মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

গৌতম দাস

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2xP

 

কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন

যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন
গৌতম দাস
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RC

 

 

যেকোনো আন্দোলন, বিক্ষোভ বা প্রতিরোধের পন্থা দেখা যায় – হয় সেটা গণ-আন্দোলন না হয়, সশস্ত্র তৎপরতায় পথে ঘটে। ভারতের দখলকৃত কাশ্মীরে জনগণের আন্দোলন শুরু থেকেই নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এটা সেখানে প্রতিষ্ঠিত যে ভারতের দখলের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গণ-আন্দোলনের পথ এখানে বেশি কার্যকর। আর সেখান থেকেই অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স নামে এক সামাজিক রাজনৈতিক জোটের জন্ম এবং এর নেতা হিসাবে সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক অথবা ইয়াসিন মালিক ইত্যাদি নামে গণ-আন্দোলন পন্থার নেতাদের আবির্ভাব। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সময়ে সশস্ত্রভাবে ভারতীয় সেনা ব্যারাকে গিয়ে দুটো সেনা মেরে আসার চেয়ে রাজপথের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী ও ফলদায়ক। সামরিকভাবে হামলার চেয়ে কার্ফু ভেঙ্গে রাস্তায় সাধারণ মানুষের নেমে আসা অথবা জানাজায় অংশগ্রহণ, কোন গৃহবধুর রাস্তায় নামা ইত্যাদি এগুলো অনেক বেশী শক্তিশালী। কাশ্মীরে দিল্লীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখানে উদোম করে চোখ আঙুল দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখানো সহজ হয়ে যায়। এই কারণ কাশ্মীরে সশস্ত্র প্রতিরোধ চলুক এটা দিল্লীর সরকারেরও পছন্দের দিক। দিল্লী তাই এই প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলার পথ একটাই – এদেরকে জঙ্গী বলে প্রপাগান্ডা করা। এরা জঙ্গি, পাকিস্তান থেকে আসা “সীমা পারকে আতঙ্কবাদী” অর্থাৎ কাশ্মীর ভারতের দখলকৃত থাকার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগণের কোন চাওয়া নাই, কোন প্রতিরোধ নাই – সব সমস্যার গোড়া হল “শান্তির” কাশ্মীরে পাকিস্তান থেকে পাঠানো সন্ত্রাসবাদ। এই বলে প্রপাগান্ডা করা। অতএব “ওরা জঙ্গী” এটা বলতে পারলেই একমাত্র ভারত সরকারের তাদেরকে সরাসরি গুলি করে মারার পক্ষে ন্যায্যতা হাজির করতে পারে। এসব কারণে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থার স্তরে গণ-আন্দোলন বেশী ফলদায়ক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বর্তমান স্তরে বলেছি, সব সময় বলি নাই।  কারণ কে না জানে বিজয় লাভ করতে হলে চুড়ান্ত দিনগুলোতে সাধারণত সশস্ত্র পথেই তা ঘটাতে দেখা যায়। কারণ সব পথ তখন একটাই, সশস্ত্র প্রতিরোধ, মোকাবিলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এর এক আদর্শ উদাহরণ। এগুলো সবাই জানে। কিন্তু যেটা মানুষ কম জানে বা খেয়াল করেনি, তা হলো ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলে একটি ব্যাপার আছে। ‘সফট ল্যান্ডিং’ ধারণাটি উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট, সেখান থেকে ধার করে এনেছি। এর মানে হল, উড়োজাহাজে যাত্রা আকাশে যতই আরামদায়কভাবে উড়ুক বা ঘটুক না কেন, সেটা আসল আরামদায়ক ভ্রমণ কি না, এর বিচার করা হবে ওই উড়োজাহাজের মাটিতে নামা মসৃণ ছিল কি না তা দিয়ে। অর্থাৎ মাটিতে নামার সময় ল্যান্ডিং বা নেমে আসাকে অবশ্যই কোনো বড় ঝাঁকুনি বা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে একেবারে মসৃণভাবে ঘটতেই হবে। নইলে সব বৃথা। ঠিক সে রকম আন্দোলন যদি গণ-আন্দোলন থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের স্তরে যাওয়ার সময় মসৃণ না হয়, পরিপক্ব হওয়ার আগে অস্ত্র ধরা হয় অথবা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্ত্র ধরা হয়- দুই ক্ষেত্রেই ওই আন্দোলন ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এতে তা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। উড়োজাহাজের  গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ার মত হবে।
কাশ্মিরের নিরস্ত্র গণ-আন্দোলন বিক্ষোভ প্রতিরোধ পঁচাত্তর দিনেরও বেশি কারফিউ অমান্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উরির ব্যারাকে হামলা করিয়ে কেউ না কেউ অপরিপক্ব অবস্থায় ওর মধ্যে সশস্ত্রতার আমদানি ঘটিয়ে দিয়েছে। কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ব্যারাক উরিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক হামলায় ১৮ জন সেনার মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারত দাবি করে যে, এই হামলা পাকিস্তান থেকে এসে ‘সীমা পার কি জঙ্গীরা’ করেছে। জবাবে স্বভাবতই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটা প্রমাণহীন এবং কোনো ইনভেস্টিগেশন বা তদন্তের আগেই করা প্রপাগান্ডা বলে দাবি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘‘পাকিস্তানের মাটি থেকে কোনও রকম অনুপ্রবেশ হয়নি।’’

কিন্তু আসল ব্যাপার হল, এমন দাবি আর পাল্টা দাবিতে কে ঠিক বলছে, তাতে আর কিছুই আসে যায় না। কারণ ভারতের নিট উদ্দেশ্য লাভ এতে ঘটে গিয়েছে। কাশ্মিরে লাগাতার প্রায় তিন মাস হতে চলা বিক্ষোভ আর সেটা মোকাবেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাম ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দিল্লি সরকার যখন ছেঁড়াবেড়া অবস্থা, তখন মোদির সরকার এখন স্থানীয়সহ গ্লোবাল মিডিয়াকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে যে, আসল ইস্যু ছিল কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন এবং এতে নির্যাতন-নিপীড়ন। তা আর আজ ইস্যু নয়। এখন ইস্যু হল ভারত-পাকিস্তানের বিবাদ। মূলকথা উরির সামরিক ব্যারাকে হামলা যেই করুক, কাশ্মিরে চলা গণ-আন্দোলনকে আড়ালে ফেলে ভারত-পাকিস্তানের সম্ভাব্য যুদ্ধকে সফলভাবে সামনে এনে ভারত গণ-আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করতে পেরেছে। আর এরই নিট বেনিফিট নিয়েছে, বেনিফিসিয়ারি হয়ে মোদি সরকার যুদ্ধের ঢোল পেটাচ্ছে। কি মজা!
গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই জানতে চেয়েছে, যুদ্ধ কি লেগে যাবে নাকি? তাদের আশঙ্কার বড় কারণ জানা গেল যে, শেখ হাসিনা সরকার এই ইস্যুতে ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলে বিবৃতিতে জানিয়েছে সেখান থেকে। ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলাতে আমাদের এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই সেকথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করে কথা বলা সহজ হয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত মানে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিডিয়ায় যা এসেছে, তাতে যুদ্ধ আসন্ন- এমন মনে করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে মূলকথা হল, সেনাছাউনিতে সশস্ত্র হামলার ঘটনার বেনিফিসিয়ারি হিসেবে মোদি ভারত-পাক যুদ্ধের দামামা তুলতে পেরেছে। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, উরির ঘটনার চিত্রনাট্য ইন্ডিয়ার নিজেরই তৈরি কি না। প্রথমে প্রশ্নটা তুলেছিল পাকিস্তানি মিডিয়া, পরে খোদ ইন্ডিয়ান মিডিয়া। এবিষয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, কিন্তু একই ভাবে উরি হামলার মুহূর্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমও। তবে সেই ভারতের মিডিয়া এই সন্দেহের কথা তুলেছিল কিছু ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের বরাতে, পরোক্ষভাবে। যেমন, ভারতের দাবি অনুসারে চারজন কথিত হামলাকারী জয়স-ই মোহাম্মদ জঙ্গি। ব্যারাকে জঙ্গি হামলায় পরে নাকি এরা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিটায়ার্ড এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কেকের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস প্রশ্ন তুলছে- এই চার জঙ্গির দাফনের জন্য কেন এত তাড়াহুড়া করা হলো। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, (“Should India have waited? ‘Hurried’ burial for Uri attackers raises eyebrows”) “দাফন করতে ভারতের দেরি করা উচিত ছিল।’ তাড়াহুড়া না করে এর বদলে তারা এই লাশগুলো সংরক্ষণ করে পাকিস্তানের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারত।

কপিল কেক পুরানা রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, এ ধরনের জঙ্গি হামলার ক্ষেত্রে সাধারণত ‘হামলাকারীদের মৃতদেহগুলা সংরক্ষণ করা হয়, পাকিস্তানকে তলব করা হয়, প্রমাণাদি পেশ করা হয়। মৃতের পরিবারকে খবর দিতে বলা হয়, যাতে তারা লাশ নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ কপিল বলছেন, কমন প্র্যাকটিস হলো… “এর আগে গত জানুয়ারি মাসে পাঠানকোট এয়ারবেজ হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের লাশ চার মাস ধরে রাখার পর দাফন হয়েছিল। আর ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় নিহত ৯ জন লস্কর-ই তাইয়্যেবা জঙ্গির লাশ প্রায় এক বছর মর্গে রাখা হয়েছিল। ২০০১ সালের পার্লামেন্ট ভবনে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় পাঁচ জঙ্গির লাশ দাফন করা হয়েছিল প্রায় এক মাস বাদে”। এ ছাড়া সব ক্ষেত্রেই লাশ নিয়ে গিয়ে দাফন-কাফন করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, যদিও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অথচ উরিতে শেষ রাতের এই হামলা ঘটে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর জানানো হলো যে, এই জঙ্গিরা সবাই পাকিস্তানি। এমনকি এ ক্ষেত্রে জঙ্গি হামলার লাশ দাফনের প্রচলিত জায়গাও বদলানো হয়েছে।
আবার ২১ সেপ্টেম্বরের হিন্দুস্তান টাইমস পাঁচটা পয়েন্ট তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, কেন পাকিস্তানে হামলা করা ভারতের জন্য সহজ হবে না। এ ছাড়া ওই রিপোর্টে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক কমিউনিটি কে কিভাবে দায়সারা করে এই হামলার নিন্দা করছে তা উল্লেখ করেছে। প্রায় প্রত্যেকেই শুধু হামলার নিন্দা করছে কিন্তু কেউ পাকিস্তানের নাম নেয়নি, দায়ী করে নাই বা উল্লেখ করেনি। এমনকি বাংলাদেশের নিন্দার বিবৃতিতেও পাকিস্তানের নাম নেয়া হয়নি। অর্থাৎ হামলায় ভারতীয় ভাষ্য বাইরের দুনিয়ার প্রায় সবাই এড়িয়ে গেছে, সম্ভবত এই দাবি প্রমাণসাপেক্ষ বলে। যেমন রাশিয়ার পুতিন মন্তব্য করেছেন কোনো দায়দায়িত্ব না নিয়ে খুব সাবধানে। বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী’। (stating: “We are also concerned about the fact that, according to New Delhi, the army base near Uri was attacked from Pakistani territory.”) আমেরিকানদের বক্তব্যও একই রকম সাবধানের, পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলেছে কাশ্মির (“an attack in the Valley”) ‘ভ্যালিতে যে হামলা হয়েছে আমরা তার নিন্দা করি”। – ওদিকে ব্রিটিশ সরকার উল্টা ডুবিয়েছে। উরি হামলার নিন্দা করে তারা বলেছে, ‘ইন্ডিয়া অ্যাডমিনিস্ট্রেডেট কাশ্মির’ (Uri as a part of “India-administrated Kashmir)। অর্থাৎ বলতে চেয়েছে যেন কাশ্মির ভূখণ্ডটি আসলে ঠিক ভারতের না।
ওদিকে বিবিসি ‘ভারত কি পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারবে?’ এই শিরোনামে ২০ সেপ্টেম্বর এক রিপোর্ট করেছে। লিখেছে, ভারতের একজন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অজয় শুক্লা মনে করেন, “নরেন্দ্র মোদি সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রেখেছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী হামলার বিপরীতে কড়া জবাব দেয়ার মতো সামরিক শক্তি এবং পরিকল্পনা তৈরি করেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। এখন মনে হচ্ছে সরকার তার নিজের বাগাড়ম্বরের মধ্যেই আটকা পড়ে গেছে”। অর্থাৎ মোদি কাশ্মিরের গণপ্রতিরোধ থেকে দেশি বিদেশি সবার চোখ সরাতে পেরেছেন ঠিকই, কিছু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বা মুডে নেই। ওই রিপোর্টের শেষ বাক্য হল, “অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ভারতকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সুচিন্তিত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বিপরীতে শুধু রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর করলে সেটি শুধু ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষতি করবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন”। অথচ ঠিক সেই সমস্যাই ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছেন মোদি।
