্দের ভাব আসতে সুযোগ দেয়া, নিজের চায়ের কাপ নয় মনে করতে শুরু করা বা, নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়া অথবা এটা আমাদের জন্য নয় – এ ধরনের মনে করাগুলা ভুল হবে।

‘রাষ্ট্র’ কথাটা আগে মানে রাজতন্ত্রের রমরমা যুগেও ছিল মনে করা বা এমন বাক্য লিখে ফেলে বা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করে ফেলে অনেকে। ব্যাপারটা হল একালে আধুনিক রাষ্ট্রের যুগে দাঁড়িয়ে সেকালের রাজতন্ত্রকে বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক সময় অসতর্কে সবকিছুকেই ঢালাওভাবে রাষ্ট্র বলে ফেলেন অনেকে। অথবা একটা যেকোন ‘শাসনব্যবস্থা’ মাত্রই তা রাষ্ট্র এমন বর্ণনামূলক অর্থে এখনো কেউ কেউ ব্যবহার করে বসেন। কিন্তু ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ধারণাটা বাস্তবতা হয়ে ওঠার পরে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটা একটা স্তরে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ দুনিয়াতে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা উত্থিত হতে হতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে এসে এটা একটা স্পষ্ট ধারণার স্তর পার হয়ে বাস্তব হয়েছে মনে করা হয়।

কারণ যেকোন শাসন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় প্রবেশেরও আগের প্রশ্ন, দুনিয়াদারিতে মানুষের তৈরি ব্যবস্থায় মানুষকে শাসন করতে পারে কে? শাসন করার ক্ষমতার উৎস কী? বা শাসনক্ষমতা কোন শাসককে কে দিয়েছে, কোথা থেকে পেয়েছে?  এই প্রশ্নের জবাব রাজতন্ত্রের কাছে নাই। আকার ইঙ্গিতের মানে হল জবরদখল। এই প্রশ্নের সুরাহা হয়েছিল যে মানুষ একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসনের অধিকারী। এই স্ব-ক্ষমতাটাই মানুষ দল বেধে জনগোষ্ঠিগতভাবে কাউকে সাময়িক ডেলিগেট করে দিলে, কাউকে সেই ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করতে দিলে তবেই কেউ একজন (সাময়িক) শাসক হতে পারে। আর এই সুরাহার পরেই দুনিয়া থেকে রাজা-সম্রাটের শাসনের মনার্কি ব্যবস্থা লোপাট হতে শুরু করেছিল। আর নতুন ব্যবস্থারই সাধারণ নাম রিপাবলিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র। অনেকে এটা রাজা ধারণার বিপরীত ধারণা বলে আর রাজার বিপরীত শব্দ বলে মনে করা প্রজা ধারণা চালু ছিল বলে রিপাবলিকের বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ চালু করেছিল। এরই প্রথম নতুন বা মর্ডান রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দিতে। তবে আমেরিকা ও ইউরোপ এরপর থেকে এক রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চলে গেলেও সেই ইউরোপই আবার অন্যদেশে উপনিবেশ গড়া শুরু করেছিল। ইউরোপ সারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় কলোনি দখল ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। যেটার আবার সমাপ্তি ঘটেছিল কেবল গত শতাব্দির মাঝামাঝি।  “যেকোন জনগোষ্ঠি কার দ্বারা শাসিত হবে সেটা বেছে নিবে একমাত্র নিজেরা – এটাকে ভিত্তি মেনে নিতে গ্লোবালি বা দুনিয়াজুড়ে একমত হতে দেখা দেখা গিয়েছে একমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পরেই। এটা হল রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা উত্থান ও বিস্তারের এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। রাজতন্ত্র থেকে পুর্ণ উত্তরণ তা যথেষ্ট না হলেও এক লম্বা লাফ অবশ্যই।

সেকারণে একটা ‘লাইন’ টানা হইয়ে যাওয়া যে, আর রাজতন্ত্র নয়, অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের পেছনে আর না যাই। আর ‘রাষ্ট্র’ শব্দ রিপাবলিক শব্দের সাথে সম-উচ্চারিত অর্থে সমার্থক হয়ে যাওয়া। রাষ্ট্র কেবল রিপাবলিকের সাথে ব্যবহার করা হবে এমন শব্দ হয়ে যাওয়া। তবে পরিস্কার থাকতে হবে, একইসাথে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা একটা ক্রম বিকাশমান শব্দ ও ধারণা। যার একটা বড় পর্যায় বা স্তর হলো অষ্টাদশ শতক। এটা ক্রমশ আরো বিকশিত ও স্পষ্ট হয়েছে আর নিজেকে শুধরে নিচ্ছে। মূল কথা ফরাসি বা আমেরিকান রিপাবলিকই সবকিছুর মডেল নয়; তা হতেই হবে এমন নয়।

