রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

রাষ্ট্র কোন পৌরসভা নয়

গৌতম দাস

০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2wC

 

 

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যেভাবেই হোক, শেষ হয়েছে। সেই সাথে শেষ হয়েছে এ নিয়ে ইতি বা নেতিবাচক বিভিন্ন উচ্ছ্বাসও। এই নির্বাচনে বিদেশী মিডিয়ার নজর পড়া যথেষ্টই ছিল বলা যায়। নির্বাচনি খবর সংগ্রহ করতে এসে তাদের তৎপরতা দেখা গিয়েছিল নির্বাচনের আগে-পরে মিলিয়ে মোট প্রায় দশ দিনের মত, যা এখন আস্তে আস্তে কমে আসছে বা নেই।

নির্বাচনের আগে বা ফল প্রকাশের পরে বিদেশী মিডিয়া বিশেষ করে যারা অর্থনীতি-ফোকাসের মিডিয়া যেমন, লন্ডন ইকোনমিস্ট বা আমেরিকার ব্লমবার্গ– এদের রিপোর্ট হল মুখ্যত জিডিপি-দেখা কেন্দ্রিক। আর এদের সাফাইয়ের সরল বয়ান কাঠামোটা হল – ‘বাংলাদেশের জিডিপি ভাল মানে, বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে, অতএব হাসিনা আবার জিতবে’, অথবা ‘জিতেছে’। এ ছাড়া  আরও যারা বাংলাদেশে নির্বাচনি ইস্যুতে এসেছিলেন এমন অন্যদের মধ্যে ছিল যেমন, লন্ডনের গার্ডিয়ান, আমেরিকার ভোয়া, গ্লোবাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স, দক্ষিণ ভারতের দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয় অথবা নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম ইত্যাদি- এরা সবাই অন্য যে বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে তা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের নাগরিক অধিকারহীনতার দুর্দশা। অর্থাৎ নাগরিক অধিকারের খবর নাই, জিনিষটাই অনুপস্থিত বা গায়েব। ফলে এর অনুষঙ্গ – গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা তথা বিরোধী দল বা সরকার-বিরোধীদের গায়েবি মামলা থেকে পালিয়ে বেড়ানো বা গ্রেফতার; অথবা কোনমতে নির্বাচনে থাকলেও  সমান সুযোগ না পাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ এরাই মূলত রাজনৈতিক দিক মুখ্য করে লেখা রিপোর্ট বা আসল রিপোর্ট করেছে।  যদিও এই দ্বিতীয় তালিকার মিডিয়াগুলোও তাদের দ্বিতীয় পয়েন্ট হিসাবে “ভাল জিডিপি” বিষয়টাকে সরকারের পুনর্বার জিতবার ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হিসাবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ কমবেশি সব বিদেশী মিডিয়া যে তর্কের চক্কর তৈরি করে রিপোর্ট লিখেছে তা পশ্চিমের ভাষায় বললে – ‘ডেমোক্রেসি বনাম ডেভেলপমেন্ট’- এর নির্বাচন। অর্থাৎ রাষ্ট্রে ‘নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার’ [Political Right] থাকাটা জরুরি নাকি ‘উন্নয়ন’ হলেই চলে – এভাবে তর্কটাকে হাজির করে এবার দাবি করা যে ‘উন্নয়নের’ কারণে হাসিনার জেতা উচিত বা জিতবে। এই হলো বয়ান।

খুবই চাতুরি তর্ক সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেক রূপে এই তর্কের হাজিরা অনেক পুরনো, সেই পাকিস্তান আমলের। আইয়ুব খানের শাসনের দশককে (১৯৫৮-৬৮) প্রশংসা আর সাফাই যোগান দিতে তখন যা বলা হত ওর সার কথা ছিল – পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে ঠিকমত কখনই ওর একটা কনস্টিটিউশন রচনা করতে ক্ষমতাসীনরা সক্ষমতা দেখাতে না পারলেও সেকালের শাসক আইয়ুব খান প্রচুর ‘উন্নয়ন’ করেছিলেন। সুতরাং আইয়ুবের শাসন জায়েজ। আর তাই ঢং করে বলা হত “আয়ুবি ডেভেলবমেন্ট ডিকেড”। পুরনো সেই তর্কটাই এবার আবার বাংলাদেশে ভেসে উঠেছে। কিন্তু কবে থেকে? অনেকে আবার সেটা খেয়াল করেনিই হয়ত।

ব্যাপারটা ঘটেছিল গত ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকার গড়ার পরে। আসলে সে সময় হাসিনার ওই “বিশেষ নির্বাচন ও সরকারের” পক্ষে একটা সাফাই যোগাড় ও খাড়া করে দেয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা দেয়ালে চিকা মারা দেখেছিলাম যে “হাসিনা হলেন বাংলাদেশের মাহাথির”। মাহাথির-এর নাম নেয়া এজন্য যে,যারা উন্নয়নের আড়ালে সব রাজনৈতিক দুর্বলতা ও খামতি ঢেকে ফেলতে দক্ষ তাঁরা বলেন মালয়েশিয়ার “উন্নয়নের” প্রতীক মাহাথির, তবে তাঁরা সাবধান থাকেন যাতে তা নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের নেতা বলে কেউ ভুলে না বুঝে। তবে বাংলাদেশে এবারের নির্বাচন শুরুর এক বছর আগে থেকেই উন্নয়নের স্লোগান দিয়েই হাসিনা আসন্ন ভোট বা পাবলিক মোকাবেলা বা তাঁর সমালোচনা মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।

সব জিনিসের বিকল্প হয় না, আমরা করি না। একটার বদলে অন্য একটা হলেও চলে এই অর্থে বিকল্প খুঁজি না বা সন্তুষ্ট হই না। মানুষের জীবন চাহিদায় এমন বহু কিছু বিষয় আছে। এ রকম বিষয়টা বুঝাতে ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে ‘নন-নিগোশিয়েবল’(non-negotiable)। মানুষের জীবনের যেসব বিষয়ের বিকল্প হয় না বলে মনে করা হয়, আমরা বিকল্প খুঁজিই না, সেগুলোই আসলে নন-নিগোশিয়েবল । যেমন ‘মায়ের ইজ্জত’ নিয়ে নিগোশিয়েশন চলে না, তাই এটা নন- নিগোশিয়েবল। ঠিক তেমন কোন রাষ্ট্রে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার বা মৌলিক মানবিক অধিকার একেবারেই  নন-নেগোশিয়েবল। কথাটার বইয়ের ভাষা থুয়ে, ব্যাপারটা আর ভেঙে বলা যাক। যেমন বলা হল – রাষ্ট্র আপনাকে পেট পুরে খেতে দেবে, চাকরি, আরামসহ আরো বহু কিছু দেবে এবং একদম নিশ্চয়তার সাথে। কিন্তু আপনি বেমালুম গুম, খুন হয়ে যেতে পারেন সে সম্ভাবনাও সাথে আছে; রাষ্ট্রের দিক থেকে এসব থেকে কোন সুরক্ষার নিশ্চয়তা নেই, প্রতিশ্রুতি নেই। এখন আপনি কি রাজি আছেন? এটাই উন্নয়ন দিয়ে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করা বা ভাবার প্রশ্ন। আসলে রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করে ফেলা যায় মনে করা আর এর বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নতিকে মুখ্য ও বিকল্প কাম্য মনে করা – এটাই ‘উন্নয়নের রাজনীতির’ ভাবনা। দুনিয়ার সব স্বৈর শাসকের কমন লক্ষণ এটা।

বস্তুত নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার নন-নেগোশিয়েবল। আমরা উন্নয়ন খেয়ে এর বিনিময়ে গুম-খুন হয়ে যেতে রাজি হতেই পারি না।  তাই এটা নেগোশিয়েবল বলে মনে করার সোজা মানে হল, আসলে আপনার রাষ্ট্রটাই নাই। কারণ রাষ্ট্র- এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য ও কাজ হল নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়া, বাস্তবে এই সুরক্ষা দেয়া, প্রতিরক্ষা বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র যদি তা না করতে পারে, না দেয় তাহলে সে রাষ্ট্র অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এর বদলে রাষ্ট্র হয়ে যায় তখন বড়জোর একটা পৌরসভা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনই পৌরসভা নয়। রাষ্ট্রের কাজ ও ভুমিকা – পানি বিদ্যুত ড্রেনেজ রাস্তা ইত্যাদির মত উন্নয়ন দেয়া নয়। সেকাজের জন্য একটা পৌরসভা বা মিউনিসিপাল্টিই যথেষ্ট। রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা, ইনসাফ দেয়া, সিরক্ষা এগুলোর নিশ্চিতের জন্যই মূলত আমাদের রাষ্ট্রগঠন নির্মাণ দরকার। তাই উন্নয়ন এর কথা বলা মানেই রাষ্ট্রকে পৌরসভায় নামিয়ে আনা। অথচ রাষ্ট্র [State] কোনভাবেই পৌরসভা নয়।

কাজেই কোনো দেশের নির্বাচনের আসরে এসে বিদেশী বা দেশী মিডিয়ায় সরকারের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার রেকর্ডের আলোচনাকে পেছনে ফেলা বা আড়াল করে ফেলাটা খুবই খারাপ ধরণের চাতু্রি। জেনে বা না জেনে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল বিষয় করে ফেলা – বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন বা জিডিপির ফিরিস্তি তোলার মিডিয়া রিপোর্ট – এটা সেই বিরাট চাতুরী। তারা অর্থনীতির মিডিয়ার লোক তাই রাজনীতি বোঝে না – এমন বুঝে নাই ভাব ধরে এরা পিঠে ছুরি মারে।
অথবা এই চাতুরী যেন উট আর বিড়ালের গল্প। যেমন একবার এক হাটে এক উট বিক্রেতা উটের দাম চাচ্ছে মাত্র এক টাকা। কিন্তু শর্ত হল ওই উটের সাথে একটা বিড়াল নিতেই হবে; যে বিড়ালের দাম পাঁচ লাখ টাকা।

এই ব্যাপারগুলো বিদেশী প্রভাবশালী মিডিয়াতেই বেশি হচ্ছে ও হয়ে থাকে। এর পেছনের মূল কারণ, এই মিডিয়াগুলো মূলত আমাদের মত দেশে দেখতে আসে বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের চোখ – এমন মিডিয়া হিসাবে। বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের পয়সাতেই তাদের আয় ও জীবিকা। তাই উন্নয়ন ও জিডিপি দিয়ে তাদের একটা নির্বাচন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার ঝোঁক দেখা যায়।
বাংলাদেশে নির্বাচন উপলক্ষে প্রকাশিত যাদের রিপোর্ট আমাদের নজরে এসেছে এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে অনেকে ব্লমবার্গকে (Bloomberg) মনে করেন। কারণ এই মিডিয়াটা “ওয়াল স্ট্রিট” ধরণের বিনিয়োগ কোম্পানীর সরাসরি মালিকানা বা বিনিয়োগ আছে। এবারের বাংলাদেশ নির্বাচনের আগে, তাদের রিপোর্টের সার কথাকে শুরুতে দেয়া দুই বুলেট বাক্য হল – ১. দ্রুত বেড়ে চলা অর্থনীতি হাসিনাকে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আনতে পারে। ২. বিরোধী নেতা জেলে বলে ভায়োলেন্স নতুন করে বাড়তে পারার শঙ্কা।

  • Fast-growing economy may propel Hasina to third term in power
  • Fears of fresh violence grow as opposition leaders jailed

অর্থাৎ এখানে সরাসরিই বলা হচ্ছে, রাজনীতিক অধিকারের দশা পরিস্থিতি নয়, জিডিপিই নির্বাচনে বিজয়ের একমাত্র নির্ণায়ক – এই আগাম অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে আবার বলে রাখা ভালো যে, ব্লমবার্গ- এই মিডিয়া গ্রুপ না হলেও অন্য অনেকে আবার অনেক সময় ‘পেজ-বিক্রি’ করার কারণেও এমন রিপোর্ট করে থাকে।

কিন্তু তবুও জিডিপিভিত্তিক আগাম অনুমানের এমন রিপোর্ট – যেটা দাবি করছে যে বাংলাদেশের জিডিপি ভাল এর মানে এটা হাসিনা মেলা উন্নয়ন করেছে তার প্রমাণ – একথা কী গ্রহণযোগ্য? সম্ভবত না।  এটাও যথেষ্ট সাফাই নয় বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ জিডিপি বাড়লেই তা সরকারের সাফল্য কি না, এর সপক্ষে ঐ রিপোর্টে সরাসরি কোনো সাফাই নাই। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতি    খুবই ব্যতিক্রমী ধরণের। তাই জিডিপি বাড়া মানেই তা সরকারের প্রত্যক্ষ সাফল্য এটা নাও হতে পারে। বাংলাদেশ  বিশেষ বৈশিষ্ট্যের তাই গতানুগতিক চোখে কেবল জিডিপির বাড়া-কমা দিয়ে সাফল্য মাপতে যাওয়া, হদিস করা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন, দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ১৭০ দিন হরতাল থাকলেও জিডিপিতে এর প্রভাব নেই। জিডিপি একই রকম থেকেছে।

যদিও এর সম্ভাব্য কারণ কী, এ নিয়ে কোনো ফরমাল স্টাডি নাই। তবুও এর সম্ভাব্য কারণ বলে যা অনুমান করা হয় সেই ফ্যাক্টরটা হল – রেমিট্যান্স। খুব কম দেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স এমন ফ্যাক্টর হয়ে থাকে। তাই এটা আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ বৈশিষ্ট বা ব্যতিক্রম। বিদেশে গরিব শ্রমিকের শ্রম বেচা অর্থ – বিদেশী মুদ্রা নিয়মিত আসে। এটা বলাই বাহুল্য, যে দেশের হরতালের সাথে এই আয়ের কম-বেশি হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই। এ ছাড়া আরেক গুরুত্বপর্ণ দিক হল, ৯০ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার আয় আসে গার্মেন্টস থেকে। এখন এর থেকে কাঁচামাল, মেশিনারিসহ ইত্যাদি্র বৈদেশিক মূল্য পরিশোধে বাদ দেয়ার পর যা নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় থাকে; দেখা যায় প্রতি বছর এর পরিমাণ যদি ১৪ বিলিয়ন ডলার হয়, তবে মোট রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও দেখা যায় আরও ১৪ বিলিয়ন ডলার, মানে প্রায় এর সমান। অর্থাৎ রেমিটেন্স আর রপ্তানি আয় প্রায় কাছাকাছি।

এখন যদি রপ্তানি আয়ের জন্য সরকারকে ক্রেডিট দেই তাহলে ঠিক আরও সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আয়ের অবদানের জন্য তো কাউকে ক্রেডিট দিতে হয়! অথচ ফ্যাক্টস হল,  রেমিট্যান্স আয় লাভের সাথে সরকারের পারফরমেন্স খুব কিছু সম্পর্ক নাই। মূলত এ কারণেই আমাদের অর্থনীতিকে বলা হয় রুটিন অর্থনীতি, মানে বিশেষ সরকারের খুবই বিশেষ ভূমিকা এখানে থাকে না। বিদেশি সাংবাদিকেরা এসব দিক আমল না করে যেকোনো দেশের মত শুধু জিডিপি দেখে ধারণা বা অর্থনীতি বুঝতে চাওয়া তাৎপর্যহীন। তবে কোন মিডিয়া রিপোর্ট যদি জিডিপি ফিগারকে দেখিয়ে তা সরকারের প্রত্যক্ষ পারফরমেন্স বলে দাবি করতেই চায়, সে ক্ষেত্রে তাকে সবার আগে – সম্পর্ক বা প্রমাণ দেখাতে হবে যে সরকারের অমুক বিশেষ নীতি-পলিসি-পদক্ষেপের কারণে জিডিপি বেড়েছে। এমন দেখানোর আগে কোন দাবি হবে অমূলক ভিত্তিহীন। আমরা কোথাও এমন প্রমাণ এখনও দেখি নাই। তাই জিডিপি বৃদ্ধিকে সরকারের পারফরমেন্স এর সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করা ভিত্তিহীন।

তাই সার কথাটা দাড়াচ্ছে, জিডিপি বা উন্নয়নের সাফাই দিয়ে বিদেশি মিডিয়ার নির্বাচনী রিপোর্ট- এগুলো সারবত্তাহীন প্রপাগান্ডা; কোন ভিত্তি প্রতিষ্ঠা আগে না করে করা উড়া দাবি মাত্র।

সবশেষঃ
এক বিরাট স্ববিরোধী বিষয় আমরা দেখেছি লন্ডন ইকোনমিস্ট গ্রুপের ইকোনমিস্ট ইকোনমিক গ্রুপের ফলাফল প্রেডিকশন। বোঝাই যাচ্ছিল এটা পেজ বিক্রি ধরণের কান্ড। তবে নির্বাচনের পরে সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার রিপোর্টই এর সাক্ষ্য বা প্রমাণ। এই রিপোর্টে কি ধরণের নির্বাচন হয়েছে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সারকথায়, ইকোনমিস্ট গ্রুপের এক মিডিয়া অপর মিডিয়ার বক্তব্যকে নাকচ করেছে, স্ববিরোধী ফাইন্ডিং হাজির করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৫ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিদেশী মিডিয়ার নির্বাচনী কাভারেজ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

গৌতম দাস

১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wo

 

[সার-কথাঃ বুদ্ধিজীবিতা করতে গেলে চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। এটা প্রি-রিকুইজিট বা আগাম শর্ত। পেটের স্বার্থ তীব্র হয়ে গেলে অথবা আপনি নিজেই পেটসর্বস্ব চিন্তাবিদ হয়ে গেলে বুদ্ধিজীবিতা আর আপনার জন্য নয়। কারণ আপনার চিন্তার আর স্বাধীন হবার সুযোগ নাই। পেটের-স্বার্থ চিন্তার উপর আধিপত্য নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে ভারতের সরকার অথবা প্রাক্তন কূটনীতিক বা বুদ্ধিবৃত্তি জগতের কেউ কোনদিন কোন মুল্যবোধ নীতি-নৈতিকতার উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে নাই। নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বা জাতিসংঘের গৃহীত মুল্যবোধের উপরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারলে ভারতের সেসব কথা আন্ডার-স্টেটমেন্ট বা নিম্নতলের খাটো-কথা হয়েই থেকে যাবে; পেটসর্বস্ব কথা যাকে বলে।]

এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় (MEA) কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ঐ অনুষ্ঠান ছিল নিয়মিত ব্রিফিং, বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ কোনো কিছু নয়। বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোয় ৬ ডিসেম্বর তাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি প্রেরিত এমন রিপোর্টে এটা  ছাপা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “এর আগে নানা সময় বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের ভোট নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগ্রহ দেখিয়েছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র রবীশ কুমার এড়িয়ে যান”।

তার মানে, ভারত অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করে না এমন নয়; করেই থাকে এবং সেটা এখানেও তারা অস্বীকার করে নাই। তার পরও কোনো মন্তব্য করেননি মুখপাত্র। কিন্তু তবুও যে কথার অর্থ হয় না, কথার কথা – এমন কথা হিসেবে বলেছেন, “বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না, প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”।

গত ১৭ নভেম্বর প্রথম আলোতে এমনই আর এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা ছিল মূলত একই প্রতিনিধিরই নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে নেয়া কিছু মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াসংবলিত একটি রিপোর্ট। আর সেই মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াদাতা ছিলেন ভারতের কিছু সাবেক এবং বর্তমান রাষ্ট্রদূতও। এ ছাড়া, আরো ছিলেন এক থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব।

১৭ নভেম্বরের রিপোর্ট লিখার আগে বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সাথে সরাসরি সে প্রতিনিধির কথা হয়নি। তবে অন্য কোথাও তিনি যেসব কথা বলেছেন, এমন রেফারেন্সে কিছু কথা সেখানে আছে। যেমন – বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এটা দেখে নাকি ভারত “উৎফুল্ল”। এছাড়া, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও তারা মনে করেন, “সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে ঠিক সময়েই ভোট হবে এবং সেই ভোট হবে “অংশগ্রহণমূলক”; বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকবে” ইত্যাদি।

কিন্তু ঘটনা হল, আমাদের নির্বাচন নিয়ে ভারতের এ’ধরনের প্রতিক্রিয়া পড়তে গিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হল, আমাদের কোনো ইস্যুতে ভারতের “সরকারি অবস্থান” অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট (Intellect) বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কখনোই কোনো “নীতিগত অবস্থানে” অথবা কোনো “মরালের” ওপর দাঁড়িয়ে তারা বলছেন – তা আমরা সাধারণত দেখিনা।

তাদের মন্তব্যগুলো অনেকটা – “মেরা ভারত মহান হ্যায়” ধরনের “জাতিবাদী দেশপ্রেমিকে” (State Interest) বক্তব্যের মত। যেকোন জাতিবাদী শ্লোগান কখনই কোন নৈতিকতা বা নীতির উপর দাঁড়াতেই পারে না যেটা অন্য রাষ্ট্রস্বার্থের ক্ষেত্রেও কাজ করবে, মানে কমন। এজন্য বলা হয় জাতিবাদী শ্লোগান মাত্রই এমন যে, তা সব সময় কোন কমন মরালিটি-ভিত্তিক হয় না। ফলে তা ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম’ সর্বস্ব বক্তব্য। আর যা ভারতের ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিকতা’ সর্বস্ব, তাতে ভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশের কী স্বার্থ? তাই এর সোজা মানে, এগুলা ভারতের সরাসরি একান্ত স্বার্থের দিক থেকে বলা কথা। অর্থাৎ কমন ইন্টেলেক্ট ভ্যালুজ বা “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” – এর ওপর দাঁড়িয়ে বলা কোনো কথা নয়। ভারতের সরকারী অবস্থান বা কোন  ইন্টেলেক্ট বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কোন “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” দাঁড়াতে এখনও কোনদিন পারে নাই। শিখেনি বা পারেনি।

আসলে নীতিগত অবস্থানের উপরে দাঁড়ানো মানে কী? এর মানে হল, এমন এক অবস্থান যার পেছনে কিছু ভ্যালুজ বা মূল্যবোধ বা মরাল কাজ করে আছে। আর “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধ” বলতে যেমন – যেকোন রাষ্ট্রের নাগরিক মৌলিক স্বার্থ (Human values) বা আন্তর্জাতিক মানবিক নাগরিক অধিকার (Civil & political Right)। সব রাষ্ট্রেরই করণীয় ‘নাগরিক অধিকার রক্ষার’ ন্যূনতম কর্তব্য আছে। সেকারণে চাইলে সহজেই, চেষ্টা করলে যেকোনো দু’টি রাষ্ট্রের “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধের” কিছু ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু  উলটা দিকে – এর অনুপস্থিতি মানে, কমন কোন ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে বলা কথা যদি না-ই থাকে, তবে ভারতের সরকারি অবস্থান অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট বা সাবেক কূটনীতিকসহ যে কারো মন্তব্যের কোনো অর্থ-তাৎপর্য বা ভিত্তি থাকে না। যেমন – বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘নাগরিকদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার অধিকার’ থাকতে হবে। এটা মানার মত কী ভারতের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সত্যিই কী আছেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না!

সব রাষ্ট্রেরই কৌশলগত নানা স্বার্থ থাকে, যার ফলে সব সময় সত্যি কথাটা সরাসরি বলতে পারে না। তবে মিথ্যা না বলে, মানে সত্য-মিথ্যার মাঝখানে নিজ অবস্থান অস্পষ্ট, রেখে কথা বলার ধরণ, এটাই যেন কূটনৈতিক ভাষার এক বড় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ তো গেল রাষ্ট্রীয় অবস্থান; তাহলে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তি যিনি সরকারি পদে নেই, তার কোন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারার কোন কারণ নাই। আর এই না পারাটা অগ্রহণযোগ্য। বরং এতে তিনি আসলে একরকম করুণার পাত্র হয়ে যান। আর সোজা ভাষায় বললে তা হয়ে দাঁড়ায় – পেটসর্বস্ব এক লোকের অযাচিত বা গায়ে পড়া কিছু কথা। এর চেয়ে বড় কথা, এতে তাঁর ধান্ধাবাজি ও পেটিস্বার্থের দিকটিও উদোম হয়ে যায়। তবে আমাদের অবজারভেশন বলে, ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান অথবা সরকারি শুভ-দৃষ্টিপ্রাপ্ত থিঙ্কট্যাঙ্কে নিয়োজিত হয়েছেন। খুব সম্ভবত চাকরি শেষের এই নিয়োগের স্বার্থেই তাদের কোন স্বাধীন অবস্থান আমরা দেখি নাই। সারা জীবন দল নির্বিশেষে ‘সরকারি অবস্থানের’ তাবেদারি করতে থাকেন। অতএব এটা পেট সর্বস্ব অবস্থান বলতে পারি, তাই কোন নীতিগত অবস্থানের কোন সুযোগ নাই।

একথা সত্য, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ (State Interest) জিনিসটার গুঢ় দিকটা অনেক সময় মরালিটি দিয়ে গঠিত ও উদ্ভূত হয় না। তাই অনেকের কাছে তা রক্ষা করা কঠিন। এর পরও রাষ্ট্র-সরকারের নীতি-পলিসিগত কিছু ন্যূনতম দিক সেখানে থাকে। চাইলে তা রাখাও সম্ভব; আর তা বজায় রাখতেও হবে যদি নুন্যতম কিছু মৌলিক নীতি নৈতিকতা মেনে চলতে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন। কিন্তু এই মাপকাঠিতে ব্যক্তির, বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়িতদের বেলায় এমন ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে না। সে সুযোগও থাকার কথা নয়।

আবার ‘রাষ্ট্রস্বার্থ’ বলেই তার ক্ষেত্রে সব ছাড়, ব্যাপারটা তেমনও নয়। বাংলাদেশে দিল্লির স্বার্থ আছে, থাকবে। কিন্তু অবশ্যই সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিষয়ক ন্যূনতম কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এরপর সেই স্বার্থ প্রকাশিত হতে  হবে। জাতিসঙ্ঘের বা আন্তর্জাতিক নীতি কনভেনশনের কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার হতে হবে এসবের ভিত্তি। আসলে এমন ভিত্তির ওপর যদি দাঁড়াতে পারি, তবে সেই কারণে আপনাতেই সেখান থেকে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে মন্তব্য করার ভিত্তি ও সাফাই তৈরি হতে পারে। কারণ, উভয় রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের পক্ষের কিছু নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অভিন্নতা, এটাই সেই ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে।

যেমন – “জনগণের ভোট দেয়ার সুযোগ অবাধ হতে হবে”। আর সেই অবাধে দেয়া ভোট থেকেই “একমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতার ম্যান্ডেট প্রাপ্ত” বলে কোন দল বিবেচিত হতে পারে – এটা একটা কমন মুল্যবোধের ভিত্তি হতে পারে। কারণ এই কথাটা কেবল বাংলাদেশের বেলায় নয়, ভারত ত বটেই যেকোন রাষ্ট্রের বেলায়ও সমান ভাবে সত্য। আর এটা যেকোন মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। অতএব এটা হতে পারে  অভিন্ন নৈতিকতা বা মূল্যবোধ। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থ এমনই “দুস্থঃ আর হাভাতে” অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের “ভোট দেয়ার অধিকার”- ন্যূনতম এ দিকটি উপেক্ষা করে হলেও যেকোন উপায়ে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধার করতে হয়! ভারত এমনই দুস্থঃ! এমন জায়গায় পৌঁছে গেছেন ভারতের নীতিনির্ধারক মহল।

গত সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশে আসা আর তাঁর খোলাখুলি হস্তক্ষেপ, এখনও এক রেকর্ড হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, “সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দল নিয়ে” মানে, বিএনপির জোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া এরশাদের সাথে মিটিংয়ে সুজাতা এরশাদকে নির্বাচনে  যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা এরশাদ গণমাধ্যমে প্রকাশও করে দিয়েছিলেন। এরশাদ বলেছিলেন, তাকে ‘পাতানো’ বিরোধী দল হয়ে যেতে বলা হচ্ছে, তা না হলে নাকি ‘বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায়’ এসে যাবে।

আমরা সবাই বিস্ময়ে লক্ষ করেছি সুজাতার সে হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের কোনো বুদ্ধিজীবী, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কেউ কখনো নিন্দা বা সমালোচনা করেননি। নিজেরা লজ্জিত ও বিব্রতও হননি। অন্তত ভারত-সরকারের এই ভূমিকার প্রশ্নে তাদের কোনো ভিন্ন মত আছে, এমনটি দেখা যায়নি। এই হল ভারতের বুদ্ধিজীবীতা!

বাংলাদেশে আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসেছে। আর তাঁরা এই নির্বাচন নিয়ে আবার মন্তব্য করতে এসেছেন। রাষ্ট্র, নির্বাচন, সরকার ইত্যাদি বিষয়ে তারা কী বলবেন? কাকে ভালো, কাকে মন্দ বলবেন? কিসের ভিত্তিতে বলবেন? ভারতের ইন্টেলেক্ট, সাবেক ডিপ্লোম্যাট বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কখনোই যে ভিত্তি তৈরি করা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেননি! এটা তো তাই একধরনের পেটসর্বস্ব বা স্বার্থসর্বস্ব হয়েই আছে সব কিছুতে। এ অবস্থায় এবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”- তখন এই অট্টহাসি দেয়া ছাড়া আর কী করা যায়!  স্বভাবতই এগুলো হাস্যকর ‘অনর্থক কথা’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং হতে থাকবে।

কিন্তু তবু ঘটনার আর এক ভিন্ন সুক্ষ্ম কোণও সম্ভবত আছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমারের এবারের মন্তব্য করতে না চাওয়া – এরও অর্থ আছে অবশ্যই; তাহলে সেটাই বা কী? যে অর্থ না লিখলেও প্রকাশিত হয়ে যায়, সেই অর্থটা কী? এর সোজা অর্থ হল, বাংলাদেশে যা হচ্ছে, এ পর্যন্ত সেটাই ঠিকঠাক; অর্থাৎ যা যা হবে বলে তারা জেনেছে সেটিই ভারতের স্বার্থ ও অবস্থান এর পক্ষেই আছে। দ্বিতীয়ত, এর আর এক অর্থ হল – খুব সম্ভবত ভারত মনে করে এবারের নির্বাচন নিয়ে যদি ভারত প্রকাশ্যে তার “অনুমোদনের কথা” ২০১৪ সালের নির্বাচনের মত প্রকাশ করে ফেলে, তবে সমস্যা হবে। অবশ্যই মূল কারণ এবার বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। যেকোন ভাবে আওয়ামী লীগ আবার জিতেছে এটা দেখতে চাওয়া – এটা তাদের প্রথম চয়েজ বা কাম্য হলেও যদি কোন কারণে প্রধান বিরোধী “জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট” কোনো ‘বিপর্যয়’ ঘটিয়ে ফেলে, তখন কী হবে? এই দুশ্চিন্তা থেকেই সম্ভবত, মূলত তাদের এইসব “অনর্থক কথা” বলে রাখা। এমন অর্থই রবীশ কুমারের ‘না বলা কথা’ প্রকাশ করেছে।

বোঝা যাচ্ছে, ভারত সরকারের মুখপাত্র অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবাই এখনও এমনই কঠিনভাবেই দুস্থ-হাভাতে অবস্থায় আছেন যে, তাদের পক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক ভোটের অধিকার প্রসঙ্গে কোনো নৈতিক অবস্থান নেয়া অসম্ভব। এ কারণেই ভারতের সরকার বা কোনো ইন্টেলেক্টের বিবৃতি-মন্তব্যের কোনো গুরুত্ব তাদের কাছেও নেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “পেটসর্বস্ব বুদ্ধিজীবিতা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

গৌতম দাস

০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2we

 

 

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

শেষ কথাঃ
কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

গৌতম দাস || Wednesday 27 June 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tI

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা প্রথম পর্ব।]

ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন শেষ হবার পর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ২৫ জুন সন্ধ্যায় ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহম্মদ মোরসিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবু দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সব জায়গায় মূল আলোচনার বিষয় মোরসির ক্ষমতা কি কি, কত দিনের প্রেসিডেন্ট, কি তাঁর কাজ এবং কাজের সীমা ইত্যাদি। কোন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) বলতে প্রচলিত যে ধারণা দুনিয়ায় আছে সেই রকম একটা ভাবের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলতে দুনিয়াতে প্রচলিত ভাবটা কে কি বুঝে তা দিয়ে কোন কাজ চলতে পারে না, বরং ঐ সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট-এর মানে কি, কি তাঁর ক্ষমতা, কোনটা তার নয়, কতদিনের জন্য ক্ষমতা ইত্যাদি স্পষ্ট করে বলা থাকতে হয়। তা বলা থাকতে হয় কনষ্টিটিউশনে এবং নির্বাচনের আয়োজন শুরুরও আগেই । একটা কনষ্টিটিউশন কোন রাষ্ট্রের থাকার মানে হল ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক-জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত (কনষ্টিটিউটেড) হয়েছে; এভাবে হলে, হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে রাষ্ট্র বলা চলে। অন্যভাবে বললে জনগণ রাজনৈতিকভাবে কনষ্টিটিউটেড হওয়া আর রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যাওয়া একই কথা। আর সেই সাথে জনগণ কিসের ভিত্তিতে একত্র হলো, কনষ্টিটিউটেড হলো সেই ভিত্তি – জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার কোন ভিত্তি – সেকথার লিখিত দলিলটা হলো কনষ্টিটিউশন। ঐ কনষ্টিটিউশনে বলে দেয়া থাকে, রাষ্ট্র যে পরিচালনার করবে সেই নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাজ, ক্ষমতা কি, কতদিনের, রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা হবে ইত্যাদি। এরপর সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনস্ততা মেনে রাষ্ট্রের বাকি সমস্ত  প্রতিষ্ঠান এমনকি খোদ নির্বাহী প্রধান, পার্লামেন্ট অথবা বিচার বিভাগ সবাই আনুগত্য প্রকাশ করেই একমাত্র তারা যার যা ভুমিকা পালন করতে পারে। ফলে রাষ্ট্র দৃশ্যমান হয়। খেয়াল রাখতে হবে আমি রাষ্ট্রের কথা বলছি, দেশ না। দেশ বলতে ওর মাটি সীমানা মানুষ ইত্যাদি সবই থাকতে পারে – এতে দেশ হয়ে থাকলেও তা রাষ্ট্র নাও হতে পারে। সোমালিয়া একটা দেশ বটে কিন্তু রাষ্ট্র নয় সেটা। আবার কোন দেশ একই থাকে কিন্তু ওর রাষ্ট্র আবার কনষ্টিটিউট বা গঠন করে নেবার দরকার হতে পারে। দরকারের মূল কারণ, পুরানা রাষ্ট্র আর জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না তাই। রাজনৈতিক শব্দে একে কোন দেশের নতুন করে রিপাবলিক গড়া বলে। আবার অনেকের মনে হতে পারে এতক্ষণ রাষ্ট্র বা রিপাবলিক (গণ)রাষ্ট্র বলতে আমি বোধহয় আগাম ধরেই নিয়েছি যে আমি “গণতন্ত্র” ধরনের রাষ্ট্রের কথাই বলছি। না আমি তা বলছি না। আমি  রাষ্ট্রের কথা বলছি, রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। এই রাষ্ট্র ইসলামি, কমিউনিষ্ট, লিবারেল ইত্যাদি অথবা এসবেরও বাইরে নতুন কোন রাষ্ট্র হতে পারে। আর এসব রাষ্ট্র শব্দের আগে বিশেষণে রিপাবলিক কথাটা যোগ করেছি এজন্য যে এটা অন্তত রাজা, বাদশা সম্রাটের রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য নয়; এসবের বিপরীতে জনগণের কর্তৃত্বের রাষ্ট্র কেবল সেটা পরিস্কার রাখার জন্য।

  • ইজিপ্টের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রের কোন কনষ্টিটিউশন বর্তমানে নাই।  মোবারকের পুরানা কনষ্টিটিউশন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর, পার্লামেন্ট বসার আগে এবং SCAF (সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স)-এর ঘোষণায় নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতার জোরে ।
  • এর মানে ইজিপ্ট একটা অন্তর্বতীকালিন বা মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে, পুরানা রাষ্ট্র নাই আবার নতুন রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা হয়নি – এদুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা।
  • তাহলে নতুন কোন কনষ্টিটিউশনের আগেই একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইজিপ্টে ঘটেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ীর মত। আবার এর আগে একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত এপ্রিলে; ব্রাদারহুড যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়েছে। সাথে ইসলামি সালাফি রাজনীতির নূর পার্টি (২৫%) মিলিয়ে মোট ৫৪% আসন এই দুই ইসলামী ব্যকগ্রাউন্ডের রাজনীতিক দলের হাতে। সাধারণভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচন মানে আগাম একটা কনষ্টিটিউশন আছে; সে কনষ্টিটিউশনের অধীনে সীমায় থেকে প্রতিদিনের নানান প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ওর কাজ। কিন্তু ইজিপ্টের বিশেষ ক্ষেত্রে নামে বলা হচ্ছে এটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট কিন্তু এর কাজ হবে একটা কনষ্টিটিউশন খাড়া করা। কিন্তু তাও আবার সরাসরি নয়। পার্লামেন্টের দ্বারা একশ মনোনিত (নির্বাচিত নয়) সদস্যের এক কমিটি ইজিপ্ট রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন (খসড়া বা প্রস্তাবিত) খাড়া করবে। যেটা পরে হয়ত পার্লামেন্ট পাশ বা অনুমোদন করলেই হবে; অথবা আবার গণভোটে দেয়া হবে।(“হয়ত” বলে আমাকে বাক্য লিখতে হচ্ছে এজন্য যে এগুলোর কোনটাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে পরিস্কার করা হয় নাই।) কিন্তু তাই যদি হয় তবে পুরানা বা নতুন কোন কনষ্টিটিউশনই না থাকা অবস্থায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের কাজ, উদ্দেশ্য লক্ষ্য কী? কেনই বা কথাটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট বলা হচ্ছে; যেখানে হবার কথা একটা কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বী (কনষ্টিটিউশন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সভা) বা আমাদের বাংলায় সমতুল্য প্রতিশব্দ ‘গণ পরিষদ’; ফলে ঠিক পার্লামেন্ট মেম্বার বা নির্বাচন নয়, বরং গণ পরিষদের সদস্য কে হবেন তাঁর নির্বাচন – এটাই হবার কথা। এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনেরও আগের কাজ। প্রথম কাজ কনষ্টিটিউশন বা রাষ্ট্র গঠন – জনগণের কনষ্টিটিউটেড হওয়া – সেটা ঘটানো। এরপর ঐ কনষ্টিটিউশনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে বড় ধরনের এক গোজামিল এখানে চলছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উপরে বারবার দেখিয়েছি কোন কিছুই স্পষ্ট না করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আওয়াজে ঘটনা চলছে। এমনকি ঐ একশজন কারা কিভাবে মনোনিত হবেন তাও স্পষ্ট করে রাখা হয় নাই। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ঐ পার্লামেন্ট এনিয়ে বিরোধ মীমাংসা শেষ করতে না পেরে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। ব্রাদারহুড সালাফি বাদে সমাজের বাকি সবাই পার্লামেন্ট থুয়ে আবার তাহরির স্কয়ারমুখী জমায়েত হয়। এই অবস্থা অবশ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগেও হয়েছিল। নির্বাচন বর্জনের ডাক এসেছিল। কিন্তু এর ভিতরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘটেছিল। আর পরে দেখলাম পার্লামেন্টের বিরোধ মীমাংসা যখন হলো না তখন ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে যাওয়ায় সবাই তাতেই মত্ত হয়ে গেল এই ভেবে যে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা দিয়েই তারা সব বিরোধের মীমাংসা করে নিবেন।

গণ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বা যেকোন বিপ্লব সফল করতে গেলে কনষ্টিটিউশন থাকা আর না থাকার মাঝের অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার হাতে থাকছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় সব কিছুর নির্ধারক এবং লক্ষণও বটে। র‍্যাডিকাল কোন পরিবর্তন বিপ্লবের ভাব তুলে এর বদলে তা উদারতাবাদী লোক দেখানো কোন ঘটনা হিসাবে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়ে যাবে কি না তা সহজে বুঝবার উপায় হলো অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতাটার দিকে লক্ষ্য রাখা। উপরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের নামে তামাশা আর পরে একইভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের নামে যে রহস্য ইজিপ্টের আমরা দেখছি – মোরসি নির্বাচিত এটা জানার পরও সাথে সাথে যে প্রশ্ন উঠছে যে তাঁর ক্ষমতা কি কি, আর সমানে পিছন থেকে SCAF সমানে প্রম্পট করছে, এক এক সময় এক এক ভাবে ফরমান জারি করে প্রেসিডেন্টকেই সাইজ করছে – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার এটা কত গুরুত্বপূর্ণ, সেন্ট্রাল পয়েন্ট। কিন্তু SCAF কিভাবে কেন অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা হয়ে গেল? এরমানে আরব জাগরণ আন্দোলন বা বিপ্লবের আওয়াজই কি  SCAF কে ক্ষমতায় আনে নাই? ঘটনা ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু এই সত্যি ঘটনা ঘটতে পারল কেন? কেন এমন হলো, এদিকটা এখন বুঝাবুঝির দিকে যাব।

ইজিপ্টের ঘটনায় মূল তিন প্লেয়ার – ১) SCAF, ২) স্থানীয় ব্রাদারহুড আর ৩)পশ্চিমের লিবারেল ইসলাম (RAND প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ধারা)। এর বাইরে সেকুলার, কমিউনিষ্ট বা লিবারেল ধারার ছোট টুকরা যারা আছে এরা ঠিক গোনায় ধরা প্লেয়ার হতে পারেনি তাই এদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা না করে তাহরিরের মাঠের সাধারণ গণ আন্দোলনের কর্মীদের ভিতরে ধরেছি, সবমিলিয়ে যারা চতুর্থ ধারা বলতে পারি।

[এই লেখাটা শুরু করেছিলাম ১৬-১৭ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে। লেখার প্রসঙ্গ ক্রমশ বিস্তার হতে থাকে কারণ, যেটাকে গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম বলছি – এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টরটা কোথাও আলোচনা হতে দেখিনি। “আরব স্প্রিং” বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম জিনিষটা কি কেন, এর প্রভাবে ইজিপ্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সম্পর্কটা কি এটা বাদ  রেখেই সব আলোচনা চলছে। মিডিয়াগুলোর ফোকাস হলো ব্রাদারহুড ইসলাম নিয়ে তেড়ে আসছে এবার কপটিক খ্রীশ্চানদের কি দশা ঘটে এটাই যেন মূল বিষয়। অথচ তুলনায় এটা সবচেয়ে তুচ্ছ দিক। ফলে কেন তুচ্ছ বলছি সেকথাগুলো ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে লেখা শেষ করতে পারিনি। এদিকে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। এই দেখে ঐ ২৫ তারিখেই ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে তাড়াহুড়া তবে আলাদা করে “কয়েক ঘন্টা পর ইজিপ্ট – কি ঘটতে পারে? কি হতে যাচ্ছে?” শিরোনামে লেখাটা দিয়ে দেই। এখন মুল লেখাটা আবার সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, কয়েক পর্বে। ]

 

বিপ্লবী রাজনীতি না উদারবাদী রাজনীতি

কোন গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে, বিপ্লব সফল করতে গেলে পুলিশ-মিলিটারীর মার নির্যাতন সহ্য করা, অঙ্গ হারানো, নিহত বা গুম হয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে দমনের সব পথ মোকাবিলায় পাড়ি দিয়েই একমাত্র সেটা ঘটতে পারে—এটা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু কোন প্রতিরোধ আন্দোলন সেটা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব হলো বা হবে কি না, পৌছাবে কি না তা – কতটা মাত্রার দমন নির্যাতন সহ্য করা হয়েছে তা মেপে ঠিক হয় না; বলা ভাল নির্যাতনের মাত্রা আর বিপ্লব – এদুটোর আসলে কোন সম্পর্কই নাই, সম্পর্ক আছে মনে করে কোন মনবুঝ দেয়াটাও বেকুবি, নিজেকে ধোকা দেয়া। বাংলাদেশেও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা ১৯৯০ সালে নিজেদের সাথে এমন ধোকাবাজি করেছিল, দাবি করেছিল প্রেসক্লাবের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে তারা নাকি এক গণঅভ্যুত্থান করে ফেলেছিল। ইজিপ্টের আরব জাগরণের বিপ্লবীরা একই সমস্যায় পড়েছে। গত আঠারো মাস ধরে আন্দোলনে তাদেরও ধারণা হয়েছিল তারা বিপ্লবের স্বাদ পেয়েছে, নিচ্ছে। আজ (১৬-১৭ জুন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড মানে রান-অফ চলছে। দুমাস আগের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (সামরিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত এক ধরণের কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট) “অবৈধ” ঘোষণায় ভেঙ্গে দিয়েছে ঠিক এর দুদিন আগে ১৪ জুন। দিন দশেক আগে ঐ একই আদালত (প্রায় একই বিচারকেরা তবে কোর্টের নাম আলাদা) হোসেনী মুবারক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ছয়জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ৮০০ এর মত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগ থেকে “প্রমাণাভাবে” তাদের খালাস বলে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ এই ৮০০ জনকে কারা মেরেছে, কাদের হুকুমে পুলিশ গুলি ছুড়েছে তা আইনের চোখে আন-আইডেনটিফায়েড”, তাই বেকসুর খালাস। কিন্তু সাথে এক তামাশা আছে এখানে। ঐ ৮০০ জনকে হত্যা রাষ্ট্র কেন প্রটেক্ট করতে পারেনি এই অভিযোগে কেবল প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। এর আগে এতদিন ইজিপ্টের বিপ্লবী তরুণেরা খুশিতেই ছিল বিপ্লবের কিছু একটা হচ্ছে মনে করে। বিপ্লব প্রায় শেষ মনে করে, বিপ্লবের গাথা লিখাতেও তারা উদ্যোগী হয়ে গিয়েছিল। গান ছড়া, কার্টুন ডকুমেন্টারীতে সমাজ সয়লাব হচ্ছিল, যেমন হয়। কিন্তু এই রায়ের পরেই কেবল তারা প্রথম টের পাওয়া শুরু করে যে তারা প্রতারিত, ঠকেছে তারা। সবকিছু হাতছাড়া তাদের, আঙ্গুলের ফাঁক গলে সব বেরিয়ে গেছে। কবে কিভাবে বের হয়ে গেছে টেরও পায়নি। এতদিন খুশিতে আশা ভরশায় বুঁদ হয়ে মগ্ন থাকছিল আর ভেবে ছিল মোবারক আর তার সঙ্গী সাগরেদদের বিচার হচ্ছে, হবে। আসলে তরুণ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদেরই ঠকিয়েছে; কারণ বিপ্লব কি, কি করে বুঝা যায় বিপ্লব হচ্ছে কি না, হবে কি না সে সম্পর্কে তাদের ভাবনা কত নাদান সে খবর রাখতে চায়নি। প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের নির্যাতন কম হয় নাই, ৮০০-৯০০ এর মত বিপ্লবী মারা গেছে এই ১৮ মাসে, ফলে অনুমান করে নেয়া যায় নিহতের সাথে আহত পঙ্গু হয়ে যাবার সংখ্যাটাও অনুপাতে কত হতে পারে এবং যারা নির্যাতনে ট্রমাটাইজ মানসিক বিকলাঙ্গ সদমা নিয়ে আছেন হয়েছেন এই সংখ্যাটাও। ফলে পুরা সমাজে উথাল পাথাল করা ১৮ মাসের এই আন্দোলন সংগ্রাম মানে সামাজিকভাবে গণ-মনকে ঝাকুনি দেয়ার ঘটনা এটা। এতেও ঝাকুনি খায়নি বাইরে রয়ে গেছে  এমন লোকজন সমাজে খুব কমই অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি নির্যাতন হত-নিহত হওয়া আর সবার উপরে সামাজিক ঝড়ের প্রভাব আন্দোলিত হয়ে যাওয়া এর সব শর্তই এখানে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এত কিছুর পরও সবাই টের পাচ্ছে এটা বিপ্লব হয় নাই; বিপ্লবের দেখা নাই। আর তরুণেরা সেটা টের পাচ্ছে এখন। এখানে তরুণ বলতে সবাই, এককথায় সামরিক কাউন্সিল SCAF বাদে রাজনৈতিক কমিউনিটি, সমাজের সব অংশে সব দল মতের সব জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বুঝিয়েছি। বিপ্লব যে ঘটেনি এটা আমি এখানে বলছি বলে না, ইজিপ্টের সবার মুখে আর মনের অনুভবের কথা, কারও বুঝতে বাকি নাই। সারা রাজনৈতিক কমিউনিটি হতাশ শুধু নয়,  নতুন করে সমাগত নির্যাতন নিপীড়নের দিন আবার ফিরে আসছে এটা ভেবে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেটা সবার আগে ঘটে রাজনৈতিক পাড়ায় পরস্পরকে ব্যর্থতায় দোষারোপ করা, বিভক্তি বড় হওয়া, যা আগেও ছিল এখন তা আরও বড় হতেও শুরু করেছে।

তাহলে মূল কথাটা, ব্যাপারটা কি এই যে, বুঝব কি করে ঘটনা বিপ্লবের দিকে হাটছে নাকি উদারবাদী রাজনীতির দিকে যাচ্ছে—এটা কেবল ঘটনা ঘটার শেষে  কি দাড়ালো সেটা দেখার পরে জানতে পারা ছাড়া আগাম বুঝবার কোন উপায়  নাই যে বিপ্লব হচ্ছে কি না? বিপ্লব কী আগে বুঝার কোন উপায় আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু কি সেটা? লেনিন সাহেব বলেছিলেন, বিপ্লব করা নাকি একটা আর্ট। এবং অভুত্থান নাকি উপযুক্ত দিন তারিখের আগেও করা যায় না পরেও না। আরও এগিয়ে বলা কথাও আছে। পুরান রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ভেঙ্গে না পরে তাহলে বুঝতে হবে বিপ্লব হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক অনেক কথাবার্তা। তবু আমি সেদিকে যাব না, কোন চর্বিত চর্বন বা আপ্তকথা আউড়াব না, সেসব আশ্রয় করে আমার কথা সাজাব না। কিছু খাস কথা খাসভাবে বলার চেষ্টা করব।

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

গৌতম দাস

২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2t0

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল হতে যাচ্ছে? – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানে নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ দলের (Movement for Justice) নেতা প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ২৭ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত শেষ খবর পর্যন্ত পাকিস্তানের ডন পত্রিকা বলছে, ২৭২ আসনের পার্লামেন্টে ইমরানের যোগাড় করেছে ১১৫ আসন। [bagging 115 of the total 270 seats on which elections were held, according to the preliminary results announced by the Election Commission of Pakistan (ECP).]অর্থাৎ সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ১৩৭ আসনের থেকে ২২ আসন দূরে। যেটা তারা আশা করছে অন্য প্রধান দুই দল  ৬৩ আসন পাওয়া নওয়াজ-মুসলিম লীগ অথবা ৪৩ আসন পাওয়া ভুট্টো পরিবারের পিপিপির কোন সহযোগিতা ছাড়াই ছোট দলের সহযোগিতায় পূরণ করে নিতে পারবে। অর্থাৎ তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনের পরের দিন ২৬ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, “ইমরান খান ও মিলিটারি বসেরা ভাবতে শুরু করেছেন যে তারা একসাথে কাজ করবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইমরান মিলিটারি বসদের একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেন যে, পাকিস্তানের আমেরিকার সাথে যো-হুজুর করে পড়ে থাকা অবস্থা কমিয়ে ফেলতে হবে আর তালেবান বা অন্যান্য চরমপন্থিদের সাথে ডায়লগে আরও কথা বলে দ্বন্দ্ব-বিরোধ কমিয়ে ফেলতে হবে”। [Mr. Khan, on the other hand, was someone the military bosses seemed to think they could work with. Analysts said he shared their worldview, in which Pakistan would kowtow less to the United States and talk more with the Taliban and other extremist groups.]

ইমরান মনে করেন, পাকিস্তানে চরমপন্থার রাজনীতি আছে কথা সত্য, কিন্তু মূল সমস্যা রাষ্ট্র শাসনের বা গভর্নেসের চরম ব্যর্থতা। [“In Pakistan, the main problem is not extremism,” he said in a recent interview with The New York Times. “We are a governance failure. And in any third world country, the moment the governance collapses, mafias appear.”]
এই হল মোটা দাগে সর্বশেষ, পাকিস্তানে কী হতে যাচ্ছে এর সংক্ষিপ্ত ধারণা। এবার মুল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

“পাকি” অথবা “পাকিস্তানে পাঠানো’
অন্য কারও মধ্যে নিজের অপছন্দের ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কিছু দেখলেই তাকে “পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার” হুমকি দিতে দেখা যায় আজকাল হামেশাই – সেই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫ জুলাই। একালের বাংলাদেশেও ভারতের মতোই ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ হুমকি সমান হাজির; আর সেটা প্রায় সমান ভারতীয় অর্থে – প্রায় একই ভাষা ও বয়ানে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে হুমকিদাতা যেন বুঝানোর চেষ্টা করে যে ভারত, আমরা তো তোমাদের মতোই। কিন্তু এই ‘তোমাদের মতোই’ মানে আসলে কী? প্রগতিশীল? অবশ্যই না। সেটা এককালে ছিল। তাহলে কি একই রাষ্ট্রনীতির কারণে? সম্ভবত হ্যাঁ। বাংলাদেশের সরকারকে প্রবল সমর্থন করা ভারত, এ দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি একই। বাস্তবে এই দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি এক হোক আর নাই হোক, পাকিস্তান প্রশ্ন এলেই চলতি আমলে আমাদের সরকারের ঝোঁক থাকে এটা দেখানোর যে, আমাদের অবস্থান ভারতের মতোই। কিন্তু তাতেও আবার সেই কথা, ভারতের মতোই মানে কী?

প্রথমেই বলে নেয়া যায় যে, ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ বুলি এটা মূলত এক “হিন্দু জাতীয়তাবাদী” রাজনীতির বয়ান। যার প্রত্যক্ষ খাতক মোদীর বিজেপি। যদিও সেই সাথে বকলমে অন্য অনেক দলই। তবে তার চেয়েও বড় কথা এই বুলির বয়ান আদতে বর্ণবাদিতার বা রেসিজমের। অথবা বিশেষ করে কাউকে “পাকি” বলে ডাকা বা ব্যঙ্গ করা। কেন? কারণ, কোনো নির্দিষ্ট আমলের পাকিস্তান সরকারের নীতি পলিসি এখানে রেফারেন্স তো নয়ই, বরং পুরো পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীকেই অভিযুক্ত করা হয়, ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়ে থাকে এখানে এই ইঙ্গিত দিয়ে যে  ‘তাদের রক্তই খারাপ’। যেন তারা  “রক্ত খারাপ” এক জনগোষ্ঠি। এটা এক ধরনের হিটলারি বর্ণবাদী যুক্তির বয়ান। তাই তারা দোষী। আসলে এটা এক ভয়ঙ্কর প্রবল ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচি। তবে অনেকে এতসব জেনে বা না জেনে সহজেই এতে সামিল হয়ে যান, আর রেসিস্ট উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের শিকার হয়ে পড়েন। ভারতে একালে এই বয়ান প্রবল করেছে বিজেপি-আরএসএসের মোদি সরকার; যদিও এর আগেও এটা কম-বেশি ছিল। ফলে উঠতি তরুণ যারা রেসিজমের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান তাদের এ ব্যাপারে সচেতন হতেই হবে। আমার অপছন্দের কিছু হলেই আমরা কাউকে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ কথা বলতে পারি না। কারণ এটা রেসিজম। বরং কোন পাকিস্তান সরকারের সুনির্দিষ্ট সেই নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা নিন্দা করাই সঙ্গত হবে। অজান্তে প্রগতিবাদিতার নামে হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক হয়ে যাওয়াটাই কোনো কাজের কথা নয়।

“পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন”
পাকিস্তান- এই শব্দটা দিয়ে এছাড়াও এই অঞ্চলে আমরা আরও অনেক কিছু ইঙ্গিতে মানে করি। যেমন পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন- এটা সমার্থক। একজন ‘প্রগতিশীল’ রাইটার আজ লিখছেন, ‘পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হল।’ অর্থাৎ তার আগাম অনুমানটা হল পাকিস্তান মানে তো সেখানে ‘সামরিক অভ্যুত্থান হবারই কথা’, সেটা না হয়ে নির্বাচন হয়েছে। কেন? কারণ, জুড়ে দেয়া ট্যাগিং অর্থটা হল, পাকিস্তানের জেনারেলরা নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া থাকতেই পারে না। এখানেও আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হল যে, জেনারেলরা যেন খুবই ক্ষমতালোভী, সে কারণেই নিজ ইচ্ছায় তারা অভ্যুত্থান করে থাকেন। আর ঘটা এ ধরনের অভ্যুত্থানগুলোতে বোধহয় পাকিস্তানের বাইরের গ্লোবাল পরিস্থিতির ও পরাশক্তি রাষ্ট্রের কোনো সংযোগ ও ভূমিকা নেই। সবই যেন স্থানীয় জেনারেলরা লোভী বলেই কেবল তারা ক্ষমতা নিয়ে নেন। এই হল প্রপাগান্ডা অনুমানগুলো।

এসব অনুমান বাস্তবতা বিবর্জিত ও ভিত্তিহীন। ফ্যাক্টস হল, পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলগুলো হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায়, ঐ রাষ্ট্রের নীতি-পলিসির কারণে। জেনারেলদের নিজের ইচ্ছায় মানে, আমেরিকার ইচ্ছা অমান্য করে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল একবারই হয়েছে; সেটা ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বেলায়। তাও সেটার পিছনে বিশেষ কারণ আছে। শ্রীলংকা থেকে দেশে ফিরতে  বাণিজ্যিক বিমানে রওনা করেছেন মোসাররফ। আর ঠিক এর পরেই ভ্রমণরত অবস্থায় মোশাররফকে সেনাপ্রধান থেকে সরানো এবং তার বিমান মাটিতে নামতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা জারি করেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। এর বিরুদ্ধে সেনা সদস্যদের মিলে পালটা যৌথ অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের জ্বালানি থাকা অবস্থায় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা মোসাররফের বিমান মাটিতে নামিয়ে আনেন।  কোন বাণিজ্যিক বিমানকে নামতে না দেওয়ার নির্দেশ জারি এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। মূলত ভারত-পাকিস্তানের কারগিল যুদ্ধের দায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর্মিকে দায়ী করা এবং বিশেষত মোশাররফের ওপর তা চাপানো আর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের তাতে মৌন সম্মতিতে ঘটেছিল এমন হাতছুট ঘটনা ও এর পরিণতি। তাও এর দু’বছর পরে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন, টুইনটাওয়ার হামলার পরের দিনই আমেরিকা মোশাররফ সরকারকে মেনে নিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সদ্য স্বাধীন সেকালের পাকিস্তানে, ১৯৫১ সালে প্রথম যে সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা করেছিল তা করেছিল পাকিস্তানের কমিউনিস্টরাই। “রাওয়ালপিন্ডি কন্সপিরেসি” নামে যা পরিচিত। ফলে জন্ম থেকেই, ইসলাম-পাকিস্তান-সামরিক ক্যু, এগুলো সব সমার্থক শব্দ, এ কথা বলে যে প্যারালাল টানা হয় এই কথারও কোন ভিত্তি নাই।

আসল কথাটা অর্থাৎ যে জায়গায় বসে পাকিস্তান বা সামরিক বিষয়টাকে দেখতে হবে তা হল কোল্ড ওয়ার; মানে ১৯৫০-১৯৯১ সাল, এই সময়কাল ধরে চলা আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে লড়াইয়ের যুগ। এইকালে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ ক্যু হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায় ও নীতিতে সামরিক শাসনে চলেছে। মূলত কমিউনিস্টদের পপুলার প্রভাবে আমেরিকার পক্ষে এসব দেশে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সরকার দূরে থাক, নামকাওয়াস্তে কোনো লিবারেল দুর্বল সরকারও টিকিয়ে রাখতে পারেনি সেকালে। ফলে আমেরিকার প্রভাব-স্বার্থ টিকাতে সামরিক ক্ষমতা দখলই ওর একমাত্র ভরসা ছিল ।

কোল্ড ওয়ার মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে (১৯৪৫) কলোনি উত্তর সময়ে কলোনিমুক্ত দেশগুলোকে নিজ বলয়ে নিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি প্রভাব বিস্তারের লড়াই, তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র-ব্লকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আসার টানাপড়েন – এটাই কোল্ড ওয়ার যুগ-বৈশিষ্ট্য। এবং অবশ্যই সেগুলো কমিউনিস্ট ও এন্টি-কমিউনিস্ট মতাদর্শের মধ্যকার লড়াই, এই উছিলায় ঘটেছিল। এতে কে সঠিক ছিল, সেটা আমরা যার যার পছন্দের মতাদর্শের ভিত্তিতে জবাব দেব আর এভাবে বিভক্ত হয়ে যাবো কোন সন্দেহ নেই। ফলে সেদিকে না গিয়ে, বরং সেই সময়ের আমেরিকান নীতি সম্পর্কে চলতি শতকে এসে আমেরিকানদের ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন কী- সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা তুলব। তবে মূল কথা হলো, অনেক হয়েছে আর কত, পাকিস্তানের ঘটনাবলি বুঝতে কোল্ড ওয়ারের চিন্তা-ফ্রেম তো লাগবেই  সাথে লাগবে আমাদের পরিপক্কতা। হিন্দু অথবা মুসলমান জাতীয়তাবাদের বাইরেও দুনিয়া আছে। ফলে বাইরে যেতে হবে। পাকিস্তানের ঘটনাবলির কারণ সেখানেও দেখতে হবে। অন্তত, দুই জাতীয়তাবাদের কোনো একটার ঘরে বসে অন্যটাকে কোপানো – এগুলোর দিন শেষ করতে হবে। পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।

RAND ও আরব স্প্রিং
র‌্যান্ড করপোরেশন (RAND Corporation) – এটা আমেরিকান আর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের নাম। বহু পুরানা, বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এর জন্ম। যখন সে আমেরিকান এয়ার ফোর্সকে নিজের নীতি গবেষণার কাজ দিয়ে সহায়তা দিত। কারণ, যুদ্ধবিমান তৈরি করে এয়ারফোর্সকে বিক্রি করে এমন এক কোম্পানি থেকে র‍্যান্ডের চলার ফান্ড আসত। বর্তমানে (১৯৪৮ সালের পর থেকে) এটা নিজেই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসাবে রেজিষ্টার্ড। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, পিএইচডি প্রোগ্রাম অফার করে থাকে। যেখান থেকে এর বিস্তর একাডেমিক তৎপরতা – স্টাডি, গবেষণার কাজ চলে। স্বভাবতই এর মূল লক্ষ্য হল, অ্যাকাডেমিক তৎপরতা- স্টাডি, গবেষণার মাধ্যমে আমেরিকান সরকারগুলোকে সম্ভাব্য তার পলিসি কী হওয়া উচিত, তা ঠিক করতে সহায়তা করা। এই অর্থে আমেরিকান রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ দেখাটাই তার কাজ। তার অনেক কাজের মধ্যে একালে এক প্রভাবশালী কাজ – পপুলারলি যেটাকে ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ নামে চেনানো যায়। বড় পরিসর থেকে বললে, ২০০১ সালে টুইনটাওয়ার হামলার পরে বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নীতিটা ছিলঃ মুসলমানমাত্রই শক্ত হাতে দমন, তাদের ধর আর মার। এই নীতি নিষ্ফলা পরাজিত হয় ও অনন্ত সমাপ্তিহীন এক যুদ্ধের ভেতর আমেরিকাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই থেকে, আমেরিকান অর্থনীতির পতনের পিছনে এটা মূল কারণ।  ২০০৬ সালের মধ্যে আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের গবেষণা মূল্যায়নে পাওয়া ফল হিসেবেই এই নিষ্ফলা পরাজয় আর অর্থনীতির পতনের ঘটনাবলি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আর এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে আর আগে থেকে চলে আসা র‌্যান্ডের এক গবেষণার ফলাফল – মূলত এই দুই থেকে তৈরি নীতি হল ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’। ওবামা প্রশাসন ২০০৯ সালে ক্ষমতা নিলে এটা স্থায়ী ও রুটিন বিদেশ নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

সার কথায় বললে, এটা হল নির্বিচারে আর মারধর-দমন নয়, ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট করার নীতি। সশস্ত্র ইসলামি ধারাগুলোর সাথে আমেরিকার আগেরই মারধর-দমন চলেছে তা বাদে ওর বাইরে বাকি সব ইসলামি ধারার সাথে আমেরিকার রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়া, রাষ্ট্র-সরকারে তাদের আসতে অংশগ্রহণে সহায়তা, সহযোগিতা করা। এরই প্রথম সবল প্রচেষ্টা ছিল মিসরে মোবারকের পতন ও পপুলার নির্বাচিত এক সরকার সৃষ্টি – আরব স্প্রিং। আর এই কাজে ইসলামি ব্রাদারহুডের সাথে কাজ করা, এটাই ছিল আমেরিকার ইসলামের সাথে এনগেজমেন্টের প্রথম উদ্যোগ। দুঃখজনক হল এটা ফেল করে যায় বা কাজ করেনি। না করলেও ওবামা আরো কিছু চেষ্টা করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু মূলত ব্রাদারহুড সম্পর্কে সৌদিরাজের ভীতি, বিশেষত প্রেসিডেন্ট মুরসির ইরান সফর করা থেকে সেই ভীতি আরো ট্রিগার করে প্রবল হওয়া থেকে, এরপর সৌদি উদ্যোগে জেনারেল সিসির আগমন উত্থানে ওবামা এতে নীরব বা উপায়হীন সমর্থকে পরিণত হয়েছিল। ফলে মুরসির পতন ঘটে। মিসর এক্সপেরিমেন্টের এখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ইজিপ্ট ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর একটা মাত্র। এই প্রজেক্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার সব দেশেই চালু তো আছেই, ফলে বাংলাদেশেও আছে। এমনকি ইন্ডিয়াতেও আছে। কারণ এটা সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির চলমান অন্যতম মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

আমেরিকার যুদ্ধের ময়দান পাকিস্তান
যুদ্ধটা শতভাগ আমেরিকার। নিজ দেশের ভুমিতে সে যুদ্ধ না করে পাকিস্তানকে যুদ্ধের ময়দান বানানো ও ব্যবহার করা, পাকিস্তানকে এক গজব বানিয়ে ফেলার শতভাগ দায় আমেরিকার। সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির সাথে আমেরিকান যুদ্ধের ময়দান হল পাকিস্তান। পাকিস্তানকে আমেরিকার হয়ে এই ময়দান হতেই হবে। নইলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে মাটির সাথে মিটিয়ে ‘পুরান প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানো হবে – এটাই ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজের প্রেসিডেন্ট মোশাররফকে টেলিফোন কথোপকথনে দেয়া পরামর্শ বা হুমকি। মোশাররফের ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইতে এর বিস্তারিত বয়ান আছে। তাই জেনারেলদের সিদ্ধান্তের পাকিস্তানের সব ‘টেররিজম’ ঘটনা ঘটছে- এ কথাগুলো অর্থহীন। আমেরিকান ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে বাধ্য হয়ে নিজেদেরকে ব্যবহৃত হতে দেওয়া এই বৃহত্তর দিক বাদ দিয়ে কেবল জেনারেলদের দায়ী করার সংকীর্ণ চোখ – এটা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের ফরেন পলিসি।  তা যাই হোক, আমেরিকান রুটিন পলিসি হিসেবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার রাষ্ট্র বলে পাকিস্তান ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর এক বড় খাতক, এই প্রকল্পের শুরু থেকেই।

আমরা বেশির ভাগই না আরব স্প্রিং পলিসির যথেষ্ট খবর নেই না পাকিস্তানের। এই প্রচারণার কাছে পাকিস্তান মানে হল ঘৃণা। এটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের চোখে দেখা ১৯৪৭ এর দেশভাগ অথবা সত্য সত্যই ১৯৭১ এর পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা নৃশংসতাও এর কারণ বটে। যদিও এরপর এরা আবার জিয়াউল হকের আমলে এসে থেমে যায়।  বুঝতে চায়না অথবা দেখতে পায়না ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল – এই ট্রিগার পয়েন্ট সব ঘটনার আরম্ভ-বিন্দুকে। যেখানে মুল বিষয় হল, রাশিয়ান জার-সাম্রাজ্য সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজ বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে নিজ সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করে আর এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে ১৮৮৯ সালে আফগানিস্তানের মাটিতে ব্রিটিশ-জার এ দুই সাম্রাজ্য লড়াই করেছিল। এরই পুনরাবৃত্তি হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল। যার আবার পিছনের মূল কারণ ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব-ভীতি। ইরান বিপ্লব ছিল এক গ্লোবাল ঐতিহাসিক তাতপর্যময় ঘটনা এই অর্থে যে সোভিয়েত ব্রেজনেভ-আফগানিস্তান-আমেরিকা-পাকিস্তান-টেরর-আলকায়েদা-তালেবান-আইএস ইত্যাদি সব শব্দাবলীতে এরপর থেকে এক চেন রিয়াকশন ঘটে গেছে এখান থেকে। একালের দুনিয়ার সবঘটনার আরম্ভ বিন্দু এখানে। । মূলত ইরান বিপ্লবের প্রভাবে মুসলিম সেন্ট্রাল এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ছাড়া হয়ে যায় কিনা আগাম সেই ভয় মনে এসেছিল সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের। আর তা থেকে তিনি ‘সমাজতন্ত্র নামের আড়ালে’  কলোনী দখলগিরিতে করতে নেমে পরেন। আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান ইরান আর সেন্টাল এশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ) প্রায় মাঝখানে। ফলে আফগানিস্তানকে বলি চড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ব্রেজনেভ এই মনে করে যে বাফার হিসেবে আফগানিস্তান দখল করে আফগানিস্তানকে  বাফার রাষ্ট্র হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।  পুরানাকালে রাশিয়ান জারের তৎপরতায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভয় পেয়ে এর বিরুদ্ধে লড়েছিল, একালে সেই একই ভয় পায় পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান যুদ্ধের দায়টা নিয়েছিল আমেরিকার হয়ে, কোল্ড ওয়ারের লড়াই লড়তে। যে যুদ্ধের শেষটায় এখান থেকেই আল-কায়েদা ও তালেবান উত্থান-পতনে, এখনও যা চলমান।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও তা ভেঙে গেলে এর আমেরিকার থিঙ্কট্যাঙ্ক একাদেমিক মহলে প্রধান তাৎপর্যময় বিষয় হয়ে উঠে যে “কোল্ড ওয়ারের” তাহলে এখন কী হবে! কারণ বাস্তবত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও নাই মানে মাঠে এবং বাস্তবে কোল্ড ওয়ার নাই হয়ে যাওয়া। ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল যে কোল্ড ওয়ারের পুরা যুগে আমাদের মত দেশে আমেরিকা সামরিক ক্যু’র করানোর পথ অনুসরণ, সেটা এবার তাহলে ফরেন পলিসি থেকে বাদ দিতে হবে।

আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন
কিন্তু আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন? এ প্রসঙ্গে র‌্যান্ড রিপোর্টের দেয়া একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তা হল, আমেরিকান পলিসি মেকারদের চোখে সমাজতন্ত্র এক এবসার্ড (বাস্তবায়ন অযোগ্য) আইডিয়া। না, এটা তাদের অপছন্দের মতাদর্শ বলে নয়। কারণ এটা এমন এক প্রজেক্ট যার সাথে আমেরিকানদের এনগেজমেন্ট বা কোনো দেয়া-নেয়া, রাষ্ট্র বা সরকারে পাশাপাশি থাকা, দুটো আলাদা দল হিসেবে থাকা, অথবা সরকারে বা বিরোধী হিসাবে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। ব্যাপারটা হয় তারা না হলে আমরা। এছাড়া কমিউনিস্টদের “সব মালিকানা উচ্ছেদ করে দিতে হবে” – এটা মধ্যবিত্ত ও গরিবদের মধ্যে খুবই পপুলার দাবি। অথচ আমেরিকার চোখে এটা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন এক এবসার্ড দাবি। তবে এবসার্ড হলেও কিন্তু তা পপুলার দাবি বলে এর সামনে আমেরিকা অসহায় এবং উপায়ন্তহীন। তাই আমেরিকা এশিয়ায় আমাদের মতো দেশে কোল্ড ওয়ারের পুরা ৪২ বছরে কোনো লিবারেল সরকারও কায়েম করতে পারেনি। এরই পরিণতি হল সামরিক ক্যু ফেনোমেনা।

এই কথাগুলো এখানে বলা হল, আমেরিকান নীতি বুঝার জন্য কেবল। তা মেনে নেয়ার জন্য এটা কোনো সুপারিশ নয়। অথবা এটাকে সাফাই হিসেবে নেয়ার জন্য নয়, তা ভুল হবে। আমেরিকানদের ভালো বা মন্দ কাজের সাফাই দেয়ার দায় আমেরিকার।

তাই সোভিয়েত ভেঙ্গে পড়ার (১৯৯১) পরে এবার আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল এবং শেষে নীতিগতভাবে আমেরিকা সিদ্ধান্ত অবস্থান নেয় যে আর সামরিক ক্ষমতা দখলকে নিজের স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে আর দেখা হবে না। সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১) প্রশাসনের শুরুর আমল। বিল ক্লিনটনের ২০০০ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফর ছিল সেই বার্তা পৌছানোর যে আমরা এখন থেকে আর সামরিক ক্যু নয় লিবারেল নির্বাচিত সরকারের পক্ষে।  আর ঠিক এই কারণে অর্থাৎ আমেরিকান ‘ক্যু-বিরোধী’ নতুন পলিসি কমিটমেন্টের পর জেনারেল মোশাররফের ক্যু এই সাময়িক দুর্ঘটনাটা ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেনি। মূল কারণ আমেরিকান নীতিগতভাবে সামরিক পথে না যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত প্রতিশ্রুতি। ফলে যারা কিছু হলেই পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল নিয়ে শঙ্কা তোলেন তারা মুখস্থ বলেন। তারা আমেরিকার পলিসির হাল-হকিকত সম্পর্কে খোঁজ রাখেন তা মনে হয় না।