মোদিসহ বিজেপি নেতারা এখন কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে, শনিবার ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী বিজেপির জাতীয় কমিটির সভা চলছে। ভারতের মিডিয়াতে এক নতুন শব্দের আমদানি হয়েছে- jingoism বা ‘জিঙ্গ-ইজম’। যার অর্থ উগ্র জাতীয়তাবাদী গরম কিন্তু ফাঁপা কথা বলে যুদ্ধের দামামা বাজানো। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ান গানবোটের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতির সপক্ষে একটা বাগাড়ম্বর গান লেখা হয়েছিল, সেখানে jingo বলে এক শব্দ ছিল। তাদের কারবারকে ঠাট্টা করতে “jingoism’ শব্দ দিয়ে তাদেরকে চিনানো শুরু হয়েছিল। তাই থেকে ‘জিঙ্গ-ইজম’ এই শব্দের উৎপত্তি। সমালোচকদের সবার অভিযোগ মোদিসহ দলের নেতারা ‘জিঙ্গ-ইজমে’ ভুগছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তবু এতে জনগণ দূরে থাক, নিজ বিজেপি দলের কর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা জবাব দিতে পারছেন না নেতারা। আনন্দবাজার গত প্রায় দশ দিনের বেশি হবে কাশ্মির ইস্যুতে সরকারের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কাহিনী নিয়ে বিস্তারিত লিখে চলছিল। শনিবার ২৪ তারিখের আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক সম্পাদকীয়তে দুঃখ জানিয়ে লিখছেন, ‘যুদ্ধের বিরোধিতাও যেন দেশদ্রোহিতার নামান্তর!’ এরপর ওইদিনের এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “কড়া জবাব কোথায়, ফুঁসছে বিজেপি, নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদি এখন নিজ দলের কর্মীদের সামলাতে হয়রান হয়ে গেছে – নিজের কর্মীরাই ফুঁসছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল প্রথম দিনেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন যিনি, তার গলাতেই আজ নরম সুর”। এটা বলতে আনন্দবাজার বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের কথা বুঝিয়েছে। মোদির সবচেয়ে বিশ্বস্ত লাঠি হল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। আর তাঁর পরের ব্যক্তিত্ব, মূল সংগঠন ‘সঙ্ঘ পরিবার’ থেকে এসে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক এই নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন রাম মাধব। তিনি এক গরম বক্তৃতায় আগের দিন ‘দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল’ খুলে নেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই বরাতে আনন্দবাজারের ওই কথা। রিপোর্টে আনন্দবাজার এর পরে লিখেছে, “পাকিস্তানকে জবাব দিতে কূটনীতি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপের হদিস দিতে পারেননি” রাম মাধব। অসন্তুষ্ট ক্ষুব্ধ দলের কর্মীদের চাপের মুখে পরে দলের আরেক সচিব শ্রীকান্ত শর্মা বোঝানোর চেষ্টা করেন, “প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনার তরফে গোড়া থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেনাকে পদক্ষেপ করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এবার সেনা কিভাবে কাজ করবে, সেটি তাদের এখতিয়ারে পড়ে। এর বেশি আর কী করা যেতে পারে এ মুহূর্তে?” – আনন্দবাজার থেকে কোট করে আনা কথাগুলো।  ওদিকে কাশ্মীর ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রীর মতভেদ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কয়েকটা গুরুত্বপুর্ণ সভায় উপস্থিত থাকেন নাই এমন রিপোর্টও ভারতীয় মিডিয়ায় এসেছে।  কেরালায় বিজেপির অভ্যন্তরীণ ঐ সভার প্রথম দিন পাকিস্তান প্রসঙ্গে মোদি কী করতে চান, তা তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি কোঝিকোড়ে শহরে এক জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ওই বক্তৃতা থেকে কোট করে তা দশটা পয়েন্ট হিসেবে তুলে এনে ছাপিয়েছে। এই দশটা পয়েন্ট পড়লে যে কেউ বুঝবে মোদি পাকিস্তানের সাথে কোনো যুদ্ধের চিন্তা করছেন না, এটা তার মাথাতেই নেই।

