ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বফিরানোর খোয়াব

গৌতম দাস

১৮ মার্চ ২০১৯, সোমবার ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yu

The judge ruled images of the suspect in court must blur his face. Photo: Mark Mitchell-Pool/Getty Images,  from this link.

প্রায় লাগোয়া দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ নিউজিল্যান্ড। এর উত্তরের দ্বীপে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী শহর ওয়েলিংটন আর দক্ষিণের দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ক্রাইস্টচার্চ [Christchurch]। এবার ১৫ মার্চ ২০১৯, সেই ক্রাইস্টচার্চ উঠে আসে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া শিরোনামে – “মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা”। শহরের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে আসতে ১০ মিনিট লাগে এমন দুরত্বে দুটো মসজিদ আছে – আল নুর [Al Noor Mosque] আর লিনউড [Linwood mosque] মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় একের পরে অন্যটায় পরপর, হামলাকারী মারাত্মক ও বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা চালায়।  মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম ‘ব্রেনটন ট্যারান্ট’ [Brenton Tarrant]। সে মূলত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে প্রায়ই পাশের নিউজিল্যান্ডে আসেন। চিন্তার দিক থেকে “খ্রিষ্টান এবং ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা চামড়ার লোকদের কথিত শ্রেষ্ঠত্বে” বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ব্রেনটনের পরিচয় হল – ২৮ বছর বয়সী এই সাদাচামড়ার পুরুষ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারের [28-year-old white male from a low-income, working-class family]। আর সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৪৯ জন ইতোমধ্যেই মৃত, আরো প্রায় ২০ জন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মিডিয়ায় বলছেন, ‘এটা খুবই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ [“well-planned terrorist attack”]।

Jacinda Ardern, prime minister of New Zealand, described the shootings as a “well-planned terrorist attack”, and said this is one of the country’s “darkest days”..

অর্থাৎ আমরা দেখলাম তিনি এখানে “মুসলমানেরাই ভিকটিম” বলে এটাকে ‘টেররিজম’ বলবেন কি না এমন দ্বিধা দেখাননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এটাকে “সন্ত্রাসী হামলা’ [extremist terrorist attack] বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতিতে এটাকে “টেররিজম” বলা হয়েছে। এমনকি ভারতের বিদেশমন্ত্রী বা কানাডার সরকারও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে “খুবই পরিকল্পিত” [well-planned] বলছেন কেন? আর একটা বিশেষ দিক হল, এই হামলার পুরো সময় ১৭ থেকে ২০ মিনিটের; যার ১৭ মিনিটেরই লাইভ শো ফেসবুকে অন-লাইনে দেখানো হয়েছে। আর তা এমন ভয়ডর-পরোয়াহীন তাণ্ডব যে, রাইফেলের মাথায় বসানো ক্যামেরা থেকে নেয়া অনলাইন লাইভ ছবি নামাজ পড়তে আসা অসহায় মুসল্লিদের প্রতি গুলি ছোড়ার লাইভ ছবি – সাথে সাথেই ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল। এ ছবিগুলো যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তা এএফপি নিজেরা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করে [AFP determined the video was genuine] এই রিপোর্ট ছেপেছে।

হামলাকারী কে বা কারা? তাদের রাজনৈতিক বা চিন্তাগত পরিচয় কী? পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা মোট চারজন, যার তিনজনই সম্ভাব্য সহযোগী। আর চতুর্থজন যে দৃশ্যমান হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হামলার পরই এবং মানুষ হত্যার মামলায় অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অন্যদের নিয়ে তদন্ত চলছে। গত ২০১১ সালে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষ হত্যা করেছিল এন্ডার্স ব্রেইভিক [Anders Breivik]। হামলাকারী ব্রেনটনের পছন্দের ব্যক্তিত্ব যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানিয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির একজন হলেন এই ব্রেইভিক আর অন্যজন হলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ব্রেনটন এই দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের চিন্তা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। অনুমান করা যায়, এর মূল কারণ এরা দু’জনই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white supremacist] চিন্তা ধারণ করেন।

White Supremacist কারা?
“দুনিয়ায় সাদাচামড়ার লোকেদের শাসন-কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে কারণ সেটা ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ যুগ” – এই বক্তব্য বিশ্বাসে চলা পাশ্চাত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক গ্রুপ এরা।  মূলত এরা ইনসাফ বা ন্যায়-অন্যায় মুল্যবোধ থেকে বিচার করে পথ চলে না, এমনই মানুষ। “আমি আর এক মানুষের সহায়-সম্পত্তি বা ওর পুরা দেশটাই দখল করে নিব – কারণ আমি সুপার – আমি ক্ষমতাবান, বলশালী” – এই সাফাই বয়ানের উপর দাঁড়ানো এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তারা বলতে চায় পশ্চিমের সাদা চামড়ার লোকেরা আমরা এটাই করে এসেছি, কলোনি দখল করেছি, দুনিয়া লুটে শাসন করেছি, দাবড়ায় রেখেছি – কাজেই আমরা শ্রেষ্ট। তাই আবার “সেদিন” ফেরত আনতে হবে। তাদের মুল বক্তব্য এটাই।  এক ধরণের ‘সাদাদের ক্ষমতা’ বা হোয়াইট পাওয়ারের [White Power] পুজারি তাঁরা।
এছাড়া এরা দাবি করে তারা মাইগ্রেন্টবিরোধী। মানে গরিব দেশ থেকে মানুষের (যুদ্ধের শরণার্থী হওয়াসহ) নানা কারণে পশ্চিমের দেশে বসবাস করতে আসাকে (ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট) অনুমোদন দেয়ার এরা তীব্র বিরোধী।
কোন তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ না থাকলেও এরা প্রচার প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসেন যে মাইগ্রেন্টরা “নোংরা”, এরা তাদের শহর নোংরা করে থাকে আর শহরে সব অপরাধের জন্য দায়ী হল এই মাইগ্রেন্টরা। এককথায় যারা তাদের মত নয় এমন “অপর” [other] যেকোন মানুষই নিকৃষ্ট, খারাপ। তাদের আচার আচরণ কালচার সব খারাপ। শুধু তাই না।  এখানে  হোয়াইট-সুপ্রিমিস্টদের পরিচয়ের আর এক অর্থ আছে। তারা বিশ্বাস করে সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠিরা ছাড়া বাকি অন্যেরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। আর তাতে কোন সাদা চামড়ার দেশে এরা সহজেই তাদের ছাড়িয়ে জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যায়। (মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের মোদীর বিজেপি-আরএসএস সংগঠন ও তাদের কর্মীদের বিশ্বাস ও ভাষ্যও প্রায় একই রকম মিল দেখতে পাওয়া যায়।) তাই, সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠি ছাড়া এমন “অপর” লোকেদেরকে বুঝাতে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকে – “ইনভেডর” [invader] – মানে অনুপ্রবেশকারি-দখলদার। হামলাকারি ব্রেনটন ও তাঁর বন্ধুরা কথিত অনুপ্রবেশকারিদেরকে হত্যা করা তাদের টার্গেট ও একাজ জায়েজ মনে করে থাকে। যদিও এরা সাধারণভাবে “ইনভেডর” বলে ডাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা ইনভেডর বলতে মূলত কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই বুঝিয়েছে। অনেকটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর  মত। আমরা মনে রাখতে পারি, তিনি ও তাঁর দল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত মাইগ্রেন্টদের “মুসলমান” এবং কখনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা “তেলাপোকা” ইত্যাদি মানুষের জন্য অমর্যাদাকর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

হামলাকারি ব্রেনটন সম্পর্কে উপরের এতকিছু তথ্য জানার উপায় বা উতস কী? হামলা ঘটে যাবার পরে ব্রেনটন সম্পর্কে খোঁজ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি [AFP] আমাদের জানাচ্ছে যে, এক মাস ধরে ফেসবুক ও টুইটারে ব্রেন্টন একটা গ্রুপ হিসেবে প্রকাশ্যেই সক্রিয় ছিল। [The Twitter profile had 63 tweets, 218 followers and was created last month.] ‘যে কেউ’ বা এনোনিমাস হিসেবে তারা একটা গ্রুপ চালিয়ে গেছে, যে গ্রুপের নাম ‘8chan’ ফোরাম [Politically Incorrect” forum on 8chan, a online discussion site ]। এই গ্রুপ যে খুলেছে, তার নাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের নাম। একই ‘মালিক’ হিসেবে একই নামে এক টুইটার অ্যাকাউন্টও [@brentontarrant] আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলার পুরো বর্ণনা এখান থেকেই প্রচারে দেয়া হয়েছে। কেন এই হামলা তা বিস্তারে বর্ণনা করতে তাদের ‘ম্যানিফেস্টো’ বলে ৭৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এই সাইট থেকে নামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ ডকুমেন্টের শিরোনাম হল- ‘The Great Replacement’ বলা হয়েছে, এই ম্যানিফেস্টো লিখতে প্রণোদনাদাতাদের নাম হল ‘হোয়াইট জেনোসাইড’। মানে এরা নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে ডাকছে। সাধারণত ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা’ নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে থাকে। এ ছাড়া, নিজেদের বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কিছু শব্দ ও ধারণা যেমন, ডাইভারসিটি (Diversity বা বহুমুখিতা) বা মাল্টিকালচারিজমের [Multi-culturalism বা সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা] এসবের ঘোরতর বিরোধী বলে দাবি করে থাকে।

ডাইভারসিটি বা মাল্টিকালচারিজম ধারণার এখানে সারকথা হলটা – অনেক ধরণের দেশের ভুগোল ও সংস্কৃতির মানুষের একসাথে এক শহরে এই রাষ্ট্রে এসে বসবাস করা – একই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর ‘বৈষম্যহীন’ এক “নাগরিক সাম্য” বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশনের অধীনে।

এনিয়ে ইউরোপের তর্কবিতর্কের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেন রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ‘মাল্টিকালচারিজম’ মেনে চলা তাদের জন্য সঠিক নীতি বলে মনে করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্স ঘোষিতভাবেই মাল্টিকালচারিজম অপছন্দ করে থাকে। এর বদলে তাদের পছন্দ হল ‘এসিমিলিয়েশন’[assimilation] নীতি। যার বাংলা ও খুলে বলা অর্থ হল – ইংরেজি assimilate (বাংলায় সব-একই-ধরণ বা এককরণ করা) থেকে এসিমিলিয়েশন। এই এসিমিলিয়েশন শব্দের মূল বিষয়টা হল, ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিসহ সব কলোনি-দখলদারেরা আমাদের মত দেশকে এককালে কলোনি বানিয়ে, দখল করে লুটতে গিয়েছিল। পরবর্তিতে সেই সূত্রে আবার সস্তা শ্রম পাওয়ার লোভে তারা আমাদেরকে (কালো চামড়ার নেটিভদেরকে) কালক্রমে নিজ নিজ ইউরোপীয় দেশেও নিয়ে গিয়েছিল। “নেটিভরা” একসময়ে কলোনি মালিকের দেশেই তারা স্থায়ীভাবে পরিবারসহ  নাগরিক হিসাবে বসবাসও শুরু করেছিল। কারণ যেমন কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়াকে কার্যত মূল বৃটিশ ভুমিরই এক্সটেনশন মনে করা হত। কিন্তু একালে এসে ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়াতে ব্যবসা বানিজ্যের ভাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এই নেটিভরাই তখন চক্ষুশুল হয়ে গেলে যা হয়, তাই। কলোনি মালিকের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের দেশে যাওয়া নেটিভদেরকেই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বি গণ্য করছে। এই ব্যাপারটা বৃটিশেরা যেমন সহনীয়ভাবে দেখে ফরাসীরা তেমন নয়। তাই ফরাসি নীতি হল, নেটিভদের সবাইকেই ফরাসি কালচারই অনুসরণ করতে হবে। নেটিভরা নিজ দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্তন হতে হবে। তদুপরি, নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্ম পালনও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্তন হয়ে পালন করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই । ফরাসি দেশে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ এ ‘যুক্তি’তেই। জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে,নেটিভেরা নিজ দেশ থেকে আনা শুধু সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্থন হতে হবে তাই না। নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্মপালনটাও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্থন হয়ে করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই assimilation নীতি। যেমন ফরাসি দেশে বোরখা পড়া আইনত নিষিদ্ধ, এই যুক্তিতেই। এটাকেই ফরাসি রাষ্ট্র তার “এসিমিলিয়েশন” এর নীতি বলে সাফাই দিয়ে চলে থাকে। এই দুই নীতির তুলনা নিয়ে গত ২০১৫ সালে আমার এক পুরানা লেখা এখানে সময় করে আবার পড়তে পারেন।

হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা হিটলারেরও ভক্ত। যেমন এরা হিটলার বা তার সংগঠন নাৎসি পার্টির নানান চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে থাকে। হিটলারের বাণী নিজেরা পুনর্ব্যবহার করে। হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের রাইফেলের গায়ে এর ওপরে কমপক্ষে ছয়টা নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আঁকা আছে। এর একটি হল, ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ (Fourteen Words) চৌদ্দ শব্দের এক বাণী। আর তা হল – আমাদেরকে অবশ্যই “আমাদের মানুষের” অস্তিত্ব ও আমাদের “সাদা সন্তানদের” ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে। [“We must secure the existence of our people and a future for white children.”]।  এটাকে অনেকে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের একটা মূল ‘মন্ত্র’ বলে থাকে। এখানে ‘our people’ বা ‘white children’ বলে এরা বর্ণবিদ্বেষ জাগানোর চেষ্টা করে থাকে।

ব্রেন্টনের মত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা বলতে চায় তারা মাইগ্রেশনবিরোধীকিন্তু আসলেই কি তাই?
আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড এসব রাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা কারা? আর কারা এর অবৈধ দখলদার? অথবা তাঁদের ভাষায় অনুপ্রবেশকারি-দখলদার? নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী [aborigine] হল ‘মাউরি’-রা [Māori]। ইউরোপ থেকে বিশেষত ডাচ বণিক ‘আবেল তাসমান’ [Abel Janszoon Tasman] প্রথম ইউরোপীয়, যিনি মাউরি সভ্যতা ও এর ভূমির সন্ধান পাওয়ায় (১৬৪২) পরবর্তী সময়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নাম দিয়ে দখল করে, কালক্রমে নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের কলোনি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে ইউরোপীয় সাদা চামড়ার লোকজনই কি অনুপ্রবেশকারী-দখলদার নয়? হামলাকারী ব্রেনটন নিজেই (বা তাঁর পূর্বপ্রজন্ম) অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের আসল অনুপ্রবেশকারী-দখলদার। অতএব, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিজেকে না বলে (মুসলমানসহ) অন্য কাউকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা প্রহসন মাত্র। ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানদেরকে “হোয়াইট জেনোসাইডার” ব্রেনটন এর বিদেশি বা তথাকত্থিত “মাইগ্রেশনবিরোধীতার” তামাশা হল এটাই যে খোদ মাইগ্রেন্ট মাইগ্রেশনবিরোধীতার ভান করতে নেমে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে।

তবে এখানে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে যে বুশ-ব্লেয়ারের “ওয়ার অন টেরর” আর হোয়াইট বা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামার” উত্থান  – এদুটো একই ফেনোমেনা নয়। বরং একেবারেই আলাদা। তবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামাকারিরা” ইচ্ছা করে ইনভেডর বা অনুপ্রবেশকারী-দখলদার বলতে কথাটা সংকীর্ণ করে কেবল “মুসলমান” বুঝাচ্ছে – যাতে তারা খ্রীশ্চান-পশ্চিমাবাসীদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করা সহজ হয়।

সারকথা : আমাদের যথেষ্ট মাথা তুলে যেটা দেখতে হবে যে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান কেন এখন দেখা যাচ্ছে? তারা অটোমানদের সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা অথবা ইউরোপিয়ান খ্রিশ্চানিটির জেরুসালেম দখল চেষ্টার অতীত লড়াইগুলোকে এখন কেন রেফারেন্সে আনছে?

আমরা গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটা পর্বে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম পর্ব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। যেটাকে “কলোনি অর্থনীতির যুগ” বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্ব হল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে গত শতাব্দী (বিশ শতক) পর্যন্ত, যেটা  আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্লোবাল অর্থনীতির যুগ”। আর তৃতীয় পর্বকে বলা যায়, চলতি শতকে আমেরিকান নেতাগিরির পতন আর ক্রমেই সেই জায়গা নিতে “চীনের উত্থিত গ্লোবাল নেতৃত্ব”।

পশ্চিমের, বিশেষত ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চলছে কি না তা বুঝবার সহজ তরিকা বা নির্ণায়ক হল – মাইগ্রান্ট ইস্যু। অর্থনীতি ভাল চললে দেখা যাবে, তারা সবাই ভুলে যায় যে মাইগ্রান্ট তাদের একটি সমস্যা। কারণ, তখন পশ্চিমের বাড়তি শ্রম দরকার; ফলে মাইগ্রান্ট শ্রমিক খুব দরকারি। আবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলেই মাইগ্রান্ট বিষয়টিকে মানে, ওই বাড়তি শ্রমের বিষয়টিকে পাশ্চাত্য এক বিরাট সমস্যা মনে করে থাকে। তারা তাদের মধ্যবিত্তদেরকে মাইগ্রান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে উঠায়। অথবা যেমন আমরা এখন ফ্রান্সে দেখছি। ফরাসি নেতা মেরিন লি পেনের National Front পার্টির উগ্র ন্যাশনালিস্টরা (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) তাদের মধ্যবিত্তকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন। তবে তারা আসলে “কী রাজনীতি” করছেন তা বুঝবার কিছু ইঙ্গিত দেয়া যাক। তার দলের দুই ভাইস-প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিপো [Florian Philippot] সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। যা তিনি বলছেন বাধ্য করা হয়েছে। ফিলিপোর দাবি তাদের দলের আভ্যন্তরীণ বিতর্ক আসলে এখন এক সরে যাওয়া ইস্যু। “আমরা আগে আসলে দাবি করতাম এক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। যেটা এখন “মাইগ্রান্ট আর ফরাসি আইডেন্টিটি” – তার এই পুরানা ট্রাডিশনাল অবস্থানকেই মুল রানোইতিক ফোকাস বলে হাজির করেছে। এটা আসলে এক ভয়ঙ্কর পিছনের দিকে পিছলে পড়া”। [Philippot said the debate within the FN about a shift away from his focus on economic nationalism back to its traditional priorities of immigration and French identity were “a terrible backward slide”].
এই বক্তব্য থেকে আমরা “অর্থনৈতিক জাতীবাদ” থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদ কোথায় আলাদা তা বুঝে নিতে পারি।

গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে এসে আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে ইউরোপ এর আগে নিজেদের কলোনি শাসনের অর্থনীতির সমাপ্তি সমর্পণের ঘোষণা দিতে হয়েছিল
এখন চীনা উত্থানের পর্বে এসে ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্স আরেক দফা (তবে এবার আমেরিকাসহ) চীনেরও পেছনে থাকতে শুরু করতে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এই  সাদা চামড়ার আইডেনটিটি- ধরনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। দাবি উঠছে তাদের আগের “কলোনি যুগ” সবচেয়ে ভালো ছিল। কারণ, সেটা ছিল শান-শওকতের যুগ। তাই কলোনি লুণ্ঠনের সেকালে ফিরে যেতে হবে”। ইউরোপের প্রবীণ প্রজন্ম এখন তরুণদের কাছে সাদা চামড়ার সুপ্রিমেসির গল্প শুনিয়ে উসকানি দিচ্ছে।

সময় কখনো পেছনে ফেরে না। যেমন আমরা চাইলেই এখন “দাস-প্রথা” আবার ফিরে দুনিয়াতে চালু করতে পারব না। একইভাবে কলোনি লুণ্ঠন একালে আবার বৈধ বলে দাবি করা, সাদা চামড়ার বর্ণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব একালে আবার ন্যায্য বলে সাফাই গাওয়া- এসব অসম্ভব। দুনিয়ার অভিমুখ আর সেটা নয়। এগারো-বারো শতকের জেরুসালেম দখলের জোশ- ক্রুসেডের সেই উসকানি একালে আবার তৈরি করা, সেটাও অসম্ভব। মডার্ন রাষ্ট্র ও শাসন দুনিয়ায় এসে যাওয়ার পরে পুরনো ‘ক্রুসেড’ আর হবে না। যদি তাই হত তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ব্রিটেন জেরুসালেম দখলের চেষ্টায় বারবার হেরে যাওয়ার শোধ তুলতে আবার ক্রুসেড লড়ে জেরুসালেমের দখল করতে চেষ্টা করত। “কামাল তুনে কামাল কিয়ার” তুরস্ক গড়ার পথে হাঁটত না। বরং আমরা দেখেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রুসেড’ শব্দটি মুখেও আনেনি।

আমরা এখন যেমন চাকরি, পড়াশোনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পশ্চিমমুখী হই। সামনের দিনে ইউরোপীয়দের অন্তত চাকরি বা অধিকতর সুযোগ-সুবিধার জন্য এশিয়ামুখী হয়ে ধাবমান হতে দেখা অসম্ভব নয়। এটাকেই তারা হার মনে করছে। পাশ্চ্যাতের সমাজে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার” নামে অস্থিরতার কারণ এখানেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ কি ফিরবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

গৌতম দাস

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xP

 

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

‘বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

বাম-ডান’ ভাবনার পিছনে

গৌতম দাস

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2xm

 

ডান-বামের রাজনীতির কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি, শুনেছি। কিন্তু এর পিছনের কথা কী? প্রথমত বাম ও দান বলে শ্রেণী ভাগ করা তা বামপন্থীদের করা, তাদের চোখে দেখে চালু করা হয়েছিল। প্রায়ই আমরা বলতে শুনি, অমুকে বামপন্থী রাজনীতি করেন। যেমন, কেউ কাউকে অপছন্দ করলে, তার গায়ে “কালো দাগ” লাগিয়ে দিতে চাইলে শোনা যায়, সে লোকের নামের আগে তিনি ‘ডানপন্থী’ শব্দ বসিয়ে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অথবা দাবি করে বলেন, “উনি তো ডানপন্থী”। আসলে বলতে চান ইনি নেতি বা খারাপ চিন্তার লোক। অর্থাৎ শেষে সার কথা দাঁড়াল, যারা ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ কথাগুলো ব্যবহার করেন তারা বলতে চাচ্ছেন- বামপন্থী মানে ভাল আর ডানপন্থী মানে খারাপ লোক। কিন্তু এই নামকরণ কী সঠিক? আর কিসের ভিত্তিতে এই নামকরণ? কাকে ডান বলব আর কাকে বাম? এই ডান-বাম কোথা থেকে এল?

এ প্রসঙ্গে এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে বটে; কিন্তু এর জবাব আমরা যথার্থ পাই আর না পাই, শেষ বিচারে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্টই রয়ে যায়। তবে, ইতিহাসে এমন ধারণার প্রথম উদ্ভব কবে, কখন, কিভাবে – এই বিচারে বলা যায়, ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ‘ফরাসি বিপ্লবের’ পর তার সোস্যালিস্ট প্রতিনিধিরা সংসদে স্পিকারের বামদিকে সদলবলে একসাথে বসতেন। ফলে বাম দিকে যারা বসেন তাদের রাজনীতি অর্থে বামপন্থা শব্দের উদ্ভব। আর সেখান থেকেই পরে বামপন্থী (left), লেফটিস্ট (leftist), লেফট উইং (left wing) ইত্যাদি বাম-বিষয়ক নানা নামের পরিচিতি চালু হয়ে যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাও এই ব্যাখ্যাকে মেনে সায় দেয়। আর যারা বামেদের বিরোধী, স্বভাবতই বামপন্থীরা তাদের ডানপন্থী নামে ডাকার রেওয়াজও এখান থেকে চালু করে দেন। তবে সাধারণভাবে বললে, এভাবে ডান-বাম শ্রেণীকরণ করা খুবই হালকা চিন্তা বা লুজ টক (loose talk) ধরণের কথা; মানে যথেষ্ট না ভেবে চিন্তা করা বা দুর্বল-চিন্তার ভিত্তিতে দাঁড় করানো বক্তব্য।

এই নামকরণের  ভিতর অনেক ধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলোর মধ্যে প্রধান হল, এই বাম-ডান শ্রেণীকরণ (category) করা – এটা এক ‘বাইনারি’ (binary) ভাবনা। অর্থাৎ যার কেবল দুইটা রূপই হতে পারে বলে আগের সীমা টেনে রাখা হয়। এজন্য অঙ্কের ভাষাতেও বাইনারির অর্থ – শূন্য আর এক এই দুই অঙ্ক। মানে আমাদের পরিচিত (এক দুই থেকে নয় আর শুন্য) এভাবে দশটা অঙ্ক দিয়ে সংখ্যা লেখা নয়। কেবল শুন্য আর এক ব্যবহার করে সংখ্যা লেখা। এই ‘বাইনারি’ কথার সোজা মানে হল – হয় এটা, না হলে ওটা; এর বাইরে কিছু নাই, একথা বলা। হয় তুমি আমার বন্ধুর দলে আসো নইলে, তুমি আমার শত্রু – সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ও তাঁর বন্ধুরা এমন বাইনারি বিভাজনের ভাষায় কথা বলতেন। অর্থাৎ এমন দুই অবস্থার বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না বলে আগে থেকেই ধরে নেয়া হয়। অথবা বলা যায়, কাউকে হয় সাদা না হলে কালো হতে হবে- এমন মনে করা। অথচ বাস্তবে সাদা আর কালোর মাঝখানে অনেক রঙ আছে, হতে পারে। কারণ হরেক অনুপাতের সাদা ও কালোর মিশ্রণে আলাদা আলাদা বহু রঙ হতে পারে। তাই কেউ কালো না হলে তা সাদা হবেই, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; তা সহজেই বুঝা যায়। কোনো কিছু সাদা অথবা কালো না হলে, মিশ্রণের হলে তাকে ধূসর বলা যায়। আর ধূসর বলতে আবার একটা নয় অনেক ধরনের ধুসর হতে পারে – যাকে আমরা সাদা-কাল মিশ্রণের নানা শেড (shade) বলি, এমন অসংখ্য শেডের ধূসর আছে, হতে পারে। কম সাদা কিন্তু বেশি কালো, অথবা বেশি সাদা কিন্তু কম কালো এমন বিভিন্ন ধরন বা শেডের ধূসর হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পুরা ব্যাপারটাকে কেবল ‘সাদা না হলে কালো’ বলে জোর করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা – এটাই বাইনারি দাবি করার চেষ্টার মতই অস্পষ্ট কাণ্ড হল – কাউকে ‘বামপন্থী না হলে, ডানপন্থী’ বলা বা নাম দেয়ার মত।

তবে এটা ঠিক যে, ফরাসি বিপ্লবের কিছু বৈশিষ্ট্যও এই ধরণের শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। এমনিতে ফরাসি বিপ্লবের এক বৈশিষ্ট্য হল, সেটা ছিল গরিব ও সাধারণ মানুষের প্রাধান্যে ঘটা একটা বিপ্লব-বিদ্রোহের ঘটনা; আর বিশেষত তা ঘটেছিল সমাজের এলিট, অবস্থাপন্ন, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধেও। তবে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই বিদ্রোহ অভিমুখ-বিহীন ছিল না। আবার অনেকেরই ধারণা, “মডার্ন রিপাবলিকান রাষ্ট্রের” সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল ফরাসি বিপ্লব। যদিও উল্লেখ করার মত ব্যাপার হল, আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬) মানে যেটা কলোনিবিরোধী চরিত্রের প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লব, সেটা ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) চেয়ে তা অন্তত ১৩ বছর আগের ঘটনা। আর রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার মধ্যে যেসব ভিত্তিমূলক চিন্তা – এমন ভিত-উপাদান খুঁজে পাবার দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব যথেষ্ট সমৃদ্ধ; অন্তত ফরাসি বিপ্লবের সাথে তুলনায়। আমেরিকান বিপ্লব এক্ষেত্রে তা কোথাও কোথাও অনন্য ও চমৎকার বটে। তবু অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা ফরাসি বিপ্লবের রেফারেন্স দেন প্রায়ই এবং সহজেই; এর তুলনায় আমেরিকান বিপ্লবের নাম প্রায় নেয়াই হয় না, তাদের। বাস্তবতা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার ভাবনা ও এর বাস্তবায়নের দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কোনো অংশেই কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ফরাসি বিপ্লবের ফলে বাম-ডান ক্যাটাগরি করে কথা বলার ভাবনা আসার পিছনের সম্ভাব্য কারণ হল – গরিব বনাম বড়লোক, এমন ভাবনা ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে ছিল। তাই সেখানে স্বভাবতই গরিব পক্ষকে আপন ও কাম্য বা ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিপরীতে, দেখা যায় আমেরিকান বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় বিষয় হল – অধিকার (ইংরেজিতে right); মানে, মানবিক-নাগরিক অধিকার (human rights) মানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার। [এটাই ফরাসি বিপ্লব আর আমেরিকান বিপ্লবের মুল ফারাকও বটে]। বলা যায়, সাধারণভাবে নাগরিক মাত্রই তাঁর “অধিকার” ধারণার চেয়ে বাম বা কমিউনিস্টদের চিন্তা (গরিব-বড়লোক এমন ভাগে) গরিব দশার প্রতি বেশি আগ্রহী, সহানুভূতি বেশি। এটাই মৌলিক পার্থক্য। যদিও বাম-ডান বলে ভাগ করে মানুষের নামের আগে বিশেষণ লাগানো নিঃসন্দেহে খুবই অস্পষ্ট ও দুর্বল-চিন্তায় আচ্ছন্ন।

আর একটু সরাসরি এবং স্পষ্ট করে বললে, ফরাসি বিপ্লবের সারবস্তু যদি সমাজের এলিট, অবস্থাবান, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধে গরিবদের উঠে দাঁড়ানো হয় এবং এই অর্থে একে বিপ্লব বলি – তা বলতে পারি অবশ্যই। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে, সমাধান পেতে চাইলে কেমন রাষ্ট্র চাই এই অর্থে, “অধিকার” ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের দরকার – এই বোধ সেখানে অস্পষ্ট করে রাখা ছিল। যাদের ভেতর এই বোধ অস্পষ্ট, তারাই মূলত বাম-ডান ভাগের ভক্ত। অথচ নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকারের ভিত্তিতে এবং নাগরিক সাম্যের নীতিতে একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন – এটাই রিপাবলিক ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আগেই বলেছি, বাম-ডান হল এক বাইনারি চিন্তাব্যবস্থা। এর মানে কোন ‘বামপন্থীর’ চোখে আপনি তার গ্রুপের নন, এ কথার মানে হল তিনি বলবেন, আপনি ডানপন্থী। সবকিছুই যেন বাম অথবা ডান হতেই হবে। যদিও বাম ও ডান উভয়েরই আবার উপবিভাগ আছে, করা হয়ে থাকে। যেমন – চরম বাম (extreme left), অতি বাম (far left) – বা ultra left। বাংলায় এখান থেকে ‘চরমপন্থী’ শব্দটা এসেছে। তাই আসলে, বাম-ডান বলে একটা শ্রেণীকরণ আগে আছে- এই বলে আগেই ধরে নেয়া একটা ধারণা আছে বলে ধরে নিলে এর ওপর ‘চরমপন্থী’ শব্দটা দাঁড়ানো পাওয়া যাবে। বামপন্থা ধারণাটার চরম রূপটাকে বুঝাতে এর নাম হয়েছে ‘চরমপন্থী’ (এক্সট্রিমিস্ট, extremist)। এই হল বামপন্থার উপবিভাগ। ওদিকে একইভাবে অতি-ডান (far right) বা চরম ডান (ultra right)- এগুলো ডানেরই নানা উপবিভাগ। এজন্য বামপন্থীদের করা এই চিন্তাব্যবস্থায় ডানের বেলায় – কোনো ধর্মীয় গণতন্ত্রী দল, রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী ইত্যাদিকে তারা ডানপন্থী খাপে ফেলেছে। এ ছাড়া রেসিস্ট (racist) বা ফ্যাসিস্টদের (facist)  বামপন্থিরা ‘চরম ডানপন্থী’ বলে মনে করে খাপে ফেলেছে। আবার সোশ্যালিস্ট, লিবারেল বা কমিউনিস্ট- এদেরও বামের উপবিভাগ বলে মনে করা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ‘বাম-ডান এই শ্রেণীকরণের’ প্রবক্তারা রেসিজম (বর্ণবাদ) এবং ফ্যাসিজমকে ‘ডানপন্থী’ ভাগে ফেলেছেন। কিন্তু এতে চিন্তার বিরাট ঘাপলাটা হল, কমিউনিস্টদের মধ্যে কি রেসিজম এবং ফ্যাসিজমের ছায়া নেই? মুখের দাবিতে তারা হয়ত কমিউনিস্ট, নিজেদের বাম বলে দাবি করছেন। অথচ বাস্তব কাজ ও পদক্ষেপ পরিচয়ে কি তাদের কেউ রেসিস্ট অথবা ফ্যাসিস্ট নন? সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রক্ষমতা মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে অথরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্ববাদিতার কিংবা এমন ক্ষমতার অভিযোগ আছে। অতএব রেসিজম এবং ফ্যাসিজমকে ডানপন্থী ভাগে ফেলা – এটাই আর এক জোরালো প্রমাণ যে, বাম-ডানে ভাগ করা মূলত বামপন্থীদের চালু করা পদ্ধতি। অর্থাৎ বামপন্থীরাই মূলত এই শ্রেণীকরণের প্রবক্তা।

এর আর একটা প্রমাণ হল, যাদেরকে কোন কোন মিডিয়া বা বামপন্থীরা  ডানপন্থী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, বিশেষণ লাগায়- কথিত সেই ডানপন্থীরা কিন্তু নিজেদের ‘ডানপন্থী’ বলে অভিহিত করেন না। এছাড়া, আমেরিকার ভেতরে বাম-ডান বলে কাউকে ডাকার, বিশেষণ লাগানোর সাধারণত তেমন চল নাই। বরং আছে উদার (লিবারেল বা liberal) আর এর বিপরীতে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ বা conservative) বলে ভাগ ও চিহ্নিত করার রেওয়াজ। আবার সেখানে উদারেরা নিজেই নিজেকে উদার এবং তাদের বিপরীতে রক্ষণশীলেরা নিজেকে রক্ষণশীল বলেই পরিচয় দিতে কোনো আপত্তি করেন না। শেষ বিচারে বাম-ডান বলে ডাকার আর এক বড় নেতিবাচক দিক হল – এটা ‘নাগরিক-মানবিক’ অধিকার বিষয়টাকে গৌণ, এমনকি অনেক সময়ে তুচ্ছই মনে করে।

ওদিক আর এক মজার দিক হল – লক্ষ করলে আমরা দেখব, বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রের নামের সাথেও কিন্তু ‘রিপাবলিক’ শব্দটা আছে। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রের নামের মধ্যে (যেমন “চীনের পিপলস রিপাবলিক” অথবা “ইউনাইটেড সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিক” ) এই ‘রিপাবলিক’ শব্দটা লিখে রাখা আসলে তা যেন অভ্যাসবশত, নেহায়েত এক রেওয়াজ যেন। এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিশেষ অর্থ তাতপর্য নেই। তবে এর চেয়েও আরও বড় গুরুত্বের দিকটা হল, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নামে ‘রিপাবলিক’ শব্দ থাকলেও ঐনামের ভিতর ‘অধিকার’ বলে অর্থ অন্তর্ভুক্ত নাই। মানে, “নাগরিকের অধিকার” বলে কোনো ধারণাকে রাখা হয় নাই বা অনুসরণ করে লিখা হয়নি। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার বা মৌলিক অধিকার বলে আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না তাই অস্পষ্ট এবং বাস্তবত তা নেই। বরং “শ্রেণীর” কথা তুলে এগুলো সব ঢেকে ফেলা হয়েছে। বরং কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে দেখা যায় নাগরিকদের বহু বস্তুগত জিনিষ পাওয়ার বা ভোগের “অধিকার” আছে। অন্ন, বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা বাসস্থান যোগানো এগুলো সবই যেন রাষ্ট্রের দায়।  কিন্তু গুম-খুন অথবা নিপীড়িত হওয়া – এগুলো থেকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দিবে কিনা এমন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা নেই। আর এমন চিন্তাভাবনা প্রসূত ধারণারই এক অনুষঙ্গ হল ‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ।

‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ বা কমিউনিস্ট আইডিয়ার আধিপত্য – এটা গত শতক পর্যন্ত ভালই দর্পের সাথে চলতে পেরেছিল বলা যায়। গত শতক ছিল মূলত ‘জাতীয়তাবাদী’ চিন্তার শতক। যদিও “জাতীয়তাবাদের রাজনীতি” বলে এর চলা শতকের শুরু থেকে শুরু হয় নাই। কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এর প্রবল উপস্থিতি শুরু হয়। কারণ এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল পরিণতিতে উপনিবেশ ব্যবস্থা দুনিয়া থেকে উঠে গিয়েছিল। এর পর থেকে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমন আইডিয়া বা ভাবনা হল নানা কিসিমের ‘জাতীয়তাবাদের রাজনীতি’।  আসলে (কমিউনিস্টসহ) যেকোন সার্বভৌম রাষ্ট্র মাত্রই, জাতিবাদের ইঙ্গিত সেখানে থাকবেই। আবার এই সময়ের রাজনীতিতে  মূলত রিপাবলিক রাষ্ট্র হতেই হবে এই মূলসুরের সাথে অনেক জায়গায় আবার অনুসঙ্গে ইসলামও ছিল। তবে তা “জাতীয়তাবাদী ইসলাম” এই ধরনের জাতীয়তাবাদ অর্থে [যেমন, ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান (১৯৪৭) অথবা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান (১৯৭৯)]। তবে সবার উপরেই চিন্তাধারা হিশাবে ‘ডান-বাম বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ’- গত শতক পর্যন্ত এটা ভালোভাবেই ছিল। কিন্তু এখন চলতি নতুন শতকে?

এই শতকের শুরুতে আমরা দেখেছি ‘আলকায়েদা’ ফেনোমেনা। মানে ইসলামও কোন বিপ্লবী তত্ত্বের এক উৎস হতে পারে, এই দাবি। যদি এর viable বা টিকে যাবে এমন রূপটা এখনই পাওয়া গেছে কি না তা স্পষ্ট নয় বা প্রমাণিত হয়নি। তবে এর ফলে মোটের উপর  দুনিয়ার সব রাজনৈতিক চিন্তাতেই “ইসলাম প্রশ্ন” – একটা নতুন শক্ত অনুষঙ্গ হয়ে হাজির হয়ে গেছে। সব রাজনৈতিক চিন্তাকেই এখন  “ইসলাম প্রশ্নে” তার অবস্থান দৃষ্টিভঙ্গি বলতে পারতে হবে – এই বাড়তি দিকটা তৈরি হয়েছে। তাই এই কালে এসে ম্রিয়মান হয়ে পড়া বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া অস্পষ্ট আরো অনেক চিন্তার মত ‘ডান-বাম’ বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ – ক্রমশ ম্লান হয়ে  যাচ্ছে। এর যৌবনের সেই ধার বা সক্ষমতা আর নেই। এর বড় কারণ খোদ ‘আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণাটাও এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে, এর পর্যালোচনার দাবি উঠে গেছে। ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে আমল কতে নিবার দাবি উঠে গেছে। এভাবে এক ‘রিভিউড’ বা ‘ক্রিটিক্যাল রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণা পুনরায় হাজির করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করা হয়। এদিকে, বাম-ডান বলাসহ কোনো অস্পষ্ট বা আধো বোলের কোনো ধারণা – একালে এদের খাতক একেবারেই কমে গেছে, যাচ্ছে।

বরং একালে এসে কেউ যদি কেবল বাম-ডান প্রগতিতে আঁকড়ে পড়ে আছে, থাকে এমন দেখি, সর্বোচ্চ প্রগতির চিন্তা বলে বড়াই করতে দেখি তবে বুঝতে হবে এই শতকে দুনিয়া কোথায় চলে গেছে এই খবর সে রাখে না। দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তাদের চিন্তাব্যবস্থায় প্রগতির বড়াইয়ে বুঁদ হয়ে, এর বাইরে কোন খোঁজ না রাখায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে সেই হিশাবে শীর্ষে উঠে আসা এমন রাষ্ট্র হল ভারত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাম-ডান’ ভাবনার তাৎপর্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন, এক বিদ্বেষ মাত্র

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন,এক বিদ্বেষ মাত্র

গৌতম দাস

0১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:৫৬

https://wp.me/p1sCvy-2xd


‘প্রগতিশীলতার’ ইসলামবিদ্বেষ সমস্যা এবার অনেকটা হাতেনাতেই ধরা পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের আয়োজন চলছে। সেটা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মত হয় কী না তা অনেকেরই শঙ্কা। সে শঙ্কা থাক। কিন্তু এই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রগতিশীলদের জ্ঞানবুদ্ধির দৌড়, খামতি উদাম হয়ে গেছে। তারা চিন্তায় কত খাটো আর অস্পষ্ট তা আমরা সবাই জানলাম।

এই নির্বাচনে আরও সবার মত ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও অংশ নিতে ইচ্ছুক। প্রথম আলো ২৪ জানুয়ারিতে লিখেছে, “ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে মঙ্গলবার বিক্ষোভ করেছিল। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে এ ঘটনা তাদের হতবাক করেছে”।

কেন? তাদের হতবাক হওয়া কেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যেন নমশুদ্র নিচুজাতের কেউ বামুনের রান্নাঘরের আঙিনায় ঢুকে পড়েছে! তাই কী? দলের নামের আগে “ইসলামী” লেখা আছে, এটাই কী প্রগতিবাদী আপত্তির কারণ?

তাদের এমন বক্তব্যের পিছনে দুইটা খামতি বা অভাবের দিক আছে। এক, রাষ্ট্র, ক্ষমতা আর কনষ্টিটিউশন সম্পর্কে সীমাহীন অজ্ঞাত থাকা। আর দুই, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের গভীর ইসলামবিদ্বেষ।

কনষ্টিটিউশন কী কাজে লাগে? খায় না মাথায় দেয়? মূলত প্রাকটিসিং কমিউনিস্ট চিন্তায় এই ব্যাপারটা একেবারেই অস্পষ্ট, অপরিস্কার। এমনকি নতুন কোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কায়েম হলে তাদেরও “বুর্জোয়া” রাষ্ট্রের মত কোন কনষ্টিটিউশন থাকে কিনা; তা গঠন-রচনা করতে বসতে হয় কীনা – এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে অনেক তাবড় নেতা মাথা চুলকাতে থাকবে, জানি। মুখে জবাব আসবে না।

প্রগতি-ওয়ালাদের অজুহাত হল, প্রথম আলো লিখেছে, প্রগতি “সংগঠনগুলো বলছে,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল কর্মসূচি পালন করতে পারবে না বলে অলিখিতভাবে নিয়ম রয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সবগুলো ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে তাঁরা এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন”।

লিখিত, অলিখিত বা গোপন তাদের চিন্তায় এটা যেখানেই থাক – এমন নিয়ম যেকোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন বিরোধী।

ব্যাপারটা হল, একটা দলের নামে ইসলাম থাকা সত্বেও সেই দল দেশের মর্ডান রিপাবলিক ধরণের কনষ্টিটিউশন মেনে রাজনীতি করতে চাইছে – অথচ প্রগতিবাদীদের মন ভরছে না। দুঃখের কথা তাদের ইসলামবিদ্বেষ উদাম হয়ে উপচায়ে উঠছে! কারণ আপত্তি কী করে তুলতে হয় বা নিরসন করতে হয় এটা তাদের জানা নাই। ফলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে যেন তাদের রাজনীতি করতে তারা ইসলামি দলের কাছে দাবি করছে।

আচ্ছা, বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর বা মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলোও কোনভাবে এক ভিসিকে হাত করে আর একটা “পরিবেশ পরিষদের বৈঠক” আয়োজন করে ফেলে এরপর তাঁরা যদি এ বিষয়ে একমত হয় যে প্রগতি-সংগঠনের ততপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলবে না – তাহলে কী হবে? ব্যাপারটা কেমন হবে? হজম হবে?

অনুমান করি এমন হলে ব্যাপারটার শেষে গড়াবে মানে আসল ফয়সালা হবে লাঠালাঠি-মারামারির গায়ের জোর দিয়ে। না, ভয় পাবার কিছু নাই, লাঠির জোরের ফয়সালার পরামর্শ দেওয়া আমাদের কাজ না। বরং বলার বিষয় হল, তার মানে একখানা নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক মীমাংসার আসল অথরিটি নয়। “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক নিরসনের কর্তা বা প্রতিষ্ঠান নয়।

বলাই বাহুল্য কোন আইডিওলজি ভাল, “আগায় আছে মানে প্রগতিশীলতার” দাবিদার এই ভিত্তিতে অথরিটি ঠিক হয় না। তা কার্যকর করাই যায় না। আচ্ছা, করলে কী হবে?

করলে সেটা আর যুক্তিবুদ্ধি বা চিন্তার ভিত্তিতে অথরিটি কে তা সাব্যস্ত হবে না, হবে লাঠির জোরে।

তাহলে মূল যে প্রশ্নের জবাব পেতে হবে তা হল, কোন “পরিবেশ পরিষদের” সিদ্ধান্ত ইসলামি অথবা প্রগতিবাদী নির্বিশেষে সকলের কাছে মান্য হবে? অর্থাৎ নিজ নিজ প্রভাবাধীন এক একটা “পরিবেশ পরিষদের” দাবিদার হওয়া কাজের পথ নয়। বরং এর সরল জবাব হল যে “পরিবেশ পরিষদ” কনষ্টিটিউশন মেনে, অনুসরণ করে তৈরি হতে হবে। আমরা আরও আগাতে পারি। জেনে নিতে পারি কোন বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশন?

স্বাধীন মন বা চিন্তার দিক থেকে কথা বললে, আমাদের প্রচলিত কনষ্টিটিউশন আমরা কেউ নাও মানতে পারি, যদিও আইনি বাধ্যবাধকতার দিক থেকে আমরা তা মানতে বাধ্য। তাই প্রশ্নের জবাবটা সাধারণভাবে দিব। কনষ্টিটিউশন ‘রিপাবলিক’ বৈশিষ্ঠের এমন হতে হবে। আর এছাড়াও গুরুত্বপুর্ণ হল যা নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তিতে রচিত। এমন কনষ্টিটিউশন মেনে বা এর কথা মাথায় রেখে ‘পরিবেশ পরিষদ’ বানালে তা সব পক্ষই সহজে মেনে নিবে।

রিপাবলিক বৈশিষ্ঠের মানে হল যা কোন রাজা-সম্রাটের রাষ্ট্র নয়, যা কোন এক কর্তৃত্ববাদী, একনায়ক স্বৈরাচার বা ফ্যাসিজমের রাষ্ট্র নয় বা এর কনষ্টিটিউশন নয়। নাগরিক গণস্বীকৃতির রাষ্ট্রই রিপাবলিক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার উৎস পাবলিক, ফলে যা নাগরিকের গণস্বীকৃত ক্ষমতা। পাবলিক যে ক্ষমতাকে অনুমোদন করে।

এছাড়া নাগরিক-সাম্য কথাটার মানে হল, নাগরিক পরিচয় নির্বিশেষে আপনি ইসলামি হন কী প্রগতিবাদী বা পাহাড়ি-সমতলি, কোন বিশেষ ফ্যাকড়ার ইসলাম বা অন্য যা কিছু হন না কেন সকল নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্যহীন আচরণ করবে, সমানভাবে আইন প্রয়োগ করবে – এই ভিত্তির রাষ্ট্র।

তাহলে সারকথা দাড়াল যে নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদের” দোহাই দিয়ে কারও রাজনৈতিক ততপরতা নিষিদ্ধ বলা যাবে না। এটা কোন পথ নয়। কারণ তাতে মানে হয়ে যাবে যেন আওয়ামি লীগকে বলা যে তাকে বিএনপির রাজনীতি মেনে রাজনীতি করতে হবে। অথবা উলটা। মানে, বিএনপিকে বলা যে তাকে লীগের রাজনীতি করতে হবে।

বরং ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়াতে গেলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে নুন্যতম কী বৈশিষ্ঠের হতে হবে – সেই নির্ণায়ক শর্ত বা ক্রাইটেরিয়া আগে বলে রাখতে হবে। যেসব ছাত্র সংগঠন সেসব শর্ত পুরণ করবে তারা সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ঠিক যেমন নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের রেজিষ্ট্রেশনের শর্ত আরোপ করে, অনেকটা সেরকম। তবে স্বভাবতই আমাদের কনষ্টিটিউশনে [Constitution] যা কিছু অনুমোদিত এর বাইরে গিয়ে কোন শর্ত আরোপ করা যাবে না। মোট কথা রিপাবলিক বৈশিষ্ঠ আর নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তি এসবের মধ্যেই থাকতে হবে সব শর্তকে। এসব শর্ত মেনেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করে থাকে।

ঠিক সেরকম এমন শর্ত মানলেই যে কোন ছাত্র সংগঠন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তাতে সে সংগঠনের নামের মধ্যে ইসলাম থাকুক বা না থাকুক কিংবা কমিউনিস্ট থাকুক কি সেকুলার – কিছু এসে যাবে না। কাউকে আর বাধা দেয়া যাবে না।

আসলে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে যথেষ্ট স্টাডি না থাকার কারণে বরং এর বদলে ইসলামবিদ্বেষী টনটনে থাকার কারণে প্রগতিবাদীতার নামে রাজনীতিতে এসব ঘৃণার চাষাবাদ হতে দেখা যায়।

আচ্ছা, আজকাল হিন্দু রাজনৈতিক দল খোলার কিছু হিড়িক দেখা যাচ্ছে। হাসিনা না থামালে তা হয়ত আরও বাড়ত। যেমন, হিন্দু ঐক্য জোট, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, জাতীয়তাবাদী হিন্দু কল্যাণ দল ইত্যাদি নানান কিসিমের নামে এসব দল আছে দেখা যায়। এছাড়া ওদিকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তো আছেই। এখন এসব দলগুলো যদি ছাত্র সংগঠন খুলে বসে আর যদি তারা ডাকসু নির্বাচন করতে চায় তাহলে এসব প্রগতিবাদীদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

রাজনীতিক ততপরতা মানে তা বিদ্বেষের নয় বরং ইতিবাচক এপ্রোচে করার বিষয় – একথা মনে রাখলে অনেক প্রশ্নের সহজ মীমাংসা পাওয়া যায়।

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

গৌতম দাস

২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wW

 

আবার হেডলাইনে আসাম। তবে এবার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নতুন “নাগরিকত্ব বিল”। যদিও সম্প্রতিকালে আসাম বলতে বাংলাদেশের মানুষ চিনে এনআরসি-এর আসাম। NRC বা এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস; অর্থাৎ আসামে এখন বসবাসকারী সবাইকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে এক নাগরিকত্বের তালিকায় নাম তুলতে হচ্ছে। যার মূল কথা – ‘পড়শি’ দেশ থেকে যারা আসামে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর পরে আসামে এসেছে তাদের চিহ্নিত করা, যারা আসামের নাগরিক গণ্য হবেন না। তাদের অনুমান ছিল যে ইতোমধ্যে এক ব্যাপক সংখ্যক লোক আসামে এসে ঢুকেছে। যদিও নানা কারণে অনেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ দিতে পারেনি; যেমন সন্তান পেরেছি কিন্তু পিতা কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেন নাই এমনও হয়েছে। তবু এসব অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া কিন্তু চিহ্নিত নাগরিকদের নিয়ে এরপর তাদের নিয়ে ঠিক কি করা হবে তা “আনুষ্ঠানিক” ভাবে কেউ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত ভারতের সরকারি অবস্থান হল যে এটা ভারতের “অভ্যন্তরীণ বিষয়”  – এই বলে চালাতে চাইছে। ঠিক যেমন ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু করলেও তা আর কখনই বন্ধ করা হয় নাই। এদিকে এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল। এই তালিকা তৈরির নির্দেশ কিন্তু ভারতের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে এসেছে। তা সত্ত্বেও সেই কোর্টও স্পষ্ট করে বলছে না যে, ‘নাগরিক প্রমাণ দিতে না পারলে’ সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে কী করা হবে। কারণ, কারও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত না হওয়া মাত্রই এটা আপনাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে না যে, সে বাংলাদেশের নাগরিক। আর মূল কথা সে ক্ষেত্রে ঐ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ইস্যু নিয়ে কোন ততপরতার শুরুর আগে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিকভাবে ফরমাল কথা বলতে হবে। বাংলাদেশকে রাজি করাতে হবে। বাংলাদেশ যদি রাজি হয় তবেই এরপরেই কেবল আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারবে।

তবে সে কথা এখন থাক। কারণ, ইস্যু এখন তার চেয়ে আলাদা এবং ভয়াবহ। হিন্দুত্বের মোদী এবার আবার আর এক নতুন দানবীয় ইস্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাকে আসামে নতুন করে আগুন লাগানোর লক্ষ্যে মোদীর ‘নাগরিকত্ব বিল’ বলা যায়। যার আঁচ বাংলাদেশেও টের পাওয়া যাবে এমনই ভয়ঙ্কর। এই বিলের আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হল – সিটিজেনশিপ (সংশোধনী) বিল ২০১৬ (Citizenship (Amendment) Bill, 2016)। এই বিলটা বিজেপি ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় পেশ করেছিল ১৯ জুলাই ২০১৬ সালে। তাই বিলের নামের সাথে ২০১৬ শব্দটা লেগে আছে। এতদিন সেটা এক যাচাই কমিটিতে ইচ্ছা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। আসলে মোদী এটা সময়-সুবিধামত বের করবেন তাই গত দু-আড়াই বছর এটা আটকা ছিল। এখন গত সপ্তাহে ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঐ শিরোনামের আইনটা ভারতের লোকসভায় শেষ অধিবেশনে পাস হয়েছে।

সার করে বললে, মূলত এটা এর আগে ভারতের “নাগরিকত্ব বিল ১৯৫৫” (Citizenship Act, 1955) এর কিছু ধারায় আনা সংশোধনের পরের নতুন রূপ। সংশোধিত হবার পর ঐ বিলের সারকথাটা হল – বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশ থেকে (মুসলমান বাদে) হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান এই ছয় ধর্মের লোক ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হলে – আর ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে তাদের ছয় বছর বসবাস পূর্ণ হলে পরে এবার তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া যাবে। এই লক্ষ্যে এমন কেউ ভারতে প্রবেশ করলে যা আগের (১৯৫৫) সংজ্ঞা অনুসারে ‘অবৈধ ইমিগ্রান্ট’ (illegal immigrant) বলে বিবেচিত হতেন, এখন এই বিল পাশের পরে তারা “আশ্রয়প্রার্থী নাগরিক” বলে বিবেচিত হবেন। ফলে তারা ভারত থেকে বহিস্কৃত (deported) হবেন না, বা অবৈধ প্রবেশের দায়ে আদালতে পঁচে মরবেন না। বরং ভারতে থাকার পারমিট পাবেন। আর এভাবে টানা সাত বছর (আগের আইনে এটা ১২ বছর ছিল) থাকার পরে আবেদন করলে, ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন।

যদিও (মুসলমান বাদে) শব্দগুলো সেখানে লেখা নেই, কিন্তু অর্থ তাই। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শব্দগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে, আর ছয় ধর্মের নামও পরিস্কার উল্লেখ করা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়া বারবার ছয় ধর্মের উল্লেখ করার ঝামেলা এড়াতে েদের বদলে একটা শব্দ লেখা শুরু করেছে – ‘অ-মুসলমান”। যেমন ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনাম হল, (Lok Sabha passes Citizenship Bill amid protests, seeks to give citizenship to non-Muslims from 3 countries)। অর্থাৎ মোদী সরকার আসলে যা বুঝাতে চেয়েছে, মিডিয়াগুলো তাই লেখা শুরু করেছে।

কেন এই আইন আদালতে অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত
যে লিগাল ত্রুটির কারণে এই বিল অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত মূল সে যুক্তিটা হলঃ এটা বৈষম্যমূলক। অর্থাৎ এটা কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক “সাম্য নীতি” ভঙ্গ করেছে। ঐ বিলে বলা হয়েছে – ঐ তিন দেশে ‘ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে থাকারা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী যারা, তারা এ সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু তা সাধারণভাবে সব ধর্মের লোক না বরং ‘মুসলমান বাদে’ ভারতের ছয় ধর্মের কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে, যাদের বেলায়ই কেবল এটা প্রযোজ্য হবে। এটা স্পষ্টত এক বৈষম্যমূলক আইন। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা থাকা ও বাস্তবায়ন – এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের এক মৌলিক ভিত্তি।  এখানে সাম্য কথাটা ইতিবাচকভাবে বলা হয়। যেখানে মূল ভাবটা হল, বৈষম্য – নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, কোন আইন করা যাবে না যার মাধ্যমে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মানে রাষ্ট্রকে এক “নাগরিক বৈষম্যহীনতার” নীতি অনুসরণ করতেই হবে। বৈষম্যহীনতা মানেই ত সাম্য – তাই শব্দটাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে “সাম্যের” নীতি বলা হয়ে থাকে। এই কারণে, কোনও রিপাবলিক রাষ্ট্র কেউ মুসলমান বলে বা হিন্দু বলে যেকোন নাগরিক এমন কারও প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পারে না। এটাই নাগরিক সাম্য বা Equility এর মৌলিক নীতি, অথবা রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন থাকার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। এই যুক্তিতে কোন সুপ্রীম কোর্ট এই বিলকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।

এছাড়া, আর একটা কথা হল কখন কোন জিনিষ আইন বলে গণ্য হবে – এই প্রসঙ্গে আইনের ভিতমূলক প্রস্তাব বলে থাকে যে কোন বিষয় আইন বলে তখনই মানা হবে যদি তা নাগরিক-নির্বিশেষে সবার উপর প্রযোজ্য করা হয় তবেই। নইলে তা কোন আইনই নয়। সোজা কথা যা সবার উপর প্রযোজ্য করা যায় না তা কোন আইনই নয়। মোদীর নাগরিক বিল এই যুক্তিতে কোন আইনই নয়। ফলে ভারতের আদালতে রিট হলে আর  সৎ ও দুরদৃষ্টির যেকোন পেশাদার বিচারক এই আইনকে অবৈধ ও রদ (null & Void) করা হল – বলে রায় দিবেন।

ওদিকে বিল পাশের আগের সপ্তাহে ০৪ জানুয়ারি আসামের শিলচর গিয়ে মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছিলেন। সেখানে আবেগী বক্তৃতায়  দিয়ে মোদী বলছেন, ভারত মাতার সন্তানদের প্রতি ভারতের দায় আছে (আগ্রহীরা ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন। 15:58 মিনিটের এই ক্লিপে 05:30 মিনেটের পর থেকে মোদীর “ভারতমাতার” সে কাহিনী শুনা যেতে পারে।)। সেই দায় থেকে ঐ তিন দেশের ঐ ছয় ধর্মের যারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদেরকে আশ্রয় দেয়া মোদীর দায়িত্ব – এটাই মোদীর সারকথা। কিন্তু এখন মোদীর এই যুক্তি অনুসারেই মুসলমানদের বাদ পড়ার কোন কারণ নাই। এটা এমনই উদাম এক মুসলমান-বিদ্বেষী আইন।  যেখানে এমনকি পারসি, খ্রীশ্চান ধর্মও মোদীর ধর্ম-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  যেমন, আরএসএস-বিজেপি তাদের উদাম বিদ্বেষ ঢাকতে প্রায়ই বলে থাকে, “ইসলাম বা মুসলমানেরা ভারতে বহিরাগত”। এখন এসব বিদ্বেষী-ভাষ্য যদি এটা মেনেও নেই তাহলে খোদ আর্যরা কী বহিরাগত নয়? তারা কোন ভারতের ঘরের লোক? এছাড়া প্রাক-ইসলামি যুগের পারস্য বা ইরানের পারসিক অথবা ইউরোপীয় খ্রীশ্চান এরা কীভাবে ভারতের ঘরের? আরএসএস-বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষ কত তীব্র তার প্রমাণ এগুলো। না তবে সাবধান। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে বলবার জন্য একথাগুলো বলা হচ্ছে অজান্তেও তা মনে করা যাবে না। সেটা আর এক বিরাট বে-ইনসাফি হবে। যেমন মোদী যদি বলতে পারতেন “যে কোন ধর্মের” আর “যে কোন দেশের” নাগরিক যারা ধর্মের কারণ নির্যাতিত তাদের জন্য এই আইন – তবে সেটাই হত সবচেয়ে মানবিক আর সবার জন্য কাম্য ও আদরের এক নাগরিকত্ব আইন।

এখন তাই মোদির নাগরিক বিল পাস হওয়ার দিন, ৮ জানুয়ারি এক উল্লেখযোগ্য নতুন বৈষম্যের দিন হয়ে থাকল। কারণ, একে তো এমনিতেই আসামে আগের নাগরিক তালিকা তৈরির – এনআরসি তাতে, ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে আসামের অপ্রমাণিত নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে আবার ১৮ লাখই হিন্দু। অর্থাৎ এনআরসি তৈরির উদ্যেশ্য বা পেছনের অনুমান ছিল যে প্রমাণ করতে না পারা অর্থে অবৈধ নাগরিকের বেশির ভাগ হবে মুসলমান। আর মুসলমান মানেই ধরে নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অনুমানই ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে যায় যখন হাজির হয় যে এর মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাদের নিয়ে কী করা হবে সেই টেনশন বাড়ছিল। এর ভেতর নতুন করে আর এক দিকে উত্তেজনা ঘুরিয়ে বিজেপির দলীয়করণ করে নেয়া হল।

১৯৮৫ সালের চুক্তি বনাম মোদীর বিল
অহমিয়াদের সাথে রাজীব গান্ধী সরকারের ১৯৮৫ সালের চুক্তিতে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন ভাগ ছিল না। বলা ছিল, যারাই ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের পরে আসামে প্রবেশ করেছে বলে জানা যাবে তাদেরকে আসামের নাগরিক মানা হবে না – এই ছিল চুক্তি মূল কথা।  এই কারণে, NRC এর ভিত্তিও একই। কিন্তু বিজেপি এই ৪০ লাখ  হিন্দু-মুসলমান, এমন অপ্রমাণিত-নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবার বাস্তবতায় হিন্দুদেরকে সুবিধা আর মুসলমানদেরকে বঞ্চনা দিয়ে এক বৈষম্য করে এতে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের খাড়া করতে চাইছে।  এমনিতে বিজেপির সবখানের কমন রাজনৈতিক কৌশল হল – সাধারণভাবে “নাগরিক অধিকার” রক্ষা নয়, বরং একে পাশ কাটিয়ে হিন্দুত্বের আওয়াজ তুলে এর ভিত্তিতে সমাজে ভোটের মেরুকরণ তৈরি করা। আর এই সুযোগে হিন্দুত্বের নামে নিজদলের ভোটের বাক্স ভারি করা। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে সেই কাজটাই করা হল; তাতে সমাজে খামোখা বিভক্তি রেষারেষি বৈষম্য বাড়ল কীনা, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল কিনা – এসব কিছু ফেলে এখন পাঁচ বছরের মোদীর শাসনের শেষে উল্লেখযোগ্য সবই হারানো বিজেপি এখন বেপরোয়া।

এই বিলের প্রভাব ও পরিণতি
প্রথমত, আমাদের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, মোদির এই বিল আসামের এনআরসি বিতর্কের কোনো সুস্থ সুরাহা করার দিকে তাকিয়ে করা হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্য এ বিতর্ককে ব্যবহার করে বিজেপির নিজের বিভাজনের রাজনীতিকে বিস্তার ঘটান। তাই বেপরোয়া হয়ে অর্ধজ্ঞানের গোয়াঁর বিজেপি নেতারা [আসামের মন্ত্রী ও সারা নর্থ-ইস্টে বিজেপির মুল সংগঠক Himanta Biswa Sarma, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Sarbananda Sonowal ] মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন করে তারা দাবি করছে এটা নাকি তাদের তথাকথিত “সভ্যতার লড়াই”। বলছে – ……They want us to be slaves of a particular civilisation. However in this civilisational fight we must win. যদিও নেপথ্যে তারা বলছেও তারা নিরুপায়। অন্য সব ইস্যু বা অর্জন হারানো বিজেপি এখন তাই আসন্ন নির্বাচনে মূল ফোকাস শ্লোগান করবে তথাকথিত হিন্দুস্বার্থ, হিন্দুত্ব বা কথিত সভ্যতার লড়াই……।

এভাবে বিভাজন ঘটিয়ে তাদের শেষ আশা যে এভাবেই তারা আসন্ন নির্বাচন পার হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে,  সাধারণভাবে ভারতীয় “নাগরিক” এমন পরিচয়ের রাজনীতি বিজেপি করে না বরং এক বিভক্ত পরিচয় হিন্দুত্ব – এমন হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিই বিজেপি করে। এই হিন্দুত্ব পরিচয়ে ভোটারদের জন্য সে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে কেবল তথাকথিত হিন্দু স্বার্থের আওয়াজ তুলে মেরুকরণ করা ও ভোট বাক্সে তা পৌঁছান- এই হলো বিজেপির রাজনীতির কৌশল। তাই মোদির নাগরিকত্ব বিল সাধারণভাবে ভারতের সব রাজ্যের দিকে তাকিয়ে করা বলে মনে হলেও তা আসলে আড়াল সৃষ্টি করা। আর এই আড়ালে তাঁর বিশেষ টার্গেট রাজ্য হল – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। যেমন এ বিলের মাধ্যমে আসলে বলা হয়ে গেছে যে, আসামের তাদের এনআরসি-ইস্যুতে অপ্রমাণিত নাগরিকদের মধ্যেকার ১৮ লাখ হিন্দুকে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিজেপি নিয়ে নিল। আর এভাবেই আসামকে এখন হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করল বিজেপি।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এতদিন বিজেপি অভিযোগ করত,  পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া হিন্দু বাঙালি [পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভাষায় যারা ‘বাঙাল’], কংগ্রেস আর সিপিএম, কেবল এদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে গেছে। ‘বাঙালদের’ রেশনকার্ড আর ভোটার বানিয়ে দিয়ে নিজের দল-ভারী করার সহজ রাজনীতি করে গেছে। এমন ধরণের পাল্টাপাল্টি বয়ান অনেক আছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল এমন অভিযোগ – কংগ্রেস, সিপিএম অথবা বিজেপি – এরা কেউই মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কখনো করে না। তাহলে কী উল্টা? মানে, মমতা “বাঙালদের” বিরুদ্ধের রাজনীতিটা করে? না, সেটাও না। এমন অভিযোগও দেখা যায়নি। তবে মজার ব্যাপারটা হল এখন এ বিলের মাধ্যমে এবার বিজেপি নিজেই “বাঙাল” মনোরঞ্জনে সবার ওপরে এগিয়ে থাকার রাজনীতিতে নামল। যে অভিযোগ সে এতদিন অন্যদের বিরুদ্ধে করত।

সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া ধর্ম-নির্বিশেষে যে কেউই হোক, তাকে ভারতে নাগরিক হিসাবে “ন্যাচারালাইজ” করে নেয়া – এটা কোনোই খারাপ বা অন্যায় কাজ নয়। আপত্তি করারও কিছু এখানে নাই। যদিও আগে আইন বানিয়ে আইনসম্মত ভাবে তা করলে সেটা তো আরও ভাল। কিন্তু ঘোরতর বে-ইনসাফি অন্যায় ও খারাপ কাজ হবে যদি বৈষম্য করা হয় যে, “কেবল অমুক ধর্ম” হলেই তাকে স্বাগত। মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে যখন “মুসলমান বাদে” বলে নীতি-পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিজেপি সেই ভয়ঙ্কর বীজ বপনের কাজ শুরু করল। আসামের ঐ ১৮ লাখ হিন্দুর কথা তুলে বিজেপি আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনি ফোকাসের বক্তব্য করতে চায়। যাতে সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর বিশেষ করে “বাঙাল” হিন্দুরা সহানুভূতিশীল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটের বাক্সে আসে, প্রতিফলিত হয়। তাই মোদীর এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করা করা হয়েছে – অহমীয়াদের স্বার্থদের বিরুদ্ধে। এই হল নাগরিকত্ব বিল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি টার্গেট। মোদী তান্ডব আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই বিলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মমতাই এখন প্রধান প্রতিরোধকারি ও ভরসা।

তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এমনকি এর সাথে পশ্চিমবঙ্গেও আর এক  বিজেপি প্রপাগান্ডাও চলবে যে, আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা “নাগরিক তালিকা” তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার শুরু করা হবে যে, তারা তুচ্ছ তেলাপোকা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাচনী অপপ্রচার এবং এই চরম ঘৃণা ছড়ান উন্মাদনা, এটাও বিজেপি পাশাপাশি চালাবেই। এটাই হবে, হিন্দুমনে জাগানো ঘৃণা-বিদ্বেষ কাজের মূল ফোকাস বয়ান। তার নির্বাচনি মুখ্য বয়ান।

যদিও এখানে খেয়াল রাখতে হবে আসামের মূল এনআরসির দাবি বা চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে আইনত তারা ঠিক কেবল মুসলমান বুঝায় নাই। এটা তেমন ভিত্তির ওপর দাঁড়ান নয়। ফলে তারা কেবল মুসলমানদের বের করে দিতে এ কাজ করছে তা নয়, বরং স্পষ্ট করে বলছে – ২৪ মার্চের পরে ধর্ম-নির্বিশেষে যারাই আসামে এসেছে তাদের বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে হবে। কিন্তু বিজেপি বা মোদি এই সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাদের সোজা ভাষ্য ও অর্থ হল – এনআরসির কর্মকান্ড বলতে কেবল ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ বুঝতে হবে।

আসামে এই বিলের প্রতিক্রিয়া
কেবল আসাম নয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আসাম ছাড়াও যেমন মনিপুরে, এমনকি ত্রিপুরায়ও। অনুমান করা যায় – তাদের মূল উদ্বেগের কারণ হল, এই সাত রাজ্যের মধ্যে যাদের সীমান্তের অপর পাড় বাংলাদেশ, তারা তো বটেই, এমনকি যারা নয়, তাদের এলাকাতেও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা এবার নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়েই এসে গেড়ে বসে যাবে – এই হল তাদের মুল উদ্বেগ। সাধারণভাবে এখানে আগে থেকেই থাকা সবচেয়ে বড় টেনশনের ইস্যু হয়ে ছিল, সমতলি-পাহাড়ি। আসামেরও মূল দ্বন্দ্ব, টেনশনও এটা। [আমাদের দেশে যেটা পাহাড়ি সেটা নর্থ-ইস্টের ভাষায় জনজাতি বা ট্রাইব।]  কারণ এই অঞ্চলের বড় বৈশিষ্ট হল পাহাড়ি বাসিন্দা অথবা ‘জনজাতি’ বাসিন্দা। ফলে এই অঞ্চলের সমতলি-পাহাড়ির মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন আর তা থেকে উদ্ভুত উচ্চ বা নিম্নস্বরে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা সেখানে সবসময় কাজ করে থাকে। এরই মধ্যে আবার “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করে তৈরি করা নাগরিকত্ব বিল এটাকে তারা দেখছে যে এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের (তারা বলতে চাচ্ছে এতে সমতলিদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে) নতুন করে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে আর স্বভাবতি তা ঘটলে তাতে আগের টেনশন আরও বড় নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তবে সুনির্দিষ্ট করে আসামের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক, তা অনুমান করা যায়। যেমন এমনিতেই আসামের এনআরসিতে যে ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকেছিল, তাদের মধ্যকার ১৮ লাখ হিন্দু নিজেদের ভাগ্য মোদী ফিরাবে একটা গতি হবে এই ভরসায় ইতোমধ্যেই তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের ও মোদীর ভক্ত হয়েছিলেন। সেটা কেবল ওই ১৮ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা আসামের বাঙালি হিন্দুমাত্রই তাঁরা ক্রমেই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছিলেন। এককথায় বললে, মোদীর হিন্দুত্বের ভিত্তিতে পাবলিক মেরুকরণ এর রাজনীতি এখানই বিভক্তির প্রভাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর তাই এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি”।

কেন? এখন এই ১৮ লাখ হিন্দুই হবেন আসামের পাহাড়ি বা যারা নিজেদের অহমিয়া পরিচয় দাবি করেন তাদের হাতে আক্রান্ত হবার প্রধান টার্গেট। আসামের পাহাড়ি বা অহমিয়া পরিচয়ধারীদেরই মূল রাজনৈতিক দল হল – অহম গণ পরিষদ ও বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। যারা বিজেপির সাথে মিলে বিজয়ে গত ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচন থেকে আসামের প্রাদেশিক জোট সরকারে ছিল। মোদীর নাগরিকত্ব বিল পাসের প্রতিবাদে এরাই এখন জোট-সরকার থেকে বের হয়ে গেছে। বিজেপির জোট শরিক অহম গণপরিষদের তিন মন্ত্রী রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে নয় জানুয়ারি সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরাই ১৯৮৫ সালের চুক্তির মুল দাবিদার পক্ষ যে চুক্তির মূলকথা হল, অ-অহমিয়দের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এরা এর প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক। এর আগে বাঙালি-নিধনের বহু রেকর্ড এদের আছে, এবং সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়া জেলায় পাঁচ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা ওই ১৮ লাখ হিন্দু বাঙালির ভাগ্যে এখন কী হবে এর ইঙ্গিত বলেছেন অনেকেই।

এ দিকে, আর এক অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যাচ্ছে। তা হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ মোদীর এই বিল পাসে খুশি হয়নি মনে হচ্ছে, অন্তত ভাল কাজ মনে করছে না। যদিও পেশাদার হিসেবে তাঁরা তাঁদের আপত্তি মনে মনে রেখেছে। তবে সেই সাথে আর একটা কাজ করেছে। তা হল, তাদের সাথে সম্পর্কিত বা এসাইনড লোকেদের হাতে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকে তাদের আপত্তি বা যুক্তিগুলো জানা গেছে। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিল পাসের ফলে এতে গত ছয় বছরে উলফার (ULFA, আসামে এটা উচ্চারিত হয় আলফা বলে) কমে আসা তৎপরতা যা এখন পরেশ বরুয়া অংশের নামে আছে কিন্তু স্তিমিত তাদের পুরনো সেসব তৎপরতা আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে তাঁরা। এমনিতেই জটিল পরিস্থিতি ও সমীকরণের আসামে আবার নতুন উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতের ফলে তাদের এতদিনের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যা কিছু অর্জন এত দিনে হয়েছিল তার উপর পানি ঢেলে দেয়া হবে বলে তারা মনে করে। তাই অশান্তি আর তাদের কাজ বাড়বে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া
এবারের ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি ও মোদীর রাজনীতি হবে বাংলাদেশের জন্যও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই বাংলাদেশের স্থানীয় হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই এখন আরএসএসের মুঠোয়। এই বিল “বাঙালি-হিন্দুমুখি” বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের “বাঙালদের” মনোরঞ্জন-মুখি এই অভিযোগ অনেকের।  ফলে মোদীর নাগরিকত্ব বিলের রাজনীতি হাজির করে বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই আরএসএসের মুঠোয় ভরতে তাদের সাহায্য করেছে। যদিও নিকট আগামিতেই বাংলাদেশের হিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে আত্মঘাতি বলে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য যে ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে তা হল, এই বিল এক বিশাল মরিচিকা।

ওদিকে অর্থনীতিক ‘উন্নয়ন ও বিকাশে’ রাজনীতিতে মোদী ইতোমধ্যেই ফেল মেরেছে। আসলে সেকারণেই মোদীর এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতি এত সিরিয়াস-নেস। আর একেই বিকল্প ইস্যু ভাব ধরে হাজির করার উদ্যোগ। মানে তার এখন একমাত্র সম্ভাব্য ইস্যু হবে হিন্দুত্ব, যার বিশেষ ফোকাস হবে ‘নাগরিকত্ব বিল’। আমরা ইতোমধ্যে – মুসলমানেরা তুচ্ছ তেলাপোকা, পিসে মেরে ফেলা হবে, বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে উপড়ে ফেলা হবে, ইত্যাদি এসব বলে গত নভেম্বর পাঁচ রাজ্য নির্বাচন লড়েছে বিজেপি দেখেছি।

সেই মহড়ার পর এবার আবার মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় নামতে হবে মোদীকে। আমাদের সরকার গতবার কেবল তথ্যমন্ত্রী ইনুকে দিয়ে এই ইস্যুতে ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নাগরিকত্বের বিল পাস করার পরে মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডা আরও তীব্র হবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ এবার এটা আরও বড় স্টেক; মোদী নির্বাচনে জেতার মামলা যেখানে আবার নাগরিকত্ব বিল মুল ইস্যু।

এছাড়া ওদিকে আবার বিশেষ করে আসামে যেখানে অহমিয়া-বাঙালি সঙ্ঘাত উসকে গেল সে পরিপ্রেক্ষিতঅও তৈরি হচ্ছে। হাসিনা সরকার তার প্রথম পাঁচ বছরেই উলফা দমনে যে ভূমিকা ও সহায়তা দিয়েছিল এর প্রশংসায় ভারতের গোয়েন্দা-আমলা থেকে রাজনীতিক সবাই পঞ্চমুখ। যদি তাই হয় তবে একদিকে এখন সেই অর্জন ভেঙে ফেলতে পরোয়া করছে না মোদীর নির্বাচনে জিতবার স্বার্থ। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের তেলাপোকা বলে ঘৃণা আর গালির জোয়ার তুলছে। এটা কতটুকু ফেয়ার? মোদীকেই জিতাবার স্বার্থে আমাদের সরকার কী মোদীর অত্যাচার, অনাচার জুলুমের দায়ীত্ব নিজের কাধে নিবে? আমাদের সরকারের নিজেকে আরও ভারতমুখি পরিচয়ে আর নিজেকে গণবিরোধী করার রিস্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে? মনে হয় না।

ভারতের হবু নির্বাচনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দুই দিকে দুই রাজ্যে থেকেই মোদীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় (যা ইতোমধ্যে আমরা রাজস্থান, ছত্তিসগড় নির্বাচনে দেখেছি) দেখতে হবে আমাদেরকে। বলা বাহুল্য এতে বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে পাল্টা সরব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর সম্ভাব্য সে পরিস্থিতির কথা আঁচ করে আগে থেকেই ভারতকে সাবধান করে নিজেদের স্বার্থ-প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে না ধরা হবে আমাদের সরকারের আর এক বড় ভুল।

গুরুতর প্রশ্ন, এ নাগরিকত্ব বিল পাসের পরে আসাম্র ‘নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকে যাওয়া’ প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের কী হবে? রোহিঙ্গাদের মত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে? অথবা মোদীর উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের কারণে জীবনের ভয়ে তারা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামাবে, নাকি তাদের বাধ্য করা হবে?

