ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন, এক বিদ্বেষ মাত্র

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন,এক বিদ্বেষ মাত্র

গৌতম দাস

0১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:৫৬

https://wp.me/p1sCvy-2xd


‘প্রগতিশীলতার’ ইসলামবিদ্বেষ সমস্যা এবার অনেকটা হাতেনাতেই ধরা পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের আয়োজন চলছে। সেটা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মত হয় কী না তা অনেকেরই শঙ্কা। সে শঙ্কা থাক। কিন্তু এই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রগতিশীলদের জ্ঞানবুদ্ধির দৌড়, খামতি উদাম হয়ে গেছে। তারা চিন্তায় কত খাটো আর অস্পষ্ট তা আমরা সবাই জানলাম।

এই নির্বাচনে আরও সবার মত ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও অংশ নিতে ইচ্ছুক। প্রথম আলো ২৪ জানুয়ারিতে লিখেছে, “ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে মঙ্গলবার বিক্ষোভ করেছিল। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে এ ঘটনা তাদের হতবাক করেছে”।

কেন? তাদের হতবাক হওয়া কেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যেন নমশুদ্র নিচুজাতের কেউ বামুনের রান্নাঘরের আঙিনায় ঢুকে পড়েছে! তাই কী? দলের নামের আগে “ইসলামী” লেখা আছে, এটাই কী প্রগতিবাদী আপত্তির কারণ?

তাদের এমন বক্তব্যের পিছনে দুইটা খামতি বা অভাবের দিক আছে। এক, রাষ্ট্র, ক্ষমতা আর কনষ্টিটিউশন সম্পর্কে সীমাহীন অজ্ঞাত থাকা। আর দুই, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের গভীর ইসলামবিদ্বেষ।

কনষ্টিটিউশন কী কাজে লাগে? খায় না মাথায় দেয়? মূলত প্রাকটিসিং কমিউনিস্ট চিন্তায় এই ব্যাপারটা একেবারেই অস্পষ্ট, অপরিস্কার। এমনকি নতুন কোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কায়েম হলে তাদেরও “বুর্জোয়া” রাষ্ট্রের মত কোন কনষ্টিটিউশন থাকে কিনা; তা গঠন-রচনা করতে বসতে হয় কীনা – এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে অনেক তাবড় নেতা মাথা চুলকাতে থাকবে, জানি। মুখে জবাব আসবে না।

প্রগতি-ওয়ালাদের অজুহাত হল, প্রথম আলো লিখেছে, প্রগতি “সংগঠনগুলো বলছে,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল কর্মসূচি পালন করতে পারবে না বলে অলিখিতভাবে নিয়ম রয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সবগুলো ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে তাঁরা এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন”।

লিখিত, অলিখিত বা গোপন তাদের চিন্তায় এটা যেখানেই থাক – এমন নিয়ম যেকোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন বিরোধী।

ব্যাপারটা হল, একটা দলের নামে ইসলাম থাকা সত্বেও সেই দল দেশের মর্ডান রিপাবলিক ধরণের কনষ্টিটিউশন মেনে রাজনীতি করতে চাইছে – অথচ প্রগতিবাদীদের মন ভরছে না। দুঃখের কথা তাদের ইসলামবিদ্বেষ উদাম হয়ে উপচায়ে উঠছে! কারণ আপত্তি কী করে তুলতে হয় বা নিরসন করতে হয় এটা তাদের জানা নাই। ফলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে যেন তাদের রাজনীতি করতে তারা ইসলামি দলের কাছে দাবি করছে।

আচ্ছা, বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর বা মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলোও কোনভাবে এক ভিসিকে হাত করে আর একটা “পরিবেশ পরিষদের বৈঠক” আয়োজন করে ফেলে এরপর তাঁরা যদি এ বিষয়ে একমত হয় যে প্রগতি-সংগঠনের ততপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলবে না – তাহলে কী হবে? ব্যাপারটা কেমন হবে? হজম হবে?

অনুমান করি এমন হলে ব্যাপারটার শেষে গড়াবে মানে আসল ফয়সালা হবে লাঠালাঠি-মারামারির গায়ের জোর দিয়ে। না, ভয় পাবার কিছু নাই, লাঠির জোরের ফয়সালার পরামর্শ দেওয়া আমাদের কাজ না। বরং বলার বিষয় হল, তার মানে একখানা নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক মীমাংসার আসল অথরিটি নয়। “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক নিরসনের কর্তা বা প্রতিষ্ঠান নয়।

বলাই বাহুল্য কোন আইডিওলজি ভাল, “আগায় আছে মানে প্রগতিশীলতার” দাবিদার এই ভিত্তিতে অথরিটি ঠিক হয় না। তা কার্যকর করাই যায় না। আচ্ছা, করলে কী হবে?

করলে সেটা আর যুক্তিবুদ্ধি বা চিন্তার ভিত্তিতে অথরিটি কে তা সাব্যস্ত হবে না, হবে লাঠির জোরে।

তাহলে মূল যে প্রশ্নের জবাব পেতে হবে তা হল, কোন “পরিবেশ পরিষদের” সিদ্ধান্ত ইসলামি অথবা প্রগতিবাদী নির্বিশেষে সকলের কাছে মান্য হবে? অর্থাৎ নিজ নিজ প্রভাবাধীন এক একটা “পরিবেশ পরিষদের” দাবিদার হওয়া কাজের পথ নয়। বরং এর সরল জবাব হল যে “পরিবেশ পরিষদ” কনষ্টিটিউশন মেনে, অনুসরণ করে তৈরি হতে হবে। আমরা আরও আগাতে পারি। জেনে নিতে পারি কোন বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশন?

স্বাধীন মন বা চিন্তার দিক থেকে কথা বললে, আমাদের প্রচলিত কনষ্টিটিউশন আমরা কেউ নাও মানতে পারি, যদিও আইনি বাধ্যবাধকতার দিক থেকে আমরা তা মানতে বাধ্য। তাই প্রশ্নের জবাবটা সাধারণভাবে দিব। কনষ্টিটিউশন ‘রিপাবলিক’ বৈশিষ্ঠের এমন হতে হবে। আর এছাড়াও গুরুত্বপুর্ণ হল যা নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তিতে রচিত। এমন কনষ্টিটিউশন মেনে বা এর কথা মাথায় রেখে ‘পরিবেশ পরিষদ’ বানালে তা সব পক্ষই সহজে মেনে নিবে।

রিপাবলিক বৈশিষ্ঠের মানে হল যা কোন রাজা-সম্রাটের রাষ্ট্র নয়, যা কোন এক কর্তৃত্ববাদী, একনায়ক স্বৈরাচার বা ফ্যাসিজমের রাষ্ট্র নয় বা এর কনষ্টিটিউশন নয়। নাগরিক গণস্বীকৃতির রাষ্ট্রই রিপাবলিক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার উৎস পাবলিক, ফলে যা নাগরিকের গণস্বীকৃত ক্ষমতা। পাবলিক যে ক্ষমতাকে অনুমোদন করে।

এছাড়া নাগরিক-সাম্য কথাটার মানে হল, নাগরিক পরিচয় নির্বিশেষে আপনি ইসলামি হন কী প্রগতিবাদী বা পাহাড়ি-সমতলি, কোন বিশেষ ফ্যাকড়ার ইসলাম বা অন্য যা কিছু হন না কেন সকল নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্যহীন আচরণ করবে, সমানভাবে আইন প্রয়োগ করবে – এই ভিত্তির রাষ্ট্র।

তাহলে সারকথা দাড়াল যে নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদের” দোহাই দিয়ে কারও রাজনৈতিক ততপরতা নিষিদ্ধ বলা যাবে না। এটা কোন পথ নয়। কারণ তাতে মানে হয়ে যাবে যেন আওয়ামি লীগকে বলা যে তাকে বিএনপির রাজনীতি মেনে রাজনীতি করতে হবে। অথবা উলটা। মানে, বিএনপিকে বলা যে তাকে লীগের রাজনীতি করতে হবে।

বরং ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়াতে গেলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে নুন্যতম কী বৈশিষ্ঠের হতে হবে – সেই নির্ণায়ক শর্ত বা ক্রাইটেরিয়া আগে বলে রাখতে হবে। যেসব ছাত্র সংগঠন সেসব শর্ত পুরণ করবে তারা সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ঠিক যেমন নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের রেজিষ্ট্রেশনের শর্ত আরোপ করে, অনেকটা সেরকম। তবে স্বভাবতই আমাদের কনষ্টিটিউশনে [Constitution] যা কিছু অনুমোদিত এর বাইরে গিয়ে কোন শর্ত আরোপ করা যাবে না। মোট কথা রিপাবলিক বৈশিষ্ঠ আর নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তি এসবের মধ্যেই থাকতে হবে সব শর্তকে। এসব শর্ত মেনেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করে থাকে।

ঠিক সেরকম এমন শর্ত মানলেই যে কোন ছাত্র সংগঠন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তাতে সে সংগঠনের নামের মধ্যে ইসলাম থাকুক বা না থাকুক কিংবা কমিউনিস্ট থাকুক কি সেকুলার – কিছু এসে যাবে না। কাউকে আর বাধা দেয়া যাবে না।

আসলে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে যথেষ্ট স্টাডি না থাকার কারণে বরং এর বদলে ইসলামবিদ্বেষী টনটনে থাকার কারণে প্রগতিবাদীতার নামে রাজনীতিতে এসব ঘৃণার চাষাবাদ হতে দেখা যায়।

আচ্ছা, আজকাল হিন্দু রাজনৈতিক দল খোলার কিছু হিড়িক দেখা যাচ্ছে। হাসিনা না থামালে তা হয়ত আরও বাড়ত। যেমন, হিন্দু ঐক্য জোট, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, জাতীয়তাবাদী হিন্দু কল্যাণ দল ইত্যাদি নানান কিসিমের নামে এসব দল আছে দেখা যায়। এছাড়া ওদিকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তো আছেই। এখন এসব দলগুলো যদি ছাত্র সংগঠন খুলে বসে আর যদি তারা ডাকসু নির্বাচন করতে চায় তাহলে এসব প্রগতিবাদীদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

রাজনীতিক ততপরতা মানে তা বিদ্বেষের নয় বরং ইতিবাচক এপ্রোচে করার বিষয় – একথা মনে রাখলে অনেক প্রশ্নের সহজ মীমাংসা পাওয়া যায়।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2oJ

ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

কোন মুসলমানকে কেউ নমিনেশন দেয় নাই কেন

বার্মার গত নির্বাচনে কোন মুসলমানকে কেউ নমিনেশন দেয় নাই কেন

গৌতম দাস

০৯ অক্টোবর ২০১৭,  মঙ্গলবার ০০:১৯

http://wp.me/p1sCvy-2iq

মায়ানমারে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হল বার্মিজ; অনেকে এদেরকে বামার বা বর্মানও বলে থাকে। এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০%। বিগত ১৮২৪ সালে বৃটিশ কলোনির বার্মা দখলেরও আগে থেকেই বার্মার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি বামার এবং এরাই নিজ জনগোষ্ঠির নামে দেশের নাম রেখেছিল বার্মা। বার্মিজ ছাড়া বার্মায় অন্যান্য আরও অসংখ্য জনগোষ্ঠি আছে; যেগুলোর মধ্যে একালে তালিকাভুক্ত বা ক্ষমতাসীন  সরকার স্বীকৃত এমন জনগোষ্ঠি হল ১৩৫ টা। এরপরেও রোহিঙ্গারা এই ১৩৫ জনগোষ্ঠির ভিতরের একজন কেউ নয়। অর্থাৎ আগামিতে স্বীকৃতি পেলে রোহিঙ্গারা হবে সম্ভবত ১৩৬তম জনগোষ্ঠি। তাই সারকথায় বললে, বার্মায় ৬০% বার্মিজদের বাইরের ৪০% হল এই ১৩৫+, এতগুলো জনগোষ্ঠি। আবার এই ৪০% জনগোষ্ঠি এরাও এক বড় রকমের সংখ্যা মানতেই হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বৃটিশ শাসনমুক্ত হবার রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরবর্তিতে স্বাধীন বার্মা কায়েম হবার পর ১৯৪৮ সাল থেকেই বার্মিজ জনগোষ্ঠির নেতারা সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভেদমুলক যে রাজনৈতিক কাজ ঘটিয়েছিল তা হল, ঐ স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়া  অ-বার্মিজ সব জনগোষ্ঠিকে সেনাবাহিনী থেকে পদচ্যুত করিয়ে দেয়া এবং রাজনৈতিক গুরুত্বপুর্ণ সব পদ থেকেও তাদের অপসারণ করে দেওয়া। এই দুই কাজ ঘটিয়ে বার্মার ক্ষমতা ও নেতৃত্ব থেকে সব অ-বার্মিজদের মুছে দেয়া হয়েছিল। যে কোন ‘অপর’ এর প্রতি এই মনোভাব, অ-বার্মিজদের প্রতি সে ট্রাডিশন ও চিন্তার চর্চা আজও মায়ানমারে সর্বত্র।  ফলে বার্মা স্বাধীন হবার পরও অন্যান্য জনগোষ্ঠির মুক্তি ও স্বায়ত্বশাসনের দাবি ও লড়াইকে শাসক বর্মী জাতিগোষ্ঠি নির্মমভাবে দমন নির্মুল – একমাত্র এই পথে মোকাবিলা করেছিল। এটা আরও নির্মম নিষ্ঠুর ভাবে ঘটেছিল ১৯৬২ সালে (আসলে ১৯৫৮ সাল থেকেই যখন তিনি সামরিক জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন দুবছরের জন্য) জেনারেল নে উইনের হাতে, যা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল। অ-বর্মিজদের সাথে কোন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদ বা রিসোর্স শেয়ার না করার সিদ্ধান্ত – এটাই সব বার্মার সব সমস্যার গোড়া। বার্মার আদি সমস্যা এই ৪০% অ-বার্মীজ জনগোষ্ঠিকে দাবায় রাখা, নির্মুল করা্র চিন্তা থেকে জাত। আর এর মধ্যেকার মাত্র ৪% হল মুসলমান। তাও এরা সবাই কেবল বার্মার রাখাইন প্রদেশের মুসলমান বাসিন্দা  এমন নয়। বার্মার সব প্রদেশেই স্বল্প হলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলমান জনগোষ্ঠি আছে। এদের সবাই আর সাথে রাখাইন প্রদেশের মুসলমান, এভাবে মিলিয়ে মোট জনগোষ্টির  ৪% হল মুসলমান।

গত ১৯৮৮ সালে নে উইনের পতনের পরে অ-বর্মিজ জনগোষ্ঠিকে দাবিয়ে রাখার  আর এক নতুন কৌশল চালু করা হয়েছিল। এই কৌশলটা হল মুলত আগের বর্মিজ-অবার্মিজ ভাগাভাগিটাই থাকবে কিন্তু সেটাকে আড়ালে পিছনে লুকিয়ে ফেলে রাখার কৌশল নিতে হবে।  জাতিগোষ্ঠির ভিত্তিতে, এদিক থেকে ভাগ করে দেখালে বার্মিজেরা মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগের বেশি হয় না। কিন্তু ভাগটা যদি করা হয় কতভাগ বৌদ্ধ এবং অ-বৌদ্ধ – এই ভিত্তিতে? এতে এক বিরাট লাভ হয়। কারণ তাতে এবার দাড়ায় ৮৮% বৌদ্ধ, ৬% খ্রীশ্চান, ৪% মুসলমান ইত্যাদি। এতে চোখে পড়ার মত মেজরিটি হয়ে যায় বৌদ্ধ। ফলে এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রাজনীতি চালু করে এই আড়ালে এর ভিতরে বর্মানদের পুরান একছত্র শাসনের রুস্তমি সহজে ঢেকে রাখার এক ভাল সম্ভাবনা দেখেছিল জেনারেলেরা। তাই জেনারেলরা সিদ্ধান্ত নেয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মিজদের একছত্র শাসনকে তারা এরপর থেকে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এই আড়াল থেকে চালু রাখবে। যেমন কাচিন বা শান জনগোষ্ঠি যারা নিজ প্রভাবাধীন প্রদেশের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্মিজ দমন-শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতার রাজনৈতিক সংগ্রাম করছে এদের কাছে বার্মিজ শাসক জেনারেলেরা নিজেদেরকে তখন থেকে হাজির করেছিল এভাবে যেন শাসকেরা আর বার্মিজ নয়; বরং কাচিন বা শান জনগোষ্ঠির মতই শাসকেরাও একই বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির লোক। আর এই ভড়ং এর আড়ালে বার্মিজ দানব শাসকের দমনের চেহারাটা যতটা সম্ভব আড়ালে ফেলে রাখতে সুযোগ নেওয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। এটা ছিল আসলে বার্মাকে নতুন করে কমন আকার দেয়া যেন এক “বৌদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির” পরিচয়ে সে উঠে দাড়াতে চাইছে । অথচ যার আড়ালে ততপর থেকে আছে আগের মতই বর্মিজ একছত্র দানব। এই নতুন পরিচয়কে পোক্ত করতেই কমন এনিমি বা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে কমন শত্রু হিসাবে মুসলমানদের দেখানো শুরু হয়েছিল। সাধারণত দেখা যায় কমন এনিমি ব্যাপারটা যতই শানিত বা তাতানো রাখা যায় ততই তা দিয়ে আভ্যন্তরীণ দমণ অসন্তোষকে ভুলিয়ে রাখা যায়।

নে উইন উত্তরকালে নতুন করে দমননীতি আসায় আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মায়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ একে নানা ধরণের অবরোধের মধ্যে রেখেছিল সেই ১৯৯৩ সাল থেকেই। এর ভিতরেই বার্মিজ একচেটিয়া শাসন নিজেকে নতুন আড়ালে নিয়ে বৌদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির পরিচয়ের রাজনীতি হিসাবে হাজির হয়েছিল। তবে মুসলমানদেরকে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের কমন শত্রু হিসাবে হাজির দেখানোর আর এক শেষ পর্যায়টা গড়াটা তখনও বাকি ছিল। যেটা সম্পন্ন করে নেয়া হয়েছিল ২০১১-১৫ সালের সরকারের শাসনকালে।

অর্থনৈতিক অবরোধে আটকে থাকা বার্মা  আমেরিকার ফ্রন্ট-রানার দুতয়াল হিসাবে ভারতকে হাজির পেয়েছিল ২০০৭ সাল থেকে। ফলে পশ্চিমের সাথে কী করলে তারা তাদের অবরোধ তুলে নিবে এর এক নিগোশিয়েশন  আলোচনা শুরু হয়েছিল। বার্মা পশ্চিমকে কোন কোন ব্যবসা-বিনিয়োগের সুযোগ দিবার বিনিময়ে আর কিছু কিছু কোন রাজনৈতিক সংস্কার করলে জেনারেলেরা পশ্চিমের সমাজে নিজ পণ্যসহ নিজেরা অবাধ গম্য হতে পারবে – এসব থাকত সেসব নিগোশিয়েশন  আলোচনার মুল প্রসঙ্গ। অন্যভাবে বললে রাজনৈতিক সংস্কার কথাটা যতই বড় শুনাক না কেন – একছত্র বার্মিজ সামরিক ক্ষমতাকে অটুট রেখে কেবল সুচিকে উপর দিয়ে একটা অলঙ্কার হিসাবে চড়িয়ে দেয়া – এই ছিল সেই সংস্কার। এতটুকুকেই বিরাট সংস্কার করা হয়েছে বলে বার্মিজ জেনারেলদের সার্টিফিকেট দিয়েছিল আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো; আর তাই থেকে এটাই মায়ানমারের আর এক সমস্যা এবং আজকের রোহিঙ্গা সংকটের আর এক উৎস হয়ে যায়। এই ফর্মুলায় বর্মিজ জেনারেলেরা নিজের একছত্র ক্ষমতা তাঁর কেবল নিজের, এই কথা লিখে নিয়েছিলেন যেখানে সেটাকেই ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশন বলে মেনে নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল সু চির পার্টিকে অলঙ্কারিক হিসাবে মেনে নিয়ে ক্ষমতায় আনা হবে বটে তবে তা ২০১০ এর নির্বাচনে নয়; অর্থাৎ এর পরের ২০১৬ সালের নির্বাচনে। এরই পুর্ব- প্রস্তুতি ছিল ২০১০ সালের  তথাকথিত নির্বাচন ও ক্ষমতা। আর একাজের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনী সেই বার নিজেই আগে একটা দল গঠন করে নিয়েছিল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলবমেন্ট পার্টি (USDP)’ নামে। আর এই দলের নামেই তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়েছিল। অনুমান করা হয়, সু চির দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স বা এনএলডি আপোষে ২০১০ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল; আর ২০১৫ সালের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  আবার USDP আসলে ছিল মূলত সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং প্রাক্তন অফিসার-সৈনিকদের রাজনৈতিক দল। যদিও এমনিতেই তখনও সংসদের ২৫ ভাগ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কর্মরত সেনা অফিসারদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

আমাদের আলোচনার প্রাসঙ্গিক সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময়কাল হল এই ২০১০-১৫ সাল, যখন ক্ষমতায় আসীন এই USDP।

ঐ সময়কালে জেনারেলেরা বার্মার রাজনীতির অভিমুখ বেধে দেওয়ার কাজটা করে রেখেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, সু চি ভোটের রাজনীতির মাঠে নামার আগেই বার্মার রাজনীতির অভিমুখ বেধে দেওয়া; ইসলাম বিদ্বেষী এক “চরম উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” ছাড়া অন্য কোন রাজনীতি চলতে না দেওয়া এবং এই রাজনীতি করতেই সু চি সহ সবাইকে বাধ্য করা। এই কাজে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটা বড় অংশকে সামরিক বাহিনী নিজে সংগঠিত করেছিল। এবং সামরিক বাহিনীর নিজ রাজনৈতিক দল USDP এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের এই সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করত।

বুদ্ধিষ্ট ভিক্ষুদের এই সংগঠনের এক সাংগঠনিক নামও দেয়া হয়েছিল; প্রথমে সামাজিক সংগঠন হিসাবে এর নাম ছিল “কমিটি ফর প্রটেকশন অব ন্যাশনিলিটি এন্ড রিলিজিয়ন”। আঞ্চলিক ভাষার যার নাম “মা বা থা” পরে রাজনৈতিক দল হিসাবে এর রেজিষ্ট্রেশনও নেয়া হয়েছিল। যদিও প্রথম আত্মপ্রকাশের সময় এই সংগঠন দাবি করেছিল (টার্গেট করে মুসলমানদের বিরোধী) “রেস ও রিলিজিয়ন” সম্পর্কিত  চারটা আইনের খসড়া তারা তৈরি করবে, আর তা সংসদ থেকে পাশ করিয়ে আনতে প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করবে। এই আইনের পক্ষে প্রচার ও জনমত তৈরির জন্যই মা বা থা সংগঠনের জন্ম দেয়া হয়েছে।  ওদিকে সাবেক জেনারেল থেন সেনের হাত দিয়ে বর্মিজ কর্মরত জেনারেলেরা USDP নামে রাজনৈতিক দল খুলেছিল, দলের সভাপতিও ছিলেন থেন সেন। আবার ২০১০ সালের তথাকথিত নির্বাচনে USDP এর প্রার্থী হিসাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি; আর  সব রাজনৈতিক সংস্কারগুলোও হয়েছিল তার সরকারের হাত দিয়ে। তিনিই ‘মা বা থার’  প্রস্তাবিত চার আইন সংসদে পেশ করেছিলেন। আইনগুলো হল, ১. (মূলত মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে তাদের নিগৃহিত করতে করা) ধর্ম বদল করতে হলে এই আইনে  আগে রেজিষ্ট্রেশন ও অনুমতি নিতে হবে। তা না হলে জেল ও জরিমানা করা হবে। ২. (একইভাবে মুসলমানদের কথা মনে রেখে তাদের জন্য করা) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন প্রদেশের সরকার যদি মনে করে যে তার কোন জনগোষ্ঠির জনসংখ্যা অন্য জনগোষ্ঠির সংখ্যার তুলনায় ভারসাম্য ছাড়িয়ে গেছে ফলে তুলনামূলক বেশি সামাজিক রিসোর্স ভোগ করছে তবে ব্যাপারটাতে সাম্য আনার জন্য প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রকে ব্যবস্থা নিতে বলবে এবং কেন্দ্র ব্যবস্থা নিবে।  (ভারতে বিজেপি-শিবসেনার মত এটা একই আর্গুমেন্ট যে মুসলমানেরা বেশি পয়দা করে, এর সাথে তুলনীয়।) ৩.  আন্তঃধর্মীয় বিয়ে নিষিদ্ধ করতে হবে। ৪। বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করা হবে। এই চার আইনের পক্ষে প্রচার এটাই নতুন “রেস ও রিলিজিয়ন” এর রাজনীতি হাজির করেছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। আসলে যেটা হল এক ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রাজনীতি; এরই দামামা।

এই চার আইনের মধ্যে প্রথম দুইটা ইতোমধ্যে সংসদে অনুমোদিত হয়ে গেছিল। তবে পরের দুটো প্রক্রিয়ায় কোথাও স্থগিত হয়ে আছে। কথিত আছে যে পুর্ব-এশিয়ার আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের সদস্যরা এব্যাপারে বিরূপ মনোভাব রাখাতে বাকি দুই আইনি প্রক্রিয়াকে আর সমাপ্ত করে নেওয়া হয় নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হলে আগেই বলেছি, এটা মূলত গেরুয়া কাপড়ধারী ভিক্ষুদের পরিচালিত এক সংগঠন, যারা সব প্রদেশব্যাপী ইসলাম-বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের পক্ষে ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত প্রবল প্রচার চালিয়েছিল । সেটা কখনও ঐ চার আইনের পক্ষে প্রচার অথবা আইনগুলো পাশ হয়েছে সেই সাফল্যের প্রচার ইত্যাদি নামের আড়ালে। যেমন একটা তথ্য দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিস্কার হবে। গত ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির এনএলডি এর প্রার্থী ছিল ১১৫১ জন। কিন্তু কোন মুসলমান সেই প্রার্থী তালিকায় ছিল না। অন্য কোন দলও কোন মুসলমান সদস্যকে নমিনেশন দেয় নাই। কারণ মুসলমান-বিরোধী প্রচারণাকে ‘মা বা থা’ এত উগ্রতায় ও তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল যে ভোটে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এই ভয়ে সু চি রাখাইন মুসলিম অঞ্চলেও কোন মুসলমানকে নমিনেশন দেন নাই।  ওদিকে ‘মা বা থার’ চরম উগ্র এক নেতা হলেন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু ইউ উইরাথু (ভিন্ন উচ্চারণে ঐরাথু বা ভিরাথু, U Wirathu)। আমেরিকান টাইম ম্যাগাজিন ঐরাথুকে নিয়েই ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এক কুখ্যাত প্রচ্ছদ স্টোরি করেছিল। শিরোনাম দিয়েছিল, “বুদ্ধিষ্ট সন্ত্রাসবাদের মুখচ্ছবি”। ঐরাথু খোলাখুলিই মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তিনি মনে করেন, “মুসলমানেরা দেশের জন্য, দেশের কালচারের জন্য হুমকি। তারা বেশি বাচ্চা পয়দা করে। তারা আমাদের নারীদেরকে রেপ করে। তারা আমাদের দেশ দখল করতে চায়, তাই আমাদেরকে বুদ্ধিষ্ট বার্মা রক্ষা করতে হবে”।  ইত্যাদি।

বাইরে থেকে দেখলে সেই ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই ঐরাথু ও তার নানান সংগঠন  (মা বা থা, ৩৬৫ এধরণের নানান নামে ) সু চির দলের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আসছে। গত নির্বাচনে ঐরাথু তাদের বিখ্যাত ‘ছয় প্রশ্ন’ তারা হাজির করেছিল। যেমন, ১. আপনি কী বুদ্ধিষ্ট? ২. আপনি ‘চার আইন’ সাপোর্ট করেন কি না? ৩. এই আইনগুলো রক্ষা করবেন কী না? ৪. আপনি ১৯৮২ সালের নাগরিক আইন বদলে ফেলবেন নাকি? ৫. কনষ্টিটিউশনের ৫৯ এফ বদলাবেন নাকি যে আইনে বিদেশি বিয়ে করেছে বলে সু চির প্রেসিডেন্ট হতে বাধা দেয়া আছে? ৬। “রেস ও রিলিজিয়ান” আন্দোলন সব সময় উর্ধে তুলে ধরতে প্রতিজ্ঞা করবেন কী না?

“They also urged people to ask six questions to candidates: whether they are Buddhist; do they support the four laws and would they protect them; will they try to change the 1982 Citizenship Law, used to restrict mainly Rohingya Muslims from becoming citizens; would they change section 59f of the constitution that in effect bars Daw Aung San Suu Kyi from the presidency; and would they promise to uphold “race and religion”.”

আজকে সু চির ক্ষমতারোহন ঘটে গেছে।  আর ইতোমধ্যে ৫ লাখ রোহিঙ্গা খেদানো আর হাজার পাচেক রোহিঙ্গা মেরে ফেলার পর সু চির সরকারের অবস্থান আর ভিক্ষু ঐরাথু-র অবস্থানের মাঝে আর কোন ফারাক নাই। অবশ্য বিবিসির মিশেল হুসেন ২০১৬ সালের এক সাক্ষাতকার নিবার সময় থেকে আমরা জানি ব্যক্তিগতভাবেও সু চি মুসলমান-বিদ্বেষে  ভুগছেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল ০৯ অক্টোবর ২০১৭।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

প্রথম পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

http://wp.me/p1sCvy-2hE

 

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

১৯৪৮ সালের বৃটিশ কলোনি শাসকমুক্ত মায়ানমারের জন্মের আগে থেকেই দমন নির্মুল আর নির্বিচারে হত্যা, এই রাষ্ট্রকে ধরে রাখার একমাত্র উৎস হয়ে গেছে ও আছে। বার্মা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যায় আকর্ণ ডুবে থাকার সমস্যা ওর জন্মের সময় থেকেই।  মায়ানমারের সবচেয়ে বড় এথিনিক জনগোষ্ঠি হল  ‘বার্মান’ বা ‘বর্মীজ’; এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ। এই বর্মী জনগোষ্ঠির রাষ্ট্র জন্মের পর থেকেই এর মূল সংকট হল অভ্যন্তরীণ অন্যান্য এথিনিক জনগোষ্ঠির সাথে সংঘাত;  অন্যভাবে বললে, বর্মীছাড়া অন্য এথিনিক জনগোষ্ঠিকে বর্মীজদের নিজেদের কর্তৃত্বের নিচে দাবায় রাখাকেই একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নেওয়া – এটাই সব বৈরীতা ও সংঘাতের উতস। অথচ এক ফেডারেল ব্যবস্থা হতে পারত এর সহজ সমাধান। বৃটিশ শাসনামলেও মায়ানমারে কোথাও কোথাও স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ ছিল।  কিন্তু ১৯৪৮ সালে জন্মের পর থেকে মায়ানমারে কোন ফেডারেল ব্যবস্থা  চেষ্টা না করে বরং পুরানা স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে সবকিছু বর্মীজদের অধীনে আনার জবরদস্তির চেষ্টা করা হয়েছে। আর তা থেকেই শুরু হয়েছে Bamar. Chin. Kachin. Kayin. Kayah. Mon. Rakhine. Shan ইত্যাদি জনগোষ্ঠির বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র ততপরতা। পরে সামরিক ক্যু করে জেনারেল নে উইনের বিগত ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলের পরও সেই বিচ্ছিন্নতাবাদে আকর্ণ ডুবে থাকা  অবস্থা থেকে বের হতে মায়ানমারের সরকারগুলো  “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” চর্চাকে উপায় হিসাবে হাজির করেছে। এই “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর আর নাম  “মায়ানমারিজম”। ফলে মায়ানমার রাষ্ট্রের আকার পরিচয় হয়েছে, “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী” ভিত্তিতে গড়া এক রাষ্ট্র। একমাত্র এতেই তারা ‘এক’ থাকতে পারবে  এমন আঠা বা গ্লু এর নাম হয়েছে “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ”, আর এর জিগির। যদিও এই নামের আড়ালে আসলে এক তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ চর্চা করে এসেছে তারা।  ব্যাপারটা পরিস্কার হবে মায়ানমারকে ধর্মীয় জনসংখ্যার দিক থেকে দেখলে। গত ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মায়ানমারের প্রায় ৮৮ ভাগ বৌদ্ধ,  ৬ ভাগ খ্রীশ্চান ও ৪ ভাগ মুসলমান। জনগোষ্ঠির বড় অংশ বৌদ্ধ বলে, এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বয়ান তৈরি করে ফেলা হয়েছে যা আবার ইসলাম বিদ্বেষী করে সাজানো – একে নিজের রাজনীতিক ভিত্তি হিসাবে বেছে নিয়েছিল নে উইন সরকার। নে উইনের অনুমান ছিল এতে মুসলমান বাদে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী জনগোষ্ঠিগুলোকে (প্রায় সবাই আবার বৌদ্ধ বলে ) “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর পরিচয়ে বেধে রাখতে। এতে  পুরান বর্মীজ আধিপত্যটা উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের (ইসলাম বিদ্বেষ) আড়ালে থেকে শাসনকাজ চালাতে পারবে। আবা ইসলাম বিদ্বেষী এই বয়ানটা  “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে” উগ্র আর গাঢ় হতে সাহায্য করবে। মুসলমানেরা সব বৌদ্ধ জনগোষ্টির কাছে এক ইমাজিনড কমন শত্রু হিসাবে হাজির করবে।  এটাই অনেকে মায়ানমারিজম বলে। এই মায়ানমারিজম তৈরি করতে পারার প্রথম সফলতা আসে ১৯৭৭ সালে। একারণে ১৯৭৭ সাল থেকে নে উইন তৈরি রোহিঙ্গা সমস্যার প্রথম প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিল এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী আসর জোয়ার দেখা গিয়েছিল। পরে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মায়ানমার বেশীর ভাগ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও, আবার ১৯৮২ সালের নতুন ইমিগ্রেশন আইন সবকিছুকে আগের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে যায়।  এরপর ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর এর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত থেমে থেমে সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা নির্মুল অপারেশন বিভিন্ন সময় চলেছে। এরপর আগের ‘মায়ানমারিজম’ সাথে এবার বয়ানে ‘ইসলামি সন্ত্রাসের’ অভিযোগ তুলার সুযোগ যুক্ত হয়েছিল। ফলে তা নিজের দানবীয় উগ্রতার পক্ষে আরও সাফাই নিয়ে হাজির হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে এক বৃটিশ সাংবাদিক ১৯৭১ সালের প্রথমার্ধে অভিযোগ করেছিলেন আপনি পুর্ব-বাংলার শরনার্থী লোকদেরকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করছেন। ইন্দিরার জবাব ছিল, ওরা কোনটা আগে হয়েছে, শরনার্থী না মুক্তিযোদ্ধা? একথার মধ্যে সব জবাব আছে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা বুশ-ব্লেয়ারের ২০০১ সালে ওয়ার অন টেররের যুদ্ধ শুরু আগে থেকেই রোহিঙ্গারা শরনার্থী হয়েছে। কাজেই একথাটা মোদি-সুচির সন্ত্রাসের বয়ান ও অভিযোগকে ভিত্তিহীন করে দেয়।

তাই বলা যায়, মায়ানমারের মুল সংকট রোহিঙ্গা বা মুসলমান ছিল না, নয়। বরং ‘মায়ানমানিজম’ এই বয়ান হাজির করার দরকারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। আর এটা বলা বাহুল্য ৮৮% বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির দেশে ৪% মুসলমান নিজে ভিকটিমই হয়, অত্যাচারিত মজলুমই হয়। অন্যের উপর অত্যাচার নির্যাতনকারি বা অন্যকে নির্মুলের কর্তা সে হতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে সে সুযোগ বিরাজ করে না।

মায়ানমান পরিস্থিতি ২০০৬ -৭ সাল থেকে এক নতুন মাত্রা পায়। আর ততদিনে মায়ানমার ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের নিন্দা ও অভিযোগের মধ্যে আর  আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ রকমের অবরোধের অধীনে। এমনিতেই জেনারেল নে উইনের শাসনামলে (১৯৬২-৮৮) বার্মা ছিল বাকশালী সমাজতন্ত্রের মত এক ‘নে উইনি সমাজতন্ত্রের’ অধীনে;  আর এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ ছিল জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-বিদ্বেষ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মায়ানমার এমন হওয়ার পিছনে ওর দুটা গঠন বৈশিষ্ট উল্লেখযোগ্য।

এর একটা হল জেনোফেবিক যার উৎস হল ভারতবিরোধীতা। ১৮২৪ সালে বৃটিশদের বার্মা দখল নিবার পর থেকে,  বার্মাকে ভারতের এক প্রদেশ (১৮২৪-১৯৩৭) বানিয়ে কলোনি শাসকেরা শাসন চালাত। [১৯৩৭ সালের পর থেকে বার্মা সরাসরি বৃটিশ শাসিত কলোনি হয়েছিল।] এতে ভারতীয় নেটিভদের মাধ্যমে বৃটিশরা শাসন করত, ফলে ভারতীয় কর্মচারি বা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেখানে ইত্যাদি। আর এখান থেকে একধরণের ভারতবিদ্বেষী জেনোফোবিক বৈশিষ্ট বার্মার জনমানসে ও  রাজনীতিবিদদের মধ্যে গেড়ে বসেছিল। ফলে বৃটিশেরা ১৯৪৮ সালে বার্মা ছেড়ে যাবার পর পর বহু ভারতীয় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর একই কারণে, ১৯৬২ সালে নে উইন সামরিক ক্যুতে ক্ষমতা দখলের পরে প্রায় চার লাখ ভারতীয় বার্মা ত্যাগ করেছিল অথবা মারা গিয়েছিল। (see Thant Myint-U’s recent fine historical travelogue, Where China meets India).

আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হল, ১৯৪২ সালের আগে সেকালের জাপান – কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক জাপান – এই কলোনি মাস্টারের হাতে সেকালের বার্মার স্বাধীনতা- যোদ্ধাদের সামরিক ট্রেনিং হওয়া। বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে কেড়ে নিবার পরিকল্পনায়, জাপানিজ কলোনি মাস্টার  মার্শাল তেজোর বাহিনীর হাতে, বেছে নেওয়া ত্রিশজন রাজনৈতিক তরুণ সামরিক ট্রেনিং পেয়েছিল। যারা পরে দেশ ফিরে প্রথম সামরিক সংগঠন ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’ বানিয়েছিল আর ১৯৪২ সালে জাপানিজ বাহিনীর সহায়তায় এরাই বৃটিশদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। সু কি বাবা অং সান (Aung San) এর নেতৃত্বে উ নু (U Nu) আর নে  উইন (Ne win) ও রাখাইন রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ – টপ এদের নেতৃত্বে ছিল সেই ত্রিশজনের দল। এদের নেতৃত্বেই নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে বার্মার সামরিক বাহিনীর ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’  (Burma Independence Army (BIA) গড়া হয়েছিল। বলা হয় জাপানিজদের দেয়া নির্মমতার ট্রেনিং, নির্যাতনের টেকনিক সেই থেকে বর্মীজ সেনাবাহিনীতে বৈশিষ্ট হয়ে যায়। পরে অবশ্য ১৯৪৫ সা্লে এসে এরা সবাই জাপান এম্পায়ারকে ছেড়ে বৃটিশ এম্পায়ারের পক্ষে সুইচ করেছিল। আর পরে এই ত্রিশ কমরেড এরাই ১৯৪৮ সালে নিগোশিয়েশন করে বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেছিল। আজও মায়ানমারে সব রাজনৈতিক সামাজিক গোষ্ঠির মধ্যে তাদের চিন্তা ও বয়ানে (সস্তাবুঝের) দেশপ্রেম ও জাতীবাদের উদাহরণ বা হিরো হয়ে আছে ঐ ত্রিশ জন। গেড়ে বসা ঐ ত্রিশজন সম্পর্কে নানান মিথ এবং তাদের চিন্তা ও বয়ান ভেঙ্গে নতুন করে তা ভেবে দেখা, ফিরে দেখা আর নতুন করে মুল্যায়নের সাহস না হওয়া পর্যন্ত মায়ানমারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি তার নির্মমতা, নির্মুলের সামরিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
কিন্তু এখনকার মূল প্রসঙ্গ হল, কলোনি শাসক জাপানিজদের হাতে জন্ম হবার কারণে ‘রাজনীতি’ বিষয়টাকে এই ‘ত্রিশ জেনারেল’ যতটা ক্ষমতা, সামরিকতার দিক থেকে বুঝেছিলেন ঠিক ততটাই যেন রাজনীতি বলতে একই সাথে আইডিয়া বা চিন্তাও – এদিকটা বুঝতে ব্যর্থ ছিলেন।  রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা ও সামরিকতা নয়, এর অন্যদিকও আছে। অন্যভাবে বলা যায়, একারণে বলা যায় মর্ডান রিপাবলিক স্টেট অথবা আধুনিকতা সম্পর্কে ততটাই তাদের জানাশুনার অভাব দেখা যায় বা তারা কম আগ্রহী ছিলেন। এই ঘাটতির কারণে পরবর্তিকাল  ঐ ত্রিশজনকে দেখা যায় দুটা ঝোঁকের পক্ষে ভাগ হয়ে যেতে; যারা রাজনীতিতে গেলেন আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলেন, এভাবে। সামরিক ধারায় যারা ছিলেন যেমন এদের শিরোমনি জেনারেল নে উইন, তার অভিযোগ রাজনীতিবিদ ধারার শিরোমনি উ নু এর প্রতি যে এরা কম দেশপ্রেমিক, এরা নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবে, এরা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে জানে না (অর্থাৎ কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন) ইত্যাদি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাস হল ঐ ত্রিশজন ও তাদের অনুসারীর – যারা রাজনীতিতে গেল আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলে এই দুভাগ হয়ে যাওয়া – আর পরস্পর পরস্পরের খামতি পুরণে দুপক্ষই অযোগ্য হিসাবে থেকে যাওয়া। যা একালেও রাজনীতিক বনাম সামরিক অফিসার এভাবে ভাগ হয়ে থেকে গেছে। মায়ানমার রাষ্ট্রের বৈশিষ্টেও এর বিরাট ছাপ রয়ে আছে।  মায়ানমারই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কমান্ডার ইন চিফ আর রাজনীতিক রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। এতে যেন খোদ রাষ্ট্রটাই ভাগ হয়ে আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এক ঠিকই কিন্তু তার আবার দ্বৈত-নির্বাহী।  এক ঘরে দুই পীর যেমন বসবাস করে থাকতে পারে না, দ্বৈত-নির্বাহীও তাই। নির্বাহী বা একজিকিউটিভ একজনই হয়, হতে হয়। নইলে সেটা ক্ষমতাই নয়। তাই কার্যত মায়ানমারে প্রধান একজিকিউটিভ হয়ে আছে সামরিক বাহিনী। যেমন ১৯৬২ সাল থেকে  সর্বেসর্বা হয়ে আছে এক মেলেটারী কাউন্সিল। এই কাউন্সিল হল আসলে পিছনে এক সামরিক বাহিনী আছে, যার মধ্যকার ক্ষমতার বিন্যাস বা সাজানো কাঠামোর শীর্ষ স্থানটাই হল কাউন্সিল। এরপর এর কাউন্সিলের অধীনে আবার একটা রাষ্ট্রও আছে। অর্থাৎ যেমন আমরা দেখতে অভ্যস্ত যে, রাষ্ট্রের ভিতরে সামরিক বাহিনী বলে এক প্রতিষ্ঠান থাকে। এখানে এর উলটা; সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানটা হল কাউন্সিল, আর সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটা রাষ্ট্রও আছে।  এখানে আবার  কমান্ডার ইন চীফ আর কাউন্সিল কথাটা সময়ে পাল্টাপাল্টি করে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যখন সামরিক ক্ষমতার একটা অংশ সিভিলিয়ান ফেসে হাজির রাখার অবস্থা তৈরি হয় তখন সামরিক বাহিনীর আবার একটা রাজনৈতিক দলও আছে। বাহিনীতে সক্রিয় চাকরিতে আছে এমন অফিসার আর অবসর নেয়া বুড়া জেনারেলরা এই দলের সদস্য হয়।  এর নাম Union Solidarity and Development Party (USDP)।  গত ২০১০ সালের আগে এটা সামরিক বাহিনীর এক এসোসিয়েশন নামে ছিল। এখন সেটাই এক রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দল। আর সবচেয়ে বড় কথা হল,  কমান্ডার ইন চীফ চাইলে যে কোন নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারে। গত ২০১৫ সালে সংসদ ঐ  USDP দলের দখলে ছিল, তখন একটা প্রস্তাব উঠেছিল ভেটো ক্ষমতা রদ করা হবে কী না এনিয়ে। যদিও বাহিনী শেষ এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।  তা নিয়ে বিবিসির ২০১৫ জুনের এই রিপোর্টটা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
দ্বৈত- নির্বাহী ক্ষমতার কথা উঠেছিল, মায়ানমারের  কমান্ডার ইন চিফ নিজেই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র  ও সীমান্তরক্ষা এই তিন মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে থাকেন আর প্রেসিডেন্ট প্রধান নির্বাহি তিনি বটে, কিন্তু তিনি ঐ তিন মন্ত্রীকে মেনে নিয়ে এবার বাকী মন্ত্রী নিয়োগ দেন। ফলে নে উইনের হাতে আর্মির সেট করে দেওয়া এই বিশেষ রাষ্ট্র বৈশিষ্ট – ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ -এর  ভিতরে অধীনে থেকে সু কি কে নোবেল প্রাইজের ধ্বজাধারী হতে থাকতে হয়, কাজ করতে হয়। এব্যাপারটা সুকি চায় কী চায় না তাতে কোন ফারাক আসে না। অর্থাৎ কার্যত সুকিও এই মায়ানমারিজম চায়। এজন্য গত সপ্তাহে বিবিসি লিখেছে, “মিয়ানমারে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্যানিং  বিবিসিকে বলেছেন তিনি (সু চি) রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। ‘বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’ সেদেশ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাকে সমর্থন না করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে”। আবার একই কারণে সু চি এর জীবনীকার উইন্টেলের বরাতে বিবিসি ঐ রিপোর্টেই লিখছে,” ………তিনি (সু চি) এখন সেনা বাহিনীর পকেটে”। ………”মিস সু চি হাড়ে মজ্জায় বার্মিজ। আমার বলতে খারাপ লাগছে – কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের পশ্চিমে রাখাইনে যা ঘটছে তা চরম জাতিবিদ্বেষী। সেখানে মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সমন্বিত বিদ্বেষ রয়েছে”।

তাহলে ২০০৬ -৭ সাল থেকে মায়ানমার পরিস্থিতি নতুন কী মাত্রা পেয়েছিল? গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৮৮ সালে নে উইন দৃশ্যত পদত্যাগ করলেও ক্ষমতা নেন তারই শিষ্য জেনারেলেরাই। ক্ষমতা ও রাজনীতি বলতে যারা একটাই জানে  – দমন ও নির্মুল – ফলে সেই পুরানা অভিজ্ঞতায় প্রায় কয়েক হাজার লোক মেরে দমিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার কাউন্সিল’ এই নতুন নামে ক্ষমতা নেন এবার জেনারেল স মং (Saw Maung)। পরবর্তিতে অবশ্য তিনি নিজেই মাত্র ৫০০ জন ‘দুষ্ট লোক’ সরিয়ে ফেলার কথা নিজেই গর্ব করে পাবলিককে বলেছিলেন।  এই সময় থেকে কথিত ‘নে উইনি সমাজতন্ত্র’ তিনি নিজেই ও তার সরকারকে সরে যেতে, গড় হাজির হতে শুরু করিয়েছিলেন। আর  ১৯৯০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন দেয়া হয়, কিন্তু বিরোধীরা জিতলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং সে নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করে দেয় জেনারেলেরা।  পরবর্তিতে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মায়ানমার একের পর এক পশ্চিমের (আমেরিকা ও ইউরোপের) স্যাংসন বা বাণিজ্য লেনদেন অবরোধের মুখে পড়ে যায়। এই অবস্থায় বাইরের প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে মায়ানমারের বাণিজ্য বিনিয়োগ লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম থেকে যায় পড়শি চীন। ফলে একমাত্র চীনের ভিতর দিয়ে যতটুকু বাইরের দুনিয়ার সাথে বার্মার সংযোগ সম্পর্ক বজায় ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মায়ানমারে চীনা বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ২০০২-৩ সালের পর থেকে। এমন অবস্থায় ২০০৬ -৭ সালের দিকে এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতি হিসাবে  চীন ও ভারত নিজ নিজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকেই মায়ানমারের গ্যাস কেনার (বুকিং ও চুক্তি) জন্য প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এই সময় থেকেই অবরোধের ব্যাপারটাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়।

ততদিনে আবার, আমেরিকা নীতি পলিসিতে এশিয়ায় ভারতকে কাছে টেনে চীন ঠেকানোর চর্চা পোক্ত নির্দিষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে ভারতের মাধ্যমে বার্মার অবরোধ তুলে নেওয়ার এক ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। এই অবস্থানের পিছনে যে মুল্যায়ন কাজ করেছিল তা হল মায়ানমারের উপর অবরোধ দেওয়াতে কোন লাভ হচ্ছে না। বরং পশ্চিমের অবরোধের সুফল চীন একা খাচ্ছে। তাই ভারতের মধ্যস্থতায় অবরোধ তুলে নেওয়ার নতুন ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। পশ্চিম পরিস্কার জানত, মায়ানমার কোন গণপ্রজাতন্ত্রী নয়, সামরিক বাহিনীর পকেটের রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও  সু চি কে কেবল ঐ কাঠামোর উপরে এক সিভিলিয়ান ফেস হিসাবে সামনে রেখে সামরিক ক্ষমতাটাই চালু রাখার পক্ষে নাম কা ওয়াস্তে এক সংস্কার করার পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। এই হল সেই ফর্মুলা। কেন “দ্বৈত নির্বাহী” এই ভুতুড়ে ধারণার ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসাবে আমরা এখনও মায়ানমারকে দেখছি – এর মূল কারণ এটা। যেমন এর আর এক বৈশিষ্টবলছিলাম যে, এই রাষ্ট্রে কমান্ডার ইন চীফ সরকারের কোন নির্বাহী সিদ্ধান্তের উপর ভেটো প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাহী সরকার একমাত্র বা একক নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী নয়, এটা এক সতীনি ক্ষমতা বলেই এমন বাক্য রচনা এখানে সম্ভব হচ্ছে। আর ২০০৮ সাল থেকে চালু যে কনষ্টিটিউশনে এসব কথা লেখা আছে তা সংশোধন করতে গেলে ওতে শর্ত দেওয়া আছে যে, ৭৫% এর বেশী ভোটের সমর্থন থাকতে হবে। কিন্তু ৭৫% কেন? কারণ প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্র সংসদে ২৫% আসন সব সময় বাহিনীর জন্য রিজার্ভ করে রাখা আছে। অর্থাৎ সারকথায় কমান্ডার ইন চিফ রাজী না থাকলে ঐ ২৫% এর একটু সমর্থনও পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, ফলে কোন সংশোধনীও সম্ভব নয়।

আসলে সব কথার এক কথা বা সেই মূল কথাটা হল, ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছিল এই কনষ্টিটিউশন। আর তা একা মনের মাধুরি মিশিয়ে সামরিক বাহিনীই এককভাবে নিজের খাতিরে লিখেছিল। কিন্তু যারা কনষ্টিটিউশন লিখেছে এরা কারা? এদের হাতে ক্ষমতা দিল কে, কী তাদের ক্ষমতার ভিত্তি – এসব প্রশ্নের ভিতরে সব জবাব আছে। যার সোজা অর্থ মায়ানমার এখনও প্রি-ষ্টেট মানে রাষ্ট্রগঠনের আগের অবস্থায় বা কোন গণপরিষদ বা সংবিধান সভা বসার আগের অবস্থায় আছে।  এই অর্থে মায়ানমার এখনও কোন মর্ডান রিপাবলিকই নয়।

ফলে এই রাষ্ট্রের কাছে মানবাধিকার, জনগণের মৌলিক অধিকার এসব কথা অর্থহীন। আর ‘ডেমোক্রাসির নেতা সু চি’ এই শব্দ আর বাক্যগুলো তো আরও হাস্যকর।

অতএব পশ্চিম সংস্কারের নামে যেটা করেছে সেটা হল ঐ সামরিক স্বৈরক্ষমতাকে সিভিলিয়ান সু চির টোপর পরিয়ে ঐ ক্ষমতাকে উদ্ভোধন বা হালাল করে দিয়েছিল। বিনিময়ে তারা নিজের ব্যবসা বিনিয়োগের করার সুযোগ বুঝে নিয়েছিল। এমনকি এই লক্ষ্যে কোন ধরণের সংস্কারের কাজ শুরু হবার আগেই এমনকি তা আসলেই কতটুকু কী সংস্কার হয় তা দেখার আগেই ২০১০ সালেই আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম নিজের বিনিয়োগ নিয়ে  মায়ানমারে ঢুকে পড়েছিল। তবে এটা নিয়ে চীনের সাথে মায়ানমারের জান্তার কোন বিরোধ দেখা দেয় নাই। চীনের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক অটূট রেখে আপোষেই তা হয়েছিল। জেনারেলেরা বিশেষ করে প্রাক্তন জেনারেল ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি থেন সিন (যিনি ২০১৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন) চীনকে বুঝাতে পেরেছিল যে পশ্চিমের অবরোধ উঠে যাওয়া মায়ানমারের জন্য কতটা জরুরি। ফলে চীন যেন জায়গা ছেড়ে দেয়।  চীনও সেটা সহজেই মেনে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। আর এসবের ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই হঠাত কেবল ২০১০ সালেই মায়ানমারে বিদেশি ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হয়েছে ২০ বিলিয়ন, আর এর অর্ধেক হল একা চীনের।

কিন্তু ভারতের অর্জন কী এতে? না তেমন কোন বৈষয়িক বিনিয়োগ ব্যবসা, না প্রভাব – কোনটাই অর্জন হয় নাই ভারতের।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনদিনের মায়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। চলতি রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরনার্থী হওয়া প্রসঙ্গে,   সু চি বলেছেন,  “অসত্য খবর প্রচার করে রাখাইনে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে”। সু চি হামলাকারিদের “টেররিস্ট” বলেছেন। আর মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”।  কিন্তু এই সাফাই যুগিয়ে দেয়ায় ভারতের কোন লাভ হয় নাই। তবে মায়ানমার সফর থেকে মোদি কী অর্জন করতে চান এই প্রশ্নে বিবিসি কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিককে সাক্ষী মেনে অনেক কথা বলিয়ে নিয়েছেন। সুবীর ভৌমিক এই কথাগুলো ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তরফ থেকে আমাদের কাছে পৌছাতে চেয়েছেন, এটাও ধরে নিতে পারি। সুবীর বিবিসিকে বলছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য বিবৃতির মূল্য উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা”। মি ভৌমিক বলছেন, “রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার”। “মুসলিমদের প্রশ্নে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী এবং কট্টর বৌদ্ধরা মি মোদি এবং তার দল বিজেপির সাথে একাত্ম বোধ করে”। ভারত যে সম্প্রতি বিশেষ অভিযানের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেছেন, সেটাকেও দেখা হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনা অভিযানের প্রতি দিল্লির সমর্থন হিসাবে”। উপরে সি রাজামোহনের লেখায় দেখেছিলাম ভারতের বিনিয়োগ মুরোদহীনতার কথা। অর্থাৎ ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রশ্নে কোন অর্জন নাই। বরং বর্মীজ জেনারেলদের ইসলামবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়ার জন্য ভারত কাজ করছে। এই কাজটাই ২০০৮ সাল থেকে ভারত করে জেনারেলদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা হত্যার বড় ঘটনাগুলো ঘটতে পেরেছে বলে মনে করা হয়।

এবারের নতুন সংযোজন মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমার মাইন পুতে রেখেছে। মায়ানমার অল্প কিছু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা যে মাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ জাতিসংঘের কনভেনশন স্বাক্ষর না করা দেশ। বাংলাদশ এখন পর্যন্ত এনিয়ে জাতিসংঘে নালিশ বা সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতে যায় নাই। পলায়নপর আশ্রয়প্রার্থিদের জন্য মাইন পুতে রাখা হয়েছে, এরা কী কোন বিদ্রোহী? অর্থাৎ নিরীহ সাধারণ মানুষ কোন আশ্রয়ও না পাক, মায়ানমারের হাতেই তাকে মরতে হবে এই স্যাডিজম এখানে কাজ করছে।  আর এই স্যাডিজমকে মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”। তার মানে ব্যাপারটা দাড়াল যেহেতু ভারতের নিজ বিনিয়োগের সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাড়ানোর মুরোদ নাই, তাই তাকে নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে। বর্মী জেনারেলরা গণহত্যার ক্লিনজিং অপারেশনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকছেন ক্রমাগত, ভারতের এই মনোরঞ্জনে কোন জেনারেলের দায় কী কমছে? অথবা বার্মার সাথে চীনের সম্পর্কে কোন ফাটল? ভারতের উতসাহে বার্মার জেনারেলরা গত ফেব্রুয়ারির রোহিঙ্গা হত্যা অপারেশন ঘটানোর পরেও কী, এই এপ্রিলে চীনের সাথে বর্মার প্রেসিডেন্ট ১০ বিলিয়ন ডলারের বন্দর নির্মাণ চুক্তি করেন নাই?  তাহলে ভারতের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অর্জন কোনটাকে ধরেন? স্যডিজমে অন্যের শরীরে কষ্টের পিন ফুটানোতে সুখ?

[এই লেখা এপর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হয়েছে। তবে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। সেটা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

গৌতম দাস

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

http://wp.me/p1sCvy-2hx

 

গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

[প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

গৌতম দাস
০২ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৫

http://wp.me/p1sCvy-2f6

কাশেম বিন আবুবাকার নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে মিডিয়ায় মানে, টিভি টকশো, নিউজ, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সোস্যাল মিডিয়া সবখানেই তোলপাড় চলছিল; এক বহুল উচ্চারিত নাম তিনি। তাও শুধু দেশে নয়, প্যারিসভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপির কল্যাণে কাশেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে তাদের করা নিউজটা যেসব দেশের স্থানীয় মিডিয়া প্রকাশ করেছে সেসব দেশেও কাশেম বিন আবুবাকারের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কী সে খবর? আবুবাকারের কী খবর? এখানে একটু দম ধরে থামতে হবে।
কয়েক বাক্যে মুল খবর হল, বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক কাশেম বিন আবুবাকার ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখেন। শ’খানেক উপন্যাস লিখেছেন। আধুনিক জগতে অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে যে মডার্নিটি বা আধুনিকতাকে শুধু গ্রহণ না করে নয়, রীতিমতো আলিঙ্গন না করে কোন উপন্যাস লেখা সম্ভব কিনা। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে বিচার করলে মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, মডার্নিটিকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরালে ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখা কি সম্ভব? বিশেষ করে যখন ইউরোপের আধুনিকতার যেসব ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধ বা সে মরালিটির ওপর ভর করে সাহিত্য উপন্যাস লেখা ও চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে বহু আগেই এবং এর প্রভাবে দুনিয়াতে প্রায় সব শহরে প্রবল প্রভাব ছেয়ে গেছে! দুনিয়াতে নানা জায়গায় এর প্রভাব পড়েছে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শাসক সূত্রে; তাদের আধুনিকতা ও এনলাইটেনমেন্টের চিন্তা ও তৎপরতার প্রভাবে আমাদের মতো দেশে এরই প্রভাবিত ধারা ও এর চর্চা গড়ে উঠেছে। আর সেটাই প্রধান ধারা হওয়ার দাবিতে নিজের আসন পোক্ত করে নিয়েছে! এরপরে আর কি ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস বা ফিকশন সম্ভব নয়? [উপরের কথাগুলো লিখেছি এটা ধরে নিয়ে যে আধুনিকতার ভিত্তিগিত ধারণা ও এর উপর দাঁড়ানো মুল্যবোধ আর ইসলামি মুল্যবোধে বড় ফারাক আছে। যদিও সে ফারাক কী, কোথায় সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাই নাই।]

আধুনিকতার এমন বাস্তবতাতেও কাশেম বিন আবুবাকার হলেন সেই লোক যিনি আধুনিকতার ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধের বাইরে সমান্তরালে (যদিও ক্রিটিক্যালি বললে আধুনিকতার  প্রভাবের বাইরে থাকা একালে কারো পক্ষেই আর সম্ভব নয়, ফলে তিনিও পুরোপুরি বা ঠিক বাইরে নন) ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন। নয়া ধারা সৃষ্টি করেছেন। এর চেয়েও বড় কথা তার উপন্যাস আবার যে সে উপন্যাস নয়, তাঁর একেবারে ৮৫ শতাংশ লেখা মূলত রোমান্টিক উপন্যাস। আধুনিক চিন্তায় লেখা উপন্যাসের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা খেয়াল রেখে বললে, আবুবাকার অবশ্যই মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। মনে হতে পারে অনেকেই তো অনেক কিছু লেখেন, লিখেছেন, কিন্তু তা হয়তো শেষে ঠাঁই পায় বালিশের তলায়, আবুবাকারকে কী এই অর্থে রোমান্টিক উপন্যাস লেখক বলা হচ্ছে? না অবশ্যই না, একেবারেই না। তবে উপন্যাসের সাহিত্য-মূল্য বিচার, এটা সেকুলার মডার্ন জগতেও যথেষ্ট জটিল, থিতু বা সেটেলড্ নয়। ফলে সে দিকটা এখানে উহ্য রেখেও বলা যায় – তার লেখার পাঠক আছে কিনা, সে পাঠকেরা ব্যাপক কিনা, সে পাঠকেরা আবুবাকারের উপন্যাসের সাথে নিজেকে সম্পর্কিত, যেন নিজেরই জীবনের ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখছেন বলে মনে করেন কিনা, এই বিচারে বলা যায় আবুবাকার একজন সফল ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর পাঠকপ্রিয় এবং প্রধান ধারার নাম কামানো ঔপন্যাসিকদের চেয়েও তার পাঠক সংখ্যা বেশি। তবে স্বভাবতই তার পাঠকরা ভিন্ন ক্যাটাগরির যাদেরকে ভিন্ন অর্থনৈতিক ভিত্তি, সামাজিক মর্যাদার স্তর ভিত্তি, মূল্যবোধের ভিত্তি ইত্যাদি অনেক কিছু দিয়েই আলাদা করা সম্ভব। আবার যারা প্রধান ধারার পাঠক সেই ক্যাটাগরিরও কিছু অংশ তারও পাঠক। এই বিচারে এক কথায় বলা যায়, আবুবাকার প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিক। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আর, ২০১১ সালের খবর হলো সেটা ছিল ত্রিশতম সংস্করণ প্রকাশিত। যদিও টিভি সাক্ষাতকারে  তিনি বলেছেন এটা আরও বেশি হতে পারে। কারণ রয়েলিটি না দেওয়ার জন্য প্রকাশকেরা অনেক সংস্করণের খবর প্রিন্টে উল্লেখ করে না।  আর তাঁর দেয়া ধারণা মতে, প্রতি সংস্করণ বই প্রকাশ সংখ্যা ৩০০০-এর কম নয়।

একথা ঠিক যে মিডিয়া তাকে নিয়ে তোলপাড় করছে। কিন্তু যতগুলো মিডিয়া আলোচনা ও মন্তব্য শোনা, জানা বা কাউকে করতে দেখা গিয়েছে তাতে খুবই নগণ্য সংখ্যক (প্রায় কেউ নয়) দাবি করেছেন যে, তিনি আবুবাকারের কোনো উপন্যাস পড়েছেন। মূল কথা হল, মিডিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে যে আবুবাকার তাঁর উপন্যাস পাঠক জগতে এত বিখ্যাত অথচ মিডিয়া সেটা জানে না কেন? ফলে খোদ মিডিয়া এবং সেকুলার পাঠক পেরেসান হয়ে গেছে যে তাদের কালচারাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাদের প্রভাবকে তুচ্ছ করে ইতোমধ্যেই গজিয়ে যাওয়া হাজির কাশেম বিন আবুবাকার ফেনোমেনাকে তারা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন।  উপায়ন্ত না পেয়ে তারা  তাঁকে নিচা দেখানো বা খাটো তুচ্ছ করে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। যেমন তাদের ট্যাগ হল, তিনি “চটুল” লেখক, তিনি “ইসলামি যৌনতার” লেখক ইত্যাদি। আর সব তর্ক-বিতর্ক আলোচনা চলছে এসব মিথ্যা ভিত্তিহীন ট্যাগের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাদের কালি লাগানোর সব প্রচেষ্টা ঢলে পড়েছে। এর মূল কারণ এরা সবাই স্বীকার যে তারা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই। এছাড়া আরও বড় প্রশ্ন আছে, উপন্যাস পড়া এক জিনিষ আর উপন্যাসের মুল্যায়ন-সক্ষমতা কী সবার আছে? সাহিত্যের ভিতর থেকে প্রকাশিত সামাজিক মন, সমাজতত্ত্ব বের করে আনা, দেখতে পাওয়া, ট্রেন্ড ব্যাখ্যা  করা কিংবা লিখায় লেখকের লিখাকালীন সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব কী কতটুকু – এসব কিছু যথেষ্ট সিরিয়াস ও পেশাদারি কাজ – এসব কাজ আমপাঠকের কাজ নয়। অতএব, এক কথায় বললে প্রায় প্রত্যেকেই নিজের অযোগ্যতা বা মনের ক্ষোভ মিটাতে ইচ্ছামতন মন্তব্য করছেন ট্যাগ লাগাচ্ছেন। কিন্তু কঠিন সত্যি হল, প্রথমত এরা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই।  কোন উপন্যাসে এটা আছে এমন কোন রেফারেন্স উল্লেখ করে কেউ অভিযোগ করছেন না।  ৭১ টিভি টকশোতে এঙকর শুরুতেই খোদ আবুবাকারের সাথে কথা বলতে গিয়ে অবলীলায় এক বিশেষণ লাগিয়ে কথা বলছেন, “আপনার চটুল উপন্যাস”। আবুবাকার পাল্টা যখন জিজ্ঞাসা করলেন “চটুল উপন্যাস বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন” এঙকর তখন আর তার ব্যবহৃত বিশেষণ এর পক্ষে কোন সাফাই পেশ করতে পারলেন না, চুপচাপ এড়িয়ে গেলেন। বলা বাহুল্য ঐ টকশোতে প্যানেলিস্ট কেউ ছিলেন না যে আবুবাকারের কোন উপন্যাস পাঠ করেছেন।

দৈনিক বাংলা ট্রিবিউন ২৭ এপ্রিল এক সাক্ষাতকার নিয়েছে। সেখানে, “আপনি কেন পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন, এ প্রশ্নের জবাবে আবুবাকার বলছেন,   “আমি মানুষকে মানুষ করতে চেয়েছি লেখার মধ্য দিয়ে। মুসলমান হয়ে চরিত্রহীন হলে চলবে না। আল্লাহর কথা মতো যারা চলে না, তারা তো মুসলমান না। আমি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে চেয়েছি বলে আমি জনপ্রিয়”। কিন্তু প্রশ্নকর্তা এবার জানতে চান “ইসলামি উপন্যাস” ইসলাম অনুমোদন করে কি না। অর্থাত প্রশ্নকর্তা নিজেই আবুবাকারের উপন্যাসেকে “ইসলামি উপন্যাস” লেবাস বা নামকরণ দিয়ে দিলেন।  এর বিপদ বুঝতে পেরে আবুবাকার পরিস্কার করে দিলেন, ‘আমি তো ইসলামি উপন্যাস লিখিনি। আমি ইসলামি ভাবকে কাজে লাগিয়ে উপন্যাস লিখেছি। কোরআন-হাদিসের আলোকে রোমান্টিসিজমের কথা লিখেছি”।  এছাড়া অনেকে দ্বিধা করেন জটিলতা পাকায়  ফেলেন যে প্রেম ও ইসলাম এর সম্পর্ক কী, এরা কী পরস্পর বিরোধী অথবা প্রেম মানেই তা যৌনতা কীনা।  তিনি এসব ধারণা পরিস্কার করার চেষ্টা করে বললেন এভাবে,  “প্রেম তো থাকবেই — ভাইয়ের সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, বিয়ের আগে প্রেমিকের সঙ্গে। কিন্তু সেই প্রেম ভেঙে গেলে প্রেমিকাকে এসিড ছুড়তে হলে সেটা তো প্রেম না, সেটাকে বলে মোহ। আমার বইয়ের মধ্য দিয়ে আমি এগুলোই শেখাতে চেয়েছিলাম পাঠকদের। আর আমার লেখা এই শিক্ষামূলক বই সবাই পড়তে চেয়েছে বলেই আমি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছি”। এছাড়া এই পত্রিকাও শুরুতে পরিচিতিমূলক বক্তব্য আবুবাকারার উপন্যাসকে বলছেন “প্রেমের চটুল গল্পের”। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যারা চটুল শব্দ ব্যবহার করছেন তারা কেউ তার উপন্যস না পড়েই প্রিযুডিস (আগাম বিচারবিবেচনা করা ছাড়া ধারণা) থেকে সেকুলার নাক সিটকানো থেকে কথা বলছেন।  তিনি বলছেন শালীনতার কথা, শালীনতা রেখেও প্রেমের পথের কথা – ইসলামি মুল্যবোধের হেদায়েতের কথা আর এর বিপরীতে সেকুলার অভিযোগ হল তিনি নাকি চটুল গল্প লিখছেন, ইসলামি লেবাসে যৌনতা লিখছেন।

ওদিকে প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আরও পরিস্কার করে কথা বলেছেন আর এক অনলাইন পত্রিকায়। তিনি বলছেন, (প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক কী) “এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমি বার বার হয়েছি। আমি ইসলামের কথা বলি প্রেমের উপন্যাসে। কেউ কেউ আমাকে বলেছেনও আমি অর্থ উপার্জনের জন্য এমন করেছি। কিন্তু আমার মন জানে আমি কেনো করেছি। আমি চিন্তা করেছি অন্য জায়গা থেকে। আমি প্রেমকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছি। কারণ, আমরা যতো বাধাই দেই না কেনো যুবকদের প্রেমবিমুখ করতে পারবো না। তাই আমি প্রেমকেই বাহক হিসেবে বেছে নিলাম এবং তাদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিলাম। তাদের বোঝালাম, প্রেমের লাভ-ক্ষতি হিসেব কিন্তু আমি আমার উপন্যাসে দিয়েছি। বিশেষ করে সীমালঙ্ঘন যেনো না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছি”। অর্থাৎ আমরা দেখছি এমন লোককে চটুল গল্প লেখক বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগেই খোদ এএফপির রিপোর্টে এক বিপজ্জনক মন্তব্য আছে তা নিয়ে কথা। আর তা থেকে এই রিপোর্ট এখন প্রকাশ করার উদ্দেশ্য কী তা কিছুটা আন্দাজ করা যায় সম্ভবত। বলা হয়েছে, “আবুবাকারের (কাজকে এখন নাকি) এক নবজাগরণের বা এক রেনেসাঁর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তা হল, যাতে বাংলাদেশের যুগ যুগ ধরে জারি থাকা মডারেট মুসলমান পরিচয় এখন থেকে এটা  ধর্মীয় কালামের আরো রক্ষণশীল ব্যাখ্যার দিকে ঢলে পড়ছে”।
Now his work is undergoing something of a renaissance as Bangladesh slides from the moderate Islam worshipped for generations to a more conservative interpretation of the scriptures.’

এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাসের সাথে সাম্প্রতিককালের হেফাজতের (আওয়ামি লীগের ঘনিষ্ঠতার) সম্পর্ক আছে এবং এটা নেতিবাচক।
একাত্তর টিভির একটা টকশো হয়েছিল যার শিরোনাম ‘লেখক কাসেম বিন আবুবাকার লাইভে এসে লেখা ও নিজের সম্পর্কে যা বললেন’– এভাবে সেটা ইউটিউবে ২৮ এপ্রিল আপলোড হয়েছে। আলোচনায় প্যানেলে ছিলেন রবীন আহসান, প্রকাশক ও সম্পাদক বই নিউজ ২৪; তিনিই মুলত আবুবাকারের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগকারী, একমাত্র তিনি অভিযোগ তুলছিলেন। এএফপি কী বুঝাতে ওই রিপোর্ট করেছিল তা রবীন এহসানের অভিযোগ থেকে আঁচ করা যায়। রবীন একই কথা অনেক ব্তযাখ্বেযা করে বলার পেয়েছেন বা নিয়েছেন। তবে রবীনের বক্তব্যের উপস্থাপন ছিল একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মত। বলতে চেয়েছেন, এএফপির রিপোর্ট ছিল যেন ‘বিদেশীদের ষড়যন্ত্র’। আর সে ষড়যন্ত্রের কথা বলতে চাওয়ার ছলে রবীন আঙুল তুলেছেন আবুবাকারের দিকে। বলছেন, আবুবাকার সেই ‘ষড়যন্ত্র প্রজেক্টে’ শামিল ।

রবীনের কিছু বক্তব্যের অংশ বিশেষ তুলে ধরছি এখানে: “তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরি করার জন্য উপন্যাস লিখেছেন। আমার যেটা মনে হয়েছে, এটা একটা প্রজেক্টের মতো। আবুবাকার একটা প্রজেক্টের মধ্যে ছিলেন। ত্রিশ বছরে তিনি যা লিখেছেন, এর প্রতিফলন সমাজের মধ্যে পড়েছে। তার উপন্যাসের নাম হচ্ছে ‘বোরখা পরা সেই মেয়েটি’ [ফ্যাক্টস হলো এই  উপন্যাস আবুবাকারের লেখা নয়]। তার উপন্যাসের ভেতর তার নায়ক-নায়িকারা যেভাবে কথা বলেন এবং বোরখা পরে, হিজাব পরে, এরকম সব চরিত্র হচ্ছে তার উপন্যাস এবং নিজেই যখন বলেছেন ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করার জন্যই তিনি লিখছেন। এজন্য কিন্তু তিনি সফল। মানে বাংলাদেশের যে সমাজ, যে সমাজের মধ্যে আমরা আছি, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই যে ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে লেখা এবং ইসলামি মূল্যবোধকে সাহিত্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে সমাজের মধ্যে প্রয়োগ করা, এতে কিন্তু কাসেম সফল হয়েছেন। তার আজকে যে ঢালাও করে প্রচার প্রপাগান্ডা পশ্চিমা দেশে হয়েছে, সেটার কিন্তু প্রমাণ হচ্ছে যে, হঠাৎ করে নিউজটা হয়েছে যখন কোনো বইমেলা নেই; তখন দেখা যাচ্ছে ইসলামি বই লাখ লাখ বিক্রি হচ্ছে-এই রকম একটা সংবাদ হয়েছে। আমি বলব, সমাজে যখন হেফাজতে ইসলামের একটা গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, ইসলামি সব দলের একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে এবং এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আবুবাকারের একটা অবদান আছে। এই যে ত্রিশ বছর পর্যন্ত তিনি লিখেছেন যে ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করবেন, ইসলামি নায়ক বানাবেন, নায়িকা বানাবেন, বোরখা পরে চলাচল করবে, আমরা কিন্তু সেটাই সমাজে দেখছি।’
[এই অনুলিপি আমার করা, কাজ চালানোর জন্য। এতে দু-একটা শব্দ এদিক ওদিক হতে পারে। তাই একেবারে সঠিক স্ক্রিপ্টের জন্য মূল ইউটিউব নিজে দেখে নেবেন, অনলাইনে। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি।]

এখন মূল কথা হল, রবীন এখানে আবুবাকারকে অভিযুক্ত করছেন উপন্যাসে ইসলামি মূল্যবোধ আনা, চর্চা বা জাগানোর চেষ্টা করার জন্য। যদি রবীনের একথাকে ফ্যাক্টস হিসাবে-একেবারে সত্যি বলে ধরেও নেই, তার পরেও বলতে হয়-ইসলামি মূল্যবোধ জাগানোর চেষ্টা করা কি অন্যায়? অপরাধ? ইসলামি বা আধুনিক যেকোন মুল্যবোধ প্রচার যে কেউ করতে পারে। আর তা বিচার বিবেচনা করে গ্রহণ -বর্জনের অধিকারও সকলের।  আবুবাকার এখানে ইসলামি এথিক্স / মরালিটির কথা বলছেন। একটা মরালিটির চর্চাকে অন্যায় বলবেন কি করে, একে অপরাধ বলবেন কী করে? আবুবাকার কারও কপালে বন্দুক ধরে মূল্যবোধের চর্চার কথা বলছেন না। তিনি এটা করতে আহ্বান রাখছেন কোন প্রবন্ধ লিখেও না- আরও নরম করে, একেবারে রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লিখে। অথচ এটাকেও রবীন আহসান অপরাধ মনে করছেন। ফলে এটা এক জাতীয় ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখছি না। এটা হতেই পারে যে, রবীন ইসলামি মূল্যবোধ পছন্দ করেন না, তাই তিনি এই মূল্যবোধ বর্জন করতে পারেন, এমনকি এর ‘অসুবিধা’র দিক নিয়েও পাল্টা প্রচার করতে পারেন। এছাড়া তিনি অবশ্যই ইসলামি মূল্যবোধের চেয়েও ভিন্ন, ভালো এবং কার্যকর মূল্যবোধ নিয়ে এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন। কিন্তু তিনি এটা ইসলামি হওয়াটাই যেন অপরাধ, সে হিসেবে ধরে নিয়ে কথা বলেছেন। এটা তাঁর লাইন ক্রশ।

রবীন আহমদ হেফাজতসহ ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ আনছেন। সত্যি এ’এক তামাসা বলতেই হয়। কোন চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেলে কি কাউকে অভিযুক্ত করা যায়? এটা তো ওই চিন্তা প্রচারকারীদের গৌরব যে, মানুষ তাদের কথা শুনেছে। রবীনের উলটো এটাকে অভিযোগ হিসেবে নেয়া বা অন্যায় মনে করেই বরং এক ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা নয় কী? এটা আইনি বিচারি চোখেও অন্যায় কাজ।
এএফপি যেন আসলে ঠিক রবীনের মতোই সাজেশন রাখতে চেয়েছিল। অভিযুক্ত করতে চাইছিল যে কাসেম বিন আবুবাকার রোমান্টিক উপন্যাস লিখে দোষী। কারণ এতেই ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, আর যেন ঠিক এ কারণেই হাসিনা হেফাজতের সাথে আপস করেছেন। এটা কাকতালীয় শব্দটার চেয়েও বেশি কাকতালীয় বক্তব্য সন্দেহ নেই। এমনকি ৭১ টিভির ওই টকশোতে অংশগ্রহণকারী আর এক প্যানেলিস্ট ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকেও রবীন আহসান তার কাকতালীয় দাবি ‘খাওয়াতে’ পারেননি। শ্যামল দত্ত অন ক্যামেরা প্রকাশ্যে তার আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

ওদিকে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরেক তথ্য জানা যাচ্ছে। উপরে এএফপির রিপোর্ট থেকে যে ইংরেজি উদ্ধৃতি দিয়েছি, যেটা ওই নিউজ মিডিয়া (কনসার্ন-বোধ করে) উদ্বেগ বোধ করেছিল – এভাবে জানিয়েছিল। পরবর্তিতে এই রিপোর্ট ফলে ঐ একই উদ্বৃতিও চোখে  পড়েছিল স্টিভ ব্যাননের।  তিনি হচ্ছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের  প্রধান পরিকল্পনা প্রণয়নকারী ( চিফ স্ট্রাটেজিস্ট)। হকিস আগ্রাসী ভুমিকার যে ট্রাম্পকে আমরা দেখেছিলাম বছরের শুরুতে এই নীতি প্রণয়নকারীদের বস তিনি। তবে ছিলেন বলতে হবে কারণ সম্প্রতি তাকে সাইজ করা হয়েছে, বহু পদ-পদবি ও দায়ীত্ব থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।  স্টিভ ব্যাননও  ঐ উদ্বৃতি তুলে নিয়ে তার নিজের ওয়েবসাইটে সেটে দিয়ে  উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটা সত্যিই মজাদার ব্যাপার যে, রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাসে লিখেও বাংলাদেশের আবুবাকারা “জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে” লড়াকুদেরও উদ্বেগের মুখে ফেলা দিতে পারেন!

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান একাডেমিক, গবেষক ও বাংলাদেশ এক্সপার্ট ড. আলী রীয়াজ। তিনি আবুবাকার ইস্যুতে ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাকে সম্ভাবত এই প্রথম একাডেমিকের ভঙ্গিতে দেখা গেল যে, কোনো ইস্যুতে তিনি সহজে কোনো পক্ষ না নিয়ে একাডেমিক অবজারভারের অবস্থান নিলেন। অবশ্য তার বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ ফ্যাক্টস হিসেবে সত্যি নয়।

তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের সোস্যাল মিডিয়ায় যারা সক্রিয় তাদের এক বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন; সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন, অবশ্যই এএফপির কাছে। কিন্তু আবিষ্কারের পরে তাদের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই লেখকের বিষয়ে তারা কিছু না জানায় বিস্মিত এবং খানিকটা ক্ষুব্ধ”।
এটা আলী রীয়াজের স্টাটাসের প্রথম দুই বাক্য। কিন্তু … আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে… ‘সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন’- এই বাক্যটা ফ্যাক্টস নয়। এটা বরং উলটো। কারণ এবারের আগে সোস্যাল মিডিয়ায় আবুবাকার ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছিলেন অন্তত গত বছর ডিসেম্বরে। পরে এএফপিতে তিনি রিপোর্টেড হয়েছেন মাত্র সেদিন।
দ্বিতীয়ত, আলী রিয়াজ “ইসলামপন্থী জনপরিমণ্ডলব্যবস্থার” আলাপ তুলেছেন। অর্থাৎ এএফপির মতো আবুবাকারা আর হেফাজত-সরকারের সম্কাপর্কক নিয়ে কাকতালীয় উদ্বেগ জানাতে যাননি ঠিকই, তবে একাডেমিকভাবে আর খুবই নরমভাবে প্রায় একই কথা বলছেন। ‘জনপরিমণ্ডল’ খুবই খটমটে শব্দ মনে হতে পারে অনেকের কাছে তাই সারকথাটা বলে রাখি। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ আরও ইসলামি মূল্যবোধের (আবুবাকারার রোমান্টিক উপন্যাসের মাধ্যমে) গভীরে ঢুকে গেলে এর যে সামাজিক প্রভাব তৈরি হবে (যা ভালো মন্দ বহু কিছু) এরপর আবার সেগুলোর পরোক্ষ ফলাফলে তা কতটা আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবে, সেটা সমাজতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে বুঝতে হবে। ফলে সরাসরি আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাস লেখা দেখে আমেরিকার জন্য কেঁদে উদ্বেগে হাহুতাশ করে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

তিনি বলছেন, “এ ধরনের উপন্যাস জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ বিষয়ে মনোনিবেশ করা দরকার কাউকে নিন্দা করার (ভিলিফাই অর্থে) জন্য নয়, বরঞ্চ জনপরিসরের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে তা বোঝার জন্য”।

এখানে তিনি বলেছেন, ‘জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ’- এখানে ‘ইসলামীকরণ’ শব্দের ব্যবহার না করলেই তিনি ভালো করতেন। যে দেশের ডেমোগ্রাফিক্যালি মুসলমানের, তাকে আর ‘ইসলামীকরণ’-এর অভিযোগ করা কি চলে? ও ন্যাচারালভাবে যাই করবে তার মধ্যে ইসলামই তো দেখা যাবে, ছাপ থাকবে। তাই নয় কী? তাহলে তিনি বলছেন ‘ইসলামীকরণ’ কিন্তু বুঝাতে চাইছেন সম্ভবত অন্য কিছু। আবুবাকার মুসলমান হিসাবে যদি প্রেমের উপন্যাস লিখে ইসলামি মরালিটির প্রচার এবং প্রদর্শন করেন তাহলে এটাই কী খুবই স্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক “ইসলামিকরণ” নয়? এর মধ্যে নেগেটিভ কী দেখলেন? এটা কী বেআইনী? মুসলমানের হাঁচি কাশিতেও নিজের বিপদ দেখলে, নিজের আধিপত্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুজে পেলে আমার মনে হয় না তাকে সাহায্য করতে পারবে? আর এখানে আধিপত্য হারানোর ট্রমা – এই মানসিক রোগে চিকিতসা ছাড়া সাহায্যেরই বা কী আছে?   বাংলাদেশের এক কমিউনিস্ট মুসলিম তরুণের বাবা মারা গিয়েছেন। তিনি দলের পত্রিকাও দেখাশুনা করেন। তো পত্রিকায় তিনি চার লাইনের এক কলামের সংবাদ লিখলেন, তার বাবা ওমুক মারা গিয়েছেন ইত্যাদি এবং ওমুক গোরস্থানে তার কবর হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক ঐ খবরটার “কবর” শব্দটা এডিট করে লিখলেন – তার “সমাধি” হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলে জানালেন “কবর সাম্প্রদায়িক শব্দ” তাই ছেটে দিয়েছেন। এই সম্পাদকও আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ট্রমাতে ভুগছেন। তবে আমাদের বাড়তি লাভ হল, আমরা সাম্প্রদায়িক শব্দের আসল সংজ্ঞা জেনে নিলাম।

আর তবুও তিনি যদি অভিযোগ করতেই চান, এই যে ইসলামিকরণ হয়ে গেল কীনা বোধের ট্রমা,  এতে নন-ইসলামি পশ্চিমা সরকার ও জনগোষ্ঠীর কি দায় ভূমিকা নেই?

সংক্ষেপে আরো কিছু সিরিয়াস স্পষ্ট আপত্তির কথা জানিয়ে রাখা যায়। ঘটনা হল, কাসেম বিন আবুবাকার মূলত মুসলিম লীগ – এই ধারার প্রডাক্ট বা ফসল। যে অর্থে আমেরিকায় জঙ্গিবাদ শব্দ ব্যবহার করা হয় সে অর্থে মুসলিম লীগ আর আলকায়েদা দুটোই ইসলামি হলেও  দুটোই একই ফেনোমেনা নয়। যেমন আবুবাকার তার গল্পে কোথাও সশস্ত্র পন্থার পক্ষে বলেনি। তা সত্ত্বেও তাকে কি আমরা ইসলামি মূল্যবোধের পক্ষেও কথা বলতে দেব না?  আবুবাকার এক রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাতে, এই “ইসলামিকরণে” যদি আমেরিকার গায়ে ফোস্কা পড়ে তাহলে, এই আমেরিকা লয়া আমরা কী করিব? ইহাকে কোথায় রাখিব?

শেষ পয়েন্ট : বলতে গেলে এই চলতি শতকে (২০০১ সালের পরে) আরও উপন্যাস লেখেন নাই। অর্থাৎ ৯/১১ এর পরে বাকার আর উপন্যাস লেখেননি। গত শতক ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামের। আর ইরানি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা বাদ রাখলে গত শতকে পোস্ট-কলোনি সময়কালের ইসলাম মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামই; এবং তা আবার ‘এ প্রডাক্ট অব মডার্নিটি’ অর্থে।

আবুবাকারের সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস “ফূটন্ত গোলাপ”। আমাদের দুর্ভাগ্য যে বিখাত সব আলোচকদের বেশীর ভাগই এই “ফূটন্ত গোলাপ” সহ কোন উপন্যাসই পড়ে দেখেন নাই। পড়লে দেখতেন এটা (মোটাদাগে ১৯০০ সালের পরে কলোনিয়াল কিন্তু হিন্দু ডমিনেটেড ) কলকাতা কেন্দ্রিক টিপিকাল মধ্যবিত্তের মডেল এর আলোকে লেখা কিন্তু ঢাকার মধ্যবিত্ত। বড়লোক নায়ক গুলসানের ও নায়িকা পুরান ঢাকার, দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। নায়িকার ফ্যামিলির মর্ডানসহ ইসলামি ভ্যালু দ্বারা পরিচালিত হতে অভ্যস্ত, আর নায়কের ফ্যামিলি মর্ডান কিন্তু নামাজ পড়তেও জানে না। এবং নায়িকার ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব যা লেখক ফুটিয়ের তুলেছেন সেজন্য কাশেম বিন আবুবাকার আপনি আমার সালাম নিবেন। বহু প্রগতিশীল এমন ব্যক্তিত্ব ধারে কাছে নয়।  লেখককে ইসলামি মরালিটির ক্ষমতা দেখাতে হবে সেজন্য তিনি লিখতে বসেছেন। ফলে এখানে আবুবাকারের মডেল হল নায়িকা লাঈলি। এই হল কলোনির হাত ধরে উঠে আসা চেনা আধুনিকতা যা কলোনি উত্তরকালের জাতীয়তাবাদ – যার প্রতীক হল মুসলীম লীগ। তা অবশ্যই আধুনিকতার ফসল। তবে উপরে পাঞ্চ করা ইসলামি মরালিটি। এই গল্প এই পরিবার আর ইসলামি ভ্যালু। মনে রাখতে হবে গত শতকে আমেরিকার সাথে ইসলামের (মানে জাতীয়তাবাদি কলোনি মর্ডানিজমের) কোনই সমস্যা নাই, ছিল না। তারা বন্ধু। এমনকি আফগান মুজাহিদ এরা একটু ভিন্ন তবুও  তারা আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু। এর বিপরীতে, একালে চলতি শতকের আলকায়েদার  নিজে কোনো আর অফ প্রডাক্ট অথবা বাই প্রডাক্ট হিসেবেও কোন জাতিবাদী ইসলাম ওটা নয়।
তাহলে আবুবাকার ও তাঁর প্রেমের উপন্যাসকেও আমেরিকা সহ্য করতে পাচ্ছে না কেন? উদ্বিগ্ন হচ্ছে কেন? আসলে এই সমস্যাটা আমেরিকার, আমাদের না। ফলে বলতেই হয়, আবুবাকারাকে নিয়ে যারা এসব উদ্বেগ-ওয়ালারা এরা হয় হেজিমনি হারানোর ভয়ে  ট্রমাটিক না হয় ধান্দাবাজ। কিন্তু মুল কথা এই “উদ্বেগ”  ভুল জায়গায় ‘নক’ করে বেড়াচ্ছে। ভুয়া সেকুলারদের গলা জড়িয়ে অস্হিরতায় কান্নাকাটির রোল তুলতে চাইছে।

তাহলে ব্যাপারটা  হল, একটা রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাও সহ্য করতে না পারছে না, আমেরিকা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, কেন? তাহলে আমাদেরই তো আমেরিকান জনপরিমণ্ডলের দিকে তাকাতে হবে, তাই তো না কী?

 সবশেষে পাঠকের কাছে একটা আবেদন রাখব, কাশেম বিন আবুবাকারের কোন একটা উপন্যাস অন্তত তার ফুটন্ত গোলাপ না পড়ে তাকে নিয়ে মন্তব্য করবেন না, অংশগ্রহণ করবেন না, কাউকে শুনবেনও না। এরপর নিজের মুল্যায়ন নিজে করেন। সেই মুল্যায়নের স্বপক্ষে তর্ক -বিতর্কের ঝড় তোলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ৩০ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

%d bloggers like this: