মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

গৌতম দাস
০৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xY

 

যুদ্ধ একই সাথে বয়ানের যুদ্ধ হয়ে উঠে, বিশেষ করে যেখানে এর একপক্ষে থাকে মোদীর মত যুদ্ধবাজ শিকারি নেতা। মোদীর কাছে  ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাটা হল আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আসন্ন নির্বাচনে জিতবার হাতিয়ার হিসাবে একে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা ও ইস্যু। সেই উত্তেজনা প্রসঙ্গে সর্বশেষ বড় খবরটা ছিল – পাকিস্তানে বিধ্বস্ত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের আটক পাইলট যার নাম – “অভিনন্দন বর্তমান” – তিনি গত ১ মার্চ রাত ১০টার দিকে ভারতের মাটিতে ফিরে গিয়েছেন; তাকে মুক্ত ও হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এর আগের দিন পাকিস্তানের সংসদে মানে ওদিনের উচ্চ ও নিম্ন সংসদের যৌথ অধিবেশনে তাঁর বক্তৃতায় নিজের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেন, “শুভেচ্ছা আর সৌজন্য দেখাতে আর উত্তেজনা নামিয়ে”[…as a gesture of goodwill to de-escalate tensions in the region.”], ডায়ালগের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের প্রতি আস্থা তৈরি করতে তিনি আটক পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কিন্তু এতে ব্যাপারটা মোদীর পক্ষে যায় নাই। বরং তাঁকে এবার এখানেও আরও উদাম করে ফেলেছে। মূল কারণ মোদী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এতদিন যে ঘৃণা তাতিয়ে ছিলেন, ভারতীয় মনকে যেভাবে উত্ত্যক্ত করে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন এই বলে যে, নিশ্চিতভাবে পাকিস্তান খুবই খারাপ স্বভাবের আর মানবিক চরিত্রহীন এক শত্রু এমন ছবি এঁকেছিলেন, তাতে খাড়া করা এমন বয়ানের ওপরে ইমরান খানের এই ঘোষণা শুধু পানি ঢেলে দেয়া নয়, একেবারে ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দিয়েছিল। এর ভালো চিহ্ন হল গত দুই সপ্তাহে মোদী পাকিস্তান বা ইমরানের যে কল্পিত দানব ছবি এঁকে ফেলেছিলেন – সেই ভারত থেকেই ইমরানের প্রতি অভিনন্দন জানানোর একটি লহর বয়ে গেছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে।

যারা অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের এমন জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে এতে প্রকাশ্যে সবচেয়ে আগে আছেন সম্ভবত ভারতীয় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। তিনি ইমরানের এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম আলো এ বিষয়ে “যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ‘হিরো’ ইমরান!” শিরোনামে সবার প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। আরো লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী ইমরানের পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তের জন্য “সামাজিক মাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। এমনকি তাকে সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কও বলা হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদীর পরিকল্পনার একেবারে বিপরীত। ভারতে পাকিস্তানবিরোধী প্রবল উত্তেজনার মধ্যে পাইলটের জীবনে এরপর কী হবে এ নিয়ে জনমত যখন চরম উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময়ে উদ্বিগ্ন মানুষের কল্পনাকে ছাড়িয়ে ইমরান এক ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় জনমতের বড় অংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিয়ে গেছেন। আর এটাই ছিল মোদির সবচেয়ে বড় হার, এক দুর্বল পয়েন্ট হয়ে হাজির হয়েছে।

কাশ্মীর প্রসঙ্গে একটা ফ্যাক্ট যা একটা কঠিন বাস্তবতা আর যা একালের খুব কম মানুষ ব্যাপারটা জানেন বা আমল করতে দেয়া হয় না এমন সে কথা তুলে ধরা যাক, যা কাশ্মির ইস্যুকে বুঝার জন্য ফাউন্ডেশনাল। গত ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ ও কলোনি মুক্তির কালে – বেঙ্গল বা পাঞ্জাব এ দুই প্রদেশ যেমন ভাগ হয়ে একেকটা করে টুকরা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে অংশ হয়ে যায়, আর সেই থেকে টুকরাগুলো এ দুই রাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেছে-  কাশ্মীর, কিন্তু সেই একই অর্থে বাংলা বা পাঞ্জাব মত নয়। এমনকি তুলনীয়ই নয়। যদিও ভারতীয় কাশ্মীর আর পাকিস্তানি কাশ্মীর বলে বিভক্ত অংশ আছে তবুও কাশ্মির কোনোভাবেই বাংলা বা পাঞ্জাব নয়। কেন?

এর একেবারে গোড়ার কারণ হল, বেঙ্গল ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রেসিডেন্সি’ প্রশাসনে আর পাঞ্জাব ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রদেশ’ প্রশাসন। আর তুলনায় কাশ্মীর বরাবরই ছিল প্রিন্সলি স্টেট বা এক  রাজার করদ রাজ্য। আসলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বলে এক ব্রিটিশ কলোনি-রাষ্ট্রের কথা আমরা জানি আর শুনি বটে, কিন্তু এককাট্টা একই প্রশাসনের অধীনস্ত ভুখন্ড মানে কোন একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে আমরা সবাই এক ইন্ডিয়ান রাষ্ট্র ভূখণ্ড  – এমন কিছু কোনো দিনই ছিল না। তাহলে ছিল কী? ছিল আসলে একই শাসক “ফোর্ট উইলিয়াম” নামে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক দুর্গ বা হেডকোয়ার্টার। এতটুকুই এক। আর বাকি সবাই আলাদা আলাদা প্রশাসনিক ভুখন্ড।
এই কোম্পানি শাসন শেষ হয় প্রথম শত বছর পরে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এরপর থেকে কোম্পানির জায়গায় সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হয়, কিন্তু তাতে আগের মতোই ব্রিটিশ-ভারত বলতে ওই একই ফোর্ট উইলিয়ামের অধীনের তিন ধরনের প্রশাসনিক পদ্ধতিতে তিন ধরনের ভূখণ্ডই বজায় রাখা হয়েছিল। বেঙ্গল, বোম্বাই আর মাদ্রাজ- এ তিনটাকে প্রেসিডেন্সি প্রশাসন বলা হত। আর এর পাশাপাশি ছিল প্রায় আট-নয়টা প্রদেশের (১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ছেড়ে যাবার সময় হয়েছিল ১৭ টা প্রদেশ) প্রশাসন। আর ওদিকে ভুখন্ডের তৃতীয় ধরণটা ছিল ছোট-বড় প্রায়.৫৬৫ প্রিন্সলি স্টেট [Princely State]। প্রিন্সলি স্টেটগুলোকে করদ রাজার রাজ্যও বলা হত – এজন্য যে এসব করদ রাজ্যের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা ইস্যুতে এরা সরাসরি ব্রিটিশদের ইচ্ছা ও স্বার্থই শেষ কথা – এমন অধীন। এছাড়া এটা মেনে নিয়েই আগের মত এর রাজারা খাজনা তুলে রাজত্ব করে যেতেন আর তোলা খাজনার একটা ভাগ ব্রিটিশদের শেয়ার করতেন। তবে এভাবে করদরাজ্য চালাতে রাজত্বের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে  রাজ্যগুলো পরিচালিত হত ঐ করদ রাজাদের আলাদা নিজস্ব প্রশাসনে। এগুলো ‘স্বাধীন’ বলে মনে করা হলেও আসলে তা ছিল বৃটিশদের পক্ষ হয়ে রাজার শাসন।

বৃটিশ ইন্ডিয়ান মোট ভুখন্ডের ৪০% ভুমিই ছিল এমন প্রিন্সলি স্টেট। আর এসব স্টেট বা করদ রাজ্যে বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩%। এমনই এক প্রিন্সলি স্টেট ছিল কাশ্মীর। কাশ্মীর তাই কোন প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশ প্রশাসনের সাথে তুলনীয় ভুখন্ড নয়, কারণ এসব প্রশাসন পরিচালিত হত সরাসরি ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। বিপরীতে কাশ্মীর সরাসরি করদ রাজার অধীনস্ত প্রশাসন; যা প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশের প্রশাসনের মত সরাসরি ব্রিটিশদের পরিচালিত প্রশাসন নয়।
একারণে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও কলোনিমুক্তির সময়, সাধারণভাবে প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশগুলো ভাগাভাগি হয়ে  যেমন তুলনামূলক সহজেই নতুন স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান বলে দুই রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পেরেছিল, প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে নাই। এর মূল কারণ করদ রাজ্যগুলো পরিচালিত হতো ফোর্ট উইলিয়ামের কোনো ধরনের প্রশাসনে নয়, বরং করদরাজার নিজের প্রশাসনে। আবার ব্রিটিশ শাসকেরা এসব রাজার সাথে ‘করদরাজ্য’ সম্পর্ক ও চুক্তিতে থাকার ফলেই  করদরাজ্যের কাউকেই আইনত ভারত অথবা পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দিতে পারার আইনি সুযোগ ছিল না, সে জটিলতা ছিল। আর এই আইনি সুযোগ নিয়েই বৃটিশ শাসকেরা, প্রিন্সলি স্টেট গুলোর কী হবে এই ইস্যু প্রসঙ্গ না তুলে বরং তা এড়িয়ে থেকেই নিজেরা ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

