ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

গৌতম দাস

০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2we

 

 

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

শেষ কথাঃ
কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

ভারতের নির্বাচন ২০১৯: আমাদের লাভ কী

গৌতম দাস

০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১২

https://wp.me/p1sCvy-2uC

 

নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকারের পাঁচ বছর শেষ হতে আর ছয় মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। ফলে কেন্দ্রিয় নির্বাচন ২০১৯ সালের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের আইনি ভাষায় এটা “লোকসভা” নির্বাচন। আরও ফরমাল ভাষায় বললে, এটা (ফেডারেল) ইউনিয়ন ভারত-রাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন। ভারতের রাজনীতিতে এখন থেকে সরকার ও বিরোধী দলের যত ততপরতা এবং সাথে যত বিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হচ্ছে – বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সংগঠন, গ্রুপ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সবাই যে যা কিছু গত ছয় মাস ধরে করে চলেছেন এবং আগামী ছয় মাসেও করবেন – ইত্যাদি সব কিছুই আসন্ন এই নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই ঘটছে। এসব ততপরতায় সবার লক্ষ্য এমন কিছু করা যেটা এই নির্বাচনের ফলাফলকে কিভাবে যার যার পছন্দের রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারে – সে কথা মনে রেখেই তাঁরা করে যাচ্ছেন। সেটা অমর্ত সেন বা অরুন্ধতি রায়সহ আরও যারা – জাতপাতের বিরুদ্ধের নিজ অধিকারের লড়াই বা দলিত আন্দোলনে – জড়িয়ে আছেন, তাদের ততপরতাও একইভাবে সংশ্লিষ্ট। এমনকি কোন কোন রাজ্যের বিভিন্ন পকেটে যেসব মাওবাদী ততপরতা চলছে সেগুলোও এখন বেশি ততপর একই কারণে। পুরা ব্যাপারটাই রাজনীতিতে ক্ষমতায় যারা ছিল আর যারা যেতে চায় সবারই একটা স্টক টেকিং বা হিসাব নেয়া ও মিলানোও বটে। ফলাফলে নতুন করে আবার জোট গঠনে কেউ বের হয়ে যাওয়া অথবা কারও প্রবেশের সময় এটা।  তাই এদিক থেকে বিচার করে কেউ হয়তো বলবেন, ভারতের রাজনীতি কেবল “কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনকেন্দ্রিক”।

এমনকি বলতে পারেন, তা পঞ্চম বছর-কেন্দ্রিক, যার প্রথম চার বছর তারা তুলনায় বেখবর থাকেন। কথাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো না হলেও এমন হওয়ার প্রধান কারণ হল – আবার যারা সম্ভাব্য নতুন ক্ষমতার প্রার্থী, ক্ষমতায় যেতে প্রবল আগ্রহী, তারা পঞ্চম বছরেই কেবল ভারতের ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার মুখোমুখি হতে চান বা পারেন। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বিরাট সমাজের বিভিন্ন গ্রুপ, গোষ্ঠী অথবা সামাজিক বা রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের মধ্যে যত বেশি সংখ্যককে তারা তাদের নিজেদের ‘নৌকায় উঠাতে’ সচেষ্ট হন। অন্য সময়ে, মানে আগের চার বছরে এই আমল করার মানে নৌকায় যদিওবা উঠানো যায় কিন্তু চার বছর তাদের ধরে রাখা খুবই কঠিন তাই, কোনো কারণ তারা দেখেন না, হাজিরও থাকেন না। তবে এমন হবার পিছনে এতে বিশাল ভারতে সকলকে এড্রেস করতে গেলে এর একটা বিরাট খরচের দিকও আছে। তাই সব মিলিয়ে এই হল “ভারত” মানে,  প্রতি পঞ্চম বছরের রাজনীতির এক ‘ভারতীয় সমাজ’, এসব সীমাবদ্ধতার ভিতরে থেকেই যার জন্ম ও ততপরতা।

এই পঞ্চম বছরেই দলগুলোর মূল টার্গেট হল, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সমাজের নানা দল ও জোট গড়ে এক ইতিবাচক ঘোঁট পাকিয়ে অর্থপূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে দু’টি বৃহত্তর জোটের পক্ষ হিসেবে নিজেদের হাজির হন বা বলা যায় এভাবেই তাদের হাজির হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সব শেষে দু’টি রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে পুরো ভারতকে মেরুকরণ করে নিতে পছন্দ করা, রাজনীতির এক স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেমন মোটা দাগে গত ৩০ বছরের এমন ‘ফেনোমেনা’ হল – হয় কংগ্রেসকে কেন্দ্রে রেখে ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) আর নয়ত বিজেপিকে কেন্দ্রে রেখে এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স) – এভাবে দু’টি জোট আমরা দেখে আসছি। যদিও এবার সম্ভবত তিনটা জোট অথবা দুটাই জোট তবে ভিন্ন নামে, হতে আমরা দেখব। অর্থাৎ বিজেপির জোট এনডিএ ঠিক থাকছে যদিও জোটের দলের কেউ বের হয়ে অন্য জোটে যাবেন অথবা নতুন কোনো দল এই জোটে ঢুকবে – এমন হবে। কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট ইউপিএ এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও কিছুটা অনিশ্চিত।

যদিও কোন সন্দেহ নাই যে বিজেপির বিরুদ্ধে সব বিরোধীদলের একটা বড় অংশের বড় জোট অবশ্যই হচ্ছে; সে লক্ষ্যে এর তৎপরতা ও উদ্দীপনা বরং অন্যবারের চেয়ে এবার বরং প্রবল। এনিয়ে প্রকাশ্যে প্রাথমিক আলোচনাও হয়ে গেছে, বলা যায় সেটা দ্বিতীয় পর্যায়ে গেছে। তবে এর মধ্যে এখনও অমীমাংসিত কিছু বিষয় আছে। তা হল, বিজেপিবিরোধী এই সম্ভাব্য জোট – এটা ঠিক কংগ্রেসের নেতৃত্বেই হবে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক বেশ গভীরে। অর্থাৎ শুরুতেই ধরে নেয়া যে জোট হবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে, যার মানে হল হবু প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের থেকে বা তিনি রাহুল গান্ধী – তা অনেকে এবার আগেই মেনে নিয়ে শুরু করতে চাচ্ছেন না। এই হল মূল বিতর্কের বিষয়, তাই জোট গঠন শুরু হতে একটু সময় নিচ্ছে। যদিও কংগ্রেস ইতোমধ্যে জোটের নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেও একটা পালটা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে যে  – জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হতে পারেন সেটা কেন্দ্রিয় নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে আলোচনা হবে – সে পর্যন্ত এটা মুলতবি করে রাখা যেতে পারে। কিন্তু জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে সেটাও তো একটা ইস্যু, তাই পুরা ব্যাপারটা আপাতত স্থবির হয়ে আছে।

কিন্তু জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এবারের নির্বাচনের আগেই বিতর্ক উঠল কেন? উঠার মূল কারণ হিসাবে দুটা ইস্যুকে বলা যায়। প্রথমতঃ  গত ২০১৪ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস খুবই খারাপ ফল করেছিল। কংগ্রেসের জন্মের পর থেকে এর আগে সে সরকারে বা বিরোধী দলে যেখানেই থাক, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জোট গঠন করে থেকেছে। কিন্তু কখনই ঐসব জোটে কংগ্রেস দলের আসন সংখ্যা সেখানে ১১৪-এর নিচে (লোকসভার মোট আসন ৫৪৫) যায়নি। অথচ গত (২০১৪) নির্বাচনে তা নেমে আসে ৪৮ আসনে, যা মোট আসনের ১০ শতাংশেরও কম। ফলে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস এবারই প্রথম অন্যান্য আঞ্চলিক দলের আসন সংখ্যার কাতারে নেমে যায়। যেমন, মমতার তৃণমূল দলের (২০১৪ সালে নির্বাচনে) লোকসভায় আসন সংখ্যা ৪২। এছাড়া আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে এটা সর্বোচ্চ। মানে লোকসভায় আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে আসন সংখ্যার দিক দিয়ে একক দল হিসেবে মমতার দলের আসন সংখ্যা ৪২, এটাই সবচেয়ে বড়। ফলে এককালের একক কংগ্রেস দল একালে এসে যেন মমতার আঞ্চলিক দলের কাতারে নেমে গেছে। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে কংগ্রেস আর আগের মত ইজ্জত-সম্মান বা গুরুত্ব আশা করতে পারে না, যেন এটাই আঞ্চলিক দলগুলো বলতে চাইছে।

ইতোমধ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর সম্ভাব্য কোন জোট হলে তাতে কংগ্রেসকে তারা কোথায়, কীভাবে রাখবে – এই অনুমানের একটা মহড়াও হয়ে গেছে ২০১৬ সালে, বিহার রাজ্যের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট ছিল না। বরং বাক্যটা লিখতে হবে এভাবে যে, ঐ নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট হয়েছিল, কংগ্রেস যেখানে নেতা নয়, তবে ঐ জোটের এক অংশীদার হিসাবে ছিল। বিজেপি-বিরোধী “কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট” না কী “আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট” – এদুইয়ের মধ্যে এক বিশাল ফারাক আছে। আর বিহারে গঠিত ঐ আঞ্চলিক জোট বিজেপিকে পরাজিত করেছিল এবং করার পর কংগ্রেস দল থেকে নয়, এক আঞ্চলিক দলের নেতা নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল। ফলে ঐ মহড়াটা যেন কংগ্রেওকে জানিয়ে দিয়েছিল আঞ্চলিক দলগুলো একালে কংগ্রেসকে কীভাবে মাপে, মুল্যায়ন করে কোথায় রাখে।

ভারত ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি প্রদেশে (রাজ্যে) বিভক্ত, যেখানে প্রদেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাজ্য’ বলে পরিচিত। আর কোন রাজ্যের স্থানীয় কোন দলকেই এখানে ‘আঞ্চলিক দল’ বলা হচ্ছে। ‘আঞ্চলিক দল’ শব্দটার বিপরীত শব্দ হল ‘সর্বভারতীয় দল’ (বৃটিশ আমলে এই ধারণাটাকেই “অল ইন্ডিয়া” বা বাংলায় “নিখিল ভারত” বলে শব্দ দলের নামের শুরুতে যুক্ত থাকত। যেমন “নিখিল ভারত মুসলিম লীগ” – বলা হত)। মানে সারা ভারতের সবপ্রদেশের যার শাখা ও সবল ততপরতা আছে এমন দলের ধারণা। আর এর বিপরীতে আঞ্চলিক দল মানে যা মূলত একটা রাজ্য কেন্দ্রিক দল, আর বাকি ভারতজুড়ে মূলত এদের কোনো শাখা বা কর্মতৎপরতা প্রায় থাকেই না। প্রত্যেকটা প্রদেশে সাধারণত কমপক্ষে একটা আঞ্চলিক দল পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য আসন পায়, ফলে কেন্দ্রে জোট সরকার গড়ার ক্ষেত্রে এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এভাবে সর্বভারতীয় দলের বিপরীতে, ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক দল এক নতুন উঠে আসা ফেনোমেনা এবং যা ক্রমশ প্রভাবশালী প্রধান ভূমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত আসন্ন এই নির্বাচন থেকেই বিজেপির বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস দলের ভুমিকা লোপ পেতে থাকবে। না ব্যাপারটা কেবল কংগ্রেসের বেলায় ঘটবে তাই শুধু না সেক্ষেত্রে বিজেপিও বাদ থাকবে না। খুব সম্ভবত “আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট” হবে ভারতীয় আগামি রাজনীতির মূল এবং নতুন ফেনোমেনা। তবে সেই সাথে হয়ত ‘আঞ্চলিক দলগুলোরই জোট’ হবে দুটা – একের বিরোধী অন্যটা। আর কংগ্রেস ও বিজেপি তাদের পছন্দ অনুসারে এবার একেকটা জোটে যোগ দিবে – এই হবে সম্ভবত নতুন দৃশ্যপট।

জোটের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের দ্বিতীয় কারণঃ কংগ্রেসের প্রভাব “শুকিয়ে আসা” এবং এর বিপরীত ঘটনা হিসাবে আঞ্চলিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা (আর বিজেপি তখন বেখবরিয়া দল ছিল) – গত ৩০ বছর ধরে এটাই ভারতের নির্বাচনী চালচিত্র। ফলে আসন্ন এই সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোটের আঞ্চলিক নেতারা যেমন, তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা উত্তরপ্রদেশের নিম্নবর্গের দল, বহুজন সমাজবাদী পার্টি দলের নেতা মায়াবতী প্রভুদাস – তারা এবার মনে করছেন, তারাও কেন রাহুল গান্ধীর মত “প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার” হবেন না? তারা অযোগ্য কিসে? এ কারণে আঞ্চলিক দলগুলো এবার জোট গঠনের শুরুতেই কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে আগের মত ইউপিএ জোট বাঁধতে দ্বিধা করছে। আর পুরান ধরণে ইউপিএ-জোটের বিপরীতে প্রথম থেকেই এবার সরব হয়েছেন মমতা। তিনি আরো এগিয়ে বলেছেন, তার আলাদা জোটের দাবির অর্থ হল, এবার ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ গড়তে হবে। মানে কংগ্রেসকে ছাড়াই আগে আঞ্চলিক দলগুলোর একটি জোট হবে। এরপর কংগ্রেসকে সাথে নেয়া বা না নেয়ার প্রশ্ন। সার কথায়, বিজেপির এনডিএ নামে জোট থাকলেও এর প্রতিদ্বন্দ্বী জোট কোনটা হবে ইউপিএ নাকি প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’- এটাই নির্ধারিত হতে একটু সময় নিচ্ছে, তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা হয়ে যাবে। ডিসেম্বর এজন্য যে ঐ মাসে পাঁচ রাজ্যের (রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম ) প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল এর নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। ঐ রাজ্য-নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে ওসব রাজ্যের আঞ্চলিক দল ও জোটে আসন ভাগাভাগির বুঝাবুঝি কেমন কী দাড়ায় – এর উপর সব কিছু নির্ভর করছে। সেটা দেখতেই সবার অপেক্ষা।

বিপরীত প্রসঙ্গ হিসাবে বিজেপিঃ
ইতোমধ্যেই এটা স্পষ্ট যে, এবারের নির্বাচনে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীর অবস্থা খুব শোচনীয় হতে পারে। কেন? কারণ মোদীর “ইকোনমিক পারফরম্যান্স” (Economic Performance), অর্থাৎ গত প্রায় পাঁচ বছরে মোদী অর্থনীতিতে কেমন করলেন! কেন্দ্রিয় সরকার অর্থনীতিতে ভালো বা মন্দ করছে কি না এনিয়ে ভারতের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচনে এটা কোন ইস্যু হতে দেখা যায় না বা এর তেমন প্রভাব পড়তে দেখা যায় না বললেই চলে। এটা চলতি মোদী সরকারের আমলনামার ভিত্তিতে বলা খবর। গত সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের বেলায় এটাই দেখা গেছে যে, মোদীর খারাপ “ইকোনমিক পারফরম্যান্স’ (বা অর্থনৈতিক সাফল্য) সেখানে কোথাও কোন ইস্যু হতে পারে নাই। কিন্তু গত দুইবারের (২০০৯ ও ২০১৪) কেন্দ্রের নির্বাচনে দেখা গেছে – আগের (কংগ্রেস ২০০৪-০৯) সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণে পরের বারও কংগ্রেস বিপুল ভোট পেয়ে আবার ক্ষমতায় এসেছিল। আবার ইউপিএ-টু (২০০৯-১৪) সরকারের ব্যর্থতাকে প্রবলভাবে তুলে ধরে দেখিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী (বিজেপি) দল ভোটে নিজে সেই জায়গা নিবে, অর্থনীতিতে ভাল করবে – এই কথায় প্রলুব্ধ করার মত করে ভোটারদের আস্থায় নিজেকে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন মোদী, এই সম্ভাবনা জাগাতে পেরেছিল বলেই মূলত একারণেই মোদী জিতেছিলেন।

এ দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর ছিল “অর্থনৈতিক সাফল্য” – এই ইস্যু। আবার এই সাফল্য প্রদর্শন মানে কেবল জিডিপি অনেক ভাল হলে হবে, তা নয়। সাথে দেখাতে হবে একদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক ‘কাজ সৃষ্টির’ বিষয় সে পেরেছে বা পারবে; অন্য দিকের গুরুত্বপূর্ণ হল, ব্যবসায়ীদের (ম্যানুফ্যাকচারার, বাণিজ্য আর শেয়ার মার্কেটসহ) মধ্যে আস্থার জোশ তুলতে পেরেছে কি না। কংগ্রেস ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে; আবার ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যুতে কংগ্রেসের হাল ছেড়ে দেয়ার মুখে সেটা আবার ঘটাতে মোদির দল ও সরকার পারবে, এই আশা জাগাতে পেরেছিলেন তিনি তাই। এভাবে দুই ক্ষেত্রেই প্রধান ফ্যাক্টর ছিল অর্থনীতিতে পারফরমেন্স। আসলে নিরন্তর গরিব হালে ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধুঁকে মরা দশায় তাদের ফেলে রাখা হয়েছে। তাই, ভারতের নির্বাচনে, “অর্থনীতিতে পারফরমেন্স” মুখ্য ভুমিকায় হাজির হবে – এটাই তো স্বাভাবিক!

তাহলে কেবল এই বিচারে ২০১৯ সালের নির্বাচনে, বিজেপির মোদীর আবার জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, বলতে হয়। কারণ প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সাফল্যের বিচারে মোদী ইতোমধ্যে ব্যর্থ। শুধু তাই না, অর্থনীতিতে সাফল্যের বিচারে – একটু পুরান এবং নতুন (চলতি) – দু ধরণের ইস্যুই আছে; আবার একটু পুরান ইস্যুটা বিরাট বড় ইস্যু। এছাড়া একালের নতুন দগদগে ইস্যুও আছে যা সামনের কয়েক মাসে ‘আরো দগদগে ঘা’ হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা।

একটু পুরনো ইস্যুটা হল, গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে, মোদীর ‘নোট বাতিলের’ (DeMonetization) সিদ্ধান্ত। আগামি দিনের ইতিহাসে এবং আসন্ন নির্বাচনেও মোদী সরকারের বিরাট ব্যর্থতা বলতে অবশ্যই ‘নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত, সামনে আসবে। মানুষের মনে ভেসে উঠবে। নোট বাতিলের’ সিদ্ধান্ত কথাটার মানে হল, ভারতের মুদ্রায় সবচেয়ে বড় নোট ছিল ৫০০ ও ১০০০ রুপির। ঐ দিনের শেষে রাত্রে হঠাৎ – এই দুই ধরনের সব নোটই বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন মোদী। যদিও পুরান নোট ব্যাংকে জমা দিলে সেটার বদলে নতুন নোট দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু নাম ঠিকানাসহ কে জমা দিচ্ছেন, তা বলতে হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর হল – মানুষের ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস অথবা দিনমজুরি সব ধরনের কাজ ফেলে ব্যাংকে লাইন দেয়া। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতায় একেবারে এলোমেলো শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়া তো আছেই, সেই সাথে বহু কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়েছিল। আর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব অর্থনৈতিক তৎপরতা ও লেনদেন-বিনিময়ে ভারতের অর্থনীতিতে সচলতার ব্যস্ততা যে পর্যায়ে আগে ছিল অর্থনীতির সেই সাজানো বাগান এবার অর্ধেক হয়ে, বড় স্থবিরতার দিকে গড়াতে থাকে।

দুটা উদাহরণ দিলে এর মারাত্মক প্রভাব বুঝা যাবে। ভারতের অর্থনীতির হাব বলে বুঝানো বা মনে করা হয় মুম্বাইকে আর একালে সাথে পড়শি গুজরাতকেও। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এদুই রাজ্যের অর্থনৈতিক ততপরতা অগ্রসর ও গতি বেশি। ব্যাপারটা কলকাতার স্বর্ণকারদের মাঝে কীভাবে আমল হয়েছিল এর একটা প্রমাণ হল, তারা দল বেধে গুজরাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত এলাকায় দোকান খুলে বসেছিল; একেক জন মুল ওস্তাদ আর সাথে পাঁচ-ছয় জন সাগরেদ এভাবে। তারা সেখানে ভাল আয় করতে পারত ফলে নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গের পরিবারের চলতে তাদের কাছে টাকা পাঠাতেও পারছিল। অর্থনীতিক স্টাডির মুল্যায়নে এগুলো অবশ্যই ‘মূল’ কাজ সৃষ্টি নয়, ইনফরমাল সেক্টর বলা হবে। মানে হল, সরকারের নীতির কারণে যারা কাজ পেয়েছে বা আয় বেড়েছে – এই মূল সুবিধাভোগীদের স্বচ্ছলতার কারণে সৃষ্ট এরা। মুল ফরমাল সেক্টরের কাজ পাওয়া সদস্য তারা নয়। তবে ফরমালদের আয় বাড়াতে ইনফরমালের কিছু লোক তাতে নিজেদের সম্ভাবনা দেখেছিল। তারা নিজেরাই যা পারে তেমন কিছু সার্ভিস নিয়ে ঐ সুবিধাভোগীদের কাছে হাজির হবার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া – এজন্য এটা ইনফরমাল, আর সুবিধাভোগীরা হল ফরমাল সেক্টর। সরকারের খুবই সফল নীতি পলিসি হলে তাতে,  ফরমাল সেক্টরের নিয়োগের চাহিদাই যত বেশি হবে ততই ইনফরমাল সেক্টর ত্যাগ করে মানুষ ফরমাল সেক্টরে চলে যাবে। ফলে তা ঠিক করে দেয় যে একজন চাকরি প্রার্থী বা লেবারকে কতদিন ইনফরমাল সেক্টরে থাকতে হবে। সারকথায় মোদীর অর্থনীতি স্বর্ণকারদের ভাল-সুবিধায়-ভরপুর কাজ দিতে পারে নাই সত্য কিন্তু এর ভিতরেই কলকাতার স্বর্ণকারেরা প্রতি ওস্তাদ পিছু পাচ-ছয় সাগরেদ মিলে ভিন রাজ্যে বেঁচে থাকার অবস্থার (ইনফরমাল) কাজ খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু মোদীর নোট বাতিলের প্রভাবে শ্লথ অর্থনীতির কারণে এদের এটুক স্বপ্নও ভঙ্গ হয়ে যায়। গুজরাতে কাজের অভাবে এরা সবাই সব গুটিয়ে দেশে ফিরে চলে যায়।  তাদের পরিবারসহ তারা এখন সেই আগের দুঃসহ গরীরি হালে ফিরে এসেছে।

আমাদের কাওরান বাজারের মত দিল্লীর পাইকারি বাজারের দিনমজুরঃ পাইকাররা মালামাল কিনলে তা পৌছে দেয়া বা গাড়িতে তুলে দেয়া এই কাজ করে তাদের দৈনন্দিন পাঁচশ রুপির মত আয় করতে পারত। কিন্তু নোট বাতিলের কারণে একই পরিণতি। ঢলে পড়া অর্থনীতির প্রভাব এই পাইকারি বাজারের এতই নিচে পড়েছে যে ঐ মজুরেরা দুই-তিনশ টাকা দৈনিক আয় করতে হিমশিম খেয়েছে। কয়েকদিন তারা উপায়ন্ত না দেখে “বাতিল নোটে মজুরি” নিবে পরে নিজে সময় দিয়ে ব্যাঙ্কে তা বদলে নিবে – এই শর্তে কাজ করেছে। একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে এর প্রভাব কত স্তরে পরে তা বুঝার জন্য এই উদাহরণ দুইটার খুটিনাটি লক্ষ্য করলে অনেক কিছু টের পাওয়া যায়। এছাড়া আসলে এটাই তো স্বাভাবিক, একটা চালু অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিলে বা যেকোন বিপর্যয় দেখা দিলে সবার চেয়ে বেশি এর চাপ গিয়ে পড়ে স্বল্প আয়ের নিচের মানুষের উপর। মোদী নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এদিকটা আমলই করেন নাই যে তাঁর  টার্গেট লক্ষ্যচ্যুত হলে, তিনি ব্যর্থ হলে পরে এর প্রভাব কত স্তরে কত মারাত্মক হতে পারে।

বরং মোদি আশ্বাসের উপরে চলছিলেন যে, রুপি বদলে নিতে ব্যাঙ্কে আসলে – এতদিন যারা নগদ রুপিতে সম্পদ রাখা কিংবা ট্যাক্স ফাঁকির সবাই এবার ধরা পড়বেন। অর্থাৎ ধরা পড়ার ও পরে শাস্তির ভয়ে এরা আর ব্যাঙ্কেই আসবে না। সেক্ষেত্রে সরকারের অনুমান ছিল, ৮৫ শতাংশের হয়ত বৈধ আয় বলে রুপি বদলে নিতে আসবে। বাকি ১৫% নোটের মালিক এরা কালোটাকার মালিক বলে ধরা পড়ার ভয়ে তাঁরা আর রুপি বদলে নিতে আসবে না, ফলে প্রায় ২৪০ হাজার কোটি রুপি রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে না, তাই বিপুল লাভ হবে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে দেখা গেল, ৯৯ শতাংশ ছাপানো মুদ্রাই ফেরত এসেছে। অর্থাৎ মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আসেনি। এর মানে, সারা ভারতের জনগোষ্ঠীকে কষ্ট দিয়ে, বিশেষ করে গরিব মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েও কোনো সুফল মেলেনি।

বরং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ রুপি ফেরত আসেনি বলে, ভারতের মিডিয়া লিখছে, ‘‘এ থেকে যা ‘লাভ’ তা মাত্র ১৬ হাজার কোটি টাকা। নতুন নোট ছাপা ও বণ্টন এবং অর্থনীতির সামগ্রিক ক্ষতি বিবেচনা করলে অবশ্য সেই লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যাবে!” অথচ সবচেয়ে কষ্টকর অবস্থা স্বল্প আয়, ‘দিনে আনে দিনে খায়’ লোকদের। এ ছাড়া, মূল ক্ষতিটা হয়েছে তাদের কাজ হারানো।

মোদির দ্বিতীয় ব্যর্থতার ইস্যুঃ মোদি গত নির্বাচনে আশ্বস্ত করেছিলেন – নির্বাচিত হলে কংগ্রেসের প্রথম জমানার (২০০৪-০৯) মত ভাল অর্থনীতি তিনি গড়বেন। এ ছাড়া আর আরো বেশি কাজ সৃষ্টি করবেন। তার দেয়া নতুন টার্গেট ছিল, বছরে দুই কোটি লোকের কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু এখন সমালোচকরা বলছেন, বাস্তব পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, উলটো গত চার বছর ধরে গড়ে ৭০ লাখ করে কর্মসংস্থান কমেছে। এটা কাজ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গত আট বছরে সর্বনিম্ন। সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন তরুণেরা এখনও বছরে ২ কোটি কাজ সৃষ্টি দেখার অপেক্ষায় আছে। [……said young Indians were waiting for the 20 million jobs promised by the Bharatiya Janata Party (BJP).]

