ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণা

 

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট (০৯ এপ্রিল) হয়ে যাওয়ায় আমেরিকার এবার হারিয়ে যাবার ঘন্টা যেন বেজেই গেল। বাণিজ্যবিরোধসহ সবরকমের বিরোধে সংঘাতে নেতি-এপ্রোচের আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা বা সুবিধা আদায়ের নীতিতে চলতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিল, এর চেয়ে বরং ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন প্রকৃতই বেশি ও গঠনমূলক হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট-রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (2nd Belt and Road Forum, যার সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চার [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্রুপ সেভেন” নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন ব্যাপক মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়ত একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় লেখার আকার বড় হওয়া এড়াতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হল, চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট [CN-EU 21st SUMMIT]। আগের লেখা প্রকাশের তিনদিন পরে ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি নেতা ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো-চিয়াং (Li Keqiang)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক (Donald Tusk) এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার (Jean-Claude Juncker)। এটা চীন-ইইউ এর ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা কিছু ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত তাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরণ। এখনো বহু বাণিজ্যিক প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান [state-owned enterprise (SOE)]। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক বা না থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনা বিপ্লবের শুরুর দিকে ভেঙ্গে দেওয়া “বাজার ব্যবস্থা” অভ্যন্তরীণভাবে নতুন করে আবার আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার উপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই সন্দেহ ও ভীতি নিয়েই  চীনা বাজার বিদেশের কাছে বেশ খানিক অনাস্থার অবস্থায় আছে। কিন্তু একই সাথে চীনা বাজার উদ্যমীভাবে গতিময় ও প্রবল সচল, তাই সেই লোভের আকর্ষণও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। যদিও চীনে নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ নিতে দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন “বাজার ব্যবস্থা” বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে – কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহই এক বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল’ অর্থাৎ “বাস্তবের বাজারব্যবস্থা” বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকু ফাংশনাল বাজারই যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে থাকে। তবু পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা গ্লোবাল বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা আছে বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমত একে আরও বাড়িয়ে বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা সহজেই তৈরি পাওয়া যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। যদিও তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও যেমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে ক্রমশ। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হল – বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক – চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ বিপরীতে লক্ষ্য করলে দেখব, আমেরিকান রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এমন শঙ্কা আমেরিকায় ভিত্তিহীন মনে করা হয় বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের শেষে – বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) ২০০১ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন ্প্রকারন্তরে অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক এশিয়ায় প্রথম কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) তখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা যদিও ব্যক্তি ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তাঁর অনুসৃত নীতি এই সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মত দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছাতই না। এমনকি, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচির নাগালও সেখানে পৌঁছত না; অথবা বলা যায় দেশের অর্থনীতির মুদ্রা-বিচলন চক্রেরও (money circulation) বাইরেই থেকে যেত বিপুল সংখ্যক গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি চালু করেছিলেন যে – অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে – তাই প্রতিষ্ঠানের সততার দিকটা উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। কিন্তু এভাবেও সাফল্য তো আসেই নি – (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ততপরতাকেই তাই কৃতিত্ব বা সাফল্য বলে মানা হয়েছিল। যদিও আবার ৪৫% পর্যন্ত উচ্চসুদ আদায় এটা মাইক্রোক্রেডিটের কপাল কালোদাগ হয়ে আছে)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে (২০০১ সালের পর থেকে) বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

আসলে  চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে জন্ম নিয়ে ফেলার মুখে সে চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে বা তা সামলাতে না পেড়ে সেকালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন তখন বলতে চেয়েছিল যে আমাদের বিশ্বব্যাংক যে পর্যায়ের স্বচ্ছতা ওর ইন্ট্রিগ্রিটি বিভাগ তৈরি করে ফেলেছে চীনা ব্যাংক সে উচ্চতার স্বচ্ছতা অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম আমেরিকার দাবিরও আমলযোগ্য নাই। কারণ বহু অচ্ছতার পথ পেরিয়েই আজ বিশ্বব্যাংক একটা লেভেলের স্টান্ডার্ড এর জায়গায় এসেছে। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ এই ঘটনায় বাজে দিকটা ছিল যে, ওবামা প্রশাসন সেসব কথাগুলো বলেছিল চীনা ঠেকানোর প্রপাগান্ডা হিসাবে, তার বন্ধুদের মনে মিথ্যা ভয় ধরাতে। এই উদ্দেশ্য সৎ ছিল না। আর যেকারণেই হোক আমেরিকার বন্ধুরা ওবামা কথা বিশ্বাস করে নাই, আমল করে নাই বা আস্থা রাখে নাই।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে ২০০৯ সালে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল যেখান থেকে তা হলঃ বিশ্বব্যাংকের নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হত। বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার শেয়ার মালিকানা এখন প্রায়  ১৭%, এটাই অন্য সবার চেয়ে খুবই বেশি ও সর্বোচ্চ। যা আবার আগে জন্মের শুরু থেকেই একটু বেশি ১৮% ছিল। এছাড়া ইউরোপের মাতবর চার রাষ্ট্রগুলোর শেয়ার ৪-৫% এর মধ্যে। আর মোট ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের বাকি আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের শেয়ার ১% এরও খুবই খুবই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তাই আমেরিকা যা বলে সেটাই বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে যায়। এই সুযোগ নিয়ে আমেরিকান সিনেট ২০০৯ সালে, বিশ্বব্যাংকে চীনা মালিকানা বাড়ানোর বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই পালটা ব্রিকস ব্যাংকের [BRICS] জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB)] জন্ম দেয়া হয়েছিল। আর সে সময়ে মানে সেই ওবামার আমল থেকেই – “চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই – তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়” ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে আমেরিকা চীনের কাছে নিজের হার বাস্তবে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় যখন দুনিয়া দেখল যে এক জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডায় কানপড়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছিল, ওর জন্মের শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের এখনও একমাত্র ভরসা হয়ে যায় – চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। এর মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন, তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায় – ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, আমাদের জবাব দিতে পারতে হবেঃ রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে নাগরিককে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর দূরের ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সেটাও বিষয়ই নয়; বরং প্রসঙ্গটা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে বা কোন অজুহাতে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গুম-খুন-গায়েব করতে পারে না। প্রশ্নই আসে না, তাই এটা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনভাবেই অগ্রহণযোগ্য। ফলে চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আবার আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে স্বীকার করবে কিন্তু বাস্তবায়ন করবে না এটাও চলতে পারে না। আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে – এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে সকলকে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হল, এই ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল কেবল এই সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভিতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারাটা দেখার পরে। তাছাড়া এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া যখন থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

ইদানিং আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ [debt trap] নামে। এর প্রপাগান্ডা তৈরি করতে একাডেমিক ও থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। এনিয়ে আলাদা করে বিস্তারে লিখতে হবে। কিন্তু উত্থিত আজকের চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা এভাবে প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক এপ্রোচ। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হয়েছে, বিশেষ করে চীনের সাথে গভীর কৌশলগত পর্যায়ের সম্পর্কে [Comprehensive Strategic Partnership] জড়িয়ে পড়ার শুরুতে। নিঃসন্দেহে এটা আজ  সারা ইউরোপের চীনের সাথে গভীরতম সম্পর্কের শুরুর পর্যায়। বিশেষ করে আমেরিকান প্রপাগান্ডার নেতিবাচক পথ ধরাতে দুনিয়ায় অভিযোগের যে আবর্জনা হাজির হয়ে গেছে সেগুলোকে নাকচ না করে ইউরোপের পক্ষে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যাওয়া ভুল হত। তাই ইইউ আসলে এই সামিটের মাধ্যমে আমেরিকার তোলা প্রতিটা নেতি-প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব দিয়ে এরপর এগিয়ে গেছে।

আসলে “চীনের স্টান্ডার্ড নাই” একথা তুলে আমেরিকা থেমে চুপ করে থেকে যেতে চেয়েছে। কারণ তার উদ্দেশ্য চীনকে ঠেকানো; এর সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার করা নয় বা চীনকে বাড়তে দেয়া নয়। বিপরীতে ইউরোপীয়দের লাইন হল চীনের স্টান্ডার্ড আছে কী নাই সেটা নাই। বরং চীনকে একটা স্টান্ডার্ডে আনা। একমত করানো, এক প্রাতিষ্ঠানিক স্টান্ডার্ড গড়তে ও তা মানতে একমত করে নেওয়া। এজন্য এটাি সঠিক ও ইতিবাচক এবং সুদুরপ্রসারিভাবে আগানোর পথ। অর্থাৎ ইইউ এটা সফলভাবে পারল, কিন্তু আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছিল। ইইউ কেন পারল?

কারণ চীন ঠেকানোতে ইউরোপের লাভালাভ বা স্বার্থ ছিল না। অনিবার্যভাবে গ্লোবাল নতুন নেতা চীনের উঠে আসা – তা চিনতে ইউরোপ ভুল করে নাই। তাই চীনের সাথে বাণিজ্য-বাজার-বিনিয়োগ শেয়ার তার জন্য খুবই জরুরি ও সঠিক পথ। চীনকে ঠেকানোর চিন্তার বাতুলতা ছেড়ে বরং চীনের কোন স্টান্ডার্ড  আমেরিকার প্রতিহিংসার ভাষ্য মতে যদি নাই থাকে তবে একটা কমন স্টান্ডার্ড গড়ে ইতিবাচক এপ্রোচে এগিয়ে যাওয়াই ইইউর জন্য একেবারে উপযুক্ত পথ।  বলা যায় এখান থেকেই আমেরিকাকে নেতা মেনে ইউরোপের গত ৭০ বছর ধরে চলা পথ বদলের সময়। আমেরিকার অনেক অপমান ইউরোপ সহ্য করেছে। এখন আমেরিকার সাথে বন্ধন আলগা করে এবার নতুন করে চীনা হাত ধরার এটাই সময়। চীন-ইইউ সামিটের গভীর তাতপর্য এখানেই। এটাই আগামি…।

এছাড়া আরও একটা দিক ছিল। ইইউ এই সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে বলা ভাল। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ইইউ এর সদস্যরা একা একা চীনের সাথে নানান চুক্তি ও সম্পর্ক করে ফেলা শুরু করে দিয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও [ফ্রান্স, জর্মানি, বৃটেন ও ইতালি] আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হল আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যে নীতি-পলিসিগুলোর সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। অতএব গত মার্চ মাসে ইইউ এর বুদ্ধিমান নেতারা এখানে থেকেই বুঝে ফেলে যে চীনের কাছে একা একা যাওয়া নয় বরং সবাই একসাথে ইইউ হিসাবে না গেলে তারা সবাই দরকষাকষির ক্ষমতা হারাবে। তাই তারা গত ১২ এর মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত নেয় যে চীনের কাছে  বরং একসাথে পুরা ইইউ-ই চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক করতে যাবে। এই লক্ষ্য দশ দফা একশন প্লান বা এক পুর্বশর্তের তালিকাও  তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া ঐ ডকুমেন্টে ওর টোন ছিল খুবই কড়া। যেমন চীনকে সেই সভায় এক পরিকল্পিত প্রতিদ্বন্দ্বি (‘systemic rival’ ) বলে কড়া শব্দে চিহ্নিত করা হয়েছিল।  চীন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে যায় যে চীনকে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে তার ইইউ-প্রতিদ্বন্দ্বিদের দরকষাকষির টেবিলে মন জয় করতে হবে। তাই ঘটেছিল। পরের মাসে মানে ১২ মার্চের পরে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট থেকে তারা একসাথে পরস্পর কৌশলগত পার্টনার [Comprehensive Strategic Partnership] বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়। ২৪ দফা যৌথ ঘোষণায় পরিচিতিমূলক বক্তব্যের প্রথম দফার পরে দ্বিতীয় দফাটাই হল এই পরস্পর কৌশলগত পার্টনার হবার ঘোষণা।   একারণের ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও গভীর তাতপর্যপুর্ণ। আর আমেরিকা যে হেরে গিয়ে মাথা খারাপ করে ফেলেছে এর চিহ্ন হল –  ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্প এখন ইইউ এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় পণ্যের উপর (চীনের মতই) বাড়তি করারোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে এয়ারবাস বিমান তৈরিতে ইউরোপের ভর্তুকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে পালটা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। কারণ চীন ৩০০টা এয়ারবাস – (ইউরোপীয় বিমান) ক্রয়ের অর্ডার দিয়েছে যার মুল্য প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সাথে ট্রাটেজিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জি৭ থেকে কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ” করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে হয়ত। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে “সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার” হওয়ার সম্পর্ক করতে যাচ্ছে, যার সোজা মানে হল, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপ এবার আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা শুরু করছে।

তবু সব ছাপিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার ঐ দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো […China and the EU reaffirm the strength of their Comprehensive Strategic Partnership, their resolve to work together for peace, prosperity and sustainable development and their commitment to multilateralism, and respect for international law and for fundamental norms governing international relations, with the United Nations (UN) at its core. The two sides commit to uphold the UN Charter and international law, and all three pillars of the UN system, namely peace and security, development and human rights.]

এটাই হবে এখন চীন-ইইউ উভয়ের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এবং বলা বাহুল্য এটাই আমেরিকার চীনের বিরুদ্ধে তোলা এপর্যন্ত সব অভিযোগকে ধুয়ে মুছে সাফা করে দিয়েছে। অর্থাৎ যৌথ ঘোষণার এই দ্বিতীয় পয়েন্টের বাক্য যে-  “চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে”।’ এটা আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ইইউ নিজেরা নতুন এক সামগ্রিক কৌশলগত জোটবদ্ধতায় উঠে দাড়াঁনো। আসলে এটা ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য এ্ক মধুর প্রতিশোধ। কারণ গত মাসে তাঁর ইতালির সফরে (২১-২৪ মার্চ) বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হবার চুক্তি করার প্রাক্কালে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী পম্পেই প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বলেছিল  ইতালিকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত না হতে যেচে নিরুতসাহিত করেছিল [……Italy is warned not to join Belt and Road Initiative…]। আর এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে পম্পেইকে নিজ চরকায় তেল দিতে বলেছিল [China tells US to mind its own business ] এক রেগুলার প্রেস ব্রিফিং থেকে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্রও প্রেসিডেন্ট শি এর ইতালি সফর নিয়ে এতই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে সে এক টুইটবার্তায় একে “ফুটানির প্রকল্প” [“vanity project.” ] নামে ডেকে লিখেন, “Italy is a major global economy and great investment destination. No need for Italian government to lend legitimacy to China’s infrastructure vanity project,” said spokesman Garrett Marquis on Twitter.] যা নিঃসন্দেহে হেরে গিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষদেরই প্রতিক্রিয়া।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে যা কিছু নিয়ে এখন বিবাদ বা বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু – এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এই যৌথ ঘোষণাটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার!

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে – “আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না”। কিন্তু আমেরিকার এই আহ্বান ছিল আসলে শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে  দিতে তাহলে –  আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিয়েছিল কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয়ভীতি তাতানো- এটা তো নেতিবাচক ও অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাঙ্খিত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু চীনের উত্থানেরে দিকে পেছন ফিরে থেকে একে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা চীন তো তাতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক এসব কাজের দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। আসলে বাস্তবের কোন মানুষকে আমরা দেখব না যে সে বাজারে যাচ্ছে  কী কী কিনবে না সেই ফর্দ নিয়ে। বরং এক ইতিবাচক -তালিকা মানে কী কী কিনবে সে তালিকা নিয়েই মানুষ বাজারে যায়। অথচ এত দিন আমেরিকা নেতি-তালিকা নিয়েই হেটেছে, সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও পতন। অথচ যে চীনকে ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে “চীন খারাপ”- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ বিপরীতে ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে সেসবের সাথে চীন খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আর বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিলই হল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি [South China Sea] বিতর্ক – এটা কার? এ নিয়ে চীনের পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন যা আছে তাকে ভিত্তি মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে ইইউ সাথে চীনের অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। চীন প্রতি বছর এনিয়ে ডায়লগ সেশন করতে রাজি হয়েছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্ক নিরসনে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? সম্ভবত আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এর বিপরীতে যেন ইউরোপে বুদ্ধি খাটানোর লোক বেশি হয়েছে। তাই তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতাকে দূরে রেখে বরং সারা ইইউ একসাথে ও ইতিবাচক পথে চীনের সাথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। এটা নিঃসন্দেহে এক অগ্র পদক্ষেপ।

আর অন্যদিকে এশিয়ার বেল্ট-রোড প্রকল্পের আর এক বিরোধী এখন বিশাল এক চাপের সম্মুখীন হবে। বিরোধিতার সাফাই যোগাড় মুশকিল হবে। তবু সেই ভরসা-অযোগ্য ট্রাম্পের আমেরিকার ভিতরেই এখনো ভরসার আশ্রয় খুজে ফিরছে ভারত! অর্থাৎ ভারতও নেতিবাচক এপ্রোচের পথের পথিক!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ১৩ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

গৌতম দাস

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার,  ০০ঃ১৫

http://wp.me/p1sCvy-2id

বাজার মানে, চাহিদা-যোগানের লড়াইয়ে এক পর্যায়ে দরদাম কোথাও যেখানে থিতু স্থির হয়। বাংলাদেশের চালের বাজার কোন “তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতির” ফেনোমেনা নয়। এখানে বাজার আছে, তা ফাংশন করে ঠিক যেভাবে কোন বাজারের করার কথা, নিয়ম মত। তবে ছাড়া-গরুর মত এই বাজারে সরকার অর্থাৎ আমাদের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে এক মেকানিজম আছে যা দিয়ে সে বাজারের সবচেয়ে বড় কুতুব-প্রভাবক। সব মজুতদারের বাপ হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সরকার সেই মেকানিজম নিজেই নষ্ট করে ফেলাতে  এখন খোদ সরকারই বাজার থেকে আউট। বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সরকার।

‘চড়া চালের বাজার’, ‘চালের দাম নাগালের বাইরে’ বা এর চরম অবস্থা ‘দুর্ভিক্ষ’ শব্দগুলোর ব্যবহার বাংলাদেশে কমবেশি লোপ পেতে শুরু করেছিল। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের পর তুলনামূলকভাবে ভাল লম্বা সময় কাটলেও দাম চড়া বা চালের অভাব ঘটার মত উল্লেখযোগ্য বছর ছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর। ওই বছরের মাইলস্টোন বা রেকর্ড হল, মোটা চালের দাম ৪২ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া। কিন্এতু এর দশ বছর পরে এবার ২০১৭ সালে আবার অনাকাঙ্খিতভাবে চালের দাম চড়া। আর এবারের নতুন রেকর্ড হল – মোটা চালের দাম বেনাপোল বন্দরেই ৪৮ টাকা বা এর উপরে উঠেছিল।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, অনেকে খেয়াল করেন নাই হয়ত, চুয়াত্তরের চালের বাজার আর আজকের চালের বাজারের মধ্যে বিরাট এক মৌলিক ফারাক আছে। তা হল, সেকালে চালের বাজার ছিল ‘কমিউনিস্ট সোভিয়েত মডেলে কথিত পরিকল্পিত অর্থনীতির’ আলোকে সাজানো – যার অর্থ আমরা সমাজে তখন চাল বিতরণ করা হত  – ‘রেশনে’ মানে ভর্তুকী দামের চাল। একালের অনেকের কাছে বিশেষত তরুণদের কাছে ‘রেশন’ শব্দটা অপরিচিত হয়ত। ‘রেশন’ শব্দের অর্থ হল, বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বাজারের চালের দাম নামিয়ে রাখে সরকার। আর প্রত্যেক পরিবারের সদস্য গুণে সে অনুযায়ী, পরিবারের সাপ্তাহিক চাহিদার পরিমাণ চাল নির্দিষ্ট দোকান (ডিলারের) থেকে বাজারের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করা।

কমিউনিস্ট অনুমানের অর্থনীতির জ্ঞানে তাদের এক বিরাট ক্ষোভের জায়গা হল – ‘বাজার’ ও এই ধারণার উপরে। বাজার তাদের কাছে নাকি শত্রু, সম্ভবত শ্রেণীশত্রু। ফলে দেশ সমাজে বাজারকে কার্যকর বা ফাংশনাল হতে না দেয়া, কাবু করে রাখতে হবে। এই হল তাদের অনুমান। কারণ তাদের চোখে বাজার জিনিষটা  ম্যানেজেবল না। নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাই বাজার ভেঙে দিতে হবে। আর তাদের কাছে এরই বিকল্প হল রেশনিং বা ভর্তুকিব্যবস্থা। আর বাজার ধারণার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ আপত্তি হল, ‘বাজার’ মুনাফা বা শোষণে সহায়তা করে। এটা সম্ভব হয়, কারণ মজুদদারেরা বাজারের মধ্যে ‘নোঙরা অযাচিত হাত’  ঢুকিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। অর্থাৎ চাহিদা ও জোগানের লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে পণ্যের মূল্য থিতু বা স্থির হওয়ার ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণের ফ্যাক্টরগুলোকে অবজেকটিভ না থাকতে দিয়ে সাবজেকটিভ ইচ্ছার হাত ঢুকিয়ে দেয়ার সুযোগ নেয়া হয়। এটা সত্যি যে, বাজারকে অবজেকটিভ রেখে দেয়া খুবই কঠিন। কে কোথা থেকে বাজারের মূল্যকে প্রভাবিত করতে হস্তক্ষেপ করে বসে, তা ঠেকানো শক্ত আইনকানুন ও মেকানিজম তৈরি করেও এটা সহজে সম্ভব হয় না। এই সমস্যা তো আছেই, কিন্তু অন্য দিকে আবার পালটা সমস্যাও তো আছে। চাল আমাদের মত দেশে মানুষের প্রধান খাদ্য, ফলে এই মুখ্য ভোগ্যপণ্যে ভর্তুকী ঢেলে এক ভর্তুকীর অর্থনীতি জারি রাখলে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণে অর্থ সংস্থান জোগাড় করতে হয়। তা জোগাড় করতে যেকোনো সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভর্তুকি কোথা থেকে আসবে? সরকারের আয়ের কোন খাত থেকে?

স্বাভাবিকভাবেই এটা রাজস্ব আয়ের ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সরকারি ব্যয়ের অন্যান্য খাতকে প্রায় সময় ছেঁটে ফেলতে হয়। কারণ চালে ভর্তুকি দেয়ার অন্য সব কিছুর চেয়ে চাল বেশি দরকারি। এর প্রায়োরিটি অন্য খরচের প্রয়োজনগুলোর চেয়ে বেশি। অন্যদিকে আবার, চালের মূল্যের সাথে শ্রমের ন্যূনতম মজুরি সরাসরি সম্পর্কিত। চালের মূল্য কম তো, ন্যূনতম মজুরি তুলনামূলকভাবে কম হবে। তাই সমাজে মোট উৎপাদনের বেশির ভাগ অংশই যদি বেসরকারি খাতে হয়, তাহলে চালে ভর্তুকির সুফল আসলে যাবে কারখানা মালিকের ঘরে, কম মূল্যে শ্রম কিনবেন তিনি। মানে, পাবলিক মানি যাবে ব্যক্তি মালিকের ঘরে। এ ছাড়া ভর্তুকির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল, এর ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা। ঠিক যার ভর্তুকি দরকার তিনি ছাড়াও অজস্র লোক যাদের দরকার নেই, তারাও ভর্তুকির আওতায় এসে যায়। ফলে ভর্তুকির চাল উঠিয়ে নেয়, বাজারে বিক্রি করে, ভুয়া নামের রেশন কার্ড থাকে ইত্যাদি এক বিরাট অপচয় ও বোঝা হয়ে হাজির হয়। তবে ভর্তুকির বিরুদ্ধে অথবা স্বপক্ষের যুক্তি আর যাই থাক, আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে খাদ্যে ভর্তুকি বা রেশনিং ব্যবস্থা একেবারেই উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

এর মূল কারণ, সরকার চালানোর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনা আর সরকার চালাতে ব্যয় কমানো, এটা করতে খরচের খাত ও  প্রয়োজনগুলোকে সুনির্দিষ্ট করা আর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করা, এভাবে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো যাতে খরচ কম হয় আর সেই সাথে ব্যবস্থাপনা দক্ষ হয়, ইত্যাদি এসব করতে নেয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের এক প্রকল্প। এর শর্ত মান্য করতে গিয়ে বাংলাদেশের রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এতটুকু পড়ার পর অনেকে সিদ্ধান্তে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠতে পারেন যে, ‘দেখছ, বিশ্বব্যাংক কত খারাপ’ ইত্যাদি।  না এমন চিন্তা অতিসরলীকরণের দোষে দুষ্ট হবে।  আসলে উঠিয়ে দিবার এই ব্যাপারটাকে বলা যায়, চালের বাজারকে ভিন্নভাবে ম্যানেজ করার দিকে চলে যাওয়া, ঠিক রেশনিং উঠানো বা ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়া নয়।

যেসব মূল কথার উপরে নতুন ব্যবস্থাটা কাজ করে সে তত্ত্বটা হল- ১. চালের বাজারকে ফিরে ফাংশন করতে দেওয়া। ২. সরকার হবে নতুন এই সিস্টেমের মনিটরিং আর ম্যানেজমেন্ট কর্তা। ৩. কোন মজুদদারি মোকাবেলার সবচেয়ে সহজ পথ হবে যে, সরকার নিজেই হবে সবচেয়ে বড় এক বিরাট মজুদদার; ফলে ব্যক্তি-মজুদদারের হয়ে যাবে অকার্যকর ক্ষমতার চুনোপুঁটি। ছোট মজুদদারিও লাভজনক হবে কি না সে সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে আসবে। ৪. ধান ওঠার পর সংগ্রহমূল্য সরকার নিজে নির্ধারণ করে দিয়ে চালের দাম কোন সীমার মধ্যে থাকবে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিবে। ৫. আর সবশেষে একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে।
অর্থাৎ এর আগে বলা সব ব্যবস্থাগুলো নেয়ার পরেও যদি বাজারে চালের দাম সরকারের কাঙ্খিত রেঞ্জের বাইরে চলে যায় তাহলে এই ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেমন এক সপ্তাহে চালের দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গেলে সরকার ডিলারের মাধ্যমে ট্রাকে করে বাজারে চাল ছাড়বে। এভাবে সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করতে নেমে পড়বে। শুধু তাই না বাজারে আগে যে কম দাম ছিক সেই দামে সে চাল বেচা শুরু করবে। এভাবে চাল ছাড়তেই থাকবে যতক্ষণ বাজারে চালের দাম আগের পর্যায়ে না নেমে আসবে। এই জায়গাটায়ই হলো আসল লড়াই। বাজারের মোট মজুদের চেয়ে সরকারের মজুদ সবসময় অনেক বেশি বলে একপর্যায়ে বাজারের ব্যক্তি মজুদদার হেরে যাবে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার হিসাবে দশ থেকে চৌদ্দ লাখ (দশ লাখের নিচে নয়) টনের খাদ্য মজুদ থাকলে ব্যক্তি-মজুদদারেরা সরকারের কাছে হারবেই।  বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার এই নিয়ম ও মাপকাঠিই সাব্যস্ত হয়েছিল আশির দশকের প্রথমার্ধ থেকে। আর কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই নতুন ব্যবস্থা ফলদায়কভাবে চলেছিল ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত। এই হিসাবে বলা যায় পুরনো রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে বাস্তবায়িত, বিকল্প এই পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল সফল। কিন্তু ব্যাপারটার তাৎপর্য কী? একবাক্যে বললে, কমিউনিস্টরা বাজার ম্যানেজেবল নয় সিদ্ধান্তে গিয়ে বাজারকে অকেজো করে দিয়েছিল, ভর্তুকীর এক রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। এর বিকল্প হল, চালের বাজার ফিরিয়ে আনা। আর বাজারের চাহিদা-জোগানোর খেলায় সরকার নিজেই এই বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হিসেবে নেমে সব ছোট খেলোয়াড়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটাকে আমরা এখন থেকে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে অভিহিত করব।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান চালের বাজারের হাল এটা প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠিত এবং প্রমাণিতভাবে কার্যকর ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ এবার দ্বিতীয়বার পরাজিত হয়েছে, ব্যক্তি মজুদদারদের কাছে। এটা ঠিক যেমন ২০০৭ সালে পরাজিত হয়েছি্‌ তেমনই। কিন্তু কেন এটা হল?

দুইবারের পরাজয়ে একটা অভিন্ন বিষয় আছে। তা হল, সরকারি চালের মজুদ ১০ লাখ টনের অনেক নিচে নেমে যেতে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে আইলা ঘূর্ণিঝড়ের পর এটা মাত্র দেড় লাখ টনে নেমে গিয়েছিল। অথচ এর আগেই খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের উপদেষ্টা প্রকাশ্যে টিভিতে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন যে, সরকারি গুদামে মজুদের পরিমাণ মাত্র দেড় লাখ টন। আর সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন, এখন সরকারের কিছু করার নেই।

আর এবারও সরকারের চাল মজুদের পরিমাণ তিন লাখ টনের নিচে নেমে গেছে। এর অর্থ ব্যক্তি মজুদদারেরা বাজারের ডমিনেটিং কর্তা হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে আরো কারণ আছে। ২০০৭ সালে বাজারে হেরে যাওয়ার পরেও সরকার কিছু গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই নিজের পক্ষে এনে ফেলেছিল যীগুলো এবার মারাত্মকভাবে অনুপস্থিত। অথচ ২০০৭ সালের রিকভারি বা নিয়ন্ত্রণ পুণরুদ্ধারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে বাজারে নিজের নিয়ন্ত্রণ  ফিরিয়ে আনতে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও সফল হয়েছিল, যা বেঞ্চমার্ক হয়ে আছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে, সেসব বেঞ্চমার্ক বা অভিজ্ঞতা থেকে এবার শিক্ষা নেয়া হয়নি।

সেটা হল একঃ চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। কিন্তু তা করতে পারার পেছনে আরেক শর্ত মানতে হয়। তা হল, সরকারের হাতে যথেষ্ট বিদেশী মুদ্রা থাকতে হবে। এর ঘাটতি থাকলে হবে না। ব্যাপারটা আমরা তুলনা করতে পারি চুয়াত্তর সালের সাথে। সেবার দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ, কোষাগারে বিদেশী মুদ্রা ছিল না যে চাল দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কমিউনিস্ট পরিকল্পিত অর্থনীতির আরেক সাধারণ ও মারাত্মক নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য থাকে যে, ওমন সরকারগুলো সবসময় বিদেশী মুদ্রার বিপুল অভাবের মধ্যে থাকে। ফলে সে সময় খাদ্য আমদানি উন্মুক্ত হওয়া দূরে থাক, আমদানির এলসি পর্যন্ত খুলতে দেয়া যায়নি। এখানে ‘উন্মুক্ত’ বলতে বুঝতে হবে যে, যে নিয়মিত চাল আমদানিকারক নয় তাকেও আমদানির এলসি খুলতে দেয়া। এককথায় বললে ২০০৭ সালের সরকার, যে-ই আগ্রহী তাকেই এলসি খুলতে দিতে পেরেছিল – এটাই ছিল ক্রাইটেরিয়া। কেন? তাতে কী সুবিধা পাওয়া গিয়েছিল?

যখনই আমাদের দেশে চালের অভাব হয় তখন পড়শি রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ভারত, সরকারি পর্যায়ে চাল বেচতে আর দরদাম ঠিক করতে নানা গড়িমসি করে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি করে থাকে। আর এসব বাধা টপকে তা উপেক্ষা করার সবচেয়ে ভাল উপায় হল, আমাদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের দিয়ে ওদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দ্রুত চাল কিনে আনা। এ ছাড়া এই পথেই সবচেয়ে কম দামে আমদানিকারকেরা  চাল আমদানি করতে পারেন। ব্যক্তি ব্যবসায়ীরা যদি প্রতি টন ৩৮৪ ডলারে আনেন, তবে সরকারি পর্যায়ে এর দাম ৪৫০ ডলারের কম হবে না। তাই সব মিলিয়ে এসব বাধা টপকানোর সবচেয়ে ভাল মেকানিজম হল, চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। ২০০৭ সালে তো ভারতের সরকারি পর্যায়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া পাঁচ লাখ টন চাল আজও ভারতের সরকার আনতে দেয়নি, সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে ভারত থেকে যা চাল এসেছিল এর সব চালই আনা সম্ভব হয়েছিল ব্যক্তিপর্যায়ে। সেটাও ভারত সরকার একপর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিল ভারতের কাস্টমসের একের পর এক নতুন আরোপিত নিষেধাজ্ঞায়। যেমন সার্কুলারে বলা হয়েছিল – প্রথমে ৪০০, কয়েকদিন পরে ৫০০ আর সবশেষ ১০০০ ডলারের নিচে কোনো এলসির রফতানি ছাড়পত্র দেয়া হবে না।

২০০৭ সালের দ্বিতীয় বেঞ্চমার্ক সিদ্ধান্ত ছিল নতুন চালের সংগ্রহমূল্য প্রসঙ্গে। এর আগে বোরো ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২১-২২ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। বন্যা দুর্যোগে চাল মজুদ কমের সমস্যার চার মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠতে শুরু করেছিল। আর ঐবারই প্রথম থেকেই কোনো দ্বিধা না রেখে সরকারের সংগ্রহমূল্য এক লাফে ২৮ টাকা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য একই। মজুদদার বা চালের মিলারদের চেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে সরকারের বাজারে প্রবেশ করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিদের হারিয়ে দিয়ে নিজে মুখ্য ক্রেতা হওয়া। ঐ ঘটনার সাথে একটা তুলনা করা যাক। এবারের বোরো চাল ক্রয় শুরু হয়েছিল বিগত মে মাসের শুরু থেকে, লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত লাখ টন। ২৫ জুন বণিকবার্তা পত্রিকার রিপোর্ট হল, সংগ্রহ অভিযান শুরুর পর এক মাস ২৫ দিন পার হয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রার এক শতাংশ চালও সংগ্রহ করা যায়নি। কেন? কারণ, ধানের সংগ্রহমূল্য করা হয়েছিল ২৪ টাকা। এটা খুবই কম। আসলে সংগ্রহমূল্য কম না বেশি, তা বুঝবার পেছনে আরেকটা ফ্যাক্টর আছে, সেদিক থেকে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চালের উৎপাদন খরচ আমদানি করা চালের চেয়ে কম। কম দাম পড়ে  কিন্তু আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ যদি কোনো বছর ফেল করে তবে এর অর্থ হল, তখন ঐ বছর ব্যক্তিপর্যায়ে চাল আমদানি করতে দিতেই হবে। এর ফলে ওই বছর স্থানীয় উৎপাদন খরচ নয়, বরং আমদানির মূল্যই চালের বাজারে মুল মুল্যনির্ধারক হয়ে যায়। স্থানীয় চাল-ধান কী দামে বেচাকেনা হবে তাও আমদানি মুল্য দিয়ে বিবেচিত হতে শুরু করে। আমাদের উতপাদন খরচ কত পরছে এটা কোন বিবেচ্যই থাকে না। অর্থাৎ তখন গত বছরের দামের চেয়ে চালের সংগ্রহ মুল্য বেশি হয়ে যায়। বেশি রাখতে হয়। এই বিচারে (২৪ টাকা ধান অথবা) ৩৪ টাকা চালের সংগ্রহমূল্য কম বলে বিবেচিত হয়েছে। এটা সম্ভবত কমপক্ষে ৩৬ টাকা হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ সরকারের গুদামে মজুদ কম বলে আগ্রাসী দাম অফার করে সরকারকে বাজারে ঢুকতে হত – এই বাজার নীতি সরকার অনুসরণ করেনি। এক কথায় সরকার বাজার বুঝে না, তাই প্রমাণ করেছে। এমনকি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে অক্ষম হলে তো সরকারকে নিজ সংগ্রহমূল্যের চেয়েও  অনেক বেশি দামে আমদানি করতেই হবে। এই বিচারে আগেই সংগ্রহমূল্য বেশি অফার করে রাখাটাই স্বাভাবিক হত, বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত হত। অথচ সেটা সরকার করেনি।

তৃতীয়ত, এর আগে কখনো চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। তবে অযথা ব্যক্তির আমদানি ঠেকাতে ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থা হয়ে গেছে, তখন শুল্ক কমাতে দ্বিধা ও দেরি করানো অদক্ষতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ।

চাল ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দাবি করেছেন দেশে চালের কোনো সঙ্কট নেই এবং সারা দেশে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় এক কোটি টন চাল আছে। মন্ত্রী তার এই দাবির ভিত্তি কী তা কোথাও বলেন নাই।   অবশ্যি চালের সঙ্কট আছে। আর সেসব কথা বাদ রাখতে হবে।  কারণ ব্যবসায়ীদের কাছে যে পরিমাণই থাকুক, সরকারের গুদামে ১০-১৪ লাখ টন খাদ্য মজুদ থাকতে হয়। তবেই তো কথিত এক কোটি টন মজুদের ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করা যাবে চাল ছাড়তে। সরকারের হাতে ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করার  কোন মেকানিজম নাই, নিজের বেকুবিতে সে অস্ত্রহীন, ঠুটো জগন্নাথ। এভাবে নিজের হাতের অস্ত্র হারানো এটা তো একটা ক্ষমাহীন অপরাধ। যে বাজার মেকানিজম বুঝে না সে মন্ত্রী হতে আসে কেন? এটা কতটা ইচ্ছাকৃত তা হোক আর নাই হোক এই ব্যর্থতা এক অপরাধ।  সরকারের হাতের বাজার নিয়ন্ত্রণের মেকানিজম একমাত্র সেই ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ কোন যুক্তিতেই সরকার হাতছাড়া করতে পারে না।  কিন্তু তা রাখতে মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা, এই সঙ্কটের দায় মন্ত্রণালয় নিতে হবে।

এই বিচারে আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ চালানোর ক্ষেত্রে বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী ব্যর্থ ও অযোগ্য। সে তুলনায় আগের খাদ্যমন্ত্রী (হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের) ড. আবদুর রাজ্জাক সফল ছিলেন। অন্কাতত বড় কোন বিপর্রযয় হয় নাই এই অর্থে।  তিনি সিস্টেমটা বুঝেছিলেন।

শিক্ষাগুলো কীঃ
এর আগে কখনও চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। অথবা থাকলেও যে মুহুর্ততে জানা যায় যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম অকার্যকর হয়ে গেছে সেই মুহুর্তে সবার আগে আমদানি শুল্ক (তা জারি থাকলে) প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত।  এটা হতে পারে অযথা ব্যক্তি আমদানী ঠেকাতে সাধারণ সময়ে ৩০% শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থায় পৌছে গেছে তখন শুল্ক উঠিয়ে নিতে দ্বিধা ও দেরি করানো এক চরম অদক্ষতা ও অযোগ্যতা। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ। দেরি হওয়াতে সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়েছে যে চাল ভারতীয় সীমান্তে আনার পরও তা কাস্টমসে ক্লিয়ার করা হয় নাই যে দু একদিনে শুল্ক উঠে যাবে। এতে বাজারে খুবই খারাপ ম্যাসেজ গিয়েছে। বাজার উলটাপালটা তোলপাড় হয়ে গেছে।

অনলাইন “সাপ্তাহিক” পত্রিকার গোলাম মোর্তোজা বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসুর নাকি টক শো তে বলেছেন, ‘দাম কে বাড়িয়েছে, সরকার বাড়িয়েছে? মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বাজার পরিস্স্থিতি দাম নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই ওএমএসের চালের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ শুভাশীষের এই বক্তব্য আপাত দৃষ্টিতে খুব স্মার্ট মনে হলেও এই বক্তব্য মিথ্যা আর এটা আসলে সচিব হিসাবে তাঁর অজ্ঞতার প্রমাণ। মিথ্যা এজন্য যে সরকারের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের শক্ত মেকানিজম আছে যেটাকে উপরে এখানে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে ব্যাখ্যা করেছি। হয় তিনি এই মেকানিজম সম্পর্কে জানেনই না। অথবা জেনেই পাবলিক মাইন্ডে এর পরিস্কার তথ্য ও চিত্র না থাকার সুবিধা নিয়ে চমক লাগানো ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ কথা বিরাট জ্ঞানী ভাব ধরে আউড়ালেন। ফেক্টস হল, বাংলাদেশের চালের বাজারে কোন ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ নাই। বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম আছে। কেবল অযোগ্য, অদক্ষ দুর্নীতিবাজ না হলে এই মেকানিজম ব্যবহার করতে পারলে সরকারের কখনও চালের বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সুযোগ নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]