অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

গৌতম দাস

২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2DQ

 

-একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

[বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

“বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

২.
এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

আইনি কারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

অর্থনৈতিক কারণঃ
জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

গৌতম দাস
০৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xY

 

যুদ্ধ একই সাথে বয়ানের যুদ্ধ হয়ে উঠে, বিশেষ করে যেখানে এর একপক্ষে থাকে মোদীর মত যুদ্ধবাজ শিকারি নেতা। মোদীর কাছে  ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাটা হল আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আসন্ন নির্বাচনে জিতবার হাতিয়ার হিসাবে একে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা ও ইস্যু। সেই উত্তেজনা প্রসঙ্গে সর্বশেষ বড় খবরটা ছিল – পাকিস্তানে বিধ্বস্ত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের আটক পাইলট যার নাম – “অভিনন্দন বর্তমান” – তিনি গত ১ মার্চ রাত ১০টার দিকে ভারতের মাটিতে ফিরে গিয়েছেন; তাকে মুক্ত ও হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এর আগের দিন পাকিস্তানের সংসদে মানে ওদিনের উচ্চ ও নিম্ন সংসদের যৌথ অধিবেশনে তাঁর বক্তৃতায় নিজের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেন, “শুভেচ্ছা আর সৌজন্য দেখাতে আর উত্তেজনা নামিয়ে”[…as a gesture of goodwill to de-escalate tensions in the region.”], ডায়ালগের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের প্রতি আস্থা তৈরি করতে তিনি আটক পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কিন্তু এতে ব্যাপারটা মোদীর পক্ষে যায় নাই। বরং তাঁকে এবার এখানেও আরও উদাম করে ফেলেছে। মূল কারণ মোদী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এতদিন যে ঘৃণা তাতিয়ে ছিলেন, ভারতীয় মনকে যেভাবে উত্ত্যক্ত করে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন এই বলে যে, নিশ্চিতভাবে পাকিস্তান খুবই খারাপ স্বভাবের আর মানবিক চরিত্রহীন এক শত্রু এমন ছবি এঁকেছিলেন, তাতে খাড়া করা এমন বয়ানের ওপরে ইমরান খানের এই ঘোষণা শুধু পানি ঢেলে দেয়া নয়, একেবারে ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দিয়েছিল। এর ভালো চিহ্ন হল গত দুই সপ্তাহে মোদী পাকিস্তান বা ইমরানের যে কল্পিত দানব ছবি এঁকে ফেলেছিলেন – সেই ভারত থেকেই ইমরানের প্রতি অভিনন্দন জানানোর একটি লহর বয়ে গেছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে।

যারা অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের এমন জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে এতে প্রকাশ্যে সবচেয়ে আগে আছেন সম্ভবত ভারতীয় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। তিনি ইমরানের এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম আলো এ বিষয়ে “যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ‘হিরো’ ইমরান!” শিরোনামে সবার প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। আরো লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী ইমরানের পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তের জন্য “সামাজিক মাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। এমনকি তাকে সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কও বলা হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদীর পরিকল্পনার একেবারে বিপরীত। ভারতে পাকিস্তানবিরোধী প্রবল উত্তেজনার মধ্যে পাইলটের জীবনে এরপর কী হবে এ নিয়ে জনমত যখন চরম উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময়ে উদ্বিগ্ন মানুষের কল্পনাকে ছাড়িয়ে ইমরান এক ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় জনমতের বড় অংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিয়ে গেছেন। আর এটাই ছিল মোদির সবচেয়ে বড় হার, এক দুর্বল পয়েন্ট হয়ে হাজির হয়েছে।

কাশ্মীর প্রসঙ্গে একটা ফ্যাক্ট যা একটা কঠিন বাস্তবতা আর যা একালের খুব কম মানুষ ব্যাপারটা জানেন বা আমল করতে দেয়া হয় না এমন সে কথা তুলে ধরা যাক, যা কাশ্মির ইস্যুকে বুঝার জন্য ফাউন্ডেশনাল। গত ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ ও কলোনি মুক্তির কালে – বেঙ্গল বা পাঞ্জাব এ দুই প্রদেশ যেমন ভাগ হয়ে একেকটা করে টুকরা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে অংশ হয়ে যায়, আর সেই থেকে টুকরাগুলো এ দুই রাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেছে-  কাশ্মীর, কিন্তু সেই একই অর্থে বাংলা বা পাঞ্জাব মত নয়। এমনকি তুলনীয়ই নয়। যদিও ভারতীয় কাশ্মীর আর পাকিস্তানি কাশ্মীর বলে বিভক্ত অংশ আছে তবুও কাশ্মির কোনোভাবেই বাংলা বা পাঞ্জাব নয়। কেন?

এর একেবারে গোড়ার কারণ হল, বেঙ্গল ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রেসিডেন্সি’ প্রশাসনে আর পাঞ্জাব ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রদেশ’ প্রশাসন। আর তুলনায় কাশ্মীর বরাবরই ছিল প্রিন্সলি স্টেট বা এক  রাজার করদ রাজ্য। আসলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বলে এক ব্রিটিশ কলোনি-রাষ্ট্রের কথা আমরা জানি আর শুনি বটে, কিন্তু এককাট্টা একই প্রশাসনের অধীনস্ত ভুখন্ড মানে কোন একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে আমরা সবাই এক ইন্ডিয়ান রাষ্ট্র ভূখণ্ড  – এমন কিছু কোনো দিনই ছিল না। তাহলে ছিল কী? ছিল আসলে একই শাসক “ফোর্ট উইলিয়াম” নামে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক দুর্গ বা হেডকোয়ার্টার। এতটুকুই এক। আর বাকি সবাই আলাদা আলাদা প্রশাসনিক ভুখন্ড।
এই কোম্পানি শাসন শেষ হয় প্রথম শত বছর পরে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এরপর থেকে কোম্পানির জায়গায় সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হয়, কিন্তু তাতে আগের মতোই ব্রিটিশ-ভারত বলতে ওই একই ফোর্ট উইলিয়ামের অধীনের তিন ধরনের প্রশাসনিক পদ্ধতিতে তিন ধরনের ভূখণ্ডই বজায় রাখা হয়েছিল। বেঙ্গল, বোম্বাই আর মাদ্রাজ- এ তিনটাকে প্রেসিডেন্সি প্রশাসন বলা হত। আর এর পাশাপাশি ছিল প্রায় আট-নয়টা প্রদেশের (১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ছেড়ে যাবার সময় হয়েছিল ১৭ টা প্রদেশ) প্রশাসন। আর ওদিকে ভুখন্ডের তৃতীয় ধরণটা ছিল ছোট-বড় প্রায়.৫৬৫ প্রিন্সলি স্টেট [Princely State]। প্রিন্সলি স্টেটগুলোকে করদ রাজার রাজ্যও বলা হত – এজন্য যে এসব করদ রাজ্যের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা ইস্যুতে এরা সরাসরি ব্রিটিশদের ইচ্ছা ও স্বার্থই শেষ কথা – এমন অধীন। এছাড়া এটা মেনে নিয়েই আগের মত এর রাজারা খাজনা তুলে রাজত্ব করে যেতেন আর তোলা খাজনার একটা ভাগ ব্রিটিশদের শেয়ার করতেন। তবে এভাবে করদরাজ্য চালাতে রাজত্বের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে  রাজ্যগুলো পরিচালিত হত ঐ করদ রাজাদের আলাদা নিজস্ব প্রশাসনে। এগুলো ‘স্বাধীন’ বলে মনে করা হলেও আসলে তা ছিল বৃটিশদের পক্ষ হয়ে রাজার শাসন।

বৃটিশ ইন্ডিয়ান মোট ভুখন্ডের ৪০% ভুমিই ছিল এমন প্রিন্সলি স্টেট। আর এসব স্টেট বা করদ রাজ্যে বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩%। এমনই এক প্রিন্সলি স্টেট ছিল কাশ্মীর। কাশ্মীর তাই কোন প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশ প্রশাসনের সাথে তুলনীয় ভুখন্ড নয়, কারণ এসব প্রশাসন পরিচালিত হত সরাসরি ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। বিপরীতে কাশ্মীর সরাসরি করদ রাজার অধীনস্ত প্রশাসন; যা প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশের প্রশাসনের মত সরাসরি ব্রিটিশদের পরিচালিত প্রশাসন নয়।
একারণে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও কলোনিমুক্তির সময়, সাধারণভাবে প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশগুলো ভাগাভাগি হয়ে  যেমন তুলনামূলক সহজেই নতুন স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান বলে দুই রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পেরেছিল, প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে নাই। এর মূল কারণ করদ রাজ্যগুলো পরিচালিত হতো ফোর্ট উইলিয়ামের কোনো ধরনের প্রশাসনে নয়, বরং করদরাজার নিজের প্রশাসনে। আবার ব্রিটিশ শাসকেরা এসব রাজার সাথে ‘করদরাজ্য’ সম্পর্ক ও চুক্তিতে থাকার ফলেই  করদরাজ্যের কাউকেই আইনত ভারত অথবা পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দিতে পারার আইনি সুযোগ ছিল না, সে জটিলতা ছিল। আর এই আইনি সুযোগ নিয়েই বৃটিশ শাসকেরা, প্রিন্সলি স্টেট গুলোর কী হবে এই ইস্যু প্রসঙ্গ না তুলে বরং তা এড়িয়ে থেকেই নিজেরা ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

ওদিকে বিশেষ করে কাশ্মীর আবার সম্ভবত একমাত্র স্টেট, যা হবু ভারত-পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে মানে উভয়েরই সীমান্তে অবস্থিত। অর্থাৎ দুটোর সাথে সীমান্ত আছে। এবার অন্য আর একটা প্রিন্সলি স্টেটের সাথে তুলনা করা যাক। আরেক করদরাজ্য হল “নিজামের হায়দরাবাদ” [এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ], এর বেলায়, এর চার দিকে ভারত ভূখণ্ড বলে যেমন নেহরু সৈন্য পাঠিয়ে বলপ্রয়োগে সহজেই একে ভারতে ঢুকিয়ে নিতে পেরেছিলেন। কাশ্মিরের বেলায় তেমনটি ঘটেনি, বা বলা যায় এমন ঘটাতে গিয়েই বিপত্তি দেখা দেয়। করদরাজ্যের করদ রাজা ও শাসক হরি সিংয়ের অধীনে কাশ্মীরে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যালঘু আর তুলনায় মুসলমানেরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠই শুধু নয়, বড় অংশ ছিল ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী। এরাই নতুন পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে বসে বলে তা মোকাবেলায় হরি সিং চলে যান নেহরুর ভারতের কাছে। তবে কে প্রথম সঙ্ঘাত শুরু করেছিল, এ নিয়ে যার যার আলাদা ভাষ্য আছে। আবার কাশ্মীর কোন দিকে যাবে অংশ হবে – ভারত না পাকিস্তানে, ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তা ফেলে রেখে কাশ্মীরের রাজা স্বাধীন থাকার বোকা স্বপ্ন দেখত। অর্থাৎ দুনিয়া অভিমুখ কোনদিকে চলে গেছে এর কোন ধারণাই তাঁর ছিল না। দুনিয়া থেকেই কলোনি শাসন উতখাত হয়ে যাওয়া যেখানে বিশ্বযুদ্ধের দুনিয়ার অভিমুখ সেখানে তিনি মহারাজা থাকার স্বপ্ন দেখতেন। ফলে এমন স্বপ্ন রাখাই থেকেছিল যেন একটা বিস্ফোরককে পকেটে রাখা। তাই সারকথায় বললে, ১৯৪৮ সালে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় কাশ্মীরকে নিয়ে। যুদ্ধ শুরু হলে পরে নেহরুর অনুমান ছিল, বিরোধের ব্যাপারটা জাতিসঙ্ঘ তুলতে পারলে তিনি নিজের পক্ষে আনুকূল্য পাবেন। তাই তিনিই ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘে তোলেন।
এখানে জাতিসংঘের জন্ম বৈশিষ্ট কিছুটা বলে রাখলে কাশ্মীর ইস্যু বুঝতে সুবিধা হবে। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া আর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এর গুছিয়ে বসা – বলা যায় এসময়টা জাতিসঙ্ঘ ছিল এক বহুল আদর্শময় ও আকাঙ্খিত মডেলের এক শান্তি স্থাপনের প্রতিষ্ঠান, হাই মরালের প্রতিষ্ঠান। দুনিয়াতে কেউ কাউকে কলোনি দখল করে রাখা এই দখলদারি ও কলোনি শাসন চালানো গ্রহণযোগ্য নয় – বলা যায় এই নীতিতে পরিচালিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এলায়েড পাওয়ার [Allied powers ] বা আমেরিকার নেতৃত্বের পক্ষ। ঐ যুদ্ধে হিটলার বিরোধী এলায়েড পাওয়ার বা মিত্র বাহিনী জয়লাভ করেছিল। জাতিসংঘের জন্মেরও ভিত্তি একই; ঐ একই “কলোনি শাসন অগ্রহণযোগ্য” – এই নীতিতে। এর মূল কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করার প্রধান শক্তি ছিল আমেরিকা আর এর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হল জাতিসঙ্ঘ। তিনি বাকি বিজয়ী শক্তিদের রাজি করিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়েন। তাই এটা আবার যুদ্ধবিরোধী নৈতিকতায় পরিচালিত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে, তা কোনো যুদ্ধে নয় বরং জাতিসংঘের করা ডায়ালগ ও মধ্যস্থতা মধ্যদিয়ে, আন্তর্জাতিক নানান আইন ও কনভেনশনের ভিত্তিতে – যেকোন বিরোধ মিটানো – এই ছিল জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য। তাই যুদ্ধ এড়ানোর আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেকালের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন রুজভেল্ট ও তারপরের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান।
আমেরিকার ১৯৩৩-১৯৫৩ সাল, এই ২০ বছরের পাঁচ প্রেসিডেন্টের প্রশাসন থাকার কথা। এই ২০ বছরের প্রথম টানা চারবার প্রেসিডেন্ট জিতেছিলেন রুজভেল্ট, আর শেষবার হ্যারি ট্রুম্যান। প্রথম পর্বের টানা সাড়ে ১২ বছর প্রেসিডেন্ট ছিল রুজভেল্টের। আর শেষ সাড়ে সাত বছর (সাড়ে তিন ও চার মিলে) প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রুম্যান। কারণ, ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থবারও শপথ নেয়ার পর, মাত্র পরের তিন মাসের মধ্যে রুজভেল্ট মারা গেলে তার নীতি-পলিসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান দায়িত্ব নেন। এছাড়া, এভাবে ভাঙ্গা প্রায় সাড়ে তিন বছর প্রেসিডেন্টের দ্বায়িতে পালন শেষ করার পরের বার ১৯৪৮ সালে নির্বাচনেও ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি প্রার্থী ছিলেন ও বিজয়ী হন। তাই ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একই রুজভেল্টের নীতিটাই বজায় ছিল। আর এদিকে রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে দেখেছিলেন দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন একেবারে উতখাত করে বদলে দিয়ে স্বাধীন রিপাবলিক (রাজতন্ত্র নয়) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও যুদ্ধ এবং এরই সুযোগ ও নীতি হিসেবে। জাতিসংঘ তাই তাঁর উদ্যোক্তা-স্বপ্ন প্রতিষ্ঠান।

আর এ’কারণেই সেকালের কাশ্মীর বিরোধে জাতিসংঘের চোখে – রাজা হরি সিং নেহরুর কাছে ভারতে এক্সেশন [accession] বা অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এক “রাজার ইচ্ছা” জানিয়েছিলেন কি না, সেটি কোনো ভিত্তি নয় বরং কাশ্মীরের জনগণ কোন দিকে যেতে চায়, এই ভিত্তিতেই কাশ্মীরের ভাগ্যের আপস সমাধানের পক্ষে রায় দেয় জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘের রেজুলেশন হয়, কাশ্মিরে গণভোট হতে হবে আর এর রায়ই হবে সমাধান যে, কাশ্মির ভারত-না-পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে কিছু বাড়তি বাক্য বলে রাখি। কমিউনিস্ট ভাষ্যে সাম্রাজ্যবাদ-আমেরিকা, অন্য দেশের তেল বা সম্পদ লুটেরা আমেরিকা, সিআইএ পাঠিয়ে গুপ্তহত্যা ঘটানোর আমেরিকা ইত্যাদি – যে পরিচয়ের আমেরিকা আমরা শুনি এর শুরু হয়েছিল রুজভেল্টের নীতির সমাপ্তিতে; মানে ১৯৫৩ সালে জানুয়ারিতে বিজয়ী রিপাবলিকান নতুন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার শপথ নেয়ার পর থেকে।
যা হোক, জাতিসঙ্ঘের এই গণভোটের সিদ্ধান্ত আজও নেহেরু বা ভারতে বাস্তবায়ন করা হয়নি। উপেক্ষা করেই চলছে। আর সে কারণেই কাশ্মীর প্রসঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারী কারো সাহায্য নেয়া যাবে না, কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কারো সাথে কাশ্মিরবিরোধ ইস্যু শেয়ার বা সংযুক্ত করা যাবে না – এই হলো ভারতের স্থায়ী নীতি। যে কারণ ভারত সবসময় আউরাতে থেকে বলে, “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – যা বলার মানে হল কেউ ভারতকে “গণভোট না করার কথা” মনে করায় দিতে পারবে না। এটাকেই বলে ভারতের “বিগ-এম” (ইংরেজিতে ‘এম’ মানে এখানে Mediation বা মধ্যস্থতা) ভীতি। এর অর্থ হল যদি কোন মধ্যস্থতাকারী আবার জাতিসঙ্ঘের সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন চেয়ে বসে কিংবা মনে করিয়ে দেয়, তা আলোচনার ইস্যু হয়ে যায়। এ সপ্তাহে ভারতের এক মুরব্বি সাংবাদিক শেখর গুপ্তা লিখেছেন, কোনো শক্তিধর দেশের মধ্যস্থতা ছাড়া কাশ্মির সমস্যার সমাধান নেই। [Bilateralism has failed. India can make peace with Pakistan only with big-power guarantees]। বলা বাহুল্য এটা ভারতের – “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – গত ৭০ বছর আটকে থাকা কিন্তু অকার্যকর নীতির সরাসরি সমালোচনা।

কেন?
কারণ, যুদ্ধবাজ মোদী বাস্তবে এবারের কাশ্মীর সমস্যার ইতি টেনেছেন বিশেষত, আটকে পড়া পাইলটকে ফেরত এনেছেন, আপাতত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে মাটিচাপা দিয়েছেন “বাইরের” মধ্যস্থতাকারীদেরই সাহায্যে।

প্রথমত, মোদীর তথাকথিত ‘প্রতিশোধের’ উন্মাদনা তৈরি করে ভারতীয় মনকে ক্ষেপানোর উদ্দেশ্য ছিল এটা দাবি করা যে, তিনিই একমাত্র নেতা ও দল যে “মুসলমান” পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে সক্ষম। মোদীই ৩৬ ইঞ্চি বুঝের ছাতি-ওয়ালা [বুকের ছাতির রেফারেন্স মোদীর নিজের দেয়া] সেই নেতা।  বিজেপির রাজনীতির বহু পুরনো অনুসরণ করা মূল লাইন হল, মুসলমানের বিরুদ্ধে  হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে এভাবে হিন্দুমনের মেরুকরণ ঘটিয়ে, সেই জনমতকে নিজের পক্ষে ভোটের বাক্সে আনা। এ কারণে মেরে ফেলব, ছিঁড়ে ফেলব, ছাল ছাড়িয়ে নেব, বুকের ছাতি দেখানো ইত্যাদি ভাষা এসব হল মোদীর দলের ও ব্যক্তিত্বদের “প্রতিশোধ” নিতে সক্ষমতার প্রমাণ। আর হিন্দু হলে ভাল আর মুসলমান হলেই খারাপ – এভাবে অতি সরলীকরণ করে নিজেদের ভয়ঙ্কর দাঙ্গার উন্মাদনা তৈরির চিন্তাকে আড়াল করা। অথচ রাজনীতি, রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন, নাগরিক অধিকার, নাগরিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এসব নিয়ে কাজ করা ইত্যাদি মোদীর দলের কাছে এজন্য কখনো কোনদিন কোন ইস্যু নয়, ইস্যু হয় নাই; বরং “প্রতিশোধের” রাজনীতি, দাঙ্গার উন্মাদনা তাদের প্রিয় জিনিস।

এবার তাই পুলওয়ামায় আত্মঘাতি হামলার বিরুদ্ধে  “প্রতিশোধের” মাতম তুলেছিলেন মোদী, পরে তিনি বোমারুবিমান পাঠিয়ে বালাকোটে [বালাকোট পাকিস্তান কাশ্মীরের ভিতরে নয়, বাইরে পাখতুন প্রদেশে]  কথিত “টেরর ক্যাম্পের” ওপর বোমা ফেলে সব ধ্বংস করে এসেছেন, এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করা ছিল তাঁর পরিকল্পনা। প্রায় সবই ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাধে পাকিস্তানের হাতে হামলাকারি ভারতের পাইলট আটকা পড়ায়। অপর দিকে আরেক বড় বিপদ দেখা দেয়। মোদী দাবি করেছিলেন, বালাকোটের ক্যাম্পে ভারতের পাইলটের বোমা হামলায় নাকি “৩০০ টেররিস্ট” মেরে এসেছেন। যদিও ঠিক তিনশ’ই কেন, ২৯৯ বা ৩০১ নয় কেন তা জানা যায়নি। এদিকে সেসব নিয়ে পরের দিন থেকে শুরু হয়ে যায় বোমা ফেলার স্থানের সরেজমিন রিপোর্টিং। পাকিস্তানের জিও টিভির এই প্রজন্মের সাংবাদিক হামিদ মীর ঘটনাস্থল সফর করে ফেসবুকে ক্লিপ পাঠিয়ে বলছেন, এক মরা কাক ছাড়া [There was one casualty, a crow ] সেখানে কেউ মরেনি। আর ওই বনের ভেতর কুঁড়েঘরের এক গরিব মানুষ কিছুটা আহত হয়েছেন। তবে বাড়ি অক্ষত আছে। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর বিশাল এক গর্ত হয়ে গেছে। সেটি আবার রয়টার্সের এক সাংবাদিকের নিজস্ব সফরের ছবি ও রিপোর্ট। সেটা আবার ইতোমধ্যে  ছাপা হয়ে গিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়

তবে এসব মিডিয়া রিপোর্ট আসার আগেই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মোদিবিরোধী মমতা-রাহুলসহ ২১ দলের এক সভা হয়েছে। সেখানে বিরোধীরা দাবি তুলে ও নিন্দা জানায় যে, মোদি সেনাবাহিনীর রক্ত ও জওয়ানদের ত্যাগকে নিজের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন [Opposition leaders condemn Modi govt for politicising current situation with Pakistan]। কলকাতা ছেড়ে দিল্লির এই মিটিংয়ে রওনা হওয়ার আগে মমতার নিজ ভাষায় আঙুল তুলে বলেছেন, “জওয়ানদের রক্ত নিয়ে ভোটের রাজনীতি’ করাই কি আসল লক্ষ্য? আর ওই দিকে পরের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি ২১ দলের মিলিত অভিযোগ মোদী “জওয়ানদের আত্মত্যাগকে নিয়ে রাজনীতিকরণ করছেন”India’s Modi criticised for politicising Pakistan standoff]। আর কলকাতায় ফিরে ১ মার্চ, এবার মমতার সরাসরি চ্যালেঞ্জ বালাকোটে‘প্রথমদিন থেকেই শুনছি, শত্রুপক্ষের ৩০০-৩৫০ লোক মারা গিয়েছেন। কত কী, আদৌ কেউ মারা গিয়েছেন কি না, আমরা জানতে চাই। আরও জানতে চাই, বোমা কোথায় ফেলা হয়েছিল, আদৌ বোমা ঠিক জায়গায় পৌঁছেছিল কি না”। এরপর বিভিন্ন বিদেশি সংবাদপত্রের নাম উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আরও বলেন, ‘‘তারা বলছে, এমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি। বোমাটা অন্য জায়গায় পড়েছে, মিস হয়েছে। মানুষ মারা যায়নি। কেউ বলছে, একজন মারা গেছেন। তো সত্যটি কী, এটা তো মানুষ জানতে চাইতেই পারে। আমরা বাহিনীর সাথে রয়েছি। কিন্তু বাহিনীকে সত্যি কথাটি বলার সুযোগ দেয়া উচিত। দেশের লোকেরও সত্যিটা জানা উচিত”।
কিন্তু এখন মোদীর বিপদ এর চেয়েও বড়। তার ধারণা ছিল প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেছে, ফলে তিনিই একমাত্র ছাতিওয়ালা নেতা, সেসব দাবির পক্ষে রসদ এখন তাঁর হাতে এসে গেছে। সুতরাং এখন সীমান্ত উত্তেজনা শীতল [de-escalation] করাই মূল কাজ। কিন্তু পাইলট আটকে যাওয়ায় ব্যাপারটি পুরা ঘোলাটে জটিল হয়ে থাকে।

তাই তিনি আসলে তিনটি বা অন্ততপক্ষে দু’টি ক্যাম্পকে মধ্যস্থতা করতে কুটনৈতিক ততপরতা করতে ডাকেন। প্রথম ক্যাম্পের মূল নেতা সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহম্মদ বিন সালমান বা এমবিএস (MBS)। এটি কারো অজানা নয় যে, অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সঙ্কটে থাকা পাকিস্তানে তিনি গত সপ্তাহে সফরে এসে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। এ ছাড়া আরো ৯ বিলিয়নের মধ্যে নগদ তিন বিলিয়ন ডলার ইমরান ক্ষমতায় আসার পরই দিয়েছেন। এক কথায় এই প্রিন্স হলেন এখন ইমরানের পাকিস্তানের কাছে প্রমাণিত ত্রাতা। আবার খাসোগি হত্যা মামলায় ইমেজ হারানো এই প্রিন্সের কাছে পাকিস্তান সফর হল ইমেজ আবার চাঙ্গা করার উপায়। কাজেই মোদীর দিক থেকে সেই ইমরানকে রাজি করাতে হলে এখন ইমরানের দুর্বলতা ও ব্যক্তি সম্পর্ক গড়ে তোলা ব্যক্তিত্ব প্রিন্সই হলেন সঠিক লোক, এটি বুঝতে মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কষ্ট হয়নি। এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রিন্স- MBS আর দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স, এরা হলেন মূল ক্ষমতাধর। দুবাইয়ের প্রিন্সও এমবিএসের আগেই পাকিস্তান সফরে এসে প্রায় ১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। কাজেই মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের আগ্রহে – ভারত ওআইসি’র কেউ নয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও দুবাইয়ের প্রিন্স ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওআইসি’র সভায় অতিথি হতে দাওয়াত করেন। এখানেই মোদীর কাম্য মধ্যস্থতাটা ঘটে। কারণ, এর শুরু শুধু প্রিন্স MBS এর নিজের প্রভাব নয় আর এক হাতে তিনি ট্রাম্পের জামাই ক্রুসনারের মাধ্যমে ট্রাম্পের আমেরিকা দিয়েও ইমরানকে প্রভাবিত করেন। ভিয়েতনাম সফরে থাকা ট্রাম্প তাই শুধু ইঙ্গিতে বলে্ন “সারপ্রাইজ আছে”। [Earlier, U.S. President Trump said he expected “reasonably decent news” regarding the conflict between India and Pakistan, adding that the United States was trying to mediate.] অতএব, এটাকে বলতে পারি আমেরিকা সমর্থিত মিডল ইস্ট ক্যাম্পের মধ্যস্থতা।
দ্বিতীয় ক্যাম্পটি হল, এটা মূলত চীনের উদ্যোগ। অনেকটা অপসৃয়মাণ আমেরিকান প্রভাবের ভেতর উত্থিত দুনিয়ার নতুন নেতা চীনের। ভারত ও পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ ও বাজার স্বার্থ খুবই ভাইটাল। এনিয়ে দুবাইয়ের এক সেমিনারের জাতিসংঘ আর বিশ্বব্যাংকের মন্তব্যটা দেখা যেতে পারে [Don’t let border tensions hamper trade: UN & World Bank economists to India, Pakistan]।  যদিও চীনের গ্লোবাল স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এর ভেতর ভারত আবার একটু বেয়াড়া, সবসময় কথা শুনতে চায় না। দাম বাড়িয়ে চায়, নেয়। তাই চীন নিজের প্রভাব বাড়াতে রাশিয়াকে সাথে রাখে। তাই এখানে মিটিংটা হয়েছে চীনে। ভারত, রাশিয়া ও চীন এ তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে। এ ছাড়া সাংহাই করপোরেশন সংগঠনের সূত্রে গত ২০১৭ সালে ভারত-পাকিস্তানকে একত্রে সাংহাই জোটের সদস্য করে নেয়া হয়।
কিন্তু সব পক্ষের “উত্তেজনা নামানোর” প্রস্তাব শুনে ইমরান উল্টো নিজের ইমেজ বাড়ানোর বুদ্ধিতে নিজেই এগিয়ে আসেন। তাই পরের দিনই বিনা শর্তে পাইলটকে ছেড়ে দেয়ার আগাম ঘোষণা তিনি দিয়ে বসেন।

কিন্তু বালাকোটে নাকি বোমা ফেলে ৩০০ জন জঙ্গী মেরে ফেলা হয়েছে – সেসব কথিত মৃত জঙ্গীর লাশ মোদী এখন কোথা থেকে দেখাবেন? সমস্যা এখন এখানে ঠেকেছে। এ দিকে খবর বেরিয়েছে, হাজার কেজি বোমা ফেলে বনজঙ্গলের পরিবেশ নষ্টের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে মামলা করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। এতে ৩০০ মৃত জঙ্গির লাশ সংগ্রহ মোদীর জন্য আরো কঠিন করে দিয়ে তাকে বিব্রত করাই পাকিস্তানের উদ্দেশ্য, তাই মনে হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস আরও খারাপ মন্তব্য করে বলেছে, – “Pakistan released the Indian pilot it had captured, capping a humiliating episode for India and a surreal week for him”.

তাহলে এখন ভারতের বিগ-এম ভীতি, মানে মধ্যস্থতাকারীর ভীতির কী হল, কোথায় গেল? আমরা দেখলাম, ঘটনা শক্তপোক্ত করতে মোদী দু’টি বৃহৎ ক্যাম্পকে নিয়োগ করে নিজে উদ্ধার পেলেন। সম্ভবত এই বাস্তবতায় শেখর গুপ্ত লিখছেন, কাশ্মির ইস্যুতে “দ্বিপাক্ষিকতার দিন শেষ, বিগ পাওয়ারের মধ্যস্থতা নেয়ার” দিন এসে গেছে।
পাইলটকে ফেরত পেতে গিয়ে আর ওই দিকে মমতার চোখা প্রশ্নের কারণে মোদির সব প্রপাগান্ডা আর তৎপরতাই এখন উদোম। সবাই সব জেনে গেছে।

সর্বশেষ আবার ওআইসিঃ
আজ আবার ওআইসি ইস্যু হাজির, কিন্তু এবার তা ভারতের জন্য চরম নেতিবাচক। ভারত দুবাইয়ে সমাদরে ওআইসির দাওয়াত খেয়ে এসে এরপরের দিনটাই তাঁর জন্য ছিল উলটা, অন্যরকম। কেন? ওআইসির ঐ দুবাই-সম্মেলন থেকে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে তাতে ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  কাশ্মীরে ভারত সরকারের নাগরিক ট্রিটমেন্ট অর্থাৎ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। মানে দুবাই মিটিংয়ে কাশ্মীরের নির্যাতিত জনগণ প্রসঙ্গের গৃহিত প্রস্তাবগুলোতে স্বভাবতই ভারতের কঠোর সমালোচনা করতে হয়েছে। সেখানে যে দুটা শব্দ ভারতের জন্য খুবই বিব্রতকর সেটা হল – “Indian terrorism” “MASS BLINDING” এর নিন্দা। প্রথমটা সরকারি গুম, খুন নিপীড়ন এসবের সীমাছাড়ানি বলপ্রয়োগের তাই এটাকে সরকারি “সন্ত্রাস” বলা হয়েছে। আর পরেরটা  বিশেষ করে নাগরিক গ্রহণযোগ্যতা সীমার বাইরে গিয়ে ছররা গুলির প্রয়োগ[use of pellet guns by security forces ] যা মাথার খুলিতেও পর্যন্ত গিয়ে ঢুকে থাকে, তাই এর কড়া সমালোচনা।

অতএব ভারত ঐ দাওয়াতে গিয়ে খাদ্য আর প্রশংসাসহ যা যা কিছু গ্রহণ করেছিল তা এবার বমি করে উগরে বের করতে হয়েছে।  ভারতকে এবার “প্রত্যাখ্যানের” বিবৃতি দিয়ে তা বলতে হয়েছে। দা হিন্দু পত্রিকার শিরোনাম, India rejects OIC resolution on “Indian terrorism” in Kashmir। আর ওদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও এর রিপোর্ট করেছে। মূলত এদুই পত্রিকাতেই এটা ভাল রিপোর্টেড হয়েছে। এক্সপ্রেসের শিরোনাম হল, “OIC condemns ‘atrocities’, India says J&K internal matter”। অর্থাৎ ওআইসি কাশ্মীরে ভারত সরকারের নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণের নিন্দা করেছে।  আর এর জবাবে ভারত বলেছে, জম্মু-কাশ্মীরে যা কিছু ঘটে তা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানে হল বাইরের কেউ এতে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু তাহলে ভারত মধ্যস্থতা নিতে গিয়েছিল কেন, সে জবাব ভারত আমাদের দিচ্ছে না!

ওদিকে ওআইসির প্রস্তাবে, ভাঙ্গা বাবরি মসজিদের জায়গায় আবার তা নির্মাণ করে দেওয়ার আহবানও রাখা হয়েছে [… Indian government to rebuild the Babri Masjid in Ayodhya]। ফলে মোদী সরকারের জন্য এটা এক চরম বিপর্যয় অবস্থা।

বাকী বেশির ভাগ মিডিয়া এটাকে মোদী সরকারের “কূটনৈতিক বিপর্যয়” এর ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেছে। কিন্তু মিডিয়ায় কেন তা এত জোড়ালো হল? কারণ সুষমা স্বরাজ ওআইসিতে দাওয়াত পাওয়াতে সেটাকে খুবই গর্বের সাথে ভারত তা প্রচারে নিয়েছিল যে এটা পাকিস্তানকে কোনঠাসা করতে পারার কুটনৈতিক সাফল্য। এছাড়া যখন সুষমা দাওয়াত করার কথা উঠেছিল ওআইসির মধ্যে আভ্যন্তরীণ ভাবে তখন থেকেই পাকিস্তানের পরিরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা নিয়ে পাকিস্তান সরকারের আপত্তির কথা সরাসরি মিডিয়ায় তুলেছিল। এরই প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের অন্য ডেলিগেট সদস্যরা পরে যখন দুবাই সম্মেলন যোগ দিলেন তখন দেখা গেল তাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাদ রাখা হয়েছে। সম্ভবত কোন বিব্রতকর কিছু ঘটার সুযোগ রাখতে চায় নাই কোন পক্ষ। আর তাতেই ভারত এটাকে তাদের বিরাট সাফল্য বলার সুযোগ নিতে গিয়েছিল। এছাড়া ওআইসির প্রস্তাবে ইমরানের পাইলট ফেরত দেবার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা হয়েছে। এটাও ভারতের দেখানো সাফল্য – এবার ফুটা হয়ে যাবার আর একটা কারণ। সারকথায় ভারতের মোদী সরকারের মিথ্যা বা যুদ্ধবাজ প্রপাগান্ডা – ধর্মের কল মানে ন্যায়ের কলের বাতাসে নড়ে – এর মত আপনাতেই যেন ভেঙ্গেচুড়ে পড়েছে।
ফলে মোদীর উদাম ন্যাংটা হয়ে যেতে আর কিছুই যেন বাকি থাকে নাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদি আরো উদোম হয়ে গেছেন“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

গৌতম দাস
১১ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2pL

আসামে ‘বাংলাদেশী’ বা ‘মুসলমান’ নামে আর এক ক্লিনজিং ও নিধন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে সীমাহীন দুর্দশা আর শরণার্থীর ঢল – এসব দৃশ্য কী আমাদের দেখতে হবে? হলে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের কাঁধে বন্ধুক রেখে এই হত্যাকান্ড ঘটবে? এর দায়ভার কী আদালত বইতে পারবে? ভারত হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ডুবে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে আর মাত্র ১৬ মাস বাকী। মোদীর অর্থনীতির ডুবে যাওয়া আর কাজ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা আর লুকানো নয়, গত সপ্তাহে এবার এটা একেবারে ষ্টাটিস্টিক্যালি প্রকাশিত। সেখানে দেখা যায় মোদীর গত চার বছরের শাসনের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি এবার, সাড়ে ছয় পারসেন্টে নেমেছে। ফলে ধরে নেয়া যায় আগামী নির্বাচনের মোদীর অস্ত্র হবে একটাই – উগ্র হিন্দুত্ব ও মুসলমানবিদ্বেষ। আর তাতে এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে পরিণতি কী হবে!

রোহিঙ্গা সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সুরাহার দেখা পাওয়া যায় নাই এখনও, অথচ এর আগেই প্রায় একই ধরনের নতুন আরেক ফেনোমেনা ‘আসাম মুসলমান নিধন নিপীড়ন’ – ব্যাপকভাবে উঠে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তারা কথিত ‘বাংলাদেশী’, ‘মুসলমান’, ‘ফরেনার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি বলে অত্যাচার-নির্যাতন নিয়মিত শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। আসলে এক কথায় বললে আসাম বা অসমিয়রা এক চরম জেনোফোবিয়াতে ভুগছে। ইংরেজি জেনোফোবিয়া (Xenophobia) শব্দের ‘জেনো-‘ এর তুল্য প্রচলিত বাংলা হবে – ফরেনার বা বিদেশী। এভাবে পুরো শব্দের অর্থ হল – ফরেনার বা বিদেশী ভীতি। যদিও এই শব্দের আসল গভীর অর্থ হল – ‘অ-পর’; যে আমার মতো নয়, এমন অপর-ভীতি। ফলে তাকে দেখতে পারি না, ঘৃণা করি। যেমন – কেউ আমার মতো নয়, সে আমার ধর্মের নয়, অথবা আমার মত অহমিয়া নয়, অথবা আমার মতো এশিয়ান নয় ইত্যাদি। ফলে সে আমার ‘অ-পর’। “অসমে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমিয়াদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সব গ্রাস করে ফেলছে” – এই হল অসমিয়াদের সবচেয়ে কমন আক্ষেপ ও বিদেশ- বিরোধী প্রপাগান্ডা। এই ‘অপর-ভীতি’ বা জেনোফোবিয়াতে ভুগছে আসাম। অথবা সম্ভবত বলা ভালো, জেনোফোবিয়াতে ভোগানো হচ্ছে। কারা ভোগাচ্ছে, কারা এরা?
বলাবাহুল্য, ‘অপরে আমাদের সব গ্রাস করে ফেলল’ – এই আক্ষেপের বয়ান তৈরির পেছনে আধা সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প তারা জড়ো করেছে, অনুমান করা যায়। এখানেই সবচেয়ে বড় মিল দেখা যাবে বর্মিজদের সাথে। বর্মিজদের অপর-ভীতি রোহিঙ্গা নিধনের পিছনের মূল কারণ। এদিকে এখানে বর্মিজদের আসাম দখল থেকে অসমিয়াদের অপর-ভীতির সুত্রপাত। দ্বিতীয় এঙ্গলো-বার্মিজ যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৫১ সালে। এর আগেই, (১৮২৪-১৮৩৮) সালের মধ্যে অহম রাজা ও আশপাশের অন্যান্য রাজা যেমন কাছাড় রাজ্য মিলিয়ে পুরো আসামই ব্রিটিশ কলোনির দখলে ও শাসনাধীন চলে যায়। বার্মিজ রাজার আসাম অঞ্চল দখল নিতে যাওয়া থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল।  তাই অসমিয়াদের একালের আক্ষেপের বয়ানে গল্পের একটি উপাদান হল – ব্রিটিশ কলোনি তাদের দখল করে নিয়েছিল। আগে তারা কত সুন্দর দিন কাটাইত। যদিও এর জন্য এখনকার বাংলাদেশ বা এর কোনো বাসিন্দা আমরা কেউ দায়ী নই। তবু এক জেনোফোবিয়ায় ভিকটিম-বোধের গল্প এখান থেকে শুরু হয়েছে। এর ওপর আদি পাপ আমরা তো মুসলমান, সেটা তো আছেই, যা জুড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো সমস্যার জন্য মুসলমানদের দায়ী করা সহজ। তবে আমাদের আরেক অপরাধ ছিল যে, যেহেতু ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক অধীনে একটি ব্রিটিশ কমিশনারেটের কর্তৃত্বে রেখে শাসন করা হয়েছিল, আর তা হয়েছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। ফলে বৃটিশেরা নয়, বাঙালিরাই যেন এতে দায়ী। আর এর জন্য যেন বাংলাদেশ, মুসলমান বা বাঙালিরা দায়ী, এমন বলে নানান অনুমান ও গল্পও তাদের ঝুলিতে আছে। ভিকটিম-হুড যারা বিক্রি করে, তারা এমনই করে।
আর ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হলে আসামকে পুরা বেঙ্গলের সাথে আর না, বরং সরাসরি পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ করা হয়। তাতেও তারা আরো বেশি অখুশি  হয়েছিল। যদিও (১৯০৫-১৯১১) মাত্র এই ছয় বছর আসাম পূর্ববঙ্গের সাথে ছিল। তবে ততদিনে আসাম ব্রিটিশদের চোখে নগদ অর্থকরী ফসল, চা উৎপাদনের এক খনি যেন, এভাবে হাজির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেকালের চা উৎপাদনের শ্রমিক কারা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশেরা স্থানীয় অসমিয়াদের পছন্দ না করে বিপুল শ্রমিক মাইগ্রেট করে এনেছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক রিপোর্টের মতে, এই শ্রমিকেরা মূলত ট্রাইবাল, তবে ছোটনাগপুর উপত্যকা মানে সেকালের বিহারের ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড (যে দুটোই এখন আলাদা রাজ্য) থেকে এবং বিহারের বাকি অংশ থেকে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (তেলেঙ্গনা, কয়েক বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আলাদা হওয়া রাজ্য) এসব অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া লর্ড কার্জনের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেন পূর্ববঙ্গ থেকেও আনা হয়। সম্ভবত পড়শি ও দক্ষ কৃষিকাজ জানা লোক বলে। [People – mostly tribals – were brought in from the Chota Nagpur plateau and its adjoining areas covering present-day Jharkhand, Chhattisgarh, and parts of Bihar, West Bengal, Odisha, Telengana and Andhra Pradesh to work in the newly-opened tea plantations from the mid 19th century; the British encouraged the migration of Muslim farmers from East Bengal after Lord Curzon became Viceroy of India (1899-1905). ]
তবে এর আরেকটা বড় কারণ আছে। ব্রিটিশ-ভারতের ‘ভারত শাসন আইন-১৯৩৫’ অনুসারে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা প্রথম স্থানীয় নেটিভদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় শাসনে সিলেক্টেড স্থানীয় নেতা নেয়া হত। তার পুরো আনুষ্ঠানিক নাম মৌলবি সাইদ স্যার মোহম্মদ সাদদুল্লাহ। গৌহাটির সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাদদুল্লাহ পরে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ও সরকারি প্লিডারও ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের আসাম প্রদেশের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত)। এর আগে তিনি ১৯১৯ সালের সরকারেও সিলেক্টেড প্রতিনিধি ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গোপীনাথ বরদোলাই। এমনকি স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার কাজে যে ৯ সদস্যের খসড়া কমিটি হয়েছিল, তিনি সেখানে একজন ছিলেন। তিনিও পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষক নিয়ে গেয়েছিলেন, ধান চাষে বাংলার অভিজ্ঞতায় বেশি ফসল এরা ফলাতে পারে এই বিশ্বাসে। এসব মিলিয়ে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা জাম্প করেছিল। তবে তা সবই ১৯৪১ সালের মধ্যে, এরপরে নয়। যেমন ১৯০১ সালে আদমশুমারিতে মুসলমান ছিল আসামের মোট জনসংখ্যার ১২.৪ শতাংশ। এরপর বিপুল মাইগ্রেটেড হয়ে আসা জনসংখ্যার কারণে পরের ৪০ বছরের মধ্যে ১৯৪১ সালে তা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছিল, ২৫.৭২ শতাংশে। তবে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সবচেয়ে বড় মুসলিম মাইগ্রেশন। মনে রাখতে হবে এটা হয়েছিল, ব্রিটিশ-ভারতে যখন দাওয়াত দিয়ে জমি ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পুর্ববঙ্গ থেকে মাইগ্রেট করে বাঙালি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের ৩০ বছরে দেখা যায় ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশ কমে ২৪.৫৬ হয়েছিল। এরও পরের ১০ বছরে এই প্রথম মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৮১ সালে ৪ শতাংশ বেশি হয়ে ২৮.৪৩ শতাংশ হয়। এর পরের ১০ বছরে জনসংখ্যা ১৯৯১ সালে আরো ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৩০.৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে এখন মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশ।
নিচের গ্রাফ নেওয়া হয়েছে, সাথে দেয়া লিঙ্ক ফলো করেন। 
ASSAM muslim population
তাই সবচেয়ে হইচই শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এক উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মুসলমান অনুপ্রবেশ’ হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ করে এমন কোন তথ্য না থাকলেও একথা বলা হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এই বিচারে এটা একটি মিথ, একটি পারসেপশন মানে ভোটে জেতার পারসেপশন। এ ছাড়া অনেক গবেষক দেখিয়েছেন এর কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে ১৯৭১ সালের শুমারিতে দেখা গেছে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়েনি। এ ছাড়া অন্য যেসব ‘রাজনৈতিক পারসেপশনের অভিযোগ’, যেমন – বাংলাদেশের সাথে আসামের সীমান্ত এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বেশি। অথচ কোন শুমারির গণনাতে দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করা হয়নি। আবার এমনই আরেক অভিযোগ হল, অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের তুলনায় আসামের মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নাকি বেশি, মানে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী” এসেছে। সেটাও তুলনীয় ফিগার দিয়ে গ্রাফ একে তুলনা করে দেখা গেছে, এই অভিযোগও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আদমশুমারির তথ্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধারণাকে সমর্থন করে না। তবে এটা হতে পারে যে, আসামের ভেতরেই ১৯৮১ সাল থেকে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানদের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এর অর্থ মুসলমান মোট জনসংখ্যা বেড়েছে তা নাও হয়ে পারে। কারণ মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানদের শতকরা হার যেহেতু এটা একটা শতকরা হিসাব অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শতকরা যোগফল ফিক্সড বা ১০০ থাকতে হবে, তাই। এতে কোন কারণে হিন্দুদের জন্মহার কমাটাও তুল্যপরিমাণ মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে বলে দেখাবে। অথচ মুসলমান মোট জনসংখ্যা আসলে হয়ত বাড়েই নাই – এমন হতে পারে।
এমনিতেই সাধারণভাবে কোন জনগোষ্ঠির শতকরা হার এর বাড়া-কমা ঘটার পিছনের কারণ হিসাবে দেখা যায় – আরবানাইজেশন বা শহরায়নের হার বেশি হলে জন্মহার কমে। হিন্দুদের শহরায়ন বা শহুরে চাকরিজীবী পেশা গ্রহণ মুসলিমদের তুলনায় বেশি হলে হিন্দু জন্মহার কমেছে – এর একটা কারণ হতে পারে। মূল কারণ হল, কৃষিকাজ বা প্রত্যক্ষ শ্রম বেচে খাওয়া বাবা-মায়েদের সন্তান বেশি নেয়ার ঝোঁক থাকে। কারণ সেক্ষেত্রে সন্তান কম বয়স থেকেই নিজেই আয় করতে পারে বা উল্টা বাবাকে শ্রম-আয় দিয়ে সাহায্য করতে পারে। যেটা শহুরে বা শিক্ষিত চাকুরে পেশার বাবা-মায়ের বেলায় উল্টা হয়। কারণ তাদের সন্তান শিক্ষিত করতে গিয়ে সন্তানের পিছনে খরচ করতে হয়। তাদের মানুষ করার এই খরচ কমাতে বাবা-মায়েরা জন্মহার কম রাখার পথে যায়। মুসলিম জন্মহারের তুলনায় বেশি দেখানোর সম্ভাব্য কারণ এটিই। আরও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আসাম ভেঙ্গে আরও নতুন চারটা প্রদেশ করা হয়েছে। আর ঐ প্রদেশগুলো হওয়ার কারণে পুরান আসাম প্রদেশ থেকে (মুসলমান জনসংখ্যার তুলনায়) বেশি হিন্দু জনসংখ্যাই বের হয়ে গেছে। তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যা কম বের হওয়াতে মোট সংখ্যাটা একই থাকলেও শতকরা হারের দিক থেকে মুসলমানের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া সম্ভব। তবে মূল কথা, কেন শতকরা হিসাবে মুসলমানের পার্সেন্টেজ বেশি দেখাচ্ছে এর আসল কারণ পরিসংখ্যান ফিগার ঘেঁটে বের করা যেত। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাই মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীর’ উপস্থিতির প্রমাণ – এদিকে অনুপ্রবেশের রাজনীতি, মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় নাই। অথচ এটা একটা অপ্রমাণিত বা ভিত্তিহীন কথা।
আসলে ১৯৪৭ সালের পর থেকেই এক মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় উঠেছিল। এরই সাক্ষ্য হয়ে আছে ১৯৫১ সালের ‘NRC 1951’ (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন)। এটা এই প্রথম ভারতের একটাই প্রদেশে যাচাই করে নাগরিক তালিকা তৈরি করা। ভারতে নিয়মিত প্রতি দশ বছর পরপর আদমসুমারি হয়ে থাকে। সে হিসাবে ১৯৫১ সালের আদমশুমারির পরই সেই ডাটা থেকে সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র আসাম প্রদেশেই “রেজিস্টার্ড নাগরিকদের তালিকা” তৈরি করা হয়েছিল; অর্থাৎ অন্য কোনো রাজ্যে তাদের কোন NRC করা হয় নাই। আসামে ‘মুসলমানেরা বেড়ে গেল কি না’ এই উছিলা তুলে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা তখন থেকেই। এমনকি এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধ’ আসামের হিন্দু বাঙালিদেরও বিপক্ষে। বিশেষ করে সিলেটের লাগোয়া আসামের তিন জেলার (কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি) হিন্দু বাঙালি যাদেরকে বরাক উপত্যকা বিধৌত অঞ্চলের লোক বলা হয়। আর শুরুতে এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস। তাই বরাক অঞ্চলের লোকেরা এখন ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, প্রথম আলোতে প্রকাশিত নাগরিকত্ব নিয়ে সোচ্চার বরাকের বাঙালিরা” এই রিপোর্ট এখনও আসামের বরাকের তিন জেলার হিন্দু বাঙালির প্রতিবাদ। যদিও এরাই ১৯৪৭ সালে সিলেট নিয়ে ভোটাভুটিতে আসামের পক্ষে পতাকা উড়িয়েছিল। এদের মোহভঙ্গ হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। বিশেষত ১৯৫১ সালে কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদোলাই যখন মুখ্যমন্ত্রী এবং  ১৯৬১ সালে, যখন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ ‘উগ্র অহমিয়াবাদের’ শুরুর দিকে এর নেতৃত্বে ছিল প্রদেশ কংগ্রেস।
যদিও খোদ নেহরু বা পরে ইন্দিরা গান্ধী এই উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ পছন্দ করেননি। আবার এদের দুজনের কেউই প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে থামাতেও পারেননি। এর নিট ফলাফল হল – এর পর থেকে আসামের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব কংগ্রেসের দেখানো পথেই থাকে কিন্তু নেতৃত্ব অন্যান্য দল বা গোষ্ঠির হাতে চলে যায়। আর সেটাই এখন বর্তমানে বিজেপির হাতে। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই ‘অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ সংক্ষেপে আসু [AASU] এটাই আসামের বড় ছাত্র সংগঠন। অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করে বললে, ভারত স্বাধীনের পরে কংগ্রেস আর কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠন সব রাজ্যে আলাদা হয়ে যায়। ব্যতিক্রম আসাম। এখানে ভাগ না হওয়া সংগঠনটাই হল আসু। সম্ভবত ‘উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ’ সেকালে উত্তাল হয়ে উঠা – এমন অবিভক্ত থেকে যাওয়ার কারণ।  AASU এই সংগঠন ১৯৭৯ সালে (NRC) এনআরসির নাগরিকের তালিকা তৈরি শেষ করে এর ভিত্তিতে ‘কথিত অনুপ্রবেশকারীদের’ বের করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে ছাত্র সংগঠনের তরফে এমন দাবির তোলা হয়েছিল। এর অর্থ তাতপর্য হল, কংগ্রেস দলের কেন্দ্র বা হাই কমান্ড, প্রদেশ কংগ্রেসের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদে মোড় নেয়ার বিপক্ষে তাদের মুখ বন্ধ রেখেছিল, এরই প্রতিক্রিয়া। এজন্য পরিণতিতে আমরা দেখি পরবর্তিতে এই ছাত্র সংগঠনই নতুন রাজনৈতিক দল (অসম গণ পরিষদ) খুলেছিল, যেটা তখন জন্ম হয় নাই। ১৯৭৯ সালের আসুর আন্দোলন শুরুর পরে ১৯৮৩ সালে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার নির্বাচনের আয়োজন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আসু এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। ফলে কংগ্রেস ছাড়া এতে আর কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু মুসলমান ভোটারেরা কংগ্রেসের প্ররোচণায় ভোট দিতে গিয়েছিল। এখান থেকে এক মহা-বিপর্যয়ের শুরু।
আসামের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান চারটির একটি – বোড়ো (Bodo) ট্রাইব, অনেকে এদেরই আদি অহমিয়া মনে করে। ট্রাইবের নামে এক আঞ্চলিক দল (National Democratic Front of Bodoland) আছে তাদের (পরে অবশ্য দুটা ভাগ হয়ে গেছে)। বিজেপির বাজপেয়ি সরকারের আমলে ২০০৩ সালে বোড়ো সংখ্যাগুরু চারটি জেলা (Kokrajhar, Baksa, Chirang and Udalguri ) নিয়ে এক  স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ও আলাদা নির্বাচিত প্রশাসন, Bodoland Territorial Council (BTC) গঠন করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে BTC তে মোট ৪০ আসনের মধ্যে ৭৫ ভাগ সংসদীয় আসন বোড়োদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই সমস্যা উল্টা হয়। কারণ সর্বসাকুল্যে বোড়ো জনসংখ্যা ৪৮% এর কম। আর পরের বড় অংশ হল ২৭% মুসলমান, এছাড়া অন্যান্য ধর্ম বা ট্রাইব ইত্যাদির লোক আছে। অর্থাৎ ঐ চার জেলাতেই মুসলমানসহ অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আছে। বোড়োরা এখন এসব কোন সংখ্যালঘুদেরকে ক্ষমতায় কোন প্রতিনিধিত্ব দিতে চায় না।  উল্টা রুখে দিতে চায়, রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত করতে চায়। এমনকি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিতে বাধা দেয়, হত্যা ম্যাসাকার করে ইত্যাদি। আগ্রহিরা এই রিপোর্টের পুরাটা পড়ে দেখতে পারেন। এটা ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের অধীনে করা হয়েছেন। সেখান থেকে, [ This year 2014, between May 1 and May 3, nearly 50 unarmed Muslims were shot dead in three separate incidents in the Bodo Territorial Administered Districts. These killings, according to the report, were a retaliation by Bodo militants because a host of non-Bodo communities, including Muslims, had collectively put up an election candidate from the United Liberation Front of Assam to contest for the Kokrajhar Lok Sabha election seat against Bodo candidates.] এরাই ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিও নিলা ম্যাসাকার (Nellie massacre) ঘটিয়েছিল। প্রায় হাজার খানেক বোড়ো অধিবাসী দল বেধে প্রায় মোট প্রায় তিন হাজার (অফিসিয়ালি দুহাজারের কম) মুসলমান জনগোষ্ঠির লোককে হত্যা করেছিল।  ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে আসামের নওগাঁ জেলার নিলা ও এর আশেপাশের গ্রাম এলাকায় মুসলমানকে হত্যা করার সাথে শিশু ও নারীদের আহত এবং নির্যাতিত হয়, এটাই নিলা ম্যাসাকার নামে এটি পরিচিত। পরবতিতে একটা ডকুমেন্টারি সিনেমা হয়েছে এই হত্যাকান্ডের সার্ভাইভারদের নিয়ে। পরে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনেও (মোদি এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর) একইভাবে আক্রমণ নিপীড়ন করা হয়েছিল।

১৯৮৩ সালের মুসলমান নিধন হলেও এ নিয়ে আজো কোনো বিচার আদালত কিছু হয়নি। তবে ইন্দিরা গান্ধীর (তিনি তখনো বেঁচে, নিহত হয়েছেন অক্টোবর ১৯৮৪) প্রতিক্রিয়া কিছু টের পাওয়া যায় তার এক কাজে। তিনি এই হত্যার ব্যাপারটা যতদুর সম্ভব চেপে গিয়েছিলেন, কথা সত্য। কিন্তু একটা কাজ করেছিলেন। ভারতের ভুখন্ডে কোন ‘বিদেশির অনুপ্রবেশ’ ইস্যু ডিল করতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় “১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট” [The Foreigners Act, 1946.] এই আইন। তা সত্ত্বেও ঐ হত্যাকান্ডের পরে কেবল আসামে প্রয়োগের জন্য ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’ [Illegal Migrants (Determination by Tribunal) Act, 1983] বলে নতুন আইন করেন তিনি। এই আইনের সারকথা হল – কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এ ছাড়াও অভিযোগকারীকে কথিত অনুপ্রবেশকারির বাসার ১০০ গজের মধ্যে বসবাস করতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে ভারত থেকে বের করে দেয়া খুবই কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধী  (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) মারা গেলে  পরে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। তিনি এবার ‘আসু’র সব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৮৫ সালের আগষ্টে  ‘আসাম চুক্তি বা আসাম অ্যাকর্ড’ সই করেন। অর্থাৎ NRC ১৯৫১ তালিকা আপডেট করে এর ভিত্তিতে অবৈধ বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার আন্দোলনকারিদের দাবি মেনে এর বাস্তবায়নে চুক্তি করেন তিনি। এছাড়াও তিনি ১৯৮৩ সালের রাজ্য নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য নতুন নির্বাচন দেন। অর্থাৎ রাজীব গান্ধী যা করলেন এর অর্থ তাতপর্য হল, তিনি স্বেচ্ছায় চাইলেন আসু এরপরে নিজেদের নতুন দল খুলুক, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতে আসু সরকার গড়ুক। এবং ১৯৮৫ সালে তাই হয়েছিল। আর  আসুর নতুন গড়া স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নাম হল ‘অসম গণ পরিষদ’ (Asom Gana Parishad, AGP) আর আসুর নেতা প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত এই দলের সভাপতি ও ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ রাজীব গান্ধীর অনুমান ও ভীতি ছিল একটাই, এমন না হতে দিলে আসাম ভারত থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে যেত। অতএব রাজীব গান্ধী টাইম বায়িং বা সময় কেনার পথ ধরেছিলেন। আর মোহান্তর কি হয়েছিল পরে? পরের বারের (১৯৯০) নির্বাচনে মোহান্ত গোহারা হেরে যান। তবে কোনোমতে তার পরের বার (১৯৯৫) জিতেছিলেন । আর সেটাই শেষ। এখন ঐ দল ভেঙ্গে দুইটা, আর প্রতিবারের রাজ্য নির্বাচনে আসামের মোট ১২৬ আসনের রাজ্য সরকারে দলের অর্জনে থাকে ১০-১৪ আসন।

এদিকে এখনকার আসাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন সর্বানন্দ সনোয়াল, তিনি আসলে ছিলেন AGP নেতা এবং আসুরও নেতা সভাপতি (১৯৯২-৯৭)। তিনি ২০০৫ সালে, নিজ নামে ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’-কে [IMDT এক্ট] কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে  একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে  ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণায় বাতিল করে দেন। ফলে এখন অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে বের করে দেয়া সহজ। আসলে এই পরিকল্পনাগুলো ছিল বিজেপির। এবার সে পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তিনি AGP ছেড়ে প্রকাশ্যে ২০১১ সালে এবার বিজেপিতে যোগ দেন। রাজ্য নির্বাচনে সেই প্রথম তিনি বিজেপির পক্ষ থেকে এর আগে যেটা ছিল অনুপ্রবেশ বা বাঙালি বা বাংলাদেশি খেদাও এর ইস্যু সেটাকে তিনি সরাসরিভাবে এবার “মুসলমান খেদাও” বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। সর্বানন্দ পরে ২০১৪ সালের বিজেপি থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হন। আর ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবে ২০১৪ সালের ঐ নতুন ভাষ্যে ‘মুসলমান খেদাও’ এতে প্রায় ৫০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল বলা হয়।  এদিকে আসামে কংগ্রেস এর মাঝের (২০০৬, ২০১১)  আবার দুইবার মুখ্যমন্ত্রী ও সরকার গড়েছিল।  তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল এই যে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে রাজীব গান্ধীর দলসহ সকলে অনুপ্রবেশ বা মুসলমান ইস্যুকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় যাবার জন্য। যারাই রাজ্য সরকারে এসেছে সবাই এটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু সবাই জানে এর বাস্তবায়ন কী কঠিন ও ভীষণ বিপদের। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি খেদাও অথবা অনুপ্রবেশকারী অথবা বিদেশী মাইগ্রেন্টের কোনো না কোনো একটি আসাম রাজনীতির ইস্যু ছিল। আর সবসময়ই ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই ‘বাংলাদেশী’ ইস্যুটি ব্যবহার করতে কেউ দ্বিধা করেনি। কিন্তু এক স্থানীয় এনজিও ইস্যুটাকে সেবার সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে যায়,  আর এর বাস্তবায়ন দাবি করেছিল। সেই থেকে এটা কোর্টের মনিটরিংয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালতও ঐ মিথ বিশ্বাস করেছে যে একটা বড় বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠি ১৯৮১ সালের পরে আসামে এসেছে।

কিন্তু এরপর কী?
সবচেয়ে ভয়াবহ এক অবস্থার জন্য যেন আসামের সব দল বা পক্ষ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও।  কেন? কারণ আসামের নাগরিকের তালিকা কী হচ্ছে, কতদূর হচ্ছে এর বাস্তবায়ন ‘নির্বাহী সরকার’ নিজে করছে না। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধানে, নির্দেশ ও মনিটরিংয়ে এটা সরকার বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু ঘটনা হল যদি ‘কেউ ভারতের নাগরিক’ এটা প্রমাণ করতে পারল না – এর মানেই সে অ-ভারতীয় হয়ত, কিন্তু সে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমানিত হল না, হবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে কারও কাছেই যার জবাব নেই তা হল, তাহল, এই কথিত ‘অ-ভারতীয় বা অবৈধদের’ কোথায় ঠেলে ফেলা হবে? এর জবাব সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নেই। কেউ অ-ভারতীয় এটুকু বলেই আদালত পার পেতে চায়। কিন্তু আদালত এ নিয়ে কিছু না বললে অন্যেরা, কোন না কোন রাজনৈতিক শক্তি এরা কী বসে থাকবে? সুযোগসন্ধানীরা কেউ বসে থাকবে না। বরং ‘বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার ক্রেডিট’ নিজে নিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এর দায় কে নেবে? সবচেয়ে আজব ব্যাপার, সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো আসামের সবাই মনে করছে, নাগরিক তালিকা পূর্ণ হলেই ওটাই সব সমাধান। অথচ এটাই হবে দাঙ্গার উৎস। নতুন ও গভীর ক্ষত তৈরি ও সঙ্কটের শুরু। ভারতের এক গবেষণা থিংক ট্যাংকও (দিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য।) এতে সায় দিয়ে বলছে, আসামের এই তালিকা একটি ‘টাইম বোমা’। তবে ভিন্ন কারণে।

ঘটনার আসল দিকটা হল, আসামের প্রধান সমস্যা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব। আসাম ঠিক ল্যান্ডলকড ভুখন্ড নয়। প্রবেশ বা একসেস আছে কিন্তু সেগুলো কেবল এক কোনা, আসামের কেবল পশ্চিম দিক শিলিগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে, ফলে সহজ না। কখনও পাচগুণ পথ ঘুরতে হয়, পুর্ব দিক থেকে আসলে। অথচ সব রিসোর্সে আসামের সহজে প্রবেশের উপায় হতে পারে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের সাহায্য ও সুসম্পর্ক হতে পারত এর জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বস্তু। কিন্তু মিথ্যা মিথ ও ভ্যানিটি আর ‘অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে পাহাড় ও মনের ঘেরার ভেতর আটকে গেছে অসমিয়রা। অসমিয়াদের যদি মিথের তালাশে দিন কাটে, বিদেশি বা অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ এর মুডে থাকে তবে এই অসমিয়াদেরকে কোন বাংলাদেশ সহায়তা করবে? কেন করবে? কেউ বিদেশি মানে সে আমার জনগোষ্ঠির স্বার্থ-বিরোধী – এসব ধারণা ও কথা বার্তা বড় জোর সত্তর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর আর নাই। বুঝমান মানুষ বুঝেছে এটা ডাহা মিথ্যা আর ভিত্তিহীন কথা। যে মানুষ ‘বিনিময়’ শব্দটার অর্থ তাতপর্য শুনে নাই, খেয়াল করে বুঝে নাই সে তো অচল। দুনিয়ার বাকী সবার জন্য সে এক অচল সিকির মত দায়!

যে ‘বিদেশী’ ঘৃণা করে বাইরের সব রিসোর্সে তাকে অ্যাকসেস দেবে কে? আসামের আসলে ত্রাতা হতে পারে কথিত এই ‘মুসলমানের বাংলাদেশই’, অথচ আসাম মুসলমান ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে। তাকে কে বাঁচাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৯ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আসাম পাহাড়ে আর মনের ঘৃণায় আটকে গেছে সঙ্কট“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]