কারণ রাষ্ট্র ধারণাটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, ‘ক্রমশ খুলছে, স্পষ্ট ফুটে উঠছে’, আইডিয়া আসছে ও পরিষ্কার হচ্ছে। তবে কেবল প্রধান বা মৌলিক বৈশিষ্টের দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে। যেমন অন্তত বাদশা-আমিরিতে ফেরত যাবেন না। আর এমনিতেই ইতোমধ্যে রাষ্ট্র ক্রম চলমান এক উত্থিত ধরনের আইডিয়া হিসেবে এর কত কী বদলে গিয়েছে তার স্টক মিলাতে পারি, সে হিসাব আমল করতে পারি।  যেমন দেখেন, রুশ বিপ্লব (১৯১৭) বা চীন বিপ্লবে (১৯৪৯) প্রাপ্ত রাষ্ট্র, অথবা কলোনি শাসন-মুক্তির মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো উত্থিত রাষ্ট্র (১৯৪৫ এর পরে যেমন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ১৯৪৭), এমনকি সর্বশেষ ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯)- সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রাপ্ত রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ কথাটা জুড়ে দেয়া আছে। অর্থাৎ বিপ্লব শেষে সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নামের সাথে নিজেরাই ‘রিপাবলিক’ শব্দ জুড়ে রেখেছেন যদিও এই সবগুলো রাষ্ট্র একই ধরনের নয়। যেমন লেনিনের ‘রুশ বা সোভিয়েত রিপাবলিক’ নিশ্চয়ই ১৭৭৬ সালের ‘আমেরিকান রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মতো নয়, এমনকি মাওয়ের চীনা ‘পিপলস রিপাবলিক’ (১৯৪৯) সেটাও ১৯১৭ সালের রুশ ‘সোভিয়েত রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মত নয়। অর্থাৎ সবখানেই কিছু না কিছু নতুন গড়ন বৈশিষ্টের ছাপ আছে। নতুন আইডিয়া, নতুন প্রয়োজন, নতুন বাস্তবতা ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। এমনকি,  ঠিক তেমনি ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক (১৯৭৯) আগের দেখা কোনো রিপাবলিকের মত নয়। সেখানেও প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে।

আবার আমাদেরই “পাকিস্তান রিপাবলিক” এর দিকে যদি দেখি, প্রথমত এদিকে তো ভালমত তাকানোই হয় নাই, তাচ্ছিল্যেই কেটে গেছে; অথচ এই রাষ্ট্রেরও মৌলিক দিকটা ছিল যে এটা রিপাবলিক – কোন রাজতন্ত্র নয়, কোন খলিফা-ডায়নেস্টি নয়। তবে এটাও সত্য যে এই রিপাবলিক পরিচয়ের চেয়ে ওটা “ইসলামি” সেই পরিচয়ের কদরই বেশি বেশি হয়েছিল। যা হোক, মূলকথাটা হলো, বস্তুত সব নতুন ‘রিপাবলিক রাষ্ট্রই’ বিশেষ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে থাকে। তার জন্ম ও গঠনে বহু নতুনত্ব থাকে, এ অর্থে প্রত্যেকটা অনন্য। যার মূল কারণ হল, আগেই হয়ে থাকা  বা যে গিভেন বাস্তবতায় একটা জনগোষ্ঠী নতুন রাষ্ট্র গঠনে প্রবৃত্ত হয় – সেই বাস্তবতা প্রতিটা হবু রিপাবলিক রাষ্ট্রের বেলায় অন্যন্য হবেই।

ওদিকে আমাদের অনুমানেও বড় কিছু গলদ রয়ে গেছে। যেমন একটা শাসক বা শাসন  ব্যবস্থা থাকা যদি আমরা দেখি তাতে আমরা গুলায় ফেলে ভাবি নিশ্চয় ওটাও রাষ্ট্র। যেমন রাজতন্ত্রী দেশগুলোতেও একটা শাসনব্যবস্থা আছে, তাদের শাসকও অবশ্যই, কিন্তু তারা কেউই রাষ্ট্র্র মানে রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। ক্ষমতা কী করে তৈরি হচ্ছে উৎস কী সে সম্পর্কে কাগজপত্রে কনষ্টিটিউশনে জন-উতস হতে হবে। যদিও এরপরে এর লম্বা সময় লাগে, প্রতিশ্রুতি লাগে যাতে সামাজিক-রাজনৈতিক চর্চায় তা বাস্তবে কার্যকর করা যায়।

‘নাগরিক’ শব্দটা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র কাদের নিয়ে গঠিত হবে? গঠনের সেই উপাদান বা ‘কন্সটিটিউয়েন্ট’ হল নাগরিক। এ অর্থে নাগরিক, এই মৌল উপাদানে রাষ্ট্র গঠিত। এবং অ-বৈষম্যমূলকভাবে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা সবাই সমান। আর এই ব্যক্তি নাগরিকের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাজতন্ত্রে এ জিনিসের বালাই থাকে না। এ ছাড়া, রাজতন্ত্রে রাজার ক্ষমতার উৎস কী? তা অন্তত জনগণের ক্ষমতা নয়। ফলে ওসব দেশে একই ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও মনে রাখতে হবে স্বয়ং বাদশাহ-ই নাগরিক নন, এর ঊর্ধ্বে। সবার সমান নন তিনি। উনার ইচ্ছা বা খায়েস-ই আইন। অথবা সম্ভবত বাদশাই একমাত্র স্বাধীন নাগরিক!

পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস
রিপাবলিক-নাগরিক খুন হলে আর কেউ অভিযোগকারী বা বাদী হোক না-ই হোক, রাষ্ট্র নিজেই মুখ্য বাদী হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে, আত্মীয়স্বজন কিংবা আর কেউ, অতিরিক্ত অর্থে, বাদী হতে পারেন। আর রাষ্ট্রের তরফে যে অফিস এমন বাদী হয়ে মামলা পরিচালনা করে থাকে সেটাই পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এবং এর প্রধানকর্তা ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’।  ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ শব্দটার মানে হল, রাষ্ট্র তাঁকে রাষ্ট্রের হয়ে মামলা পরিচালনা করার ক্ষমতা দেয়, মানে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দেয়। ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ – মানে হল “অন্যকে আমার হয়ে মামলা পরিচালনের ক্ষমতা” লিখে দেয়া। পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এর বেলায়  “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি”  স্থায়ীভাবে এবং সাধারণভাবে দেয়া হয়ে থাকে এবং তাই ঐ পদের নাম ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ হয়ে গেছে। আর তাঁর কাজ হল রাষ্ট্র নিজেই বাদী, এই বাদীর হয়ে অভিযোগ দায়ের করা আর এর ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা করা, এই অর্থে ‘প্রসিকিউট’ করা। এ অফিস জনগণের হয়ে মামলা পরিচালনা করে, তাই এটা পাবলিক প্রসিকিউটর। তাকে আমরা সংক্ষেপে ‘পিপি’ বলে চিনতে অভ্যস্ত।

কোন কোন রাষ্ট্রের বেলায় দেখা যায় তাদের পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস  ও তাদের কাজের দায় ও পদ্ধতি একটু ভিন্ন। যেমন তারা মামলার তদন্তের ভারও পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের তদারকি ও পরিচালনার অধীনে দিয়ে রেখেছে। ফলে তদন্তও এই অফিসের অধীনে হয়ে থাকে। মানে, আমাদের দেশের মত ‘পুলিশ তদন্ত’ করে ‘পিপি অফিসে পাঠিয়ে’ দেয়ার সম্পর্ক নয়।

সৌদি আরব রাজতন্ত্রী হলেও আধুনিক রাষ্ট্রের আদলে তারাও ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ নামেই অফিস ও ব্যবস্থা রেখেছে। জামাল খাশোগির গুম ও হত্যা প্রসঙ্গে সরাসরি সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে দেয়া এক বিবৃতি বা ভাষ্য, তাদেরই এক ওয়েব লিঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে। এই অফিসের সেই পাবলিক পেজ বলছে,  “The Kingdom of Saudi Arabia’s Public Prosecutor stated the following: Preliminary investigations carried out by the Public Prosecution into the disappearance case of the citizen Jamal bin Ahmad Khashoggi revealed that the discussions that took place between him and the persons who met him during his attendance in the Kingdom’s consulate in Istanbul led to a quarrel and a brawl with the citizen /Jamal Khashoggi, resulted in his death.”।
বাংলায় বললে, “সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউটর নিচের কথাগুলো বলছেন- নাগরিক জামাল বিন আহমদ খাশোগি গুমের মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করে তাতে দেখেছেন যে, জামাল এর সাথে যেসব ব্যক্তি দেখা করেছিল ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে জামালের উপস্থিতির সময়ে তাদের সাথে আলোচনা হয়েছিল, তবে সে সময় ঝগড়া ও হইচইপূর্ণ মারামারিও হয়েছিল, তার ফলেই জামাল খাশোগির মৃত্যু ঘটে”।

প্রথমত, এটা মানা কঠিন যে, এটা ‘আইনি’ ডকুমেন্ট। শুধু তাই না। এটা একটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য। রাষ্ট্রের একটা সর্বোচ্চ আইনি অফিস যারা পেশাদারভাবে রাষ্ট্রীয় মামলা পরিচালনা করার দায়িত্বে, তারা এ ভাষায় বর্ণনা দিতে পারেন না। দুটা নাদান বালকের ঝগড়ার বর্ণনাও আপনাতেই এর থেকে ভালো আইনি ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। যেমন, এখানে বলা হচ্ছে না যে কাদের সাথে জামাল খাশোগির “আলোচনা” হয়েছিল  – কারা তারা, কী পরিচয়, যাদের সাথে জামালের কথিত এরপরে ‘quarrel and a brawl’ ঘটেছে? এই বিবৃতি বলছে, “যাদের সাথে” জামালের “কথা হয়েছে”। তাদের নাম ঠিকানা কিছুই না দিয়ে এসব কথা বলার অর্থ পিপির অফিস নিজেই অপরাধীর পরিচয় লুকানোর দায়ে অভিযুক্ত হবার কথা।

দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে জামালের সাথে ঐ ভিলেনদের “আলোচনা হচ্ছিল”। কিন্তু আলোচনা- ঝগড়া- হইচইপূর্ণ মারামারি, এভাবে একটা ঘটনাক্রম কল্পনা করা অসম্ভব। কারণ জামাল সেখানে একেবারেই একা ছিলেন। ফলে একা জামাল পনেরজন প্রতিপক্ষের সাথে ঝগড়া মারামারি করতে কেন যাবে? বরং এটাই স্বাভাবিক  ‘বহুজনের’ সাথে ‘বিশেষ ধরনের আলোচনার’ আর পরিণামে জামালের মৃত্যু হয়েছে – একথা বলার সোজা মনে হলেও ওই “বহুজন” ব্যক্তিবর্গই হত্যাকারী। কিন্তু এই সত্যের দিকে পিপি অফিসের আগ্রহ নেই। রাজপুত্রদের প্রতি বাদশাহী পিপি অফিসের আনুগত্য এতই সীমাহীন।

তৃতীয়ত, দেশের কোনো সরকারি অফিসে কোনো নাগরিক কারও সাথে দেখা করতে গেলে কথাবার্তা থেকে তাতে ঝগড়া বাধবে কেন? আমি চাইলেও সেই কর্তা ঝগড়া করবেন কেন? করতে দিবেন কেন? বড় জোর উনি আমাকে বের করে দিতে পারেন। আর আসলে কিছু করার আগে তিনি আমাকে ওয়ার্নিং দেবেন, এর পরিণতি বলবেন, কেন করবেন, তা ব্যাখ্যা করবেন, কেবল পেশাদার গার্ডদের দিয়ে বের করাবেন এবং তা যতদূর সম্ভব আমাকে স্পর্শ না করেই করবেন। কিন্তু তা না, একটা দূতাবাসের অফিসে একেবারে হইচই করে মারামারি বাধালেন, আর শেষে এমনকি খুন করে ফেললেন? কী সুন্দর! আর এ গল্প বিশ্বাস করল ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ তদন্ত অফিস’?

চতুর্থত, লাশ কই? পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের বিবৃতি থেকে, তাদেরও তা জানার কোনো আগ্রহ আছে বলে দেখা গেল না। অথচ তারা নাকি ‘ক্রিমিনাল অপরাধ তদন্ত’ এর সর্বোচ্চ অফিস!

ঘটনাক্রমে এখানে পাশাপাশি তিনটি রাষ্ট্রের পাবলিক প্রসিকিউটর ও নির্বাহীদের কাজ ও কথার প্রসঙ্গ এসেছে। তারা হলেন, রাজকীয় সৌদি আরব, রিপাবলিক তুরস্ক আর রিপাবলিক আমেরিকা। জামাল সৌদি নাগরিক। কিন্তু নিজ দেশেরই এক কনসুলেটে এসে এমন “আলোচনা” বিপদে পড়ে গেছিলেন যে এর আড়ালে পড়ে করাতে কাটা টুকরায় খুন হয়ে গেলেন। লাশের কথা পিপি বলতে পারছেন না। অথচ এর বিপরীতে, তুরস্ককে দেখুন, বলতে গেলে বিষয়টাকে সিরিয়াস ইস্যু হিসেবে দেখা, তদন্ত আর তথ্য জোগাড়ের কাজ সেটা মূলত তুরস্ক রিপাবলিকই করেছে। অনেকের মনে হতে পারে, তুরস্ক-সৌদি রেষারেষির কারণে এরদোগান অতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তিনি ফায়দা নিতে চান। এমন ভাবনাকারী সবার  এতে যে দিকটা নজর এড়িয়ে গেছে তা হল – রিপাবলিক রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতা। প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায়; নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দায় পালনে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

এরদোগানসহ তুরস্ক রাষ্ট্রের নির্বাহী দায়িত্বের সবাই এই উদ্যোগ না নিলে তারা নিজেরাই বরং অপরাধে অভিযুক্ত হতে যেতেন। আমাদের লক্ষ করতে হবে, তুরস্কের মাটিতে গুম ও খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধ ঘটেছে। খুনিরা তুরস্কের বা বিদেশী যেই হোক – এর অপরাধীদের আইনিভাবে (জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুম দেওয়ার মত না)  ধরে আনতে হবে। পরে তাদের আইনি হেফাজতে নিয়ে জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুমদাতা ও সহযোগীদের তুরস্কের আদালতে হাজির করতে এরদোগান ও তার পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস আইনগতভাবে বাধ্য। তুরস্ক রাষ্ট্রের আদালত ও জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে। এর ব্যর্তয় হলে, আর যেকোন সংক্ষুব্ধ তুরস্কের নাগরিক তুরস্কের আদালতে নালিশ দিলে এরদোগানসহ নির্বাহী বিভাগের লোকেরা কর্তব্যে অবহেলায় অভিযুক্ত হয়ে যেতে পারেন।

অপর দিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ আমেরিকার নির্বাহীদের দিকে তাকান। স্পষ্ট করেই ট্রাম্প বলছেন, সৌদির কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির স্বার্থ আছে। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে তাকে বলতে হচ্ছে, এটা ‘খুনি মিথ্যুকের (rogue killers) কাজ’ এবং এর “পরিণতি হবে ভয়াবহ”। সিনেটর বা কংগ্রেস সদস্যরা খোলাখুলি অন ক্যামেরা প্রেসিডেন্টকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান রাখছেন, “নইলে তারাই উদ্যোগ নেবেন” বলতে হচ্ছে। একজন মিথ্যুক ও খুনির সাথে রাষ্ট্রের কোনো নির্বাহী বা জনপ্রতিনিধি বৈঠক করেছেন, যোগাযোগ রেখেছেন – এটা কিছুতেই তারা ঘটতে, গোপনে ঘটাতে বা দেখাতে চান না। আমেরিকা রাষ্ট্রের অপকর্মের শেষ নেই, একথা খুবই ঠিক। এরপরেও তার কিছু মূল্যবোধ আছে, যা লঙ্ঘন করলে কারো কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে। নিজ সমাজে সকলের সাথে এক টেবিলে বসার অপাঙেক্তেয় মানে অনুপযুক্ত হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ সকলে আপনাকে রেখে ঐ ঘর বা টেবিল ত্যাগ করবে। পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকান সমাজে খুব করা আর প্রমাণিত মিথ্যা বলা – এধরণের অমার্জণীয় কৃত অপরাধ।  এগুলো সবই মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল্যবোধ বা সংক্ষেপে মর্ডান মূল্যবোধ ও এর ক্ষমতা।

দেখা যাচ্ছে, রাজতন্ত্রে আসলে শান্তিতে একটু খুন হয়ে যাবেন সেই সুযোগও নেই। কারণ বাদশা ব্যক্তিগত  প্রতিহিংসা পূরণ করতে আপনার আঙুল কেটে নিয়ে যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে না দেখায়, সৌদি ঘটনা তত বড় নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটা সৌদি ডায়নেস্টির সমাপ্তিসহ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ম্যাপ, নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে – আরো বড় বিষয় হবে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা।

সর্বশেষ গতকালের ঘটনা –  বিশেষ করে এরদোগানের আমেরিকা, বৃটিশ, ফ্রান্স ও জর্মানির কাছে খুনিদের কথোপকথনের টেপ শুনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া – এর প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক। চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প বিরাট চাপের সম্মুখিন হচ্ছেন। আর সেই চাপ সামলাতে না পেরে তিনি সৌদিয়াওরবের বিরুদ্ধে কঠোর একশনে যাচ্ছেন দেখলে অবাক হবেন না। এই সরকার প্রধানেরা এখন দায়বাধ্য হয়ে গেলেন টেপ হাতে পাওয়া ও শোনার পর আইনি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিতে। কারণ, তারা কেউ বাদশা-আমির বা রাজপুত্র নন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “জামাল খাশোগিঃ একজন নাগরিকের দুর্ভাগ্য  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]