একইভাবে রয়টার্সের এই রিপোর্ট বলছে, যার শিরোনামটাই সাংঘাতিকঃ [No jobs, no vote: Indian town warns Modi ahead of 2019 polls]। ঐ রিপোর্টই আরও বলছে,  কাজ সৃষ্টি দূরে থাক,  ভারতে বেকারত্ব এখন সর্বোচ্চ। [……hit its highest level in 16 months in March at 6.23 percent, according to the Centre for Monitoring Indian Economy (CMIE), an independent think-tank.]

চলতি সময়ে মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ইস্যু – তেলের দামঃ
ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের বিপুল ঘাটতি শুরু হয়েছে, এই ঘাটতিই  সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধির কারণ। ২০১৬ সালে দাম সর্বোচ্চ নেমে যাওয়ার সময়, ৩০ ডলারে নেমে যাওয়া জ্বালানি তেল কিনেছিল ভারত। আর এখন তা (অক্টোবর ২০১৮) ৮৪ ডলার এবং এ দাম ক্রমবর্ধমান। তেলের দাম কমাতে সেই সময় রাজস্ব বিভাগ ১৪০ বিলিয়ন ডলার বাড়তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল। কিন্তু সেই অর্থ থেকে কোন আপতকালীন রিজার্ভ রাখা হয় নাই, বরং পুরা অর্থ অন্য প্রকল্পে লাগিয়ে ফেলায় এখন মোদীর পক্ষে কোন ভর্তুকি আয়োজনের সুযোগ নাই।  তাই ভারতের শহরগুলোতে তেলের পাম্প-স্টেশনে তেলের দাম এখন ওঠানামা করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাথে সম্পর্কিত হয়ে, কোনো সরকারি ভর্তুকি এখানে নেই।
তবুও আগের অবরোধের সময় ভারতের আরও একটা বিশেষ সুবিধা ছিল,  কমমুল্যের ইরানি তেল সরবরাহ কিনতে পারত ভারত (আমেরিকান অবরোধ ভারতের উপর শিথিল থাকত, আর ইরানও কিছুটা সস্তায় তেন বিক্রি করত)  – যেটা খুব সম্ভবত মোদী এবার হাতছাড়া করে ফেলেছেন। ইরান ছিল ভারতে তেল সরবরাহকারি হিসাবে তৃতীয়। এর আগের যেকোন তেল অবরোধের ক্ষেত্রেও আমেরিকার থেকে বিশেষ ছাড় পাবার কারণে ঐ বিশেষ সুবিধার দামে ইরানি তেন কিনতে পেরেছিল ভারত সেটা এবার ব্যতিক্রম কারণ এবার  – রাশিয়ান অস্ত্র আর ইরানি তেল ক্রয় – দুটার ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন জোর আপত্তি জারি করেছিল। খুব সম্ভবত রাশিয়ান অস্ত্র ক্রয়ে ছাড় পেতে আর ট্রাম্পকে খুশি করতে এবারই প্রথম ভারত আমেরিকাকে জানিয়েছে যে, অবরোধ মেনে ইরানি তেল এবার ভারত ক্রয় করবে না। ব্রাকেটে বলে রাখা যায়, চীন এখনও ইরানি তেল কিনছে, তবে ইরানি ট্যাংকার পৌছে দিবে এই শর্তে।

আর মোদীর ক্ষেত্রে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনীতিক গতি বা উন্নতির এক প্রধান নিয়ামক হল জ্বালানি তেলের মুল্য এবং মুল্যের স্থিরতা। ফলে তেলের দাম এবার ভারতের অর্থনীতিকে শ্লথ করার ক্ষেত্রে প্রধান ভুমিকায় হাজির হতে যাচ্ছে।

ওদিকে আবার তেলের দামের প্রভাবে ভারতে উঠে এসেছে মুদ্রাস্ফীতিও, যেটা তেলের দাম বৃদ্ধির আগে থেকেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী।  এছাড়াও আছে খারাপ ঋণ (নন-পারফরমিং লোন) বিতরণ গত পাঁচ বছরে ৪৫০ গুণ বেড়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্ট করেছে; পার্লামেন্টে প্রশ্নোত্তর থেকে জানা যাচ্ছে তা ১৪৮ বিলিয়ন ডলারের মত।

শেষ বড় আঘাতঃ রুপির দর পতন
সব কিছু মিলিয়ে আবার বাজারের বিরাট অস্থিরতায় রুপি-ডলার বিনিময় হারে রুপির মান কমেই চলেছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা নেয়ার সময় ডলার ছিল ৬০ রুপি, সেটা এখন ৭৪ রুপি। ভারতের ইকনমিক টাইমসের প্রাক্তন সম্পাদকের দাবি রুপির এই মুল্য পতনের পরিমাণ ১২.৫%। [Rupee is Asia’s worst performing currency ..]

তাহলে সার কথাটা হল ‘অর্থনৈতিক সাফল্যের’ ইস্যুতে মোদীর প্রায় সব প্রতিশ্রুতি গত চার বছরে উলটো দিকে হাঁটছে। তাই আর সাফল্য নিয়ে যেন কেউ আর কথা না বলে, এটাই এখন মোদীর কাম্য। তাহলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভারতে যে জাতীয় নির্বাচন আসন্ন – বিজেপি ও মোদিকে যার মুখোমুখি হতে হবে – সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদী বা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ কী করবেন?

অর্থনৈতিক সাফল্যের ইস্যু চাপা দেয়া বা পেছনে ফেলে দেয়ার উপায় নিশ্চয় মোদী-অমিত খুঁজবেন, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে এদের একমাত্র ইস্যু এখন হিন্দুত্ব; মুসলমানবিদ্বেষের দামামা সর্বোচ্চ শব্দে বাজানো। এই আলোকেই অমিত শাহের মুসলমান নিধন, বাংলাদেশীদের ‘উইপোকা-তেলাপোকা’ বলে তুচ্ছ করে সম্বোধন এবং মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গালাগালি, তাদের হত্যা করার হুঙ্কার – এসব কিছুকে আমাদের দেখতে ও বিচার করতে হবে। সেই সাথে আসামের নাগরিকত্ব বিল নিয়ে আরো নোংরা হুঙ্কার। আসামের মতো নাগরিকত্ব বাছাইয়ের কর্মসূচি পশ্চিমবাংলা ও ছত্তিশগড় এবং অন্যান্য রাজ্যে চালু করা হবে বলে স্থানীয় বিজেপি হুমকি দিচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই- এ কথা বলে মুসলমানবিদ্বেষী একটা আবহ সৃষ্টি করা। ওদিকে ত্রিপুরায় গিয়ে বিজেপিরই আরেক অসভ্য এমপি সুব্রমানিয়াম স্বামী বাংলাদেশ দখলের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি নাকি হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট, এর নমুনা এটা?

ব্যাপারটা ভারতের আর এক সিনিয়র সম্পাদক,  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গ্রুপের শেখর গুপ্তা, তাঁরও নজরে পরেছে। তিনি নিজেই দ্যা প্রিন্ট এরও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি লিখেছেন, BJP has decided to use Assam as its key to 2019। আবার  রাহুল গান্ধীও হিন্দুত্বের রাজনীতির অনুসারি হয়ে উঠতে চাইছেন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই শেখর লিখছেন, রাহুলেরটা সফট হিন্দুত্ব

সারকথায় এভাবে নাহলে ওভাবে এসব মুসলিমবিদ্বেষী দামামা, ঘৃণা উগরানো আসন্ন হয়ে উঠছে।  এসবেরই উদ্দেশ্য একটাই – মোদীর ডুবে যাওয়া অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের সমস্যাকে আড়াল করে বিজেপি দলকে ভোট চাইবার ‘উপযুক্ত’ করে তোলা। সে কারণে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ভারতের সমাজকে বিভক্ত ও মেরুকরণের ফলে যাতে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে ‘হিন্দুত্ব’। অর্থাৎ আগামী ছয় মাস, অন্তত ভারতের নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মুসলিমবিদ্বেষের বিষ, ঘৃণা উগলানো দেখতেই থাকব, সেই আশঙ্কা হচ্ছে।

শেষ কথাঃ
ভারতের এই ভোটযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক বিচারে আমাদের জন্য “ফেবারিট” বা কাম্য হল, ‘ফেডারল ফ্রন্ট’ গড় উঠে এরা জয় লাভ করুক। এটা মনে রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের নির্বাচন ২০১৯; কী হতে যাচ্ছে?”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নির্বাচন ২০১৯ঃ  বিজেপিবিরোধী কাম্য ক্ষমতাজোট

নির্বাচন ২০১৯ঃ  বিজেপিবিরোধী কাম্য ক্ষমতাজোট

গৌতম দাস

২৬ মে ২০১৮, ০০ঃ০১ শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rM

 

 

 

ভারতের রাজনীতিতে ২৩ মে সম্ভবত, মনে রাখার মত এক গেম চেঞ্জার বা খেলা পাল্টানোর দিন তৈরি হল। যেমন, এই প্রসঙ্গে ভারতের ইংরাজি দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়ার’ ২৪ মে এক রিপোর্টারের শিরোনাম ছিল, “মোদি বনাম বাকি সবাই : ১৯৯৬ সালের পর সবচেয়ে বড় বিজেপিবিরোধী ঐক্যজোটের মহড়া। ২০১৯ সাল পর্যন্ত টিকবে তো?” [Modi vs Rest : Biggest anti-BJP unity show since 1996. Will it hold till 2019?] কিন্তু ২৩ মে দিনটা এমন কী ছিল? মূলত ২৩ মে ছিল সদ্য সমাপ্ত কর্ণাটক রাজ্যের নির্বাচনে নির্বাচিত নতুন সরকারের শপথ নিবার দিন।

ঘটনা হিসাবে খুবই সাদামাটা। ভারতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৯ টা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকার আছে। এসব রাজ্যে নির্বাচন অথবা সরকার গঠনের ভাঙাগড়া, অথবা স্থানীয় ইস্যুতে নানান সঙ্কট – এগুলো লেগেই আছে।  তো সেগুলোরই একটার মত ২৩ মে ছিল দক্ষিণ ভারতের পুরনো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য কর্নাটকের নবনির্বাচিত প্রাদেশিক বা রাজ্যসরকারের মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্যদের শপথ নেয়া ও নতুন সরকার গঠনের দিন। কিন্তু এটা নিয়ে এত রাজনৈতিক হইচইয়ের কারণ কী? কারণ হল, মোদি বা বিজেপিবিরোধী যত মুখ্যমন্ত্রী বা রাজনৈতিক দলের নেতা বর্তমানে ভারতে আছেন, তারা প্রায় সবাই (কংগ্রেসের সোনিয়া-রাহুলসহ) এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন এবং তারা সবাই এসেছিলেন। আর ওই শপথ অনুষ্ঠানের পর তারা নিজেরাই শপথ মঞ্চে এসে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে আসন্ন ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে মোদি যেন দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে জিততে না পারেন, সে লক্ষ্যে সবাই একাত্মতা প্রকাশ করেন। এটাই বিশাল অর্থপূর্ণভাবে মোদীবিরোধী সম্ভাব্য জোটের এক প্রথম প্রদর্শনী হয়ে উঠেছিল। এটাই বিশেষ তাতপর্য।

এভাবেই এক স্থানীয় রাজ্য সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ঘটনা ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির ঘটনা হিসেবে হাজির হল। আর সেই সাথে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন বা লোকসভার নির্বাচনী লড়াই যে শুরু হয়ে গেল তা বলা চলে। যদিও মোদী সরকারের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে প্রায় আরো এক বছর পর, পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে। তাহলেও এখনই ‘নির্বাচনী লড়াই শুরু’ বলার কারণ হল, আসলে ২৩ মের ঘটনাটি ছিল প্রক্সি নির্বাচনী লড়াই। অর্থাৎ আগামী বছরের হবু লড়াইয়ের একটি ছায়া যা ভিন্ন পাত্রপাত্রী আর ভিন্ন এক ঘটনার ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হল। ভারতের রাজনীতিতে ১৯৮৫   সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে এক দলের বিরুদ্ধে আরেক দল কেন্দ্রে সরকার গড়বে এমন ধারায় আর চলে নাই। বিষয়টি আর সেই জায়গায় থাকে নাই। বরং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার প্রার্থী বা প্লেয়ার এখন আর কংগ্রেস বা বিজেপির মতো সর্বভারতীয় দল নয়, বরং আঞ্চলিক দলগুলোই (মূলত রাজ্যভিত্তিক স্থানীয় দল) গুরুত্বপূর্ণ ও খুবই নির্ধারক। উলটা করে বললে সর্বভারতীয় দল দুটো আসন এমন কমে গেছে যে সাথে আঞ্চলিক দলগুলোকে পেলে তবেই একমাত্র তারা সরকার গঠনের মত সংখ্যায় পৌছায়। এভাবে ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস অথবা বিজেপি এককভাবে কেউই কেন্দ্রীয় সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসতে পারে নাই। বরং উভয়েই (কংগ্রেসের ইউপিএ অথবা বিজেপির এনডিএ নামে জোট) দুই ভিন্ন জোটের নামে ক্ষমতায় ছিল। আবার ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু এই ট্রেন্ডেরই প্রথম আর এক চরম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে। সেবার কেবল কিছু আঞ্চলিক দলের জোট সাথে কংগ্রেস বা বিজেপির কাউকে না নিয়ে নিজেরাই কেন্দ্রে সরকার গড়েছিল।  এমনকি এবার শুরুতে মোদি সরকারের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বিজেপি ‘এনডিএ জোট সরকার’ হিসেবে ক্ষমতাসীন আছে। আর এখন কর্ণাটকের নির্বাচনের পর থেকে অবশ্য বিজেপি দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও হারিয়েছে, এক বা দুই আসনের কমতি হয়ে গেছে। যদিও জোট হিসেবে মোদী সরকারের কোনো সঙ্কট নেই। মূল কথা হল, ভারতের রাজনীতি আঞ্চলিক দলগুলোর ভূমিকা ক্রমেই বড় থেকে আরো বড় ও প্রভাবশালী এবং নির্ধারক হয়ে উঠছে। মোদি বা বিজেপিবিরোধী জোটের ছায়ায় একাধিক আঞ্চলিক দল ও মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি গত ২৩ মের এক মুখ্যমন্ত্রীর সামান্য শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান একারণে ভারতের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে হাজির হয়েছে।

চলতি মে মাসের ১২ তারিখে কর্নাটকের রাজ্য সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ফল গণনা ও তা প্রকাশিত হয় ১৫ মে। কিন্তু ফলাফল আসে তিন দলের এক ঝুলন্ত সংসদ। মোট ২২৪ আসনের কর্নাটক সংসদে রাজ্যসরকার গঠন করতে গেলে ১১১ আসন দরকার (দুই আসন নির্বাচন হয়নি, ফাঁকা আছে তাই ১১৩ আসনের জায়গায় নির্বাচিত মোট ১১১ আসন যোগাড় করতে পারলেই সরকার গড়া যায়), যা কোনো দলই পায়নি। যদিও বিজেপি গতবারের (৪০ আসন) চেয়ে এবার সবার চেয়ে বেশি, ১০৪ আসন পেয়েছে। আর গতবার ১২২ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে থাকা কংগ্রেস, তার এবার আসন কমে নেমে এসেছে মাত্র ৭৮ আসনে। আর স্থানীয় দল, জনতা দল (এস) আগে পেয়েছিল ৪০ আর এবার অল্প কিছু কমে গিয়ে পেয়েছে ৩৭ আসন।

সারকথায়, বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১১১ আসন) না থাকায় সরকার গড়তে পারছিল না। এর পিছনের বড় কারণ, স্বতন্ত্র বা এক-দুই আসন পাওয়া কোনো ছোট-বড় দল এবার নাই যে এদেরকে সামিল করে বিজেপি সরকার গড়তে পারে। আসলে এমন আসনই হল এবার মোট  মাত্র দু’টি। অর্থাৎ সরকার গঠনে বিজেপির ঘাটতি সাত আসন, এটা পূরণ করতে হলে তাকে মূলত জনতা দল (এস) থেকে অথবা না পারলে কংগ্রেস দল থেকেই টাকা দিয়ে তাদের এমপি ভাগিয়ে আনতে হবে। যেটা আর সহজ নয়। কারণ, ওদিকে কংগ্রেস দল ফল প্রকাশের সাথে সাথে উল্টা জনতা দল (এস)-কে মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিয়ে দেয়। বিনিময়ে কোয়ালিশন বা জোট সরকার গড়তে রাজি করে নেয়। এরপরও বিজেপি হাল ছাড়তে রাজি হয় নাই। অর্থের উপর ভরসা করে সব সামলাবে বলে ভেবেছে। তাই তারা কর্নাটক রাজ্যের রাজ্যপালের সাথে দেখা করে ‘সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে’ এই দাবি জানায়। তাতে রাজ্যপাল যেন বিজেপিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানায়, সেই দাবি করা হয়। এর পরের দিন ১৮ মে রাজ্যপালও বিজেপি নেতা ইয়েদুরাপ্পাকে শপথ নিতে আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন।

ভারতের রাজনীতিক কাঠামো ও সরকারব্যবস্থায় মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্যপাল নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তাই রাজ্যপালরা বাস্তবত কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকারের নয়, খোদ সরকারী দলেরই মুখ হয়ে থাকেন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর হুকুম তামিলের দলীয় ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। ফলে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কখনো কখনো রাজ্যপাল ক্ষমতার পাত্রের বিশাল ফুটা ও বিরাট ফাঁক-ফোকর হয়ে ওঠে। কর্নাটকে এটা স্পষ্ট ছিল যে বিজেপি (গোপনে টাকার বিনিময়ে) অন্য দলের এমপি ভাগিয়ে আনা বা হর্স ট্রেডিং ছাড়া সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে পারবে না। বিপরীতে কংগ্রেস-জনতা দল (এস) এদের জোট তাদের মোট ১১৫ আসনের সবার নামসহ তালিকা রাজ্যপালের কাছে সরবরাহ ও আবেদন করলেও তিনি তাদের সরকার গঠনের দাবি অগ্রাহ্য করেন। সম্ভবত রাজ্যপালের দুর্বল যুক্তি এই যে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও তিনি সবচেয়ে ‘বেশি আসন পাওয়া’ বিজেপিকেই সবার আগে সরকার গঠন করে দেখানোর জন্য ডাকতেই পারেন। বিজেপি তাতে ব্যর্থ হলে এর পরে তিনি হয়ত কংগ্রেসের জোটকে ডাকবেন। অর্থাৎ এতে রাজ্যপালের কথা ও আইনের ফাঁকটা হল, জেনেশুনে তিনি বিজেপিকে হর্স ট্রেডিং করে অন্য দলের লোক ভাগিয়ে আনার সুযোগ করে দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, এই কেনাবেচার কাজ করতে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ যেন যথেষ্ট সময় পান; সেজন্য বিজেপি নেতা হবু মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দেখাতে লম্বা ১৫ দিনের সময় দেন। ফলে বিক্ষুব্ধ কংগ্রেস জোট এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপত্তি জানায়।

যদিও ইদানিং ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এমন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কথা উঠেছে যে সেই অনিয়মের সুযোগে শেষ বিচারে তা থেকে ক্ষমতাসীন নেতাদের কেউ কেউ ‘পার পাওয়ার’ সুবিধা পেয়ে যান। ওদিকে মূলত একই অভিযোগ তবে ভিন্ন আইনি ভাষায় ও প্রকাশ্যে সম্প্রতি অন্য বিচারপতিরাও প্রেসের সামনে অভিযোগ তুলেছিলেন। সেসবের কোন সুরাহা হয় নাই। এমনকি রাজ্যসভাতেও কংগ্রেসের নেতৃত্বে এক জোটও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব তুলেছিলেন। কিন্তু স্পিকার তা নাকচ করে দেওয়াতে তারা আদালতেও গিয়েছিলেন। মোটকথা রাজনৈতিক দল আর সুপ্রীম কোর্ট মিলে ক্ষমতার করিডোরে কোনাকাঞ্চিতে কোথাও কোথাও এক ধরণের অস্বস্তি এখন লুকায়ে আছে। ফলে ভারতের কোর্ট পাড়ার সময়টাকে বলা যায় এক ধরণের আভ্যন্তরীণ বিভক্তি সেখানে আছে। ফলে কিছু ক্ষত আছে যা এখনও পুরা শুকায় নাই। তবে সকলেই নিজের জায়গায় বসে চেষ্টা করছে।

তবু এসব অস্বস্তিকর ব্যাপার থাকা সত্বেও ভাগ্য ভাল বলতে হয় যে [ সুপ্রীম কোর্টের এক প্রাক্তন বিচারপতি এই এমনই “ভাগ্য ভাল” বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় মন্তব্য করেছেন। ] ভারতের সুপ্রীম কোর্ট সব শুনে রায়ে হবু মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে শপথ নিতে বাধা দেন নাই বটে। কিন্তু হর্স ট্রেডিং এর বিরুদ্ধে দুটা স্পষ্ট পদক্ষেপ নেন।

আদালত শর্ত দেন যে ১৫ দিন নয়, ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পূর্ণ সংসদ ডেকে সেখানে বিজেপির হবু মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে নিজ সমর্থক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে হবে। এ ছাড়াও এর সব কিছুই ঘটতে হবে, অন ক্যামেরা। ফলে সোজাকথায় বললে, টাকা দিয়ে এমপি কেনার কোনো সুযোগ ও সময় আদালত বিজেপির জন্য রাখেননি। এতে অবস্থা এতই বেগতিক ও বিপজ্জনক বলে মোদীসহ বিজেপি দলের অন্যান্য নেতারা অনুমান করে যে পরবর্তিতে অনুষ্ঠিত বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পার শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও দলীয় সভাপতি অমিত শাহ অনুপস্থিত হয়ে যান। অথচ এ পর্যন্ত সব নতুন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথে তারা গর্বের সাথে উপস্থিত থাকতেন। শুধু তাই নয়, শপথের পরপরই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মোদী মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পাকে খবর পাঠান যে, তিনি যেন সংসদ ডেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের দিকে আর চেষ্টায় না যান। এর বদলে আগেই রাজ্যপালের কাছে যেন নিজের অপারগতা জানান ও পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। কারণ, সংসদ ডেকে বসলে বিজেপির বেইজ্জতি আরো বেশি হত। ফলে ইয়েদুরাপ্পার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এরপর উপায়হীন রাজ্যপাল এবার কংগ্রেস- জনতা দল (এস)-এর জোটের নেতা কুমারস্বামীকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। আর এই কুমারস্বামীর মুখ্যমন্ত্রীত্বের সরকারের শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানই ছিল মূলত ২৩ মের অনুষ্ঠান। মোদী এই অনৈতিক হর্স ট্রেডিং করতে গিয়ে ব্যর্থতার শুরু। আর তা থেকেই মোদী বা বিজেপিবিরোধী জোটের নৈতিক বিজয় হয়ে হাজির হয়েছে বলে বিরোধীরা মনে করছে। এই বিজয় উদযাপনই যেন হয়ে উঠে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। কলকাতার আনন্দবাজার এবিষয়ে রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, “বিরোধী শক্তির শপথ”।