আমাদের উচিত হবে এমন যেকোনো কিছুর আগে এনিয়ে মোদীর সাথে ‘ডায়লগ ওপেন’ করা। মোদীকে আগে থেকেই সংযত করা, আমাদের উদ্বেগের কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি আদায় করা হবে আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অন্যথায় আমাদের সরকারকে অজনপ্রিয় হওয়ার অপ্রয়োজনীয় ভারতমুখি পরিচয়ের রিস্ক নিতে হবে।

শেষ কথাঃ
শেষ কথাটা হল এই বিল পুরাপুরি আইনসিদ্ধ হবার প্রক্রিয়া এখনও বাকী। কারণ লোকসভায় পাশের পর এবার ভারতের উচ্চ-কক্ষ, রাজসভাতেও তা পাশ হতে হবে। তবেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা পরিপুর্ণ আইন হবে। রাজ্যসভা বসবে আগামি ৩১ জানুয়ারি। সবচেয়ে বড় কথা কিন্তু এখানে বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই। এর অর্থ এই বিল এখানে পাশ হবার কোন সম্ভাবনা নাই। ২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর জোট এখনো ৮৮ জন সদস্য। বিপরীতে বিজেপি বিরোধী শিবিরের এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যা ১৫৬। তাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
তাহলে এটা জানার পরেও মোদী এত উদ্যোগী কেন? কারণ, আপাতত তাঁর “বাঙালি-হিন্দুমুখি” প্রেমের প্রকাশ – আর কিছু পারুক না পারুক  মোদীর মূল উদ্যোগ হল – এটা দেখিয়েই সে কাজ সারতে চায়। এটাই তাঁর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম-ত্রিপুরাসহ পুরা নর্থ-ইস্টে (মোট ৬৬ আসনে) নির্বাচনে লড়বার লক্ষ্যে মেরুকরণে হিন্দুত্ব রাজনীতির একমাত্র কৌশল।  আর এই মেরুকরণে এই অঞ্চলের প্রাণ-বেড়িয়ে যাবার অবস্থা তৈরি হলেও সংকীর্ণ স্বার্থপর বিজেপি ও মোদী নির্বিকার; যেভাবেই হোক তাঁকে ক্ষমতা পেতে হবে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) মোদির নতুন বিল: আসাম ও বাংলাদেশ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

গৌতম দাস

১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2vK

সৌদি নাগরিক, জার্নালিষ্ট জামাল খাশোগি এ সময়ের বিশ্বে এক আলোচিত নাম। আশির দশকে আর এক ‘খাশোগির’ নাম আমরা তখন শুনেছিলাম, আদনান খাশোগি। ড্রাগ বা অস্ত্রের মতো চরম নিষিদ্ধ বা বেআইনি পণ্যের পেমেন্ট লেনদেনে জড়িত ব্যাংক বিসিসিআইর ডিরেক্টর ছিলেন আদনান। তাই তিনি ‘কুখ্যাত’ আর বিপরীতে জামাল দুনিয়ার সহানুভূতি পাওয়া, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যক্তিত্ব। সেকালের পত্রিকায় লেখা হত, ‘সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি’। “খাশোগি” নামের সেই বাংলা বানানই বজায় রাখলাম এখানে। আর সেই আদনান খাশোগির ভাতিজা হলেন জামাল খাশোগি।

জামাল খাশোগির দাদা মোহাম্মদ খাশোগি ছিলেন মূলত তুরস্কের নাগরিক, এক ডাক্তার। তিনি সৌদি আরবে এসে সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর রাজ পরিবারের সাথে স্বভাবতই তাঁর  ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। পরে এক সৌদি নারীকে বিয়ে করে তিনি সৌদি নাগরিক হয়ে যান। তারই নাতি জামাল খাশোগির জন্ম ১৯৫৩ সালে সৌদি আরবে। জামাল রাজ পরিবারের সাথে রক্তের সম্পর্কের কেউ নন। কিন্তু তা না হলেও দাদার সূত্রে, রাজ পরিবারের অনেকের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়ে ওঠেন। তবে সেটা হওয়ার পেছনে আর একটা ফ্যাক্টরও গুরুত্ব ছিল – যখন জামাল পড়ালেখায় আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতায় ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

তবে জামালের এরপরের পরিচিতি অঙ্গনটা হয়ে যায় মূলত – মধ্যপ্রাচ্যের মূলত দেশিবিদেশী ইংরাজি মিডিয়ার জগত। চাকরি সূত্রে তিনি ‘সৌদি গেজেট, আরব নিউজ, আল ওয়াতন ইত্যাদির পত্রিকার সাথে জড়িয়ে পড়েন। প্রিন্ট মিডিয়ায় সাধারণ রিপোর্টার থেকে প্রধান সম্পাদক, আর টিভি মিডিয়াতে নিউজ এডিটর থেকে ডিরেক্টর – এভাবে পুরো নব্বইয়ের দশক হল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে জামাল খাশোগির উত্থান কালপর্ব। এ সময়েই এক ফাঁকে ফেলো সিটিজেন ওসামা বিন লাদেনের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন এবং  সোভিয়েতবিরোধী  মুজাহিদিনদের সেই প্রতিরোধে লড়াইয়ের সময়কাল থেকে কয়েকবার তিনি লাদেনের সাক্ষাৎকার ছেপেছেন। তবে অবশ্যই আমেরিকায় টুইন টাওয়ার হামলার পরে সেই বিন লাদেনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ভিন্ন বিষয়।

তবুও অনেকের সাথে সেসব পুরনো পরিচয় আর বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও তার গঠন সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা একদিকে; অন্য দিকে পশ্চিমের চিন্তার সাথেও তাঁর পরিচিতি আর পশ্চিমের ভাষায় তা উপস্থাপনের দক্ষতার জন্য জামাল গুরুত্বপূর্ণ ‘রিসোর্স পারসন’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে ওঠেন। পারিবারিক সূত্রের সুবিধায় রাজপরিবারের নানা প্রজন্মের অনেক সদস্যের সাথে তার স্বাভাবিক পরিচয়ও ছিল। তেমন একজন হলেন এক প্রিন্স, তুর্কি বিন ফয়সল বিন আব্দুল আজিজ। পুরো আফগান মুজাহিদিন লড়াইয়ের সময়কালে তুর্কি ছিলেন সৌদি গোয়েন্দাবাহিনীর প্রধান। তিনি আসলে মুজাহিদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে যারা সৌদি ফান্ডের সাথে সম্পর্কিত তাদের অর্থ বিতরণ আর নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও পরিচালনা করতেন। পরে ২০০১ সালের দিকে গোয়েন্দাপ্রধানের কাজ ছেড়ে কিছুদিন তিনি সৌদি আরবে ফিরে গিয়ে সেখানেই ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি লন্ডনে বা আমেরিকায় কাটিয়েছেন, বিশেষ করে পড়ালেখার সূত্রে। পরে ২০০৫ সালে তিনিই ব্রিটেনে সৌদি রাষ্ট্রদূত যুক্ত হন। আর সেই সময় তিনি জামাল খাশোগিকে তার মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করেন।  আর সর্বশেষ তিনি সৌদি ডিফ্যাক্টো রাজার ক্ষমতায় হাজির থাকা যুবরাজ, মোহাম্মদ বিন সালমন (MBS) এর প্রতিহিংসা স্বীকার হতে পারেন, এই ভয়ে আগেই  আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ  গিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় কলাম লিখতেন। কিন্তু যুবরাজের ব্যক্তি প্রতিহিংসা থেকে বাঁচতে পারলেন না।

এই জামাল খাশোগি গত ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে প্রবেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখান থেকে গুম বা খুন হয়ে যান। আমাদের মূল আলোচনার প্রসঙ্গ এখান থেকে। জামালের দুর্ভাগ্য যে তিনি এক মনার্কি (monarchy) বা রাজতন্ত্রের দেশের নাগরিক। বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা লাভের দিক থেকে তিনি পশ্চিমের আলোতে বড় হয়েছেন, ফলে যথেষ্ট আলোকিত বলা যায়। এরপরেও তার দুর্ভাগ্য, তিনি রাজতন্ত্রের জমিদারসুলভ  ফিউড্যাল অহঙ্কারের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছেন। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, বাদশার ছেলে নিজের ফিউড্যাল জেদ পূরণ করতে তাঁকে নৃশংসভাবে খুন করেছেন। এখানে ‘নাগরিক’ শব্দটা ব্যবহার করেছি বটে, কিন্তু শব্দটা রাজতান্ত্রিক শাসনের সাথে মানানসই শব্দ নয়। ধার করে আনা।

রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থাকে দুই ধরণে ভাগ করা যায় – অতীত ব্যবস্থা আর চলতি বা মডার্ন ব্যবস্থা। অতীত ব্যবস্থা বলতে আগেকার রাজতন্ত্র বা বাদশা-আমিরিতন্ত্রের ডাইনেস্টি বা বংশীয় শাসন ব্যবস্থা। এরা সবই এক ক্যাটাগরির। আর এদের সবার বিপরীতে ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র থেকে রিপাবলিক মানে সব সমাধান পেয়ে যাওয়া নয়। তবে এক মৌলিক বদল আর তা স্বাভাবিক বদল না একেবারে লাফানো বদলের উল্লফন। আবার না, অবশ্যই এটা প্রাচীন “রোমের রিপাবলিক” নয়; তাই ফারাক টানতে অনেক সময় একে ‘আধুনিক প্রজাতন্ত্র’ বা ‘মডার্ন রিপাবলিক’ বলেও উল্লেখ করা হয়। মূলত অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে (১৭৮৯) ও স্বাধীন আমেরিকায় (১৭৭৬) এর উত্থান ও সূচনা। এর প্রথম বাস্তব রূপ। তবু ‘মডার্ন’ শব্দটা শুনেই মনে এক অপছন্দের ভাব আসতে সুযোগ দেয়া, নিজের চায়ের কাপ নয় মনে করতে শুরু করা বা, নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়া অথবা এটা আমাদের জন্য নয় – এ ধরনের মনে করাগুলা ভুল হবে।

‘রাষ্ট্র’ কথাটা আগে মানে রাজতন্ত্রের রমরমা যুগেও ছিল মনে করা বা এমন বাক্য লিখে ফেলে বা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করে ফেলে অনেকে। ব্যাপারটা হল একালে আধুনিক রাষ্ট্রের যুগে দাঁড়িয়ে সেকালের রাজতন্ত্রকে বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক সময় অসতর্কে সবকিছুকেই ঢালাওভাবে রাষ্ট্র বলে ফেলেন অনেকে। অথবা একটা যেকোন ‘শাসনব্যবস্থা’ মাত্রই তা রাষ্ট্র এমন বর্ণনামূলক অর্থে এখনো কেউ কেউ ব্যবহার করে বসেন। কিন্তু ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ধারণাটা বাস্তবতা হয়ে ওঠার পরে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটা একটা স্তরে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ দুনিয়াতে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা উত্থিত হতে হতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে এসে এটা একটা স্পষ্ট ধারণার স্তর পার হয়ে বাস্তব হয়েছে মনে করা হয়।

কারণ যেকোন শাসন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় প্রবেশেরও আগের প্রশ্ন, দুনিয়াদারিতে মানুষের তৈরি ব্যবস্থায় মানুষকে শাসন করতে পারে কে? শাসন করার ক্ষমতার উৎস কী? বা শাসনক্ষমতা কোন শাসককে কে দিয়েছে, কোথা থেকে পেয়েছে?  এই প্রশ্নের জবাব রাজতন্ত্রের কাছে নাই। আকার ইঙ্গিতের মানে হল জবরদখল। এই প্রশ্নের সুরাহা হয়েছিল যে মানুষ একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসনের অধিকারী। এই স্ব-ক্ষমতাটাই মানুষ দল বেধে জনগোষ্ঠিগতভাবে কাউকে সাময়িক ডেলিগেট করে দিলে, কাউকে সেই ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করতে দিলে তবেই কেউ একজন (সাময়িক) শাসক হতে পারে। আর এই সুরাহার পরেই দুনিয়া থেকে রাজা-সম্রাটের শাসনের মনার্কি ব্যবস্থা লোপাট হতে শুরু করেছিল। আর নতুন ব্যবস্থারই সাধারণ নাম রিপাবলিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র। অনেকে এটা রাজা ধারণার বিপরীত ধারণা বলে আর রাজার বিপরীত শব্দ বলে মনে করা প্রজা ধারণা চালু ছিল বলে রিপাবলিকের বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ চালু করেছিল। এরই প্রথম নতুন বা মর্ডান রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দিতে। তবে আমেরিকা ও ইউরোপ এরপর থেকে এক রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চলে গেলেও সেই ইউরোপই আবার অন্যদেশে উপনিবেশ গড়া শুরু করেছিল। ইউরোপ সারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় কলোনি দখল ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। যেটার আবার সমাপ্তি ঘটেছিল কেবল গত শতাব্দির মাঝামাঝি।  “যেকোন জনগোষ্ঠি কার দ্বারা শাসিত হবে সেটা বেছে নিবে একমাত্র নিজেরা – এটাকে ভিত্তি মেনে নিতে গ্লোবালি বা দুনিয়াজুড়ে একমত হতে দেখা দেখা গিয়েছে একমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পরেই। এটা হল রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা উত্থান ও বিস্তারের এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। রাজতন্ত্র থেকে পুর্ণ উত্তরণ তা যথেষ্ট না হলেও এক লম্বা লাফ অবশ্যই।

সেকারণে একটা ‘লাইন’ টানা হইয়ে যাওয়া যে, আর রাজতন্ত্র নয়, অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের পেছনে আর না যাই। আর ‘রাষ্ট্র’ শব্দ রিপাবলিক শব্দের সাথে সম-উচ্চারিত অর্থে সমার্থক হয়ে যাওয়া। রাষ্ট্র কেবল রিপাবলিকের সাথে ব্যবহার করা হবে এমন শব্দ হয়ে যাওয়া। তবে পরিস্কার থাকতে হবে, একইসাথে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা একটা ক্রম বিকাশমান শব্দ ও ধারণা। যার একটা বড় পর্যায় বা স্তর হলো অষ্টাদশ শতক। এটা ক্রমশ আরো বিকশিত ও স্পষ্ট হয়েছে আর নিজেকে শুধরে নিচ্ছে। মূল কথা ফরাসি বা আমেরিকান রিপাবলিকই সবকিছুর মডেল নয়; তা হতেই হবে এমন নয়।

কারণ রাষ্ট্র ধারণাটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, ‘ক্রমশ খুলছে, স্পষ্ট ফুটে উঠছে’, আইডিয়া আসছে ও পরিষ্কার হচ্ছে। তবে কেবল প্রধান বা মৌলিক বৈশিষ্টের দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে। যেমন অন্তত বাদশা-আমিরিতে ফেরত যাবেন না। আর এমনিতেই ইতোমধ্যে রাষ্ট্র ক্রম চলমান এক উত্থিত ধরনের আইডিয়া হিসেবে এর কত কী বদলে গিয়েছে তার স্টক মিলাতে পারি, সে হিসাব আমল করতে পারি।  যেমন দেখেন, রুশ বিপ্লব (১৯১৭) বা চীন বিপ্লবে (১৯৪৯) প্রাপ্ত রাষ্ট্র, অথবা কলোনি শাসন-মুক্তির মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো উত্থিত রাষ্ট্র (১৯৪৫ এর পরে যেমন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ১৯৪৭), এমনকি সর্বশেষ ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯)- সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রাপ্ত রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ কথাটা জুড়ে দেয়া আছে। অর্থাৎ বিপ্লব শেষে সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নামের সাথে নিজেরাই ‘রিপাবলিক’ শব্দ জুড়ে রেখেছেন যদিও এই সবগুলো রাষ্ট্র একই ধরনের নয়। যেমন লেনিনের ‘রুশ বা সোভিয়েত রিপাবলিক’ নিশ্চয়ই ১৭৭৬ সালের ‘আমেরিকান রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মতো নয়, এমনকি মাওয়ের চীনা ‘পিপলস রিপাবলিক’ (১৯৪৯) সেটাও ১৯১৭ সালের রুশ ‘সোভিয়েত রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মত নয়। অর্থাৎ সবখানেই কিছু না কিছু নতুন গড়ন বৈশিষ্টের ছাপ আছে। নতুন আইডিয়া, নতুন প্রয়োজন, নতুন বাস্তবতা ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। এমনকি,  ঠিক তেমনি ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক (১৯৭৯) আগের দেখা কোনো রিপাবলিকের মত নয়। সেখানেও প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে।

আবার আমাদেরই “পাকিস্তান রিপাবলিক” এর দিকে যদি দেখি, প্রথমত এদিকে তো ভালমত তাকানোই হয় নাই, তাচ্ছিল্যেই কেটে গেছে; অথচ এই রাষ্ট্রেরও মৌলিক দিকটা ছিল যে এটা রিপাবলিক – কোন রাজতন্ত্র নয়, কোন খলিফা-ডায়নেস্টি নয়। তবে এটাও সত্য যে এই রিপাবলিক পরিচয়ের চেয়ে ওটা “ইসলামি” সেই পরিচয়ের কদরই বেশি বেশি হয়েছিল। যা হোক, মূলকথাটা হলো, বস্তুত সব নতুন ‘রিপাবলিক রাষ্ট্রই’ বিশেষ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে থাকে। তার জন্ম ও গঠনে বহু নতুনত্ব থাকে, এ অর্থে প্রত্যেকটা অনন্য। যার মূল কারণ হল, আগেই হয়ে থাকা  বা যে গিভেন বাস্তবতায় একটা জনগোষ্ঠী নতুন রাষ্ট্র গঠনে প্রবৃত্ত হয় – সেই বাস্তবতা প্রতিটা হবু রিপাবলিক রাষ্ট্রের বেলায় অন্যন্য হবেই।

ওদিকে আমাদের অনুমানেও বড় কিছু গলদ রয়ে গেছে। যেমন একটা শাসক বা শাসন  ব্যবস্থা থাকা যদি আমরা দেখি তাতে আমরা গুলায় ফেলে ভাবি নিশ্চয় ওটাও রাষ্ট্র। যেমন রাজতন্ত্রী দেশগুলোতেও একটা শাসনব্যবস্থা আছে, তাদের শাসকও অবশ্যই, কিন্তু তারা কেউই রাষ্ট্র্র মানে রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। ক্ষমতা কী করে তৈরি হচ্ছে উৎস কী সে সম্পর্কে কাগজপত্রে কনষ্টিটিউশনে জন-উতস হতে হবে। যদিও এরপরে এর লম্বা সময় লাগে, প্রতিশ্রুতি লাগে যাতে সামাজিক-রাজনৈতিক চর্চায় তা বাস্তবে কার্যকর করা যায়।

‘নাগরিক’ শব্দটা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র কাদের নিয়ে গঠিত হবে? গঠনের সেই উপাদান বা ‘কন্সটিটিউয়েন্ট’ হল নাগরিক। এ অর্থে নাগরিক, এই মৌল উপাদানে রাষ্ট্র গঠিত। এবং অ-বৈষম্যমূলকভাবে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা সবাই সমান। আর এই ব্যক্তি নাগরিকের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাজতন্ত্রে এ জিনিসের বালাই থাকে না। এ ছাড়া, রাজতন্ত্রে রাজার ক্ষমতার উৎস কী? তা অন্তত জনগণের ক্ষমতা নয়। ফলে ওসব দেশে একই ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও মনে রাখতে হবে স্বয়ং বাদশাহ-ই নাগরিক নন, এর ঊর্ধ্বে। সবার সমান নন তিনি। উনার ইচ্ছা বা খায়েস-ই আইন। অথবা সম্ভবত বাদশাই একমাত্র স্বাধীন নাগরিক!

পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস
রিপাবলিক-নাগরিক খুন হলে আর কেউ অভিযোগকারী বা বাদী হোক না-ই হোক, রাষ্ট্র নিজেই মুখ্য বাদী হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে, আত্মীয়স্বজন কিংবা আর কেউ, অতিরিক্ত অর্থে, বাদী হতে পারেন। আর রাষ্ট্রের তরফে যে অফিস এমন বাদী হয়ে মামলা পরিচালনা করে থাকে সেটাই পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এবং এর প্রধানকর্তা ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’।  ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ শব্দটার মানে হল, রাষ্ট্র তাঁকে রাষ্ট্রের হয়ে মামলা পরিচালনা করার ক্ষমতা দেয়, মানে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দেয়। ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ – মানে হল “অন্যকে আমার হয়ে মামলা পরিচালনের ক্ষমতা” লিখে দেয়া। পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এর বেলায়  “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি”  স্থায়ীভাবে এবং সাধারণভাবে দেয়া হয়ে থাকে এবং তাই ঐ পদের নাম ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ হয়ে গেছে। আর তাঁর কাজ হল রাষ্ট্র নিজেই বাদী, এই বাদীর হয়ে অভিযোগ দায়ের করা আর এর ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা করা, এই অর্থে ‘প্রসিকিউট’ করা। এ অফিস জনগণের হয়ে মামলা পরিচালনা করে, তাই এটা পাবলিক প্রসিকিউটর। তাকে আমরা সংক্ষেপে ‘পিপি’ বলে চিনতে অভ্যস্ত।

কোন কোন রাষ্ট্রের বেলায় দেখা যায় তাদের পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস  ও তাদের কাজের দায় ও পদ্ধতি একটু ভিন্ন। যেমন তারা মামলার তদন্তের ভারও পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের তদারকি ও পরিচালনার অধীনে দিয়ে রেখেছে। ফলে তদন্তও এই অফিসের অধীনে হয়ে থাকে। মানে, আমাদের দেশের মত ‘পুলিশ তদন্ত’ করে ‘পিপি অফিসে পাঠিয়ে’ দেয়ার সম্পর্ক নয়।

সৌদি আরব রাজতন্ত্রী হলেও আধুনিক রাষ্ট্রের আদলে তারাও ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ নামেই অফিস ও ব্যবস্থা রেখেছে। জামাল খাশোগির গুম ও হত্যা প্রসঙ্গে সরাসরি সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে দেয়া এক বিবৃতি বা ভাষ্য, তাদেরই এক ওয়েব লিঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে। এই অফিসের সেই পাবলিক পেজ বলছে,  “The Kingdom of Saudi Arabia’s Public Prosecutor stated the following: Preliminary investigations carried out by the Public Prosecution into the disappearance case of the citizen Jamal bin Ahmad Khashoggi revealed that the discussions that took place between him and the persons who met him during his attendance in the Kingdom’s consulate in Istanbul led to a quarrel and a brawl with the citizen /Jamal Khashoggi, resulted in his death.”।
বাংলায় বললে, “সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউটর নিচের কথাগুলো বলছেন- নাগরিক জামাল বিন আহমদ খাশোগি গুমের মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করে তাতে দেখেছেন যে, জামাল এর সাথে যেসব ব্যক্তি দেখা করেছিল ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে জামালের উপস্থিতির সময়ে তাদের সাথে আলোচনা হয়েছিল, তবে সে সময় ঝগড়া ও হইচইপূর্ণ মারামারিও হয়েছিল, তার ফলেই জামাল খাশোগির মৃত্যু ঘটে”।

প্রথমত, এটা মানা কঠিন যে, এটা ‘আইনি’ ডকুমেন্ট। শুধু তাই না। এটা একটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য। রাষ্ট্রের একটা সর্বোচ্চ আইনি অফিস যারা পেশাদারভাবে রাষ্ট্রীয় মামলা পরিচালনা করার দায়িত্বে, তারা এ ভাষায় বর্ণনা দিতে পারেন না। দুটা নাদান বালকের ঝগড়ার বর্ণনাও আপনাতেই এর থেকে ভালো আইনি ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। যেমন, এখানে বলা হচ্ছে না যে কাদের সাথে জামাল খাশোগির “আলোচনা” হয়েছিল  – কারা তারা, কী পরিচয়, যাদের সাথে জামালের কথিত এরপরে ‘quarrel and a brawl’ ঘটেছে? এই বিবৃতি বলছে, “যাদের সাথে” জামালের “কথা হয়েছে”। তাদের নাম ঠিকানা কিছুই না দিয়ে এসব কথা বলার অর্থ পিপির অফিস নিজেই অপরাধীর পরিচয় লুকানোর দায়ে অভিযুক্ত হবার কথা।

দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে জামালের সাথে ঐ ভিলেনদের “আলোচনা হচ্ছিল”। কিন্তু আলোচনা- ঝগড়া- হইচইপূর্ণ মারামারি, এভাবে একটা ঘটনাক্রম কল্পনা করা অসম্ভব। কারণ জামাল সেখানে একেবারেই একা ছিলেন। ফলে একা জামাল পনেরজন প্রতিপক্ষের সাথে ঝগড়া মারামারি করতে কেন যাবে? বরং এটাই স্বাভাবিক  ‘বহুজনের’ সাথে ‘বিশেষ ধরনের আলোচনার’ আর পরিণামে জামালের মৃত্যু হয়েছে – একথা বলার সোজা মনে হলেও ওই “বহুজন” ব্যক্তিবর্গই হত্যাকারী। কিন্তু এই সত্যের দিকে পিপি অফিসের আগ্রহ নেই। রাজপুত্রদের প্রতি বাদশাহী পিপি অফিসের আনুগত্য এতই সীমাহীন।

তৃতীয়ত, দেশের কোনো সরকারি অফিসে কোনো নাগরিক কারও সাথে দেখা করতে গেলে কথাবার্তা থেকে তাতে ঝগড়া বাধবে কেন? আমি চাইলেও সেই কর্তা ঝগড়া করবেন কেন? করতে দিবেন কেন? বড় জোর উনি আমাকে বের করে দিতে পারেন। আর আসলে কিছু করার আগে তিনি আমাকে ওয়ার্নিং দেবেন, এর পরিণতি বলবেন, কেন করবেন, তা ব্যাখ্যা করবেন, কেবল পেশাদার গার্ডদের দিয়ে বের করাবেন এবং তা যতদূর সম্ভব আমাকে স্পর্শ না করেই করবেন। কিন্তু তা না, একটা দূতাবাসের অফিসে একেবারে হইচই করে মারামারি বাধালেন, আর শেষে এমনকি খুন করে ফেললেন? কী সুন্দর! আর এ গল্প বিশ্বাস করল ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ তদন্ত অফিস’?