আবার আমরা বেশির ভাগই একালের পাকিস্তান, নতুন প্রজন্মের পাকিস্তান সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকেবহাল নই। বিশেষ করে আরব স্প্রিংয়ের প্রভাব পাকিস্তানে কেমন পড়েছিল। ঠিক যেমন বাংলাদেশে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনকি আমাদের বেসরকারি মেয়েদের স্কুল ভিকারুন্নিসা পর্যন্ত আরব স্প্রিং ছড়িয়ে আছে, আমরা কী জানি! মনে হয় না। অবশ্য ধরতে পারারও একটা ব্যাপার আছে। এই ততপরতাগুলোকে চেনার একটা সহজ উপায় হল, ‘ইয়ুথ’ বা ‘লিডারশিপ’ – এসব শব্দে প্রকাশিত কোনো তৎপরতা দেখতে পেলেই বুঝতে হবে এটাই সেই। বাইরে থেকে দেখতে এটা আমাদের পরিচিত ‘শিক্ষার্থীদের কোন ক্লাব’ (ডিবেটিং) ধরনের এমন নানা তৎপরতা, যেগুলো যে কোনো অ্যাকাডেমিতে এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি বলা হয় তেমনই ধরনের।
র‌্যান্ডের ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ঙ্গামেরিকান ফরেন পলিসি হিসাবে গৃহিত হওয়া আসলে আমেরিকারই সামরিক ক্যু’র পথে আর না যাওয়ারই আরেক পরিপূরক অবস্থান, আরেক এক্সটেনশন।

তাহলে মূল কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়াতে তাই আমেরিকাকে এরপর দেখানো জরুরি হয়ে পড়ল যে, এখন তাহলে রাষ্ট্র গঠনে, রাষ্ট্রীয় কনস্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া, মৌলিক অধিকার সম্পর্কে মাস লেভেলে সচেতনতা তৈরি ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকার এগিয়ে আসা উচিত। এ্টাই ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ এর কোর লক্ষ্য । যুক্তির শুরু এখান থেকেই। তবে মূলত এর মাঝে টুইনটাওয়ার হামলা ঘটে যাবার কারণে, মূল প্রজেক্টকে মুসলমান জনসংখ্যার জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য এমন বিশেষ আর এক মাত্রা দিয়ে সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল যাতে তা ‘ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্টের ইচ্ছার’ প্রকাশ হিসাবেও কাজ করতে পারে।

টার্গেট হিসাবে এই প্রজেক্ট মূলত এটা তরুণদের মধ্যে বেশি কাজ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে, পপুলারও হতে চায়। এটা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র, কনস্টিটিউশন, প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে এবং সমাজকে নেতৃত্ব দেয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আমেরিকান প্রকল্প।

“Youth leadership”
পাকিস্তানে এই প্রকল্প তৎপরতা খুব সম্ভবত ২০১০ সাল থেকে ব্যাপকতা লাভ করে। ইমরান খানের দলের নাম পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ, সংক্ষেপে পিটিআই। যার মানে হল (Movement for Justice) বা ইনসাফের লড়াই।  যদিও পিটিআইয়ের জন্ম ১৯৯৬ সালে আরব স্প্রিংয়েরও বহু আগে থেকে। তবে আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতা ধীরে ধীরে জমে ওঠার পর গত ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে দিয়ে সমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থেকে তারা একটা দল বেছে নিয়েছিল। সেটা ইমরান খানের দলের সাথেই, সেখান থেকে তাদের বুঝাপড়া ও এক সাথে কাজ করার ঐক্য হয়েছিল। এমনিতে আরব স্প্রিংয়ের প্রকল্পগুলো মাঠে হাজির থাকে এনজিও প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা হিসেবে। তবে বাইরে আমরা দেখি কেবল তাদের সুবিধালাভ যারা যারা করে এমন শিক্ষার্থীদেরকেই। সরাসরি ইউএস এইডের সরকারি ফান্ড এটা; অন্য কোন সামাজিক দাতব্যের ফান্ড নয়। আমেরিকান প্রায় ৯টি এনজিও প্রতিষ্ঠান সাধারণত এ কাজ-ততপরতায় জড়িত।   ফলে তারা সরাসরি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে পারে না, করেও না। তবে তাদের তৎপরতা থেকে সুবিধা-লাভকারি স্থানীয় জনগণ বা শিক্ষার্থী নিজেরা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথেও কাজ করতে পারে। তবে “youth leadership” নামে চলা কর্মসুচিগুলো কবে কখন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কর্মিদের সাথেও সম্পর্ক কাজ করবে এটা ভ্যরি করে। সাধারণত এটা অনেক দেরি করে ঘটে। মিসরের “সিক্সথ অক্টোবর লিডারশীপ গ্রুপ” শেষে নিজেই রাজনৈতিক দল হয়ে যায়। তবে কোন কারণে তা নির্বাচনের পরে হয়েছিল।

“youth leadership” ্ধরণের কাজের মাধ্যমে গত বিশ বছরে তরুণ পাকিস্তানিরা, পাকিস্তানের পরিচিতি অনেক বদলে দিয়েছে। এরা মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত।  ইমরানের দলের গত পাঁচ বছরের তৎপরতায় মনে করার কারণ আছে যে, এসব তরুণ নেতৃত্বেও কিছু যোগ্যতা অর্জন করেছে। পাকিস্তান সমাজের এই অংশটার কথাই বাইরের আমরা খুবই কম জানি কারণ আমাদের পরিচিত পাকিস্তান যেটা ছিল সেটা মূলত বড়জোর সত্তরের দশকের; সেটা দিয়েই একালের পাকিস্তানকে বুঝতে চাই বলে সমস্যা হয়। নিরন্তর যুদ্ধ, রিফুইজি, অস্ত্র  বোমা আর ইসলামের হরেক রক্ষণশীল বয়ান- ইত্যাদি এসবের পালটা এসব কিছুতে ত্যক্তবিরক্ত এসব তরুণেরা এক ব্যাপক মডার্নাইজেশন বা রুপান্তরের ভেতর দিয়ে পার হয়ে গেছে। যার প্রধান উপায় হিসেবে কাজ করেছে এনজিও তৎপরতা। এরই সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল ব্যাপক  ও একটিভ নারী ভোটার এর ততপরতা। পাকিস্তান রক্ষণশীল সমাজ তা সত্বেও নারীরা সক্রিয়ভাবে সবকিছুতে তাদের উপস্থিতি আজ দেখতে পাওয়া যায়। এই নির্বাচনে শিখ, হিন্দু, খ্রীশ্চান ও নারী এমনকি ট্রান্সজেন্ডারেরা প্রার্থী হয়েছে। কয়েকজন সম্ভবত নির্বাচিতও হয়েছেন। এর পিছনে মূল যে বাস্তবতা কাজ করেছে তা হল, নারীরা বাইরে বের না হওয়ার মানে কঠিন কষ্টকর জীবন সংগ্রামে পরিবারের আয়ের তাবত দায় কেবল পুরুষ সদস্যদের নিতে হবে। স্বভাবতই তা পরিমাণেও কম হবে। অনটন বাড়বে। ফলে এই কঠিন বাস্তবতার ফলাফল হল নারীদেরকে বাইরে দেখতে পাওয়া। সমাজে তা গ্রহণযোগ্যও করে নেয়া হয়েছে, হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আমরা আফগানিস্থানের সাথে তুলনা করলে দেখি সেখানে নারীরা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া (তা আটবছরের বালক হলেও) এখনও বাইরে বের হতেই পারেন না। এসব কিছু মিলিয়ে এক পরিবর্তন – পরিবর্তিত পাকিস্তান – এরই প্রতীক ইমরান।

এরা নিঃসন্দেহে একেবারেই নতুন প্রজন্ম, নতুন তাদের অভিজ্ঞতা। তাদের তৎপরতার প্রথম ফলাফল দেখার সময় সম্ভবত এই নির্বাচন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে পিটিআই সবার চেয়ে এগিয়ে। এর পেছনের একটা বড় কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ পরিবারসহ তার অর্থ পাচারের দুর্নীতির মামলার রাজনৈতিক তৎপরতা করার অযোগ্য ঘোষিত হয়ে যাওয়া, এর নৈতিক প্রভাব। মনে হচ্ছে পিটিআই অথবা তাদের নেতৃত্বের এক জোট, সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রিগিংয়ের অভিযোগ আছে। বিদেশি অবজারভাররা নির্বাচন ভাল হয় নাই বলেছে কারণ নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না তারা বলছে। তবু সব কিছু যতটা সম্ভব আমল করে, প্রতিকার করে কাটিয়ে ইমরান খান সরকার গড়তে যাচ্ছেন – এটাই  ডমিনেটিং পাবলিক মনোভাব ও আকাঙ্খা। এই তথ্য আলজাজিরার পাকিস্থানের স্থায়ী সংবাদদাতা কামাল হায়দারের বরাতে বলছি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পাকিস্তানে আরব বসন্তের নতুন মডেল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

গৌতম দাস
১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০০:২১

https://wp.me/p1sCvy-2oW

 

অবশেষে এখন এ’কথা বলা যায় যে, নেপাল এখন নিজ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কায়েম করতে পেরেছে এবং তা এগিয়ে যেতে পারবে। নেপালের প্রধান তিন দলের মধ্যকার দুটোই কমিউনিস্ট পার্টি। দুই কমিউনিস্ট পার্টি এবারের নির্বাচনে এক কমিউনিস্ট  জোট (‘লেফট অ্যালায়েন্স’) গড়ে নির্বাচনে লড়ে জিতেছে। অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় এক কমিউনিস্ট, মাওবাদী দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছিলেন, এই অ্যালায়েন্স তাঁরা করছেন নেপালের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য, স্থিতিশীল সরকার দেয়ার জন্য [grand Left alliance will “end Nepal’s elongated political instability” ]। নেপাল গত ৯ বছরে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে গেছে। এখন দাহালের আকাঙ্খা ও অনুমান সঠিক প্রমাণ হল। নেপালের এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স সংসদে ৭১ শতাংশের মতো আসন লাভ করেছে।

গত ১৯৯৬ সাল থেকে যদি ধরি, সশস্ত্র রাজনৈতিক লাইনে চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহালের ‘মাওবাদী সেন্টার’ দল অথবা CPN (Maoist Centre)  প্রথম যখন রাজতন্ত্র উৎখাত ও ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিল। সেই থেকে হিসাব কষতে বসলে গত ২০ বছরের বেশি সময়, এটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই নেপালের জনগণের এক বিরাট লম্বা পথপরিক্রমা। আর কে না জানে লক্ষ্যে পৌঁছানোতে পথ যত লম্বা হয়ে যায়, ততই সেখানে আরো বেশি অনিশ্চয়তা হাজির হয়ে যায়, আর তা বিপজ্জনক হয়। তবুও আজ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে এক কথায় বললে নেপালের সাফল্য অনেক। আর এতে অন্তত তিনটি বড় অর্জন আছে।

এক. শত বছরেরও বেশি পুরনো নেপালি রাজতন্ত্রের শাসনকে উৎখাত ও অবসান ঘটানো। দুই. দুইবারের চেষ্টায় অনিশ্চয়তার সাত বছরের শেষে নেপালকে সর্বপ্রথম একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ রাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে রিপাবলিক বা লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সফল হয়। কনস্টিটিউশন রচনার কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করা এবং এই কাজ শেষে প্রথম কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন – ২০১৫ ঘোষণা দিতে নেপাল সফল হয়। আর তিন. নতুন কনস্টিটিউশনের অধীনে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ভোটের ফলাফলে নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কিছু কম (গণনার প্রাথমিক পর্যায়ের ১৬৫ আসনের মধ্যে ৮০ আসন) পেয়েছে। এই দল হল, চেয়ারম্যান খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির কমিউনিস্ট পার্টি (CPN-UML)  । আর এরা অপর কমিউনিস্ট ‘মাওবাদী সেন্টার’ দলের সাথে মিলে প্রায় ৭১ শতাংশ আসন পেয়েছে। অর্থাৎ এই তৃতীয় অর্জন সম্পর্কে বলা যায়, এখন সহজেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির নেতৃত্বে নেপাল এক নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।

প্রায় ২০ বছর পরের নেপাল এই প্রথম স্থিতিশীলভাবেই পূর্ণ সময়কালের সরকার কায়েম করতে পারবে, আর সেই সরকার দৃঢ়তার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর পিছনের প্রধান কারণ হল, অপর কমিউনিস্ট পার্টি  ‘মাওবাদী সেন্টার’-এর সাথে ইতোমধ্যে গত অক্টোবরে এরা যে জোটটা গঠন করেছে, সেটা শুধু কোনো নির্বাচনী জোট নয়,  বরং একটা এক দলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটা জোট। [The two parties also said they would work for their formal merger……]।   ফলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি মিটানো নয়, সরকারের নানান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতের অমিলগুলো সামলে এক সিদ্ধান্ত পৌছানোর সুযোগ এখানে বেশি থাকবে। এই নির্বাচনে মাওবাদীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল (১৬৫ আসনের মধ্যে ৩৬ আসন), আর তৃতীয় নেপালি কংগ্রেস (১৬৫ আসনের মধ্যে ২৩ আসন)। তবে নতুন গঠিত এই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্সে আরো একটা দল আছে। সেটা বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি পার্টি, এই দলের একা তিনি জিতেছেন। তিনি আসলে ছিলেন মাওবাদী দলের সাবেক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর ২০১১ সালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন, পরে দল ছেড়ে বের হয়ে যান। এখন জোটে ফিরে আসলেন। প্রথম কনষ্টিটিউশন গঠনকালীন সরকারের (২০০৮-২০১১) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠন করে ছিল মাওবাদীরা। ফলে ঐ সময়ে ভারতের সাথে স্বার্থ বিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া ও চাপ সামলানোর বিপদের ঝড়ঝাপ্টা গুলো সবচেয়ে তাদের উপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়দের চাপের মুখে তা মোকাবিলা করতে গিয়ে বাবুরাম  “ভারতীয়দের সাথে পারা যাবে না” ফলে “নরম পথে আগাতে হবে” ধরণের অবস্থানের কারণে দাহালের সাথে বিরোধে, শেষে দল থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে যান। পরে আলাদা দল করেন, তিনি এবার জোটে ফিরে এসেছেন। তাহলে অল্পকথায় তিনটি গুরুত্বপুর্ণ অর্জন হলঃ রাজতন্ত্রের উৎখাত, নতুন লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা আর শেষে এক স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার গঠন পথে এসে পৌছানো।

নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট – ফেডারল (কেন্দ্র), প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার – এভাবে এবং এভাবেই নতুন কনস্টিটিউশন অনুসারে গঠিত। বিশেষ দিকটা হল, তিন স্তরের নির্বাচন এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক বিরাট সাফল্য। কারণ গত বছরের এই সময়েও নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এত চরম অবস্থায় ছিল যে, এক বছর পরে সরকারের আয়ু শেষ হবার পরে এই সময়ে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অর্জন আজ এই উচ্চতায় উঠবে তা তখন বিশ্বাস করা যেত না।

আচ্ছা, গত ২০ বছরের পথপরিক্রমায় কারা নেপালের গণস্বার্থের দিক থেকে বিচারে এর রাজনীতিক-ভিলেন ছিল? এই প্রশ্নের জবাব হবে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বভাবতই সেই ভিলেন, তিনি ছিলেন নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তবে এরপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে  পাল্টা মাওবাদীসহ নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধা ও এর উপরে ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আনা ইত্যাদি – এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় নির্ধারক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল ভারত। হ্যা, ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলে কনস্টিটিউশন গঠনের কাল থেকে ক্রমেই ভারত নেতিবাচক বিরাট ভিলেনের ভূমিকায় হাজির হতে থাকে। সেই থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে এক ভিলেন হয়ে আছে ভারত। গানের ভাষায় বললে- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। ভারত চাইতেই জানে না। নেপালের কাছে ‘কিভাবে’ আর ‘কী’ চাইতে হয় – কী চাওয়া যায় না – তা জানে না। নেহরুর হাতে ভিত্তি পাওয়া ও গড়া স্বাধীন ভারত, আর এ থেকে সবচেয়ে বাজে ও ভুল শিক্ষা পাওয়া আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভারত, এরাই মূলত সেই ভিলেন। নেহরু ভেবেছিলেন কলোনি-উত্তর স্বাধীন ভারত, একালে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া সুবিধাগুলো তিনি ব্রিটিশদের মতই নিজেও ব্যবহার করবেন। এটা তার প্রিরোগেটিভ (prerogative) বা পড়ে পাওয়া চারআনা বিশেষ সুবিধা, প্রাধিকার। তিনি বুঝতেই পারেননি যে, এর অর্থ হল, তাতে ভারত এক কলোনিয়াল ক্ষমতা বলে আগাম কল্পনা করে নিতে হবে বা করা হয়ে যায়। এর চেয়েও আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। তিনি সে সময়কে মানে এর তাতপর্যকেও বুঝতে পারেন নাই। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যে নতুন দুনিয়া গড়ে তোলা হচ্ছিল, সেটা আর যুদ্ধের আগের মত কলোনি-শাসিত দুনিয়া নয়, কোনো ইউরোপীয় কলোনি-শাসকের দুনিয়া নয়। বরং এক বিরাট ভিন্নতায় আমেরিকার  নেতৃত্বের এক নতুন দুনিয়া। মৌলিকভাবে এটা বরং খোদ পুরনো কলোনি-অর্থনৈতিক-সম্পর্কেরই অবসান। আর আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের-অর্থনীতিক-সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ আমেরিকার গড়ে তোলা এটা নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি সম্পর্কের দুনিয়া। যেখানে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান – ইত্যাদির মত বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিলেটারাল) প্রতিষ্ঠান এবারের নতুন দুনিয়ায় আছে।

মূল কথায় এখানে অপর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও সম্পর্ক রাখা এবং সুবিধা নেয়া ও কিছু দেয়ার তরিকাই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিনিময় সম্পর্ক আর পুরান কলোনিয়াল একেবারেই নয়, বরং আলাদা। নেহরু এর খবর নেন নাই বা রাখেননি। এ কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, নেহরুর করা ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’। যেটা আসলে এর আগে ব্রিটিশদের করা ‘নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি ১৯২৩’ এর কার্বন কপি। এই চুক্তি থেকে এটা পরিষ্কার, নেহেরু ভারতকে কলোনি-শাসকের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, দেখেছিলেন। আগে ব্রিটিশ কলোনির এক ভেসেল রাষ্ট্র বা করদরাজ্য ছিল নেপাল। ব্রিটিশদের নেপালকে সরাসরি কলোনি না করে ভেসেল রাষ্ট্র করে সুবিধা দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। পরবর্তিতে যোগ হওয়া নতুন এক কারণ হল, সিপাহী বিদ্রোহ কালে নেপালের রাজাদের বৃটিশের পক্ষে গোর্খা সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেওয়া। এই বিদ্রোহের আগে পুরো নেপাল ব্রিটিশরা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়াতে বিদ্রোহ পরাজিত করার শেষে এই ভেসেল রাষ্ট্রের জন্ম আরও পাকাপোক্ত হয়। তাই নেপাল-ব্রিটেন এর মধ্যে আগের অনেক চুক্তি ছিল, আমরা জানতে পাই। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশরা তাতে নতুন নতুন অনেক ছাড় যোগ করেছিল। এমন সর্বশেষের চুক্তিটিই হল, ১৯২৩ সালের চুক্তি। কিন্তু নেপালের ল্যান্ডলকড অবস্থার সুযোগ নিয়ে, পুরান সেই চুক্তি অনুসরণ বা অনুকরণ করে একই দাসত্ব চুক্তি করেছিল নেহরুর ‘রিপাবলিক ভারত’। ওই চুক্তিটিই এখনো বহাল আছে। প্রশ্নটা আসলে, একালে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে দাস বানানোর সুযোগ পেলেও আপনি তা নেবেন কি না? নেহরু সেটা দাবির সাথে নিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ নেহরুর মৌলিক আগাম অনুমান হল, “স্বাধীন ভারত সেটা বৃটিশ কলোনি ভারতেরই উত্তরসুরি ও ধারাবাহিকতা”। অর্থাৎ ভারত নিজে স্বাধীন তবে এটা এখন নিজেই এক কলোনি শাসক। ফলে কন্টিনিউয়েশন বা ধারাবাহিকতা।  তাই, এই কলোনি ওরিয়েন্টেশনে বা ধাঁচে নিজ নতুন আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গড়েছিলেন নেহেরু। নেহেরুর সেট করে দেওয়া ‘সেই ট্রাডিশন’ এখনও চলছে।

গত অক্টোবরে কমিউনিস্টদের লেফট অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর তাদের যৌথ নির্বাচনী ম্যানুফেস্টো প্রকাশিত হয়। জাপান থেকে প্রকাশিত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন ১ ডিসেম্বর বলছে, ঐ ম্যানুফেস্টোতে বলা হয়েছে – লেফট অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতলে পরে তাদের দ্বারা গঠিত অ্যালায়েন্স সরকার এরপর ‘ইন্ডিয়া-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি-১৯৫০’ বাতিল করবে এবং একটা নতুন চুক্তি করবে। এখন নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ওই আকাঙ্খা মত অ্যালায়েন্সের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে। ফলে এখন স্বভাবতই ঐ চুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সংঘাতে আর এক পর্ব শুরু হবে, আর এক খাতা খোলা হবে।

এই নির্বাচনের শুরু থেকে নয়াদিল্লি খুবই অস্বস্তিতে ছিল। আর ফল প্রকাশের পর সেটা আরো বেশি হয়ে এখন উলটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। এমনিতেই গত অক্টোবরে নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য নানান বিপদ আসন্ন বলে আঁচ করতে শুরু করেছিল। যেমন সুবীর ভৌমিকের নেপালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ অনলাইনে তার লেখা দিয়েছেন। সেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নেপালের নির্বাচনকে ভারতের নিজের পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত!’  তবে সুবীরের এবারের লেখাটি ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে লেখা। তাই সম্ভবত ভারতের অনেক ভুলত্রুটি এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ভারতকে আমল না করে ২০১৫ সালের অক্টোবরে নেপালের কনস্টিটিউশন ঘোষণা করে দেওয়াতে টানা ছয় মাস ল্যান্ডলক নেপালে সকল ‘পণ্য  আমদানি অবরোধ’ করে রেখেছিল নয়াদিল্লি। নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাস থেকে যানবাহনের জ্বালানিসহ সব কিছু ছয়মাস বন্ধ রাখলে গরীব মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে তা অনুমেয়। তাই বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়েছে।  প্রচ্ছন্নে সুবীরের লেখায় ভারতের সিদ্ধান্ত ভুল এটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ঐ ঘটনাই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কঠোরভাবে বিমুখ করে তোলে, যার প্রভাব এখনো প্রবল।  আর খুব সম্ভবত, এসব ভোটারদেরই নিজের ব্যাগে তুলে নিতে পেরেছে,  চরম ভারত-বিরোধিতার লাইনের চেয়ারম্যান অলির কমিউনিস্ট দল। মোট ১৬৫ এর মধ্যে ৮০ আসন – এভাবে বিপুল সংখ্যার আসন পেয়েছে এই নির্বাচনে।ওদিকে সুবীর তাঁর লেখায়, আবার শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির সাথে নয়াদিল্লি এখন নেপালকে তুলনা করে দেখছে সে খবর জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে তাদের এখনকার মূল্যায়ন নাকি – শেষ বিচারে শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অন্যান্য ইস্যুতে চীনকে আসলে ঠেকানো যায়নি। নেপালেও গেল না। তাই সুবীর যেন শিরোনামে বলছেন, হতাশ হয়েন না 

শ্রীলঙ্কার মত নেপালের বেলায় কোন সমুদ্রবন্দর নির্মাণ তার ইস্যু ছিল না। শ্রীলঙ্কার হাম্মনটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ২০১০ সালে শেষ হবার পরও তা ভারত চালু না করতে দিয়ে পাঁচ বছর আটকে রাখতে পেরেছিল, নির্বাচন রাজনীতিতে, সরকার গঠনে হাত ঢুকিয়ে। কিন্তু শেষ বিচারে বন্দর চালু হওয়া ভারত ঠেকাতে পারে নাই। ভারত ঘেঁষা চলতি সরকারই চীনের সাথে সংশোধিত চুক্তি করে বন্দর চালু করে ফেলেছে। তাই ভারত এখন এটাকে নিজের হার মনে করে, সেকথাই সুবীর তুলে এনেছে। তুলনায় নেপালে বন্দর না হলেও চীনের সাথে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আড়াই বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প আছে বা ছিল। যে সরকারের অধীনে চলতি নির্বাচন সমাপ্ত হল সেটা নেপালি কংগ্রেস দলের। তবে তা মাওবাদী দলের সমর্থনে গড়া এক কোয়ালিশন সরকার। নেপালে পানিবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুবীর বলছেন, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ৭৫৩ মেগাওয়াটের মত। ২০১৫ সালের শেষে কমিউনিস্ট অলির সরকারের আমলে চীনের সাথে তিনি ১২০০ মেগাওয়াটের ঐ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছিলেন, সেটাই আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির। কিন্তু চলতি নেপালের প্রথমপর্যায়ের নির্বাচন শুরুর কয়েক দিন মা্ত্র আগে গত নভেম্বরে নেপালি কংগ্রেস সরকার ঐ চুক্তি বাতিল করে দেয়। তাই আইনত সেই চুক্তি ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে। অজুহাত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার করা হয় নাই। এতে নেপালকে ঘিরে চীন-ভারত রেষারেষি আরো সরাসরি নির্বাচনে হাজির হয়ে পড়ে তখন থেকেই। স্বভাবতই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স এখন নির্বাচনে বিজয় লাভ করাতে ওই প্রকল্প ও চুক্তি আবার জীবিত হবে বলে সবাই অনুমান করছেন। মজার কথা হচ্ছে, সুবীর ভৌমিক ওই চুক্তি জীবিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। বলছেন এটাই নেপালের স্বার্থ। এই প্রকল্প চীনের চীনের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে অংশ বলে ঘোষণা করা ছিল। এমনকি তা সত্ত্বেও চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আরো অবকাঠামো প্রকল্প নেপালের আনার পক্ষে তিনি কথা বলছেন।

নয়াদিল্লি ঘোরতরভাবে চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পের বিরোধী। এটা ভারতের প্রকাশ্য বিদেশ নীতি ও অবস্থান। ভারতের কোনো ‘বন্ধু’ বা পড়শি রাষ্ট্র বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত থাকুক এটা দেখতে বা সহ্য করতে সে একেবারেই রাজি নয় (ফলে বাংলাদেশের সাথেও এটা এক অনৈক্যের বিরাট ইস্যু)। কিন্তু নেপালের বেলায় সুবীর বলতে চাইছেন, নেপালের এখন দরকার বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। না হলে নেপালের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। ইতোমধ্যে সদ্যগঠিত নেপালে জয়লাভ করা কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স, আগামী ১০ বছরের মধ্যে নেপালকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার আয়ের অর্থনীতির দেশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে চীনের মতই ভারতকেও নেপাল কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে দিয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু আজও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু হয়নি বলে সুবীর জানাচ্ছেন। অর্থাৎ একদিকে ভারতের সক্ষমতা দক্ষতা সামর্থ্য নেই, অন্য দিকে চীনের আছে, সুবীর এই তুলনা আনছেন। আবার চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার তুলনায় ভারত যে কিছুই না, সেটা শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে। ফলে সুবীর ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের কাছে ‘স্মার্ট হতে’ পরামর্শ রেখেছেন। আসলে সুবীরেরই খুবই স্মার্ট পরামর্শ এটা। কারণ তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, প্রশাসনের উচিত চীন-নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করা। পরামর্শ খুবই অ-ভারতীয় অথবা অ-চিরাচরিত ভারতীয় পরামর্শ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবীর বুদ্ধি দিচ্ছেন, এইবার যে বাড়তি বিদ্যুৎ তৈরি হবে তা যেন ভারত কিনে নেয়। আর এইবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ওই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিক্রি করে দিবার টাউটারি নিতে, নগদ লাভ এখানেই। অর্থাৎ ভারত যে উতপাদন আয়োজনে অক্ষম তা স্বীকার করে নিয়ে সুবীর টাউটারিতে নামতে বলছেন, তাই কী? তবে টাউট মারচেন্ডাইজ (tout merchandise ) খারাপ ব্যবসা নয়, ভারত যেটুকু ভাল পারে। এখানে আমাদের জানা থাকা ভাল যে, ভারত নেপালকে এমন ‘কলোনি-চুক্তির’ মধ্যে রেখেছে যে, ভারতের অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে নেপাল নিজ উতপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে না।

তবে আমাদের মতো দেশের বেলায় পাল্টা আরেকটা কথা সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে (যেমন বাংলাদেশেও) এক বিরাট কালো দাগ আছে। কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাই, কোনো ওপেন টেন্ডার হয় না। শুধু তাই না প্রকল্পের কোনো টেন্ডার করতে যাতে না হয়, বালাই যেন না থাকে, টেন্ডার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যাতে এড়ানো যায়; তাই প্রকল্পগুলো জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)-এর অধীনে সম্পন্ন করার চুক্তি করা হয়। আর এতে টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় বলে স্বভাবতই প্রকল্প মূল্যের কোনো মা-বাপ থাকে না। এ ছাড়া লোকাল এজেন্টের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা সুযোগও থাকে। বিশ্বব্যাংকের অনেক বদনাম আছে বা ছিল। তা সত্ত্বেও তুলনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অন্তত কোনো ওপেন আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়া সেক্ষেত্রে কো্ন প্রকল্প নিতে দেয়না।  বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটুকু অগ্রগতি তাদের ঝুলিতে আছে। এমনকি জাপান সরকার দাতা হলেও জাপানি ঠিকাদারকেই কাজ দেয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই নীতি কার্যকর করার সক্ষমতা তাদের আছে, ইতোমধ্যেই সেটা দেখিয়েছে। চীনের বিশ্বব্যাংক AIIB গঠনের প্রাক্কালে একে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করাতে এর বিরুদ্ধে মোক্ষম এই অভিযোগই তুলেছিল আমেরিকা। যদিও আমেরিকা নিজের বিরাট স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার কারণে নিয়মিতভাবে AIIB গঠনের বিরোধিতা করে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান অভিযোগ মিথ্যা ছিল না, তা বাস্তব।

তবে সেটা যাই হোক, সুবীরের লেখায় এই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা-দক্ষতা সামর্থের অযোগ্যতা বা ঘাটতির দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দিতে দেখা গেল। সুবীরের এই লেখা থেকে মনে করার কারণ আছে যে, ভারতের প্রশাসন বিপদে আছে বলে অন্তত কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে টনক নড়ারও কেউ কেউ আছে। আসলে ভারত বিপদ দেখছে; একের পর এক ভারতের পড়শি রাষ্ট্রে চীন প্রকল্প নিয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভারতের কিছু করার থাকছে না। এটা না দেখতে পাবার কারণ নাই, তবে স্বীকার করতে দেখা যায় না। সুবির তাই পরিস্কার করেই বলছে, ভারত এখন শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও আসলে শেষে কিছু ঠেকানো যায়নি বলে তারা মনে করে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ নীতিতে করণীয় – “শ্রীলঙ্কা মডেল বলেও কিছু দাড়ালো না।

কিন্তু আসলেই ব্যাপারটি এমন হওয়ার কথা নয় কি? ভারতের যদি সক্ষমতা-দক্ষতা-সামর্থ্য না থাকে, আর তা থেকে সৃষ্ট নানা দুর্বলতা তাকে ঘিরে রাখে, তবে এমনই কি হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রথম প্রশ্ন করা উচিত যে, ভারত কেন অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক সক্ষমতার দিক থেকে নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য বলে বিবেচনা করছে? কিসের ভিত্তিতে?

দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিহীন সব অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসন পড়শিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর ধপাধপ পড়ছে – শ্রীলঙ্কা আর এরপর নেপাল…। সুবীর ভৌমিকই বলছেন, শ্রীলঙ্কার পর নেপালেও নাকি নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার ভূত দেখতে পাচ্ছে। [But again, the ghosts of Sri Lanka may return to haunt Delhi…] তা হলে? এরপর কোথায়?

পাঠকের জন্য একটা সতর্কতা দিয়ে শেষ করব। বাইরের মিডিয়ার মত দেশেরও অনেক মিডিয়া – নেপালে একটা কমিউনিস্ট এলায়েন্স তৈরি হয়েছে আর চীন (মানে সেটাও তো কমিনিস্ট) – এভাবে সব মিলিয়ে বিষয়টাকে “চীনপন্থী”, বা “কমিউনিস্ট” ঘটনা বলে ইঙ্গিত হাজির করার চেষ্টা করছে। এই অনুমান ইঙ্গিত শতভাগ ভুল, ভিত্তিহীন। যে চিন্তা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে তা কোল্ড ওয়ারের যুগের; যেন ষাটের দশকের দুনিয়ায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি – এই ভিত্তিহীন অনুমানে বলা কথা। আমরা এখন একুশ শতকে, সকল রাষ্ট্র যখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে পরস্পরের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে লেপ্টে গেছি ও আছি। সবচেয়ে বড় কথা এই লেপ্টে যাওয়া আর কখনও  কোল্ড ওয়ারের মত আগের যুগে ফেরত যাবে না। তাই পুরানা চিন্তা কাঠামো আর বাস্তবতায় পুরানি টার্ম ব্যবহার করে কথা বলা আর সঠিক নয়। তাই এই ঘটনা কোনভাবেই আর “নেপালি কমিউনিস্ট আর চীনের” কোন বামপন্থা ততপরতা একেবারেই নয়। যেমন আগামিতে নেপালে দুই কমিউনিস্টকেই বাদ দিয়ে নেপালি কংগ্রেসের সাথে চীনের ঘনিষ্ট হওয়া খুবই সম্ভব। আসলে একালে ‘বামপন্থা’ বা ‘ডানপন্থা’ বলে কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা অর্থহীন।

আর একটা তথ্যঃ নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন শেষ হয় নাই। মোট আসন ২৭৫ যার মধ্যে ১৬৫ আসন আসবে সরাসরি প্রত্যেক আসনের ভোট কাউন্টে, একজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে প্রাপ্ত ১৬৫ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে।  আর বাকি ১১০ আসনের ফলাফল পুরণ হবে দলগুলোর আনুপাতিক ভোট প্রাপ্তি থেকে। অর্থাৎ সব আসন মিলিয়ে একটা দল মোট ভোটারের কত পার্শেন্ট ভোট পেয়েছে সে অনুপাতে এই ১১০ আসন ভাগ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন দল একটা আসনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জিততে না পারে যদি, তাহলেও এবার আনুপাতিক ১১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার সুযোগ আছে।  আনুপাতিক ১১০ আসনের গণনা এটা ঘরে বসে গণনা করে কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে দিবে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে ১৬৫ আসনের ভিত্তিতে বলে আনুপাতিক আসন এরপর যোগ হলে আনুপাতিক ভাবেই সব দলের আসন বাড়বে, তাই তেমন কোন হরফের হবে না। এভাবে নেপালের (ফেডারেল) সংসদে মোট আসন বা সংসদ সদস্য ২৭৫ জনেরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘নেপালে নির্বাচনের ফলাফল : শ্রীলঙ্কার ভূত দেখছে নয়াদিল্লি’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের সাপ ও ওঝার কুটনীতি

ভারতের সাপ আর ওঝার কূটনীতি

গৌতম দাস

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১২ঃ৩৫

http://wp.me/p1sCvy-2i4

 

সাপ ও ওঝা কুটনীতি। .মানে সাপ হয়ে কাউকে কামড়ানোর পরে আবার ওঝা হয়ে সেই বিষ নামাতে আসার ভান করা। কিন্তু এটা কী কূটনীতি হতে পারে? কুটনীতির মধ্যে বুদ্ধি, শঠতা, দুরদর্শীতা, কাছে ও দুরের স্বার্থ ইত্যাদি সবই থাকে। কিন্তু অন্তত সকাল বিকাল মিছা বলে ধরা খাওয়া বেকুব কেউ হয় না।  অথচ ভারত তাই হয়েছে। এটা কে বলে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব। আর এর সাগরেদ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আমাদের সরকার বলেছিল, বার্মার সাথে যৌথ ট্হল দিতে চাই যাতে রোহিঙ্গার বাপও না আসতে পারে। আবার এখন বলছে, ১৬ কোটি লোক খাওয়াতে পারলে ওদের খাওয়াতে পারব না কেন।  এরা সকলে ধরে নিয়েছে যে মানুষ এতই বোকা যে তারা কিছুই দেখবে না, বুঝতেও পারবে না? অথচ এটা অসম্ভব! এটা হয় না, হতে পারে না। তবু লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে অসহায় ভারত এই কাজই করেছে, বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে ডুবেছে।  সব হারিয়ে দুস্থ ভারত এখন সাপ-ওঝার কূটনীতিতে নেমে গেছে।

মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর বার্মার সেনাবাহিনী ও সরকারের নির্মুল অভিযান বহু পুরানা কাল সেই ১৯৭৭ সাল থেকেই চলে আসছে। কেবল কিছুদিন পর পর এই এথনিক ক্লিনজিং বা নির্মুল অভিযানের জোয়ার উঠতে দেখা যায়। এবারের পর্বে মায়ানমারে রোহিঙ্গা মারা ও খেদানো শুরু হয়েছিল ২৫ আগষ্ট রাত থেকে। প্রত্যেক বারের মত এবারও বার্মা সেনাবাহিনীকে এক নতুন অজুহাত দিতে দেখি আমরা। এবারের অজুহাত হল, আরসা নামে রোহিঙ্গাদের এক সামরিক সংগঠন বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর নাকি কিছু আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু তাতে পরিণতি বা ফলাফল কী হয়েছে? এখন আমরা দেখছি তাতে ফলাফল হল, বর্মীজ সামরিক বাহিনী এপর্যন্ত চার লাখের মত রাখাইন রোহিঙ্গাদের উপর নির্মুল অত্যাচার নিপীড়ন করেছে আর হাজার চারেক হত্যা করেছে। তাহলে কে কার পক্ষে কাজ করল? মায়ানমার তাদের উদ্বাস্তু করল কেন? ইন্টার নাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ অবশ্য একটা সাফাই টেনে উল্লেখ করেছে, আরসা সংগঠনের হামলার প্রতিক্রিয়ায় নাকি সেনাবাহিনী একটা “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” চালিয়েছে। [In response, the military is conducting “clearance operations” across ……] । কিন্তু আরসা সংগঠন হামলা চালালেই বর্মী সেনাবাহিনী কোন “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” কী  চালাতে পারে এই প্রশ্ন কেউ তুলছে না। কে কাকে কী ক্লিয়ার করল? মানুষ ক্লিয়ার করল মানে কী? ক্রাইসিস গ্রুপ এই রিপোর্ট কী আসলে সেনাবাহিনীর স্বীকার করে নেওয়া যে তারা রোহিঙ্গা নির্মুল করেছে! ক্লিনজিং!

আবার ২৭ আগষ্টের রয়টার্স পরিবেশিত খবরে দেখা যাচ্ছে বার্মা সেনাবাহিনীর এক বিবৃতি পাঠিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে প্রায় “৮০০ বাঙালী টেররিস্ট” (রোহিঙ্গা উচ্চারণ না করে বর্মীজ সরকার তাদের বাঙালী বলে) কে তারা ‘মোকাবিলা’ করেছে। সেনাবাহিনীর ‘মোকাবিলা’ মানে বুঝতে হবে মেরে ধরে হত্যা নির্যাতন ধর্ষণ করে ঘরছাড়া উদ্বাস্তু করা। কিন্তু সেনাবাহিনী যে ৮০০ সংখ্যা উল্লেখ করে যতই আরসার (ARSA) কথিত হামলাকে অজুহাত হিসাবে দেখাক না কেন, বাস্তবে আমরা দেখছি, চার লাখের উপর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে উদ্বাস্তু করা আর প্রায় চার হাজারের মত হত্যা করা হয়েছে। ফলে ৮০০ সংখ্যার উল্লেখ এরপরেও এই অত্যাচারের ফিগারগুলোর পক্ষে ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে না। ফ্যাক্টস হল, বরং এতে এখানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ঘটেছে তা প্রমাণিত হয়। আসলে শাহবাগী একটা যুক্তি আছে এখানে। যুক্তিটা ামরা শাহবাগের রমরমা যুগেও দেখেছি যে বলা হত, কোথাও হয়ত পুলিশের উপরও কিছু পালটা  হামলা হয়েছে। এইবার সেটাকে অজুহাত হিসাবে নিয়ে এরা সাফাই গাইত যে এজন্যই পুলিশ এবার নির্বিচারে হত্যা, বলপ্রয়োগ নির্যাতন, পায়ে গুলি করা ইত্যাদি সবই করেছে এবং পুলিশ এমন সবকিছু করতে পারে এবং এটা জায়েজ। অথচ ফ্যাক্টস ও আইনের কথা হল, এটাকে পুলিশী ভাষাতেই বলে ‘একসেস বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ বলে। অর্থাৎ পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে যখন কোন সিভিল গ্রুপ মুখোমুখি হয় বা মারামারি হয় তখন সেটা জমি নিয়ে দুপক্ষের লড়াই বা পাড়ার দুই পক্ষের পোলাপানের মারামারির মত না; যেখানে উভয় পক্ষই যথেচ্ছাচার অপরপক্ষের উপর যেকোন মাত্রায় বলপ্রয়োগ করতে পারে। কারণ আলোচ্য ক্ষেত্রে এখানে একপক্ষ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তার কাজ কখনই অপরপক্ষকে নির্মুল বা ঘরছাড়া করা নয়; এবং এই লক্ষ্যে সে ইচ্ছামত মাত্রার বলপ্রয়োগ একেবারেই সে করতে পারে না। বরং যতটুকু বলপ্রয়োগ করলে সে অপরপক্ষকে কাবু করতে পারবে ঠিক ততটুকুই সে বলপ্রয়োগ বা  “ওভার-পাওয়ার” করবে। এর বেশি না। কোন প্রতিহিংসা তো নয়ই। আর এর বেশি হলে বরং ঐ নিরাপত্তা বাহিনী উলটা ফৌজদারি অপরাধ করেছে বলে গণ্য হবে। এটাকেই একসেস বা “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ” এর অপরাধ বলে। আর এটাই হল যে কোন ফোর্সের ‘ফোর্স এনগেজমেন্ট রুল’, ‘বলপ্রয়োগে সংশ্লিষ্ট’ হবার পক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর পালনীয় শর্ত। এতে পরিস্কার যে বর্মীজ বাহিনীর নিজেরই দেয়া তথ্য ও কথিত  যুক্তিকে সত্যি হিসাবে যদি ধরি তবুও নিরাপত্তা বাহিনী অবশ্যই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। ফলে এখানে স্পষ্টত সেনাবাহিনীই অপরাধ করেছে। মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন হয়েছে। ওদিকে গণতন্ত্রের নোবেল নেত্রী সু চি আবার দাবি করে বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইনে রোহিঙ্গা জঙ্গীরাই নাকি রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে”। এখন কার কথা আমরা বিশ্বাস করব এও আর এক মুসিবত!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বার্মা সফরে ছিলেন গত ৫-৭ সেপ্টেম্বর।  বিবিসি লিখেছিল, এই সফরে ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। আর “সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা” করা। অর্থাৎ নিজে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া অথবা কাউকে হারানোর জন্য কোন রাষ্ট্র কারও গণহত্যা ও নির্মূলকরণে সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল মোদির ভারত। সুচির সাথে মিডিয়ার সামনে সাক্ষাতে মোদি বলেছিলেন তিনি সুচির ‘পাশে আছেন’। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, তিনিও বর্মী সেনাবাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানান। আর সু চি সাথে তাল মিলিয়ে মনে করেন, এটা রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বা নির্মুল করে ফেলার ইস্যু না বরং এটা হল,একটা “ইসলামি টেররিজমের” ইস্যু। ফলে মোদি তা সঠিক মনে করেন ও সু চি কে সমর্থন জানান। সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা ছিল ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। অবশ্য মোদির এই সফর শুরুর আগের সপ্তাহে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হঠাত করে বলা শুরু করেছিলেন ভারতে নাকি ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছে (জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনারের মতে ১৬ হাজার), এবং তাদের বের করে দেয়া হবে বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। এটাও বার্মার সেনাবাহিনী ও সু চির মন পাবার জন্য ভারতের কাতর এক প্রচেষ্টা তা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু মোদির এই সফর শেষে তিনদিন পরে ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টে শুরুতেই লিখছে যে মোদি তার সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে দেখেছেন চরম সন্ত্রাসবাদের ঘটনা হিসাবে এবং তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ রোহিঙ্গাদের উপর পরিচালিত ক্লিনজিং – নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হবার দিকটা নিয়ে কিছুই বলেন নাই। অথচ ঐ সফর শেষে আচমকা ১০ সেপ্টেম্বর এই বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা আবেদন রাখব রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ‘সামালে আর পরিপক্কতার’ সাথে যেন নাড়াচাড়া করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ‘বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের’ দিকটাও যেন দেখা হয়”। বেশির ভাগ অন্যান্য পত্রিকা শুধু এতটুকুওই ছেপেছে, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এছাড়াও এক বাড়তি বাক্য ছেপেছে, ‘পিছনের কারণ’ বলে। তা হল, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তিনি নাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে দেখা করার পরেই ভারত এই মত বদলিয়ে ফেলে। আসলে এটা হল ভারতের নিজের ইউ-টার্ণের পক্ষে এক সাফাই নিজ উদ্যোগে বাজারে ছেড়ে রাখা। আর এই উলটা মোড় যে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব তা পরোক্ষে স্বীকার করে নেয়া। ব্যাপারটা হল, যদি বাংলাদেশের ঐ হাইকমিশনার এতই বুদ্ধিমান, কার্যকর ও করিতকর্মা হয়ে থাকেন আর ভারতের কূটনৈতিকদের কাজের ভুল সংশোধনের মূল ব্যক্তি হয়ে থাকেন তবে ভারতের উচিত তাকে স্থায়ীভাবে ভারতের কূটনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া, যাতে ভবিষ্যতে এমন বেকুবি আর দেউলিয়া সিদ্ধান্ত ভারত আর না নিয়ে বসতে হয়। তাই নয় কী!

ব্যাপারটা হল সকালে মোদি যাকে “রোহিঙ্গা টেরর” বলছেন বিকেলে তারই সুরক্ষার জন্য আবার সু চিকে “বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের দিকটা সামলাতে” বলছেন। নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনীতিতে একইসঙ্গে সাপ আর ওঝার ভুমিকা পালনের এক ক্লাসিক উদাহরণ।

কিন্তু আসলেই কী ভারতের কূটনীতিকেরা এতই বেকুব যে তাঁরা নিজেদের এই স্ববিরোধিতাটা দেখতেই পায় নাই? না, বরং এটা আসলে জেনেশুনে নিজেকে বেকুব বলে হাজির করা এবং মনে করা যে এতে বেশি লাভ হবে। অনেক পত্রিকাতেই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মন্তব্যে আরও একটা বাক্য আছে। তা হল, “এটা বুঝাই যাচ্ছে যে সহিংসতা শেষ হয়েছে, রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত ফিরে আসছে”।  অর্থাৎ ভারতের ফরেন অফিস বলতে চাইছে যে হা কথা সত্য, তাদের অফিস সকাল বিকেল  ভোল বদলিয়েছে। তবে বদলেছে কারণ রাখাইনে দাঙ্গা থেমে গেছে। কিন্তু এমন বাক্য ভারত লিখতে গেল কেন? সেপ্রসঙ্গের আগে বলতেই হয়, এটা খুবই অকূটনীতিক ভাষা। কারণ মায়ানমারে দাঙ্গা পরিস্থিতি ভাল বা উন্নতি হয়েছে কী না তা নিয়ে ভারত কথা বলার কে? এটা তার বলার কথা না, এক্তিয়ার নয়। এমনকি ভারত এটা জানলেও তা ওরবলা উচিত না বা বলার কথা না। কারণ তাতে ব্যাপারটা ভিন রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের মত হয়ে যায়। তাই একমাত্র মায়ানমার বলতে পারে, আর এরপরেই সে ভাষ্য ভারত ব্যবহার করতে পারে মাত্র, এর আগে না। তাহলে ভারত এই কুটনীতিক রীতিভঙ্গ করল কেন?

কারণ, এবারে বার্মা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোন এক উছিলায় বাধ্য করে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া, যাতে  প্রায় চার লাখের উপরে এরা এরপর থেকে শরনার্থী ষ্টাটাস পায়। তাতে বার্মার লাভ হল যে,  বার্মা দাবি করছিল এরা বার্মার নাগরিক নয়। কিন্তু ওরা দেশের ভিতরে বসবাস করছিল বলে সেই বার্মার সে দাবি হালে পানি পাচ্ছিল না। তাই এবার ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বার্মার অর্জন হল, মূল জনগোষ্ঠির রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়া সফল হয়ে গেছে। যদিও এতে কিছু পকেটে কিছু রোহিঙ্গা এরপরেও থেকে যেতে পারে কিন্তু মুল অংশ বের করে দেয়া গেছে। সুতরাং লক্ষ্য অর্জিত। তাই, এখন ভারত অবস্থান বদলালে তেমন অসুবিধা নাই। তাই ভারত নিজ উদ্যোগে দাবি করছে ‘দাঙ্গা থেমে গেছে’, ফলে তাদের অবস্থান বদল। তাহলে মূল কথা, সু চিকে ভারতীয় সার্ভিস পুরা মাত্রায় দেয়া হয়ে গেছে বলে ভারত অবস্থান বদলিয়ে নিয়েছে, তাতে যতই কূটনীতিক বেইজ্জতিই ভারতের হোক না কেন! অতএব এখন সময় হাসিনা-সুষমা গলা জড়াজড়ি করা। ত্রাণ পাঠানোর ছবি তোলা, আর মহড়া করার।

কেউ কম যায় নাই। চীনের গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, বার্মার নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়ছে আর তাতে নিজের  উদ্বেগের কথা চীন জানিয়েছে। [backs Myanmar’s efforts to “safeguard peace and stability,”]। অথচ রোহিঙ্গাদের নির্মুল নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হওয়াকে চীনের কাছে ইস্যু নয়। এর কোন উল্লেখ চীন করে নাই।  অর্থাৎ সবার রোগ একই। আর চীনের ঐ খবরের শিরোনাম হল, মায়ানমার নাকি “শান্তি আর স্থিতিশীলতা সুরক্ষা করছে” বলে চীন মনে করে। ফলে ভারতের মত চীনও পিছিয়ে না থেকে এখন ত্রাণ পাঠাতে ব্যস্ত।

আমেরিকাও তাই; সেও পিছিয়ে নাই। আমেরিকান উপ-সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফি গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনিও নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আর তিনি মনে করেন রাখাইনে রাজ্যে একা মুসলমানেরা নির্যাতিত নয়, মুসলমানদের হাতে অন্যেরাও নির্যাতিত। এটাই সু চির এর লাইন। সু চি চায় সবাই ‘এটা বিভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা’ এটা প্রচার করুক। আর সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা ক্লিনজিং বা সাফা করা আড়াল করুক।

 

গৌতম দাস

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

গৌতম দাস

২২ মে ২০১৭, ০০ঃ ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2fz

প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান,  বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত” ব্যক্তি কিনা সেই সন্দেহ রেখেছেন। ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’! কী দুর্দান্ত ভাষা! আর সেই বিশেষ ‘অনুভুতি’ মাপার ডাক্তার হয়েছেন মিজান। বাহ! বাহ! এটা কি রাজনীতি পর্যালোচনার ভাষা  নাকি যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা জাতীয় মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ? অথবা ‘ব্যাটলিং বেগামস’ এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে প্রথম-আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপের এক এগারোর রাজনীতির নতুন ড্রিল? গত ১১ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো মিজানুর রহমান খানের ‘জিয়া-যাদু গোপন চুক্তিটি কি প্রকাশ করবেন খালেদা জিয়া?’ লেখাটি প্রকাশ করে। শিরোনামের স্টাইল খেয়াল করলেই সন্দেহ জাগে এর মতলব ভালো না। যাদু মিয়ার সঙ্গে জিয়াউর রহমান নাকি একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন । আর এখন ১০ মেবুধবার খালেদা জিয়া তাঁর ভিশান ২০৩০ পেশ করবার পরপরই দৈনিক প্রথম আলোর একটাই বিশাল রহস্যমিশ্রিত আবদার, সেই ‘গোপন’ চুক্তি খালেদা জিয়া প্রকাশ করুক!

বিএনপি এবং ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির যেকোন সমালোচনা পর্যালোচনা হতেই পারে। কিন্তু বলুন তো খালেদা জিয়ার মধ্যে  গণতন্ত্র মনস্ক অনুভূতিসম্পন্ন “উপলব্ধি” আছে কিনা সেটা বিচার করবার ডাক্তার কোথায় পাবেন? দ্বিতীয়ত একটি দেশ বা সমাজের রাজনীতি স্রেফ একজন ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না। যে সকল রাজনৈতিক বর্গ কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠি নিজ নিজ ক্ষমতা  এবং নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক সম্মতি তৈয়ার করে তার সঙ্গে সেই বর্গটি সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন বয়ানের ভূমিকা থাকে। থাকবেই। সেই ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কে  যে সকল বয়ান সমাজে হাজির এবং সেই সকল বয়ান কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক সমালোচনা পর্যালোচনা ছাড়া জাতীয় রাজনীতির কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। তার মধ্য দিয়েই জনগণের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটে। এই গোড়ার কথা যখন আমরা মনে রাখি না, তখন হলুদ সংবাদ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার সমাধান হিসাবে ‘মাই নাস টু’ ফর্মুলা তৈয়ার এবং তা কার্যকর করবার কাজে অনায়াসেই লেগে পড়তে পারে। গত এক-এগারোর সময় এটাই আমরা দেখেছি। “মাইনাস টু” রাজনীতির মূল তত্ত্ব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য দুইজন “ব্যাটলিং বেগাম” – অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়ী। অতএব করণীয় হচ্ছে এদের দুইজনকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ পাঠক আপনার নিজের মতো করে বুঝে নিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য যখন আমাদের বিচারের মানদণ্ড খালেদা কিম্বা শেখ হাসিনার ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত উপলব্ধি’ থাকা না থাকার বিচার হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা মূলত মাইনাস টুর তত্ত্বই আর এক ভাবে আওড়াই। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্ট ভাবে খালেদা জিয়া সম্পর্কে এই বোম্বাস্টিক বিশেষণ প্রয়োগের চেষ্টা দেখে আন্দাজ করা যায়  এবার মাইনাস-টু না সম্ভবত মাইনাস ওয়ান এটা।

যাক্‌,  তবুও বাংলাদেশে তাহলে ‘গণতন্ত্রমনস্ক’ এবং গণতন্ত্রের ‘অনুভূতি প্রসূত উপলব্ধি্র’ ধারক মহানুভব   একজন ব্যক্তি পাওয়া গিয়েছে।  বিএনপি একটা ভাল দল কীনা, ওর রাজনীতি ভাল কীনা এমন কিছু প্রমাণ মিজানুর রহমান খান করবেন আমরা তা আশা করি না। যদিও পর্যালোচনায় ভালমন্দ উভয় দিকটাই তুলে ধারা্র কথা। মুল্যায়নে বসলে বিএনপির একগাদা ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা অনেকেই খুজে পেতেই পারেন। তবে মিজানুর রহমান খান  ব্যক্তিগতভাবে একজন বাকশাল-প্রেমি ও ‘বাঙালী জাতীবাদ”-প্রেমিও তিনি বটে। যদিও তাতেও আমাদের সমস্যা নাই।   কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন চরম প্রিজুডিস বা নিজের বাকশালপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবাদকে পাশে সরিয়ে না রেখে উলটা তা দিয়েই  রাজনীতির মুল্যায়ন করতে বসেন। সেটা দৈনিক প্রথম আলোর মতো তথিকথিত সাংবাদিকতার আড়ালে মূলত ‘বাকশালী’ অপপ্রচারের অধিক কিছু হয়ে ওঠে না।

কোন রাজনীতি বা রাষ্ট্রের ভালমন্দ বিচার করবেন কী দিয়ে? সে বিচার কাজে ক্রুশিয়াল বৈশিষ্টগুলো কী কী ?  সেগুলো জেনে রাখার বদলে নিজের বাকশালপ্রীতির উপর ভরসা করে বিচারে বসলে তাতে সেটা ঘোরতর অন্ধ দলবাজীই হবে। প্রথম আলোতে প্রকাশ্যে ঘোষিত মিজানসহ তিনজন বাকশাল সমর্থককে এডিটর আমরা দেখে থাকি।  বিশেষ করে মিজানের লেখায়, যেমন আলোচ্য এই কলামের শিরোনাম পড়ে যেকারও মনে হবে পাপীতাপী বিএনপির বিরাট এক গোপন দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসে মিজান কথা বলছেন। তাই কী? আসেন তাহলে দেখা যাক!

বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীলরা’ কেউ কোনদিন শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর কোন রিভিউ, সমালোচনা করেছেন জানা যায় না। তবু অনেকের মনে পড়বে হয়ত, একদলীয় শাসন অথবা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ইত্যাদির কথা। কিন্তু এগুলো সেই সংশোধনী কার্যকর করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের যে  বৈশিষ্ট্যগত  ত্রুটি ঘটেছে তার আসল বিচার নয়। অর্থাৎ কনষ্টিটিউশানাল বা রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা নয়। অথচ মিজানুর রহমান খান অনবরত নিজেকে মহা সংবিধান বিশারদ জ্ঞান করে আমাদের আলোকিত করে থাকেন!

গঠন প্রক্রিয়া কিম্বা বৈশিষ্ট্য কোন দিক থেকেই বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদর্শ মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। সেটা ইতিহাসের ফলাফল, আমরা তা মেনে নিয়ে যতটুকু পেয়েছিলাম তাই নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। সেই ক্ষেত্রে তার যতটুকু ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য আছে তা অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু বাকশাল সংশোধনীর ফলে এরপরের বাংলাদেশ আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় বরং এক  দানব বা স্বৈরশাসন আনয়নকারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন বদলানোর ফলে সেই দানবীয় চরিত্র  কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে খুব কমই পর্যালোচনা দেখা যায়।  তবু বাকশালী মিজানুর রহমান খানের একটা সহজ ফর্মুলা হল অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিয়াউর রহমানকে গালি গালাজ করা। বাকশাল সম্পর্কে টুঁ শব্দ না করে সারাক্ষণ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গালমন্দ পাড়া। সব সমস্যার কারণ হিসাবে সামরিক শাসনকে দেখানো। সামরিক  শাসন সামরিকতন্ত্র খারাপ, অবশ্যই। কিন্তু বাকশালকে মহৎ প্রমাণ  করবার সুবিধা না পেয়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কতো খারাপ ছিলেন সেটা প্রমাণ করে বাকশালের মহিমা গোপনে জারি রাখাই বাংলাদেশের নব্য বাকশালিদের কাজ। মিজানুর রহমানকে তাদের সর্দার বলা যায়। সেটা বাকশালিদের পক্ষে সহজ হয়েছে কারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বুদ্ধিজ্ঞানহীন বোকাদের দল, যারা নব্য বাকশালিদের রাজনীতি মোকাবিলা করবার ন্যূনতম হিম্মত রাখে না।

মিজান তাঁর লিখায় নিজেকে বারবার   রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক ক্ষমতা পুঞ্জীভুত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব হিসাবে তুলে ধরেন।  কিন্তু আজীব ব্যাপার হল, আমাদের সংবিধানে সর্বপ্রথম যে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে প্রায় সব ধরণের ক্ষমতা সঞ্চিত করা হয়েছিল সেটা বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী। তা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে মিজানুরের কলম জাগে না। বরং তিনি কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বলে এক রহস্য তৈরি করতে গিয়েছেন, ১১ মে এর ঐ কলামে। কথিত সেই গোপন চুক্তি নাকি অপ্রকাশিত, মিজান জানাচ্ছেন। কিন্তু অপ্রকাশিত হলেও মিজানুর আবার এর পুরাটা জানেন ও এবং সেটা তার আবার মুখস্থ। তাঁর কথিত মতে, শেখ মুজিবের বাকশালী সংশোধনীতে প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীন যে একক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন, জিয়া নাকি এরচেয়েও আরও ক্ষমতা চেয়েছিলেন। যদিও মিজান নিজেই জানাচ্ছেন জিয়া শেষে এমন ক্ষমতা নেনই নাই। সেই না নেওয়ার দলিলই হল মিজান কথিত যাদু মিয়ার সাথে ‘গোপন চুক্তি’। তাহলে  সেক্ষেত্রে কথিত সেই দলিল বলে যদি কিছু আদৌ থেকেও থাকে তবে তা  বিএনপি বা জিয়ার কোন কলঙ্কের দলিল হয় কেমন করে? কিন্তু তবু মিজানুর রহমান খানের দাবি কথিত ঐ গোপন দলিল ‘কলঙ্কিত’ এবং তা “খালেদা জিয়াকেই প্রকাশ করতে হবে”।

মিজানুরের চরম বিনোদনমূলক তামাসাটা হল, তিনিই বলছেন ঐ গোপন দলিল আসলে জিয়াউর রহমানের বাড়তি ক্ষমতা না নেওয়ার দলিল বা রাজনীতিবিদ যাদু মিয়ার সাথে  “সন্ধি-পত্র”  – অথচ এই কথিত চুক্তি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি  আর জিয়া এবং  বিএনপিকে ‘পাপীতাপী’ ‘অভিশপ্ত’ বলে ইঙ্গিত তৈরি করছেন তিনি। এই সুযোগ মিজানুর কোথায় পাচ্ছেন? বরং মিজানুর যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক সীমাহীন ক্ষমতা সঞ্চিত করার বিরুদ্ধের সোচ্চার প্রবক্তা হতে চান তবে সেক্ষেত্রে শেখ মুজিবের এবং বাকশাল সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা দিয়েই তাকে শুরু করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি তার প্রগতিশীলতা-বোধ, বাঙালী জাতিয়তাবোধ কিংবা বাকশালপ্রীতি বাধা হয়ে দাড়ায় তবে তা তাকেই পেরিয়ে আসতে হবে। এপর্যন্ত যা তিনি কখনও পেরেছেন আমরা দেখিনি।

এই প্রসঙ্গে বলে নেয়া যায় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস বিচারে – বিশেষত কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী কী কী কারণে কালোদাগের এবং ক্ষতিকর এমন কোন একাদেমিক মুল্যায়ন আমরা ‘প্রগতিশীলদের’ ঘর থেকে বের হয়েছে দেখি নাই। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসরেও এবিষয়ে আর যা দেখা যায় সেগুলোকে বড়জোর পার্টিজান বা দলকানাদের সমালোচনা। এই অবস্থায় বাকশালের আসল মুল্যায়ন হল – এককথায় বললে – এই সংশোধনী্র মধ্য দিয়ে আসলে বাংলাদেশ  রাষ্ট্রের খোদ কনষ্টিটিউশনকেই নাই করে দেয়া হয়েছে।  সোজা কথায় ভাঙাচোরা হোক বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে একটা রাষ্ট্র বানানো গঠন হয়েছিল, আর সেটাকেই বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী পুরাটাই ভেঙ্গে দিয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী এই অর্থে রাষ্ট্র নিরাকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যে অভিজ্ঞতা থেকে বারবার আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র নাই অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়ার দলিল এটা।

কেন? এর মূল কারণ এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রের  নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের আদালতে  রিট করার ক্ষমতা [আর্টিকেল ৪৪] কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই না, জুডিশিয়ারির বা আদালতের রিট শোনার যে আলাদা নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া ছিল [আর্টিকেল ১০২ (১)] সেটাও চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। [চতুর্থ সংশোধনীর পিডিএফ কপিতে এখানে দেখুন, সংশোধনীর ইংরাজী অংশে প্রথম পাতায় ৩ নম্বর সংশোধনী আর ১৭ নম্বর সংশোধনী দেখুন হলুদ মার্কার দেয়া আছে।।] আর প্রেসিডেণ্ট জিয়ার সামরিক অধ্যেদেশ বলেই, আবার বলছি ১৯৭৬ সালের সামরিক অধ্যাদেশ বলেই  ঐ বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া [আর্টিকেল ৪৪] এবং [আর্টিকেল ১০২ (১)]  ফেরত নিয়ে আসেন। একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ এবং কথাগুলো সবচেয়ে সহজে স্পষ্ট বুঝা যায় কনষ্টুটিটিশনের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের আপিল কোর্টের রায়ে। ঐ রায় ১৮৪ পৃষ্টার। ঐ রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল বলে জানানো হলেও একই সাথে পঞ্চম সংশোধনীর যেসব অংশ বাতিল হবে না, বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জীবিত থাকবে সেসবের একটা তালিকা দেয়া আছে ওর ১৮৩ পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা আছে জিয়ার আনা সংশোধনীর কথা। [দেখুন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়, আপিল কোর্ট জাজমেন্ট ২০১০,  ১৮৩ পৃষ্ঠায় 3e এর (iii, iv & v)]    শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর ফলে এভাবেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতার দানব বানিয়েছিল, এর বিরুদ্ধে আদালতে কোন প্রতিকার চাইবার সুযোগ ছিল না। ফলে বাংলাদেশ  আর কোন প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে নাই। যে রাষ্ট্রে রিট করার সুযোগ নাই, সেটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না। এই দিকটা নিয়ে কোন জজ-উকিল বা কোন রাজনীতিবিদকে আমরা পয়েন্ট তুলতে শুনি নাই। এটাও এখন প্রমাণিত যে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনষ্টিটিউশনের ভাল-মন্দ বিচার কী করে করব, কী করে এটা কাজ করে তা বুঝার ক্ষেত্রেও আমরা এখনও যথেষ্ট লায়েক হই নাই। এখনও কেবল দলবাজি আর প্রগতিশীলতার ভাণ ও ভণ্ডামির মধ্যে আটকে আছি। অথচ আমরা আবার আওয়ামি লীগ বা বিএনপির এবং রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট বুঝার বিচারক হতে চাচ্ছি।

‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা
মিজানুর রহমান খানের আর এক প্রবল পছন্দের বয়ান হল ‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার’ তুলনা। এটাতে  তাঁর চিন্তা করার কাঠামোটাও ধরা পরে। অবশ্য এটা তাঁর একার না, বাকশালের পক্ষে সাফাই যারাই দেন তাদের সাধারণ বয়ান এটা। মিজান সে বয়ান পরিপাটি করেন মাত্র। এই বয়ান দিয়ে তিনি বলতে চান বাকশাল দানব ক্ষমতার রাষ্ট্র তৈরি করলেও যেহেতু এটা বেসামরিক শাসন, আর বেসামরিক শাসন মানেই বৈধ শাসন, তাই দানব বাকশাল হলেও এটা বৈধ, ফলে গ্রহণীয়। আর তাই বিপরীত যুক্তিতে সামরিক শাসন অবৈধ। দারুন বাকশালী যুক্তি। বিএপির বিরুদ্ধে এটাই  প্রধান বাকশালী অস্ত্র, কিন্তু বিএনপির সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা এই বাকশালী কৌশলের মর্ম ধরতে পারে না বলে এর কোন উত্তর দেবার হিম্মত দেখাতে পারে না।

আসলে এভাবে বৈধ-অবৈধ এর ভাগাভাগির লাইন টানা – এটা নগ্ন  শঠতা। মিজান বলতে চান বাকশাল সংশোধনীর ভিতরে যত খারাপ কিছুই থাক তবু এটা বৈধ কারণ তা সিভিলিয়ান ক্ষমতা। এটাই শঠতা। উপরে দেখিয়েছি, কনষ্টিটিউশনে চতুর্থ সংশোধনী এনে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে চাইলে কোন নাগরিকের আইনিভাবে আদালতে নালিশ জানাতে যাবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে এরপরের বাংলাদেশ, এটা দেখতে তখনও একই দেশ বা আধুনিক রাষ্ট্র মনে হলেও কার্যত এটা আর তখন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। এটা আসলে নির্বাহী প্রেসিডেন্ট – নামে “এক সম্রাটের  প্রি-রিপাবলিক বাংলাদেশ” হয়ে গেছিল। আমি নিশ্চিত মিজানসহ কোন ‘প্রগতিশীল’, ‘বাঙালী জাতিবাদীর” চিন্তায় এটা ধরা পড়বে না। এভাবে তারা চিন্তা করে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এমনকি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও নয়। বেসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন মানেই মন্দ গল্প তারা বাকশালিদের কাছ থেকে ভালোই হজম করে। হয়তো নীরবে মেনেও নেয়।  চতুর্থ সংশোধনী যেখানে রাষ্ট্রের রিপাবলিক বৈশিষ্টই নষ্ট করে দেয় এরপর সেই বাকশালী রাষ্ট্রটা বৈধ নাকি অবৈধ –  সামরিক নাকি বেসামরিক – সেটা  কী আর কোন তর্ক? কিন্তু মিজান মার্কা এই বাকশালী মিথ্যা আর চাতুর্য প্রপাগান্ডার তোড়ে বিএনপিই  ঘায়েল হয়ে গিয়েছে। কারণ রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য সুরক্ষা বিএনপির রাজনীতি নয়। এর ফলে তারা জিয়াউর রহমানকেও স্রেফ একজন সামরিক শাসকের বেশী বুঝতে অক্ষম। অথচ বাকশালী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব আসলে আমাদেরই এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতায়, “পোস্ট-বাকশাল পরিস্থিতিতে আবার ট্রাকে উঠার উদ্যোগ” এটা বোঝার ক্ষমতা বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নাই।

এমনিতেই বৈধ-অবৈধের তর্ক আর এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ বিষয়কে বুঝার চেষ্টা একটা খুবই নাবালকের কাজ। মনে রাখতে হবে একটা কালাকানুন বা কালো আইন – চরম দমনমূলক ও নিপীড়ন আইন হলেও সেটা বিদ্যমান সংবিধানের কারণে  ‘বৈধ’ আইন হতে পারে; কোন অসুবিধা ছাড়াই।  তাই, এই বৈধ-অবৈধ জাতীয় শঠ প্রশ্ন তুলে বাকশালের কুকীর্তি আড়াল করে বলেই মিজানুর রহমান খানকে বাকশালের দলবাজ সমর্থক বলছি।

আবার বিপরীতে সেসময়ের জিয়ার সামরিক ক্ষমতা সেটাও সামরিক নাকি বেসামরিক সেবিচারে যাওয়াও একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কারণ সেটা যাই হোক না কেন সেসময়ের ঐ ক্ষমতাটা ছিল এক অন্তর্বর্তী ধরণের ক্ষমতা মাত্র। এটাই ঐ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্ট। আর ওর ভাল মন্দ নির্ধারিত হবে নতুন যে ক্ষমতা কাঠামো সে তৈরি করবে বা হবে ওর গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। তাতে যারা নির্বাচিত হয়ে নতুন ক্ষমতায় আসবেন সেসব অনেক কিছুর গ্রহনযোগ্যতার উপরে। আর প্রি-কনষ্টিটিউশনাল সরকার মাত্রই অন্তর্বর্তী সরকার। বাকশাল করে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা এবং  শেখ মুজিব খুন হবার পর যা আমরা পেয়েছি তাতে সেটা আবার একটা প্রজাতান্ত্রিক কনষ্টিটিউশনের ফিরে যাবার আগের অন্তবর্তী অবস্থা।

তবু মিজানুরের মনে হতে পারে যে না, “ক্যান্টনমেন্টে বসে” যারা দল বানালো তাদেরকে হাতে নাতে ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যায় না। ওকে নো প্রবলেম, আসুন মিজান তাহলে এবার আপনারই বিচার করি। ১/১১ এর সরকার কী সামরিক সরকার ছিল না? আর এই সামরিক সরকারের সাথে খোদ আপনি মিজান আর আপনার বস  মতি-মাহফুজদের  সম্পর্ক কী ছিল তা  নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নিবেন? আপনি মিজান কী তখন সে কালের “ক্যান্টনমেন্টে বসে” রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কারের নামে মহৎ কাজে  লিপ্ত হন নাই? ঐ কাজ আর ঐ সামরিক সরকার কী “বৈধ” হয়ে গেছিল আপনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে?   আরও ভিতরে যাবেন?  আসেন!
১/১১ এর ক্ষমতায় ইচ্ছামত যা মনে চায় করে যে রাজনৈতিক সংস্কার আপনারা করেছিলেন – কী তার পরিণতি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও এর কাঠামো এমন কিছু অথবা কী ছাপ আপনারা রেখে গেছিলেন যার সুফল এই আট বছরের হাসিনা সরকারের থেকে আমরা পাচ্ছি? বলেন, কোনটা  আপনাদের অবদান? কোন সে সুফল? আপনাদের সংস্কারের ফসল কী খোদ হাসিনার শাসনটাই নয়? নিঃসন্দেহে এখন কোন দায়ই নিতে চাইবেন না, আপনি। আমরা জানি। কিন্তু ইতিহাস সবাইকে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। আপনারাও ব্যতিক্রম নন।

কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ
মিজান আর এক বিরাট অভিযোগ করেছেন প্রায়ই করেন, “সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, যা পার্লামেন্টকে একটি রাবার স্ট্যাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেত্রীর বশংবদ করে রেখেছে,সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি”।  তিনি এটা প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আর এর রাজনৈতিক নেতাদের গায়ে কালি লাগায় দিবার জন্য করে থাকেন।  তো মিজানের এই কথা পড়লে সকলেরই মনে হবে হা, তাই তো!  মিজান এই মোক্ষম জায়গায় ধরেছেন। হা, অবশ্যই এক মোক্ষম জায়গা। কিন্তু মিজান কাকে ধরেছেন? খালেদা জিয়া? নাকি এখানে অনুল্লেখ থাকা শেখ হাসিনাকে? মোটেও না। মিজান আসলে ধরেছে নিজেকেই।  বাইরের মানুষ – হাসিনা, খালেদাকে দোষারোপের আগে মিজান আপনি নিজেকে কাঠগড়ায় তুলার হিম্মত দেখান। পারবে্ন?
যতদিন মিজানুরসহ মতি-মাহফুজের মিডিয়া গ্রুপের মত লোকের সক্রিয় সমর্থনে, ১/১১ ঘটবার সম্ভাবনা আর বিশেষ করে বিদেশী স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব গ্রুপের লোকেদেরকে ব্যবহারে ভাড়া খাটা মিজানুর রহমান খানেরা লুপ্ত না হবেন ততদিন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ থাকতে থাকবে। কারণ এই ৭০ অনুচ্ছেদই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। মিজানদের মত লোকেদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। আমরা বরং  মিজানের এসব স্বীকার করার সৎসাহস দেখতে চাইতে পারি। হাসিনা খালেদারা খারাপ রাজনীতির ধারক বাহক, এটা কে না জানে, এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এখান থেকে বের হতে, তা পরিস্কার করতে, পালটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া লাগবে। বিদেশী স্বার্থে সংস্কারের নামে পরাশক্তির  স্বার্থরক্ষা নয়। এই স্বার্থ রক্ষার্থে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কলঙ্কের দাগ দেখিয়ে নয়।

মিজান আরও অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রও দলের প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আছে, আর সেজন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন। ফলে এরও সংস্কার দাবি করেছেন তিনি। মিজান নিশ্চয় ভুলে যান নাই – মান্নান ভুঁইয়াকে দিয়ে কীভাবে বাধ্য করে সংস্কার ধারার বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বেচারা দেলোয়ার হোসেনকে  কিভাবে ছেঁচা  দেয়া হয়েছিল, এর কষ্ট মৃত দেলোয়ার হোসেনই জানতেন। তবু তার গৌরব, তিনি পতাকা ছাড়েন নাই। শামসুল হুদার ভুঁইফোড়  নির্বাচন কমিশন কোনটা “আসল বিএনপি” সেই রায় দিয়েছিল। আর পরে তিনি নিজেই তার এই কাজ অন্যায় হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।  এটা যেন আমরা কেউ না ভুলি। তাহলে দাঁড়াল এই যতদিন বিদেশী স্বার্থে আপনি মিজান ও আপনাদের পত্রিকা  বাইরে থেকে ইচ্ছামত কোনটা বৈধ দল, কোনটা বিএনপি ঠিক করতে থাকবেন, সে সম্ভাবনা থাকবে, ততদিন হাসিনা-খালেদা কনস্টিটিউশানে ৭০ অনুচ্ছেদ রাখবে এবং অবশ্যই রাখবেন। ‘গণতন্ত্র’ শিখাতে আসবেন না। মনে রাখবেন, হাসিনা বা খালেদা সেসব কম বুঝে না। তাঁরা দলের সব ক্ষমতা সভাপতি হিসাবে অবশ্যই নিজের হাতেই রাখবেন। কোনটা আওয়ামী লীগ আর কোনটা বিএনপি এটা যদি বিদেশীরা নির্ধারণ করতে থাকে তবে এমন ব্যবস্থা ও সুযোগ যতদিন থাকবে ততদিন এই শকুনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে  হাসিনা-খালেদার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদের পক্ষে থাকা এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থান। দুনিয়ার হুঁশজ্ঞান ওয়ালা মানুষ মাত্রই এটাই করবে।  তাই বাইরে  অন্যদের দিকে না, সৎসাহসে নিজের দিকে তাকান। নিজেকেই কাঠগড়ায় দেখতে পাবেন।

অতএব, কনষ্টিটুশনে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার জন্য আপনারা মিজানেরাই মূলত দায়ী। নিজেরা যা করেছিলেন এর রিভিউ করেন, আবেদন করি ভাল হয়ে যান আগে। এরপর ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি তুলেন।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গতকাল ২১ মে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা খুবই সংক্ষিপ্ত ভার্সান; চল্লিশ ভাগ ফেলে ষাট ভাগ ছাপা ভার্সান বলা যায়। এছাড়া  অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও আর এক ভার্সান ছাপা হয়েছে আজ ২২ মে ২০১৭, তাতে অনেকাংশেই পুর্ণ ভার্সান সেটা। কিন্তু তবু ফুল ভার্সান নয়। এখানে আরও বহু সংযোজন ও এডিটের পর সর্বশেষ ভার্সান এটাই।  ]

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

নির্মূলের রাজনীতি ও শাহবাগ: অনিশ্চিত গন্তব্য

গৌতম দাস

বৃহষ্পতিবার ২৭ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2f3

 

ঘটনার শুরু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলায়, যা ৯/১১ বলে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে বিশেষ ধরনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেয় এবং তা নির্মূল করবার জন্য নতুন ধরণের যুদ্ধের সূচনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ‘আল কায়েদা’কে দায়ী করে। বুশের নেতৃত্বে আমেরিকা আল-কায়েদার রাজনীতি ও হামলা মোকাবিলার যে নীতি গ্রহণ করে তার বৈশিষ্টগুলো হলোঃ

১. খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় আল কায়েদা নির্মূলের যুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিশ্চান জগতের ক্রুসেড সাব্যস্ত করে লড়া।

২. “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়া, এই ডাকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে পক্ষে টানা। সবাইকে সতর্ক করা যে এটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সামিল হয়ে এই হামলা মোকাবিলা করার কমন লাইন হলো, ওয়ার অন টেরর।

৩.“হয় তুমি আমার পক্ষে নইলে তুমি আমার শত্রু” – এই নীতির ভিত্তিতে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নৌকায় উঠতে বাধ্য করা, ভূগোল জুড়ে এই বিভাজনের ভিত্তিতে নতুন এক অক্ষশক্তি তৈরি করা যার লক্ষ্য হচ্ছে যারা এই ক্রুসেডের পক্ষে নয় তাদের নির্মূল করা।

৪. এই যুদ্ধকে খ্রিশ্চান ইভানজেলিক ধারায় ক্রুসেড বলে মনে করলেও রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধকে আবার সেকুলারিজমের রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলে দাবি করা ও প্রচার চালানো। ক্রুসেডের মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশাবে তৈরি হওয়া এই সেকুলারিজমের সোজা মানে দাঁড়ালো, ইসলামের বিরুদ্ধে লড়া। ইসলাম ডাকনামে যত রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা সাংস্কৃতিক প্রকাশ দুনিয়ায় আছে সবকিছুকেই শত্রুর কাতারে ফেলা। দুষমন জ্ঞান করে নির্মূল করা, ইত্যাদি।

 

যুদ্ধের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের ভূমিকা
আমাদের নিশ্চয় স্মরণ হবে ৯/১১ হামলার সময় বাংলাদেশ ছিল একটা সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন ক্ষমতায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। তবুও তাকে আফগানিস্তান হামলায় বিমানের রিফুয়েলিং ও এয়ার স্পেস ব্যবহার করতে অনুমতি দিতে হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যুদ্ধ চাহিদা মেটানোর দায় কবুল করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত কোন একটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলেও এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লতিফুরকে নিতে হয়েছিল ।

একটা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশকে ওয়ার অন টেররের নৌকায় তুলে নেয়ার কাজটাতে একটা পজ দিতে হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ আগেই ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে কো্ন দল ক্ষমতায় আসে সেটা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর স্থানীয় মার্কিন দূতাবাসকে এটা মানতে হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যে, ওয়াশিংটনের পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস যে-লাইনে আগানোর পরিকল্পনা নেয় সেটা হলো, ইসলামের নাম-গন্ধ আছে এমন সব দল ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার কায়েম করা। নির্বাচিত বিএনপির জোটের সরকারকে ক্রুসেড নীতি্র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও তা বাস্তবায়নের জনু উপযুক্ত মনে হয় নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মোকাবিলার একটা জাতীয় সরকার গঠিত হোক। তার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ওয়ার অন টেররের নৌকায় উঠুক। প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার উদ্যোগ ছিল এটাই।

জোট সরকার ও মার্কিন যুদ্ধের অংশীদারিত্ব নেবার স্থানীয় প্রতিযোগিতা
মোটা দাগে বললে, বিএনপি বাংলাদেশ সরকারকে বুশের নৌকায় ওঠানো এড়িয়ে যেতে পারে নাই। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ক্ষমতা শেয়ার আর ইসলামী রাজনীতির যাবতীয় প্রকাশগুলোকে শত্রু গণ্য করে একটা ভাগ তৈরির পলিসি জোট সরকার মানে নাই, এই দিকটা এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু অন্যদিকে আবার র‍্যাব গঠন, পশ্চিমের টার্গেট করা লোকদের ধরে নির্যাতন করে তথ্য আদায় ও তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ, ইত্যাদি কাজে জোট সরকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের সহযোগী ভূমিকাই পালন করেছে। এককথায় রেনডিশনের কাজে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন আইন তৈরি, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে বিশেষ সিকিউরিটি স্টেট আকারে সাজানো, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস ও পাশ্চাত্যের শক্তিধর দেশগুলোর কূটনৈতিক মহলকে জোট সরকার মোটামুটি আস্থায় নিতে পেরেছিল। সেটাও সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। বেচারা বদরুদ্দোজার পদত্যাগ এসবেরই প্রতীকি প্রকাশ।

তখনকার মত পরিস্থিতি এভাবে থিতু হওয়াতে হাসিনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে হতাশ হাসিনা এই ঘটনার ভিতর থেকে পশ্চিমের চাহিদাটা ভাল করে বুঝেছিলেন। এই চাহিদা হবহু পূরণ করে দিতে পারলে তিনি পশ্চিমের চোখে একচ্ছত্র প্রার্থী হতে পারেন – এই সম্ভাবনার কথা ভেবে পরবর্তীতে তিনি এই লাইনেই রাজনীতি করবেন বলে মনস্থ করেন। শেখ হাসিনা পশ্চিমের ওয়ার অন টেররের চাহিদা বুঝে তাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের দিকে পা বাড়ান। সিদ্ধান্ত নেন এই চাহিদা মোতাবেক নিজে ও দলকে ঢেলে সাজাবেন। সে মোতাবেক রাজনৈতিক কৌশল তৈরিতে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির চেয়ে নিজেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি আন্তরিক ও উপযুক্ত খেদমতগার হিশাবে পশ্চিমের বাজারে হাজির করা। এই কাজের জন্য তিনিই একমাত্র ক্যান্ডিডেড হিসাবে নিজেকে বিক্রির কাজটা করতে পারা। ওয়ার অন টেররের উপযুক্ত সৈনিক হিশাবে আমেরিকান সমর্থন যোগাড় করা তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়ে পড়ে। এই লক্ষ্যকেই ধ্যানজ্ঞান করে ২০০২ সাল থেকে শেখ হাসিনা কাজ করে গেছেন।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশল, লোকাল এজেন্ডা
নিজের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ হাসিনার কৌশল হলো, ওয়ার অন টেররের আমেরিকান নৌকায় তিনি সদলবলেই উঠবেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে এর নাম দিবেন “যুদ্ধাপরাধের বিচার”। আবার যুদ্ধাপরাধের বিচারে তিনি একনিষ্ঠ – এই ভাব ধরে “স্বাধীনতার চেতনার” নামে নতুন এক রাজনীতি তিনি কায়েম করবেন। হাসিনার এই “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতির মানে হোল নিজের বাইরের আর সব রাজনীতি, চিন্তা, তৎপরতার যা কিছু বাংলাদেশে আছে তাকে নির্মূল করবার পথে অগ্রসর হওয়া। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের যে দাবি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গুমরে মরছিল, তাকে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বাস্তবায়নের অধীনে এনে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের বীজ তিনি বপন করলেন তার কুফল শাহবাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে পড়ল। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সৈন্যদের বিচার করতে পারে নি, তাদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যারা করেছিল তাদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। সুষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া মেনে ও দেশে বিদেশে সকলের কাছে বৈচারিক নীতির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য একটি বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুষিয়ে রাখা এই দাবি মেটানোই ছিল সঠিক পথ। শেখ হাসিনা সেই পথে অগ্রসর হন নি।

ওয়ার অন টেররের ছাতার নীচে পপুলার এক উন্মত্ততা (ফ্যাসিজম) তৈরি করে কঠোরভাবে তার নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও নির্মূল করবার পথে তিনি গেলেন। ‘নির্মূল’ করাটা আক্ষরিক অর্থেই, অর্থাৎ ফিজিক্যালি বা শারিরীক ভাবে নির্মূল করা। এছাড়া হাসিনা যেভাবে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বুঝেছেন, তিনি চেয়েছেন চেতনার জয়গান। তার গান গাওয়াই হবে বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। খাঁটি বাঙালি তারাই যারা তার চেতনা ধারণ করে। শেখ হাসিনার “স্বাধীনতার চেতনায়” সওয়ার হয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোও বাঙালির খাঁটি চেতনা পয়দা করবার কাজে নেমে পড়ল। এই খাঁটি চেতনা, খাঁটি ইতিহাস, খাঁটি বাঙালি ধারণা, খাঁটি বাঙালি (পাঠ্য পুস্তকসহ) বই পুস্তক ছাড়া বাকি সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক উন্মাদনা তিনি আনলেন। নিজের এই খাঁটি বাঙালিত্ব বাদে আর সমস্ত চিন্তাকে রাজাকারি বা রাজাকারের সহযোগী বলে ট্যাগ লাগিয়ে নির্মুল করবেন। একেই আমরা “বাঙালী জাতীয়তাবাদের” উগ্রতার চরম ও ৭১ এর পরের নব উত্থান এবং একই সাথে শেষ পর্যায় বলতে পারি। যারা গত পাঁচ-ছয় বছরের বাংলা ব্লগ ট্রেন্ড খেয়াল করেছেন তারা ভাল বুঝবেন এই নব উত্থিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ আক্ষরিক অর্থে তার প্রতিপক্ষকে ফিজিকালি নির্মূল করবার আকাংখা কিভাবে চর্চা করেছে। এই নির্মূলের আকাংখার তাগিদেই তাদের কদম কদম বাড়বৃদ্ধি হয়েছে। সেতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তচিন্তা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে। এই উন্মাদনায় ধর্ম বা ইসলাম আমাদের সব চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান শত্রু এই ধারণা ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে আবার শুরু হয় আস্তিক-নাস্তিক ইত্যাদি নানান বিতর্কের ঝড়।

এতটুকু তাও সহনীয় ছিল। সব সমাজে নাস্তিকতা থাকে,আমাদের সমাজেও অনেকদিন থেকে আছে। কিন্তু এবারের আক্ষরিক অর্থে বিনাশ বা শারিরীক ভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মুলের আকাঙ্খা এতোই উন্মত্ত ছিল যে আস্তিক-নাস্তিক ঝগড়া সহজেই ইসলামের আখেরি নবীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চর্চার নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। কারণ এই রাজনীতির অনুমান হচ্ছে লাখ দুয়েক রাজাকার ও রাজাকারের সহযোগী বলে যাদের ট্যাগ লাগানো হবে তাদের সবাইকে নির্মূল করে দিলে “স্বাধীনতার চেতনার” রাজনীতিকে একচ্ছত্র করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জয় নিশ্চিত করা যাবে। এই নির্মূল পরিকল্পনা আক্ষরিক অর্থেই এক ক্লিনজিং অপারেশানের মতো, এই ধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা রাজনৈতিক ভাবে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইল যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবার এটাই উপযুক্ত পথ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রেখে এই যুদ্ধ চালাবার এটাই মোক্ষম সময়। দ্বিতীয় পজন্মের মুক্তিযুদ্ধের এটাই মর্মকথা। এভাবেই বিশুদ্ধ এক বাঙালির বাংলাদেশ কায়েম করতে হবে। আরেকবার রক্তে স্নান করে একাত্তরের যুদ্ধের দায় মুক্তি ঘটবে।

শেখ হাসিনার যুদ্ধ কৌশলের দুর্বলতা ও অসঙ্গতি
কিন্তু হাসিনার এই নতুন যুদ্ধবাজ রাজনীতির বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা আছে।

১. যুদ্ধাপরাধের বিচার বড় জোর একটা ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার হতে পারে। এটাকে ওয়ার অন টেরর বা পশ্চিমের চোখে সন্ত্রাস দমনের কাজ হিসাবে কতটুকু হাজির করা সম্ভব যাতে পশ্চিমারা আগ্রহী হবেন?

২. জামাত একটা সংবিধান মেনে চলা দল, যারা কনস্টিটিউশনাল রাজনীতি করে। পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা মানে এবং সেখানে অংশ গ্রহণ করে। পাশ্চাত্য তা বিশ্বাসও করে। এমন একটি লিবারাল নির্বাচনমুখী ইসলামী দলকে ‘সন্ত্রাসী’ প্রমাণ করা খুবই কঠিন। তাছাড়া বাস্তবেও এটা সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে স্থানীয় প্রভাব ও সমর্থন তৈরির দল। বাংলাদেশের শ্রেণি-গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশেরই আশা আকাঙ্খার দল। শেখ হাসিনা একে একটা ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসাবে হাজির করবেন কি করে? জামাত যতটুকু ত্রাস সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে তা অন্য দুই প্রধান পার্লামেন্টারী দল আওয়ামী বা বিএনপির চাপাতি, পিস্তল বা কাটা রাইফেলের ত্রাস সৃষ্টি করতে পারার মতই। কিন্তু একটা পার্লামেন্টারী রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী দল বলে হাজির করতে গেলে অন্ততপক্ষে তাকে নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠন বলে হাজির করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। যে দল ভোট চাইতে জনগণের কাছে যায় তাকে একটা গোপন, সহিংস বা সশস্ত্র দল হিসাবে দেশে বিদেশে চেনানো কঠিন।

৩. বাংলাদেশে জামাতই একমাত্র ইসলামী দল নয় বা ইসলামী রাজনীতির একমাত্র প্রকাশ নয়। যারা আফগানিস্তান ফিরে এসেছে তারা কেউ জামাতের রাজনীতি করে না, কখনও করে নাই। বরং তারা আওয়ামী লীগ করে এমন নজিরই বরং আছে। আবার মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের নয়। কিম্বা ইসলামি বিপ্লবও নয়। জামাতে ইসলামি ক্যাডার ভিত্তিক রেজিমেন্টেড সৎ চরিত্রের মানুষ গড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল। এই দিক থেকে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল ‘সুশীল’দের রাজনীতির। যারা জামাতে ইসলামির মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক চায়। মওলানা মওদুদি মনে করতেন ঈমানের দুর্বলতার জন্য রাষ্ট্রের সদর্থক উদ্দেশ্য ভ্রষ্ট হয়ে যায় । তার মানে আল্লাভীরু সৎ চরিত্রের লোকের রাষ্ট্রনায়কী নেতৃত্বের অভাবে। সমস্যাটা নৈতিকতার। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক বিষয়ে তার চিন্তায় মধ্যে বিপুল ওসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতা আছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হচ্ছে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বহুদিক ইসলামী ঈমান আকিদা ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা করলেও শেষমেষ ‘আধুনিক রাষ্ট্রই কায়েম করতে চেয়েছেন। অথচ ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র কায়েম আদৌ ইসলামের লক্ষ্য হতে পারে কিনা সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিশাবে হাজির হয়েছে।

অন্যদিকে ‘৭২ সালের পর থেকে মওলানা মওদুদির নিজের চিন্তার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের পুরানা রাজনীতিতে তিনিই আর থাকেননি। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাকি ৭ বছর তার কেটেছে সৌদি আরবে। ইরানী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে সুন্নি প্রধান মুসলিম দেশে ইসলামের রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক আঁচ থেকে বাঁচানোর কাজটা সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। জামাতে ইসলামি সে কারনে সোদি রাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণহয়ে ওঠে । সুন্নি বাংলাদেশে সৌদি রাজতন্ত্রকে সেই সার্ভিস আন্তরিকতার সঙ্গেই জামাত দিয়েছে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। মোগল আমল থেকেই সামাজিক সৌজন্য আকারে আমরা বিদায় বেলায় “খোদা হাফেজ” বলতে অভ্যস্ত। আমাদের বয়স্ক প্রজন্ম এখনও তাই বলেন। কিন্তু এখন এটা “আল্লাহ হাফেজ” হয়ে গেছে। কখন থেকে কিভাবে এটা ঘটে গেছে কেউ টের পাইনি।

কোন ধরণের রেডিক্যাল ইসলামী রাজনীতি জামাতের লক্ষ্য নয় সেটা ১৯৭৯ সালের পরের সময়কালে জামাতের ভুমিকা আরও সাক্ষ্য দেয়। রাজনৈতিক দল হিশাবে জামাতে ইসলামি কখনই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির কোন ক্ষেত্রেই জালিমের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু ভূমিকার চর্চা করে নি, বরং সবসময়ই নিজের ভাবমূর্তি এভাবেই তৈরী করেছে যে কোন প্রকার বিপ্লবী ইসলামী রাজনীতি তার স্বার্থের বিরোধী। ইরানী বিপ্লব থেকে কেউ যেন কোন ইতিবাচক পাঠ না নেয় জামাত সেই কাজটাই সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিক ভাবে করে গিয়েছে। ইসলামী রাজনীতির পরিমণ্ডলে এই সকল গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক কাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ক্ষেত্রে জামাতে ইসলামির সখ্যতা গভীর। এককথায় বললে বলতে হয় ইসলামের নামে কোন রাডিক্যাল রাজনীতি যেন বাংলাদেশে জেগে না ওঠে ও দানা বাঁধতে না পারে পাশ্চাত্যের পক্ষে জামাতে ইসলামি তারই খেদমতগারি করে গিয়েছে। এই ধরণের মিত্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের চোখে শত্রু প্রমাণ করা শেখ হসিনার জন্য কঠিন একটি কাজ।

টাইম বাউন্ডিং দুর্বলতা বা গ্লোবাল যুদ্ধ কৌশলে বদল
উপরে শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতির যেসব বড় দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বললাম সেগুলো স্থায়ী। কিন্তু আর এক বিশাল দুর্বলতার দিক আছে যাকে বলা যায় “টাইম বাউন্ডিং” বা সময় নির্ধারিত দুর্বলতা। মানে, কোন্‌ সময়ে তিনি তার রাজনীতিটা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার নতুন রাজনীতিটার ২০০৭-৮ সালের আগে করতে সক্ষম হলে এক রকম হত, কিন্তু এর পরের যে কোন সময়ে করতে চাওয়াটা এক বিরাট বাধা। কেন? মুল কারণ ২০০৮ সালের পর খোদ আমেরিকাই আর বুশের নীতিতে থাকেনি। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট যুদ্ধনীতি বদলে ফেলেছে। এটা ২০০৮ সালে বুশের বদলে ওবামা জিতেছে বলে নয়। বুশের সম্মুখ সমরে ইসলাম মোকাবিলার নীতি তার ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরে নিজস্ব মুল্যায়ন রিপোর্টে ঐ নীতি অকেজো প্রমাণিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষের নাম লক্ষণ নাই বরং তা আফগানিস্তান বা ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকেনি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর সবকিছুর উপরে যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের উপরে দাঁড়ানো বলে পরিণতিতে এটা একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা (২০০৭-৮) হিসাবে হাজির হয়।

এর ফলে বুশের সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামের বিরুদ্ধে অল-রাউন্ড যুদ্ধ মোড় বদলাতে বাধ্য হয়। যুদ্ধকৌশল মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক খুজে বের করার দিকে ধাবিত হয়, যার বাইরের নাম আরব স্প্রিং। ব্যাড মুসলিম আর গুড মুসলিমের ভাগাভাগি শুরু হয়। ওয়ার অন টেররের বাগাড়ম্বর স্তিমিত কিম্বা অবস্থা বিশেষে গায়েব হয়ে যায়। যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো আর বাড়ানো নয় বরং কত দ্রুত (২০১৪ সাল টার্গেট) সবগুলোকে গুটিয়ে নেয়া যায় – এটাই হয়ে যায় মার্কিন নীতি। কিন্তু হাসিনার স্থানীয় যুদ্ধকৌশল তো বুশের একরোখা ওয়ার অন টেররের উপর দাঁড়িয়ে সাজানো। ইতমধ্যে বারাক ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং এশিয়া হয়ে ওঠে ওবামা প্রশাসনের কাছে আগামি দিনের সাম্রাজ্যবাদী লড়াই-সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ আর সেকারণে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূল অভিযানে মার্কিন যুকরাষ্ট্র কতোটা সমর্থন তা এখন নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ওবামা আমলে আমেরিকার নতুন নীতি ও যুদ্ধকৌশলের সীমার ভিতরে হাসিনার নেয়া স্থানীয় ইসলাম নির্মূল কৌশল আনফিট ও অসামঞ্জস্যপুর্ণ এই দিকটা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূল নীতির পালে হাওয়া লাগা অসম্ভব কিছু নয়। টাইম বাউন্ডিং বা সময় দ্বারা নির্ধারিত এই দুর্বলতার দিকটা বাদ রেখে হাসিনা তার দুর্বলতাগুলো কিভাবে কাটিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলোচনা এখন সেদিকে নেবো।

শেখহাসিনা-নির্মুল কমিটির পরিপূরক সম্পর্ক
শেখ হাসিনার কৌশলের মূল দুর্বলতাগুলো পূরণ করতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখেন শাহরিয়ার কবীর ও তার নির্মুলের রাজনীতি। এটাকে হাসিনার কৌশলের সাথে শাহরিয়ারের রাজনীতির পারফেক্ট ম্যাচ মেকিং বলা যায়। হাসিনার নতুন কৌশলটা শাহরিয়ার কবীরই সবচেয়ে পছন্দ করেছিলেন। সেই ২০০২ সাল থেকে নির্মুলের রাজনীতি প্রচার ও চর্চার কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছিলেন তিনি। একাজে তিনি নতুন শত্রুর যে ভাগটা তৈরি করেন তা হলো, ব্রড হেডলাইনে ইসলাম আর তার প্রকাশ মানেই হলো জামাত। এভাবে তিনি কি করেছিলেন এবং কেন তা পেরেছিলেন এর তিনটা কারণ উল্লেখ করা যায়।

১. বাংলাদেশে আলকায়েদা বা তালেবানদের মত ইসলামী রাজনীতির সোল এজেন্ট, একমাত্র সম্ভাব্য দল হলো জামাত -এই মিথ্যা ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। পরিকল্পিতভাবে তিনি একাজ করেছেন। এছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামাত মানেই বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির সকল ধারা ও প্রবণতার উৎপত্তি কারণ, উৎস ও প্রতীক। এভাবে বয়ান তৈরির সম্ভব হয়েছিল কারণ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত তো বটেই কমিউনিস্টরাও দুনিয়ায় বা বাংলাদেশের ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে কোনটার সাথে কোনটার মৌলিক রাজনৈতিক তফাত কি, কোন ইস্যুতে তাদের পার্থক্য, কোথায় তাদের সাপে নেউলে সম্পর্ক — এইসবের কোন খবর জানে না, রাখার দরকারও মনে করে না। বরং মনে করে মানুষের দুঃখ কষ্টের মুল কারণ হলো ধর্ম, মানে ইসলাম। ফলে ধর্ম উৎখাত তাদের বিশাল রাজনৈতিক কর্তব্য। এই পরিস্থিতি শাহরিয়ারকে তার বয়ান তৈরি করতে সহায়তা করেছে।

২. ১৯৭১ সালে জামাতের রাজনীতি আর একালের তালেবান রাজনীতির কোন মিল থাকুক আর নাই থাকুক জামাতের ৭১ সালের ভুমিকাই হোল অকাট্য প্রমাণ যে জামাত তালেবানের মত একটা “সন্ত্রাসী” দল। জামাতের ৭১ এর ভুমিকা নিয়ে জনগনের মনে যে সেন্টিমেন্ট আছে তা কচলে ব্যবহার করে সাধারণভাবে সব ইসলামী রাজনীতিকে দানব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার এই জবরদস্তি শাহরিয়ারের দরকার ।

৩. আফগান ফেরতদের দলগুলোর নানান তৎপরতা এবং জেএমবির স্বল্পকালীন উত্থান (২০০৫) এই ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবীরদের দারুণ কাজে লেগেছিল। শহুরে মধ্যবিত্তকে জঙ্গী ইসলামের নিশ্চিত আবির্ভাব সম্পরক্কে ভীত ও আতংকিত করা গেছে। জেএমবির উত্থান রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে অন্ধ অবস্থা তৈরী করেছিল তার সুযোগ নিতে পেরেছিলে নির্মূলের রাজনীতি। জামাতের রাজনীতির সাথে জেএমবির রাজনীতির কোনই মিল নাই। কিন্তু মিল না থাকলেও মধ্যবিত্ত, সেকুলার,কমিউনিস্ট আর মিডিয়ার চোখে এদের জামাতি বলে প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছিল।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ঘটলো যে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটা আর ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার থাকল না। বিচারের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকল না। বয়ানের পাটাতন একেবারে বদলে গিয়ে হয়ে দাড়ালো, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে সবকিছুরই নির্মুল, বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে ঝেড়ে মুঝে সাফ করে ফেলা। একাকার করা এই বয়ানে এক দড়িতে ফাঁসি হয়ে গেল “বিচার” আর ইসলামের।

এতে দ্বিতীয় আরেক বিপদ তৈরি হলো। ধরা যাক ঠিক বিচার নয়, ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ আছে সেগুলোকেই মোকাবিলা করতে চান শাহরিয়ার ও তার নির্মুল কমিটি। তাতে একটু না হয় যুদ্ধাপরাধের বিচার কথাটা ঢাল হিসাবেই ব্যবহারই তিনি করেছেন। এভাবেই যদি ধরি তো সেক্ষেত্রেও যে প্রশ্ন আমাদের ছাড়ে না তা হলো,ইসলাম নামে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশগুলোর মোকাবিলা কি নির্মূল বা ইসলাম ক্লিনজিং করে করা যায়, নাকি সম্ভব? অর্থাৎ কাজটা কি নির্মুল বা ক্লিনজিং -এর? যার যার মাথায় ইসলামী চিন্তা আছে এমন লোকদের এক এক করে ধরে মাথা কেটে ফেলার ব্যাপার ? মোটেই না। চিন্তার মোকাবিলা একমাত্র আরো অগ্রসর চিন্তা দিয়েই করা সম্ভব। নইলে তার পরাস্ত হবার কোন সম্ভবনাই নাই। । অর্থাৎ চিন্তা বা ভাবাদর্শগত ভাবে পরাস্ত করা এবং সেভাবে পরাস্ত করবার রাজনীতির মানে আক্ষরিক অর্থে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করা নয়। ঠিক যেমন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়া মানে মানুষের পুনর্গঠন আর পুনর্গঠিত সেই নারী ও পুরুষের নতুন সম্পর্ক রচনা — দুনিয়া থেকে পুরুষ নির্মূলের কর্মসুচী নয়। মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব সংঘাত শ্রেণীযুদ্ধ বটে কিন্তু কোনভাবেই এটা সমাজের মালিক অথবা শ্রমিক কাউকেই ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। বরং এটা সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্গঠনের যাতে সমাজে একদিকে পুঁজিপতি আর অন্যদিকে শ্রমিক উৎপাদন করতে না পারে। অর্থাৎ সামাজিক মানুষ যেন দুই বিবাদমান শ্রেণি হয়ে উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত না হয়, ইত্যাদি।

ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে অনেকের মনে হতে পারে বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষমতার জন্ম দিতে গেলে একটা যুদ্ধ তো হবেই, সেটা কি? সেটা আর যাই হোক কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং অপারেশান নয়। বিদ্যমান ক্ষমতাকে পরাস্ত করে নতুন ক্ষমতা কায়েমের জন্য যতোটুকু বলপ্রয়োগ লাগে ততোটুকুই। বৈপ্লবিক রূপান্তরে প্রাণের ক্ষয় ঘটে ঠিক, কিন্তু উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়, নতুন ক্ষমতার জন্ম দেওয়া এবং নতুন আইন ও নীতিনৈতিকতার জন্ম দিয়ে নিজের নতুন ক্ষমতার বৈধতা ও ন্যায্যতা প্রমান করা। নতুন শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা যেন নতুন মানুষ তৈরী হতে পারে। কোনভাবেই সেটা ফিজিক্যাল নির্মুল বা ক্লিনজিং করা নয়। । এমন বাসনা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা কেউ একা বা দলবদ্ধভাবে তৈরি করা নয়। সমাজের সংস্কার বা বিপ্লব প্রতিহিংসার চর্চা হতে পারে না। জিঘাংসার আকাঙ্খা যে উন্মাদনা তৈরি করে বাস্তবে একা বা গোষ্ঠিসহ কাউকে নির্মুল বা ক্লিনজিং করা মানেই হলো আরেকটি যুদ্ধাপরাধ ঘটানো।

সমাজে চিন্তা ও ভাবাদর্শগত লড়াইকে খুনোখুনি করে সস্তায় সেরে ফেলতে চেয়েছেন শাহরিয়ার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে হাসিনা আর নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার, মুনতাসির ইত্যাদিরা মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে গেছেন আর সমর্থকদের মনে সফল ভাবে ঢুকিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর ক্লিনজিং-এর আকাঙ্খা। নির্মূল বাসনার এক অসুস্থ উন্মত্ততা।

শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ারের এই যৌথ প্রকল্পের খবর অনেকেই রাখেননি। বলা বাহুল্য শেখ হাসিনার সাথে শাহরিয়ারের এই মহামিলন ও তাদের প্রজেক্টের অভিমুখ ও পরিণতি হলো হাসিনার কারজাই হওয়া। আর প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই এটা তালেবান রাজনীতিকে দাওয়াত দিয়ে আনা। ইসলাম নামে যত রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক প্রকাশ বাংলাদেশে আছে শাহরিয়ার আজীবন নির্মূলের মধ্যেই তার সমাধান দেখেছেন। তার সাফল্য হলো,এই উন্মাদনাকে তিনি বাংলাদেশের সমাজে একটা মানসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পেরেছেন। এখন বলে বুঝিয়ে এদের কাউকে বিরত করা যাবে মনে হয় না। কারণ এই উন্মাদনা চেপে বসেছে। তাদের অনুমানে দুলাখ ইসলামপন্থীদের নির্মূলের পথে নিয়া যাবার জন্য এরা তাদের মন ও সেকুলার জিঘাওংসাকে পুরাপুরি বেঁধে ফেলেছেন।

শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর তাদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নির্মূল বাসনা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে গ্লোবাল ও লোকাল শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটাচ্ছে সেটা বিচার করবার সাথে সাথে আমাদের কাছে একটা দিক পরিস্কার থাকতে হবে। যুদ্ধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত একটি ইস্যু। বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ায় এর ফয়সালা না করলে নানান পেটি স্বার্থে এই জাতীয় ইস্যুটি সবসময় রাজনীতিতে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতেই থাকবে। যেমন শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবীর যেভাবে করছেন।

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শাহরিয়ারের যুদ্ধ প্রস্তাব
তবু শেষ বিচারে হাসিনা আর শাহরিয়ারের রাজনৈতিক আকাঙ্খা কিন্তু এক নয়। শেখ হাসিনার আকাংখা ও পথ হোল যে-রাজনৈতিক লাইন বুকে ধরে তিনি গত দশ বছর এগিয়েছেন তা দিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করবার কাজে এই পথটাকে ব্যবহার করা। এই বিচারে শাহরিয়ার কিন্তু সৎ ও নির্মূলের একনিষ্ঠ সৈনিক। তাঁর নিজের ভাষাতেও “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করতে চান। এজন্য তিনি VOA এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছে হস্তক্ষেপ সহায়তা চেয়েছেন। হাসিনা পশ্চিমের সমর্থনে একনিষ্ঠ “ওয়ার অন টেররের” একনিষ্ঠ খেদমতগার হয়ে বিনিময়ে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চান, নিজস্ব “স্বাধীনতার চেতনার” বাইরে থাকা বাকি সবাইকে মেরে কেটে সাফ করা যার লক্ষ্য, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আতাত ও আপোষ করতে বাধা নাই। । শাহরিয়ার চান একই “ওয়ার অন টেররের” খেদমতগার হওয়া, কিন্তু কোন আঁতাত বা আপোষ নয়। কারন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন তার উদ্দেশ্য নয়। বরং “জঙ্গি মৌলবাদ” তিনি খতম বা নির্মুলের পথেই সমাধান করবার কাজে একনিষ্ঠ থাকতে চান। এই কাজে তিনি শেখ হাসিনার ওপর পুরাপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। বরং সরাসরি আমেরিকার সমর্থন, লজিস্টিক , সৈন্য সব কিছুই চান। কোথায় তাদের মিল আর কোথায় পার্থক্য সেটা আমাদের বুঝতে হবে। একই সাথে শাহবাগের অংশ গ্রহণকারীরা যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে নিজেদের পৃথক দাবি করে, তারা শাহরিয়ারের নির্মূলের রাজনীতি ধারণ করে বলেই সে কথা বলে। ঠিক যে শাহবাগ শেখ হাসিনার আশু রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলিত থাকলেও শাহবাগের রাজনীতি শেখ হাসিনার রাজনীতি নয়। সেটা একান্তই শাহরিয়ার কবীরের নির্মূল বা ক্লিনজিং-এর রাজনীতি।

লক্ষ্য করার বিষয় ভয়েস অব আমেরিকার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার কিন্তু আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলছেন না। বলছেন ওয়ার অন টেররের খাঁটি লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন”। এটাই চান তিনি। বিষয়টা শাহরিয়ারের কাছে স্পষ্টতই এখন আর আদালত পাড়ার বিষয় নয়, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবার বিষোয়।। তাই তিনি প্রকাশ্যে সাক্ষ্যতকারে দাবি করছেন,“জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”। কিন্তু প্রশ্ন হোল এখন তিনি সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকারঙ্করে সবাইকে জানাচ্ছেন কেন? এতদিন আড়ালে যেভাবে চলছিল সেই পর্দা উঠিয়ে ফেলার কী দরকার ছিল।

কারণ শেখ হাসিনা আর শাহরিয়ার – প্রতীকি নামের দুই রাজনৈতিক আকাঙ্খা হাত ধরাধরি করে চলতে থাকলেও তাদের উদ্দেশ্যে পার্থক্য ছিল। এই ফারাক থাকা সত্ত্বেও এতদিন তাদের সহাবস্থানে অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এখন সেটা দিনকে দিন সেটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শাহরিয়ারের নির্মূল ধারা মনে করছে হাসিনা যথেষ্ঠ কঠোর পথে যাচ্ছেন না। কি সেই কঠোর পথ? সুনির্দিষ্ট করে বললে, সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে দানব হয়ে মাঠে নেমে পড়া, দাবড়ানো, খুনোখুনি। জিতি অথবা মরি জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ে যাওয়া। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে হাসিনা নির্বাহি ক্ষমতায় আছেন আর শাহরিয়ার আছেন একই নির্মূলের আদর্শে, চিন্তায় রাজনৈতিক লাইনে, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকার ঠেলা বা বিপদ শাহরিয়ারের বুঝের বাইরে। পোলাপান অনেক কিছুই আবদার করে। কিন্তু বাবাকে টাকা কামিয়ে, সেই কামানো অনুপাতে ব্যয় করতে হয়। তার পর আবদার কতক অংশ পুর্ণ করতে পারে কতক অংশ পারে না। পোলাপানের আবদারকে ভিত্তি মেনে বাবার চলা অসম্ভব। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ার মানে ও পরিণতি কী সেটা না বুঝে শেখ হাসিনা পা ফেলতে পারেন না। বিশেষত সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার সায় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আগে নিতে হবে। তা না নিয়ে লাঠি হাঁকাতে পারেন না তিনি। সন্ত্রাস দমন আইন দিয়ে ক্লিনজিংয়ে্র লাইনে ঝাপিয়ে পড়ার মানে শুধু পরিস্থিতি লেজে গোবরে করে ফেলা না, কিম্বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও না, বরং নিজের জান বাচানোও এতে সঙ্গীন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সমর্থন, লজিষ্টিক বা রসদের সরবরাহ পাওয়া না পাওয়ার কথা নাইবা তুললাম।

শেখ হাসিনাএখন একটা স্ববিরোধিতায় পড়েছেন। তিনি সচেতন ভাবে ক্লিনজিংয়ের ধারণা দিয়ে গত চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠিকে তাতিয়েছেন। শুধু আওয়ামী পন্থী নয়, যারা আওয়ামী লীগ করে না সেকুলারিষ্ট, বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক, তরুণ ভোটার -ইত্যাদি সকলকে জিঘাংসার উন্মাদনায় শেখ হাসিনা উন্মত্ত করেছেন। তিনি এসব করেছেন এই উন্মাদনাকে রাজনৈতিক ভাবে প্রবাহিত করে নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করার কাজে একে ব্যবহার করতে। অন্যদিকে শাহরিয়ার চাইছেন, উন্মাদনাকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মত্ত ব্যবহারে প্রয়োগ করতে, ক্লিনজিংয়ের কাজে লাগাতে। এজন্য তিনি পরিষ্কার করেই এখন বলছেন আদালতে কোন ‘বিচার’ এমনকি শাহবাগের মত ফাঁসিও না, একেবারে নির্মুল বা ক্লিনজিং করবার কাজ সম্পন্ন করতে চান তিনি। চান চিরতরে “জঙ্গি মৌলবাদ দমন”। একাজেই “আমেরিকার সহায়তা প্রয়োজন”।

শাহরিয়ার কবীরের এই নির্মূল বাসনা আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যে তীব্র সংঘাত চলছে তার প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তাহ তিনেক আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির এক টকশো তে। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯-এর প্রয়োগের পক্ষে আর বিপক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুব। ওখানে মাহবুব বারবার আর্গু করছিলেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে আর ব্যারিষ্টার আমিরুল ততই বারবার আর্গু করছিলেন সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ধরে নিতে পারি হাসিনা অন্তত বোঝেন “সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯” বাংলাদেশের হলেও আইনটা কার্যত আমেরিকার। আমেরিকার আগ্রহে ও ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি গাইড লাইন মেনে এটা তৈরি। এই আইন ব্যবহার করে নির্মুল বা ক্লিনজিং-এর পথে যেতে গেলে আমেরিকার আশির্বাদ লাগবে। কিন্তু শাহরিয়ার, মুনতাসির বা আমিরুল সেটা বেখবর। ফলে তারা বালখিল্য আচরণ করছেন। কান্নাকাটি করছেন, আমেরিকা কেন আফগানিস্তান বা ইরাকের মত বাংলাদেশেও একটা নতুন তালেবান মোকাবিলার ফ্রন্ট খুলছে না।

সন্ত্রাস দমন আইন এমন আইন যা কোথাও ব্যবহার করলে এর সব একটিভিটি রিপোর্ট আমেরিকাকে দিতে হয়। কেন? সেটা আমরা যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ বুঝি সেই সহজ বোঝাবুঝি ছাড়াও আরও ভিন্ন দিক থেকে বোঝার ব্যাপার আছে। আমেরিকাকে না জানিয়ে হাসিনা যদি এই আইন একার বুদ্ধিতে ব্যবহার করে তবে সে কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠবে। সেটা একটা তালেবান পরিস্থিতি তৈরি করবে, প্রথম চোটে যার অভিমুখ হবে এন্টি-আমেরিকান, বাংলাদেশের সব পশ্চিমা ইনষ্টলেশন এর টার্গেট হবে। অল-রাউন্ড একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট ওপেন করলে যেমন ঘটে। শুধু তাই নয়,এর উপচে পড়া প্রতিক্রিয়া কেবল বাংলাদেশে না, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বার্মাসহ পুরা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের প্রতিদিনের আঞ্চলিক ঝগড়া দ্বন্দ্ব বিবাদ সবসময়ে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া বা মায়ানমারে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিবাদ হিসাবে চলছে এগুলো সমন্বিত হবে আর তার নির্দিষ্ট অভিমুখ হবে পশ্চিমা-বিরোধী। স্থানীয় যে কোন বিরোধ এভাবে গ্লোবাল বিরোধ হয়ে হাজির হতে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য আত্মরক্ষামূলক ধরণের হলেও সেই সীমিত লক্ষ্যের নতুন ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতা তৈরি করে ফেলবে। ফলে সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ দেখতে বাংলাদেশের মনে হলেও এর প্রয়োগ ও পরিণতি শতভাগ আঞ্চলিক ও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক। এদেশে যারা দুলাখ জামাত ও রাজাকারি ট্যাগ লাগানো লোক মেরে নির্মুলের মধ্যে ঘটনার সুখকর সমাপ্তি দেখছেন তাদের বেহুঁশ ও বালখিল্য বললে কম বলা হয়। আমেরিকার যুদ্ধ বালখিল্য ব্যাপার নয়। যদি তাই হোত তাহলে সারা দুনিয়ার উপর সাম্রাজ্যের ছড়ি ঘুরাতে পারত না। তাহলে কি শাহরিয়ারের লাইনে “জঙ্গি ও মৌলবাদ দমন” কাজে আমেরিকাকে ডাকার চেষ্টাটা ভূয়া? এতে কিছু হবে না? কোন বিপদ নাই?

না ভূয়া বলছি না। বলতে পারলে ভাল লাগত। গ্রাউন্ড রিয়েলিটি হলো,আওয়ামী লীগ, অ-আওয়ামী লীগার, সেকুলারিস্ট,বামপন্থি, জামাত খুন করার জন্য অবসেসড লোক –সকলেই একপ্রকার জিঘাংসার উন্মাদনায় আছে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তাতানোর ফলাফল এটা। এটা পটেনশিয়াল ও খুবই বিপজ্জনক। যে কোন দিকে এর মোড় নেবার সম্ভাবনা আছে। হাসিনা একে তার নির্বাচনী বা ক্ষমতা লাভালাভের কাজের মধ্যে পরিণতি টানবার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। শাহবাগ নামে যা ফেটে বের হয়েছে। আবার শাহবাগের অনেকেই যেমন বলে শাহবাগের অভিমুখ একটা না, ভিতরে অনেক অভিমুখ আছে। এর ভিতরের একটা শক্ত অভিমুখকে চিনিয়ে দেই। যেমন ষ্টেজে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আছেন সবসময় ইমরানের পাশে। নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একই সাথে হাসিনা ও নির্মূল কমিটির প্রতীক। ওখানে যে আইকন বা ছবি তোলা হয়েছে সেটা “বঙ্গবন্ধুর” না, নির্মুল কমিটির জাহানারা ইমামের । বেঁচে থাকলে জাহানারা নির্মূলের রাজনীতি করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তার ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটির পটেনশিয়ালিটি নিশ্চয় নতুন করে বলবার কিছু নাই।

কোথায় নিয়ে যাবে এরা?
পটেনশিয়ালিটি – মানে কিছু ঘটিয়ে দেবার উন্মত্ততা। শেখ হাসিনা কিন্তু এখনো তৈরি হওয়া এই উন্মত্ততা দিয়ে কিছু ঘটিয়ে ফেলার পটেনশিয়াল নিস্তেজ করতে পারেন নি। ওদিকে শাহরিয়ার, মুনতাসির বা ব্যারিস্টার আমিরুলের নির্মুলের রাজনৈতিক আকাঙ্খা জীবিত আছে, সরব হচ্ছে। হাসিনার টালবাহানা দেখে শাহরিয়ার সরাসরি আমেরিকার কাছে আহ্বান নিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে নির্মুল কমিটির ধারাটাই উন্মত্ততার উপযুক্ত ও কার্যকর ক্যারিয়ার হতে পারে। এই হোল পটেনশিয়াল বিপদ তৈরি হয়ে থাকার দিক। ওদিকে আমেরিকাও বাংলাদেশে কোন নতুন ফ্রন্ট খোলার কোন তাগিদ দেখাচ্ছে না। পরিকল্পনা ও অর্থ খরচের সামর্থ হারাচ্ছে তারা। অন্তত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উন্মত্ততার লাইন প্রথম ঝাপ্টায় ইতোমধ্যে দেড়শ লোক মেরে ফেলেছে, কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। প্রথম দফার রক্তারক্তির পর উভয় পক্ষই সমাজকে স্ব স্ব পক্ষে নতুন শক্তি ও শ্রেণি বিন্যাস তৈরির জন্য সময় নিচ্ছে। কোন পক্ষই টোন ডাউন করবে এমন বাস্তবতা নাই। কিছু ঘটাবার সক্ষমতা উভয় পক্ষেই আছে। এটাই অনিচ্ছুক শেখ হাসিনা আর অনিচ্ছুক আমেরিকাকে যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার বাস্তবতায় টেনে নিতে পারে। একটা লোকাল ঘটনা রিজিওনাল ও গ্লোবাল হয়ে উঠতে পারে। এর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকাকে কিছু তো করতে হবে, অন্তত আত্মরক্ষামূলক। লিবিয়ার “আরব স্প্রিং” উন্মাদনার এত বড় ঘটনায় খরচের কথা চিন্তা করে আমেরিকা কোন মেরিন পাঠানোর পথে যায় নাই। এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু গাদ্দাফি উত্তরকালে নিজের রাষ্ট্রদুত খুন হবার পর কিন্তু সে মেরিন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল। এর সোজা মানে হলো, মেরিন পাঠানোর অবস্থা তার এখনও নাই বললে চলে, একান্ত বাধ্য হয়ে না গেলে। খরচ সামলানো মুশকিল। এখন কম খরচে ন্যূনতম কিছু করতে হলে সেটা হবে ড্রোন হামলা।

এসব বিবেচনায় করেই প্রতীকি ভাবে ড্রোনের কথা এসেছে। কিন্তু মুল বিষয় হলো, যে পটেনশিয়াল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে তা যে কোন দিকে মোড় নেবার ঝুঁকি রাখে। উন্মত্ততা নিস্তেজ করবে কে, কি দিয়ে এমন শক্তি দেখা যাচ্ছে না। এখন এই সম্ভাবনা আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

 

[এই লেখাটির একটি প্রাথমিক খসড়া সর্বপ্রথম তোলা হয়েছিল গত ২১ মার্চ ২০১৩ সালে ফেসবুকে নোট আকারে। শিরোনাম ছিল, ‘শাহরিয়ার ও শাহবাগ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে’সেই লেখাটি এক সম্পাদিত রূপ এরপর ছাপা হয়েছিল চিন্তা নামের ওয়েব পত্রিকায়।  চিন্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল দুদিন পড়ে  ২৪ মার্চ ২০১৩ সালে। এখানে চিন্তা পত্রিকার ভার্সানটাই আবার এখানে হুবহু তুলে আনা হল, সংরক্ষণের জন্য।]