এখন আমরা যদি দেখি, আঞ্চলিক এক জনতা দল (এস) কারা এবং তার নেতা মুখ্যমন্ত্রী কুমারস্বামী কে? আমাদের মনে থাকার কথা এইচ ডি দেবগৌড়ার নাম। দেবগৌড়া ১৯৯৬ সালে কলকাতার জ্যোতি বসুর সিপিএমসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সহযোগিতায় গড়া কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ভারতে কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর কোন জোটও যে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারে এর প্রথম প্রমাণ হল সেই দেবগৌড়া সরকার।  আর আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ ঘটনাটা হল,  একমাত্র সেই সরকারের আমলেই বাংলাদেশ-ভারত পানিচুক্তি হয়েছিল এবং আমরা কিছু দিন গঙ্গা নদীর পানি পেয়েছিলাম। সেই দেবগৌড়া একজন কর্নাটকি। তারই দলের নাম জনতা দল (এস) এবং তিনি এখনো ঐ আঞ্চলিক দল, জনতা দলের প্রধান। আর তারই বড় ছেলে হলেন এইচ ডি কুমারস্বামী, তিনি এবার মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিলেন। দেবগৌড়া এখনো দলে সক্রিয় আছেন; তবে ছেলেকে সামনে রাখেন।

এদিকে মোদীবিরোধী জোট গড়ার আরও পাত্রপাত্রীদের ততপরতার খবরও আছে। কর্ণাটকের  নির্বাচনে ঝুলন্ত ফলাফলের খবর প্রকাশের পরপরই কর্নাটকের জোট সরকার গড়ার ক্ষেত্রে দেবগৌড়া-সোনিয়ার সাথে কথা বলে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যয়। কর্ণাটকে যেন কংগ্রেস-জনতা দল এর জোট সরকার গঠিত হয় সে ব্যাপারে উদ্যোগগুলোর প্রধান ভুমিকায় ছিলেন মমতা। তার সাথে আরো ছিলেন উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিএসপি দলের মায়াবতী, সমাজবাদী দলের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। ফলে এটা কেবল দেবগৌড়া-সোনিয়ার জোটের রাজ্যসরকার নয়; বলতে গেলে যেসব আঞ্চলিক নেতা বা মুখ্যমন্ত্রী ওই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তারা সবাই মোদিবিরোধী জোটের একেকজন কারিগর হয়ে ভুমিকা নিয়েছিলেন।

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আমরা কেউই এখনই জানি না। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়েও এই নির্বাচনে কোন ভোট পড়বে না, সরকার গঠনও হবে না। তবে সারকথায় আমরা কেবল বলতে পারি, ভারতে কোন দল জোট ক্ষমতায় এলে তা বাংলাদেশের জন্য কী প্রভাব পড়তে পারে বা আনতে পারে। এই বিচারে ভারতে আঞ্চলিক দলের যেকোন এক জোট কোয়ালিশন সরকার আমাদের জন্য সবচেয়ে ফেবারেবল বা কাম্য সরকার হবে। বাংলাদেশের স্বার্থের জায়গায় বসে দেখলে এটাই দেখা যায়। গত ১৯৯৬ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে। তবে পরিস্কার থাকতে হবে, কংগ্রেসের নেতৃত্বের কোনো জোট সরকার অথবা বিজেপির নেতৃত্বে কোনো জোট সরকা্রের কথা এখানে বলা হচ্ছে না। আবার ভারতের সরকার বাংলাদেশে কোন দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিক কিংবা আজীবন রাখুক- এ আকাঙ্খা বাংলাদেশে যাদের আছে, এদেরকে বাইরে রেখে কেবল বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের দিক থেকে দেখে একথা বলা। আসলে, গত ১৯৯৬ সালের কোয়ালিশন সরকার এই ব্যতিক্রমটা ছাড়া, তুলনামূলক অর্থে বাংলাদেশের স্বার্থের বিচারে, ভারতের সব সরকারই মূলত ছিল হকিশ (hawkish) মানে, বাজপাখির মত ধরো-মারো-লুটে খাও বৈশিষ্টের সরকার। সে তুলনায় ১৯৯৬ সালের ভারতের সরকারকে বলা যায় এক লিবারেল সরকার। এই লিবারেলিজম দেখতে পাওয়ার সাথে তাদের ওই আঞ্চলিক জোট সরকারের কোয়ালিশন বৈশিষ্ট্ থাকা সম্পর্কিত বলে মনে করার কারণ আছে। অর্থাৎ আঞ্চলিক জোট বলেই তারা লিবারেল বৈশিষ্ট্যর। আগে অবশ্য আঞ্চলিক জোটে যেন কংগ্রেস বা বিজেপি দলও না থাকে এমন আঞ্চলিক জোটের কথা বলেছি। তবে একটা ব্যতিক্রম আছে। গত ২০১৬ সালে বিহারের রাজ্য সরকারের নির্বাচন হয়েছিল বিজেপি বনাম বিজেপিবিরোধী বিহারের আঞ্চলিক দল, এভাবে। আর তাতে কংগ্রেস আঞ্চলিক দল হিসাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ সর্বভারতীয় কংগ্রেস নয়, ওর বিহার আঞ্চলিক শাখা (বিহার প্রাদেশিক কংগ্রেস) তাতে যুক্ত ছিল। এই হিসাবে, এমনকি আগামীতে সম্ভাব্য আঞ্চলিক জোট বা কোয়ালিশন সরকারের ভেতরে কংগ্রেসও আঞ্চলিক দলের মতই সমান মর্যাদায় থাকতে পারে।

কোনোভাবেই সেটি প্রভাবশালী এক কংগ্রেস দলের নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলের জোট যেমন ২০০৪-২০১৪ সাল পর্যন্ত দুই ইউপিএ মতো হবে না। আগামী আঞ্চলিক জোট এমন হলে তবেই তা বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে যেতে পারে বলে অনুমান করা যায়। এই বিচারে তৃণমূলের মমতা বা সিপিএমের ইয়াচুরিসহ অনেকের মাথায় কংগ্রেস বা বিজেপির বাইরে একটি কাঙ্খিত আঞ্চলিক জোট দেখতে পাওয়ার আকাঙ্খা কথা জানা যায়। মূলত আঞ্চলিক দলের ভেতর দিয়ে ভারতের নির্বাচনী ক্ষমতার প্রধান প্রকাশিত ধারা- ভারতের এমন জোট সরকার বাংলাদেশের সবচেয়ে ফেবারেবল হবে। আমরা কি আগামিতে এমন আঞ্চলিক দলের জোট সরকার দেখতে পাবো? ভারতের কাছে আমেরিকার বিক্রি করে দেওয়া বাংলাদেশ কী মুক্তি পাবে?

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতে বিজেপিবিরোধী জোটের মহড়া”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্যাক ক্যালকুলেশন

ব্যাক ক্যালকুলেশন

গৌতম দাস

০৮ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার ০০ঃ০৩

https://wp.me/p1sCvy-2qv

 

 

‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’। কথাটার মানে হল, দু’টি সংখ্যার যোগফল আর ওই সংখ্যা দু’টির একটা জানা থাকলে; বিয়োগ করে অপর সংখ্যাটি বের করা যায়। অর্থাৎ ফলাফল থেকে শুরুর উপাদান কী ছিল, তা জানার চেষ্টা। অথবা রান্না খেয়ে রেসিপি কী ছিল তা বোঝার চেষ্টা বলা যায়।

গত ১৯-২১ ফেব্রুয়ারি হোটেল র‌্যাডিসনে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ’ নামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ভারতের প্রধান ধারার প্রিন্ট মিডিয়ার বেশির ভাগই অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর পর্যায়ের ব্যক্তিরা (যুগান্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা কমপক্ষে আটজন) এতে যোগ দিয়েছিলেন। যুগান্তরের রিপোর্ট থেকে আরো জানা যাচ্ছে, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ -এর আহ্বায়ক শ্যামল দত্ত। তিনি বাংলাদেশের দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক। কিন্তু কেন এই অপ্রচলিত আয়োজন? এর একটি জবাব খুঁজে পাওয়া যায় “মৌলবাদ রুখতে দিল্লিকে চায় ঢাকা” শিরোনামে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আনন্দবাজার পত্রিকার অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা রিপোর্ট থেকে। অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তিনিও একজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তিনি লিখছেন, “দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে সরকারি স্তরে তৎপরতা তো রয়েছেই। তার পাশাপাশি মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে দুই দেশের সাংবাদিকদের মতবিনিময়ের মতো ‘ট্র্যাক টু’ কূটনীতির একটি উদ্যোগ নজর কেড়েছে ঢাকার একটি পরিচিত ‘থিংক ট্যাংক’ ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইসিএলডিএস) উদ্যোগে”।

তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা বেশ চিন্তাভাবনা করে করা আয়োজন। কিন্তু আনন্দবাজারের ‘ট্র্যাক টু’ কথাটা যেন অনেক কিছু বলে দিচ্ছে, যা কোথায় নাই, বলা হয়নি। “ব্যাক ক্যালকুলেশন” করা যাক। মাস কয়েক আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময়ও আনন্দবাজার এই শব্দটা ব্যবহার করেছিল। “ট্র্যাক টু” – মানে মূল কূটনৈতিক চ্যানেল ও অবস্থানের বাইরে দ্বিতীয় আর এক মাধ্যমে যোগাযোগ বা বার্তা পৌছানো। অর্থাৎ ‘কাকাবাবু’ যেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হয়ে কিছু একটা মোদি সরকারের কাছে পৌঁছে দেন, সুপারিশ করেন বা দুই সরকারের মতভিন্নতায় মধ্যস্থতা করেন ইত্যাদি। কিন্তু কী সে বিষয়, তা কোথাও লিখিত প্রকাশ ছিল না, যদিও অনুমানে ছিল।

আসলে ঘটনার শুরু বা গুঞ্জন অনেক পুরনো; শেখ হাসিনার সর্বশেষ ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফরের সময় থেকে। কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত দুই সরকারের মধ্যে মতভিন্নতা বাড়ছিল,  গত প্রায় একবছর ধরে। তা কমিয়ে একটা আপোষ-রফার একমত অবস্থানে  দাঁড় করানো যায় কীনা সে প্রচেষ্টাও চলছে। সেই আপোষ-রফায় পৌছানোর ইচ্ছায় আমাদের সরকারের দিক থেকে নেয়া পদক্ষেপ হিসাবে  ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ ্কে বলা যায় এক সর্বশেষ উদ্যোগ।

বিরোধের ইস্যুগুলো কী
চীনের One Belt One Road বা সংক্ষেপে OBOR প্রকল্প। এটা মূলত ৬৫ রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে বা ঐসব রাষ্ট্রের ভিতর দিয়ে যাবে এমন এক মেগা অবকাঠামো প্রকল্প। এটা সড়ক ও রেল পথে ও সাথে সমুদ্র পথেও যোগাযোগের সম্পর্কের দিক থেকে পণ্য চলাচলের এক নেটওয়ার্ক হয়ে উঠবে।  মূলত এশিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র, ওদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও সেন্ট্রাল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এবং রাশিয়াসহ ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রকে এই প্রকল্পের যোগাযোগের আওতায় আনা এর লক্ষ্য।  তবে এর সাথে কিছু আফ্রিকান ও ল্যাটিন আমেরিকান রাষ্ট্রকেও সাথে যুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। আর মূল অবকাঠামোটা রেল ও সড়ক-ভিত্তিক হলেও এই পুরা সড়ক পথের অন্তত পাঁচ জায়গায় পাঁচ গভীর সমুদ্র বন্দরের কানেকশন থাকবে। অর্থাৎ সমুদ্রপথে পণ্য- মালামাল এনে সুবিধামত কোন একটা গভীর সমুদ্র বন্দরে তা নামিয়ে এবার সড়ক পথে যে কোন দেশে ঐ পণ্য নেওয়ার সুবিধা থাকবে এই প্রকল্পে। এইভাবে এটা ট্রিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগের  এক প্রকল্প। বাংলাদেশ সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে রাজি হলে সে বন্দরও বেল্ট-রোড প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবে। তবে তা  হোক আর নাই হোক, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ বা যুক্ত হয়ে থাকতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারের সাথে ভারতের বিরোধ, আপত্তি বা মতভিন্নতা এখান থেকে। সাথে অবশ্য আরও কিছু প্রসঙ্গও আছে।

এই OBOR প্রকল্প কাজের নানা অগ্রগতি আছে। তার একটা হল এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারি রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে সর্বপ্রথম এক সামিট ডাকা। ঐ সামিট ডাকা হয়েছিল চীনের বেইজিংয়ে গত বছর মানে, ২০১৭ সালের মে মাসে। তখন থেকে OBOR  প্রকল্পের আর এক নতুন নামকরণ হয়, Belt-Road Initiative (BRI) অথবা বাংলায় ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’।

বাইরে থেকে চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে  যুদ্ধ লেগে না গেলেও অনবরত আমরা বিবাদ, রেষারেষি দেখি সেটা মুদ্রার এক পিঠ। সহযোগিতার অন্য পিঠ আছে। না, এখান থেকে দুই পিঠের মধ্যে কোন স্ববিরোধিতা বা শঠতা খুঁজা যাবে না, ভুল হবে। এটা শুধু চীন-ভারত বলে নয় সব আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কই একালে এরকমই হবে, এটাই স্বাভাবিক।  তবে ‘একালে’ কথার মানে কী? একালে মানে হল, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পরের সময়ে। তখন থেকে সারা দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত। ফলে,  পণ্য, পূজি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য আর একই বাজারে্র এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ  লেনদেনে একেবারে মাখামাখি। এখানে কেউ আর বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি বা বিনিময় সম্পর্কহীন কেউ নয়। তাই একালে মানে ১৯৯১ সালের পরের দুনিয়াতে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কুটনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি সব সম্পর্ক এরকম দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার – মাখামাখি।

ফলে অন্য পিঠ, চীন-ভারতের মধ্যে প্রবল সহযোগিতাও আছে। যদিও ভারতের মিডিয়া ব্যাপারটাকে আরাল করে এক উগ্র এবং ভুয়া জাতিবাদী অবস্থান প্রচার করে থাকে। যেমন তাদের দ্বিপাক্ষিক পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশই হলো চীনের রফতানি আর ১০ শতাংশ ভারতের রফতানি,  চীনের বিনিয়োগ ভারতে ডেকে আনা আছে, আবার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আপারহ্যান্ড বা বড় ভাগটা চীন নিয়ে নিল কি না সে টেনশন আছে, সেই সাথে অচিহ্নিত সীমান্ত বিতর্কের টেনশন – তা তো আছেই। কিন্তু ২০১৭ সালের মে মাসের আগ পর্যন্ত  কখনোই তাদের মধ্যে বড় বা দৃশ্যমান কোন অসহযোগিতা দেখা যায়নি। এমনকি, গত ২০০৫ সাল থেকে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিতে সে ভারতের পিঠে হাত রাখা সত্ত্বেও চীন-ভারত সম্পর্ক এমনই ছিল। ভারত ঐ সামিটে দাওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও,  সেবারই প্রথম চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সামিট ভারত বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল।

ভারত যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এর কারণ বলেছিল যে,   বিতর্কিত পাকিস্তান অংশের কাশ্মিরের উপর দিয়ে এই প্রকল্প গেছে, তাই ভারত  নিজের সার্ভভৌমত্ব লঙ্ঘণের সমস্যা হিসাবে দেখে সেই  আপত্তিতে তারা এতে অংশ নিচ্ছে না। “Regarding the so-called ‘China-Pakistan Economic Corridor’, which is being projected as the flagship project of the BRI/OBOR, the international community is well aware of India’s position. No country can accept a project that ignores its core concerns on sovereignty and territorial integrity, ” Baglay added.  [Gopal Baglay is the Spokesperson of MEA, India.]

তবে ভিতরের কারণও চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অশোক কান্তা বলে দিয়েছিলেন ভারতের এক মিডিয়াতে। আমরা যদি এর আগে ২০১৫ সালের চীনের বিশ্বব্যাংক (AIIB ব্যাংক) গড়ার সময়ের ভারত-চীন সহযোগিতার সাথে তুলনা করি, তাহলে আমরা দেখি –  যে কোন ভাগাভাগিতে মুড়োটা নিজের পাতে পাওয়ার জন্য ভারত দরাদরি করেছে আর চীন সহানুভূতির সাথে তা দেয়ার চেষ্টা করছে। সব পশ্চিমা রাষ্ট্রের চেয়েও ভারতকে ভাগের দিক থেকে ওপরে রাখছে চীন। কিন্তু বেল্ট রোড উদ্যোগের বেলায় ভারতের মনের কথাটা সার করে অশোক কান্তা যা বলছেন তা হল, “বেল্ট-রোড উদ্যোগ খুবই কাজের; তা সবার দরকার। বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্রের জন্য।  কিন্তু ভারত এতে যোগ দিলে সে চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবার সম্বেভাবনা খুব বেশি, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত প্রথম তিনটি অর্থনীতির মধ্যে একটি হতে যাচ্ছে”।  [আসলে বেল্ট-রোড উদ্যোগ যে খুবই কাজের তা ভারত কেন আর এক প্রতিদ্বন্দ্বি আমেরিকাও তা অস্বীকার করে নাই কোথাও।] নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা ১৩ মে ২০১৭ থেকে ইংরাজি উদ্ধৃতিগুলো নেয়া। 
[Former Indian Ambassador to China Ashok K Kantha said,
“It needs pragmatic approach on China’s part as well. We will be two largest economies of the world by 2030. So joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,” Kantha added.]

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, এটা কেবল তথাকথিত সার্বভৌম ইস্যুতে ভারত ‘বেল্ট-রোড সামিট’ বয়কট করছে; তা নয়। এ প্রসঙ্গে ভারতের সিরিয়াসনেস কত গভীরে সেটা বুঝানোর জন্য একটু বিস্তারিত বলতেই হবে। কিন্তু তার আগে একটি ডিসক্লেমার দিয়ে রাখতে হবে। সেটা হল, মনে রাখতে হবে, এখানে আমি বলিনি যে, ভারতের বা অশোক কান্তার এই অনুমান-বিশ্বাস [ইংরাজিতে কোট করে আনা উপরের বক্তব্য] সঠিক। আসলে এটা তাদের একটা পারসেপশন মাত্র। অর্থাৎ আমি এখানে কেবল বলছি যে, ভারত নিজেকে কী মনে করে, সেটা। কিন্তু তাদের এই অনুমান সঠিক আমি তা মনে করি না। ফলে আমি তাতে কিন্তু সায় দেইনি। আর খুব সম্ভবত এই বয়কটের কারণেই ভারতের ট্রেন মিস হবে। তবে সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

স্বভাবতই এই বয়কটের সিদ্ধান্তের পরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং এ’ঘটনার লেজ আছে। এর অন্যতম হল, এরপর থেকেই ভারতের বিদেশনীতিতে নতুন কিছু হিসাব, কিছু ‘মুই কী হনু রে’ যোগ হয়েছে।  যেমন  এশিয়ার যেসব রাস্ট্রের সরকার চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছে ভারতের বিদেশনীতি তাদের উপর খড়্গহস্ত হয়ে গেছে। নেপাল বা শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। এশিয়ায় ভারতের পড়শি মানে চীনেরও, এমন রাষ্ট্রের কোনো সরকার যদি চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে নিজের সম্মতি চীনকে দিয়ে থাকে, তবে সেই পড়শির সরকারের এখন কপাল খারাপ। কারণ ওই সরকারের সাথে ভারত চরম অসহযোগিতার অবস্থান নেয়। শুধু তাই না, ঐ সরকার ফেলে দেয়া, অথবা ওর বিরোধীদের জিতিয়ে আনার চেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, এমনকি সম্ভাব্য সাবভার্সিভ এক্টিভিটিসহ দরকার মতো সবকিছু করা পর্যন্ত ভারত যেতে পারে। এই হয়েছে ভারতের বিদেশ নীতির নতুন বৈশিষ্ট, নতুন পালক। কিন্তু কেন, এর কারণ নিয়ে পরে আসছি। তবে ভারতের এই বিদেশ নীতি, স্বভাবতই এটা কোনো দলিল দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। তবে খোলা চোখে বাস্তব তৎপরতা দেখে বোঝা যেতে পারে। বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বলেছে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ২০১৭ সালের এপ্রিল ভারত সফরে তিনি বার্তা পেয়েছিলেন – No OBOR, নো চাইনিজ প্রজেক্ট। আমাদের ব্যাক ক্যালকুলেশন এটাই বলে। কারণ যেকথা দিয়ে লেখা শুরু হয়েছিল, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’  এতে আগত ভারতীয় সম্পাদকেরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে তিনি পরোক্ষে এটাই বলেছেন যে ভারতীয় সম্পাদকেরা যেন ভারতের চীন নিয়ে উদ্বেগ কমাতে ভুমিকা রাখে।

কিন্তু এই রচনার মূল প্রসঙ্গে এখন আসব। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা কীভাবে নিয়েছিলেন, ভারতের বার্তা ও পরামর্শকে?

আগে বলেছি ভারতের নির্ণায়ক হল ‘চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে’ যে সরকার সম্মতি জানিয়েছে, ভারত সে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু খুব সম্ভবত বাংলাদেশ ভারতের ‘অনেক কাছের ও বন্ধু সরকার’ বলে একে কাছে ডেকে ভারতের চাহিদার কথা বলে দেয়া হয়েছিল। সরকার ফেলানো বা সরাসরি বিরোধীতার দিকে যায় নাই।

আসলে ভারত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে, সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে উথাল-পাথাল চলছে, চীন নতুন নেতা হয়ে আসছে কিন্তু ভারতের কী হবে – ইত্যাদি পুরা ব্যাপারটা নিয়ে এপর্যন্ত অন্তত চারটি (তিনটা আমেরিকার সরকারি ও একটা প্রাইভেট) বড় বড় সার্ভে ও গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে এপর্যন্ত , কিন্তু তাদের কোনটাতেই এমন কথা বলা হয়নি। তবু যেন ভারত এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে, এই বিশ্বাসে আমাদের দৈনিক কালেরকন্ঠ পত্রিকা কোনো রেফারেন্স ছাড়াই এমন দাবি করে একটি লেখা ছাপিয়ে ফেলেছে গত মাসে। যার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “কয়েক বছরেই চীনকে টপকে যাবে ভারত, উবে যাবে পাকিস্তানও!”। অথচ কোথা থেকে এই খবর পেল এর কোন রেফারেন্স সেখানে দেয়া হয় নাই। খুব সম্ভবত ভারতের ইকোনমিক টাইমসের কোন ‘প্রপাগান্ডা’ খবর এখানে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

উপরে যেসব স্টাডি রিপোর্টের কথা বললাম, ওর মধ্যে প্রাইভেট কোম্পানী “প্রাইজ-ওয়াটার-হাউজ-কুপারস” এর যে রিপোর্ট তা ২০৫০ সালের দুনিয়ায় সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে সার্ভে স্টাডি। একমাত্র সেখানেই ভারতকে আমেরিকার উপরে নিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখলের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আর বাকি তিনটা আমেরিকান রিপোর্ট হল ২০৩০ সাল, ২০৩৫ সাল ও ২০৩৫ সালের দুনিয়ায় টপ অর্থনৈতিক অবস্থানে কোন রাষ্ট্র কে কোথায় থাকবে তা নিয়ে। কিন্তু  (২০৩০-২০৫০ সালের মধ্যে) কোথাও কোন রিপোর্টে ভারতের প্রথম স্থান দখলের কথা কোথাও নাই। চারটা রিপোর্টেই চীন প্রথম এবং দ্বিতীয় যে কারও চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা প্রথম।

ওদিকে আবার শেষ বিচারে এই রিপোর্টগুলো এখনও একেকটা সার্ভে ও স্টাডির এক অনুমিত ফলাফল,  যা বাস্তব নয়। তবে সম্ভাবনা মাত্র। ফলে বহু ‘যদি, কিন্তু’সহ নানা শর্তসাপেক্ষ; যার মূলকথা হল, এগুলা অনুমিত ফলাফল বা প্রেডিকশন। কিন্তু ভারত ব্যাপারটাকে পুরাপুরি ভিত্তিহীন অনুমানে অর্থনীতিতে নিজের প্রথম হওয়ার বিষয় হিসাবে নিয়ে সেটা ফসকে যাওয়া-না যাওয়া হিসেব এমন সিরিয়াস হয়ে দেখছে।

তাহলে সারকথা হল, ভারতের একটা পারসেপশন তৈরি হয়েছে যে ভারত নিজের কথিত এক নম্বর অর্থনীতি সে হতে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে যে ব্যাপারটা পারসেপশনের,মানে অনুমানের। যেটা সত্য নয়। আর ঐ পারসেপশনের উপর দাড়ানো ভারতের বৈদেশিক নীতি অবস্থান হল এই যে, বেল্ট-রোড প্রকল্পে এশিয়ার যে সরকার যাবে সে ভারতের শত্রু। ভারতকে ওর বিরোধিতা করতে হবে, ঐ সরকারের পতন ঘটানো ভারতের স্বার্থ। ফলে তা থেকেই ভারত সরকারের এক প্রেসিং ডিমান্ড তৈরি হয়েছে কেবল যাকে ব্যাখ্যা করতে পারলে জানা যাবে যে ভারত এত মরিয়া অবস্থায় কেন, অথবা কেন ভারত এক চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

ব্যাপারটা দাঁডিয়েছে এমন যে, এশিয়ার কোন সরকার চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে ভারতের কাছে একথার মানে ঐ সরকার ভারতের দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট করতে কাজ করছে।

আমাদের সরকার কী ভারতের বার্তা বুঝেছে?
তাহলে হাসিনা তার গত ভারত সফরে তিনি যে বার্তা পেয়েছিলেন তা কী ঠিকঠাক বুঝেছিলেন? খুব সম্ভবত না। কী দেখে তা মনে হল? মনে হল কারণ, হাসিনার ঐ এপ্রিল ২০১৭ সফরের পরে,  ঐ বছরই ২০১৭ অক্টোবরে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব ভারত সফরে গিয়ে সরবে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা জানিয়ে এসেছিলেন। অর্থাৎ আমাদের সরকার বুঝাতে চাচ্ছিল যে ভারতের আপত্তি মতভিন্নতা আছে কিন্তু ব্যাপারটা আমাদের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ। অথচ ভারতের মূল আপত্তি হল কোন সরকারের  চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়া, চীনা বিনিয়োগ নেয়া।  এথেকে বুঝা যায় যে বাংলাদেশ ভারতের অবস্থানের সম্মক উপলব্দি ছিল না। অথবা ভারতও তার আপত্তির কারণ খুলে বলে নাই। ভারতের (পারসেপশন অনুসারে)অবস্থান হল যদি সে বাংলাদেশকে বেল্ট-রোডে যোগ দিতে দেয়, চীনা বিনিয়োগ এনে নিজের উন্নয়ন চালায়ে যায় তবে এর মানে হবে সেই বাংলাদেশ ভারতের “দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট” করতে কাজ করছে। অর্থাৎ এটা ভারতের মরিয়া স্বার্থ। কিন্তু এটা যে ভারতের প্রথম হওয়া ফসকে যাবার মামলা তা সে কখনও বাংলাদেশের মত কাউকে খুলে বলছে না। বলছে পাকিস্তান-কাশ্মীর হয়ে প্রকল্প আঁকাতে তা ভারতের সার্বভৌমত্ব – এটাই তার আপত্তি। ফলে হাসিনা সরকারও মনে করছে এই ইস্যুটা হল, ঠিকমত ভারতকে বুঝালে, তোয়াজ করলে ভারত মানবে। আর সে কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের চীনা বেল্ট-রোডের পক্ষে থাকা শক্ত করে তুলে ধরে ভারতকে বুঝানো। অথচ হাসিনা সরকারের ঠেকা যদি হয় আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন তার জন্য খুবই জরুরি তবে সরকার আসলে পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়ে উলটা কাজই করিয়েছে। মুল কথা এটা তো পরিস্কার যে হাসিনাকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে দিয়ে ভারত নিজের এক নম্বর হওয়ার ‘মরিয়া স্বার্থ’ [perceived desparate interest] নষ্ট করতে পারে না। ভারতের কাছে হাসিনার আবার ক্ষমতায় আসা না আসা ভারতের মরিয়া স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারে না।

অতএব এই ব্যাপারে সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে যে হাসিনা ভারতের পারসেপশন, ভারতের অবস্থান কেন এমন ইত্যাদি বুঝেছে কি না। বরং হাসিনা ব্যাপারটাকে চীন-ভারতের সাধারণ বিরোধ যেমনটা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে স্বাভাবিক রুটিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা,  প্রতিযোগিতায় হতে দেখা যায় এর বেশি কিছু বলে দেখেছে মনে হয় না। সে কারণেই, বাংলাদেশ সরকার এখনো মনে করছে একটা ভালো পারসুয়েশন হলে, একটু তোয়াজ কিংবা বুঝিয়ে বললে ভারত বুঝে যাবে। অর্থাৎ আমাদেরকে চীনা প্রজেক্ট নিতে দেবে। গত এক বছর ধরে আমরা দেখেছি সেই পারসুয়েশনের তোয়াজ, বাংলায় যাকে বলে, মন জয়ের চেষ্টা। আর এর সর্বশেষ নজির হল  ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ-২০১৮’।

যদিও আসলে এটা তোষামোদ কি না সেটা আমার বলার মুল বিষয় নয়। মূল ব্যাপার হল, ভারত ব্যাপারটাকে দেখছে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিজের কথিত প্রথম হওয়া-না-হওয়া হিসেবে। বাংলাদেশ সরকার এখনও বিষয়টা ভারতের চোখে দেখেনি বা এই পারস্পেকটিভের নাগালই পায়নি,  কারণ ভারতও খুলে সেকথা বলছে না বা বলতে পারছে না বা চাচ্ছে না – এটা মনে করার কারণ আছে। কারণ, আমাদের সরকার নাগাল পেলে বা জানা থাকলে তো বুঝত যে সেক্ষেত্রে এরপরে আর এখানে তোয়াজ বা ভারতকে বুঝানোর আর কিছু নেই। সেকারণে এই উলটা তোয়াজ আমরা হতে দেখছি, ভারতীয় সম্পাদকদের মাধ্যমে হাসিনা ম্যাসেজ পৌছাতে চাইছেন যে ‘‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। বাংলাদেশের কাছ ভারত ভারতের জায়গাতেই থাকবে, চিন চিনের জায়গায়। ভারতের বন্ধুত্ব সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। চিন তো নতুন বন্ধু।’’ অথচ এই ম্যাসেজের অর্থ ভারতের কাছে তো উলটা।

ভারত হাসিনাকে বলছে, বাংলাদেশে নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ। আর হাসিনা পালটা ম্যাসেজ দিচ্ছে, বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আমি আর কিছু করব না, চীনের বলয়ে যাব না। এটাই হল এখানে, ব্যাট আর বলের পরস্পরের সংযোগ সম্পর্ক না হবার ঘটনা।  ভারত চাচ্ছে চীনের সাথে সম্পর্কহীন, বিনিয়োগ সম্পর্কহীন এক বাংলাদেশ। অথচ সরকার এটাকে বুঝছে এভাবে যে, চীনের থেকে বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক না রাখলেই বুঝি ভারত সন্তুষ্ট হবে!

তাহলে ভারতের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে? এককথায় এর জবাব ভারতের কাছে নাই। তবে ভারতের স্বপ্ন হল কল্পিত চীনের বেল্ট-রোড এর এক বিকল্প ‘মাজা ভাঙা’ একটা চার দেশীয় জোট হতে পারে কি না তেমন প্রাথমিক আলাপ চলছে এবং যেটা পাল্টা বেল্ট-রোড উদ্যোগ হতেও পারে। যেটা অবশ্যই অনেকটা ‘গোফে তেল’ ধরণের। তবুও গরিবেরও যেমন অর্থ না থাকলেও স্বপ্ন থাকে, তেমনি। ওই বিকল্প চালু হলে এরপরে ভারত সেই হবু প্রজেক্টের নৌকায় বাংলাদেশকে তুলে নেবে। আর ততদিন বাংলাদেশকে বিনিয়োগহীন বসে থাকতে হবে। বাস্তবে এখন, বাংলাদেশে অবকাঠামোতে যে বিনিয়োগ চাহিদা সেখানে ভারতের কোনো বিনিয়োগই নেই, অবদান নেই। থাকার কথাও না। মূল কারণ হল – ভারত এখনো অন্য রাষ্ট্রের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে পারে, এমন অর্থনীতিই নয়। তবে দু-চার বিলিয়নের যে কথা শোনা যায় সেটা বাংলাদেশে কোন অবকাঠামো বিনিয়োগ নয়। আসলে সেটা ভারতের দুর্বল মান এবং প্রতিযোগিতায় অচল স্টিল ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ভর্তুকির অর্থ। এজন্য ওই দু-চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়ে মূলত ভারতের স্টিল সংশ্লিষ্ট প্রডাক্ট (টাটা বা অন্য ভারতীয় গাড়ি, রেলের যন্ত্রপাতি) কিনতে পারা যায়; যাতে ভারতের অদক্ষ স্টিল ইন্ডাস্ট্রি ভারত সরকারের সাহায্যে টিকে থাকে। তাহলে বাংলাদেশ সরকারের মূল সমস্যাটা হল, চীনকে বাদ দিলে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় সে বিনিয়োগ ভারত থেকেও পাচ্ছে না। তাহলে কোথা থেকে পাবে? আর বিনিয়োগ না পেলে –“গণতন্ত্র না উন্নয়ন” – এ বিতর্কে নিজেকে উন্নয়নের কর্তা হিসেবে কেমনে প্রচার করবে? কারণ, অবকাঠামো বিনিয়োগ নেই মানে প্রজেক্ট নেই। প্রজেক্ট নাই তো হাসিনার দল বা কর্মি কিছুই নাই। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের চাহিদা পূরণের দিক থেকেও ভারত এখনও অযোগ্য, অপুষ্ট। আসলে ভারত এখনও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ গ্রহীতা অর্থনীতির রাষ্ট্র। অথচ স্বপ্নে পোলাও খায়। চীনের রিজার্ভ যেখানে ৩১৮১ বিলিয়নের উপরে ভারতের সেখানে মাত্র ৪১৭ বিলিয়ন। কিন্তু ভারত এখনই ‘গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক নম্বর অর্থনীতি হয়ে গেছে’- এই ভাব ধরতে চায়।

এই বিচারের দিক থেকে দেখলে প্রথম আলোও একই ভুল করছে, ব্যাপারটা তারাও বুঝেছে মনে হয় না। তারা একটা আর্টিকেল ছেপেছে, “চীন-ভারতের ‘লড়াই’য়ে বাংলাদেশ জড়িত না” এই শিরোনামে, এটাও অর্থহীন। কারণ বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনা তো জড়াচ্ছেন না। ভারতই তার অনুমিত ধারণা বা পারসেপশনে জড়িয়ে বাংলাদেশকে দেখছে। আর প্রশ্নটা আসলে চীনা বিনিয়োগে ভারতের কঠোর আপত্তি। বলছে, শুধু বেল্ট-রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে না তাই নয়; কোনো চীনা বিনিয়োগই নিতে পারবে না হাসিনা সরকার। অপর দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’ দুটো এক কথা নয়। বরং বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগই তো ভারতের ‘পারসিভড’ উদ্বেগের কারণ। আসলে ভারত যেন বাংলাদেশকে বলছে- ‘কোনো কিছু না ছুঁয়ে বসে থাক।’ এ কথার মানে কী পাঠকেরা কল্পনা করে দেখতে পারেন। কারণ বিনিয়োগের বাজারে, মুরোদে ভারত এখনো বামন, অপুষ্ট। তাই ভারত, চীনের কোন বিকল্প নয়। প্রথম আলোও বুঝেছে যেন চীনা প্রভাব বলয়ে হাসিনা যাবে না – এর নিশ্চয়তা চাচ্ছে ভারত। অথচ বিষয়টা চীনা প্রভাব বলয় নয়, চীনা বিনিয়োগ নেয়া না নেয়ার।

ভারত যদি মনে করে বাংলাদেশে  – নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ – অবস্থান মানলে একমাত্র তবেই হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিবে – তাহলে অবস্থা দাড়াবে এবার তাহলে আর ভারত হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিতে পারছে না।

এ অবস্থায় আস্তে ধীরে হলেও হাসিনা সরকার তাই সপক্ষে কোনো বিদেশের সমর্থন পাওয়া ছাড়াই সংসদ নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছে, বুঝতে হবে।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ মার্চ ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ব্যাক ক্যালকুলেশন”  -এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

গৌতম দাস
১১ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2pL

আসামে ‘বাংলাদেশী’ বা ‘মুসলমান’ নামে আর এক ক্লিনজিং ও নিধন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে সীমাহীন দুর্দশা আর শরণার্থীর ঢল – এসব দৃশ্য কী আমাদের দেখতে হবে? হলে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের কাঁধে বন্ধুক রেখে এই হত্যাকান্ড ঘটবে? এর দায়ভার কী আদালত বইতে পারবে? ভারত হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ডুবে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে আর মাত্র ১৬ মাস বাকী। মোদীর অর্থনীতির ডুবে যাওয়া আর কাজ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা আর লুকানো নয়, গত সপ্তাহে এবার এটা একেবারে ষ্টাটিস্টিক্যালি প্রকাশিত। সেখানে দেখা যায় মোদীর গত চার বছরের শাসনের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি এবার, সাড়ে ছয় পারসেন্টে নেমেছে। ফলে ধরে নেয়া যায় আগামী নির্বাচনের মোদীর অস্ত্র হবে একটাই – উগ্র হিন্দুত্ব ও মুসলমানবিদ্বেষ। আর তাতে এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে পরিণতি কী হবে!

রোহিঙ্গা সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সুরাহার দেখা পাওয়া যায় নাই এখনও, অথচ এর আগেই প্রায় একই ধরনের নতুন আরেক ফেনোমেনা ‘আসাম মুসলমান নিধন নিপীড়ন’ – ব্যাপকভাবে উঠে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তারা কথিত ‘বাংলাদেশী’, ‘মুসলমান’, ‘ফরেনার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি বলে অত্যাচার-নির্যাতন নিয়মিত শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। আসলে এক কথায় বললে আসাম বা অসমিয়রা এক চরম জেনোফোবিয়াতে ভুগছে। ইংরেজি জেনোফোবিয়া (Xenophobia) শব্দের ‘জেনো-‘ এর তুল্য প্রচলিত বাংলা হবে – ফরেনার বা বিদেশী। এভাবে পুরো শব্দের অর্থ হল – ফরেনার বা বিদেশী ভীতি। যদিও এই শব্দের আসল গভীর অর্থ হল – ‘অ-পর’; যে আমার মতো নয়, এমন অপর-ভীতি। ফলে তাকে দেখতে পারি না, ঘৃণা করি। যেমন – কেউ আমার মতো নয়, সে আমার ধর্মের নয়, অথবা আমার মত অহমিয়া নয়, অথবা আমার মতো এশিয়ান নয় ইত্যাদি। ফলে সে আমার ‘অ-পর’। “অসমে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমিয়াদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সব গ্রাস করে ফেলছে” – এই হল অসমিয়াদের সবচেয়ে কমন আক্ষেপ ও বিদেশ- বিরোধী প্রপাগান্ডা। এই ‘অপর-ভীতি’ বা জেনোফোবিয়াতে ভুগছে আসাম। অথবা সম্ভবত বলা ভালো, জেনোফোবিয়াতে ভোগানো হচ্ছে। কারা ভোগাচ্ছে, কারা এরা?
বলাবাহুল্য, ‘অপরে আমাদের সব গ্রাস করে ফেলল’ – এই আক্ষেপের বয়ান তৈরির পেছনে আধা সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প তারা জড়ো করেছে, অনুমান করা যায়। এখানেই সবচেয়ে বড় মিল দেখা যাবে বর্মিজদের সাথে। বর্মিজদের অপর-ভীতি রোহিঙ্গা নিধনের পিছনের মূল কারণ। এদিকে এখানে বর্মিজদের আসাম দখল থেকে অসমিয়াদের অপর-ভীতির সুত্রপাত। দ্বিতীয় এঙ্গলো-বার্মিজ যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৫১ সালে। এর আগেই, (১৮২৪-১৮৩৮) সালের মধ্যে অহম রাজা ও আশপাশের অন্যান্য রাজা যেমন কাছাড় রাজ্য মিলিয়ে পুরো আসামই ব্রিটিশ কলোনির দখলে ও শাসনাধীন চলে যায়। বার্মিজ রাজার আসাম অঞ্চল দখল নিতে যাওয়া থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল।  তাই অসমিয়াদের একালের আক্ষেপের বয়ানে গল্পের একটি উপাদান হল – ব্রিটিশ কলোনি তাদের দখল করে নিয়েছিল। আগে তারা কত সুন্দর দিন কাটাইত। যদিও এর জন্য এখনকার বাংলাদেশ বা এর কোনো বাসিন্দা আমরা কেউ দায়ী নই। তবু এক জেনোফোবিয়ায় ভিকটিম-বোধের গল্প এখান থেকে শুরু হয়েছে। এর ওপর আদি পাপ আমরা তো মুসলমান, সেটা তো আছেই, যা জুড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো সমস্যার জন্য মুসলমানদের দায়ী করা সহজ। তবে আমাদের আরেক অপরাধ ছিল যে, যেহেতু ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক অধীনে একটি ব্রিটিশ কমিশনারেটের কর্তৃত্বে রেখে শাসন করা হয়েছিল, আর তা হয়েছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। ফলে বৃটিশেরা নয়, বাঙালিরাই যেন এতে দায়ী। আর এর জন্য যেন বাংলাদেশ, মুসলমান বা বাঙালিরা দায়ী, এমন বলে নানান অনুমান ও গল্পও তাদের ঝুলিতে আছে। ভিকটিম-হুড যারা বিক্রি করে, তারা এমনই করে।
আর ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হলে আসামকে পুরা বেঙ্গলের সাথে আর না, বরং সরাসরি পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ করা হয়। তাতেও তারা আরো বেশি অখুশি  হয়েছিল। যদিও (১৯০৫-১৯১১) মাত্র এই ছয় বছর আসাম পূর্ববঙ্গের সাথে ছিল। তবে ততদিনে আসাম ব্রিটিশদের চোখে নগদ অর্থকরী ফসল, চা উৎপাদনের এক খনি যেন, এভাবে হাজির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেকালের চা উৎপাদনের শ্রমিক কারা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশেরা স্থানীয় অসমিয়াদের পছন্দ না করে বিপুল শ্রমিক মাইগ্রেট করে এনেছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক রিপোর্টের মতে, এই শ্রমিকেরা মূলত ট্রাইবাল, তবে ছোটনাগপুর উপত্যকা মানে সেকালের বিহারের ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড (যে দুটোই এখন আলাদা রাজ্য) থেকে এবং বিহারের বাকি অংশ থেকে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (তেলেঙ্গনা, কয়েক বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আলাদা হওয়া রাজ্য) এসব অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া লর্ড কার্জনের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেন পূর্ববঙ্গ থেকেও আনা হয়। সম্ভবত পড়শি ও দক্ষ কৃষিকাজ জানা লোক বলে। [People – mostly tribals – were brought in from the Chota Nagpur plateau and its adjoining areas covering present-day Jharkhand, Chhattisgarh, and parts of Bihar, West Bengal, Odisha, Telengana and Andhra Pradesh to work in the newly-opened tea plantations from the mid 19th century; the British encouraged the migration of Muslim farmers from East Bengal after Lord Curzon became Viceroy of India (1899-1905). ]
তবে এর আরেকটা বড় কারণ আছে। ব্রিটিশ-ভারতের ‘ভারত শাসন আইন-১৯৩৫’ অনুসারে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা প্রথম স্থানীয় নেটিভদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় শাসনে সিলেক্টেড স্থানীয় নেতা নেয়া হত। তার পুরো আনুষ্ঠানিক নাম মৌলবি সাইদ স্যার মোহম্মদ সাদদুল্লাহ। গৌহাটির সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাদদুল্লাহ পরে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ও সরকারি প্লিডারও ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের আসাম প্রদেশের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত)। এর আগে তিনি ১৯১৯ সালের সরকারেও সিলেক্টেড প্রতিনিধি ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গোপীনাথ বরদোলাই। এমনকি স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার কাজে যে ৯ সদস্যের খসড়া কমিটি হয়েছিল, তিনি সেখানে একজন ছিলেন। তিনিও পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষক নিয়ে গেয়েছিলেন, ধান চাষে বাংলার অভিজ্ঞতায় বেশি ফসল এরা ফলাতে পারে এই বিশ্বাসে। এসব মিলিয়ে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা জাম্প করেছিল। তবে তা সবই ১৯৪১ সালের মধ্যে, এরপরে নয়। যেমন ১৯০১ সালে আদমশুমারিতে মুসলমান ছিল আসামের মোট জনসংখ্যার ১২.৪ শতাংশ। এরপর বিপুল মাইগ্রেটেড হয়ে আসা জনসংখ্যার কারণে পরের ৪০ বছরের মধ্যে ১৯৪১ সালে তা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছিল, ২৫.৭২ শতাংশে। তবে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সবচেয়ে বড় মুসলিম মাইগ্রেশন। মনে রাখতে হবে এটা হয়েছিল, ব্রিটিশ-ভারতে যখন দাওয়াত দিয়ে জমি ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পুর্ববঙ্গ থেকে মাইগ্রেট করে বাঙালি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের ৩০ বছরে দেখা যায় ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশ কমে ২৪.৫৬ হয়েছিল। এরও পরের ১০ বছরে এই প্রথম মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৮১ সালে ৪ শতাংশ বেশি হয়ে ২৮.৪৩ শতাংশ হয়। এর পরের ১০ বছরে জনসংখ্যা ১৯৯১ সালে আরো ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৩০.৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে এখন মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশ।
নিচের গ্রাফ নেওয়া হয়েছে, সাথে দেয়া লিঙ্ক ফলো করেন। 
ASSAM muslim population
তাই সবচেয়ে হইচই শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এক উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মুসলমান অনুপ্রবেশ’ হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ করে এমন কোন তথ্য না থাকলেও একথা বলা হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এই বিচারে এটা একটি মিথ, একটি পারসেপশন মানে ভোটে জেতার পারসেপশন। এ ছাড়া অনেক গবেষক দেখিয়েছেন এর কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে ১৯৭১ সালের শুমারিতে দেখা গেছে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়েনি। এ ছাড়া অন্য যেসব ‘রাজনৈতিক পারসেপশনের অভিযোগ’, যেমন – বাংলাদেশের সাথে আসামের সীমান্ত এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বেশি। অথচ কোন শুমারির গণনাতে দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করা হয়নি। আবার এমনই আরেক অভিযোগ হল, অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের তুলনায় আসামের মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নাকি বেশি, মানে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী” এসেছে। সেটাও তুলনীয় ফিগার দিয়ে গ্রাফ একে তুলনা করে দেখা গেছে, এই অভিযোগও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আদমশুমারির তথ্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধারণাকে সমর্থন করে না। তবে এটা হতে পারে যে, আসামের ভেতরেই ১৯৮১ সাল থেকে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানদের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এর অর্থ মুসলমান মোট জনসংখ্যা বেড়েছে তা নাও হয়ে পারে। কারণ মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানদের শতকরা হার যেহেতু এটা একটা শতকরা হিসাব অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শতকরা যোগফল ফিক্সড বা ১০০ থাকতে হবে, তাই। এতে কোন কারণে হিন্দুদের জন্মহার কমাটাও তুল্যপরিমাণ মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে বলে দেখাবে। অথচ মুসলমান মোট জনসংখ্যা আসলে হয়ত বাড়েই নাই – এমন হতে পারে।
এমনিতেই সাধারণভাবে কোন জনগোষ্ঠির শতকরা হার এর বাড়া-কমা ঘটার পিছনের কারণ হিসাবে দেখা যায় – আরবানাইজেশন বা শহরায়নের হার বেশি হলে জন্মহার কমে। হিন্দুদের শহরায়ন বা শহুরে চাকরিজীবী পেশা গ্রহণ মুসলিমদের তুলনায় বেশি হলে হিন্দু জন্মহার কমেছে – এর একটা কারণ হতে পারে। মূল কারণ হল, কৃষিকাজ বা প্রত্যক্ষ শ্রম বেচে খাওয়া বাবা-মায়েদের সন্তান বেশি নেয়ার ঝোঁক থাকে। কারণ সেক্ষেত্রে সন্তান কম বয়স থেকেই নিজেই আয় করতে পারে বা উল্টা বাবাকে শ্রম-আয় দিয়ে সাহায্য করতে পারে। যেটা শহুরে বা শিক্ষিত চাকুরে পেশার বাবা-মায়ের বেলায় উল্টা হয়। কারণ তাদের সন্তান শিক্ষিত করতে গিয়ে সন্তানের পিছনে খরচ করতে হয়। তাদের মানুষ করার এই খরচ কমাতে বাবা-মায়েরা জন্মহার কম রাখার পথে যায়। মুসলিম জন্মহারের তুলনায় বেশি দেখানোর সম্ভাব্য কারণ এটিই। আরও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আসাম ভেঙ্গে আরও নতুন চারটা প্রদেশ করা হয়েছে। আর ঐ প্রদেশগুলো হওয়ার কারণে পুরান আসাম প্রদেশ থেকে (মুসলমান জনসংখ্যার তুলনায়) বেশি হিন্দু জনসংখ্যাই বের হয়ে গেছে। তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যা কম বের হওয়াতে মোট সংখ্যাটা একই থাকলেও শতকরা হারের দিক থেকে মুসলমানের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া সম্ভব। তবে মূল কথা, কেন শতকরা হিসাবে মুসলমানের পার্সেন্টেজ বেশি দেখাচ্ছে এর আসল কারণ পরিসংখ্যান ফিগার ঘেঁটে বের করা যেত। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাই মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীর’ উপস্থিতির প্রমাণ – এদিকে অনুপ্রবেশের রাজনীতি, মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় নাই। অথচ এটা একটা অপ্রমাণিত বা ভিত্তিহীন কথা।
আসলে ১৯৪৭ সালের পর থেকেই এক মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় উঠেছিল। এরই সাক্ষ্য হয়ে আছে ১৯৫১ সালের ‘NRC 1951’ (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন)। এটা এই প্রথম ভারতের একটাই প্রদেশে যাচাই করে নাগরিক তালিকা তৈরি করা। ভারতে নিয়মিত প্রতি দশ বছর পরপর আদমসুমারি হয়ে থাকে। সে হিসাবে ১৯৫১ সালের আদমশুমারির পরই সেই ডাটা থেকে সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র আসাম প্রদেশেই “রেজিস্টার্ড নাগরিকদের তালিকা” তৈরি করা হয়েছিল; অর্থাৎ অন্য কোনো রাজ্যে তাদের কোন NRC করা হয় নাই। আসামে ‘মুসলমানেরা বেড়ে গেল কি না’ এই উছিলা তুলে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা তখন থেকেই। এমনকি এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধ’ আসামের হিন্দু বাঙালিদেরও বিপক্ষে। বিশেষ করে সিলেটের লাগোয়া আসামের তিন জেলার (কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি) হিন্দু বাঙালি যাদেরকে বরাক উপত্যকা বিধৌত অঞ্চলের লোক বলা হয়। আর শুরুতে এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস। তাই বরাক অঞ্চলের লোকেরা এখন ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, প্রথম আলোতে প্রকাশিত নাগরিকত্ব নিয়ে সোচ্চার বরাকের বাঙালিরা” এই রিপোর্ট এখনও আসামের বরাকের তিন জেলার হিন্দু বাঙালির প্রতিবাদ। যদিও এরাই ১৯৪৭ সালে সিলেট নিয়ে ভোটাভুটিতে আসামের পক্ষে পতাকা উড়িয়েছিল। এদের মোহভঙ্গ হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। বিশেষত ১৯৫১ সালে কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদোলাই যখন মুখ্যমন্ত্রী এবং  ১৯৬১ সালে, যখন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ ‘উগ্র অহমিয়াবাদের’ শুরুর দিকে এর নেতৃত্বে ছিল প্রদেশ কংগ্রেস।
যদিও খোদ নেহরু বা পরে ইন্দিরা গান্ধী এই উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ পছন্দ করেননি। আবার এদের দুজনের কেউই প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে থামাতেও পারেননি। এর নিট ফলাফল হল – এর পর থেকে আসামের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব কংগ্রেসের দেখানো পথেই থাকে কিন্তু নেতৃত্ব অন্যান্য দল বা গোষ্ঠির হাতে চলে যায়। আর সেটাই এখন বর্তমানে বিজেপির হাতে। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই ‘অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ সংক্ষেপে আসু [AASU] এটাই আসামের বড় ছাত্র সংগঠন। অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করে বললে, ভারত স্বাধীনের পরে কংগ্রেস আর কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠন সব রাজ্যে আলাদা হয়ে যায়। ব্যতিক্রম আসাম। এখানে ভাগ না হওয়া সংগঠনটাই হল আসু। সম্ভবত ‘উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ’ সেকালে উত্তাল হয়ে উঠা – এমন অবিভক্ত থেকে যাওয়ার কারণ।  AASU এই সংগঠন ১৯৭৯ সালে (NRC) এনআরসির নাগরিকের তালিকা তৈরি শেষ করে এর ভিত্তিতে ‘কথিত অনুপ্রবেশকারীদের’ বের করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে ছাত্র সংগঠনের তরফে এমন দাবির তোলা হয়েছিল। এর অর্থ তাতপর্য হল, কংগ্রেস দলের কেন্দ্র বা হাই কমান্ড, প্রদেশ কংগ্রেসের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদে মোড় নেয়ার বিপক্ষে তাদের মুখ বন্ধ রেখেছিল, এরই প্রতিক্রিয়া। এজন্য পরিণতিতে আমরা দেখি পরবর্তিতে এই ছাত্র সংগঠনই নতুন রাজনৈতিক দল (অসম গণ পরিষদ) খুলেছিল, যেটা তখন জন্ম হয় নাই। ১৯৭৯ সালের আসুর আন্দোলন শুরুর পরে ১৯৮৩ সালে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার নির্বাচনের আয়োজন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আসু এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। ফলে কংগ্রেস ছাড়া এতে আর কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু মুসলমান ভোটারেরা কংগ্রেসের প্ররোচণায় ভোট দিতে গিয়েছিল। এখান থেকে এক মহা-বিপর্যয়ের শুরু।
আসামের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান চারটির একটি – বোড়ো (Bodo) ট্রাইব, অনেকে এদেরই আদি অহমিয়া মনে করে। ট্রাইবের নামে এক আঞ্চলিক দল (National Democratic Front of Bodoland) আছে তাদের (পরে অবশ্য দুটা ভাগ হয়ে গেছে)। বিজেপির বাজপেয়ি সরকারের আমলে ২০০৩ সালে বোড়ো সংখ্যাগুরু চারটি জেলা (Kokrajhar, Baksa, Chirang and Udalguri ) নিয়ে এক  স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ও আলাদা নির্বাচিত প্রশাসন, Bodoland Territorial Council (BTC) গঠন করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে BTC তে মোট ৪০ আসনের মধ্যে ৭৫ ভাগ সংসদীয় আসন বোড়োদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই সমস্যা উল্টা হয়। কারণ সর্বসাকুল্যে বোড়ো জনসংখ্যা ৪৮% এর কম। আর পরের বড় অংশ হল ২৭% মুসলমান, এছাড়া অন্যান্য ধর্ম বা ট্রাইব ইত্যাদির লোক আছে। অর্থাৎ ঐ চার জেলাতেই মুসলমানসহ অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আছে। বোড়োরা এখন এসব কোন সংখ্যালঘুদেরকে ক্ষমতায় কোন প্রতিনিধিত্ব দিতে চায় না।  উল্টা রুখে দিতে চায়, রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত করতে চায়। এমনকি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিতে বাধা দেয়, হত্যা ম্যাসাকার করে ইত্যাদি। আগ্রহিরা এই রিপোর্টের পুরাটা পড়ে দেখতে পারেন। এটা ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের অধীনে করা হয়েছেন। সেখান থেকে, [ This year 2014, between May 1 and May 3, nearly 50 unarmed Muslims were shot dead in three separate incidents in the Bodo Territorial Administered Districts. These killings, according to the report, were a retaliation by Bodo militants because a host of non-Bodo communities, including Muslims, had collectively put up an election candidate from the United Liberation Front of Assam to contest for the Kokrajhar Lok Sabha election seat against Bodo candidates.] এরাই ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিও নিলা ম্যাসাকার (Nellie massacre) ঘটিয়েছিল। প্রায় হাজার খানেক বোড়ো অধিবাসী দল বেধে প্রায় মোট প্রায় তিন হাজার (অফিসিয়ালি দুহাজারের কম) মুসলমান জনগোষ্ঠির লোককে হত্যা করেছিল।  ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে আসামের নওগাঁ জেলার নিলা ও এর আশেপাশের গ্রাম এলাকায় মুসলমানকে হত্যা করার সাথে শিশু ও নারীদের আহত এবং নির্যাতিত হয়, এটাই নিলা ম্যাসাকার নামে এটি পরিচিত। পরবতিতে একটা ডকুমেন্টারি সিনেমা হয়েছে এই হত্যাকান্ডের সার্ভাইভারদের নিয়ে। পরে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনেও (মোদি এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর) একইভাবে আক্রমণ নিপীড়ন করা হয়েছিল।