চতুর্থত, লাশ কই? পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের বিবৃতি থেকে, তাদেরও তা জানার কোনো আগ্রহ আছে বলে দেখা গেল না। অথচ তারা নাকি ‘ক্রিমিনাল অপরাধ তদন্ত’ এর সর্বোচ্চ অফিস!

ঘটনাক্রমে এখানে পাশাপাশি তিনটি রাষ্ট্রের পাবলিক প্রসিকিউটর ও নির্বাহীদের কাজ ও কথার প্রসঙ্গ এসেছে। তারা হলেন, রাজকীয় সৌদি আরব, রিপাবলিক তুরস্ক আর রিপাবলিক আমেরিকা। জামাল সৌদি নাগরিক। কিন্তু নিজ দেশেরই এক কনসুলেটে এসে এমন “আলোচনা” বিপদে পড়ে গেছিলেন যে এর আড়ালে পড়ে করাতে কাটা টুকরায় খুন হয়ে গেলেন। লাশের কথা পিপি বলতে পারছেন না। অথচ এর বিপরীতে, তুরস্ককে দেখুন, বলতে গেলে বিষয়টাকে সিরিয়াস ইস্যু হিসেবে দেখা, তদন্ত আর তথ্য জোগাড়ের কাজ সেটা মূলত তুরস্ক রিপাবলিকই করেছে। অনেকের মনে হতে পারে, তুরস্ক-সৌদি রেষারেষির কারণে এরদোগান অতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তিনি ফায়দা নিতে চান। এমন ভাবনাকারী সবার  এতে যে দিকটা নজর এড়িয়ে গেছে তা হল – রিপাবলিক রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতা। প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায়; নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দায় পালনে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

এরদোগানসহ তুরস্ক রাষ্ট্রের নির্বাহী দায়িত্বের সবাই এই উদ্যোগ না নিলে তারা নিজেরাই বরং অপরাধে অভিযুক্ত হতে যেতেন। আমাদের লক্ষ করতে হবে, তুরস্কের মাটিতে গুম ও খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধ ঘটেছে। খুনিরা তুরস্কের বা বিদেশী যেই হোক – এর অপরাধীদের আইনিভাবে (জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুম দেওয়ার মত না)  ধরে আনতে হবে। পরে তাদের আইনি হেফাজতে নিয়ে জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুমদাতা ও সহযোগীদের তুরস্কের আদালতে হাজির করতে এরদোগান ও তার পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস আইনগতভাবে বাধ্য। তুরস্ক রাষ্ট্রের আদালত ও জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে। এর ব্যর্তয় হলে, আর যেকোন সংক্ষুব্ধ তুরস্কের নাগরিক তুরস্কের আদালতে নালিশ দিলে এরদোগানসহ নির্বাহী বিভাগের লোকেরা কর্তব্যে অবহেলায় অভিযুক্ত হয়ে যেতে পারেন।

অপর দিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ আমেরিকার নির্বাহীদের দিকে তাকান। স্পষ্ট করেই ট্রাম্প বলছেন, সৌদির কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির স্বার্থ আছে। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে তাকে বলতে হচ্ছে, এটা ‘খুনি মিথ্যুকের (rogue killers) কাজ’ এবং এর “পরিণতি হবে ভয়াবহ”। সিনেটর বা কংগ্রেস সদস্যরা খোলাখুলি অন ক্যামেরা প্রেসিডেন্টকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান রাখছেন, “নইলে তারাই উদ্যোগ নেবেন” বলতে হচ্ছে। একজন মিথ্যুক ও খুনির সাথে রাষ্ট্রের কোনো নির্বাহী বা জনপ্রতিনিধি বৈঠক করেছেন, যোগাযোগ রেখেছেন – এটা কিছুতেই তারা ঘটতে, গোপনে ঘটাতে বা দেখাতে চান না। আমেরিকা রাষ্ট্রের অপকর্মের শেষ নেই, একথা খুবই ঠিক। এরপরেও তার কিছু মূল্যবোধ আছে, যা লঙ্ঘন করলে কারো কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে। নিজ সমাজে সকলের সাথে এক টেবিলে বসার অপাঙেক্তেয় মানে অনুপযুক্ত হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ সকলে আপনাকে রেখে ঐ ঘর বা টেবিল ত্যাগ করবে। পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকান সমাজে খুব করা আর প্রমাণিত মিথ্যা বলা – এধরণের অমার্জণীয় কৃত অপরাধ।  এগুলো সবই মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল্যবোধ বা সংক্ষেপে মর্ডান মূল্যবোধ ও এর ক্ষমতা।

দেখা যাচ্ছে, রাজতন্ত্রে আসলে শান্তিতে একটু খুন হয়ে যাবেন সেই সুযোগও নেই। কারণ বাদশা ব্যক্তিগত  প্রতিহিংসা পূরণ করতে আপনার আঙুল কেটে নিয়ে যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে না দেখায়, সৌদি ঘটনা তত বড় নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটা সৌদি ডায়নেস্টির সমাপ্তিসহ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ম্যাপ, নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে – আরো বড় বিষয় হবে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা।

সর্বশেষ গতকালের ঘটনা –  বিশেষ করে এরদোগানের আমেরিকা, বৃটিশ, ফ্রান্স ও জর্মানির কাছে খুনিদের কথোপকথনের টেপ শুনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া – এর প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক। চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প বিরাট চাপের সম্মুখিন হচ্ছেন। আর সেই চাপ সামলাতে না পেরে তিনি সৌদিয়াওরবের বিরুদ্ধে কঠোর একশনে যাচ্ছেন দেখলে অবাক হবেন না। এই সরকার প্রধানেরা এখন দায়বাধ্য হয়ে গেলেন টেপ হাতে পাওয়া ও শোনার পর আইনি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিতে। কারণ, তারা কেউ বাদশা-আমির বা রাজপুত্র নন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “জামাল খাশোগিঃ একজন নাগরিকের দুর্ভাগ্য  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

গৌতম দাস

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uc

ভুটানের সদ্য শেষ হওয়া সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের অপেক্ষা

ভারতের জন্য সম্ভবত “আরেকটা উইকেটের পতন” হতে যাচ্ছে। না, দুবাইয়ের এশিয়া কাপ ক্রিকেট খেলা নয়, ভুটানের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। ভুটানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। প্রো-ইন্ডিয়ান যে দল এতদিন ক্ষমতায় ছিল যার নাম পিডিপি [Peoples’ Democratic Party’s (PDP)], এবারের নির্বাচনে এর শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দলটি নেমে গেছে প্রথম থেকে তৃতীয় অবস্থানে। এটা অবশ্য প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন। সেকেন্ড বা ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে আগামি মাসে ১৮ অক্টোবর। ২১ সেপ্টেম্বর ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার শেষ দিন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে ভারত “নিজের বাড়ির পিছনের বাগানবাড়ি” মনে করতে ভালোবাসে। শুধু তাই নয়, নিজের কোনো মুরোদ থাকুক আর নাই থাকুক, চীন কেন সেখানে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে হাজির হবে এবং এতে সেখানে চীনের প্রভাব কেন বাড়াবে তা নিয়ে ভারতের নাই-মুরোদের অস্বস্তি ও আপত্তি কেউ শুনুক আর না শুনুক, ভারত নিয়মিত এনিয়ে উষ্মা-অভিযোগ করে যেতে খুবই ভালোবাসে।

ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের(?) চুক্তি ১৯৪৯
ভুটান এক দিকে ভারত ও অন্য দিকে চীন দিয়ে ঘেরা। আর এক পড়শি নেপাল রাষ্ট্রের মতই ভুটানও চারদিকে অন্যের ভুমি দিয়ে ভূমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। বাইরে বের হতে চাইলে ভুটানকে ভারত অথবা চীনের ভুমি পেরিয়ে তবেই তাদেরই কোন সমুদ্র বন্দরের নাগাল পেতে পারে। বাণিজ্য ও পণ্য আনা নেওয়া সচল করতে পারে। সাম্প্রতিককালে ভারতের নাগপাশ ছিঁড়ে নেপালের সার্বভৌমত্বের চর্চা, সাহস এবং তার নেয়া পদক্ষেপগুলো দেখে সম্ভবত ভুটানের মনেও অনেক সাহস জমা হয়ে থাকবে। ভুটানের প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে অন্তত এর একটা প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করার কারণ আছে; তাই এতে ভুটানও হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য সম্ভবত আরেক উইকেটের পতনের ইঙ্গিত!

নেপালের মত ভুটানও “ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের চুক্তি ১৯৪৯” নামে ভারতের কাছে দাসখতের খোটায় বাধা পরে আছে। এগুলো একালে ১৯৪৭ সালের পরে ভারতের রিনিউ বা নতুন করে করা চুক্তি হলেও, সবই কলোনি আমলে বৃটিশ এম্পায়ারের সাথে ভুটানের (নেপালেরও) যে দাসত্ব চুক্তি ছিল, মুলত সেটারই কপি। কেবল “বৃটিশ সরকারের” জায়গায় “ভারত সরকার” বসিয়ে নিয়েছেন ভারতের নেহেরু সাহেব।  সে আমলে কলোনি মালিক বলতে বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, স্পেনিস, পর্তুগীজ মূলত এরাই ছিল, আর ছিল এদের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কার কলোনি কে যেকোন উপায়ে টান দিয়ে নিয়ে যায় এনিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। একারণে পুরানা রাজার রাজ্য কলোনি করে নিতে পারলে এরপর অনেক সময় সেটাকে “করদ রাজ্য” বলে ছাড় দিয়ে রাখত। আর করদ রাজ্য অন্যতম বৈশিষ্ট হত এক চুক্তিপত্র যেখানে লেখা থাকত যে ঐ রাজ্য আর বৈদেশিক বিষয়ে নিজে নিজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না, সেটা করবে বৃটেন। […the Kingdom of Bhutan is guaranteed its independence, but agrees to be represented by Great Britain in its foreign affairs.] এটা (১৯১০ সালে) বৃটেন ও ভুটানের মধ্যেকার চুক্তিপত্র  থেকে তুলে আনলাম। চুক্তিতে এমন লেখা থাকার মূল কারণ যাতে নেপাল বা ভুটান অন্যকোন কলোনি শক্তির সাথে নতুন চুক্তি করে চলতি চুক্তি ভেঙ্গে না দিতে পারে। পুরান চুক্তির কলোনি প্রভুদের কথাগুলোই কপি করার মধ্য দিয়ে “কথিত প্রগতিবাদী” প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নিজেই কলোনি-প্রভু হবার খায়েস এবং কলোনি-শাসক-প্রিয়তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সেই থেকে ভারতের সিভিল-মিলিটারি আমলা প্রশাসনের ওরিয়েন্টেশনে ও মন-মানসিকতায় অন্য রাষ্ট্রকে কলোনি-সম্পর্কে আবদ্ধ করার আগ্রহ অভ্যাস হিসাবে রপ্ত হয়ে যায়।
অনেকে মনে করতে পারেন কলোনি আমলে কলোনি বানানো জায়েজ হলে একালে নয় কেন, নেহেরুর তাহলে দোষ কী? অবশ্যই দোষের এবং ঘোরতর দোষের। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়া শুরু হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত অবস্থান ও কনভেনশনে যে, কলোনি শাসন অন্যায়, অবৈধ। ভিন্ন ভাষায়, “প্রত্যেক জনগোষ্ঠি কিভাবে শাসিত হবে তা তাঁরা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। আর এই নির্ধারণ তাদের অধিকার”। তাই ১৯৪১ সালের পরে জন্ম নেয়া জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। সেকারণে কফি আনান বলতে পেরেছিলেন, সাদ্দাম-উতখাতের পরের ইরাকে আমেরিকার বুশ প্রশাসনের উপস্থিতি – জাতিসংঘের চোখে এখানে “আমেরিকা এক দখলদার শক্তি”।

আর এটারই নেহেরু আমলে ১৯৪৯ সালের করা চুক্তির ভাষ্যে, তৃতীয় দফা আছে এভাবে, “……বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে ভারত সরকার  ভুটান সরকারকে যা বলবে ভুটান সেই পরামর্শ অনুসরণ করবে বলে রাজি হচ্ছে”। [On its part the Government of Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.] অর্থাৎ কেবল ভাষার রকম ফের করে একই জিনিষ রেখে দেয়া হয়েছে। মজার কথা হল, এই চুক্তিতে ভুটান সরকারকে বৃটিশ সরকারের একটা ক্ষতিপুরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল। যার ১৯১০ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী ছিল সেকালের মুদ্রায় ১০ লাখ ভারতীয় রুপী। আর ১৯৪৯ সালে এসে দেখা যায়, নেহেরু সাব একালের মুদ্রামানে বাড়ানো দূরে থাক বরং কমিয়ে করেছিলেন মাত্র ৫ লাখ রুপী। তবে এসব প্রসঙ্গগুলো ২০০৭ সালে চুক্তি আপডেট [update the 1949 Treaty] এর সময় বাদ দেয়া হয়েছে । আর সেই সাথে ২০০৭ সালের এই আপডেট চুক্তিতে কী শর্তে ভারতের ভুমি ব্যবহার করে মালামাল আমদানি করতে পারবে এই ইস্যু ঢুকানো হয়েছে। তবে বলা হয়েছে ভুটান সব কিছুই আমদানি করতে পারবে “ভারত যতক্ষণ সন্তুষ্ট” [as long as the Government of India is satisfied] থাকবে। এটা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষ্যটাই এটাই। এবার সেটার আলোকে ২০০৭ সালে ভারত-ভুটান আপডেট চুক্তি করে নেয়া হয়েছে। এর সোজা অর্থ হল এই চুক্তি অর্থহীন। কারণ ভারত যে কোন সময় কোন কারণ না দেখিয়ে যেকোন আমদানিকে “বন্ধ” বলতে পারবে – কেবল সে “অসন্তুষ্ট” একথা উল্লেখ করার যথেষ্ট হবে।

এখান থেকে এটা পরিস্কার কেন ভুটান চীনের সাথে সম্পর্ক পাতাতে আগ্রহী। নেপাল বা ভুটান উভয়েই ভারতের শর্তের বেড়াজাল ভাঙতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি নেপাল কোন কিছু আমদানি করতে গেলে এতদিনের ভারতের উপর তার শতভাগ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার পথ পেয়ে গেছে। নেপালকে ট্রানজিট দানের ক্ষেত্রে ভারতের একচেটিয়ার দিন শেষ হয়েছে।  ভারতের বিকল্প হিসাবে চীনের ভুমি ব্যবহার করে চীনের চারটা সমুদ্র পোর্টসহ ও স্থলবন্দর মিলিয়ে মোট সাতটা পয়েন্ট দিয়ে আমদানি করতে পারার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের সাথে এই চুক্তির ফলে বাস্তবত এটা নেপাল-ভারত মৈত্রী চুক্তির নামে দাসত্ব চুক্তি নেপালের কাছে “অপ্রয়োজনীয়” হয়ে গেছে। চীন-নেপাল সম্পর্কের এই নতুন বিকাশ ও অভিমুখ ভুটানের অজানা থাকার কারণ নাই। নেপালকে অনুসরণ এখন ভুটানের জন্য কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

২০১৩ ও ২০১৮ এর নির্বাচন কিছু তুলনামূলক আলাপ
গত ২০০৭ সালে আগের পুরা রাজতন্ত্র থেকে কনষ্টিটিউশনাল শাসনে আসার পর থেকে এটা ভুটানের তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। তবে ভুটানে নির্বাচনব্যবস্থা দুই স্তরে সম্পন্ন হয়। তাই এবারের নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ করতে, দ্বিতীয় ও শেষ স্তরের নির্বাচন হবে ১৮ অক্টোবর। যেখানে এবার প্রার্থী হতে পারবেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয়, কেবল সেই দুই দলের প্রত্যেকের (ভুটানের পার্লামেন্টে মোট সংসদীয় আসন ৪৭ মাত্র) ৪৭ জন করে প্রার্থী।

২০১৩ সালের নির্বাচনের ফলাফলের সাথে এবারের একটা তুলনার মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের মধ্যে তুলনা করে বলা চলে যে, গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে যে (পিডিপি) [[Peoples’ Democratic Party’s (PDP)],] দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল সেই দল এবার ২০১৮ সালের প্রথম রাউন্ডে হয়ে গেছে তৃতীয়। আর ২০১৩ সালে যে দল দ্বিতীয় হয়েছিল (ডিপিটি) [Druk Phuensum Tshogpa (Bhutan Peace and Prosperity Party) (DPT)]; সে এবারো দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। কিন্তু তৃতীয় দল (ডিএনটি) [Druk Nyamrup Tshogpa (DNT) দলের মূলনেতা ডাক্তার লোটে শেরিং] এবার চমক দিয়ে উঠে এসে একেবারে প্রথম হয়ে গেছে। আর প্রথম হওয়া দলটা গঠিত হয়েছিল মাত্র গত ২০১৩ নির্বাচনের আগদিয়ে।

খুব ছোট দেশ ভুটানের লোকসংখ্যা মাত্র প্রায় আট লাখ [আমাদের মধ্যম মানের দুটা উপজেলার মোট জনসংখ্যা এরকমই; যার মধ্যে আবার এবারের মোট ভোটার প্রায় তিন লাখ (২৯১,০৯৮)। এবার ভোটদানের হারও বেশি; ভোট পড়েছে মোট ভোটারের ৬৬%, গতবার যা ছিল ৫৫.৩%। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ভুটানি মিডিয়া বলছে, পোস্টাল ভোট এবার অনেক বেশি পড়েছে। এর বেশির ভাগ পেয়েছে প্রথম হওয়া দল। সরকারি কর্মচারী আর প্রবাসী ভুটানি (যারা আগে থেকে রেজিস্টার্ড)- এরাই মূলত পোস্টাল ভোটার। ওই দিকে বাংলাদেশের কোনো কোনো পত্রিকায় খবর বের হয়েছে [ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ছাত্র লোটে শেরিং] – প্রথম হওয়া ডিএনটি দলের প্রধান একজন এমবিবিএস ডাক্তার, তিনি আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। যা হোক, তার দলের বিরাট জনপ্রিয়তা ও প্রথম হওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে যে, তার প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তিনি বিজয়ী হলে গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছে দেবেন, বিশেষ করে মা ও মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। মনে হচ্ছে এই প্রতিশ্রুতি তাদের মনে ধরেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো অবকাঠামো যেখানে খুবই অপ্রতুল যেমন – মোট মাত্র ১৮ হাজার বর্গমাইলের ভুটানের (তুলনায় ৫৭ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ) পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে যেতে আজও এক সপ্তাহ সময় লাগে।

সাহস করে ভুটানের চীনের প্রতি আগ্রহের হাত বাড়ানো
তবে আরেক ফ্যাক্টস হল, এবারের দ্বিতীয় হওয়া দল ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘ডিপিটি’ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন  করে ক্ষমতায় (২০০৮-১৩) ছিল। কিন্তু ভারতের চোখে এই দলের “অপরাধ” হল, ২০১২ সালে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাওয়ের সাথে ব্রাজিলে দলের নেতা ও তৎকালীন ভুটানি প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করেছিলেন। এতে ভারত খুবই নাখোশ হয়। এই প্রসঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়ার কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রাণী বাগচী লিখছেন, India has had a rocky relationship with DPT which was in government between 2008 and 2013, largely because of the then PM Jigme Thinley’s interest in building ties with China.অর্থাৎ ডিপিটির প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। আর এখান থেকেই পড়শি সব দেশে ভারতের যা করা স্বভাব যে, কোনো একটি দলকে প্রভাবিত করে সেটাকে ভারতের অন্ধ দালাল বানিয়ে ঐ দেশের রাজনীতি কলুষিত করে ফেলা, তা শুরু হয়। ফলে ভুটানের সেসময়ের ক্ষমতাসীন দল ‘ডিপিটি এর প্রতিদ্বন্দ্বি দল – পিডিপি ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে পরের নির্বাচনে হাজির হয়ে যায় ও জয়লাভ করে।

সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘স্ট্রেইট টাইমস’।  ইন্ডিয়া থেকে এর ব্যুরো চিফ হলেন নির্মলা গণপতি। তিনি তাঁর রিপোর্টে ভুটানিরা ভারত ও চীন ইস্যুকে কিভাবে দেখে তা বোঝাতে একটা সাবহেডিং বাক্য লিখেছেন এমন – “ভুটানিরা দিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু তাঁরা একই সাথে বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়”। [While Bhutanese value close ties with Delhi, they also feel need for relations with Beijing…]
যদিও ব্যাপারটা হল- ‘মূল্য দেয়’ অবশ্যই অগত্যা। কারণ, না দিলে আরো বিপদ। কিন্তু বেইজিংকেও খুঁজতে হয়। কারণ একতরফা ভারতের কর্তৃত্ব থেকে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতেই হবে।

চীনের সাথে এখনও ভুটানের রাষ্ট্রদূত বিনিময় হয়নি। সেটা এখন প্রক্রিয়াধীন। তবে ইতোমধ্যেই ভারতে পরস্পরের অফিস বা অন্য কোন দেশের কোথাও গিয়ে তারা দেখা করে কথা বলে। কিন্তু তাতেও ঘোরতর অস্বস্তি আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি যে ভারতের পার্লামেন্ট -লোকসভার সংসদীয় প্রশ্নোত্তরে এটাকে প্রসঙ্গ করা হয়েছিল। ব্যাপারটা এমনভাবে হাজির করা হয়েছে, যেন বৌমা কেন কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছে আর শাশুড়ির তা নিয়ে কথা তোলার সুযোগ পেয়েছে। এনিয়ে সংসদীয় রিপোর্ট এখানে দেখা যাবে, [Q NO. 1470 BHUTAN-CHINA GETTING CLOSER]।

এ দিকে, ২০০৭ সালের পর থেকে ভুটান আর রাজার খেয়ালি শাসনের দেশ নয়, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রাষ্ট্র। এবার নিয়ে সেখানে তৃতীয়বার পার্লামেন্ট নির্বাচন হল। আর এর আগে প্রায় শত বছরের পুরনো (১৯১০) স্বাধীন রাজতন্ত্র হলেও, ১৯৪৭ সালে নেহরুর আমল থেকে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতনির্ভর।

যেহেতু ভারতের ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া ভুটানের ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্তি নেই- এটাকেই ভারত একরকম মুক্তিপণ বানিয়ে নিয়েছে; আর ভারতনির্ভর হতে বাধ্য করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু কত দিন ভারত সেসুযোগ পাবে? ভুটানের নতুন প্রজন্ম এথেকে মুক্তি পেতে যেন মরিয়া। যা সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই সতর্কভাবে ভুটানিজদের অন্তরে ভারত-বিরোধিতা আর চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার হাতছানি – দুটোই বাড়ছে। নেপাল ভারতের বিকল্প এবং ভারতের চেয়ে প্রাপ্ত সুবিধাদির দিক থেকেও অগ্রসর চীনা ট্রানজিট (রেল যোগাযোগ) জোগাড় করতে পারলে, তাহলে ভুটানেরও সেটা না পারার কোনো কারণ নেই। কেবল তা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এটা অতীতে ১৯৪৭ সাল থেকেই নেহরুর ‘ভাইসরয়’ ভাব ধরে থাকার যে খায়েশ দেখিয়ে গেছে, ভারতের সিভিল ও গোয়েন্দা আমলা প্রশাসন এখনও যেই নীতির অনুসারি এর তো ক্ষতিপূরণ ভারতকে এখন দিতেই হবে। নেহরুর সেই আত্মঘাতী চিন্তার মূল্য ভারতকে চুকাতেই হবে।

খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেই ২০০৭ সালের পর থেকে রাজার আর খামখেয়ালি তো শাসন নয়। ভারতের হাত থেকে ভুটানকে বাঁচাতে তিনি তা একা পারবেন না, তাই জনগণকে শাসন-ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বেচ্ছায় রাজা জননির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের সরকার আর কনস্টিটিউশনের অধীনে (রাজার খেয়াল নয়) পরিচালিত সরকার – এমন কনষ্টিটিউশনাল রাজতন্ত্র চালু করে দেন; আর সেই সাথে রাজনৈতিক দল ও তৎপরতা চালু হওয়ায় সরকার গঠনে জনসম্পৃক্ততাও আসে। এখান থেকেই ভুটান সরকারের নিজেরা নিজের সার্বভৌমত্ব চর্চা ও নিজ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে তদানীন্তন চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ ছিল এর অংশ। কিন্তু ভারত এতে অসন্তুষ্ট হয়েছিল ও নিজের কোটারি স্বার্থের বিপদ দেখেছিল। ভুটানের জ্বালানি তেলের সরবরাহকারী ভারত, আর এতে ভারত কিছু ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তাই ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগের দিন ওই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে, নিজের পক্ষে ভুটানিদের ওপর চাপ দিতে – ভারত ওই ভর্তুকি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছিল। হঠাৎ এই চাপের মুখে, জনমনে কিছুটা ভয়ে – সব মিলিয়ে এর প্রভাবেই ঐ নির্বাচনে ভারতপন্থী দল পিডিপি ক্ষমতায় জয়লাভ করেছিল বলে মনে করা হয় এখনও। এমনকি ভারতীয় মিডিয়াতেও  কেউ কেউ এটাকে ভারতীয় সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া বলে দোষারোপ করে থাকে।

চীনের ঝাড়ি মারা
কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রো-ইন্ডিয়ান দলের এক নম্বর অবস্থান থেকে তিনে চলে যাওয়াতে ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচুর হইচই পড়ে যায়। এমনকি কোথাও ভারত সরকারকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান ও পরামর্শও আসতে থাকে। তেমনি এক রিপোর্ট হল – টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। এতে কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রানী বাগচী লিখছেন, “ভুটানে ভারতকে উদ্যোগ ও তৎপরতা দ্বিগুণ করতে হবে”। [India will have to work doubly hard to help its closest neighbour achieve its aspirations while securing its interest…]
কিন্তু ভুটানে ভারতকে  “কোন উদ্যোগ” (হস্তক্ষেপের?) নিতে তিনি তাগিদ দিচ্ছেন সেটা ইন্দ্রাণী উহ্য রাখছেন। ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি আগের মত কোন ভারতীয় হস্তক্ষেপের কথা বলছেন। লিখছেন, ‘পড়শিকে তার স্বার্থরক্ষার আকাঙ্খা অর্জন করতে ভারত যেন ভুটানে নিজ প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করে”। এটা কি সাংবাদিকতা না উগ্র জাতীয়তাবাদী মনের আধিপত্য কামনা? আবার ভাব ধরছেন বিরাট কূটনীতিকের। কসরত করেছেন কোন এক কায়দা ব্যবহার করে “ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে” আহ্বান করবেন যা কূটনৈতিক বা সাংবাদিকতার নর্মস অথবা আইনের বরখেলাপ মনে না হয়।
এটা আসলে পড়শির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া না, পড়শির মাথায় চায়ের কাপ রেখে আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে চা খাওয়ার বেকুবি চেষ্টা। সেই নেহরুর আমল থেকে এটাই ভারতের নিয়মনীতি বা পড়শি পলিসি হয়ে আছে। এভাবেই বিশেষ করে ল্যান্ডলকড পড়শিদের নানা চুক্তিতে বাধ্য করে সুবিধা আদায় করে এসেছে ভারত। ব্রিটিশ কলোনি মাস্টার ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেপাল বা ভুটানের মতো পড়শি দেশের বেলায় নেহরুকে যেন বৃটিশ “ভাইসরয়” হিসেবে ভূমিকা পালন করতে দিয়ে গেছে। মোটকথা, পড়শিদের ভারতকে ‘ট্যাক্স’ দিয়ে চলতে হবে, যাতে নিধিরাম সর্দার ভারত দাবি করতে পারে যে – “এই চীন, এদিকে এসো না, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না; এটা আমার এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট!”

কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারতের অর্থনীতিতে যেমন অবকাঠামো ঋণের চাহিদা ও অভাব প্রবল – আর তা মেটাতে সে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে; তেমনি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মতো পড়শিরাও একই কারণে সেটাই করছে। কারণ কলোনি আমল থেকে ভারতসহ আমাদের সবার অর্থনীতিতে স্থানীয় মানুষের হাড় ভেঙে খেটে যা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়, যা আমাদের হক এবং হবু বিনিয়োগ পুঁজি, তা লোপাট ও নিজ দেশে পাচার করেছে ব্রিটিশরা। সে অভাব, সেই থেকে বিনিয়োগ চাহিদা আর প্রাপ্তির যে বিরাট গ্যাপ সেটা এখন একটু মনোযোগ পাচ্ছে – কারণ চীনের হাতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়েছে, যা অবকাঠামো ঋণ হিসেবে দিতে চীনও আগ্রহী।

তাই ভারতসহ সবাই আমরা বুভুক্ষের মতো চীনা অবকাঠামো ঋণ ও প্রকল্প নেবো কারো বাধা না মেনে। তবে যাদের সরকার, রাজনীতি বা রাষ্ট্র ইতোমধ্যে যথেষ্ট শক্তপোক্ত হয়ে গেছে, ব্যাপস্থাপনায় দক্ষ; তারা প্রকল্প ও শর্তগুলো ভালো বাছবিচার করতে পারবে। না হলে কোন কোন দেশ কিছু আরও কষ্ট স্বীকার করবে, কোন কোন প্রকল্প লাটে উঠবে, চুরি দুর্নীতিতে ভরে যাবে।

সব ঘটনার মূল কারণ তাহলে, আমাদের সীমাহীন অবকাঠামো ঋণ চাহিদা এবং বিনিয়োগ না হওয়া। এই চাহিদা প্রসঙ্গে এডিবির এক স্টাডি বলছে – এশিয়াতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি আর এআইআইবি (AIIB, চীনের বিশ্বব্যাংক) সবাই মিলে তাদের সব সামর্থ্য ঢেলে অবকাঠামো বিনিয়োগ করলেও তাতে এশিয়ার এখন অবকাঠামো বিনিয়োগ চাহিদা যত তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ঘাটতি থেকেই যাবে। অবকাঠামো ঋণ পেতে এ ব্যাপারে ভারতসহ আমরা সবাই “একই নৌকায়”। ভারতের যেমন, আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের পড়শি সব রাষ্ট্রেরও একই অবস্থা। ভারতসহ সবাই এক কাতারে যে, চীন আমাদের সবার অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণকারী এবং দীর্ঘ দিনের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ না হওয়া খরা-দশায় মূল ঋণদাতা। ফলে ‘আমার বাগানবাড়িতে চীন ঢুকে গেল’ এসব অর্থহীন কথা আর ভুয়া অহঙ্কার ভারতের বন্ধ করা উচিত। এগুলো আমাদের না কারও আর না বুঝার কিছু নাই।

আসলে ভারতের উচিত সবার আগে নিজে “চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগ” না নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক । চীন খোদ ভারতের অর্থনীতিতেই ঋণদাতা হয়ে ঢুকে বসে আছে, ভারত চীনের এআইআইবির (চীনের বিশ্বব্যাংক) সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। মানে চীন ভারতের বাগানবাড়ি না খোদ মূল বাড়িতে ঢুকে বসে আছে। এটা সবাই জানে।

ভারতীয় মিডিয়া হৈ চৈ প্রসঙ্গটা, ব্যাপারটা চীনের সরকারি ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকারও নজর এড়ায়নি।  তাই গ্লোবাল টাইমসের এক রিপোর্ট প্রশ্ন তুলেছে ভুটানের নির্বাচনী ইস্যুতে ইন্দ্রাণী বাগচীর লেখাসহ ভারতীয় মিডিয়ার হইচই নিয়ে। আর বলেছে, ‘ভারত যেটাকেই উন্নয়নের আদর্শ মডেল মনে করুক, তা যেন সব জায়গায়ই একই থাকে, আর ভারত যেন সেই একই মডেলের পক্ষে থাকে।’ উদাহরণ হিসেবে বলছে, ভুটান পূর্ব-পশ্চিমব্যাপী হাইওয়ে তৈরিতে এডিবির থেকে একটা ঋণ পেতে যাচ্ছিল কিন্তু ভারতীয় প্ররোচনায় সেটা বাতিল হলো কেন? ভারত একচেটিয়াভাবে ভুটানের সস্তা জলবিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে; অথচ তৃতীয় দেশে এর বিক্রি বাণিজ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। কিন্তু কেন?

আইএমএফের রেফারেন্স দিয়ে পত্রিকাটি প্রশ্ন করছে, ‘ভুটান কেন ঋণগ্রস্ত, এত আকণ্ঠে নিমজ্জিত? ভুটানের মোট ঋণ তার জিডিপি-এর চেয়েও বেশি হয়ে গেছে কেন? তাহলে ভুটান নিয়ে চাপাবাজি করছে কে? [Who is bullying Bhutan, China or India?] আর সেটা হয়েছে গত মাত্র ছয় বছরে – ভুটানের ঋণ জিডিপির ৬৭ শতাংশ থেকে ১১৮ শতাংশে উঠে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ভুটানের মোট ঋণের ৬৪ শতাংশ ঋণই হল ভারতের প্রদত্ত?

আসলে ইন্দ্রাণীর ভারত সরকারকে সরাসরি কিছু করার (হস্তক্ষেপের) আহ্বান, নিঃসন্দেহে এটা এক বেপরোয়া কাজ হয়েছে। ইন্দ্রাণী তার লেখার শুরুতে ‘হাইলাইট’ উপ-শিরোনামে তিনটি পয়েন্ট মানে তিনটি বাক্য লিখেছেন। এর প্রথম বাক্যটা হল এই বেপরোয়া আচরণ। আর পরের দুটা হল তার হতাশার কারণ বর্ণনা। যেমন, দ্বিতীয় বাক্যে তিনি আক্ষেপ করে লিখছেন, “২০১৩ সালের মত এবারের ২০১৮ সালে ভুটানের নির্বাচনে “ভারত কোনো ইস্যুই হতে পারেনি”। আর তৃতীয় বাক্য হল, “ভুটানে যে দুটো দল প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছে তারা ভারতের সাথে খাতিরের সম্পর্ক গড়ার কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়েই আমাদের খালি কিছু আশ্বাস শুনিয়েছে”।

আসলে ভুটানের এই নির্বাচনের বহু আগে থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে ভুটানিদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল এবং করণীয় নিয়ে খুবই সংগঠিতভাবে আলোচনা ও প্রচার তাঁরা চালিয়েছে। যেমন এনিয়ে “ভুটানিজ ফোরাম” নামে ফেসবুক গ্রুপ, সেছিল সবচেয়ে সরব। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় তারা একেবারে লো প্রোফাইল। কোনো দলের ক্ষোভ থাকুক আর ভালোবাসাই থাকুক নির্বাচনের মূল তিনটা দল ভুটানে “ভারতের তৎপরতার” বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ সম্পর্কে ছিল একেবারেই নিশ্চুপ। সম্ভবত তাদের ভয় ছিল, এতে ২০১৩ সালের মতো ভারতের কোনো পদক্ষেপ তাদের সাধারণ মানুষকে আরো কষ্টে ফেলে দিতে পারে। তাই তারা ভারতীয় মিডিয়ায় নয়, নিজ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছে, আর ভোটের বাক্সে ভোট দিয়ে আসল কাজটা করেছে; ভারতকে আসল জবাবটা দিয়েছে।

বহু পুরনো এক প্রবাদ হলো, কারো ক্ষতি করে সেটা থেকে তোমার লাভ আসবে – সেটা আশা করো না কখনও।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালের পর এবার ভুটান হাতছাড়া!  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

গৌতম দাস || Wednesday 27 June 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tI

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা প্রথম পর্ব।]

ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন শেষ হবার পর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ২৫ জুন সন্ধ্যায় ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহম্মদ মোরসিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবু দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সব জায়গায় মূল আলোচনার বিষয় মোরসির ক্ষমতা কি কি, কত দিনের প্রেসিডেন্ট, কি তাঁর কাজ এবং কাজের সীমা ইত্যাদি। কোন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) বলতে প্রচলিত যে ধারণা দুনিয়ায় আছে সেই রকম একটা ভাবের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলতে দুনিয়াতে প্রচলিত ভাবটা কে কি বুঝে তা দিয়ে কোন কাজ চলতে পারে না, বরং ঐ সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট-এর মানে কি, কি তাঁর ক্ষমতা, কোনটা তার নয়, কতদিনের জন্য ক্ষমতা ইত্যাদি স্পষ্ট করে বলা থাকতে হয়। তা বলা থাকতে হয় কনষ্টিটিউশনে এবং নির্বাচনের আয়োজন শুরুরও আগেই । একটা কনষ্টিটিউশন কোন রাষ্ট্রের থাকার মানে হল ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক-জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত (কনষ্টিটিউটেড) হয়েছে; এভাবে হলে, হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে রাষ্ট্র বলা চলে। অন্যভাবে বললে জনগণ রাজনৈতিকভাবে কনষ্টিটিউটেড হওয়া আর রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যাওয়া একই কথা। আর সেই সাথে জনগণ কিসের ভিত্তিতে একত্র হলো, কনষ্টিটিউটেড হলো সেই ভিত্তি – জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার কোন ভিত্তি – সেকথার লিখিত দলিলটা হলো কনষ্টিটিউশন। ঐ কনষ্টিটিউশনে বলে দেয়া থাকে, রাষ্ট্র যে পরিচালনার করবে সেই নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাজ, ক্ষমতা কি, কতদিনের, রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা হবে ইত্যাদি। এরপর সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনস্ততা মেনে রাষ্ট্রের বাকি সমস্ত  প্রতিষ্ঠান এমনকি খোদ নির্বাহী প্রধান, পার্লামেন্ট অথবা বিচার বিভাগ সবাই আনুগত্য প্রকাশ করেই একমাত্র তারা যার যা ভুমিকা পালন করতে পারে। ফলে রাষ্ট্র দৃশ্যমান হয়। খেয়াল রাখতে হবে আমি রাষ্ট্রের কথা বলছি, দেশ না। দেশ বলতে ওর মাটি সীমানা মানুষ ইত্যাদি সবই থাকতে পারে – এতে দেশ হয়ে থাকলেও তা রাষ্ট্র নাও হতে পারে। সোমালিয়া একটা দেশ বটে কিন্তু রাষ্ট্র নয় সেটা। আবার কোন দেশ একই থাকে কিন্তু ওর রাষ্ট্র আবার কনষ্টিটিউট বা গঠন করে নেবার দরকার হতে পারে। দরকারের মূল কারণ, পুরানা রাষ্ট্র আর জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না তাই। রাজনৈতিক শব্দে একে কোন দেশের নতুন করে রিপাবলিক গড়া বলে। আবার অনেকের মনে হতে পারে এতক্ষণ রাষ্ট্র বা রিপাবলিক (গণ)রাষ্ট্র বলতে আমি বোধহয় আগাম ধরেই নিয়েছি যে আমি “গণতন্ত্র” ধরনের রাষ্ট্রের কথাই বলছি। না আমি তা বলছি না। আমি  রাষ্ট্রের কথা বলছি, রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। এই রাষ্ট্র ইসলামি, কমিউনিষ্ট, লিবারেল ইত্যাদি অথবা এসবেরও বাইরে নতুন কোন রাষ্ট্র হতে পারে। আর এসব রাষ্ট্র শব্দের আগে বিশেষণে রিপাবলিক কথাটা যোগ করেছি এজন্য যে এটা অন্তত রাজা, বাদশা সম্রাটের রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য নয়; এসবের বিপরীতে জনগণের কর্তৃত্বের রাষ্ট্র কেবল সেটা পরিস্কার রাখার জন্য।

  • ইজিপ্টের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রের কোন কনষ্টিটিউশন বর্তমানে নাই।  মোবারকের পুরানা কনষ্টিটিউশন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর, পার্লামেন্ট বসার আগে এবং SCAF (সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স)-এর ঘোষণায় নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতার জোরে ।
  • এর মানে ইজিপ্ট একটা অন্তর্বতীকালিন বা মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে, পুরানা রাষ্ট্র নাই আবার নতুন রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা হয়নি – এদুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা।
  • তাহলে নতুন কোন কনষ্টিটিউশনের আগেই একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইজিপ্টে ঘটেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ীর মত। আবার এর আগে একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত এপ্রিলে; ব্রাদারহুড যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়েছে। সাথে ইসলামি সালাফি রাজনীতির নূর পার্টি (২৫%) মিলিয়ে মোট ৫৪% আসন এই দুই ইসলামী ব্যকগ্রাউন্ডের রাজনীতিক দলের হাতে। সাধারণভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচন মানে আগাম একটা কনষ্টিটিউশন আছে; সে কনষ্টিটিউশনের অধীনে সীমায় থেকে প্রতিদিনের নানান প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ওর কাজ। কিন্তু ইজিপ্টের বিশেষ ক্ষেত্রে নামে বলা হচ্ছে এটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট কিন্তু এর কাজ হবে একটা কনষ্টিটিউশন খাড়া করা। কিন্তু তাও আবার সরাসরি নয়। পার্লামেন্টের দ্বারা একশ মনোনিত (নির্বাচিত নয়) সদস্যের এক কমিটি ইজিপ্ট রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন (খসড়া বা প্রস্তাবিত) খাড়া করবে। যেটা পরে হয়ত পার্লামেন্ট পাশ বা অনুমোদন করলেই হবে; অথবা আবার গণভোটে দেয়া হবে।(“হয়ত” বলে আমাকে বাক্য লিখতে হচ্ছে এজন্য যে এগুলোর কোনটাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে পরিস্কার করা হয় নাই।) কিন্তু তাই যদি হয় তবে পুরানা বা নতুন কোন কনষ্টিটিউশনই না থাকা অবস্থায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের কাজ, উদ্দেশ্য লক্ষ্য কী? কেনই বা কথাটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট বলা হচ্ছে; যেখানে হবার কথা একটা কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বী (কনষ্টিটিউশন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সভা) বা আমাদের বাংলায় সমতুল্য প্রতিশব্দ ‘গণ পরিষদ’; ফলে ঠিক পার্লামেন্ট মেম্বার বা নির্বাচন নয়, বরং গণ পরিষদের সদস্য কে হবেন তাঁর নির্বাচন – এটাই হবার কথা। এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনেরও আগের কাজ। প্রথম কাজ কনষ্টিটিউশন বা রাষ্ট্র গঠন – জনগণের কনষ্টিটিউটেড হওয়া – সেটা ঘটানো। এরপর ঐ কনষ্টিটিউশনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে বড় ধরনের এক গোজামিল এখানে চলছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উপরে বারবার দেখিয়েছি কোন কিছুই স্পষ্ট না করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আওয়াজে ঘটনা চলছে। এমনকি ঐ একশজন কারা কিভাবে মনোনিত হবেন তাও স্পষ্ট করে রাখা হয় নাই। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ঐ পার্লামেন্ট এনিয়ে বিরোধ মীমাংসা শেষ করতে না পেরে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। ব্রাদারহুড সালাফি বাদে সমাজের বাকি সবাই পার্লামেন্ট থুয়ে আবার তাহরির স্কয়ারমুখী জমায়েত হয়। এই অবস্থা অবশ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগেও হয়েছিল। নির্বাচন বর্জনের ডাক এসেছিল। কিন্তু এর ভিতরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘটেছিল। আর পরে দেখলাম পার্লামেন্টের বিরোধ মীমাংসা যখন হলো না তখন ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে যাওয়ায় সবাই তাতেই মত্ত হয়ে গেল এই ভেবে যে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা দিয়েই তারা সব বিরোধের মীমাংসা করে নিবেন।

গণ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বা যেকোন বিপ্লব সফল করতে গেলে কনষ্টিটিউশন থাকা আর না থাকার মাঝের অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার হাতে থাকছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় সব কিছুর নির্ধারক এবং লক্ষণও বটে। র‍্যাডিকাল কোন পরিবর্তন বিপ্লবের ভাব তুলে এর বদলে তা উদারতাবাদী লোক দেখানো কোন ঘটনা হিসাবে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়ে যাবে কি না তা সহজে বুঝবার উপায় হলো অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতাটার দিকে লক্ষ্য রাখা। উপরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের নামে তামাশা আর পরে একইভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের নামে যে রহস্য ইজিপ্টের আমরা দেখছি – মোরসি নির্বাচিত এটা জানার পরও সাথে সাথে যে প্রশ্ন উঠছে যে তাঁর ক্ষমতা কি কি, আর সমানে পিছন থেকে SCAF সমানে প্রম্পট করছে, এক এক সময় এক এক ভাবে ফরমান জারি করে প্রেসিডেন্টকেই সাইজ করছে – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার এটা কত গুরুত্বপূর্ণ, সেন্ট্রাল পয়েন্ট। কিন্তু SCAF কিভাবে কেন অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা হয়ে গেল? এরমানে আরব জাগরণ আন্দোলন বা বিপ্লবের আওয়াজই কি  SCAF কে ক্ষমতায় আনে নাই? ঘটনা ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু এই সত্যি ঘটনা ঘটতে পারল কেন? কেন এমন হলো, এদিকটা এখন বুঝাবুঝির দিকে যাব।

ইজিপ্টের ঘটনায় মূল তিন প্লেয়ার – ১) SCAF, ২) স্থানীয় ব্রাদারহুড আর ৩)পশ্চিমের লিবারেল ইসলাম (RAND প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ধারা)। এর বাইরে সেকুলার, কমিউনিষ্ট বা লিবারেল ধারার ছোট টুকরা যারা আছে এরা ঠিক গোনায় ধরা প্লেয়ার হতে পারেনি তাই এদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা না করে তাহরিরের মাঠের সাধারণ গণ আন্দোলনের কর্মীদের ভিতরে ধরেছি, সবমিলিয়ে যারা চতুর্থ ধারা বলতে পারি।

[এই লেখাটা শুরু করেছিলাম ১৬-১৭ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে। লেখার প্রসঙ্গ ক্রমশ বিস্তার হতে থাকে কারণ, যেটাকে গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম বলছি – এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টরটা কোথাও আলোচনা হতে দেখিনি। “আরব স্প্রিং” বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম জিনিষটা কি কেন, এর প্রভাবে ইজিপ্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সম্পর্কটা কি এটা বাদ  রেখেই সব আলোচনা চলছে। মিডিয়াগুলোর ফোকাস হলো ব্রাদারহুড ইসলাম নিয়ে তেড়ে আসছে এবার কপটিক খ্রীশ্চানদের কি দশা ঘটে এটাই যেন মূল বিষয়। অথচ তুলনায় এটা সবচেয়ে তুচ্ছ দিক। ফলে কেন তুচ্ছ বলছি সেকথাগুলো ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে লেখা শেষ করতে পারিনি। এদিকে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। এই দেখে ঐ ২৫ তারিখেই ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে তাড়াহুড়া তবে আলাদা করে “কয়েক ঘন্টা পর ইজিপ্ট – কি ঘটতে পারে? কি হতে যাচ্ছে?” শিরোনামে লেখাটা দিয়ে দেই। এখন মুল লেখাটা আবার সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, কয়েক পর্বে। ]

 

বিপ্লবী রাজনীতি না উদারবাদী রাজনীতি

কোন গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে, বিপ্লব সফল করতে গেলে পুলিশ-মিলিটারীর মার নির্যাতন সহ্য করা, অঙ্গ হারানো, নিহত বা গুম হয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে দমনের সব পথ মোকাবিলায় পাড়ি দিয়েই একমাত্র সেটা ঘটতে পারে—এটা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু কোন প্রতিরোধ আন্দোলন সেটা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব হলো বা হবে কি না, পৌছাবে কি না তা – কতটা মাত্রার দমন নির্যাতন সহ্য করা হয়েছে তা মেপে ঠিক হয় না; বলা ভাল নির্যাতনের মাত্রা আর বিপ্লব – এদুটোর আসলে কোন সম্পর্কই নাই, সম্পর্ক আছে মনে করে কোন মনবুঝ দেয়াটাও বেকুবি, নিজেকে ধোকা দেয়া। বাংলাদেশেও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা ১৯৯০ সালে নিজেদের সাথে এমন ধোকাবাজি করেছিল, দাবি করেছিল প্রেসক্লাবের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে তারা নাকি এক গণঅভ্যুত্থান করে ফেলেছিল। ইজিপ্টের আরব জাগরণের বিপ্লবীরা একই সমস্যায় পড়েছে। গত আঠারো মাস ধরে আন্দোলনে তাদেরও ধারণা হয়েছিল তারা বিপ্লবের স্বাদ পেয়েছে, নিচ্ছে। আজ (১৬-১৭ জুন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড মানে রান-অফ চলছে। দুমাস আগের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (সামরিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত এক ধরণের কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট) “অবৈধ” ঘোষণায় ভেঙ্গে দিয়েছে ঠিক এর দুদিন আগে ১৪ জুন। দিন দশেক আগে ঐ একই আদালত (প্রায় একই বিচারকেরা তবে কোর্টের নাম আলাদা) হোসেনী মুবারক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ছয়জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ৮০০ এর মত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগ থেকে “প্রমাণাভাবে” তাদের খালাস বলে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ এই ৮০০ জনকে কারা মেরেছে, কাদের হুকুমে পুলিশ গুলি ছুড়েছে তা আইনের চোখে আন-আইডেনটিফায়েড”, তাই বেকসুর খালাস। কিন্তু সাথে এক তামাশা আছে এখানে। ঐ ৮০০ জনকে হত্যা রাষ্ট্র কেন প্রটেক্ট করতে পারেনি এই অভিযোগে কেবল প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। এর আগে এতদিন ইজিপ্টের বিপ্লবী তরুণেরা খুশিতেই ছিল বিপ্লবের কিছু একটা হচ্ছে মনে করে। বিপ্লব প্রায় শেষ মনে করে, বিপ্লবের গাথা লিখাতেও তারা উদ্যোগী হয়ে গিয়েছিল। গান ছড়া, কার্টুন ডকুমেন্টারীতে সমাজ সয়লাব হচ্ছিল, যেমন হয়। কিন্তু এই রায়ের পরেই কেবল তারা প্রথম টের পাওয়া শুরু করে যে তারা প্রতারিত, ঠকেছে তারা। সবকিছু হাতছাড়া তাদের, আঙ্গুলের ফাঁক গলে সব বেরিয়ে গেছে। কবে কিভাবে বের হয়ে গেছে টেরও পায়নি। এতদিন খুশিতে আশা ভরশায় বুঁদ হয়ে মগ্ন থাকছিল আর ভেবে ছিল মোবারক আর তার সঙ্গী সাগরেদদের বিচার হচ্ছে, হবে। আসলে তরুণ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদেরই ঠকিয়েছে; কারণ বিপ্লব কি, কি করে বুঝা যায় বিপ্লব হচ্ছে কি না, হবে কি না সে সম্পর্কে তাদের ভাবনা কত নাদান সে খবর রাখতে চায়নি। প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের নির্যাতন কম হয় নাই, ৮০০-৯০০ এর মত বিপ্লবী মারা গেছে এই ১৮ মাসে, ফলে অনুমান করে নেয়া যায় নিহতের সাথে আহত পঙ্গু হয়ে যাবার সংখ্যাটাও অনুপাতে কত হতে পারে এবং যারা নির্যাতনে ট্রমাটাইজ মানসিক বিকলাঙ্গ সদমা নিয়ে আছেন হয়েছেন এই সংখ্যাটাও। ফলে পুরা সমাজে উথাল পাথাল করা ১৮ মাসের এই আন্দোলন সংগ্রাম মানে সামাজিকভাবে গণ-মনকে ঝাকুনি দেয়ার ঘটনা এটা। এতেও ঝাকুনি খায়নি বাইরে রয়ে গেছে  এমন লোকজন সমাজে খুব কমই অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি নির্যাতন হত-নিহত হওয়া আর সবার উপরে সামাজিক ঝড়ের প্রভাব আন্দোলিত হয়ে যাওয়া এর সব শর্তই এখানে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এত কিছুর পরও সবাই টের পাচ্ছে এটা বিপ্লব হয় নাই; বিপ্লবের দেখা নাই। আর তরুণেরা সেটা টের পাচ্ছে এখন। এখানে তরুণ বলতে সবাই, এককথায় সামরিক কাউন্সিল SCAF বাদে রাজনৈতিক কমিউনিটি, সমাজের সব অংশে সব দল মতের সব জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বুঝিয়েছি। বিপ্লব যে ঘটেনি এটা আমি এখানে বলছি বলে না, ইজিপ্টের সবার মুখে আর মনের অনুভবের কথা, কারও বুঝতে বাকি নাই। সারা রাজনৈতিক কমিউনিটি হতাশ শুধু নয়,  নতুন করে সমাগত নির্যাতন নিপীড়নের দিন আবার ফিরে আসছে এটা ভেবে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেটা সবার আগে ঘটে রাজনৈতিক পাড়ায় পরস্পরকে ব্যর্থতায় দোষারোপ করা, বিভক্তি বড় হওয়া, যা আগেও ছিল এখন তা আরও বড় হতেও শুরু করেছে।

তাহলে মূল কথাটা, ব্যাপারটা কি এই যে, বুঝব কি করে ঘটনা বিপ্লবের দিকে হাটছে নাকি উদারবাদী রাজনীতির দিকে যাচ্ছে—এটা কেবল ঘটনা ঘটার শেষে  কি দাড়ালো সেটা দেখার পরে জানতে পারা ছাড়া আগাম বুঝবার কোন উপায়  নাই যে বিপ্লব হচ্ছে কি না? বিপ্লব কী আগে বুঝার কোন উপায় আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু কি সেটা? লেনিন সাহেব বলেছিলেন, বিপ্লব করা নাকি একটা আর্ট। এবং অভুত্থান নাকি উপযুক্ত দিন তারিখের আগেও করা যায় না পরেও না। আরও এগিয়ে বলা কথাও আছে। পুরান রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ভেঙ্গে না পরে তাহলে বুঝতে হবে বিপ্লব হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক অনেক কথাবার্তা। তবু আমি সেদিকে যাব না, কোন চর্বিত চর্বন বা আপ্তকথা আউড়াব না, সেসব আশ্রয় করে আমার কথা সাজাব না। কিছু খাস কথা খাসভাবে বলার চেষ্টা করব।

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

গৌতম দাস

২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2t0

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল হতে যাচ্ছে? – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানে নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ দলের (Movement for Justice) নেতা প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ২৭ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত শেষ খবর পর্যন্ত পাকিস্তানের ডন পত্রিকা বলছে, ২৭২ আসনের পার্লামেন্টে ইমরানের যোগাড় করেছে ১১৫ আসন। [bagging 115 of the total 270 seats on which elections were held, according to the preliminary results announced by the Election Commission of Pakistan (ECP).]অর্থাৎ সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ১৩৭ আসনের থেকে ২২ আসন দূরে। যেটা তারা আশা করছে অন্য প্রধান দুই দল  ৬৩ আসন পাওয়া নওয়াজ-মুসলিম লীগ অথবা ৪৩ আসন পাওয়া ভুট্টো পরিবারের পিপিপির কোন সহযোগিতা ছাড়াই ছোট দলের সহযোগিতায় পূরণ করে নিতে পারবে। অর্থাৎ তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনের পরের দিন ২৬ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, “ইমরান খান ও মিলিটারি বসেরা ভাবতে শুরু করেছেন যে তারা একসাথে কাজ করবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইমরান মিলিটারি বসদের একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেন যে, পাকিস্তানের আমেরিকার সাথে যো-হুজুর করে পড়ে থাকা অবস্থা কমিয়ে ফেলতে হবে আর তালেবান বা অন্যান্য চরমপন্থিদের সাথে ডায়লগে আরও কথা বলে দ্বন্দ্ব-বিরোধ কমিয়ে ফেলতে হবে”। [Mr. Khan, on the other hand, was someone the military bosses seemed to think they could work with. Analysts said he shared their worldview, in which Pakistan would kowtow less to the United States and talk more with the Taliban and other extremist groups.]

ইমরান মনে করেন, পাকিস্তানে চরমপন্থার রাজনীতি আছে কথা সত্য, কিন্তু মূল সমস্যা রাষ্ট্র শাসনের বা গভর্নেসের চরম ব্যর্থতা। [“In Pakistan, the main problem is not extremism,” he said in a recent interview with The New York Times. “We are a governance failure. And in any third world country, the moment the governance collapses, mafias appear.”]
এই হল মোটা দাগে সর্বশেষ, পাকিস্তানে কী হতে যাচ্ছে এর সংক্ষিপ্ত ধারণা। এবার মুল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

“পাকি” অথবা “পাকিস্তানে পাঠানো’
অন্য কারও মধ্যে নিজের অপছন্দের ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কিছু দেখলেই তাকে “পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার” হুমকি দিতে দেখা যায় আজকাল হামেশাই – সেই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫ জুলাই। একালের বাংলাদেশেও ভারতের মতোই ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ হুমকি সমান হাজির; আর সেটা প্রায় সমান ভারতীয় অর্থে – প্রায় একই ভাষা ও বয়ানে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে হুমকিদাতা যেন বুঝানোর চেষ্টা করে যে ভারত, আমরা তো তোমাদের মতোই। কিন্তু এই ‘তোমাদের মতোই’ মানে আসলে কী? প্রগতিশীল? অবশ্যই না। সেটা এককালে ছিল। তাহলে কি একই রাষ্ট্রনীতির কারণে? সম্ভবত হ্যাঁ। বাংলাদেশের সরকারকে প্রবল সমর্থন করা ভারত, এ দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি একই। বাস্তবে এই দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি এক হোক আর নাই হোক, পাকিস্তান প্রশ্ন এলেই চলতি আমলে আমাদের সরকারের ঝোঁক থাকে এটা দেখানোর যে, আমাদের অবস্থান ভারতের মতোই। কিন্তু তাতেও আবার সেই কথা, ভারতের মতোই মানে কী?

প্রথমেই বলে নেয়া যায় যে, ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ বুলি এটা মূলত এক “হিন্দু জাতীয়তাবাদী” রাজনীতির বয়ান। যার প্রত্যক্ষ খাতক মোদীর বিজেপি। যদিও সেই সাথে বকলমে অন্য অনেক দলই। তবে তার চেয়েও বড় কথা এই বুলির বয়ান আদতে বর্ণবাদিতার বা রেসিজমের। অথবা বিশেষ করে কাউকে “পাকি” বলে ডাকা বা ব্যঙ্গ করা। কেন? কারণ, কোনো নির্দিষ্ট আমলের পাকিস্তান সরকারের নীতি পলিসি এখানে রেফারেন্স তো নয়ই, বরং পুরো পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীকেই অভিযুক্ত করা হয়, ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়ে থাকে এখানে এই ইঙ্গিত দিয়ে যে  ‘তাদের রক্তই খারাপ’। যেন তারা  “রক্ত খারাপ” এক জনগোষ্ঠি। এটা এক ধরনের হিটলারি বর্ণবাদী যুক্তির বয়ান। তাই তারা দোষী। আসলে এটা এক ভয়ঙ্কর প্রবল ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচি। তবে অনেকে এতসব জেনে বা না জেনে সহজেই এতে সামিল হয়ে যান, আর রেসিস্ট উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের শিকার হয়ে পড়েন। ভারতে একালে এই বয়ান প্রবল করেছে বিজেপি-আরএসএসের মোদি সরকার; যদিও এর আগেও এটা কম-বেশি ছিল। ফলে উঠতি তরুণ যারা রেসিজমের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান তাদের এ ব্যাপারে সচেতন হতেই হবে। আমার অপছন্দের কিছু হলেই আমরা কাউকে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ কথা বলতে পারি না। কারণ এটা রেসিজম। বরং কোন পাকিস্তান সরকারের সুনির্দিষ্ট সেই নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা নিন্দা করাই সঙ্গত হবে। অজান্তে প্রগতিবাদিতার নামে হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক হয়ে যাওয়াটাই কোনো কাজের কথা নয়।

“পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন”
পাকিস্তান- এই শব্দটা দিয়ে এছাড়াও এই অঞ্চলে আমরা আরও অনেক কিছু ইঙ্গিতে মানে করি। যেমন পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন- এটা সমার্থক। একজন ‘প্রগতিশীল’ রাইটার আজ লিখছেন, ‘পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হল।’ অর্থাৎ তার আগাম অনুমানটা হল পাকিস্তান মানে তো সেখানে ‘সামরিক অভ্যুত্থান হবারই কথা’, সেটা না হয়ে নির্বাচন হয়েছে। কেন? কারণ, জুড়ে দেয়া ট্যাগিং অর্থটা হল, পাকিস্তানের জেনারেলরা নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া থাকতেই পারে না। এখানেও আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হল যে, জেনারেলরা যেন খুবই ক্ষমতালোভী, সে কারণেই নিজ ইচ্ছায় তারা অভ্যুত্থান করে থাকেন। আর ঘটা এ ধরনের অভ্যুত্থানগুলোতে বোধহয় পাকিস্তানের বাইরের গ্লোবাল পরিস্থিতির ও পরাশক্তি রাষ্ট্রের কোনো সংযোগ ও ভূমিকা নেই। সবই যেন স্থানীয় জেনারেলরা লোভী বলেই কেবল তারা ক্ষমতা নিয়ে নেন। এই হল প্রপাগান্ডা অনুমানগুলো।

এসব অনুমান বাস্তবতা বিবর্জিত ও ভিত্তিহীন। ফ্যাক্টস হল, পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলগুলো হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায়, ঐ রাষ্ট্রের নীতি-পলিসির কারণে। জেনারেলদের নিজের ইচ্ছায় মানে, আমেরিকার ইচ্ছা অমান্য করে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল একবারই হয়েছে; সেটা ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বেলায়। তাও সেটার পিছনে বিশেষ কারণ আছে। শ্রীলংকা থেকে দেশে ফিরতে  বাণিজ্যিক বিমানে রওনা করেছেন মোসাররফ। আর ঠিক এর পরেই ভ্রমণরত অবস্থায় মোশাররফকে সেনাপ্রধান থেকে সরানো এবং তার বিমান মাটিতে নামতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা জারি করেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। এর বিরুদ্ধে সেনা সদস্যদের মিলে পালটা যৌথ অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের জ্বালানি থাকা অবস্থায় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা মোসাররফের বিমান মাটিতে নামিয়ে আনেন।  কোন বাণিজ্যিক বিমানকে নামতে না দেওয়ার নির্দেশ জারি এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। মূলত ভারত-পাকিস্তানের কারগিল যুদ্ধের দায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর্মিকে দায়ী করা এবং বিশেষত মোশাররফের ওপর তা চাপানো আর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের তাতে মৌন সম্মতিতে ঘটেছিল এমন হাতছুট ঘটনা ও এর পরিণতি। তাও এর দু’বছর পরে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন, টুইনটাওয়ার হামলার পরের দিনই আমেরিকা মোশাররফ সরকারকে মেনে নিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সদ্য স্বাধীন সেকালের পাকিস্তানে, ১৯৫১ সালে প্রথম যে সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা করেছিল তা করেছিল পাকিস্তানের কমিউনিস্টরাই। “রাওয়ালপিন্ডি কন্সপিরেসি” নামে যা পরিচিত। ফলে জন্ম থেকেই, ইসলাম-পাকিস্তান-সামরিক ক্যু, এগুলো সব সমার্থক শব্দ, এ কথা বলে যে প্যারালাল টানা হয় এই কথারও কোন ভিত্তি নাই।

আসল কথাটা অর্থাৎ যে জায়গায় বসে পাকিস্তান বা সামরিক বিষয়টাকে দেখতে হবে তা হল কোল্ড ওয়ার; মানে ১৯৫০-১৯৯১ সাল, এই সময়কাল ধরে চলা আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে লড়াইয়ের যুগ। এইকালে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ ক্যু হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায় ও নীতিতে সামরিক শাসনে চলেছে। মূলত কমিউনিস্টদের পপুলার প্রভাবে আমেরিকার পক্ষে এসব দেশে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সরকার দূরে থাক, নামকাওয়াস্তে কোনো লিবারেল দুর্বল সরকারও টিকিয়ে রাখতে পারেনি সেকালে। ফলে আমেরিকার প্রভাব-স্বার্থ টিকাতে সামরিক ক্ষমতা দখলই ওর একমাত্র ভরসা ছিল ।

কোল্ড ওয়ার মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে (১৯৪৫) কলোনি উত্তর সময়ে কলোনিমুক্ত দেশগুলোকে নিজ বলয়ে নিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি প্রভাব বিস্তারের লড়াই, তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র-ব্লকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আসার টানাপড়েন – এটাই কোল্ড ওয়ার যুগ-বৈশিষ্ট্য। এবং অবশ্যই সেগুলো কমিউনিস্ট ও এন্টি-কমিউনিস্ট মতাদর্শের মধ্যকার লড়াই, এই উছিলায় ঘটেছিল। এতে কে সঠিক ছিল, সেটা আমরা যার যার পছন্দের মতাদর্শের ভিত্তিতে জবাব দেব আর এভাবে বিভক্ত হয়ে যাবো কোন সন্দেহ নেই। ফলে সেদিকে না গিয়ে, বরং সেই সময়ের আমেরিকান নীতি সম্পর্কে চলতি শতকে এসে আমেরিকানদের ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন কী- সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা তুলব। তবে মূল কথা হলো, অনেক হয়েছে আর কত, পাকিস্তানের ঘটনাবলি বুঝতে কোল্ড ওয়ারের চিন্তা-ফ্রেম তো লাগবেই  সাথে লাগবে আমাদের পরিপক্কতা। হিন্দু অথবা মুসলমান জাতীয়তাবাদের বাইরেও দুনিয়া আছে। ফলে বাইরে যেতে হবে। পাকিস্তানের ঘটনাবলির কারণ সেখানেও দেখতে হবে। অন্তত, দুই জাতীয়তাবাদের কোনো একটার ঘরে বসে অন্যটাকে কোপানো – এগুলোর দিন শেষ করতে হবে। পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।

RAND ও আরব স্প্রিং
র‌্যান্ড করপোরেশন (RAND Corporation) – এটা আমেরিকান আর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের নাম। বহু পুরানা, বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এর জন্ম। যখন সে আমেরিকান এয়ার ফোর্সকে নিজের নীতি গবেষণার কাজ দিয়ে সহায়তা দিত। কারণ, যুদ্ধবিমান তৈরি করে এয়ারফোর্সকে বিক্রি করে এমন এক কোম্পানি থেকে র‍্যান্ডের চলার ফান্ড আসত। বর্তমানে (১৯৪৮ সালের পর থেকে) এটা নিজেই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসাবে রেজিষ্টার্ড। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, পিএইচডি প্রোগ্রাম অফার করে থাকে। যেখান থেকে এর বিস্তর একাডেমিক তৎপরতা – স্টাডি, গবেষণার কাজ চলে। স্বভাবতই এর মূল লক্ষ্য হল, অ্যাকাডেমিক তৎপরতা- স্টাডি, গবেষণার মাধ্যমে আমেরিকান সরকারগুলোকে সম্ভাব্য তার পলিসি কী হওয়া উচিত, তা ঠিক করতে সহায়তা করা। এই অর্থে আমেরিকান রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ দেখাটাই তার কাজ। তার অনেক কাজের মধ্যে একালে এক প্রভাবশালী কাজ – পপুলারলি যেটাকে ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ নামে চেনানো যায়। বড় পরিসর থেকে বললে, ২০০১ সালে টুইনটাওয়ার হামলার পরে বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নীতিটা ছিলঃ মুসলমানমাত্রই শক্ত হাতে দমন, তাদের ধর আর মার। এই নীতি নিষ্ফলা পরাজিত হয় ও অনন্ত সমাপ্তিহীন এক যুদ্ধের ভেতর আমেরিকাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই থেকে, আমেরিকান অর্থনীতির পতনের পিছনে এটা মূল কারণ।  ২০০৬ সালের মধ্যে আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের গবেষণা মূল্যায়নে পাওয়া ফল হিসেবেই এই নিষ্ফলা পরাজয় আর অর্থনীতির পতনের ঘটনাবলি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আর এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে আর আগে থেকে চলে আসা র‌্যান্ডের এক গবেষণার ফলাফল – মূলত এই দুই থেকে তৈরি নীতি হল ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’। ওবামা প্রশাসন ২০০৯ সালে ক্ষমতা নিলে এটা স্থায়ী ও রুটিন বিদেশ নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

সার কথায় বললে, এটা হল নির্বিচারে আর মারধর-দমন নয়, ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট করার নীতি। সশস্ত্র ইসলামি ধারাগুলোর সাথে আমেরিকার আগেরই মারধর-দমন চলেছে তা বাদে ওর বাইরে বাকি সব ইসলামি ধারার সাথে আমেরিকার রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়া, রাষ্ট্র-সরকারে তাদের আসতে অংশগ্রহণে সহায়তা, সহযোগিতা করা। এরই প্রথম সবল প্রচেষ্টা ছিল মিসরে মোবারকের পতন ও পপুলার নির্বাচিত এক সরকার সৃষ্টি – আরব স্প্রিং। আর এই কাজে ইসলামি ব্রাদারহুডের সাথে কাজ করা, এটাই ছিল আমেরিকার ইসলামের সাথে এনগেজমেন্টের প্রথম উদ্যোগ। দুঃখজনক হল এটা ফেল করে যায় বা কাজ করেনি। না করলেও ওবামা আরো কিছু চেষ্টা করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু মূলত ব্রাদারহুড সম্পর্কে সৌদিরাজের ভীতি, বিশেষত প্রেসিডেন্ট মুরসির ইরান সফর করা থেকে সেই ভীতি আরো ট্রিগার করে প্রবল হওয়া থেকে, এরপর সৌদি উদ্যোগে জেনারেল সিসির আগমন উত্থানে ওবামা এতে নীরব বা উপায়হীন সমর্থকে পরিণত হয়েছিল। ফলে মুরসির পতন ঘটে। মিসর এক্সপেরিমেন্টের এখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ইজিপ্ট ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর একটা মাত্র। এই প্রজেক্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার সব দেশেই চালু তো আছেই, ফলে বাংলাদেশেও আছে। এমনকি ইন্ডিয়াতেও আছে। কারণ এটা সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির চলমান অন্যতম মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

আমেরিকার যুদ্ধের ময়দান পাকিস্তান
যুদ্ধটা শতভাগ আমেরিকার। নিজ দেশের ভুমিতে সে যুদ্ধ না করে পাকিস্তানকে যুদ্ধের ময়দান বানানো ও ব্যবহার করা, পাকিস্তানকে এক গজব বানিয়ে ফেলার শতভাগ দায় আমেরিকার। সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির সাথে আমেরিকান যুদ্ধের ময়দান হল পাকিস্তান। পাকিস্তানকে আমেরিকার হয়ে এই ময়দান হতেই হবে। নইলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে মাটির সাথে মিটিয়ে ‘পুরান প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানো হবে – এটাই ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজের প্রেসিডেন্ট মোশাররফকে টেলিফোন কথোপকথনে দেয়া পরামর্শ বা হুমকি। মোশাররফের ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইতে এর বিস্তারিত বয়ান আছে। তাই জেনারেলদের সিদ্ধান্তের পাকিস্তানের সব ‘টেররিজম’ ঘটনা ঘটছে- এ কথাগুলো অর্থহীন। আমেরিকান ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে বাধ্য হয়ে নিজেদেরকে ব্যবহৃত হতে দেওয়া এই বৃহত্তর দিক বাদ দিয়ে কেবল জেনারেলদের দায়ী করার সংকীর্ণ চোখ – এটা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের ফরেন পলিসি।  তা যাই হোক, আমেরিকান রুটিন পলিসি হিসেবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার রাষ্ট্র বলে পাকিস্তান ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর এক বড় খাতক, এই প্রকল্পের শুরু থেকেই।

আমরা বেশির ভাগই না আরব স্প্রিং পলিসির যথেষ্ট খবর নেই না পাকিস্তানের। এই প্রচারণার কাছে পাকিস্তান মানে হল ঘৃণা। এটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের চোখে দেখা ১৯৪৭ এর দেশভাগ অথবা সত্য সত্যই ১৯৭১ এর পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা নৃশংসতাও এর কারণ বটে। যদিও এরপর এরা আবার জিয়াউল হকের আমলে এসে থেমে যায়।  বুঝতে চায়না অথবা দেখতে পায়না ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল – এই ট্রিগার পয়েন্ট সব ঘটনার আরম্ভ-বিন্দুকে। যেখানে মুল বিষয় হল, রাশিয়ান জার-সাম্রাজ্য সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজ বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে নিজ সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করে আর এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে ১৮৮৯ সালে আফগানিস্তানের মাটিতে ব্রিটিশ-জার এ দুই সাম্রাজ্য লড়াই করেছিল। এরই পুনরাবৃত্তি হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল। যার আবার পিছনের মূল কারণ ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব-ভীতি। ইরান বিপ্লব ছিল এক গ্লোবাল ঐতিহাসিক তাতপর্যময় ঘটনা এই অর্থে যে সোভিয়েত ব্রেজনেভ-আফগানিস্তান-আমেরিকা-পাকিস্তান-টেরর-আলকায়েদা-তালেবান-আইএস ইত্যাদি সব শব্দাবলীতে এরপর থেকে এক চেন রিয়াকশন ঘটে গেছে এখান থেকে। একালের দুনিয়ার সবঘটনার আরম্ভ বিন্দু এখানে। । মূলত ইরান বিপ্লবের প্রভাবে মুসলিম সেন্ট্রাল এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ছাড়া হয়ে যায় কিনা আগাম সেই ভয় মনে এসেছিল সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের। আর তা থেকে তিনি ‘সমাজতন্ত্র নামের আড়ালে’  কলোনী দখলগিরিতে করতে নেমে পরেন। আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান ইরান আর সেন্টাল এশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ) প্রায় মাঝখানে। ফলে আফগানিস্তানকে বলি চড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ব্রেজনেভ এই মনে করে যে বাফার হিসেবে আফগানিস্তান দখল করে আফগানিস্তানকে  বাফার রাষ্ট্র হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।  পুরানাকালে রাশিয়ান জারের তৎপরতায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভয় পেয়ে এর বিরুদ্ধে লড়েছিল, একালে সেই একই ভয় পায় পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান যুদ্ধের দায়টা নিয়েছিল আমেরিকার হয়ে, কোল্ড ওয়ারের লড়াই লড়তে। যে যুদ্ধের শেষটায় এখান থেকেই আল-কায়েদা ও তালেবান উত্থান-পতনে, এখনও যা চলমান।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও তা ভেঙে গেলে এর আমেরিকার থিঙ্কট্যাঙ্ক একাদেমিক মহলে প্রধান তাৎপর্যময় বিষয় হয়ে উঠে যে “কোল্ড ওয়ারের” তাহলে এখন কী হবে! কারণ বাস্তবত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও নাই মানে মাঠে এবং বাস্তবে কোল্ড ওয়ার নাই হয়ে যাওয়া। ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল যে কোল্ড ওয়ারের পুরা যুগে আমাদের মত দেশে আমেরিকা সামরিক ক্যু’র করানোর পথ অনুসরণ, সেটা এবার তাহলে ফরেন পলিসি থেকে বাদ দিতে হবে।

আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন
কিন্তু আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন? এ প্রসঙ্গে র‌্যান্ড রিপোর্টের দেয়া একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তা হল, আমেরিকান পলিসি মেকারদের চোখে সমাজতন্ত্র এক এবসার্ড (বাস্তবায়ন অযোগ্য) আইডিয়া। না, এটা তাদের অপছন্দের মতাদর্শ বলে নয়। কারণ এটা এমন এক প্রজেক্ট যার সাথে আমেরিকানদের এনগেজমেন্ট বা কোনো দেয়া-নেয়া, রাষ্ট্র বা সরকারে পাশাপাশি থাকা, দুটো আলাদা দল হিসেবে থাকা, অথবা সরকারে বা বিরোধী হিসাবে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। ব্যাপারটা হয় তারা না হলে আমরা। এছাড়া কমিউনিস্টদের “সব মালিকানা উচ্ছেদ করে দিতে হবে” – এটা মধ্যবিত্ত ও গরিবদের মধ্যে খুবই পপুলার দাবি। অথচ আমেরিকার চোখে এটা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন এক এবসার্ড দাবি। তবে এবসার্ড হলেও কিন্তু তা পপুলার দাবি বলে এর সামনে আমেরিকা অসহায় এবং উপায়ন্তহীন। তাই আমেরিকা এশিয়ায় আমাদের মতো দেশে কোল্ড ওয়ারের পুরা ৪২ বছরে কোনো লিবারেল সরকারও কায়েম করতে পারেনি। এরই পরিণতি হল সামরিক ক্যু ফেনোমেনা।

এই কথাগুলো এখানে বলা হল, আমেরিকান নীতি বুঝার জন্য কেবল। তা মেনে নেয়ার জন্য এটা কোনো সুপারিশ নয়। অথবা এটাকে সাফাই হিসেবে নেয়ার জন্য নয়, তা ভুল হবে। আমেরিকানদের ভালো বা মন্দ কাজের সাফাই দেয়ার দায় আমেরিকার।

তাই সোভিয়েত ভেঙ্গে পড়ার (১৯৯১) পরে এবার আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল এবং শেষে নীতিগতভাবে আমেরিকা সিদ্ধান্ত অবস্থান নেয় যে আর সামরিক ক্ষমতা দখলকে নিজের স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে আর দেখা হবে না। সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১) প্রশাসনের শুরুর আমল। বিল ক্লিনটনের ২০০০ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফর ছিল সেই বার্তা পৌছানোর যে আমরা এখন থেকে আর সামরিক ক্যু নয় লিবারেল নির্বাচিত সরকারের পক্ষে।  আর ঠিক এই কারণে অর্থাৎ আমেরিকান ‘ক্যু-বিরোধী’ নতুন পলিসি কমিটমেন্টের পর জেনারেল মোশাররফের ক্যু এই সাময়িক দুর্ঘটনাটা ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেনি। মূল কারণ আমেরিকান নীতিগতভাবে সামরিক পথে না যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত প্রতিশ্রুতি। ফলে যারা কিছু হলেই পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল নিয়ে শঙ্কা তোলেন তারা মুখস্থ বলেন। তারা আমেরিকার পলিসির হাল-হকিকত সম্পর্কে খোঁজ রাখেন তা মনে হয় না।

আবার আমরা বেশির ভাগই একালের পাকিস্তান, নতুন প্রজন্মের পাকিস্তান সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকেবহাল নই। বিশেষ করে আরব স্প্রিংয়ের প্রভাব পাকিস্তানে কেমন পড়েছিল। ঠিক যেমন বাংলাদেশে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনকি আমাদের বেসরকারি মেয়েদের স্কুল ভিকারুন্নিসা পর্যন্ত আরব স্প্রিং ছড়িয়ে আছে, আমরা কী জানি! মনে হয় না। অবশ্য ধরতে পারারও একটা ব্যাপার আছে। এই ততপরতাগুলোকে চেনার একটা সহজ উপায় হল, ‘ইয়ুথ’ বা ‘লিডারশিপ’ – এসব শব্দে প্রকাশিত কোনো তৎপরতা দেখতে পেলেই বুঝতে হবে এটাই সেই। বাইরে থেকে দেখতে এটা আমাদের পরিচিত ‘শিক্ষার্থীদের কোন ক্লাব’ (ডিবেটিং) ধরনের এমন নানা তৎপরতা, যেগুলো যে কোনো অ্যাকাডেমিতে এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি বলা হয় তেমনই ধরনের।
র‌্যান্ডের ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ঙ্গামেরিকান ফরেন পলিসি হিসাবে গৃহিত হওয়া আসলে আমেরিকারই সামরিক ক্যু’র পথে আর না যাওয়ারই আরেক পরিপূরক অবস্থান, আরেক এক্সটেনশন।

তাহলে মূল কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়াতে তাই আমেরিকাকে এরপর দেখানো জরুরি হয়ে পড়ল যে, এখন তাহলে রাষ্ট্র গঠনে, রাষ্ট্রীয় কনস্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া, মৌলিক অধিকার সম্পর্কে মাস লেভেলে সচেতনতা তৈরি ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকার এগিয়ে আসা উচিত। এ্টাই ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ এর কোর লক্ষ্য । যুক্তির শুরু এখান থেকেই। তবে মূলত এর মাঝে টুইনটাওয়ার হামলা ঘটে যাবার কারণে, মূল প্রজেক্টকে মুসলমান জনসংখ্যার জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য এমন বিশেষ আর এক মাত্রা দিয়ে সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল যাতে তা ‘ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্টের ইচ্ছার’ প্রকাশ হিসাবেও কাজ করতে পারে।

টার্গেট হিসাবে এই প্রজেক্ট মূলত এটা তরুণদের মধ্যে বেশি কাজ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে, পপুলারও হতে চায়। এটা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র, কনস্টিটিউশন, প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে এবং সমাজকে নেতৃত্ব দেয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আমেরিকান প্রকল্প।

“Youth leadership”
পাকিস্তানে এই প্রকল্প তৎপরতা খুব সম্ভবত ২০১০ সাল থেকে ব্যাপকতা লাভ করে। ইমরান খানের দলের নাম পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ, সংক্ষেপে পিটিআই। যার মানে হল (Movement for Justice) বা ইনসাফের লড়াই।  যদিও পিটিআইয়ের জন্ম ১৯৯৬ সালে আরব স্প্রিংয়েরও বহু আগে থেকে। তবে আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতা ধীরে ধীরে জমে ওঠার পর গত ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে দিয়ে সমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থেকে তারা একটা দল বেছে নিয়েছিল। সেটা ইমরান খানের দলের সাথেই, সেখান থেকে তাদের বুঝাপড়া ও এক সাথে কাজ করার ঐক্য হয়েছিল। এমনিতে আরব স্প্রিংয়ের প্রকল্পগুলো মাঠে হাজির থাকে এনজিও প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা হিসেবে। তবে বাইরে আমরা দেখি কেবল তাদের সুবিধালাভ যারা যারা করে এমন শিক্ষার্থীদেরকেই। সরাসরি ইউএস এইডের সরকারি ফান্ড এটা; অন্য কোন সামাজিক দাতব্যের ফান্ড নয়। আমেরিকান প্রায় ৯টি এনজিও প্রতিষ্ঠান সাধারণত এ কাজ-ততপরতায় জড়িত।   ফলে তারা সরাসরি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে পারে না, করেও না। তবে তাদের তৎপরতা থেকে সুবিধা-লাভকারি স্থানীয় জনগণ বা শিক্ষার্থী নিজেরা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথেও কাজ করতে পারে। তবে “youth leadership” নামে চলা কর্মসুচিগুলো কবে কখন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কর্মিদের সাথেও সম্পর্ক কাজ করবে এটা ভ্যরি করে। সাধারণত এটা অনেক দেরি করে ঘটে। মিসরের “সিক্সথ অক্টোবর লিডারশীপ গ্রুপ” শেষে নিজেই রাজনৈতিক দল হয়ে যায়। তবে কোন কারণে তা নির্বাচনের পরে হয়েছিল।

“youth leadership” ্ধরণের কাজের মাধ্যমে গত বিশ বছরে তরুণ পাকিস্তানিরা, পাকিস্তানের পরিচিতি অনেক বদলে দিয়েছে। এরা মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত।  ইমরানের দলের গত পাঁচ বছরের তৎপরতায় মনে করার কারণ আছে যে, এসব তরুণ নেতৃত্বেও কিছু যোগ্যতা অর্জন করেছে। পাকিস্তান সমাজের এই অংশটার কথাই বাইরের আমরা খুবই কম জানি কারণ আমাদের পরিচিত পাকিস্তান যেটা ছিল সেটা মূলত বড়জোর সত্তরের দশকের; সেটা দিয়েই একালের পাকিস্তানকে বুঝতে চাই বলে সমস্যা হয়। নিরন্তর যুদ্ধ, রিফুইজি, অস্ত্র  বোমা আর ইসলামের হরেক রক্ষণশীল বয়ান- ইত্যাদি এসবের পালটা এসব কিছুতে ত্যক্তবিরক্ত এসব তরুণেরা এক ব্যাপক মডার্নাইজেশন বা রুপান্তরের ভেতর দিয়ে পার হয়ে গেছে। যার প্রধান উপায় হিসেবে কাজ করেছে এনজিও তৎপরতা। এরই সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল ব্যাপক  ও একটিভ নারী ভোটার এর ততপরতা। পাকিস্তান রক্ষণশীল সমাজ তা সত্বেও নারীরা সক্রিয়ভাবে সবকিছুতে তাদের উপস্থিতি আজ দেখতে পাওয়া যায়। এই নির্বাচনে শিখ, হিন্দু, খ্রীশ্চান ও নারী এমনকি ট্রান্সজেন্ডারেরা প্রার্থী হয়েছে। কয়েকজন সম্ভবত নির্বাচিতও হয়েছেন। এর পিছনে মূল যে বাস্তবতা কাজ করেছে তা হল, নারীরা বাইরে বের না হওয়ার মানে কঠিন কষ্টকর জীবন সংগ্রামে পরিবারের আয়ের তাবত দায় কেবল পুরুষ সদস্যদের নিতে হবে। স্বভাবতই তা পরিমাণেও কম হবে। অনটন বাড়বে। ফলে এই কঠিন বাস্তবতার ফলাফল হল নারীদেরকে বাইরে দেখতে পাওয়া। সমাজে তা গ্রহণযোগ্যও করে নেয়া হয়েছে, হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আমরা আফগানিস্থানের সাথে তুলনা করলে দেখি সেখানে নারীরা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া (তা আটবছরের বালক হলেও) এখনও বাইরে বের হতেই পারেন না। এসব কিছু মিলিয়ে এক পরিবর্তন – পরিবর্তিত পাকিস্তান – এরই প্রতীক ইমরান।

এরা নিঃসন্দেহে একেবারেই নতুন প্রজন্ম, নতুন তাদের অভিজ্ঞতা। তাদের তৎপরতার প্রথম ফলাফল দেখার সময় সম্ভবত এই নির্বাচন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে পিটিআই সবার চেয়ে এগিয়ে। এর পেছনের একটা বড় কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ পরিবারসহ তার অর্থ পাচারের দুর্নীতির মামলার রাজনৈতিক তৎপরতা করার অযোগ্য ঘোষিত হয়ে যাওয়া, এর নৈতিক প্রভাব। মনে হচ্ছে পিটিআই অথবা তাদের নেতৃত্বের এক জোট, সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রিগিংয়ের অভিযোগ আছে। বিদেশি অবজারভাররা নির্বাচন ভাল হয় নাই বলেছে কারণ নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না তারা বলছে। তবু সব কিছু যতটা সম্ভব আমল করে, প্রতিকার করে কাটিয়ে ইমরান খান সরকার গড়তে যাচ্ছেন – এটাই  ডমিনেটিং পাবলিক মনোভাব ও আকাঙ্খা। এই তথ্য আলজাজিরার পাকিস্থানের স্থায়ী সংবাদদাতা কামাল হায়দারের বরাতে বলছি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পাকিস্তানে আরব বসন্তের নতুন মডেল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

গৌতম দাস

১৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sE

File photo of 1st China-South Asia Cooperation Forum ((CSACF), Fuxian Lake Initiative – ORF

ভারতের অন্যতম বেসরকারি দাতব্য থিংকট্যাংক বা বেসরকারি পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা সংক্ষেপে ওআরএফ (Observer Research Foundation, ORF)। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনেকেই থাকেন রিসার্চ ফেলো হিসেবে, যারা সাধারণত হন দীর্ঘ পেশাদার জীবন কাটানো কোনো কূটনীতিক, জার্নালিস্ট বা একাডেমিক ইত্যাদি পেশাজীবী। কিন্তু ওআরএফ রিসার্চ ফেলোদের নিয়ে এক আজব ঝোঁক দেখা যাচ্ছে যে, তারা তাদের সহকর্মী একই বিষয়ের কী নিয়ে কাজ করছে, কোথায় কী বলছে, সেসবের খবর রাখে না। তাই একই প্রতিষ্ঠান ওআরএফের এক সহকর্মী যা বলছেন, অপর সহকর্মী ঠিক এর উল্টো বলছেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য খারাপ নাম কামিয়ে বাংলাদেশের চোখে পড়ে যাওয়া ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। পরবর্তী সময়ে কূটনীতিক চাকরির জীবন শেষ করে তিনি ২০১৬ সালে ভারতের ওআরএফ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো হয়েছিলেন। এমনিতেই ভারতের থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ ঝোঁক হলো প্রো-আমেরিকান পলিসি অনুসরণ করা অথবা তাদের জন্মই হয় আমেরিকান অর্থে আমেরিকান নীতি-পলিসি প্রচারের জন্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, বিপুল উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির পক্ষে প্রচারণা চালাতে ভারতের প্রায় সব থিংকট্যাংকই ভাড়া খাটে। এর মূল কারণ, এদের বেশির ভাগেরই জন্ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডিং এ কারণে। তেমনই, প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খাটা, আর আমেরিকান বলে বলীয়ান এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর হলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। যদিও কপাল খারাপ, এখন ট্রাম্পের জমানা, আর তাতে এসব ভাড়াটেদের অবশ্য অবস্থা খুবই শোচনীয়। ট্রাম্পের চলতি “বাণিজ্য যুদ্ধের” নীতির ঠেলায় আমেরিকান পলিসির পক্ষে দাঁড়ানো ও ওকালতি তারা করুক এব্যাপারে ট্রাম্পই তেমন আগ্রহী না, গুরুত্ব দেয় না। সময়ে বেইজ্জতি করে দেয়। আর ভারতের বিরুদ্ধেও যে আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছে সেই প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খেটে ইজ্জত রক্ষা করা অসম্ভব। অর্থহীন এক দালালিতে পরিণত হয়েছে একাজ।  কিন্তু তা হলেও সেই ২০১৬ সালেও পিনাক রঞ্জনদের ডাটফাট ছিল আলাদা, খুবই আক্রমণাত্মকভাবে আমেরিকান ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে তারা চোটপাট করে যেতেন।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র-জোট সার্কের (SAARC) ২০১৬ সালে অক্টোবরের সম্মেলন ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম হয় ভারত। সেবারের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে। ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশও পাকিস্তানে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার পক্ষে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিল। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ রিপোর্ট ছিল, সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যাচ্ছে না বাংলাদেশসহ চার দেশ । সার্ক ভন্ডুল করার ক্ষেত্রে ভারতের সফলতা হিসাবে প্রথম আলো লিখেছিল, সার্কের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে।

ভারতের কূটনৈতিক লবিতে অবজারভার সদস্য আফগানিস্তানসহ চার রাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান) পাকিস্তানের সার্কের সম্মেলনে যেতে অপারগতা জানায়। আনন্দবাজার লিখেছিল ভারতের মনের গোপন কথাটা। অক্টোবর ২০১৬ তে লিখেছিল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লিভারতের অমিত বসু কালের কন্ঠে কলাম লিখে ছিলেন, “ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক সুতোয় ঝুলছে। ছিঁড়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়। দুই দেশের মৈত্রী উধাও”। শুধু তাই নয়, আবার কবে সার্ক সচল হবে, সেটাও অনিশ্চিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- তার জন্মজন্মান্তরের শত্রু পাকিস্তানকে একঘরে করা।

ইতোমধ্যে ১৯৯৭ সালে এক ‘বে অব বেঙ্গল উদ্যোগ’ হিসেবে এবং ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) নামে আর এক রাষ্ট্র জোট গঠন হয়েছিল। যেখানে পাকিস্তান ছাড়া সার্কের বাকি পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বাড়তি নতুন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এ দুই রাষ্ট্র, এভাবে মোট সাত রাষ্ট্র নিয়ে এটা গঠিত ছিল।

ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সার্কের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশনীতির পক্ষে ২০১৬ সালে প্রচারণার কাজ হাতে নেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল এ রকম- ‘সার্কের দিন শেষ’। ফলে পাকিস্তানও একঘরে হয়ে শেষ। এখন থেকে এর বদলে, এর জায়গায় এখন সবাইকে ‘বিমসটেক’ নিয়ে ভাবতে হবে। গত ৪ অক্টোবর ২০১৬ যুগান্তর লিখেছিল,  এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই।’

আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল এমন যে, এ ঘটনার প্রায় একই কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশের কিছু প্রো-গভর্নমেন্ট সাংবাদিক ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সফরসূচির অংশ হিসেবে তারা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জনের সাথে দেখা করেছিলেন। দেশে ফিরে ওসব সাংবাদিকরা পিনাক রঞ্জনের বরাতে বিরাট নিউজ করেছিলেন, ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন’। উপরে যুগান্তরের রিপোর্টের ঐ সাংবাদিকও ছিলেন ঐ সফরে। এছাড়া, ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে অনলাইন বিডিনিউজ২৪-এর রিপোর্টের শিরোনাম দেখতে পারেন। বিডিনিউজের রিপোর্টারও ছিলেন ঐ ভারত সফরে। আর তাতে মূল খবরটি ছিল এভাবে- ‘সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক।’

তাহলে এতক্ষণের সার কথা হল, গত ২০১৬ সালেই সার্কের “কবর দিতে” বা “ভুলিতে দিতে” ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। এবং এর পালটা হিসাবে ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) কে হাজির করার সিদ্ধান্ত সকলকে প্রকাশ্যেই ভারত জানিয়েছিল।

কিন্তু, আসলে সবই ভাগ্যের পরিহাস। নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটাই প্রমাণিত হলো। সার্ক প্রসঙ্গে ভারতের ঘৃণা ও প্রচারণায় এই ফেলা থুথু এখন সেই ভারতকেই এখন ফিরে চাটতে হইতেছে।

কারণ, বেশি দিন লাগেনি, প্রায় দেড় বছর না যেতেই গত ১০ জুলাই ২০১৮ ওই একই ওআরএফের সাইটে এবার আরেক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, ‘সার্ক কোমায়, চীন আর এক নতুন আঞ্চলিক জোট হাজির করেছে।’ [SAARC in coma, China throws another challenging regional initiative]। তার মানে এই রিপোর্ট এখানে সেই সার্কের প্রতি ভারত এখন কত সহানুভুতিশীল তাই দেখাতে চাইছে। একেবারে পুরা উল্টা-রথ।

যদিও এবারের রিপোর্টটা আর পিনাক রঞ্জনের করা নয়, করেছেন আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি’। আর এখানে এবার বিশেষ করে লক্ষণীয় হল, দেড় বছর আগে যে ওআরএফ একই ‘সার্ক’ এবং সাথে পাকিস্তানের ‘ডুবে যাক’ চাচ্ছিল, সবারই ‘ভুলে যাওয়া’ চাচ্ছিল; এবার সেই একই সার্কের পক্ষে ওআরএফের দরদ ও প্রীতি ঝরে পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ ভারতের এখন বিপরীত মুডে, সার্কের পক্ষে ভারতের প্রীতি এখন উপচানো। সত্যি এ’এক বড়ই আজব ঘটনা! ভারতের এই উল্টো যাত্রা কেন? ঘটনা কী?

ঘটনা হল, গত মাসে চীনের গুয়াংজুতে চীনা উদ্যোগে এক আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। জোটের নাম চীন-দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা ফোরাম, [China-South Asia Cooperation Forum] (CSACF)। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আগের সার্ক আর সাথে উদ্যোক্তা চীন। দক্ষিণ এশিয়া রাষ্ট্র জোটের সাথে চীনের সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম এটা। অর্থাৎ এটা মূলত (সেই ভারত-পাকিস্তানসহ) সার্ক প্লাস চীনের জোট।

এখন তাহলে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা সংক্ষেপে ওআরএফের আগে কি আগে স্বীকার ও ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল না যে, ২০১৬ সালে ‘সার্ককে ডুবিয়ে দেয়ার পক্ষে’ ভারতের যে বিদেশনীতি ছিল আর যেটা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন প্রশংসা ও সমর্থন করেছিলেন, সেটা থেকে এখনকার ওআরএফ সরে এসেছে? এবং কেন এই সরে আসা, সে ব্যাখ্যাই বা কী? নাকি ওআরএফ এর আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি এখনো জানেনই না যে, পিনাক রঞ্জন এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালে এমন একটি অবস্থান ছিল?

তবে এটা হওয়াও অসম্ভব নয়, এখন নতুন চীনা উদ্যোগে আগের ‘সার্ক +’ জোট একটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দেখে রাতারাতি ভোল বদলে ওআরএফ এখন সার্কের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অবস্থান নিচ্ছে? অর্থাৎ এই সহানুভূতিও ফাঁপা, ওআরএফের দরকার চীনের বিরুদ্ধে খোঁড়া হলেও একটি যুক্তি (নিজের স্ববিরোধিতা প্রকাশ হয়ে গেলেও তা) হাজির করা। কিন্তু তাতেও, প্রশ্ন আরো আছে।

কারণ, ওআরএফ এবার নিজেই জানাচ্ছে, চীনে এই সম্মেলনের খবর ভারতে খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। (এমনকি বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় এসেছে চোখে পড়েনি, অথচ বাংলাদেশের প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিল।) কিন্তু ভারতে প্রচার হয়নি কেন?

এছাড়া, আরো বেশ কিছু সিরিয়াস ‘কেন’ প্রশ্ন আছে?
কারণ, ওআরএফ ছদ্ম সার্ক-দরদি সেজে এক খোঁচামারা মন্তব্য করে বলেছে, “চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরাম কি আসলে চীনের বেল্ট রোডেরই এক সহযোগী উদ্যোগ, যার ভেতর দিয়ে সার্কের মৃত্যুঘণ্টা বাজবে?” [The parallel, yet unasked question, either at or outside the CSACF venue, was if the new Chinese initiative, alongside the more-visible Belt and Road Initiative (BRI) could ring the death-knell for the South Asian Association for Regional Cooperation (SAARC), where it had failed to go beyond the ‘Observer’ status, to obtain full membership.]

ওআরএফের এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেন সার্কের মৃত্যু হলে ভারতের জান চলে যাবে। এতই পতিপ্রাণা, অথচ কারপেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা কথাটা হল,  ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়ে ভারত আগেই সার্কের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। আর এখন দরদি সাজছে। কুমিরের চোখে যেন জল।

এ ছাড়া, আরেকটা খোঁচা দিয়ে ওআরএফ বলছে যে, সার্ক থেকে চীনকে কখনোই অবজারভারের বেশি মর্যাদা ভারত দিয়ে দেয়নি। আর যেন তা ভারতের বিরাট সাফল্য ছিল? এতে পরিষ্কার যে, ভারত কখন কী চেয়ে কী করে আর তাতে লক্ষ্যই বা কী- এসবের পেছনে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করার কোনো পরিকল্পনাই থাকে না।

এবারের চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরামের সভায় খুব ভালোভাবেই ভারতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। প্রতিনিধিত্ব করেছেন গুয়াংজুতে ভারতের কনসাল জেনারেল সাইলাস থাংগেল (Sailas Thangal)। ভারতের প্রতিনিধি ওই সভায় এই জোট উদ্যোগকে বহুল প্রশংসা করেছেন, বলেছেন এই উদ্যোগ এ অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে হাজির করবে। [Praising Beijing’s initiative, Indian Consul General in Guangzhou, Sailas Thangal said the CSACF boasts of the world’s biggest market. But the region also boasts of being home to millions of poor people.] শ্রীলঙ্কার এক অনলাইন পত্রিকা দ্য আইল্যান্ড এই খবর দিয়েছে। এ ছাড়া, চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক ডিরেক্টর জেনারেল লি জিমিংয়ের বরাতে আইল্যান্ড লিখেছে, ‘CSACF’ ফোরাম আসলে বেল্ট রোড উদ্যোগেরই অংশ, যেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে চীনের ভৌগোলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গাঢ় করবে।’ [He declared that the CSACF was a part of the BRI, “which is expected to bring together South Asian countries that share a geographical vicinity and cultural affinity with China” ]

মজার কথা হলো এসব খবর ওআরএফ নিজেই নিজের রিপোর্টে লিখে জানাচ্ছে। তাহলে এর মানে কি এই এক ফাইন মর্নিংয়ে আমরা উল্টো প্রশ্নের সম্মুখীন হব যে, ভারত তখন উল্টো আমাদের জিজ্ঞেস করবে, ভারত কবে চীনা বেল্ট রোড উদ্যোগের বিরোধী ছিল?

এসব কারবার দেখে মনে হয় থিংকট্যাংক, রিসার্চ, পলিসি ইত্যাদি এসব শব্দ এসব ব্যক্তি এখনো গুরুত্বের সাথে নেয়নি। যথার্থ ওজন বুঝে ব্যবহার করে না। আসলে নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটা তাদের বোঝানোর কেউ নেই।

তবে তামাশার কথাটা হল, ভারত চীনা উদ্যোগের এর CSACF সভায় ঠিকই পাকিস্তানের সাথে ও পাশে বসতে পেরেছে। বস্তুত CSACF  ফোরামটা হল আগেরই সার্ক + চীন। তাহলে, সার্ককে চলতেই না দিলেও এবার চীনা দাবড়ে এই ফোরামে ঠিকই পাকিস্তানের পাশে অবলীলায় বসতে পারছে ভারত! আসলে ভারত হল শক্তের ভক্ত, তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৪ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সার্ক দরদের স্বরূপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

%d bloggers like this: