সংলাপ, নাকি বিরোধী দলে বসার প্রস্তাব!

সংলাপ, নাকি বিরোধী দলে বসার প্রস্তাব!

গৌতম দাস

০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2vz

 

 

সংলাপ কত দূর, কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? গত ০১ নভেম্বর সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে হাজির হওয়া সংলাপ শেষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোথায় নিয়ে যাবে?

ত মাসে ১৩ অক্টোবর “জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট” গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এরপর তাদের দাবি ও করণীয় দফার তালিকা নিয়ে তারা সরকারের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আমরা দেখেছিলাম সরকারি দল কোনো ধরনের সংলাপ বা আলোচনাকে একেবারেই নাকচ করে দিচ্ছে। আর টিটকারি বা বাঁকা কথা দিয়ে হাসিনাসহ মন্ত্রীরা কাঙ্খিত   যেকোনো সংলাপের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে নানান কটুকথা বলে চলছিলেন। “কোনো সংলাপ হবে না। …সংলাপের কথা ভুলে যান” – স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিংবা, “যে ঐক্য নীতিহীন, যে ঐক্য স্বাধীনতাবিরোধী ও দেশবিরোধী—সেই ঐক্যে এ দেশের সাধারণ জনগণ যাবে না, মেনে নেবে না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র বিশ্বাস করে।” – আইনমন্ত্রী ইত্যাদি… এধরণের কথা শুনতে শুনতে আম-পাবলিকে মনেও তা দৃঢ়বিশ্বাস জন্মে গেথে গেছিল। কেউ আর আশা করেনি যে, আলোচনা-সংলাপ বলে এবার এমন কিছু আর বাংলাদেশ দেখবে। কিন্তু না।  তাহলে সরকারের এই মন পরিবর্তনকে অবশ্যই আকস্মিক বলা যায়। কারণ, এটা কেবল গত শেষ এক সপ্তাহের গতিপ্রকৃতি ও বিকাশ। কিন্তু এমন পরিবর্তন কেন?

সংলাপে সরকারের তাগিদ কী এবং কেন? সেটি কী দিয়ে কোথা থেকে এই বোঝাবুঝি শুরু করব? সে কাজ সবচেয়ে সহজে করতে আর সবচেয়ে বেশি অথেনটিক রেজাল্ট পেতে চাইলে এর উপায় হল জাতীয় পার্টির এরশাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা। আমাদেরকে এরশাদের নড়াচড়ার দিকে চোখ ফেলতে হবে। এই সংলাপের দিন ১ নভেম্বর বাংলাদেশের সবচেয়ে বিরক্তিবোধ করা ব্যক্তিটি ছিলেন জাতীয় পার্টির এরশাদ। এর চেয়েও বড় কথা তিনি যে, এ দিন খুবই বিরক্ত সেটা তিনি রেজিস্টার করে রাখতে চেয়েছিলেন এবং তা রেখেছিলেন একেবারে মিডিয়ায়।

কিন্তু এ’দিন ঢাকায় মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া খুবই কঠিন ছিল। কারণ, এ দিনের ঢাকার মিডিয়া বিশেষ করে টিভি মিডিয়াগুলো দু’টি হাই-প্রফাইল কাভারেজ নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিল। এর একটি হল, এ দিন রাষ্ট্রপতির সাথে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের নির্ধারিত সাক্ষাতের দিন ছিল। আর ওই সাক্ষাতের শেষে নির্বাচনের তারিখ যা ফাইনাল হয়েই আছে অনুমান করা যায়, এর ঘোষণার দিন না হলেও ইঙ্গিতে তা সামনে চলে আসতে পারে। ফলে সেটির কাভারেজ গুরুত্বপুর্ণ এবং প্রতিযোগিতাপুর্ণ। আর দ্বিতীয়ত সবচেয়ে বড় প্রফাইল হল, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে সরকারের সংলাপের সংবাদ কাভারেজ। অতএব বলাই বাহুল্য, সংলাপের এই দিনের এই দুই হাই-প্রফাইল ঘটনার বাইরে আর কারও মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া সত্যি কঠিন। ব্যাপারটা আঁচ করতে এরশাদ ও তার সঙ্গীদের সময় লাগার কথা না। খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেকায় মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া নিশ্চিত করতে এরশাদকে রংপুর চলে যেতে হয়। যাতে রংপুরের স্থানীয় কাভারেজ দিয়ে তিনি ঢাকার ড্রয়িংরুমগুলোতে সন্ধ্যায় নিজেকে হাজির করতে পারেন।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ দিন তিনি ছিলেন যেন ১ নভেম্বরের বাংলাদেশের সবচেয়ে বিরক্তিবোধ করা মানুষ। আর সেই বিরক্তি তিনি মিডিয়ায় আনতে চান, এই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু আসল কথা এরশাদের নড়াচড়া দেখলে ঢাকায় সংলাপ আয়োজনের মূল কারণ জানা যাবে কেন?

এরশাদ গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে এক অদ্ভুত বিপদের মুখে আছেন। সেই থেকে থাকেনও প্রায় সময়ই। তুলনা করে বললে, ব্যাপারটা যেন এমন, এক লোক খুবই আকর্ষণীয়, কিন্তু অদ্ভুত এক দাওয়াত পেয়েছেন। সেটি বলা বাহুল্য খুবই লোভনীয় কিন্তু ওই দাওয়াত খাওয়ার ক্ষেত্রে সেখানে একটা শর্ত আছে। সেটি হল দাওয়াতের হোস্ট বা দাওয়াতদাতা এই ব্যক্তিকে আগাম জানাচ্ছেন, আপনি দাওয়াত পেয়েছেন বটে কিন্তু আসলে দ্বিতীয় একজনও দাওয়াত পেয়েছেন যিনি আসলে মূল গেষ্ট বা দাওয়াতি, ফলে তারই আসার কথা। মূলত এই দ্বিতীয় দাওয়াতিকে খাওয়ানোর জন্যই এত আয়োজন, তার সেখানে খাওয়ার কথা। তবে এখানে শর্ত হল দ্বিতীয়জন বা মূল গেষ্ট – তিনি যদি আসেন ও খাওয়াদাওয়া করেন তবে সে ক্ষেত্রে প্রথমজন আপনি – ভাই, আপনার জন্য ভাত বা খাবার কোনোটার ব্যবস্থা থাকবে না। আর উল্টো হলে, স্বভাবতই মূল দাওয়াতি দ্বিতীয়জন যদি অনুপস্থিত থাকেন তবে প্রথমজনের কপাল খুলে যাবে। তিনি তার দোস্তদের সাথে পেটপুরে খেতে পাবেন। এই গল্পের মূল দাওয়াতি বা দ্বিতীয়জন হলো আসলে বিএনপি। আর প্রথমজন হলেন এরশাদ, তিনি এই অদ্ভুত দাওয়াত পেয়ে অপেক্ষায় আছেন। আপাতত রংপুরে গেছেন।

২০১৪ সালে তিনি এমন দাওয়াত দিলে তা খাবেনই না বলার পরও কোনো এক কারিশমাতে তিনি ও তার দল একাধারে সরকারি ও বিরোধী দলেরও এমপিই – দুটোই হয়ে গেছিলেন। অর্থাৎ সরকারি মন্ত্রিত্ব নিয়েছেন আবার তারা নিজেদেরকে বিরোধী দল মনে করেন। সংসদের সকলেও তাদেরকে সরকারি মন্ত্রীত্ব পাওয়া আবার বিরোধী দল মর্যাদা পাওয়া এমপি গণ্য করতে দ্বিধা করে না। আজ এর প্রায় পাঁচ বছর শেষের দিকে দেখা যাচ্ছে এরশাদ ও তার দলের অভিজ্ঞতা হলো, ভালোই ছিল বলে তারা উপভোগ করেছেন। তাই এবার এরশাদ নিজেই যেচে সেটি এবারো চাইছেন।

সেই এরশাদ এবার সংলাপের দিন সংলাপ প্রসঙ্গে রংপুর থেকে খুবই বিরক্তি প্রকাশ করে কথা বলেছেন। কারো মুখের সামনে থেকে খাবার সরিয়ে আনলে বা উঠিয়ে নিয়ে সরিয়ে রাখতে তার যেমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হয়, এই প্রতিক্রিয়া যেন তেমনই।

রশাদকে মিডিয়া কাভারেজ সবচেয়ে ভালো দিয়েছে যুগান্তর। আমরা এরশাদের বক্তব্য সেখান থেকে টুকে আনলে সেগুলা হল : “সংলাপের সফলতা নিয়ে এরশাদের সংশয়”… “ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির কোনোটিই মানা সম্ভব নয়”।… “সংলাপ ব্যর্থ হবে”… “শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো দাবিই কোনোভাবে মেনে নেয়া সম্ভব নয়”। “বিএনপি আদৌ নির্বাচনে অংশ নেবে সন্দেহ রয়েছে”। আর সবশেষে বলেছেন… “বিএনপি নিজেদের অস্তিত্বের সঙ্কটে রয়েছে”। এগুলো সব দৈনিক যুগান্তর থেকে জড়ো করা এরশাদের ভাষ্য। দেখাই যাচ্ছে, এখানে প্রতিটি বাক্যে এরশাদের অসন্তোষ ফুটে উঠেছে। যেন তিনি বলতে চাইছেন, যেটা হবে না সেটা নিয়ে কেন যে আপা চেষ্টা করছেন!

এখান থেকে পরিস্কার ফুটে উঠেছে যা এরশাদকে দেয়া আছে – বিরোধী দল হয়ে থাকা – তা এই সংলাপ থেকে অন্য কাউকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর সেকারণেই এরশাদ এবার “সর্ব হারা” হবার শঙ্কায় হাহুতাশ শুরু করেছেন।

ব্যাপারটা হল, অনুমান করা যায় এরশাদ জানতেন বা তাকে জানানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর এই সংলাপের মানে কী? এরশাদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়, খুব সম্ভবত  ১ নভেম্বর এটি ছিল আসলে বিরোধী দলের আসন নিতে বিএনপি রাজি হবে কি না- এই লক্ষ্যে তাদেরকে ডেকে দেয়া অফার। কাজেই সংলাপ মানে ছিল বিরোধী দল হওয়ার জন্য বিএনপিকে দেয়া লীগের অফার। অতএব এই অফার মানে আবার, দেয়া দাওয়াত যদি বিএনপি তা না নেয়, তবেই এটা জাতীয় পার্টির এরশাদের। সে কারণে এরশাদের দাওয়াতটাই এমন যে, বিএনপি যদি বিরোধী দলের আসন নেয়ার অফার নিয়ে নেয়, তবে এরশাদের দলের ভাগে আর ভাত নেই হয়ে যাওয়া। সে কারণে এরশাদের পুরো বক্তব্যই বেশি বেশি করে গরু মরে না কেন এ জন্য শকুনের করা বদ-দোয়ার মত।

এরশাদের কাছে তাই অজানা নয় যে সংলাপের আসল মানে হল, বিএনপিকে বিরোধী দলের আসন নিতে হাসিনার অফার, এর মানে এরশাদের ভাগে সেক্ষেত্রে কিছুই জুটবে না। তাই স্বভাবতই সংলাপের দিন সবচেয়ে দুঃখ আর হা-হুতাশের দিন হলো এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টির। আর এ কারণে তিনি এ দিন যা প্রচার চালিয়ে গেছেন এর সারকথা হল- “সংলাপ ব্যর্থ হবে”। সবার চেয়ে স্পষ্ট করে এরশাদ বলেছেন, সংলাপের সফলতা নিয়ে তার সংশয় আছে।
আর সবার শেষে একটা বোমা মেরে বলেছেন, “… আগামী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে”।

অতএব এখান থেকেই আমরা সিদ্ধান্তে যেতে পারি, এরশাদের এই প্রবল বদ-দোয়া – এটা বলছে যে হাসিনা হঠাৎ মন পরিবর্তন করে সংলাপ করতে চাইলেন, এ জন্য যে বিএনপিকে তিনি বিরোধী দল হতে অফার করেছেন। বলা বাহুল্য বিএনপি যদি এই অফার মেনে নিতে আপসে রাজি হয়ে যায়, তবে এর সোজা অর্থ হল বিএনপি লীগকেও সরকারি দলে আবার ক্ষমতায় থেকে যেতে দিতে সেও আগাম রাজি হয়ে যাচ্ছে।
অতএব গত ১ নভেম্বর থেকে সবচেয়ে টেনশনে ও বদদোয়া দেয়ার মধ্যে আছে জাতীয় পার্টি। কত দিন যে থাকতে হয়। গতবার এক অদ্ভুত সরকারি মন্ত্রীর বিরোধী দল হতে পেরেছিল এরশাদ হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে। এবার কি আর সেই কপাল হবে?

সংলাপের দিনের বেশ কিছু সময় টিভি মিডিয়া কাভারেজে উভয় পক্ষকে দেখা গেছিল। স্বল্প সময়ের হলেও আমরা তাতে তাদের মুখ ও চোখের ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদি দেখতে পেয়েছিলাম। লক্ষণীয় হল, অন্তত ক্যামেরার সামনে সরকারি দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে অতিথিদের প্রতি যেন এক বিশেষ ধরনের সম্মান ও সম্ভ্রমবোধ প্রকাশ পাচ্ছিল। কাউকে সম্মান করে পা টিপে বা সতর্ক হয়ে হাঁটলে যেমন লাগে, তেমন মনে হচ্ছিল। লীগের চোখ দিয়ে দেখে সেটা কল্পনা করা যাক, তারা ভাবতে পারে এটা হল, এই দুর্বল সময়ে দুর্বল বিএনপিকে দেয়া আমাদের বেস্ট অফার। তাহলে লীগের দিক থেকে যার অর্থ হবে এটা লীগের জন্য শুধু আগামী পাঁচ বছর ক্ষমতার নিশ্চয়তা নয়, বরং আসন্ন অ-নে-ক বছরের ও অনেক কিছুর নিশ্চয়তা। ফলে এমন বিএনপি বা তার বন্ধুদের জোট ঐক্যফ্রন্টের জন্য লীগের বিশেষ সম্মান ও সম্ভ্রমবোধ প্রকাশ- এটা কোনো ব্যাপারই নয়। চাই কি আরো একটু খাতির যত্নও তারা করতে পারে। তবে কাউকে একেবারে হিসাব করে বিরোধী দলের আসনে বসানো, কাজটা  ২০১৪ সালের নির্বাচনে (১৫৩ জন খ্যাত) ফলাফল বানানোর কারিগর এইচটি ইমাম এর মত হাতও ব্যর্থ হবে।

তবে প্রস্তাব সরকারি দল যাই দেক না কেন, সংলাপের নিয়ন্ত্রণ এখনও সরকারি দলের হাতে। তাই কাদের বলছেন, “আমরা সংবিধানের বাইরে যাব না, আলোচনা অব্যাহত থাকবে: কাদের”। অর্থাৎ আমরা যা দিচ্ছি তাই। এর বাইরে কিছু নাই।

তবে আর একটা দিক আছে। গত ১ নভেম্বর গণভবনে টেবিলের দু’পাশে যারা মুখোমুখি বসেছিলেন, তারা এটা ১৯৯১ সালের পর প্রায় ২০ বছরের মতো হলো, এভাবে মুখোমুখি আগে কখনো এমন বসেছেন আমাদের মনে পড়ে না। এই সময়কালের শেষের ১০ বছর বিরোধীরা সরকারি দলের মুখোমুখি হয়েছে কেবল ভিকটিম হিসেবে। ফলে তারা যে আবার কখন টেবিলে মুখোমুখি বসতে পারে বা চোখে তাকিয়ে কথা বলতে পারে, এটা মিডিয়া বা সাধারণ মানুষের চোখে অকল্পনীয় হয়ে গেছিল। তাই অনভ্যস্ততার চোখ ছড়িয়ে ছিল চার দিকে।

এখন কী হবে?
প্রথমত, সরকারি পক্ষ ছিল সংলাপ কেন তা তাদের জানা। ফলে প্রস্তুতও পরিকল্পিত। অন্য দিকে, বিরোধীরা ছিল চোখে লাগার মত হোমওয়ার্কহীন আর পুরো অন্ধকারে। যদিও কেনো সংলাপ, কী অফার সেসব কিছুই আগাম ধারণা না থাকায়, সেটাও একধরনের অপ্রস্তুতি এবং পরিকল্পনাহীন হয়ে থাকতে হওয়া। তবে তারা এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব ইতিবাচকভাবে দেখছিল, অথচ কোথাও কোনো ইঙ্গিত ছাড়াই। এ ছাড়া মানুষ ভালো হয়ে যেতেও পারে – ধরনের ভাবনাকে চিন্তার কোন অবস্থানে জায়গা দিয়েছিল; অথচ তাদের উচিত ছিল তাদের দাবির কোন কথাটা কিভাবে, কার পরে কী বলবে- এগুলো নিয়ে কিছু আগাম পরিকল্পনা করে হাজির হওয়া। আর আগাম কিছুই ইতিবাচক দেখার দরকার ছিল না। তবে এখন আর একটু গোছানোর সময় পেয়েছে।জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তা নিয়ে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে ‘সমাধান পায়নি’ তারা।

তাহলে এখন কী হবে?
লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী কাদের এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করেছেন। তার অনুমান ৮ নভেম্বরের পর অনেক কিছু জানা যাবে। তিনি আসলে হয়ে যাওয়া সংলাপকে (মানে প্রদত্ত অফার) প্রবল ইতিবাচকভাবে দেখার ও পেশ করার সুযোগ নিয়েছেন। তিনি বলছেন, আবার ছোট আকারে বসার দরকার হতে পারে।

এখন ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি যদি সংলাপ (বা কোনো অফার) প্রত্যাখ্যান করলাম ধরনের কথা বলার দিকে যদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে স্বভাবতই মধুচন্দ্রিমার দিন শেষ হবে, কাদেরের ৮ তারিখও। সে ক্ষেত্রে আমরা সংলাপ-পূর্ব দিনগুলোর মতো আবার দমন-নির্যাতনে সংঘাতের দিনগুলোতে ফিরে যেতে দেখব।

না, আজকের পরিস্থতি আরও আপোষের অভিমুখে। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আশা করছেন, আবার সংলাপ খালেদার মুক্তির এজেন্ডায় হতে পারে। কাদের: খালেদার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

সবশেষে গত কালকে ভারতের পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী এক লেখা ছাপা হয়েছে সাউথ এশিয়া মনিটরে, সেখানে তার কিছু মন্তব্য আছে। এটা মূলত আগের বার হাসিনাকে তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ যতকিছু বলে অভিযুক্ত করেছিলেন এবারের লেখাটা তার শোধবোধে থুক্কু বলা; কথা ফিরিয়ে নেয়া বলা যেতে পারে। যদিও লেখার শিরোনামটা অদ্ভুত – লিখছেন, “ঘেরার মধ্যে পড়া আওয়ালী লীগ কী সম্মিলিত বিরোধীদের চাপ সামলাতে পারবে?”। আসলে এবারের পুরা লেখায় তার বক্তব্য কেবল একটা বাক্যে – “In this effort, the AL can count on India’s support.”। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই পরিস্থিতিতে হাসিনার ভারতের কোলে মাথা রাখতে পারে। “তারা খুশিই হবে”।

যদি পরিস্থিতির পরিণতি এদিকেই যায় বা নিয়ে যাওয়া হয় তবে এর মানে হবে, বাংলাদেশের রাজনীতিক সংকটে এরপর সমাজের একটা বড় অংশ এসবের বাইরে থেকে যাবে যারা রেডিকেল হতে থাকবে। না, বলা ভাল তাদেরকে ঠেলে দেয়া হবে; যাদেরকে না লীগ না বিএনপি বা এদের মত কেউ প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সংলাপ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

শিক্ষার্থীদের শ্লোগানের ভাষার সমাজতত্ব

গৌতম দাস

০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2ti

 

 

শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা – ছবি : ফেবু থেকে সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যে স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে, তা নিয়ে চার দিকে তুমুল অলোচনা চলছে। এ স্লোগানগুলোতে দেশের পরিস্থিতির নানা চিত্র উঠে এসেছে। গত চার দিনের চলমান রাস্তার আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের দেয়া স্লোগানের ভাষা কী অশ্লীল, প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এক কথায় বললে এর প্রথম জবাব হবে ‘কে আপনি’, প্রশ্নটি তুলতেছেন। আপনি যদি ক্ষমতাসীন দানব ক্ষমতার মানে দানব এস্টাবলিসমেন্টের পক্ষের লোক হন কিংবা জেনে – নাজেনে এই দানব ক্ষমতাকে সম্মতিদাতা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার অভিযোগ হবে শিক্ষার্থীদের ভাষা ‘অশ্লীল’। আপনি দানব ক্ষমতার সুবিধাভোগী হলেও বলবেন, এটা ‘অশ্লীল’ ভাষা। ক্ষমতাসীনদের সাগরেদ হলে ‘এথিক্যাল পুলিশের’ ভূমিকায় নামতে ইচ্ছে করবে আপনার কিংবা নেমেই যাবেন। কারণ আপনি হারতেছেন – লুজিং। চ্যালেঞ্জড হয়েছেন – এরই দিশাহারা প্রতিক্রিয়া এটা!

আসলে এটাকে শ্লীল-অশ্লীলের বিষয় না বলে মানে ‘নৈতিকতার পুলিশগিরি’ পজিশন না নিয়ে বরং এটা ফরমাল বনাম ইনফরমাল ভাষার তর্ক – এভাবে বর্ণনা অর্থে সেটি বলাই সম্ভবত সঠিক হবে। স্ল্যাং (slang) বা অশ্লীল ভাষা সব সমাজে থাকে, চর্চাও হয় সমানে। [স্ল্যাংয়ের ডিকশনারি অর্থও আরও সহজ – very casual speech or writing।] মানে স্যুট-কোর্ট থুয়ে হাফ প্যান্ট পড়ে কথা বলা। এমন সমাজ দুনিয়ায় পাওয়া যাবে না যেখানকার ভাষায় স্ল্যাং শব্দ নাই বা এই শব্দের চর্চা নাই। তবে স্বভাবতই এই চর্চা হয় মূলত সমাজের ইনফরমাল পকেটগুলোতে – চায়ের দোকানে, ক্লাব আড্ডায়, সমবয়সী ও বন্ধু মহলে। তবে ফরমাল জায়গাগুলোর ভাষা যেহেতু আলাদা হয়, তাই সেখানে এই ভাষা দেখা যায় না। কিন্তু একটা কথা মানতে হবে, ভাষার মুখ্য কাজটা হল মনের কথা ঠিক ঠিক-ঠিকভাবে বাইরে আনা, যেটাকে আমরা বলি এক্সপ্রেশন বা প্রকাশ ঘটানো। লক্ষ করবেন, ইনফরমাল শব্দ মানে যার ভিতর স্ল্যাং শব্দ অন্তর্ভুক্ত – এই শব্দ অন্য যেকোন কিছু চেয়ে খুবই সফল ও সাবলীলভাবে এক্সপ্রেশন ঘটায়, অন্তত ফরমাল ভাষার তুলনায় এবং ওর চেয়ে সহজে। তুলনায় এই চমৎকার প্রকাশগুণ, এটাই ইনফরমাল ভাষা কদর পাওয়ার একটি অন্যতম কারণ। আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই প্রকাশগুণসম্পন্ন হয়, তাই ইনফরমাল আবহের সুযোগ পেলেই তা নিয়ে আমরা এই ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ নিয়ে নেই। মূল কারণ, সহজে এখানে নিজের মনের ঠিক ঠিক ভাব তুলে ধরা বা বাইরে আনা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, মূলত যেমন ধরেন রেগে গেলে বা রাগে, ক্ষোভে অথবা দীর্ঘদিনের চাপা থাকা অবস্থার মন অসহ্য হয়ে পড়লে সাধারণত আমাদের প্রকাশভঙ্গির শব্দ ইনফরমাল হয়ে যায়। অর্থাৎ ফরমালিটির কন্ট্রোল তখন অকার্যকর হয়। মনে হতে থাকে, রুলিং পাওয়ার বা শাসকসমাজ আমাকে আমল করছে না, আমার ব্যথা বুঝছে না, বুঝতেই চাচ্ছে না; তাহলে আমি কেন একপক্ষীয় তাকে আমল করার দায় নেব! ফলে ইনফরমাল শব্দ ব্যবহারকারির মানসিক অবস্থা থাকে এরকম। আর আমরা সবাই জীবনের নানান চড়াই-উতরাইয়ের স্তরে পরে কখন না কখনও ইনফরমাল স্তরে যাবার সদুযোগ নিয়ে নিজেকে হাল্কা অনুভব করার সুযোগ নিয়েই থাকি।

তার মানে দাঁড়াল ফরমাল-ইনফরমাল ভাষা বলে সমাজে একটা ফারাক, সব দেশ-সমাজে আছে আর তা বজায় বা ধরে রাখা হয় বা থাকে। ফরমাল সমাজের আড়ালে থেকে থাকা ভাষা আসলে ‘দোস্ত-বন্ধু সার্কেলের ভাষা;’ যাকে ইনফরমাল ভাষা বলছি তা সফল আয়ু নিয়ে টিকে থাকে, ফরমাল ভাষার পাশাপাশি হেঁটে চলে।

তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু এর মানে কি এটা যে এখন থেকে দেশে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ, ভাষার ফারাক এগুলো কি এখন থেকে উঠে যাবে? এই আন্দোলনে যারা বেশির ভাগ বা সংখ্যায় ভারী এরা মূলত ১৬-১৭ বছরের কিশোর বা তরুণ। এই ১৬-১৭ বছরের তরুণ, এরা ইনফরমাল ভাষা অবলীলায় ব্যবহার করছে – এর মানে কী এখন থেকে বাসার ড্রয়িংরুমে, ডাইনিং টেবিলে কিংবা ক্লাসরুমে এরা নিয়মিত ইনফরমাল ভাষায়ই কথা বলা শুরু করবে? পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ভাষা কি সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? না, একেবারেই না। আসলে ঘটনা খুবই সিম্পল। আগে ফরমাল-ইনফরমাল ভাষার আলাদা আলাদা জগৎ যতটা আপনা-আপনিই বজায় রাখা যেত বা থাকত, এখন সেখানে একটা ব্যত্যয় ঘটেছে। তা ঘটিয়েছে সোস্যাল মিডিয়া। সোস্যাল মিডিয়ার কারণে ইনফরমাল জগৎ ও এর ততপরতা ফরমাল দুনিয়ায় হাজির হয়ে গেছে। অর্থাৎ ইনফরমাল ভাষা তাদের বন্ধুমহল ছেড়ে মিডিয়ার কল্যাণে সবার সামনে চলে এসেছে। আর তাতেই এত তর্ক উঠেছে। খেয়াল করলে দেখব, ফেসবুকই এ ধরনের ইনফরমাল ভাষার প্ল্যাকার্ড বা এর ছবি সবার কাছে প্রকাশ করে দিচ্ছে, ফেসবুক এর প্রধান সোর্স। পাশাপাশি তুলনা করলে দেখব, আমাদের মেন স্ট্রিম বা প্রচলিত মিডিয়া এমনকি টিভি মিডিয়ারও যাদের কাছে এমন প্ল্যাকার্ড ও এর ছবির কথা অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু তাদের মিডিয়ায় ইনফরমাল ভাষার খবর, এটা অনুপস্থিত। তারা কিন্তু ফরমাল জগতে একে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

তাহলে এই ফরমাল-ইনফরমাল জগৎ ও ভাষার যে ভেদ এখন দেখা যাচ্ছে তাতে কিছু ছিদ্র দেখা গেছে, এই হল কথা। এখন এই ছিদ্র দেখা দেয়ায় আগামীতে এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, এই ভাষার ফরমাল-ইনফরমাল ভেদ কখনই উঠে যাবে না। যদিও ঠিক যেমন, অন্তত মা জানে তার সন্তান সিগারেট খায়, কিন্তু তা নিয়ে নাড়াচাড়া করার কায়দাও কেমন নরম-গরমে রাখতে হয় তা মায়েরা জানে। বাড়াবাড়ি করে না। এরকম হয়ে থেকে যাবে। ফলে হয়তো সেভাবে সোস্যাল মিডিয়ায় এটা জানাজানি ঘটা অবস্থাতেই তা থাকবে, কিন্তু আবার এই তথ্য ফরমাল সমাজ উপেক্ষা করতেও থাকবে, ফরমাল সমাজে তা আনবে না। আর সম্ভবত এটা নির্ধারিত হবে অভিভাবক মা-বাবারা সন্তানদের এই আন্দোলনের প্রতি কী মনোভাব পোষণ করছে ও করবে তা দিয়ে।

এখন পর্যন্ত যা প্রকাশিত তাতে মনে করার কারণ আছে যে, এটা কেবল ১৬-১৭ বছরের তরুণদের আন্দোলনই নয় এর পাশাপাশি এটা তাদের মা-বাবারও সম্মতির আন্দোলন। বিশেষ করে মায়েরাই মূলত সন্তানদের স্কুল-কলেজে পৌঁছে দিতে আসে সেই মায়েদেরও সম্মতিতে সন্তানদের আন্দোলন। এর একটা বড় কারণ সড়ক ও যানবাহনের অনিরাপত্তা। এমনিতেও তারা চিনায় দিচ্ছে যে নিরাপদ সড়ক – এটাই তাদের আন্দোলনের ইস্যু। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে এই মায়েদের পূর্ণ সম্মতি আছে পড়ুয়াদের আন্দোলনের প্রতি। অন্তত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, আশির দশকেও তখনকার আন্দোলনে এমনটা কোনো অভিভাবককে পাওয়া যেত না যে সন্তানের আন্দোলনে অংশ নেয়াকে সম্মতি দিত। কিন্তু এখনকার পড়ুয়াদের আন্দোলনে অভিভাবকদের পূর্ণ সম্মতি আছে, এর বড় প্রমাণ হল গত চার দিনে তরুণেরা তারা লাগাতার মাঠে উপস্থিত থাকছে; বাসায় বাধা তেমন পায়নি শুধু তাই না, মায়েরা নিজেই পরের দিনও ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনছে বা তাদের আসতে দিচ্ছে। সম্ভাব্য এর মূল কারণ হল, চরম অনিরাপদ বেপরোয়া যানবাহন আর এই নৈরাজ্যকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে এমন ‘পাবলিক জবাবদিহিতাহীন’ সরকার ও এর ক্ষমতা- এসবের  প্রতি মায়েদের গভীর অনাস্থা। বেপরোয়া এই ব্যবস্থা রাজীব ও মীমকে হত্যা আর সাথে আরো দশজনকে মারাত্মকভাবে পিষে মেরে ফেলার অবস্থায় আহত করেছে। কিন্তু এই বীভৎসতার অভিজ্ঞতা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, এটা কেবল রাজীব বা মিমেরও নয়, রাজীব অথবা মিমের ভেতর দিয়ে আসলে প্রতিটি শিক্ষার্থী ও  অনিরাপদ সড়ক তাদের নিরাপত্তা দিতে আসা মায়েরা প্রত্যেকে নিজেকেই দেখতে পেয়েছেন। ঘাতক বেপরোয়া পরিবহনের সরাসরি শিকার এখন মা এবং সন্তানেরা। তাদের সাথে রাজীব-মিমের ফারাক হল এই যে, এরা দু’জন পরিবহন নৈরাজ্যে হত্যার শিকার হয়েছে; আর এই মা-সন্তানেরা এক্সিডেন্টলি মারা যায়নি, তাই বেঁচে আছে। ফলে চরম নৈরাজ্যের বিপরীতে একটা সুস্থ সিস্টেমের এক নির্বাহী সরকার পরিচালনার অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে মা বা সন্তান কাউকেই দাওয়াত দিতে হয়নি। এটি ভুক্তভোগীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের প্রকাশ। এ কারণে সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা গেছে অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে নিজেই মাঠে আইডেন্টিফাই করে বাহবা দিতে। অর্থাৎ পড়ুয়া সন্তানের সাথে সমান সরাসরি ভুক্তভোগী বলেই অভিভাবকেরা এই আন্দোলনে সম্মতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে।

এই আন্দোলনকারী কারা? অনেকে এদেরকে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা ছেলে বলে সম্বোধন করছেন। এটা সম্ভবত অসতর্কতা অথবা আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি বোঝাতে ‘বাচ্চা ছেলে’ কথা যতটা না তাদের বয়স বোঝানোর শব্দ, এর চেয়ে বেশি তাদের প্রতি সহানুভূতিসূচক শব্দ। তবুও সেটি যাই হোক, বয়সের বিচারে এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৬-১৭ বছর। অর্থাৎ টিনএজের শেষার্ধে। এই বয়সের মূল বৈশিষ্ট্য হল, পরিবার ও সমাজকে তারা এটা জানান দিতে চায় যে, “আমি এখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারি, আমার চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয়েছে, মনে বুঝাবুঝির ফ্যাকাল্টি ডেভেলপ করে গিয়েছে  ও ন্যূনতম পরিপক্বতা এসেছে। ফলে প্রতিটি বিষয় আমি কিভাবে চাই অথবা দেখতে চাই তা আমাকে আমার মত করে দেখতে ও তাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে; আর সেই সাথে অন্যদের তা আমল করতে হবে। আপনার আইডিয়ার তলে আমাকে চেপে দেয়ার সুযোগ আর নাই”।

এরপর ১৮ বছর হয়ে গেলে এ ভাবটাকেই তো আইনসিদ্ধ মতামত জানানোর মত পোক্ত বলে মানা হয়, আমরা মেনে নেই যে তারা রাজনীতি ও নির্বাচনে ভোট বা মতামত দেয়ার যোগ্য বিবেচিত। এ জন্য উল্টো এক কমন ট্রেন্ড দেখা যায় এদের মধ্যে তা হল, তাদের মতামত প্রকাশ করতে না দিলে বা এদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অবস্থান নিলে এরা ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ করে, এদের প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায় জীবন দিয়ে দেওয়ার মত মরিয়া। এরা নিজেদের আমল করানো, তাদের কথা শোনানোর জন্য কোনো ২৫ বা ৩৫ বছর বয়সী মানুষের চেয়েও বহু দূর যেতে রাজি থাকে। তবে ঠাণ্ডামাথায় বুঝিয়ে বলেই একমাত্র যদি তাদের মানানো যায় বা যেতে পারে।

এসব কারণে তাদের দাবি খুবই চিন্তা করে বলা যার মূল সুর হল অনিরাপদ সড়কের তাদের আপত্তি ও অভিযোগ, সড়ক নিরাপত্তা তাদের মূল ইস্যু। দানব ক্ষমতার নৈরাজ্যের এক প্রকাশ পরিবহন নৈরাজ্য – এটা তাদের সব ক্ষোভের কেন্দ্র। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ সড়কে আহত নিজের কোনো বাসযাত্রীকে চিকিৎসা দেয়ার ঝামেলা এড়াতে নদীতে ছুড়ে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে – পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আজ এই ভয়ংকর অবিশ্বাস্য অমানুষের জায়গায় চলে গেছে। কেউ আর মানুষের গুণ স্বভাবে নেই। এমনকি এ ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সরকার-মালিক-শ্রমিক নেতা কারো দিক থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং নতুন করে আবার দায় এড়ানোর বুদ্ধি আঁটছে তারা।

এক কথায় বললে ১৯৮৩ সালে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BRTA) গঠনের সময় থেকেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা সোজাসাপ্টা চেয়েছে – তারা লাইসেন্স কিনে নিতে পারে এমন ব্যবস্থা চায়। কোন ট্রেনিং শেষে যোগ্যতা পরীক্ষার প্রমাণ দেয়া নয়, সরাসরি কাগজ কেনা এমন একটা লাইসেন্সিং-অনুমোদন ব্যবস্থা যেন কায়েম হয়। আর সেকাজে প্রগতি বা অ-প্রগতিবাদী পরিবহণ নেতারা সকলেই এই ব্যবস্থায় সায় দিয়েছে এই অজুহাতে যে ট্রেনিং-পরীক্ষার যে ব্যবস্থাকে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া বলে এটা নাকি ‘আমলাতান্ত্রিক’। কারণ আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গালি দিতে পারা চরম বিপ্লবীপনা মানা হয়। ফলে তারা এই আমলাতন্ত্রের অজুহাতের আড়ালে সকলেই চেয়েছে পয়সা দিয়ে কেনা যায় এমন এক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কায়েম হোক। আর আমলারাও এমন ব্যবস্থা হলে সহজেই পরিবহণের কাঁচা পয়সার ভাগ মিলবে বলে এতে সামিল হয়েছিল। এভাবে পয়সা দিয়ে কিনে নেয়ার এই ব্যবস্থায় তারা সরকারকেও শামিল করে নিয়েছিল। সেটাই এখন ভয়াবহ দানব মহীরুহ হয়েছে। তাই গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্স দিতে হবে- এটা মন্ত্রী এখন প্রকাশ্যেই দাবি করছেন। অথচ মূল ব্যাপারটা হল, লাইসেন্স বা অনুমোদন যদি কিনেই নেয়া যায়, এরপর তা কি আর ‘লাইসেন্স’ বলে বিবেচ্য হতে পারে? না সেটা লাইসেন্স থাকে? সেটা তো তখন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষালব্ধ দলিল অর্থে লাইসেন্স নয়, এক টুকরো কাগজ মাত্র। এটা চিন্তা করা অবস্থায় সরকার-মালিক-শ্রমিকেরা কেউ নেই। আসলে সরকার-মালিক-শ্রমিকের মিলিত এক সিন্ডিকেট বিআরটিএ’র মাধ্যমে মানুষ মারার ‘লাইসেন্স’ কেনাবেচা করছে মাত্র। আর অন্যদিকে পরিবহনের এই মন্ত্রী-মালিক-শ্রমিকদের গুণ্ডামির এরা এক কোটারি ক্ষমতা, এটাকে দানব সরকার নিজের ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে তাদের মধ্যে এই দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের সিন্ডিকেট, সে আরো চরম বেপরোয়া। অর্থাৎ সরকার মালিক-শ্রমিকদের এই সিন্ডিকেট প্রমাণ করেছে বিআরটিএ আসলে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এক সংগঠন। কার্যকর কোনো রাষ্ট্র-সরকার ও বিআরটিএ সব কিছু একেবারেই বাস্তবত অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এই জায়গা থেকে দেখলে বোঝা যায় টিনএজ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন আমাদের বলতে চাচ্ছে, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য আসলে নতুন রাষ্ট্র-সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন।

তাহলে ব্যাপারটা শুধু পরিবহন নৈরাজ্য নয়, খোদ রাষ্ট্র ও সরকারই এক নৈরাজ্যের দানব, প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এরই প্রধান প্রতিভূ যাকে মাঠের লড়াকু তরুণেরা সম্মুখ মোকাবেলা করছে, তারা হলো পুলিশ। পুলিশ হয়ে উঠেছে নৈরাজ্যের দানবীয় প্রতীক।

ফলে তরুণদের স্লোগানের টার্গেট মূলত পুলিশ ও ক্ষমতা। কিন্তু এই পুলিশ ও ক্ষমতা এটা নষ্টা, বিচ্যুত ও অধঃপতিত। “পুলিশ তুই কোন চ্যাট@র বা@…”। অর্থাৎ তুই আমার কাছে, আমার চোখে তুচ্ছ – এটাই আন্দোলনকারীদের বক্তব্য-বয়াত্নের সার কথাটা। সারকথায়, তাই একে তুচ্ছজ্ঞান করে দেয়া। কারণ, নষ্টা ক্ষমতা, despotic বা ‘দাগী’ ক্ষমতা সে তো পশমের মতোই তুচ্ছ। এই বয়ান হাজির করাই তরুণদের আন্দোলনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরম রাগ-ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ হয়ে কাউকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দেয়া- সে কিছুই না, তাকে সে মানে না পাত্তা দেয় না; এটা বোঝানোর ক্ষেত্রে ইনফরমাল ভাষা- এক্সপ্রেশন হিসেবে অতুলনীয়, আনপ্যারালাল। তাই পুলিশ সম্পর্কিত সব স্নোগানই তাদের তুচ্ছ জ্ঞান করার ভাষা। ইনফরমাল ভাষা যাকে বলি। এখন আপনি দানব ক্ষমতার বেনিফিসারি হলে ওর সাথে থাকলে, আত্মীয় হলে তো এই ভাষার বয়ান নিজের স্বার্থে আঘাত খেয়ে প্রতিক্রিয়ায় নিচা দেখাতে একে ‘অশ্লীল’ বলতে চাইবেনই। তাহলে দেখা যাচ্ছে শেষ বিচারে শ্লীল-অশ্লীল ব্যাপারটা পৌঁছাল যে, এটা আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন। আপনি দানব ক্ষমতার আত্মীয় হলে দানব ক্ষমতার চ্যালেঞ্জকারীকে অশ্লীলই বলবেন।

একটা ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়েও ওপর পুলিশ লাঠি তুলছে, পেটাচ্ছে বা ভয় দেখাচ্ছে – এমন অনেক ছবি মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু সব ছবিতেই দেখবেন তরুণদের ভিতর কোনো ভয় পাওয়ার চিহ্ন নেই, সটান দাঁড়িয়ে আছে, একটুও হেলেনি, মার থেকে বাঁচার চেষ্টা নেই। অথচ ঐ উদ্যত লাঠির বাড়ি পড়লে মাথা দুভাগ হবার সম্ভাবনা। তবু সে ভয়ডর কারও ভিতর কাজ করছে মনে হয় না। কেউ একজন ১৬-১৭ বছরের ছেলে বা মেয়ে – এরই হুবহু প্রতীক হল এ ছবিগুলো। সে বলতে চায়, সে স্বাধীন চিন্তা করতে সক্ষম। ফলে তাকেও আমল দিতে হবে। তার কথা শুনতে হবে।

গ্রীক এক প্রবাদ আছে, যা আপনি কাউকে দিবার যোগ্যতা রাখেন না মুরোদ নাই তা কারও থেকে কেড়ে নিবারও আপনি কেউ না, আপনার সে অধিকার নাই। সুর্যের আলো আপনি কাউকে দিতে পারেন না, সে যোগ্য আমরা কেউ নই। তাহলে কারও সুর্যের আলো পাওয়ার পথে আপনি বাধা হতে পারেন না। সে অধিকারই নাই। মীমের বাবা-মার কথাই ধরা যাক। তারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, বড় জোর ২৫ হাজার টাকার মধ্যে নিরন্তর কষ্ট করে সংসারে মাসের সব খরচ চালাতে বাধ্য হন এমন পরিবার। আশা করার মত তাদের কিছু নাই। কিন্তু এধরণের জীবন নিয়ে মানুষ বেচে থাকে কেন? বাকি জীবনে এর পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নাই। তাহলে কী আছে যা তাদের বাঁচিয়ে রাখে? আত্মহত্যা করতে দেয় না, বাঁচতে আগ্রহ যোগায়? সেই উসিলাটা কী? ঘনিষ্ট হয়ে বসে এদের যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে শুনবেন “বাচ্চাদের মুখের দিকে চেয়ে বেচে আছি”। এক স্বপ্ন আছে যা তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে, বেঁচে থাকতে প্রেরণা দেয়। অর্থাৎ মা-বাবারা বুঝে গেছে তাদের প্রজন্ম গেছে। কিন্তু পরের প্রজন্মের সময়ে জীবনমান অবস্থা বদলের স্বার্থে নিজের প্রজন্মকে বলি দিতে রাজি আছে।  যেমন আশা করে থাকে যে মীম পড়ালেখা করে বড় হলে একটা (সরকারি) চাকরি পেলে তাদের চির দুঃখের অবসানে তাদের জীবনযাত্রার মান এক নতুন স্তরে উতীর্ণ হতে পারে। কিন্তু মীমের মৃত্যু তাদের পাচজনের পরিবারের সবস্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার করে দিয়েছে। জীবন ও এতদিনের দাতচেপে ধরে করা কষ্ট সব এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। রাষ্ট্র তাদেরকে একটা নুন্যতম অভাবপুরণের জীবন দিতে পারে নাই। তাহলে রাষ্ট্র-সরকারের কী অধিকার আছে তাদের স্বপ্ন ছিনিয়ে নিবার? কিন্তু এর জবাব দিবার কেউ নাই। কারণ মীমের পরিবারের সংগ্রাম আর তাদের দিক থেকে জীবনকে একবার দেখারও কেউ নাই! আমরা এমন সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাস করছি।

তাহলে আগামীতে কী হবে? প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কী বুঝবেন বা বুঝেছেন- তারা কার মুখোমুখি হয়েছেন, কার সাথে ডিল করছেন? এর জবাব সম্ভবত হতাশাব্যঞ্জক হবে! তারা বুঝবেনই না; অথচ  কী শক্তি ছিল অদমনীয় ১৬-১৭ বছরের এই তরুণদের ভিতর। কাজেই মাননীয় ক্ষমতা- আপনি পরাজিতই হবেন। আপনারা নো বডি, তুচ্ছ! তাহলে আমরা কি একটা ম্যাসাকার দেখতে যাচ্ছি। এক কঠিন সময়ের প্রান্তে আমরা।

[এই রচনাটা লিখতে যাদের ফিল্ড রিপোর্ট আমাকে খুবই সাহায্য করেছে, বিশেষ করে আলনোলনরত মা-সন্তানদের তথ্য আর অথবা রাজীব ও মীমের পারিবারিক তথ্য – এসবগুলোকে আমার ইমাজিনেশনে নিতে পেরেছি, তা নিয়েছি দৈনিক প্রথম আলো থেকে। তাদের রিপোর্টিং সত্যিই ছিল প্রফেশনাল যা আমাকে খুবই সহায়তা করেছে। তারা জানে তারা কি করছে। আর আমার দিক থেকে, কারণ সমাজতত্বের আলাপ তুলতে গেলে যে ধরণের নুন্যতম তথ্য দরকার হয় তা একমাত্র প্রথম আলোতেই ছিল। তাদের সকলকে তাই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ আগস্ট ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ব্যাক ক্যালকুলেশন

ব্যাক ক্যালকুলেশন

গৌতম দাস

০৮ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার ০০ঃ০৩

https://wp.me/p1sCvy-2qv

 

 

‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’। কথাটার মানে হল, দু’টি সংখ্যার যোগফল আর ওই সংখ্যা দু’টির একটা জানা থাকলে; বিয়োগ করে অপর সংখ্যাটি বের করা যায়। অর্থাৎ ফলাফল থেকে শুরুর উপাদান কী ছিল, তা জানার চেষ্টা। অথবা রান্না খেয়ে রেসিপি কী ছিল তা বোঝার চেষ্টা বলা যায়।

গত ১৯-২১ ফেব্রুয়ারি হোটেল র‌্যাডিসনে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ’ নামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ভারতের প্রধান ধারার প্রিন্ট মিডিয়ার বেশির ভাগই অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর পর্যায়ের ব্যক্তিরা (যুগান্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা কমপক্ষে আটজন) এতে যোগ দিয়েছিলেন। যুগান্তরের রিপোর্ট থেকে আরো জানা যাচ্ছে, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ -এর আহ্বায়ক শ্যামল দত্ত। তিনি বাংলাদেশের দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক। কিন্তু কেন এই অপ্রচলিত আয়োজন? এর একটি জবাব খুঁজে পাওয়া যায় “মৌলবাদ রুখতে দিল্লিকে চায় ঢাকা” শিরোনামে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আনন্দবাজার পত্রিকার অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা রিপোর্ট থেকে। অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তিনিও একজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তিনি লিখছেন, “দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে সরকারি স্তরে তৎপরতা তো রয়েছেই। তার পাশাপাশি মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে দুই দেশের সাংবাদিকদের মতবিনিময়ের মতো ‘ট্র্যাক টু’ কূটনীতির একটি উদ্যোগ নজর কেড়েছে ঢাকার একটি পরিচিত ‘থিংক ট্যাংক’ ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইসিএলডিএস) উদ্যোগে”।

তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা বেশ চিন্তাভাবনা করে করা আয়োজন। কিন্তু আনন্দবাজারের ‘ট্র্যাক টু’ কথাটা যেন অনেক কিছু বলে দিচ্ছে, যা কোথায় নাই, বলা হয়নি। “ব্যাক ক্যালকুলেশন” করা যাক। মাস কয়েক আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময়ও আনন্দবাজার এই শব্দটা ব্যবহার করেছিল। “ট্র্যাক টু” – মানে মূল কূটনৈতিক চ্যানেল ও অবস্থানের বাইরে দ্বিতীয় আর এক মাধ্যমে যোগাযোগ বা বার্তা পৌছানো। অর্থাৎ ‘কাকাবাবু’ যেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হয়ে কিছু একটা মোদি সরকারের কাছে পৌঁছে দেন, সুপারিশ করেন বা দুই সরকারের মতভিন্নতায় মধ্যস্থতা করেন ইত্যাদি। কিন্তু কী সে বিষয়, তা কোথাও লিখিত প্রকাশ ছিল না, যদিও অনুমানে ছিল।

আসলে ঘটনার শুরু বা গুঞ্জন অনেক পুরনো; শেখ হাসিনার সর্বশেষ ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফরের সময় থেকে। কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত দুই সরকারের মধ্যে মতভিন্নতা বাড়ছিল,  গত প্রায় একবছর ধরে। তা কমিয়ে একটা আপোষ-রফার একমত অবস্থানে  দাঁড় করানো যায় কীনা সে প্রচেষ্টাও চলছে। সেই আপোষ-রফায় পৌছানোর ইচ্ছায় আমাদের সরকারের দিক থেকে নেয়া পদক্ষেপ হিসাবে  ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ ্কে বলা যায় এক সর্বশেষ উদ্যোগ।

বিরোধের ইস্যুগুলো কী
চীনের One Belt One Road বা সংক্ষেপে OBOR প্রকল্প। এটা মূলত ৬৫ রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে বা ঐসব রাষ্ট্রের ভিতর দিয়ে যাবে এমন এক মেগা অবকাঠামো প্রকল্প। এটা সড়ক ও রেল পথে ও সাথে সমুদ্র পথেও যোগাযোগের সম্পর্কের দিক থেকে পণ্য চলাচলের এক নেটওয়ার্ক হয়ে উঠবে।  মূলত এশিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র, ওদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও সেন্ট্রাল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এবং রাশিয়াসহ ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রকে এই প্রকল্পের যোগাযোগের আওতায় আনা এর লক্ষ্য।  তবে এর সাথে কিছু আফ্রিকান ও ল্যাটিন আমেরিকান রাষ্ট্রকেও সাথে যুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। আর মূল অবকাঠামোটা রেল ও সড়ক-ভিত্তিক হলেও এই পুরা সড়ক পথের অন্তত পাঁচ জায়গায় পাঁচ গভীর সমুদ্র বন্দরের কানেকশন থাকবে। অর্থাৎ সমুদ্রপথে পণ্য- মালামাল এনে সুবিধামত কোন একটা গভীর সমুদ্র বন্দরে তা নামিয়ে এবার সড়ক পথে যে কোন দেশে ঐ পণ্য নেওয়ার সুবিধা থাকবে এই প্রকল্পে। এইভাবে এটা ট্রিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগের  এক প্রকল্প। বাংলাদেশ সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে রাজি হলে সে বন্দরও বেল্ট-রোড প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবে। তবে তা  হোক আর নাই হোক, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ বা যুক্ত হয়ে থাকতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারের সাথে ভারতের বিরোধ, আপত্তি বা মতভিন্নতা এখান থেকে। সাথে অবশ্য আরও কিছু প্রসঙ্গও আছে।

এই OBOR প্রকল্প কাজের নানা অগ্রগতি আছে। তার একটা হল এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারি রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে সর্বপ্রথম এক সামিট ডাকা। ঐ সামিট ডাকা হয়েছিল চীনের বেইজিংয়ে গত বছর মানে, ২০১৭ সালের মে মাসে। তখন থেকে OBOR  প্রকল্পের আর এক নতুন নামকরণ হয়, Belt-Road Initiative (BRI) অথবা বাংলায় ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’।

বাইরে থেকে চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে  যুদ্ধ লেগে না গেলেও অনবরত আমরা বিবাদ, রেষারেষি দেখি সেটা মুদ্রার এক পিঠ। সহযোগিতার অন্য পিঠ আছে। না, এখান থেকে দুই পিঠের মধ্যে কোন স্ববিরোধিতা বা শঠতা খুঁজা যাবে না, ভুল হবে। এটা শুধু চীন-ভারত বলে নয় সব আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কই একালে এরকমই হবে, এটাই স্বাভাবিক।  তবে ‘একালে’ কথার মানে কী? একালে মানে হল, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পরের সময়ে। তখন থেকে সারা দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত। ফলে,  পণ্য, পূজি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য আর একই বাজারে্র এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ  লেনদেনে একেবারে মাখামাখি। এখানে কেউ আর বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি বা বিনিময় সম্পর্কহীন কেউ নয়। তাই একালে মানে ১৯৯১ সালের পরের দুনিয়াতে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কুটনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি সব সম্পর্ক এরকম দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার – মাখামাখি।

ফলে অন্য পিঠ, চীন-ভারতের মধ্যে প্রবল সহযোগিতাও আছে। যদিও ভারতের মিডিয়া ব্যাপারটাকে আরাল করে এক উগ্র এবং ভুয়া জাতিবাদী অবস্থান প্রচার করে থাকে। যেমন তাদের দ্বিপাক্ষিক পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশই হলো চীনের রফতানি আর ১০ শতাংশ ভারতের রফতানি,  চীনের বিনিয়োগ ভারতে ডেকে আনা আছে, আবার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আপারহ্যান্ড বা বড় ভাগটা চীন নিয়ে নিল কি না সে টেনশন আছে, সেই সাথে অচিহ্নিত সীমান্ত বিতর্কের টেনশন – তা তো আছেই। কিন্তু ২০১৭ সালের মে মাসের আগ পর্যন্ত  কখনোই তাদের মধ্যে বড় বা দৃশ্যমান কোন অসহযোগিতা দেখা যায়নি। এমনকি, গত ২০০৫ সাল থেকে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিতে সে ভারতের পিঠে হাত রাখা সত্ত্বেও চীন-ভারত সম্পর্ক এমনই ছিল। ভারত ঐ সামিটে দাওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও,  সেবারই প্রথম চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সামিট ভারত বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল।

ভারত যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এর কারণ বলেছিল যে,   বিতর্কিত পাকিস্তান অংশের কাশ্মিরের উপর দিয়ে এই প্রকল্প গেছে, তাই ভারত  নিজের সার্ভভৌমত্ব লঙ্ঘণের সমস্যা হিসাবে দেখে সেই  আপত্তিতে তারা এতে অংশ নিচ্ছে না। “Regarding the so-called ‘China-Pakistan Economic Corridor’, which is being projected as the flagship project of the BRI/OBOR, the international community is well aware of India’s position. No country can accept a project that ignores its core concerns on sovereignty and territorial integrity, ” Baglay added.  [Gopal Baglay is the Spokesperson of MEA, India.]

তবে ভিতরের কারণও চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অশোক কান্তা বলে দিয়েছিলেন ভারতের এক মিডিয়াতে। আমরা যদি এর আগে ২০১৫ সালের চীনের বিশ্বব্যাংক (AIIB ব্যাংক) গড়ার সময়ের ভারত-চীন সহযোগিতার সাথে তুলনা করি, তাহলে আমরা দেখি –  যে কোন ভাগাভাগিতে মুড়োটা নিজের পাতে পাওয়ার জন্য ভারত দরাদরি করেছে আর চীন সহানুভূতির সাথে তা দেয়ার চেষ্টা করছে। সব পশ্চিমা রাষ্ট্রের চেয়েও ভারতকে ভাগের দিক থেকে ওপরে রাখছে চীন। কিন্তু বেল্ট রোড উদ্যোগের বেলায় ভারতের মনের কথাটা সার করে অশোক কান্তা যা বলছেন তা হল, “বেল্ট-রোড উদ্যোগ খুবই কাজের; তা সবার দরকার। বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্রের জন্য।  কিন্তু ভারত এতে যোগ দিলে সে চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবার সম্বেভাবনা খুব বেশি, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত প্রথম তিনটি অর্থনীতির মধ্যে একটি হতে যাচ্ছে”।  [আসলে বেল্ট-রোড উদ্যোগ যে খুবই কাজের তা ভারত কেন আর এক প্রতিদ্বন্দ্বি আমেরিকাও তা অস্বীকার করে নাই কোথাও।] নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা ১৩ মে ২০১৭ থেকে ইংরাজি উদ্ধৃতিগুলো নেয়া। 
[Former Indian Ambassador to China Ashok K Kantha said,
“It needs pragmatic approach on China’s part as well. We will be two largest economies of the world by 2030. So joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,” Kantha added.]

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, এটা কেবল তথাকথিত সার্বভৌম ইস্যুতে ভারত ‘বেল্ট-রোড সামিট’ বয়কট করছে; তা নয়। এ প্রসঙ্গে ভারতের সিরিয়াসনেস কত গভীরে সেটা বুঝানোর জন্য একটু বিস্তারিত বলতেই হবে। কিন্তু তার আগে একটি ডিসক্লেমার দিয়ে রাখতে হবে। সেটা হল, মনে রাখতে হবে, এখানে আমি বলিনি যে, ভারতের বা অশোক কান্তার এই অনুমান-বিশ্বাস [ইংরাজিতে কোট করে আনা উপরের বক্তব্য] সঠিক। আসলে এটা তাদের একটা পারসেপশন মাত্র। অর্থাৎ আমি এখানে কেবল বলছি যে, ভারত নিজেকে কী মনে করে, সেটা। কিন্তু তাদের এই অনুমান সঠিক আমি তা মনে করি না। ফলে আমি তাতে কিন্তু সায় দেইনি। আর খুব সম্ভবত এই বয়কটের কারণেই ভারতের ট্রেন মিস হবে। তবে সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

স্বভাবতই এই বয়কটের সিদ্ধান্তের পরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং এ’ঘটনার লেজ আছে। এর অন্যতম হল, এরপর থেকেই ভারতের বিদেশনীতিতে নতুন কিছু হিসাব, কিছু ‘মুই কী হনু রে’ যোগ হয়েছে।  যেমন  এশিয়ার যেসব রাস্ট্রের সরকার চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছে ভারতের বিদেশনীতি তাদের উপর খড়্গহস্ত হয়ে গেছে। নেপাল বা শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। এশিয়ায় ভারতের পড়শি মানে চীনেরও, এমন রাষ্ট্রের কোনো সরকার যদি চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে নিজের সম্মতি চীনকে দিয়ে থাকে, তবে সেই পড়শির সরকারের এখন কপাল খারাপ। কারণ ওই সরকারের সাথে ভারত চরম অসহযোগিতার অবস্থান নেয়। শুধু তাই না, ঐ সরকার ফেলে দেয়া, অথবা ওর বিরোধীদের জিতিয়ে আনার চেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, এমনকি সম্ভাব্য সাবভার্সিভ এক্টিভিটিসহ দরকার মতো সবকিছু করা পর্যন্ত ভারত যেতে পারে। এই হয়েছে ভারতের বিদেশ নীতির নতুন বৈশিষ্ট, নতুন পালক। কিন্তু কেন, এর কারণ নিয়ে পরে আসছি। তবে ভারতের এই বিদেশ নীতি, স্বভাবতই এটা কোনো দলিল দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। তবে খোলা চোখে বাস্তব তৎপরতা দেখে বোঝা যেতে পারে। বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বলেছে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ২০১৭ সালের এপ্রিল ভারত সফরে তিনি বার্তা পেয়েছিলেন – No OBOR, নো চাইনিজ প্রজেক্ট। আমাদের ব্যাক ক্যালকুলেশন এটাই বলে। কারণ যেকথা দিয়ে লেখা শুরু হয়েছিল, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’  এতে আগত ভারতীয় সম্পাদকেরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে তিনি পরোক্ষে এটাই বলেছেন যে ভারতীয় সম্পাদকেরা যেন ভারতের চীন নিয়ে উদ্বেগ কমাতে ভুমিকা রাখে।

কিন্তু এই রচনার মূল প্রসঙ্গে এখন আসব। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা কীভাবে নিয়েছিলেন, ভারতের বার্তা ও পরামর্শকে?

আগে বলেছি ভারতের নির্ণায়ক হল ‘চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে’ যে সরকার সম্মতি জানিয়েছে, ভারত সে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু খুব সম্ভবত বাংলাদেশ ভারতের ‘অনেক কাছের ও বন্ধু সরকার’ বলে একে কাছে ডেকে ভারতের চাহিদার কথা বলে দেয়া হয়েছিল। সরকার ফেলানো বা সরাসরি বিরোধীতার দিকে যায় নাই।

আসলে ভারত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে, সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে উথাল-পাথাল চলছে, চীন নতুন নেতা হয়ে আসছে কিন্তু ভারতের কী হবে – ইত্যাদি পুরা ব্যাপারটা নিয়ে এপর্যন্ত অন্তত চারটি (তিনটা আমেরিকার সরকারি ও একটা প্রাইভেট) বড় বড় সার্ভে ও গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে এপর্যন্ত , কিন্তু তাদের কোনটাতেই এমন কথা বলা হয়নি। তবু যেন ভারত এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে, এই বিশ্বাসে আমাদের দৈনিক কালেরকন্ঠ পত্রিকা কোনো রেফারেন্স ছাড়াই এমন দাবি করে একটি লেখা ছাপিয়ে ফেলেছে গত মাসে। যার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “কয়েক বছরেই চীনকে টপকে যাবে ভারত, উবে যাবে পাকিস্তানও!”। অথচ কোথা থেকে এই খবর পেল এর কোন রেফারেন্স সেখানে দেয়া হয় নাই। খুব সম্ভবত ভারতের ইকোনমিক টাইমসের কোন ‘প্রপাগান্ডা’ খবর এখানে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

উপরে যেসব স্টাডি রিপোর্টের কথা বললাম, ওর মধ্যে প্রাইভেট কোম্পানী “প্রাইজ-ওয়াটার-হাউজ-কুপারস” এর যে রিপোর্ট তা ২০৫০ সালের দুনিয়ায় সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে সার্ভে স্টাডি। একমাত্র সেখানেই ভারতকে আমেরিকার উপরে নিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখলের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আর বাকি তিনটা আমেরিকান রিপোর্ট হল ২০৩০ সাল, ২০৩৫ সাল ও ২০৩৫ সালের দুনিয়ায় টপ অর্থনৈতিক অবস্থানে কোন রাষ্ট্র কে কোথায় থাকবে তা নিয়ে। কিন্তু  (২০৩০-২০৫০ সালের মধ্যে) কোথাও কোন রিপোর্টে ভারতের প্রথম স্থান দখলের কথা কোথাও নাই। চারটা রিপোর্টেই চীন প্রথম এবং দ্বিতীয় যে কারও চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা প্রথম।

ওদিকে আবার শেষ বিচারে এই রিপোর্টগুলো এখনও একেকটা সার্ভে ও স্টাডির এক অনুমিত ফলাফল,  যা বাস্তব নয়। তবে সম্ভাবনা মাত্র। ফলে বহু ‘যদি, কিন্তু’সহ নানা শর্তসাপেক্ষ; যার মূলকথা হল, এগুলা অনুমিত ফলাফল বা প্রেডিকশন। কিন্তু ভারত ব্যাপারটাকে পুরাপুরি ভিত্তিহীন অনুমানে অর্থনীতিতে নিজের প্রথম হওয়ার বিষয় হিসাবে নিয়ে সেটা ফসকে যাওয়া-না যাওয়া হিসেব এমন সিরিয়াস হয়ে দেখছে।

তাহলে সারকথা হল, ভারতের একটা পারসেপশন তৈরি হয়েছে যে ভারত নিজের কথিত এক নম্বর অর্থনীতি সে হতে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে যে ব্যাপারটা পারসেপশনের,মানে অনুমানের। যেটা সত্য নয়। আর ঐ পারসেপশনের উপর দাড়ানো ভারতের বৈদেশিক নীতি অবস্থান হল এই যে, বেল্ট-রোড প্রকল্পে এশিয়ার যে সরকার যাবে সে ভারতের শত্রু। ভারতকে ওর বিরোধিতা করতে হবে, ঐ সরকারের পতন ঘটানো ভারতের স্বার্থ। ফলে তা থেকেই ভারত সরকারের এক প্রেসিং ডিমান্ড তৈরি হয়েছে কেবল যাকে ব্যাখ্যা করতে পারলে জানা যাবে যে ভারত এত মরিয়া অবস্থায় কেন, অথবা কেন ভারত এক চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

ব্যাপারটা দাঁডিয়েছে এমন যে, এশিয়ার কোন সরকার চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে ভারতের কাছে একথার মানে ঐ সরকার ভারতের দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট করতে কাজ করছে।

আমাদের সরকার কী ভারতের বার্তা বুঝেছে?
তাহলে হাসিনা তার গত ভারত সফরে তিনি যে বার্তা পেয়েছিলেন তা কী ঠিকঠাক বুঝেছিলেন? খুব সম্ভবত না। কী দেখে তা মনে হল? মনে হল কারণ, হাসিনার ঐ এপ্রিল ২০১৭ সফরের পরে,  ঐ বছরই ২০১৭ অক্টোবরে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব ভারত সফরে গিয়ে সরবে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা জানিয়ে এসেছিলেন। অর্থাৎ আমাদের সরকার বুঝাতে চাচ্ছিল যে ভারতের আপত্তি মতভিন্নতা আছে কিন্তু ব্যাপারটা আমাদের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ। অথচ ভারতের মূল আপত্তি হল কোন সরকারের  চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়া, চীনা বিনিয়োগ নেয়া।  এথেকে বুঝা যায় যে বাংলাদেশ ভারতের অবস্থানের সম্মক উপলব্দি ছিল না। অথবা ভারতও তার আপত্তির কারণ খুলে বলে নাই। ভারতের (পারসেপশন অনুসারে)অবস্থান হল যদি সে বাংলাদেশকে বেল্ট-রোডে যোগ দিতে দেয়, চীনা বিনিয়োগ এনে নিজের উন্নয়ন চালায়ে যায় তবে এর মানে হবে সেই বাংলাদেশ ভারতের “দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট” করতে কাজ করছে। অর্থাৎ এটা ভারতের মরিয়া স্বার্থ। কিন্তু এটা যে ভারতের প্রথম হওয়া ফসকে যাবার মামলা তা সে কখনও বাংলাদেশের মত কাউকে খুলে বলছে না। বলছে পাকিস্তান-কাশ্মীর হয়ে প্রকল্প আঁকাতে তা ভারতের সার্বভৌমত্ব – এটাই তার আপত্তি। ফলে হাসিনা সরকারও মনে করছে এই ইস্যুটা হল, ঠিকমত ভারতকে বুঝালে, তোয়াজ করলে ভারত মানবে। আর সে কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের চীনা বেল্ট-রোডের পক্ষে থাকা শক্ত করে তুলে ধরে ভারতকে বুঝানো। অথচ হাসিনা সরকারের ঠেকা যদি হয় আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন তার জন্য খুবই জরুরি তবে সরকার আসলে পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়ে উলটা কাজই করিয়েছে। মুল কথা এটা তো পরিস্কার যে হাসিনাকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে দিয়ে ভারত নিজের এক নম্বর হওয়ার ‘মরিয়া স্বার্থ’ [perceived desparate interest] নষ্ট করতে পারে না। ভারতের কাছে হাসিনার আবার ক্ষমতায় আসা না আসা ভারতের মরিয়া স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারে না।

অতএব এই ব্যাপারে সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে যে হাসিনা ভারতের পারসেপশন, ভারতের অবস্থান কেন এমন ইত্যাদি বুঝেছে কি না। বরং হাসিনা ব্যাপারটাকে চীন-ভারতের সাধারণ বিরোধ যেমনটা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে স্বাভাবিক রুটিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা,  প্রতিযোগিতায় হতে দেখা যায় এর বেশি কিছু বলে দেখেছে মনে হয় না। সে কারণেই, বাংলাদেশ সরকার এখনো মনে করছে একটা ভালো পারসুয়েশন হলে, একটু তোয়াজ কিংবা বুঝিয়ে বললে ভারত বুঝে যাবে। অর্থাৎ আমাদেরকে চীনা প্রজেক্ট নিতে দেবে। গত এক বছর ধরে আমরা দেখেছি সেই পারসুয়েশনের তোয়াজ, বাংলায় যাকে বলে, মন জয়ের চেষ্টা। আর এর সর্বশেষ নজির হল  ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ-২০১৮’।

যদিও আসলে এটা তোষামোদ কি না সেটা আমার বলার মুল বিষয় নয়। মূল ব্যাপার হল, ভারত ব্যাপারটাকে দেখছে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিজের কথিত প্রথম হওয়া-না-হওয়া হিসেবে। বাংলাদেশ সরকার এখনও বিষয়টা ভারতের চোখে দেখেনি বা এই পারস্পেকটিভের নাগালই পায়নি,  কারণ ভারতও খুলে সেকথা বলছে না বা বলতে পারছে না বা চাচ্ছে না – এটা মনে করার কারণ আছে। কারণ, আমাদের সরকার নাগাল পেলে বা জানা থাকলে তো বুঝত যে সেক্ষেত্রে এরপরে আর এখানে তোয়াজ বা ভারতকে বুঝানোর আর কিছু নেই। সেকারণে এই উলটা তোয়াজ আমরা হতে দেখছি, ভারতীয় সম্পাদকদের মাধ্যমে হাসিনা ম্যাসেজ পৌছাতে চাইছেন যে ‘‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। বাংলাদেশের কাছ ভারত ভারতের জায়গাতেই থাকবে, চিন চিনের জায়গায়। ভারতের বন্ধুত্ব সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। চিন তো নতুন বন্ধু।’’ অথচ এই ম্যাসেজের অর্থ ভারতের কাছে তো উলটা।

ভারত হাসিনাকে বলছে, বাংলাদেশে নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ। আর হাসিনা পালটা ম্যাসেজ দিচ্ছে, বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আমি আর কিছু করব না, চীনের বলয়ে যাব না। এটাই হল এখানে, ব্যাট আর বলের পরস্পরের সংযোগ সম্পর্ক না হবার ঘটনা।  ভারত চাচ্ছে চীনের সাথে সম্পর্কহীন, বিনিয়োগ সম্পর্কহীন এক বাংলাদেশ। অথচ সরকার এটাকে বুঝছে এভাবে যে, চীনের থেকে বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক না রাখলেই বুঝি ভারত সন্তুষ্ট হবে!

তাহলে ভারতের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে? এককথায় এর জবাব ভারতের কাছে নাই। তবে ভারতের স্বপ্ন হল কল্পিত চীনের বেল্ট-রোড এর এক বিকল্প ‘মাজা ভাঙা’ একটা চার দেশীয় জোট হতে পারে কি না তেমন প্রাথমিক আলাপ চলছে এবং যেটা পাল্টা বেল্ট-রোড উদ্যোগ হতেও পারে। যেটা অবশ্যই অনেকটা ‘গোফে তেল’ ধরণের। তবুও গরিবেরও যেমন অর্থ না থাকলেও স্বপ্ন থাকে, তেমনি। ওই বিকল্প চালু হলে এরপরে ভারত সেই হবু প্রজেক্টের নৌকায় বাংলাদেশকে তুলে নেবে। আর ততদিন বাংলাদেশকে বিনিয়োগহীন বসে থাকতে হবে। বাস্তবে এখন, বাংলাদেশে অবকাঠামোতে যে বিনিয়োগ চাহিদা সেখানে ভারতের কোনো বিনিয়োগই নেই, অবদান নেই। থাকার কথাও না। মূল কারণ হল – ভারত এখনো অন্য রাষ্ট্রের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে পারে, এমন অর্থনীতিই নয়। তবে দু-চার বিলিয়নের যে কথা শোনা যায় সেটা বাংলাদেশে কোন অবকাঠামো বিনিয়োগ নয়। আসলে সেটা ভারতের দুর্বল মান এবং প্রতিযোগিতায় অচল স্টিল ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ভর্তুকির অর্থ। এজন্য ওই দু-চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়ে মূলত ভারতের স্টিল সংশ্লিষ্ট প্রডাক্ট (টাটা বা অন্য ভারতীয় গাড়ি, রেলের যন্ত্রপাতি) কিনতে পারা যায়; যাতে ভারতের অদক্ষ স্টিল ইন্ডাস্ট্রি ভারত সরকারের সাহায্যে টিকে থাকে। তাহলে বাংলাদেশ সরকারের মূল সমস্যাটা হল, চীনকে বাদ দিলে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় সে বিনিয়োগ ভারত থেকেও পাচ্ছে না। তাহলে কোথা থেকে পাবে? আর বিনিয়োগ না পেলে –“গণতন্ত্র না উন্নয়ন” – এ বিতর্কে নিজেকে উন্নয়নের কর্তা হিসেবে কেমনে প্রচার করবে? কারণ, অবকাঠামো বিনিয়োগ নেই মানে প্রজেক্ট নেই। প্রজেক্ট নাই তো হাসিনার দল বা কর্মি কিছুই নাই। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের চাহিদা পূরণের দিক থেকেও ভারত এখনও অযোগ্য, অপুষ্ট। আসলে ভারত এখনও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ গ্রহীতা অর্থনীতির রাষ্ট্র। অথচ স্বপ্নে পোলাও খায়। চীনের রিজার্ভ যেখানে ৩১৮১ বিলিয়নের উপরে ভারতের সেখানে মাত্র ৪১৭ বিলিয়ন। কিন্তু ভারত এখনই ‘গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক নম্বর অর্থনীতি হয়ে গেছে’- এই ভাব ধরতে চায়।

এই বিচারের দিক থেকে দেখলে প্রথম আলোও একই ভুল করছে, ব্যাপারটা তারাও বুঝেছে মনে হয় না। তারা একটা আর্টিকেল ছেপেছে, “চীন-ভারতের ‘লড়াই’য়ে বাংলাদেশ জড়িত না” এই শিরোনামে, এটাও অর্থহীন। কারণ বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনা তো জড়াচ্ছেন না। ভারতই তার অনুমিত ধারণা বা পারসেপশনে জড়িয়ে বাংলাদেশকে দেখছে। আর প্রশ্নটা আসলে চীনা বিনিয়োগে ভারতের কঠোর আপত্তি। বলছে, শুধু বেল্ট-রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে না তাই নয়; কোনো চীনা বিনিয়োগই নিতে পারবে না হাসিনা সরকার। অপর দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’ দুটো এক কথা নয়। বরং বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগই তো ভারতের ‘পারসিভড’ উদ্বেগের কারণ। আসলে ভারত যেন বাংলাদেশকে বলছে- ‘কোনো কিছু না ছুঁয়ে বসে থাক।’ এ কথার মানে কী পাঠকেরা কল্পনা করে দেখতে পারেন। কারণ বিনিয়োগের বাজারে, মুরোদে ভারত এখনো বামন, অপুষ্ট। তাই ভারত, চীনের কোন বিকল্প নয়। প্রথম আলোও বুঝেছে যেন চীনা প্রভাব বলয়ে হাসিনা যাবে না – এর নিশ্চয়তা চাচ্ছে ভারত। অথচ বিষয়টা চীনা প্রভাব বলয় নয়, চীনা বিনিয়োগ নেয়া না নেয়ার।

ভারত যদি মনে করে বাংলাদেশে  – নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ – অবস্থান মানলে একমাত্র তবেই হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিবে – তাহলে অবস্থা দাড়াবে এবার তাহলে আর ভারত হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিতে পারছে না।

এ অবস্থায় আস্তে ধীরে হলেও হাসিনা সরকার তাই সপক্ষে কোনো বিদেশের সমর্থন পাওয়া ছাড়াই সংসদ নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছে, বুঝতে হবে।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ মার্চ ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ব্যাক ক্যালকুলেশন”  -এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

গৌতম দাস

১৯ অক্টোবর ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2kt

 

 

আমাদের একজন সিনিয়র সিটিজেন ড. আকবর আলি খান। তার মূল যে পরিচয়, যে কারণে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তা হল, তিনি একজন দক্ষ আমলা বা বুরোক্র্যাট। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তিনি পেশাজীবন শেষ করেছেন। একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে তিনি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। গত ২৬ মার্চ ২০১৭ দৈনিক প্রথম আলোতে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। অনুমান করি, তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইটির কথা মাথায় রেখে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের জন্য একটা কার্যকর ও দক্ষ প্রশাসন গড়তে কী কী করা উচিত, তা নিয়ে যারা কিছু চিন্তাভাবনা করেছেন, করেন অথবা কিছু প্রয়োগ করেছেন, বদলিয়েছেন ও উদ্যোগ নিয়েছেন – এমন কাজের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন আকবর আলি খান। তার সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ ও কৌতূহল এখান থেকেই। অবশ্য ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে আমরাই আবার বেশ খানিকটা যেন হতাশ হতে যাই।

ওই সাক্ষাৎকারে আকবর আলি খানের রাষ্ট্রবিষয়ক বিভিন্ন মন্তব্য আছে। সেগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করি, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাকে তিনি এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। ইংরাজি নেশন স্টেট (nation-state) শব্দের বাংলা আমরা করে নিয়েছি জাতিরাষ্ট্র। একথা  সত্য যে, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে প্রবল প্রতাপে মডার্ন রাষ্ট্র মানেই তা জাতিরাষ্ট্র, এ ধারণা ছেয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেখানে নাগরিকেরা সবাই একই জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্টের একই ভাষা, একই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত এবং সম্ভবত একই ধর্ম বা মেজরিটির ধর্ম একই এমন একটা অবস্থা থাকে সেখানে জাতিরাষ্ট্র শব্দটার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। আসলে একটা বহুল প্রচলিত শব্দ এখানে সাধারণত ব্যবহৃত হতে দেখা যায় যেটা আমরা ব্যবহার করিনি, সেটা হল ‘জাতি’, যা ইংরাজি নেশন শব্দের বাংলা। ভুখন্ডে বসবাসরত নাগরিক সকলকে বুঝাতে বহুল প্রচলিত শব্দ হল ‘জাতি’, যা এখানে ব্যবহার করা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তার বদলে এখানে আরও সাধারণ অর্থবোধক শব্দ ‘জনগোষ্ঠিগত’ দিয়ে তা বুঝানো হয়েছে। কী হলে জনগোষ্ঠি ‘জাতি’তে রূপান্তরিত হয়ে যায়? সে প্রশ্ন এখানে তুলব।

আবার একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করা গেলেই কী সেটাই কী জাতিরাষ্ট্র কায়েম হয়ে যাওয়া?  তাহলে রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই কী জাতিরাষ্ট্র?  সে প্রশ্নও তো আছেই।

তবে এই শতাব্দি এসে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। ধারণা ও উপলব্ধি ততদিনে থিতু হতে সময় পেয়ে যায় যে, না, জাতিরাষ্ট্র’ কথাটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ধারণা বা বিষয় নয়; বরং এক উটকো ধারণার অংশ।

আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যাপারে সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ‘রিপাবলিক’। আর রিপাবলিক ধারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিক সাম্য, মানুষের মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার। কিন্তু রাষ্ট্র গঠন বা রাষ্ট্রধারণার বাস্তবায়নের কালে দেখা সব সংশ্লিষ্ট ধারণাকে তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান ও গণ্য করে সব কিছু পর্যবসিত হয়েছে শুধু ‘জাতিরাষ্ট্র’ শব্দ ও ধারণায়। রাষ্ট্রমাত্রই যেন জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। অথচ অষ্টাদশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী শব্দ ও ধারণা এখনো রিপাবলিক। সে তুলনার সাথে জাতিরাষ্ট্র বলে একটা ধারণা এসে যাওয়া যেন হাতছুট ঘটনা। কারণ সেই থেকে এখনো নেশন কী, নেশন মানে কী, এগুলো অস্পষ্ট। এখনো তা নিজেকে প্রোথিত করতে পারেনি।

আবার লক্ষ্য করলে দেখব সেকালেও মানে অন্তত বিংশ শতকের শুরুতেও সবাই জাতিরাষ্ট্র বলতে রিপাবলিক বোঝেনি। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জন্ম নেয়া সোভিয়েত রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯১৭), মাওয়ের চীনের পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯৪৯), এমনকি ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)- এগুলোর একটিতেও জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র বলতে যা সেকালে বুঝা হত, তা বুঝে এসব রাষ্ট্র ও বিপ্লব কায়েম করা হয়নি। ফলে এগুলো জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কায়েম হয়েছে, এমন কোনো দাবি তাদের নেই; বরং প্রত্যেকে নিজ রাষ্ট্রের নামের সাথে গৌরবোজ্জ্বলভাবে রিপাবলিক শব্দ ও ধারণা বয়ে বেড়াতে পিছপা হচ্ছে না বা ভুল করেনি। একেবারে রাষ্ট্রের নামের মধ্যেই তা খোদাই করে দিয়েছিল।

আবার আধুনিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ১৭৭৬ সালের ইউএসএ পর্যন্ত নিজেকে কোনো জাতিরাষ্ট্র দাবি করে না। আবার লক্ষণীয় হল, ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে সব আধুনিক রাষ্ট্রই রিপাবলিক ধারণাকে মুখ্য রেখে তৈরি হয়েছে। এর প্রমাণ লেনিনের ইউএসএসআর (১৯১৭) রাষ্ট্রের নামের শেষের রিপাবলিক। মাওয়ের চীন পিআরসি (পিপলস রিপাবলিক অব চায়না, ১৯৪৯) আর ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)। বিশ শতকের এই তিন রাষ্ট্র রিপাবলিক হয়ে আধুনিক রাষ্ট্র বলে নিজেদের দাবি করলেও কেউই জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র নয়, সে দাবিও করেনি। এই উদাহরণগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে আর রাষ্ট্রমাত্রই সেটা জাতিরাষ্ট্র, এমন ভুল বা পশ্চাৎপদ ধারণা আঁকড়ে থাকার কথা নয়। কিন্তু আকবর আলি খান জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে আঁকড়ে এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন; দাবি করছেন- “জাতিরাষ্ট্র বিষয়টি আধুনিক ধারণা। ‘ …’ পৃথিবীর সবখানেই জাতিসত্তা পরে জন্ম নিয়েছে।”

সারকথায়, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই যে তাকে জাতিরাষ্ট্রও বলা ঠিক হবে না এটা ক্রমশ মানুষের মধ্যে সতর্কতা আসতে শুরু করেছিল। তবুও এরপরেও অনেকে এখনও একাকার করে দেখে থাকেন। আকবর আলি খান তাদের একজন থেকে গেছেন দেখা যাচ্ছে। আর সব নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণাধারী যে বিপদে পড়েন, তিনিও সে একই ‘বিপদে’ পড়েছেন। একই সূত্র অনুসারে ‘জাতিসত্তা’ বলে শব্দটি তিনিও এনেছেন। এতে যে বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তা হল – ‘জাতি’ জিনিসটি কী তা ব্যাখ্যা করতে হবে তাদের। এখন , এই ‘জাতি’ মানে কী? সেটা কি ইংরেজি (race) রেস নাকি (ethnicity) এথনিসিটি? নাকি কমন কালচারাল কোন বৈশিষ্ট্য অর্থে এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা? কোনটা? এরা সেটা পরিষ্কার করে বলেন না। তা সত্ত্বেও তারাই আবার জাতিসত্তা শব্দটি ব্যবহার করে আরও অস্পষ্টতা বাড়ান। আকবর আলি বলছেন, ‘কাজেই বাংলাদেশের উৎস প্রাচীন বা মধ্যযুগে খুঁজলে হবে না, বাংলাদেশের আদিসত্তার উৎস খুঁজতে হবে ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতকে।’ আর প্রশ্নকর্তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি বইয়ে আপনি লিখেছেন, …. সেদিক থেকে বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ মধ্যযুগ থেকে।’

অর্থাৎ দু’জনেই খুঁজছেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে থেকে উত্থিত। কারণ এ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তারা এরপর তাদের পছন্দের জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট ধারণাকে পোক্ত করবেন সম্ভবত। কিন্তু আসলে এই অনুমান অর্থহীন। কারণ মূল বিষয় জাতি কী, নেশন বলতে তারা কী বুঝাচ্ছেন তা তো অস্পষ্টই রয়ে গেছে। জাতি মানে কী – রেসিয়াল অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা কী? অথবা অন্য কোনো ধারণা? তারা এদিকে খোঁড়াখুঁড়ি করেছেন বা করতে চান বলে মনে হয় না।
কিন্তু এই জট আমরা কী করে সহজে খুলতে পারি? একটি দিক লক্ষ করলেই সবাই এই জট খুলতে পারব।

রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক যে ধারণাই হোক, ব্যাপারটাকে একটা কমন বৈশিষ্ট্য হিসাবে অবশ্যই দেখা যায়। কিন্যেতু সবচেয়ে গুরুত্মবপুর্নণ যেটা  লক্ষ করলে দেখব, ‘জাতি’ বলতে যাই বুঝাতে চাই, তা আসলে এক ধরনের (given) গিভেন বৈশিষ্ট্য বা গিভেন ধারণা। তা কী অর্থে? মানে হল যে, “আগে থেকে দেয়া আছে”। যেমন দুনিয়ার কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজের রেসিয়াল (অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক) বৈশিষ্ট্য বেছে নিতে পারে না, সম্ভব নয় বলে। রেসিয়াল বৈশিষ্ট মানুষের পছন্দ করে বেছে নিবার জিনিষ না।  জন্মানোর আগে কেউ আল্লাহর সাথে চুক্তি করে, চয়েজে টিক দিয়ে বাঙালি হয় না, বিহারি হয় না; বরং বাঙালির ঘরে জন্মানোর পরে ওই ঘর মোতাবেক অর্থাৎ (given) গিভেন হিসেবে বাঙালি হয়। ফলে রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি যাই হোক না কেন, এগুলোর মূল পরিচয় আসলে গিভেন ধারণার অন্তর্গত। সোজা কথা হলো, আমি জাতে বাঙালি হতে চাইছি বলে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাঙালি হতে পারি না। হই নাই। এখন একটা কথা স্পষ্ট করতে হবে। এর মানে কি এই যে, এখন তাহলে যার যার (আল্লাহর দেয়া) বা গিভেন পরিচয় অনুসারে তাকে এখন ওই পরিচয়ের রাজনীতিই করতে হবে? মানে এথনিক বাঙালিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই করতে হবে?

এর জবাব-ফয়সালা পেতে আমাদের শেষ বাক্যে মনোযোগ দিতে হবে। ওই বাক্যে দুইবার বাঙালি শব্দটি ব্যবহার করেছি- এথনিক বাঙালি আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী। অথচ লক্ষ করুন, এ দুই বাঙালি শব্দের অর্থ এক নয়। কেন? প্রথমে ব্যবহৃত বাঙালি শব্দটি গিভেন অর্থে বাঙালি। সেজন্য ওটা আমার গিভেন পরিচয় বা প্রাকৃতিক পরিচয়। তাহলে পরেরটা?

পরেরটা হল বেছে নিয়েছি, ইচ্ছামতো যেটা ভালো লেগেছে সেই রাজনীতি- নিজের রাজনৈতিক পরিচয়। স্বেচ্ছায় সচেতনে যেটা মানুষ করে কিংবা বেছে নেয়, সেটাকে রাজনৈতিক কাজ বা সিদ্ধান্ত বলে। এই পরিচয় বা রাজনীতি আবার শুধু আমার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটা আমরা যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা বদলাতেও পারি। যেমন ১৯৪৭ সালে আমরা একই জনগোষ্ঠী ‘ইসলামি জাতিবাদী’ হয়েছিলাম। সে পরিচয় নিয়েছিলাম। আবার আমরাই ১৯৭১ সালে নতুন পরিচয় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ হয়েছিলাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছাড়াও আরো যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনীতি আমরা আগামীতে করতে পারি, বেছে নিতে পারি। একটার বদলে আরেকটা রাজনীতি করতে পারি। মূল কথা, এথনিক বাঙালি হয়েও আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতে পারি, না-ও করতে পারি। এর অর্থ, তাহলে এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠী এক আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে গেলে সেটা একটা জাতিরাষ্ট্রই হয়ে যাবে, বাঙালি জাতিবাদী (অথবা বাংলাদেশী জাতিবাদী) জাতিরাষ্ট্র হয়ে যাবেই- এমন ধারণা ভিত্তিহীন।

আকবর আলি খান এবং প্রশ্নকর্তা দু’জনই খুঁজছিলেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে হয়েছে, মধ্যযুগে কি না- এই খোঁজাখুঁজি অর্থহীন। কারণ এটা নৃতাত্ত্বিক বা থিনিক খোঁড়াখুঁড়ি গিভেন পরিচয়ের খোঁড়াখুঁড়ি। এর সাথে রাজনৈতিক পরিচয় মিলিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলা অর্থহীন। কারণ দুটো আলাদা জিনিস। রাজনীতি সচেতন হওয়া বা রাজনীতি মানে কী সেসব বোঝার বহু আগেই ‘গিভেন’ পরিচয় আমরা পেয়ে যাই। আমাদের জানা না থাকলে প্রাকৃতিক পরিচয় আর রাজনৈতিক পরিচয়- এ দুটোকে গুলিয়ে ফেলে কথা বলতে থাকি। শেখ মুজিব সর্বপ্রথম রাজনৈতিক বাঙালি বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি হাজির করেন। স্পষ্ট আকারে তা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ছয় দফায়। অর্থাৎ এর সাথে গিভেন বাঙালি কবে থেকে শুরু হয়েছিল, এর কোনোই সম্পর্ক নেই। যেমন অনেকে ‘আবহমান বাঙালি’ বলে একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। এই শব্দের সাথে বাঙালি জাতিবাদী ধারণার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আবহমান বাঙালি একটি এথনিক বা প্রাকৃতিক বা গিভেন পরিচয়ের ধারণা।
এই কারণে আকবর আলি খানের ওই সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর শব্দ ও ধারণা হলো ‘জাতি’। প্রথমত, ওটা অস্পষ্ট যে, তা গিভেন না পলিটিক্যাল। তাই এটা অস্পষ্ট রয়েছে বলে পুরো আলোচনাই সেখানে অর্থহীন হয়ে গেছে।

তিনি বলছেন, ‘বাঙালিদের জন্য পরিচয়ের ভুল ঠিকানা ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবির্ভাব ছিল এক আকস্মিক ঘটনা। ভারতীয় উপমহাদেশে যত মুসলমান ছিল, তারা এক জাতি; হিন্দু যারা তারা আরেক জাতি- এমন ভাবনা থেকে এর সৃষ্টি। কার্যত মুসলমান বা হিন্দুদের সবাই এক ভাষা, এক জাতি, এক অঞ্চলের মানুষ ছিল না। … সেজন্য আমি মনে করি, আধুনিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া ছিল অনিবার্য।’

তার এই বয়ানের পর্যালোচনা করে বলতে হয়- প্রথমত, মানতে হবে যে, দেশ ভাগ সবার জন্য খারাপ অভিজ্ঞতা। আসলে এ কথা বাস্তবে সত্যি ছিল না। যেমন পূর্ববঙ্গের প্রজাদের কাছে দেশ ভাগ ছিল অনিবার্য এবং তাদের খুবই কাম্য। তাই এককাতারে প্রজারা তাতে খুশি হয়েছিল। হিন্দু বাঙালিরা জমিদারির পক্ষ নিয়ে, তা আঁকড়ে থেকে এ থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষমতার আধিপত্যের শেয়ার ভোগ করতে চাইল। জমিদারেরা এমন একক মোড়লিপনা চালিয়ে যেতে চাইলো প্রজাদের সাথে- দেশ ভাগ করা মানেই, প্রাকটিক্যালি জমিদারি উচ্ছেদ- এই পথে যেতে চাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

দ্বিতীয় কথা, দ্বিজাতির ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়নি। মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে আলাদা পাকিস্তান হওয়া আর মুসলমানেরা আলাদা জাতি বলে পাকিস্তান হওয়া এককথা নয়। যদিও দেশ ভাগের পর এমন সাফাই কেউ কেউ দিয়েছিলেন। আর কলকাতার জমিদারদের পক্ষের সাফাই হিসেবে অনেকে বলে- ‘মুসলমান যেহেতু জাতি নয়, একটা ধর্মের নাম; কাজেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি- এটা হয় না। এটা করা ভুল।’ এটাকে বিরাট জ্ঞানগর্ভ আরগুমেন্ট মনে করে অনেকে খুশি হয়ে যায়। ধরা যাক, ইসলামি জাতিবাদ ধারণা ভুল। তাহলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা সঠিক হয় কিভাবে?

বাস্তবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত রাষ্ট্র হয়েছে। তবে সেটা তারা অকপটে স্বীকার করেছে, না ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ শব্দের আড়াল নিয়েছে সে কথা আলাদা। কিন্তু হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই ৫০০-এর বেশি করদরাজার রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়ে আর ২৯ রাজ্যকে একসাথে বেঁধে আজকের ভারত রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছে। আর একটি ফ্যাক্ট হলো, কংগ্রেস হিন্দু জাতিবাদী রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দল হিসেবে খাড়া হয়ে ছিল। সে কারণেই এর ভেতর মুসলমানেরা নিজেদের খুঁজে না পেয়েই কংগ্রেস দল খোলার পর ২০ বছর অপেক্ষা করে শেষে মুসলিম লীগ গঠন করেছিল।
আসলে পুরো বিষয়ে মূল সমস্যা পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্স। সব জাতীয়তাবাদ, সব জাতি ধারণাই একেকটা পরিচয়ের রাজনীতি; সেক্টেরিয়ান পলিটিক্স। সেটা কংগ্রেস হিন্দুত্বের জাতিবাদ করলেও যা, মুসলিম লীগের ইসলামি জাতীয়তাবাদ করলেও তা। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ করলেও একই সমস্যা থেকেই যাবে। বাংলাদেশে কেউ বাঙালি জাতিবাদ করতে চাইলে আরেকজন বলবে তিনি ইসলামি জাতীয়তাবাদ করবেন। আপনি ভাষার জাতীয়তাবাদ চাইলে আর একজন ভুখণ্ডের জাতিবাদ চেয়ে বসবেন। জাতিবাদী রাজনীতি মানেই পরিচয়ের রাজনীতি, মানে বিভক্তির রাজনীতি। অথচ এর বাইরে আসতে হবে আমাদের।
অতএব ‘জাতি’ ধারণা, জাতিবাদী রাজনীতির ধারণা ইত্যাদি আগে স্বচ্ছ করে না নিলে প্রাসঙ্গিক আলোচনা অর্থহীন থেকে যাবে।

আকবার আলি খানের বক্তব্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হলো তিনি বলছেন, জাতির পিতা স্বয়ং মনে করতেন আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদান রয়েছে। একটি হলো ধর্ম, আরেকটি হলো ভাষা। তিনি যদি সত্যি সত্যিই মনে করে থাকেন, জাতির পিতার জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদানের একটা ধর্ম; তাহলে দ্বিজাতিতত্ত্বকে মানে ধর্মীয় পরিচয়কে সমালোচনা করার তো সুযোগ নেই। দেশ ভাগের ব্যাপারে কলকাতার বয়ানের পক্ষে দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কই? এটা তো স্ববিরোধিতা। ফলে ‘পাকিস্তান হওয়া এক দুর্ঘটনা আর বাংলাদেশ হওয়া এরই সংশোধন!’-কথাটা খুবই স্ববিরোধী বক্তব্য হয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

গৌতম দাস

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার,  ০০ঃ১৫

http://wp.me/p1sCvy-2id

বাজার মানে, চাহিদা-যোগানের লড়াইয়ে এক পর্যায়ে দরদাম কোথাও যেখানে থিতু স্থির হয়। বাংলাদেশের চালের বাজার কোন “তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতির” ফেনোমেনা নয়। এখানে বাজার আছে, তা ফাংশন করে ঠিক যেভাবে কোন বাজারের করার কথা, নিয়ম মত। তবে ছাড়া-গরুর মত এই বাজারে সরকার অর্থাৎ আমাদের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে এক মেকানিজম আছে যা দিয়ে সে বাজারের সবচেয়ে বড় কুতুব-প্রভাবক। সব মজুতদারের বাপ হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সরকার সেই মেকানিজম নিজেই নষ্ট করে ফেলাতে  এখন খোদ সরকারই বাজার থেকে আউট। বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সরকার।

‘চড়া চালের বাজার’, ‘চালের দাম নাগালের বাইরে’ বা এর চরম অবস্থা ‘দুর্ভিক্ষ’ শব্দগুলোর ব্যবহার বাংলাদেশে কমবেশি লোপ পেতে শুরু করেছিল। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের পর তুলনামূলকভাবে ভাল লম্বা সময় কাটলেও দাম চড়া বা চালের অভাব ঘটার মত উল্লেখযোগ্য বছর ছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর। ওই বছরের মাইলস্টোন বা রেকর্ড হল, মোটা চালের দাম ৪২ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া। কিন্এতু এর দশ বছর পরে এবার ২০১৭ সালে আবার অনাকাঙ্খিতভাবে চালের দাম চড়া। আর এবারের নতুন রেকর্ড হল – মোটা চালের দাম বেনাপোল বন্দরেই ৪৮ টাকা বা এর উপরে উঠেছিল।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, অনেকে খেয়াল করেন নাই হয়ত, চুয়াত্তরের চালের বাজার আর আজকের চালের বাজারের মধ্যে বিরাট এক মৌলিক ফারাক আছে। তা হল, সেকালে চালের বাজার ছিল ‘কমিউনিস্ট সোভিয়েত মডেলে কথিত পরিকল্পিত অর্থনীতির’ আলোকে সাজানো – যার অর্থ আমরা সমাজে তখন চাল বিতরণ করা হত  – ‘রেশনে’ মানে ভর্তুকী দামের চাল। একালের অনেকের কাছে বিশেষত তরুণদের কাছে ‘রেশন’ শব্দটা অপরিচিত হয়ত। ‘রেশন’ শব্দের অর্থ হল, বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বাজারের চালের দাম নামিয়ে রাখে সরকার। আর প্রত্যেক পরিবারের সদস্য গুণে সে অনুযায়ী, পরিবারের সাপ্তাহিক চাহিদার পরিমাণ চাল নির্দিষ্ট দোকান (ডিলারের) থেকে বাজারের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করা।

কমিউনিস্ট অনুমানের অর্থনীতির জ্ঞানে তাদের এক বিরাট ক্ষোভের জায়গা হল – ‘বাজার’ ও এই ধারণার উপরে। বাজার তাদের কাছে নাকি শত্রু, সম্ভবত শ্রেণীশত্রু। ফলে দেশ সমাজে বাজারকে কার্যকর বা ফাংশনাল হতে না দেয়া, কাবু করে রাখতে হবে। এই হল তাদের অনুমান। কারণ তাদের চোখে বাজার জিনিষটা  ম্যানেজেবল না। নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাই বাজার ভেঙে দিতে হবে। আর তাদের কাছে এরই বিকল্প হল রেশনিং বা ভর্তুকিব্যবস্থা। আর বাজার ধারণার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ আপত্তি হল, ‘বাজার’ মুনাফা বা শোষণে সহায়তা করে। এটা সম্ভব হয়, কারণ মজুদদারেরা বাজারের মধ্যে ‘নোঙরা অযাচিত হাত’  ঢুকিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। অর্থাৎ চাহিদা ও জোগানের লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে পণ্যের মূল্য থিতু বা স্থির হওয়ার ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণের ফ্যাক্টরগুলোকে অবজেকটিভ না থাকতে দিয়ে সাবজেকটিভ ইচ্ছার হাত ঢুকিয়ে দেয়ার সুযোগ নেয়া হয়। এটা সত্যি যে, বাজারকে অবজেকটিভ রেখে দেয়া খুবই কঠিন। কে কোথা থেকে বাজারের মূল্যকে প্রভাবিত করতে হস্তক্ষেপ করে বসে, তা ঠেকানো শক্ত আইনকানুন ও মেকানিজম তৈরি করেও এটা সহজে সম্ভব হয় না। এই সমস্যা তো আছেই, কিন্তু অন্য দিকে আবার পালটা সমস্যাও তো আছে। চাল আমাদের মত দেশে মানুষের প্রধান খাদ্য, ফলে এই মুখ্য ভোগ্যপণ্যে ভর্তুকী ঢেলে এক ভর্তুকীর অর্থনীতি জারি রাখলে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণে অর্থ সংস্থান জোগাড় করতে হয়। তা জোগাড় করতে যেকোনো সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভর্তুকি কোথা থেকে আসবে? সরকারের আয়ের কোন খাত থেকে?

স্বাভাবিকভাবেই এটা রাজস্ব আয়ের ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সরকারি ব্যয়ের অন্যান্য খাতকে প্রায় সময় ছেঁটে ফেলতে হয়। কারণ চালে ভর্তুকি দেয়ার অন্য সব কিছুর চেয়ে চাল বেশি দরকারি। এর প্রায়োরিটি অন্য খরচের প্রয়োজনগুলোর চেয়ে বেশি। অন্যদিকে আবার, চালের মূল্যের সাথে শ্রমের ন্যূনতম মজুরি সরাসরি সম্পর্কিত। চালের মূল্য কম তো, ন্যূনতম মজুরি তুলনামূলকভাবে কম হবে। তাই সমাজে মোট উৎপাদনের বেশির ভাগ অংশই যদি বেসরকারি খাতে হয়, তাহলে চালে ভর্তুকির সুফল আসলে যাবে কারখানা মালিকের ঘরে, কম মূল্যে শ্রম কিনবেন তিনি। মানে, পাবলিক মানি যাবে ব্যক্তি মালিকের ঘরে। এ ছাড়া ভর্তুকির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল, এর ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা। ঠিক যার ভর্তুকি দরকার তিনি ছাড়াও অজস্র লোক যাদের দরকার নেই, তারাও ভর্তুকির আওতায় এসে যায়। ফলে ভর্তুকির চাল উঠিয়ে নেয়, বাজারে বিক্রি করে, ভুয়া নামের রেশন কার্ড থাকে ইত্যাদি এক বিরাট অপচয় ও বোঝা হয়ে হাজির হয়। তবে ভর্তুকির বিরুদ্ধে অথবা স্বপক্ষের যুক্তি আর যাই থাক, আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে খাদ্যে ভর্তুকি বা রেশনিং ব্যবস্থা একেবারেই উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

এর মূল কারণ, সরকার চালানোর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনা আর সরকার চালাতে ব্যয় কমানো, এটা করতে খরচের খাত ও  প্রয়োজনগুলোকে সুনির্দিষ্ট করা আর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করা, এভাবে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো যাতে খরচ কম হয় আর সেই সাথে ব্যবস্থাপনা দক্ষ হয়, ইত্যাদি এসব করতে নেয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের এক প্রকল্প। এর শর্ত মান্য করতে গিয়ে বাংলাদেশের রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এতটুকু পড়ার পর অনেকে সিদ্ধান্তে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠতে পারেন যে, ‘দেখছ, বিশ্বব্যাংক কত খারাপ’ ইত্যাদি।  না এমন চিন্তা অতিসরলীকরণের দোষে দুষ্ট হবে।  আসলে উঠিয়ে দিবার এই ব্যাপারটাকে বলা যায়, চালের বাজারকে ভিন্নভাবে ম্যানেজ করার দিকে চলে যাওয়া, ঠিক রেশনিং উঠানো বা ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়া নয়।

যেসব মূল কথার উপরে নতুন ব্যবস্থাটা কাজ করে সে তত্ত্বটা হল- ১. চালের বাজারকে ফিরে ফাংশন করতে দেওয়া। ২. সরকার হবে নতুন এই সিস্টেমের মনিটরিং আর ম্যানেজমেন্ট কর্তা। ৩. কোন মজুদদারি মোকাবেলার সবচেয়ে সহজ পথ হবে যে, সরকার নিজেই হবে সবচেয়ে বড় এক বিরাট মজুদদার; ফলে ব্যক্তি-মজুদদারের হয়ে যাবে অকার্যকর ক্ষমতার চুনোপুঁটি। ছোট মজুদদারিও লাভজনক হবে কি না সে সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে আসবে। ৪. ধান ওঠার পর সংগ্রহমূল্য সরকার নিজে নির্ধারণ করে দিয়ে চালের দাম কোন সীমার মধ্যে থাকবে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিবে। ৫. আর সবশেষে একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে।
অর্থাৎ এর আগে বলা সব ব্যবস্থাগুলো নেয়ার পরেও যদি বাজারে চালের দাম সরকারের কাঙ্খিত রেঞ্জের বাইরে চলে যায় তাহলে এই ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেমন এক সপ্তাহে চালের দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গেলে সরকার ডিলারের মাধ্যমে ট্রাকে করে বাজারে চাল ছাড়বে। এভাবে সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করতে নেমে পড়বে। শুধু তাই না বাজারে আগে যে কম দাম ছিক সেই দামে সে চাল বেচা শুরু করবে। এভাবে চাল ছাড়তেই থাকবে যতক্ষণ বাজারে চালের দাম আগের পর্যায়ে না নেমে আসবে। এই জায়গাটায়ই হলো আসল লড়াই। বাজারের মোট মজুদের চেয়ে সরকারের মজুদ সবসময় অনেক বেশি বলে একপর্যায়ে বাজারের ব্যক্তি মজুদদার হেরে যাবে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার হিসাবে দশ থেকে চৌদ্দ লাখ (দশ লাখের নিচে নয়) টনের খাদ্য মজুদ থাকলে ব্যক্তি-মজুদদারেরা সরকারের কাছে হারবেই।  বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার এই নিয়ম ও মাপকাঠিই সাব্যস্ত হয়েছিল আশির দশকের প্রথমার্ধ থেকে। আর কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই নতুন ব্যবস্থা ফলদায়কভাবে চলেছিল ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত। এই হিসাবে বলা যায় পুরনো রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে বাস্তবায়িত, বিকল্প এই পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল সফল। কিন্তু ব্যাপারটার তাৎপর্য কী? একবাক্যে বললে, কমিউনিস্টরা বাজার ম্যানেজেবল নয় সিদ্ধান্তে গিয়ে বাজারকে অকেজো করে দিয়েছিল, ভর্তুকীর এক রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। এর বিকল্প হল, চালের বাজার ফিরিয়ে আনা। আর বাজারের চাহিদা-জোগানোর খেলায় সরকার নিজেই এই বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হিসেবে নেমে সব ছোট খেলোয়াড়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটাকে আমরা এখন থেকে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে অভিহিত করব।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান চালের বাজারের হাল এটা প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠিত এবং প্রমাণিতভাবে কার্যকর ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ এবার দ্বিতীয়বার পরাজিত হয়েছে, ব্যক্তি মজুদদারদের কাছে। এটা ঠিক যেমন ২০০৭ সালে পরাজিত হয়েছি্‌ তেমনই। কিন্তু কেন এটা হল?

দুইবারের পরাজয়ে একটা অভিন্ন বিষয় আছে। তা হল, সরকারি চালের মজুদ ১০ লাখ টনের অনেক নিচে নেমে যেতে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে আইলা ঘূর্ণিঝড়ের পর এটা মাত্র দেড় লাখ টনে নেমে গিয়েছিল। অথচ এর আগেই খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের উপদেষ্টা প্রকাশ্যে টিভিতে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন যে, সরকারি গুদামে মজুদের পরিমাণ মাত্র দেড় লাখ টন। আর সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন, এখন সরকারের কিছু করার নেই।

আর এবারও সরকারের চাল মজুদের পরিমাণ তিন লাখ টনের নিচে নেমে গেছে। এর অর্থ ব্যক্তি মজুদদারেরা বাজারের ডমিনেটিং কর্তা হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে আরো কারণ আছে। ২০০৭ সালে বাজারে হেরে যাওয়ার পরেও সরকার কিছু গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই নিজের পক্ষে এনে ফেলেছিল যীগুলো এবার মারাত্মকভাবে অনুপস্থিত। অথচ ২০০৭ সালের রিকভারি বা নিয়ন্ত্রণ পুণরুদ্ধারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে বাজারে নিজের নিয়ন্ত্রণ  ফিরিয়ে আনতে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও সফল হয়েছিল, যা বেঞ্চমার্ক হয়ে আছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে, সেসব বেঞ্চমার্ক বা অভিজ্ঞতা থেকে এবার শিক্ষা নেয়া হয়নি।

সেটা হল একঃ চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। কিন্তু তা করতে পারার পেছনে আরেক শর্ত মানতে হয়। তা হল, সরকারের হাতে যথেষ্ট বিদেশী মুদ্রা থাকতে হবে। এর ঘাটতি থাকলে হবে না। ব্যাপারটা আমরা তুলনা করতে পারি চুয়াত্তর সালের সাথে। সেবার দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ, কোষাগারে বিদেশী মুদ্রা ছিল না যে চাল দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কমিউনিস্ট পরিকল্পিত অর্থনীতির আরেক সাধারণ ও মারাত্মক নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য থাকে যে, ওমন সরকারগুলো সবসময় বিদেশী মুদ্রার বিপুল অভাবের মধ্যে থাকে। ফলে সে সময় খাদ্য আমদানি উন্মুক্ত হওয়া দূরে থাক, আমদানির এলসি পর্যন্ত খুলতে দেয়া যায়নি। এখানে ‘উন্মুক্ত’ বলতে বুঝতে হবে যে, যে নিয়মিত চাল আমদানিকারক নয় তাকেও আমদানির এলসি খুলতে দেয়া। এককথায় বললে ২০০৭ সালের সরকার, যে-ই আগ্রহী তাকেই এলসি খুলতে দিতে পেরেছিল – এটাই ছিল ক্রাইটেরিয়া। কেন? তাতে কী সুবিধা পাওয়া গিয়েছিল?

যখনই আমাদের দেশে চালের অভাব হয় তখন পড়শি রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ভারত, সরকারি পর্যায়ে চাল বেচতে আর দরদাম ঠিক করতে নানা গড়িমসি করে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি করে থাকে। আর এসব বাধা টপকে তা উপেক্ষা করার সবচেয়ে ভাল উপায় হল, আমাদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের দিয়ে ওদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দ্রুত চাল কিনে আনা। এ ছাড়া এই পথেই সবচেয়ে কম দামে আমদানিকারকেরা  চাল আমদানি করতে পারেন। ব্যক্তি ব্যবসায়ীরা যদি প্রতি টন ৩৮৪ ডলারে আনেন, তবে সরকারি পর্যায়ে এর দাম ৪৫০ ডলারের কম হবে না। তাই সব মিলিয়ে এসব বাধা টপকানোর সবচেয়ে ভাল মেকানিজম হল, চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। ২০০৭ সালে তো ভারতের সরকারি পর্যায়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া পাঁচ লাখ টন চাল আজও ভারতের সরকার আনতে দেয়নি, সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে ভারত থেকে যা চাল এসেছিল এর সব চালই আনা সম্ভব হয়েছিল ব্যক্তিপর্যায়ে। সেটাও ভারত সরকার একপর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিল ভারতের কাস্টমসের একের পর এক নতুন আরোপিত নিষেধাজ্ঞায়। যেমন সার্কুলারে বলা হয়েছিল – প্রথমে ৪০০, কয়েকদিন পরে ৫০০ আর সবশেষ ১০০০ ডলারের নিচে কোনো এলসির রফতানি ছাড়পত্র দেয়া হবে না।

২০০৭ সালের দ্বিতীয় বেঞ্চমার্ক সিদ্ধান্ত ছিল নতুন চালের সংগ্রহমূল্য প্রসঙ্গে। এর আগে বোরো ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২১-২২ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। বন্যা দুর্যোগে চাল মজুদ কমের সমস্যার চার মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠতে শুরু করেছিল। আর ঐবারই প্রথম থেকেই কোনো দ্বিধা না রেখে সরকারের সংগ্রহমূল্য এক লাফে ২৮ টাকা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য একই। মজুদদার বা চালের মিলারদের চেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে সরকারের বাজারে প্রবেশ করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিদের হারিয়ে দিয়ে নিজে মুখ্য ক্রেতা হওয়া। ঐ ঘটনার সাথে একটা তুলনা করা যাক। এবারের বোরো চাল ক্রয় শুরু হয়েছিল বিগত মে মাসের শুরু থেকে, লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত লাখ টন। ২৫ জুন বণিকবার্তা পত্রিকার রিপোর্ট হল, সংগ্রহ অভিযান শুরুর পর এক মাস ২৫ দিন পার হয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রার এক শতাংশ চালও সংগ্রহ করা যায়নি। কেন? কারণ, ধানের সংগ্রহমূল্য করা হয়েছিল ২৪ টাকা। এটা খুবই কম। আসলে সংগ্রহমূল্য কম না বেশি, তা বুঝবার পেছনে আরেকটা ফ্যাক্টর আছে, সেদিক থেকে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চালের উৎপাদন খরচ আমদানি করা চালের চেয়ে কম। কম দাম পড়ে  কিন্তু আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ যদি কোনো বছর ফেল করে তবে এর অর্থ হল, তখন ঐ বছর ব্যক্তিপর্যায়ে চাল আমদানি করতে দিতেই হবে। এর ফলে ওই বছর স্থানীয় উৎপাদন খরচ নয়, বরং আমদানির মূল্যই চালের বাজারে মুল মুল্যনির্ধারক হয়ে যায়। স্থানীয় চাল-ধান কী দামে বেচাকেনা হবে তাও আমদানি মুল্য দিয়ে বিবেচিত হতে শুরু করে। আমাদের উতপাদন খরচ কত পরছে এটা কোন বিবেচ্যই থাকে না। অর্থাৎ তখন গত বছরের দামের চেয়ে চালের সংগ্রহ মুল্য বেশি হয়ে যায়। বেশি রাখতে হয়। এই বিচারে (২৪ টাকা ধান অথবা) ৩৪ টাকা চালের সংগ্রহমূল্য কম বলে বিবেচিত হয়েছে। এটা সম্ভবত কমপক্ষে ৩৬ টাকা হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ সরকারের গুদামে মজুদ কম বলে আগ্রাসী দাম অফার করে সরকারকে বাজারে ঢুকতে হত – এই বাজার নীতি সরকার অনুসরণ করেনি। এক কথায় সরকার বাজার বুঝে না, তাই প্রমাণ করেছে। এমনকি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে অক্ষম হলে তো সরকারকে নিজ সংগ্রহমূল্যের চেয়েও  অনেক বেশি দামে আমদানি করতেই হবে। এই বিচারে আগেই সংগ্রহমূল্য বেশি অফার করে রাখাটাই স্বাভাবিক হত, বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত হত। অথচ সেটা সরকার করেনি।

তৃতীয়ত, এর আগে কখনো চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। তবে অযথা ব্যক্তির আমদানি ঠেকাতে ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থা হয়ে গেছে, তখন শুল্ক কমাতে দ্বিধা ও দেরি করানো অদক্ষতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ।

চাল ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দাবি করেছেন দেশে চালের কোনো সঙ্কট নেই এবং সারা দেশে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় এক কোটি টন চাল আছে। মন্ত্রী তার এই দাবির ভিত্তি কী তা কোথাও বলেন নাই।   অবশ্যি চালের সঙ্কট আছে। আর সেসব কথা বাদ রাখতে হবে।  কারণ ব্যবসায়ীদের কাছে যে পরিমাণই থাকুক, সরকারের গুদামে ১০-১৪ লাখ টন খাদ্য মজুদ থাকতে হয়। তবেই তো কথিত এক কোটি টন মজুদের ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করা যাবে চাল ছাড়তে। সরকারের হাতে ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করার  কোন মেকানিজম নাই, নিজের বেকুবিতে সে অস্ত্রহীন, ঠুটো জগন্নাথ। এভাবে নিজের হাতের অস্ত্র হারানো এটা তো একটা ক্ষমাহীন অপরাধ। যে বাজার মেকানিজম বুঝে না সে মন্ত্রী হতে আসে কেন? এটা কতটা ইচ্ছাকৃত তা হোক আর নাই হোক এই ব্যর্থতা এক অপরাধ।  সরকারের হাতের বাজার নিয়ন্ত্রণের মেকানিজম একমাত্র সেই ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ কোন যুক্তিতেই সরকার হাতছাড়া করতে পারে না।  কিন্তু তা রাখতে মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা, এই সঙ্কটের দায় মন্ত্রণালয় নিতে হবে।

এই বিচারে আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ চালানোর ক্ষেত্রে বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী ব্যর্থ ও অযোগ্য। সে তুলনায় আগের খাদ্যমন্ত্রী (হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের) ড. আবদুর রাজ্জাক সফল ছিলেন। অন্কাতত বড় কোন বিপর্রযয় হয় নাই এই অর্থে।  তিনি সিস্টেমটা বুঝেছিলেন।

শিক্ষাগুলো কীঃ
এর আগে কখনও চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। অথবা থাকলেও যে মুহুর্ততে জানা যায় যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম অকার্যকর হয়ে গেছে সেই মুহুর্তে সবার আগে আমদানি শুল্ক (তা জারি থাকলে) প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত।  এটা হতে পারে অযথা ব্যক্তি আমদানী ঠেকাতে সাধারণ সময়ে ৩০% শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থায় পৌছে গেছে তখন শুল্ক উঠিয়ে নিতে দ্বিধা ও দেরি করানো এক চরম অদক্ষতা ও অযোগ্যতা। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ। দেরি হওয়াতে সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়েছে যে চাল ভারতীয় সীমান্তে আনার পরও তা কাস্টমসে ক্লিয়ার করা হয় নাই যে দু একদিনে শুল্ক উঠে যাবে। এতে বাজারে খুবই খারাপ ম্যাসেজ গিয়েছে। বাজার উলটাপালটা তোলপাড় হয়ে গেছে।

অনলাইন “সাপ্তাহিক” পত্রিকার গোলাম মোর্তোজা বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসুর নাকি টক শো তে বলেছেন, ‘দাম কে বাড়িয়েছে, সরকার বাড়িয়েছে? মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বাজার পরিস্স্থিতি দাম নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই ওএমএসের চালের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ শুভাশীষের এই বক্তব্য আপাত দৃষ্টিতে খুব স্মার্ট মনে হলেও এই বক্তব্য মিথ্যা আর এটা আসলে সচিব হিসাবে তাঁর অজ্ঞতার প্রমাণ। মিথ্যা এজন্য যে সরকারের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের শক্ত মেকানিজম আছে যেটাকে উপরে এখানে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে ব্যাখ্যা করেছি। হয় তিনি এই মেকানিজম সম্পর্কে জানেনই না। অথবা জেনেই পাবলিক মাইন্ডে এর পরিস্কার তথ্য ও চিত্র না থাকার সুবিধা নিয়ে চমক লাগানো ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ কথা বিরাট জ্ঞানী ভাব ধরে আউড়ালেন। ফেক্টস হল, বাংলাদেশের চালের বাজারে কোন ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ নাই। বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম আছে। কেবল অযোগ্য, অদক্ষ দুর্নীতিবাজ না হলে এই মেকানিজম ব্যবহার করতে পারলে সরকারের কখনও চালের বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সুযোগ নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

গৌতম দাস

২২ মে ২০১৭, ০০ঃ ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2fz

প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান,  বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত” ব্যক্তি কিনা সেই সন্দেহ রেখেছেন। ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’! কী দুর্দান্ত ভাষা! আর সেই বিশেষ ‘অনুভুতি’ মাপার ডাক্তার হয়েছেন মিজান। বাহ! বাহ! এটা কি রাজনীতি পর্যালোচনার ভাষা  নাকি যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা জাতীয় মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ? অথবা ‘ব্যাটলিং বেগামস’ এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে প্রথম-আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপের এক এগারোর রাজনীতির নতুন ড্রিল? গত ১১ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো মিজানুর রহমান খানের ‘জিয়া-যাদু গোপন চুক্তিটি কি প্রকাশ করবেন খালেদা জিয়া?’ লেখাটি প্রকাশ করে। শিরোনামের স্টাইল খেয়াল করলেই সন্দেহ জাগে এর মতলব ভালো না। যাদু মিয়ার সঙ্গে জিয়াউর রহমান নাকি একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন । আর এখন ১০ মেবুধবার খালেদা জিয়া তাঁর ভিশান ২০৩০ পেশ করবার পরপরই দৈনিক প্রথম আলোর একটাই বিশাল রহস্যমিশ্রিত আবদার, সেই ‘গোপন’ চুক্তি খালেদা জিয়া প্রকাশ করুক!

বিএনপি এবং ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির যেকোন সমালোচনা পর্যালোচনা হতেই পারে। কিন্তু বলুন তো খালেদা জিয়ার মধ্যে  গণতন্ত্র মনস্ক অনুভূতিসম্পন্ন “উপলব্ধি” আছে কিনা সেটা বিচার করবার ডাক্তার কোথায় পাবেন? দ্বিতীয়ত একটি দেশ বা সমাজের রাজনীতি স্রেফ একজন ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না। যে সকল রাজনৈতিক বর্গ কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠি নিজ নিজ ক্ষমতা  এবং নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক সম্মতি তৈয়ার করে তার সঙ্গে সেই বর্গটি সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন বয়ানের ভূমিকা থাকে। থাকবেই। সেই ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কে  যে সকল বয়ান সমাজে হাজির এবং সেই সকল বয়ান কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক সমালোচনা পর্যালোচনা ছাড়া জাতীয় রাজনীতির কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। তার মধ্য দিয়েই জনগণের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটে। এই গোড়ার কথা যখন আমরা মনে রাখি না, তখন হলুদ সংবাদ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার সমাধান হিসাবে ‘মাই নাস টু’ ফর্মুলা তৈয়ার এবং তা কার্যকর করবার কাজে অনায়াসেই লেগে পড়তে পারে। গত এক-এগারোর সময় এটাই আমরা দেখেছি। “মাইনাস টু” রাজনীতির মূল তত্ত্ব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য দুইজন “ব্যাটলিং বেগাম” – অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়ী। অতএব করণীয় হচ্ছে এদের দুইজনকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ পাঠক আপনার নিজের মতো করে বুঝে নিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য যখন আমাদের বিচারের মানদণ্ড খালেদা কিম্বা শেখ হাসিনার ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত উপলব্ধি’ থাকা না থাকার বিচার হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা মূলত মাইনাস টুর তত্ত্বই আর এক ভাবে আওড়াই। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্ট ভাবে খালেদা জিয়া সম্পর্কে এই বোম্বাস্টিক বিশেষণ প্রয়োগের চেষ্টা দেখে আন্দাজ করা যায়  এবার মাইনাস-টু না সম্ভবত মাইনাস ওয়ান এটা।

যাক্‌,  তবুও বাংলাদেশে তাহলে ‘গণতন্ত্রমনস্ক’ এবং গণতন্ত্রের ‘অনুভূতি প্রসূত উপলব্ধি্র’ ধারক মহানুভব   একজন ব্যক্তি পাওয়া গিয়েছে।  বিএনপি একটা ভাল দল কীনা, ওর রাজনীতি ভাল কীনা এমন কিছু প্রমাণ মিজানুর রহমান খান করবেন আমরা তা আশা করি না। যদিও পর্যালোচনায় ভালমন্দ উভয় দিকটাই তুলে ধারা্র কথা। মুল্যায়নে বসলে বিএনপির একগাদা ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা অনেকেই খুজে পেতেই পারেন। তবে মিজানুর রহমান খান  ব্যক্তিগতভাবে একজন বাকশাল-প্রেমি ও ‘বাঙালী জাতীবাদ”-প্রেমিও তিনি বটে। যদিও তাতেও আমাদের সমস্যা নাই।   কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন চরম প্রিজুডিস বা নিজের বাকশালপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবাদকে পাশে সরিয়ে না রেখে উলটা তা দিয়েই  রাজনীতির মুল্যায়ন করতে বসেন। সেটা দৈনিক প্রথম আলোর মতো তথিকথিত সাংবাদিকতার আড়ালে মূলত ‘বাকশালী’ অপপ্রচারের অধিক কিছু হয়ে ওঠে না।

কোন রাজনীতি বা রাষ্ট্রের ভালমন্দ বিচার করবেন কী দিয়ে? সে বিচার কাজে ক্রুশিয়াল বৈশিষ্টগুলো কী কী ?  সেগুলো জেনে রাখার বদলে নিজের বাকশালপ্রীতির উপর ভরসা করে বিচারে বসলে তাতে সেটা ঘোরতর অন্ধ দলবাজীই হবে। প্রথম আলোতে প্রকাশ্যে ঘোষিত মিজানসহ তিনজন বাকশাল সমর্থককে এডিটর আমরা দেখে থাকি।  বিশেষ করে মিজানের লেখায়, যেমন আলোচ্য এই কলামের শিরোনাম পড়ে যেকারও মনে হবে পাপীতাপী বিএনপির বিরাট এক গোপন দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসে মিজান কথা বলছেন। তাই কী? আসেন তাহলে দেখা যাক!

বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীলরা’ কেউ কোনদিন শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর কোন রিভিউ, সমালোচনা করেছেন জানা যায় না। তবু অনেকের মনে পড়বে হয়ত, একদলীয় শাসন অথবা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ইত্যাদির কথা। কিন্তু এগুলো সেই সংশোধনী কার্যকর করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের যে  বৈশিষ্ট্যগত  ত্রুটি ঘটেছে তার আসল বিচার নয়। অর্থাৎ কনষ্টিটিউশানাল বা রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা নয়। অথচ মিজানুর রহমান খান অনবরত নিজেকে মহা সংবিধান বিশারদ জ্ঞান করে আমাদের আলোকিত করে থাকেন!

গঠন প্রক্রিয়া কিম্বা বৈশিষ্ট্য কোন দিক থেকেই বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদর্শ মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। সেটা ইতিহাসের ফলাফল, আমরা তা মেনে নিয়ে যতটুকু পেয়েছিলাম তাই নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। সেই ক্ষেত্রে তার যতটুকু ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য আছে তা অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু বাকশাল সংশোধনীর ফলে এরপরের বাংলাদেশ আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় বরং এক  দানব বা স্বৈরশাসন আনয়নকারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন বদলানোর ফলে সেই দানবীয় চরিত্র  কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে খুব কমই পর্যালোচনা দেখা যায়।  তবু বাকশালী মিজানুর রহমান খানের একটা সহজ ফর্মুলা হল অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিয়াউর রহমানকে গালি গালাজ করা। বাকশাল সম্পর্কে টুঁ শব্দ না করে সারাক্ষণ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গালমন্দ পাড়া। সব সমস্যার কারণ হিসাবে সামরিক শাসনকে দেখানো। সামরিক  শাসন সামরিকতন্ত্র খারাপ, অবশ্যই। কিন্তু বাকশালকে মহৎ প্রমাণ  করবার সুবিধা না পেয়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কতো খারাপ ছিলেন সেটা প্রমাণ করে বাকশালের মহিমা গোপনে জারি রাখাই বাংলাদেশের নব্য বাকশালিদের কাজ। মিজানুর রহমানকে তাদের সর্দার বলা যায়। সেটা বাকশালিদের পক্ষে সহজ হয়েছে কারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বুদ্ধিজ্ঞানহীন বোকাদের দল, যারা নব্য বাকশালিদের রাজনীতি মোকাবিলা করবার ন্যূনতম হিম্মত রাখে না।

মিজান তাঁর লিখায় নিজেকে বারবার   রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক ক্ষমতা পুঞ্জীভুত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব হিসাবে তুলে ধরেন।  কিন্তু আজীব ব্যাপার হল, আমাদের সংবিধানে সর্বপ্রথম যে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে প্রায় সব ধরণের ক্ষমতা সঞ্চিত করা হয়েছিল সেটা বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী। তা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে মিজানুরের কলম জাগে না। বরং তিনি কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বলে এক রহস্য তৈরি করতে গিয়েছেন, ১১ মে এর ঐ কলামে। কথিত সেই গোপন চুক্তি নাকি অপ্রকাশিত, মিজান জানাচ্ছেন। কিন্তু অপ্রকাশিত হলেও মিজানুর আবার এর পুরাটা জানেন ও এবং সেটা তার আবার মুখস্থ। তাঁর কথিত মতে, শেখ মুজিবের বাকশালী সংশোধনীতে প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীন যে একক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন, জিয়া নাকি এরচেয়েও আরও ক্ষমতা চেয়েছিলেন। যদিও মিজান নিজেই জানাচ্ছেন জিয়া শেষে এমন ক্ষমতা নেনই নাই। সেই না নেওয়ার দলিলই হল মিজান কথিত যাদু মিয়ার সাথে ‘গোপন চুক্তি’। তাহলে  সেক্ষেত্রে কথিত সেই দলিল বলে যদি কিছু আদৌ থেকেও থাকে তবে তা  বিএনপি বা জিয়ার কোন কলঙ্কের দলিল হয় কেমন করে? কিন্তু তবু মিজানুর রহমান খানের দাবি কথিত ঐ গোপন দলিল ‘কলঙ্কিত’ এবং তা “খালেদা জিয়াকেই প্রকাশ করতে হবে”।

মিজানুরের চরম বিনোদনমূলক তামাসাটা হল, তিনিই বলছেন ঐ গোপন দলিল আসলে জিয়াউর রহমানের বাড়তি ক্ষমতা না নেওয়ার দলিল বা রাজনীতিবিদ যাদু মিয়ার সাথে  “সন্ধি-পত্র”  – অথচ এই কথিত চুক্তি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি  আর জিয়া এবং  বিএনপিকে ‘পাপীতাপী’ ‘অভিশপ্ত’ বলে ইঙ্গিত তৈরি করছেন তিনি। এই সুযোগ মিজানুর কোথায় পাচ্ছেন? বরং মিজানুর যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক সীমাহীন ক্ষমতা সঞ্চিত করার বিরুদ্ধের সোচ্চার প্রবক্তা হতে চান তবে সেক্ষেত্রে শেখ মুজিবের এবং বাকশাল সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা দিয়েই তাকে শুরু করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি তার প্রগতিশীলতা-বোধ, বাঙালী জাতিয়তাবোধ কিংবা বাকশালপ্রীতি বাধা হয়ে দাড়ায় তবে তা তাকেই পেরিয়ে আসতে হবে। এপর্যন্ত যা তিনি কখনও পেরেছেন আমরা দেখিনি।

এই প্রসঙ্গে বলে নেয়া যায় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস বিচারে – বিশেষত কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী কী কী কারণে কালোদাগের এবং ক্ষতিকর এমন কোন একাদেমিক মুল্যায়ন আমরা ‘প্রগতিশীলদের’ ঘর থেকে বের হয়েছে দেখি নাই। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসরেও এবিষয়ে আর যা দেখা যায় সেগুলোকে বড়জোর পার্টিজান বা দলকানাদের সমালোচনা। এই অবস্থায় বাকশালের আসল মুল্যায়ন হল – এককথায় বললে – এই সংশোধনী্র মধ্য দিয়ে আসলে বাংলাদেশ  রাষ্ট্রের খোদ কনষ্টিটিউশনকেই নাই করে দেয়া হয়েছে।  সোজা কথায় ভাঙাচোরা হোক বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে একটা রাষ্ট্র বানানো গঠন হয়েছিল, আর সেটাকেই বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী পুরাটাই ভেঙ্গে দিয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী এই অর্থে রাষ্ট্র নিরাকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যে অভিজ্ঞতা থেকে বারবার আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র নাই অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়ার দলিল এটা।

কেন? এর মূল কারণ এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রের  নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের আদালতে  রিট করার ক্ষমতা [আর্টিকেল ৪৪] কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই না, জুডিশিয়ারির বা আদালতের রিট শোনার যে আলাদা নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া ছিল [আর্টিকেল ১০২ (১)] সেটাও চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। [চতুর্থ সংশোধনীর পিডিএফ কপিতে এখানে দেখুন, সংশোধনীর ইংরাজী অংশে প্রথম পাতায় ৩ নম্বর সংশোধনী আর ১৭ নম্বর সংশোধনী দেখুন হলুদ মার্কার দেয়া আছে।।] আর প্রেসিডেণ্ট জিয়ার সামরিক অধ্যেদেশ বলেই, আবার বলছি ১৯৭৬ সালের সামরিক অধ্যাদেশ বলেই  ঐ বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া [আর্টিকেল ৪৪] এবং [আর্টিকেল ১০২ (১)]  ফেরত নিয়ে আসেন। একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ এবং কথাগুলো সবচেয়ে সহজে স্পষ্ট বুঝা যায় কনষ্টুটিটিশনের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের আপিল কোর্টের রায়ে। ঐ রায় ১৮৪ পৃষ্টার। ঐ রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল বলে জানানো হলেও একই সাথে পঞ্চম সংশোধনীর যেসব অংশ বাতিল হবে না, বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জীবিত থাকবে সেসবের একটা তালিকা দেয়া আছে ওর ১৮৩ পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা আছে জিয়ার আনা সংশোধনীর কথা। [দেখুন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়, আপিল কোর্ট জাজমেন্ট ২০১০,  ১৮৩ পৃষ্ঠায় 3e এর (iii, iv & v)]    শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর ফলে এভাবেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতার দানব বানিয়েছিল, এর বিরুদ্ধে আদালতে কোন প্রতিকার চাইবার সুযোগ ছিল না। ফলে বাংলাদেশ  আর কোন প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে নাই। যে রাষ্ট্রে রিট করার সুযোগ নাই, সেটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না। এই দিকটা নিয়ে কোন জজ-উকিল বা কোন রাজনীতিবিদকে আমরা পয়েন্ট তুলতে শুনি নাই। এটাও এখন প্রমাণিত যে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনষ্টিটিউশনের ভাল-মন্দ বিচার কী করে করব, কী করে এটা কাজ করে তা বুঝার ক্ষেত্রেও আমরা এখনও যথেষ্ট লায়েক হই নাই। এখনও কেবল দলবাজি আর প্রগতিশীলতার ভাণ ও ভণ্ডামির মধ্যে আটকে আছি। অথচ আমরা আবার আওয়ামি লীগ বা বিএনপির এবং রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট বুঝার বিচারক হতে চাচ্ছি।

‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা
মিজানুর রহমান খানের আর এক প্রবল পছন্দের বয়ান হল ‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার’ তুলনা। এটাতে  তাঁর চিন্তা করার কাঠামোটাও ধরা পরে। অবশ্য এটা তাঁর একার না, বাকশালের পক্ষে সাফাই যারাই দেন তাদের সাধারণ বয়ান এটা। মিজান সে বয়ান পরিপাটি করেন মাত্র। এই বয়ান দিয়ে তিনি বলতে চান বাকশাল দানব ক্ষমতার রাষ্ট্র তৈরি করলেও যেহেতু এটা বেসামরিক শাসন, আর বেসামরিক শাসন মানেই বৈধ শাসন, তাই দানব বাকশাল হলেও এটা বৈধ, ফলে গ্রহণীয়। আর তাই বিপরীত যুক্তিতে সামরিক শাসন অবৈধ। দারুন বাকশালী যুক্তি। বিএপির বিরুদ্ধে এটাই  প্রধান বাকশালী অস্ত্র, কিন্তু বিএনপির সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা এই বাকশালী কৌশলের মর্ম ধরতে পারে না বলে এর কোন উত্তর দেবার হিম্মত দেখাতে পারে না।

আসলে এভাবে বৈধ-অবৈধ এর ভাগাভাগির লাইন টানা – এটা নগ্ন  শঠতা। মিজান বলতে চান বাকশাল সংশোধনীর ভিতরে যত খারাপ কিছুই থাক তবু এটা বৈধ কারণ তা সিভিলিয়ান ক্ষমতা। এটাই শঠতা। উপরে দেখিয়েছি, কনষ্টিটিউশনে চতুর্থ সংশোধনী এনে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে চাইলে কোন নাগরিকের আইনিভাবে আদালতে নালিশ জানাতে যাবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে এরপরের বাংলাদেশ, এটা দেখতে তখনও একই দেশ বা আধুনিক রাষ্ট্র মনে হলেও কার্যত এটা আর তখন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। এটা আসলে নির্বাহী প্রেসিডেন্ট – নামে “এক সম্রাটের  প্রি-রিপাবলিক বাংলাদেশ” হয়ে গেছিল। আমি নিশ্চিত মিজানসহ কোন ‘প্রগতিশীল’, ‘বাঙালী জাতিবাদীর” চিন্তায় এটা ধরা পড়বে না। এভাবে তারা চিন্তা করে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এমনকি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও নয়। বেসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন মানেই মন্দ গল্প তারা বাকশালিদের কাছ থেকে ভালোই হজম করে। হয়তো নীরবে মেনেও নেয়।  চতুর্থ সংশোধনী যেখানে রাষ্ট্রের রিপাবলিক বৈশিষ্টই নষ্ট করে দেয় এরপর সেই বাকশালী রাষ্ট্রটা বৈধ নাকি অবৈধ –  সামরিক নাকি বেসামরিক – সেটা  কী আর কোন তর্ক? কিন্তু মিজান মার্কা এই বাকশালী মিথ্যা আর চাতুর্য প্রপাগান্ডার তোড়ে বিএনপিই  ঘায়েল হয়ে গিয়েছে। কারণ রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য সুরক্ষা বিএনপির রাজনীতি নয়। এর ফলে তারা জিয়াউর রহমানকেও স্রেফ একজন সামরিক শাসকের বেশী বুঝতে অক্ষম। অথচ বাকশালী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব আসলে আমাদেরই এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতায়, “পোস্ট-বাকশাল পরিস্থিতিতে আবার ট্রাকে উঠার উদ্যোগ” এটা বোঝার ক্ষমতা বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নাই।

এমনিতেই বৈধ-অবৈধের তর্ক আর এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ বিষয়কে বুঝার চেষ্টা একটা খুবই নাবালকের কাজ। মনে রাখতে হবে একটা কালাকানুন বা কালো আইন – চরম দমনমূলক ও নিপীড়ন আইন হলেও সেটা বিদ্যমান সংবিধানের কারণে  ‘বৈধ’ আইন হতে পারে; কোন অসুবিধা ছাড়াই।  তাই, এই বৈধ-অবৈধ জাতীয় শঠ প্রশ্ন তুলে বাকশালের কুকীর্তি আড়াল করে বলেই মিজানুর রহমান খানকে বাকশালের দলবাজ সমর্থক বলছি।

আবার বিপরীতে সেসময়ের জিয়ার সামরিক ক্ষমতা সেটাও সামরিক নাকি বেসামরিক সেবিচারে যাওয়াও একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কারণ সেটা যাই হোক না কেন সেসময়ের ঐ ক্ষমতাটা ছিল এক অন্তর্বর্তী ধরণের ক্ষমতা মাত্র। এটাই ঐ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্ট। আর ওর ভাল মন্দ নির্ধারিত হবে নতুন যে ক্ষমতা কাঠামো সে তৈরি করবে বা হবে ওর গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। তাতে যারা নির্বাচিত হয়ে নতুন ক্ষমতায় আসবেন সেসব অনেক কিছুর গ্রহনযোগ্যতার উপরে। আর প্রি-কনষ্টিটিউশনাল সরকার মাত্রই অন্তর্বর্তী সরকার। বাকশাল করে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা এবং  শেখ মুজিব খুন হবার পর যা আমরা পেয়েছি তাতে সেটা আবার একটা প্রজাতান্ত্রিক কনষ্টিটিউশনের ফিরে যাবার আগের অন্তবর্তী অবস্থা।

তবু মিজানুরের মনে হতে পারে যে না, “ক্যান্টনমেন্টে বসে” যারা দল বানালো তাদেরকে হাতে নাতে ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যায় না। ওকে নো প্রবলেম, আসুন মিজান তাহলে এবার আপনারই বিচার করি। ১/১১ এর সরকার কী সামরিক সরকার ছিল না? আর এই সামরিক সরকারের সাথে খোদ আপনি মিজান আর আপনার বস  মতি-মাহফুজদের  সম্পর্ক কী ছিল তা  নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নিবেন? আপনি মিজান কী তখন সে কালের “ক্যান্টনমেন্টে বসে” রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কারের নামে মহৎ কাজে  লিপ্ত হন নাই? ঐ কাজ আর ঐ সামরিক সরকার কী “বৈধ” হয়ে গেছিল আপনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে?   আরও ভিতরে যাবেন?  আসেন!
১/১১ এর ক্ষমতায় ইচ্ছামত যা মনে চায় করে যে রাজনৈতিক সংস্কার আপনারা করেছিলেন – কী তার পরিণতি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও এর কাঠামো এমন কিছু অথবা কী ছাপ আপনারা রেখে গেছিলেন যার সুফল এই আট বছরের হাসিনা সরকারের থেকে আমরা পাচ্ছি? বলেন, কোনটা  আপনাদের অবদান? কোন সে সুফল? আপনাদের সংস্কারের ফসল কী খোদ হাসিনার শাসনটাই নয়? নিঃসন্দেহে এখন কোন দায়ই নিতে চাইবেন না, আপনি। আমরা জানি। কিন্তু ইতিহাস সবাইকে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। আপনারাও ব্যতিক্রম নন।

কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ
মিজান আর এক বিরাট অভিযোগ করেছেন প্রায়ই করেন, “সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, যা পার্লামেন্টকে একটি রাবার স্ট্যাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেত্রীর বশংবদ করে রেখেছে,সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি”।  তিনি এটা প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আর এর রাজনৈতিক নেতাদের গায়ে কালি লাগায় দিবার জন্য করে থাকেন।  তো মিজানের এই কথা পড়লে সকলেরই মনে হবে হা, তাই তো!  মিজান এই মোক্ষম জায়গায় ধরেছেন। হা, অবশ্যই এক মোক্ষম জায়গা। কিন্তু মিজান কাকে ধরেছেন? খালেদা জিয়া? নাকি এখানে অনুল্লেখ থাকা শেখ হাসিনাকে? মোটেও না। মিজান আসলে ধরেছে নিজেকেই।  বাইরের মানুষ – হাসিনা, খালেদাকে দোষারোপের আগে মিজান আপনি নিজেকে কাঠগড়ায় তুলার হিম্মত দেখান। পারবে্ন?
যতদিন মিজানুরসহ মতি-মাহফুজের মিডিয়া গ্রুপের মত লোকের সক্রিয় সমর্থনে, ১/১১ ঘটবার সম্ভাবনা আর বিশেষ করে বিদেশী স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব গ্রুপের লোকেদেরকে ব্যবহারে ভাড়া খাটা মিজানুর রহমান খানেরা লুপ্ত না হবেন ততদিন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ থাকতে থাকবে। কারণ এই ৭০ অনুচ্ছেদই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। মিজানদের মত লোকেদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। আমরা বরং  মিজানের এসব স্বীকার করার সৎসাহস দেখতে চাইতে পারি। হাসিনা খালেদারা খারাপ রাজনীতির ধারক বাহক, এটা কে না জানে, এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এখান থেকে বের হতে, তা পরিস্কার করতে, পালটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া লাগবে। বিদেশী স্বার্থে সংস্কারের নামে পরাশক্তির  স্বার্থরক্ষা নয়। এই স্বার্থ রক্ষার্থে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কলঙ্কের দাগ দেখিয়ে নয়।

মিজান আরও অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রও দলের প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আছে, আর সেজন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন। ফলে এরও সংস্কার দাবি করেছেন তিনি। মিজান নিশ্চয় ভুলে যান নাই – মান্নান ভুঁইয়াকে দিয়ে কীভাবে বাধ্য করে সংস্কার ধারার বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বেচারা দেলোয়ার হোসেনকে  কিভাবে ছেঁচা  দেয়া হয়েছিল, এর কষ্ট মৃত দেলোয়ার হোসেনই জানতেন। তবু তার গৌরব, তিনি পতাকা ছাড়েন নাই। শামসুল হুদার ভুঁইফোড়  নির্বাচন কমিশন কোনটা “আসল বিএনপি” সেই রায় দিয়েছিল। আর পরে তিনি নিজেই তার এই কাজ অন্যায় হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।  এটা যেন আমরা কেউ না ভুলি। তাহলে দাঁড়াল এই যতদিন বিদেশী স্বার্থে আপনি মিজান ও আপনাদের পত্রিকা  বাইরে থেকে ইচ্ছামত কোনটা বৈধ দল, কোনটা বিএনপি ঠিক করতে থাকবেন, সে সম্ভাবনা থাকবে, ততদিন হাসিনা-খালেদা কনস্টিটিউশানে ৭০ অনুচ্ছেদ রাখবে এবং অবশ্যই রাখবেন। ‘গণতন্ত্র’ শিখাতে আসবেন না। মনে রাখবেন, হাসিনা বা খালেদা সেসব কম বুঝে না। তাঁরা দলের সব ক্ষমতা সভাপতি হিসাবে অবশ্যই নিজের হাতেই রাখবেন। কোনটা আওয়ামী লীগ আর কোনটা বিএনপি এটা যদি বিদেশীরা নির্ধারণ করতে থাকে তবে এমন ব্যবস্থা ও সুযোগ যতদিন থাকবে ততদিন এই শকুনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে  হাসিনা-খালেদার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদের পক্ষে থাকা এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থান। দুনিয়ার হুঁশজ্ঞান ওয়ালা মানুষ মাত্রই এটাই করবে।  তাই বাইরে  অন্যদের দিকে না, সৎসাহসে নিজের দিকে তাকান। নিজেকেই কাঠগড়ায় দেখতে পাবেন।

অতএব, কনষ্টিটুশনে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার জন্য আপনারা মিজানেরাই মূলত দায়ী। নিজেরা যা করেছিলেন এর রিভিউ করেন, আবেদন করি ভাল হয়ে যান আগে। এরপর ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি তুলেন।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গতকাল ২১ মে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা খুবই সংক্ষিপ্ত ভার্সান; চল্লিশ ভাগ ফেলে ষাট ভাগ ছাপা ভার্সান বলা যায়। এছাড়া  অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও আর এক ভার্সান ছাপা হয়েছে আজ ২২ মে ২০১৭, তাতে অনেকাংশেই পুর্ণ ভার্সান সেটা। কিন্তু তবু ফুল ভার্সান নয়। এখানে আরও বহু সংযোজন ও এডিটের পর সর্বশেষ ভার্সান এটাই।  ]

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

গৌতম দাস
০২ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৫

http://wp.me/p1sCvy-2f6

কাশেম বিন আবুবাকার নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে মিডিয়ায় মানে, টিভি টকশো, নিউজ, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সোস্যাল মিডিয়া সবখানেই তোলপাড় চলছিল; এক বহুল উচ্চারিত নাম তিনি। তাও শুধু দেশে নয়, প্যারিসভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপির কল্যাণে কাশেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে তাদের করা নিউজটা যেসব দেশের স্থানীয় মিডিয়া প্রকাশ করেছে সেসব দেশেও কাশেম বিন আবুবাকারের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কী সে খবর? আবুবাকারের কী খবর? এখানে একটু দম ধরে থামতে হবে।
কয়েক বাক্যে মুল খবর হল, বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক কাশেম বিন আবুবাকার ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখেন। শ’খানেক উপন্যাস লিখেছেন। আধুনিক জগতে অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে যে মডার্নিটি বা আধুনিকতাকে শুধু গ্রহণ না করে নয়, রীতিমতো আলিঙ্গন না করে কোন উপন্যাস লেখা সম্ভব কিনা। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে বিচার করলে মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, মডার্নিটিকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরালে ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখা কি সম্ভব? বিশেষ করে যখন ইউরোপের আধুনিকতার যেসব ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধ বা সে মরালিটির ওপর ভর করে সাহিত্য উপন্যাস লেখা ও চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে বহু আগেই এবং এর প্রভাবে দুনিয়াতে প্রায় সব শহরে প্রবল প্রভাব ছেয়ে গেছে! দুনিয়াতে নানা জায়গায় এর প্রভাব পড়েছে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শাসক সূত্রে; তাদের আধুনিকতা ও এনলাইটেনমেন্টের চিন্তা ও তৎপরতার প্রভাবে আমাদের মতো দেশে এরই প্রভাবিত ধারা ও এর চর্চা গড়ে উঠেছে। আর সেটাই প্রধান ধারা হওয়ার দাবিতে নিজের আসন পোক্ত করে নিয়েছে! এরপরে আর কি ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস বা ফিকশন সম্ভব নয়? [উপরের কথাগুলো লিখেছি এটা ধরে নিয়ে যে আধুনিকতার ভিত্তিগিত ধারণা ও এর উপর দাঁড়ানো মুল্যবোধ আর ইসলামি মুল্যবোধে বড় ফারাক আছে। যদিও সে ফারাক কী, কোথায় সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাই নাই।]

আধুনিকতার এমন বাস্তবতাতেও কাশেম বিন আবুবাকার হলেন সেই লোক যিনি আধুনিকতার ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধের বাইরে সমান্তরালে (যদিও ক্রিটিক্যালি বললে আধুনিকতার  প্রভাবের বাইরে থাকা একালে কারো পক্ষেই আর সম্ভব নয়, ফলে তিনিও পুরোপুরি বা ঠিক বাইরে নন) ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন। নয়া ধারা সৃষ্টি করেছেন। এর চেয়েও বড় কথা তার উপন্যাস আবার যে সে উপন্যাস নয়, তাঁর একেবারে ৮৫ শতাংশ লেখা মূলত রোমান্টিক উপন্যাস। আধুনিক চিন্তায় লেখা উপন্যাসের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা খেয়াল রেখে বললে, আবুবাকার অবশ্যই মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। মনে হতে পারে অনেকেই তো অনেক কিছু লেখেন, লিখেছেন, কিন্তু তা হয়তো শেষে ঠাঁই পায় বালিশের তলায়, আবুবাকারকে কী এই অর্থে রোমান্টিক উপন্যাস লেখক বলা হচ্ছে? না অবশ্যই না, একেবারেই না। তবে উপন্যাসের সাহিত্য-মূল্য বিচার, এটা সেকুলার মডার্ন জগতেও যথেষ্ট জটিল, থিতু বা সেটেলড্ নয়। ফলে সে দিকটা এখানে উহ্য রেখেও বলা যায় – তার লেখার পাঠক আছে কিনা, সে পাঠকেরা ব্যাপক কিনা, সে পাঠকেরা আবুবাকারের উপন্যাসের সাথে নিজেকে সম্পর্কিত, যেন নিজেরই জীবনের ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখছেন বলে মনে করেন কিনা, এই বিচারে বলা যায় আবুবাকার একজন সফল ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর পাঠকপ্রিয় এবং প্রধান ধারার নাম কামানো ঔপন্যাসিকদের চেয়েও তার পাঠক সংখ্যা বেশি। তবে স্বভাবতই তার পাঠকরা ভিন্ন ক্যাটাগরির যাদেরকে ভিন্ন অর্থনৈতিক ভিত্তি, সামাজিক মর্যাদার স্তর ভিত্তি, মূল্যবোধের ভিত্তি ইত্যাদি অনেক কিছু দিয়েই আলাদা করা সম্ভব। আবার যারা প্রধান ধারার পাঠক সেই ক্যাটাগরিরও কিছু অংশ তারও পাঠক। এই বিচারে এক কথায় বলা যায়, আবুবাকার প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিক। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আর, ২০১১ সালের খবর হলো সেটা ছিল ত্রিশতম সংস্করণ প্রকাশিত। যদিও টিভি সাক্ষাতকারে  তিনি বলেছেন এটা আরও বেশি হতে পারে। কারণ রয়েলিটি না দেওয়ার জন্য প্রকাশকেরা অনেক সংস্করণের খবর প্রিন্টে উল্লেখ করে না।  আর তাঁর দেয়া ধারণা মতে, প্রতি সংস্করণ বই প্রকাশ সংখ্যা ৩০০০-এর কম নয়।

একথা ঠিক যে মিডিয়া তাকে নিয়ে তোলপাড় করছে। কিন্তু যতগুলো মিডিয়া আলোচনা ও মন্তব্য শোনা, জানা বা কাউকে করতে দেখা গিয়েছে তাতে খুবই নগণ্য সংখ্যক (প্রায় কেউ নয়) দাবি করেছেন যে, তিনি আবুবাকারের কোনো উপন্যাস পড়েছেন। মূল কথা হল, মিডিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে যে আবুবাকার তাঁর উপন্যাস পাঠক জগতে এত বিখ্যাত অথচ মিডিয়া সেটা জানে না কেন? ফলে খোদ মিডিয়া এবং সেকুলার পাঠক পেরেসান হয়ে গেছে যে তাদের কালচারাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাদের প্রভাবকে তুচ্ছ করে ইতোমধ্যেই গজিয়ে যাওয়া হাজির কাশেম বিন আবুবাকার ফেনোমেনাকে তারা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন।  উপায়ন্ত না পেয়ে তারা  তাঁকে নিচা দেখানো বা খাটো তুচ্ছ করে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। যেমন তাদের ট্যাগ হল, তিনি “চটুল” লেখক, তিনি “ইসলামি যৌনতার” লেখক ইত্যাদি। আর সব তর্ক-বিতর্ক আলোচনা চলছে এসব মিথ্যা ভিত্তিহীন ট্যাগের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাদের কালি লাগানোর সব প্রচেষ্টা ঢলে পড়েছে। এর মূল কারণ এরা সবাই স্বীকার যে তারা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই। এছাড়া আরও বড় প্রশ্ন আছে, উপন্যাস পড়া এক জিনিষ আর উপন্যাসের মুল্যায়ন-সক্ষমতা কী সবার আছে? সাহিত্যের ভিতর থেকে প্রকাশিত সামাজিক মন, সমাজতত্ত্ব বের করে আনা, দেখতে পাওয়া, ট্রেন্ড ব্যাখ্যা  করা কিংবা লিখায় লেখকের লিখাকালীন সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব কী কতটুকু – এসব কিছু যথেষ্ট সিরিয়াস ও পেশাদারি কাজ – এসব কাজ আমপাঠকের কাজ নয়। অতএব, এক কথায় বললে প্রায় প্রত্যেকেই নিজের অযোগ্যতা বা মনের ক্ষোভ মিটাতে ইচ্ছামতন মন্তব্য করছেন ট্যাগ লাগাচ্ছেন। কিন্তু কঠিন সত্যি হল, প্রথমত এরা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই।  কোন উপন্যাসে এটা আছে এমন কোন রেফারেন্স উল্লেখ করে কেউ অভিযোগ করছেন না।  ৭১ টিভি টকশোতে এঙকর শুরুতেই খোদ আবুবাকারের সাথে কথা বলতে গিয়ে অবলীলায় এক বিশেষণ লাগিয়ে কথা বলছেন, “আপনার চটুল উপন্যাস”। আবুবাকার পাল্টা যখন জিজ্ঞাসা করলেন “চটুল উপন্যাস বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন” এঙকর তখন আর তার ব্যবহৃত বিশেষণ এর পক্ষে কোন সাফাই পেশ করতে পারলেন না, চুপচাপ এড়িয়ে গেলেন। বলা বাহুল্য ঐ টকশোতে প্যানেলিস্ট কেউ ছিলেন না যে আবুবাকারের কোন উপন্যাস পাঠ করেছেন।

দৈনিক বাংলা ট্রিবিউন ২৭ এপ্রিল এক সাক্ষাতকার নিয়েছে। সেখানে, “আপনি কেন পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন, এ প্রশ্নের জবাবে আবুবাকার বলছেন,   “আমি মানুষকে মানুষ করতে চেয়েছি লেখার মধ্য দিয়ে। মুসলমান হয়ে চরিত্রহীন হলে চলবে না। আল্লাহর কথা মতো যারা চলে না, তারা তো মুসলমান না। আমি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে চেয়েছি বলে আমি জনপ্রিয়”। কিন্তু প্রশ্নকর্তা এবার জানতে চান “ইসলামি উপন্যাস” ইসলাম অনুমোদন করে কি না। অর্থাত প্রশ্নকর্তা নিজেই আবুবাকারের উপন্যাসেকে “ইসলামি উপন্যাস” লেবাস বা নামকরণ দিয়ে দিলেন।  এর বিপদ বুঝতে পেরে আবুবাকার পরিস্কার করে দিলেন, ‘আমি তো ইসলামি উপন্যাস লিখিনি। আমি ইসলামি ভাবকে কাজে লাগিয়ে উপন্যাস লিখেছি। কোরআন-হাদিসের আলোকে রোমান্টিসিজমের কথা লিখেছি”।  এছাড়া অনেকে দ্বিধা করেন জটিলতা পাকায়  ফেলেন যে প্রেম ও ইসলাম এর সম্পর্ক কী, এরা কী পরস্পর বিরোধী অথবা প্রেম মানেই তা যৌনতা কীনা।  তিনি এসব ধারণা পরিস্কার করার চেষ্টা করে বললেন এভাবে,  “প্রেম তো থাকবেই — ভাইয়ের সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, বিয়ের আগে প্রেমিকের সঙ্গে। কিন্তু সেই প্রেম ভেঙে গেলে প্রেমিকাকে এসিড ছুড়তে হলে সেটা তো প্রেম না, সেটাকে বলে মোহ। আমার বইয়ের মধ্য দিয়ে আমি এগুলোই শেখাতে চেয়েছিলাম পাঠকদের। আর আমার লেখা এই শিক্ষামূলক বই সবাই পড়তে চেয়েছে বলেই আমি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছি”। এছাড়া এই পত্রিকাও শুরুতে পরিচিতিমূলক বক্তব্য আবুবাকারার উপন্যাসকে বলছেন “প্রেমের চটুল গল্পের”। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যারা চটুল শব্দ ব্যবহার করছেন তারা কেউ তার উপন্যস না পড়েই প্রিযুডিস (আগাম বিচারবিবেচনা করা ছাড়া ধারণা) থেকে সেকুলার নাক সিটকানো থেকে কথা বলছেন।  তিনি বলছেন শালীনতার কথা, শালীনতা রেখেও প্রেমের পথের কথা – ইসলামি মুল্যবোধের হেদায়েতের কথা আর এর বিপরীতে সেকুলার অভিযোগ হল তিনি নাকি চটুল গল্প লিখছেন, ইসলামি লেবাসে যৌনতা লিখছেন।

ওদিকে প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আরও পরিস্কার করে কথা বলেছেন আর এক অনলাইন পত্রিকায়। তিনি বলছেন, (প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক কী) “এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমি বার বার হয়েছি। আমি ইসলামের কথা বলি প্রেমের উপন্যাসে। কেউ কেউ আমাকে বলেছেনও আমি অর্থ উপার্জনের জন্য এমন করেছি। কিন্তু আমার মন জানে আমি কেনো করেছি। আমি চিন্তা করেছি অন্য জায়গা থেকে। আমি প্রেমকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছি। কারণ, আমরা যতো বাধাই দেই না কেনো যুবকদের প্রেমবিমুখ করতে পারবো না। তাই আমি প্রেমকেই বাহক হিসেবে বেছে নিলাম এবং তাদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিলাম। তাদের বোঝালাম, প্রেমের লাভ-ক্ষতি হিসেব কিন্তু আমি আমার উপন্যাসে দিয়েছি। বিশেষ করে সীমালঙ্ঘন যেনো না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছি”। অর্থাৎ আমরা দেখছি এমন লোককে চটুল গল্প লেখক বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগেই খোদ এএফপির রিপোর্টে এক বিপজ্জনক মন্তব্য আছে তা নিয়ে কথা। আর তা থেকে এই রিপোর্ট এখন প্রকাশ করার উদ্দেশ্য কী তা কিছুটা আন্দাজ করা যায় সম্ভবত। বলা হয়েছে, “আবুবাকারের (কাজকে এখন নাকি) এক নবজাগরণের বা এক রেনেসাঁর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তা হল, যাতে বাংলাদেশের যুগ যুগ ধরে জারি থাকা মডারেট মুসলমান পরিচয় এখন থেকে এটা  ধর্মীয় কালামের আরো রক্ষণশীল ব্যাখ্যার দিকে ঢলে পড়ছে”।
Now his work is undergoing something of a renaissance as Bangladesh slides from the moderate Islam worshipped for generations to a more conservative interpretation of the scriptures.’

এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাসের সাথে সাম্প্রতিককালের হেফাজতের (আওয়ামি লীগের ঘনিষ্ঠতার) সম্পর্ক আছে এবং এটা নেতিবাচক।
একাত্তর টিভির একটা টকশো হয়েছিল যার শিরোনাম ‘লেখক কাসেম বিন আবুবাকার লাইভে এসে লেখা ও নিজের সম্পর্কে যা বললেন’– এভাবে সেটা ইউটিউবে ২৮ এপ্রিল আপলোড হয়েছে। আলোচনায় প্যানেলে ছিলেন রবীন আহসান, প্রকাশক ও সম্পাদক বই নিউজ ২৪; তিনিই মুলত আবুবাকারের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগকারী, একমাত্র তিনি অভিযোগ তুলছিলেন। এএফপি কী বুঝাতে ওই রিপোর্ট করেছিল তা রবীন এহসানের অভিযোগ থেকে আঁচ করা যায়। রবীন একই কথা অনেক ব্তযাখ্বেযা করে বলার পেয়েছেন বা নিয়েছেন। তবে রবীনের বক্তব্যের উপস্থাপন ছিল একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মত। বলতে চেয়েছেন, এএফপির রিপোর্ট ছিল যেন ‘বিদেশীদের ষড়যন্ত্র’। আর সে ষড়যন্ত্রের কথা বলতে চাওয়ার ছলে রবীন আঙুল তুলেছেন আবুবাকারের দিকে। বলছেন, আবুবাকার সেই ‘ষড়যন্ত্র প্রজেক্টে’ শামিল ।

রবীনের কিছু বক্তব্যের অংশ বিশেষ তুলে ধরছি এখানে: “তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরি করার জন্য উপন্যাস লিখেছেন। আমার যেটা মনে হয়েছে, এটা একটা প্রজেক্টের মতো। আবুবাকার একটা প্রজেক্টের মধ্যে ছিলেন। ত্রিশ বছরে তিনি যা লিখেছেন, এর প্রতিফলন সমাজের মধ্যে পড়েছে। তার উপন্যাসের নাম হচ্ছে ‘বোরখা পরা সেই মেয়েটি’ [ফ্যাক্টস হলো এই  উপন্যাস আবুবাকারের লেখা নয়]। তার উপন্যাসের ভেতর তার নায়ক-নায়িকারা যেভাবে কথা বলেন এবং বোরখা পরে, হিজাব পরে, এরকম সব চরিত্র হচ্ছে তার উপন্যাস এবং নিজেই যখন বলেছেন ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করার জন্যই তিনি লিখছেন। এজন্য কিন্তু তিনি সফল। মানে বাংলাদেশের যে সমাজ, যে সমাজের মধ্যে আমরা আছি, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই যে ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে লেখা এবং ইসলামি মূল্যবোধকে সাহিত্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে সমাজের মধ্যে প্রয়োগ করা, এতে কিন্তু কাসেম সফল হয়েছেন। তার আজকে যে ঢালাও করে প্রচার প্রপাগান্ডা পশ্চিমা দেশে হয়েছে, সেটার কিন্তু প্রমাণ হচ্ছে যে, হঠাৎ করে নিউজটা হয়েছে যখন কোনো বইমেলা নেই; তখন দেখা যাচ্ছে ইসলামি বই লাখ লাখ বিক্রি হচ্ছে-এই রকম একটা সংবাদ হয়েছে। আমি বলব, সমাজে যখন হেফাজতে ইসলামের একটা গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, ইসলামি সব দলের একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে এবং এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আবুবাকারের একটা অবদান আছে। এই যে ত্রিশ বছর পর্যন্ত তিনি লিখেছেন যে ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করবেন, ইসলামি নায়ক বানাবেন, নায়িকা বানাবেন, বোরখা পরে চলাচল করবে, আমরা কিন্তু সেটাই সমাজে দেখছি।’
[এই অনুলিপি আমার করা, কাজ চালানোর জন্য। এতে দু-একটা শব্দ এদিক ওদিক হতে পারে। তাই একেবারে সঠিক স্ক্রিপ্টের জন্য মূল ইউটিউব নিজে দেখে নেবেন, অনলাইনে। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি।]

এখন মূল কথা হল, রবীন এখানে আবুবাকারকে অভিযুক্ত করছেন উপন্যাসে ইসলামি মূল্যবোধ আনা, চর্চা বা জাগানোর চেষ্টা করার জন্য। যদি রবীনের একথাকে ফ্যাক্টস হিসাবে-একেবারে সত্যি বলে ধরেও নেই, তার পরেও বলতে হয়-ইসলামি মূল্যবোধ জাগানোর চেষ্টা করা কি অন্যায়? অপরাধ? ইসলামি বা আধুনিক যেকোন মুল্যবোধ প্রচার যে কেউ করতে পারে। আর তা বিচার বিবেচনা করে গ্রহণ -বর্জনের অধিকারও সকলের।  আবুবাকার এখানে ইসলামি এথিক্স / মরালিটির কথা বলছেন। একটা মরালিটির চর্চাকে অন্যায় বলবেন কি করে, একে অপরাধ বলবেন কী করে? আবুবাকার কারও কপালে বন্দুক ধরে মূল্যবোধের চর্চার কথা বলছেন না। তিনি এটা করতে আহ্বান রাখছেন কোন প্রবন্ধ লিখেও না- আরও নরম করে, একেবারে রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লিখে। অথচ এটাকেও রবীন আহসান অপরাধ মনে করছেন। ফলে এটা এক জাতীয় ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখছি না। এটা হতেই পারে যে, রবীন ইসলামি মূল্যবোধ পছন্দ করেন না, তাই তিনি এই মূল্যবোধ বর্জন করতে পারেন, এমনকি এর ‘অসুবিধা’র দিক নিয়েও পাল্টা প্রচার করতে পারেন। এছাড়া তিনি অবশ্যই ইসলামি মূল্যবোধের চেয়েও ভিন্ন, ভালো এবং কার্যকর মূল্যবোধ নিয়ে এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন। কিন্তু তিনি এটা ইসলামি হওয়াটাই যেন অপরাধ, সে হিসেবে ধরে নিয়ে কথা বলেছেন। এটা তাঁর লাইন ক্রশ।

রবীন আহমদ হেফাজতসহ ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ আনছেন। সত্যি এ’এক তামাসা বলতেই হয়। কোন চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেলে কি কাউকে অভিযুক্ত করা যায়? এটা তো ওই চিন্তা প্রচারকারীদের গৌরব যে, মানুষ তাদের কথা শুনেছে। রবীনের উলটো এটাকে অভিযোগ হিসেবে নেয়া বা অন্যায় মনে করেই বরং এক ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা নয় কী? এটা আইনি বিচারি চোখেও অন্যায় কাজ।
এএফপি যেন আসলে ঠিক রবীনের মতোই সাজেশন রাখতে চেয়েছিল। অভিযুক্ত করতে চাইছিল যে কাসেম বিন আবুবাকার রোমান্টিক উপন্যাস লিখে দোষী। কারণ এতেই ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, আর যেন ঠিক এ কারণেই হাসিনা হেফাজতের সাথে আপস করেছেন। এটা কাকতালীয় শব্দটার চেয়েও বেশি কাকতালীয় বক্তব্য সন্দেহ নেই। এমনকি ৭১ টিভির ওই টকশোতে অংশগ্রহণকারী আর এক প্যানেলিস্ট ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকেও রবীন আহসান তার কাকতালীয় দাবি ‘খাওয়াতে’ পারেননি। শ্যামল দত্ত অন ক্যামেরা প্রকাশ্যে তার আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

ওদিকে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরেক তথ্য জানা যাচ্ছে। উপরে এএফপির রিপোর্ট থেকে যে ইংরেজি উদ্ধৃতি দিয়েছি, যেটা ওই নিউজ মিডিয়া (কনসার্ন-বোধ করে) উদ্বেগ বোধ করেছিল – এভাবে জানিয়েছিল। পরবর্তিতে এই রিপোর্ট ফলে ঐ একই উদ্বৃতিও চোখে  পড়েছিল স্টিভ ব্যাননের।  তিনি হচ্ছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের  প্রধান পরিকল্পনা প্রণয়নকারী ( চিফ স্ট্রাটেজিস্ট)। হকিস আগ্রাসী ভুমিকার যে ট্রাম্পকে আমরা দেখেছিলাম বছরের শুরুতে এই নীতি প্রণয়নকারীদের বস তিনি। তবে ছিলেন বলতে হবে কারণ সম্প্রতি তাকে সাইজ করা হয়েছে, বহু পদ-পদবি ও দায়ীত্ব থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।  স্টিভ ব্যাননও  ঐ উদ্বৃতি তুলে নিয়ে তার নিজের ওয়েবসাইটে সেটে দিয়ে  উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটা সত্যিই মজাদার ব্যাপার যে, রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাসে লিখেও বাংলাদেশের আবুবাকারা “জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে” লড়াকুদেরও উদ্বেগের মুখে ফেলা দিতে পারেন!

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান একাডেমিক, গবেষক ও বাংলাদেশ এক্সপার্ট ড. আলী রীয়াজ। তিনি আবুবাকার ইস্যুতে ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাকে সম্ভাবত এই প্রথম একাডেমিকের ভঙ্গিতে দেখা গেল যে, কোনো ইস্যুতে তিনি সহজে কোনো পক্ষ না নিয়ে একাডেমিক অবজারভারের অবস্থান নিলেন। অবশ্য তার বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ ফ্যাক্টস হিসেবে সত্যি নয়।

তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের সোস্যাল মিডিয়ায় যারা সক্রিয় তাদের এক বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন; সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন, অবশ্যই এএফপির কাছে। কিন্তু আবিষ্কারের পরে তাদের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই লেখকের বিষয়ে তারা কিছু না জানায় বিস্মিত এবং খানিকটা ক্ষুব্ধ”।
এটা আলী রীয়াজের স্টাটাসের প্রথম দুই বাক্য। কিন্তু … আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে… ‘সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন’- এই বাক্যটা ফ্যাক্টস নয়। এটা বরং উলটো। কারণ এবারের আগে সোস্যাল মিডিয়ায় আবুবাকার ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছিলেন অন্তত গত বছর ডিসেম্বরে। পরে এএফপিতে তিনি রিপোর্টেড হয়েছেন মাত্র সেদিন।
দ্বিতীয়ত, আলী রিয়াজ “ইসলামপন্থী জনপরিমণ্ডলব্যবস্থার” আলাপ তুলেছেন। অর্থাৎ এএফপির মতো আবুবাকারা আর হেফাজত-সরকারের সম্কাপর্কক নিয়ে কাকতালীয় উদ্বেগ জানাতে যাননি ঠিকই, তবে একাডেমিকভাবে আর খুবই নরমভাবে প্রায় একই কথা বলছেন। ‘জনপরিমণ্ডল’ খুবই খটমটে শব্দ মনে হতে পারে অনেকের কাছে তাই সারকথাটা বলে রাখি। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ আরও ইসলামি মূল্যবোধের (আবুবাকারার রোমান্টিক উপন্যাসের মাধ্যমে) গভীরে ঢুকে গেলে এর যে সামাজিক প্রভাব তৈরি হবে (যা ভালো মন্দ বহু কিছু) এরপর আবার সেগুলোর পরোক্ষ ফলাফলে তা কতটা আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবে, সেটা সমাজতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে বুঝতে হবে। ফলে সরাসরি আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাস লেখা দেখে আমেরিকার জন্য কেঁদে উদ্বেগে হাহুতাশ করে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

তিনি বলছেন, “এ ধরনের উপন্যাস জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ বিষয়ে মনোনিবেশ করা দরকার কাউকে নিন্দা করার (ভিলিফাই অর্থে) জন্য নয়, বরঞ্চ জনপরিসরের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে তা বোঝার জন্য”।

এখানে তিনি বলেছেন, ‘জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ’- এখানে ‘ইসলামীকরণ’ শব্দের ব্যবহার না করলেই তিনি ভালো করতেন। যে দেশের ডেমোগ্রাফিক্যালি মুসলমানের, তাকে আর ‘ইসলামীকরণ’-এর অভিযোগ করা কি চলে? ও ন্যাচারালভাবে যাই করবে তার মধ্যে ইসলামই তো দেখা যাবে, ছাপ থাকবে। তাই নয় কী? তাহলে তিনি বলছেন ‘ইসলামীকরণ’ কিন্তু বুঝাতে চাইছেন সম্ভবত অন্য কিছু। আবুবাকার মুসলমান হিসাবে যদি প্রেমের উপন্যাস লিখে ইসলামি মরালিটির প্রচার এবং প্রদর্শন করেন তাহলে এটাই কী খুবই স্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক “ইসলামিকরণ” নয়? এর মধ্যে নেগেটিভ কী দেখলেন? এটা কী বেআইনী? মুসলমানের হাঁচি কাশিতেও নিজের বিপদ দেখলে, নিজের আধিপত্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুজে পেলে আমার মনে হয় না তাকে সাহায্য করতে পারবে? আর এখানে আধিপত্য হারানোর ট্রমা – এই মানসিক রোগে চিকিতসা ছাড়া সাহায্যেরই বা কী আছে?   বাংলাদেশের এক কমিউনিস্ট মুসলিম তরুণের বাবা মারা গিয়েছেন। তিনি দলের পত্রিকাও দেখাশুনা করেন। তো পত্রিকায় তিনি চার লাইনের এক কলামের সংবাদ লিখলেন, তার বাবা ওমুক মারা গিয়েছেন ইত্যাদি এবং ওমুক গোরস্থানে তার কবর হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক ঐ খবরটার “কবর” শব্দটা এডিট করে লিখলেন – তার “সমাধি” হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলে জানালেন “কবর সাম্প্রদায়িক শব্দ” তাই ছেটে দিয়েছেন। এই সম্পাদকও আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ট্রমাতে ভুগছেন। তবে আমাদের বাড়তি লাভ হল, আমরা সাম্প্রদায়িক শব্দের আসল সংজ্ঞা জেনে নিলাম।

আর তবুও তিনি যদি অভিযোগ করতেই চান, এই যে ইসলামিকরণ হয়ে গেল কীনা বোধের ট্রমা,  এতে নন-ইসলামি পশ্চিমা সরকার ও জনগোষ্ঠীর কি দায় ভূমিকা নেই?

সংক্ষেপে আরো কিছু সিরিয়াস স্পষ্ট আপত্তির কথা জানিয়ে রাখা যায়। ঘটনা হল, কাসেম বিন আবুবাকার মূলত মুসলিম লীগ – এই ধারার প্রডাক্ট বা ফসল। যে অর্থে আমেরিকায় জঙ্গিবাদ শব্দ ব্যবহার করা হয় সে অর্থে মুসলিম লীগ আর আলকায়েদা দুটোই ইসলামি হলেও  দুটোই একই ফেনোমেনা নয়। যেমন আবুবাকার তার গল্পে কোথাও সশস্ত্র পন্থার পক্ষে বলেনি। তা সত্ত্বেও তাকে কি আমরা ইসলামি মূল্যবোধের পক্ষেও কথা বলতে দেব না?  আবুবাকার এক রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাতে, এই “ইসলামিকরণে” যদি আমেরিকার গায়ে ফোস্কা পড়ে তাহলে, এই আমেরিকা লয়া আমরা কী করিব? ইহাকে কোথায় রাখিব?

শেষ পয়েন্ট : বলতে গেলে এই চলতি শতকে (২০০১ সালের পরে) আরও উপন্যাস লেখেন নাই। অর্থাৎ ৯/১১ এর পরে বাকার আর উপন্যাস লেখেননি। গত শতক ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামের। আর ইরানি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা বাদ রাখলে গত শতকে পোস্ট-কলোনি সময়কালের ইসলাম মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামই; এবং তা আবার ‘এ প্রডাক্ট অব মডার্নিটি’ অর্থে।

আবুবাকারের সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস “ফূটন্ত গোলাপ”। আমাদের দুর্ভাগ্য যে বিখাত সব আলোচকদের বেশীর ভাগই এই “ফূটন্ত গোলাপ” সহ কোন উপন্যাসই পড়ে দেখেন নাই। পড়লে দেখতেন এটা (মোটাদাগে ১৯০০ সালের পরে কলোনিয়াল কিন্তু হিন্দু ডমিনেটেড ) কলকাতা কেন্দ্রিক টিপিকাল মধ্যবিত্তের মডেল এর আলোকে লেখা কিন্তু ঢাকার মধ্যবিত্ত। বড়লোক নায়ক গুলসানের ও নায়িকা পুরান ঢাকার, দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। নায়িকার ফ্যামিলির মর্ডানসহ ইসলামি ভ্যালু দ্বারা পরিচালিত হতে অভ্যস্ত, আর নায়কের ফ্যামিলি মর্ডান কিন্তু নামাজ পড়তেও জানে না। এবং নায়িকার ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব যা লেখক ফুটিয়ের তুলেছেন সেজন্য কাশেম বিন আবুবাকার আপনি আমার সালাম নিবেন। বহু প্রগতিশীল এমন ব্যক্তিত্ব ধারে কাছে নয়।  লেখককে ইসলামি মরালিটির ক্ষমতা দেখাতে হবে সেজন্য তিনি লিখতে বসেছেন। ফলে এখানে আবুবাকারের মডেল হল নায়িকা লাঈলি। এই হল কলোনির হাত ধরে উঠে আসা চেনা আধুনিকতা যা কলোনি উত্তরকালের জাতীয়তাবাদ – যার প্রতীক হল মুসলীম লীগ। তা অবশ্যই আধুনিকতার ফসল। তবে উপরে পাঞ্চ করা ইসলামি মরালিটি। এই গল্প এই পরিবার আর ইসলামি ভ্যালু। মনে রাখতে হবে গত শতকে আমেরিকার সাথে ইসলামের (মানে জাতীয়তাবাদি কলোনি মর্ডানিজমের) কোনই সমস্যা নাই, ছিল না। তারা বন্ধু। এমনকি আফগান মুজাহিদ এরা একটু ভিন্ন তবুও  তারা আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু। এর বিপরীতে, একালে চলতি শতকের আলকায়েদার  নিজে কোনো আর অফ প্রডাক্ট অথবা বাই প্রডাক্ট হিসেবেও কোন জাতিবাদী ইসলাম ওটা নয়।
তাহলে আবুবাকার ও তাঁর প্রেমের উপন্যাসকেও আমেরিকা সহ্য করতে পাচ্ছে না কেন? উদ্বিগ্ন হচ্ছে কেন? আসলে এই সমস্যাটা আমেরিকার, আমাদের না। ফলে বলতেই হয়, আবুবাকারাকে নিয়ে যারা এসব উদ্বেগ-ওয়ালারা এরা হয় হেজিমনি হারানোর ভয়ে  ট্রমাটিক না হয় ধান্দাবাজ। কিন্তু মুল কথা এই “উদ্বেগ”  ভুল জায়গায় ‘নক’ করে বেড়াচ্ছে। ভুয়া সেকুলারদের গলা জড়িয়ে অস্হিরতায় কান্নাকাটির রোল তুলতে চাইছে।

তাহলে ব্যাপারটা  হল, একটা রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাও সহ্য করতে না পারছে না, আমেরিকা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, কেন? তাহলে আমাদেরই তো আমেরিকান জনপরিমণ্ডলের দিকে তাকাতে হবে, তাই তো না কী?

 সবশেষে পাঠকের কাছে একটা আবেদন রাখব, কাশেম বিন আবুবাকারের কোন একটা উপন্যাস অন্তত তার ফুটন্ত গোলাপ না পড়ে তাকে নিয়ে মন্তব্য করবেন না, অংশগ্রহণ করবেন না, কাউকে শুনবেনও না। এরপর নিজের মুল্যায়ন নিজে করেন। সেই মুল্যায়নের স্বপক্ষে তর্ক -বিতর্কের ঝড় তোলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ৩০ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

গৌতম দাস

বৃহষ্পতিবার ২৭ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2f3

 

ঘটনার শুরু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলায়, যা ৯/১১ বলে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে বিশেষ ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেয় এবং তা নির্মূল করবার জন্য নতুন ধরণের যুদ্ধের সূচনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ‘আল কায়েদা’কে দায়ী করে। বুশের নেতৃত্বে আমেরিকা আল-কায়েদার রাজনীতি ও হামলা মোকাবিলার যে নীতি গ্রহণ করে তার বৈশিষ্টগুলো হলোঃ

১. খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় আল কায়েদা নির্মূলের যুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিশ্চান জগতের ক্রুসেড সাব্যস্ত করে লড়া।

২. “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়া, এই ডাকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে পক্ষে টানা। সবাইকে সতর্ক করা যে এটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সামিল হয়ে এই হামলা মোকাবিলা করার কমন লাইন হলো, ওয়ার অন টেরর।

৩.“হয় তুমি আমার পক্ষে নইলে তুমি আমার শত্রু” – এই নীতির ভিত্তিতে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নৌকায় উঠতে বাধ্য করা, ভূগোল জুড়ে এই বিভাজনের ভিত্তিতে নতুন এক অক্ষশক্তি তৈরি করা যার লক্ষ্য হচ্ছে যারা এই ক্রুসেডের পক্ষে নয় তাদের নির্মূল করা।

৪. এই যুদ্ধকে খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় ক্রুসেড বলে মনে করলেও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে আবার সেকুলারিজমের রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলে দাবি করা ও প্রচার চালানো। ক্রুসেডের মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশাবে তৈরি হওয়া এই সেকুলারিজমের সোজা মানে দাঁড়ালো, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়া। ইসলাম ডাকনামে যত রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রকাশ দুনিয়ায় আছে সবকিছুকেই শত্রুর কাতারে ফেলা। দুষমন জ্ঞান করে নির্মূল করা, ইত্যাদি।

 

যুদ্ধের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা
আমাদের নিশ্চয় স্মরণ হবে ৯/১১ হামলার সময় বাংলাদেশ ছিল একটা সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। তবুও তাকে আফগানিস্তান হামলায় বিমানের রিফুয়েলিং ও এয়ার স্পেস ব্যবহার করতে অনুমতি দিতে হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যুদ্ধ চাহিদা মেটানোর দায় কবুল করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত কোন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলেও এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লতিফুরকে নিতে হয়েছিল ।

একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশকে ওয়ার অন টেররের নৌকায় তুলে নেয়ার কাজটাতে একটা পজ দিতে হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ আগেই ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে কো্ন দল ক্ষমতায় আসে সেটা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসকে এটা মানতে হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যে, ওয়াশিংটনের পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস যে-লাইনে আগানোর পরিকল্পনা নেয় সেটা হলো, ইসলামের নাম-গন্ধ আছে এমন সব দল ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার কায়েম করা। নির্বাচিত বিএনপির জোটের সরকারকে ক্রুসেড নীতি্র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তা বাস্তবায়নের জনু উপযুক্ত মনে হয় নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মোকাবিলার একটা জাতীয় সরকার গঠিত হোক। তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ওয়ার অন টেররের নৌকায় উঠুক। প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার উদ্যোগ ছিল এটাই।

জোট সরকার ও মার্কিন যুদ্ধের অংশীদারিত্ব নেবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা
মোটা দাগে বললে, বিএনপি বাংলাদেশ সরকারকে বুশের নৌকায় ওঠানো এড়িয়ে যেতে পারে নাই। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ক্ষমতা শেয়ার আর ইসলামী রাজনীতির যাবতীয় প্রকাশগুলোকে শত্রু গণ্য করে একটা ভাগ তৈরির পলিসি জোট সরকার মানে নাই, এই দিকটা এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে আবার র‍্যাব গঠন, পশ্চিমের টার্গেট করা লোকদের ধরে নির্যাতন করে তথ্য আদায় ও তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ, ইত্যাদি কাজে জোট সরকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সহযোগী ভূমিকাই পালন করেছে। এককথায় রেনডিশনের কাজে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে বিশেষ সিকিউরিটি স্টেট আকারে সাজানো, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস ও পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলকে জোট সরকার মোটামুটি আস্থায় নিতে পেরেছিল। সেটাও সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। বেচারা বদরুদ্দোজার পদত্যাগ এসবেরই প্রতীকি প্রকাশ।

তখনকার মত পরিস্থিতি এভাবে থিতু হওয়াতে হাসিনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে হতাশ হাসিনা এই ঘটনার ভিতর থেকে পশ্চিমের চাহিদাটা ভাল করে বুঝেছিলেন। এই চাহিদা হবহু পূরণ করে দিতে পারলে তিনি পশ্চিমের চোখে একচ্ছত্র প্রার্থী হতে পারেন – এই সম্ভাবনার কথা ভেবে পরবর্তীতে তিনি এই লাইনেই রাজনীতি করবেন বলে মনস্থ করেন। শেখ হাসিনা পশ্চিমের ওয়ার অন টেররের চাহিদা বুঝে তাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের দিকে পা বাড়ান। সিদ্ধান্ত নেন এই চাহিদা মোতাবেক নিজে ও দলকে ঢেলে সাজাবেন। সে মোতাবেক রাজনৈতিক কৌশল তৈরিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির চেয়ে নিজেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি আন্তরিক ও উপযুক্ত খেদমতগার হিশাবে পশ্চিমের বাজারে হাজির করা। এই কাজের জন্য তিনিই একমাত্র ক্যান্ডিডেড হিসাবে নিজেকে বিক্রির কাজটা করতে পারা। ওয়ার অন টেররের উপযুক্ত সৈনিক হিশাবে আমেরিকান সমর্থন যোগাড় করা তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। এই লক্ষ্যকেই ধ্যানজ্ঞান করে ২০০২ সাল থেকে শেখ হাসিনা কাজ করে গেছেন।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশল, লোকাল এজেন্ডা
নিজের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ হাসিনার কৌশল হলো, ওয়ার অন টেররের আমেরিকান নৌকায় তিনি সদলবলেই উঠবেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এর নাম দিবেন “যুদ্ধাপরাধের বিচার”। আবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে তিনি একনিষ্ঠ – এই ভাব ধরে “স্বাধীনতার চেতনার” নামে নতুন এক রাজনীতি তিনি কায়েম করবেন। হাসিনার এই “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতির মানে হোল নিজের বাইরের আর সব রাজনীতি, চিন্তা, তৎপরতার যা কিছু বাংলাদেশে আছে তাকে নির্মূল করবার পথে অগ্রসর হওয়া। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের যে দাবি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গুমরে মরছিল, তাকে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়নের অধীনে এনে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের বীজ তিনি বপন করলেন তার কুফল শাহবাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে পড়ল। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে পারে নি, তাদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যারা করেছিল তাদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। সুষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া মেনে ও দেশে বিদেশে সকলের কাছে বৈচারিক নীতির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য একটি বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুষিয়ে রাখা এই দাবি মেটানোই ছিল সঠিক পথ। শেখ হাসিনা সেই পথে অগ্রসর হন নি।

ওয়ার অন টেররের ছাতার নীচে পপুলার এক উন্মত্ততা (ফ্যাসিজম) তৈরি করে কঠোরভাবে তার নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও নির্মূল করবার পথে তিনি গেলেন। ‘নির্মূল’ করাটা আক্ষরিক অর্থেই, অর্থাৎ ফিজিক্যালি বা শারিরীক ভাবে নির্মূল করা। এছাড়া হাসিনা যেভাবে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বুঝেছেন, তিনি চেয়েছেন চেতনার জয়গান। তার গান গাওয়াই হবে বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। খাঁটি বাঙালি তারাই যারা তার চেতনা ধারণ করে। শেখ হাসিনার “স্বাধীনতার চেতনায়” সওয়ার হয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোও বাঙালির খাঁটি চেতনা পয়দা করবার কাজে নেমে পড়ল। এই খাঁটি চেতনা, খাঁটি ইতিহাস, খাঁটি বাঙালি ধারণা, খাঁটি বাঙালি (পাঠ্য পুস্তকসহ) বই পুস্তক ছাড়া বাকি সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক উন্মাদনা তিনি আনলেন। নিজের এই খাঁটি বাঙালিত্ব বাদে আর সমস্ত চিন্তাকে রাজাকারি বা রাজাকারের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগিয়ে নির্মুল করবেন। একেই আমরা “বাঙালী জাতীয়তাবাদের” উগ্রতার চরম ও ৭১ এর পরের নব উত্থান এবং একই সাথে শেষ পর্যায় বলতে পারি। যারা গত পাঁচ-ছয় বছরের বাংলা ব্লগ ট্রেন্ড খেয়াল করেছেন তারা ভাল বুঝবেন এই নব উত্থিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ আক্ষরিক অর্থে তার প্রতিপক্ষকে ফিজিকালি নির্মূল করবার আকাংখা কিভাবে চর্চা করেছে। এই নির্মূলের আকাংখার তাগিদেই তাদের কদম কদম বাড়বৃদ্ধি হয়েছে। সেতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তচিন্তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে। এই উন্মাদনায় ধর্ম বা ইসলাম আমাদের সব চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান শত্রু এই ধারণা ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে আবার শুরু হয় আস্তিক-নাস্তিক ইত্যাদি নানান বিতর্কের ঝড়।

এতটুকু তাও সহনীয় ছিল। সব সমাজে নাস্তিকতা থাকে,আমাদের সমাজেও অনেকদিন থেকে আছে। কিন্তু এবারের আক্ষরিক অর্থে বিনাশ বা শারিরীক ভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মুলের আকাঙ্খা এতোই উন্মত্ত ছিল যে আস্তিক-নাস্তিক ঝগড়া সহজেই ইসলামের আখেরি নবীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চর্চার নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কারণ এই রাজনীতির অনুমান হচ্ছে লাখ দুয়েক রাজাকার ও রাজাকারের সহযোগী বলে যাদের ট্যাগ লাগানো হবে তাদের সবাইকে নির্মূল করে দিলে “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতিকে একচ্ছত্র করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয় নিশ্চিত করা যাবে। এই নির্মূল পরিকল্পনা আক্ষরিক অর্থেই এক ক্লিনজিং অপারেশানের মতো, এই ধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক ভাবে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবার এটাই উপযুক্ত পথ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রেখে এই যুদ্ধ চালাবার এটাই মোক্ষম সময়। দ্বিতীয় পজন্মের মুক্তিযুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এভাবেই বিশুদ্ধ এক বাঙালির বাংলাদেশ কায়েম করতে হবে। আরেকবার রক্তে স্নান করে একাত্তরের যুদ্ধের দায় মুক্তি ঘটবে।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশলের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি
কিন্তু হাসিনার এই নতুন যুদ্ধবাজ রাজনীতির বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা আছে।

১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বড় জোর একটা ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার হতে পারে। এটাকে ওয়ার অন টেরর বা পশ্চিমের চোখে সন্ত্রাস দমনের কাজ হিসাবে কতটুকু হাজির করা সম্ভব যাতে পশ্চিমারা আগ্রহী হবেন?

২. জামাত একটা সংবিধান মেনে চলা দল, যারা কনস্টিটিউশনাল রাজনীতি করে। পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা মানে এবং সেখানে অংশ গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য তা বিশ্বাসও করে। এমন একটি লিবারাল নির্বাচনমুখী ইসলামী দলকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাস্তবেও এটা সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন তৈরির দল। বাংলাদেশের শ্রেণি-গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশেরই আশা আকাঙ্খার দল। শেখ হাসিনা একে একটা ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসাবে হাজির করবেন কি করে? জামাত যতটুকু ত্রাস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তা অন্য দুই প্রধান পার্লামেন্টারী দল আওয়ামী বা বিএনপির চাপাতি, পিস্তল বা কাটা রাইফেলের ত্রাস সৃষ্টি করতে পারার মতই। কিন্তু একটা পার্লামেন্টারী রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী দল বলে হাজির করতে গেলে অন্ততপক্ষে তাকে নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠন বলে হাজির করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। যে দল ভোট চাইতে জনগণের কাছে যায় তাকে একটা গোপন, সহিংস বা সশস্ত্র দল হিসাবে দেশে বিদেশে চেনানো কঠিন।

৩. বাংলাদেশে জামাতই একমাত্র ইসলামী দল নয় বা ইসলামী রাজনীতির একমাত্র প্রকাশ নয়। যারা আফগানিস্তান ফিরে এসেছে তারা কেউ জামাতের রাজনীতি করে না, কখনও করে নাই। বরং তারা আওয়ামী লীগ করে এমন নজিরই বরং আছে। আবার মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নয়। কিম্বা ইসলামি বিপ্লবও নয়। জামাতে ইসলামি ক্যাডার ভিত্তিক রেজিমেন্টেড সৎ চরিত্রের মানুষ গড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল। এই দিক থেকে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল ‘সুশীল’দের রাজনীতির। যারা জামাতে ইসলামির মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক চায়। মওলানা মওদুদি মনে করতেন ঈমানের দুর্বলতার জন্য রাষ্ট্রের সদর্থক উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায় । তার মানে আল্লাভীরু সৎ চরিত্রের লোকের রাষ্ট্রনায়কী নেতৃত্বের অভাবে। সমস্যাটা নৈতিকতার। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে তার চিন্তায় মধ্যে বিপুল ওসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতা আছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হচ্ছে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বহুদিক ইসলামী ঈমান আকিদা ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা করলেও শেষমেষ ‘আধুনিক রাষ্ট্রই কায়েম করতে চেয়েছেন। অথচ ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র কায়েম আদৌ ইসলামের লক্ষ্য হতে পারে কিনা সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিশাবে হাজির হয়েছে।

অন্যদিকে ‘৭২ সালের পর থেকে মওলানা মওদুদির নিজের চিন্তার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের পুরানা রাজনীতিতে তিনিই আর থাকেননি। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাকি ৭ বছর তার কেটেছে সৌদি আরবে। ইরানী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশে ইসলামের রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক আঁচ থেকে বাঁচানোর কাজটা সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। জামাতে ইসলামি সে কারনে সোদি রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণহয়ে ওঠে । সুন্নি বাংলাদেশে সৌদি রাজতন্ত্রকে সেই সার্ভিস আন্তরিকতার সঙ্গেই জামাত দিয়েছে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। মোগল আমল থেকেই সামাজিক সৌজন্য আকারে আমরা বিদায় বেলায় “খোদা হাফেজ” বলতে অভ্যস্ত। আমাদের বয়স্ক প্রজন্ম এখনও তাই বলেন। কিন্তু এখন এটা “আল্লাহ হাফেজ” হয়ে গেছে। কখন থেকে কিভাবে এটা ঘটে গেছে কেউ টের পাইনি।

কোন ধরণের রেডিক্যাল ইসলামী রাজনীতি জামাতের লক্ষ্য নয় সেটা ১৯৭৯ সালের পরের সময়কালে জামাতের ভুমিকা আরও সাক্ষ্য দেয়। রাজনৈতিক দল হিশাবে জামাতে ইসলামি কখনই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন ক্ষেত্রেই জালিমের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু ভূমিকার চর্চা করে নি, বরং সবসময়ই নিজের ভাবমূর্তি এভাবেই তৈরী করেছে যে কোন প্রকার বিপ্লবী ইসলামী রাজনীতি তার স্বার্থের বিরোধী। ইরানী বিপ্লব থেকে কেউ যেন কোন ইতিবাচক পাঠ না নেয় জামাত সেই কাজটাই সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিক ভাবে করে গিয়েছে। ইসলামী রাজনীতির পরিমণ্ডলে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামির সখ্যতা গভীর। এককথায় বললে বলতে হয় ইসলামের নামে কোন রাডিক্যাল রাজনীতি যেন বাংলাদেশে জেগে না ওঠে ও দানা বাঁধতে না পারে পাশ্চাত্যের পক্ষে জামাতে ইসলামি তারই খেদমতগারি করে গিয়েছে। এই ধরণের মিত্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের চোখে শত্রু প্রমাণ করা শেখ হসিনার জন্য কঠিন একটি কাজ।

টাইম বাউন্ডিং দুর্বলতা বা গ্লোবাল যুদ্ধ কৌশলে বদল
উপরে শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতির যেসব বড় দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বললাম সেগুলো স্থায়ী। কিন্তু আর এক বিশাল দুর্বলতার দিক আছে যাকে বলা যায় “টাইম বাউন্ডিং” বা সময় নির্ধারিত দুর্বলতা। মানে, কোন্‌ সময়ে তিনি তার রাজনীতিটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতিটার ২০০৭-৮ সালের আগে করতে সক্ষম হলে এক রকম হত, কিন্তু এর পরের যে কোন সময়ে করতে চাওয়াটা এক বিরাট বাধা। কেন? মুল কারণ ২০০৮ সালের পর খোদ আমেরিকাই আর বুশের নীতিতে থাকেনি। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট যুদ্ধনীতি বদলে ফেলেছে। এটা ২০০৮ সালে বুশের বদলে ওবামা জিতেছে বলে নয়। বুশের সম্মুখ সমরে ইসলাম মোকাবিলার নীতি তার ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরে নিজস্ব মুল্যায়ন রিপোর্টে ঐ নীতি অকেজো প্রমাণিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষের নাম লক্ষণ নাই বরং তা আফগানিস্তান বা ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর সবকিছুর উপরে যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের উপরে দাঁড়ানো বলে পরিণতিতে এটা একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা (২০০৭-৮) হিসাবে হাজির হয়।

এর ফলে বুশের সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে অল-রাউন্ড যুদ্ধ মোড় বদলাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধকৌশল মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক খুজে বের করার দিকে ধাবিত হয়, যার বাইরের নাম আরব স্প্রিং। ব্যাড মুসলিম আর গুড মুসলিমের ভাগাভাগি শুরু হয়। ওয়ার অন টেররের বাগাড়ম্বর স্তিমিত কিম্বা অবস্থা বিশেষে গায়েব হয়ে যায়। যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো আর বাড়ানো নয় বরং কত দ্রুত (২০১৪ সাল টার্গেট) সবগুলোকে গুটিয়ে নেয়া যায় – এটাই হয়ে যায় মার্কিন নীতি। কিন্তু হাসিনার স্থানীয় যুদ্ধকৌশল তো বুশের একরোখা ওয়ার অন টেররের উপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ইতমধ্যে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া হয়ে ওঠে ওবামা প্রশাসনের কাছে আগামি দিনের সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ আর সেকারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুকরাষ্ট্র কতোটা সমর্থন তা এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ওবামা আমলে আমেরিকার নতুন নীতি ও যুদ্ধকৌশলের সীমার ভিতরে হাসিনার নেয়া স্থানীয় ইসলাম নির্মূল কৌশল আনফিট ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ এই দিকটা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূল নীতির পালে হাওয়া লাগা অসম্ভব কিছু নয়। টাইম বাউন্ডিং বা সময় দ্বারা নির্ধারিত এই দুর্বলতার দিকটা বাদ রেখে হাসিনা তার দুর্বলতাগুলো কিভাবে কাটিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলোচনা এখন সেদিকে নেবো।

শেখহাসিনা-নির্মুল কমিটির পরিপূরক সম্পর্ক
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দুর্বলতাগুলো পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখেন শাহরিয়ার কবীর ও তার নির্মুলের রাজনীতি। এটাকে হাসিনার কৌশলের সাথে শাহরিয়ারের রাজনীতির পারফেক্ট ম্যাচ মেকিং বলা যায়। হাসিনার নতুন কৌশলটা শাহরিয়ার কবীরই সবচেয়ে পছন্দ করেছিলেন। সেই ২০০২ সাল থেকে নির্মুলের রাজনীতি প্রচার ও চর্চার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছিলেন তিনি। একাজে তিনি নতুন শত্রুর যে ভাগটা তৈরি করেন তা হলো, ব্রড হেডলাইনে ইসলাম আর তার প্রকাশ মানেই হলো জামাত। এভাবে তিনি কি করেছিলেন এবং কেন তা পেরেছিলেন এর তিনটা কারণ উল্লেখ করা যায়।

১. বাংলাদেশে আলকায়েদা বা তালেবানদের মত ইসলামী রাজনীতির সোল এজেন্ট, একমাত্র সম্ভাব্য দল হলো জামাত -এই মিথ্যা ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে তিনি একাজ করেছেন। এছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামাত মানেই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সকল ধারা ও প্রবণতার উৎপত্তি কারণ, উৎস ও প্রতীক। এভাবে বয়ান তৈরির সম্ভব হয়েছিল কারণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তো বটেই কমিউনিস্টরাও দুনিয়ায় বা বাংলাদেশের ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে কোনটার সাথে কোনটার মৌলিক রাজনৈতিক তফাত কি, কোন ইস্যুতে তাদের পার্থক্য, কোথায় তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক — এইসবের কোন খবর জানে না, রাখার দরকারও মনে করে না। বরং মনে করে মানুষের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ হলো ধর্ম, মানে ইসলাম। ফলে ধর্ম উৎখাত তাদের বিশাল রাজনৈতিক কর্তব্য। এই পরিস্থিতি শাহরিয়ারকে তার বয়ান তৈরি করতে সহায়তা করেছে।

২. ১৯৭১ সালে জামাতের রাজনীতি আর একালের তালেবান রাজনীতির কোন মিল থাকুক আর নাই থাকুক জামাতের ৭১ সালের ভুমিকাই হোল অকাট্য প্রমাণ যে জামাত তালেবানের মত একটা “সন্ত্রাসী” দল। জামাতের ৭১ এর ভুমিকা নিয়ে জনগনের মনে যে সেন্টিমেন্ট আছে তা কচলে ব্যবহার করে সাধারণভাবে সব ইসলামী রাজনীতিকে দানব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এই জবরদস্তি শাহরিয়ারের দরকার ।

৩. আফগান ফেরতদের দলগুলোর নানান তৎপরতা এবং জেএমবির স্বল্পকালীন উত্থান (২০০৫) এই ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবীরদের দারুণ কাজে লেগেছিল। শহুরে মধ্যবিত্তকে জঙ্গী ইসলামের নিশ্চিত আবির্ভাব সম্পরক্কে ভীত ও আতংকিত করা গেছে। জেএমবির উত্থান রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে অন্ধ অবস্থা তৈরী করেছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছিলে নির্মূলের রাজনীতি। জামাতের রাজনীতির সাথে জেএমবির রাজনীতির কোনই মিল নাই। কিন্তু মিল না থাকলেও মধ্যবিত্ত, সেকুলার,কমিউনিস্ট আর মিডিয়ার চোখে এদের জামাতি বলে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ঘটলো যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটা আর ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার থাকল না। বিচারের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকল না। বয়ানের পাটাতন একেবারে বদলে গিয়ে হয়ে দাড়ালো, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে সবকিছুরই নির্মুল, বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে ঝেড়ে মুঝে সাফ করে ফেলা। একাকার করা এই বয়ানে এক দড়িতে ফাঁসি হয়ে গেল “বিচার” আর ইসলামের।

এতে দ্বিতীয় আরেক বিপদ তৈরি হলো। ধরা যাক ঠিক বিচার নয়, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ আছে সেগুলোকেই মোকাবিলা করতে চান শাহরিয়ার ও তার নির্মুল কমিটি। তাতে একটু না হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার কথাটা ঢাল হিসাবেই ব্যবহারই তিনি করেছেন। এভাবেই যদি ধরি তো সেক্ষেত্রেও যে প্রশ্ন আমাদের ছাড়ে না তা হলো,ইসলাম নামে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশগুলোর মোকাবিলা কি নির্মূল বা ইসলাম ক্লিনজিং করে করা যায়, নাকি সম্ভব? অর্থাৎ কাজটা কি নির্মুল বা ক্লিনজিং -এর? যার যার মাথায় ইসলামী চিন্তা আছে এমন লোকদের এক এক করে ধরে মাথা কেটে ফেলার ব্যাপার ? মোটেই না। চিন্তার মোকাবিলা একমাত্র আরো অগ্রসর চিন্তা দিয়েই করা সম্ভব। নইলে তার পরাস্ত হবার কোন সম্ভবনাই নাই। । অর্থাৎ চিন্তা বা ভাবাদর্শগত ভাবে পরাস্ত করা এবং সেভাবে পরাস্ত করবার রাজনীতির মানে আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করা নয়। ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়া মানে মানুষের পুনর্গঠন আর পুনর্গঠিত সেই নারী ও পুরুষের নতুন সম্পর্ক রচনা — দুনিয়া থেকে পুরুষ নির্মূলের কর্মসুচী নয়। মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব সংঘাত শ্রেণীযুদ্ধ বটে কিন্তু কোনভাবেই এটা সমাজের মালিক অথবা শ্রমিক কাউকেই ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। বরং এটা সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্গঠনের যাতে সমাজে একদিকে পুঁজিপতি আর অন্যদিকে শ্রমিক উৎপাদন করতে না পারে। অর্থাৎ সামাজিক মানুষ যেন দুই বিবাদমান শ্রেণি হয়ে উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত না হয়, ইত্যাদি।

ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে অনেকের মনে হতে পারে বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষমতার জন্ম দিতে গেলে একটা যুদ্ধ তো হবেই, সেটা কি? সেটা আর যাই হোক কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং অপারেশান নয়। বিদ্যমান ক্ষমতাকে পরাস্ত করে নতুন ক্ষমতা কায়েমের জন্য যতোটুকু বলপ্রয়োগ লাগে ততোটুকুই। বৈপ্লবিক রূপান্তরে প্রাণের ক্ষয় ঘটে ঠিক, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়, নতুন ক্ষমতার জন্ম দেওয়া এবং নতুন আইন ও নীতিনৈতিকতার জন্ম দিয়ে নিজের নতুন ক্ষমতার বৈধতা ও ন্যায্যতা প্রমান করা। নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা যেন নতুন মানুষ তৈরী হতে পারে। কোনভাবেই সেটা ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। । এমন বাসনা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা কেউ একা বা দলবদ্ধভাবে তৈরি করা নয়। সমাজের সংস্কার বা বিপ্লব প্রতিহিংসার চর্চা হতে পারে না। জিঘাংসার আকাঙ্খা যে উন্মাদনা তৈরি করে বাস্তবে একা বা গোষ্ঠিসহ কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং করা মানেই হলো আরেকটি যুদ্ধাপরাধ ঘটানো।

সমাজে চিন্তা ও ভাবাদর্শগত লড়াইকে খুনোখুনি করে সস্তায় সেরে ফেলতে চেয়েছেন শাহরিয়ার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে হাসিনা আর নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার, মুনতাসির ইত্যাদিরা মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে গেছেন আর সমর্থকদের মনে সফল ভাবে ঢুকিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর ক্লিনজিং-এর আকাঙ্খা। নির্মূল বাসনার এক অসুস্থ উন্মত্ততা।

শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ারের এই যৌথ প্রকল্পের খবর অনেকেই রাখেননি। বলা বাহুল্য শেখ হাসিনার সাথে শাহরিয়ারের এই মহামিলন ও তাদের প্রজেক্টের অভিমুখ ও পরিণতি হলো হাসিনার কারজাই হওয়া। আর প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই এটা তালেবান রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা। ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে শাহরিয়ার আজীবন নির্মূলের মধ্যেই তার সমাধান দেখেছেন। তার সাফল্য হলো,এই উন্মাদনাকে তিনি বাংলাদেশের সমাজে একটা মানসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পেরেছেন। এখন বলে বুঝিয়ে এদের কাউকে বিরত করা যাবে মনে হয় না। কারণ এই উন্মাদনা চেপে বসেছে। তাদের অনুমানে দুলাখ ইসলামপন্থীদের নির্মূলের পথে নিয়া যাবার জন্য এরা তাদের মন ও সেকুলার জিঘাওংসাকে পুরাপুরি বেঁধে ফেলেছেন।

শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নির্মূল বাসনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটাচ্ছে সেটা বিচার করবার সাথে সাথে আমাদের কাছে একটা দিক পরিস্কার থাকতে হবে। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত একটি ইস্যু। বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ায় এর ফয়সালা না করলে নানান পেটি স্বার্থে এই জাতীয় ইস্যুটি সবসময় রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতেই থাকবে। যেমন শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর যেভাবে করছেন।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শাহরিয়ারের যুদ্ধ প্রস্তাব
তবু শেষ বিচারে হাসিনা আর শাহরিয়ারের রাজনৈতিক আকাঙ্খা কিন্তু এক নয়। শেখ হাসিনার আকাংখা ও পথ হোল যে-রাজনৈতিক লাইন বুকে ধরে তিনি গত দশ বছর এগিয়েছেন তা দিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার কাজে এই পথটাকে ব্যবহার করা। এই বিচারে শাহরিয়ার কিন্তু সৎ ও নির্মূলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর নিজের ভাষাতেও “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করতে চান। এজন্য তিনি VOA এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছে হস্তক্ষেপ সহায়তা চেয়েছেন। হাসিনা পশ্চিমের সমর্থনে একনিষ্ঠ “ওয়ার অন টেররের” একনিষ্ঠ খেদমতগার হয়ে বিনিময়ে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চান, নিজস্ব “স্বাধীনতার চেতনার” বাইরে থাকা বাকি সবাইকে মেরে কেটে সাফ করা যার লক্ষ্য, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আতাত ও আপোষ করতে বাধা নাই। । শাহরিয়ার চান একই “ওয়ার অন টেররের” খেদমতগার হওয়া, কিন্তু কোন আঁতাত বা আপোষ নয়। কারন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন তার উদ্দেশ্য নয়। বরং “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করবার কাজে একনিষ্ঠ থাকতে চান। এই কাজে তিনি শেখ হাসিনার ওপর পুরাপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। বরং সরাসরি আমেরিকার সমর্থন, লজিস্টিক , সৈন্য সব কিছুই চান। কোথায় তাদের মিল আর কোথায় পার্থক্য সেটা আমাদের বুঝতে হবে। একই সাথে শাহবাগের অংশ গ্রহণকারীরা যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে নিজেদের পৃথক দাবি করে, তারা শাহরিয়ারের নির্মূলের রাজনীতি ধারণ করে বলেই সে কথা বলে। ঠিক যে শাহবাগ শেখ হাসিনার আশু রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলিত থাকলেও শাহবাগের রাজনীতি শেখ হাসিনার রাজনীতি নয়। সেটা একান্তই শাহরিয়ার কবীরের নির্মূল বা ক্লিনজিং-এর রাজনীতি।

লক্ষ্য করার বিষয় ভয়েস অব আমেরিকার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার কিন্তু আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলছেন না। বলছেন ওয়ার অন টেররের খাঁটি লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন”। এটাই চান তিনি। বিষয়টা শাহরিয়ারের কাছে স্পষ্টতই এখন আর আদালত পাড়ার বিষয় নয়, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবার বিষোয়।। তাই তিনি প্রকাশ্যে সাক্ষ্যতকারে দাবি করছেন,“জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”। কিন্তু প্রশ্ন হোল এখন তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকারঙ্করে সবাইকে জানাচ্ছেন কেন? এতদিন আড়ালে যেভাবে চলছিল সেই পর্দা উঠিয়ে ফেলার কী দরকার ছিল।

কারণ শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ার – প্রতীকি নামের দুই রাজনৈতিক আকাঙ্খা হাত ধরাধরি করে চলতে থাকলেও তাদের উদ্দেশ্যে পার্থক্য ছিল। এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও এতদিন তাদের সহাবস্থানে অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এখন সেটা দিনকে দিন সেটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ারের নির্মূল ধারা মনে করছে হাসিনা যথেষ্ঠ কঠোর পথে যাচ্ছেন না। কি সেই কঠোর পথ? সুনির্দিষ্ট করে বললে, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে দানব হয়ে মাঠে নেমে পড়া, দাবড়ানো, খুনোখুনি। জিতি অথবা মরি জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে হাসিনা নির্বাহি ক্ষমতায় আছেন আর শাহরিয়ার আছেন একই নির্মূলের আদর্শে, চিন্তায় রাজনৈতিক লাইনে, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকার ঠেলা বা বিপদ শাহরিয়ারের বুঝের বাইরে। পোলাপান অনেক কিছুই আবদার করে। কিন্তু বাবাকে টাকা কামিয়ে, সেই কামানো অনুপাতে ব্যয় করতে হয়। তার পর আবদার কতক অংশ পুর্ণ করতে পারে কতক অংশ পারে না। পোলাপানের আবদারকে ভিত্তি মেনে বাবার চলা অসম্ভব। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার মানে ও পরিণতি কী সেটা না বুঝে শেখ হাসিনা পা ফেলতে পারেন না। বিশেষত সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার সায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আগে নিতে হবে। তা না নিয়ে লাঠি হাঁকাতে পারেন না তিনি। সন্ত্রাস দমন আইন দিয়ে ক্লিনজিংয়ে্র লাইনে ঝাপিয়ে পড়ার মানে শুধু পরিস্থিতি লেজে গোবরে করে ফেলা না, কিম্বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও না, বরং নিজের জান বাচানোও এতে সঙ্গীন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, লজিষ্টিক বা রসদের সরবরাহ পাওয়া না পাওয়ার কথা নাইবা তুললাম।

শেখ হাসিনাএখন একটা স্ববিরোধিতায় পড়েছেন। তিনি সচেতন ভাবে ক্লিনজিংয়ের ধারণা দিয়ে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠিকে তাতিয়েছেন। শুধু আওয়ামী পন্থী নয়, যারা আওয়ামী লীগ করে না সেকুলারিষ্ট, বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক, তরুণ ভোটার -ইত্যাদি সকলকে জিঘাংসার উন্মাদনায় শেখ হাসিনা উন্মত্ত করেছেন। তিনি এসব করেছেন এই উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ভাবে প্রবাহিত করে নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করার কাজে একে ব্যবহার করতে। অন্যদিকে শাহরিয়ার চাইছেন, উন্মাদনাকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মত্ত ব্যবহারে প্রয়োগ করতে, ক্লিনজিংয়ের কাজে লাগাতে। এজন্য তিনি পরিষ্কার করেই এখন বলছেন আদালতে কোন ‘বিচার’ এমনকি শাহবাগের মত ফাঁসিও না, একেবারে নির্মুল বা ক্লিনজিং করবার কাজ সম্পন্ন করতে চান তিনি। চান চিরতরে “জঙ্গি মৌলবাদ দমন”। একাজেই “আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”।

শাহরিয়ার কবীরের এই নির্মূল বাসনা আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যে তীব্র সংঘাত চলছে তার প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তাহ তিনেক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির এক টকশো তে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর প্রয়োগের পক্ষে আর বিপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুব। ওখানে মাহবুব বারবার আর্গু করছিলেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আর ব্যারিষ্টার আমিরুল ততই বারবার আর্গু করছিলেন সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ধরে নিতে পারি হাসিনা অন্তত বোঝেন “সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯” বাংলাদেশের হলেও আইনটা কার্যত আমেরিকার। আমেরিকার আগ্রহে ও ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি গাইড লাইন মেনে এটা তৈরি। এই আইন ব্যবহার করে নির্মুল বা ক্লিনজিং-এর পথে যেতে গেলে আমেরিকার আশির্বাদ লাগবে। কিন্তু শাহরিয়ার, মুনতাসির বা আমিরুল সেটা বেখবর। ফলে তারা বালখিল্য আচরণ করছেন। কান্নাকাটি করছেন, আমেরিকা কেন আফগানিস্তান বা ইরাকের মত বাংলাদেশেও একটা নতুন তালেবান মোকাবিলার ফ্রন্ট খুলছে না।

সন্ত্রাস দমন আইন এমন আইন যা কোথাও ব্যবহার করলে এর সব একটিভিটি রিপোর্ট আমেরিকাকে দিতে হয়। কেন? সেটা আমরা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ বুঝি সেই সহজ বোঝাবুঝি ছাড়াও আরও ভিন্ন দিক থেকে বোঝার ব্যাপার আছে। আমেরিকাকে না জানিয়ে হাসিনা যদি এই আইন একার বুদ্ধিতে ব্যবহার করে তবে সে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠবে। সেটা একটা তালেবান পরিস্থিতি তৈরি করবে, প্রথম চোটে যার অভিমুখ হবে এন্টি-আমেরিকান, বাংলাদেশের সব পশ্চিমা ইনষ্টলেশন এর টার্গেট হবে। অল-রাউন্ড একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট ওপেন করলে যেমন ঘটে। শুধু তাই নয়,এর উপচে পড়া প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশে না, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বার্মাসহ পুরা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের প্রতিদিনের আঞ্চলিক ঝগড়া দ্বন্দ্ব বিবাদ সবসময়ে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মায়ানমারে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিবাদ হিসাবে চলছে এগুলো সমন্বিত হবে আর তার নির্দিষ্ট অভিমুখ হবে পশ্চিমা-বিরোধী। স্থানীয় যে কোন বিরোধ এভাবে গ্লোবাল বিরোধ হয়ে হাজির হতে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য আত্মরক্ষামূলক ধরণের হলেও সেই সীমিত লক্ষ্যের নতুন ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতা তৈরি করে ফেলবে। ফলে সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ দেখতে বাংলাদেশের মনে হলেও এর প্রয়োগ ও পরিণতি শতভাগ আঞ্চলিক ও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। এদেশে যারা দুলাখ জামাত ও রাজাকারি ট্যাগ লাগানো লোক মেরে নির্মুলের মধ্যে ঘটনার সুখকর সমাপ্তি দেখছেন তাদের বেহুঁশ ও বালখিল্য বললে কম বলা হয়। আমেরিকার যুদ্ধ বালখিল্য ব্যাপার নয়। যদি তাই হোত তাহলে সারা দুনিয়ার উপর সাম্রাজ্যের ছড়ি ঘুরাতে পারত না। তাহলে কি শাহরিয়ারের লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন” কাজে আমেরিকাকে ডাকার চেষ্টাটা ভূয়া? এতে কিছু হবে না? কোন বিপদ নাই?

না ভূয়া বলছি না। বলতে পারলে ভাল লাগত। গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো,আওয়ামী লীগ, অ-আওয়ামী লীগার, সেকুলারিস্ট,বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক –সকলেই একপ্রকার জিঘাংসার উন্মাদনায় আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তাতানোর ফলাফল এটা। এটা পটেনশিয়াল ও খুবই বিপজ্জনক। যে কোন দিকে এর মোড় নেবার সম্ভাবনা আছে। হাসিনা একে তার নির্বাচনী বা ক্ষমতা লাভালাভের কাজের মধ্যে পরিণতি টানবার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। শাহবাগ নামে যা ফেটে বের হয়েছে। আবার শাহবাগের অনেকেই যেমন বলে শাহবাগের অভিমুখ একটা না, ভিতরে অনেক অভিমুখ আছে। এর ভিতরের একটা শক্ত অভিমুখকে চিনিয়ে দেই। যেমন ষ্টেজে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আছেন সবসময় ইমরানের পাশে। নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একই সাথে হাসিনা ও নির্মূল কমিটির প্রতীক। ওখানে যে আইকন বা ছবি তোলা হয়েছে সেটা “বঙ্গবন্ধুর” না, নির্মুল কমিটির জাহানারা ইমামের । বেঁচে থাকলে জাহানারা নির্মূলের রাজনীতি করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তার ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটির পটেনশিয়ালিটি নিশ্চয় নতুন করে বলবার কিছু নাই।

কোথায় নিয়ে যাবে এরা?
পটেনশিয়ালিটি – মানে কিছু ঘটিয়ে দেবার উন্মত্ততা। শেখ হাসিনা কিন্তু এখনো তৈরি হওয়া এই উন্মত্ততা দিয়ে কিছু ঘটিয়ে ফেলার পটেনশিয়াল নিস্তেজ করতে পারেন নি। ওদিকে শাহরিয়ার, মুনতাসির বা ব্যারিস্টার আমিরুলের নির্মুলের রাজনৈতিক আকাঙ্খা জীবিত আছে, সরব হচ্ছে। হাসিনার টালবাহানা দেখে শাহরিয়ার সরাসরি আমেরিকার কাছে আহ্বান নিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে নির্মুল কমিটির ধারাটাই উন্মত্ততার উপযুক্ত ও কার্যকর ক্যারিয়ার হতে পারে। এই হোল পটেনশিয়াল বিপদ তৈরি হয়ে থাকার দিক। ওদিকে আমেরিকাও বাংলাদেশে কোন নতুন ফ্রন্ট খোলার কোন তাগিদ দেখাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও অর্থ খরচের সামর্থ হারাচ্ছে তারা। অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উন্মত্ততার লাইন প্রথম ঝাপ্টায় ইতোমধ্যে দেড়শ লোক মেরে ফেলেছে, কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। প্রথম দফার রক্তারক্তির পর উভয় পক্ষই সমাজকে স্ব স্ব পক্ষে নতুন শক্তি ও শ্রেণি বিন্যাস তৈরির জন্য সময় নিচ্ছে। কোন পক্ষই টোন ডাউন করবে এমন বাস্তবতা নাই। কিছু ঘটাবার সক্ষমতা উভয় পক্ষেই আছে। এটাই অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা আর অনিচ্ছুক আমেরিকাকে যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতায় টেনে নিতে পারে। একটা লোকাল ঘটনা রিজিওনাল ও গ্লোবাল হয়ে উঠতে পারে। এর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাকে কিছু তো করতে হবে, অন্তত আত্মরক্ষামূলক। লিবিয়ার “আরব স্প্রিং” উন্মাদনার এত বড় ঘটনায় খরচের কথা চিন্তা করে আমেরিকা কোন মেরিন পাঠানোর পথে যায় নাই। এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু গাদ্দাফি উত্তরকালে নিজের রাষ্ট্রদুত খুন হবার পর কিন্তু সে মেরিন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সোজা মানে হলো, মেরিন পাঠানোর অবস্থা তার এখনও নাই বললে চলে, একান্ত বাধ্য হয়ে না গেলে। খরচ সামলানো মুশকিল। এখন কম খরচে ন্যূনতম কিছু করতে হলে সেটা হবে ড্রোন হামলা।

এসব বিবেচনায় করেই প্রতীকি ভাবে ড্রোনের কথা এসেছে। কিন্তু মুল বিষয় হলো, যে পটেনশিয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে তা যে কোন দিকে মোড় নেবার ঝুঁকি রাখে। উন্মত্ততা নিস্তেজ করবে কে, কি দিয়ে এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে না। এখন এই সম্ভাবনা আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

 

[এই লেখাটির একটি প্রাথমিক খসড়া সর্বপ্রথম তোলা হয়েছিল গত ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ফেসবুকে নোট আকারে। শিরোনাম ছিল, ‘শাহরিয়ার ও শাহবাগ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে’সেই লেখাটি এক সম্পাদিত রূপ এরপর ছাপা হয়েছিল চিন্তা নামের ওয়েব পত্রিকায়।  চিন্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল দুদিন পড়ে  ২৪ মার্চ ২০১৩ সালে। এখানে চিন্তা পত্রিকার ভার্সানটাই আবার এখানে হুবহু তুলে আনা হল, সংরক্ষণের জন্য।]

 

 

বাংলাদেশে ‘ভারতের সমর্থনের সরকারও’ কাজ করছে না

বাংলাদেশে ভারতের সমর্থনের সরকারও কাজ করছে না

গৌতম দাস

১৮ এপ্রিল ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2eC

 

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষ হবার পর সপ্তাহ পার হতে চলছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা এখন শেষ হয়েছে ধরে নেয়া যায়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকেই সবচেয়ে বড় সমালোচনার আসর ছিল বলা যায়। যেকোনো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর সফরকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সম্মেলনের আবহাওয়ায় নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে ঘিরে সাধারণত প্রচুর জল্পনাকল্পনা হয়ে থাকে। আর তাতে উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যুর সম্ভাব্য অর্থ তাৎপর্য কী তা নিয়ে মিডিয়ায় বিভিন্ন বয়ান ব্যাখ্যা শুরু হওয়া সাধারণ ঘটনা। কিন্তু শেখ হাসিনার সফরকে ঘিরে সেসব বিবেচনায় যত আলাপ-আলোচনা উঠে থাকুক না কেন তা যথেষ্ট ছিল না। যেমন তিস্তার পানি ইস্যুতে আমরা মিডিয়াতে বিস্তর আলোচনা হতে দেখছি যে – কেন পানি দিচ্ছে না, কী সমস্যা, কী হলে দিতে পারে, কবে দিতে পারে, আদৌ দিবে কি না, অথবা কী হলে সমস্যার হাল হতে পারে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই আলোচনায় উঠে এসেছে। এরপরও নির্দ্বিধায় বলা যায় তবু মূল একটা বিষয় কোথাও আসেনি। কী সেটা? না, শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সবচেয়ে বড় সমর্থন জুগিয়ে চলেছে ভারত, বলা যায় এই সমর্থন সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। বাস্তবতা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে কম বেশি সব পক্ষই তা স্বীকার করেন। “ভারতের সমর্থনের সরকার” – ভারতের দিক থেকে দেখলে এটাই কী সবচেয়ে বড় কিছু দিয়ে দেয়া নয়? তাহলে এরপরে আরও কিছু কেন দিবার কথা ভাববে?
ব্ব্র

ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে দেখলে, এই সমর্থনকে তারা এক বিরাট দান বলে গণ্য করে। ভারতের এই দানের অনুভব এটা কেউ আমল করেনি। আর এই দান তারা বাংলাদেশকে দিলো, নাকি তাদের পছন্দের ব্যক্তি বা দলকে দিলো সবই তাদের কাছে সমান। কিছু আসে যায় না। যদিও এর ফারাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশাল হয়ত। কিন্তু ভারত গণ্য করবে দুই ক্ষেত্রেই তারা বাংলাদেশকে বিশাল কিছু দিয়েছে। আর ঠিক সে কারণেই আমরা আর যা কিছু ভারত থেকে আশা করছি তা তাদের চোখে বিবেচনায় আরো অতিরিক্ত, বাড়তি। এ কারণেই সব সময়ই ভারতের মনে প্রশ্ন উঠে কোনো বাড়তি বা অতিরিক্তগুলো সে আর কেন দেবে? বিনা নির্বাচনে একটা সরকার বসিয়ে দেয়া বা তাতে ভারতের সমর্থন দেয়া – এর একটা বড় রকমের মূল্য যে আছে সেটা ভারতকে বুঝিয়ে বলার কিছু নাই। ভারত এটা না বুঝার কথা নয়।

হাসিনার ভারত সফরকে নিয়ে বিস্তর দিকে আলোচনা উঠেছে কিন্তু ভারতের এই দৃষ্টিকোণটা সব আলোচনাতেই অনুপস্থিত। অথচ এটাই ভারতের মুখ্য দৃষ্টিভঙ্গি।
তিস্তায় বা অন্য কোনো যৌথ নদীর বেলায় পানি, এটা তো বাড়তি; এই পানি ভারত কেন দিবে? অথবা ট্রানজিটের মূল্য কেন দেবে, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার করতে পারবে না কেন, সীমান্তে লোক মারা বন্ধ করা ইত্যাদি। আগেই তো সরকারে সমর্থন দিয়ে রেখেছে! এক কথায় বললে সমর্থন দিয়ে সরকার ক্ষমতায় রাখার মূল্য এতই অমূল্য বা তা সীমাহীন হওয়ারই কথা। ফলে সেই অমূল্যদানের পরে এরপর আবার বাংলাদেশের আর কোনো মূল্য চাওয়ার আছে এটা তারা গণ্য করতে রাজি না হওয়ারই কথা। সরকার বসিয়ে দেওয়ার পর সেই সরকারের আর কতটা বারগেন-দড়কষাকষির অবস্থা অবশিষ্ট থাকে! বাকী সব ডিমান্ড সেকেন্ডারী গুরুত্বের হয়ে যায়।
তিস্তার কথাই ধরা যাক, সবশেষ ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা ইস্যু প্রসঙ্গ সবচেয়ে জীবন্ত ছিল। ভারত তখ্নও পানি দিতে পারেনি বা চায়নি। কেবল নাম-কা ওয়াস্তে একটা চুক্তি করে রাখতে চেয়েছিল। বড় জোর যেমন গঙ্গাপানি চুক্তি। চুক্তির সাথে বাস্তবে পানি প্রাপ্যতার সম্পর্কিত নয়। সেবার তিস্তার বেলায় সেটাও হয় নাই।  এরপর থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে হাসিনার দিক থেকে ভারতের সমর্থন পাওয়া স্বভাবতই এতই গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক ছিল যে ওই নির্বাচনের দুই বছর আগে এবং পরে নির্বাচনের একই  সাথে তিস্তা প্রসঙ্গ তোলা হত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই তোলার বিষয়টা গুরুত্ওব যোগাড় করতে পারে নাই। নির্বাচনে সমর্থন পাওয়া ব্যাপারটা যতই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে অন্য যেকোনো ইস্যু তুলনায় ততই গুরুত্বহীন হবে, তোলা হবে না এটাই তো স্বাভাবিক; বাংলাদেশ ততই ‘লেস ডিমান্ডিং’ হবে। বাংলাদেশের এই দুর্বলতার দিকটা ভারতীয় কূটনীতিকদের টের না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই ঠিক এর পাল্লা দিয়ে যেন ভারতের অবস্থা হয়েছে তাদের স্তবার্তথের ইস্যুতে  ‘এন্ডলেস ডিমান্ডিং’।
সরকারে রাখার সমর্থনের ‘বিনিময় মূল্যও’ দাবি হয়ে পড়েছে অফুরন্ত। আবার ২০১৭ সালের হাসিনার ভারত সফর, এখানেও তিস্তা গত ছয় বছরের মতোই কোনো ইস্যু ছিল না, হতে পারেনি। কারণ এবার হাসিনার কাছে এর চেয়ে অনেক অনেক উঁচু প্রায়োরিটির একনম্বর ইস্যু ছিল ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’। অর্থাৎ ডিফেন্স প্যাক্ট না করে আপাতত শুধু একটা এমওইউর মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রেখে যদি ফিরতে পারেন, এটাই হবে তাঁর বিরাট অর্জন। রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলী একবার স্পষ্ট এই ভাষাতেই কথাটা বলে ফেলেছিলেন।

ভারতের সাথে চীনের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধ আছে, থাকাই স্বাভাবিক। সব রাষ্ট্রের সাথেই যেমন সবার থাকে। আর মূলত যে কারণে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র বলে নিজেকে গণ্য রাখে, টিকিয়ে রাখে মিলে যায় না। যেকোনো বড় দুই ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রেরও স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্ট আলাদাই হয়, সঙ্ঘাতমুখর হতে পারে। আবার সব রাষ্ট্র একই কূটনৈতিক পথে নিজের স্বার্থবিরোধ নিয়ে লড়ে আর, আদায় ও মোকাবেলা করে না। নানান কায়দা সেখানে থাকে, নরম-গরম, গিভ অ্যান্ড টেক, কোনো ইস্যুতে নরম হলেও আবার একই সময়ে আর এক ইস্যুতে গরম ইত্যাদি সব কিছুর মিশাল, এটাই এই শতকের কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু শুধু এই স্বাভাবিক বিষয়টাই ভারত-বাংলাদেশ এখানে কার্যকর নয়। কিছু সীমিত কার্যকর দিক থাকলেও তা মুখ্য নয়।  এখানে ব্যতিক্রম বা বাড়তি বিষয়টা হল, ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গি যে, ‘বাংলাদেশ’ সেটা তো আমাদেরই সরকার। তাই ভারতের দাবি ও আকাঙ্খা হল, তাহলে চীন-ভারত স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ যেসব জায়গায় সঙ্ঘাতপূর্ণ সেখানে বাংলাদেশ মানে হাসিনা সরকার নিজের সব কিছু ভুলে ভারতের স্বার্থে অবস্থান নেবে না কেন?  বাংলাদেশে যেকোন অবকাঠামো প্রজেক্ট থেকে চীনকে বাংলাদেশ দূরে রাখুক – এটা ভারতের কাম্য।  ভারতের সব ডিম্যান্ডের-আর্গুমেন্ট, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আকাঙ্খা এখান থেকেই। এটাকে বলা যায় হাসিনা ভারতের ‘দাবির জবরদস্তির’ ভেতর পড়ে গেছে। কারণ ভারত এমন পেতে পেতে এভাবে নিতে ও পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেন এমন হলো?
একটা উদাহরণ নেয়া যাক। ডিপ সি পোর্ট বা গভীর সমুদ্রবন্দর। কক্সবাজারের  সোনাদিয়ায় টেকনিক্যাল স্টাডি করে লোকেশন পছন্দ করা, ফিজিবিলিটি ভায়াবিলিটি নিরীক্ষা সব শেষ হওয়ার পরও ২০০৯ সালে এই সরকার আসার পর ঐ প্রজেক্ট ঠেলতে ঠেলতে এখন সোনাদিয়া একেবারেই বাদ করে দেয়া হয়েছে। আবার ভারত এর বদলে পোর্ট অন্য কোথাও  কিছুই না করার পক্ষে ছিল। কিন্তু শেষে ‘পায়রায়’ বিকল্প বন্দর পছন্দ করেছে। যেন এটা খামখিয়ালের বিষয়। আর তবুও এই প্রজেক্টে ভারতকে অযাচিত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অযাচিত এই অর্থে যে অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকা সত্ত্বেও ভারতকে ছোট অনুসঙ্গী করে প্রজেক্টে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবু প্রজেক্টে মূল পোর্ট গড়ার কাজ চীনকে দিতেই হয়েছে। কারণ অন্য কারও কোন অর্থ বিনিয়োগের সংস্থান মুরোদ নেই, কেবল ভারতের ইচ্ছাকে জায়গা দেয়া এটা বাংলাদেশ দিতে চাইলেও তো দিতে পারা সম্ভব নয়, সম্ভব নয়। মূল প্রশ্ন বিনিয়োগ কে দেবে? আর এই মারাত্মক কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পিপিপি বা ব্যক্তি উদ্যোগ ঢুকানো হয়েছে। অবকাঠামো প্রকল্প আর বাণিজ্যিক প্রকল্পের ফারাক আর বজায় রাখা হয়নি। যেন যমুনা সেতু নামমাত্র সুদের অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে করে বাংলাদেশ ভুল করেছে। এতে ট্রাকপিছু এর টোল এখনো এক হাজার টাকা। এর বদলে ওই সেতু যদি (২-৬% সুদের) বাণিজ্যিক প্রকল্প অথবা পিপিপি করতাম তাহলে টোল পড়ত ট্রাকপিছু তিন হাজার টাকা, এটাই ভালো হত। তাই কী? এমন এক বেলজিয়াম কোম্পানিকে ঢুকানো হয়েছে মূল চ্যানেল খননের কাজে। আর পুরো প্রজেক্টটাই জি-টু-জি তে চীনকে। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশ থেকে টেন্ডার আহ্বান উঠে গেছে। যদিও এখনো বিনা সিক্রি টকশোতে বলে বেড়াচ্ছেন মূল প্রজেক্ট নাকি চীনকে না, ডাচদেরকে দেয়া হয়েছে।
আচ্ছা সোনাদিয়ায় ভারতের আপত্তির মূল বক্তব্য কী? ভারতের বক্তব্যকে কোনো যুক্তি হিসেবে মেনে নেয়া মুশকিল। ভারতের একটা সুপ্ত স্বপ্ন-আকাঙ্খা আছে, তা হলো চীন বাংলাদেশে কিছুই করতে পারবে না। মুরোদের খবরহীন ফালতু এসব স্বপ্ন নিয়ে কথা বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। ওবামার আমেরিকার একটা লক্ষ্য ছিল চীন ঠেকানো; চায়না কনটেইনমেন্ট। বুশ ও ওবামার আমেরিকা এটা ভারতকে সামনে রেখে ভারতকে দিয়ে যতদূর সম্ভব করাতে চাইত। ট্রাম্পের আমলেও ‘চীন ঠেকানো’ এখনও ট্রাম্পের আমেরিকার এজেন্ডা কিনা এখনও আমরা এর রিনিউয়াল কিছুই শুনিনি। কিন্তু ভারত তার পুরনো অবস্থানেই আছে, ‘চীন নাকি ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলল’, আমেরিকার এই শিখানো বুলি সে কপচে চলছে।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর একটা বাণিজ্যিক প্রজেক্ট। কোনো ডিপ সি পোর্ট প্রজেক্ট যেটা নাকি আসলে ছুপা  স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হয়েছে বা হতে পারে এটা শোনা যায়নি। এর কারণ মূল প্রজেক্টটাই কমপক্ষে চার বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি একমাত্র এটা বাণিজ্যিক হলেই এই বিনিয়োগ ঋণের বোঝার দায় নিতে সে সক্ষম। কারণ স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হলে ওর বাণিজ্যিক রিটার্ন নেই। সারকথায় বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো প্রজেক্ট মানেই তা অবশ্যই বাণিজ্যিক  প্রজেক্ট হতে হবে। নইলে ঋণ শোধ করতে পারবে না। তাই  নিঃসন্দেহে সোনাদিয়া আসলেই ছিল এক বাণিজ্যিক প্রজেক্ট এবং বাংলাদেশকেও নিজে থেকেই যেটা নিশ্চিত করতে হবে –  চীনের সাথে কথা বলতে হতে পারে যে এটা মাত্র বাণিজ্যিক প্রজেক্টই হবে। এ জন্য যে এই বন্দর ব্যবহার করে চীনের সাউথ-ইস্ট, ভারতের নর্থ-ইস্ট এবং বার্মা সবাই মূলত নিজের নিজের ল্যান্ডলকড অঞ্চল বা এলাকাগুলোকে সমুদ্র যোগাযোগের আওতায় নাগালে আনবে। এটাই সবার মুখ্য আর বার্ণিং স্বার্থ। ফলে এর যেন শুধু বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় এটা বাংলাদেশ নিজেই দায়িত্ব ও লিড নিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে ও চায়। ভারত এটাই বাংলাদেশের কাছে আশা করতে পারত। আর চীনের এতে আপত্তিরও কোনো কারণ থাকত না। নিজের ল্যান্ডলকড দশা ছুটানোটাই চীনের বিরাট ও মূল স্বার্থ। বাংলাদেশের গভীর স্বার্থ হল, এটা যদি ব্যবহারকারীদের সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ শক্তভাবে রক্ষা করা যায় তবে সবার ব্যবহারে ব্যবহারকারী বেশি হওয়ায় পোর্টের বিনিয়োগ খরচ তুলে আনা সহজ ও দ্রুত সম্ভব। কিন্তু ভারত সে পথে না গিয়ে আমাদের সরকারের ওপর আবদারের চাপ তৈরি করে সোনাদিয়া বন্ধ করে দিল। যদিও অন্য কোন ডিপ সি পোর্ট না করার পক্ষে থেকে চুপ থাকতে পারেনি। সরকারের ওপর চাপ দিয়ে পায়রাতে রাজি করিয়েছে। কিন্তু কেন? এতে ভারতের কী লাভ হয়েছে? একমাত্র ঈর্ষা হাসিল করা ছাড়া? আচ্ছা চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক সামরিক প্রভাবও বাড়বেই। সেটাকে   ঠেকানো – ভারতের এই চিন্তা বড় জোর এক খড়কুটো নয় কী? আর এটা কি সেই পথ?  আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারতের সেই মুরোদ কৈ? আর বাংলাদেশ সেটা ভারতের ইচ্ছায় কেন ঠেকাবে? বাংলাদেশের কী লাভ হয়েছে এতে? ভারতেরই যেখানে মুরোদ নাই সেখানে বাংলাদেশের মুরোদ কোথায়? উলটা বাংলাদেশের বৈষয়িক সুবিধা আছে এখানে।  হাসিনা সরকারকে কেন, ভারতের যেকোনো বসানো সরকারকে তারা নিজের ব্যক্তিগত গোলাম বানিয়ে রেখেও তো বাংলাদেশের কোনো ডিপ সি পোর্টের চাহিদা ঠেকানো সম্ভব নয়। এটা অবজেকটিভিটি, এক বাস্তবতা।
কিন্তু পায়রাতে সরিয়ে নেওয়াতে এখন ফলাফল কী হয়েছে? ভারতকে বাংলাদেশে চীনের সংশ্লিষ্টতাতেই একটা ডিপ সি পোর্ট তৈরি মানতেই হয়েছে। কিন্তু লোকেশন বদলে ভারতের কী লাভ হয়েছে? আমাদের অর্জন কী? সর্বশেষটা শোনা যাক। পায়রায় লোকেশন পছন্দ-পরিকল্পনার ভিতরে শুরু থেকেই ড্রাফটের সমস্যা ছিলই। ড্রাফট মানে গভীরতা বা নাব্যতার সমস্যা ছিল। তাই শুরু থেকেই নাব্প্রযতা ধরে রাখতে প্রবেশমুখ ও আশপাশের ১০-১৫ কিমি নিয়মিত ড্রেজিং করে যাওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়েছিল।  এটাই সে পরিকল্পনাতে ত্রুটির  প্রমাণ। এরপরেও এর ড্রাফট সোনাদিয়ার সমপর্যায়ের লেভেলে পৌঁছাবে না, সমান হবে না এটা সবাই জানত। এখন সেই দায়ভার আগেই ঝেড়ে ফেলতে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলে বসেছেন, ‘পায়রা বন্দরের স্থান নির্বাচন সঠিক হয় নাই’, গত ১০ এপ্রিলের দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বরাতে আমরা এ কথা জানছি। এখন একনম্বর প্রশ্ন হল, তাহলে সোনাদিয়া বাদ দেয়া আর পায়রায় নতুন স্থান নির্বাচন  কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছিল? বাণিজ্যিক ঋণ নিয়ে বড় অবকাঠামো প্রজেক্টে এসব খামখেয়ালিপনা করা হচ্ছে কেন? আমরা চাইলেই কি ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব? করা উচিত হচ্ছে? এর অর্থনৈতিক দায় কে নিবে?

ভারত সফরের একমাস আগে থেকে আমরা দেখলাম ভারত চলতি সরকারের বদলে অন্য কাউকে সরকারে রাখার কথা ভাবতে পারে এই সন্দেহ হাসিনার সরকারে হাজির হয়েছে। আবার ভারতেরও সন্দেহ হয়েছে চীনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের পক্ষে ‘তাদের সমর্থিত সরকার” সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সম্ভবত তাদের পক্ষে থাকছে না!
এসব মিলিয়ে এটা আজ পরিষ্কার ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ বাংলাদেশে এটা কোনো কাজের না, ফাংশনাল না, কাজ করছে না। এটা কার্যকর থাকছে না, থাকবে না। আমরা চাইলেই ভারতের খুশিতে খামখেয়ালিভাবে পায়রায় বন্দর করতে পারছি না। সম্ভব নয়।

ওদিকে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কথাটারই আর এক অর্থ হল, এর প্রভাবে বাংলাদেশে এখন নির্বাচন আয়োজন ঠিকঠাক মত করা না করার সাথে ক্ষমতার কোনোই সম্পর্ক নেই। নির্বাচনের বাইরে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এটাই আজকের হাসিনার সরকারের রীতি। কিন্তু তা ওয়ার্কেবল কী? হাসিনার সব মিলিয়ে আট বছর অভিজ্ঞতা বলছে না যে তা খুব সুখকর কিছু। এর চেয়ে বড় বিষয় ইতোমধ্যেই হাসিনা নিজেকে ভালনারেবল বা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছেন। জনগণের সাথে থেকে মোকাবেলা, সাথে নিয়ে থাকা, নির্বাচন ইত্যাদি সবকিছু থেকে দূরে চলে গিয়েছে দল এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ফলে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতার বিকল্প যে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কোনো মতেই নয় এটা বোঝার মতো কানে পানি যাওয়ার কথা। ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ হাসিনার জন্য আরো রিস্কি ও অনিশ্চিত এক পথ, এই বাস্তবতা ক্রমে বাইরে আসা স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে। হাসিনা কি সাহসের সাথে নিজের সে অনুভব পক্ষে কাজ করতে পারবেন? কারণ সেটা হাসিনা পারেন আর নাই পারেন এটা প্রমাণিত যে ‘আমরা চাইলেই ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব না।
হাসিনার ভারত সফর-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে, “ভারতে গিয়ে আরো পাঁচ বছরের দাসখত দিয়ে আসলেন কিনা, অথবা আরো পাঁচ বছরের ক্ষমতা নিশ্চিত করে আসলেন কিনা” , এমন প্রশ্ন উঠেছিল। সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন হাসিঠাট্টা করে প্রধানমন্ত্রী জবাব দিয়েছেন। এটা কিন্তু তেমন ঠাট্টার বিষয় নয়। গত ২০০১ সালে বিএনপি ভারতের কাছে দেশ বেচছিল সেকারণে ২০০৯ অথবা ২০১৪ তে আওয়ামী লীগের বেচাটা জায়েজ বা ভালো। এটা গ্রহণ করার মতো বয়ান বক্তব্য নয়। বাংলাদেশ অথবা এর কোনো রাজনীতিকের ভবিষ্যৎও ঐ বয়ানে নেই। এই কথা তাই কাউকে ভালো লাগার মতো কথা নয়। ফলে আমরা যত ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’  এরপরেও চেষ্টাই করতে দেখি না কেন, জনভিত্তি গড়া ও জনসমর্থন ধরে রাখা-মুখী রাজনীতি ও সরকার আবার ফিরে আসবেই। অচিরেই ফিরবে, অভিমুখ সেটাই। আমাদের কী সাহস হবে অভিমুখ চিনে সাড়া দিবার!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ১৬ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। ১৮ এপ্রিল অনলাইন দুরবীন ম্যাগাজিনেও ছাওয়া হয়েছে।  সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

গৌতম দাস

০৪ মার্চ ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2eb

 

দিল্লির নাকি আঞ্চলিক আধিপত্য  ছিল অথবা আছে কিংবা কায়েম করতে হবে – এধনের অনুমানের উপর অনেকেই কথা বলেন দেখা যায়। শিরোনামের “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” কথাটা আমার না। ভারতীয় শাখার থিঙ্কটাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ‘কর্ণেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর সি রাজামোহনের থেকে ধার নেয়া। দিল্লি নাকি এতদিন তাঁর কথা শুনে নাই। তাই  হতাশ হয়ে তিনি বলছেন এটা বাগড়ম্বরা; “……দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”।  এখন “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” তো  বাগড়ম্বরাই তাহলে আর আমাদের সরকারের উপর ভারতের ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ এর চাপাচাপি  – এটা তো আসলে ফালতু কথাবার্তা। হাসিনার আবার “নির্বাচিত” হবার ঠেকা আছে বলে তাকে অপব্যবহার করার সুযোগ নেয়া নয় কী? আসলে কুঁজা লোকেরও চিত হয়ে শোয়ার শখ হয়!

‘সাবমেরিন কেনা’ শব্দটা আমাদের মিডিয়ায় হারিয়ে আস্তে আস্তে যত পেছনে চলে যাচ্ছে, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ ব্যাপারটা ততই ভাসুরের নাম নেয়ার মতো আকার-ইঙ্গিত থেকে এবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এই বিচারে গত পয়লা এপ্রিল ছিল ভারতের সাথে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’-এর পক্ষে বড় ও প্রকাশ্য উচ্চারণের দিন। সংবাদ সংস্থা বাসস জানাচ্ছে, সেদিন ‘ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইক্ল্যাডস) আয়োজনে রাজধানীতে লেকশোর হোটেলে এক গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে। সেখানে আলোচনার শুরুতে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন এর নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ। আগ্রহীরা মো:আবদুর রশীদ এর পুরা লেখাটা পেতে পারেন, দৈনিক সমকাল পত্রিকাতে, সেখানে পুরা লেখাটাই উনার নিজের নামে ছাপা হয়েছে। (দেখুন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’)। লেকশোর হোটেলের ঐ গোলটেবিল বৈঠক এটাকে মূলত সরকারের পক্ষের পেশাজীবীদের সমর্থন সমাবেশ বলা যেতে পারে। সেখানে মো: আবদুর রশীদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, “প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অবয়ব আমরা জানি না এখনো”। অর্থাৎ ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ ভারত কী প্রস্তাব করেছে তা অনেকের মতো তারও জানা নেই। ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ কথাটা ভারতের মিডিয়া থেকে নিয়ে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ধারণাপত্রে সারকথা হলো তিনি শর্তসাপেক্ষে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ স্বাক্ষর করার পক্ষে। তিনি বলছেন, “সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা খর্বের শর্ত না থাকলে এবং সামরিক জোটের ক্ষেত্র বাদ দিয়ে সামরিক সহযোগিতা হতে কোনো বাধা নেই। রাজনৈতিকভাবে বন্ধুকে সামরিকভাবে বৈরী ভাবার কোনো যুক্তি নেই”। যার সোজা অর্থ, ‘নিজ সার্বভৌমত্ব খর্ব’ করা যাবে না আর, ভারতের সাথে কোনো ‘সামরিক জোটে’ ঢুকে পড়া যাবে না। কিন্তু কি হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন বা খর্ব হবে এর ব্যাখ্যা কে দিবে। হয়ত একটা ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ হয়ে যাবার পরেও মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ এর কাছে মনে হতে পারে যে সেটাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হয় নাই। দ্বিতীয়ত  বিএসএফ গুলি করে সীমান্তে বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা চলে । সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষা বা গণপ্রতিরক্ষার সুনির্দিষ্ট নীতি দাঁড় না করালে বিমূর্ত ভাবে ভারতের সঙ্গে ‘সামরিক সহযোগিতা’ কথাটা কোন অর্থ বহন করে না। সেটা কি সহযোগিতা নাকি দাসত্বের দাসখৎ তা আমরা ফাঁপা কথাবার্তা দিয়ে বুঝব না।

সামরিক সহযোগিতা নিয়ে ফিসফিসানি থেকে শুরু করে লেকশোর হোটেলের গোলটেবিল আলোচনা দেখে এখন স্পষ্ট করে বলা যায় যে, বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ‘কথিত’ সামরিক চুক্তি প্রস্তাব নিয়ে চোরাগোপ্তা আলোচনাটা চার মাসের শেষে আর আড়ালে আবডালে রইল না। তবে প্রথম কিঞ্চিত একে প্রকাশ্য দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল ভারতের বরাতে আমাদের মিডিয়ায় বাংলা ট্রিবিউনে গত বছর ডিসেম্বরের ১ তারিখে। দেখুন, “সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ভারতের নতুন প্রস্তাব”। আর এরপর গত ১০ ডিসেম্বর আনন্দবাজার লিখেছিল, “দিল্লিতে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন হাসিনা। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর গোপালকৃষ্ণ প্রভু পর্রীকর ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করেছেন”।  আগ্রহিরা এবিষয়ের আরও দেখতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও দেখতে পারেন (এখানে দেখুন, Bangladesh keen to forge expanded military ties with India)।  ভারতের আনন্দবাজার ৯ ডিসেম্বর রিপোর্ট করেছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ডিফেন্স প্যাক্ট করতে যাবার সফর পিছিয়ে গেল।  (দেখুন, ‘পিছিয়ে গেল সফর, ফেব্রুয়ারি নাগাদ আসতে পারেন হাসিনা’)।

তবু ,এমনকি গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পরেও, আমাদের মিডিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে কোনো রিপোর্ট ছেপেছে বলে দেখা যায়নি। ফলে ভারতের কথিত ডিফেন্স প্যাক্ট’-এ কী আছে তা আমরা কেউই জানি না। তবে ভারতীয় মিডিয়ার বক্তব্য নিয়ে একধরনের কানাঘুষা উঠছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রকে ব্যাশিং নিয়ে। সেটা অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে ডিফেন্স প্যাক্টে কী আছে তা নিয়ে নয়। কিন্তু গত এক সপ্তাহে আমরা দুটো গোলটেবিল হতে দেখলাম। প্রথমটা ২৮ মার্চ প্রথম আলোর আয়োজনে ( দেখুন, ‘ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও ঘাটতি আস্থায়‘); আর পরেরটা এ লেখায় আগেই উল্লিখিত হয়েছে (যুগান্তরের রিপোর্ট দেখতে পারেন, ‘ভারত বিরোধিতা রাজনৈতিক কৌশল, ২ এপ্রিল ২০১৭) ‘। এতে একটা লাভ হয়েছে যে ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে ভারতের প্রস্তাব যে আছে, আমাদের মিডিয়ায় তার স্বীকৃতি মিলল। সরকারের সম্ভবত দ্বিধা ছিল বিষয়টা নিয়ে খোলা আলাপ হলে তা কোথায় গড়ায় তা নিয়ে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশে ভারতের বাংলাদেশ নীতিরযারা সমর্থক তারাও সমস্যায় ভুগছিলেন। কারণ সরকারের পক্ষে তারা চুক্তির সমর্থনে নামুন, তাতে ভারতীয় হাইকমিশন সম্ভবত নিজের স্বার্থ দেখলেও কিছু করা যাচ্ছিল না। ফলে লেকশোর হোটেলের এই গোলটেবিলকে তাদেরই উদ্যোগ হিসাবে দেখা যায়। 

ওদিকে প্রথম আলোর ২৮ মার্চের গোলটেবিলের আগে গত ১৩ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খানের কলামটা ছিল উল্টা অবস্থানের।  (দেখুন,  ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, তিস্তা চুক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা’)।  মিজানুর রহমান, তিনি ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বলে সব নষ্টের গোড়া এক শত্রু হাজির করেছিলেন।  অর্থাৎ মিজান প্রচ্ছন্নে ডিফেন্স প্যাক্টের পক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছিলেন। একই কথা লেকশোর হোটেলের গোলটেবিলে আলাপেও দেখা গিয়েছিল শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্যে; এটা মূলত ভারতীয় কূটনীতির কৌশলগত বয়ান। যাই হোক মিজানের ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বয়ানের পরে ২৮ মার্চ এবার প্রথম আলোর গোলটেবিলে বসে দেখতে পেয়েছে, ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা সাম্প্রতিক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে গেছে। তার পরও দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কে আস্থার সঙ্কট লক্ষ করা যায়’। বাংলাদেশে  ‘ভারতের বাংলাদেশ নীতি’র কোনো সমর্থক যখন দিল্লি-ঢাকার ‘পারস্পরিক আস্থার সঙ্কট’ দেখতে পান, তখন এটা তাৎপর্যপূর্ণ মানতেই হয়। প্রথম আলোর গোলটেবিলের সার মূল্যায়ন হলো, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ অপ্রয়োজনীয়। ওপরে প্রথম আলোর রেফারেন্সেই দেখুন, নিজেই লিখেছে এভাবে: “কোন প্রেক্ষাপটে, কী প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সহযোগিতার রূপরেখা হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে”।

এরপরেও যেটা দুঃসংবাদ হয়ে এখনো রয়ে গেছে তা হলো, যেটাকে শুধু ডিফেন্স প্যাক্টবলে এক বোঝাবুঝির মধ্যে রাখছি তা পুরো ইস্যুটার খুবই ক্ষুদ্র অংশ। মুল ইস্যুটা অনেক ব্যাপক।  পুরা ইস্যুটা আসলে কেবল বাংলাদেশ তো নয়ই, সাথে ভারতকে নিয়েও নয়; রিজিওনাল! হা, আঞ্চলিক তো বটেই, বরং আরো কিছু। এমনকি আগামীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা ভারত সমর্থন করবে কি না এতটুকুতেও সীমিত নয়।

বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় থাকবে ভারতের কেবল এতটুকুর নির্ণায়ক হওয়াতে তা আগামি আর যথেষ্ট হচ্ছে না। এত দিন তো ভারত নির্ণায়ক হয়েই ছিল বা আছে। তা , প্রতীকীভাবে কথাটা বলা যায় এভাবে: গত বছরের অক্টোবর মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ভারত সরকারের সস্তা জাতীয়তাবাদে তাল দিতে ভারতের মিডিয়া সারাক্ষণ চীনা ব্যাশিং করে থাকে। ওদিকে আবার যদিও ভারতের প্রতিটা রাজ্য সরকার কিভাবে গুজরাটের মতো চীনের সাথে বিশেষ সম্পর্ক পাতিয়ে নিজ রাজ্যে বিনিয়োগ-বাণিজ্য আনবে এর জন্য উদগ্রীব আর পরস্পর প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে, তা ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক জানিয়েছেন। ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি থেকে শুরু করে এনডিটিভির অ্যাঙ্কর-সাংবাদিক বরখা দত্ত, সবাই পাবলিক আলোচনায় এটা উল্লেখ করতে ভোলেন না যে, তাদের ফ্রেন্ডলি এক সরকার বাংলাদেশে বসানো আছে। এনডিটিভিতে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকে মাথায় রেখে বরখার এঙ্করে এক টকশোর আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, একটা ধাঁধার উত্তর জানা। তারা সবাই জানেন, বাংলাদেশে তাদের পছন্দের একটা “বন্ধু সরকার” আছে। প্রায় তাদের সব প্রয়োজন পুরণ করতে খেদমত করার জন্য একপায়ে খাড়া হয়ে।  কিন্তু তাহলে এখানে চীনা প্রেসিডেন্ট সফরে আসেন কেমনে? তার সঙ্গে হাসিনার এত কী খাতির? তাইলে কি তাদের ‘ফ্রেন্ডলি সরকার’ ধারণাটা ভুল? এই ধাঁধার জবাব কী? তো ইতোমধ্যে তারা ঐ টকশোতে জানিয়েছে যে প্রেসিডেন্ট শি ওই সফরে বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিতে আসছেন। ফলে আলোচনা শেষে ওই টকশোর কনক্লুশন হলো, ভারত তো আসলে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ গ্রহীতা দেশ। সে নিজেও চীন থেকে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ নিচ্ছে। ফলে ২৪ বিলিয়নের তুলনায় ভারতের ২-৩ বিলিয়ন (তাও অবকাঠামো খাতে নয়, টাটার স্টিলে তৈরি বাস বা রেল পণ্য বিক্রির খাতে) বাংলাদেশে বিনিয়োগ – এদুটা ফিগার কি তুলনীয়? কোনোভাবেই না। তাই তারা বিমর্ষ হয়ে মেনে নিয়েছিল যে, এই খাতে বাংলাদেশে চীনের ভূমিকা ও প্রয়োজন অনেক বেশি আর সেটা ভারতের সাথে তুলনীয়ই নয়। এটা সেদিন অন্তত টকশোর লোকেরা বুঝেছিলেন। কথা আরো আছে; পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এখন বড় প্রজেক্টে বিশ্বব্যাংককে বাদ রেখেই অবকাঠামোর জন্য বিকল্প বিনিয়োগ ভারতের চরম অপছন্দের হলেও হাসিনা ঐ বিনিয়োগ চীন থেকে জোগাড় করে চলেছে। আরও আছে। ভারতকে ট্রানজিট দিতে যশোর থেকে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত নতুন যে রেল যোগাযোগ তৈরি করা হচ্ছে এই বিনিয়োগও চীন দিচ্ছে। সার কথায় ভারতের খায়েশ ট্রানজিট পাওয়া,  কলকাতা-আগরতলা ট্রেন যোগাযোগ অবকাঠামো বাংলাদেশ তৈরি করে দিচ্ছে, চীন থেকে বিনিয়োগ ঋণ নিয়ে।

এদিকে আর একটা বিষয় লক্ষণীয়, ইতোমধ্যে নির্বাচন সরকার বদল করে না বা কাউকে ক্ষমতায় আনে না;  নির্বাচন আর ক্ষমতায় থাকা- এটা আর সম্পর্কিত নয়। হাসিনার সরকার নিজেই এমন নীতিচালু করেছে, সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে সরকারের নতুন স্লোগান হলো, “ভালো নির্বাচন নয়; মূল কথা হলো জনগণের দরকার মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়ন”। আর এই সরকার নাকি উন্নয়নে চ্যাম্পিয়ন। তাই সব ঠিক আছে। একথাগুলো আমরা সবাই কমবেশি জানি। যেটা জানি না বা খেয়াল করা হয় নাই তা হল এই স্লোগান সরকার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এ জন্য যে, সে ভারতের কথা শুনে চীনের সাথে ঘনিষ্টতা ত্যাগ করে নাই। চীনকে হারায় নাই তাই। চীনের সাথে খাতির রেখেই বিনিয়োগ এনেছে। উল্টা বিশ্বব্যাংককে কলা দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক ও পশ্চিমকে মামলা প্রত্যাহার করতেও বাধ্য করেছে। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষমতার উৎস কাকাবাবু- এ কথা্টা একেবারেই সবটা সত্যি নয়। উন্নয়নেরস্লোগান চালু রাখতে গেলে কাকাবাবু না, শিং জিন পিংকেই  হাসিনার দরকার। এটা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি ভালো আর কে বুঝে? ফলে যারা ছদ্ম হাসিনাপ্রেমী সেজে ডিফেন্স প্যাক্ট করতে হাসিনাকে সমর্থন জোগাতে মাঠে নেমেছেন অথবা ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে আস্থাহীনতা দেখছেন এরা কেউ সরকারের সংকট সমস্যার গভীরতা বুঝে কথা বলছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।

সম্প্রতি চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করে গেলেন। বাংলাদেশেও আসার কথা ছিল। তা হয়নি। চীনের গ্লোবাল টাইমস গত ২১ জুন চীনা সাংবাদিক আই জুনের লেখা চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওই সফর নিয়ে এক রিপোর্ট ছাপে। শিরোনাম ছিল, “সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চীনের সংশ্লিষ্ট হওয়া নিয়ে ভারত অহেতুক অস্থির হয়”। দেখুন, (India over-sensitive on China’s engagement in South Asia) এই রিপোর্টে বহু কথা চাঁচাছোলা ভাষায় বলা হয়েছে। ওর কনক্লুশন বক্তব্য হলো, চীন পালটা লড়াই করবে। বলছে, ভারত বাধা সৃষ্টি করলে তাকে এমন ‘পাল্টা লড়ানি’ জবাব দিতে হবে; কারণ এটা চীনের কোর স্বার্থ। এটা মূলত চীনের সাথে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মৌলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক – বিনিয়োগ বাণিজ্যের সম্পর্ক। তবে চীনের কথাটা আবার আরও বড় প্রেক্ষাপট থেকে বলা। সেটা হলো চীনের ‘এক বেল্ট, এক সড়ক’ প্রজেক্ট। সাউথ-ইস্ট এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কারা এই ‘সড়ক ও গভীর সমুদ্র যোগাযোগের প্রজেক্টে’ যুক্ত হতে চায় – চীনের কাছে এখনকার সময়টা হলো, এমন সবার কাছে এই সুবিধা ফেরি করতে যাওয়া। স্বল্পসুদে লম্বা সময়ের এই অবকাঠামো ঋণ চীন সবাইকে দিতে চায়। এমনকি ভারতকেও। প্রেসিডেন্ট শিং এর বিগত বছর ঢাকা সফরের সময় এই প্রস্তাব রেখে গেছেন। গত সপ্তাহে নেপালের মাওবাদী প্রধানমন্ত্রী এই প্রজেক্টে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কাও চিন্তা করছে। আর পাকিস্তান ইতোমধ্যে চীনের কাছ থেকে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট নিয়েছে যা বেল্ট-সড়ক প্রজেক্টের অংশ এবং  অন্তর্ভুক্ত। বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে। এই প্রজেক্ট মূলত অর্থনৈতিক। কিন্তু এত বিশাল প্রজেক্ট, বড় বিনিয়োগের বলে একে প্রতিরক্ষার একটা ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সেই সূত্রে গ্রহীতা এই রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে তাদের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক প্রতিরক্ষা-সাহায্য চীনকে করতে হবে। এখন ভারত যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে খামাখা “পুরা সাউথ-ইস্ট এশিয়াকে নিজের বাড়ির পেছনের আপন বাগানবাড়ি” মনে করে, সেভাবে আচরণ করে — যেমন দেখেন, আজ পর্যন্ত ল্যান্ডলকড ভুটানের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত হতে দেয়নি ভারত, এভাবে যদি চলতে থাকে তবে চীনকে ফাইটব্যাক করতেই হবে, না করে উপায় কী? গ্লোবাল টাইমসে এই কথা গুলোই চাঁচাছোলা ভাবে বলা হয়েছে।

ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকলেও সবাইকে নাকি চীনের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে সম্পর্ক করত হবে ভারত এমন দাবি করে। “চীনের প্রতি পড়শি রাষ্ট্রগুলোর নিউট্রাল অবস্থানকেও” ভারত চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া মনে করে। ‘বল কিন্তু ভারতের কোর্টে’, যা করার সে কী করবে সে সিদ্ধান্ত ভারতকেই নিতে হবে।

ভারতের কৌশলগত বিষয় ও নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলোর বড় অংশটাই আমেরিকান ফান্ডেড। অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে সাজিয়ে খাড়া করার আমেরিকান নীতি – এরই প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে ভারতের নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলো। এরই অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। তিনি ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’- ওয়াশিংটনভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা ‘কার্নেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর। তিনি এখন নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ কলাম লিখেন ম্যানডেলা শিরোনামে। তিনি গ্লোবাল টাইমসের ওই রিপোর্ট নিয়ে লিখেছেন নিজের কলামে। রাজামোহন খুবই হতাশা ব্যক্ত করে নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে দিল্লির প্রস্তুতি নেই।’ ওই কলামের শেষ প্যারাটা অনুবাদ করে দিচ্ছি যেখান থেকে তার কথার একটা সারবক্তব্য পাওয়া যাবে। প্রথম আলোর অনুবাদটাই এডিট করেছি এখানে।

‘… গ্লোবাল টাইমস নয়া দিল্লিকে উপদেশ দিয়েছে, ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ব্যাপারটি দিল্লিকে মেনে নিতে হবে। এসব দেশে বেশি বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান শিকড় গাড়তে শুরু করলে চীন অনিবার্যভাবেই তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করবে। শুধু চীনের নয়,এই অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষার্থেও তাদের এটা করতে হবে।’

তামসার দিক হলো, রাজামোহন স্বীকার করে বলছেন, “ভারত দেরিতে হলেও এই ব্যাপারটা আমলে নিতে শুরু করেছে। দিল্লি এখন বুঝতে পারছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়তে থাকলে এর কৌশলগত রূপও দেখা যাবে, যার মধ্যে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারিও থাকতে পারে”। অথচ তা সত্ত্বেও আমরা দেখছি, ডিফেন্স প্যাক্ট করার জন্য হুদাই ভারত হাসিনাকে চাপাচাপি করছে। যে বাস্তবতা রাজামোহন মেনে নিয়েছেন তা ভারতের মানতে কষ্ট লাগছে। 

  বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে – একথা  এবং বাস্তবতা রাজামোহনও সহজেই মানছেন। তাই আরো বলছেন , কংগ্রেস সরকার চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পকে আপত্তিসহকারে মেনে নিলেও নরেন্দ্র মোদির সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর সম্পর্কেও সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে। ভারত আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা কূটনীতিও জোরদার করেছে। এতে বেইজিং ও দিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত বাড়বে। ভারত যে উপমহাদেশে চীনের ক্ষমতা বিস্তারের ব্যাপারে এত দিন পরে কার্যকরভাবে সাড়া দিলো, সেটাই বরং বিস্ময়ের ব্যাপার। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বহু দিনের সামরিক সম্পর্ক। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান হারে চীনের অস্ত্র বিক্রিকে ভারত এত দিন ভালোভাবে না নিলেও তারা আশপাশের দেশগুলোতে চীনের কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির ব্যাপারে একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। দিল্লি অনেক দিন থেকেই উপমহাদেশে নিজের স্বাভাবিক শক্তি সম্পর্কে আত্মসন্তুষ্ট ছিল”।

রাজামোহন শেষ বাস্তবতা মেনে নিয়েই যেন মানতে চাচ্ছেন না। ব্যাপারটা নাকি মূলক ভারতের “আমলা গোয়েন্দাদের আলস্য” এমন ব্যাখ্যার আড়ালে যেতে চাইছেন। তিনি লিখছেন, “স্বাধীনতার পর ভারত তার আশপাশে পশ্চিমা, বিশেষ করে ইঙ্গ-মার্কিন সামরিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ১৯৮০ সালে আফগানিস্তান দখল করে নেয়, তখন সে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করেছে। কিন্তু বহু দূরের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব আজ ২১ শতকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখন চীনের সামরিক শক্তি ভারতকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন ও রফতানির কথা বলেছেন, কিন্তু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলস্য দূর করাতে পারেননি”।

তিনি বলতে চাইছেন তিনি পরামর্শ দেয়া সত্ত্বেও কেউ শুনে নাই।   বলছেন, এমনকি তিনি “প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রতিরক্ষা কূটনীতির ব্যাপারটা গ্রহণ করাতে পারেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী বারবার অনুনয়-বিনয় করা সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ব্যাপক পরিসরে সামরিক বিনিময় করতে পারেনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মনোভঙ্গি না বদলালে ‘ভারতীয় আঞ্চলিক আধিপত্য’ ও ‘উপমহাদেশের কৌশলগত একতা’ নিয়ে দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”। এখানে এসে তিনি তিনি পুরা হতাশ, দোষারোপ আর হাল ছেড়ে দেয়া অবস্থায়।

আসলে বড় বড় হামবড়া কথার বিরুদ্ধে গ্রাম দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, “ট্যাকা লাগে চাচা! এমনি হইব না!” –  রাজামোহনের এখন সেই অবস্থা।  আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সমগ্র দিক সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ওয়াকিবহাল – আমরা ধরে নিতে পারি। । তাই আমাদের গোলটেবিল-ওয়ালারা তাঁকে চুক্তি করার হাওয়াই সাহস দিচ্ছেন বুঝা যাচ্ছে। রাজামোহনের মত কী আমরা বাস্তবতা মেনে নিব? কঠিন সত্যিটা হলো, চুক্তির বাস্তবতাই নেই- এটা তাদের কে বুঝাবে! আর এই বাস্তবতা বুঝেও কী প্রধানমন্ত্রী ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ যাবেন, শুধু আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন আবার পাবার কথা ভেবে? আর ওদিকে  ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’র পক্ষে চীনের প্রতিক্রিয়া কী স্বাভাবিক থাকবে? নিশ্চিত বলা যায় এটাও প্রধানমন্ত্রীকে আমলে নিতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে সর্ব প্রথম দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইন ০২ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এরপর এর আর এক ভার্সান ‘চিন্তা’ ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর এক ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর সব শেষে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন ও এডিটের পর এখানে ছাপা হল। ]