১৯৮৩ সালের মুসলমান নিধন হলেও এ নিয়ে আজো কোনো বিচার আদালত কিছু হয়নি। তবে ইন্দিরা গান্ধীর (তিনি তখনো বেঁচে, নিহত হয়েছেন অক্টোবর ১৯৮৪) প্রতিক্রিয়া কিছু টের পাওয়া যায় তার এক কাজে। তিনি এই হত্যার ব্যাপারটা যতদুর সম্ভব চেপে গিয়েছিলেন, কথা সত্য। কিন্তু একটা কাজ করেছিলেন। ভারতের ভুখন্ডে কোন ‘বিদেশির অনুপ্রবেশ’ ইস্যু ডিল করতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় “১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট” [The Foreigners Act, 1946.] এই আইন। তা সত্ত্বেও ঐ হত্যাকান্ডের পরে কেবল আসামে প্রয়োগের জন্য ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’ [Illegal Migrants (Determination by Tribunal) Act, 1983] বলে নতুন আইন করেন তিনি। এই আইনের সারকথা হল – কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এ ছাড়াও অভিযোগকারীকে কথিত অনুপ্রবেশকারির বাসার ১০০ গজের মধ্যে বসবাস করতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে ভারত থেকে বের করে দেয়া খুবই কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধী  (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) মারা গেলে  পরে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। তিনি এবার ‘আসু’র সব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৮৫ সালের আগষ্টে  ‘আসাম চুক্তি বা আসাম অ্যাকর্ড’ সই করেন। অর্থাৎ NRC ১৯৫১ তালিকা আপডেট করে এর ভিত্তিতে অবৈধ বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার আন্দোলনকারিদের দাবি মেনে এর বাস্তবায়নে চুক্তি করেন তিনি। এছাড়াও তিনি ১৯৮৩ সালের রাজ্য নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য নতুন নির্বাচন দেন। অর্থাৎ রাজীব গান্ধী যা করলেন এর অর্থ তাতপর্য হল, তিনি স্বেচ্ছায় চাইলেন আসু এরপরে নিজেদের নতুন দল খুলুক, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতে আসু সরকার গড়ুক। এবং ১৯৮৫ সালে তাই হয়েছিল। আর  আসুর নতুন গড়া স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নাম হল ‘অসম গণ পরিষদ’ (Asom Gana Parishad, AGP) আর আসুর নেতা প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত এই দলের সভাপতি ও ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ রাজীব গান্ধীর অনুমান ও ভীতি ছিল একটাই, এমন না হতে দিলে আসাম ভারত থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে যেত। অতএব রাজীব গান্ধী টাইম বায়িং বা সময় কেনার পথ ধরেছিলেন। আর মোহান্তর কি হয়েছিল পরে? পরের বারের (১৯৯০) নির্বাচনে মোহান্ত গোহারা হেরে যান। তবে কোনোমতে তার পরের বার (১৯৯৫) জিতেছিলেন । আর সেটাই শেষ। এখন ঐ দল ভেঙ্গে দুইটা, আর প্রতিবারের রাজ্য নির্বাচনে আসামের মোট ১২৬ আসনের রাজ্য সরকারে দলের অর্জনে থাকে ১০-১৪ আসন।

এদিকে এখনকার আসাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন সর্বানন্দ সনোয়াল, তিনি আসলে ছিলেন AGP নেতা এবং আসুরও নেতা সভাপতি (১৯৯২-৯৭)। তিনি ২০০৫ সালে, নিজ নামে ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’-কে [IMDT এক্ট] কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে  একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে  ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণায় বাতিল করে দেন। ফলে এখন অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে বের করে দেয়া সহজ। আসলে এই পরিকল্পনাগুলো ছিল বিজেপির। এবার সে পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তিনি AGP ছেড়ে প্রকাশ্যে ২০১১ সালে এবার বিজেপিতে যোগ দেন। রাজ্য নির্বাচনে সেই প্রথম তিনি বিজেপির পক্ষ থেকে এর আগে যেটা ছিল অনুপ্রবেশ বা বাঙালি বা বাংলাদেশি খেদাও এর ইস্যু সেটাকে তিনি সরাসরিভাবে এবার “মুসলমান খেদাও” বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। সর্বানন্দ পরে ২০১৪ সালের বিজেপি থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হন। আর ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবে ২০১৪ সালের ঐ নতুন ভাষ্যে ‘মুসলমান খেদাও’ এতে প্রায় ৫০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল বলা হয়।  এদিকে আসামে কংগ্রেস এর মাঝের (২০০৬, ২০১১)  আবার দুইবার মুখ্যমন্ত্রী ও সরকার গড়েছিল।  তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল এই যে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে রাজীব গান্ধীর দলসহ সকলে অনুপ্রবেশ বা মুসলমান ইস্যুকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় যাবার জন্য। যারাই রাজ্য সরকারে এসেছে সবাই এটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু সবাই জানে এর বাস্তবায়ন কী কঠিন ও ভীষণ বিপদের। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি খেদাও অথবা অনুপ্রবেশকারী অথবা বিদেশী মাইগ্রেন্টের কোনো না কোনো একটি আসাম রাজনীতির ইস্যু ছিল। আর সবসময়ই ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই ‘বাংলাদেশী’ ইস্যুটি ব্যবহার করতে কেউ দ্বিধা করেনি। কিন্তু এক স্থানীয় এনজিও ইস্যুটাকে সেবার সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে যায়,  আর এর বাস্তবায়ন দাবি করেছিল। সেই থেকে এটা কোর্টের মনিটরিংয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালতও ঐ মিথ বিশ্বাস করেছে যে একটা বড় বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠি ১৯৮১ সালের পরে আসামে এসেছে।

কিন্তু এরপর কী?
সবচেয়ে ভয়াবহ এক অবস্থার জন্য যেন আসামের সব দল বা পক্ষ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও।  কেন? কারণ আসামের নাগরিকের তালিকা কী হচ্ছে, কতদূর হচ্ছে এর বাস্তবায়ন ‘নির্বাহী সরকার’ নিজে করছে না। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধানে, নির্দেশ ও মনিটরিংয়ে এটা সরকার বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু ঘটনা হল যদি ‘কেউ ভারতের নাগরিক’ এটা প্রমাণ করতে পারল না – এর মানেই সে অ-ভারতীয় হয়ত, কিন্তু সে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমানিত হল না, হবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে কারও কাছেই যার জবাব নেই তা হল, তাহল, এই কথিত ‘অ-ভারতীয় বা অবৈধদের’ কোথায় ঠেলে ফেলা হবে? এর জবাব সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নেই। কেউ অ-ভারতীয় এটুকু বলেই আদালত পার পেতে চায়। কিন্তু আদালত এ নিয়ে কিছু না বললে অন্যেরা, কোন না কোন রাজনৈতিক শক্তি এরা কী বসে থাকবে? সুযোগসন্ধানীরা কেউ বসে থাকবে না। বরং ‘বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার ক্রেডিট’ নিজে নিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এর দায় কে নেবে? সবচেয়ে আজব ব্যাপার, সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো আসামের সবাই মনে করছে, নাগরিক তালিকা পূর্ণ হলেই ওটাই সব সমাধান। অথচ এটাই হবে দাঙ্গার উৎস। নতুন ও গভীর ক্ষত তৈরি ও সঙ্কটের শুরু। ভারতের এক গবেষণা থিংক ট্যাংকও (দিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য।) এতে সায় দিয়ে বলছে, আসামের এই তালিকা একটি ‘টাইম বোমা’। তবে ভিন্ন কারণে।

ঘটনার আসল দিকটা হল, আসামের প্রধান সমস্যা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব। আসাম ঠিক ল্যান্ডলকড ভুখন্ড নয়। প্রবেশ বা একসেস আছে কিন্তু সেগুলো কেবল এক কোনা, আসামের কেবল পশ্চিম দিক শিলিগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে, ফলে সহজ না। কখনও পাচগুণ পথ ঘুরতে হয়, পুর্ব দিক থেকে আসলে। অথচ সব রিসোর্সে আসামের সহজে প্রবেশের উপায় হতে পারে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের সাহায্য ও সুসম্পর্ক হতে পারত এর জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বস্তু। কিন্তু মিথ্যা মিথ ও ভ্যানিটি আর ‘অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে পাহাড় ও মনের ঘেরার ভেতর আটকে গেছে অসমিয়রা। অসমিয়াদের যদি মিথের তালাশে দিন কাটে, বিদেশি বা অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ এর মুডে থাকে তবে এই অসমিয়াদেরকে কোন বাংলাদেশ সহায়তা করবে? কেন করবে? কেউ বিদেশি মানে সে আমার জনগোষ্ঠির স্বার্থ-বিরোধী – এসব ধারণা ও কথা বার্তা বড় জোর সত্তর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর আর নাই। বুঝমান মানুষ বুঝেছে এটা ডাহা মিথ্যা আর ভিত্তিহীন কথা। যে মানুষ ‘বিনিময়’ শব্দটার অর্থ তাতপর্য শুনে নাই, খেয়াল করে বুঝে নাই সে তো অচল। দুনিয়ার বাকী সবার জন্য সে এক অচল সিকির মত দায়!

যে ‘বিদেশী’ ঘৃণা করে বাইরের সব রিসোর্সে তাকে অ্যাকসেস দেবে কে? আসামের আসলে ত্রাতা হতে পারে কথিত এই ‘মুসলমানের বাংলাদেশই’, অথচ আসাম মুসলমান ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে। তাকে কে বাঁচাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৯ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আসাম পাহাড়ে আর মনের ঘৃণায় আটকে গেছে সঙ্কট“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদির ‘বুকের ছাতি’ কী এবার শুকিয়ে যাবে

মোদির ‘বুকের ছাতি’ কী এবার শুকিয়ে যাবে
গৌতম দাস
১৪ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ১৮:০০
https://wp.me/p1sCvy-2kR

DECLINING

গত বছর ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের সবচেয়ে বড় মানের দুই নোট (হাজার ও পাঁচ শ’ রুপির নোট) “ডি-মনিটাইজ’ করা হলো” বলে আকস্মিক এক সরকারি ঘোষণা দিয়েছিলেন।  টিভি ঘোষণার সে বক্তৃতার সময়, অতি-আস্থাশীল মোদী সেদিন দাবি করে বলেছিলেন কয়েক ঘন্টার মধ্যে নাকি ৮৬% ভারতীয় নোট যে অর্থহীন তা কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রমাণ হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবে ফল হয়েছে উলটা। অতি-আত্মআস্থার মোদি এক বোকায় পরিণত হয়ে গেছে, এই স্বভাব  কাউন্টার প্রডাকটিভ। আজ এক বছরে এটা প্রমাণিত যে নিজের উপর অতি আস্থাশীলতা ভাল না, এবং মোদি ও তাঁর “ডি-মনিটাইজেশন ব্যার্থ। মোদির দাবি অনুসারে ৮৬% ভারতীয় নোট যে অর্থহীন  নয় তাই প্রমাণ করে ছেড়েছে, আর উলটা এটা এখন মোদি-পতনের ইঙ্গিত।

ডি-মনিটাইজ শব্দটি অনেক পাঠকের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। লাগারই কথা। কারণ, আমরা যাকে টাকা বলি, মানে টাকার নোট, এর মধ্যে একটা অদ্ভুত কনসেপ্ট কাজ করে থাকে। যেমন, ছাপানো টাকা্র নোট প্রেসে ছাপার পরও ওটা নাকি আর পাঁচটা ছাপা কাগজের মতো নেহায়েতই একটা চিরকুট থেকে যায়। কেন? কারণ ওতে তখনো বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি নাই, মানে বোধন বা উদ্বোধন তো তখনও হয় নাই। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে তা রিলিজ করবে, মানে কারো পাওনা পরিশোধ করা হিসেবে রিলিজ বা হস্তান্তর করবে; অন্যভাবে বললে যখন থেকে এর অর্থ হবে এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্বীকৃত বৈধ টাকা’ তখন থেকেই কেবল ওটা ‘টাকা’। এ ঘটনাকে বলে মনিটাইজেশন। যার অর্থ নেহায়েতই এক ছাপা কাগজের টুকরার উপর তখন থেকে মুদ্রার গুরুত্বও আরোপিত হবে বা স্বীকৃতি পাবে। এরই ইংরেজি শব্দ হল মনিটাইজ (monetize) করা। ফলে এমনকি এরপর উল্টাপথে পরবর্তীকালে কখনো যদি বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো দিন এক ‘পাবলিক ঘোষণা’ দিয়ে বলে যে ওই সুনির্দিষ্ট নাম্বারের নোটটা অথবা বাজারে চালু সব বা ওমুক ওমুক নোট এখন থেকে আর আমার স্বীকৃত বৈধ নোট নয়, অচল নোট তাহলে সে ঘটনাটাকে এইবার বলা হবে ডি-মনিটাইজ করা। যার বাংলা অর্থ হল, আগের দেয়া স্বীকৃত বা নোটের মুদ্রাগুণ তখন থেকে কেড়ে নেয়া হল। তাহলে সার কথায় নোট ছাপা হয়ে গেলেই সেটা তখনও নোট হবে না। নোট বৈধ হতে গেলে নোট হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান অথবা প্রত্যাহার – এদুটাই ওর আসল জিনিষ। তবে চলতি শব্দ হিসেবে ‘ডি-মনিটাইজ’ – এই কাজকে আমরা ‘নোট বাতিল’ও বলি। যদিও তা বললেও সব রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক ভাষায় এটাকে ডি-মনিটাইজেশন অথবা মনিটাইজেশন বলা হবে।

তবে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত তার সবচেয়ে বড় মানের মুদ্রাগুলোকে মানে যেমন বাংলাদেশের বেলায় ধরা যাক হাজার টাকা, অথবা এর সব চালু নোট যদি ডি-মনিটাইজ করার ঘোষণা দেয় তবে সব নোটগুলো বদলে নেয়ার একটা সময়ও সেই সাথে ঘোষণা করে দেয়া হয়ে থাকে। তাতে ঘোষিত কেবল ওই শেষ দিন পর্যন্ত আর সাথে বদলে নেয়ার ব্যাংকেই কেবল ঐ নোট তখনো বৈধ নোট বলে গ্রহণ করা হবে। এর বাইরে, অন্য কোনো পণ্য লেনদেনে, মুল্যা পরিশোধের ক্ষেত্রে দুই মানুষের মধ্যে দেয়া-নেয়ায় ওই নোটের আর গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।

গত বছর মোদি এই ডি-মনিটাইজই করেছিলেন। ওদিকে কোনো রাষ্ট্রের ডি-মনিটাইজ পদক্ষেপের প্রধানতম কারণগুলো সাধারণত হল, ডি-মনিটাইজ ঘোষণার পরে বাতিল টাকা বদলাতে পাবলিককে ব্যাংকে আসতেই হবে।  আর টাকা বদলাতে গেলে ঐ টাকা কার, কার নামে ঐ টাকা দেখাতে হবে ব্যাংককে তা বলেই কেবল বদল সম্ভব হবে। আর আসলে তাতেই ধরা পড়ে যায় যে কার নামে কী পরিমাণ নোট বা অর্থ আছে ও জমা হল। এটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাজানি বা রেজিস্টার হয়ে যাওয়ার ঘটনা হয়ে যায় তাতে। ফলে এরপর অত টাকার আয়কর সে দিয়েছে কি না সেটা মিলিয়ে দেখলে ওই নোট আয়কর পরিশোধ করে দেয়া অর্থে বৈধ না অবৈধ আয় (কালো না সাদা আয় বলি অনেক সময় আমরা) তা ধরা পড়ে যায়। এ ছাড়া দেশে নকল নোটে ছেয়ে গেলে পরে ডি-মনিটাইজ ঘোষণা হলে তাতে নোট বদলাতে এলে কেবল আসল নোটওয়ালারাই আসবে। কারণ নকল নোট নিয়ে আসলে ধরা পড়তে হবে। ফলে এভাবে নকল নোটকে বাজারছাড়া করে দেয়া যায়। তাই মূল কথা বা চাবিকাঠি হল  – নোট বদলাতে আসতে হয়, কার নামের নোট তা বলতে হয়, আর এতেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাজানি বা রেজিস্টার হয়ে যায় বলে পরবর্তিতে  প্রমাণিত এই সত্যের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র অনেক অ্যাকশন নিতে পারে।

মোদির ক্ষমতায় আসার পরবর্তিতে বর্তমানে এটা  সাড়ে তিন বছর চলছে; অর্থাৎ নোট ডি-মনিটাইজেশনের সময় মোদির সরকারের আয়ু পার হয়েছিল মাত্র আড়াই বছর। আর এই হিসাবে মোদি সরকারের আয়ু বাকি আছে আর মাত্র দেড় বছরের মত। ভারতে পরের কেন্দ্রীয় নির্বাচন ২০১৯ সালে মে মাসের কাছাকাছি সময়ে। কিন্তু ইতোমধ্যেই ‘পপুলার মোদির’ দিন ফুরিয়েছে,  রব উঠে গেছে চার দিকে যে মোদির শাসন খারাপ ছিল বা খারাপ কেটেছে। অথবা মোদি সরকারের আর জোশ নেই দম ফুরাইছে – এই ধরনের কথা উঠে গেছে। এটা শুধু বাইরে বা বিরোধী শিবিরে নয়, খোদ বিজেপি বা আরএসএসের ভেতর থেকেও কাছাকাছি এমন সমালোচনা ওঠা শুরু হয়েছে। যেমন বিজেপি বা আরএসএসের যারা সরকারের বাইরে আছেন বা বয়স্ক, এমনদের সাথে মোদির মন্ত্রীদের প্রকাশ্য বাদানুবাদ, মিডিয়ায় লিখিত সমালোচনা পাল্টাপাল্টি শুরু হয়ে গেছে। এসব সমালোচনার সারার্থ হল, ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদি আর পপুলার প্রার্থী নন, তিনি জিতবেন না। সাধারণ মানুষও হতাশ হয়ে পড়েছে।

মোদির সরকারের আয়ু আড়াই বছর কেটে যাওয়ার পর নোট ডি-মনিটাইজেশন কালের আগ পর্যন্ত তিনি অবশ্যই জনপ্রিয় ছিলেন, যেটা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কম সময়ে দেখা গেছে। এসব সময়গুলোতে মিডিয়ায় প্রায়ই তিনি তার ‘৩৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি আছে’ অর্থাৎ তিনি শক্ত ও ক্ষমতাশালী মানুষ – এভাবে রেফারেন্স দিয়ে কথা বলতেন। সে কথা এখন মনে করিয়ে দিয়ে অনেকেই একে পাল্টা ঠাট্টার প্রসঙ্গ হিসেবে তুলছেন যে, মোদির সেই ছাতি এখন কোথায় গেল। তবুও এসব বিচারে এখন আর পরিস্থিতি যাই হোক, অনেকগুলো বিচারে তিনি যে জনপ্রিয় ছিলেন তা মানতেই হয়। অবশ্য আবার ব্যতিক্রম এই যে, বিহারেসহ কিছু রাজ্য-নির্বাচনে ছাড়া প্রায় সব নির্বাচনেই মোদির দল নিয়মিত জিতে আসছিল। এই অর্থেও তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। অপর দিকে সরকারের বিরুদ্ধে তেমন দুর্নীতির বড় অভিযোগ ছিল না, এই বিচারে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। অর্থনীতিবিষয়ক নীতি বা আইনে বড় বড় সংস্কার তিনি খুবই দ্রুততার সাথে এনেছেন, প্রচুর বিনিয়োগ এনেছেন; জিডিপি অর্থে অর্থনীতিতে অগ্রগতি এসেছিল, বিদেশের বাজারেও তিনি শোরগোল তুলতে পেরেছিলেন যে, ভারত একটা ‘রাইজিং অর্থনীতি’।

মোদির সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে তাতে ভুল হয়েছে বা কিছু ভুল আছে এমন মনে হলে তিনি কোনো কোনো সময় সহজেই আগে নেয়া কোন সিদ্ধান্ত রদবদল করে নিতে পারতেন। এমন সক্রিয়তা তার সরকারের ছিল। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হবে, প্রবল হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা বিজেপির ‘ঘর ওয়াপসি’ ( ধর্মীয়ভাবে কনভার্টেড হিন্দু মানুষকে আবার হিন্দুতে বা  ঘরে ফিরিয়ে আনা) কর্মসূচি। বিজেপি দলের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরুর পরে সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ভারতের ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটি থেকে। এই কর্মসূচির অর্থ যারা ক্রিশ্চিয়ান হয়ে গেছে এদের আবার হিন্দুধর্ম পালনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রপাগান্ডা করা। যদিও বাস্তবে এর সারকথা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল চার্চ বা চার্চসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিজেপির হামলা ও আক্রমণ। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে নানান সময় হিন্দু বা মুসলমান কমিউনিটি আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানরা কখনো নয়। তবে দুনিয়ায় যে ক্রিশ্চিয়ানরা রুল করে, সেদিন আরেকভাবে তা বোঝা গিয়েছিল। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ওবামা ভারতে এসেছিলেন। ওবামা এ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তবে পাবলিকের অপ্রকাশ্যে। তবে ফিরে গিয়ে তিনি ‘ঘর ওয়াপসি’  নিয়ে সরাসরি ভারত সরকারের কঠোর না হলেও হুঁশিয়ারি ধরনের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন।

আমেরিকানদের কমন যে কথা তারা বলে থাকে, এটা ‘প্লুরালিজম (Pluralism) বা বহুত্ববাদি মতামতের সমাজ হলো না’; সে কথাসহ ওবামা আরো কিছু কথা তুলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, আর তাতেই কাজ হয়েছিল। ওবামা বলেছিলেন – এ কাজ ভারতের ‘রাইজিং ইকোনমির’ আকাঙ্খা সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতেই সরকারের টনক নড়েছিল। ফলে এর কয়েক দিন পরই মোদি ধর্মীয় সহনশীলতা বিষয়ে তার সরকারের (বিজেপির নয়) নীতি ঘোষণা করেছিলেন। কেরালা-ভিত্তিক এক শতবর্ষী পুরনো চার্চের (তবে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত) এক ধর্মীয় নেতার স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে, সেখানে। মনে রাখতে হবে মোদি সেকুলার নন, বরং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক। তাহলে ক্রিশ্চিয়ানিটিকে জায়গা দিয়েছিলেন তিনি কী করে? তিনি সেকুলারিজম প্রসঙ্গে সোজা আমেরিকান অবস্থান নিয়েছিলেন। সেটা হল, ইউরোপ যেখানে বলে রাষ্ট্র ও ধর্মের তথাকথিত সেপারেশনের কথা, আমেরিকা এ প্রসঙ্গটা বলে উল্টা করে। বলে, মানুষের ধর্ম পালনের অধিকার একটা মৌলিক অধিকার। ফলে যেকোনো নাগরিক মাত্রই তার ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা করা আমেরিকা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

সারকথায়, মোদি ঠিক এভাবেই, এটা তার সরকারের নীতি বলে ঘোষণা করেছিলেন সেখানে। স্বভাবতই তাতে বিজেপি দল এরপর সরকারের নীতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল, যদিও সেটা হার স্বীকার করে নয়, বরং চুপচাপ ও ধীরে ধীরে। অপর দিকে এরপর আবার উত্তর প্রদেশের নির্বাচনকে মাথায় রেখে, গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আর মাংস বহন নিয়ে দাঙ্গা, পাবলিক ন্যুইসেন্স ও হয়রানি চরমে উঠিয়েছিলেন মোদি। কিন্তু তবু সরকারের জনপ্রিয়তা এসবের কারণে তেমন কমেনি যতটা প্রথম বিরাট ধাক্কা হিসেবে এসেছিল – নোট বাতিল বা ডি-মনিটাইজেশন। বলা যায়, মোদির জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে সেটাই প্রথম সবল আঘাত। যদিও প্রথম ৯ মাস তিনি সেটা অস্বীকার করে চলতেন। প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিলেন যে ডি-মনিটাইজেশনের কারণে ভারতের অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। কিন্তু বিশেষ করে দুটো প্রমাণ বা নির্ণায়ক মোদিকে আর পরিস্থিতি লুকিয়ে রাখতে দেয়নি। এর প্রথমটি হলঃ সাধারণভাবে ডি-মনিটাইজেশনের পদক্ষেপ সঠিক ও সফল হয়েছিল কি না তা মাপার একটা নির্ণায়ক আছে। তা হল, বাজারে ছাড়া থাকা বাতিল নোটের কত পার্সেন্ট পাবলিক বদলে নিয়ে গেল সেই গণনা। মোদির টার্গেট ও আশা অনুমান ছিল এটা ৮৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। যার তাৎপর্য হল, বাকি ১৫ শতাংশ নোট হবে সে ক্ষেত্রে আয়কর না দেয়া আয় ধরে রাখা হয়েছে এই নোট। এছাড়া কিছু নকল নোটও হয়ত, যেটা ধরা পড়ার ভয়ে তা বদলে নিতে ব্যাংকে কেউ আসেনি। আর ওই ১৫ শতাংশ নোটের অর্থ এটাই হবে সরকারের নীট অর্জন। কারণ এতে বাজারে ছাড়া থাকা আগের মোট নোটের ১৫ শতাংশ সরকারকে আর ফেরত বা বদলে দিতে হলো না। এটাই ডি-মনিটাইজেশনের সাফল্য।

মোদি সরকার তাই বদলে দেয়া নোটের মোট পরিমাণ কত, এত তথ্য বাজারে প্রকাশে যত সম্ভব দেরি করেছিল। ফেরত আসা নোটের মোট হিসাব এখনো জড়ো করা যায়নি এই অজুহাতে। অবশেষে ৯ মাসের মাথায় জানাজানি হয়েই গেছিল যে ফেরত আসা এই নোটের পরিমাণ প্রায় ৯৯ শতাংশের কাছাকাছি। যার সোজা অর্থ ডি-মনিটাইজেশন ও এর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে গেছে। স্বভাবতই মোদি সেটা টের পেয়ে আগে থেকেই গোলপোস্ট সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। তিনি দাবি করতে শুরু করেছিলেন, আসলে কালো টাকা উদ্ধার নয়, নগদ টাকায় লেনদেন কমানো নাকি ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। কিন্তু কেন ডি-মনিটাইজেশন ব্যর্থ হল, পণ্ডিতদের মধ্যে এনিয়ে জবাব একটাই দেখা গেছে। তা হলো ‘জনধন’ প্রকল্প। এটা মোদি সরকারের ঢাকঢোল পিটিয়ে করা এক প্রকল্পের নাম। যা সারকথায় বললে, প্রান্তিক আয়ের মানুষেরও একটা ১০ টাকায় খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। যেমন এই একাউন্ট থাকলে, বিশেষত চাষিকে কোনো সরকারি ভর্তুকি বা এমন কিছু পৌঁছাতে সরকার সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে এতে। সরাসরি যোগাযোগ আর সঞ্চয় এটাই ছিল ‘জনধন একাউন্ট খুলানোর’ মূল লক্ষ্য। কিন্তু বলা হচ্ছে, এটাই ডি-মনিটাইজেশনকে ব্যর্থ করেছে। কারণ, গরিব মানুষ বড়লোকের আয়কর না দেয়া কালো টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে রেখে সাদা করে দিয়েছে কমিশনের লোভে ও বিনিময়ে। এ কথার একেবারে সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করা মুশকিল, তবে এখন পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।

তবে ব্যাখ্যা যাই হোক, বাস্তবতা হলো ৯৮ শতাংশের বেশি বাতিল নোট ফিরে আসায় সব কিছুই আসলে ব্যর্থ প্রমাণিত। (বাতিল হওয়া ৫০০-১০০০ টাকার নোটের প্রায় ৯৮.৯৬ শতাংশই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে ফেরত এসেছে।) অথচ নোট বদলনো নিয়ে  সারা ভারতে গণ-দুর্ভোগের অন্ত ছিল না, বিশেষত গরীব স্বল্প আয়ের মানুষদের ক্ষেত্রে ও তাদের আয় রোজগারে।  অপর দিকে দ্বিতীয় নির্ণায়ক কী? যা দিয়ে এই ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছিল?
মোদির আগে টানা দুই টার্মে ১০ বছর (২০০৪-১৪) ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেসের জোট সরকার। কংগ্রেস তার প্রথম টার্মের পর থেকে ভারতের অর্থনীতিকে এই প্রথম রাইজিং অর্থনীতিতে ডাকা শুরু হয় গ্লোবাল জগৎ থেকে। যেমন, ২০০৯ সাল থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের পাল্টা গ্লোবাল উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ততকালে চিহ্নিত ‘রাইজিং ইকোনমির’ পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক উদ্যোগ, ভারত যার অন্যতম। কিন্তু আবার সেকেন্ড টার্মে জিতে এসে ওর মাঝামাঝি সময়ে, ঠিক মোদি সরকারের মতই আড়াই বছরের মাথায় ভারতের জিডিপি নেমে ৫ শতাংশের কাছে চলে গিয়েছিল। অথচ কংগ্রেস দ্বিতীয়বারেও জিতে সরকার গড়েছিল ভোটের বাজারে আগের টার্মের চাঙ্গা অর্থনীতি দেখিয়েই। এ কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদি নির্বাচনী ইস্যু করেছিল ‘কাজ সৃষ্টি’ এই বক্তব্যকে ঘিরে; মোদির ভাষায় ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’। আর এতেই কংগ্রেসের ওপর হতাশাগ্রস্ত মানুষ (এখানে এই মানুষ বলতে গরিব বেকার থেকে ২০ হাজার রুপির চাকরি করা মধ্যবিত্ত পর্যন্ত) সবাই আবার আশায় বুক বেঁধেছিল যে, মোদি হয়তো অর্থনীতিকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। এটাই ভোটের ফলাফলে ধরা পড়েছিল, মোদি ক্রেজ, উত্থান এখান থেকেই। অর্থাৎ ভারতের অর্থনীতিতে জিডিপির অর্থ সমাজের সাধারণ মানুষের কাছেও ট্রান্সলেটেড বা অর্থপূর্ণ। এমনিতে ‘বিকাশ’ শব্দের সমতুল্য অর্থ ‘উন্নয়ন’। আমরা যেটাকে ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ বলি। যার আসল অর্থ ‘অবকাঠামোতে বিনিয়োগ’। স্বভাবতই অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হল যে এটা ইন্ডাস্ট্রিজ বা নতুন কাজ সৃষ্টির জন্য পূর্বশর্ত। যদিও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ঘটার পরে আবার শিল্পে আলাদা বিনিয়োগ (ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) লাগবে, তবেই মূল ‘কাজ সৃষ্টি’ হবে বলে মনে করা হয়। তাই ভারতে হিন্দিতে বিকাশ শব্দের অর্থ আমাদের চেয়ে অনেক সোজাসাপ্টা। এর অর্থ উন্নয়ন হলেই শেষ না, বরং ইন্ডাস্ট্রিতে মূল কাজ সৃষ্টি করতে হবে, এই অর্থে বিকাশ।

তাহলে এখন কথা স্পষ্ট। ডি-মনিটাইজেশনের পর থেকে ৯ মাসের মধ্যে চলতি বছরের দ্বিতীয় তিন মাস (এপ্রিল-জুনের)  যখন ভারতের প্রকাশিত জিডিপি ফিগার হাজির হল, দেখা গেল সেটা ৫.৭ শতাংশে নেমে গেছে (অথচ এটা মোদির আমলেই ৭.৫% থেকে ধীরে ধীরে এজায়গায় নেমে আসা)। তখন থেকে ডি-মনিটাইজেশনের নেতিফল মোদি আর লুকিয়ে বা অস্বীকার করে থাকতে পারেননি। আর ভোটের বাজারে এই তথ্যের তাৎপর্য হল, তাহলে ২০১৯ সালে মোদি আর দ্বিতীয়বার জিতে আসতে পারছেন না, এরই স্পষ্ট ইঙ্গিত এটা।

আগেই বলেছি, এসব তথ্য ইতোমধ্যে সাধারণ্যে হতাশা নামিয়েছে। শুধু তাই নয়, গ্লোবাল বাজারেও এই খবর হতাশার হয়ে পৌচেছে। আর দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলেরা এটাকে তাদের নিজেদের জন্য ক্ষমতা পাবার ইঙ্গিত বলে দেখছে।

অপর দিকে বিজেপি-আরএসএসে গৃহদাহ শুরু হয়েছে। কিন্তু বিরোধী বলতে কি কংগ্রেস? না এখানে কংগ্রেসের জায়গায় ‘আঞ্চলিক দলগুলোর জোট’ পড়তে হবে। যেমন মমতার পশ্চিম বাংলা, আর ওইদিকে বিহার ও উড়িষ্যা তো বটেই, আরো এমন আঞ্চলিক দলগুলোর জোট কংগ্রেসের চেয়ে পপুলার সম্ভাবনার দল হয়ে আছে বলে ধরা হচ্ছে। তবে কংগ্রেস যেভাবে যে কোন এক আঞ্চলিক  দলের চেয়েও তুলনায় গুরুত্ব হারিয়েছিল, সেখান থেকে এর রেটিং কিছুটা ওপরে উঠেছে এখন। আগামী মাসে মোদির শহর গুজরাটের রাজ্য-নির্বাচন, সেখানে কংগ্রেসের কোলে সাফল্য আসতেছে বলে কথা বাজারে ভাসছে এখন। অপর দিকে একাডেমিক পরিসরে ও মিডিয়ায় এ কথা আলোচনা শুরু হয়েছে যে, আগের মনমোহন সরকারের চেয়ে মোদির অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স খারাপ, কেউ কেউ এই তুলনা ও দাবি করা শুরু করেছে। তর্ক শুরু হয়েছে একথা কত সঠিক তা নিয়ে। (The policies, such as demonetisation and restriction on cattle markets, are the result of Modi government’s flawed understanding of economics.) বোঝাই যাচ্ছে, মোদির কপাল পুড়েছে।

ভারতের বাইরে গ্লোবের এই আঞ্চলিক এলাকায় প্রভাব হিসেবে সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে যদি বলি আমাদের জন্য কাম্য হবে ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোর কোন জোট সরকার জিতুক, সরকার গঠন করুক। ফলে স্বভাবতই আগামী মাসের নির্বাচন থেকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা নির্বাচনের দিকে বাংলাদেশের চোখ পড়ে থাকবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

গৌতম দাস

২৬ জুলাই ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gz

 

কখন কোন জিনিষ যে কার প্রতীক হয়ে উঠে বলা মুশকিল। যেমন, ভারতের গরু প্রীতি ও পূজা। এটাই এখন ভারতের হিন্দুত্ব-ভিত্তিক রাষ্ট্র ও মোদির বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি দুটোরই মুখ্য প্রকাশ ও প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই মাস আগে গত ২৫ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি, ভারতের গ্রাম বা শহরের কোন হাট-বাজারে  জবাইর উদ্দেশ্যে নিয়ে গরু কেনাবেচা করা যাবে না; এটা নিষিদ্ধ বলে এক আইন জারি করেছিলেন। গরু কেনাবেচার আগে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে এক কমিটি বিস্তর ফর্ম পুরণ করে নেয়, তাতে প্রায় শপথ করিয়ে নেওয়ার মত যে ঐ গরু জবাই করার জন্য কেনাবেচা হচ্ছে না; কৃষিকাজ বা অন্যকিছুর জন্য কেনাবেচা হচ্ছে। সেই আইনে (ঐ আইনের এক পিডিএফ কপি আগ্রহিরা এখানে দেখতে পারেন) গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সমাজের এর প্রবল প্রভাব পড়েছিল মুখ্যত  দুই জায়গায়। চামড়া ও মাংস সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ দিনের সব ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে (রপ্তানি বাণিজ্যসহ) এবং এসব সংশ্লিষ্ট কসাইসহ নানান পেশাজীবিদের জীবনে। আর অপর সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া হয়েছিল যে, এক পাবলিক লিঞ্চিং উন্মাদনা দেখেছিল সারা ভারত। পাবলিক লিঞ্চিং যাকে আমরা গণপিটুনি, হাটুরে মার ইত্যাদি বলি। যার সার কথা হল মানুষ খেপিয়ে কাউকে কাউকে বিচার বহিবহির্ভুতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অথবা আরএসএসের সমর্থক হিন্দুত্ববাদী নানান ব্রান্ডের সংগঠনের সদস্যদেরকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয় এই আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কী না এর তদারকি বা ভিজিলেন্সের নামে। স্বভাবতই গরু অথবা মাংস নিয়ে চলাচলকারি কেউ এদের হাতে পড়লে সে পাবলিক লিঞ্চিং তাণ্ডবের শিকার হবেই। ভিজিলেন্স শব্দটা ইংরাজি পত্রিকা আর মোদির বক্তৃতার ভাষ্য থেকে এসেছে।  মোদির ঘোষিত জবাই নিষিদ্ধ আইন বাস্তবায়িত কারি দলীয় ক্যাডারদের ভাষায় এই ভিজিলেন্স টিমের সদস্যদের আদর করে এরা ‘গোরক্ষক’ ডাকত। এই নামে তারা শুরুতে হাজির হয়েছিল। এক কথায় বললে, এরা ছিল এক ফ্যাসিজমের তাণ্ডব বাহিনী। ‘আইনকানুন হীনতা’র এক চরম প্রকাশ। এতে যে কেউ যখন তখন একদল লোকের হাতে পরিকল্পিতভাবে আক্রান্ত, নিগৃহীত বা নিহত হয়ে যেতে পারেন; বিশেষ করে তিনি যদি মুসলমান নাগরিক হন অথবা কোনো মুসলমান ধর্মীয় চিহ্ন শরীরে প্রকাশিত থাকে। ভারতের নিউজ টিভিমিডিয়া এনডিটিভির হিসাবে গত ২২ মাসে ১৭ ব্যক্তি হত্যা অথবা আক্রান্ত হয়েছে এই গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স টিমের হাতে। প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ভিতর বসে থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় নাই, নিহত হয়েছেন।

গত দুই মাস ধরে এই পরিস্থিতি চলে আসার পর এখন সাময়িক হলেও এক ইতিবাচক খবর হল, মোদির ওই আইন গত ১১ জুলাই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘স্থগিত’ ঘোষণা করেছে। এর সাথে সরকারি সলিসিটর জেনারেল আদালতকে জানিয়েছেন, সরকার আদালতে উঠা আপত্তিগুলোকে আমলে নিয়ে সংশোধিতরূপে আইনটা আবার চালু করবে।

এখানে আদালতের আদেশটা পরিস্কার করে বলা ভাল। এটা ছিল সুপ্রীম কোর্টের আদেশ। আর এর আগে গরুজবাই নিষিদ্ধ আইন প্রথমে মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ পেয়েছিল। সে আদেশ এরপর সুপ্রীম কোর্টে আপিলের জন্য এসে এবার সর্বভারতীয় স্তরে প্রযোজ্য বলে মোদির আইন স্থগিতাদেশ পেল। তবে এবার আদালতে উঠা আপত্তিগুলো আমলে নিয়ে পুরান আইনটাকেই ঝেড়েপিছে মোদি যে  আবার নতুন করে আনবেন এটা পরিস্কার।

শুরুতে বলেছিলাম, মোদির জবাই নিষিদ্ধ আইনটা ২৫ মে ২০১৭ চালু হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ১৯৬০ সালের একটা আইনকেই (Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960) নতুন করে মোদির হাতে ঝেড়ে মুছে হাজির করা আইন; ঠিক নতুন আইন নয়। অর্থাৎ বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আইনটা ১৯৬০ সালে কংগ্রেসের শাসন আমলে করা হয়েছিল এবং খুবই চতুরভাবে, পশুদের কষ্ট নিবারণের উদ্যোগ হিসেবে। ‘পশুদের অনেক কষ্ট, তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা করা হচ্ছে, মানুষ (মুসলমান) নিষ্ঠুর’ …… এসব বয়ানের আড়ালে এই আইন সেকালে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এখন কংগ্রেসের কাঁধে চড়ে মোদি সেটাতেই একালে নতুন শব্দ বাক্য সংযোজন করে নিয়ে বলছেন – জবাই করার উদ্দেশ্যে গরু কোনো হাটে কিনতে পাওয়া যাবে না; জবাইয়ের এর কাজে গরু কিনবে এমন কোন হাটবাজারই আর কার্যকর নাই অথবা নিষিদ্ধ।

এখন কথা হল, এই বছরে মোদি এই আইন করতে উৎসাহী হলেন কেন? অথবা আদালতে সদ্য স্থগিত হওয়া আইন আবার নতুন করে আপত্তিগুলো সামলিয়ে চালু করার তাড়া বা তাগিদ বিজেপির কেন?
এককথায় বললে, এর পেছনের মূল বিষয়, সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচন। সদ্য অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ঐ নির্বাচনে, গত মার্চ মাসে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছিল। ওই নির্বাচনের পর থেকেই বিজেপির নীতিনির্ধারকেরা বলা শুরু করেছিলেন ‘আমরা এতদিন যে নির্বাচনী ফর্মুলা খুঁজে ফিরছিলাম সেটা এবার পেয়ে গেছি’। যেমন গত ১৯ মার্চ আনন্দবাজার লিখেছিল, “বিজেপি সূত্রের মতে, এ বার উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, মেরুকরণের তাস খেলেই জাত-পাতের অঙ্ককে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া গিয়েছে। হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে একজোট করা গিয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে সেটিকেই আরও কাজে লাগাতে চাইছে দল”।  কিভাবে সেটা? বাইরে থেকে দেখতে শুনতে ভারতে হিন্সদু জনগোষ্ঠির সবাইকে একাট্টা হিন্দু মনে হলেও আসলে ভেতরে জাত-পাতের বিভক্তি, ছোঁয়াছুঁয়ি, ক্ষমতা কাঠামোতে অবস্থান ইত্যাদির বিভক্তিতে একাট্টা হিন্দু-স্বার্থ বলে ভোটের বাজারে সব না হলেও মেজরিটি ভোট এক জায়গায় করা বিজেপির জন্য সবসময় খুবই কঠিন কাজ মনে করা হয়ে এসেছে। এবং আসলেই তা কঠিন। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের মতো এত বড় অঞ্চল (ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ ৫৪১ টা এর মধ্যে একাই উত্তরপ্রদেশ ৮০ টি আসনের) যা নানা জাত-উপজাত, এর ওপর আবার রয়েছে মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সিতে (কোন কোন কনষ্টিটুয়েন্সিতে ৩০% পর্যন্ত মুসলমান ভোটার) এর বিভক্ত হয়ে থাকা।  উত্তর প্রদেশে এছাড়া আবার অব্রাক্ষ্মণ যাদব, মুসলমান, দলিত এবং  ব্রাহ্মণ ইত্যাদি সব বড় বড় ভাগের জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল আছে। এর মধ্যে মুসলমান বাদে অভিন্ন সব জাতের দল হিসেবে বিজেপিকে কেবল সব হিন্দুদের দল হিসেবে হাজির করার ফর্মুলাটাই বিজেপি খুঁজছিল। তাই বিজেপি এবার দাবি করছে যে তারা সেটা এবার পেয়ে গেছে। ফলে এরই প্রকাশ দেখেছি আমরা। তা হল, যেমন দাঙ্গাবাজ যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কিন্হতু এর চেয়েও তাতপর্লেযের ঘটনা হল সাথে উপ-মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন দু’জন। দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য এবং দীনেশ শর্মা। এদের একজন ব্রাহ্মণ আর একজন দলিত। অর্থাৎ সব হিন্দু্দের মধ্যেই কিছু না কিছু সুবিধা বা  ক্ষমতা বিতরণ, এটাকেই বিজেপি সম্ভবত ‘সেই ফর্মুলা পেয়ে যাওয়া’ মনে করেছিল। এটাকে বলা যায়, সব জাতের সব হিন্দু ভোটকে একই বিজেপি প্রার্থীর পক্ষে জড়ো করা, তারা এভাবেই উত্তর প্রদেশে জিতেছে- এটাই হল বিজেপির দাবি।

কিন্ততু বিজেপির এই দাবি সত্ত্বেও আমরা আগের মতোই বর্ণহিন্দুদের অত্যাচারে দলিতদের ধর্মান্তরিত হয়ে বৌদ্ধ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে আমরা দেখিনি।  বরং ওই নির্বাচনের পরেও তা বন্ধ হয়নি। দলিতদের পালটা সংগঠন ভীমসেনার ততপরতা নিয়ে রিপোর্টটা দেখুন।   তবু বিজেপির উপলব্ধি হল, এটা তাদের জন্য গরু রক্ষার রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব উথাল পাথাল করে ফেলার সময়। এতে সহজেই মুসলমানকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে ভোটবাক্স ভরাট করার রাজনীতি খোলাখুলি করতে হবে। এই বিচার থেকেই এখন গরু জবাই নিষেধ বা হাটে গরু কেনাবেচা নিষিদ্ধের আইন; মোদিকে এমন আইন চালু করতে হয়েছিল। বিশেষ করে এখন ছয়টা রাজ্যসরকার বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড। এসব এলাকায় আইনের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এই ছয় রাজ্যকে চিহ্নিত করেছে যাতে এখানে বাড়তি কিছু পদক্ষেপ আদালত নিতে বাধ্য করতে পারে ভিজিলেন্সের বিরুদ্ধে। আদালতে আইনটা স্থগিত হয়ে এক্সাবার পরও এবার আনন্দবাজার লিখছে, “গো-রক্ষকদের তাণ্ডব কী করে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে কেন্দ্র ও ছ’টি বিজেপি শাসিত রাজ্যের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট”।

তার মানে সবখানে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল জবাই নিষিদ্ধ আইন স্থগিতের আগে অথবা পরে, তা হল ‘ভিজিলেন্স’। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলের ভিজিলেন্স টিম আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাবলিক লিঞ্চিং (গণনির্যাতন) শুরু করাতে এটা এমন বড় হইচই সৃষ্টি করে যে, এনডিটিভির মতে, গত ২২ মাসে ১৭ জন নিহত বা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উপায়ন্তর না দেখে ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী মোদি তখন নিজেই ভিজিলেন্সের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করা শুরু করেন। নিজেই এদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি, নিন্দা শুরু করে দেন। হাত-পা ধুয়ে ফেলা শুরু করেছিলেন। এছাড়া গত ১৬ জুলাই দ্বিতীয়বার তিনি একইভাবে এসবের বিরুদ্ধে আবার হুঁশিয়ারি দেন।   কারণ ততদিনে আদালতে তিনি হেরে গেলেছে ফলে সর্বদলীয় বৈঠক করছেন। মূলত  রাস্তায় রাস্তায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর সদস্যকে হয়রানি জনমত বিগড়ে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে সাহায্য করেছিল। আর ঠিক এ সময়ই সুপ্রিম কোর্টে শুনানিগুলো চলছিল বলে আদালতের পরিস্থিতি জবাই নিষিদ্ধ আইনটির বিপক্ষে চলে যায়। ওদিকে আদালতে শুনানি চলাকালে তথাকথিত ভিজিলেন্স কমিটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কার দায়িত্ব? কেন্দ্র না রাজ্য- এই প্রশ্নে মোদি সরকার দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাজ্যসরকারের, কেন্দ্রের নয়। এই কথা বলে নিজের দায় এড়ানোর সুযোগ করে নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এ কথা সত্যি, ভারতে প্রাথমিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কর্তব্য রাজ্যের। আর রাজ্য সেকাজ  নিজে না পারলে সে কেন্দ্রের কাছে বাড়তি ফোর্স চাইবে। তাতে কেন্দ্রীয় ফোর্স বাড়তি হিসেবে এলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায় আসলে রাজ্যের।

এদিকে সব ভিজিলেন্স টিমের তাণ্ডবের দায় আদালতের চোখ এড়িয়ে মোদি সরকার রাজ্যের ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হলেও আসলেই কি মোদি সরকার দায়শূন্য? হাত-পা ধোয়া?
একেবারেই না। কারণ প্রথমত, যাদেরকে ভিজিলেন্স টিম বলা হচ্ছে, যতই তাদেরকে উৎসাহী সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখানো হোক না কেন, এরা মূলত বিজেপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। কিন্তু তাতেো মোদির দায় কি অতটুকুই যে, মোদি বিজেপি দলের নেতা, তাই? না অতটুকু নয়, বরং ওই টুক দায়িত্ব মোদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফেলে দিতেই পারেন। কারণ ওর চেয়েও মোদির বড় পরিচয় হলো, উনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

মোদি প্রধানমন্ত্রী। এবং তার সরকারের আনা আইনের কারণেই এককভাবে মোদিকে ভিজিলেন্স টিমের জন্য দায়ী করা যায়। কিভাবে? মোদির ‘গরু জবাই নিষিদ্ধ’ আইনের পিডিএফ কপি নেটে পাওয়া যায়। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি। ঐ আইনে একটা শব্দ আছে Society for Prevention of Cruelty to Animals (SPCA)। এটাই এর প্রমাণ। আসলে এই আইন বাস্তবায়নের সময় জনসম্পৃক্ততার অজুহাতে একটা ‘গণকমিটি’ গড়ে নেয়ার কথা আছে যাদের কাজ হবে ওই আইন বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতা করা। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এলাকার জনগণ নিয়ে ওই SPCA গঠন করে নিতে হবে। আর বাস্তবে বিজেপির অঙ্গসংগঠনের লোকজন নিয়েই গঠিত হয় ওই SPCA কমিটি। আর এই কমিটিই কার্যত ‘ভিজিলেন্স টিম’; এভাবেই আইনটি বাস্তবায়নের সব ক্ষমতা দলীয় লোকদের হাতে।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার হবে। আমাদের দেশে সরকার যদি বলে, কাল থেকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নামবে আর তাদেরকে জনগণের পক্ষ থেকে সহায়তা করবে ছাত্রলীগ, এ কথা বললে যা হবে তাই হয়েছে ওখানে। আর স্বভাবতই গণপিটুনির নামে ওখানে লীগের পিটুনিই হবে।
অতএব, ওই আইনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এই ‘SPCA কমিটি’। এটাই কার্যত সেই পাবলিক লিঞ্চিং কমিটি। ভারতের একজন একাডেমিক শিক্ষক লিখছেন, Public lynching, a barbaric form of political expression, seems to have become the new norm in India since the Modi government came to power at the centre. কিন্তু মোদি যদি আইনেই ওই লিঞ্চিং কমিটি গড়ার বৈধ ব্যবস্থা রেখে দেন, তবে পিটুনি ঠেকাবে কে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৫ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার

গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-2go

 হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গড়া ও দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হল ভারত। এই রাষ্ট্র গঠনের সময় মনে করে করা হয়েছিল যে, বিভিন্ন প্রাদেশিক বৈশিষ্টে বিভক্ত রাজ্যের (এখন ২৯ রাজ্যে বিভক্ত) ভারতকে ‘হিন্দুত্ব’ এই আঠা না থাকলে একে এক রাখার আর কোনো উপায় নেই; এই ধারণাটা ভুল যদিও। ভারতের উগ্র হিন্দুসমাজ মুসলমানসমাজকে নিজের অধীনে আনা ও চাপে রাখার জন্য কী না করতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এরই আদর্শ নমুনা। ভারতে গরুর (মহিষ উট গবাদিসহ সব পশু) গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ। [The notification covers bulls, bullocks, cows, buffaloes, steers, heifers and calves, as well as the camel trade.] মানে, বেচাবিক্রি, জবাই ও খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য হল, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে আধিপত্যে থাকা সংখ্যাগুরু কমিউনিটির পছন্দসই বিধিব্যবস্থার অধীনে মুসলমান কমিউনিটিকে আনা, দাবড়ানো। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নয়, জারি করা হয়েছে এক অদ্ভুত কায়দায়। কংগ্রেসের নেহরু আমলে তারা এর প্রথম কায়দাটা বের করেছিলেন। তা হল ভারতীয় রাষ্ট্র “পশু-প্রেমী” হয়ে গিয়েছিল। তারা ‘প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেল অ্যাক্ট ১৯৬০’ নামে এক আইন পাস করে ফেলেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য ‘সোসাইটি ফর প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেলস’ নামে সমিতি গড়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মুল কথা ছিল, “পশুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যথা বা কষ্ট দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা করা যাবে না” এর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এই আইনটা লেখা হয়েছিল। আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব জায়গায় একই কথা বলা হয়েছিল যে, ‘পশুকে অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও কষ্ট দেয়া রোধ’ করাই উদ্দেশ্য। আইনটি কেমন তা বোঝার সবচেয়ে ভালো এক উপায় হল, এতে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ লক্ষ করতে হবে। যেমন ‘পশুর কল্যাণ, ‘পশুর ব্যথা’, ‘পশুর কষ্ট’, ‘পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ বোধ বা অনুভূতিগুলো (ফলে শব্দগুলো) আসলে মানুষের, মানুষ সম্পর্কিত। কিন্তু সেগুলোকে অবলীলায় পশুর ওপর প্রয়োগ করে ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর এখানে সবচেয়ে তামাশার শব্দ হল, ‘পশুর কল্যাণ বা ওয়েলফেয়ার’। বিগত ১৯৬০ সালের ভারতে তো বটেই, এখনকার ভারতেও কোনো কোনো আম-মানুষের অবস্থা এমন যে, পশুর ওপর তো বটেই, আপন সন্তান বা স্ত্রীসহ পরিবারের আপন সদস্যদের ওপর “ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা” দেখানো ছাড়া নিজের পেটের ভাত জোগাড়ের আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ সেই দেশে মানুষের বদলে পশুর ওয়েলফেয়ার নিয়ে আইন করা হয়েছিল, চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। আসলে আইনটি করেছিল অবস্থাপন্ন শ্রেণী। করেছিল মুসলমান কমিউনিটিকে হেয় করে দেখাতে যে, তারা ‘ব্যথা ও কষ্ট দিয়ে বা নিষ্ঠুরতা করে’ গরুর গোশত খায়। অতএব এটা বন্ধ করতে হবে। এক কথায় একটা ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছিল। তবে অবশ্য এটা ছিল এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি-কিক, এক পরোক্ষ আইন। কারণ এই আইনের সেকশন ২৮-এ এক ফাঁকে একটা ছাড় দেয়া ছিল। [Section 28 of the Act 1960, mandates that “nothing contained in this Act (1960 Act) shall render it an offence to kill any animal in a manner required by the religion of any community.”]। বাংলা করলে বলা হয়েছিল, “কোনো কমিউনিটির ধর্মীয় আচার হিসেবে বিধান মতে যদি জবাই করা হয়, পশুকে ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়, তবুও সে ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না”।

কিন্তু গত ১৯৬০ সালের সেই আইনের ওপরে এবং সেই আইনের সীমার মধ্যে থেকে নতুন করে দু’টি বিধি তৈরি করেছে মোদি সরকার। এর একটা হল,
Prevention of Cruelty to Animals (Regulation of Livestock Markets) Rules, 2017, &
Prevention of Cruelty to Animals (Care and Maintenance of Case Property Animals) Rules, 2017

সোজা বাংলায় বললে, প্রথমটা মুল অর্থ হল, পশুর হাট বা মার্কেট ভেঙে দেয়া। অর্থাৎ জবাই করার উদ্দেশ্যে মার্কেটে থেকে কোন পশু কেনা অথবা বেচা যাবে না- এরই আইন এটা। কারণ দেখা গেছে, প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে জবাইয়ের গরুটা হাট/মার্কেট হয়ে আসে। তাই প্রথম আইনটার ২২ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো পশু কোনো মার্কেটে তোলা, কেনাবেচা করা যাবে না’। [22 (iii) stating that the cattle has not been brought to market for sale for slaughter;] আর সাথে এই কথাটাই হাটে যে কোন গরু উঠানোর পর  ‘রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে আর সেখানে শপথ করে বলতে হবে” ইত্যাদি তো আছেই। আর দ্বিতীয় আইন হলটা হল কেয়ার মেন্টেনেন্স না করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সেসব সংক্রান্ত।

হাটে পশু উঠবে, রেজিস্ট্রেশন হবে, কানে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার লাগবে, কেনাবেচা হবে; তবে তা কেবল পশু কৃষিকাজের ব্যবহারের উদ্দেশ্য। গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতা এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেবল হাটে গরু বেচা ও ক্রয় করতে পারবে।  তাহলে মূল কথাটা হল,  গরুর গোশতের জন্য গরু কেনাবেচা করা যাবে না। এমনকি পশু মারা গেলে বা পশু অসুস্থ হয়ে মরা অথবা আয়ু শেষে মরা যা-ই হোক, সব ক্ষেত্রেই মরা গরু একেবারে সোজা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন ভাবেই মরা গরুর বা মারা গরুর চামড়া ছিলানো যাবে না। অথবা মারা বা কাটা গরুর হাড়গোড়সহ কোনো অবশেষই সংগ্রহ ও বিক্রি করা যাবে না। চামড়াও বিক্রি করা যাবে না।

এই হলো মোটা দাগে আইনটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া যেখানে দেখা যাচ্ছে শুরু থেকেই এই আইনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবোধক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায়, “পশুর উপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর” নামে কংগ্রেস আমলেই মুসলমানের প্রতি বৈষম্যটা করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্বলভাবে। আর সেটাকেই এখন সবলভাবে করতে চাইছেন বিজেপি-আরএসএসের নেতা মোদি। গত ২৩ মে গেজেটেড বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন আইন সম্পর্কে মোদি সরকার সবাইকে “নোটিফাই করে” জানিয়েছে। আর এই আইন জারি করে তা সেই পুরনো আইনের ওপর দাঁড় করানো বলে এটা কংগ্রেসকেও বেকায়দায় ফেলতে পেরেছে, যাতে কংগ্রেস মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে থেমে যায়। কারণ তাতে ১৯৬০ সালের নেহরুকেই সমালোচনা করা হয়ে যায়। আবার ‘পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানো’র নামে এবার সবলভাবে ইসলামবিদ্বেষটা মোদি সফলভাবে দেখাতে পারেন। তবে আরো কারণও আছে।

একটা কথা পরিস্কার রাখা দরকার। এতদিন গরু জবাই দেয়া, বেচাকেনা ও খাওয়া সম্পর্কে যেসব খবর আমরা শুনে আসছিলাম তা কেন্দ্রীয় বা মোদি সরকারের কোনো আইন ছিল না। এমনকি ২০১৫ সালে মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফকে ‘বাংলাদেশের গরু খাওয়া বন্ধ করা’র যে তাতানো বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটাও আসলে মন্ত্রীর অনধিকারচর্চা ছিল। কারণ গরু জবাই বন্ধ করা কেন্দ্রের বা রাজনাথদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন ছিল না, আবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারেরও কোনো আইন ছিল না সেটা। তবে দুই বছর আগে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখানে এ আইন পাস করা হয়েছিল। আর তা সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছিল বা বিজেপি প্রচার করেছিল। এজন্য এটা যে কোন কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর জন্য অনধিকার ছিল।  তবে এবার প্রথম কেন্দ্র নিজেই আইন জারি করা হলো। কিন্তু এতে বিভিন্ন অ-বিজেপি রাজ্যসহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকেও বিরোধিতা প্রবল হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজ সংশ্লিষ্ট এই বিষয় ‘রাজ্যসরকারের এখতিয়ার’ এমন দাবি বা এই প্রশ্ন উঠিয়েছে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। কথা সত্য ইস্যুটায় রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিবার এক্তিয়ার।  মমতা ব্যানার্জি এই আইনকে কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্য রাজ্যকেও তারা আপত্তি তোলার আহ্বান রেখেছিলেন। শেষে গত ২ জুন ‘মোদির সেনাপতি’ অরুণ জেটলি বলেন, ‘নতুন বিজ্ঞপ্তি রাজ্যসরকারের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়।’ দৈনিক আনন্দবাজার এই কথার অর্থ করেছে, ‘গবাদিপশু জবাইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাজ্যের হাতেই থাকছে’। মোদির খাস লোক তার অর্থমন্ত্রী জেটলির মন্তব্যের একটা ব্যাখ্যা আনন্দবাজার হাজির করে বলছে, ‘এখন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, তাতে রাজ্যের আইনে হস্তক্ষেপ হচ্ছে না। এটি শুধু গবাদিপশুর কেনাবেচার স্থানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। কৃষকেরা গবাদিপশু শুধু বাজারে বেচতে পারবেন নাকি বাজারের বাইরে থেকেও কেনা যাবে, বিজ্ঞপ্তি শুধু সেটি নিয়েই। কিন্তু তাদের জবাই করার জন্য রাজ্যের আইনই বলবৎ থাকবে”।

কিন্তু আইনগত দিক থেকে মোদির এই আইন কি আদালতে টিকবে, নাকি কনস্টিটিউশনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বাতিল হয়ে যাবে? গুজরাটের হাইকোর্টের (ময়ূর) বিচারপতি গোমূত্র পানে ও প্রশংসায় বেহুঁশ, তা আমরা জেনেছি। কিন্তু শক্ত তর্ক উঠেছে দক্ষিণে তামিলনাড়–তে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চে। সেখানকার রিট পিটিশনের পয়েন্ট খুবই শক্তিশালী। যেমন তারা বলছেন, “নতুন আইনটা প্যারেন্ট আইনের বাইরে যেতে পারে না”। ১৯৬০ সালের আইনে যেকোনো কমিউনিটির ধর্মীয় শরিয়ত বা রিচুয়াল হিসেবে পশু কেনাবেচা, কোরবানি এবং গোশত খাওয়ার ওপরে এই আইন প্রযোজ্য করা হয় নাই, বাইরে ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছিল। কাজেই এখনও কেন্দ্রের কোনো এখতিয়ার নেই সেটা লঙ্ঘন করার। এ ছাড়া ভারতীয় কনস্টিটিউশনে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারবিষয়ক ২৫ ধারায় ‘অবাধে ধর্মপালন নাগরিকের অধিকার’ এবং ২৯ ধারায় ‘সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অধিকারই মোদির নতুন আইনে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া আর একটা পয়েন্ট আনা হয়েছে তা হলো, ভারতীয় কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১৯ (১)(জি) অনুসারে কোনো পেশার লোককে বেকার করে দেয়া যাবে না। এখানে কসাইসহ চামড়া ইত্যাদির প্রক্রিয়াজাত করা যাদের পেশা তাদেরকে কাজ-পেশাহীন করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটাও অভিযোগের একটি জোরালো যুক্তি।
ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও একটা জনস্বার্থ বা পাবলিক লিটিগেশনের মামলা হয়েছে। সেখানেও উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও একটা বাড়তি পয়েন্ট হল, পুরনো আইনের ১১ অনুচ্ছেদ। সেখানে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশু জবাইকে খাদ্য জোগাড় হিসেবে দেখা হয়েছিল, নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা হয়নি। তবে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া ও নিষ্ঠুরতা না করা সাপেক্ষে তা করতে হবে। তাই এবার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ১১ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেছেন আর সরকারকে জবাব তৈরি করে আসতে বলেছেন। এই মামলার বাদি হলো হায়দরাবাদের এক এনজিও, বাদির দাবি- মোদির দুই নতুন আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিতে হবে।

তবে আগেই বলেছিলাম মোদির আইনে ‘পশুর ওয়েলফেয়ার’ কথাটার সত্যিই বিষ্ময়কর। এক ধরনের ওয়েলফেয়ার সংগঠনের কথা আইনে অনেকবার রেফার করা হয়েছে। আর এটাই হল, বিজেপি- আরএসএসের লোকাল ‘পশুর ওয়েলফেয়ার কমিটি’ যাদের হাতে পশু ব্যবসায়ীরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং তারা পাবলিক লিঞ্চিং বা প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। আশা করা যায়, এ বিষয়গুলোও আদালত আমলে নেবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মোদির আইন দু’টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি তা হয়, তবে এটা ভারত রাষ্ট্রকে বাড়তি কিছু আয়ু দেবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৯ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্প-ভক্তিতে খুশি থাকা ভারতীয় হিন্দু মন এখন বিপদে

ট্রাম্প-ভক্তিতে খুশি থাকা ভারতীয় হিন্দু মন এখন বিপদে

গৌতম দাস

০৯ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2en


ঘটনা বহুবিধ এবং বেশ তামাশার! যেন সেই বহু পুরান প্রবাদ যে, দাঁত থাকতে কেউ দাঁতের মর্ম বুঝে না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প – তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী দাবিদার হয়ে বাজারে আসার পর থেকে এনিয়ে ভারতের বিজেপি শিবসেনা সমর্থক কিছু মানুষের খুশি ছিল দেখার মত। কেন? এতে ভারতের খুশি হবার জন্য আবার কী হল? ভারতের সরকারি ইঙ্গিতে প্রকাশিত অবস্থান ছিল তারা খুশিতে আহ্লাদিত। তাদের অনুমান ছিল যে ট্রাম্প ২০১৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে জিতার অর্থ হবে বিগত জুনিয়র বুশ আমলের (দুই টার্ম ২০০১-৮) মত ইসলাম কোপানো দাবড়ানোর – মজা আর মজা- আবার ফিরে আসবে। খালি মুসলিম ব্যাশিং, মুসলমান দেখলেই দাবড়ানো আর চাপে রাখার নীতি ফিরে আসতেছে। এমনকি ট্রাম্পের জয়লাভের পর এবং গত জানুয়ারি ২০১৭ সালেও তারা প্রচন্ড খুশি ছিল। সদ্য উত্তরপ্রদেশে যে কুখ্যাত দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী হলেন আদিত্যনাথ তিনিও খুশি শুধু না উনি আরও এক কাঠি সরেস। তা হল এই মুসলমান ব্যাশিং কোপানো ব্যান ইত্যাদি এগুলো করা ট্রাম্প নাকি শিখেছেন  তাদের দলের কাছ থেকে। আবার ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে যাওয়াতে মোদী সরকারের মধ্তেযেও এক ধরণের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল কারণ এটাকে  তারা পাকিস্তানের উপর আমেরিকার চাপ বাড়ানোর দিন ফিরে আসতেছে বলে দেখত।  ওয়ার অন টেররে ভারতের প্রপাগান্ডা গুলোও বেশ অদ্ভুত। এই যুদ্ধের শুরু যেন আফগানিস্তানের আলকায়েদা বনাম আমেরিকা – এখান থেকে শুরু নয়। মুল বিষয় যেন আলকায়েদা-বিরোধী আমেরিকার লড়াই নয়, সেই লড়াইয়ে পাকিস্তান যেন আমেরিকার হয়ে লড়বার, লড়ে দিবার ফ্রন্টাল রাষ্ট্র নয়। আফগানিস্তানে আলকায়েদার উত্থান ও ততপরতা যেন পাকিস্তানের কারণেই, পাকিস্তানের ইচ্ছায় শুরু হয়েছে বা পাকিস্তানই এসব কিছু করেছে, এটা ভাবতে ও প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসে। অথচ মূল ঘটনাটা হল আসলে, আলকায়েদা টাইপের রাজনীতির সঙ্গে আমেরিকার রাজনৈতিক লড়াই। পাকিস্তান-ইন্ডিয়া কাশ্মীর নিয়ে লড়াই ঝগড়া প্রক্সি যুদ্ধ সবই করছে। সেগুলো আমেরিকার ওয়ার অন টেররের বড় জোর আন্ডার কারেন্ট। যেটা ৯/১১ এর আগেও ছিল এখনও আছে।

আবার আমেরিকা তার এই ওয়ার অন টেররের লড়াইটা লড়তে চায় এক. প্রচ্ছন্ন এই বয়ানের আড়ালে যে শুধু আলকায়েদারা টেরিরিস্ট নয় মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট। দুই. ‘টেররিস্ট’ শব্দটা এনে এই যুদ্ধে নিজের দায়ভার উলটে সে মুসলমানের উপর দিতে চায় এবং ‘ওরা’ খারাপ – এই দায়ভারে অভিযুক্ত করতে চায়। এর উপর আবার একালে আমেরিকান নির্বাচনে এসে ট্রাম্প আরও এক উলটা গান ধরতে চায়।  তা হল, “মুসলমানেরা দুনিয়ায় গন্ডগোল করছে” এই আগাম অনুমিত বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে এইবার বলতে চায় যে, তাই ট্রাম্প মুসলমানেদের আমেরিকায় ঢুকা বন্ধ করে আমেরিকানদের জীবন সুরক্ষা করার পথে যেতে চায়। সেকারণে নির্বাচনে এক অভিনব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ট্রাম্প যে, সে নির্বাচিত হবার পর দুনিয়ার মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবে। প্রমাণহীন এসব বয়ানের বাস্তবায়নের ঝামেলা এবং এতে ট্রাম্পের বর্ণবাদ ছড়ানোর বিপদ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এই ধারণাকেই ছড়িয়ে  পপুলার করার পথ ধরেছিল কেবল ভোটের স্বার্থে।

এদিকেও ভোটে জিতে শপথ নিবার পর তিনি এককথার লোক এটা দেখাতে, তিনি তাঁর কথা টুইস্ট করে কথার ফাঁক তৈরি করেন।  তাঁর বয়ানে প্রথমত তিনি দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট –এই ধারণা যেন তিনি বজায় রেখেছেন এই ভাব ধরলেন ঠিকই কিন্তু এনিয়ে সিদ্ধান্তের সময় কেবল সাত রাষ্ট্রের (সারা দুনিয়ার না) মুসলমানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।  দ্বিতীয়ত, আবার ইমিগ্রেশনে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় যে কোন দেশের মুসলমান মাত্রই কার্যত তাঁর উপর এই নিষেধাজ্ঞা ইমিগ্রেশনে ব্যবহার করতে চাইলেন। তিন. তিনি ভাব ধরতে চাইলেন যে তাঁর এই সিদ্ধান্ত যেন আজীবনের। কিন্তু আদেশে যে তিনি লিখলেন এই সিদ্ধান্ত তিন মাসের। অর্থাৎ এটা সাময়িক। ব্যাপারটা নির্বাহী আদেশের মধ্যে “সাময়িক” তা বলে রাখতে চান এজন্য যে তাহলে আসলে যে “দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট” এবং “মুসলমানদের অমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করে দিলে আমেরিকানদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে” এর কোন প্রমাণ বা স্টাডি ট্রাম্পের কাছে না থাকলেও তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে কোন সাফাই তাকে দিতে হবে হবে না। কারণ তিনি বলতে চান এবিষয়ে আমেরিকান সরকারের নীতি কী হবে তা ঠিক করতে গিয়েই তার সরকার বুঝাবুঝির শেষ করার জন্য এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ তাঁর দরকার। এই ছিল ট্রাম্পের চাতুর্য ও সাফাই। আবার এই কাজটাও তিনি বর্ণবাদ ছড়িয়ে করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমান মাত্রই সে ‘অভিযুক্ত’ ও ‘টেররিস্ট’ – বয়ান  এমন বানানোটা তা বর্ণবাদী। তা হলেও এই বর্ণবাদ করার লোভ ট্রাম্প ছাড়তে চান না। এমনকি কোন মুসলমান আমেরিকান নাগরিক বা আমেরিকায় বসবাস ও চাকরি করতে অনুমতিপ্রাপ্ত গ্রীনকার্ড ধারী ব্যক্তির বেলায়ও কেবল তিনি মুসলমান হলেই তার উপর ইমিগ্রশন নিষেধাজ্ঞা বলবত করতে চান ট্রাম্প।  এইভাবে মুসলমান  অধিবাসীর উপর আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ট্রাম্প। যদিও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত আমেরিকান আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। তিনি আর তা টিকাতে পারে নাই। বাতিল হয়ে যায়।  কিন্তু ট্রাম্পের এসব মিলিয়ে মুসলমান ব্যাশিং বা পিছনে লাগা – এটার ভিতরেই ভারত সরকার আর বিজেপি শিবসেনা সমর্থক দলীয় লোকেরা নিজেদের স্বার্থ দেখেছিল। কারণ এই মুসলমান ব্যাশিং ও বিদ্বেষ এর মধ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের কূটনৈতিক সুযোগ সম্ভাবনা আছে। আর এই নীতি বাস্তবায়নে আমেরিকাকে ভারতের উপর নির্ভরশীল করে ফেলার সুবর্ণ সুযোগ জুটে যাওয়া হিসাবে দেখেছিল ভারতের আমলা-গোয়েন্দা চক্র। এছাড়া মোদীর মত রাজনৈতিকরা মুসলমান বিরোধী রেঠরিক আওয়াজ তুলে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ও ভোটের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর বিশেষ সুবিধা পাবার সুযোগ হিসাবে দেখেছিল। এসব কিছু মিলিয়ে আমরা ভারতের কোন অর্ধ-আরবান শহরেও রাস্তায় রাস্তায় ট্রাম্পের ছবি টাঙিয়ে ফুল আর ধুপধুনা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘন্টা নেড়ে পুজা করা হতে দেখেছি আমরা। আগ্রহীরা এই ক্লিপটা খুলে দেখতে পারেন। স্বভাবতই এটা ঠিক আর পুজা ছিল না, থাকেনি। ইসলাম –বিদ্বেষ আর ঘৃণা ভারতে কত তীব্র ভাবে লালন পালন করা হচ্ছে এর কিছু নজির – তাই আমরা দেখেছিলাম।  অবলীলায় বর্ণবাদের খোলাখুলি এত প্রকাশ বোধহয় আর কিছুতে প্রকাশিত হতে দেখা যায় না। ভারতে  বর্ণবাদ-বিরোধী হুশজ্ঞানসম্পন্ন কোন মানুষ বসবাস করে মনে হয় নাই। সে যাই হোক কিন্তু ওদিকে আদালতের বাধায় ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা এক-দেড় সপ্তাহের বেশি কার্যকর থাকতে পারে নাই। কিন্তু অতটুকু সময়েই এমনকি ভারতীয়দের এমন তর্ক করতে আমরা দেখেছি যে তারা বলছে, ইসরায়েলে যেতে বাংলাদেশের পাসপোর্টে যেহেতু নিষেধাজ্ঞা জারি আছে অতএব এরই সমতুল্য ঘটনা নাকি ট্রাম্পের “আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি” করা। অথচ বাংলাদেশ-ইসরায়েলের ব্যাপারটা হল, একটা  পারস্পরিক আইনী কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা। এর ফলে কেবল নিজ দেশের নাগরিকের উপর নিষেধাজ্ঞা। অথচ এই বিষয়টাকে ট্রাম্পের “মুসলিম ব্যানের” এর সাথে জবরদস্তিতে তুল্য ঘটনা বানিয়েছিল এরা ফেসবুকে। পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা মানেই সেটা বর্ণবাদি সমস্যা নয়। চীনে মাওয়ের বিপ্লবের পর থেকে পরের ২২ বছর চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সেটা বর্ণবাদী সমস্যা নয়। ওদিকে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ধরণ নিজ নাগরিক উপর নয়। বরং দুনিয়ার এক বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়ের উপর (বর্ণবাদি কায়দায়)। এমনকি ঐ ধর্ম সম্প্রদায়ের  কোন দেশি বা বিদেশি নাগরিকের উপর নির্বিশেষে । তবু  ট্রাম্প-প্রেমিম ও  ইসলাম-বিদ্বেষী ভারতীয়দের এমন সাফাই গাইতে আমরা দেখেছি। ভারতের আমলা-গোয়েন্দার এই ইসরায়েল-প্রেম তাদেরকে কূটনৈতিক মাইলেজ দিবে বলে তারা বিশ্বাস করে।

কিন্তু বেশি দিন লাগে নাই। বেচারা ভারতের আমলা-গোয়েন্দা। আর ট্রাম্পকে আক্ষরিকভাবেই পুজা-কারী সেই প্যাথেটিক আরএসএস সমর্থক ও ভোটাররা। ট্রাম্পের ক্ষমতার শপথ নিবার মাত্র একমাস – এর মধ্যে ভারত টের পেতে শুরু করে যে ঘটনা কল্পনা মত আগাচ্ছে না। ট্রাম্প জুনিয়র বুশ না; যে আমেরিকার ইসলামবিদ্বেষী নীতি মানেই তা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কোলে ভারতীয় হিন্দু রাজনীতির উঠে পড়ার দুয়ার খুলে যাওয়ার এক্সট্রা মাইলেজ নয়।  বুশের আমলের রমরমা সুযোগ ট্রাম্পের হাত ধরে ফিরে আসছে না। ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ট্রাম্পকে পাঠ করেছিল খুবই সহজভাবে। “আমরা আমরাই তো মনে করে”, এক ইসলাম-বিদ্বেষী ক্রুক হিসাবে। হিন্দু রাজনৈতিক মন এখানে প্রায় শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে।

তাঁরা প্রথম ধাক্কাটা খায় “ভারতীয়রা আমেরিকানদের চাকরি খাচ্ছে” – ট্রাম্পের এই ইস্যুতে। এটা আমলা-গোয়েন্দারা আগে খেয়াল করে নাই এমন না। তারা ভেবেছিল একটা ‘প্যাচ আপ’ বা রফা তারা বের করে ফেলতে পারবে। এখানটাতেই তাদের নজর আন্দাজ ঘটে গেছিল।  ট্রাম্প কী নিয়ে রাজনীতি করতে চাচ্ছে তারা এটা শুধু বুঝেই নাই তা নয় একে আন্ডার এস্টিমেট করেছিল। ট্রাম্পের এই নির্বাচনের সাথে সাথে আমেরিকান সংসদ (কংগ্রেস) ও সিনেটের নির্বাচনে সবই রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্টতায় চলে যায়। গত বছর নভেম্বরে নির্বাচনের ফল আসার পর থেকেই প্রথমত “আমেরিকানদের চাকরি খাওয়ার” ভারতীয় কোম্পানীর বিরুদ্ধে একশনে  যাওয়া – এটা  পাগলা ট্রাম্পের একার পাগলামি ইস্যু নয়। এর প্রমাণ হল, ট্রাম্পের শপথ নিবার  আগে থেকেই লিড নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেস ও সিনেট ‘চাকরি খাওয়া ইস্যু’ নিয়ে পাল্টা নতুন আইন, চাকরি আমেরিকার বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো নিয়ে নানান আইন প্রণয়ন শুরু হয়। আর এই প্রক্রিয়া শুরুর আড়াই মাস পর ট্রাম্প শপথ নিয়ে এতে যোগ দিয়েছিল। এরচেয়েও বড় কথা নতুন আইনের প্রস্তাবে কেবল রিপাবলিকানই না, ডেমোক্রাটদেরও তাতে সমর্থন ছিল ও আছে। শুধু তাই না কোন কোন আইনের প্রস্তাবক বাই-পার্টিজান, মানে দুই দল মিলে। সারকথায় ট্রাম্প আমেরিকানদের চাকরি খাওয়াকে নিজের নির্বাচনি ইস্যু করেছিল কথাটা সত্যি হলেও  কংগ্রেস ও সিনেটে এই ইস্যুটা ছিল বাই-পার্টিজান।

আসলে এই ঘটনার আসল অর্থ তাতপর্য হল, আমেরিকা ক্রমশ পতন হইতেছে এমন এক পরাশক্তি – কানে পানি যাবার এই অনুভব আমাদের সকল রাজনীতিকের , সব দলের। ফলে সবাই চাইতেছে আমেরিকার ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসাবে রিপাবলিকানদের লিডে সবাই একসাথে সমর্থনে খাঁড়ানো। ট্রাম্প লিড নিলেও অন্তত এই ব্যাপারটাতে াইনের প্পিরস্ছতাবের পিছনে দাড়ানোর বেলায় সব অবস্থান গুলো এরকম। এদিকটাই ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাসহ অনেকেই আন্ডার এস্টিমেট করেছে। ভেবেছে এটা কেবল পাগলা ট্রাম্পের ইস্যু। ফলে ট্রাম্পের মুসলমান ব্যাশিং-এ খুশি হওয়া ভারতীয় হিন্দু মন অচিরেই বুঝতে শুরু করে যে ট্রাম্প তাদের রাজনীতির ‘বাবাও’ নয় অথবা কোন ‘দেবতাও’ নয়। ভারতীয় যারা আমেরিকানদের চাকরি খায় তারা “এইচ-১ বি” ক্যাটাগরির ভিসায় আমেরিকা গিয়ে চাকরি করে। আর ভারতে বসে কল সেন্টার’ ব্যবসা করা অথবা সফটওয়ার তৈরির শ্রমঘন অংশটা ভারত থেকে করে আনা – এগুলোকেই আমেরিকান চাকরি বাইরে থেকে করে আনা বা আউটসোর্সিং  বলা হয়। এসব কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন চলছে এখন। এসব খবর পেয়ে ভারতীয়দের টনক নড়া শুরু হয়। শেষ চেষ্টা হিসাবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারত সব ধরলনের লবি করা প্রায় শেষ করেছে। কিন্তু ফলাফল শুণ্য। ট্রাম্প বুশ নয়, এটা ট্রাম্পের আমল – দিন বদল গয়া। ভারত সরকার ইসলাম-বিদ্বেষী উচ্ছ্বাসে আমেরিকার এক নম্বর দোস্ত ally  – এই বুঝ,  বুশের আমলের সেই পুরান আলাপ ট্রাম্পের আমলে অচল। এটা বুঝতেই দেরি করে আন্ডার এস্টিমেট করে ভারত ধরা খেয়েছে। ট্রাম্পের ইসলাম-বিদ্বেষ আর বুশের ইসলাম বিদ্বেষ এক নয়। আসলে সোজা কথা হল,  ট্রাম্পের ইসলাম বিদ্বেষী ড্রাম-পিটানো মূলত বিদেশী খেদাও, ইমিগ্রেন্ট খেদাও দেশি মানুষের চাকরি বাঁচাও – এই লাইনের।

ঘটনা এক, ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবসহ কূটনীতিকরা আমেরিকায় লবি সফর শেষ করে ভারতে পা  দিয়ে যেই না বলেছে ‘চাকরি ইস্যুতে’ আমেরিকার আশ্বাস দিয়েছে সেই বলা শেষ না করতেই কল সেন্টার বিরোধী বিল পেশ, অথবা “এইচ-১ বি” ক্যাটাগরির ভিসার সুযোগ সুবিধা একটার পর একটা ছেটে দেওয়ার খবর ভারতীয় মিডিয়ায় ছেয়ে গেছে।

ঘটনা দুই, আরও যে সব নেগেটিভ কাহিনী ভারতীয় মিডিয়া নিচু আলোতে ফেলে রেখে এতদিন লুকায়ে রাখতে চাইছিল সেগুলো এখন উথলে সামনে আসছেই। গত ০৬ মার্চ আনন্দবাজার এখন লিখছে,  “তালিকাটা দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমশ। শ্রীনিবাস কুচিভোটলা, হার্নিশ পটেলের পরে দীপ রাই। আমেরিকায় ফের গুলিবিদ্ধ এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত”। ভারতীয়রা আমেরিকায় এসে আমেরিকানদের চাকরি খাচ্ছে – তাই ভারতীয়দের আক্রমণ বা খুন করে দেশে ফিরে যাবার “নকশালী চিরকুট প্রচার” শুরু হয়েছে, সেকথাই এখন ভারতীয় মিডিয়া বলছে। আনন্দবাজারের আর এক রিপোর্টের প্রথম বাক্য  এরকম, – “এক দিকে কূটনৈতিক স্তরে মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দৌত্য। অন্য দিকে,ভারত-মার্কিন বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে দিয়ে ট্রাম্প নেতৃত্বের উপর চাপ তৈরি করা। আমেরিকায় কর্মরত এবং বসবাসকারী ভারতীয়দের পেশা এবং নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এই দু’টি মাধ্যমে সক্রিয়তা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে নয়াদিল্লি” ।

এখআনে তামাশার দিকটা লক্অষ্থয করা যাক, এই তো কয়েক মাস আগেও মুসলিম ব্যানে আমরা ভারতীয় সরকার, দল ও সমর্থক ভোটারদের উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম। আর এখন আনন্দবাজার সেই ট্রাম্পের হাতে “ভারতীয়দের পেশা এবং নিরাপত্তা” নিয়ে উদ্বিগ্নতা খুজে ফিরছে।  আর উপরে যে “ভারত-মার্কিন বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে দিয়ে” কথাটা বলতে দেখলাম ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা এদেরকে দিয়েই আমেরিকায় বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিল।  এছাড়াও আনন্দবাজার নিজের এক সম্পাদকীয় লিখে বসেছে। যেখানে এবার লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে সম্পাদকের  আত্মসমালোচনাও আছে। অনলাইন আনন্দবাজারের সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের নামে লেখা ৬ মার্চ সম্পাদকীয়র শিরোনাম হল, “পড়শিরা যখন আক্রান্ত হচ্ছিলেন,তখন পাশ ফিরে শোওয়াটা উচিত হয়নি”।   অর্থাৎ যখন “মুসলিম ব্যান” চলছিল তখন এরাই হাততালি দিয়েছিল। ট্রাম্পের পুজা করছিল। আর আজ  মুসলমান ব্যশিং এর “আসল মজা” এখন টের পাচ্ছেন অঞ্জন। তাই দল ভারী করতে ‘উচিত হয়নি’ বলে নিজেরই সমালোচনা করছে। কিন্তু আর কী সে দিন আছে? নিজের বিশ্বাযোগ্যতা?

শেষ করব আর একটা তথ্য দিয়ে। আগেই বলেছি সোশাল মিডিয়াতে ভারতীয় বাঙালিরা, ট্রাম্পের মুসলিম ব্যানের নির্বাহী আদেশের আর ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের পাশপোর্টে ইসরায়েল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করেছিল।  গতকাল ১০ মার্চের খবর, ট্রাম্পের মুসলিম ব্যানের নির্বাহী আদেশে সেকালে খুশি হওয়া ভারতীয়রা নিজেই জানতে পারছে  – ভারতীয়রাও এই ব্যান থেকে বাইরে নয়। আনন্দবাজারের খবর, ট্রাম্পের দেশ “আমেরিকায় ঢোকা বারণ মনপ্রীতেরও”। সবচেয়ে বিস্ময়কর শব্দ হল “ও”, মনপ্রীত নামটা  মুসলমান নয়, এমন ভারতীয় মেয়েটাও। কানাডীয় নাগরিক হয়েও ভারতীয় শিখ অরিজিন মনপ্রীত আমেরিকার ঢুকতে পারেনি। ভারতীয়দের হয়ে আনন্দবাজার এতে খুবই কষ্ট পেয়েছে। এরপরেও কী হিন্দু-মন ইসলাম বিদ্বেষ বা বর্ণবাদি অবস্থান ত্যাগী হবে? হিন্দুগিরি নয়, সাধারণভাবে যে কোন মানুষের অধিকারের পক্ষে  নীতিগত অবস্থান নিবার তাগিদ বুঝবে? আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি!

 

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[[এই লেখাটা এর আগে মাসিক অন্যদিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপার জন্য ১১ মার্চ লেখা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

হাসিনার ‘র’-কে তুলাধুনাতে টার্গেট ছিল কে

হাসিনার ‘র’-কে তুলাধুনাতে টার্গেট ছিল কে

গৌতম দাস

২৯ মার্চ ২০১৭ ভোর সাড়ে পাঁচটা

http://wp.me/p1sCvy-2dZ

গত ১১ মার্চ মহিলা আওয়ামি লীগের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বোমা ফাটানোর মত এক বক্তব্যে বলেন, “২০০১ সালে পার্শ্ববর্তী দেশের কাছে দেশের সম্পদ বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও তারা আজ ভারত বিরোধিতার কথা বলছে। ভারতবিরোধিতার কথা বিএনপির মুখে মানায় না”। বাসসের বরাতে প্রথম আলো এই সংবাদ ছেপেছিল।

এই বক্তব্য হাসিনা এর আগেও মানে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগেও অনেক সময় রেখেছিলেন, কম বেশি একই ভাষায়। সেখানে তার বলবার মূল পয়েন্ট থাকত যে, দেশের স্বার্থে তিনি নাকি আপোষ করেন নাই বলে ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন নাই। তাই কথাগুলা পুরানা কথার বরাতে আবার কমবেশি একই কথা ফলে সে হিসাবে হয়ত মনে হতে পারে কথার নতুন তাৎপর্য কিছু নাই। কিন্তু তাই কি? এবারের তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে নতুন এবং তাৎপর্যময় দিকটা হল  বক্তব্যের পরের অংশে।  প্রথম আলো লিখেছে, “শেখ হাসিনা আরও বলেন, এখন ভারতবিরোধী কথা বললেও আমেরিকান অ্যাম্বাসি, র-এর লোকেরা তো (তখন) হাওয়া ভবনে Continue reading “হাসিনার ‘র’-কে তুলাধুনাতে টার্গেট ছিল কে”