ওদিকে বিশেষ করে কাশ্মীর আবার সম্ভবত একমাত্র স্টেট, যা হবু ভারত-পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে মানে উভয়েরই সীমান্তে অবস্থিত। অর্থাৎ দুটোর সাথে সীমান্ত আছে। এবার অন্য আর একটা প্রিন্সলি স্টেটের সাথে তুলনা করা যাক। আরেক করদরাজ্য হল “নিজামের হায়দরাবাদ” [এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ], এর বেলায়, এর চার দিকে ভারত ভূখণ্ড বলে যেমন নেহরু সৈন্য পাঠিয়ে বলপ্রয়োগে সহজেই একে ভারতে ঢুকিয়ে নিতে পেরেছিলেন। কাশ্মিরের বেলায় তেমনটি ঘটেনি, বা বলা যায় এমন ঘটাতে গিয়েই বিপত্তি দেখা দেয়। করদরাজ্যের করদ রাজা ও শাসক হরি সিংয়ের অধীনে কাশ্মীরে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যালঘু আর তুলনায় মুসলমানেরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠই শুধু নয়, বড় অংশ ছিল ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী। এরাই নতুন পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে বসে বলে তা মোকাবেলায় হরি সিং চলে যান নেহরুর ভারতের কাছে। তবে কে প্রথম সঙ্ঘাত শুরু করেছিল, এ নিয়ে যার যার আলাদা ভাষ্য আছে। আবার কাশ্মীর কোন দিকে যাবে অংশ হবে – ভারত না পাকিস্তানে, ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তা ফেলে রেখে কাশ্মীরের রাজা স্বাধীন থাকার বোকা স্বপ্ন দেখত। অর্থাৎ দুনিয়া অভিমুখ কোনদিকে চলে গেছে এর কোন ধারণাই তাঁর ছিল না। দুনিয়া থেকেই কলোনি শাসন উতখাত হয়ে যাওয়া যেখানে বিশ্বযুদ্ধের দুনিয়ার অভিমুখ সেখানে তিনি মহারাজা থাকার স্বপ্ন দেখতেন। ফলে এমন স্বপ্ন রাখাই থেকেছিল যেন একটা বিস্ফোরককে পকেটে রাখা। তাই সারকথায় বললে, ১৯৪৮ সালে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় কাশ্মীরকে নিয়ে। যুদ্ধ শুরু হলে পরে নেহরুর অনুমান ছিল, বিরোধের ব্যাপারটা জাতিসঙ্ঘ তুলতে পারলে তিনি নিজের পক্ষে আনুকূল্য পাবেন। তাই তিনিই ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘে তোলেন।
এখানে জাতিসংঘের জন্ম বৈশিষ্ট কিছুটা বলে রাখলে কাশ্মীর ইস্যু বুঝতে সুবিধা হবে। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া আর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এর গুছিয়ে বসা – বলা যায় এসময়টা জাতিসঙ্ঘ ছিল এক বহুল আদর্শময় ও আকাঙ্খিত মডেলের এক শান্তি স্থাপনের প্রতিষ্ঠান, হাই মরালের প্রতিষ্ঠান। দুনিয়াতে কেউ কাউকে কলোনি দখল করে রাখা এই দখলদারি ও কলোনি শাসন চালানো গ্রহণযোগ্য নয় – বলা যায় এই নীতিতে পরিচালিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এলায়েড পাওয়ার [Allied powers ] বা আমেরিকার নেতৃত্বের পক্ষ। ঐ যুদ্ধে হিটলার বিরোধী এলায়েড পাওয়ার বা মিত্র বাহিনী জয়লাভ করেছিল। জাতিসংঘের জন্মেরও ভিত্তি একই; ঐ একই “কলোনি শাসন অগ্রহণযোগ্য” – এই নীতিতে। এর মূল কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করার প্রধান শক্তি ছিল আমেরিকা আর এর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হল জাতিসঙ্ঘ। তিনি বাকি বিজয়ী শক্তিদের রাজি করিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়েন। তাই এটা আবার যুদ্ধবিরোধী নৈতিকতায় পরিচালিত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে, তা কোনো যুদ্ধে নয় বরং জাতিসংঘের করা ডায়ালগ ও মধ্যস্থতা মধ্যদিয়ে, আন্তর্জাতিক নানান আইন ও কনভেনশনের ভিত্তিতে – যেকোন বিরোধ মিটানো – এই ছিল জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য। তাই যুদ্ধ এড়ানোর আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেকালের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন রুজভেল্ট ও তারপরের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান।
আমেরিকার ১৯৩৩-১৯৫৩ সাল, এই ২০ বছরের পাঁচ প্রেসিডেন্টের প্রশাসন থাকার কথা। এই ২০ বছরের প্রথম টানা চারবার প্রেসিডেন্ট জিতেছিলেন রুজভেল্ট, আর শেষবার হ্যারি ট্রুম্যান। প্রথম পর্বের টানা সাড়ে ১২ বছর প্রেসিডেন্ট ছিল রুজভেল্টের। আর শেষ সাড়ে সাত বছর (সাড়ে তিন ও চার মিলে) প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রুম্যান। কারণ, ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থবারও শপথ নেয়ার পর, মাত্র পরের তিন মাসের মধ্যে রুজভেল্ট মারা গেলে তার নীতি-পলিসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান দায়িত্ব নেন। এছাড়া, এভাবে ভাঙ্গা প্রায় সাড়ে তিন বছর প্রেসিডেন্টের দ্বায়িতে পালন শেষ করার পরের বার ১৯৪৮ সালে নির্বাচনেও ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি প্রার্থী ছিলেন ও বিজয়ী হন। তাই ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একই রুজভেল্টের নীতিটাই বজায় ছিল। আর এদিকে রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে দেখেছিলেন দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন একেবারে উতখাত করে বদলে দিয়ে স্বাধীন রিপাবলিক (রাজতন্ত্র নয়) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও যুদ্ধ এবং এরই সুযোগ ও নীতি হিসেবে। জাতিসংঘ তাই তাঁর উদ্যোক্তা-স্বপ্ন প্রতিষ্ঠান।

আর এ’কারণেই সেকালের কাশ্মীর বিরোধে জাতিসংঘের চোখে – রাজা হরি সিং নেহরুর কাছে ভারতে এক্সেশন [accession] বা অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এক “রাজার ইচ্ছা” জানিয়েছিলেন কি না, সেটি কোনো ভিত্তি নয় বরং কাশ্মীরের জনগণ কোন দিকে যেতে চায়, এই ভিত্তিতেই কাশ্মীরের ভাগ্যের আপস সমাধানের পক্ষে রায় দেয় জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘের রেজুলেশন হয়, কাশ্মিরে গণভোট হতে হবে আর এর রায়ই হবে সমাধান যে, কাশ্মির ভারত-না-পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে কিছু বাড়তি বাক্য বলে রাখি। কমিউনিস্ট ভাষ্যে সাম্রাজ্যবাদ-আমেরিকা, অন্য দেশের তেল বা সম্পদ লুটেরা আমেরিকা, সিআইএ পাঠিয়ে গুপ্তহত্যা ঘটানোর আমেরিকা ইত্যাদি – যে পরিচয়ের আমেরিকা আমরা শুনি এর শুরু হয়েছিল রুজভেল্টের নীতির সমাপ্তিতে; মানে ১৯৫৩ সালে জানুয়ারিতে বিজয়ী রিপাবলিকান নতুন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার শপথ নেয়ার পর থেকে।
যা হোক, জাতিসঙ্ঘের এই গণভোটের সিদ্ধান্ত আজও নেহেরু বা ভারতে বাস্তবায়ন করা হয়নি। উপেক্ষা করেই চলছে। আর সে কারণেই কাশ্মীর প্রসঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারী কারো সাহায্য নেয়া যাবে না, কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কারো সাথে কাশ্মিরবিরোধ ইস্যু শেয়ার বা সংযুক্ত করা যাবে না – এই হলো ভারতের স্থায়ী নীতি। যে কারণ ভারত সবসময় আউরাতে থেকে বলে, “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – যা বলার মানে হল কেউ ভারতকে “গণভোট না করার কথা” মনে করায় দিতে পারবে না। এটাকেই বলে ভারতের “বিগ-এম” (ইংরেজিতে ‘এম’ মানে এখানে Mediation বা মধ্যস্থতা) ভীতি। এর অর্থ হল যদি কোন মধ্যস্থতাকারী আবার জাতিসঙ্ঘের সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন চেয়ে বসে কিংবা মনে করিয়ে দেয়, তা আলোচনার ইস্যু হয়ে যায়। এ সপ্তাহে ভারতের এক মুরব্বি সাংবাদিক শেখর গুপ্তা লিখেছেন, কোনো শক্তিধর দেশের মধ্যস্থতা ছাড়া কাশ্মির সমস্যার সমাধান নেই। [Bilateralism has failed. India can make peace with Pakistan only with big-power guarantees]। বলা বাহুল্য এটা ভারতের – “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – গত ৭০ বছর আটকে থাকা কিন্তু অকার্যকর নীতির সরাসরি সমালোচনা।

কেন?
কারণ, যুদ্ধবাজ মোদী বাস্তবে এবারের কাশ্মীর সমস্যার ইতি টেনেছেন বিশেষত, আটকে পড়া পাইলটকে ফেরত এনেছেন, আপাতত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে মাটিচাপা দিয়েছেন “বাইরের” মধ্যস্থতাকারীদেরই সাহায্যে।

প্রথমত, মোদীর তথাকথিত ‘প্রতিশোধের’ উন্মাদনা তৈরি করে ভারতীয় মনকে ক্ষেপানোর উদ্দেশ্য ছিল এটা দাবি করা যে, তিনিই একমাত্র নেতা ও দল যে “মুসলমান” পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে সক্ষম। মোদীই ৩৬ ইঞ্চি বুঝের ছাতি-ওয়ালা [বুকের ছাতির রেফারেন্স মোদীর নিজের দেয়া] সেই নেতা।  বিজেপির রাজনীতির বহু পুরনো অনুসরণ করা মূল লাইন হল, মুসলমানের বিরুদ্ধে  হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে এভাবে হিন্দুমনের মেরুকরণ ঘটিয়ে, সেই জনমতকে নিজের পক্ষে ভোটের বাক্সে আনা। এ কারণে মেরে ফেলব, ছিঁড়ে ফেলব, ছাল ছাড়িয়ে নেব, বুকের ছাতি দেখানো ইত্যাদি ভাষা এসব হল মোদীর দলের ও ব্যক্তিত্বদের “প্রতিশোধ” নিতে সক্ষমতার প্রমাণ। আর হিন্দু হলে ভাল আর মুসলমান হলেই খারাপ – এভাবে অতি সরলীকরণ করে নিজেদের ভয়ঙ্কর দাঙ্গার উন্মাদনা তৈরির চিন্তাকে আড়াল করা। অথচ রাজনীতি, রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন, নাগরিক অধিকার, নাগরিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এসব নিয়ে কাজ করা ইত্যাদি মোদীর দলের কাছে এজন্য কখনো কোনদিন কোন ইস্যু নয়, ইস্যু হয় নাই; বরং “প্রতিশোধের” রাজনীতি, দাঙ্গার উন্মাদনা তাদের প্রিয় জিনিস।

এবার তাই পুলওয়ামায় আত্মঘাতি হামলার বিরুদ্ধে  “প্রতিশোধের” মাতম তুলেছিলেন মোদী, পরে তিনি বোমারুবিমান পাঠিয়ে বালাকোটে [বালাকোট পাকিস্তান কাশ্মীরের ভিতরে নয়, বাইরে পাখতুন প্রদেশে]  কথিত “টেরর ক্যাম্পের” ওপর বোমা ফেলে সব ধ্বংস করে এসেছেন, এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করা ছিল তাঁর পরিকল্পনা। প্রায় সবই ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাধে পাকিস্তানের হাতে হামলাকারি ভারতের পাইলট আটকা পড়ায়। অপর দিকে আরেক বড় বিপদ দেখা দেয়। মোদী দাবি করেছিলেন, বালাকোটের ক্যাম্পে ভারতের পাইলটের বোমা হামলায় নাকি “৩০০ টেররিস্ট” মেরে এসেছেন। যদিও ঠিক তিনশ’ই কেন, ২৯৯ বা ৩০১ নয় কেন তা জানা যায়নি। এদিকে সেসব নিয়ে পরের দিন থেকে শুরু হয়ে যায় বোমা ফেলার স্থানের সরেজমিন রিপোর্টিং। পাকিস্তানের জিও টিভির এই প্রজন্মের সাংবাদিক হামিদ মীর ঘটনাস্থল সফর করে ফেসবুকে ক্লিপ পাঠিয়ে বলছেন, এক মরা কাক ছাড়া [There was one casualty, a crow ] সেখানে কেউ মরেনি। আর ওই বনের ভেতর কুঁড়েঘরের এক গরিব মানুষ কিছুটা আহত হয়েছেন। তবে বাড়ি অক্ষত আছে। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর বিশাল এক গর্ত হয়ে গেছে। সেটি আবার রয়টার্সের এক সাংবাদিকের নিজস্ব সফরের ছবি ও রিপোর্ট। সেটা আবার ইতোমধ্যে  ছাপা হয়ে গিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়

তবে এসব মিডিয়া রিপোর্ট আসার আগেই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মোদিবিরোধী মমতা-রাহুলসহ ২১ দলের এক সভা হয়েছে। সেখানে বিরোধীরা দাবি তুলে ও নিন্দা জানায় যে, মোদি সেনাবাহিনীর রক্ত ও জওয়ানদের ত্যাগকে নিজের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন [Opposition leaders condemn Modi govt for politicising current situation with Pakistan]। কলকাতা ছেড়ে দিল্লির এই মিটিংয়ে রওনা হওয়ার আগে মমতার নিজ ভাষায় আঙুল তুলে বলেছেন, “জওয়ানদের রক্ত নিয়ে ভোটের রাজনীতি’ করাই কি আসল লক্ষ্য? আর ওই দিকে পরের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি ২১ দলের মিলিত অভিযোগ মোদী “জওয়ানদের আত্মত্যাগকে নিয়ে রাজনীতিকরণ করছেন”India’s Modi criticised for politicising Pakistan standoff]। আর কলকাতায় ফিরে ১ মার্চ, এবার মমতার সরাসরি চ্যালেঞ্জ বালাকোটে‘প্রথমদিন থেকেই শুনছি, শত্রুপক্ষের ৩০০-৩৫০ লোক মারা গিয়েছেন। কত কী, আদৌ কেউ মারা গিয়েছেন কি না, আমরা জানতে চাই। আরও জানতে চাই, বোমা কোথায় ফেলা হয়েছিল, আদৌ বোমা ঠিক জায়গায় পৌঁছেছিল কি না”। এরপর বিভিন্ন বিদেশি সংবাদপত্রের নাম উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আরও বলেন, ‘‘তারা বলছে, এমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি। বোমাটা অন্য জায়গায় পড়েছে, মিস হয়েছে। মানুষ মারা যায়নি। কেউ বলছে, একজন মারা গেছেন। তো সত্যটি কী, এটা তো মানুষ জানতে চাইতেই পারে। আমরা বাহিনীর সাথে রয়েছি। কিন্তু বাহিনীকে সত্যি কথাটি বলার সুযোগ দেয়া উচিত। দেশের লোকেরও সত্যিটা জানা উচিত”।
কিন্তু এখন মোদীর বিপদ এর চেয়েও বড়। তার ধারণা ছিল প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেছে, ফলে তিনিই একমাত্র ছাতিওয়ালা নেতা, সেসব দাবির পক্ষে রসদ এখন তাঁর হাতে এসে গেছে। সুতরাং এখন সীমান্ত উত্তেজনা শীতল [de-escalation] করাই মূল কাজ। কিন্তু পাইলট আটকে যাওয়ায় ব্যাপারটি পুরা ঘোলাটে জটিল হয়ে থাকে।

তাই তিনি আসলে তিনটি বা অন্ততপক্ষে দু’টি ক্যাম্পকে মধ্যস্থতা করতে কুটনৈতিক ততপরতা করতে ডাকেন। প্রথম ক্যাম্পের মূল নেতা সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহম্মদ বিন সালমান বা এমবিএস (MBS)। এটি কারো অজানা নয় যে, অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সঙ্কটে থাকা পাকিস্তানে তিনি গত সপ্তাহে সফরে এসে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। এ ছাড়া আরো ৯ বিলিয়নের মধ্যে নগদ তিন বিলিয়ন ডলার ইমরান ক্ষমতায় আসার পরই দিয়েছেন। এক কথায় এই প্রিন্স হলেন এখন ইমরানের পাকিস্তানের কাছে প্রমাণিত ত্রাতা। আবার খাসোগি হত্যা মামলায় ইমেজ হারানো এই প্রিন্সের কাছে পাকিস্তান সফর হল ইমেজ আবার চাঙ্গা করার উপায়। কাজেই মোদীর দিক থেকে সেই ইমরানকে রাজি করাতে হলে এখন ইমরানের দুর্বলতা ও ব্যক্তি সম্পর্ক গড়ে তোলা ব্যক্তিত্ব প্রিন্সই হলেন সঠিক লোক, এটি বুঝতে মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কষ্ট হয়নি। এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রিন্স- MBS আর দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স, এরা হলেন মূল ক্ষমতাধর। দুবাইয়ের প্রিন্সও এমবিএসের আগেই পাকিস্তান সফরে এসে প্রায় ১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। কাজেই মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের আগ্রহে – ভারত ওআইসি’র কেউ নয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও দুবাইয়ের প্রিন্স ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওআইসি’র সভায় অতিথি হতে দাওয়াত করেন। এখানেই মোদীর কাম্য মধ্যস্থতাটা ঘটে। কারণ, এর শুরু শুধু প্রিন্স MBS এর নিজের প্রভাব নয় আর এক হাতে তিনি ট্রাম্পের জামাই ক্রুসনারের মাধ্যমে ট্রাম্পের আমেরিকা দিয়েও ইমরানকে প্রভাবিত করেন। ভিয়েতনাম সফরে থাকা ট্রাম্প তাই শুধু ইঙ্গিতে বলে্ন “সারপ্রাইজ আছে”। [Earlier, U.S. President Trump said he expected “reasonably decent news” regarding the conflict between India and Pakistan, adding that the United States was trying to mediate.] অতএব, এটাকে বলতে পারি আমেরিকা সমর্থিত মিডল ইস্ট ক্যাম্পের মধ্যস্থতা।
দ্বিতীয় ক্যাম্পটি হল, এটা মূলত চীনের উদ্যোগ। অনেকটা অপসৃয়মাণ আমেরিকান প্রভাবের ভেতর উত্থিত দুনিয়ার নতুন নেতা চীনের। ভারত ও পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ ও বাজার স্বার্থ খুবই ভাইটাল। এনিয়ে দুবাইয়ের এক সেমিনারের জাতিসংঘ আর বিশ্বব্যাংকের মন্তব্যটা দেখা যেতে পারে [Don’t let border tensions hamper trade: UN & World Bank economists to India, Pakistan]।  যদিও চীনের গ্লোবাল স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এর ভেতর ভারত আবার একটু বেয়াড়া, সবসময় কথা শুনতে চায় না। দাম বাড়িয়ে চায়, নেয়। তাই চীন নিজের প্রভাব বাড়াতে রাশিয়াকে সাথে রাখে। তাই এখানে মিটিংটা হয়েছে চীনে। ভারত, রাশিয়া ও চীন এ তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে। এ ছাড়া সাংহাই করপোরেশন সংগঠনের সূত্রে গত ২০১৭ সালে ভারত-পাকিস্তানকে একত্রে সাংহাই জোটের সদস্য করে নেয়া হয়।
কিন্তু সব পক্ষের “উত্তেজনা নামানোর” প্রস্তাব শুনে ইমরান উল্টো নিজের ইমেজ বাড়ানোর বুদ্ধিতে নিজেই এগিয়ে আসেন। তাই পরের দিনই বিনা শর্তে পাইলটকে ছেড়ে দেয়ার আগাম ঘোষণা তিনি দিয়ে বসেন।

কিন্তু বালাকোটে নাকি বোমা ফেলে ৩০০ জন জঙ্গী মেরে ফেলা হয়েছে – সেসব কথিত মৃত জঙ্গীর লাশ মোদী এখন কোথা থেকে দেখাবেন? সমস্যা এখন এখানে ঠেকেছে। এ দিকে খবর বেরিয়েছে, হাজার কেজি বোমা ফেলে বনজঙ্গলের পরিবেশ নষ্টের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে মামলা করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। এতে ৩০০ মৃত জঙ্গির লাশ সংগ্রহ মোদীর জন্য আরো কঠিন করে দিয়ে তাকে বিব্রত করাই পাকিস্তানের উদ্দেশ্য, তাই মনে হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস আরও খারাপ মন্তব্য করে বলেছে, – “Pakistan released the Indian pilot it had captured, capping a humiliating episode for India and a surreal week for him”.

তাহলে এখন ভারতের বিগ-এম ভীতি, মানে মধ্যস্থতাকারীর ভীতির কী হল, কোথায় গেল? আমরা দেখলাম, ঘটনা শক্তপোক্ত করতে মোদী দু’টি বৃহৎ ক্যাম্পকে নিয়োগ করে নিজে উদ্ধার পেলেন। সম্ভবত এই বাস্তবতায় শেখর গুপ্ত লিখছেন, কাশ্মির ইস্যুতে “দ্বিপাক্ষিকতার দিন শেষ, বিগ পাওয়ারের মধ্যস্থতা নেয়ার” দিন এসে গেছে।
পাইলটকে ফেরত পেতে গিয়ে আর ওই দিকে মমতার চোখা প্রশ্নের কারণে মোদির সব প্রপাগান্ডা আর তৎপরতাই এখন উদোম। সবাই সব জেনে গেছে।

সর্বশেষ আবার ওআইসিঃ
আজ আবার ওআইসি ইস্যু হাজির, কিন্তু এবার তা ভারতের জন্য চরম নেতিবাচক। ভারত দুবাইয়ে সমাদরে ওআইসির দাওয়াত খেয়ে এসে এরপরের দিনটাই তাঁর জন্য ছিল উলটা, অন্যরকম। কেন? ওআইসির ঐ দুবাই-সম্মেলন থেকে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে তাতে ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  কাশ্মীরে ভারত সরকারের নাগরিক ট্রিটমেন্ট অর্থাৎ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। মানে দুবাই মিটিংয়ে কাশ্মীরের নির্যাতিত জনগণ প্রসঙ্গের গৃহিত প্রস্তাবগুলোতে স্বভাবতই ভারতের কঠোর সমালোচনা করতে হয়েছে। সেখানে যে দুটা শব্দ ভারতের জন্য খুবই বিব্রতকর সেটা হল – “Indian terrorism” “MASS BLINDING” এর নিন্দা। প্রথমটা সরকারি গুম, খুন নিপীড়ন এসবের সীমাছাড়ানি বলপ্রয়োগের তাই এটাকে সরকারি “সন্ত্রাস” বলা হয়েছে। আর পরেরটা  বিশেষ করে নাগরিক গ্রহণযোগ্যতা সীমার বাইরে গিয়ে ছররা গুলির প্রয়োগ[use of pellet guns by security forces ] যা মাথার খুলিতেও পর্যন্ত গিয়ে ঢুকে থাকে, তাই এর কড়া সমালোচনা।

অতএব ভারত ঐ দাওয়াতে গিয়ে খাদ্য আর প্রশংসাসহ যা যা কিছু গ্রহণ করেছিল তা এবার বমি করে উগরে বের করতে হয়েছে।  ভারতকে এবার “প্রত্যাখ্যানের” বিবৃতি দিয়ে তা বলতে হয়েছে। দা হিন্দু পত্রিকার শিরোনাম, India rejects OIC resolution on “Indian terrorism” in Kashmir। আর ওদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও এর রিপোর্ট করেছে। মূলত এদুই পত্রিকাতেই এটা ভাল রিপোর্টেড হয়েছে। এক্সপ্রেসের শিরোনাম হল, “OIC condemns ‘atrocities’, India says J&K internal matter”। অর্থাৎ ওআইসি কাশ্মীরে ভারত সরকারের নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণের নিন্দা করেছে।  আর এর জবাবে ভারত বলেছে, জম্মু-কাশ্মীরে যা কিছু ঘটে তা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানে হল বাইরের কেউ এতে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু তাহলে ভারত মধ্যস্থতা নিতে গিয়েছিল কেন, সে জবাব ভারত আমাদের দিচ্ছে না!

ওদিকে ওআইসির প্রস্তাবে, ভাঙ্গা বাবরি মসজিদের জায়গায় আবার তা নির্মাণ করে দেওয়ার আহবানও রাখা হয়েছে [… Indian government to rebuild the Babri Masjid in Ayodhya]। ফলে মোদী সরকারের জন্য এটা এক চরম বিপর্যয় অবস্থা।

বাকী বেশির ভাগ মিডিয়া এটাকে মোদী সরকারের “কূটনৈতিক বিপর্যয়” এর ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেছে। কিন্তু মিডিয়ায় কেন তা এত জোড়ালো হল? কারণ সুষমা স্বরাজ ওআইসিতে দাওয়াত পাওয়াতে সেটাকে খুবই গর্বের সাথে ভারত তা প্রচারে নিয়েছিল যে এটা পাকিস্তানকে কোনঠাসা করতে পারার কুটনৈতিক সাফল্য। এছাড়া যখন সুষমা দাওয়াত করার কথা উঠেছিল ওআইসির মধ্যে আভ্যন্তরীণ ভাবে তখন থেকেই পাকিস্তানের পরিরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা নিয়ে পাকিস্তান সরকারের আপত্তির কথা সরাসরি মিডিয়ায় তুলেছিল। এরই প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের অন্য ডেলিগেট সদস্যরা পরে যখন দুবাই সম্মেলন যোগ দিলেন তখন দেখা গেল তাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাদ রাখা হয়েছে। সম্ভবত কোন বিব্রতকর কিছু ঘটার সুযোগ রাখতে চায় নাই কোন পক্ষ। আর তাতেই ভারত এটাকে তাদের বিরাট সাফল্য বলার সুযোগ নিতে গিয়েছিল। এছাড়া ওআইসির প্রস্তাবে ইমরানের পাইলট ফেরত দেবার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা হয়েছে। এটাও ভারতের দেখানো সাফল্য – এবার ফুটা হয়ে যাবার আর একটা কারণ। সারকথায় ভারতের মোদী সরকারের মিথ্যা বা যুদ্ধবাজ প্রপাগান্ডা – ধর্মের কল মানে ন্যায়ের কলের বাতাসে নড়ে – এর মত আপনাতেই যেন ভেঙ্গেচুড়ে পড়েছে।
ফলে মোদীর উদাম ন্যাংটা হয়ে যেতে আর কিছুই যেন বাকি থাকে নাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০২ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদি আরো উদোম হয়ে গেছেন“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

গৌতম দাস

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xP

 

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]