ওই দশ পয়েন্টের দ্বিতীয় এবং সাত থেকে দশ নম্বর পয়েন্ট- এগুলো পড়লে যে কেউ এটা বুঝবে। দ্বিতীয় পয়েন্টটি হল, ‘উরিতে যে আঠারোজন সেনা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করবে”। (Indians will never forget the gruesome act of killing 18 soldiers in Uri.) অর্থাৎ সম্ভবত এর মানে হল, ওই আঠারোজনই সবচেয়ে বড় সংখ্যার ‘শহীদ’। এরা ছাড়া আগামিতে আর কোন সেনা শহীদ হচ্ছে না। মোদি ইতোমধ্যে তা জেনে গেছেন। আর ওই আঠারোজনের জীবনের বিনিময়েই মোদী কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হলেন- সেজন্য কি? এর জবাব আগামীতে পরিষ্কার হবে।
পরের সাত ও আট নম্বর পয়েন্টে দেখা যাচ্ছে মোদি পাকিস্তানের সরকারের বদলে পাকিস্তানের জনগণের সাথে কথা বলতে চাইছেন। সেজন্য তাদের অ্যাড্রেস করে বক্তব্য রেখেছে। কংগ্রেস মোদীর বক্তৃতার সেদিকটাতে খোচা দিতে পরেরদিন টিপ্পনি করে বলেছে, মোদী সম্ভবত আগামি নির্বাচন “পাকিস্থান থেকে লড়বেন”।  অর্থাৎ সার কথা হল, তিনি যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছেন না, এর ইঙ্গিত সেটা। যেমন সাত নম্বরের প্রথম বাক্যটা হল, তিনি “পাকিস্তানের জনগণকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন- আসেন একটা যুদ্ধ লড়ি।’ এটুকু পড়ে পাঠকের মনে সামরিক যুদ্ধের কথাই ভেসে উঠবে। কিন্তু না, মোদি সামরিক যুদ্ধের কথা বলছেন না। পরের বাক্যে জানা গেল যে – “কে কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এরই প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে জেতার চ্যালেঞ্জ” দিচ্ছেন তিনি। বলছেন, “এটা হবে কে আগে বেশি চাকরি সৃষ্টি করা, দারিদ্র্য দূর করা আর শিক্ষার হার বাড়াতে পারে- এরই চ্যালেঞ্জ”। এ কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, তিনি আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের বয়ানে৪ও নাই। এখন “উন্নয়নের” (তার শ্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’) চিন্তার ভেতরেই সরে আসতে চাইছেন। যুদ্ধে যাওয়ার মানে উন্নয়ন-বিরোধী কাজ, (যা তিনি করেছেন সব ডুবে যাবে, সব বেপথে যাবে- এটা পরিষ্কার করে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ফলে মোদির পরিষ্কার যুদ্ধবিরোধী পথের ইঙ্গিত।
আট নম্বর পয়েন্টও একই ইঙ্গিত। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের জনগণের তাদের নেতাদেরকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, “আমরা দুই দেশ একই সময়ে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আমরা করি সফটওয়্যার রফতানি আর পাকিস্তান করে সন্ত্রাসবাদ রফতানি, কেন”। অর্থাৎ একই চিন্তা কাঠামোর বক্তব্য- “যুদ্ধ বনাম উন্নয়ন আর তিনি উন্নয়নের পক্ষে”। এরপর ৯ নম্বর পয়েন্ট। এটা হলো পাকিস্তান বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ কী করবেন, সে প্রসঙ্গে। এক কথায় বললে, কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং এটাই হবে সেই সর্বোচ্চ করণীয়। তিনি পাকিস্তানকে পশ্চিমাসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, কূটনীতি তার পথ।
শেষে দশ নম্বর পয়েন্ট। এটা বদ দোয়া দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। মোদি বলছেন,”একদিন পাকিস্তানের জনগণ নিজ ঘরের তৈরি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে”। যুদ্ধের ভুয়া দামামা বাজানোর চেয়ে তবুও এটা ভালো নিঃসন্দেহে। দশ পয়েন্টের সারকথা, যুদ্ধ বনাম উন্নয়নে মোদি উন্নয়নের পক্ষে।
আনন্দবাজারের রিপোর্টের শেষ দুই বাক্য এ রকম- “পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি এই বিদ্রোহী নেতাদের আগামীকাল সংবর্ধনা দেবেন। তার পরই “গরিবি হটাওয়ের স্লোগান দেবেন তিনি। লক্ষ্য, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাবের ভোট”। অর্থাৎ লক্ষ্যণীয় যে মোদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা পরিচয় করাচ্ছে এই বলে যে, তিনি হলেন- ‘পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি।’ এরপর আর কোনো মন্তব্য নিঃপ্রয়োজন। যুদ্ধ বিষয়ে কোনো খবর আর নেই। কাজকর্ম যেমন চলছিল, তেমনি রুটিন। সামনের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, আর এর কৌশল নির্ধারণ। বিজনেস এজ ইউজুয়াল! আসলে হিন্দুত্ত্ব – এর শ্লোগান তুলে ভোটের বাক্স ভরে তোলা যায় হয়ত তবে যুদ্ধের বাজারে এই শ্লোগান একেবারেই অচল। কোনই কাজে আসে না, উলটা মিথ্যার ভান্ড ফুটে যাবার  বিপদ ঢেকে আনে। বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে ২৬ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

 

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা
গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর  ২০১৬, সোমবার ০০ঃ০১

http://wp.me/p1sCvy-1R1

ভারতের জন্মের শুরু থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বিস্তর চড়াই-উতরাই আছে। কখনো তা চরম তুঙ্গে, আবার কখনো তুলনামূলক শীতল। কিন্তু এবারের চরম অবস্থা নিজগুণেই যেন তুলনাহীন। টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৭ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে রিপোর্টে জানাচ্ছে, কাশ্মিরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া চলমান কারফিউ ২৭ আগস্টে পঞ্চাশতম দিন পূর্ণ করেছে। কিন্তু পুরা ঘটনার বেজ-ফ্যাক্টস মানে, কী থেকে ঘটনা স্ফুলিঙ্গে রূপ নিল সেটা কী? সেটা ভারত সরকারের ভাষায় বলা যাক। ভারতের এনডিটিভির খবর অনুবাদ করে আমাদের বাংলা ট্রিবিউন কী ছেপেছে সেটা দেখে নেয়া যেতে পারে।  সেই ভাষ্যটা হল,  হিজবুল মুজাহিদিন নামে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠনের নেতা বুরহান ওয়ানী গত ৯ জুলাই ২০১৬ ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। তার ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়া রাজনৈতিক গণ-অসন্তোষ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কারফিউ অমান্য করেছিল জনগণ এবং জানাজায় অংশ নেয়া থেকে অসন্তোষ ও এর তীব্রতা শুরু। আর তা এবার ৫০ দিন পূর্ণ করল। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত দিয়ে তৈরি। এই শব্দ দিয়ে আমরা অনেক কিছু ঘটনা বুঝে ফেলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আমাদের পরিচিত এই বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে ব্যাপারটা বুঝানো হল। যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়া সুনির্দিষ্ট করে ‘এনকাউন্টার’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এটা ভারতীয় গণমাধ্যমের শব্দ। অপর দিকে যে শহরে ৫০ দিন টানা কারফিউ দিয়ে রাখতে হয়, সেখানকার জনজীবনের অবস্থা কী, মানুষের আয়-ইনকাম দিন এনে খায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সরকার সবসময় যথেচ্ছাচার বলপ্রয়োগে দাবড়ে সমাধান করে এসেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। কিন্তু এবার বুরহান এনকাউন্টারের পরের পরিস্থিতি যে এমন অগ্নিরূপ ধারণ করবে, কারফিউ দিলেও যে তা ভেঙ্গে মানুষ বুরহানের জানাজায় অংশগ্রহণ করে বসবে এগুলো তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কাশ্মীরের রাজ্য সরকারে উপরে কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনীর রুস্তমি চলে থাকে। এজন্য আইনগত ভাবেই সামরিক বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিগত ১৯৫৮ সালের এক আইনে (ওটা প্রথম আইন আসামের নাগাদের জন্য ছিল। পরে ঐ আইনের আদলে ১৯৯০ সালে বিশেষ করে কাশ্মীরের জন্য এক আইন প্রনয়ন করা হয়) যার নাম Armed Forces (Special Powers) Acts (AFSPA)। ফলে বলা যায় এই বাহিনীই এই প্রথম কার্যত পর্যদুস্ত হয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার এই বিষয়ে একটা রিপোর্ট লিখেছে যার শিরোনাম, “কোন পথে উপত্যকায় শান্তি আসতে পারে, হাতড়ে বেড়াচ্ছে নয়াদিল্লি”।  যেখানে ভারতের গোয়েন্দা-নিরাপত্তা মহলের হারু ও পর্যদুস্ত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আনন্দবাজার সেখানে লিখছে,  “প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামলাতে না পারার জন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে কেন্দ্র। এক জন জঙ্গির মৃত্যুর প্রতিবাদে কাশ্মীরে যে এত বড় মাপের অশান্তি হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও ধারণাই ছিল না গোয়েন্দাদের। এমনকী দিল্লিতে বসে শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তারা দাবি করেছিলেন,বিক্ষোভ সাময়িক। দশ দিনেই থেমে যাবে। তা যে কবে থামবে,সে ধারণাও নেই কারও! উপত্যকার অশান্তি সেটাই!”।খুব সহজে কাতর হন না এমন ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর গায়েও আঁচ লেগেছে। আর চুপ থাকা যায়নি এবং আনন্দবাজারের রিপোর্ট তা ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলা যায়। এসব পরিমাপের দিক থেকে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও কাশ্মিরের এবারের ঘটনায় আর চুপ থাকতে পারেননি। আনন্দবাজারের ভাষ্যটাই তুলে আনছি, এক টিভি সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেছেন,

“সরকার এতটাই খারাপভাবে কাশ্মির-পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে যে এটাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপরে সবচেয়ে বড় দাগ হিসেবেই দেখছে গোটা বিশ্ব”। চার দিক থেকে সবাই বিষয়টিকে সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে নাড়াচাড়ার ত্রুটি হিসেবেই দেখছে তাতে সন্দেহ নেই। সেটা এখানে তুলে ধরতে একটু বড় এক উদ্ধৃতি আনন্দবাজার থেকে আনছি। লিখেছে “সমালোচনা হচ্ছিলই। কাশ্মিরের উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দুষছিল মোদি সরকারকে। আরএসএস নেতাদের একাংশও মনে করছেন, কাশ্মিরের পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলানো হচ্ছে না। কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এভাবে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে মুখর হওয়ায় চাপ আরো বাড়ল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার সরকারের ওপরে। কাশ্মিরিদের মধ্যে যে দেশের বাকি অংশ সম্পর্কে নানা রকম মত রয়েছে, সে কথাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য। কিন্তু সেই বাস্তবতার নিরিখেও সরকার যে ভূমিকা নিচ্ছে, অমর্ত্যরে মতে সেটা বড় রকমের ভুল। এই সূত্রে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, কাশ্মিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা জরুরি। তবে সেটাই কাশ্মিরিদের মূল সমস্যা বলে ধরে নেয়াটা ভুল। …অমর্ত্য সেনের এই সমালোচনার জবাবে সরকারের তরফে কেউ মুখ খোলেননি তাৎক্ষণিকভাবে। এবং ভূস্বর্গে অব্যাহতই রয়েছে অশান্তি। দক্ষিণ কারের কাজিগুন্দে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে গুরুতর জখম আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে আজ। এই নিয়ে ১১ দিনে উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৪৪। তবে গুলি চালনার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।”

আনন্দবাজারের এই রিপোর্ট গত ২০ জুলাইয়ের। ফলে নিহতের সংখ্যা এটা সর্বশেষ সংখ্যা নয়। কারফিউর ৫০তম দিনে মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৬৯ জন।
এক কথায় বললে মোদি সরকার এবারের কাশ্মির ইস্যুটি নিয়ে বড়ই পেরেশান আর বেকায়দায় আছে। বেকায়দায় পড়লে মানুষ আরো উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। এখানেও তাই হয়েছে। আর সেটাই এখানে  আমাদের এই রচনার মুল প্রসঙ্গ।

তবে ঘটনাস্থল এবার ঠিক কাশ্মীর নয়। কাশ্মীর থেকে ব্যাঙ্গালোরে, যদিও ইস্যু সেই একই কাশ্মীর। ব্যাঙ্গালোরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের’ (এআই) শাখা অফিস কাশ্মিরে মানবাধিকার ইস্যুতে এক সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
কিন্তু বিজেপির ছাত্রসংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের’ (এভিবিপি) অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে, তাদের আয়োজিত ঐ কাশ্মির বিষয়ক সেমিনারে ভারতের বিরুদ্ধে ও ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে লাগাতার স্লোগান দেয়া হয়েছে। তাই অ্যামনেস্টি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে এর পরের দু-তিন দিন ধরেই ব্যাঙ্গালুরুতে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিজেপির ছাত্র শাখা। যদিও জবাবে অ্যামনেস্টি দাবি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনার কোনো ভিত্তিই থাকতে পারে না।
ঘটনার সূত্রপাত সেমিনারের একজন বক্তা, কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিত নেতা আর কে মাট্টু দাবি করেছিলেন “ভারতীয় সেনার মতো সুশৃঙ্খল বাহিনী দুনিয়াতে কমই আছে”। এই তথ্যগুলো নিয়েছি ভারতীয় বিবিসির ১৬ আগস্টের এক রিপোর্ট থেকে। ব্যাঙ্গালুরুতে ঐ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল এর আগের শনিবার, মানে ১৩ আগস্ট। ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কিছু কাশ্মীরি ছাত্র, যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করেন। ফলে হিন্দু পণ্ডিত নেতা মাট্টুর ওই বক্তব্যের পর সভায় উপস্থিত কাশ্মীরি যুবকেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন, তাঁরা কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করেন। আসলে ঐ সভায় হিন্দু নেতা আর কে মাট্টুসহ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের উপস্থিতিও গণ্ডগোল লাগানোর দিক থেকে পরিকল্পিত বলা যায়। দাওয়াতি না হয়েও তারা গণ্ডগোল পাকানোর উদ্দেশ্যে সভায় শুরুতে দলবেঁধে ওই সভায় প্রবেশ করেন। এরপর উসকানিমূলকভাবে কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর তৎপরতার পক্ষে উগ্র ও কড়া সাফাই বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দিয়েছিল তারা।
কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের পর ঘটনা পরিকল্পনায় মঞ্চে হাজির হয় এভিবিপি। পরের দিন গুলোতে  বিজেপির ছাত্র শাখা এভিবিপি, তারা ঐ অনুষ্ঠানে স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে এবং শহরে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে মিছিল করে জনমত খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে তাঁরা ব্যাঙ্গালুরু অ্যামনেস্টির অফিসে হামলা করেছিল। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে পুলিশের ওপর উলটা চাপ সৃষ্টি করে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা’ করে।
এ বিষয়ে বিবিসি তাদের রিপোর্টে লিখেছে, অনেকটা তাদের চাপের মুখেই ব্যাঙ্গালুরুর পুলিশ ‘অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার’ বিরুদ্ধে দেশদ্রোহসহ আরো নানা অভিযোগে এফআইআর দাখিল করে। এ ছাড়া বিবিসি আরো লিখেছে, বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা সাকেত বহুগুনা বলছেন, “অ্যামনেস্টি ও তাদের মতো আরো কিছু এনজিও বারবার এটাই বলে চলেছে কাশ্মিরে সব সমস্যার মূলে আছে ভারতীয় সেনা। তারা এমন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে যে, কাশ্মিরের মুসলিমরা সেনাদের হাতে নির্যাতিত। তাদের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে, এখন বলুন কোন দেশ এটা সহ্য করবে যে, তাদেরই একটা অংশকে আলাদা করে ফেলতে প্রকাশ্যে উসকানি দেয়া হচ্ছে?’।
কাশ্মির ইস্যুতে সাধারণভাবে বিজেপির অবস্থান হল, যেভাবে সাকেত বহুগুনার বক্তব্যে দেখা গেছে, মোটা দাগে সেটাই। কাশ্মিরের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠলেই সেটাকে তারা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ বলে অভিযোগ আনে। সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে তারা জনমনে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করে থাকে।
উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগিরে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন যে কাশ্মিরের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠালে তা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ হতেও পারে। কিন্তু না, এটা রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ নয়। এটা আমার কথা নয়, এ নিয়ে বহু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার বক্তব্য ও ঐ ধরণের বহু মামলায় বেকসুর খালাসের রায় আছে। আশির দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রথম এমন রায় দিয়েছিলেন। যা পরে অন্যান্য অনেক ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা হিসেবে কোর্টের সামনে আনা হয়েছিল। এখানে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার সীমা টেনে দেয়া লাইন হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের স্লোগান – সেটা কাশ্মিরের স্বাধীনতা চাই অথবা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা চাই; যা-ই তোলা হোক এগুলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ’ ঘটে এমন কাজ নয়। স্বাধীনতার দাবি করে স্লোগান দিলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না। তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অথবা সেনাবাহিনী যার বিরুদ্ধেই স্লোগান হোক না কেন। তবে একমাত্র কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে স্লোগান দিলে বা সশস্ত্র সাংগঠনিক তৎপরতা চালালে বা সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন চালালে তা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহ হবে।
বিজেপি এই রায়ের কথা জানে। তবুও সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে হাজির করে আবেগ থেকে ফায়দা নিতে চাওয়া তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশল। তারা বলছে, ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে। এখন বলুন, কোন দেশ এটা সহ্য করবে?’ – হ্যাঁ, ভারত রাষ্ট্রই এটা সহ্য করবে, নিরস্ত্র হলেই করবে। করতে হবে এটাই সুপ্রিম কোর্টের রায়। সেনাবাহিনী অন্যায় করলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে, যদি তা নিরস্ত্র হয় এবং তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে না।

ওদিকে ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনার আরেক তামাশার দিক আছে। কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু (পুরানা নাম ব্যাঙ্গালোর)। এর রাজ্য সরকার বা প্রাদেশিক সরকার হল কংগ্রেস দলের ফলে এর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসি। বিবিসি তাদের ওই রিপোর্টে বলছে, “কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া আবার যুক্তি দিচ্ছেন, একটা সভায় দেশবিরোধী স্লোগান ওঠার পরও সরকার হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না। তাই বিষয়টি নিয়ে তার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে”। অর্থাৎ একজন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তিনিও বিজেপির রাজনীতি অনুসরণ করে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, পছন্দ করছেন। কেন? তিনি তো বিজেপি করেন না, কংগ্রেস দল করেন ও সেই দলের মুখ্যমন্ত্রী! তাতে কী? তিনিও বিজেপির সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে জনমনে বিভ্রান্তি জাগানোর বিরুদ্ধে দাড়াতে, সত্য বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিজেপি হিন্দুত্বের জিগিরের এমনই এক আবহাওয়া তৈরি করে ফেলেছে। ফলে তিনি কিছুতেই ঐ  হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ারের সামনে দাড়াতে চাচ্ছেন না, এতে তিনি অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ার তুলে এর সামনে ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীকেও বিজেপির রাজনীতি করতে বাধ্য করেছে বিজেপি। অথচ সব দলই জানে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা বা অভিযোগ কোনো হাইকোর্ট আমল করবেন না, বেকসুর খালাস দিয়ে দেবেন। কিছু দিন আগে দিল্লীতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা কাহানাইয়ার মামলাতেই একই ঘটনা হয়েছিল। মামলা চলে নাই। কাহানাইয়া এখন মুক্ত কিন্তু কয়েক মাস তাকে জেলে থাকা সহ বিশাল হয়রানী পোহাইতেই হয়। অর্থাৎ আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ নিতে, হয়রানির রাজনীতি করতে কংগ্রেস বিজেপির থেকে প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে থাকতে চায় না। এই হলো হিন্দুত্বের রাজনীতি, এই তার মহিমা।
হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা এতই যে, বিবিসি লিখেছে, ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিলেও দিল্লিতে দলের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলছেন, “একটা প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলা যায় কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ আছে”।
মি. সিংভির বক্তব্য, ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি দেয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর হতেই পারে, কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা বোধ হয় সমীচীন নয়।’ ‘কোনো ব্যক্তি হয়তো তার বাকস্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটা সংস্থাকে এভাবে অভিযুক্ত করা ভুল বলেই আমার ধারণা।’ অর্থাৎ কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি জানেন বুঝেন নিজেই এটাকে ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি’ দিয়ে নাচা বলছেন। এর পরও হিন্দুত্বের রাজনীতি করার লোভ না ছেড়ে বরং চিকনে মেরে ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই’ বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা ছাড়তে চাচ্ছে না। যাতে এ-ও হয় সে-ও হয়, এমন একটা ঝাপসা অবস্থান থাকে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

লেখাটা এর আগে গত ২৮ আগষ্ট দৈনিক নয়াদিগন্তে অনলাইনে (প্রিন্টে ২৯ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে আপডেট ভার্সান হিসাবে এখানে আবার ছাপা হল।